তিন প্রজন্মের শাস্তি। 

কেউ যদি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে "অপরাধ" করে — তাহলে শুধু সে নয়, তার তিন প্রজন্ম শাস্তি পাবে। দাদা-দাদি, বাবা-মা, সন্তান — সবাইকে কারাগারে পাঠানো হবে, প্রায়ই আজীবনের জন্য। ভাবো — তোমার দাদা একটা ভুল কথা বলেছিলেন, আর সেই অপরাধে তুমি জন্মালেই কারাগারে। নিজের অপরাধ ছাড়াই। এই ভয়ের শিকল দিয়েই একটা গোটা জাতিকে চুপ করিয়ে রাখা হয়েছে। 

১৯৯০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতিও ধসে পড়ল। শুরু হলো এক ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ, যাকে সরকার নাম দিল — "কষ্টের যাত্রা।" বিভিন্ন অনুমানে এই দুর্ভিক্ষে মারা যায় ৬ লাখ থেকে ৩০ লাখ পর্যন্ত মানুষ। কিন্তু সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ব্যাপারটা কী জানো? সরকার "দুর্ভিক্ষ" বা "ক্ষুধা" — এই শব্দগুলো ব্যবহার করাই নিষিদ্ধ করে দিল। কারণ এই শব্দগুলো বললে মানে দাঁড়ায় — সরকার ব্যর্থ। 

এখান থেকে অনুমতি ছাড়া বের হওয়া এক বিশাল অপরাধ। সীমান্ত পার হতে গিয়ে ধরা পড়লে — গুলি করে মেরে ফেলার নির্দেশ আছে। আর কেউ পালাতে সফল হলে? পেছনে থেকে যাওয়া তার পরিবার — সেই তিন প্রজন্মের শাস্তির শিকার হয়। তাই অনেকে মুক্তি চাইলেও পালাতে পারে না — নিজের জন্য নয়, পরিবারের ভয়ে। গোটা একটা দেশ — যেন একটা বিশাল উন্মুক্ত কারাগার। 

এটা শুধু ইতিহাস নয়, এটা বর্তমান। এই মুহূর্তেও একটা গোটা দেশের মানুষ জন্মের আগেই শাস্তি পেয়ে বসে আছে — শুধু কোথায় জন্মেছে, সেই অপরাধে। তাদের কণ্ঠ আমরা শুনতে পাই না, তাদের মুখ আমরা দেখতে পাই না। এই দেশটির মতো পৃথিবীর অন্যান্য দেশ নয়, আমাদের দেশেও আছে দেখতে না পাওয়া কোটি কোটি জীবন্ত মানুষ আছে; শুধু কোথায় জন্মেছে বলেই জন্মের পর থেকে তারা শাস্তি পাচ্ছে। আর তাদের কথা মনে রাখাটাই আমাদের সবচেয়ে বড়কর্তব্য। 


ফারমেন্টেড সবজি

গরু, ছাগল, ভেড়ার মতো তৃণভোজী প্রাণীরা কিন্তু ঠিকই প্রচুর পরিমাণে ঘাস, পাতা, শাকসবজির মতো উদ্ভিজ্জ খাবার খেয়ে শক্তিশালী ও পুষ্ট থাকে। কারণ তাদের পাচনতন্ত্র মানুষের মতো একটা চেম্বারের না! তাদের রয়েছে বিশেষ ফারমেন্টেশন সিস্টেম, যেখানে খাবার দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান করে এবং কোটি কোটি উপকারী ব্যাকটেরিয়া সেই উদ্ভিজ্জ খাদ্যকে ফারমেন্ট করে। এই দীর্ঘ অভ্যন্তরীণ ফারমেন্টেশনের দ্বারা উদ্ভিদের পুষ্টি উপাদানগুলো ভেঙে সহজে শোষণযোগ্য রূপে পরিণত হয়।

মানুষের ক্ষেত্রে সমস্যা হলো আমাদের ফারমেন্টেশন সময় খুবই কম। খাবার পাকস্থলী ও অন্ত্রে সীমিত সময় থাকে, ফলে শাকসবজির জটিল গঠন ভাঙার সুযোগও সীমিত!

আর এখানেই আসে ফারমেন্টেড সবজির গুরুত্ব। বাইরে থেকে আগেই শাকসবজিকে ল্যাকটিক এসিড ফারমেন্টেশনের মাধ্যমে রেডি করে নিলে, তখন আমরা আসলে সেই কাজটাই করলাম যেটা তৃণভোজী প্রাণীদের দেহের ভেতরে ঘটে! ল্যাকটিক এসিড ব্যাকটেরিয়া শাকসবজির জটিল কার্বোহাইড্রেট ও অ্যান্টি-নিউট্রিয়েন্টস ভেঙে দেয়, ফলে তার পুষ্টিগুলো বায়োএভেইলেবল—মানে শরীরের জন্য সহজে শোষণযোগ্য হয়ে ওঠে!

ফারমেন্টেড সবজি বলা যায় এক ধরনের প্রি-ডাইজেস্টেড ফুড! ফার্মেন্টেড সবজি প্রাকৃতিক প্রোবায়োটিকেরও বেশ উত্তম এক উৎস। প্রতিদিন একটু খেলেই এটি হজমশক্তি বৃদ্ধি করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, গাট মাইক্রোবায়োমকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখে এবং শরীরকে শক্তিশালী করে।

শাকসবজি খেয়ে ঠিকঠাক পুষ্টি পাওয়া এবং গাট হেলথকে সাপোর্ট করার সাথে সাথে আপনি যদি শাকসবজি রান্না করতে না চান, বা নিয়মিত ফ্রেশ শাকসবজি পাওয়া কঠিন হয়, তাহলে ফারমেন্টেড সবজি হলো আপনার জন্য সবচেয়ে উত্তম, বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সমাধান!

ফার্মেন্টেড সবজি হলো সবজিকে ল্যাকটিক এসিড ফার্মেন্টেশন প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করার প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যমান ল্যাকটিক এসিড ব্যাকটেরিয়ারা (Lactobacillus) সবজির কার্বোহাইড্রেটকে ভেঙে ল্যাকটিক এসিড তৈরি করে। ফলে সবজি টক স্বাদ ধারণ করে, তাতে প্রচুর লাইভ প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া জন্মায় এবং রেফ্রিজারেটর ছাড়াই সংরক্ষণ করা যায়!

প্রায় সব ধরনের সবজিই ফার্মেন্ট করা যায়। যেমন- বাঁধাকপি, গাজর, পেঁপে, মুলা, শসা, শিম, বিট, লাউ, ঝিঙে, কাঁচামরিচ ইত্যাদি। একক কোনো সবজিও করা যায়, আবার মিশ্র সবজিও করা যায়।

ফার্মেন্টেড সবজি তৈরির পদ্ধতি:

- সবজি ভালোভাবে ধুয়ে পাতলা স্লাইস অথবা ছোট টুকরো করে কাটুন। কাটা সবজিতে পানি দিয়ে পানিসহ—অর্থাৎ সবজি + পানি এর মোট ওজন নিন।

- মোট ওজনের ২% পরিমাণ নুন ওতে মিশিয়ে দিন। সবজি ও পানি ১ কেজি হলে ২০ গ্রাম নুন লাগে। নুন মিশ্রিত পানি (Brine) ভালো ব্যাকটেরিয়ার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে।

- এখন ডিব্বা নিন। মাটির পাত্র, কাচের জার বা স্টেইনলেস স্টিল কন্টেইনার সবচেয়ে উত্তম। ডিব্বার ভিতর সবজি ভালোভাবে নুন-পানিতে চুবিয়ে রাখুন।

- ডিব্বার মুখ বন্ধ করুন। সবজি যেন নুন-পানির ভেতর ডুবে থাকে। যদি ভেসে ওঠে তাহলে পরিষ্কার সুতি কাপড় বা ছোট ওজন দিয়ে চেপে দিন।

- প্রতিদিন একবার ডিব্বার মুখ সামান্য সময়ের জন্য খুলে দিবেন। কারণ ফার্মেন্টেশনের সময় গ্যাস তৈরি হয়।

- কক্ষ তাপমাত্রা ১৮–২৪°C হলে সবচেয়ে ভালো ফার্মেন্টেশন হয়।

সতর্কতা:

- সবসময় পরিষ্কার পাত্র ও প্রাকৃতিক পানি ব্যবহার করতে হবে।

- রিফাইন্ড লবণ ব্যবহার না করতে পারলেই ভাল হয়।

- যদি বাজে গন্ধ, কালো দাগ বা ফাংগাস দেখা দেয় তবে সেই ব্যাচ ফেলে দিবেন।

ফার্মেন্টেড সবজি খাওয়ার নিয়ম:

- ২ দিনেই আপনার ফার্মেন্টেড সবজি রেডি হয়ে যাবে। ২ দিনের সবজি হালকা টক, কচকচে স্বাদের হয়।

- বেশি টক টক খেতে চাইলে ৩-৭ দিন পরে খেতে হবে।

- অবশ্যই কাঁচা খেতে হবে। রান্না করলে লাইভ ব্যাকটেরিয়া মারা যায়।

- ভাতের সঙ্গে, স্যালাডে, রুটি/পরোটার সাথে বা এমনি সরাসরিই খাওয়া যায়।

- প্রতিদিন অল্প পরিমাণ (২–৩ চামচ) খেলেই যথেষ্ট।

ফার্মেন্টেড সবজির উপকারিতা:

- গাট হেলথ উন্নত করে। যা ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী করে। কারণ ৭০% ইমিউন সিস্টেম গাটের সাথে সম্পর্কিত।

- প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া অন্ত্রে ভালো মাইক্রোবায়োম তৈরি করে। গাট ব্যালেন্স ভালো থাকলে শরীরে সংক্রমণ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।

- ভিটামিন ও মিনারেল সমৃদ্ধ। সবজিকে গাঁজালে এর C, K এবং B-ভিটামিন বাড়ে এবং মিনারেলস (iron, magnesium, calcium) সহজে শোষণযোগ্য হয়।

- অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি প্রভাব শরীরের ফ্রি র‌্যাডিক্যাল কমায়। ইনফ্লামেশন কমাতে সাহায্য করে।

- ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। হজমে সাহায্য করে। মেটাবলিজম উন্নত করে।

ফার্মেন্টেড সবজির পানি (brine) একটা প্রোবায়োটিক টনিক। সবজির পানিও প্রোবায়োটিক, ভিটামিন ও মিনারেলস সমৃদ্ধ।

এটা সরাসরি ২–৩ টেবিল চামচ খেতে পারেন। অথবা সালাদে মিশিয়ে খেতে পারেন। ডিটক্স ওয়াটারের মতো পানিতে মিশিয়েও পান করতে পারেন।

প্রথম দিকে বেশি না খেয়ে অল্প (১–২ চামচ) দিয়ে শুরু করুন।

ফার্মেন্টেড সবজি আর সেটার পানি ঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে অনেকদিন ভালো থাকে। ফার্মেন্টেশন সম্পূর্ণ হয়ে গেলে ফ্রিজে রাখলে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ধীর হয়ে যায়, ফলে টক স্বাদ আর বাড়ে না এবং দীর্ঘদিন ভালো থাকে।

ফার্মেন্টেশন শেষ হলে ফ্রিজে রাখুন। এতে সহজেই ১–৩ মাস পর্যন্ত ভালো থাকবে। যতদিন সঠিক গন্ধ ও স্বাদ থাকবে, ততদিন খাওয়া নিরাপদ।

ভালো ফার্মেন্টেড সবজির লক্ষণ হলো হালকা টক গন্ধ (ভিনেগারের মতো কিন্তু মনোরম), স্বচ্ছ বা হালকা ঘোলা পানি এবং স্বাদে টক-মিষ্টি-নোনতা।

খারাপ হয়ে গেলে বাজে দুর্গন্ধ (পচা বা তীব্র তিতা গন্ধ) হয়, পানি বা সবজিতে কালচে বা নীলচে ছত্রাক হয় এবং রঙ বদলে যায়। এসব হলে ফেলে দিন এবং নতুন ব্যাচ তৈরি করুন।

@ captin green


একজন মানুষ বাইরে যতটা সফল বা বড় হয়, তার আগে সে নিজের মনের ভেতরে ততটাই বড় হয়ে ওঠে। সব বড় অর্জনের শুরু হয় একটি চিন্তা, সিদ্ধান্ত বা মাইন্ডসেট থেকে। 


2



রোম সাম্রাজ্যের ত্রাস: সম্রাট ক্যালিগুলা এবং তার অদ্ভুত ও বিকৃত সব শখ!

প্রাচীন রোমের ইতিহাস ঘাঁটলে এমন কিছু শাসকের নাম পাওয়া যায়, যাদের নিষ্ঠুরতা ও পাগলামি আজও মানুষকে অবাক করে। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন সম্রাট ক্যালিগুলা (Caligula)। ৩৭ থেকে ৪১ খ্রিষ্টাব্দ—মাত্র চার বছরের শাসনকালে তিনি রোমকে এক আতঙ্কের নগরীতে পরিণত করেছিলেন। ক্ষমতার অহংকার তাকে এতটা উন্মাদ করেছিল যে, তার কিছু বিকৃত ও অদ্ভুত অভ্যাস ইতিহাসের পাতায় তাকে 'পাগল সম্রাট' বা 'Mad Emperor' হিসেবে কুখ্যাত করে রেখেছে।

চলুন জেনে নিই এই রোমান সম্রাটের কিছু অদ্ভুত ও বিকৃত অভ্যাসের কথা:

প্রিয় ঘোড়াকে 'মন্ত্রী' বানানোর চেষ্টা!

তার সবচেয়ে বিখ্যাত এবং হাস্যকর পাগলামি ছিল তার প্রিয় ঘোড়া 'ইনসিট্যাটাস' (Incitatus)-কে ঘিরে। তিনি ঘোড়াটির জন্য মার্বেল পাথরের আস্তাবল, হাতির দাঁতের পাত্র এবং মণি-মুক্তা খচিত গলার হার বানিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, ক্যালিগুলা তার এই ঘোড়াকে রোমের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ 'কনসাল' (Consul) বা সিনেটর বানানোর ঘোষণাও দিয়েছিলেন!

সমুদ্র দেবতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা

ক্যালিগুলার উন্মাদনার আরেকটি চরম নিদর্শন হলো সমুদ্রের দেবতা নেপচুনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা। তিনি তার বিশাল সেনাবাহিনীকে ইংলিশ চ্যানেলের সমুদ্র সৈকতে নিয়ে গিয়ে তরবারি দিয়ে ঢেউকে আক্রমণ করার নির্দেশ দেন। যুদ্ধ শেষে নিজেকে 'বিজয়ী' দাবি করে সৈন্যদের নির্দেশ দেন সমুদ্রের তীর থেকে ঝিনুক কুড়িয়ে আনতে। এই ঝিনুকগুলোকে তিনি যুদ্ধের 'লুট করা সম্পদ' হিসেবে রোমে প্রদর্শন করেছিলেন!

নিজেকে 'জীবন্ত ঈশ্বর' দাবি

ক্ষমতার নেশায় তিনি নিজেকে সাধারণ মানুষ থেকে ঈশ্বর পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। রোমের বিভিন্ন মন্দিরে থাকা দেবতাদের মূর্তির মাথা কেটে সেখানে নিজের চেহারার আদলে মূর্তি বসানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। তিনি চাইতেন সাধারণ মানুষ ও সিনেটররা যেন তাকে ঈশ্বর হিসেবে পূজা করে।

চরম নিষ্ঠুরতা ও রক্তপিপাসা

মানুষের কষ্ট দেখাটা তার জন্য এক ধরণের বিনোদন ছিল। গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াইয়ে যখন অপরাধী বা বন্দীদের অভাব পড়ত, তখন তিনি গ্যালারিতে বসে থাকা দর্শকদের মধ্য থেকেই সাধারণ মানুষকে জোর করে সিংহের খাঁচায় ছুঁড়ে ফেলার নির্দেশ দিতেন। এমনকি খাওয়ার টেবিলেও তিনি মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা উপভোগ করতেন।

বিকৃত যৌনাচার ও প্রাসাদে পতিতালয়

সম্রাটের বিরুদ্ধে নিজের বোনদের (বিশেষ করে দ্রুসিলা) সাথে অনৈতিক ও বিকৃত সম্পর্কের অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, অর্থ উপার্জনের এক অদ্ভুত নেশায় তিনি নিজের রাজপ্রাসাদের একাংশকে পতিতালয়ে রূপান্তর করেছিলেন এবং রোমের অভিজাত পরিবারের নারীদের সেখানে কাজ করতে বাধ্য করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়।

ক্যালিগুলার এই চরম স্বেচ্ছাচারিতা, বিকৃত উল্লাস ও পাগলামি বেশিদিন টেকেনি। মাত্র ২৯ বছর বয়সে, ৪১ খ্রিষ্টাব্দে তার নিজের দেহরক্ষী বাহিনী 'প্রিটোরিয়ান গার্ড'-এর সদস্য এবং কিছু বিক্ষুব্ধ সিনেটরের হাতে তিনি নির্মমভাবে খুন হন। মাত্র চার বছরের শাসনকালে ক্যালিগুলা প্রমাণ করে গেছেন যে, জবাবদিহিতাহীন অসীম ক্ষমতা কীভাবে একজন মানুষকে আক্ষরিক অর্থেই দানবে পরিণত করতে পারে। @ The Saifullah

প্রোডাক্টিভিটি টাইম ম্যানেজমেন্ট নিয়ে খেলা নয়, এটি এনার্জি ম্যানেজমেন্টের খেলা। 

যখন মানুষ প্রোডাক্টিভিটিকে শুধু “কত ঘণ্টা কাজ করলাম” দিয়ে মাপতে চায়। কিন্তু এখানে মৌলিক ত্রুটি আছে। আপনি যদি ৬ ঘণ্টা কাজ করেন কিন্তু আপনার কগনিটিভ এনার্জি লো থাকে, তাহলে আপনার আউটপুট হবে নিম্নমানের, সিদ্ধান্ত হবে দুর্বল, এবং ভুলের হার বাড়বে। অন্যদিকে, আপনি যদি ২ ঘণ্টা কাজ করেন কিন্তু সেই সময়ে আপনার ফোকাস, মানসিক সতর্কতা এবং মোটিভেশন সর্বোচ্চ থাকে, তাহলে সেই ২ ঘণ্টার আউটপুট অনেক বেশি মূল্যবান হতে পারে। অর্থাৎ সময় নয়, এনার্জি-ই আসল লিমিটিং ফ্যাক্টর। আমাদের মস্তিষ্ক দিনের নির্দিষ্ট সময়ে সবচেয়ে বেশি কার্যকর থাকে, কেউ সকালে তীক্ষ্ণ, কেউ রাতে। কিন্তু যদি আপনি আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো এমন সময়ে রাখেন যখন আপনার এনার্জি ড্রপ করে থাকে, তাহলে আপনি নিজের সিস্টেমের বিরুদ্ধে কাজ করছেন। 

অধিকাংশ মানুষ শুধু ইনপুট নিয়ে ভাবে, যেমন আরও কাজ, আরও সময়, আরও চাপ। কিন্তু তারা রিকভারি মেকানিজমকে অবহেলা করে, যেমন গভীর ঘুম, বিরতি, মেন্টাল ডিটক্স। ফলে তাদের মোট এনার্জি ক্যাপাসিটি ধীরে ধীরে কমে যায়। এটা ঠিক একটি ব্যাটারির মতো, আপনি যদি চার্জ না দিয়ে শুধু ব্যবহার করেন, একসময় সেটা অকেজো হয়ে যাবে। দীর্ঘমেয়াদে প্রোডাক্টিভিটি ধরে রাখতে হলে এনার্জি রিকভারি একটি স্ট্র্যাটেজিক অংশ । @ The Analyst's Journal


অনেক সময় আমরা ক্যারিয়ার বা ব্যবসায় একটি নির্দিষ্ট সফলতার পর্যায়ে পৌঁছে গেলে আত্মতুষ্ট হয়ে যাই। আমরা ধরে নিই যে, যা অর্জন করেছি তা-ই যথেষ্ট। কিন্তু , "আমরা আত্মতুষ্টিতে ভুগতে পারি না। প্রতিদিন নতুন করে উদ্ভাবন করতে হবে এবং গ্রাহকদের আরও ভালো কিছু দিতে হবে।" 


১৯৫৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইনের মৃত্যুর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার মস্তিষ্ক উধাও হয়ে যায়!  

ঘটনাটি শুরু হয় প্রিন্সটন হাসপাতালের একটি সাধারণ কক্ষে। ১৮ এপ্রিল, ১৯৫৫। মহান পদার্থবিজ্ঞানী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার ইচ্ছা ছিল দেহ পোড়ানোর, কিন্তু ময়নাতদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্যাথলজিস্ট ড. থমাস হার্ভে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেন।

স্ক্যাল্পেল হাতে একা মর্গে দাঁড়িয়ে হার্ভের চোখে শুধু কৌতূহল। তিনি কারও অনুমতি ছাড়াই প্রথমে আইনস্টাইনের চোখ, তারপর করাত দিয়ে খুলি কেটে পুরো মস্তিষ্ক বের করে ফর্মালডিহাইডের জারে ভরে ফেলেন। তার যুক্তি ছিল এত বড় প্রতিভার মস্তিষ্কের গঠন জানা গেলে বিজ্ঞানের উন্নতি হবে!

পরদিন পরিবার দেহ পোড়াতে এলে মস্তিষ্ক নেই! খবর ছড়িয়ে পড়ে। প্রিন্সটন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ক্ষিপ্ত হয় এবং হার্ভেকে চাকরিচ্যুত করে। তাকে বলা হয় মস্তিষ্ক ফেরত দিতে, কিন্তু হার্ভে অস্বীকৃতি জানান। তিনি স্ত্রীসন্তান নিয়ে চলে যান এবং একটি সাধারণ বিয়ারের কুলারের মধ্যে, বরফের চাদরে ঢেকে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান মস্তিষ্কটি লুকিয়ে রাখেন। একটানা ৪০ বছর ধরে!

হার্ভে তখন একটি সাধারণ ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন। রাতের বেলা গোপনে গ্যারেজে গিয়ে কুলার খুলে মস্তিষ্কের টুকরোগুলো পরীক্ষা করতেন, ছবি তুলতেন। তাঁর স্ত্রী একবার কুলার ফেলে দিতে গেলে সম্পর্ক প্রায় ভেঙে যায়। হার্ভে বিশ্বাস করতেন, এই মস্তিষ্ক শুধু পড়ে রাখার নয়, গবেষণা করা দরকার।

একজন সাংবাদিক স্টিভেন লেভি হার্ভের সন্ধান পান। নিউ জার্সির বাড়িতে গিয়ে তিনি দেখেন রান্নাঘরের কাঠের বাক্সে মেসন জারে ভর্তি মস্তিষ্কের টুকরো! সাংবাদিক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলে হার্ভে বলেনঃ "এটা আমার সন্তানের চেয়েও বেশি।" এই সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হতেই বিশ্বব্যাপী হইচই পড়ে যায়।

অবশেষে হার্ভে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মারিয়ান ডায়মন্ড-এর কাছে কিছু নমুনা পাঠান। গবেষণায় চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে আসে।

আইনস্টাইনের মস্তিষ্কের প্যারাইটাল লোব যে অংশ গাণিতিক ও স্থানিক চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করে সেটা স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে প্রায় ১৫ শতাংশ বড় ছিল। আরও আশ্চর্যের বিষয়, যে সিলভিয়ান ফিশার যা খাঁজ সেটা সাধারণ মানুষের মস্তিষ্কে গভীর থাকে, তা তাঁর মস্তিষ্কে প্রায় অনুপস্থিত ফলে নিউরনগুলোর মধ্যে বেশি সংযোগ তৈরি হওয়ার সুযোগ ছিল।

গবেষণা প্রকাশের পর হার্ভে কেঁদে ফেলেন। তাঁর ৩০ বছরের পাগলামি, চাকরি হারানো, স্ত্রী হারানোসহ সবকিছুর যেন অর্থ খুঁজে পান ।

শেষ বয়সে হার্ভে বুঝতে পারেন, এই টুকরোগুলো তাঁর কাছে না রেখে বিশ্বের সম্পদ হিসেবে তুলে দেওয়া উচিত। ১৯৯৮ সালে তিনি প্রিন্সটন হাসপাতালে অধিকাংশ অংশ ফিরিয়ে দেন। বর্তমানে ৪৬টি স্লাইড ফিলাডেলফিয়ার মাটার মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে এবং কিছু নমুনা ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ হেলথ অ্যান্ড মেডিসিনে দেখা যায়।

ড. থমাস হার্ভে ২০০৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বিশ্বাস করতেন তিনি যা করেছেন, তা সঠিক ছিল।

সূত্র: The Denver Post


একটি দেশের সাধারণ মানুষ বা প্রজারা যখন নিজেদের মধ্যে ধর্ম, বর্ণ বা জাতিগত দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকে, তখন তারা চরমভাবে খণ্ডিত হয়ে পড়ে। তাদের ভেতরের এই অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ের কারণে তারা কখনোই ঐক্যবদ্ধ হয়ে শোষক বা শাসকের বিরুদ্ধে কোনো গণআন্দোলন গড়ে তুলতে পারে না। ফলে শাসকের গদি থাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ


.৫


হেডফোন কিভাবে এলো

১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে সনি-র সহ-প্রতিষ্ঠাতা মাসারু ইবুকা (Masaru Ibuka) দীর্ঘ আন্তর্জাতিক বিমান ভ্রমণের সময় অপেরা মিউজিক শোনার জন্য একটি সহজ উপায় খুঁজছিলেন। তিনি তাঁর প্রকৌশলী দলকে সনি-র 'প্রেসম্যান' নামক একটি ভারী পোর্টেবল টেপ রেকর্ডার পরিমার্জন করার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, রেকর্ড করার মেকানিজমটি পুরোপুরি বাদ দিয়ে এর সাথে হালকা এক জোড়া স্টেরিও হেডফোন যুক্ত করতে। প্রকৌশলীরা ঠিক তা-ই করেন।

প্রোটোটাইপ বা প্রাথমিক মডেলটি তৈরি হওয়ার পর সনি-র মার্কেটিং বিভাগ যখন সাধারণ মানুষ ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি জরিপ (Focus Group) চালায়, তখন ফলাফল আসে অত্যন্ত নেতিবাচক। বিশেষজ্ঞরা সাফ জানিয়ে দেন, যে ক্যাসেট প্লেয়ারে গান রেকর্ড করা যায় না, সেটি বাজারে একদমই চলবে না। তাছাড়া, জনসমক্ষে কানে হেডফোন গুঁজে হেঁটে বেড়ানোকে মানুষ 'অসামাজিক' এবং 'অদ্ভুত' মনে করবে, তাই কেউ এটি কিনবে না।

কিন্তু সনি-র তৎকালীন চেয়ারম্যান আকিও মোরিতা (Akio Morita) সব নেতিবাচক জরিপ ও ডেটা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি তাঁর বিখ্যাত উক্তিতে বলেছিলেন—"সাধারণ মানুষ আসলে কী চায়, তা তারা নিজেরাও জানে না, যতক্ষণ না আমরা তাদের তা বানিয়ে দেখাচ্ছি।"

সব বাধা পেরিয়ে ১৯৭৯ সালের ১ জুলাই সনি বাজারে ছাড়ে তাদের প্রথম মডেল 'Walkman TPS-L2'। ফলাফল হয়েছিল ঐতিহাসিক। প্রথম দুই মাসেই সনি তাদের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বহুগুণ বেশি ওয়াকম্যান বিক্রি করে। এটি কেবল একটি গ্যাজেট ছিল না, এটি রাতারাতি তরুণ প্রজন্মের কাছে স্টাইল স্টেটমেন্ট এবং পোর্টেবল মিউজিকের এক বৈশ্বিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। মানুষের মতামতকে অন্ধের মতো বিশ্বাস না করে দূরদর্শী মেধা দিয়ে বিশ্ববাজারকে পুনর্নির্মাণ করা যায় 


বেশি গাছ মানেই বেশি প্রাণবৈচিত্র্য নয়; বরং কিছু পাখির জন্য তা বিপদের কারণও হতে পারে।

জাপানের হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটি কৃষিভিত্তিক জলাভূমি অঞ্চলে গাছের সারি বা ‘শেল্টারবেল্ট’-এর প্রভাব বিশ্লেষণ করেছে। শেল্টারবেল্ট হলো এমন সারিবদ্ধ গাছ, যা সাধারণত প্রবল বাতাস থেকে ফসল রক্ষা করার জন্য কৃষিজমির পাশে লাগানো হয়। বহুদিন ধরে এগুলোকে কৃষি ও পরিবেশ—উভয়ের জন্যই উপকারী বলে মনে করা হয়েছে। কিন্তু গবেষকরা দেখতে পেলেন, এই গাছের সারি কিছু পাখিকে সুবিধা দিলেও অন্য অনেক পাখির জন্য আবাসস্থলকে কম উপযোগী করে তুলছে।

গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছিল জাপানের মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত কাহোকুগাতা হ্রদের আশপাশের কৃষি এলাকায়। বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত, পদ্মক্ষেত, চাষযোগ্য জমি ও তৃণভূমি নিয়ে গড়ে ওঠা এই অঞ্চলটি পূর্ব এশিয়া-অস্ট্রেলেশিয়া অভিবাসন পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিরতিস্থল। প্রতি বছর অসংখ্য পরিযায়ী পাখি এখানে বিশ্রাম নেয়, খাদ্য সংগ্রহ করে এবং মৌসুমি আবাস গড়ে তোলে। এ পর্যন্ত এলাকাটিতে প্রায় ৩০০ প্রজাতির পাখির উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়েছে।

গবেষকরা ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে এবং ২০২৩ সালের জুন মাসে মাঠপর্যায়ে পাখি জরিপ পরিচালনা করেন। তাঁরা খোলা মাঠ এবং শেল্টারবেল্টের পাশের এলাকায় পাখির সংখ্যা ও বৈচিত্র্য তুলনা করেন। ফলাফল ছিল বিস্ময়কর।

যেসব পাখি ঝোপঝাড় বা বনভূমির কিনারায় থাকতে পছন্দ করে, তারা শেল্টারবেল্টের উপস্থিতিতে লাভবান হয়েছে। গাছের সারি তাদের জন্য নতুন আশ্রয়, বসার জায়গা এবং খাদ্য অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু উন্মুক্ত তৃণভূমি ও জলাভূমির ওপর নির্ভরশীল পাখিদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র।

গবেষণায় দেখা যায়, শেল্টারবেল্টের কাছাকাছি এলাকায় তৃণভূমিনির্ভর পাখির সংখ্যা খোলা মাঠের তুলনায় ৭০ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে। একই সঙ্গে জলাভূমির বিশেষায়িত পাখিদের বৈচিত্র্যও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। অর্থাৎ, কয়েক সারি গাছ এমন একটি পরিবর্তন ঘটাতে পারে যা পুরো পাখি সম্প্রদায়ের গঠনকেই বদলে দেয়।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। অনেক ঘাসভূমি ও জলাভূমির পাখি বিস্তৃত খোলা পরিবেশে বাসা বাঁধে, খাদ্য সংগ্রহ করে এবং শিকারিদের আগাম শনাক্ত করে বেঁচে থাকে। গাছের সারি সেই উন্মুক্ত দৃশ্যপটকে ভেঙে দেয়। ফলে তাদের জন্য কার্যকর আবাসস্থলের পরিমাণ কমে যায়। এছাড়া গাছ শিকারি পাখি বা অন্যান্য শিকারিদের লুকিয়ে থাকার সুযোগও বাড়িয়ে দিতে পারে, যা উন্মুক্ত পরিবেশে অভ্যস্ত পাখিদের জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করে।

গবেষণার প্রধান গবেষক মাসুমি হিসানোর ভাষায়, শেল্টারবেল্টকে অনেকটা ‘পরিবেশগত দেয়াল’-এর সঙ্গে তুলনা করা যায়। এগুলো কিছু প্রজাতির জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে, আবার অন্যদের জন্য অদৃশ্য বাধা তৈরি করে। ফলে একই ব্যবস্থাপনা পদক্ষেপে প্রকৃতির মধ্যে একদল বিজয়ী এবং একদল পরাজিতের জন্ম হয়।

এই গবেষণা পরিবেশ সংরক্ষণ নীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। দীর্ঘদিন ধরে ‘আরও বেশি গাছ লাগাও’ স্লোগানকে পরিবেশ রক্ষার সার্বজনীন সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি ভূদৃশ্যের পরিবেশগত চাহিদা আলাদা। যেখানে বনভূমির অভাব, সেখানে গাছ লাগানো অত্যন্ত উপকারী হতে পারে। কিন্তু জলাভূমি বা উন্মুক্ত তৃণভূমি অঞ্চলে নির্বিচারে গাছ লাগানো স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর ফলও বয়ে আনতে পারে। Science News 


বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে এখনও বহাল আছে ঔপনিবেশিক আমলের একটি বিধান, যার আওতায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ধূমপায়ী বন্দীরা প্রতিদিন ৮টি করে বিনামূল্যে সিগারেট পান। বর্তমানে দেশে ২,০০০-এর বেশি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি থাকায় প্রতিদিন প্রায় ১৬,০০০ সিগারেট কারাগারের ভেতরে বিতরণ করা হয়। কারা কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই নিয়মের মূল উদ্দেশ্য -মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীদের জীবনের শেষ সময়ে কিছুটা মানসিক স্বস্তি দেওয়া। কারাগারের বাইরে কোটি কোটি মানুষকে সিগারেট পান করতে দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো যারা নিজেকে ধ্বংস করার পথযাত্রী তাদেরকে দ্রুত শেষ হতে সহায়তা করা। 


কুমির সত্যিই খাবার খাওয়ার সময় চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরাতে পারে, তবে এই অশ্রুর সঙ্গে দুঃখ, অনুশোচনা বা অন্য কোনো আবেগের সম্পর্ক নেই। বিজ্ঞানীদের মতে, খাওয়ার সময় চোয়ালের শক্তিশালী নড়াচড়া এবং এর ফলে মাথার অভ্যন্তরে সৃষ্ট চাপ বা সাইনাস দিয়ে বাতাসের প্রবাহ অশ্রুগ্রন্থিকে উদ্দীপিত করতে পারে, যার ফলে চোখ থেকে জল বের হয়। 



পোষা প্রাণী অনেকের কাছেই পরিবারের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। নিঃসঙ্গতা দূর করতে বা মানসিক প্রশান্তির জন্য কুকুর বা বিড়ালের সাথে এক বিছানায় ঘুমানোর অভ্যাস আমাদের অনেকেরই আছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানও স্বীকার করে যে, আদরের পোষা প্রাণীর কাছাকাছি থাকলে আমাদের স্ট্রেস বা মানসিক চাপ অনেকটা কমে যায়। কিন্তু এই ভালোবাসার উল্টো পিঠে লুকিয়ে আছে স্বাস্থ্যঝুঁকি, যা সম্পর্কে অনেকেই হয়তো সচেতন নই।

আদরের কুকুর বা বিড়ালের মাধ্যমে শরীরে বাসা বাঁধতে পারে মারাত্মক কিছু পরজীবী। এর মধ্যে অন্যতম হলো 'টক্সোক্যারিয়াসিস' (Toxocariasis)। এটি মূলত এক ধরণের কৃমি বা রাউন্ডওয়ার্মের ইনফেকশন, যা সাধারণত কুকুর এবং বিড়ালের অন্ত্রে (Intestines) জন্ম নেয়। প্রাণীগুলোর লোমে, লালায় বা তাদের মলমূত্রের সংস্পর্শে আসা ধুলোবালিতে এই পরজীবীর ডিম লেগে থাকতে পারে। যখন আমরা এদের সাথে এক বিছানায় ঘুমাই, তখন আমাদের অজান্তেই এই আণুবীক্ষণিক ডিমগুলো আমাদের শরীরে প্রবেশ করার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে ঘরের ছোট বাচ্চাদের এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাদের এই ইনফেকশনে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, এই পরজীবীর লার্ভা মানুষের শরীরে প্রবেশ করার পর রক্তস্রোতের মাধ্যমে লিভার, ফুসফুস, এমনকি চোখ পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি জ্বর, কাশি, পেট ব্যথা থেকে শুরু করে চোখের মারাত্মক ক্ষতিও হতে পারে। তবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, একটু সচেতন হলেই এই বিপদ এড়ানো সম্ভব!

