১
কঠিন জিনিস সহজে মনে রাখার উপায়
পাঠ্যপুস্তকের সব বিষয় এক রকম নয়। কোনো কোনো বিষয় অপেক্ষাকৃত কঠিন। এগুলো রপ্ত করতে প্রয়োজন হয় কিছু কৌশলের।
>>না বুঝে কোনো বিষয় মুখস্থ করলে তা বেশিক্ষণ মনে থাকে না। কোনো বিষয় মুখস্থ করার আগে তার অর্থ ও প্রেক্ষাপট বোঝার চেষ্টা করো। যখন আমরা কোনো তথ্যের পেছনের যুক্তি বুঝি, তখন সেটি মস্তিষ্কে দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয়। শুধু শব্দ বা বাক্য মুখস্থ করলে তা দ্রুত ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
>>মনে রাখতে কোনো বিষয়কে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে নাও। বড় ও জটিল তথ্যকে ছোট অংশে ভাগ করলে মস্তিষ্ক সহজে তা গ্রহণ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একটি দীর্ঘ তালিকা বা সংজ্ঞা একসঙ্গে না পড়ে কয়েকটি অংশে ভাগ করে পড়লে মনে রাখা সহজ হয়।
কঠিন বিষয়কে চিত্র, মানচিত্র বা গ্রাফের সাহয্যে প্রকাশ করা যায় কিনা দেখ। মাইন্ড ম্যাপ, চার্ট বা ডায়াগ্রাম তৈরি করলে তথ্যগুলো চোখে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ভিজ্যুয়াল উপস্থাপন মস্তিষ্কে দ্রুত ছাপ ফেলে এবং দীর্ঘমেয়াদে মনে রাখতে সাহায্য করে।
>>একবার রপ্ত করা হয়ে গেলেই হবে না, দীর্ঘদিন মনে রাখার জন্য কয়েক দিন পরপর আবার অনুশীলন করতে হবে। একবার পড়ে রেখে দিলে অধিকাংশ তথ্য দ্রুত বিস্মৃত হই। নির্দিষ্ট বিরতিতে একই বিষয় পুনরায় পড়ার ফলে তথ্য দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে পরিণত হয়।
>>কঠিন বিষয়টি নিজে বুঝে পড়ো এবং অন্যকে শেখানোর চেষ্টা করো। নিজের শেখা বিষয় অন্যকে বোঝালে তা মস্তিষ্কে দীর্ঘস্থায়ী স্থান লাভ করে। এতে ভুল বা দুর্বল জায়গাগুলোও ধরা পড়ে এবং সংশোধনের সুযোগ তৈরি হয়।
>>স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম অপরিহার্য। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে নতুন শেখা তথ্য মস্তিষ্কে ঠিকভাবে সংরক্ষিত হয় না। তাই নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
>>পড়ার সময় সর্বোচ্চ মনোযোগ দিয়ে পড়ার চেষ্টা করো। পড়ার সময় যেন মনোযোগের বিঘ্ন না ঘটে সে জন্য মোবাইল ফোন সাইলেন্ট করে রাখো। খাওয়ার পানি, পেনসিল বাক্স, কলম, ক্যালকুলেটর প্রভৃতি নিয়ে পড়তে বসো।
>>স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক চর্চা। সঠিক কৌশল, নিয়মিত অনুশীলন এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে স্মৃতিশক্তি বাড়ে। যার ফলে কঠিন বিষয়ও সহজে মনে রাখা সম্ভব। @ লিজা চৌধুরী
২
ক্লাসে নোট নেওয়ার সহজ পদ্ধতি
পড়াশোনাকে সহজ ও মজার করে তোলার সবচেয়ে ভালো উপায়গুলোর একটি হলো নোট নেওয়া। ক্লাসে শিক্ষক যা বোঝান, সব সময় মনে রাখা সম্ভব হয় না। কিন্তু নিজের হাতে ছোট করে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো লিখে রাখলে, তা পরে খুব সহজে মনে পড়ে। নোট নেওয়া শুধু বোঝার সুবিধাই করে না, পরীক্ষার আগে দ্রুত রিভিশনেরও সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।
পরীক্ষার আগে পুরো বই পড়ার বদলে নোট দেখলে সময় বাঁচে। নোটে মূল ডেফিনিশন, সূত্র, উদাহরণ থাকলে রিভিশন দ্রুত হয়। নোট মানে সব সময় বইয়ের ভাষা নয়, তুমি নিজের মতো করে, নিজের বোঝা অনুযায়ী লিখবে। চাইলে ছবি, ডায়াগ্রাম, টেবিল বা রং ব্যবহার করে নোট সুন্দর ও বোধগম্য করতে পার। এতে পরবর্তী সময়ে পড়া আরও সহজ মনে হয়। কারণ, তা তোমার কাছে পরিচিত ফরম্যাটে সাজানো থাকে।
কীভাবে ভালো নোট নেওয়া যায়
১. শিরোনাম ও তারিখ লিখে শুরু করো: টপিক/অধ্যায়ের নাম ও তারিখ লিখে নিলে পরে খুঁজে পেতে সুবিধা হয়।
২. সংক্ষিপ্ত সারাংশ (২-৩ লাইন): ক্লাসের শুরুতে বা শেষে কী শিখলে তার ছোট সারাংশ লিখে রাখো।
৩. বুলেট পয়েন্টে তথ্য লেখো: বড় অনুচ্ছেদের বদলে পয়েন্টে লিখলে পড়া সহজ হয়।
৪. গুরুত্বপূর্ণ শব্দ বা সূত্র আলাদা করো: আন্ডারলাইন, বক্স বা স্টার
(*) ব্যবহার করতে পারো।
৫. উদাহরণ ও ডায়াগ্রাম যোগ করো: বিশেষ করে বিজ্ঞান ও গণিতে নমুনা অঙ্ক বা স্কেচ রাখো।
৬. সংজ্ঞা, কারণ, ফল আলাদা করো: যেমন সংজ্ঞা → কারণ → উদাহরণ ফল।
৭. রং ও হাইলাইটার ব্যবহার করো (যদি সম্ভব হয়): তবে মাত্র ২-৩টি রং ব্যবহার করাই ভালো; অতিরিক্ত রং বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
৮. সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন লেখো: নোটের শেষে ২-৩টি ছোট প্রশ্ন যুক্ত করে রিভিশনের জন্য রাখো।
এক লাইনের সারসংক্ষেপ লিখে শেষ করো: টপিক শেষে ১-২ লাইনের সারাংশ রাখলে পরে পড়তে সুবিধা হয়।
ছোট নমুনা নোট
টপিক: পানিচক্র
তারিখ: ২৬ নভেম্বর ২০২৫
সারাংশ: পানি প্রকৃতিতে বাষ্পীভবন, সংবহন ও বৃষ্টির মাধ্যমে চলাচল করে, এটিই পানিচক্র।
ধাপসমূহ:
বাষ্পীভবন: সূর্যের তাপে সমুদ্র/নদীর পানি বাষ্পে পরিণত হয়।
সংবহন (কনডেনসেশন): বাষ্প ঠান্ডা হয়ে মেঘ তৈরি করে। বৃষ্টি (প্রেসিপিটেশন): মেঘ থেকে পানি বৃষ্টি বা তুষার হয়ে পড়ে। সঞ্চালন: পানি মাটিতে জমে নদী-পাতালে ফিরে যায়। গুরুত্বপূর্ণ: পানিচক্র ধারাবাহিক; এতে কোনো নতুন পানি সৃষ্টি হয় না, পানি বারবার ঘোরে। উদাহরণ: বৃষ্টির পানি পুকুরে জমে মাছের জন্য আবাস তৈরি করে।
প্রশ্ন (রিভিশন):
১. বাষ্পীভবন কী?
২. কনডেনসেশন কেন হয়?
সারসংক্ষেপ: সূর্যের তাপ পানিচক্র চালায়, বাষ্পীভবন মেঘ তৈরি করে, আর মেঘ বৃষ্টি হয়ে পানি ফেরায়।
ছোট চেকলিস্ট
আজকের টপিক ও তারিখ লিখেছি? ৩টি বা তার কম মূল পয়েন্ট বুলেটে রেখেছি? অন্তত ১টি উদাহরণ বা ডায়াগ্রাম আছে? শেষে ১-২টি প্রশ্ন ও সারসংক্ষেপ রেখেছি?
কীভাবে এসব অভ্যাস তৈরি করা যায়
>> ক্লাসে মনোযোগ দিয়ে শুনো, অপ্রয়োজনীয় কথা বলো না।
>> শিক্ষক যা বলেন তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছোট করে লিখে রাখো।
>> রঙিন কলম বা হাইলাইটার ব্যবহার করে নোট সুন্দর করে সাজিয়ে রাখো।
>> প্রতিদিন ১০-১৫ মিনিট নোট দেখে রিভিশন করো।
>> কোনো কিছু না বুঝলে শিক্ষককে প্রশ্ন করতে ভ*য় পেয়ো না।
শেখা কখনোই শুধু বই খুলে বসার নাম নয়; বুদ্ধিমানের মতো নিয়মানুবর্তী হয়ে শেখাই আসল শিক্ষা। ক্লাসে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নোট করে রাখার অভ্যাস ছোট হলেও এর উপকার অনেক বড়। এটি একটি ছোট অভ্যাস হলেও এটি শেখাকে আরও সহজ, গোছানো ও আনন্দদায়ক করে তোলে। @ পল্লব শাহরিয়ার
৩
অল্প সময়ে বেশি পড়ার কৌশল পমোডোরো টেকনিক
স্মার্টফোনের এই যুগে মনোযোগ ধরে রেখে দীর্ঘক্ষণ পড়াই এখন শিক্ষার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পমোডোরো টেকনিক হতে পারে তাদের সহায়তাকারী বন্ধু। Pomodoro ইতালিয়ান শব্দ, এর অর্থ টমেটো। পমোডোরো টেকনিকের আবিষ্কারক ফ্রান্সিসকো সিরিল্লো পদ্ধতিটি ব্যবহারের সময় টমেটো আকৃতির একটি টাইমার ব্যবহার করতেন বলে এই টেকনিকের নামকরণ করেন পমোডোরো টেকনিক।
পড়ার সময় মনোযোগ ধরে রাখা খুবই কঠিন। পড়া শুরু করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই দুইয়ে মিলে সৃষ্টি হয় দীর্ঘসূত্রতা। দীর্ঘসূত্রতার দুষ্টু চক্রে পড়ে দিনের পড়া দিনে শেষ করা আর হয়ে ওঠে না। শুধু পড়াশোনাই নয়, সৃজনশীল কাজে অথবা দৈনন্দিন জীবনে সব জায়গায় এই দীর্ঘসূত্রতা একটি বড় বাধা। এই বাধা দূর করতে কৌশলও কম আবিষ্কার হয়নি।
তেমনই একটি কৌশল হলো পমোডোরো টেকনিক। এই টেকনিকের মূল লক্ষ্য হলো একটি বড়কাজের জন্য ব্যয়িত সময়কে ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত করে কাজকে যথাসম্ভব সহজ করে তোলা।
ছোট ছোট কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হওয়ায় মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয়, দ্রুত ক্লান্তি ভর করে না, দীর্ঘসূত্রতা দানা বাঁধতে পারে না।
শুধু পড়াশোনা নয়, যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করতে এই কৌশল অবলম্বন করতে পারো।
পমোডোরো টেকনিকের ধাপ পমোডোরো টেকনিকের ধাপগুলো খুবই সরল।
প্রথম ধাপ
নির্দিষ্ট ওই কাজের জন্য মোট কত সময় লাগতে পারে তা অনুমান করো।
দ্বিতীয় ধাপ
কাজের জন্য যতটুকু সময় লাগতে তাকে ২৫ মিনিটের প্রয়োজনীয় কয়েকটি খণ্ডে বিভক্ত করো। প্রতিটি ২৫ মিনিটের পর ৫ মিনিটের বিরতি নাও। বিরতির পর আবার ২৫ মিনিট কাজে ফিরে এসো।
তৃতীয় ধাপ
এভাবে ৫টি ২৫ মিনিটের চক্র পূর্ণ হলে ২৫ মিনিটের একটি বড় বিরতি নাও। এভাবে সম্পন্ন হয় একটি পমোডোরো সেট। একটি পমোডোরো সেট সম্পন্ন হওয়ার পর প্রয়োজনে পুনরায় ২৫ মিনিটের চক্র শুরু করো। এভাবে যতবার পমোডোরো সেট পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন হয় ততবার পুনরাবৃত্তি করো।
টাইমার সেট
স্মার্টফোন ব্যবহার করলে খুব সহজেই পমোডোরো অ্যাপস ডাউনলোড করে নিতে পারো। এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যালার্ম দিয়ে বিরতির শুরু ও শেষ জানিয়ে দেবে। অন্য টাইমার ব্যবহার করলে উপরিউক্ত নিয়ম অনুসারে টাইমার সেট করে নাও।
সতর্ক থাকো
>>পমোডোরো টেকনিক ব্যবহার করার সময় নিজেকে একাধিক কাজে ব্যস্ত রাখবে না।
>>সম্পূর্ণ মনোযোগ একটি কাজেই নিবদ্ধ রাখো।
>>পমোডোরো টেকনিক ব্যবহার করার সময় সময়ের হিসেব রাখতে ঘড়ি নয়, টাইমার ব্যবহার করো। নইলে ঘড়ির দিকে লক্ষ্য রাখতে গিয়েই সময়ের অপচয় এবং মনোযোগে বিঘ্ন দুই-ই ঘটবে।
>>৫ মিনিটের বিরতি যেন ৫ মিনিটেই শেষ হয় সে দিকে খেয়াল রাখবে।
>>বিরতির সময় যেন পরিপূর্ণ বিশ্রামেই ব্যয় হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
>>পমোডোরো টেকনিক ব্যবহারের সময় যেন কেউ বিরক্ত করতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রেখে কাজের জায়গা নির্বাচন করবে। @ লিজা চৌধুরী
৪
পড়াশোনায় স্মৃতিশক্তি কার্যকর রাখার কৌশল Active Recall
আমরা অনেকেই পরীক্ষার আগে অস্থির হয়ে পড়ি-সব কিছু পড়েছি, রিভিশন দিয়েছি, কিন্তু কিছুই মনে থাকছে না! মূল সমস্যা আসলে আমাদের শেখার ধরনে। শুধু বই পড়ে যাওয়া বা আন্ডারলাইন করলেই স্মৃতি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এজন্য প্রয়োজন অ্যাকটিভ রিকল (Active Recall)-যেখানে মস্তিষ্ক নিজেই তথ্য পুনরুদ্ধার করার অনুশীলন করে।
অ্যাকটিভ রিকল কীভাবে কাজ করে
এই পদ্ধতিতে আপনি নিজেকে প্রশ্ন করেন, নোট না দেখে বিষয়টি মনে করার চেষ্টা করেন, বা নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করেন। যেমন-একটি অধ্যায় পড়ার পর বই বন্ধ করে ভাবুন, 'আমি কী শিখলাম?', 'এই টপিকের মূল ধারণা কী?'। এই অনুশীলনে মস্তিষ্ক বারবার তথ্য আহরণ করে এবং নতুন সেল সংযোগ তৈরি করে, ফলে স্মৃতি আরও গভীর হয়।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, এটি retrieval practice-যেখানে তথ্য মনে করার মাধ্যমে স্মৃতির স্থায়িত্ব বাড়ে। গবেষণায় প্রমাণিত, অ্যাকটিভ রিকল ব্যবহার করলে শিখে রাখা তথ্য ৫০-৭০% বেশি দিন মনে থাকে।
কেন এটি এত কার্যকর?
আমরা সাধারণত 'পড়ার' মাধ্যমে মস্তিষ্কে তথ্য জমাই, কিন্তু 'মনে করা'র মাধ্যমে সেটি সক্রিয় করি। প্রতিবার আপনি যখন উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেন, তখন আপনার মস্তিষ্ক শেখার প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়, শুধু গ্রহণকারী নয়, সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হয়ে ওঠে। এই সক্রিয়তা দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিকে শক্তিশালী করে এবং শেখাকে আনন্দদায়ক করে তোলে।
কীভাবে শুরু করবেন
নিজেকে প্রশ্ন করুন: অধ্যায় শেষে বই বন্ধ করে প্রশ্ন তৈরি করুন-'মূল বিষয় কী ছিল?'
নোট না দেখে লিখুন: বিষয়টি নিজের ভাষায় সংক্ষেপে লিখে ফেলুন।
ফ্ল্যাশকার্ড ব্যবহার করুন: এক পাশে প্রশ্ন, অন্য পাশে উত্তর লিখে অনুশীলন করুন।
বন্ধুদের শেখান: কাউকে শেখানোর সময় নিজের শেখা আরও শাণিত হয়।
চাকরি ও ভর্তি পরীক্ষায় প্রয়োগ
বাংলাদেশে চাকরি ও ভর্তি পরীক্ষার সিলেবাস বিশাল, কিন্তু সময় সীমিত। এখানে অ্যাকটিভ রিকল কার্যকরভাবে সময় বাঁচায়। প্রতিদিন ৩০-৪৫ মিনিট এই পদ্ধতিতে অনুশীলন করলে সাধারণ জ্ঞান, ইংরেজি শব্দার্থ, গণিতের সূত্র বা ইতিহাসের তারিখ সহজেই মনে রাখা যায়। যেমন-একটি অধ্যায় পড়ার পর নিজেকে প্রশ্ন করুন-'এখানে তিনটি মূল পয়েন্ট কী?' অথবা 'এই সূত্রটা কোথায় প্রয়োগ হয়?' এই অনুশীলন শুধু স্মৃতি নয়, চিন্তাশক্তি ও বিশ্লেষণ ক্ষমতাও বাড়ায়।
ডিজিটাল অ্যাপ ও প্রযুক্তির ব্যবহার
বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী Anki, Quizlet ev Notion Recall Template ব্যবহার করে অ্যাকটিভ রিকল অনুশীলন করছেন। এগুলো ফ্ল্যাশকার্ড তৈরি করে নিয়মিত রিভিউর সুযোগ দেয়, ফলে তথ্য ভুলে যাওয়ার হার কমে যায়। @ মো. আশিকুর রহমান
৫
ক্লাসে মনোযোগী হওয়ার দারুণ কৌশল
শ্রেণিকক্ষে ক্লাস চলার সময় চারপাশে কত কিছুই না ঘটে । বন্ধুর ফিসফাস , ব্যাগে লুকোনো টিফিনের গন্ধ , আর মাঝেমধ্যে মনে প্রশ্ন ওঠে- ‘ এমন পরিবেশে মনোযোগ দেব কীভাবে ! ” অথচ শেখার শুরুটা এই শ্রেণিকক্ষ থেকেই । শিক্ষক যা শিখিয়ে দেন , সে মুহূর্তে মনোযোগ ধরে রাখতে পারলে পড়াশোনা হয়ে ওঠে সহজ এবং নিয়মিত । তাই মনোযোগ বাড়ানোর কৌশলগুলো জানা থাকলে শুধু পরীক্ষা নয় , প্রতিটি ক্লাসই হয়ে উঠবে নতুন কিছু শেখার দারুণ অভিজ্ঞতা । চলুন এমনই দারুণ কিছু কৌশল সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক :
সামনে বসার চেষ্টা করতে হবে
সামনে বসার চেষ্টা করলে শিক্ষককে স্পষ্টভাবে দেখা ও শোনা যায় । ফলে মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয় । পেছনের ফিসফাস বা ছোটখাটো বিভ্রান্তি কম থাকে । বোর্ডের লেখা দ্রুত নোট করা যায় এবং কোনো অংশ না বুঝলে শিক্ষককে প্রশ্ন করতেও সুবিধা হয় । সামনে বসা শেখাকে আরও কার্যকর করে তোলে ।
খাতা - কলম প্রস্তুত রাখতে হবে
ক্লাস শুরুর আগেই খাতা - কলম প্রস্তুত রাখলে মন পড়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হতে শুরু করে । প্রয়োজনীয় জিনিস হাতের কাছে থাকায় অযথা খোঁজাখুঁজি করতে হয় না , ফলে মনোযোগ নষ্ট হয় না । শিক্ষক বোঝানো শুরু করলেই দ্রুত নোট নেওয়া যায় । প্রস্তুতি থাকলে শেখা হয় গুছানো , দ্রুত এবং আরও কার্যকর।
বোর্ডের লেখা সঙ্গে সঙ্গে নোট করতে হবে
বোর্ডে শিক্ষক যে তথ্য লেখেন , তা সাধারণত পাঠের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ । তাই সেটা সঙ্গে সঙ্গে নোট করে ফেললে কোনো তথ্য বাদ পড়ে না । বোর্ডের লেখা দেখে লিখলে বিষয়টি মাথায় আরও পরিষ্কারভাবে বসে যায় । এতে মনোযোগ ভাঙার সুযোগ কমে এবং শেখা শক্তভাবে মনে থাকে । নোট নিতে গেলে বোঝার চেষ্টা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায় । ফলে কঠিন বিষয়ও সহজ মনে হয় ।
না বুঝলে সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করতে হবে
ক্লাসে কোনো অংশ না বুঝলে সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করা শেখার সবচেয়ে ভালো উপায় । সন্দেহ জমতে দিলে মনোযোগ ভেঙে যায় এবং পরের অংশ বোঝাও কঠিন হয়ে পড়ে । প্রশ্ন করলে বিষয়টি সে মুহূর্তেই পরিষ্কার হয়ে যায় , ভুল ধারণা সৃষ্টি হয় না এবং শেখা গভীর হয় । শিক্ষকও বুঝতে পারেন কোথায় তোমার সাহায্য দরকার , তাই ঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন । নিয়মিত প্রশ্ন করার অভ্যাস আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং পড়াশোনা হয় সহজ ও স্বচ্ছ ।
নিজের খাতায় ‘ ছোট সারাংশ ' লিখে রাখতে হবে
নিজের খাতায় ছোট সারাংশ লিখে রাখা পড়াশোনাকে অনেক সহজ করে । ক্লাস শেষে ১- ২ লাইনে কী শিখলে তা নিজের ভাষায় লিখলে বিষয়টি মাথায় দ্রুত বসে যায় । সারাংশ লিখতে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো আবার মনে পড়ে , ফলে শেখা আরও দৃঢ় হয় । পরে রিভিশন করার সময় পুরো খাতা না দেখেও শুধু এই ছোট সারাংশ দেখে পাঠ মনে করা যায় । এতে সময় বাঁচে , মনোযোগ বাড়ে এবং পড়া হয় সংগঠিত ।
ক্লাস শেষে ২ মিনিটের ‘ রিভিউ
ক্লাস শেষ হলে ২ মিনিট সময় নিয়ে খাতায় তাকাও—
•কী লিখলে ?
•কোন অংশটা কঠিন ?
•কোনটা মনে রাখতে হবে ?
এই ছোট রিভিউ মনোযোগকে আরও স্থায়ী করে ।
ক্লাসে মনোযোগী হওয়া কোনো কঠিন কাজ নয় ; বরং ছোট ছোট কৌশলেই তা তৈরি করা সম্ভব । সামনে বসা , নোট নেওয়া , প্রশ্ন করা , নিজের ভাষায় সারাংশ লেখা — এসবই শেখাকে আরও সহজ করে তোলে । মনোযোগ বাড়লে পড়াশোনা শুধু সহজই হয় না , আনন্দদায়ক ও হয়ে ওঠে । কারণ মন যে জায়গায় থাকে , শেখা সেখানেই সবচেয়ে দ্রুত হয় । @ পল্লব শাহরিয়ার
৬
মনমেজাজ ভালো রাখতে পুষ্টিকর খাবার জরুরি
মানসিক চাপ, উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং ক্লান্তি আমাদের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু অনেকেই হয়তো জানি না, প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাস এই মানসিক অবস্থাগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।
আমাদের মস্তিষ্ক কাজ করে বিভিন্ন নিউরোট্রান্সমিটার কিংবা রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে। সেরোটোনিন, ডোপামিন, গ্যাবা ইত্যাদি মানুষের মনমেজাজ নিয়ন্ত্রণ করে। এসব তৈরির মূল কাঁচামাল পাওয়া যায় খাদ্য থেকে। যেমন ট্রিপটোফান থেকে তৈরি হয় সেরোটোনিন; যা কলা, ডিম, বাদাম ও দুধে পাওয়া যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড গ্রহণ মানসিক প্রশান্তিতে সাহায্য করে। এটি পাওয়া যায় ইলিশ, সার্ডিন মাছ ও আখরোটে। ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স, ফোলেট, ম্যাগনেশিয়াম স্নায়ু স্থিতিশীল রাখে এবং মানসিক চাপ কমায়।
সাম্প্রতিক জরিপগুলো বলছে, দেশে প্রতি চারজনে একজন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। অনেকের খাদ্যতালিকায় থাকে উচ্চমাত্রার প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিনি, ফাস্ট ফুড, সফট ড্রিংক। এসব মেজাজ খারাপ করে, ঘুম ব্যাহত করে, এমনকি দীর্ঘ মেয়াদে বিষণ্ণতা সৃষ্টি করে।
অন্যদিকে যাঁরা ফলমূল, শাকসবজি, আঁশযুক্ত খাবার ও দইজাতীয় প্রোবায়োটিকস গ্রহণ করেন, তাঁদের মন ভালো থাকে। তাঁদের মধ্যে আবেগের ওঠানামা তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। অস্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যকার সম্পর্ক আজ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত।
যাঁরা দিনের শুরুতে সুষম নাশতা খান, তাঁদের মনোযোগ ও মানসিক স্থিতি ভালো থাকে। আবার যাঁরা সকালে খাবার বাদ দিয়ে শুধু কফি বা চিনিজাতীয় খাবার খেয়ে থাকেন, তাঁদের মধ্যে রাগ, হতাশা ও অবসাদ বেশি দেখা যায়।
দেশে কিশোর বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিষণ্ণতা বাড়ছে। তাদের খাদ্যতালিকায় প্রোটিনের ঘাটতি, ভিটামিন বি১২-এর অভাব, নিয়মহীন খাবারের সময়সূচি ইত্যাদি বেশ সাধারণ। স্কুল ও পরিবারের উচিত সচেতনভাবে খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা।
খাবার শুধু পেট ভরানোর জন্য নয়, এটি আমাদের অনুভূতি, আবেগ এবং মনের রসায়নেরও ভিত্তি। সঠিক খাবার নির্বাচন করলে মন হালকা থাকে, ঘুম ভালো হয় এবং কাজে আগ্রহ বাড়ে। অন্যদিকে ভুল খাবার গ্রহণ মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে পুষ্টির বিষয়টিও সামনে আনতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে এই সংযুক্তি এখন সময়ের দাবি।
আপনি প্রতিদিন কী খাচ্ছেন, সেটি শুধু শরীর নয়, মনকেও গড়ে তুলছে। তাই মনমেজাজ ঠিক রাখতে হলে তালিকায় রাখতে হবে সঠিক ও পরিমিত খাবার।
@ হাসিবুল হাসান, ডায়েটিশিয়ান
৭
অগোছালো কাজ গুছিয়ে আনার সহজ পদ্ধতি
দৈনন্দিন জীবনে কাজের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে-অফিসের বিভিন্ন দায়িত্ব, ব্যক্তিগত লক্ষ্য, শেখার ইচ্ছা, প্রতিদিনকার জীবনের নানা চর্চা, সব মিলিয়ে মাথায় থাকে নানা চিন্তা। এর ফলে মনোযোগ কমে যায়, সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়, মানসিক চাপ বাড়ে। এই সমস্যার কার্যকর সমাধান হিসেবে প্রোডাক্টিভিটির জগতে দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয় GTD বা Getting Things Done টেকনিক-যা একটি সম্পূর্ণ সিস্টেম তৈরি করে মাথায় জট না পাকিয়ে বরং পরিকল্পনা সাজাতে সাহায্য করে।
কী এই GTD টেকনিক
ডেভিড অ্যালেনের তৈরি সময় ও কাজ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি হলো GTD। এর মূল দর্শন হলো-'মানুষ ভুলে যায় না, বরং বেশি কিছু মনে রাখতে চেষ্টা করলে মনোযোগ হারায়।' এর বিপরীতে GTD শেখায় সবগুলো কাজকে একটি নির্ভরযোগ্য সিস্টেমে সংগ্রহ করে তারপর ধাপে ধাপে তা সামলে নিতে।
GTD পাঁচটি ধাপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি-
১. Capture যেকোনো কাজ বা আইডিয়া এলেই তা সংগ্রহ করুন
২. Clarifz: প্রতিটি বিষয়ের অর্থ বা বিস্তারিত ধারণা পরিষ্কার করুন
৩. Organize: কাজের তালিকা ও ধরন অনুযায়ী তা ধাপে ধাপে সাজান
8. Reflect: নিয়মিত রিভিউ করুন
৫. Engage: সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করুন
GTD কীভাবে কাজ করে
প্রথমেই একটি সংগ্রহ ব্যবস্থা তৈরি করতে হয়-যেমন Notion, Todoist, Google Keep বা একটি খাতার মাধ্যমে।
এরপর-
মনে আসা সব কাজ দ্রুত ইনবক্সে ঢুকিয়ে দিন
প্রতিটি কাজ Clarifz করে ঠিক করুন এটি-করতেই হবে, নাকি ডেলিগেট করা যাবে: শিডিউল করা যাবে; অথবা, না করলে চলবে।
এরপর সাজিয়ে নিন-Project list, Next Actions, Waiting list, Someday list
সপ্তাহে একদিন Review করে নিন সবকিছু
তারপর Engage পর্যায়ে গিয়ে যে কাজের সময় এসেছে সেটিই করুন
GTD-এর সুবিধাগুলো হলো-
চিন্তাগুলো ইনবক্সে রাখায় মাথায় চাপ কমে
কাজ গুছিয়ে রাখায় ভুলে যাওয়ার সমস্যা কমে
পরিকল্পনা পরিষ্কার হওয়ায় ফোকাস বাড়ে
বড় লক্ষ্যগুলো ছোট ধাপে ভেঙে করা সহজ হয়
সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝামেলা কমে যায় অফিস, ব্যক্তিগত জীবন, শিক্ষা-সব জায়গায় এটি সমানভাবে কার্যকর।
ক্যারিয়ারে প্রয়োগ
করপোরেট পেশাজীবীরা GTD ব্যবহার করে প্রজেক্ট, মিটিং নোট, ইমেইল অ্যাকশন-সব এক সিস্টেমে রাখেন। ফ্রিল্যান্সারদের ক্ষেত্রে ক্লায়েন্ট প্রজেক্ট, ইনভয়েস, আইডিয়া-সব কিছু নিয়ন্ত্রণ রাখা সহজ হয়।
শিক্ষার্থীদের জন্য পড়াশোনা, রিভিশন, অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষা প্রস্তুতি-সব কিছু সুনির্দিষ্টভাবে সাজানো সম্ভব।
সহায়ক টুলস ও অ্যাপ
Todoist (GTD Template): ইনবক্স, নেক্সট অ্যাকশন, ওয়েটিং- সব লিস্ট প্রস্তুত
Notion GTD Workspace: সম্পূর্ণ কাস্টমাইজড GTD সেটআপ তৈরি করা যায়
Evernote: নোট, প্রজেক্ট আইডিয়া ও টাস্ক একসঙ্গে রাখা সহজ Microsoft To Do : সহজ তালিকা ব্যবস্থাপনার জন্য উপযোগী @ মো. আশিকুর রহমান
৮
প্যারেটো নীতি: সীমিত প্রচেষ্টায় সর্বাধিক ফলপ্রাপ্তির কৌশল
মানুষের কাজ কিংবা শিক্ষাজীবনে প্রায়ই দেখা যায়, দীর্ঘ পরিশ্রম করেও কাঙ্ক্ষিত ফল মেলে না। এ পরিস্থিতিতে ৮০/২০ নীতি বা প্যারেটো প্রিন্সিপল কার্যকর হতে পারে। এই নীতি বলে-মাত্র ২০ শতাংশ প্রচেষ্টাই ৮০ শতাংশ ফলাফল তৈরি করতে সক্ষম।
এই নীতির প্রাথমিক সূত্রপাত ইতালীয় অর্থনীতিবিদ ভিলফ্রেডো প্যারেটোর হাতে। তিনি দেখেছিলেন, ইতালির প্রায় ৮০ শতাংশ সম্পদ কেবল ২০ শতাংশ মানুষের অধীনে কেন্দ্রীভূত। পরবর্তীতে এ পর্যবেক্ষণ শুধু অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা, ব্যক্তিগত উন্নয়ন এমনকি সময় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও সমানভাবে কার্যকর প্রমাণিত হয়। এর মূল বার্তা হচ্ছে-প্রত্যেক কাজের মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট কার্যক্রম থাকে, যা তুলনামূলকভাবে সর্বাধিক প্রভাব বিস্তার করে। সেই উচ্চ-প্রভাবশালী কার্যক্রম চিহ্নিত ও অগ্রাধিকার দেওয়া-ই হলো এই নীতির প্রধান দিক।
শিক্ষা বা পেশাগত জীবনের বাস্তবতায় আমরা প্রায়ই দেখি, সব কাজ সমান গুরুত্ব বহন করে না। যেমন, পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সব অধ্যায় সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ নাও হতে পারে। কিছু নির্দিষ্ট অধ্যায় বা বিষয়বস্তু পরীক্ষায় বারবার আসতে পারে, যেগুলোতে মনোযোগ দিলে তুলনামূলকভাবে বেশি নম্বর অর্জন সম্ভব। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ২০ শতাংশ মূল বিষয়বস্তুকে গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে ৮০ শতাংশ সাফল্য নিশ্চিত করা যায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কম-মূল্যবান কাজ থেকে দূরে থাকা। সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত সময় ব্যয়, অপ্রয়োজনীয় আলোচনা কিংবা ক্ষুদ্র কাজে নিমগ্ন হওয়া আমাদের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এসব কার্যক্রমের ফল তুলনামূলকভাবে নগণ্য হলেও, এগুলো আমাদের শক্তি ও সময় শুষে নেয়।
৮০/২০ নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে লক্ষ্য নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোন কাজ আসলেই সাফল্যের পথে সহায়ক, তা নির্ধারণ করাই এই নীতির মূল প্রয়োগ। প্রথমে উচ্চ-ফলপ্রসূ কাজ সম্পন্ন করলে উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং মানসিক চাপও কমবে।
সাফল্য কেবল পরিশ্রমের পরিমাণে নয়, বরং তার সঠিক দিকনির্দেশনায় নির্ভর করে। দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে প্যারেটো প্রিন্সিপল প্রয়োগ করলে সীমিত সময়ে সর্বাধিক সাফল্য অর্জন সম্ভব। @ মো. আশিকুর রহমান
৯
বিদেশে পড়তে চাইলে নিজেকে যেভাবে প্রস্তুত করবেন
বর্তমান যুগে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পড়াশোনা করার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। উন্নত শিক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, গবেষণার সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা-সব মিলিয়ে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা অনেক শিক্ষার্থীর স্বপ্ন। তবে এই স্বপ্নপূরণ করতে গেলে আগে থেকেই সঠিক প্রস্তুতি নেওয়া খুব জরুরি। পরিকল্পনা ছাড়া শুধু ইচ্ছা করলেই বিদেশে পড়া সম্ভব নয়। বিদেশে পড়ার জন্য কীভাবে নিজেকে প্রস্তুত করা যেতে পারে নিচে ধাপে ধাপে আলোচনা করা হলো-
১. লক্ষ্য নির্ধারণ করুন
সবার আগে আপনাকে ঠিক করতে হবে, কেন আপনি বিদেশে পড়তে চান এবং কোন বিষয়ে পড়বেন। শুধু বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছা নয়, বরং আপনি ভবিষ্যতে কোন ক্ষেত্রে কাজ করতে চান, সে অনুযায়ী বিষয় বেছে নিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি প্রযুক্তি বা প্রকৌশলে আগ্রহী হন, তা হলে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা বা জার্মানির বিশ্ববিদ্যালয় ভালো অপশন হতে পারে। আবার ব্যবসায় বা ব্যবস্থাপনায় আগ্রহ থাকলে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া কিংবা নেদারল্যান্ডস ভালো অপশন হতে পারে।
২. বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের তথ্য সংগ্রহ করুন
লক্ষ্য ঠিক করার পরের ধাপ হলো উপযুক্ত দেশ ও বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নেওয়া। কোন দেশে পড়াশোনার খরচ কত, জীবনযাত্রা কেমন, স্কলারশিপের সুযোগ আছে কি না- এসব বিষয় জেনে নেওয়া দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে গিয়ে কোর্সের সময়কাল, ভর্তি যোগ্যতা, টিউশন ফি এবং আবেদন করার সময়সীমা সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুন। পাশাপাশি ইউটিউব বা বিদেশে পড়া সিনিয়রদের থেকে বাস্তব অভিজ্ঞতাও জেনে নিতে পারেন।
৩. ইংরেজিতে দক্ষতা বাড়ান
বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা হলো ভাষাগত দক্ষতা, বিশেষ করে ইংরেজি। বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে IELTS, TOEFL বা PTE পরীক্ষার স্কোর দিতে হয়। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ইংরেজিতে অনুশীলন শুরু করুন। প্রতিদিন ইংরেজি সংবাদ পড়া, ইংরেজি সিনেমা দেখা এবং ইংরেজিতে কথা বলার চেষ্টা করা-এগুলো অভ্যাসে আনুন। ভালো স্কোরের জন্য নিয়মিত অনুশীলনের বিকল্প নেই।
৪. একাডেমিক ফল ভালো রাখুন
বিদেশে ভর্তি হওয়ার জন্য ভালো একাডেমিক রেজাল্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আপনার পূর্বের ফলাফল দেখে মূল্যায়ন করে আপনি কতটা যোগ্য শিক্ষার্থী। তাই স্কুল ও কলেজ জীবন থেকেই মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করুন। বিশেষ করে আপনি যে বিষয়ে পড়তে চান, সে বিষয়ে ভালো ফল করার চেষ্টা করুন।
৫. প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও সার্টিফিকেট প্রস্তুত করুন
অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে GRE, GMAT, SAT বা ACT-এর মতো পরীক্ষা দিতে হয়। আপনার পছন্দের কোর্সে কোন পরীক্ষা দরকার, তা আগে থেকে জেনে নিয়ে প্রস্তুতি নিন। এসব পরীক্ষায় ভালো স্কোর করলে ভর্তি এবং স্কলারশিপ-দুই ক্ষেত্রেই বাড়তি সুবিধা পাওয়া যায়।
৬. স্টেটমেন্ট অব পারপাস (SOP) ও
রেকমেন্ডেশন লেটার প্রস্তুত করুন বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করার সময় সাধারণত 'Statement of Purpose (SOP) এবং 'Letter of Recommendation' (LOR) দিতে হয়। SOP হলো আপনার শিক্ষাগত লক্ষ্য, আগ্রহ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ। এটি এমনভাবে লিখতে হবে যাতে বোঝা যায়, আপনি কেন ওই বিষয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আগ্রহী। আর রেকমেন্ডেশন লেটার সাধারণত আপনার শিক্ষক বা কর্মক্ষেত্রের সুপারভাইজার লিখে দেন। এগুলো আবেদন প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তাই সময় নিয়ে প্রস্তুত করুন।
৭. স্কলারশিপ ও ফান্ডিং সুযোগ খুঁজুন
বিদেশে পড়ার খরচ অনেক বেশি। তাই স্কলারশিপের সুযোগ খোঁজা জরুরি। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য টিউশন ফি ছাড়, গ্রান্ট বা ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপ দেয়। যেমন- চেভেনিং, ফুলব্রাইট, ইরাসমাস, কমনওয়েলথ ইত্যাদি বিখ্যাত স্কলারশিপ প্রোগ্রাম রয়েছে। আবেদন করার সময় এসবের যোগ্যতা ও সময়সীমা জেনে রাখুন।
৮. পাসপোর্ট, ভিসা ও অন্যান্য কাগজপত্র প্রস্তুত রাখুন
ভর্তি হওয়ার পর ভিসা আবেদন করতে হয়। এ জন্য আগে থেকেই পাসপোর্ট তৈরি করে রাখুন।
এ ছাড়া একাডেমিক সনদ, পরীক্ষার ফলাফল, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, মেডিকেল রিপোর্ট ইত্যাদি সব কাগজপত্র সঠিকভাবে সংরক্ষণ করুন। ভিসা ইন্টারভিউয়ের সময় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করতে পারলে সুযোগ বাড়ে।
৯. মানসিকভাবে প্রস্তুত হোন
বিদেশে পড়াশোনা মানে শুধু ক্লাস নয়- এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতি ও পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার অভিজ্ঞতা। নতুন বন্ধু তৈরি, ভিন্ন খাবার, আবহাওয়া ও নিয়মের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সময় লাগবে। তাই মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকুন এবং ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখুন। মনে রাখবেন, প্রথম দিকে একটু কষ্ট হলেও পরে এই অভিজ্ঞতা আপনাকে অনেক পরিণত করে তুলবে।
১০. আত্মবিশ্বাস ও ধৈর্য ধরে এগিয়ে যান
বিদেশে পড়ার পথ সহজ নয়, কিন্তু অসম্ভবও নয়। হয়তো প্রথমবার আবেদন করে সফল হবেন না, কিন্তু হাল ছাড়বেন না। ধৈর্য ধরে চেষ্টা চালিয়ে যান, প্রতিটি ভুল থেকে শিখুন এবং নিজের স্বপ্নে বিশ্বাস রাখুন।
মনে রাখবেন
বিদেশে পড়াশোনা শুধু ডিগ্রি অর্জনের বিষয় নয়-এটি একটি জীবনের অভিজ্ঞতা। সঠিক পরিকল্পনা, অধ্যবসায় এবং আত্মবিশ্বাস থাকলে এই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেওয়া সম্ভব। তাই এখন থেকেই লক্ষ্য ঠিক করুন, ধীরে ধীরে নিজেকে প্রস্তুত করুন এবং একদিন হয়তো আপনিও বিদেশের একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হয়ে উঠবেন।
১০
সঞ্চয় করতে চান? জাপানি কাকেবো পদ্ধতি মেনে চলুন
আমরা প্রায়ই মাসের শুরুতে প্রতিজ্ঞা করি - “এই মাস থেকে টাকা জমাবো!” কিন্তু মাসের শেষে দেখি, বেতন প্রায় শেষ। বড় কোনো বিলাসিতা নয়, বরং ছোট ছোট খরচ—হুটহাট বাইরে খাওয়া, নতুন পোশাক, কিংবা সন্তানের খেলনা - এসবই শেষ করে দেয় সঞ্চয়ের সুযোগটুকু।
এর সমাধান আছে শত বছরের পুরোনো এক জাপানি পদ্ধতিতে, নাম “কাকেবো (Kakeibo)” - যার অর্থ “পরিবারের হিসাবের খাতা”।
কাকেবো কী?
