গায়ে আগুন লাগলে সাথে সাথে যে পাঁচটি কাজ করা জরুরি
কম ডেটা ব্যবহার করতে শুধু টেক্সট পড়ুন
ছবির উৎস,
Getty Images
ছবির ক্যাপশান,
বাংলাদেশে প্রতিবছরই বিভিন্ন ধরণের অগ্নিকাণ্ডে শত শত মানুষ হতাহত হয়।
Article Information
Author,
মুন্নী আক্তার
Role,
বিবিসি বাংলা, ঢাকা
৭ সেপ্টেম্বর ২০২০
২০০৪ সালে রান্না করতে গিয়ে গ্যাস স্টোভ থেকে গায়ের কাপড়ে আগুন লাগে সোমা দত্তের।
বিবিসি বাংলাকে সোমা দত্ত বলেন, কাপড়ে আগুন লাগার পর নিজেই সেটি নেভানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু আগুন যখন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছিলেন না তখন সাহায্যের জন্য চিৎকার করতে শুরু করেন।
ওই সময়ে বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন তার স্বামী। তিনিও আগুন নেভাতে চেষ্টা করেন।
"কিন্তু ওই মুহূর্তে আসলে কি তাৎক্ষণিক বোধ শক্তি কাজ করে না। রান্নাঘরের সামনেই জল ছিল। আমরা কেউই নজর করিনি। আমার হাজবেন্ড দৌড়ে বাথরুম গিয়ে জল এনে ঢালতে শুরু করে। ততক্ষণে আগুনে অনেকটা পুড়ে যায়।"
সোমা দত্ত বলেন, তার শরীরের ২৫ শতাংশ আগুনে পুড়ে যায়। এর মধ্যে ১২ শতাংশ ছিল মারাত্মক ক্ষত।
তিনি জানান, অন্তত দুটি হাসপাতাল ঘুরে শেষমেশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাকে।
তবে এর মধ্যে আগুন লাগার পর তার শরীরে অনেক ঠাণ্ডা পানি ঢালা হয়েছিল।
"জ্বলুনিটা কমানোর জন্য আর শরীর ঠাণ্ডা করার জন্য প্রচুর ঠাণ্ডা পানি ঢালা হয়েছিল। এর ফলে যেটা হয়েছিল সেটা হচ্ছে ভেতরে মাংস সেদ্ধ হওয়াটা রোধ করা গিয়েছিল," সোমা দত্ত বলেন।
Skip সর্বাধিক পঠিত and continue reading
সর্বাধিক পঠিত
End of সর্বাধিক পঠিত
শুধু তিনি নন, বাংলাদেশে প্রতিবছরই বিভিন্ন ধরণের অগ্নিকাণ্ডে শত শত মানুষ হতাহত হয়।
বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব মতে, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ২৪ হাজার ৭৪টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে আবাসিক গৃহে অগ্নিকাণ্ড হয়েছে আট হাজারের বেশি।
এই সময়ে আগুনে পুড়ে প্রাণ হারিয়েছে ১৮৪ জন। আর আহত হয়েছে ৫৬০ জন।
কতটুকু পোড়াটা বিপজ্জনক?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেয়া তথ্য মতে, বড়দের ক্ষেত্রে শরীরের ১৫ শতাংশ এবং শিশুদের ক্ষেত্রে যদি শরীরের ১০ শতাংশ পুড়ে যায় তাহলে তা ঝুঁকিপূর্ণ বলে ধরা হয়।
তবে খুব কম বয়সী শিশু বা নবজাতক এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই পরিমাপ সব সময় খাটে না। এসব এক্ষেত্রে ১০ কিংবা ১৫ ভাগের চেয়ে কম পুড়ে গেলেও অনেক সময় তা প্রাণঘাতী হতে পারে।
পোড়া অংশের পরিমাণ যত বেশি হবে মৃত্যুর আশঙ্কা তত বেড়ে যাবে। এছাড়া এটা বয়সের সাথে সম্পর্কযুক্ত। অর্থাৎ বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে কম পরিমাণ পোড়াও প্রাণহানির কারণ হতে পারে।
এ বিষয়ে শেখ হাসিনা ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি'র সহকারি অধ্যাপক ডা. শারমিন আক্তার সুমি বলেন, কোন কোন ক্ষেত্রে ৩০% এর কম পোড়াটাও বিপদজনক।
"যখন পোড়াটা অনেক গভীর হয়, রোগী যখন অনেক বেশি বয়স্ক থাকে কিংবা খুব কম বয়সী থাকে, রোগীর যদি অন্য কোন স্বাস্থ্য সমস্যা যেমন রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অ্যাজমা থাকে, যারা অনেক মোটা থাকে, যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকে, এসব ক্ষেত্রে পোড়ার পরিমাণ খুব বেশি না থাকলেও অবস্থা অনেক বেশি খারাপ হয়ে যায়।"