পোষা প্রাণীকে নিয়মিত পশু চিকিৎসকের কাছে নেওয়া, রুটিন অনুযায়ী কৃমির ওষুধ (Deworming) খাওয়ানো এবং প্রাণী ধরার পর বা বিছানায় যাওয়ার আগে ভালো করে হাত ধোয়ার অভ্যাস আপনার পরিবারকে এই ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে পারে। @AH Abubakkar Siddique


অতিরিক্ত চিনি খেলে রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা বেড়ে যায়, যা টেস্টোস্টেরন তৈরিতে বাধা দেয়। চিনি খাওয়া কমালে টেস্টোস্টেরন স্বাভাবিক নিয়মে বাড়ে। 

আজ থেকে কয়েকশো বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষেরা কিন্তু এত চিনি খেতেন না। তখন রিফাইন বা পরিশোধিত চিনির কোনো অস্তিত্বই ছিল না। মানুষ তখন জঙ্গল থেকে ফলমূল বা প্রাকৃতিক খাবার সংগ্রহ করে খেত। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় সেই আমলের মানুষেরা শারীরিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী ও চনমনে থাকতেন। কিন্তু আধুনিক যুগে এসে যখন কলকারখানায় চিনি তৈরি শুরু হলো, তখন থেকে মানুষের খাবারের টেবিলে চিনির বন্যা বয়ে গেল। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে চিকিৎসকেরা প্রথম খেয়াল করলেন যে অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার কারণে মানুষের শরীরের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখলেন যে পুরুষ ও নারী উভয়ের শরীরের জন্যই অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এই টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা দিন দিন কমে যাওয়ার পেছনে এই সাদা চিনি এক বড় ভূমিকা পালন করছে।

এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনের থিওরি বা বৈজ্ঞানিক তত্ত্বটি বোঝা কিন্তু খুবই সহজ। আমরা যখনই কোনো মিষ্টি খাবার বা চিনি খাই, তখন আমাদের রক্তে গ্লুকোজ বা শর্করার মাত্রা এক লাফে অনেক বেড়ে যায়। এই গ্লুকোজকে সামাল দেওয়ার জন্য আমাদের অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নামের একটি হরমোন ক্ষরিত হয়। এই ইনসুলিনের কাজ হলো রক্ত থেকে চিনিকে সরিয়ে শরীরের বিভিন্ন কোষে পৌঁছে দেওয়া। বিজ্ঞানের ভাষায় ইনসুলিন এবং টেস্টোস্টেরনের সম্পর্কটি হলো ঠিক দা কুমড়ো সম্পর্কের মতো। রক্তে যখনই ইনসুলিনের মাত্রা অনেক বেশি থাকে, তখন তা টেস্টোস্টেরন হরমোন তৈরির কারখানাকে সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরীক্ষায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার ঠিক দুই ঘণ্টার মধ্যে শরীরের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা প্রায় পঁচিশ শতাংশ পর্যন্ত নেমে যেতে পারে। তাই চিনি বাদ দিলে ইনসুলিন শান্ত থাকে আর টেস্টোস্টেরন রাজা আবার ফ্রিলী নিজের কাজ করতে পারে।

আসুন বিষয়টি একটি খুব সহজ এনালজি বা তুলনা দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি যা ঘরের ছোট বাচ্চারাও খুব সহজে মনের মধ্যে গেঁথে নিতে পারবে। মনে করুন আপনার কাছে একটি চমৎকার রিমোট কন্ট্রোল খেলনা গাড়ি আছে যা খুব দ্রুত চলে। এই গাড়িটি হলো আপনার টেস্টোস্টেরন। এখন আপনি যদি গাড়ির চাকার মধ্যে একদলা আঠালো কাদা লাগিয়ে দেন, তবে গাড়ির গতি কেমন হবে? নিশ্চয়ই গাড়িটি আর আগের মতো জোরে চলতে পারবে না এবং এক জায়গায় আটকে যাবে। চিনি হলো ঠিক সেই আঠালো কাদার মতো, যা আপনার শরীরের হরমোন তৈরির চাকাগুলোকে জ্যাম করে দেয়। আপনি যখনই আপনার শরীর থেকে সেই চিনির কাদা পরিষ্কার করে দেবেন, অর্থাৎ চিনি খাওয়া বন্ধ করবেন, আপনার খেলনা গাড়িটি আবার আগের মতো পুরো গতিতে ছুটতে শুরু করবে।

এবার কিশোরদের জন্য এই হরমোনের লড়াইয়ের একটি দুর্দান্ত উদাহরণ দেওয়া যাক যা তাদের এক নিঃশ্বাসে পুরো বিষয়টি বুঝিয়ে দেবে। মনে করুন আপনি একটি ভিডিও গেম খেলছেন যেখানে আপনার ক্যারেক্টারের শক্তি বা পাওয়ার বুস্ট দরকার। টেস্টোস্টেরন হলো সেই পাওয়ার বুস্টার যা কিশোর ও তরুণদের গলার আওয়াজ গম্ভীর করতে, দাড়ি গোঁফ গজাতে, মনঃসংযোগ বাড়াতে এবং মেদহীন শরীর গঠনে সাহায্য করে। কিন্তু যখন কেউ সারাদিন কোল্ড ড্রিঙ্কস, চকলেট, আইসক্রিম বা ফাস্টফুডের মাধ্যমে চিনি গিলতে থাকে, তখন তার লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমতে শুরু করে যাকে ভিসারাল ফ্যাট বলা হয়। এই চর্বি আবার এক বিশেষ এনজাইম তৈরি করে যা টেস্টোস্টেরনকে মেয়েলি হরমোন ইস্ট্রোজেনে রূপান্তর করে দেয়। এর ফলে শরীরে ক্লান্তি আসে, অলসতা বাড়ে এবং মন খিটখিটে হয়ে যায়। গেমের বসকে হারাতে যেমন পাওয়ার বুস্টার লাগে, তেমনি জীবনের খেলায় জিততে গেলে এই চিনি নামক ভিলেনকে ডায়েট থেকে আউট করা জরুরি।

এই ধারণার এপলিকেশন বা বাস্তব প্রয়োগ কিন্তু আমাদের সুস্থ জীবনের মূল চাবিকাঠি। আপনি যদি মাত্র দুই সপ্তাহের জন্য আপনার চা, কফি, মিষ্টি বা প্রক্রিয়াজাত খাবার থেকে চিনি পুরোপুরি বাদ দিয়ে দেন, তবে আপনার শরীরে এক অবিশ্বাস্য পরিবর্তন দেখতে পাবেন। প্রথম কয়েকদিন হয়তো চিনির প্রতি এক ধরনের টান বা ক্রেভিং তৈরি হবে, কিন্তু সেটি সামলে নিতে পারলে আপনার ইনসুলিনের মাত্রা একদম নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। এর ফলে আপনার শরীর নিজে থেকেই টেস্টোস্টেরন হরমোন উৎপাদন বাড়িয়ে দেবে। আপনি দেখতে পাবেন আপনার সকালের ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে, সারাদিন কাজে দারুণ এনার্জি পাচ্ছেন এবং জিম বা খেলাধুলায় আপনার পেশির শক্তি অনেক বেড়ে গেছে। @ Pritam Biswas

তথ্যসূত্র:

১. হরমোন ও বিপাকীয় রোগ গবেষণা সাময়িকী অ্যান্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ।

২. মানব শরীরে চিনির প্রভাব ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স পুষ্টি বিজ্ঞান একাডেমি।

৩. টেস্টোস্টেরন হরমোন ও আধুনিক ডায়েট চার্ট মেডিকেল জার্নাল সিরিজ।



মেটাকগনিশন 


 নিজের ভুলত্রুটিগুলোকে নিজে ধরতে পারা এবং নিজের মনকে পরিচালনা করার যে জাদুকরী ক্ষমতা, তাকেই মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় মেটাকগনিশন। 

আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে প্রাচীন গ্রিসের দার্শনিক সক্রেটিস কিংবা অ্যারিস্টটলের মতো মহাপুরুষেরা এই মেটাকগনিশন নিয়ে কথা বলেছিলেন। তারা সবসময় বলতেন যে নিজেকে জানো। তবে আধুনিক বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের জগতে ১৯৭০ এর দশকে আমেরিকান উন্নয়নমূলক মনোবিজ্ঞানী জন ফ্লাভেল প্রথম এই মেটাকগনিশন শব্দটি আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহার করেন। তিনি শিশুদের পড়াশোনা এবং স্মৃতিশক্তি নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখলেন যে কিছু মানুষ বা শিশু অন্যদের চেয়ে অনেক দ্রুত নতুন বিষয় শিখে ফেলতে পারে। কারণ তারা কেবল পড়া মুখস্থ করে না, বরং তারা নিজেরা ভালো করে জানে যে কোন পদ্ধতিতে পড়লে তাদের পড়াটা মনে থাকবে। কেউ লিখে মনে রাখে, কেউ ছবি দেখে মনে রাখে। নিজের এই শেখার পদ্ধতিটাকে নিজে বুঝতে পারার যে তত্ত্ব, সেটিই ফ্লাভেলের গবেষণার মাধ্যমে আধুনিক বিজ্ঞানজগতে মেটাকগনিশন থিওরি বা তত্ত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। 

মনে করুন দুজন শিক্ষার্থী একটি কঠিন পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রথম জন সারাদিন রাত না ঘুমিয়ে বইয়ের পর বই মুখস্থ করে যাচ্ছে, কিন্তু সে খেয়ালই করছে না যে কোন চ্যাপ্টারটি সে আসলেই বুঝতে পেরেছে আর কোনটি তার মনে নেই। পরীক্ষা শেষে সে দেখল অনেক জানা জিনিসও সে ভুল করে এসেছে। এবার দ্বিতীয় জনের দিকে তাকানো যাক। সে পড়ার মাঝখানে একটু থামে, নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে যে আমি এতক্ষণ যা পড়লাম তা কি আসলেই বুঝতে পেরেছি। সে যখন দেখে একটি নির্দিষ্ট অংক বা প্রশ্নের উত্তর সে মেলাতে পারছে না, তখন সে নিজের পড়ার কৌশল বদলে ফেলে। সে নিজের ভুলগুলো নিজে চিহ্নিত করে এবং পরীক্ষার আগেই তা সংশোধন করে নেয়। এই দ্বিতীয় শিক্ষার্থীটি কিন্তু কোনো অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী নয়, সে কেবল নিজের মনের মেটাকগনিশন ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়েছে।

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে এত চমৎকার একটি ক্ষমতা মানুষের জন্য ক্ষতিকর বা বিপজ্জনক কীভাবে হতে পারে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন যে মেটাকগনিশনের মাত্রা যখন জীবনের স্বাভাবিক সীমার বাইরে চলে যায়, তখন এটি মানুষের জন্য মারাত্মক মানসিক কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একে পরিভাষায় বলা হয় ক্লিনিক্যাল মেটাকগনিশন ডিসঅর্ডার বা অতিরিক্ত আত্মচিন্তার ফাঁদ। যখন একজন মানুষ নিজের প্রতিটি চিন্তা নিয়ে এত বেশি বিশ্লেষণ করতে শুরু করে যে তার রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়, তখন সে এক গভীর চক্রে আটকে পড়ে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আপনি হয়তো কাউকে একটি সাধারণ কথা বলেছেন, কিন্তু বাড়ি ফিরে আপনি সারারাত ধরে ভাবছেন যে আমি কেন এই কথাটা বললাম, সে নিশ্চয়ই আমার সম্পর্কে খারাপ ভাবছে, আমার মাথাটাই নষ্ট হয়ে গেছে। এই যে নিজের চিন্তাকে নিয়ে অনবরত নেতিবাচক চিন্তা করা, একে বলা হয় ওভারথিংকিং বা অতিচিন্তা। অতিরিক্ত মেটাকগনিশন মানুষকে অবসাদ, তীব্র দুশ্চিন্তা বা অ্যাংজাইটি এবং একাকীত্বের দিকে ঠেলে দেয়, যা মানুষের মানসিক শান্তি পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে পারে।

ধরুন আপনি পড়তে বসে বারবার মোবাইল ফোনের দিকে তাকাচ্ছেন। সাধারণ মানুষ ভাববে যে আমার আজ পড়তে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু আপনি যদি মেটাকগনিশন ব্যবহার করেন, তবে আপনি নিজেকে থার্ড পারসন বা তৃতীয় কোনো ব্যক্তির মতো প্রশ্ন করবেন যে আমি কেন বারবার ফোন ধরছি। তখন আপনি বুঝতে পারবেন যে আসলে পড়ার অধ্যায়টি কঠিন লাগছে বলেই আপনার মন ফোন দিয়ে নিজেকে আড়াল করতে চাইছে। এই সত্যটি বুঝতে পারার সাথে সাথেই আপনি ফোনটি দূরে রেখে পড়ার সহজ অংশ দিয়ে আবার শুরু করতে পারবেন। নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করা, বিষণ্ণতা থেকে মুক্তি পাওয়া এবং যেকোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এই ক্ষমতার সঠিক ব্যবহার মানুষকে সাধারণ থেকে অসাধারণ করে তোলে। @ Pritam Biswas


তথ্যসূত্র:

1. Flavell, J. H. (1979). Metacognition and cognitive monitoring: A new area of cognitive-developmental inquiry. 'American Psychologist', 34(10), 906–911. DOI: 10.1037/0003-066X.34.10.906

2. Wells, A., & Matthews, G. (1994). Modelling cognition in anxiety: The cognitive self-regulatory attentional syndrome (S-REF) model. 'Behaviour Research and Therapy', 32(, 867–870. DOI: 10.1016/0005-7967(94)90150-3

3. Schraw, G., & Dennison, R. S. (1994). Assessing metacognitive awareness. :Contemporary Educational Psychology', 19(4), 460–475. DOI: 10.1006/ceps.1994.1033


১০


কসমোলজিকাল কন্সট্যান্ট বা মহাজাগতিক ধ্রুবক 


কল্পনা করুন আপনি ঘরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে একটি সুন্দর সুতোয় বাঁধা রঙিন বেলুন হাত দিয়ে ছেড়ে দিলেন। স্বাভাবিক নিয়মে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বা মহাকর্ষ বলের টানে বেলুনটি সোজা নিচের মেঝেতে এসে পড়ার কথা। কিন্তু আপনি অবাক হয়ে দেখলেন বেলুনটি নিচে তো পড়লই না বরং ঘরের ছাদের দিকেও উড়ে গেল না। সেটি ঠিক মাঝ আকাশে একদম স্থির হয়ে ভেসে রইল যেন কোনো অদৃশ্য জাদুকর তাকে নিচ থেকে আলতো করে ঠেলে ধরে রেখেছে। মহাবিশ্বের দিকে তাকালে আজ থেকে একশ বছর আগে বিজ্ঞানীরাও ঠিক এমন একটি জাদুকরী কাণ্ড দেখে চমকে উঠেছিলেন। তারা ভাবছিলেন মহাবিশ্বের কোটি কোটি গ্রহ নক্ষত্র আর গ্যালাক্সি বা ছায়াপথগুলোর নিজস্ব যে টান বা মহাকর্ষ বল আছে তার কারণে তো পুরো মহাবিশ্ব একদিন সংকুচিত হয়ে নিজের ভেতরে ধসে পড়ার কথা। কিন্তু মহাবিশ্ব তা না করে কীভাবে সুখে শান্তিতে স্থির হয়ে টিকে আছে। এই রহস্যের সমাধান করতে গিয়েই আলবার্ট আইনস্টাইন তার খাতায় এক রহস্যময় সংখ্যার জন্ম দিয়েছিলেন যাকে আমরা বলি কসমোলজিকাল কন্সট্যান্ট বা মহাজাগতিক ধ্রুবক। আজ আমরা গল্পে গল্পে জানবো কীভাবে আইনস্টাইনের কলমের এক ছোট্ট টান বিজ্ঞানের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রহস্যে পরিণত হলো।

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৯১৭ সালে যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজছে আর আলবার্ট আইনস্টাইন তার মহাকর্ষের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের জটিল সমীকরণগুলো মেলাতে ব্যস্ত। আইনস্টাইনের সেই সমীকরণগুলো বারবার বলছিল যে এই মহাবিশ্ব হয় দিন দিন বড় হচ্ছে না হয় ছোট হয়ে যাচ্ছে এটি কখনোই এক জায়গায় স্থির থাকতে পারে না। কিন্তু সেই জামানার সমস্ত বড় বড় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতেন যে মহাবিশ্ব হলো একদম স্থির বা স্ট্যাটিক অর্থাৎ এর কোনো শুরু বা শেষ নেই এবং এটি চিরকাল একই রকম থাকবে। আইনস্টাইনও নিজের যুগের এই ধারণাকেই সত্যি বলে মানতেন। তাই নিজের সমীকরণকে জোর করে স্থির বানানোর জন্য তিনি গণিতের ভেতরে আস্ত একটা নতুন ধ্রুবক বা ফিক্সড নম্বর গুঁজে দিলেন। এই সংখ্যাটি এমন এক অদৃশ্য শক্তির কথা বলছিল যা মহাকর্ষের বিপরীত দিকে কাজ করে মহাবিশ্বকে জোড়াতালি দিয়ে স্থির রাখে। কিন্তু এর ঠিক বারো বছর পর ১৯২৯ সালে বিজ্ঞানী এডুইন হাবল তার শক্তিশালী দূরবীন দিয়ে আকাশ মেপে এক যুগান্তকারী সত্য আবিষ্কার করলেন। তিনি দেখলেন মহাবিশ্ব আসলে স্থির নয় এটি প্রতিনিয়ত বেলুনের মতো ফুলে ফেঁপে বড় হচ্ছে। এই খবর শুনে আইনস্টাইন এতটাই লজ্জিত হয়েছিলেন যে তিনি নিজের সমীকরণ থেকে কসমোলজিকাল কন্সট্যান্টকে লাথি মেরে বের করে দেন এবং এটিকে তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল বা বিগেস্ট ব্লান্ডার বলে আফসোস করেন।

ভৌত বিজ্ঞানের ভাষায় এটি কোনো গ্রহ বা নক্ষত্র থেকে আসে না এটি হলো স্বয়ং শূন্যস্থানের নিজস্ব সহজাত শক্তি বা ভ্যাকুয়াম এনার্জি ডেনসিটি। আইনস্টাইন গাণিতিকভাবে দেখিয়েছিলেন যে মহাকর্ষের ভেতরের দিকে টেনে নেওয়ার ক্ষমতা আর কসমোলজিকাল কন্সট্যান্টের বাইরের দিকে ঠেলে দেওয়ার ক্ষমতা যখন একদম সমান সমান হয়ে যায় তখন মহাবিশ্বটি নিখুঁত স্থিতি অবস্থা বা স্ট্যাটিক ইকুিলিব্রিয়াম বজায় রেখে এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।  

আসুন বিষয়টি একটি খুব সহজ এনালজি বা তুলনা দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি যা ঘরের ছোট বাচ্চারাও খুব সহজে মনের মধ্যে গেঁথে নিতে পারবে। মনে করুন আপনি আর আপনার বন্ধু একটি বড় রবারের দড়ির দুই মাথা ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। আপনার বন্ধু দড়িটি নিজের দিকে জোরে টানছে যা হলো মহাকর্ষের ভেতরের টান। এবার দড়িটিকে মাঝখানে সোজা ও স্থির রাখতে গেলে আপনাকেও ঠিক ততটুকু জোর দিয়েই উল্টোদিকে টানতে হবে। আপনার হাতের এই যে উল্টোমুখী টান এটাই হলো কসমোলজিকাল কন্সট্যান্ট। কিন্তু যদি হঠাৎ দেখা যায় যে আপনি আপনার বন্ধুর চেয়ে অনেক বেশি জোরে টানতে শুরু করেছেন তবে দড়িটি ক্রমশ আপনার দিকে বড় হতে থাকবে। ঠিক এই জিনিসটাই ঘটেছিল ১৯৯৮ সালে যখন বিজ্ঞানীরা টাইপ ওয়ান এ সুপারনোভা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আবিষ্কার করলেন যে আমাদের মহাবিশ্ব কেবল বড়ই হচ্ছে না বরং তার বড় হওয়ার গতি দিন দিন রকেটের মতো বাড়ছে যাকে আমরা বলি ত্বরান্বিত প্রসারণ বা অ্যাক্সিলারেটিং এক্সপ্যানশন। বিজ্ঞানীরা দেখলেন মহাবিশ্বের এই হঠাৎ পাগল হয়ে ছুটে চলার পেছনে যে শক্তিটি কাজ করছে তা আর কিছুই নয় আইনস্টাইনের সেই পুরনো কসমোলজিকাল কন্সট্যান্ট যা আসলে ডার্ক এনার্জি বা অন্ধকার শক্তির এক সুনির্দিষ্ট গাণিতিক রূপ।

এবার কিশোরদের জন্য এই মহাজাগতিক নাটকের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর উদাহরণটি দেওয়া যাক যা তাদের এক নিঃশ্বাসে পুরো বিষয়টি বুঝিয়ে দেবে। মনে করুন আপনি মহাকাশে একটি সুপার হিরো সিনেমা দেখছেন যেখানে পুরো মহাবিশ্ব এক বিশাল দড়ি টানাটানি খেলায় মেতেছে। একদিকে আছে সমস্ত দৃশ্যমান গ্রহ নক্ষত্র ছায়াপথ আর ডার্ক ম্যাটার বা অদৃশ্য পদার্থ যারা নিজেদের মহাকর্ষ বল দিয়ে মহাবিশ্বকে এক জায়গায় জোট বেঁধে ছোট করতে চাইছে। আর অন্যদিকে একাই বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ডার্ক এনার্জি যা মহাবিশ্বের মোট শক্তির প্রায় সত্তর শতাংশ দখল করে বসে আছে এবং প্রতি মুহূর্তে স্পেস বা শূন্যস্থানকে বাইরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের দৃষ্টিতে এই শূন্যস্থানের শক্তি বা ভ্যাকুয়াম এনার্জি হলো এমন এক ক্ষেত্র যা কখনোই শেষ হয় না। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন যে এই ডার্ক এনার্জির ঘনত্ব বা এনার্জি ডেনসিটি সময়ের সাথে সাথে একদম অপরিবর্তিত থাকে যা হুবহু আইনস্টাইনের কসমোলজিকাল কন্সট্যান্টের বৈশিষ্ট্যের সাথে মিলে যায়। অর্থাৎ আইনস্টাইন যেটিকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ভেবেছিলেন আধুনিক কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি এবং কসমোলজি প্রমাণ করেছে যে সেটি আসলে মহাবিশ্বের চালিকাশক্তি।

এই জাদুকরী ধারণার এপলিকেশন বা বাস্তব প্রয়োগ কিন্তু আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ মহাজাগতিক মডেল তৈরিতে এক বিশাল ভূমিকা রাখছে। আজ বিজ্ঞানীরা যখন মহাকাশযান বা ল্যাম্বডা সিডিএম মডেলের মতো আধুনিক কসমোলজিকাল ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করেন তখন তারা এই কসমোলজিকাল কন্সট্যান্টের মান নিখুঁতভাবে গণনা করেন। এই ধ্রুবকের সঠিক মানের ওপর নির্ভর করছে আমাদের এই মহাবিশ্বের শেষ পরিণতি বা বিগ ফ্রিজ বা বিগ ক্রাঞ্চের মতো ভবিষ্যৎ কী হবে। যদি কসমোলজিকাল কন্সট্যান্টের শক্তি এভাবেই রাজত্ব করতে থাকে তবে কোটি কোটি বছর পর মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি এত বেড়ে যাবে যে রাতের আকাশের সমস্ত নক্ষত্র আর ছায়াপথ আমাদের চোখের আড়াল হয়ে যাবে এবং এক চরম নিঃসঙ্গ অন্ধকার যুগের সৃষ্টি হবে। তবে বর্তমান যুগে ডার্ক এনার্জি স্পেক্ট্রোস্কোপিক ইনস্ট্রুমেন্ট বা ডেসি এর মতো আধুনিকতম গবেষণার কিছু নতুন যুগান্তকারী তথ্যে দেখা যাচ্ছে যে মহাবিশ্বের এই প্রসারণের গতি হয়তো চিরকাল এক নাও থাকতে পারে। সময়ের সাথে সাথে এই শক্তির রূপ পরিবর্তিত হয়ে মহাবিশ্ব ভবিষ্যতে কোনো এক সময় থেমে গিয়ে আবার উল্টোদিকে সংকুচিত হতে শুরু করতে পারে অর্থাৎ এটি একমুখী প্রসারণের মডেলকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে। এই গণনাগুলোর মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে আইনস্টাইনের সেই ১৯১৭ সালের সমীকরণের ভেতরে।

আইনস্টাইনের এই জাদুকরী মহাজাগতিক ধ্রুবকের গল্প আমাদের শেখায় যে বিজ্ঞানে কোনো ভুলই আসলে চিরন্তন ব্যর্থতা নয়। আপনি যখন রাতের আকাশের দিকে তাকাবেন তখন ভাববেন যে আমরা চোখের সামনে যে বিশাল শূন্যস্থান দেখতে পাই তা আসলে মোটেও ফাঁকা বা নিঃস্ব নয়। সেই নিকষ কালো অন্ধকারের প্রতিটি বিন্দুতে লুকিয়ে আছে এক জাদুকরী গাণিতিক ধ্রুবক যা প্রতিনিয়ত পুরো মহাবিশ্বকে এক অনন্ত যাত্রার দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। কিশোর তরুণরা যখন বিজ্ঞানের এই অবিশ্বাস্য মোড় পরিবর্তনগুলোকে অনুধাবন করতে পারবে তখন তারা বুঝতে শিখবে যে আমাদের চেনা বাস্তবতার আড়ালে আরও কত শত রহস্য একাডেমিক গবেষণার মাধ্যমে উন্মোচিত হওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছে যা তাদের আগামী দিনে নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের নায়ক হতে অনুপ্রাণিত করবে। @ Pritam Biswas

সহজ তথ্যসূত্র:

১. আলবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা ও মহাজাগতিক সমীকরণমালা বিজ্ঞান সাময়িকী প্রকাশনী।

২. ডার্ক এনার্জি স্পেক্ট্রোস্কোপিক ইনস্ট্রুমেন্ট (DESI) বৈজ্ঞানিক ফলাফল ও পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট ২০২৬।

৩. আধুনিক কসমোলজি ও ডার্ক এনার্জির রহস্য বিশ্ববিদ্যালয় পদার্থবিজ্ঞান সিরিজ।



১১


লেপটিন রেজিস্ট্যান্স 


লেপটিন হলো শরীরের “ক্ষুধা নিয়ন্ত্রক” হরমোন। চর্বি কোষ থেকে তৈরি হয়ে এটি মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায় এবং আমাদের খাওয়ার ইচ্ছে নিয়ন্ত্রণ করে।

কীভাবে কাজ করে?

ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ: শরীরে চর্বি পর্যাপ্ত থাকলে লেপটিন বাড়ে। এটি মস্তিষ্ককে বলে— "যথেষ্ট শক্তি আছে, খাওয়া বন্ধ করো।" আর চর্বি কমলে লেপটিন কমে, ফলে খিদে বাড়ে।

শক্তি খরচ: যথেষ্ট শক্তি সঞ্চিত থাকলে লেপটিন বিপাকীয় হার বা মেটাবলিজম বাড়ায়।

চর্বির পরিমাপক: এটি শরীরের চর্বির স্টক সম্পর্কে মস্তিষ্ককে প্রতিনিয়ত তথ্য দেয়।

লেপটিন রেজিস্ট্যান্স (মূল সমস্যা)

অতিরিক্ত ওজনের মানুষদের শরীরে প্রচুর লেপটিন তৈরি হলেও মস্তিষ্ক সেই সংকেত ঠিকমতো গ্রহণ করতে পারে না। একেই লেপটিন রেজিস্ট্যান্স বলে। এর ফলে মস্তিষ্ক ভুলবশত মনে করে শরীরে চর্বি নেই এবং ক্রমাগত খিদে বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে ওজন আরও বাড়তে থাকে। @ Plabon Sarkar


প্রাচীন ভারতে সমাজের নিম্নবর্গীয় মানুষরা পেঁয়াজ খেত। যারা খেত, তারা আলাদাভাবে বসবাস করত। মুসলিমগণের দ্বারাই পেঁয়াজের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়েছিল সারা ভারতবর্ষে। বিশেষ করে সুলতানি ও মোগল আমলে। তারপর ধাপে ধাপে পেঁয়াজ উপমহাদেশের সাধারণ মানুষের হেঁশেলে ঢুকে পড়ে। 


১২


প্রথম দরায়ুস পালিয়ে গেছেন, ব্যাবিলন তার শহরের দরজা খুলে দিয়েছে, সুসা কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই আত্মসমর্পণ করেছে। 

আলেকজান্ডার কোনো যুদ্ধ ছাড়াই ব্যাবিলনে প্রবেশ করেছিলেন। সেখানে তিনি প্রায় এক মাস অবস্থান করেন। বছরের পর বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধের পর, সেনাবাহিনীকে বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল এবং ব্যাবিলন তাদের সব রকমের প্রাচুর্য এনে দিয়েছিল।

শহরটি তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করে নেয়। গ্রিস, ম্যাসিডোনিয়া এবং থ্রেস থেকে নতুন সৈন্যদল এসে পৌঁছায়। প্রশাসনিক নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়। গাউগামেলার যুদ্ধে পারসিক কমান্ডার থাকা মাজায়েসকে তার সত্রাপির দায়িত্বেই বহাল রাখা হয়। যা ছিল আলেকজান্ডারের দূরদর্শী সাম্রাজ্য নীতির একটি প্রাথমিক নিদর্শন।

ব্যাবিলন থেকে আলেকজান্ডার সুসার দিকে রওনা হন। সুসাও আত্মসমর্পণ করে। সেখানকার রাজকোষে থাকা হাজার হাজার ট্যালেন্ট (তৎকালীন মুদ্রা) গ্রিসের মূল ভূখণ্ডের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আলেকজান্ডারের আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করে।

তা সত্ত্বেও আলেকজান্ডার শীতকালে সুসায় অবস্থান করেননি। দরায়ুস তখনও বেঁচে ছিলেন, আর যতদিন দরায়ুস বেঁচে থাকবেন, ততদিন পারসিক সাম্রাজ্যের বৈধতা টিকে থাকবে।

রাজনৈতিক এবং সামরিক উভয় দিক থেকেই পারস্য বিজয় সম্পন্ন করতে আলেকজান্ডারকে পারস্যের মূল কেন্দ্রস্থল পার্সিসে প্রবেশ করতে হতো। তাকে পৌঁছাতেই হতো পার্সিপোলিসে।

কিন্তু সুসা এবং পারস্যের মূল ভূখণ্ডের মাঝখানে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল জাগ্রোস পর্বতমালা, যা পারস্য সাম্রাজ্যের কেন্দ্রকে রক্ষা করার একটি প্রাকৃতিক সীমানা।

আলেকজান্ডার তার বাহিনীকে দুই ভাগে বিভক্ত করলেন। পারমেনিয়নকে পাঠানো হলো রয়্যাল রোড ধরে ব্যাগেজ ট্রেন (রসদ সামগ্রী), থেসালিয়ান অশ্বারোহী বাহিনী, গ্রিক মিত্র এবং ভাড়াটে সৈন্যদের নিয়ে, যা ছিল ধীরগতির কিন্তু তুলনামূলক নিরাপদ পথ।

আলেকজান্ডার নিজে আনুমানিক ১৭,০০০ থেকে ২০,০০০ সৈন্য নিয়ে সংক্ষিপ্ত পাহাড়ি পথ ধরে রওনা হলেন। এর ফলে মূল সৈন্যদলটি ব্যাগেজ ট্রেনের জন্য অপেক্ষা না করেই দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়।

কোনো বড় ধরনের প্রতিরোধ ছাড়াই বেশ কয়েক দিন কেটে গেল। যাত্রা কোনো বাধা ছাড়াই চলতে থাকল। স্কাউটিং বা অগ্রবর্তী দলের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হলো। পুরো সৈন্যদল উপত্যকার মেঝে জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে অগ্রসর হতে থাকল। পার্সিয়ান গেটের প্রবেশমুখটি প্রায় দুই কিলোমিটার চওড়া একটি উন্মুক্ত সমতল ভূমি দিয়ে শুরু হয়। সেখানে সুসংগঠিত কোনো প্রতিরক্ষার চিহ্ন ছিল না। ম্যাসিডোনীয় সেনাবাহিনী পূর্ণ গতিতে সেই সংকীর্ণ গিরিপথের দিকে এগিয়ে গেল।

