১
যে ব্রাজিলিয়ান ফুলকে বাংলা থেকে উৎখাত করা যায় নি
বর্ষাকালে বাংলাদেশের নদী, খাল, বিল কিংবা পুকুর কচুরিপানায় ঢেকে যায়। যত দূর অতীতের কথা আমরা সর্বশেষ তিন চার প্রজন্মের মানুষ মনে করতে পারি সবাই বাংলার খালে বিলে কচুরিপানা দেখেছি। এতটাই পরিচিত যে আমরা কচুরিপানাকে বাংলাদেশেরই স্বাভাবিক উদ্ভিদ বলে মনে করি হয়ত।
কিন্তু কচুরিপানা বাংলাদেশের দেশজ উদ্ভিদ নয়। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ারও নয়। এর জন্ম অনেক দূরে—দক্ষিণ আমেরিকায় ব্রাজিলের আমাজন অববাহিকায়। আর বাংলায় আসার পর একটি সুন্দর ফুলের জলজ উদ্ভিদ কীভাবে কয়েক দশকের মধ্যে কৃষি, নৌপথ, মৎস্য ও জনজীবনের জন্য বড় সমস্যা হয়ে উঠেছিল, ব্রিটিশ সরকার এটিকে উৎখাত করতে অর্থ ও শ্রম ব্যয় করেও ব্যার্থ হয়েছিল!
১. আদি নিবাস:
কচুরিপানার বৈজ্ঞানিক নাম Eichhornia crassipes। এটি Pontederiaceae পরিবারের একটি ভাসমান জলজ উদ্ভিদ। আমাজন অববাহিকাই এর আদিনিবাস বলে সাধারণভাবে স্বীকৃত।
পানির ওপর ভেসে থাকার জন্য কচুরিপানার পাতার গোড়ায় থাকে ফাঁপা, স্পঞ্জের মতো টিস্যু। এর সাহায্যে গাছটি পানিতে ভেসে থাকে। পানির ওপর থেকে দেখতে যতটা সাধারণ মনে হয়, এর বংশবিস্তার ক্ষমতা ততটাই অসাধারণ।
একটি গাছের গোড়া থেকে লম্বা শাখা বা stolon বের হয়। সেই শাখা থেকে আবার নতুন গাছ তৈরি হয়। ফলে একটি গাছ খুব দ্রুত অনেকগুলো গাছে পরিণত হতে পারে। ফুল ও বীজের মাধ্যমেও এর বংশবিস্তার হয়।
দক্ষিণ আমেরিকার নিজস্ব পরিবেশে এই বিস্তার নিয়ন্ত্রিত রাখার মতো নানা প্রাকৃতিক উপাদান—রোগজীবাণু, কীটপতঙ্গ, প্রতিদ্বন্দ্বী উদ্ভিদ ও অন্যান্য পরিবেশগত সীমাবদ্ধতা—কাজ করে। কিন্তু পৃথিবীর অন্য অঞ্চলে যখন কচুরিপানা পৌঁছাল, সেখানে অনেক সময় সেই প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রণগুলো ছিল না।
ফলে যে উদ্ভিদটি আমাজনে একটি স্বাভাবিক জলজ উদ্ভিদ, অন্য জায়গায় সেটিই হয়ে উঠল invasive species—এমন একটি আগ্রাসী বিদেশি প্রজাতি, যা দ্রুত বিস্তার লাভ করে স্থানীয় পরিবেশ ও মানুষের কর্মকাণ্ডে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
আর এর ফুল কিন্তু মোটেও আগাছার মতো নয়। হালকা বেগুনি বা নীলচে ফুলের সৌন্দর্যই বরং একসময় মানুষকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে কচুরিপানা নিয়ে যেতে উৎসাহিত করেছিল। সেই সৌন্দর্যই শেষ পর্যন্ত বাংলার জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
২. বাংলায় এল কীভাবে?
কচুরিপানা ঠিক কবে, কে এবং কোন পথ দিয়ে প্রথম বাংলায় এনেছিলেন, তার কোনো একক, নির্ভুল ঐতিহাসিক নথি পাওয়া যায় না। বরং বিভিন্ন সময়ে কয়েকটি ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
প্রচলিত একটি ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, জর্জ মরগান নামে একজন স্কটিশ পাট ব্যবসায়ী নারায়ণগঞ্জে বসবাস করতেন। বিদেশে যাতায়াতের সময় তিনি কচুরিপানার সুন্দর ফুল দেখে আকৃষ্ট হন এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে এর কিছু গাছ নিয়ে এসে নিজের বাগানের পুকুরে লাগান। কচুরিপানা তার আগেই অস্ট্রেলিয়ায় ঘাটি গেড়েছিল।
সেখান থেকেই কচুরিপানা ধীরে ধীরে আশপাশের জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ে—এমন একটি বর্ণনা পাওয়া যায়। ইতিহাসবিদ ইফতেখার ইকবালের গবেষণায়ও এই বিবরণটি এসেছে। তবে একই গবেষণায় লেখক দেখিয়েছেন যে কচুরিপানার বাংলায় আগমনের আরও কয়েকটি ব্যাখ্যাও প্রচলিত ছিল।
তাই এটিকে নিশ্চিত ইতিহাস না বলে পূর্ববঙ্গে কচুরিপানার আগমনের সবচেয়ে শক্তিশালী স্থানীয় বর্ণনাগুলোর একটি বলা নিরাপদ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব হলো, কচুরিপানা প্রথমে ব্রাজিল থেকে কলকাতার রয়াল বোটানিক্যাল গার্ডেনে আসে।
উনিশ শতকের শেষভাগে ইউরোপীয় উদ্ভিদবিদদের মধ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আকর্ষণীয় উদ্ভিদ সংগ্রহ করে বাগানে লাগানোর প্রবণতা ছিল। কচুরিপানাও সেই উদ্ভিদ-বিনিময়ের অংশ হয়ে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ভারতের দিকে আসে বলে একটি ঐতিহাসিক বর্ণনা রয়েছে।
এরপর কলকাতার বাগান বা ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে এটি বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- অস্ট্রেলিয়া থেকে জর্জ মরগানের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জে আসা এবং ব্রাজিল থেকে কলকাতায় আসা—এই দুই গল্প একে অপরকে পুরোপুরি বাতিল করে না।
কারণ কচুরিপানা তখন ইতিমধ্যে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে বিশ্বের বিভিন্ন উষ্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছিল। ফলে অস্ট্রেলিয়া কিংবা কলকাতা- দুই জায়গাই বাংলায় পৌঁছানোর সম্ভাব্য মধ্যম পথ হতে পারে।
আর একবার বাংলার উষ্ণ ও জলসমৃদ্ধ পরিবেশে পৌঁছে যাওয়ার পর এর বিস্তারের জন্য মানুষের আর তেমন কিছু করতে হয় নি। নদী, খাল, বিল আর বর্ষার স্রোতই হয়ে উঠল এর বাহন।
৩. সুন্দর ফুল থেকে ‘বাংলার আতঙ্ক’:
কচুরিপানার প্রকৃত বিপদ বোঝা শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে। প্রথমদিকে এটি ছিল বাগানের সৌন্দর্য। কিন্তু ধীরে ধীরে গাছটি ব্যক্তিগত পুকুরের সীমানা ছাড়িয়ে খাল, বিল ও নদীতে চলে যেতে থাকে।
তারপর শুরু হয় বিস্ফোরক বিস্তার।
একটি জলাশয়ের কচুরিপানা স্রোতের সঙ্গে অন্য জলাশয়ে যায়। সেখান থেকে আবার নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বর্ষাকালে এই বিস্তার আরও সহজ হয়।
কিছুদিনের মধ্যেই পূর্ববঙ্গের বিস্তীর্ণ জলাভূমি কচুরিপানায় আক্রান্ত হতে শুরু করে। ১৯১০-এর দশকে সমস্যাটি এতটাই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে যে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে শুরু করে।
১৯১৪ সালে নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স কচুরিপানার সমস্যা সরকারের নজরে আনে। কিন্তু তখনও সমস্যার প্রকৃত মাত্রা পুরোপুরি বোঝা যায় নি।
কচুরিপানা পুরো জলাশয় ঢেকে ফেলতে পারে। ঘন স্তর তৈরি হলে সূর্যের আলো পানির নিচে পৌঁছাতে পারে না। পানির স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়। সেচ ও নিষ্কাশনের সমস্যা তৈরি হয়। পূর্ববঙ্গের কৃষির জন্য এটি ছিল বিশেষ বিপজ্জনক।
ধান ও পাটের জমির সঙ্গে যুক্ত খাল-বিল ও জলপথগুলো কচুরিপানায় আটকে গেলে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হতো। কোথাও জলাবদ্ধতা তৈরি হতো, কোথাও আবার সেচব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতো।
১৯২০-এর দশকে বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষি ক্ষতির যে হিসাব পাওয়া যায়, তা ছিল ভয়াবহ। ময়মনসিংহে এমন এলাকাও ছিল যেখানে কৃষকেরা কচুরিপানার কারণে জমি চাষ করা ছেড়ে দিয়েছিলেন বলে রিপোর্ট করা হয়েছিল।
১৯২৬ সালের একটি হিসাব অনুযায়ী, কোনো কোনো এলাকায় আমন ধানের ১৫–২০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতির কারণ ছিল কচুরিপানা।
নদী ও নৌপথের শত্রু:
তখনকার পূর্ববঙ্গ ছিল নদী ও খালের দেশ। মানুষের যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহন, পাটের ব্যবসা- সবকিছুর সঙ্গে নৌপথের সম্পর্ক ছিল গভীর।
ছোট নদী ও খালগুলোতে কখনো এত ঘনভাবে কচুরিপানা জমে যেত যে নৌকা চলাচল কঠিন হয়ে পড়ত। পাট ও অন্যান্য কৃষিপণ্য বহনকারী নৌকাগুলো আটকে যেত।
একটি জায়গা পরিষ্কার করলেও সমস্যা শেষ হতো না। উজান থেকে আবার ভেসে আসত নতুন কচুরিপানা।
মাছের ওপর প্রভাব:
বাংলার মানুষের খাদ্য ও অর্থনীতিতে মাছের গুরুত্ব তখনও বিশাল। কচুরিপানা পানির ওপর ঘন আবরণ তৈরি করলে পানিতে আলো ও অক্সিজেনের স্বাভাবিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মাছের চলাচল ও প্রজননের পরিবেশও বদলে যায়। ফলে মৎস্যসম্পদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
জনস্বাস্থ্যের উপর প্রভাব:
কচুরিপানা নিয়ে আরেকটি বড় উদ্বেগ ছিল জনস্বাস্থ্য। তৎকালীন কিছু কর্মকর্তা ও গবেষক মনে করতেন, কচুরিপানা পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে স্থির পানির পরিবেশ তৈরি করছে এবং এর ফলে মশার বংশবৃদ্ধির সুযোগ বাড়ছে।
বিশেষ করে ম্যালেরিয়া নিয়ে উদ্বেগ ছিল। ঘন কচুরিপানা জলাবদ্ধ ও স্থির পানির পরিবেশ তৈরি করে মশার জন্য উপযোগী আবাসস্থল সৃষ্টি করতে পারে।
১৯২০-এর দশকে ‘বাংলার আতঙ্ক’:
সমস্যা এতটাই বেড়ে যায় যে সরকারকে বিশেষভাবে কচুরিপানা নিয়ে গবেষণা করতে হয়। ১৯২১–২২ সালে Water Hyacinth Committee গঠিত হয়। এই কমিটির সঙ্গে ছিলেন বিজ্ঞানী আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু।
কমিটির পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, পূর্ববঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চল কচুরিপানায় আক্রান্ত। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়া প্রায় সব জেলাতেই এর উপস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠেছিল।
কচুরিপানাকে তখন আর কোনো সাধারণ আগাছা হিসেবে দেখা হচ্ছিল না। এটি হয়ে উঠেছিল জনজীবনের জন্য হুমকি।
কচুরিপানার বিরুদ্ধে যুদ্ধ:
মানুষ এবার কচুরিপানার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করল। সমস্যা মোকাবিলায় একের পর এক পদ্ধতি নেওয়া হলেও কোনোটি স্থায়ী সমাধান দিতে পারে নি।
সার বানানোর চেষ্টা: কচুরিপানা তুলে পচিয়ে সার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু গাছের অধিকাংশই পানি হওয়ায় তা সংগ্রহ ও পরিবহন ছিল ব্যয়বহুল, আর পচানোর সময় অনেক পুষ্টিমান নষ্ট হতো।
অর্থনৈতিক ব্যবহার: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় পটাশের সংকট দেখা দিলে কচুরিপানার ছাই থেকে পটাশ তৈরির চেষ্টা হয়। বোর্ড, জ্বালানি ও অ্যালকোহল তৈরির সম্ভাবনাও পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু সংগ্রহ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের খরচ সম্ভাব্য লাভের চেয়ে বেশি হওয়ায় কোনো উদ্যোগই টেকে নি।
শ্রমিক দিয়ে অপসারণ: মানুষ দিয়ে কচুরিপানা তুলে ফেলা ছিল সবচেয়ে সরল পদ্ধতি, কিন্তু হাজার হাজার বর্গমাইলের জলপথ পরিষ্কার করা ছিল প্রায় অসম্ভব। একটি জায়গা পরিষ্কার করার পরই উজান থেকে আবার কচুরিপানা ভেসে আসত।
রাসায়নিক প্রয়োগ: বিভিন্ন রাসায়নিক ও স্প্রে দিয়েও ধ্বংসের চেষ্টা হয়। কিন্তু সেগুলোর কার্যকারিতা নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণিত হয়নি। উপরন্তু মরা উদ্ভিদ পানিতে পচে মাছ ও জলজ পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে—এমন আশঙ্কাও ছিল।
আইন করে নিয়ন্ত্রণ: ১৯২১ সালে স্থানীয়ভাবে কচুরিপানা নিয়ন্ত্রণের আইন করা হয়। পরে ১৯৩৬ সালের Bengal Water Hyacinth Act-এর মাধ্যমে এর আমদানি, বিক্রি, চাষ ও এক স্থান থেকে অন্যত্র নেওয়া নিষিদ্ধ করা হয় এবং সরকারকে জলাশয় পরিষ্কারের ক্ষমতা দেওয়া হয়। কিন্তু কচুরিপানা কোনো প্রশাসনিক সীমানা মানে না—এক জায়গা পরিষ্কার করলেও অন্য জায়গা থেকে আবার ভেসে আসত। ফলে আইনও শেষ পর্যন্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে পারে নি।
একটি পুকুর পরিষ্কার করলেই হবে না। তার সঙ্গে যুক্ত খাল পরিষ্কার করতে হবে। খাল থেকে নদী, নদী থেকে উজানের জলপথ—সব জায়গা একসঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
কচুরিপানার বংশবৃদ্ধিও এত দ্রুত যে পরিষ্কার করার গতি অনেক সময় তার বৃদ্ধির গতির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারত না। আর পূর্ববঙ্গের ভূপ্রকৃতি ছিল তার পক্ষে আদর্শ—অসংখ্য নদী, খাল, বিল, হাওর, পুকুর এবং বর্ষার পানির বিশাল নেটওয়ার্ক।
১৯৩৩ সালেই বাংলার গভর্নর স্যার জন এন্ডারসন স্বীকার করেছিলেন যে সফলভাবে কচুরিপানা নির্মূল করতে হলে পুরো আক্রান্ত অঞ্চলে একই সময়ে অভিযান চালাতে হবে। কিন্তু এত বিশাল অভিযান পরিচালনার মতো প্রশাসনিক ও আর্থিক সক্ষমতা সরকারের ছিল না।
শেষ পর্যন্ত কচুরিপানা জিতে গেল:
কচুরিপানাকে নির্মূল করার সেই ঔপনিবেশিক যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত সফল হয় নি।
একদিকে সরকার তাকে ধ্বংস করতে চেয়েছে, অন্যদিকে বিজ্ঞানীরা তার ব্যবহার খুঁজেছেন; কেউ সার বানাতে চেয়েছেন, কেউ পটাশ, কেউ জ্বালানি, কেউ শিল্পপণ্য।
কিন্তু কোনোটিই এমন কার্যকর সমাধান হয়ে উঠতে পারেনি, যা পূর্ববঙ্গের বিশাল জলাভূমি থেকে কচুরিপানাকে নির্মূল করতে পারে।
আর এভাবেই দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন অববাহিকার একটি সুন্দর জলজ উদ্ভিদ বাংলায় এসে পরিণত হয় “বাংলার আতঙ্কে”।
এই একবিংশ শতকেও কচুরিপানা একই সমস্যা নিয়ে বয়ে চলেছে। বাঁধের কারণে বাংলাদেশের নদীগুলোর পানি প্রবাহ কমে গিয়েছে। যার কারণে কচুরিপানা বিভিন্ন যায়গায় আটকে থাকছে। অনেক যায়গায় একারণে নৌকা বাইচও আয়োজন করতে পারছে না।
তবে নতুন করে গবেষণা হয়েছে এই সমস্যা দূর করতে। আসলে দূর করতে না, কচুরিপানাকে ব্যবহার করতে। বরিশাল এলাকায় এটিকে কৃষিকাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। কচুরিপানা থেকে কুটির শিল্পপণ্য তৈরি করা হচ্ছে। এগুলো কচুরিপানার ব্যবহার মাত্র। সমাধান নয়।
@ boikal
২
** সালাউদ্দিন আইয়ুবির মৃত্যুর পর যখন বিনা যুদ্ধে খ্রিষ্টানরা জেরুজালেম দখল করে
ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ক্রুসেডের ইতিহাসে সাধারণত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমেই জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ হাতবদল হতো। কিন্তু ১২২৯ সালে এর সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ঘটে। পবিত্র রোমান সম্রাট (Holy Roman Emperor) দ্বিতীয় ফ্রেডরিক (Frederick II) এবং আইয়ুবীয় সুলতান আল-কামিল (Al-Kamil) যুদ্ধের বদলে আলোচনার পথ বেছে নেন। সেসময় ফ্রেডরিক পোপের দ্বারা একঘরে (excommunicated) ছিলেন, অন্যদিকে সুলতান আল-কামিল তার নিজ সাম্রাজ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ব্যস্ত ছিলেন এবং মঙ্গোলদের দিক থেকেও সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় ছিলেন। তাই উভয়েই সংঘাত এড়িয়ে একটি রক্তপাতহীন রাজনৈতিক সমাধান চাচ্ছিলেন।
১২২৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তারা একটি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেন, যা ষষ্ঠ ক্রুসেডের সমাপ্তি টানে।এই চুক্তির ফলে বিনা যুদ্ধে জেরুজালেম শহরের শাসনভার ক্রুসেডারদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি বেথলেহেম (Bethlehem) এবং নাজারেথ (Nazareth)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোও খ্রিষ্টানদের নিয়ন্ত্রণে আসে।চুক্তির সবচেয়ে যুগান্তকারী দিক ছিল ধর্মীয় সহনশীলতা। জেরুজালেমের শাসনভার খ্রিষ্টানদের হাতে গেলেও আল-আকসা মসজিদ (Al-Aqsa Mosque) এবং ডোম অফ দ্য রক (Dome of the Rock)-এর মতো মুসলিমদের পবিত্র স্থানগুলোর পূর্ণ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ মুসলিমদের হাতেই রেখে দেওয়া হয়।
উভয় পক্ষের চরমপন্থীরা এই চুক্তি মেনে নিতে পারেনি। অনেক মুসলিম বিনা যুদ্ধে জেরুজালেম হস্তান্তরকে বিশ্বাসঘাতকতা মনে করেছিলেন, আবার পোপ এবং কট্টর খ্রিষ্টানরা একজন 'একঘরে' সম্রাটের চুক্তিকে স্বীকৃতি দিতে নারাজ ছিলেন।
তা সত্ত্বেও, এই ব্যবস্থা প্রায় ১৫ বছর জেরুজালেমে শান্তি বজায় রেখেছিল। কিন্তু ১২৪৪ সালে এই শান্তির চূড়ান্ত অবসান ঘটে। মঙ্গোলদের আক্রমণে বাস্তুচ্যুত হওয়া দুর্ধর্ষ খাওয়ারিজমীয় (Khwarazmian) বাহিনী জেরুজালেম আক্রমণ করে। তারা শহরটি ব্যাপকভাবে লুণ্ঠন ও দখল করে নেয়, যার ফলে ক্রুসেডাররা স্থায়ীভাবে জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ হারায়।
@ saiful islam
৩
"বিশ্বের চাষযোগ্য জমির শতাংশে শীর্ষস্থানে বাংলাদেশ (৬০.৬%)। আর ৫১.৭% জমি নিয়ে ভারতের অবস্থান ৫ম।"
ভৌগোলিক আয়তনের বিশালত্ব কোনো দেশের কৃষি-উর্বরতার একমাত্র মাপকাঠি নয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং বিশ্বব্যাংকের যৌথ সমীক্ষা অনুযায়ী, পৃথিবীর মোট স্থলভাগের গড় চাষযোগ্য জমির পরিমাণ মাত্র ১০.৭১ শতাংশ। তবে এই বৈশ্বিক গড়ের বিপরীতে এক অবিশ্বাস্য ব্যতিক্রম আমাদের এই দক্ষিণ এশিয়া।
সাধারণভাবে বড় রাষ্ট্রগুলোর আবাদি জমি বেশি মনে হলেও, দেশের মোট আয়তনের অনুপাতে হিসাব করলে বিশ্বের সমস্ত পরাশক্তিকে পেছনে ফেলে শীর্ষস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। যেখানে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সিংহভাগ ভূমি মরুভূমি, পাহাড় কিংবা বরফে ঢাকা থাকে, সেখানে বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৬০.৬ শতাংশ জমিই সরাসরি চাষের উপযোগী। বিপরীতে, বিশাল আয়তনের দেশ হওয়া সত্ত্বেও শতাংশের হিসাবে ভারতের অবস্থান বিশ্বে ৫ম (৫১.৭%) এবং পাকিস্তানের অবস্থান ১৪তম (৩৯.৩%)।
আয়তনে ছোট হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের এই অভূতপূর্ব অর্জনের পেছনে কাজ করেছে কিছু অনন্য প্রাকৃতিক মেকানিজম।
বাংলাদেশ মূলত গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা বিশ্বের বৃহত্তম সক্রিয় বদ্বীপ। হাজার বছর ধরে হিমালয় থেকে নেমে আসা নদ-নদীগুলো প্রতি বছর কোটি কোটি টন খনিজসমৃদ্ধ পলিমাটি বহন করে নিয়ে আসে। যা মাটিকে কৃত্রিম রাসায়নিক ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবেই অত্যন্ত উর্বর ও ফসল উৎপাদনের উপযোগী করে তোলে।
তাছাড়া চীন, রাশিয়া কিংবা অস্ট্রেলিয়ার মতো বিশাল রাষ্ট্রে পর্বতমালা, মালভূমি বা স্থায়ী বরফাচ্ছাদিত অঞ্চলের কারণে মোট ভূখণ্ডের বড় অংশই অব্যবহৃত থেকে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকাই প্রাকৃতিকভাবে সমতল সমভূমি। ফলে দেশের সিংহভাগ অঞ্চলের মাটিই চাষাবাদের আওতাভুক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ুর কারণে বাংলাদেশে তীব্র শীত বা দীর্ঘস্থায়ী বরফ পড়ার মতো কোনো জলবায়ুগত প্রতিবন্ধকতা নেই। পর্যাপ্ত সূর্যালোক এবং নিয়মিত বৃষ্টিপাতের ফলে এখানকার কৃষিজমিগুলো সারাবছর সচল থাকে। ফলে একই জমিতে বছরে একাধিকবার ফসল ফলানো বা 'মাল্টি-ক্রপিং' প্রাকৃতিকভাবেই সহজ হয়ে যায়।
সহজ কথায়, ভৌগোলিক আয়তনে বাংলাদেশ ছোট হতে পারে, কিন্তু সম্পদের ঘনত্ব বা 'রিসোর্স ডেনসিটি'র দিক থেকে এই মাটি পৃথিবীর অন্যতম এক অনন্য বিস্ময়।
তথ্যসূত্রঃ World Bank Arable Land Indicator, CEIC, StatsPanda
ব্যাখ্যাঃ Wildology Bangla
৪
*** জার্মানিকে কেন ডোয়েচল্যান্ড বলা হয়?
জার্মানিকে এর নিজ ভাষায় (জার্মান ভাষায়) 'ডয়েচল্যান্ড' (Deutschland) বলা হয়। এর পেছনের কারণটি মূলত ঐতিহাসিক এবং ভাষাতাত্ত্বিক। Deutsch, এই শব্দটি প্রাচীন উচ্চ জার্মান (Old High German) ভাষার শব্দ "diutisc" থেকে এসেছে। "diutisc" শব্দের আদি অর্থ ছিল "সাধারণ মানুষের" (of the people) বা "জনগণের ভাষা"। Land এর অর্থ হলো ভূমি বা দেশ। সুতরাং, আক্ষরিক অর্থে 'ডয়েচল্যান্ড' (Deutschland) মানে হলো "সাধারণ মানুষের ভূমি"।
মধ্যযুগে (৮ম শতাব্দীর দিকে) ইউরোপের অভিজাত শ্রেণী, চার্চের যাজক এবং শিক্ষিত পণ্ডিতরা মূলত ল্যাটিন ভাষায় কথা বলতেন এবং লেখালেখি করতেন। ল্যাটিন ছিল তৎকালীন সভ্য সমাজের প্রধান ভাষা। কিন্তু সাধারণ মানুষ, কৃষক এবং শ্রমিকরা ল্যাটিন বুঝতেন না। তারা নিজেদের স্থানীয় জার্মানিক ভাষায় (Germanic dialects) কথা বলতেন। অভিজাতদের ল্যাটিন ভাষার বিপরীতে, সাধারণ মানুষের এই ভাষাকেই বলা হতো "diutisc" বা "জনগণের ভাষা"। কালক্রমে, যারা এই "জনগণের ভাষায়" কথা বলত, তাদের ভৌগোলিক অঞ্চলটিকে একটি একক পরিচয়ে পরিচিত করতে 'ডয়েচল্যান্ড' নামটির প্রচলন শুরু হয়। অর্থাৎ, এটি এমন একটি ভূখণ্ড, যেখানে সাধারণ মানুষের ভাষা (ডয়েচ) কথা বলা হয়।
জার্মানি পৃথিবীর অন্যতম একটি দেশ, যাকে একেক ভাষায় একেক নামে ডাকা হয়। ইংরেজরা একে 'জার্মানি' বলে, যা প্রাচীন রোমানদের দেওয়া নাম "জার্মানিয়া" (Germania) থেকে এসেছে। রোমানরা রাইন নদীর পূর্ব দিকের উপজাতিদের বোঝাতে এই নাম ব্যবহার করত। ফরাসি (Allemagne) এবং স্প্যানিশ (Alemania) ভাষায় এই নাম ব্যবহার করা হয়, যা প্রাচীন জার্মানিক উপজাতি 'আলেমান্নি' (Alemanni)-দের নাম থেকে এসেছে। অন্য দেশগুলো তাদের নিজস্ব ঐতিহাসিক যোগাযোগের ভিত্তিতে জার্মানির নাম দিয়েছে, কিন্তু জার্মানরা নিজেদের দেশকে তাদের সাধারণ মানুষের ভাষার আদি পরিচয় অনুযায়ী 'ডয়েচল্যান্ড'-ই বলে থাকে
@ saiful islam
৫
মাইক্রোপ্লাস্টিক কীভাবে রক্তে মেশে, বাঁচার উপায় কী ?
পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিকের কণাকে বলে মাইক্রোপ্লাস্টিক। নিজেদের অজান্তে প্রতিনিয়ত আমরা গ্রহণ করছি মাইক্রোপ্লাস্টিক। বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা বলছে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে প্রতি সপ্তাহে গড়ে প্রায় ৫ গ্রাম প্লাস্টিক কণা প্রবেশ করছে। বাতাস, পানি কিংবা প্রিয় খাবার—কোনোটিই আজ এই অদৃশ্য বিষ থেকে মুক্ত নয়। বিস্তারিত জানাচ্ছেন ঢাকার স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. আফলাতুন আকতার জাহান
১. খাদ্য ও পানীয়ের মাধ্যমে: বোতলজাত পানি, প্রক্রিয়াজাত খাবার, সামুদ্রিক ও প্রাকৃতিক জলাশয়ের মাছ, প্রক্রিয়াজাত লবণ, এমনকি টি-ব্যাগেও মিলছে এই কণা। প্লাস্টিক বা ওয়ান-টাইম পাত্রে গরম খাবার ও পানীয় রাখলে প্লাস্টিকের ক্ষতিকর রাসায়নিক গলে সরাসরি খাবারে মিশে যায়।
২. শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে: কৃত্রিম বা সিন্থেটিক তন্তুর পোশাক, ঘরের কার্পেট, আসবাবের ধুলা এবং যানবাহনের টায়ার ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে বাতাসে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়ায়। শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে সহজে যা ফুসফুসে পৌঁছে যায়।
৩. ত্বক ও প্রসাধন: ফেসওয়াশ, স্ক্রাব ও টুথপেস্টে ব্যবহৃত ‘মাইক্রোবিডস’ এবং সিন্থেটিক কাপড়ের ঘর্ষণে ত্বকের সূক্ষ্ম ছিদ্র দিয়েও এসব কণা শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
হুমকিতে যেসব অঙ্গ
গবেষণার তথ্য বলছে, রক্তনালির প্লাক, ফুসফুস, যকৃৎ, মস্তিষ্ক, প্রজনন অঙ্গ, এমনকি মাতৃগর্ভের ফুল প্লাসেন্টাতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
গবেষণার তথ্য বলছে, রক্তনালির প্লাক, ফুসফুস, যকৃৎ, মস্তিষ্ক, প্রজনন অঙ্গ, এমনকি মাতৃগর্ভের ফুল প্লাসেন্টাতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
গবেষণার তথ্য বলছে, রক্তনালির প্লাক, ফুসফুস, যকৃৎ, মস্তিষ্ক, প্রজনন অঙ্গ, এমনকি মাতৃগর্ভের ফুল প্লাসেন্টাতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এসব কণা দেহের ভেতরে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও প্রদাহ সৃষ্টি করে।
প্লাস্টিকের কণাগুলো পেটে জমা হয়ে ভেতরে ঘা বা প্রদাহ সৃষ্টি করে। আমাদের পেটে কিছু ভালো ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা খাবার হজম এবং রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। প্লাস্টিকের কণা এই ভালো ব্যাকটেরিয়াগুলোকে মেরে ফেলে। ফলে হজমশক্তি কমে যায়, সহজে অসুস্থ হয়ে পড়ে শরীর।
শ্বাসনালিতে জ্বালাপোড়া এবং প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন সৃষ্টি করে। ফলে কাশি, হাঁচি, বুকে বাঁশির মতো শব্দ (হুইজিং), শ্বাসকষ্ট ও অ্যাজমা বা সিওপিডির মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ বৃদ্ধি পায়।
দীর্ঘদিন ধরে প্লাস্টিকের কণাগুলো ফুসফুসে জমা হতে থাকলে টিস্যুতে স্থায়ী ক্ষত তৈরি হয়, যা পালমোনারি ফাইব্রোসিসের প্রধান কারণ।
টেক্সটাইল, নাইলন বা পলিপ্রোপিলিন ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত শ্রমিকদের ফুসফুসে ক্রমাগত এসব তন্তু প্রবেশের কারণে ইন্টারস্টিশিয়াল লাং ডিজিজ, পালমোনারি হাইপারটেনশন এবং পরবর্তী সময়ে রেসপিরেটরি ফেইলিউরের (ফুসফুস অকেজো হওয়া) মতো মারাত্মক পরিণতি দেখা দেয়।
খাবারের মাধ্যমেও শরীরে ঢোকে মাইক্রোপ্লাস্টিক।
হরমোনের ভারসাম্যহীনতা: প্লাস্টিক তৈরিতে ব্যবহৃত ‘বিসফেনল-এ’ ও ‘থ্যালেটস’-এর মতো উপাদান মানবদেহের এন্ডোক্রাইন সিস্টেমে সরাসরি ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। এগুলো ইস্ট্রোজেনসহ অন্যান্য হরমোনের স্বাভাবিক কার্যকারিতাকে বিভ্রান্ত করে থাইরয়েড ও মেটাবলিজমে ব্যাঘাত ঘটায়।
মাইক্রোপ্লাস্টিক নারী ও পুরুষ উভয়ের প্রজননস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এটি পুরুষের শুক্রাণুর গুণগত মান ও সংখ্যা কমায় এবং নারীদের ক্ষেত্রে ডিম্বাণুর কার্যকারিতা ব্যাহত করে গর্ভধারণে জটিলতা তৈরি করে।
দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব রোগীর রক্তনালিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি ছিল, তাঁদের হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও আকস্মিক মৃত্যুর ঝুঁকি সাধারণের তুলনায় প্রায় সাড়ে চার গুণ বেশি।
ক্ষুদ্র কণাগুলো কোষে প্রবেশ করে কোষের গঠন ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ডিএনএ ভাঙনের কারণ হয়। ফলে পরিপাকতন্ত্র, ফুসফুস ও থাইরয়েডের মতো অঙ্গে ক্যানসার সৃষ্টির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে আতঙ্ক নয়, চাই সচেতনতা।
কমানোর কৌশল
পরিবেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় মাইক্রোপ্লাস্টিক শতভাগ দূর করা অসম্ভব। তবে কিছু সতর্কতামূলক অভ্যাসের মাধ্যমে শরীরকে কম ঝুঁকিতে রাখা সম্ভব।
বোতলজাত পানির বদলে কাচ, স্টেইনলেস স্টিল বা সিরামিকের পাত্রে পানি ও খাবার সংরক্ষণের অভ্যাস করুন। প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার না খাওয়া, ফ্রিজে খাবার রাখতেও আইসক্রিমের বাটি বা প্লাস্টিকের বক্স ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।
ওভেনে কখনো প্লাস্টিকের পাত্র বা র্যাপিং পেপার ব্যবহার করবেন না। উচ্চ তাপে প্লাস্টিকের প্লাস্টিসাইজার ও কণা দ্রুত খাদ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
প্লাস্টিকের বদলে কাচের বোতলে পানি খাওয়ার অভ্যাস বহ্নি, ছবি: কবির হোসেন ।
সুতি, লিনেন বা পাটের পোশাক ব্যবহারে অভ্যস্ত হন। পলিয়েস্টার বা নাইলনের মতো সিন্থেটিক কাপড়ের পোশাক পরিহার করাই ভালো।
ঘরের সিন্থেটিক কার্পেট এড়িয়ে চলুন। বাতাসের ভাসমান কণা কমাতে নিয়মিত ভেজা কাপড়ে ঘর মুছুন কিংবা ভ্যাকিউম করুন।
অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত ও প্লাস্টিক মোড়কজাত খাবার এড়িয়ে তাজা ফলমূল ও শাকসবজি খান। টি-ব্যাগের বদলে ঐতিহ্যবাহী উপায়ে পাতা চা ফুটিয়ে পান করা নিরাপদ।
নিজের ও পরিবারের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আমাদের ব্যক্তিগত সচেতনতাই সবচেয়ে বড় ঢাল। দৈনন্দিন জীবনে ছোট ছোট অভ্যাসের পরিবর্তনই পারে আমাদের রক্তে মিশতে থাকা এই অদৃশ্য বিষের মাত্রা অনেকাংশে কমিয়ে আনতে।
প্রথম আলো অনলাইন ডেস্ক
World Vision (বিশ্ব দর্শন)
৬
যেসব দেশের নামকরণ হয়েছে নদী থেকে
পৃথিবীতে স্বাধীন ও ডিপেন্ডেন্সি মিলিয়ে মোট দুই শতাধিক দেশ আছে। প্রতিটা দেশেরই নামকরণের পেছনে কোনো কারণ আছে। ইতিহাস, ভৌগোলিক অবস্থা, ভাষা, জাতি, ব্যক্তি, রাজনীতি ইত্যাদি কারণ। এর মধ্যে অল্প কয়েকটি দেশ আছে যাদের নামকরণ হয়েছে নদী থেকে। এই ধরণের নামকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়- সরাসরি নদীর নাম থেকে অথবা নদীর সাথে কোনো না কোনো ভাবে সর্ম্পক রেখে। আমরা আজকে এমন নদীনির্ভর নামের দেশগুলোর কথা জানব।
১. জর্দান:
ঐতিহাসিক জর্দান নদীর নাম থেকে আধুনিক রাষ্ট্রের নাম। নদী ও দেশের নাম হুবহু এক। অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ব্রিটিশ দখলে আসা জর্ডান নদীর পূর্বাঞ্চলকে “Transjordan” নামে একটি পৃথক রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে গড়ে তোলা হয়। ১৯৪৬ সালে এটি Transjordan নামে স্বাধীন হয়, আর ১৯৪৯ সালে নাম পরিবর্তন করে Jordan করা হয়।
Transjordan-এর আক্ষরিক অর্থ “জর্ডান নদীর ওপারের ভূখণ্ড”। ইউরোপীয়/পশ্চিমা দৃষ্টিকোণ থেকে জর্ডান নদীর পূর্ব তীরের অঞ্চলকে এ নামে ডাকা হতো। ঘটনাটা এভাবে দাড়ায়- জর্দান নদীর ওপাড়ের দেশ, পরে “ওপাড়ের দেশ” কাটা গিয়ে নদীর নামটি রয়ে যায়।
২. ইন্ডিয়া
ইন্ডিয়া নামটির আদি উৎস একটি নদীর নাম- সিন্ধু। প্রাচীন পারসিক ভাষায় “স” ধ্বনি অনেক ক্ষেত্রে “হ” হয়ে যাওয়ায় Sindhu থেকে Hindu রূপটি তৈরি হয়। পারসিকরা মূলত সিন্ধু নদীর ওপারের মানুষ ও ভূখণ্ডকে Hindu নামে উল্লেখ করত।
গ্রিকরা পারসিকদের কাছ থেকে নামটি গ্রহণ করে Indos (নদী) ও India (ভূখণ্ড) রূপে ব্যবহার করে। পরে লাতিন ও ইউরোপীয় ভাষার মাধ্যমে India নামটি প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ India নামের মূল উৎস সিন্ধু নদী, যদিও মাঝখানে পারসিক ও গ্রিক ভাষার মাধ্যমে শব্দটির রূপ বদলে গেছে।
[Niger নদীটি পশ্চিম আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ একটি নদী, যা কয়েকটি দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নাইজেরিয়ায় গিয়ে আটলান্টিক মহাসাগরের গিনি উপসাগরে পড়ে।]
৩. নাইজার:
Niger-কে আমাদের দেশে “নাইজার” লেখা হয়। Niger নামটির ইংরেজি উচ্চারণ সাধারণত “নিই-ঝের” বা ফরাসি উচ্চারণের কাছাকাছি “নিজের/নিজের্”। তবে আমরা একটাকে প্রচলিত বানানে “নাইজার” লিখব।
ঔপনিবেশিক আমলে অঞ্চলটি French West Africa-র অংশ ছিল এবং Territory of Niger নামে পরিচিত ছিল। ১৯২২ সালে ফরাসিরা আনুষ্ঠানিকভাবে Colony of Niger প্রতিষ্ঠা করে। তখন থেকেই Niger নামটি একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক এককের সরকারি নামে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬০ সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীন হওয়ার পর দেশটি Republic of Niger নামে স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
৪. নাইজেরিয়া:
১৮৯৭ সালে ব্রিটিশ সাংবাদিক ও লেখিকা ফ্লোরা শ (Flora Shaw) ব্রিটিশ উপনিবেশিক প্রশাসনের অধীন অঞ্চলটির জন্য Nigeria নামটি প্রস্তাব করেন। তিনি Niger নামের সঙ্গে -ia প্রত্যয় যোগ করে নামটি তৈরি করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯১৪ সালে উত্তর ও দক্ষিণ নাইজেরিয়ার ব্রিটিশ উপনিবেশ একীভূত হলে Nigeria নামটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
৫. সেনেগাল:
সেনেগাল দেশের নাম এসেছে সেনেগাল নদীর নাম থেকে। নদীটির নাম আগে থেকেই প্রচলিত ছিল; পরে ইউরোপীয় মানচিত্র ও ঔপনিবেশিক প্রশাসনে নদীসংলগ্ন বৃহত্তর অঞ্চলের নাম হিসেবেও “সেনেগাল” ব্যবহৃত হতে থাকে। ১৯৬০ সালে স্বাধীনতার পর সেই প্রচলিত নামই দেশের নাম হিসেবে থেকে যায়।
৬. গাম্বিয়া
পশ্চিম আফ্রিকায় সেনেগাল দিয়ে ঘিরে থাকা দেশটি হল গাম্বিয়া। গাম্বিয়ার নাম এসেছে দেশটির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত গাম্বিয়া নদীর নাম থেকে। ইউরোপীয় নাবিকদের নথিতে নদীটির নাম ১৫শ শতক থেকেই পাওয়া যায়। পরবর্তীতে নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা অঞ্চলটিও “Gambia” নামে পরিচিত হয়। ১৯৬৫ সালে স্বাধীনতার সময় দেশটি “The Gambia” নামেই স্বাধীন হয়। গাম্বিয়া উচ্চারণ শুনতে আফ্রিকার আরেকটি দেশ জাম্বিয়ার মত শোনায়। তাই কনফিউশন দূর করতে গাম্বিয়ার নামের আগে ‘দি’ যুক্ত করা হয়েছে।
৭. জাম্বিয়া
জাম্বিয়ার নাম এসেছে জাম্বেজি নদীর নাম থেকে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে জাম্বিয়ার নাম ছিল উপনিবেশিক ব্যবসায়ীর সিসিল রোডেস এর নামে “Northern Rhodesia”। স্বাধীনতার আগে অপমানজনক উপনিবেশিক নাম ঝেড়ে ফেলে দেশটির জন্য “জাম্বিয়া” নামটি গ্রহণ করা হয় এবং ১৯৬৪ সালের ২৪ অক্টোবর স্বাধীনতার পর দেশটির সরকারি নাম হয় “Republic of Zambia”।
৮. ক্যামেরুন
নদীটির নাম আসলে উওরি, ক্যামেরুন নয়, তবে নদীটিই দেশটির নামের উৎস। পর্তুগিজরা নদীটির নাম দিয়েছিল Rio dos Camarões, অর্থ “চিংড়ির নদী”; সেখান থেকে Cameroon। পর্তুগিজ ভাষায় দেশটির নাম এখনও Camarões.
