টাকার অভাব খুব ভয়ংকর। এটা শুধু পকেট শূন্য করে না। মানুষের মনটাকেও ধীরে ধীরে নিঃস্ব করে দেয়। টাকা না থাকলে মানুষ তার ন্যায্য কথাটাও জোর দিয়ে বলতে পারে না। মাথা নত করে চলতে হয় প্রতিটি মুহূর্তে। অভাব মানুষের আত্মসম্মান কেড়ে নেয়। সম্পর্কের ভেতর তৈরি করে অদৃশ্য দূরত্ব। অনেক সময় যোগ্যতা থাকা সত্বেও সুযোগ মেলে না। কারণ দারিদ্র্য সব দরজায় নিরব তালা ঝুলিয়ে দেয়। কিছু কষ্ট শুধু টাকার অভাবেই জন্ম নেয়। 

====

সৃষ্টিকর্তা কাউকে ঠকান না। যাকে সুন্দর গায়ের রং দেননি, কিন্তু দিয়েছেন মায়া কাড়া চেহারা। যাকে মেঘের মতো ঘন কালো চুল দেননি, তাকে দিয়েছেন হরিণের মতো টানা টানা মায়াবী চোখ। কাউকে মেধা দিয়েছেন, আবার কাউকে দিয়েছেন অসাধারণ গুণ। কাউকে হয়তো টাকা পয়সা দেননি, কিন্তু দিয়েছেন অগাধ ভালোবাসার ক্ষমতা। কাউকে হয়তো কিছুই দেননি, কিন্তু দিয়েছেন সুন্দর মন মানসিকতা। কাউকে দিয়েছেন অগাধ ধৈর্য, আবার কাউকে দিয়েছেন অগাধ দুঃখ নিয়েও সব পরিস্থিতি হাসিমুখে মানিয়ে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা। আবার কাউকে কিছু না দিয়ে দিয়েছেন মানসিক শান্তি। সৃষ্টিকর্তা কাউকেই ঠকান না, একদিক না একদিক দিয়ে ঠিকই পূর্ণ করে দেন। 

====

কেউ বলে দেশ চালাতে লাগে নৈতিক নেতা, “ভালো মন”।

হান ফেইজি (Han Feizi, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৮০–২৩৩) বলতেন—ভালো মন দিয়ে না, রাষ্ট্র চলে ব্যবস্থা দিয়ে।

তার বার্তা ছিল পরিষ্কার: মানুষকে “ভালো হতে বললে” সবাই ভালো হয় না; কিন্তু নিয়ম ভাঙলে ক্ষতি হলে, নিয়ম মানতে সবাই শেখে।

তিনি বিশ্বাস করতেন—মানুষ স্বার্থ দেখে, সুবিধা দেখে।

আপনি যদি শুধু নীতির গল্প বলেন, শক্তিশালী লোক নিয়ম ভাঙবে, দুর্বল লোক শাস্তি পাবে।

হান ফেইজি বললেন—নৈতিকতা দারুণ, কিন্তু নৈতিকতা দিয়ে রাষ্ট্রের ইঞ্জিন চলে না।

কারণ নৈতিকতা একেক জনের কাছে একেক রকম।

তার চোখে “ভালো শাসন” মানে শাসকের ভালোবাসা নয়—সিস্টেমের নিরপেক্ষতা।

ভয়ংকর সত্য: শাসকের চারপাশে ভণ্ড বেশি থাকে।

আজ হান ফেইজি কেন প্রাসঙ্গিক

আজ আমরা “সৎ নেতা চাই” বলি, কিন্তু সৎ নেতা এসে চলে গেলে সিস্টেম যদি দুর্নীতিগ্রস্ত থাকে, তাহলে আবারও একই জায়গায় ফিরি।

হান ফেইজি বলতেন—লিডার না, দরকার ব্যবস্থা। মানুষ বদলায়, আইন-প্রক্রিয়া বদলালে রাষ্ট্র বদলায়। কিন্তু আইনবাদ যদি কেবল শাস্তি হয়, ন্যায় না হয়—তাহলে রাষ্ট্র হয় ভয়-চালিত জেলখানা।

তার দর্শন এক বাক্যে: মানুষের ভালোত্বের ওপর রাষ্ট্র দাঁড়ায় না, রাষ্ট্র দাঁড়ায় এমন নিয়মে, যেখানে খারাপ মানুষও বাধ্য হয় ঠিক কাজ করতে

@অনন্ত লোকের স্পর্শ


কিছু প্রাণী নিজের সন্তানকেই খেয়ে ফেলে

প্রকৃতিতে মা-বাবার ভালোবাসার নানা নিদর্শন রয়েছে। সন্তানকে বাঁচাতে জীবন দিয়ে দেওয়ার গল্পও আমরা প্রায়শই শুনি। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠটা দেখেছেন কি? যে মা-বাবা সন্তানকে পরম স্নেহে বড় করছে, সেই আবার খিদে পেলে সন্তানকেই গপাগপ খেয়ে ফেলছে!

শুনতে গা শিউরে উঠলেও জীবজগতে এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। সুইডেনের ইউনিভার্সিটি অব এগ্রিকালচারাল সায়েন্সেসের বিহেভিওরাল ইকোলজিস্ট আনিস বোস বলছেন, ‘স্বজাতি বা নিজের সন্তানকে খেয়ে ফেলার এই স্বভাব প্রাণিজগতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে। প্রায় ১ হাজার ৫০০ প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে এই আচরণের দেখা মেলে। বালুচড়া গবি মাছ থেকে শুরু করে স্ট্যাগ বিটল, এমনকি আমাদের খুব পরিচিত পোষা প্রাণীদের মধ্যেও দেখা যায় এই আচরণ।’

কিন্তু প্রশ্ন হলো, সন্তানের বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত করাটাই তো প্রকৃতির নিয়ম। তাহলে কেন প্রাণীরা উল্টো নিজের বংশধরকেই ধ্বংস করে দেয়? এর পেছনে আছে প্রকৃতির এক নির্মম কিন্তু টিকে থাকার কৌশল। 

বেশির ভাগ সময় মাছ, পোকা বা মাকড়সারা তাদের শত শত বাচ্চার মধ্য থেকে কয়েকটাকে খেয়ে ফেলে। এর পেছনে কয়েকটি কারণ আছে।

খাবারের অভাব: খাবার কমে গেলে বাবা-মা কিছু সন্তানকে খেয়ে ফেলে, যাতে বাকিরা পর্যাপ্ত খাবার পায় এবং বেঁচে থাকতে পারে।

শক্তির অপচয় রোধ: কুকুর বা বিড়ালের মতো স্তন্যপায়ী প্রাণীরা অনেক সময় মৃত বা অসুস্থ বাচ্চা খেয়ে ফেলে। সন্তান জন্ম দেওয়াটা মায়েদের জন্য খুব ধকলের কাজ। মৃত বা দুর্বল বাচ্চাকে খেয়ে তারা সেই হারানো শক্তি কিছুটা পুনরুদ্ধার করে।

বাবার সন্দেহ: কিছু মাছের ক্ষেত্রে (ব্লুগিল সানফিশ) বাবা যদি গন্ধ শুঁকে বুঝতে পারে যে ডিম বা বাচ্চাগুলো তার নিজের নয়, তবে সে ওগুলো খেয়ে ফেলে! মজার ব্যাপার হলো, মায়েরা এটা হতে দিতে চায় না। তাই অনেক সময় মা মাছ ডিম পাহারা দেয়, যাতে বাবা মাছ সেগুলোকে খেয়ে ফেলতে না পারে। 

ইঁদুর বা খরগোশের মতো ছোট স্তন্যপায়ীদের মধ্যে এটা দেখা যায়। মা যদি দেখে বাচ্চার সংখ্যা খুব কম, অথবা পরিবেশ খুব বিপজ্জনক, তখন সে সব বাচ্চা খেয়ে ফেলে। ওরা চায় এখনকার দুর্বল প্রচেষ্টাকে বাতিল করে শক্তি সঞ্চয় করতে, যাতে পরে পরিবেশ ভালো হলে নতুন করে এবং ভালোভাবে বেশি বাচ্চার জন্ম দিতে পারে। 

কুকুরের মতো স্তন্যপায়ী প্রাণীরা অনেক সময় মৃত বা অসুস্থ বাচ্চা খেয়ে ফেলে লেখা:কমল দাস 



দুশ্চিন্তা বাড়লে কি পেট বাড়ে?" – কর্টিসল হরমোনের খেলা

​"আমি তো চিনি খাই না, ভাতও কম খাই, নিয়মিত হাঁটাহাঁটিও করি। শরীরের অন্য জায়গার মেদ একটু কমলেও পেটের চর্বি বা ভুঁড়িটা যেন জেদি একরোখা! কিছুতেই নড়ছে না।"—এই অভিযোগটা কি আপনারও? আপনি হয়তো ভাবছেন, নিশ্চয়ই আপনার ডায়েটে কোথাও ভুল হচ্ছে, তাই আরও কম খাওয়া শুরু করলেন। কিন্তু তাতে হিতে বিপরীত হলো—দুর্বল হলেন, মেজাজ খিটখিটে হলো, কিন্তু পেটের মাপ কমল না। আসলে, এই জেদি পেটের চর্বির পেছনের খলনায়ক কোনো 'খাবার' নয়, এর নাম হলো 'দুশ্চিন্তা' বা স্ট্রেস।

​আমাদের শরীরটা আদিম যুগের নিয়মে চলে। আদিম যুগে মানুষের স্ট্রেস বা টেনশন ছিল—হয়তো কোনো হিংস্র প্রাণী তাড়া করেছে অথবা খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে। সেই বিপদ থেকে বাঁচার জন্য শরীর তখন 'ফাইট অর ফ্লাইট' (Fight or Flight) মোডে চলে যেত এবং প্রচুর পরিমাণে 'কর্টিসল' (Cortisol) নামের এক হরমোন নিঃসরণ করত। এই কর্টিসলের কাজ হলো তাৎক্ষণিক শক্তি জোগানো। তাই সে যকৃৎ বা লিভার থেকে জমানো গ্লুকোজ রক্তে ঢেলে দেয়, যাতে আপনি দৌড়ে পালাতে পারেন।

​কিন্তু মুশকিল হলো, আধুনিক জীবনে আমাদের বাঘ-ভাল্লুক তাড়া করে না। আমাদের স্ট্রেস হলো—অফিসের ডেডলাইন, ট্রাফিক জ্যাম, লোনের কিস্তি, বা সংসারের অশান্তি। আমরা চেয়ারে বসেই টেনশন করি। ফলে কর্টিসল রক্তে যে গ্লুকোজ বা সুগার ঢেলে দিল, তা খরচ করার মতো কোনো শারীরিক পরিশ্রম আমরা করি না। তখন শরীরে ইনসুলিন আসে এবং সেই বাড়তি সুগারকে চর্বি হিসেবে জমা করে। আর জানেন কি? আমাদের পেটের চর্বি কোষগুলোতে (Visceral Fat) কর্টিসলের রিসেপ্টর বা গ্রাহক সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই কর্টিসল হরমোন সোজা পেটের কাছেই চর্বি জমা করতে পছন্দ করে। একেই ডাক্তাররা বলেন 'স্ট্রেস বেলি' (Stress Belly)।

​শুধু তাই নয়, যখন আপনি খুব স্ট্রেসে থাকেন, তখন আপনার ঘুম ভালো হয় না। আর ঘুমের অভাবে কর্টিসল আরও বেড়ে যায়। তখন শরীর আপনার মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায়—"তাড়াতাড়ি শক্তি দরকার, কার্বোহাইড্রেট বা মিষ্টি জাতীয় খাবার খাও।" খেয়াল করে দেখবেন, মন খারাপ থাকলে বা টেনশন থাকলে আমাদের চকলেট, আইসক্রিম বা ভাজাপোড়া খাওয়ার তীব্র ইচ্ছে জাগে। এটা আপনার দোষ নয়, এটা হরমোনের কারসাজি।

​তাহলে সমাধান? পেটের চর্বি কমাতে হলে ডায়েট চার্টের দিকে তাকানোর আগে নিজের মনের দিকে তাকান। দিনে অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম নিশ্চিত করুন। কারণ ঘুমই একমাত্র সময় যখন শরীর কর্টিসল লেভেল নামিয়ে আনে এবং হরমোনের ভারসাম্য ঠিক করে। এছাড়া ধীর লয়ে শ্বাস নেওয়া (Deep Breathing) বা যোগব্যায়াম স্ট্রেস কমাতে জাদুর মতো কাজ করে। মনে রাখবেন, শরীর যদি নিরাপদ বা 'রিল্যাক্সড' বোধ না করে, তবে সে কিছুতেই তার জমানো পুঁজি বা চর্বি খরচ করবে না। তাই ওজন কমাতে চাইলে আগে নিজেকে শান্ত করুন।

​আপনার কি মনে হয় অতিরিক্ত টেনশনই আপনার ওজন কমানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে? কমেন্টে জানাতে পারেন। Probal Kumar Mondal



নিউজিল্যান্ডের ভেড়ার সংখ্যা এবং জনসংখ্যার এই অনুপাতটি আসলেই অবাক করার মতো!

যেখানে ​নিউজিল্যান্ডে মানুষের মানুষের সংখ্যা মাত্র ৪.৫ মিলিয়ন (৪৫ লক্ষ) সেখানে ভেড়ার সংখ্যা প্রায় ৩০ মিলিয়ন (৩ কোটি)।

​অর্থাৎ, নিউজিল্যান্ডে প্রতি ১ জন মানুষের বিপরীতে প্রায় ৬ থেকে ৭টি ভেড়া রয়েছে। এই বিশাল সংখ্যক ভেড়া দেশটির অর্থনীতি এবং ল্যান্ডস্কেপের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।



জেজু দ্বীপের সমুদ্র-কন্যা: হেনীয়ো

​দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপের উপকূলে 'হেনীয়ো' বা "সমুদ্র-কন্যা" নামে পরিচিত একদল বয়োজ্যেষ্ঠ নারী ডুবুরি রয়েছেন। তারা কোনো প্রকার অক্সিজেন সিলিন্ডার ছাড়াই সমুদ্রের তলদেশ থেকে সামুদ্রিক খাবার সংগ্রহ করেন। পানির নিচে তারা দীর্ঘ কয়েক মিনিট দম ধরে রাখতে পারেন।

তাদের অনেকের বয়স ৮০ বছরের বেশি, তবুও তারা অসাধারণ দক্ষতা ও শারীরিক সামর্থ্যের সাথে সমুদ্রে ডুব দেন।

শত বছরের পুরনো এই ঐতিহ্য বংশপরম্পরায় চলে আসছে।

​বর্তমানে এই ঐতিহ্যবাহী জীবনশৈলীকে ইউনেস্কো (UNESCO) তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে সম্মানিত করেছে।


বায়তুল হিকমাহ

বায়তুল হিকমাহর ধারণার সূচনা হয় বাগদাদ প্রতিষ্ঠার সময়। আব্বাসীয়দের দ্বিতীয় খলিফা, আল-মনসুর এখানে রাজধানী সরিয়ে আনেন। উদ্দেশ্য ছিল দামেস্ককেন্দ্রিক উমাইয়াদের প্রভাব একেবারে মুছে ফেলা। আল-মনসুর বাগদাদে  কিছু করতে চাইলেন।

খলিফা আলেক্সান্দ্রিয়ার লাইব্রেরি থেকেও অনুপ্রাণিত হন। তার ইচ্ছে বাগদাদে এমন একটি সংগ্রহ গড়ে তোলা যার নাম হবে খিজানাত আল-হিকমাহ (Khizanat al-Hikmah/ Library of Wisdom)। ৭৭৫ সালে মারা যান তিনি। তার স্বপ্ন সত্যি করেন খলিফা হারুন আল-রশিদ (Harun al-Rashid)। ৭৮৬ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর পরই রাজদরবারের লাইব্রেরির একাংশ সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেন তিনি। উজির ইয়াহইয়া আল-বারমাকির (Yahya Al Barmaki) ওপর দায়িত্ব পড়ে বড় পরিসরে লাইব্রেরি তৈরি করার।

