১
আপনি হয়তো ভুল জায়গায় আছেন, ভুল মানুষের সাথে আছেন অথবা নিজেকে ভুলভাবে উপস্থাপন করছেন।
এক কাপ চায়ের কথা ভাবুন তো! রাস্তার ধারের কোনও সাধারন দোকানে যে চা আপনি ৫ বা ১০ টাকায় খান, ফাইভ স্টার হোটেলে সেই একই চা সুন্দর একটি কাপে পরিবেশন করা হয় ৫০০ টাকায়! চা কিন্তু একই, শুধু বদলেছে তার 'পরিবেশ' আর 'উপস্থাপন'।
ঠিক একইভাবে, জীবনে যদি কখনো আপনার মনে হয় যে মানুষ আপনাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না বা আপনার কোনো দাম নেই, তার মানে এই নয় যে আপনি সত্যি সত্যিই মূল্যহীন। এর মানে হলো— আপনি হয়তো ভুল জায়গায় আছেন, ভুল মানুষের সাথে আছেন অথবা নিজেকে ভুলভাবে উপস্থাপন করছেন। নিজের ভ্যালু বা গুরুত্ব ১০ গুণ বাড়িয়ে তোলার জন্য আজই নিজের জীবনে প্রয়োগ করুন এই ১০টি সহজ সাইকোলজিক্যাল রুল:
১. ছেড়ে যাওয়ার সাহস রাখুন (The Power of Walking Away)
আপনার ভ্যালু বা সম্মান সবচেয়ে বেশি তখনই বাড়ে, যখন আপনি অপমানের জায়গা থেকে সম্মানের সাথে সরে আসতে পারেন। যে সম্পর্কে, যে আড্ডায় বা যে কাজের জায়গায় আপনার কোনো কদর নেই— সেখানে জোর করে পড়ে থাকবেন না। যখন মানুষ দেখবে আপনাকে চাইলেই ধরে রাখা যায় না এবং আপনার আত্মসম্মানবোধ প্রখর, তখন তারা আপনাকে হারাতে ভয় পাবে এবং আপনার কদর করতে বাধ্য হবে।
২. সহজলভ্য নয়, মূল্যবান হন (Be Valuable, Not Available)
অর্থনীতির একটা সহজ নিয়ম হলো— যার যোগান বেশি, তার দাম কম। বাতাস ছাড়া আমরা বাঁচতে পারি না, কিন্তু বাতাসের কোনো দাম নেই কারণ তা সব জায়গায় পাওয়া যায়। অন্যদিকে হীরের দাম কোটি টাকা, কারণ তা দুর্লভ।
ঠিক তেমনি, আপনি যদি মানুষের এক ডাকেই নিজের সব কাজ ফেলে সবসময় হাজির হয়ে যান, তবে মানুষ আপনাকে সস্তা ভাবতে শুরু করবে। সবার জন্য সবসময় 'অ্যাভেইলেবল' থাকা বন্ধ করুন। মাঝে মাঝে 'না' বলতে শিখুন এবং নিজের সময়কে সবার আগে গুরুত্ব দিন।
৩. রহস্য ধরে রাখুন (The Power of Mystery)
যে বইয়ের গল্প আমরা আগে থেকেই জানি, সেই বই পড়তে আমাদের আর ভালো লাগে না। মানুষের ক্ষেত্রেও বিষয়টা একই। যারা খুব বেশি কথা বলে এবং নিজের সব পরিকল্পনা, কষ্ট বা দুর্বলতার কথা সবাইকে বলে বেড়ায়, মানুষ তাদের প্রতি দ্রুত আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
তাই কম কথা বলুন, বেশি শুনুন। নিজের জীবনের সবটা খোলা বইয়ের মতো সবার সামনে মেলে ধরবেন না। আপনার মধ্যে কিছুটা রহস্য থাকতে দিন, মানুষকে ভাবতে দিন আপনার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে চলেছে!
৪. কথার চেয়ে কাজকে বড় করুন (Actions Over Words)
"আমি এই করব, সেই করব, ফাটিয়ে দেব"— এসব কথা বলে বেড়ানো মানুষগুলোকে সমাজ খুব একটা গুরুত্ব দেয় না। নিজের বড় বড় পরিকল্পনার কথা ঢোল পিটিয়ে সবাইকে জানানো বন্ধ করুন। নীরবে কাজ করুন, আপনার পরিশ্রমের ফলাফলটাই যেন সবার কানে শব্দ করে। যখন আপনার সফলতা কথা বলবে, তখন মানুষকে আর আপনার গুরুত্ব বুঝিয়ে দিতে হবে না।
৫.নিজেকে আপডেট করুন (The Upgrade Rule)
বর্তমানের ফাইভ-জি (5G) স্মার্টফোনের যুগে কেউ যদি আপনাকে পুরোনো একটি বাটন ফোন ব্যবহার করতে দেয়, আপনি সেটা ব্যবহার করতে অস্বস্তি বোধ করবেন? তেমনি আপনি যদি সময়ের সাথে নিজেকে আপডেট না করেন, তবে সমাজ আপনাকে দাম দেবে না। নিজের ভ্যালু বাড়াতে প্রতিদিন নতুন কিছু শিখুন, ভালো বই পড়ুন, নতুন স্কিল তৈরি করুন এবং নিজের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিন। মনে রাখবেন, স্থির পুকুরের জলে শেওলা জমে, কিন্তু বহমান নদীর জল থাকে সবসময় পরিষ্কার। আপনি পুকুর হবেন না, নদী হোন।
৬.আবেগের নিয়ন্ত্রণ (Emotional Control)
কেউ একজন কিছু বলল আর আপনি সাথে সাথে সবার সামনে রেগে গেলেন বা কেঁদে ফেললেন— এমনটা করলে সমাজ আপনাকে দুর্বল ও অপরিণত (Immature) ভাববে। নিজের আবেগের রিমোট কন্ট্রোল কখনো অন্যের হাতে দেবেন না। কেউ অপমান করলে সাথে সাথে রিঅ্যাক্ট (React) না করে শান্ত থাকুন এবং হাসিমুখে এড়িয়ে যান। আপনার এই নীরবতা এবং শান্ত স্বভাবই আপনার ব্যক্তিত্বকে অন্যদের চোখে অনেক বেশি সম্মানজনক করে তুলবে।
৭. মানুষের পেছনে ছোটা বন্ধ করুন (Stop Chasing People)
নিজের সুখের জন্য বা একাকিত্ব দূর করার জন্য অন্যের মনোযোগের কাঙাল হবেন না। যারা সবসময় অন্যের সঙ্গ পাওয়ার জন্য মরিয়া থাকে, সমাজ তাদের সস্তা মনে করে। এর বদলে একা থাকতে শিখুন, নিজের সঙ্গ উপভোগ করুন (Embrace Solitude)। নিজের শখ, বই পড়া, বা কোনো পছন্দের কাজের মধ্যে ডুবে থাকুন। আপনি যখন নিজের মধ্যেই পরিপূর্ণ ও সুখী থাকবেন, মানুষ এমনিতেই আপনার দিকে আকর্ষিত হবে।
৮.নিজের সীমারেখা বা বাউন্ডারি তৈরি করুন (Set Your Boundaries)
অন্যরা আপনাকে ততটুকুই অপমান করবে, যতটুকু অপমান আপনি মুখ বুজে সহ্য করবেন। নিজের জন্য একটি পরিষ্কার বাউন্ডারি বা সীমারেখা তৈরি করুন। আশেপাশের মানুষকে আপনার আচরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিন যে, ওই সীমানা অতিক্রম করার অধিকার কারও নেই। নিজের আত্মসম্মানের সাথে কখনোই আপস করবেন না। যে দিন থেকে আপনি নিজের সম্মানের ব্যাপারে আপসহীন হবেন, পৃথিবীও আপনাকে সম্মান করতে বাধ্য হবে।
৯. সঠিক মানুষের সঙ্গ বেছে নিন (Upgrade Your Circle)
ইংরেজিতে একটি কথা আছে— "You are the average of the five people you spend the most time with." আপনি যাদের সাথে সবচেয়ে বেশি সময় কাটান, আপনার চিন্তাভাবনাও ঠিক তাদের মতোই হয়ে যায়। আপনি যদি সস্তা মানসিকতার, পরচর্চাকারী ও লক্ষ্যহীন মানুষদের সাথে মেশেন, তবে সমাজ আপনাকেও তাদের কাতারেই ফেলবে। তাই এমন মানুষদের সাথে মেশার চেষ্টা করুন, যারা জীবনে বড় কিছু করতে চায় এবং আপনাকেও ভালো কাজে অনুপ্রাণিত করে।
১০. অযথা অভিযোগ করা বন্ধ করুন (Complain Less, Solve More)
আমাদের আশেপাশে এমন কিছু মানুষ আছে, যারা সবসময় নিজের পরিস্থিতি, দুর্ভাগ্য বা অন্যদের নিয়ে কেবল অভিযোগ করতেই থাকে। সত্যি বলতে, এই "কাঁদুনে" স্বভাবের মানুষদের কেউ পছন্দ করে না। আজ থেকে অভিযোগ করা বন্ধ করুন। কোনো সমস্যা হলে সেটার সমাধান কীভাবে করা যায়, সেদিকে ফোকাস করুন। যারা যেকোনো পরিস্থিতিতে ইতিবাচক থাকে এবং সমাধানের পথ খোঁজে, সমাজ তাদেরকেই সত্যিকারের 'লিডার' হিসেবে সম্মান করে।
শেষ কথা
সম্মান কেউ কাউকে উপহার হিসেবে দেয় না, সম্মান নিজের যোগ্যতা দিয়ে অর্জন করে নিতে হয়। এই ১০টি নিয়ম শুধু পড়ার জন্য নয়, আজ থেকেই নিজের জীবনে চর্চা করার জন্য। নিজেকে ভালোবাসুন, নিজের ওপর বিনিয়োগ করুন। যখন আপনি নিজেকে মূল্যবান হিসেবে গড়ে তুলবেন, তখন পুরো পৃথিবী আপনাকে সেই মূল্য দিতে বাধ্য হবে!
এমনই সব পাওয়ারফুল টিপস এবং প্র্যাকটিক্যাল জীবন দর্শন পেতে আমাদের পেজটি 'ফলো' করে রাখুন। ইন্টারনেটে ভালো কনটেন্টের ভিড়ে এই ধরণের ‘Real & Practical’ তথ্য পাওয়া সত্যিই বিরল। হারিয়ে যাওয়ার আগেই যুক্ত হোন আমাদের সাথে! @Rohit Baagdii
২
জীবনে খারাপ কিছু ঘটবেই, উঠে দাঁড়ানো আপনার চয়েস
জ্যাকি চ্যানের এই কথাটা জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী সত্য তুলে ধরে, বিপদে পড়া আপনার নিয়ন্ত্রণে নেই, কিন্তু উঠে দাঁড়ানো আপনার চয়েস। জীবনে খারাপ কিছু ঘটবেই চাকরি হারাবেন, রিলেশনশিপ ভাঙবে, বিজনেস ব্যর্থ হবে, স্বাস্থ্য খারাপ হবে। এগুলো এড়ানো যায় না, কারণ এগুলো জীবনের অংশ। কিন্তু এরপর কী করবেন সেটা সম্পূর্ণ আপনার হাতে। হয় পড়ে থাকবেন, হতাশায় ভেঙে পড়বেন, ভিক্টিম মেন্টালিটিতে আটকে যাবেন। অথবা ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়াবেন, শিখবেন, এডজাস্ট করবেন, আবার চেষ্টা করবেন। এই চয়েসই আপনার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।
বাস্তবতা হলো, সফল মানুষেরা কম পড়েননি বরং তারা বেশিবার উঠে দাঁড়িয়েছেন। জ্যাকি চ্যান নিজেও অসংখ্যবার ইনজুরি পেয়েছেন, হাড় ভেঙেছে, কিন্তু থেমে থাকেননি। তাই আপনি যখন বিপদে পড়বেন এবং তখনই মনে রাখবেন এটা শেষ নয়। প্রশ্ন হলো: আপনি কতক্ষণ শুয়ে থাকবেন? এক ঘণ্টা? একদিন? এক বছর? নাকি এখনই উঠে দাঁড়াবেন? মনে রাখবেন, চ্যাম্পিয়ন এবং হেরে যাওয়া মানুষের পার্থক্য এটা নয় যে তারা বিপদে পড়ে না—পার্থক্য হলো তারা কতবার উঠে দাঁড়ায়। @ SpikeStory
৩
প্রাচীন হোমিনিন (hominin) প্রজাতি থেকে মানুষের আবির্ভাব
মানুষ বানর থেকে এসেছে বা মানুষের পূর্বপুরুষ বানর এই কথাটি খুবই প্রচলিত। কিন্তু এটি বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। আধুনিক বিজ্ঞান, বিশেষ করে Theory of Evolution অনুযায়ী, আধুনিক মানুষ এবং বর্তমানের বানর (monkeys ও apes) দু’জনেই একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ (common ancestor) থেকে আলাদা আলাদা পথে বিবর্তিত হয়েছে। এই ধারণাটি সুসংগঠিতভাবে উপস্থাপন করেছিলেন চার্লস ডারউইন (Charles Robert Darwin)।
প্রায় ৬–৭ মিলিয়ন বছর আগে আফ্রিকায় বসবাসকারী কিছু প্রাচীন হোমিনিন (hominin) প্রজাতি থেকে মানুষের এবং অন্যান্য এপদের (যেমন শিম্পাঞ্জি) পূর্বপুরুষের মধ্যে বিভাজন ঘটে। অর্থাৎ, মানুষ সরাসরি কোনো বর্তমান বানর বা এপ থেকে আসেনি বরং তারা আমাদের বিবর্তনীয় নিকট আত্মীয়।
প্রসঙ্গত, আধুনিক মানুষের বৈজ্ঞানিক নাম 'Homo sapiens', যার ল্যাটিন অর্থ জ্ঞানবান মানুষ বা বুদ্ধিমান মানুষ। এই নামটি ১৭৫৮ সালে প্রখ্যাত জীববিজ্ঞানী কার্ল লিনিয়াস (Carl Linnaeus) দেন।
অন্যদিকে, শিম্পাঞ্জির বৈজ্ঞানিক নাম Pan troglodytes এবং গরিলার Gorilla gorilla। এরা মানুষের নিকট আত্মীয় হলেও আলাদা প্রজাতি। মানুষের সঙ্গে শিম্পাঞ্জির জিনগত মিল প্রায় ৯৮-৯৯% হলেও, মানুষের মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যক্ষমতা অনেক বেশি উন্নত যার ফলে জটিল ভাষা, বিমূর্ত চিন্তা, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির বিকাশ সম্ভব হয়েছে।
আসলে বিবর্তন কোনো সরল সোজা রেখা নয় এটি একটি শাখাবিশিষ্ট বৃক্ষের মতো (evolutionary tree), যেখানে বিভিন্ন প্রজাতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আলাদা শাখায় বিভক্ত হয়েছে এবং অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এই প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিক নির্বাচন (natural selection), জেনেটিক মিউটেশন এবং পরিবেশগত পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মানুষের বিবর্তনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য গড়ে উঠেছে যেমন সোজা হয়ে হাঁটা, বড় ও জটিল মস্তিষ্ক, সূক্ষ্ম হাতের ব্যবহার, এবং ভাষা ও প্রতীকী চিন্তার ক্ষমতা। এই বৈশিষ্ট্যগুলোই মানুষকে অন্যান্য প্রাইমেট থেকে আলাদা করেছে।
সুতরাং, Humans came from monkeys বলা একটি oversimplification বা ভুল সরলীকরণ। সঠিকভাবে বলা উচিত মানুষ ও বানরের পূর্বপুরুষ এক ছিল, এবং তারা ভিন্ন পথে বিবর্তিত হয়েছে। এই বৈজ্ঞানিক সত্যটি বুঝলে আমরা মানবজাতির ইতিহাস ও প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে আরও গভীর ধারণা পেতে পারি এবং বিষয়টি পরিষ্কার হয়র © অভিষেক দে
৪
"পিতৃতন্ত্রের শৃংখল ভেঙে বেরোনোর একমাত্র উপায় নারীদের শিক্ষা।"
বাল্যকালে তিনি একটি বই পড়ার চেষ্টা করেছিলেন, তার বাবা দেখে বইটিকে জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেন এবং তিনি বইটি কুড়িয়ে এনে লুকিয়ে যত্ন করে রেখে দেন পরে পড়বেন বলে। তখন বলা হত মেয়েরা লেখাপড়া শিখলে তাদের স্বামীর মৃত্যু হবে।
নয় বছরের বয়সে এই মেয়েটির বিয়ে হয়ে যায়। স্বামী ছিলেন শিক্ষা অনুরাগী। তাই তিনি তার স্ত্রীকে, স্ত্রী যখন মাঠে খাবার নিয়ে যেত সেই মাঠের মধ্যে পড়াশোনা শেখাতেন- যাতে সমাজ থেকে বাধা না আসে। তবুও সে কথা একদিন জানাজানি হয়ে যায়।বাবা বলেন হয় লেখাপড়া বন্ধ করতে হবে না হলে তাদের বাড়ি ছাড়তে হবে। মেয়েটি ও তার স্বামী বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন।
আঠারো বছরের এই মেয়েটি যখন প্রধান শিক্ষিকা হয়ে স্কুলে যেতেন, ব্যাগে রাখতেন বাড়তি শাড়ি। রাস্তায় এত লোক কাদা ছুড়ত যে, স্কুলে গিয়েই শাড়ি বদলাতে হত। গোবর, পাথর, পচা ডিমও ছুড়ে মারত। এত অপমান সত্বেও তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল। তিনি বলতেন— “তোমাদের গোবর পাথর, আমার কাছে ফুল।”
পরাধীন ভারতবর্ষের সামন্ততান্ত্রিক অন্ধসংস্কার ও কুপমুন্ডকতার বিরুদ্ধে লড়াই করে আজীবন যিনি মেয়েদের শিক্ষার জন্য নিজেকে অঙ্গীকারবদ্ধ করেছিলেন, উক্ত ঘটনার এই প্রধান শিক্ষিকাটি হলেন ভারতীয় নবজাগরণের বিশিষ্ট চরিত্র সাবিত্রীবাই ফুলে। তার স্বামী হলেন জ্যোতিবারাও ফুলে।১৮৩১ সালের ৩রা জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন সাবিত্রী।
সাবিত্রীবাই ফুলে এবং জ্যোতিরাও ফুলে প্রতিষ্ঠা করেন ভারতবর্ষের প্রথম মেয়েদের শিক্ষার জন্য আলাদা স্কুল। সেখানে ভারতবর্ষে প্রথম নারী শিক্ষিকা হিসাবে সাবিত্রীবাই ফুলে যোগদান করেন। তারা ৯ জন তথাকথিত নিম্ন বর্ণের দলিত ছাত্রীদের নিয়ে স্কুল শুরু করেন।
১৮৫১-র শেষে সাবিত্রী ও জ্যোতিবা ফুলে তিনটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, মোট ছাত্রী-সংখ্যা দেড়শোর আশেপাশে। তাঁরা মোট ১৮টি বিদ্যালয় স্থাপন করেন। তাঁরা প্রতিষ্ঠা করেন একটি অনাথ আশ্রম, যেখানে ধর্ষিতা নারীর সন্তানদের আশ্রয়, লালন-পালন এবং শিক্ষা দেওয়া হতো। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি জাতপাত,গোঁড়ামি, অন্ধকার, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। একটি ১০ বছরের ছেলের শুশ্রূষা করতে গিয়ে তিনি রোগের সংক্রমিত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন ১৮৯৭সালের ১০ই মার্চ। @ Tuhin Subhro Bhowmik
৫
JNF Blue Box ছোট ছোট অনুদান জমা বাক্স
বক্সটির নাম JNF Blue Box (Jewish National Fund বা Keren Kayemeth LeIsrael)। এটি ইহুদি ইতিহাসের একটি অত্যন্ত পরিচিত ও প্রভাবশালী প্রতীক। এই ব্লু বক্স মূলত একটি দান বা অনুদান সংগ্রহের বাক্স (collection box) হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ১৯০১ সালে JNF প্রতিষ্ঠার পর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী ইহুদি পরিবারগুলো এই বাক্সে ছোট ছোট অনুদান জমা করত। এই অর্থ ব্যবহার করা হতো উসমানীয় সাম্রাজ্য এবং পরবর্তীতে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অধীনে থাকা ফিলিস্তিন অঞ্চলে জমি ক্রয় ও গাছ রোপণের জন্য।
তবে এটি শুধু একটি দানবাক্স ছিল না—এটি ছিল একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের অংশ। ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে জমি কেনার জন্য এটি ছিল অন্যতম প্রধান অর্থসংগ্রহের মাধ্যম। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এই ব্লু বক্স প্রায় প্রতিটি ইহুদি পরিবারের ঘরে দেখা যেত এবং এটি তাদের আত্মপরিচয় ও জাতীয়তাবাদের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো।
JNF প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্যই ছিল ফিলিস্তিন অঞ্চলে জমি ক্রয় করে সেখানে ইহুদি বসতি স্থাপন করা। বড় দাতাদের ওপর নির্ভর না করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুদান—পেনি বা সেন্ট—সংগ্রহের মাধ্যমে একটি বিশাল তহবিল গড়ে তোলা হয়েছিল। এই দিক থেকে এটি ইতিহাসের অন্যতম সফল “ক্রাউডফান্ডিং” উদ্যোগ হিসেবে ধরা হয়।
১৯২০-এর দশকের মধ্যেই এই ব্লু বক্স বিশ্বের প্রায় প্রতিটি ইহুদি পরিবারে পৌঁছে যায়। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো হতো টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে এই বাক্সে দান করতে—যা তাদের মনে একটি নতুন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন ও দায়বদ্ধতা তৈরি করত।
বর্তমান সময়ে JNF এই ঐতিহ্যকে আধুনিক প্রযুক্তির সাথে মিলিয়ে নিয়েছে। এখন তারা “Blue Box App” এবং অনলাইন ডোনেশন সিস্টেমের মাধ্যমে আগের মতোই বিশ্বজুড়ে অনুদান সংগ্রহ করে যাচ্ছে। মুসলমানরা দানের প্রয়োজন না বুঝলে ইহুদিরা ঠিকই বুঝতে পেরেছে। সংগৃহীত
৬
গ্লোবাল পাওয়ার ডায়নামিক্স
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন পুরো বিশ্ব ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল, তখন আমেরিকা অত্যন্ত সুকৌশলে ব্রেটন উডস চুক্তির মাধ্যমে ডলারকে বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসে। কিন্তু আসল খেলাটি শুরু হয় ১৯৭১ সালের নিক্সন শক-এর পর, যখন আমেরিকা ডলারের বিপরীতে স্বর্ণ মজুত রাখার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসে।
এরপর ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় যখন আরব দেশগুলো ইসরায়েলকে সমর্থন করার অপরাধে আমেরিকায় তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেয়, তখন মার্কিন অর্থনীতি আক্ষরিক অর্থেই ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছিল।
নিজেদের অর্থনীতি বাঁচাতে এবং বিশ্ব মোড়লগিরি ধরে রাখতে আমেরিকা তখন সৌদি আরবের সাথে একটি নোংরা চুক্তি করে। চুক্তিটি ছিল, সৌদি আরব শুধুমাত্র মার্কিন ডলারে তেল বিক্রি করবে, আর বিনিময়ে আমেরিকা তাদের সামরিক সুরক্ষা দেবে।
যেহেতু বিশ্বের সব দেশেরই জ্বালানি তেলের প্রয়োজন, তাই তেল কেনার জন্য তাদের বাধ্য হয়ে ডলার মজুত করতে হয়। আর এই পেট্রো-ডলার সাইকেলের কারণেই আমেরিকা বিনা পরিশ্রমে বিশ্বজুড়ে তাদের অর্থনৈতিক আধিপত্য বা ফাইন্যান্সিয়াল মনোপলি বজায় রেখে চলেছে।
আর এই ডলারের দম্ভেই তারা আজ ইরান বা রাশিয়ার মতো স্বাধীন দেশগুলোর ওপর যখন-তখন অবৈধ স্যাংশন বা নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয়।
তবে ক্ষমতার এই পালাবদল এখন শুরু হয়ে গেছে।
রাশিয়া, চীন এবং ইরানের মতো পরাশক্তিগুলো এখন ব্রিকস এর মাধ্যমে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় আমেরিকার এই ডলারের ফাঁদ কেটে বের হওয়ার মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করছে। চীন এবং রাশিয়া ইতিমধ্যেই তাদের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে ইউয়ান এবং রুবলের ব্যবহার শুরু করেছে।
আমেরিকা হয়তো ভাবছে তারা স্যাংশন দিয়ে দেশগুলোকে কাবু করবে, কিন্তু গ্লোবাল সাউথ এখন ডলারের বিকল্প হিসেবে স্বর্ণ এবং নিজেদের মুদ্রার দিকে ঝুঁকছে।
সামরিক দাম্ভিকতা আর কাগুজে ডলার দিয়ে হয়তো সাময়িক খবরদারি করা যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী জিওপলিটিক্যাল এবং ইকোনমিক লড়াইয়ে আমেরিকা যে চীনের এই নীরব মাস্টারস্ট্রোকের কাছে হার মানতে চলেছে, তা এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার।
ভর্টেক্স ম্যাথে ৯-কে বলা হয় সিঙ্গুলারিটি।
১, ২, ৪, ৮, ৭, ৫ এই ভৌত প্যাটার্নের বাইরে থেকে ৯ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। ৯-কে আপনি যে সংখ্যা দিয়েই গুণ করুন না কেন, তার ডিজিটাল রুট সবসময় ৯-এ ফিরে আসে (যেমন: ৯ x ৫ = ৪৫; ৪+৫=৯)। অতএব ৯ হচ্ছে,পূর্ণতার উভয়েরই প্রতীক।
৭
'রিলস'-এ আস*ক্তি আপনার মা*থা খেয়ে ফেলছে না তো?
এখন ৩০ সেকেন্ড বা ১ মিনিটের রিলসে। ফেসবুকের ফিড, বা ইউটিউব অ্যাপ স্ক্রল করতে থাকলে একের পর এক রিলস মনোযোগ কেড়ে নেয়। আরও কয়েকটি সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম রয়েছে, সেখানেও একই দশা। ঘনঘন রিলস দেখার অভ্যাস একধরনের আস*ক্তি তৈরি করে। আপনি যদি তেমনই আস/ক্ত হন, তাহলে সেটিই এই সময়ের একটি বড় বিপদের প্রমাণ।
আমরা ভাবি, যেকোনো মা/দক, অ্যাল/কোহল বা সিগারেটই মানুষের সবচেয়ে বড় আস/ক্তি। কিন্তু সত্যিকারের বাস্তবতা হলো, ডিজিটাল স্পেসে বিচরণকারী মানুষের বড় অংশ আস*ক্ত হয়ে পড়েছে শর্ট ভিডিও বা রিলস-এর প্রতি।
এই ছোট ছোট ভিডিওগুলো বিনোদন নয়। ধীরে ধীরে এগুলো মানুষের মনোযোগ, চিন্তার ক্ষমতা এবং সময়কে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছে। আমরা অনেক সময় ভাবি, এই রিল-টা দেখেই তারপর কাজ শুরু করব। কিন্তু সেই 'অল্প একটু সময়' কখন যে পার হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়, তা টেরই পাওয়া যায় না। একবার ভেবে দেখুন, শেষবার যখন রিল দেখছিলেন, আপনি কি সত্যিই শুধু একটা ভিডিও দেখেই আপনার ডিভাইস বা অ্যাপ বন্ধ করেছিলেন? নাকি বিরামহীনভাবে চালিয়ে গেছেন?