৯. মলদোভা
পূর্ব ইউরোপের দেশ মলদোভা, দেশটি মাত্র দুটো দেশ- রোমানিয়া ও ইউক্রেন দ্বারা বেষ্টিত। মলদোভা নামটি এসেছে মলদোভা নদী (Moldova) থেকে। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এই নদীর উপত্যকাকে কেন্দ্র করে মলদাভিয়া রাজ্য গড়ে ওঠেছিল। লোককথা অনুযায়ী, প্রাচীন এক রাজকুমার নদীটির তীরে ষাঁড় শিকার করার পর এই নামকরণ করেছিলেন।
১০. বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা
দেশটি আসলে দুটি অঞ্চল নিয়ে গঠিত বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা। বৃহৎ অংশের নাম বসনিয়া, হার্জেগোভিনা ছোট এলাকা, তবু দেশের নামে যায়গা দেয়া হয়েছে।
দেশটির অন্যতম প্রধান নদী ‘বসনা’ (Bosna River)। এই নদীর নাম থেকেই অঞ্চলটির নাম হয়েছে বসনিয়া, মানে বসনা নদীর দেশ। আর সেটিই পরে দেশের নামে যায়গা পায়।
১১. উরুগুয়ে
উরুগুয়ের নাম এসেছে উরুগুয়ে নদীর নাম থেকে। নদীটির নাম স্থানীয় গুয়ারানি ভাষা থেকে এসেছে বলে মনে করা হয়, তবে “Uruguay” শব্দটির সঠিক অর্থ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ১৮২৮ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় নদীর নাম থেকেই দেশের নাম গ্রহণ করা হয়।
১২. সুরিনাম
দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর উপকূলের দেশ সুরিনাম, যার অধিকাংশ এলাকাই আমাজন বনের অংশ। দেশেটির নাম Suriname নদীর নাম থেকে এসেছে।
ইউরোপীয় অভিযাত্রীরা আসার আগে এই অঞ্চলে 'সুরিনেন' নামের একটি স্থানীয় আদিবাসী উপজাতি বাস করত। তাদের নাম থেকেই অঞ্চলটির নদী ও ভূখণ্ডের নাম রাখা হয়। প্রথমে সুরিনাম নদীটির নামকরণ করা হয়। পরবর্তীতে সেই নদীর নাম থেকেই পুরো অঞ্চলের নাম 'সুরিনাম' হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
পরাধীন আমলে দেশটির নাম ছিল ডাচ গায়ানা।
১৩. কঙ্গো
এটি আরেকটি নদী যার সাথে দুটো দেশের নাম জড়িয়ে আছে। তবে সরাসরি নদীর নাম থেকে দেশদুটির নাম হয় নি। আসলে নদী ও দেশের নামের উৎস একই। এই বিশাল জনপদকে প্রাচীন কালে কঙ্গো রাজ্য বলা হত। সেই সূত্রে নদীটির নাম হয় কঙ্গো নদী।
মধ্য আফ্রিকার দুটো দেশ কঙ্গো- গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো ও প্রজাতন্ত্রী কঙ্গো যারা তাদের রাজধানীর নামে বেশি পরিচিত হয়, যথাক্রমে ব্রাজাভিল ও কিনশাসা।
কঙ্গো জনগোষ্ঠী ও তাদের ঐতিহাসিক রাজ্য “কঙ্গো” থেকে ইউরোপীয়রা নদীটির নাম রাখে- কঙ্গো। এরপর নদীর অববাহিকা ও আশপাশের অঞ্চলগুলোও কঙ্গো নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। ফলে স্বাধীনতার সময় নদীর দুই পাড়ের দুটি দেশই ‘কঙ্গো’ নামটি গ্রহণ করে। ডিআর কঙ্গো মাঝে অবশ্য “জায়ারে” নাম নিয়েছিল।
১৪. প্যারাগুয়ে
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়ের নামের সাথে নদীর সম্পর্ক একটু অনিশ্চিৎ। তবে দেশটিতে প্যারাগুয়ে নামে একটি নদী আছে এবং নদীটির নাম থেকে দেশটির নাম প্যারাগুয়ে রাখা হয়েছে বলে ব্যাপকভাবে গ্রহণ করা হয়। সেখানে পায়াগুয়া (Payaguá) নামের একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী আছে। গুয়ারানি ভাষাভাষীরা প্যারাগুয়ে নদীকে “Payaguá-y” বলত, যার অর্থ “পায়াগুয়াদের নদী” বলা হয়।
প্যারাগুয়ের নামকরণের আরও দুটো থিওরি আছে তাই নদীকে একচ্ছত্র কারণ বলা যায় না। একটি মত অনুযায়ী, নামটি এসেছে গুয়ারানি ভাষার “paraguá”, যার অর্থ “পালকের মুকুট”, এবং “y”, যার অর্থ “পানি”—এই দুটি শব্দ থেকে। সে হিসেবে Paraguay শব্দের অর্থ দাঁড়ায় “জলের পালকের মুকুট”।
আরেকটি ব্যাখ্যায়ও গুয়ারানি ভাষার শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে “para” অর্থ “সমুদ্র”, “gua” অর্থ “যেখান থেকে উৎপত্তি”, আর “y” অর্থ “নদী”। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী Paraguay বলতে বোঝায় “যে নদী সমুদ্রের জন্ম দেয়” বা “সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত নদী”। সবগুলো থিওরি কোনো না কোনো ভাবে নদী বা পানির সাথে সম্পর্কিত। @ বইকাল
৭
'ফিরিঙ্গি' কারা?
'ফিরিঙ্গি' শব্দটি আমাদের কাছে বেশ পরিচিত হলেও এর শেকড় লুকিয়ে আছে সুদূর ইউরোপের ইতিহাসে। প্রাচীনকালে 'ফ্রাঙ্ক' (Franks) নামে ইউরোপে একটি শক্তিশালী জাতিগোষ্ঠী ছিল, যারা বর্তমান ফ্রান্স এবং এর আশেপাশের অঞ্চল শাসন করত। একাদশ শতকে যখন ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ শুরু হয়, তখন মধ্যপ্রাচ্যের আরবরা ইউরোপ থেকে আসা সকল শ্বেতাঙ্গ যোদ্ধাদের জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সামগ্রিকভাবে 'ফ্রাঙ্ক' নামেই ডাকতে শুরু করে।
আরবি ও ফার্সি ভাষার উচ্চারণের প্রভাবে এই 'ফ্রাঙ্ক' শব্দটি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে থাকে। আরবরা তাদের 'ইফরাঞ্জ' বা 'ফারাঞ্জ' বলতো, যা ফার্সি ভাষায় এসে 'ফিরাঙ্গ' বা 'ফিরাঙ্গী' (Farangi) রূপ ধারণ করে। মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্যের মানুষেরা যেকোনো পশ্চিমা ইউরোপীয়কে বোঝাতেই এই 'ফিরাঙ্গী' শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করত।
পরবর্তীতে ভারতবর্ষে যখন ফার্সিভাষী মুসলিম শাসকদের (যেমন সুলতানি ও মুঘল আমল) শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তাদের রাজকীয় ভাষার সাথে সাথে 'ফিরাঙ্গী' শব্দটিও এই অঞ্চলে প্রবেশ করে। ষোড়শ শতকে যখন পর্তুগিজ নাবিক, ব্যবসায়ী ও জলদস্যুরা প্রথমবার ভারতবর্ষ এবং বাংলার উপকূলে (বিশেষ করে চট্টগ্রামে) আসতে শুরু করে, তখন স্থানীয়রা রাজদরবারের ব্যবহৃত ফার্সি ভাষার অনুকরণে এই শ্বেতাঙ্গ বিদেশিদের 'ফিরিঙ্গি' বলে ডাকা শুরু করে।
সময়ের সাথে সাথে ভারতবর্ষে এই শব্দের ব্যবহার আরও প্রসারিত হয়। শুধু পর্তুগিজ নয়, বরং ব্রিটিশ, ফরাসি বা ওলন্দাজসহ যেকোনো ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গকেই ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষ 'ফিরিঙ্গি' বলতে শুরু করে। এমনকি পরবর্তীকালে ইউরোপীয় ও ভারতীয়দের মিশ্রণে যে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়, তাদেরকেও 'ফিরিঙ্গি' আখ্যা দেওয়া হতো। এভাবেই ইউরোপের একটি নির্দিষ্ট জাতির নাম 'ফ্রাঙ্ক' থেকে শত শত বছরের ভৌগোলিক ও ভাষাগত বিবর্তনের মাধ্যমে আমাদের অতি পরিচিত 'ফিরিঙ্গি' শব্দের জন্ম হয়েছে।
saiful islam
৮
৫০-এর পর থেকে গুরুতর কোমর্বিডিটি থাকলে চারটে ভ্যাকসিন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি কেন?
তবে তার আগে একটা কথা পরিষ্কার জানা দরকার—টিকা মানেই কিন্তু ইনফেকশন একবারে আটকে দেওয়া নয়। আসল কাজ হল রোগের তীব্রতা কমিয়ে দেওয়া। একটা সাধারণ ভ্যাকসিনই ঠিক করে দেবে আপনি বাড়ি বসে বিশ্রাম নিয়ে সুস্থ হবেন, নাকি আপনাকে হাসপাতালের আইসিইউ-তে বেড খুঁজতে হবে।
মরশুম বদলের মুখে ফের মাথার ওপর খাঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে ইনফ্লুয়েঞ্জা সহ একাধিক ভাইরাল সংক্রমণ। ঘরে ঘরে জ্বর, সর্দি বেশ কিছুদিন ধরেই হচ্ছে, কখনও ভাইরাল, কখনও ইনফ্লুয়েঞ্জায় প্রকোপ। বয়স্ক থেকে শিশু সবাই আক্রান্ত হচ্ছে। পাশাপাশি ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া তো রয়েছেই।
এই পরিস্থিতিতে শিশু ও বয়স্কদের বিশেষ কেয়ার দরকার, তারজন্য জরুরি ভ্যাকসিন গুলো নিতে হবে।
প্রবীণদের ৪টি আবশ্যিক প্রতিষেধক
১. ইনফ্লুয়েঞ্জা (ফ্লু) ভ্যাকসিন
• কেন জরুরি: বয়স বাড়ার পাশাপাশি যদি হৃদরোগ, ফুসফুসের সমস্যা বা মেদ-ডায়াবেটিস থাকে, তবে ফ্লু থেকে নিউমোনিয়া ও বড়সড় শারীরিক জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে।
• ডোজ বা নিয়ম: প্রতি বছর ফ্লু-এর মরশুম শুরুর আগেই মাংসপেশিতে একটি করে ডোজ নেওয়া উচিত।
২. নিউমোকোকাল ভ্যাকসিন
• কেন জরুরি: স্ট্রেপ্টোকোকাস নিউমোনি (Streptococcus pneumoniae) ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ প্রতিহত করতে জরুরি। এই ব্যাকটেরিয়া নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের মেনিনজাইটিস এবং রক্তে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটায়। ডায়াবেটিস, সিওপিডি (COPD) কিংবা কিডনির রোগীদের এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
• ডোজ বা নিয়ম: ‘PCV20’ ভ্যাকসিনের একক ডোজই এখন সবচেয়ে বেশি কার্যকর ও পছন্দসই। আর এটি না পাওয়া গেলে প্রথমে ‘PCV13’ এবং তার অন্তত ৮ সপ্তাহ পর ‘PPSV23’ নেওয়া যেতে পারে।
৩. Tdap (ট্রেটানাস, ডিপথেরিয়া, পারটুসিস)
• কেন জরুরি: ছোটবেলায় নেওয়া টিকার প্রতিরোধ ক্ষমতা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে কমতে থাকে। ফলে প্রবীণদের বিশেষ করে 'হুপিং কাফ' বা পারটুসিসের ঝুঁকি বাড়ে, যা ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি করে।
• ডোজ বা নিয়ম: প্রাপ্তবয়সে আগে টিড্যাপ (Tdap) না নেওয়া থাকলে একটি ডোজ নিতে হবে। তারপর প্রতি ১০ বছর অন্তর Td বা Tdap বুস্টার নেওয়া প্রয়োজন।
৪. কোভিড-১৯ বুস্টার
• কেন জরুরি: ভাইরাস নিত্যনতুন রূপ বদলায়। ফলে বয়স্ক ও জটিল ব্যাধিতে ভুগতে থাকা মানুষদের বাড়তি সুরক্ষার জন্য এই প্রতিষেধক প্রয়োজন।
• ডোজ বা নিয়ম: স্বাস্থ্য মন্ত্রকের সময়োপযোগী নির্দেশিকা মেনে নির্দিষ্ট সময় অন্তর বুস্টার ডোজ নেওয়া উচিত।
নতুন নতুন ভাইরাস বা ভ্যারিয়েন্ট আসবেই, সেটা আটকানো সম্ভব নয়। কিন্তু সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত আর চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে এই টিকাগুলো নেওয়া থাকলে অসুখের জটিলতা এড়ানো সম্ভব। তাই অযথা আতঙ্ক নয়, সচেতন থাকুন এবং নিজের স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখুন।
দ্য ওয়াল ব্যুরো
৯
জরুলের এই কালজয়ী দর্শনের একটি বিস্তারিত ও গভীর বিশ্লেষণ
১. জন্মগত পরিচয়ের চেয়ে মানবিকতার প্রাধান্য:
নজরুল বিশ্বাস করতেন, একটি শিশু যখন পৃথিবীতে আসে, তখন সে কোনো ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে আসে না। সমাজের মানুষই হিন্দু পরিবারে জন্মানো শিশুর কানে 'হরিনাম' বা দীক্ষামন্ত্র দিয়ে তাকে হিন্দু বানায়, আর মুসলিম পরিবারে জন্মানো শিশুর কানে 'আজান' দিয়ে তাকে মুসলমান হিসেবে চিহ্নিত করে। কবির মতে, এগুলো কেবলই বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা। প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠার জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের সিলমোহরের প্রয়োজন নেই, বরং প্রয়োজন নৈতিকতা, বিবেক এবং মূল্যবোধের।
২. সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদের তীব্র সমালোচনা:
১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে ভারতীয় উপমহাদেশে যখন ধর্মকে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা এবং রাজনৈতিক বিভাজন তীব্র রূপ নিচ্ছিল, তখন নজরুল তাঁর কলমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে, মানুষ ধর্মের নামে একে অপরকে আঘাত করছে, অথচ ধর্মের মূল শিক্ষা 'মানবপ্রেম' ভুলে যাচ্ছে। তাঁর এই উক্তিটি মূলত সেই অন্ধ ধর্মান্ধতা এবং গোঁড়ামির বিরুদ্ধে এক চরম চপেটাঘাত।
৩. 'মানুষ হওয়ার মন্ত্র' কী?
কবির দৃষ্টিতে, মানুষ হওয়ার মন্ত্র হলো—জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে ভালোবাসার ক্ষমতা। অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং নিপীড়িতের পাশে দাঁড়ানোর সাহস। সংকীর্ণতার প্রাচীর ভেঙে সব মানুষকে এক পরিবারভুক্ত মনে করা। নজরুল তাঁর ‘মানুষ’ কবিতায় স্পষ্ট বলেছিলেন, "মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।" যিনি এই সাম্য ও মানবতার পাঠ সমাজকে দিতে পারেন, কবি তাকেই সমাজের সবচেয়ে 'মহান' ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
৪. ধর্মীয় সমন্বয়বাদ ও বৈশ্বিক চেতনা:
নজরুল তাঁর নিজের জীবনেও এই দর্শনের চর্চা করেছিলেন। তিনি যেমন ইসলামিক ধারার গজল ও হামদ-নাত লিখেছেন, তেমনই সমান পারদর্শিতায় হিন্দু ভক্তিগীতি ও শ্যামাসংগীত রচনা করেছেন। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক সমাজ ব্যবস্থা, যেখানে মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হবে সে একজন 'মানুষ'।
সারসংক্ষেপ:
কাজী নজরুল ইসলামের এই বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে ধর্মীয় সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে একটি উদার, অসাম্প্রদায়িক এবং মানবিক সমাজ গঠনে উদ্বুদ্ধ করা। তাঁর মতে, সমাজ বা পরিবার একজন মানুষকে সহজে হিন্দু বা মুসলমান বানাতে পারলেও, যিনি মানুষকে প্রকৃত অর্থে মানবিক গুণসম্পন্ন 'মানুষ' হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন, তিনিই প্রকৃত পথপ্রদর্শক ও মহান।
তথ্য সংগ্রহ: মৃণাল নন্দী
১০
ক্ষুদ্র পরিবর্তনে বৃহৎ প্রভাব – ১১টি মূলনীতি (Margin Manifesto: 11 Tenets)
১। উৎপাদনের চেয়ে মুনাফার ওপর ফোকাস করুন
কাজের পরিমাণ নয়, লাভ বৃদ্ধির কৌশলে মনোযোগ দিন।
২। ভলিউমের পরিবর্তে মানে বিনিয়োগ করুন
অনেক পণ্য বিক্রি নয়, লাভজনক পণ্য বিক্রিই গুরুত্বপূর্ণ।
৩। ৮০/২০ নিয়ম প্রয়োগ করুন
যেসব কাস্টমার বা কার্যকলাপ বেশি লাভ আনে, তাদের অগ্রাধিকার দিন।
৪। আপনার সময়ের মূল্য নির্ধারণ করুন
সময় কোথায় ব্যয় করছেন, সেটার বিশ্লেষণ করুন এবং কম লাভজনক কাজ বাতিল করুন।
৫। “না” বলা শিখুন
সব প্রস্তাবে রাজি না হয়ে, শুধু লাভজনক প্রস্তাবে মনোযোগ দিন।
৬।পণ্যের দাম বাড়ান
ভয় না পেয়ে দামের মাধ্যমে পণ্যের মান ও শ্রেণি তুলে ধরুন।.
৭। বিনামূল্যে বা সস্তা কাস্টমারকে এড়িয়ে চলুন
তারা সাধারণত বেশি অভিযোগ করে এবং কম লাভ এনে দেয়।
৮। নিজের ওপর বিনিয়োগ করুন
নতুন দক্ষতা বা দক্ষতাবান টিম মেম্বার আনুন, যা আপনাকে বাঁচিয়ে রাখবে।
৯। কম ফিচার = কম খরচ, বেশি লাভ
কম জিনিসে বেশি মান দিন—বিপরীত না।
১০। প্রোডাক্টে ফোকাস করুন
এমন কিছু তৈরি করুন যা একবার বানিয়ে বারবার বিক্রি করা যায়।
১১।নিজের ব্যবসাকে আপনি নিয়ন্ত্রণ করুন, তা যেন আপনাকে না নিয়ন্ত্রণ করে
ব্যবসা যেন আপনার জীবনকে দখল না করে—স্বাধীনতা ও সিস্টেমের মাঝে ভারসাম্য রাখুন।
এই নীতিগুলোর মূল কথা হলো—"কম কাজ করে, বেশি আয় করুন"—ঠিক যেটা ৪-Hour Workweek বইয়ের গোড়ার দর্শন।
@ আব্দুল্লাহ আজাদ
১১
স্পিনোজার “God” বা “ঈশ্বর”
১. ঈশ্বর মানে প্রকৃতি (God = Nature)
স্পিনোজা বলেছিলেন, ঈশ্বর কোনো ব্যক্তি বা আকাশের ওপরে বসে থাকা আলাদা সত্তা নন। তিনি ঈশ্বরকে সমগ্র সত্তার একমাত্র মৌলিক ভিত্তি হিসেবে দেখেছেন।
তার বিখ্যাত ধারণা হলো Deus sive Natura ( ঈশ্বর বা প্রকৃতি )। অর্থাৎ, প্রকৃতির ভেতরে যা কিছু আছে গাছ, নদী, মানুষ, প্রাণী, নক্ষত্র, মহাবিশ্বের নিয়ম সবই ঈশ্বরের প্রকাশ।
২. ঈশ্বর সৃষ্টিকর্তা নন, বরং অস্তিত্ব নিজেই
ঈশ্বর কোনো বাইরের শক্তি দিয়ে পৃথিবী বানিয়ে দূরে বসে দেখছেন স্পিনোজা এটা মানতেন না। বরং, তিনি বলেছিলেন , ঈশ্বর = অস্তিত্ব = সবকিছুর মৌলিক নিয়ম। প্রকৃতির বাইরে ঈশ্বর নেই ; প্রকৃতিই ঈশ্বর।
৩. ঈশ্বরের কোনো মানবিক গুণ নেই
ঈশ্বরকে মানুষ-সদৃশ ভাবা (যেমন রাগ করেন, পুরস্কার দেন, শাস্তি দেন) স্পিনোজা এটাকে কুসংস্কার ভাবতেন।
ঈশ্বর কারও ইচ্ছে পূরণ করেন না, কারও বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব করেন না । প্রকৃতির নিয়ম যেমন নিরপেক্ষ, ঈশ্বরও তেমন।
৪. নৈতিক শিক্ষা
স্পিনোজা বলেছিলেন, যদি আমরা বুঝতে পারি যে আমরা প্রকৃতির অংশ, এবং প্রকৃতিই ঈশ্বর, তাহলে আমরা প্রকৃতির নিয়মকে মেনে চলব, মানুষের প্রতি সহমর্মী হব, এবং অযথা ভয় বা কুসংস্কার ছাড়বো । স্পিনোজার কাছে ঈশ্বর মানেই প্রকৃতি। ঈশ্বর কোনো ব্যক্তি নন, বরং মহাবিশ্বের সামগ্রিকতা, অস্তিত্বের মূলনীতি এবং সবকিছুর অন্তর্নিহিত ঐক্য।
১. আমরা যদি একটি গাছ দেখি সাধারণভাবে ভাবলে গাছটা ঈশ্বরের সৃষ্টি। কিন্তু স্পিনোজার দৃষ্টিতে গাছটাই ঈশ্বরের প্রকাশ। অর্থাৎ গাছ, তার বেড়ে ওঠা, পাতা ঝরা সবই প্রকৃতির নিয়মে হচ্ছে। আর সেই প্রকৃতিই ঈশ্বর।
২. সূর্য ওঠা আর রাত-দিন হওয়া আমরা দেখি। প্রচলিত ধারণায় ঈশ্বর সূর্য উঠাচ্ছেন। স্পিনোজা বলবেন সূর্য উঠছে, কারণ প্রকৃতির নিয়ম তাই আর এই নিয়মই ঈশ্বর।
৩. ধরুন, নদী বয়ে যাচ্ছে সমুদ্রের দিকে। আমরা বলি এটা ঈশ্বরের ইচ্ছা। স্পিনোজা বলবেন নদীর পানি নিচের দিকে যাবে, কারণ মাধ্যাকর্ষণ আছে। প্রকৃতির যে অটল নিয়ম, সেটাই ঈশ্বর।
মানুষের জীবনে প্রয়োগ:
ধরুন, একজন ছাত্র পড়াশোনা না করে শুধু প্রার্থনা করছে।
প্রচলিত বিশ্বাসে সে ভাবতে পারে ঈশ্বর হয়তো তাকে পরীক্ষায় পাশ করিয়ে দেবেন।
কিন্তু স্পিনোজা বলবেন ঈশ্বর বা প্রকৃতির নিয়ম এমন পরিশ্রম না করলে ফল হবে না। স্পিনোজার মতে ঈশ্বর কোনো আকাশের ওপরে বসা রাজা নন। ঈশ্বর মানে প্রকৃতির নিয়ম +মহাবিশ্বের সামগ্রিকতা। তাই প্রকৃতিকে বোঝা মানে ঈশ্বরকে বোঝা।
১. কুসংস্কার থেকে মুক্তি
স্পিনোজা বললেন, ঈশ্বর প্রকৃতি ছাড়া আর কিছু নন।
তাই, ঝড় হলে বা রোগ হলে ঈশ্বর রাগ করেছেন এমন ভয় বা কুসংস্কার অর্থহীন । বরং আমাদের বোঝা উচিত এটা প্রকৃতির নিয়মে হচ্ছে। এভাবে মানুষ ভয় বা অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্ত হতে পারে।
২. বিজ্ঞানের সঙ্গে ধর্মের মিল
স্পিনোজার ঈশ্বরের ধারণা বিজ্ঞানকে অস্বীকার করে না।
বিজ্ঞান বলে: নিয়মে মহাবিশ্ব চলছে।
স্পিনোজা বলেন সেই নিয়মই ঈশ্বর। ফলে ধর্ম ও বিজ্ঞানকে একে অপরের বিপরীতে না দেখে সমন্বয় করা যায়।
৩. সহনশীলতা ও মানবতা
যদি আমরা বুঝি যে আমরা সবাই প্রকৃতির অংশ, আর প্রকৃতিই ঈশ্বর তাহলে মানুষে মানুষে বিভেদ কমে যায়।
তুমি অন্য ধর্ম মানো, তুমি অন্য জাতি, তাই তুমি আলাদা এভাবে ভাবার জায়গা থাকে না। সবাই এক ঐক্যের অংশ।
৪. প্রকৃতির প্রতি সম্মান
স্পিনোজার ধারণা বলছে প্রকৃতিই ঈশ্বর।
তাহলে প্রকৃতিকে ধ্বংস করা মানে ঈশ্বরেরই ক্ষতি করা।
আজকের পরিবেশ আন্দোলন বা ইকো ফ্রেন্ডলি চিন্তা এর সঙ্গে এই ভাবনা বেশ মিলে যায়।
৫. ব্যক্তিগত জীবনে প্রভাব
স্পিনোজার মতে, সুখী হতে চাইলে প্রকৃতির নিয়ম বুঝে জীবন চালাতে হবে। যেমন অসুস্থ হলে শুধু প্রার্থনা না করে ডাক্তার দেখাতে হবে কারণ প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী চিকিৎসা করলে শরীর সুস্থ হয় । সফল হতে হলে পড়াশোনা বা পরিশ্রম জরুরি (শুধু ভাগ্যের উপর নির্ভর নয়)।
স্পিনোজার ধারণা মানুষের ধর্মীয় ভাবনাকে অলৌকিক শক্তি থেকে সরিয়ে প্রকৃতি, যুক্তি ও মানবিকতার দিকে টেনে আনে। আজকের দিনে এটা আমাদের শেখায় বিজ্ঞানের প্রতি আস্থা রাখা, প্রকৃতিকে সম্মান করা, মানবতার ঐক্য বোঝা, আর কুসংস্কার এড়িয়ে চলা।
ছোট গল্পের মাধ্যমে প্রকৃতির নিয়ম আর ঈশ্বর সম্পর্কে বিষয়টি আলোকপাত করা হলো।
রায়হান নামের এক তরুণ সবসময় চিন্তায় থাকত।
একদিন সে বনে হাঁটছিল আর মনে মনে ঈশ্বরকে ডাকছিল
হে ঈশ্বর, তুমি কোথায়? আমি কেন তোমাকে দেখতে পাই না?
তখন তার সামনে দিয়ে একটা হাওয়ার ঝাপটা বয়ে গেল, গাছের ডাল নড়ল, পাখি ডাকল, দূরে একটা নদী বয়ে চলল।
কিন্তু রায়হান বুঝল না, এগুলোর ভেতরেই তো সেই ঈশ্বর আছেন।
সে মসজিদে গিয়ে এক হুজুরকে জিজ্ঞেস করল—
ঈশ্বর আসলে কোথায়?