১৯০৪ সালে জাপানি সাংবাদিক হানি মোতোকো এই ধারণাটি চালু করেন। এর উদ্দেশ্য হলো প্রতিটি খরচের হিসাব রেখে টাকার ওপর নিয়ন্ত্রণ গড়ে তোলা।
খরচ লিখে রাখলে বুঝতে পারবেন কোথায় অর্থ যাচ্ছে, এবং কোথায় কমানো সম্ভব।
কাকেবো শেখায় -“সঞ্চয় খরচের পরের বিষয় নয়, বরং খরচের অংশ।”
অর্থাৎ আগে সঞ্চয় করুন, পরে খরচ করুন।
যেমন, আপনার আয় যদি ২০,০০০ টাকা হয়, আপনি যদি ২,০০০ টাকা সঞ্চয়ের লক্ষ্য রাখেন, তাহলে বেতন হাতে পেয়েই ২,০০০ টাকা আলাদা করে রাখুন। এখন আপনার মাসিক বাজেট ১৮,০০০ টাকা - এভাবেই খরচের পরিকল্পনা করুন।
কাকেবো পদ্ধতি মেনে চলার ৫ ধাপ
১️) মাসিক আয় ও আবশ্যিক ব্যয় লিখে ফেলুন:
বাড়িভাড়া, বাজার, বিল, স্কুল ফি—এসব নির্দিষ্ট ব্যয়ের তালিকা তৈরি করুন। এতে মাসের আর্থিক ছবি পরিষ্কার হবে।
২️) সঞ্চয়কে ধরুন ‘আবশ্যিক ব্যয়’ হিসেব:
খরচের আগে সঞ্চয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করুন এবং শুরুতেই টাকা আলাদা রাখুন।
৩️) প্রতিদিনের খরচ লিখে রাখুন:
খরচের হিসাব মোবাইলে নয়, হাতে লিখুন।
উদাহরণ: ২ আগস্ট – কফি: ২০০ টাকা, বিদ্যুৎ বিল: ৮০০ টাকা, বাজার: ১৫০০ টাকা।
এভাবে লিখে রাখলে টাকার প্রতি সচেতনতা বাড়বে - এটাই কাকেবোর মূল জা°দু।
৪️) খরচকে চার ভাগে ভাগ করুন:
আবশ্যিক: খাবার, ভাড়া, বিল, পরিবহন ইত্যাদি
ইচ্ছাধীন: রেস্তোরাঁ, শখের কেনাকা*টা, ভ্রমণ
সাংস্কৃতিক: বই, সিনেমা, কোর্স ইত্যাদি
অতিরিক্ত বা জরুরি: চিকিৎসা, উপহার, উৎসবের খরচ
৫️) মাস শেষে হিসাব পর্যালোচনা করুন:
মাস শেষে দেখুন - লক্ষ্য অনুযায়ী সঞ্চয় হয়েছে কি না, কোথায় অতিরিক্ত খরচ হয়েছে, পরের মাসে কীভাবে উন্নতি করা যায়।
উদাহরণ: আয় ২০,০০০ টাকা, সঞ্চয় ২,০০০ টাকা, খরচ ২০,২০০ টাকা ➤ ঘাটতি ২,২০০ টাকা।
এবার বোঝা গেল, পরের মাসে কোথায় কা*টছাঁট দরকার।
সচেতনতা থেকেই সঞ্চয় শুরু
কাকেবো শেখায় - সঞ্চয় কোনো জাদু নয়, বরং টাকার প্রতি মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ।
ছোটখাটো অপ্রয়োজনীয় খরচ (চা, কফি, সাবস্ক্রিপশন) বাদ দিলেই বড় সঞ্চয় সম্ভব।
এছাড়া আপনি চাইলে ব্যবহার করতে পারেন:
পারেতো নীতি (Pareto Principle): আপনার খরচের ৮০% কোথা থেকে আসছে, তা চিহ্নিত করুন, এবং সেই অংশে সামান্য কা*টছাঁট করুন।
‘মুদা’ ধারণা (Muda): অপ্রয়োজনীয় ব্যয় চিহ্নিত করে বাদ দিন।
হানি মোতোকো এক শতাব্দী আগেই দেখিয়েছিলেন—
>“সঞ্চয়ের শুরু হয় হিসাব থেকে, আর হিসাবের শুরু সচেতনতা থেকে।”
আজও কাকেবো আমাদের মনে করিয়ে দেয় — “হিসাব রাখুন, সচেতন থাকুন, সঞ্চয় করুন।”
১১
৫০টি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
১. পরিকল্পনা ছাড়া কাজ কখনো সফল হয় না। (পিটার ডাকার)
২. সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ করাই প্রথম ধাপ। (স্টিফেন কোভি)
৩. সময় ব্যবস্থাপনা দক্ষতা উন্নত করুন। (জন ম্যাক্সওয়েল)
৪. দলগত কাজের গুরুত্ব কখনো অবহেলা করবেন না। (জিম কলিন্স)
৫. নেতৃত্ব মানে শুধু আদেশ দেয়া নয়, অনুপ্রেরণা দেয়াও। (সাইমন সিনেক)
৬. পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো শিখুন। (কেঞ্জি ইটামি)
৭. ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিন, তা আপনার শক্তি বাড়াবে। (টনি রবিনস)
৮. যোগাযোগ দক্ষতা উন্নত করুন, কারণ এটি সফলতার চাবিকাঠি। (জন ম্যাক্সওয়েল)
৯. সততা ও নৈতিকতা ম্যানেজমেন্টের মূল ভিত্তি। (পিটার ড্রাকার)
১০. কর্মীদের মূল্যায়ন ও প্রশংসা করুন। (হেনরি মিন্টজবার্গ)
১১. সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী চিন্তা বিকাশ করুন। (ফিলিপ কটলার)
১২. ঝুঁকি নেয়ার সাহস রাখুন, তবে পরিকল্পিতভাবে। (টনি রবিনস)
১৩. গ্রাহকের চাহিদা বুঝতে শিখুন। (ফিলিপ কটলার)
১৪. নিজেকে নিয়মিত আপডেট করুন নতুন জ্ঞানে। (পিটার ড্রাকার)
১৫. কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করবেন না। (জিম কলিন্স)
১৬. কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করুন। (স্টিফেন কোভি)
১৭. সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিন। (সাইমন সিনেক)
১৮. দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গি রাখুন। (জন ম্যাক্সওয়েল)
১৯. প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার করুন। (কেঞ্জি ইটামি)
২০. নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা উন্নত করুন। (পিটার ড্রাকার)
২১. কর্মীদের মধ্যে বিশ্বাস ও সম্মান গড়ে তুলুন। (হেনরি মিন্টজবার্গ)
২২. পরিবেশ বান্ধব ও সামাজিক দায়িত্ব পালন করুন। (কনরাড হিলটন)
২৩. নতুন সুযোগ খুঁজে বের করার দক্ষতা অর্জন করুন। (টনি রবিনস)
২৪. কর্মক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখুন। (পিটার ড্রাকার)
২৫. নিজের কাজের প্রতি দায়িত্বশীল হোন। (জন ম্যাক্সওয়েল)
২৬. সমস্যা সমাধানে সৃজনশীল পদ্ধতি অবলম্বন করুন। (ফিলিপ কটলার)
২৭. কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও উন্নয়নে বিনিয়োগ করুন। (হেনরি মিন্টজবার্গ)
২৮. সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিন। (জিম কলিন্স)
২৯. নিজের সময় ও সম্পদ সঠিকভাবেব্যবহার করুন। (স্টিফেন কোভি)
৩০. পরিবর্তনকে স্বাগত জানান, কারণ এটি উন্নতির পথ। (কেঞ্জি ইটামি)
৩১. কর্মক্ষেত্রে ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখুন। (টনি রবিনস)।
৩২. দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তুলুন গ্রাহক ও কর্মীদের সঙ্গে। (কনরাড হিলটন)
৩৩. নিজের কাজের প্রতি আত্মবিশ্বাস রাখুন। (জন ম্যাক্সওয়েল)
৩৪. কর্মীদের মতামত গ্রহণ করুন ও মূল্যায়ন করুন। (হেনরি মিন্টজবার্গ)
৩৫. সঠিক নেতৃত্বের মাধ্যমে দলকে একত্রিত করুন। (সাইমন সিনেক)
৩৬. কর্মক্ষেত্রে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ বজায় রাখুন। (পিটার ড্রাকার)
৩৭. সফলতার জন্য ধৈর্য্য ও অধ্যবসায় অপরিহার্য। (জিম কলিন্স)
৩৮. নিজের কাজের প্রতি নিষ্ঠাবান হোন। (স্টিফেন কোভি)
৩৯. কর্মক্ষেত্রে সৃজনশীল চিন্তা উৎসাহিত করুন। (ফিলিপ কটলার)
৪০. সঠিক সময়ে বিশ্রাম নিন, কারণ এটি কর্মক্ষমতা বাড়ায়। (টনি রবিনস)
৪১. কর্মীদের মধ্যে নেতৃত্ব গুণাবলি বিকাশ করুন। (জন ম্যাক্সওয়েল)
৪২. পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত থাকুন। (কেঞ্জি ইটামি)
৪৩. নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিন এবং তা পুনরাবৃত্তি করবেন না। (জিম কলিন্স)
৪৪. কর্মক্ষেত্রে সমতা ও বৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দিন। (সাইমন সিনেক)
৪৫. সফলতার জন্য দলগত সহযোগিতা অপরিহার্য। (হেনরি মিন্টজবার্গ)
৪৬. নিজের কাজের প্রতি দায়িত্বশীলতা বজায় রাখুন। (পিটার ড্রাকার)
৪৭. কর্মীদের মধ্যে উদ্দীপনা ও উৎসাহ বজায় রাখুন। (টনি রবিনস)
৪৮. সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা অর্জন করুন। (জন ম্যাক্সওয়েল)
৪৯. নিজের কাজের প্রতি ভালোবাসা ও আগ্রহ রাখুন। (স্টিফেন কোভি)
৫০. সর্বদা শেখার মনোভাব বজায় রাখুন, কারণ শেখার শেষ নেই। (পিটার ড্রাকার)
১২
গ্রিন টি নাকি লাল চা?
লাল চা ভালো নাকি গ্রিন টি, এমন প্রশ্ন অনেক স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের মাঝেই রয়েছে। তবে মজার কথা হলো গ্রিন টি এবং লাল চা দুইটিই ক্যামেলিয়া সিনেনসিস গাছের পাতা থেকে তৈরি। শুধুমাত্র প্রক্রিয়াজাতকরণের তারতম্যের কারণে এদের গুণগত বৈশিষ্ট্য আলাদা। এই দুটি চা-ই স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, তবে অতিরিক্ত পানে ক্ষতি হতে পারে শরীরের। তাই প্রশ্ন ওঠে, সকালবেলা শরীর ও মন চাঙ্গা করতে কোনটি বেশি কার্যকর আর কোন সময় কোন চা খাওয়া উচিত।
পুষ্টিবিদরা বলছেন, গ্রিন টি তুলনামূলকভাবে কম প্রক্রিয়াজাত এবং এতে থাকে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট। অন্যদিকে, লাল চা সম্পূর্ণভাবে অক্সিডাইজড, যার ফলে এর স্বাদ বেশি তীব্র এবং এতে ক্যাফেইনের পরিমাণ গ্রিন টি-এর চেয়ে বেশি।
প্রতি কাপ লাল চায়ে সাধারণত ৪০-৭০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন থাকে। এটি দ্রুত শরীর চাঙ্গা করে, মনোযোগ ও কর্মক্ষমতা বাড়ায়। অন্যদিকে, প্রতি কাপ গ্রিন টি-তে ক্যাফেইন থাকে ২০-৪৫ মিলিগ্রাম। তবে এতে রয়েছে এল-থিয়ানিন নামক একটি অ্যামাইনো অ্যাসিড, যা দেহ ও মনকে শান্ত করে, কিন্তু ঘুমঘুম ভাব আনে না।
সকালে বা কাজের সময় তাই লাল চা বেশি কার্যকর। এটি দ্রুত জাগিয়ে তোলে, কর্মক্ষমতা বাড়ায় ও ক্লান্তি দূর করে।
বিকেল বা রাতে সেরা পছন্দ হতে পারে গ্রিন টি। এটি ধীরে ধীরে মন ও শরীরকে সজাগ রাখে, কিন্তু অতিরিক্ত উ*ত্তেজনা তৈরি করে না। ফলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে না।
গ্রিন টি আর লাল চা উভয়েরই স্বাস্থ্যগুণ আছে, তবে ব্যবহারের সময় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিক চা বেছে নেওয়া জরুরি। সকাল বা চাপের সময় লাল চা আর শান্ত সময় বা রাতে গ্রিন টি এই ভারসাম্য বজায় রাখলেই আপনি পাবেন দুইয়ের সর্বোচ্চ উপকার।
১৩
বিশ্বে প্রথম কফি আবিষ্কার হয় ছাগলের মাধ্যমে
বাঙালির প্রিয় পানীয়ের মধ্যে কফি অন্যতম। কফি পছন্দ করেন না এমন মানুষ কমই আছেন। অনেকেরই সকাল শুরু হয় কফির পেয়ালায় চু*মুক দিয়ে। এরপর সারাদিন ক্লান্তি, ঘুম দূর করতে কাজের ফাঁকে কয়েক দফায় চলে কফি পান। শুধু আমাদের দেশেই নয়, পুরো বিশ্বে কফি জনপ্রিয় এক ক্যাফেইন।
তবে মানুষের পছন্দের এই পানীয় কিন্তু আবিষ্কার করেছিল একদল ছাগল। নবম শতকে আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণ ইথিওপিয়ার কাফা অঞ্চলের খালিদ নামের এক আরব বাসিন্দা ছাগল চরানোর সময় খেয়াল করেন যে, তার ছাগলগুলো জামের মতো এক ধরনের ফল খাচ্ছে। সে ব্যাপারটি তেমন গুরুত্ব দেয়নি। তবে পরবর্তীতে সে লক্ষ্য করে এই ফলগুলো খাওয়ার পর প্রাণীগুলোকে অনেক সতেজ দেখাচ্ছে। এমনকি তার ছাগলগুলো সারারাত না ঘুমিয়ে পার করে দেয়। এরপর খালিদ ওই ফলগুলোকে সিদ্ধ করে সর্বপ্রথম কফি তৈরি করেন। একদল সন্ন্যাসীকে তার পর্যবেক্ষণ জানানোর পর ঐ ফল থেকে পানীয় তৈরি করে তারা। উদ্দেশ্য ছিল সারারাত জেগে প্রার্থনা করা। এরপর কফি নামক এই পানীয় ইথিওপিয়া থেকে ইয়েমেনে রপ্তানি করা হয়। সেখানে সুফি-সাধকরা বিশেষ উপলক্ষে রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগি করার জন্য এটি পান করতেন। এরপরই বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রসার লাভ করে এই পানীয়টি। ফলে ইথিওপিয়াকে কফির জন্মস্থান মনে করা হয়। ইথিওপিয়ায় জন্ম নেওয়া কফি গাছ থেকে পাওয়া কফিকে বলা হয় 'অ্যারাবিকা'।
আপনি জানেন কি, ফিনল্যান্ডের একজন ব্যক্তির বছরে গড় কফি গ্রহণের পরিমাণ প্রায় ১২ কেজি। এছাড়া নরওয়ে ও আইসল্যান্ডের মানুষের গড় কফি গ্রহণের পরিমাণ বছরে ৯ কেজির ওপর। ডেনমার্ক ও সুইডেনের অধিবাসীরাও বছরে গড়ে ৮ কেজির বেশি কফি গ্রহণ করে থাকে।
পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষদিকে কফি পৌঁছে যায় মক্কা ও তুরস্কে। যেখান থেকে ১৬৪৫ সালে এটি যায় ইতালির ভেনিস নগরীতে। ১৬৫০ সালে পাস্ক রোসী নামের এক তুর্কীর হাত ধরে এটি ইংল্যান্ডে প্রবেশ করে। তিনি লন্ডন নগরীর লোম্বার্ড স্ট্রিটে সর্বপ্রথম কফির দোকান দেন।
কফি যে শুধু ঘরেই উপভোগ করা হতো, তা কিন্তু নয়। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন শহরে কফির দোকানগুলোকে বলা হতো 'কাহভেহ খানেহ'। ঐসব কফির দোকানগুলো পরবর্তীতে দৈনন্দিন আড্ডা, জমায়েতের জায়গা হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করে।
সেসময় এসব কফি হাউসগুলোই হয়ে ওঠে সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। তবে বিশ্বের অনেক মুসলিম দেশে এসব কফি হাউজকে নি/ষিদ্ধ করা হয়। তখনকার সময় মনে করা হতো, কফি হাউসে মানুষ বসে বসে আড্ডা দিচ্ছে। ফলে দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত ঘটছে। কফির মধ্যে থাকা ক্যাফেইনের কারণে যেহেতু ঘুম কম হতো তাই মনে করা হতো এটি নে*/শাদ্রব্য তাই কফি পান করাও নি/ষিদ্ধ ছিল। কিন্তু এত কিছুর পরও দমিয়ে রাখা যায়নি কফির জনপ্রিয়তা।
যে কফির আবিষ্কার করেছিল ছাগল, সেই কফির সবচেয়ে দামি ধরনটা আসে একটি প্রাণীর বিষ্ঠা থেকে। 'সিভেট' নামের স্তন্যপায়ী এক ধরনের বিড়াল অথবা হাতি-পৃথিবীর সবচেয়ে দামি কফি এই দুই প্রাণীর যে কোনো একটির পরিপাকতন্ত্র হয়ে মানুষের কাছে পৌঁছায়। 'কোপি লুয়াক' এক ধরনের কফি যা সিভেট নামক একধরনের ইন্দোনেশিয়ান স্তন্যপায়ী বিড়ালের বিষ্ঠা থেকে তৈরি হয়। বিড়ালের পরিপাকতন্ত্র দিয়ে যাওয়ার সময় স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতে কফি চেরিগুলো গাঁ*জানো হয়, পরবর্তীতে সেগুলো সংগ্রহ করে বিক্রি করা হয়। ঐ ধরনের কফির ৫০০ গ্রামের দাম হতে পারে ৭০০ ডলার (প্রায় ৬০ হাজার টাকা) পর্যন্ত। তবে বর্তমানে এই ধরনের কফিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে ফেলছে ব্ল্যাক আইভরি কফি। হাতে আলাদা করা কফি চেরি খাওয়ার পর থাইল্যান্ডের হাতিদের বি*ষ্ঠা থেকে তৈরি হয় এই জাতের কফি। ব্লেক ডিস্কিন নামের একজন কানাডিয়ান আবিষ্কার করেছিলেন এই ব্ল্যাক আইভরি কফি। যুক্তরাষ্ট্রে ৩৫ গ্রাম পরিমাণ ব্ল্যাক আইভরি কফির মূল্য প্রায় ৮৫ ডলারের কাছাকাছি। সূত্র: ডেজ অব দ্য ইয়ার
১৪
একা নয়, সবাই মিলেই শক্তি হয়
বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন কেবল একজনের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে এগোতে পারে না। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, প্রযুক্তি কিংবা উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে দলগত চেষ্টা ছাড়া সাফল্য সম্ভব নয়। একটি দলকে কীভাবে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন করা যায়, তার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দিয়েছেন কেন ব্ল্যাঙ্কার্ড, ডোনাল্ড কেয়ারও এবং ইউনিস প্যারিসি-কেয়ারও তাঁদের বহুল আলোচিত বই দ্য ওয়ান মিনিট ম্যানেজার বিল্ডস হাই পারফর্মিং টিমস-এ।
নেতৃত্বের নতুন সংজ্ঞা
আগে নেতৃত্ব মানে ছিল নির্দেশ দেওয়া আর নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু এখন নেতৃত্ব মানে হলো সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা, দলকে অনুপ্রাণিত করা এবং সদস্যদের দক্ষতা সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ করে দেওয়া। বাংলাদেশে করপোরেট প্রতিষ্ঠান কিংবা এনজিওগুলোতে যাঁরা খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে পারেন, তাঁরাই কর্মীদের মধ্যে আস্থা ও দায়বদ্ধতা গড়ে তুলতে সক্ষম হন।
কেন দলগত কাজ জরুরি
একজন ম্যানেজারের সময়ের ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ চলে যায় সভা, আলোচনা আর দলগত কাজে। কার্যকর দল ছাড়া তাই কোনো প্রতিষ্ঠান টেকসই হতে পারে না। একটি ভালো দল জটিল সমস্যা সহজে সমাধান করতে পারে, নতুন আইডিয়া বের করে আনে, সদস্যদের দক্ষতা বাড়ায় এবং প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিয়ে যায়। বাংলাদেশে গার্মেন্টস খাত, তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানি কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দলগত কাজের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন দলের বৈশিষ্ট্য:
পারফর্ম মডেল
লেখকেরা কার্যকর দল বোঝাতে ব্যবহার করেছেন পারফর্ম মডেল। এর মূল বিষয়গুলো হলো:
উদ্দেশ্য ও মূল্যবোধ: এটি দলকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়।
ক্ষমতায়ন: সদস্যদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেয়।
সুস্থ সম্পর্ক ও যোগাযোগ: এটিও টিমকে প্রাণবন্ত রাখে।
নমনীয়তা: দলকে পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে টিকিয়ে রাখে।
সর্বোচ্চ কর্মদক্ষতা: মানসম্মত কাজ ও ধারাবাহিক উন্নয়ন নিশ্চিত করে।
স্বীকৃতি ও প্রশংসা: কাজের স্বীকৃতি ও প্রশংসা প্রদান করে মনোবল বাড়ায়।
আস্থা ও উৎসাহ: দলকে দীর্ঘস্থায়ী
আমাদের কেউই একা সবার মতো বুদ্ধিমান নয়; একসঙ্গে থাকলেই আমরা সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জন করতে পারি।
করে একটি টিমকে উচ্চক্ষমতায় পৌঁছে দেয়।
দলের বিকাশের চার ধাপ
লেখকদের মতে, কোনো দল গঠনের সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয়ে ওঠে না। এর চারটি ধাপ রয়েছে-
অভিমুখী ধাপ: সবাই উৎসাহী কিন্তু অনিশ্চিত।
অসন্তোষ ধাপ: প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাকে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।
সমন্বয় ধাপ: সদস্যরা একে অপরকে বোঝে, সহযোগিতা গড়ে ওঠে।
উৎপাদনশীল ধাপ: দল আস্থাভিত্তিক হয়ে উচ্চক্ষমতায় কাজ করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গ্রুপ প্রেজেন্টেশনের প্রস্তুতিতে এ ধাপগুলো সহজেই চোখে পড়ে।
নেতৃত্বের ধরন
দল গঠনের প্রতিটি ধাপে নেতার আলাদা ভূমিকা থাকে। অভিমুখী ধাপে নেতাকে হতে হয় দৃঢ় নির্দেশক। অসন্তোষ ধাপে তাঁকে হতে হবে ধৈর্যশীল শ্রোতা ও সমস্যা সমাধানকারী। সমন্বয় ধাপে নেতাকে আস্থা তৈরি করে মতবিরোধ মিটিয়ে সহযোগিতা বাড়াতে হয়। আর উৎপাদনশীল ধাপে নেতা হয়ে ওঠেন সহায়ক ও প্রশিক্ষক। যেমন ক্রিকেটে দলের ক্যাপ্টেনের ক্ষেত্রেও দেখা যায়-কখনো দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেওয়া, আবার কখনো শুধু মনোবল ধরে রাখাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
বাস্তব উদাহরণ
একটি সফটওয়্যার কোম্পানি নতুন মোবাইল অ্যাপ তৈরির জন্য একটি দল গঠন করল। শুরুতে উৎসাহ নিয়ে কাজ শুরু করে। এটি অভিমুখী ধাপ। পরে ডিজাইনার ও প্রোগ্রামারের মধ্যে মতবিরোধ হলো, যা অসন্তোষ ধাপ। আলোচনা ও সহযোগিতার মাধ্যমে তারা তারা। সমস্যা কাটিয়ে উঠল, এটি হলো সমন্বয় ধাপ। আর শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকে স্বাধীনভাবে কাজ সম্পন্ন করে সফলভাবে অ্যাপ বাজারে ছাড়ল, এটি উৎপাদনশীল ধাপ। অনেক স্টার্টআপ ও এনজিও প্রজেক্টেও একই অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়।
সবাই মিলে এগোনোর শক্তি
দল মানে শুধু একসঙ্গে কাজ করা নয়, দল মানে হলো অভিন্ন উদ্দেশ্য, স্বপ্ন আর পারস্পরিক আস্থা। দ্য ওয়ান মিনিট ম্যানেজার বিল্ডস হাই পারফর্মিং টিম শেখায়-কার্যকর নেতৃত্ব, স্পষ্ট লক্ষ্য আর পারস্পরিক বিশ্বাসই একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন দলের মূল ভিত্তি। লেখকদের বিখ্যাত উক্তি-'নান তাব আস ইজ অ্যাজ স্মার্ট অ্যাজ অল অব আস।' অর্থাৎ, আমাদের কেউই একা সবার মতো বুদ্ধিমান নয়; একসঙ্গে থাকলেই আমরা সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জন করতে পারি।
@ সাব্বির হোসেন
১৫
হাতের লেখা সুন্দর করার ৭ উপায়
বর্তমান ডিজিটাল যুগে স্মার্ট ফোন, কম্পিউটার এবং ই-মেইল ব্যবহারের কারণে হাতে লেখার চর্চা কমে গেছে। তবুও, শিক্ষাক্ষেত্রে বা পরীক্ষার খাতায় হাতে লেখা গুরুত্ব কোনো অংশে কমেনি। পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর হাতের লেখা শিক্ষক ও পরীক্ষক—উভয়েরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কিছু সহজ কৌশল অনুশীলনের মাধ্যমে হাতের লেখা সুন্দর করা সম্ভব। এমনই কিছু কৌশল তুলে ধরা হলো:
সঠিক কলমের ব্যবহার
হাতের লেখার ক্ষেত্রে কলমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লেখার সময় এমন কলম বেছে নিতে হবে যা হালকা ও ব্যবহার করা সহজ। অনেকেই অতিরিক্ত ভারী বা কম গতিসম্পন্ন কলম ব্যবহার করেন, যার ফলে হাত দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং লেখা সুন্দর হয় না। একটি হালকা ও আরামদায়ক কলম দিয়ে লিখলে হাতের লেখা স্বাভাবিকভাবে সুন্দর হয়। কলমের ধরন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তা হালকাভাবে ধরে লেখা প্রয়োজন। অতিরিক্ত চাপ দিয়ে কলম ধরলে আঙুলে ব্যথা হতে পারে এবং লেখার মান খারাপ হয়ে যায়। তাই কলম হালকাভাবে ধরে, স্বাভাবিক গতিতে লিখতে হবে।
বর্ণমালার সঠিক অনুশীলন
হাতের লেখা সুন্দর করার অন্যতম প্রধান শর্ত প্রতিটি বর্ণ ও অক্ষর সঠিকভাবে লেখা। হাতের লেখার সৌন্দর্য নির্ভর করে প্রতিটি অক্ষরের সঠিক আকার ও বিন্যাসের ওপর। স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ—প্রতিটি অক্ষর আলাদা করে পরিষ্কারভাবে লেখার অভ্যাস করতে হবে। যেমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুকণা একত্রিত হয়ে বিশাল মরুভূমি গঠন করে, তেমনি প্রতিটি অক্ষর সুন্দর হলে পুরো লেখাটাই সুন্দর দেখাবে। শুধু বর্ণমালার আকার নয়, লাইন গ্যাপ ও মাত্রা সঠিক রাখা প্রয়োজন। এ জন্য প্রতিদিন কিছুটা সময় বর্ণমালা অনুশীলনে ব্যয় করলে হাতের লেখার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।
সোজা করে লেখা
লেখার সময় অনেকেই লক্ষ্য করেন যে তাদের লেখাগুলো বাঁকা হয়ে যায়। বাঁকা লেখার কারণে লেখার সৌন্দর্য নষ্ট হয় এবং তা পড়তে অসুবিধা হয়। সোজা লাইন ধরে লেখার অভ্যাস গড়ে তুলতে প্রথমদিকে পেনসিল দিয়ে সরলরেখা টেনে লেখা যেতে পারে। এ ছাড়া লেখার সময় শরীরের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। সোজা হয়ে বসে লেখার অভ্যাস করতে হবে, কারণ ঝুঁকে বা বাঁকা হয়ে বসলে হাতের লেখা ঠিকঠাক হয় না। লেখার সময় মনোযোগ দিতে হবে যেন প্রতিটি লাইন সোজা থাকে এবং লেখার বিন্যাস সুন্দর হয়।
মাঝারি আকারের অক্ষর ব্যবহার করা
হাতের লেখা সুন্দর করতে অক্ষরের আকারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অক্ষরগুলো খুব ছোট বা খুব বড় হলে তা দেখতেও খারাপ লাগে এবং পড়তে অসুবিধা হয়। তাই অক্ষরের আকার মাঝারি রাখার চেষ্টা করতে হবে। মাঝারি সাইজের অক্ষর দেখতে সুন্দর লাগে এবং পড়ার জন্যও উপযোগী হয়। বড় বা ছোট অক্ষরের পরিবর্তে প্রতিটি অক্ষর যেন পরিমিত আকারে থাকে সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে।
মনোযোগ সহকারে এবং ধীরে লেখা