প্রাথমিক পর্যায়ে খলিফার দাদা এবং বাবার কাছে থাকা শিল্পসাহিত্য আর বিজ্ঞান বিষয়ক বইয়ের ঠাঁই হয় লাইব্রেরিতে। পারস্যের উপকথা, সাসানিয়ান জ্যোতির্বিদদের লেখনি ইত্যাদি আরবিতে অনুবাদ করা হয়। এজন্য নিয়োগ পেয়েছিলেন অনুবাদক এবং বই বাঁধাইকারকেরা। এই পর্যায়ে অবশ্য প্রাচীন পারস্যভাষার গ্রন্থই কেবল আরবিতে অনুবাদ হয়েছিল।

হারুন আল-রশিদের পুত্র পরবর্তী খলিফা আল-মামুনের সময় এই পাঠাগার চূড়ান্ত উৎকর্ষ অর্জন করে। ৮১৩ থেকে ৮৩৩ সাল পর্যন্ত শাসন করেছিলেন আল-মামুন। মূল ভবনকে পরিবর্ধিত করে তিনি একটি অ্যাকাডেমি স্থাপন করেন, এর নামই হয় বাইতুল হিকমাহ (the House of Wisdom)। ৮২৯ সালে আল-মামুন এখানে একটি মানমন্দিরও (observatory) বানিয়ে দেন।

সংগ্রহশালা বাড়াতেও নানা পদক্ষেপ নেন খলিফা। কিংবদন্তী আছে- সিসিলির রাজকীয় লাইব্রেরির পুরোটাই নিয়ে এসেছিলেন তিনি। তৎকালীন বিশ্বে বিজ্ঞান আর গণিতের উঁচুমানের কিছু পাণ্ডুলিপি ছিল সেখানে। আল-মামুন মূলত সেগুলো কপি করতে চেয়েছিলেন। এই ব্যাপারে সিসিলিতে বার্তা পাঠান তিনি। রাজা তার উপদেষ্টাদের সাথে আলাপ করেন। তাদের মতামত ছিল গ্রন্থাগারের এসব বই তাদের পূর্বপুরুষদের কোনো উপকারে আসেনি, এগুলো দিয়ে দেয়াই ভাল। রাজা এরপর খলিফাকে সম্পূর্ণ লাইব্রেরিই দিয়ে দেন। বলা হয়, ৪০০ উট লেগেছিল সমস্ত বই নিয়ে আসতে।

বাইতুল হিকমাহর অন্যতম একটি কাজ ছিল বিজ্ঞানের বই গ্রীক, সংস্কৃত, ল্যাটিন ইত্যাদি ভাষা থেকে আরবিতে অনুবাদ করা। বলা হয়, এই কাজকে প্রণোদনা দিতে চমকপ্রদ কৌশল অবলম্বন করেছিলেন খলিফা আল-মামুন- অনূদিত বইয়ের ওজনের সমপরিমাণ স্বর্ণ দেয়া হবে অনুবাদককে।

গ্রীক পন্ডিতদের অনেক লেখা আরবিতে তর্জমা করা হয়েছিল। পিথাগোরাস, প্লাটো, অ্যারিস্টোটল, হিপোক্র্যাটস, গ্যালেন, সক্রেটিস, ইউক্লিড কেউ বাদ যাননি। বলা হয়, গ্রন্থাগারে পা রাখলে আরবি, ফারসি, হিব্রু, গ্রীক, ল্যাটিন হেন কোনো ভাষা নেই যা শোনা যেত না। লিঙ্গ, ধর্মবিশ্বাস, গায়ের রঙ, জাতপাত, ভাষা যা-ই হোক, কারো জন্যই বন্ধ ছিল না লাইব্রেরির দরজা।  

ধ্বংস

বাইতুল হিকমাহ চূড়ান্তভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় ত্রয়োদশ শতকে। ১২৫৮ সালে ঝড়ের মতো ইরাকে ঢুকে পড়ে দুর্ধর্ষ মোঙ্গল বাহিনী, বাগদাদ তছনছ করে দেয় তারা। নির্বিচার নরহত্যায় লাল হয়ে যায় টাইগ্রিসের পানি। এককালের জৌলুষময় বাগদাদকে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় মোঙ্গলরা। এর সাথে সাথেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় বাইতুল হিকমাহ। @ Imtiaz Ahmed


রাশিয়ার সাহিত্যিক লিও তলস্তয়

১৯০১ সাল থেকে সাহিত্যে নোবেল দেয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত নোবেলের সবচেয়ে বড় বিতর্ক হচ্ছে সাহিত্যে লিও তলস্তয়কে নোবেল পুরস্কার দিতে না পারা। ১৯১০ সালে মৃত্যুবরণ করেন মহামতি তলস্তয়। তখনও বিশ্বসাহিত্যের সবচেয়ে বড় নাম লিও তলস্তয়কে নোবেল দিতে পারেনি নোবেল কমিটি। শুধু তখনই না, বরং এখনও বিশ্বসাহিত্যের মহীরুহ হয়ে আছেন তলস্তয়। তার লেখা ‘ওয়ার এন্ড পিস’ এবং ‘আন্না কারেনিনা’ বিশ্বসাহিত্যের যেকোনো শ্রেষ্ঠ উপন্যাসের তালিকায় সবচেয়ে উপরের দুটি নাম। ওয়ার এন্ড পিস’ লেখা হয়েছে দীর্ঘ ৫ বছর ধরে, হাজারের উপর পৃষ্ঠা উপন্যাসটির। চরিত্রের সংখ্যাই ছয় শতাধিক। নেপোলিয়ান বোনাপার্টের রাশিয়া আক্রমণ ও কয়েকটি অভিজাত পরিবারের ভাঙাগড়ার খেলা নিয়ে এর কাহিনী। ‘আন্না কারেনিনা’ ৩ বছর ধরে লেখা উপন্যাস। তৎকালীন বিস্তৃত রাশিয়ান সমাজ ও একটা নিরেট ঝামেলাপূর্ণ প্রেমের গল্প আন্না কারেনিনা, এটাও এক বিশাল উপন্যাস। রিসারেকশন, আত্মজীবনী এবং বেশ কয়েকটি কালজয়ী গল্প লিখে গেলেও লিও তলস্তয়ের পরিচয় এই দুটো উপন্যাসই।

১৮২৮ সালে এক সম্ভ্রান্ত রুশ পরিবারে তলস্তয়ের জন্ম। অল্প বয়সে বাবা-মাকে হারান। ছোটবেলা থেকে অসম্ভব মেধাবী ও পরিশ্রমী ছিলেন তিনি। ম্যাক্সিম গোর্কির মতে, তলস্তয় নিজেই একটা পৃথিবী। নিজ আগ্রহে শেখেন লাতিন, ইংরেজি, আরবি, ইতালীয়, হিব্রুসহ আরো কয়েকটি ভাষা। প্রচুর বই পড়তেন তিনি, যখনই মনে হতো একটা বিদেশী বই মূল ভাষায় পড়া দরকার, তাহলেই ঐ মূল ভাষা শিখেই বই পড়ার চেষ্ঠা করতেন।

কম বয়সে তিনি বুঝতে পারছিলেন না সাহিত্যের জগতে আসবেন কিনা। কাছের বন্ধু আরেক বিখ্যাত লেখক তুর্গেনেভের অনুপ্রেরণায় লিখতে বসেন। তার প্রথম বই ‘চাইল্ডহুড’, কয়েক বছরের মধ্যে অটোবায়োগ্রাফির অপর দুই খন্ডও লিখে ফেলেন। সাধারণত মানুষ জীবনের শেষের দিকে আত্মজীবনী লিখে থাকেন, অথচ তলস্তয় তার লেখালেখি শুরুই করেন আত্মজীবনী দিয়ে। তার জীবন ছিল এতটাই ঘটনাবহুল। অল্প বয়সে বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর দাদির মৃত্যু, পরে এক ফুফুর আশ্রয়ে বড় হতে থাকলে ফুফুও মৃত্যুবরণ করেন। এত সব দুঃখ সামলে নিজের পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি তিনি। আকৃষ্ট হয়ে যান মন্টেস্কো আর রুশোর দর্শনে। বাড়িতে এসে জমিদারী করতে গিয়ে আবার ব্যর্থ হন। ইউরোপ সফরে বের হন। সৈনিক হিসেবে যান ক্রিমিয়ার যুদ্ধ লড়তে।

এত অভিজ্ঞতা তলস্তয়কে একজন ভালো লেখক হিসেবে সমৃদ্ধই করে গেছে শুধু। প্রচুর লিখেছেন তিনি। শুধু উপন্যাসই না, তার লেখা গল্পও সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। ছিলেন দার্শনিকও। তার দেখানো অহিংস দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী। শেষ দিকে তিনি আধ্যাত্মিকতার দিকে মনোযোগ দেন। নিজের মতো ধর্মচর্চায় মনোযোগ দেন। নিজের প্রায় সব সম্পদ বিলিয়ে যেতে লাগলেন। কপর্দকশূন্য অবস্থায় ৮২ বছর বয়সে বের হয়ে যান ঘর থেকে, আক্রান্ত হন নিউমোনিয়ায়। রাশিয়ার ছোট এক স্টেশনে নিঃসঙ্গ অবস্থায় মারা যান বিশ্ব সাহিত্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলোর একজন মহামতি লিও তলস্তয়। @ Himel Mahmud



আগুন মমি

উত্তর ফিলিপাইনের বেঙ্গুত (Benguet) প্রদেশের পাহাড়ি এক অঞ্চল কাবাইয়ান (Kabayan)। এখানে বাস করে ইবালোই (Ibaloi ) উপজাতি। টিম্বাক (Timbac) পর্বতের পাদদেশে ছোট ছোট গ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করে তারা। এই পাহাড়ের গুহায় পাওয়া যায় আগুন মমির দেখা। ইবালোইদের পূর্বপুরুষেরা মৃতদের মমি করে রেখে আসতেন টিম্বাক, বাঙ্গাও, টেনোগচোল, নাপাই, ওপডাস এরকম আরো নানা গুহায়। এজন্য এই মমি ইবালোই মমি বা কাবাইয়ান মমি নামেও পরিচিত।  

ইবালোইরা ঠিক কীভাবে মমি করতো সেটা নিয়ে খুব বেশি লিখিত বিবরণ পাওয়া যায় না। তবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলে আসা গল্প থেকে বেশ ভালো তথ্য পাওয়া যায়। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেও  জানা গেছে অনেক কিছু। 

সব সুতো জোড়া দিয়ে জানা যায় মমিকরণের শুরুটা হতো ব্যক্তি জীবিত থাকাকালেই। মুমূর্ষুকে পান করতে দেয়া হতো লবণাক্ত একরকম পানীয়। নোনা পানি শরীরকে পানিশূন্য করে দেয়, সেটা জানা ছিল স্থানীয়দের। তারা মনে করতো মৃত্যুর আগে এই পানীয় খাওয়ালে শরীর থেকে পানি বেরিয়ে যাবে তাড়াতাড়ি। তবে আধুনিক বিজ্ঞানের মতে মমি তৈরির পেছনে এই প্রক্রিয়ার অবদান ছিল না বললেই চলে।

মূল কাজ শুরু হতো ব্যক্তি মারা যাবার পর। সব মিলিয়ে সপ্তাহখানেক থেকে মাসও লাগতে পারত। প্রাথমিক ধাপে ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল দেয়া হত মৃতদেহ। এরপর তাকে ঢেকে দেয়া হত কোলেবাও (kolebao/pinagpagan) নামে বিশেষ ধরনে র কম্বলে। মাথায় পড়ানো হতো সিনালিবুবো (sinalibubo) নামে একরকম স্কার্ফ। মৃতকে বসানো হতো মৃতদের চেয়ার/সাঙ্গাচিলে (sangachil)। কম্বল দিয়ে বাঁধা থাকত তার দেহ, আর স্কার্ফ দিয়ে সোজা করা থাকত মাথা।

পরবর্তী ধাপ ছিল ধোঁয়া দিয়ে মৃতদেহ শুকিয়ে ফেলা। এজন্য ছোট করে আগুন জ্বালিয়ে তার নিচে রাখা হতো চেয়ার। তবে সরাসরি মৃত ব্যক্তিকে আগুনের সংস্পর্শে আনা হতো না কখনোই। তাপে শরীরের সমস্ত পানি ধীরে ধীরে বের হয়ে যেতো, সেটা সংরক্ষণ করা হতো বোতলে। পুরোপুরি শুকিয়ে গেলে চেয়ার থেকে মৃতদেহ নামিয়ে আনত ইবালোইরা।

এবার আসতো শেষ ধাপের কাজ। কুঁচকে যাওয়া দেহ সূর্যের আলোতে রেখে দুদুয়ান (duduan) অনুষ্ঠান পালন করতো আত্মীয় ও সমাজের বয়োজ্যোষ্ঠরা। উদ্দেশ্য চামড়ার ওপরের অংশ ছাড়িয়ে নেয়া। স্থানীয় লতাপাতা আর শেকড়-বাকড় দিয়ে তৈরি বিশেষ ঔষধ শরীরে লাগিয়ে জ্বালানো হতো তামাক। এমন ব্যবস্থা করা হতো যাতে এই ধোঁয়া মৃতের নাকমুখ দিয়ে প্রবেশ করে। ইবালোইরা মনে করতো এর ফলে শরীরের ভেতর যদি আর কোনো পানি থেকেও থাকে সেটা শুকিয়ে যাবে। বলাই বাহুল্য, বিজ্ঞানীরা এই তত্ত্বও ভুল বলে জানিয়েছেন।     

কাজ শেষ! এবার মৃত ব্যক্তি প্রস্তুত শেষবিদায় নেবার জন্য। মমিকে কোলেবাও দিয়ে কয়েকস্তরে ঢেকে কাঠের কফিনে মায়ের পেটে শিশু যেভাবে থাকে অনেকটা সেভাবে রেখে দিত সমাজের লোকেরা। নানা আচার পালন করতে করতে বয়ে নিয়ে যেত পাহাড়ি গুহায়। সেখানে তাকে রেখে দিয়ে তবেই সমাপ্ত হতো শেষকৃত্য।

ইবালোইদের বিশ্বাস অনুযায়ী আগুন মমিকে যেই গুহায় রাখা হয়েছে সেখান থেকে কখনোই বের করা যাবে না, তাহলে কষ্ট পাবে তাদের আত্মা। তেমন হলে নেমে আসবে অভিশাপ, দেখা দেবে নানা দুর্যোগ। গুহার ভেতরে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় অবশ্য নেয়া যাবে। আগুন আর ধোঁয়া ব্যবহার করে মমি করার পদ্ধতি কিন্তু ইবালোইদের একার নয়। পাপুয়া নিউ গিনির বেশ কিছু উপজাতির মধ্যেও এর প্রচলন ছিল। তবে ফিলিপাইনের আগুন মমিই বেশি পরিচিত। @ Imtiaz Ahmed


তিব্বতীয় বৌদ্ধধর্ম প্রতিষ্ঠায় প্রাচীন বাঙালিদের অবদান

তিব্বতীয় বৌদ্ধধর্ম এবং তিব্বতি সভ্যতার গোড়াপত্তনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন তিলো পা, নারো পা এবং অতীশ দীপঙ্কর। তিব্বতিরা তাদের শান্তি এবং সার্বজনীন শুভেচ্ছা বার্তার জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত।যেখানে এই জ্ঞানের সূচনা হয়েছিল। এবং তা বাস্তবায়িত হয়েছিল প্রাচীন বাঙালি বৌদ্ধদের দ্বারা। 

