জনতার মঞ্চ (People's Platform)
জনতার মঞ্চ (People's Platform)
বক্তব্য শুরু করার আগ মূহুর্তে এই কয়েকটি বিষয় সবসময় মাথায় রাখবেন। এতে পরের ধাপটুকু আরও অনেক সহজ হয়ে যাবে।
আত্মবিশ্বাস রাখুন
সর্বপ্রথম মনের মাঝে আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে যে, আমি পারব। কারণ, যদি কনফিডেন্স না থাকে তবে, বক্তব্য শুরু করতে পারবেন না। মাথার মধ্যে যে কথাগুলো বলার জন্য ঘুরঘুর করে, তাও গুলিয়ে যাবে।
দর্শক বুঝে নিন
এর মানে হলো সেখানকার দর্শকরা ঠিক কেমন ধরনের, মানে তারা কী ধরনের মানুষ, কেমন বিষয় সম্পর্কে শুনতে আগ্রহী তা বুঝে নেয়ার চেষ্টা করুন। তাহলে সহজেই মনের খচখচানি দূর হবে।
মনে করুন আপনি কোন একটি কক্ষে দাঁড়িয়ে আপনার বক্তব্য উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন। এমন অবস্থায় যদি কিছু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকে তবে, আপনি তাদেরকে খুব স্বাভাবিকভাবে কোনো গল্প থেকে কিংবা অন্য কিছুর মাধ্যমে আকর্ষণীয় করে তারপর আপনার বক্তব্যটা শুরু করতে যাবেন। যাতে তা শিশুদের উপযোগী হয়।
আবার যদি কোন মাধ্যমিক বিদ্যালয় বা কলেজের স্টুডেন্ট থাকে তবে সে ক্ষেত্রে আপনি আরও অন্য রকম ভাবে মানে আরো একটু বিস্তারিতভাবে তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করবেন।
আর যদি তারা প্রাপ্তবয়স্ক হয় মানে তাদের বয়স যদি একটু বেশি হয় তবে সেখানে আপনার বক্তব্য তাদেরকে তাদের সময়োপযোগী ভাবে আপনার বক্তব্য প্রদান করতে হবে। যাতে তারাও আপনার কথাগুলো সঠিক ভাবে বুঝতে পারে। যেহেতু দুই পক্ষের জেনারেশন এক নয়।
কল্পনা করুন
আপনাকে কল্পনা করতে হবে যে, আমার কথাগুলো এখন অনেকে শুনবে। আমি অনেক বড় কোনো জায়গায় আছি। বিরাট মঞ্চে আছি। আমাকে দৃঢ় কন্ঠে নম্রভাবে কথা বলতে হবে।
কন্ঠের দিকে লক্ষ রাখুন
আপনি যখন আপনার বক্তব্য দেয়া শুরু করবেন, তখন আপনার কন্ঠের দিকে খেয়াল রাখবেন। যেমন ধরুন আপনি বক্তব্য শুরু করার আগ মূহুর্তে যদি টের পান যে গলা শুঁকিয়ে যাচ্ছে, তবে একটু পানি খেয়ে তবে স্টেজে উঠবেন। কারণ বক্তব্যের শুরুতেই যদি গলা ধরে ওঠে বা বিরক্তিবোধ হয় তবে পরের অংশটুকুও বলতে পারা কষ্টকর হয়।
কন্ঠের উঁচু নিচুর তারতম্য লক্ষ করুন
আপনি যখন বক্তব্য দেয়া শুরু করবেন তখন উঁচু গলায় কথা বলা শুরু করবেন না। এতে শ্রোতারা বিরক্ত হয়। আবার একদম নিচু গলায়ও ধীরে ধীরে কথা বলা শুরু করবেন না। স্বাভাবিক কন্ঠে কথা বলার চেষ্টা করবেন।
কথার মাঝে উত্তেজিত হয়ে যাবেন না। প্রথম থেকেই তাই স্বাভাবিক ভাবে কথা বলা শুরু করবেন। হঠাৎ করে কর্কশ কন্ঠে কথা বলা শুরু করলে সে বক্তব্য কারো জন্য আকর্ষণীয় হয় না। তাই একদম নরমাল স্পিডে কথা বলবেন।
শ্বাস স্বাভাবিক রাখবেন
অনেকেই আছেন যারা বক্তব্য দেওয়ার সময় কথা বলতে গিয়ে একটানা লম্বা লাইন বলতে চান এবং লম্বা শ্বাস প্রশ্বাস নিয়ে থাকেন। দেখা গেছে তখন তাদের কথার মাঝে ব্যাঘাত ঘটে এবং একপর্যায়ে তাদের কথাটা থেমে যায় কিন্তু সেখানে লাইনটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। অর্থাৎ এই বক্তব্যটি শ্রুতিমধুর হয় না।
শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রেখে তবেই বক্তব্য শুরু করতে হবে। একসঙ্গে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস ফেলবেন। তারপর বক্তব্য শুরু করবেন। শ্বাস নেয়ার বিষয়টিই বক্তব্যে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপনাদের বক্তব্য শুরু থেকে শ্বাস ঠিক রাখতে না পারেন, তবে পুরো বক্তব্য মাধুর্যহীন হয়ে যাবে। আপনি স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস ফেলবেন এবং স্বাভাবিকভাবে আবার গ্রহণ করবেন।