এখনকার সময়ে অনেক মানুষই ২ মিনিট মনোযোগ ধরে রেখে কিছু পড়তে পারেন না। কারণ, তাদের মস্তিষ্ক এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছে দুই সেকেন্ড পরপর নতুন কিছু দেখার জন্য। মোটাদাগে, অতিরিক্ত রিলস দেখার ফলে ধীরে ধীরে আপনি যে পরিবর্তন অনুভব করছেন তা হল-
মনোযোগ কমে যাচ্ছে, তাই গভীরভাবে ভাবা বা দীর্ঘ সময় ধরে কোনো কাজে মন দেওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
স্মৃতিশক্তি দুর্বল হচ্ছে, অনেক সময় একটু আগে কী করতে চেয়েছিলেন তা ভুলে যাচ্ছেন।
যেকোনো কাজ খুব দ্রুতই বিরক্তিকর মনে হতে শুরু করে এবং সবসময় নতুন উত্তেজনা খোঁজেন।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, কারণ মস্তিষ্ক সহজ আনন্দে অভ্যস্ত হয়ে কঠিন কাজ এড়িয়ে যেতে চায়।
উদ্বেগ ও হতাশা বাড়ছে, কারণ ভিডিও কন্টেন্টে ৩০ সেকেন্ডে এক ঝলকে দেখা অন্যের 'সাজানো' জীবনের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করতে করতে ভেতরে ভেতরে অসন্তোষ অনুভব করছেন।
মিথ্যা ব্যস্ততার অনুভূতি তৈরি হয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়।
ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, কর্মদক্ষতা কমে যায়, ফলে ধীরে ধীরে নিজের শক্তি ও উৎপাদনশীলতা হারাচ্ছেন।
তাই প্রশ্ন রইল, 'রি*লস'-এ আস*ক্তি এভাবে আপনার মা*থা খে*য়ে ফেলছে না তো? এই আস*ক্তি এখনই থামিয়ে দেওয়া জরুরি নয় কি? ভেবে দেখুন।
@ আজিজুল হক,
৮
এই ২০ ধরনের মানুষ থেকে দূরে থকবেন।
১. অভিযোগকারী: যারা কেবল সমস্যার কথা বলে, সমাধানের নয়।
২. পরনিন্দাকারী: যারা আপনার কাছে অন্যের বদনাম করে।
৩. হিংসুটে: যারা আপনার উন্নতি দেখে মনে মনে ঈর্ষা করে।
৪. সুবিধাবাদী: যারা কেবল নিজেদের প্রয়োজনে আপনাকে মনে করে।
৫. মিথ্যাবাদী: যাদের কথার ওপর কোনো ভরসা রাখা যায় না।
৬. অহংকারী: যারা সবসময় নিজেদের অন্যদের চেয়ে বড় মনে করে।
৭. নেতিবাচক মানুষ: যারা প্রতিটি ভালো কাজের মধ্যেও খারাপ কিছু খোঁজে।
৮. সবজান্তা: যারা অন্যের পরামর্শ নিতে চায় না এবং নিজেকেই সেরা ভাবে।
৯. এনার্জি ভ্যাম্পায়ার: যাদের সাথে কথা বললে আপনি মানসিক ক্লান্তি অনুভব করেন।
১০. নিয়ন্ত্রণকারী: যারা আপনার জীবনের ওপর নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে চায়।
১১. বিচারক মানসিকতার: যারা সবসময় আপনার কাজ বা পছন্দ নিয়ে খুঁত ধরে।
১২. অকৃতজ্ঞ: যারা আপনার করা উপকারের কথা সহজেই ভুলে যায়।
১৩. ভুক্তভোগী সাজার ভান করা: যারা নিজের ভুলের জন্য সবসময় ভাগ্য বা অন্যকে দোষ দেয়।
১৪. ভণ্ড বা মুনাফিক: যাদের মুখে এক কথা কিন্তু অন্তরে অন্য কিছু থাকে।
১৫. সন্দেহপ্রবণ: যারা বিনা কারণে আপনাকে বা অন্যদের সবসময় অবিশ্বাস করে।
১৬. আবেগীয় ব্ল্যাকমেইলার: যারা নিজের স্বার্থে আপনার আবেগ নিয়ে খেলা করে।
১৭. সমালোচক: যারা গঠনমূলক নয়, বরং আপনাকে নিচু করার জন্য সমালোচনা করে।
১৮. সীমানা লঙ্ঘনকারী: যারা আপনার ব্যক্তিগত সময় বা প্রাইভেসির তোয়াক্কা করে না।
১৯. অলস ও লক্ষ্যহীন: যাদের জীবনে কোনো লক্ষ্য নেই এবং তারা আপনার সময় নষ্ট করে।
২০. প্রতিযোগিতামূলক বন্ধু: যারা বন্ধু হয়েও আপনার সাথে সারাক্ষণ রেষারেষি করে।
@Mohiuddin Ahmed
ইংরেজিতে একটি চমৎকার কথা আছে, Your network is your net worth, অর্থাৎ আপনার নেটওয়ার্কই আপনার আসল সম্পদ। আপনি জীবনে কতদূর যাবেন, তা অনেকটাই নির্ভর করে আপনি কেমন মানুষের সাথে চলাফেরা করেন তার ওপর।
৯
প্রথম তরল জ্বালানি চালিত রকেট
রকেট লাউছার যদি এক দেশ থেকে অন্য দেশে গিয়ে পড়তে পারে, তাহলে তা সোজা আকাশে উঠে চাঁদেও পড়তে পারবে এই ধারণা প্রথম আসে রবার্ট গডার্ড-এর মাথায়। ১৯২৬ সালের মার্চ মাস, এই অবর্ননীয় স্বপ্নের বাস্তবায়নের দিকে প্রথম পদক্ষেপ নিলেন রবার্ট হাটচিংস গডার্ড। তিনি ছিলেন একজন তরুণ বিজ্ঞানী, যিনি দীর্ঘদিন ধরে স্বপ্ন দেখছিলেন মানুষের আকাশে যাত্রার। গডার্ডের এই স্বপ্ন শুধুই কল্পনা নয়, তিনি এটিকে বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দিতে চান। তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটি ছিল পৃথিবীতে প্রথম তরল জ্বালানি চালিত রকেট তৈরি করা, যা আধুনিক রকেটবিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেছে।
রবার্ট গডার্ড ১৮৮২ সালে ম্যাসাচুসেটসের ওরচেস্টারে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে তার আগ্রহ প্রবল ছিল। তিনি তরুণ বয়সে ভাবতেন, কীভাবে মানুষ পৃথিবীর সীমা অতিক্রম করে আকাশে পৌঁছাতে পারে। কলেজে পদার্থবিজ্ঞানে শিক্ষাগ্রহণকালে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল অতিক্রম করার জন্য কঠিন জ্বালানির রকেট যথেষ্ট নয়। শুধুমাত্র তরল জ্বালানি ব্যবহার করেই সম্ভব হবে বড় শক্তি উৎপন্ন করা, যা একটি রকেটকে আকাশে তুলতে সক্ষম হবে। এই ধারণা নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন গবেষণা চালালেন এবং বাস্তব পরীক্ষার মাধ্যমে এটি প্রমাণ করার চেষ্টা করলেন।
গডার্ডের গবেষণার প্রথম বড় সফলতা ঘটে মার্চ ১৬, ১৯২৬ সালে। তিনি তার খালা’র ফার্মে একটি ছোট রকেট তৈরি করেন, যা তরল অক্সিজেন এবং গ্যাসোলিন দিয়ে চালিত। রকেটটির নাম ছিল “নেল”। এই রকেট মাত্র ২.৫ সেকেন্ড ধরে জ্বলতে থাকে এবং প্রায় ৪১ ফুট উচ্চতায় ওঠে, পরে প্রায় ১৮৪ ফুট দূরে ল্যান্ড করে। যদিও এটি খুব ছোট একটি উড্ডয়ন ছিল, তবুও এটি প্রমাণ করেছিল যে তরল জ্বালানি চালিত রকেট কাজ করতে পারে এবং এটি ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানকে সম্ভব করতে পারে।
গডার্ডের এই গবেষণা তৎকালীন মিডিয়ায় সমালোচিত হয়। অনেকেই মনে করতেন, রকেট দিয়ে মানুষ চাঁদে বা আকাশের বাইরে যেতে পারবে না। তবুও, গডার্ড তাঁর গবেষণা থামাননি। তিনি রকেটের ডিজাইন উন্নত করলেন, যেমন জাইরোস্কোপ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ভেন ব্যবহার করে রকেটকে সঠিকভাবে পরিচালনা করার ব্যবস্থা। তিনি ধীরে ধীরে মাল্টিস্টেজ রকেটের ধারণা বিকাশ করলেন, যা পরবর্তীকালে আধুনিক মহাকাশযান নির্মাণে অপরিহার্য হয়।
গডার্ডের কাজ শুধু প্রযুক্তিগত ছিল না, এটি মানবজাতির মহাকাশে যাত্রার স্বপ্নকে বাস্তবায়নের পথ দেখিয়েছিল। তিনি দেখিয়েছিলেন যে স্বপ্নের পেছনে যদি ধৈর্য, বিজ্ঞান ও পরীক্ষার সংমিশ্রণ থাকে, তবে অসম্ভব কিছু নেই। @ সাইন্স টুডে
১০
সীমান্ত গান্ধী: পাকিস্তানের স্বাধীনতার বিরোধী ও 'আফগান এজেন্ট' বলা হত যাকে
মানুষ তাকে 'খান সাহেব' বা 'বাদশাহ খান' নামে ডাকত। অনেকেই তাকে 'সীমান্ত গান্ধী' বা 'সারহাদি গান্ধী' নামেও স্মরণ করে থাকে।
ছয় ফুট চার ইঞ্চি উচ্চতা, টান টান পিঠ, দয়ালু চোখ এবং অহিংসার প্রচারক ছিলেন এই ব্যক্তি—খান আবদুল গাফফার খান।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বাদশাহ খান (পাকিস্তানের) উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে অহিংস আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। পশতুন বা পাঠানরা সাধারণত অহিংসার পথ বেছে নেয় না, কিন্তু বাদশাহ খানের অনুসারীরা অহিংসার পথে হেঁটেছিলো।
১৯৩০-এর দশকে তিনি শিবগ্রামে গান্ধীর সঙ্গে অনেক সময় কাটিয়েছেন।
ভারতের বিখ্যাত কূটনীতিক নটবর সিং তাঁর বই 'ওয়াকিং উইথ লাইন্স: টেলস ফ্রম ডিপ্লোমেটিক পাস্ট'-এ লেখেন, 'কংগ্রেসের পাঁচজন নেতা ভারত ভাগের বিরোধিতা করেছিলেন'। 'তাদের মধ্যে ছিলেন গান্ধী, খান আবদুল গাফফার খান, জয়প্রকাশ নারায়ণ, রাম মনোহর লোহিয়া এবং মাওলানা আবুল কালাম আজাদ।'
"১৯৪৭ সালের ৩১শে মে থেকে ২রা জুনের মধ্যে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং পাকিস্তানকে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন সীমান্ত গান্ধী অনুভব করেন যে, তাকে ধোঁকা দেওয়া হয়েছে।" "ব্রিটিশ সরকার শুধু তাকে বহু বছর জেলে রাখেনি, স্বাধীনতার পর পাকিস্তান সরকারও তাকে জেলে রাখতে দ্বিধা করেনি।" "নেলসন ম্যান্ডেলার মতো বাদশাহ খান, অর্থাৎ খান আবদুল গাফফার খান, তার জীবনের ২৭ বছর জেলে কাটিয়েছেন।"
১৯৩০ সালে গান্ধী যখন লবণ আইন ভাঙার উদ্যোগ নেন, তখন এর বড় প্রভাব সীমান্ত প্রদেশে পড়ে।
ব্রিটিশ সরকার খান আবদুল গাফফার খান এবং তার কিছু সহচরকে পেশাওয়ার যাওয়ার পথে গ্রেপ্তার করে ১৯৩০ সালের ২৩শে এপ্রিল।
এই খবর শুনে হাজার হাজার মানুষ চরসাদ্দা জেল ঘেরাও করে, যেখানে তাদের রাখা হয়েছিল। পুরো শহর রাস্তায় নেমে আসে।
"সেই দিন পেশাওয়ারের কিসা খোয়ানি বাজার ও সীমান্ত প্রদেশে প্রায় ২৫০ জন পাঠান ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে নিহত হন।
"পাঠানরা সাধারণ উগ্র ও রাগী স্বভাবের হলেও সেদিন তারা কোনো প্রতিহিংসামূলক হিংসাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখাননি। এমনকি সেনাবাহিনীর গাড়োয়াল রাইফেলসের সৈন্যরাও নিরস্ত্র পাঠানদের উপর গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানায়"।
স্বাধীনতার ১০ মাসের মধ্যে পাকিস্তানের জেলে
১৯৪৮ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি বাদশাহ খান পাকিস্তানের আইনসভার এক অধিবেশনে অংশ নেন এবং নতুন দেশ ও তার পতাকার প্রতি আনুগত্যের শপথ নেন। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা এবং আইনসভার প্রধান মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তাকে চায়ের আমন্ত্রণ জানান। এই উপলক্ষে জিন্নাহ তাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, "আজ আমার মনে হচ্ছে যে আমার পাকিস্তান গঠনের স্বপ্ন পূর্ণ হয়েছে"। ১৯৪৮ সালের ৫ই মার্চ খান আবদুল গাফফার খান প্রথমবার পাকিস্তানের পার্লামেন্টে ভাষণ দেন। তিনি স্বীকার করেন, "আমি ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের বিরোধিতা করেছিলাম"।
বাদশাহ খান এবং পাকিস্তান সরকারের মধ্যে সমঝোতা বেশিদিন টেকেনি। ব্রিটিশ সরকার চলে যাওয়ার ১০ মাসের মধ্যেই বাদশাহ খানকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে পশ্চিম পাঞ্জাবের মন্টগোমারি জেলে তিন বছরের জন্য পাঠানো হয়। ১৯৬১ সালের এপ্রিলে পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খান তাকে আবার গ্রেপ্তার করে সিন্ধুর একটি জেলে পাঠান। ১৯৬১ সালের মধ্যে বাদশাহ খান 'বিশ্বাসঘাতক', 'দেশদ্রোহী', 'আফগান এজেন্ট' এবং পাকিস্তান সরকারের জন্য 'বিপজ্জনক' ব্যক্তি' হয়ে ওঠেন। বাদশাহ খানের জন্য পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে তিনি পাকিস্তান ছেড়ে আফগানিস্তানে আশ্রয় নেন।
সত্তর দশকের শুরুর দিকে আফগানিস্তান সরকার তাঁকে জালালাবাদে থাকার জন্য একটি বাড়ি দেয়। প্রথমে বাদশাহ খান আফগানিস্তানে সোভিয়েত হস্তক্ষেপকে সমর্থন করলেও ১৯৮১ সালে যখন তিনি চিকিৎসার জন্য ভারতে আসেন, তখন তিনি সোভিয়েতের উপস্থিতির বিরুদ্ধে চলে যান।
তিনি ইন্দিরা গান্ধীর কাছে অনুরোধ করেন যেন তিনি সোভিয়েত নেতা লিওনিদ ব্রেজনেভের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেন।
"ইন্দিরা গান্ধী শুরুতে দ্বিধায় ছিলেন। তিনি ভাবতেন, সোভিয়েতরা এই অনুরোধ গ্রহণ করবে না এবং রেগে যাবে। পাশাপাশি তিনি মনে করতেন আফগানিস্তানে সোভিয়েতদের কিছু সময়ের উপস্থিতি ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে নয়। "কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী বেশিদিন বাদশাহ খানের চাপ উপেক্ষা করতে পারলেন না।" "ইন্দিরা গান্ধী বাদশাহ খানের বার্তা সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত ভোরোনৎসভ ও সোভিয়েত উপ-রাষ্ট্রপতি ভাসিলি কুজনিতসোভকে পৌঁছে দেন, যারা তখন ভারতে সফরে ছিলেন।
বাদশাহ খান ৯৮ বছর বয়সে ১৯৮৮ সালের ২০শে জানুয়ারি সকাল ৬টা ৫৫ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার শেষ ইচ্ছা ছিল যেন তাকে আফগানিস্তানের জালালাবাদ শহরে তার বাড়ির উঠোনে কবর দেওয়া হয়।
সীমান্ত গান্ধীর প্রায় ২০ হাজার ভক্ত পাকিস্তানের আতমানজাই থেকে তার জানাজায় অংশ নিতে মিছিল করে আফগানিস্তানে প্রবেশ করেন এবং কোনো পাকিস্তানি পাসপোর্ট বা আফগান ভিসা ছাড়াই ডুরান্ড সীমান্ত পার হন।
গাড়ি, ট্রাক আর বাসের একটি দীর্ঘ বহর তাদের সঙ্গে ছিল। জালালাবাদে সেই মিছিলে আরও কয়েক হাজার মানুষ যোগ দেন। তার শেষকৃত্যে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউল হক এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী দুজনেই উপস্থিত ছিলেন।
@রেহান ফজল ,বিবিসি হিন্দি
১১
অজানা পাহাড়ি জনগোষ্ঠি থেকে যেভাবে মহাশক্তি হিসেবে গড়ে উঠেছিল পারস্য সাম্রাজ্য
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, পারসিস অঞ্চলের পার্সিয়ানরা ছিল এক অজানা পাহাড়ি জনগোষ্ঠী—ইরান মালভূমির দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। কিন্তু তাদের মধ্যে এক অসাধারণ নেতা আবির্ভূত হন এবং মাত্র এক প্রজন্মের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে দখলদারি শুরু করেন। প্রাচীন রাজ্যগুলো জয় করেন, বিখ্যাত শহরগুলো লুট করেন এবং এমন একটি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন যা তখন পর্যন্ত বিশ্বে সর্ববৃহৎ ছিল।
এই সাম্রাজ্য বিশ্বের জনসংখ্যার ৪৪ শতাংশের ওপর রাজত্ব করত। পশ্চিমে বলকান ও মিশর থেকে শুরু করে উত্তর-পূর্বে পশ্চিম ও মধ্য এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্বে ভারতীয় উপমহাদেশের সিন্ধু উপত্যকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
এই রাজবংশের শাসকেরা হতেন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। তাদের সম্পদ এত বেশি ছিল যে সেগুলো সীমাহীন বলেই মনে হতো।
তাদের বিজয়ের গতি ও ব্যাপ্তি ছিল এতটাই বিস্ময়কর ছিল যে তারা অপরাজেয় হিসেবে পরিচিতি পায়।
এই গল্পের শুরু হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৫৫৯ সালে, যখন সাইরাস দ্য গ্রেটের আবির্ভাব হয়েছিল—প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। আর এই গল্পের শেষ হয় ২৩০ বছর পরে, ম্যাসিডোনিয়ার নেতা আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের হাত ধরে।
পারস্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সাইরাসের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিজয় ছিল পার্শ্ববর্তী মিডস রাজ্যের রাজাকে পরাজিত করা। তিনি তার রাজত্ব বিস্তৃত করেন ইরান মালভূমি ও মেসোপটেমিয়ার বিশাল অংশজুড়ে। এরপর তিনি আক্রমণ করেন এশিয়া মাইনর যা আনাতোলিয়া নামেও পরিচিত ছিল। এভাবে তিনি আয়োনীয় উপকূলের অন্যান্য শহরগুলোর পথ খুলে দেন। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় জয় ছিল নিও-ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান, যার মাধ্যমেই তিনি সাংস্কৃতিকভাবে উন্নত ও সম্পদে ভরপুর ব্যাবিলন শহরে প্রবেশ করেন।
খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৯ সালে তিনি শহরটি দখল করেন।
খানে 'সাইরাস সিলিন্ডার' নামে পরিচিত—একটি মাটির সিলিন্ডারে অতি সূক্ষ্ম কিউনিফর্ম লিপিতে লেখা আছে কীভাবে "বিশ্বের রাজা" বিজয়ী হয়েছেন—সহিংসতা দিয়ে নয়, সহনশীলতার মাধ্যমে।
একটি জাতির মুক্তি ঘোষণা
সাইরাসের আদেশেই সিলিন্ডারটি ব্যাবিলন শহরের প্রাচীরের ভিত্তির নিচে মাটি চাপা দেওয়া হয়, যা ছিল ঐ অঞ্চলের একটি ঐতিহ্য — যার মাধ্যমে বলা হতো 'যেন ঈশ্বরের আশীর্বাদ লাভ হয় এবং শাসকের শৈর্য ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ থাকে'।
ব্রিটিশ মিউজিয়ামের বর্ণনায় আছে, যেখানে সিলিন্ডারটি সংরক্ষিত আছে। দেবতারা সাইরাসকে নির্বাচিত করেন, তাকে "বিশ্বের রাজা" ঘোষণা করে ব্যাবিলন আক্রমণের নির্দেশ দেন। শহরের মানুষ আনন্দের সঙ্গে সাইরাসের রাজত্ব মেনে নেয়।
এরপর বর্ণনা পাল্টে যায়, এবং সাইরাস নিজেই বলেন: "আমি সাইরাস, বিশ্বের রাজা, মহারাজা, শক্তিশালী রাজা, ব্যাবিলনের রাজা, সুমের ও আক্কাদের রাজা, পৃথিবীর চার কোনার রাজা... "আমার বিশাল বাহিনী শান্তিতে ব্যাবিলনে প্রবেশ করে। আমি কাউকে জনগণকে ভয় দেখাতে দিইনি। আমি ব্যাবিলন ও এর পবিত্র স্থানগুলোর মঙ্গল কামনা করেছি।"
গ্রিক ঐতিহাসিক জেনোফন তার "সাইরোপেডিয়া" গ্রন্থে সাইরাসকে আদর্শ নেতা হিসেবে তুলে ধরেন এবং বাইবেলের প্রাচীন গ্রন্থগুলোতে উল্লেখ আছে যে, তিনি ইহুদিদের ব্যাবিলনীয় বন্দিত্বের অবসান ঘটিয়ে তাদের জেরুজালেমে ফেরার অনুমতি দেন।
এভাবে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, তিনি হয়ে ওঠেন প্রাচীন বিশ্বের এক মহান শাসকের প্রতীক—সহনশীল, উদার, সাহসী এবং দূরদর্শী।
এমনকি আধুনিক সময়েও সাইরাস সিলিন্ডারকে বলা হয়েছে মানবাধিকারের প্রথম ঘোষণা, কারণ এটি ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সহনশীলতার বার্তা দেয় বলে মনে করা হয়।
আরেকজন মহামানব
সাইরাস দ্য গ্রেট পারস্য সাম্রাজ্যের সূচনা করেছিলেন এবং তার পরবর্তী দুই উত্তরসূরি এটিকে আরও বিস্তৃত করেন। তবে যিনি এই সাম্রাজ্যকে সুনিয়ন্ত্রিত করেছিলেন, তিনি ছিলেন দারায়ুস প্রথম, যিনি দারায়ুস দ্য গ্রেট নামে খ্যাত। দারায়ুস প্রকৃতপক্ষেই সাম্রাজ্যটিকে সুসংগঠিত করেন।
তিনি ডাকব্যবস্থা চালু করেন, মাপ-জোখ এবং মুদ্রা ব্যবস্থার মান নির্ধারণ করেন। এত বিশাল এক সাম্রাজ্য পরিচালনার নানান প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলায় তিনি গোটা এলাকা ভাগ করেন প্রশাসনিক প্রদেশে, যাকে বলা হতো 'সাত্রাপি'; সেখানে কর আরোপ করেন।
সবচেয়ে উচু প্রশাসনিক পদগুলোতে তিনি নিযুক্ত করেন পারস্যের উচ্চবর্গীয় অভিজাতদের মধ্য থেকে নির্বাচিত লোকদের।
তিনি গোটা সাম্রাজ্যজুড়ে বিভিন্ন রকম নির্মাণ কার্যক্রম শুরু করেন—যেমন, মিশরে নীল নদী ও লোহিত সাগরের মধ্যে একটি খাল নির্মাণ করেন।
খ্রিস্টপূর্ব ৪৯০ সালে দারায়ুস দ্য গ্রেট যখন গ্রিস জয় করতে যান, তার অভিযান শেষ হয় বিখ্যাত ম্যারাথন যুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী পরাজয়ের মাধ্যমে।
এর চার বছর পর তিনি মারা যান এবং সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের দায়িত্ব পড়ে তার পুত্র জার্খসেস-এর ওপর।
খ্রিস্টপূর্ব ৪৮০ সালে জার্খসেস এথেন্স দখল করলেও, তার বাহিনী গ্রিকদের কাছে একাধিক পরাজয়ের সম্মুখীন হয়; সমুদ্রে সালামিস, ভূমিতে প্লেটাইয়া ও মাইকালে পরাজিত হন। শেষ পর্যন্ত, জার্খসেস বুঝতে পারেন যে গ্রিস তার সাম্রাজ্যের অংশ হবে না এবং সেই আশা ছেড়ে দেন।
পরবর্তী দেড় শতাব্দী ধরে পারস্য সাম্রাজ্যে চলতে থাকে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ—মিশর হারানো ও পুনরুদ্ধার হয়, সাইডন (বর্তমান লেবানন) বিদ্রোহ করে এবং দমন করা হয়। এই সমস্ত সংকটের মাঝেও পারস্য বিশ্বের প্রধান শক্তি হিসেবেই থেকে যায়।
ততদিনে, প্রাচীন ম্যাসিডোনিয়ায় এক রাজা আবির্ভূত হন, যার রাজসিংহাসনে বসার আগেই লক্ষ্য ছিল পারস্য সাম্রাজ্য জয়।
সে লক্ষ্য নিয়েই তিনি বড় হয়েছেন। আর বাস্তবতাও ছিল—গ্রিসের এই চিরশত্রুর সম্পদ ছাড়া তার সেনাবাহিনী রক্ষা করা এবং অভিযান চালানো সম্ভব ছিল না। তিনি ইতিহাসে পরিচিত হয়ে ওঠেন আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট হিসেবে—মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই আখিমেনীয় সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দেন তিনি।
খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০ সালে, তিনি পারস্য আক্রমণ করেন এবং লুট করেন। বলা হয়, সেখান থেকে ২০০ গাড়ি বোঝাই সোনা-রূপা নিয়ে যান।
মূল উৎস: BBC সিরিজ "Art of Persia"
১২
মিশরীয়রা কেন বছরে দুইবার ইমাম হুসাইনের জন্মদিন পালন করে?
কায়রোতে ইমাম হুসাইনের মাজার হিসেবে পরিচিত হুসাইনি মসজিদে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে ইমাম হুসাইনের জন্ম উৎসব, যার নাম মৌলিদ,
দুনিয়ার নানা প্রান্ত থেকে আসা হাজারো পর্যটকের কাছে কায়রোর একদম কেন্দ্রে অবস্থিত ইমাম হুসাইনের মাজারটি একটি অন্যতম বড় আকর্ষণ।
মৌলিদের সময় এই পুরো মাজার এবং আশপাশের এলাকা ভক্ত আর দর্শনার্থীদের ভিড়ে কানায় কানায় পূর্ণ থাকে, পা ফেলার জায়গা থাকে না সেখানে। আড়ম্বরপূর্ণ, ব্যাপক আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রাচীন এই জনপদে ইমাম হুসাইনের জন্মবার্ষিকী পালন হয়, বছরে দুইবার।
ইমাম হুসাইন ইবনে আলি, ইসলামের নবী হযরত মোহাম্মদ স.-এর নাতি হিজরি বর্ষপঞ্জির চতুর্থ বছরের শাবান মাসে জন্মেছিলেন।
কিন্তু মিসরে তার জন্মদিন পালন হয় রাবি-উস-সানি মাসের শেষ মঙ্গলবারে এবং এ উদযাপনটি তার আসল জন্মদিনের চাইতে বড় হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এই পৃথক বা ভিন্ন উদযাপনের পেছনে কারণ কী?
'মিসরীয়দের আধ্যাত্মিক পুনর্জন্ম'
ইমাম হুসাইনের মাধ্যমে মিসরীয় মানুষজন আহলে আল-বাইতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। ইসলাম ধর্মে আহলে আল-বাইত বলতে হযরত মোহাম্মদ স.-এর পরিবারকে বোঝায়। বহু মিসরীয় বিশ্বাস করেন ইমাম হুসাইনের শির বা মস্তক মিসরে সমাহিত করা হয়েছে। আর সে কারণেই দেশটির বাসিন্দারা গৌরব আর আনন্দের সাথে মৌলিদ পালন করে।
যদিও ইমাম হুসাইনের শির মিসরের ঠিক কোন জায়গায় সমাহিত করা হয়েছে, তা নিয়ে মত-ভিন্নতা আছে। কিন্তু মিসরীয়রা তাদের অন্তরে ইমাম হুসাইনকে বিশেষ জায়গায় রেখেছে।
আইন শামস বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও সভ্যতা বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল বাকি আল-কাত্তান বলেছেন, অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, ইমাম হুসাইনের শির কায়রোতে পৌঁছেছিল হিজরি ৫৪৮ সালের জামাদা আস-সানি, মানে আরবি বর্ষপঞ্জির ষষ্ঠ মাসের আট তারিখে।
কিন্তু মিসরীয়রা ওই নির্দিষ্ট দিনের দুই মাস আগে এ দিবস পালন করে। এর কারণ হয়ত ওই সময়ে অর্থাৎ রাবি-উস-সানি মাসের শেষদিকে ইমাম হুসাইনের শির ফিলিস্তিনের উপকূলীয় শহর আশকেলন থেকে মিসরে পাঠানো হয়েছিল, বলছেন অধ্যাপক আব্দুল বাকি আল-কাত্তান।
তবে, ইতিহাসবিদদের কেউ কেউ মনে করেন, ইমাম হুসাইনের শির পরের বছর অর্থাৎ হিজরি ৫৪৯ সালে কায়রো পৌঁছেছিল।
হুসাইনি মসজিদের ইমাম ড. মোমিন আল-খালিজি বলেন, মিসরীয়রা ওই দিনটিকে 'ইশতবিশার', মানে যেদিন সুসংবাদ এসেছিল, বলে পালন করেন।
মৌলিদ অর্থাৎ ইমাম হুসাইনের জন্মদিনটি হুসাইনি মসজিদের ভেতরে শান্তিপূর্ণভাবে পালন করা হয়।
সেদিন দিনভর কোরান তেলাওয়াত, হাদিসের তরজমা আসর, নবী মোহাম্মদ ও তার পরিবারের সদস্যদের জীবন ও কর্ম নিয়ে আলাদা সেশন হয়। এছাড়াও ওইদিন সেখানে হামদ ও নাতেরও আয়োজন করা হয়। ড. মোমিন আল-খালিজি বলেছেন, সেসময় কয়েকদিন ধরে মসজিদে নবী মোহাম্মদের প্রশংসাসূচক গান নাত পরিবেশন এবং মিষ্টি বিতরণ চলতে থাকে। শাবান মাসে ইমাম হুসাইনের আসল জন্মদিনেও এই একই ধরনের আয়োজন হয়। তবে, রাবি-উস-সানি মাসের শেষে ইমাম হুসাইনের শির কায়রো পৌঁছানোর দিনে বিপুল জনসমাগম হয় সেখানে।
তবে, মিশরের কিছু মানুষ, বিশেষ করে যারা সালাফি মতবিশ্বাসের সাথে যুক্ত, তারা এ রীতি বা বিশ্বাসকে স্বীকার করেন না।
এখানে উল্লেখ্য, ইতিহাসবিদরা এ বিষয়টিতে একমত যে, ইরাকে কারবালার যুদ্ধের পর শির ছাড়া ইমাম হুসাইনের দেহাবশেষ ৬১ হিজরির ১০ই মুহররম (১০ই অক্টোবর, ৬৮০ খ্রিস্টাব্দ) 'উৎবাহ হুসাইনিয়া'তে সমাহিত করা হয়েছিল।
তবে, হুসাইনের শির কোথায় সমাহিত হয়েছিল তা নিয়ে মত ভিন্নতা রয়েছে।
ইতিহাসবিদদের মতে, কারবালার ঘটনার পর, ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার অধীনে ইরাকের গভর্নর ইবনে জিয়াদের সৈন্যরা ইমাম হুসাইনের শির ইরাকের বিভিন্ন শহর ঘুরিয়ে সিরিয়ায় নিয়ে যায়।
আরো কিছু বর্ণনায় বলা হয়েছে, ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার সময়েই ইমাম হুসাইনের শির সিরিয়ার দামেস্কের রাজকীয় অস্ত্রগারের পাশে দাফন করা হয়েছিল এবং বলা হয়ে থাকে সে জায়গাটির অবস্থান দামেস্কের অন্যতম প্রাচীন ঐতিহাসিক ফটক 'বাব আল-ফারাদিস' এ।
তবে, মিসরে বহুল প্রচলিত বিশ্বাস হচ্ছে, ইমাম হুসাইনের কাটা মস্তক দামেস্ক, যেখানে খলিফা উমরের প্রাসাদ ছিল, সেখান থেকে ফিলিস্তিনি শহর আশকেলনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
ইমাম হুসাইনের আত্মত্যাগ, অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া তাকে বীরের আসন দিয়েছে মিসরীদের মনে।
@উমাইমা আল-সাজলি, বিবিসি অ্যারাবিক, কায়রো
১৩
বিপুল সাম্রাজ্য জয় করলেও কেন ভারতের সীমান্ত থেকে ফিরে যান চেঙ্গিস খান
প্রায় ৮০০ বছর আগে, কৃষ্ণ সাগর থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একজন মঙ্গোল যাযাবর। তার নাম ছিল তেমুজিন, যিনি সারা বিশ্বের কাছে চেঙ্গিস খান নামে পরিচিত।
১১৬২ সালে বৈকাল হ্রদের পূর্বে অবস্থিত দুর্গম এলাকায় একজন সাহসী যাযাবরের পরিবারে জন্ম হয়েছিল তার। তার শিশুকালটা সহজ ছিল না। বিষ প্রয়োগ করে তার বাবাকে হত্যা করেছিল শত্রুরা। খুব অল্প বয়সেই নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলেন চেঙ্গিস খান।
অবহেলা ও দারিদ্র্যের মধ্যে কেটেছে তার জীবনের প্রথম অংশ। কিন্তু ৫০ বছর বয়সে পৌঁছে চেঙ্গিস খান জয়ের যে ধারা তৈরি করেন, তা তাকে পৌঁছে দিয়েছিল বিশ্বের মহান যোদ্ধাদের তালিকায়। তারই নেতৃত্বে মঙ্গোল রাজবংশের আবির্ভাব হয় যা সমগ্র চীন, মধ্য এশিয়া, ইরান, পূর্ব ইউরোপ এবং রাশিয়ার একটা বড় অংশকে শাসন করে। চেঙ্গিস খানের সৈন্যবাহিনী অস্ট্রিয়া, ফিনল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, ভিয়েতনাম, বার্মা, জাপান এমনকি ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছে গিয়েছিল। "চেঙ্গিসের সাম্রাজ্য এক কোটি ২০ লাখ বর্গমাইল জুড়ে বিস্তৃত ছিল, যা আয়তনের দিক থেকে আফ্রিকা মহাদেশের সমান এবং উত্তর আমেরিকা মহাদেশের চেয়েও বড়। তুলনামূলকভাবে রোমান সাম্রাজ্য খুবই ছোট ছিল।"
প্রসঙ্গত ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে আলেকজান্ডারের কাছে তার বাবা ফিলিপের তৈরি বিশাল সেনাবাহিনী ছিল। জুলিয়াস সিজারের কাছে ছিল ৩০০ বছরের পুরোনো সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের ঐতিহ্য। ফরাসী বিপ্লবের পর জনপ্রিয়তার উপর ভিত্তি করা সমর্থনের কারণে শাসন করতে পেরেছিলেন নেপোলিয়ন বোনাপার্ট। অন্যদিকে, চেঙ্গিস খানকে নিজের ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছিল। বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার সঙ্গে লড়ে নিজের জন্য জায়গা তৈরি করেছিলেন তিনি যা মোটেই সহজ কাজ ছিল না।
তরুণ বয়সে বাজপাখির সঙ্গে অন্যান্য পাখি মারার কৌশল শিখতে শুরু করেন তিনি। ১৩ বছর বয়সে তিনি তার সৎ ভাই বেহতেরকে হত্যা করেন।
চেঙ্গিস খানের নিষ্ঠুরতা নিয়ে আরো অনেক গল্প রয়েছে। তার শাসনকালে যেকোনো শহর দখল করার পর তরুণ ও শারীরিকভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের ছাড়া বাকিদের মাঠে দাঁড় করিয়ে হত্যার রীতি সাধারণ ঘটনা ছিল।
চেঙ্গিস খান যে একজন নিষ্ঠুর, প্রতিহিংসাপরায়ণ ও বিশ্বাসঘাতক ব্যক্তি ছিলেন সে কথা প্রায় সব ঐতিহাসিকই মেনে নিয়েছেন।
এমনকি কয়েকজন ঐতিহাসিক তাকে একজন মানসিক রোগী বলেও অভিহিত করেছেন।
চেঙ্গিস খান সম্পর্কে কথিত রয়েছে যে নিজের সাম্রাজ্য বিস্তারের নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে তিনি কখনো ঘোড়ার পিঠ থেকে নামেননি। কখনো আরামদায়ক বিছানায় ঘুমাতেন না। শুধু তাই নয়, তিনি সাধারণত ক্ষুধার্ত থাকতেন এবং সব সময় মৃত্যু ভয়ে থাকতেন।
চেঙ্গিস খান ১২১১ থেকে ১২১৬ সাল অর্থাৎ পাঁচ বছর কাটিয়েছিলেন মঙ্গোলিয়া থেকে দূরে। সেই সময় তার লক্ষ্য ছিল চীনকে জয় করার।
তিনি ভারত সীমান্তে এসে পৌঁছেছিলেন জালাল আল-দিনকে ধাওয়া করে। দুই পক্ষের মধ্যে শেষ যুদ্ধ হয়েছিল সিন্ধু নদীর তীরে।
জালাল আল-দিন ছিলেন মধ্য এশিয়া থেকে ইরান পর্যন্ত এলাকার শাসনকারী খাওয়ারিজম শাহ সাম্রাজ্যের শেষ শাসক, যিনি মঙ্গোলদের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন।
চেঙ্গিস খানের অতীত ঘাঁটলে অবশ্য এই বিষয়টা আশ্চর্যজনক লাগতে পারে যে জালাল আল-দিনকে ধাওয়া করার পরিকল্পনা ত্যাগ করেন এবং ভারতের ভেতরে তার সেনাবাহিনীকে পাঠাননি।
"দিল্লির সুলতান ইলতুৎমিস জালাল আল-দিনকে আশ্রয় না দিলেও তাকে অনুসরণ করার ক্ষেত্রে চেঙ্গিসকে উৎসাহ দেননি।"
চেঙ্গিস খানের সামনে দ্বিতীয় সমস্যা ছিল ঘোড়াকে কেন্দ্র করে।
ইবনে বতুতা উল্লেখ ১০ হাজার ঘোড়ার বাহিনীর জন্য ২৫০ টন পশুখাদ্য এবং দুই লক্ষ ৫০ হাজার গ্যালন জলের প্রয়োজন ছিল। সিন্ধু ও মুলতানে জলের যোগান মিললেও পশুখাদ্য ছিল না। দ্বিতীয়ত, ওই এলাকায় উচ্চমানের ঘোড়ার ঘাটতি ছিল এবং অতিরিক্ত ঘোড়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। উপরন্তু, চেঙ্গিস খান এত বিপুল পরিমাণে অঞ্চল জয় করেছিলেন তা সেটা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তার কাছে পর্যাপ্ত সৈন্য ছিল না।
এছাড়াও সৈন্যদের স্বাস্থ্যের বিষয়টাও ছিল।
ফ্র্যাঙ্ক ম্যাকলিন লিখেছেন, "চেঙ্গিসের অনেক সৈন্য এই অঞ্চলের জ্বর এবং অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন।"
"অন্যদিকে, ভারতের বনাঞ্চল ও পর্বতমালা সম্পর্কে চেঙ্গিসের কাছে সঠিক তথ্য ছিল না। এসবের মাঝেই চেঙ্গিস তার নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।" @ রেহান ফজল বিবিসি হিন্দি
১৪
একটি মুদি দোকান থেকে দিল্লির সিংহাসনে: ছোট এক ভুলে ১৪ বছরের আকবরের কাছে হেরে গিয়েছিলেন হিমু
ভারতজুড়ে যখন মুসলিম শাসকদের প্রতাপ বাড়ছে, সেই মধ্যযুগে অল্প সময়ের জন্য 'হিন্দু রাজ' প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব দেওয়া হয় তাকে, যার নাম ছিল হিমু এবং ছিলেন ভারতের হরিয়ানার বাসিন্দা। জীবনে মোট ২২টি যুদ্ধে বিজয়ী হন তিনি, যে কারণে অনেক ইতিহাসবিদ তাকে 'মধ্যযুগের সমুদ্রগুপ্ত' বলে অভিহিত করেছেন। কেউ কেউ আবার তাকে 'মধ্যযুগের নেপোলিয়ন' বলেও উল্লেখ করেন।
হিমু যেমন ছিলেন দক্ষ যোদ্ধা, তেমনি ছিলেন বিচক্ষণ প্রশাসক। সহযোদ্ধা থেকে শুরু করে শত্রুপক্ষ—সবাই তার যুদ্ধদক্ষতা স্বীকার করতেন।
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ আর. পি. ত্রিপাঠী তার গ্রন্থ 'রাইজ অ্যান্ড ফল অফ দ্য মুঘল এম্পায়ার'-এ লিখেছেন, "আকবরের হাতে হিমুর পরাজয় ছিল দুর্ভাগ্যজনক। ভাগ্য যদি তার অনুকূলে থাকত, এই পরাজয় তাকে স্বীকার করতে হতো না।"
আরেক খ্যাতিমান ইতিহাসবিদ আর.সি. মজুমদার শের শাহ-বিষয়ক বইয়ের একটি অধ্যায়–– লেখা হয়েছে, "পানিপথের যুদ্ধে একটি দুর্ঘটনার কারণে হিমুর নিশ্চিত বিজয় পরাজয়ে পরিণত হয়েছিল। তা না হলে দিল্লিতে মুঘলদের পরিবর্তে একটি হিন্দু রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা হতেন তিনিই"।
হেম চন্দ্র ওরফে হিমু ১৫০১ সালে হরিয়ানার রিওয়ারি জেলার কুতুবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবারের একটি মুদি দোকান ছিল।
আকবরের জীবনীকার আবুল ফজল তাকে অবহেলাভরে রিওয়ারির রাস্তায় লবণ বিক্রেতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তবে তার পেশা যা-ই হোক না কেন, শের শাহ সুরির ছেলে ইসলাম শাহের মনোযোগ আকর্ষণে সফল হয়েছিলেন তিনি। শিগগিরই তিনি সম্রাটের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয়ে উঠেন এবং প্রশাসনে তাকে সহায়তা করতে শুরু করেন। সম্রাট তাকে গোয়েন্দাপ্রধান ও ডাক বিভাগপ্রধানের পদ দেন।
পরবর্তীতে, হিমুর মধ্যে সামরিক গুণাবলী দেখেন ইসলাম শাহ। এ বিষয়টি তাকে নিজ সেনাবাহিনীতে হিমুকে একটি পদ দিতে অনুপ্রাণিত করে।
আদিল শাহের শাসনকালে, হিমুকে 'ভাকিল আলা'র (যার অর্থ প্রধানমন্ত্রী) মর্যাদা দেওয়া হয়। আদিল শাহ যখন জানতে পারেন যে হুমায়ুন ফিরে এসেছেন এবং দিল্লির সিংহাসন দখল করেছেন, তখন তিনি মুঘলদের ভারত থেকে উৎখাত করার দায়িত্ব হিমুকে দেন। হিমু ৫০ হাজার সৈন্য, এক হাজার হাতি এবং ৫১টি কামান নিয়ে দিল্লির দিকে অগ্রসর হন। কালপি ও আগ্রার গভর্নর আব্দুল্লাহ উজবেগ খান ও সিকান্দার খান আতঙ্কে তাদের নিজ নিজ শহর ছেড়ে যান। "হিমুকে বাধা দেওয়ার সব ব্যবস্থা নিয়েছিলেন দিল্লির মুঘল গভর্নর তার্দি খান।
"পরের দিন তার বাহিনী ও মুঘলদের বাহিনীর মধ্যে একটি যুদ্ধ হয়। এতে মুঘলরা পরাজিত হয় এবং তার্দি খান প্রাণ বাঁচাতে পালান পাঞ্জাবে। সেখানে ইতোমধ্যেই আকবরের সেনাবাহিনী অবস্থান করছিল"।
"হিমু বিজয়ীর বেশে দিল্লিতে প্রবেশ করেন। মাথায় রাজকীয় ছাতা নিয়ে হিন্দু রাজ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি খ্যাতিমান মহারাজা বিক্রমাদিত্য উপাধি গ্রহণ করেন, নিজের নামে মুদ্রা ছাপান এবং দূরবর্তী প্রদেশগুলোতে গভর্নর নিয়োগ করেন"।
দিল্লিতে পরাজয়ের খবর ১৫৫৬ সালের ১৩ই অক্টোবর আকবরের কাছে পৌঁছায়, তার ১৪তম জন্মদিনের ঠিক দুই দিন আগে। সেই সময় আকবর ছিলেন পাঞ্জাবের জলন্ধরে বৈরাম খাঁর সঙ্গে। তার্দি খান যখন দিল্লি ত্যাগ করে আকবরের শিবিরে পৌঁছান, আকবর তখন শিকারের জন্য বাইরে ছিলেন। তার্দি খানকে শিবিরে আসার সমন জারি করেছিলেন বৈরাম খাঁ"। "কিছু কথোপকথনের পর, বৈরাম খাঁ মাগরিবের নামাজের জন্য ওজু করতে যান। এই সময়, বৈরাম খাঁর লোকেরা শিবিরে প্রবেশ করে তার্দি খানকে হত্যা করে"। "আকবর যখন শিকার থেকে ফিরে আসেন, তখন তাকে তার্দি খানের মৃত্যুর খবর দেন বৈরাম খাঁর দ্বিতীয় মুখপাত্র পীর মুহাম্মদ"। "বৈরাম খাঁ পীর মুহাম্মদের মাধ্যমে আকবরকে একটি বার্তা পাঠান। তাতে তার উদ্যোগকে আকবর সমর্থন করবেন বলে আশা প্রকাশ করা হয়। বার্তাটির উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধ থেকে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের কী পরিণতি হতে পারে তা যেন অন্যরা শিখতে পারে"।
অন্যদিকে, মুঘলরা পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে—এ খবর হিমু জানতে পারার পর তিনি আগেভাগেই তার কামানবাহিনী পানিপথের পথে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আলী কুলি শাইবানির নেতৃত্বে বৈরাম খাঁও ১০ হাজার সৈন্যকে পানিপথে পাঠান। শাইবানি ছিলেন একজন উজবেক যোদ্ধা এবং সমকালীন ইতিহাসে খ্যাতিমান বলে বিবেচিত।
আবুল ফজল আকবরের জীবনী 'আকবরনামা'-য় লিখেছেন, "হিমু খুব ভোরে দিল্লি ছেড়ে যান। দিল্লি থেকে পানিপথের দূরত্ব ছিল ১০০ কিলোমিটারেরও কম। ওই অঞ্চলে তখন প্রচণ্ড খরা; ফলে পথে মানুষের কোনো চিহ্নই পাওয়া যাচ্ছিল না"। "হিমুর বাহিনীতে ছিল ৩০ হাজার অভিজ্ঞ অশ্বারোহী এবং ৫০০ থেকে দেড় হাজারের মতো হাতি। হাতিগুলোর শুঁড়ে বেঁধে রাখা থাকত তলোয়ার ও বর্শা, আর তাদের পিঠে চড়ে থাকতেন যুদ্ধে দক্ষ ধনুকধারী সৈন্যরা"।
"মুঘল সেনারা এর আগে কখনো যুদ্ধক্ষেত্রে এত লম্বা, বলিষ্ঠ হাতি দেখেনি। এসব হাতি শত্রুপক্ষের ঘোড়াকে আরোহীসহ শুঁড় দিয়ে তুলে বাতাসে ছুড়ে ফেলতে সক্ষম ছিল"। হিমু রাজপুত ও আফগানদের বিশাল সেনাবাহিনীসহ পানিপথে পৌঁছে যান। "এই যুদ্ধে আকবরকে মূল লড়াইয়ের স্থান থেকে কিছুটা দূরে নিরাপদ আশ্রয়ে রাখা হয়েছিল। বৈরাম খাঁও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিজেকে দূরে রেখেছিলেন এবং যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব তার বিশ্বস্ত সহচরদের দিয়েছিলেন"।
হিমু যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করেন মাথায় কোনো বর্ম না পরেই। বসেছিলেন 'হাওয়াই' নামের একটি পিঠে। আর নিজের সহযোদ্ধাদের মনোবল বাড়াতে ক্রমাগত চিৎকার করে উদ্দীপিত করছিলেন তিনি।, "হিমুর আক্রমণের তীব্রতা এমন ছিল যে তিনি মুঘল বাহিনীর ডান ও বাম দুই দিকেই আতঙ্ক ও ভয়ের সৃষ্টি করেন। তবে মধ্য এশিয়ার অশ্বারোহীদের কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়"। "তারা সামনে থেকে সরাসরি আক্রমণ না করে, পাশ দিক থেকে তির্যকভাবে আক্রমণ করেছিল। এতে হাতির পিঠে থাকা সৈন্যরা পড়ে যায় এবং দ্রুত দৌড়ানো ঘোড়ার খুরে পিষ্ট হয়"।
কিন্তু ঠিক সেই সময়ে মুঘল সেনাদের সমর্থন দিয়েছিল এক অদৃশ্য সৌভাগ্য।
আবুল ফজল লিখেছেন, "হিমু কখনো ঘোড়ায় চড়তে শেখেননি—সম্ভবত এ কারণেই তিনি হাতির পিঠে যুদ্ধ করছিলেন। তবে হয়তো আরেকটি কারণ ছিল—সেনাপতি যদি হাতির ওপর থাকেন, দূর থেকে সমস্ত সৈন্যই তাকে দেখতে পায়। হিমুর দেহের উপরের অংশে কোনো বর্ম ছিল না"।
"এটি সাহসী হলেও অবিবেচক একটি সিদ্ধান্ত ছিল। যুদ্ধ চলাকালে হঠাৎ ছুটে আসা একটি তীর হিমুর চোখ ভেদ করে মাথার খুলি পর্যন্ত গিয়ে গেঁথে বসে"। কিছুক্ষণ পরই হিমু অচেতন হয়ে হাতির শুঁড়ে পরে যান। এমন যুদ্ধে সেনাপতি আহত হলে সৈন্যদের লড়াইয়ের আগ্রহ কমে যায়।
ফলে আকবর ও বৈরাম খাঁ যখন যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছান, তখন তারা দেখেন—সৈন্যরা যুদ্ধ না করে বিজয়োৎসব করছে।
আবুল ফজল লিখেছেন, "২০ টিরও বেশি যুদ্ধে বিজয়ী সেই হিমুকে রক্তাক্ত অবস্থায় ১৪ বছরের আকবরের সামনে আনা হয়। তখন বৈরাম খাঁ সদ্য সম্রাট হওয়া আকবরকে নিজ হাতেই শত্রুকে হত্যা করতে বলেন। আহত হিমুকে সামনে দেখে আকবর স্পষ্টতই দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন"।
আকবর একটি অজুহাত দিয়ে বলেছিলেন, "আমি তাকে ইতোমধ্যেই টুকরো টুকরো করে ফেলেছি।"
চারপাশে দাঁড়ানো কিছু লোক বৈরাম খাঁর কথাকে সমর্থন জানিয়ে হিমুকে হত্যা করতে আকবরকে উসকানি দেয়। তবে এতে রাজি হননি তিনি।
আকবর কেবল আহত হিমুর ওপর নিজের তলোয়ার স্পর্শ করেছিলেন। বৈরাম খাঁ নিজের তলোয়ার দিয়ে হিমুর শিরশ্ছেদ করেছিলেন। @ বিবিসি বাংলা
১৫
ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি: যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়
মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের নামের সাথে জড়িয়ে আছে বিখ্যাত ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি। তিনিই হলেন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট যিনি বিরোধী দলের উপর নজরদারীর কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। প্রথম মেয়াদে ব্যাপকভাবে সফল এ প্রেসিডেন্ট দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনেও জয়ী হয়েছিলেন ৫০টি রাজ্যের ৪৯টিতেই। কিন্তু তার পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায় নির্বাচন পূর্ববর্তী এ ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি।
কী এই ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি?