মূল পয়েন্টে এসে পার্সিয়ান গেটটি অত্যন্ত সংকীর্ণ হয়ে গেছে। কোনো কোনো জায়গায় পথটি মাত্র কয়েক মিটার চওড়া। দুই পাশেই উঁচু পাহাড়ি শৈলশিরা। পথটি দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বেঁকে গিয়েছিল। সকালের সূর্যের আলো পাহাড়ের ঢালের দিকে দৃষ্টিসীমা আবছা করে দিচ্ছিল। পাহাড়ের চূড়ায় কিছু অবয়ব দেখা গেল, যাদের সাধারণ বাস্তুচ্যুত নাগরিক বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল। ফলে কোনো সতর্কতা জারি করা হয়নি।

অগ্রবর্তী দল যখন গিরিপথের বাঁকে পৌঁছাল, তারা দেখতে পেল পাথর ও মাটির তৈরি একটি শক্ত প্রাচীর সামনের পথ পুরোপুরি আটকে রেখেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে আলেকজান্ডার বুঝতে পারলেন যে তিনি একটি মস্ত বড় ভুল করে ফেলেছেন। কিন্তু ততক্ষণে তার বাহিনীকে পেছনে ফিরিয়ে নেওয়ার সময় পার হয়ে গেছে। যখন পর্যাপ্ত পরিমাণ ম্যাসিডোনীয় সৈন্য সেই ফাঁদের ভেতর প্রবেশ করল, তখনই আক্রমণ শুরু হলো।

উত্তর দিকের পাহাড়ের ঢাল থেকে বিশাল সব পাথর নিচে গড়িয়ে পড়তে লাগল। উঁচুতে অবস্থান নেওয়া তিরন্দাজরা তির ছুড়তে শুরু করল। দুই পাশের খাড়া পাহাড় থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র বা পাথর ছুড়ে মারা হতে লাগল। সৈন্যদের দলবদ্ধ হওয়ার মতো কোনো জায়গাই সেখানে ছিল না। পেছনের সৈন্যরা সামনের অ্যামবুশের ভয়াবহতা না জেনেই ক্রমাগত সামনের দিকে চাপ দিতে থাকল। ফলে জটলা আরও বেড়ে গেল। নিহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে লাগল। আলেকজান্ডার পিছু হটার নির্দেশ দিলেন। তার বাহিনীকে সেখান থেকে উদ্ধার করতে গিয়ে অনেক মৃত সৈন্যকে সেখানেই ফেলে আসতে হয়েছিল।

এশিয়ার অভিযানে এটিই ছিল প্রথমবার যখন আলেকজান্ডার শত্রুর চাপে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন। পার্সিয়ান গেট পারসিকদের নিয়ন্ত্রণেই থাকল।

পার্সিসের সত্রাপ এবং গাউগামেলার অভিজ্ঞ যোদ্ধা আরিওবারজানেস তার রণক্ষেত্রটি খুব সাবধানে বেছে নিয়েছিলেন। প্রাচীন সূত্রগুলো দাবি করে আরিওবারজানেসের বাহিনীতে ২৫,০০০ থেকে ৪০,০০০ সৈন্য ছিল।  এই ধরনের ভূখণ্ডে সৈন্যসংখ্যার চেয়ে ভৌগোলিক অবস্থানের গুরুত্বই ছিল সবচেয়ে বেশি। আরিওবারজানেস গিরিপথ ছেড়ে সামনে এগিয়ে আসেননি; তিনি নিজের অবস্থান ধরে রেখেছিলেন। তার পেছনেই ছিল পার্সিপোলিসের পথ। আর তারও ওপারে পারস্যের হৃদয়।

তৃতীয় দরায়ুস পিছু হটেছিলেন। আরিওবারজানেস জানতেন যে পাহাড়ে আলেকজান্ডারকে যত বেশি আটকে রাখা যাবে, দরায়ুস নতুন সেনাবাহিনী গড়ে তোলার জন্য তত বেশি সময় পাবেন। আর পার্সিয়ান গেটের এই সংকীর্ণ পথে ম্যাসিডোনীয় সেনাবাহিনীর পক্ষে রাস্তা ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার উপায় ছিল না।

আলেকজান্ডার এখন এমন এক পরিস্থিতিতে পড়লেন যা কেবল শক্তি দিয়ে সমাধান করা সম্ভব ছিল না। সেখানে ফ্যালানক্স (Phalanx - বিশেষ সামরিক ব্যূহ) সাজানোর কোনো জায়গা ছিল না, কিংবা সুসংগঠিত আক্রমণেরও কোনো সুযোগ ছিল না। গিরিপথ দিয়ে সরাসরি এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

পুনরায় সেখানে আক্রমণ করতে গেলে একই পথ এবং একই ভূখণ্ডের মুখোমুখি হতে হতো। রসদ সরবরাহ থাকলে একটি ছোট বাহিনীও এই অবস্থান দীর্ঘ সময় ধরে রাখতে পারত। আলেকজান্ডারের অভিযানের গতি থমকে গেল। পূর্বদিকের পথ অবরুদ্ধই রইল এবং সময় আর তার পক্ষে কাজ করছিল না।

শীতকালীন আবহাওয়ার কারণে রসদ সরবরাহের পথ আরও কঠিন হয়ে পড়ল। আলেকজান্ডার শত্রু ভূখণ্ডের অনেক গভীরে আটকা পড়েছিলেন। পারমেনিয়নের নেওয়া রয়্যাল রোডের দূরত্ব ছিল অনেক বেশি। বর্তমান অবস্থানে থমকে থাকায় কোনো অগ্রগতি হচ্ছিল না, এবং বিকল্প কোনো পথের সন্ধানও জানা ছিল না।

তাহলে তিনি কীভাবে এই বাধা ভাঙবেন?

সম্ভবত স্থানীয় এক মেষপালকের কাছ থেকে, যে এই পাহাড়ি এলাকার প্রতিটি পথ চিনত, একটি গোপন পাহাড়ি পথের সন্ধান পাওয়া যায় যা পারসিক অবস্থানের পেছন দিকে চলে গেছে। পথটি ছিল অত্যন্ত দুর্গম, আঁকাবাঁকা এবং শীতকালে খুবই বিপজ্জনক।

আলেকজান্ডার তার বাহিনীকে আবারও বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নিলেন। আনুমানিক ৩,০০০ পদাতিক সৈন্য মূল ক্যাম্পে রেখে দেওয়া হলো। রাতের বেলা সেখানে অতিরিক্ত আগুন জ্বালিয়ে রাখার নির্দেশ দেওয়া হলো যাতে পারসিকরা মনে করে পুরো সেনাবাহিনী এখনও ওখানেই অবস্থান করছে এবং তাদের মনোযোগ যেন সামনের দিকেই আটকে থাকে।

পাহাড়ের একটি অংশ সুরক্ষিত করার জন্য দ্বিতীয় আরেকটি দল পাঠানো হলো। আর আলেকজান্ডার নিজে মূল আক্রমণকারী দলটিকে নিয়ে দূরবর্তী উত্তর দিকের একটি পাহাড়ি পথ বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল আরিওবারজানেসের প্রতিরক্ষাব্যূহের ঠিক পেছনে গিয়ে পৌঁছানো।

এই পথ চলা ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। কনকনে ঠান্ডা বাতাস, খাড়া পাহাড় এবং পাথুরে দুর্গম পথে পা পিছলে পড়ে যাওয়ার অবিরাম ঝুঁকি। প্রায় দুই দিন অত্যন্ত কষ্টকর যাত্রার পর, ম্যাসিডোনীয় বাহিনী পারসিকদের পেছনের অংশটি দেখতে পায় এমন এক উচ্চতায় এসে পৌঁছাল। তাদের কৌশলগত মুভমেন্ট সফল হল। এবার আক্রমণের পালা।

ভোর হতেই আক্রমণ শুরু হলো। ম্যাসিডোনীয় ক্যাম্পে থেকে যাওয়া সৈন্যরা পারসিকদের সামনের ভাগে সরাসরি আক্রমণ চালাল, যার ফলে ডিফেন্ডারদের পুরো মনোযোগ গিরিপথের দিকেই আটকে রইল। পাহাড়ি শৈলশিরার যুদ্ধে পারসিকরা যখন পুরোপুরি ব্যস্ত হয়ে পড়ল, তখনই দ্বিতীয় আঘাতটি হানা হলো। পাহাড়ের উঁচুতে অবস্থান নেওয়া দ্বিতীয় ম্যাসিডোনীয় দলটি আক্রমণ শুরু করল। গিরিপথের ওপর এতক্ষণ আধিপত্য বিস্তার করে রাখা পারসিকরা এখন একই সাথে একাধিক দিক থেকে সমন্বিত আক্রমণের মুখে পড়ল।

ঠিক শেষ মুহূর্তে, আলেকজান্ডার পেছনের পাহাড় থেকে সরাসরি পারসিকদের মূল ক্যাম্পের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। যা ছিল তাদের জন্য একটি চূড়ান্ত এবং আকস্মিক ধাক্কা। যে সংকীর্ণ ভূখণ্ডটি একসময় পারসিকদের সুবিধা দিচ্ছিল, এখন তা-ই তাদের পিছু হটার পথ বন্ধ করে দিল।

শুরু হলো মুখোমুখি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। প্রাচীন বিবরণগুলো বলছে যে যুদ্ধের শেষ মুহূর্তে কিছু পারসিক সৈন্য ম্যাসিডোনীয় সৈন্যদের জড়িয়ে ধরে আত্মঘাতী লড়াই করেছিল এবং এমনকি কেড়ে নেওয়া অস্ত্র দিয়েই তাদের আঘাত করেছিল। আরিওবারজানেস ব্যারিকেড ভেঙে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিছু সূত্রের দাবি, তিনি শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই করে মারা যান; আবার অন্য কিছু সূত্রের মতে, তিনি কোনোমতে পালিয়ে যেতে পেরেছিলেন কিন্তু পার্সিপোলিসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর তাকে হত্যা করা হয়। দুপুরের মধ্যেই গিরিপথে পারসিকদের সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে পড়ল। পার্সিয়ান গেটের পতন হলো।

গিরিপথ সুরক্ষিত করে আলেকজান্ডার পার্সিপোলিসের দিকে অগ্রসর হলেন। শহরের গভর্নর তিরিদাতিস সমঝোতার প্রস্তাব দিলেন। রাজকোষ আলেকজান্ডারের নিয়ন্ত্রণে এল। প্রাচীন ঐতিহাসিকদের মতে, সেখান থেকে আনুমানিক ১,২০,০০০ ট্যালেন্ট সোনা ও রুপা উদ্ধার করা হয়েছিল, যা ছিল প্রাচীন পৃথিবীর ইতিহাসের একক কোনো স্থানে থাকা সম্পদের অন্যতম বৃহত্তম ভাণ্ডার। ©রাজিক হাসান


13


আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে, খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ বা ৫ম শতকের দিকে শ্রীলঙ্কা এবং দক্ষিণ ভারতের কেরালা অঞ্চল থেকে কিছু সাহসী মানুষ সমুদ্র পাড়ি দিয়ে প্রথম এই দ্বীপগুলোতে বসতি গড়েছিল। পরবর্তীতে আরব, পারস্য এবং আফ্রিকার নাবিক ও ব্যবসায়ীরা এই পথ দিয়ে যাতায়াতের সময় অনেকেই এখানে স্থায়ী হন। আর এই সবার রক্ত আর সংস্কৃতি মিলেমিশে জন্ম নেয় এক নতুন জাতি, যাদের বলা হয় ‘ধিভেহী’।

আজকে আপনি হয়তো জানেন যে মালদ্বীপ একটি শতভাগ মুসলিম রাষ্ট্র, কিন্তু এর মুসলিম রাষ্ট্র হওয়ার পেছনে যে একটা চরম রহস্যময় ইতিহাস লুকিয়ে আছে, তা হয়তো অনেকেই জানেন না। আমাদের ছোটবেলায় মা বা দাদি-নানিরা রাতে ঘুমানোর আগে যেমন রাক্ষস-খোক্কস কিংবা সমুদ্রের দানবের গল্প শোনাতেন, মালদ্বীপের ইসলাম গ্রহণের কাহিনীটা ঠিক তেমনই রূপকথার মতো। ১২ শতক পর্যন্ত মালদ্বীপ ছিল মূলত একটি বৌদ্ধ শাসিত দেশ। লোকগাথা অনুযায়ী, সে সময় প্রতি মাসের এক বিশেষ রাতে সমুদ্র থেকে 'রান্নামারি' নামের এক ভয়ানক জিন বা দানব উঠে আসতো। সেই দানবের কোপ থেকে পুরো দ্বীপকে বাঁচাতে প্রতি মাসের শেষ রাতে একটি করে কুমারী মেয়েকে সমুদ্র তীরের এক মন্দিরে একা রেখে আসতে হতো, আর সকালে তাকে পাওয়া যেত মৃত অবস্থায়। এই নৃশংস প্রথা যখন চলছিল, ঠিক তখনই মরক্কো থেকে আবুল বারাকাত ইউসুফ আল-বারবারী নামের এক মুসলিম দরবেশ সেখানে আসেন। এই করুণ কাহিনী শুনে তিনি নিজেই মেয়ে সেজে সেই মন্দিরে গিয়ে বসে থাকেন এবং সারারাত উচ্চস্বরে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করতে লাগলেন। সকালে দ্বীপবাসীরা যখন কান্নাকাটি করতে করতে মন্দিরে এলো, তারা অবাক হয়ে দেখল কোনো দানব আসেনি, বরং সেই দরবেশ অক্ষত অবস্থায় অক্ষুণ্ণ মনে বসে আছেন! এই অলৌকিক ঘটনা পুরো দ্বীপে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং ১১৫৩ সালে মালদ্বীপের রাজা ও সাধারণ মানুষ স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

অনেকের মনেই আবার প্রশ্ন জাগতে পারে, ভারত মহাসাগরের বুকে ছড়িয়ে থাকা এই ছোট্ট দেশটিকে কেন কখনো ভারত বা শ্রীলঙ্কার মতো বড় প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো দখল করে নেয়নি? এর পেছনে মূল কারণ হলো তাদের ভৌগোলিক গঠন। মালদ্বীপ আসলে কোনো একটা একক ভূখণ্ড নয়, এটি প্রায় বারোশো ছোট ছোট দ্বীপের এক বিশাল সমষ্টি। প্রাচীন বা মধ্যযুগে বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে এই হাজারটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা যেকোনো দেশের জন্যই ছিল অত্যন্ত কঠিন আর ব্যয়বহুল। তার ওপর প্রাচীনকালে এই দ্বীপগুলোতে মাছ আর কড়ি ছাড়া কোনো সোনা-রুপা বা খনিজ সম্পদ ছিল না, যার কারণে কোনো পরাশক্তির একে দখল করার লোভও ছিল না। এমনকি আমাদের এই অঞ্চলকে ব্রিটিশরা যেভাবে সরাসরি শাসন আর অত্যাচার করেছে, মালদ্বীপে তারা সেটা করেনি। ব্রিটিশরা মালদ্বীপকে শুধু নিজেদের প্রটেকশনে রেখেছিল, যার কারণে ভেতরের শাসন ব্যবস্থা সব সময়ই তাদের নিজেদের সুলতানদের হাতেই ছিল। ১৯৬৫ সালে এসে তারা একদম শান্তিপূর্ণভাবে পূর্ণ স্বাধীনতা পায়।

আজকে মালদ্বীপে মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের বাস। তাদের কঠোর আইন, ধর্মীয় সুশাসন এবং ট্যুরিজম থেকে আসা বিপুল আয়ের কারণেই তারা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এবং পরিচ্ছন্ন এক লাইফস্টাইল তৈরি করতে পেরেছে। @ The Analyst's Journal


14


প্রজননক্ষম জনসংখ্যা নেমে আসে মাত্র ১,২৮০ জনে

২০২৩ সালে Science সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণা পৃথিবীর বিজ্ঞানী সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। গবেষণাটি বলছে, প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার বছর আগে আধুনিক মানুষের পূর্বপুরুষদের সংখ্যা এতটাই কমে গিয়েছিল যে প্রজননে সক্ষম মানুষের সংখ্যা নেমে এসেছিল মাত্র প্রায় ১,২৮০ জনে। আরও আশ্চর্যের বিষয়, এই সংকট কয়েক শতাব্দী নয়, বরং প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার বছর ধরে চলেছিল। বিবর্তনের ভাষায় এটি ছিল এমন একটি দীর্ঘ "জনসংখ্যাগত সংকোচন" বা population bottleneck, যা মানবজাতির অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছিল।

মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসে "বটলনেক" একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। সহজ ভাষায়, কোনো একটি প্রজাতির জনসংখ্যা যদি হঠাৎ করেই অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়, তাহলে তাদের জিনগত বৈচিত্র্যও দ্রুত হ্রাস পায়। এর ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মে একই ধরনের জিন বারবার উত্তরাধিকার হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে এবং নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। অনেক প্রাণীই এমন পরিস্থিতি থেকে আর কখনও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। তাই মানুষের ক্ষেত্রেও এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল কি না, তা বহু বছর ধরেই বিজ্ঞানীদের আগ্রহের বিষয় ছিল।

এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন চীনের গবেষক হুয়াং লি এবং তাঁর সহকর্মীরা। তারা আফ্রিকা, ইউরোপ, এশিয়া ও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ৩,১৫৪ জন জীবিত মানুষের পূর্ণ জিনোম বিশ্লেষণ করেন। এই বিশাল তথ্যভাণ্ডার থেকে তারা তৈরি করেন একটি নতুন গণনামূলক পদ্ধতি, যার নাম FitCoal বা Fast Infinitesimal Time Coalescent Process। এটি এমন একটি পরিসংখ্যানভিত্তিক কম্পিউটার মডেল, যা বর্তমান মানুষের ডিএনএর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবর্তনের হার বিশ্লেষণ করে অতীতে কোনো সময়ে জনসংখ্যা কত ছিল, তা অনুমান করতে পারে।

এখানে একটি বড় সমস্যা ছিল। প্রায় ৯ লাখ বছর আগের মানুষের ডিএনএ আজ আর সংরক্ষিত থাকার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। এত দীর্ঘ সময়ে ডিএনএ ভেঙে যায় এবং নষ্ট হয়ে যায়। ফলে বিজ্ঞানীদের সামনে একমাত্র উপায় ছিল বর্তমান মানুষের জিনোমে রয়ে যাওয়া গাণিতিক ও পরিসংখ্যানগত সংকেত বিশ্লেষণ করা। ডিএনএতে নতুন পরিবর্তন বা mutation নির্দিষ্ট হারে জমা হয়। সেই পরিবর্তনের ধরন, সংখ্যা এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে মিল-অমিল বিশ্লেষণ করে FitCoal অতীতের জনসংখ্যার আকার পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়।

গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার বছর আগে পূর্বপুরুষদের মোট কার্যকর প্রজননক্ষম জনসংখ্যা নেমে আসে মাত্র ১,২৮০ জনে। এখানে "কার্যকর জনসংখ্যা" বলতে পৃথিবীতে জীবিত মোট মানুষের সংখ্যা বোঝানো হয় না। এটি বোঝায় এমন মানুষদের সংখ্যা যারা বাস্তবে পরবর্তী প্রজন্মে জিন স্থানান্তর করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বাস্তবে তখন মোট মানুষের সংখ্যা এর চেয়ে কিছুটা বেশি হতে পারে, কিন্তু জিনগতভাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনে ভূমিকা রেখেছিল এই অল্প সংখ্যক মানুষই।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সংকট খুব অল্প সময়ের জন্য ছিল না। গবেষণার হিসাব অনুযায়ী এটি প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার বছর স্থায়ী হয়েছিল। মানুষের গড় একটি প্রজন্ম যদি ২৫ থেকে ৩০ বছর ধরা হয়, তাহলে এই সময়ে কয়েক হাজার প্রজন্ম একই সংকুচিত জনসংখ্যার মধ্যে বেঁচে ছিল। এত দীর্ঘ সময় ধরে ছোট একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রজনন চলার ফলে বিপুল পরিমাণ জিনগত বৈচিত্র্য হারিয়ে যায়। গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে, মানুষের পূর্বপুরুষদের মোট জিনগত বৈচিত্র্যের প্রায় ৬৫ শতাংশ এই সময়ে হারিয়ে যেতে পারে।

কিন্তু এমন ভয়াবহ সংকটের কারণ কী ছিল? এখানেই বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিত উত্তর দিতে পারেননি। তবে কয়েকটি শক্তিশালী সম্ভাবনা রয়েছে। এই সময়টি ছিল পৃথিবীর "আর্লি থেকে মিডল প্লাইস্টোসিন ট্রানজিশন" নামে পরিচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ুগত পরিবর্তনের যুগ। পৃথিবীতে তখন হিমযুগের ধরন বদলে যাচ্ছিল। বরফাচ্ছাদিত অঞ্চল দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছিল, বৈশ্বিক তাপমাত্রা ওঠানামা করছিল, বহু অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দিচ্ছিল এবং বনভূমি সঙ্কুচিত হয়ে তৃণভূমিতে পরিণত হচ্ছিল। এসব পরিবর্তনের ফলে খাদ্যের উৎস কমে যেতে পারে, নিরাপদ আবাসস্থল হারিয়ে যেতে পারে এবং ছোট ছোট মানবগোষ্ঠী বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।

এই সময়ে আফ্রিকার পরিবেশেও বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়। হ্রদ শুকিয়ে যাওয়া, বৃষ্টিপাতের অনিয়ম, উদ্ভিদের পরিবর্তন এবং বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীদের সংখ্যা ওঠানামা—এসবের প্রমাণ ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় পাওয়া গেছে। মানুষের পূর্বপুরুষরা তখনও কৃষিকাজ জানত না, স্থায়ী বসতি গড়ে তোলেনি এবং উন্নত প্রযুক্তিও ছিল না। তারা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করত প্রাকৃতিক খাদ্য, শিকার এবং পরিবেশের ওপর। ফলে পরিবেশের বড় পরিবর্তন তাদের অস্তিত্বের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারত।

গবেষণার আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো, এই সময়কাল মানুষের বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপের সঙ্গেও মিলে যায়। কিছু নৃতত্ত্ববিদ মনে করেন, এই সময়ের কাছাকাছি কোনো এক পর্যায়ে আধুনিক মানুষের পূর্বপুরুষদের মধ্যে এমন কিছু শারীরিক ও জিনগত পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে, যা পরে হোমো হাইডেলবার্গেনসিস, নিয়ান্ডারথাল এবং শেষ পর্যন্ত হোমো স্যাপিয়েন্স-এর বিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে। যদিও এই সম্পর্ক এখনও নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়, তবুও জনসংখ্যাগত সংকোচন এবং পরবর্তী বিবর্তনের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে নতুন গবেষণার পথ খুলে দিয়েছে এই আবিষ্কার।

গবেষকেরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন। তারা মনে করেন, এই দীর্ঘ সংকটের সময় মানুষের ৪৬টি ক্রোমোজোমের পূর্বসূরি কাঠামো গঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনগত ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। মানুষের ক্রোমোজোম সংখ্যা অন্যান্য বৃহৎ বনমানুষের তুলনায় ভিন্ন। মানুষের ২ নম্বর ক্রোমোজোমটি আসলে দুটি প্রাচীন ক্রোমোজোম একীভূত হয়ে তৈরি হয়েছে বলে বহু আগেই জানা গেছে। এই জনসংখ্যাগত সংকোচনের সময় এমন পরিবর্তন স্থায়ী হয়ে থাকতে পারে কি না, সেটিও এখন গবেষণার বিষয়।

তবে এই গবেষণা নিয়ে কিছু বিতর্কও রয়েছে। সব বিজ্ঞানী এখনও এই ফলাফলের সঙ্গে একমত নন। কারণ FitCoal একটি শক্তিশালী পরিসংখ্যানগত মডেল হলেও এটি সরাসরি অতীত পর্যবেক্ষণ নয়; বরং বর্তমান জিনগত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি একটি অনুমান। ভবিষ্যতে আরও উন্নত কম্পিউটার মডেল, নতুন জীবাশ্ম আবিষ্কার এবং প্রাচীন পরিবেশগত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই ফলাফল আরও যাচাই করা হবে। বিজ্ঞান গবেষণার স্বাভাবিক নিয়মই হলো—একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার নতুন প্রশ্নও তৈরি করে।

এই গবেষণার গুরুত্ব শুধু মানুষের ইতিহাস জানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেখায়, বর্তমান জিনোম বিশ্লেষণ করে এমন সময়ের ঘটনাও পুনর্গঠন করা সম্ভব, যেখান থেকে কোনো প্রাচীন ডিএনএ পাওয়া যায় না। একই ধরনের পদ্ধতি ভবিষ্যতে অন্যান্য বিলুপ্ত মানবপ্রজাতি, বিপন্ন প্রাণী এবং দীর্ঘমেয়াদি বিবর্তনীয় পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যেতে পারে। জিনোম এখন শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয় নয়; এটি পৃথিবীর গভীর অতীত বোঝার অন্যতম নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক দলিল হয়ে উঠছে।

আমরা আজ যে পৃথিবীতে বাস করি, সেখানে মানুষের সংখ্যা কয়েকশো কোটি। কিন্তু এই বিপুল মানবসমাজের জিনগত শিকড় হয়তো এক সময়ে মাত্র ১,২৮০ জন প্রজননক্ষম মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তাদের পরিচয় আমরা জানি না, তারা কোথায় বাস করত তাও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। কিন্তু তাদের টিকে থাকার কারণেই মানবজাতির বিবর্তনের ধারা অব্যাহত ছিল। আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে থাকা ডিএনএ সেই দীর্ঘ সংগ্রামের নীরব সাক্ষী হয়ে আজও বহন করে চলেছে প্রায় ৯ লাখ বছরের পুরোনো সেই সংকটের স্মৃতি। মানবসভ্যতার ইতিহাস তাই শুধু সভ্যতার ইতিহাস নয়; এটি বিলুপ্তির খুব কাছ থেকে ফিরে আসারও ইতিহাস।

সূত্র: সায়েন্স (Science) জার্নাল, Hu W., Hao Z., Du P., Di Vincenzo F., Manzi G., Cui J., Fu Y. X., Pan Y. H. & Li H., ২০২৩.

© উপম বিকাশ |


15


মুড়ি খাওয়ার উপকারিতা, অপকারিতা!!

কতটা মুড়ি খাওয়া উচিত?

একটা কথা সমাজে প্রচলিত আছে...যে মুড়ি নাকি কৃষক-শ্রমিকদের খাবার! (দয়া করে কৃষক-শ্রমিকরা আহত হবেননা)

ঘটনা কিন্তু সত্য,

১০০ গ্রাম মুড়িতে প্রায় ৩৮১ থেকে ৪০২ ক্যালরি থাকে।

যেখানে ১০০ গ্রাম ভাতে মাত্র ১০০ থেকে ১৩০ ক্যালোরি থাকে।

মুড়িতে ফ্যাট প্রায় নেই বললেই চলে, প্রোটিন থাকে ৫% থেকে ৬%

মুড়ি মূলত চটজলদি শর্করার উৎস। তবে মুড়ির সাথে যদি চানাচুর, তেল, বা মিষ্টি মিশিয়ে খাওয়া হয় তাহলে ক্যালরির পরিমাণ আরো বাড়ে।

সবথেকে উল্লেখযোগ্য হল যে মুড়ির গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) বেশ উচ্চ, এর অর্থ হলো, মুড়ি খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা (ব্লাড সুগার) খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায়। যা সাধারণত ৮০ থেকে ৯০ এর কাছাকাছি হয়ে থাকে (কোনো কোনো বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে এটি ১০৫ পর্যন্ত হতে দেখা গেছে)।

মুড়ি ফ্যাট শূন্য এবং হালকা খাবার হলেও, চালকে ভেজে ফোলানোর কারণে এর ভেতরের জটিল কার্বোহাইড্রেট সহজ শর্করায় রূপান্তরিত হয়, তাই এটি রক্তে দ্রুত গ্লুকোজ সরবরাহ করে।

ফলে মুড়ি সত্যই কৃষক-শ্রমিকদের উপযুক্ত খাবার, বাকি যারা বিশেষ পরিশ্রম করেননা, তাদের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে নিয়মিত প্রচুর মুড়ি খাওয়া ইনসুলিন সংবেদনশীলতা কমিয়ে দিতে পারে।

সুতরাং মুড়ি প্রিয় খাবার হলে, মুড়ি সাঁটানোর পরেই শারীরিক সক্রিয়তা বাড়ান।

মুড়ি সহজপাচ্য, পেট ভরায় এবং তাৎক্ষণিক শক্তি জোগায়।

মুড়ির ভালো দিকগুলি হল - খুব সহজেই হজম হয়ে যায়। পেট খারাপ বা অ্যাসিডিটির সমস্যাতেও বিশুদ্ধ শুকনো বা ভেজা মুড়ি বেশ উপকারী (ইউরিয়া ভেজাল বা প্রচুর নুন দেওয়া থাকলে কিন্তু অপকার করবে)।

তথ্যসূত্র : https://diabesmart.in/blogs/diet-for-diabetics/is-puffed-rice-good-for-diabetes-what-is-the-glycemic-index-of-puffed-rice

গরম ভাত রেঁধে সেটা সঙ্গে সঙ্গে খাওয়ার থেকে ডায়াবেটিকদের উচিত আগের দিনের ভাত খাওয়া৷ ভাত রেঁধে ফ্রিজে রাখতে হবে ১২ ঘণ্টা আগে৷ তার পর সেই ভাত খাওয়া যাবে ব্লাড সুগারে৷ তাতে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রিত থাকবে৷ ভাত এবং আলুর মতো শর্করাজাত খাবার ফ্রিজে রেখেই খাওয়া বাঞ্ছনীয় মধুমেহ রোগীদের জন্য৷ ( Digestible starch ভেঙে গিয়ে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়৷ অন্যদিকে Resistant starch-কে শরীর ভাঙতে পারে না৷ তাই ডায়াবেটিকদের জন্য পরামর্শ, একদিন আগে রাঁধা ভাত ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা করে তার পর খান৷ রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়বে না৷ 


16


বাংলাদেশ ও ভারতের অসংখ্য গ্রামে আজও একটি দৃশ্য খুব পরিচিত। কারও চোখ হলুদ হয়ে গেছে, প্রস্রাব গাঢ় হলুদ, খাওয়ার রুচি কমে গেছে, শরীর দুর্বল লাগছে। পরিবারের লোকজন দ্রুত তাকে কোনো হাসপাতাল বা চিকিৎসকের কাছে না নিয়ে প্রথমে গ্রামের পরিচিত ঝাড়ফুঁকের ওস্তাদের কাছে নিয়ে যান। সেখানে মন্ত্র পড়া হয়, পানি ফুঁ দিয়ে খাওয়ানো হয়, কখনো গাছের পাতা, কখনো সুতো, কখনো আবার নানা ধরনের লোকজ আচার পালন করা হয়। আশ্চর্যের বিষয়, কয়েক সপ্তাহ পর দেখা যায় রোগী সত্যিই সুস্থ হয়ে উঠেছে। তখন স্বাভাবিকভাবেই অনেকে বিশ্বাস করতে শুরু করেন—জন্ডিস নিশ্চয়ই ঝাড়ফুঁকেই ভালো হয়েছে।

এই বিশ্বাস নতুন নয়। শত শত বছর ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এমন ধারণা প্রচলিত ছিল। শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, এমনকি ইউরোপের বহু অঞ্চলেও জন্ডিসের জন্য ধর্মীয় আচার, প্রার্থনা বা লোকজ চিকিৎসার ইতিহাস রয়েছে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত মানুষ রোগের প্রকৃত কারণ জানত না। তাই কোনো রোগ যদি কিছুদিন পরে নিজে থেকেই সেরে যেত, মানুষ ধরে নিত যে মাঝখানে করা ঝাড়ফুঁক, তাবিজ কিংবা ভেষজ ওষুধই তাকে সুস্থ করেছে।

কিন্তু বিজ্ঞানের একটি মৌলিক নীতি হলো—দুটি ঘটনা একসঙ্গে ঘটলেই একটির কারণে অন্যটি ঘটেছে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। ইংরেজিতে একে বলা হয় Correlation is not Causation। অর্থাৎ, ঝাড়ফুঁকের পর রোগ ভালো হয়েছে মানেই ঝাড়ফুঁকের কারণেই রোগ ভালো হয়েছে—এমনটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, যদি ঝাড়ফুঁক না করা হতো, তাহলেও কি রোগী একইভাবে সুস্থ হয়ে উঠতেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই গত কয়েক দশকে যকৃত বা লিভারের রোগ নিয়ে হাজার হাজার গবেষণা হয়েছে। ভাইরাস, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, রক্তের রাসায়নিক পরিবর্তন, লিভারের কোষের পুনর্জন্ম ক্ষমতা এবং বিলিরুবিন নামের একটি বিশেষ রঞ্জক পদার্থ নিয়ে বিজ্ঞানীরা এত বিস্তারিত গবেষণা করেছেন যে আজ জন্ডিসকে আর একটি রোগ হিসেবে নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়। আর এই গবেষণাগুলো আমাদের এমন এক বাস্তবতা দেখিয়েছে, যা একদিকে আশ্চর্যজনক, অন্যদিকে অনেক প্রচলিত বিশ্বাসকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে বাধ্য করে।

প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। জন্ডিস কোনো নির্দিষ্ট রোগের নাম নয়। এটি এমন একটি অবস্থা, যেখানে রক্তে বিলিরুবিন (Bilirubin) নামের হলুদ রঙের রঞ্জকের পরিমাণ বেড়ে যায়। সাধারণত মানুষের লোহিত রক্তকণিকার আয়ু প্রায় ১২০ দিন। এরপর পুরোনো রক্তকণিকা ভেঙে যায় এবং সেখান থেকে হিমোগ্লোবিন ভেঙে বিলিরুবিন তৈরি হয়। এই বিলিরুবিন রক্তের মাধ্যমে লিভারে পৌঁছায়। লিভার সেটিকে রাসায়নিকভাবে পরিবর্তন করে পিত্তরসের সঙ্গে অন্ত্রে পাঠিয়ে দেয়। পরে মল এবং সামান্য অংশ প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়।