নিজের মহত্ত্ব দিয়ে বক্তব্য শুরু করবেন না
অনেকেই বক্তব্যের শুরুতে নিজের মহত্ত্ব, ক্ষমতা নিয়ে কথা বলেন। উদাহরণ স্বরূপ,
” তোমরা জানো তো আমি কে? আমি এই সেই, অমুক তমুক। আমি আজ তোমাদের সামনে এই নিয়ে কথা বলব। তোমরা ভাগ্যবান যে আমার কথা শোনার সুযোগ পেয়েছ। আমার বাপের অনেক টাকা। আমার টাকা পয়সার অভাব নাই। বাংলাদেশের সবাই, আমার নিকট ঋণী”
এসব কথা দিয়ে কখনো বক্তব্য শুরু করবেন না। এতে আপনার কথার প্রতি অন্যদের আর আকর্ষণ থাকবে না। বরং একজন স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে বক্তব্য দিন।
দুশ্চিন্তা করবেন না
আপনি বক্তব্য দেয়ার সময় কোনো প্রকার দুশ্চিন্তা করবেন না। মনের মাঝে অন্য কোনো বিষয় নিয়ে ভাববেন না স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করবেন। বক্তব্য শুরু করার সময় আপনাকে পুরোপুরি দুশ্চিন্তা মুক্ত থাকতে হবে।
বক্তব্য কিভাবে শুরু করবেন
সালাম দেয়া
বক্তব্য শুরু করার সময় আপনার প্রথম কাজ হলো সালাম দেয়া। আপনি যদি মুসলমান হন তবে “আসসালামু আলাইকুম” বলে বক্তব্য শুরু করবেন। আর যদি অন্য কেনো ধর্মের অবলম্বী হন, তবে আপনার ধর্ম অনুযায়ী আপনি তাদের কল্যান কামনা করবেন। এই কাজটি আপনি দুইভাবে করতে পারবেন।
আপনি চাইলে সালাম একটু পরে দিতে পারেন। এসময় আপনি দুই ভাবে বক্তব্য শুরু করবেন।
প্রথমত,
“আসসালামু আলাইকুম। আশা করি আপনারা উপস্থিত সকলে ভসলো আছেন। আজকে এখানে উপস্থিত……… [যারা উপস্থিত থাকবে তাদের নাম বা উপাধি (সভাপতি, চেয়ারম্যান) বলবেন] সকলকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন / শুভেচ্ছা। “
দ্বিতীয়ত,
“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। আশা করি আপনারা উপস্থিত সকলেই সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে ভালো আছেন। ‘ক’ (যে অনুষ্ঠান উপলক্ষে আয়োজিত সে অনুষ্ঠানের নাম) এর জন্য আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত সভাপতি, চেয়ারম্যান, অভিভাবকবৃন্দ, আমার ছোট ও বড় ভাই ও বোনেরা সকলকে আসসালামু আলাইকুম। “
এই দুইটি উপায়ে আপনি সালাম দিয়ে আপনার বক্তব্য শুরু করতে পারেন।
Storytelling
পৃথিবীর অনেক বড় বড় ব্যক্তিরা, বক্তব্য শুরু করার ক্ষেত্রে Storytelling ফরমুলা অনুসরণ করে। মানে একদম শুরুতেই একটা গল্প দিয়ে শুরু করে। এতে করে, শ্রোতাদের আকর্ষন সৃষ্টি করা যায় বক্তব্যের মধ্যে। যে টাইপের অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিবেন, সে অনুষ্ঠান সম্পর্কিত গল্প দিয়ে শুরু করতে পারেন।
উপস্থিত সকলের কথা বলবেন
অনুষ্ঠানে বা বক্তব্যের স্থানে যারা উপস্থিত থাকবেন তাদের নাম বা উপাধি উল্লেখ করবেন।
” আসসালামু আলাইকুম। এই আলোচনা সভায় উপস্থিত সম্মানিত সভাপতি, চেয়রাম্যান এ এফ সি, উপস্থিত অভিভাবকবৃন্দ ও সকল শিক্ষার্থীদেরকে আমার পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা। “
অনুষ্ঠানের কথা বলা
আপনি ঠিক যে কারণে বক্তব্য দিতে এখানে উপস্থিত হয়েছেন সে কারণের কথা উল্লেখ করবেন।
” আসসালামু আলাইকুম। আজ আমি এই মঞ্চে আমাদের “স্বাধীনতা দিবস” উদযাপন উপলক্ষে দুই একটি কথা বলতে চাই।…..”