প্রাচীন বাঙালি তিলো পা

৯৮৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে, তিলো পা নামে এক প্রাচীন ভারতীয় বাঙালি জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্য গৃহত্যাগ করেন। ধারণা করা হয়, বঙ্গদেশের চাটিভাভো বা অধুনা চট্টগ্রামে এক ব্রাহ্মণ বা রাজপরিবারে জন্মেছিলেন তিনি। জ্ঞানপিপাসু তিলো পা জ্ঞানান্বেষণে ঘুরে বেড়ান পুরো ভারতজুড়ে, শিক্ষালাভ করেন বিভিন্ন পণ্ডিত-গুরুর থেকে। শেষ পর্যন্ত তিনি থিতু হন নেপালে। ওখানে এক গুরুর কাছ থেকে দীক্ষা নেওয়ার সময় নির্বাণ বা ‘সিদ্ধি’ লাভ করেন তিনি। কিছু কিংবদন্তি অনুসারে, তার এই বোধিলাভ ছিল সরাসরি এক দৈব উপহার। তিলো পা ছিলেন একজন পরিশ্রমী বৌদ্ধ সাধক। জ্ঞানের দীর্ঘ অনুসন্ধানের একপর্যায়ে তিনি তিল পিষে জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন।


নারো পা 

তিলো পা’র শিষ্যত্ব গ্রহণ করে তার দর্শন শিক্ষালয়ের অংশ হন নারো পা নামে একজন লোক। গুরুর মতো তার জন্মও এক রাজকীয় বাঙালি পরিবারে। তার আসল নাম ছিল সামন্তভদ্র বা অভয়কীর্তি। স্ত্রীর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদের পর নারো পা বাড়ি ছেড়ে চলে যান, একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হিসাবে নিযুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু তার প্রবল আগ্রহ তাকে ধাবিত করে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের পথে। নালন্দায় ভর্তির পর তিনি বিভিন্ন বিষয়ে সেখানে অধ্যয়ন শুরু করেন। নালন্দার একজন মহান পণ্ডিত হিসেবে চারপাশে শুরু হয় তার জয়জয়কার। জনশ্রুতি আছে, একজন ডাকিনীর আহ্বানে তিলো পা’কে খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন নারো পা। মূল উদ্দেশ্য ছিল, তিলো পা’র দীক্ষায় জ্ঞানের সর্বোচ্চ চূড়ায় আহরণ করা। ততদিনে মহাসিদ্ধ হিসেবে তিলো পা’র জ্ঞান গরিমার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল চারিদিকে। যা-ই হোক, অবশেষে তিলো পা’র দর্শন পেলেন নারো পা। প্রথম দেখাতে নারো পা তাকে চিনতে পারেনি। জ্ঞান পরিধি বিস্তৃতির জন্য বারোটি কঠিন এবং বারোটি সহজসাধ্য কাজ দেওয়া হয়েছিল নারো পা’কে। নিজ অধ্যবসায় এবং কঠোর সাধনার গুণে এই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নারো পা তার গুরুর সমস্ত দীক্ষা আয়ত্তে সক্ষম হন। পরবর্তীকালে, নারো পা তার শিষ্যদের মাঝে এই সমস্ত তত্ত্বজ্ঞান ছড়িয়ে দিয়ে যান।

  

অতীশ দীপঙ্করের আখ্যান

অতীশ দীপঙ্করকে প্রাক বৌদ্ধধর্মের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুরু হিসেবে সম্মান করা হয়। তিনি তিব্বত, সুমাত্রা এবং ভারত ও এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে বৌদ্ধধর্মের শান্তি ও অহিংসার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। বর্তমান বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জ জেলার বজ্রযোগিনী গ্রাম ছিল তার জন্মস্থান। অতীশের আসল নাম ছিল চন্দ্রগর্ভ। শৈশব থেকেই ক্রমশ স্ফুরণ ঘটাতে থাকে তাঁর জ্ঞানমহিমা। যুবক বয়সেই তিনি জ্যোতির্বিদ্যা, যুক্তিবিদ্যা, ব্যাকরণ, সাহিত্য, ধ্যান বিজ্ঞান, শিল্প এবং সঙ্গীতের বিষয়ে দক্ষ হয়ে ওঠেন। এর পাশাপাশি তিনি বৈষ্ণব, তান্ত্রিক হিন্দু এবং শৈব ধর্মের দীক্ষাও আয়ত্ত করেছিলেন।

অসংখ্য শিক্ষকের অধীনে শিক্ষা গ্রহণ করেন তিনি। শীঘ্রই একজন সন্ন্যাসী হিসেবে নিযুক্ত হবার পর আরও অনেক ধর্মোপদেষ্টার কাছ থেকে বৌদ্ধ শাস্ত্রীয় শিক্ষায় পারদর্শিতা অর্জন করেন অতীশ দীপঙ্কর। এরপর তিনি বৌদ্ধধর্মকে আরও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে জানার আগ্রহে উদ্‌গ্রীব হয়ে ওঠেন। তাঁর প্রচণ্ড জ্ঞানতেষ্টাই তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে সফলতার স্বর্ণশিখরে। করে রেখেছে ইতিহাসের পাতায় অমর। তিনি অন্যান্য ধর্মের পণ্ডিতদের বিতর্কে সফলভাবে পরাজিত করাতেও ছিলেন বেশ পটু। তার তত্ত্বাবধানে গুটিকতক মঠ পরিচালিত হতো।

এগারো শতকের গোঁড়ার দিকে, অতীশ সুবর্ণদ্বীপে (বর্তমান ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপ) ভ্রমণ করেন। সেখানে মোট ১২ বছর অবস্থান করে বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানার্জন করেন তিনি। ভারতে ফিরে আসার পর তাঁকে বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর কয়েক বছর পর, তিব্বতি রাজার একজন দূত আসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি অতীশ দীপঙ্করকে অনুরোধ করেন তার সাথে তিব্বতে গিয়ে সেখানকার মানুষকে জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত করার জন্য। তিব্বতে পা রাখার পর নিজ জ্ঞান, প্রজ্ঞা, ও মেধার স্বাক্ষরে সেখানকার লোকজনকে করেছিলেন আকৃষ্ট। বানিয়েছিলেন বহু অনুসারী এবং শিষ্য। তিব্বতের মঠগুলোতে দ্বিতীয় বুদ্ধের পদে উন্নীত হন, যার প্রভাব ও খ্যাতি আজও অব্যাহত রয়েছে। ধারণা করা হয়, এই তিব্বতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন অতীশ দীপঙ্কর। রাজধানী লাসার কাছে তাঁকে সমাহিত করা হয়। @ Mohasin Alam Roni

ভারতের ধনী সম্প্রদায়

অষ্টম থেকে দশম শতকে ইরান থেকে যে জরথুস্ত্রপন্থি মানুষেরা ভারতে আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে ঠাঁই নেয়, তাদেরকেই ভারতীয় পারসি বলে অভিহিত করা হয়।  সম্প্রদায়ের লোকেরা যে ধর্মে বিশ্বাস করে, তার নাম হলো ‘জরথুস্ত্রবাদ‘ বা ‘পারসিক ধর্ম’। আবেস্তা বা জেন্দাবেস্তা হলো তাদের ধর্মগ্রন্থ। প্রায় ৪,০০০ বছর পূর্বে উদ্ভব হওয়া এই ধর্মকে পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন একেশ্বরবাদী ধর্ম হিসেবে গণ্য করা হয়। সপ্তম শতাব্দীতে পারস্য (ইরান) ছিল সাসানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে। ৬৫১ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিমদের পারস্য বিজয় পতন ঘটায় সাসানীয় সাম্রাজ্যের।  ক্রমশ ম্লান হয়ে আসে জরথুস্ত্রীয় ধর্মের প্রভাব। এরপর থেকে ছোট ছোট পারসিকদের দল খণ্ড খণ্ডভাবে আসতে থাকে ভারতে।  তৎকালীন গুজরাটের সাঞ্জান শহরের শাসক ছিলেন সম্রাট জাদি রানা। সেই সম্রাটের সাথে বাতচিতের জন্য পাঠানো হয় জরথুস্ত্র এক পুরোহিতকে। তিনি রাজাকে বলেন, আপনার রাজ্যে শরণার্থী হিসেবে থাকতে দিলে আমাদের বেজায় উপকার হতো। কিন্তু রাজামশাই অপরিচিত এই সম্প্রদায়কে নিয়ে খানিকটা সন্দিহান ছিলেন। তিনি তাদের দুধে কানায় কানায় পূর্ণ একটি বাটি দেখিয়ে বললেন, আমার রাজ্যে জনসংখ্যার অবস্থা এই দুধের বাটির মতোই। অতিরিক্ত আরেকটু যুক্ত হলেই উপচে পড়ে যাবে। পুরোহিত তখন রাজার কাছে একমুঠো চিনির আবদার করেন। চিনি নিয়ে আসা হলে সেই চিনিকে দুধের পাত্রে মিশিয়ে দেন পুরোহিত। বলেন, দুধে এই চিনির মিশ্রণের মতোই আমরা আপনার রাজ্যে প্রজাদের সাথে মিলেমিশে থাকব। পুরোহিতের উপস্থিত বুদ্ধি দেখে যারপরনাই মুগ্ধ হন সম্রাট। তাদেরকে দেওয়া হয় থাকার অনুমতি। কিন্তু এর সাথে কিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন তিনি। তা হলো:

পরবর্তী কয়েকশো বছরে আরও ছোট ছোট কিছু পারসি গোষ্ঠী বসতি গড়ে গুজরাটের সাঞ্জান এলাকায়। তাদের সম্মানার্থে ১৯২০ সালে সাঞ্জান স্তম্ভ নামে এক স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। সময়ের সাথে সাথে অধিকাংশ পাড়ি জমায় মুম্বাইয়ের পথে। সেজন্য বর্তমানে ভারতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পারসি পাওয়া যায় মুম্বাই শহরে। প্রথমে তারা আফিমের  ব্যবসা করতো ১৭২৯ সালে চীন সরকার আফিমের আমদানি ও বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কারণ, চীনে তখন মাদকদ্রব্যের প্রতি মানুষের আসক্তি পৌঁছেছিল চরম পর্যায়ে। ১৮৩০ আসতে আসতে পারসিরা আফিমের ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছিল। বিকল্প হিসেবে তারা তুলা উৎপাদনের দিকে মনোনিবেশ করে। আর সেসময় তুলার চাহিদা ছিল আকাশচুম্বী। তাই, ঝোপ বুঝে কোপ মেরে অল্প সময়েই আঙুল ফুলে কলাগাছ হয় ভারতীয় পারসি সম্প্রদায়ের। ব্রিটিশ রাজের শাসনামলে তারা নিজ সন্তানদের ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পাঠানো শুরু করে। পারসিদের সন্তানেরা শিখে ফেলে ইংরেজি ভাষা, আয়ত্ত করে পশ্চিমাদের আচার-ব্যবহার, যেটা সেসময়ের জন্য বিলাসপূর্ণ চালচলন হিসেবেই গণ্য করা হতো। এজন্য তারা নিজেদের এক ব্যক্তিত্বশালী সম্প্রদায় হিসেবে গড়ে তুলতে পেরেছিল। তখন পারসি মাত্রই ছিল শিক্ষিত, প্রগতিশীল, এবং সফল এক সম্প্রদায়। পারসিদের অনন্যসাধারণ একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তারা দানশীলতার সাথে সংযুক্ত। সমাজ ও নিজ সম্প্রদায়ের উন্নয়নে তারা দানকর্মে অংশগ্রহণ করে থাকে। এর বীজ প্রোথিত ছিল জরথুস্ত্র ধর্মের মূল ভিত্তিতে। তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, সর্বদা সৎ কাজ করলেই মন্দকে দূরীভূত করা সম্ভব।  জামসেটজি টাটাকে উল্লেখ করা হয় ভারতীয় শিল্পের জনক হিসেবে। তিনি টাটা গ্রুপের প্রতিষ্ঠা এবং জামশেদনগর নামে এক শহর স্থাপনের সাথে জড়িত। জরথুস্ত্রবাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, পারসিদের বংশের ধারা প্রবাহিত হতে পারবে শুধুমাত্র পুরুষদের মাধ্যমে। অর্থাৎ, একজন পারসি পুরুষের সাথে যদি একজন অ-পারসি মহিলার বিয়ে হয়, তাদের সন্তান হবে পারসি। অপরদিকে যদি একজন অ-পারসি পুরুষের সাথে একজন পারসি মহিলার বিয়ে হয়, তাদের সন্তানকে সেক্ষেত্রে পারসি বলা যাবে না। @ Mohasin Alam Roni


‘জুলফিকার আলী ভুট্টো: দক্ষিণ এশিয়ার কুলীন রাজনীতির এক অধ্যায়’ 

প্রাচীন ভারতের জাতিগুলোর মধ্যে রাজপুত অন্যতম। তারা জাতে ক্ষত্রীয় অর্থাৎ যুদ্ধ করাই তাদের কাজ। প্রায় মধ্যযুগ পর্যন্ত উত্তর ভারতের একটা অংশ রাজত্ব করে রাজপুতরা। মোহাম্মদ ঘুরি ১১৯২ সালে সর্বশেষ রাজপুত রাজা পৃথ্বিরাজ চৌহানকে পরাজিত করলে রাজপুত সাম্রাজ্য ভেঙে যায়। তবে মুসলিম শাসকদের সাথে রাজপুতদের সম্পর্ক যে সবসময় খারাপ ছিল তা বলা যায় না।  সম্রাট আকবরের সাথে রাজপুতদের ছিল বিশেষ সম্পর্ক। আকবরের শীর্ষ সামরিক বা বেসামরিকদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল রাজপুতদের দখলে। নবরত্ন ভগবান দাস, অর্থমন্ত্রী টোডরমল, প্রধান সেনাপতি মানসিংহ, সভাসদ বীরবল এরা সবাই ছিলেন রাজপুত। আকবরের স্ত্রী যোধাবাই, যিনি সম্রাট জাহাঙ্গীরের মা, তিনি ছিলেন রাজপুত। সম্রাট শাহজাহানের মা-ও রাজপুত ছিলেন। মোগলরা এই ভুট্টোদের ‘খান’ উপাধিতে ভুষিত করেন।  রাজপুত একটা বিশাল জাতি। তারা  মোট ৩৬টি গোত্র আছে। তার মধ্যে একটি ভুট্টো গোষ্ঠী। তারা ভাট্টি বা ভাটিয়া ইত্যাদি নামেও পরিচিত। ইসলামের সংস্পর্শে আসা ভুট্টোরা বর্তমান পাকিস্তানের সিন্ধুতে পাড়ি জমায়। মোগল জমানা থেকে মুসলমানদের সাথে রাজপুতদের বিয়ের প্রচলন দেখা যায়।রাজপুত মেয়েরা ধর্ম পরিবর্তন না করেই তখন মুসলমানদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্দ হতে পারতো।  পাকিস্তানের ইতিহাসের একটা বড় অংশে জুড়ে বস করত ভুট্টোরা। জুলফিকার আলী ভুট্টো এই গোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় নাম। জুলফিকার যেমন ভালো বক্তা ছিলেন, একইসাথে একজন অনুসন্ধিৎসু ছিলেন। এই অনুসন্ধিৎসু মনই তাকে সারাজীবন বাকি সবার চেয়ে আলাদা করে রেখেছিল।  তার বাবা শাহনওয়াজ করেন একাধিক  বিয়ে। ভুট্টোর মা লক্ষ্ণীবাই (খুরশীদ বেগম) জন্মসূত্রে একজন হিন্দু। ভুট্টো সারাজীবন তার মায়ের পরিচয় নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগতেন। তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাও তার এই পরিচয় নিয়ে আক্রমণ করতো। ভুট্টোর দ্বিতীয় স্ত্রী নুসরাতও একজন শিয়া মুসলিম। এটা নিয়েও কথা শুনতে হতো ভুট্টোকে। 