শরীরের কত ভাগ পুড়লো তার সাথেও বিপদের মাত্রাটা জড়িত বলে মনে করেন তিনি।
ছবির উৎস,
Getty Images
ছবির ক্যাপশান,
শরীরের কত ভাগ পুড়লো তার সাথেও বিপদের মাত্রাটা জড়িত বলে মনে করেন তিনি।
মানবদেহকে ১০০ ভাগ ধরা হয়। এর মধ্যে ১৫% এর বেশি পুড়ে গেলে অবস্থা খারাপ হওয়া শুরু হয়। এটা ৩০ ভাগের বেশি হলে সেখানে এক্সটেনসিভ ট্রিটমেন্ট (বিশেষ চিকিৎসা) দরকার হয়।
শরীরের ৪০ ভাগের বেশি পুড়ে গেলে সেই রোগীকে ক্রিটিক্যাল বা সংকটাপন্ন বলে ধরা হয়।
"আর ৭০ ভাগের বেশি হলে ধরে নেয়া হয় যে তার বাঁচার আশা নেই বললেই চলে।"
আগুনে পোড়ার হিসাব কিভাবে হয়?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পুড়ে যাওয়া পরিমাপ করতে পুরো দেহকে ১০০ ভাগ ধরা হয়। এর পর বিভিন্ন অংশকে আলাদা ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন, আঙুল খোলা রেখে পুরো হাতের তালু মিলে এক ভাগ ধরা হয়।
পোড়া যদি ছোট আকারের হয় তাহলে তা পরিমাপের ক্ষেত্রে ওই অংশটি হাতের তালুর কতগুণ সেটা হিসাব করা হয়।
সংস্থাটির মতে, প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে মানুষের পুরো দেহকে ৯% হিসেবে বা ৯ এর গুণিতক ধরে ভাগ করে হিসাব করা হয়।
এবিষয়ে ডা. শারমিন আক্তার সুমি বলেন, প্রাপ্ত বয়স্কদের ক্ষেত্রে হাতের আঙুল থেকে শুরু করে ঘাড় পর্যন্ত সামনের এবং পেছনের অংশ মিলে ৯%। আবার পায়ের সামনের অংশ ৯% এবং পেছনের অংশ ৯%। অর্থাৎ পুরো পা মিলে ১৮% ধরা হয়।
"চিকিৎসা বিজ্ঞানে এগুলো পরিমাপ করার আলাদা চার্ট আছে। সে অনুযায়ী এগুলো পরিমাপ করা হয়।"
তবে শিশুদের ক্ষেত্রে এই হিসাবটি একটু আলাদা। শিশুদের মাথার সামনে এবং পেছনের অংশ মিলে ২০% ধরা হয়। কিন্তু প্রাপ্ত বয়স্কদের ক্ষেত্রে মাথার সামনে এবং পেছনের অংশ মিলে ৯% ধরা হয়।
কী ধরণের পোড়া কতটা মারাত্মক?
একটা জিনিস কতখানি গভীর হয়ে পুড়বে তা নির্ভর করে কতক্ষণ সময় ধরে আগুনের সংস্পর্শে থাকলে, কোন ধরণের আগুনে পুড়লো এবং যে জিনিসে পুড়লো সেটার তাপমাত্রা কত ছিল।
এগুলো মিলে পোড়াকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। এগুলো হচ্ছে-
কন্টাক্ট বার্ন: এটা হচ্ছে কোন কিছুর সাথে লেগে পোড়া। তরল পদার্থ বা শক্ত পদার্থের সংস্পর্শে আসা। যেমন গরম পাতিল বা কয়েনে পোড়া।
ফ্লেম বার্ন: সরাসরি আগুনের সংস্পর্শে পোড়া। অর্থাৎ আগুন জামায় লাগলো বা গায়ে লাগলো।
কেমিকেল বার্ন: বিভিন্ন ধরণের রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসলে পুড়ে গেলে সেটাকে কেমিকেল বার্ন ধরা হয়।
ছবির উৎস,
Getty Images
ছবির ক্যাপশান,
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু পানি ঢাললেই পোড়ার পরিমাণ কমিয়ে আনা যেতে পারে।
বাংলাদেশে ফ্লেম বার্ন সবচেয়ে বেশি হয় বলে জানান ডা. শারমিন আক্তার সুমি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গভীরতা বা মাত্রা অনুযায়ী পোড়া তিন ধরণের হয়।
ফার্স্ট ডিগ্রি বার্ন: এটি মূলত সূর্যের তাপের কারণে হয়। এতে চামড়া লাল হয়ে যেতে পারে, ব্যথা থাকতে পারে, কিন্তু ফোস্কা পড়ে না।
সেকেন্ড ডিগ্রি বার্ন: গরম কোন তরল পদার্থের সংস্পর্শে আসলে এ ধরণের পোড়া হতে পারে। এতে চামড়া লাল বা ধূসর হয়ে পুড়ে বা ঝলসে যায়।
থার্ড ডিগ্রি বার্ন: এতে চামড়া কালো হয়ে পুড়ে যায় এবং মারাত্মক আকার ধারণ করে। আগুন, বিদ্যুৎ বা বজ্রপাত, দীর্ঘ সময় গরম তরল বা ধাতব পদার্থের সংস্পর্শে আসলে এধরণের পোড়ার ঘটনা ঘটে।
শ্বাসনালী পোড়া খারাপ কেন?