সময় ১৯৭২ সাল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বইছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের হাওয়া। ওয়াশিংটন ডিসির ওয়াটারগেট হোটেলের ছয় তলায় ছিলো ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কমিটির কার্যালয়। এখান থেকেই ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী কৌশল আর প্রচারণার সবকিছু নির্ধারণ করা হতো। ডেমোক্র্যাটদের নীতিনির্ধারকদের নিয়মিত আনাগোনায় মুখরিত এ অফিসেই ১৯৭২ সালের ১৭ই জুন খুব ভোরে ঢুকে পড়েন পাঁচ ব্যক্তি।
তারা সেই অফিসে থাকা টেলিফোনে ছোট মাইক্রোফোন লাগাতে শুরু করেন যার মাধ্যমে নজরদারি করার পরিকল্পনা করা হয় ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী কৌশলের উপর। পাশাপাশি দরকারি কাগজপত্রের ছবি তুলতে গিয়ে অফিসে থাকা ফাইল ক্যাবিনেট তছনছ করে অনুপ্রবেশকারীরা। সেদিন ভোরে নিরাপত্তাকর্মী ফ্রাঙ্ক উইলস তার রুটিন টহল দিচ্ছিলেন। ছয় তলায় টহল দিতে গিয়ে তিনি খেয়াল করলেন ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কমিটির অফিসের দরজায় লাগানো লক ডাক্ট টেপ। এই টেপ লাগানো থাকলে দরজা এমনভাবে বন্ধ হয় যাতে লকটা আটকে না যায়। সেটা দেখে সহজেই বোঝা যায় ভিতরে কেউ আছে। কিন্তু এত ভোরে কারো অফিসে থাকার কথা নয়। তাই উইলস কেবল এই টেপটা খুলে দিলেন দরজার লক থেকে। গুরুতর কিছু মনে না হওয়ায় তিনি চলে যান তার রুটিন টহলে। ঘন্টাখানেক পরে দরজায় আবার সেই একই টেপ দেখতে পেয়ে তিনি খবর দেন পুলিশকে। এরপরই পুলিশ আটক করে সেই দলটিকে। ৫ জনের সেই দলের কাছে পাওয়া যায় নগদ ২৩০০ ডলার, যার প্রায় সবই ১০০ ডলারের। ওয়াশিংটন পোস্টের দুই তরুণ সাংবাদিক কার্ল বার্নস্টেইন আর বব উডওয়ার্ড পাঁচ অনুপ্রবেশকারী আর এই ১০০ ডলার নোটের সিরিয়াল নিয়ে রীতিমত তদন্ত শুরু করেন।
১০ অক্টোবর ১৯৭২, ওয়াশিংটন পোস্টে ‘Deep Throat’ গোপন সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয় প্রেসিডেন্ট নিক্সন ওয়াটারগেটের এই ঘটনার জন্যে দায়ী। প্রথম মেয়াদের দায়িত্বের শেষপ্রান্তে থাকা নিক্সন এই ঘটনাকে অস্বীকার করেন এবং পুরো ঘটনাটা ষড়যন্ত্র বলেই চালিয়ে দেন। প্রেসিডেন্ট নিক্সন নির্বাচিত হবার পরেও রীতিমতো ওয়াশিংটন পোস্টে তাদের তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করতে থাকেন। তাদের রিপোর্টে বেরিয়ে আসে ওয়াটারগেটে ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কমিটির অফিসে মোট চারবার ঢুকেছিলো অনুপ্রবেশকারী সেই দলটি। পুলিশের হাতে ধরা পড়া সেই দলের অনেকেরই পরিচয় প্রকাশের সাথে সাথে মিডিয়ায় সাড়া পড়ে যায়। অনুপ্রবেশকারীদের একজন ছিলেন জ়েমস ম্যাককর্ড। অবসরপ্রাপ্ত এই সিআইএ কর্মকর্তা ছিলেন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের নিরাপত্তা কর্মকর্তা! তাদের কাছে ১০০ ডলারের যে নোট পাওয়া যায় সেগুলোর সিরিয়াল নাম্বার নিয়ে তদন্ত শুরু করেন দুই সাংবাদিক। দেখা যায় এই সিরিয়াল নাম্বারের নোটগুলো ব্যাংক থেকে নিক্সনের নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের ব্যয় নির্বাহের জন্য তোলা নোটগুলোর সাথে মিলে যাচ্ছে। নিক্সন প্রশাসনের ধামাচাপা দেবার সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে এ ঘটনা গড়ায় সিনেট পর্যন্ত। সিনেটে তদন্ত কমিটি গঠিত হবার প্রস্তাব ৭৭-০ ভোটে গৃহীত হয়। প্রথমে রুদ্ধদ্বার শুনানির ব্যবস্থা করলেও পরে টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের সিদ্ধান্ত নেয় মার্কিন সিনেট। প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের সময়কাল থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের ওভাল অফিস সহ হোয়াইট হাউজের গুরুত্বপূর্ণ সব টেলিফোন আলাপ রেকর্ড করে গোপনে সুরক্ষিত রাখা হতো।
১৯৭৩ সালে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের রেকর্ড করা কিছু টেপ ফাঁস হয়ে যায়। তদন্তকারীদের চাপে শেষ পর্যন্ত হোয়াইট হাউজের টেপ হস্তান্তর করতে বাধ্য হন তিনি। ১৯৭৪ সালের ২৭ জুলাই নিক্সনের ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিতে যুক্ত থাকার নিশ্চিত প্রমাণ পাবার পর তদন্ত কমিটি সুপারিশ করে রিচার্ড নিক্সনকে তার প্রেসিডেন্ট পদ থেকে অভিশংসন করার পার্লামেন্টে বিল আনার জন্য। কিন্তু তার আগেই ৯ আগস্ট তিনি তার পদত্যাগপত্র জমা দেন এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পান। দায়িত্ব পেয়ে তিনি সাবেক প্রেসিডেন্টের ক্ষমার আদেশ জারি করেন। নিক্সন প্রশাসনের এক ডজনের বেশি কর্মকর্তার বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি হয়। কার্ল বার্নস্টেইন আর বব উডওয়ার্ড সাহসী সাংবাদিকতার জন্যে পুলিৎজার পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। @ Shah MD. Minhajul Abedin
১৬
আমেরিকান প্রেসিডেন্টদের কিছু অজানা কথা
আমেরিকার ফাউন্ডিং ফাদারদের মধ্যে তিনি একজন। শুধু টানা তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট হতে অস্বীকৃতি জানিয়েই তাঁর মহত্ব সীমাবদ্ধ রাখেন নি, তিনি প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থাতেও বার্ষিক ২৫০০০ ডলার বেতন গ্রহণ করেন নি। জী আমেরিকারদের চোখে সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় মানুষটির কথাই, তিনি হলেন জর্জ ওয়াশিংটন। এখানেই থেমে নেই ওয়াশিংটেনের কীর্তি। নিজের ইনোগুরেশনে অংশ নেওয়ার পর্যাপ্ত অর্থ ছিলনা তাঁর কাছে। আর তাই সেই উপলক্ষে প্রতিবেশির কাছে ধার করেছিলেন ৬০০ ডলার।
জল্লাদ যখন প্রেসিডেন্ট
আমেরিকার ২২ এবং ২৪ তম প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড প্রথম জীবনে ছিলেন নিউইয়র্কের ছোট্ট এক কাউন্টির শেরিফ। এছাড়া কর্মজীবনে তিনি দুইবার অপরাধীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে জল্লাদের দায়িত্বও পালন করেছে। বলে রাখা ভাল তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন দুইবার তবে পরপর দুই নির্বাচনে নয়। মজার ব্যাপার হল আমেরিকার ইতিহাসে এমন ঘটনা আর কখনও ঘটেনি!
যেভাবে পেলাম OK শব্দটি
ফেসবুক কিংবা হোয়াটস অ্যাপে চ্যাট করতে বসলেই বারবার ঘুরে ফিরে যে শব্দটি সবচেয়ে বেশী ব্যবহার হয় সেটা হল O.K এই বহুল ব্যবহৃত শব্দের উৎপত্তির সাথে জড়িয়ে আছে একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের নাম। প্রেসিডেন্ট মার্টিন ভ্যান ব্যুরেন Old Kinderhook নামেও পরিচিত ছিলেন। নির্বাচনী প্রচারণার সময় Old Kinderhook এর সংক্ষিপ্তরূপ O.K ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। আর সেটাই কালের বিবর্তনে জায়গা করে নিয়েছে অভিধানে আজকের OK.
বমির সমার্থক যে প্রেসিডেন্টের নাম
১৯৯২ সালে জাপান সফরের সয়ম আমেরিকার ৪১তম প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ সিনিওর জাপানি প্রধান মন্ত্রী কিচি মিয়াজাওয়ার উপর বমি করেছিলেন। ব্যাতিক্রমী ঘটনাটি বিশ্ব মিডিয়াতে বেশ সারা জাগিয়েছিল। সেই সাথে জাপানি অভিধানেযুক্ত হয়েছিল নতুন একটি শব্দ “বুশুরু” যার অর্থ বুশের মত কাজ করা বা বমি করা!
জেনারেল থেকে প্রেসিডেন্ট
ডেভিড আইজেন হাওয়ারের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা আমরা অনেকই জানি তবে যেটা জানিনা সেটা হল তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছিলেন। এছাড়া যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি নিজের মহিলা ড্রাইভার কেই সামারসবে’র সাথে প্রণয়ের জন্যও আলোচিত হয়েছেন তিনি। যার কাহিনীর নিয়ে সামারসবে তাঁর Past Forgetting: My Love Affair with Dwight D. Eisenhower বইতে বিস্তারিত লিখেছেন।
অর্থ ছিল না যার নামের
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে চিত্রপটে আসেন আমেরিকার তৎকালীন নব নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান। জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ফেলার অত্যন্ত বিতর্কিত সিদ্ধান্তটিও ছিল তাঁরই। তবে মজার ব্যাপার হল তাঁর মধ্যনাম “এস” এর কোন অর্থই ছিলনা।
প্লেবয় প্রেসিডেন্ট
জন এফ ক্যানেডি যিনি JFK নামে বেশি পরিচিত মার্কিন ইতিহাসে। মাত্র ৪৩ বছরে নির্বাচিত ক্যানেডি ছিলেন আমেরিকার সর্বকনিষ্ঠ নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। বিখ্যাত ক্যানেডি পরিবারের সন্তান তিনি। ছেলেবেলা থেকে ইচ্ছা ছিল লেখক হওয়ার। সদা লাজুক ক্যানেডির রাজনীতিতে আসার ইচ্ছা ছিলনা কখনও। তারপরও আমেরিকার ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত প্রেসিডেন্ট তিনি। তাঁর সুদর্শন, রুচিশীল, ভদ্র, উচ্চশিক্ষিত ইমেজের পাশাপাশি আরেকটি ইমেজ হয়ত অনেকের কাছেই অজানা। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জন্যও তিনি ছিলেন ব্যাপকভাবে পরিচিত। জগৎ বিখ্যাত সুন্দরী মেরিলিন মুনরোর সাথে ছিল তাঁর গভীর প্রণয়। মুনরো ছাড়াও জাইনি ম্যানসফিল্ড, ওডেরি হেপবার্ন, এঞ্জি ডিক্সন সহ অনেক সেলিব্রেটির শয্যাসঙ্গী ছিলেন প্রেসিডেন্সির মাত্র বছরের ৩ বছরের মাথায় আততায়ীর গুলিতে নিহত হওয়া জন এফ ক্যানেডি।
বহুমুখী প্রতিভাধর আব্রাহাম লিঙ্কন
আব্রাহাম লিঙ্কনের নাম শুনেননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। আমেরিকা থেকে দাস প্রথা নিষিদ্ধ করে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন লিঙ্কন। এছাড়া আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার কারণে তাঁর জীবনকে ঘিরে রয়েছে নানা জল্পনা কল্পনা। তবে লিঙ্কনের ঘটনা বহুল জীবন পাঠকের জন্য বরাবরই বিস্ময়ের। প্রথম জীবনে এই প্রসিডেন্ট ছিলেন ভয়ংকর মুষ্টিযোদ্ধা। প্রায় ৩০০ মত যুদ্ধে লড়ে হেরেছিলেন মাত্র একটিতে। এছাড়া তাঁর নামে একটি পেটেন্টও আছে। মজার ব্যাপার হল মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে লম্বা প্রেসিডেন্টের খেতাবটিও কিন্তু তাঁর। ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার লিঙ্কনকে শুধু কীর্তিতে নয় শারীরিক উচ্চতায়ও আজ পর্যন্ত হারাতে পারেনি কোন প্রেসিডেন্ট! কোন প্রেসিডেন্টের ইনোগুরেশন অনুষ্ঠানে তোলা প্রথম ছবিটিও কিন্তু তাঁরই। এর আগে কোন প্রেসিডেন্টের ইনাগুরেশনে ছবি তোলা হয়নি। সেই ছবিতে ভবিষ্যৎ আততায়ীর সাথে একই ফ্রেমে বন্দী হয়েছিলেন আব্রাহাম লিঙ্কন।
সবচেয়ে ভাগ্যবান প্রেসিডেন্ট
জেরাল্ড ফোর্ড ভাগ্য যাকে টেনে এনেছিল আমেরিকার প্রেসিডেন্টের চেয়ারে। প্রথমে কোন প্রকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ গ্রহণ ছাড়াই ভাইস প্রেসিডেন্ট পদের স্থালাভিষিক্ত হন ভাইস প্রেসিডেন্ট স্পিরো ইগ্নেউ পদত্যাগ করার পর। তার মাত্র এক বছর পর ওয়াটার গেট কেলেঙ্কারিতে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের পদত্যাগের পর তিনিই গ্রহণ করেন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব। আজ অবধি তিনি একমাত্র ব্যক্তি যিনি কোন নির্বাচনে না জিতেও প্রেসিডেন্ট হিসাবে ঠাই পেয়েছিলেন হোয়াইট হাউসে।
সবচেয়ে মোটা ও পাতলা প্রেসিডেন্ট
জেমস ম্যাডিসন আদ্যবধি আমেরিকার সবচেয়ে খাটো প্রেসিডেন্ট যার উচ্চতা ছিল ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি। ম্যাডিসনের ওজনও কোনদিন ১০০ পাউন্ডের বেশি ছিলনা। তবে সবচেয়ে মোটা প্রেসিডেন্ট ছিলেন উইলিয়াম হাওয়ার্ড ট্যাফট। যিনি “বিগ বিল” নামেই বেশি পরিচিত। ৩২৫ পাউন্ড ওজনের এই বিশাল বপু অধিকারী প্রেসিডেন্ট প্রায়ই হোয়াইট হাউজের বাথটাবে আটকে যেতেন। তারপর উপদেষ্টরা তাকে টেনে উদ্ধার করে আনত এহেন বিব্রতকর দশা থেকে।
টেডি বেয়ার যখন প্রেসিডেন্ট
থিওডর রুজভেল্টের ডাক নাম ছিল টেডি। তাঁরই নামানুসারে একটি খেলনা কোম্পানি পুতুল ভাল্লুকের নাম টেডি বেয়ার রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আর সেই থেকে আজ অবধি কোটি কোটি শিশুর খেলার সাথী টেডি বেয়ারের সাথে অমর হয়ে আছেন থিওডর রুজভেল্ট।
প্রেসিডেন্ট পরিচয় প্রত্যাখান করেছেন যিনি
টমাস জেফারসন আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় মানুষদের একজন। আমেরিকার অন্যতম ফাউন্ডিং ফাদার। দুই বারের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। তবে নিজের সমাধি ফলকে নিজের প্রেসিডেন্ট পরিচয়ে নিজেকে পরিচিত করতে চান নি আমেরিকার মহান এই নেতা। বরং তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর সমাধিতে তাকে পরিচিত করা হয়েছে এভাবে –এখানে শায়িত আছে টামস জেফারসন, আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র ও ভার্জিনিয়ার ধর্মীয় স্বাধীনতা খসড়ার লেখক এবং ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থপতি।
টমাস জেফারসনের এই সমাধি ফলক আমাদের একটি প্রশ্ন মনে করিয়ে দেয় মৃত্যুর পর এই পৃথিবীর কাছে আমরা কীভাবে পরিচিত হতে চাই? মারা যাওয়ার পর পৃথিবীকে জানানোর মত কোন কাজ কি আমরা করতে পেরেছি কি? @ Shakib Mustavee
১৭
যেভাবে গড়ে উঠেছিল প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্য
পৃথিবীতে যতগুলো প্রাচীন সভ্যতা বা সাম্রাজ্য আছে, তাদের মধ্যে রোমান সাম্রাজ্য অনন্য। আইনের প্রকৃত শাসনের সূতিকাগার এই সাম্রাজ্য। তারা সমৃদ্ধ করেছে শিল্প, সাহিত্য, ভাষার জগত। উপহার দিয়েছে পরি-কাঠামো। তবে গৌরবময় এই সাম্রাজ্যের শুরু কিন্তু সাম্রাজ্য হিসেবে হয়নি। হয়েছিল বসতি হিসেবে। প্রাচীন বিশ্বের ক্ষমতাধর জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশের আগে, তাদেরকে পারি দিয়ে দিতে হয়েছে অনেকটা পথ। প্রাক-রোমান সময়ে কেমন ছিল সেকালের লোকদের জীবনযাত্রা, চলুন দেখে নেওয়া যাক।
প্রাচীন রোম
ইতালিয়ান উপদ্বীপের বিস্তৃতি ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত। তিন দিক থেকে সমুদ্র ঘিরে রেখেছে দেশটাকে- পশ্চিমে টাইরেনিয়ান সাগর, দক্ষিণে আয়োনিয়ান সাগর এবং পূর্বে অ্যাড্রিয়াটিক সাগর। উপদ্বীপের মধ্যখানটির প্রায় পুরোটাই দখল করে আছে অ্যাপেনাইন পর্বতমালা। টাইবার, ইতালির সর্ববৃহৎ নদী, ইতালির পশ্চিম উপকূলকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। পর্বত থেকে জন্ম নেওয়া এই নদীটি শুরুর দিকে প্রশস্ত হলেও, ধীরে ধীরে তা সরু হয়ে গিয়েছে। আজকের রোমসহ টাইবার নদীর দক্ষিণের এলাকাটুকু এককালে পরিচিত ছিল ল্যাটিয়াম নামে।
নৃতাত্ত্বিক গবেষণা অনুসারে এই ল্যাটিয়ামে প্রথম মানুষের পা পড়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব এগারো শতকে। এই মানুষগুলো ছিল যাযাবর, মূল ইউরোপ থেকে আগত। কথা বলতো ইন্দো-ইউরোপিয়ান ভাষায়। ল্যাটিয়ামে তারা গৃহপালিত ভেড়ার জন্য পেয়েছিল চারণভূমি, আবার কৃষিকাজের জন্য জায়গাটাও ছিল উর্বর। এদিক ওদিক মিলিয়ে বসবাসের জন্য উপযুক্ত। এর অবস্থান বর্তমান রোমের ১৫ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে।
খ্রিষ্টপূর্ব ৮৫০ অব্দের দিকে দেখা গেল, এই প্রাচীন মানুষদের অনেকেই সেখান থেকে সরে গিয়ে বাসা বেঁধেছে অন্য এক এলাকায়। সেই এলাকাটিই আজকের রোম। প্রথম বসতি হয় যেখানে, সেটাই পরবর্তীতে রূপ নেই রোম নগরীর। প্রথম দিককার কৃষক এবং রাখালরা মন দেয় গম, বজারি এবং বার্লি উৎপাদনের কাজে। ভেড়া চড়াবার ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিল চারপাশের পাহাড়ি তৃণভূমি। সাতটা পাহাড় ছিল সেখানে; উত্তরে আছে কুইরিনাল, ভিমিনাল, এস্কুইলাইন এবং কেইলিয়ান পাহাড়। টাইবার নদীর মাঝে আছে প্যালাটাইন পাহাড় এবং ক্যাপিটোলাইন পাহাড়। একেবারে দক্ষিণের আছে অ্যাভেনটাইন পাহাড়। সেখানে বসবাসের জন্য ছোট-ছোট উপবৃত্তাকার কিংবা গোলাকার কুটির বানিয়ে সেগুলোকে ঢেকে দিল তারা নলখাগড়া, কাদা এবং ডাল-পালা দিয়ে। তারপর সেই বসতিকে ঘিরে দেওয়া হলো বেড়া দিয়ে। আরো পরে যেখানে স্থাপন করা হয় পাথরের দেয়াল। সাত পাহাড়ের পাদে আবাস তৈরি করা সেটলাররাই পরবর্তীতে পরিচিত হয় ‘ল্যাটিন’ নামে।
আরেকটা গোত্র, এদের নাম স্যাবিন। খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০ অব্দের আগেই বসতি গেড়েছিল এই অঞ্চলের অ্যাপেনাইন পাহাড়ের পাদদেশে। এদের ভাষাও ছিল ইন্দো-ইউরোপিয়ান। তবে এরা ল্যাটিনদের চেয়ে কিছুটা আলাদা। একপর্যায়ে দুই প্রতিবেশীর দেখা হলো। মাধ্যম হিসেবে কাজ করলো তাদের পশুদের চারণক্ষেত্র। আস্তে-আস্তে স্যাবিনরা এসে বাস করতে লাগল এস্কুইলাইন এবং কুইরিনাল পাহাড়ে। একপর্যায়ে তারা মিশেও গেল ল্যাটিনদের সঙ্গে। প্রথম দিককার সেটলাররা টাইবার নদীর পূর্ণ সুবিধা নিয়ে মন দিল ভ্রমণ এবং ব্যবসায়। তাদের মাঝে থেকে জন্ম নিতে লাগল বণিক এবং শিল্পী সত্ত্বা। ইতালির অন্যান্য অংশের তখন মানুষ বাসা বাধছিল। এদের মধ্যে অন্যতম ছিল গ্রিক। বেশ বড় এলাকা নিয়ে বসতি স্থাপন করে তারা। সময়টা ছিল ৭৫০ খ্রিষ্টপূর্ব। স্থান ছিল বে অব নেপলস-এর কাছে, কুমাই অঞ্চলে।
এট্রুসকানদের কথা
টাইবারের দক্ষিণ দিকে বসতি স্থাপন করে ল্যাটিনরা। তার এক কি দুই শতাব্দী আগে এর উত্তর দিকে বাসা বাধে আরেকদল মানুষ। এট্রুরিয়া নামক এই এলাকার অধিবাসীদের ডাকা হতো এট্রুসকান নামে। ল্যাটিন প্রতিবেশীদের চাইতে অনেক এগিয়ে ছিল এরা। তাই ল্যাটিন সংস্কৃতিতে রেখেছে তাদের প্রভাব। নগর-রাষ্ট্র স্থাপন করে তারা। এলাকার শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করত এই নগর-রাষ্ট্রগুলো।
প্রচলিত মত অনুযায়ী, তারা এসেছিল এশিয়া মাইনরের লিডিয়া থেকে। সেখানকার এক রাজকুমার, টাইরহেনাস-এর নেতৃত্বে। আবার অনেকের মতে, তারা বহিরাগত নয়, ইতালিরই মানুষ। সে যাই হোক, ইন্দো-ইউরোপিয়ান ভাষায় কথা বলত না তারা। তাদের লেখ্য কোনো নথি কিংবা সাহিত্যও পাওয়া যায় না। যা পাওয়া গিয়েছে, তা সবই ছোট-ছোট বাক্য। অনেকটা ঘোষণা ধরনের।
ইতিহাস বলে, নিজেদেরকে তারা পরিচয় দিত ‘রাসেননা’ বলে। তবে রোমানদের কাছে তাদের পরিচয় ছিল ‘এট্রুসকি’ বা ‘টুসকি’, গ্রিকদের কাছে ‘টাইরেনিয়ানস’ বা ‘টাইসেনিয়ানস’। আধুনিক কালে ইতালিয়ান এলাকা টাসকানি’র নামকরণ হয়েছে রোমানদের দেওয়া টুসকি থেকে। খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম থেকে পঞ্চম শতাব্দীতে তারা পৌঁছে যায় তাদের সভ্যতার শীর্ষে। পরবর্তীতে যার পতন ঘটে খ্রিষ্টপূর্ব ২৬৪ সনে, ভলসিনি নামক নগরী ধ্বংসের সাথে।
সতেরো শতকের শুরুর দিকে, টাইবারের ল্যাটিন সমাজ আর দক্ষিণ দিককার ল্যাটিন সমাজগুলো একীভূত হতে শুরু করল। এদিকে উত্তর অংশের এট্রুসকান নগর-রাষ্ট্রগুলো হচ্ছিল শক্তিশালী। একপর্যায়ে ক্যাম্পানিয়া এবং ল্যাটিয়াম দখল করে নিল তারা। পরবর্তী দেড়শো বছর, রোম ছিল এট্রুসকানের অধীনে।
আরও দক্ষিণে গিয়ে সরাসরি গ্রিকদের সঙ্গে মোলাকাত হয় এট্রুসকানদের। প্রথমদিকে গ্রিক শত্রুদের মোকাবেলায় এগিয়েই ছিল তারা, কিন্তু একসময় আর কুলিয়ে উঠতে পারেনি। পতন হতে শুরু হয় তাদের। এই সুযোগে বিদ্রোহ করে বসে রোম। খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ সনে স্বাধীনতা লাভ করে তারা।
তবে রোমের উপর এট্রুসকানদের প্রভাব অনস্বীকার্য। এদের কাছ থেকে মন্দির নির্মাণের পদ্ধতি শেখে তারা। সম্ভবত এই সভ্যতার প্রধান তিন দেবতা থেকেই উদ্ভূত হয়ে রোমানদের প্রধান তিনি উপাস্য- ইউনি থেকে জুনো, মেনর্ভা থেকে মিনার্ভা এবং টিনিয়া থেকে জুপিটার।
আজও টিকে আছে এট্রুসকান সভ্যতার কিছু চিহ্ন, তাদের মাঝে বিখ্যাত হচ্ছে লাজিও-তে অবস্থিত টারকুইনিয়া। ওখানকার নেক্রোপলিস, তথা ‘মৃতদের শহর’ হচ্ছে দক্ষিণ ইউরোপের সবচেয়ে ভালভাবে সংরক্ষিত সমাধিক্ষেত্রের একটি। সেখানে গেলে এমনসব চিত্রকর্ম দেখা যায়, যাদেরকে বলা হয়ে থাকে- ইতালীয় চিত্রকর্মের প্রথম অধ্যায়। পেরুজিয়াতে অবস্থিত এট্রুসকান কূপ আজও টিকে আছে সভ্যতাটির স্থাপত্যকর্মের বিশেষত্বের সাক্ষী হয়ে।
প্রাথমিক রোমান ধর্ম
প্রথম দিকে রোমানরা পেশায় ছিল প্রধানত কৃষক এবং রাখাল। দিনের অধিকাংশ সময় তারা ব্যয় করত ঘরের বাইরে। তারা জানত না- কেন প্রায়ই বন্য এবং খরা তাদের সমাজকে তছনছ করে দিয়ে যায়। জানত না বজ্রপাতের কারণ, জানত না কেন প্রকৃতি তার রূপ বদল করে সময়ে সময়ে, ঋতুতে ঋতুতে। অথচ এই রহস্যময় শক্তিগুলোর কারণে তাদের জীবনে আসত মারাত্মক সব পরিবর্তন। তাই একপর্যায়ে তারা শুরু করে নানা দেবতার প্রার্থনা। তাদের বিশ্বাস ছিল এই যে দেবতারা মানুষের আশপাশেই বাস করেন- ক্ষেত্রে, বনে, এমনকি তাদের নিজেদের বাড়িতেও। নিজেদেরকে অশুভের হাত থেকে রক্ষা করতে, এবং এই প্রবল ক্ষমতাশালী দেবতাদেরকে তুষ্ট করতে রোমানরা উপাসনা করত সাধারণ বেদিতে। উৎসর্গ হিসেবে সেখানেই তারা রেখে দিত খাবার, পানীয় এবং সুগন্ধি। সেখান থেকে ধীরে ধীরে বিকাশ লাভ করতে থাকে তাদের ধর্মচর্চা। @ Md. Fuad Al Fidah
১৮
মঙ্গোল থেকে তুর্কি: খানদের দ্বারা খানাত শাসনের বিচিত্র ইতিহাস
ভারতীয় উপমহাদেশে ‘খান’ উপাধিকে বেশ আভিজাত্যের প্রতীক বলেই মনে করা হয়। মূলত খানাত শাসকদেরকে ‘খান’ নামে ডাকা হত। কথাটি ঘুরিয়ে বললে দাঁড়ায়- খানরা যে অঞ্চল শাসন করত তাকেই খানাত বলা হত। খানাত হলো সাম্রাজ্যের একটি বিস্তৃত প্রশাসনিক অঞ্চল। একটি সাম্রাজ্য অনেকগুলো খানাতে বিভক্ত থাকত। সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় শাসকের পাশাপাশি প্রত্যেকটি খানাতে একজন নির্দিষ্ট শাসক থাকত। খানাতের শাসকগণ আবার সর্বদা কেন্দ্রীয় শাসকের অনুগত থাকত। সহজভাবে বলতে গেলে, এটা ছিল অনেকটা প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থার মতো।
মঙ্গোল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অনেক পূর্বেই বেশ কয়েকটি খানাতের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। সেসবের মধ্যে রোরা খানাত ছিল সবচেয়ে প্রাচীন। রোরা খানাত প্রতিষ্ঠিত হয় চতুর্থ শতকের শুরুর দিকে। মূলত মঙ্গোলীয় আদিবাসীদের দ্বারা এই খানাত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই খানাত স্থায়ী ছিল প্রায় ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত। সেসময় গুরতুর্ক বিদ্রোহের মাধ্যমে এই খানাতের বিলুপ্ত হয়। পরবর্তীতে এর মধ্য দিয়েই উত্থান ঘটে তুর্কিদের।
চেঙ্গিস খানের উত্থানের পূর্বে মঙ্গোলরা একক কোনো জাতি ছিল না। একাধিক গোষ্ঠী এবং গোত্রে বিভক্ত থেকে তারা যাযাবর জীবনযাপন করত। পুরো মঙ্গোলীয় স্তেপ জুড়ে তাদের ছোট ছোট অসংখ্য যাযাবর গোষ্ঠী ছিল, যারা সুযোগ পেলেই পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোতে ছোটখাট হামলা করে বসত। ডাকাতি আর লুটপাটই ছিল তাদের অনাড়ম্বরভাবে বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা।
দশম শতাব্দীর দিকে ‘খামাগ’ নামে একটি খানাত প্রতিষ্ঠিত হয়। বিস্তৃত মঙ্গোল যাযাবর গোষ্ঠীগুলো তখন অনন, খেরলেন ও তুল নদীর অববাহিকায় বসতি স্থাপন করে। মঙ্গোল যাযাবরদের সমন্বয়ে মঙ্গোলিয়ান স্তেপ জুড়ে বিস্তৃত এই শাসনাঞ্চল খামাগ খানাত নামে পরিচিত ছিল, মঙ্গোলদের ইতিহাসে যা সর্বপ্রথম খানাত। তবে খানাতের সবচেয়ে ব্যাপক প্রচলন ও বিস্তার ঘটে মঙ্গোল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর। মঙ্গোল সাম্রাজ্যে খানাতের এর উৎপত্তি ঘটে চেঙ্গিস খানের আপানিজ ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে। আপানিজ ছিল এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে মঙ্গোল সাম্রাজ্যের অধিপতি চেঙ্গিস খানের স্ত্রী, পুত্র, কন্যা এবং দৌহিত্রগণ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশের অংশীদার হয়ে যান। বিস্তৃত সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রশাসনিক অঞ্চলের শাসনভার দেওয়া হয় একেকজনের হাতে। সাম্রাজ্যের এই প্রত্যেকটি অংশকে তখন খানাত নামে অভিহিত করা হয়। এভাবে মঙ্গোল সাম্রাজ্যে খানাতের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটে। মঙ্গোল সাম্রাজ্য ছাড়াও আফসারি, তিমুরী, তুর্কি এবং সালাভি সাম্রাজ্যে খানাতের বিস্তার লক্ষ্য করা যায়।
মঙ্গোল খানাত
১২০৬ সালে চেঙ্গিস খানের হাত ধরে মঙ্গোল সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটে। এটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধমানশীল সাম্রাজ্য। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রায় একশ বছরের মধ্যেই সমস্ত পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া এবং মধ্য ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি ছিল সর্ববৃহৎ অবিচ্ছিন্ন স্থলবেষ্টিত সাম্রাজ্য, ত্রয়োদশ শতকেই যার আয়তন পৌঁছে যায় প্রায় ২ কোটি ৩০ লক্ষ বর্গ কিলোমিটারে।
চেঙ্গিস খানের পূর্বনাম ছিল তেমুজিন। মূলত, খানাত বা খাগানাত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মঙ্গোল সাম্রাজ্যের অধিপতি তেমুজিন ‘চেঙ্গিস খান’ নামে আবির্ভূত হয়। মঙ্গোল সাম্রাজ্যের খানাতগুলোর অধিপতিদের উপাধি ছিল খান। যেহেতু চেঙ্গিস খান ছিলেন সমগ্র মঙ্গোল সাম্রাজ্যের অধিপতি, সেজন্য তার উপাধি ছিল ‘খাগান’ বা ‘খানদের খান’। এটা ছিল অনেকটা পার্সী ‘শাহেনশাহ’-এর মতো, যার অর্থও ছিল ‘রাজাদের রাজা’। তবে সংক্ষেপে তিনি চেঙ্গিস খান নামেই অধিক পরিচিত।
যেহেতু চেঙ্গিস খান মঙ্গোল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন, এজন্য মঙ্গোলরা তাকে জাতির পিতা হিসেবে মান্য করে। মঙ্গোল সাম্রাজ্যের বিজয়াভিযান শুরু হয় চেঙ্গিস খানের আমল থেকেই। সেসময় তিনি চীনা সাম্রাজ্যসমূহ, খোয়ারিজমীয় সাম্রাজ্য, পারস্য এবং পশ্চিম এশিয়ার তুর্কি গোত্রসমূহের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। মঙ্গোলদের বিধ্বংসী এবং দুর্দমনীয় আক্রমণের সামনে কোনো সাম্রাজ্যই বেশিদিন টিকতে পারেনি। তাদের বিজয়াভিযান পৌঁছে যায় মধ্য ইউরোপ পর্যন্ত। ১২২৭ সালে চেঙ্গিস খানের মৃত্যুর আগপর্যন্ত ২১ বছর ধরে মঙ্গোলরা এশিয়া এবং ইউরোপে মুসলিম গোত্র ও সাম্রাজ্যগুলোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এবং সমৃদ্ধ করে মঙ্গোলীয় জাতিকে।
চেঙ্গিস খানের মৃত্যুর পরও মঙ্গোলদের বিজয়াভিযান অব্যাহত থাকে। তার উত্তরসূরিরা পোল্যান্ড থেকে কোরিয়া পর্যন্ত এই বিশাল ভূখণ্ড চষে বেড়িয়েছেন। নিজেদের আয়ত্বে নিতে সক্ষম হন আজকের ইরাক, ইরানসহ তৎকালীন আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের অধিকাংশ ভূখণ্ড। ১২৫৯ সালে মঙ্গু খানের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মঙ্গোল সাম্রাজ্যের ভাঙন শুরু হয়। ১২৯০ সালের মধ্যেই বিস্তীর্ণ এই সাম্রাজ্য চার ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যা ছিল- ইউয়ান সাম্রাজ্য, চাগতাই খানাত, সোনালি সাম্রাজ্য, ইলখানদের এলাকা।
গোল্ডেন হোর্ড
গোল্ডেন হোর্ড মঙ্গোলীয় সাম্রাজ্যের একটি ঐতিহাসিক খানাত। এটি মূলত মঙ্গোলীয় সাম্রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হলেও ত্রয়োদশ শতকে এসে যখন মঙ্গোল সাম্রাজ্যে ভাঙন দেখা দেয়, তখন এটি স্বতন্ত্র স্বাধীন খানাতে পরিণত হয়। তুর্কিদের উত্থানের পর এটি তাদের সাম্রাজ্যের অধীনে চলে যায়। ১৩১৩ সালে এটি তুর্কিদের অধীনে আসলে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৩১৪ সালে এর সর্বোচ্চ আয়তন প্রায় ৬০ লক্ষ বর্গ কিলোমিটারে পৌঁছে যায়। আজকের সার্বিয়া, জর্জিয়া, বুলগেরিয়া, তুর্কমেনিস্থান, মধ্য ইউরোপের বিস্তৃত অঞ্চল এ শাসনব্যবস্থার অধীনে ছিল। ১২৪২ সাল থেকে ১২৫৬ পর্যন্ত গোল্ডেন হোর্ডের শাসক ছিলেন বাতু খান। তার মৃত্যুর পর তার ভাই বারকা খান গোল্ডেন হোর্ডের শাসক হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ করেন। বাতু খান এবং বারকা খান উভয়েই ছিলেন চেঙ্গিস খানের নাতি। মূলত আপানিজ ব্যবস্থার মাধ্যমে এ অঞ্চলের শাসনভারের দায়িত্ব পড়ে বাতুর ওপর।
মঙ্গোলদের মধ্যে ১২৫২ সালে সর্বপ্রথম বারকা খান ইসলাম গ্রহণ করেন। বারকা খানের ইসলাম গ্রহণের মধ্য দিয়েই ‘খান’ উপাধিটি মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি লাভ করে। ‘খান’ উপাধি ছড়িয়ে পড়তে থাকে তুর্কিদের মধ্যেও। এরপর ১২৬৬ সাল থেকে ১২৮০ সাল পর্যন্ত গোল্ডেন হোর্ড শাসন করেন বাতু খানের নাতি মেনগু-তৈমুর। কারণ বারকা খানের কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। পরবর্তীতে বিভিন্ন উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে এটি অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে চলে আসে। @ Shakil Ahmed
১৯
প্রাচীন মিশরের ফারাওদের অদ্ভুত যত কাহিনী
মিশর নামক দেশটির নাম শুনলে আমাদের মানসপটে প্রথমেই যে দুটি চিত্র ভেসে ওঠে তা হলো ‘পিরামিড’ ও ‘মমি’। তবে এর সাথে আরেকজন ব্যক্তির পদবীও আমাদের মনে মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে যায়, তিনি হলেন ফারাও। মিশরের উচ্চ ও নিম্নভূমির শাসক ছিলেন ফারাও।
আজ তেমনই কয়েকজন ফারাওকে নিয়ে লিখছি। তাদের বিশেষত্ব ছিলো জীবদ্দশায় করা তাদের অদ্ভুত কিছু কাজ-কারবার। কিছু কাজের কথা শুনে যেমন বিস্মিত না হয়ে থাকা সম্ভব না!