জুলফিকারের পিতা শাহনওয়াজ ভুট্টোও একজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ছিলেন। বিশেষ করে সিন্ধু অঞ্চলে তার প্রভাব ছিল অনেক। তিনি ছিলেন স্বাধীন পাকিস্তান গঠনের একজন শক্তিশালী কন্ঠস্বর। তার দ্বিতীয় স্ত্রীর জ্যেষ্ঠ পুত্র জুলফিকার। বড় হবার সকল উপকরণ দিয়ে ছেলেকে বড় করতে থাকেন বাবা। পড়ান ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া ও অক্সফোর্ডের মতো জায়গায়। পড়া শেষে দেশে এসে রাজনীতিতে যোগ দেন ভুট্টো।

পরিবারের ঐতিহ্য বজায় রেখে জুলফিকার ভুট্টোও একাধিক বিয়ে করেন। তার বয়স যখন ১২, বছর তখন তিনি ১০ বছরের বড় শিরিন আমিরকে বিয়ে করেন বা বিয়ে দেয়া হয়। এই বিয়ের উদ্দেশ্য ছিলো জমিদারী বৃদ্ধি। বিবাহিত থাকা অবস্থাতেই বোম্বেতে পরিচয় হয় জন্মসূত্রে ইরানী নুসরাতের সাথে। সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী ইস্পাহানী পরিবারের মেয়ে নুসরাত। তার শিয়া পরিচয়ের কারণে বিপদে পড়তে হয় জুলফিকারকে, যদিও নুসরাতকে নিয়ে গর্বিত ছিলেন তিনি। নুসরাত ছিলেন উচ্চশিক্ষিত ও আধুনিকমনা। রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টি ছিল তার। নুসরাতের রাজনৈতিক জ্ঞান ও যোগাযোগ জুলফিকারকে অনেক সুবিধা এনে দিয়েছিল। জুলফিকার যখন বিপদে পড়েন, তার দল পিপিপির হাল ধরতে দেখা যায় নুসরাতকে।

জুলফিকারের সর্বশেষ স্ত্রী হুসনা শেখ। ঢাকার জনৈক আব্দুল আহাদের স্ত্রী হুসনা ছিলেন দুই সন্তানের জননী।জুলফিকারের টানে ঢাকা ছেড়ে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান হুসনা। শুধু এই তিনজনই না, আরো অনেক নারী জুলফিকর আলী ভুট্টোর উপপত্নী ছিলেন। তিনি কখনো এ ব্যাপারে অস্বীকারও করতেন না। বরং অনেকটা গর্বের সাথেই স্বীকার করতেন। বাংলাদেশ জন্মলাভের ৪ দিন পর, ২০ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে, জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি হন। পরবর্তীতে হন প্রধানমন্ত্রীও। ১৯৭৯ সালে ভুট্টোর নিয়োগ দেয়া জিয়াউল হকের সামরিক আদালতে ফাঁসি দেয়া হয় রাজপুতদের এই বংশধরের। @ Himel Mahmud


 স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর সুখের কারণ কী?  

ভৌগলিকভাবে ডেনমার্ক, সুইডেন, নরওয়ে ও সাংস্কৃতিকভাবে এই তিনটিসহ আইসল্যান্ড, ফিনল্যান্ড ও ফারো দ্বীপপুঞ্জকে বলা হয় স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ।  ইউরোপের উত্তরের স্ক্যান্ডিনেভিয়ানরা সুখ সূচকে এগিয়ে বা এত সুখী হওয়ার রয়েছে বিভিন্ন কারণ।   তাছাড়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মুক্তবাজার অর্থনীতির জন্য দেশের অর্থনীতি ভালো কাজ করে, মানুষের আয় তুলনামূলক ভালো থাকে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশে সোশ্যাল ডেমোক্রেসি থাকায় মানুষের সামাজিক সুরক্ষা অত্যন্ত শক্তিশালী। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ফ্রিসহ মৌলিখ অধিকার নিয়ে চিন্তা করতে হয় না জনগণকে।  

কটি শিশু যখন নর্ডিক দেশে জন্ম নেয়, তার দায়িত্ব সরকারও নেয়। ফ্রি স্কুল, ফ্রি চিকিৎসা পেয়ে থাকে দেশের সকল নাগরিক। সামাজিক সহযোগিতার মধ্যে রয়েছে চ্যারিটি, অন্যের উপকার। একজন স্ক্যান্ডিনেভিয়ান নাগরিক দিনশেষে চিন্তা করবে আমি কি চ্যারিটিতে দান করেছি? এই চ্যারিটির মাধ্যমে একজন মানুষ মানসিক শান্তি পেয়ে থাকে। ঠিক তেমনিভাবে পরোপকারের মাধ্যমে তারা মানসিক শান্তি পেয়ে থাকে। শারীরিক অসুস্থতার জন্য সরকারের সহযোগিতা থাকে। শিক্ষার পর কেউ যদি চাকরি চলে যায়, রাষ্ট্র তার সামাজিক সুরক্ষা দিয়ে থাকে।  

দেশসমূহ সামজিক কল্যাণ প্রোগ্রামের উপর জোর দেয়, যেমন- সার্বজনীন শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য সামাজিক সুবিধা। যার ফলে সেখানে আয়বৈষম্য, বিভেদ কম। একজন অশিক্ষিত বাবা-মায়ের সন্তান চাইলে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে ফ্রিতে। রাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে আয়বৈষম্য কম থাকার দরুন মানুষের মধ্যে হতাশা কম কাজ করে।  


সিন্ধু সভ্যতার অবদান

প্রাচীন পৃথিবীর দক্ষিণ এশিয়ায় গড়ে ওঠা সিন্ধু সভ্যতা এক অপার বিস্ময়ের নাম। আজ থেকে প্রায় ৫০০০ বছর পূর্বে যখন অন্ধকারে নিমজ্জিত ইউরোপের মানুষজন গুহায় বসবাস করত, ঠিক সে-সময়ে পৃথিবীর আরেক প্রান্তে প্রাচীন ভারতবর্ষে গড়ে উঠেছিল এক সুসংগঠিত সভ্যতা। উন্নত জীবনযাপনের পাশাপাশি তারা ব্যবসা-বাণিজ্যেও যোজন যোজন ক্রোশ এগিয়ে গিয়েছিল। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রকৌশলবিদ্যাকে কাজে লাগিয়ে তারা দৈনন্দিন জীবনযাপনকে করে তুলেছিল অধিকতর সহজ ও সাবলীল। যার প্রমাণ বয়ে বেড়াচ্ছে সিন্ধু সভ্যতা থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন প্রত্নসম্পদ। 

মহেঞ্জোদারো শহরের নগর পরিকল্পনা ও প্রকৌশলের কাঠামোর কথা বিবেচনা করলে, তা তৎকালীন বিশ্বের যেকোনো শহরকে টেক্কা দেওয়া ক্ষমতা রাখত। মহেঞ্জোদারোতে ছিল বিশাল এক শস্যাগার। গম আর যব ছিল এখানকার প্রধান কৃষিজ ফসল। গ্রামাঞ্চল থেকে গরুর গাড়িতে করে শস্য এনে এই শস্যভাণ্ডারে তা সংরক্ষণ করে রাখা হতো। খাদ্যশস্য যেন অনেকদিন পর্যন্ত ভালো অবস্থায় থাকে, সেজন্য শস্যভাণ্ডারে বাতাস চলাচলের জন্যও উপযুক্ত ব্যবস্থা ছিল। মহাশস্যাগারের পাশাপাশি এখানে বিশাল এক স্নানাগারের অস্তিত্ব ছিল। বাড়িঘর নির্মাণ করা হতো পোড়া মাটির ইট দিয়ে এবং অধিকাংশই ছিল দোতলা। বৃহৎ স্নানাগারের পাশাপাশি কয়েকটি বাড়িতে নিজস্ব স্নানাগারও ছিল। মহেঞ্জোদারোর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ছিল বর্তমানের মতো আধুনিক। প্রত্যেক বাড়ির ময়লা যাতে শহরের নর্দমায় গিয়ে মিলিত হতে পারে, সে ব্যবস্থা করা হয়েছিল তখন। 

শহরের রাস্তাগুলোও কিন্তু এলোপাথাড়ি তৈরি করা হয়নি, হয়েছে গাণিতিক নিয়ম মেনে। হরপ্পায় রাস্তার পাশে একটি নির্দিষ্ট দূরত্বে সড়ক বাতির পাশাপাশি শহরের প্রধান রাস্তাগুলোর পাশে মূল নর্দমাগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল। তারা প্রতিরক্ষাকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিত বলে গড়ে তুলেছিল প্রাচীর।   বিজ্ঞান ও প্রকৌশলবিদ্যাকে কাজে লাগিয়ে গরুর গাড়ি এবং নৌকা তৈরি করেছিল তারা। নৌকাগুলো আকারে ছিল ছোট এবং চালানো পালের সাহায্যে, বাতাসকে কাজে লাগিয়ে।  , ভিন্ন ঋতুতে ভিন্ন ফসল ফলাত হরপ্পাবাসী। গ্রীষ্মকালীন ফসল হিসেবে ধান, ভুট্টা, শিম, এবং শীতকালে গম, বার্লি, ডাল চাষের নিয়ম জানত তারা।  আজ থেকে ৫০০০ বছর আগের এই মানুষেদের সভ্যতা নদীমাতৃক হওয়ায় উন্নত সেচ প্রক্রিয়ার উদ্ভাবন ঘটিয়েছিল তারা।  

ধাতুবিদ্যায় হরপ্পাবাসীর জ্ঞান ছিল প্রখর। তারা নির্দিষ্ট ওজন ও আকৃতির পোড়ামাটির ইট বানাতে পারত। তুলা ব্যবহারের নিয়মও ভালোভাবে জানা ছিল তাদের। প্রত্নস্থল থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তারা গয়না হিসেবে সোনা, রূপা, তামা, লাপিস লাজুলি, নীলকান্তমণি, পান্না, শ্বেতস্ফটিক ইত্যাদি ব্যবহার করত। তারা তামা, পিতল, সীসা, টিনসহ বিভিন্ন ধাতু নিষ্কাশনের নতুন কিছু পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিল। হরপ্পার প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে স্বর্ণমোড়ানো এক পাথর পাওয়া গেছে। গবেষকদের ধারণা অনুযায়ী, সেটা স্বর্ণের বিশুদ্ধতা পরিমাপের জন্য কষ্টিপাথর হিসেবে ব্যবহার করা হতো। সিন্ধু সভ্যতার কুমারেরা মাটির পাত্র তৈরি করত চাকার সাহায্যে। বিভিন্ন আকার ও আকৃতির মাটির তৈজসপত্র তৈরি হতো সেখানে। এদের উপর আঁকা থাকত বিভিন্ন চিত্রকল্প।   তারাই সর্বপ্রথম স্কেল আবিষ্কার করেছিল। লোথালে হাতির দাঁতের একটি স্কেলের সন্ধান পাওয়া গেছে যেটা দিয়ে ১.৬ মিলিমিটার পর্যন্ত মাপা যেত। সিন্ধু সভ্যতায় ওজন পরিমাপের জন্য বাটখারার প্রচলনও ছিল। রোগবালাই সারাতে সিন্ধু সভ্যতার বাসিন্দারা বিভিন্ন ঔষধি এবং ভেষজ উদ্ভিদের ব্যবহার জানত।  @ Mohasin Alam Roni


মৌর্য রাজবংশ

খ্রি.পূ. ৩২২ অব্দ থেকে খ্রি.পূ. ১৮৫ অব্দ পর্যন্ত শাসন করত মৌর্য সাম্রাজ্য। পাটলিপুত্র ছিল এর রাজধানী। চাণক্যের সাথে মৌর্য সাম্রাজ্য ওৎপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তিনি ছিলেন প্রাচীন ভারতীয় অর্থনীতিবিদ, দার্শনিক ও রাজ-উপদেষ্টা। সুপ্রাচীন রাষ্ট্রনীতি বিষয়ক গ্রন্থ ‘অর্থশাস্ত্র’ তাঁরই হাতেই রচিত। এই চাণক্য, কৌটিল্য বা বিষ্ণুগুপ্ত নামেও সুপরিচিত ছিলেন। চাণক্যের সহায়তায় চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এই সুবিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। প্রাচীন লোককথা অনুসারে, নন্দ রাজবংশের সম্রাট ধননন্দ একবার অপমান করেছিলেন চাণক্যকে। এর প্রতিশোধ হিসেবে তিনি নন্দ সাম্রাজ্যকে ধসিয়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেন। সম্রাট অশোক কলিঙ্গ রাজ্য জয়ের মাধ্যমে সমগ্র দক্ষিণ ভারতকে মৌর্য সাম্রাজ্যের ছায়াতলে নিয়ে আসেন। 


উত্তরে হিন্দুকুশ পর্বতমালা থেকে শুরু করে দক্ষিণ ভারতের কিছু অংশ বাদ দিয়ে মোটামুটি সমগ্র ভারতবর্ষই চলে আসে তার শাসনের আওতায়। এরপর তিনি পরিকল্পনা করেন কলিঙ্গ রাজ্য আক্রমণের। এই কলিঙ্গ যুদ্ধই সম্রাট অশোককে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছিল। এই যুদ্ধের ভয়াবহতা এতোই তীব্র ছিল যে, প্রায় ১ লক্ষ মানুষ এতে প্রাণ হারিয়েছিলেন, নির্বাসিত হয়েছিল দেড় লক্ষেরও বেশি। রক্তের এই মহাসমুদ্র এবং অধিকসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি দেখে দারুণ বিমর্ষ হয়ে পড়েন সম্রাট অশোক। তীব্র অনুশোচনায় দগ্ধ হন তিনি। এই যুদ্ধের পরেই তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, জীবনে আর কোনো যুদ্ধ-বিগ্রহ কিংবা সংঘর্ষে জড়াবেন না। তিনি সকলকেই হানাহানি, সন্ত্রাস রাহাজানি এসব ত্যাগ করে শান্তিতে বসবাসের আহবান জানান। হয়ে যান বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষক, শান্তিকামী, প্রজাবৎসল এক রাজা। তার আমলে শুধু মৌর্য সাম্রাজ্যই নয়, এশিয়ার বিভিন্ন রাজ্যেও বৌদ্ধধর্মের প্রসার ঘটেছিল। 

মৌর্য সাম্রাজ্যের একটা উল্লেখযোগ্য দিক হলো, কৌটিল্যের বুদ্ধিতে বিভিন্ন গুপ্তচর পুষতেন সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। তারা বিভিন্ন রাজ্যে গিয়ে গোপন ও স্পর্শকাতর সকল সংবাদ এনে দিত রাজামশাইকে। এই সাম্রাজ্যের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সর্বদা বৃহৎ এক সেনাবাহিনী তৈরি থাকত এই রাজ্যে। আদেশ পাওয়া মাত্রই তারা যেকোনো কিছুর জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ত। এমনকি মৌর্য সাম্রাজ্যের তৃতীয় সম্রাট অশোক যুদ্ধ-বিগ্রহ থামিয়ে দেওয়ার পরেও তার কাছে ওই সেনাবাহিনী মজুদ ছিল। সৈনিকদের প্রধান কাজ ছিল যুদ্ধে শামিল হয়ে প্রতিপক্ষের সাথে লড়াই করা। যখন কোনো যুদ্ধ-বিগ্রহ থাকত না, তখন তারা তাদের খেয়ালখুশি মতো যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারত। 