অনেকেই দ্রুত গতিতে লেখার চেষ্টায় হাতের লেখার সৌন্দর্য নষ্ট করে ফেলে। দ্রুত গতিতে লেখা প্রয়োজনীয় হলেও, হাতের লেখার স্পষ্টতা ও সৌন্দর্য বজায় রাখা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত লিখতে গিয়ে অক্ষরগুলো অস্পষ্ট হয়ে গেলে লেখার মান কমে যায়। তাই দ্রুত লেখার সময়ও পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে ধীরে এবং পরিষ্কারভাবে লেখার অভ্যাস করতে হবে। প্রতিটি অক্ষর ও শব্দের প্রতি মনোযোগ দিলে হাতের লেখার মান উন্নত হবে।
কা*টাকা*টি থেকে বিরত থাকা
লেখার সময় কা*টাকা*টি করা বা ওভার রাইটিং করা হাতের লেখার সৌন্দর্য কমিয়ে দেয়। যদি কোনো কিছু কেটে দিতে হয়, তাহলে একবারে সোজা টানে কেটে দেবে। কা*টাকা*টির ফলে লেখা অপরিষ্কার দেখায় ও পড়তে অসুবিধা হয়। তাই হাতের লেখার মান বজায় রাখতে যতটা সম্ভব কা°টাকা°টি থেকে বিরত থাকতে হবে।
নিয়মিত অনুশীলন করা
হাতের লেখা সুন্দর করার জন্য সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো নিয়মিত অনুশীলন। প্রতিদিন কিছুটা সময় নির্দিষ্ট করে হাতের লেখার অনুশীলন করলে ধীরে ধীরে লেখার মান উন্নত হয়। অনেকে মনে করেন, বয়স বাড়লে হাতের লেখা আর সুন্দর করা সম্ভব নয়। কিন্তু সত্যি কথা হলো, যেকোনো বয়সে নিয়মিত চর্চা করলে হাতের লেখা সুন্দর করা সম্ভব। প্রতিদিন অনুশীলনের মাধ্যমে হাতের লেখাকে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন করে তোলা যায়। @ সাব্বির হোসেন
১৬
দি রিচেস্ট ম্যান ইন ব্যাবিলন বইয়ের ১০ শিক্ষা
১৯২৬ সালে প্রকাশিত এই বই প্রাচীন ব্যাবিলনের দৃষ্টান্তের মাধ্যমে গল্প আকারে তুলে ধরা হয়েছে। বইটি থেকে এমন ১০টি শিক্ষা পাওয়া যায়, যা অনুসরণ করে মানুষ জীবনে সম্পদ নির্মাণ এবং আর্থিক সাফল্য পেতে পারে। বইটি পড়ে শিক্ষাগুলো লিখেছেন এম এম মুজাহিদ উদ্দীন।
বইটির অন্যতম মৌলিক নীতি হলো নিজের জন্য সঞ্চয় করা। পাঠকদের অন্য কিছুতে ব্যয় করার আগে তাদের আয়ের কমপক্ষে ১০ শতাংশ নিজের জন্য সঞ্চয় করার পরামর্শ দিয়েছেন ক্লাসন। এতে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে ওঠে। যার ফলে ব্যক্তিরা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্পদ সঞ্চয় করতে পারেন।
আয় অনুযায়ী ব্যয় করুন
ক্লাসন নিজের আয় অনুযায়ী জীবনযাপন এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। আয় অনুযায়ী খরচের তালিকা তৈরি করতে হবে। প্রয়োজন এবং চাহিদার মধ্যে পার্থক্য করে সে অনুযায়ী খরচ করতে হবে। যেন প্রতি মাসে সঞ্চয় এবং বিনিয়োগের জন্য টাকা অবশিষ্ট থাকে।
টাকা যেন আপনার জন্য কাজ করে
বইটি শিক্ষা দেয় যে অতিরিক্ত আয় অর্জনের জন্য টাকা জমিয়ে না রেখে বিজ্ঞতার সঙ্গে বিনিয়োগ করা উচিত। পাঠকদের বিনিয়োগের সুযোগ খোঁজার জন্য উৎসাহিত করেছেন। ফলে বিনিয়োগকারীর সম্পদ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পেতে থাকবে। এর মানে হলো, টাকা বসে না থেকে আপনার জন্য কাজ করবে।
জ্ঞান এবং পরামর্শের সন্ধান করুন
ক্লাসন আর্থিক শিক্ষা এবং জ্ঞানী ব্যক্তিদের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়ার মূল্যকে তুলে ধরেছেন। যারা সফলভাবে তাদের টাকা পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা করেছেন তাদের কাছ থেকে টাকা ব্যবস্থাপনার কৌশল শিখতে পারলে আরও ভালো আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সহায়ক হবে।
পরিকল্পিত বাজেট তৈরি করুন
প্রতি মাসে বাজেট তৈরি করা বইয়ের একটি অন্যতম শিক্ষা। ক্লাসন পাঠকদের তাদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আয় এবং ব্যয়ের ওপর নজর রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। যাতে তারা ভবিষ্যতে প্রয়োজনের জন্য পরিকল্পনা করতে পারেন। কার্যকরভাবে সম্পদ সঞ্চয় করতে পারেন। একটি পরিকল্পিত বাজেট অতিরিক্ত খরচ কমানো ও সঞ্চয়ের জন্য সহায়ক হয়।
নিজের মধ্যে বিনিয়োগ করুন
ক্লাসন আত্ম-উন্নতি এবং শিক্ষার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন। নিজের দক্ষতা এবং জ্ঞানে বিনিয়োগ করলে আরও ভালো কাজের সুযোগ এবং আয়ের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেতে পারে। আর্থিক সাফল্য অর্জনের জন্য ক্রমাগত শেখা অপরিহার্য।
ঋণ এড়িয়ে চলুন
ঋণ একটা মানুষকে তিলে তিলে শেষ করে দেয়। বইটি ঋণের বিপদ, বিশেষ করে উচ্চ সুদের ঋণের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। ক্লাসন পাঠকদের অপ্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য ঋণ নেওয়া এড়াতে এবং বিদ্যমান যেকোনো ঋণ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পরিশোধ করার পরামর্শ দিয়েছেন। সম্পদ গড়ে তোলার জন্য ঋণমুক্ত জীবনযাপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অধ্যবসায় ও ধৈর্য
সৎভাবে সম্পদ বৃদ্ধি করা রাতারাতি সম্ভব নয়। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। যার জন্য প্রচুর অধ্যবসায় ও ধৈর্যের প্রয়োজন। ক্লাসন শিক্ষা দেন যে এর মধ্যে বিপত্তিও ঘটতে পারে। তবুও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখে এ সাফল্যের জন্য কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে আর্থিক লক্ষ্যের প্রতি থাকতে হবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
একাধিক আয়ের পথ তৈরি করুন
ক্লাসন পাঠকদের তাদের মূল পেশার পাশাপাশি ব্যবসা, বিনিয়োগ বা প্যাসিভ আয় করতে উৎসাহিত করেছেন। আয়ের বিভিন্ন রকম উৎস থাকলে একটা উৎসে কোনো সমস্যা হলে বাকি উৎস থেকে আয় আসতে থাকবে। ফলে একেবারে বিপদগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা খুবই কম। তা ছাড়া এতে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিও সহজ হয়।
সম্পদ ভাগ করুন
পরিশেষে, ক্লাসন দান করা এবং নিজের সম্পদ ভাগ করে নেওয়ার গুরুত্বের ওপর জোর দেন। দাতব্য অবদানের মাধ্যমে হোক বা অন্যকে সাহায্য করার মাধ্যমে হোক, তিনি সম্পদ ভাগাভাগি করতে উৎসাহিত করেছেন। এতে করে সবার মধ্যে মানবিকতাবোধ তৈরি হয় এবং দাতা ও প্রাপক উভয়কেই সমৃদ্ধ করে।
১৭
উড়োজাহাজের জনক: রাইট ব্রাদার্সের সংগ্রাম ও সাফল্য
মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক অসাধারণ মাইলফলক হলো উড়োজাহাজের আবিষ্কার। আর এই অর্জনের পেছনে যাঁদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে, তাঁরা হলেন অরভিল রাইট ও উইলবার রাইট — রাইট ভাইয়েরা। ছোট্ট এক সাইকেল ওয়ার্কশপ থেকে যাত্রা শুরু করে তাঁরা যন্ত্রচালিত, নিয়ন্ত্রিত ও ভারসাম্যপূর্ণ উড়োজাহাজ আবিষ্কার করেন, যা বদলে দেয় গোটা বিশ্বের যাতায়াত ব্যবস্থার মানচিত্র।
শুরুর গল্প
ওহায়োর ডেটন শহরের দুই ভাই, উইলবার (জন্ম ১৮৬৭) ও অরভিল (জন্ম ১৮৭১), ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি নিয়ে কৌতূহলী ছিলেন। তাঁরা সাইকেল সারাইয়ের ব্যবসা চালাতেন, আর সময় পেলেই বিভিন্ন ধরনের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যস্ত থাকতেন। তাঁদের আগ্রহ জন্মায় উড়ার প্রযুক্তি নিয়ে, বিশেষ করে স্যামুয়েল ল্যাংলি ও অটো লিলিয়েনথাল এর কাজ দেখে।
পরীক্ষা ও ব্যর্থতা
১৮৯৯ সাল থেকে তাঁরা ডানা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার নকশা নিয়ে কাজ শুরু করেন। ১৯০০ থেকে ১৯০২ সালের মধ্যে তাঁরা বিভিন্ন ধরনের গ্লাইডার তৈরি করে নর্থ ক্যারোলিনার কিটি হক-এ বারবার পরীক্ষা চালান। বহুবার ব্যর্থ হয়েছেন, দুর্ঘটনায় পড়েছেন—তবু হাল ছাড়েননি।
ইতিহাস গঠনের দিন
১৭ ডিসেম্বর ১৯০৩, কিটি হকে ইতিহাসের প্রথম সফল মানবচালিত ও মোটরচালিত উড়োজাহাজ "ফ্লায়ার ১" আকাশে ওড়ে। অরভিল রাইট প্রথম চালক ছিলেন এবং তাঁর সেই প্রথম ফ্লাইট ছিল ১২ সেকেন্ডে ১২০ ফুট দীর্ঘ। একই দিনে উইলবারও আরও বড় ফ্লাইট সম্পন্ন করেন।
কেন তাঁরা সফল হলেন?
রাইট ভাইদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁদের বাস্তবভিত্তিক গবেষণা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উদ্ভাবন। তাঁরা উড়োজাহাজের জন্য থ্রি-অ্যাক্সিস কন্ট্রোল সিস্টেম (Roll, Pitch, Yaw) তৈরি করেন, যা আজকের আধুনিক উড়োজাহাজেও ব্যবহার হয়।
রাইট ভাইদের আবিষ্কার শুধু প্রযুক্তিগত বিপ্লবই নয়, বরং মানব কল্পনার দিগন্তও প্রসারিত করেছে। তাঁদের আত্মত্যাগ, অধ্যবসায় ও নিরলস চেষ্টার ফলে আজ মানুষ মহাকাশেও বিচরণ করতে পারে।
১৮
টিনএজেই সফল হতে সাত পরামর্শ
লেখাপড়া শেষে কর্মজীবনে প্রবেশ করেই সফল মানুষ হয়ে ওঠার প্রসঙ্গ আসে। এসব সফল মানুষের পেছনে পড়ে থাকে স্মৃতিময় টিনএজ বয়সের রঙিন দিনগুলো। কিন্তু অনেক টিনএজারের কাছে তার সময়টি খেলাধুলার মাঠ নয়, টিনএজ বয়স থেকেই তাদের জীবনে সফলতা অর্জনের পথ খুঁজতে হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, চাইলে একজন সফল টিনএজার হয়ে ওঠাও অসম্ভব কিছু নয়। যদিও এ বয়সে সফল হওয়াটা সহজ কথা নয়, কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রেই তা সম্ভাবনাময়। এখানে টিনএজ বয়সেই সফলতা লাভের সাতটি পরামর্শ।
স্কুলে ভালো করো: ভবিষ্যৎ কেমন হবে- টিনএজাররা এর পরিচয় রাখে স্কুলজীবনে। তাই লেখাপড়ার কাজটি বেশ মনোযোগের সঙ্গে করা জরুরি। হতে পারে অনেক বিষয়ই ভালো ঠেকছে না; কিন্তু এরপরও সফল হয়ে ওঠার বিষয়টি মাথায় রেখে দারুণ একটা ফল বাগিয়ে নিতে ঝাঁপ দাও।
নিজস্বতা তৈরি করো: তুমি যেমন, সবসময় তেমনই থাকো। বড়রা এ নিয়ে দ্বিমত পোষণ করলেও তুমি নিজের মতো থাকার চেষ্টা করবে। এর সঙ্গে যোগ করবে আত্মবিশ্বাস। নিজের সামর্থ্যের ওপর ভরসা করবে। এই গুণগুলোর পরিচর্যা করো। যা নিজের জন্য ভালো বলে মনে হয়, নিজস্বতা নিয়ে তা করতে কোনো দোষ নেই।
মাদক থেকে দূরে থাকো: কখনোই মাদকের প্রতি আকৃষ্ট হবে না। আগ্রহের বশে একটু চেখে দেখার ইচ্ছাও মনে আনবে না। তোমার সব ভালো এবং সম্ভাবনাময় বিষয়ের ইতি ঘটাতে এই একটি বিষয়ই যথেষ্ট। মাদকে বিন্দুমাত্র আগ্রহ না রাখলে তোমার কিছুই যাবে-আসবে না। কাজেই টিনএজারদের মাদককে ঘৃণা করতে হবে।
নিজের গণ্ডিতে ভালো কিছু করো: তুমি যেখানে থাকো তার চারপাশের মানুষ এবং পরিবারের জন্য ভালো কিছু করার চেষ্টা চালিয়ে যাও। নিজের লেখাপড়ার ক্ষতি না করেও ছোট ছোট অথচ সমাজের জন্য ভালো অনেক কিছুই করা যায়। এতে করে তুমি সুখী হবে এবং বড় কিছু করার আশা জন্ম নেবে। এর ফলে সম্ভাবনার জানালাগুলো খুলে যাবে, যা তুমি আগে কখনো দেখনি।
জীবনের লক্ষ্য স্থির করো: টিনএজ বয়সের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ হলো, জীবনের লক্ষ্য স্থির করা। একবার লক্ষ্য সম্পর্কে পরিষ্কার হয়ে গেলে নির্দিষ্ট দিকে এগিয়ে যেতে সুবিধা হবে তোমার। লক্ষ্যকে ক্যারিয়ারের সঙ্গে যুক্ত করো। এতে চলার পথের সন্ধান পাবে। এই বয়স থেকেই পথের দিশা পেলে তোমাকে ঠেকায় কে?
ব্যবহার ভালো করো: পরিচিত বা অপরিচিত সবার সঙ্গেই ভালো ব্যবহার করো। এটি তোমার দারুণ এক ব্যক্তিত্ব তৈরি করে দেবে। বন্ধুমহল, শুভাকাঙ্ক্ষী ও বড়দের পরামর্শ শুনবে। সেখান থেকে নিজের জন্য ভালো মনে হয় এমন পরামর্শগুলো গ্রহণ করো। আচরণ ভালো থাকলে সবাই তোমাকে সুপরামর্শই দেবে।
ভালো বন্ধুমহল তৈরি করো: বন্ধুরা জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখানে যদি ভালোদের সমাগম ঘটে, তবে তোমার জীবনে ভালো কিছু না কিছু ঘটতেই থাকবে। তাই তোমার মতো সফল টিনএজারদেরই বন্ধু হিসেবে পাওয়ার চেষ্টা করো। সুবিধার নয়, এমন বন্ধুদের সঙ্গ ত্যাগ করো। এসব বন্ধু জীবনটাকে বিষাক্ত করে দেবে।
১৯
জাপানি '৫ এস' নিয়মেই মিলবে শৃঙ্খলা
কর্মক্ষেত্র গুছিয়ে রাখার কৌশলের জন্য জাপানিরা আবিষ্কার করেছেন ফাইভএস পদ্ধতি। এ পদ্ধতি নিয়ে লিখেছেন এম এম মুজাহিদ উদ্দীন।
ধরুন, সকালে অফিসে ঢুকেই দেখলেন ডেস্কটা জগাখিচুড়ি। কলম খুঁজে পাচ্ছেন না, দরকারি নোট কোথায় রেখেছেন মনে নেই, চারপাশে কাগজের পাহাড়। এমন অবস্থায় কাজ শুরু করা কি সহজ? মোটেই নয়। এ সমস্যার সমাধান খুঁজতেই জাপানিরা আবিষ্কার করেছেন 'ফাইভ এস' পদ্ধতি। এ পদ্ধতির মূলকথা হলো, আপনার কাজের জায়গা যদি গুছানো থাকে, তাহলে কাজ করা হবে সহজ, দ্রুত ও নির্ভুল। শুধু শুধু অফিসে নয়, এ নিয়ম আপনার পড়ার টেবিল এমনকি জীবনযাপনেও বদল এনে দিতে পারে। জাপানের শিল্পবিপ্লবের সময় এ কৌশলটির উদ্ভব হয় এবং পরবর্তী সময়ে তা বিশ্বের নানা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা ও মান বজায় রেখে কর্মপরিবেশ উন্নত করার এমন কৌশল সচেতন ব্যবস্থাপনার চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করে।
'ফাইভ এস' কী?
'ফাইভ এস' বা (5S) হলো পাঁচটি জাপানি শব্দের আদ্যাক্ষর, যার প্রতিটি আপনাকে শেখায় কীভাবে একটা জায়গা গুছিয়ে, পরিষ্কার রেখে এবং শৃঙ্খলা বজায় রেখে কাজের গতি বাড়ানো যায়। ১৯৫০-এর দশকে জাপানের টয়োটা মোটর কোম্পানিতে উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা আনার উদ্দেশ্যে 'টয়োটা প্রোডাকশন সিস্টেম' চালু হয়। এ ব্যবস্থার একটি অংশ ছিল ফাইভ এস, যা পরে একটি স্বতন্ত্র ব্যবস্থাপনা কৌশল হিসেবে বিবেচিত হয়। Kaizen (নিরবিচার উন্নয়ন) নীতির অন্তর্ভুক্ত এ কৌশলটি ব্যবস্থাপনার জগৎকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। পাঁচটি ধাপ-
বাছাই করুন (Seiri)
যে জিনিসগুলো প্রয়োজনীয় নয়, সেগুলোকে কর্মপরিবেশ থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। এতে জায়গা খালি হয়, বিশৃঙ্খলা কমে এবং দরকারি জিনিসগুলো খুঁজে পেতে সহজ হয়। আমরা প্রতিদিন কত অপ্রয়োজনীয় জিনিস জমিয়ে রাখি পুরোনো ম্যাগাজিন, নষ্ট কলম, ফেলে দেওয়ার মতো ফাইল! Seiri শেখায় কীভাবে দরকারি আর অদরকারি জিনিস আলাদা করে জায়গা ফাঁকা করা যায়।
গুছিয়ে রাখুন (Seiton)
প্রয়োজনীয় জিনিস এমনভাবে রাখুন, যাতে প্রয়োজনের সময় সহজে পাওয়া যায়। যেমন ধরুন, খাতা-কলম বা প্রতিদিন পড়েন এমন কোনো বই যদি প্রতিদিন আলাদা জায়গায় রাখেন, তাহলে প্রতিবার খুঁজতে সময় যাবে। Seiton বলে, 'প্রতিটি জিনিসের একটা নির্দিষ্ট জায়গা থাকা উচিত।' বাসায় প্রয়োগ করুন: অফিসে যেসব ফাইল প্রয়োজন হয়, সেগুলো হাতের নাগালে রাখুন। আর যেগুলো কম প্রয়োজন, সেগুলো আলমারি বা ডেস্কে রাখতে পারেন।
পরিষ্কার করুন (Seiso)
শুধু গুছিয়ে রাখলেই হবে না, নিয়মিত পরিষ্কার করাও জরুরি। জাপানের অফিস বা কারখানায় প্রত্যেক কর্মী নিজের টেবিল, এমনকি যন্ত্রপাতি নিজে পরিষ্কার করেন। এতে পরিবেশ যেমন ভালো থাকে, তেমনি নিজের জিনিস নিয়েও সচেতনতা বাড়ে।
বাসায় প্রয়োগ করুন: প্রতিদিন ৫ মিনিট করে নিজের পড়ার টেবিল বা অফিস ডেস্ক পরিষ্কার করুন।
নিয়ম বানান (Seiketsu)
এই তিনটি ধাপ যেন একবার করে করে থেমে না যায়, সেটাই Seiketsu-র শিক্ষা। তাই তারা নিয়ম বানায় প্রতিদিন সকালে পরিষ্কার করা, সপ্তাহে একদিন রিভিউ করা, লেবেল আপডেট রাখা। বাসায় প্রয়োগ করুন: প্রতি শনিবার আলমারি বা ফ্রিজ গোছানোর 'পরিবার দিবস' চালু করুন।
শৃঙ্খলা বজায় রাখুন (Shitsuke)
যেকোনো অভ্যাস টিকিয়ে রাখতে লাগে শৃঙ্খলা, ধৈর্য ও নিজস্ব দায়বদ্ধতা। জাপানিরা এ ধাপকে খুব গুরুত্ব দেন। কারণ তাঁরা বিশ্বাস করেন, গুছিয়ে রাখার অভ্যাস শুধু জিনিসপত্রে নয়, জীবনেও শৃঙ্খলা আনে। ছোটদের শেখান জিনিসপত্র ব্যবহারের পর যেখানে ছিল, সেখানে রেখে দিতে।
কোথায় কোথায় ফাইভ এস কাজ করে?
অফিসে: সময় বাঁচে, ভুল কমে, পরিবেশ হয় পেশাদার।
স্কুলে: শিক্ষার্থীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ সৃষ্টি হয়।
হাসপাতালে: নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন চিকিৎসা পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
ঘরে: সময়, জায়গা ও মানসিক চাপ কমে।
'ফাইভ এস' শুধু একটি কাজের কৌশল নয়, এটি একটি জীবনদর্শন। এটি শেখায় কীভাবে ছোট ছোট অভ্যাস আপনাকে একজন গোছানো, সময়সচেতন ও দায়িত্ববান মানুষে রূপান্তরিত করতে পারে।
২০
জীবনে এগিয়ে যাওয়ার ১০টি শিক্ষা: 'দ্য আলকেমিস্ট' এর আলোকে
পাওলো কোয়েলহোর 'দ্য আলকেমিস্ট' শুধু একটি উপন্যাস নয়, বরং এটি জীবনের গভীর দিকগুলো নিয়ে লেখা এক অনুপ্রেরণাদায়ক আখ্যান। এই বইটি জীবন সম্পর্কে অনেক মূল্যবান শিক্ষা দেয়, যা আমাদের পথচলাকে সহজ এবং অর্থবহ করে তুলতে পারে। এই লেখায় বইটি থেকে পাওয়া ১০টি মূল্যবান জীবন পাঠের কথা উল্লেখ করা হলো:
১. আপনার স্বপ্ন অনুসরণ করুন
প্রতিটি মানুষের জীবনে একটি স্বপ্ন থাকে, যা তার অন্তরে বোনা থাকে। জীবনে সুখী হতে হলে সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। বইটির মূল চরিত্র সান্তিয়াগো গুপ্তধনের খোঁজ পেতে নিজের স্বপ্নের পথে হাঁটতে শুরু করে।
২. বা*ধা-বিপত্তি আসবে, তবে তা মোকাবেলা করতে হবে
জীবনে বড় কিছু অর্জন করতে গেলে বা*ধা আসবেই। কিন্তু বা*ধা-বিপত্তি আসা মানেই থেমে যাওয়া নয়। সান্তিয়াগো নিজের যাত্রায় বহু বা*ধার সম্মুখীন হয়, তবে সে কখনো হাল ছাড়েনি।
৩. আপনার হৃদয়ের কথা শুনুন
হৃদয়ের ভেতরকার অনুভূতি আমাদের জীবনের আসল পথ নির্দেশ করে। বইটি বারবার এই কথা মনে করিয়ে দেয় যে, আমাদের অন্তরের ইচ্ছাগুলো জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যাল।
৪. একা চলতে শিখুন
জীবনের কিছু যাত্রা আপনাকে একাই করতে হবে। সান্তিয়াগোর মতো, কখনো কখনো অন্যদের সহায়তা ছাড়াই নিজেকে শক্তিশালী হতে হবে এবং একা চলতে হবে।
৫. প্রত্যেকটি দিনের মূল্য বুঝুন
'দ্য আলকেমিস্ট' শিক্ষা দেয় যে, জীবনের প্রতিটি দিনই বিশেষ। প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা আমাদের জীবনকে উন্নত করতে সাহায্য করে এবং নতুন কিছু শেখায়।
৬. ভ*য়ের মোকাবেলা করুন
আমাদের জীবনের বড় বাধা হলো ভ*য়। বইটি ভ*য়কে জয় করার কথা বলে, কারণ ভ*য় আমাদের ব্যক্তিগত লক্ষ্য অর্জন বা স্বপ্নের পথে সবচেয়ে বড় বা*ধা।
৭. বিশ্বাস রাখুন যে সবকিছু সম্ভব
পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে তা আমাদের সাহায্য করার জন্যই ঘটে। আমাদের স্বপ্ন পূরণ করতে হলে নিজেদের উপর এবং সৃষ্টিকর্তার উপর বিশ্বাস রাখতে হবে।
৮. আনন্দের সন্ধান করুন
বইটি জানায়, আমাদের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো সুখ। যাত্রা যতই কঠিন হোক না কেন, সান্তিয়াগো সর্বদা তার স্বপ্নের সুখের দিকে মনোযোগ দেয়।
৯. ভ্রমণই শিক্ষার উৎস
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার মাধ্যমে মানুষ অনেক কিছু শিখতে পারে। সান্তিয়াগোর ভ্রমণ তার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক হিসেবে প্রমাণিত হয়।
১০. সবকিছুই একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ
জীবনে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনা, প্রত্যেকটি অভিজ্ঞতা, একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ঘটে। যা আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
২১
আন্তন চেকভের অনুগল্প গ্রাম্য কুটির
[মূল: আন্তন চেখভ || রুশ থেকে ইংরেজি কনস্ট্যান্স গার্নেট || ইংরেজি থেকে বাংলা: মোখলেছুর রহমান আকন্দ]
গ্রামের এক রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে যুবাবয়সী দু'জন নারী-পুরুষ হাঁটাচলা করছে। কিছুদিন আগে তাদের বিয়ে হয়েছে। পুরুষটি এক হাতে তার সঙ্গিনীকে জড়িয়ে আছে; সঙ্গিনীটির মাথাও তার সঙ্গীর কাঁধে আনত। উভয়েই এক অজানা সুখের আবেশে মগ্ন হয়ে আছে।
ভাসমান মেঘমালার ফাঁকে চাঁদ উকি দেয়। ভ্রু কুঁচকে তাদের দেখে। তাদের সুখ বুঝি চাঁদের মনে ঈর্ষা জাগায়। তার অনাবশ্যক শুদ্ধতা অনুশোচনায় তাকে ভারাক্রান্ত করে।
বুনো চেরি আর লাইলাকের সৌরভে থমকে যাওয়া বাতাস ক্রমশ গাঢ়। দূর সীমানায় কোথাও এক শস্যখোঁচা পাখির ডাক শোনা যায়।
'অপূর্ব সাশা, অপূর্ব!' মেয়েটি বিড়বিড় করে বলে। 'যেন স্বপ্ন দেখছি।
দেখো, একটা সামান্য ঝোপও কেমন কাছে ডাকছে! এই টেলিগ্রাফের খুঁটিগুলোই দেখো না। কী দৃঢ় একেকটা, আবার কী নীরব! ওরা কিন্তু এই গোটা পরিবেশে একটা অন্যরকম মাত্রা যোগ করেছে, না? মানুষের সভ্যতাকে চেনাচ্ছে ওরা ... আর, তুমিই বলো, দারুণ লাগে না যখন দূর থেকে ট্রেনের শব্দ ভেসে ভেসে আসে? অপূর্ব সব!'
'একদম! কিন্তু তোমার হাত কেমন গরম হয়ে আছে! বোধহয় খুব অস্থির হয়ে আছ তুমি, ভারিয়া। ভালো কথা, রাতে আমরা কী খাচ্ছি?'
'মুরগির মাং স, সালাদ... দু'জনের হিসেবে মুরগিটা কিন্তু বেশ বড়। আর শহর থেকে যে স্যামন এলো, সারডিন, ওগুলোও থাকছে।'
চাঁদ লজ্জায় মেঘের আড়ালে মুখ লুকায়। মানুষের সুখ তার একাকিত্বকে উপহাস করে। তাদের মধুময় অভিসার, পাহাড়-উপত্যকার আড়ালে নিত্য তার নিভৃত যাপনের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে থাকে। সমব
ভারিয়া বলে ওঠে, 'কী মজা, দেখো ট্রেন আসছে!'
ট্রেনের জ্বলজ্বলে তিন চোখ দূর থেকে দেখা যেতে থাকে। স্টেশনমাস্টার প্ল্যাটফর্মে হাজির। এখানে-ওখানে সতর্কবাতি জ্বলে উঠতে থাকে।
সাশা হাই তুলে বলে, 'ট্রেনটা আসুক, এরপর দেখে চল বাড়ি ফিরি। হ্যাঁ আসলেই ভারিয়া, দারুণ কাটছিল সময়। কেউ বিশ্বাস করবে না, এত ভালো!'
কালো দৈত্যাকার ট্রেন প্রায় নিঃশব্দে প্ল্যাটফর্ম ঘেঁষে ঢুকে পড়ে এবং একসময় ঠায় দাঁড়িয়ে যায়। জানালায় তাকিয়ে কম্পার্টমেন্টের আবছা আলোয় যাত্রীদের টুপি, দেহাবয়ব, নিদ্রালু মুখগুলো চোখে পড়ে।
'দেখ! দেখা', গাড়ির ভেতর থেকে শব্দ আসে 'ভারিয়া, সাশা ওরা এসেছে আমাদেরকে এগিয়ে নিতে! ঐ যে! ভারিয়া, ভারিয়া! দেখো আমরা এখানে!'
দুটি ছোট্ট মেয়ে ট্রেন থেকে সুড়ৎ বেরিয়ে দৌড়ে এসে ভারিয়ার কাঁধ ধরে ঝুলতে থাকে। পেছন পেছন আসে মধ্যবয়সী, তাগড়া এক নারী। সঙ্গে লম্বা, লিকলিকে এক লোক, ধূসর ঝাঁটার মতো গোঁফ নাকের নিচে। পেছন পেছন কাঁধে ব্যাগ নিয়ে আসতে থাকে আরও দুটো ছেলে, স্কুলছাত্র। পেছনে তাদের গৃহশিক্ষিকা, সবশেষে দাদিমা।
'ছেলেরা, এসে গেছি আমরা!' বললেন গোঁফওয়ালা ভদ্রলোক। সাশার করমর্দন করে বললেন, 'অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত নিশ্চয়ই! না বলে পারছি না, বুড়ো চাচার আসতে দেরি দেখে ক্ষেপেছ নির্ঘাত! কলিয়া, কস্তিয়া, নিনা, ফিফা... বাচ্চারা, তোমরা কোথায়? তোমাদের ভাই সাশা'কে চুমু খাও! সবাই এসে গেছি, পুরো দল নিয়ে। মাত্র তিন-চার দিনের জন্য। আশা করি, সংখ্যায় খুব বেশি না আমরা, কী বলো। আমাদের জ্বালাতনে নিশ্চয়ই অতিষ্ঠ হবে না!'