কিন্তু যদি কোনো কারণে এই পুরো প্রক্রিয়ার যেকোনো ধাপে সমস্যা দেখা দেয়, তখন বিলিরুবিন শরীরে জমতে শুরু করে। রক্তে বিলিরুবিনের স্বাভাবিক মাত্রা সাধারণত প্রতি ডেসিলিটারে ০.২ থেকে ১.২ মিলিগ্রাম। এই মাত্রা ২ থেকে ৩ মিলিগ্রাম বা তার বেশি হলে চোখের সাদা অংশে প্রথম হলুদ ভাব দেখা যায়। এরপর ত্বকও ধীরে ধীরে হলুদ হতে শুরু করে। এটিই জন্ডিস।

এখানেই আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জন্ডিসের কারণ এক নয়, বহু রকম। ভাইরাসজনিত হেপাটাইটিস এ বা হেপাটাইটিস ই হলে অধিকাংশ সুস্থ মানুষের শরীর নিজেই কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসের মধ্যে ভাইরাসকে দমন করে এবং লিভারের ক্ষতিগ্রস্ত কোষ ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হয়। ফলে জন্ডিসও কমে যায়। আবার হেপাটাইটিস বি বা হেপাটাইটিস সি অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণে পরিণত হতে পারে। অন্যদিকে পিত্তনালিতে পাথর আটকে গেলে, অগ্ন্যাশয়ের টিউমার হলে, লিভার ক্যানসার হলে, অতিরিক্ত মদ্যপানে লিভার নষ্ট হলে, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় কিংবা জন্মগত বিপাকীয় সমস্যাতেও জন্ডিস হতে পারে। অর্থাৎ, বাইরে থেকে সব জন্ডিস একই রকম দেখালেও ভেতরের কারণ সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো, ঝাড়ফুঁকের পরে অনেক মানুষ কেন সত্যিই ভালো হয়ে যায়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে রোগের প্রকৃতির মধ্যে। ধরুন একজন মানুষের হেপাটাইটিস এ হয়েছে। এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিজেই কাজ শুরু করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ২ থেকে ৮ সপ্তাহের মধ্যে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসে। লিভারের কোষগুলোর অসাধারণ পুনর্জন্ম ক্ষমতা রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, লিভারের একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও উপযুক্ত পরিবেশ পেলে বাকি কোষগুলো বিভাজিত হয়ে আবার নতুন টিস্যু তৈরি করতে পারে। ফলে রোগী ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। এই সময় যদি তিনি ঝাড়ফুঁকও করান, তাহলে সময়ের মিলের কারণে মনে হতে পারে ঝাড়ফুঁকের ফলেই তিনি ভালো হয়েছেন। বাস্তবে কাজটি করেছে তার নিজের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং লিভারের পুনর্গঠন ক্ষমতা।

এই ঘটনাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে Spontaneous Recovery, অর্থাৎ স্বাভাবিকভাবে রোগমুক্ত হওয়া বলা হয়। চিকিৎসা ইতিহাসে এর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। অনেক ভাইরাসজনিত সংক্রমণ, কিছু অ্যালার্জি, কিছু প্রদাহ এমনকি কিছু মৃদু ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণও শরীর নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কিন্তু মানুষ সাধারণত যে ঘটনাটি শেষবার ঘটেছে সেটিকেই কারণ বলে ধরে নেয়। মনোবিজ্ঞানে একে Post hoc fallacy বলা হয়। অর্থাৎ, "এর পরে হয়েছে, তাই এর কারণও এটি"—এই ভুল ধারণা।

আরেকটি বিষয়ও এখানে কাজ করে, যাকে Placebo Effect বলা হয়। যদি একজন রোগী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে তিনি ভালো হয়ে যাবেন, তাহলে তার উদ্বেগ কমে, মানসিক চাপ হ্রাস পায়, ঘুম ভালো হয়, কিছু হরমোনের ভারসাম্য পরিবর্তিত হয় এবং ব্যথা বা অস্বস্তির অনুভূতি কমতে পারে। তবে প্লাসিবো কখনো ভাইরাস ধ্বংস করতে পারে না, পিত্তনালির পাথর সরাতে পারে না, ক্যানসার নিরাময় করতে পারে না কিংবা লিভারের মারাত্মক ক্ষতি সারাতে পারে না। এটি কেবল কিছু উপসর্গের অনুভূতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে কোনো চিকিৎসা কার্যকর কি না, তা যাচাই করতে Randomized Controlled Trial (RCT) ব্যবহার করা হয়। এখানে রোগীদের একাধিক দলে ভাগ করা হয়। একটি দল প্রকৃত চিকিৎসা পায়, অন্য দল পায় দেখতে একই রকম কিন্তু কার্যকর উপাদানবিহীন প্লাসিবো। অনেক ক্ষেত্রেই রোগী বা চিকিৎসক কেউই জানেন না কে কোনটি পাচ্ছেন। এরপর পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখা হয় কোন পদ্ধতি সত্যিই বেশি কার্যকর। ঝাড়ফুঁক বা মন্ত্রপাঠ জন্ডিস সারায়—এমন দাবির পক্ষে এ ধরনের উচ্চমানের বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বরং সমস্যা তৈরি হয় অন্য জায়গায়। যদি কোনো রোগীর জন্ডিসের কারণ পিত্তনালিতে আটকে থাকা পাথর হয়, তাহলে অস্ত্রোপচার বা এন্ডোস্কোপিক চিকিৎসা ছাড়া সমস্যা দূর হবে না। যদি কারণ লিভার ক্যানসার হয়, তাহলে সময় নষ্ট করলে রোগ অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে। যদি নবজাতকের রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা অত্যন্ত বেড়ে যায়, তাহলে সেই বিলিরুবিন মস্তিষ্কে জমে Kernicterus নামের স্থায়ী স্নায়বিক ক্ষতি করতে পারে। এই অবস্থায় জরুরি Phototherapy বা প্রয়োজনে Exchange Transfusion না করলে শিশুর জীবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। ঝাড়ফুঁকে সময় নষ্ট করার মূল্য তখন অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিশ্বের বড় বড় লিভার গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, ভাইরাল হেপাটাইটিসের কারণে প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ১৩ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। এই মৃত্যুর বড় অংশই ঘটে দীর্ঘমেয়াদি লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের কারণে। অথচ সময়মতো রোগ নির্ণয়, রক্ত পরীক্ষা, আল্ট্রাসনোগ্রাফি, ভাইরাস শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করলে অসংখ্য জীবন বাঁচানো সম্ভব।

জন্ডিসের চিকিৎসা তাই একটাই নয়; কারণভেদে চিকিৎসাও বদলে যায়। কোথাও শুধু বিশ্রাম, পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টিকর খাবারই যথেষ্ট। কোথাও অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ দরকার। কোথাও অস্ত্রোপচার অপরিহার্য। কোথাও আবার লিভার প্রতিস্থাপনই শেষ ভরসা। একজন চিকিৎসক তাই রোগীর চোখ দেখে নয়, বরং রক্তের বিলিরুবিন, ALT, AST, ALP, GGT, Albumin, Prothrombin Time, ভাইরাল মার্কার, আল্ট্রাসনোগ্রাফি এবং প্রয়োজনে আরও নানা পরীক্ষার ফল একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেন।

তাহলে গ্রামের সেই মানুষগুলো কেন এখনও বিশ্বাস করেন যে ঝাড়ফুঁকে জন্ডিস ভালো হয়? এর উত্তর সমাজবিজ্ঞানেও রয়েছে। মানুষ এমন ঘটনাই বেশি মনে রাখে যেখানে ঝাড়ফুঁকের পর রোগী সুস্থ হয়েছে। কিন্তু যেসব রোগী ঝাড়ফুঁক করেও সুস্থ হননি, কিংবা পরে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে, এমন উদাহরণ ধীরে ধীরে মানুষের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়। মনোবিজ্ঞানে একে Confirmation Bias বলা হয়। আমরা আমাদের বিশ্বাসকে সমর্থন করে এমন ঘটনাই বেশি মনে রাখি, আর বিপরীত ঘটনাগুলো উপেক্ষা করি।

সবশেষে বলা যায়, জন্ডিস এমন একটি শারীরিক সংকেত যা শরীর আমাদের সতর্ক করতে পাঠায়। কখনো এটি সাময়িক ভাইরাস সংক্রমণের ফল, যা শরীর নিজেই কাটিয়ে ওঠে। কখনো এটি এমন একটি গুরুতর রোগের লক্ষণ, যেখানে দ্রুত চিকিৎসা না পেলে জীবন বিপন্ন হতে পারে। তাই ঝাড়ফুঁকের পরে কেউ সুস্থ হয়ে গেলে সেটি ঝাড়ফুঁকের কার্যকারিতার প্রমাণ নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে সেটি শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং লিভারের অসাধারণ পুনর্গঠন ক্ষমতার ফল। বিজ্ঞান কোনো বিশ্বাসকে আঘাত করার জন্য নয়, বরং কোন ক্ষেত্রে শরীর নিজে কাজ করে আর কোন ক্ষেত্রে চিকিৎসা জরুরি—এই পার্থক্যটি স্পষ্টভাবে বোঝানোর জন্যই আমাদের সামনে প্রমাণ হাজির করে। সেই প্রমাণের আলোকে সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত হলো—জন্ডিস দেখা দিলে দ্রুত কারণ নির্ণয় করা, কারণ জন্ডিস নয়, এর পেছনের রোগটিই আসল চিকিৎসার বিষয়।

সূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), European Association for the Study of the Liver (EASL), American Association for the Study of Liver Diseases (AASLD), The Lancet Gastroenterology & Hepatology, Nature Reviews Gastroenterology & Hepatology,



17


বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য

বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য প্রায় ১,০০০ বছর (১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত) টিকে ছিল।

বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল) এমন এক জায়গায় অবস্থিত ছিল, যাকে প্রাকৃতিকভাবেই একটি দুর্গ বলা যায়।

এটি তিন দিক থেকে পানি দ্বারা বেষ্টিত ছিল, যার ফলে কেবল একদিক থেকে স্থলপথে আক্রমণ করা সম্ভব হতো।

স্থলভাগকে রক্ষা করার জন্য ছিল বিখ্যাত থিওডোসিয়ান দেয়াল (Theodosian Walls), যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যেকোনো আক্রমণ প্রতিহত করেছে।

সমুদ্রপথে আক্রমণ ঠেকাতে তারা গোল্ডেন হর্ন (একটি সামুদ্রিক প্রণালী) জুড়ে বিশালাকার লোহার শিকল টেনে দিত, যাতে শত্রু জাহাজ ঢুকতে না পারে।

কনস্টান্টিনোপল ছিল সিল্ক রোড (Silk Road) এবং ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্য পথের মিলনস্থল। এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের সমস্ত বাণিজ্য এই শহরের ওপর দিয়ে হতো।

এই বিপুল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কারণে বাইজেন্টাইনরা সহজেই বিশাল সেনাবাহিনী পরিচালনা করতে পারত, দুর্গের সংস্কার করতে পারত এবং প্রয়োজনে শত্রুদের বিশাল অঙ্কের টাকা (Trubute/ঘুষ) দিয়ে যুদ্ধ এড়িয়ে যেত।

বাইজেন্টাইনদের কাছ ছিল গ্রিক ফায়ার। এটি ছিল এক ধরণের তরল আগুন, যা পানির ওপরেও জ্বলত। সমুদ্র যুদ্ধে শত্রু জাহাজের ওপর এটি স্প্রে করা হতো।

পানি দিয়ে এই আগুন নেভানো যেত না বলে শত্রু নৌবাহিনী এর সামনে পঙ্গু হয়ে পড়ত। এই প্রযুক্তির সূত্রটি বাইজেন্টাইনরা এতটাই গোপন রেখেছিল যে আজ পর্যন্ত এর সঠিক উপাদান কী ছিল তা জানা যায়নি।

পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য যেখানে স্থানীয় জমিদার বা সামন্ত প্রভুদের কোন্দলে দুর্বল হয়ে পড়েছিল, বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য সেখানে অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হতো। তাদের কর আদায় ব্যবস্থা ছিল চমৎকার, যার ফলে যুদ্ধের সংকটের সময়েও রাজকোষ কখনো শূন্য হতো না।

বাইজেন্টাইনরা কেবল তরবারি দিয়ে নয়, বুদ্ধি দিয়ে যুদ্ধ জিতত। তাদের একটি সুপরিচিত নীতি ছিল—"শত্রুর শত্রুকে বন্ধু বানানো"। তারা এক বর্বর জাতিকে অন্য বর্বর জাতির বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিত। গোয়েন্দা তথ্যের ব্যবহার এবং বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে তারা অনেক বড় বড় যুদ্ধ ছাড়াই সাম্রাজ্যের সীমান্ত সুরক্ষিত রেখেছিল।

এতসব চমৎকার সুবিধা থাকা সত্ত্বেও ১৪৫৩ সালে অটোমেন তুর্কিদের হাতে এই বিখ্যাত শহর ও সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। @ Ahmed Rafique Barki


18



"তিনি একটা গোটা দেশকে বানিয়ে ফেলেছিলেন এক বিশাল কারাগার — সর্বত্র গোপন পুলিশ, প্রতিবেশী প্রতিবেশীর নামে গুপ্তচরবৃত্তি করছে, মানুষ নিজের ঘরেও মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছে। তিনি তাঁর জনগণকে ঠেলে দিয়েছিলেন ঠান্ডা, অন্ধকার আর ক্ষুধার মধ্যে — অথচ নিজের জন্য গড়ছিলেন পৃথিবীর অন্যতম বিশাল প্রাসাদ। ২৪ বছর ধরে মানুষ তাঁর বিরুদ্ধে ফিসফিস করতেও ভয় পেত। আর তারপর — মাত্র এক সপ্তাহে সব ভেঙে পড়ল; বড়দিনের দিন, সর্বশক্তিমান সেই স্বৈরশাসক দাঁড়িয়ে রইলেন ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে।"

রোমানিয়া, ১৯৮০-র দশক। এমন এক দেশ, যেখানে রাতের বেলা আলো নিভে যায়, দোকানের তাক খালি, আর দেয়ালেরও কান আছে। আর এর কেন্দ্রে এক মানুষ, যিনি বিশ্বাস করতেন তিনি এক প্রতিভা, জাতির পিতা, সবার প্রিয় — নিকোলাই চসেস্কু, "কনডুকাটর" (মহান নেতা)। তিনি বিন্দুমাত্র টের পাননি, তাঁর জনগণ তাঁকে কতটা ঘৃণা করে — যতক্ষণ না সেই দিনটা এলো, যেদিন তারা শেষ পর্যন্ত তা দেখিয়ে দিল।

এই পোস্টটা এখনই Save করো —

কারণ শেষে বলব — মানুষ যখন অনাহারে, তখন গড়া সেই বিশাল প্রাসাদের কথা, যে একটিমাত্র মুহূর্তে জনতা ঘুরে দাঁড়িয়ে তাঁর সর্বনাশ ডেকে আনল, আর কত অবিশ্বাস্য দ্রুততায় তাঁর পতন ও পরিণতি ঘটল।

প্রথম অধ্যায় — যে মুচি দেবতা হয়ে উঠল।

চসেস্কুর জন্ম ১৯১৮ সালে, এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে; ছিলেন মুচির শিক্ষানবিশ। কিশোর বয়সেই কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন, কারাবরণ করেন, আর ধাপে ধাপে দলে উঠে আসেন। ১৯৬৫ সালে তিনি হন রোমানিয়ার নেতা। শুরুর দিকে তিনি ছিলেন সত্যিকারের জনপ্রিয় — তিনি প্রকাশ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নকে চ্যালেঞ্জ করতেন (১৯৬৮ সালে সোভিয়েতের চেকোস্লোভাকিয়া আক্রমণের তীব্র নিন্দা করে দেশে-বিদেশে প্রশংসা কুড়ান)। এক মুহূর্তের জন্য তাঁকে মনে হয়েছিল একজন সংস্কারক।

দ্বিতীয় অধ্যায় — স্বৈরাচারের দিকে মোড়।

১৯৭১ সালের দিকে মাও সে তুং-এর চীন আর কিম ইল-সাং-এর উত্তর কোরিয়া সফর করে চসেস্কু ফিরে এলেন এক নতুন অনুপ্রেরণা নিয়ে — তাদের সর্বগ্রাসী নিয়ন্ত্রণ আর ব্যক্তিপূজায় মুগ্ধ হয়ে। তিনি তাঁর শুরুর উদারনীতি উল্টে দিলেন, কঠোর সেন্সরশিপ চাপালেন, আর নিজেকে — আর স্ত্রী এলেনাকে — ঘিরে গড়ে তুললেন এক চরম ব্যক্তিপূজা; দুজনকে মহিমান্বিত করা হলো জাতির মেধাবী অভিভাবক হিসেবে। "জাতির পিতা"র সেই মুখোশের আড়ালে শক্ত হতে লাগল এক স্বৈরশাসনের মুঠো।

তৃতীয় অধ্যায় — দেয়ালের কান।

তাঁর গোপন পুলিশ "Securitate" হয়ে উঠল গোটা পূর্ব ব্লকের অন্যতম সর্বগ্রাসী গুপ্ত-সংস্থা। ইনফর্মারদের এক বিশাল জালের মাধ্যমে Securitate সবার ওপর নজর রাখত। মানুষ নিজের পরিবারের সাথেও খোলাখুলি কথা বলতে ভয় পেত। শাসকগোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে এই অনুভূতিটাই জিইয়ে রাখত যে "সবাইকে দেখা হচ্ছে" — যাতে একটা গোটা জাতিকে ভয়ের জোরে বশ করে রাখা যায়। এমনকি সোভিয়েত-ব্লকের মানদণ্ডেও এটা ছিল ব্যতিক্রমীভাবে নিষ্ঠুর।

চতুর্থ অধ্যায় — ঠান্ডা, অন্ধকার আর ক্ষুধা।

এটার জন্যই Save করতে বলেছিলাম (প্রথম অংশ)।

১৯৮০-র দশকে চসেস্কু এক ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নিলেন — রোমানিয়ার পুরো বিশাল বিদেশি ঋণ শোধ করে ফেলবেন। এর জন্য তিনি দেশের খাদ্য আর পণ্য রপ্তানি করতে লাগলেন বিদেশে, আর দেশের ভেতরে চাপালেন নির্মম রেশনিং। রোমানিয়ার মানুষ বছরের পর বছর সহ্য করল ভয়াবহ সংকট — খালি দোকান, রেশন করা রুটি আর জ্বালানি, বিদ্যুৎ বাঁচাতে ঠান্ডা-অন্ধকার ঘর (যাতে কারখানা চালু রাখা যায়)। শিশুমৃত্যুর হার হয়ে উঠল ইউরোপের সর্বোচ্চগুলোর একটি। তিনি সফল হলেন — ১৯৮৯ সালের মধ্যে রোমানিয়া তার পুরো ঋণ শোধ করে ফেলল — কিন্তু সেটা করলেন নিজের জনগণের জীবনীশক্তি নিংড়ে নিয়ে। আর তাঁর নিজের পরিবার, অবশ্যই, বিলাসিতায় ডুবে রইল, যখন জাতি অনাহারে।

পঞ্চম অধ্যায় — প্রাসাদ আর অনাথ শিশুরা।

মানুষ যখন অনাহারে, তখনই চসেস্কু বুখারেস্টের এক বিশাল ঐতিহাসিক এলাকা বুলডোজ করে গড়তে শুরু করলেন নিজের জন্য এক স্মৃতিস্তম্ভ — "House of the People" (আজকের প্যালেস অফ দ্য পার্লামেন্ট) — যা আজও পৃথিবীর অন্যতম বিশাল আর ভারী ভবন; এক জাতি যখন কাঁপছে শীতে, তখন গড়ে ওঠা এক বিকট প্রাসাদ। আর ছিল আরও এক অন্ধকার, নিঃশব্দ ট্র্যাজেডি: জনসংখ্যা বাড়াতে চসেস্কু আগেই গর্ভনিরোধ আর গর্ভপাত নিষিদ্ধ করেছিলেন (Decree 770); তীব্র দারিদ্র্যের সাথে মিলে এটা রোমানিয়ার রাষ্ট্রীয় অনাথাশ্রমগুলো ভরিয়ে দিল লক্ষ লক্ষ পরিত্যক্ত শিশুতে, যাদের অনেকে বাস করত হৃদয়বিদারক অবহেলায় — এক লুকানো ক্ষত, যা পৃথিবী পুরোপুরি দেখল কেবল তাঁর পতনের পর। (গভীর সহানুভূতি আর সংযমের সাথেই এটুকু বললাম।)

ষষ্ঠ অধ্যায় — যেদিন জনতা ঘুরে দাঁড়াল।

এটার জন্যই Save করতে বলেছিলাম (দ্বিতীয় অংশ)।

১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে গোটা পূর্ব ব্লক জুড়ে একের পর এক কমিউনিস্ট শাসন ভেঙে পড়ছিল — কিন্তু নিজের ব্যক্তিপূজার খোলসে বন্দি চসেস্কু বিশ্বাস করতেন, রোমানিয়া আলাদা, তাঁর জনগণ তাঁকে ভালোবাসে। তিমিশোয়ারা শহরে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, যা দমন করা হয় প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগে। তারপর, ২১ ডিসেম্বর ১৯৮৯-এ, চসেস্কু বুখারেস্টে এক বিশাল জনসভা ডাকলেন — ভেবেছিলেন আবারও শুনবেন সেই চিরাচরিত স্তুতির স্লোগান। কিন্তু — জাতীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের মধ্যেই — জনতা শুরু করল দুয়ো দিতে, বিদ্রূপ করতে! ক্যামেরা ধরে ফেলল তাঁর মুখের সেই অভিব্যক্তি: হতভম্ব, বিভ্রান্ত, ভীত — এক স্বৈরশাসক, যিনি ঠিক সেই মুহূর্তে বুঝতে পারছেন যে তাঁর ক্ষমতাটা আসলে এক মায়া। টিভিতে ধরা পড়া সেই একটিমাত্র মুহূর্ত — যে মুহূর্তে ভয় ভেঙে গেল — তাঁর সর্বনাশ ডেকে আনল।

সপ্তম অধ্যায় — বড়দিনের দিন।

এরপর যা ঘটল, তার গতি ছিল অবিশ্বাস্য। বিপ্লব বিস্ফোরিত হলো; সেনাবাহিনী তাঁর বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়াল। পরদিন, ২২ ডিসেম্বর, চসেস্কু আর এলেনা হেলিকপ্টারে বুখারেস্ট ছেড়ে পালালেন — কিন্তু দ্রুতই ধরা পড়লেন। ২৫ ডিসেম্বর — বড়দিনের দিন — এক দ্রুত সামরিক বিচারে দম্পতিকে দোষী সাব্যস্ত করা হলো, আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফায়ারিং স্কোয়াডে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলো; পুরোটা ভিডিও করে জাতিকে দেখানো হলো। যে মানুষটা ২৪ বছর ধরে চরম আতঙ্ক দিয়ে শাসন করেছিলেন, তিনি বিদায় নিলেন মাত্র কয়েক দিনে — ১৯৮৯-এর বিপ্লবগুলোতে একমাত্র পূর্ব-ব্লক নেতা, যিনি সহিংসভাবে উৎখাত হয়ে মৃত্যুদণ্ড পেলেন। যে অভ্যুত্থান রোমানিয়াকে মুক্ত করল, তাতে প্রাণ দিয়েছিল হাজারেরও বেশি মানুষ।

শেষ কথা।

চসেস্কুর গল্প আমাদের কয়েকটা গভীর সত্য শেখায়। প্রথমত — নিজের ব্যক্তিপূজার কারাগার: চসেস্কুর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল, তিনি নিজের প্রচারণাকেই বিশ্বাস করে বসেছিলেন; দশকের পর দশক চাটুকার আর স্তুতিকারী জনতায় ঘেরা থেকে তিনি সত্যিই ভেবেছিলেন তাঁর জনগণ তাঁকে ভালোবাসে — তাই যেই মুহূর্তে তারা দুয়ো দিল, তিনি সম্পূর্ণ হতভম্ব হয়ে গেলেন; এটা চরম ক্ষমতা নিয়ে এক শক্তিশালী সতর্কবার্তা: ক্ষমতা শুধু কলুষিত করে না, অন্ধও করে দেয়; যখন কেউ তোমাকে সত্যি বলতে সাহস পায় না, তখন তুমি বাস্তবতা দেখার ক্ষমতাটাই হারিয়ে ফেলো — আর নিজের পতনের খবরটা জানা শেষ মানুষটা হয়ে ওঠো তুমিই। দ্বিতীয়ত — সাধারণ মানুষের রক্ত দিয়ে কেনা মহাস্বপ্নের নিষ্ঠুরতা: তিনি একটা জাতিকে অনাহারে রাখলেন একটা ঋণ শোধ করতে আর নিজের গৌরবের প্রাসাদ গড়তে; এই সিরিজে বারবার দেখি, নেতারা কীভাবে কোনো বিমূর্ত মহৎ ধারণার (জাতীয় গর্ব, নিখুঁত সমাজ, একটা স্মৃতিস্তম্ভ) বেদিতে বলি দেন লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষের বাস্তব, দৈনন্দিন জীবন; কোটি মানুষের উষ্ণতা, খাবার আর মর্যাদা খরচ হয়ে গেল কেবল একজন মানুষের দেবতা-হওয়ার সাধ মেটাতে। আর তৃতীয়ত — ভয় কাটিয়ে ওঠা জনতার সেই ভঙ্গুর, আকস্মিক শক্তি: ২৪ বছর ধরে ভয়ই চসেস্কুকে অজেয় মনে করিয়েছিল; আর তারপর, টিভিতে ধরা পড়া এক মুহূর্তে, সেই ভয় ফাটল ধরল — আর মাত্র চার দিনে "অজেয়" স্বৈরশাসক উধাও হয়ে গেলেন; সব স্বৈরাচারের নিচে বয়ে চলা এক অদ্ভুত, প্রায় আশাজাগানো সত্য এটাই — একজন স্বৈরশাসকের ক্ষমতা পুরোপুরি দাঁড়িয়ে থাকে এই বিশ্বাসের ওপর যে তাঁর বিরোধিতা করা যায় না; যেই মুহূর্তে যথেষ্ট মানুষ সেই বিশ্বাসটা ছেড়ে দেয় — স্তুতির বদলে দুয়ো দেয় — তখন সবচেয়ে পরাক্রমশালী স্বৈরশাসকও তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারেন।

@সম্রাট রায় চৌধুরী 


19


ইন্দোনেশিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব পাপুয়ার ঘন রেইনফরেস্টে বসবাস করে করোয়াই নামে একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী। পৃথিবীর খুব কম জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রাই তাদের মতো এতটা ব্যতিক্রমী। কারণ, তারা গাছের অনেক উঁচুতে নিজেদের ঘর তৈরি করে।

করোয়াইদের কাঠের ঘরগুলো বিশাল গাছের কাণ্ডের ওপর নির্মিত হয়। সাধারণত এগুলো মাটি থেকে বেশ উঁচুতে হলেও, কিছু ঘরের উচ্চতা প্রায় ১০০ ফুট পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

বাড়ি নির্মাণে তারা ব্যবহার করে শুধু বন থেকে পাওয়া কাঠ, গাছের বাকল, সাগো পাম গাছের পাতা এবং লতা। কোনো পেরেক, বিদ্যুৎচালিত যন্ত্র বা আধুনিক মাপজোখের সরঞ্জাম ছাড়াই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা এই ঘর তৈরি করে আসছে।

ঘরে ওঠার জন্য ব্যবহৃত হয় গাছের কাণ্ড কেটে তৈরি করা একটি সরু মই। রাতে সেটিও ওপরে তুলে রাখা হয়, যাতে বন্য প্রাণী বা অনাহূত কেউ সহজে ওপরে উঠতে না পারে।

এভাবে গাছের চূড়ায় বসবাসের পেছনে রয়েছে বাস্তব ও সাংস্কৃতিক- দুই ধরনের কারণ।

উঁচুতে থাকলে তারা বন্যা, মশার উপদ্রব এবং প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর হামলা থেকে তুলনামূলক নিরাপদ থাকে। পাশাপাশি করোয়াইদের বিশ্বাস, রাতের বেলায় অশুভ আত্মারা বনভূমির মাটিতে ঘোরাফেরা করে। তাই গাছের ওপরে থাকা তাদের কাছে নিরাপত্তার প্রতীক।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৪ সালের আগে তাদের বাইরের বিশ্বের সঙ্গে কার্যত কোনো সরাসরি যোগাযোগ ছিল না। ওই সময় এক ডাচ মিশনারি প্রথম তাদের কাছে পৌঁছান।

এর আগে বহু প্রজন্ম ধরে তারা নিজেদের নিয়মে জীবন কাটিয়েছে- শিকার করেছে, সাগো সংগ্রহ করেছে, পরিবার গড়েছে এবং গাছের উঁচু ঘরেই বসবাস করেছে। আ 

বর্তমানে করোয়াই জনগোষ্ঠীর একটি অংশ নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলোতে বসবাস শুরু করলেও, গভীর অরণ্যের ভেতরে এখনও অনেক পরিবার তাদের পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় তারা গাছের দুলতে থাকা মই বেয়ে ওপরে ওঠে, মই টেনে তুলে নেয় এবং শত শত বছরের পুরনো সেই জীবনধারাতেই রাত কাটায়।



20


মানুষের শরীরে প্রায় ৩৭ ট্রিলিয়ন কোষ রয়েছে। এই কোষগুলোর মধ্যে রয়েছে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ, হৃদপেশির কোষ, যকৃতের কোষ, ত্বকের কোষ, রক্তকণিকা, হাড়ের কোষ এবং আরও শত শত ধরনের বিশেষায়িত কোষ। এদের প্রত্যেকটির গঠন, কাজ এবং আয়ুষ্কাল একে অপরের থেকে আলাদা। কিন্তু বিস্ময়কর সত্য হলো, এই বিশাল ও জটিল দেহের শুরু হয় মাত্র একটি কোষ দিয়ে। প্রশ্ন হলো, মানুষ যখন জীবনের শুরুতে মাত্র একটি কোষ, তখন সেই এককোষী অবস্থা থেকে কোটি কোটি নয়, ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন কোষ নিয়ে গঠিত একটি পূর্ণাঙ্গ মানুষ তৈরি হয় কীভাবে? একটি মাত্র কোষ কীভাবে জানে কোনটি হবে মস্তিষ্ক, কোনটি হৃদপিণ্ড, কোনটি চোখ, আর কোনটি হবে ত্বক? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা গত একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে জীববিজ্ঞান, জিনতত্ত্ব, ভ্রূণতত্ত্ব এবং আণবিক জীববিজ্ঞানের অসংখ্য গবেষণা পরিচালনা করেছেন। আজ আমরা জানি, মানুষের ভ্রূণ আসলে এককোষী অবস্থায় জীবন শুরু করলেও সেই এক কোষের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে পুরো মানুষ তৈরির সম্পূর্ণ নকশা।

প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। অনেকেই বলেন "মানুষের ভ্রূণ এককোষী।" কথাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। মানুষের জীবন শুরু হয় একটি এককোষী জাইগোট (Zygote) হিসেবে। এটিই নিষিক্ত ডিম্বাণু, যা গঠিত হয় যখন বাবার একটি শুক্রাণু এবং মায়ের একটি ডিম্বাণু একত্রিত হয়। এই মিলনের সময় প্রত্যেকটি কোষ ২৩টি করে ক্রোমোজোম দেয়। ফলে জাইগোটে মোট ৪৬টি ক্রোমোজোম তৈরি হয়, যার মধ্যে থাকে প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি জিন। এই জিনগুলোই ভবিষ্যতের মানুষের চোখের রং, উচ্চতা, বিপাকক্রিয়া, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং শরীরের হাজারো বৈশিষ্ট্যের মৌলিক নির্দেশনা বহন করে। অর্থাৎ, এককোষী জাইগোটের মধ্যেই ভবিষ্যতের পূর্ণাঙ্গ মানুষের জেনেটিক তথ্য সংরক্ষিত থাকে। তবে জাইগোটকে আমরা ভ্রূণের প্রথম ধাপ বলতে পারি। কয়েকবার কোষ বিভাজনের পর সেটি আর এককোষী থাকে না; তখন সেটি বহুকোষী ভ্রূণে পরিণত হয়।

নিষেকের প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর জাইগোট প্রথমবার বিভাজিত হয়ে দুটি কোষ তৈরি করে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ক্লিভেজ বা Cleavage। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিভাজনের সময় ভ্রূণের মোট আকার বাড়ে না। বরং একই আকারের ভেতরে কোষের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং প্রতিটি নতুন কোষের আকার ক্রমশ ছোট হতে থাকে। প্রথমে দুটি, তারপর চারটি, আটটি, ষোলটি, বত্রিশটি—এভাবে বিভাজন চলতে থাকে। মাত্র তিন থেকে চার দিনের মধ্যেই প্রায় ১৬ থেকে ৩২টি কোষ নিয়ে একটি ছোট বলের মতো গঠন তৈরি হয়, যাকে বলা হয় মোরুলা (Morula)। এরপর কোষগুলোর ভেতরে তরল জমতে শুরু করলে এটি ব্লাস্টোসিস্ট (Blastocyst)-এ পরিণত হয়। সাধারণত নিষেকের পঞ্চম বা ষষ্ঠ দিনে এই পর্যায় আসে। ব্লাস্টোসিস্টের বাইরের কোষগুলো পরবর্তীতে প্লাসেন্টা বা গর্ভফুল তৈরি করে, আর ভেতরের কোষগুলোর একটি ছোট দল থেকে গড়ে ওঠে সম্পূর্ণ মানবদেহ।

এখানেই আসে স্টেম সেলের ভূমিকা। ব্লাস্টোসিস্টের ভেতরের কোষগুলোকে বলা হয় ভ্রূণীয় স্টেম সেল। এদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এরা এখনও কোনো নির্দিষ্ট অঙ্গের কোষ নয়। অর্থাৎ এদের ভবিষ্যৎ এখনও নির্ধারিত হয়নি। বিজ্ঞানীরা একে বলেন প্লুরিপোটেন্ট (Pluripotent) অবস্থা। এর অর্থ, এই কোষগুলো প্রায় সব ধরনের দেহকোষে রূপান্তরিত হতে পারে। একটি স্টেম সেল কখন মস্তিষ্কের নিউরন হবে, কখন হৃদপেশির কোষ হবে, কখন যকৃতের কোষ হবে—তা নির্ধারণ করে জিনের সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় হওয়ার জটিল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং আশপাশের কোষ থেকে আসা রাসায়নিক সংকেত। অর্থাৎ, সব কোষের ডিএনএ একই হলেও সব জিন একসঙ্গে কাজ করে না। কোন কোষে কোন জিন চালু থাকবে আর কোনটি বন্ধ থাকবে, সেটিই নির্ধারণ করে কোষটির পরিচয়।