সৈনিকেরা অনেকগুলো ভাগে বিভক্ত ছিল। যেমন, পদাতিক বাহিনী, অশ্বারোহী সৈন্য, নৌবাহিনী, রথারোহী, হাতি বাহিনী, সরবরাহকারী ইত্যাদি। সৈনিকদের ভরণপোষণ এবং অস্ত্র যোগান দেওয়ার দায়িত্ব ছিল রাজার। পদাতিক সৈন্যদের কাছে থাকত তীর-ধনুক, বর্ম, বর্শা, এবং লম্বা তরবারি।  

মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন হিন্দু ধর্মের অনুসারী। বিন্দুসার পালন করতেন অজীবিক নামক ধর্ম। শেষ জীবনে তিনি জৈন ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তার দৌহিত্র অশোক পুরো রাজ্যে বৌদ্ধধর্মের বাণী ছড়িয়েছিলেন। হিন্দু, জৈন, ও বৌদ্ধধর্ম ছাড়াও মৌর্য সাম্রাজ্যের একটা অংশ ছিল নাস্তিক এবং অজ্ঞেয়বাদী।  @ Mohasin Alam Roni


তক্ষশীলা

খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে গড়ে উঠেছিল ‘গান্ধার’ নামে এক ইন্দো-আর্য রাজ্য। এই গান্ধার ছিল প্রাচীন ভারতবর্ষের ষোড়শ মহাজনপদের একটি। তক্ষশীলা ছিল এর রাজধানী। উন্নত শিক্ষা-সংস্কৃতির জন্য তখন সারা বিশ্বব্যাপী দারুণ খ্যাতি কুড়িয়েছিল তক্ষশীলা

প্রায় হাজার বছর ধরে মাটির নিচে চাপা পড়েছিল তক্ষশীলার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। আঠারো শতকের শেষের দিকে ব্রিটিশ রাজ সরকারের দুই প্রত্নতাত্ত্বিক আলেকজান্ডার কানিংহাম, এবং জন মার্শালের প্রচেষ্টায় সকলের সামনে আসে তক্ষশীলার ধ্বংসাবশেষ। 

রামায়ণ অনুসারে, দশরথের দ্বিতীয় ছেলে ভরত গান্ধার রাজ্য জয়ের পর নিজ সন্তান ‘তক্ষ’ এর নামানুসারে এই অঞ্চলের নাম দেন ‘তক্ষশীলা’। মহাভারতেও তক্ষশীলার উল্লেখ আছে। আবার অনেকের মতে, প্রাচীন ভারতের নাগা জনগোষ্ঠীর ‘তক্ষক’ নাম থেকে এই অঞ্চলের নামকরণ করা হয়েছিল ‘তক্ষখন্ড’। সময়ের পরিক্রমায় ‘তক্ষখন্ড’ শব্দটি রূপ নেয় তক্ষশীলায়। গ্রীকদের লেখনীতে তক্ষশীলা হয়ে ‘ট্যাক্সিলা’। বর্তমানে ইংরেজিতে তক্ষশীলাকে ‘Taxila’ লিখা হয়। 

তৎকালীন বিশ্বে তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয় বা তক্ষশীলা মহাবিহার ছিল পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ। খ্রি.পূ. প্রায় ৫০০ অব্দে নির্মিত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল বিভিন্ন পণ্ডিত ও শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা। সারা এশিয়া থেকে জ্ঞান তৃষ্ণা নিবারণ করতে এখানে আসতেন জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থীরা। তক্ষশীলা মহাবিহারের আঙিনা মুখরিত থাকত বিভিন্ন জ্ঞানী-গুণীর পদচারণায়। তবে কেউ ইচ্ছা করলেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেত না। সেজন্য তার বয়স কমপক্ষে ষোলো বা তার বেশি হতে হতো। নিজ এলাকায় প্রাথমিক শিক্ষার পাট চুকিয়ে তাকে প্রমাণ করতে হতো, সে তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের যোগ্য।

পড়াশোনার খরচ শিক্ষার্থীকেই বহন করতে হতো। তবে যারা আর্থিকভাবে অসচ্ছল ছিল, তারা গায়ে-গতরে খেটে তা পরিশোধ করে দিত। এখানে পড়ানো হতো গণিত, বেদশাস্ত্র, অর্থনীতি, চিকিৎসাবিদ্যা, দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ব্যাকরণ বিষয়ক বিভিন্ন জিনিস। এর শিক্ষা পদ্ধতি ছিল যথেষ্ট আধুনিক। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে জড়িতে আছে চাণক্য, পাণিনি, চরক, আত্রেয়, বিষ্ণু শর্মা, নাগার্জুন, জীবকের মতো প্রাচীন বিশ্বের প্রথিতযশা পণ্ডিত ও গুণীজনদের নাম। খ্রিস্টপূর্ব ৪০৫ অব্দের দিকে বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক ফা-হিয়েন এসেছিলেন এই শিক্ষাঙ্গনে। তিনি একে অত্যন্ত পবিত্র এবং সমৃদ্ধশালী বলে যথেষ্ট প্রশংসায় ভাসিয়েছিলেন। @ Mohasin Alam Roni


এস্কিমোদের রোমাঞ্চকর সাত জীবনাচার

সুমেরু অঞ্চল; বরফ-স্নিগ্ধ হিমশীতল প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম করে টিকে থাকা এস্কিমো জনগোষ্ঠীর এক রহস্যময় জনপদ। জমাটবদ্ধ জলরাশি, কনকনে ঠাণ্ডা পরিবেশ ও বৈরী আবহাওয়ার এমন রোমাঞ্চকর স্থান পৃথিবীর রহস্যময়তাকে যেন আরও বাড়িয়ে তোলে। কল্পকাহিনীর গল্পকেও হার মানায় এখানে বসবাসরত বাসিন্দাদের জীবনধারা।

জনপদের বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে থাকা রহস্য, প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম, টিকে থাকার লড়াই ও বেঁচে থাকার এক অমোঘ যুদ্ধে লিপ্ত এস্কিমোরা। এভাবেই শতবছর ধরে তারা রচনা করছে নিজেদের বিচিত্র জীবনগাঁথা। গড়ে তুলেছে বৈচিত্র্যময় জনপদ ও অদম্য সাহসী বংশপরম্পরা। 

১. কুকুরটানা গাড়ি

নর্থ আলাস্কা, কানাডা ও সাইবেরিয়ার বৈরী পরিবেশে উন্নত যাতায়াতব্যবস্থা কল্পনা করাও কঠিন। যেখানে টিকে থাকাই এক জীবন্ত রহস্য, সেখানে যাতায়াতের জন্য পিচঢালা সড়কপথ যেন এক বিমূর্ত কল্পনা। তবে প্রয়োজনের তাগিদে, খাদ্যের খোঁজে কিংবা বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে পাড়ি জমানোর প্রয়োজন পড়েছে এস্কিমোদের। তারই সুবাদে একসময় তারা গড়ে তুলেছে নিজস্ব যাতায়াতব্যবস্থা। শৈল্পিক এ মানুষগুলোর বিচিত্র মেধায় সৃষ্টি করেছে এক অনন্য বাহন কুকুরের গাড়ি!

এসব বাহনে একত্রে জুড়ে দেওয়া হয় গোটাদশেক কুকুর। মনিবের প্রতি এসব কুকুরের অপরিসীম বিশ্বাস বিরূপ পরিস্থিতিতেও নিরাপদ দিগন্তের পানে অভিগমনের সাহস যোগায়। এস্কিমো ভাষায় এসব কুকুরের গাড়িকে বলা হয় কামুতিক। জমাটবাঁধা পিচ্ছিল বরফের উপর দিয়ে খুবই দ্রুতবেগে চলতে পারে এ গাড়ি। এছাড়াও স্বল্পপাল্লার যাতায়াতে কায়াক নামক ছোট ছোট নৌকাও ব্যবহার করে তারা।

২. বরফের তৈরি ইগলু ঘর

মেরু অঞ্চলে সূর্যালোকের অভাবে গাছপালার অনুপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। যেগুলো আছে সেগুলোও কেবল ব্যবহৃত হয় রান্নাবান্না ও অন্যান্য জ্বালানি কাজে। আর তাই গাছশূন্য সে স্থানে গাছ কেটে গৃহনির্মাণ যেন বিলাসিতা। তবে, এরূপ পরিস্থিতিতেও এস্কিমোরা দেখিয়েছে চমকপ্রদ সৃজনশীলতা। অবারিত বরফের রাজ্যে নান্দনিক পদ্ধতিতে তারা তৈরি করে নিয়েছে নিজেদের বাসস্থান বরফের ইগলু ঘর!

বিশালাকার বরফের মজবুত খন্ডাংশ সংগ্রহ করে তৈরি করা হয় এ ঘর। জীবনধারণের জন্য এসব ঘরের উচ্চতা হয় সর্বোচ্চ ৫-৬ ফুট। তবে, কিছু কিছু ঘরের উচ্চতা হয় এর চেয়েও কম। ফলে হামাগুড়ি দিয়ে প্রবেশ করতে হয় সেসবে। দেখে মনে হয় যেন সাদা বিরানভূমিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে ছোট ছোট বরফের গুহা। অবশ্য শীতের শেষে গ্রীষ্ম এলে এসব ঘর গলে যায়, মিশে যায় বরফের নদীর অববাহিকায়। এসময় এস্কিমোরা খোলা আকাশের নিচে তাঁবু খাটিয়ে রাত্রিযাপন করে। এসব তাঁবুর ছাদ তৈরিতে তারা ব্যবহার করে চামড়া আর দেয়াল হিসেবে ব্যবহৃত হয় পশুর হাড় ও তিমি মাছের বিশালাকার কাঁটা। রাতের বেলা এসব ঘরে সিল মাছের চর্বি দিয়ে জ্বালানো হয় উষ্ণ তেলের প্রদীপ।

৩. বসতির নিচে সমুদ্রতল

উত্তর মেরু যেন এক বরফের শুভ্র নির্মল চাদর। এ চাদরের নিচে বইছে শান্ত-স্নিগ্ধ সমুদ্র। যেন সাগরের বুকে ভাসমান জনপদ। সমুদ্রের তলদেশে রয়েছে বিচিত্র সব প্রাণীর বসবাস। রয়েছে সুস্বাদু সব মাছ ও নাম না জানা রূপসী সব উদ্ভিদের সমাহার। সাগরতলে তাদের ভাসমান দৃশ্যপট এক চোখধাঁধানো অপরূপ সৌন্দর্যের আধার৷ 

বরফের এমন সুবিশার আবরণের শেষ নেই। তবে, মাঝে মাঝেই একচিলতে খালি জায়গায় দেখা মিলে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি আইসবার্গ। গ্রীষ্মকালে হিমশীতল জলের অল্প স্রোতে তারা ভেসে বেড়ায় বিভিন্ন স্থানে।এলোপাথাড়ি ঘুরে বেড়ায় আর্কটিক জুড়ে। বরফগুলোর ধূসর সাদা গাত্রবর্ণ চোখে পড়ার মতো। এছাড়াও বরফের নিচে থাকা সমুদ্রের জলও বেশ বিশুদ্ধ। তবে, অতিরিক্ত লবণাক্ততা জলের স্বাভাবিক ব্যবহারে সমস্যা সৃষ্টি করেছে। আর তাই খাবার জল উনুনে ফুটিয়ে রাখতে হয় আগেভাগেই।

৪. শূন্য ডিগ্রি সর্বোচ্চ তাপমাত্রা

এ অঞ্চলে সাধারণ দুটি ঋতু বিদ্যমান- শীত ও গ্রীষ্ম। তবে, দুই ঋতুর পরিচিতি থাকলেও গ্রীষ্মকালের স্থায়িত্ব হয় খুবই অল্প সময়। এসময় অঞ্চলের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা গিয়ে দাঁড়ায় কেবল শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে। আর শীতের আগমন সঙ্গে করে নিয়ে আসে বিবর্ণ ঠাণ্ডা আধার। এসময় বফরের আবরণে ঢাকা পড়ে পুরো আর্কটিক অঞ্চল। সমস্ত অঞ্চল আচ্ছাদিত থাকে কনকনে শীতের আবরণে।

বরফে ঘেরা সমুদ্র, তাই জলীয়বাষ্পও নেই। আকাশে মেঘও জমে না, তাই বৃষ্টিও হয় না। ফলে আকাশ থাকে ঝকঝকে পরিষ্কার। যেন সাদা মরুর উপরে একটুকরো স্বচ্ছ নীল আয়না। তবে, কিছু কিছু স্থানে মাঝে মাঝেই ঘটে তুষারপাতের ঘটনা। অবশ্য সম্প্রতি পরিবেশবিদরা শীত-গ্রীষ্ম ছাড়াও শরৎ ও বসন্ত ঋতুরও সন্ধান পেয়েছেন সেখানে। তবে তাদের সময় খুবই সংক্ষিপ্ত।

৫. রোমাঞ্চকর শিকার অভিযান

সংগ্রামী মানুষদের জীবন্ত উদাহরণ এই এস্কিমোরা। বিরূপ প্রকৃতির সাথে লড়াই করে টিকে থাকা তাদের অনন্য বৈশিষ্ট্য। আর তাই এমন পরিবেশে খাদ্য সংগ্রহ ও ধূর্ত পশু শিকার মোটেই সহজ কথা নয়। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় তাদের সঙ্গে অভিযোজন করে টিকে থাকা পশুদেরই শিকার করে তারা। ক্ষুধা মেটায় পশুর মাংসের সুস্বাদু ভোজনে। এসব পশুর মধ্যে রয়েছে বল্গা হরিণ, বন্য খরগোশ, মেরু ভাল্লুক, উড়ন্ত হাঁস, শিকারি পাখি ও পেঙ্গুইন। মাছের মধ্যে সিল ও তিমি মাছও বেশ পছন্দের আহার তাদের।

এসব প্রাণী শিকারে ব্যবহৃত হয় পূর্বে শিকার করা প্রাণীদেরই হিংস্র দাঁত ও সূচালো হাড় দিয়ে তৈরি করা বিশেষ ধরনের বর্শা। গ্রীষ্মকালের উষ্ণ মৌসুমে পরিচালিত হয় এসব শিকারের বেশিরভাগ অভিযান। এসময় সংগৃহীত মাংস ও অন্যান্য খাবারের একটা নির্দিষ্ট অংশ শীতকালের জন্য তোলে রাখে তারা। নিম্ন তাপমাত্রার সুবিধার্তে এসব কাঁচা খাবারও অনায়াসে টিকে থাকে দিনের পর দিন।

৬. পশুর চামড়ার গাত্রাবরণ

শিকারকৃত পশুর চামড়া দিয়ে এস্কিমোরা তৈরি করে একপ্রকার উষ্ণ পোশাক। এসব পোশাক তৈরিতে তারা ব্যবহার করে মেরু ভাল্লুক, বল্গা হরিণ ও শিয়ালসহ অন্যান্য প্রাণীর মোটা চামড়া। তৈরিকৃত এসব পোশাকের নাম ক্যারিবো ফারস। জবুথবু ঠাণ্ডায় একমাত্র এই পোশাকই সুরক্ষা প্রদান করে তাদের।

শিকারকৃত পশুর চামড়াকে শরীর থেকে আলাদা করার পর কিছুদিনের জন্য বরফের পাতলা আবরণের নিচে রেখে দেওয়া হয়। অতঃপর, শুরু হয় পোশাক তৈরির অনন্য প্রক্রিয়া। প্রথমেই চামড়ায় লেপ্টে থাকা মাংসসমূহ ভালোভাবে পরিষ্কার করে নেয় তারা। ঠাণ্ডা পানিতে ধৌত করে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় শুকাতে দেওয়া হয়। এভাবে ব্যবহার উপযোগী করে তোলা এসব চামড়া। চামড়া দিয়ে তৈরি হওয়া এসব পোশাকও টেকসই হয় বছরের পর বছর। তাই একজন এস্কিমোর খুব বেশি কাপড়ের প্রয়োজন পড়ে না।

৭. ছয় মাস দিন ও ছয় মাস রাত

পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তরে অবস্থান করছে এই আর্কটিক অঞ্চল। তাই প্রকৃতির খেয়ালিপনায় সেখানে সূর্য যেন অমাবস্যার চাঁদ! ফলস্বরূপ, থাকে ছয় মাস দিন, বাকি ছয় মাস রাত। অর্থাৎ উত্তর গোলার্ধে যদি একটানা রাত থাকে, তখন দক্ষিণ গোলার্ধে একটানা দিন। একটানা এই রাতকে বলা হয় পোলার নাইট বা মেরু রাত্রি। যার জন্য বছরে কেবল একবারই পুরোপুরি সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দেখা যায় সেখানে।

গ্রীষ্মকালের স্থায়িত্ব হয় টানা ১৮৭ দিন, এ সময় সূর্যের কিরণ সার্বক্ষণিক আকাশে মিলে বলে এসময়কে একটানা দিন বলা হয়। গ্রীষ্মের পর আসে শীতকাল, যার স্থায়িত্ব হয় অবশিষ্ট ১৭৮ দিন। এসময় আকাশে সূর্যের দেখা মেলে না বলে এসময়কে বলা হয় একটানা রাত। @ Md. Mizanur Rahman



পাতাল শহর

বর্তমান তুরস্কের নেভশেহির প্রদেশের কাপাডোশিয়া অঞ্চল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩ হাজার ফুট উঁচু এ অঞ্চলে ডাইনোসর যুগের পর ব্যাপকহারে সংগঠিত হয় অগ্নুৎপাতের ঘটনা। তেমনই এক ভয়াবহ অগ্নুৎপাতে ফলে লাভার গরম আবরণের নিচে চাপা পড়ে বিস্তীর্ণ এই এলাকা। দিনের পর দিন রোদ-বৃষ্টি ও বাতাসের আর্দ্রতার প্রভাবে লাভার আবরণ পরিবর্তিত হয়ে রূপ নেয় নরম শিলামাটিতে। একসময় এসব মাটি ভেদ করে সৃষ্টি হয় সবুজ-সতেজ প্রকৃতি। গড়ে ওঠে বিভিন্ন মানববসতি। 

ঐতিহাসিকদের মতে, খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০-১৬০০ শতাব্দীতে কাপাডোশিয়ায় বসবাস করতো হিট্টাইট সম্প্রদায়ের মানুষজন। বৈরী প্রকৃতি, আগ্রাসী জাতিগোষ্ঠী ও দুর্ধর্ষ ডাকাতদের সঙ্গে অভিযোজন করেই চলছিল তাদের জীবন। একদিন তারা বুঝতে পারলেন, স্বজাতি ও সম্পদের সুরক্ষায় অদূরে নরম শিলা মাটি খুঁড়ে নির্মাণ করা সম্ভব এক সুরক্ষিত পাতাল শহর। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। একে দুইয়ে সামর্থ্যবান সকলেই হাত লাগালেন নির্মাণযজ্ঞে।

কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে ধীরে ধীরে মাটির প্রায় ২৫০ ফুট গভীরে ছড়িয়ে যেতে থাকে নগরীর পরিসীমা। অবশেষে গড়ে ওঠে কারুকার্যখচিত সুরক্ষিত এক গোপন শহর ডেরিনকুয়ু। শান্তিপ্রিয় হিট্টাইট জনগোষ্ঠীর প্রায় ২০ হাজার মানুষ একত্রে বসবাস করতো এ শহরে। আর তাই সবার নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিতে মাটির উপরিভাগে তৈরি করা হয় ৬০টি গোপন দরজা। শহরের অলিতে-গলিতে আলো-বাতাস ও অক্সিজেনের বাধাহীন চলাচল নিশ্চিতে আরও নির্মিত হয় প্রায় ১,৫০০ চিমনি।

একসময় মাটি কেটে বানানো হয় অগণিত আঁকাবাকা সুড়ঙ্গপথও। এগুলো তৈরির মূল কারণ অন্য জাতির কেউ এ শহরে এলে যেন মুহূর্তেই দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েন, দ্বিধায় পড়ে যান শহরের অভ্যন্তরে প্রবেশের মূল সুরঙ্গ নিয়ে। এভাবেই কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে তৈরি হয় জটিল ও দুরুহ গঠনবিশিষ্ট এককালের রহস্যময় ডেরিনকুয়ু পাতাল নগরী।

প্রায় ১৮ তলাবিশিষ্ট এ শহরের বিভিন্ন তলায় খুঁজে পাওয়া যায় আস্তাবল, তেলের ঘাঁনি, গুদামঘর, ভোজনকক্ষ, ভূগর্ভস্থ রত্নভান্ডার, প্রার্থনাকক্ষসহ আরও অনেক কিছুই। শহরের দ্বিতীয় তলায় দেখা মিলেছে কিছু অদ্ভুতদর্শন সমাধিরও। @ Md. Mizanur Rahman


হাম্মুরাবি: এক আদর্শবাদী রাজা

খ্রিস্টপূর্ব ১৮১০ অব্দে মেসোপটেমিয়ায় জন্ম নেওয়া হাম্মুরাবি ছিলেন ব্যাবিলনিয়ার প্রথম রাজবংশের ষষ্ঠ রাজা। তিনি আদর্শবাদী রাজা বলেও সুপরিচিত। তবে হাম্মুরাবি ইতিহাসের পাতায় সবচেয়ে বিখ্যাত হয়ে আছেন তার প্রণীত আইন হাম্মুরাবি কোডের জন্য। এছাড়াও প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার ইতিহাসে তিনিই প্রথম শাসক, যিনি জয়লাভের পর বিদ্রোহ ছাড়াই সফলভাবে সমস্ত মেসোপটেমিয়া নিজ শাসনের ছায়াতলে আনতে সক্ষম হন। রাজ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য সম্রাট হাম্মুরাবি আইন-কানুনের লিখিত অনুশাসনও তৈরি করেছিলেন, যা ইতিহাসে ‘হাম্মুরাবি কোড’ নামে পরিচিত। 

এই হাম্মুরাবি কোডে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অন্যায়ের জন্য নির্দিষ্ট শাস্তি বরাদ্দ ছিল। ব্যাবিলন ও তার ক্ষুদ্র রাষ্ট্রসমূহের প্রত্যেক নাগরিককেই মেনে চলতে হতো প্রণীত সেই নীতিমালা। এ নীতিমালাকে স্থায়ী দলিল হিসেবে রূপ দিতে তা খোদাই করা হয়েছিল পাথরে। এগুলোর মধ্যে কিছু আইন ছিল এরকম-

এরকম প্রায় ২৮২টি আইন লিপিবদ্ধ করে রাজার কাছে পেশ করেন সভাসদেরা। চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই ও কাটছাঁটের পর আইনগুলোকে অনুমোদন দেয়া হলে ব্যাবিলনজুড়ে কার্যকর হয় ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন আইন ‘হাম্মুরাবি কোড’। তবে মজার ব্যাপার হলো, হাম্বুরাবির প্রণীত আইন পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন আইন নয়। উর-নাম্মু, এশনুন্নার আইন, এবং লিপিত ইশতারের আইন হাম্বুরাবির আইনের চেয়ে প্রাচীন আইন। ১৯০১ সালে এলামীয়দের প্রাচীন রাজধানী সুসা থেকে আবিষ্কার করা হয়েছিল এই অমূল্য রত্ন। মোট ১২টি পাথরের টুকরোয় লেখা এই আইন সংকলন পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন আইন হিসেবে সুপরিচিত। আক্কাদীয় ভাষায় লেখা এই আইনগুলো অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন যে কেউ পড়তে পারতেন। @ Mohasin Alam Roni


গ্ল্যাডিয়েটর যোদ্ধাদের অজানা দশ কাহিনি

চীন রোমান সাম্রাজ্যের দুর্ধর্ষ এ যোদ্ধারা হলিউড সিনেমার কল্যাণে একসময় বিশ্বজুড়ে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। হিংস্র প্রাণী ও মানুষদের সাথে তাদের আমরণ লড়াই যদিও এখনো গায়ে কাঁটা দেয় অনেকেরই। শিহরণ জাগায় শরীরজুড়ে। মৃত্যুকে মুষ্টিবদ্ধ করে রুদ্ধশ্বাস এ যুদ্ধ চলতো টান টান উত্তেজনায়। আর এতেই সম্রাট ও সাম্রাজ্যের সাধারণ প্রজারা পরিতৃপ্ত হতো এক বীভৎস পৈশাচিক আনন্দে।

তবে, রোমের দুঃসাহসী এই যোদ্ধাদের নিয়ে হলিউডের মুভি-সিরিজের কাহিনীকে রাঙানো হয়েছে কিছুটা অতিরঞ্জনের ছটায়। দর্শকদের মুগ্ধ করতে দেখানো হয়েছে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে, সাজানো হয়েছে বিবর্তিত রূপে। আর এখানেই মিথ্যার ছোট্ট এক অনন্য মিশ্রণে মিশে গেছে ইতিহাসের এক চিলতে সত্য। তাদের ঘিরে রচিত হয়েছে উদ্ভট সব কল্পকাহিনী। আজকের এ লেখায় জানবো সেই অজানা দশ কাহিনি নিয়েই

১. গ্ল্যাডিয়েটরদের সবাই দাস নয়

মুভি-সিরিজের রূপালী পর্দায় গ্ল্যাডিয়েটরদের দেখানো হয়েছে সাম্রাজ্যের দাস হিসেবে। যেখানে তারা বন্দী দাসত্বের নির্মম শৃঙ্খলে। আর তাই একজন দাস হিসেবে সম্রাটের আদেশ মানা একান্ত কর্তব্য। ফলে সম্রাটের আদেশে বাধ্য হয়েই তাদেরকে লড়তে হয়েছে সাধারণ মানুষ ও কৃতদাসের সঙ্গে। কিন্তু এটি পুরোপুরি সত্যি নয়! কেননা, যুদ্ধে বিজয়ী প্রত্যেক গ্ল্যাডিয়েটর সম্রাটের নিকট থেকে পেত মহামূল্যবান পুরষ্কার। আর তাই, দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে মুক্তি পেতে সাধারণ মানুষ, এমনকি সাবেক দক্ষ সেনারাও নাম লিখিয়েছে গ্ল্যাডিয়েটরের খাতায়। হয়ে উঠেছে একেকজন অদম্য সাহসী যোদ্ধা।

২. খেলাটি ছিল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার একাংশ

প্রাচীন রোমানরা বিশ্বাস করতো, মৃত্যুর পর মৃতদেহের সামনে রক্ত ঝরালে মৃতের আত্মা নির্বাণ লাভ করে, মুক্তি পায় শাস্তি থেকে। আর তাই অভিজাত সম্প্রদায়ের কারও মৃত্যু ঘটলে সম্রাটের আদেশে আয়োজিত হতো এই বীভৎস খেলা। যেখানে দুঃসাহসী গ্ল্যাডিয়েটরদের বিপরীতে যুদ্ধের ময়দানে নামিয়ে দেওয়া হতো সাজাপ্রাপ্ত ভয়ংকর সব আসামীদের। সংঘটিত হতো এক রক্তক্ষয়ী বীভৎস যুদ্ধ। রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের রাজত্বকালে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এটি। সম্রাট নিজেও মৃত পিতা ও কন্যার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ১০০ যোদ্ধার এক সুবিশাল লড়াইয়ের আয়োজন করেন।

৩. লড়াই মানেই মৃত্যু অবধারিত, এমন নয়

গ্ল্যাডিয়েটরদের যুদ্ধে দু’পক্ষের সংঘর্ষে একপক্ষ হারবে, পরাজয় বরণ করবে, এবং মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে, মুভি-সিরিজে সাধারণত এমনটাই দেখানো হয়ে থাকে। কিন্তু রোমান ইতিহাস অনুযায়ী এটি পুরোপুরি মিথ্যে। কেননা, সম্রাটের আদেশেই নির্ধারিত হতো খেলার নির্মমতার মাত্রা ও খেলোয়াড়দের মৃত্যু। কিছু কিছু খেলা আয়োজিত হতো কেবলই আনন্দ-বিনোদনের জন্য। সেসবে সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুনের ভেতর দিয়ে যেতে হতো খেলোয়াড়দের। যেখানে খেলা পরিচালনায় থাকতো একজন সুদক্ষ রেফারিও। দু’জন খেলোয়াড়ের কেউ যদি মারাত্মকভাবে আহত হতো, তখনই তিনি খেলা থামিয়ে দিতেন। তবে, কিছু খেলার নিয়মই ছিল মৃত্যু পর্যন্ত লড়াই।

৪. বৃদ্ধাঙ্গুলি নামানো মানেই মৃত্যু নয়

কলোসিয়ামের ভেতর চলমান যুদ্ধে গ্ল্যাডিয়েটরদের কেউ মারাত্মক আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তার মৃত্যু নির্ধারিত হতো সম্রাটের সিদ্ধান্তে। কখনো কখনো নির্ভর করতো দর্শকদের মতামতের উপরও। অনেকেই মনে করেন, সম্রাট তার বৃদ্ধাঙ্গুলি নিচের দিকে দেখালে বিজয়ী গ্ল্যাডিয়েটর ছিন্নভিন্ন করে ফেলতো তার প্রতিপক্ষের দেহ-পিঞ্জর। কিন্তু বাস্তবে তা হতো না। কিছু ঐতিহাসিকের মতে, সম্রাটের দু’হাতের ইশারাই কেবল নির্ধারণ করতো তা। এছাড়াও, সাদা রুমালের নাড়াচাড়া রক্ষা করতো আহত গ্ল্যাডিয়েটরের জীবন।

৫. তারা একাধিক দলে বিভক্ত ছিল

কলোসিয়ামে আয়োজিত হওয়া প্রথমদিকের যুদ্ধে অভিজ্ঞ যোদ্ধাদের পূর্ববর্তী খেলার বিজয়গাঁথা সাফল্য, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার উপর একাধিক দলে বিভক্ত করা হতো। অতঃপর আয়োজিত হতো এই খেলা। পাশাপাশি, প্রত্যেক দলের যোদ্ধাকে প্রদান করা হতো ধারালো অস্ত্র ও ছোরা। এসব দলের মধ্যে সেসময় সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল থারেসেস ও মুরমিলুনস নামে দুটি দল। এছাড়াও ঘোড়ার পিঠে চড়ে ইকুইটিস নামের একদল গ্ল্যাডিয়েটর সবেগে প্রবেশ করতো রণাঙ্গনে। তখনই হর্ষধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠতো রণাঙ্গন।

৬. হিংস্র প্রাণীদের সঙ্গে লড়াই করতো

অদম্য সাহসী গ্ল্যাডিয়েটরদের ভেতর থাকা একাধিক দলের মধ্যে অন্যতম দুটো হলো ভেনাতোরেস ও বেস্টিয়ারি। দল দুটোর যোদ্ধারা হিংস্র সিংহ, কুমির, ভাল্লুক, এমনকি বিশালাকার হাতিদের সঙ্গেও যুদ্ধ করেছে। তবে, এসব খেলায় তাদের অংশগ্রহণের পূর্বে হিংস্র প্রাণী শিকার করে পূর্ণ করতে হয়েছে নিজেদের অভিজ্ঞতার ঝুলি। এভাবে কলোসিয়ামে খেলা শুরু হওয়ার মাত্র একশো দিনের মাথায় গ্ল্যাডিয়েটরদের হাতে প্রাণ হারিয়েছিল প্রায় ৯ হাজার প্রাণী!

৭. নারীরাও ছিল গ্ল্যাডিয়েটর যোদ্ধা

রোমান ইতিহাস অনুযায়ী, পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও অংশগ্রহণ করতো রক্তক্ষয়ী এই খেলায়। তারাও পারদর্শী ছিল হিংস্র প্রাণীদের সঙ্গে বীভৎস যুদ্ধে। অংশ নিয়েছে অসংখ্য রণে হিংস্র প্রাণীদের বিপক্ষে। ঐতিহাসিকদের মতে, প্রথম শতাব্দীর প্রারম্ভে নারী যোদ্ধারা মেতে ওঠে এই খেলায়।

৮. রোমান সম্রাটরাও ছিলেন গ্ল্যাডিয়েটর

ইতিহাস বলে, জীবন বাজি রাখা মরণপণ এ লড়াইয়ে বেশ কয়েকজন রোমান সম্রাটও নিজেদের শক্তিমত্তা প্রদর্শনে অংশ নিয়েছেন। এভাবে কখনো তারা আয়োজকের ভূমিকা থেকে নেমে এসেছেন খেলোয়াড়ের কাতারে। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন রোমান সম্রাট ক্যালিগুলা, টাইটাস ও হাড্রিয়ান। যদিও সম্রাটদের সঙ্গে যুদ্ধে গ্ল্যাডিয়েটররা হামলা নয়, কেবল আত্মরক্ষার পন্থা অনুসরণ করেছে।

৯. লাভ করতো সম্মান ও খ্যাতি

গ্ল্যাডিয়েটর যোদ্ধারা রোমান সাম্রাজ্যে কুৎসিত মানুষ হিসেবে পরিগণিত হতো। তবে, সবকিছু ছাপিয়ে সাহসী গ্ল্যাডিয়েটরদের কীর্তিও শোনা যেত রাজ্যের আনাচে-কানাচে। গুরুত্বপূর্ণ দেয়ালে আঁকা হতো তাদের চিত্র। ঝোলানো থাকতো একেকজন সফল যোদ্ধার অর্জনের গল্প। ফলে, শিশু, যুবক ও বৃদ্ধদের মুখে ধ্বনিত হতো তাদের সুনাম। যুবতীরা আকৃষ্ট হতো তাদের প্রতি।

১০. পরিশেষে ছিল এক মজবুত ভ্রাতৃত্ববোধ

হিংস্র মনোভাব নিয়ে আজন্ম যুদ্ধ করা গ্ল্যাডিয়েটরদের ভেতরও ছিল ভ্রাতৃত্ববোধ। ছিল একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান ও মমত্ববোধ। সেখান থেকে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে গ্ল্যাডিয়েটরদের একটি সহযোগী ইউনিয়ন। আহত গ্ল্যাডিয়েটরদের সেবা-শুশ্রূষা ও নিহতদের যথাযোগ্য মর্যাদায় কবর দেওয়া ছিল এই ইউনিয়নের অন্যতম কাজ। এছাড়াও মৃতের স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্বও নিত তারা।

অদম্য সাহসী গ্ল্যাডিয়েটর যোদ্ধারা আদিম রোমান সাম্রাজ্যের এক অপ্রতিরোধ্য ঐতিহাসিক চরিত্র। তাদের প্রকৃত পরিচয় লড়াকু, দুরন্ত ও বীরত্বপূর্ণ দুঃসাহসী মানব। আর তাই চাঞ্চল্যকর মুভি-সিরিজের চিত্তাকর্ষক ভিএফএক্সের ছোঁয়ায় তাদের প্রকৃত ইতিহাসে মরীচিকার আবরণ না পড়ুক। বিকৃত না হোক সত্য ঘটনা। সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ুক কেবল রোমাঞ্চকর সেসব গল্পের নিখাঁদ বর্ণনা। @ Md. Mizanur Rahman



6-6-6 রুল সফল ক্যারিয়ার ও সুস্থ জীবনের ভারসাম্য

মো. আশিকুর রহমান

বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক যুগে ক্যারিয়ারে সফল হতে গিয়ে আমরা প্রায়ই একটি চোরাবালিতে আটকে যাই। দিনরাত এক করে কাজ করাকে আমরা ভাবি সাফল্যের শর্টকাট । কিন্তু শরীর আর মন যখন বিদ্রোহ করে, তখন উপলব্ধি হয় যে আমরা বাঁচার জন্য কাজ করছি, না কি কাজ করার জন্য বাঁচছি? যারা কাজের চাপে নিজের ব্যক্তিগত জীবন হারিয়ে ফেলছেন, তাদের জন্য আধুনিক ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞানের এক জাদুকরি সমাধান হলো "৮-৮-৮ রুল'।

কী এই ৮-৮-৮ রুল

আমাদের প্রত্যেকের হাতে দিনে ২৪ ঘণ্টা সময় আছে। এই সময়কে তিনটি সমান ভাগে ভাগ করে ভারসাম্যপূর্ণ জীবন যাপন করাই হলো এই নিয়মের মূল কথা। অর্থাৎ

প্রথমত, ৮ ঘণ্টা কঠোর পরিশ্রম (Hard Work), এটি আপনার অফিস, ব্যবসা বা পড়াশোনার সময়।

এই ৮ ঘণ্টা হবে নিরেট কাজ বা 'ডিপ ওয়ার্ক'-এর জন্য। দ্বিতীয়ত, ৮ ঘন্টা প্রশান্তির ঘুম (Good Sleep), সুস্থ মস্তিষ্ক এবং শরীরের জন্য পর্যাপ্ত ঘুম অপরিহার্য। এটি আপনার পরের দিনের কাজের জ্বালানি। তৃতীয়ত, বাকি ৮ ঘণ্টা নিজের জন্য (Personal Time), এই শেষ ৮ ঘণ্টাই নির্ধারণ করে আপনি কতটা সুখী মানুষ। এটি ব্যয় হবে পরিবার, শখ, প্রার্থনা, ব্যায়াম এবং সামাজিক কাজে।

The Great Bangladesh

১. প্রোডাক্টিভিটি বা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি : অফিসে অতিরিক্ত সময় কাটালেই বেশি কাজ হয়—এই ধারণাটি ভ্রান্ত। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত পরিশ্রম মানুষের সৃজনশীলতা কমিয়ে দেয়। ৮ ঘণ্টা মন দিয়ে কাজ করলে যে আউটপুট আসে, ক্লান্ত মস্তিষ্কে ১২ ঘণ্টায়ও তা সম্ভব নয়।

২. বার্নআউট থেকে মুক্তি : টানা কয়েক মাস ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করলে 'বার্নআউট' বা মানসিক অবসাদ দেখা দেয়। ৮-৮-৮ রুল মেনে চললে কাজের প্রতি একঘেয়েমি আসে না এবং দীর্ঘ মেয়াদে ক্যারিয়ারে টিকে থাকা সহজ হয়।

৩. শারীরিক ও মানসিক সুস্বাস্থ্য : আমরা কাজের পেছনে ছুটতে গিয়ে স্বাস্থ্য বিসর্জন দিই। কিন্তু ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে পৌঁছে যদি শরীর ভেঙে পড়ে, তবে সেই সাফল্যের স্বাদ নেওয়া যায় না। পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিজের জন্য সময় রাখলে উচ্চ রক্তচাপ বা দুশ্চিন্তার মতো সমস্যাগুলো দূরে থাকে।

এটি বাস্তবায়ন করবেন যেভাবে

অনেকে বলতে পারেন, 'কর্পোরেট চাকরিতে কি আর ৮ ঘণ্টায় কাজ শেষ হয়?' তাদের জন্য কিছু টিপস— > কাজের অগ্রাধিকার ঠিক করুন : প্রতিদিন সকালে আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৩টি কাজ চিহ্নিত করুন এবং সেগুলো ৮ ঘণ্টার মধ্যেই শেষ করার চেষ্টা করুন ।

ডিজিটাল ডিটক্স : অফিস থেকে ফেরার পর ল্যাপটপ বা অফিসের ইমেইল থেকে দূরে থাকুন। বাড়ির ৮ ঘণ্টা সময় যেন অফিসের চিন্তা দখল করতে না পারে।

৩-এফ ও ৩-এইচ ফর্মুলা : নিজের জন্য বরাদ্দ ৮ ঘণ্টাকে আরও অর্থবহ করতে ৩-এফ (Family, Friends, Faith) এবং ৩-এইচ (Health, Hygiene, Hobby)-এর পেছনে ব্যয় করুন।

শেষ কথা ক্যারিয়ারে এই ভারসাম্য কেন জরুরি

বিখ্যাত শিল্পপতি রতন টাটা একবার বলেছিলেন, ‘কাজ জীবনের একটি অংশ মাত্র, পুরো জীবন নয়। আপনার পদবি বা স্যালারি কেবল আপনার ক্যারিয়ারের পরিচয়, কিন্তু আপনার স্বাস্থ্য এবং পরিবারই আপনার জীবনের আসল ভিত্তি। ক্যারিয়ারের সিঁড়িতে ওঠার সময় যদি ভিত্তিটাই নড়বড়ে হয়ে যায়, তবে সেই সাফল্য ক্ষণস্থায়ী। তাই আজ থেকেই শুরু করুন ৮-৮-৮ রুলের চর্চা । নিজের ২৪ ঘণ্টাকে নতুন করে সাজান, দেখবেন সাফল্য এবং সুখ—দুটোই আপনার হাতের মুঠোয়।#

সোর্স আশিকুর রহমান

ইত্তেফাক


গুছিয়ে কথা বলবেন যেভাবে

কারও কথা বলার জাদুতে মুগ্ধ হয়ে কি কখনও মনে হয়েছে—"ইশ! আমিও যদি এমন দারুণভাবে বলতে পারতাম?” মনে রাখবেন, সুন্দর করে কথা বলা কোনো দুর্লভ জন্মগত প্রতিভা নয়, বরং এটি একটি সুনিপুণ শিল্প যা চর্চার মাধ্যমে যে কেউ আয়ত্ত করতে পারে।

কেন গুছিয়ে কথা বলবেন?

কর্মক্ষেত্রে যারা গুছিয়ে কথা বলেন, তারা খুব সহজেই সহকর্মী ও ঊর্ধ্বতনদের আস্থা অর্জন করেন। একজন উদ্যোক্তার জন্য বাচনভঙ্গি হল তার অন্যতম প্রধান ব্যবসায়িক পুঁজি। একটি সাধারণ পণ্যও যদি সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা যায়—যেমন সেটি গ্রাহকের ঠিক কোন সমস্যাটি সমাধান করছে—তবে সেটির চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে। সঠিক বাচনভঙ্গি একজন উদ্যোক্তাকে কেবল একজন বিক্রেতা নয়, বরং একজন নেতা বা লিডার হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে।

সহজ কথায়—আপনার চিন্তাভাবনা আর কণ্ঠস্বরের মধ্যে নিখুঁত সামঞ্জস্য থাকাই হল সাফল্যের মূল মন্ত্র। নিজের ব্যক্তিত্বকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে আজই অনুসরণ করুন নিচের এই ৮টি কার্যকর টিপস।

১. সংক্ষিপ্ত ও সুনির্দিষ্ট হোন

আপনার বক্তব্যের মূল অংশটুকু সরাসরি বলার অভ্যাস করুন। দীর্ঘ এবং প্যাঁচানো বাক্য শ্রোতাকে ক্লান্ত করে দেয় এবং মূল আলোচনা থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। পাঁচটি বড় বাক্যের চেয়ে একটি শক্তিশালী ও সহজ বাক্য অনেক বেশি কার্যকর।

প্রতিটি কথা উচ্চারণের আগে একবার ভেবে নিন আপনি ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন। সংক্ষেপে মূল কথা বলার চর্চা করুন। যদি দেখেন আপনি অপ্রয়োজনীয় কথা বলছেন, তবে তাৎক্ষণিক নিজেকে থামিয়ে পুনরায় মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসুন।

২. প্রথম বাক্যটি ভেবেচিন্তে শুরু করুন

আপনার কথার শুরুটাই নির্ধারণ করে দেয় শ্রোতা আপনার কথা শেষ পর্যন্ত শুনবেন কিনা। তাই গতানুগতিক ভূমিকা বা কুশল বিনিময় দিয়ে শুরু না করে সরাসরি এমন কিছু বলুন যা শ্রোতার মনে কৌতূহল জাগায়।

যদি আপনাকে কোথাও বক্তৃতা দিতে হয় তবে বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন প্রশ্ন, কোনো চমকে দেওয়া তথ্য কিংবা ছোট কোনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করতে পারেন।

৩. স্পষ্ট এবং দৃঢ়ভাবে কথা বলুন

আপনার বিষয়বস্তু যতই ভাল হোক, শ্রোতারা যদি শব্দগুলিই বুঝতে না পারে তবে তার কোনো মূল্য নেই। প্রতিটি শব্দ পরিষ্কারভাবে উচ্চারণ করুন এবং অস্পষ্টতা এড়িয়ে চলুন। একঘেয়ে সুরে কথা বললে শ্রোতারা দ্রুত আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

কথা বলার সময় গলার স্বরে কখনও কিছুটা জোর দিন, আবার কখনও ধীরস্থিরভাবে বুঝিয়ে বলুন। প্রয়োজনে মাঝে মাঝে বিরতি দিন, যাতে আপনার কথাগুলি মানুষের মনে গেঁথে যায়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনুশীলন বা নিজের কণ্ঠ রেকর্ড করে শোনা আপনার এই জড়তা কাটাতে দারুণ সাহায্য করবে।

৪. নিয়মিত অনুশীলন করুন

বাকপটুতা রাতারাতি অর্জিত হয় না, এটি নিরন্তর অভ্যাসের বিষয়। কথা বলার প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগান—তা হতে পারে আড্ডায়, মিটিংয়ে বা নিজের সাথে একান্তে কথা বলা। শব্দ করে পড়ার অভ্যাস করুন এবং কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করুন। অন্যের কাছ থেকে গঠনমূলক মতামত বা ফিডব্যাক চান। সহকর্মী বা বন্ধুরা বলে দিতে পারবে আপনার উন্নতির জায়গাগুলি কোথায়।

৫. কথা বলার গতি নিয়ন্ত্রণ করুন

আপনি কতটা দ্রুত বা ধীরে কথা বলছেন, তার ওপর নির্ভর করে শ্রোতারা আপনাকে কতটা অনুসরণ করতে পারবে। খুব দ্রুত কথা বললে মানুষ খেই হারিয়ে ফেলে, আবার খুব ধীরে বললে তারা একঘেয়েমি অনুভব করে। একটি মাঝারি ও স্বাচ্ছন্দ্যময় গতি বজায় রাখুন।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সময় গতি কিছুটা কমিয়ে দিন যাতে শ্রোতারা তা প্রসেস করার সময় পায়। কথা বলার সময় শ্রোতাদের চোখের দিকে তাকিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করুন। যদি দেখেন তারা মনোযোগ হারাচ্ছে, তবে গলার স্বর বা গতি পরিবর্তন করে পুনরায় সংযোগ তৈরি করুন।

৬. হাত এবং মুখের ভঙ্গি ব্যবহার করুন

কথা বলার দক্ষতা শুধু শব্দের কারুকার্যে সীমাবদ্ধ নয়। আপনার শারীরিক ভাষা বা বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এতে বড় ভূমিকা রাখে। হাত নেড়ে বা চেহারার অভিব্যক্তির মাধ্যমে আপনার কথাকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলুন। সোজা হয়ে বসা বা দাঁড়ানো এবং কাঁধ পেছনের দিকে রাখা আপনাকে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হিসাবে উপস্থাপন করে।

কথা বলার সময় পরিমিতভাবে হাতের ব্যবহার করুন, যা শ্রোতাদের মনে বিষয়টি গেঁথে দিতে সাহায্য করবে। যেমন কোনো তালিকা বোঝাতে আঙুল দিয়ে গুণতে পারেন। এটি শ্রোতাদের মনে গেঁথে যায়। একইভাবে হাসিমুখে কথা বলা বা চোখের যোগাযোগ রাখা মানুষের সাথে সংযোগ তৈরি করে।

৭. শ্রোতাদের যুক্ত করুন

বক্তব্য যেন একতরফা বক্তৃতা না হয়ে বরং একটি প্রাণবন্ত আলাপচারিতা হয়। সরাসরি শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে কথা বলুন এবং তাদের আলোচনার অংশ করে নিন। মাঝে মাঝে এমন সব প্রশ্ন করুন যা তাদের চিন্তার খোরাক জোগায়। যেমন, "আপনারা কি কখনও এমন সমস্যায় পড়েছেন?"—এভাবে শ্রোতারা নিজেদের আপনার কথার সাথে মেলাতে পারবে। মানুষের কল্পনাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে কথা বললে তাদের মনোযোগ দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখা সম্ভব হয়।

৮. গল্পের শক্তি ব্যবহার করুন

মানুষ শুকনা তথ্য বা উপাত্ত ভুলে গেলেও সুন্দর একটি গল্প সবসময় মনে রাখে। 'স্টোরিটেলিং' হল কথাকে আকর্ষণীয় করার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। আমাদের মস্তিষ্ক গল্পের মাধ্যমে কোনো বিষয়কে দ্রুত গ্রহণ করতে পারে।

আপনার বক্তব্যের মাঝে প্রাসঙ্গিক ছোট কোনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা রূপক ব্যবহার করুন। এটি শ্রোতাদের মনে একটি দৃশ্যপট তৈরি করে এবং আবেগের সাথে সংযোগ স্থাপন করে। তবে খেয়াল রাখবেন গল্প যেন খুব বেশি দীর্ঘ না হয় এবং অবশ্যই তা মূল প্রসঙ্গের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।

.

যে সাধারণ ভুলগুলি এড়িয়ে চলবেন

সবাই ভুল করে, কিন্তু সেগুলি চিনতে পারাটাই বড় কথা। এই ৫টি বিষয় এড়িয়ে চলুন—

১. জটিল শব্দের ব্যবহার: খুব বেশি টেকনিক্যাল ও জটিল শব্দ ব্যবহার করলে মানুষ আপনার কথা বুঝতে পারবে না। সহজ ও প্রচলিত ভাষা ব্যবহার করুন।

২. কথার পুনরাবৃত্তি: একই কথা বার বার বললে মানুষ ধৈর্য হারিয়ে ফেলে। একবার পরিষ্কার করে বুঝিয়ে পরের পয়েন্টে চলে যান।

৩. লম্বা ও জটিল বাক্য: বাক্যের মারপ্যাঁচে আসল কথা হারিয়ে যায়। বড় চিন্তাকে ছোট ছোট বাক্যে ভাগ করুন।

৪. নেতিবাচক বা পরোক্ষ প্রকাশভঙ্গি: সবসময় ইতিবাচক ও সক্রিয় শব্দ ব্যবহার করুন। "এটা খারাপ না" না বলে বলুন "এটা বেশ ভাল"। এতে আপনার আত্মবিশ্বাস প্রকাশ পায়।

৫. মূল বিষয় থেকে দূরে সরে যাওয়া: আলোচনায় মূল বিষয় ধরে রাখুন। অপ্রাসঙ্গিক গল্প বা কথা শ্রোতাদের মনোযোগ নষ্ট করে।

.

সুন্দর করে কথা বলা কোনো জাদুকরী বিষয় নয়। এটি মূলত জ্ঞান, অনুশীলন এবং সচেতন যোগাযোগের ফল। যে কেউ চাইলে এই দক্ষতা অর্জন করতে পারে। এখানে দেওয়া টিপসগুলি আপনার জন্য একটি টুলবক্সের মত কাজ করবে। নিয়মিত এগুলি ব্যবহার করুন।

কোনো বক্তৃতা বা আলোচনা নিখুঁত না হলে মন খারাপ করবেন না। ভুল থেকেই মানুষ শেখে। প্রতিটি নতুন সুযোগ আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়াবে। পরবর্তী প্রেজেন্টেশন বা আড্ডায় এখান থেকে অন্তত একটি টিপস কাজে লাগানোর চেষ্টা করুন। দেখবেন, খুব দ্রুতই আপনি একজন দারুণ বক্তা হিসাবে নিজেকে আবিষ্কার করবেন। শুভকামনা আপনার এই পথচলায়!


স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ক্যারল ডোয়েক তার দীর্ঘ গবেষণার পর একটি যুগান্তকারী ধারণা দিয়েছেন, যা 'গ্রোথ মাইন্ডসেট' (Growth Mindset) নামে পরিচিত।

মাইন্ডসেট কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?

সহজ কথায়, মাইন্ডসেট হলো আমাদের চিন্তা করার ধরন বা দৃষ্টিভঙ্গি। আমরা নিজেদের এবং নিজেদের ক্ষমতা সম্পর্কে যা বিশ্বাস করি, তা-ই আমাদের জীবনকে চালিত করে। ডুয়েকের মতে, মানুষের মানসিকতা প্রধানত দুই প্রকার:

১. ফিক্সড মাইন্ডসেট (Fixed Mindset): যারা বিশ্বাস করেন যে মানুষের মেধা, বুদ্ধি এবং দক্ষতা জন্মগতভাবে নির্ধারিত এবং তা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এরা ব্যর্থতাকে ভয় পায় এবং নতুন চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে চলতে চায়।

২. গ্রোথ মাইন্ডসেট (Growth Mindset): যারা বিশ্বাস করেন যে কঠোর পরিশ্রম, সঠিক কৌশল এবং নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে যেকোনো দক্ষতা বা মেধা বৃদ্ধি করা সম্ভব। এরা ব্যর্থতাকে শেখার একটি সুযোগ হিসেবে দেখে।

সাফল্যের সিঁড়িতে আরোহণ করতে হলে গ্রোথ মাইন্ডসেটের কোনো বিকল্প নেই। কারণ, যেখানে ফিক্সড মাইন্ডসেট মানুষকে থামিয়ে দেয়, সেখানে গ্রোথ মাইন্ডসেট মানুষকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

সাফল্যের সিঁড়ি হিসেবে গ্রোথ মাইন্ডসেটের ভূমিকা

সাফল্যের পথ কখনো মসৃণ হয় না। সেখানে থাকে বাধা, সমালোচনা এবং অনেক ব্যর্থতা। গ্রোথ মাইন্ডসেট কীভাবে এই প্রতিটি ধাপে আমাদের সাহায্য করে, তা নিচে আলোচনা করা হলো:

১. চ্যালেঞ্জকে আলিঙ্গন করা

ফিক্সড মাইন্ডসেটের অধিকারীরা চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে চলে কারণ তারা ভয় পায় যে ব্যর্থ হলে লোকে তাদের 'অযোগ্য' ভাববে। কিন্তু গ্রোথ মাইন্ডসেট সম্পন্ন ব্যক্তিরা চ্যালেঞ্জকে স্বাগত জানান। তারা জানেন যে একটি কঠিন কাজ করার মাধ্যমেই মস্তিষ্কের নতুন নতুন নিউরন সক্রিয় হয় এবং তারা আরও দক্ষ হয়ে ওঠেন। সাফল্যের প্রথম সিঁড়ি হলো আরামদায়ক অবস্থা বা 'কমফোর্ট জোন' থেকে বেরিয়ে আসা, যা কেবল গ্রোথ মাইন্ডসেট থাকলেই সম্ভব।

২. ব্যর্থতাকে শিক্ষার অংশ হিসেবে দেখা

টমাস আলভা এডিসন বৈদ্যুতিক বাল্ব আবিষ্কারের আগে হাজার বার ব্যর্থ হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, "আমি ব্যর্থ হইনি, আমি কেবল ১০,০০০টি উপায় খুঁজে পেয়েছি যা কাজ করে না।" এটিই হলো খাঁটি গ্রোথ মাইন্ডসেট।

সাফল্যের সিঁড়িতে প্রতিটি ব্যর্থতা আসলে একটি করে অভিজ্ঞতার ধাপ। গ্রোথ মাইন্ডসেট আমাদের শেখায় যে ব্যর্থতা মানে পরাজয় নয়, বরং এটি একটি সংকেত যে আমাদের কৌশল পরিবর্তন করা প্রয়োজন।

৩. প্রচেষ্টাকে শ্রেষ্ঠত্বের পথ হিসেবে গণ্য করা

অনেকেই ভাবেন, "আমার যদি প্রতিভা থাকত, তবে আমাকে এত খাটতে হতো না।" এটি একটি নেতিবাচক ধারণা।

গ্রোথ মাইন্ডসেট বলে যে, পরিশ্রমই প্রতিভাকে শাণিত করে। বাস্কেটবল কিংবদন্তি মাইকেল জর্ডান বা ফুটবল তারকা লিওনেল মেসির মতো সফল মানুষেরা তাদের অলৌকিক দক্ষতার পেছনে হাজার হাজার ঘণ্টার কঠোর পরিশ্রম ব্যয় করেছেন। তারা বিশ্বাস করতেন যে অনুশীলনের মাধ্যমেই অসাধ্য সাধন সম্ভব।

৪. সমালোচনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ

সাফল্যের পথে অন্যের গঠনমূলক সমালোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফিক্সড মাইন্ডসেটের মানুষ সমালোচনা শুনলে আঘাত পায় এবং নিজেকে গুটিয়ে নেয়।

অন্যদিকে, গ্রোথ মাইন্ডসেটের মানুষ সমালোচনার মধ্য থেকে প্রয়োজনীয় তথ্যটি খুঁজে নেয় যা তাকে ভবিষ্যতে আরও ভালো করতে সাহায্য করবে। তারা অন্যকে প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে তাদের সাফল্য থেকে অনুপ্রেরণা নেয়।

গ্রোথ মাইন্ডসেট গঠনের কৌশল

গ্রোথ মাইন্ডসেট কোনো জন্মগত বৈশিষ্ট্য নয়; এটি চর্চার মাধ্যমে গড়ে তোলা যায়। নিচে কিছু কার্যকরী কৌশল দেওয়া হলো:

১. "এখনও" (Yet) শব্দের জাদু:

যখনই মনে হবে "আমি এই কাজটি পারছি না", তখন বাক্যটি এভাবে বলুন— "আমি এই কাজটি এখনও পারছি না।" এই ছোট একটি শব্দ আপনার মস্তিষ্কের সীমাবদ্ধতাকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে ভবিষ্যতে আপনি অবশ্যই এটি পারবেন।

২. ফল নয়, প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব দিন:

সাফল্য অর্জনে চূড়ান্ত ফলাফলের চেয়ে আপনি কীভাবে কাজটি করছেন, সেই প্রক্রিয়া বা চেষ্টার প্রশংসা করুন। আপনি যখন নিজের পরিশ্রমের মূল্যায়ন করতে শিখবেন, তখন ফলাফল আপনার অনুকূলে আসতে বাধ্য।

৩. প্রতিনিয়ত নতুন কিছু শেখা:

নিজেকে সব সময় একজন শিক্ষার্থীর ভূমিকায় রাখুন। প্রতিদিন অন্তত নতুন একটি তথ্য বা দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করুন। জ্ঞান অর্জনের এই তৃষ্ণা আপনার মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।

৪. কমফোর্ট জোন ত্যাগ করা:

যে কাজগুলো করতে আপনি ভয় পান বা অস্বস্তি বোধ করেন, সেগুলো করার চেষ্টা করুন। ছোট ছোট ঝুঁকি নিন। প্রতিবার যখন আপনি নতুন কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবেন, আপনার আত্মবিশ্বাস এবং মাইন্ডসেট শক্তিশালী হবে।

নিউরোপ্লাস্টিসিটি: বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে গ্রোথ মাইন্ডসেট

আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান বা নিউরোসায়েন্স গ্রোথ মাইন্ডসেটের ধারণাকে সমর্থন করে। বিজ্ঞান বলছে, আমাদের মস্তিষ্ক অনেকটা প্লাস্টিকের মতো নমনীয়, যাকে 'নিউরোপ্লাস্টিসিটি' বলা হয়।

আমরা যখন নতুন কিছু শিখি বা কোনো কঠিন সমস্যার সমাধান করি, তখন আমাদের মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর মধ্যে নতুন নতুন সংযোগ (Synapse) তৈরি হয়। অর্থাৎ, আমরা আক্ষরিক অর্থেই আমাদের মস্তিষ্ককে আরও বুদ্ধিমান করে তুলতে পারি। তাই আপনি জন্মগতভাবে কতটা মেধাবী, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো আপনি নিজের মস্তিষ্ককে কতটা ব্যবহার করছেন।

সাফল্য ও গ্রোথ মাইন্ডসেটের বাস্তব উদাহরণ

পৃথিবীর ইতিহাসে যারাই বড় কিছু করেছেন, তাদের প্রত্যেকের মধ্যেই এই গ্রোথ মাইন্ডসেট প্রবল ছিল। জে.কে. রাউলিং-এর 'হ্যারি পটার' পাণ্ডুলিপি ১২টি প্রকাশনী প্রত্যাখ্যান করেছিল। তিনি যদি ফিক্সড মাইন্ডসেটের হতেন, তবে হয়তো প্রথম দুই-তিনবার প্রত্যাখ্যাত হয়েই লেখা ছেড়ে দিতেন। কিন্তু তিনি নিজের ওপর বিশ্বাস রেখেছিলেন এবং ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।

একইভাবে, মহাকাশ গবেষণা সংস্থা 'স্পেস এক্স'-এর প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্কের প্রথম তিনটি রকেট উৎক্ষেপণ ব্যর্থ হয়েছিল। তিনি দেউলিয়া হওয়ার পথে ছিলেন, কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে চতুর্থবার তিনি সফল হন। এই জেদ আর হার না মানা মানসিকতাই হলো সাফল্যের আসল সিঁড়ি।

সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে হলে আপনাকে কেবল আপনার কাজের দক্ষতাই বাড়াতে হবে না, বরং আপনার চিন্তা জগতের খোলনলচে বদলে ফেলতে হবে।

গ্রোথ মাইন্ডসেট মানে এই নয় যে প্রত্যেকেই আইনস্টাইন বা ম্যারাডোনা হয়ে যাবে, বরং এর অর্থ হলো প্রত্যেকেই তার বর্তমান অবস্থা থেকে অনেক বেশি উন্নতি করতে সক্ষম।

মনে রাখবেন, মেধা বা প্রতিভা আপনাকে কেবল শুরুর লাইনে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে, কিন্তু শেষ রেখা অতিক্রম করতে হলে প্রয়োজন অদম্য মানসিকতা এবং নিরলস পরিশ্রম।

আজ থেকেই নিজের সীমাবদ্ধতাকে প্রশ্ন করুন, ব্যর্থতাকে আলিঙ্গন করতে শিখুন এবং বিশ্বাস করুন যে আপনি আপনার চেষ্টায় যেকোনো পর্বত জয় করতে পারেন। কারণ সাফল্য আপনার ভাগ্যে নয়, আপনার মাইন্ডসেট বা মানসিকতায় লুকিয়ে আছে।

আপনার চিন্তা পরিবর্তন করুন, আপনার জীবন পরিবর্তিত হবে। সাফল্যের সিঁড়ি আপনার অপেক্ষায়।