চাচা ও তার পরিবারকে দেখে স্বামী-স্ত্রী আ ত ঙ্কি ত। যখন তাদের চু মু খাচ্ছিল তারা, অনর্গল কথা বলে যাচ্ছিল, সাশার চোখের সামনে ভেসে উঠল তাদের ছোট্ট কুটিরটা। দেখতে পেল ভারিয়া ও সে তোমার।' তাদের ছোট ছোট তিনটে ঘর অতিথিদের ছেড়ে দিয়েছে; বিছানা, বালিশ সবকিছু। স্যামন-সারডিন-মুরগি সবকিছু মুহূর্তে সাবাড়। চাচাতো ভাইবোনগুলো সবাই তাদের সুন্দর ছোট্ট বাগানটার ফুলগুলো সব ছিঁ ড়ে নিচ্ছে। কালির দোয়াত উল্টে ফেলেছে, কালি ছিটকে পড়ছে চারদিক। চাচি ক্রমাগত তার অসুখ-বিসুখের ফিরিস্তি দিয়ে যাচ্ছে, আর তার বাবার ব্যারন ভন ফিন্টিক... সাশা প্রায় ঘৃণার চোখে তাকাল তরুণী বধূর দিকে। ফিসফিসিয়ে বলে, 'তোমাকে দেখতে এসেছে ওরা। চুলোয় যাক, যত্তসব!'
'অসম্ভব, তোমাকে দেখতে এসেছে।' রাগে তার মুখও ছাইবর্ণ। 'ওরা আমার আত্মীয় না।
অতঃপর সহাস্য সাদর-দৃষ্টে মেহমানদের দিকে তাকিয়ে ভারিয়া বলে ওঠে, 'আমাদের কুটিরে স্বাগতম!'
চাঁদ আবার মেঘের আড়াল হতে উঁকি দেয়। যেন তার কোনো স্বজন নেই ভেবে ধন্য। ওদিকে হতাশ সাশা কষ্টে নিজেকে সংযত রেখে আন্তরিকতার সুরে বলে, 'দারুণ হলো তোমরা এলে। কুটিরে স্বাগতম!'
২২
মস্তিষ্কেরও ব্যায়াম আছে, মস্তিষ্ক ক্ষুরধার হয় একে ব্যবহার করলে।
শৈশবে নিকোলা টেসলার পিতা-মাতা তাঁকে মাথা খাটানোর জন্য চমৎকার কিছু কাজ দিতেন। তাঁর আত্মজীবনী 'মাই ইনভেনশনস: দি অটোবায়োগ্রাফি অব নিকোলা টেসলা' বইয়ে তিনি এ সম্পর্কে বলেছেন। এর মধ্যে ছিল আগের কোনো স্মৃতি বর্ণনা করা, বড় বড় বাক্য আওড়ানো, মনে মনে অঙ্ক কষা, মানুষের মন বুঝতে চেষ্টা করা ইত্যাদি। নিকোলা টেসলা তাঁর ছেলেবেলায় মনে মনে একটা পিরামিডকে এর পাদদেশ, বিভিন্ন কোনা, ওপর-নিচ, চারপাশ থেকে দেখতেন। এভাবে তিনি তাঁর ত্রিমাত্রিক বস্তু কল্পনার শক্তিনকে ঝালিয়ে নিতেন। তুমি যেকোনো ত্রিমাত্রিক বস্তু নিয়েই এই অনুশীলনটা করতে পারো। বস্তুটা হতে পারে তোমার পেনসিল বাক্স, ক্রিকেট ব্যাট, ফিফা বিশ্বকাপ, স্মার্টফোন কিংবা ক্যালকুলেটর।
প্রথমে তোমার পছন্দের বস্তুটাকে নেড়েচেড়ে সব দিক থেকে একবার পর্যবেক্ষণ করে শুরু করে দাও মনের খেলা। মনে মনে চেষ্টা করো বস্তুটার ছবি তৈরি করতে, সেটাকে হাতির সমান বড় কিংবা পিঁপড়ের সমান ছোট করে দেখো এবং পর্যবেক্ষণ করো। এভাবে কোনো বস্তুর ছবি কল্পনা করা ছাড়াও তুমি চাইলে তোমার অবসরে বিভিন্ন অঙ্কও মনে মনে সমাধান করার চেষ্টা করতে পারো। ভিত্তি শক্ত করার জন্য আগে ০ থেকে ৯ পর্যন্ত অঙ্কগুলো, বাংলা-ইংরেজি বর্ণমালা মনে মনে কল্পনা করে সেগুলোর ছবি মনে ধরে রাখার অনুশীলন করে নাও। এভাবে তুমি খুব মজার ছলেই মনে মনে বিভিন্ন গণিতের সমাধান করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতে পারবে। শুনে অবাক হবে যে নিকোলা টেসলা ক্যালকুলাসের কঠিন কঠিন অঙ্ক মনে মনেই করে ফেলতেন।
এবার আসি আরেক বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের মস্তিষ্কের ব্যায়াম নিয়ে। আইনস্টাইনেরও অন্যতম গুণ ছিল কল্পনাকে প্রাধান্য দেওয়া। তিনি বলেছেন, 'কল্পনা জ্ঞানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। জ্ঞান কেবল আমরা যা জানি এবং বুঝি তাতেই সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে কল্পনা সমগ্র বিশ্বের যা যা এবং জানা এবং বোঝা দরকার, তাকেও করে।' আইনষ্টাইনের অধিকাংশ আবিষ্কারের শুরুটাই হয়েছে একেকটা কিংবদন্তিতুল্য 'থট এক্সপেরিমেন্ট' বা কাল্পনিক পরীক্ষা দিয়ে। আলবার্ট আইনস্টাইনের কাল্পনিক পরীক্ষার কিছু নমুনা পাবে তাঁর জীবনী নিয়ে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের নির্মিত 'জিনিয়াস' সিরিজে।
অন্য কোনো উপায়েও কি মস্তিষ্ককে শাণিত করা যায়?
অবশ্যই। এখন আমি তোমাদের একটা মজার খেলা শেখাব। একে আমি বলি আঙুলের খেলা। এর জন্য তোমাকে তোমার দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ অবস্থায় রাখতে হবে। খেলা হবে হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল এবং কনিষ্ঠাঙ্গুলের মধ্যে
প্রথমে তোমার ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল খুলবে এবং বাঁ হাতে খুলবে কনিষ্ঠাঙ্গুল। বাকি সব আঙুল মুষ্টিবদ্ধ থাকবে। এরপরে করবে ঠিক বিপরীত কাজ অর্থাৎ ডান হাতে খুলবে
কনিষ্ঠাঙ্গুল আর বাঁ হাতে খুলবে বৃদ্ধাঙ্গুল। বাকি আঙুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ থাকবে। এভাবে চলতে থাকবে। একটু কষ্ট হচ্ছে? কিছুক্ষণ অনুশীলন করলে অভ্যস্ত হয়ে যাবে।
কিন্তু এতে মস্তিষ্কের কী লাভ?
মস্তিষ্কের একটা অংশের নাম সেরেব্রাম। এর দুইটি ভাগ আছে-ডান ও বাঁ অংশ। সেরেব্রামের বাঁ অংশ ভাষা, গণিত, যুক্তি, ইত্যাদির সঙ্গে জড়িত। অন্যদিকে ডান অংশ ছবি আঁকা, কল্পনা করা ইত্যাদি সৃজনশীল কাজের সঙ্গে জড়িত। মজার বিষয় হচ্ছে, তোমার মস্তিষ্কের সেরেব্রামের বাঁ অংশ চালায় তোমার দেহের ডান অংশকে আর সেরেব্রামের ডান অংশ চালায় দেহের বাঁ অংশকে। অর্থাৎ তুমি ডানহাতি হলে তোমার মস্তিষ্কের বাঁ অংশ বেশি সক্রিয় থাকে। এর ফলে তোমার গণিত, ভাষা, যুক্তি ইত্যাদি বিষয়ক কাজে মস্তিষ্ক বেশি পারদর্শী হয়। কিন্তু আমরা চাই যুক্তি এবং সৃজনশীলতা উভয়েই সমানতালে চলুক। আর সে জন্যই তোমার সেই আঙুলের ব্যায়াম তোমার মস্তিষ্কের ডান-বাম উভয় অংশকেই কার্যকর করে তোলে এবং ভারসাম্য নিয়ে আসে। এতে তুমি যেমন যুক্তি, গণিতে পারদর্শী হবে, তেমনি হতে পারবে ভালো লেখক, কবি, কিংবা চিত্রকর।
২৩
ভোকাবুলারি সহজে মনে রাখবেন যেভাবে...
ভোকাবুলারিতে দুর্বলতা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা থেকে শুরু করে বাস্তব জীবনের অনেক ক্ষেত্রেই বড় একটি বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আমরা অনেক সময় শব্দ মুখস্থ করি, কিন্তু কিছুদিন পরে ভুলে যাই। অথচ কিছু টেকনিক ব্যবহার করলে শব্দগুলো সহজেই মনে রাখা যায় এবং দীর্ঘদিন মনে থাকে। চলুন জেনে নিই এমনই কিছু কার্যকর পদ্ধতি...
আমাদের দেশে সাধারণত বর্ণানুক্রমিকভাবে ভোকাবুলারি পড়ানো হয়। এই প্রচলিত পদ্ধতি থেকে বের হয়ে Word Root, Mnemonic, Explanation, Origin ও Derivative ব্যবহার করে পড়লে শব্দগুলোর সঙ্গে অর্থের গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়। এতে শব্দ মুখস্থ না করে উপলব্ধি করা যায়, যা স্মৃতিতে দীর্ঘদিন থাকে।
Phrase-Idiom
ছোটবেলা থেকেই আমরা Phrase বা Idiom-এর শুধু অর্থ মুখস্থ করে থাকি। ফলে বেশির ভাগ সময়েই তা মনে থাকে না। কিন্তু যদি প্রতিটি Phrase-Idiom-এর শব্দগুলোর আক্ষরিক অর্থ বিশ্লেষণ করে যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করি, তাহলে সহজেই বোঝা যায় কোনটি কীভাবে এসেছে এবং কেন আক্ষরিক অর্থ থেকে ভিন্ন অর্থ দেয়। উদাহরণস্বরূপ: A black sheep মানে আক্ষরিকভাবে একটি কালো ভেড়া। সাধারণত ভেড়ার গায়ের রং সাদা হয়। সেই সাদার ভিড়ে যদি একটি কালো ভেড়া থাকে, সেটিকে আলাদা এবং ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা হয়, যা নেতিবাচক অর্থে কু°লাঙ্গার বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এইভাবে যুক্তির সহায়তায় Phrase-Idiom মনে রাখলে তা আজীবন মনে থাকার সম্ভাবনা থাকে।
Appropriate Preposition
বাংলাদেশে প্রচলিত বইগুলোতে আমরা Appropriate Preposition পড়ি বর্ণানুক্রম অনুযায়ী; প্রথমে A দিয়ে সব, তারপর B দিয়ে ইত্যাদি। তবে সহজ টেকনিক হলো 'Bundling Method'; অর্থাৎ সমার্থক ও বিপরীতার্থক শব্দগুলোকে একত্রে নিয়ে তাদের পরবর্তী Preposition দেখে শেখা।
যেমন জনপ্রিয়তা বোঝাতে ব্যবহৃত সব শব্দের পর for বসে-Popular for, Prominence for, Eminent for, Known for, Renowned for. অর্থাৎ শব্দের অর্থ বুঝলেই প্রিপজিশনটি মনে থাকবে।
Synonym-Antonym
Synonym-Antonym সাধারণত বর্ণানুক্রমে পড়া হয়, যার ফলে কাছাকাছি শব্দগুলো আমাদের কনফিউজ করে এবং মনে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু যদি Word Root Mnemonic-এর মাধ্যমে শব্দগুলো পড়া যায়, তাহলে তা একবারেই মনে রাখা সম্ভব। যেমন 'Ben' একটি Word Root যার অর্থ 'ভালো'। এ থেকে গঠিত কিছু শব্দ: Benign = দয়ালু; Benevolent = উপকারী; Beneficial = উপকারী; Benefit = সুবিধা; Benefactor = দাতা: একটি Root জানলে এমন অনেক শব্দ একসঙ্গে আয়ত্তে আনা যায়।
Group Verb
Group Verb সাধারণত Verb অনুযায়ী শেখানো হয়, যা মনে রাখা কঠিন। বরং Preposition অনুযায়ী Bundling করলে তা অনেক সহজ হয়। যেমন Out একটি Preposition, যার অর্থ হতে পারে 'শেষ' বা 'ধ্বংস'। Burn out = পুড়িয়ে শেষ করা; Run out = ফুরিয়ে যাওয়া; Blow out = নিভিয়ে ফেলা; Die out = বিলুপ্ত হওয়া; Wipe out = সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা। এইভাবে Preposition অনুযায়ী ভাগ করে Group Verb পড়লে মনে রাখা সহজ হয়।
Spelling
Spelling মনে রাখার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো Syllable ভেঙে উচ্চারণ করে শেখা।
এতে বানান ভুল কমে যায়। যেমন: Malaria → Mala + ria. এভাবে না পড়লে বানান বিভ্রান্তি হতে পারে, যেমন Melaria, Maleria, Malarea ইত্যাদি।
Substitution
একই ধরনের Substitutionগুলো একসঙ্গে এবং Word Root অনুযায়ী পড়লে আত্মস্থ করা সহজ হয়। যেমন Gamy = বিবাহ; Mono = এক → Monogamy = একবিবাহ; Poly = বহু → Polygamy = বহুবিবাহ; Mis = বিদ্বেষ → Misogamist = বিবাহবিদ্বেষী। একটি Root জানলেই ৫-৭টি Substitution সহজে মুখস্থ করা যায়।
বিশেষ পরামর্শ
প্রতিটি শব্দ দিয়ে নিজের মতো করে মজার বাক্য তৈরি করুন। যেমন আপনার বন্ধু রানা খুব ঝগড়াটে হলে বলুন, Rana is a belligerent person. এতে Belligerent শব্দটি সহজেই মনে থাকবে। যেসব শব্দের অর্থে আপনি কনফিউজ হন, সেগুলোর অর্থ মোবাইলে অডিও রেকর্ড করে রাখুন। অন্য সময় শুনলে তা মনে থাকবে। ফ্ল্যাশ কার্ড ব্যবহার করুন; এক পাশে শব্দ, অপর পাশে অর্থ লিখুন। কার্ডগুলো শাফল করে শব্দ দেখে অর্থ অথবা অর্থ দেখে শব্দ মনে করার চেষ্টা করুন। এসব কৌশল ব্যবহার করে এবং প্রচলিত নিয়ম এড়িয়ে প্রতিটি টপিক অনুযায়ী নির্দিষ্ট টেকনিক অনুসরণ করলে ভোকাবুলারি শেখা হবে সহজ, আনন্দদায়ক ও দীর্ঘস্থায়ী। @ আরিফ ইসতিয়াক। অনুলিখন: শাহ বিলিয়া জুলফিকার
২৪
ডা. লুৎফর রহমানের গল্প মহৎ প্রাণ
বড় বাজারে এক তাঁতির একখানা দোকান ছিল। একদিন দোকানে বেচাকেনা করার সময় জরুরি কাজে করিম বখশ বলে এক ছেলেকে দোকানে বসিয়ে রেখে তিনি কিছুক্ষণের জন্য বাইরে গেলেন। করিম বখশ এক ঘণ্টা দোকানে বসে থাকল। কিন্তু তবুও দোকানদার ফিরে এলো না। এদিকে ক্রেতারা জিনিসপত্রের জন্য তাগাদা করতে লাগল। করিম বখশের জিনিসপত্রের দাম জানা ছিল। সে কয়েকখানা কাপড় বিক্রয় করল। দুঃখের বিষয়, সারাদিন চলে গেল, তবুও দোকানদার ফিরে এলো না। করিম অগত্যা সেদিন আর বাড়ি যেতে পারল না, দোকানদারের অপেক্ষায় সেখানেই রাত্রি যাপন করল। পরের দিন যথাসময়ে দোকান খুলে করিম মালিকের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু মালিকের আর সন্ধান নেই। করিম অগত্যা নিজেই বেচাকেনা করতে লাগল। এইভাবে দু' তিন দিন শেষে এক মাস কেটে গেল, তাঁতি ফিরল না। করিম দোকানের ভার ফেলে যাওয়া অধর্ম মনে করে বিশ্বস্ত ভৃত্যের মতো কাজ চালাতে লাগল। তাঁতি যাদের কাছে ঋণী ছিল, করিম তাদের সব টাকা পরিশোধ করল। তাঁতির হয়েই সে নতুন কাপড়ের চালান এনে দোকানের আয় ঠিক রাখল। এক বছর অতিবাহিত হয়ে গেল। করিমের আন্তরিক চেষ্টায় দোকানের ক্রমেই উন্নতি হচ্ছিল। শেষে এক দোকানের পরিবর্তে তিনটি দোকান স্থাপিত হলো। করিম সব দোকানই তাঁতির নামে চালাতে লাগল। লোকে ভাবল, করিম তাঁতির দোকান কিনে নিয়েছে। করিমের সম্মান-প্রতিপত্তি ইত্যবসরে খুব বেড়ে গেল, সে মস্ত সদাগর হয়ে বিরাট কারবার চালাতে লাগল।
প্রায় সাত বছর অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে। একদিন করিম দোকানের গদিতে বসে আছে, এমন সময় সে দেখল, একটা বুড়ো লোক লাঠিতে ভর করে তারই দোকানের সামনে করিম বলে একটা বালকের খোঁজ করছে। বুড়োর পরনে একখানা ময়লা কাপড়, রোগা চেহারা। শরীর একেবারে ভেঙে গিয়েছে। তাকে পথের ভিক্ষুক বলে মনে হচ্ছিল। করিম দৌড়ে এসে বুড়োকে বুকের সঙ্গে আঁকড়ে ধরে বলল, আমি হচ্ছি সেই করিম, এই সাত বছর আমি আপনার দোকান পাহারা দিচ্ছি, দয়া করে এখন আপনি আপনার দোকানের ভার নিন। বৃদ্ধ করিমের মহৎ প্রাণের পরিচয় পেয়ে দুই চোখ দিয়ে পানি ছেড়ে দিলেন। বললেন, করিম, আমার আর কিছুই দরকার নেই, এ সবই তোর। আমার এ সংসারে যারা আপন ছিল, সবাই ছেড়ে গিয়েছে, এখন তুই আমার আপন। যেই সাত বছর আগেকার কথা, এখান থেকে বেরিয়ে পথে সংবাদ পেলাম, আমার পত্নীর সাংঘাতিক পীড়া, কালবিলম্ব না করে আমাকে বাড়ি যেতে হয়েছিল। বাড়ি গিয়ে দেখলাম পত্নীর মৃ°ত্যু হয়েছে।
পত্নীর মৃ°ত্যুর কয়েক দিন পরে ছেলে দু'টিও মারা গেল। তারপর আমি নানা দুর্বিপাকে পড়ি। কিছুতেই বাড়ি ছাড়তে পারলাম না। তারপর এই দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে; এখন আমার কেউ নেই। আত্মীয়স্বজন, অর্থ, দেহের বল সব হারিয়ে এখন আমি পথের ফকির হয়েছি। অতি দুঃখে অনেক আশা-নিরাশায় মনে হলো, কলিকাতায় গিয়ে একবার করিমের সন্ধান করি। তাকে যদি পাই, তার কাছ থেকে দুএক টাকা ভিক্ষা নেব। দোকান কি আর এতদিন আছে? করিম, আমি যে তোকে এমন রাজার হালে দেখব, এ কখনও মনে করিনি। আর, তুই যে এমন করে আমার কাছে পরিচয় দিলি, এ ভেবে আমার মনে যে আনন্দ হচ্ছে, তা আর কি বলব? বল বাবা, মানুষ, না ফেরেশতা। করিম সবিস্ময়ে বলল, আপনি পিতার মতো আমাকে বিশ্বাস করেছিলেন। সে বিশ্বাসকে আমি রক্ষা করতে পেরেছি, এই আমার পক্ষে ঢের। এর বেশি আমি কিছু আশা করি না। তাঁতি করিমের হাত থেকে দোকানের ভার গ্রহণ করলেন না। জীবনে তার আর কোনো বন্ধন রইল না। একটা মাসিক বন্দোবস্ত করে তিনি অতঃপর তীর্থে চলে গেলেন। মানুষের জীবন যে এত সুন্দর, এত পবিত্র হয়, তা বিশ্বাস করতে মন চায় না। এই পাপময় মানব সমাজে মহৎপ্রাণ মানুষ আছে, মানুষ তাদের নাম জানুক আর না জানুক, এরা যে জগৎকে ধন্য করে দিয়েছেন, সে বিষয়ে আর কোন সন্দেহ নেই।
২৫
তিমির ঘুম: আধা ঘুমে বেঁচে থাকা এক বিস্ময়
প্রকৃতি মাঝে মাঝে এমন কিছু রহস্য তৈরি করে, যা আমাদের শুধু অবাকই করে না—আমাদের যুক্তিবোধকেও চ্যালেঞ্জ জানায়। এমনই এক উদাহরণ তিমি মাছের ঘুম।
একবার ভাবুন তো, আপনি যদি ঘুমিয়ে থাকেন আর তখন আপনার শ্বাস নেওয়া যদি সচেতনভাবে না হয়, তাহলে কী হবে? হ্যাঁ, মৃত্যু অবধারিত। অথচ এই অবিশ্বাস্য বাস্তবতা প্রতিদিনের মতো স্বাভাবিকভাবেই মোকাবিলা করে যাচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্তন্যপায়ী—তিমি।
মস্তিষ্কের অর্ধেক ঘুম, অর্ধেক জাগ্রত!
তিমিরা কখনোই পুরোপুরি ঘুমায় না। তাদের ঘুম "unihemispheric sleep" নামে পরিচিত, যার অর্থ—এক পাশে ঘুম, অন্য পাশে জাগরণ।
এভাবে ঘুমানোর মাধ্যমে তারা শুধু শ্বাসপ্রশ্বাসই চালিয়ে যায় না, বরং তাদের দিকনির্ণয় ক্ষমতা, শিকার এড়ানো এবং ঝাঁকে চলার সমন্বয়ও বজায় রাখে।
কেন ঝুঁকিপূর্ণ তিমির ঘুম?
তিমিদের ঘুম মানুষের মতো স্বাভাবিক নয়, কারণ তারা পানির নিচে থাকলেও বাতাসে শ্বাস নেয়। ফুলকা নেই, ফলে অক্সিজেন সংগ্রহের জন্য তাদের বারবার পানির উপরে উঠতে হয়। পুরোপুরি ঘুমিয়ে গেলে তারা শ্বাস নিতে ভুলে যাবে, যা হবে প্রাণ*ঘা*তী।
এ কারণেই প্রকৃতি তাদের শিখিয়েছে—ঘুমালেও একচোখ ও আধা মস্তিষ্ক খোলা রাখো!
কতক্ষণ ঘুমায় তিমি?
বিজ্ঞানীদের গবেষণা বলছে, তিমিরা দিনে মাত্র ১.৫ থেকে ২ ঘণ্টা ঘুমায়। ভাবতে পারেন? আমরা যেখানে প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা না ঘুমালে ক্লান্ত হয়ে পড়ি, সেখানে এই বিশাল প্রাণী দিনের প্রায় ৯০-৯৫% সময়ই পুরোপুরি সজাগ থাকে।
ডলফিনের সঙ্গেও মিল!
এই অদ্ভুত ঘুমের প্যাটার্ন শুধু তিমিদেরই নয়, বরং ডলফিন, সীল (seal), ও কিছু সামুদ্রিক স্তন্যপায়ীদেরও আছে। এরা সবাই "conscious breathers", অর্থাৎ যেকোনো নিঃশ্বাস নিতে হলে তাদের জেগে থাকতে হয়। প্রকৃতি যেন সাগরের সন্তানদের বাঁচাতে তাদের ঘুমেও চোখ খোলা রাখা শিখিয়েছে।
বিজ্ঞানীরা কীভাবে জানলো?
তিমির মাথায় বিশেষ ধরনের সেন্সর বসিয়ে ইলেকট্রোএনসেফালোগ্রাফি (EEG) প্রযুক্তির সাহায্যে তাদের ঘুম পর্যবেক্ষণ করেছেন বিজ্ঞানীরা। এতে স্পষ্ট দেখা গেছে, ঘুমের সময় মস্তিষ্কের এক পাশ বিশ্রামে গেলেও অন্য পাশ সম্পূর্ণ সচল থেকে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
অবিশ্বাস্য দক্ষতা!
তিমিরা ঘুমের মধ্যেও—
☞ শিকারি হাঙরের আগমন টের পায়,
☞ সন্তানদের খেয়াল রাখে,
☞ ঝাঁক থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না,
☞ প্রয়োজন হলে পানির ওপরে উঠে শ্বাস নেয়।
এ যেন আধা ঘুম, আধা যু°দ্ধের প্রস্তুতি!
ঘুম—যা আমাদের বিশ্রাম দেয়, তিমিদের কাছে তা এক চ্যালেঞ্জ।
আর এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পদ্ধতি শুনলে মনে হয়, প্রকৃতি নিজেই যেন তাদের জন্য বিজ্ঞান হয়ে উঠেছে।
২৬
দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি বইয়ের ৮ শিক্ষা
প্রখ্যাত মার্কিন লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের লেখা শ্রেষ্ঠ উপন্যাস হলো 'দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি'। ১৯৫২ সালে প্রকাশিত বইটির জন্য লেখক নোবেল ও পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছেন। সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ বইটি বিভিন্ন ভাষায় পড়েছেন। এটি একটি উপন্যাস হলেও এর মধ্যে রয়েছে জীবনদর্শন ও নানা শিক্ষা। বইটি পড়ে শিক্ষাগুলো লিখেছেন এম এম মুজাহিদ উদ্দীন।
কখনো হাল ছাড়বেন না
'মানুষ পরাজয়ের জন্য সৃষ্টি হয়নি। তাকে ধ্বং°স করা যায়, কিন্তু পরাজিত করা যায় না।' এটাই বইটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। সারা জীবন পূর্ণ উদ্যমে স্বপ্ন নিয়ে বাঁচুন, কখনো হাল ছাড়বেন না, কখনো আত্মসমর্পণ করবেন না। সান্তিয়াগোর কাছে একটি পুরোনো ভাঙা নৌকা এবং বৃদ্ধ সান্তিয়াগোর ভাঙা দেহ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তিনি বৃদ্ধ হলেও হাল ছাড়েননি। টানা ৮৪ দিন কোনো মাছ ধরতে পারেননি, তবু প্রতিদিন সমুদ্রে মাছ ধরতে গেছেন। মনে একরাশ স্বপ্ন ছিল, তিনি একদিন সমুদ্রের সবচেয়ে বড় ও সুন্দর মাছটি ধরবেন। ৮৫তম দিনে তাঁর বড়শিতে ধরা পড়ল এক বিশাল আকৃতির মাছ।
সফলতা হলো দৃষ্টিভঙ্গি
সফলতার প্রকৃত অর্থ কী, তা হেমিংওয়ে আমাদের ভাবতে বাধ্য করেন। সফলতা কি সমাজের উঁচু পদ-পদবি, অনেক টাকার মালিক হওয়া নাকি অন্য কিছু? সান্তিয়াগো সামাজিক মর্যাদার সর্বনিম্ন প্রান্তে ছিলেন। তিনি গরিব ছিলেন, কিন্তু তাঁর ছিল জীবনদর্শন। তাঁর কাছে সফলতার অর্থ ছিল মূল্যবোধ অনুযায়ী জীবন যাপন করা। তিনি সততা ও কঠোর পরিশ্রমের মতো গুণাবলি অনুসরণ করে জীবন যাপন করতে পছন্দ করতেন। তিনি সাফল্যের জন্য কারও কাছে হাত পাতেননি, বরং তিনি কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি নিজের ব্যর্থতা ও ভুল স্বীকার করেছেন এবং সফলও হয়েছেন।
যা আছে তার জন্য কৃতজ্ঞ হোন
আমরা শুধু ব্যর্থতার হিসাব করি। আমার এটা নেই, সেটা নেই প্রভৃতি কথা বলি। কিন্তু যা আমাদের আছে, তা নিয়ে খুব একটা কৃতজ্ঞ হই না। আমাদের উচিত যা আছে, তার জন্য কৃতজ্ঞ থাকা এবং সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার করা। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও আমাদের তেমন কিছু ছিল না। দৃঢ় মনোবল নিয়ে যা ছিল, তা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ায় বিজয় অর্জিত হয়েছে। ঠিক তেমনি উপন্যাসে সান্তিয়াগোর পৃথিবী খুবই কঠিন ছিল। তাঁর একমাত্র জীবিকার উৎস ছিল সমুদ্রে মাছ ধরা। তিনি অত্যন্ত গরিব ছিলেন, ঠিকমতো খাবার খেতে পারতেন না। তাঁর বন্ধু ম্যানোলিন মাঝেমধ্যে তাঁর জন্য খাবার নিয়ে আসতেন।
অন্যের কথায় কান না দেওয়া
আপনি নিজেই নিজের বস হোন। আপনাকে নিয়ে অন্য কে কী ভাবল, এসব ভেবে সময় নষ্ট করবেন না। ছোট জেলেরা তাঁর দিকে তাকিয়ে হাসত এবং বড়রা তাঁর জন্য করুণ চোখে দুঃখ প্রকাশ করত, কিন্তু সান্তিয়াগো এতে কান দেননি। পাত্তা না দিয়ে আপন মনে নিজের কাজটি করে গেছেন। কেননা তিনি জানতেন, যা করছেন তা ঠিকই করছেন। তাঁর মনে ছিল স্বপ্ন। একদিন তিনি স্বপ্নকে স্পর্শ করেন।
শুধু ভাগ্যের আশায় বসে না থাকা
ভাগ্যে বিশ্বাস করা উচিত। তবে কাজ না করে শুধু ভাগ্যের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। কঠোর পরিশ্রম করুন, অধ্যবসায়ী হোন। দেখবেন, ভাগ্য একদিন আপনার পদধূলি নেবে। সান্তিয়াগো ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে বসে ছিলেন না। তিনি কঠোর পরিশ্রম করেছেন। এরপর যখন সুযোগ আসে, তখন তার জন্য প্রস্তুত থেকে নিজের ভাগ্য নিজে তৈরি করেছেন। ৮৪ দিন মাছ ছাড়া থাকার পরও তিনি কঠোর পরিশ্রম করতে থাকেন এবং চেষ্টা চালিয়ে যান। সান্তিয়াগো সফলতার জন্য শর্টকাট পথ বেছে নেননি, বরং তিনি কঠোর পরিশ্রম করে গেছেন। তবে এটা ঠিক, শুধু কঠোর পরিশ্রম করলেই হবে না; স্মার্টলি কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।
অভিযোগ না করা
সকালের ঠান্ডায় বুড়ো সান্তিয়াগো কাঁপছিলেন। কিন্তু তিনি জানতেন, তিনি নিজেকে উষ্ণ করে তুলবেন। সে জন্য তিনি শিগগির নৌকা চালাতে শুরু করবেন। তার আগপর্যন্ত সান্তিয়াগো ঠান্ডায় কষ্ট সহ্য করেছেন। কিন্তু তিনি প্রচেষ্টা থামাননি। এমনকি যখন তিনি ঠান্ডা, ক্ষুধা, তৃষ্ণায় মৃত্যুর মুখোমুখি হন, তখনো তিনি কেবল যা করা দরকার তা-ই করেছিলেন। তিনি কখনো অভিযোগ করেননি। নিজের প্রতি করুণা দেখাননি, তিনি কেবল ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। একবার মাছ ধরার লাইন থেকে তাঁর হাত কেটে যায়। কিন্তু তা তাকে দমাতে পারেনি। তিনি বসে বসে কান্না না করে নিজের কাজ করে গেছেন।
২৭
ইট দ্যাট ফ্রগ বই থেকে ৯ শিক্ষা
ব্রায়ান ট্রেসি একজন কানাডিয়ান–আমেরিকান আত্মোন্নয়নমূলক বক্তা ও লেখক। তাঁর রচিত ‘ইট দ্যাট ফ্রগ’ বইটি ২০০১ সালে প্রকাশিত হয়। বইটি এখন পর্যন্ত ৪২টির বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ বইয়ের শিক্ষা বাস্তবজীবনে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। বইটি পড়ে শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লিখেছেন এম এম মুজাহিদ উদ্দীন।
এই বইতে লেখক গুরুত্বপূর্ণ কাজকে রূপক অর্থে ব্যাঙ খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। কারণ, ব্যাঙ খাওয়া যেমন কঠিন ও বিরক্তিকর, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করাও কঠিন। শুরুতে গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন কাজটি সম্পন্ন করতে পারলে সহজ বা পছন্দের কাজ করতে সমস্যা হয় না। সবচেয়ে প্রয়োজনীয় থেকে শুরু করে সব কাজ সহজে সম্পন্ন হয়। এভাবে কাজ করলে কোনো কাজ জমা পড়ে থাকে না। তাই সবার আগে ব্যাঙগুলো তথা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো চিহ্নিত করতে হবে। আর সেগুলো দিনের শুরুতে করতে হবে। কোনো গড়িমসি করা যাবে না। বইটিতে গড়িমসি করাকে নেতিবাচক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
লক্ষ্য নির্ধারণ হোক স্পষ্ট
সফলতার জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হয়। সেই লক্ষ্য হতে হবে খুবই স্পষ্ট এবং বাস্তবায়নযোগ্য। লক্ষ্য স্পষ্ট থাকলে কাজ করার ক্ষেত্রে কার্যকর সময় ব্যবস্থাপনা সহজ হয়। ব্রায়ান ট্রেসি পাঠকদের লক্ষ্যগুলো লিখে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। আর সেই লক্ষ্য পূরণের জন্য দিকনির্দেশনার আলোকে মনোযোগের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
অগ্রাধিকার দিন কাজকে
আমাদের সব কাজ সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাই কাজগুলোকে এ, বি, সি ও ডি পদ্ধতিতে শ্রেণিবদ্ধ করুন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ এ শ্রেণিতে, এরপরের গুরুত্বপূর্ণ কাজ বি শ্রেণিতে, মাঝারি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সি এবং সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ কাজ ডি শ্রেণিতে রেখে সেগুলো সম্পন্ন করতে হবে। প্রথমে এ শ্রেণির কাজগুলো সম্পন্ন করতে হবে। তারপর পর্যায়ক্রমে বি, সি এবং ডি শ্রেণির কাজ শেষ করতে হবে।
আগের রাতে হোক দিনের পরিকল্পনা
আগামীকাল কী কী কাজ করতে হবে, সেগুলোর পরিকল্পনা আগের রাতে করে ফেলতে হবে। তাহলে নতুন দিনের শুরুতে আপনি পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করতে পারবেন। কোন কাজ দিনের প্রথমে শুরু করতে হবে, সেটা আপনি জানবেন। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আপনার সব কাজ সম্পন্ন হয়ে যাবে। এতে সময় নষ্ট হবে না। গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজও বাদ পড়বে না।
কাজে নেমে পড়ুন
শুধু স্বপ্ন দেখে আর পরিকল্পনা করে বসে থাকলে সফলতা আসবে না। সফলতার জন্য লেখক বইয়ে কাজে নেমে পড়ার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। আপনি কাজ না করে যত গড়িমসি করবেন, ততই আপনার মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা ভর করবে। ফলে কাজগুলো করা হয়ে উঠবে না। তাই যত কঠিন মনে হোক না কেন, কাজ শুরু করতে হবে; তবেই সফলতা আসবে।
আত্মশৃঙ্খলা বাড়ান
কার্যকর সময় ব্যবস্থাপনার জন্য আত্মশৃঙ্খলা বাড়ানো অপরিহার্য। ব্রায়ান ট্রেসি পাঠকদের জন্য আত্মনিয়ন্ত্রণ অনুশীলন করতে বলেছেন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ যত বোরিং হোক না কেন, তা দ্রুত ও নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করতে উৎসাহিত করেছেন।
বিভ্রান্তি দূর করুন
কাজ করার ক্ষেত্রে নানা বিভ্রান্তি আসে, যেমন পড়তে বসলে মোবাইল টিপতে মন চায়। কাজের ক্ষেত্রে যত বিভ্রান্তি আছে, সব দূর করে কাজে মনোনিবেশ করলে ভালো ফল আশা করা যায়।
প্রযুক্তিকে বিজ্ঞতার সঙ্গে ব্যবহার করুন
উৎপাদন বাড়াতে প্রযুক্তি কাজে লাগান। তবে এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হওয়া এড়িয়ে চলুন। কাজ করার সময় প্রয়োজনে
প্রযুক্তির বিভিন্ন সরঞ্জাম এবং অ্যাপস ব্যবহার করুন। কিন্তু যেসব প্রযুক্তি এবং অ্যাপস কাজে বিভ্রান্তি ঘটায়, সেগুলো দূরে রাখতে হবে; যেমন পড়াশোনার সময় মোবাইল।
নিজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করুন
শুধু কাজ করলে হবে না, নিয়মিত নিজের অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে হবে। যথাযথ অগ্রগতি না হলে কাজের কৌশল পরিবর্তন করতে হবে। কেননা জীবনে সফলতা শুধু পরিশ্রম করলে যদি পাওয়া যেত, তাহলে গাধা হতো বনের রাজা। তাই কাজের পরিশ্রমের পাশাপাশি কৌশলী হতে হবে। প্রয়োজনে কৌশল পরিবর্তন করে একই কাজ নতুনভাবে বা একই স্থান থেকে শুরু করা যেতে পারে।
২৮
মস্তিষ্ক যত কম কাজ করে, পারফরম্যান্স তত ভালো হয়!!!