এই প্রক্রিয়াকে বোঝার জন্য একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া যায়। ধরুন, আপনার কাছে একটি বিশাল রান্নার বই আছে, যেখানে হাজার হাজার রেসিপি লেখা। কিন্তু আপনি প্রতিদিন সব রেসিপি রান্না করেন না। যেদিন ভাত রান্না করবেন, সেদিন সেই রেসিপিটি খুলবেন; যেদিন মিষ্টি বানাবেন, সেদিন অন্য রেসিপি। ডিএনএও অনেকটা তেমন। প্রতিটি কোষের কাছে একই "নির্দেশনার বই" থাকে, কিন্তু সব কোষ একই অধ্যায় ব্যবহার করে না। স্নায়ুকোষ এক ধরনের জিন চালু রাখে, পেশিকোষ অন্য ধরনের, আবার রক্তকোষ আরও ভিন্ন ধরনের জিন ব্যবহার করে। এই নির্বাচন প্রক্রিয়াকেই জিন Gene Expression বলা হয়।

ভ্রূণের বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি ঘটে নিষেকের তৃতীয় সপ্তাহে। তখন গঠিত হয় গ্যাস্ট্রুলা (Gastrula) এবং শুরু হয় গ্যাস্ট্রুলেশন (Gastrulation)। এই পর্যায়ে ভ্রূণের কোষ তিনটি প্রধান স্তরে বিভক্ত হয়ে যায়। এগুলো হলো এক্টোডার্ম, মেসোডার্ম এবং এন্ডোডার্ম। এক্টোডার্ম থেকে তৈরি হয় মস্তিষ্ক, মেরুদণ্ড, স্নায়ুতন্ত্র, চোখের কিছু অংশ এবং ত্বকের বাইরের স্তর। মেসোডার্ম থেকে গড়ে ওঠে হৃদপিণ্ড, পেশি, হাড়, রক্ত, কিডনি এবং প্রজননতন্ত্রের অনেক অংশ। অন্যদিকে এন্ডোডার্ম থেকে তৈরি হয় ফুসফুসের ভেতরের আবরণ, যকৃত, অগ্ন্যাশয়, অন্ত্র এবং পরিপাকতন্ত্রের বেশিরভাগ অঙ্গ। অর্থাৎ, মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ভবিষ্যতের প্রতিটি অঙ্গের ভিত্তি তৈরি হতে শুরু করে।

বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে জানতে চেয়েছেন, কোষগুলো কীভাবে জানে তারা কোথায় যাবে এবং কী হবে। এই প্রশ্নের উত্তর এসেছে ডেভেলপমেন্টাল বায়োলজি বা বিকাশজীববিজ্ঞানের গবেষণা থেকে। ভ্রূণের কোষগুলো একে অপরের সঙ্গে রাসায়নিক সংকেত বিনিময় করে। Wnt, Hedgehog, Notch, BMP এবং FGF-এর মতো সংকেতবাহী প্রোটিন ভ্রূণের বিভিন্ন অংশে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় উপস্থিত থাকে। কোষগুলো এই রাসায়নিক ঘনত্ব "পড়তে" পারে এবং সেই অনুযায়ী নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। একই সঙ্গে HOX জিন নামের বিশেষ জিনের একটি দল শরীরের সামনের অংশ, পেছনের অংশ, হাত, পা এবং মেরুদণ্ডের অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই জিনগুলোর কাজ বিঘ্নিত হলে জন্মগত বিভিন্ন ত্রুটি দেখা দিতে পারে।

একটি বিষয় আরও বিস্ময়কর। ভ্রূণের প্রথম দিকের কোষগুলো শুধু বিভাজিত হয় না, তারা নিজেদের অবস্থানও পরিবর্তন করে। লক্ষ লক্ষ কোষ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যায়, একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়, আবার অনেক কোষ ইচ্ছাকৃতভাবে মারা যায়। এই নিয়ন্ত্রিত কোষমৃত্যুকে বলা হয় অ্যাপোপটোসিস (Apoptosis)। এটি শুনতে অদ্ভুত লাগলেও সুস্থ মানুষ তৈরির জন্য এটি অপরিহার্য। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গর্ভের শুরুতে মানুষের হাত অনেকটা হাঁসের পায়ের মতো জোড়া অবস্থায় থাকে। পরে আঙুলগুলোর মাঝখানের কোষগুলো অ্যাপোপটোসিসের মাধ্যমে ধ্বংস হয়ে যায় বলেই পৃথক পাঁচটি আঙুল তৈরি হয়। যদি এই প্রক্রিয়ায় সমস্যা হয়, তাহলে জন্মগতভাবে জোড়া আঙুল নিয়ে শিশু জন্মাতে পারে।

মানব ভ্রূণের বিকাশ এত দ্রুত ঘটে যে মাত্র চার সপ্তাহের মধ্যেই হৃদপিণ্ড স্পন্দন শুরু করে। যদিও তখন হৃদপিণ্ড সম্পূর্ণ গঠিত নয়, তবুও এটি রক্ত সঞ্চালন শুরু করতে পারে। পঞ্চম থেকে অষ্টম সপ্তাহের মধ্যে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ দ্রুত বিকশিত হয়, চোখ, কান, হাত ও পায়ের কুঁড়ি স্পষ্ট হতে শুরু করে। অষ্টম সপ্তাহের শেষে ভ্রূণের দৈর্ঘ্য সাধারণত ২.৫ থেকে ৩ সেন্টিমিটারের মতো হয়, কিন্তু তখনই প্রায় সব প্রধান অঙ্গের মৌলিক কাঠামো তৈরি হয়ে যায়। নবম সপ্তাহ থেকে একে সাধারণত ফিটাস বা গর্ভস্থ শিশু বলা হয়। এরপরের মাসগুলোতে মূলত অঙ্গগুলোর বৃদ্ধি, পরিপক্বতা এবং কার্যক্ষমতা উন্নত হতে থাকে।

বর্তমান যুগে এই পুরো প্রক্রিয়া বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। কনফোকাল মাইক্রোস্কোপি, টাইম-ল্যাপস ইমেজিং, সিঙ্গেল-সেল আরএনএ সিকোয়েন্সিং, ফ্লুরোসেন্ট মার্কিং এবং জিন সম্পাদনার জন্য CRISPR প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা একটি ভ্রূণের প্রতিটি কোষের ভবিষ্যৎ পর্যন্ত অনুসরণ করতে পারছেন। বিশেষ করে সিঙ্গেল-সেল প্রযুক্তির মাধ্যমে গবেষকেরা দেখতে পারেন, একই ভ্রূণের দুটি পাশাপাশি থাকা কোষেও কোন জিন কতটা সক্রিয় রয়েছে। এর ফলে জন্মগত রোগ, গর্ভপাতের কারণ, বন্ধ্যাত্ব এবং অঙ্গ পুনর্গঠন চিকিৎসা সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। স্টেম সেল গবেষণাও এই জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করেই এগিয়ে চলছে। ভবিষ্যতে ক্ষতিগ্রস্ত হৃদপেশি, স্নায়ু বা অগ্ন্যাশয়ের কোষ পুনর্গঠনের চিকিৎসায় এই গবেষণা বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, যদি প্রতিটি কোষে একই ডিএনএ থাকে, তাহলে কেন সব কোষ একই রকম হয়ে যায় না? এর উত্তর লুকিয়ে আছে এপিজেনেটিক্সে। ডিএনএর ওপর রাসায়নিক পরিবর্তন এবং হিস্টোন নামের প্রোটিনের বিন্যাসের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয় কোন জিন দীর্ঘমেয়াদে চালু থাকবে এবং কোনটি বন্ধ থাকবে। এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণেই মস্তিষ্কের কোষ সারাজীবন স্নায়ুকোষ হিসেবেই থাকে এবং যকৃতের কোষ হঠাৎ গিয়ে হৃদপেশির কোষে পরিণত হয় না। অর্থাৎ, মানুষের শরীরের প্রতিটি কোষ একই বই বহন করলেও তারা ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায় অনুসরণ করে নিজেদের বিশেষ পরিচয় ধরে রাখে।

মানুষের বিকাশের এই গল্পটি শুধু জীববিজ্ঞানের একটি অধ্যায় নয়; এটি প্রকৃতির সবচেয়ে নিখুঁত স্ব-সংগঠিত ব্যবস্থাগুলোর একটি। কোনো প্রকৌশলী প্রতিটি কোষকে আলাদা নির্দেশনা দেন না, কোনো কেন্দ্রীয় কম্পিউটার পুরো শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে না। তবুও কোটি কোটি কোষ নির্ভুল সময়ে বিভাজিত হয়, স্থান পরিবর্তন করে, রাসায়নিক সংকেত বিনিময় করে, প্রয়োজন হলে নিজেকে ধ্বংস করে এবং শেষ পর্যন্ত এমন একটি দেহ তৈরি করে, যা চিন্তা করতে পারে, শিখতে পারে, ভালোবাসতে পারে এবং আবার নতুন জীবন সৃষ্টি করতে পারে। একটি মাত্র নিষিক্ত কোষের মধ্যে এই অসাধারণ সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকার কারণেই জীববিজ্ঞান আজও বিজ্ঞানের অন্যতম বিস্ময়কর ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হয়।

তাই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো—মানুষের জীবন শুরু হয় একটি এককোষী জাইগোট দিয়ে, কিন্তু সেই অবস্থা খুব অল্প সময়ের জন্য। কয়েক দিনের মধ্যেই এটি দ্রুত বহুকোষী ভ্রূণে পরিণত হয়। এরপর জিন, স্টেম সেল, রাসায়নিক সংকেত, কোষের পারস্পরিক যোগাযোগ, এপিজেনেটিক নিয়ন্ত্রণ এবং কোটি কোটি কোষ বিভাজনের সমন্বয়ে ধাপে ধাপে তৈরি হয় পূর্ণাঙ্গ মানুষ। এককোষী থেকে বহুকোষী হওয়ার এই যাত্রা শুধু জীবনের সূচনা নয়; এটি এমন একটি জৈবিক প্রকৌশল, যার প্রতিটি ধাপ আজও বিজ্ঞানীদের নতুন নতুন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় এবং ভবিষ্যতের চিকিৎসাবিজ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করার পথ দেখায়।

সূত্র: National Institute of Child Health and Human Development (NICHD), Harvard Medical School, Nature Reviews Molecular Cell Biology, Development Journal, Cell, ২০২১–২০২৫.

© উপম বিকাশ |


21


দিনে মাত্র ৫ মিনিট সময় বের করলেই কমে যেতে পারে আপনার anxiety এর প্রায় ৩৭% সত্যিই কি সম্ভব ?

আপনার মাথার ভেতরে একটা রেডিও সারাক্ষণ বাজে 

আপনি কি লক্ষ করেছেন আপনার মাথার ভেতর একটা দুশ্চিন্তার  চ্যানেল সারাদিন চলতেই থাকে। অফিসের কাজ বাকি আছে মা ঠিকমতো ঔষধ খাচ্ছে কিনা ছেলের পরীক্ষার রেজাল্ট কেমন হবে। এই রেডিও আপনি বন্ধ করতে পারেন না কারণ আপনি কখনো এটাকে সময় দেননি।

মনোবিজ্ঞান কি বলছে এই বিষয়ে

মনোবিজ্ঞানী Borkovec এবং তার দল একটি গবেষণা করেছিলেন যেখানে মানুষকে দিনে মাত্র ৫ থেকে ৩০ মিনিট একটি নির্দিষ্ট সময়ে বসে শুধু চিন্তা করতে বলা হতো। বাকি সারাদিন যখনই কোনো দুশ্চিন্তা মাথায় আসতো তখন তাকে বলা হতো এটা পরে ভাবব এখন না। ফলাফল ছিল চমকপ্রদ। মানুষের anxiety প্রায় ৩৭% পর্যন্ত কমে গিয়েছিল। কারণ আমাদের মস্তিষ্ক চায় তার কথা শোনা হোক। সময় না দিলে সে আরও জোরে চিৎকার করে।

আপনি কীভাবে শুরু করবেন

প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময় বেছে নিন ধরুন সন্ধ্যা ৬টা। সেই সময় ৫ মিনিট বসুন এবং যা যা চিন্তা মাথায় আসছে লিখে ফেলুন বা মনে মনে বলুন। দিনের বাকি সময় যখনই কোনো দুশ্চিন্তা আসবে নিজেকে বলুন এটা সন্ধ্যা ৬টার জন্য তোলা থাকল। প্রথম কয়েকদিন কঠিন লাগবে কিন্তু সপ্তাহখানেক পর মাথা নিজেই মেনে নেবে।

মনস্তত্ত্বে এটাকে "ওরি  সিডিউল " বলা হয়। এটি সাইকোথেরাপির অত্যন্ত কার্যকরী একটি কৌশল।

চিন্তাকে শৃঙ্খলা পরায়ণ হতে শেখান 

যেমন গাছে জল দিলে গাছ সময় বুঝে বড় হয় তেমনি চিন্তাকেও নির্দিষ্ট সময় দিলে সে শৃঙ্খলায় চলে আসে। এলোমেলো সময়ে জল ঢাললে গাছ যেমন মরে যায় তেমনি এলোমেলো চিন্তা মনকেও দুর্বল করে দেয়।

#পার্থপ্রতিমরায়


22


প্রতিদিনের খবরের দিকে তাকালে মনে হতেই পারে—অঢেল সম্পদ এবং অপরাধের যেন গভীর কোনো সম্পর্ক রয়েছে। ওয়াল স্ট্রিটের বড় বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে জেফ্রি এপস্টেইনের মতো ধনকুবেরদের ভয়ংকর সব অপরাধের খবর আমরা প্রায়ই দেখি। কিন্তু আসলেই কি অতিরিক্ত টাকা মানুষকে অপরাধপ্রবণ বা স্বার্থপর করে তোলে?

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, সম্পদ বাড়ার সাথে সাথে মানুষের মনস্তত্ত্বে এক অদ্ভুত পরিবর্তন আসে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (UC Berkeley) বিখ্যাত এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের আর্থিক ক্ষমতা যত বাড়ে, তাদের মধ্যে সহানুভূতি (Empathy) বা অন্যের কষ্ট বোঝার ক্ষমতা তত কমতে থাকে। টাকা মানুষকে এক ধরনের মানসিক সুরক্ষা ও স্বাধীনতা দেয়। ফলে তারা অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ফেলে। আর এই অতিরিক্ত স্বাধীনতাবোধ থেকেই অনেক সময় বেপরোয়া মনোভাবের জন্ম নেয়।

বিজ্ঞান বলছে, টাকা মানুষকে সরাসরি 'খারাপ' বা 'দানব' বানায় না, বরং এটি মানুষের ভেতরের লুকিয়ে থাকা নৈতিকতার বাঁধনগুলোকে আলগা করে দেয়। গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, তুলনামূলক ধনী ব্যক্তিরা সাধারণ মানুষের চেয়ে ট্রাফিক নিয়ম ভাঙা বা নিজের স্বার্থে অনৈতিক কাজ করার ক্ষেত্রে বেশি এগিয়ে থাকেন।

@ AH Abubakkar Siddique



23


দিনে মাত্র একবেলা খাওয়া বা intermittent fasting এর দারুণ সব উপকারিতা, যা আপনার জীবন বদলে দেবে:

​১) পকেট বাঁচবে, বাজারের আর রান্নার পেছনে বাড়তি টাকা একদমই নষ্ট হবে না

২) রান্নাবান্না আর খাওয়ার পেছনে প্রতিদিনকার যে বিশাল সময় নষ্ট হয়, সেটা বেঁচে যাবে

৩) সারাদিন পেট খালি থাকায় হজমশক্তি দারুণ হবে, গ্যাস্ট্রিক-বুক জ্বালাপোড়া উধাও হয়ে যাবে

৪) শরীরের ভেতরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যাবে

৫) অটোফেজি চালু হবে, অর্থাৎ শরীর নিজেই নিজের ভেতর জমে থাকা মরা আর নষ্ট কোষগুলো পরিষ্কার করে ফেলবে

৬) শরীর ভেতর থেকে টক্সিনমুক্ত থাকবে, ফলে দীর্ঘদিন সুস্থভাবে বেঁচে থাকা যাবে

৭) শরীর একবার মানিয়ে নিলে হুটহাট অহেতুক ক্ষুধা লাগার প্রবণতা একদম চলে যাবে

৮) বিকেলে ফুচকা, চটপটি বা মিষ্টি খাওয়ার যে তীব্র লোভ বা ক্রেভিং, সেটা আর থাকবে না

৯) রক্ত পরিষ্কার হবে, ফলে ব্রণ কমে গিয়ে ত্বকে একটা স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা আসবে

১০) অলসতা আর শরীর ম্যাজম্যাজ করা দূর হবে, শরীরে উপচে পড়া এনার্জি পাবেন

১১) মেজাজ খিটখিটে হওয়া বন্ধ হবে, মন সবসময় ফুরফুরে আর শান্ত থাকবে

১২) বাতের ব্যথা, গা-হাত পা কামড়ানো বা শরীরের ভেতরের দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ কমে যাবে

১৩) রক্তচাপ বা হাই প্রেশার খুব সুন্দরভাবে নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে

১৪) রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল কমবে, ফলে হার্টের রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি এক ধাক্কায় কমে যাবে

১৫) রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা ঠিক থাকবে, ফলে ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি একদম থাকবে না

১৬) লিভারে জমে থাকা অতিরিক্ত চর্বি গলে যাবে, যা ফ্যাটি লিভারের সেরা সমাধান

১৭) আপনার শরীর একটা ফ্যাট-বার্নিং মেশিনে পরিণত হবে, বিশেষ করে জেদি পেটের মেদ বা ভুঁড়ি দ্রুত গলবে

১৮) নিজের জিহ্বা আর মনের ওপর একটা দারুণ আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ডিসিপ্লিন তৈরি হবে

১৯) শরীরের মাংসপেশি বা মাসল নষ্ট হবে না, বরং শরীর অনেক বেশি টানটান ও ফিট হবে

২০) অনেকের মেটাবলিজম অলস হয়ে যায়, এই নিয়মে সেই ধীরগতির মেটাবলিজম আবার চাঙ্গা হয়ে উঠবে

২১) ব্রেন অনেক দ্রুত কাজ করবে, পড়াশোনা বা অফিসে মনোযোগ বাড়বে, বয়সকালের স্মৃতিভ্রম (ডিমেনশিয়া) রোধ হবে এবং সারাদিন ভারী খাবারের ঝিমুনি না থাকায় চিন্তাভাবনা সবসময় পানির মতো পরিষ্কার থাকবে

@ Captain Green



24


ডানহাতি মানুষের সংখ্যা কেন বেশি হল!!

বিবর্তন আসলে সচেতনভাবে কিছু করেনা, ঘটনা হল ডানহাতিরা অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়ার ফলেই লাখ লাখ বছর ধরে বিবর্তনের ফলেই ডানহাতির সংখ্যা বেশি হয়েছে।

আদিম মানুষের মস্তিষ্ক যখন আকারে বড় ও জটিল হতে লাগল, তখন টিকে থাকার প্রতিযোগিতায় মস্তিষ্কের ডান ও বাম অংশের মধ্যে কাজের ভাগাভাগি শুরু হলো।

সাধারণত মানুষের মস্তিষ্কের বাম অংশটি ভাষা, কথা বলা এবং জটিল সমস্যা সমাধানের কাজগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। যেহেতু মস্তিষ্কের বাম অংশ শরীরের ডান দিককে নিয়ন্ত্রণ করে, তাই ভাষা ও জটিল কাজের দক্ষতার সাথে ডান হাত ব্যবহারের একটি সরাসরি যোগসূত্র তৈরি হয়।

একটি বড় এবং জটিল মস্তিষ্কের জন্য দুই হাতের কাজ আলাদা করে দেওয়া বেশি শক্তি সাশ্রয়ী। সব কাজ উভয় হাতে শেখার চেয়ে একটি হাতকে নির্দিষ্ট কাজের জন্য দক্ষ করে তোলা বিবর্তনের পথে বেশি কার্যকর ছিল।

গবেষণায় দেখা যায়, ডানহাতি হওয়ার প্রবণতা হোমো গণের (Homo habilis এবং Homo erectus) সময় থেকেই শুরু হয়েছিল।

তবে বামহাতি মানুষ যে একেবারেই টিকে থাকত না তা নয়, যুদ্ধ বা প্রতিযোগিতামূলক খেলায় বামহাতিদের আলাদা সুবিধা থাকায় (যেমন প্রতিপক্ষকে চমকে দেওয়া) প্রাকৃতিক নির্বাচন উভয় বৈশিষ্ট্যকেই মানবসমাজে টিকিয়ে রেখেছে।

তথ্যসূত্র: Why is almost everyone right-handed? - University of Oxford

Why Are Most Humans Right-Handed? The Modified Fighting Hypothesis - Multidisciplinary Digital Publishing Institute (MDPI), Switzerland

@সিদ্ধার্থ জৈন



25


দুনিয়ার ৯৯% মানুষের চেয়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্য হার্ভার্ডের এই ১৪টা টেকনিক আপনার লাইফ চেঞ্জ করে দিতে পারে।

জাস্ট ৫ মিনিট সময় নিয়ে পড়ে ফেলুন, কাজে দেবে:

​১. ৫-সেকেন্ড রুল (The 5-Second Rule)

কোনো প্রোডাক্টিভ কাজ করার চিন্তা মাথায় আসলেই মনে মনে ৫-৪-৩-২-১ গুনবেন আর সাথে সাথে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়বেন। ব্রেইন যাতে দ্বিধায় পড়ার বা আলসেমি করার টাইম না পায়। বিছানা থেকে উঠতে বা ওয়ার্কআউট শুরু করতে এটা জোস কাজ করে।

​২. ফাইনম্যান টেকনিক (The Feynman Technique)

যেকোনো জটিল জিনিস শেখার সেরা উপায়। মনে করুন আপনি সেটা কোনো ১২ বছরের বাচ্চাকে বোঝাচ্ছেন। কোনো কঠিন শব্দ ছাড়া সহজ বাংলায় লিখুন বা বলুন। যেখানে গিয়ে আটকে যাবেন, বুঝবেন ওই জায়গায় আপনার নিজেরই গ্যাপ আছে। আবার পড়ুন!

​৩. আইজেনহাওয়ার ম্যাট্রিক্স (Eisenhower Matrix)

একটা কাগজে প্লাস (+) চিহ্ন দিয়ে ৪টা ঘর বানান:

​১ নম্বর ঘর: জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ (এখনই করুন)

​২ নম্বর ঘর: গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু জরুরি না (শিডিউল করুন)

​৩ নম্বর ঘর: জরুরি কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ না (অন্য কাউকে দিয়ে করান)

​৪ নম্বর ঘর: কোনোটিই না (বাদ দিন/ডিলিট করুন)

​৪. ২-মিনিট রুল (The 2-Minute Rule)

হুট করে সামনে আসা কোনো কাজ (যেমন: একটা ইমেইলের রিপ্লাই বা মেসেজ পাঠানো) যদি করতে ২ মিনিটের কম সময় লাগে, তবে সেটা পরে করবেন বলে ফেলে রাখবেন না। ইনস্ট্যান্ট করে ফেলুন। ব্রেইনের ওপর ফালতু প্রেসার কমবে।

​৫. পমোডোরো টেকনিক (The Pomodoro Technique)

মোবাইলটা দূরে রেখে ২৫ মিনিটের একটা টাইমার সেট করুন। পুরো ফোকাস দিয়ে কাজ করুন। ২৫ মিনিট পর ৫ মিনিটের একটা ব্রেক নিন (একটু হেঁটে আসুন বা পানি খান)। এভাবে ৪ বার করার পর একটা বড় (২০-৩০ মিনিটের) ব্রেক নিন। ক্লান্তি আসবেই না!

​৬. অ্যাক্টিভ রিকল (Active Recall)

কোনো মিটিং শেষ হলে বা বইয়ের চ্যাপ্টার পড়া শেষ হলে খাতা-কলম বন্ধ করুন। এবার মনে মনে বা অন্য কাগজে লেখার চেষ্টা করুন আপনার কী কী মনে আছে। এরপর মেইন নোটের সাথে মিলিয়ে দেখুন কী কী ভুলে গেছেন। পড়া মাথায় সেট হয়ে যাবে।

​৭. ১% রুল (The 1% Rule)

যেকোনো একটা স্কিল বা অভ্যাস ধরুন। প্রতিদিন সেটা সামান্য একটু উন্নত করুন। আজ ১টা পেজ বেশি পড়লেন, কাল ১টা পুশ-আপ বেশি দিলেন। বছর শেষে এই ছোট ছোট ১% মিলে আপনার লাইফ ৩৬৫% বদলে দেবে!

​৮. ডিপ ওয়ার্ক ব্লকস (Deep Work Blocks)

দিনের মধ্যে ২ থেকে ৪ ঘণ্টা ক্যালেন্ডারে ব্লক করে রাখুন। মোবাইল অন্য রুমে পাঠিয়ে সব নোটিফিকেশন অফ করে দিন। এই সময়ে শুধু একটা হাই-ভ্যালু কাজ করবেন। মনে করবেন এটা আপনার নিজের সাথে নিজের একটা ভিআইপি মিটিং, যা ক্যান্সেল করা যাবে না।

​৯. দ্য প্রিমর্টেম (The Premortem)

কোনো প্রজেক্ট শুরু করার আগেই টিম নিয়ে বসুন আর ভাবুন—"ধরো আজ থেকে ৬ মাস পর এই প্রজেক্টটা পুরোপুরি ফ্লপ খাইছে, কেন খাইছে?" সম্ভাব্য সব ফালতু কারণের লিস্ট করুন আর ব্যাকআপ প্ল্যান এখনই রেডি রাখুন।

​১০. হ্যাবিট স্ট্যাকিং (Habit Stacking)

আপনার অলরেডি একটা অভ্যাস আছে, সেটার পিঠে নতুন অভ্যাস জুড়ে দিন। যেমন: "সকালে চা খাওয়ার পরপরই আমি ডায়েরিতে আজকের দিনের সেরা ৩টা কাজের লিস্ট লিখবো।" আগের অভ্যাসটাই নতুন অভ্যাসের ট্রিগার হিসেবে কাজ করবে।

​১১. ৮০/২০ প্রিন্সিপল (The 80/20 Principle)

আপনার জীবনের ৮০% সাকসেস আসে মাত্র ২০% কাজের মাধ্যমে। খুঁজে বের করুন কোন ২০% কাজ আপনাকে সবচেয়ে বেশি রেজাল্ট দিচ্ছে। বাকি ফালতু কাজগুলো ছাঁটাই করুন বা অন্যকে দিয়ে করিয়ে নিন।

​১২. টু-লিস্ট স্ট্র্যাটেজি (The Two-List Strategy)

এই কোয়ার্টারের সেরা ৫টা ক্যারিয়ার গোল একটা লিস্টে লিখুন। এরপর বাকি যত হাবিজাবি ইচ্ছা বা আইডিয়া আছে, সেগুলোর আরেকটা লিস্ট বানান। প্রথম ৫টা গোল পূরণ না হওয়া পর্যন্ত দ্বিতীয় লিস্টের দিকে তাকানোও নিষেধ!

​১৩. রিফ্লেক্টিভ জার্নালিং (Reflective Journaling)

রোজ রাতে ঘুমানোর আগে মাত্র ১০ মিনিট সময় নিয়ে ৩টা জিনিস লিখুন:

​আজকে কী ভালো হলো?

​কোনটা খারাপ হলো?

​কালকের জন্য ১টা স্পেসিফিক চেঞ্জ কী হবে?

এটা কোনো ইমোশনাল ডায়রি না, এটা আপনার ডেইলি ফিডব্যাক লুপ।

​১৪. স্পেসড রিপিটিশন (Spaced Repetition)

নতুন কিছু শিখলে সেটা আজ রিভিশন দেওয়ার পর আবার ৩ দিন পর দিন, তারপর ৭ দিন পর, তারপর ১৪ দিন পর। আপনি অ্যাপ ইউজ করতে পারেন বা ক্যালেন্ডারে নোট রাখতে পারেন। আজীবন মনে থাকবে।

@ Tanvir Ahmed Niloy

26

আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব অনুযায়ী, সময় মহাবিশ্বের সব জায়গায় একইভাবে চলে না। স্থান এবং গতিভেদে সময়ের গতি পরিবর্তিত হয়, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় 'টাইম ডাইলেশন'। কোনো বস্তু যদি আলোর গতির কাছাকাছি গতিতে ভ্রমণ করে, তবে তার জন্য সময় অত্যন্ত ধীর হয়ে যায়। একইভাবে, মহাকর্ষ বল যেখানে তীব্র, সেখানেও সময় ধীরগতিতে চলে।

ধরা যাক, দুই যমজ ভাইয়ের একজন পৃথিবীতে রইল এবং অন্যজন একটি অতি দ্রুতগতির রকেটে করে মহাকাশে ঘুরে এল। মহাকাশ থেকে ফিরে এসে দেখা যাবে, মহাকাশে থাকা ভাইটির বয়স পৃথিবীর ভাইয়ের চেয়ে অনেক কম বেড়েছে। ব্ল্যাকহোলের কাছাকাছি এই প্রভাব আরও মারাত্মক। ব্ল্যাকহোলের তীব্র মহাকর্ষের কারণে সেখানে কাটানো মাত্র কয়েক মিনিট পৃথিবীর কয়েক বছরের সমান হতে পারে। অর্থাৎ, সময় কোনো স্থায়ী বা স্থির বিষয় নয়, এটি একটি আপেক্ষিক অনুভূতি।

 Voice of Pipul

27

আমরা অনেকেই একসঙ্গে ২০–২৫ চামচ চিনি খাওয়ার কথা কল্পনাও করতে পারি না। কিন্তু একটি ১ লিটার Coca-Cola Original Taste পান করলে অজান্তেই শরীরে চলে যায় প্রায় ১০৬ গ্রাম চিনি, যা গড় হিসেবে প্রায় ২৬–২৭ চা চামচ চিনির সমান।

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, যখন এই পরিমাণ চিনি আলাদা করে টেবিলে সাজিয়ে রাখা হয়, তখন সেটি দেখে অনেকেই অবাক হয়ে যান। অথচ পানীয় হিসেবে খাওয়ার সময় সেই একই পরিমাণ চিনি আমাদের কাছে ততটা অনুভূত হয় না। এর কারণ, তরল অবস্থায় চিনি খুব সহজেই পান করা যায় এবং খুব দ্রুত শরীরে শোষিত হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক ফ্রি সুগার গ্রহণ মোট ক্যালোরির ১০%-এর কম হওয়া উচিত। আরও ভালো স্বাস্থ্যগত সুবিধার জন্য সেটি ৫%-এর নিচে, অর্থাৎ প্রায় ২৫ গ্রাম বা ৬ চা চামচ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।

অথচ মাত্র ১ লিটার কোকাকোলায়ই রয়েছে প্রায় ১০৬ গ্রাম চিনি যা এই আদর্শ সীমার প্রায় চার গুণেরও বেশি। তবে এর মানে এই নয় যে, জীবনে কখনোই কোমল পানীয় খাওয়া যাবে না।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, এগুলোকে প্রতিদিনের অভ্যাস না বানিয়ে মাঝেমধ্যে এবং পরিমিত পরিমাণে পান করাই ভালো। কারণ নিয়মিত অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ করলে ওজন বৃদ্ধি, দাঁতের ক্ষয় এবং টাইপ–২ ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।

@ Mahfuz Ahmed Chy


28


পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ব্যক্তিগত জীবন এবং তাঁর রাজনৈতিক আদর্শের মধ্যে এক বড় ধরনের বৈপরীত্য ছিল। তিনি ধর্মের ভিত্তিতে মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র "পাকিস্তান" প্রতিষ্ঠা করলেও, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি কোনো গোঁড়া মুসলিম ছিলেন না এবং তাঁর স্ত্রী রতনবাঈ (রতি) ও একমাত্র কন্যা দিনা ওয়াদিয়া দুজনেই জন্মসূত্রে পার্সি বা অমুসলিম ছিলেন।

জিন্নাহর পূর্ব পুরুষ হিন্দু ছিলেন:

হ্যাঁ, পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর পূর্বপুরুষরা হিন্দু ছিলেন। তাঁরা গুজরাটের লোহানা ঠক্কর বা ঠক্কর সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

জিন্নাহর পারিবারিক ইতিহাস এবং ধর্মান্তরের মূল কারণগুলো নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

পারিবারিক পটভূমিদাদামশাই বা পিতামহ:

জিন্নাহর পিতামহ পুঞ্জা গোকুলদাস মেঘজি (বা পুঞ্জা মেঘজি) ভারতের গুজরাটের সৌরাষ্ট্র বা কাঠিয়াবাড় অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি হিন্দু ধর্মের বৈশ্য (বণিক) শ্রেণিভুক্ত লোহানা সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন।

পিতা:

জিন্নাহর পিতার নাম ছিল পুঞ্জলাল ঠাকুর, যিনি পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর জিন্নাহভাই পুঞ্জা নামে পরিচিত হন।

ধর্মান্তরিত হওয়ার কারণ মাছের ব্যবসা ও সমাজচ্যুতি: জিন্নাহর পরিবার ঐতিহ্যগতভাবে নিরামিষাশী লোহানা সম্প্রদায়ের অংশ ছিলেন। কিন্তু পুঞ্জা মেঘজি একপর্যায়ে উপকূলীয় অঞ্চলে মাছের ব্যবসা শুরু করেন। নিরামিষাশী লোহানা সমাজ তাদের এই আমিষ বা মাছের ব্যবসার কারণে গোঁড়া ধর্মীয় নিয়মে সমাজচ্যুত বা বহিষ্কার করে।

ইসলাম গ্রহণ:

পরবর্তীতে পুঞ্জা মেঘজি মাছের ব্যবসা বন্ধ করে দিয়ে পুনরায় হিন্দু সমাজে ফিরে আসার চেষ্টা করেছিলেন। তবে তৎকালীন গোঁড়া সমাজপতিরা তাঁকে আর সমাজে ফিরিয়ে নিতে রাজি হননি। এই সামাজিক অবমাননা ও ক্ষোভ থেকে তাঁর পুত্র পুঞ্জলাল ঠাকুর (জিন্নাহর পিতা) সপরিবারে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং গুজরাট ছেড়ে করাচিতে চলে যান। মুসলিম পারিবারিক জীবন ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর তাঁরা শিয়া ইসলামের খোজাহ ইসমাইলি সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হন। এরপর জিন্নাহর পিতা সন্তানদের আর হিন্দু নাম দেননি এবং তাঁরা সম্পূর্ণ মুসলিম ঐতিহ্য অনুযায়ী জীবনযাপন শুরু করেন। এই পরিবারেরই প্রথম সন্তান হিসেবে ১৮৭৬ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জন্মগ্রহণ করেন।

জিন্নাহর স্ত্রী ও কন্যার ধর্মীয় জীবন এবং এই সংক্রান্ত পারিবারিক জটিলতার বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

জিন্নাহর স্ত্রী:

রতনবাঈ পেতিত (রতি জিন্নাহ)

জন্ম ও পরিচয়:

রতনবাঈ ছিলেন বোম্বাইয়ের (বর্তমান মুম্বাই) এক অত্যন্ত ধনী পার্সি পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবা স্যার দিনশ পেতিত ছিলেন জিন্নাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

প্রেম ও বিয়ে:

২৪ বছরের ব্যবধান এবং পার্সি সমাজের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও জিন্নাহ ও রতি ১৯১৮ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

ধর্মান্তর:

বিয়ের আগে রতি আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তাঁর নাম রাখা হয় 'মরিয়ম জিন্নাহ'। তবে তাঁর লালন-পালন ও জীবনযাত্রায় ধর্মীয় গোঁড়ামির কোনো প্রভাব ছিল না।

রাজনৈতিক কারণ:

জিন্নাহ তখন আইন সভায় মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন। প্রচলিত 'সিভিল ম্যারেজ অ্যাক্ট' অনুযায়ী বিয়ে করলে তাঁকে রাজনৈতিক পদ ছাড়তে হতো, তাই তিনি ইসলামী রীতিতেই বিয়ে করেন।

পরিণতি:

এই বিয়ে বেশিদিন টেকেনি এবং ১৯২৯ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে রতি মারা যান।

জিন্নাহর কন্যা:

দিনা ওয়াদিয়া পরিচয়:

দিনা ওয়াদিয়া ছিলেন জিন্নাহ এবং রতির একমাত্র সন্তান।

পিতার আদর্শের পুনরাবৃত্তি:

জিন্নাহ যেভাবে পার্সি পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন, দিনাও ঠিক একইভাবে এক পার্সি তরুণকে ভালোবেসে বসেন। তাঁর পছন্দ ছিল ভারতের বিখ্যাত পার্সি ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান নেভিল ওয়াদিয়া।

জিন্নাহর তীব্র বিরোধিতা:

জিন্নাহ এই বিয়ের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি দিনাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, ভারতের কোটি কোটি মুসলমানের নেতা হিসেবে তাঁর মেয়ের একজন অমুসলিমকে বিয়ে করা রাজনৈতিকভাবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।

সম্পর্কচ্ছেদ:

পিতার আপত্তি অমান্য করে ১৯৩৮ সালে দিনা নেভিল ওয়াদিয়াকে বিয়ে করেন। এর ফলে জিন্নাহর সাথে তাঁর সম্পর্ক চিরতরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। জিন্নাহ দিনাকে নিজের মেয়ে হিসেবে স্বীকার করা বন্ধ করে দেন এবং তাঁকে 'মিসেস ওয়াদিয়া' বলে সম্বোধন করতে শুরু করেন।

ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বৈপরীত্য:

ব্যক্তিগত বনাম রাজনৈতিক জীবন:

জিন্নাহ ব্যক্তিগত জীবনে পশ্চিমা পোশাকে অভ্যস্ত, ইংরেজিভাষী এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের ঊর্ধ্বে থাকা একজন মানুষ ছিলেন।

দ্বিজাতি তত্ত্ব:

১৯৪০ সালের পর থেকে জিন্নাহ "হিন্দু ও মুসলমান দুটি আলাদা জাতি" (দ্বিজাতি তত্ত্ব) এই স্লোগান তুলে পাকিস্তান আন্দোলন তীব্র করেন। অথচ তাঁর নিজের ঘরেই ছিল আন্তঃধর্মীয় সম্পর্কের ইতিহাস।

দিনার ভারতভুক্তি:

১৯৪৭ সালে ভারতভাগের পর জিন্নাহ পাকিস্তানে চলে গেলেও দিনা ওয়াদিয়া পাকিস্তানে যাননি। তিনি ভারতেই থেকে যান এবং পরবর্তী জীবনে নিউইয়র্কে বসবাস শুরু করেন। তিনি তাঁর পুরো জীবনে মাত্র দুই বার পাকিস্তানে গিয়েছিলেন।

বিবিসিকে দেওয়া দিনার সাক্ষাৎকার:

https://www.bbc.com/bengali/news-41861684

তথ্য সংগ্রহ: মৃণাল নন্দী


29


মানসিক চাপ নিয়ে রাত ৯ টার পর খাবার খেলে

হজমশক্তি কমে যায় প্রায় ৩৯% !

Digestive Disease Week 2026-এ উপস্থাপিত একটি মাল্টি-কোহর্ট গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের NHANES জরিপের ১১,০০০-এর বেশি প্রাপ্তবয়স্ক এবং American Gut Project-এর ৪,০০০-এর বেশি অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

শুধু দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপই হজমজনিত সমস্যার ঝুঁকি প্রায় ৩২% বাড়িয়েছে। কিন্তু যখন এর সঙ্গে নিয়মিত দেরিতে রাতের খাবার খাওয়ার অভ্যাস যুক্ত হয়েছে, তখন ঝুঁকি আরও অনেক বেড়ে গেছে। উচ্চ মানসিক চাপ ও দেরিতে খাওয়া এই দুই বৈশিষ্ট্য যাদের ছিল, তাদের ৩৯.৩% মলত্যাগের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তুলনায়, কম মানসিক চাপ এবং স্বাভাবিক সময়ে খাবার খাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে এই হার ছিল ২৩.২%।

গবেষকেরা দেখেছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপে (Chronic Stress) ছিলেন এবং রাত ৯টার পর দৈনিক মোট ক্যালরির ২৫%-এর বেশি গ্রহণ করতেন, তাদের কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়ার মতো অস্বাভাবিক মলত্যাগের সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা ১.৭ থেকে ২.৫ গুণ বেশি ছিল।

এই অভ্যাস অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য (Microbial Diversity) পরিমাপ করে গবেষকেরা দেখেছেন, যাদের দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এবং দেরিতে খাওয়ার অভ্যাস দুটিই ছিল, তাদের অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এই অবস্থাকে গাট ডিসবায়োসিস (Gut Dysbiosis)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়। কারণ, কম ব্যাকটেরিয়াল বৈচিত্র্য ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (IBS) থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিপাকীয় (Metabolic) রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।

গবেষকেরা এই বিষয়টিকে “ক্রোনোনিউট্রিশন-স্ট্রেস অ্যাক্সিস (Chrononutrition-Stress Axis)” নামে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ, আপনি কখন খাবার খান এবং আপনি কতটা মানসিক চাপে আছেন এই দুটি বিষয় একসঙ্গে আপনার অন্ত্রের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে।

আমাদের হজমের এনজাইম, অন্ত্রের চলাচল (Gut Motility) এবং ইনসুলিন সংবেদনশীলতা (Insulin Sensitivity) সবই শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম বা জৈবিক ঘড়ির নিয়ম অনুসরণ করে। তাই গভীর রাতে খাওয়া এই ব্যবস্থাগুলোকে এমন সময় কাজ করতে বাধ্য করে, যখন সেগুলোর কার্যকারিতা তুলনামূলকভাবে কম থাকে। এর ওপর যদি দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ যুক্ত হয়, তাহলে গবেষণার প্রধান লেখকের ভাষায় এটি শরীরের জন্য “ডাবল হিট” বা দ্বিগুণ নেতিবাচক আঘাতের মতো কাজ করে।

স্ট্রেস শুধু মনকেই প্রভাবিত করে না, এটি মস্তিষ্ক–অন্ত্র (Brain–Gut Axis)-এর মাধ্যমে সরাসরি হজমতন্ত্রের কার্যকারিতাকেও প্রভাবিত করে। স্ট্রেসের সময় শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিন বাড়ে। ফলে পাকস্থলী ও অগ্ন্যাশয় থেকে হজমের জন্য প্রয়োজনীয় এনজাইম ও রসের নিঃসরণ ব্যাহত হতে পারে। এতে খাবার ঠিকভাবে ভাঙতে সমস্যা হয়।

এর সমাধান হিসেবে রাতে দেরীতে খাবার খাওয়া পরিহার করতে হবে। সম্ভব হলে ঘুমোতে যাবার ২-৩ ঘন্টা পূর্বে খাবার খাওয়া উত্তম। খাবার খাওয়ার পরপরই বিশ্রাম না নিয়ে হাঁটলে ইনসুলিন হরমোনের সেন্সসিটিভিটি বাড়ে এবং স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল কমে। খুব ক্ষুধা লাগলে শর্করা না খেয়ে শুধু প্রোটিন ও চর্বি যুক্ত খাবার যেমন মাছ, মাংস অথবা ডিম খেলেও শরীরে ইনসুলিন স্পাইক হবে না। এর পাশাপাশি পেটের জন্য উপকারী ব্যাকটেরিয়া সম্বলিত টক দই খেলেও দারুণ উপকার পাওয়া সম্ভব। এই বিষয়গুলো অনুসরণ করলে গভীর ঘুমে যেতেও সহায়তা হবে।

@ Tajbir Hassan Sifat

30

ইস্পাহানি চা

১৮২০ সালে ইরানের ঐতিহাসিক শহর ইসফাহান থেকে হাজী মোহাম্মদ হাশেম ইস্পাহানি ভারতবর্ষের বোম্বেতে (বর্তমান মুম্বাই) এসে ব্যবসা শুরু করেন। সেখান থেকেই ইস্পাহানি পরিবারের বাণিজ্যিক যাত্রার সূচনা। কয়েক বছরের মধ্যেই ব্যবসা কলকাতায় সম্প্রসারিত হয় এবং চা, পাট, চামড়া, মসলা ও বিভিন্ন রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বাণিজ্যে তারা নিজেদের অবস্থান শক্ত করে। উনিশ শতকের শেষভাগে এই ব্যবসা শুধু ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; মাদ্রাজ, ঢাকা, লন্ডন এবং অন্যান্য বাণিজ্যকেন্দ্রেও তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত হয়।

১৯০০ সালে M. M. Ispahani & Sons নামে কলকাতায় নতুন কর্পোরেট কাঠামো গড়ে ওঠে। পরে ১৯৩৪ সালে মির্জা আহমদ ইস্পাহানি তাঁর দুই ভাইকে নিয়ে M. M. Ispahani Limited প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর নেতৃত্বেই প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত উপমহাদেশের অন্যতম বড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ১৯৪০-এর দশকে কাঁচা পাট, হেসিয়ান, জুট ব্যাগ, চা, রাসায়নিক পণ্যসহ বিভিন্ন খাতে ইস্পাহানি ছিল অন্যতম শীর্ষ রপ্তানিকারক।

১৯৪৭ সালের দেশভাগ ইস্পাহানি গ্রুপের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মোড় এনে দেয়। সে সময় উপমহাদেশের অনেক মুসলিম ব্যবসায়ী পশ্চিম পাকিস্তানে চলে গেলেও ইস্পাহানি পরিবার তাদের কর্পোরেট সদর দপ্তর কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা বদল করেনি; চট্টগ্রামকে দেশের অন্যতম প্রধান শিল্প ও বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পথেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আজও প্রায় আট দশক ধরে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামেই রয়েছে।

চট্টগ্রামে কার্যক্রম শুরু করার পর ইস্পাহানি গ্রুপ শুধু বাণিজ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তারা পাটশিল্প, বস্ত্রশিল্প, চা শিল্প, শিপিং, কৃষি ও ভোগ্যপণ্য উৎপাদনে ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ করে। Victory Jute Products-কে কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে স্থানান্তর করা হয়। পরে প্রতিষ্ঠা করা হয় Chittagong Jute Manufacturing Company Limited, যা একসময় দেশের বৃহত্তম বেসরকারি পাটকলগুলোর একটি ছিল। ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত Pahartali Hosiery Mills বাংলাদেশের প্রাচীন বস্ত্রশিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম হিসেবে পরিচিত।

বাংলাদেশের চা শিল্পের সঙ্গেও ইস্পাহানির নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। বর্তমানে তাদের মালিকানাধীন মির্জাপুর, গাজীপুর, জারিন এবং নেপচুন—এই চারটি চা বাগান দেশের সবচেয়ে উৎপাদনশীল বাগানগুলোর মধ্যে গণ্য হয়। বহু বছর ধরে চট্টগ্রাম চা নিলামে (Chittagong Tea Auction) সর্বোচ্চ দর পাওয়া চায়ের তালিকায় ইস্পাহানির বাগানগুলোর নাম নিয়মিত উঠে আসে। প্রতিষ্ঠানটি আজও বাংলাদেশের বৃহত্তম বেসরকারি চা ব্যবসায়ীদের অন্যতম।

শিল্প ও বাণিজ্যের পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়নেও ইস্পাহানি পরিবারের অবদান উল্লেখযোগ্য। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং জনকল্যাণমূলক নানা উদ্যোগে তারা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। বিশেষ করে Ispahani Islamia Eye Institute and Hospital দেশের অন্যতম সুপরিচিত অলাভজনক চক্ষু চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।

আজ প্রায় ২০০ বছরেরও বেশি সময় পরও ইস্পাহানি গ্রুপ বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন এবং ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। আর চট্টগ্রামের ইতিহাসে তাদের পরিচয় শুধু একটি কোম্পানি হিসেবে নয়; বরং এমন একটি ব্যবসায়িক উত্তরাধিকার হিসেবে, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বন্দরনগরীর শিল্পায়ন, বাণিজ্যের বিস্তার এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিকাশের দীর্ঘ পথচলা। @ Sheikh Shahriar Kamal Bhuiyan


31


সৌদি রাজবংশের অন্ধকার ইতিহাসঃ

মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর জীবদ্দশাতেই আরব ভূমির প্রায় সবটাই মুসলমানদের শাসনাধীন চলে এসেছিল। প্রায় সব গোত্র মদিনা রাষ্ট্রের শাসন মেনে নিয়েছিল।মহানবী (সা.)–এর ইন্তেকালের পর প্রথম খলিফা হিসেবে হজরত আবু বকর (রা.) দায়িত্ব নেন এবং এর পরপরই আরবের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন গোষ্ঠী বিদ্রোহ শুরু করে বসে। কেউ কেউ নিজেদের নবী পর্যন্ত দাবি করে বসেন।

তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিধর বিদ্রোহী ছিল ইয়ামামা এলাকার (বর্তমান রিয়াদ শহরের ৪০ মাইল দক্ষিণ-পূর্বের আল-খার্জ ও তার আশপাশের এলাকা) ভণ্ড নবী মুসাইলামাতুল কাজ্জাব। বিদ্রোহ দমনে খলিফা তাঁর ‘আনডিফিটেড জেনারেল’ খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-কে পাঠালেন।

মুসাইলামা ছিলেন বনু হানিফা গোত্রের লোক। এটি যুদ্ধবাজ গোত্র ছিল। ৬৩২ সালের ডিসেম্বরে ইয়ামামার যুদ্ধে খালিদ বিন ওয়ালিদ মুসাইলামা এবং তাঁর বনু হানিফাকে এমনভাবে পরাস্ত করলেন যে গোত্রটি পরের এক হাজার বছর পর্যন্ত আর উঠে দাঁড়াতে পারেনি।

তবে এক হাজার বছর পর সেই বনু হানিফা থেকে এমন একজন নেতা উঠে আসেন, যাঁর উত্তরসূরিরা আরবের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর হিসেবে কয়েক শতাব্দী ধরে টিকে আছেন। সেই নেতার নাম মুহাম্মদ বিন সৌদ।

১৬৮৭ সালে জন্ম নেওয়া মুহাম্মদ বিন সৌদ রিয়াদের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকণ্ঠের দিরিয়াহ এলাকার আমির ছিলেন। ১৭২৭ সালে আমির পদে বসেছিলেন তিনি। তাঁর পূর্বপুরুষেরাও দিরিয়াহর শাসক ছিলেন।

মুহাম্মদ বিন সৌদ যখন আমির, তখন আরবের বিরাট অংশের দখল ছিল উসমানীয় সালতানাতের হাতে। তবে কিছু কিছু এলাকা দুর্গম হওয়ায় সেগুলো উসমানীয়দের দখলমুক্ত ছিল। এর মধ্যে দিরিয়াহও ছিল।

উসমানীয়রা মূলত হানাফি মাজহাবের অনুসারী ও কিছুটা সুফি ঘরানার ছিলেন। তাঁরা মক্কা ও মদিনার ধর্মীয় বিষয়গুলোয় চার সুন্নি মাজহাবকেই (হানাফি, মালিকি, শাফিই, হাম্বলি) সরকারি স্বীকৃতি দিতেন।

উসমানীয়দের এই ধর্মীয় আক্বিদার বিরোধিতা করে ওই সময় একজন ব্যক্তি প্রচার চালানো শুরু করলেন। তাঁর নাম মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব নাজদি ইবনে সুলাইমান আত-তামিমি (১৭০৩-১৭৯২)। তিনি ছিলেন মধ্য আরবের নাজদ অঞ্চলের একজন ধর্মীয় নেতা ও সংস্কারক।

বর্তমানে সৌদি আরবের সরকারি ধর্মীয় মতবাদ যে ওয়াহাবি ধারার, তিনি সেই ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর সমর্থকেরা তাঁকে ইসলামের বিশুদ্ধ তওহিদ পুনঃপ্রতিষ্ঠাকারী মনে করেন। আর তাঁর বিরোধীরা তাঁকে অতিরিক্ত কঠোর এবং ঐতিহ্যবিরোধী সংস্কারক হিসেবে দেখেন।

আবদুল ওয়াহাবের নতুন মতবাদ প্রচারের কথা উসমানীয় শাসকদের কানে যেতেই তাঁরা তাঁর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করলেন। গ্রেপ্তার এড়াতে ওয়াহাব দিরিয়াহর আমির মুহাম্মদ বিন সৌদের কাছে গিয়ে আশ্রয় চাইলেন।

মুহাম্মদ বিন সৌদ তাঁকে শুধু আশ্রয় দিলেন না, নিজের ছেলে আবদুলআজিজ বিন মুহাম্মদের সঙ্গে ওয়াহহাবের মেয়ে আমিনা বিনতে ওয়াহাবের বিয়ে দিয়ে দিলেন। দুই ‘মুহাম্মদ’ বেয়াই হয়ে গেলেন।

‘দিরিয়াহ চুক্তি’ নামের একটি চুক্তির মধ্য দিয়ে দুই বেয়াই ১৭৪৪ সালে (মতান্তরে ১৭৪৫ সালে) একটি জোট গড়ে তুললেন। ঠিক হলো, নতুন এই শাসনব্যবস্থার প্রশাসনিক ও সামরিক দিকটি দেখবে সৌদি বংশ; আর ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসনের বিষয়গুলো দেখবে ওয়াহাবি বংশ।

একদিকে ওয়াহাবিদের ধর্মীয় খানদান, আরেক দিকে সৌদিদের সামরিক খানদান। দুই খানদান মিলে আজকের রিয়াদকেন্দ্রিক দিরিয়াহতে এক মজবুত আমিরাত কায়েম করল। এই শাসনই ‘প্রথম সৌদি রাষ্ট্র’।

@-Naz Zain



32


ভাত খেলেও কেন জাপানিদের ওজন বাড়ে না?

জাপানিরা এমনভাবে খাওয়াদাওয়া ও শরীরচর্চা করেন যাতে তাদের ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে

আমাদের দেশে ওজন কমানোর প্রসঙ্গ আসলেই সবার আগে খাদ্যতালিকা থেকে বাদ পড়ে ‘ভাত’। কার্বোহাইড্রেটের এই প্রধান উৎসটিকে স্থূলতা বা মোটা হওয়ার অন্যতম বড় শত্রু মনে করা হয়। তবে ডায়েটের সময় এই প্রচলিত ধারণাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলেছে জাপান। জাপানিরা প্রায় প্রতি বেলাতেই প্রধান খাবার হিসেবে ভাত খায়। তা সত্ত্বেও তারা মোটা হয় না।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জাপানে স্থূলতার হার মাত্র ৪.৬%। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই হার প্রায় ৪০.৩%। ভাত খেয়েও জাপানিদের এই ফিট ও স্লিম থাকার রহস্য লুকিয়ে আছে তাদের খাবারের পরিমাণ, শারীরিক সক্রিয়তা এবং খাদ্যের প্রতি এক অনন্য শৃঙ্খলার মধ্যে।

ভাতের পাশাপাশি মিসো স্যুপ গ্রহণ

জাপানিদের খাবারের থালায় ভাতের পাশাপাশি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ‘মিসো স্যুপ’। তারা দিনে অন্তত দুই থেকে তিনবার এই স্যুপ পান করে থাকে। এভাবে মূল খাবার বা ভারী খাবার খাওয়ার আগে স্যুপ দিয়ে শুরু করলে সামগ্রিক ক্যালোরি গ্রহণের পরিমাণ প্রায় ২০% পর্যন্ত কমে যায়। স্যুপ একটি তৃপ্তির অনুভূতি তৈরি করে, যা পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমায়।

এছাড়া, জাপানিরা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডসমৃদ্ধ খাবারও প্রচুর পরিমাণে খায়, যা দীর্ঘ জীবনের জন্য খুব দরকারি। আরেকটি আশ্চর্য ব্যাপার হলো, তারা মার্কিনদের তুলনায় ৫ গুণ বেশি ক্রুসিফেরাস সবজি (যেমন ব্রকলি, বাঁধাকপি, ফুলকপি ইত্যাদি) খায়।

তাতামি ম্যাট

জাপানি সংস্কৃতির একটি অনন্য দিক হলো মেঝেতে বসে খাবার খাওয়া। ঐতিহ্যবাহী এই মেঝের আসনকে বলা হয় ‘তাতামি ম্যাট’। পশ্চিমা দেশগুলোতে বা আধুনিক ডাইনিং টেবিল ও সোফায় বসার যে আরামদায়ক অভ্যাস, তার চেয়ে তাতামি ম্যাটে বসার ধরন একদম আলাদা। মেঝেতে বসার কারণে শরীরের গভীরের সুনির্দিষ্ট কিছু পেশি সক্রিয় থাকে, যা তাদের অজান্তেই প্রতিদিনের হালকা শারীরিক মুভমেন্ট বা ক্যালোরি বার্নিংয়ে সাহায্য করে।

জাপানি শিশুদের একদম ছোটবেলা থেকেই একটি বিশেষ পাঠ দেওয়া হয় - খাবার কখনো অপচয় করা যাবে না। বাটিতে ভাত ফেলে রাখা কিংবা অতিরিক্ত খাবার চেয়ে নিয়ে তা শেষ না করাকে জাপানি সমাজে অত্যন্ত নেতিবাচক ও অসম্মানজনক আচরণ হিসেবে দেখা হয়। ফলে তারা শুরু থেকেই পরিমিত খাবার নেয়।

জাপানিরা দেহভঙ্গি ঠিক রাখে

জাপানিদের দেহভঙ্গি খুব সুন্দর। ঐতিহ্যগতভাবে তারা সেইজা ভঙ্গিতে বসেন। সেইজা মানে গোড়ালির ওপর ভর দিয়ে হাঁটু মুড়ে বসা, এটাই জাপানের আনুষ্ঠানিকভাবে বসার রীতি এটা আসলে আমাদের সবার প্রাকৃতিক বসার ভঙ্গি। কিন্তু আমরা সারা দিন চেয়ারে বসে থাকি, যা শরীরের জন্য অস্বাভাবিক ও ক্ষতিকর। পশ্চিমা স্টাইলে দীর্ঘ সময় বসে থাকা আমাদের পেশি ও হাড়ের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলে।

মুখরোচক খাবার এড়িয়ে চলে

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, জাপানিদের মধ্যে দুই বেলার মাঝবর্তী সময়ে মুখরোচক স্ন্যাকস বা খাওয়ার অভ্যাস নেই বললেই চলে। এমনকি রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বা জনসমক্ষে কোনো কিছু খাওয়াকে সেখানে সামাজিকভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত বা অনুচিত আচরণ মনে করা হয়। জাপানিরা এমন খাবার খায়, যা সহজে হজম হয় ও অন্ত্রের ক্ষতি করে না। তাই তাদের শরীর সাধারণত অনেক বেশি সুস্থ থাকে। তারা প্রচুর ফারমেন্টেড খাবার (যেমন মিসো ও কিমচি) খেয়ে থাকে, যা হজমের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এ ছাড়া জাপানিরা পরিমাণে কম খায়। ফলে তাদের হজমপ্রক্রিয়াকে কখনো অতিরিক্ত চাপ নিতে হয় না এবং শরীর হালকা থাকে।

খাবারের পেছনে খরচের খতিয়ান দেখলেও পশ্চিমা বিশ্বের সাথে জাপানের আকাশ-পাতাল তফাত চোখে পড়ে। যেমন, মার্কিন নাগরিকরা তাদের খাদ্য বাজেটের প্রায় অনেকাংশে খরচ করে প্রক্রিয়াজাত জাঙ্ক ফুডের পেছনে, যার মধ্যে কেবল সোডা বা কোমল পানীয়র পেছনেই যায়স। বিপরীতে, জাপানিরা এই ধরনের অভ্যাস থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকে।

গরম পানিতে গোসল

জাপানিরা ঠান্ডা পানিতে গোসল করেন না। গরম পানিতে স্নান করলে শরীরে ‘হিট শক প্রোটিন’ তৈরি হয়। এই প্রোটিন মেদ ঝরার প্রক্রিয়াকে তরান্বিত করে।

‘হারা হাচি বু’ পন্থা

কখনো পেট ঠেসে খাবার খান না তারা। যখনই মনে হয় পেটের ৮০% ভরে গিয়েছে, তখন খাওয়া থামিয়ে দেন। জাপানি ভাষায় এই পন্থার নাম ‘হারা হাচি বু’। খাবার যতই লোভনীয় হোক না কেন, ঠিক সংযম বজায় রেখে চলেন তারা।

ব্যস্ত জীবনযাপন করেও নিয়মিত ব্যায়াম করে

ওজন কমাতে জাপানিদের আলাদা করে কোনো জিমে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। জাপানে গাড়ি রাখা বেশ ব্যয়সাপেক্ষ, একধরনের বিলাসিতা। ফলে কর্মস্থলে যাতায়াতের জন্য তাদের হাঁটতে হয়, সাইকেল চালাতে হয় কিংবা ট্রেনে চড়তে হয়। আর ট্রেনেও জায়গার অভাবে তারা দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে সারা দিনে তারা অনেক হাঁটাহাঁটি ও দাঁড়িয়ে থাকে। দিনে যত বেশি সময় বসে কাটাবেন, আপনার আয়ুও তত কমবে। জাপানিরা যেহেতু বেশি হাঁটে ও দাঁড়িয়ে থাকে, তাই তারা দীর্ঘায়ু। তাছারা কোনো পরিকল্পিত জিম ছাড়াই স্বাভাবিক নিয়মে প্রতিদিন কিলোমিটারের পর কিলোমিটার হাঁটা বা সাইকেল চালানোর ফলে প্রাকৃতিকভাবেই তাদের শরীরের মেদ ঝরে যায়।

জাপানিদের এই জীবনধারা একটি চিরন্তন সত্যকেই সামনে আনে - স্থূলতা কিংবা ওজন বাড়ার পেছনে ‘ভাত’ মূল কারণ নয়। বরং খাবারের পরিমাপ নিয়ন্ত্রণ, প্রক্রিয়াজাত খাবার বর্জন এবং প্রাত্যহিক জীবনের ছোট ছোট শারীরিক সক্রিয়তাই সুস্থ ও স্লিম থাকার আসল মূলমন্ত্র।

Dhaka Tribune


33


খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে খাওয়ার উপকারিতা

খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে খাওয়া আপনার স্বাস্থ্যের দারুণ উন্নতি ঘটাতে পারে। বিশেষজ্ঞরা প্রতিটি গ্রাস প্রায় ৩০ বার চিবিয়ে খাওয়ার পরামর্শ দেন এবং গবেষণাও এই পরামর্শকে সমর্থন করে।

কেন ভালোভাবে চিবিয়ে খাওয়া জরুরি?

সহজ হজম ও পুষ্টি শোষণ: বেশি চিবানোর ফলে খাবার ছোট ছোট টুকরোতে ভেঙে যায়। এটি আপনার শরীরকে খাবার আরও সহজে হজম করতে এবং শাকসবজি থেকে ভিটামিন ও বাদাম থেকে ফ্যাটের মতো পুষ্টি আরও বেশি শোষণ করতে সাহায্য করে।

ওজন নিয়ন্ত্রণ: এটি এমন কিছু হরমোনকে সক্রিয় করে যা আপনাকে দ্রুত পেট ভরার অনুভূতি দেয়। এর ফলে আপনি স্বাভাবিকভাবেই কম ক্যালরি গ্রহণ করেন।

গ্যাসের অস্বস্তি দূর করে: খুব দ্রুত খাওয়ার প্রভাব ঠিক এর বিপরীত। দ্রুত খাওয়ার সময় আপনি অতিরিক্ত বাতাস গিলে ফেলেন, যার কারণে প্রায়শই ঢেঁকুর ওঠে এবং পরে পেটে অস্বস্তি হয়।

ধীরে-সুস্থে এবং ভালোভাবে চিবিয়ে খেলে তা হজমশক্তি বাড়ায়, ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং খাবারকে আরও তৃপ্তিদায়ক করে তোলে। আপনার পরবর্তী খাবার খাওয়ার সময় এটি চেষ্টা করে দেখুন- আপনার শরীর আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে।

@ Plabon Sarkar


34


এআই দিয়ে একটি ছবি বানাতে লাগে দুই গ্লাস পানি!

পৃথিবীর যেকোনো ব্যক্তি, যেকোনো স্থান থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে একটি অনুরোধ করলে, সেই অনুরোধ রাখতে উপাত্তকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে হয় তার। উপাত্ত খুঁজে বের করা ও তা প্রক্রিয়াজাত বা প্রসেস করতে অসংখ্য গণনা ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। এই ডিজিটাল প্রক্রিয়াকরণ থেকে তৈরি হয় তাপ। অতিরিক্ত এই তাপ তাই বিকিরণ করতে হয় যন্ত্রকে সচল ও সমর্থ রাখতে। 

গত এক দশকে উপাত্তকেন্দ্রের ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। আর এ কারণে, বায়ুভিত্তিক শীতলীকরণ অপ্রতুল হয়ে দাঁড়ায়, আর দরকার হয় তরলভিত্তিক শীতলীকরণের। এর কারণ, পানির তাপ শোষণ ক্ষমতা বায়ুর প্রায় ৪ হাজার গুণ।

এই শীতলীকরণ প্রক্রিয়া চালু রাখতে পানির দরকার পড়ছে দুটি ধাপে। প্রথমটি ডিজিটাল উপকরণের সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শে থাকা ‘ডিরেক্ট-টু-চিপ’ কুলিং প্রযুক্তিতে পানি ও গ্লাইকল মিশ্রণে, আর দ্বিতীয়টি এই মিশ্রণ থেকে তাপ সরাবার জন্য সরাসরি পানির ব্যবহারে।

অর্থাৎ আপনার যেকোনো অনুরোধ মেটাতে যে গণনা সম্পাদন করতে হয়, এর পরিণাম হিসেবে সুপেয় পানি উত্তোলন আর ব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ২০২৫ সালে এক ডাচ গবেষকের হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে উপাত্তকেন্দ্রগুলোর শীতলীকরণে দরকার পড়েছে প্রায় ৫৫০ বিলিয়ন লিটার পানি, যা কিনা পৃথিবীর তাবৎ বোতলজাত সুপেয় পানির বার্ষিক পরিমাণের সমান!

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে একটি ই–মেইল ড্রাফট করাতে এবং তা ১০ বার সংশোধন করাতে খরচ হবে এক গ্লাস পানি।

একইভাবে, একটি ছবি একবার তৈরি করাতে খরচ হবে কমপক্ষে দুই গ্লাস এবং একটি ১০ সেকেন্ডের ভিডিও একবার তৈরিতে ২০ গ্লাস সুপেয় পানি খরচ করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। তাই অবসরে সময় কাটাতে কিংবা অপ্রয়োজনে কেবল বিনোদনের জন্য জেমিনাইকে ব্যবহার করার আগে একবার অন্তত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অনন্ত জলতৃষ্ণার কথা আমাদের ভাবা উচিত।

আমাদের জীবনের সঙ্গে কম্পিউটার প্রযুক্তির মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও অবশ্যম্ভাবীভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এর ব্যবহার বাড়তেই থাকবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে যেকোনো অনুরোধ বা জিজ্ঞাসার সময় মনে রাখা দরকার যে এই প্রতিটি উত্তর তৈরি করার পেছনে রয়েছে বিদ্যুৎ, তাপ আর জলের অপরিহার্যতা।  @ নাভিদ সালেহ 

35


বাংলাদেশেও এই বাস্তবতা ক্রমশ সামনে আসছে। বড় বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় উত্তরণ। ইউরোপের বিভিন্ন পুনর্গঠন ব্যবস্থার মূল দর্শন হলো, একটি কার্যকর ব্যবসাকে বাঁচিয়ে রাখা। কারণ একটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর পতন শুধু মালিকের ক্ষতি নয়; এর সঙ্গে জড়িত থাকে কর্মসংস্থান, সরবরাহ ব্যবস্থা, ব্যাংক ঋণ এবং সামগ্রিক অর্থনীতি। পৃথিবীর পারিবারিক ব্যবসার ইতিহাসে দ্বিতীয় প্রজন্মে টিকে থাকে প্রায় ৩০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান। তৃতীয় প্রজন্মে সেই সংখ্যা নেমে আসে ১২ শতাংশের কাছাকাছি। কারণ ব্যবসা পরিচালনা করা আর ব্যবসা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এক জিনিস নয়। বাংলাদেশেও এই বাস্তবতা ক্রমশ সামনে আসছে। বড় বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় উত্তরণ।



36



আপেল সাইডার ভিনেগার কোনো জাদুকরী পানীয় নয়। এর কিছু সুনির্দিষ্ট ক্লিনিক্যাল বেনিফিট যেমন আছে, তেমনি কিছু মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিও রয়েছে। চলুন চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে এর আদ্যোপান্ত জেনে নেওয়া যাক।

মেটাবলিক স্বাস্থ্য উন্নত করতে এবং প্রাকৃতিকভাবে শরীরকে সুস্থ রাখতে যে কয়েকটি অর্গানিক উপাদান বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণিত, তার মধ্যে আপেল সাইডার ভিনেগার (ACV) অন্যতম শীর্ষস্থানীয়।

আপেল সাইডার ভিনেগার (ACV) আসলে কী?