অনেক সময় দেখা যায় যে, আগুনের সংস্পর্শে আসলে শ্বাসনালী পুরে যায়। এ ধরণের পোড়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানান ডা. শারমিন আক্তার সুমি।
পেট্রোল বা কোন দাহ্য পদার্থ দিয়ে যদি আগুন লাগানো হয়, কিংবা গ্যাস থেকে আগুন লাগলে বা বদ্ধ কোন জায়গায় আগুন লাগলে শ্বাসনালী পুড়ে যাওয়ার শঙ্কা সবচেয়ে বেশি থাকে।
তিনি বলেন, শ্বাসনালীর পোড়াটা সরাসরি ফুসফুসে প্রভাব সৃষ্টি করে বলে এই পোড়া সবচেয়ে মারাত্মক।
আমরা যে শ্বাস নেই সেটি একটি নালীর মাধ্যমে ফুসফুসে যায়। এই বাতাসের সাথে ছোট ছোট উপাদান থাকে যা খালি চোখে দেখা যায় না। এগুলো ফুসফুসে গিয়ে সংক্রমণ সৃষ্টি করে।
"পরিবেশে বা বাতাসে যে মাইক্রোঅর্গানিজম থাকে সেগুলো চামড়া বা ত্বক ভেদ করে ঢুকতে পারে না। কিন্তু চামড়া পুরো গেলে সেগুলো সহজেই ফুসফুস এবং মাংসপেশিকে সংক্রমণ তৈরি করে।"
এই মাইক্রোঅর্গানিজমগুলো পোড়া শ্বাসনালীর ভেতর দিয়ে ফুসফুসে সংক্রমণ তৈরি করে। যার কারণে নিউমোনিয়া দেখা দেয়। এ কারণে এটি একটি বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে বলে জানান ডা. শারমিন আক্তার সুমি।
প্রাথমিক অবস্থায় কী কী ব্যবস্থা নেয়া যায়?
কেউ অগ্নিকান্ডের শিকার হলে সাথে সাথে কী কী ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে সে বিষয়ে চিকিৎসক এবং বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন।
এছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ-এনএইচএস-ও কিছু পরামর্শের কথা উল্লেখ করেছে। এগুলো হচ্ছে-
শেখ হাসিনা ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি'র সহকারী অধ্যাপক ডা. শারমিন আক্তার সুমি বলেন, আগুনে পোড়ার প্রথম আধাঘণ্টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এসময় রোগীর শরীরে যত বেশি সম্ভব পানি ঢালতে হবে।
শুধু পানি ঢাললেই পোড়ার পরিমাণ কমিয়ে আনা যেতে পারে।
"যেখানে ২০% পুড়তো সেটাকে হয়তো ১৫ বা ১০% এ নামিয়ে আনা যেতে পারে।"
যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বহমান ঠাণ্ডা পানি দিয়ে পোড়া জায়গা অন্তত ২০ মিনিট ধরে ধুতে হবে। তবে বরফ, বরফ শীতল পানি কোন ধরণের ক্রিম ও তৈলাক্ত পদার্থ যেমন মাখন দেয়া যাবে না।
২. কাপড় ও গহনা খুলে ফেলুন
কেউ অগ্নিকাণ্ডের শিকার হলে তার পরিহিত কাপড় ও গহনা যত দ্রুত সম্ভব খুলে ফেলতে হবে।
শিশুদের ক্ষেত্রে ন্যাপি কিংবা ডায়াপার থাকলে সেটি খুলে ফেলতে হবে।
কিন্তু পোড়া চামড়া বা পেশীর সাথে যদি কোন ধাতব পদার্থ বা কাপড়ের টুকরো আটকে গিয়ে থাকে তাহলে তা সরানোর চেষ্টা করা যাবে না। এক্ষেত্রে ক্ষত আরো বেশি বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
পানি ঢালার পর রোগীর শরীর গরম রাখার চেষ্টা করতে হবে যাতে হাইপোথারমিয়া না হয়। সেক্ষেত্রে কম্বল দিয়ে তাকে জড়িয়ে নেয়া যেতে পারে। তবে শরীরের যে অংশ পুড়ে গেছে সেখানে যাতে কোন ধরণের কাপড় না থাকে সেটি খেয়াল রাখতে হবে।
৩. যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে নিতে হবে
আগুনে পোড়োর পর প্রথম ২৪ ঘণ্টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে মধ্যে হাসপাতালে নেয়া গেলে রোগীর মৃত্যু ঝুঁকি অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
ডা. শারমিন আক্তার সুমি বলেন, প্রথমত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে নেয়া হলে রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী তাকে ২০-৩০ লিটার পর্যন্ত স্যালাইন দেয়া যায়। কিন্তু এর চেয়ে বেশি সময় অতিবাহিত হয়ে গেলে ৩-৪ লিটারের বেশি দেয়া সম্ভব নয়। ফলে তার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