আপনি কি কখনো এমন সিচুয়েশনে পড়েছেন যে একটা কাজ শুরু করবেন বলে ভাবছেন, কিন্তু চিন্তা করতে করতে দিন পার হয়ে যাচ্ছে?
হয়তো একটা ইউটিউব চ্যানেল খুলবেন, বা নতুন কোনো স্কিল শিখবেন। আপনি ইন্টারনেটে ঘাঁটাঘাঁটি করছেন, হাজারটা ভিডিও দেখছেন, সেরা প্ল্যানটা খুঁজছেন - কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাজটাই আর শুরু করা হচ্ছে না।
আপনার এই অস্থিরতার নামই হলো 'অ্যানালাইসিস প্যারালাইসিস'। অর্থাৎ, অতিরিক্ত চিন্তা করতে করতে আপনি কার্যত পঙ্গু হয়ে যাচ্ছেন।
গল্পের প্রথম টুইস্টটা শুনলে আপনি চমকে যাবেন।
আমাদের আজকের এই আধুনিক সমস্যার সমাধান লুকিয়ে আছে ৪০০ বছর আগের জাপানি সামুরাইদের তলোয়ারের ধারালো এজে।
বিখ্যাত সামুরাই মিয়ামোতো মুসাশি এক অদ্ভুত দর্শন শিখিয়েছিলেন, যাকে বলা হয় ‘মুশিন’ (Mushin) বা 'মনহীন মন'। এটা শুনতে রহস্যময় মনে হলেও এর আসল মানেটা খুব প্র্যাকটিক্যাল।
মুসাশি বলতেন, যুদ্ধের ময়দানে যখন আপনার সামনে শত্রু তলোয়ার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন যদি আপনি চিন্তা করেন - "আমি কোন দিক থেকে কোপ দেব?" বা "সে যদি আমাকে এভাবে মারে তবে আমি কী করব?"
তবে নিশ্চিত থাকুন, ওই মুহূর্তেই আপনি শেষ! কারণ চিন্তা করতে গেলেই আপনার শরীরের রিফ্লেক্স বা স্বয়ংক্রিয় ক্ষমতা কমে যায়। মুসাশির দর্শন ছিল - চিন্তা নয়, সরাসরি অ্যাকশন।
গল্পের পরের টুইস্টটা আরও গভীর।
এমিলি কার্টার নামের এক মেয়ের কথা চিন্তা করুন।
সে তার কাজে খুবই পারদর্শী ছিল, কিন্তু সে কোনো বড় সুযোগ নিতে পারত না। কারণ সে সবকিছুর একটা গ্যারান্টি বা 'সার্টেনিটি' খুঁজত। একবার তার জাপানি পার্টনার ‘কো’ তাকে একটা বড় ব্যবসার অফার দিলেন। এমিলি বরাবরের মতো বলল, "আমি একটু ভেবে জানাই।"
সে দুই সপ্তাহ ধরে ডায়েরি কাটাকাটি করল, লাভ-ক্ষতির হিসাব মেলাল - কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে পারল না।
কো তখন এমিলিকে একটা অসামান্য কথা বলেছিলেন।
তিনি বললেন, "এমিলি, আপনি আসলে 'নিশ্চয়তা' খুঁজছেন, কিন্তু দুনিয়াতে নিশ্চয়তা বলে কিছু নেই। আপনার শুধু দরকার 'স্পষ্টতা' (Clarity)।
অর্থাৎ, আপনার পুরো যাত্রা দেখার দরকার নেই, শুধু পরের পদক্ষেপটা কী হবে সেটুকুই যথেষ্ট।"
এখানেই বিজ্ঞানের এক অদ্ভুত খেলা আছে!
আধুনিক নিউরোসায়েন্স বলছে, আমরা যখন কোনো কাজে সেরা পারফর্ম করি (যাকে আমরা ‘ফ্লো স্টেট’ বলি), তখন আমাদের মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স বা 'চিন্তা করার অংশ' আসলে শান্ত হয়ে যায়। সার্জন, অ্যাথলেট বা আর্টিস্টরা যখন অসাধারণ কিছু করেন, তারা আসলে চিন্তা করে করেন না, তারা করেন তাদের অর্জিত দক্ষতা দিয়ে। মুশিন মানে হলো সেই 'ভোয়েড' বা শূন্যতা তৈরি করা, যেখানে আপনার অতিরিক্ত চিন্তা আপনার কাজের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।
গল্পের সবচেয়ে বড় টুইস্টটা কী জানেন?
এই মুশিন বা চিন্তাহীন অবস্থা অর্জন করা কোনো নতুন কিছু শেখা নয়, বরং এটা একটা 'আন-লার্নিং'। খেয়াল করে দেখুন, ছোট বাচ্চারা যখন খেলে, তারা কিন্তু চিন্তা করে না যে তাদের খেলনাটা নিখুঁত কি না। তারা স্রেফ খেলে!
আমরা বড় হওয়ার সাথে সাথে 'পারফেক্ট' হওয়ার লোভে নিজেদের চিন্তার কারাগারে বন্দি করে ফেলেছি।
তাহলে সমাধান কী?
সমাধান হলো - অপেক্ষা করা বন্ধ করুন।
আপনি যদি কোনো কাজে আটকে থাকেন, তবে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একটা ছোট পদক্ষেপ নিন। সেটা হতে পারে একটা ফোন কল, একটা ইমেইল বা স্রেফ একটা খসড়া তৈরি করা। নিখুঁত হওয়ার চিন্তা ঝেড়ে ফেলুন।
ভুল হবে? হোক না!
সামুরাইরা বলতেন, ভুল হলো একটা ফিডব্যাক। আপনি যত বেশি ভুল করে তা থেকে শিখবেন, আপনার দক্ষতা তত বেশি 'অটোমেটিক' হয়ে যাবে।
আপনার স্বাধীনতা আসলে নিখুঁত প্ল্যানের মধ্যে নেই, আপনার স্বাধীনতা আছে 'কাজ শুরু করার' মধ্যে। তাই এখন এই স্ক্রলিং বন্ধ করে নিজের সেই থমকে থাকা লক্ষ্যটার দিকে এক পা বাড়ান।
আপনার ব্রেইনকে একটু ছুটি দিন, আর আপনার
হাতকে কাজ করতে দিন।
সামুরাই তলোয়ারের মতো নিজেকে শাণিত করতে প্রস্তুত তো?
আজ থেকেই 'ওভারথিংকিং' বন্ধ করে 'অ্যাকশন' মুডে চলে আসুন!
২৯
বাংলাভাষার ইতিহাসটা জানেন কি!
২০ ফেব্রুয়ারী ১৯৫২ সাল। সন্ধ্যায় নবাবপুর আওয়ামী মুসলিম লীগ অফিসে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা পরিষদের সভা। মাওলানা ভাসানী, আতাউর রহমান খান অনুপস্থিত। শেখ মুজিবুর রহমান জেলে। উপস্থিত রয়েছেন আওয়ামী মুসলীম লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক , যুবলীগের অলি আহাদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আব্দুল মতিন।সভাপতিত্ব করছেন খেলাফতে রব্বানি পার্টির সভাপতি প্রবীণ আবুল হাশিম। ভোটাভুটি হলো ১৪৪ ধারা ভাঙ্গা হবে কি হবে না । ১১/৪ ভোটে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার প্রস্তাব জয়লাভ হলো।
সিদ্ধান্ত মানলেন না অলি আহাদ। তিনি বললেন, “আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ছাত্রসভা, সেই সভা যদি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে রায় দেয় , তবে আমরাও ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে থাকব।”
আব্দুল মতিন বললেন,”একটা সিদ্ধান্ত না নিয়ে এই সভা সিদ্ধান্ত নিক যে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে এবং বিপক্ষে - দুটো মতই এসেছে। আগামী কালের ছাত্রসভায় দুটো মতই প্রকাশ করা হবে।এরপর ছাত্ররা সিদ্ধান্ত নিবে।”
আবুল হাশিম বললেন,”আগামীকাল শামসুল হক ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার পক্ষে ছাত্রজনসভায় বক্তব্য দিবেন।”
পরের দিন অর্থাৎ ২১ ফেব্রুয়ারী সকাল ১১টায় আমতলায় ছাত্রজনসভা। সিদ্ধান্ত মোতাবেক একটু আগেই ১০ টায় শামসুল হক গেলেন মধুর ক্যান্টিনে। ছাত্রজনসভা ১ ঘন্টা পরেই। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে উপস্থিত ছাত্রদের বোঝানোর চেষ্টা করতে লাগলেন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা ঠিক হবেনা। হঠাৎ একজন ছাত্র ”ট্র্রেইটর” বলে চিৎকার করে ধেয়ে আসলেন শামসুল হকের দিকে। শামসুল হক সাহেবের মাথার জিন্না টুপিটি ছিনিয়ে নিয়ে ছুড়ে ফেললেন দূরে, শূন্যে এবং বলতে লাগলেন , “You have no right to speak, get out.”
সেই ছাত্রটির নাম হাসান হাফিজুর রহমান।
রাত গভীর। ফজলুল হক হল পুকুরের সিঁড়িতে বুকে তীব্র আগুন নিয়ে বসে আছে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান শেলী, মোহাম্মদ সুলতান,জিল্লুর রহমান,এম এ মোমিন, এস এ বারী,এম আর আখতার মুকুল, কমরুদ্দীন শহুদ, আনোয়ারুল হক খান, আনোয়ার হোসেন ও গাজীউল হক।
সূর্য উঠলেই ২১শে ফেব্রুয়ারী। সকলেরই একমত ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে হবে।এ সিদ্ধান্ত নিয়ে সবাই চলে গেল । শুধু বসে রইল গাজীউল হক এবং আব্দুল মোমিন।
মোমিনের পরামর্শে গ্রেফতার এড়াতে গাজীউল হক ভোরে নয়, রাতেই কলা ভবনে চলে যাবেন। পুকুরের শীতল সিঁড়ির গায়ে শরীর এলিয়ে দিলেন গাজীউল হক, চেয়ে রইলেন আকাশ পানে। লক্ষ তারার অনন্ত আকাশ ।আজ সব তারাগুলো যেন তাকে দেখছে স্তব্ধতার মাঝে। পুকুর পাড়ের নারকেল গাছ পেরিয়ে শীতল হাওয়া ঝাপটা দেয় তাঁর মুখে। কি হবে কাল ! কেউ জানেনা। শুধু সূর্য সন্তানই জানেন, ফেরার পথ নাই। সংগ্রাম চলবেই! মমিন বিদায় নিলেন।
গাজীউল হক বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়ামের মধ্য দিয়ে একা চললেন কলাভবনের দিকে। মধুর ক্যান্টিনঘেঁষা প্রাচির টপকালেন। দুটি ছিন্ন পোষ্টার বিছিয়ে তার ওপর শুয়ে পড়লেন। মনে পড়ছে বন্ধুর মুখ, মনে পড়ছে মায়ের মুখ , মনে পড়ছে বাংলা ভাষার সন্মান। ভাবনার মাঝে কখন যেন ঘুমিয়ে গেলেন ক্লান্ত শরীরের গাজীউল হক।
কাক ডাকার আগেই গাজীউল হকের ঘুম ভাঙ্গল। কলাভবনের বারান্দায় পায়াচারী করলেন। চারদিকে কেউ নেই। বিশাল দেহটা কোনরকমে ছোট চাঁদরে ঢেকে ছুটলেন মধুর ক্যান্টিনের দিকে।
ঘন কুয়াশা, প্রচন্ড ঠান্ডা!আলতো করে গেটটি ঠেলে কুয়াশা ভেদ করে কে যেন আসছে! কে? ওহ! মোহাম্মদ সুলতান! সঙ্গে এস এ বারী ,আরো দু’জন। তোমরা এত সকালে এসেছ! কি করবা? মুহাম্মদ সুলতান কোন কথা না বলে ছোট ছোট কাগজের টুকরায় লিখতে রইল- “ছোট ভাই বোনেরা, সরকার ১৪৪ ধারা জারি করেছে । বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠার জন্য ১৪৪ ধারা ভাঙ্গতে হবে। তোমরা দু'জন দু'জন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে এসো।”
কিছুক্ষণের মধ্যে যোগ হোল আরো কিছু ছাত্র। মেডিকেলের ছাত্র মঞ্জু, সাইকেল চালিয়ে আসল ছোট্ট মেয়ে জাহানারা লাইজু। তাদের হাতে চিরকুটগুলো পাঠিয়ে দিল পোগোজ স্কুলসহ বিভিন্ন স্কুল কলেজে। ক্ষুদে সংগ্রামী লাইজু চিরকুট নিয়ে সাইকেলে চেপে বলাকার মতো উড়ে চলল মেয়েদের স্কুল কলেজে।
সকাল আটটার মধ্যেই পুলিশ ঘিরে ফেলল পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা।একজন দুজন করে পরিপূর্ণ হয়ে গেল ।কলাভবনের আমতলায় হাজার হাজার ছাত্রজনতা। রোদ উঠেছে ঝলমলে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হবে পূর্ব ঘোষিত ছাত্রজনতার জনসভা। এম আর আখতার মুকুলের কন্ঠে ঘোষণা এলো,” ....সভার সভাপতিত্ব করবেন গাজীউল হক। সমর্থন করলেন, কমরুদ্দীন শহুদ। প্রথমেই বক্তব্য রাখবেন তুখোড় বক্তা আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক। হাসান হাফিজুর রহমান আজ সকালে যে তার টুপি খুলে গগনে নিক্ষেপ করেছিল, গালমন্দ করেছে সবই তার মনে আছে। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তবুও তাকে ১৪৪ ধারা না ভাঙ্গার পক্ষেই বক্তব্য রাখতে হবে। মাইক হাতে দাঁড়ালেন শামসুল হক। চার দিকে ছাত্রদের ‘না না না’ বলে চিৎকার ! শামসুল হক সাহেব তার অসাধারন বাগ্মীতায় কঠোর সমালোচনা করলেন নাজিম উদ্দীন- নুরুল আমিন সরকারের। ক্ষুরধার বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি তিনি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসলেন, কিন্তু যেই তিনি বললেন, নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করতে হবে, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা ঠিক হবে না, সমবেত সকলেই তাকে বিরোধিতা করে বক্তব্য শেষ করতে বাধ্য করলেন।
এবার বক্তব্য দিবেন বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কমিটির পক্ষে আব্দুল মতিন। চারদিকে মুখরিত মিছিল স্লোগানে পূর্ন ।
আব্দুল মতিন বললেন,”...আজ ১৪৪ ধারা আমরা যদি ভঙ্গ না করি, ভবিষ্যতে কোন আন্দোলনই আমরা আর করতে পারব না। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বর্তমান পর্যায়ে এসে পৌঁছেছি ।এখন পিছিয়ে যাওয়ার কোন উপায় নেই। বলেন, ভাই বোনেরা, আমরা কি ১৪৪ ধারার ভয়ে পিছিয়ে যাব? “
চারিদিকে মুখরিত আওয়াজ গগন চৌচির করে স্ফুলিঙ্গের চিৎকার ভেসে এলো,”না না না", "পিছিয়ে যাবনা", “১৪৪ ধারা ভাঙ্গতেই হবে"।
লম্বা টগবগে তরুণ, বিশ্বিবদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট। শ্রেষ্ঠ ছাত্রটি হাত জাগালেন, " আমিই প্রথম ১৪৪ ধারা ভাঙ্গব।প্রথম গুলিটি আমি বরণ করতে চাই। দেখতে চাই, নুরুল আমিন সরকারের বারুদাগারে কত বুলেট জমা আছে।”
সেই ছাত্রটির নাম হাবিবুর রহমান শেলী।যিনি পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হয়েছিলেন। সংগৃহীত
৩০
পয়গম্ভরী খৎনা
ঘুমের মধ্যে বেশি ছটফট করার ফলে প্যান্টের সাথে লিঙ্গের ফোরস্কিনের বেশ ভালো মতোই ঘর্ষণ হয় এতে তার ফোরস্কিন শিশ্নমুণ্ড পেরিয়ে পেনিসের নেকে আটকে যায়। এটাই ।
সাধারণত খৎনা করা অবস্থায় যেমন ফোরস্কিন থাকে না এবং শিশ্নমুণ্ড উন্মুক্ত থাকে তেমনি এইক্ষেত্রেও অগ্রচর্ম পেনিস নেকে আটকে থাকায় শিশ্নমুণ্ড উন্মুক্ত হয়ে যায়। যার ফলে সেই ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা ও পরিবারের সবাই ভাবে কোনো অলৌকিক সত্ত্বা রাতারাতি খৎনা করিয়েছে। যাকে পয়গম্ভরী খৎনা নামে ডাকা হচ্ছে।
৩১
স্তনের আকার আকৃতি প্রধানত নির্ভর করে বংশপরম্পরায় পাওয়া জিনের উপর, কারো স্পর্শ -এর উপর নয়
নারীর স্তনের আকার পুরুষ স্পর্শ -এর উপর নির্ভর করে না, কিশোর বয়স হতেই বাঙালী পুরুষদের মনস্তত্বে এই প্রশ্নের এক ভুল উত্তর যেনো গেঁথে যায়।
স্তনের আকার আকৃতি প্রধানত নির্ভর করে বংশপরম্পরায় পাওয়া জিনের উপরে। কোনো নারীর নিকটাত্মীয়ের (যেমন: মা, বোন, মাতামহ প্রভৃতি) স্তনের আকার তুলনামূলক বড় কিংবা ছোট হলে উক্ত নারীর ক্ষেত্রেও একইরকম আকারপ্রাপ্তির সম্ভাবনা সর্বাধিক। কোনো গোষ্ঠীর ৫৬ শতাংশ নারীর স্তনই তার পরিবারের অন্যান্য নারী সদস্যের মতো একই গড়নের হয়ে থাকে অর্থাৎ জিন এখানে বেশ বড় ভূমিকা পালন করছে। বেশ কিছু জিনের ভূমিকা উল্লেখ করলাম, আগ্রহ থাকলে জেনে নিতে পারেন।
• ZNF703 (স্তনের টিস্যুর পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য দায়ী। মূলত টিস্যুর পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য স্তন সুগঠিত হয়ে থাকে। এই জিন আবার অতি সক্রিয় হলে স্তন ক্যান্সার হতে পারে)।
• PPARG (স্তনের টিস্যুতে থাকা ফ্যাটের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে এই জিন যা সরাসরি স্তনের আকারকেও প্রভাবিত করে।)
• ESR1 (কোষ কিভাবে ইস্ট্রোজেন হরমোন দ্বারা প্রভাবিত হবে তা এই জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। অর্থাৎ স্তনের এপিথেলিয়াল কোষের বৃদ্ধি ও বিকাশ নিয়ন্ত্রণ করে এই জিন।)
• IGF1 (এই জিন স্তনের পাশাপাশি শরীরের অন্যান্য টিস্যুর গঠনের উপরও প্রভাব ফেলে।)
• CYP19A1 (এই জিন এন্ড্রোজেন হরমোনকে ইস্ট্রোজেন হরমোনে রূপান্তরিত করে।)
এবার আসি হরমোনের কথায়। একটু আগেই আমরা ESR1 এবং CYP19A1 জিনের কথা আলাপ করেছি যারা ইস্ট্রোজেন হরমোন নিয়ন্ত্রণ করে। এই ইস্ট্রোজেন, প্রজেস্টোরন, প্রোল্যাকটিন হরমোন সরাসরি স্তনবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। বয়ঃসন্ধিকাল তথা পিউবার্টি শুরু হয় হাইপোথ্যালামাস হতে আগত সংকেতের কারণে। এই সংকেত পিটুইটারি নালিকাকে উত্তেজিত করে যার ফলে পিউবার্টি সম্পর্কিত হরমোন নিঃসরণ শুরু হয়। এর মধ্যে- ইস্ট্রোজেন হরমোন স্তনের দুগ্ধগ্রন্থির গঠন উন্নত করে, যেখানে গ্রোথ হরমোনের কাজ স্তনের বাহ্যিক অংশ সুগঠিত করা।
ঋতুস্রাব চক্রের প্রথমার্ধে ইস্ট্রোজেন হরমোনের নিঃসরণ অনেক বেড়ে যায়, যার ফলে স্তনে থাকা দুগ্ধনালিকার বৃদ্ধি আরও দ্রুত ঘটে। শেষার্ধে প্রজেস্টেরন হরমোনের নিঃসরণ স্তনের গ্লান্ডুলার টিস্যুর বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে। এই গ্লান্ডুলার টিস্যু একধরনের নিঃসরক টিস্যু যা দুগ্ধ তৈরীর সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। এসময়ে অনেক নারীই নিজের স্তনকে ভারী এবং অধিক স্ফীত অনুভব করে যা ঋতুস্রাব চক্রের শেষে আবার পূর্বের অবস্থায় চলে আসে। এছাড়া ইনসুলিন হরমোনের নিঃসরণ অধিক হলে তা স্তনের আকার বড় করে।
গর্ভধারণের পর নারীর স্তন ল্যাকটেশন তথা দুগ্ধ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত হয়। এসময় অমরা হতে নির্গত ইস্ট্রোজেন হরমোন স্তনে রক্তের প্রবাহ বৃদ্ধি করে যার দরুন স্তন পূর্বের তুলনায় দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং সুগঠিত হয়। অমরা হতে ইস্ট্রোজেনের পাশাপাশি প্রোজেস্টেরনও নিঃসরিত হয়, যা দুগ্ধনিঃসরক অ্যালভিওলাই সুগঠিত করে। উল্লেখ্য, এই ইস্ট্রোজেন-প্রোজেস্টেরন হরমোন যুগলই শিশুপ্রসবের পূর্ব পর্যন্ত দুগ্ধ নিঃসরণ প্রতিরোধ করে প্রোল্যাকটিন হরমোনকে নিস্ক্রিয় রেখে।
অমরা হতে hPL নামক বিশেষ এক ধরনের হরমোন নিঃসৃত হয়। এর নাম আমরা আগে শুনিনি। এই হরমোনও বাকিদের মতো স্তনবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে দুগ্ধগ্রন্থিকে দুগ্ধনিঃসরণ উপযোগী করে তোলে। পাশাপাশি ফ্যাট ঠিকমতো জমা হওয়া না হওয়ার পিছনেও ভূমিকা রয়েছে hPL এর।
আমরা ইতোমধ্যে এইটুকু বুঝতে পারলাম স্তনের আকারের উপর সম্পূর্ণ প্রভাব থাকে জিন অথবা হরমোনের। এখন আমরা পুরুষ মননে বাসা বাঁধা ভুল ধারণার কারণ অনুসন্ধান করবো। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রথম প্রেম আমাদের জীবনে আসে কৈশোরে, বয়স যখন ১৪-১৭ এমন সময়ে। এইসময় নারী বলে না, পুরুষের শরীরের গঠনেও খুব দ্রুত পরিবর্তন সাধিত হয়। দৈহিক আকার বৃদ্ধি পায়, যৌনাঙ্গ সুগঠিত ও পরিপূর্ণ হয়। তাই খুব স্বাভাবিকভাবে এই বয়সে আপনার সঙ্গীর শরীরের পরিবর্তন খুবই সুস্পষ্ট হয়ে ধরা দিবে আপনার চোখে। এতে আপনার সঙ্গ, প্রেম, স্পর্শ কোনোকিছুরই ভূমিকা নেই। আপনি না থাকলেও আপনার সঙ্গীর শরীর এসময় সুগঠিত ও সুন্দর হতো। অনেক সময় নারীর শরীরের পরিবর্তন ১৮-২০ বছর সময়েও সুস্পষ্ট হয় (এটাকে বলে- পিউবার্টি দেরীতে হিট করা। ঠিক যেমন পুরুষের দাঁড়ি গজাতে অনেক সময় দেরী হয়)। বিশোর্ধ অবিবাহিত নারী যারা নিজেদের শরীর মেইনটেইন করে চলেন তাদের যতই প্রেমিক থাকুক না কেনো, শরীরের গঠনে পরিবর্তন মন্থর হয়। তাই "স্পর্শের কারণে হচ্ছে"- এই হাইপোথিসিস পরীক্ষা করার সবচেয়ে ভালো উপায় বিশোর্ধ অবিবাহিত নারীদের নিয়ে একটা পরিসংখ্যান করে দেখা।
এবার আলোচনা প্রেম থেকে বিয়ের দিকে ধাবিত হলে সেখানে নারীর শরীরে প্রধান পরিবর্তন ঘটে প্রধানত মেদ জমার কারণে। বিয়ের পর আমাদের ঘরের নারীরা অনেক ক্ষেত্রেই নিজেদের স্বাস্থ্য নিয়ে অসচেতন হয়ে পড়েন। অতিরিক্ত, অনিয়মিত খাদ্য গ্রহণ শরীরে খুব দ্রুত মেদ জমা করে। অনেকে ভাবেন- বিয়ের পর তো নারীরা আরও বেশি পরিশ্রম করে ঘরের কাজে, তাহলে তো এমন স্থুলতা আসার কথা না। এখানেই ভুল। শুধু পরিশ্রম করলেই শরীরের গঠন ঠিক থাকেনা, খাদ্য হিসেবে কী গ্রহণ করছেন এবং কখন গ্রহণ করছেন সেটা মুখ্য ভূমিকা রাখে স্থুলতায়, নারী পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে। সন্তান প্রসবের পরে কেনো স্থুলতা আসে তাতো আলাপ করলামই।
তবে শারীরিক উত্তেজনার সময় রক্তপ্রবাহ বেড়ে স্তন কিছুটা ফুলে উঠতে পারে। পাশাপাশি চুম্বন বা স্পর্শে ব্রেস্ট টিস্যুতে সাময়িকভাবে রক্ত চলাচল বেড়ে যেতে পারে, যা সাময়িকভাবে আকারে সামান্য পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু এটি স্থায়ী কোনো বিষয় নয় যে, স্পর্শ করলেই আকার পুরোপুরি পরিবর্তিত হবে। আমাদের আশেপাশের মানুষজন এমনকি আপনিও হয়তো জীবনের কোনো এক সময়ে নারীদের শরীরের এই পরিবর্তন নিয়ে নানা ধরণের বাজে মন্তব্য করে এসেছেন। নিজের অজান্তেই একটা ভুল ধারণা মনের মধ্যে গেঁথে নিয়েছেন এবং ভবিষ্যত প্রজন্মও ভুল বার্তা পেয়ে চলেছে আপনার থেকে, যা কখনোই কাম্য নয়।
কখনো কখনো ১০-১১ বছর বয়সী কোনো বালিকার শারীরিক গঠন আমরা গড়পড়তা ১৮-১৯ বছর বয়সী নারীদের মতো সুগঠিত হতে দেখি। আবার কখনো কখনো ১৮-১৯ বছর বয়সী নারীদের শারীরিক গঠন হয় ১০-১১ বছরের বালিকাদের মতো। কেনো? এর প্রধান কারণ টেস্টোস্টেরন আর ইস্ট্রোজেন। বয়ঃসন্ধিকালে ইস্ট্রোজেনের উচ্চমাত্রার কারণেই প্রধানত স্তনের আকৃতি সমবয়সীদের তুলনায় অধিক বৃহৎ হয়ে থাকে। ইস্ট্রোজেনের সাথে সাথে ESR1 জিনেরও একটা প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এই জিন যার শরীরে যত বেশি সক্রিয় তার স্তনের টিস্যু ইস্ট্রোজেনের প্রতি তত বেশি সংবেদনশীল। অর্থাৎ একই পরিমাণ ইস্ট্রোজেন হরমোন নিঃসরণের পরও দুইজন ভিন্ন নারীর শারীরিক গঠন ভিন্ন হওয়া খুবই স্বাভাবিক। যার স্তনটিস্যু যত বেশি সংবেদনশীল তার স্তন তত বেশি সুগঠিত। স্তনের আকৃতি খর্ব হওয়ার জন্য দায়ী টেস্টোস্টেরন হরমোনের প্রভাব। হরমোনাল ইনসুলিন হরমোনের পরিমাণ শরীরে বেড়ে গেলে এটি ডিম্বাশয় এবং অ্যাড্রেনাল গ্লান্ডকে প্রভাবিত করে এবং অতিরিক্ত টেস্টোস্টেরন উৎপন্ন করে। এই টেস্টোস্টেরন হলো পুরুষ হরমোন যা সমতল বক্ষের জন্য দায়ী, ফলে টেস্টোস্টেরন বেশি যেসব নারীর শরীরে তাদের স্তন খর্বাকৃতির হয়ে থাকে। PCOS আছে এমন নারীর শরীরে হরমোনের ভারসম্যহীনতা ঘটে। যার দরুণ কারো স্তন বয়সের তুলনায় অধিক বৃহৎ বা অধিক খর্ব যেকোনোটাই হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক স্ব-গর্বিত পুরুষ মানুষের কমেন্ট দেখা যায় যেখানে তারা কোনো অল্প বয়সী তরুনীর স্তনের আকার নিয়ে কুরুচিপুর্ণ মতামত দিয়ে থাকেন, কিংবা তাদের চরিত্রে আঙুল তুলে থাকেন। একটু সাধারণ বোধ বুদ্ধি অর্জন করলেই মানুষ হওয়াটা এতটাও কঠিন নয়! লেখক: তিকতালিকীয় সদস্যবৃন্দ
লক্ষ লক্ষ বছর আগে সাপের পূর্বপুরুষরা ছিল টেট্রাপড (চার পা বিশিষ্ট) সরীসৃপ, যারা ভূমিতে চলাচল করত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে, পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য তাদের শরীরে পরিবর্তন আসে। সাপের পূর্বপুরুষরা গর্তে বাস করত বা মাটির নিচে চলাচল করত। ফলে একসময় তাদের শরীর দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি পা ছোট হতে শুরু করে এবং অবশেষে অকার্যকর হয়ে পড়ে। বিজ্ঞানীরা কিছু আদিম সাপের জীবাশ্ম (যেমন Najash rionegrina) আবিষ্কার করেছেন, যেগুলোর পিছনের ছোট পা ছিল। এছাড়া, কিছু আধুনিক সাপের (যেমন বোয়া এবং অজগর) দেহে এখনো ছোট পায়ের অবশেষ (পেলভিক স্পার) দেখা যায়, যা তাদের পূর্বপুরুষদের পায়ের স্মৃতি বহন করে!!