“আসসালামু আলাইকুম। আজ “ঈদে মিলাদুন্নাবীর জন্য দোয়া মাহফিল” এর এই আয়োজনে আমি কিছু কথা বলতে যাচ্ছি। “
কী কর্তৃক আয়োজিত তা উল্লেখ করবেন
অনুষ্ঠানটি কীসের মাধ্যমে আয়েজিত হয়েছে তা উল্লেখ করবেন।
” আসসালামু আলাইকুম। এবিসি মাধ্যমিক বিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে আমি এই বিষয়ের (যে বিষয় নিয়ে বক্তব্য প্রদান করবেন) উপর একটি বক্তব্য প্রদান করতে যাচ্ছি। “
“আসসালামু আলাইকুম৷ আশা করি সকলেই ভালো আছেন। আজ এই সভা উপস্থিত সম্মানিত সভাপতি, পরিচালক, উপস্থিত অভিভাবকবৃন্দ ও সকল শিক্ষার্থীদেরকে আমার পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা। এবিসি মাধ্যমিক বিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে আমি আজ প্রিয় শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য কিছু কথা বলতে চাই।……”
১ সম্ভাষণ : ভাষণ বা বক্তব্যের শুরুতেই উপস্থিতিদের যথাযথভাবে সম্বোধন করতে হবে। ভাষণ যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো অনুষ্ঠান উপলক্ষে লিখতে বলা হয়, তাহলে সেখানে অধ্যক্ষ, শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অতিথিও থাকতে পারেন। তাই ভাষণে তাদের উদ্দেশ করে সম্ভাষণ করতে হবে।
যেমন—মাননীয় প্রধান অতিথি/শ্রদ্ধেয় অধ্যক্ষ ও উপস্থিত শিক্ষকবৃন্দ/প্রিয় ছাত্র-ছাত্রী ভাই-বোনেরা/সম্মানিত উপস্থিতি।
প্রতিষ্ঠানের বাইরে হলে—মাননীয় প্রধান অতিথি/সম্মানিত সভাপতি/প্রিয় এলাকাবাসী/সংগ্রামী বন্ধুরা/সম্মানিত উপস্থিতি ইত্যাদি উল্লেখ করা যেতে পারে।
সম্ভাষণ অংশের নমুনা—
...দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের সম্মানিত সভাপতি, মাননীয় প্রধান অতিথি, আমন্ত্রিত বিশেষ অতিথি ও মঞ্চের সামনে উপবিষ্ট সুধীমণ্ডলী; সবার প্রতি আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা।
২ ভূমিকা : সম্ভাষণের পর এমন কিছু কথা দিয়ে ভাষণ শুরু করতে হবে, যাতে ভাষণের বিষয়বস্তু সম্পর্কে শ্রোতা আগাম ধারণা পায়। যে উপলক্ষে ভাষণ সে সম্পর্কে কিছু সাধারণ তথ্য তুলে ধরতে হবে।
এ অংশে প্রাসঙ্গিক উক্তি, প্রচলিত কথা কিংবা কবিতাও থাকতে পারে।
৩ মূল বক্তব্য : মূল বক্তব্য যেন গোছালো হয়। কোনো ঘটনা বা ইতিহাসের কথা উল্লেখ থাকলে তার যেন ধারাবাহিকতা থাকে। অপ্রয়োজনীয় কথা লেখা যাবে না। যে বিষয়বস্তুর ওপর ভাষণ লেখা হচ্ছে,
সে ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে হবে। কী উপলক্ষে কোন বিষয়বস্তুর ওপর কাদের উদ্দেশ করে ভাষণ—সে অনুযায়ী বুঝেশুনে ভাষণের বাক্য সাজাতে হবে। পরীক্ষায় সাধারণত মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনসংশ্লিষ্ট ভাষণ বেশি আসে।
ওপরের প্রতিটি অংশ আলাদা আলাদা প্যারায় লিখতে হবে। মূল বক্তব্য অংশ একাধিক প্যারায় লেখা যেতে পারে; প্রতিটি প্যারার শুরুতে প্রিয় ছাত্র-ছাত্রী ভাই-বোনেরা/ সুপ্রিয় সুধীমণ্ডলী ইত্যাদি যেন থাকে।
৪ সমাপ্তি : মূল বক্তব্যের আলোকে আশাবাদ ব্যক্ত করে কিংবা উপদেশ/অনুরোধমূলক কথা বলে ভাষণ শেষ করতে হবে।