প্রথম ২৪ ঘণ্টায় স্যালাইন দেয়ার কারণে যে উপকার পাওয়া যায় পরে আর সেটি পাওয়া যায় না। এজন্য এই ২৪ ঘণ্টাকে পোড়া রোগীর জন্য গোল্ডেন আওয়ার বলা হয়।
৪. টুথপেস্ট, লবণ, ডিমের সাদা অংশ দেয়া যাবে না
পোড়া রোগীকে তার ক্ষত স্থানের উপর টুথপেস্ট, লবণ বা ডিমের সাদা অংশ দেয়া যাবে না। এটি প্রাথমিকভাবে জীবাণুমুক্ত থাকলেও পরবর্তীতে এটাকে সংক্রমণের দিকে ঠেলে দেয়।
হাসপাতালে নেয়ার পর এই জিনিসগুলোকে পরিষ্কার করা হয়। আর তখন এগুলো জমাট বেঁধে থাকে বলে চামড়া উঠে আসার শঙ্কা থাকে। অর্থাৎ তার ক্ষত আরো গভীর হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
যদি রোগীর মুখ কিংবা চোখ পুড়ে যায় তাহলে রোগীকে যতক্ষণ সম্ভব সোজা করে বসিয়ে রাখার চেষ্টা করতে হবে। এতে ফোস্কা পড়া বা ফুলে যাওয়া কমে যায়।
৫. বেশি করে তরল খাওয়াতে হবে
পোড়া রোগীকে স্যালাইন দেয়া সম্ভব না হলে মুখে অন্তত স্যালাইন, ডাবের পানি বা তরল জাতীয় খাবার বেশি করে খাওয়াতে হবে।
এছাড়া ক্যালরি ও প্রোটিন জাতীয় খাবার যেমন ডিম বা মুরগি খাওয়ানোর পরামর্শ দেয়া হয়।
সর্পদংশন: বিষাক্ত সাপের কামড় থেকে বাঁচতে করণীয় কী, সাপ কামড়ালে কী ঘটে, অ্যান্টিভেনম কীভাবে তৈরি হয়
কম ডেটা ব্যবহার করতে শুধু টেক্সট পড়ুন
ছবির উৎস,
Alamy
ছবির ক্যাপশান,
চেরা আঁশযুক্ত সাপ
২১ এপ্রিল ২০২১
বিষাক্ত সাপের কামড়ে প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মারা যায় প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ, কিন্তু সহজ কিছু পদক্ষেপ সর্পদংশন থেকে মানুষের মৃত্যু ঠেকাতে পারে।
"বর্ষায় আগাছা বেড়ে ক্ষেতের মাটি ঢেকে যায়," বলছিলেন টুকারাম রাও, যিনি ভারতের কর্নাটক রাজ্যের রত্নাপুরী গ্রামের এক ক্ষেত মজুর। "রাতের বেলা ওই ক্ষেতের মধ্য দিয়ে আমাদের হেঁটে যেতে হয় পাম্প চালু করার জন্য। পানির পাইপ ঠিকমত কাজ না করলে, হাত দিয়ে সেই পাইপ টেনে বের করে তা মেরামত করতে হয়।"
মি. রাও-এর মত গ্রামের বহু কৃষক ও ক্ষেত মজুর খালি পায়েই হাঁটাচলা করেন। বর্ষাকালে ঘন আগাছার মধ্যেই থাকে রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া সাপের আস্তানা। ভারত আর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে খুবই বিষাক্ত এই সাপের ছোবলে প্রাণ যায় বহু মানুষের।
এই সাপ রাতের বেলায় বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ছোবল মারার আগে নিস্তেজ অবস্থায় অনেকক্ষণ নিজেকে লুকিয়ে রাখে চন্দ্রবোড়া। দীর্ঘ সময় নড়াচড়া করে না এই সাপ, তারপর হঠাৎই ভয়ানকভাবে ছোবল বসায়।
এরা সচরাচর ইঁদুরজাতীয় প্রাণী বা ছোটখাট ব্যাঙ শিকার করে খায়। মানুষ সচরাচর তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু থাকে না। তার পরেও ভারতে অন্য যে কোন জাতের সাপের তুলনায় চন্দ্রবোড়া সাপের দংশনের শিকার হয় সবচেয়ে বেশি মানুষ, আর এই সাপের ছোবলে মৃত্যুও ঘটে সবচেয়ে বেশি।
ভারতে সর্পদংশনে মৃত্যুর ৪৩ শতাংশই চন্দ্রবোড়ার কামড়ে মারা যায়। শ্রীলঙ্কাতেও সর্পদংশনের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের জন্য দায়ী চন্দ্রবোড়া।
বাংলাদেশেও যেসব সাপ দেখা যায়, তার মধ্যে সবচেয়ে বিষাক্ত চন্দ্রবোড়া। একশো' বছর আগে এই প্রজাতির সাপ বাংলাদেশে বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলে মনে করা হলেও গত বছর দশেক ধরে এই সাপের দংশনের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে বলে বিবিসিকে জানিয়েছে বাংলাদেশ টক্সিকোলজি সোসাইটি।
বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:
Skip সর্বাধিক পঠিত and continue reading
সর্বাধিক পঠিত