৩২
মাংস খাওয়া শুরুর ইতিহাস
, আমরা (আমাদের পূর্বপুরুষেরা) ছিলাম প্রধানত শাকাহারী, ফলাহারী৷ ফল, বাদাম, পাতা, মূল, বীজ এসবই ছিলো প্রধান খাদ্য। তবে এসবের সাথে নানান জাতের পোকামাকড়ও আমাদের খাদ্যতালিকায় সসম্মানে ছিলো। কিন্তু এসব খাদ্য থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি এবং ক্যালরি পেতে তাদের প্রায় সারাদিনই একটু সময় পর পর খাওয়া লাগতো। এই সমস্যার সমাধানের জন্য দুইটা ঘটনা ঘটে।
১। আমাদের পূর্বপুরুষরা নেকড়ে এবং অন্যান্য হিংস্র মাংসাশী শিকারীদের ফেলে যাওয়া উচ্ছিষ্ট সংগ্রহ করতে থাকে। প্রথম প্রথম শুধু অস্থিমজ্জাই খেতো তারা। অস্থি থেকে অস্থিমজ্জা বের করার জন্য ব্যবহার করতো পাথর। এরপর এই সূঁচালো পাথর দিয়েই পিষ্ট করে কাঁচা মাংসও খাওয়া শুরু করে তারা। এভাবেই হাতেখড়ি হয় এক সম্পূর্ণ নতুন খাদ্যাভ্যাসের। আর আমাদের যে পূর্বপুরুষ শাকাহারী থেকে মাংসাহারী হয়ে ওঠে তার নাম অস্ট্রালোপিথেকাস। উল্লেখ্য, অস্ট্রালোপিথেকাস প্রথম মাংস খাওয়া শুরু করে মানে এমন নয় যে এদের সব গোষ্ঠী কিংবা গোষ্ঠীর প্রত্যেক সদস্য মাংস খেতো। কিছু স্থানের অস্ট্রালোপিথেকাসের মাংশাসী হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায় শুধু।
২। নিয়মিত আগুন ব্যবহারের শুরুর সাথে সাথে বিবর্তনে রান্নার আবির্ভাব ঘটে। গত পর্বে আমরা দেখেছিলাম মাংস আমাদের পূর্বপুরুষদের খাদ্যতালিকায় না থাকার সবচেয়ে বড় কারণ, এটা ঠিকমতো কর্তন কিংবা চর্বণ করে গলধঃকরণযোগ্য করার দাঁত আমাদের ছিলো না। পরে পাথর দিয়ে পিষে, কেটে খাওয়া শুরু করলেও গলধঃকরণের পর তা হজম করা কিংবা মাংস হতে সম্পূর্ণ শক্তি শরীরের কাজে লাগানো সম্ভবকর ছিলো না। এই সমস্যার সমাধানই ছিলো মাংসকে আগুনে ঝলসিয়ে, পুড়িয়ে এর স্থিতিস্থাপক, শক্ত লিগামেন্টগুলো ভাঙা। ফলে মাংস হতো নরম, চর্বণযোগ্য এবং হজমের জন্য তুলনামূলক বেশি উপযোগী৷ এবং খাদ্য গ্রহণকারীর শরীরও এর ফলে আরও দ্রুত তরতাজা, বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। এর বাস্তব উদাহরণ পাওয়া যায় খামারীদের অভিজ্ঞতা থেকে। পশুখামারে বীজ বা অন্যান্য খাবার কাঁচা না দিয়ে রান্না করে দেওয়া হলে গরু বা ভেড়ার বৃদ্ধি অনেক বেশি হয়। আবার, গরুর দুধে চর্বির পরিমাণও রান্না করা খাদ্য খাওয়ালে বেশি হয়। একইরকম দৈহিক বৃদ্ধিতে পরিবর্তন লক্ষ করা যায় মাছের খামারে। রান্না সর্বপ্রথম শুরু করে আমাদের পূর্বপুরুষ এবং অস্ট্রালোপিথেকাসের উত্তরপুরুষ "হোমো ইরেক্টাস"।
এখানে পুরো গল্পে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়। মাংস বলতে তো শুরু স্থলজ প্রাণীর শরীর থেকে প্রাপ্ত পেশি বুঝায় তাতো না, জলজ প্রাণীও আছে। আমাদের পুরো গল্পে আমরা তো জলজ প্রাণীদের কথা আলাপ করতে ভুলেই গেছি। রান্নার ইতিহাসে ঢোকার আগে মাছ শিকারের বিবর্তনীয় ইতিহাসের দিকে একবার চোখ ফেরানো যাক।
২০১০ সালে “ Anthropology” জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে সবথেকে পুরাতন মাছ শিকারের প্রমাণ তুলে ধরা হয়। এখানে প্রায় ২ মিলিয়ন বছর আগে প্রাপ্ত সেসব প্রাণীদের হাড়গোড় আবিষ্কারের কথা বলা হয়েছে যারা মনুষ্য শিকারে পরিণত হয়েছিলো। এসকল হাড়গোড় প্রায় ২ মিলিয়ন বছর আগেকার সময়ের। এসব হাড়গোড়ের মধ্যে বিভিন্ন স্থলজ প্রাণীর সাথে সাথে কচ্ছপ, কুমির এবং বিভিন্ন ধরনের মাগুর জাতীয় (Catfish) মাছের অবশিষ্ট কঙ্কালের অস্তিত্বও ছিলো। ২ মিলিয়ন বছর আগেকার সময়ে আমাদের যে পূর্বপুরুষ পৃথিবীতে রাজত্ব বিস্তার করছিলে সে আর কেউ নয়, প্রথম শিকার উপযোগী অস্ত্র তৈরীর কৃতিত্বধারী মহান “হোমো ইরেক্টাস”। ২০১০ এর গবেষণাপত্র থেকে অনুধাবন করা যায়, হোমো ইরেক্টাস কিংবা ইরেক্টাসেরও আগেকার সময় থেকেই আমাদের পূর্বপুরুষ, পূর্বপুরুষদের অন্যান্য নিকটাত্মীয়রাও মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী শিকার করে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতো। যেটা আমাদের বিবর্তনের ধারায় বড় মস্তিষ্কধারী হওয়ার সম্ভাব্য কারণের একটা হতে পারে। মাছ থেকে প্রাপ্ত ফ্যাটি অ্যাসিডে থাকে ওমেগা থ্রি এবং ওমেগা সিক্স যা আমাদের ব্রেইনের আকার, গঠন আরও উন্নত করেছে। যাহোক, এই আলোচনা অন্য কোনোদিন অন্য কোনো গল্পে নাহয় করা যাবে।
বর্তমান ইসরায়েলের উত্তরে অবস্থিত জর্ডান উপত্যকায় প্রায় ০.৭৮ মিলিয়ন বছরের আশেপাশে হোমো ইরেক্টাসের বসবাস শনাক্ত করা যায়। এসকল ইরেক্টাসরা অশ্যুলিয়ান (Acheulean) সংস্কৃতির, অর্থাৎ এদের কাছে বিভিন্ন ধরনের অশ্যুলিয়ান অস্ত্র ছিলো। বোঝার সুবিধার্থে বলি, আগের প্রবন্ধে যে ওল্ডোয়ান অস্ত্রের কথা লিখেছিলাম, সেই ওল্ডোয়ান অস্ত্র থেকে বিবর্তিত এবং উন্নত হয়ে আসছে অশ্যুলিয়ান অস্ত্র। অশ্যুলিয়ান অস্ত্র মূলত “কাঁচা মাংস খাওয়ার ইতিহাস” প্রবন্ধে আলোচিত ওল্ডোয়ান অস্ত্রের বিবর্তিত ও উন্নত রূপ। গোলাকার কিংবা নাশপাতি আকৃতির এক ধার বা দুইধার বিশিষ্ট বিভিন্ন হাতকুঠারের সমারোহ এই অশ্যুলিয়ান অস্ত্রের তালিকায়। ইসরায়েলের উক্ত স্থানের ইরেক্টাসরা এসব অস্ত্র দিয়েই শিকারে নামতো। তারা বড় বড় শিকারের সাথে সাথে প্রচুর মাছও শিকার করতো। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা যেটা জানতেন না সেটা হলো এসকল ইসরায়েলি ইরেক্টাসরা সবকিছু কাঁচাই খেতো নাকি রান্নার দক্ষতা অর্জন করেছিলো তারা। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে উক্ত স্থানে প্রাপ্ত মাছের দাঁতের ক্রিস্টাল অ্যানালাইসিস করেন গবেষকরা। গবেষণায় উঠে আসে এইসকল দাঁত যেসব মাছের সেসকল মাছ আগুনে ঝলসানো হয়েছিলো, বলা যায় রান্না করা হয়েছিলো। কারণ, দাঁতগুলো পোড়ানো হয়েছে ৫০০° সেলসিয়াসের নিচে। আগ্নেয়গিরিতে পুড়েছে এমন হলে সেটার তাপমাত্রা ৫০০° সেলসিয়াসের বেশি হতো। নিয়ন্ত্রিত আগুনেই পুড়িয়ে এগুলো খাওয়ার উপযোগী করা হয়েছে তার সবচেয়ে বড় ইঙ্গিত এটা এবং এটাই প্রথম প্রমাণ যার সাহায্যে আমরা বলতে পারি, “হ্যাঁ, ইরেক্টাসরা রান্না করতে শিখেছিলো।”
দুইটা মজার তথ্য উল্লেখ করি। প্রথমত, প্রাইমেট বর্গে আমাদের বেশ দূর সম্পর্কের আত্মীয় ওরাংওটাংও কিন্তু লাঠি দিয়ে মাছ শিকার করে থাকে। অর্থাৎ আর যাই হোক, মাছ শিকার নতুন কিছু নয়। দ্বিতীয়ত, অনেকেই মনে করেন অতীতে মাছ শিকার শুধুমাত্র তখনই করা হতো যখন খাদ্য সংকট হতো। এটাও অসংগতিপূর্ণ। যে হারে মাছের কঙ্কাল, অবশিষ্ট উদ্ধার হয়েছে একেক স্থানে তাতে হলফ করে বলা যায়, মাছ হোমো ইরেক্টাসদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসেরই অংশ ছিলো। উপরে উল্লিখিত জর্ডান উপতক্যাতেই প্রায় ৫০০০ মাছের কঙ্কাল পাওয়া গেছে একসাথে। ওইসময় মাছ ধরার জন্য বঁড়শির ব্যবহার ছিলোনা। লাঠি এবং পাথর মেরে মাছ ঘায়েল করা ছাড়া হাত দিয়ে মাছ ধরাটা ছিলো অন্যতম একটা জনপ্রিয় উপায় মাছ শিকারের।
যাহোক, রান্না প্রচলনের একদম শুরুর দিনগুলোতে শুধু মাংস পুড়িয়ে খাওয়া হতো। বলা যায়, বার্বিকিউ ছিলো আমাদের প্রথম রান্না করা খাদ্যের আইটেম। মাংসের সাথে সাথে মাছও পুড়িয়ে খাওয়া প্রচলিত হতে থাকে। কিন্তু শাক-সবজি, ফলমূল পুড়িয়ে খাওয়া হতো কি হতোনা- এর পক্ষে-বিপক্ষে তেমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয়, ইরেক্টাসরা পোড়ানো ছাড়াও আরও দুইটা রান্নার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলো- সিদ্ধ করা এবং বেক করা। বেক করা বলতে তারা উত্তপ্ত ছাইয়ের মধ্যে মাংস, মূল জাতীয় সবজি, বিভিন্ন ধরনের বীজ চাপা দিয়ে দিতো। ছাইয়ের উত্তাপে দীর্ঘসময় রাখার ফলে মাংসে একটা স্মোকি ফ্লেবার চলে আসতো। অপরদিকে, মাংস সিদ্ধ করার জন্য ইরেক্টাসের সময় কোন পাত্র ছিলোনা, অন্তত এখনও পর্যন্ত “ইরেক্টাসরা হাতে তৈরী পাত্র ব্যবহার করতো” এরূপ কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মাংস সিদ্ধের প্রচলন সেসময় থাকলে তারজন্য হয়তো গাছের বাকল, অবতল আকৃতির পাথর পাত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সিদ্ধ করার সুবিধা হলো, এতে মাংস হতে চর্বি ছাড়িয়ে যায় এবং পানির ভিতর আলাদা হয়ে ভাসতে থাকে। যেখানে পোড়ানোর সময় মাংসের পৃষ্ঠতল হতে চর্বি গলে গলে পড়ে যায় এবং রান্না করা মাংসে চর্বির পরিমাণ কমে যায়। সিদ্ধ করলে যেহেতু চর্বি পানিতেই থেকে যায়, ওই পানি (চর্বির স্যুপ) পান করে চর্বির চাহিদা অল্পতেই পূরণ করা সম্ভব হয়ে উঠে। উল্লেখ্য, মাংস পুড়িয়ে খাওয়ার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া গেলেও সিদ্ধ এবং বেক করার কোনোপ্রকার প্রমাণ পাওয়া যায় নাই, এগুলো কেবল হাইপোথিসিস মাত্র।
এরপরে মিলিয়ন বছরের সময়কালে আসলে রান্নার পদ্ধতি কিংবা রান্নার সরঞ্জামে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। বলা যায়, আমাদের পূর্বপুরুষরা রান্না নিয়ে আহামরী কোনো চিন্তা-ভাবনা করেনি নতুন কিছু আবিষ্কারের জন্য, অন্তত উল্লেখযোগ্য কিছু এখনো পাওয়া যায়নি। বরং এসময়টাতে আমাদের পূর্বপুরুষেরা তাদের শিকার সরঞ্জামে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করেছিলো। রান্নাবান্নায় কেনো তেমন পরিবর্তনসাধন হয়নি সে প্রশ্নের উত্তর জ্যাকব ব্রোনোওস্কি খুব সুন্দরভাবে তার “The Ascent of Man” বইতে লিখেছেন। ইরেক্টাস বা তার উত্তর-পূর্বপুরুষরা কোনো একটা নির্দিষ্ট স্থানে বছরের পর বছর বংশপরম্পরায় বাস করতো না। বরং প্রতি মুহুর্তে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণের উপর থাকতো। যেটাকে বর্তমান বাংলা ভাষায় বলা হয় “যাযাবর”। ফলে তাদের জন্য বেশি প্রয়োজন ছিলো নিজেদের আত্মরক্ষা করা এবং শিকারের সাথে সম্পর্কিত সরঞ্জাম, পদ্ধতি, কৌশল আরও আরও উন্নত করতে থাকা। রান্নার জন্য যে পদ্ধতি তারা আবিষ্কার করেছিলো (আগুনে পোড়ানো) সে পদ্ধতিই তাদের টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট সহায়ক ছিলো, নতুন নতুন পদ্ধতি ভাবার প্রয়োজনীয়তা কিংবা প্রতিকূলতা আসেনি। এজন্য ওইসময়কালে রান্না সম্পর্কিত নতুন নতুন আবিষ্কারের খুব বেশি আশা রাখাও উচিত না আমাদের।
রান্নার পদ্ধতিতে পরবর্তী বড় পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায় ৩০,০০০ বছর আগে। তখন মাটি খুঁড়ে গর্ত করে সেখানে চুলা বানানো শুরু করে ইউরোপিয়ানরা। প্রথমে মাটিতে গর্ত করা হতো, এরপর নিচে পাথর দেওয়া হতো, তার উপরে থাকে গরম উত্তপ্ত কয়লা এবং ছাই, এর উপরে পাতায় মুড়িয়ে মাছ মাংস রাখা হতো। তারপর পুরো গর্তটাই মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হতো। ঘন্টার পর ঘন্টা উত্তপ্ত কয়লার তাপে ধীরে ধীরে মাংস রান্না হতো। ধীরে ধীরে অধিক সময় নিয়ে রান্নার সুফল হলো- মাংসের কানেক্টিভ টিস্যুতে থাকা কোলাজেন ভেঙে জেলাটিনে পরিণত হওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যেতো। এটাই প্রথম খাদ্য তৈরীতে ‘বেক পদ্ধতি” ব্যবহার করার প্রাপ্ত প্রমাণ। উল্লেখ্য, মাটি খুঁড়ে চুলা বানানো অনেক আগেই শুরু হলেও আমাদের গ্রামাঞ্চলে এখন যে মাটির চুলা ব্যবহৃত হয় তার প্রচলন এখন থেকে মাত্র ১০,০০০ বছর আগে।
এরপর আসে পাত্র ব্যবহারের যুগ। সবথেকে পুরাতন মাটির পাত্রের যে অস্তিত্ব পাওয়া গেছে সেটা প্রায় ২০,০০০ বছর আগেকার। হয়তো তার আরও আগে থেকেই বিভিন্ন পাত্র ব্যবহারের প্রচলন ছিলো। কিন্তু সেসব শুধুই “হয়তো”, ২০০০০ বছরের পূর্ববর্তী সময়ে পাত্র ব্যবহারের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় নি এখনো। যাহোক, জাপান থেকে প্রাপ্ত পাত্রের অবশিষ্টাংশ থেকে গবেষকরা উদ্ধার করেছেন মাছ এবং খোলসওয়ালা মাছের শরীরে পাওয়া যায় এমন ফ্যাটি অ্যাসিড। এটাই প্রথম পানিতে সিদ্ধ করার মাধ্যমে রান্নাবান্না করার প্রত্যক্ষ প্রমাণ।
বরফযুগ শেষ হওয়ার পর রান্নাবান্নায় নতুন জোয়ার দেখা যায়। তখন শিকারী-সংগ্রাহক সমাজ থেকে কৃষিভিত্তিক সমাজের উত্থান ঘটে। ফলে মানুষ জায়গায় জায়গায় ঘুরে না বেরিয়ে একটা নির্দিষ্ট স্থানে ঘর বেঁধে, গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে বসবাস শুরু করে। নির্দিষ্ট জায়গায় চাষবাষ করে অধিক পরিমাণে খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা যায় বিধায় খাদ্য সংগ্রহের চাপ কমে আসে, হাতে অধিক সময় থাকায় রান্নাবান্নায় নতুন নতুন সৃজনশীলতাও আসতে থাকে, নতুন নতুন রেসিপির উদ্ভব ঘটে। বলে রাখা ভালো, খাদ্যে সুগন্ধ এবং ভিন্ন স্বাদ আনার জন্য গাছের পাতা এবং বীজ মশলা হিসেবে ব্যবহারও জনপ্রিয় হতে থাকে এই কৃষিভিত্তিক সমাজে, নতুন নতুন রেসিপি আবিষ্কারের তাগিদে। তবে শিকারী সমাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন পাত্রের ধ্বংসাবশেষ থেকে একধরনের পাতার ব্যবহার শনাক্ত করা যায় যার গন্ধ, স্বাদ প্রায় রসুন-সরিষার মতোই। এ থেকে ধারণা করা হয়, কৃষিভিত্তিক সমাজে বেশি জনপ্রিয় ও প্রচলিত হলেও রান্নায় মশলার ব্যবহার আরও বহু আগেই শুরু হয়েছে, বিশেষ করে পাত্র আবিষ্কারের পর থেকেই।
এই ছিলো আজকের রান্নার আবির্ভাব এবং রন্ধন পদ্ধতি ও সরঞ্জামের বিবর্তনের সংক্ষিপ্ত গল্প। আপনার মনে জিজ্ঞাসা আসতে পারে, প্রথম মাংস আগুনে পুড়িয়ে খেয়ে দেখার বুদ্ধি ইরেক্টাসদের মাথায় কীভাবে এসেছিলো? এর কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই, পাওয়া হয়তো সম্ভবও নয়। তবে সবথেকে সরল ধারণা হলো, প্রাকৃতিক আগুনে (আগ্নেয়গিরি, বজ্রপাত) পুড়ে মরা কোনো প্রাণী অনুসন্ধিৎসু মনে প্রথম খেয়েছিলো ইরেক্টাস বা তারও আগের পূর্বপুরুষরা। সেখান থেকেই আগুনে পুড়িয়ে খাদ্য প্রস্তুতের ধারণা আসে। পরবর্তীতে আগুনের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার শেখার পর বার্বিকিউ করে মাছ মাংস খাওয়া জনপ্রিয় হতে থাকে। এই গল্প বলার সময় একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে এসেছে। যেটা হলো, বিবর্তনে রান্না এমন কী ভূমিকা রাখলো যে সেটা এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অনবদ্য অংশ হয়ে গেছে? রান্না আমাদের ফিজিওলজি এবং অ্যানাটমিকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে? মূলত রান্নাই আজকের মানুষকে মানুষ করেছে। বিস্তারিত আলোচনা এবং গবেষণা আমরা আগামী পর্বে করবো। ততক্ষণের জন্য ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। আর তিকতালিকের সাথে থাকুন।
লেখক: তিকতালিকীয় সদস্যবৃন্দ
৩৩
মশা নিয়ন্ত্রণ।
নারী মশার ডানা ঝাপটানোর মিষ্টি-মধুর শব্দ শুনে আকৃষ্ট হয়ে তাদের দিকে এগিয়ে যায় পুরুষ মশা। কিন্তু পুরুষ মশা বধীর হয়ে গেলে কী হবে ভাবতে পারছেন?
হ্যাঁ, তারা আর শুনতে পারবে না সঙ্গীর পাখা ঝাপটানোর শব্দ, আকৃষ্ট হবে না আর নারীর দিকে। এতে তাদের বংশ বিস্তার করার প্রবণতা কমে যাবে। ‘CRISPR-Cas9’ নামক জিন এডিটিং পদ্ধতি ব্যবহার করে মশাদের শ্রবণের অনুভূতি জাগানো ‘একটি জিনকে মডিফাই করার পর দেখা গেছে একটি পুরুষ মশা চতুর্দিকে নারী পরিবেষ্টিত পরিবেশেও নারী মশাদের দিকে ফিরেই তাকাচ্ছে না। উক্ত জিনটি হলো trpVa। উল্লেখ্য যে, এই পদ্ধতি কিন্তু রোগ সংক্রামনকারী নারী মশাদের সরাসরি মারার পদ্ধতি না। বরং জন্ম নিয়ন্ত্রণ করে সার্বিক ভাবে মশাদের বাড় বাড়ন্তপনা কমানোর পদ্ধতি।
৩৪
জেনেটিক কারণেই কিছু লোক অন্যান্যদের চেয়ে গড়ে অন্তত আধা ঘণ্টা আগেই সকালে উঠে
আপনি কি সক্কাল সক্কাল উঠে দিনের সব কাজ শুরু করবেন নাকি রাত জেগে সকালে দেরীতে উঠে কাজে যেতে রোজ রোজ দেরী করবেন তা কিন্তু আপনার জিনের উপরেই নির্ভর করে। আপনি আর্লি রাইজার হবেন নাকি বেশি বেশি রাত জাগবেন তা নির্ণয়কারী বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় ‘ক্রোনোটাইপ’ (Chronotype)। ৮৫,০০০ জনের বিশাল জনগোষ্ঠীর হাতে বিশেষ রিস্ট ব্যান্ড পরিয়ে তাদের শারীরিক অ্যাক্টিভিটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, জেনেটিক কারণেই কিছু লোক অন্যান্যদের চেয়ে গড়ে অন্তত আধা ঘণ্টা আগেই সকালে উঠে পড়ে! অর্থাৎ আপনার যদি সকালে না উঠে শুধু গড়াগড়ি করতে মন চায়, হতে পারে তা আপনি জেনেটিক্যালিই পেয়েছেন।
৩৫
গুবরে পোকা আছে তিন শ্রেণীর
এক শ্রেণী যারা গোবরের টুকরাকে একসাথে করে বলের মতো আকৃতি দেয়, এরপর এটা গড়িয়ে গড়িয়ে এক স্থান থেকে অন্যস্থানে নিয়ে যায়, সর্বশেষে এটা নিজেদের বাসস্থানে লুকিয়ে ফেলে, এই শ্রেণীর পোকাদের বলা হয় রোলার। এই বলগুলোতে নারী সদস্যরা ডিম পাড়ে আবার এই বলগুলো থেকেই বয়স্করা নিজেদের খাদ্য পেয়ে থাকে। আরেক শ্রেণী আছে যারা তুলনামূলক নরম মাটিতে গর্ত করে এবং সুড়ঙ্গ তৈরী করে, তারপর সেই সুড়ঙ্গের শেষপ্রান্তে গোবর দিয়ে ডিম পারার উপযুক্ত স্থান তৈরী করে যেটাকে বলা হয় ব্রুড বল। আর এই শ্রেণীর গুবরে পোকাদের নাম টানেলার। সবার শেষে আসে ডুয়েলার। এদের রোল করারও সময় নেই, এদের সুড়ঙ্গ করারও সময় নেই। এরা সরাসরি যেখানে গোবর পায় সেখানেই থাকে, সেখানেই খায়, সেখানেই বাচ্চা দেয়।
৩৬
ক্ষত চেটে দিয়েছিল বাড়ির পোষ্য, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কোমায়!
চিকিৎসকদের বক্তব্য, মনজিতের শরীরে সংক্রমণ শুরু হয় যখন তার পোষা কুকুরটি তার ছোট একটি কাটা বা আঁচড়ের জায়গা চেটে দেয়। এর ফলে কুকুরের লালায় থাকা জীবাণু তার রক্তে ঢুকে যায়। Capnocytophaga canimorsus নামের এই ব্যাকটেরিয়া সাধারণত কুকুরের শরীরে থাকে এবং তাদের কোনো ক্ষতি করে না। কিন্তু মানুষের শরীরে ঢুকলে এটি গুরুতর অসুখ, যেমন সেপসিস, এমনকি মারাত্মক অবস্থায় মৃত্যুও ঘটাতে পারে।
সেপসিস কী
সেপসিস শরীরে এক ধরনের মারাত্মক সংক্রমণ। এতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা উল্টো কাজ শুরু করে। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা তখন নিজের সুস্থ টিস্যু ও অঙ্গগুলোকে আক্রমণ করতে শুরু করে। ফলে সারা শরীরে মারাত্মক ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়ে। গুরুতর হলে এটি সেপটিক শকে পরিণত হতে পারে। এর ফলে রক্তচাপ হঠাৎ কমে যায়। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একাধিক অঙ্গ বিকল হতে পারে এবং মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
কেন হয় সেপসিস
বিশেষজ্ঞদের মতে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ সেপসিসের সবচেয়ে সাধারণ কারণ। তবে ছত্রাক, পরজীবী এবং ভাইরাসজনিত সংক্রমণ থেকেও সেপসিস হতে পারে। যে সব সংক্রমণ থেকে সেপসিস হওয়ার ঝুঁকি বেশি, সেগুলো হল— ফুসফুস, মূত্রথলি, কিডনি বিশেষ করে ক্যাথেটার থাকলে, পেটের ভেতরের সংক্রমণ যেমন অ্যাপেন্ডিসাইটিস, পেরিটোনাইটিস, পিত্তথলি বা লিভারের সংক্রমণ, মস্তিষ্ক বা স্পাইনাল কর্ডের সংক্রমণ এবং ত্বকের সংক্রমণ। তথ্যসূত্র : Z ২৪ ঘন্টা
৩৭
কাঁকড়ার কি আমাদের মতোই অনুভূতি রয়েছে?
অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের অনুভূতি আছে কিনা এটা খুব বড় একটা বিতর্কের বিষয় বিজ্ঞান দুনিয়ায়, এটা যে শুধু একটা ডিসিপ্লিনের ভাবনার বিষয় এমন না; পতঙ্গবিদ্যা, আচরণবিদ্যা, স্নায়ুবিদ্যা, প্রাইমেটোলজি সহ বহু বহু ক্ষেত্র জড়িয়ে আছে এই এক প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সাথে। গত এক দুই দশক আগেও প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা হতো অমেরুদণ্ডী প্রাণী যেমন কাঁকড়া, অক্টোপাস কিংবা স্কুইড কিংবা কোনে পতঙ্গ- এদের কোনোরকম কোনোপ্রকার অনুভূতি নেই। কিন্তু এখন আর দৃষ্টিভঙ্গী তেমন নাই। অধুনিক গবেষণা আমাদের জানান দেয়, তাদেরও অনুভূতি আছে, এই অনুভূতি শুধু সুখ কিংবা দুঃখের নয়, হয়তো তারা ক্রোধ, ভালোবাসার মতো জটিল জটিল অনুভূতিগুলোও ধারণ করে।
২০২০ সালে মুক্তি পাওয়া ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্র "My Octopus Teacher" এ দেখা যায় অক্টোপাস রোবোটের মতো শুধু খায়, দায়, শিকার করে, নিজেকে রক্ষা করে এমন কিন্তু না। অক্টোপাস মাছেদের সাথে ঘুরে ঘুরে খেলা করে, নেচে বেড়ায়, আনন্দ করে। শিকারকে কুপোকাত করার পরে কিংবা নিজেকে শিকারীর হাত থেকে রক্ষার পর গর্বের সাথে উল্লাসও করে। শিকার থেকে নিজেকে রক্ষা করতে কৌশলও বানায়। এসব থেকে এক ধাপ উপরে, অক্টোপাস মানুষের সাথে ইমোশনালি অ্যাটাচডও হতে পারে, উক্ত ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্র নির্মাতা ক্রেইগ ফস্টারের সাথেও এমনই হয়েছিলো। তিনি একবছর একটা অক্টোপাসের সাথে কাটিয়েছেেন, এক পর্যায়ে সেই অক্টোপাস ক্রেইগকে নিজের আপনজন বন্ধু ভেবে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে শুরু করে; আমাদের পোষা প্রাণীগুলোর মতোই।
অক্টোপাস ছাড়াও কাঁকড়া, লবস্টার জাতীয় অমেরুদণ্ডীর মধ্যেও একইরকম অনুভূতির অস্তিত্ব শনাক্ত করা যায়। ফ্রান্সিস ডি ওয়াল, যিনি প্রাইমেটদের আচরণ নিয়ে গবেষণা এবং বইয়ের জন্য বিখ্যাত, তার কলিগ ক্রিস্টিন অ্যান্ড্রিউর সাথে অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের অনুভূতি নিয়ে একটি গবেষণাপত্র লিখেন সাইন্স জার্নালে, ২০২২ সালে। সেখানে ওয়াল বলেন, "অনুভূতিকে যদি আমরা বিভিন্ন অবস্থায় টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিক্রিয়ার অভিযোজন হিসেবে চিন্তা করি তাহলে সেটা অনেক অমেরুদণ্ডী প্রাণীতেই দেখা যায়, বিশেষ করে চিংড়ি, কাঁকড়া কিংবা অক্টোপাসে।" ২০০০ সালের এলউডের কাঁকড়া নিয়ে গবেষণার ফলাফল কিংবা উপসংহারও কিছুটা এরকমই ছিলো। তিনি কাঁকড়া শরীরে অ্যাসিটিক অ্যাসিড লাগিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে দেখা যায় এই অ্যাসিডের দরুণ হওয়া ব্যথা দূর করতে কাঁকড়াটা নিজের শরীর কাঁচের সাথে বারবার ঘষছে, ঘষে অ্যাসিড দূর করছে। এ থেকে প্রমাণিত হয় কাঁকড়ার ব্যথা অনুভবে ক্ষমতা আছে। এখন প্রশ্ন এই অনুভূতি ঠিক কতটা বেশি? এই ব্যথার অনুভূতি শুধুই একটা প্রতিবর্তী প্রক্রিয়া নাকি কাঁকড়া এইসব ব্যথার অনুভূতি থেকে কিছু শিক্ষা নিয়ে থাকে? উত্তর হলো, হ্যাঁ। এলউড ওই কাঁকড়াকে যখন বৈদ্যুতিক শক প্রদান করেন, দেখা যায়, বৈদ্যুতিক শক থেকে বাঁচতে কাঁকড়াটি নিজের আচরণ, চলার পথে পরিবর্তন এনেছে। একটু বিস্তারিত বলি।
এলউড একটা বড় পানিহীন অ্যাকুরিয়ামের মধ্যে সমুদ্রের তীরের মতো পরিবেশ সৃষ্টি করেন। তারপর সেখানে দুটো ছোটো ছোটো আশ্রয় নেওয়ার মতো জায়গা রাখেন। কাঁকড়া নিজেদের রক্ষার জন্য সাধারণ পাথর কিংবা বড় কিছুর পিছনে নিজেদের লুকিয়ে রাখে। এটা তাদের বংশগত আচরণ। এখানেও ব্যতিক্রম হয়নি। কাঁকড়াটাকে যখনই অ্যাকুইরিয়ামের মাঝামাঝি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে সে দৌড়ে চলে গেছে এক কোণায় নিজেকে লুকিয়ে আশ্রয় নিতে। কিন্তু আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার সাথে সাথে যখনই বৈদ্যুতিক শক লেগেছে তখনই সে নিজের আগের আশ্রয় ছেড়ে অন্য আশ্রয়ে চলে গেছে। উভয় আশ্রয়ে বৈদ্যুতিক শক লাগার পর দেখা গেছে কাঁকড়া আর কোনো আশ্রয়কেন্দ্রেই আশ্রয় নিচ্ছেনা। বরং খোলা ময়দানে থাকাই বেশি নিরাপদ মনে করছে। এ থেকে বোঝা যায়, কাঁকড়াদের এই ব্যাথার অনুভূতি যথেষ্ট জটিল, তারা এটা থেকে শিক্ষা নিতে পারে এবং হয়তো চিন্তাভাবনাও করতে পারে।
তবে এখনো সব বিজ্ঞানীরা এই বিষয়ে একমত নয়। পোকামাকড় কিংবা এরকম অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের স্নায়ুতন্ত্র আমাদের মতো উন্নত নয়। তাই তারা "অনুভব" করতে পারে কিংবা আমাদের মতো তাদেরও "ইমোশন" আছে এমনটা বলতে নারাজ স্নায়ুবিশেষজ্ঞ ক্যারেন ম্যাশ্চে কিংবা পতঙ্গবিশেষজ্ঞ ডেভিড ম্যারিট। আসলে তাদের যুক্তিও ফেলে দেওয়ার মতো নয়, তাদের যুক্তিতে, অমেরুদণ্ডীরা বিভিন্ন অবস্থায় বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখায় এটা তাদের রাসায়নিক প্রতিবর্তী ক্রিয়া মাত্র। তারা এটা নিয়ে আমাদের মতো চিন্তা করতে পারে কিংবা আমাদের মতোই অনুভব করতে পারে এমনটা কখনোই সত্য নয়, আমাদের স্নায়ুতন্ত্র যতটা উন্নত তাদের তেমন উন্নত না। ফলে তাদের বিভিন্ন আচরণ দেখে আমরা যেটা ভাবছি সেটা আমরা মানুষরাই অনুভব করছি আমাদের অনুভবের সক্ষমতা আছে বলে, তারা করছে না। তো পাঠকগণ, আপনাদের কী মনে হয়? এই ভিডিওতে দেখানো কাঁকড়াটা কি আসলেই ভালোবাসার টানে এমন করছে? তথ্য সংগ্রহ ও সম্পাদনা: তিকতালিক
৩৮
আমাদের রক্তের গ্রুপ
আমাদের রক্তের গ্রুপ নির্ধারণের পদ্ধতি হলো ABO সিস্টেম। রক্তের লোহিত রক্তকণিকার পৃষ্ঠে উপস্থিত অ্যান্টিজেন এবং রক্তরসে উপস্থিত অ্যান্টিবডির উপর নির্ভর করে কার রক্তের গ্রুপ কী হবে। ধরুন, আপনার রক্তরসে উপস্থিত অ্যান্টিবডি হলো b, এর অর্থ আপনার লোহিত রক্তকণিকার পৃষ্ঠতলে অ্যান্টিজেন B থাকবেনা, শুধু অ্যান্টিজেন A থাকবে। আপনার রক্তের গ্রুপ হবে A। একইভাবে, রক্তরসে a অ্যান্টিবডি থাকলে লোহিত রক্তকণিকায় A অ্যান্টিজেন থাকবেনা, শুধু B থাকবে। আপনার রক্তের গ্রুপ হবে B। রক্তরসে কোনো অ্যান্টিবডি না থাকলে তখন লোহিত রক্তকণিকায় A B উভয় অ্যান্টিজেনই থাকবে, রক্তের গ্রুপ AB। রক্তরসে উভয় অ্যান্টিবডি থাকলে লোহিত রক্তকণিকা হবে অ্যান্টিজেনহীন, রক্তের গ্রুপ O।
এখন এই রক্তের গ্রুপ সাধারণত একজন মানুষের ক্ষেত্রে আজীবন একই থাকে। কিছু বিরল ঘটনায় রক্তের গ্রুপ পরিবর্তিত হতে পারে। যেমন:
অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন: আমাদের শরীরে রক্ত কোথা হতে উৎপন্ন হয়? অস্থিমজ্জা হতে। লোহিত, শ্বেত কিংবা অনুচক্রিকা রক্তকণিকা সবই অস্থিমজ্জায় উৎপন্ন। লিউকোমিয়া রোগীদের ক্ষেত্রে এই অস্থিমজ্জা সুস্থ সবল হয়না। ফলে তাদের অনেকসময় অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন করার প্রয়োজন পড়ে। যদি রক্ত উৎপাদনের কারখানাই পরিবর্তিত হয় তবে উৎপাদিত রক্তের গ্রুপও পরিবর্তিত হবে। এটাই স্বাভাবিক।
প্রচুর রক্তগ্রহণ: অনেক সময় দুর্ঘটনায় প্রচুর রক্তক্ষরণ হলে তখন A, B, বা AB গ্রুপ ধারী কেউ সর্বজনীন দাতা O এর থেকে রক্ত নিতে পারে। ফলে সাময়িক সময়ের জন্য রক্ত পরীক্ষায় গ্রুপ ভিন্ন দেখায়। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই অস্থিমজ্জা থেকে উৎপন্ন নতুন রক্ত এই বাইরে থেকে নেওয়া রক্তকে প্রতিস্থাপিত করে এবং রোগীর রক্তের গ্রুপ আবার আগেরটাতেই ফিরে আসে।
ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ: ইনটেস্টাইনে ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে ইনফেকশন হলে এক ধরনের এনজাইম সৃষ্টি হয় যে এনজাইম A রক্তের গ্রুপের উপাদানগুলো B রক্তের গ্রুপের উপাদানে বদলে দেয়। অর্থাৎ রোগীর রক্তগ্রুপই পরিবর্তিত হয়। এটা শুধুমাত্র A গ্রুপের রোগীদেরই হয় এবং তাদের নতুন রক্তের গ্রুপ B হওয়ায় এটাকে বলে "acquired B phenomenon"। এই ঘটনা আর ঘটে কোলন ক্যান্সার কিংবা সেপসিস হলে।
সবশেষে বলা যায় রক্তের গ্রুপ চেঞ্জ হওয়া আদতে এত সহজ কিছু নয়। এটা অহরহ ঘটেনা। বিরল রোগ এবং জেনেটিক কান্ডিশনে এমন হতে পারে। কিন্তু খুবই কম সেটা। অনেকে বলে থাকে, " শৈশবে আমার রক্তগ্রুপ যা ছিলো, বড় হওয়ার পর তা নেই", এ আসলে ভ্রান্ত ধারণা। বয়সের সাথে রক্তের গ্রুপের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই৷ হয় তিনি জানতেনই না শৈশবে তার রক্তের গ্রপ কী ছিলো, নতুবা রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ে কোনো ত্রুটি ছিলো। প্রাপ্তবয়স্ক হলে রক্তের গ্রুপ কখনোই এমনি এমনি পরিবর্তিত হয়ে যায়না।
Reference: Can my blood type change?, Our blood Institute
৩৯
রান্নার উৎপত্তি
রান্নার উৎপত্তি মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মোড়, যা প্রায় ৭,৮০,০০০ থেকে ১৫ লক্ষ বছর আগে হোমো ইরেক্টাস বা আদিম মানুষের আগুন আয়ত্ত করার মাধ্যমে শুরু হয়েছিল [১, ৩, ৮]। মূলত কাঁচা খাবার সহজে হজম করা এবং আগুনের তাপে রোস্ট করে খাওয়ার মাধ্যমে রান্নার সূচনা, যা পরবর্তীতে বিবর্তনের ধারায় ও নবোপলীয় যুগে পোড়ামাটির পাত্রের ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নত হয়েছে ।
রান্নার উৎপত্তি ও বিকাশের মূল পর্যায়:
আগুনের ব্যবহার (প্রায় ৭.৮ - ১৫ লক্ষ বছর পূর্বে): প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ অনুযায়ী, হোমো ইরেক্টাসরা আগুনের সাহায্যে খাবার প্রস্তুত করত । ধারণা করা হয়, বনের আগুণের ফলে পোড়া পশুর মাংস খাওয়ার পর তারা আগুনের ব্যবহার শেখে ।
প্রাথমিক পদ্ধতি: শুরুতে মানুষ শিকার করা পশুর মাংস আগুনে সরাসরি পুড়িয়ে বা রোস্ট করে খেত ।
বিবর্তন ও কৌশল: সময়ের সাথে সাথে মানুষ শস্য পোড়ানো এবং পরে পোড়ামাটির পাত্রে সিদ্ধ করে খাবার তৈরির কৌশল শেখে (নব্যপ্রস্তর যুগ) ।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: রান্নার ফলে খাবার সহজে হজমযোগ্য হয়েছে, যা আদিম মানুষের মস্তিস্কের দ্রুত বিকাশে সহায়তা করেছে ।
আঞ্চলিক ও আধুনিক উন্নয়ন:
পরবর্তীতে চকমকি পাথর ও মাটির চুলার ব্যবহার বৃদ্ধি পায় । খাবারের স্বাদ বৃদ্ধিতে মশলার ব্যবহার ও রান্নার বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় পদ্ধতি তৈরি হয় । ১৮শ শতকে ফ্রান্সে পেশাদার রান্নার বা আধুনিক রন্ধনশিল্পের বিকাশ ঘটে
২০১৬ সালের ৯ মার্চ, লস অ্যাঞ্জেলস টাইমসে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে নেটবার্ণ নামক একজন লেখক কাঁচা মাংস ভক্ষণ নিয়ে নৃতত্ত্ববিদ ও জীবাশ্মবিদ ড্যানিয়েল লিবারম্যানের গবেষণা এবং লিবারম্যানের মতামত তুলে ধরেন। লিবারম্যান কাঁচা ছাগলের মাংস চিবিয়ে খেয়ে দেখেছেন রান্না এবং কাঁচা মাংস খাওয়ার পার্থক্য অনুধাবন করার জন্য।
নেকড়ে, সিংহের মতো কাঁচা মাংস খেয়ে থাকে এমন প্রাণীদের দাঁত থেকে আমাদের দাঁতে রয়েছে বিস্তর পার্থক্য। শুধুমাত্র এদের দাঁতের গঠনের জন্যই এরা কাঁচির মতো মাংস কুচি কুচি করে সহজে টুকরো টুকরো করে ফেলতে পারে মাংস চিবানোর সময়। ফলে গলাধঃকরণে কোনোপ্রকার সমস্যা হয়না। কিন্তু আমাদের দাঁত কাঁচা মাংসের স্থিতিস্থাপকতাকে অতিক্রম করতে পারেনা। ফলে আমরা যখন চিবাই মাংস মোটেই টুকরো টুকরো হয়না। বরং দাঁতের চাপে পিষ্ট হয়ে একপ্রকার লালাযুক্ত মন্ডে পরিণত হয়ে যায়। লিবারম্যান কাঁচা মাংস চিবানোর সময় এই একই বিষয়ই অনুভব করেছেন। তিনি বলেছেন, কাঁচা মাংস আসলে নোনতা এবং শক্ত। মুখে দিয়ে চিবাতে থাকলেও কোনো বিশেষ উপকার পাওয়া যায়না গলাধঃকরণে।
আমাদের হোমিনিন পূর্বপুরুষরা গাছে গাছে ঘুরত এবং ফলমূল খেয়ে বেঁচে থাকতো। দুই পায়ে চলতে শেখার পরও এই গাছে গাছে ঘুরে বেড়ানোটা আরও বহুকাল আমাদের পূর্বপুরুষদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ ছিলো। ফল, বাদাম, পাতা, মূল, বীজ, পোকামাকড় এসবই ছিলো প্রধান খাদ্য। কিন্তু এসব খাদ্য থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি এবং ক্যালরি পেতে তাদের প্রায় সারাদিনই একটু সময় পর পর খাওয়া লাগতো। এই সমস্যার একমাত্র সমাধান ছিলো এমন খাদ্য উৎস খুঁজে বের করা যেনে সামান্য খাদ্য হলেই প্রয়োজনীয় ক্যালরি পাওয়া যায়। এইরকম খাদ্য উৎসের সন্ধানেই হোমিনিনরা বেছে নেয় মাংসাশী প্রাণীদের উচ্ছিষ্ট খাদ্য, বিশেষ করে হাড়গোড় আর অস্থিমজ্জা। প্রায় তিন মিলিয়ন বছর আগে এভাবেই আমাদের খাদ্য তালিকায় এক বিশাল পরিবর্তন আসে।
সম্ভবত, তখনই মোটামুটি কোনো কোনো হোমিনিন গোষ্ঠীতে বড় স্কেলে মাংস ভক্ষণ শুরু হয়। আরও নির্দিষ্ট করে বললে অস্ট্রালোপিথেকাসরা প্রথম প্রাণী শিকার করে খাবার হিসেবে গ্রহণ শুরু করে। অস্ট্রালোপিথেকাসদের আদি বাসস্থান ছিলো তাঞ্জানিয়ায়। এই তাঞ্জানিয়ায় ছোট ঘোড়া, জিরাফ, চেয়াল, হায়েনা, বিশাল আকৃতির হাতি থাকতো। কিন্তু তখনও কোনো প্রকার ধারালো নিঁখুত অস্ত্র বা শিকার সরঞ্জামের আবির্ভাব হয়নাই বিধায় অস্ট্রালোপিথেকাসরা ব্যাঙ, খরগোশ, হাঁসই বেশি শিকার করে খেতো। এসব শিকারে তাদের অস্ত্র ছিলো চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাথর। গবেষকরা দেখেছেন, শুধুমাত্র বিভিন্ন ধরনের ধারালো পাথর ব্যবহার করেই শিকার করা, মাংস হাড় থেকে আলাদা করা, মাংস কুচি কুচি করা, হাড় ভেঙে মজ্জা আলাদা করার কাজ করতো তারা। এইসকল ধারালো পাথরের ব্যবহার থেকেই ধীরে ধীরে পরবর্তীতে "আধুনিক পাথুরে অস্ত্র" তৈরীর জোয়ার আসে। উল্লেখ্য, অস্ট্রেলোপিথেকাসরা গাছের ডাল, লাঠির মাথা সূঁচালো করে বল্লম সদৃশ কিছু একটা বানিয়েছিলো যা প্রতিরক্ষার কাজে এরা ব্যবহার করতো।
যেমনটা বললাম, এই অস্ট্রালোপিথেকাসদের ব্যবহার করা ধারালো পাথরগুলো সাধারণত চারপাশের প্রকৃতি থেকে কুড়িয়ে পাওয়া, এগুলো ঠিক হাতে তৈরী না বলে এগুলোকে অস্ত্র বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়না। পাথর ঘষে ঘষে তীক্ষ্ম করে মাংস কাটা কিংবা টুকটাক শিকারের সরঞ্জাম (টুল) বানানোর প্রথম কৃতিত্ব আসলে হোমো হাবিলিসদের। জীবাশ্ম বিজ্ঞানী লুইস লিকির মতে, হাবিলিসরা পাথরের সাথে সাথে জীবজন্তুর হাড় দিয়েও হাতিয়ার বানানো শুরু করেছিলো। মূলত পিথেকাস বা হাবিলিসরা একটু গোলাকৃতির পাথরগুলো অন্য পাথরের সাথে আঘাত করে ভেঙে ফেলতো। ফলে পাথরের ভাঙা অংশ অনেক বেশি সুঁচালো এবং ধারালো ছুরির ন্যায় ব্যবহার করা যেতো। এইধরনের অস্ত্রকে বলা হয় ওল্ডোয়ান অস্ত্র। প্রায় ১.৭-২.৯ মিলিয়ন বছর আগের সময়কালে এসকল ওল্ডোয়ান অস্ত্র ব্যবহৃত হতো। পরবর্তীতে, হোমো হাবিলিসদের বংশধর হোমো আর্গাস্টাররা পাথর কেটে কেটে আরও উন্নত, ভয়ংকর রকম অস্ত্র বানানো শুরু করে। হাবিলিসরা যেখানে হাড় থেকে মজ্জা সংগ্রহ আর ছোটোখাটো শিকারে অস্ত্র ব্যবহার করতো সেখানে আর্গাস্টাররা রীতিমতো অস্ত্র ব্যবহারে নিপুণ সৈন্য হয়ে ওঠে। গাছপালা থেকে কাঠ কাটা, বড় বড় শিকার, মাংস কাটা, হিংস্র প্রাণীকে পাল্টা আক্রমণ করে আত্মরক্ষা- সবকিছুতেই মহারথী ওঠে তারা।
কাঁচা মাংস ভক্ষণের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো ফুড পয়জনিং। কাঁচা মাংসে তুলনামূলক ব্যাকটেরিয়া অনেক বেশি পরিমাণে থাকে। বিশুদ্ধ মাংসাশী হিসেবে বিবর্তিত হওয়া প্রাণীদের পাকস্থলীর অ্যাসিড আমাদের পাকস্থরীর তুলনায় কমপক্ষে দশগুণ বেশি শক্তিশালী হওয়ায় তাদের শরীর এসব অ্যাসিড সহজে ধ্বংস করতে পারে। উপরন্তু, তারা শিকার করেই সাথে সাথে ভক্ষণ করে বলে মাংসে ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা থাকে নগণ্য। এর একটা বড় উদাহরণ ইথোপিয়ানরা। ইথোপিয়ায় এখনো মানুষ কাঁচা গরুর মাংস ভক্ষণ করে। ফলে প্রতিবছর প্রায় ৪,০০,০০০ মানুষ ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগে আক্রান্ত হয় এবং ১৯০ জন মানুষ মারাও যেয়ে থাকে। তারা যথেষ্ট সচেতনতার সাথে মাংস প্রসেস করলেও কাঁচা খাওয়ার দরুণ এই সমস্যায় ভুগতে হয় তাদের। আবার জার্মানরা সচরাচর শূকরের কাঁচা মাংস লবণ এবং মরিচ দিয়ে খেয়ে থাকে। ফলে তাদের মধ্যে yersiniosis, salmonella and Campylobacter coli এই তিন ব্যাকটেরিয়াজনিত ইনফেকশন অনেজ বেশি দেখা যায়।
সরাসরি শিকার করে ভক্ষণ করলে রোগের সম্ভাবনা কম হয় যদিও কিন্তু উপরে যে দাঁতের কথা বললাম, এই দাঁতের কারণে আমরা সরাসরি শিকার করেই খেতে বসতে পারিনা। আমাদের আগে প্রসেস করা লাগে, ছোট ছোট টুকরা করা লাগে। অনেক বেশি সময় লাগে এসবে। শিকারের পর খেতে যত দেরী হয় মাংসে ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যাও তত বেড়ে যায়। এমন না এই খাদ্য বিষাক্ততার সমস্যা আমাদের পূর্বপুরুষদের হয়নি। হয়েছিলো বলেই রান্নার মতো এক অভিনব পদ্ধতির উত্থান ঘটে পরবর্তীতে। আগুন নিয়ন্ত্রণ এবং রান্নার উৎপত্তির পরে বলা চলে, মাংস ভক্ষণে এক নতুন জোয়ার এসেছিলো। সে আসলে এক আলাদা গল্প। রান্না কীভাবে আজকের মানুষকে মানুষ বানিয়েছে তা নাহয় আরেকদিন বলা যাবে।
অনেকেই ভাবেন, আমাদের পূর্বপুরুষরা কাঁচা মাংস ভক্ষণ করতে পারলে আমরা কেন পারবোনা? সহজ উত্তর পারবো। আমাদের পাকস্থলী এ খাদ্য হজম করতে পারবে। কিন্তু ঠিকমতো ব্যবস্থা না নিলে খাদ্য বিষাক্ততায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও অনেক। আমাদের পূর্বপুরুষরাও এরকম বহু সমস্যায় ভুগতো। এজন্য তাদের আয়ু ছিলো আমাদের থেকে অনেক কম। আপনি কী তাদের মতো অকালে মরতে চান?
পরবর্তীতে, মানুষের আয়ু দিন কমছে নাকি বাড়ছে এবং রান্না কীভাবে আমাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে বিবর্তনে তা নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করবো আমরা। সে আলাপের অংশ হতে যুক্ত থাকুন তিকতালিকের সাথে।
লেখক: তিকতালিকীয় সদস্যবৃন্দ
৪০
Clinical Death & Brain Death
ঘটনা-১ : রাহুল সাহেব দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে অপারেশনে আছেন। অপারেশনের থেকে সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরে আসার পরে উনার দাবি ছিলো যে, উনি নাকি মৃত্যু দেখে এসেছেন। নিজেই(আত্মা) নিজের মৃতদেহ দেখেছেন। তারপরে একটা আলোর রেখা এসে উনাকে জীবিত করে তোলে।
ঘটনা-২ : অতুল সরকার হাসপাতালে গেছেন উনার বন্ধুকে দেখতে। উনার বন্ধু মৃত্যুর সাথে লড়ছেন। একসময় ডাক্তাররা ঘোষণা দিলেন অতুল সরকারের বন্ধুটি মারা গেছেন। কিন্তু অবাক করা একটা বিষয় দেখতে পেলেন অতুল সরকার-
মৃতদেহের যেন বুক উঠা-নামা করছে। অল্প কিছুক্ষণের জন্য যেন হাতটা নড়ে উঠলো। কিন্তু অন্যকে দেখাতে গিয়ে তখন আর কিছু দেখাতে পারলেন না।
উপরে উল্লিখিত ঘটনা দুটোই মৃত্যু নিয়ে, তবে দুইটা দুই রকমের মৃত্যু। প্রথমটা হলো- ক্লিনিক্যাল ডেথ( Clinical eath) বা ডাক্তারি মৃত্যু আর দ্বিতীয়টা হলো- ব্রেইন ডেথ( Brain death) বা মস্তিষ্কের মৃত্যু।
Clinical death:
কোনো কারণে যখন হৃৎপিণ্ড রক্ত পাম্প করা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, আর এর ফলে শ্বাস-প্রশ্বাস পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় তখন হৃৎপিণ্ডের সেই অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট( Cardiac Arrest) বলে। Cardiac Arrest এর এই অবস্থাকেই Clinical death বলা হয়ে থাকে।
Cardiac Arrest অবস্থায় হৃৎপিণ্ড রক্ত পাম্প করা বন্ধ করে দেয় বিধায় মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এমতাবস্থায় মস্তিষ্কের কোষগুলো অকেজো হয়ে পড়ে। এতে করে সাময়িক সময়ের জন্য শ্বাস-প্রশ্বাস থেমে যায়।
Clinical death এরপর মানুষের আবার বেঁচে ফেরার জন্য হাতে সাধারণত ৪-৬ মিনিট সময় থাকে। এই সময়টাকে বলে 'Window of Survival'
Window of Survival এর প্রথম ৪ মিনিটে মস্তিষ্কের কোষগুলো সাধারণত খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় না। এই সময়ে হৃৎপিণ্ড সচল হলে আবার স্বাভাবিক হয়ে ওঠা যায়।
পরের দুই মিনিটে অর্থাৎ ৫-৬ মিনিটে মস্তিষ্কের কোষগুলো অক্সিজেনের অভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া শুরু হয়। এরপর থেকে কোষগুলো নষ্ট হয়ে যেতে থাকে আর তা কখনও সুস্থ করা সম্ভব হয় না। তখন সেই অবস্থাকে ডাক্তাররা 'আসল মৃত্যু' বা বায়োলজিক্যাল মৃত্যু ঘোষণা করে।
লক্ষণ:
১। গলায় বা হাতে কোনোরকম নাড়ির স্পন্দন পাওয়া যায় না।
২। নাকে কাছে বাতাসের প্রবাহ নেই বা বুক উঠানামা করে না।
৩। রোগী জ্ঞান হারিয়ে থাকে। অর্থাৎ কোনো ডাকে বা ব্যথায় সাড়া দেয় না।
৪। চোখের মণি প্রসারিত হয়ে যায়, আলো ফেললেও সংকুচিত হয় না।
কারণ : নানা কারণেই ক্লিনিক্যাল ডেথ হয়ে থাকে-
১। তীব্র হার্ট অ্যাটাকের কারণে ধমনী হটাৎ বন্ধ হয়ে গেলে।
২। হৃৎপিণ্ডের স্পন্দনে অস্বাভাবিকতা বা পুরোপুরি থেমে গেলে।
৩। হৃৎপিণ্ডের রোগ হলে।
৪। খাদ্য আটকে বা অন্য কোনো কারণে শ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে।
৫। পানিতে ডুবে ফুসফুসে জল ঢুকে গেলে।
৬। তীব্র বৈদ্যুতিক শক লাগলে
৭। গুরুতর আঘাত বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে।
৮। কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে।
চিকিৎসা এবং মৃত্যু থেকে ফিরে আসা : নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই ব্যবস্থা নিতে পারলে ব্যক্তি আবার সুস্থ হয়ে উঠতে পারে।
১। CPR( Cardiopulmonary Resuscitation) এর দ্বারা কৃত্রিমভাবে রক্ত পাম্প করে মস্তিষ্কে অক্সিজেন যোগান দিয়ে।
২। Defibrillation: হৃৎপিণ্ডের অস্বাভাবিক কম্পনে AED মেশিনের সাহায্যে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে।
৩। Epinephrine: অ্যাড্রেনালিন ইনজেকশন দিয়ে হৎপিণ্ডকে উদ্দীপিত করে।
মানুষের অনুভূতি: উপরে উল্লিখিত ঘটনা-১ এর মতো অবস্থা রোগীর হতে পারে । এইটা মূলত মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাব হলে হ্যালুসিনেশনের বা মতিভ্রমের ফলে হয়ে থাকে।
মস্তিষ্কের মৃত্যু বা Brain death: কি?
মস্তিষ্কের স্টেম হলো যা মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে। কোনো কারণে মস্তিষ্ক স্টেম সম্পূর্ণরূপে অকার্যকর হয়ে পড়লে সেই অবস্থাকে বলা হয় মস্তিষ্ক মৃত্যু বা ব্রেন ডেথ।
Brain death হলে মস্তিষ্কের কোষগুলো পঁচে যাওয়ার ফলে তা আর সিগন্যাল পাঠাতে পারে না। এর ফলে হৃৎপিণ্ড স্বাভাবিক নিয়মে রক্ত পাম্প করতে পারে না। তাই মস্তিষ্কের মৃত্যুকেই আসল মৃত্যু বা আইনি মৃত্যু ( Legal Death) বলে।
বোঝার উপায়: Brain death ঘোষণা করার ক্ষেত্রে কোনো ডাক্তার চাইলেই ঘোষণা করতে পারে না। কয়েকজন ডাক্তারের সমন্বয়ে একটা বোর্ড গঠন করে সাধারণত ৬ ঘন্টার ব্যবধানে দুইবার পরীক্ষা করে ঘোষণা করা হয়।
এই বিষয়ে নিশ্চিত হলেই Brain death ঘোষণা করা হয়।
১। রোগী কোনো ব্যথা বা ডাকে সাড়া না দিলে।
২। চোখের মণির উপর আলো ফেললে কোনো প্রতিবর্তী ক্রিয়া না ঘটলে অর্থাৎ চোখের মণি ছোট না হলে।
৩। গলার ভেতরে নল ঢুকালে কাশি( gag reflex) না ঘটলে।
৪। Apnea Test এর মাধ্যমে দেখা হয়- কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র ছাড়া মস্তিষ্ক শ্বাস নেওয়ার জন্য সংকেত দিচ্ছে কিনা।
কেন হয়?