আপেল সাইডার ভিনেগার মূলত আপেলের রসে ইস্ট (Yeast) এবং ব্যাকটেরিয়া মিশিয়ে ফারমেন্টেশন বা গাজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় আপেলের শর্করা প্রথমে অ্যালকোহলে এবং পরে অ্যাসিটিক অ্যাসিডে (CH3COOH) রূপান্তরিত হয়। এই অ্যাসিটিক অ্যাসিডই মূলত ভিনেগারের মূল কার্যকরী উপাদান।

সবচেয়ে ভালো মানের ভিনেগার হলো "র' এবং আনফিল্টারড" (Raw and Unfiltered) ভিনেগার, যার নিচে ঘোলাটে একটি আস্তরণ থাকে। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় "মাদার" (The Mother)। এই মাদারে থাকে প্রচুর পরিমাণে উপকারী প্রোবায়োটিক (উপকারী ব্যাকটেরিয়া), এনজাইম এবং প্রোটিন যা অন্ত্রের স্বাস্থ্যের (Gut Health) জন্য দারুণ উপকারী।

কাদের আপেল সাইডার ভিনেগার খাওয়া উচিত?

যারা প্রাকৃতিকভাবে মেটাবলিজম ঠিক রাখতে চান বা নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন, তাদের জন্য ACV চমৎকার কাজ করে:

ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং প্রি-ডায়াবেটিক রোগী:

গবেষণায় দেখা গেছে, শর্করা জাতীয় খাবার খাওয়ার পর আপেল সাইডার ভিনেগার পোস্টপ্রান্ডিয়াল গ্লাইসেমিয়া (খাবারের পর রক্তে শর্করার আকস্মিক বৃদ্ধি) কমাতে সাহায্য করে। এটি ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বাড়ায়, ফলে মেটাবলিক সিনড্রোম নিয়ন্ত্রণে এটি দারুণ কার্যকরী।

ওজন নিয়ন্ত্রণে আগ্রহীরা:

অ্যাসিটিক অ্যাসিড আমাদের পরিপাকতন্ত্রে গ্যাস্ট্রিক এম্পটিং (পাকস্থলী থেকে খাবার অন্ত্রে যাওয়ার প্রক্রিয়া) ধীর করে দেয়। ফলে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকার অনুভূতি হয় (Satiety) এবং অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমে যায়।

হাইপোক্লোরহাইড্রিয়া (Hypochlorhydria) বা লো-স্টমাক অ্যাসিডের রোগী:

অনেকের পাকস্থলীতে প্রাকৃতিকভাবেই অ্যাসিডের পরিমাণ কম থাকে, ফলে প্রোটিন ঠিকমতো হজম হয় না এবং বদহজম হয়। খাওয়ার আগে পাতলা করা ACV খেলে পাকস্থলীর অ্যাসিডিক পরিবেশ উন্নত হয় এবং হজমপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়।

পিসিওএস (PCOS) আক্রান্ত নারী:

পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমের মূল কারণগুলোর একটি হলো ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স। যেহেতু ACV ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ায়, তাই এটি পরোক্ষভাবে হরমোনাল ব্যালেন্স ফেরাতে সাহায্য করে।

কাদের আপেল সাইডার ভিনেগার ভুলেও খাওয়া উচিত নয়?

কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক অবস্থায় আপেল সাইডার ভিনেগার মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে:

পেপটিক আলসার ডিজিজ (PUD) ও তীব্র গ্যাস্ট্রিকের রোগী:

যাদের পাকস্থলী বা অন্ত্রে আলসার আছে, অথবা ইসোফ্যাগাসে (খাদ্যনালী) প্রদাহ বা GERD আছে, তাদের জন্য এটি বিষের সমতুল্য। অ্যাসিটিক অ্যাসিড আলসারের ক্ষত বা মিউকোসাল লাইনিংকে (পাকস্থলীর ভেতরের আবরণ) আরও পুড়িয়ে দিতে পারে।

ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (CKD) বা কিডনি ফেইলিউরের রোগী:

কিডনির অন্যতম কাজ হলো শরীরের অ্যাসিড-বেইজ ভারসাম্য (Acid-base balance) রক্ষা করা। কিডনি রোগীরা অতিরিক্ত অ্যাসিডিক খাবার শরীর থেকে বের করতে পারেন না। ফলে ACV খেলে রক্তে অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।

হাইপোক্যালেমিয়া (Hypokalemia) বা রক্তে পটাশিয়ামের ঘাটতি যাদের আছে:

অতিরিক্ত আপেল সাইডার ভিনেগার রক্ত থেকে পটাশিয়াম বের করে দেয়। পটাশিয়াম কমে গেলে হৃদস্পন্দনে অস্বাভাবিকতা (Arrhythmia) এবং পেশিতে টান লাগার মতো মারাত্মক সমস্যা হতে পারে।

ডায়াবেটিক গ্যাস্ট্রোপেরেসিস (Diabetic Gastroparesis) রোগী:

দীর্ঘদিন ডায়াবেটিস থাকলে অনেকের পাকস্থলীর নার্ভ ড্যামেজ হয়ে যায়, ফলে খাবার এমনিতেই দেরিতে হজম হয়। যেহেতু ACV গ্যাস্ট্রিক এম্পটিং আরও ধীর করে দেয়, তাই এই রোগীদের ক্ষেত্রে এটি বমি বমি ভাব, পেট ফাঁপা এবং বুক জ্বালাপোড়া বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

যারা নির্দিষ্ট কিছু ঔষধ সেবন করছেন:

যারা ডাইউরেটিকস (প্রস্রাব বাড়ানোর ঔষধ যেমন: Furosemide) বা ইনসুলিন নিচ্ছেন, তারা ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ACV খাবেন না। কারণ ঔষধ এবং ভিনেগার একসঙ্গে রক্তে পটাশিয়াম বা সুগার বিপজ্জনক মাত্রায় কমিয়ে দিতে পারে।

খাওয়ার সঠিক নিয়ম ও সতর্কতা

আপেল সাইডার ভিনেগার কখনোই সরাসরি বা কাঁচা খাওয়া যাবে না। এর উচ্চমাত্রার অ্যাসিড দাঁতের এনামেল ক্ষয় করে দিতে পারে এবং খাদ্যনালীতে পুড়ে যাওয়ার মতো ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে।

সঠিক পদ্ধতি:

১ গ্লাস (২৫০-৩০০ মিলি) কুসুম গরম বা সাধারণ তাপমাত্রার পানিতে ১-২ চা চামচ (সর্বোচ্চ ১ টেবিল চামচ) আনফিল্টারড ACV মেশান।

দাঁতের সংস্পর্শ এড়াতে অবশ্যই স্ট্র (Straw) ব্যবহার করে পান করবেন।

খাওয়ার পরপরই সাধারণ পানি দিয়ে কুলকুচি করে মুখ ধুয়ে ফেলুন। ব্রাশ করবেন না, কারণ অ্যাসিডের কারণে এনামেল নরম থাকে, তখন ব্রাশ করলে দাঁত ক্ষয় হতে পারে।

সেরা ফলাফলের জন্য ভারী খাবার খাওয়ার ১৫-২০ মিনিট আগে পান করুন।

@ সুরাইয়া নাজনীন তুলি/Abdur Rahman 


37



রাতে ভাত খেলে কি আসলেই ওজন বাড়ে?

আমাদের মধ্যে খুব সাধারণ একটি ধারণা প্রচলিত আছে— "ওজন কমাতে চাইলে রাতে ভাত খাওয়া একদম বন্ধ করে দিতে হবে।" কিন্তু একজন পুষ্টিবিদ হিসেবে আমি বলি, কোনো নির্দিষ্ট খাবার একা কখনো আপনার ওজন বাড়ায় না!

ভাত কোনো সমস্যা নয়, আসল সমস্যা হলো আমাদের খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রার ভারসাম্যহীনতা (Imbalance)।

ওজন বাড়ে মূলত দুটি কারণে:

১. ক্যালরির ভারসাম্যহীনতা: আপনার শরীরে সারাদিনে যতটুকু ক্যালরি প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি ক্যালরি গ্রহণ করলে।

২. শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা: পর্যাপ্ত পরিমাণে Physical Activity বা হাঁটাচলা না করা।

তাই রাতে পরিমিত পরিমাণে ভাত খেয়েও সুস্থ থাকা এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা পুরোপুরি সম্ভব।

Late Night Overeating Avoid করুন: রাতে ঘুমানোর ঠিক আগমুহূর্তে বা মাঝরাতে অতিরিক্ত খাবার (যেমন: স্ন্যাক্স, মিষ্টি বা ফাস্টফুড) খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। ঘুমানোর অন্তত ২-৩ ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করার চেষ্টা করুন।

খাবার বাদ দেওয়া কোনো সমাধান নয়, বরং সঠিক পরিমাণে সঠিক খাবার বাছাই করাই হলো সুস্থতার চাবিকাঠি।কোন বেলার খাবার skip করা ঠিক নয়।


রাতে দেরিতে খাওয়ার অভ্যাস কি আপনার শরীরকে নীরবে ক্ষতি করছে?

অনেকেই ব্যস্ততার কারণে রাত ১০টার পর খাবার খান। কিন্তু জানেন কি? এই ছোট্ট অভ্যাসই ধীরে ধীরে আপনার লিভারের বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে!

রাত জাগা + দেরিতে খাওয়া = লিভারের জন্য বিপদের সংকেত

আমাদের শরীরের হজম প্রক্রিয়া রাতে অনেক ধীর হয়ে যায়। ফলে রাত করে খাবার খেলে খাবার ঠিকভাবে হজম হতে পারে না এবং শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমতে শুরু করে। দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলে তৈরি হতে পারে Fatty Liver, ওজন বৃদ্ধি, এমনকি ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও।

রাত ১০টার পর খাবারের অভ্যাস থাকলে সতর্ক হওয়া জরুরি

ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়

রাতে শরীরের পরিপাক ক্ষমতা কমে যায়

ইনসুলিনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে শরীরে সমস্যা তৈরি হয়

অতিরিক্ত ক্যালোরি শরীরে চর্বি হিসেবে জমা হয়

লিভারের কোষ ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে

অতিরিক্ত ওজন ও ডায়াবেটিসের সম্ভাবনা তৈরি হয়

কেন রাতে দেরিতে খাওয়া ক্ষতিকর?

রাতে শরীর বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত থাকে। তখন বেশি ক্যালোরিযুক্ত খাবার খেলে শরীর তা শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে না। ফলাফল হিসেবে সেই অতিরিক্ত ক্যালোরি চর্বি হয়ে লিভার ও শরীরের বিভিন্ন অংশে জমে যায়। এভাবেই শুরু হয় Fatty Liver-এর মতো নীরব সমস্যা।

নিজেকে সুস্থ রাখতে যা করবেন:

রাত ৮টা–৯টার মধ্যে রাতের খাবার শেষ করুন

ঘুমানোর অন্তত ২–৩ ঘণ্টা আগে খাবার খেয়ে নিন

তৈলাক্ত ও অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার বাদ দিন।

প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন

নিয়মিত হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করুন

ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন

পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন

@ সুরাইয়া নাজনীন তুলি 



38


কয়েকদিন ধরে ভিমরুল, বোলতা ও মৌমাছি ঢুকেছে মাথার মধ্যে এগুলোর আদ্যোপান্ত জানার চেষ্টা করছি। বিভিন্ন ভিডিও ও এআই ব্যবহার করে যা যা জেনেছি তার মধ্য থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

১. এই সামাজিক প্রাণীগুলো যে রানি ভিত্তিক বাসা গড়ে তুলে সে-কথা সম্ভবত সবাই জানে। কিন্তু মজার তথ্য হলো রানি ঠিক মানুষের রাজা-রানির মতো সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নয়, বরং শ্রমিক ভিমরুল/ মৌমাছির নির্ধারিত এক প্রতিনিধি যার কাজ ডিম পাড়া ও ডিমকে ফার্টিলাইজ করা। আরো ভালো করে বলতে গেলে সে শ্রমিকদের কাছে জিম্মি। সবকিছু নির্ধারণ করার ক্ষমতা শ্রমিকদের।

একটা মজার তথ্য হলো, যদি শ্রমিকরা মনে করে বাসা পরিবর্তন করতে হবে, তারা সেলগুলো পরিষ্কার করা বন্ধ করে দেয়, ফলে রানি ডিম পাড়তে পারে না। একইসঙ্গে রানির খাবার বন্ধ করে দেয় যাতে সে হালকা হয় এবং উড়তে পারে।

সেলের সাইজ পরিবর্তন করে শ্রমিকরাই ঠিক করে দেয় রানি কোন সেলের ডিম নিষিক্ত করবে আর কোনটা করবে না। শ্রমিকরা কোনো সেলের সাইজ বড়ো করলে রানি সেখানে পুরুষ তৈরির জন্য অনিষিক্ত ডিম পাড়তে বাধ্য।

২. এক বাসায় সাধারণত একটাই রানি থাকে। মৌমাছির ক্ষেত্রে রানি দুর্বল হয়ে গেলে শ্রমিকরা নতুন রানি তৈরির প্রজেক্ট নেয়, সোজা কথায় ক্যু করার প্লট করে। অনেক সময় মেরেও ফেলে। না মারলেও মেইন রানিকে নতুন রানির প্রজেক্ট সম্পর্কে জানানো হয় না, কারণ তাহলে সে নতুন রানি জন্মাবার আগেই মেরে ফেলতে পারে। নতুন রানি জন্মালে শ্রমিকরা পুরোনো রানিকে মেরে ফেলে, অথবা দুই রানির যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে একজন মারা যেতে পারে, অথবা এক রানি কিছু বিদ্রোহী শ্রমিক নিয়ে নতুন বাসার সন্ধানে যায়। একসঙ্গে একাধিক নতুন রানি জন্মালেও যুদ্ধ অনিবার্য ও একজনের বাসা ত্যাগ ঘটে থাকে।

ভিমরুল ও বোলতার ক্ষেত্রে একসঙ্গে অনেক নতুন রানি ও পুরুষ জন্মানো হয় শীতের আগে আগে, কারণ শীতকালে সব পুরোনো রানি, শ্রমিক ও পুরুষ মারা যায়। বেঁচে থাকে কেবল নতুন রানিগুলো। তারা ঘরের কোণাকাঞ্চিতে ঢুকে সার্ভাইব করে, তারপর বসন্ত এলে একা একাই বাসা গড়ে তুলে, ডিম পাড়ে ও নতুন কলোনি গড়ে তুলে।

৩. রানি মৌমাছি/ভিমরুল/বোলতা নিজেই নিজের ডিম নিষিক্ত করে। এর জন্য কোনো পুরুষ মৌমাছির দরকার পড়ে না। রানী (ভার্জিন কুইন) তার জীবনের শুরুতে (জন্মের দুই সপ্তাহ পরে) অনেকগুলো পুরুষের সঙ্গে মিলিত হয়ে শরীরে স্পার্ম জমা করে রাখে। এই স্পার্ম দিয়ে সে সারা জীবন (মৌমাছির ক্ষেত্র ৩/৫ বছর, ভিমরুল ও বোলতার ক্ষেত্রে ৮/৯ মাস) হাজার/লক্ষ ডিম নিষিক্ত করতে পারে।

৪. প্রত্যেক বাসাতেই বেশ কিছু পুরুষ থাকে, কিন্তু ইনব্রিডিং এড়ানোর জন্য এগুলোর সঙ্গে একই বাসার রানি মিলিত হয় না। পুরোনো রানিরা তো এমনিতেই কোনো পুরুষের সঙ্গে মিলিত হয় না, ভার্জিন রানিরা মিলিত হয় বাসা থেকে এমন একটা দূরত্বে গিয়ে যেখানে একই বাসার পুরুষরা (বস্তুত ভার্জিন রানির ভাইয়েরা) যেতে পারে না। পুরুষ মৌমাছির এনার্জি রিজার্ভ তুলনামূলক কম বলে খুব বেশিদূর অতিক্রম করতে পারে না, এজন্যই তাদের বোনেরা মিলনের জন্য এমন একটা দূরত্বে যায় যেখানে তার ভাইয়েরা যেতে পারবে না। এভাবে মৌমাছি অ্যাকসিডেন্টাল ইনব্রিডিং এড়িয়ে থাকে।

এখানে বলা প্রয়োজন যে, মৌমাছির মিলনের জন্য প্রত্যেক এলাকায় ড্রোন কংগ্রিগেশন এরিয়া আছে যেখানে বিভিন্ন বাসা থেকে পুরুষরা গিয়ে জড়ো হয়। ভার্জিন রানিরা সেখানে মিলনের জন্য গেলে পুরুষগুলো তার পেছনে ছোটে এবং প্রথমে যারা পৌঁছাতে পারা তারা রানির সঙ্গে মিলিত হয়। বাকিরা এনার্জি থাকতে থাকতেই বাসায় ফিরে আসে।

আরেকটা ব্যাপার, পুরুষগুলো একবার মিলনের পরেই মারা যায়। মূলত মিলনরত অবস্থায়ই তাদের আধামৃত্যু ঘটে, মিলন শেষে মাটিতে পড়ে যায় এবং মারা যায়। সুতরাং মৌচাকে যে পুরুষগুলো দেখা যায় সেগুলো এখনো হয় ম্যাচিউর হয়নি অথবা এখনও মিলনের সুযোগ পায়নি। বাস্তবতা হলো বেশিরভাগ পুরুষের জীবনেই মিলনের সুযোগ হয় না।

৫. রানি, পুরুষ ও শ্রমিক - সবই কিন্তু একই ডিম দিয়েই তৈরি হয়। শ্রমিক মৌমাছি/ভিমরুল/বোলতা আসলে নারী। রানির সঙ্গে তাদের পার্থক্য হলো রানি তৈরির জন্য শ্রমিকরা আলাদা খাবারের (রয়েল জেলি) ব্যবস্থা করে, ফলে তাদের জেনেটিক পরিবর্তন ঘটে। পুরুষগুলো তৈরি হয় অনিষিক্ত ডিম থেকে, তার মানে সম্পূর্ণরূপে মায়ের (ঐ বাসার রানির) জিন বহন করে।

৬. সকল সতর্কতা এড়িয়েও অ্যাকসিডেন্টাল ইনব্রিডিং ঘটলে শ্রমিক মৌমাছিরা তা টের পেয়ে যায় এবং লার্ভাগুলোকে তারা মেরে খেয়ে ফেলে। যেহেতু একজন রানি ডিম পাড়তে শুরু করার আগে কয়েকটা পুরুষের সঙ্গে মিলিত হয়ে সেগুলোর স্পার্ম সংগ্রহ করে রাখে, সব পুরুষ রানির ভাই হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

ভিমরুল ও বোলতা অবশ্য মৌমাছির চেয়ে অনেক বেশি ইনব্রিডিং টলারেন্ট। এদের মিলনের জন্য ড্রোন কংগ্রিগেশন এরিয়া নেই। আর নতুন জন্মানো রানিরা শীতের আগে আগে পুরুষদের সঙ্গে মিলিত হয় এবং শরীরে জমানো স্পার্ম নিয়ে কোনাকাঞ্চিতে একা একা সার্ভাইব করে। তারপর বসন্তের শুরুতে ডিম পাড়া শুরু করে। @ Samadder Ratan



39



ইসবগুলের জল (Isabgol Water) নাকি চিয়া সিডের জল (Chia Seed Water)—কোনটি বেশি ভালো, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে আপনার শরীরের প্রয়োজন এবং আপনি কী উদ্দেশ্যে এটি খাচ্ছেন তার ওপর। দুটোই স্বাস্থ্যের জন্য দারুণ উপকারী, তবে এদের কাজ কিছুটা ভিন্ন।

​নিচে সহজভাবে দুটোরই উপকারিতা, পার্থক্য এবং কাদের জন্য কোনটি সেরা তা বুঝিয়ে দেওয়া হলো:

​ ১. ইসবগুলের জল (Isabgol Water)

​ইসবগুল মূলত একটি চমৎকার দ্রবণীয় ফাইবার (Soluble Fiber), যা পেটের যেকোনো সমস্যায় ওষুধের মতো কাজ করে।

​ মূল উপকারিতা:

​কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে: এটি পেটে গিয়ে জল শুষে নেয় এবং মল নরম করে মলত্যাগকে সহজ করে।

​অ্যাসিডিটি ও গ্যাস কমায়: পেট ঠান্ডা রাখে এবং বুক জ্বালাপোড়া করা কমায়।

​ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে: অবাক করা বিষয় হলো, টক দইয়ের সাথে ইসবগুল খেলে তা লুজ মোশন বা ডায়রিয়া কমাতেও সাহায্য করে।

​কোলেস্টেরল ও সুগার নিয়ন্ত্রণ: রক্তে কোলেস্টেরল এবং শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।

​ কাদের জন্য সবচেয়ে ভালো?

​যারা দীর্ঘদিন ধরে কোষ্ঠকাঠিন্য  সমস্যায় ভুগছেন।

​যাদের প্রায়ই গ্যাস, অ্যাসিডিটি বা বদহজমের সমস্যা হয়।

​পাইলস বা ফিশারির রোগীদের জন্য এটি অত্যন্ত আরামদায়ক।

​ ২. চিয়া সিডের জল (Chia Seed Water)

​চিয়া সিড হলো একটি "সুপারফুড"। এতে ফাইবারের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, প্রোটিন, ক্যালসিয়াম এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে।

​ মূল উপকারিতা:

​ওজন কমাতে জাদুকরী: চিয়া সিড জল শুষে নিয়ে ফুলে ওঠে। এটি খেলে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকে, ফলে ঘন ঘন খিদে পাওয়ার প্রবণতা কমে এবং ওজন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে।

​প্রচুর এনার্জি দেয়: সকালের কায়িক পরিশ্রম বা ওয়ার্কআউটের জন্য এটি শরীরে দারুণ শক্তি জোগায়।

​ত্বক ও চুলের উজ্জ্বলতা: এর ওমেগা-৩ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বককে ভেতর থেকে গ্লোয়িং করে এবং চুল পড়া কমায়।

​হার্টের সুরক্ষা: এটি শরীরের খারাপ কোলেস্টেরল কমিয়ে হার্ট সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

​ কাদের জন্য সবচেয়ে ভালো?

​যারা ওজন কমাতে (Weight Loss) এবং মেদ ঝরাতে চাইছেন।

​যারা ডায়েট করছেন এবং শরীরে পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করতে চান।

​ত্বক ও চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে চান যারা।

​ দুটোর মধ্যে আসল পার্থক্য কী?

​কাজের দিক থেকে: ইসবগুলের প্রধান কাজ হলো পেটের পরিপাকতন্ত্র বা হজম প্রক্রিয়াকে পরিষ্কার ও শান্ত রাখা। অন্যদিকে, চিয়া সিডের প্রধান কাজ হলো শরীরকে দীর্ঘক্ষণ এনার্জি দেওয়া এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করা।

​পুষ্টির দিক থেকে: ইসবগুলে মূলত ফাইবার থাকে। কিন্তু চিয়া সিডে ফাইবারের সাথে সাথে প্রোটিন, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড এবং নানা রকম খনিজ উপাদান থাকে।

​খাওয়ার সময়: ইসবগুল সাধারণত রাতে ঘুমানোর আগে খাওয়া বেশি উপকারী। আর চিয়া সিড সকালে খালি পেটে বা ওয়ার্কআউটের আগে-পরে খাওয়া সবচেয়ে ভালো।

​ চূড়ান্ত রায় (Conclusion)

​আপনার যদি মূল সমস্যা পেটের গোলমাল বা কোষ্ঠকাঠিন্য হয়, তবে আপনার জন্য ইসবগুলের জল সেরা।

​আর আপনি যদি ওজন কমাতে চান, ফিট থাকতে চান এবং এনার্জি বাড়াতে চান, তবে আপনার জন্য চিয়া সিডের জল সবচেয়ে ভালো।

​বিশেষ টিপস: আপনি চাইলে একদিন ইসবগুল এবং অন্যদিন চিয়া সিড—এভাবে বদলে বদলে দুটোই আপনার লাইফস্টাইলে রাখতে পারেন! তবে যেটাই খান না কেন, সারাদিনে পর্যাপ্ত জল (৩-৪ লিটার) অবশ্যই পান করবেন।

@ Payel Ghosh



40



মানুষের দেহ নানাভাবে সংক্রমিত (ইনফেকশন) হয়। দেহে চষে বেড়ানো ব্যাকটেরিয়া যদি মস্তিষ্কে প্রবেশ করে, তাহলে মৃত্যু প্রায় অনিবার্যই ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু ৯৯ ভাগ ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া মস্তিষ্কে অনুপ্রবেশ করতে পারে না।

মস্তিষ্কের রক্তনালী দেহের অন্যান্য রক্তনালীর তুলনায় একটু আলাদা গঠনের। মস্তিষ্কের রক্তবাহিকার গায়ে এক অদৃশ্য দেয়াল থাকে। নাম ব্লাড ব্রেইন ব্যারিয়ার। এটি কোনো দৃশ্যমান দেয়াল নয়, বরং এন্ডোথেলিয়াল কোষের একটা ঘন স্তর। অন্যান্য এন্ডোথেলিয়াল কোষে ফাঁকফোকর থাকলেও এই ব্যারিয়ারে সেটাও থাকে না।

এই ব্লাড ব্রেইন ব্যারিয়ারের ভেতর দিয়ে মস্তিষ্কের জগতে পুষ্টি, হরমোন প্রবেশ করতে পারে। এমনকি ক্যাফেইন, অ্যালকোহলও প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, টক্সিন ও বেশিরভাগ ওষুধ মস্তিষ্কে ঢুকতে পারে না। মস্তিষ্ককে দুর্গের প্রহরীর মতো রক্ষা করে এই ব্যারিয়ার।

এই ব্যারিয়ারের আবার অসুবিধাও আছে। আলঝাইমার, পারকিনসন বা ব্রেইন টিউমারের মতো রোগ নিরাময়ে প্রধান বাধাই এই ব্যারিয়ার। কেননা, ওষুধ ঢুকতে পারে না। তবে ন্যানোটেক আর কেমিক্যাল ট্রান্সপোর্টার ব্যবহার করে এরও সমাধান করা সম্ভব। তথ্য: বিজ্ঞানপ্রিয়।



41



আপনি কি জানেন যে আমাদের জীবন যেমন নানা অধ্যায়ে বিভক্ত, তেমনি আমাদের মস্তিষ্কও সারা জীবনে পাঁচটি ভিন্ন যুগে বা পর্যায়ে নিজেকে নতুন করে সাজায়? ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা ৩,৮০২ জন মানুষের (০-৯০ বছর) এমআরআই স্ক্যান বিশ্লেষণ করে এই তথ্য আবিষ্কার করেছেন। 'নেচার কমিউনিকেশন্স' জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, জন্মের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের মস্তিষ্কের গঠনে চারটি মূল 'টার্নিং পয়েন্ট' আসে, যা মস্তিষ্ককে পাঁচটি স্তরে ভাগ করে। এই গবেষণার তথ্যমতে, ৩২ বছর বয়সে পৌঁছানোর আগে মানুষের মস্তিষ্ক সম্পূর্ণরূপে প্রাপ্তবয়স্ক হয় না।

মস্তিষ্কের প্রথম পর্যায়টি জন্ম থেকে ৯ বছর বয়স পর্যন্ত স্থায়ী হয়, যেখানে অতিরিক্ত স্নায়ু সংযোগগুলো বাদ গিয়ে দরকারী সংযোগগুলো সুসংগঠিত হয় এবং মস্তিষ্কের আকার দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এরপর ৯ বছর বয়স থেকে শুরু হয় মস্তিষ্কের কৈশোর কাল, যা ৩২ বছর বয়স পর্যন্ত চলতে থাকে। এই দীর্ঘ সময়ে মস্তিষ্কের ভেতরে তথ্যের আদান-প্রদান সবচেয়ে দ্রুত ও নিখুঁত হয়, এবং ৩২ বছর বয়সে মস্তিষ্কের গঠনে জীবনের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত পরিবর্তনটি ঘটে।

৩২ বছর বয়স থেকে শুরু হয় মস্তিষ্কের প্রাপ্তবয়স্ক পর্যায়, যা জীবনের দীর্ঘ এবং স্থিতিশীল একটি সময়, যেখানে মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও ব্যক্তিত্ব একটি স্থায়ী রূপ পায়। এরপর ৬৬ বছর বয়সে মস্তিষ্ক 'আর্লি এজিং' স্তরে প্রবেশ করে, যখন মস্তিষ্কের হোয়াইট ম্যাটার ক্ষয় হতে থাকে এবং স্নায়ুর সংযোগ ধীরে ধীরে কমে আসে। এই সময়ে মানুষের বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি মস্তিষ্কের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে।

জীবনের শেষ টার্নিং পয়েন্টটি আসে ৮৩ বছর বয়সে, যখন মস্তিষ্ক তার চূড়ান্ত বার্ধক্য পর্যায়ে পৌঁছায় এবং পুরো মস্তিষ্কের সার্বিক সংযোগ কমে গিয়ে নির্দিষ্ট কিছু অংশের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ে। ড. অ্যালেক্সা মাউসলির মতে, মস্তিষ্কের এই পর্যায়গুলো সম্পর্কে জানাটা চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য খুবই জরুরি। কারণ এর মাধ্যমে শিশুদের শেখার সমস্যা, মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি কিংবা বৃদ্ধ বয়সের ডিমেনশিয়ার মতো রোগগুলো জীবনের ঠিক কোন সময়ে কেন হয়, তা ভবিষ্যতে আরও সহজে বোঝা সম্ভব হবে।

Khairul Alom Fardush

Team Science Bee



42



অ্যালকোহল কীভাবে আমাদের শরীরের ক্ষতি করে?

যকৃৎ বা লিভার অ্যালকোহলকে একটি ক্ষতিকারক পদার্থ বা 'বিষ' হিসেবে বিবেচনা করে এবং শরীর থেকে এটিকে দ্রুত বের করে দেওয়াকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। এর ফলে আমাদের শরীরে বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটে:

চর্বি পোড়ানো বন্ধ হয়ে যায়: আপনি যখন মদ্যপান করেন (এমনকি রাতে এক গ্লাস ওয়াইন হলেও), তখন লিভার অ্যালকোহল হজম করার জন্য 'অ্যালকোহল ডিহাইড্রোজিনেজ' (Alcohol dehydrogenase) নামক এনজাইম ব্যবহার করে। অ্যালকোহল প্রক্রিয়াজাত করার এই কাজের জন্য লিভার সাময়িকভাবে শরীরে চর্বি পোড়ানো (Fat burning) বন্ধ রাখে।

নতুন চর্বি তৈরি হয়: চর্বি পোড়ানো বন্ধ হওয়ার ফলে শরীরে চর্বি উৎপাদন বেড়ে যায়, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় 'ডি নোভো লিপোজেনেসিস' (De novo lipogenesis) বলা হয়। এটি রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

বিজ্ঞান কী বলছে?

গবেষণায় দেখা গেছে যে, অ্যালকোহল পরিপাক করার সময় শরীরে NADH-এর মাত্রা বেড়ে যায়। এটি স্বাভাবিকভাবে চর্বি কমানোর প্রক্রিয়াকে বাধা দেয় এবং লিভারে নতুন চর্বি তৈরিতে সাহায্য করে।

নিয়মিত মদ্যপানের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব

আগে যাকে একটি নিরীহ অভ্যাস বলে মনে করা হতো, তা আসলে শরীরের জন্য একটি বড় বিপাকীয় বোঝা (Metabolic burden)। প্রতি রাতে মদ্যপানের অভ্যাস থাকলে তা সময়ের সাথে সাথে শরীরে নানা জটিলতা সৃষ্টি করে:

* রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বৃদ্ধি।

* ফ্যাটি লিভারের (Fatty Liver) ঝুঁকি।

* বিপাক প্রক্রিয়া বা মেটাবলিজম ধীর হয়ে যাওয়া।

মদ্যপান ছাড়ার সুফল

যারা মদ্যপান ছেড়ে দিয়েছেন, তাদের অনেকেই জানিয়েছেন যে এর ফলে তাদের বেশ কিছু শারীরিক উন্নতি হয়েছে, যেমন:

* কর্মশক্তি বা এনার্জি অনেক বেড়েছে।

* শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ করা আগের চেয়ে সহজ হয়েছে।

* লিভারের স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়েছে।

উপসংহার: পরিমিত মদ্যপানের গুরুত্ব হয়তো এখনও অনেকেই মেনে চলেন, তবে বিজ্ঞান পরামর্শ দেয় যে সর্বোত্তম সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রতিদিনের ওই এক গ্লাস ওয়াইন পানের অভ্যাসটি নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবা উচিত।

@ Plabon Sarkar


43


মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সি আমাদের সৌরজগতের চেয়ে কতো বড়?

মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সি আমাদের সৌরজগতের চেয়ে প্রায় ১০ কোটি (১০০ মিলিয়ন) গুণ বড়। তুলনামূলকভাবে এদের আকারের হিসাব দিলে বিষয়টি বুঝতে সহজ হবে।

আয়তন বা পরিমাপ:

* সৌরজগৎ: 'ওর্ট ক্লাউড'-এর (Oort Cloud) বাইরের প্রান্ত পর্যন্ত পরিমাপ করলে এর ব্যাস দাঁড়ায় প্রায় ২৮,৭০০ কোটি কিলোমিটার (১৮,০০০ কোটি মাইল)।

* মিল্কি ওয়ে: এর ব্যাস প্রায় ১,০০,০০০ আলোকবর্ষ। এক আলোকবর্ষ হলো প্রায় ৯.৫ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার (৫.৯ ট্রিলিয়ন মাইল)।

দৈনন্দিন জীবনের উদাহরণের সাথে তুলনা:

* মুদ্রা ও মহাদেশ: আমাদের সৌরজগৎ যদি একটি মার্কিন 'কোয়ার্টার' মুদ্রার (২৫ সেন্টের কয়েন) সমান হতো, তবে মিল্কি ওয়ে হতো পুরো যুক্তরাষ্ট্রের সমান।

* বালুকণা: সৌরজগৎ যদি একটিমাত্র বালুকণা হতো, তবে মিল্কি ওয়ে হতো এতটাই বিশাল যে তা দিয়ে একটি পুরো অলিম্পিক-আকারের সুইমিং পুল বালি দিয়ে পূর্ণ করা যেত।

আলোর গতির সাথে তুলনা:

* সৌরজগৎ অতিক্রম করা: সূর্য থেকে সৌরজগতের বাইরের প্রান্তে পৌঁছাতে আলোর সময় লাগে প্রায় ১১ ঘণ্টা।

* গ্যালাক্সি অতিক্রম করা: মিল্কি ওয়ের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে আলোর সময় লাগে ১,০০,০০০ বছর।

Source:

nasa(.gov)


44

অনেকেই ইন্টারনেটে নানা ঘরোয়া টোটকা বা ওজন কমানোর কৌশল হিসেবে না জেনেই বেকিং সোডা মেশানো পানি পান করেন। এটি যেমন কিছু ক্ষেত্রে ওষুধের মতো কাজ করে, তেমনি ভুল মানুষের জন্য এটি মারাত্মক বিপদের কারণ হতে পারে।

চলুন, চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং গবেষণার আলোকে বেকিং সোডা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

বেকিং সোডা আসলে কী?

ফার্মাকোলজির ভাষায় বেকিং সোডার রাসায়নিক নাম হলো সোডিয়াম বাইকার্বোনেট (NaHCO3)। এটি একটি অ্যালকালাইন (Alkaline) বা ক্ষারীয় যৌগ। চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে অ্যান্টাসিড (Antacid) হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়।

যখন আমাদের শরীরে বা পাকস্থলীতে অতিরিক্ত এসিড তৈরি হয়, তখন এই ক্ষারীয় বেকিং সোডা সেই এসিডের সাথে বিক্রিয়া করে তাকে প্রশমিত (Neutralize) করে দেয়। এর মূল কাজই হলো শরীরের পিএইচ (pH) ব্যালেন্স বা অম্ল-ক্ষারের ভারসাম্য বজায় রাখা।

কারা ডায়েটে বা চিকিৎসায় বেকিং সোডা খেতে পারবেন?

(অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ এবং নির্দিষ্ট মাত্রায়)

১. ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (CKD) বা দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগী

কিডনি যখন সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না, তখন শরীর থেকে অতিরিক্ত এসিড প্রস্রাবের মাধ্যমে বের হতে পারে না। এই অবস্থাকে বলা হয় মেটাবলিক এসিডোসিস (Metabolic Acidosis)।

মেকানিজম: ন্যাশনাল কিডনি ফাউন্ডেশন (NKF) এবং KDIGO গাইডলাইন অনুযায়ী, রক্তে এসিডের মাত্রা কমানোর জন্য নেফ্রোলজিস্টরা অনেক সময় সোডিয়াম বাইকার্বোনেট ট্যাবলেট বা পাউডার প্রেসক্রাইব করেন। এটি কিডনির কার্যকারিতা দ্রুত নষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে।

২. তীব্র এসিডিটি বা হার্টবার্নের রোগী (Dyspepsia/GERD)

মাঝেমধ্যে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া বা ঝাল খাওয়ার পর বুকে জ্বালাপোড়া বা টক ঢেকুর উঠলে, সাময়িক স্বস্তির জন্য এটি ব্যবহার করা যায়।

মেকানিজম: আধা চামচ বেকিং সোডা এক গ্লাস পানিতে মিশিয়ে খেলে এটি পাকস্থলীর অতিরিক্ত হাইড্রোক্লোরিক এসিডকে (HCl) প্রশমিত করে পানি ও কার্বন ডাই-অক্সাইডে পরিণত করে। তবে এটি টানা ২ সপ্তাহের বেশি খাওয়া চিকিৎসাবিজ্ঞানে নিষিদ্ধ।

৩. অ্যাথলেট বা পেশাদার খেলোয়াড়

খেলাধুলা বা ভারী ব্যায়ামের পর পেশিতে ল্যাকটিক এসিড (Lactic acid) জমা হয়, যার ফলে পেশিতে তীব্র ব্যথা ও ক্লান্তি আসে।

মেকানিজম: স্পোর্টস মেডিসিন জার্নালের গবেষণা অনুযায়ী, অনেক অ্যাথলেট ব্যায়ামের আগে পরিমিত মাত্রায় বেকিং সোডা গ্রহণ করেন। এটি আর্গোজেনিক এইড (Ergogenic aid) বা কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিকারক হিসেবে কাজ করে এবং ল্যাকটিক এসিডকে বাফার (Buffer) করে পেশির ক্লান্তি দূর করে।

৪. গাউট (Gout) বা ইউরিক এসিডের রোগী

যাদের রক্তে ইউরিক এসিড বেশি এবং জয়েন্টে ব্যথা হয়, চিকিৎসকরা মাঝে মাঝে তাদের প্রস্রাবকে ক্ষারীয় (Alkalinization of urine) করার জন্য সোডিয়াম বাইকার্বোনেট দেন। এতে ইউরিক এসিড ক্রিস্টাল গলে প্রস্রাবের সাথে সহজে বেরিয়ে যেতে পারে।

কারা ডায়েটে বেকিং সোডা ভুলেও খাবেন না?

(এদের জন্য এটি বিষের সমতুল্য হতে পারে)

১. উচ্চ রক্তচাপ (Hypertension) ও হৃদরোগী

বেকিং সোডায় প্রচুর পরিমাণে সোডিয়াম থাকে (মাত্র আধা চা চামচ বেকিং সোডায় প্রায় ৬১৬ মিলিগ্রাম সোডিয়াম থাকে)।

বিপদ: আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন (AHA)-এর মতে, অতিরিক্ত সোডিয়াম শরীরে পানি ধরে রাখে। একে বলা হয় ফ্লুইড রিটেনশন (Fluid Retention) বা ইডেমা। এর ফলে রক্তনালীতে চাপ বেড়ে গিয়ে ব্লাড প্রেশার মারাত্মকভাবে বেড়ে যেতে পারে। হার্ট ফেইলিউরের রোগীদের ক্ষেত্রে ফুসফুসে পানি জমে যাওয়ার (Pulmonary Edema) ঝুঁকি থাকে।

২. গর্ভবতী নারী

গর্ভাবস্থায় এমনিতেই অনেক নারীর পায়ে পানি আসে এবং উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি থাকে। বেকিং সোডা খেলে প্রিক্ল্যাম্পসিয়া (Preeclampsia) নামক মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে, যা মা ও শিশু উভয়ের জন্যই বিপজ্জনক।

৩. যাদের রক্তে পটাশিয়াম কম (Hypokalemia)

বেকিং সোডা শরীরের অম্লতা কমিয়ে ক্ষারীয় ভাব (Alkalosis) বাড়ায়। শরীর যখন এই ক্ষারীয় অবস্থা ঠিক করতে যায়, তখন কোষের ভেতর থেকে পটাশিয়াম বের হয়ে যায়। যাদের আগে থেকেই রক্তে পটাশিয়াম কম, তাদের হার্টবিট অনিয়মিত হয়ে (Arrhythmia) কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

৪. ভরা পেটে থাকা অবস্থায় (Gastric Rupture Risk)

খুব বেশি পেট ভরে খাওয়ার পরপরই বেকিং সোডা মেশানো পানি খাওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক।

বিপদ: পেটের ভেতরের এসিড আর বেকিং সোডা মিলে প্রচুর কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস তৈরি করে। পেট অতিরিক্ত ভরা থাকলে এই গ্যাসের চাপে পাকস্থলী ফেটে যাওয়ার (Gastric rupture) মতো বিরল কিন্তু প্রাণঘাতী ঘটনা ঘটতে পারে।

৫. ৫ বছরের কম বয়সী শিশু

শিশুদের কিডনি ও পরিপাকতন্ত্র পূর্ণাঙ্গরূপে বিকশিত না হওয়ায়, তাদের শরীর হুট করে পিএইচ (pH) পরিবর্তন সহ্য করতে পারে না। এটি শিশুদের ব্রেইনে খিঁচুনি (Seizures) বা মেটাবলিক অ্যালকালোসিস তৈরি করতে পারে।

এক নজরে: বেকিং সোডা নির্দেশিকা

কাদের জন্য উপকারী (পরামর্শ সাপেক্ষে)

ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (CKD) রোগী

মাঝেমধ্যে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় ভোগা ব্যক্তি

পেশাদার অ্যাথলেট (ব্যায়ামের ক্লান্তি কাটাতে

গাউট (ইউরিক এসিড) রোগী

কাদের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ (Contraindicated)

উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনের রোগী

হার্ট ফেইলিউর বা হৃদরোগী

গর্ভবতী নারী ও ৫ বছরের কম বয়সী শিশু

যাদের রক্তে পটাশিয়ামের ঘাটতি আছে

পরামর্শ: "ওজন কমবে" বা "শরীর ডিটক্স হবে"—ইন্টারনেটের এমন ভিত্তিহীন কথায় প্রতিদিন সকালে খালি পেটে লেবু ও বেকিং সোডার পানি খাওয়ার অভ্যাস আজই পরিহার করুন। এটি আপনার পাকস্থলীর স্বাভাবিক এসিডিটি নষ্ট করে হজমশক্তি কমিয়ে দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদে কিডনি ও হার্টের মারাত্মক ক্ষতি করে।

বেকিং সোডা কোনো সাধারণ খাবার নয়, এটি রাসায়নিকভাবে একটি ওষুধ। তাই ওষুধ হিসেবেই এর মূল্যায়ন করা উচিত।

Abdur Rahman


48


কেনো সকালে ঘুম থেকে উঠে আয়নায় নিজের চেহারা দেখে হাসবেন !

শুনতে হয়তো অদ্ভুত লাগে কিন্তু আসলে এটা শুধু একটা “হাসিই” না, এটা আপনার মস্তিষ্ককে দেওয়া একপ্রকার একটা সিগন্যাল। আপনি যখন সকালে আয়নায় তাকিয়ে হাসেন, আপনার ব্রেইন ধরে নেয় “সব ঠিক আছে।”

আর তখনই শরীরে রিলিজ হয় dopamine আর serotonin

যেগুলো আপনার মুড ভালো করে, স্ট্রেস কমায়, আর ফোকাস বাড়ায়।

Reality:

দেখবেন, আপনি দিনের শুরু যেভাবে করেন, আপনার পুরো দিনটা অনেকটা সেভাবেই চলে। সকালে আলস্য করলে সারাদিন আপনার ব্রেন 'স্লো' মোডে থাকে। আর সকালে একটি কঠিন কাজ শেষ করলে সারাদিন বিজয়ী মনোভাব বজায় থাকে। যদি দিন শুরু হয় চিন্তা, টেনশন আর নেগেটিভ ভাবনা দিয়ে,

তাহলে সেই ভাইবটাই সারাদিন আপনাকে ফলো করবে।

কিন্তু যদি দিন শুরু করেন একটা ছোট্ট হাসি দিয়ে,

আপনার মাইন্ড শান্ত থাকে

আত্মবিশ্বাস বাড়ে

আপনি নিজের উপর কন্ট্র্রোল অনুভব করেন

আর সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার, আপনি প্রথমে ফেক করে হাসলেও, ধীরে ধীরে সেটা রিয়েল ফিলিংয়ে কনভার্ট হয়ে যায়। তাই কাল থেকে ট্রাই করুন ঘুম থেকে উঠে আয়নায় তাকান, আর নিজেকে দেখে একটু হাসুন

Because sometimes,

you don’t need a good day to smile—

you need a smile to start a good day.

Sceince & Psychology

World Vision 



46


বিগ ব্যাং-এর ঠিক পরে মহাবিশ্ব ছিল উত্তপ্ত এক আলোর বল। কিন্তু প্রায় ৩ লক্ষ ৮০ হাজার বছর পর সেই আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় এবং মহাবিশ্ব নামে এক অদ্ভুত অন্ধকার যুগে। অনেকের ধারণা, এই অন্ধকার মানেই শূন্যতা, কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক উল্টো। এই অন্ধকার যুগটিই ছিল মহাবিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতির সময়, যখন অদৃশ্য হাতে গড়ে উঠেছিল আজকের প্রতিটি নক্ষত্র আর গ্যালাক্সির ভিত।

চলুন এবার প্রথমে একটু পেছনে যাওয়া যাক। বিগ ব্যাং-এর শুরুতে মহাবিশ্ব এতটাই উত্তপ্ত ছিল যে তার ভেতরের ইলেকট্রন আর প্রোটন আলাদা আলাদা ভেসে বেড়াত, আর আলো মানে ফোটনগুলো ক্রমাগত এই মুক্ত ইলেকট্রনের সাথে ধাক্কা খেয়ে ছড়িয়ে পড়ত। ফলে মহাবিশ্ব ছিল পুরোপুরি অস্বচ্ছ, ঠিক যেমন আজ সূর্যের অভ্যন্তরীণ অংশ। তারপর মহাবিশ্ব প্রসারিত হতে থাকে এবং ধীরে ধীরে ঠান্ডা হতে থাকে। যখন তাপমাত্রা প্রায় তিন হাজার কেলভিনে নেমে আসে, তখন ঘটে গেল এক যুগান্তকারী ঘটনা। ইলেকট্রন আর প্রোটন একসাথে মিলে তৈরি করল নিরপেক্ষ হাইড্রোজেন পরমাণু, আর আলো পেল মুক্তি। এই ঘটনাকে বিজ্ঞানীরা বলে রিকম্বিনেশন। এর ফলাফল হলো মহাবিশ্ব হঠাৎ স্বচ্ছ হয়ে গেল, কারণ আলো আর ধাক্কা খাচ্ছিল না। সেই মুক্তি পাওয়া আলো আজও আমরা কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন নামে দেখতে পাই।

কিন্তু এখানেই সমস্যা হলো, আলো তো মুক্তি পেল, কিন্তু তখন মহাবিশ্বে আর কোনো নতুন আলোর উৎস ছিল না। কোনো নক্ষত্র ছিল না, কোনো গ্যালাক্সি ছিল না, কোথাও কোনো কোয়াসার ছিল না। শুধু শীতল নিরপেক্ষ হাইড্রোজেন গ্যাস আর সেই পুরনো ঠান্ডা হয়ে যাওয়া আলো ছড়িয়ে রয়েছে সর্বত্র। আর এটাই শুরু করল মহাবিশ্বের দীর্ঘ অন্ধকার যুগ। এই সময়টাকে বিজ্ঞানীরা বলেন কসমিক ডার্ক এজেস।

এখন প্রশ্ন হলো, এই অন্ধকারের ভেতরে কী ঘটছিল? মহাবিশ্ব কিন্তু একেবারে স্থির ছিল না। অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটারের মহাকর্ষীয় টান ধীরে ধীরে সেই নিরপেক্ষ হাইড্রোজেন গ্যাসকে টেনে এনে ঘনীভূত করতে শুরু করে, ঠিক যেমন মেঘ জমে বৃষ্টি হয়। একই সাথে মহাবিশ্ব প্রসারিত হতে থাকে এবং তার তাপমাত্রা আরও কমতে থাকে, কয়েক হাজার কেলভিন থেকে নেমে আসে মাইনাস দুশো তের ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। এছাড়া তখন মহাবিশ্বে শুধু হাইড্রোজেন আর হিলিয়াম গ্যাস ছিল, আর সেই গ্যাসগুলো কোনো নতুন মৌল তৈরি করছিল না। পুরো মহাবিশ্ব ছিল এক বিশাল, নিস্তব্ধ, শীতল গ্যাসের সাগর।

এই অন্ধকার যুগকে অন্ধকার বলার কারণ হলো, তখন মহাবিশ্বে কোনো নক্ষত্র বা কোয়াসার ছিল না যা আলো বিকিরণ করবে। নিরপেক্ষ হাইড্রোজেন গ্যাস আলো শোষণ করলেও নিজে থেকে তা নির্গত করত না। আর শুধু সিএমবি-র ঠান্ডা মাইক্রোওয়েভ বিকিরণ ছিল, যা মানুষের চোখে সম্পূর্ণ অদৃশ্য। যদি কোনো মহাকাশচারী তখন মহাবিশ্বে ভেসে বেড়াতেন, তিনি চারপাশে ঘোর অন্ধকার দেখতেন, আলোর একটি বিন্দুও চোখে পড়ত না।

এই অন্ধকার যুদ্ধের অবসান ঘটে প্রায় দশ থেকে পনেরো কোটি বছর পরে। মহাকর্ষের টানে ঘনীভূত হাইড্রোজেন গ্যাসের মেঘ এতটাই গরম এবং ঘন হয়ে ওঠে যে তার কেন্দ্রে শুরু হয় নিউক্লিয়ার ফিউশন। হাইড্রোজেন মিলে তৈরি হয় হিলিয়াম, আর নির্গত হয় প্রচণ্ড আলো আর তাপ। তখন জন্ম নেয় প্রথম প্রজন্মের তারাগুলো, যাদের বিজ্ঞানীরা বলেন পপুলেশন থ্রি। এই তারাগুলো ছিল আজকের সূর্যের চেয়ে শতগুণ থেকে পাঁচশো গুণ ভারী এবং কয়েক হাজার গুণ বেশি উজ্জ্বল। তাদের অতি-বেগুনি রশ্মি আবারও নিরপেক্ষ হাইড্রোজেন গ্যাসকে ভেঙে ফেলে, যাকে বলে পুনরায় আয়নায়ন। ধীরে ধীরে সেই কুয়াশা কেটে যায় এবং মহাবিশ্ব আবার স্বচ্ছ ও আলোকিত হয়ে ওঠে। এভাবেই শেষ হয় অন্ধকার যুগ।

এখন আমরা জানি, বিজ্ঞানীরা কিন্তু তখন ছিলেন না, আলোও ছিল না, তাহলে কীভাবে তারা এত নিশ্চিতভাবে এই অন্ধকার যুগের কথা জানতে পেরেছেন? তারা নির্ভর করেছেন কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশনের তথ্যের ওপর, যা প্ল্যাঙ্ক স্যাটেলাইট ও ডব্লিউএমএপি থেকে পাওয়া গেছে। এছাড়া নিরপেক্ষ হাইড্রোজেন একটি বিশেষ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের রেডিও তরঙ্গ নির্গত করে, যাকে বলে একুশ সেন্টিমিটার হাইড্রোজেন লাইন। ভবিষ্যতের টেলিস্কোপগুলো সেই সংকেত খুঁজছে, যা এই অন্ধকার যুগের গ্যাসের বিন্যাস সম্পর্কে আরও তথ্য দেবে। আর জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ এখন সেই প্রথম প্রজন্মের তারকা ও গ্যালাক্সির অবশিষ্ট আলো খুঁজে বের করছে।

মহাবিশ্বের এই অন্ধকার যুগকে যদি আমরা মৃত সময় বলি, তা সম্পূর্ণ ভুল হবে। এটি ছিল গর্ভাবস্থার মতো, বাইরে অন্ধকার, কিন্তু ভেতরে চলছে গঠনের কাজ। ডার্ক ম্যাটার তৈরি করছিল কাঠামো, হাইড্রোজেন জমা হচ্ছিল ভবিষ্যৎ নক্ষত্রের জন্য, আর সময় গুনছিল প্রথম আলোর মুহূর্ত। আজ যখন আমরা রাতের আকাশে অসংখ্য তারকা দেখি, মনে রাখবেন সেই আলোর প্রতিটি কণাই একসময় অন্ধকারের গর্ভ থেকে জন্ম নিয়েছে। মহাবিশ্ব আমাদের শেখায়, অন্ধকার মানেই শেষ নয়, বরং এটি নতুন সৃষ্টির নীরব সেতুবন্ধন। আমাদের জীবনেও মাঝে মাঝে তেমন কিছু অন্ধকার যুগ আসে, শুধু অপেক্ষা করে প্রথম তারার জন্য। @ Al Mamun Riton


47


আপনার নাম কি কেবল একটা পরিচয়,

নাকি সেটিই এখন আপনার সবচেয়ে বড় বিজনেস অ্যাসেট?

অনেক সময় আমাদের মনে দ্বিধা কাজ করে—নিজের নামে পরিচিতি বাড়াবো, নাকি একটা আলাদা কোম্পানির লোগো বা পেজের আড়ালে লুকিয়ে থাকব? আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই দ্বিধাটাই অনেক বড় একটা ভুল।

আসুন, বিষয়টি একটু সহজ করে খুলে বলি।

পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং বনাম বিজনেস ব্র্যান্ডিং: পার্থক্যটা কোথায়?

সহজ কথায়, মানুষ মানুষের সাথে কানেক্ট করতে ভালোবাসে, লোগোর সাথে নয়। যখন আপনি নিজের নামকে ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তোলেন, তখন মানুষ আপনার ওপর বিশ্বাস (Trust) রাখা শুরু করে। আর এই বিশ্বাসটাই যখন একটা সিস্টেমে পরিণত হয়, তখন সেটি হয়ে যায় বিজনেস ব্র্যান্ডিং।

**কখন কোনটি বেছে নেবেন? জেনে নিন ৫টি গোল্ডেন রুল:

১. শুরুটা হোক আপনার নাম দিয়ে: আপনি যখন নতুন কোনো জার্নি শুরু করছেন, তখন আপনার পার্সোনাল প্রোফাইল বা পেজই আপনার সবচেয়ে বড় পোর্টফোলিও। মানুষ আপনার স্কিলকে নয়, বরং আপনার কাজ করার ধরণকে আগে চিনে রাখুক।

২. যখন বিজনেস বড় হয়: যখন দেখবেন আপনার হাতে কাজের চাপ অনেক, আর আপনি একা সব হ্যান্ডেল করতে পারছেন না—তখন আপনার বিজনেসকে একটি আলাদা পরিচিতি (Business Page) দিন। সেখানে আপনার টিমের কাজ এবং সিস্টেমগুলো হাইলাইট করুন।

৩. হাইব্রিড মডেল (সবচেয়ে কার্যকর): সবথেকে সেরা স্ট্র্যাটেজি হলো—নিজের নাম দিয়ে ভ্যালু শেয়ার করা (যেমন: টিপস, লাইভ সেশন, স্ট্র্যাটেজি), আর ব্যবসার নামে সেই সার্ভিস বা প্রোডাক্টের অফারগুলো প্রসেস করা। আপনি নিজেই আপনার ব্র্যান্ডের মুখ!

৪. কখন আলাদা রাখা জরুরি: যদি আপনার বিজনেস এমন হয় যে সেটি আপনার ব্যক্তিগত উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল নয় (যেমন: একটি ই-কমার্স সাইট বা বড় কোনো কনসালটেন্সি ফার্ম), তখন বিজনেস ব্র্যান্ডিংকে আলাদা প্রাধান্য দেওয়া ভালো।

৫. কখন একসাথে চালানো যায়: আপনি যদি একজন এক্সপার্ট হিসেবে সার্ভিস সেল করেন বা মেন্টরশিপ প্রোভাইড করেন, তবে আপনার পার্সোনাল ব্র্যান্ডই হবে বিজনেসের ফুয়েল। আপনার পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং মানুষকে আপনার কাছে আনবে, আর বিজনেস সিস্টেম তাদের সার্ভিস প্রদান করবে।

দিনশেষে, মানুষ আপনার প্রোডাক্ট না কিনলেও, আপনার ব্যক্তিত্ব এবং নলেজের ওপর ভরসা থাকলে তারা আপনার কাছে বারবার ফিরে আসবে। এটাই হলো পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংয়ের ম্যাজিক। @ OnnoRokom Uddokta 


48


১৭৬১ সাল।

মহীশূরের রাজা বীর হায়দার আলী এমন একটি কাজ করেছিলেন, যা তাঁর আগে পৃথিবীর কেউ করেনি। সে সময় পৃথিবীতে রকেট ছিল—ইউরোপের কাছে, চায়নার কাছে, কিন্তু সেগুলো সবই বাঁশ বা কাগজের তৈরি হতো; দুর্বল এবং যুদ্ধের জন্য তো একেবারেই বেকার।

মহারাজ হায়দার আলী বাঁশের জায়গায় লোহা ব্যবহার করালেন। ফলে লোহার ভেতর বেশি চাপ পড়ে,আর বেশি চাপ পড়া মানে বেশি স্পিড, আর বেশি স্পিড মানে প্রায় এক কিলোমিটারের চেয়েও বেশি বা দুই কিলোমিটার পর্যন্ত রেঞ্জ! যেখানে ইউরোপের রকেটগুলো এক কিলোমিটারও যেতে পারত না। যখন এই রকেটগুলো ফাটত, তখন মনে হতো যেন পুরো আকাশ লাল হয়ে গেছে।

মহারাজ বীর ​হায়দার আলীর ছেলে হলেন বীর টিপু সুলতান, যিনি এই প্রযুক্তিকে আরও বেশি বিপজ্জনক করে তোলেন। তিনি ৫,০০০ সৈনিককে শুধু এই রকেটগুলো ব্যবহার করার জন্য ট্রেনিং দেন। কিছু রকেটের সামনে ফ্লাইং ব্লেডও যুক্ত করেন, যেগুলো ল্যান্ড করার সময় ঘুরত এবং শত্রুদের কেটে ফেলত।

​১৭৮০ সালে ব্যাটল অব পোলিলুর।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং টিপু সুলতানের মধ্যে যুদ্ধ হয়। প্রথমবার পৃথিবী এই রকেটগুলোর আসল তাণ্ডব দেখল। টিপু সুলতানের ফৌজ ব্রিটিশ কর্নেল বেইলির ফৌজের ওপর রকেটের বৃষ্টি করে দিল। ব্রিটিশ ফৌজ ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল কারণ তারা এর আগে এমন কিছু দেখেইনি কখনো। এই রকেটগুলো, যেগুলোকে 'মহীশূর রকেট' বলা হতো, এগুলোর চর্চা এবার দূর-দূরান্ত পর্যন্ত হতে লাগল।

​এর প্রায় ২০ বছর পর, ১৭৯৯ সালের শ্রীরঙ্গপত্তনম। মীর সাদেক নামক বিশ্বাসঘাতকের কারণে টিপু সুলতান ব্রিটিশদের কাছে যুদ্ধে হেরে যান ও বীরদর্পে লড়াই করতে করতে শহীদ হন। এবার ব্রিটিশরা মহীশূর রকেটের প্রযুক্তি প্রথমবার হাতে পায়। তারা প্রায় ৬০০টি লঞ্চার, ৭০০টি জ্যান্ত রকেট এবং প্রায় ৯,০০০টি খালি কেস মহীশূর রকেটের খুঁজে পায়। আর এই সবই লন্ডনে পাঠানো হয়।

​সেখানে উইলিয়াম কনগ্রিভ নামের এক ব্যক্তি এই রকেটগুলো নিয়ে স্টাডি করেন, রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং করেন এবং তৈরি করেন 'কনগ্রিভ রকেট'। যেহেতু মূলত ওটা মহীশূর রকেটই ছিল, কিন্তু কনগ্রিভ তা বানিয়েছে, তাই নাম রাখা হলো কনগ্রিভ রকেট।অর্থাৎ,পশ্চিমাদের চুরি বিদ্যা

​এবার আসে ১৮১৪ সাল। আমেরিকা ও ব্রিটেনের মধ্যে ম্যারিল্যান্ডে একটা ঐতিহাসিক যুদ্ধ হয় যার নাম হলো ফোর্ট ম্যাকহেনরির যুদ্ধ। ব্রিটিশ জাহাজগুলো সারারাত ফোর্ট ম্যাকহেনরির ওপর অ্যাটাক করে। সারারাত আকাশ লাল হয়ে ছিল। সেখানেই এক আমেরিকান আইনজীবী যার নাম ফ্রান্সিস স্কট কি।তিনি একটি ব্রিটিশ জাহাজে আটকে ছিলেন। তিনি একজন কবি মানুষ ছিলেন; এই পুরো পরিবেশ দেখে তাঁর কবিতা লেখার মন চাইল। তিনি সারারাত সেই লাল আলো দেখলেন। মনে হচ্ছিল যেন আমেরিকা এই যুদ্ধে হেরে যাবে। কিন্তু তেমনটা হয়নি, আর সকালে ফোর্ট ম্যাকহেনরির ওপর আমেরিকান পতাকা উড়ছিল।

ফ্রান্সিস স্কট কি একটি যে কবিতাটি লিখেলেন, তাতে একটি লাইন আসে—

"And the rockets' red glare, the bombs bursting in air"

(এবং রকেটের সেই লাল আভা, বাতাসে বোমার বিস্ফোরণ)।

​আর এর প্রায় ১১৭ বছর পর, ১৯৩১ সালে আমেরিকা এই কবিতাকে নিজেদের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে ঘোষণা করে।

​ভেবে দেখুন,মহারাজ হায়দার আলী একটি রকেট বানালেন; তাঁর ছেলে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সেটাকে ভয়ংকরভাবে ব্যবহার করলেন;;!


49


ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে শুধু ওষুধ নয়, জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ!

অনেকেই মনে করেন, ডায়াবেটিসের ওষুধ খেলেই সব ঠিক থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—ওষুধের পাশাপাশি আপনার প্রতিদিনের জীবনযাপনই নির্ধারণ করে রক্তে শর্করা কতটা নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে যেসব অভ্যাস গড়ে তুলবেন:

প্রতিদিন অন্তত ৩০–৪৫ মিনিট হাঁটুন বা হালকা ব্যায়াম করুন। নিয়মিত শরীরচর্চা ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে।

খাদ্যতালিকায় রাখুন বেশি শাকসবজি, আঁশযুক্ত খাবার, ডাল, পরিমিত ফল এবং পর্যাপ্ত পানি। অন্যদিকে কোমল পানীয়, অতিরিক্ত মিষ্টি, জাঙ্ক ফুড ও অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন।

প্রতিদিন ৭–৮ ঘণ্টা ভালো ঘুম নিশ্চিত করুন। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে যেতে পারে।

অতিরিক্ত মানসিক চাপও ডায়াবেটিসের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই মেডিটেশন, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন বা প্রিয় কোনো কাজে সময় দিন।

নিজের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা করুন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করুন—নিজের ইচ্ছামতো কখনো ওষুধ বন্ধ করবেন না।

মনে রাখবেন, ছোট ছোট স্বাস্থ্যকর অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিবর্তন আনে। আজকের সচেতনতা আপনাকে ভবিষ্যতে কিডনি, চোখ, হৃদরোগ ও স্নায়ুর জটিলতার মতো অনেক ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে পারে।

@Edu Quest



50


যাদের দিনের লম্বা সময় ধরে বসে থাকতে হয়, এই পোস্ট তাদের জন্য।

লম্বা সময় ধরে বসে থাকা আপাতদৃষ্টিতে খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার হলেও বাস্তবিক অর্থে ব্যাপারটা মোটেই স্বাভাবিক না। বরঞ্চ, লম্বা সময় ধরে বসে থাকা সরাসরি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বেড়ে যাওয়ার সাথে যুক্ত।

ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সটা কি??

এটা এমন একটা অবস্থা যখন আপনার শরীরে ইনসুলিন তার স্বাভাবিক একশন হারিয়ে ফেলে, ফলে রক্তে থাকা গ্লুকোজ লিভার ও মাসলে প্রবেশ করতে পারে না। এই পরিস্থিতি লম্বা সময় ধরে চলমান থাকলে তা ডায়বেটিস, হাইপারটেনশান থেকে শুরু করে অসংখ্য মেটাবলিক ডিজর্ডারের জন্ম দেয়।

বুঝতেই পারছেন, লম্বা সময় ধরে বসে থাকা কোন স্বাস্থ্যকর ব্যাপার না তাহলে। ঐতিহাসিকভাবে পৃথিবীতে এমন কোন যুগ ছিল না যখন লম্বা সময় ধরে বসে থাকা মানুষেরা হেলদি ছিল।

এই বসে থাকা সবচেয়ে বেশি সমস্যা সৃষ্টি করে খাবার পর আপনার ব্লাড গ্লুকোজ বাড়িয়ে দিয়ে। এটা নিয়ে একটা মজার স্টাডি আছে।

দুটো ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপকে স্টাডির জন্য বেছে নেয়া হল। এক গ্রুপকে খাওয়ার আগের দুই ঘন্টা বসে থাকতে বলা হল, আরেক গ্রুপকে আগের দুই ঘন্টা বসে থাকা অবস্থায়ই মাঝে মাঝে বসা থেকে উঠে ২-৩ মিনিট হাটতে বলা হল।

গবেষনা শেষে দেখা গেল যারা দুই ঘন্টা পুরোপুরি বসে ছিলেন, তাদের খাবার দুই ঘন্টা পরের ব্লাড গ্লুকোজ অন্যদের তুলনায় ৪৫% বেশি বেড়েছে।

বুঝতেই পারছেন, যথেষ্ট নড়াচড়া না করে আমাদেরকে কত সহজে ডায়বেটিসের কাছে নিয়ে যায়!

এখন, যাদের রোজই লম্বা সময় বসে থাকা লাগে তাদের করনীয় কি??

গবেষনায় দেখা গেছে, খাবার দু ঘন্টা আগে থেকে ২০ মিনিট পরপর যদি কেউ ২ মিনিট করে হাটে, তাহলে এই যে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ইফেক্ট পুরোপুরি স্বাভাবিকে ফিরে আসে।

কত সহজ না??

আরো আছে। খাবার পর যদি আপনি ১০ মিনিটের মত খুবই হালকা চালে হাটেন, এটা আপনার ব্লাড গ্লুকোজ বেড়ে যাবার প্রবনতা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমিয়ে আনে। একটা না, সাত সাতটা গবেষনায় এটা দেখা গেছে। এই হাটাটা আপনাকে হাটতে হবে খাওয়া শেষ করার ৩০ মিনিট থেকে ৯০ মিনিট পরে।

যাদের ডায়বেটিস, ফ্যাটি লিভার বা ওবিসিটি আছে, তারা কিন্তু চাইলেই এই টেকনিকগুলো ফলো করতে পারেন।