ডায়াবেটিস রোগীদের ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়ার মূল কারণ এবং এটি নিয়ন্ত্রণে রাখার উপায়গুলো নিচে সহজভাবে আলোচনা করা হলো:

​কেন ঘন ঘন প্রস্রাব হয়?

​ডায়াবেটিসে রক্তে শর্করার (গ্লুকোজ) মাত্রা যখন অনেক বেড়ে যায়, তখন শরীর সেই বাড়তি শর্করা প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় 'অসমোটিক ডাইইউরেসিস' (Osmotic Diuresis) বলা হয়।

কিডনির বাড়তি চাপ: রক্তে অতিরিক্ত গ্লুকোজ থাকলে কিডনি তা ফিল্টার করতে হিমশিম খায়। তখন শরীর থেকে বাড়তি গ্লুকোজ বের করার জন্য কিডনি রক্ত থেকে প্রচুর পানি টেনে নিয়ে প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।

শরীরের প্রতিরক্ষা: শরীর তার ভেতরকার অতিরিক্ত চিনি বের করে দেওয়ার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবেই প্রস্রাব তৈরির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, ফলে রোগীকে বারবার প্রস্রাব করতে হয়।

​এটি কিভাবে রোধ বা নিয়ন্ত্রণ করা যায়?

​এই সমস্যাটি মূলত ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করে। রক্তে শর্করার মাত্রা ঠিক রাখতে পারলে প্রস্রাবের এই সমস্যা অনেকাংশেই কমে আসে।

১. রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ:

সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো নিয়মিত ওষুধ বা ইনসুলিন গ্রহণ করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্লাড সুগার লেভেল স্বাভাবিক সীমায় রাখা।

২. স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস:

​শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ খাবার মেপে খান।

​আঁশযুক্ত খাবার (শাক-সবজি, খোসাসহ ফলমূল) বেশি করে খান, যা রক্তে চিনি বাড়ার গতি ধীর করে দেয়।

​মিষ্টি, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয় পুরোপুরি এড়িয়ে চলুন।

৩. নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম:

প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট মাঝারি ধরনের ব্যায়াম (যেমন: দ্রুত হাঁটা) করুন। এটি শরীরের ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ায় এবং রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

৪. পর্যাপ্ত পানি পান:

ঘন ঘন প্রস্রাবের কারণে শরীর পানিশূন্য (Dehydration) হয়ে যেতে পারে। তাই সারাদিন প্রচুর পানি পান করুন। তবে রাতে প্রস্রাবের বেগ কমাতে ঘুমের অন্তত ২ ঘণ্টা আগে থেকে তরল জাতীয় খাবার খাওয়ার পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে দিতে পারেন।

৫. ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল পরিহার:

চা, কফি বা অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় মূত্রাশয়কে উত্তেজিত করতে পারে, যা প্রস্রাবের বেগ বাড়ায়। এগুলো এড়িয়ে চলাই ভালো।

৬. নিয়মিত চেকআপ:

ডায়াবেটিসের কারণে কিডনির কোনো সমস্যা বা মূত্রনালীর সংক্রমণ (UTI) হয়েছে কি না তা নিশ্চিত হতে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। অনেক সময় ডায়াবেটিসের কারণে মূত্রাশয়ের স্নায়ু দুর্বল হয়ে যেতে পারে, যার জন্য বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

সতর্কতা: যদি হঠাৎ প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া, প্রস্রাবে রক্ত আসা, তীব্র ব্যথা বা জ্বর অনুভব করেন, তবে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এগুলো সংক্রমণ বা অন্য কোনো গুরুতর সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।




আপনি কি সত্যিই টাকা উপার্জন করছেন, নাকি শুধু নিজের সময় বিক্রি করছেন?

একটি প্রশ্নই আপনার পুরো অর্থনৈতিক বাস্তবতা বদলে দিতে পারে।

আজ যদি আপনি আপনার চাকরি, ব্যবসা বা ফ্রিল্যান্সিং বন্ধ করে দেন, আগামী মাসেও কি আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা আসবে?

যদি উত্তর "না" হয়, তাহলে বাস্তবতা হলো আপনার এখনো কোনো ওয়েলথ নেই। আপনার আছে শুধু একটি ইনকাম সোর্স।

এই একটি পার্থক্যই পৃথিবীর ধনী এবং সাধারণ মানুষের জীবনকে দুই ভিন্ন পথে নিয়ে যায়।

অধিকাংশ মানুষ ইনকাম বাড়ানোর জন্য সারাজীবন কঠোর পরিশ্রম করে। কিন্তু খুব কম মানুষ এমন একটি সিস্টেম তৈরি করে, যেখানে টাকা নিজেই নতুন টাকা তৈরি করতে শুরু করে।

আর এখান থেকেই শুরু হয় ওয়েলথ ক্রিয়েশন।

১. পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষদের একটি মিল আছে, তারা সবাই কোনো না কোনো কিছুর মালিক

এক মুহূর্তের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষদের কথা ভাবুন।

কেউ বিশাল বিজনেসের ওনার, কেউ হাজার কোটি টাকার ইনভেস্টমেন্ট পোর্টফোলিও পরিচালনা করেন, কেউ রিয়েল এস্টেট এম্পায়ার গড়েছেন, আবার কেউ এমন একটি রেয়ার স্কিল তৈরি করেছেন যার মূল্য কোটি কোটি টাকা।

খেয়াল করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়। তাদের আয়ের মূল উৎস তাদের শ্রম নয়, তাদের ওনারশিপ।

এখানেই অধিকাংশ মানুষ সবচেয়ে বড় ভুলটি করে। আমরা ছোটবেলা থেকেই শিখি ভালো পড়াশোনা করতে, ভালো চাকরি পেতে এবং একটি নিরাপদ স্যালারি নিশ্চিত করতে। কিন্তু খুব কম মানুষ শেখে কীভাবে এমন কিছু তৈরি করতে হয়, যা নিজের অনুপস্থিতিতেও আয় করতে পারে।

এই চারটি স্তরের পার্থক্য বোঝা ছাড়া ফাইন্যান্সিয়াল ফ্রিডম সম্ভব নয়।

২. স্যালারি আপনাকে ধনী বানাতে পারে না, যদি না আপনি ওনারশিপ তৈরি করেন

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। চাকরি খারাপ নয়। ব্যবসাও সবার জন্য নয়। আসল বিষয় চাকরি বা ব্যবসা নয়।

আসল বিষয় হলো আপনার ইনকাম এর ক্যারেক্টার।

আপনার ইনকাম কি আপনার উপস্থিতির উপর নির্ভর করছে, নাকি আপনার তৈরি করা অ্যাসেট এর উপর?

ধরুন আপনি একজন দক্ষ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। আপনি যতক্ষণ কাজ করবেন ততক্ষণ আয় করবেন। কাজ বন্ধ করলেই ইনকাম বন্ধ হয়ে যাবে।

অন্যদিকে একজন ব্যক্তি হয়তো দশ বছর আগে একটি সফটওয়্যার প্রোডাক্ট তৈরি করেছেন। আজও প্রতিদিন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ সেটি কিনছে। তিনি ঘুমাচ্ছেন, ভ্রমণ করছেন কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন, কিন্তু তার ক্যাশ ফ্লো বন্ধ হচ্ছে না।

এটাই অ্যাকটিভ ইনকাম এবং প্যাসিভ ইনকাম এর মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য।

যতক্ষণ আপনার প্রতিটি টাকার জন্য নিজের সময় বিক্রি করতে হবে, ততক্ষণ আপনি ইনকাম আর্ন করছেন। কিন্তু যেদিন আপনার অ্যাসেট আপনার হয়ে আয় করতে শুরু করবে, সেদিন থেকে আপনি ওয়েলথ বিল্ড করা শুরু করবেন।

৩. পৃথিবীতে আসলে দুটি অর্থনীতি একসঙ্গে চলে

অধিকাংশ মানুষ এই বিষয়টি কখনো উপলব্ধিই করে না।

প্রথম অর্থনীতির নাম এমপ্লয়মেন্ট ইকোনমি। এখানে মানুষ নিজের সময় বিক্রি করে টাকা আয় করে।

দ্বিতীয় অর্থনীতির নাম ওনারশিপ ইকোনমি। এখানে মানুষ অ্যাসেট তৈরি করে, বিজনেস তৈরি করে, ইনভেস্টমেন্ট করে এবং ক্যাপিটালকে নিজের জন্য কাজ করায়।

বেশিরভাগ মানুষ প্রথম অর্থনীতিতে জন্মায়, পড়াশোনা করে এবং সারা জীবন সেখানেই থেকে যায়। অন্যদিকে ধনী মানুষ ধীরে ধীরে দ্বিতীয় অর্থনীতিতে প্রবেশ করে।

এই কারণেই একই স্যালারি থাকা দুই ব্যক্তির ফাইন্যান্সিয়াল ফিউচার সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।

৪. ২৫ শতাংশ রুল আসলে ইনভেস্টমেন্ট রুল নয়, এটি একটি আইডেন্টিটি রুল

২৫% রুল হল, আপনার ইনকামের ২৫% ইনভেস্টমেন্ট করা। অনেকেই মনে করেন এই নিয়ম শুধু বাজেট ম্যানেজমেন্ট শেখায়। আসলে বিষয়টি তার চেয়েও গভীর।

এই রুল আপনাকে একটি নতুন পরিচয় দেয়। আপনি আর শুধু একজন কনজিউমার থাকেন না। আপনি ধীরে ধীরে একজন ওনার হয়ে ওঠেন।

প্রথম ২৫ শতাংশ ইনকাম এর উদ্দেশ্য টাকা জমিয়ে রাখা নয়। এর উদ্দেশ্য এমন অ্যাসেট তৈরি করা, যা ভবিষ্যতে আপনার জন্য ইনকাম জেনারেট করবে।

এই অ্যাসেট হতে পারে একটি ইনডেক্স ফান্ড, একটি বিজনেস, একটি ডিজিটাল প্রোডাক্ট, একটি হাই ইনকাম স্কিল অথবা এমন একটি নলেজ বেস, যার মাধ্যমে আপনি ভবিষ্যতে আরও বেশি আয় করতে পারবেন।

এক কথায়, এই ২৫ শতাংশ আপনার ভবিষ্যতের ইনভেস্টমেন্ট। আজ আপনি তাকে টাকা দিচ্ছেন। আগামী দশ বছর পরে সেই অ্যাসেট আপনাকে টাকা দেবে।

৫. কম্পাউন্ড গ্রোথ হলো পৃথিবীর সবচেয়ে অবমূল্যায়িত ফাইন্যান্সিয়াল সুপারপাওয়ার

ধরুন দুইজন কৃষক একই জমিতে চাষ শুরু করলেন।

প্রথম কৃষক আজই একটি আমগাছ লাগালেন। দ্বিতীয় কৃষক ভাবলেন, "আরও দশ বছর পরে লাগাব। তখন একসঙ্গে অনেকগুলো লাগাব।"

দশ বছর পরে দ্বিতীয় কৃষক সত্যিই অনেক বেশি গাছ লাগালেন। কিন্তু ততদিনে প্রথম কৃষকের গাছ শুধু বড়ই হয়নি, ফল দেওয়াও শুরু করেছে। সেই ফল থেকে নতুন চারা হয়েছে। নতুন চারাগুলোও বড় হচ্ছে।

দেখতে গেলে দ্বিতীয় কৃষক হয়তো বেশি পরিশ্রম করেছেন। কিন্তু প্রথম কৃষক সময়কে নিজের পক্ষে কাজ করিয়েছেন।

ইনভেস্টমেন্ট ঠিক এমনই। কম্পাউন্ড গ্রোথ কখনো টাকাকে পাত্তা দেয় না। । সে সময়কে পাত্তা দেয়।

এই কারণেই ২০ বছর বয়সে করা ছোট একটি ইনভেস্টমেন্ট অনেক সময় ৩০ বছর বয়সে করা বড় ইনভেস্টমেন্ট এর চেয়েও বেশি সম্পদ তৈরি করে। ফাইন্যান্সিয়াল ওয়ার্ল্ড এ সবচেয়ে দামি জিনিস টাকা নয়। সবচেয়ে দামি জিনিস হলো টাইম।

৬. সবচেয়ে বড় ভুল, মানুষ ইনভেস্টমেন্ট শুরু করার আগে অনেক টাকা জমার অপেক্ষা করে

এই মানসিকতা হাজার হাজার মানুষের ফাইন্যান্সিয়াল জার্নি শুরু হওয়ার আগেই শেষ করে দেয়।

মানুষ ভাবছে, "যখন মাসে এক লাখ টাকা আয় করব, তখন ইনভেস্টমেন্ট শুরু করব।" বাস্তবে তখনও নতুন একটি নতুন অজুহাত তৈরি হবে টাকা না জমানোর।

বেশি ইনকাম মানেই বেশি ইনভেস্টমেন্ট নয়। কারণ ইনকাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লাইফস্টাইলও বাড়তে থাকে। এটাকেই বলা হয় লাইফস্টাইল ইনফ্লেশন।

আজ যে মানুষ ৩০ হাজার টাকায় চলতে পারে, অনেক সময় তিন লাখ টাকা আয় করেও মাস শেষে একইভাবে শূন্য হয়ে যায়। কারণ সমস্যা ইনকাম এর নয়, সমস্যা ফাইন্যান্সিয়াল বিহেভিয়ার এর।

যারা ওয়েলথ বিল্ড করে, তারা ইনকাম বাড়ার আগেই এই জমানোর হ্যাবিট তৈরি করে।

৭. তাহলে প্রথম ২৫ শতাংশ কোথায় ইনভেস্টমেন্ট হিসাবে যাবে?

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার। সব ইনভেস্টমেন্ট সমান নয়। যে ইনভেস্টমেন্ট আপনাকে রাতে ঘুমাতে দেয় না, সেটি দীর্ঘমেয়াদে ভালো ইনভেস্টমেন্ট নয়। কারন আপনি নিজেকে সেই ইনভেস্টমেন্ট এ রিক্স ফ্রি করতে পারেন নি।

প্রথম ধাপে লো কস্ট ইনডেক্স ফান্ড দীর্ঘমেয়াদে একটি শক্তিশালী ফাউন্ডেশন তৈরি করতে পারে। এর পাশাপাশি নিজের স্কিল এ ইনভেস্টমেন্ট করা এমন একটি সিদ্ধান্ত, যার রিটার্ন অনেক সময় স্টক মার্কেট এর চেয়েও বেশি হয়। কারণ স্কিল শুধু ইনকাম বাড়ায় না, ভবিষ্যতের অপরচুনিটিও বাড়ায়।

এরপর ধীরে ধীরে বিজনেস, রিয়েল এস্টেট কিংবা অন্যান্য অ্যাসেট ক্লাস এ ডাইভার্সিফাই করা যেতে পারে।

যারা শুরুতেই দ্রুত ধনী হওয়ার লোভে সব টাকা হাই রিস্ক অ্যাসেট এ বিনিয়োগ করেন, তারা সাধারণত ওয়েলথ তৈরি করার আগেই ক্যাপিটাল হারিয়ে ফেলেন।

ওয়েলথ ক্রিয়েশন কখনো স্প্রিন্ট নয়। এটি একটি ম্যারাথন। যে ব্যক্তি ধারাবাহিকভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে, শেষ পর্যন্ত সম্পদ তার দিকেই এগিয়ে আসে।

আজই নিজের ইনকাম কোথাও লিখুন এবং একটি প্রশ্ন করুন, "আমার আয়ের কত শতাংশ আগামী পাঁচ বছর পরও আমার জন্য কাজ করবে?"

আজ থেকেই ২৫ শতাংশ গ্রোথ ফান্ড তৈরি করার পরিকল্পনা করুন। অল্প দিয়ে শুরু করুন, কিন্তু ধারাবাহিকতা বজায় রাখুন। ফাইন্যান্সিয়াল ফ্রিডম বড় সিদ্ধান্তের ফল নয়; এটি ছোট কিন্তু নিয়মিত সিদ্ধান্তের সমষ্টি।

ধনী মানুষ বেশি টাকা আয় করে বলে ধনী হয় না। তারা ধনী হয় কারণ এক সময় তাদের টাকা তাদের হয়ে কাজ করা শুরু করে। প্রশ্ন হলো, আপনার টাকা আজ কার হয়ে কাজ করছে?





 কেন অনেক বুদ্ধিমান হয়েও আপনি জীবনে এগোতে পারছেন না?

‎আমরা অনেকেই কঠোর পরিশ্রম করি, তবুও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাই না। এর প্রধান কারণ ‎আমাদের কিছু 'হিডেন বিহেভিয়ার প্যাটার্ন' বা গোপন আচরণের ধরণ। নিজেকে বদলে ফেলতে এই ‎১০টি পয়েন্ট মাথায় রাখুন:

1. ‎অন্যের নয়, নিজের গ্রোথে নজর দিন:

আপনি কি সারাদিন দেখেন কে নতুন গাড়ি কিনল বা

‎কার প্রমোশন হলো? অন্যের জীবন না দেখে গত ৩০ দিনে আপনি নিজের স্কিল বা কথা বলার ধরণ

‎কতটা উন্নত করেছেন, সেদিকে খেয়াল দিন।

2. ‎ভালো মানুষ হোন, ভালো সাজার চেষ্টা করবেন না:

সবাইকে খুশি রাখার জন্য সব জায়গায় ‎'হ্যাঁ' বলা বন্ধ করুন। নিজের মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়ে অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করা ‎আপনার ব্যক্তিত্বকে দুর্বল করে দেয়।

3. ‎সাফাই দেওয়া বন্ধ করুন:

কারো ফোন না ধরলে বা কোনো কাজ না করতে পারলে দীর্ঘ ‎ব্যাখ্যা দেবেন না। বারবার নিজেকে জাস্টিফাই করা আপনার ভেতরের নিরাপত্তাহীনতা বা

‎ইনসিকিউরিটিকে প্রকাশ করে।

4. ‎অ্যাটেনশন বা মনোযোগের সঠিক ব্যবহার:

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে অন্যের সোশ্যাল ‎মিডিয়া পোস্ট দেখে নিজের সাথে তুলনা করবেন না। আপনার মনোযোগ যেখানে যাবে, আপনার ‎মস্তিষ্ক সেভাবেই গড়ে উঠবে।

5. ‎ব্যস্ত থাকা মানেই উন্নতি নয়:

আপনি সারাদিন মিটিং বা কাজে ব্যস্ত থাকতে পারেন,

‎কিন্তু দিনশেষে ভাবুন—আজকের কাজটি কি আপনাকে আপনার লক্ষ্যের কাছে নিয়ে গেছে?

‎লক্ষ্যহীন ব্যস্ততা সময়ের অপচয় মাত্র।

6. ‎নিজের জীবনের স্টিয়ারিং অন্যের হাতে দেবেন না:

কোনো কাজ শুরু করার আগে "লোকে কী ‎বলবে" বা "কে হাসবে"—এই চিন্তা করা বন্ধ করুন। অন্যের মতামতের ওপর ভিত্তি করে নিজের ‎সিদ্ধান্ত বদলাবেন না।

7. ‎আবেগ নিয়ন্ত্রণ করুন:

কেউ প্রশংসা করলে খুব খুশি হওয়া আর সমালোচনা করলে সারারাত ‎মন খারাপ করে থাকা মানে হলো—আপনার জীবনের রিমোট কন্ট্রোল অন্যের হাতে। ইমোশনকে ‎নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখুন।

8. ‎শুনুন বেশি, বলুন কম:

আমরা অনেক সময় শোনার চেয়ে উত্তর দেওয়ার জন্য বেশি অস্থির ‎থাকি। সামনের মানুষটি কী বলছে এবং কোন অনুভূতি থেকে বলছে, তা বোঝার চেষ্টা করুন। পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা বাড়ান।

9.ব্যর্থতাকে পরিচয় বানাবেন না:

একবার কোনো কাজে ব্যর্থ হয়েছেন মানেই আপনি

‎'ব্যর্থ' নন। ওটা স্রেফ একটা পদ্ধতি ছিল যা কাজ করেনি। নিজেকে ছোট না করে ভুল থেকে

‎শিক্ষা নিয়ে পরের ধাপে এগিয়ে যান।

10.জানার চেয়ে প্রয়োগ বেশি জরুরি:

হাজারটা মোটিভেশনাল ভিডিও দেখে বা বই পড়ে লাভ

‎নেই যদি আপনি জীবনে তার ১% ও কাজে না লাগান। তথ্যের চেয়ে ইমপ্লিমেন্টেশন বা ‎প্রয়োগের গুরুত্ব অনেক বেশি।

শেষ কথা

একসাথে ১০টি পরিবর্তন আনা কঠিন। তাই আজই যেকোনো একটি পয়েন্ট বেছে নিন এবং ‎আগামী ৩০ দিন সেটির ওপর কাজ করুন। মনে রাখবেন, আপনার বর্তমান পরিচয় আপনার ভবিষ্যতের ‎ক্ষমতা নির্ধারণ করে না, বরং আপনার আজকের কাজই আপনার ভবিষ্যৎ গড়ে দেয়।  @ Gayan





প্রাচীন রোমের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন কে ছিল জানেন?

তিনি হলেন কার্থেজের শ্রেষ্ঠ সেনাপতি— হ্যানিবল বার্কা (Hannibal Barca)! যাকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা সামরিক প্রতিভা এবং "রোমের সর্বশ্রেষ্ঠ শত্রু" হিসেবে মানা হয়।

রোমান সাম্রাজ্য যখন নিজেদের অজেয় ভাবতে শুরু করেছিল, তখন এই একজন মানুষ তাদের অহংকার মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছিলেন। তার জীবনের কিছু দুর্ধর্ষ অধ্যায় আজও মানুষকে অবাক করে:

আল্পস পর্বত পাড়ি:

রোমানরা স্বপ্নেও ভাবেনি উত্তর দিক থেকে তাদের ওপর আক্রমণ হতে পারে। কিন্তু হ্যানিবল অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন! তিনি তার বিশাল সেনাবাহিনী এবং পালপাল যুদ্ধ-হাতি নিয়ে ভয়ংকর, বরফে ঢাকা আল্পস পর্বতমালা পাড়ি দিয়ে সরাসরি রোমের মাটিতে প্রবেশ করেন। এই দুঃসাহসিক অভিযান আজও সামরিক ইতিহাসের এক চরম বিস্ময়!

৫টি বড় যুদ্ধে পরাজয়:

ইতালিতে প্রবেশ করে তিনি রোমানদের রীতিমতো নাস্তানাবুদ করে ছাড়েন। তার তুখোড় রণনীতি ও বুদ্ধিমত্তার কাছে রোমান বাহিনী একে একে ৫টি বড় যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। নিজের মাটিতেই রোম এতটা অসহায় আগে কখনো হয়নি।

একদিনে ৮০ হাজার সৈন্যের মৃত্যু:

তবে হ্যানিবলের সবচেয়ে ভয়ংকর রূপটি রোম দেখেছিল ২১৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে 'ক্যানির যুদ্ধে' (Battle of Cannae)। এই যুদ্ধে হ্যানিবল তার অভাবনীয় 'Pincer Movement' বা সাঁড়াশি আক্রমণের ট্যাকটিক্স ব্যবহার করে একদিনেই রোমের প্রায় ৮০ হাজার সৈন্যকে হত্যা করেছিলেন! এটি ছিল রোমানদের জন্য এক আক্ষরিক মৃত্যুফাঁদ এবং তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক বিপর্যয়।

হ্যানিবল হয়তো শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে তার মাতৃভূমি কার্থেজকে জেতাতে পারেননি, কিন্তু রোমানদের মনে তিনি যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন, তা আজও কিংবদন্তি। তার রণকৌশল আজও বিশ্বের বিভিন্ন আধুনিক সামরিক অ্যাকাডেমিতে পড়ানো হয়।

একজন মানুষ কতটা জেদ আর বুদ্ধি রাখলে তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যকে একা হাতে কাঁপিয়ে দিতে পারে, হ্যানিবল তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ!





‘স্তান’ শব্দের শিকড় যেখানে

বিশ্ব মানচিত্রের দিকে তাকালে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় একটি চমৎকার ভাষাগত মিল চোখে পড়ে। সাতটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের নামের শেষে জুড়ে আছে একটি সাধারণ প্রত্যয়— ‘স্তান’। কাজাখস্তান থেকে আফগানিস্তান, কিংবা পাকিস্তান থেকে উজবেকিস্তান— এই দেশগুলোর ভৌগোলিক বৈচিত্র্য যেমন বিশাল, তেমনি তাদের নামের পেছনের ইতিহাসও বেশ রোমাঞ্চকর।

‘স্তান’ শব্দের শিকড় যেখানে:

‘স্তান’ প্রত্যয়টি মূলত একটি ফারসি (Persian) শব্দ। তবে এর ব্যুৎপত্তি আরও গভীরে, প্রাচীন ইন্দো-ইরানীয় মূল শব্দ ‘স্তা’ (Sta) থেকে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই একটি মূল শব্দ থেকেই তৈরি হয়েছে সংস্কৃতের ‘স্থান’, লাতিনের ‘Status’ এবং ইংরেজির ‘Stand’ বা ‘Station’।

এ কারণেই এর সঙ্গে বাংলা-সংস্কৃতের “স্থান” শব্দেরও আত্মীয়তা আছে।

মানে, “রাজস্থান”, “হিন্দুস্থান”, -এগুলোর “স্থান” আর “-স্তান” আসলে দূরসম্পর্কের নয়, প্রায় একই পরিবারভুক্ত।

সহজ কথায়, ফারসি ভাষায় ‘স্তান’ মানে হলো কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা গোষ্ঠীর ‘ভূমি’, ‘দেশ’ বা ‘বসবাসের স্থান’। যখন কোনো জাতিগোষ্ঠীর নামের শেষে এটি যুক্ত হয়, তখন সেটি তাদের আবাসভূমিকে নির্দেশ করে।

কেন এত দেশ ও অঞ্চলের নামে এটা আছে?

কারণ ঐতিহাসিকভাবে ফারসি ভাষা ও পারসিক সাংস্কৃতিক প্রভাব মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, আফগানিস্তান, ইরান-পার্শ্ববর্তী অঞ্চল, এমনকি রাশিয়ার কিছু অংশ পর্যন্ত খুব শক্তিশালী ছিল।

ফলে বহু জনগোষ্ঠী, ভূখণ্ড ও রাজনৈতিক এককের নামকরণে “-স্তান” একটি সাধারণ ভূ-নামকরণ suffix হয়ে যায়।

অর্থাৎ এটা শুধু ভাষা না—সাম্রাজ্য, প্রশাসন, সাহিত্য, মানচিত্র ও সংস্কৃতিরও উত্তরাধিকার।

সার্বভৌম ‘স্তান’ ও তাদের পরিচয়:

বর্তমানে বিশ্বের মানচিত্রে সরাসরি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে সাতটি ‘স্তান’ রয়েছে:

আফগানিস্তান: ‘আফগানদের ভূমি’। প্রাচীন সিল্ক রোডের এই সংযোগস্থলটি ঐতিহাসিকভাবেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কাজাখস্তান: আয়তনের দিক থেকে এটি বিশ্বের বৃহত্তম ‘স্তান’ এবং নবম বৃহত্তম রাষ্ট্র। ‘কাজাখ’ শব্দের অর্থ ‘দুঃসাহসী’ বা ‘স্বাধীনচেতা’। অর্থাৎ, এটি স্বাধীনচেতাদের দেশ।

কিরগিজস্তান: ‘কিরগিজ’ শব্দের উৎস হলো তুর্কি শব্দ ‘কিরক’, যার অর্থ ৪০। মনে করা হয়, ৪০টি শক্তিশালী গোত্রের মিলনে এই জাতির উৎপত্তি।

তাজিকিস্তান: পাহাড়-বেষ্টিত এই দেশটি ‘তাজিক’ বা পারস্য বংশোদ্ভূত মানুষের আবাসভূমি।

তুর্কমেনিস্তান: মরুভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এই দেশ ‘তুর্কমেন’ জাতিগোষ্ঠীর নামানুসারে।

উজবেকিস্তান: ‘উজবেক’ অর্থ ‘নিজের মালিক নিজে’। মধ্য এশিয়ার জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রাচীন কেন্দ্র বুখারা ও সমরখন্দ এই দেশেই অবস্থিত।

পাকিস্তান: এই নামটির ব্যুৎপত্তি কিছুটা ভিন্ন। এটি ভারত বিভাগের সময় কয়েকটি মুসলিম প্রধান অঞ্চলের নামের আদ্যক্ষর (P-Punjab, A-Afghania, K-Kashmir, S-Sindh, Tan-Balochistan) নিয়ে গঠিত। সাতটি দেশের মধ্যে এটি ব্যতিক্রমী কারণ এটি কোনো জাতির নামে নয়।

দেশ বাদে আঞ্চলিক নামগুলো নিয়ে আরেকদিন বলব। আর এই তালিকার বাইরে বেশ কয়েকটা দেশ আছে যারা নিজেরা ‌-স্তান বলে না নিজেদের দেশকে, কিন্তু অন্যভাষায় নামে স্তান আছে। সেগুলোর কথা বলছি তার আগে সবচে ব্যতিক্রম দেশটির কথা বলি-

হায়াস্তান:

অবাক হচ্ছেন? এই নামে কোনো দেশ আছে পৃথিবীর কোথাও সেটাই তো অজানা! আর্মেনিয়াকে তো চিনেন? ভৌগোলিকভাবে এশিয়ায় কিন্তু সাংস্কৃতিক ভাবে ইউরোপের সাথে যুক্ত। এই দেশটি নিজেকে আর্মেনিয়া নয়, "হায়াস্তান" নামে ডাকে। এই ‘স্তান’ অংশটি ওই একই ফারসি প্রত্যয় থেকেই এসেছে, যা অন্য সাতটি ‘স্তান’ দেশের ক্ষেত্রে আমরা দেখি।

অন্যান্য দেশের মতোই ‘হায়াস্তান’ শব্দটি দুটি অংশের সংমিশ্রণ:

হায়া (Haya): এটি এসেছে আর্মেনীয় জাতির পৌরাণিক আদিপিতা ‘হায়ক’ (Hayk)-এর নাম থেকে। আর্মেনীয়রা নিজেদের ‘হায়’ (Hay) বলে পরিচয় দেয়।

স্তান (Stan): এটি সেই প্রাচীন ফারসি প্রত্যয়, যার অর্থ ‘ভূমি’ বা ‘স্থান’।

অর্থাৎ, শাব্দিক অর্থে হায়াস্তান মানে হলো ‘হায়-দের ভূমি’ বা ‘হায়ক-এর বংশধরদের দেশ’।

আরও বেশ কয়েকটি দেশ আছে যাদের অন্য ভাষায় 'স্তান' বলা হয়, কিন্তু তাদের সরকারী নামে 'স্তান' নেই। তাদের নিয়ে আগামিতে বলব।

@ boikal


একদিনে একটি সিগারেট খেলে কেউ মারা যায় না, বা একদিন চকলেট খেলে কেউ মোটা হয় না। কিন্তু এই ছোট ভুলগুলোই যখন আমরা বছরের পর বছর

দিনের পর দিন করি, তখন তা জীবনকে ধ্বংস করে দেয়। একেই বলে 'ছোট ভুলের ফাঁদ'।




স্পেনে ৭৮১ বছরের মুসলিম শাসনের উত্থান ও পতন

৭১১ সাল: মুসলিমদের স্পেনে আগমন:

উমাইয়া খিলাফতের অধীনে সেনাপতি তারিক ইবন জিয়াদ জিব্রাল্টার প্রণালী অতিক্রম করে স্পেনে প্রবেশ করেন। ভিসিগথ রাজা রডরিককে পরাজিত করার পর অল্প কয়েক বছরের মধ্যে আইবেরীয় উপদ্বীপের অধিকাংশ অঞ্চল মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে আসে।

৭৫৬ সাল: স্বাধীন উমাইয়া আমিরাত প্রতিষ্ঠা:

উমাইয়া রাজপুত্র আবদুর রহমান প্রথম কর্ডোভায় স্বাধীন আমিরাত প্রতিষ্ঠা করেন। এর ফলে আল-আন্দালুস রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী ও স্থিতিশীল হয়ে ওঠে।

৯২৯ সাল: কর্ডোভা খেলাফতের প্রতিষ্ঠা:

আবদুর রহমান তৃতীয় নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন। এই সময় আল-আন্দালুস অর্থনীতি, বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে সর্বোচ্চ উন্নতিতে পৌঁছায়।

১০০৯–১০৩১ সাল: গৃহযুদ্ধ ও খেলাফতের পতন:

কর্ডোভা খেলাফতের অভ্যন্তরে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়, যা ফিতনা অব আল-আন্দালুস নামে পরিচিত।

১০৩১ সালে কর্ডোভা খেলাফত আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়।

এরপর সমগ্র অঞ্চল ছোট ছোট স্বাধীন মুসলিম রাজ্যে (Taifa Kingdoms) বিভক্ত হয়ে যায়। এটিই মুসলিম শক্তির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়।

১০৮৫ সাল: টলেডো খ্রিস্টানদের দখলে:

কাস্তিলের রাজা আলফোনসো ষষ্ঠ টলেডো দখল করেন। এটি ছিল মুসলিম শাসনের জন্য একটি বড় ধাক্কা। টলেডো শুধু রাজনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিক ও কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

১০৮৬ সাল: আলমোরাভিদদের আগমন:

উত্তর আফ্রিকার আলমোরাভিদরা মুসলিম রাজ্যগুলোর আহ্বানে স্পেনে এসে খ্রিস্টান বাহিনীকে সাময়িকভাবে প্রতিহত করে এবং কিছু সময়ের জন্য মুসলিম শক্তিকে পুনর্গঠিত করে।

১১৪৭ সাল: আলমোহাদ শাসন:

আলমোরাভিদদের স্থলে উত্তর আফ্রিকার আরেক শক্তিশালী মুসলিম রাজবংশ আলমোহাদরা ক্ষমতা গ্রহণ করে। কিছু সময় তারা মুসলিম শাসন টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়।

১২১২ সাল: লাস নাভাস দে টোলোসার যুদ্ধ:

এটি ছিল মুসলিম শাসনের ভাগ্য নির্ধারণকারী যুদ্ধ।

কাস্তিল, আরাগন ও নাভারের সম্মিলিত খ্রিস্টান বাহিনী আলমোহাদ সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে।

এরপর মুসলিমদের সামরিক শক্তি দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দক্ষিণ স্পেনে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।

১২৩৬ সাল: কর্ডোভা হারানো:

কাস্তিলের রাজা ফার্দিনান্দ তৃতীয় কর্ডোভা দখল করেন। মুসলিমদের শতাব্দীর রাজধানী হারিয়ে যায়।

১২৪৮ সাল: সেভিল পতন:

সেভিলও খ্রিস্টানদের দখলে চলে যায়। এরপর মুসলিমদের হাতে কেবল গ্রানাডা অবশিষ্ট থাকে।

১২৩৮–১৪৯২ সাল: গ্রানাডা আমিরাত:

নাসরিদ রাজবংশ গ্রানাডাকে কেন্দ্র করে প্রায় আড়াই শতাব্দী টিকে থাকে। তারা কাস্তিলকে কর প্রদান করে এবং কূটনৈতিকভাবে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করে। এই সময়েই বিখ্যাত আলহাম্বরা প্রাসাদ নির্মিত ও সম্প্রসারিত হয়।

১৪৬৯ সাল: খ্রিস্টান শক্তির ঐক্য:

কাস্তিলের রানি ইসাবেলা প্রথম এবং আরাগনের রাজা ফার্দিনান্দ দ্বিতীয়-এর বিবাহের মাধ্যমে দুটি শক্তিশালী রাজ্যের রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে ওঠে।

এই ঐক্য গ্রানাডার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অভিযানের পথ সুগম করে।

১৪৮২–১৪৯২ সাল: গ্রানাডা যুদ্ধ:

প্রায় ১০ বছর ধরে খ্রিস্টান বাহিনী গ্রানাডা অবরোধ করে। অন্যদিকে নাসরিদ রাজপরিবারের ভেতরেও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চলছিল।

২ জানুয়ারি ১৪৯২: মুসলিম শাসনের সমাপ্তি:

গ্রানাডার শেষ মুসলিম শাসক মুহাম্মদ দ্বাদশ শহরটি ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্পণ করেন। এর মধ্য দিয়ে স্পেনে প্রায় ৭৮১ বছরের মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে।

পতনের প্রধান কারণ:

মুসলিমদের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি:

কর্ডোভা খেলাফতের পতনের পর অসংখ্য ছোট ছোট তাইফা রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে। তারা একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত, এমনকি কখনও কখনও খ্রিস্টান রাজ্যগুলোর সহায়তাও নিত।

শক্তিশালী খ্রিস্টান জোট:

কাস্তিল, আরাগন, নাভার ও পর্তুগাল ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে “রিকনকুইস্তা” (Reconquista) বা পুনর্দখল অভিযান চালায়।

অর্থনৈতিক ও সামরিক দুর্বলতা:

দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সম্পদের সংকট মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে দুর্বল করে দেয়।

নেতৃত্বের সংকট:

শেষ নাসরিদ আমিরদের মধ্যে পারিবারিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব মুসলিম প্রতিরোধকে আরও দুর্বল করে।

উত্তর আফ্রিকার সহায়তা কমে যাওয়া:

আলমোরাভিদ ও আলমোহাদদের শক্তি ক্ষয় হওয়ার পর আল-আন্দালুস কার্যত একা হয়ে পড়ে।

মুসলিম শাসন শেষ হওয়ার পর কী ঘটেছিল?

মুসলমানদের প্রথমে ধর্ম পালনের কিছু অধিকার দেওয়া হলেও ধীরে ধীরে সেই অধিকার সীমিত করা হয়।

১৫০২ সালে কাস্তিলে মুসলমানদের ইসলাম ত্যাগ করে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ অথবা দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

১৫২৬ সালে আরাগনেও একই ধরনের নীতি কার্যকর হয়।

পরে অনেক মুসলমান জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত হন; এদের “মোরিস্কো” বলা হতো।

১৬০৯–১৬১৪ সালের মধ্যে স্পেনের রাজা তৃতীয় ফিলিপের শাসনামলে বিপুল সংখ্যক মোরিস্কোকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়।

@ ফিনলিট মাসুদ,






কেন ১০ মিনিটও ফোকাস ধরে রাখতে পারছেন না ?

আপনি কি কখনো খেয়াল করেছেন, একই মানুষ একদিন ১০ ঘণ্টা গভীর মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে পারে, আবার আরেকদিন ১০ মিনিটও বসে থাকতে পারে না? বেশিরভাগ মানুষ ভাবে এটা “ডিসিপ্লিনের” সমস্যা। কিন্তু আসল সত্য হলো, ফোকাস একটা পরিবেশ, একটা সিস্টেম, একটা মেন্টাল ডিজাইন, যেখানে ডিসিপ্লিনের অবদান খুব বেশি নয়।

যারা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি প্রোডাক্টিভ, তারা নিজেদের জোর করে কাজ করায় না। তারা এমনভাবে জীবন ডিজাইন করে, যাতে মনোযোগ স্বাভাবিকভাবে তৈরি হয়। আর এই জায়গাটাই আমাদের বেশিরভাগ মানুষ মিস করি।

যে মানুষ “না” বলতে পারে না, সে কখনো বড় কিছুতে “হ্যাঁ” বলতে পারে না

আমরা সাধারণত ভাবি সফল মানুষরা অনেক কিছু করে। বাস্তবে তারা অনেক কিছু “করে না”। এটাই তাদের শক্তি।

ভাবুন আপনার মনটা একটা রাস্তার মতো। প্রতিটা নোটিফিকেশন, প্রতিটা অপ্রয়োজনীয় কাজ, প্রতিটা ছোটখাটো ডিস্ট্রাকশন হলো রাস্তার স্পিড ব্রেকার। আপনি যত বেশি ব্রেকার রাখবেন, তত কম গতিতে এগোবেন। তাই ফোকাস বাড়ানোর প্রথম কাজ হলো “টু-ডু লিস্ট” না, বরং “নট-টু-ডু লিস্ট” তৈরি করা।

যে কাজ অন্য কেউ কম টাকায় করতে পারে, সেটা নিজে করা বন্ধ করতে হবে। যে অভ্যাস আপনার এনার্জি খেয়ে ফেলে, যেমনঃ অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া, টক্সিক মানুষদের সাথে সময় কাটানো, এসব ধীরে ধীরে আপনার ভবিষ্যৎকে নষ্ট করে দেয়। সফলতা অনেক সময় নতুন কিছু যোগ করার মাধ্যমে আসে না, বরং অপ্রয়োজনীয় জিনিস বাদ দেওয়ার মাধ্যমে আসে।

ফোকাস আসে না, ফোকাস তৈরি করতে হয়

অনেকেই অপেক্ষা করে “মুড” আসার জন্য। কিন্তু সত্য হলো, যারা বড় কিছু করে, তারা “মুড” এর উপর নির্ভর করে না। তারা ট্রিগার তৈরি করে।

একজন অ্যাথলেট যেমন ম্যাচের আগে নির্দিষ্ট রুটিন ফলো করে, তেমনি গভীর কাজ করার জন্যও আপনার মস্তিষ্ককের একটা সংকেত দরকার। নির্দিষ্ট চেয়ার, নির্দিষ্ট টেবিল, নির্দিষ্ট সময়, এগুলো মস্তিষ্ককে বলে দেয়, এখন “সিরিয়াস মুড।”

এখানে একটা মজার বিষয় আছে। আপনি যদি প্রতিদিন একই জায়গায় বসে শুধু ডিপ ওয়ার্ক করেন, কয়েক সপ্তাহ পর আপনার ব্রেন ওই জায়গাকে “ফোকাস জোন” হিসেবে চিনে ফেলবে। তখন বসার সাথে সাথেই মনোযোগ তৈরি হবে। এটা অনেকটা এমন, যেমন স্কুলের ঘণ্টা বাজলেই আমাদের ছোটবেলায় অটোমেটিক্যালি ক্লাসের মুড চলে আসত।

সহজ কাজ দিয়ে দিন শুরু করলে, গুরুত্বপূর্ণ কাজ আর করা হয় না

আমাদের মস্তিষ্ক ন্যাচারালি সহজ কাজের দিকে দৌড়ায়। কারণ সেটা ইনস্ট্যান্ট স্যাটিসফ্যাকশন দেয়। কিন্তু সমস্যা হলো, দিনের সবচেয়ে শক্তিশালী এনার্জি আমরা নষ্ট করি ছোটখাটো কাজে।

ইমেইল চেক করা, নোটিফিকেশন দেখা, রেন্ডোল রিপ্লাই দেওয়া, এগুলো প্রোডাক্টিভ মনে হলেও বেশিরভাগ সময় এগুলো শুধু “ব্যস্ততা”, আসল অগ্রগতি মোটেও নয়।

যে কাজটা আপনার জীবন বদলাতে পারে, সেটা সাধারণত আনকমফোর্টেবল হয়। তাই দিনের শুরুতেই সবচেয়ে কঠিন কাজটা করতে হয়। কারণ সকালে আপনার মেন্টাল এনার্জি অনেক বেশি থাকে।

পৃথিবী আপনাকে ডিস্ট্র্যাক্টেড রাখার জন্য বিলিয়ন ডলার খরচ করছে

এটা বুঝতে হবে, আপনার ফোকাস এর বিরুদ্ধে একটা পুরো ইন্ডাস্ট্রি কাজ করছে।

সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো পৃথিবীর সেরা সাইকোলজিস্ট নিয়োগ দিচ্ছে শুধু একটা কাজের জন্য: কীভাবে আপনাকে আরও বেশি সময় অ্যাপ এর মধ্যে আটকে রাখা যায়। নোটিফিকেশন এর রং, সাউন্ড, টাইমিং সবকিছু সায়েন্টিফিক্যালি ডিজাইন করা হয় আপনার অ্যাটেনশন হাইজ্যাক করার জন্য।

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, আপনি চাইলে এলগোরিদম কে নিজের জন্যও কাজ করাতে পারেন।

যদি আপনি বিজনেস, স্কিল, এআই এবং মার্কেটিং এসব কন্টেন্ট নিয়মিত দেখেন, সেভ করেন, কমেন্ট করেন, তাহলে অ্যালগরিদম ধীরে ধীরে আপনার ফিড কে লার্নিং মেশিনে পরিণত করবে। কিন্তু যদি র‍্যান্ডম এন্টারটেইনমেন্ট কনজিউম করেন, তাহলে আপনার ব্রেইন ধীরে ধীরে শ্যালো হয়ে যাবে।

আপনার ফিড আসলে আপনার ভবিষ্যতের আয়না।

মাল্টি টাস্কিং আসলে হিডেন সেলফ-ডেস্ট্রাকশন

আমরা গর্ব করে বলি, “আমি মাল্টি টাস্ক পারি।” বাস্তবে মাল্টি টাস্কিং মানে হলো একসাথে কয়েকটা কাজ খারাপভাবে করা।

রিসার্চ বলে একটি ডিস্ট্রাকশন এর পর পুরো ফোকাস ফিরে পেতে এভারেজে ২৩ মিনিট লাগে। অর্থাৎ আপনি যদি প্রতি ১০ মিনিটে ফোন চেক করেন, তাহলে প্র্যাকটিক্যালি আপনি কখনোই ডিপ ফোকাস এ যেতে পারছেন না।

এজন্য ইনটেলিজেন্ট মানুষরা দিনকে থিমে ভাগ করে ফেলে। যেমন একটা দিন শুধু স্ট্রেটেজি, আরেকটা দিন শুধু মিটিং, আরেকটা দিন শুধু কন্টেন্ট ক্রিয়েশন। এতে ডিসিশন ফ্যাটিগ কমে যায়।

জীবনের কোয়ালিটি অনেক সময় টাইম ম্যানেজমেন্টের কোয়ালিটির উপর না, এনার্জি ম্যানেজমেন্ট এর উপর নির্ভর করে।

আপনি ক্লান্ত না, আপনি ডিস্ট্রাক্টেড

অনেক মানুষ ভাবে তাদের এনার্জি নেই। কিন্তু আসলে এনার্জি তৈরি করতে হয়।

খেয়াল করে দেখবেন, কখনো এক্সাইটিং কোনো সশুনলে হঠাৎ শরীর এনার্জেটিক হয়ে যায়। অর্থাৎ এনার্জি বাইরে থেকে আসে না, ব্রেন তৈরি করে।

এই কারণে এক্সারসাইজ, ওয়াকিং মিটিং এবং মর্নিং রুটিন এসব শুধু শরীরের জন্য না, ফোকাস এর জন্যও পাওয়ারফুল টূল l

নিজের কাজকে গেম বানাতে পারলে কন্সিস্টেন্সি সহজ হয়ে যায়

ভিডিও গেম এত এডিক্টিভ কেন? কারণ সেখানে প্রোগেস ভিজিবল।

বাস্তব জীবনেও যদি আপনি প্রোগ্রেস দেখতে পারেন, তাহলে কাজ বোরিং লাগে না। মানুষ ডিস্ট্র্যাকশন এর কারণে ফোকাস হারায় না, প্রোগ্রেস না দেখতে পেয়ে ফোকাস হারায়।

যে উদ্যোক্তা উইকলি সেলস প্রোগ্রেস ভিজিবলি দেখে, সে বেশি মোটিভেটেড থাকবে। কারণ progress itself creates dopamine

আমরা সময়ের অভাব বা ফোকাসের অভাবে পিছিয়ে পড়ি না। বেশিরভাগ সময় আমরা পিছিয়ে পড়ি ভুল সিদ্ধান্তের কারণে। আর ফোকাস বাড়ানো মূলত সঠিক সিদ্ধান্তের আউটকাম; আমরা কীসে মনোযোগ দেব এবং কী উপেক্ষা করব। @ nur rahaman




আর্কিমিডিস (Archimedes of Syracuse) 

আর্কিমিডিস তাঁর বৃত্তগুলো নষ্ট করতে বারণ করেছিলেন কারণ তিনি তখন বালিতে আঁকা একটি জটিল জ্যামিতিক সমস্যার সমাধানে সম্পূর্ণ মগ্ন ছিলেন এবং নিজের জীবনের চেয়েও তাঁর গাণিতিক কাজটিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছিলেন। খ্রিষ্টপূর্ব ২১২ অব্দে রোমান বাহিনী যখন তাঁর জন্মভূমি সিরাকিউস শহরটি দখল করে নেয়, তখন এক রোমান সৈন্য তাঁর ঘরে প্রবেশ করে তাঁকে রোমান জেনারেল মার্সেলুসের কাছে যাওয়ার আদেশ দেয়। কিন্তু গভীর মনোযোগে থাকা এই মহান বিজ্ঞানী জ্যামিতিক চিত্রটি নষ্ট হওয়ার ভয়ে সৈন্যটিকে বাধা দিয়ে ইতিহাসের এই অমর উক্তিটি করেন—ল্যাটিন ভাষায় যা "Noli turbare circulos meos!" নামে খ্যাত।

ঐতিহাসিক এই ঘটনাটির বিস্তারিত প্রেক্ষাপট নিচে তুলে ধরা হলো:

সিরাকিউস অবরোধের প্রেক্ষাপট:

দ্বিতীয় পিউনিক যুদ্ধের সময় আর্কিমিডিসের শহর সিরাকিউস রোমানদের বিরুদ্ধে কার্থেজের পক্ষ নেয়। রোমান জেনারেল মার্সেলুস সিরাকিউস আক্রমণ করলে আর্কিমিডিসের তৈরি বিভিন্ন মারণাস্ত্র (যেমন: বিশালাকার ক্যাটাপল্ট এবং শত্রু জাহাজে আগুন ধরানোর জন্য বিশেষ দর্পণ) রোমান বাহিনীকে দীর্ঘ দুই বছর ঠেকিয়ে রাখে। তবে শেষ পর্যন্ত খ্রিষ্টপূর্ব ২১২ অব্দে রোমানরা শহরের প্রতিরক্ষা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং ব্যাপক লুটপাট ও হত্যাকাণ্ড শুরু করে।

মৃত্যুর মুহূর্ত ও উক্তিটির কারণ:

রোমান জেনারেল মার্সেলুস আর্কিমিডিসের মেধার ব্যাপারে অবগত ছিলেন এবং তাঁকে জীবিত ও অক্ষত অবস্থায় তাঁর কাছে ধরে আনার জন্য সৈন্যদের কড়া নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের চরম বিশৃঙ্খলা আর চিৎকারের মধ্যেও আর্কিমিডিস ছিলেন সম্পূর্ণ অবিচল।

গভীর একাগ্রতা:

ইতিহাসবিদ প্লুটার্ক এবং ভ্যালেরিয়াস ম্যাক্সিমাসের বিবরণ অনুযায়ী, আর্কিমিডিস তখন তাঁর ঘরের মেঝেতে বা সৈকতের বালিতে জ্যামিতিক নকশা (বৃত্ত) এঁকে কোনো একটি গাণিতিক সমীকরণ মেলাচ্ছিলেন। চারপাশের যুদ্ধের তাণ্ডব তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি।

সৈন্যের আগমন:

এমন সময় এক রোমান সৈন্য তাঁর ঘরে ঢুকে তরবারি উঁচিয়ে তাঁকে অবিলম্বে জেনারেল মার্সেলুসের সাথে দেখা করার আদেশ দেয়।

বৃত্ত রক্ষার আকুতি:

গণিতের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা আর্কিমিডিস নিজের জীবনের পরোয়া না করে সৈন্যটির দিকে হাত বাড়িয়ে বলেন, "আমি তোমার কাছে মিনতি করছি, আমার এই বৃত্তগুলোকে নষ্ট কোরো না!" বা "ওটা নাড়াচাড়া কোরো না।" তিনি চেয়েছিলেন তাঁর জ্যামিতিক সমাধানটি শেষ করতে, আর সৈন্যটি ঠিক তাঁর আঁকা বৃত্তগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে পড়েছিল বা সেগুলো মুছে দেওয়ার উপক্রম করেছিল।

দুঃখজনক পরিণতি:

ঐ রোমান সৈনিকটি সম্ভবত আর্কিমিডিসকে চিনতে পারেনি অথবা যুদ্ধের উত্তেজনায় বৃদ্ধ বিজ্ঞানীর এমন অবাধ্যতা ও উদাসীনতা দেখে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। সে নিজের তরবারি বের করে ঘটনাস্থলেই আর্কিমিডিসকে হত্যা করে। পরে জেনারেল মার্সেলুস এই খবর পেয়ে অত্যন্ত দুঃখিত ও মর্মাহত হন। তিনি আর্কিমিডিসকে হত্যাকারী সৈন্যটিকে শাস্তি দেন এবং এই মহান বিজ্ঞানীর পরিবারকে যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শনপূর্বক অত্যন্ত মর্যাদার সাথে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন।

আর্কিমিডিসের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর সমাধিতে একটি সিলিন্ডারের ভেতরে গোলক খোদাই করা হয়েছিল, যা ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা গাণিতিক আবিষ্কার।

আর্কিমিডিস (Archimedes of Syracuse) ছিলেন প্রাচীন ক্লাসিক্যাল যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রিক গণিতবিদ, পদার্থবিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, জ্যোতির্বিদ এবং আবিষ্কারক। তিনি আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৮৭ অব্দে সিসিলির সিরাকিউস শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং ২১২ বা ২১১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রোমান সেনাদের সিরাকিউস অবরোধের সময় নিহত হন। গণিত এবং বিজ্ঞানে তাঁর যুগান্তকারী অবদানের জন্য তাঁকে প্রায়শই "গণিতের জনক" (Father of Mathematics) বলা হয়।

তাঁর জীবন এবং প্রধান আবিষ্কারগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ নিচে দেওয়া হলো:

১. আর্কিমিডিসের নীতি (Archimedes' Principle):

এটি তরল গতিবিদ্যার (Hydrostatics) একটি মৌলিক নিয়ম। কোনো বস্তুকে তরলে নিমজ্জিত করলে বস্তুটির হারানো ওজন, তার দ্বারা অপসারিত তরলের ওজনের সমান হয়। রাজার মুকুটের খাঁটিত্ব পরীক্ষা করতে গিয়ে তিনি এই সূত্র আবিষ্কার করেন। স্নানাগারে এই সত্য বুঝতে পেরে তিনি উলঙ্গ অবস্থায় "ইউরেকা! ইউরেকা!" (আমি পেয়ে গেছি!) বলে চিৎকার করে রাস্তায় ছুটেছিলেন।

২. গাণিতিক অবদানবৃত্তের পরিধি ও ব্যাসের অনুপাত বা পাই (π) এর মান নিখুঁতভাবে নির্ণয় করার পদ্ধতি তৈরি করেন। গোলকের আয়তন এবং পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল যে তার পরিবেষ্টিত সিলিন্ডারের দুই-তৃতীয়াংশ, তা প্রমাণ করেন।ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাস এবং অসীম সিরিজের যোগফলের ধারণার ভিত্তি স্থাপন করেন।

৩. বিখ্যাত আবিষ্কার ও প্রকৌশল আর্কিমিডিসের স্ক্রু (Archimedes' Screw):

নিচু স্থান থেকে উঁচুতে পানি তোলার জন্য একটি বিশেষ স্ক্রু পাম্প উদ্ভাবন করেন, যা আজও ব্যবহৃত হয়।

লিভারের নীতি (Law of the Lever):

লিভারের যান্ত্রিক সুবিধা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেছিলেন, "আমাকে একটি দাঁড়ানোর জায়গা দাও, আমি পৃথিবীকে নাড়িয়ে দেব"।

যুদ্ধাস্ত্র:

রোমান আক্রমণ প্রতিহত করতে তিনি ক্যাটাপুল্ট, "আর্কিমিডিসের থাবা" (Claw of Archimedes) এবং বড় বড় আয়না ব্যবহার করে রোমান জাহাজে আগুন ধরানোর প্রযুক্তি তৈরি করেছিলেন।

মৃত্যু:

তাঁর মৃত্যুর গল্পটি অত্যন্ত বিখ্যাত। রোমান সৈন্যরা যখন তাঁর শহরে প্রবেশ করে, তখন তিনি মাটিতে জ্যামিতিক নকশা এঁকে একটি গণিত সমাধান করছিলেন। একজন রোমান সৈন্য তাঁর কাজে বাধা দিলে তিনি বলেছিলেন, "আমার বৃত্তগুলো নষ্ট করো না"। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সৈন্যটি তাকে হত্যা করে।

তথ্য সংগ্রহ: মৃণাল নন্দী





Critical Thinking

অনলাইনের এই যুগে প্রতিদিন হাজার হাজার ইনফরমেশন আমাদের চোখের সামনে দিয়ে যাচ্ছে। ফেক নিউজ, ক্লিকবেট হেডলাইন আর আবেগী কথার ভিড়ে আমরা খুব সহজেই ম্যানিপুলেট হয়ে যাই।

বাস্তব জীবনে, ক্যারিয়ারে বা যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের ব্রেইনকে প্রফেসিওনাল লেভেলে ধারালো রাখার আসল গোপন অস্ত্র হলো Critical Thinking।

নিজের ভাবনার জগতকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে এবং ব্রেইনকে ১০ গুণ স্মার্ট করতে এই ৫টি সহজ টেকনিক মেনে চলুন:

১. প্রশ্ন করার অভ্যাস করুন (Ask like a Detective)

কোনো কিছু শুনেই সঙ্গে সঙ্গে গিলে ফেলবেন না। নিজেকে প্রশ্ন করার হ্যাবিট বানান— "কেন?", "কীভাবে?", "এর পেছনে আসল প্রমাণ কী?"

যেমন: কেউ এসে বলল "এই ডায়েট প্ল্যানটা অলৌকিক কাজ করে!"—সঙ্গে সঙ্গে অন্ধের মতো ট্রাই না করে জিজ্ঞেস করুন, "এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বা রিয়েল প্রমাণ কী?" তথ্যের গভীরে যাওয়ার মানসিকতা তৈরি করুন।

২. উৎস যাচাই বা Source Check করুন

যে তথ্যটা পেলেন, সেটা কি পলিটিক্যালি Biased কোনো পেজ থেকে এসেছে নাকি কোনো নির্ভরযোগ্য রিসোর্স থেকে? উৎস ঠিক না থাকলে তথ্যের কোনো ভ্যালুই নেই। একটা সোর্সের ওপর ভরসা না করে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও গবেষণাপত্র থেকে সত্যটা যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

৩. মুদ্রার অপর পিঠও দেখার মানসিকতা রাখুন

আমরা মানুষ হিসেবে অবচেতনভাবেই সবসময় নিজের মতের পক্ষে যুক্তি খুঁজি (যাকে সায়েন্সের ভাষায় বলে Confirmation Bias)। কিন্তু একজন রিয়েল ক্রিকিটিক্যাল থিনকার সবসময় অপজিট সাইডের যুক্তিগুলো শান্ত মাথায় শোনে এবং নিরপেক্ষভাবে বিচার করে। বিপক্ষের যুক্তি বুঝলেই পুরো চিত্রটা পরিষ্কার হয়।

৪. নিজের ইগো ও Bias স্বীকার করুন

"আমিই সবসময় ঠিক আর বাকি সবাই ভুল"—এই মেন্টালিটি বুদ্ধিমান হওয়ার সবচেয়ে বড় বাধা। নিজের ভুল ধরতে পারা এবং অবচেতন পক্ষপাতিত্ব স্বীকার করাই হলো বিচক্ষণতার প্রথম লক্ষণ। তাছাড়া বাজারে প্রচলিত Logical Fallacy (যেমন- "সবাই করছে তাই নিশ্চয়ই ঠিক") থেকে নিজেকে মুক্ত রাখুন।

৫. তাড়াহুড়ো না করে 'Pause and Think' অ্যাপ্লাই করুন

যেকোনো জটিল সমস্যা দেখলে হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। সমস্যাটাকে ছোট ছোট ভাগে কেটে ভেঙে ফেলুন। সময় নিয়ে ভাবুন। Remember, "Pause and Think" নীতি মেনে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বেশি নিখুঁত হয়।

সোজা কথায়, ব্রেইনকে শুধু ইনফরমেশনের ডাস্টবিন না বানিয়ে একটা পাওয়ারফুল প্রসেসর হিসেবে ব্যবহার করাই হলো আসল খেলা!

@বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি


১০



একজন প্রধানমন্ত্রীর একমাত্র শার্ট

তাজউদ্দীন আহমদ মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ছিলো একজন প্রধানমন্ত্রী, তখন তার ছিল একটি মাত্র শার্ট।  যে শার্টটি ময়লা হলে তিনি নিজ হাতে ধুয়ে শুকিয়ে তারপর আবার গায়ে চাপাতেন।

.

মুক্তিযুদ্ধকালে একদিন ডঃ আনিসুজ্জামান কলকাতায় তাজউদ্দীন আহমদের বাসায় গিয়ে দেখলেন তাঁর চোখ লাল, দেখে অসুস্থ মনে হচ্ছে। তিনি বলে উঠলেন 'স্যার আপনার কি শরীর খারাপ?'

.

জবাবে তাজউদ্দীন আহমদ বলে উঠলেন গতকাল রাতে ঘুমাতে যাওয়ার পর, হঠাৎ ঝড়ে আমার ঘরের জানালার একটা অংশ খুলে গেল, তখন হঠাৎ মনে হলো, এই ঝড়ে আমার ছেলেরা না খেয়ে, না ঘুমিয়ে দেশের জন্য যুদ্ধ করছে, আর আমি এখানে ঘুমাচ্ছি! এরপর সারারাত ঘুমাতে পারিনি!

.

মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি ঘটনা। ভারতে তখন মুজিবনগর সরকারের ব্যস্ত সময়। মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত সময় তখন। একদিন অফিসে গেলেন তিনি। কিন্তু পিয়ন নেই অফিসে। দ্রুত তিনি পিয়নের থিয়েটার রোডের বাসায় চলে গেলেন।

.

তাঁর আরেক কর্মচারী অফিসে এসে, তাঁকে না পেয়ে সেই পিয়নের বাসায় গেলো। ঢুকেই তো ভিমরি খাওয়ার যোগাড়! জ্বরে আক্রান্ত পিয়নের মাথায় বদনা দিয়ে পানি ঢালছেন স্বয়ং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ।

.

অথচ প্রধানমন্ত্রীত্ব নিতে প্রথমে এক মুহূর্তের জন্যও রাজি ছিলেন না তাজউদ্দীন আহমদ। বলেছিলেন তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে প্রধানমন্ত্রিত্বের পদ দিতে। একপ্রকার চাপে পড়েই তিনি নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীত্বের পদ।

মুক্তিযুদ্ধের মে মাস। কলকাতার থিয়েটার রোডে একটি দুই তলা বাড়ি ভাড়া নেয়া হলো মুজিব নগর সরকারের পক্ষ থেকে। বাড়িটির  দু তলার এক দিকের ছোট একটি স্যাঁতস্যাঁতে কামরায় থাকতেন তাজউদ্দিন আহমদ, বাকিটা অফিসের জন্য ছেড়ে দিলেন। 

.

বাড়ির বাড়িওয়ালা যেদিন জানলো একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাড়ির এই ময়লা কামরায় থাকেন  তখন তিনি বলে উঠলেন, “তোমরা পারোও! প্রধানমন্ত্রী হয়ে এই কামরায়! তোমরা স্বাধীন না হলে আর কে স্বাধীন হবে!”

.

মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিক তখন। একদিন তাঁর বাড়িতে দুই ধরনের রান্নার আয়োজন করা হলো। মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর জন্য এক ধরনের রান্না, আর সাধারন বাকিদের জন্য আরেক ধরনের রান্না। মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীদের রান্নায় বেশ আয়োজনের ভাব।

.

তাজউদ্দীন আহমদ খেতে বসেই খাবারের আয়োজন দেখে গর্জে উঠে সহকারীকে ডাকলেন।  সহকারী হাজির হতেই বলে উঠলেন এগুলো কেন? সাধারণ খাবার কই?

.

সহকারী বলে উঠলো এটা আপনার জন্যই স্পেশাল রান্না হয়েছে। সাধারণ খাবার কেবল ডাল, ছোট মাছ আর আলুর তরকারী।

.

তিনি এবার চেঁচিয়ে উঠে বললেন, "দেশের মানুষ না খেয়ে আছে আর আমি এখানে পোলাও কোর্মা খাবো?

.

মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে অবস্থানকালে বাংলাদেশ সরকারের অন্যরা যখন ভারতীয় সময় মেনে চলতেন, তাজউদ্দীন আহমদের ঘড়ি চলতো বাংলাদেশী সময়ে তথা ভারতীয় সময় থেকে ৩০ মিনিট এগিয়ে।

.

অস্থায়ী সরকার গঠন করার পর ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে ভারতে যাবেন তিনি। ভারতের সীমান্তে পৌঁছালেন অথচ ভারতে তখনো ঢুকেননি। একজন বলে উঠলো ‘আপনি যাবেন না?’

.

তিনি দৃঢ় গলায় বললেন আমার দেশ স্বাধীন। আর স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে আমি বিনা প্রটোকল আর তাঁদের আমন্ত্রণ ছাড়া আমি তাঁদের দেশে যেতে পারিনা। এটি আমার দেশের জন্য প্রচণ্ড অসম্মানজনক।  আমাকে তো ভারত আমন্ত্রণ জানায়নি।

.

পরবর্তীতে যদিও ভারত সরকার তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করে ভারতে নেয়। এমনই ছিলো তাঁর আত্মসম্মান বোধ।

.

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন বাকশাল করেছিলো তখন তিনিই তিনিই সর্বপ্রথম প্রতিবাদ করেছিলেন।

.

বাকশাল গঠনের প্রশ্নে শেখ মুজিবের সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদের গুরুতর মতপার্থক্য দেখা দিয়েছিলো। তা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এ দেশীয় দোসরদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণায় তাজউদ্দীন আহমদ হতাশ হয়েছিলেন। এসব ঘটনা শেখ মুজিব ও তাজউদ্দীনের মধ্যে দূরত্বের সৃষ্টি করেছিলো।

.

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এক ক্যাম্পে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন-"মুছে যাক আমার নাম, তবু থাকুক বাংলাদেশ।"

.

ইতিহাসে বাংলাদেশ যতোদিন থাকবে, বাংলাদেশের পরিচয় যতোদিন থাকবে বঙ্গতাজ থাকবেন ততোদিন। বাংলাদেশের পরিচয় তো তিনিই।

.

আজ থেকে ১০১ বছর পূর্বে গাজীপুরের কাপাসিয়ার দরদরিয়া গ্রামে জন্ম নেয়া শিশুটি কালক্রমে হয়ে উঠেছিলো আমাদের মুক্তি সংগ্রামের মহান প্রতিভূ। আজ বঙ্গতাজ শহীদ তাজউদ্দীন আহমদের জন্মদিন। বঙ্গতাজের জন্মদিনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা।

@ আহমাদ ইশতিয়াক


১১



প্রাচীন ভারতের প্রায় এক হাজার বছর 

প্রাচীন ভারতে প্রায় এক হাজার বছর ধরে মগধ (বর্তমান বিহার) ছিল দেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। মৌর্য ও গুপ্ত সাম্রাজ্যের মতো শক্তিশালী রাজবংশ এখান থেকেই সমগ্র ভারত শাসন করেছে। এরপর ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে দ্বাদশ শতকের শেষ পর্যন্ত উত্তর ভারতের ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে ওঠে কনৌজ। সেই সময় কনৌজের অধিকার নিয়ে বহু শক্তিশালী রাজ্যের মধ্যে দীর্ঘ সংঘর্ষ চলেছে।

দ্বাদশ শতাব্দীর শেষদিকে তুর্কি মুসলিম শাসকদের আক্রমণে কনৌজের গুরুত্ব কমে যায় এবং দিল্লি নতুন রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তুর্কিরা সংখ্যায় খুব বেশি ছিল না, কিন্তু তাদের ছিল অসাধারণ সামরিক দক্ষতা, কঠোর শৃঙ্খলা এবং দৃঢ় ঐক্য। অন্যদিকে ভারত অসংখ্য ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত ছিল। এই বিভক্তিই বিদেশি শক্তির সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

দাস, খিলজি ও তুঘলক—এই তিন তুর্কি রাজবংশের শাসনের শেষে দিল্লি সুলতানির শক্তি দুর্বল হতে শুরু করে। সেই সুযোগে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাধীন মুসলিম রাজ্যের উত্থান ঘটে—বাংলা, বাহমনী ও জৌনপুর তার মধ্যে অন্যতম।

কিন্তু জৌনপুরের বিশেষত্ব ছিল অন্য জায়গায়। দিল্লির মতো কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, হিন্দু ও মুসলমানের যৌথ অংশগ্রহণের ওপর ভিত্তি করে তারা নিজেদের রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিল। রাজদরবারে হিন্দুরা সম্মানজনক স্থান পেতেন, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করতেন। দিল্লিতে এই ধরনের সমতা অনেক পরে, সম্রাট আকবরের সময় দেখা যায়।

জৌনপুর শুধু রাজনৈতিক শক্তি ছিল না; এটি ছিল এক সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, অওধী ভাষা ও সাহিত্য এখানেই নতুন প্রাণ পায়। মঞ্চন, কুতুবন ও মালিক মুহাম্মদ জায়সীর মতো কবিরা জৌনপুরের দরবারকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। তাঁরা মুসলমান হলেও ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতিকেই নিজেদের সৃষ্টির ভিত্তি করেছিলেন। ফলে জৌনপুর প্রকৃত অর্থেই হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে ওঠে।

এই জৌনপুরের পরিবেশেই উঠে আসেন এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব—শেরশাহ সূরি। তিনি বুঝেছিলেন, কেবল তরবারির জোরে কোনো সাম্রাজ্য দীর্ঘস্থায়ী হয় না; মানুষের আস্থা, ন্যায়বিচার এবং ঐক্যই একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত ভিত্তি।

সহসরামকে কেন্দ্র করে তিনি নিজের শক্তি গড়ে তোলেন। তাঁর সাহস, ন্যায়পরায়ণতা ও নেতৃত্বের গুণে ভোজপুর ও অওধ অঞ্চলের অসংখ্য যোদ্ধা তাঁর সঙ্গে যোগ দেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বিহারের শক্তিশালী শাসকে পরিণত হন এবং পরে মুঘল সম্রাট হুমায়ূনকে চৌসার যুদ্ধে পরাজিত করে ভারত থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেন।

শেরশাহ শুধু একজন বিজয়ী সেনাপতি নন, তিনি ছিলেন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রশাসক। তিনিই দীর্ঘ সড়ক নির্মাণ করেন, পথের ধারে গাছ, কূপ ও সরাইখানা নির্মাণের ব্যবস্থা করেন, জায়গির প্রথায় সংস্কার আনেন, দক্ষ হিন্দু কর্মকর্তাদের উচ্চপদে নিয়োগ দেন এবং এমন একটি প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলেন, যার অনেক দিক পরবর্তীকালে সম্রাট আকবর আরও উন্নত রূপে গ্রহণ করেন।

আজ যখন আমরা ভারতের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করি, তখন জৌনপুর ও শেরশাহ সূরির অবদানকে উপেক্ষা করা যায় না। কারণ ইতিহাস শুধু যুদ্ধের নয়—ইতিহাস হলো ঐক্যের, সুশাসনের, সংস্কৃতির এবং মানুষের বিশ্বাস অর্জনের ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসে জৌনপুর ও শেরশাহ সূরির নাম চিরস্মরণীয়। ©Manas Bangla



১২



ইয়েমেনের হুতিদের ইতিহাস 

অনেকেই মনে করেন ইয়েমেনের হুতিদের হয়তো ইরান সৃষ্টি করেছে, ইরানের ইশারায় তারা কাজ করে। কিন্তু না! আপনারা ভুল জানেন। হুতিদের ইতিহাস অনেক পুরনো, ইয়েমেনের প্রতিটি বালুকণায় হুতিদের রক্ত মিশ্রিত।

১৮৩৯ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দখল করে নেয় ইয়েমেনের এডেন বন্দর — ভারতগামী জাহাজের জ্বালানি স্টেশন আর পরবর্তীতে সুয়েজ খাল পাহারা দেওয়ার কৌশলগত অবস্থান হিসেবে। ইয়েমেনিরা এটাকে 'মিনা আদন' নামে ডাকে। প্রাচীনকালে গ্রিক ও রোমানরা একে 'ইউডাইমন আরাবিয়া' বলে ডাকত, যার অর্থ 'সুখী' বা 'সমৃদ্ধ'।

ব্রিটিশরা ১৮৩৯ সালে দক্ষিণের এডেন বন্দর দখল করে বসে। ব্রিটিশদের এই উত্থান ও লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথে তাদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব দেখে ওসমানি সাম্রাজ্য টেনশনে পড়ে যায়। তারা ভাবে, "আমরা যদি উত্তর ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারি, তাহলে ব্রিটিশরা হয়তো পুরো আরব উপদ্বীপে আমাদের টেক্কা দিয়ে যাবে!"

তাই তারা ১৮৪৯ সালে আবারও দ্বিতীয় বারের মত ফিরে এসে উত্তর ইয়েমেনের উপকূলীয় অঞ্চল (তিহামা) দখল করার চেষ্টা করে, এবং ধীরে ধীরে অভ্যন্তরীণ পার্বত্য অঞ্চলে ঢোকে। ১৮৭২ সালে তারা চূড়ান্তভাবে সানা শহর দখল করে নিয়ে পুরো উত্তর ইয়েমেনে তাদের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।

১৯০৪ সালে ব্রিটিশ ও অটোম্যান দুই সাম্রাজ্য মিলে একটি সীমারেখা টেনে দেয়, যা অজান্তেই ভবিষ্যতের উত্তর-দক্ষিণ ইয়েমেনের বিভাজনের বীজ বুনে রাখে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর উত্তর ইয়েমেনের ক্ষমতায় আসেন জায়েদি শিয়া ইমামরা, প্রতিষ্ঠা করেন রাজতন্ত্র — 'মুতাওয়াক্কিলীয়া কিংডম অব ইয়েমেন'।

আর ইয়েমেনের দক্ষিণে থেকে যায় ব্রিটিশ শাসন, এডেন কলোনি ঘিরে অসংখ্য ছোট সুলতানি আর শেখডম নিয়ে গড়া এক জটিল প্রটেক্টরেট। সহজ ভাষায় 'সুরক্ষিত রাষ্ট্র' বা 'আশ্রিত অঞ্চল'।

আজকের হুতিরা আছে উত্তর ইয়েমেনে, যা জায়েদি শিয়া ইমামরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আর দক্ষিণ ইয়েমেনে আছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার, যা ব্রিটিশদের দখলে ছিল।

১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বরের শেষভাগে ইমাম আহমদ স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করলে তার ছেলে মুহাম্মদ আল-বদর সিংহাসনে বসেন। কিন্তু মাত্র সপ্তাহখানেকের মাথায় সেনা কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আস-সাল্লালের নেতৃত্বে একদল বিপ্লবী নতুন ইমামকে ক্ষমতাচ্যুত করে বন্দী করেন, এবং ২৬শে সেপ্টেম্বর ইয়েমেনকে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেন। তরুণ ইমাম বদর কোনোভাবে  বন্দী থেকে পালিয়ে সৌদি সীমান্তে পৌঁছান এবং উত্তরের জায়েদি গোত্রগুলোর মধ্যে সমর্থন জোগাড় করে ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের প্রস্তুতি নেন।

১৯৬২ সালে উত্তর ইয়েমেনে যখন শিয়া ইমামদের রাজতন্ত্র ভেঙে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে 'প্রজাতন্ত্র' ঘোষণা করা হয়, তখন পুরো বিশ্ব এবং মধ্যপ্রাচ্য মূলত দুটি প্রধান শিবিরে ভাগ হয়ে যায়। একে বলা হয় 'আরব শীতল যুদ্ধ' (Arab Cold War)।

সে সময়ে মিশরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের নতুন বিপ্লবী প্রজাতন্ত্রের পাশে দাঁড়ান এবং শেষ পর্যন্ত সত্তর হাজার সেনা পাঠান তাদের রক্ষায়। মিশরের পাশে থাকে সোভিয়েত ইউনিয়ন। তারা সরাসরি সেনা না পাঠালেও মিশর এবং ইয়েমেনের প্রজাতন্ত্রী বাহিনীকে আধুনিক ভারী অস্ত্র, ট্যাংক ও বিমান সরবরাহ করেছিল।

অন্যদিকে সৌদি আরব, ইরান আর জর্ডান দাঁড়ায় ক্ষমতাচ্যুত তরুণ ইমাম মুহাম্মদ আল-বদরের পক্ষে; তারা পাহাড়ি অঞ্চলের উপজাতিদের একত্রিত করে আবার ইয়েমেনে রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিল। সৌদির পাশে ছিল আমেরিকা।

প্রায় আট বছর ধরে চলা এই যুদ্ধ মিশরের জন্য এতটাই ব্যয়বহুল ও ক্লান্তিকর প্রমাণিত হয় যে ইতিহাসবিদরা একে ডাকেন 'মিশরের ভিয়েতনাম'।

১৯৬৭ সালে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ছয় দিনের যুদ্ধে পরাজয়ের পর নাসের বাধ্য হন ইয়েমেন থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে; আর একই বছর উত্তর ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহে সেই বিপ্লবী সামরিক কর্মকর্তা সাল্লালকেও ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।

তবে ১৯৭০ সালে মিশর-সোভিয়েত ব্লক, ও সৌদি আরব-ইরান-জর্ডান-মার্কিন ব্লক—উভয় পক্ষ একটা সমঝোতায় পৌঁছায়; সৌদি আরব নতুন প্রজাতন্ত্রকে স্বীকৃতি দেয়। যুদ্ধ থামে, কিন্তু তার ক্ষত ইয়েমেনি সমাজে থেকে যায় আরও অনেক দশক। তখন উত্তর ইয়েমেনে ক্ষমতায় আসেন আবদুর রহমান আল-ইরিয়ানি। তিনি ছিলেন একজন বেসামরিক নেতা।

অন্যদিকে উত্তর ইয়েমেনে এত দ্বন্দ্বের মধ্যেই ১৯৬৩ সালের ১৪ই অক্টোবর দক্ষিণ ইয়েমেনে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হয়। রাদফান এলাকার উপজাতিরা ব্রিটিশ সেনাদের ওপর হামলা চালায়।

এই ব্রিটিশবিরোধী বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিল দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠন—তারা নিজেদের মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিল। তাদের মতাদর্শ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি হচ্ছে মার্কসবাদী বা কমিউনিস্ট ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট (NLF); আর অন্যটি মিশরের প্রেসিডেন্ট নাসেরপন্থী FLOSY। ১৯৬৪-৬৫ সালের দিকে তারা সংগঠিত রূপ পায়।

দুই দলেরই প্রধান লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশদের তাড়ানো, কিন্তু তাদের আসল কোন্দল ছিল—'ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর দক্ষিণ ইয়েমেনের ক্ষমতা কার হাতে থাকবে?'

নাসেরপন্থীরা চেয়েছিল দক্ষিণ ইয়েমেন যেন মিশরের প্রেসিডেন্ট নাসেরের ব্লক বা জোটের অংশ হয়ে যায়।

অন্যদিকে মার্কসবাদীরা চেয়েছিল কোনো আরব দেশের অধীনে না থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের আদলে একটি কট্টর কমিউনিস্ট রাষ্ট্র গঠন করতে।

চার বছরের এই সংঘাতে প্রাণ হারান প্রায় ৯০-৯২ জন ব্রিটিশ সেনা, ১৭ জন ব্রিটিশ বেসামরিক নাগরিক এবং অন্তত ৩৮২ জন বিদ্রোহী।

১৯৬৬ সালে ব্রিটিশ সরকার ঘোষণা দেয়, স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গেই সব সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে—এই ঘোষণাই স্থানীয় মিত্রদের মনোবল ভেঙে দেয়, কারণ কেউ বিশ্বাস করত না ব্রিটিশ সহায়তা ছাড়া ফেডারেশন সরকার টিকবে।

২৯শে নভেম্বর, ১৯৬৭ সালে ব্রিটিশরা এডেন ছেড়ে চলে যায়—শেষ গভর্নর স্যার হামফ্রি ট্রেভেলিয়ানের হাতে দক্ষিণ ইয়েমেনে ক্ষমতা হস্তান্তরের মতো কেউ ছিল না। তাই সম্মানের নিদর্শন হিসেবে তিনি গভর্নমেন্ট হাউসটা রং করিয়ে রেখে যান, NLF ও FLOSY-এর মধ্যে যেই বিজয়ী হোক তার জন্য।

আর শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বী নাসেরপন্থী FLOSY-কে হারিয়ে ৩০ নভেম্বর ক্ষমতা দখল করে নেয় NLF। সেদিনই ঘোষিত হয় 'পিপলস রিপাবলিক অফ সাউথ ইয়েমেন'—আরব বিশ্বের প্রথম কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের সূচনা। @ Aliora Insights


১৩


গাজীপুর ও ভাওয়াল রাজবাড়ি।

প্রতাপশালী এক রাজাকে মৃত ঘোষণা করা হলো। তার দাহও হয়েছে বলে সবাই বিশ্বাস করলো। কিন্তু ১২ বছর পরে এক সন্ন্যাসী ফিরে এসে বললেন, "আমিই সেই রাজা!"

পরিবারের অধিকাংশ তাকে চিনে সমর্থন করলো, হাজার হাজার মানুষ তাকে সমর্থন করলো। তবে পরিবারের কেউ কেউ অস্বীকার করায়, সমস্যা শুরু হলো। সাথে নানা রহস্য!

ইনি কি আসলেই সেই রাজা?

নাকি অত্যন্ত দক্ষ এক প্রতারক?

কী হয়েছিলো ১২ বছর আগে?

রাজা কি তবে মারা যাননি?

বর্তমানে যেটা গাজীপুর জেলার ডিসি অফিস, সেটাই ছিলো ভাওয়াল রাজবাড়ি। একসময় এখানে থেকে ৫ লাখ প্রজার উপর শাসন চালানো হতো। সে আমলের অন্যতম বৃহৎ ও নামকরা রাজদরবার ছিলো এটা। ১৯০০ পরবর্তী সালে- ভাওয়াল এস্টেটের রাজা হন মেজকুমার রমেন্দ্র নারায়ণ রায়। তবে তিনি প্রচুর ভোগবিলাসে জীবন কাটাতেন। এ কারণে অসুস্থ হন। আর তখন তাকে হাওয়া বদলের উদ্দেশ্যে দার্জিলিং পাঠান তাদের পারিবারিক চিকিৎসক। সেখানেই তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। সালটা তখন ১৯০৯!

কিন্তু ১৯২১ সালে গাজীপুরে এক সন্ন্যাসীর আবির্ভাবের পর পুরো ভারতবর্ষে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তিনি নিজেকে মেজকুমার বা সেই রাজা হিসেবে দাবি করেন। প্রজারা ও রাজপরিবারের অনেকে এই দাবি মেনে নেন। কারণ তার বোনসহ অনেকেই প্রথম দেখাতেই চিনে ফেলেন। একই চেহারা, কণ্ঠস্বর, হাতের তর্জনী আলাদা করে খাওয়ার অভ্যাস, গায়ের দাগ- সব হুবহু মিলে যায়! রাজবাড়ির পারিবারিক নানা পরীক্ষায়ও সহজে পাস করে যান এই সাধু। তাই বুঝাই যায়, সন্ন্যাসীটাই রাজা!

তবে রাণী সেটা অস্বীকার করেন। সাথে আরও কয়েকজন। বিশেষ করে রাজার শ্যালক সত্যেন্দ্রনাথ, যিনি ততদিনে রাজার বীমার ৩০ হাজার টাকা আর বড় অংকের মাসোহারা নিজের পকেটে ভরেছিলেন। সাথে রাজকার্য চালাচ্ছিলেন। তারা অস্বীকার করায়, রাজাকে হাঁটতে হয় আইনি পথে। সাধারণ প্রজা ও তালুকদারেরা চাঁদা তুলে রাজাকে আইনি লড়াইয়ে সাপোর্ট দেন। ১৯৩০ সালে শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী 'ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা'। ১৫৪৮ জন সাক্ষীর দীর্ঘ সাক্ষ্য গ্রহণ, আবহাওয়ার ভুয়া রিপোর্ট ফাঁস, আর টানা লড়াইয়ের পর ঢাকার জজ আদালত, কলকাতা হাইকোর্ট এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৪৬ সালে লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিল রায় দেয়- এই সন্ন্যাসীই প্রকৃতপক্ষে ভাওয়ালের সেই মেজকুমার!

মূলত দার্জিলিং ভ্রমণে, পারিবারিক ডাক্তার ও শ্যালকের- বিষপ্রয়োগের ফলে মেজকুমার নিস্তেজ হয়ে পড়লে, তাকে শ্মশান নিয়ে যাওয়া হয়। তবে ঝড়-বৃষ্টির রাতে তাকে ওভাবে রেখে, সবাই পালিয়ে যায়। আধমরা রাজাকে উদ্ধার করেন একদল নাগা সন্ন্যাসী। তাদের সেবায় তিনি সুস্থ হলেও, স্মৃতি হারিয়ে সন্ন্যাসী জীবন কাটান এবং পরে ধীরে ধীরে অতীত স্মৃতির কথা মনে পড়তে শুরু করে। এরপর প্রত্যাবর্তন ঘটে।

যদিও আইনে লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার ৩ দিন পর পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন রাজা। স্ট্রোক করেন। পরে জমিদারি প্রথাও বিলুপ্ত হয়। তবে এই গল্প আজও হয়ে আছে ঐতিহাসিক!

একসময় গাজীপুর ও এর আশেপাশের বিশাল এলাকা ছিলো ভাওয়াল এস্টেটের অধীনে। বিস্তীর্ণ শালবন, কৃষিজমি এবং অসংখ্য গ্রামের মালিক ছিলো এই জমিদার পরিবার। পরবর্তীতে এস্টেটের সেই অধিকাংশ বনভূমি ও বড় বড় জমি সরাসরি সরকারের অধীনে চলে যায়। আর সেই কারণেই আজও গাজীপুর ঘুরলে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ সরকারি বনভূমি, শালবন ও প্রচুর সরকারি জমি। @ saiful islam



১৪


'আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স' বা AI 

'দেখো কাণ্ড, আমি যা বলছি এই যন্ত্রটা ঠিক তাই করে দিচ্ছে! এর মধ্যে কি মানুষ বসে আছে নাকি?' — সেদিন সন্ধেবেলা বাবার চশমা পরা অবাক চোখদুটো দেখে বেশ হাসি পেয়েছিল। বাবা সবেমাত্র চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করতে শিখেছেন।

বাবা ভেবেছিলেন এ বুঝি কোনো জাদুর বাক্স। আসলে আমাদের প্রজন্মের অনেকেই তাই ভাবেন। 'আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স' বা AI শব্দটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কল্পবিজ্ঞানের কোনো সিনেমা। কিন্তু এর ভেতরের বিজ্ঞানটা আমাদের আটপৌরে জীবনের মতোই বড্ড চেনা।

ব্যাপারটা আসলে কী?

ধরুন, আপনার পাড়ার মোড়ের

ওই পুরোনো মুদি দোকানদার কাকুর কথা। যিনি গত বিশ বছর ধরে আপনাকে দেখছেন। আপনি দোকানে ঢোকার আগেই তিনি জানেন, আপনি আজ কোন ব্র্যান্ডের চা-পাতাটা খুঁজবেন, কিংবা মাসের শুরুতে আপনি সাবান কতগুলো নেন। কাকু কি কোনো জাদুকর? না। তিনি কেবল বছরের পর বছর ধরে আপনার কেনাকাটার স্বভাব বা 'প্যাটার্ন' দেখেছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি নিখুঁত অনুমান করতে পারেন।

AI বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও ঠিক এই মুদি দোকানদার কাকুর মতোই কাজ করে। শুধু কাকুর অভিজ্ঞতার গণ্ডিটা একটা পাড়া, আর AI-এর অভিজ্ঞতার গণ্ডিটা গোটা পৃথিবী।

টেকনিক্যাল ভাষায়, এই পুরো সিস্টেমটা দাঁড়িয়ে আছে মূলত তিনটি খুঁটির ওপর:

১. ডেটা বা তথ্য: (আমাদের প্রতিদিনের ফেলে যাওয়া ছাপ) মানুষের শেখার জন্য যেমন বই বা বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রয়োজন, AI-এর শেখার জন্য প্রয়োজন বিশাল ডেটা। এই যে আপনি সারাদিন ফেসবুকে স্ক্রল করছেন, গুগলে সার্চ করছেন, কিংবা ইউটিউবে রান্নার ভিডিও দেখছেন—এগুলো সবই এক একটা তথ্য। কোটি কোটি মানুষের এই বিশাল তথ্যভাণ্ডারই হলো AI-এর প্রধান জ্বালানি।

২. অ্যালগরিদম ও মেশিন লার্নিং : (নিজে নিজে শেখার ক্ষমতা) তথ্য তো পেল, কিন্তু সেটা নিয়ে করবে কী? এখানেই আসে অ্যালগরিদম বা লজিক্যাল নিয়ম। ধরুন, আপনি একটা ছোট বাচ্চাকে শেখাচ্ছেন 'গরম' কী। আপনি তাকে দশবার সাবধান করলেন, কিন্তু সে শিখল না। যেদিন সে এক কাপ গরম চায়ে হাত দিয়ে ছ্যাঁকা খেল, সেদিন সে চিরকালের মতো শিখে গেল গরম জিনিস থেকে দূরে থাকতে হয়। কম্পিউটারকেও ঠিক এভাবেই শেখানো হয়। হাজার হাজার বিড়ালের ছবি দেখিয়ে তাকে বলা হয়, "দেখো, এদের কান খাড়া, লেজ আছে—এরা বিড়াল।" এরপর সম্পূর্ণ নতুন কোনো বিড়ালের ছবি দেখালে সে ঠিক চিনে ফেলে। নিজে নিজে ভুল থেকে শেখার এই পদ্ধতিকেই বলা হয় 'মেশিন লার্নিং'।

৩. নিউরাল নেটওয়ার্ক : (মস্তিষ্কের এক গাণিতিক অনুকরণ) মানুষের মস্তিষ্কে কোটি কোটি নিউরন জালের মতো বিছানো থাকে, যা আমাদের ভাবতে আর সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। বিজ্ঞানীরা ভাবলেন, যন্ত্রের ভেতরেও যদি এমন একটা জাল তৈরি করে দেওয়া যায়? ঠিক তাই করা হলো। তৈরি হলো 'আর্টিফিশিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্ক'। এটি তথ্যের ভেতরে গভীরে গিয়ে স্তরে স্তরে বিশ্লেষণ করে। প্রথম স্তর হয়তো শুধু একটা ছবির রং বোঝে, দ্বিতীয় স্তর বোঝে আকৃতি, আর শেষের স্তর বলে দেয় ছবিটা আসলে কিসের। এই যে গভীরে গিয়ে শেখা, একেই বলে 'ডিপ লার্নিং'।

শুরুতে সেও মানুষের মতোই অজস্র ভুল করে, হোঁচট খায়। কিন্তু বারবার অনুশীলনের (Training Phase) মধ্যে দিয়ে সে নিজের ভুলগুলো শুধরে নেয়। রাত জেগে পড়া সেই নাছোড়বান্দা ছাত্রটার মতো, যে যতক্ষণ না অঙ্কের উত্তর মিলছে, ততক্ষণ হাল ছাড়ে না।

আদতে যন্ত্রের নিজস্ব কোনো বুদ্ধি বা আবেগ নেই। মানুষের হাজার বছরের সঞ্চিত জ্ঞান, নিরলস পরিশ্রম আর নীরব কান্নাহাসিই আজ যন্ত্রের ভেতর দিয়ে এক নতুন রূপ নিয়ে কথা বলছে। মানুষ কত বিচিত্র উপায়ে নিজের বুদ্ধিকে, নিজের অস্তিত্বকে অমর করার চেষ্টা করে চলেছে, সেটাই বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিস্ময়।

বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির এই নিরেট হিসাব-নিকাশগুলো যখন আমাদের জীবনের চেনা গল্পের সাথে মিশে যায়, তখন তা বুঝতে আরও কতই না সহজ হয়ে ওঠে, তাই না? @ বিজ্ঞানকথা



১৫



নাইট রাইটিং"

১৮০৯ সালে ফ্রান্সের কুপভ্রে গ্রামে জন্ম নেওয়া লুই ব্রেইল সুস্থ চোখ নিয়েই পৃথিবীতে আসেন। মাত্র ৩ বছর বয়সে বাবার চামড়ার কাজের দোকানে খেলতে খেলতে একটা সূচালো হাতিয়ার দিয়ে নিজের বাঁ চোখে আঘাত করে বসেন। ক্ষতটা সংক্রমিত হয়ে পরে দুই চোখেই ছড়িয়ে পড়ে, আর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ছোট্ট লুই সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন।

১৮১৯ সালে মাত্র ১০ বছর বয়সে প্যারিসের রয়্যাল ইনস্টিটিউট ফর ব্লাইন্ড ইউথ-এ ভর্তি হওয়া সর্বকনিষ্ঠ ছাত্র হন লুই, কিন্তু সেখানকার লাইব্রেরিতে বই ছিল মাত্র তিনটা। কারণ সেই সময় অন্ধদের জন্য বই বানাতে হতো উঁচু করে ছাপা বিশাল অক্ষর দিয়ে, যা পড়তে সময় লাগত অনেক আর বানাতে খরচও ছিল প্রচুর। ১৮২১ সালে এক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা স্কুলে নিয়ে আসেন তার নিজের বানানো "নাইট রাইটিং" পদ্ধতি—১২টা বিন্দুর একটা গ্রিড দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে অন্ধকারে বার্তা পাঠানোর কৌশল। ১২ বছর বয়সী লুই এটা দেখে মুগ্ধ হলেও বুঝতে পারেন, এতে একটা শব্দ লিখতেই লাগে ১০০টা পর্যন্ত বিন্দু, যা মোটেও ব্যবহারিক নয়।

পরের তিন বছর নিজের অবসর সময়ের পুরোটা ঢেলে দিয়ে লুই সেই পদ্ধতিকে ছোট করে আনেন মাত্র ৬টা বিন্দুর একটা গ্রিডে, যেখানে প্রতিটা বিন্যাস বোঝাত একেকটা অক্ষর, সংখ্যা এমনকি বিরতিচিহ্নও। ১৮২৪ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সামনে নিজের এই পদ্ধতি প্রদর্শন করে সবাইকে চমকে দেন লুই ব্রেইল, পরবর্তীতে এক প্রদর্শনীতে তাকে দেখা যায় মিনিটে ২৫০০টা বিন্দু পর্যন্ত ছাপাতে। অথচ ১৮৫২ সালে মাত্র ৪৩ বছর বয়সে যক্ষ্মায় মা/রা যাওয়া পর্যন্ত তার এই যুগান্তকারী পদ্ধতি নিজের স্কুলের বাইরে তেমন স্বীকৃতি পায়নি, বিশ্বজুড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হতে সময় লাগে প্রায় এক শতাব্দী, ১৯৩২ সাল পর্যন্ত।

১৯৫২ সালে ফরাসি সরকার তার দেহাবশেষ প্যারিসের প্যানথিয়নে (যেখানে ফ্রান্সের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তিদের সমাহিত করা হয়) স্থানান্তর করে, তবে গ্রামবাসীদের অনুরোধে তার দুই হাত রয়ে যায় নিজ গ্রামেই, একটা কলসিতে সংরক্ষিত অবস্থায়।

ইতিহাসের পাতা World Vision (বিশ্ব দর্শন)



১৬



হালকা গরম পানিতে অনসেন 

জাপানে প্রাকৃতিক গরম ঝরনার পানিতে গোসল করাকে অনসেন বলে। আরেকটু শুনলে হাসবেন, আগে এই গরম পানিতে শত শত বছর ধরে পুরুষ ও মহিলা একসাথে গোসল করত, এবং কারো গায়েই কাপড় তো দূরের কথা, একটা সুতাও থাকত না!

শুধু লজ্জাস্থান ঢাকার জন্য একটা ছোট্ট তোয়ালে থাকত। কিন্তু এই তোয়ালেটাও আবার পানিতে ভেজানো যেত না। পানিতে নামার আগে এই তোয়ালেটা রেখে দিতে হত! এই ২০২৬ সালে এসেও তারা পুরো ন্যাংটা হয়ে একজন আরেকজনের সামনে গোসল করে। তবে এখন তারা নিয়ম কিছুটা চেঞ্জ করেছে। এখন পুরুষ ও মহিলাদের গোসল করার জায়গাটা আলাদা করা হয়েছে।

ওদের এই হালকা গরম পানিতে গোসল করে নিজের শরীরকে হিল করা ও রিফ্রেশ করাটা হাজার বছরের ঐতিহ্য।

আর গোসল করার এই অনসেন থেকেই অনসেন ডিমের উদ্ভব! আগে অনসেনের এই হালকা গরম পানিতেই ৩০ থেকে ৪০ মিনিট ডিমকে খোসাসহ রেখে দেওয়া হত। যেহেতু পানির তাপমাত্রা মাত্র ৬০ থেকে ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, তাই ডিম রান্না হতে এত সময় লাগত। এরপর তা ভেঙ্গে বাটিতে করে সার্ভ করা হয়।

তবে এই ডিম কখনও পুরো সিদ্ধ হয় না, আবার আমরা যেমন সিদ্ধ বা হাফ বয়েল ডিম খাই, তেমনও না।

এই ডিম শুধু স্বাদেই অনন্য নয়, পুষ্টিগুণেও দারুণ। অনসেন ডিমে উচ্চমানের প্রোটিন, ভিটামিন এ, বি১২, ডি, কোলিন এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয় খনিজ থাকে। কম তাপমাত্রায় ধীরে রান্না করার ফলে ডিমের কোমল গঠন বজায় থাকে এবং অনেকের মতে এটি সহজে হজমও হয়।

জাপানে অনসেন ডিম সাধারণত ভাত, রামেন, উদোন, নুডলস বা সালাদের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়।


আর এই ডিম অর্ধেক করে বা কামড় দিয়ে খাওয়া যায় না। বাটিটা মুখের কাছে ধরে এক টানেই সুরুত করে মুখে ঢুকিয়ে দিতে হয়। এরপর চোখ বন্ধ করে, কামড় না দিয়ে, শুধু জিহ্বা দিয়ে আলতো চাপ দিয়ে এই জাপানিজ ডিমের স্বাদ উপভোগ করতে হয়!

বিল্লাল হোসাইন



১৭




পরিপাকতন্ত্রে ভালো ব্যাকটেরিয়া বাড়ানো এবং খারাপ ব্যাকটেরিয়া কমানোর বিস্তারিত নিয়মাবলি  

১. প্রিবায়োটিক ফাইবার (Prebiotic Fiber) গ্রহণ বৃদ্ধি

উপকারী ব্যাকটেরিয়া, যেমন— Bifidobacteria এবং Lactobacilli-এর প্রধান জ্বালানি হলো প্রিবায়োটিক ফাইবার।

আমাদের পাকস্থলী এই ফাইবার হজম করতে পারে না। উপকারী ব্যাকটেরিয়া এই ফাইবারকে গাঁজন (Fermentation) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড (Short-Chain Fatty Acids বা SCFAs), বিশেষ করে 'বিউটাইরেট' (Butyrate) তৈরি করে। বিউটাইরেট অন্ত্রের কোষগুলোকে শক্তি জোগায় এবং 'লিকি গাট' বা ইন্টেস্টিনাল পারমিয়াবিলিটি (Intestinal Permeability) রোধ করে।

খাদ্যতালিকা: রসুন, কাঁচা পেঁয়াজ, অ্যাসপারাগাস, কাঁচাকলা, অর্গানিক ওটস এবং ফ্ল্যাক্সসিড (তিল/তিসি)।

২. পলিফেনল (Polyphenols) সমৃদ্ধ অর্গানিক খাবারের অন্তর্ভুক্তি

পলিফেনল হলো শক্তিশালী উদ্ভিদভিত্তিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্য চমৎকার পরিবেশ তৈরি করে।

পলিফেনল পরিপাকতন্ত্রের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস (Oxidative Stress) কমায় এবং ক্ষতিকর প্যাথোজেনিক ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি সরাসরি প্রতিহত করে। এটি রক্তচাপ ও মেটাবলিক সিনড্রোম নিয়ন্ত্রণেও দারুণ কার্যকর।

খাদ্যতালিকা: গ্রিন টি, ডার্ক চকোলেট, ব্রকোলি এবং বিশেষ করে অপরিশোধিত চাল। সাধারণ সাদা চালের বদলে ফাইবার ও পলিফেনল সমৃদ্ধ 'ব্রাউন রাইস' বা 'ব্ল্যাক রাইস' (Black Rice) অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী একটি পরিবর্তন।

৩. প্রোবায়োটিক (Probiotics) বা ফারমেন্টেড ফুড গ্রহণ

প্রোবায়োটিক হলো জীবন্ত উপকারী অণুজীব যা সরাসরি পরিপাকতন্ত্রের স্বাস্থ্য উন্নত করে।

এই খাবারগুলো ল্যাকটিক অ্যাসিড (Lactic acid) তৈরি করে অন্ত্রের পিএইচ (pH) ব্যালেন্স ঠিক রাখে, ফলে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক সেখানে টিকতে পারে না।

খাদ্যতালিকা: ঘরে পাতা চিনিমুক্ত টক দই, কেফির (Kefir) এবং অ্যাপল সিডার ভিনেগার।

৪. পরিশোধিত চিনি এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার (Processed Foods) বর্জন

চিনি এবং কৃত্রিম সুইটনার ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার প্রধান খাদ্য। এটি পরিহার করা সবচেয়ে জরুরি।

উচ্চমাত্রার চিনি Candida albicans-এর মতো ক্ষতিকর ইস্ট (Yeast) এবং অন্যান্য প্যাথোজেনিক ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার ঘটায়। এর ফলে অন্ত্রে ক্রনিক ইনফ্ল্যামেশন (Chronic Inflammation) বা দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ সৃষ্টি হয়, যা মেটাবলিজমকে ধীর করে দেয়।

করণীয়: প্যাকেটজাত খাবার, বেকারি পণ্য, রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট এবং যেকোনো আর্টিফিশিয়াল সুগার সম্পূর্ণ বাদ দিতে হবে। এর বদলে প্রাকৃতিকভাবে মিষ্টি ফল পরিমিত পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে।

৫. ফাস্টিং (Fasting) বা উপবাসকালীন মেটাবলিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা

পরিপাকতন্ত্রকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিশ্রাম দেওয়া অন্ত্রের স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের একটি প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি।

নিয়ন্ত্রিত উপবাস বা ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের (Intermittent Fasting) সময় পরিপাকতন্ত্রে Akkermansia muciniphila-এর মতো কিছু বিশেষ উপকারী ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি পায়। এই ব্যাকটেরিয়া অন্ত্রের মিউকাস লেয়ার (Mucus layer) বা প্রতিরক্ষামূলক স্তর মজবুত করে এবং ইনসুলিন সেনসিটিভিটি (Insulin Sensitivity) বাড়ায়।

৬. খাবারে উদ্ভিদভিত্তিক বৈচিত্র্য (Plant-based Diversity) বজায় রাখা

আমেরিকান গাট প্রজেক্ট (American Gut Project)-এর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল অনুযায়ী, খাদ্যে যত বেশি বৈচিত্র্য থাকবে, মাইক্রোবায়োম তত বেশি শক্তিশালী হবে।

ভিন্ন ভিন্ন ফাইবার ভিন্ন ভিন্ন উপকারী ব্যাকটেরিয়ার কলোনি তৈরি করে। কেউ যদি শুধু এক ধরনের সবজি খায়, তবে নির্দিষ্ট একটি ব্যাকটেরিয়ার প্রজাতিই শুধু শক্তিশালী হবে।

করণীয়: সপ্তাহে অন্তত ২০-৩০ ধরনের ভিন্ন ভিন্ন অর্গানিক উদ্ভিদজাত খাবার (বিভিন্ন রঙের শাকসবজি, ফলমূল, বাদাম, বীজ ও ডাল) ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে গ্রহণ করতে হবে।

(পোস্টটি ভাল লাগলে অবশ্যই শেয়ার করে অন্যদের জানার সুযোগ করে দিন এবং কোন প্রশ্ন থাকলে কমেন্ট করে জানাতে পারেন)

Abdur Rahman

Bachelor of Unani Medicine and Surgery (DU)

DGHS Reg No: U-495

Acupuncturist & Integrative Physician-

Chinese Neuro Acupuncture Center, Sylhet



১৮


মাইক্রোপ্লাস্টিক কী?

প্লাস্টিক যখন রোদ, পানি আর ঘর্ষণে ক্ষয় পেয়ে চালের দানার চেয়েও শতগুণ ছোট ছোট কণায় পরিণত হয়, সেটাই মাইক্রোপ্লাস্টিক। এগুলো চোখে ধরা পড়ে না, কিন্তু ক্ষতি করে মারাত্মক!

প্রতিদিন যেভাবে এই প্লাস্টিক আমাদের শরীরে ঢুকছে:

১. প্লাস্টিকের পাত্রে গরম খাবার রাখা বা ওভেনে হিট দেওয়া।

২. প্লাস্টিকের বোতলে বারবার গরম বা রোদে রাখা পানি খাওয়া।

৩. প্লাস্টিকের চপিং বোর্ডে শাকসবজি ও মাংস কাটাকাটি করা।

৪. টি ব্যাগে চা খাওয়া বা সিঙ্গেল-ইউজ কাপে গরম চা/কফি পান করা।

কেন এটি বিপজ্জনক?

এই সূক্ষ্ম প্লাস্টিক কণাগুলো আমাদের রক্তে, ফুসফুসে এবং পরিপাকতন্ত্রে জমতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে হরমোনের ভারসাম্য নষ্টসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

ঝুঁকি কমাতে আমরা আজ থেকেই যা করতে পারি:

১. গরম খাবার ও পানি রাখার জন্য প্লাস্টিক বাদ দিয়ে কাঁচ, স্টিল বা মাটি/সিরামিকের পাত্র ব্যবহার করি।

২. ওভেনে কখনো প্লাস্টিকের বাটিতে খাবার গরম না করি।

৩. রান্নাঘরে প্লাস্টিকের কাটাবোর্ডের বদলে কাঠের বোর্ড ব্যবহার করি।

৪. একবার ব্যবহারের উপযোগী (Single-use) প্লাস্টিক সম্পূর্ণ বর্জন করি।

ছোট ছোট অভ্যাস বদলেই রক্ষা পেতে পারে আমাদের স্বাস্থ্য ও পরিবার। প্লাস্টিক পরিহার করুন, সুস্থ থাকুন।

@ Iftekhar Ahmed


১৯


বোতলজাত পানি খেলে শরীরে ঢোকে ৯০ হাজার অতিরিক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক

গবেষণায় দেখা গেছে, একজন মানুষ খাবার ও পানির মাধ্যমে বছরে গড়ে ৩৯ থেকে ৫২ হাজার মাইক্রোপ্লাস্টিকের কণা নিজের অজান্তেই খেয়ে ফেলছে। কিন্তু যারা প্রতিদিন বোতলজাত পানি পান করে, তাদের অবস্থা আরও খারাপ। তারা বছরে আরও প্রায় ৯০ হাজার অতিরিক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা নিজেদের শরীরে ঢোকাচ্ছে! মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো প্লাস্টিকের অতি ক্ষুদ্র কণা, যার আকার ১ মাইক্রোমিটার থেকে ৫ মিলিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। আর ন্যানোপ্লাস্টিক তো আরও ছোট! এগুলো খালি চোখে দেখাই যায় না। বোতল তৈরি, সংরক্ষণ ও পরিবহনের সময় এগুলো তৈরি হতে থাকে। বিশেষ করে রোদের তাপে বা তাপমাত্রার পরিবর্তনে প্লাস্টিক বোতল থেকে এসব কণা পানিতে মিশে যায়। আর পানি খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এগুলো সোজা চলে যায় তোমার পেটে। একবার শরীরে ঢুকে পড়লে এই অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাগুলো রক্তে মিশে যেতে পারে এবং শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোয় পৌঁছে যেতে পারে। ফলে শরীরে হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ। হরমোনের সমস্যা, প্রজননক্ষমতার ক্ষতি এবং স্নায়ুতন্ত্রের ওপরও এটি প্রভাব ফেলতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্যানসারের সঙ্গেও এর যোগসূত্র পাওয়া গেছে।

সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো, বিশ্বজুড়ে প্লাস্টিকের ব্যাগ বা স্ট্র নিয়ে অনেক কড়াকড়ি থাকলেও প্লাস্টিকের বোতল নিয়ে তেমন কোনো শক্ত নিয়মকানুন নেই। অথচ এটাই স্বাস্থ্যের জন্য সরাসরি হুমকি। তাই এর পর থেকে তৃষ্ণা পেলে প্লাস্টিকের বোতল কেনার আগে দুবার ভেবো, নিজের শরীরের জন্যও প্লাস্টিক এড়িয়ে চলা জরুরি!  বাজারে সুন্দর সুন্দর কাঁচের বোতল বা মেটাল বোতল পাওয়া যায়। ওগুলি নিয়ে বিশুদ্ধ পানি ভরে সঙ্গে রাখুন। সূত্র: ওয়্যার্ড ডটকম 


২০


কেফিরি বোরহানি' 

টক দইয়ে যেখানে ৩ থেকে ৫ ধরণের ভালো ব্যাকটেরিয়া থাকে, সেখানে কেফিরে প্রায় ৩০ থেকে ৬০ প্রজাতির বিলিয়ন বিলিয়ন শক্তিশালী প্রোবায়োটিক এবং উপকারী ইস্টের এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার থাকে। এটি তৈরির জন্য লাগবে ঘরে তৈরি ফ্রেশ মিল্ক কেফির, তাজা পুদিনা পাতা, ধনেপাতা, সবুজ কাঁচামরিচ, তাজা আদার রস, বিট লবণ, ভাজা জিরার গুঁড়ো, ভাজা ধনিয়ার গুঁড়ো, গোলমরিচ গুঁড়ো, এবং টক-মিষ্টির চমৎকার ভারসাম্য আনার জন্য খাঁটি মধু বা গুড়।

প্রথমেই ভালো করে ধুয়ে রাখা পুদিনা পাতা, ধনেপাতা, কাঁচামরিচ এবং সামান্য আদা অল্প পানিতে ব্লেন্ডারে একদম মিহি করে পেস্ট করে নিতে হবে। এরপর এই মিশ্রণটি একটি পাতলা সুতি কাপড় বা ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে শুধু রসটুকু আলাদা করে নেওয়া ভালো, যেন পান করার সময় মুখে কোনো আঁশ না লাগে। এবার একটি বড় পাত্রে কেফির নিন। কেফিরে ছেঁকে রাখা রসটুকু ঢেলে দিন। এরপর একে একে পরিমাণমতো বিট লবণ, ভাজা জিরার গুঁড়ো, ভাজা ধনিয়ার গুঁড়ো, গোলমরিচ গুঁড়ো এবং মধু/গুড় মিশিয়ে দিন।

সব উপকরণ পাত্রে নেওয়া হলে ঘুটনি দিয়ে ভালোভাবে ফেটিয়ে নিতে হবে। ব্লেন্ডারে কেফির দিয়ে দীর্ঘক্ষণ ব্লেন্ড করলে এর প্রাকৃতিক ফেনা ও টেক্সচার নষ্ট হয়ে যায়, তাই হাত দিয়ে নাড়ানোটাই সবচেয়ে ভালো। যদি বোরহানিটি বেশি ঘন মনে হয়, তবে সামান্য ঠান্ডা পানি বা বরফের টুকরো যোগ করে পছন্দের ঘনত্বে আনা যায়। তৈরি হয়ে গেলে এটি গ্লাসে ঢেলে ওপরে সামান্য ভাজা জিরার গুঁড়ো আর পুদিনা পাতা দিয়ে সাজিয়ে পরিবেশন করা যায়।

দাওয়াতের ভারী খাবারের পরপরই এক গ্লাস ঠান্ডা কেফিরি বোরহানি পান করলে এটি হজমে দারুণভাবে সাহায্য করবে। @Captain Green 


২১


দুইশ বছর ধরে ইতালির সিসিলি ছিল এক ইসলামী আমিরাত

ভূমধ্যসাগরের বুকে একটা দ্বীপ আছে, যার নাম সিসিলি। আজ এটা পরিচিত ইতালির একটা প্রদেশ হিসেবে, পিৎজা আর মাফিয়ার গল্পের সাথে জড়িয়ে। কিন্তু এই দ্বীপের মাটির নিচে লুকিয়ে আছে এমন এক ইতিহাস, যা প্রায় সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে গেছে মুসলিম বিশ্বের সম্মিলিত স্মৃতি থেকে—প্রায় দুইশ বছর ধরে সিসিলি ছিল এক ইসলামী আমিরাত, যেখানে গড়ে উঠেছিল ইতিহাসের সবচেয়ে অসাধারণ এক বহুত্ববাদী সভ্যতা।

নবম শতাব্দীর শুরুতে, ৮২৭ খ্রিস্টাব্দে, উত্তর আফ্রিকার আগলাবি রাজবংশ এক অভিযান শুরু করল সিসিলি জয়ের উদ্দেশ্যে। সেই যুগে সিসিলি ছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অধীনে, আর এর জনসংখ্যা ছিল প্রধানত গ্রিক খ্রিস্টান। এই বিজয় সম্পন্ন হতে সময় লেগেছিল প্রায় সাত দশক, শেষ বাইজেন্টাইন দুর্গ তাওরমিনার পতন ঘটেছিল ৯০২ খ্রিস্টাব্দে। কিন্তু যা ঘটল এরপর, তা ইতিহাসের এক বিরল অধ্যায়—এক এমন সভ্যতার জন্ম, যেখানে আরবি, গ্রিক, লাতিন, আর পরবর্তীতে নরমান সংস্কৃতি একসাথে মিলেমিশে তৈরি করল অভূতপূর্ব এক সহাবস্থানের মডেল।

আগলাবিদের অধীনে সিসিলির রাজধানী হয়ে উঠল পালেরমো, যা দ্রুতই পরিণত হলো ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ, সমৃদ্ধ শহরে। আরব ভূগোলবিদ ইবনে হাওকাল, যিনি দশম শতাব্দীতে পালেরমো পরিদর্শন করেছিলেন, তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে লিখেছেন, এই শহরে ছিল তিনশোরও বেশি মসজিদ, যার মধ্যে একটা প্রধান জামে মসজিদ এত বিশাল ছিল যে সেখানে একসাথে সাত হাজার মানুষ নামাজ পড়তে পারতেন।

এই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কৃষি বিপ্লব, যা মুসলিম শাসকরা নিয়ে এলেন সিসিলিতে। তাঁরা প্রবর্তন করলেন উন্নত সেচব্যবস্থা—নোরিয়া নামের পানির চাকা, ভূগর্ভস্থ পানির নালা, যা কানাত নামে পরিচিত। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে তাঁরা রূপান্তরিত করলেন সিসিলির শুষ্ক ভূমিকে উর্বর কৃষিক্ষেত্রে।

তাঁরা নিয়ে এলেন এমন সব ফসল, যা ইউরোপে আগে কখনো চাষ হয়নি—কমলালেবু, লেবু, তুলা, আখ, খেজুর, পেস্তা, তরমুজ। আজকের ইতালীয় রন্ধনশৈলীর অনেক উপাদান—বিশেষ করে সিসিলিয়ান খাবারের বৈশিষ্ট্য হিসেবে পরিচিত জাফরান, বাদাম, শুকনো ফল ব্যবহারের রীতি—এসেছে সেই মুসলিম শাসনামল থেকে।

কিন্তু এই ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর অধ্যায় শুরু হয় ১০৬১ সালে, যখন নরমান বিজেতা রজার প্রথম সিসিলি আক্রমণ শুরু করলেন। তিন দশকের যুদ্ধের পর, ১০৯১ সালে সম্পূর্ণ দ্বীপ চলে গেল নরমান নিয়ন্ত্রণে।

স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা যায়, এরপর শুরু হবে মুসলিম সভ্যতার সম্পূর্ণ বিলুপ্তি। কিন্তু ইতিহাস এখানে নিয়েছে এক আশ্চর্যজনক মোড়।

রজার প্রথম, আর তাঁর পুত্র রজার দ্বিতীয়, যিনি ১১৩০ সালে সিসিলির রাজা হিসেবে মুকুট পরেন, তাঁরা উপলব্ধি করেছিলেন—মুসলিম প্রশাসকদের দক্ষতা, মুসলিম কৃষিবিদদের জ্ঞান, মুসলিম স্থপতিদের শৈল্পিক প্রতিভা এতটাই মূল্যবান যে, এগুলো ধ্বংস করা হবে চরম নির্বুদ্ধিতা। ফলে জন্ম নিল ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব ব্যবস্থা—একজন খ্রিস্টান রাজার শাসনাধীনে মুসলিম কর্মকর্তা, মুসলিম বিজ্ঞানী, মুসলিম স্থপতিরা অব্যাহত রাখলেন তাঁদের কাজ, প্রায়ই সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত থেকে।

রজার দ্বিতীয়ের দরবারে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের একজন ছিলেন আল-ইদ্রিসি, যিনি ছিলেন মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভূগোলবিদ। রজার দ্বিতীয় তাঁকে দায়িত্ব দিলেন এমন এক মানচিত্র তৈরির, যা হবে তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভুল, সবচেয়ে বিস্তারিত। আল-ইদ্রিসি পনেরো বছর গবেষণা করে তৈরি করলেন "তাবুলা রোজেরিয়ানা"—রজারের মানচিত্র, যা ছিল একটা রৌপ্য নির্মিত বিশাল গোলক আর তার সাথে সংযুক্ত এক বিস্তারিত ভৌগোলিক গ্রন্থ, "নুযহাতুল মুশতাক", যেখানে বর্ণিত হয়েছিল সেই যুগে পরিচিত গোটা বিশ্বের ভূগোল।

এই ঘটনা প্রমাণ করে, জ্ঞানের মূল্য কোনো নির্দিষ্ট শাসকের ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে না। একজন খ্রিস্টান রাজা যখন একজন মুসলিম পণ্ডিতের জ্ঞানকে সম্মান জানালেন, তখন জন্ম নিল এমন এক কীর্তি, যা পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে ইউরোপীয় নাবিকদের পথ দেখিয়েছিল।

রজার দ্বিতীয়ের দরবারের এই বহুসাংস্কৃতিক চরিত্র এতটাই স্বতন্ত্র ছিল যে, তাঁকে বলা হতো "বাপ্টাইজড সুলতান"—খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত সুলতান। তিনি পরতেন আরবি শিলালিপি খোদাই করা রাজকীয় পোশাক, তাঁর দরবারে ব্যবহৃত হতো আরবি, গ্রিক, আর লাতিন—তিনটা ভাষাই সরকারি নথিপত্রে। তাঁর মুদ্রায় লেখা থাকত আরবি লিপি।

পালেরমোর কাপেলা প্যালাটিনা, যা রজার দ্বিতীয় নির্মাণ করিয়েছিলেন ১১৩২ সালে, আজও দাঁড়িয়ে আছে এই সহাবস্থানের এক অবিশ্বাস্য সাক্ষী হয়ে। এই গির্জার ছাদ নির্মিত হয়েছিল মুসলিম কারিগরদের হাতে, মুকারনাস শৈলীতে—যা ইসলামী স্থাপত্যের এক বিশিষ্ট বৈশিষ্ট্য, মৌচাকের মতো জ্যামিতিক নকশার এক জটিল বিন্যাস। এই ছাদে চিত্রিত আছে আরবি লেখা, জ্যোতিষ সংক্রান্ত চিত্র, দরবারের দৃশ্য—অথচ এটা একটা খ্রিস্টান গির্জা, যার দেয়ালে আবার শোভা পাচ্ছে বাইজেন্টাইন ঘরানার মোজাইক, যিশু খ্রিস্টের চিত্র।

একটা ভবনের মধ্যে ইসলামী স্থাপত্যশৈলী আর খ্রিস্টান ধর্মীয় প্রতীকীবাদের এই সহাবস্থান পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। এটা প্রমাণ করে, সেই যুগের সিসিলিতে সৌন্দর্য আর জ্ঞানের মূল্যায়ন হতো ধর্মীয় সীমানা অতিক্রম করে।

কিন্তু এই ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর অধ্যায় শুরু হয় ১০৬১ সালে, যখন নরমান বিজেতা রজার প্রথম সিসিলি আক্রমণ শুরু করলেন। তিন দশকের যুদ্ধের পর, ১০৯১ সালে সম্পূর্ণ দ্বীপ চলে গেল নরমান নিয়ন্ত্রণে।

স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা যায়, এরপর শুরু হবে মুসলিম সভ্যতার সম্পূর্ণ বিলুপ্তি। কিন্তু ইতিহাস এখানে নিয়েছে এক আশ্চর্যজনক মোড়।

রজার প্রথম, আর তাঁর পুত্র রজার দ্বিতীয়, যিনি ১১৩০ সালে সিসিলির রাজা হিসেবে মুকুট পরেন, তাঁরা উপলব্ধি করেছিলেন—মুসলিম প্রশাসকদের দক্ষতা, মুসলিম কৃষিবিদদের জ্ঞান, মুসলিম স্থপতিদের শৈল্পিক প্রতিভা এতটাই মূল্যবান যে, এগুলো ধ্বংস করা হবে চরম নির্বুদ্ধিতা। ফলে জন্ম নিল ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব ব্যবস্থা—একজন খ্রিস্টান রাজার শাসনাধীনে মুসলিম কর্মকর্তা, মুসলিম বিজ্ঞানী, মুসলিম স্থপতিরা অব্যাহত রাখলেন তাঁদের কাজ, প্রায়ই সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত থেকে।

রজার দ্বিতীয়ের দরবারে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের একজন ছিলেন আল-ইদ্রিসি, যিনি ছিলেন মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভূগোলবিদ। রজার দ্বিতীয় তাঁকে দায়িত্ব দিলেন এমন এক মানচিত্র তৈরির, যা হবে তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভুল, সবচেয়ে বিস্তারিত। আল-ইদ্রিসি পনেরো বছর গবেষণা করে তৈরি করলেন "তাবুলা রোজেরিয়ানা"—রজারের মানচিত্র, যা ছিল একটা রৌপ্য নির্মিত বিশাল গোলক আর তার সাথে সংযুক্ত এক বিস্তারিত ভৌগোলিক গ্রন্থ, "নুযহাতুল মুশতাক", যেখানে বর্ণিত হয়েছিল সেই যুগে পরিচিত গোটা বিশ্বের ভূগোল।

এই ঘটনা প্রমাণ করে, জ্ঞানের মূল্য কোনো নির্দিষ্ট শাসকের ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে না। একজন খ্রিস্টান রাজা যখন একজন মুসলিম পণ্ডিতের জ্ঞানকে সম্মান জানালেন, তখন জন্ম নিল এমন এক কীর্তি, যা পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে ইউরোপীয় নাবিকদের পথ দেখিয়েছিল।

রজার দ্বিতীয়ের দরবারের এই বহুসাংস্কৃতিক চরিত্র এতটাই স্বতন্ত্র ছিল যে, তাঁকে বলা হতো "বাপ্টাইজড সুলতান"—খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত সুলতান। তিনি পরতেন আরবি শিলালিপি খোদাই করা রাজকীয় পোশাক, তাঁর দরবারে ব্যবহৃত হতো আরবি, গ্রিক, আর লাতিন—তিনটা ভাষাই সরকারি নথিপত্রে। তাঁর মুদ্রায় লেখা থাকত আরবি লিপি।

পালেরমোর কাপেলা প্যালাটিনা, যা রজার দ্বিতীয় নির্মাণ করিয়েছিলেন ১১৩২ সালে, আজও দাঁড়িয়ে আছে এই সহাবস্থানের এক অবিশ্বাস্য সাক্ষী হয়ে। এই গির্জার ছাদ নির্মিত হয়েছিল মুসলিম কারিগরদের হাতে, মুকারনাস শৈলীতে—যা ইসলামী স্থাপত্যের এক বিশিষ্ট বৈশিষ্ট্য, মৌচাকের মতো জ্যামিতিক নকশার এক জটিল বিন্যাস। এই ছাদে চিত্রিত আছে আরবি লেখা, জ্যোতিষ সংক্রান্ত চিত্র, দরবারের দৃশ্য—অথচ এটা একটা খ্রিস্টান গির্জা, যার দেয়ালে আবার শোভা পাচ্ছে বাইজেন্টাইন ঘরানার মোজাইক, যিশু খ্রিস্টের চিত্র।

একটা ভবনের মধ্যে ইসলামী স্থাপত্যশৈলী আর খ্রিস্টান ধর্মীয় প্রতীকীবাদের এই সহাবস্থান পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। এটা প্রমাণ করে, সেই যুগের সিসিলিতে সৌন্দর্য আর জ্ঞানের মূল্যায়ন হতো ধর্মীয় সীমানা অতিক্রম করে।



২২



প্রচুর গাছ কিভাবে পৃথিবীকে শীতল করবে?

বায়ুমন্ডলের যে সব গ্যাস সূর্যের অবলোহিত তাপ শোষণ করে ধরে রাখে সেই সব গ্যাসগুলোকে গ্রিনহাউস গ্যাস বলে।‌

কার্বন ডাই-অক্সাইড একটি অন্যতম গ্রিনহাউস গ্যাস, অর্থাৎ বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধি পেলে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়।

বায়ুমন্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড সরানোয় গাছের ভূমিকা।

গাছ সরাসরি বায়ুমন্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিয়ে প্রথমে গ্লুকোজ তৈরি করে, এই গ্লুকোজ থেকে পরে পুরো গাছটাই তৈরি হয়।

(গ্লুকোজ--> সেলুলোজ, হেমিসেলুলোজ, লিগনিন ইত্যাদি জটিল কার্বোহাইড্রেট পলিমার সংশ্লেষ হয়ে কাঠ, পাতা তৈরি হয়, আর প্রোটিন, ফ্যাটও তৈরি হয়, যা প্রাণিদের খাদ্য জোগায়)

এইভাবে পৃথিবীর সব উদ্ভিদ ও শ্যাওলা মিলে কোটি কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমন্ডল থেকে সরায়।

১৭৫০ সালের দিকে স্টিম ইঞ্জিন আবিষ্কার হয়ে শিল্প বিপ্লব ও পরে পেট্রল-ডিজেল চালিত ইঞ্জিন আবিষ্কার হয়ে মোটরগাড়ি ইত্যাদি তৈরি হয়ে পেট্রল-ডিজেল, প্রাকৃতিক গ্যাস পোড়ানোর ফলে ও মানুষের আরও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ফলে বর্তমান সময় পর্যন্ত বায়ুমন্ডলে ৪০% কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস বৃদ্ধি পেয়েছে।

অন্যদিকে মানুষের বসতি স্থাপন, ঘর-বাড়ি, দরজা-জানালা-বিছানা ও জ্বালানি ইত্যাদির প্রয়োজনে প্রচুর গাছ কাটা হয়েছে, ফলে বায়ুমন্ডলে অতিরিক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড রয়ে যাচ্ছে ও পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে যে হারে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হচ্ছে তা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে ২০৩৬ সালের মধ্যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে, এর ফলে পৃথিবীর জলবায়ু সিস্টেমে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে।

বর্তমানে মানুষের হাতে এমন কোন কার্যকর পদ্ধতি নেই যার দ্বারা এই বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড সরিয়ে ফেলা যায়।

ফলে বর্তমানে একমাত্র কয়েকশ কোটি গাছই পারে এই অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড সরিয়ে ফেলতে, তাই গাছ লাগানোর কথা বলা হচ্ছে।

@ বিজ্ঞানকথা

বৈজ্ঞানিক তথ্য: https://iopscience.iop.org/article/10.1088/1748-9326/ac2966



২৩


ছিয়াত্তরের মন্বন্তর:

==============

বাংলায় ইংরেজদের শাসন শুরু হয়েছে সবেমাত্র। ১৯০ বছরের শাসনামলের মাত্র এক যুগ পেরিয়েছে। ইংরেজি সাল ১৭৭০, বাংলা পঞ্জিকায় ১১৭৬। সে সময় বাংলার বুকে নেমে আসে ভয়াবহ এক দুর্ভিক্ষ। যার নাম 'ছিয়াত্তরের মন্বন্তর'। বাংলা সাল অনুযায়ী এই নামকরণ।

তাতে মারা যায় প্রায় এক কোটি মানুষ। দুই বাংলার জনসংখ্যার তিনভাগের একভাগ মানুষ শুধু খেতে না পেয়ে মারা যায়। খাবারের অভাবে কীটপতঙ্গের মতো মরতে থাকে মানুষ। পথে ঘাটে শুধু লাশের দেখা মেলে তখন। এমন দূর্বিষহ চিত্র এই অঞ্চলের মানুষ এর আগে কখনো দেখেনি।

এই দুর্ভিক্ষের কারণ ব্রিটিশদের রাজস্ব নীতি। ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সাধারণ কৃষক প্রজার খাজনা ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করে। যে খাজনা নীতি বাংলাকে দুর্ভিক্ষের দিকে ঠেলে দেয়। এর মধ্যে ১৭৬৯ সালে দেখা দেয় ভয়াবহ বন্যা।

অতিরিক্ত খাজনা আর ভারী বন্যায় কৃষকের গোলা ফাঁকা হয়ে যায়। শুরু হয় দুর্ভিক্ষ। এমন অবস্থায়ও ইংরেজরা খাজনা তোলা বন্ধ করেনি। উল্টো পরের বছর খাজনা আরও ১০ শতাংশ বাড়িয়ে ৬০ শতাংশ করা হয়। তাতে কৃষকদের জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। উৎপাদনের অর্ধেকের বেশি তুলে দিতে হতো ব্রিটিশ বেনিয়াদের কাছে।

-- History Hunters



২৪



মুহাম্মদ আলী পাশা: আল-মাশরাকিনের চিত্রকর্মের সেই কিংবদন্তি পুরুষ

মুহাম্মদ আলী পাশা—এমন এক চরিত্র যিনি দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে চিন্তামগ্ন, অনুসন্ধানরত, অধ্যয়নরত, প্রশ্নবিদ্ধ এবং বিস্ময়বিমুগ্ধ হয়ে অবস্থান করেছেন।

মুহাম্মদ আলী ছিলেন সেই মেসিডোনীয় শিশু, যার বাবা অল্প বয়সেই মারা যান। এরপর তার মা তাকে আগলে রাখেন এবং তার চাচা তুসুন তার লালন-পালনের দায়িত্ব নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। পরবর্তীতে তার চাচাও মারা যান এবং কাওয়ালা শহরের গভর্নর তার দেখাশোনার দায়িত্ব নেন। যুবক বয়সে তিনি সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন এবং আমিনা হানিম আল-রাহিয়াহকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে ইব্রাহিম, তুসুন, ইসমাইল নামে তিন পুত্র এবং দুই কন্যা জন্মগ্রহণ করে।

মুহাম্মদ আলী ব্যবসায়িক কাজে নিয়োজিত ছিলেন, কিন্তু তিনি ছিলেন অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী, বুদ্ধিমান এবং দুঃসাহসী। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তার জীবনে ভাগ্য এবং সুযোগ একটি বড় ভূমিকা পালন করেছিল।

যখন অটোমান সাম্রাজ্য মিশর থেকে ফরাসিদের বিতাড়িত করার জন্য কাওয়ালা থেকে একটি বাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তখন শহরের গভর্নর মুহাম্মদ আলীকে সেই অভিযানে যোগ দিতে আহ্বান জানান। অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া গভর্নরের ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়লে মুহাম্মদ আলী বাহিনীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি আবু কাইর ও আল-রাহমানিয়ার যুদ্ধে অংশ নেন এবং অত্যন্ত বীরত্বের পরিচয় দেন। তাকে জেনারেল পদে পদোন্নতি দেওয়া হয় এবং তার সামনে উন্নতির পথ প্রশস্ত হয়; তার স্বপ্ন ও উচ্চাকাঙ্ক্ষাগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত হতে থাকে।

ফরাসি ও ইংরেজরা মিশর ত্যাগ করার পর, মুহাম্মদ আলী একজন শিকারি সিংহের মতো ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছিলেন। তিনি তাড়াহুড়ো না করে প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে হিসাব করে ফেলছিলেন, কারণ তার স্বপ্ন ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল সীমানাহীন।

যখন তিনি দেখলেন মিশরীয় জনগণের দুর্বলতার জায়গাটি হলো তাদের অর্থসম্পদ, তখন তিনি তাদের পাশে দাঁড়ালেন এবং এমনভাবে সহানুভূতি প্রদর্শন করলেন যে মানুষের নজর তার দিকে আকৃষ্ট হলো। এটি কেবল মিশরীয় জনগণের ইচ্ছার বিজয় বা তাদের সংগঠনের ফল ছিল না, বরং এটি ছিল মিশরের শাসনক্ষমতা নিজের হাতে নেওয়ার কৌশল।

ফ্রেজার অভিযানের পর মিশরের জনগণ যখন তাদের শক্তির পরিচয় দিল এবং রশিদ বন্দরে জয়লাভ করল, তখন পাশা বুঝতে পারলেন যে, এই জনপ্রিয় নেতাদের নিয়ন্ত্রণেই মিশরের প্রকৃত ক্ষমতা নিহিত। তাই তিনি তাদের নেতা ওমর মাকরামকে সরানোর পরিকল্পনা করলেন এবং তাকে দামিয়েত্তায় নির্বাসিত করলেন, আর অর্থের মাধ্যমে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করলেন।

এরপর তার পথের বড় বাধা হিসেবে দাঁড়াল মামলুকরা। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন তাদের মূলোৎপাটন করার। তিনি তাদের সাথে অত্যন্ত ভালো আচরণ করলেন, তাদের স্বাগত জানালেন এবং বিশাল ভোজসভার আয়োজন করলেন। তারা জানত না যে, এটাই তাদের জীবনের শেষ ভোজ এবং এরপরই তাদের ধ্বংস অনিবার্য।

মামলুকরা তাদের শ্রেষ্ঠ পোশাকে সজ্জিত হয়ে সেই ভোজে এসেছিল, যেন তারা কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে যাচ্ছে। কিন্তু চূড়ান্ত মুহূর্তে, তারা যখন দুই দেয়ালের মাঝের একটি সরু পথে প্রবেশ করল, পাশা সংকেত দিলেন। অমনি তার সৈন্যদের বন্দুক থেকে বৃষ্টির মতো গুলি বর্ষিত হতে লাগল। রক্ত নদীর মতো বইতে শুরু করল, আর সেই দোজখ থেকে কেউই বেঁচে ফিরতে পারল না।

একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছায় একজন মাত্র বেঁচে ছিলেন; আমিন বে তার ঘোড়াসহ দেয়াল থেকে লাফ দিয়ে পালিয়ে প্রাণ বাঁচান। এই গণহত্যায় প্রায় ৪৭০ জন মামলুক নিহত হয়।

গণহত্যা শেষ হওয়ার পর পাশা তার সৈন্যদের কায়রো শহরে লেলিয়ে দিলেন। চারদিকে রক্তের বন্যা বয়ে গেল, মানুষ আতঙ্কিত হয়ে নিজেদের ঘরে আশ্রয় নিল এবং আল্লাহর কাছে প্রাণভিক্ষা চাইল। সৈন্যদের অত্যাচারে কায়রোতে তিন দিন ধরে লুটপাট ও চরম বিশৃঙ্খলা চলল, যা ছিল এক ভয়াবহ বিপর্যয়।

মামলুকদের নির্মূল করার পর পাশা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। তার স্বপ্নের পথে যে কাঁটা ছিল, তা তিনি সরিয়ে ফেললেন। এখন মামলুকদের বাধা থেকে মুক্ত হয়ে তিনি পরম শক্তি ও দৃঢ়তার সঙ্গে রাষ্ট্র গঠন ও উন্নয়নের কাজে মনোনিবেশ করলেন।



২৫



 মিডলাইফ ক্রাইসিস : মধ্য বয়সীদের বিভ্রান্তির প্রবণতা 

মানুষের জীবন যেন একটি দীর্ঘ নদী। শৈশব তার উৎস, যৌবন তার উচ্ছ্বাস, আর মধ্যবয়স সেই নদীর এমন এক বাঁক, যেখানে গতি কিছুটা ধীর হলেও স্রোতের গভীরতা বেড়ে যায়।

এই সময়েই অনেক মানুষ হঠাৎ নিজেকে নতুন করে প্রশ্ন করতে শুরু করেন—তিনি কি সত্যিই সুখী ? , তার জীবনের অর্থ কী? , " তিনি যা হতে চেয়েছিলেন, তা কি হতে পেরেছেন? এই আত্মজিজ্ঞাসা কখনও কখনও এমন এক মানসিক অবস্থার জন্ম দেয়, যাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় " মিডলাইফ ক্রাইসিস " (Midlife Crisis) বলা হয়।

তবে, মিডলাইফ ক্রাইসিস কোনো মানসিক রোগ (Mental Disorder) নয়। বরং এটি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরকাল (Psychological Transition), যা সাধারণত ৪০ থেকে ৬০ বছর বয়সের মধ্যে অনেকের জীবনে দেখা দিতে পারে। তবে প্রত্যেক মানুষ এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান না এবং সবার ক্ষেত্রে এর তীব্রতাও সমান হয় না।

এই সময় মানুষ প্রায়ই অস্তিত্বগত সংকট (Existential Crisis)-এর মুখোমুখি হন।

জীবনের অর্জন, অপূর্ণ স্বপ্ন, কর্মজীবন, পারিবারিক দায়িত্ব, শারীরিক পরিবর্তন এবং মৃত্যুচিন্তা—সব মিলিয়ে নিজের জীবনকে নতুন করে মূল্যায়ন করার প্রবণতা তৈরি হয়। মনোবিজ্ঞানী এরিক এরিকসন (Erik Erikson) এই পর্যায়কে কর্মশীলতা বনাম স্থবিরতা (Generativity vs. Stagnation) নামে ব্যাখ্যা করেছিলেন।

তাঁর মতে, এই সময় মানুষ সমাজ ও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কিছু রেখে যেতে চাইলে মানসিক পরিপূর্ণতা অনুভব করেন; অন্যথায় স্থবিরতা ও হতাশা (Stagnation) জন্ম নিতে পারে।

মিডলাইফ ক্রাইসিসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো কগনিটিভ ডিসোন্যান্স (Cognitive Dissonance) বা মানসিক দ্বন্দ্ব।

বাস্তব জীবনের অর্জন ও কল্পিত জীবনের প্রত্যাশার মধ্যে যখন বড় ফারাক তৈরি হয়, তখন ব্যক্তি অস্থির হয়ে পড়তে পারেন। অনেকেই মনে করেন, "আর সময় নেই", "এখনই কিছু বদলাতে হবে"—এবং এই তাড়না থেকেই হঠাৎ বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।

এই সময় কিছু মানুষের মধ্যে ইম্পালসিভ ডিসিশন-মেকিং (Impulsive Decision-making) বা আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা বেড়ে যায়।

কেউ হঠাৎ চাকরি ছেড়ে দেন, কেউ অপ্রয়োজনীয় বিলাসী জিনিস কেনেন, কেউ অযৌক্তিক আর্থিক ঝুঁকি নেন, আবার কেউ সম্পর্কের ক্ষেত্রে অস্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। যদিও এই আচরণ সবার ক্ষেত্রে দেখা যায় না, তবুও এগুলো মিডলাইফ ক্রাইসিসের আলোচনায় বহুল পরিচিত।

মধ্যবয়সে শরীরেও নানা পরিবর্তন ঘটে। শারীরিক শক্তি কিছুটা কমে, বিপাকক্রিয়া (Metabolism) ধীর হয় এবং বিভিন্ন হরমোনগত পরিবর্তন (Hormonal Changes) মানসিক অবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। পুরুষদের ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরন (Testosterone) এবং নারীদের ক্ষেত্রে ইস্ট্রোজেন (Estrogen)-এর পরিবর্তন আবেগ, আত্মবিশ্বাস ও জীবনদৃষ্টিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

মনোবিজ্ঞানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো সেলফ-আইডেন্টিটি (Self-Identity)। মধ্যবয়সে এসে অনেকেই উপলব্ধি করেন যে, তাঁদের পরিচয় দীর্ঘদিন ধরে কেবল পেশা, পরিবার বা সামাজিক ভূমিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সন্তানরা বড় হয়ে গেলে, অবসর গ্রহণ ঘনিয়ে এলে বা জীবনের গতি বদলে গেলে নিজের পরিচয় নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার—মিডলাইফ ক্রাইসিস মানেই নেতিবাচক কিছু নয়। অনেক বিজ্ঞানীই একে মিডলাইফ ট্রানজিশন (Midlife Transition) বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কারণ এই সময়ই অনেকে নতুন দক্ষতা অর্জন করেন, নতুন পেশা শুরু করেন, সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটান, সমাজসেবায় যুক্ত হন কিংবা বহুদিনের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যান। অর্থাৎ সংকটই কখনও কখনও নতুন সম্ভাবনার জন্ম দেয়।

এই সময় মনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে সহায়ক হতে পারে—নিজের অনুভূতি সম্পর্কে সচেতন থাকা (Emotional Awareness), ইতিবাচক মানসিক অভিযোজন (Psychological Resilience) গড়ে তোলা, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে খোলামেলা যোগাযোগ এবং প্রয়োজনে মনোবিজ্ঞানী বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ।

জীবনের মধ্যবয়স এমন এক সময়, যখন মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও পরিপক্বতাকে নতুন অর্থে আবিষ্কার করতে পারেন। নদী যেমন মোহনায় পৌঁছানোর আগে আরও গভীর ও বিস্তৃত হয়, তেমনি মধ্যবয়সও জীবনের এক গভীরতর উপলব্ধির সময় হতে পারে। বিভ্রান্তি যদি আত্মঅনুসন্ধানে রূপ নেয়, তবে মিডলাইফ ক্রাইসিস আর সংকট থাকে না—তা হয়ে ওঠে আত্মবিকাশের এক নতুন সূচনা। @ Jyotirmay Das Mandal

[তথ্যসূত্র (References):

Erikson EH. Childhood and Society. W. W. Norton & Company.

Erikson EH. Identity: Youth and Crisis. W. W. Norton & Company.

Lachman ME. Development in Midlife. Annual Review of Psychology.

American Psychological Association (APA). Midlife Development and Psychological Well-being.



২৬


জগতের সৃষ্টি: খ্রিস্টান পর্ব

খ্রিস্টান পাদ্রী জেমস উসার হিসাব কষে দেখান বাইবেল অনুযায়ী জগতের সৃষ্টি খ্রিস্টপূর্ব ৪০০৪ সনের ২৩ অক্টোবর রবিবার সকাল ৯টা। 

অন্ধ বাইবেল বিশ্বাসীদের কাছে এটাই সত্য।  কিন্তু বিজ্ঞান প্রমাণ পেয়েছে —

৭ হাজার বছর আগের মমি এবং তুষারে সমাধীপ্রাপ্ত মানুষের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছে।

৮ হাজার বছর আগে কৃষির সূচনা হয়। মানুষ নীলনদ, তাইগ্রিস-ইউফ্রেতিস, গঙ্গা-সিন্ধু, হোয়াংহো-ইয়াংসিকিয়াং ইত্যাদি বড় বড় নদীর তীরবর্তী উর্বর সমভূমিতে বসতি স্থাপন করেন। স্থায়ী বাসগৃহে মানুষ বাস করতে শুরু করে।

১০ হাজার বছরে আগের গুহাচিত্র, হাতিয়ার, তৈজসপত্র পাওয়া গিয়েছে।

১২ হাজার বছর আগে নতুন প্রস্তর যুগের শুরু হয়। গৃহপালিত পশু পালন, গাছের ছাল/পাতা, পশুর চামড়া দিয়ে পোশাক ইত্যাদির সূচনা হয়।

৩৫ হাজার বছর আগে আগে শুরু হয় ক্রোমাগনন মানুষের যাত্রা।

৭০ হাজার বছর আগে বরফ যুগে ইউরোপে বাস করতো নিয়ানডার্থাল মানুষ।

৩ লক্ষ বছর আগের আদিম মানুষের জীবাশ্ম পাওয়া গিয়েছে।

২০ লক্ষ বছর আগের হোমো সাপিন্সের পূর্বপুরুষ হোমো হ্যাবিলিসের জীবাশ্মের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে।

৩২ লক্ষ বছর আগের মানুষের পূর্বপ্রজাতি লুসি নামের এক নারীর ফসিল পাওয়া গিয়েছে৷

তার মানে বাইবেলে মানুষ সৃষ্টির যে হিসাব দেয়া হয়েছে তা সঠিক নয়। 

বাইবেল অনুযায়ী মানুষ সৃষ্টি  হয়েছে মাত্র দুইজন মানুষ থেকে।.এখানে বটলনেক ইফেক্ট নিয়ে আলোচনা করা যাক।

১৭৭৫ সাল। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের ক্ষুদ্র দ্বীপ পিনগেলাপে আঘাত হানে এক বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়। প্রায় পুরো জনবসতি মুছে যায় মানচিত্র থেকে। বেঁচে থাকেন মাত্র বিশজনের মতো মানুষ। তখন বেঁচে যাওয়াদের মধ্যে ছিলেন দ্বীপের শাসক। তুফান পরবর্তী সময়ে তিনি ব্যাপক হারে সন্তান উৎপাদন করেন। আজো সেই দ্বীপের বাসিন্দা ঘুরেফিরে সেই বিশজনই। যাদের সবাই অসুস্থ এবং প্রতিবন্ধী। এটাই বটলনেক ইফেক্ট, যখন কোনো জনগোষ্ঠী হঠাৎ করে অতি ক্ষুদ্র সংখ্যায় নেমে আসে। তখন পরবর্তী প্রজন্ম তৈরি হয় সেই সীমিত জিন পুল থেকে।  

# স্পেনের হ্যাবসবার্গ রাজবংশ একসময় ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী সাম্রাজ্য পরিচালনা করত। প্রতিষ্ঠাতা ফিলিপ থেকে শুরু হয়ে ১৬ প্রজন্ম ধরে এই রাজবংশ টিকে ছিল। কিন্তু ১৭০০ সালে চার্লস দ্বিতীয়ের মৃত্যুর সাথে সাথে এই বিশাল সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে। কারণ এই পরিবারে চাচাতো-মামাতো ভাই-বোন, চাচা-ভাতিজি, এমনকি চাচা-ভাতিজার মধ্যে বিবাহ ছিল স্বাভাবিক রীতি। এই  নিকট আত্মীয়দের মধ্যে বিবাহকে বলা হয় ইনব্রিডিং, এবং ক্রমাগত এটি চলতে থাকলে জিনগত ক্ষতির পরিমাণ সংখ্যাটি বাড়তে থাকে — যাকে বলা হয় ইনব্রিডিং কোএফিশেন্ট । প্রজন্মের পর প্রজন্মে বাড়তে বাড়তে একসময় নিঃশ্বাস হয়ে যায় । হ্যাবসবার্গ বংশ (১৪৫০–১৮০০) বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৭১টি পরিবারের ৫০২টি গর্ভধারণের মধ্যে মোট শিশুমৃত্যু ছিল বিস্ময়কর উচ্চ — যা সেই যুগের সাধারণ স্পেনীয় পরিবারের চেয়ে বহুগুণ বেশি।

#  সব প্রাণীর প্রতিটি জিনের দুটি কপি থাকে — একটি পিতা থেকে, একটি মাতা থেকে। যখন একই জিনের দুটি কপি হুবহু একই ধরনের হয়, তখন সেটাকে বলা হয় হোমোজাইগাস অবস্থা। আর যখন দুটি কপি ভিন্ন রকমের হয়, তখন সেটা হেটেরোজাইগাস।  নিকট আত্মীয়দের মধ্যে বিবাহ এই হেটেরোজাইগোসিটি ধ্বংস করে হোমোজাইগোসিটি বাড়ায়, ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জনগোষ্ঠীর সার্বিক টিকে থাকার ক্ষমতা কমে আসে। @ মুজিব রহমান


২৭


১৯৭৮ সালে চীনের মাথাপিছু আয় ছিল ১৫৭ ডলার, বাংলাদেশের ছিল ১৫৮ ডলার

তারপর…..