মেন্কৌরের মৃত্যুভীতি
আনুমানিক ২,৫৩০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে প্রাচীন মিশরের রাজার আসনে বসেছিলেন মেনকৌর। ১৮-২২ বছর ধরে রাজত্ব করা মেন্কৌর বিখ্যাত হয়ে আছেন গিজার ‘মেনকৌরের পিরামিড’-এর জন্য। মৃত্যুকে সবসময়ই বেশ ভয় পেতেন এ রাজা, চাইতেন যেকোনোভাবে এর নাম না শুনতে, এর হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে। একবার এক পুরোহিত এসে তাকে জানিয়েছিলো যে, তিনি সর্বসাকুল্যে আর ছয় বছরের মতো বাঁচবেন।
এ কথা শুনে মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে মেন্কৌরের। মৃত্যুকে যেকোনোভাবে এড়াতে নানা রকম ফন্দি-ফিকির করতে লাগলেন তিনি। রাজা ভেবে দেখলেন, যদি রাত শেষ না হয়, তাহলে নতুন দিন কখনো শুরু হবে না। যদি নতুন দিন শুরু না হয়, তাহলে সময়ও আর চলতে পারবে না। আর সময় যদি চলতে না পারে, তাহলে তার মৃত্যুও হবে না!
এরপর থেকেই শুরু হয় মেন্কৌরের অদ্ভুত কাজ-কারবার। জীবনের বাকি দিনগুলো রাতের বেলায় তিনি যত পারতেন আলো জ্বালিয়ে রাখতেন যাতে রাতকেও দিনের মতোই মনে হয়। রাতে সচরাচর ঘুমাতেন না তিনি। পান করে আর হৈ-হুল্লোড়ের মধ্য দিয়েই কাটিয়ে দিতেন প্রতিটি রাত। মাথার মাঝে সারাক্ষণ একটা ভয়ই কাজ করতো তার- ‘এই বুঝি আলো নিভে গেলো!’
আখেনাতেনের আমার্না
খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্দশ শতকের দিকে প্রায় সতের বছর মিশরের অধিপতি ছিলেন আখেনাতেন। তিনি সিংহাসনে বসার পূর্বে মিশরীয়রা অনেক দেবতার পূজা করতো। কিন্তু তিনি ক্ষমতায় এসে ওগুলো সব নিষিদ্ধ ঘোষণা করে একমাত্র সৌর দেবতা আতেনের উপাসনা চালু রাখেন। মূলত এমন যুগান্তকারী পদক্ষেপের কারণেই ইতিহাস তাকে স্মরণে রেখেছে।
আতেনের সম্মানে আখেনাতেন নতুন এক শহর নির্মাণে হাত দিয়েছিলেন, নাম তার আমার্না। প্রায় ২০,০০০ লোককে এ শহর নির্মাণের কাজে নিয়োজিত করা হয়েছিলো। দিন-রাত অমানুষের মতোই পরিশ্রম করা লাগতো সেই দুর্ভাগাদের। শহরের কবরস্থানে পাওয়া কঙ্কালগুলো নিয়ে গবেষণা করে দেখা গেছে যে, শ্রমিকদের দুই-তৃতীয়াংশেরই কাজ করার সময় কোনো না কোনো হাড় ভেঙেছিল।
শহরের অধিবাসীদের অধিকাংশই অনাহারে, অর্ধাহারে দিন কাটাতো। তাদের অধিকাংশই ছিলো অপুষ্টির শিকার। তবে এ নিয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো মাথাব্যথা ছিলো না। তারা ব্যস্ত ছিলো আমার্নার সৌন্দর্য বর্ধন নিয়েই। যদি কেউ পেটের দায়ে লাইন ভেঙে কিছু বাড়তি খাবার চুরির চেষ্টা চালাতো, তাহলে ক্রমাগত ছুরিকাঘাত করতে করতেই শেষ করে দেয়া হতো তাকে।
এতকিছু করেও অবশ্য লাভ হয়নি শেষ পর্যন্ত। আখেনাতেনকে মন থেকে মেনে নিতে পারে নি মিশরের অধিবাসীরা। মৃত্যুর পর তাই আখেনাতেনের মূর্তির অনেকগুলোই ভেঙে ফেলা হয়েছিলো, কিছু কিছু লুকিয়েও রাখা হয়েছিলো। রাজাদের তালিকাতেও ঠাই দেয়া পায়নি তার নাম। মিশর আবার তার আগের বহু ঈশ্বরের আরাধনাতেই ফিরে গিয়েছিলো।
সেসোস্ত্রিসের অদ্ভুত স্মৃতিফলক
মিশরের ইতিহাসের অন্যতম সেরা সামরিক কমান্ডার হিসেবে বিবেচনা করা হয় সেসোস্ত্রিসকে। তৎকালীন জ্ঞাত পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই তিনি তার বাহিনী পাঠিয়েছিলেন। তার রাজ্য তৎকালে এতটাই বিস্তৃত হয়েছিলো যা কেউ কল্পনাও করতে পারতো না। প্রতিটি যুদ্ধে জয়ের পরই সেসোস্ত্রিস সেই জায়গায় একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করে আসতেন। সেখানে প্রথমেই শুরু হতো তাঁর পরিচয় দিয়ে। তিনি কে, কীভাবে তিনি তার শত্রুদের পরাজিত করেছেন এবং কীভাবে তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে দেবতারা এ আক্রমণে তার পক্ষেই থাকবেন- এসব বিষয়েই লেখা থাকতো নানা দম্ভোক্তি। এরপরই করা হতো সবচেয়ে অদ্ভুত কাজটি। যদি শত্রুপক্ষ সেসোস্ত্রিসের বাহিনীর সাথে বীরের মতোই যুদ্ধ করে হারতো, তাহলে সেই স্তম্ভে এঁকে দেয়া হতো পুং জননাঙ্গের ছবি! আর যদি তারা বলার মতো প্রতিরোধ করতে না পারতো, তাহলে আঁকা হতো স্ত্রী জননাঙ্গের ছবি!
অ্যাক্টিসেন্সের নাক কাটাদের শহর
বিদ্রোহের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসলেও এই বিদ্রোহই আবার ক্ষমতাচ্যুত করেছিলো দ্বিতীয় আমাসিসকে। বেশ রুক্ষ মেজাজের শাসক ছিলেন তিনি। তার শাসনে অতিষ্ট হয়ে একসময় তাকে উচ্ছেদ করে দেশবাসী। সেই উচ্ছেদ অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এক ইথিওপিয়ান, নাম তার অ্যাক্টিসেন্স। পরবর্তীতে তিনিই হয়েছিলেন মিশরের রাজা। ক্ষমতায় বসেই অপরাধীদের শায়েস্তা করতে নতুন উপায় খুঁজতে শুরু করেন অ্যাক্টিসেন্স। অবশেষে তিনি এমন এক উপায় বের করেছিলেন যা একজন অপরাধীকে আজীবন স্মরণ করাতে থাকবে তার কৃতকর্মের কথা। অ্যাক্টিসেন্স ঘোষণা দেন যে, এখন থেকে রাজ্যে যত অপরাধী ধরা পড়বে, সবারই নাক কেটে দেয়া হবে। শুধু তাই না, অপরাধীকে এরপর পাঠিয়ে দেয়া হবে শুধুমাত্র অপরাধীদের জন্যই বানানো এক শহরে; নাম তার রাইনোকলুরা। সারা শহর জুড়ে কেবল নাক কাটা লোকদেরই বসবাস! শহরের পরিবেশও জনস্বাস্থ্যের জন্য খুব একটা উপযোগী ছিলো না। পান করার পানি ছিলো দূষিত। বেশ মানবেতর জীবন কাটাতে হতো সভ্য সমাজ থেকে রাইনোকলুরায় স্থান পাওয়া অপরাধীদের।
দ্বিতীয় রামেসিসের বিয়েপ্রীতি
মিশরীয় সাম্রাজ্যের ফারাওদের মাঝে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও ক্ষমতাশালী ছিলেন দ্বিতীয় রামেসিস। তিনি বেঁচে ছিলেন প্রায় একানব্বই বছর ধরে। তৎকালের অধিকাংশ ফারাওই গুপ্তঘাতকদের হাতে নিহত হয়ে যেত। কিন্তু রামেসিসকে এতদিন ধরে বেঁচে থাকতে দেখে তার রাজ্যের লোকেরা ভাবতে শুরু করেছিলো যে, তিনি বোধহয় কোনোদিনই মরবেন না! ৬৬ বছর ধরে রাজত্ব করা দ্বিতীয় রামেসিস মৃত্যুর আগে নিজের ভাষ্কর্য বানানোর দিক যেমন অতীতে অন্য সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন, তেমনি ছাড়িয়েছিলেন স্ত্রীর সংখ্যার দিক দিয়েও।
মৃত্যুর আগে কম করে হলেও নয়জন স্ত্রী ও একশ সন্তান রেখে গিয়েছিলেন তিনি। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, তার এ বিয়ের বাসনা থেকে মুক্তি পায়নি স্বীয় সন্তানেরাও। নয় স্ত্রীর মাঝে তিনজন ছিলো তার নিজেরই মেয়ে। @ Muhaiminul Islam Antik
২০
প্রাচীন গ্রিসে অদ্ভুতভাবে মৃত্যুবরণ করা বিখ্যাত ব্যক্তিরা
অপমানিত হয়ে ফাঁসিতে ঝুলে পড়া
হিপোনাক্স ছিলেন একজন কবি, হিপোনাক্সের কবিতাগুলো ঘেঁটে দেখলে নগ্নতা আর অশ্লীল বাক্য ছাড়া অন্য কিছু খুঁজে পাওয়াও গোবরে পদ্মফুল খুঁজে পাওয়ার শামিল। যা-ই হোক, এই হিপোনাক্সকে ইতিহাসের অন্যতম কুৎসিত চেহারার অধিকারী বলে মনে করা হয়। তাই তিনি তার ভালোবাসার মানুষটিকে প্রস্তাব পাঠানোর পর প্রত্যাখ্যাত হবেন এমনটা অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে সবাই ভেবেছিল, হিপোনাক্স সাধারণদের মতোই অন্য কাউকে খুঁজে নেবে। কিন্তু হিপোনাক্স বেছে নিলেন অন্য পথ। তার কুরুচিশীল কবিতাগুলোর শিকার হলেন তার বাবা বুপালাস! হিপোনাক্স তার খারাপ চেহারার জন্য দায়ী করলেন তার বাবাকেই। এই বিখ্যাত গ্রিক ভাস্কর তার ছেলের করা অপমানে শেষমেশ আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন।
নিজের কৌতুকে নিজেই হেসে মারা যাওয়া
প্রাচীন গ্রিসের সেরা দার্শনিকদের নামের তালিকায় ক্রিসিপাসের নামটা দেখা আশ্চর্যের কিছু নয়। দর্শনশাস্ত্র, পদার্থবিদ্যা এবং নীতিশাস্ত্র নিয়ে গবেষণা করা এই বিদ্বান যদিও বাস্তব জীবনে খুবই অহংকারী ছিলেন, তা সত্ত্বেও ক্রিসিপাসের গুণ মোটেই কম না। ৭৩ বছরের জীবনে তিনি প্রায় ৭৫০ বই রচনা করেছেন, এর বেশিরভাগই কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। তার বেশ কয়েকটি বিখ্যাত লেখার একটিতে তিনি দেবী জুনোকে পতিতা হিসেবে দাবী করেছেন, যা গ্রিকদের মতে “বইটি পড়ার পর মুখ ঠিক রাখা অসম্ভব একটা ব্যাপার”! ক্রিসিপাস একদিন পথ দিয়ে যাওয়ার সময় একটি গাধাকে ডুমুর ফল খেতে দেখে ব্যাপক মজা পান এবং তার লোকজনদেরকে নির্দেশ দেন গাধাটিকে ওয়াইন দেওয়ার জন্য! এ কথা বলতে বলতেই তিনি মারা যান!
উপহারের ওজনে মারা যাওয়া
এথেন্স শহরের প্রথম হর্তাকর্তা বেশ কড়া শাসকই ছিলেন বলা যায়। তিনি মনে করতেন, গাজর চুরি করার জন্যেও মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা রাখা উচিৎ! এসব সত্ত্বেও এথেন্সবাসীরা ড্রাকোকে খুবই পছন্দ করত! এইজিনার থিয়েটারে ড্রাকোর ভক্তরা তার জন্য সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ড্রাকো তার বক্তব্য দেওয়া শেষ করলে ভক্তরা তার দিকে নিজেদের জামাকাপড় খুলে তার দিকে ছুড়ে মারা শুরু করে। অবাক হওয়ার কিছু নেই, প্রাচীন গ্রিসে অভিবাদন জানানোর রীতিটাও ছিল এরকম অদ্ভুতই। যা-ই হোক, ড্রাকোর ভক্তরা সেদিন একটু বেশিই উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল। কয়েকশ ভক্তের ঘামে ভেজা কাপড়ের নিচে পড়ে শেষপর্যন্ত দমআটকে মারা যান প্রাচীন গ্রিসের বিখ্যাত এই শাসক!
গোবরে মাখামাখি হয়ে কুকুরের কামড়ে মারা যাওয়া
অ্যারিস্টটল-প্লেটোর ভাবাদর্শকে প্রভাবিত করা হেরাক্লিটাস ছিলেন সক্রেটিস যুগেরও আগের দার্শনিক। বর্তমান তুরস্ক এবং প্রাচীন পারস্যের অধীনে থাকা এফিসাস শহরে থেকেই “বৈজ্ঞানিক ইতিহাসের জনক” তার গবেষণা চালিয়ে যেতে থাকেন। এই দার্শনিক বৃদ্ধ বয়সে শরীর ফোলা রোগে আক্রান্ত হন। তার শরীরে পানি জমতে শুরু করে। অনেক ডাক্তার দেখিয়েও কোনোরকম উপকার না পাওয়ায় তিনি অদ্ভুত এক উপায়ের দ্বারস্থ হন। তার মনে হয়েছিল, “গোবরে শুয়ে থাকলে গোবর তার শরীরের পানি শুষে নেবে”! এই চিন্তাভাবনা থেকেই তিনি একদিন সকালে গোবরে মাখামাখি হয়ে শুয়ে পড়লেন। সন্ধ্যার দিকে উঠতে চেষ্টা করলেও গোবর শক্ত হয়ে লেপ্টে যাওয়ায় তিনি ওখানেই আটকে থাকলেন। শেষমেশ গভীর রাতে জ্যান্ত অবস্থাতেই হিংস্র কুকুরের পেটে চলে যান এই দার্শনিক।
বই লেখার সময়ে মারা যাওয়া
“দ্য হিস্টোরি অফ পেলোপোনেশিয়ান ওয়্যার”- বইয়ের লেখক থুসিডাইডস ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের আরেকজন বিখ্যাত দার্শনিক। প্রাচীন গ্রিসের অল্প কিছু ইতিহাস রচয়িতাদের মধ্যে থুসিডাইডসই ছিলেন এমন ব্যক্তি যারা ইতিহাসের মধ্যে গালগল্প এবং রুপকথা ঢুকিয়ে দেননি, এজন্য বর্তমানে তার লেখা ইতিহাসের বইগুলোই একেবারে প্রথম সারিতে রাখা হয়। থুসিডাইডস ছিলেন স্পার্টা এবং অ্যাথেন্সের মধ্যে সংঘটিত পেলোপোনেশিয়ান যুদ্ধের একজন সেনাপতি। কিন্তু তিনি তার শহর “আম্ফিপোলিস” রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ায় তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন নির্বাসনে থাকাকালীন সময়ে তিনি তার বই লেখার কাজ চালিয়ে যান। তারপর হঠাৎ করেই গ্রিস থেকে নির্দেশ আসে তার দন্ড উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। একেবারে সঠিক কারণ জানা না গেলেও গ্রিসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার পর পথিমধ্যেই কেউ একজন তাকে খুন করে। ছুরি দিয়ে করা আঘাতের সময় তিনি বই লেখায় ব্যস্ত ছিলেন এবং তার বাক্য তখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি!
ভুল ঠিক করতে গিয়ে না খেয়ে মারা যাওয়া
লেখক এবং একইসাথে কবি এরকম কিছু ব্যক্তিদের মধ্যে প্রাচীন গ্রিসে সর্বপ্রথম উদয় হয়েছিলেন ফিলিটাস। ফিলিটাস তার সময় পার করতেন আরেকজন মানুষের ভুল ধরে! যখনই কেউ তার সামনে কোনো ভুল শব্দ উচ্চারণ করত কিংবা অযৌক্তিক কথা বলত, তিনি পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখে তার ভুল ধরিয়ে দিতেন। কোন শব্দটি ব্যবহার করলে তার বাক্যটি আরও যৌক্তিক এবং আরও সুন্দর হত তা নিয়েই সারাদিন গবেষণা করতেন।
তিনি আরেকজনের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার জন্য এতটাই উদগ্রীব ছিলেন যে, নিজের খাওয়ার কথাটাই মনে রাখতে পারতেন না! তিনি খুবই রুগ্ন স্বাস্থ্যের অধিকারী হলেন। শেষমেশ তিনি মারাই যান ভুল শব্দ নির্বাচনের প্রতিকার নিয়ে চিন্তা করতে করতে! ফিলিটাসের এই কান্ড কিংবদন্তীর রূপ নেয়। অবশেষে তার কবরের ফলকে লিখে রাখা হয়, “আগন্তুক, আমি সেই ফিলিটাস। মিথ্যা শব্দগুলো আমাকে ধ্বংস করে দিয়েছে”!
অলিম্পিক জেতা প্রথম মৃত ব্যক্তি
প্রাচীন গ্রিসের অলিম্পিক গেমসে প্যানক্রেশন ছিল অন্যতম আকর্ষণীয় ইভেন্ট। এটি অনেকটা আধুনিক রেসলিং-এর মতো, খালি হাতে মারামারি করা এবং আরেকজন ট্যাপ আউট করা না পর্যন্ত তা চালিয়ে যাওয়া। বেশিরভাগ সময়েই প্যানক্রাটিয়াস্টরা মারা যেত। আরিকিওন ছিলেন এমন একজন প্যানক্রাটিয়াস্ট এবং বোধহয় সবচেয়ে বিখ্যাত। অলিম্পিক গেমসে নিজের ক্যারিয়ারের একেবারে শুরু থেকেই অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন ছিলেন আরিকিওন। প্রতিবারের মতো সেবারও চ্যাম্পিয়নশিপ নিজের দখলে রাখতে ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিলেন আরেকজন মুষ্টিযোদ্ধার। ম্যাচের এক পর্যায়ে প্রতিপক্ষ আরিকিওনের পা বাঁকিয়ে চেপে ধরে কটিসন্ধির মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। আরিকিওন ব্যাথায় পরাজয় স্বীকার করতে যাওয়ার ঠিক আগেই পাশ থেকেই তার ওস্তাদ এরিক্সিয়াস তাকে চিৎকার করে উৎসাহ দিয়ে বলছিলেন, “কতটা গৌরবের ব্যাপার হবে যদি তোমার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় সবাই বলতে থাকে এই লোকটি অলিপিয়াতেও হাল ছেড়ে দেয় নি!” এই কথা শুনতেই আরিকিওন তার প্রতিপক্ষের গোড়ালি পা থেকে আলাদা করে ফেলেন! প্রতিপক্ষ ব্যাথায় আত্মসমর্পণ করার আগেই আরিকিওন দুনিয়া ছেড়ে বিদায় নেয়।
ঈগলের মুখ থেকে ফেলে দেওয়া কচ্ছপের আঘাতে মারা যাওয়া
“ট্রাজেডি সাহিত্যের জনক” এইসকিলাসকে দেখে এক সাধু ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন “তুমি সাগরের ঝাপ্টায় মারা যাবে”! এই বাণীর কারণেই তিনি সবসময়ই কোনো নাটকীয় মৃত্যুর অপেক্ষা করতেন, হয়ত জলোচ্ছাসের আঘাতে ভাঙ্গা বাড়ির নিচে চাপা পড়ে মরবেন এরকম কিছুই তার আশঙ্কা ছিল। তবে তার মৃত্যুর কারণটাও যে এর চেয়েও নাটকীয় ছিল তা কে জানত? এইসকিলাস যখন সিসিলিতে অবস্থান করেছিলেন, তখন এক ঈগল মুখ থেকে কচ্ছপ ফেলে দেয়। এরকম ঈগলের অভ্যাস হলো মুখে কচ্ছপ নিয়ে কোনো পাথরের উপর ছুড়ে মারা যাতে কচ্ছপের খোলস ভেঙে যায়। এইসকিলাসের চকচকে টাক দেখে ঈগলটি ভেবেছিল হয়ত এটি কোনো পাথরই হবে! শেষমেশ কচ্ছপের খোলস ফাটার বদলে এইসকিলাসের মাথাটাই ফেটে একাকার হয়ে যায়!
অমর হওয়ার জন্য আগ্নেয়গিরিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে মৃত্যু
সিসিলির অন্তর্গত আক্রাগাস শহরে বাস করতেন বিখ্যাত দার্শনিক এম্পেডোক্লিস। হঠাৎ করেই আক্রাগাস শহরের এক বৃদ্ধা ভয়ানক অসুস্থ হয়ে পড়ল, কোনো চিকিৎসকই তাকে সুস্থ করে তুলতে পারছিল না। তো সেই বৃদ্ধা এম্পেডোক্লিসের শরণাপন্ন হলেন। এম্পেডোক্লিসও কিভাবে যেন সেই বৃদ্ধার রোগ সারিয়ে দিল। তারপর থেকে এই বিখ্যাত দার্শনিক মনে করতে থাকলেন তিনি নিশ্চয়ই কোনো দেবতা হবেন। এরপর তিনি শহরের সবাইকে জড়ো করে এক আগ্নেয়গিরির চূড়ায় উঠলেন। সেখান থেকেই ঘোষণা করলেন, “সবাই মাথা নিচু কর! আমিই তোমাদের অমর দেবতা!” কথাটা বলেই আগ্নেয়গিরিতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এম্পেডোক্লিস এবং এভাবেই মারা যান! @ Usama Rafid
২১
সার্গন দ্য গ্রেট: প্রাচীন আক্কাদীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা
আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগের কথা। প্রাচীন ইরাকে তখন দজলা-ফোরাত নদীর মধ্যবর্তী স্থানে গড়ে ওঠা সুসংগঠিত সুমেরীয় সভ্যতা চলমান। তপ্ত বালির উপর নির্মিত ধবধবে প্রাসাদে বসে তখন রাজ্য শাসন করছেন কিশির রাজা উর-জাবাবা। সেসময় বুকভরা সাহস আর অদম্য স্পৃহা নিয়ে মসনদে আসীন হওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন সুমেরের এক ফলচাষী। নিজ প্রচেষ্টায় তিনি ফলচাষী থেকে উর-জাবাবার ভৃত্য তালিকায় জায়গা করে নেন। একসময় তার অধরা এই স্বপ্ন বাস্তবতা হিসেবে প্রতিফলিত হয়। উর-জাবাবাকে হটিয়ে তিনি হয়ে উঠেন সুমেরের অধিকর্তা। তার হাত ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয় প্রাচীন আক্কাদীয় সাম্রাজ্য। ইতিহাসে এই ফলচাষী আক্কাদের সার্গন বা সার্গন দ্য গ্রেট নামেই সুপরিচিত।
আক্কাদীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা
সিংহাসন ছিনিয়ে নেওয়ার পরেই সার্গন তার নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিটি নগর-রাষ্ট্রের শাসনকার্য ঘনিষ্ঠ লোকজনদের হাতে সঁপে দেন। গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় পদে তিনি শুধু নিজের পরিবারের লোকজনকেই বসাতেন। যেমন, তিনি তার কন্যা এনহেদুয়ানাকে দেবী ইশতারের মহাযাজিকা হিসেবে নিযুক্ত করেন। ইতিহাসের সাক্ষ্য অনুসারে, সার্গনকন্যা এনহেদুয়ানা হলেন পৃথিবী প্রথম মহিলা কবি, যার ৪২টি স্ত্রোতগীতির সন্ধান পাওয়া গেছে।
কোনো এক অজানা কারণে, লুগাল-জেগে-সি এবং সার্গনের সম্পর্কে ফাটল ধরে যায়। তারপর দুজনই একে অপরের বিপরীতে পূর্ণ শক্তি নিয়ে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন। এই দ্বন্দ্বে জয়ের স্বাদ আস্বাদন করেছিলেন সার্গন দ্য গ্রেট। ফলে, তিনি প্রতিপক্ষ সম্রাটকে বন্দী করার পাশাপাশি, লুগাল-জেগে-সির রাজ্য উরুকের দুর্ভেদ্য প্রাচীর ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। যেহেতু সুমেরের বেশিরভাগ অংশই ছিল লুগাল-জাগে-সির অধীনে, তাই সারগন বিশাল বড় অঞ্চল শাসনের সুযোগ পান। পরবর্তীতে তিনি বড় বড় সামরিক অভিযান চালিয়ে তার রাজ্যকে ক্রমশই সম্প্রসারণ করে গেছেন। সময়ের সাথে সাথে সিরিয়া, লেবানন এবং আনাতোলিয়ার অংশগুলোও তার রাজ্যসীমায় যুক্ত হয়ে যায়। রাজ্য সম্প্রসারণের একপর্যায়ে ক্লান্ত হবার পর তিনি নতুন একটি শহর নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন, যা হবে তার সাম্রাজ্যের রাজধানী। টাইগ্রিস নদীর পূর্বে অবস্থিত হওয়ায় মেসোপটেমীয় গ্রন্থে এই শহরকে ‘আগাদে’ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। কালক্রমে শহরটি ‘আক্কাদ‘ নামে পরিচিতি পায়।
আক্কাদীয় সাম্রাজ্য ছিল বিশ্বের প্রথম সভ্যতাগুলোর একটি, যারা নিজ সাম্রাজ্যে আমলাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রয়োগ করেছিল। সার্গনের পূর্বে মেসোপটেমিয়ার সমাজগুলো ছিল রাজতন্ত্র শাসিত। সম্রাটদের পাশাপাশি পুরোহিতেরাও অনেকসময় শাসনভার গ্রহণ করতেন। রাজ্যশাসনে তাদের ক্ষমতা ছিল অসীম। সার্গন তার নতুন ব্যবস্থার অধীনে ধর্মীয় পুরোহিতদের উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক কর্তৃত্ব দিলেও অনেক বিষয়ে তাদের হস্তক্ষেপ সীমিত করে দেন।
আক্কাদীয় সাম্রাজ্যের শুরুর দিকে সুমেরে সবচেয়ে প্রভাব বজায় রেখেছিল প্রাচীন সুমেরীয় ধর্ম। সার্গনের সাম্রাজ্য বিস্তৃত হওয়ার সাথে সাথে সুমেরীয় দেব-দেবীদের মন্দির মেসোপটেমিয়ার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। সার্গন নিজে ছিলেন দেবী ইশতারের খাঁটি ভক্ত, সেজন্য তিনি প্রাচীন সুমেরীয় ধর্মে ইশতারকে উচ্চ মর্যাদায় আসীন করেছিলেন। শাসক হিসেবে উত্থানের প্রথম দিকে তিনি সমগ্র রাজ্য জুড়ে এই দেবীর উপাসনার রীতি প্রচার করেছিলেন। মেসোপটেমীয় সভ্যতায় দেবী ইশতারের তুমুল জনপ্রিয়তা, উপাসনা, এবং প্রভাব বিস্তারের পেছনে প্রায়শই সার্গনের প্রভাবকে দায়ী করা হয়। তার অধীনে থাকা সকল অঞ্চলের মধ্যে তিনি পরস্পর সংযুক্ত একটি সুগঠিত বাণিজ্যিক কাঠামো গড়ে তুলেছিলেন। আক্কাদীয় সাম্রাজ্য কৃষিতে সমৃদ্ধ থাকলেও, অন্যান্য মূল্যবান সম্পদ, যেমন- ধাতু এবং কাঠের অভাব ছিল সেখানে। সেজন্য তিনি লেবানন থেকে ধাতু এবং কাঠ এনে এসবের চাহিদা মিটিয়েছিলেন। এএই ব্যবস্থাকে আরও সহজ করার লক্ষ্যে তিনি কৃষি ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সেচ-খাল নির্মাণে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন। এছাড়াও মানব ইতিহাসে প্রথম ডাক-ব্যবস্থা এবং স্থায়ী সেনাবাহিনী গঠনের মূল কারিগর ধরা হয় তাকেই।
খ্রিষ্টপূর্ব ২২৭৯ অব্দে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। সার্গন-পরবর্তী আক্কাদীয় সাম্রাজ্যে সার্গন এতটাই সম্মানিত ছিলেন যে, পরবর্তী রাজারা তাদের নামের সাথে সার্গন যোগ করতেন। খ্রিষ্টপূর্ব ২১৫৪ অব্দের দিকে গুতিয়ান নামে এক বর্বর জাতির আক্রমণে স্তিমিত হয়ে যায় দেড়শো বছর ধরে জ্বলতে থাকা আক্কাদীয় সাম্রাজ্যের সূর্য। @ Mohasin Alam Roni
২২
যুগে যুগে বাঙালীর খাদ্যাভ্যাস
প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে ধান আমদানি করা হয়। অন্যান্য দেশে যখন শুকনো মাটিতে ধান চাষ হতো, তখন ভারতবর্ষেই প্রথম পানিতে ডোবানো জমিতে ধান চাষ শুরু হয়। আর বাংলার বা বাংলাদেশের ভৌগোলিক কারণেই, কৃষিপ্রধান বাংলার প্রধান খাদ্য হয়ে ওঠে ভাত। এমন খোঁজই পাওয়া যায় চতুর্দশ শতাব্দীর ‘প্রাকৃত পৈঙ্গল’ গ্রন্থে। বাঙালি মাছ কবে থেকে খাওয়া শুরু করে, তার কোনো সঠিক দিনক্ষণ পাওয়া যায়নি। তবে, বাংলায় যত নদী-নালা-খাল-বিল ছিল, তাতে ধারণা করা যায়, আদিকাল থেকেই মাছ খেতো বাঙালি। সেজন্যই এ জাতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে “মাছেভাতে বাঙালি” কথাটি। বাংলাদেশের পাহাড়পুর ও ময়নামতিতে পাওয়া বিভিন্ন ফলকেই মাছ কোটার, ঝুড়িতে করে মাছ নিয়ে যাওয়ার ছবি ফুটে ওঠে। মাছ যে বাঙালির অতি প্রাচীন এক খাদ্যাভ্যাস, তা এসকল ফলকই প্রমাণ করে। তবে বঙ্গে মুসলমানরাই মাছ বেশি খেতো। ব্রাক্ষ্মণ আর বৌদ্ধধর্মানুসারীদের জন্য মাছ খাওয়ার সুযোগ ছিল না ধর্মীয় বিধিনিষেধের কারণে। তবে, মাছ বাঙালির কাছে যে প্রিয় খাদ্য ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন রন্ধন বইয়ে। গৃহিণীরা সেকালে বহুভাবে মাছ রান্না করতেন। যেমন জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির প্রজ্ঞাসুন্দরী তাঁর এক রান্নার বইতে ৫৮ পদের মাছ রান্নার পদ্ধতি জানিয়েছেন।
মধ্যযুগে বাঙালির বিভিন্ন মঙ্গলকাব্যে মৎস্য ভোজনের বিপুল বর্ণনা রয়েছে। রুই, কাতলা, চিতল, মাগুর, চিংড়ি, পাবদা, শোল ইত্যাদি মাছের নাম আছে সেগুলোতে। প্রাচীনকাল থেকেই শুঁটকি মাছ বাঙালির কাছে জনপ্রিয়তা লাভ করে। ষোড়শ শতকে বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গল কাব্যে মাছ রান্নার বিভিন্ন বিবরণ পাওয়া যায়। বিয়ের পরদিন শ্বশুরবাড়িতে ‘জামাই বাজার’ রীতিতেও কিন্তু মাছ থাকা আবশ্যকীয়। ইলিশ হোক কি রুই, জামাই বাজার কেমন করেন, মাছ কেমন চেনেন, তা পরখ করতো শালা্রা।
মাংস খাওয়ার বর্ণনাও পাওয়া যায় চর্যাপদে ভুসুকুপার গানে। গরু, খাসি এবং হরিণের মাংস খাওয়ার চল ছিল মধ্যযুগ থেকেই। হরিণের মাংস খুব সুস্বাদু তাই চর্যাপদে লেখা ছিল “আপনা মাংসে হরিণা বৈরী”। অর্থাৎ হরিণের মাংস এতই সুখ্যাতি ছিল যে সবাই বনে এসে হরিণ খুঁজে মারে। সেসময় বাঙালির বিয়ের ভোজে হরিণের মাংসের পদ অনিবার্যভাবে পরিবেশন করা হতো। সাথে খাসি, পাখির মাংসও থাকতো।
ব্রিটিশ শাসনামলে ভাতের উপরই জোর দিয়েছে বাঙালি। তবে শখ হলে লুচি-পরোটা খাওয়ার চল ছিল ঠিকই। বিংশ শতকে রুটি খাওয়ায় পুরোদস্তুর অভ্যস্ত হয়ে পড়ে বাঙালি। গ্রামবাংলায় যদিও তিনবেলাই ভাত খাওয়া হয়, কিন্তু শহুরে মানুষের এত সময় কোথায়? তাই তারা রুটি-পাউরুটিকেই বেছে নিয়েছে নাশতা হিসেবে জনজীবনের ব্যস্ততায়। যদিও বর্তমানে রকমারি খাবারের ছোঁয়ায় ভাতের ওপর মানুষের অনীহা লক্ষণীয়। ঘি মেশানো ভাত কী স্বাদের, সে কথা না জানে আজকের প্রজন্ম, না পাওয়া যাবে সেই প্রকৃত স্বাদের ঘি।
মিষ্টি খাওয়া বাঙালির খাদ্যাভ্যাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তবে সেকালে মিষ্টি বলতে প্রচলিত ছিল হাতে তৈরী নাড়ু, রকম রকম পিঠে-পুলী আর পায়েস। চাল দিয়ে তৈরী হতো মুড়ি, চিড়া-খই-নাড়ু ইত্যাদি। আর মিষ্টি সাধারণত হতো দুধের তৈরী।
অতিথি আপ্যায়ণে বাঙালীর জুড়ি ছিল না। আহারের পর মশলা পান, সুপারি খাওয়ার রীতিও ছিল। গ্রাম-বাংলায় হয়তো এখনো শোভা পায়, কিন্তু শহুরে লোকের কাছে এ বড় ‘খ্যাত’!