End of সর্বাধিক পঠিত
চন্দ্রবোড়ার দংশন ভয়ানক - কারণ হল তাদের শিকারের ধরন।
ঘাস বা আগাছার মধ্যে দিয়ে তারা চলে অতি ধীরে। এত ধীরে যে মনেই হয় না তারা নড়াচড়া করছে। গায়ের সবুজ ও বাদামী চাকা চাকা দাগের কারণে দিনের বেলা তারা ঘাস বা আগাছার রংয়ের সাথে মিশে থাকে - তাদের দেখা যায় না। আর রাতের বেলা তাদের দেখতে পাওয়া আরও কঠিন।
ধানক্ষেতে বা বেড়ে ওঠা আগাছায় তাদের গায়ের ওপর অসাবধানে পা পড়লেই চন্দ্রবোড়া ভয়ংকর হয়ে ওঠে। তার ওপর হামলা হচ্ছে ধরে নিয়ে সে ঘনঘন ছোবল বসায়।
বিশেষ করে যারা ক্ষেতখামারে কাজ করেন, তারা চন্দ্রবোড়া সাপে কাটার আশঙ্কায় থাকেন।
ছবির উৎস,
Alamy
ছবির ক্যাপশান,
ক্ষেত খামারে ঘন আগাছার মধ্যে লুকিয়ে থাকা রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া সাপ চট করে চোখে পড়া মুশকিল - এর আর একটা কারণ তার গায়ের রঙ
ভারতে প্রতি বছর সর্পদংশনের শিকার হয় প্রায় ২৮ লাখ মানুষ, আর মারা যায় ৫০ হাজার। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, গত দুই দশকে শুধু ভারতেই সাপের কামড়ে মারা গেছে ১২ লাখের বেশি মানুষ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৯ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত সর্বশেষ এক রিপোর্ট থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুমে প্রতি বছর অন্তত পাঁচ লাখ ৮০ হাজার মানুষ সাপের দংশনের শিকার হয়, এবং মারা যায় অন্তত ছয় হাজার মানুষ।
সারা বিশ্বে প্রতি বছর সাপের কামড়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৮১ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৮ হাজারের মধ্যে। আর বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর সাপের দংশনের শিকার হয় আনুমানিক ৪৫ লাখ মানুষ।
সাপে কামড়ানোর পর যারা প্রাণে বেঁচে যান, তাদের জীবনেও এর সূদুর প্রসারী প্রভাব পড়ে। দংশনের কারণে অনেকের জীবন-জীবিকা দারুণভাবে বিপর্যস্ত হয়ে যায়।
"সম্প্রতি একজন হলুদ চাষীর পায়ে সাপে ছোবল মেরেছিল। সে ক্ষেতে আগাছা পরিষ্কার করছিল। তার গোড়ালির চারপাশের মাংস পচে গেছে," বলছিলেন মি. রাও। "ওই পচন তার হাঁটু পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়, এখন সে আর কোন কাজকর্ম করতে পারে না।"
ডাক্তারদেরকে তার পায়ের পচে যাওয়া অংশ কেটে বাদ দিতে হয়েছে। পরিবারের খাওয়া-পরা যোগাতে এখন তার স্ত্রীকে বাড়তি কাজ খুঁজতে হচ্ছে। এ ধরনের ঘটনা ঘটছে ঘরে ঘরে, বিবিসিকে বলেন মি. রাও।
"প্রতি বছর প্রায় চার লাখ সাপে কাটা মানুষ কোন না কোন ধরনের পঙ্গুত্বের শিকার হন - হয় তাদের কোন অঙ্গের কোষকলা শুকিয়ে মরে যায়, যার ফলে সেই অঙ্গ কেটে বাদ দিতে হয়, নয়ত সেই অঙ্গ নষ্ট হয়ে আর ব্যবহারযোগ্য থাকে না। অনেকে সাপের কামড়ের কারণে অন্ধও হয়ে যান," বলছেন ব্রিটেনে লিভারপুল স্কুল অফ ট্রপিকাল মেডিসিনের সাপের বিষ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ লরা-ওয়ানা আলবুলেস্কু।
"সর্পদংশনের কিন্তু একটা বিরাট মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও রয়েছে, যা নিয়ে গবেষণার কাজ সবে মাত্র শুরু হয়েছে। সাপে কাটার মানসিক প্রভাবও কিন্তু মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে।
"অনেকে সাপে কাটার পর কাজ করতে পারেন না - কেউ ভয়ে, আবার কেউ প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ার কারণে। প্রতিবন্ধী অল্পবয়সী মেয়েদের বিয়ে হয় না, তারা ঘরবন্দী হয়ে যায়, অনেকে চিকিৎসার খরচ যোগাতে সর্বস্বান্ত হয়ে যায়।"
ছবির উৎস,
Sumanth Bindumadhav/HSI
ছবির ক্যাপশান,
ভারতে বেশিরভাগ সর্পদংশনের ঘটনা ঘটে দুর্ঘটনাবশত সাপের গায়ে পা পড়লে - মোটা রাবারের তৈরি বুট জুতা কিছুটা সুরক্ষার কাজ করে