১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসে চীন সরকার জনগণের কমিউন ব্যবস্থা ধীরে ধীরে বাতিল করার সিদ্ধান্ত হয়।

কমিউন ব্যবস্থা ছিল মাও সেতুং-এর সময় চালু করা একটি সমষ্টিগত কৃষি ও সামাজিক ব্যবস্থা, যেখানে সব কৃষক মিলে একই জমিতে কাজ করত।

সব জমি ছিল সরকার বা কমিউনের, কারো ব্যক্তিগত জমি ছিল না।

কে কোন জমিতে কাজ করবে, কী ফসল হবে—এসব সিদ্ধান্ত কমিউনের নেতারা নিতেন।

উৎপাদিত ফসল কমিউনের গুদামে জমা হতো, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কৃষকদের মাঝে খাদ্য ও আয় বণ্টন করা হতো।

এ পদ্ধতি চালুর কারণ ছিল, মাও সেতুং বিশ্বাস করতেন—ব্যক্তিগত লাভের চিন্তা না করে সবাই দেশের জন্য কাজ করবে। একসাথে উৎপাদন করলে মোট উৎপাদন বাড়াবে।

কিন্তু, বাস্তবে দেখা গেল—

কৃষকদের বেশি উৎপাদনের ব্যক্তিগত উৎসাহ ছিল না।

সবাই একই রকম সুবিধা পাওয়ায় কৃষকদের মাঝে পরিশ্রমের আগ্রহ  কমে যায়।

অনেক স্থানীয় কর্মকর্তা উৎপাদনের তথ্য অতিরঞ্জিত করে সরকারের কাছে পাঠাতেন।

সরকার সেই ভুল তথ্যের ভিত্তিতে অতিরিক্ত খাদ্য সংগ্রহ করত।

ফলে গ্রামে গ্রামে খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দেয়।

১৯৫৯–১৯৬১ সালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। সেই দুর্ভিক্ষে ১.৫–৪.৫ কোটি মানুষ মারা যায়।

এ ঘটনার পর ১৯৭৮ সালে দেং শিয়াওপিং উপলব্ধি করেন, যে কৃষক নিজের পরিশ্রমের ফল ভোগ করতে পারে না, তার উৎপাদন বাড়ানোর আগ্রহও কম থাকে।

তাই তিনি Household Responsibility System চালু করেন।

এর ফলে—জমির মালিক রাষ্ট্রই থাকে, কিন্তু কৃষক পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদে জমি চাষের অধিকার দেওয়া হয়।

সরকারকে নির্ধারিত অংশ দেওয়ার পর অতিরিক্ত উৎপাদিত ফসল কৃষক নিজে বাজারে বিক্রি করতে পারে।

অর্থাৎ, যত বেশি উৎপাদন, তত বেশি আয়—এই চিন্তা কৃষকদের মাথায় ঢুকে ।

ফলে, মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই কৃষি উৎপাদন প্রায় ৫০% বৃদ্ধি পায়, যা চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রথম বড় সাফল্য হিসেবে ধরা হয়।

এভাবে কমিউন ব্যবস্থা বাতিল হয়ে যায়….

এরপর ১৯৮০ সালে দেশটিতে শেনজেনসহ ৪টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হয়।

এখানে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কর ছাড়, সহজ ব্যবসার পরিবেশ এবং উন্নত অবকাঠামো দেওয়া হয়।

ফলে হাজার হাজার বিদেশি প্রতিষ্ঠান চীনে কারখানা স্থাপন করে।

খেলনা, পোশাক, ইলেকট্রনিক্স থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে উচ্চপ্রযুক্তি পণ্য উৎপাদন শুরু হয়।

এভাবেই চীন হয়ে উঠে বিশ্বের কারখানা

১৯৯০ এর দশকে দেশটিতে হাজার হাজার কিমি মহাসড়ক নির্মাণ, গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাপক বিনিয়োগ, শিল্পাঞ্চল ও নতুন শহর গড়ে তোলা হয়।

ফলে Apple, Samsung, Dell, HP, Sony-সহ বিশ্বের বড় বড় কোম্পানি চীনে উৎপাদন শুরু করে।

রপ্তানি দ্রুত বাড়তে থাকে এবং কোটি কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। দেশের অর্থনীতির লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে।

চীন বুঝেছিল, শিল্পায়নের জন্য শুধু কারখানা নয়—রাস্তা, রেল, বন্দর ও বিদ্যুৎ সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে দেশটিতে ৪৮,০০০ কিমির বেশি উচ্চগতির রেলপথ রয়েছে। রয়েছে ১,৮০,০০০ কিমির বেশি এক্সপ্রেসওয়ে। আর বিশ্বের ব্যস্ততম ১০টি কনটেইনার বন্দরের মধ্যে ৭টি রয়েছে চীনে।

২০১২ সালে শি জিনপিং ক্ষমতায় এসে ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু করেন

তিনি Tiger and Flies নীতি গ্রহণ করেন।

এ নীতি অনুযায়ী শুধু ছোট কর্মকর্তা নয়; দূর্নীতি করলে মন্ত্রী, জেনারেল, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের প্রধানসহ উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

এক দশকে লক্ষ লক্ষ সরকারি কর্মকর্তা শাস্তি, বরখাস্ত বা তদন্তের আওতায় এসেছে; এর মধ্যে হাজার হাজার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও ছিলেন।

সরকারি ক্রয়, কর আদায়, কাস্টমস ও প্রশাসনের অনেক সেবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা হয়, ফলে ঘুষ ও অনিয়মের সুযোগ কমে।

বড় ধরনের দুর্নীতির মামলায় অনেক কর্মকর্তাকে আজীবন কারাদণ্ড, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে, যা অন্য কর্মকর্তাদের জন্য শক্ত বার্তা হিসেবে কাজ করেছে।

ফলে, ব্যবসায়ীদের আস্থা বৃদ্ধি পায়। বড় সরকারি প্রকল্পে অর্থ অপচয় ও অনিয়ম কমে আসে। বিদেশি বিনিয়োগ আরও বাড়ে।

আজকের চীন…

বিশ্বের ২য় বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। GDP প্রায় ২০ ট্রিলিয়ন ডলার। মাথাপিছু আয় প্রায় ১৩,৫০০ ডলার। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি।

অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক দিয়ে আমেরিকা যদি কাউকে পরোয়া করে সেটা হলো চীন।

দেশটিতে প্রতিবছর শত শত কিলোমিটার নতুন রেলপথ ও মহাসড়ক যুক্ত হচ্ছে।

১৯৭৮ সালে যেখানে শহরে বাস করত মাত্র ১৮% মানুষ, বর্তমানে ৬৭% এরও বেশি মানুষ শহরে বাস করছে।

১৯৮১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ৮০ কোটিরও বেশি মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে।

সাক্ষরতার হার এখন ৯৭% এর বেশি।

গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) বার্ষিক ব্যয় প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার যা বাংলাদেশের জিডিপির সমান।

বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV) উৎপাদনে বিশ্বের ১ নম্বর দেশ।

মাত্র ৪০–৪৫ বছর লেগেছে….

আজকে চীন কোথায় আর বাংলাদেশ কোথায়! বাংলাদেশের গল্প না-ই-বা বল্লাম, আপনারা সবই জানেন

@ Financial Literacy  


২৮



উটের কাহিনি

দুপুরের সাহারা। মাটি যেন আগুনে গড়া। বাতাস যেন গরম ছুরি। দূরে দিগন্ত তাপের ঢেউ, আর এদিকে আকাশ আর বালির রেখা একে অপরের সাথে মিশে যাচ্ছে। মনে হতে পারে এখানে জীবনের কোনো অস্তিত্বই থাকা সম্ভব নয়।

ঠিক সেই মুহূর্তে, দূর দিগন্তে একটি ছায়া দেখা যায়।

প্রথমে ছোট, অস্পষ্ট—মরীচিকার মতো। তারপর ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়—একটি উট। মাথা নিচু, ধীর পায়ে এগোচ্ছে, থেমে নেই। কিন্তু মনে হয় না সে হাঁটছে—মনে হয় সে সময়ের বিরুদ্ধে এগিয়ে যাচ্ছে।

উট—মরুভূমির সেই প্রাণী, যে হেরে যাওয়ার জন্য জন্মায়নি।

কিন্তু এই পথ সহজ নয়।

কিছুক্ষণ আগেও সে জানত না সামনে জল আছে কি নেই। গত কয়েকদিনে এক ফোঁটা জলও পায়নি। তবুও সে থামে না। কারণ মরুভূমিতে থেমে যাওয়া মানেই শেষ হয়ে যাওয়া।

তার শরীরের ভেতরে তখন শুরু হয়েছে এক যুদ্ধ।

মরুভূমিতে সবচেয়ে বড় শত্রু—তৃষ্ণা। রক্ত ঘন হয়ে আসছে, শরীর শুকিয়ে যাচ্ছে, তবুও সে বেঁচে আছে।

একটি সাধারণ প্রাণী যদি শরীরের ১০–১২% জল হারায়, তবে তার মৃত্যু নিশ্চিত। কিন্তু উট? সে শরীরের প্রায় ২৫–৩০% জল হারিয়েও বেঁচে থাকতে পারে!

এটি কীভাবে সম্ভব?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে তার শরীরের গভীরে। প্রথমেই আসি তার কুঁজের কথায়। অনেকে মনে করে কুঁজে জল জমা থাকে কিন্তু আসলে সেখানে জমা থাকে চর্বি (fat)। এই চর্বি ভেঙে শক্তি উৎপন্ন হয়, আর সেই প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় বিপাকীয় জল (metabolic water)। অর্থাৎ, উট নিজের শরীর থেকেই জল তৈরি করতে পারে। তার কুঁজে থাকা চর্বি ধীরে ধীরে ভেঙে শক্তি দিচ্ছে আর সেই শক্তির ভেতর থেকে তৈরি হচ্ছে সামান্য জল। যেন শরীর নিজেই নিজের জন্য শেষ আশ্রয় বানাচ্ছে। এটি যেন মরুভূমির মধ্যে নিজের ভেতরেই এক “গোপন জলাধার”।

কিন্তু কুঁজে চর্বি শুধু জল তৈরি করলেই হবে না—জল ধরে রাখাও জরুরি। এখানেই আসে তার বৃক্কের অসাধারণ ক্ষমতা। উটের বৃক্ক এতটাই দক্ষ যে তার প্রস্রাব অত্যন্ত ঘন—জল প্রায় বেরই হয় না। তার মলও এতটাই শুকনো যে তা সরাসরি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়!

কিন্তু সবচেয়ে অবিশ্বাস্য বিষয় হচ্ছে—সে আতঙ্কিত হয় না। কারণ তার শরীর জানে, কীভাবে ধৈর্য ধরতে হয়।

হঠাৎ সামনে কিছু নড়াচড়া। শিকারি নয়, কিন্তু বিপদ হতে পারে। মরুভূমিতে প্রতিটি শব্দই সন্দেহজনক। উট চোখ তুলে তাকায়। লম্বা পাপড়ির ফাঁক দিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। বালুঝড় এলে তার নাক বন্ধ হয়ে যাবে, চোখ বাঁচবে। কিন্তু এখন সে শুধু পথ দেখে।

আরও কিছুক্ষণ পর শুরু হয় ঝড়ের ইঙ্গিত।

বাতাস হঠাৎ থমকে যায়, তারপর এক ঝটকায় বালির দেয়াল উঠে আসে। দৃশ্য মুহূর্তে হারিয়ে যায়। মানুষ হলে আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে যেত। কিন্তু উট থামে না। সে মাথা নিচু করে হাঁটে। তার নাসারন্ধ্র প্রায় বন্ধ, চোখ আধা ঢেকে গেছে। তবুও সে পথ চিনে চলে।

এটাই মরুভূমির সবচেয়ে বড় সত্য—এখানে বেঁচে থাকা মানে লড়াই নয়, বরং টিকে থাকা।

ঝড়ের মাঝেও তার মনে একটা লক্ষ্য। জল পাই কোথায়।

দিনের পর দিন অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে, কোথায় কোথায় সামান্য সবুজের চিহ্ন থাকতে পারে। হয়তো দূরে কোনো মরুদ্যান, হয়তো পুরনো শুকনো নদীখাত। এই আশার ওপরেই সে এগিয়ে চলে।

সময় যেন টানতে থাকে—প্রতিটি মুহূর্ত ভারী।

তার পা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসে, কিন্তু সে থামে না। কারণ মরুভূমিতে থামলে বেঁচে থাকার আর কোন গল্প থাকে না।

অবশেষে—একটা পরিবর্তন।

দূরে হালকা সবুজের আভা। বাতাসে আর্দ্রতার সামান্য পরিবর্তন। উটের শরীর যেন সেটা বুঝে ফেলে, যেন চোখের আগে নয়, শরীরের ভেতরে কোনো ইন্দ্রিয় তাকে জানিয়ে দেয়— তুমি লক্ষ্যের কাছে ।

আর তখনই ঘটে আসল বিস্ময়।

যে প্রাণী কয়েকদিন ধরে জল পায়নি, সে একবারে ১০০ লিটার পর্যন্ত জল পান করতে পারে! খুব দ্রুত, গভীরভাবে, যেন সময়কে ফিরিয়ে আনছে। তার রক্তকণিকা হঠাৎ জলে ফেটে যায় না, বরং ধীরে ধীরে ভারসাম্য ফিরে পায়।

উটের লোহিত রক্তকণিকা (Red Blood Cell, RBC) মরুভূমির কঠিন পরিবেশে টিকে থাকার জন্য অসাধারণভাবে অভিযোজিত। অন্যান্য অধিকাংশ স্তন্যপায়ী প্রাণীর RBC যেখানে গোলাকার ও দ্বি-অবতল (biconcave), সেখানে উটের RBC ডিম্বাকৃতি (elliptical বা oval)। এই বিশেষ গঠনই তাকে তীব্র পানিশূন্যতা ও হঠাৎ প্রচুর জল পান—উভয় পরিস্থিতি সামলাতে সাহায্য করে।

এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে—

তীব্র জলশূন্যতায় রক্ত চলাচল সচল থাকে: শরীর থেকে অনেক জল বেরিয়ে গেলে রক্ত ঘন হয়ে যায়। সাধারণ গোলাকার RBC সহজেই বিকৃত হতে পারে, কিন্তু উটের ডিম্বাকৃতি RBC নমনীয় হওয়ায় ঘন রক্তের মধ্যেও সরু কৈশিক রক্তনালিতে সহজে চলাচল করতে পারে।

হঠাৎ প্রচুর জল পান করলেও ফেটে যায় না: কয়েক দিন জল না পেয়ে উট একবারে প্রায় ১০০ লিটার পর্যন্ত জল পান করতে পারে। তখন রক্ত দ্রুত পাতলা হয়ে যায় এবং RBC-তে জল প্রবেশ করে। সাধারণ প্রাণীর RBC এত দ্রুত ফুলে গেলে ফেটে (hemolysis) যেতে পারে। কিন্তু উটের ডিম্বাকৃতি ও অত্যন্ত স্থিতিস্থাপক RBC নিজের আয়তনের প্রায় দুই থেকে আড়াই গুণ পর্যন্ত প্রসারিত হতে পারে, তবুও সহজে ফেটে যায় না। অক্সিজেন পরিবহন অব্যাহত থাকে ফলে দীর্ঘ সময় ধরে হাঁটা ও কঠিন পরিবেশে কাজ করা সম্ভব হয়।

তার ডিম্বাকৃতি, অত্যন্ত স্থিতিস্থাপক লোহিত রক্তকণিকাও (RBC) এই অভিযোজনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের ফলে গড়ে ওঠা এই বৈশিষ্ট্যই উটকে পৃথিবীর অন্যতম সফল মরুভূমির প্রাণীতে পরিণত করেছে।

এটি কোন অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা নয়—এটি তার নিখুঁত অভিযোজন। আর এই পুরো যাত্রার নেপথ্যে আছে হাজার বছরের বিবর্তন।

যারা সামান্য বেশি জল ধরে রাখতে পেরেছে, তারা বেঁচেছে। যারা একটু বেশি গরম সহ্য করতে পেরেছে, তারা এগিয়েছে। যারা মরুভূমির প্রতিটি কণাকে বুঝতে শিখেছে, তারা টিকে গেছে। সেই ছোট ছোট পরিবর্তন জমে আজকের এই প্রাণী তৈরি করেছে।

উট তাই শুধু একটি প্রাণী নয়—এটি মরুভূমির ইতিহাসে লেখা এক চলমান অধ্যায়।

ঝড় থেমে গেলে আবার সব স্বাভাবিক হয়ে আসে। বালির ওপর সেই একাকী ছায়া আবার চলতে শুরু করে—এবার জল পেয়েছে, কিন্তু যাত্রা শেষ হয়নি।

কারণ মরুভূমিতে একবার পৌঁছানো মানে সে বিজয়ী এমন নয়। বরং পরের যুদ্ধের প্রস্তুতি।

উটের কাহিনি তাই শুধু বেঁচে থাকার কাহিনি নয়—এটি অসীম প্রতিকূলতার মাঝেও টিকে থাকার এক মহাযাত্রা ।

লেখা : পঞ্চানন মণ্ডল



২৯



মস্তিষ্ক অপ্রয়োজনীয় তথ্য প্রতিনিয়ত তা ছাঁটাই করে ফেলে

আপনি কি কখনো লক্ষ্য করেছেন, কোনো নতুন বিষয় গভীর মন দিয়ে শেখার ঠিক তিন দিন বা বাহাত্তর ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই মাথা থেকে প্রায় নব্বই শতাংশ তথ্য গায়েব হয়ে যায়?

এই অদ্ভুত সমস্যায় পড়ে আপনি হয়তো ভাবছেন, আপনার স্মৃতিশক্তি একেবারেই দুর্বল হয়ে গেছে।

কিন্তু বিশ্বাস করুন, আপনার মাথা পুরোপুরি ঠিক আছে।

আসলে আমাদের মস্তিষ্ক এক অদ্ভুত চাল চালে, যেখানে অপ্রয়োজনীয় তথ্য জমতে না দিয়ে প্রতিনিয়ত তা ছাঁটাই করে ফেলে, যাতে নতুন কোনো কাজের চাপে মাথা জ্যাম হয়ে না যায়।

জার্মান মনোবিজ্ঞানী হারমান এবিংহাউস কী বললেন?

বিখ্যাত বিজ্ঞানী  ' হারমান এবিংহাউস ' তাঁর বিখ্যাত  'Forgetting Curve (ভুলে যাওয়ার রেখাচিত্র) '-এ দেখিয়েছেন যে, মানুষ শেখার পরপরই দ্রুত ভুলে যেতে শুরু করে।

বিজ্ঞান বলছে, আপনি যদি নতুন কিছু শেখার পর নির্দিষ্ট সময়ে তা ঝালাই না করেন, তবে আপনার মস্তিষ্ক সেটিকে আবর্জনা ভেবে  ডাস্টবিনে ফেলে দেয়

এটি সম্পূর্ণ একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যা আমাদের মাথাকে অতিরিক্ত ক্লান্তির হাত থেকে বাঁচাতে সাহায্য করে।

এই ভুলে যাওয়ার সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো **Spaced Repetition (ব্যবধানে পুনরাবৃত্তি)**।

নতুন কিছু শেখার **২৪ ঘণ্টা** পরে একবার রিভিশন করুন।

এরপর **৩ দিন** পরে আবার দেখুন।

তারপর **৭ দিন** পরে আরেকবার ঝালাই করুন।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, এই বিশেষ কৌশলে পড়াশোনা করলে তথ্যগুলো সাময়িক স্মৃতি থেকে দীর্ঘস্থায়ী ও শক্তিশালী স্মৃতিতে স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হতে সাহায্য করে। @ পার্থ প্রতিম রায় 




থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত (জেনেটিক) রক্তের রোগ। এই রোগে শরীরে স্বাভাবিক পরিমাণে হিমোগ্লোবিন তৈরি হয় না, ফলে রক্তস্বল্পতা (অ্যানিমিয়া) দেখা দেয়। অনেকেই রোগটি সম্পর্কে জানেন না, তাই সময়মতো পরীক্ষা ও সচেতনতার অভাবে আক্রান্ত শিশুর জন্ম হতে পারে।

থ্যালাসেমিয়ার সাধারণ লক্ষণ: অতিরিক্ত দুর্বলতা ও ক্লান্তি শরীর ফ্যাকাশে দেখানো শ্বাসকষ্ট মাথা ঘোরা বারবার সংক্রমণ হওয়া শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া

কীভাবে প্রতিরোধ করবেন? বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া ক্যারিয়ার (Carrier) পরীক্ষা করুন। পরিবারে থ্যালাসেমিয়ার ইতিহাস থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সচেতনতা বাড়ান এবং অন্যদেরও পরীক্ষা করার জন্য উৎসাহিত করুন।

থ্যালাসেমিয়া থাকলেই জীবন থেমে যায় না। নিয়মিত চিকিৎসা, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা এবং প্রয়োজনীয় যত্নের মাধ্যমে অনেক রোগী সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।


৩০



কাঞ্চনজঙ্ঘা একটি পাহাড়।

অনেক লেপচা (হিমালয়ের আদিম জনগোষ্ঠী )  আজও মনে করেন, পাহাড়ে ওঠা মানে শুধু একটি শৃঙ্গে পৌঁছানো নয়। সেখানে এমন এক শক্তির রাজ্যে প্রবেশ করা, যেখানে মানুষ অতিথি মাত্র। পাহাড়ের নিজেরও ইচ্ছা আছে, নিজেরও রাগ আছে।

১৮৯৮ সালে ডগলাস ফ্রেশফিল্ড কাঞ্চনজঙ্ঘার নতুন রুট নির্ধারণ করার পর একটি অদ্ভুত মন্তব্য করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, এই পর্বত যেন "অগম্যতার এক অদৃশ্য রক্ষক" দ্বারা পাহারা দেওয়া হয়। লেপচাদের ভাষায় সেই রক্ষকের নাম জো-নাগা।

অনেকে বিশ্বাস করেন, এই জো-নাগাই হয়তো সেই রহস্যময় ইয়েতি, যাকে আমরা তুষার মানব বা Bigfoot নামে চিনি।

১৯২৫ সালে একটি ব্রিটিশ অভিযানের সদস্যরা দাবি করেছিলেন, তারা দূরে এক দ্বিপদ প্রাণীকে হাঁটতে দেখেছেন। গ্রিক আলোকচিত্রী নিকোলাস তোমবাজি পরে লিখেছিলেন, প্রাণীটি মানুষের মতো সোজা হয়ে হাঁটছিল, কিন্তু তার গায়ে কোনো পোশাক ছিল না। মাঝে মাঝে থেমে রডোডেনড্রনের ঝোপ উপড়ে ফেলছিল।

এরপর ১৯৫১ সালে এরিক শিপটন ও মাইকেল ওয়ার্ড যে পায়ের ছাপের ছবি তুলেছিলেন, তা আজও ইয়েতি রহস্যের সবচেয়ে আলোচিত প্রমাণগুলোর একটি। প্রায় ১৮ ইঞ্চি লম্বা সেই ছাপ পৃথিবীর নানা গবেষকের কৌতূহল বাড়িয়েছে, আবার সমানভাবে সন্দেহও তৈরি করেছে।

বিজ্ঞান অবশ্য অন্য কথা বলে। তাদের মতে, উচ্চতার কারণে অক্সিজেনের স্বল্পতা, ক্লান্তি, তুষারের বিভ্রম এবং মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াই এমন অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়।

বিজ্ঞান ব্যাখ্যা দিতে পারে। কিন্তু মানুষের বিশ্বাসকে পুরোপুরি মুছে দিতে পারে না।

━━━━━━━━━━━━━━

কাঞ্চনজঙ্ঘার আরেকটি রহস্যের নাম মায়েল লিয়াং।

লেপচাদের বিশ্বাস, পৃথিবীর কোথাও একটি লুকানো ভূমি আছে। যার নামের অর্থই হলো চিরন্তনের গোপন দেশ।

সেখানে মৃত্যু নেই, ভয় নেই, সময়েরও যেন কোনো ক্ষমতা নেই। বলা হয়, কাঞ্চনজঙ্ঘার আশপাশের কোনো অদৃশ্য অঞ্চলে মাতৃদেবী না-জং-নিওনতা সেই ভূমি সৃষ্টি করেছিলেন। এমনকি অতিথি পাখিরাও নাকি প্রতি বছর সেই অদেখা দেশে উড়ে যায়, বাসা বাঁধে, ডিম পাড়ে, আবার ফিরে আসে।

এটা কি শুধুই লোককথা?

নাকি প্রতিটি পাহাড়ের মতো কাঞ্চনজঙ্ঘারও এমন কিছু গোপন অধ্যায় আছে, যেগুলো মানুষ এখনও পড়ে শেষ করতে পারেনি?

সত্যি বলতে, আমার কাছে এই প্রশ্নের উত্তর নেই।

হয়তো উত্তর না থাকাটাই রহস্যের সবচেয়ে সুন্দর দিক।

মায়েল লিয়াং নিয়ে পরের পর্বে আরও বিস্ময়কর কিছু গল্প নিয়ে ফিরে আসব।

আপনার কী মনে হয়? ইয়েতি কি শুধুই মানুষের কল্পনা..? নাকি বিজ্ঞান এর বাহিরে হিমালয়ের অজানা কোন রহস্য।

@ Asad Uzzanman


৩১


4th dimension 

এই দুনিয়ায় দশটিরও বেশী ডাইমেনশন রয়েছে আর মানুষ হল ত্রিমাত্রিক জগতের মানুষ মানে আমরা 3D dimension এ বাস করি এই ডাইমেনশনে আগে পিছে দামে ডামে এবং উপর নিচ থাকে, এখন যারা 2D ডাইমেনশনের জীবজন্তু পশুপাখি উদ্ভিদ প্রাণীরা এবং মানুষরা বসবাস করে সেখানকার মানুষেরা আগে পিছে বামে ডানে যেতে পারবে কিন্তু তাদের দুনিয়ায় উপরে-নিচে বলতে কিছু নেই, এখন ভাবুন ত্রিমাত্রিক দুনিয়ার একটি মানুষ যদি 2D ডাইমেনশনাল দুনিয়াতে প্রবেশ করে তখন ত্রিমাত্রিক মানুষটি 2d ডাইমেনশনাল মানুষদের দেখতে পারবে, কিন্তু 2d দুনিয়ার মানুষেরা থার্ড ডাইমেনশনের সেই মানুষটিকে কেউ দেখতে পারবে না,

কারণ তাদের 2d দুনিয়ায় উপর-নিচে বলতে কিছু নেই, ত্রিমাত্রিক দুনিয়ার মানুষটি 2d দুনিয়ায় মানুষদের উপর থেকে এবং নিচে থেকে দেখতে পারছে কারণ তারা ত্রিমাত্রিক মানুষ আর ত্রিমাত্রিক মানুষটির দুনিয়ায় উপর এবং নিচ থাকে,

এখন সেই ত্রিমাত্রিক মানুষটির ইচ্ছে হলেই 2d দুনিয়ার যে কোনো কিছুকে ধরতে এবং নাড়াতে পারবে তার হাত দিয়ে এমনকি যদি ত্রিমাত্রিক মানুষটি 2D দুনিয়ার কোন রাস্তায় যেখানে বেশি গাড়ি চলে সেখানে রাস্তার মাঝখানে তার আঙ্গুল বা হাত রেখে দিল আর সেই মুহূর্তে চলন্ত গাড়ি সেই ত্রিমাত্রিক মানুষটির হাতে ধাক্কা লাগলো এবং অ্যাক্সিডেন্ট হল কিন্তু 2D দুনিয়ার মানুষরা সেই ত্রিমাত্রিক মানুষ টির হাতটি দেখতে পারবেনা কারণ তাদের 2d দুনিয়ায় গউপরে-নিচে বলতে কিছু নেই তখন 2D দুনিয়ার মানুষরা ভাববে এ রাস্তার মাঝখানে কিছু অশরীর আত্মা আছে বা কোনো ভূত-প্রেতের কারণে বা প্যারানরমাল অ্যাক্টিভিটি কারণে এমনটি হচ্ছে কারণ তারা সে হাতটি দেখতে পাচ্ছে না এজন্য তারা এই কথাটি বলবে,

2d দুনিয়াতে উপর-নিচ থাকে না কিন্তু তখন কি হবে যদি ত্রিমাত্রিক মানুষটি যদি 2d দুনিয়ায় কোন একটি মানুষকে তার হাত দিয়ে উপরে উঠালে, তখন সেই 2D মানুষটি 2d দুনিয়া থেকে অদৃশ্য হয়ে যাবে।

এখন মেইন টপিকে আসা যাক এখন একটু ভয়ানক! ভাবুন আমরা ত্রিমাত্রিক দুনিয়াতে বাস করি এটা তো জানি কিন্তু যারা 4th dimension বাস করে তারা আমাদের দেখতে পারবে কিন্তু আমরা তাদের দেখতে পারবো না।

আর সেই ত্রিমাত্রিকমানুষটা 2d দুনিয়ার মানুষকে ক্ষতি করতে পারে আবার নাও করতে পারে নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ এর জন্য যেকোনো কিছু করতে পারে। ঠিক সেরকম ভাবে 4th dimension এর মানুষেরা কেন পারবে না, পৃথিবীতে নানা অলৌকিক ও paranormal কাহিনীর পিছনে এটি একটি কারণ হতে পারে।

আইনস্টাইনের থিওরি অফ রিলেটিভিটি অনুযায়ী ৪র্থ মাত্রা হলো সময় Time । কিন্তু আধুনিক কোয়ান্টাম ফিজিক্সের স্ট্রিং থিওরি String Theory ও M-Theory দাবি করে এই মহাবিশ্বে বাস্তবে ১০ বা ১১টি ডাইমেনশন রয়েছে! তবে বাকি উচ্চ মাত্রাগুলো সাব-এটমিক স্কেলে এতোটাই সূক্ষ্মভাবে পেঁচিয়ে Compactified আছে যে আমাদের সাধারণ চোখ বা সেন্সর তা অনুধাবন করতে পারে না।

@ Shariar Ovi


৩২



মার্ক টোয়েনের একটা বিখ্যাত উক্তি আছে— **❝সত্যি কথা বললে, আপনাকে কিছুই মনে রাখতে হবে না!❞**

কখনো ভেবে দেখেছেন, মিথ্যা কথা মনে রাখা আসলে এত কঠিন কেন?

বিজ্ঞান বলে, সত্য হলো আমাদের স্মৃতির একটা স্বাভাবিক অংশ। বাস্তবে যা ঘটেছে, আমাদের মস্তিষ্ক শুধু সেটা রিকল বা স্মরণ করে। কিন্তু মিথ্যা বলার সময় মস্তিষ্ককে ডাবল ডিউটি করতে হয়!

মিথ্যা মনে রাখা কঠিন হওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো:

* **মস্তিষ্কের অতিরিক্ত খাটুনি (Cognitive Load):** সত্য বলার সময় ব্রেন রিল্যাক্স থাকে। কিন্তু মিথ্যা বলার সময় ব্রেনকে প্রথমে একটা কাল্পনিক গল্প বানাতে হয়, তারপর সেটাকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য যুক্তির খোঁজ করতে হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্কের অনেক বেশি শক্তি খরচ হয়।

* **ডিটেইলস মনে রাখার চাপ:** সত্য ঘটনায় আপনি চাইলেও খুব বেশি অমিল করতে পারবেন না। কিন্তু মিথ্যা বললে আপনাকে মনে রাখতে হয়— কাকে, কখন, কোন পরিস্থিতিতে, ঠিক কী গল্প শুনিয়েছিলেন!

* **ভয় ও মানসিক চাপ:** "ধরা পড়ে যাব না তো?"— এই অবচেতন ভয়ের কারণে শরীরে স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হয়। আর অতিরিক্ত মানসিক চাপে মানুষের স্মৃতিশক্তি এমনিতেই দুর্বল হয়ে যায়, ফলে নিজের বানানো গল্পই মানুষ ভুলে যেতে শুরু করে।

সোজা কথায়, একটা মিথ্যাকে টিকিয়ে রাখতে আরও দশটা মিথ্যার জন্ম দিতে হয়। এতসব হিসাব মেলাতে গিয়ে একসময় মিথ্যার সুতো ঠিকই ছিঁড়ে যায়!

তাই তো মিথ্যাবাদীদের সবসময় ভয়ে তটস্থ থাকতে হয়, আর সত্যবাদীরা থাকেন একদম বিন্দাস! রাতে শান্তিতে ঘুমাতে চাইলে সত্যের কোনো বিকল্প নেই।

আপনার জীবনে কি কখনো এমন হয়েছে যে কারো মিথ্যা কথা খুব সহজেই ধরে ফেলেছেন? কমেন্টে শেয়ার করুন! @ Psycorix



৩৩



শূন্য হাতে জন্ম নেওয়া আমার সিদ্ধান্ত ছিল না, কিন্তু শূন্য রেখে পৃথিবী ছেড়ে যাওয়া হবে আমার সিদ্ধান্ত।

এই কথাটি আমাদের জীবনের এক গভীর সত্যকে মনে করিয়ে দেয়। আমরা কেউই জন্মের সময় নিজের পরিবার, অর্থ বা সুযোগ বেছে নিতে পারি না। কিন্তু জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি পরিশ্রম আর প্রতিটি শেখা এসবই আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ে।

সম্পদ মানেই শুধু ব্যাংক ব্যালেন্স নয়। প্রকৃত সম্পদ হলো দক্ষতা, জ্ঞান, সততা, অভিজ্ঞতা এবং এমন কিছু সৃষ্টি করা, যা আপনার অনুপস্থিতিতেও মানুষের উপকারে আসে। অর্থ তারই একটি ফল।

আজ আপনি যেখানে আছেন, সেটাই আপনার শেষ গন্তব্য নয়। ছোট ছোট অভ্যাস, প্রতিদিনের পরিশ্রম এবং নিজের উপর বিনিয়োগ এই তিনটি জিনিসই একদিন অসাধারণ পরিবর্তন এনে দিতে পারে। যারা সফল হয়, তারা একদিনে বড় হয় না; তারা প্রতিদিন একটু একটু করে নিজেদের বদলে ফেলে।

তাই নিজের অতীতকে নয়, নিজের সম্ভাবনাকে বিশ্বাস করুন। কারণ জন্মের পরিস্থিতি আপনার হাতে ছিল না, কিন্তু জীবনের গল্প কীভাবে লেখা হবে সেই কলমটি আজও আপনার হাতেই রয়েছে। @ Pial Hasan Tutul


৩৪


ON 618-এর কাছে কি সত্যিই এক সেকেন্ড মানে পৃথিবীর হাজার হাজার বছর?