উনিশ-বিশ শতকে ‘রেস্টুরেন্ট সংস্কৃতি’র ফলে মোগলাই-ইংরেজি খাবারের ধুম পড়ে। মোগলাই খাবারগুলো মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। যেমন- কোর্মা, কাবাব, কোপ্তা, ফ্রাই, গ্রিল, কাটলেট, বেগুন ভাজা, লেমনেড ইত্যাদি। এছাড়াও সেসব খাবারের মধ্যে কেক, বিস্কুট, চপ, কাটলেট উল্লেখযোগ্য ।
বাঙালীর বর্ষবরণ এবং পান্তা-ইলিশ
বাংলা নতুন বছরকে বরণ করা এখন একটি সার্বজনীন উৎসবের সামিল।সেই বাঙালিয়ানা বৈশিষ্ট্যের মধ্যে এখন অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ‘পান্তা-ইলিশ’ খাওয়ার রীতি। এটা মোটেও সত্যি নয় যে, কৃষকরা নববর্ষ উদযাপনে পান্তা-ইলিশ খেয়ে বছর শুরু করতো। গ্রামবাংলায় নববর্ষের উৎসবই ছিল খুবই সাধারণ আর ছোট আকারে। কৃষাণী আগের রাতে একটি নতুন ঘটে কাঁচা আমের ডাল ও চাল ভিজিয়ে রাখতেন। সকালে কৃষক সেই চালপানি খেয়ে হালচাষ করতে যেত। দুপুরবেলায় কাজের ফাঁকে পান্তা খেতো কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ দিয়ে আবার কখনো কখনো একটু শুঁটকি, বেগুন ভর্তা বা আলু ভর্তা দিয়ে। কবির ভাষায়-
“পান্তা ভাতে মরিচ-পেঁয়াজ
গরম ভাতে ভর্তা
সকাল বিকাল খেয়ে জবর
ঘুমায় গাঁয়ের কর্তা।”
এই পংক্তিগুলো থেকে বোঝা যায়, বাঙালির গরম ভাতের সাথে মরিচ-পেঁয়াজ আর ভর্তা খাওয়ার খাদ্যাভাসটি প্রকৃত অর্থে স্বাভাবিক এবং সহজলভ্য।
@ Afra Nawmi
২৩
"পারস্য নববর্ষ" নওরোজ বা নতুন দিন
নওরোজ সাধারণত প্রতি বছর ২১ মার্চ বা তার আশপাশে পালিত হয়। নওরোজ ফার্সি শব্দ যার অর্থ "নতুন দিন" হল ইরানি সৌর বর্ষপঞ্জী অনুসারে পালিত ইরানি নববর্ষ। এই উৎসবকে "পারস্য নববর্ষ" হিসেবে অভিহিত করাও বহুল প্রচলিত।
নওরোজ পার্সিয়ান, কুর্দিস্তান, লুরিস্তিনি, বালুচি, আইজরি এবং বালুচী মানুষের জাতীয় দিবস যে দেশগুলো এক সময় বৃহত্তর ইরানের অংশ ছিল।
নওরোজ কেবল ইরানে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, আজারবাইজান, তুরস্কের কুর্দি অঞ্চল, কাজাখস্তান এবং এমনকি ভারত ও পাকিস্তানের পার্সি সম্প্রদায়ের মধ্যেও অত্যন্ত জনপ্রিয়।
উৎপত্তি: নওরোজের ইতিহাস প্রায় ৩,০০০ বছরের পুরোনো। এটি প্রাচীন পারস্যের (বর্তমান ইরান) রাজা জামশিদের আমল থেকে শুরু হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
স্বীকৃতি: ইউনেস্কো ২০০৯ সালে নওরোজকে 'মানবতার বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য' হিসেবে ঘোষণা করেছে। এছাড়া জাতিসংঘ ২১ মার্চকে 'আন্তর্জাতিক নওরোজ দিবস' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
ধর্মীয় নিরপেক্ষতা: যদিও এটি পারস্যের প্রাচীন ধর্ম জরথুস্ট্রবাদের সাথে জড়িত ছিল, বর্তমানে এটি একটি জাতিগত ও সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে যা বিভিন্ন ধর্মের মানুষ পালন করে।
নওরোজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো 'হাফত সিন' টেবিল সাজানো। এই টেবিলে ফার্সি বর্ণমালার 'সিন' (S) অক্ষর দিয়ে শুরু হওয়া সাতটি উপাদান রাখা হয়, গমের চারা ,গমের পুডিং, শুকনো ফল , সিরকা ,আপেল , রসুন ,মশলা । এছাড়াও টেবিলে পবিত্র গ্রন্থ (যেমন কুরআন বা শাহনামা), আয়না, মোমবাতি এবং রঙিন ডিম রাখা হয়।
উৎসবের আগে সবাই ঘরবাড়ি পরিষ্কার করে (যাকে বলা হয় 'খোনেহ তেকোনি') এবং নতুন পোশাক কেনে। নওরোজের আগের শেষ বুধবার রাতে আগুনের ওপর দিয়ে লাফিয়ে এই উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয়, যা দুর্ভাগ্য দূর করার প্রতীক। উৎসবের ১৩তম দিনে মানুষ ঘরের বাইরে বেরিয়ে যায় এবং প্রকৃতির মাঝে সময় কাটায়। ধারণা করা হয়, এদিন ঘরে থাকা অমঙ্গলজনক।
২৪
সাপে-বেজি লড়াই
লোকমুখে শোনা যায় বেজির নাকি সাপের বিষে কিছু হয় না। কথাটা আসলে পুরোপুরি সত্য না।
সামান্য পরিমাণ সাপের বিষে বেজির তেমন কিছু হয় না। কেননা এদের শরীরে এক ধরণের গ্লাইকোপ্রোটিন থাকে যা সামান্য পরিমাণ সাপের বিষকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলতে পারে। তবে যথেষ্ট পরিমাণ সাপের বিষে বেজির মৃত্যু হতে পারে। তাই সাপে-নেউলে লড়াইয়ে বেজিকে হারানোর একমাত্র উপায় হল বেজিকে বারবার ছোবল মারা।
তাহলে সাপে-বেজি লড়াইয়ে বেজিই কি করে জিতে যায়? পুরোটাই আসলে নির্ভর করে বেজির কৌশল, দ্রুতগামিতা আর শরীরে পুরু পশমের আবরণ এর উপর। সাপকে আক্রমণ করে বেজি সাপকে উস্কে দেয় আঘাত করার জন্যে। সাপ তখন বারবার আঘাত করতে থাকে বেজিকে। কিন্তু বেজির শরীরের ক্ষিপ্র গতি সফল হতে দেয় না সাপের একটি ছোবলকেও। এভাবে একটা সময় সাপ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। আর ওমনি সাপের মাথাটা কামড়ে ধরে বেজি। কামড়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলে সাপের মাথাটা। সাপের বিষ বেজির পেটে গেলে হজম হয়ে যায়। তাই সাপের মাথা আর বিষ গ্রন্থি খেয়ে নিলেও কিছু হয় না এদের। সংগৃহিত
২৫
পেশাদার শোক পালনকারী:
রাজস্থানে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মহিলারা কান্নার বিনিময়ে অর্থ উপার্জন করেন, যারা 'রুদালি (Rudaali) নামে পরিচিত। এটি মূলত একটি পেশাদার শোক পালনের সংস্কৃতি। রুদালি (Rudaali) শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো "ক্রন্দনরতা নারী" বা এমন নারী যিনি বিলাপ করেন।
ঐতিহাসিকভাবে এটি ভারতের রাজস্থান অঞ্চলের একটি বিশেষ সামাজিক প্রথা।
রুদালিরা হলেন এমন একদল নিম্নবর্ণের নারী যাদের উচ্চবর্ণের বা প্রভাবশালী পরিবারের কোনো পুরুষ সদস্য মারা গেলে অর্থের বিনিময়ে শোক প্রকাশ করার জন্য ভাড়া করা হয়।
বিলাপের ধরণ:
তারা মৃত ব্যক্তির বাড়িতে গিয়ে বুক চাপড়ে, চুল ছিঁড়ে এবং সজোরে কেঁদে শোকের পরিবেশ তৈরি করেন, যা ওই পরিবারের সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
পেশার ধরন:
উচ্চবর্ণের পরিবারে কোনো পুরুষ মারা গেলে সেই শোক প্রকাশ করতে এবং সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শন করতে এই নারীদের ভাড়া করা হয়। সামাজিক প্রথার কারণে অনেক সময় উচ্চবর্ণের নারীরা প্রকাশ্যে কান্নাকাটি করেন না, তাই রুদালিরা তাদের হয়ে বিলাপ করেন।
পরিচিতি:
তারা সাধারণত কালো পোশাক পরেন এবং বুক চাপড়ে বা উচ্চস্বরে বিলাপ করে শোকের পরিবেশ তৈরি করেন।
পারিশ্রমিক:
ঐতিহাসিকভাবে তারা কান্নার বিনিময়ে সামান্য টাকা, পুরনো কাপড় বা খাবার পেতেন। তবে বর্তমান সময়ে শিক্ষার হার বৃদ্ধি এবং আধুনিকতার প্রভাবে এই পেশা অনেকটাই কমে এসেছে।
সামাজিক অবস্থান:
রুদালিরা সাধারণত সমাজের প্রান্তিক বা নিম্নবর্ণের হয়ে থাকেন এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের অশুভ হিসেবে দেখা হয়।
বর্তমানে এই পেশার চল তেমন নেই বললেই চলে, তবে রাজস্থানের লোকগাথা ও ইতিহাসে এটি এখনও একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। @ মৃণাল নন্দী
২৬
রাম সেতু ও সাহাবী গাছ
কদিন আগেই ডিসকভারি সাইন্স চ্যানেলে রাম সেতু বা আদম সেতু নিয়ে একটা প্রোগ্রাম দেখছিলাম।। দেখে যা বুঝলাম...
বর্তমান শ্রীলঙ্কা দেশটি একসময় ভারতীয় প্লেটের সঙ্গে যুক্ত ছিল, পরবর্তীতে গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর সাথে সাথে সমুদ্রের জলের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়ে পৃথক হয়ে যায়। আজ থেকে বহুদিন আগে যখন আজকের তুলনায় জলের উচ্চতা অনেক কম ছিল, তখন দুই পারের মানুষজন যোগাযোগ ব্যবস্থা বজায় রাখার জন্য পাথর ফেলে একটা পায়ে চলা ব্রিজের নির্মাণ করে।। এই সেতুর সঙ্গে ধর্মীয় কোন সম্পর্ক নেই বরং এই নির্মাণের সময়কাল অনুমান করে কবির কল্পনায় সাহিত্যে সেতুটিকে সম্পৃক্ত করা হয় মাত্র।।
একটা লিংক খুঁজে পেলাম... https://youtu.be/odUtqDz4lEk?si=GqVjC63I3Lq_yhYe
এইরকমই আরেকটা ধর্মীয় প্রচার হলো জর্ডনের সাহাবী গাছ...Pistacia atlantica এক ধরণের গাছ, আরবীতে একে ‘আলবাতাম’ বলা হয়। আমাদের দেশের বট বৃক্ষের মত এই গাছ গুলো খুব দীর্ঘজীবী হয়ে থাকে। মরুভূমি এলাকায় এই গাছের আধিক্যও রয়েছে।
প্রত্নতত্ববিদ ডঃ আব্দুল কাদির হাসান ২০০২ সালে এই গাছটির বয়স ১৪৫০ বছর বলে উল্লেখ করে বলেছেন, এই রাস্তা দিয়েই আমাদের ধর্ম প্রচারক ১২ বছর বয়সে সিরিয়ায় ব্যবসায়ের জন্য গিয়েছিলেন, এবং এই গাছটিই হলো সেই পবিত্র গাছ, যার ডাল পালা নুইয়ে পড়েছিলো তার সম্মানে!!
বিশেষজ্ঞরা পরবর্তীতে সত্যের অনুসন্ধান করলে জর্ডানের কৃষি মন্ত্রণালয়ের আরেকটি ফাইলে পাওয়া যায় এই গাছটির প্রত্নতাত্বিক রিপোর্ট। সেখানে স্পষ্টতঃ উল্লেখ আছে যে গাছটির মূল থেকে প্রাপ্ত কার্বণ ডেটিং পরীক্ষা অনুযায়ী এর বয়স ৫২০ বছর, কাজেই ডঃ আব্দুল কাদির যা রটিয়েছিলেন সেটা শুধুমাত্র ধর্মীয় বানোয়াট গল্প ছাড়া আর কিছুই নয়।। এইরকমই বিশ্ব জুড়ে কতো ধর্মীয় কাল্পনিক গল্প আছে তার ইয়ত্তা নেই কিন্তু এই আধুনিক যুগে এসেও মানুষ কীভাবে প্রশ্নহীন আনুগত্যের মতন সেইসব কাল্পনিক গল্পগুলো বিশ্বাস করে চলে সেটা কিন্তু সত্যিই খুব বিস্ময়কর!! @ Rajib Basu
২৭
কবি জসিম উদ্দিনের ‘জীবনকথা’ ও সেকালের সমাজ জীবন
কবি জসিম উদ্দিনের আত্মজীবনী ‘জীবনকথা’ গ্রামবাংলার সামাজিক চিত্র জানার জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ বই। তার জীবনকাহিনী পড়তে গিয়ে বেশ ধাক্কা খেতে হবে পাঠককে।
আপনি যখন দেথবেন জসিমউদ্দিনের শৈশবে, অর্থ্যাত মাত্র একশো বছর আগে মুসলমান বিবাহিত নারীরাও সিঁদুর পরছে তখন হজম করতে কষ্ট হবে! জসিম উদ্দিন লিখেছেন, তার মা বাপের বাড়ি থেকে আসার সময় হাট থেকে তার নানার কেনা নতুন শাড়ি পরে, কপালে সিঁদুর দিয়ে, চোখে কাজল দিয়ে রওনা দেয়ার জন্য তৈরি হলেন...। যদিও জসিম উদ্দিনের বাবা হাজি শরীয়তুল্লাহ’র ওহাবী চেতনার অনুসারী ছিলেন, বাড়িতে গান বাজনা এলাউ ছিলো না।
‘গাস্বী’ ছিলো ফরিদপুর ও তত্সংলগ্ন অঞ্চলের সবচেয়ে বড় উত্সব। জসিমউদ্দিন লিখেছেন, এই গাস্বী উত্সবের মধ্যে কোন রকম ধর্মীয় বিষয় ছিলো না। তাই এই উত্সবটিকে হিন্দু মুসলমানের জন্য একটি জাতীয় উত্সব করা যেতে পারে। গাস্বী হচ্ছে ‘আশ্বিনে রাঁধে কার্তিকে খায়’ সেই লোকজ উত্সবটি।
জসিমউদ্দিনই বলেছেন, এই দেশে হিন্দু মুসলমান পাশাপাশি বাস করেও কোন অভিন্ন উত্সবে তারা যোগ দিতে পারে নাই। তিনি নিজের শৈশবের কথা লিখতে গিয়ে বলছেন, সেকালে গ্রামগঞ্জে ‘পাকা মুসলমান’ বলতে কাউকে পাওয়া যেতো না। হিন্দুদের মত মুসলমানরাও লক্ষ্মীপুজা, হাওয়া সিন্নি, গাস্বী উত্সবে সমস্ত গ্রাম মেতে উঠত। ‘হাওয়া উত্সব’ মানে হাওয়া বিবির নামে সিন্নি চড়ানো হতো। এটা হতো লক্ষ্মীপুজার পরের পূর্ণিমাতে। সম্ভবত লক্ষ্মীপুজার একটা মুসলিম ভার্সন ছিলো এটি যেখানে দেবী লক্ষ্মীর বদলে আদমের স্ত্রী হাওয়াকে বসানো হয়। জসিমউদ্দিন গাস্বী উত্সবের যে বর্ণনা দিয়েছেন তাতে বুঝা যাচ্ছে মুসলমানদের প্রধান উত্সব তখন সেই অঞ্চলের গাস্বী ছিলো। এই দিন বাচ্চারা খুব ভোরে উঠে হলুদ টলুদ মেখে নদী থেকে গোসল করে এসে ভালো জামাকাপড় পরে ভালো নাস্তা খেতো। বাড়িতে ভালো ভালো খাবার রান্না হতো। গ্রামে গ্রামে চলত উত্সব। মেলা, গান বাজনা চলত সারারাত। কুস্তি হাডুডু নৌকাবাইচ হতো গ্রামে গ্রামে। গাস্বী হিন্দু মুসলমান মিলে পালন করত। গ্রামীণ এই পটভূমিকে ধ্বংস করে দেয় ‘ওহাবী আন্দোলন’। জসিমউদ্দিন লিখেছেন, তাঁর বাবা চিরকাল ধুতির সঙ্গে পায়জামা পরতেন আর মাথায় টুপি থাকত। তিনি ছিলেন গ্রামের মুসলিম কমিউনিটির সার্টিফিকেটধারী একজন ‘মোল্লা’ যিনি মুসলমানদের বিয়ে, জানাজা, আকিকা অনুষ্ঠান পরিচালনা করে পয়সা পেতেন। জসিমউদ্দিনের পরদাদার নাম ছিলো ‘আরাধন মোল্লা’। তার বাবার পিতামহের এক ভাইয়ের নাম ছিলো ‘দানু মোল্লা’। দানু মানে কি দিনেশ? গ্রামে আরেকজন ঢোল বাদকের নাম জানা গেলো যাদব ঢুলি ও মদন ঢুলি। দুজনই মুসলমান! জসিমউদ্দিন লিখেছেন, তখন মুসলমানদের নাম রাখা হতো বাংলায়, যেটাকে ওহাবীরা ‘হিন্দুদের মত নাম’ বলা শুরু করেছিলো।
কবি জসিমউদ্দের পিতা গ্রামের স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। তিনি ইংরেজি শিখতে পারেননি কারণ তার শৈশবে দুদুমিয়ার নির্দেশ ছিলো মুসলমানদের জন্য ইংরেজি শেখা হারাম। ফলে জসিমউদ্দিনের পিতামহ ছেলেকে ইংরেজ পড়া থেকে বিরত করেন। ওহাবী আন্দোলন কতখানি প্রভাব বিস্তার করেছিলো এ থেকে স্পষ্ট হয়। কবি জসিমউদ্দিন লিখেছেন, পাঠশালায় পড়তে গিয়ে তিনি ‘হিন্দুপাড়া’ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। হিন্দুদের বাড়িতে ফুল গাছ থাকে। হিন্দু বউরা বাড়িতে আলপনা আঁকে। আর নানা রকম উত্সব লেগেই থাকে। কিন্তু মুসলমান পাড়ায় কিছু নেই। মুসলমান পাড়ায় গান বাজনা নাই। ফুল গাছ নাই। ওহাবী আন্দোলনের পর মুসলমানদের গ্রামগুলিতে সব উত্সব বন্ধ হয়ে গেছে। জসিমউদ্দিনের ‘জীবনকথা’ বইতে অকপটে বাংলার গ্রামগুলিতে ওহাবী আন্দোলনের সর্বনাশের কথা লিখে গেছেন।
জসিমউদ্দি তার বাল্যে একটি তুলসী গাছ বন্ধুর বাড়ি থেকে এনে বাড়িতে লাগানোর পর ‘মুসলমানের বাড়িতে তুলসী গাছ লাগানোর’ বিরূপ সমালোচনা শুনতে হয়েছে প্রতিবেশীদের কাছে। যদিও সেই গাছ বড় হলে ঔষধী কাজে যখন প্রতিবেশীরা তুলসী পাতা চেয়ে নিতো তার বড় আনন্দ হতো। যে সমাজে হিন্দু মুসলমান পাশাপাশি এতকাল বসবাস করেও একটি গাছ যা প্রকৃতির সৃষ্টি তা সাম্প্রদায়িক কারণে অগ্রহণীয় হয়ে উঠে!
জসিমউদ্দিন তার সময়কার হিন্দু মুসলমান গ্রামবাসীর যে স্মৃতিচারণ করেছেন তাতে আজকের সময়ে এসে বেশ বিস্ময়কর লাগে। গ্রামে চৈত্র পুজা হিন্দুরা করলেও সে উপলক্ষ্যে যে মেলা হতো তাতে হিন্দুর মত মুসলমানদেরও প্রধান বিনোদন ছিলো। সেই মেলায় ‘ভাঙরা নাচের অভিনয়’ ছিলো বিনোদনের একটি উপকরণ।
ওহাবীজিম ইংরেজরা তৈরি করে দেয়নি। ইংরেজরা এদেশে এসে হিন্দু মুসলমান দুই ভাইয়ের মধ্যে বিরোধ লাগিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে শাসন করতে চেয়েছে। শরীয়তুল্লাহ সৌদি আরব থেকে দীক্ষা নিয়ে দেশে ফিরে বাংলার মুসলমানদের কাফের হিন্দুদের থেকে পৃথক হওয়ার জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলেন।
জসিম উদ্দিন গ্রামীণ জীবনে উত্সব হারিয়ে যাবার জন্য ওহাবীদের দায়ী করেছেন। হিন্দু মুসলমান ঐক্যের কথা বলেছেন। জসিম উদ্দিনকে যেভাবেই দাঁড় করানো হোক, যে গ্রুপেই ফেলা হোক, আর যাই হোক, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করার সময়ও কবির লড়াই করত। কবির লড়াইয়ে হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীর চরিত্র সেজে উপস্থিতি ছন্দসহকারে কাব্যগীতি বলে যাওয়া কম কথা নয়। @সংগৃহিত ...
২৮
ফিনল্যান্ড কেন সবচেয়ে সুখী?
গবেষকদের মতে, ফিনল্যান্ডের সুখের পেছনে ধর্মের চেয়ে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রভাব বেশি কার্যকর:
সামাজিক নিরাপত্তা: ফিনল্যান্ডে শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা বলয় রয়েছে, যা নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং বেকারত্বের সময় পূর্ণ সহায়তা প্রদান করে।
পারস্পরিক আস্থা:
ফিনিশ নাগরিকরা একে অপরের ওপর এবং সরকারের ওপর গভীর আস্থা রাখেন। সেখানে দুর্নীতির হার অত্যন্ত কম।
ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সাম্য:
সমাজে নারী-পুরুষের সমান অধিকার এবং নিজের পছন্দমতো জীবন যাপনের অবারিত স্বাধীনতা সুখের অন্যতম মানদণ্ড।
প্রকৃতির সাথে সংযোগ:
দেশটির বিশাল বনাঞ্চল এবং হ্রদ নাগরিকদের মানসিকভাবে প্রশান্ত রাখতে সাহায্য করে। ফিনল্যান্ডে প্রথাগত বা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যা কম এবং অনেক মানুষ নিজেদের অসাম্প্রদায়িক বা ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে পরিচয় দেন। তবে দেশটিতে উচ্চমানের জীবনযাত্রাই তাদের সুখের মূল কারণ।
ফিনল্যান্ডের সুখের প্রধান কারণসমূহ:
সামাজিক নিরাপত্তা:
চমৎকার স্বাস্থ্যসেবা, বিনামূল্যে মানসম্মত শিক্ষা এবং শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী।
নিরাপত্তা ও বিশ্বাস:
সমাজে দুর্নীতির হার অত্যন্ত কম এবং পুলিশ ও একে অপরের প্রতি ব্যাপক আস্থা।
প্রকৃতির সান্নিধ্য ও ভারসাম্য:
কর্মক্ষেত্রে সুস্থ পরিবেশ এবং ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা।
সোউনা সংস্কৃতি:
ফিনল্যান্ডের অনন্য সোউনা (Sauna) সংস্কৃতি তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে মানসিক প্রশান্তি দেয়।
সেকুলার জীবনধারা:
ফিনল্যান্ডের সমাজ ব্যবস্থা অত্যন্ত সেকুলার বা ইহজাগতিক। অধিকাংশ মানুষ চার্চের সদস্য হলেও দৈনন্দিন জীবনে ধর্মের প্রভাব বেশ কম। @ মৃণাল নন্দী
বি:দ্র: সোউনা (Sauna) সংস্কৃতি বলতে মূলত উচ্চ তাপমাত্রার একটি বদ্ধ ঘরে বসে ঘাম ঝরানোর মাধ্যমে শরীর ও মনকে সতেজ করার এক প্রাচীন ঐতিহ্যকে বোঝায়। এর উৎপত্তি ফিনল্যান্ডে হলেও বর্তমানে এটি বিশ্বজুড়ে এক জনপ্রিয় 'ওয়েলনেস' বা সুস্থতা চর্চায় পরিণত হয়েছে। ফিনিশ সোউনা সংস্কৃতি UNESCO-এর অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে । বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সোউনার ভিন্ন ভিন্ন রূপ দেখা যায়:
ফিনল্যান্ড (Finnish Sauna): সাধারণত কাঠের তৈরি শুষ্ক তাপের ঘর, যেখানে গরম পাথরে জল ঢেলে আর্দ্রতা তৈরি করা হয় (যাকে 'Löyly' বলা হয়)।
রাশিয়া (Banya): এটি ফিনিশ সোউনার মতোই, তবে এখানে তাপ ও আর্দ্রতা অনেক বেশি থাকে এবং প্রায়ই বার্চ গাছের ডাল (Venik) দিয়ে শরীরে মৃদু আঘাত করে রক্ত সঞ্চালন বাড়ানো হয়।
তুরস্ক (Hamam): এটি একটি বাষ্পীয় স্নানাগার যেখানে মার্বেল পাথরের গরম মেঝেতে শুয়ে শরীর ম্যাসাজ ও স্ক্রাবিং করা হয়।
জাপান (Sento/Onsen): জাপানে প্রথাগত গরম জলের ঝরনা বা বাথহাউস সংস্কৃতির সাথে বর্তমানে সোউনা যুক্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্যগত উপকারিতা
নিয়মিত সোউনা ব্যবহারের বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক উপকারিতা রয়েছে:
ডিটক্সিফিকেশন: প্রচুর ঘাম ঝরানোর মাধ্যমে শরীর থেকে টক্সিন বা বর্জ্য পদার্থ বের হয়ে যায়।
হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য: এটি রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে এবং উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
মানসিক প্রশান্তি: এন্ডোরফিন হরমোন নিঃসরণের মাধ্যমে মানসিক চাপ ও ক্লান্তি দূর করে গভীর ঘুমে সহায়তা করে।
পেশীর আরাম: ব্যায়ামের পর পেশীর ব্যথা কমাতে এবং শরীরের নমনীয়তা বাড়াতে সোউনা কার্যকর।
সোউনার শিষ্টাচার (Etiquette)
পাবলিক সোউনা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম মেনে চলা হয়:
পরিচ্ছন্নতা: ভেতরে প্রবেশের আগে ভালোমতো স্নান করে নেওয়া জরুরি।
তোয়ালে ব্যবহার: স্বাস্থ্যবিধি মানতে কাঠের বেঞ্চের ওপর তোয়ালে বিছিয়ে বসা উচিত।
নীরবতা: সোউনা প্রশান্তির জায়গা, তাই সেখানে উচ্চস্বরে কথা বলা অনুচিত।
পোশাক: ফিনল্যান্ড বা জার্মানিতে অনেকে নগ্ন হয়ে সোউনা করেন, তবে আমেরিকা বা অনেক এশীয় দেশে সাঁতারের পোশাক (Swimsuit) পরা বাধ্যতামূলক।
সতর্কতা: হার্টের সমস্যা বা গর্ভবতী মায়েদের সোউনা ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
ফিনিশ সোউনা (Sauna) সেশন সঠিকভাবে সম্পন্ন করার একটি ধারাবাহিক ধাপ নিচে দেওয়া হলো:
১. প্রস্তুতি ও পূর্ব-সতর্কতা
হাইড্রেটেড থাকা: সোউনা সেশন শুরুর আগে প্রচুর পানি পান করুন যাতে শরীর ডিহাইড্রেটেড না হয়ে পড়ে।
ভারী খাবার এড়িয়ে চলা: সোউনার ঠিক আগে খুব ভারী খাবার খাবেন না।
২. সেশন শুরুর ধাপসমূহ
১. স্নান করে নেওয়া (Shower): সোউনা রুমে প্রবেশের আগে সাবান দিয়ে ভালোভাবে গোসল করে নিন। এটি স্বাস্থ্যবিধির অংশ এবং শরীরের ছিদ্রগুলো খুলতে সাহায্য করে।
২. শরীর শুকানো: ভেজা শরীরে সোউনা রুমে প্রবেশের চেয়ে শরীর শুকিয়ে প্রবেশ করা ভালো, এতে ঘাম দ্রুত বের হয়।
৩. তোয়ালে নেওয়া: সোউনার গরম কাঠের বেঞ্চে সরাসরি না বসে একটি তোয়ালে বিছিয়ে বসুন।
সোউনা রুমের ভেতর
বেঞ্চ নির্বাচন: সোউনা রুমের ওপরের দিকে তাপ বেশি থাকে। আপনি যদি নতুন হন, তবে নিচের দিকের বেঞ্চে বসা ভালো।
লয়লি (Löyly) তৈরি: গরম পাথরের ওপর মাঝে মাঝে পানি ছিটিয়ে আর্দ্র বাষ্প তৈরি করুন। তবে অন্যদের অনুমতি নিয়ে পানি ছিটানো ভদ্রতা।
সময়: সাধারণত ১০-১৫ মিনিট একনাগাড়ে থাকা যায়। তবে শরীর খারাপ লাগলে বা মাথা ঘুরলে সাথে সাথেই বেরিয়ে আসা উচিত।
বিহতা (Vihta) ব্যবহার: ঐতিহ্যবাহী অভিজ্ঞতার জন্য বার্চের ডাল দিয়ে শরীরে আলতো করে আঘাত করতে পারেন, যা রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়।
৪. কুল-ডাউন ও বিরতি
শীতল হওয়া: সোউনা থেকে বেরিয়ে ঠান্ডা ্পানিতে গোসল করুন । এতে শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক হয় এবং এক ধরনের সতেজতা কাজ করে।
বিশ্রাম ও পানীয়: অন্তত ১৫-২০ মিনিট বিশ্রাম নিন এবং পানি বা ফলের রস পান করুন।
৫. পুনরাবৃত্তি
আপনি চাইলে এই পুরো প্রক্রিয়াটি (সোউনা -> কুল-ডাউন -> বিশ্রাম) ২ থেকে ৩ বার পুনরাবৃত্তি করতে পারেন।
মনে রাখবেন: সোউনা কোনো প্রতিযোগিতা নয়, তাই যতক্ষণ আপনার শরীর আরামবোধ করবে ততক্ষণই ভেতরে থাকুন।
২৯
Down Syndrome - এক্সট্রা ক্রোমোজমের ধাক্কা
Down Syndrome বা ডাউন সিনড্রোম, জেনেটিক এক কন্ডিশন যেখানে একটা মানুষের শরীরের প্রত্যেকটা কোষে ৪৬টি ক্রোমোজম থাকার জায়গায় থাকে ৪৭টি, যাকে Trisomy 21 নামে ডাকা হয়। আমরা অনেকেই জানি আমাদের শরীরের প্রতেকটি কোষে ২৩ জোড়া বা ৪৬টি ক্রোমোজম থাকে। ধরা যাক ক্রোমোজম ১, ক্রোমোজম ২ এমন। জেনেটিক এররের জন্য যখন কারোর শরীরে ক্রোমোজম ২১ একটি বেশি চলে আসে (প্রকারভেদও আছে) তখনই ঘটে বিপত্তি, আর জন্ম হয় Down Syndrome এ ভোগা শিশু। এখন সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তরটা জানা যাক। Down Syndrome এ ভোগা মানুষেরা দেখতে প্রায় একই হয় কেন? একই চোখ, একই নাক, একই গোলগাল চেহারা, কেন?