হুজুর হেসে বললেন
ঈশ্বরকে খুঁজতে আকাশে তাকিও না। চারপাশে তাকাও
সূর্য যখন ওঠে, গাছ যখন বাড়ে, নদী যখন বয়, মানুষ যখন ভালো কাজ করে এসবই প্রকৃতির নিয়ম। আর সেই প্রকৃতিই হলো ঈশ্বর।
রায়হান তখন বুঝলো
ঈশ্বর কোনো দূরের শাসক নন, বরং তিনি আছেন তার ভেতরেও, চারপাশের জগৎ জুড়ে। এটা বুঝতে পারার পর থেকে রায়হান কুসংস্কার মানা বন্ধ করল, প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শুরু করল, আর সবার সঙ্গে সহমর্মিতা দেখাতে লাগল।
তাহলে স্পিনোজার মতো ভাবলে ঈশ্বর মানে প্রকৃতির নিয়ম,
প্রকৃতিকে সম্মান করা মানেই ঈশ্বরকে সম্মান করা , আর মানুষে মানুষে কোনো বিভেদ নেই, কারণ সবাই সেই একই প্রকৃতির অংশ।
@ Monika Acharjee
১২
ভূতের ভয় নয়, বিজ্ঞানের আলোয়
শ্রীরামকৃষ্ণ শিশু তীর্থ হাই স্কুলে বিজ্ঞানমনস্কতা ও কুসংস্কারবিরোধী অনুষ্ঠান
কিছুদিন আগে শ্রীরামকৃষ্ণ শিশু তীর্থ হাই স্কুল, ডানকুনির একটি ভবনকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল চাঞ্চল্যকর এক খবর। প্রচার করা হয়েছিল, বিদ্যালয়ের ওই ভবনে নাকি “ভূত দেখা গেছে”! মুহূর্তের মধ্যে সেই খবর ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। বিষয়টি সংবাদমাধ্যমেরও নজরে আসে। বিদ্যালয়ে আসেন সাংবাদিকরা। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা ও বিদ্যালয়ের সম্পাদকের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। অনুসন্ধানে সামনে আসে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যে ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সংবাদমাধ্যমেও ভাইরাল হয়েছিল, সেটি বাস্তব কোনও ঘটনার ছবি নয়, AI বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি একটি ছবি।
একটি কৃত্রিম ছবি কীভাবে মানুষের মনে ভয়, সন্দেহ ও কৌতূহল তৈরি করতে পারে, সেই ঘটনাই যেন আমাদের সামনে একটি বড় শিক্ষা রেখে যায়। প্রযুক্তির যুগে শুধু চোখে দেখা বা সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত কোনও তথ্য বিশ্বাস করলেই হবে না, তার সত্যতা যাচাই করতে হবে। আর সেই যাচাইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হল বিজ্ঞানমনস্কতা ও যুক্তিবোধ।
এই প্রেক্ষাপটেই একটি হাই স্কুলে অনুষ্ঠিত হল এক গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞানমনস্কতা ও কুসংস্কারবিরোধী সচেতনতা অনুষ্ঠান। এই আলোচনায় উঠে এল ভূত, অলৌকিকতা, তন্ত্র-মন্ত্র, ঝাড়ফুঁক এবং তথাকথিত অতিপ্রাকৃত ঘটনাকে ঘিরে মানুষের বিশ্বাসের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ।
মূল বার্তাটি অত্যন্ত স্পষ্ট:
ভূতের ভয় নয়, প্রমাণ চাই।
অন্ধবিশ্বাস নয়, যুক্তি চাই।
কুসংস্কার নয়, বিজ্ঞানমনস্কতাই হোক পথের দিশা।
আমাদের চোখ কি সব সময় সত্যি বলে?
অনুষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের সামনে অত্যন্ত সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, আমাদের পাঁচটি ইন্দ্রিয় আসলে বাইরের জগতের তথ্য মস্তিষ্কে পৌঁছে দেয়। চোখ দেখে, কান শোনে, ত্বক স্পর্শ অনুভব করে, নাক গন্ধ পায়, জিহ্বা স্বাদ গ্রহণ করে। কিন্তু এই তথ্যগুলির চূড়ান্ত ব্যাখ্যা তৈরি করে আমাদের মস্তিষ্ক।
আর মস্তিষ্ক ভুল করতে পারে।
আমরা যা দেখি, তা সব সময় বাস্তবের সম্পূর্ণ ও নির্ভুল ছবি নয়। আলো-আঁধারি, ভয়, প্রত্যাশা, মানসিক চাপ, পূর্বধারণা কিংবা অসম্পূর্ণ তথ্যের কারণে মস্তিষ্ক অনেক সময় ভুল ব্যাখ্যা তৈরি করতে পারে। অন্ধকারে একটি গাছের ছায়াকে মানুষের অবয়ব মনে হওয়া, কোনও শব্দকে অস্বাভাবিক বলে মনে হওয়া কিংবা ঘুমের বিশেষ অবস্থায় কারও উপস্থিতি অনুভব করা তারই উদাহরণ।
তাই “আমি দেখেছি” মানেই “ঘটনাটি অলৌকিক” নয় বা ধ্রুব সত্য নাও হতে পারে।
চোখের সামনে অলৌকিক, কিন্তু আসলে বিজ্ঞান
অনুষ্ঠানে এমন কিছু প্রদর্শনী দেখানো হয়, যা সাধারণ মানুষের চোখে প্রথমে অবিশ্বাস্য বা অলৌকিক বলে মনে হতে পারে। আগুনের সঙ্গে এমন কিছু কৌশল দেখানো হয়, যাতে মনে হতে পারে আগুন শরীরে লাগলেও কোনও ক্ষতি হচ্ছে না।
এছাড়াও দেখানো হয় কীভাবে মানুষের চোখকে বিভ্রান্ত করে কাউকে “শূন্যে ভাসিয়ে” তোলার মতো দৃশ্য তৈরি করা যায়, কীভাবে মুখে আগুনের গোলা খাওয়ার মতো বিপজ্জনক প্রদর্শনীকে রহস্যময় করে তোলা হয় এবং কীভাবে তান্ত্রিক বা ঝাড়ফুঁককারীদের নানা তথাকথিত অলৌকিক কৌশলের পেছনে থাকতে পারে পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, মনোবিজ্ঞান, হাতসাফাই ও দৃশ্যভ্রমের মতো সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক কারণ।
উদ্দেশ্য ছিল কাউকে অপমান করা নয়, বরং রহস্যের আড়ালে থাকা বিজ্ঞানকে সামনে নিয়ে আসা।
যে বিষয়টি দূর থেকে অলৌকিক মনে হয়, তার কাছাকাছি গিয়ে প্রশ্ন করলেই অনেক সময় তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায়।
“ভূত” কোথায়?
আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ভূতের ধারণা নিয়ে আলোচনা।
ছাত্র-ছাত্রীদের বারবার বোঝানো হয়, ভূতের অস্তিত্বের কোনও নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। মানুষের ভয়, কল্পনা, গুজব, ভুল প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, ঘুমের সমস্যা, পরিবেশের অস্বাভাবিক শব্দ, আলো-আঁধারি এবং মস্তিষ্কের ভুল ব্যাখ্যা অনেক সময় “ভূত দেখার” অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে।
আজকের দিনে AI প্রযুক্তি যেমন অসাধারণ সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে, তেমনই এর অপব্যবহার করে মিথ্যা ছবি ও বিভ্রান্তিকর তথ্য তৈরি করাও সম্ভব। তাই ডিজিটাল যুগে বিজ্ঞানমনস্কতা মানে শুধু বিজ্ঞান পড়া নয়, তথ্যের সত্যতা যাচাই করার অভ্যাস তৈরি করাও বিজ্ঞানমনস্কতার অংশ।
প্রশ্ন করাই বিজ্ঞানের প্রথম পাঠ
শুধু বক্তৃতা নয়, তাদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করা হয়। বিভিন্ন প্রদর্শনী দেখার পর ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেদের প্রশ্ন ও মতামত তুলে ধরে।
তাদের উৎসাহিত করা হয় কোনও কিছু অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে প্রশ্ন করতে।
“কেন হল?”
“কীভাবে হল?”
“এর প্রমাণ কী?”
“অন্যভাবে পরীক্ষা করলে কি একই ফল পাওয়া যাবে?”
এই প্রশ্নগুলিই বিজ্ঞানমনস্কতার ভিত্তি।
বিজ্ঞান সব প্রশ্নের উত্তর এক মুহূর্তে দিতে পারে না। কিন্তু বিজ্ঞান মানুষকে শেখায় কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, কীভাবে প্রমাণ খুঁজতে হয় এবং প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত কোনও দাবিকে সত্য বলে মেনে না নিতে হয়।
শেষ কথা
ভূতের গল্প হয়তো মানুষের কল্পনাকে আনন্দ দেয়, কিন্তু ভূতের ভয় মানুষের চিন্তাকে অন্ধকার করে দিতে পারে। সেই অন্ধকার দূর করার জন্য দরকার যুক্তির আলো। @অরজিত
১৩
গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলার প্রভাব ইউরোপের আবহাওয়াতেও বড় পরিবর্তন
গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলার প্রভাব শুধু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি ইউরোপের আবহাওয়াতেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। নতুন এক গবেষণা বলছে, গ্রিনল্যান্ডের বিপুল পরিমাণ বরফগলা ঠান্ডা পানি উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের তাপমাত্রা বদলে দিয়ে জেট স্ট্রিমের গতিপথে পরিবর্তন ঘটাতে পারে। এর ফলে পশ্চিম ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র তাপপ্রবাহের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
গবেষকদের মতে, যে বছর ইউরোপের ওপর বড় ধরনের উচ্চচাপের রিজ তৈরি হয়, তার আগের গ্রীষ্মে গ্রিনল্যান্ডের বরফস্তর থেকে গড়ে প্রায় ৮১ বিলিয়ন টন অতিরিক্ত গলিত পানি উত্তর আটলান্টিকে পৌঁছাতে পারে। এই ঠান্ডা মিষ্টি পানি সমুদ্রপৃষ্ঠকে ঠান্ডা করে এবং নিচের তুলনামূলক উষ্ণ ও লবণাক্ত পানির সঙ্গে মিশতে বাধা দেয়। এর ফলে সমুদ্রের উষ্ণ-ঠান্ডা পানির মধ্যে তাপমাত্রার বড় পার্থক্য তৈরি হয়, যা জেট স্ট্রিমকে আরও আঁকাবাঁকা করে তুলতে পারে।
এই পরিবর্তিত জেট স্ট্রিম ইউরোপের ওপর দীর্ঘস্থায়ী উচ্চচাপের অঞ্চল তৈরি করতে পারে। তখন মেঘ কমে গিয়ে আকাশ পরিষ্কার থাকে এবং প্রচণ্ড গরম দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতির ভয়াবহ উদাহরণ ২০০৩ সালের ইউরোপীয় তাপপ্রবাহ, যাতে প্রায় ৭০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। গবেষকদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে বিশেষ করে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে তাপপ্রবাহ ও খরা আরও তীব্র হতে পারে।
তবে বিজ্ঞানীরা এটাও বলছেন, গ্রিনল্যান্ডের বরফগলা পানি ও এই আবহাওয়াগত পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক এখনও পুরোপুরি প্রমাণিত নয়। উত্তর আটলান্টিকের সামুদ্রিক স্রোতব্যবস্থা বা বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহের স্বাভাবিক পরিবর্তনের মতো অন্যান্য কারণও এখানে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্ভাব্য যোগসূত্র তুলে ধরলেও বিষয়টি নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
@MD Ruman Soiyod
১৪
কোষের “পাওয়ার হাউজ” মাইটোকন্ড্রিয়া
*আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষের ভেতরে থাকা মাইটোকন্ড্রিয়াকে বলা হয় কোষের “পাওয়ার হাউজ”।* বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাইটোকন্ড্রিয়াগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু কেন এমন হয়? এবার সেটারই একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষের ভেতরে থাকা মাইটোকন্ড্রিয়াকে কোষের পাওয়ার হাউজ বলা হয়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে মাইটোকন্ড্রিয়াগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু কেন? এবার সেটারই গুরুত্বপূর্ণ কারণ খুঁজে পেলেন বিজ্ঞানীরা।
জার্মানির Leibniz Institute on Aging-এর গবেষকরা দেখেছেন*
বয়স বাড়ার সঙ্গে মাইটোকন্ড্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ চর্বিজাত উপাদান ফসফাটিডাইলকোলিন (phosphatidylcholine) কমে যায়। এই উপাদান কমে গেলে মাইটোকন্ড্রিয়া নিজেদের মধ্যে জোড়া লাগানো, আকার বদলানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা হারাতে থাকে। যার ফলে কোষ পর্যাপ্ত শক্তি পায় না এবং বয়সজনিত ক্ষয় দ্রুত বাড়তে পারে।
*তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, এই প্রক্রিয়াটিকে থামানো সম্ভব!* গবেষণায় পূর্ণবয়স্ক C. elegans কৃমি এবং চাপের মধ্যে থাকা মানব কোষে ফসফাটিডাইলকোলিন বা এর পূর্বসূরি কোলিন (choline) সরবরাহ করা হলে মাইটোকন্ড্রিয়ার গঠন ও কার্যক্ষমতায় আবার তরুণ অবস্থার মতো পরিবর্তন দেখা যায়। অর্থাৎ, বয়স বাড়ার সঙ্গে মাইটোকন্ড্রিয়ার যে ক্ষয় হয়, তার অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে পরিবর্তনযোগ্য বা “ম্যালিয়েবল” বলে মনে হচ্ছে।
*ফসফ্যাটিডিলকোলিন কী?*
ফসফ্যাটিডিলকোলিন (Phosphatidylcholine) একটি গুরুত্বপূর্ণ ফসফোলিপিড, যা মানবদেহের প্রায় প্রতিটি কোষের কোষঝিল্লির (Cell Membrane) অন্যতম প্রধান উপাদান। এটি লেসিথিনের একটি প্রধান উপাদান এবং শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে।
এর প্রধান ভূমিকা
*কোষের স্বাস্থ্য:*
কোষের ঝিল্লির গঠন, স্থিতিস্থাপকতা ও স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
*মস্তিষ্কের কার্যকারিতা:*
ফসফ্যাটিডিলকোলিন শরীরে কোলিনের উৎস হিসেবে কাজ করে। কোলিন থেকে অ্যাসিটাইলকোলিন তৈরি হয়, যা স্মৃতি, শেখা ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যকারিতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
*লিভারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ:*
লিভারের কোষের স্বাভাবিক গঠন ও কার্যকারিতা বজায় রাখতে ফসফ্যাটিডিলকোলিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
*কোথায় পাওয়া যায়?*
ফসফ্যাটিডিলকোলিন বা কোলিনসমৃদ্ধ খাবারের মধ্যে রয়েছে— ডিমের কুসুম সয়া ও সূর্যমুখীর লেসিথিন, মাছ, মাংস বিভিন্ন প্রাণিজ ও উদ্ভিজ্জ খাদ্য। সহজ কথায় হলো, শরীরের কোষ, স্নায়ুতন্ত্র ও লিভারের স্বাভাবিক গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ ফসফোলিপিড।
*বিশেষ দ্রষ্টব্য:*
ডিমের কুসুম বা রেড মিট খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর... বিশেষ করে চল্লিশের পর, সেটা একেবারেই অবান্তর, অবৈজ্ঞানিক প্রচলিত কথা। হজম ক্ষমতা এবং কাজকর্ম দৈনন্দিন পরিশ্রম অনুযায়ী যেকোনো স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া যায়। আর মাছ মাংস এবং ডিম খুব সহজে দেহের প্রয়োজনীয় পুষ্টি মেটাতে সক্ষম। তবে ওই যে বললাম হজম ক্ষমতা এবং পরিশ্রম অনুযায়ী খাবার খাওয়া হলে সেটা উপকারী। @ Kartick Saha
১৫
হাঁটলেই বদলাবে শরীর!
শরীরকে সুস্থ ও সক্রিয় রাখতে সবসময় কঠিন ব্যায়াম বা জিমের প্রয়োজন হয় না। প্রতিদিনের সহজ হাঁটাও হতে পারে শরীরচর্চার দারুণ একটি উপায়।
নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস শরীরকে সক্রিয় রাখার পাশাপাশি হৃদ্স্বাস্থ্য, ওজন নিয়ন্ত্রণ, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, পেশি ও হাড়ের সুস্থতা এবং মানসিক ভালো থাকায় ভূমিকা রাখতে পারে।
নিয়মিত হাঁটার ১০টি চমৎকার উপকারিতা
শরীরের অতিরিক্ত ক্যালরি খরচে সহায়তা করে
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে
হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক
রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে
পেশি ও হাড়কে সক্রিয় রাখতে সহায়তা করে
শরীরের কর্মক্ষমতা ও স্ট্যামিনা বাড়াতে সাহায্য করে
মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমাতে সহায়ক হতে পারে
ঘুমের মান ভালো করতে সাহায্য করতে পারে
দৈনন্দিন জীবনে কর্মচাঞ্চল্য ও সতেজতা বাড়ায়
আজ থেকেই শুরু হোক হাঁটার অভ্যাস।
লিফটের বদলে সিঁড়ি, কাছের গন্তব্যে গাড়ির বদলে হাঁটা কিংবা প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় হাঁটা—ছোট ছোট পদক্ষেপই গড়ে তুলতে পারে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—নিয়মিত থাকা।
আজকের ছোট্ট হাঁটাটাই হতে পারে আগামী দিনের সুস্থ শরীরের ভিত্তি।
তাই সময় পেলেই বসে না থেকে—হাঁটুন, সক্রিয় থাকুন, সুস্থ থাকুন।
@ হেলথ লাইফ
১৬
উত্তর বোর্নিও অঞ্চলে বিয়ের পর তিন দিন ও তিন রাত টয়লেট ব্যবহার, প্রস্রাব, মলত্যাগ কিংবা গোসল নিষিদ্ধ
উত্তর বোর্নিও অঞ্চলে বসবাসকারী টিডং জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিয়ের পর একটি ব্যতিক্রমী রীতি প্রচলিত আছে। এই রীতিতে নবদম্পতিকে টানা ৭২ ঘণ্টা, অর্থাৎ তিন দিন ও তিন রাত টয়লেট ব্যবহার, প্রস্রাব, মলত্যাগ কিংবা গোসল- সবকিছু থেকে বিরত থাকতে হয়।
স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই সময়কে একধরনের 'গৃহবন্দিত্ব' হিসেবে ধরা হয়। টিডং সম্প্রদায়ের ধারণা, এই নিয়ম মেনে চললে দাম্পত্যজীবনে পরকীয়া, বিবাহবিচ্ছেদ কিংবা সন্তানের অকালমৃত্যুর ঝুঁকি কমে আসে। এর মাধ্যমে নবদম্পতির দীর্ঘ, সুখী ও স্থিতিশীল দাম্পত্যজীবন নিশ্চিত হয় বলে তারা বিশ্বাস করে।
এই তিন দিনে দম্পতিকে খুব অল্প পরিমাণ খাবার ও পানি দেওয়া হয়। একইসঙ্গে পরিবারের সদস্য বা প্রবীণরা তাদের ওপর নজর রাখেন, যাতে কেউ নিয়ম ভঙ্গ না করে। পুরো প্রক্রিয়াকে শারীরিক ও মানসিক সহনশীলতার একটি কঠিন পরীক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
নির্ধারিত সময় শেষ হলে নবদম্পতিকে গোসল করতে দেওয়া হয়। এরপর আয়োজন করা হয় একটি ছোট উৎসবের, যা এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। টিডং জনগোষ্ঠীর মতে, এই রীতি সফলভাবে সম্পন্ন হওয়াই একটি দীর্ঘস্থায়ী ও দৃঢ় দাম্পত্য জীবনের সূচনা করে।
@ইতিহাসের গল্প
১৭
"পাথরে লেখা হাজার বছরের ইতিহাস!"
ছবিতে দেখা যাচ্ছে প্রাচীন মিশরের দেয়ালে খোদাই করা অসংখ্য হায়ারোগ্লিফিক চিহ্ন। এগুলো নিছক অলংকরণ নয়—প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার ধর্মীয় বিশ্বাস, রাজাদের কীর্তি, আচার-অনুষ্ঠান ও নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষণের অন্যতম মাধ্যম ছিল এই লিপি।
হাজার হাজার বছর আগে পাথরের গায়ে খোদাই করা এই প্রতীকগুলো আজও আমাদের সামনে প্রাচীন মিশরের জ্ঞান, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের এক অসাধারণ জানালা খুলে দেয়।
হায়ারোগ্লিফিক লিপির উৎপত্তি খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দের শেষভাগে এবং এটি প্রায় তিন হাজার বছর ধরে বিভিন্ন রূপে ব্যবহৃত হয়েছে।
প্রাচীন মিশরের হায়ারোগ্লিফ যেন পাথরের পাতায় লেখা এক জীবন্ত ইতিহাস। আজ আমরা যেসব চিহ্ন দেখি, সেগুলোর পেছনে রয়েছে একটি হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার ভাষা, বিশ্বাস ও জীবনযাত্রার গল্প।
আধুনিক গবেষণা ও প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের মাধ্যমে সেই নীরব পাথরগুলো আবার কথা বলতে শিখেছে—আর আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সভ্যতার স্মৃতি সময়ের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। @ ইতিহাসের ইতিকথা
১৮
অ্যানিমোন
অ্যানিমোনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রেম, বিরহ, মৃত্যু, শোক এবং পুনরুত্থানের নানা কাহিনি। ফুলটির ইংরেজি নাম windflower - অর্থাৎ ‘বাতাসের ফুল’। প্রাচীন বিশ্বাস ছিল, বসন্তের প্রথম কোমল বাতাস বইতে শুরু করলেই অ্যানিমোন তার পাপড়ি মেলে ধরত। এই ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্যের মধ্যেই যেন ফুলটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে জীবনের অনিত্যতার একটি ইঙ্গিত।
গ্রিক পুরাণে অ্যানিমোনের জন্মকথা প্রেম ও মৃত্যুর এক করুণ পরিণতির সঙ্গে যুক্ত। শিকারে গিয়ে বন্য শূকরের আক্রমণে মৃত্যুবরণ করেন অ্যাডোনিস। তাঁর প্রতি দেবী ভেনাসের প্রেম ছিল গভীর, কিন্তু সেই প্রেমের আহ্বানের চেয়েও শিকারের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল প্রবল। অ্যাডোনিসের মৃত্যুর পর ভেনাসের চোখের জল মাটিতে ঝরে পড়ে। দেবীর অশ্রু এতই মূল্যবান যে তা যেন বাতাসে মিলিয়ে যেতে পারে না - পৃথিবীও তাই স্বর্গীয় এক রূপান্তরের মাধ্যমে সেই অশ্রুকে পরিণত করল অ্যানিমোন ফুলে।
তবে অ্যানিমোনের আরেকটি গ্রিক কাহিনিতে তার জন্ম আরও ব্যক্তিগত এক বেদনার সঙ্গে যুক্ত। ক্লোরিসের রাজসভায় ছিল অ্যানিমোন নামে এক সুন্দরী তরুণী। পশ্চিমা বাতাসের দেবতা জেফিরাস তাঁর প্রেমে পড়েছিলেন। জেফিরাস ছিলেন সেই বাতাসের দেবতা, যার নিঃশ্বাসে পৃথিবীতে ফুল ও ফলের জন্ম নেয়। ক্লোরিস মনে করেছিলেন, জেফিরাস হয়তো তাঁকেই বিবাহের প্রস্তাব দিতে চলেছেন। কিন্তু অ্যানিমোনের প্রতি তাঁর আকর্ষণের কথা জানতে পেরে ক্লোরিস ক্রুদ্ধ হন এবং তরুণীটিকে তাঁর সান্নিধ্য থেকে দূরে সরিয়ে দেন।
প্রিয়জনকে হারিয়ে অ্যানিমোন তখন ভেঙে পড়েন। তাঁর দুঃখ ও বিষণ্নতা দেখে জেফিরাসও শেষ পর্যন্ত তাঁকে ছেড়ে চলে যান। বিদায়ের সময় সেই অসহায় তরুণীকে তিনি এমন এক ফুলে রূপান্তরিত করেন, যার নাম হয়ে থাকে অ্যানিমোন। তাই জার্মান ভাষায় ফুলটির একটি পুরোনো নামের অর্থ দাঁড়ায় ‘ছোট বাতাসের গোলাপ’।
প্রাচীন গ্রিক ও রোমানদের কাছে অ্যানিমোন ছিল প্রেমের দেবী ভেনাসের সঙ্গে সম্পর্কিত ফুল। দেবীর বেদি সাজাতে এই ফুল ব্যবহার করা হতো, কারণ এটি তাঁর প্রেমের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত ছিল। কিন্তু একই ফুল আবার মৃতদের স্মরণেও ব্যবহৃত হতো।
আবার চীনা সংস্কৃতিতে অ্যানিমোনের সঙ্গে শোক ও দুঃখের সম্পর্ক আরও স্পষ্ট। সেখানে ফুলটিকে কখনও কখনও মৃত্যুর ফুল হিসেবেও দেখা হয় এবং তার সঙ্গে বেদনা ও দুর্ভোগের নানা প্রতীকী অর্থ জড়িয়ে আছে। ফুলটির এই অশুভ ভাবমূর্তি অবশ্য সর্বত্র ছিল না। রোমানরা বরং অ্যানিমোন সংগ্রহ করত ম্যালেরিয়ার জ্বরের চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য। সেই সময়ে ইতালির ক্যাম্পাগনা অঞ্চলের জলাভূমি থেকে মশার মাধ্যমে ম্যালেরিয়া ছড়িয়ে পড়ত; ফলে যে ফুল অন্য সংস্কৃতিতে মৃত্যুর প্রতীক, রোমানদের কাছে সেটিই হয়ে উঠেছিল রোগের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত একটি উদ্ভিদ।
অ্যানিমোনের সঙ্গে মৃত্যুর সম্পর্ক থাকলেও ইউরোপের কিছু অঞ্চলে আবার এটি হয়ে উঠেছে পুনর্জন্ম ও অমরত্বের প্রতীক। বহু জায়গায় ফুলটিকে ‘ইস্টার ফুল’ কিংবা ‘পুনরুত্থানের ফুল’ বলা হয়। জার্মানদের ইস্টার উৎসবেও এর উপস্থিতি ছিল। এমনকি ‘কাউ-বেল’ নামে পরিচিত এক রূপে অ্যানিমোন দিয়ে গরুর গলায় মালা পরানোর রীতিও ছিল।
খ্রিস্টীয় লোকবিশ্বাসে অ্যানিমোনের আরও একটি করুণ কাহিনি প্রচলিত। পবিত্র ভূমিতে একে বলা হয় ‘খ্রিস্টের রক্তবিন্দু’। বিশ্বাস করা হয়, ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার দিন সন্ধ্যায় কালভেরির মাটিতে যেসব অ্যানিমোন ফুটে ছিল, খ্রিস্টের রক্ত তাদের ওপর ঝরে পড়েছিল। সেই মুহূর্ত থেকেই ফুলগুলোর রং লাল হয়ে যায়।
অ্যানিমোনের প্রতীকের আরেকটি দিক আসে খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ব থেকে। এর তিনটি পত্রবিশিষ্ট একটি রূপকে প্রাচীন খ্রিস্টীয় পিতৃগণ ঈশ্বরত্বের তিন ব্যক্তিসত্তার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করতেন। সেই কারণেই ফুলটির আরেক নাম হয়ে ওঠে ‘Herb Trinity’।
লেখকঃ তিলোত্তমা সরকার তিথি
তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতাঃ
Skinner, Charles M. Myths and Legends of Flowers, Trees, Fruits, and Plants: In All Ages and in All Climes. Philadelphia & London: J. B. Lippincott Company, 1911.
১৯
শাশুড়ির সঙ্গে বৌমা যেভাবে গড়বেন মধুর সম্পর্ক
সংসারে শাশুড়ি ও বৌমার সম্পর্কটি অনেক সময় অকারণ ভুল বোঝাবুঝি, প্রত্যাশা ও অভ্যাসের পার্থক্যে কঠিন হয়ে ওঠে। অথচ একটু ধৈর্য, সম্মান ও আন্তরিকতা থাকলে এই সম্পর্কটিই হয়ে উঠতে পারে মা-মেয়ের মতো সুন্দর। গবেষক কীরা অ্যালেনডর্ফ (Keera Allendorf) ভারতের একটি গ্রামে ২২টি পরিবারের ৪৬ জন সদস্যের সাক্ষাৎকার নিয়ে দেখেছেন, শাশুড়ি ও বৌমার সম্পর্কে ভালোবাসা ও বোঝাপড়ার পাশাপাশি টানাপোড়েনও থাকে, আর পারিবারিক কাঠামো সেই সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। এই গবেষণাটি ২০০৬ সালে Journal of Family Issues-এ প্রকাশিত হয় এবং এতে দেখা যায়, শাশুড়ি ও বৌমা একই পরিবারের মানুষ হলেও তাঁদের ভূমিকা ও প্রত্যাশা এক নয়। তাই শুরুতেই একে অপরকে নিজের মতো করে বদলানোর চেষ্টা না করে মানুষ হিসেবে বুঝতে শেখা জরুরি। সম্পর্ক ভালো করার প্রথম শর্ত হলো, দুজনের কাছেই সম্মান যেন থাকে।
শাশুড়ির উচিত নতুন বৌমাকে নিজের সময়ের নিয়মে সবকিছু করতে বাধ্য না করা। বৌমারও মনে রাখা দরকার, শাশুড়ি দীর্ঘদিন ধরে এই সংসার সামলেছেন এবং তাঁর অনেক অভিজ্ঞতা আছে। ২০০৬ সালের ওই গবেষণায় দেখা যায়, অনেক পরিবারে শাশুড়ি ও বৌমার সম্পর্ককে মা-মেয়ের মতো ভাবার একটি ইতিবাচক প্রত্যাশা থাকে, যদিও বাস্তবে সেই সম্পর্ক সবসময় একই রকম হয় না। তাই পুরোনো অভিজ্ঞতা ও নতুন প্রজন্মের চিন্তাকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর বদলে দুজনের ভালো দিকগুলো মিলিয়ে নেওয়া উচিত। বৌমা কোনো কাজে ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করলে শাশুড়ি সঙ্গে সঙ্গে সেটিকে ভুল না ধরে কারণটি জানতে পারেন। একইভাবে শাশুড়ির কোনো পরামর্শ পছন্দ না হলে বৌমা রাগ না করে শান্তভাবে নিজের মতটি বোঝাতে পারেন।
কথার ধরন অনেক সময় কথার বিষয়বস্তুর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গবেষক ক্রিস্টিন রিটেনোর ও জর্ডান সলিজ ২০০৯ সালে ১৯০ জন বৌমার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, সহায়ক যোগাযোগ এবং পরিবারের সঙ্গে একটি যৌথ পরিচয়ের অনুভূতি শাশুড়ি-বৌমার সম্পর্কের মানের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ শুধু ভালো কথা বললেই হবে না, এমনভাবে কথা বলতে হবে যাতে অন্যজন বুঝতে পারেন যে তিনি এই পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ। শাশুড়ি যদি সবার সামনে বৌমার ভুল ধরার বদলে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেন, তাহলে অপমানের অনুভূতি কমে যায়। বৌমাও শাশুড়ির কোনো আচরণে কষ্ট পেলে অন্যের কাছে অভিযোগ ছড়ানোর আগে সরাসরি ও ভদ্রভাবে বিষয়টি জানাতে পারেন। এতে ছোট সমস্যা বড় ঝগড়ায় পরিণত হওয়ার সুযোগ কমে এবং সম্পর্কের মধ্যে বিশ্বাস বাড়ে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, শাশুড়ির সঙ্গে নেতিবাচক যোগাযোগ দাম্পত্য সন্তুষ্টির সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে। মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি পুত্রার গবেষক মেই সান লিয়ং ও রুমায়া জুহারি ১৯৭ জন বিবাহিত কর্মজীবী চীনা দম্পতির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, শাশুড়ির সঙ্গে ইতিবাচক ও নেতিবাচক যোগাযোগ দাম্পত্য জীবনের সন্তুষ্টির সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। তাঁদের গবেষণাটি ২০২১ সালে Malaysian Journal of Social Sciences and Humanities-এ প্রকাশিত হয়। তাই স্বামীকে প্রতিবার মা ও স্ত্রীর মধ্যে বিচারকের আসনে বসানো ঠিক নয়, বরং দুজনেরই উচিত নিজেদের সম্পর্ক নিজেরা যতটা সম্ভব সুন্দরভাবে সামলানো। শাশুড়ি বৌমার ব্যক্তিগত বিষয়ে অযথা হস্তক্ষেপ না করলে এবং বৌমা শাশুড়ির ব্যক্তিগত সম্মান ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিলে সংসারে চাপ অনেকটাই কমে। সংসারের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া, একে অপরের পরিশ্রমের মূল্য দেওয়া এবং প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো সম্পর্ককে আরও গভীর করে।
সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, শাশুড়ি ও বৌমাকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, একই পরিবারের দুই প্রজন্মের নারী হিসেবে দেখতে হবে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত চীনের একটি গুণগত গবেষণায় টিং চাই ও জুনশিয়া হোউ দেখিয়েছেন, শাশুড়ি-বৌমার সম্পর্কে ক্ষমতার টানাপোড়েনের পাশাপাশি স্থিতিশীলতার জন্য সহযোগিতার প্রয়োজনও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকদের পর্যবেক্ষণে পারস্পরিক ভদ্রতা, কথাবার্তার ধরন ও পরিবারের ভেতরের ক্ষমতার ভারসাম্য সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই শাশুড়ি যদি বলেন, “তুমি আমার মেয়ের মতো”, তবে সেই কথার সঙ্গে আচরণেও মমতা থাকতে হবে, আর বৌমার মুখেও “আপনি আমার মায়ের মতো” কথাটি যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতা না হয়। ভুল হলে ক্ষমা চাওয়া, ভালো কিছু হলে প্রশংসা করা এবং কষ্ট পেলে চুপচাপ জমিয়ে না রাখা এই সম্পর্ককে অনেক বেশি মানবিক করে তোলে। একটি সংসারে ভালোবাসা জোর করে তৈরি করা যায় না, কিন্তু সম্মান, সহনশীলতা, সহযোগিতা ও সুন্দর আচরণের মাধ্যমে সেই ভালোবাসার জায়গাটি ধীরে ধীরে তৈরি করা যায়।
তথ্যসূত্র
Allendorf, Keera. “Like Her Own: Ideals and Experiences of the Mother-in-Law/Daughter-in-Law Relationship.” Journal of Family Issues, 2006/2015. Indiana University.
২০
কেন গুজরাতিরা এত ধনী হয়? জেনে নিন তাদের টাকার ৫টি গোপন নিয়ম!