মহাবিশ্ব আমাদের এমন অনেক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়, যা প্রথম শুনলে কল্পকাহিনির মতো মনে হয়। সময়ও তেমনই একটি বিষয়। আমরা সাধারণত মনে করি, সময় সবার জন্য একই গতিতে চলে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আলবার্ট আইনস্টাইন দেখিয়ে দিলেন—এই ধারণা সম্পূর্ণ সঠিক নয়। তাঁর সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব (General Relativity) অনুযায়ী, মহাকর্ষ শুধু বস্তু নয়, সময়ের প্রবাহকেও প্রভাবিত করে। অর্থাৎ, মহাকর্ষ যত বেশি শক্তিশালী হবে, সময় তত ধীরে অতিক্রান্ত হবে।

এই তত্ত্বের সবচেয়ে বিস্ময়কর উদাহরণগুলোর একটি হলো কৃষ্ণগহ্বর (Black Hole)। কৃষ্ণগহ্বর এমন এক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বস্তু, যার মহাকর্ষ এতটাই প্রবল যে আলো পর্যন্ত তার আকর্ষণ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশে স্থান ও সময় এত বেশি বেঁকে যায় যে, সেখানে সময়ের প্রবাহ দূরবর্তী অঞ্চলের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর হয়ে যায়। এই ঘটনাকেই বলা হয় মহাকর্ষীয় সময় প্রসারণ (Gravitational Time Dilation)।

এই প্রসঙ্গে প্রায়ই আলোচনায় আসে TON 618—মানবজাতির জানা সবচেয়ে বিশাল অতিভারী কৃষ্ণগহ্বরগুলোর একটি। এর ভর প্রায় ৬৬ বিলিয়ন সূর্যের সমান। এত বিশাল ভরের কারণে এর চারপাশের স্থান-কালের বক্রতা অসাধারণ মাত্রায় পৌঁছে যায়। ফলে, তাত্ত্বিকভাবে যদি কোনো পর্যবেক্ষক এর ঘটনাক্ষেত্রের (Event Horizon) খুব কাছাকাছি একটি স্থিতিশীল কক্ষপথে অবস্থান করতে পারেন, তবে তার জন্য সময় পৃথিবী বা দূরে থাকা অন্য কোনো পর্যবেক্ষকের তুলনায় অনেক ধীরে অতিক্রান্ত হবে।

এখান থেকেই জন্ম নিয়েছে একটি বহুল প্রচলিত দাবি—"TON 618-এর কাছে এক সেকেন্ড মানে পৃথিবীর হাজার হাজার বছর।" কথাটি শুনতে চমকপ্রদ হলেও এটিকে বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করা ঠিক নয়। কারণ এখন পর্যন্ত এমন কোনো পর্যবেক্ষণ বা পরিমাপ করা সম্ভব হয়নি, যা এই নির্দিষ্ট দাবিকে নিশ্চিত করে।

আসলে সময় কতটা ধীর হবে, তা নির্ভর করে একাধিক বিষয়ে। পর্যবেক্ষক কৃষ্ণগহ্বর থেকে ঠিক কত দূরে আছেন, তিনি কী গতিতে চলছেন, কৃষ্ণগহ্বরটি কত দ্রুত ঘুরছে (Spin), এবং স্থান-কালের সুনির্দিষ্ট জ্যামিতি কী—এসবের উপর সময় প্রসারণের মাত্রা পরিবর্তিত হয়। তাই একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা দিয়ে এই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।

তবে এটিও সত্য যে আইনস্টাইনের ভবিষ্যদ্বাণী শুধু তত্ত্বেই সীমাবদ্ধ নয়। পৃথিবীতেও মহাকর্ষীয় সময় প্রসারণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। জিপিএস (GPS) উপগ্রহের ঘড়িগুলো পৃথিবীর ঘড়ির তুলনায় ভিন্ন হারে চলে। যদি এই আপেক্ষিকতাজনিত পার্থক্য হিসাব না করা হয়, তাহলে প্রতিদিনই জিপিএসের অবস্থান নির্ণয়ে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত ভুল দেখা দিত। অর্থাৎ, আপেক্ষিকতা শুধু মহাকাশের রহস্য নয়, আমাদের দৈনন্দিন প্রযুক্তিরও একটি অপরিহার্য অংশ।

কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে গবেষণা আজও চলমান। বিজ্ঞানীরা এগুলোর মাধ্যমে স্থান, কাল, মহাকর্ষ এবং মহাবিশ্বের মৌলিক নিয়ম সম্পর্কে নতুন নতুন ধারণা লাভ করছেন। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অনেক তথ্য বাস্তব বিজ্ঞান ও তাত্ত্বিক সম্ভাবনার সীমারেখা মুছে দেয়। তাই যে কোনো চমকপ্রদ দাবি গ্রহণ করার আগে তার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি যাচাই করা জরুরি।

সময় হয়তো আমাদের কাছে একটানা প্রবাহিত একটি নদী। কিন্তু মহাবিশ্বের গভীরে, কৃষ্ণগহ্বরের অদৃশ্য সীমান্তে দাঁড়ালে সেই নদীর স্রোত আর আগের মতো থাকে না। সেখানে সময় নিজেই যেন ধীর হয়ে যায়—এবং সেই বিস্ময়ই আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপহার।

তথ্যসূত্র: NASA, ESA, Einstein Online (Max Planck Institute for Gravitational Physics)

@ সাইকোলজি এবং বিজ্ঞানের অজানা সব তথ্য


৩৫


মানুষ গরুকে পুষেছে, নাকি গরুই মানুষকে? ১০ হাজার বছরের এক অসাধারণ সহাবস্থানের গল্প ||

ছোটবেলায় পরীক্ষায় যখন গরুর রচনা আসতো, তখন তার উপকারিতা নিয়ে কত কী লিখতেন না? মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন খুব কম প্রাণী আছে, যারা মানুষের জীবনকে গরুর মতো গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। আমরা সাধারণত বলি, মানুষ গরুকে পোষ মানিয়েছে। কিন্তু বিবর্তনবিজ্ঞান, প্রত্নতত্ত্ব ও জিনতত্ত্বের গবেষণা একটি আরও চমকপ্রদ প্রশ্ন সামনে এনেছে—মানুষ কি শুধু গরুকেই পুষেছে, নাকি গরুও মানুষকে “গড়ে তুলেছে”?

উত্তর হলো—দুজনেই একে অপরকে বদলে দিয়েছে।

প্রায় ১০–১১ হাজার বছর আগে, পশ্চিম এশিয়ার উর্বর Fertile Crescent অঞ্চলে, এবং পরে ভারতীয় উপমহাদেশে মানুষ বন্য Aurochs নামের বিশালাকার গরুকে ধীরে ধীরে গৃহপালিত করতে শুরু করে। প্রথমদিকে উদ্দেশ্য ছিল শীতকালের খাদ্যের জোগান (মূলত মাংস), এবং পরে কৃষিকাজ, পরিবহন, দুধ, চামড়া ও সার। তাকে পোষ মানানো ছিল এক দীর্ঘ সহাবস্থানের শুভারম্ভ মাত্র।

মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শান্ত স্বভাবের, বেশি দুধ দেয় এমন, এবং সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায়—এমন গরুকে প্রজননের জন্য বেছে নিয়েছে। এই নির্বাচনের ফলে আজকের গৃহপালিত গরু তাদের বন্য পূর্বপুরুষের তুলনায় অনেক বেশি শান্ত, উৎপাদনশীল এবং মানুষের সঙ্গে বসবাসে অভিযোজিত।

অন্যদিকে, গরুও মানুষের বিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মানুষের অধিকাংশ শিশুই জন্মের পর দুধ হজম করতে পারে। কিন্তু হাজার হাজার বছর আগে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে সাধারণত ল্যাক্টেজ (lactase) নামের এনজাইমের উৎপাদন কমে যেত। ফলে বড় হওয়ার পর দুধ হজম করা সম্ভব হতো না।

গরু পালন শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। যেসব মানুষের শরীরে জিনগত পরিবর্তনের কারণে প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থাতেও ল্যাক্টেজ তৈরি হতো, তারা দুধ থেকে অতিরিক্ত পুষ্টি পেত। দুর্ভিক্ষ, খাদ্যসংকট বা কঠিন পরিবেশে এই সুবিধা তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। ধীরে ধীরে এই বৈশিষ্ট্য অনেক জনগোষ্ঠীতে ছড়িয়ে পড়ে। বিজ্ঞানীরা এই ঘটনাকে gene–culture coevolution বা জিন ও সংস্কৃতির সহ-বিবর্তন বলে থাকেন। (আজও অনেক মানুষ ল্যাকটোস হজম করতে পারে না, কিন্ত যারা পারে, তারা দুধ থেকে আরও বেশি পুষ্টিগুণ অর্জন করে নেয়)

গরুর অবদান শুধু খাদ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বলদের সাহায্যে জমি চাষ হওয়ায় কৃষির উৎপাদন বেড়েছে, উদ্বৃত্ত খাদ্য তৈরি হয়েছে, স্থায়ী বসতি গড়ে উঠেছে, শহর ও রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। ইতিহাসবিদদের মতে, কৃষি বিপ্লবের সাফল্যের পেছনে গরুর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আজ পৃথিবীতে প্রায় ১৩০ কোটির আশেপাশে গৃহপালিত গরু রয়েছে। তাদের বন্য পূর্বপুরুষ Aurochs বহু আগেই বিলুপ্ত হয়েছে, কিন্তু মানুষের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কের কারণেই তাদের বংশধররা পৃথিবীর অন্যতম সফল বৃহৎ স্তন্যপায়ী প্রাণীতে পরিণত হয়েছে।

তাই প্রশ্নটি—“মানুষ গরুকে পুষেছে, নাকি গরুই মানুষকে?”—এর উত্তর একপাক্ষিক নয়।

জীববিজ্ঞানের ভাষায় মানুষই গরুকে গৃহপালিত করেছে। কিন্তু সভ্যতার ইতিহাসের ভাষায় গরুও মানুষকে খাদ্য, শক্তি, কৃষি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রদান করেছে। গরু ছাড়া আধুনিক মানবসভ্যতার বিকাশ কল্পনা করা কঠিন।

হয়তো তাই বলা যায়, মানুষ গরুকে গৃহপালিত করেছে, কিন্তু গরুও মানুষকে সভ্য করেছে।

@ সাইকোলজি এবং বিজ্ঞানের অজানা সব তথ্য


৩৬



ইতিহাসে লেবাননের কখনও দেশ হওয়ার ইতিহাস নেই।

লেবানন ভূমধ্যসাগরের পূর্বপাড়ে সিরিয়ার পশ্চিমে ছোট একটি দেশ। আশেপাশের দেশগুলোর মত এই দেশটির কোনো ঐতিহাসিক স্বাতন্ত্র ছিল না। সিরিয়া বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সাম্রাজ্য ও খেলাফতের অংশ হলেও এর ঐতিহাসিক স্বাতন্ত্র আছে, যেমন আশেপাশের মিশর, লিবিয়ার মত দেশগুলোর আছে।

কিন্তু ইতিহাসে লেবাননের কখনও দেশ হওয়ার ইতিহাস নেই। ঐতিহাসিকভাবে এটি সাম তথা সিরিয়ারই অংশ ছিল। তাহলে কী এমন হল যে এই সীমানায় একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র তৈরি করতে হল?


নামের উৎস: ‘লেবানন’ শব্দের শেকড়


‘লেবানন’ নামটি এসেছে সেমিটিক বা আরামাইক শব্দ ‘লাবান’ (Labán) থেকে, যার আক্ষরিক অর্থ ‘সাদা’ বা ‘উজ্জ্বল’। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, শীতকালে লেবানন পর্বতমালার চূড়াগুলো বরফে ঢেকে সাদা হয়ে যেত। সেই দৃশ্য থেকেই অঞ্চলটির নাম হয় "লেবানন"—অর্থাৎ সাদা পাহাড়।


হাজার বছর আগে ফিনিশীয়, আরামাইক ও বাইবেলীয় সাহিত্যেও এই অঞ্চলের উল্লেখ পাওয়া যায়। "লেবানন" নামটি প্রাচীন হলেও সেটি ছিল একটি ভৌগোলিক অঞ্চলের নাম, কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের নয়।


প্রাচীন ইতিহাসে:


ফিনিশীয় আমল: আজকের লেবানন অঞ্চলে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে গড়ে ওঠে ফিনিশীয় সভ্যতা। ভূমধ্যসাগরের তীরে টায়ার, সিডন ও বাইব্লোস ছিল বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ বন্দরনগর। টায়ার (Tyre), সিডন (Sidon) এবং বাইব্লোসের (Byblos) মতো বিখ্যাত বন্দর নগরীগুলো থেকে তারা ভূমধ্যসাগরে বাণিজ্যের প্রসার ঘটিয়েছিল এবং বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন বর্ণমালা উপহার দিয়েছিল।


সাম্রাজ্যের হাতবদল: ফিনিশীয়দের পতনের পর একে একে এই অঞ্চল দখল করে আসিরীয়, ব্যাবিলনীয়, পারসিক, গ্রিক (আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের অধীন), রোমান এবং বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য। সপ্তম শতাব্দীতে আরব মুসলিম বিজয়ের পর লেবানন ইসলামি খিলাফতের অংশ হয়ে ওঠে। এরপর প্রায় এক হাজার বছর লেবানন অঞ্চল বৃহত্তর বিলাদ আল-শাম-এর অংশ হিসেবে শাসিত হয়।


উসমানীয় শাসন: ষোড়শ শতাব্দী থেকে শুরু করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত—প্রায় চারশ বছর এই অঞ্চলটি উসমানীয় সাম্রাজ্যের বৃহত্তর শামের (সিরিয়া) অধীনে শাসিত হয়।


কেন এবং কীভাবে আলাদা রাষ্ট্র হলো লেবানন?


ঐতিহাসিকভাবে লেবানন আলাদা কোনো জাতি বা রাষ্ট্র ছিল না। সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও জর্ডানের মতো এটিও বৃহত্তর শাম অঞ্চলের অংশ ছিল। মূলত ফ্রান্সের আগ্রহের কারণেই এটি আলাদা রাষ্ট্রে রূপ নেয়, ধাপে ধাপে সেই ইতিহাস:


১. মাউন্ট লেবাননের বিশেষ স্বায়ত্তশাসন:


লেবাননের পাহাড়ি অঞ্চলে মূলত মারোনাইট খ্রিস্টান এবং দ্রুজ সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস ছিল। ১৮৬০ সালে এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর ইউরোপীয় শক্তিগুলোর (বিশেষ করে ফ্রান্স) চাপে উসমানীয় সাম্রাজ্য ১৮৬১ সালে মাউন্ট লেবাননকে ‘মুতাসাররিবিয়া’ (Mutasarrifiyya) নামে একটি বিশেষ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ঘোষণা করে। উসমানীয় সাম্রাজ্যের অংশ হলেও এখানে একজন খ্রিস্টান গভর্নর শাসন করতেন।


২. প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও ফরাসি ম্যান্ডেট:


১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। বিজয়ী মিত্রশক্তি মধ্যপ্রাচ্য নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। এরপর ব্রিটেন ও ফ্রান্স মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র নতুন করে আঁকতে শুরু করে। ১৯১৬ সালের গোপন সাইকস-পিকো চুক্তির ভিত্তিতে শাম অঞ্চল দুই ইউরোপীয় শক্তির প্রভাবক্ষেত্রে ভাগ হয়ে যায়। ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণে আসে সিরিয়া ও বর্তমান লেবাননের এলাকা।

ফরাসিরা নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ ও খ্রিস্টান মিত্রদের সুরক্ষার জন্য বৃহত্তর শাম অঞ্চলকে ভেঙে টুকরো টুকরো করার নীতি গ্রহণ করে।


৩. কেন আলাদা লেবানন তৈরি করল ফ্রান্স?


১৯২০ সালের ১ সেপ্টেম্বর ফরাসি জেনারেল অঁরি গুরো "গ্রেটার লেবানন" প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। এর পেছনে কয়েকটি কারণ ছিল:


প্রথমত, ফ্রান্স দীর্ঘদিন ধরে মারোনাইট খ্রিস্টানদের রক্ষক হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিত। তারা এমন একটি রাষ্ট্র গঠন করতে চেয়েছিল যেখানে খ্রিস্টানদের রাজনৈতিক প্রভাব শক্তিশালী থাকবে।


দ্বিতীয়ত, ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূলে একটি ফরাসিপন্থী রাষ্ট্র গড়ে তোলা ছিল তাদের কৌশলগত লক্ষ্য।


তৃতীয়ত, শুধু পাহাড়ি অঞ্চল নিয়ে রাষ্ট্র গঠন করলে তা অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকা কঠিন হতো। তাই বৈরুত, ত্রিপোলি, সাইদা, টাইরসহ উপকূলীয় শহর এবং উর্বর বেকা উপত্যকাও নতুন রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।


ফলে নতুন লেবাননের জনসংখ্যা আর শুধু খ্রিস্টান রইল না; এর মধ্যে বিপুলসংখ্যক সুন্নি ও শিয়া মুসলিমও অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।


এই সিদ্ধান্ত কতটা গ্রহণযোগ্য ছিল:


মারোনাইট নেতাদের বড় অংশ পৃথক লেবাননের পক্ষে ছিলেন।


অন্যদিকে অনেক মুসলিম নেতা মনে করতেন, এই অঞ্চল ঐতিহাসিকভাবে সিরিয়ার অংশ এবং এটিকে আলাদা করা উচিত নয়। তাদের স্বপ্ন ছিল বৃহত্তর সিরিয়ার সঙ্গে একীভূত থাকা।


এই মতপার্থক্যের প্রভাব পরবর্তী কয়েক দশক ধরে লেবাননের রাজনীতিতে স্পষ্টভাবে দেখা যায়।


স্বাধীনতার পর ভারসাম্যের রাজনীতি:


১৯৪৩ সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর জাতিগত ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং গৃহযুদ্ধ এড়াতে একটি অভিনব ক্ষমতা ভাগাভাগি ব্যবস্থা চালু হয়, যা ‘ন্যাশনাল প্যাক্ট’ (National Pact) নামে পরিচিত। এর নিয়ম অনুযায়ী লেবাননের রাষ্ট্রপতি হবেন মারোনাইট খ্রিস্টান, প্রধানমন্ত্রী হবেন সুন্নি মুসলিম এবং সংসদের স্পিকার হবেন একজন শিয়া মুসলিম।


তৎকালীন বাস্তবতায় এই ব্যবস্থা ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হলেও পরবর্তীকালে জনসংখ্যার পরিবর্তন, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং গৃহযুদ্ধের কারণে এটি বারবার বিতর্কের মুখে পড়ে।


তাহলে লেবানন কি কৃত্রিম রাষ্ট্র?


আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে লেবাননের জন্ম নিঃসন্দেহে ফরাসি ম্যান্ডেট আমলে যা নির্দিষ্ট কোনো জাতির, নির্দিষ্ট কোনো ধর্ম বা নির্দিষ্ট কোনো ভাষাভাষীর মানুষের দেশ নয়। এর বর্তমান সীমান্তও মূলত ফরাসিদের নির্ধারণ করা।


কিন্তু যে ভূখণ্ডকে আমরা আজ লেবানন নামে চিনি, তার ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের। এই অঞ্চলের মানুষ, পর্বত, বন্দর, বাণিজ্য এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে।


লেবানন একটি প্রাচীন সভ্যতার ভূমি, কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে তার জন্ম মাত্র এক শতাব্দী আগে। @বইকাল


৩৭

৯-১৮ মাস বয়সে শিশু আস্তে আস্তে বুঝতে শেখে মা চোখের আড়ালে গেলেও কোথাও না কোথাও আছেন

শিশু মনোবিজ্ঞান বলছে, জন্মের প্রথম কয়েক মাস শিশু নিজেকে ও মাকে আলাদা মানুষ ভাবতে পারে না। ধীরে ধীরে যখন বুঝতে শেখে মা আলাদা একজন মানুষ, তখন থেকেই কান্নার মাধ্যমে মাকে ডাকতে শুরু করে - মা সাড়া না দিলে তার মনে হয় মা তাকে ছেড়ে চলে গেছেন।

মনোবিজ্ঞানী জ্যঁ পিয়াজের মতে, চোখের আড়ালে গেলেও কেউ বা কিছু যে অস্তিত্বে থাকে - এই বোধ ("অবজেক্ট পারমানেন্স") শিশুর মধ্যে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে, সাধারণত ৮-৯ মাস বয়সের কাছাকাছি সময়ে পোক্ত হয়। তার আগ পর্যন্ত আপনি যতই বলুন "মা এখনই আসছি", শিশু তা বুঝবে না - কারণ তার মধ্যে তখনও ভবিষ্যতের ধারণা তৈরি হয়নি, তার কাছে "এখন মা নেই" মানেই "মা নেই"।

মনোবিজ্ঞানী জন বাউলবির অ্যাটাচমেন্ট তত্ত্ব বলে, মা থেকে আলাদা হওয়ার এই কষ্ট প্রতিবাদ, হতাশা আর নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার ধাপ পার হয় - আচরণগতভাবে যা শোকের ধাপগুলোর সাথে বেশ মিলে যায়। ৯-১৮ মাস বয়সে শিশু আস্তে আস্তে বুঝতে শেখে মা চোখের আড়ালে গেলেও কোথাও না কোথাও অস্তিত্বে আছেন, তবে মা কখন ফিরবেন আর ফিরে আগের মতোই আদর করবেন কিনা - এই দুশ্চিন্তা তখনও তাকে পেয়ে বসে। @ AH Abubakkar Siddique


৩৮


পৃথিবীর প্রথম দইটি তৈরি হয়েছিল কীভাবে?

দই বানানোর নিয়ম অনেকেরই জানা। গরম দুধ ঠান্ডা করে সামান্য একটু পুরোনো দই মিশিয়ে ঢেকে রেখে দিলেই সুন্দর জমে যায় দই। কিন্তু কখনো কি মনে এই প্রশ্ন এসেছে, দই বানাতে যদি আগে থেকেই একটু দইয়ের প্রয়োজন হয়, তবে পৃথিবীর একদম প্রথম দইটি তৈরি হয়েছিল কীভাবে? তখন তো দইয়ের বীজ হিসেবে ব্যবহার করার মতো কোনো দই–ই ছিল না।বিশেষজ্ঞদের মতে, দইয়ের জন্ম হয়েছিল একদম দুর্ঘটনাবশত। হাজার হাজার বছর আগে মানুষ যখন পশুর চামড়ার থলিতে দুধ জমা করে রাখত, তখন পশুর চামড়া থেকে একধরনের উপকারী ব্যাকটেরিয়া প্রাকৃতিকভাবেই দুধে মিশে যেত। এই ব্যাকটেরিয়ার প্রভাব ও বিক্রিয়ায় সাধারণ তরল দুধ জমে টক ও ঘন দই হতো।তবে কোনো আবিষ্কার কিন্তু মানুষের চারপাশের ছোট ছোট ঘটনা খেয়াল করার ওপর ভিত্তি করেই শুরু হয়। হাজার বছর আগে মানুষ ব্যাকটেরিয়া বা অণুজীব কী, তা একেবারেই জানত না। তারা শুধু দেখেছিল, পশুর চামড়ার থলিতে দুধ রাখলেই তা জমে চমৎকার টক দই হয়ে যাচ্ছে। প্রথমে সবাই ভাবত, চামড়ার থলিটিতেই শুধু দই হয়। কিন্তু কিছুদিন পর মানুষ খেয়াল করল, থলির পুরোনো একটু দই রেখে তাতে নতুন দুধ ঢাললেই দ্রুত দই জমে যায়। এরপর তারা বুঝে গেল, আগের জমানো একটু দই অন্য পাত্রের দুধে মিশিয়ে দিলেই একই জিনিস ঘটে। এভাবেই অভিজ্ঞতা আর বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে জন্ম নেয় দই থেকে দই বানানো। @ কি আ


৩৯


আধুনিক বিজ্ঞানের জন্মভূমি: বাগদাদের ‘বায়তুল হিকমাহ’

আধুনিক বিজ্ঞানের জন্মভূমি: বাগদাদের ‘বায়তুল হিকমাহ’শোনা যায়, যুদ্ধে পরাজিত সম্রাটদের কাছে স্বর্ণের বদলে বই দাবি করতেন খলিফা আল-মামুন।আব্বাসীয় লাইব্রেরিতে পণ্ডিতরা (মাকামাত আল-হারিরি), চিত্রশিল্পী: ইয়াহয়া ইবনে মাহমুদ আল-ওয়াসিতি, ১২৩৭ খ্রিস্টাব্দ, ইউরোপীয় রেনেসাঁ এবং আধুনিক বিজ্ঞানের ইতিহাস যখন আমরা পড়ি, তখন বড় একটি শূন্যস্থান চোখে পড়ে। রোমান সাম্রাজ্যের পতন আর লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি কিংবা কলম্বাসের আগমনের মধ্যবর্তী প্রায় এক হাজার বছর ইউরোপের জন্য ছিল অন্ধকার সময়। এই সময়টাকে চার্লেমেন, ক্রুসেড কিংবা নরম্যান বিজয়ের গল্প দিয়ে দ্রুত পার করে দেওয়া হয়। কিন্তু ইতিহাসের এই ইউরো-কেন্দ্রিক বয়ানে যা প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়, তা হলো ঠিক এই অন্ধকার যুগেই পশ্চিম এশিয়ায় প্রদীপ্ত হয়ে উঠেছিল সমান্তরাল এক সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানচর্চার মহাবিপ্লব।৬৩২ সালে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওফাতের পর ইসলামের দ্রুত প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে স্পেন থেকে পারস্য পর্যন্ত বিশাল এক ভূখণ্ডে জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে বসন্ত এসেছিল, তার প্রাণকেন্দ্র ছিল বাগদাদের ‘বায়তুল হিকমাহ’ বা ‘হাউস অব উইজডম’। ইরাকি বংশোদ্ভূত পদার্থবিদ জিম আল-খালিলি তার ‘দ্য হাউস অব উইজডম’ বইয়ে এই বিস্মৃত অধ্যায়কে ইতিহাসের পাতায় তার যোগ্য স্থানে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন।তার বর্ণনা অনুযায়ী, এক হাজার বছর আগে যখন ইউরোপ অন্ধকারে নিমজ্জিত, তখন মুসলিম শাসকেরা তাদের প্রাসাদগুলোকে আধুনিককালের ‘থিংক ট্যাংক’-এ পরিণত করেছিলেন। সেখানে জ্যোতির্বিদ, গণিতবিদ, চিকিৎসক এবং দার্শনিকেরা কেবল ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বিজ্ঞানকে একটি অভিজ্ঞতামূলক অনুসন্ধান বা ‘এম্পিরিক্যাল ইনকোয়ারি’ হিসেবে চর্চা করার সুযোগ পেয়েছিলেন।৭৬২ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসীয় খলিফারা বাগদাদ শহরটি প্রতিষ্ঠা করেন। মাত্র পাঁচ দশকের মধ্যেই এটি বিশ্বের বৃহত্তম এবং ঐশ্বর্যশালী নগরীতে পরিণত হয়, যার জনসংখ্যা তৎকালীন সময়ে প্রায় দশ লক্ষ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। খলিফারা, বিশেষ করে খলিফা আল-মামুন ছিলেন এই বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। তার সময়কার বাগদাদকে তুলনা করা যায় রেনেসাঁ যুগের ফ্লোরেন্স কিংবা পেরিক্লিসের আমলের অ্যাথেন্সের সঙ্গে।খলিফা আল-মামুন ছিলেন জ্ঞান সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রায় একরোখা। তিনি কনস্টান্টিনোপল থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশে দূত পাঠাতেন প্রাচীন গ্রিক পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের জন্য। এমনকি যুদ্ধে পরাজিত সম্রাটদের কাছ থেকে সন্ধির শর্ত হিসেবে স্বর্ণের বদলে প্রাচীন লাইব্রেরির বই দাবি করতেন তিনি। এই মহাযজ্ঞের ফলে অ্যারিস্টটল, প্লেটো, হিপোক্রেটিস এবং ইউক্লিডের মতো মনীষীদের কাজগুলো আরবিতে অনূদিত হয়।ডি ম্যাটেরিয়া মেডিকা-র ত্রয়োদশ শতাব্দীর আরবি অনুবাদ, ছবি: সংগৃহীত।এই অনুবাদ প্রক্রিয়াটি কেবল রাষ্ট্রীয় প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ ছিল না, লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছিল। এই জোয়ারকে ত্বরান্বিত করেছিল কাগজ তৈরির প্রযুক্তি, যা আরবরা চিনা যুদ্ধবন্দিদের কাছ থেকে শিখেছিল। চর্মচক্ষু বা প্যাপিরাসের চেয়ে কাগজ অনেক সস্তা ও সহজলভ্য হওয়ায় জ্ঞানচর্চা কেবল উচ্চবিত্তের ড্রয়িংরুম থেকে বেরিয়ে সাধারণ মানুষের নাগালে চলে আসে।ইসলামী বিজ্ঞানের এই স্বর্ণযুগের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল অনুবাদকে কেবল স্রেফ অনুবাদে আটকে না রেখে তাতে মৌলিক গবেষণার সংযোগ ঘটানো। এই সময়ের বিজ্ঞানীদের মধ্যে আল-খোয়ারিজমি ছিলেন প্রবাদপ্রতিম। তাকে ‘বীজগণিতের জনক’ বলা হয়। তার বিখ্যাত বই ‘কিতাব আল-জাবর’ থেকেই আজকের ‘অ্যালজেব্রা’ শব্দটির উৎপত্তি। তিনি এবং আল-কিন্দী মিলে হিন্দু দশমিক সংখ্যা পদ্ধতিকে আরবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন, যা আজ আমরা বিশ্বজুড়ে ব্যবহার করি।জিম আল-খালিলির তালিকায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভাধর হলেন ইবনে আল-হাইথাম। আর্কিমিডিস ও নিউটনের মধ্যবর্তী সময়ে তাকে পৃথিবীর ‘সর্বশ্রেষ্ঠ’ পদার্থবিদ হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি আলোর প্রতিফলন, প্রতিসরণ এবং চোখের গঠন নিয়ে সাত খণ্ডের এক বিশাল গবেষণা লিখেছিলেন। প্রাচীন গ্রিকরা মনে করত চোখ থেকে আলো বের হয়ে বস্তুর ওপর পড়ে, কিন্তু ইবনে আল-হাইথাম প্রমাণ করেন যে আলো আসলে বস্তু থেকে প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে আসে।আবার আল-বিরুনি ছিলেন এমন এক প্রতিভা, যিনি অ্যারিস্টটলের নিছক যুক্তিবিদ্যার সমালোচনা করেছিলেন। তার মতে, বিজ্ঞান কেবল শুদ্ধ চিন্তার ওপর ভিত্তি করে চললে ভুল হতে পারে; এর জন্য প্রয়োজন নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং হাতে-কলমে পরীক্ষা। এই আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির বীজ বপন করেছিলেন আল-বিরুনিই। এছাড়া চিকিৎসা বিজ্ঞানে ইবনে সিনার অবদান ছিল অপরিসীম। তার ‘কানন অব মেডিসিন’ বা চিকিৎসা শাস্ত্রের কানুন কয়েকশ বছর ধরে ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রধান পাঠ্যবই হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। @ বিডি২৪



৪০


তরল বুদ্ধিমত্তা ও স্ফটিক বুদ্ধিমত্তা

তরল বুদ্ধিমত্তা ও স্ফটিক বুদ্ধিমত্তা) এর ইংরেজি হল (Fluid intelligence ও crystallize intelligence) বুদ্ধিমত্তার পার্থক্য বুঝার জন্য আমি একটি বিষয় সহজ করে বলি আগে।

যেমন ক্রিস্টালাইজড ইন্টেলিজেন্স কি? সেটা হলো ক্রিস্টালাইজড বুদ্ধিমত্তা শুধু Facts তথ্যের উপর ভিতি করে এবং অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে। স্ফটিক বুদ্ধিমত্তা এমন কিছু যা শেখার মাধ্যমে উন্নত করা যেতে পারে। আপনার যত বেশি সঞ্চিত জ্ঞান থাকবে আপনি তত বেশি স্ফটিক বুদ্ধিমত্তার অধিকারী হবেন। স্ফটিক বুদ্ধিমত্তাকে শুধু বই পড়া অনুশীলন করা নতুন জায়গা দর্শন, দক্ষতা অর্জন প্রভৃতির মাধ্যমেই  নিজেকে সান্তনা দেয়া যায়। কিন্তু তরল বুদ্ধিমত্তার ক্ষেএে তা সম্ভব না।

মনে করেন পরীক্ষায় একটি গাণিতিক সমস্যা এসেছে। এখন যদি ওই একই ধরনের গাণিতিক সমস্যা সমাধানের চর্চা আপনি আগেও করে থাকেন, এবং সমাধানের সুএ আপনার জ্ঞান থাকে, তাহলে সহজেই বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে এবং সূএ প্রয়োগের মাধ্যমে আপনি সমাধান বের করে ফেলতে পারবেন। এক্ষেএে  আপনি আপনার পূর্বের মূখস্ত জ্ঞানেরই প্রয়োগ ঘটাবেন তাই এটি আপনার স্ফটিক বুদ্ধিমত্তা।

এখন আসি Fluid intelligence তরল বুদ্ধিমত্তার ব্যাপারে। কিন্তু গাণিতিক সমস্যাটি যদি নতুন ধরনের হয় তার সাথে আপনার পূর্ব জ্ঞান পরিচয় না থাকে, তখন আপনি কী করবেন? তখন আপনাকে সমস্যাটি ভালো করে পর্যবেক্ষণ করতে হবে যুক্তি বিশ্লেষন দিয়ে চিন্তা করতে হবে খুঁজে বের করতে হবে, এবং সবশেষে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক সম্ভাবনাটিকে কাজে লাগিয়ে উত্তর বের করতে হবে। তাহলে দেখা যাচ্ছে আপনি এক্ষেএে আপনার পূর্ব মুখস্ত জ্ঞান নয় বরং নিজের মস্তিষ্ক ব্যবহার করে যুক্তি, ইমেজিনেশন, বিশ্লেষণ, বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগের মাধ্যমে সমাধানটি করলেন। তাই এটিই আপনার তরল বুদ্ধিমত্তা।

আপনি যদি চান এছাড়াও স্ফটিক বুদ্ধিমত্তা ও তরল বুদ্ধিমত্তা দুটোকে একসাথে ব্যবহার করে সমস্যা সমাধান করতে পারবেন।

যেমন একজন দাবারু তার পূর্ব জ্ঞান অভিজ্ঞতার এবং খেলার নিয়ম কানুন ভালোভালো তার জানা আছে যে দাবা কিভাবে খেলতে হয়। কিন্তু সে যখন অন্য ব্যক্তির সাথে দাবা খেলার সময় তখন সে জানে না সামনের কর্তৃপক্ষ কোন চাল দিতে পারে তখন সে নিজের মস্তিষ্ককে কাজে লাগায় সৃজনশীল প্রক্রিয়ায় চিন্তা করতে হয় যাতে গেমটি কিভাবে জিততে হয়। তখন আপনার পূর্ব মুখস্ত জ্ঞান কাজে লাগে কম তরল বদ্ধিমত্তা প্রয়োগ হয় বেশি।

একজন আবিষ্কারক বা ইনভেন্টর বা থমাস আলভা এডিসন এর কথাই বলা যাক সে স্ফটিক বুদ্ধিমত্তা এবং তরল বুদ্ধিমত্তা দুটোই কাজে লাগিয়ে বড় বড় আবিষ্কার করতে পারত। তার লাইট বাল্ব আবিষ্কারের সময় সে তার পূর্ব অর্জিত জ্ঞান এবং বুদ্ধিমতাকে কাজে লাগিয়ে লাইট বাল্ব আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন, এমন নয় যে থমাস এডিসন আগে থেকে জানতো লাইট কিভাবে তৈরি করতে হয়। যদি জেনে থাকতো তাহলে ১০০ বার ব্যর্থ হত না। এই দ্বারা বোঝা যায় থামাস এডিসন তরল ও স্ফটিক বুদ্ধিমত্তাকে বেশি প্রাধান্য দিত।

কিন্তু তরল বুদ্ধিমত্তা বয়সের সাথে সাথে হ্রাস পেতে থাকে যখন স্ফটিক বুদ্ধিমত্তার উপর অধিক নির্ভরশীল হয়ে যায়। তাই স্ফটিক বুদ্ধিমত্তার উপর নির্ভরশীল হওয়া যাবে না।

আমি বলছি না যে বুদ্ধিমত্তা বৃদ্ধির জন্য বই পড়া বাদ দিয়ে শুধু বোকার মত চিন্তা করুন! জ্ঞান ও শিক্ষা লাভের কোন বিকল্প নেই। কিন্তু তাই বলে সব কিছুতে পুঁথিগত বিদ্যা বা অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগ করতে যাওয়া হবে  ঠিক নয়। এতে তরল বুদ্ধিমত্তা এর আয়ু কমে যায়। বাস্তব জীবনে এমন অনেক সমস্যাই সামনে আসে যেগুলোর ব্যাপারে হয়তো কোন বইতে লেখা নেই কেউ আপনাকে সেগুলোর কথা বলেওনি। তাই এসব সমস্যার সমাধানেও আপনি যদি পূর্বলব্ধ জ্ঞানেরই সন্ধানে থাকেন কিংবা সমস্যা সমাধানের জন্য নতুন করে জ্ঞান খোঁজার পিছনে অনেকটা সময় ব্যয় করেন তার ফল কখনো ভালো হবে না। রেডিমেড সমাধানের আশায় বসে না থেকে নিজের সৃজনশীল মাইন্ডসেটকে কিছুটা গুরুত্ব দিন।

আপনি যদি কোন সময় এমন কোন সমস্যা বা ধাঁধা দেখেন যেটা আপনার পূর্ব জ্ঞানের সাথে কোন সম্পর্ক নেই যার কারণে আপনি সমস্যার সমাধান করতে পারবেন না তাই পূর্ব জ্ঞানের উপর নির্ভর না করে প্রশ্নের উত্তর অন্য কেউ সমাধান করে দিবে এই আশা না করে বরং আপনি সমস্যার সমাধান করার জন্য নিজের বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগাতে পারেন।

নিজেকে চ্যালেঞ্জ করুন সমস্যার সমাধান করতে। সমাধান করতে গিয়ে হেরেও যদি যান তাহলে অন্তত আপনি থিঙ্কিং কৌশল প্রসেস টা অন্তত শিখবেন পারবেন।

এই আধুনিক যুগে কঠিন কাজকে সহজ করার জন্য Ai প্রযুক্তি তো আছে তাই বলে অতিরিক্ত প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল হওয়া যাবে না এআই আমিও ব্যবহার করি কিন্তু কিভাবে ব্যবহার করলে আমার চিন্তা চেতনা উন্নতি হবে সেরকম ভাবে ব্যবহার করি। Ai আমার মগজ কিনে নেয় নি এবং আমিও তার কাছে মগজ বিক্রি করিনি। নিজের চিন্তা নিজেকে উন্নতি করতে হবে। লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মত আপনাকে কবর থেকে লাশ চুরি করে গবেষণা বা তথ্য সংগ্রহ করার সেরকম রেনেসাঁ যুগ নয় এখন, ইনফরমেশন হাতের নাগালে এখনকার যুগে তথ্য এখন পানির মত পাওয়া যায় কিন্তু আপনার চিন্তা চেতনা অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না সেটা আপনাকে নিজে থেকেই বিকাশ করতে হবে।

আইনস্টাইনের কথা একবার চিন্তা করুন আইনস্টাইন যখন তার টেবিলে কাজ করছিল তখন একজন ব্যক্তি আইনস্টাইনকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল আপনি কোথায় গবেষণা করেন এবং আপনার ল্যাবরেটরি কোথায়? তখন আইনস্টাইন তার টেবিলের কাগজ কলম এবং নিজের আঙ্গুল দিয়ে নিজের মাথার উপর ইঙ্গিত করে বলল এটাই আমার গবেষণার ল্যাবরেটরি। কারণ সে তরল বুদ্ধিমত্তা বেশি ব্যবহার করত এবং স্ফটিক বুদ্ধিমত্তা একটু কম করতো। লিওনার্দো ভিঞ্চি এর কথা তো আপনারা জানেন তার অবাক করা আবিষ্কার উদ্ভাবন এখনো মানুষকে অবাক করে সেই সুযোগের একজন মানুষ কিভাবে আধুনিক যুগের চেয়েও এত আগে চিন্তা করতে পারে! এর পেছনেও তরল বুদ্ধিমত্তা হাত আছে।

একটি কথা মন দিয়ে শুনুন!

এখন ভাবছেন এত বুদ্ধিমত্তা বাড়িয়ে কি লাভ এত সময় কার সমস্যা দেখা দিলে ব্রেনকে কাজে লাগিয়ে যুক্তি বিশ্লেষণ মনে মনে ভাবনা চিন্তা করার!

এখন শুনুন আমি এই বলছিনা যে আপনাকে জগৎ উল্টে ফেলতে হবে, আমি ভালো করে জানি সবার সময় নেই এত চিন্তা বিশ্লেষণ করার কিন্তু আপনি জগত বদলাতে না পারলে কমপক্ষ নিজের চিন্তা চেতনার মাইন্ড সেট কে বদলান কারণ সমাজ বা মানুষজন যাতে আপনাকে বদলে না দিতে পারে তার জন্য আপনার নিজের মাইন্ড সেট কে বদলানো উচিত সেটা অন্য কেউ করে দিবে না, নাহলে জগত আপনাকে বদলে দিবে।

@ Shariar Ovi


৪১


*পাহাড়পুর (সোমপুর মহাবিহার) এর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস*

সোমপুর মহাবিহার বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিক বৌদ্ধ প্রত্নস্থল। এটি নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলার পাহাড়পুরে অবস্থিত। অষ্টম শতাব্দীর শেষভাগে পাল সাম্রাজ্যের রাজা **ধর্মপাল** এই বিশাল বৌদ্ধ বিহারটি প্রতিষ্ঠা করেন। পরে তাঁর উত্তরসূরি **দেবপাল** এর সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন করেন।

সোমপুর মহাবিহার ছিল প্রাচীন ভারতের অন্যতম বৃহৎ বৌদ্ধ শিক্ষা, ধর্মচর্চা ও গবেষণাকেন্দ্র। এখানে শত শত ভিক্ষু বসবাস ও অধ্যয়ন করতেন। বিহারটির চারদিকে মোট ১৭৭টি ভিক্ষুকক্ষ এবং মাঝখানে একটি বিশাল কেন্দ্রীয় মন্দির রয়েছে, যার স্থাপত্যশৈলী দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক বৌদ্ধ স্থাপনার ওপর প্রভাব ফেলেছিল।

একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীতে বিভিন্ন আক্রমণ ও প্রাকৃতিক কারণে মহাবিহারটি ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে যায় এবং দীর্ঘদিন মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকে। পরে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে এর ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করা হয়।

এর অসাধারণ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ **১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো সোমপুর মহাবিহারকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান (World Heritage Site)** হিসেবে ঘোষণা করে। বর্তমানে এটি বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় প্রত্নতাত্ত্বিক পর্যটনকেন্দ্র এবং দেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন।

@Abdul Awal


৪২



মিল্ক কেফির এবং টকদই

মিল্ক কেফির এবং টকদই দুটিই দুগ্ধজাত ফারমেন্টেড খাবার হলেও এদের মধ্যে তৈরি প্রক্রিয়া, পুষ্টিগুণ, প্রোবায়োটিকের ধরণে বেশ কিছু বড় পার্থক্য রয়েছে।

আসুন সেগুলো জেনে নিই।

১। ​তৈরির পদ্ধতি

​উপাদান:

টকদই তৈরিতে মূলত পূর্বের দই থেকে নেওয়া  'স্টার্টার কালচার' (যেমন Lactobacillus bulgaricus ও Streptococcus thermophilus ব্যাকটেরিয়া) ব্যবহার করা হয়।

অন্যদিকে মিল্ক কেফির তৈরিতে 'কেফির গ্রেইনস' নামক এক ধরণের বিশেষ ইস্ট ও ব্যাকটেরিয়ার দানাদার জেলি-সদৃশ উপাদান ব্যবহার করতে হয়।

​ফারমেন্টেশন প্রক্রিয়া:

টকদই মূলত ব্যাকটেরিয়াল ফারমেন্টেশনের মাধ্যমে তৈরি হয়, যেখানে দুধ জমাট বেঁধে ঘন দইয়ে পরিণত হয়।

কেফির তৈরির ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া ও ইস্টের যৌথ ফারমেন্টেশন ঘটে, যার ফলে এটি পুরোপুরি দইয়ের মতো জমে না, বরং কিছুটা পাতলা তরল পানীয়ের মতো হয়।

২। ​প্রোবায়োটিক ও পুষ্টিগুণ

​প্রোবায়োটিকের বৈচিত্র্য:

টকদইয়ে সাধারণত ১ থেকে ৫ ধরনের উপকারী ব্যাকটেরিয়া থাকে।

কিন্তু মিল্ক কেফিরে প্রায় ৩০ থেকে ৫০ ধরনের বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া এবং উপকারী ইস্ট বিদ্যমান থাকে, যা অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী!

​হজম ও পেটের স্বাস্থ্য:

কেফিরে থাকা ইস্ট এবং ফ্রেন্ডলি ব্যাকটেরিয়া পেটের ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংস করতে এবং হজমশক্তি বাড়াতে টকদইয়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখে।

​ল্যাকটোজের পরিমাণ:

কেফিরের ফারমেন্টেশন প্রক্রিয়া দুধের ল্যাকটোজকে দইয়ের তুলনায় অনেক বেশি ভেঙে ফেলে। ফলে যাদের ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স (দুধ খেলে পেটে সমস্যা বা গ্যাস হওয়া) রয়েছে, তাদের জন্য কেফির হজম করা টকদইয়ের চেয়েও সহজ।

৩। ​স্বাদ ও টেক্সচার

​স্বাদের অনুভূতি:

টকদই সচরাচর হালকা বা মাঝারি টক স্বাদের হয়।

অন্যদিকে কেফির একটু বেশি টক, সামান্য ঝাঁঝালো এবং হালকা ইস্টের গন্ধযুক্ত হয়ে থাকে।

​ঘনত্ব:

টকদই সাধারণত চামচ দিয়ে খাওয়ার মতো ঘন বা ক্রিমের মতো জমে থাকে।

কেফির অন্যদিকে কিছুটা পাতলা এবং পান করার উপযোগী টেক্সচারের হয়।

​৪। সহজলভ্যতা ও ব্যবহার

​পাওয়ার জায়গা:

বাংলাদেশে টকদই অত্যন্ত পরিচিত ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং যেকোনো মিষ্টির দোকান, সুপারশপ বা মুদি দোকানে কম দামে সহজে পাওয়া যায়। ঘরেও সহজেই বানানো যায়।

কিন্তু মিল্ক কেফির বাংলাদেশে একেবারেই নতুন। গরুর দুধের হোমমেড ফ্রেশ কেফির পাবেন আমাদের কাছে। আর যদি ঘরে কেফির বানাতে চান, তো কেফির বানানোর জন্য জীবন্ত 'কেফির গ্রেইনস'ও আমাদের কাছে পেয়ে যাবেন।

​ব্যবহার:

মেজবান, বিরিয়ানি, রোস্ট বা অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী রান্নায় টকদইয়ের বহুল ব্যবহার রয়েছে। তাছাড়া টকদই দিয়ে বোরহানি বা লস্যিও বানানো হয়।

মিল্ক কেফির রান্নায় বা তাপে ব্যবহার করলে এর পুষ্টিগুণ ও ইস্ট নষ্ট হয়ে যায়, তাই এটি রান্নায় ব্যবহার না করে প্রধানত স্মুদি বানিয়ে বা সরাসরি স্বাস্থ্যকর পানীয় হিসেবে পান করা হয়। খেজুর, মুড়ি, চিড়া, ইসবগুল, তোকমাবীজ, ফ্রিজে রাখা ভাত এসব দিয়ে সিনবায়োটিক কম্বিনেশন করে খাওয়াও অত্যন্ত উপকারী। কেফির দিয়ে কেফিরি বোরহানি বানানো যায়, যা টকদই ভিত্তিক বোরহানির চেয়ে বেশি উপকারী।

৫। ​বাজেট ও খরচ

টকদই তৈরির কালচার বা বাজার থেকে রেডিমেড দই কেনার খরচ বেশ কম।

অন্যদিকে কেফির এর গুণ অনুযায়ী দামও কিছুটা ভাল। আর ঘরে কেফির বানানোর ক্ষেত্রে প্রথমবার 'কেফির গ্রেইনস' কিনতে অল্প কিছু বিনিয়োগ লাগলেও, এগুলো সঠিক নিয়মে ঘরে বাঁচিয়ে রাখা যায় এবং সারাজীবন এই গ্রেইনস থেকেই বারবার কেফির তৈরি করা সম্ভব হয়!

@ Captain Green



৪৩




ওয়াশিংটন ডিসিই আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ও একমাত্র রাজধানী নয়। এবং রাজধানী একবার বা দুইবার মাত্র পাল্টায় নি।

অবাক না হয়ে পারবেন না যে যুক্তরাষ্ট্র ১৭৭৬ সালে স্বাধীনতা ঘোষণার পর ১৮০০ সাল পর্যন্ত নয়টি ভিন্ন শহরে রাজধানী পাল্টেছে। শুধু ফিলাডেলফিয়াই চারবার রাজধানী হয়েছে। রাজধানী ছিল সুপরিচিত নিউ ইয়ক শহর, আবার অখ্যাত ট্রেটনের মত শহর, মাত্র এক দিনের জন্যেও রাজধানী হবার ইতিহাস আছে!

আমেরিকান বিপ্লবের সময় নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ এবং একটি নির্দিষ্ট জায়গায় প্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক অবকাঠামোর অভাব—এই দুইটি কারণে রাজধানীর এত ঘন ঘন স্থানান্তর ঘটেছিল।

১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গৃহীত হওয়ার পর ফিলাডেলফিয়া দেশের প্রথম রাজধানী হিসেবে বিবেচিত হয়। সে সময় রাজধানী বলতে সেই শহরকেই বোঝানো হতো, যেখানে কংগ্রেস বসত এবং আইন প্রণয়ন করত। কিন্তু ব্রিটিশ বাহিনী শহরটিতে হামলা চালাতে পারে—এমন আশঙ্কায় কংগ্রেস ১৭৭৬ সালের ২০ ডিসেম্বর মেরিল্যান্ডের বাল্টিমোরে চলে যায়। সেখানে সরকারের কেন্দ্র ছিল মাত্র দুই মাসের কিছু বেশি সময়।

১৭৭৭ সালের মার্চে কংগ্রেস আবার ফিলাডেলফিয়ায় ফিরে আসে। কিন্তু ওই বছরের সেপ্টেম্বরে ব্রিটিশ বাহিনী শহরটি দখল করে নিলে কংগ্রেসকে আবার পালিয়ে যেতে হয়। প্রতিনিধিরা আরও পশ্চিমে পেনসিলভানিয়ার ভেতরে সরে গিয়ে ১৭৭৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর মাত্র এক দিনের জন্য ল্যাঙ্কাস্টারে অবস্থান করেন। এরপর তারা চলে যান ইয়র্কে।

১৭৭৮ সালের জুনে ব্রিটিশ বাহিনী ফিলাডেলফিয়া ছেড়ে চলে যাওয়ার পর রাজধানী আবার সেই শহরটিতে ফিরে আসে এবং প্রায় পাঁচ বছর সেখানেই থাকে।

কিন্তু ১৭৮৩ সালের পেনসিলভানিয়া বিদ্রোহের সময় বেতন না পাওয়ায় সৈন্যদের একটি বিদ্রোহের ফলে কংগ্রেস জুন মাসে ফিলাডেলফিয়া ছেড়ে নিউ জার্সির প্রিন্সটনে চলে যায়।

এরপরও রাজধানীর যাত্রা থামে নি। কংগ্রেস প্রথমে মেরিল্যান্ডের অ্যানাপোলিসে অবস্থিত স্টেট হাউসে যায়। এরপর গন্তব্য হয় নিউ জার্সির ট্রেন্টন, তারপর নিউইয়র্ক সিটি।

অবশেষে ১৭৯০ সালের জুলাইয়ে Residence Act আইনে পরিণত হয়। এর মাধ্যমে ওয়াশিংটন, ডি.সি.-কে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে একই আইনে ফিলাডেলফিয়াকে সাময়িক রাজধানী হিসেবে পুনঃনির্ধারণ করা হয়, যতদিন না নতুন রাজধানী শহরটি যথেষ্ট উন্নত হয়ে ওঠে এবং প্রস্তাবিত ক্যাপিটল ভবনের নির্মাণ শেষ হয়।

ফলে কংগ্রেস আরও প্রায় ১০ বছর তার পুরোনো আবাস ফিলাডেলফিয়াতেই ফিরে যায়। অবশেষে ১৮০০ সালের নভেম্বর মাসে রাজধানী স্থায়ীভাবে ওয়াশিংটন, ডি.সি.তে স্থানান্তরিত হয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী আর বদলায় নি।

এক নজরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানীরা:

১. ফিলাডেলফিয়া, পেনসিলভেনিয়া (১৭৭৬)— মহাদেশীয় কংগ্রেস কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গ্রহণের পর এটি প্রথম রাজধানী হিসেবে গণ্য হয়।

২. বাল্টিমোর, মেরিল্যান্ড (১৭৭৬–১৭৭৭)— ব্রিটিশ বাহিনী ফিলাডেলফিয়ার কাছাকাছি চলে আসায় নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে রাজধানী স্থানান্তরিত হয়।

৩. ফিলাডেলফিয়া, পেনসিলভেনিয়া (১৭৭৭)— সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য পুনরায় রাজধানী হিসেবে ফিলাডেলফিয়াতে ফিরে আসে।

৪. ল্যাংকাস্টার, পেনসিলভেনিয়া (১৭৭৭)— ব্রিটিশদের ফিলাডেলফিয়া দখলের সময় মাত্র এক দিনের জন্য এখানে রাজধানী ছিল।

৫. ইয়র্ক, পেনসিলভেনিয়া (১৭৭৭–১৭৭৮)— যুদ্ধের সময় কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস এখানে আশ্রয় নেয় এবং এখান থেকেই ‘আর্টিকেলস অব কনফেডারেশন’ পাস করা হয়।

৬. ফিলাডেলফিয়া, পেনসিলভেনিয়া (১৭৭৮–১৭৮৩)— ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর রাজধানী আবার ফিলাডেলফিয়াতে ফিরে আসে এবং প্রায় পাঁচ বছর থাকে।

৭. প্রিন্সটন, নিউ জার্সি (১৭৮৩)— সৈন্যদের অসন্তোষ ও বিদ্রোহের (Pennsylvania Mutiny) মুখে কংগ্রেস ফিলাডেলফিয়া ছেড়ে এখানে চলে যায়।

৮. অ্যানাপোলিস, মেরিল্যান্ড (১৭৮৩–১৭৮৪)— এই শহরেই জর্জ ওয়াশিংটন তার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন।

৯. ট্রেটন, নিউ জার্সি (১৭৮৪)— খুব অল্প সময়ের জন্য এখানে রাজধানী ছিল।

১০. নিউ ইয়র্ক সিটি, নিউ ইয়র্ক (১৭৮৫–১৭৯০)— এখানেই জর্জ ওয়াশিংটন দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন এবং কিছুকাল রাজধানী হিসেবে কার্যক্রম চলে।

১১. ফিলাডেলফিয়া, পেনসিলভেনিয়া (১৭৯০–১৮০০)— স্থায়ী রাজধানী তৈরির চুক্তি বা 'রেসিডেন্স অ্যাক্ট'-এর অধীনে ওয়াশিংটন ডি.সি. নির্মিত হওয়ার আগপর্যন্ত এটি ১০ বছরের জন্য পুনরায় অন্তর্বর্তীকালীন রাজধানী হয়।

১২. ওয়াশিংটন, ডি.সি. (১৮০০–বর্তমান)— ১৭৯০ সালের রেসিডেন্স অ্যাক্ট অনুযায়ী পোটোম্যাক নদীর তীরে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও স্থায়ী পরিকল্পিত শহর হিসেবে রাজধানী স্থাপন করা হয়, যা ১৮০০ সাল থেকে আজ পর্যন্ত দেশের স্থায়ী রাজধানী হিসেবে বহাল রয়েছে।

@ boikal


৪৪



প্রকৃতির সাথে মানুষের এক অদ্ভুত নিবিড় সম্পর্ক 

জাপানের সংস্কৃতিতে প্রকৃতির সাথে মানুষের এক অদ্ভুত নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। আধুনিক জীবনের শত ব্যস্ততার মাঝেও তারা সুস্থ থাকার জন্য একটি বিশেষ পদ্ধতি মেনে চলে। জাপানি ভাষায় একে বলা হয় শিনরিন ইয়োকু। ইংরেজিতে এর নাম ফরেস্ট বেদিং। এর অর্থ হলো গাছের ছায়ায় বা বনের ভেতরে গিয়ে প্রকৃতির পরিবেশকে নিজের পাঁচটি ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করা। এটি কেবল পাহাড়ে হাঁটা বা ব্যায়াম করা নয়। এটি হলো শান্ত হয়ে গাছের পাতা নড়ার শব্দ শোনা এবং বনের বিশুদ্ধ বাতাস বুক ভরে গ্রহণ করা।

শহরের ইটপাথরের জীবন আমাদের শরীরকে প্রতিনিয়ত এক অজানা ক্লান্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা মনে করি দামি ভিটামিন বা সাপ্লিমেন্ট খেলেই হয়তো আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যাবে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান প্রকৃতির এই শান্ত পরিবেশের মধ্যে এক অসাধারণ নিরাময় ক্ষমতার সন্ধান পেয়েছে। বনের গাছপালা নিজেদের ক্ষতিকর পোকামাকড় ও ছত্রাক থেকে রক্ষা করার জন্য এক ধরনের বিশেষ উদ্বায়ী তেল বাতাসে ছড়িয়ে দেয়। বিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রাকৃতিক উপাদানটিকে বলা হয় ফাইটনসাইড (Phytoncides)।

আমরা যখন বনের ভেতর দিয়ে হাঁটি তখন নিঃশ্বাসের সাথে এই ফাইটনসাইড আমাদের শরীরে প্রবেশ করে। আমাদের শরীরে এক ধরনের বিশেষ শ্বেত রক্তকণিকা আছে যাকে ন্যাচারাল কিলার সেল বা এনকে সেল (NK Cell) বলা হয়। এই কোষগুলো আমাদের শরীরের ভেতরে থাকা ক্ষতিকর ভাইরাস ও বহিরাগত আক্রমণকারী কোষ ধ্বংস করতে সাহায্য করে।

গবেষণায় দেখা গেছে প্রকৃতির সান্নিধ্যে থেকে ফাইটনসাইড গ্রহণ করলে শরীরে এই ন্যাচারাল কিলার সেলের সংখ্যা এবং কার্যক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়।

প্রকৃতির এই সান্নিধ্য আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের ওপর এক গভীর প্রভাব ফেলে। শহরের কোলাহল আর কাজের চাপে আমাদের শরীর প্রতিনিয়ত মানসিক চাপের হরমোন কর্টিসল তৈরি করে। কিন্তু যখন আমরা বনের শান্ত পরিবেশে সময় কাটাই তখন আমাদের স্নায়ুতন্ত্র তার সতর্ক অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসে।

শরীর তখন প্যারাসিমপ্যাথেটিক বা বিশ্রামের স্তরে প্রবেশ করে। এই শান্ত অবস্থায় আমাদের হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক হয় এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। ফাংশনাল পুষ্টি বিজ্ঞান আমাদের শেখায় যে শরীর যখন মানসিক চাপমুক্ত থাকে কেবল তখনই পরিপাকতন্ত্র তার সর্বোচ্চ ক্ষমতায় কাজ করতে পারে। ফলে আমরা যে খাবার খাই তার পুষ্টিগুণ খুব সহজেই কোষে কোষে পৌঁছাতে পারে। মানসিক প্রশান্তির এই প্রাকৃতিক অবস্থাটি আমাদের অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়াদেরও একটি সুন্দর পরিবেশ উপহার দেয়।

সুস্থ থাকার জন্য আমাদের সবসময় অনেক দূরে কোনো গহীন অরণ্যে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ছুটির দিনে শহরের কাছাকাছি কোনো গাছপালায় ঘেরা পার্ক বা খোলা মাঠে কিছুটা সময় কাটানো যেতে পারে। খালি পায়ে ঘাসের ওপর হাঁটা গাছের পাতা স্পর্শ করা কিংবা কেবল শান্ত হয়ে প্রকৃতির শব্দ শোনার অভ্যাস আমাদের শরীরকে ভেতর থেকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে।

প্রকৃতির এই অমূল্য উপহারকে জীবনে গ্রহণ করলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আমাদের আর কেবল ওষুধের ওপর নির্ভর করতে হবে না। প্রকৃতির এই নীরব ছোঁয়া আমাদের দীর্ঘায়ু এবং সম্পূর্ণ সুস্থতার এক নতুন দরজা খুলে দেয়। @ Probal Kumar Mondal



৪৫



৩ কোটি বছর আগের কুকুর

আজকের কুকুরকে দেখলে আমাদের চোখে তার দৌড়ানো, ছুটে চলা আর চার পায়ে দ্রুত এগিয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক হয়ে ধরা দেয় । পোষা কুকুরকে গাছের কাণ্ড আঁকড়ে ওপরে উঠতে দেখলে বরং সেটিই অস্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু পৃথিবীর প্রায় ৩ কোটি বছর আগের এক কুকুরের শরীর বলছে, তার পূর্বপুরুষদের জীবন ছিল বেশ আলাদা। তারা হয়তো মাটিতে দ্রুত ছুটে বেড়ানোর চেয়ে গাছপালা আর বনভূমির সঙ্গে অনেক বেশি ঘনিষ্ঠভাবে মানিয়ে নিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগনের মাটির নিচে প্রায় তিন দশক ধরে সংরক্ষিত একটি জীবাশ্ম সেই হারিয়ে যাওয়া জগতের জানালা খুলেছে। জীবাশ্মটি যখন ১৯৮০ এর দশকে উদ্ধার করা হয়েছিল, তখন বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন এটি সম্ভবত ওরিওডন্ট নামের বিলুপ্ত একদল স্তন্যপায়ীর দেহাবশেষ। পরে খুলির পরীক্ষা করে বোঝা যায়, এটি আসলে একটি প্রাচীন কুকুর। আরও পরে কঙ্কালের বাকি অংশ বের করার পর বোঝা যায়, এটি উত্তর আমেরিকায় পাওয়া প্রাগৈতিহাসিক কুকুরের সবচেয়ে সম্পূর্ণ জীবাশ্মগুলোর একটি।

প্রাণীটির বৈজ্ঞানিক নাম Mesocyon coryphaeus। প্রজাতিটি ১৮৭৯ সালেই বিজ্ঞানীদের পরিচিত ছিল, কিন্তু এত দিন পর্যন্ত এর মূলত বিচ্ছিন্ন খুলি পাওয়া গিয়েছিল। নতুন জীবাশ্মে প্রায় পুরো কঙ্কালই সংরক্ষিত আছে। লেজ এবং হাত পায়ের কিছু অংশ ছাড়া শরীরের অধিকাংশ হাড় অক্ষত থাকায় বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো প্রাণীটির চলাফেরা সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পেয়েছেন। আকারে এটি মোটামুটি একটি কোয়োটের সমান ছিল।

প্রশ্ন হলো, বিজ্ঞানীরা কীভাবে বুঝলেন যে এই কুকুর গাছে উঠতে পারত? এর উত্তর লুকিয়ে আছে কঙ্কালের গঠনে। প্রাণীটির কনুইয়ের জোড় এমনভাবে তৈরি ছিল, যা সামনের পা ঘোরানো ও কোনো কিছুকে আঁকড়ে ধরার ক্ষেত্রে সুবিধা দিত। ফলে গাছের কাণ্ড বা ডাল আঁকড়ে ওঠার ক্ষমতা তার ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। তার সামনের পায়ের প্রথম আঙুলটিও তুলনামূলকভাবে বড় ছিল। আধুনিক কুকুরের শরীরে এর ক্ষুদ্র অবশিষ্টাংশকে আমরা ডিউ ক্ল নামে চিনি।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, Mesocyon আধুনিক কুকুরের মতো পুরোপুরি দৌড়ানোর জন্য তৈরি ছিল না। এর হাড় ছিল তুলনামূলকভাবে মোটা ও শক্ত, শরীর ছিল খাটো এবং ভারী। পায়ের গঠনও ইঙ্গিত দেয় যে এটি কখনও কখনও গোড়ালি মাটিতে রেখে হাঁটতে পারত। আধুনিক কুকুর সাধারণত পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে হাঁটে, যা দ্রুত দৌড়ানোর জন্য বেশি উপযোগী।

এই পরিবর্তন বোঝার জন্য সময়ের দিকে তাকাতে হয়। কুকুরের পূর্বপুরুষেরা উত্তর আমেরিকায় প্রায় ৪ কোটি বছর আগে আবির্ভূত হয়। সেই সময় মহাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ছিল ঘন বনভূমিতে ঢাকা। তাদের প্রাচীন পূর্বপুরুষ Hesperocyon সম্ভবত ভালো গাছে ওঠার ক্ষমতা রাখত। প্রায় ১ কোটি বছর পরে Mesocyon এর আবির্ভাবের সময় পৃথিবীর জলবায়ু ঠান্ডা হতে শুরু করে। ঘন বন ধীরে ধীরে উন্মুক্ত বনভূমি ও ঝোপঝাড়ের পরিবেশে বদলাতে থাকে। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে কুকুরের শরীরও ধীরে ধীরে নতুন ধরনের চলাফেরার জন্য অভিযোজিত হতে থাকে।

কিন্তু Mesocyon-এর সবচেয়ে বড় শিক্ষা তার বেঁচে থাকার কৌশলের চেয়েও বড়। এই প্রাণী এবং তার সঙ্গে সম্পর্কিত গোটা বিবর্তনীয় শাখাটি পরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। আধুনিক কুকুর তার সরাসরি উত্তরসূরি নয়। অর্থাৎ একটি প্রাণী হারিয়ে গেলে শুধু একটি প্রজাতিই হারায় না, তার সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে সম্পূর্ণ একটি জীবনধারা এবং পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার এক অনন্য পদ্ধতি। বিবর্তন সব সময় নিখুঁত বিকল্প তৈরি করে না; কোনো পরিবেশে যে প্রাণীটি যথেষ্ট ভালোভাবে টিকে থাকতে পারে, প্রকৃতি তার দিকেই এগোয়। তাই আজকের পৃথিবীতে বিলুপ্তির অর্থ শুধু অতীতের কোনো প্রাণীকে হারানো নয়, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য অনেক জীবনধারাকেও চিরতরে হারিয়ে ফেলা।

তথ্যসূত্র:

Anne E. Kort, Jennifer Cavin and Xiaoming Wang, “Postcrania and locomotor function of Mesocyon coryphaeus (Canidae, Carnivora) from the Arikareean of North America,” Journal of Paleontology, 29 May 2026. DOI: 10.1017/jpa.2026.10232.

গবেষণাটি University of Michigan, John Day Fossil Beds National Monument এবং সংশ্লিষ্ট গবেষকদের সহযোগিতায় সম্পন্ন হয়েছে।

© উপম বিকাশ |


১৩৪৬ সালে বিখ্যাত বিশ্বপর্যটক ইবনে বতুতা যখন বাংলায় পা রাখেন, এখানকার অবিশ্বাস্য বাজারদর ও প্রাচুর্য দেখে তার চোখ কপালে ওঠে। এক টাকায় পাওয়া যেত সারা বছরের চাল! কিন্তু তারপরেও ভিনদেশি বণিকরা বাংলায় আসতে ভয় পেত। কেন?

কারণ এখানকার স্যাঁতসেঁতে গরম, মশা আর মহামারিতে মারা যেত অসংখ্য ভিনদেশি। সম্পদের এমন ছড়াছড়ি আর প্রাকৃতিক মরণফাঁদ দেখে ইবনে বতুতা বাংলার নাম দিয়েছিলেন 'দোযখ-ই-পুর নিয়ামত' বা 'প্রাচুর্যপূর্ণ নরক'। শুধু তাই নয়, তার লেখায় উঠে এসেছে তৎকালীন বাংলার এক নিষ্ঠুর অন্ধকার ইতিহাস—হাটেবাজারে পশুর চেয়েও সস্তায়, মাত্র ১০ টাকায় প্রকাশ্য দাস-দাসী কেনাবেচা


৪৬


"দ্য আলকেমিস্ট"। 

বইটির লেখক পাওলাে কোয়েলহাে, বইটির নাম "দ্য আলকেমিস্ট"। গল্পের মূল চরিত্রে সান্তিয়াগো। স্পেনের আন্দালুসিয়া অঞ্চলের এক সাধারণ তরুণ। বাবা-মা চেয়েছিলেন ছেলে পুরোহিত হোক। কিন্তু সান্তিয়াগো পুরোহিত হওয়ার পথ ছেড়ে দিয়ে হয়ে গেল একজন মেষপালক।

ছোট পেশা হলেও সান্তিয়াগোর কাছে এটাই ছিল স্বাধীনতা। ভেড়াগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সে এক শহর থেকে আরেক শহরে ঘুরে বেড়াতো। প্রতিদিন নতুন পথ, নতুন মানুষ, নতুন গল্প, নতুন অভিজ্ঞতা।

এক সন্ধ্যায় সান্তিয়াগো ভেড়াগুলোকে নিয়ে আশ্রয় নিল এক পরিত্যক্ত গির্জায়। ভেড়াগুলো ঘুমিয়ে ছিল। সান্তিয়াগোও তার চোখ বন্ধ করলো। তখনই সে অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখলো।

সে পিরামিডের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। একটি ছোট্ট শিশু হাসিমুখে বললো, "এখানেই গুপ্তধন লুকিয়ে আছে।"

কয়েকদিন পর.আবার সে একই স্বপ্ন দেখল। তারপর আবার। তারপর আবার। একই স্বপ্ন, একই শিশু, একই পিরামিড, একই গুপ্তধন।

সান্তিয়াগো ভাবলো, যদি এই স্বপ্নের সত্যিই কোনো অর্থ থাকে।

প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সে গেল এক জিপসি বৃদ্ধার কাছে। বৃদ্ধা মন দিয়ে পুরো স্বপ্ন শুনলেন, তারপর খুব শান্ত গলায় বললেন, "স্বপ্ন কখনো কখনো ঈশ্বরের ভাষা হয়। তুমি যাও মিসরের পিরামিডে, তোমার গুপ্তধন যেখানে অপেক্ষা করছে।"

তারপর পথে দেখা হল  এমন একজন মানুষের সাথে, যিনি সান্তিয়াগোর জীবনটাই বদলে দিলেন। তার পোশাক ছিল সাধারণ, কিন্তু চোখে ছিল এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস। এক বিকেলে সান্তিয়াগো যখন একটা বই পড়ছিল তখন তিনি হেসে জিজ্ঞেস করলেন, "কী পড়ছো?" সান্তিয়াগো বইটি এগিয়ে দিল। বৃদ্ধ কয়েক পাতা উল্টে বললেন: "বইটি একটি কথাই বলছে, বেশিরভাগ মানুষ বিশ্বাস করে তাদের নিজেদের জীবনের উপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, ভাগ্যই সব ঠিক করে দেয়।"

সান্তিয়াগো খুব অবাক হল। কীভাবে এত অল্প সময়ে বইটির মূল কথাটি তিনি বুঝে ফেললেন? তার কৌতূহল আরো বেড়ে গেল। সান্তিয়াগো জানতে চাইলো, "কে আপনি?"

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন, "আমি সালেমের রাজা, মেলকিসেদেক।"

বৃদ্ধ সান্তিয়াগোর কিছু ব্যক্তিগত ঘটনার কথা বলতে শুরু করলেন, যেগুলো সান্তিয়াগো ছাড়া আর কারো জানার কথা নয়। তার বাবা-মা, তার মেষপালক হওয়ার সিদ্ধান্ত, এমনকি বারবার দেখা সেই রহস্যময় স্বপ্ন।

সান্তিয়াগো অবাক হল। মানুষটি এতসব জানলেন কীভাবে?

ঠিক তখনই মেলকিসেদেক বললেন, "প্রত্যেক মানুষের জীবনে একটি ব্যক্তিগত কিংবদন্তি থাকে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এটি সেই স্বপ্ন, সেই লক্ষ্য, যেটি পূরণ করার জন্যই যেন তোমার জন্ম হয়েছে। যদিও সমাজ বলে এটা সম্ভব নয়', পরিবার বলে 'ঝুঁকি নিও না', ভয় বলে 'যদি ব্যর্থ হও?' আর একসময় মানুষ নিজের স্বপ্নকেই বিশ্বাস করা বন্ধ করে দেয়।"

সান্তিয়াগো যেন নিজেকেই দেখতে পেল। সত্যিই কি সে সেই স্বপ্নের পেছনে ছুটবে? নাকি সবাই যেমন করে, তেমনই নিরাপদ জীবন বেছে নেবে?

মেলকিসেদেক মৃদু হেসে বললেন, "যখন তুমি কিছু চাও, তখন তা অর্জনে সাহায্য করার জন্য সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ষড়যন্ত্র করে। ।" (And, when you want something, all the universe conspires in helping you to achieve it) এটিই দ্য অ্যালকেমিস্ট-এর সবচেয়ে বিখ্যাত উক্তি।

সান্তিয়াগো তার সমস্ত ভেড়া বিক্রি করে দিল। হাতে যা অর্থ পেল, তা নিয়ে রওনা দিল আফ্রিকার উদ্দেশ্যে। চোখে তার একটাই স্বপ্ন, মিসরের পিরামিড আর সেই গুপ্তধন।

জাহাজ থেকে নেমে সে পৌঁছালো মরক্কোর ট্যাঞ্জিয়ার বন্দরে। চারদিকে অচেনা মানুষ, অচেনা ভাষা, অচেনা পোশাক ও সংস্কৃতি। সবাই কথা বলছে, সান্তিয়াগো একটি শব্দও বুঝতে পারছে না।

একটা ছেলে স্পেনিশ ভাষায় সান্তিয়াগোর সাথে কথা বলল। ওদের বন্ধুত্ব হল। দুজনে বাজারের ভিড়ের মধ্যে হাঁটতে লাগলো। চারপাশি মানুষের কোলাহল, মশলার গন্ধ, রঙিন কাপড়, উটের ঘণ্টার শব্দ। এক মুহূর্তের মধ্যে ছেলেটি সান্তিয়াগোর সমস্ত টাকা নিয়ে জনসমূদ্রে অদৃশ্য হয়ে গেল।

সান্তিয়াগো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার হাতে কিছুই নেই। টাকা নেই, বন্ধু নেই, ভাষা নেই, থাকার জায়গা নেই, না এমনকি বাড়ি ফেরার উপায়ও নেই। মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করল, "আমি কি একজন দুর্ভাগা মানুষ?"

সান্তিয়াগো নিজেকে সামলে নিল। সে বুঝতে পারলো, তার কাছ থেকে টাকা চুরি হয়েছে, কিন্তু তার 'স্বপ্ন' কেউ চুরি করতে পারেনি!

পরদিন সকালে পাহাড়ের উপরে উঠে সে দেখতে পেল স্ফটিকের খুবই পুরনো এক দোকান, কাঁচের জিনিসগুলোর উপর ধুলোর আস্তরণ পড়ে আছে।

সান্তিয়াগো ভেতরে ঢুকে দোকানের বৃদ্ধ মালিককে বললো, "যদি আমি এই দোকানের কাঁচগুলো পরিষ্কার করি, তাহলে কি আপনি আমাকে কিছু পারিশ্রমিক দেবেন?"

বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন। সান্তিয়াগো এক মুহূর্তও নষ্ট না করে মন দিয়ে সব স্ফটিক পরিষ্কার করতে শুরু করলো। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দোকানটা যেন বদলে গেল। সূর্যের আলো কাঁচে পড়ে ঝলমল করতে লাগলো। ঠিক তখনই দুজন নতুন ক্রেতা দোকানে ঢুকলেন এবং কিছু জিনিস কিনে চলে গেলেন। বৃদ্ধ অবাক হয়ে গেলেন। তিনি সান্তিয়াগোকে বললেন, "তুমি চাইলে আমার এখানে কাজ করতে পারো।"

সান্তিয়াগো এক বাক্যে রাজি হয়ে গেল। দিন যেতে লাগলো। সান্তিয়াগোর মাথায় একটি নতুন বুদ্ধি এলো। সে বৃদ্ধকে বললো, "দোকানের বাইরে যদি স্ফটিকের গ্লাসে চা বিক্রি করা হয়?"

বৃদ্ধ প্রথমে রাজি না হলেও, পরে সম্মতি দিলেন। কয়েকদিনের মধ্যেই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ শুধু চা খেতেই নয়, সুন্দর স্ফটিকের গ্লাসগুলো কিনতেও আসতে লাগলো। দোকানের বিক্রি কয়েক গুণ বেড়ে গেল। এক বছরেরও কম সময়ে সান্তিয়াগো যথেষ্ট টাকা জমিয়ে ফেললো।

একদিন সান্তিয়াগো বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করলো, "আপনি কি কখনো আপনার স্বপ্ন পূরণ করতে চাননি?"

বৃদ্ধ জানালার বাইরে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বললেন, "আমার সারাজীবনের স্বপ্ন ছিল মক্কায় যাওয়া। কিন্তু আমি ভয় পাই, স্বপ্নটা পূরণ হয়ে গেলে আমার জীবনে আর কিছুই বাকি থাকবে না। মক্কায় যাওয়ার স্বপ্নটাই আমাকে প্রতিদিন বাঁচিয়ে রাখে।"

সান্তিয়াগো বুঝতে পারলো, অনেক মানুষ স্বপ্ন পূরণ করতে নয়, স্বপ্ন দেখেই জীবন কাটিয়ে দেয়। কারণ তারা ব্যর্থ হতে বা সফল হতে ভয় পায়।

এরপর একদিন সে বৃদ্ধের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সাহারা মরুভূমির উদ্দেশ্যে রওনা হলো।

সান্তিয়াগোর সামনে এখন পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ মরুভূমি, সাহারা। অসীম বালুর সমুদ্র। দিনে প্রচন্ড রোদ, রাতে হাড় কাঁপানো শীত।

কাফেলার ভেতরেই সান্তিয়াগোর পরিচয় হয় এক ইংরেজ ভদ্রলোকের সঙ্গে। ইংরেজ ভদ্রলোকটি একজন 'অ্যালকেমিস্ট'-কে খুঁজতে এখানে এসেছেন। অ্যালকেমিস্ট সাধারণ ধাতুকে সোনায় পরিণত করতে পারেন।

দিনের পর দিন কাফেলা এগিয়ে চললো। অবশেষে তারা পৌঁছালো এক বিশাল মরূদ্যানে। যেখানে হাজার হাজার খেজুর গাছ আর স্বচ্ছ পানির কূপ। সেখানেই সান্তিয়াগো প্রথম মেয়েটিকে দেখলো। সে শুধু জল তুলতে এসেছিল, কিন্তু সান্তিয়াগোর মনে হলো সময় যেন থেমে গেছে। সান্তিয়াগো বুঝে গেল, এটাই ভালোবাসা।

পরদিন তাদের আবার দেখা হলো। সান্তিয়াগো মেয়েটির নাম জানতে চাইল। মেয়েটি বলল, ফাতিমা। সান্তিয়াগো সাহস করে বললো, "আমি তোমাকে ভালোবাসি।"

ফাতিমা মৃদু হেসে বললো,"তুমি যদি সত্যিই তোমার স্বপ্ন পূরণ করতে চাও, তাহলে থেমে যেও না। মরু নারীরা অপেক্ষা করতে জানে। সত্যিকারের ভালোবাসা কখনো কাউকে তার স্বপ্ন থেকে দূরে সরিয়ে দেয় না, বরং স্বপ্ন পূরণে শক্তি দেয়।"

এরপর সান্তিয়াগোর দেখা হলো সেই রহস্যময় ব্যক্তির সঙ্গে যিনি অ্যালকেমিস্ট। সান্তিয়াগোর দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন:

"তুমি কি সত্যিই তোমার গুপ্তধন খুঁজে পেতে চাও? তাহলে তোমাকে শুধু পথ চিনলেই হবে না, নিজের হৃদয়ের ভাষাও  বুঝতে হবে। কারণ হৃদয় কখনো মিথ্যা বলে না।" তিনি সান্তিয়াগোকে নিজের সঙ্গে মরুভূমির গভীরে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন।

যাত্রাপথে অ্যালকেমিস্ট সান্তিয়াগোকে বললেন, "যেখানে অন্যরা শুধু বালি দেখে, সেখানে জীবনও লুকিয়ে থাকতে পারে। প্রকৃতির সবকিছুরই একটি বার্তা আছে।"

যাত্রাপথে হঠাৎ একদল সশস্ত্র যোদ্ধা তাদের ঘিরে ফেললো। ধরে নিয়ে যাওয়া হলো গোত্রপ্রধানের সামনে। গোত্র প্রধান কঠোর কণ্ঠে বললেন, "তোমরা আমাদের এই অঞ্চলে কী করছো?" অ্যালকেমিস্ট শান্তভাবে উত্তর দিলেন, "এ এমন একজন মানুষ, যে চাইলে নিজেকে বাতাসে রূপান্তরিত করতে পারে।"

সান্তিয়াগোর ভয় পেয়ে গেল! সে তো এমন কিছু পারে না। সবাই হেসে উঠলো। গোত্রপ্রধান বললেন, "ঠিক আছে! তিনদিনের মধ্যে যদি এই ছেলেটি নিজেকে বাতাসে পরিণত করতে পারে, তাহলে তোমরা মুক্তি পাবে। আর যদি না পারে তাহলে মৃত্যু!"

তৃতীয় দিন। সান্তিয়াগো মরুভূমির মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালো। সে প্রথমে মরুভূমির সঙ্গে কথা বললো, তারপর বাতাসের সঙ্গে, শেষে সূর্যের সঙ্গে। সে অনুভব করলো এই পুরো পৃথিবী আসলে একই আত্মার অংশ। মানুষ, বাতাস, মরুভূমি, সূর্য সবকিছুই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত।

ঠিক সেই মুহূর্তে মরুভূমির উপর দিয়ে এক প্রচন্ড বালুঝড় বয়ে যেতে শুরু করলো। বাতাস এত জোরে বইছিল যে সবাই ভয়ে পিছিয়ে গেল। আর সেই ঝড়ের মাঝখানে সান্তিয়াগো যেন প্রকৃতিরই একটি অংশ হয়ে উঠলো।

ঝড় থামলে গোত্রপ্রধান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি বিস্ময় নিয়ে বললেন, "তোমরা যেতে পারো।"

সান্তিয়াগো বুঝতে পারলো, সে আসলে নিজের ভয়কে জয় করেছে।

এরপর দীর্ঘ পথ পেরিয়ে, অসংখ্য বাধা অতিক্রম করে সান্তিয়াগো প্রথমবারের মতো দূর থেকে দেখতে পেল মিসরের পিরামিড। সোনারালী সূর্যের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা সেই বিশাল পাথরের স্থাপত্য দেখে সান্তিয়াগোর চোখে জল চলে এলো। সে হাঁটু গেড়ে বসে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানালো।

তারপর সে মাটি খুঁড়তে শুরু করলো। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেল, হাত ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল, কিন্তু গুপ্তধনের কোনো চিহ্ন নেই! ঠিক তখনই কয়েকজন ডাকাত এসে তাকে চিৎকার করে বললো, "এখানে কী খুঁজছিস?" সান্তিয়াগো তার স্বপ্নের কথা, গুপ্তধনের কথা বললো। শুনে ডাকাতদের নেতা হো হো করে হেসে উঠে বললো: "তুই সত্যিই বোকা। আমিও দুই বছর আগে একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম। স্পেনের এক পুরনো ভাঙা গির্জায়, যেখানে একটা ডুমুর গাছ জন্মেছে, তার নিচে বিশাল গুপ্তধন আছে। কিন্তু আমি কি এতই বোকা যে একটা স্বপ্নের জন্য হাজার মাইল পথ পাড়ি দেব?"

কথাটি শোনা মাত্রই সান্তিয়াগোর বুক কেঁপে উঠলো! কারণ সেই ভাঙা গির্জা, সেই ডুমুর গাছ, সেটা তো সেই জায়গা, যেখান থেকে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল।

হঠাৎ করেই সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল। গুপ্তধন কখনো পিরামিডের নিচে ছিল না। পিরামিড তাকে শুধু সত্যের কাছে নিয়ে এসেছে।

ডাকাতরা তাকে ফেলে রেখে চলে গেল। কিন্তু সান্তিয়াগোর মুখে তখন ছিল হাসি। সে আবার স্পেনে ফিরে এলো সেই পুরনো পরিত্যক্ত গির্জায়। ডুমুর গাছটার নিচে মাটি খুঁড়তেই বেরিয়ে এলো একটি পুরনো কাঠের সিন্দুক। স্বর্ণমুদ্রা, মূল্যবান রত্ন, প্রাচীন অলঙ্কার।

কিন্তু আসল গুপ্তধন কি এই সোনা? না। আসল গুপ্তধন হল সান্তিয়াগোর ভেতরের পরিবর্তন। পিরামিড তাকে ধন দেয়নি, পিরামিড তাকে পথ দেখিয়েছে। পিরামিড তাকে বদলে দিয়েছে।

সিন্দুকটির দিকে তাকিয়ে সান্তিয়াগো আকাশের দিকে মুখ তুলে মৃদু হাসলো, তারপর মনে মনে বলে উঠল, "এবার আমি ফাতিমার কাছে ফিরে যাবো।"

গল্পটা এখানেই শেষ। @ Razik Hasan


৪৭




পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি একটি ঘর শুধু সৌন্দর্যই বাড়ায় না, মানসিক স্বস্তিও এনে দেয়। 

বিশ্বের সবচেয়ে গোছানো জাতিগুলোর একটি হিসেবে জাপানিদের নাম বারবার উঠে আসে। তাদের কাছে ঘর পরিষ্কার রাখা কেবল অতিথি আপ্যায়নের জন্য নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনযাপনেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

জাপানিদের বিশ্বাস, একদিন ধরে অনেক সময় ব্যয় করে ঘর পরিষ্কার করার চেয়ে প্রতিদিন অল্প অল্প করে গুছিয়ে রাখার অভ্যাস অনেক বেশি কার্যকর। ফলে ঘরে কখনোই অতিরিক্ত অগোছালো পরিবেশ তৈরি হয় না।

১. কাজ শেষ, সঙ্গে সঙ্গে গুছিয়ে রাখা

রান্না শেষ করেই রান্নাঘর পরিষ্কার করা, ব্যবহার করা জিনিস আবার নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা কিংবা পোশাক বদলেই তা গুছিয়ে রাখা, এসবই জাপানিদের দৈনন্দিন অভ্যাস। এতে পরে একসঙ্গে অনেক কাজ জমে থাকে না।

২. অপ্রয়োজনীয় জিনিসের ভিড় নয়

ঘরে যত কম অপ্রয়োজনীয় জিনিস থাকবে, তত সহজ হবে পরিচ্ছন্ন রাখা। দীর্ঘদিন ব্যবহার করা হয় না এমন জিনিস দান করা বা সরিয়ে দেওয়ার প্রবণতা জাপানিদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। এতে ঘর যেমন খোলামেলা থাকে, তেমনি পরিষ্কার করাও সহজ হয়।

৩. প্রতিটি জিনিসের নির্দিষ্ট ঠিকানা

কাঁচি, রিমোট, চার্জার, চাবি কিংবা নখ কাটার যন্ত্র প্রতিটি জিনিসের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা নির্ধারণ করে রাখেন তারা। ব্যবহার শেষে সেই জায়গাতেই ফিরিয়ে রাখার অভ্যাস ঘরকে সবসময় পরিপাটি রাখে।

৪. ঘরের বাইরে জুতা

জাপানি সংস্কৃতিতে বাইরে থেকে জুতা পরে ঘরে প্রবেশের প্রচলন নেই। প্রবেশপথেই জুতা খুলে রাখার ফলে বাইরের ধুলাবালি ও জীবাণু ঘরের ভেতরে কম প্রবেশ করে এবং মেঝে দীর্ঘ সময় পরিষ্কার থাকে।

৫. প্রতিদিন অল্প সময়ের পরিচ্ছন্নতা

প্রতিদিন কয়েক মিনিট সময় দিলেই ঘর পরিচ্ছন্ন রাখা সহজ হয়। টেবিল মুছে নেওয়া, ধুলা ঝাড়া কিংবা বাথরুম দ্রুত পরিষ্কার করে নেওয়ার মতো ছোট কাজগুলোই বড় পরিশ্রমের প্রয়োজন কমিয়ে দেয়।

৬. নতুন এলে পুরোনো বিদায়

জাপানিদের একটি জনপ্রিয় নীতি হলো ‘ওয়ান ইন, ওয়ান আউট’। অর্থাৎ ঘরে নতুন কিছু এলে একটি পুরোনো বা অপ্রয়োজনীয় জিনিস সরিয়ে দেওয়া। এতে ঘরে অকারণে জিনিসপত্র জমে না।

৭. পরিবারের সবাই ভাগ করে নেন দায়িত্ব

পরিচ্ছন্ন ঘর শুধু একজনের দায়িত্ব নয়। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ছোট ছোট দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়। কেউ টেবিল পরিষ্কার করেন, কেউ বাসন ধোন, কেউ কাপড় ভাঁজ করেন। ফলে কাজের চাপ কমে, আর ঘরও থাকে সবসময় গুছানো।

পরিচ্ছন্নতার আসল রহস্য

দামি ক্লিনিং সরঞ্জাম বা একদিনের দীর্ঘ পরিশ্রম নয়, বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসই একটি ঘরকে দীর্ঘদিন পরিষ্কার ও সুন্দর রাখে। ঘর গোছানোর কাজকে যদি আলাদা ঝামেলা না ভেবে দৈনন্দিন রুটিনের অংশ করা যায়, তাহলে পরিচ্ছন্ন ও আরামদায়ক বাসস্থান গড়ে তোলা অনেক সহজ হয়ে ওঠে।


৪৮




যার নাম আছে, তার বদনামও আছে—সমালোচনাকে এনজয় করবেন কীভাবে?"

আমরা যখন জীবনে ভালো কিছু করার চেষ্টা করি বা সাফল্যের দিকে এক ধাপ এগিয়ে যাই, তখন প্রশংসার পাশাপাশি কিছু সমালোচনাও বয়ে আসে। বিষয়টি খুব স্বাভাবিক—জগতে যার নাম ছড়িয়ে পড়ে, তাকে নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা দুটোই হয়!

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সমালোচনাকে আপনি কীভাবে নেবেন?

চারপাশের হাজারও মানুষ আপনাকে নিয়ে অনেক কথা বলবে, আঙুল তুলবে কিংবা নেতিবাচক মন্তব্য করবে। কিন্তু সেই কথার ভারে নিজের মানসিক প্রশান্তি হারিয়ে ফেলা একদমই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। ছবির মানুষটির দিকে তাকালেই তা স্পষ্ট বোঝা যায়—চারপাশে এত কথা ও সমালোচনার প্রতীকী শব্দ থাকা সত্ত্বেও, সে কাপ হাতে অত্যন্ত শান্ত মনে নিজের মুহূর্তটি উপভোগ করছে।

সমালোচনাকে উপভোগ করার এবং মানসিক প্রশান্তি ধরে রাখার ৪টি কৌশল:

বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখা: কেউ আপনার সমালোচনা করছে মানে আপনি তাদের নজর কেড়েছেন এবং আপনি থামেননি। আপনার কাজের চর্চা হচ্ছে—এটাকেই আপনার সাফল্যের লক্ষণ হিসেবে ধরে নিন।

গঠনমূলক ও অযৌক্তিক সমালোচনার পার্থক্য বোঝা: যে সমালোচনায় নিজেকে সুধরে নেওয়ার সুযোগ আছে, তা থেকে শিক্ষা নিন। আর যা শুধু হিংসা বা নিচু মানসিকতা থেকে আসা, তা এক কানে শুনে অন্য কান দিয়ে বের করে দিন।

প্রতিক্রিয়া না দেওয়া (Silence is Golden): সবার কথার উত্তর দিতে যাওয়া সময় ও শক্তির অপচয়। আপনার নীরবতা এবং কাজের সাফল্যই হবে তাদের জন্য সেরা জবাব।

নিজের শান্তিতে অবিচল থাকা: অন্যের মন্তব্য যেন আপনার মানসিক শান্তি কেড়ে নিতে না পারে। একটি কাপ চা হাতে ধীরস্থির হয়ে নিজের কাজে মনোযোগী হওয়াই একজন পরিণত মানুষের পরিচয়।

মনে রাখবেন: ঝড়ের মধ্যে গাছ ভেঙে পড়ে, কিন্তু যে গাছ নমনীয় থাকে তা টিকে যায়। সমালোচনা হলো সেই ঝড়—একে ভয় না পেয়ে শান্ত থেকে হাসিমুখে মোকাবিলা করাই প্রকৃত জয়ের পথ।

জীবনচর্চা, মানসিক শক্তি বৃদ্ধি ও প্রশান্তিময় জীবন গঠনের বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন:

@ Healthy Lifestyle & Total Fitness


৪৯


রঙ মানুষের আবেগ, চিন্তা ও আচরণে প্রভাব ফেলে

২০১৪ সালে প্রকাশিত একটি বিস্তৃত গবেষণা-পর্যালোচনায় দেখা যায়, রঙ মানুষের আবেগ, চিন্তা ও আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এই প্রভাব নির্ভর করে রঙ, কাজের ধরন, পরিবেশ, সংস্কৃতি এবং ব্যক্তির অভিজ্ঞতার ওপর।

.

চোখ রঙ দেখলে মস্তিষ্ক কী করে?

রঙ চোখে পড়ার পর মস্তিষ্ক শুধু ‘লাল’ বা ‘নীল’ বলে সেটিকে শনাক্ত করে থেমে থাকে না। রঙ চারপাশের দৃশ্য থেকে কোন তথ্যটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কোথায় মনোযোগ দেওয়া দরকার এবং পরিস্থিতিটি কেমন—এসব বোঝার ক্ষেত্রেও সংকেত দেয়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় আমাদের শেখা অভিজ্ঞতা। ছোটবেলা থেকে লাল রঙকে আমরা বিপদ, সতর্কতা, ভুল বা থামার সংকেত হিসাবে দেখে আসি। সবুজকে দেখি প্রকৃতি, নিরাপত্তা বা চলার সংকেত হিসাবে। ফলে কোনো রঙ চোখে পড়লে সেই রঙের সঙ্গে আগে থেকে তৈরি অর্থও মস্তিষ্কে সক্রিয় হতে পারে।

অর্থাৎ রঙের প্রভাবের একটি অংশ আসে দৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য থেকে, আরেকটি অংশ আসে শেখা অর্থ ও অভিজ্ঞতা থেকে।

লাল কেন সতর্ক করে?

রঙের মনস্তত্ত্বে লাল নিয়ে সবচেয়ে বেশি গবেষণা হয়েছে। লাল অনেক পরিস্থিতিতে উচ্চ উত্তেজনা, সতর্কতা এবং ঝুঁকি এড়িয়ে চলার প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত।

২০০৯ সালে Science–এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় Ravi Mehta ও Rui Zhu দেখান, লাল ও নীল রঙ মানুষের কাজের ধরনকে ভিন্নভাবে প্রভাবিত করতে পারে। পরীক্ষায় লাল মানুষকে তুলনামূলকভাবে সতর্ক ও বিস্তারিত নজর দেওয়ার মানসিক অবস্থায় নিয়ে যায়। নীল আবার তুলনামূলকভাবে অনুসন্ধানী ও সৃজনশীল কাজের সঙ্গে ভাল ফল দেখায়।

পরবর্তী গবেষণাতেও দেখা যায়, সহজ ও বিস্তারিত নজর দেওয়ার কাজে লাল কিছু সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু কঠিন বিস্তারিত কাজ ও সৃজনশীল কাজে নীল দিতে পারে ভাল ফল।

এর অর্থ, লাল সব সময় ভাল বা খারাপ নয়। রঙ আমাদের মানসিক প্রস্তুতি বদলাতে পারে, আর কাজের ধরন ঠিক করে সেই পরিবর্তনটি শেষ পর্যন্ত কাজে লাগবে নাকি বাধা দেবে।

নীল কি সত্যিই শান্ত করে?

নীল সাধারণত শান্ত বা কম উত্তেজনামূলক আবেগের সঙ্গে যুক্ত। এর একটি কারণ হতে পারে আকাশ ও পানির মত প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে নীলের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। তবে এটি শুধু প্রকৃতির বিষয় নয়, সংস্কৃতি ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও রঙের অর্থ তৈরি করে।

২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি বড় systematic review-তে ১৮৯৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত ১৩২টি গবেষণা এবং মোট ৪২,২৬৬ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা ৬৪টি দেশের ছিলেন।

গবেষণায় দেখা যায়, নীল, সবুজ, নীল-সবুজ ও সাদা সাধারণত অপেক্ষাকৃত কম উত্তেজনামূলক ইতিবাচক আবেগের সঙ্গে যুক্ত। লাল বেশি উত্তেজনামূলক আবেগের সঙ্গে যুক্ত।

হলুদ ও কমলা ইতিবাচক এবং বেশি উত্তেজনামূলক আবেগের সঙ্গে যুক্ত ছিল। কালো ও গাঢ় রঙ তুলনামূলকভাবে নেতিবাচক আবেগের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে একই রঙ সবার ওপর একই প্রভাব ফেলে না।

শুধু রঙ নয়, রঙের তীব্রতাও গুরুত্বপূর্ণ

‘লাল’, ‘নীল’ বা ‘সবুজ’ বললেই রঙের পুরো বৈশিষ্ট্য বোঝানো হয় না। রঙের উজ্জ্বলতা, গাঢ়ত্ব ও তীব্রতা মানুষের প্রতিক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

২০২৪ সালের গবেষণা-পর্যালোচনায় দেখা যায়, হালকা রঙ সাধারণত বেশি ইতিবাচক আবেগের সঙ্গে যুক্ত, আর গাঢ় রঙ তুলনামূলকভাবে বেশি নেতিবাচক আবেগের সঙ্গে যুক্ত। বেশি তীব্র বা saturated রঙ আবার বেশি উত্তেজনামূলক আবেগ তৈরি করার প্রবণতা দেখায়।

তাই একই নীলের হালকা শেড হাসপাতালের দেয়ালে শান্ত মনে হতে পারে, কিন্তু উজ্জ্বল নীল বিজ্ঞাপনে চোখে অনেক বেশি জোরালোভাবে ধরা দিতে পারে।

তাহলে কি রঙ আমাদের অজান্তেই সিদ্ধান্ত বদলায়?

কিছু ক্ষেত্রে গবেষণায় এমন প্রভাব পাওয়া গেছে। Mehta ও Zhu-র ২০০৯ সালের গবেষণায় রঙের প্রভাব অংশগ্রহণকারীদের সচেতন মনোযোগের বাইরে ঘটতে পারে—এমন প্রমাণও পাওয়া যায়। অর্থাৎ মানুষ নিজে হয়ত বুঝতে পারেনি যে পেছনের রঙ তার কাজের ধরনকে প্রভাবিত করছে।

আরেকটি চমকপ্রদ উদাহরণ লাল রঙ ও আকর্ষণ।

Andrew Elliot ও Daniela Niesta ২০০৮ সালে পাঁচটি পরীক্ষায় দেখেছিলেন, পুরুষ অংশগ্রহণকারীরা একই নারীকে লাল রঙের সঙ্গে দেখলে তুলনামূলক বেশি আকর্ষণীয় হিসাবে মূল্যায়ন করছিলেন। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা নিজেরা এই প্রভাব সম্পর্কে সচেতন ছিলেন না।

তবে প্রভাবটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ও নির্দিষ্ট অংশগ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল; তাই এটিকে “লাল দেখলেই আকর্ষণ বেড়ে যায়” ধরনের সার্বজনীন নিয়ম হিসাবে নেওয়া ঠিক হবে না।

এখানেই রঙের মনস্তত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আসে: রঙ আচরণকে একা নিয়ন্ত্রণ করে না; রঙ একটি পরিস্থিতির অর্থ বদলে দিতে পারে।

সংস্কৃতিও রঙের অর্থ বদলে দেয়

রঙের সঙ্গে কিছু আবেগের সম্পর্ক বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে মিলতে পারে। কিন্তু সব সংস্কৃতিতে রঙের অর্থ এক নয়।

২০২০ সালের একটি বড় আন্তর্জাতিক গবেষণায় ৩০টি দেশের ৪,৫৯৮ জন মানুষ এবং ২২টি ভাষার তথ্য নেওয়া হয়েছিল। গবেষকরা দেখেছেন, রঙ ও আবেগের মধ্যে কিছু শক্তিশালী সার্বজনীন সম্পর্ক রয়েছে।

একই সঙ্গে দেশ, ভাষা ও ভৌগোলিক নৈকট্যের সঙ্গে রঙের আবেগগত অর্থও বদলেছে। কাছাকাছি ভাষা ও সংস্কৃতির দেশগুলির মানুষের রঙ-আবেগ সম্পর্কও তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি ছিল।

অর্থাৎ মানুষের মস্তিষ্কে রঙের কিছু প্রভাব সম্ভবত ব্যাপকভাবে ভাগ করা হলেও, তার ওপর সংস্কৃতির একটি স্তর বসে যায়।

একটি রঙ কোথাও শোকের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, অন্য কোথাও উৎসবের সঙ্গে। একটি রঙ কোনো সংস্কৃতিতে পবিত্রতার প্রতীক হতে পারে, অন্য সংস্কৃতিতে তার অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন।

তাই আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের জন্য রঙ বেছে নেওয়ার সময় শুধু ‘লাল মানে শক্তি’ বা ‘সাদা মানে বিশুদ্ধতা’ ধরনের সূত্র ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন ও ব্যবসা কেন রঙ নিয়ে এত সতর্ক?

কারণ মানুষ কোনো পণ্য কেনার আগে তার সব বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে না। অনেক সিদ্ধান্ত খুব দ্রুত নিতে হয়। প্যাকেট, লোগো, দোকানের পরিবেশ, ওয়েবসাইটের বোতাম—সব জায়গায় রঙ প্রথম দিকের সংকেতগুলির একটি।

রঙ কোনো পণ্যের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা তৈরি করতে পারে। খাবারের ক্ষেত্রে রঙ খাবারটি কতটা সুস্বাদু বা আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে, সেটিকেও প্রভাবিত করতে পারে। গবেষণার পর্যালোচনাগুলিতে রঙ ও ভোক্তার চিন্তা, অনুভূতি ও আচরণের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

কিন্তু এখানেও একটি ভুল ধারণা এড়াতে হবে। কোনো বোতাম লাল করলেই বিক্রি বাড়বে, বা নীল করলেই মানুষ বেশি বিশ্বাস করবে—এমন কোনো সার্বজনীন বৈজ্ঞানিক সূত্র নেই।

রঙের প্রভাব নির্ভর করে পণ্য কী, ব্যবহারকারী কে, কোথায় দেখা হচ্ছে, অন্য কোন রঙ পাশে আছে, রঙটির উজ্জ্বলতা কত, এবং সেই রঙের সঙ্গে মানুষের আগের অভিজ্ঞতা কী।

তাহলে রঙ কীভাবে আচরণে প্রভাব ফেলে?

বিষয়টি সহজভাবে এমনভাবে দেখা যায়:

রঙ → চোখে সংকেত → মস্তিষ্কে অর্থ ও স্মৃতি সক্রিয় → মনোযোগ ও আবেগের পরিবর্তন → পরিস্থিতির মূল্যায়ন → আচরণে পরিবর্তন।

প্রতিটি ধাপে পরিবর্তন খুব ছোট হতে পারে। কিন্তু আমরা প্রতিদিন অসংখ্য রঙের সংকেতের মধ্যে থাকি—রাস্তার সিগন্যাল, হাসপাতালের চিহ্ন, মোবাইলের অ্যাপ, বিজ্ঞাপন, খাবারের প্যাকেট, পোশাক ও ঘরের দেয়াল।

তাই রঙ একা আমাদের সিদ্ধান্ত তৈরি করে না। বরং এটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবেশকে বদলে দেয়।

লাল আমাদের আরও সতর্ক করতে পারে। নীল কোনো পরিস্থিতিকে তুলনামূলক শান্ত বা অনুসন্ধানী মনে করাতে পারে। উজ্জ্বল রঙ মনোযোগ টানতে পারে। গাঢ় রঙ ভিন্ন আবেগ তৈরি করতে পারে। আবার একই রঙ ব্যক্তির অভিজ্ঞতা ও সংস্কৃতির কারণে সম্পূর্ণ আলাদা অর্থও বহন করতে পারে।

সবচেয়ে বড় ভুল: রঙের ‘জাদুকরী’ শক্তি ধরে নেওয়া

রঙের মনস্তত্ত্ব নিয়ে জনপ্রিয় লেখায় প্রায়ই বলা হয়—লাল মানে শক্তি, নীল মানে বিশ্বাস, সবুজ মানে প্রকৃতি, হলুদ মানে সুখ, বেগুনি মানে বিলাসিতা। এগুলি পুরোপুরি ভিত্তিহীন নয়, কিন্তু এগুলিকে বৈজ্ঞানিক নিয়ম হিসাবে ব্যবহার করা ঠিক নয়।

রঙের মনস্তত্ত্বের গবেষণাক্ষেত্র এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে। Andrew Elliot ও Markus Maier-এর ২০১৪ সালের বিস্তৃত review-তে বলা হয়েছিল, রঙ মানুষের আবেগ, চিন্তা ও আচরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে, কিন্তু কোন পরিস্থিতিতে, কতটা এবং কার ক্ষেত্রে সেই প্রভাব দেখা যাবে—এ বিষয়ে আরও গবেষণা দরকার।

২০১৯ সালের আরেকটি ঐতিহাসিক review-ও গবেষণাগুলির পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা এবং ফল ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সতর্কতার প্রয়োজন তুলে ধরে।

সাম্প্রতিক ১৩২টি গবেষণার systematic review-ও একই সঙ্গে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক দেখিয়েছে এবং সতর্ক করেছে যে রঙ-আবেগের সম্পর্ক অনেক সময় একাধিক অর্থ বহন করে। একই রঙ একাধিক আবেগের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

রঙের মনস্তত্ত্ব

রঙ আমাদের মনকে রিমোট কন্ট্রোলের মত নিয়ন্ত্রণ করে না। কিন্তু আমাদের মস্তিষ্ক পরিবেশ থেকে পাওয়া সংকেতের অর্থ দ্রুত বের করতে চায়। রঙ সেই সংকেতগুলির একটি শক্তিশালী মাধ্যম।

তাই রঙের মনস্তত্ত্ব আসলে ‘কোন রঙ দেখলে কী হবে’—এই সহজ তালিকা নয়। বরঙ এটি একটি বড় প্রশ্নের গবেষণা: চোখ দিয়ে পাওয়া একটি সাধারণ দৃশ্যগত সংকেত কীভাবে মস্তিষ্কে অর্থ তৈরি করে, সেই অর্থ কীভাবে আমাদের অনুভূতি ও মনোযোগ বদলায়, আর সেখান থেকে কীভাবে আচরণে পরিবর্তন আসে।

এই কারণেই রঙ শুধু ছবি, পোশাক, দেয়াল বা বিজ্ঞাপনের সাজসজ্জা নয়। আমাদের চারপাশের পরিবেশ কীভাবে আমাদের অনুভব করায় এবং কীভাবে কাজ করতে প্রস্তুত করে—রঙ তার একটি অংশ।

@ Citytouch


৫০


মাতৃগর্ভে যখন একটি মানব ভ্রূণ (Embryo) মাত্র বেড়ে উঠতে শুরু করে, তখন শরীরের কোন অঙ্গটি সবার আগে তৈরি হয়? মস্তিষ্ক? হৃৎপিণ্ড? নাকি চোখ?

বিজ্ঞানের ভাষায় মানুষ এবং স্টারফিশের মতো আরও কিছু মেরুদণ্ডী প্রাণীকে বলা হয় "ডিউটেরোস্টোম" (Deuterostomes)। এর মানে হলো, মাতৃগর্ভে ভ্রূণের বিকাশের একদম প্রাথমিক পর্যায়ে আমাদের শরীরে সর্বপ্রথম যে ছিদ্র বা ওপেনিংটি তৈরি হয়, সেটি পরবর্তীতে আমাদের মলদ্বার বা Anus-এ পরিণত হয়! আর আমাদের মুখ বা Mouth তৈরি হয় এর বেশ পরে।

মাতৃগর্ভে নিষিক্তকরণের পর ভ্রূণটি দ্রুত বিভাজিত হওয়া কিছু কোষের একটি ছোট্ট পিণ্ড বা কাঠামো থাকে, তখন সেই অবস্থাকে বলা হয় গ্যাস্ট্রুলেশন (Gastrulation) স্টেজ। এই ধাপে কোষগুলো নিজেদের গুছিয়ে শরীরের মূল ভিত্তি বা প্রাথমিক পরিপাকতন্ত্র তৈরি করতে শুরু করে। ডিউটেরোস্টোম প্রাণীদের ক্ষেত্রে এই পর্যায়ে "ব্লাস্টোপোর" (Blastopore) নামক একটি ছিদ্র তৈরি হয়, যা সবার আগে পরিপাকতন্ত্রের শেষ প্রান্ত হিসেবে বিকশিত হয়।

অন্যদিকে, পোকামাকড় বা কেঁচোর মতো প্রাণীদের বলা হয় "প্রোটোস্টোম" (Protostomes)। এদের ক্ষেত্রে ঘটে ঠিক উল্টো ঘটনা—এদের শরীরে সবার আগে মুখ তৈরি হয়, আর মলদ্বার তৈরি হয় পরে।

@ AH Abubakkar Siddique