এর উত্তর আসলে আগেই দিয়ে দিয়েছি। ক্রোমোজম ২১ এর একটা এক্সট্রা কপি চলে আসে শরীরে৷ ফলে যাদেরই এই কন্ডিশন থাকে তাদেরই কিছু কমন ট্রেইট থাকে, ক্রোমোজম ২১ এর এক্সট্রা কপির জন্য। জিনের ভুজুংভাজুং বোঝাতে গেলে পোস্ট অনেক বড় হয়ে যাবে। তাই সেটা বাদ থাকুক, কারোর আগ্রহ জাগলে সে রিসার্চ করতে পারেন।
এখন জানা যাক কী কী লক্ষণ থাকে এই কন্ডিশনের:
- চোখ, খানিকটা ছোট এবং বাঁকানো।
- নাকের মাঝে উঁচু না হয়ে খানিকটা সমান থাকা।
- সাইজে ছোট হাত-পা এবং কান, ইত্যাদি শারীরিক লক্ষণ।
মানসিক লক্ষণ হিসেবে আছে বুদ্ধির কিছুটা কমতি। অর্থাৎ স্বাভাবিক ক্ষেত্রে একটা শিশুর কোনো কিছু শিখতে যতটা সময় লাগে, down syndrome এ ভোগা শিশুর সেটা শিখতে অনেক বেশি সময় লাগতে পারে। তাছাড়া আচরণীয় সমস্যাও থাকতে পারে তবে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব সঠিক চিকিৎসার দ্বারা।
এমন আরো বহু জেনেটিক কন্ডিশন আছে, তবে Trisomy 21 জেনেটিক কন্ডিশনের মধ্যে সবথেকে কমন হিসেবে ধরা হয়, তো কন্ডিশনটা খুব কমন নয়, খুব বিরলও নয়। এই কন্ডিশনে বাবা মায়ের কারোর দোষ থাকে না৷ জন্মের আগে ঘটা কোনো কারণ এই জেনেটিক কন্ডিশনের জন্য দায়ী নয়। বলতে গেলে এটা পিওর চান্স। তবে গবেষণায় দেখা গেছে যে মায়ের বয়স যত বাড়বে ডাউন সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও তত বেশি বাড়বে৷ তাই বলে বাল্যবিবাহ দিতে হবে এমন বলা হয়নি। ৩৫+ বয়সের নারীর ক্ষেত্রে এই কন্ডিশন ঘটার সম্ভাবনা একটু বেশি, কারণ মায়ের থেকেই সাধারণত এই এক্সট্রা "ক্রোমোজম ২১" কপিটা আসে। বাবার দিক থেকে আসে খুবই কম। এখানে একটা ব্যাপার আছে, কমেন্টে বলবো।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে এই রোগ কি ভালো হয় না? না। এই জেনেটিক কন্ডিশন ভালো হবার নয়৷ কোনো জেনেটিক কন্ডিশনই আমরা নির্মূল করতে পারি না, ভবিষ্যতে হয়তো পারবো, সে পথেই হাঁটছি। তবে Down Syndrome এর বিভিন্ন প্রকারভেদ আছে, এই বিভিন্ন প্রকারভেদ অনুযায়ী এই কন্ডিশনে ভোগা মানুষগুলোও আলাদা আলাদা হয়। তবে প্রত্যেকটা ক্ষেত্রেই সঠিক চিকিৎসার দ্বারা চমৎকার একটা জীবন পাওয়া সম্ভব। এক্সট্রা একটা ক্রোমোজমের জন্য যে তারা আমাদের থেকে আলাদা কিছু এমন নয়৷ তারাও মানুষ। তাই এই লেখা যদি কেউ পুরোটা পড়ে থাকেন তাহলে তাকে বলবো Down Syndrome এ ভোগা মানুষদেরকেও মানুষ হিসেবেই দেখুন, তাদেরকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করবেন না। এক্সট্রা ক্রোমোজম তাদের জীবন থেকে তেমন কিছু কেড়ে নেয়না, তারাও আমাদের মতো জ্ঞানে, বিজ্ঞানে, শক্তিতে এগিয়ে থাকতে পারে। @ ব্যাঙের ছাতার বিজ্ঞান
৩০
সময় নেই—নাকি আমরা নিজেরাই সময় নষ্ট করছি?
চাইলে মাত্র ৬ মাসেই নিজের জীবন বদলে ফেলা সম্ভব। প্রশ্ন হলো—আপনি সত্যি পরিবর্তন চান, নাকি অজুহাত খুঁজছেন?
চলুন, শুরু করি ৬ মাসের একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ—
অপ্রয়োজনীয় আড্ডা কমান । সব ডাকে সাড়া দিতে হবে না। যে আড্ডা আপনার কোনো উন্নতি করছে না, সেটাকে ‘না’ বলতে শিখুন।
শুরুতে খারাপ লাগবে, কিন্তু পরে আপনি নিজের পরিবর্তন টের পাবেন।
নিজের স্বপ্নকে গুরুত্ব দিন । দিনে অন্তত ১ ঘণ্টা নিজের লক্ষ্যকে দিন। ছোট ছোট কাজ শুরু করুন—কিন্তু নিয়মিত থাকুন।
স্বপ্ন পূরণ হয় ধারাবাহিকতায়, হুট করে নয়।
নেগেটিভ মানুষ থেকে দূরে থাকুন । যারা আপনাকে ছোট করে, নিরুৎসাহিত করে—তাদের থেকে দূরে থাকুন।
পজিটিভ মানুষদের সাথে থাকলে আপনার চিন্তাভাবনাও বদলাবে।
পরিকল্পনা ছাড়া দিন শুরু নয় । প্রতিদিনের কাজ আগে ঠিক করুন। একটা ছোট To-Do List আপনাকে অনেক এগিয়ে দেবে। দিন শেষে নিজের কাজগুলো দেখে আত্মবিশ্বাস বাড়বে। নিজের শরীর ও মনকে সময় দিন । প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়াম করুন।
১০ মিনিট নিজেকে শান্ত রাখুন—প্রার্থনা বা মেডিটেশনে। একটা ভালো শরীরই বড় শক্তি।
সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণে রাখুন । অযথা স্ক্রল করা বন্ধ করুন। দিনে নির্দিষ্ট সময়ের বেশি ব্যবহার করবেন না। বাকি সময় নিজের স্কিল বাড়াতে ব্যবহার করুন। নিজেকে দক্ষ মানুষে পরিণত করুন । প্রতিদিন নতুন কিছু শিখুন। যে মানুষ নিজের ভ্যালু বাড়ায়, তাকে কেউ থামাতে পারে না।
মনে রাখবেন—
৬ মাস পর আপনি একই মানুষও থাকতে পারেন, আবার সম্পূর্ণ নতুন একজন মানুষও হতে পারেন। সিদ্ধান্তটা আজ আপনার হাতে।
৩১
স্ট্রোক এড়াতে জাপানিরা একটি বিশেষ পদ্ধতি
"স্ট্রোক " যা একটি মূহুর্ত, আর সেই মুহূর্তে থেমে যেতে পারে আপনার স্বাভাবিক জীবন। থেমে যেতে পারে আপনার পুরো ভবিষ্যত। কিন্তু পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র জাপানিরা এই ভয়কে প্রতিদিন হারিয়ে দেয়। এখনো পর্যন্ত পৃথিবী তে সবচেয়ে বেশিদিন বাঁচে এই জাপানিরা। এদের আয়ু হয় খুব দীর্ঘ। স্ট্রোক প্রতিরোধে তারা একটি লুকানো কৌশল ব্যবহার করে। কি সেই কৌশল? এই ভয় থেকে দূরে থাকতে জাপানিরা একটি বিশেষ পদ্ধতি বহু প্রাচীন কাল থেকে ব্যবহার করে আসছে।" আশি ইউ" পদ্ধতি অর্থাৎ ঈষৎ উষ্ণ গরম জলে পা ডুবিয়ে রাখা। স্ট্রোক প্রতিরোধে এই "আশিইউ " পদ্ধতি কে তারা কিভাবে কাজে লাগায় ,
জাপানি দের বিশ্বাস প্রতিদিন মাত্র ১৫-২০ মিনিট ঈষৎ উষ্ণ গরম জলে পা ডুবিয়ে রাখলে শরীরের রক্ত সঞ্চালন এতোটাই সক্রিয় হয় যে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ৩৮ থেকে ৪২ ডিগ্ৰী সেলসিয়াস উষ্ণ জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকলে অথবা সামান্য ঈষৎ উষ্ণ গরম জলে সপ্তাহে ২-৩ দিন দেহ ডুবিয়ে বসে থাকলে শরীরে টান দূর হয় , রক্ত নালী গুলো স্বাভাবিক ভাবেই প্রসারিত হয়। স্নায়ুর ওপর চাপ কমে আসে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের দেহের বিভিন্ন অংশে রক্ত প্রবাহ ধীর হয়ে যায় , ফলে মস্তিষ্কে যথাযথ অক্সিজেন পৌঁছায় না। রক্তনালী তে ফ্যাট জমে সংকীর্ণ হয়ে গেলে স্ট্রোকের ঝুঁকি আরো বেড়ে যায়। গরম জলে পা ডুবিয়ে রাখা এই জটিলতার বিরুদ্ধে কাজ করে । পা দিয়ে শরীরে থাকা সাত হাজারের ও বেশি স্নায়ু প্রান্ত উদ্দীপ্ত হয়। রক্ত চলাচল বাড়ে , এবং মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ উন্নত হয়। এই পদ্ধতি চর্চা করা খুব সহজ একটি বড় পাত্রে ঈষৎ উষ্ণ গরম জল নিন , তারপর নীরব কোনো স্থানে বসে ১৫ - ২০ মিনিট পা ডুবিয়ে রাখুন , এই সময় চাইলে , ব ই পড়া , হাল্কা চা পান , বা মেডিটেশন ও করতে পারেন। সময় শেষে পা শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে ফেলুন। স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি এই ফুট বাথ মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে , পায়ের ক্লান্তি দূর করে ও শরীরকে আরাম দেয় , আর ঘুমের জন্য বেশ উপকারী। যাদের ঘুমের সমস্যা আছে , তাদের ক্ষেত্রে বেশ কার্যকরী, ভালো ঘুম হতে সাহায্য করবে অবশ্যই। দিনের এই কয়েক মিনিটের অভ্যাস স্বাস্থ্য রক্ষায় হতে পারে এক বড় সহায়ক।
এবার বলি , ঈষৎ উষ্ণ গরম জলে ১৫ -২০ মিনিট পা ডুবিয়ে রাখলে পেশির ব্যাথা কমে , সারাদিনের ক্লান্তি দূর হয় , এবং রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায়। এটি মানসিক চাপ কমায় , রাতে ভালো ঘুমের সহায়তা করে । এবং পায়ের শুষ্ক ত্বক কোমল করতে ও গোড়ালি ফাটা কমাতেও সাহায্য করে। এছাড়াও এটা পায়ের ফোলাভাব কমাতে , এবং প্রদাহ উপশম করতেও কার্যকরী ভূমিকা রাখে।
গরম জলে পা ডুবিয়ে রাখার উপকারিতা
**************************************
পেশী ও জয়েন্টের ব্যাথা উপশম :- হাঁটা চলা বা দীর্ঘ ক্ষন দাঁড়িয়ে থাকার ফলে পায়ে ব্যথা হলে গরম জল দারুন কাজ করে। এটি পায়ের পেশী শিথিল করতে এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি:- গরম জলের তাপে পায়ের রক্ত নালী গুলো ও প্রসারিত হয়। যা সারা শরীরে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
ক্লান্তি দূর ও মানসিক প্রশান্তি ও ভালো ঘুমের সহায়তা করে :- সারাদিনের পর কুসুম জলে পা ডুবিয়ে রাখলে মন ও শরীর দুই শান্ত হয়। যা ভালো ঘুমের জন্য সহায়ক।
ত্বকের যত্ন:- এটি পায়ের ত্বকের রুক্ষতা কমায়। পা কে নরম ও মসৃণ রাখতে সাহায্য করে।
সংক্রমণ প্রতিরোধ:- ঈষদুষ্ণ জলে সামান্য লবণ মিশিয়ে পা ডুবিয়ে রাখলে পায়ের পাতা এবং নখের ছত্রাকজনিত সংক্রমণ ( fungal infection) প্রতিরোধ করা সম্ভব।
মাইগ্ৰনের আরাম - অনেক সময় মাথায় প্রচন্ড ব্যাথা যন্ত্রণা হলে গরম জলে পা ডুবিয়ে রাখলে আরাম পাওয়া যায়।
বিশেষ সতর্কতা:-১) যাদের ডায়াবেটিস বা স্নায়ুর সমস্যা আছে তারা গরম জলে পা ডোবানোর আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কারণ তারা অনেক সময় ডায়াবেটিস বা স্নায়ুর সমস্যা রোগীরা বুঝতে পারে না অনুভবে কতোটা গরম জলে পা ডুবিয়েছে , সেই অনুভূতি টা তাদের খুব কম থাকে।
২) জল বেশি গরম হ ওয়া উচিত নয়।
৩) পা ভিজানোর পর ভালো করে মুছে ময়েশ্চারাইজার বা যে কোনো লোশন লাগান। @ মৌঝুরী
৩২
ভালুক যেভাবে বর্জ্যকে পেশিতে রূপান্তরিত করে!
মানুষসহ অধিকাংশ প্রাণীর ক্ষেত্রে, দিনের পর দিন প্রস্রাব করতে না পারা শরীরে বিষাক্ত বর্জ্য জমা হওয়ার কারণে মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তবে, আমেরিকান ব্ল্যাক বিয়ার এবং গ্রিজলি ভালুকের এমন এক জৈবিক "সুপারপাওয়ার" বা বিশেষ ক্ষমতা বিবর্তিত হয়েছে, যার মাধ্যমে তারা একটানা সাত মাস পর্যন্ত কোনো বিরতি ছাড়াই মলমূত্র ত্যাগ না করে থাকতে পারে। শীতনিদ্রার সময় ভালুকের কিডনি সামান্য পরিমাণে প্রস্রাব তৈরি করতে থাকে, কিন্তু তা শরীর থেকে বের হয় না। পরিবর্তে, মূত্রাশয় প্রস্রাবের প্রধান উপাদান ইউরিয়াকে পুনরায় রক্তপ্রবাহে শুষে নেয়।
একবার রক্তে ফিরে আসার পর, একটি বিশেষ বিপাকীয় প্রক্রিয়া শুরু হয়। ভালুকের শরীরকে বিষাক্ত করার পরিবর্তে, এই ইউরিয়া ভেঙে যায় এবং এতে থাকা নাইট্রোজেন বিমূর্ত হয়ে যায়। এরপর এই নাইট্রোজেন লিভারে বা যকৃতে স্থানান্তরিত হয়, যেখানে এটি প্রোটিনের মূল উপাদান 'অ্যামিনো অ্যাসিড' তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
এই অবিশ্বাস্য অভ্যন্তরীণ পুনর্ব্যবহারযোগ্য চক্রটি ভালুককে পুরো শীতকাল জুড়ে তাদের পেশি এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের টিস্যুগুলো ঠিক রাখতে সাহায্য করে, যদিও তারা এই সময়ে এক গ্রাম খাবারও গ্রহণ করে না। এটি প্রকৃতির এমন এক বিস্ময়কর ব্যবিস্থাপনা, যা একটি বর্জ্য পদার্থকে জীবন রক্ষাকারী শক্তির উৎস হিসেবে বদলে দেয়। © বিজ্ঞান ঘর
৩৩
এক পা দিয়ে পানি পরীক্ষা করা শুরু করুন এবং ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে যান।
আপনি যদি নতুন কিছু শিখতে চান,তবে প্রথমে খুব অল্প পরিসরে শুরু করুন। যেমন, আপনি যদি একটা নতুন ব্যবসায় হাত দিতে চান, তো শুরুতে বড় বাজেট বা ঝুঁকি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বরং, একটু সাবধানে, এক পা দিয়ে পানি পরীক্ষা করা শুরু করুন নিজেকে সময় দিন, পরিস্থিতি বুঝুন, এবং ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে যান।
শিখতে হবে, খুঁজে বের করতে হবে
ওয়্যারেন বাফেটের কথাটি আমাদের শেখায় যে, প্রথমে সবকিছু ঝুঁকি নিয়ে শুরুর আগে সেটার সম্ভাব্য ফলাফল এবং পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তা করা উচিত।মানে, আপনি যেমন কোনো নতুন উদ্যোগের শুরুতে অর্থনৈতিক দিকগুলি, প্রতিযোগিতা এবং বাজারের অবস্থা যাচাই করে থাকেন, তেমনি নিজেকে কেবল একটি ছোট পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখলে ঝুঁকি কম হয় এবং এক ধরনের আত্মবিশ্বাসও আসে।
ফাঁদ থেকে দূরে থাকুন
সাধারণত, আমরা অনেক সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে চাই। আমাদের মনে একটা তাড়া থাকে,আর কখনো কখনো সেই তাড়ার কারণে আমরা তাড়াহুড়া করে ফেলি, যার ফলাফল হয় বিপরীত। কিন্তু ওয়্যারেন বাফেটের পরামর্শ এখানে একদম সঠিক: ঝুঁকি নিতে হবে, তবে হিসেব-নিকেশ করে, এক পা দিয়েই।
আমাদের নিজস্ব যাত্রা
এই জীবনটাই তো এক বড় যাত্রা, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তই আমাদের নতুন কিছু শিখতে এবং বেড়ে উঠতে সাহায্য করে। আপনি যখন নিজের জীবনে ‘পানি পরখ করার আগে এক পা দিয়ে দেখা’ এই ধারণাটি গ্রহণ করবেন, তখন আপনি বুঝতে পারবেন যে, জীবনের প্রতিটি ধাপই আমাদের শিখিয়ে দেয়—ঝুঁকি নেওয়া এবং সঠিকভাবে সেগুলি ব্যবস্থাপনা করা কিভাবে ভবিষ্যতের দিক নির্দেশ করতে পারে।
এটা মনে রাখবেন, প্রতিটি পদক্ষেপেই একটা নতুন সুযোগ থাকে। আর সেই সুযোগটি লাভের দিকে নিয়ে যেতে পারে, যদি আপনি কেবল এক পা দিয়েই শুরু করেন, আর কিছুটা সময় নিয়ে বিষয়টি ভালোভাবে বুঝে নেন।
এবার, আপনিও কী করবেন? কীভাবে আপনার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে 'এক পা দিয়েই পানি পরীক্ষা করার' সাহস যোগাবেন?
আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ছোট ছোট পদক্ষেপ নিন, আর আপনার সফলতা আপনাকে খুঁজে নেবে। @ Pial Hasan Tutul
৩৪
কীভাবে প্রতিটি ধাপ আপনাকে সাফল্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
১. দক্ষতা: আপনার প্রথম পদক্ষেপ
দক্ষতা অর্জন হল প্রতিটি মানুষের জীবনের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। পৃথিবীটা যদি হয় একটি বিশাল মঞ্চ, তবে আপনি আপনার দক্ষতা দিয়েই সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিনয় শুরু করবেন। দক্ষতার মাধ্যমে আপনি শুধু নিজের পেশাগত জীবনই উন্নত করেন না, বরং আপনি নিজের আত্মবিশ্বাস এবং মূল্যবান অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারেন।
একজন দক্ষ ব্যক্তি কখনোই বেকার থাকে না, কারণ তার কাছে এমন কিছু বিশেষ গুণ থাকে যা অন্যরা শিখতে চায়। এই দক্ষতা শিখতে হবে, নতুন কিছু জানার তৃষ্ণা থাকতে হবে। আপনি যদি আজকে কিছু শিখেন, কাল সেটা আপনাকে নতুন পথ দেখাবে।
২. আয়: দক্ষতার ফলাফল
দক্ষতার পর, দ্বিতীয় ধাপ হল আয়। আপনি যদি দক্ষ হন, তবে আয়ের দরজা খোলার সুযোগ আপনার সামনে থাকবে। আয় হল সেই শক্তি, যা আপনাকে একে একে আপনার লক্ষ্য পূরণের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আয় হলো সেই হাতিয়ার যা আপনাকে নিজের জীবনকে আরও উন্নত করতে সহায়ক হবে। এটা এক রকম যাত্রার সঙ্গী, যাকে ছাড়া স্বপ্ন দেখা সম্ভব নয়।
৩. সম্পদ: আপনির ভবিষ্যত তৈরির পদক্ষেপ
সম্পদ অর্থ শুধু টাকার বিষয় নয়, এটি আপনির ভবিষ্যত। আপনি যখন আয় থেকে কিছু সঞ্চয় করতে শুরু করেন, তখন আপনি আস্তে আস্তে নিজের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা গড়তে শুরু করেন। সম্পদই আপনাকে একটি শান্ত এবং নিশ্চিন্ত জীবনের সুরক্ষা দেয়, যেখানে আপনি কাজ থেকে অবসর নিতে পারেন, কিংবা আপনি যে কোনও পরিস্থিতিতে নিজের পছন্দমতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
অথবা, যদি আপনি সম্পদের সঠিক ব্যবহার জানেন, তবে আপনি নিজের জীবনকে আরও সমৃদ্ধ এবং আনন্দময় করতে পারেন। এই সম্পদ আপনার স্বাধীনতা এবং সৃজনশীলতার একটি মূল চাবিকাঠি হয়ে ওঠে।
৪. স্বাধীনতা: আসল সাফল্য
এখন, আসল সাফল্য তখনই আসে যখন আপনার আয় এবং সম্পদ আপনাকে সত্যিকার স্বাধীনতা দেয়। স্বাধীনতা মানে শুধুমাত্র আর্থিক স্বাধীনতা নয় এটা মানে হচ্ছে, আপনি নিজের জীবনকে যেমন ইচ্ছা তেমনভাবে পরিচালনা করতে পারেন। আপনার সময়, আপনার কর্ম, আপনার সিদ্ধান্ত সবকিছু আপনি নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
স্বাধীনতা পাওয়ার জন্য অবশ্যই কঠোর পরিশ্রম, সংগ্রাম, এবং পরিকল্পনার প্রয়োজন, কিন্তু একবার যখন আপনি এই সীমানা অতিক্রম করবেন, তখন আপনি দেখবেন সত্যিকারের সাফল্য কি জিনিস!
আমরা যখন দক্ষতা অর্জন করি, তখন আয় আসে। আয় একসময় সম্পদে পরিণত হয়, এবং সেই সম্পদ আপনাকে স্বাধীনতার পথে নিয়ে যায়। জীবনটা একটা সিরিজ একটা ধাপ পর পর আরেকটা ধাপ। যদি আপনি আজ দক্ষ হন, কাল আপনি আয়ের মাধ্যমে ভবিষ্যত গড়বেন। এই প্রক্রিয়াটি আপনাকে সম্পদ তৈরি করতে সাহায্য করবে, এবং একদিন, সেই সম্পদই আপনাকে আপনার জীবনে পূর্ণ স্বাধীনতা দেবে। @ Pial Hasan Tutul
৩৫
১৪৯২ থেকে স্পেনিশ সাম্রাজ্যের উত্থান শুরু হয়। এটি ছিল ইউরোপের প্রথম সাম্রাজ্য।
স্পেনিশ, পর্তুগিজ, ডাচ, বৃটিশ, সোভিয়েতসহ ইউরোপের সমস্ত সাম্রাজ্য পতনের ক্ষেত্রে ৭টা ধাপ পার হইতে হইছে।
ইতিহাসে কোনো সাম্রাজ্য এর ব্যতিক্রম ছিল না। এই প্যাটার্নটা যে খুঁজে বের করছে আমেরিকার অন্যতম সফল ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ রে ডালিও। তার মতে আমেরিকা ইতোমধ্যেই পতনের সাত ধাপের মধ্যে পাঁচটা অতিক্রম করে ফেলছে।
সাম্রাজ্যগুলোর পতনের প্রথম ধাপ হল অতিবিস্তৃতি বা ইম্পেরিয়াল ওভারস্ট্রেচিং।
সাম্রাজ্যগুলোর উত্থানকালের পর যখন বিস্তৃতির সময় আসে, তখন সেগুলো বিস্তৃত হতে হতে সাদা হাতির মত এত বড় হয়ে যায় যে নিজের হাত পা-ই আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ইচ্ছেমত নাড়াইতে পারে না। আমেরিকা এই রোগে ইতিহাসের যেকোনো সাম্রাজ্যের চাইতে বেশি আক্রান্ত। পৃথিবীর ৮০ টা দেশে আমেরিকার ৭৫০ প্লাস সামরিক ঘাঁটি আছে। ১৫০ এর বেশি দেশে আমেরিকার সৈন্য আছে।
দ্বিতীয় ধাপটা সবচেয়ে ইম্পোর্ট্যান্ট। সেটা হল কারেন্সি ডিবেজমেন্ট (Currency Debasement)। অর্থাৎ মুদ্রার পিছনে যে প্রকৃত সম্পদ থাকে, সেটা হটিয়ে দেওয়া। যেমন ১৫৯০ সালে স্পেন পৃথিবীর অর্ধেক সোনা আর অর্ধেক রূপা নিয়ন্ত্রণ করত। আমেরিকা মহাদেশের সবগুলো খনি থেকে এককভাবে স্পেন এসব সোনা-রূপা সংগ্রহ করত। পৃথিবীর বাকি সমস্ত সাম্রাজ্য মিলে নিয়ন্ত্রণ করত অবশিষ্ট ৫০ পার্সেন্ট।
কিন্তু সেই একই ট্র্যাপ অর্থাৎ বিশ্বজুড়ে ঘাঁটি ও যুদ্ধ পরিচালনার জন্য প্রচুর অর্থের দরকার হয়। সেই অর্থচাহিদা মেটানোর জন্য প্রথমে স্পেনিশ মুদ্রায় ২৫ পার্সেন্ট তামা মেশানো হয়। যেটা ছিল আগে হান্ড্রেড পার্সেন্ট খাঁটি রূপা। ফলে সারা দুনিয়ার সবগুলো সাম্রাজ্যের রিজার্ভ ছিল স্পেনিশ মুদ্রা। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে এই মুদ্রা চলত। কিন্তু মাত্র ৮০ বছরের ব্যবধানে স্পেনিশ মুদ্রা পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায়। কোথাও এক পয়সা মুদ্রা রিজার্ভ হিসেবে রাখা ছিল না। কারণ ক্রমান্বয়ে ৫০, ৭৫ এবং অবশেষে ১০০ পার্সেন্ট তামায় পরিণত হয় তাদের মুদ্রা। যা ভাঙ্গারি আইটেমের বাইরে কোনো কাজে আসত না।
আমেরিকার এই ধাপ ১৯৭১ সালেই শুরু হইছে। যখন ডলারের বিনিময়ে স্বর্ণ প্রদানের পদ্ধতি বাতিল করা হয়। এরপর তেলের মাধ্যমে সেটা ধরে রাখা হইছে কৃত্রিমভাবে।
তৃতীয় ধাপ হল ঋণের ফাঁদ।
সর্বশেষ কিছুদিন আগে আপনারা এই নিউজটা দেখেছেন কিনা যে ইতিহাসে প্রথমবারের মত আমেরিকার ঋণ ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে!
এই অকল্পনীয় ঋণ শুধু আমেরিকার ইতিহাসেই না, বরং পুরা পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বোচ্চ ঋণ। যা আসলে আগামী কয়েক হাজার বছরেও শোধ করা সম্ভব হবে না। এই ঋণের ফাঁদ থেকে বের হতে না পারার কারণেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বৃটিশ সাম্রাজ্য ধ্বসে পড়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ধ্বসে পড়েছে। ২০০৮ সালে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ১০ ট্রিলিয়ন। ২০২০ এ ২৭ ট্রিলিয়ন। রে ডালিও যখন তার বই লেখেন, তখন প্রতি ১০০ দিনে আমেরিকার কাঁধে এক বিলিয়ন ডলারের ঋণ যুক্ত হচ্ছিল।
কারণ বর্তমানে আমেরিকার বার্ষিক সামরিক বাজেটে যত অর্থ যায়, তারচে বেশি যায় জাস্ট ঋণের সুদ প্রদানে! প্রতিবছর এক ট্রিলিয়ন ডলার দিতে হয় সুদ বাবদ! দিনদিন যেটা ক্রমবর্ধমান।
তারপর চতুর্থ ও পঞ্চম ধাপে আছে যথাক্রমে উৎপাদনক্ষমতা হ্রাস ও সামাজিক অবক্ষয়। এই বিষয়গুলো নিয়ে আসলে কিছুই বলার নাই। কারণ চীনের প্রোডাকশন ক্যাপাসিটির কাছে আমেরিকা এখন নস্যি।
ষষ্ঠ ধাপে আছে মুদ্রা রিজার্ভ কারেন্সির মর্যাদা হারানো। এরপর জাস্ট পতন।
আমেরিকা যে ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণগ্রস্ত, এটা পৃথিবীর কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সরকার আর বিনিয়োগকারীরা জানে। পাশাপাশি এটাও জানে যে চীনের বাজেট উদ্বৃত্ত থাকে বার্ষিক ট্রিলিয়ন ডলারের উপর। ফলে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ঋণের ফাঁদে জর্জরিত একটা কারেন্সির পরিবর্তে ট্রিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত থাকা কারেন্সির দিকে নির্বোধরাও ঝুঁকবে। বিনিয়োগ এক্সপার্টদের কথা তো বলাই বাহুল্য।
জাস্ট অপেক্ষা–কোনদিন হুড়মুড়িয়ে ভেঙ্গে পড়বে মেকিভাবে ধরে রাখা সুপারপাওয়ারের মুখোশ। @ রাকিবুল হাসান
৩৬
এত পরিশ্রমের পরও কেন জীবনের মোড় ঘুরছে না?
আমরা সবাই জীবনে সফল হতে চাই। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একটানা কাজ করি, পরিশ্রম করি। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, কেন আপনি সেখানেই পড়ে আছেন, যেখান থেকে শুরু করেছিলেন?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে একটি ছোট্ট, কিন্তু শক্তিশালী কথার মধ্যে। আসুন জেনে নিই সেই জাদুকরী কথাগুলো, যা বদলে দিতে পারে আপনার জীবনের পুরো চিত্রপট:
১. কাজের চেয়ে নিজের ওপর কাজ করুন
বেশিরভাগ মানুষ শুধু তাদের 'কাজ' নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু সফল ব্যক্তিরা কাজের পাশাপাশি 'নিজের ওপর কাজ' করেন। এর মানে হলো— শুধু ডিউটি করা নয়, বরং নিজের দক্ষতা, চিন্তা এবং ব্যক্তিত্বকে উন্নত করা। আপনি যখন নিজেকে বদলাবেন, আপনার চারপাশের সবকিছু আপনাআপনি বদলে যাবে।
২. সফলতা তাড়া করার জিনিস নয়, এটি আকর্ষণ করার বিষয়
টাকা, ক্ষমতা, সম্মান বা ভালো সঙ্গী— এগুলো কখনোই তাদের কাছে যায় না, যারা এর পেছনে পাগলের মতো ছোটে। এগুলো যায় তাদের কাছে, যারা নিজেদেরকে এসবের 'যোগ্য' করে তোলে। সফলতা কোনো প্রজাপতি নয় যে আপনি দৌড়ে ধরবেন, বরং এটি হলো এমন এক ফুল যা আপনার নিজের ভেতরে ফুটিয়ে তুললে প্রজাপতি নিজেই আপনার কাছে ছুটে আসবে।
৩. আপনি যা, তার চেয়ে বেশি পেতে হলে আপনাকে আরও বেশি 'হতে' হবে
আপনি বর্তমানে জীবনে যা পাচ্ছেন, তা আপনার বর্তমান যোগ্যতার সমান। আপনি যদি আরও ভালো কিছু পেতে চান, তবে আপনাকে আগের চেয়ে আরও ভালো, আরও দক্ষ এবং আরও যোগ্য মানুষ হয়ে উঠতে হবে।
৪. নিজেকে বহুমুখী করে তুলুন (Learn New Skills)
শুধুমাত্র একটি কাজে আটকে থাকবেন না। আপনি যদি শুধু লিখতে পারেন, তবে সাথে কথা বলাও শিখুন। আপনি যদি এডিটিং পারেন, তবে মার্কেটিংও শিখুন। নতুন ভাষা শিখুন, নতুন প্রযুক্তি জানুন। আপনার ঝুলিতে যত বেশি স্কিল থাকবে, আপনি তত বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবেন।
৫. আপনি যত বেশি জানবেন, তত বেশি আকর্ষণীয় হবেন (The More You Become, The More You Attract)
আপনার জ্ঞান, আপনার দক্ষতা এবং আপনার ব্যক্তিত্ব আপনাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে। আপনি যত বেশি নিজেকে উন্নত করবেন, আপনি তত বেশি 'ম্যাগনেটিক' বা আকর্ষণীয় হয়ে উঠবেন। তখন সফলতা আপনাকে খুঁজতে খুঁজতে আপনার কাছে চলে আসবে।
শেষ কথা:
কাজ আপনাকে বেঁচে থাকার রসদ দেবে, কিন্তু নিজের ওপর করা পরিশ্রম আপনাকে এমন একটি জীবন দেবে যা আপনি সবসময় স্বপ্ন দেখেছেন। তাই আজ থেকে শুধু কাজের পেছনে না ছুটে, প্রতিদিন একটু একটু করে নিজেকে উন্নত করার কাজে মন দিন।
"কারণ আপনি যখন বদলাবেন, তখন আপনার পৃথিবীটাও বদলে যাবে!" @ Rohit Baagdii
৩৭
কেন আরবরা অসহায়:
=================
১. ২২টি আরব দেশের সম্মিলিত আয়তন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ বর্গ কিলোমিটার, বাংলাদেশের প্রায় ৯৫ গুণ। কিন্তু গ্রীন এরিয়া আছে মাত্র ৫/৭ এরিয়ায়। এইটা আরবদের খাবারের সংকটকে বিপুল মাত্রা দিয়েছে।
২. চাষযোগ্য এরিয়া একেবারেই নেই বললে চলে, বাংলাদেশের চেয়ে আরব বিশ্ব আয়তনে প্রায় ৯৫ গুণ বড়, কিন্তু আরবদের মোট চাষযোগ্য জমি বাংলাদেশের চেয়ে কোনমতে দ্বিগুণ। গুণগত মান হিসাব করলে আরবদের চেয়ে বাংলাদেশের চাষ যোগ্য জমির পরিমাণ কয়েক গুণ বেশি। জাতি হিসেবে এইটা বাংলাদেশের একটা বিরাট শক্তি, যা থেকে আরবরা বঞ্চিত।
৩. আরবদের জিওগ্রাফি আধুনিক যুগের লার্জ স্কেল সভ্যতা বা নগরায়নের বিরুদ্ধে অবস্থান করে। প্রাকৃতিকভাবে ব্যাপক পরিমাণ জনসংখ্যা বৃদ্ধি আরবদের পক্ষে কখনোই সম্ভব ছিল না। বর্তমানে তেল ও গ্যাস সম্পদের কারনে আরবদের পক্ষে বিশাল বিশাল শহর গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে, কিন্তু এইসব শহরের বিপুল পরিমাণ জনগণ বাইরের বা ইমিগ্র্যান্ট।
কাতার, বাহরাইন, বা আরব আমিরাতের টোটাল জনসংখ্যা বাংলাদেশের অনেক জেলার চেয়ে বহুগুণে কম। আরবদের যেসব বড় বড় রাষ্ট্র দেখা যায় এইগুলো ন্যাচারাল না, বরং আর্টিফিসিয়াল। যাবতীয় খাবার দাবার বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়, প্রচণ্ড খরচ করে লবণ পানিকে পানযোগ্য পানিতে রূপান্তর করতে হয়। শুধূ তেল গ্যাসের উপরেই আরব রাষ্ট্রগুলোর বেড়ে ওঠা, বড় হয়ে ওঠা।
৪. ন্যাচারাল রিসোর্স যদি তেল বা গ্যাস কিংবা মিনারেল জাতীয় হয় তবে সেইসব দেশে একনায়ক শাসকেরা বিরাট বেনিফিট পায়। তেল বা গ্যাসক্ষেত্রগুলো খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং অর্জিত অর্থের উপর খবরদারি করা যায়।
৫. ন্যাচারাল রিসোর্স একটা সময়ে রিসোর্স কার্স বা অভিশাপে রূপান্তরিত হয়। আরব বিশ্বে যে সব দেশ দেখা যায় এইগুলো আসলে কোন দেশ বা রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় পড়ে না। শাসকের সাথে শাসিতের জবাবদিহিতামূলক সম্পর্ক আরব বিশ্বে গড়ে উঠতে পারেনি সংগত কারনেই। জনগণের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক তৈরি হয় ট্যাক্স কালেকশনের মাধ্যমে।
যেহেতু, ট্যাক্স দেওয়া লাগে না এই কারনে আরব জনগণের হাতে বারগেইনিং টুল আসলে তেমন কিছুই নেই। সে চাইলেও নাগরিক হয়ে উঠতে পারে না, সে চাইলেই রাজনৈতিক হয়ে উঠতে পারে না। আধুনিক বিশ্বের কোন পলিটি সে নির্মাণ করতে পারে না। উল্টো রাজকোষ থেকে অর্থের প্রবাহ তাঁকে উনমানুষে পরিণত করেছে। রাজার উপর তীর্থের কাকের মত চেয়ে থাকতে থাকতে সে তার পলিটিক্যাল এজেন্সি হারিয়ে ফেলেছে।
৬. আরব দেশগুলো বাই ডিফল্ট দুর্বল। কেননা, তার যাবতীয় সম্পদ কেন্দ্রীভূত। পুরো আরব বিশ্বের তেল ও গ্যাসের খনিগুলোতে টার্গেটেড হামলা চালিয়ে ধ্বংস করতে খুব বেশি বেগ পেতে হবে না কোন শক্তিশালী দেশকে। কয়েকশ খনিতে হামলা চালিয়ে, লবন পানির শোধনাগারে হামলা চালিয়ে আরবদেরকে রীতিমত রাতারাতি বিপর্যয়ের মধ্যে ঠেলে দেওয়া সম্ভব।
মরুভূমি হওয়ার কারনে তার পক্ষে গোপনভাবে কোন প্রতিরক্ষা গড়ে তোলাও সম্ভব না। পাহাড় পর্বত বেষ্টিত দেশ সমূহে মানুষ প্রাকৃতিকভাবে বহুদিন টিকে থাকতে পারে এবং বিদ্রোহী কর্মকান্ড চালিয়ে যেতে পারে। আরবদের জন্য এইটা খুবই কঠিন ও অসম্ভব বলা যায়।
৭. তেল গ্যাস নির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরের দিকে যাওয়াটাও আরবদের জন্য ভীষণ রকমের একটা সমস্যার ব্যাপার। তার বাজার খুব ছোট এবং নিজে বানানোর চেয়ে বাইরে থেকে কিনে আনা তার জন্য অনেক বেশি সেন্সিবল। বিশাল অংকের টাকা ঢেলে ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা যতটা কল্পনায় সহজ বাস্তবে ততটাই কঠিন। @ Yeanur Rahman
৩৮
আমরা অনেক সময় কারণ না জেনেই নিয়ম মেনে চলি
একটি ক্যান্টনমেন্টে নতুন ব্রিগেড কমান্ডার যোগ দিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি একটি অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করলেন—মাঠের পাশে একটি সাধারণ বেঞ্চ, আর সেই বেঞ্চের দুই পাশে প্রতিদিন দাঁড়িয়ে থাকে দুইজন সশস্ত্র সৈনিক। আশেপাশে আরও অনেক বেঞ্চ থাকলেও সেগুলোতে কোনো পাহারা নেই। কিন্তু কয়েকদিন পর্যবেক্ষণের পর তিনি জানতে চাইলেন—কেন এই বেঞ্চে পাহারা দেওয়া হয়? উত্তরে সবাই একটাই কথা বলল—এটাই নিয়ম, এটাই রেওয়াজ। কিন্তু কেউই জানে না, কেন এই নিয়ম চালু হয়েছিল।
অনুসন্ধান করতে করতে তিনি জানতে পারলেন, প্রায় ২০ বছর আগে এই নিয়ম চালু করা হয়েছিল। অবশেষে সেই সময়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলো। জবাব শুনে সবাই হতবাক।
তিনি বললেন—তখন বেঞ্চটি নতুন রঙ করা হয়েছিল। তাই সাময়িকভাবে দুইজন সৈনিককে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যেন কেউ বসে রঙ নষ্ট না করে। কিন্তু সেই অস্থায়ী নির্দেশই বছরের পর বছর ধরে “নিয়ম” হয়ে গেছে।
এই গল্পটা শুধু একটি বেঞ্চের নয়, এটি আমাদের সমাজের প্রতিচ্ছবি। আমরা অনেক সময় কারণ না জেনেই নিয়ম মেনে চলি। প্রশ্ন করি না, যাচাই করি না—শুধু অনুসরণ করি।
বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সংগঠন বা সমাজে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ নিয়ম সময়ের সাথে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়, কিন্তু প্রশ্ন না করার কারণে সেগুলো চলতেই থাকে। ফলে সময়, শ্রম ও সম্পদের অপচয় হয়।
বাস্তবতা হলো—প্রতিটি নিয়মের পেছনে একটি কারণ থাকে। কিন্তু যখন সেই কারণ হারিয়ে যায়, তখন নিয়ম শুধু একটি অভ্যাসে পরিণত হয়।
তাই প্রশ্ন করা জরুরি। কারণ প্রশ্ন মানে বিদ্রোহ নয়, বরং সচেতনতা। যে সমাজ প্রশ্ন করতে শেখে, সেই সমাজই এগিয়ে যায়।
আপনি কি নিশ্চিত—আপনার জীবনে এমন কোনো “বেঞ্চ” নেই, যেটাকে আপনি কারণ না জেনেই পাহারা দিয়ে যাচ্ছেন? @ অনন্তলোকেরস্পর্শ
৩৯
সংসারের খরচ কমানোর ১০ টি বাস্তব উপায়।
সংসারের খরচ কমানোর ১০টি বাস্তব উপায় যা আজই শুরু করা যাবে!