সাপে কাটা একটা উপেক্ষিত রোগ
প্রতি বছর সারা বিশ্বে সাপের দংশনের শিকার হয় যে ৪৫ লাখ মানুষ, তাদের মধ্যে ২৭ লাখ পুরুষ, নারী এবং শিশু শারীরিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয় বলে জানাচ্ছে বেসরকারি সংস্থা গ্লোবাল স্নেকবাইট ইনিশিয়েটিভ।
সাপের কামড়ের সমস্যা মোকাবেলায় কাজ করছে এই সংস্থা।
"সাপের দংশন যে কতটা ব্যাপক সমস্যা, বহু মানুষই তা বোঝে না," ব্যাখ্যা করেছেন আমেরিকায় অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যে সংস্থা সাপের বিষ প্রতিরোধী রসায়ন, এর ওষুধ ও জরুরি চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা করছে তার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক লেসলি বয়ার।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করে, সাপের দংশন কোন কোন সম্প্রদায়ের জন্য বিশাল একটা সমস্যা, এবং সেই বিবেচনা থেকে তারা সম্প্রতি সর্পদংশনের কারণে মানুষের শরীরে ঘটা বিষক্রিয়াকে উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের একটা উপেক্ষিত রোগ হিসাবে শ্রেণিভুক্ত করেছে।
সাপে কাটাকে এখন বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে উপেক্ষিত একটি স্বাস্থ্য সমস্যা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে - যে সমস্যা বিশ্বের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যের ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
লেসলি বয়ার বলেন, "প্রায় ১২০ বছর ধরে আমরা জানি সাপের বিষ কাটানোর ওষুধ বা অ্যান্টিভেনম কীভাবে তৈরি করতে হয়।"
ছবির উৎস,
Getty Images
ছবির ক্যাপশান,
অ্যান্টিভেনম বা সাপে কামড়ানোর ওষুধ তৈরি করতে সংগ্রহ করতে হয় সাপের বিষ
তিনি বলেন, ফ্রান্সের পাস্তুর ল্যাবরেটরিতে বিজ্ঞানীরা বহুকাল আগে অ্যান্টিভেনম তৈরির কিছু কাজ করেছেন। এছাড়াও ইংল্যান্ডের লিস্টার ইনস্টিটিউট এবং ব্রাজিলের বুতানতান ইনস্টিটিউটেও অ্যান্টিভেনম নিয়ে গবেষণা হয়েছে। অনেক অ্যান্টিভেনম ভাল কাজও করে।
"কিন্তু সাপের বিষের চরিত্র যেহেতু বেশ জটিল, ফলে এর সফল চিকিৎসাও অনেক সময় কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।"
সঠিক অ্যান্টিভেনম যোগাড় করা এবং অ্যান্টিভেনম ব্যবহার করে বিষক্রিয়া বন্ধের চিকিৎসা খুবই ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ফলে অনেকেই সাপের কামড় থেকে বাঁচার সহজ ও কার্যকর উপায়গুলোর দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
ভারতে কর্নাটক রাজ্যের টুকারাম রাও এবং তার প্রতিবেশীরা একটা প্রকল্পের সাথে যুক্ত হয়েছেন। ভারতে হিউমেন সোসাইটি ইন্টারন্যাশনাল পরিচালিত এক কর্মসূচির আওতায় তারা এলাকার কৃষকদের সাপের দংশন থেকে বাঁচাতে মোটা রাবাবের বুট জুতা সরবরাহ করছেন।
"মানুষ যখন চলতে গিয়ে অজান্তে সাপের গায়ে পাড়া দেয়, তখনই সাপের ছোবল খায় তারা। নব্বই শতাংশ সর্পদংশনের ঘটনা এভাবেই ঘটে," জানান সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তা সুমন্ত বিন্দুমাধব।
তার সংস্থা থেকে মি. রাও-এর গ্রামের কৃষকদের ৪০০ জোড়ার বেশি রাবারের বুট এবং ২০০ সৌরশক্তি চালিত বাতি বিলি করা হয়েছে।
"চন্দ্রবোড়ার ফণা ভারতে অন্যান্য প্রজাতির অনেক সাপের চেয়ে বেশি লম্বা। কিন্তু গামবুটের রাবার ভেদ করে কামড়ানো তাদের পক্ষে খুবই কঠিন। আর সাপে কাটার পরে চিকিৎসার চেয়ে আগেই সাপের কামড় থেকে বাঁচা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ," বলেন মি. বিন্দুমাধব।
সাপের বিষ নানাধরনের বিষাক্ত পদার্থের একটা জটিল সংমিশ্রণ। আর এই বিষের ধরন সাপের প্রজাতি ভেদে ভিন্ন।
শরীরের যে স্নায়ু কোষগুলো মস্তিষ্কে বার্তা পাঠায়, সাপের বিষে থাকা কিছু জারক রস এবং অল্প মাত্রার প্রোটিন সেই বার্তা বহন প্রক্রিয়াকে অচল করে দেয়। এর ফলে মানুষের মাংসপেশিতে দ্রুত সংকোচন শুরু হয়, পেশিতে ব্যথা হতে থাকে এবং মাংসপেশি অসাড় হয়ে যেতে থাকে।
শ্বাসতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করে যেসব মাংসপেশি, সেগুলো ঠিকমত কাজ না করায় মানুষের দমবন্ধ হওয়ার অবস্থা হয়।
ছবির উৎস,
Getty Images
ছবির ক্যাপশান,
বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে বিষধর একটি সাপ ব্ল্যাক মাম্বা
আফ্রিকায় ব্ল্যাক মাম্বা নামে এক ধরনের সাপ আছে, যার বিষ হৃদপিণ্ডের মাংসপেশিকে আক্রমণ ক'রে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ করে দেয়। কোন কোন বিষের ক্রিয়ায় কাটা জায়গায় রক্ত জমাট বাধে না, ফলে প্রবল রক্তক্ষরণ হয়ে মানুষ মারা যায়।
কিছু সাপের বিষ আছে যা রক্তের কোষকে এমনভাব ভেঙে দেয় যে সাপে কাটা মানুষের রক্তকোষে অক্সিজেনের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
আবার কোন কোন সাপের বিষে শিরার ভেতর রক্ত জমাট বেধে গিয়ে আক্রান্ত ব্যক্তি প্রাণ হারায়। কখনও বিষক্রিয়া আবার শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে সেসব অঙ্গ বিকল করে দেয়।
আর কিছু কিছু বিষ যেখানে সাপে কেটেছে সেই স্থান ও আশপাশের কোষগুলোকে পুরো মেরে ফেলে। তখন মৃত কোষের কারণে পচে যাওয়া সেই সব প্রত্যঙ্গ কেটে বাদ দিতে হয়।
অনেক সাপের শরীরে এমন বিভিন্ন ধরনের বিষের সংমিশ্রণ থাকে। ফলে সেইসব সাপ কামড়ালে একই সাথে নানাধরনের বিষক্রিয়া ঘটতে থাকে। যে কারণে সাপের দংশনের চিকিৎসা খুব সহজ নয়।
"কোন একটা সাপের শরীরে ভিন্ন মাত্রায় কয়েকশো' ধরনের বিষ থাকতে পারে। ফলে একটা ওষুধ দিয়ে এত ভিন্ন ধরনের বিষ কাটানো দুঃসাধ্য ব্যাপার," বলছেন লেসলি বয়ার।
অ্যান্টিভেনম বা বিষের প্রতিকার ওষুধ তৈরি করা কঠিন নয়, যদি আপনি জানেন অ্যান্টিভেনম বানানোর সঠিক পদ্ধতিটা কী।
এছাড়া আপনার কাছে থাকতে হবে ঘোড়া।
যে সাপের বিষ কাটানোর ওষুধ আপনি বানাতে চাইছেন, সেই সাপের শরীর থেকে আপনাকে বিষ সংগ্রহ করতে হবে, সেই বিষ খুবই অল্প মাত্রায় ঘোড়ার শরীরে ঢোকাতে হবে ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে। এর থেকে ঘোড়ার শরীরে যে অ্যান্টিবডি তৈরি হবে সেই অ্যান্টিবডিকে বিশুদ্ধ করে নিয়ে তা সাপে কাটা মানুষের শরীরে দিলে সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব।
কিন্তু অ্যান্টিভেনম ঠিকমত কাজ করতে হলে অনেকটা পরিমাণে এই ওষুধ সাপে কামড়ানো মানুষকে দিতে হয়। কারণ ওষুধ কার্যকর হতে গেলে বেশ অনেকটা অ্যান্টিবডির প্রয়োজন হয়।
কী ধরনের সাপের দংশন হয়েছে তার ওপর নির্ভর করে কতটা পরিমাণ অ্যান্টিভেনম সেই বিষ কাটাতে কার্যকর হবে। অ্যান্টিভেনম দামেও সস্তা নয়। অনেক সময় দামের কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের অ্যান্টিভেনম দিয়ে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য থাকে না।
ছবির উৎস,
Getty Images
ছবির ক্যাপশান,
এই হাঁড়ি থেকে গোখরা সাপ নিয়ে তার থেকে বিষ বের করে অ্যান্টিভেনম তৈরি করা হয় ভারতের তামিলনাড়ুর এক অ্যান্টিভেনম কারখানায়
এছাড়াও সব অ্যান্টিভেনম সব সাপের বিষ সারাতে কাজ করে না।
যেমন, ভারতে মূলত চার ধরনের সাপের অ্যান্টিভেনম তৈরি হয় - কোবরা বা গোখরা প্রজাতির সাপ, ক্রেইট বা শঙ্খিনী, রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া এবং চেরা আঁশযুক্ত ভাইপার। অথচ ভারতে ৬০টির বেশি বিষাক্ত প্রজাতির সাপ রয়েছে।
প্রতিটি প্রজাতির সাপের জন্য অ্যান্টিভেনম তৈরি করা খুবই খরচ সাপেক্ষ। তাই যে কোন জাতের সাপে কামড়ালে মূলত এই চারটি সাপে কামড়ানোর ওষুধ দিয়েই তার চিকিৎসা করা হয়।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশটিতে যে অ্যান্টিভেনম ব্যবহার করা হয়, তা মূলত আসে ভারতের তামিলনাড়ু থেকে। এমন অভিযোগ রয়েছে যে আমদানি করা এই অ্যান্টিভেনম বাংলাদেশে সাপে কামড়ানোর চিকিৎসায় সবসময় কাজ করে না।
বাংলাদেশ টক্সিকোলজি সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে যে অ্যান্টিভেনম আনা হয়, সেটি মূলত চারটি সাপের বিষের একটি 'ককটেল' বা মিশ্রণ, যা কিছু সাপের দংশন নিরাময়ে কাজ করে। বাকি ক্ষেত্রে সেগুলো আংশিক কাজ করে।
তবে সাপে কামড়ানোর ওষুধ বা অ্যান্টিভেনম তৈরির জন্য এখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গবেষণার কাজ শুরু হয়েছে। অ্যান্টিবডি-ভিত্তিক চিকিৎসার ওপর বিজ্ঞানীরা বেশি জোর দিচ্ছেন, যে অ্যান্টিবডি ব্যাপক সংখ্যক প্রজাতির সাপের বিষ নিরাময়ে কাজ করবে।
ছবির উৎস,
Getty Images
ছবির ক্যাপশান,
বিভিন্ন প্রজাতির সাপের আচরণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়লে মানুষ সাপের কামড় থেকে নিজেকে রক্ষা করার সহজ পদক্ষেপগুলো নিতে সক্ষম হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন
সাপের বিষ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ লরা-ওয়ানা আলবুলেস্কু এমন ওষুধ তৈরির ব্যাপারে কাজ করছেন যা হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের এবং যা মুখে খাওয়ার ক্যাপসুল হিসাবে ব্যবহার করা যাবে।
তিনি বলছেন, সাপে কাটার পর সাথে সাথে এই ক্যাপসুল খেলে তা বিষ নিষ্ক্রিয় করতে সাহায্য করবে এবং সাপ কামড়ানোর সাথে সাথে আক্রান্ত ব্যক্তির অবস্থার দ্রুত অবনতি রোধ করতে পারবে।
মিজ আলবুলেস্কু এবং তার সহযোগীরা এমন উপাদান উদ্ভাবনের চেষ্টা করছেন, যা দিয়ে তৈরি ওষুধ বিভিন্ন প্রজাতির সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করতে পারবে। কারণ অনেক সময়ই সাপে কাটা ব্যক্তি জানতেও পারে না কোন সাপ তাকে কেটেছে।
লেসলি বয়ার বলেন, "এমন একটা ওষুধ কখনই বের করা সম্ভব হবে না, যা সব সাপের বিষ নিরাময়ে একই ভাবে কাজ করবে। কিন্তু এমন ওষুধ তৈরির কাজ চলছে যা সাপে কাটা মানুষের প্রাথমিক শুশ্রুষায় কাজ করবে, যাতে রোগী চিকিৎসার জন্য হাতে সময় পায়, যাতে বিষ দ্রুত শরীরে ছড়িয়ে না পড়ে এবং দ্রুত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল করে দিতে না পারে।"
হিউমেন সোসাইটি ইন্টারন্যাশানালের মি. বিন্দুমাধব বলছেন যে সাপে কামড়ানোর সফল চিকিৎসার ক্ষেত্রে এখনও যেহেতু অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, তাই সাপের কামড় ঠেকানোর জন্য সহজ পদক্ষেপগুলোর দিকে মানুষের বেশি মনোযোগ দেয়া উচিত।
যেমন, তিনি বলেন, সাপখোপ থাকার সম্ভাবনা যেসব গ্রাম এলাকায় সেখানে মশারি টাঙিয়ে ঘুমানো, আগাছায় ঢাকা ক্ষেতখামারে মোটা রাবারের জুতা পরে হাঁটা, ঘরের আশেপাশে জঞ্জাল না জমানো ইত্যাদি।
তার আরও পরামর্শ: আপনার এলাকায় যে সাপের আনাগোনা বেশি, সেই সাপের আচরণ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করাও সাপের কামড়ের হাত থেকে বাঁচার বড় একটা পথ।
সাপ কোন পরিস্থিতিতে কীভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে, কীভাবে সাপ মনে করে যে সে আক্রান্ত যার কারণে সে ফণা তোলে, কোন সাপ কোন সময়ে কোথায় থাকে - এসব তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিলে সাপ এড়িয়ে চলার ব্যাপারে মানুষ আরও সচেতন হবে বলে মনে করেন মি. বিন্দুমাধব।
এই প্রতিবেদনের তথ্য মূলত সংগ্রহ করেছেন বিবিসি ফিউচারের রিচার্ড গ্রে।