ব্যবসা এবং অর্থ ব্যবস্থাপনায় গুজরাতিদের দক্ষতা বিশ্বজুড়ে পরিচিত। আম্বানি বা আদানির মতো পরিবারগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে নিয়মগুলো মেনে চলে, সেগুলো নিচে সহজভাবে আলোচনা করা হলো:
1. গোপনীয়তা বজায় রাখা (Don't Tell Anyone):
আপনার কাছে কত টাকা আছে বা হুট করে অনেক টাকা চলে এল—তা ভুলেও কাউকে বলবেন না। এমনকি খুব কাছের বন্ধু বা আত্মীয়কেও নয়। কারণ, টাকা পাওয়ার খবর জানাজানি হলে মানুষ সাহায্য চাইতে বা ধার নিতে ভিড় করবে, যা আপনার সঞ্চয়ে টান ফেলতে পারে। গুজরাতিদের মতে, 'গোপনীয়তাই হলো সম্পদের সুরক্ষা'।
2. টাকাকে একটু সময় দিন (Let the Money Breathe):
হুট করে বড় অংকের টাকা হাতে এলে অন্তত কয়েকদিন দিন পর্যন্ত তা স্পর্শ করবেন না। তাড়াহুড়ো করে কোথাও ইনভেস্ট বা শপিং করবেন না। টাকাটা এক জায়গায় থাকতে দিন এবং শান্ত মাথায় ভাবুন তা দিয়ে কী করবেন। ৯০ শতাংশ আর্থিক ক্ষতি হয় আবেগপ্রবণ হয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে।
3. লাইফস্টাইল হুট করে বদলাবেন না (Avoid Sudden Lifestyle Change):
টাকা এসেছে বলেই দামি গাড়ি, নতুন ঘর বা ব্র্যান্ডের ঘড়ি কিনতে যাবেন না। প্রকৃত ধনীরা কখনও শো-অফ বা লোক দেখানো জীবনযাপনে বিশ্বাসী নন। তারা বরং উপার্জিত অর্থ আবার ব্যবসায় খাটান (Reinvest), যাতে সেই টাকা আরও টাকা তৈরি করতে পারে। সাধারণ জীবনযাপনই হলো দীর্ঘস্থায়ী সমৃদ্ধির চাবিকাঠি।
4. সম্পর্ক ও টাকাকে আলাদা রাখা (Never Mix Relationships with Money):
বন্ধুত্ব বা আত্মীয়তার মাঝে কখনও ব্যবসা বা বড় অংকের লেনদেন আনবেন না। যখনই সম্পর্কের মাঝে টাকা ঢুকে পড়ে, তখনই সেখানে তিক্ততা শুরু হয়। তাই সম্পর্ক আর টাকাকে সবসময় দুটি আলাদা রাস্তায় রাখা উচিত।
5. বাচ্চাদের ছোট থেকে স্বাবলম্বী করা (Teach Kids Self-Reliance):
বাচ্চারা ছোট থাকতেই তাদের বাড়ির সম্পদের পরিমাণ জানতে দেবেন না। তাদের বিলাসবহুল জীবন দেওয়ার বদলে পরিশ্রম করতে শেখান। অনেক গুজরাতি ব্যবসায়ী তাদের সন্তানদের খুব ছোটবেলা থেকেই দোকানের কাউন্টারে বসান বা ব্যবসায়িক পরিবেশের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন, যাতে তারা
নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখে।
সারকথা: ধনী হওয়া যতটা না ভাগ্যের ব্যাপার, তার চেয়েও বেশি হলো সঠিক নিয়ম ও শৃঙ্খলার বিষয়। এই ৫টি নিয়ম আপনার জীবনকেও বদলে দিতে পারে।
২১
হাজ্জাজ বিন ইউসুফ
হাজ্জাজ বিন ইউসুফ নাম শুনলে অনেকের কাছে ছোটবেলার ইতিহাস বইয়ের কথা মনে হয়ে যেতে পারে। সিন্ধুর রাজা দাহিরের কথা। যে হাজ্জাজের হুকুমে মুহাম্মাদ বিন কাসিম সিন্ধু বিজয় করেন। কিন্তু সে বইগুলোতে অবশ্য এটা লেখা ছিল না যে, হাজ্জাজ বিন ইউসুফ একজন সাহাবী হত্যাকারীও ছিলেন । হাজ্জাজ বিন ইউসুফ যে একজন সাহাবি হত্যাকারী ও কাবা শরীফ ধংসকারী সেটা আমি ছোট বেলার বইতে পাই নি। বরং আমার পড়া সবচেয়ে ভয়ংকর শাসক হচ্ছেন এই হাজ্জাজ বিন ইউসুফ।বলা যায় ভ্লাদ দ্য ইম্পেলারের সমতুল্য।তার হিংস্রতার কাহিনী এক লেখায় তুলে ধরা সম্ভব না। তারপরও লেখার চেষ্টা করছি
তার সবচেয়ে খারাপ কাজের একটা হচ্ছে কাবা শরীফ ধংস করা । উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিকের নির্দেশে ৬৯২ খ্রিষ্টাব্দে (৭৩ হিজরি) হাজ্জাজ বিন ইউসুফ মক্কা অবরোধ করেন। সেই সময়ে মক্কার শাসনভার ছিল বিশিষ্ট সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.)-এর হাতে।হাজ্জাজ মক্কা অবরোধ করে আবু কুবাইস পাহাড়ে 'মানজানিক' (ক্যাটাপোল্ট বা পাথর নিক্ষেপক যন্ত্র) স্থাপন করেন। সেখান থেকে পবিত্র কাবা শরীফ লক্ষ্য করে অনবরত পাথর নিক্ষেপ করা হয়। এই আক্রমণের ফলে কাবা শরীফের দেয়ালে ফাটল ধরে এবং এক পর্যায়ে গিলাফে আগুন লেগে কাবার মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি হয়। কাবার মতো পবিত্র স্থানে এমন আক্রমণ তৎকালীন মুসলিম বিশ্বকে গভীরভাবে স্তব্ধ করেছিল।
মক্কা অবরোধের শেষ পর্যায়ে প্রথম খলিফা আবু বকরের (রা.) নাতি এবং বিশিষ্ট সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.) বীরত্বের সাথে লড়াই করে শহীদ হন। হাজ্জাজ তাঁর মৃতদেহকে সম্মান জানানোর বদলে মক্কার প্রবেশদ্বারে ক্রুশবিদ্ধ করে ঝুলিয়ে রাখেন, যা ছিল চরম ধৃষ্টতা। এই সেই আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের, যিনি মদিনায় জন্মগ্রহন করা প্রথম মুসলিম শিশু ছিলেন।যার জন্ম উপলক্ষে রাসুল(সাঃ) সয়ং খুশী হয়েছিলেন।
বিশিষ্ট সাহাবী আনাস ইবনে মালিক (রা.)-কেও হাজ্জাজ চরম অপমান করেছিলেন এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতার মিথ্যা অভিযোগ এনে তাঁকে ভয়ভীতি দেখিয়েছিলেন। পরবর্তীতে খলিফা আবদুল মালিকের কঠোর হস্তক্ষেপে হাজ্জাজ নিবৃত্ত হন।
ইরাকের গভর্নর হিসেবে কুফায় পৌঁছে মসজিদে তিনি যে ভাষণ দেন, তা ইতিহাসে বিখ্যাত। তিনি বলেছিলেন, "আমি এমন কিছু মাথা দেখতে পাচ্ছি যা পেকে গেছে, এবং সেগুলো কাটার সময় এসেছে।বিদ্রোহ দমনের নামে তিনি বিনা বিচারে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেন। ঐতিহাসিকদের মতে, তাঁর শাসনামলে প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।তাঁর কারাগারগুলোতে কোনো ছাদ ছিল না, ফলে বন্দিদের রোদ-বৃষ্টিতে চরম মানবেতর জীবন কাটাতে হতো। তাঁর কারাগারে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষ বিনা বিচারে বন্দি ছিল।
প্রখ্যাত তাবেয়ী ও মুফাসসির সাঈদ বিন জুবায়েরকে হত্যার ঘটনা হাজ্জাজের নিষ্ঠুরতার সবচেয়ে ভয়ংকর উদাহরণ। সাঈদ (র.) হাজ্জাজের স্বৈরাচারের প্রতিবাদ করেছিলেন। তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। মৃত্যুর আগে সাঈদ বদদোয়া করেছিলেন যেন তাঁর পরে হাজ্জাজ আর কাউকে হত্যা করতে না পারে। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, এই ঘটনার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই হাজ্জাজ ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন ও অসুস্থতায় ভুগে মারা যান। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ইসলামি সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটালেও, তাঁর এই রক্তপিপাসু ও স্বৈরাচারী নীতির কারণে মুসলিম ঐতিহাসিকরা তাকে কখনোই ক্ষমা করেননি।
২২
চীনের সোলার প্যানেল
চীনের জনসংখ্যা আমাদের দেশের চেয়ে প্রায় ৮.২ গুণ। অথচ চীন প্রতিদিন কেবল সোলার প্যানেল দিয়েই যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, তা বাংলাদেশের মোট দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদার প্রায় ১০ গুণ!
অর্থাৎ, চীন যদি আজ বাংলাদেশ হতো এবং তাদের সেই সোলার উৎপাদনকে আমাদের জনসংখ্যার অনুপাতে ভাগ করা হতো, তবে দেশের শিল্প কারখানা, বাসাবাড়ির সব চাহিদা মিটিয়েও প্রতিদিন অন্তত ২০% সৌরবিদ্যুৎ অতিরিক্ত উদ্বৃত্ত থেকে যেতো!
এখন চিন্তা করুন, আমরা যদি তেল, গ্যাস আর কয়লার এই সর্বনাশা নির্ভরতা কমিয়ে সোলারে সঠিক ফোকাস দিতাম, তবে কী হতো?
১. প্রতিদিন কয়লা ও ফার্নেস অয়েল পুড়িয়ে যে বিষাক্ত নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার ও সূক্ষ্ম ধূলিকণা বাতাসে ছড়ানো হচ্ছে— যা আমাদের হৃদরোগ, ফুসফুসের ক্যান্সার ও স্ট্রোকের মতো ব্যাধির অন্যতম মূল কারণ, তা শূন্যের কোঠায় নেমে আসতো।
২. থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্টের বিষাক্ত ছাই এবং নদীর ইকোসিস্টেম ধ্বংসকারী তাপীয় দূষণ বন্ধ হতো, বেঁচে যেতো আমাদের নদী ও মাছ।
৩. প্রতি বছর কোটি কোটি ডলারের কয়লা-তেল-এলএনজি আমদানির নামে যে বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে চলে যাচ্ছে, তা চিরতরে বন্ধ হতো।
কিন্তু সমস্যাটা কোথায়?
সমস্যাটা প্রযুক্তি বা প্রকৃতির নয়; সমস্যাটা নীতি-নির্ধারকদের টেবিল আর চেয়ারের মগজে!
কোনো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আর্টস বা কমার্স ব্যাকগ্রাউন্ডের হলে আমরা পত্রিকায় কলাম লিখি, ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিই, তুমুল প্রতিবাদ করি।
কিন্তু যেসব আমলা আর নীতি-নির্ধারকেরা একটা পুরো দেশের কোটি কোটি ডলারের টেকনিক্যাল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত পরিচালনা করছেন— তাদের অনেকেরই প্রকৌশল, শক্তিনীতি বা আধুনিক টেকনোলজির 'ক'-টুকুও জানা নেই!
যাদের টেবিলের সিদ্ধান্তেই ঠিক হয় একটা দেশ কয়লা পুড়িয়ে বিষ গিলবে নাকি সোলারে এগোবে, তাদের যোগ্যতার দৌড় শুধু কয়েকটা গৎবাঁধা ফাইল সই করা পর্যন্তই।
সায়েন্স ও টেকনোলজির সর্বশেষ আপডেট কোনটা, বিশ্ব আজ কোন উদ্ভাবনের দিকে যাচ্ছে— এসব আধুনিক জ্ঞান তো দূরের কথা, সাধারণ গাণিতিক কমন সেন্সটুকুও তাদের মানসিকতায় অনুপস্থিত।
কোনোরকম দীর্ঘমেয়াদি ভিশন ছাড়া, অযোগ্য মানুষকে উপযুক্ত চেয়ারে বসিয়ে শুধু বিদেশী জ্বালানি কেনার কমিশনের ওপর দেশ চালালে ফলাফল
— Neerob Hasan
MS (Thesis) in Renewable Energy Technology
Institute of Energy, University of Dhaka
২৩
কী স্বপ্ন দেখবেন তা ঠিক করে দিতে পারে যে কৌশল।
ঘুমানোর আগে মনে নির্দিষ্ট চিন্তা প্রবেশ করিয়ে স্বপ্নকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন গবেষকরা। স্বপ্ন নিয়ে মানুষের কৌতূহল বহু পুরোনো। কেন আমরা স্বপ্ন দেখি, স্বপ্নের উৎস কোথায় কিংবা এর অর্থ কী - এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে আসছেন গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরে। এবার বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভবিষ্যতে শুধু স্বপ্নের ব্যাখ্যাই নয়, বরং স্বপ্নের বিষয়বস্তুকেও নির্দিষ্টভাবে প্রভাবিত করা সম্ভব হতে পারে।
এ নিয়ে গবেষণা চলছে ‘স্লিপ ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা স্বপ্ন প্রকৌশল নিয়ে। গবেষকদের ধারণা, ঘুমানোর আগে মানুষের মনে নির্দিষ্ট কোনো চিন্তা বা বিষয় প্রবেশ করিয়ে দিলে ঘুমের সময়ের অভিজ্ঞতাকে একটি নির্দিষ্ট দিকে পরিচালিত করা যেতে পারে। প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের কৌশল শেখার ক্ষমতা ও সৃজনশীলতা বাড়াতে এবং মানসিক আঘাত মোকাবিলায় সহায়তা করতে পারে।
বিবিসির এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
স্বপ্নকে প্রভাবিত করার কৌশল :
স্বপ্নের বিষয়বস্তু প্রভাবিত করার একটি পদ্ধতি হলো ‘ড্রিম ইনকিউবেশন’। এতে ঘুমানোর আগে নির্দিষ্ট কোনো বিষয়, সমস্যা বা প্রশ্নের ওপর মনোযোগ দেওয়া হয়। এমনকি ঘুমের সময় মস্তিষ্কে ছোট ছোট অডিও বার্তা বা প্রম্পট পাঠিয়েও স্বপ্নকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের লেখক ও শিল্পী উইল ডাউড এই পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা করেছেন। ঘুমের সময় কবিতা পাঠের রেকর্ডিং শুনে তিনি নিজের স্বপ্নে নানা ধরনের চিত্রকল্পের অভিজ্ঞতা পেয়েছেন। কখনো তিনি স্বপ্নে বন্যায় বিধ্বস্ত একটি রহস্যময় শহর দেখেছেন, আবার কখনো চাঁদের আলোয় ঢেউয়ের ওপর শেয়ালের সঙ্গে ছুটে চলার অভিজ্ঞতা হয়েছে।
তার এসব স্বপ্ন পরবর্তী সময়ে তার একটি বইয়ের ভিত্তি হয়ে ওঠে। একইসঙ্গে তিনি মনে করেন, এ ধরনের স্বপ্ন তাকে একধরনের মুক্তির অনুভূতিও দিয়েছে।
প্রযুক্তি দিয়ে স্বপ্ন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা
স্বপ্নকে বাইরের উদ্দীপনার মাধ্যমে প্রভাবিত করার ধারণা অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ২০০০ সালের শুরুর দিকে এ বিষয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবার্ট স্টিকগোল্ড লক্ষ্য করেন, ‘টেট্রিস’ ভিডিও গেম খেলে ঘুমাতে যাওয়া ব্যক্তিদের অনেকেই স্বপ্নে গেমটির মতো বিভিন্ন আকৃতির পতনশীল বস্তু দেখছেন। পরে বিষয়টি ‘টেট্রিস এফেক্ট’ নামে পরিচিত হয়।
বর্তমানে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির সঙ্গে কাজ করা গবেষকেরা স্বপ্নকে আরও নির্দিষ্টভাবে প্রভাবিত করার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন।
গবেষক ড. অ্যাডাম হার হোরোউইৎজের তৈরি ‘ডর্মিও’ নামের একটি যন্ত্র ঘুমের সময় মানুষের শারীরবৃত্তীয় সংকেত পর্যবেক্ষণ করে এবং কানে শোনা যায় এমন প্রম্পট দেয়। ঘুম ও জেগে থাকার মধ্যবর্তী ‘হিপনাগোজিয়া’ পর্যায়ে এ ধরনের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এক গবেষণায় ৭০%-এর বেশি অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, ডর্মিও ব্যবহারের পর নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে স্বপ্ন দেখার নির্দেশ পাওয়ার পর তারা সেই বিষয় নিয়েই স্বপ্ন দেখেছেন।
মানসিক আঘাত মোকাবিলায় সম্ভাবনা
স্বপ্নের এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে মানসিক আঘাত মোকাবিলাতেও কাজে লাগতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ক্যালিফোর্নিয়ার মেয়ার লুকাস তার কিশোর ছেলে জেনকে হারানোর পর দীর্ঘদিন দুঃস্বপ্ন দেখতেন। তবে স্তন ক্যান্সারের অস্ত্রোপচারের পর অ্যানেস্থেসিয়া থেকে জেগে ওঠার সময় তিনি ছেলেকে নিয়ে একটি সুন্দর স্বপ্ন দেখেন। ওই স্বপ্ন তাকে সান্ত্বনা দেয় এবং এরপর তার দীর্ঘদিনের দুঃস্বপ্নের ধারাবাহিকতাও থেমে যায়।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা তার এই অভিজ্ঞতা নিয়ে গবেষণা করছেন। গবেষক ড. পিলেরিন সিক্কার মতে, অস্ত্রোপচারের পর মানুষকে ধীরে ধীরে জাগিয়ে তোলার প্রক্রিয়া চিকিৎসাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভবিষ্যতে স্বপ্নকে কাজে লাগিয়ে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিএসটিডি), উদ্বেগ ও বিষণ্নতার মতো সমস্যার সঙ্গে মোকাবিলা করা সম্ভব হতে পারে। এমনকি একদিন ‘স্বপ্নের ক্লিনিক’ তৈরি হতে পারে বলেও মনে করছেন কেউ কেউ।
স্বপ্ন নিয়ে নৈতিকতার প্রশ্ন
স্বপ্নকে প্রভাবিত করার প্রযুক্তি যত এগোচ্ছে, এর নৈতিক ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ২০২১ সালে মার্কিন বিয়ার ব্র্যান্ড কুর্স ‘ড্রিম ইনকিউবেশন’ ব্যবহার করে একটি বিজ্ঞাপন তৈরি করেছিল। সেখানে ঘুমানোর আগে দর্শকদের নির্দিষ্ট কিছু দৃশ্য দেখার পরামর্শ দেওয়া হয়, যাতে তারা পণ্যটি নিয়ে স্বপ্ন দেখেন।
এ ঘটনায় কয়েকজন বিজ্ঞানী তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান এবং বিজ্ঞাপনে ড্রিম ইনকিউবেশন ব্যবহারের সমালোচনা করে খোলা চিঠি লেখেন। তাদের আশঙ্কা, মানুষের ঘুম ও স্বপ্নও যদি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রভাবিত করা শুরু হয়, তাহলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রও বাণিজ্যিক ব্যবহারের আওতায় চলে আসতে পারে।
তবে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এ নিয়ে আশঙ্কা কিছুটা অতিরঞ্জিত। তাদের মতে, সাধারণ বিজ্ঞাপনের তুলনায় স্বপ্নকে প্রভাবিত করার এই পদ্ধতির প্রভাব এখনও খুব তীব্র নয়।
গবেষণা যত এগোচ্ছে, স্বপ্নকে আর মনের নিষ্ক্রিয় একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। একদিকে এটি মানসিক স্বাস্থ্য ও সৃজনশীলতার জন্য সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হয়ে উঠছে, অন্যদিকে মানুষের অবচেতন জগতকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের আশঙ্কাও তৈরি করছে।
Dhaka Tribune
২৪
মার্বেল: পাথরের শরীরে জমে থাকা নকশা
কোনো পাথরকে দেখে কি কখনো মনে হয়েছে, এর ভেতরেও ইতিহাস লুকিয়ে আছে? মার্বেল তেমনই এক পাথর। সাদা পাথরের ওপর ধূসর শিরা, কোথাও কালো রেখা, কোথাও হালকা সবুজ বা গোলাপি আভা—দেখতে যতটা সুন্দর, তার চেয়েও দীর্ঘ এর ইতিহাস। একটি মার্বেলের টুকরো হয়তো মানুষের হাতে আসার আগে কোটি কোটি বছর পৃথিবীর ভেতরে ছিল। আর মানুষ তাকে ব্যবহার করছে কয়েক হাজার বছর ধরে।
আজকের ঝকঝকে মেঝে, বিলাসবহুল ভবন কিংবা রান্নাঘরের কাউন্টার থেকে একটু পেছনে তাকালে দেখা যায়—মার্বেল আসলে মানুষের সভ্যতার দীর্ঘ যাত্রার এক নীরব সঙ্গী।
সমুদ্রের তলায় যার শুরু:
মার্বেল মূলত এক ধরনের রূপান্তরিত শিলা (metamorphic rock)। কিন্তু তার ইতিহাস শুরু মার্বেল হিসেবে নয়, চুনাপাথর হিসেবে।
কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ছিল অগভীর সমুদ্র। সামুদ্রিক প্রাণীর খোলস, কঙ্কাল ও ক্যালসিয়াম কার্বনেটসমৃদ্ধ অন্যান্য পদার্থ সমুদ্রের তলায় জমে জমে তৈরি করেছিল চুনাপাথরের স্তর। পরে পৃথিবীর ভূত্বকের বিশাল পরিবর্তনে এসব স্তর চাপা পড়ে যায় ভূগর্ভের গভীরে।
সেখানে প্রচণ্ড তাপ ও চাপের প্রভাবে চুনাপাথরের খনিজগুলো পুনরায় স্ফটিকায়িত হয়। ধীরে ধীরে তার পুরোনো গঠন বদলে গিয়ে তৈরি হয় মার্বেল।
একটি মার্বেলের টুকরোকে এক অর্থে বলা যায়- কোটি কোটি বছর আগে সমুদ্রের তলায় জমে থাকা জীবনের স্মৃতি, যা পৃথিবীর অভ্যন্তরের তাপ ও চাপ পেরিয়ে নতুন শৈল্পিক রূপে উন্মোচিত হয়েছে।
তারপর ভূত্বকের উত্থান ও ক্ষয়ের মাধ্যমে সেই মার্বেল আবার পৃথিবীর পৃষ্ঠের কাছাকাছি উঠে আসে। মানুষ পাহাড় কেটে তার সন্ধান পায়।
মানুষ প্রথম কখন মার্বেল ব্যবহার করল?
মানুষের মার্বেল ব্যবহারের ইতিহাস অন্তত প্রাচীন গ্রিস ও এজিয়ান অঞ্চলের কয়েক হাজার বছর পুরোনো। প্রাগৈতিহাসিক যুগের শেষভাগ থেকেই এ অঞ্চলের মানুষ স্থানীয় মার্বেল ব্যবহার করে ছোটখাটো বস্তু ও স্থাপনা তৈরি করত।
কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দে এসে গ্রিক সভ্যতায় মার্বেলের ব্যবহার নতুন মাত্রা পায়।
গ্রিক স্থপতি ও ভাস্কররা বুঝতে পেরেছিলেন, মার্বেল শুধু শক্ত পাথর নয়- এর মধ্যে শিল্প ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। ফলে মার্বেল হয়ে উঠল ভাস্কর্যের পাথর।
প্রাচীন গ্রিসের মন্দির, মূর্তি ও স্থাপত্যে মার্বেলের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। এথেন্সের পার্থেনন তার সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণগুলোর একটি। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে নির্মিত এই মন্দিরের বড় অংশ স্থানীয় পেন্টেলিক দিয়ে তৈরি।
তবে এখানে একটি মজার ভুল ধারণাও আছে। আমরা প্রাচীন গ্রিক মূর্তিকে প্রায় সবসময় সাদা দেখি, কিন্তু অনেক মূর্তিই মূলত রঙ করা ছিল। সময়ের সঙ্গে সেই রঙ মুছে গেছে; থেকে গেছে পাথরের সাদা শরীর।
রোমানরা মার্বেলকে সাম্রাজ্যের ভাষায় পরিণত করল:
গ্রিকদের কাছ থেকে রোমানরা মার্বেলের ব্যবহার গ্রহণ করেছে এবং সেটিকে আরও ব্যাপক করে তুলেছিল।
রোমান সাম্রাজ্যের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নানা ধরনের মার্বেল রোমে আসতে শুরু করে। উত্তর আফ্রিকা, গ্রিস, এশিয়া মাইনর ও ভূমধ্যসাগরের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আনা হতো নানা রঙের মার্বেল। রোমানদের কাছে মার্বেল ছিল ক্ষমতা ও ঐশ্বর্যের প্রতীক।
সম্রাট, অভিজাত ও ধনী পরিবারগুলোর প্রাসাদ, স্নানাগার, মন্দির ও জনস্থাপনায় মার্বেল ব্যবহৃত হতো। দেয়াল ও মেঝেতে বিভিন্ন রঙের মার্বেল পাশাপাশি বসিয়ে তৈরি করা হতো জটিল নকশা।
এই সময়েই ইতালির Carrara অঞ্চলের মার্বেলের গুরুত্ব বাড়তে শুরু করে। রোমানরা সেখানে quarry তৈরি করে মার্বেল উত্তোলন করত এবং সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে তা পাঠাত।
আজকের বিখ্যাত ক্যারারা মার্বেলের বাণিজ্যিক ব্যবহারও দুই হাজার বছরের বেশি পুরোনো।
রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পরও মার্বেলের ব্যবহার থেমে যায় নি। মধ্যযুগে ইউরোপের বিভিন্ন গির্জা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় এটি ব্যবহৃত হয়েছে। তবে রেনেসা বা পুনর্জাগরণের যুগে মার্বেল আবার এক নতুন জীবন পেল।
ইতালির শিল্পীরা প্রাচীন গ্রিক ও রোমান শিল্পের দিকে ফিরে তাকালেন। মানুষের শরীর, সৌন্দর্য ও বাস্তবতাকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতে তারা মার্বেলকে বেছে নিলেন।
মার্বেলের ব্যবহার ভাস্কর্য ছাড়িযে মসজিদ, গির্জা, মন্দির, প্রাসাদ, সমাধিসৌধ- বিশ্বের নানা সভ্যতা মার্বেল ব্যবহার করেছে। কোথাও এটি সৌন্দর্যের জন্য, কোথাও স্থায়িত্বের জন্য, কোথাও আবার রাজকীয়তার প্রতীক হিসেবে।
তাজমহল এই ইতিহাসের আরেকটি অসাধারণ অধ্যায়। সপ্তদশ শতকে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের নির্মিত তাজমহলের প্রধান নির্মাণসামগ্রীর মধ্যে ছিল রাজস্থানের মাকরানা মার্বেল। সাদা মার্বেলের ওপর সূক্ষ্ম পাথরের কাজ, খোদাই ও অলংকরণ এই স্থাপনাটিকে এমন এক চেহারা দিয়েছে, যা আজ পৃথিবীর বিখ্যাত স্থাপত্যচিহ্ন।
অর্থাৎ গ্রিসের মন্দির থেকে রোমের প্রাসাদ, রেনেসার ভাস্কর্য থেকে মুঘল সমাধিসৌধ- মার্বেল বারবার মানুষের সৌন্দর্যবোধের সঙ্গে নতুনভাবে মিশেছে।
পৃথিবীর কোথায় সবচেয়ে বেশি মার্বেল পাওয়া যায়?
মার্বেল পৃথিবীর বহু দেশে পাওয়া যায়। তবে উল্লেখযোগ্য উৎপাদক দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে তুরস্ক, ইতালি, চীন, ভারত, ইরান, গ্রিস, স্পেন, পর্তুগাল, ব্রাজিল ও পাকিস্তান।
প্রতিটি অঞ্চলের মার্বেল আবার এক রকম নয়। কোথাও একেবারে সাদা, কোথাও ধূসর শিরাযুক্ত, কোথাও সবুজ, কোথাও গোলাপি বা গভীর কালো।
ইতালির ক্যারেরার সাদা মার্বেল, ভারতের মারকানা মার্বেল, গ্রিসের পেন্টেলিক ও থাসোস মার্বেল কিংবা তুরস্কের বিভিন্ন ধরনের মার্বেল- প্রতিটির নিজস্ব জিওলজিক্যাল ইতিহাস রয়েছে।
আর সেই বৈচিত্র্যের কারণেই মার্বেল কখনো সাদা পাথরের থেকেও বেশি কিছু।
আজ আমরা যখন মার্বেলের একটি মসৃণ টুকরো দেখি, তখন তার ওপর আলো পড়ে চকচক করে। কিন্তু সেই চকচকে পৃষ্ঠের পেছনে রয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পৃথিবী।
যে ক্যালসিয়াম কার্বনেট কোনো এক প্রাচীন সমুদ্রের প্রাণীর শরীরের অংশ ছিল, সেটি প্রথমে জমেছিল সমুদ্রের তলায়। তারপর চাপা পড়েছিল পৃথিবীর গভীরে। টেকনিক মুভমেন্ট তাকে ঠেলে তুলেছে, পাহাড় তৈরি হয়েছে, ক্ষয় হয়েছে, আবার মানুষ এসে সেই পাথর কেটে নিয়েছে।
তারপর কোনো এক শিল্পী হয়তো সেই পাথরে মানুষের মুখ এঁকেছেন। কোনো স্থপতি বানিয়েছেন স্তম্ভ। কোনো সম্রাট বানিয়েছেন সমাধিসৌধ। আর আজ হয়তো সেই একই ধরনের পাথর কোনো আধুনিক বাড়ির মেঝেতে।
মার্বেলের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক আসলে তার ধারণ করা সময়। এক টুকরো মার্বেল মানুষের সভ্যতার চেয়েও বহু পুরোনো। আমরা তাকে কয়েক হাজার বছর ধরে ব্যবহার করছি, অথচ তার নিজের বয়স কোটি কোটি বছর।
২৫
কাপাডোইকা: পাথরের ভেতর লেখা এক হাজার বছরের ইতিহাস
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। কাপাডোইকার উপত্যকাগুলো ধীরে ধীরে অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসছে। সামনে অদ্ভুত আকৃতির পাথরের স্তম্ভ—কেউ যেন বিশাল কোনো ভাস্কর্যের সারি দাঁড় করিয়ে রেখেছে। আর একটু পরেই আকাশে ভেসে উঠবে শত শত রঙিন বেলুন।
কিন্তু এই দৃশ্যের সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ওই বেলুনগুলো নয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আপনি যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছেন, সেখানে মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে বসবাস করেছে—কখনো পাথরের মাথার ওপর, কখনো পাহাড়ের ভেতর, আবার কখনো মাটির বহু নিচে।
এই জায়গাটির নাম কাপাডোইকা।
আজ এটি তুরস্কের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা, কিন্তু কাপাডোইকাকে পর্যটন দিয়ে বোঝা যাবে না।
আগ্নেয়গিরির তৈরি এক অদ্ভুত ভূখণ্ড:
কাপাডোইকার যাত্রা শুরু হয়েছিল আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত দিয়ে। লক্ষ লক্ষ বছর আগে এ অঞ্চলের আগ্নেয়গিরিগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ ছাই, লাভা ও আগ্নেয় পদার্থ বেরিয়ে এসে বিস্তীর্ণ অঞ্চল ঢেকে দেয়। সময়ের সঙ্গে সেই ছাই শক্ত হয়ে তৈরি হয় নরম আগ্নেয় শিলা—যাকে টাফ বলা হয়।
তার ওপর দিয়ে বয়ে যায় পানি ও বাতাস। শক্ত অংশ অপেক্ষাকৃত টিকে থাকলেও নরম অংশ ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে থাকে। এভাবেই তৈরি হয় উপত্যকা, পাহাড় এবং সেই বিখ্যাত সরু পাথরের স্তম্ভগুলো, যেগুলো আজ ‘ফেরি চিমনি’ নামে পরিচিত।
দূর থেকে এগুলোকে মানুষের তৈরি মনে হতে পারে। কোথাও যেন টুপি পরা পাথরের মূর্তি, কোথাও সরু মিনারের মতো স্তম্ভ। কিন্তু এগুলোর পেছনে কোনো স্থপতি ছিল না—ছিল প্রকৃতি।
তবে পরে মানুষ এই অদ্ভুত ভূদৃশ্যকে শুধু দেখেই থেমে থাকেনি। আজকে আমরা সেখানে গেলে এই আগ্নেয় শিলা কীভাবে যুগে যুগে মানুষের ইতিহাস লিখেছে তা দেখব। তারা এর ভেতরেই নিজেদের জায়গা খুঁজে নিয়েছিল।
পাথর যখন বাড়ি হয়ে যায়:
কাপাডোইকার নরম টাফ পাথরের একটি অদ্ভুত সুবিধা ছিল। এটি যথেষ্ট শক্ত, কিন্তু একই সঙ্গে সহজে খোদাই করা যায়।
ফলে মানুষ পাহাড় কেটে ঘর তৈরি করতে শুরু করল। কোনো কোনো জায়গায় তৈরি হলো কয়েকটি কক্ষের ছোট বসতি, আবার কোথাও পাহাড়ের গায়ে গড়ে উঠল বিশাল গুহা-কমপ্লেক্স।
একটি পাথরের পাহাড় বাইরে থেকে হয়তো নিছক পাহাড়। কিন্তু তার ভেতরে ঢুকলে দেখা যায়—ঘর, রান্নাঘর, গুদাম, আস্তাবল, সভাকক্ষ।
কাপাডোইকার মানুষ প্রকৃতির তৈরি পাহাড়ের ভেতরেই নিজেদের জীবন তৈরি করেছিল।সআর খ্রিস্টধর্মের আগমনের পর এই গুহাগুলোর ব্যবহার আরও বিস্ময়কর হয়ে ওঠে-
খ্রিস্টধর্ম কাপাডোইকায় পৌঁছায় খ্রিস্টীয় প্রথম শতকের মধ্যেই। পরবর্তী কয়েক শতকে এ অঞ্চলে খ্রিস্টান সম্প্রদায় শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে রোমান সাম্রাজ্যের খ্রিস্টানদের ওপর নির্যাতন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে কাপাডোইকার দুর্গম ভূপ্রকৃতি ও গুহাগুলো নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
পাথরের দেয়ালে খোদাই করা কক্ষের ভেতর মানুষ প্রার্থনা করত। দেয়ালে আঁকা হতে থাকে যিশু, মেরি, বাইবেলের বিভিন্ন ঘটনা ও সাধুদের ছবি। আজও কাপাডোইকার অনেক গুহা-গির্জার দেয়ালে সেই বাইজেন্টাইন যুগের ফ্রেস্কো দেখা যায়।
কাপাডোইকার খ্রিস্টীয় ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর ধর্মতাত্ত্বিক ঐতিহ্য। চতুর্থ শতকে এখানকার Basil the Great, Gregory of Nazianzus এবং Gregory of Nyssa—পরবর্তীকালে যাঁরা Cappadocian Fathers নামে পরিচিত হন—খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
আর মাটির নিচে?
পাহাড়ের ভেতরের জীবনই যদি বিস্ময়কর হয়, তাহলে মাটির নিচে নেমে গেলে গল্প আরও অবিশ্বাস্য হয়ে ওঠে।
কাপাডোইকার বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া গেছে বিশাল ভূগর্ভস্থ শহর। এর মধ্যে দেরিনকুয়ু ও কায়মাকলি সবচেয়ে পরিচিত।
এগুলো অল্প কয়েকটি গর্ত বা আশ্রয়কক্ষ নয়। মাটির নিচে একের পর এক স্তরে তৈরি হয়েছে থাকার ঘর, রান্নাঘর, খাদ্য সংরক্ষণের জায়গা, কূপ, বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা, ধর্মীয় স্থান এবং সরু সুড়ঙ্গ। একটি পুরো শহর!
কোনো কোনো অংশ এত গভীরে নেমে গেছে যে বাইরে দাঁড়িয়ে তার অস্তিত্ব কল্পনাই করা কঠিন।
তবে জনপ্রিয় একটি গল্প হলো—রোমানদের অত্যাচার থেকে বাঁচতেই খ্রিস্টানরা এসব ভূগর্ভস্থ শহর বানিয়েছিল। বাস্তব ইতিহাস তার চেয়ে অনেক জটিল। এসব স্থাপনার কিছু অংশ খ্রিস্টধর্মের আগমনেরও আগের হতে পারে এবং এগুলো বিভিন্ন সময়ে নানা জনগোষ্ঠী ব্যবহার ও সম্প্রসারণ করেছে। তবু খ্রিস্টীয় যুগে এগুলোর ব্যবহার যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।
কাপাডোইকার সবচেয়ে বড় বিস্ময় তাই হয়তো এই—একই ভূখণ্ডে মানুষ পাহাড়ের ওপর বসবাস করেছে, পাহাড়ের ভেতর গির্জা বানিয়েছে, আবার প্রয়োজন হলে মাটির নিচেও নেমে গেছে।
সাম্রাজ্য বদলেছে, কাপাডোইকা থেকে গেছে:
কাপাডোইকার ওপর দিয়ে একের পর এক শাসক এসেছে। হিট্টাইটদের পর পারসিকরা, তারপর আলেকজান্ডারের যুগ, কাপাডোইকা রাজ্য, রোমান সাম্রাজ্য এবং বাইজেন্টাইন শাসন। পরে সেলজুক তুর্কিদের উত্থান, তারপর অটোমান সাম্রাজ্য।
শাসক বদলেছে, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ বদলেছে, কিন্তু কাপাডোইকার পাথর রয়ে গেছে।
সেলজুক যুগে এই ভূখণ্ডে গড়ে ওঠে মসজিদ, মাদ্রাসা ও কারাভানসেরাই। বাণিজ্যপথের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের কারণে কাপাডোইকা আবারও মানুষের যাতায়াতের পথে পরিণত হয়।
এই দীর্ঘ ইতিহাসের সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো—একটি ভূখণ্ড তার ওপর দিয়ে যাওয়া সভ্যতাগুলোর চিহ্ন নিজের শরীরে ধরে রেখেছে।
কোথাও বাইজেন্টাইন ফ্রেস্কো, কোথাও গুহাবসতি, কোথাও ভূগর্ভস্থ শহর, আবার কোথাও সেলজুক স্থাপত্য।
তারপর একদিন আকাশে উঠল বেলুন:
কাপাডোইকার ইতিহাসের তুলনায় হট-এয়ার বেলুনের গল্প একেবারেই নতুন। আজ ভোরে গোরেমের আকাশে যে শত শত বেলুন দেখা যায়, সেগুলোর বয়স কাপাডোইকার পাথরের তুলনায় খুবই সামান্য। কিন্তু এগুলো এখন এই অঞ্চলের দৃশ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে।
সূর্য ওঠার ঠিক আগে মানুষ উপত্যকার দিকে তাকিয়ে দাঁড়ায়। চারপাশে তখন সেই পুরোনো পাথরের স্তম্ভ, হাজার বছরের গুহা আর দূরের পাহাড়। তারপর একে একে আকাশে উঠতে শুরু করে বেলুন।
একটি, দুটি, দশটি নয়—অনেকগুলো। লাল, হলুদ, নীল, কমলা নানা রঙের বেলুন ধীরে ধীরে পাথুরে উপত্যকার ওপরে উঠে যায়। নিচে পড়ে থাকে সেই ভূখণ্ড, যেখানে মানুষ একসময় পাহাড় কেটে ঘর বানিয়েছিল, গুহার দেয়ালে ধর্মীয় ছবি এঁকেছিল এবং মাটির নিচে শহর তৈরি করেছিল।
একসময় মানুষ নিরাপত্তার জন্য পাহাড়ের ভেতর ঢুকেছিল। আজ মানুষ সেই একই পাহাড় দেখতে আকাশে উঠে যায়। একসময় এই পাথর ছিল মানুষের আশ্রয়। আজ সেই পাথরই বিশ্বের মানুষকে এখানে টেনে আনে।
তেমনই একটি বেলুনে উঠে আপনার মনে হবে, আপনি যেন একটি বিশাল ইতিহাসের শেষ পাতায় দাঁড়িয়ে আছেন—যেখানে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত থেকে শুরু হওয়া গল্পটি এসে থেমেছে মানুষের বানানো রঙিন বেলুনে। কিন্তু পাথরের নিচে, গুহার দেয়ালে আর মাটির গভীরে সেই পুরোনো গল্পগুলো তখনও রয়ে গেছে। তার পর দৃষ্টি যাবে বহুদূর দিগন্ত পর্যন্ত। তাতে শুধু উপরিভাগ দেখা যাবে। কিন্তু নিচে- ইতিহাসের স্তরগুলো, সেগুলো দেখতে হৃদয় লাগবে। @ বইকাল
২৬
৫ হাজার বছরের পুরোনো পাথরের সমাধি
প্যারিসের উত্তরে ৫ হাজার বছরের পুরোনো এক পাথরের সমাধি যেন হঠাৎ থেমে যাওয়া একটি সময়ের চিহ্ন। প্রায় ৩১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সেখানে একসময়ের সমৃদ্ধ মানবসমাজের ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়। কয়েক শতাব্দী ধরে যে জনগোষ্ঠী বিশাল পাথরের সমাধি নির্মাণ করেছিল, তাদের পর সেই একই স্থানে আসে সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনগত পরিচয়ের মানুষ। প্রশ্ন উঠেছে, এই পরিবর্তনের পেছনে কি শুধু মানুষের স্থানান্তর ছিল, নাকি কোনো বড় বিপর্যয় একটি গোটা জনগোষ্ঠীকে সরিয়ে দিয়েছিল?
ফ্রান্সের প্যারিস থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত বুরি নামের মেগালিথিক সমাধিতে প্রায় ৩০০ মানুষের দেহাবশেষ পাওয়া গেছে। Nature Ecology & Evolution-এ প্রকাশিত নতুন গবেষণায় আন্তর্জাতিক একদল গবেষক এই সমাধির ১৩২ জনের প্রাচীন ডিএনএ বিশ্লেষণ করেছেন। সেই জেনেটিক তথ্যের সঙ্গে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ মিলিয়ে তাঁরা উত্তর-পশ্চিম ইউরোপে প্রায় ৫ হাজার বছর আগে ঘটে যাওয়া এক বড় জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের ছবি পুনর্গঠন করেছেন।
বুরি সমাধিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রটি লুকিয়ে ছিল সমাধিগুলোর মাঝের একটি দীর্ঘ বিরতিতে। গবেষকেরা দেখতে পান, এখানে দুই পর্যায়ে মানুষকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। দুই পর্যায়ের মধ্যে ব্যবধান প্রায় ২০০ বছর। অর্থাৎ এটি কেবল একই জনগোষ্ঠীর ধারাবাহিক সমাধিস্থল ছিল না। মাঝের সময়টিতে যেন পুরো প্রক্রিয়াই থেমে গিয়েছিল।
আরও বিস্ময়কর তথ্য আসে ডিএনএ বিশ্লেষণে। প্রথম পর্যায়ের মানুষের জিনগত বৈচিত্র্য ছিল অনেক বেশি এবং তা প্যারিস অববাহিকার বাইরের কৃষিজীবী জনগোষ্ঠীর সঙ্গেও সম্পর্ক দেখায়। কিন্তু দ্বিতীয় পর্যায়ের মানুষদের মধ্যে জিনগত মিল ছিল অনেক বেশি। তাঁদের পূর্বপুরুষদের ৮০ শতাংশেরও বেশি নিওলিথিক আইবেরিয়া, অর্থাৎ বর্তমান স্পেন ও দক্ষিণ ফ্রান্স অঞ্চলের কৃষিজীবী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত।
এর অর্থ কী? গবেষকদের মতে, প্রায় ৩১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে উত্তর ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে জনসংখ্যা হ্রাস পেয়েছিল। একই সময় মহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে মেগালিথিক সমাধি নির্মাণের দীর্ঘ ঐতিহ্যও হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় স্থানীয় কৃষকদের জায়গা নেয় স্টেপ অঞ্চলের পশুপালক জনগোষ্ঠী। প্যারিস অববাহিকায় সেই শূন্যস্থান পূরণ করে আইবেরিয়া থেকে আসা কৃষিজীবীরা।
কেন এত বড় জনসংখ্যাগত পতন ঘটেছিল, তার পুরো উত্তর অবশ্য এখনও মেলেনি। বুরি সমাধির দেহাবশেষে প্রাচীন রোগজীবাণুর চিহ্ন পাওয়া গেছে। গবেষকদের ধারণা, সংক্রামক রোগের পাশাপাশি পরিবেশগত চাপ এবং দীর্ঘস্থায়ী জনসংখ্যা সংকোচন একসঙ্গে এই পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই বুরির সমাধি শুধু প্রাচীন মানুষের শেষযাত্রার নিদর্শন নয়। এর ডিএনএ প্রমাণ দেখাচ্ছে, প্রায় ৫ হাজার বছর আগে ইউরোপের কিছু অঞ্চলে একটি জনগোষ্ঠীর পতন এবং অন্য জনগোষ্ঠীর আগমন একই বৃহৎ পরিবর্তনের অংশ হতে পারে। তবে রোগ, পরিবেশ ও মানুষের চলাচলের মধ্যে কোনটির ভূমিকা কতটা ছিল, সেটি জানতে আরও প্রত্নতাত্ত্বিক ও জিনগত প্রমাণ প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র: Nature Ecology & Evolution; Bury Megalithic Tomb গবেষণা; প্রাচীন DNA বিশ্লেষণ।
২৭
"ফেস ট্র্যাকার" গাণিতিক তথ্যের জটিল নকশায় রূপান্তর
ক্যামেরার সামনে হাজারো মুখ। ভিড়ের মধ্যে কেউ থেমে নেই, কেউ হাঁটছে, কেউ স্লোগান দিচ্ছে। তবু একটি সফটওয়্যার মুহূর্তের মধ্যে প্রতিটি মুখ আলাদা করে চিহ্নিত করতে পারে, তাদের গতিবিধি অনুসরণ করতে পারে, এমনকি একটি নির্দিষ্ট মুখকে লক্ষ লক্ষ ছবির ভাণ্ডার থেকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে পারে। এই প্রযুক্তিকেই সাধারণভাবে অনেকে "ফেস ট্র্যাকার" বলে ডাকেন। কিন্তু এর ভেতরের বিজ্ঞান শুধু মুখের ছবি দেখা নয়; এটি মানুষের মুখকে গাণিতিক তথ্যের একটি জটিল নকশায় রূপান্তর করার প্রক্রিয়া।
গত এক দশকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির অগ্রগতি এত দ্রুত হয়েছে যে এটি এখন বিমানবন্দর, স্মার্টফোন, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং অপরাধ তদন্তের মতো ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে। ভারতের ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন অথরিটি বা UIDAI মুখ শনাক্তকরণকে একটি বায়োমেট্রিক প্রযুক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা একটি মুখকে বিশাল ডেটাবেসের অসংখ্য মুখের সঙ্গে মিলিয়ে সম্ভাব্য পরিচয় খুঁজে বের করতে পারে।
এই প্রযুক্তির প্রয়োজন কেন? কারণ মানুষের চোখ একসঙ্গে কয়েক হাজার মুখ বিশ্লেষণ করতে পারে না। বড় জনসমাগম, বিমানবন্দর বা রেলস্টেশনের মতো জায়গায় নিরাপত্তা বাহিনীর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অল্প সময়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে শনাক্ত করা। ফেস ট্র্যাকার সেই কাজটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে করার চেষ্টা করে।
কাজটি শুরু হয় ফেস ডিটেকশন দিয়ে। সফটওয়্যার প্রথমে ছবির মধ্যে কোথায় মানুষের মুখ রয়েছে, সেটি খুঁজে বের করে। তারপর আসে ফেসিয়াল রিকগনিশন। এখানে AI মুখের চোখ, নাক, ঠোঁট, চোয়ালের রেখা এবং মুখের বিভিন্ন বিন্যাস বিশ্লেষণ করে একটি ডিজিটাল বৈশিষ্ট্য মানচিত্র তৈরি করে। এটি ছবির কপি নয়; বরং মুখের বৈশিষ্ট্যকে সংখ্যার ধারায় প্রকাশ করা একটি গাণিতিক উপস্থাপন।
এরপর সেই উপস্থাপনাটি একটি ডেটাবেসের সঙ্গে তুলনা করা হয়। বিজ্ঞানীরা একে ওয়ান টু এন ম্যাচিং বলেন। অর্থাৎ একটি মুখকে একসঙ্গে হাজার বা লক্ষ মুখের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। আধুনিক AI মডেল, বিশেষ করে ডিপ লার্নিংভিত্তিক নিউরাল নেটওয়ার্ক, এই তুলনার সময় প্রতিটি মুখের মিলের সম্ভাবনা হিসাব করে।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফেস ট্র্যাকার নিশ্চিতভাবে বলে না যে দুই ব্যক্তি একই মানুষ। এটি কেবল একটি সম্ভাব্য মিল দেখায়। আলো, ক্যামেরার কোণ, মুখে মাস্ক, বয়সের পরিবর্তন বা যমজ মানুষের মতো পরিস্থিতিতে ভুল মিল বা ফলস পজিটিভ ঘটতে পারে। তাই গবেষকেরা জোর দিয়ে বলেন, এই প্রযুক্তির ফলাফল মানুষের যাচাই ছাড়া চূড়ান্ত পরিচয় হিসেবে ধরা উচিত নয়।
মুখ শনাক্তকরণের গবেষণা শুরু হয়েছিল ১৯৬০-এর দশকে, যখন কম্পিউটার দিয়ে মুখের কয়েকটি নির্দিষ্ট বিন্দু মাপার চেষ্টা করা হতো। কিন্তু ২০১৪ সালের পর ডিপ লার্নিং প্রযুক্তি আসায় নির্ভুলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। আজকের সিস্টেম স্থির ছবির পাশাপাশি চলমান ভিডিও থেকেও রিয়েল টাইমে বহু মুখ বিশ্লেষণ করতে পারে।
তবু এই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ শুধু আরও নিখুঁত অ্যালগরিদম তৈরির প্রশ্ন নয়। সমান গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, মানুষের বায়োমেট্রিক তথ্য কতটা নিরাপদ থাকবে, কোথায় সংরক্ষিত হবে এবং কোন পরিস্থিতিতে এটি ব্যবহার করা হবে। তাই ফেস ট্র্যাকার আজ শুধু AI প্রযুক্তির সাফল্যের উদাহরণ নয়; এটি এমন একটি বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি, যার সঙ্গে প্রযুক্তিগত নির্ভুলতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং নৈতিক ব্যবহারের প্রশ্নও সমানভাবে জড়িয়ে আছে।
তথ্যসূত্র: UIDAI Facial Authentication ও Facial Recognition নথি; দিল্লি পুলিশের Facial Recognition System সম্পর্কিত প্রযুক্তিগত তথ্য; AI ভিত্তিক মুখ শনাক্তকরণ নিয়ে প্রকাশিত গবেষণা ও প্রযুক্তিগত প্রতিবেদন।
২৮
ক্লেইন বোতল: যে বোতলের কোনো ‘ভেতর’ বা ‘বাহির’ নেই!
আমাদের পরিচিত যেকোনো বোতলের কথা ভাবলে চোখের সামনে একটি পাত্র ভেসে ওঠে যার একটি ভেতরের এবং একটি বাইরের অংশ থাকে। কিন্তু একটি বিখ্যাত জ্যামিতিক প্যারাডক্স হলো ক্লেইন বোতল, যা এমন এক অনন্য সৃষ্টি, যার আলাদা কোনো ভেতর বা বাহির বলতে কিছুই নেই! পুরো কাঠামোটি একটিমাত্র অবিচ্ছিন্ন তল দিয়ে গঠিত।
এই ধারণার উদ্ভাবক বিখ্যাত জার্মান গণিতবিদ ফেলিক্স ক্লেইন। ১৮৮২ সালে তিনি প্রথম এই জ্যামিতিক তলের ধারণাটি প্রকাশ করেন। জার্মান ভাষায় তিনি এর নাম দিয়েছিলেন "ক্লেইনশে ফ্লেখে", যার অর্থ 'ক্লেইন তল'। কিন্তু পরবর্তীতে জার্মান ভাষা থেকে ইংরেজিতে রূপান্তরের সময় ভুলবশত ফ্লেখে শব্দটি ফ্রাশে হিসেবে অনূদিত হয়, যার ইংরেজি অর্থ বোতল। এই একটি অনুবাদগত ঐতিহাসিক ভুলের কারণেই এটি পরবর্তীতে "ক্লেইন বোতল' নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো কেন এর কোনো ভেতর বা বাহির নেই? সাধারণ বোতলের একটি উন্মুক্ত প্রান্ত বা খোলা মুখ থাকে যার মধ্য দিয়ে ভেতরে ঢুকতে হয়। আপনি যদি ক্লেইন বোতলের গায়ের যেকোনো একটি স্থান থেকে হাঁটা শুরু করেন, তবে কাচ না কেটে বা কোনো খোলা মুখ পার না হয়েই পুরো বোতল ঘুরে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসতে পারবেন। কিন্তু ফিরে এসে দেখবেন, আপনি কোনো দেয়াল পার না হওয়া সত্ত্বেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে তলটির অন্য পাশে চলে এসেছেন। এটিই প্রমাণ করে যে, এর ভেতরের পাশ আর বাইরের পাশ আসলে একই তল।
বাস্তব জগতে আমরা কাচের তৈরি যে ক্লেইন বোতলগুলো দেখি, সেগুলো মূলত আসল গাণিতিক কাঠামোর একটি ত্রিমাত্রিক মডেল। আমাদের তিন মাত্রার জগতে এটি তৈরি করতে গেলে নলের অংশটিকে বোতলের দেয়াল ভেদ বা ছেদ করে যুক্ত করতে হয়। কিন্তু আসল কাঠামো অনুযায়ী কোনো দেয়াল ছেদ করা যাবে না। একটি নিখুঁত ক্লেইন বোতল অবস্থান করার জন্য অন্তত চারমাত্রিক স্থানের প্রয়োজন, যেখানে নলটি দেয়াল স্পর্শ না করেই চতুর্থ মাত্রা ব্যবহার করে মূল তলের সাথে মিশে যেতে পারে।
ফেলিক্স ক্লেইনের এই অনন্য আবিষ্কার কেবল একটি রূপক পাত্র নয়, এটি এমন এক জ্যামিতিক রূপ যা আমাদের ত্রিমাত্রিক জগতে থেকে স্থানিক চারমাত্রিক জগত অনুধাবন করতে শেখায়।
@ মহাকাশ
২৯
বাংলায় ইসলাম কীভাবে শিকড় গেড়েছিল ?
Richard M. Eaton-এর The Rise of Islam and the Bengal Frontier বইটা পড়লে বাংলায় ইসলামায়নের গল্পটি অনেক বেশি জটিল, ধীর এবং জনমানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা একটি রূপান্তর বলে মনে হয়। বইটির দশম অধ্যায়ে তিনি দেখান, বাংলায় ইসলাম প্রথমে পুরোনো ধর্মীয় জগৎকে উচ্ছেদ করে প্রবেশ করেনি; বরং অনেকটা নীরবে তার ভেতরেই জায়গা করে নিয়েছিল।
তৎকালীন বাংলার লোকজ ধর্মীয় জগৎ ছিল বেশ উন্মুক্ত। মানুষ একদিকে স্থানীয় দেবদেবী, পীর, সাধু ও নানা অতিপ্রাকৃত শক্তিতে বিশ্বাস করত, অন্যদিকে নতুন কোনো ধর্মীয় শক্তিকেও সেই জগতের মধ্যে গ্রহণ করতে পারত। নতুন কিছু গ্রহণ করার অর্থ পুরোনোটাকে ছুড়ে ফেলে দেওয়া ছিল না।
সুন্দরবনের Daksin Ray (দক্ষিণ রায়) ও মুসলিম গাজি Badi' Ghazi Khan-এর লোককাহিনী এর একটি চমৎকার উদাহরণ। একজন বাঘের সঙ্গে সম্পর্কিত স্থানীয় দেবতা, অন্যজন মুসলিম ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। কিন্তু লোকবিশ্বাসে তাদের একজনকে গ্রহণ করতে অন্যজনকে বাদ দিতে হয়নি। তারা একই ধর্মীয় জগতের ভেতরে পাশাপাশি অবস্থান করেছে। অর্থাৎ, বাংলায় ইসলামায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রে Inclusion বা অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া কাজ করেছিল—পুরোনো বিশ্বাসের পাশে নতুন বিশ্বাসের জন্য জায়গা তৈরি করে।
এরপর আসে Identification বা সমীকরণ। মানুষ শুধু ইসলামী চরিত্র বা ধারণাকে নিজেদের ধর্মীয় জগতের মধ্যে জায়গা দেয়নি; অনেক ক্ষেত্রে সেগুলোকে পরিচিত বাঙালি ধর্মীয় ধারণার সঙ্গেও মিলিয়ে দেখতে শুরু করেছিল। বাংলার মুসলিম কবিদের রচনায় আল্লাহকে কখনো গোসাঁই বা নিরঞ্জন-এর মতো পরিচিত শব্দে প্রকাশ করা, কিংবা ইসলামী কাহিনিকে বাংলার নদী, মাটি, গাছপালা, প্রাণী ও মানুষের জীবন দিয়ে সাজানো—এসব ছিল সেই সাংস্কৃতিক অনুবাদের অংশ।
অর্থাৎ, ইসলাম শুধু বাংলায় আসেনি; ধীরে ধীরে বাংলার ভাষা, কল্পনা ও সংস্কৃতির মধ্যেও নিজের একটি স্থায়ী স্থান তৈরি করেছে।
কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়।
সময়ের সঙ্গে ইসলামের একটি নতুন ধারা সামনে আসে, যেখানে প্রশ্ন ওঠে—স্থানীয় এসব বিশ্বাস ও আচার আদৌ ইসলামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। বিশেষ করে উনিশ শতকের সংস্কার আন্দোলনগুলো পীরকেন্দ্রিক লোকাচার, মাজার, বিভিন্ন স্থানীয় রীতি এবং ইসলামের সঙ্গে মিশে যাওয়া বহু প্রথার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে শুরু করে।
এখানে একটা বেশ চমকপ্রদ বৈপরীত্য লক্ষ করা যায়।
যে স্থানীয় সাংস্কৃতিক জগতের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ইসলাম বাংলায় শিকড় গেড়েছিল, পরবর্তী সময়ে ইসলামের সংস্কারবাদী ধারার অনেক অংশ সেই স্থানীয় উপাদানগুলোকেই ইসলাম থেকে সরিয়ে দিতে চাইল।
Eaton-এর বিশ্লেষণ তাই বাংলার ইসলামায়নকে তিনটি শব্দে ধরতে চায় Inclusion, Identification, Displacement।
প্রথমে নতুন ধর্মীয় শক্তি পুরোনোর পাশে জায়গা করে নিল। তারপর ইসলামী চরিত্র ও ধারণাগুলোকে পরিচিত স্থানীয় ধর্মীয় ধারণার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা ও অর্থবহ করে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হলো। সময়ের সঙ্গে লিখিত ধর্মীয় জ্ঞান, নতুন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং পরবর্তী সংস্কারবাদী চিন্তার বিস্তারের মধ্য দিয়ে ইসলামী ধর্মীয় কর্তৃত্ব আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও একচেটিয়া রূপ পেতে থাকে। এর ফলে অনেক পুরোনো ধর্মীয় শক্তি ও লোকাচার ধীরে ধীরে সরে যেতে শুরু করে।
তবে এই Displacement বা ধীরে ধীরে সরে যাওয়ার প্রক্রিয়া মানে লোকজ সংস্কৃতির রাতারাতি সম্পূর্ণ অবলুপ্তি ছিল না; বরং এটি ছিল ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও আধ্যাত্মিক প্রাধান্য নিয়ে দীর্ঘ এবং ধারাবাহিক এক টানাপোড়েন।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল লিখিত জ্ঞানের বিস্তার। ইসলাম ছিল কিতাবের ধর্ম। তবে সাধারণ মানুষের বড় অংশ আরবি না বোঝার কারণে কোরআনের লিখিত বাণী প্রথমদিকে শুধু ধর্মতাত্ত্বিক জ্ঞানের উৎস হিসেবেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা বরকত ও সুরক্ষার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে উঠেছিল। ধীরে ধীরে মক্তব, কোরআন এবং ধর্মীয় শিক্ষার বিস্তারের মাধ্যমে ধর্মীয় কর্তৃত্বের একটি নতুন উৎসও গুরুত্ব পেতে শুরু করে—“কিতাবে কী লেখা আছে?”
নারীর জীবনেও এই পরিবর্তনের ছাপ পড়েছিল। মধ্যযুগীয় ও প্রাক-আধুনিক বাংলার কৃষিভিত্তিক সমাজে নারীরা সরাসরি মাঠে ধান কাটা ও অন্যান্য কৃষিকাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। পরবর্তী সময়ে ইসলামী সামাজিক আদর্শের কিছু ব্যাখ্যা—বিশেষ করে পর্দা ও নারী-পুরুষের পৃথক সামাজিক ভূমিকার ধারণা—ধীরে ধীরে সাহিত্যিক আদর্শ থেকে সামাজিক বাস্তবতার দিকে প্রবেশ করতে থাকে। তবে এই আদর্শিক রূপরেখা সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গেই সমাজ বদলে যায়নি; সাহিত্যিক আদর্শ থেকে সাধারণ গ্রামীণ নারীর দৈনন্দিন জীবনে এর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে দীর্ঘ সময় লেগেছিল।
সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই।
কোনো ধর্ম একটা নতুন ভূখণ্ডে শুধু বক্তৃতা, যুদ্ধ কিংবা শাসকের আদেশের মাধ্যমে শিকড় গাড়ে না। বিশেষ করে পূর্ব বাংলায় নতুন কৃষি-সীমান্তের বিস্তার, বন পরিষ্কার করে বসতি ও কৃষিভিত্তিক সমাজ গড়ে ওঠা, এবং সেই প্রক্রিয়ায় পীর-ফকির ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকার মধ্য দিয়ে ইসলাম সাধারণ মানুষের পরিচিত ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি করেছিল।
অর্থাৎ, ইসলামায়নের প্রক্রিয়াটি কেবল ওপর থেকে নিচে নামা কোনো রাজনৈতিক প্রকল্প ছিল না; এটি কৃষি সম্প্রসারণ, বসতি স্থাপন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়েও গড়ে উঠেছিল।
বাংলায় ইসলামের ইতিহাস তাই শুধু ধর্মান্তরের ইতিহাস নয়। এটি ইসলামী ধর্মীয় ঐতিহ্য ও বাংলার স্থানীয় সমাজ-সংস্কৃতির দীর্ঘ সাক্ষাৎ, বিনিময়, অভিযোজন এবং শেষ পর্যন্ত রূপান্তরের ইতিহাস।
আর এই কারণেই বাংলায় ইসলামকে বুঝতে হলে শুধু রাজাদের ইতিহাস পড়লেই হয় না; পড়তে হয় গ্রামের মানুষ, পীর, কবি, কৃষক, নারী, লোককাহিনী এবং মানুষের দৈনন্দিন বিশ্বাসের ইতিহাসও।
@ মহাকাশ
০
কেন হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ?
আহা এ বড় সুখের সময়!অন্তত দিল্লী নগরীর ইংরেজ সমাজের জন্য তো এ কথা বলাই যায়।1914 সালের বসন্ত কাল, মাত্র তিন বছর আগে রাজধানী স্থানান্তরিত করা হয় দিল্লীতে, আগের রাজধানী কলকাতায় আর থাকা একদম সম্ভবই হচ্ছিল না।বাপ রে, বাঙালি স্বদেশীগুলি কী সাঙ্ঘাতিক বদমায়েশ! যখন তখন ইংরেজদের গাড়ির মধ্যে বোমা ছুঁড়ে মারে, কথা নেই বার্তা নেই অকস্মাৎ কোনও বড় ইংরেজ শাসন কর্তার সামনে পকেট থেকে বের করে পিস্তল আর গুলী চালিয়ে দেয়, কথা তো তাদের কার্যকলাপ সম্বন্ধে, বলেও শেষ করা যাবে না।এমনকি দিল্লীতেও এসে তাদের হাত থেকে প্রথমে রেহাই পাওয়া যায় নি।প্রথম শোভাযাত্রাতেই এরা ভাইসরয়ের হাতির ওপরে বোমা ছুঁড়ে মেরেছিল, ভাগ্যিস তিনি প্রানে বেঁচে যান!তবে হ্যাঁ এখন তো সত্যিই বড় সুখের সময়, এই কথাটা মানতেই কিন্তু হবে।এখন দিল্লীতেই প্রায় সমস্ত দফতর সরিয়ে আনা হয়েছে, সেজন্য বেশিরভাগ ইংরেজ এই দিল্লী নগরীর বাসিন্দাই হয়ে গেছে, সত্যিই এ বড়ই সুখের সময়!আর বৃটেনের ইংরেজরা, তাদের তো অত্যন্তই সুখ, এই জাতির জীবনে এমন সুখের সময় কোনদিনই আসেনি।শুধু বৃটেন নয়, নেদারল্যান্ড, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, পর্তুগাল, স্পেন, এই সমস্ত এবং আরও ইউরোপীয় দেশের বাসিন্দারাও সুখী একই রকম, উথলে উঠছে তাদের সুখ 1914 সালে।দেশে দেশে তাদের বাণিজ্য, সমুদ্রে সমুদ্রে তাদের জাহাজ, দিগন্তব্যাপী সাম্রাজ্য, উপনিবেশের ঐশ্বর্যে তারা অপরিসীম শক্তিশালী।সারা পৃথিবীর অধিকারী তারা, তাদের আধিপত্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক।আহা এখন সত্যিই বড় সুখেরই সময়।1815 সালের পরে বড় কোনও যুদ্ধ ইওরোপ ভুখন্ডে ঘটে নি।শুধু তাই নয়, এই সময়ের মধ্যেই ঘটে গেছে বিজ্ঞানের অভুতপূর্ব বিস্ময়কর উন্নতি।
বিজ্ঞান নিয়োজিতই হয়ে গেল মানুষের সম্পদ বৃদ্ধির কাজে আর তা জীবনকে ক্রমশই সহজ করে তুলতে লাগল।আহা এ তো সত্যিই বড় সুখের সময়!পৃথিবীর এক চতুর্থাংশ বৃটেনের হাতে চলে এসেছে আর ততটাই ভূমি এসে গেছে ফ্রান্সের হাতে।তবে এমন সুখের সময় অনেকেই খেয়াল করেনি যে, জার্মানি উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে।শতাব্দীর শেষদিকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে প্রিন্স বিসমার্কের হাত ধরে, কথাটা বলবার অর্থ হলো যে, তিনি ছোট ছোট 39 টি জার্মান রাজ্যকে একীভূত করে এক জার্মান সাম্রাজ্য সৃষ্টি করেছেন।এখন আমরা যে জার্মানি দেখি তার থেকে অনেক বড় ছিল সে জার্মান সাম্রাজ্য। জার্মানদের স্বভাব চরিত্র কেমন সেটা নতুন করে এখন আর বলার মনে হয় না কোনও প্রয়োজন আছে।তো সেই জার্মান সাম্রাজ্য চুপচাপ বসে থাকবে তা তো হতে পারে না কিন্তু সাম্রাজ্যটি বিস্তার করতে গিয়েই তারা দেখল যে, প্রায় সব জায়গাতেই হয় ফ্রান্স অথবা বৃটেন বসে আছে।এটা দেখেই যে খুব কিছু তাদের ভালো লাগে তা তো মনে হচ্ছে না।ফলে ইওরোপের যে শক্তির ভারসাম্য ছিল তা জার্মানির উত্থানের সাথে সাথেই নষ্ট হতে শুরুও করে।
নৌ বাহিনীতে বৃটেনের একাধিপত্য দেখে জার্মানিও তাদের নৌবাহিনীর আকার ও উৎকর্ষ বৃদ্ধি করতে শুরু করে এবং সত্যি সত্যিই তাদের নৌ বাহিনীকেও একই উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়।তবে বৃটেন আগে থেকে সমুদ্রের দুরত্ব থাকার ফলে বাকী ইওরোপের দিকে নজর তেমন রাখেনি, ফ্রান্সও তেমনই একই ভাবে এক পাশে বলে ইওরোপ ভুখন্ডের দিকে নজর তেমন রাখে নি।অতএব জার্মানি নিজের কাজই করে যাচ্ছিল এবং বৃটেন ও ফ্রান্সের পরেই সবচেয়ে বেশি ভূমি তারাই দখল করে নেয়।সুতরাং এবার তাদের অপেক্ষাই করতে হচ্ছিল কিছু না কিছু হওয়ার জন্য।তবে উপরোক্ত জাতিগুলো সেই সমস্ত নিয়ে কিছু ভাবছিল না, তাদের কাছে এটা ছিল বড়ই সুখের সময়।এ ভাবে বিংশ শতাব্দীর উষাকাল এসে দাঁড়াল 1914 সালের গ্রীষ্মে, যখন পৃথিবীর সাম্রাজ্যবাদী ও সুখী চেহারা বেশ ভালোই দেখা যাচ্ছিল।তবে সেই সুখের দিনেই অকস্মাৎ 28 শে জুনে সেরাজেভোতে অস্ট্রিয়ার আর্চ ডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্ড সস্ত্রীকই নিহত হলেন আততায়ীর গুলিতে।বলকানের এক সামান্যই শহর সেরাজেভো, হত্যাকারী ক্ষুদ্র সার্বিয়া রাজ্যের সামান্য একজন ষড়যন্ত্রকারী তবে নিহত মানুষটি কিন্তু কোনও সামান্য লোকই নন।অস্ট্রিয়া - হাঙ্গেরী রাজ্যের হাপসবার্গ রাজবংশে তিনি উত্তরাধিকারী।তাই বারুদাগারে অগ্নিসংযোগের মতোই সারা ইওরোপ যেন জ্বলে উঠল।তবে আমাদের মনে হবে যে, ভাই এক দেশের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী তাঁর নিজের দেশে তো নিহত হয়েছেন আর তা নিতান্তই সেই দেশের অন্তর্নিহিত ঘটনা, তাতে সারা ইউরোপ কেনই বা জ্বলে উঠতে যাবে, এটা কেন ঘটল?এর উত্তর পেতে হলে আমাদের প্রয়োজন সেই সময় কেমন রাজনীতি চলছিল ইউরোপে তা জানা নাহলে কিছুই বোঝা যাবে না।
তবে সেসবের আগে আমরা একবার জেনে নিই যে, রাজকুমার যে নিহত হয়েছিলেন সেই ঘটনাটা ঘটেছিল কী ভাবে।প্রথমতঃ এই সাম্রাজ্যের সম্রাট ছিলেন ফ্রান্সিস যোশেফ ও সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল 1867 সালে।সে সময়ে বর্তমানের কয়েকটি দেশ ছিল একই সঙ্গে আর পোল্যান্ড নামে কোন দেশ ছিলই না।তাদের স্বাধীনতা 100 বছর আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল, পোল্যান্ড বিভক্ত ছিল অস্ট্রিয়া রাশিয়া জার্মানি এই তিন দেশের মধ্যে।তবে পোল্যান্ড না থাকলেও তার বর্তমান রাজধানীটি তখনও ছিল, অর্থাৎ আমি ওয়ারশর কথা বলছি।তো সাম্রাজ্যের সম্রাট যে ছিলেন ফ্রান্সিস যোশেফ, তাঁর তিনটি পুত্র ও একটি কন্যা ছিল কিন্তু পুত্ররা কেউ সম্রাট হওয়ার যোগ্য ছিলেন না।তাই দুঃখিত হলেও তিনি ভ্রাতুষ্পুত্রকে উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করে দেন।কোথাও বলা আছে তাঁর ভাগ্নে, আবার কোথাও বলা আছে তাঁর পুত্র, তবুও আমরা ভ্রাতুষ্পুত্র লিখব কারণ প্রায় সব জায়গাতেই ভ্রাতুষ্পুত্রই বলা হয়েছে।উত্তরাধিকারী তিনি মনোনীত করলেও এটাও তিনি লিপিবদ্ধ করেন যে, রাজকুমারের পুত্র কিন্তু পরবর্তী সম্রাট হতে পারবেন না।হয়তো তিনি ভেবেছিলেন যে তাঁর নিজের কোনও পুত্র তো ভবিষ্যতে যোগ্য পুত্রের পিতা হতেই পারেন।যাইহোক রাজকুমার এ নিয়ে তখন কোনও উচ্চবাচ্য করেননি কারণ তিনিও হয়তো ভেবেছিলেন যে যখন তিনি সম্রাট হবেন তখন তাঁরও তো পরবর্তী সম্রাট মনোনীত করবার জন্য অনেকটা ক্ষমতা হাতে থাকবেই তাই এখনই কোনও কথা বলার জন্য উচিত সময় নয়।তো ধীরে ধীরে এসে গেল 1914 সাল আর সে সময় সম্রাট ফ্রান্সিস যোশেফ অসুস্থ ও শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন।তবে তার আগেই তিনি বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা দেশটিকেও 1908 সালে জিতে, তাঁর সাম্রাজ্যটির অন্তর্ভুক্ত করে নেন যার আয়তন ছিল প্রায় 51000 sq.km.এই দেশটি তিনি জিতে নিয়েছিলেন অটোমান সাম্রাজ্য থেকে।তাতেই কী হলো যে, যে দেশটি 400 বছর ধরে অটোমান সাম্রাজ্যের গোলাম ছিল তারা স্বাধীনতা পেল না বরং তারা আর এক সাম্রাজ্যের দাসে পরিণত হলো।এতে বসনিয়ানরা খুব যে আনন্দিত হয়ে উঠল না সেটা তো আন্দাজ করা তেমন কঠিন নয়।তবুও সম্রাট যেহেতু শয্যাশায়ীই, রাজকুমার চাইছিলেন সারা দেশেই একবার ঘুরে দেখে এসে তার পরেই সম্রাটের মৃত্যুর পরে তাঁর অভিষেক হোক।তখন তাঁর বয়সও হয়ে গেছিল পঞ্চাশ বছর প্রায় এবং তাঁর একটি পুত্র ও দু'টি কন্যাও জন্ম নিয়েছিল।তবে রাজ্যের গুপ্তচর যাঁরা ছিলেন তাঁরা বললেন যে, সমস্ত জায়গায় গেলেও তিনি যেন কিছুতেই সেরাজোভায় না যান, আমাদের দেশ ভারতে যেমন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁর সিকিউরিটি অফিসারদের কথা না শুনে উল্টে বলেছিলেন "কেন শিখ দেহরক্ষী কেন রাখব না, are we not secular?"তো একই ভাবে রাজকুমার গুপ্তচরদের কথা তেমন একটা গ্রাহ্যই করলেন না, তিনি ঠিক করলেন আরে বাবা বসনিয়া সবে হাতে এসেছে তাই সেরাজোভায় তো যেতেই হবে, সবার কথায় গুরুত্ব দিলে কী চলে নাকি, হুঁ হুঁ বাবা দেশ চালানোটা কী আর যার তার কাজ!
28 শে জুন 1914 সালে একটি শাহী ট্রেন সেরাজোভা স্টেশনে পৌঁছে গেল নির্ধারিত সময়ে, ইউরোপে কেউই 'জ' উচ্চারণ করে না তারা বলে সেরাওভা তো ট্রেন পৌঁছতে শাহী দম্পতি নেমে আসেন।গভর্নর ও আরও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা তাঁদের রাজকীয় সম্মানে স্বাগত জানালেন।আগে থেকেই পুরো পরিকল্পনা ছকে রাখা হয়েছিল, সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী তাঁদের জন্য ছ'টি হুডখোলা গাড়ি সার দিয়েই স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল কারণ দম্পতির ইচ্ছে মতোই তাঁরা দেরী না করে সঙ্গে সঙ্গে টাউন হলে যাবেন যেখানে আর একটি সভার আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে রাজকুমার তাঁর বক্তব্য পেশ করবেন এবং তাঁর মনোরঞ্জনের জন্য বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করা হবে।হুডখোলা গাড়িই ষড়যন্ত্রের অংশ, তা অবশ্য নয় আসলে সেসময় প্রায় সব গাড়িই হুডখোলা হতো আর তখন তো গ্রীস্মকালই।আরও একটি বিষয় এখানে বলে নিই, আগে বলেছি যে, বসনিয়ার মানুষ এই দ্বিতীয়বারের পরাধীনতাটা একেবারেই ভালো ভাবে নেয়নি।তো বসনিয়া পরাধীন হওয়ার আগেই তার পাশের দেশগুলো যেমন সার্বিয়া রোমানিয়া বুলগেরিয়া এইসব দেশগুলো অটোমান সাম্রাজ্যের হাত থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছিল কারণ রাশিয়া তাদের সাহায্য করেছিল।তো সার্বিয়া চেয়েছিল যে, রোমানিয়া আর বসনিয়াকে সঙ্গে নিয়ে ও সাম্রাজ্যের থেকে কিছুটা অংশ নিয়ে তারাই শ্লাভ জাতির নিজস্ব একটি বড় দেশ তৈরি করবে ও তার নাম হবে যুগোশ্লাভিয়া। যুগোশ্লাভিয়া কথাটার অর্থ হল গিয়ে, দক্ষিন দিকের শ্লাভ জাতিগোষ্ঠী।পরে তারা এই নামের একটি দেশের সৃষ্টিও করে তবে নিজেদের মধ্যে কোন্দলের ফলেই দেশটি পরে বিলুপ্তও হয়ে যায়, রাশিয়ায় যেহেতু এই জাতির মানুষও প্রচুর রয়েছে সেজন্যই রাশিয়া তাদের সাহায্য করেছিল স্বাধীন হতে।তবে যে সময়ের কথা আমি বলছি সেই সময়ে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা অন্য একটি সাম্রাজ্যের হাতে চলে গেল বলে খুবই রুষ্ট হয় সার্বিয়া।সার্বিয়ায় এক বিপ্লবী দল সৃষ্টি হয় এর পরেই যার নাম ছিল Black hand. এই দলটি সাহায্য পেত সার্বিয়া সরকারের Intelligence য়ের agency থেকে আর বসনিয়ায় ওদের একটি শাখা ছিল যার নাম ছিল ইয়ং বসনিয়া।বসনিয়ার কম বয়সী সাহসী যুবকদের দল ছিল এটি, এই দলটির ছ'জন খুব সাহসী যুবকও এই ঘটনায় জড়িত ছিল।এই সব তথ্য অবশ্য পরে জানা যায় যখন আক্রমণকারী যুবক গ্রেপ্তার হয়, এমনকি যুবকটির পিস্তল পর্যন্ত Serb Intelligence ই সরবরাহ করেছিল।
যাইহোক পৃষ্ঠপট ছেড়ে আমরা এবার মুল ইতিহাসে ফিরে আসি, ফুল দিয়ে সাজানো মোট ছ'টি গাড়ির দিকে সব লোক এগিয়ে গেলেন।প্রথম গাড়িতে বসলেন রাজকুমার তাঁর স্ত্রী, পেছনের সীটে, ড্রাইভারটির নাম লিওপোলড লয়কা।পরের গাড়িগুলোতে গার্ডদের দল, গাড়ির বহরটি চলতে শুরু করল এবং শুরু হলো রাজকুমারের নগরটি পরিদর্শনের কাজ।রাস্তারও একদিকে উঁচু দেওয়াল আরেক দিকে খাদ, তো সেদিন রবিবার তাই মানুষও অনেকই জমা হয়েছে রাজ দম্পতিকে দেখার জন্য।এদের মধ্যেই ছ'জন বিপ্লবীদের সকলে লুকিয়ে আছেন তবে প্রত্যেক বিপ্লবীই পৃথক পৃথক স্থানে রয়েছেন।এবারে একটি স্থানে মোড় নিতে গিয়ে গাড়িটির গতি কিছুটা কমে গেল সঙ্গে সঙ্গেই একটি বোমা এসে পড়ল ঠিক উইন্ড স্ক্রিনের পাশেই বনেটের ওপরে। সেখানে ধাক্কা খেয়ে বাঁ দিকে বোমাটি গিয়ে পড়ল রাস্তায়।প্রচন্ড শব্দে সেটি ফাটল, তবে ততক্ষনে প্রথম গাড়িটি এগিয়ে গেছে ও দ্বিতীয় গাড়িটির গার্ড মারাত্মক ভাবে আহত হয়েছেন দুজন আর তাছাড়া আরও গার্ডেরা আহতই হয়েছেন কয়েকজন, তবে কেউ নিহত হননি।রাজকুমার ও তাঁর স্ত্রী যার নাম ছিল সোফি, তাঁরা উভয়ে গাড়ি ছেড়ে নেমে এলেন ও স্থানীয় লোকেদের ও সরকারি অফিসারদের সাহায্য নিয়েই সবাইকে হাসপাতাল পাঠাবার ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন।অতঃপর তাঁরা পুনরায় টাউন হলটির দিকেই অগ্রসর হলেন।তো যিনি বোমাটি ছুঁড়েছিলেন তিনিও দেখলেন যে, ওখানে আর থাকা ঠিক হবে না তখন তিনি অর্থাৎ নেভিলকো ক্রাভিনোভিচ পকেট থেকে বের করে নিলেন পটাশিয়াম সায়ানাইডের এক capsule ও সেটি মুখে ঢুকিয়ে নিলেন কিন্তু সেটির তারিখ হয়তো আর ছিল না অর্থাৎ তারিখ expire করে গেছিল তাই সেটি কোন কাজ করল না।তিনি অতঃপর দেখলেন, একজন পুলিশও তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে তাই দেরী না করে তিনি দৌড়ে কাছের পুলটির ওপরে গিয়ে সেখান থেকে জলে ঝাঁপ দিলেন।তবে সেদিন তাঁর কপাল মনে হয় খারাপই ছিল কারণ যেখানে ঝাঁপ দিলেন সেখানে নিতান্তই হাঁটুজল।এর পরে যা হওয়ার তাই হয়ে গেল, তাঁকে পুলিশের হাতেই গ্রেফতার হতে হলো।যাইহোক ওদিকে রাজকুমার দলবল নিয়ে পৌঁছে গেলেন টাউন হলে তাঁকে সেখানেও রাজকীয় সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে হলে স্বাগত জানানো হলো।তো একটি ছোট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষ হলে রাজকুমার তাঁর ভাষণ দিলেন ও তার মধ্যেই তিনি নিজের ক্ষোভটাকে গোপন করে উঠতে পারলেন না তিনি এক সময় বলেই ফেললেন যে, তিনি এই শহরে এসেছেনই নাগরিকদেরকে তাঁর শুভেচ্ছা জানাতে আর সেখানেই কিনা তাঁকে বোমা ছুঁড়ে স্বাগতম বলা হলো!
যাইহোক ভাষণ শেষেই ঘোষণা করলেন তিনি যে, তিনি খুব খুশি হয়ে লক্ষ্য করেছেন তাঁকে যে আতিথেয়তা প্রদান করা হয়েছে তা খুবই চমৎকার ও রাজকীয় কিন্তু তাঁর গার্ডদের শরীর কেমন আছে তা নিয়ে তিনি চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন তাই তিনি এখনই হাসপাতালে একবার যেতে চান, তাঁকে যেন তাঁরা দয়া করে এখনই ছেড়ে দেন।এই কথা বলে তিনি হাসপাতালের দিকে রওনা হয়ে গেলেন তখন।হাসপাতাল তেমন একটা দূরে নয়, ছোট শহর সবকিছুই আশেপাশেই রয়েছে।রবিবার যেহেতু সেজন্য বেশিরভাগ লোকজন রাস্তায় রয়েছেন তখনও, একটু পরে বেরিয়ে এলেন রাজকুমার আর সোফি সদলে আর গাড়ির বহরও চলতে শুরু করল কিন্তু সোফি যিনি ছিলেন ডাচেস অফ ওডেনবার্গ 1900 সালে বিয়ে করে এ রাজবংশে বধু হয়ে এসেছিলেন তিনি এই বোমা নিক্ষেপের ঘটনায় খুব ভয়ে ভয়ে ছিলেন।যাইহোক কিছুক্ষন পরে লয়কা গাড়ি চালাতে চালাতেই এবার একটি ভুল মোড়ে টার্ন নিয়ে ফেলেন।তবে সঙ্গে সঙ্গেই তিনি বুঝতে পারেন যে, আরে এদিকে তো নয় এবং তিনি গাড়ি থামান ঠিক দিকে যাবেন বলে, এখন ছয়টি গাড়ি তাই ধীরে ধীরে সব গাড়িই রিভার্স গিয়ারে পেছনের দিকে ফিরছিল।ঠিক ঐ মোড়ে ঘাসের ওপর বসে হুইস্কি খাচ্ছিল Gavrilo Princip নামের ইয়ং বসনিয়ার এক যুবক।সে এত কাছে রাজকুমারকে পেয়ে যাবে তা ভাবতেই পারেনি।সে কী করল যে, মাত্র প্রায় পাঁচ ফুট দূরত্ব থেকে দৌড়ে গিয়ে গাড়ির পা'দানীর ওপর পা'টাকে রেখে গুলী চালিয়ে দিল।একটি গুলী লাগল রাজকুমারের গলায় ও অন্যটি গিয়ে লাগল তাঁর স্ত্রীর পেটে।
পুলিশ এসে সঙ্গে সঙ্গেই আততায়ীকে গ্রেপ্তার করে ফেলল বটে কিন্তু সোফি ও রাজকুমারকে আর বাঁচানোই গেল না।এ দুই হত্যাকারীর কাছ থেকে সব কিছু জানা গেল, সার্বিয়াই যে আসলে এ সবকিছুর পেছনে তাও জানা গেল, সম্রাটের কাছেও সব সংবাদ আসল।এত বড় সাম্রাজ্যের রাজকুমারকে যে তারা হত্যা করিয়েছে তার ফল তাদের তো পেতেই হবে।তবে সম্রাট অবশ্য এ ঘটনা নিতান্তই ঈশ্বরের ইচ্ছায় হয়েছে এতে আর মানুষ কী করবে, এই সমস্ত কথা বলেই ঘটনাটি রফাদফা করবার চেষ্টা করছিলেন।তবে তাঁর সেনাপতি সেটা হতেই দিলেন না, তিনি বার বার তাঁকে বলতে লাগলেন যে, সার্বিয়াকে এভাবে ছেড়ে দেওয়া হলে সম্রাট এত বড় একটি সাম্রাজ্যকে শাসন করবেন কীভাবে?এর পরে বিভিন্ন রাজ্য নিজে থেকে সাম্রাজ্য ছেড়ে চলে যেতে যদি চায় তখন তাদেরকে আটকাতে তিনি কোন মুখে বাধা দেবেন?সম্রাটের তো অনেক বয়সও হয়েছে তিনি কত দিন আর সেনাপতির সঙ্গে পেরে উঠবেন? তাছাড়া দেখতে গেলে সেনাপতি ভুল কথাও তো বলছেন না, সত্যিই তো যে রাস্তায় তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন তাতে কী ভাবে সাম্রাজ্য ধরে রাখা যায়?সুতরাং তিনি অবশেষেই রাজী হয়েও গেলেন, তাঁরও বয়স হয়ে গিয়েছিল 83 বছর, কতদিন ধরেই তিনি আর সেনাপতির সঙ্গে বাকবিতণ্ডা করবার ক্ষমতা ধরে রাখতে বা পারবেন?
অতএব 23 শে জুলাই অর্থাৎ হত্যার 25 দিন পরে সাম্রাজ্য থেকে সার্বিয়ার কাছে একটি আল্টিমেটাম এসে গেল, সেই চিঠিতে 10 টি দাবি করা হয়েছে। সবগুলোই সার্বিয়াকে মেনে নিতে হবে এমনই সেখানে লিখে দেওয়া হয়েছে। সার্বিয়া সে সব শর্তের 8 টি শর্ত মেনে নিল বাকী দুটি শর্ত না মানতে পারার জন্য দুঃখ প্রকাশ করল কারণও বলে দিল যে, বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পণ যদি তারা করে আর সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত হয় তাহলেই সেটা নিতান্তই রাজধর্মের অপমান করা হবে।এতটা নত হওয়ার পর সম্রাটের যদিও তা মেনে নেওয়ার কথা ছিল কিন্তু সেনাপতির ইচ্ছে ছিল যে, এ ক্ষুদ্র সার্বিয়া তাদের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাওয়াই ঠিক হবে।তাই যুদ্ধ শুরু হয়েই গেল, সার্বিয়ার উত্তর পশ্চিম দিক থেকে কামান দিয়ে লম্বা লম্বা দুরত্বের গোলা ছোঁড়া শুরু হয়ে গেল।তাহলে তো হয়েই গেল, বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল আর এটা জানার জন্য এই রচনাটিও লেখা, তাই এবারে এটি শেষ করাই যায়।তবে এটি শুধু হাঁড়ির ঢাকনাটিই খোলা হলো এখনও বাকী আছে হাঁড়ির খবরের।অর্থাৎ এখনও তো এই রচনার নায়ক খলনায়কেরাই আখাড়ায় স্থান গ্রহণ করেনি শুধুমাত্র সাইড রোলের চরিত্রগুলো অভিনয়টা শুরু করেছে।তবে যদি তেমন একটা সাড়া না পাই তাহলে বুঝতে পারব যে পাঠকগণ এতেই খুশি তাই আমাকেও আর পরিশ্রম করতে হবেনা।যাইহোক শেষ করার আগেই একবার অকুস্থলে ঘুরে আসি আমরা অর্থাৎ যেখানে সব কিছুই হয়েছিল যার অর্থ হত্যাকান্ডটি যেখানে ঘটেছিল, সেখানে হত্যাকারী ও নিহতদের জন্যেই কি ব্যাবস্থা গ্রহন করা হয়েছিল।আততায়ীর ছিল ক্ষয় রোগ অর্থাৎ তার মনে কোনও সুখও ছিল না, সুখ থাকলে সে একা একাই কেন বসে হুইস্কি খাচ্ছিল!সে তো বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে বসে হৈচৈ করে হুইস্কি খেতে পারত, অথবা নিজের কাজের প্রতি আরও যত্নবান হতে পারতো, না হয়ে সে কপালের ওপর ফেলে রাখত না যে, কখন ভুল করে রাজকুমারের গাড়ি তার সামনে এসে যাবে।বিচারে তার ফাঁসি হয়ে যেত কিন্তু দেখা গেল যে, কুড়ি বছর পূর্ণ হতে এখনও দুটি মাস বাকি রয়েছে তার।সুতরাং তাকে অস্ট্রিয়ার নিয়ম অনুযায়ী ফাঁসি দিতে পারা সম্ভবই নয়, তাই তাকে 20 বছর কারাদণ্ডই দেওয়া হলো তবে অসুখের জন্যে সে মাত্র চার বছর সাজা খাটার পরেই মৃত্যু বরণ করল।2015 সালেই সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট চিন্তা করা উচিত ভাবলেন, কিছু একটা করা ঠিক এবং কর্তব্য হবে Gavrilo র জন্য, তমিস্লাভ নিকলিচ তাঁর নাম ছিল।তিনি একটি মর্মর মূর্তি স্থাপন করলেন তার, সেটা স্থাপন করলেন তিনি রাজধানীতেই ও তাকে জাতীয় বিপ্লবীর মর্যাদা দিলেন, যদি কখনও বেলগ্রেডে যান তাহলেই দেখতে পাবেন সেই মর্মর মূর্তি।অপর দিকে জুলাই মাসের 04 তারিখেই শেষ কৃত্য সম্পন্ন করা হলো শাহী দম্পতির ভিয়েনা নগরীতে, সাম্রাজ্যে সর্বত্র সব মানুষ শোক প্রকাশ করলেন এরপরই তাঁদের মৃতদেহ ভিয়েনা থেকেও 122 km দূরে Artstetten Castle এ নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানেই গোর দিয়ে দেওয়া হয়।
Sources :
1) Why The W.W.1 took place?
By Saifullah Saif.
2) First World War (Complete History).
By Dr. Faisal Warrich.
3) Unknown Facts Of W.W.1
By Dr. Hitesh Giri Gosai.
৩১
মানুষের DNA
মানুষের DNA-তে প্রায় ছয়শ কোটি বেস বা জেনেটিক সংকেত। এর মধ্যে কোন অংশটি কখন সক্রিয় হবে, কোন কোষে কাজ করবে এবং কতটা সক্রিয় হবে, তার নির্দেশনা ছড়িয়ে আছে এই বিশাল জেনেটিক ভাণ্ডারে। এতদিন এই নির্দেশনার অনেকটাই বিজ্ঞানীদের কাছে অস্পষ্ট ছিল। এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI ব্যবহার করে সেই জটিল কোডের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের সংকেত শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। আবিষ্কারটি শুধু একটি DNA অনুক্রম খুঁজে পাওয়ার বিষয় নয়, বরং জিন কীভাবে চালু হয়, সেই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র উন্মোচন করেছে।
গবেষণাটি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের University of California San Diego-এর অধ্যাপক James T. Kadonaga-র দল। গবেষকেরা DNA-র একটি বিশেষ অংশ নিয়ে কাজ করেছেন, যার নাম ‘initiator’। জিনের নির্দেশনা থেকে কার্যকর RNA তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়া কোথা থেকে শুরু হবে, এই অংশটি সেই শুরুর স্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু মানুষের জিনে ঠিক কোন DNA বিন্যাস এই কাজটি করে, তা সব ক্ষেত্রে স্পষ্ট ছিল না।
সমস্যাটি বোঝার জন্য আগে জানতে হবে, জিন থাকা মানেই জিনটি সবসময় সক্রিয় নয়। শরীরের প্রতিটি কোষে প্রায় একই DNA থাকলেও মস্তিষ্ক, পেশি বা যকৃতের কোষে ভিন্ন ভিন্ন জিন সক্রিয় থাকে। ফলে DNA-র মধ্যে এমন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রয়োজন, যা সঠিক জিনকে সঠিক সময়ে সক্রিয় করে। এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো initiator।
গবেষকেরা প্রায় ৫ লাখ ভিন্ন DNA sequence পরীক্ষা করে দেখেন কোন ধরনের initiator জিন সক্রিয় করার সঙ্গে বেশি কার্যকরভাবে যুক্ত। এই বিপুল পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে একটি machine learning মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এরপর AI DNA-র অক্ষরগুলোর মধ্যে এমন একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য খুঁজে বের করে, যা initiator-এর উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল আসে মানুষের জিন বিশ্লেষণের সময়। AI মডেলটি দেখায়, প্রায় ৬০ শতাংশ মানব জিনে এই initiator-এর বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। অর্থাৎ বিজ্ঞানীরা এখন শুধু একটি পরিচিত DNA অংশ দেখছেন না, বরং তার কোন বৈশিষ্ট্য জিন সক্রিয় করার সঙ্গে সম্পর্কিত, সেটিও বিশ্লেষণ করতে পারছেন।
এর সম্ভাব্য গুরুত্ব আরও বড়। DNA-র এই অঞ্চলে কোনো ক্ষতিকর mutation বা জেনেটিক পরিবর্তন ঘটলে জিনের কার্যকলাপ বদলে যেতে পারে। ভবিষ্যতে এমন AI মডেল ব্যবহার করে কোনো পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব আগে থেকেই অনুমান করা সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে জিনকে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করার জন্য synthetic promoter তৈরির গবেষণাতেও এই তথ্য কাজে লাগতে পারে।
তবে এটি এখনও মানুষের পুরো gene expression code পড়ে ফেলার সমান নয়। গবেষকদের নিজেদের ভাষাতেই initiator নিয়ে তৈরি এই মডেল সেই বিশাল জেনেটিক নির্দেশনার একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অংশ মাত্র। পরবর্তী লক্ষ্য হলো DNA-র আরও বহু নিয়ন্ত্রণ সংকেতকে একইভাবে পরীক্ষাগারের তথ্য ও AI-এর সাহায্যে শনাক্ত করা। সেই কাজ এগোলে মানুষের জিন কীভাবে কখন এবং কোথায় সক্রিয় হয়, তার অনেক বেশি নির্ভুল মানচিত্র তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
তথ্যসূত্র: University of California San Diego; ScienceDaily; Torrey E. Rhyne-Carrigg et al., Machine learning analysis of the human initiator region reveals key features of different types of core promoters, Genes, 2026.
৩২
মিষ্টি জিনিসের সাথে পেটে কৃমি হওয়ার সরাসরি সম্পর্ক আছে কি?
আমাদের দেশের বাবা-মায়েরা আমাদেরকে সবচেয়ে বেশি যে ভয়গুলো দেখান, তার মধ্যে একটি হলো, "বেশি মিষ্টি খাস না, পেটে কৃমি হবে।"
ছোটবেলা থেকে এই কথা শুনে আমরা অনেকেই বিশ্বাস করে নিয়েছি যে, মিষ্টি জিনিসের সাথে পেটে কৃমি হওয়ার সরাসরি সম্পর্ক আছে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান কি আসলেই এই দাবিকে সমর্থন করে?
আদতে এটি শিশুদের ভয় দেখানোর জন্য তৈরি করা সম্পূর্ণ একটি অবৈজ্ঞানিক মিথ। মিষ্টি, চকলেট বা চিনির সাথে পেটে কৃমি হওয়ার সরাসরি কোনো সম্পর্কই নেই।
বিজ্ঞান বলছে, কৃমি হলো এক ধরনের পরজীবী বা প্যারাসাইট। এগুলো কোনো খাবার থেকে পেটের ভেতরে নিজে নিজে তৈরি হতে পারে না। শরীরে কৃমি হওয়ার জন্য অবশ্যই বাইরে থেকে কৃমির ডিম বা লার্ভা মানুষের পেটে প্রবেশ করতে হবে। আপনি যতই চিনি বা চকলেট খান না কেন, তা শরীরের ভেতরে পরজীবী বা কৃমি তৈরি করতে পারে না।
তাহলে পেটে কৃমি আসলে কীভাবে হয়?
মূলত অপরিচ্ছন্নতাই এর প্রধান কারণ। মাটি বা ধুলায় খেলার পর হাত না ধুয়ে খাবার খেলে হাতের নখে থাকা কৃমির ডিম সহজেই পেটে চলে যায়। এছাড়া কৃমির ডিমযুক্ত দূষিত পানি পান করলে, ভালো করে না ধোয়া শাকসবজি বা কাঁচা-অর্ধসেদ্ধ মাংস খেলেও শরীরে কৃমি প্রবেশ করতে পারে। এমনকি অপরিষ্কার বা স্যাঁতসেঁতে মাটিতে খালি পায়ে হাঁটলে হুকওয়ার্মের মতো কিছু কৃমির লার্ভা সরাসরি ত্বক ভেদ করে শরীরে ঢুকে যায়।
তাহলে মিষ্টির সাথে কৃমির নাম কেন জড়ানো হলো?
এর পেছনের সবচেয়ে যৌক্তিক কারণ হতে পারে, বাচ্চারা অনেক সময় ধুলোবালিতে খেলার পর অপরিষ্কার হাতেই মিষ্টি বা চকলেট খায়। সেই অপরিষ্কার হাতের মাধ্যমেই মূলত কৃমির ডিম পেটে যায়, আর দোষ গিয়ে পড়ে মিষ্টির ওপর। অতিরিক্ত মিষ্টি খাওয়া দাঁতের ক্যাভিটি বা স্থূলতার জন্য ক্ষতিকর, কিন্তু এটি কোনোভাবেই পেটে কৃমি তৈরি করে না।
@ আদতে কি
৩৩
Attention Seeking
ধরুন একদল বন্ধু মিলে আড্ডা দিচ্ছে কিন্তু একজন বারবার সবার কথা থামিয়ে দিয়ে নিজের অতীত সাফল্য, রূপ বা গুণ গেয়ে নিজেকে আলোচনার কেন্দ্রে টানার চেষ্টা করছেন। আমাদের আশেপাশে প্রায় এমন কিছু মানুষ দেখি যারা কথায় কথায় নিজের সাফল্য,গুণের প্রশংসা করে এবং সব পরিস্থিতিতে নিজেকে আলোচনার কেন্দ্রে রাখার চেষ্টা করে যাকে আমরা Attention Seeking বলি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন এর তথ্যমতে, এই ধরনের আচরণ সবসময় কোনো রোগ নাও হতে পারে। অনেক সময় এটি মানুষের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। যখন মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে তখন এ ধরনের আচরণ করে।নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস কমে গেলে বাইরের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিজের যোগ্যতা নিশ্চিত করতে চায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আন্তর্জাতিক রোগ নির্দেশিকা অনুযায়ী, এই আচরণ যখন একজন লোকের পরিবার, সমাজ ও কর্মস্থলের পরিবেশ নষ্ট করে এবং তীব্র রুপ নেয় তখন তাকে Personality Disorder বলে। মূলত দুটি ডিসঅর্ডারের সাথে এই আচরণ সরাসরি জড়িত।প্রথমটি নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার। এই ডিসঅর্ডারের ফলে ব্যক্তি নিজেকে সবার সেরা মনে করে। ফলে অন্যের চিন্তা না করে শুধু নিজের প্রশংসা শোনার তীব্র আকাঙ্ক্ষা কাজ করে। দ্বিতীয়টি হলো হিস্টিওনিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার। এতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবসময় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে চায়। যখনই তারা কম আকর্ষণ পায় তখন অস্বস্তি বোধ করে এবং তখন নাটকীয় আচরণ করে।
তাই আড্ডায় বা সমাজে কাউকে সবসময় নিজেকে জাহির করতে দেখলে তাকে শুধু বিরক্তিকর বা অহংকারী ভেবে বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এর পেছনে যেমন থাকতে পারে মনের গভীরের নিরাপত্তাহীনতা তেমনই এটি হতে পারে নার্সিসিস্টিক অথবা হিস্টিওনিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারের প্রাথমিক লক্ষণ। সাধারণ স্বভাব আর মানসিক সমস্যার মাঝের এই সূক্ষ্ম ব্যবধান বুঝতে পারা জরুরি। তাই এই ধরনের আচরণ যখন কারও ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে তখন তাকে কোনো ট্যাগ না দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে একজন সাইকোলজিস্টের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেওয়া উচিত।
@ আদতে কি
৩৪
হাতের নখে সাদা ছোপ বা দাগ
ছোটবেলায় আমাদের হাতের নখে সাদা ছোপ বা দাগ দেখলেই পরিবারের বড়রা বলতেন, তোর শরীরে ক্যালসিয়ামের অভাব হয়েছে, বেশি করে দুধ খা। কিন্তু এর পেছনের আসল বিজ্ঞানটা কী? আসলেই কি ক্যালসিয়ামের অভাবে নখে এমন সাদা দাগ হয়?
আদতে এটি আমাদের সমাজে প্রচলিত অত্যন্ত সাধারণ এবং ভিত্তিহীন একটি মিথ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় নখের এই সাদা দাগকে Leukonychia বলা হয়। এর সাথে শরীরে ক্যালসিয়াম বা অন্য কোনো ভিটামিনের অভাবের কোনো সম্পর্ক নেই।নতাহলে এই দাগগুলো কেন হয়?
বিজ্ঞান বলছে, আমাদের নখের গোড়ায় যে অংশটি থাকে (যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে Nail matrix বলা হয়), সেখানে কোনো কারণে ছোটখাটো আঘাত লাগলে নখে এমন সাদা দাগ তৈরি হয়। যেমন- দরজার ফাঁকে আঙুল সামান্য চাপা পড়া, দাঁত দিয়ে নখ কামড়ানো, শক্ত কিছুতে টোকা দেওয়া বা অতিরিক্ত চাপ লাগা।
নখের গোড়ায় আঘাত লাগার সাথে সাথেই এই দাগ দেখা যায় না। বেশ কয়েক সপ্তাহ পর যখন নখ ধীরে ধীরে বড় হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে আসে, তখনই এই সাদা দাগগুলো দৃশ্যমান হয়।
যেহেতু নখ খুব ধীরে বড় হয়, তাই আঘাত পাওয়ার কথা ততদিনে আমরা ভুলেই যাই এবং একে ক্যালসিয়ামের অভাব বলে ধরে নিই। নখ বড় হয়ে যাওয়ার পর কেটে ফেললে এই দাগগুলো প্রাকৃতিকভাবেই চলে যায়।
@ আদতে কি
৩৫
DNA-তে জমা থাকা বংশগত তথ্য
সাধারণত আমরা ভাবি, পরিবার মানে শুধু ভালোবাসা, সম্পর্ক আর একসঙ্গে বেড়ে ওঠা। কিন্তু এর গভীরে লুকিয়ে আছে আরও বিস্ময়কর এক বৈজ্ঞানিক গল্প— হ্যাঁ, DNA-এর গল্প।
একটি শিশুর চোখ, চুলের ধরন, মুখের গঠন কিংবা শরীরের কিছু বৈশিষ্ট্য কেন বাবামায়ের সঙ্গে এতটা মিলে যায়? কারণ আমাদের শরীরের কোষের ভেতরে থাকা DNA-তে জমা থাকে বংশগত তথ্যের বিশাল এক নকশা। এই নকশাই তো আসল।
বাবা ও মা দুজনের কাছ থেকেই আমরা জিনের একটি করে কপি পাই। ফলে আমাদের DNA আসলে দুটো পারিবারিক ইতিহাসের এক আশ্চর্য মিশ্রণ। এই কারণেই একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে মিল থাকে, আবার প্রত্যেক মানুষই আলাদা।
আরও অবাক করার বিষয় হলো, DNA শুধু বাবা-মায়ের পরিচয় বহন করে না। এর ভেতরে বহু প্রজন্মের জেনেটিক ইতিহাসের ছাপও থাকতে পারে। আমাদের শরীরের ক্ষুদ্র কোষের মধ্যে এমন তথ্য লুকিয়ে আছে, যা আমাদের সঙ্গে বহু আগে বেঁচে থাকা পূর্বপুরুষদেরও এক অদৃশ্য সুতোয় যুক্ত করে।
তবে DNA মানেই ভাগ্য নয়। আমাদের জিন অনেক বৈশিষ্ট্যের সম্ভাবনা তৈরি করে, কিন্তু পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন এবং নানা জৈবিক প্রক্রিয়াও আমাদের শরীর ও জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ব্যাপার হলো, পরিবারে আমরা যে বন্ধনকে অনুভূতি দিয়ে বুঝি, DNA সেটার একটি জৈবিক ভিত্তিও দেখিয়ে দেয়। একই রক্তের সম্পর্কের মানুষগুলো যেন একই দীর্ঘ জীবনের গল্পের ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায়।
আসুন শেষ করি দুই লাইনে- আমাদের শরীরের গভীরেও সেই সম্পর্কের একটি অদৃশ্য স্বাক্ষর লেখা থাকে মাত্র কয়েকটি অণুর ভাষায়, DNA-এর ভাষায়। ● তথ্য সংকলন: আল মামুন রিটন
৩৬
চা খেলে কি গায়ের রং কালো হয়ে যায়?
গায়ের রং কালচে হয়ে যাওয়ার ভয়ে অনেকেই, বিশেষ করে মেয়েরা নাকি চা খাওয়া থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখেন। চা নিয়ে ছোটবেলা থেকেই আমরা অনেকে শুনি যে, চা খেলে নাকি গায়ের রং কালো হয়ে যায়। আমাদের সমাজের অত্যন্ত পুরোনো প্রচলিত একটি তথ্য এটি। কিন্তু এই ভয়ের পেছনে কি আদৌ কোনো বিজ্ঞান আছে?
আদতে এটি পুরোপুরি একটি ভিত্তিহীন এবং হাস্যকর Myth। চা খাওয়ার সাথে গায়ের রং কালো বা ফর্সা হওয়ার দূরতম কোনো বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক নেই।
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, আমাদের গায়ের রং কী হবে, তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে আমাদের Genetics এবং ত্বকের নিচে থাকা Melanin নামক পিগমেন্টের ওপর। যার ত্বকে মেলানিনের মাত্রা যত বেশি, তার গায়ের রং তত গাঢ় হয়।
সাধারণত সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে, হরমোনের পরিবর্তনের কারণে বা জেনেটিক কারণে ত্বকে মেলানিন বাড়ে বা কমে। আমরা যে চা খাই, তার কোনো উপাদানেরই আমাদের রক্তে বা ত্বকের এই মেলানিন উৎপাদনকে বাড়িয়ে দেওয়ার বিন্দুমাত্র ক্ষমতা নেই।
বরং বিজ্ঞানের সত্যটা হলো একদম উল্টো। চায়ে (বিশেষ করে গ্রিন টি বা রং চায়ে) প্রচুর পরিমাণে Antioxidants থাকে। পরিমিত মাত্রায় চিনি ছাড়া চা খেলে তা আমাদের শরীরের দূষিত পদার্থ বের করে দিতে সাহায্য করে, যা পরোক্ষভাবে আমাদের ত্বককে সতেজ রাখতেই ভূমিকা রাখে। @ আদতে কি
৩৭
pain of paying
ক্যাশ টাকা খরচ করার সময় আমাদের মস্তিষ্ক টাকা খরচ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া, চোখ দিয়ে দেখা, হাত দিয়ে স্পর্শ করা, গণনা করা, সবশেষে অন্য কাউকে দিয়ে দেওয়া ইত্যাদি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। ফলে মস্তিষ্ক এটিকে আমাদের জন্য ক্ষতি হিসেবে ধরে নেয়। এ বিষয়টিকে আচরণগত অর্থনীতি ও ভোক্তা মনোবিজ্ঞানের ভাষায় pain of paying বলে।
অন্যদিকে বিকাশ, নগদ, কার্ড বা অন্যান্য ডিজিটাল পেমেন্টে বিষয়টি ভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। ডিজিটাল পেমেন্টের ক্ষেত্রে টাকা খরচের সিদ্ধান্ত নেওয়া, চোখ দিয়ে দেখা, হাত দিয়ে স্পর্শ করা, গণনা করা বা সরাসরি অন্য কাউকে দিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটে না। এক ক্লিকেই পুরো পেমেন্ট সম্পন্ন হয়ে যায়। বেশিরভাগ সময় ভাবার সময়টাও পাওয়া যায় না যে, “এই মুহূর্তে টাকা খরচ করাটা ঠিক হচ্ছে কি-না।” ফলে মস্তিষ্ক এই ক্ষতি ভালোভাবে বুঝতে উঠতেই পারে না।
ক্যাশ টাকা খরচ করার সময় মস্তিষ্ক যেসব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়, অনলাইন বা ডিজিটাল পেমেন্টে সেসব বিষয়গুলো অনুপস্থিত থাকে। এজন্য সার্বিকভাবে ক্যাশ টাকা খরচ করার চেয়ে মানুষ ডিজিটাল পেমেন্টে তুলনামূলক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। @ বিজ্ঞান ডায়েরি
৩৮
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল: আমাদের এবং মহাকাশের মধ্যে ৫টি স্তর
মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে একটি পাতলা নীল গোলকের মতো দেখতে লাগলেও, একে ঘিরে রয়েছে একটি জটিল বায়ুমণ্ডল যা কয়েকটি স্বতন্ত্র অঞ্চল নিয়ে গঠিত। আমরা প্রতিদিন যে আবহাওয়া অনুভব করি তা থেকে শুরু করে সেই সীমানা পর্যন্ত যেখানে পৃথিবী ধীরে ধীরে মহাকাশের সাথে মিশে যায়, প্রতিটি স্তরেরই একটি অনন্য ভূমিকা রয়েছে।
ট্রপোস্ফিয়ার — ~০–১২ কিমি
এটি সেই স্তর যেখানে আমরা বাস করি এবং যেখানে আমাদের দৈনন্দিন প্রায় সমস্ত আবহাওয়া ঘটে। মেঘ, বৃষ্টি, ঝড় এবং বাতাস এখানেই তৈরি হয়। বায়ুমণ্ডলের বেশিরভাগ ভর এবং প্রায় সমস্ত জলীয় বাষ্প এখানেই থাকে। উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে তাপমাত্রা সাধারণত কমতে থাকে।
স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার — ~১২–৫০ কিমি
স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে ওজোন স্তর অবস্থিত, যা সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মির বেশিরভাগ শোষণ করে। যেহেতু ওজোন সৌরশক্তি শোষণ করে, তাই এই অঞ্চলে উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে তাপমাত্রা সাধারণত বৃদ্ধি পায়। এখানকার বায়ুও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকে।
মেসোস্ফিয়ার — ~৫০–৮৫ কিমি
উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে তাপমাত্রা আবার কমে যায়, যার ফলে ঊর্ধ্ব মেসোস্ফিয়ার পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের অন্যতম শীতলতম অঞ্চলে পরিণত হয়। অনেক আগত উল্কাপিণ্ড এখানে উত্তপ্ত হয়ে ভেঙে যায়, যা থেকে উজ্জ্বল রেখা তৈরি হয় এবং আমরা সেগুলোকে উল্কা বলি।
থার্মোস্ফিয়ার — ~৮৫–৭০০ কিমি
থার্মোস্ফিয়ারে বায়ু অত্যন্ত পাতলা হয়ে যায়, এবং উচ্চ-শক্তির সৌর বিকিরণের কারণে তাপমাত্রা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। তাপমাত্রা প্রায় ২,০০০°C বা তারও বেশি হতে পারে, তবুও এই পাতলা বায়ু পৃথিবীর পৃষ্ঠের কাছাকাছি বায়ুর মতো গরম অনুভূত হয় না। এই অঞ্চলে অরোরা দেখা যায় এবং আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থার্মোস্ফিয়ারের মধ্যেই প্রদক্ষিণ করে।
এক্সোস্ফিয়ার — ~৭০০–১০,০০০ কিমি
এক্সোস্ফিয়ার হলো বায়ুমণ্ডলের সবচেয়ে বাইরের প্রধান অঞ্চল। গ্যাসের অণুগুলো অবিশ্বাস্যভাবে ছড়িয়ে থাকে এবং কিছু কণা পৃথিবীর মহাকর্ষীয় প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারে। বায়ুমণ্ডলের এমন কোনো সুস্পষ্ট সীমানা নেই যেখানে এটি হঠাৎ শেষ হয়ে যায়—এটি ধীরে ধীরে মহাকাশের পরিবেশে বিলীন হয়ে যায়।
গুরুত্বপূর্ণ: এই স্তরগুলোর কোনো সুনির্দিষ্ট সীমানা নেই। এদের আনুমানিক উচ্চতা ভিন্ন হতে পারে, এবং আয়নোস্ফিয়ার কোনো পৃথক স্তর নয়; এটি মেসোস্ফিয়ার এবং থার্মোস্ফিয়ারের কিছু অংশের উপর উপরিপাতিত থাকে এবং বৈদ্যুতিকভাবে চার্জিত কণা দ্বারা সংজ্ঞায়িত হয়।
বায়ুমণ্ডল কেন গুরুত্বপূর্ণ?
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, জীবন ধারণে সহায়তা করে, ক্ষতিকর সৌর বিকিরণ ফিল্টার করে, অরোরা তৈরি করে এবং ভূপৃষ্ঠে পৌঁছানোর আগেই অনেক আগত উল্কাপিণ্ডকে পুড়িয়ে দেয়।
ঝোড়ো ট্রপোস্ফিয়ার থেকে শুরু করে অত্যন্ত পাতলা এক্সোস্ফিয়ার পর্যন্ত, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল একটি অসাধারণ সুরক্ষা ব্যবস্থা যা আমাদের গ্রহকে মহাকাশের সাথে সংযুক্ত করে।
উৎস: নাসা সায়েন্স, নাসা গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টার এবং নোয়া। @ M. a. Kaiyum Mojumder
৩৯
সাইবার হাইজিন ও ডিজিটাল লিটারেসি: ইন্টারনেটে নিরাপদ থাকার আধুনিক উপায়!
আমরা যেমন প্রতিদিন সকালে উঠে হাত ধোয়া বা ব্রাশ করার মতো ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি বা হাইজিন মেনে চলি, তেমনি ডিজিটাল যুগে সুস্থ ও নিরাপদ থাকার জন্য প্রয়োজন 'সাইবার হাইজিন' (Cyber Hygiene)। ইন্টারনেটের দুনিয়ায় আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য, ডিভাইস এবং অ্যাকাউন্টগুলোকে সুরক্ষিত রাখার নিয়মিত অভ্যাস বা চর্চাই হলো সাইবার হাইজিন। আর এটি সঠিকভাবে বোঝার জন্য প্রয়োজন সঠিক 'ডিজিটাল লিটারেসি' বা ডিজিটাল সাক্ষরতা।
সাইবার হাইজিন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
আজকের দিনে আমাদের জীবন অনেকটাই অনলাইন-নির্ভর। পড়াশোনা, সোশ্যাল মিডিয়া, ব্যাংকিং থেকে শুরু করে কেনাকাটা, সবকিছুই চলছে ইন্টারনেটে। কিন্তু সচেতনতার অভাবে আমরা প্রায়ই হ্যাকার বা সাইবার অপরাধীদের সহজ শিকারে পরিণত হই। তাই নিজেদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করতে এবং ডিজিটাল প্রতারণা এড়াতে সাইবার হাইজিন মেনে চলা এখন সময়ের দাবি।
দৈনন্দিন জীবনে মেনে চলার ৫টি সহজ সাইবার হাইজিন:
১. শক্তিশালী এবং ভিন্ন পাসওয়ার্ড ব্যবহার: একই পাসওয়ার্ড সব জায়গায় ব্যবহার করা বড় একটি ভুল। প্রতিটি অ্যাকাউন্টের জন্য আলাদা এবং বড় হাতের অক্ষর, ছোট হাতের অক্ষর, সংখ্যা ও বিশেষ প্রতীকের সমন্বয়ে শক্তিশালী পাসওয়ার্ড তৈরি করুন।
২. টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন (2FA) চালু করা: পাসওয়ার্ড চুরির হাত থেকে বাঁচতে আপনার ফেসবুক, জিমেইল বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে 2FA বা টু-স্টেপ ভেরিফিকেশন অন রাখুন। এতে কেউ পাসওয়ার্ড জানলেও আপনার ফোনে আসা ওটিপি (OTP) ছাড়া ঢুকতে পারবে না।
৩. সফটওয়্যার এবং অ্যাপ আপডেট রাখা: আপনার ফোনের অপারেটিং সিস্টেম বা অ্যাপগুলোর আপডেট নোটিফিকেশন আসলে দেরি না করে আপডেট করে নিন। এই আপডেটগুলোতে আগের ত্রুটি ও সিকিউরিটি হসোলগুলো ঠিক করা থাকে।
৪. অপরিচিত লিংকে ক্লিক না করা: ইমেইল বা মেসেজে আসা লোভনীয় অফার বা অজানা লিংকে ক্লিক করা থেকে বিরত থাকুন। এগুলো সাধারণত 'ফিশিং' (Phishing) লিংক হয়, যা আপনার তথ্য চুরি করার জন্য তৈরি করা হয়।
৫. পাবলিক ওয়াইফাই ব্যবহারে সাবধানতা: রেস্টুরেন্ট বা শপিং মলের ফ্রি ওয়াইফাই ব্যবহারের সময় সংবেদনশীল কাজ (যেমন- ব্যাংকিং লেনদেন) এড়িয়ে চলুন। একান্ত প্রয়োজন হলে বিশ্বস্ত ভিপিএন (VPN) ব্যবহার করুন।
ডিজিটাল লিটারেসি কেবল ইন্টারনেট ব্যবহার করতে জানা নয়, বরং ইন্টারনেটকে নিরাপদ ও বুদ্ধিমত্তার সাথে ব্যবহার করার জ্ঞান অর্জন করা। সচেতনতাই হলো সাইবার দুনিয়ার সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা দুর্গ। আমরা যদি দৈনন্দিন অভ্যাসে একটুখানি সাইবার হাইজিন মেনে চলি, তবে আমাদের ডিজিটাল জীবন হবে আরও নিরাপদ, আত্মবিশ্বাসী ও সুন্দর।
@ BIGYAN ALO
৪০
পাখির গানের বৈজ্ঞানিক রহস্য ও পরিবেশের প্রভাব
ফ্রান্সের সেন্ট-এতিয়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক ৩,০০০ প্রজাতির প্রায় ১,১৬,০০০টি পাখির গান বিশ্লেষণ করে এক চমকপ্রদ তথ্য আবিষ্কার করেছেন। তারা দেখেছেন, বিশ্বজুড়ে পাখির গানের এই বিশাল বৈচিত্র্যের মূলে রয়েছে মাত্র ৮টি মৌলিক শব্দ বা 'মোটিফ'। এই ৮টি উপাদান হলো—তিন ধরনের ট্রিল (Trill), তিন ধরনের হুইসেল (Whistle), বিশৃঙ্খল সুর (Chaotic notes) এবং হারমোনি। AI বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে এই বিশাল তথ্যাবলি বিশ্লেষণ করে এই সহজ কাঠামোর সন্ধান পাওয়া গেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, পাখিরা তাদের গান কীভাবে রচনা করবে তা নির্ভর করে তারা কোন পরিবেশে বড় হয়েছে তার ওপর।
ট্রপিক্যাল বা ক্রান্তীয় বন (যেমন আমাজন): ঘন গাছপালা ও অন্যান্য জীবের তীব্র শব্দের মাঝে নিজেদের শব্দ দূর দূরান্তে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এখানকার পাখিরা ফ্ল্যাট হুইসেলের মতো সহজ মোটিফ ব্যবহার করে।
নাতিশীতোষ্ণ বন (Temperate forests): এখানে পাখিরা কাছাকাছি দূরত্বে যোগাযোগ করে, তাই তারা দ্রুতগতির ট্রিল এবং তথ্যসমৃদ্ধ জটিল মোটিফ দিয়ে গান গায়।
গবেষক ক্যান্তা বাকলে (Quentin Bacquelé) জানান, প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস বা মানুষের তৈরি কোলাহলের কারণে পাখির গানের এই পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। পরিবেশ বদলে গেলে তাদের যুগ যুগ ধরে বিবর্তিত এই গান নতুন পরিবেশে আর খাপ খাওয়াতে পারে না।
@ BIGYAN ALO
৪১
বেশি মিষ্টি বা চিনি খেলেই কি ডায়াবেটিস?
আমাদের সমাজে একটা শক্ত ধারণা আছে যে, বেশি মিষ্টি বা চিনি খেলেই ডায়াবেটিস হানা দেয়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান কি আসলেই এই দাবিকে সমর্থন করে?
আদতে এটি একটি আংশিক সত্য। সাধারণ স্বাস্থ্যবার্তায় বলা হয় যে, চিনি সরাসরি ডায়াবেটিস করে না, বরং চিনি খেলে ওজন বাড়ে এবং সেই মেদ বা বাড়তি ওজন পরোক্ষভাবে ডায়াবেটিস ডেকে আনে। কিন্তু আধুনিক মেটাবলিক গবেষণা বলছে অন্য কিছু।
আমরা যে চিনি বা মিষ্টি খাই, তার ৫০ শতাংশই হলো Fructose। আমাদের শরীরের অন্য কোনো কোষ এই ফ্রুকটোজ প্রসেস করতে পারে না, এর পুরো চাপটা গিয়ে পড়ে সরাসরি আমাদের লিভারের ওপর।
যখন আমরা অতিরিক্ত চিনি বা মিষ্টি খাই, তখন এই বিপুল পরিমাণ ফ্রুকটোজ সরাসরি আমাদের লিভারের ভেতরে চর্বি হিসেবে জমতে শুরু করে। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় Non-Alcoholic Fatty Liver Disease বলে। লিভারে এই চর্বি জমার কারণেই সরাসরি হেপাটিক ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়, যার ফলে রক্তে সুগারের মাত্রা বেড়ে যায় এবং মানুষ টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়।
সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এই পুরো প্রক্রিয়ার জন্য আপনার ওজন বাড়ার বা মোটা হওয়ার কোনোই দরকার নেই। আপনি বাহ্যিকভাবে একদম স্লিম বা চিকন হলেও, অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার কারণে আপনার লিভারের ভেতরে ফ্যাটের স্তর জমে আপনি সরাসরি ডায়াবেটিসের মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
স্থূলতা ছাড়াও অতিরিক্ত চিনি বা হাই-সুগার ডায়েট সরাসরি ডায়াবেটিস তৈরি করতে পারে। তাই সুস্থ থাকতে চাইলে ওজন যেমনই হোক না কেন, অতিরিক্ত চিনি খাওয়া থেকে দূরে থাকতেই হবে।
৪২
এক দেশের দুই নাম: পৃথিবীর দেশগুলো নিজেদের কী নামে ডাকে?
কিছু দেশ আছে যারা আন্তর্জাতিকভাবে যে নামে পরিচিত, নিজেদের সে নামে বলে না। বা তারা আন্তর্জাতিকভাবে নিজেদের জাতীয় নামে পরিচিত না, সহজ কথায় তাদের জাতীয় নাম ভিন্ন।
জার্মানি, গ্রিস, চীন, জাপান—এসব নাম আমাদের কাছে এত পরিচিত যে মনে হয়, দেশগুলোর নাম বুঝি এমনই ছিল চিরকাল। কিন্তু একজন জার্মান তাঁর দেশকে বলেন ডয়েশল্যান্ড, একজন গ্রিক বলেন Elláda, আর জাপানি বলেন নিহন বা নিপ্পন। আবার আমার যে দুই কোরিয়াকে একই নামে ডাকি, তাদের জাতীয় নাম সম্পুর্নই ভিন্ন।
একটি দেশকে নিজের ভাষায় যে নামে ডাকা হয়, তাকে বলা হয় দেশীয় নাম বা endonym। আর অন্য ভাষার মানুষ সেই দেশকে যে নামে ডাকে, সেটি বহিরাগত নাম বা exonym। অনেক সময় দুটির উৎস একেবারেই আলাদা। আবার কখনো আন্তর্জাতিক নামটি বদলালেও দেশের নিজস্ব নামটি থেকে যায় বহু শতাব্দী ধরে। এর মাঝে কিছু কিছু নাম উচ্চারণ করতে না পারায় ইংরেজিতেই লিখেছি।
চীন:
ইংরেজিতে আমরা দেশটিকে China বলি, কিন্তু চীনা ভাষায় দেশটির প্রচলিত নাম Zhōngguó। শব্দটির অর্থ মোটামুটি “মধ্যদেশ” বা “মধ্যের রাষ্ট্রসমূহ”। তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। Zhōngguó হলো চীনের প্রচলিত সংক্ষিপ্ত দেশীয় নাম; রাষ্ট্রের পূর্ণ সরকারি নাম Zhōnghuá Rénmín Gònghéguó —অর্থাৎ People’s Republic of China। ইংরেজি China আর চীনা Zhōngguó একই শব্দের অনুবাদ নয়; দুটির পেছনে রয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন নামের ইতিহাস।
জাপান:
জাপান-এর ক্ষেত্রে পার্থক্যটি তুলনামূলক সহজ। জাপানিরা দেশটিকে বলেন Nihon (日本) অথবা Nippon (日本)। একই অক্ষর দুটি উচ্চারণে পড়া যায়, আর দুটির অর্থই দাঁড়ায় “সূর্যের উৎস” বা “সূর্যোদয়ের দেশ”—যেখান থেকে Land of the Rising Sun কথাটির সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ইংরেজি Japan নামটি আবার চীনা ভাষায় জাপানের নামের ঐতিহাসিক উচ্চারণের মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় ভাষায় পৌঁছেছে।
দক্ষিণ কোরিয়া:
দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষ দৈনন্দিন কথাবার্তায় নিজেদের দেশকে সাধারণত Hanguk বলেন। কিন্তু রাষ্ট্রের সরকারি নাম Daehan Minguk—ইংরেজিতে Republic of Korea। তাই Hanguk এবং Daehan Minguk একেবারে একই জিনিস নয়: প্রথমটি প্রচলিত দেশীয় নাম, দ্বিতীয়টি রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক নাম। এখানে “Korea” নামটিও এসেছে ভিন্ন ঐতিহাসিক পথ ধরে—মধ্যযুগের Goryeo রাজবংশের নাম থেকে, যা বিদেশি ভাষায় ধীরে ধীরে কোরিয়া রূপ নেয়।
উত্তর কোরিয়া:
কারণ দুই কোরিয়া একই উপদ্বীপের দেশ হলেও নিজেদের জন্য একই নাম ব্যবহার করে না। উত্তর কোরিয়ায় দেশটির প্রচলিত নাম Chosŏn। তাদের সরকারি পূর্ণ নাম Chosŏn Minjujuŭi Inmin Konghwaguk —অর্থাৎ Democratic People’s Republic of Korea। এখানে Chosŏn একই সাথে ডাক নাম ও সরকারী নামও। বিপরীতে দক্ষিণ কোরিয়া নিজেদের Hanguk বলে। ফলে একই “কোরিয়া”কে দক্ষিণ ও উত্তর—দুই রাষ্ট্র নিজেদের ভাষায় দুই ভিন্ন নামে পরিচয় দেয়।
জার্মানি:
জার্মানিকে জার্মানরা বলেন Deutschland। অথচ ইংরেজি Germany, ফরাসি Allemagne, ইতালীয় Germania, আরবিতে আলমানিয়া—বিভিন্ন ভাষায় দেশের নাম আবার ভিন্ন। Germany এসেছে প্রাচীন রোমানদের ব্যবহৃত Germania থেকে, আর ডয়েশল্যান্ড-এর শিকড় জার্মান ভাষার পুরোনো রূপে, যেখানে diutisc বলতে সাধারণত “জনগণের/জনসাধারণের ভাষা” বোঝানো হতো।
গ্রিস:
গ্রিস-এর ক্ষেত্রেও বাইরের নাম ও নিজেদের নামের ব্যবধান বেশ বড়। গ্রিকরা নিজেদের দেশকে বলেন Elláda, আর সরকারি পূর্ণ নাম Ellinikí Dimokratía—অর্থাৎ Hellenic Republic। অন্যদিকে ইংরেজি Greece এসেছে লাতিন Graecia থেকে। অর্থাৎ “Greece” নামটি গ্রিকদের নিজেদের ভাষার নাম নয়।
আলবেনিয়া:
আলবেনিয়ার মানুষ নিজেদের দেশকে বলেন Shqipëria। আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত Albania নামটির উৎস আলাদা।
হাঙ্গেরি:
হাঙ্গেরির দেশীয় নাম Magyarország—অর্থাৎ মোটামুটি “মাগিয়ারদের দেশ”। Magyar হলো হাঙ্গেরীয় জনগোষ্ঠীর নিজেদের নাম।
ফিনল্যান্ড:
ফিনল্যান্ডকে ফিনিশ ভাষায় বলা হয় Suomi (সৌমি)। আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত Finland নামটি এসেছে সুইডিশ ও অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষার ঐতিহাসিক ব্যবহারের মাধ্যমে।
অস্ট্রিয়া:
অস্ট্রিয়ার জার্মান নাম Österreich, যার আক্ষরিক অর্থ “পূর্বের রাজ্য”। ইংরেজি Austria এসেছে লাতিন Austria থেকে।
ক্রোয়েশিয়া: ক্রোয়েশিয়াকে ক্রোয়েশীয়রা বলেন Hrvatska।
মন্টেনেগ্রো:
মন্টেনেগ্রোর স্থানীয় নাম Crna Gora, যার অর্থ “কালো পাহাড়”—ইংরেজি Montenegro-ও আসলে একই অর্থের অনুবাদ। এখানে তাই নাম দুটির অর্থ একই, শুধু ভাষা আলাদা।
আর্মেনিয়া:
আর্মেনিয়ার দেশীয় নাম হায়াস্তান। Hay হলো আর্মেনীয়দের নিজেদের নামের সঙ্গে সম্পর্কিত, আর -stan এসেছে “ভূমি/দেশ” বোঝানো প্রত্যয় থেকে। ফলে Hayastan-কে মোটামুটি “হায়দের দেশ” বলা যায়।
সুইডেন: জাতীয় নাম Sverige, সরকারী নাম Konungariket Sverige. (কেও উচ্চারণটি করে দিলে সুবিধা হয়)
সুইজারল্যান্ড:
সুইজারল্যান্ডে দেশীয় নামের রীতিমত বাজার বসেছে। দেশটির চারটি সরকারি ভাষায় নাম চার রকম: জার্মানে Schweiz, ফরাসিতে Suisse, ইতালীয় ভাষায় Svizzera এবং রোমানশ ভাষায় Svizra।
ভারত:
ভারতও এই তালিকায় আছে, আমাদের কাছে ভারত ও ইন্ডিয়া উভয় নাম সমান পরিচিত বলে আমরা বিষয়টা ধরি না। কিন্তু উপমহাদেশের বাইরে সারা পৃথিবীতে ইন্ডিয়া নামে পরিচিত, সেখানে ভারত খুব কমই পরিচিত। তবে ইন্ডিয়া শুধু প্রচলিত ইংরেজি নাম নয়, একই সাথে সাংবিধানিকও, ভারতীয় সংবিধানের প্রথম অনুচ্ছেদেই রয়েছে—“India, that is Bharat”। অর্থাৎ India এবং Bharat—দুটিই রাষ্ট্রের সাংবিধানিক পরিচয়ের অংশ।
মিশর:
ইংরেজিতে Egypt, কিন্তু আরবিতে দেশটির নাম Miṣr। Egypt এসেছে প্রাচীন গ্রিক Aigyptos থেকে, যার শিকড় আরও পুরোনো মিশরীয় নামের মধ্যে। অন্যদিকে Miṣr আরবি ভাষায় মিশরকে বোঝানোর প্রচলিত নাম। আমাদের কাছে ভারতের মত মিশর ও ইজিপ্ট সমান পরিচিত।
এই তালিকাটি এই কয়টি নামের মধ্যে শেষ করে দেয়া যায় না। এর বাইরেও আরও থাকতে পারে, কারণ বেশ কিছু দেশের জাতীয় নাম ইংরেজির মতই, সামান্য এদিক সেদিক, আসলে জাতীয় নামটিই কিছুটা বিকৃত হয়ে ইংরেজি রুপ নিয়েছে, যেমন-
জর্দানকে আরবিতে বলা হয় উর্দুন,
চেকিয়ার স্থানীয় নাম Česko,
স্লোভাকিয়ার স্লোভেনস্কো,
পোল্যান্ডের জাতীয় নাম পোলস্কা,
নরওয়ের জাতীয় নাম নর্জ,
স্পেনের 'এস্পানিয়া'
ইতালির 'ইতালিয়া',
@boikal
৪৩
উসমানীয় সাম্রাজ্য প্রায় আড়াইশ বছর ছাপাখানা প্রযুক্তি থেকে বঞ্চিত থাকে
১৪৮৩ সালে অটোমান সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদ আরবি হরফে বই ছাপানোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। পরবর্তীতে ১৫১৫ সালে সুলতান প্রথম সেলিম এই নিষেধাজ্ঞা পুনরায় বহাল করেন। তৎকালীন প্রধান মুফতি (শাইখুল ইসলাম) এবং উলামাগণ এই নিষেধাজ্ঞাকে জোরালোভাবে সমর্থন করেছিলেন। তাদের মূল যুক্তি ছিল— ছাপাখানায় কুরআন বা ইসলামি ধর্মীয় গ্রন্থ ছাপানো হলে হরফে ভুল হতে পারে, যার ফলে পবিত্র গ্রন্থের অমর্যাদা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেসময় অটোমান সাম্রাজ্যে হাজার হাজার লিপিকার (Calligrapher) হাতে বই লিখে বা নকল করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ছাপাখানা চালু হলে তাদের বিশাল একটি অংশ বেকার হয়ে পড়বে, এই আশঙ্কায় তারাও ধর্মীয় নেতাদের মাধ্যমে ছাপাখানার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন।
এই নিষেধাজ্ঞার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ছিল অত্যন্ত নেতিবাচক। এর ফলে উসমানীয় সাম্রাজ্য প্রায় আড়াইশ বছর ছাপাখানা প্রযুক্তি থেকে বঞ্চিত থাকে। ইউরোপ যখন ছাপাখানার কল্যাণে খুব সহজে বইপত্র ছড়িয়ে দিয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন ও প্রযুক্তিতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল (রেনেসাঁ), তখন অটোমান সাম্রাজ্যে জ্ঞানচর্চা মূলত অভিজাতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায় এবং তারা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়তে শুরু করে।
দীর্ঘ সময় পর, ১৭১৮ সালের দিকে ইব্রাহিম মুতেফেররিকা নামের এক ব্যক্তি অটোমান সাম্রাজ্যে প্রথম মুসলিম ছাপাখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেন। তিনি তৎকালীন প্রধান মুফতি (শাইখুল ইসলাম) আবদুল্লাহ এফেন্দি-এর কাছে একটি ফতোয়া চান। শেষ পর্যন্ত ১৭২৭ সালে আবদুল্লাহ এফেন্দি একটি ফতোয়া জারি করেন, যেখানে কুরআন বা ধর্মীয় গ্রন্থ বাদে অন্যান্য বৈষয়িক এবং বিজ্ঞানভিত্তিক (যেমন: চিকিৎসা, ভূগোল, ইতিহাস) বই ছাপানোর অনুমতি দেওয়া হয় @ saiful islam
৪৪
"ভিসিয়াস সার্কেল অফ পোভার্টি" "দারিদ্র্যের দুষ্ট চক্র"
একটা দেশ গরীব, কারন , দেশের জনগনের ইনকাম কমের কারনে তাদের সেভিংস কম, এই কম সেভিংস থেকে ইনভেস্টমেন্টের ক্যাপিটাল আসে না, আর ব্যবসায়ের ক্যাপিটাল মানে মূলধন না বাড়ার কারনে ব্যবসা বাড়ে না, যার কারনে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ে না। আর কর্মসংস্থান না বাড়ার কারনে মানুষের ইনকামও বাড়ে না! ব্যাপারটা দেখেন - ইনকাম বাড়ে না!
অর্থাৎ যেখান থেকে শুরু করেছিলাম, আবার সেখানে ফিরে গিয়ে সার্কেল বা চক্র একই পথে ঘুরা শুরু করেছে। আমাদের দেশের পুরো অর্থনীতি এই চক্রে ঘুড়ছে, যতক্ষন না আমরা এই সার্কেলকে ব্রেক করতে পারবো, ততক্ষন আমরা এমন "লো ইনকাম কান্ট্রি" মানে গরীব দেশ হিসেবেই থাকবো। এটা গেলো দেশের ইকোনমি কেনো ভালো হয়না তার একটা ব্যাখ্যা।
এই সার্কেল শুধুমাত্র তখনই ব্রেক হবে যখন ঐ দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। একই সাথে ঐ দেশের জনগন যদি "সার্ভিস সেক্টর" মানে চাকুরীর উপড় থেকে চাপ কমিয়ে কৃষি, শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ফোকাস করে। এখানে উদাহরণ হিসেবে সাউথ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ব্রাজিল ও চীনের কথা বলা যায়। ব্রাজিল পুরোপুরি সফল না হলেও অন্য ৩ টা দেশ গোটা দুনিয়ার কাছে রোল মডেল!
এখন দেখেন সাউথ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও চীন এই ৩ টা দেশেই তাদের এই অর্থনৈতিক শিকল ব্রেক করা শুরু করেছে আমাদের স্বাধীনতার দুই এক দশক আগে পরে থেকেই! যেমন সাউথ কোরিয়া ৬০ এর দশকে, সিঙ্গাপুর ৭০ দশকে আর চীনও ৭০ দশক থেকে তাদের ভিসিয়াস সার্কেল অফ পোভার্টিকে ব্রেক করা শুরু করে, তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সোশাল সিকিউরিটি আর এর সাথে দুই একটা ইকোনমিক পলিসি দিয়ে! আমরাও কিন্তু আমাদের জার্নি শুরু করি ৮০র দশক থেকে। এখন দেখেন, তারা কোথায় আর আমরা কোথায়!
এবার একটু অন্য কিছু দেখেন,
পলিসি কে দেয় বা কোথা থেকে আসে?
সরকার থেকে।
সরকার কোথা থেকে আসে?
রাজনৈতিক দল থেকে।
সরকার সফল হতে হলে কেমন রাজনৈতিক পরিবেশ লাগবে?
বহুমাত্রিক, গনতান্ত্রিক, সহযোগিতামূলক।
বংলাদেশে কি এই ৩ টার ১ টাও আছে?
না নেই।
এই দেশের রাজনীতিতে কি আছে?
পলিটিক্যাল ফ্যামিলি'স ডেভিল সার্কেল।
এটা কেমন?
এটা হলো গনতন্ত্রের নামে পারিবারিক এরিস্টোক্রাস্যিকে এস্টাবলিশড করা। বাপের পরে ছেলে, ছেলের পরে নাতী, এরপরে নাতীর ঘরের পুতি'র দেশের ক্ষমতা পাওয়ার যে চক্র তাকে আমরা পলিটিক্যাল ফ্যামিলিস ডেভিল সার্কেল বলতে পারি।
এই সার্কেলের কারনে "রয়েল ব্লাড" থেকে কেবল দেশের রাজনীতিতে আসাকে পজিটিভলি নেওয়া হয়। গরীব "সিভিলিয়ান ব্লাড" থেকে কেউ উঠে আসতে চাইলে হয় তাকে "ফকিন্নির বাচ্চা" অথবা "বান্দীর পুত" বা এগুলায় কাজ না হলে তাকে "রাজাকারের বাচ্চা" বলে জোর করে থামিয়ে দেওয়া হয়।
এখন আপনি বলুন, যারা দেশের পলিসি বানাবে ও তা বাস্তবায়িত করবে, তারা যদি "ভাই ভাই" মিলে "কমিটির টীম" বানায়, সেখানে ঐ দেশের পলিসি চেঞ্জ হবে কিভাবে আর সেই দেশের "ভিসিয়াস সার্কেল অফ পোভার্টি" ব্রেক হবে কিভাবে!
গনতান্ত্রিক রাজনীতিতেতো সবাই আসতে পারবে। এখানে আপনি যদি কোরাম করেন তাহলে এটা গনতান্ত্রিক কিভাবে হয়! এখানে আপনারা এক গ্রুপ ২৫০ বিলিয়ন ডলার "চিলি সস" মাখিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়ে ফেললেও কিছু বলেন না, আরেকদিকে অন্য কেউ "২৫০০ টাকায় হাস ভুনা" খেয়ে ফেললে তা নিয়ে ২৫০ ঘন্টার প্রতিবাদী টকশো করেন, তাহলে তো ব্যাপারটা মিললো না! পুরো ব্যাপারটায় আপনারা যে "রসুন" এর মত তা প্রমান হয়।
যা হোক এই দেশের এই গরিবী হালত, মানে দারিদ্র্যের দুষ্ট চক্র তখনই ভাঙ্গবে, যখন আপনি দেশের পলিসিগুলাকে ঠিক ভাবে প্রনয়ন ও বাস্তবায়ন করতে পারবেন। আর পলিসি তখনই ঠিক ভাবে বাস্তবায়ন হবে, যখন এই পলিসি করার মানুষগুলো "মানুষ" হবে। যেখানে কোন "রয়েল ব্লাড" বা "ফকিন্নির বাচ্চা" বলে কেউ থাকবে না।
একটা তথ্য দিয়ে লেখা শেষ করছি, আমরা এতটাই "রয়েল ব্লাড" প্রতিষ্ঠা করেছি যে, এইবারের প্রধান মন্ত্রী ছাড়া গত ৩৫ বছরে বাংলাদেশে মাত্র ২ জন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
আর উল্টোদিকে আমেরিকায় ৫ জন, সাউথ কোরিয়ায় ৭ জন, ইংল্যান্ডে ৮ জন, জাপানে ১৩ জন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এখন বলেন তারা গণতন্ত্র বুঝে না, আমরাই বুঝি, তাই আমাদের একই লোক লাগে, ওদের লাগে না!
এই হচ্ছে আমাদের উচ্চবিত্তীয় ডেভিল'স সার্কেলের গনতন্ত্রের নমুনা! এখন আবার বইলেন না, ওদের থেকে গনতন্ত্র আমরা ভালো বুঝি। গনতন্ত্রের সুতিকাগার গ্রীস না, বাংলাদেশ!
শুনেন "রাতকানা" হওয়াও ভালো, কারন চিকিৎসা করানো যায়, তবু "দলকানা" হইয়েন না।কারন এর চিকিৎসা নাই!
বিল্লাল হোসাইন
৪৫
বুদ্ধিমত্তার প্রথম স্ফুলিঙ্গ
কখনো কি ভেবেছেন, আজকের এই স্মার্টফোন আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে পৌঁছানোর শুরুটা ঠিক কোথায় হয়েছিল? একদম আদিম যুগে, একটি সাধারণ পাথর থেকে!
টিকে থাকার প্রথম সংগ্রাম
লক্ষ লক্ষ বছর আগে, যখন চারপাশের পরিবেশ ছিল চরম প্রতিকূল, তখন আদিম মানুষের বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল ছিল প্রকৃতি। আর সেই বাঁচার তাগিদেই জন্ম নেয় ইতিহাসের প্রথম 'স্মার্ট' টুল—পাথরের হাতিয়ার বা Stone Tools! এটি শুধু আত্মরক্ষার জন্যই নয়, বরং মানব সভ্যতার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার প্রধান হাতিয়ার ছিল।
কী কী কাজে লাগত এই হাতিয়ার?
শিকার ও আত্মরক্ষা: বন্য প্রাণীদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে এবং দূর থেকে শিকার করতে তীক্ষ্ণ পাথরের বর্শা বা তীরের ফলা ব্যবহার করা হতো।
খাদ্য ও চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ: পশুর মাংস কাটা এবং শীত নিবারণের জন্য চামড়া ছাড়ানোর কাজে ধারালো পাথরের টুকরো (Hand axes) ছিল আদিম মানুষের সবচেয়ে বড় ভরসা।
নতুন সরঞ্জাম তৈরি: কাঠ বা হাড় কেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য জিনিস বানাতে পাথরের স্ক্র্যাপার (Scrapers) দারুণ কাজে দিত।
বুদ্ধিমত্তার প্রথম স্ফুলিঙ্গ
পাথরের হাতিয়ার শুধু একটি জড়বস্তু ছিল না, এটি ছিল মানব মস্তিষ্কের বিকাশের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। মানুষ যখন প্রথম বুঝতে পারল যে একটি পাথরকে ভেঙে বা ঘষে নতুন কোনো কাজে লাগানো যায়, ঠিক তখনই পৃথিবীতে 'প্রযুক্তি' বা Technology-র জন্ম হয়েছিল।
আজকের এই আধুনিক পৃথিবীতে বসে আদিম মানুষের সেই প্রথম উদ্ভাবন সম্পর্কে ভাবতে কেমন লাগে? আপনার মতে, প্রাচীন যুগের কোন আবিষ্কারটি মানব ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে? @ Psycorix
৪৬
মায়া সভ্যতার উত্থান ও পতনের মহাকাব্য:---
হাজার বছর আগে মধ্য আমেরিকার বুক চিরে জেগে ওঠা ঘন রেইনফরেস্টের মাঝে গড়ে উঠেছিল এমন এক মানব সভ্যতা, যার জ্ঞান, বিজ্ঞান এবং স্থাপত্যশৈলী আজও আধুনিক মানুষকে সমানভাবে চমকে দেয়। সেটি ছিল মায়া সভ্যতা। প্রকৃতির রুক্ষ রূপকে জয় করে তারা গড়ে তুলেছিল এক অনন্য দুনিয়া। বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার এমন মেলবন্ধন মানব ইতিহাসে সত্যিই বিরল।
বৈচিত্র্যময় নগর ও অনন্য জীবনধারা:---
মায়া সভ্যতা কোনো একক রাজার অধীনে থাকা বিশাল সাম্রাজ্য ছিল না। এটি ছিল মূলত ছোট-বড় অসংখ্য স্বাধীন শহরের এক চমৎকার কোলাজ। প্রাচীন গ্রিসের নগর-রাষ্ট্রগুলোর মতো এদের প্রত্যেকের ছিল নিজস্ব শাসনব্যবস্থা ও সৈন্যদল। এই শহরগুলো কখনো নিজেদের মধ্যে মিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ হতো, আবার কখনো জড়িয়ে পড়ত ক্ষমতার দ্বন্দ্বে। সবুজ অরণ্যের মাঝে জীবনধারণের জন্য তারা উদ্ভাবন করেছিল চমৎকার কৃষি কৌশল। পাহাড়ের ঢাল কেটে ধাপ চাষ এবং জলাভূমিকে চাষযোগ্য জমিতে রূপান্তর করার প্রযুক্তি তারা আয়ত্ত করেছিল। প্রকৃতির খামখেয়ালিপনাকে রুখে দিতে তারা তৈরি করেছিল বিশাল সব জলের আধার। তাদের এই সুপরিকল্পিত জীবনযাত্রার ফলেই এক একটি শহর লক্ষাধিক মানুষের কোলাহলে মুখরিত হয়ে উঠেছিল।
গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং সময়ের হিসাব:---
মায়ারা শুধু মাটির বুকেই চমৎকার শহর গড়ে তোলেনি, তাদের দৃষ্টি ছিল সুদূর আকাশেও। আধুনিক দূরবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়াই তারা নিখুঁতভাবে গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি হিসাব করতে পারত। সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণের মতো মহাজাগতিক ঘটনার আগাম আভাস দেওয়া তাদের জন্য ছিল বাঁ হাতের খেল। গণিতের ক্ষেত্রেও তাদের অবদান ছিল অতুলনীয়; তারা স্বাধীনভাবে 'শূন্য'-এর ধারণা আবিষ্কার ও ব্যবহার করেছিল।
সময়ের হিসাব রাখতে তারা অত্যন্ত জটিল ও নিখুঁত ক্যালেন্ডার ব্যবস্থা তৈরি করেছিল। তাদের ছিল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের জন্য আলাদা হিসাব, আবার সাধারণ বছরের জন্য ৩৬৫ দিনের সৌর ক্যালেন্ডার। এমনকি হাজার বছরের দীর্ঘ সময় গণনা করার জন্য তাদের ছিল বিশেষ ব্যবস্থা, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানব মনকে কৌতূহলী করে রেখেছে।
পিরামিড, ধর্ম এবং বিশ্বাসের জগত:---
মায়াদের পুরো সমাজব্যবস্থা আবর্তিত হতো ধর্মকে কেন্দ্র করে। তাদের তৈরি আকাশছোঁয়া পিরামিডগুলো মিশরের মতো রাজাদের সমাধিক্ষেত্র ছিল না, বরং সেগুলো ছিল দেবতাদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত পবিত্র মন্দির। মায়াদের বিশ্বাস ছিল, দেবতারা নিজেদের রক্ত দিয়ে এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, তাই দেবতাদের সন্তুষ্ট রাখতে এবং মহাবিশ্বের ভারসাম্য বজায় রাখতে তারা নিয়মিত রক্ত ও মানব বলির মতো কঠোর আচার পালন করত। তাদের স্থাপত্যের অন্যতম সেরা নিদর্শন হলো চিচেন ইৎজার পিরামিড। এর চারদিকের সিঁড়ির সংখ্যা বছরের মোট দিনের সমান। বছরের নির্দিষ্ট কিছু দিনে সূর্যের আলো-ছায়ার এমন এক জাদুকরী খেলা তৈরি হয়, যা দেখলে মনে হয় একটি বিশাল সাপ পিরামিড বেয়ে নিচে নেমে আসছে। এটি ছিল তাদের দেবতা কুকুলকানের প্রতীক। বিজ্ঞান ও স্থাপত্যের এমন মেলবন্ধন সত্যিই অবিশ্বাস্য।
সভ্যতার অবসান ও মহাকালের গর্ভে বিলীন:---
কোনো এক সোনালী অধ্যায়ের পর হঠাৎ করেই এই সভ্যতায় নেমে আসে অন্ধকারের মায়া। এক শতাব্দীর ব্যবধানে তাদের জমজমাট শহরগুলো একে একে জনশূন্য হতে শুরু করে। অতিরিক্ত জনসংখ্যা, নির্বিচারে বন উজাড় করার ফলে মাটির উর্বরতা হ্রাস এবং বছরের পর বছর ধরে চলা ভয়াবহ খরা এই সাজানো সভ্যতাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। এর সাথে যোগ হয়েছিল অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ।পরবর্তীকালে বহিরাগত স্প্যানিশদের আক্রমণ এবং তাদের বয়ে আনা রোগব্যাধি অবশিষ্ট প্রতিরোধটুকুও ভেঙে দেয়। দুর্ভাগ্যবশত, স্প্যানিশ ধর্মগুরুরা মায়াদের বিজ্ঞান, ইতিহাস ও দর্শনের অমূল্য বইগুলোকে শয়তানের সৃষ্টি মনে করে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। ফলে মানব ইতিহাসের এক বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার চিরতরে হারিয়ে যায়।
মায়া সভ্যতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেলেও মায়া মানুষেরা হারিয়ে যায়নি। আজও মধ্য আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে লক্ষ লক্ষ মায়া বংশধর তাদের প্রাচীন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বুকে নিয়ে বেঁচে আছেন।
মায়া সভ্যতার এই উত্থান ও পতনের গল্প আধুনিক মানবজাতির জন্য এক বিরাট সতর্কবার্তা। প্রকৃতিকে অবহেলা করে, জলবায়ুর পরিবর্তনকে অবজ্ঞা করে কোনো সভ্যতাই যে চিরস্থায়ী হতে পারে না—মায়াদের হারিয়ে যাওয়া শহরগুলো আজ নীরব ভাষায় আমাদের সেই সত্যই স্মরণ করিয়ে দেয়।
৪৭
রান্নার শুরু ও ব্রেইনের বিকাশ
একটু ভাবুন তো! লাখ লাখ বছর আগের এক অন্ধকার, কনকনে শীতের রাত... চারপাশে হিংস্র প্রাণীর ভয়। ঠিক সেই সময়ে একটা ছোট্ট স্ফুলিঙ্গ কীভাবে পুরো মানবজাতির ইতিহাস বদলে দিয়েছিল?
হ্যাঁ, বলছি মানুষের আগুন নিয়ন্ত্রণের কথা! এটি শুধু সাধারণ কোনো আবিষ্কার ছিল না, এটি ছিল মানব সভ্যতার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সবচেয়ে বড় ম্যাজিক।
রান্নার শুরু ও ব্রেইনের বিকাশ:
আগুনের ব্যবহার শেখার আগে আমাদের পূর্বপুরুষদের সারাদিন কেটে যেত কাঁচা মাংস আর শক্ত লতাপাতা চিবিয়ে। আগুন সব বদলে দিল—শুরু হলো রান্না! পোড়ানো খাবার শুধু সুস্বাদুই ছিল না, হজম করাও অনেক সহজ হলো। খাবার থেকে পাওয়া বাড়তি এনার্জি কাজে লাগাল আমাদের শরীর, আর ধীরে ধীরে আমাদের মস্তিষ্ক আরও বড় ও উন্নত হলো। বলা যায়, এই রান্না করা খাবারই আমাদেরকে আজকের 'বুদ্ধিমান' মানুষ বানিয়েছে!
উষ্ণতা আর প্রথম 'সোশ্যাল মিডিয়া':
হিমশীতল রাতে আগুন দিল পরম উষ্ণতা। হিংস্র প্রাণীরা আর কাছে ঘেঁষার সাহস পেল না। আর সবচেয়ে দারুণ ব্যাপার কী জানেন? এই আগুনের চারপাশেই মানুষ প্রথম গোল হয়ে বসতে শুরু করল। শুরু হলো ইশারা আর শব্দে গল্প বলা, তৈরি হলো সমাজ। আগুনের কুণ্ডলীটাই ছিল আদিম যুগের প্রথম 'সোশ্যাল মিডিয়া'!
পরের বার যখন রান্নার জন্য গ্যাসের চুলা জ্বালাবেন বা শীতের রাতে আগুন পোহাবেন, আদিম মানুষের সেই যুগান্তকারী মুহূর্তটার কথা অন্তত একবার ভেবে দেখতে পারেন! আচ্ছা, আপনার কী মনে হয়, মানুষ যদি আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে না শিখত, তবে আজকে আমরা কোথায় থাকতাম? কমেন্টে আপনার চিন্তার কথা জানান! @ Psycorix
৪৮
হাসিদিক ইহুদিদের ব্যাপারে অনেক কিছু
১. তারা দিনে তিনবার প্রার্থনা করে এবং দিনের বড় অংশ পড়াশোনা ও ধর্মীয় গবেষণায় ব্যয় করে। তাদের অনেকেই প্রতিদিন ১০ ঘণ্টার বেশি পড়াশোনা করে। সেখানে প্রায় ৫০০ জন ছেলে রয়েছে, যাদের বেশিরভাগই ইসরাইল থেকে এসেছে।
তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, পৃথিবী শেষ সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং খুব শিগগিরই মাসীহ (দাজ্জাল) আসবেন। এরপর পবিত্র ভূমিতে তৃতীয় মন্দির নির্মাণের কথাও তারা বলে।
২. তারা মোবাইল, ইন্টারনেটসহ আধুনিক প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকে। তাদের ধারণা, এসব রুহানিয়াত ও ঈশ্বরের প্রতি মনোযোগ নষ্ট করে দেয়।
৩. আয়-রোজগার বা ক্যারিয়ার নিয়ে তারা খুব বেশি উদ্বিগ্ন নয়। তাদের বিশ্বাস, ঈশ্বরই তাদের প্রয়োজনের ব্যবস্থা করবেন।
৪. ইবাদতের শুরুতেই তারা দান করে এবং জেরুজালেমের দিকে মুখ করে প্রার্থনা করে। তাদের ইবাদতখানায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য দান বাক্সও রয়েছে।
৫. তারা সাধারণত ইহুদি ছাড়া অন্যদের সঙ্গে খুব বেশি মেলামেশা করতে আগ্রহী নয়। ক্যামেরা ও ইন্টারনেটও তাদের অপছন্দ। টিভি, সিনেমা কিংবা জনপ্রিয় খেলোয়াড়-সেলিব্রিটিদের সম্পর্কেও অনেকের তেমন ধারণা নেই।
৬. তাদের পরিবারে সন্তানসংখ্যা সাধারণত অনেক বেশি—অনেকের ১০ জনেরও বেশি সন্তান রয়েছে। পরিবার পরিকল্পনার মতো বিষয়েও তারা ধর্মগুরুর পরামর্শকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। তাদের দাবি, প্রতি ২০ বছরে তাদের জনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়।
৭. তাদের নিজস্ব ধর্মীয় বিচারব্যবস্থা, পারস্পরিক সহযোগিতার নেটওয়ার্ক, নিরাপত্তা টহল ও অ্যাম্বুলেন্স সেবাও রয়েছে। নিজেদের সমাজকে স্বতন্ত্রভাবে পরিচালনা করার চেষ্টা তাদের মধ্যে স্পষ্ট।
৮. নারীরাও এই জীবনব্যবস্থার অংশ। তারা শালীন পোশাক পরেন এবং ইবাদত করেন, তবে ইবাদতগাহে পুরুষদের থেকে আলাদা স্থানে থাকেন।
@ তারেক আবদুল্লাহ
৪৯
মানুষ আসলে কী করছে? -
১. কুকুর: প্রকৃতির বৈচিত্র্য থেকে মানুষের নির্বাচন
কুকুরের ইতিহাস এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণগুলোর একটি। প্রাচীন মানুষেরা বন্য ক্যানিডদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে শান্ত, মানুষের কাছে থাকা বা নির্দিষ্ট কাজে উপযোগী প্রাণীদের বেছে প্রজনন করিয়েছে। এরপর প্রজন্মের পর প্রজন্ম নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যকে নির্বাচন করতে করতে কুকুরের বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছে।
এখানে মানুষ নতুন কোনো জিন নিজের হাতে লিখে দেয়নি। বরং বিদ্যমান জিনগত বৈচিত্র্যের মধ্য থেকে নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যকে বারবার নির্বাচন করেছে। ফলে সময়ের সঙ্গে জনসংখ্যার জিনগত গঠন বদলেছে। এটিই কৃত্রিম নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তন।
২. ভুট্টা: বুনো ঘাস থেকে আধুনিক ফসল
আজকের ভুট্টা দেখতে এতটাই আলাদা যে এর বুনো পূর্বপুরুষকে দেখলে হয়তো আমরা চিনতেই পারব না। আধুনিক ভুট্টার পূর্বপুরুষ ছিল teosinte নামের একটি বুনো উদ্ভিদ। দক্ষিণ মেক্সিকোতে হাজার হাজার বছর আগে মানুষের চাষ ও নির্বাচনের মাধ্যমে এটি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়েছে।
মানুষ বড় দানা, বেশি ফলন এবং কৃষির জন্য সুবিধাজনক বৈশিষ্ট্যের উদ্ভিদ বেছে নিয়েছে। গবেষণায় ভুট্টার জিনোমে কৃত্রিম নির্বাচনের চিহ্নও শনাক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ কৃষি শুধু আমাদের খাদ্য বদলায়নি; দীর্ঘমেয়াদে উদ্ভিদের বিবর্তনীয় পথও বদলে দিয়েছে।
৩. কীটনাশক: পোকামাকড়ের ওপর মানুষের তৈরি পরীক্ষা
এবার ঘটনাটি আরও অদ্ভুত। ধরা যাক, একটি পোকামাকড়ের জনসংখ্যায় স্বাভাবিকভাবেই কিছু পোকা এমন জিনগত বৈশিষ্ট্য বহন করছে, যা একটি কীটনাশকের বিরুদ্ধে তাদের সামান্য বেশি প্রতিরোধী করে। কীটনাশক প্রয়োগের পর সংবেদনশীল পোকাগুলো বেশি মারা যাবে, কিন্তু প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্যধারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি বেঁচে থাকতে পারে এবং বংশবিস্তার করতে পারে।
ফলে পরবর্তী প্রজন্মে প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্যের অনুপাত বেড়ে যেতে পারে। এখানে মানুষ পোকাটির DNA সরাসরি পরিবর্তন করছে না। মানুষ এমন একটি পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে নির্দিষ্ট জিনগত বৈশিষ্ট্য বেঁচে থাকার সুবিধা দিচ্ছে। অর্থাৎ মানুষ নির্বাচনের চাপ তৈরি করছে, আর বিবর্তন সেই চাপের মধ্যে কাজ করছে।
৪. অ্যান্টিবায়োটিক: বিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আধুনিক উদাহরণ
ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রে একই নীতির আরও গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ দেখা যায়। একটি ব্যাকটেরিয়া জনসংখ্যায় জিনগত পরিবর্তনের কারণে কিছু ব্যাকটেরিয়া কোনো অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে বেশি প্রতিরোধী হতে পারে। অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের ফলে সংবেদনশীল ব্যাকটেরিয়া কমে গেলে প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়াগুলো বেঁচে গিয়ে দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে।
ফলে সময়ের সঙ্গে জনসংখ্যায় প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার অনুপাত বাড়তে পারে। গবেষণায় অ্যান্টিবায়োটিককে শক্তিশালী নির্বাচনী চাপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের অপব্যবহার ও অতিরিক্ত ব্যবহারের সঙ্গে প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তারের সম্পর্ক তুলে ধরেছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার—অ্যান্টিবায়োটিক সাধারণত ব্যাকটেরিয়াকে “প্রতিরোধী হতে শেখায়” না। বরং বিদ্যমান বা নতুন তৈরি হওয়া বংশগত বৈচিত্র্যের মধ্যে যেগুলো প্রতিরোধে সুবিধা দেয়, সেগুলো নির্বাচিত হয়ে জনসংখ্যায় বাড়তে পারে।
৫. CRISPR: এবার মানুষ সরাসরি DNA-তে হাত দিচ্ছে
এখানেই মানুষের ক্ষমতা আগের উদাহরণগুলোর তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। CRISPR-Cas9-এর মতো genome-editing প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা DNA-র নির্দিষ্ট জায়গা লক্ষ্য করতে পারেন। Cas9 এনজাইম নির্দিষ্ট DNA sequence-এ গিয়ে DNA কাটতে পারে, এরপর কোষ সেই ক্ষত মেরামত করে। গবেষকরা এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করে কোনো জিন নিষ্ক্রিয় করতে বা নির্দিষ্ট জিনগত পরিবর্তন ঘটাতে পারেন।
অর্থাৎ আগে মানুষ মূলত নির্বাচন করত, এখন নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মানুষ সরাসরি জিনোম পরিবর্তন করার প্রযুক্তিও পেয়েছে।
তবে এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সীমাটা রয়েছে। একটি জীবের DNA-তে পরিবর্তন ঘটানো আর একটি নতুন প্রজাতি তৈরি করা এক জিনিস নয়। কোনো জিন সম্পাদনা করলেই সেই জীব নতুন প্রজাতিতে পরিণত হয় না। বিবর্তন বলতে সাধারণত প্রজন্মের পর প্রজন্মে জনসংখ্যার বংশগত বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তনকে বোঝায়। আর নতুন প্রজাতি গঠনের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি জিনগত পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রজননগত বিচ্ছিন্নতার মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে মানুষ আসলে কী করছে? মানুষ এখানে তিনটি ভিন্ন স্তরে জীবের বিবর্তনীয় পথকে প্রভাবিত করতে পারে।
কখনো মানুষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যকে বাড়িয়ে দেয়, যেমন কুকুর বা কৃষিজ ফসলে।
কখনো মানুষ পরিবেশ বদলে এমন নির্বাচনী চাপ তৈরি করে, যেমন কীটনাশক বা অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে। আর আধুনিক জিনসম্পাদনা প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষ কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি DNA-র নির্দিষ্ট অংশ পরিবর্তন করতে পারে।
এখানে আমার কাছে সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপারটি হলো: বিবর্তন নিজে কোনো লক্ষ্য ঠিক করে এগোয় না। কিন্তু মানুষ যখন কোনো বৈশিষ্ট্যকে বারবার নির্বাচন করে, তখন সেই বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত বংশগত পরিবর্তনগুলো জনসংখ্যায় বেশি সাধারণ হয়ে উঠতে পারে।
অর্থাৎ মানুষ বিবর্তনের নিয়ম বদলে দেয়নি। মানুষ বিবর্তনের নিয়মের মধ্যেই একটি নতুন শক্তি হয়ে উঠেছে। প্রকৃতি যেখানে নির্বাচন করে পরিবেশের মাধ্যমে, মানুষ সেখানে কখনো কৃষি, কখনো চিকিৎসা, কখনো প্রজনন নির্বাচন, আবার কখনো জিনসম্পাদনা প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্বাচনের দিকটিই বদলে দিতে পারে।
আর এখানেই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড়ো প্রশ্নটি দাঁড়িয়ে আছে: মানুষ যখন কোনো জীবের জিনোম পরিবর্তন করার ক্ষমতা আরও নিখুঁত করে তুলবে, তখন আমরা কি শুধু জীবের বৈশিষ্ট্য বদলাব, নাকি একদিন সত্যিই বিবর্তনের গতিপথকে পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করার পর্যায়ে পৌঁছে যাব?
বিজ্ঞান এখনো সেই শেষ প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। কিন্তু প্রথমবারের মতো মানুষ প্রশ্নটি করার মতো প্রযুক্তি অবশ্যই অর্জন করেছে।
তথ্য সংকলন: আল মামুন রিটন
৫০
কেন রেনেসাঁ আমাদেরই আনতে হবে
নবজাগরণ বলতে আমরা বুঝবো— একটি স্থবির, কুসংস্কারাচ্ছন্ন অন্ধকার সময় পেছনে ফেলে অধিকার আদায় করে মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সূচনা। ইউরোপে রেনেসাঁ অন্ধকার যুগকে কাটিয়ে এনেছিল আধুনিক যুগ। ইউরোপে অবশ্য পুনঃর্জাগরণ বলা হয় কারণ তারা গ্রিক সভ্যতার সেই ভাবনাগুলোই ধারণ করেছিল অন্ধকার যুগ পেরিয়ে। তারা আবার জ্ঞানের আলোয় পা রেখেছিল। আমাদের হবে আসলে জাগরণ, নব বা পুনঃজাগরণ নয়। বাস্তবিক আমাদের কি জাগরণ কোনদিন ঘটেছিল
কেন ইউরোপে জাগরণ এসেছিল
অন্ধকার যুগের শেষ দিকে ইউরোপীয়ানরা আবিষ্কার করছিল বিভিন্ন সমুদ্রপথ। প্রসার ঘটছিল বাণিজ্যের। গড়ে উঠছিল নতুন নতুন রাষ্ট্র, নগর। তৈরি হচ্ছিল একটি শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণি। তারা আকৃষ্ট হচ্ছিল বিজ্ঞান, দর্শন, শিল্প, সাহিত্য ও ইতিহাসের প্রতি। শিক্ষিত ও সচেতন শ্রেণির সম্মান বৃদ্ধি পাওয়ায় শিক্ষার প্রতি একটি ঝোঁক তৈরি হয়েছিল। সমাজে তৈরি হচ্ছিল ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, আইনজীবী, সরকারি কর্মচারী এবং অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। তারা রাষ্ট্রের ও নাগরিকদের উপর চার্চের প্রভাব দুর্বল করতে সক্ষম হয়। ধর্মের নামে চলছিল যাবতীয় অযৌক্তিক, অবৈজ্ঞানিক, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, অমানবিক কর্মকাণ্ড। অগ্রসর মানুষেরা ধর্মের নামে পৈশাচিক বর্বরতা, শোষণ, কুসংস্কার, ভিন্নমত, মানবাধিকার ইত্যাদি নিয়ে কথা বলতে লাগলো। তারা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের ধারণা নিয়ে আসলো, কথা বললো গণতন্ত্র ও শোষণমুক্ত অর্থনীতি নিয়ে, কথা বললেন নারী স্বাধীনতা নিয়ে, লেখা হল নাটক, উপন্যাস, কবিতা, দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস। ঘটলো নবজাগরণ!
বাংলায় কেন আসলো না জাগরণ
যদিও কেউ কেউ দাবি করেন বাংলায়ও জাগরণ ঘটেছিল। বাস্তবিক জাগরণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল কিন্তু জাগরণ ঘটেনি। যাদের আমরা জাগরণের মধ্যমণি বলি বাস্তবিক তারাও ছিলেন প্রতিবন্ধক। একমাত্র এইচ.এল.ভি ডিরোজিও ও তার বিপ্লবী শিষ্যবৃন্দ সূচনা করেছিলেন কিন্তু তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা ও আকস্মিক মৌলবাদীদের হাতে খুন হওয়া (কলেরায় মৃত্যু বলেই চালানো হয়), সেই সম্ভাবনা শেষ করে দেয়। অক্ষয় কুমার দত্ত, মাইকেল মধুসূদন দত্তসহ খুব কম জনই ধর্মীয় বাঁধা পেরোতে পেরেছিলেন কিন্তু তারা যাদের উপর নির্ভরশীল ছিলেন তারাও ছিলেন প্রতিবন্ধক।
রাজা রামমোহন রায়কে তৈরি করেছিলেন ইংরেজরা। তিনি ইংরেজদের সমর্থন করে গেছেন এবং তাদের ভাবাদর্শ অনুযায়ীই সতিদাহ প্রথার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরও ইংরেজদের তোষণ করেছেন এবং তাদের মতাদর্শ মতেই শিক্ষা বিস্তার ও বিধবা বিবাহের পক্ষে কাজ করেছেন। সতিদাহ প্রথা বন্ধ, বিধবা বিবাহ ও শিক্ষা বিস্তার গুরুত্বপূর্ণ হলেও তারা ব্যাপক মানুষের মধ্যে সাড়া জাগাতে পারেননি। মানুষ তখন চাচ্ছিল ইংরেজদের দখলমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কেশবচন্দ্র সেন, বিপিনচন্দ্র পালসহ আরো অনেকেই ছিলেন নতুন ধর্ম ব্রাহ্ম ধর্মের বিস্তারে নিয়োজিত। তারা আধ্যাত্মিক সাধনা করতেই ব্যস্ত থাকতেন। এছাড়া এরা ছিলেন ধনীক শ্রেণির মানুষ যারা প্রজা নিপীড়নও করতেন। তারা কোন ভাবেই পরিবর্তন বা জাগরণ ঘটুক তা চাননি। শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ও স্বামী বিবেকানন্দ নিয়োজিত ছিলেন হিন্দুত্ববাদী চেতনা জাগ্রত করতে। মুসলিমদের মধ্যে লেগেছিল ওহাবীবাদের ঢেউ আর বৃটিশ বিরোধীরাও যতটা বৃটিশ খেদাও আন্দোলনে জড়িত ছিলেন ততটা প্রগতিশীল ছিলেন না বরং অনেকেই ছিলেন কট্টর ধর্মান্ধ। তাদের হাতে কোনরূপ জাগরণ সম্ভব ছিল না এবং বাস্তবিক হয়ওনি।
এখনই দক্ষিণ এশিয়ায় একটি শক্তিশালী মধ্যবৃত্ত শ্রেণি গড়ে উঠেছে যারা শিক্ষায় এগিয়ে এসেছে। সমাজে বিরাজ করছে বহু লেখক, শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী, চাকরিজীবী, উদ্যোক্তাসহ বহু পেশার শিক্ষিত মানুষ। তাদের দরকার কথা বলা। তাদের হাত ধরেই আসবে জাগরণ। সেই সূচনাটাই দেখছি। কে কে ভূমিকা রাখবেন সেটাই বিষয়৷ বাড়তি সুযোগ তৈরি করেছে সামাজিক মিডিয়া৷ ধর্মবাজদের ভুয়া দাবি প্রমাণসহ মিথ্যা দাবি বাতিল করতে সময় লাগছে না৷ মিথ্যাবাদী আযহারী কাতার থেকে কায়রো যাওয়ার পথে হিমালয় দেখেননি সেটা এক মিনিটেই গুগল ম্যাপ দেখেই বুঝতে পারি৷ ইসলামিক স্কলার মুফতি ইব্রাহিম, তারেক মনোয়ার, আমির হামজার মিথ্যাচার সামনে এনে দিচ্ছে বহু মানুষ৷ চার্চের বেহেস্তের সার্টিফিকেট বেচে টাকা কামানো পাদ্রিদের মতোই বিপাকে আছে আমাদের বহু পীর ও মুফতি৷ বলাৎকার ও শিশু ধর্ষণের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ হচ্ছে৷ কোথাও জনগণই আইন হাতে তুলে নিয়ে গণপিটুনি দিচ্ছে বা ন্যাড়া করে দিচ্ছে মারধরসহ৷ প্রগতিশীলদের খুন করতে আগ্রহী দুএকজনকেও এখন প্রগতীর ছায়াতলে দেখি৷ প্রকাশ্যেই প্রতিবাদ হচ্ছে৷ কথিত তৌহিদি জনতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে করা গেলো নৌকা বাইচ৷ আপত্তির পরেও প্রকাশ করা গেলো হুজুরের ডিএনএ টেস্ট৷ মামুনুল হকের ৫০১ নিয়ে প্রতিনিয়তই প্রতিবাদ হচ্ছে৷ সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়াচ্ছে সাধারণ মানুষ৷ মানুষ বিজ্ঞানমনস্ক হচ্ছে৷ আশার আলো তৈরি হচ্ছে৷ আমাদের প্রধান দুই শত্রু মৌলবাদ ও অগণতান্ত্রিক মনোভাব৷ এই দুই প্রতিবন্ধকার বিরুদ্ধে লক্ষ কণ্ঠ জাগ্রত হলে—নক করতে থাকা জাগরণ জ্বলে উঠবেই৷ আমরা কথা বলছি৷ জাগরণ আমরাই আনবো৷ @ Mojib Rahman