“আপনার মাসের খরচ বেড়ে যাচ্ছে কি? চিন্তার কিছু নেই! ছোট ছোট পরিবর্তনেই আপনার বাকি টাকা বেড়ে যাবে । নিচের ১০টি কৌশল শুরু করুন
১️⃣ খরচের বাজেট বানান
প্রতিটি মাসের আয় এবং খরচ লিখে রাখুন।
ট্রিগার: যখন আপনি খরচ লিখবেন, অপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে মন চাইবে না।
প্রশ্ন: আপনি কি জানেন, মাসে কতটা অপ্রয়োজনীয় জিনিসে খরচ হয়?
২️⃣ অপ্রয়োজনীয় সাবস্ক্রিপশন কেটে দিন
Netflix, YouTube Premium বা অন্যান্য সেবা পরীক্ষা করুন।
ট্রিগার: অপ্রয়োজনীয় সাবস্ক্রিপশন বন্ধ করলে মাসে কমপক্ষে ৫০০-১০০০ টাকা বাঁচতে পারে।
৩️⃣ বাড়ির বেলুন-বিদ্যুৎ খরচ কমান
LED লাইট ব্যবহার করুন, অপ্রয়োজনীয় লাইট/ফ্যান বন্ধ রাখুন।
প্রশ্ন: কখন শেষবার আপনার বিল দেখে হজম করেছেন?
৪️⃣ বাজারের পরিকল্পনা করুন
প্রতিদিন কেনাকাটা না করে সাপ্তাহিক বা মাসিক লিস্ট বানান।
ট্রিগার: লিস্ট ছাড়া বাজার করলে অতিরিক্ত জিনিস কেনার প্রবণতা ৪০% বেশি।
৫️⃣ পানি ও গ্যাস সাশ্রয় করুন
নল ফাঁকা রাখবেন না, গ্যাসের চাপ অনুযায়ী রান্না করুন।
প্রশ্ন: আপনার মাসে কত টাকা পানিতে খরচ হয়, জানেন কি?
৬️⃣ Second-hand বা ডিসকাউন্ট ব্যবহার করুন
জিনিসপত্র নতুন না হলেও মানের হলে সাশ্রয় হয়।
ট্রিগার: “ভালো মানের, কম দামে” প্রিন্সিপল মেনে চলুন।
৭️⃣ নিজে রান্না করুন
বাইরে খাওয়া কমান, বাড়িতে খাওয়া স্বাস্থ্যকর ও সাশ্রয়ী।
প্রশ্ন: মাসে বাইরে খাওয়ায় কত টাকা চলে যায়, হিসাব করেছেন?
৮️⃣ DIY (নিজে তৈরি করুন)
ঘর, সাজসজ্জা বা ছোট মেরামত নিজে করার চেষ্টা করুন।
ট্রিগার: “নিজে করলে খরচ কমে, শখও থাকে” – দুই পাখি এক পাথরে!
৯️⃣ মাসিক খরচ পুনর্বিবেচনা করুন
একবারে সমস্ত খরচ দেখা এবং অপ্রয়োজনীয় জিনিস বাদ দিন।
প্রশ্ন: আপনার খরচের ২০% কি আসলে অপ্রয়োজনীয়?
সঞ্চয়কে রুটিন বানান
মাসের শুরুতেই সঞ্চয় নির্ধারণ করুন।
ট্রিগার: “দেখুন কত দ্রুত ছোট ছোট সঞ্চয় বড় হয়।”
শেষের কথা: ছোট ছোট অভ্যাসই বড় পরিবর্তন আনে। আজই শুরু করুন, আগামী মাসের খরচ কমে যাবে! @ দৃষ্টিকোণ
৪০
আসল স্মার্টনেস; নিজেকে আপডেট করুন
দামী ব্র্যান্ডের কাপড় আর আইফোন হাতে নিলেই 'স্মার্ট' হওয়া যায় না; স্মার্টনেস থাকে মাথায় আর আচরণে—কম কথা বলা, পরিস্থিতি বোঝা আর নিজের পকেট সামলানোই হলো আসল স্মার্টনেস; নিজেকে আপডেট করুন, নতুবা নোকিয়া ফোনের মতো হারিয়ে যাবেন।
Smartness isn't about Appearance, It's about Mindset
আমরা অনেকেই ভাবি—সুন্দর করে চুল কাটা, চোখে সানগ্লাস আর পায়ে দামী জুতো পরলেই বুঝি স্মার্ট হওয়া যায়।
ভুল! ওটা তো শুধু 'সাজগোজ'। আসল স্মার্ট মানুষ সে-ই, যে জানে কোথায় মুখ খুলতে হয় আর কোথায় চুপ থাকতে হয়।
যে জানে পকেটের ১০ টাকা কীভাবে ১০০ টাকায় পরিণত করতে হয়।
স্মার্টনেস কোনো জন্মগত প্রতিভা নয়, এটা অর্জন করতে হয়।
বোকারা তর্কে জেতে, আর স্মার্টরা কাজে জেতে।
আজকের যুগে আপনি যদি নিজেকে সময়ের সাথে আপডেট না করেন, তবে নোকিয়া ফোনের মতোই মার্কেট আউট হয়ে যাবেন।
তাই শুধু দেখতে সুন্দর না হয়ে, কাজেও ধারালো হোন।
স্মার্ট মানুষ ভিড়ের মধ্যে থেকেও আলাদা হয়। তাদের কেউ ইগনোর করতে পারে না। কারণ তাদের ব্যক্তিত্ব চুম্বকের মতো কাজ করে।
আপনি যদি সত্যিই স্মার্ট হতে চান, তবে নিজের মধ্যে নিচের পরিবর্তনগুলো আনুন।
স্মার্ট হতে হলে আপনাকে কী কী জানতে হবে?
১. শোনার অভ্যাস করুন (Listen More, Talk Less)
বোকারা সবসময় নিজের ঢোল পিটায়, আর স্মার্টরা অন্যের কথা শোনে।
কারণ বললে আপনি শুধু সেটাই জানবেন যেটা আপনি জানেন, কিন্তু শুনলে আপনি নতুন কিছু শিখবেন।
ঈশ্বর আমাদের দুটো কান আর একটা মুখ দিয়েছেন—এর মানে হলো, শোনার কাজটা বলার চেয়ে দ্বিগুণ করতে হবে।
২. প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ (Control Your Reaction)
কেউ আপনাকে গালি দিল বা অপমান করল, আর আপনি সাথে সাথে রেগে গেলেন—মানে আপনি আপনার রিমোট কন্ট্রোলটা তার হাতে দিয়ে দিলেন। স্মার্ট মানুষরা হুটহাট রিয়েক্ট করে না। তারা হাসিমুখে পরিস্থিতি হ্যান্ডেল করে, অথবা চুপ থেকে বুঝিয়ে দেয়—"তোমার কথায় আমার কিছু যায় আসে না।" নীরবতা হলো স্মার্টনেসের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
৩. না বলতে পারা (Learn to Say No)
সবাইকে খুশি করতে যাওয়া হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বোকামি।
স্মার্ট মানুষরা জানে তাদের সময়ের মূল্য কত।
তাই যে কাজটা তাদের লক্ষ্যের সাথে মেলে না, বা যে আড্ডাটা তাদের সময় নষ্ট করে—সেখানে তারা ভদ্রভাবে 'না' বলতে জানে।
'না' বলাটা অভদ্রতা নয়, এটা নিজের বাউন্ডারি সেট করা।
৪. টাকার সঠিক ব্যবহার (Financial Smartness)
স্যালারি পাওয়ার পর শপিং মলে দৌড়ানো স্মার্টনেস নয়, স্মার্টনেস হলো সেই টাকার একটা অংশ সেভ করা বা ইনভেস্ট করা।
দামী ফোন দেখিয়ে বড়লোক সাজার চেয়ে, গোপনে ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়ানো অনেক বেশি স্মার্ট কাজ।
স্মার্টরা টাকা দিয়ে টাকা বানায়, আর বোকারা টাকা দিয়ে দেখনদারি করে।
শেষ কথা
নিজেকে এমনভাবে তৈরি করুন যেন আপনার উপস্থিতি মানুষকে মুগ্ধ করে, আর অনুপস্থিতি মানুষকে ভাবায়।
স্মার্টনেস কোনো গন্তব্য নয়, এটা একটা যাত্রা। রোজ নিজেকে ১% হলেও উন্নত করুন।
নিজেকে বলুন—"আমি শুধু দেখতে স্মার্ট নই, আমি চিন্তাতেও স্মার্ট।" @ MotivationalQuotesBangla
৪১
আধ্যাত্মিক সাধনা বা 'উপবাস
আমরা যাকে আধ্যাত্মিক সাধনা বা 'উপবাস হিসেবে জানি, তার প্রকৃত উৎস মূলত চতুর্থ শতকের রোমান সাম্রাজ্যের একটি সুনিপুণ রাজনৈতিক শৃঙ্খলা? ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ৩৮০ খ্রিস্টাব্দে রোম সম্রাট প্রথম থিওডোসিয়াস প্রবর্তিত রাষ্ট্রীয় দর্শনের একটি পরিমার্জিত সংস্করণ হল উপবাস।
৩৮০ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট থিওডোসিয়াস 'ডিক্রি অফ থেসালোনিকা' (Edict of Thessalonica) জারির মাধ্যমে খ্রিস্টধর্মকে রোমের একমাত্র রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করেন। এটি আধ্যাত্মিকতার ও বিশ্বাসের বিষয় ছিলো না, এটি ছিল সাম্রাজ্যকে একটি একক আইনি কাঠামোর নিচে আনার চেষ্টা। থিওডোসিয়াস বুঝতে পেরেছিলেন, প্রজাদের দেহ ও মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে তাদের খাদ্যাভ্যাস ও প্রাত্যহিক রুটিনকে রাষ্ট্রীয় পাহারায় আনতে হবে। খ্রিস্টধর্মে যে 'লেন্ট' (Lent) বা উপবাসের প্রথা আগে থেকেই ছিল, থিওডোসিয়াসের আমলে তাকে একটি সুসংগঠিত রূপ দিয়ে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের পরীক্ষা হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়।
খ্রিস্টান রাজনৈতিক দর্শনে উপবাসের মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষের জৈবিক তাড়নাকে অবদমিত করে তাকে একটি অনুগত নাগরিকে পরিণত করা। "যখন একজন মানুষ রাষ্ট্রের নির্দেশে ক্ষুধা ও তৃষ্ণাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে, তখন সে মানসিকভাবে যে কোনো কঠিন রাজকীয় আইন মেনে নিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।" এই 'অ্যাসেটিসিজম' বা কৃচ্ছ্রসাধনই ছিল সম্রাট হিরাক্লিয়াস ও আবিসিনিয়ার সম্রাট নাজাশীর রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি। ক্রমে সেই দর্শন বাইজেন্টাইন সম্রাজ্যের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ে। কনস্টান্টিনোপল যা বর্তমানে তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহর সেখানে উপবাসের আধ্যাত্মিকতা সবচেয়ে বেশি ছিল বলে জানা যায়। @ গ্রুপ-বি
৪২
পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী প্রাণী।
Quokka (কোয়োকা)-কে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী প্রাণী। এর সর্বদা হাসিমাখা মুখই মূলত এটিকে সুখী প্রাণী হিসেবে পরিচিত করিয়েছে। আসলে প্রাণীটির মুখের গঠনই এমন যে, এটি স্বাভাবিকভাবেই সব সময় হাসছে বলে মনে হয়। এই অনন্য হাসিমাখা অভিব্যক্তিই একে অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা করে তুলেছে।
কোয়োকা মূলত একটি মারসুপিয়াল স্তন্যপায়ী প্রাণী। এটি ক্যাঙ্গারু পরিবারের অন্তর্ভুক্ত (Macropodidae)। এর বৈজ্ঞানিক নাম Setonix brachyurus। সাধারণত এদের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০ থেকে ৫৪ সেন্টিমিটার এবং ওজন ২.৫ থেকে ৫ কেজির মধ্যে হয়। এদের লেজ তুলনামূলকভাবে ছোট এবং মোটা। এদের শরীর গোলাকার, কান ছোট ও গোল, এবং চোখ বড় ও উজ্জ্বল। মুখের কোণের গঠন এমনভাবে বাঁকানো যে সব সময়ই হাসিমাখা মনে হয়।
প্রধানত পশ্চিম Australia-র উপকূলীয় অঞ্চল ও দ্বীপে এরা বাস করে। বিশেষ করে Rottnest Island-এ এদের ঘনবসতি দেখা যায়। এই দ্বীপে গেলে অনেক সময় পর্যটকেরা খুব কাছ থেকে কোয়োকাকে দেখতে পান। মূলত ঝোপঝাড় ও ঘাসপূর্ণ এলাকায় থাকতেই এরা বেশি পছন্দ করে।
খাবারের ক্ষেত্রে কোয়োকা সম্পূর্ণ তৃণভোজী। এরা সাধারণত ঘাস, পাতা, গাছের কচি ডাল এবং বিভিন্ন উদ্ভিদ খেয়ে থাকে। শুষ্ক পরিবেশে টিকে থাকার জন্য এদের শরীরে বিশেষ অভিযোজন ক্ষমতা রয়েছে। খাবার থেকেই পানির চাহিদা পূরণ হওয়ার কারণে অনেক সময় এরা খুব কম পানি পান করেও দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে।
কোয়োকা মূলত নিশাচর (nocturnal), অর্থাৎ রাতে বেশি সক্রিয়। দিনে এরা ছায়াযুক্ত স্থানে বিশ্রাম নেয়। এরা সামাজিক প্রাণী এবং ছোট দলে থাকতে পছন্দ করে। মারসুপিয়াল হওয়ায় কোয়োকার বাচ্চা খুব ছোট অবস্থায় জন্মায় এবং মায়ের থলিতেই (pouch) বেড়ে ওঠে। সাধারণত বছরে একটি বাচ্চা জন্মায়। বন্য পরিবেশে এরা প্রায় ১০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে।
স্বভাবে কোয়োকা বেশ কৌতূহলী ও নির্ভীক। মানুষের উপস্থিতিতে এরা খুব একটা ভয় পায় না। অনেক সময় এরা মানুষের অনেক কাছাকাছি চলে আসে। এই কারণে পর্যটকেরাও এদের সঙ্গে ছবি তুলতে আগ্রহী। “কোয়োকা সেলফি” একসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। তবে প্রাণীটির নিরাপত্তার জন্য অনেক জায়গায় তাদের স্পর্শ করা বা খাবার দেওয়া নিষিদ্ধ।
তবে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, কোয়োকা বর্তমানে “Vulnerable” বা ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতি হিসেবে বিবেচিত। আবাসস্থল ধ্বংস, শিকারি প্রাণী (যেমন শিয়াল ও বিড়াল) এবং মানব কার্যকলাপ এদের জন্য বড় হুমকি। তথ্যসূত্র: https://en.wikipedia.org/wiki/Quokka
৪৩
মেয়েদের প্রতি মাসের চার ধাপ : The Four Stages of Menstrual Cycle
নারীদের পিরিয়ড সাইকেলকে ২৮ দিনে ধরা হয়, এর মধ্যেই চারটি ধাপ প্রতি মাসে লুপ আকারে চলতে থাকে। তবে ২১-৩৫ দিনের সাইকেলও হতে পারে, তাই ধাপের একদম নির্দিষ্ট সময়সীমা বলা সম্ভব নয়। এটা নারী-পুরুষ সবার জন্য জানা অতীব জরুরি। তো এখন দেখা যাক কোন ধাপে কী কী হয়-
Menstrual Phase: এই ধাপ মূলত পিরিয়ডকেই বোঝায়।
- সাইকেলকে যদি ১-২৮ দিন ধরা হয় তবে ১ম দিন থেকে ৩-৭ দিন হলো এই ধাপের সময়সীমা।
- এই সময় ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্ট্রেরন হরমোন কম থাকে, তারমানে মুড খারাপ থাকতে পারে৷
একেক ধাপে মন-মেজাজের একেক অবস্থা হয়, আর তার সাথে হরমোন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই হরমোন কোন ধাপে কেমন থাকে সেটা মনে রাখা জরুরি।
Follicular Phase:
- এই ধাপটা শুরু হয় পিরিয়ডের প্রথমদিন থেকে এবং শেষ হয় এর পরের ধাপ মানে Ovulation phase এর দিন।
- Follicular phase আর Menstrual phase একইসাথে চলতে থাকে প্রথম ৩-৭ দিন, তারপর থেকে Follicular Phase ই থাকে পুরোটা।
- এই ধাপের সময়সীমা ১৪দিনের আশেপাশে।
- এই ধাপে মস্তিষ্ক বুঝতে পারে যে শরীর গর্ভধারণ করতে পারেনি, তার মানে আবারও ডিম্বাণুর প্রয়োজন, যেহেতু ডিম্বাণু সহ জরায়ুর লাইনিং বেরিয়ে গেছে পিরিয়ডের সাথে। শুরু হয় FSH হরমোন নিঃসরণ করা।
- FSH হরমোন ডিম্বাণুকে আদেশ দেয় কিছু ডিমের থলি (যাকে follicle বলা হয়) তৈরি করতে, সেখান থেকে সবথেকে সুস্থ্য সবল একটা ডিম্বাণু বের হবে পরের ধাপে।
- এই হরমোন এবং ইস্ট্রোজেন জাতীয় অন্যান্য হরমোনগুলো শরীরকে গর্ভধারণ করার জন্য জন্য প্রস্তুত করে তোলে।
- এই ধাপে ইস্ট্রোজেন ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়।আমরা আগেই জেনেছি ইস্ট্রোজেনের সাথে মুডের একটা সম্পর্ক আছে, কিছু গবেষণায় দেখা গেছে ইস্ট্রোজেন সেরোটোনিন হরমোন নিঃসরণে সহায়তা করে আর সেরোটোনিন হরমোনকে তো ডাকাই হয় খুশির হরমোন নামে। তার মানে এই ধাপে ইস্ট্রোজেন ধীরে ধীরে বাড়তে থাকাকালীন মুডও আগের থেকে ভালো হতে থাকে সেরেটোনিনের জন্য।
- এই সময় নারীরা সাধারণত ফোকাসড থাকে বেশি, কাজের প্রোডাক্টিভিটি বাড়ে, মোটিভেশন বাড়ে, আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়, মোট কথায় চমৎকার একটা সময় কাটায়। সাথে মিলিত হওয়ার ইচ্ছাও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
Ovulation Phase: নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে কী হতে পারে এই ধাপে।
- এই ধাপে LH হরমোনের দায়িত্বে পরিপক্ক একটি ডিম্বাণুর সৃষ্টি হয় (অনেকসময় দু'টো ডিম্বাণুও সৃষ্টি হতে পারে তবে তা বিরল) এবং প্রস্তুত হয় শুক্রাণুর সাথে মিলিত হবার জন্য।
- এ সময় ইস্ট্রোজেন থাকে সর্বোচ্চ পরিমাণে, তার মানে মনও থাকে সবচেয়ে ভালো।
- এই ধাপে গর্ভবতী হওয়ার সম্ভাবনা সবথেকে বেশি, তবে এর কিছুদিন আগে হলেও গর্ভবতী হওয়া সম্ভব কারণ শুক্রাণু সঠিক পরিবেশে প্রায় ৫দিন বেঁচে থাকতে পারে।
- এসময় নারীদের লিবিডো অর্থাৎ মিলিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষাও অন্যান্য ধাপের থেকে অনেক বেশি থাকে।
- ডিম্বাণু ফেলোপিয়ান টিউব দিয়ে ধীরে ধীরে এগোতে থাকে শুক্রাণুর অপেক্ষায়। এগোতে সময় লাগে ২৪ ঘন্টা মতো, অর্থাৎ এই ধাপের সময়সীমা ২৪ ঘন্টা।
- পিরিয়ড সাইকেলের একদম মাঝামাঝি সময় এই ধাপের সূচনা হয়। ডিম্বাণু যদি এই সময় শুক্রাণুর সাথে মিলিত না হয় তবে ভেঙ্গে যেতে শুরু করে এবং শুরু হয় পিরিয়ড সাইকেলের সর্বশেষ ধাপ।
Luteal Phase: ডিম্বাণু তো কোনো কাজে লাগলো না, ভেঙ্গেও গেলো, কিন্তু সেটা তো আর জরায়ু জানে না। তাই পরবর্তী ঘটনাগুলো ঘটে:-
- জরায়ু তার উপর একটা আস্তরণ তৈরি করে এবং ফিটাস ধরে রাখার জন্য প্রস্তুত হয়। আর এই জরায়ুর আস্তরণ তৈরি হয় ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরন হরমোনের সাহায্যে।
- যদি এইসময় গর্ভধারণ না হয় তবে ধীরে ধীরে জরায়ুর আস্তরণ ভেঙ্গে পড়তে থাকে, শুরু হয় পিরিয়ডের প্রস্তুতি।
- ধীরে ধীরে ইস্ট্রোজেন আর প্রোজেস্টেরন কমতে থাকে কারণ তাদের আর কোনো কাজ নেই।
- হরমোনের ওঠানামার প্রভাবে মু্ড সুইং ঘটে প্রচুর, ক্লান্তি ভর করে শরীরে, অ্যাংজাইটি ও বিরক্তি দেখা দেয়, মোট কথায় একটা ঝামেলা মতো লাগে, Follicular Phase এর উল্টোটা বলা যেতে পারে।
- এই ধাপ চলতে থাকে পিরিয়ড শুরু হওয়ার দিন পর্যন্ত, প্রায় ১৪ দিন মতো থাকে। তারপর আবারও শুরু হয় সাইকেল, পুনরায় আগের ধাপগুলো শুরু হয় আবার শেষ হয়।
অর্থাৎ প্রত্যেক মাসে নারীদেহ একবার করে গর্ভধারণের জন্য প্রস্তুত হয়।
উপরোক্ত বিষয়গুলোর মধ্যে শারীরিক ব্যাপারগুলো মোটামুটি সবার ক্ষেত্রে একই হলেও মানসিক ব্যাপারগুলো একেকজনের একেকরকম ঘটতে পারে। যেমনটা বলেছি যে Luteal Phase এ সাধারণত মেজাজ খারাপ থাকে, কিন্তু কিছুক্ষেত্রে দেখা যায় প্রোজেস্টেরন হরমোনের জন্য অনেকে খুব শান্ত একটা সময় কাটায়। আবার অনেকের তো পুরো সাইকেলের কখনোই কোনোরকম সাইকোলজিক্যাল পরিবর্তন আসে না। তবুও বিষয়গুলো জানা থাকলে মেয়েদের তো অবশ্যই সুবিধা হবে, সাথে সাথে ছেলেদেরও তাদের প্রিয়মানুষগুলোকে বোঝার ক্ষমতা বাড়বে, ফলে সম্পর্ক হবে আরো দৃঢ়। @ Joy Nandy
৪৪
হিগস ফিল্ড: মহাবিশ্বের অদৃশ্য আঠার গল্প
মনে করুন আপনি একটি জমজমাট মেলায় গিয়েছেন। সেখানে চারিদিকে মানুষ গিজগিজ করছে। হঠাৎ আপনি দেখলেন মেলায় জনপ্রিয় কোনো একজন ফুটবল তারকা ঢুকে পড়েছেন। তাকে দেখা মাত্রই চারপাশ থেকে ভক্তরা এসে ভিড় জমালো। ফলে সেই তারকা চাইলেও খুব দ্রুত মেলার ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতে পারছেন না। মানুষের ভিড় তাকে আটকে দিচ্ছে অথবা তার গতি কমিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে মেলায় আপনার মতো সাধারণ একজন মানুষ যখন হাঁটছেন তখন কেউ আপনাকে আটকাচ্ছে না। আপনি খুব সহজেই মেলা পার হয়ে চলে যেতে পারছেন। মহাবিশ্বের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণাগুলোর সাথেও ঠিক এই ঘটনাই ঘটে। এই যে ভিড় যা কাউকে আটকে দিচ্ছে আর কাউকে দিচ্ছে না সেটাই হলো হিগস ফিল্ড।
আমাদের এই মহাবিশ্ব অসংখ্য অদৃশ্য চাদরে ঢাকা। বিজ্ঞানের ভাষায় এই চাদরগুলোকে আমরা ফিল্ড বা ক্ষেত্র বলি। হিগস ফিল্ড হলো এমনই এক রহস্যময় ক্ষেত্র যা পুরো মহাবিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে আছে। আপনি যখন হাত নাড়ছেন কিংবা নিশ্বাস নিচ্ছেন তখন আপনি আসলে এই হিগস ফিল্ডের ভেতর দিয়েই বিচরণ করছেন। এই ফিল্ডের কাজ হলো মৌলিক কণাগুলোকে ভর দান করা। যদি এই ফিল্ড না থাকতো তবে মহাবিশ্বের সবকিছুই আলোর গতিতে ছুটে বেড়াত। কোনো পরমাণু তৈরি হতো না কোনো নক্ষতর হতো না এমনকি আপনি বা আমিও থাকতাম না। সবকিছুই হতো গুরুত্বহীন আর ভরহীন।
এই চমৎকার বিষয়টি সবার আগে মাথায় আসে ১৯৬৪ সালের দিকে। পিটার হিগস সহ বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানী চিন্তা করতে থাকেন যে কেন ইলেকট্রনের ভর আছে কিন্তু আলোর কণা ফোটনের কোনো ভর নেই। তারা গাণিতিকভাবে বের করলেন যে নিশ্চয়ই মহাবিশ্বে এমন কিছু একটা আছে যা সব জায়গায় মিশে আছে এবং কণাগুলোর গতির ওপর প্রভাব ফেলছে। বিজ্ঞানী পিটার হিগসের নাম অনুসারে এই ধারণার নাম দেওয়া হয় হিগস মেকানিজম। তবে এটি কেবল খাতাকলমেই সীমাবদ্ধ ছিল দীর্ঘ সময় ধরে। প্রায় ৫০ বছর পর ২০১২ সালে সার্ন এর লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে একটি বিশেষ কণা খুঁজে পাওয়া যায় যা প্রমাণ করে যে হিগস ফিল্ড আসলেই সত্য। এই কণাটিকেই আমরা চিনি হিগস বোসন বা ঈশ্বর কণা নামে।
সহজভাবে বোঝার জন্য আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যাক। কল্পনা করুন এক বিশাল মাঠ ভর্তি খুব ঘন ঝোলা গুড় বা মধু রাখা আছে। এখন এই মধুর ওপর দিয়ে যদি আপনি একটি ছোট মার্বেল গড়িয়ে দেন তবে সেটি খুব দ্রুত চলে যাবে কারণ মধুর সাথে তার ঘর্ষণ কম হচ্ছে। কিন্তু একই মধুর ওপর দিয়ে যদি একটি বড় তুলার বল পাঠাতে চান তবে মধু তাকে আটকে ধরবে এবং তার গতি কমে যাবে। এখানে মধু হলো হিগস ফিল্ড। যে কণাগুলো এই ফিল্ডের সাথে বেশি মাখামাখি করে তাদের ভর বেশি হয়। আর যারা এই ফিল্ডকে তোয়াক্কা না করে বেরিয়ে যেতে পারে তাদের কোনো ভর থাকে না। আলোর কণা ফোটন হলো সেই চতুর পথিক যে এই হিগস ফিল্ডের ভেতর দিয়ে কোনো বাধা ছাড়াই চলে যায় তাই ফোটনের কোনো ভর নেই।
এখন আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে এই হিগস ফিল্ড আমাদের জীবনে কী কাজে লাগে। আসলে এর সরাসরি কোনো ব্যবহার আমাদের রান্নাঘরে বা মোবাইল ফোনে হয়তো নেই কিন্তু এর প্রয়োজন অনস্বীকার্য। হিগস ফিল্ড না থাকলে ইলেকট্রনগুলো নিউক্লিয়াসের চারদিকে ঘুরতে পারতো না।
ফলে কোনো অণু তৈরি হতো না। আপনি যদি আজ চেয়ারে বসে থাকতে পারেন কিংবা পৃথিবীর মাটিতে পা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন তবে তার কৃতিত্ব এই হিগস ফিল্ডের। এটি না থাকলে মহাবিশ্ব কেবল একরাশ আলোর ঝলকানি ছাড়া আর কিছুই হতো না। এক অর্থে এটিই মহাবিশ্বের অস্তিত্বের ভিত্তি।
বিজ্ঞানের এই আবিষ্কার আমাদের মহাবিশ্বের জন্ম রহস্য বুঝতে সাহায্য করে। হিগস ফিল্ড হলো মহাবিশ্বের সেই অদৃশ্য স্থপতি যা সবকিছুর আকার এবং ভর নিশ্চিত করে। এর অপ্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভাবার অবকাশ নেই কারণ এর অনুপস্থিতি মানেই মহাবিশ্বের অনুপস্থিতি। আপনি যখন আকাশের দিকে তাকান কিংবা নিজের হাতের দিকে তাকান তখন মনে রাখবেন এক রহস্যময় অদৃশ্য সমুদ্রের মাঝে আপনি ডুবে আছেন যা আপনাকে গড়ে তুলেছে। @ প্রীতম বিশ্বাস, তথ্যসূত্র ১। ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম স্টিফেন হকিং ২। দ্য গড পার্টিকল লিওন লেডারম্যান
৪৫
ঘরে সিগারেটের ধোঁয়া ১২ বছর বয়সে শিশুকে অ্যান্টিসোশ্যাল করে তোলে
ছোট্ট অ্যালেক্সের বাবা প্রতিদিন বাসায় সিগারেট খেতেন। অ্যালেক্স যখন মাত্র ৪ বছরের তখন থেকেই প্রায়ই কাশতে শুরু করে। রাতে ঘুমাতে সমস্যা হতো, চোখ লাল হয়ে যেত। মা ভাবতেন হয়তো ঠান্ডা লেগেছে বা বয়স বাড়লে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু ১২ বছর বয়সে অ্যালেক্সের আচরণ পুরোপুরি বদলে যায়। স্কুলে বন্ধুদের সাথে ছোটখাটো বিষয়ে ঝগড়া শুরু হয়, মারামারি করে, শিক্ষকদের কথা না মেনে নিয়ম ভাঙে। বাড়িতে রেগে গেলে জিনিসপত্র ছুঁড়ে মারে। মা এখনও ভাবেন ❝বয়স বাড়লে ঠিক হয়ে যাবে❞। কিন্তু কানাডার একটি বিশাল গবেষণা বলছে—❝বাবার সিগারেটের ধোঁয়াই অ্যালেক্সের মস্তিষ্কে ধীরে ধীরে আগ্রাসন বাড়িয়ে দিয়েছে❞। এই ধোঁয়া শুধু ফুসফুসে সমস্যা করে না, শিশুর বিকাশমান মস্তিষ্ককে নীরবে বিষিয়ে তোলে।
১৯৯৭ থেকে ১৯৯৮ সালের মধ্যে কানাডার কুইবেক প্রদেশে জন্ম নেওয়া হাজার হাজার শিশুকে নিয়ে শুরু হয় Quebec Longitudinal Study of Child Development (শিশু বিকাশের উপর কানাডার কুইবেক লংগিটুডিনাল স্টাডি)। গবেষক লিন্ডা পাগানি (Université de Montréal) এবং তার দল এই শিশুদের জন্ম থেকে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত নিয়মিত অনুসরণ করেন। তাদের প্রশ্ন ছিল খুব সোজা: প্রথম ৭-৮ বছর বাড়িতে সেকেন্ডহ্যান্ড সিগারেটের ধোঁয়া (বাবা-মায়ের সিগারেটের ধোঁয়া) থাকলে শিশুর আচরণে কী হয়? এই গবেষণায় মোট ২,০৫৫ জন শিশুর তথ্য নেওয়া হয়। এর মধ্যে ১,০৩৫ জন শিশুর ওপর বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হয়।
ধোঁয়ার এক্সপোজার মাপা হয়েছে খুব সতর্কভাবে—পিতামাতারা ৭ বার রিপোর্ট দিয়েছেন (শিশুর ১.৫ বছর থেকে ৭.৫ বছর বয়স পর্যন্ত)। তারপর ১২ বছর বয়সে শিশুরা নিজেরাই তাদের আচরণের কথা বলেছে। তারা বলেছে কতটা মারামারি করে, রাগ করে, স্কুলে নিয়ম ভাঙে বা পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার ঝুঁকি অনুভব করে। ২০১৭ সালে Indoor Air জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণার ফলাফল দেখে সবাই চমকে যায়।
ঘরে সিগারেটের ধোঁয়া যত বেশি, ১২ বছর বয়সে অ্যান্টিসোশ্যাল বা সমাজবিরোধী আচরণ তত বেশি। প্রতি এক ইউনিট ধোঁয়া বাড়ার সাথে সাথে দেখা গেছে: কন্ডাক্ট প্রবলেম (মারামারি, নিয়ম ভাঙা) ১৯% বেশি , প্রো-অ্যাকটিভ বা পরিকল্পনাকৃত আগ্রাসন ১১% বেশি, রি-অ্যাকটিভ বা পরিকল্পনাবিহীন আগ্রাসন ১৩% বেশি, স্কুলে অস্বাভাবিক আচরণ ১৪% বেশি এবং পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার ঝুঁকি ১০% বেশি।
গবেষকরা সব ধরনের অন্য কারণ বাদ দিয়ে দেখেছেন—বাবা-মায়ের আয়, শিক্ষা, মানসিক সমস্যা, এমনকি বাবা-মায়ের নিজের আগ্রাসী স্বভাব—সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার পরও এই সম্পর্ক একই রয়ে গেছে। যাদের ঘরে কখনো সিগারেটের ধোঁয়া ছিল না, তাদের তুলনায় সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকা শিশুরা অনেক বেশি আগ্রাসী হয়ে ওঠে। গবেষক লিন্ডা পাগানি বলেন, ❝প্রথম ৭-৮ বছর ঘরের সিগারেটের ধোঁয়া শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে। এটা শুধু ফুসফুস নয়, আচরণও বদলে দেয়।❞ গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে সেকেন্ডহ্যান্ড সিগারেটের ধোঁয়া (বিশেষ করে সাইডস্ট্রিম ধোঁয়া, যা জ্বলন্ত সিগারেট থেকে বের হয়) অক্সিজেনের অভাব ঘটিয়ে শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশমান অংশকে দুর্বল করে। এতে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (যে অংশ রাগ নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাজ করে) ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে শিশু ছোটখাটো বিষয়ে রেগে যায়, আক্রমণাত্মক হয় এবং স্কুলে সমস্যা তৈরি করে। এই ধোঁয়া শিশুর মস্তিষ্ককে ❝নিউরোটক্সিক্যান্ট❞ বা স্নায়ুবিষ হিসেবে বিষিয়ে তোলে—যা দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে।
সারকথা হল, এই গবেষণা স্পষ্ট করে বলছে—বাড়িতে ধূমপান মানে শুধু নিজের ক্ষতি নয়, শিশুর ভবিষ্যৎও নষ্ট করা। কিন্তু সুখের খবর হলো, ধূমপান ছেড়ে দিলে এই ঝুঁকি অনেক কমে যায়। আজ থেকেই বাড়িতে তামাকের ধোঁয়ামুক্ত পরিবেশ তৈরি করুন। শিশুরা শান্ত, সুস্থ ও সফল হোক—এটাই আমাদের সবার চাওয়া।।@ — সাম্মা হিবা— দীপায়ন তূর্য 🍁 হিংস্রতার উৎস সন্ধানে 🍁
৪৬
গর্ভাবস্থার জটিলতা আর দুর্বল অভিভাবকত্ব
১৯৯৪ সালে গবেষক ড. অ্যাড্রিয়ান রেইন ও তাঁর দল তাঁদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেন। এই গবেষণায় ১৯৫৯ - ১৯৬১ সালে রিগশহসপিটালেটে জন্ম নেওয়া ৪ হাজার ২৬৯ জন জীবিত ছেলে শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। জন্মের সময় যেসব জটিলতা হয় সেগুলো মূল্যায়ন করেছিলেন প্রসূতিবিদরা। তাদের সাহায্য করেছিলেন ধাত্রীরা। প্রসবের সময়ের জটিলতার উদাহরণ হলো ফোর্সেপ ব্যবহার করে ডেলিভারি (ফোর্সেপ করা ডেলিভারি মানে চিমটার মতো একটা যন্ত্র দিয়ে শিশুকে টেনে বের করা), ব্রীচ ডেলিভারি (মানে শিশুর পা আগে বের হয়ে আসা), নাভিরজ্জু বেরিয়ে আসা (মানে নাভির দড়ি শিশুর আগেই বেরিয়ে পড়া যা শিশুর অক্সিজেন কমিয়ে দেয়), প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া (মানে মায়ের খুব উচ্চ রক্তচাপ আর প্রোটিনের গুরুতর সমস্যা), আর দীর্ঘ সময় ধরে প্রসব চলা (মানে প্রসব প্রক্রিয়া অনেকক্ষণ লেগে যাওয়া)।
যখন এই ছেলেরা আঠারো বছর বয়সে পৌঁছায় তখন গবেষকরা ডেনমার্কের সব আদালতের নথি খুঁজে দেখেন কারা সহিংস অপরাধের জন্য গ্রেপ্তার হয়েছে। তারপর তাঁরা তাদের চারটি দলে ভাগ করেন। প্রথম দল নিয়ন্ত্রণ দল (কন্ট্রোল গ্রুপ)। এদের জন্মে কোনো জটিলতা ছিল না আর প্রথম বছরে মায়ের প্রত্যাখ্যানও ছিল না। দ্বিতীয় দলে যাদের জন্মে জটিলতা ছিল কিন্তু মায়ের প্রত্যাখ্যান ছিল না। তৃতীয় দলে যারা মায়ের প্রত্যাখ্যানের শিকার হয়েছিল কিন্তু জন্ম স্বাভাবিক ছিল। চতুর্থ দলকে বলা হয় ❝ডাবল হোয়ামি❞। ডাবল হোয়ামি মানে দুই ধরনের আঘাত। এদের জন্মে জটিলতা ছিল আর সন্তান বড় হওয়ার প্রক্রিয়ায় মায়ের অবহেলা ছিল।
আরও গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪.৫ শতাংশের ক্ষেত্রে জন্মজটিলতা আর শৈশবের প্রাথমিক প্রত্যাখ্যান দুটোই ছিল। এটি শুধু শৈশব বা কৈশোরে শুরু হওয়া সহিংসতার ক্ষেত্রেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রথম উদ্যোগ নেন দুই মার্কিন অপরাধবিজ্ঞানী। তারা ❝খারাপ জন্ম আর খারাপ মা হাইপোথিসিস❞ (Bad birth, bad mother hypothesis) পরীক্ষা করেন। খারাপ জন্ম আর খারাপ মা মানে জন্মের সময়কার জটিলতা আর মায়ের খারাপ যত্ন। তাঁরা এটি পরীক্ষা করেন ফিলাডেলফিয়া কোলাবরেটিভ পেরিনাটাল প্রজেক্টের ৮৬৭ জন আফ্রিকান-আমেরিকান ছেলে ও মেয়ের ওপর। ফলাফল খুব স্পষ্ট। প্রায় একই ধরনের প্যাটার্ন পাওয়া গেছে। যাদের জন্মকালীন জটিলতা আর বঞ্চিত বা খারাপ পারিবারিক পরিবেশ দুটোই ছিল তারা প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে সহিংস অপরাধে জড়ানোর সম্ভাবনায় অনেক এগিয়ে ছিল। অর্থাৎ ডেনমার্কের ফলাফল কোনো কাকতালীয় ঘটনা ছিল না।
সুইডেনের ৭ হাজার ১০১ জন পুরুষের ওপর গবেষণায় দেখা গেছে গর্ভাবস্থার জটিলতা আর দুর্বল অভিভাবকত্ব একসাথে কাজ করে প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে সহিংস আচরণের পূর্বাভাস দেয়। কানাডার ৮৪৯ জন কিশোরের গবেষণায় দেখা গেছে গুরুতর প্রসবজটিলতা আর পারিবারিক খারাপ পরিবেশ দুইয়ে মিলে ১৭ বছর বয়সে সহিংস অপরাধের ঝুঁকি বাড়ায়।
ফিনল্যান্ডের ৫ হাজার ৫৮৭ জন পুরুষের ওপর গবেষণায় দেখা গেছে জন্মকালীন জটিলতা আর একমাত্র সন্তান হওয়া একসাথে থাকলে প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে সহিংস অপরাধের সম্ভাবনা ৪.৪ গুণ বাড়ে। জন্মকালীন জটিলতা আর নেতিবাচক পারিবারিক পরিবেশ যদি মিলে তাহলে শিশুদের সমাজবিরোধী আচরণের ঝুঁকি বাড়ে এমন প্রমাণ হাওয়াই আর পিটসবার্গের গবেষণাতেও পাওয়া গেছে।
এবার প্রশ্ন আসতে পারে জন্মকালীন জটিলতা আর মাতৃ প্রত্যাখ্যানের মতো খারাপ পারিবারিক পরিবেশ ঠিক কীভাবে একসাথে কাজ করে প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে সহিংস আচরণ গড়ে তোলে?
প্রথমে জন্মকালীন জটিলতার দিকে তাকাই। এগুলো সরাসরি মস্তিষ্কের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলে। কিছু শিশু জন্মের সময় নীল হয় কারণ তাদের হাইপোক্সিয়া হয়। হাইপোক্সিয়া মানে আংশিক অক্সিজেনের অভাব। মস্তিষ্কের কোষগুলো শক্তির জন্য গ্লুকোজ ব্যবহার করে। গ্লুকোজ পোড়াতে অক্সিজেন লাগে। অক্সিজেন না পেলে কয়েক মিনিটে মস্তিষ্কের কোষ মরতে শুরু করে।
এই ধ্বংসের প্রতি সবচেয়ে সংবেদনশীল মস্তিষ্কের অংশ হলো হিপোক্যাম্পাস। হিপোক্যাম্পাস মানে স্থানিক দক্ষতা আর স্বল্পমেয়াদি স্মৃতির অংশ। আজীবন যারা বারবার অপরাধ করে তাদের এই ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত থাকে।
শিশুদের আচরণগত সমস্যায় জন্মকালীন জটিলতা কীভাবে কাজ করে তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন জিয়াংহং লিউ। তিনি মরিশাসের বড় জন্ম-ভিত্তিক গবেষণা বিশ্লেষণ করে তিনটি প্রক্রিয়ার সংযোগ দেখিয়েছেন। জন্মকালীন জটিলতা, কম আইকিউ আর অসামাজিক আচরণ। আইকিউ মানে বুদ্ধিমত্তার সূচক। এই গবেষণায় গর্ভকালীন, প্রসবকালীন আর জন্ম পরবর্তী জটিলতা মূল্যায়ন করা হয়। এগারো বছর বয়সে শিশুদের আইকিউ আর এক্সটারনালাইজিং আচরণ সমস্যা মাপা হয়। জিয়াংহং লিউ দেখান জন্মকালীন জটিলতা সাথে এই সমস্যার সম্পর্ক আছে। একইসাথে জন্মকালীন জটিলতা কম আইকিউর সাথেও যুক্ত।
ব্রিটিশ মনোবিজ্ঞানী এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জন বোলবি ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত বিখ্যাত গবেষণায় শিশুদের অপরাধ প্রবণতার সাথে তাদের শৈশবে মায়েদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। এটি মনোবিজ্ঞানের 'অ্যাটাচমেন্ট থিওরি' (Attachment Theory) বা 'সংযুক্তি তত্ত্বের' অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
মায়ের সাথে দুর্বল বন্ধন আর শৈশবের এই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। তিনি পরে অপরাধপ্রবণ শিশুদের নিয়ে কাজ করেন। সাইকোঅ্যানালিস্ট আর সাইকিয়াট্রিস্ট হন। ধীরে ধীরে অ্যাটাচমেন্ট থিওরির নতুন ধারা প্রতিষ্ঠা করেন। অ্যাটাচমেন্ট থিওরি মানে প্রাথমিক বন্ধন তত্ত্ব। তিনি বলেন শিশু আর মায়ের মধ্যে যদি নিরবচ্ছিন্ন উষ্ণ ভালোবাসাপূর্ণ সম্পর্ক না থাকে তাহলে স্বাভাবিক ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে না। সামাজিক সম্পর্কও কঠিন হয়।
তাঁর কেস স্টাডিতে দেখা যায় ৪৪ জনের শৈশবে দীর্ঘ সময় মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্নতা ছিল। ফলে উষ্ণ ধারাবাহিক সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। এর ফলাফল তিনি নাম দেন ❝অ্যাফেকশনলেস সাইকোপ্যাথি❞। অর্থাৎ ভালোবাসাহীন সাইকোপ্যাথি। সাইকোপ্যাথি মানে আবেগহীন ঠান্ডা মানসিকতা।
পরবর্তী গবেষকরা বলেন মূল কথা হলো কারো সাথে আবেগগত বন্ধন গড়ার সুযোগ পাওয়া। সে যেই হোক। আয়া, বাবা, বড় ভাই-বোন—যেই হোক। জীবনের শুরুতে নিয়মিত কারো সাথে বন্ধন গড়লে সুস্থ সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি হয়।
জন্মের সময় যেসব সমস্যা দেখা দেয়—যেমন অকালে জন্ম, খুব কম ওজন নিয়ে জন্ম, প্রসবের সময় অক্সিজেনের অভাব, মাতৃগর্ভে ধূমপান ও মাদকের প্রভাব—এসবকে জন্মকালীন জটিলতা বলা হয়। অন্যদিকে জীবনের প্রথম বছরে পর্যাপ্ত স্নেহ ও যত্ন না পাওয়া, দারিদ্র্য, পারিবারিক অশান্তি, অবহেলা বা কঠোর লালন-পালনকে পারিবারিক প্রতিকূলতা বা সামাজিক অস্বীকৃতি হিসেবে ধরা হয়। আধুনিক গবেষণাও দেখাচ্ছে, এই দুই ধরনের ঝুঁকি একসঙ্গে থাকলে ভবিষ্যতে সহিংস আচরণের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
বর্তমানের সব গবেষণায় দেখা যায়, একাধিক ঝুঁকি—যেমন জন্মকালীন সমস্যা, দারিদ্র্য, মায়ের মানসিক চাপ, কঠোর বাবা মায়ের আচরণ, শৈশবের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা—একত্রে থাকলে প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যায়।
লিঙ্গভেদেও কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। ছেলেদের ক্ষেত্রে প্রভাব কিছুটা বেশি দেখা যায়, সম্ভবত স্নায়বিক বিকাশের ধরণ ও হরমোনীয় প্রভাবের কারণে। খারাপ পরিবেশ থাকলে এই দুর্বলতা আরও বেশি করে সহিংসতার দিকে ঠেলে দেয়।
বর্তমান গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপসংহার হলো, সহিংসতার বিকাশ দুই ধরনের পথে অগ্রসর হতে পারে। প্রথম পথটি হলো প্রারম্ভিক-বয়সে শুরু হওয়া দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতা। এই ধরনের সহিংসতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণত শৈশব থেকেই আক্রমণাত্মক আচরণ শুরু করে এবং তা কৈশোর ও প্রাপ্তবয়স্ক জীবনেও চলতে থাকে। এখানে স্নায়বিক ভঙ্গুরতা (যেমন জন্মকালীন জটিলতা থেকে সৃষ্ট মস্তিষ্কের সমস্যা) এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রতিকূলতা (যেমন দারিদ্র্য, নির্যাতন, অবহেলা) একত্রে কাজ করে। দ্বিতীয় পথটি হলো পরবর্তী জীবনে পরিস্থিতিনির্ভর সহিংসতা। এই ধরনের সহিংসতা সাধারণত কৈশোরের শেষ দিকে বা প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় শুরু হয়। এটি প্রায়ই সামাজিক চাপ, অর্থনৈতিক সংকট, সম্পর্কের টানাপোড়েন বা তাৎক্ষণিক কোনো উত্তেজনার ফলে ঘটে। এই দুই পথের স্নায়বিক ও সামাজিক গঠন এক নয়। প্রথম পথে জৈবিক ও স্নায়বিক কারণগুলো বেশি প্রভাবশালী, দ্বিতীয় পথে সামাজিক ও পরিস্থিতিগত কারণগুলো বেশি মুখ্য।
ইতিবাচক লালন-পালন প্রোগ্রাম (ট্রিপল পি নামে পরিচিত ❝পজিটিভ প্যারেন্টিং প্রোগ্রাম❞, যেখানে পিতামাতাকে শেখানো হয় শিশুর ভালো আচরণকে প্রশংসা করে উৎসাহ দেওয়া, খারাপ আচরণের সময় শান্তভাবে টাইম-আউট দেওয়া, যার মানে হলো— শিশু যখন খারাপ আচরণ করে যেমন মারামারি, চিৎকার, জিনিস ছোঁড়া বা নির্দেশ না মানা, তখন বাবা-মা রাগ না করে, চিৎকার না করে, শান্ত ও দৃঢ় গলায় শিশুকে খুব অল্প সময়ের জন্য একটা নীরস, বিরক্তিকর জায়গায় নিয়ে যাওয়া। এটি কোনো শাস্তি বা জেল নয়, বরং শিশুকে শেখানোর একটা শান্ত পদ্ধতি। এর সাথে বাবা-মায়ের রাগ নিয়ন্ত্রণ করা ও শিশুর আবেগ বোঝা) এবং অসাধারণ বছর প্রোগ্রাম (ইনক্রেডিবল ইয়ার্স, যেখানে পিতামাতা, শিশু ও শিক্ষকদের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় ভিডিও দেখিয়ে, রোল-প্লে করে—যাতে আগ্রাসী আচরণ কমে ও সামাজিক দক্ষতা বাড়ে) দিয়ে শিশুর খারাপ আচরণ ও সমস্যা ২০ থেকে ৫০ শতাংশ কমে যায়। হাইস্কোপ পেরি প্রিস্কুল প্রকল্পে (৩-৪ বছরের দরিদ্র শিশুদের জন্য উন্নত খেলা-ভিত্তিক স্কুল যেখানে শিশুরা নিজেরাই পরিকল্পনা করে, কাজ করে, পর্যালোচনা করে এবং বাড়িতে সাপ্তাহিক সাহায্য পায়) ৪০ বছর পর্যন্ত দেখা গেছে সহিংস অপরাধের হার প্রায় অর্ধেক হয়েছে, জীবনে গ্রেপ্তার অনেক কমেছে এবং অর্থনৈতিকভাবেও লাভ হয়েছে ।
দেশে গর্ভাবস্থায় স্বামীর সহিংসতার কারণে শিশুর কম ওজন নিয়ে জন্ম ও বৃদ্ধি কম হওয়ার হার অনেক বেশি, আর শৈশবের খারাপ অভিজ্ঞতা (যেমন নির্যাতন, অবহেলা, পরিবারে সহিংসতা বা দারিদ্র্য) বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৪ শতাংশেরও বেশি দেখা যায়—যা পরে মানসিক চাপ, আচরণগত সমস্যা ও সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ায়। @— দীপায়ন তূর্য — সাম্মা হিবা 🍁 হিংস্রতার উৎস সন্ধানে 🍁
৪৭
নিকোলা টেসলা
বিশ্ববিখ্যাত উদ্ভাবক নিকোলা টেসলা বিদ্যুৎ ও তড়িৎচুম্বকত্ব নিয়ে তাঁর যুগান্তকারী গবেষণার জন্য বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিশেষভাবে পরিচিত। তিনি এমন অনেক ধারণা দিয়েছিলেন যা তাঁর সময়ের তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে ছিল। এর মধ্যে অন্যতম একটি ছিল তার ছাড়াই সারা পৃথিবীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার পরিকল্পনা। টেসলার বিশ্বাস ছিল যে পৃথিবী নিজেই একটি বড় বৈদ্যুতিক পরিবাহী, এবং সঠিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে পৃথিবীকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে দূর-দূরান্তে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
তিনি মনে করতেন, পৃথিবী ও আয়নোস্ফিয়ারের মধ্যে একটি প্রাকৃতিক বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা রয়েছে। যদি খুব উচ্চ ভোল্টেজ ও নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের বৈদ্যুতিক তরঙ্গ সৃষ্টি করা যায়, তবে পৃথিবীকে এক ধরনের রেজোন্যান্সে (অনুরণন) আনা সম্ভব। তখন পৃথিবী একটি বিশাল বৈদ্যুতিক সার্কিটের মতো আচরণ করবে এবং সেই সার্কিটের মাধ্যমে শক্তি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়িয়ে পড়বে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ পরিবহনের জন্য দীর্ঘ তারের প্রয়োজন হবে না এবং মানুষ পৃথিবীর যেকোনো স্থানেই সহজে বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারবে।
এই ধারণা বাস্তবে পরীক্ষা করার জন্য টেসলা নিউ ইয়র্কে একটি বিশাল টাওয়ার নির্মাণের উদ্যোগ নেন, যা পরিচিত হয় Wardenclyffe Tower নামে। এই টাওয়ারের মাধ্যমে তিনি পৃথিবীর ভেতর দিয়ে বৈদ্যুতিক শক্তি ও রেডিও ওয়েভ (বেতার সংকেত) ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। তাঁর আশা ছিল যে এই প্রযুক্তি সফল হলে ভবিষ্যতে সারা পৃথিবীতে সহজেই বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
টেসলার ধারণা ছিল পৃথিবী প্রায় একটি বিশাল সুপারকন্ডাক্টরের মতো আচরণ করতে পারে, যার মাধ্যমে খুব কম শক্তি ক্ষয় করে বিদ্যুৎ দূর-দূরান্তে পাঠানো সম্ভব। কিন্তু আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিষয়টি উল্টো। বাস্তবে পৃথিবীর মাটি বিদ্যুৎ পরিবাহিতা করলেও তা খুবই দুর্বল পরিবাহী এবং অনেক ক্ষেত্রে বড় রোধকের মতো আচরণ করে। ফলে পৃথিবীর ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ পাঠানোর চেষ্টা করলে অল্প দূরত্ব অতিক্রম করার আগেই অধিকাংশ শক্তি তাপ আকারে নষ্ট হয়ে যায়। এই কারণে কয়েক মিটারের বেশি দূরত্বে কার্যকরভাবে শক্তি পৌঁছে দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
তাত্ত্বিকভাবে তড়িৎচুম্বকীয় শক্তি খুব শক্তিশালী মাইক্রোওয়েভ বা লেজারের মাধ্যমে দূরে পাঠানো সম্ভব। তবে এভাবে শক্তি পাঠাতে হলে অপর প্রান্তে সরাসরি সামনে (line-of-sight) একটি নির্দিষ্ট রিসিভার থাকতে হয়, যা সেই শক্তি গ্রহণ করবে। বাস্তবে এমন ব্যবস্থা তৈরি করা এবং ঠিকভাবে চালানো অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল। আধুনিক প্রযুক্তিতে তারবিহীনভাবে শক্তি পাঠানোর কিছু সফল উদাহরণ থাকলেও তা সাধারণত খুব অল্প দূরত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। টেসলা যে শত শত বা হাজার মাইল দূরত্বে বিদ্যুৎ পাঠানোর কথা ভেবেছিলেন, সেই মাত্রায় শক্তি পাঠানো এখন পর্যন্ত সম্ভব হয়নি।
মূলত টেসলার পরিকল্পনার ব্যর্থতার প্রধান কারণ ছিল তাঁর এই ধারণা যে পৃথিবীর ভেতর দিয়েই সরাসরি বৈদ্যুতিক শক্তি দূর দূরান্তে পাঠানো সম্ভব। সেই সময় এই ধরনের ধারণা অনেকের মধ্যেই ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা যায় যে পৃথিবী এভাবে বিদ্যুৎ পরিবহনের জন্য কার্যকর মাধ্যম নয়।
এসব কারণেই ধীরে ধীরে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমতে থাকে। তারা বুঝতে পারেন যে এই প্রকল্পটি বাস্তবে সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ফলে অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যায় এবং টেসলার তারবিহীন বিদ্যুৎ সরবরাহের সেই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
তবে টেসলার তারবিহীন বিদ্যুতের পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত না হলেও এটি বিজ্ঞান ইতিহাসে এক সাহসী ও দূরদর্শী চিন্তার উদাহরণ হয়ে আছে। তাঁর এই স্বপ্ন দেখায় যে একজন বিজ্ঞানীর কল্পনাশক্তি কত দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। যদিও তাঁর পরিকল্পনা সফল হয়নি, তবুও তাঁর ধারণাগুলো আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। @ Rupayan Chowdhury
তথ্যসূত্র: https://en.wikipedia.org/wiki/Wardenclyffe_Tower
৪৮
বাংলাদেশে আঁশধারী স্তন্যপায়ী বনরুই
রাত গভীর হলে, বনভূমির নিস্তব্ধতার ভেতর মাটির নিচে নিঃশব্দে নড়েচড়ে ওঠে এক অদ্ভুত প্রাণী প্যাঙ্গোলিন বা বনরুই। মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত শক্ত কেরাটিনের আঁশে মোড়া এই স্তন্যপায়ীকে অনেকেই ভুল করে “স্কেলওয়ালা সরীসৃপ” মনে করেন। অথচ এটি সম্পূর্ণরূপে স্তন্যপায়ী। বাংলাদেশে আজ এই লাজুক প্রাণী বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে।
আঁশযুক্ত শরীর ও মৎস্যাকৃতি গঠনে বনজঙ্গলে চলাফেরা করা রুই মাছের মতো দেখতে মনে হয় বলে এদেরকে বনরুই বলা হয়ে থাকে। এরা বিপদের আভাস পেলে নিজের শরীর গুটিয়ে নেয় বলে মালয় ভাষায় এদের বলা হয় "পেঙ্গুলিং" - যেখান থেকে এসেছে এদের ইংরেজি নাম প্যাঙ্গোলিন।
প্যাঙ্গোলিনদের মোট ৪ টি প্রজাতি পাওয়া যায়। তার মধ্যে ৩ টিই বাংলাদেশে রয়েছে।
বাংলাদেশে যেসব প্রজাতির উপস্থিতি জানা যায় তা হচ্ছে:
Chinese Pangolin — সংকটাপন্নেরও চেয়েও ভয়াবহ অবস্থা (Critically Endangered)
Indian Pangolin — বিপন্ন (Endangered)
Sunda Pangolin — মারাত্মক সংকটাপন্ন (Critically Endangered)
আধুনিক জিনগত গবেষণা অনুযায়ী প্যাঙ্গোলিন সম্পূর্ণ আলাদা এক বর্গের প্রাণী, যার নাম Pholidota। যদিও একসময় ধারণা করা হতো এরা Xenarthra (যেমন অ্যান্টইটার, স্লথ, আর্মাডিলো) গোষ্ঠীর কাছাকাছি। বিবর্তনের দিক থেকে এদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হলো মাংসাশী স্তন্যপায়ীরা। অর্থাৎ জিনগতভাবে তাদের দূরসম্পর্ক রয়েছে:
বিড়ালদের সঙ্গে
কুকুরদের সঙ্গে
এমনকি ভালুকদের সঙ্গেও
দেখতে যতই আলাদা হোক, একই বৃহত্তর বিবর্তনীয় শাখা (Laurasiatheria)–তে এদের অবস্থান।
ফসিল তথ্য অনুযায়ী, প্যাঙ্গোলিনের পূর্বপুরুষ প্রায় ৬০ মিলিয়ন বছর আগে বিবর্তিত হয়েছিল, ডাইনোসরের বিলুপ্তির পরবর্তী সময়ে। তাই একে অনেক সময় “প্রাগৈতিহাসিক জীবিত জীবাশ্ম”ও বলা হয়।
বাংলাদেশে প্যাঙ্গোলিনের বিস্তৃতি আজ সীমিত ও বিচ্ছিন্ন। একসময় দেশের বিভিন্ন বনাঞ্চলে তাদের উপস্থিতির কথা জানা গেলেও বর্তমানে তারা মূলত টিকে আছে কিছু খণ্ডিত ও অপেক্ষাকৃত নির্জন বনভূমিতে।
প্যাঙ্গোলিন সাধারণত পাওয়া গেছে—
শাল বনাঞ্চলে
মিশ্র চিরসবুজ বনে
পার্বত্য ও পাহাড়ি অরণ্যে
ঝোপঝাড় ও বনসংলগ্ন গ্রামীণ প্রান্তিক এলাকাতেও (খাদ্যের প্রাচুর্য থাকলে)
বিশেষ করে Lawachara National Park–এর চিরসবুজ অরণ্য এবং Chittagong Hill Tracts–এর বিস্তৃত পাহাড়ি বনাঞ্চলে অতীতে তাদের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম, কম-বসতিপূর্ণ বনভূমি একসময় প্যাঙ্গোলিনের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয়স্থল ছিল।
প্যাঙ্গোলিন মূলত মাটিনির্ভর প্রাণী। তারা শক্ত নখর দিয়ে গভীর সুড়ঙ্গ খুঁড়ে বাসা তৈরি করে। যার দৈর্ঘ্য কয়েক মিটার পর্যন্ত হতে পারে। এই সুড়ঙ্গ কেবল আশ্রয়ই নয়, শিকারি ও তাপমাত্রার চরম পরিবর্তন থেকে সুরক্ষারও উপায়। দিনের আলোতে তারা সাধারণত এই গর্তেই লুকিয়ে থাকে এবং রাত নামলে খাদ্যের সন্ধানে বের হয়।
তাদের আবাস নির্বাচন নির্ভর করে তিনটি প্রধান বিষয়ের ওপর: পিঁপড়া ও উইপোকার প্রাচুর্য,নরম বা খননযোগ্য মাটি এবং মানবচাপ তুলনামূলক কম থাকা।
প্যাঙ্গোলিন একাকী ও নিশাচর। তাদের প্রধান খাদ্য পিঁপড়া ও উইপোকা। দাঁত নেই বললেই চলে; বরং লম্বা আঠালো জিহ্বা দিয়ে পোকা সংগ্রহ করে। শক্ত নখর দিয়ে মাটি খুঁড়ে খাবার বের করা তাদের দৈনন্দিন কাজ।
প্রকৃতিতে এরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি প্যাঙ্গোলিন বছরে লক্ষাধিক পোকামাকড় খেয়ে বনজ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা করে।
প্যাঙ্গোলিন বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পাচার হওয়া বন্যপ্রাণীর একটি। আঁশের আন্তর্জাতিক চাহিদা, ঐতিহ্যগত চিকিৎসায় ব্যবহার, মাংসের জন্য শিকার, বন উজাড় ও আবাসস্থল ধ্বংস ; বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে অতিরিক্ত শিকার অনেক এলাকায় এদের সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে।
আইনগতভাবে প্যাঙ্গোলিন সম্পূর্ণ সুরক্ষিত প্রাণী হলেও বাস্তব প্রয়োগ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের বনভূমিতে যদি এই নীরব প্রাণীর পদচিহ্ন একদিন হারিয়ে যায়, তবে তা হবে আমাদের জীববৈচিত্র্যের ইতিহাসে এক অপূরণীয় ক্ষতি। @ আরিফ
৪৯
গাঙ ডলফিন বা শুশুক
গাঙ ডলফিনের বৈজ্ঞানিক নাম হলো Platanista gangetica. পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র নদী এবং তাদের প্রধান খাল ও উপনদীগুলোতে এদেরকে পাওয়া যায়। দেশের নদীগুলোতে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় গাঙ ডলফিন। তবে এটি গাঙ শুশুক বা শুশুক নামেই অধিক পরিচিত। গাঙ ডলফিন মূলত মিঠা পানির গভীর নদী ও খালগুলোতে থাকে। এদের চোখের লেন্স অপরিণত থাকায় চোখ প্রায় অকার্যকর। ফলে এটি চারপাশকে বোঝার জন্য শব্দ তরঙ্গ (ইকোলোকেশন) ব্যবহার করে। এরা সরু ঠোঁট দিয়ে নদীর তলদেশে মাছ খোঁজে থাকে। এদের দেহ মোটা, ত্বক সংবেদনশীল এবং ঘোলা পানিতে টিকে থাকার জন্য উপযুক্ত। সাধারণত এরা একাই থাকে, তবে মাঝে মাঝে ছোট দলে দেখা যায়। এরা প্রধানত ছোট মাছ ও ক্রাস্টেশিয়ান শিকার করে। শিকারী চক্রে গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণকারী হিসেবে এরা নদীর খাদ্যশৃঙ্খল বজায় রাখতে সাহায্য করে। বর্তমানে পানি দূষণ ও বাঁধ নির্মাণের প্রভাবে এদের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে, যা নদীর বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্যের সংকেত হিসেবে ধরা হয়।
পৃথিবীতে ৪০ থেকে ৪৯টি প্রজাতির ডলফিনের অস্তিত্ব আছে।
বটলনোজ ডলফিন (Bottlenose Dolphin): সবচেয়ে পরিচিত ও বুদ্ধিমান প্রজাতি।
অরকা বা কিলার হোয়েল (Orca): এরা ডলফিন পরিবারের সবচেয়ে বড় সদস্য।
স্পিনার ডলফিন (Spinner Dolphin): জলে ডিগবাজি দেওয়ার জন্য এরা বিখ্যাত।
কমন ডলফিন (Common Dolphin): এদের পিঠের ওপর ঘণ্টার গ্লাসের মতো বিশেষ দাগ থাকে।
অ্যামাজন নদী ডলফিন (Amazon River Dolphin): এদের গায়ের রঙ গোলাপি হওয়ার জন্য এরা 'পিঙ্ক ডলফিন' নামেও পরিচিত
৫০
ব্যায়াম আপনার পেশিকে শক্তিশালী করে। একই সঙ্গে আপনার মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষকেও সক্রিয় ও শক্তিশালী করে তোলে।
১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে Neuron জার্নালে প্রকাশিত এক নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ট্রেডমিলে দৌড়ানোর মাধ্যমে ইঁদুরের মস্তিষ্কের ভেতরের স্নায়ু সংযোগ আরও শক্তিশালী হয়। এর ফলে নির্দিষ্ট কিছু নিউরন দ্রুত সক্রিয় হতে শেখে। এই ‘পুনর্গঠন’ প্রক্রিয়াই ধীরে ধীরে দৌড়ানোর সহনশীলতা বাড়াতে মূল ভূমিকা রাখে।
গবেষণাপত্রটির সহলেখক এবং ফিলাডেলফিয়ার পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসায়েন্টিস্ট নিকোলাস বেটলি বলেন, সহনশীলতা গড়ে ওঠার পেছনে মস্তিষ্ক সক্রিয়ভাবে কাজ করে। ইঁদুরের ক্ষেত্রে যেমন দেখা গেছে, মানুষের ক্ষেত্রেও সম্ভবত একই প্রক্রিয়া কাজ করে। বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে কোনো শারীরিক কাজ সহজ হয়ে ওঠে। এই ক্ষমতাই সহনশীলতা। আর এই প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্কের ভূমিকা আগে যতটা ধারণা করা হয়েছিল, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি।
বেটলি বলেন, “আপনি যখন দৌড়াতে যান, আপনার ফুসফুস প্রসারিত হয়, হৃদস্পন্দন শক্তিশালী হয়, পেশি ক্ষয় হয় এবং পরে আবার গড়ে ওঠে। এসব পরিবর্তনের ফলে পরের বার দৌড়ানো সহজ লাগে। আমি ভাবিনি, এই পুরো প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্ক এত গভীরভাবে সমন্বয় করে।”
গবেষকরা জানতে চেয়েছিলেন, মানুষ বা প্রাণী যখন নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে শক্তিশালী হয়, তখন মস্তিষ্কের ভেতরে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তারা মস্তিষ্কের ভেন্ট্রোমিডিয়াল হাইপোথ্যালামাস নামের একটি অংশের ওপর নজর দেন। এই অঞ্চল ক্ষুধা, শক্তির ব্যবহার এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।
এরপর তারা এই অঞ্চলের ভেতরে থাকা এমন একদল নিউরনের দিকে মনোযোগ দেন, যেগুলো স্টেরয়ডোজেনিক ফ্যাক্টর ১ বা সংক্ষেপে SF1 নামের একটি প্রোটিন তৈরি করে। এই প্রোটিন বিপাক প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আগের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব ইঁদুরে SF1 তৈরির জিন মুছে ফেলা হয়েছিল, তাদের দৌড়ানোর সহনশীলতা স্পষ্টভাবে কমে গিয়েছিল। @ বিজ্ঞানবার্তা, বিস্তারিত: https://bigganbarta.org/.../exercise-builds-new-neural...