১। মস্তিষ্কের তীব্র আঘাত
২। স্ট্রোকের কারণে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হলে
৩। Clinical Death এরপরে যদি মস্তিষ্কে আর অক্সিজেন পৌঁছতে না পারে।
Brain death এরপরে স্পাইনাল রিফ্লেক্সের কারণে মাঝেমধ্যে মৃতদেহ হাত পা নাড়াতে পারে বা মেরুদণ্ড বাঁকা করতে পারে, একে ল্যাজারাস সাইন( Lazarus sign) বলে। এটি মূলত মস্তিষ্কের সংকেতের কারণে নয়, মেরুদণ্ডের স্নায়ুর কারণে হয়। প্রথমে উল্লেখ করা ঘটনা-২ তে অতুল সরকার এইটাই প্রত্যক্ষ করেছেন।
মস্তিষ্কের মৃত্যুর পরেও কৃত্রিম উপায়ে হৃৎপিণ্ডে শ্বাস চালনা সম্ভব হয়। সাধারণত ৪৮-৭২ ঘন্টা পর্যন্ত ভেন্টিলেটর দিয়ে হৎস্পন্দন ঠিক রাখা যায়। রোগীর
অঙ্গদানের পরিকল্পনা থাকলে এই সময়ে অঙ্গসমূহ স্থানান্তর করা হয়।
কোমা আর Brain death এর পার্থক্য: কোমা তে থাকলে মস্তিষ্কের কার্যকারিতা অনেকটাই নষ্ট হওয়ার কারণে দেহকে সংকেত প্রেরণ করতে পারে না। তবুও এই অবস্থায় মস্তিষ্কের কিছু কোষ সজীব থাকে মস্তিষ্ক সচল থাকে।
কিন্তু Brain death এর ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের কোষসমূহ নষ্ট হওয়ার দরুণ কোনোই সংকেত দিতে পারে না।
সবশেষে, clinical death এরপর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলে রোগী বেঁচে যেতে পারলেও Brain death এ কোনোভাবেই আর রোগীর বেঁচে ওঠা সম্ভব নয়।
৪১
ট্রমা মানেই শুধু বড় কোনো দুর্ঘটনা নয়।
হঠাৎ প্রিয় মানুষকে হারানো, দীর্ঘদিনের অবহেলা, মানসিক বা শারীরিক নির্যাতন এসবও ট্রমা তৈরি করতে পারে।
ট্রমার পর একেক মানুষের প্রতিক্রিয়া একেক রকম হয়। কেউ চুপচাপ হয়ে যায়, কেউ অতিরিক্ত রেগে যায়, কেউ আবার সবকিছু এড়িয়ে চলতে চায়। এগুলো দুর্বলতা নয়, বরং মস্তিষ্কের স্বাভাবিক survival response।
ট্রমার সাধারণ কিছু প্রতিক্রিয়া হতে পারে—
* বারবার সেই স্মৃতি মনে পড়া
* হঠাৎ ভয় বা আতঙ্ক
* নিজেকে আলাদা করে নেওয়া
* অনুভূতি প্রকাশ করতে না পারা
* অতিরিক্ত সতর্ক বা সন্দেহপ্রবণ হয়ে যাওয়া
ট্রমার প্রতিক্রিয়া অস্বাভাবিক নয়, বরং অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতার প্রতি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
সময়, নিরাপদ পরিবেশ এবং সঠিক সহায়তা পেলে ধীরে ধীরে এই ক্ষত সেরে ওঠে।
© সামান্থা বারবারা রোজারিও
৪২
লিও তলস্তয়
তাঁর বিভিন্ন সাহিত্যকর্ম এবং দার্শনিক লেখায় মানুষের নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতা নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করেছেন। আপনার উল্লেখ করা এই কথাটি সরাসরি তলস্তয়ের নামে প্রচলিত একটি জনপ্রিয় উদ্ধৃতি, যা ধন ও দারিদ্র্যের মাঝে ঈশ্বরের প্রয়োজনীয়তাকে দুই ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে:
১. ধনীদের জন্য ঈশ্বর (অহংবোধ নিয়ন্ত্রণ ও শূন্যতা পূরণ):
তলস্তয় বিশ্বাস করতেন, ধন-সম্পদ মানুষকে জাগতিকভাবে শক্তিশালী করলেও মানসিকভাবে প্রায়ই একা করে দেয়। ধনীদের কাছে ভোগবিলাসের সব উপকরণ থাকে, যা অনেক সময় তাদের মধ্যে অহংকার এবং জীবনের প্রতি একঘেয়েমি তৈরি করে। তলস্তয়ের মতে, যখন একজন মানুষের "সবকিছু" থাকে, তখন সে জীবনের উচ্চতর অর্থ বা উদ্দেশ্য খুঁজে পায় না। এই অবস্থায় তার এমন একজন সত্তার (ঈশ্বর) প্রয়োজন, যিনি তাকে মনে করিয়ে দেবেন যে পার্থিব সম্পদের বাইরেও একটি জগত আছে এবং নৈতিক দায়বদ্ধতা বলে কিছু আছে। ঈশ্বর এখানে ধনীদের জন্য একটি 'নৈতিক কম্পাস' হিসেবে কাজ করেন।
২. গরীবদের জন্য ঈশ্বর (আশা ও শেষ আশ্রয়):
অন্যদিকে, একজন দরিদ্র মানুষের বেঁচে থাকার জন্য খুব সামান্য রসদ থাকে। যখন জাগতিক সব পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখন ঈশ্বরই হন তার একমাত্র আশা ও শক্তির উৎস। তলস্তয় নিজে সাধারণ কৃষক এবং দরিদ্র মানুষের সরল জীবনযাপন ও অটল বিশ্বাসের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। তিনি মনে করতেন, যার কেউ নেই তার ঈশ্বর আছেন-এই বিশ্বাসটাই একজন মানুষের চরম কষ্টের মাঝেও বেঁচে থাকার মনোবল জোগায়।
এখানে ঈশ্বর কোনো বিলাসিতা নন, বরং টিকে থাকার "একমাত্র অবলম্বন"।
তলস্তয়ের মূল দর্শন:
তলস্তয় মনে করতেন, প্রকৃত ধর্ম বা ঈশ্বরতত্ত্ব চার্চের আড়ম্বরপূর্ণ নিয়মে নয়, বরং মানুষের অন্তরের সততা এবং অন্যের প্রতি ভালোবাসার মধ্যে নিহিত। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সম্পদ মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে বাধা হতে পারে (যেমনটা তিনি তাঁর জীবনস্মৃতি বা কনফেশন-এ উল্লেখ করেছেন)। তাই ধনীদের জন্য ঈশ্বর হলেন বিনয় শেখার মাধ্যম, আর গরীবদের জন্য তিনি হলেন পরম সান্ত্বনা।
পরিচিতি:
লিও তলস্তয় (১৮২৮-১৯১০) ছিলেন একজন প্রখ্যাত রুশ লেখক এবং বিশ্ব সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক, যিনি বাস্তববাদী কথাসাহিত্য, মহাকাব্যিক উপন্যাস ও দার্শনিক প্রবন্ধের জন্য পরিচিত। তাঁর কালজয়ী উপন্যাস "যুদ্ধ ও শান্তি" (War and Peace) এবং "আন্না কারেনিনা"
(Anna Karenina) বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। তিনি রুশ অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৮৯২ সালে 'ইয়াস্নায়া পলিয়ানা' নামক স্থানে তাঁর জন্ম হয়।
লিও তলস্তয়ের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:
পুরো নাম:
কাউন্ট লেভ নিকোলায়েভিচ তলস্তয়
(Leo Tolstoy)।
জন্ম ও মৃত্যু:
জন্ম ১৮২৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর এবং মৃত্যু ১৯১০ সালের ২০ নভেম্বর।
পরিচিতি:
রিয়েলিজম বা বাস্তববাদী সাহিত্য ধারার অন্যতম প্রধান প্রবর্তক।
বিখ্যাত কাজ:
যুদ্ধ ও শান্তি (War and Peace), আন্না কারেনিনা
(Anna Karenina), ইভান ইলিচের মৃত্যু
(The Death of Ivan Ilyich)।
জীবনের দর্শন:
জীবনের শেষ দিকে তিনি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দর্শনের দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং অহিংসা মতবাদে বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন, যা মহাত্মা গান্ধীকেও প্রভাবিত করেছিল।
অভিজ্ঞতা:
ক্রিমিয়ান যুদ্ধে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যকর্মে, বিশেষ করে 'সেভাস্তোপল স্কেচ'-এ দারুণভাবে ফুটে উঠেছে।
তিনি উপন্যাস ছাড়াও প্রচুর ছোটগল্প, নাটক এবং প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তাঁর সাহিত্যকর্ম অবাস্তব রোমান্টিকতা থেকে মুক্ত এবং বাস্তব জীবনের গভীর চিত্রায়ণ হিসেবে স্বীকৃত।
নোবেল নিয়ে বিতর্ক:
বিশ্ববিখ্যাত রুশ সাহিত্যিক লিও তলস্তয় নোবেল বিজয়ী ছিলেন না। তিনি ১৯০২ থেকে ১৯০৬ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন এবং ১৯০১, ১৯০২ ও ১৯০৯ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্যও মনোনয়ন পেয়েছিলেন, কিন্তু কখনোই এই পুরস্কার পাননি। এটি নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসের অন্যতম প্রধান বিতর্ক হিসেবে গণ্য হয়।
মূল বিষয়সমূহ:
মনোনয়ন:
তলস্তয় বেশ কয়েকবার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন।
পুরস্কার না পাওয়ার কারণ:
নোবেল কমিটির অনেকের সাথে তার মতাদর্শগত বিরোধ ছিল এবং তিনি অর্থের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে পুরস্কারের বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখতেন না।
প্রত্যাখ্যান:
শোনা যায়, তিনি পুরস্কার পাওয়ার আগেই তা প্রত্যাখ্যান করার মনোভাব ব্যক্ত করেছিলেন।
যদিও তিনি নোবেল পাননি, তবুও তার সাহিত্যিক প্রতিভা এবং ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ (War and Peace) এর মতো উপন্যাসের জন্য তিনি বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম সেরা লেখক হিসেবে স্বীকৃত। @ মৃণাল নন্দী
৪৩
আইরিশ নাট্যকার ও চিন্তাবিদ জর্জ বার্নার্ড শ
জর্জ বার্নার্ড শ' নোবেল পুরস্কারকে "শয়তানের সৃষ্টি" বা ডিনামাইটের চেয়েও ধ্বংসাত্মক বলে মন্তব্য করেছিলেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন এই পুরস্কার আলফ্রেড নোবেলের ধ্বংসাত্মক আবিষ্কার (ডিনামাইট) থেকে অর্জিত অর্থের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়, যা মানুষের শান্তির চেয়ে ধ্বংসের প্রতীক। তিনি পুরস্কারের অর্থের উৎস এবং এই পুরস্কারের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে হিংসা ও বৈষম্য তৈরির বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছিলেন।
১. ডিনামাইটের সাথে সম্পর্ক:
নোবেল পুরস্কার যে অর্থ থেকে দেওয়া হয়, তা ডিনামাইট আবিষ্কারক আলফ্রেড নোবেলের। শ' মনে করতেন, এই রক্তমাখা অর্থ দিয়ে ভালো কাজের পুরস্কার দেওয়া একটি "শয়তানি" কাজ।
২. ব্যক্তিগত অভিমত: শ' ১৯২৫ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেও এই পুরস্কারের ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং প্রথম দিকে এটি গ্রহণ করতে চাননি।
যদিও শ' পুরস্কারটি অবশেষে গ্রহণ করেন, কিন্তু তিনি এর সমালোচনা করতে ছাড়েননি। তিনি মনে করতেন, এই পুরস্কারটি সাহিত্য বা বিজ্ঞানের চেয়েও বেশি আলফ্রেড নোবেলের নিজের অনুশোচনা থেকে তৈরি, তাই তিনি নোবেল পুরস্কারের তহবিলকে ধ্বংসকারী হিসেবে মনে করতেন।
বিখ্যাত আইরিশ নাট্যকার ও চিন্তাবিদ জর্জ বার্নার্ড শ নোবেল পুরস্কার প্রবর্তনের পেছনে এক ধরনের নৈতিক দ্বিধা ও ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই মন্তব্য করেছিলেন। ১৯২৫ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর তিনি এর অর্থ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেছিলেন।
"আমি আলফ্রেড নোবেলকে ডিনামাইট আবিষ্কারের জন্য ক্ষমা করতে পারি, কিন্তু নোবেল পুরস্কার প্রবর্তনকারীকে ক্ষমা করতে পারি না; কারণ একমাত্র মানুষরূপী শয়তানই এমন পুরস্কার প্রবর্তন করতে পারে।"
বার্নার্ড শ-এর এমন মন্তব্যের পেছনে প্রধান কারণগুলো ছিল:
পুঁজি ও নৈতিকতার দ্বন্দ্ব:
আলফ্রেড নোবেল ডিনামাইটের মতো ধ্বংসাত্মক বস্তু বিক্রি করে যে বিপুল সম্পদ অর্জন করেছিলেন, সেই অর্থ দিয়ে 'মানবতার সেবা'র জন্য পুরস্কার দেওয়াকে শ একটি নৈতিক বৈপরীত্য হিসেবে দেখতেন।
পুরস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন:
তিনি মনে করতেন, যখন একজন লেখক বা বিজ্ঞানী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যান, তখন তাকে কেউ সহায়তা করে না। কিন্তু যখন তিনি সফল হয়ে যান এবং তাঁর আর অর্থের প্রয়োজন থাকে না, তখন তাঁকে এমন বড় পুরস্কার দেওয়া অনেকটা "সাঁতার কেটে তীরে আসা ব্যক্তিকে লাইফবেল্ট ছুড়ে দেওয়ার মতো" নিরর্থক।
পুরস্কারকে আপদ মনে করা:
তাঁর মতে, পুরস্কার অনেক সময় সৃজনশীলতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং মানুষের মধ্যে আত্মতুষ্টি তৈরি করে।
শেষ পর্যন্ত জনমতের চাপে তিনি NobelPrize.org থেকে সম্মাননাটি গ্রহণ করলেও এর অর্থ (তৎকালীন ৭,০০০ পাউন্ড) নিতে অস্বীকার করেন। তিনি সেই অর্থ দিয়ে একটি ট্রাস্ট গঠন করেন, যা সুইডিশ সাহিত্যকে ইংরেজিতে অনুবাদ করার কাজে ব্যয় করা হয়।
উল্লেখ্য যে:
বার্নার্ড শ ইতিহাসের একমাত্র ব্যক্তি যিনি একই সাথে সাহিত্যে নোবেল এবং চলচ্চিত্রের জন্য অস্কার (পিগম্যালিয়ন চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের জন্য) লাভ করেছেন। @মৃণাল নন্দী
৪৪
মৃত্তিকা ক্ষয়: কারণ ও প্রতিরোধের কার্যকর উপায়:---
মৃত্তিকা ক্ষয় বা মাটি ক্ষয় বর্তমান বিশ্বের অন্যতম একটি পরিবেশগত সমস্যা। মাটির উপরিভাগের উর্বর অংশ যখন বাতাস, জলস্রোত বা মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে অপসারিত হয়, তখন তাকেই মূলত মৃত্তিকা ক্ষয় বলা হয়। মাটি তৈরি হতে শত শত বছর সময় লাগে, কিন্তু অবহেলার কারণে তা নষ্ট হতে সময় লাগে খুব কম। নিচে মৃত্তিকা ক্ষয় এবং এটি প্রতিরোধের উপায়গুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:-----
মৃত্তিকা ক্ষয় কী :---
সহজ কথায়, মাটির উপরিভাগের আলগা স্তরটি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হওয়াই হলো মৃত্তিকা ক্ষয়। মাটির এই উপরিভাগেই গাছের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান থাকে। তাই মাটি ক্ষয়ে গেলে সেই জমি তার উর্বরতা হারায় এবং মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়।
মৃত্তিকা ক্ষয়ের প্রধান কারণসমূহ:----
প্রাকৃতিক কারণ: প্রবল বৃষ্টিপাত, বন্যা, নদী ভাঙন এবং শুষ্ক অঞ্চলে বাতাসের তীব্র বেগ।
বন উজাড়: গাছপালা কেটে ফেলার ফলে মাটির বাঁধন আলগা হয়ে যায়।
অতিরিক্ত পশুচারণ: গবাদি পশু ঘাস খেয়ে ফেললে মাটির উপরিভাগ উন্মুক্ত হয়ে পড়ে।
ভুল কৃষি পদ্ধতি: ঢালু জমিতে আড়াআড়ি চাষ না করা বা বারবার একই জমিতে চাষাবাদ।
মৃত্তিকা ক্ষয় প্রতিরোধের উপায়:----
মৃত্তিকা ক্ষয় রোধ করা কেবল পরিবেশের জন্য নয়, আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও জরুরি। এটি প্রতিরোধের কার্যকর কিছু উপায় নিচে দেওয়া হলো:
১. বৃক্ষরোপণ ও বনায়ন:---
গাছ মাটির সবচেয়ে বড় বন্ধু। গাছের শিকড় মাটির গভীরে গিয়ে মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখে। উপকূলীয় অঞ্চল বা পাহাড়ি ঢালে বেশি করে গাছ লাগালে বৃষ্টির জল বা বাতাস সহজে মাটি সরিয়ে নিতে পারে না।
২. ধাপ চাষ (Terrace Farming):--
পাহাড়ি অঞ্চলে মাটি ক্ষয় রোধের এটি একটি চমৎকার পদ্ধতি। পাহাড়ের ঢালকে সিঁড়ির মতো ধাপে ধাপে কেটে চাষাবাদ করা হয়। এতে বৃষ্টির জলের গতি কমে যায় এবং মাটি ধুয়ে নিচে যেতে পারে না।
৩. ফালি চাষ ও শস্য আবর্তন:---
জমিতে লাইন করে ফসল বোনা এবং নির্দিষ্ট সময় পর পর ফসলের ধরন পরিবর্তন করা (Crop Rotation) মাটির গঠন ঠিক রাখে। যেমন—একবার ধান চাষের পর ডাল জাতীয় শস্য চাষ করলে মাটির নাইট্রোজেন ও উর্বরতা বজায় থাকে।
৪. আবরণী ফসলের ব্যবহার:---
জমি চাষের পর খালি ফেলে না রেখে সেখানে ঘাস বা লতা জাতীয় গাছ (Cover Crops) লাগিয়ে রাখা উচিত। এটি মাটির ওপর একটি চাদরের মতো কাজ করে যা সরাসরি বৃষ্টির আঘাত থেকে রক্ষা করে।
৫. গবাদি পশু চড়ানো নিয়ন্ত্রণ:---
একটি নির্দিষ্ট জমিতে অতিরিক্ত পশু চড়ানো বন্ধ করতে হবে। পশুরা ঘাস শিকড়সহ তুলে ফেলে, যা মাটিকে অরক্ষিত করে দেয়। তাই নিয়ন্ত্রিত পশুচারণ নিশ্চিত করা জরুরি।
৬. বাঁধ নির্মাণ ও নদী শাসন:---
নদী ভাঙন রোধে নদীর পাড়ে উপযুক্ত বাঁধ নির্মাণ এবং পাথর বা সিমেন্টের ব্লক বসানো প্রয়োজন। এছাড়া জমিতে জল নিকাশের সঠিক ব্যবস্থা থাকলে অতিরিক্ত জল মাটি ধুয়ে নিতে পারে না।
মাটি হলো আমাদের প্রাণশক্তির উৎস। মৃত্তিকা ক্ষয় শুধু একটি কৃষিকাজের সমস্যা নয়, এটি বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য নষ্ট করে। ব্যক্তিগত সচেতনতা এবং সরকারি উদ্যোগের সঠিক সমন্বয়েই আমরা আমাদের অমূল্য এই সম্পদকে রক্ষা করতে পারি। মনে রাখবেন, "আজকের সুস্থ মাটিই আগামী দিনের সুন্দর পৃথিবীর নিশ্চয়তা।"@ ভূগোল বলয়
৪৫
'The Hope Experiment'
বিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্বের ইতিহাসে এই পরীক্ষাটি 'The Hope Experiment' নামে পরিচিত। এটি কেবল প্রাণীদের ওপর করা কোনো সাধারণ পরীক্ষা নয়, এটি আমাদের জীবনের এক অমোঘ সত্যকে তুলে ধরে।
১৫ মিনিট বনাম ৬০ ঘণ্টা: এক ফোঁটা ‘আশা’র অবিশ্বাস্য শক্তি!
আমরা অনেক সময় ভাবি, মানুষের শারীরিক শক্তিই তাকে বাঁচিয়ে রাখে। কিন্তু বিজ্ঞানী কার্ট রিখটারের (Curt Richter) করা এই পরীক্ষাটি প্রমাণ করে দিয়েছে যে, শরীর নয় বরং মানুষের 'মন' এবং **'আশা'**ই তাকে অসম্ভব সব পরিস্থিতি জয় করতে সাহায্য করে।
১. প্রথম ধাপ: যখন আশা নেই (১৫ মিনিটের আত্মসমর্পণ)
বিজ্ঞানী যখন প্রথমবার ইঁদুরগুলোকে জলে ছেড়ে দিলেন, তাদের সামনে বাঁচার কোনো পথ ছিল না। তারা হাত-পা ছুড়ে লড়াই করল, কিন্তু কোনো কূলকিনারা খুঁজে পেল না। ঠিক ১৫ মিনিটের মাথায় তারা ক্লান্ত হয়ে রণে ভঙ্গ দিল এবং ডুবে মারা যেতে লাগল।
২. দ্বিতীয় ধাপ: যখন আশার সঞ্চার হলো (উদ্ধারের মুহূর্ত)
দ্বিতীয় দফায় বিজ্ঞানী কয়েকটি ইঁদুরকে আবার জলে ছাড়লেন, কিন্তু এবার তারা ডুবে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে তিনি তাদের তুলে নিলেন। তিনি তাদের যত্ন করলেন, খাবার দিলেন এবং বিশ্রাম দিয়ে সুস্থ করে তুললেন। এরপর একই ইঁদুরগুলোকে আবার সেই জলেই ছেড়ে দেওয়া হলো।
৩. অভাবনীয় ফলাফল: শরীর নয়, জিতল মন!
আপনি হয়তো ভাববেন, এবার ইঁদুরগুলো ক্লান্ত থাকায় ১০ মিনিটেই হাল ছেড়ে দেবে। কিন্তু যা ঘটল তা কল্পনাকেও হার মানায়! সেই ইঁদুরগুলো এবার টানা ৬০ ঘণ্টা (প্রায় ২.৫ দিন) সাঁতার কাটতে থাকল!
যে ইঁদুরগুলো আগে ১৫ মিনিটে হার মেনেছিল, তারা এখন ২৪০ গুণ বেশি সময় লড়াই করছে!
৪. কেন এমন হলো? (মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা)
কেন এই আমূল পরিবর্তন? কারণ এবার ইঁদুরগুলোর মনে একটি ‘আশা’ তৈরি হয়েছিল। তারা জানত— "আমি যদি আরেকটু চেষ্টা করি, তবে কেউ একজন এসে আমাকে উদ্ধার করবে।" এই ছোট্ট আশাটাই তাদের শরীরের সমস্ত ক্লান্তি দূর করে দিয়েছিল এবং তাদের ভেতরে পাহাড় সমান জীবনীশক্তি জন্ম দিয়েছিল।
এই পরীক্ষা থেকে আমাদের জীবনের শিক্ষা:
১. আশা হলো টিকে থাকার জ্বালানি:
জীবনের কঠিন সময়ে যখন মনে হয় আর কোনো পথ নেই, তখন নিজের অতীতের সফলতার কথা বা আগামীর সুন্দর দিনের কথা ভাবুন। একফোঁটা পজিটিভ চিন্তা আপনার মানসিক শক্তিকে কয়েকশ গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
২. হাল ছাড়ার আগের মুহূর্তটিই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ:
ইঁদুরগুলো ৬০ ঘণ্টা সাঁতার কাটতে পেরেছিল কেবল এই জন্য যে, তারা বিশ্বাস করেছিল মুক্তি সম্ভব। আপনি যখন মনে করছেন "আমি আর পারছি না", তখন মনে রাখবেন— আপনার জয় হয়তো আরও এক পা সামনেই অপেক্ষা করছে।
৩. বিশ্বাস বাস্তবতাকে বদলে দেয়:
পুরো পৃথিবী যদি আপনাকে বলে যে "তোমাকে দিয়ে হবে না", তবুও আপনি যদি নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারেন, তবে আপনি সেই অসম্ভবকেও সম্ভব করতে পারবেন যা আগে কেউ করেনি।
শেষ কথা
আপনার পরিস্থিতি ইঁদুরের মতো সেই গভীর জলের চেয়েও কঠিন হতে পারে। কিন্তু মনে রাখবেন, যতক্ষণ আপনার মনে 'আশা' আছে, ততক্ষণ আপনার ডুবে যাওয়ার ভয় নেই।
পুরো পৃথিবী যখন বলে "হাল ছেড়ে দাও", আশা তখন কানে কানে ফিসফিস করে বলে— "আরেকবার শেষ চেষ্টা করে দেখো।"
আপনার সেই শেষ চেষ্টাটুকুই হয়তো আপনার জীবন বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। @ Rohit Baagdii
৪৬
আইকনিক স্টোরেজ ব্যাগে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও 'চিরস্থায়ী রাসায়নিক'
সম্প্রতি দায়ের করা ক্লাস-অ্যাকশন মামলার অভিযোগ: প্লাস্টিক ব্যাগ ও কনটেইনার ব্যবহার করলে খাবারের মধ্যে ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে PFAS এবং মাইক্রোপ্লাস্টিক নির্গত হচ্ছে। বিশেষ করে উচ্চ তাপমাত্রায় এগুলো ভেঙে যায়, যা পরিবেশগত বিষাক্ত পদার্থ শোষণ করে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
বাদীরা বলছেন, কোম্পানি বিপণন করে কিন্তু স্বাস্থ্য ও পরিবেশ ঝুঁকির তথ্য প্রকাশ করে না। ফিলাডেলফিয়াও প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারযোগ্যতা নিয়ে বিভ্রান্তিকর লেবেলিংয়ে মামলা করেছে।
যদিও কোম্পানি দাবি করছে, তাদের পণ্য FDA অনুমোদিত এবং BPA ও ফথালেট মুক্ত, আইন বিশেষজ্ঞদের মতে এটি হতে পারে প্লাস্টিক শিল্পে বড় ধরনের আইনি ঢেউয়ের শুরু।
সচেতন থাকুন, খাদ্য সংরক্ষণে প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার আগে ভালো করে যাচাই করুন।
৪৭
স্বাক্ষর থেকে জেনে নিন কণ মানুষ কেমন
গ্রাফোলজিস্ট বা হাতের লেখার বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি স্বাক্ষর থেকে আপনার পাবলিক ইমেজ বা অন্যদের সামনে আপনি নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করতে চান, সে সম্পর্কে বেশ ভালো ধারণা পাওয়া যায়।
স্বাক্ষর থেকে কী বোঝা যায়
১. ব্যক্তিত্বের প্রকাশ: স্বাক্ষর হলো আপনার বাইরের রূপের একটি প্রতিচ্ছবি। এর মাধ্যমে মূলত আপনি বহির্বিশ্বের সামনে নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করতে চান, সেটিই প্রতিফলিত হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে এর আড়ালে মানুষের সত্যিকারের ব্যক্তিত্বও প্রকাশ পেয়ে যায়।
২. স্বাক্ষরের আকার: বড় আকারের স্বাক্ষর উচ্চ সামাজিক আত্মবিশ্বাস, মনোযোগ আকর্ষণের প্রবণতা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। অন্যদিকে ছোট স্বাক্ষর সাধারণত অন্তর্মুখী স্বভাব, লাজুকতা বা বিনয়ী মনোভাব প্রকাশ করে।
৩. পাঠযোগ্যতা: অনেকের স্বাক্ষর বেশ স্পষ্ট ও সহজে পড়া যায়। এর মানে হলো, তাঁরা সামাজিকভাবে বেশ খোলামেলা ও সরল প্রকৃতির। অন্যদিকে অস্পষ্ট বা জটিল স্বাক্ষরের অধিকারীরা সাধারণত গোপনীয়তা পছন্দ করেন এবং নিজের সম্পর্কে অন্যদের খুব কম তথ্যই দিতে চান।
৪. লেখার ঝোঁক ও আকৃতি: স্বাক্ষর ডান দিকে হেলানো হওয়ার অর্থ হলো, স্বাক্ষরকারী বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ এবং সহজেই মানুষের সঙ্গে মিশতে পারেন। বাঁ দিকে হেলানো থাকলে ধারণা করা হয় যে তিনি কিছুটা নিজের ব্যক্তিগত জীবন গোপন রাখতে পছন্দ করেন। আবার গোলাকার অক্ষরের স্বাক্ষর সাধারণত শান্ত ও সহমর্মী ব্যক্তির লক্ষণ।
৫. অলংকরণ বা সাজানো ভাব: অনেকের স্বাক্ষর একদম অন্য রকম এবং বেশ অলংকৃত বা প্যাঁচানো হয়। এর অর্থ হলো, তিনি নিজেকে বিশেষ বা অন্যদের চেয়ে আলাদা হিসেবে তুলে ধরতে চান। অন্যদিকে বেশি কোঁকড়ানো বা তীক্ষ্ণ কোণযুক্ত স্বাক্ষরের অধিকারীরা অনেক সময় কঠোর স্বভাবের ও সমালোচনামুখর হতে পারেন।
ক্রিমিনাল ইন্টেলিজেন্স ও ফরেনসিক গ্রাফোলজিতে স্বাক্ষর
ফরেনসিক গ্রাফোলজি ব্যবহার করে স্বাক্ষরের ধরন, কলমের চাপ, কোণ এবং রেখার বৈশিষ্ট্যগুলো নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা হয়। এটি মূলত স্বাক্ষরের সত্যতা যাচাই বা জালিয়াতি চিহ্নিত করতে কাজে লাগে। কোনো ব্যাংক চেক, চুক্তিপত্র, আইনি নথি বা চিঠি যে আসলেই নির্দিষ্ট ওই ব্যক্তিরই লেখা, তা নিশ্চিত করতে মূল স্বাক্ষরের সঙ্গে সন্দেহভাজন স্বাক্ষরের তুলনা করা হয়।
কিছু ক্ষেত্রে জাল স্বাক্ষরকে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হয়। তবে কোনো অপরাধীকে শনাক্ত বা দোষী সাব্যস্ত করার জন্য কেবল একটি স্বাক্ষরই যথেষ্ট নয়।
সাধারণত, স্বাক্ষর পরীক্ষার ফলাফলকে ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর জবানবন্দি, আঙুলের ছাপ, ডিএনএ এবং অ্যালিবাইয়ের মতো অন্যান্য জোরালো প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়।
কোনো ব্যাংক চেক, চুক্তিপত্র, আইনি নথি বা চিঠি যে আসলেই নির্দিষ্ট ওই ব্যক্তিরই লেখা, তা নিশ্চিত করতে মূল স্বাক্ষরের সঙ্গে সন্দেহভাজন স্বাক্ষরের তুলনা করা হয়।
স্বাক্ষর পরীক্ষার সীমাবদ্ধতা
১. নকল হওয়ার ঝুঁকি: খুব দক্ষ জালিয়াতেরা প্রায় আসলের মতোই হুবহু স্বাক্ষর নকল করতে পারে। অনেক সময় সাধারণ গ্রাফোলজিস্টদের পক্ষেও এই সূক্ষ্ম জালিয়াতি ধরা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।
২. পরিবর্তনশীলতা: মানুষের স্বাক্ষর সারা জীবন এক রকম থাকে না। বয়স, মানসিক অবস্থা, মানসিক চাপ বা স্নায়বিক অসুস্থতার কারণে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বাক্ষরের ধরন বা প্যাটার্ন বদলে যেতে পারে।
৩. শতভাগ নিশ্চয়তার অভাব: গ্রাফোলজি একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে বেশ ভালো ধারণা দিতে পারে ঠিকই, তবে এই ধারণা যে সব সময় শতভাগ নির্ভুল বা বিজ্ঞানসম্মত হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। @ জিনাত শারমিন সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট
৪৮
শিং আর মাগুর মাছের কাঁটার আঘাতে এত তীব্র ব্যথা হয় কেন
যে একবার শিং মাছের কাঁটার গুঁতো খেয়েছে সে বোঝে এর যাতনা কত, এর বিষ কী সাংঘাতিক। প্রশ্ন হলো শিং মাছ, মাগুর মাছ বা ট্যাংরা মাছের শিংয়ের দরকার কেন হলো, অন্য মাছের তো নেই।, মূলত আত্মরক্ষার জন্য তাদের মাথার দুপাশে শিং থাকে। কেউ ধরতে গেলে গুঁতো দেয়।
ওদের শিংয়ের গোড়ায় বিষ সরবরাহের ব্যবস্থা থাকে। তবে মাগুর বা ট্যাংরা মাছের বিষের তীব্রতা তেমন নয়। শিং মাছের বিষে জ্বালা বেশি। এই বিষ একধরনের অ্যামিনো অ্যাসিডে তৈরি। এই বিষে ইনফেকশন হতে পারে। তাই শিং মাছের গুঁতো খেলে ওই স্থান পরিষ্কার, হালকা গরম পানিতে ধুয়ে অ্যান্টিসেপটিক মলম ব্যবহার করা উচিত। বেশি সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন দেখা দেয়। @ আব্দুল কাইয়ুম
৪৯
ব্যাটারির কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যায় কেন?
শখের স্মার্টফোনটা কিনেছেন মাত্র এক বছর হলো। এরই মধ্যে ব্যাটারি ব্যাকআপ কমে অর্ধেক! কিন্তু কেন এমন হয়? এতদিন এটা ছিল এক রহস্য।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ইউনিভার্সিটি অস্টিন ও নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক অবশেষে সেই রহস্যের জট খুলেছেন। তাঁদের দাবি, ব্যাটারি আসলে ‘শ্বাস’ নেয়! আর এই শ্বাস-প্রশ্বাসই এর মৃত্যুর কারণ। অবাক হওয়ার কিছু নেই। মানুষের ফুসফুস যেমন শ্বাস নেওয়ার সময় প্রসারিত হয় ও ছাড়ার সময় সংকুচিত হয়, ব্যাটারির ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটে। চার্জ দেওয়া ও ব্যবহারের সময় ব্যাটারির ভেতরের উপাদানগুলো একবার করে প্রসারিত হয়, আবার সংকুচিত হয়। তাই রূপক অর্থে একে ব্যাটারির শ্বাস-প্রস্বাস বলতে পারেন।
মোবাইল ব্যাটারি আসলে শ্বাস নেয়। আপাতদৃষ্টিতে এটা খুব সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু ফলাফল ভয়াবহ। বারবার সংকোচন-প্রসারণের ফলে ব্যাটারির ভেতরে তৈরি হয় মারাত্মক চাপ। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন কেমো-মেকানিক্যাল ডিগ্রেডেশন। সহজ কথায়, ব্যাটারির ভেতরের কাঠামো নড়বড়ে হয়ে যায় এবং ফাটল ধরে। ফলে ধীরে ধীরে কমতে থাকে কার্যক্ষমতা।
গবেষণার প্রধান এবং টেক্সাস ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ইজিন লিউ বলছেন, ‘ব্যাটারির প্রতিটি সংকোচনে কিছু না কিছু ক্ষতি হয়। এই ক্ষতি জমতে থাকে। একসময় ব্যাটারি পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়ে।’
বারবার সংকোচন-প্রসারণের ফলে ব্যাটারির ভেতরে তৈরি হয় মারাত্মক চাপ। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন কেমো-মেকানিক্যাল ডিগ্রেডেশন। সহজ কথায়, ব্যাটারির ভেতরের কাঠামো নড়বড়ে হয়ে যায়।
গবেষকেরা একে বলছেন চাপের চেইন রিঅ্যাকশন। ব্যাটারির ভেতরে লাখ লাখ কণা থাকে। চার্জিংয়ের সময় এগুলোর আচরণ এক হয় না। কোনোটা স্থির থাকে, আবার কোনোটা উল্কাপিন্ডের মতো ছোটাছুটি করে। এই অসামঞ্জস্যের কারণেই নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় চাপ বাড়ে এবং তৈরি হয় ফাটল। কিন্তু ব্যাটারির ভেতরের এই খবর মিলল কী করে?
গবেষকরা ব্যবহার করেছেন অত্যাধুনিক হাই-রেজ্যুলেশন এক্স-রে মাইক্রোস্কোপি ও থ্রি-ডি ল্যামিনোগ্রাফি। চার্জ হওয়ার সময় ব্যাটারির ভেতরের কণাগুলোর নড়াচড়া সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেছেন তাঁরা। শুরুতে একটি ইয়ারবাডের ব্যাটারিতে এই পরীক্ষা চালানো হয়।
এই আবিষ্কারের ফলে ব্যাটারি প্রযুক্তিতে বড়সড় বিপ্লব আসতে চলেছে। সমস্যা যখন জানা গেছে, সমাধানও মিলবে দ্রুত। গবেষকেরা এখন এমন ইলেকট্রোড তৈরির চেষ্টা করছেন, যা এই চাপ সহ্য করতে পারবে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আমাদের আর ঘন ঘন ফোন চার্জ নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না! @ লিটন রায়
৫০
উষ্ণ লেবু পানি কি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো
গরম পানির সঙ্গে লেবু মিশিয়ে খাওয়ার উপকারিতা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় রিলসের অভাব নেই। স্ক্রল করলেই দেখা যায় ইনফ্লুয়েন্সাররা এক হাতে লেবু ও অন্য হাতে ধোঁয়া ওঠা মগ নিয়ে বলছেন, ‘মাত্র এক সপ্তাহ এই পানীয় নিয়মিত খেলে ওজন কমে যাবে!’ শরীর বিষমুক্ত হওয়া, হজম ভালো হওয়া, ত্বক মসৃণ হওয়া থেকে শুরু করে এর নাকি হাজারো গুণ। এটি নাকি শক্তি বাড়ায়, এমনকি মনোযোগও বৃদ্ধি করে। কিন্তু বিজ্ঞান কী বলে? এই দাবিগুলো কতটা সত্য?
নিউইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত এক প্রশ্নোত্তরমূলক প্রতিবেদনে পুষ্টিবিদ ও গবেষকেরা এই বিষয়ে তাঁদের মতামত দিয়েছেন। তাঁদের মতে, গরম পানিতে লেবু চিপে খাওয়া খারাপ কিছু না। তবে একে অলৌকিক পানীয় বা সব সমস্যার সমাধান ভাবার কোনো কারণ নেই। দিনের শুরুতে লেবু পানি খাওয়ার সবচেয়ে বড় উপকারিতা হলো, এটি শরীরকে হাইড্রেট করে।
রাতে দীর্ঘ সময় কিছু না খেয়ে থাকার পর সকালে তরল গ্রহণ করা শরীরের জন্য জরুরি। শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, হাড়ের সংযোগগুলো নমনীয় রাখা এবং ঘাম ও প্রস্রাবের মাধ্যমে বর্জ্য বের করে দেওয়ার কাজে পানির ভূমিকা অপরিহার্য। পর্যাপ্ত পানি খেলে ত্বক ভালো থাকে, মন ফুরফুরে থাকে এবং চিন্তাভাবনা পরিষ্কার হয়। তবে এখানে একটা বড় ‘কিন্তু’ আছে। এই হাইড্রেশন বা আর্দ্রতা কিন্তু লেবুর জন্য হয় না। সাধারণ পানি, হারবাল চা, এমনকি কফি দিয়েও একই কাজ করা যায়। লেবু যোগ করলে আলাদা কোনো জাদু ঘটে না।
হজমের ক্ষেত্রেও বিষয়টা প্রায় একই। ঠিকঠাক হজম হওয়ার জন্য দরকার তরল। তাতে লেবু থাকুক আর না থাকুক। এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দিনে আট কাপের বেশি পানি পান করেন, তাঁদের কোষ্ঠকাঠিন্যের ঝুঁকি অনেক কম। হজমে লেবু পানির সহায়তা নিয়ে সরাসরি বড় কোনো গবেষণা নেই। ছোট একটি গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, লেবুর রস পাকস্থলীর অ্যাসিড নিঃসরণ একটু বাড়িয়ে দেয়। ফলে খাবার ভাঙার গতি বাড়তে পারে। তবে গবেষণাটি খুব ছোট হওয়ায় একে বড় প্রমাণ ধরার সুযোগ নেই।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক মানুষের পাকস্থলীতে অ্যাসিড কমে যায়। এতে বুকজ্বালা বা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা হতে পারে। তাত্ত্বিকভাবে লেবুর অ্যাসিড এতে সামান্য সহায়তা করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে একটি লেবু থেকে পাওয়া অ্যাসিডের পরিমাণ খুবই সামান্য। তাই এতে বড় কোনো পরিবর্তন হওয়ার প্রমাণ নেই।
রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কথা ভাবলে উষ্ণ লেবু পানি পান করা কিছুটা যৌক্তিক। লেবুতে প্রচুর ভিটামিন সি থাকে। বড় একটি লেবুর অর্ধেক রস খেলে প্রতিদিনের দরকারি ভিটামিনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ভিটামিন সি পাওয়া যায়। ভিটামিন সি শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে ও ক্ষত সারাতে কাজে লাগে। কারণ এটি একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। তবে এখানেও কথা আছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বেশি ভিটামিন সি খেলেই যে সর্দি কম হবে বা দ্রুত সেরে যাবে, এমন নয়। বহু গবেষণার পর্যালোচনায় বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, উচ্চমাত্রার ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্টও সাধারণ মানুষের সর্দি-কাশির তীব্রতা বা আক্রান্ত হওয়ার সময় খুব একটা কমাতে পারে না। তাছাড়া ভিটামিন সির ঘাটতি উন্নত দেশগুলোতে তুলনামূলকভাবে বিরল, তবু সেসব দেশের মানুষের সর্দি-কাশি হয়।
লেবুতে প্রচুর ভিটামিন সি থাকে। বড় একটি লেবুর অর্ধেক রস খেলে প্রতিদিনের দরকারি ভিটামিনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ভিটামিন সি পাওয়া যায়।
তবে ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে তাপমাত্রা গেলে ভিটামিন সি দ্রুত নষ্ট হতে শুরু করে। ফুটন্ত পানিতে লেবুর রস দিলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে এর বেশিরভাগ ভিটামিন সি নষ্ট হয়ে যায়।
ওজন কমানোর জাদুকরী টোটকা হিসেবে এর প্রচার থাকলেও প্রমাণ খুব কম। কেউ যদি চিনিসহ কফি বা সফট ড্রিঙ্কের বদলে গরম লেবু পানি খায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই কম ক্যালোরি গ্রহণ করা হবে, যা ওজন কমাতে সাহায্য করে। কিন্তু লেবু পানি নিজে থেকেই মেটাবলিজম বাড়িয়ে চর্বি গলায়, এমন কোনো শক্ত প্রমাণ নেই।
কিছু গবেষণায় বলা হয়, সাইট্রাস বা টক ফল রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে পারে। কিন্তু এই প্রমাণগুলো এখনো বেশ দুর্বল।
আসল কথা হলো, গরম লেবু পানি অবশ্যই একটি ভালো পানীয়। এতে ক্যালোরি কম থাকে এবং চিনি মেশানো পানীয়ের তুলনায় এটি নিঃসন্দেহে ভালো বিকল্প। সকালে গরম পানির সঙ্গে লেবুর টক স্বাদ অনেকের কাছে সতেজ লাগতে পারে। দিন শুরুর জন্য এটা ভালো হতে পারে। কিন্তু এটিকে ডিটক্স, ওজন কমানোর গোপন চাবিকাঠি ভাবলে ভুল হবে। গরম লেবু পানিতে কোনো ক্ষতি নেই, তবে এতে অলৌকিকও কিছু নেই। @ আহমাদ মুদ্দাসসেরসূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস