দ্রুত পড়ার পদ্ধতি স্কিমিং
পড়ার বিষয় আছে প্রচুর। কিন্তু সময় কম। দ্রুত পড়ার অভ্যাস আয়ত্ত করতে পারলে এ সমস্যা থেকে উদ্ধার পাওয়া সম্ভব। দ্রুত পড়ার বিভিন্ন পদ্ধতি আছে, তার মধ্যে স্কিমিং অন্যতম। এ পদ্ধতিতে অনেক অল্প সময়েই প্রয়োজনীয় তথ্য জানা হবে।
স্কিমিং
পড়ার সময় স্কিমিং পদ্ধতির ব্যবহার কমবেশি অনেকেই করে থাকে, অনেক সময় না জেনেই। স্কিমিং রিডিং হলো বইয়ের পাতায় প্রতিটি লাইনে কেবল চোখ বুলিয়ে যাওয়া এবং সেখান থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শব্দ বের করে বোঝার চেষ্টা করা।
পদ্ধতি
এ পদ্ধতিতে বইয়ের লাইন বরাবর হাতের আঙুল বা কলম ব্যবহার করা হয় যেন চোখ অন্য কোনো লাইনে সরে না পড়ে। ফলে নির্দিষ্ট শব্দগুলো সহজেই চিহ্নিত করা যায়। এই পদ্ধতি মেটা গাইডিং নামেও পরিচিত।
স্কিমিং পদ্ধতিতে দক্ষ হওয়ার উপায় হলো নিয়মিত অনুশীলন করা। পাঠক কোন শব্দ কত দ্রুত শনাক্ত করতে পারছে তার ওপর নির্ভর করে পড়ার গতি। যদি শব্দটি পাঠকের অনেক পরিচিত হয়, তাহলে পড়ার গতিও স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যাবে।
এই পদ্ধতিতে কোনো একটি অনুচ্ছেদের প্রথম এক বা দুটি বাক্য পড়ার পর শেষের বাক্যটি পড়তে হবে। পড়ার বিষয়ের মধ্যে ব্যাখ্যা বা যুক্তিগুলোর দিক নির্ধারণ করার চেষ্টা করতে হবে। বিস্তারিত পড়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
পড়ার সময় পড়তে হবে পড়ার উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখে। পঠিত বিষয় থেকে যা যা জানা দরকার তা সে বিষয়ে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে কি না তা দেখতে হবে। অপরিচিত শব্দ ও নতুন তথ্য কয়েকবার পড়ে বোঝার চেষ্টা করতে হবে।
শেষ অনুচ্ছেদে সাধারণত একটি উপসংহার বা সংক্ষিপ্তসার থাকে। এটিকে স্কিম করার দরকার নেই। লেখকের সামগ্রিক উদ্দেশ্য বুঝতে এটা মনোযোগ সহকারে পড়তে হবে। কিন্তু অন্যান্য অংশ স্কিম করে পড়ার কারণে অনেকটা সময় যেমন বেচে যাবে, তেমনি সহজে বিষয়ের গভীরে পৌঁছতে পারবে।
শিক্ষাজীবনে জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতে জীবনী, সংবাদপত্র, বিভিন্ন বিষয়ের ওপর লিখিত বইপত্র ও জার্নাল পড়তে হয়। এসব বিষয়ে পাঠযোগ্য লেখার পরিমাণ এতই বিশাল যে, চাইলেও সব পড়ে শেষ করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে স্কিমিং পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারো। পাঠ্যপুস্তকের বিষয় হৃদয়ঙ্গম করতে বিষয়টির প্রতিটি লাইন মনোযোগ দিয়ে পড়ার পদ্ধতি বেশি কাজে দেবে।
লেখা: লিজা চৌধুরী
ন বসছে না পড়ার টেবিলে? জেনে নাও কারণ
পড়ার টেবিলে বসে আছে রাফি। ১০ মিনিট পর দেখা যায় সে বই রেখে মোবাইলে স্কুল করছে। আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বইয়ের দিকে তাকাচ্ছে।
আসলে তার পড়ায় মন বসছে না। 'পড়তে মন চাইছে না'-এ কথাটি আজকাল শিক্ষার্থীদের মুখে প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই 'মন চাইছে না' কি আসলে মস্তিষ্কের কাজ, নাকি এর পেছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা?
চলুন জেনে নেওয়া যাক, পড়ার সময়ে অলস লাগলে বা পড়ায় মন না বসার কারণ নিয়ে-
গবেষকেরা বলছেন, অলসতা অনেকটাই মস্তিষ্কের নিউরোকেমিক্যাল প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। আমাদের মস্তিষ্ক সিদ্ধান্ত নেয়, কাজ শুরু করে এবং শেষ করে-এই তিনটি প্রক্রিয়া মোটিভেশন বা অনুপ্রেরণা সিস্টেম মেনে। এর মূল তিনটি অংশ হলো-
>> প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স: পরিকল্পনা ও লক্ষ্য স্থির করে।
>> বেসাল গ্যাংলিয়া: কাজ শুরু করার 'স্টার্ট বাটন'।
>> ডোপামিন নেটওয়ার্ক: চালিকাশক্তির মতো কাজ করে।
যখন এ সিস্টেমের সমন্বয় হারায়, তখন শিক্ষার্থী নিজেকে অলস মনে করতে শুরু করে। বই পড়তে বসলেও মন বসে না, কাজ জমা দেওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত দেরি হয়, সহজ কাজও ভারী মনে হয়। এটি কোনো চরিত্রগত দুর্বলতা নয়; বরং মস্তিষ্কের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
➤প্রতিটি অংশের ভূমিকা
>> বেসাল গ্যাংলিয়া: মস্তিষ্কের স্টার্ট বাটন। এটি ধীর হলে কাজ শুরু করতে অনীহা হয়।
>> ডোপামিন: রাসায়নিক যা মস্তিষ্ককে আগ্রহী করে। কম ডোপামিন থাকলে কাজ শুরুতে অনীহা, সবকিছু নীরস মনে হয়। সামাজিক মিডিয়া, গেম বা শর্ট ভিডিও দ্রুত ডোপামিন বাড়ায়, পড়াশোনা তুলনামূলকভাবে কম আকর্ষণীয় লাগে।
>> প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স: মস্তিষ্কের ম্যানেজার। এটি পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং মনোযোগ ধরে রাখে। পরীক্ষার চাপ, কম ঘুম, স্ট্রেস-সবই এটি দুর্বল করে। ফলে কঠিন কাজ আরও কঠিন মনে হয়, মনোযোগ ভেঙে যায়।
➤শিক্ষার্থীদের মধ্যে অলসতা বাড়ার কারণ
শুধু মস্তিষ্ক নয়, পরিবেশ ও আধুনিক জীবনের চাপও গুরুত্বপূর্ণ। আজকের শিক্ষার্থীরা আগের তুলনায় বেশি তথ্য, প্রতিযোগিতা এবং বিভ্রান্তির মধ্যে বড় হচ্ছে। অতিরিক্ত ক্লাস, কোচিং ও পরীক্ষার চাপ, ঘুমের অভাব মস্তিষ্কের মোটিভেশন সিস্টেমকে ক্লান্ত করে। মনস্তাত্ত্বিক কারণও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যর্থতার ভয়-কাজ ভুল হতে পারে এ ধারণা- শুরু করার আগে থামিয়ে দেয়। নিখুঁত হওয়ার প্রবণতাও বাধা। লক্ষ্য যদি অস্পষ্ট বা খুব বড় হয়, যেমন 'পুরো সিলেবাস শেষ করতে হবে,' মস্তিষ্ক কাজটিকে চাপ হিসেবে দেখে। কম আত্মবিশ্বাস, 'আমি পারব না'-ধারণাও অলসতা বাড়ায়। [ জানা-অজানা 360 ]
➤কীভাবে এই সেফ মোড নিয়ন্ত্রণে আনা যায়
শিক্ষার্থীরা কিছু কৌশল মেনে মোটিভেশন সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে-
>> কাজকে ছোট অংশে ভাগ করা: একসঙ্গে বড় অধ্যায় বা প্রকল্প দেখা মস্তিষ্ককে অতিরিক্ত চাপ দেয়। প্রতিদিন ১৫-২০ মিনিট করে ছোট অংশ পড়া বা নোট তৈরি করা কার্যকর। ছোট কাজ মস্তিষ্ককে ডোপামিন দেয়, আগ্রহ বাড়ায়।
>> টুডু লিস্ট ও সংকেত ব্যবহার: অ্যালার্ম, স্টিক নোট বা ওয়াল ক্যালেন্ডার স্মরণ করিয়ে দেয়, কাজ কখন শুরু করতে হবে।
>> পোমোডোরো পদ্ধতি: ২৫ মিনিট পড়া এবং ৫ মিনিট বিরতি মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে। ২ মিনিট রুলও কার্যকর-কোনো কাজ ২ মিনিট করে শুরু করলে মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবে বাকিটা করে।
>> ঘুম, ব্যায়াম ও সুষম খাবার: পর্যাপ্ত ঘুম মস্তিষ্ককে শক্তি দেয়, ব্যায়াম ডোপামিন ও এন্ডোরফিন বাড়ায়।
>> স্ক্রিন ও সামাজিক মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ: অতিরিক্ত ভিডিও বা গেম দ্রুত ডোপামিন দেয়, পড়াশোনাকে তুলনায় কম আকর্ষণীয় বানায়। নির্দিষ্ট সময় ফোন বন্ধ বা স্ক্রিন ব্রেক মস্তিষ্ককে স্বাভাবিক মোটিভেশন মোডে আনে।
>> নিজেকে দোষারোপ করা বন্ধ করা: 'আমি অলস' বলার বদলে বলুন, 'আমার মোটিভেশন সিস্টেম শক্ত করতে হবে।' নেতিবাচক চিন্তা কমে যায়, উদ্যম বাড়ে।
➤কেন মস্তিষ্ক কাজ শুরু করতে চায় না?
নিউরোসায়েন্স অনুযায়ী, মস্তিষ্ক প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় বিবেচনা করে-
১. কাজটি করতে কতটা মানসিক শক্তি লাগবে এবং
২. কাজটি করলে কী ধরনের ফল বা আনন্দ পাওয়া যাবে।
যখন ফলাফলের মান কম মনে হয়, মস্তিষ্ক কাজ এড়িয়ে যেতে 'সেফ মোডে' চলে যায়। শিক্ষার্থীরা তাই বলে, 'আজ কেমন যেন লাগছে, পরে করি।'
অলসতা কোনো চরিত্রগত দুর্বলতা নয়; এটি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, ক্লান্তি, চাপ, ডোপামিনের ওঠানামা এবং পরিবেশগত প্রভাবের ফল। পরিবর্তনের পথ হলো মস্তিষ্ককে বোঝা এবং তার কাজের ধরন অনুযায়ী কৌশল তৈরি করা। ছোট পদক্ষেপে এগোলে ধীরে ধীরে 'আমি পারব না' বা 'এখন নয়' ধরনের প্রতিক্রিয়া কমে আসে, আর উদ্যম ফিরে আসে। সত্যিকারের শক্তি আমাদের ভেতরেই আছে-শুধু মস্তিষ্ককে তার নিজস্ব ছন্দে একটু পথ দেখাতে হবে।
.
লেখা: Pallab Shariare
নারীরা কীভাবে ভোটাধিকার পেলেন
১৮৯৩ সালের সেপ্টেম্বর। নিউজিল্যান্ডের রাজধানী ওয়েলিংটনে পার্লামেন্ট ভবনের সামনে তখন এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। সংসদ সদস্যদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে বিশাল এক পিটিশন—লম্বা কাগজের রোল, যেন শেষই হয় না।
সেই কাগজে আছে ৩২ হাজারেরও বেশি নারীর স্বাক্ষর। এই পিটিশনের মূল দাবি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট এবং আনুষ্ঠানিক: “নির্বাচনী আইন সংশোধন করে নারীদের সংসদীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার দিতে হবে।”
এই আন্দোলনের মূল স্লোগান ছিল—“Votes for Women.” (ভোটস ফর উইমেন)।
সেই বছর নিউজিল্যান্ড বিশ্বের প্রথম দেশ হিসাবে নারীদের ভোটাধিকার দেয়। কিন্তু এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বিস্ময় ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘদিনের সংগঠিত আন্দোলন, যুক্তি, পিটিশন এবং রাজনৈতিক চাপের ফলাফল—একটি বৈশ্বিক পরিবর্তনের প্রথম বড় জয়।
এই দৃশ্য শুধু একটি আবেদনপত্র জমা দেওয়ার ঘটনা ছিল না। এটা ছিল নারীদের দীর্ঘদিনের নীরব ক্ষোভের প্রকাশ, তাদের সাহসের ঘোষণা।
আর ঠিক সেই বছরই নিউজিল্যান্ড ইতিহাস তৈরি করে। বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে তারা নারীদের ভোটাধিকার দেয়।
কিন্তু এই অর্জন কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া বিস্ময় নয়। এটা ছিল বহু দশক ধরে জমে ওঠা প্রতিবাদ, যুক্তি, সংগঠন আর সাহসের ফল।
.
উনিশ শতকে নারীর নাগরিক অধিকারহীনতা
একটি বৈশ্বিক আন্দোলনের প্রথম বড় জয়—যা পরে বদলে দেয় পুরো পৃথিবীর রাজনীতির ভাষা।
এই আন্দোলনের শিকড় খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় এমন এক সময়ে, যখন নারীদের রাষ্ট্রের চোখে নাগরিক হিসাবেই দেখা হত না। উনিশ শতকের শুরুতে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় প্রচলিত ছিল Law of Coverture—একটি আইনি নীতি, যার অর্থ ছিল, বিয়ের পর একজন নারী তার স্বতন্ত্র আইনি সত্তা হারান। তিনি আর ব্যক্তি নন, তিনি স্বামীর অধীন এক আইনি অস্তিত্ব।
এই ব্যবস্থায় নারীর সম্পত্তির অধিকার, আয়ের অধিকার বা রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নই উঠত না। ভোটাধিকার তো দূরের কথা—রাষ্ট্রের কাছে নারী ছিলেন এমন কেউ, যার হয়ে “স্বাভাবিকভাবে” একজন পুরুষ সিদ্ধান্ত নেবে।
.
যুক্তরাষ্ট্রে আন্দোলনের প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা
এই ধারণায় প্রথম বড় আঘাত আসে ১৮৪৮ সালে, আমেরিকার নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের একটি ছোট শহরে। সেনেকা ফলস কনভেনশনে জড়ো হয়েছিলেন কয়েক ডজন নারী ও পুরুষ, যাদের মধ্যে ছিলেন এলিজাবেথ ক্যাডি স্ট্যান্টন এবং লুক্রেশিয়া মট। তারা যে ডিক্লারেশন অব সেন্টিমেন্টস প্রকাশ করেন, তা ইচ্ছাকৃতভাবেই মার্কিন স্বাধীনতা ঘোষণার ভাষা অনুকরণে লেখা। পার্থক্য ছিল একটি জায়গায়—এখানে বলা হয়েছিল, “অল মেন অ্যান্ড উইমেন আর ক্রিয়েটেড ইক্যুয়াল।”
এই বাক্যটি শুধু একটি দাবি নয়, এটা ছিল একটি রাজনৈতিক বিস্ফোরণ। সমসাময়িক পত্রিকাগুলি এই ঘোষণাকে হাস্যকর ও বিপজ্জনক বলে আখ্যা দেয়। এমনকি অনেক নারী অংশগ্রহণকারীও ভোটাধিকার দাবির পক্ষে ভোট দিতে দ্বিধায় ছিলেন। তবু এই ঘোষণাই ভবিষ্যতের আন্দোলনের ভাষা নির্ধারণ করে দেয়।
পরবর্তী কয়েক দশকে আমেরিকায় নারী ভোটাধিকার প্রশ্নটি ধীরে ধীরে সংগঠিত রাজনীতির অংশ হয়ে ওঠে। ১৮৬৯ সালে গঠিত হয় ন্যাশনাল ওম্যান সাফ্রেজ অ্যাসোসিয়েশন এবং আমেরিকান ওম্যান সাফ্রেজ অ্যাসোসিয়েশন। তারা একদিকে যুক্তি, আইন ও সাংবিধানিক সংস্কারের পথে হাঁটেন, অন্যদিকে জনসমর্থন গড়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু অগ্রগতি ছিল ধীর। প্রতিটি অঙ্গরাজ্যে আলাদা লড়াই, আলাদা পরাজয়। ভোটাধিকার বার বার সংসদে উঠেছে, আবার বার বার প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।
.
ব্রিটেনে সরকারের দমননীতি
ব্রিটেনে পরিস্থিতি ছিল আরও কঠিন। সেখানে সংসদীয় সংস্কারের মাধ্যমে পুরুষদের ভোটাধিকার সম্প্রসারিত হলেও নারীরা বার বার উপেক্ষিত হন। এই হতাশা থেকেই আন্দোলন ভেঙে পড়ে দুটি ভিন্ন কৌশলে। একদিকে ছিলেন শান্তিপন্থীরা, যাদের নেতৃত্বে ছিলেন মিলিসেন্ট ফসেট।
তিনি বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্রকে যুক্তির মাধ্যমে বাধ্য করা সম্ভব। অন্যদিকে ছিলেন সেই নারীরা, যারা মনে করতেন যুক্তির ভাষা রাষ্ট্র শুনছে না। ১৯০৩ সালে এই ক্ষোভ থেকেই এমেলিন প্যাঙ্কহার্স্ট প্রতিষ্ঠা করেন উইমেন্স সোশ্যাল অ্যান্ড পলিটিক্যাল ইউনিয়ন। তাদের স্লোগান ছিল—“Deeds, not words” (ডিডস, নট ওয়ার্ডস)। এটা ছিল কৌশলের পরিবর্তন নয়, এটা ছিল রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ঘোষণা।
১৯০৯ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে ব্রিটেনে হাজার হাজার সাফ্রেজেটকে গ্রেপ্তার করা হয়। সাফ্রেজেট মানে ২০শ শতকের শুরুর দিকে ব্রিটেনে নারীদের ভোটাধিকার আদায়ের জন্য যারা সরাসরি আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। কারাগারে গিয়ে তারা অনশন শুরু করেন। সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল ভয়াবহ—ফোর্স-ফিডিং। মানে জোর করে খাওয়ানো। চিকিৎসার ভাষায় একে বলা হত “জীবন রক্ষা”। বাস্তবে এটা ছিল নাক ও মুখ দিয়ে পাইপ ঢুকিয়ে জোর করে খাবার ঢোকানো, যা বহু নারীর স্থায়ী শারীরিক ক্ষতি করে। ১৯১৩ সালে সরকার পাশ করে কুখ্যাত ক্যাট অ্যান্ড মাউস অ্যাক্ট—অনশনরত নারীদের মুক্তি দিয়ে সুস্থ হলেই আবার গ্রেপ্তার করার আইন। এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল আন্দোলন ভাঙা। ফল হয়েছিল উল্টা—জনমত ধীরে ধীরে নারীদের পক্ষে যেতে শুরু করে।
এই সময়েই বিশ্বের অন্য প্রান্তে ভিন্ন এক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছিল। নিউজিল্যান্ডে কেট শেপার্ড-এর নেতৃত্বে নারী ভোটাধিকার আন্দোলন তুলনামূলকভাবে কম সহিংস কিন্তু অত্যন্ত সংগঠিত রূপ নেয়। ১৮৯৩ সালের পিটিশন কেবল প্রতীকী ছিল না। এটা প্রমাণ করেছিল যে নারীরা রাজনৈতিকভাবে সচেতন এবং সংগঠিত হতে সক্ষম। অস্ট্রেলিয়া ১৯০২ সালে ফেডারেল পর্যায়ে শ্বেতাঙ্গ নারীদের ভোটাধিকার দেয়, যদিও আদিবাসী নারীরা তখনও বাদ পড়েন—যা এই আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করে।
.
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর রাজনৈতিক পরিবর্তন
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আন্দোলনের গতি বদলে দেয়। ১৯১৪ থেকে ১৯১৮—এই চার বছরে ইউরোপ ও আমেরিকায় নারীরা এমন কাজ করেন, যা আগে “পুরুষের কাজ” বলে বিবেচিত হত। অস্ত্র কারখানা, রেলওয়ে, প্রশাসন—সব জায়গায় নারীরা দায়িত্ব নেন। যুদ্ধ শেষে রাষ্ট্রের পক্ষে আর বলা সম্ভব ছিল না যে নারীরা রাজনৈতিকভাবে অযোগ্য। এই বাস্তবতা আইনেও প্রতিফলিত হতে শুরু করে।
১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের পর রাশিয়া নারীদের ভোটাধিকার দেয়। ১৯১৮ সালে যুক্তরাজ্যে ৩০ বছরের বেশি বয়সী সম্পত্তির মালিক নারীরা ভোটাধিকার পান, ১৯২৮ সালে তা পুরুষদের সমান করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১৯২০ সালে সংবিধানের ১৯তম সংশোধনীর মাধ্যমে নারীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত হয়। তবে এখানেও ইতিহাস অসম্পূর্ণ। আফ্রিকান-আমেরিকান নারীরা কার্যত ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন ১৯৬৫ সালের ভোটিং রাইটস অ্যাক্ট-এর পর।
উপমহাদেশে এই ইতিহাস ভিন্ন পথ নেয়। ভারতে নারী ভোটাধিকার যুক্ত ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বৃহত্তর রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে। ১৯১৭ সালে সারোজিনী নাইডু এবং অ্যানি বেসান্ট ব্রিটিশ সরকারের কাছে নারীদের ভোটাধিকার দাবি করেন। ধীরে ধীরে ১৯২১ সাল থেকে প্রাদেশিক পর্যায়ে সীমিত ভোটাধিকার দেওয়া হয়, যা ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে আরও বিস্তৃত হয়।
.
ভোটাধিকার অর্জনের সীমাবদ্ধতা
ভোটাধিকার অর্জনের পরও গল্প শেষ হয়নি। বহু দেশে নারীরা ভোট দিলেও সংসদে তাদের উপস্থিতি ছিল নগণ্য। রাজনৈতিক ভাষা ও ক্ষমতার কাঠামো বদলাতে আরও সময় লেগেছে। ভোটাধিকার ছিল প্রবেশদ্বার, গন্তব্য নয়।
সব আন্দোলন সফল হয়নি। বহু বিল সংসদে বাতিল হয়েছে। বহু নারী জেলে প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের নাম ইতিহাসে লেখা হয়নি। অনেক সময় আন্দোলন ভেঙে পড়েছে, নেতারা ক্লান্ত হয়েছেন, সমাজ ফিরে গেছে পুরোনো অবস্থানে।
এই ব্যর্থতাগুলি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলি দেখায়—অধিকার অর্জন কোনো সরল রেখা নয়। এটা ওঠানামার পথ, যেখানে পরাজয়ও ভবিষ্যতের জয়ের বীজ বয়ে আনে।
ভোটাধিকার পাওয়ার পর অনেক নারী বুঝতে পারেন, আইনি অধিকার পেলেও বাস্তব ক্ষমতা এখনও দূরে। সংসদে নারীর সংখ্যা ছিল নগণ্য। রাজনৈতিক ভাষা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি—সবই ছিল পুরুষশাসিত। তারা বুঝতে পারেন, ভোটাধিকার কোনো চূড়ান্ত বিজয় নয়, এটা কেবল প্রবেশদ্বার।
আরো একটি দিক হল, ভোটাধিকার আন্দোলনের মূল গল্পগুলি পশ্চিমের দেশকেন্দ্রিক। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যের নারীদের সংগ্রাম আরও দেরিতে, আরও নীরবে হয়েছে। অনেক জায়গায় ধর্ম, উপনিবেশবাদ ও দারিদ্র্য নারীদের কণ্ঠ আরও চেপে ধরেছে। এই অনুপস্থিতি স্বীকার করা জরুরি, কারণ এটা দেখায়, এই ইতিহাসও অসম্পূর্ণ।
.
এই ইতিহাসে এমন হাজারও নারী আছেন, যাদের নাম নেই কোনো বইয়ে। তারা মিছিলে হেঁটেছেন, জেলে গেছেন, পরিবার হারিয়েছেন। তাদের জন্য কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নেই, কিন্তু আজকের প্রতিটি নারী ভোটারের মধ্যে তাদের ছায়া রয়ে গেছে।
নারীদের ভোটাধিকার আন্দোলন তাই কেবল নারীদের ইতিহাস নয়। এটা দেখায়, গণতন্ত্র কীভাবে ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়—চাপের মুখে, প্রশ্নের মুখে, এবং প্রায়ই রাষ্ট্রের অনিচ্ছার বিরুদ্ধে। আজ আমরা যখন ভোট দিই, তখন সেই ব্যালট পেপারে শুধু একটি পছন্দ নয়—এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে চলা এই লড়াইয়ের ছাপও পড়ে থাকে।
,আজকের মুরগি প্রাচীন থেরোপড ডাইনোসরের বিবর্তিত রূপ
বর্তমান বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুযায়ী,আধুনিক পাখি যার মধ্যে মুরগিও রয়েছে, তারা প্রাচীন থেরোপড ডাইনোসরের বিবর্তিত রূপ। অর্থাৎ ডাইনোসর পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি, তাদের একটি শাখা আজও পাখি হিসেবে বেঁচে আছে।
থেরোপড ছিল দুই পায়ে হাঁটা ডাইনোসরের একটি গোষ্ঠী। এদের মধ্যেই ধীরে ধীরে পালক গড়ে ওঠে, হাড় হালকা হয়, সামনের হাত ডানায় রূপ নেয় এবং দীর্ঘ বিবর্তনের মাধ্যমে প্রাচীন পাখির উদ্ভব ঘটে।
জীবাশ্ম প্রমাণ দেখায় যে, অনেক থেরোপড ডাইনোসরের দেহে পালক ছিল। তাদের হাড়ের গঠন, বিশেষ করে ফাঁপা হাড় এবং বুকে জোড়া হাড়ের উপস্থিতি আধুনিক পাখির সঙ্গে মিলে যায়। এমনকি ডিম পাড়া ও বাসা বানানোর আচরণেও মিল পাওয়া গেছে।
চীনে আবিষ্কৃত বহু জীবাশ্মে পালকের স্পষ্ট ছাপ পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে পালক প্রথমে তাপ সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের কাজে ব্যবহৃত হতো। পরে সেটিই উড়ার উপযোগী গঠনে রূপ নেয়।
বিবর্তনের ধারায় ছোট ও দ্রুতগামী পালকওয়ালা থেরোপড থেকে ধীরে ধীরে এমন প্রাণীর উদ্ভব হয় যাদের শরীর আরও হালকা, লেজ ছোট এবং ডানা শক্তিশালী ছিল। এভাবেই কোটি কোটি বছরের পরিবর্তনের মাধ্যমে আধুনিক পাখির সৃষ্টি হয়।
তাই বিজ্ঞানীরা মনে করেন,আজকের মুরগি সরাসরি কোনো একটি নির্দিষ্ট ডাইনোসরের সন্তান নয়, বরং দীর্ঘ বিবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে থেরোপড ডাইনোসরের বংশধর হিসেবে গড়ে ওঠা এক জীবিত উত্তরসূরি।
তাইয়েবুন নেছা..
ডোপামিন: পুরুষদের জীবনে ২১টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
ডোপামিন, যা মস্তিষ্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিউরোট্রান্সমিটার, পুরুষদের জীবনে বিভিন্নভাবে প্রভাব ফেলে। নিচে ডোপামিনের ২১টি ভূমিকা তুলে ধরা হলো:
1. মেজাজ উন্নত করে বিষণ্নতা কমাতে সহায়তা করে।
2. স্মৃতিশক্তি এবং শেখার ক্ষমতা বাড়ায়।
3. মোটর নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে শরীরের সমন্বয় উন্নত করে।
4. আনন্দ এবং সন্তুষ্টির অনুভূতি সৃষ্টি করে।
5. অনুপ্রেরণা এবং পুরস্কার-প্রণোদিত আচরণে ভূমিকা রাখে।
6. মনোযোগ এবং ফোকাস বাড়াতে সহায়তা করে।
7. সৃজনশীলতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা উন্নত করে।
8. শারীরিক কার্যকলাপে পারফরম্যান্স বাড়ায়।
9. ঘুমের চক্র নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
10. যৌন আকাঙ্ক্ষা এবং কর্মক্ষমতা বাড়ায়।
11. প্রতিক্রিয়া সময় দ্রুত করে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে।
12. মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
13. আবেগ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
14. সামাজিক আচরণ এবং সম্পর্ক উন্নত করে।
15. উদ্যম এবং শক্তি বাড়াতে সহায়তা করে।
16. কাজের প্রতি আগ্রহ এবং সম্পৃক্ততা বাড়ায়।
17. নতুন অভিজ্ঞতা গ্রহণে উৎসাহিত করে।
18. ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতা বাড়ায়।
19. হজম প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
20. ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখে।
21. স্ট্রেস এবং উদ্বেগ কমাতে সহায়তা করে।
'নির্জীব বস্তু থেকে প্রাণের উৎপত্তি' বিজ্ঞানের অন্যতম রোমাঞ্চকর এক রহস্য। এটি কোনো জাদুর গল্প নয় বরং কোটি কোটি বছর ধরে চলা রসায়নের জীববিজ্ঞানে রূপান্তরিত হওয়ার এক মহাকাব্য। চলুন তবে, গল্পটা শুরু করা যাক পৃথিবীর একদম শুরুর দিনগুলো থেকে-
পৃথিবী তখন এক উত্তপ্ত গোলক। আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত, ঘন ঘন বজ্রপাত আর অতিবেগুনি রশ্মির প্রচণ্ড দাপট। বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন ছিল না, বরং ছিল মিথেন, অ্যামোনিয়া, জলীয় বাষ্প আর হাইড্রোজেন। সমুদ্রের তলদেশে ছিল গরম পানির ঝরনা বা Hydrothermal Vents যা ছিল খনিজ উপাদানে ঠাসা।
বিজ্ঞানী স্ট্যানলি মিলার ও হ্যারল্ড উরে ১৯৫৩ সালে দেখান যে, আদিম পৃথিবীর ওই প্রতিকূল পরিবেশে সাধারণ গ্যাসগুলো থেকে প্রাণের মূল উপাদান অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরি হওয়া সম্ভব। অর্থাৎ, অজৈব অণু থেকে জৈব অণু তৈরির প্রথম ধাপটি ছিল স্রেফ প্রাকৃতিক রাসায়নিক বিক্রিয়া।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, ডিএনএ আসার অনেক আগে তৈরি হয়েছিল আরএনএ। এটি একাধারে তথ্য জমা রাখতে পারত এবং এনজাইমের মতো কাজ করতে পারত। এই অণুগুলো সমুদ্রের পানিতে ভাসতে ভাসতে নিজের প্রতিলিপি তৈরি করতে শিখে গেল। এখান থেকেই শুরু হলো "বংশগতি"র প্রাথমিক রূপ।
চর্বি জাতীয় অণু পানিতে গোলক বা বুদবুদের মতো গঠন তৈরি করে। ঘটনাক্রমে কিছু আরএনএ অণু এই চর্বির আবরণের ভেতরে আটকা পড়ে যায়। তৈরি হয় প্রাণের প্রথম প্রোটো-সেল বা আদি কোষ। এটি বাইরের পরিবেশ থেকে নিজেকে আলাদা রাখতে শিখল এবং ভেতরকার রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলোকে সুরক্ষিত করল।
অনেকেই এই আবায়োজেনেসিস এবং বিবর্তনবাদকে গুলিয়ে ফেলেন। পরিষ্কার করা যাক ভেজালটা-
আবায়োজেনেসিস:
কীভাবে নির্জীব পদার্থ থেকে প্রথম এককোষী প্রাণ তৈরি হলো।
আবায়োজেনেসিস (Abiogenesis) হলো একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, যা অনুযায়ী প্রায় ৪ বিলিয়ন বছর আগে আদি পৃথিবীর নির্জীব অজৈব পদার্থ (যেমন-মিথেন, অ্যামোনিয়া, জলীয় বাষ্প) থেকে ধাপে ধাপে জটিল জৈব অণু এবং পরিশেষে প্রথম এককোষী প্রাণ তৈরি হয়েছে।
ধাপসমূহ:
সরল অণু গঠন: আদি পৃথিবীর বিদ্যুৎ চমকানো ও আগ্নেয়গিরির তাপে অজৈব উপাদানগুলো থেকে অ্যামিনো অ্যাসিড ও নিউক্লিওটাইডের মতো সরল জৈব অণু তৈরি হয়।
জটিল অণু (RNA/Protein):
এই সরল অণুগুলো মিলে RNA-র মতো আত্ম-প্রতিলিপি গঠনকারী অণু তৈরি করে, যা জীবনের ভিত্তি স্থাপন করে।
মেমব্রেন বা আবরণী:
লিপিড অণুগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে একটি পর্দা বা কোষঝিল্লি তৈরি করে, যার ভেতরে জৈব অণুগুলো সুরক্ষিত থাকে।
প্রথম কোষ: RNA এবং মেমব্রেনের মিলনে তৈরি হয় প্রোক্যারিওটিক বা আদি কোষ, যা পুষ্টি গ্রহণ ও বংশবৃদ্ধি করতে সক্ষম।
এই প্রক্রিয়াটি লক্ষ-কোটি বছর ধরে চলা রাসায়নিক বিবর্তনের ফল।
বিবর্তনঃ
সেই প্রথম প্রাণ থেকে কীভাবে লক্ষ লক্ষ প্রজাতির সৃষ্টি হলো।
আজকের পৃথিবীতে আবায়োজেনেসিস আর প্রাকৃতিকভাবে ঘটা সম্ভব নয়, কারণ এখনকার বায়ুমণ্ডলে প্রচুর অক্সিজেন আছে যা আদিম রাসায়নিক অণুগুলোকে ভেঙে ফেলে। এছাড়া, কোনো নতুন অণু তৈরি হওয়ার আগেই বর্তমানের ব্যাকটেরিয়া বা জীবরা তা খেয়ে ফেলবে।
এই যাত্রাটি কোনো একদিনে হয়নি, এটি সম্পন্ন হতে সময় লেগেছিল কোটি কোটি বছর। প্রকৃতি যেন খুব ধৈর্য ধরে অণুর পর অণু সাজিয়ে প্রাণের এই জটিল নকশাটি তৈরি করেছে। বিষয়টির আদিম পরিবেশ ভাবার পরেই আমাদের উচিত বর্তমান পরিস্থিতির সাথে তুলনা করে বিতর্ক তৈরি করা। মনে রাখা উচিত, প্রকৃতির সিস্টেম বোঝার কাজ বিজ্ঞান করে, সিস্টেম হওয়ার জন্য না।
তথ্য সংগ্রহ: মৃণাল নন্দী
ভালুক যেভাবে বর্জ্যকে পেশিতে রূপান্তরিত করে!
মানুষসহ অধিকাংশ প্রাণীর ক্ষেত্রে, দিনের পর দিন প্রস্রাব করতে না পারা শরীরে বিষাক্ত বর্জ্য জমা হওয়ার কারণে মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তবে, আমেরিকান ব্ল্যাক বিয়ার এবং গ্রিজলি ভালুকের এমন এক জৈবিক "সুপারপাওয়ার" বা বিশেষ ক্ষমতা বিবর্তিত হয়েছে, যার মাধ্যমে তারা একটানা সাত মাস পর্যন্ত কোনো বিরতি ছাড়াই মলমূত্র ত্যাগ না করে থাকতে পারে। শীতনিদ্রার সময় ভালুকের কিডনি সামান্য পরিমাণে প্রস্রাব তৈরি করতে থাকে, কিন্তু তা শরীর থেকে বের হয় না। পরিবর্তে, মূত্রাশয় প্রস্রাবের প্রধান উপাদান ইউরিয়াকে পুনরায় রক্তপ্রবাহে শুষে নেয়।
একবার রক্তে ফিরে আসার পর, একটি বিশেষ বিপাকীয় প্রক্রিয়া শুরু হয়। ভালুকের শরীরকে বিষাক্ত করার পরিবর্তে, এই ইউরিয়া ভেঙে যায় এবং এতে থাকা নাইট্রোজেন বিমূর্ত হয়ে যায়। এরপর এই নাইট্রোজেন লিভারে বা যকৃতে স্থানান্তরিত হয়, যেখানে এটি প্রোটিনের মূল উপাদান 'অ্যামিনো অ্যাসিড' তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
এই অবিশ্বাস্য অভ্যন্তরীণ পুনর্ব্যবহারযোগ্য চক্রটি ভালুককে পুরো শীতকাল জুড়ে তাদের পেশি এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের টিস্যুগুলো ঠিক রাখতে সাহায্য করে, যদিও তারা এই সময়ে এক গ্রাম খাবারও গ্রহণ করে না। এটি প্রকৃতির এমন এক বিস্ময়কর ব্যবিস্থাপনা, যা একটি বর্জ্য পদার্থকে জীবন রক্ষাকারী শক্তির উৎস হিসেবে বদলে দেয়।
: ওভারথিঙ্কিং থামানোর ম্যাজিক
মাঝরাত। চারপাশ নিস্তব্ধ, অথচ আপনার মাথার ভেতরে যেন এক বিশৃঙ্খল কনসার্ট চলছে। পুরোনো ভুল, আগামীর ভয় আর অহেতুক 'কী হতো যদি...' গল্পের জালে আমরা জড়িয়ে পড়ি। এই ওভারথিঙ্কিং বা অতিচিন্তা আসলে মনের এক প্রকার ক্লান্তি, যা আমাদের প্রশান্তিটুকু শুষে নেয়।
রাত নামলে মস্তিষ্কের এই 'অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা' থামাতে নিচের কৌশলগুলো ট্রাই করতে পারেন:
১. 'ব্রেইন ডাম্প' বা শব্দে মুক্তি
মাথার ভেতর জট পাকিয়ে থাকা চিন্তাগুলোকে কাগজে নামিয়ে ফেলুন। যখন আপনি মনের বিশৃঙ্খলাকে ডায়েরির পাতায় বন্দী করবেন, তখন মস্তিষ্ক অনেকটা হালকা বোধ করে। অগোছালো ভাবনাগুলো তখন আর শত্রু মনে হয় না।
২. ৫-৪-৩-২-১ টেকনিক
চিন্তার সুতো যখন ছিঁড়ে যাচ্ছে, তখন বর্তমানে ফিরুন।
* চোখ মেলে ৫টি জিনিস দেখুন।
* ৪টি শব্দ অনুভব করুন।
* ৩টি জিনিসের স্পর্শ নিন।
* ২টি ঘ্রাণ নিন।
* ১টি ভালো কথা নিজেকে বলুন।
এটি আপনার মস্তিষ্ককে কাল্পনিক জগৎ থেকে বর্তমানে আছড়ে ফেলবে।
৩. চিন্তার জন্য 'সময়' বরাদ্দ করুন
শুনতে অদ্ভুত লাগলেও কার্যকর! সারাদিন নিজেকে বলুন, "এই বিষয় নিয়ে আমি কাল সকালে ১০টায় ভাবব।" যখন আপনি চিন্তাকে নির্দিষ্ট সময় দেবেন, তখন মাঝরাতে সে আপনার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটানোর অধিকার হারাবে।
৪. শ্বাস-প্রশ্বাসের ছন্দ (Box Breathing)
গভীরভাবে শ্বাস নিন, ৪ সেকেন্ড আটকে রাখুন এবং ৪ সেকেন্ড ধরে ছাড়ুন। বিজ্ঞানের ভাষায় এটি আপনার Parasympathetic Nervous System-কে শান্ত করে, যা শরীরকে সংকেত দেয় যে—"সব ঠিক আছে, এখন ঘুমানোর সময়।"
শেষ কথা: অতীতকে আপনি বদলাতে পারবেন না, আর ভবিষ্যৎ এখনো জন্মই নেয়নি। মাঝরাতে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে পুরো পৃথিবীর ভার নিজের কাঁধে নেবেন না। আপনি কেবল একজন মানুষ, কোনো সুপার কম্পিউটার নন। নিজেকে কিছুটা বিরতি দিন।
রাতটা ঘুমের হোক, ভাবনার অন্তহীন সমুদ্রের নয়।
সম্পর্ক নষ্ট না করে ভিন্নমত উপস্থাপনের কৌশল
দৈনন্দিন জীবনে মতের অমিল হওয়াই স্বাভাবিক। সেটা দুপুরে কী খাবেন এর মত ছোট ব্যাপার হোক, বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিষয়, ভিন্ন মত আসবেই। আমাদের সবারই আলাদা ভাবনা আছে। সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন এই মতভেদ ধীরে ধীরে তর্কে গড়ায় এবং অজান্তেই একটা সুন্দর সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আসলে দ্বিমত পোষণ মানেই ঝগড়া করা নয়। সম্মান অটুট রেখে, অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট না করেও ভিন্ন মত প্রকাশ করা যায়। কীভাবে সেটা সম্ভব—সহজ, বাস্তব আর কাজে লাগার মত কিছু উপায় নিয়েই এই লেখা।
১. আলোচনার গুরুত্ব ও উপযোগিতা বিচার
তর্কে জড়ানোর আগে একবার ভাবুন, এর ফলটা পরে কী হতে পারে। অনেক সময় আমরা রাগ বা আবেগে এমন কথাবার্তায় জড়িয়ে পড়ি, যা পরে সম্পর্কের ওপর স্থায়ী দাগ ফেলে। তাই বিশেষজ্ঞরা বলেন, সব তর্কে নামতে নেই। কোনটা দরকার, কোনটা নয়, সেটা বেছে নিতে হয়। একে বলা হয় “পিক ইয়োর ব্যাটলস”।
নিজেকে সহজ করে প্রশ্ন করুন, এই কথা বললে কি সত্যিই কোনো সমাধান তৈরি হবে? নাকি শুধু ঝগড়া বাড়বে? যদি দেখেন সামনে থাকা মানুষটি যুক্তি বা তথ্য শুনতেই রাজি নয়, তাহলে চুপ থাকাই অনেক সময় সবচেয়ে ভাল সিদ্ধান্ত। চুপ থাকা মানে হার মানা নয়। বরং এটা নিজের শক্তি বাঁচিয়ে রাখা আর মানসিক শান্তি ধরে রাখার একটা বুদ্ধিমান উপায়।
২. জয় পাওয়ার চেয়ে বোঝার মানসিকতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ
যখন আমরা তর্ককে যুদ্ধ মনে করি, তখন স্বাভাবিকভাবেই লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় সামনে থাকা মানুষটাকে হারানো। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় কাউকে তর্কে হারালেও তার মনে আপনার জন্য সম্মান তৈরি হয় না। বরং রাগ বা বিরক্তি জমে। তাই বিশেষজ্ঞরা বলেন, এখানে লক্ষ্য হওয়া উচিত কাউকে বদলে দেওয়া নয়, তার সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা। এটাকে বলা হয় “কানেকশন ওভার কনভার্শন”।
এই জায়গায় আপনার আসল কাজ হল অপর পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার চেষ্টা করা। তিনি কেন কোনো বিষয়কে ঠিক মনে করছেন, তার পেছনে কী অভিজ্ঞতা বা ভাবনা কাজ করছে এটা বুঝতে পারলে কথাবার্তার উত্তেজনা অনেকটাই কমে যায়। তখন তর্কের জায়গায় আসে সহানুভূতি, আর সেই পরিবেশে সমাধান খুঁজে পাওয়াও অনেক সহজ হয়।
৩. স্পষ্ট উদ্দেশ্য আর সম্মতির গুরুত্ব
কঠিন কোনো বিষয় নিয়ে কথা শুরু করার সবচেয়ে ভাল উপায় হল শুরুতেই নিজের ভাল উদ্দেশ্যটা পরিষ্কার করে বলা। ধরুন আপনি বললেন, “আমি নিজের মতামত দিতে আসিনি, শুধু তোমার কথাটা বুঝতে চাই”—এতেই অনেক সময় সামনে থাকা মানুষের ভেতরের প্রতিরক্ষার দেয়ালটা নরম হয়ে যায়।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, কাউকে জোর করে আলোচনায় টেনে না আনা। কথা বলার আগে তার অনুমতি নেওয়া, বা তাকে “না” বলার সুযোগ দেওয়া মানে তাকে সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণটা দেওয়া। এই নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি মানুষকে স্বাভাবিকভাবেই শান্ত রাখে এবং সে তখন বেশি যুক্তি দিয়ে কথা বলতে পারে।
৪. বিচারক হবেন না, বরং ৫ শতাংশ নিয়ম প্রয়োগ করুন
আমরা যখন কাউকে সঙ্গে সঙ্গে ভুল প্রমাণ করতে যাই, তখন সে বিষয়টাকে আক্রমণ হিসাবেই নেয়। তখন আর যুক্তি কাজ করে না, বরং প্রতিরোধ আরও শক্ত হয়। তাই বিচারকের ভূমিকায় না গিয়ে গবেষকের মত কৌতূহলী হওয়াই ভাল।
ভাবুন, তার জীবনের কোন অভিজ্ঞতা বা কোন পরিস্থিতি তাকে এমন ভাবতে শিখিয়েছে? সেটা জানার চেষ্টা করুন। এখানে একটি কাজে লাগার মত কৌশল আছে—“৫ শতাংশ নিয়ম”। মানে, তার কথার মধ্যে অন্তত ৫ শতাংশ হলেও এমন কিছু খুঁজে বের করুন, যেটা যুক্তিসংগত বা সত্য হতে পারে, এবং সেটা খোলাখুলি স্বীকার করুন। এতে আলোচনা শত্রুতার জায়গা থেকে সরে এসে ধীরে ধীরে সহযোগিতার দিকে এগোয়।
৫. উপযুক্ত সময় আর জায়গা বেছে নেওয়া জরুরি
কথাবার্তা কোথায় আর কখন হচ্ছে, তার ওপর আলোচনার মান অনেকটাই নির্ভর করে। সোশ্যাল মিডিয়ার কমেন্টে বা সবার সামনে তর্কে জড়ালে বিষয়টা সহজেই অহংকারের লড়াইয়ে বদলে যায়। তখন মানুষ সত্য বোঝার চেয়ে নিজের সম্মান রক্ষা করতেই বেশি ব্যস্ত থাকে।
তাই গুরুত্বপূর্ণ বা সংবেদনশীল কোনো কথা হলে সেটাকে ব্যক্তিগত পরিসরে বলা ভাল—এটাকে বলা হয় “প্রাইভেট ডিসকোর্স”। শান্ত, চাপমুক্ত পরিবেশে কথা বললে মানুষের স্নায়ুর টান টান ভাব কমে, মাথা ঠাণ্ডা থাকে, আর যুক্তি দিয়ে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে আলোচনা বেশি ফলপ্রসূ হয়।
৬. নিজের সীমাবদ্ধতা খোলাখুলি বলার সাহস
যখন আমরা নিজেকে সব জানি, কখনও ভুল করি না এমনভাবে তুলে ধরি, তখন সামনে থাকা মানুষটা আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। কারণ তার মনে হয়, এখানে কথা বলার জায়গা নেই। কিন্তু আপনি যদি বলেন, “এই বিষয়টা নিয়ে আমারও সব পরিষ্কার না, তবে আমি এভাবে বুঝেছি”—তাহলে কথাবার্তা হঠাৎ করেই অনেক বেশি মানবিক হয়ে যায়।
নিজের দুর্বলতা বা সংশয় স্বীকার করা মানে দুর্বল হয়ে পড়া নয়। বরং এটা আত্মবিশ্বাসেরই লক্ষণ।
৭. কথার গতি কমান, নীরবতাকে কাজে লাগান
রাগ বা উত্তেজনার সময় আমরা সাধারণত দ্রুত কথা বলা শুরু করি। আমরা ভাবি যত দ্রুত আমাদের ভাবনা প্রকাশ করব, তত দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। কিন্তু বাস্তবে এতে সামনে থাকা মানুষটি আরও উত্তেজিত হয়ে ওঠে এবং যুক্তির জায়গা দখল করে নেয় আবেগ।
এমন পরিস্থিতিতে কার্যকর কৌশল হল সচেতনভাবে কথা বলার গতি কমানো। অপরপক্ষকে তার কথা শেষ করার জন্য পর্যাপ্ত সময় দিন, যাতে সে অনুভব করে যে তাকে সত্যিই শোনা হচ্ছে। এই ছোট্ট বিরতিটিই আপনার মস্তিষ্ককে আবার শান্তভাবে ভাবতে সাহায্য করবে এবং উত্তেজিত পরিস্থিতিকে ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা করে আনবে।
৮. আপনার শব্দ বাছাই আলোচনার দিক ঠিক করে দেবে
কোন শব্দে কথা বলছেন, সেটাই অনেক সময় ঠিক করে দেয় আলোচনা ঝগড়ায় যাবে, নাকি সমাধানের দিকে এগোবে। সরাসরি “কেন” দিয়ে প্রশ্ন করলে সেটা প্রায়ই অভিযোগের মত শোনায়। তাই সম্ভব হলে “কীভাবে” বা “কী” দিয়ে প্রশ্ন করুন।
যেমন, “তুমি কেন এটা করলে?” বললে সামনে থাকা মানুষটা আত্মপক্ষ সমর্থনে নেমে পড়ে। কিন্তু যদি বলেন, “কী কারণে তোমার মনে হয়েছে এটা করা ঠিক ছিল?”—তাহলে সেটা শুনতে হয় জানার আগ্রহের মত, দোষারোপের মত নয়।
.
যখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে শুরু করে
সব আলোচনা যে শেষ পর্যন্ত ভালভাবে এগোবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। যদি দেখেন সামনে থাকা মানুষটি অতিরিক্ত রেগে যাচ্ছে, চিৎকার করছে বা ব্যক্তিগত আক্রমণে নামছে, তখন নিজেকে ও পরিস্থিতিকে বাঁচাতে কিছু বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
• আবেগ সামলানো এবং ‘মিররিং’ এড়ানো
অপরপক্ষ যখন চিৎকার শুরু করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই আমাদেরও চিৎকার করে জবাব দিতে ইচ্ছা করে। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘মিররিং’—অর্থাৎ, সামনে যা পাচ্ছি সেটারই প্রতিফলন ঘটানো। কিন্তু পরিস্থিতি শান্ত করতে হলে ঠিক উল্টাটা করতে হয়। অপরপক্ষ যত জোরে কথা বলবে, আপনি তত ধীরে ও নিচু স্বরে কথা বলুন। এতে পরিবেশে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়, যা অনেক সময় উত্তেজনা কমাতে সাহায্য করে।
• কৌশলগত বিরতি বা ‘ট্যাকটিক্যাল পজ’
তীব্র রাগের সময় আমাদের যুক্তি দিয়ে ভাবার ক্ষমতা কমে যায়, আর আবেগ পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। ঠিক এই সময় কয়েক সেকেন্ডের বিরতি অনেক কাজে দেয়। এক গ্লাস পানি খাওয়া, জানালা দিয়ে বাইরে তাকানো, বা বসার ভঙ্গি বদলানোর মত ছোট কাজ শরীরকে একটা সংকেত দেয়—সব ঠিক আছে, বিপদ নেই।
• সম্মান বজায় রেখে সরে আসা ও সীমা টেনে দেওয়া
সব আলোচনার শেষ টানতেই হবে—এমন কোনো কথা নেই। বিশেষ করে যখন কথা গালাগালি বা ব্যক্তিগত অপমানের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। মনে রাখবেন, কারো অশিষ্ট আচরণ সহ্য করা আপনার দায়িত্ব নয়। এই অবস্থায় নিজেকে ছোট না করে, শান্ত কিন্তু স্পষ্ট ভাষায় নিজের সীমা জানানোই সবচেয়ে সঠিক কাজ। আপনি বলতে পারেন, “যে ধরনের ভাষা ও আচরণ এই আলাপে আসছে, আমি তাতে অস্বস্তি বোধ করছি, তাই এই আলোচনায় থাকতে চাচ্ছি না।”
এভাবে সরে আসা পরাজয় নয়। বরং এটা নিজের মানসিক শান্তি, আত্মসম্মান এবং সুস্থ থাকার জন্য নেওয়া একটি সাহসী ও পরিণত সিদ্ধান্ত।
.
কখন আলোচনা শেষ করবেন
যদি দেখেন কথোপকথন বার বার একই বৃত্তে ঘুরছে, সামনে থাকা মানুষটি ব্যক্তিগত আক্রমণে নামছে, বা আপনি নিজে মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন—এটাই লক্ষণ যে আলোচনা আর ফলপ্রসূ হবে না। তখন সঙ্গতিপূর্ণ ও শান্তভাবে আলাপ শেষ করা সবচেয়ে ভাল। তাকে ধন্যবাদ দিয়ে আপনি আলাপ শেষ করতে পারেন।
আপনি যত ভালো কাজই করুন ভুল সহকর্মী থাকলে আপনার ক্যারিয়ার ঝুঁকিতে। বাংলাদেশের কর্পোরেট জবে ক্যারিয়ার ধ্বংস হওয়ার সবচেয়ে অবমূল্যায়িত কারণ হলো ভুল সহকর্মী। অনেকেই মনে করে কাজ ভালো করলেই নিরাপদ। বাস্তবতা হলো অফিসে পারফরমেন্সের পাশাপাশি মানুষও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
১. ভুল সহকর্মী আপনার কাজের কৃতিত্ব নষ্ট করে দেয়ঃ
বাংলাদেশের বহু অফিসে দেখা যায় একজন কাজ করে আর অন্যজন বসের সামনে গল্প সাজিয়ে নিজের নামে চালিয়ে দেয়। আপনি যত ভালো কাজই করুন যদি সহকর্মী আপনার অবদান হালকা করে তুলে ধরে তবে আপনার ভ্যালু কমে যায়।
২. নেগেটিভ সহকর্মী বসের কাছে আপনার ইমেজ নষ্ট করেঃ
রিয়াল ফ্যাক্ট হলো বস সবসময় সরাসরি সবকিছু দেখে না। অনেক সিদ্ধান্ত হয় ফিডব্যাকের উপর। ভুল সহকর্মী আড়ালে গিয়ে আপনার ভুল বড় করে আর সাফল্য ছোট করে তুলে ধরে।
৩. ভুল সহকর্মী টিমের ভেতরে বিশ্বাস ভেঙে দেয়ঃ
কর্পোরেট বাংলাদেশে টিমওয়ার্ক খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একজন ভুল মানুষ গোপনে তথ্য লুকায় দোষ চাপায় এবং বিভ্রান্তি তৈরি করে। এতে পুরো টিমের উপর বসের আস্থা নষ্ট হয় যার ভুক্তভোগী আপনি।
৪. ক্যারিয়ার গ্রোথ থেমে যায় কিন্তু আপনি বুঝতেও পারেন নাঃ
অনেক সময় প্রোমোশন আটকে যায় কারণ আপনার নামে নেগেটিভ ইমেজ তৈরি হয়েছে। আপনি শুধু দেখেন ফলাফল পাচ্ছেন না কিন্তু বুঝতে পারেন না সমস্যার উৎস সহকর্মী।
৫. মানসিক চাপ বাড়িয়ে পারফরমেন্স নামিয়ে দেয়ঃ
বাংলাদেশের কর্পোরেট জবে স্ট্রেস এমনিতেই বেশি। ভুল সহকর্মীর কারণে অতিরিক্ত মানসিক চাপ তৈরি হয়। এর প্রভাব সরাসরি আপনার কাজের মানে পড়ে।
৬. আপনাকে অপ্রয়োজনীয় কনফ্লিক্টে জড়িয়ে ফেলেঃ
ভুল সহকর্মী নিজের ভুল ঢাকতে আপনাকে সামনে ঠেলে দেয়। এতে আপনি অকারণে বসের নজরে নেগেটিভ হয়ে যান। বাস্তবে বহু কর্মী এই কারণেই চাকরি হারিয়েছে।
৭. আপনার পেশাদার নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ঃ
বাংলাদেশের কর্পোরেট জগৎ ছোট। একজন সহকর্মী যদি আপনার সম্পর্কে ভুল বার্তা ছড়ায় সেটা অন্য অফিসেও পৌঁছে যায়। এতে ভবিষ্যৎ সুযোগ নষ্ট হয়।
৮. শেখার পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায়ঃ
ভালো সহকর্মী শেখায়। ভুল সহকর্মী লুকায়। তথ্য শেয়ার করে না। আপনাকে পিছিয়ে রাখে যেন সে নিজে এগিয়ে থাকে।
৯. দীর্ঘমেয়াদে ক্যারিয়ারের দিক পরিবর্তন হয়ে যায়ঃ
অনেক দক্ষ মানুষ ভুল সহকর্মীর কারণে ফিল্ড পরিবর্তন করে অথবা কর্পোরেট ছেড়ে দেয়। এটা বাংলাদেশের বাস্তব কর্পোরেট ট্র্যাজেডি।
১০. ভালো কাজ একা যথেষ্ট নয় সঠিক মানুষ দরকার
কর্পোরেট ক্যারিয়ারে সফল হতে হলে স্কিলের পাশাপাশি পরিবেশ দরকার। ভুল সহকর্মী সেই পরিবেশ ধ্বংস করে দেয়।
প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে কোষ আছে গড়ে প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন। আর, অণুজীব (মাইক্রোঅর্গানিজম) আছে গড়ে প্রায় ৩৯ ট্রিলিয়ন!
শরীরের এই অণুজীবের প্রায় ৮০–৯০ ভাগই বাস করে আপনার অন্ত্রে (গাট)! বাকিটা মুখগহ্বর, ত্বক, যোনি ইত্যাদি স্থানে। এগুলো প্রধানত- ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ফাঙ্গাই, প্রোটোজোয়া এবং অন্যান্য অণুজীব।
পেটের এই ট্রিলিয়ন-ট্রিলিয়ন উপকারী ও ক্ষতিকর জীবাণুর বিশাল কলোনিটাকে বলে গাট মাইক্রোবায়োম। এই জীবাণুগুলো একসাথে আপনার শরীরের এক রকম ‘সিক্রেট অঙ্গ’ হিসেবে কাজ করে! (যা ভারসাম্যহীন হলে আপনার সামগ্রিক স্বাস্থ্য উলটপালট হয়ে যাবে!)
গাট মাইক্রোবায়োম হলো একটা জীবাণুর শহর। এই শহরে সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী হলো ব্যাকটেরিয়া। গাট মাইক্রোবায়োমে থাকা অণুজীবদের ৯০–৯৫ ভাগই হলো ব্যাকটেরিয়া!
প্রতিটি মানুষ শরীরে যে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন অণুজীব বহন করে তার সবই উপকারী নয়। কিছু অণুজীব ক্ষতিকর হতে পারে। এর মধ্যে উপকারী জীবাণুদের বলে প্রোবায়োটিকস। যেমন- বিফিডোব্যাকটেরিয়া, ল্যাকটোব্যাসিলাস, স্ট্রেপ্টোফিলাস ইত্যাদি প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া। এই প্রোবায়োটিকস আপনার শরীরের জন্য ভীষণ উপকারী! তারা সবরকম ক্ষতিকর অণুজীবকে কন্ট্রোলে রাখে, হজম, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, পুষ্টি শোষণ ইত্যাদিতে সাহায্য করে!
গাট মাইক্রোবায়োম স্বাভাবিক অবস্থায় এক চমৎকার ভারসাম্যে থাকে। কিন্তু আধুনিক জীবনযাত্রা, প্রসেসড ফুড, চিনি, অ্যান্টিবায়োটিক, ফার্মার ওষুধ, দূষণ ইত্যাদি এই ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে! গাট মাইক্রোবায়োম ভারসাম্য নষ্ট হওয়া মানে– ভালো ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা কমা, আর ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বাড়া।
এই ভারসাম্য নষ্ট হওয়া কোনো ছোট বিষয় না। এটা পুরো শরীরের ইমিউন, হরমোন, মস্তিষ্ক, হজম ও বিপাক ক্রিয়াকে নষ্ট করতে পারে!
বর্তমান আধুনিক জীবনযাত্রার প্রতিটি উপাদান ও কালচার– খাবার, পানি, বাতাস, ঔষধ, মানসিক চাপ, অতি-পরিচ্ছন্নতা এসব একজোট হয়ে গাটের অনুজীব কলোনির ওপর ননস্টপ আক্রমণ চালাচ্ছে! উপকারী ব্যাকটেরিয়াদের গণহত্যা করছে!
আর এর ফল প্রকাশ পাচ্ছে গ্যাস, অ্যাসিডিটি, আইবিএস, ডায়াবেটিস, পিসিওএস, ডিপ্রেশন, স্কিন ডিজিজ, অটোইমিউন ইত্যাদি রোগের মাধ্যমে!
কঞ্জিউমার ক্যাপিটালিজমের বি/ষা/ক্ত আক্রমণে আজ আপনার গাট মাইক্রোবায়োম বিধ্বস্ত!
প্রোবায়োটিক ফুড খেয়ে গাটের ভারসাম্য পুনরায় কিছুটা ফিরিয়ে আনা যায়।
প্রোবায়োটিক ফুড হলো এমন খাবার যেগুলিতে জীবন্ত উপকারী ব্যাকটেরিয়া (প্রোবায়োটিকস) থাকে। প্রোবায়োটিক ফুড খেলে এতে থাকা ভালো ব্যাকটেরিয়া আপনার অন্ত্রে পৌঁছে যায়। যা নিয়মিত খেলে আপনার অন্ত্রে ভালো ও খারাপ জীবাণুর ভারসাম্য ঠিক রাখতে সাহায্য করে।
প্রোবায়োটিক ফুডের উপকারীতা—
- প্রোবায়োটিক ফুড খেলে আপনার শরীরে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়ে। এই ভালো ব্যাকটেরিয়াগুলো হজম প্রক্রিয়া উন্নত করে, যার ফলে খাবার ভালোভাবে ভাঙে, পুষ্টি উপাদান সহজে শোষিত হয়, পেট সুস্থ থাকে!
- প্রোবায়োটিকস শরীরে থাকা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, ফাঙ্গাস, ভাইরাস ও প্যারাসাইটের বিরুদ্ধে লড়াই করে, যাতে এগুলো অতিরিক্ত বৃদ্ধি পেয়ে অসুখ না ঘটায়! এর ফলে পেটের ইনফেকশন, গ্যাস, ফুলে ওঠা, বদহজমের মতো সমস্যা কমে যায়।
- ভালো ব্যাকটেরিয়াগুলো শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিউট্রিয়েন্ট তৈরিতে সাহায্য করে, যেমন কিছু B-ভিটামিন এবং ভিটামিন-K!
- প্রোবায়োটিকস রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এগুলো আপনার ইমিউন সিস্টেমকে ক্ষতিকর জীবাণু চিনে নিতে ও মোকাবিলা করতে প্রশিক্ষণ দেয়!
- যখন শরীরে ভালো ব্যাকটেরিয়া কমে যায়, যেমন- অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার পর। তখন প্রোবায়োটিক ফুড সেই ঘাটতি পূরণ করে।
- এছাড়াও, প্রোবায়োটিকস ত্বকের স্বাস্থ্য উন্নত করে, একজিমার মতো সমস্যা কমাতে সাহায্য করে, ইউরিনারি ও ভ্যাজাইনাল হেলথে ভারসাম্য বজায় রাখে, অ্যালার্জি ও সর্দি-কাশি কমায় এবং মানসিক স্বাস্থ্য ভাল রাখে।
প্রোবায়োটিক ফুড এমন সব খাবার যেগুলো তৈরি করার সময় তাতে প্রচুর জীবিত উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও ইস্ট জন্মায় এবং খাবারে থেকে যায়। এই জীবিত অণুজীব তৈরির প্রক্রিয়াটা হলো গাঁজানো (ফারমেন্টেশন)। গাঁজন একধরনের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যেখানে ব্যাকটেরিয়া ও ইস্ট খাবারের সুগার ও স্টার্চ ভেঙে ল্যাকটিক অ্যাসিড, অ্যালকোহল বা গ্যাসে রূপান্তর করে। এই প্রক্রিয়ায় খাবারে ক্ষতিকর জীবাণু মারা যায়, আর উপকারী জীবাণু দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ফলে খাবার দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা যায়, নতুন স্বাদ ও গন্ধ তৈরি হয়, আর প্রোবায়োটিকস জীবিত থাকে। সব প্রোবায়োটিক ফুডই ফারমেন্টেড, কিন্তু সব ফারমেন্টেড ফুড প্রোবায়োটিক নয়!
এদেশে সহজলভ্য ও মানুষের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মানানসই কিছু প্রাকৃতিক প্রোবায়োটিক ফুড—
- কেফির, ফারমেন্টেড ফুডের রাজা!
- টক দই, বাড়িতে তৈরি টক দইয়ে জীবিত ভালো ব্যাকটেরিয়া বেশি থাকে।
- গাঁজানো আচার, লবণ-পানিতে ফারমেন্ট করে তৈরি আচার।
- সাওয়ারক্রাউট
- কিমচি
- ঘরে তৈরি ভিনেগার
- ফারমেন্টেড সবজি
- পান্তা ভাত, এই ঐতিহ্যবাহী ফারমেন্টেড ফুডে ল্যাকটিক অ্যাসিড ব্যাকটেরিয়া প্রচুর থাকে।
- ঘরে তৈরি পনির, বিশেষ করে যেগুলো পাস্তুরাইজড নয়।
- কাঁচা দুধ
ভুলভাবে খেলে প্রোবায়োটিক ফুড আপনার কোনো উপকারে আসবে না।
- সকালে খালি পেটে প্রোবায়োটিক ফুড খাওয়া সবচেয়ে উত্তম। খালি পেটে খেলে প্রোবায়োটিকস দ্রুত অন্ত্রে পৌঁছে যায়। কিংবা হালকা খাবার খাওয়ার ১৫–৩০ মিনিটের মধ্যে খাওয়া যেতে পারে।
- প্রোবায়োটিক ফুড, যেমন টক দই, পান্তা ভাত, কেফির, গাঁজানো সবজি ইত্যাদি ঠান্ডা অবস্থায় বা রুম টেম্পারেচারে খেতে হবে। গরম করে খেলে কোনো উপকার থাকবে না।
- একসাথে বেশি না খেয়ে প্রতিদিন অল্প পরিমাণে নিয়মিত খাওয়াই উত্তম। নিয়মিত না খেয়ে দুই-এক দিন খেলে লাভ নেই। আর অতিরিক্ত খেলে গ্যাস, ডায়রিয়া বা অস্বস্তি হতে পারে।
- প্রোবায়োটিকের সাথে প্রিবায়োটিক ফুড খেলে ফলাফল দ্বিগুণ হয়।
- পানি পর্যাপ্ত খেতে হবে, কারণ প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার কাজ করতে হাইড্রেশন লাগে।
- নতুন নতুন খাওয়া শুরু করলে প্রথম ২–৩ দিনে হালকা গ্যাস বা পেট ফাঁপা হতে পারে, এটা স্বাভাবিক।
- প্রাকৃতিক জীবনযাপন ও প্রাকৃতিক খাবারে না ফিরলে শুধু প্রোবায়োটিক ফুড দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে কোনো ফায়দা নাই!
প্রোবায়োটিক ফুড সবচেয়ে বেশি উপকার করে—
- অ্যান্টিবায়োটিক কোর্সের পর গাট ব্যাকটেরিয়া পুনর্গঠনের জন্য
- হজমের সমস্যা থাকলে, যেমন গ্যাস, ফাঁপা, কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া
- দুশ্চিন্তা, হতাশা, ঘুমের সমস্যা থাকলে
- ত্বকের সমস্যা, এলার্জি থাকলে
- বাচ্চা, বয়স্ক ও দুর্বল মানুষদের ক্ষেত্রে হজম ও রোগপ্রতিরোধ শক্তি বাড়াতে
Captain Green
প্রায় ৩ হাজার বছর আগে প্রাচীন চীনা সভ্যতা শিজিয়াহে (Shijiahe) কীভাবে হঠাৎ করে বিলুপ্ত হয়ে গেল। অবশেষে সেই ধাঁধার সমাধান মিলেছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব আর্থ সায়েন্সেস–এর নেতৃত্বে পরিচালিত এক যুগান্তকারী গবেষণায় জানা গেছে, টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও ভয়াবহ বন্যাই এই সভ্যতার পতনের প্রধান কারণ। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ন্যাশনাল সায়েন্স রিভিউস–এ।
গবেষকদের মতে, ইয়াংজে নদী অঞ্চলে প্রথমে প্রায় এক হাজার বছরের দীর্ঘ খরা দেখা দেয়। এর পরপরই শুরু হয় দীর্ঘ সময়ের অস্বাভাবিকভাবে প্রবল বৃষ্টিপাত। এই আকস্মিক জলবায়ুগত পরিবর্তনের ফলে নদীতে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হয়, যা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ধারণা করা হচ্ছে, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগই শেষ পর্যন্ত শিজিয়াহে সভ্যতাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।
কীভাবে ঘটেছিল এই বিপর্যয়? গবেষকরা ইয়াংজে নদীর তলদেশ থেকে সংগ্রহ করা পলি (sediment) নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, ওই অঞ্চলে একসঙ্গে খরা ও অতিবৃষ্টির বিরল সমন্বয় ঘটেছিল। এর ফলে ধারাবাহিকভাবে একাধিক বড় বন্যা হয়—যা নদীতীরবর্তী যে কোনো সভ্যতার জন্যই মারাত্মক হতে পারত। এসব বন্যা ঘটেছিল তথাকথিত “ইয়াংজে বন্যা পর্ব”–এ, যখন প্রবল বর্ষণ ও তীব্র প্লাবন ছিল নিয়মিত ঘটনা।
এই প্রাচীন দুর্যোগের পেছনের বিজ্ঞানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় বলা হয়েছে, পূর্ব এশীয় মৌসুমি বায়ু ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছিল, যা পৃথিবীর কক্ষপথে সূক্ষ্ম পরিবর্তনের কারণে উদ্দীপিত হয়। এর ফলেই দীর্ঘ খরার পর হঠাৎ করে প্রবল বৃষ্টিপাত শুরু হয় এবং সৃষ্টি হয় বিধ্বংসী বন্যা।
এই আবিষ্কার শুধু একটি প্রাচীন সভ্যতার রহস্যজনক পতনের ব্যাখ্যাই দেয় না; বরং জলবায়ু পরিবর্তন ও মানব ইতিহাসের জটিল সম্পর্ক সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়। আজ যখন বিশ্ব আবার জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন অতীতের এই অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়—পরিবেশের বড় পরিবর্তনের সঙ্গে মানব সমাজ কীভাবে লড়াই করেছে, আর কোথায় গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া বিজ্ঞানীরা সবাই অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ সায়েন্সেস বিভাগের সঙ্গে যুক্ত।
সূত্র: National Science Reviews–এ প্রকাশিত গবেষণা
মাইক্রোওয়েভ‑ফ্রি প্লাস্টিক বিশেষ করে খাবারের রিহিটিং করার জন্য ব্যবহার হয়। গবেষণা বলছে যে এর সাথে কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকতে পারে, যদিও ফলাফল সবসময় একরকম না এবং অনেকটা নির্ভর করে প্লাস্টিকের ধরন ও ব্যবহারের পরিস্থিতির উপর।
প্লাস্টিকের “Microwave‑safe” লেবেলটি শুধু বোঝায় যে পাত্রটি মাইক্রোওয়েভে গরম করলে গলে যাবে না বা তার আকৃতি নষ্ট হবে না — এটা বোঝায় না যে প্লাস্টিক থেকে কোন রাসায়নিক খাবারে ঢোকে কি না। অনেক বিশেষজ্ঞও এই ভুল ধারণা সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।
গবেষণা অনুযায়ী প্লাস্টিকের কিছু রাসায়নিক খাবারে মাইক্রোওয়েভ গরম করার সময় বের হয়ে যেতে পারে, বিশেষ করে গরম, তেলচর্বিযুক্ত বা অ্যাসিডিক খাবারের ক্ষেত্রে। যেমন Bisphenol A পলিকার্বোনেট প্লাস্টিক থেকে গরমে নিঃসৃত হতে পারে এবং খাবারের মধ্যে পৌছাতে পারে। এছাড়া BPA‑free প্লাস্টিকেও বিকল্প রাসায়নিক (যেমন BPS, BPF) থাকতে পারে, যেগুলো হরমোনে ব্যাঘাত বা অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গবেষণা ও এক্সপার্ট মতামত থেকে জানা যায়, প্রধান সমস্যাগুলো হল, হরমোন ব্যাঘাত (Endocrine disruption) — BPA, phthalates ও তাদের বিকল্প রাসায়নিকগুলি মানুষের হরমোন সিস্টেমে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের জন্য ঝুঁকি বেশি। তাছাড়া অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি — যেমন ক্যান্সার, মেটাবলিক বা কার্ডিওভাসকুলার সমস্যা তো আছেই। তথ্য:বিজ্ঞানবর্ণালী
১. যারা আপনাকে ভুল বুঝতে চায়, তাদের কাছে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা ছেড়ে দিন। আপনার সময় এবং শক্তি দুটোই মূল্যবান।
২. নিজের শান্তিকে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি সম্পদ মনে করুন এবং একে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করুন।
৩. যেখানে আপনার সম্মান নেই, সেখান থেকে নীরবে সরে আসুন। আপনি যা মেনে নেবেন, মানুষ আপনাকে ঠিক সেভাবেই ব্যবহার করবে।
৪. হুটহাট প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করুন। মনে রাখবেন, অনেক অশান্তি কেবল আপনার মনোযোগ না পেলেই ধামাচাপা পড়ে যায়।
৫. কাজের জন্য কেবল 'ইচ্ছাশক্তি' বা অনুপ্রেরণার অপেক্ষায় থাকবেন না; বরং নিয়ম বা শৃঙ্খলার মধ্যে অভ্যস্ত হোন। অনুভূূতি ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু শৃঙ্খলা সাফল্য আনে।
৬. অন্যকে বদলানোর চেষ্টা না করে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শিখুন। অস্থির না হয়ে স্থিরভাবে পরিস্থিতি সামলানোই হলো প্রকৃত শক্তি।
৭. সবাই আপনাকে বুঝবে—এমন আশা করা ছেড়ে দিন। সবার কাছে জবাবদিহি করার প্রয়োজন নেই।
৮. নিজের অনিচ্ছায় কাউকে 'হ্যাঁ' বলা মানে নিজেকে 'না' বলা। তাই অপরাধবোধ না রেখে প্রয়োজনমতো না বলতে শিখুন।
৯. যারা নিজের সাথেই সৎ নয়, তাদের কাছে সততা আশা করা বোকামি। মানুষের স্বভাব মেনে নিলে কষ্ট কম হবে।
১০. শান্তির চেয়ে দামি কিছু নেই; তাই যে কাজে বা যে সম্পর্কে আপনার মনের শান্তি নষ্ট হয়, সেটি আপনার জন্য অনেক বেশি ব্যয়বহুল। তা বর্জন করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
ইমপালস বায়িং
তুমি যত টাকা ওড়াও, তার বেশিরভাগই বেহুদা। আবেগে আবেগাপ্লুত হয়ে ওড়াই দাও। তুমি যদি টাকা জমাতে চাও কিংবা বাজে খরচ থেকে নিজেকে Marked Safe করতে চাও, তাহলে এই পোস্টটা তোমার জন্যে।
১. হুট করে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে আমরা যে কোনো কিছু পারচেজ করে ফেলি, এটাকে বলে ইমপালস বায়িং।
যখনই কোনো দামী জিনিস দেখে মনে হবে "এটা আমার লাগবেই", সাথে সাথে কিনবা না। নিজেকে ৩০ দিনের একটা কুলিং পিরিয়ড দাও। ৩০ দিন পরও যদি দেখো যে জিনিসটার প্রতি তোমার আগ্রহ একই আছে, তখন কিনে ফেলো।
কিন্তু, ৯৯% ক্ষেত্রে দেখবে, ৩০ দিন পর ওটা কেনার ইচ্ছাই মরে গেছে। এটা হলো ইমপালস বায়িং থামানোর সেরা ওষুধ।
(২) যেতে যেতে পথে, পূর্ণিমা রাতে হুট করে একটা আইসক্রিম খাও কিংবা সারাদিনে ১০ টাকা রিকশা ভাড়া দাও, সেটাও নোটপ্যাডে বা অ্যাপে লিখে রাখো। মাস শেষে যখন দেখবে তোমার "টুকটাক" খরচের যোগফল দিয়ে একটা প্লেন টিকেট কেনা যেত, তখন অটোমেটিক তোমার বিবেকের ঘণ্টা বাজবে এবং পরের মাসে হাত এমনিতেই গুটিয়ে আসবে।
(৩) ডিজিটাল দুনিয়ায় আমরা টাকা খরচ করি কিন্তু ফিল পাই না। তাই প্লাস্টিক মানি বা কার্ড ব্যবহার কমাও, ক্যাশ টাকা ব্যবহার করো। কার্ড ঘষলে ব্রেইন ব্যথা পায় না, কিন্তু পকেট থেকে যখন ৫০০ টাকার কড়কড়ে নোটটা বের করে দিবা, তখন কলিজায় একটু হলেও টান লাগবে। এই 'পেইন অফ পেমেন্ট' তোমাকে ফালতু খরচ থেকে আটকাবে।
(৪)আর খরচ করার আগে একটা মারাত্মক ক্যালকুলেশন করবে, টাকাকে সময়ে কনভার্ট করা। ধরো তুমি ঘণ্টায় ১০০ টাকা আয় করো। এখন ৩০০০ টাকার একটা জুতা কেনার আগে ভাববে, "এই জুতাটার জন্য আমাকে ৩০ ঘণ্টা বা প্রায় ৪ দিন গাধার মতো খাটতে হয়েছে।" যখনই জিনিসের দামকে নিজের শ্রমের ঘামের সাথে মেলাবে, দেখবে অনেক কিছুই আর কিনতে ইচ্ছা করছে না।
(৫) মার্কেটিংয়ের ফাঁদ থেকে বাঁচাটা জরুরি। ডিসকাউন্ট বা সেল দেখলেই দৌঁড় দিও না। মনে রাখবে, ১০০০ টাকার জিনিস ৭০০ টাকায় কেনা মানে ৩০০ টাকা লাভ না, বরং ৭০০ টাকা খরচ। যে জিনিস তোমার দরকারই ছিল না, সেটা অর্ধেক দামে কেনাও লস। সেল বা 'বাই ওয়ান গেট ওয়ান' হলো তোমার পকেট কাটার স্মার্ট ফাঁদ।
(৬) ট্রিগার পয়েন্টগুলো রিমুভ করা। অর্থাৎ, সোশ্যাল মিডিয়াতে যেসব ব্র্যান্ড বা ইনফ্লুয়েন্সার তোমাকে সারাদিন নতুন জামা, গ্যাজেট বা রেস্টুরেন্টের লোভ দেখায়, তাদের নির্দয়ভাবে আনফলো বা আনসাবস্ক্রাইব করো। চোখের সামনে না থাকলে, কেনার ইচ্ছাও জাগবে না। আউট অফ সাইট, আউট অফ মাইন্ড।
(৭) এনভেলপ ইউজ করো। মাসের শুরুতে স্যালারি পাওয়ার পর বিভিন্ন খামে টাকা ভাগ করে ফেলো।
যেমন : যাতায়াত, খাওয়া, বিনোদন।
বিনোদনের খামে যদি ২০০০ টাকা থাকে, তবে মাসের ১৫ তারিখে সেটা শেষ হয়ে গেলে বাকি ১৫ দিন তোমাকে ঘরে বসে সিনেমা দেখেই কাটাতে হবে, কোনোভাবেই অন্য খাম থেকে টাকা ধার করা যাবে না।
এই স্ট্রিক্ট ডিসিপ্লিনটা যদি একবার নিজের মধ্যে নিয়ে আসতে পারো, দেখবে মাস শেষে তোমার কাছে শুধু টাকা না সাথে একটা ভালো ফিলিংসও থাকবে।
আর জমবেও কিছু।
কাজে অলসতা দূর করতে...
অনেক সময় আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সম্পন্ন করার পরিবর্তে আমরা সময় নষ্ট করি, কাজ করতে অযথা দেরি করি। এই অভ্যাসটিকে প্রোক্রাস্টিনেশন (অলসতা বা ঢিলেমি) বলা হয়। প্রোক্রাস্টিনেশন শুধু সময়ের অপচয় ঘটায় না, বরং মানসিক চাপ, কর্মদক্ষতার হ্রাস এবং জীবনে লক্ষ্য পূরণের ক্ষেত্রে ব্যর্থতার কারণও হয়ে দাঁড়ায়। তাই এটি দূর করার জন্য সঠিক পরিকল্পনা, মনোযোগ এবং আচরণগত পরিবর্তন জরুরি। লিখেছেন তাসকিন
প্রোক্রাস্টিনেশন কেন হয়?
প্রোক্রাস্টিনেশনের কারণ অনেক। অনিশ্চয়তা বা কাজের জটিলতা মানুষকে কাজ শুরু করতে বাধা দেয়। ভয়ভীতি কিংবা সারফেকশনিজমও এক ধরনের বিলম্বের কারণ হতে পারে। কখনো কখনো কাজের প্রতি আগ্রহের অভাব বা অপ্রিয় কাজগুলোকে এড়িয়ে যাওয়াই প্রোক্রাস্টিনেশনের মূল কারণ। মানসিক অবস্থা, শারীরিক ক্লান্তি ও সময় বাবস্থাপনার অভাবও প্রভাব ফেলে।
কীভাবে প্রোক্রাস্টিনেশন দূর করা যায়?
কাজ ভাগ করা এবং প্রাধান্য দেওয়া
বড় কোনো কাজ বা প্রজেক্ট কখনো শুরু করা কঠিন মনে হয়। তাই এটি ছোট ছোট অংশে ভাগ করা সবচেয়ে কার্যকর উপায়। প্রতিটি অংশকে আলাদা লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করলে কাজকে সহজভাবে সামলানো যায়। উদাহরণস্বরূপ, একটি দীর্ঘ রিপোর্ট লেখা বা কোনো প্রেজেন্টেশন প্রস্তুত করা হলে পুরো কাজটিকে কয়েকটি ধাপে ভাগ করা যায় যেমন গবেষণা, ড্রাফট লেখা, সম্পাদনা এবং ফাইনাল প্রেজেন্টেশন। প্রতিটি বাগের জন্য নির্দিষ্ট সময় ঠিক করলে চাপ কমে যায় এবং কাজ
সম্পন্ন করার প্রেরণা বৃদ্ধি পায়।
এ ছাড়া কাজের মধ্যে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোন অংশটি সবচেয়ে জরুরি বা কঠিন, সেটিকে প্রথমে শেষ করার চেষ্টা করুন। এতে মানসিক চাপ হ্রাস পায় এবং ছোট ছোট সাফল্য অর্জনের মাধ্যমে মনোবল বৃদ্ধি পায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে বড় কাজও সহজ মনে হবে। [ জানা-অজানা 360 ]
মনোযোগ বজায় রাখার কৌশল
কাজ করার সময় মনোযোগ বজায় রাখা প্রোক্রাক্টিনেশন কমানোর অন্যতম চাবিকাঠি। এ ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, মোবাইল ফোন, টেলিভিশন ইত্যাদি এড়িয়ে চলা জরুরি।
নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে পোমোডোরো পদ্ধতি খুব কার্যকর। এতে ২৫-৩০ মিনিটের জন্য সম্পূর্ণ মনোনিবেশের সঙ্গে কাজ করা হয় এবং এরপর ৫ মিনিটের সংক্ষিপ্ত বিরতি নেওয়া হয়। এই নিয়মিত চক্র মনকে সতেজ রাখে, মনোযোগ বাড়ায় এবং দীর্ঘ সময় ঘরে কার্যকরভাবে কাজ সম্পন্ন করতে সাহায্য করে।
নিজেকে মোটিভেট করা
কাজের প্রতি উদ্দীপনা ও প্রেরণা ধরে রাখতে ছোট ছোট সাফল্যকেও উদযাপন হিসেবে দেখুন। প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করার পর নিজেকে ছোট পুরস্কার দিন। উদাহরণস্বরূপ, একটি গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট শেষ করার পর কফি, চকলেট বা হালকা খাবার গ্রহণ করা বা ছোট বিরতি নেওয়া মনকে সতেজ ও উদ্যমী রাখে। নিয়মিত প্রণোদনা গ্রহণের মাধ্যমে কাজের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয় এবং পরবর্তী কাজের জন্য উদ্দীপনা বজায় থাকে।
পারফেকশনিজমকে নিয়ন্ত্রণ করা
অনেক সময় মানুষ কাজের নিখুঁততা খুঁজে কাজ শুরু করতে পিছিয়ে যায়। প্রোক্রাক্টিনেশনের অন্যতম কারণই পারফেকশনিজম। মনে রাখুন, সবসময় নিখুঁততা অর্জন করা প্রয়োজন নয়। কাজকে ছোট অংশে ভাগ করে পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করলে মানসিক চাপ কমে এবং ফলাফলও সন্তোষজনক হয়।
মানসিক চাপ কমানো
চাপ, উদ্বেগ এবং মানসিক অস্থিরতা প্রোক্রাস্টিনেশনের অন্যতম প্রধান কারণ। নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, ধ্যান বা যোগব্যায়াম মনকে স্থিতিশীল ও শান্ত রাখে। এ ছাড়া শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম বা হটি মনকে রিফ্রেশ করে এবং কাজের প্রতি মনোযোগ পুনরুদ্ধার করতে সাহায্য করে। মানসিক চাপ কম হলে কাজের গতি বৃদ্ধি পায় এবং সময়মতো কাজ শেষ করা সহজ হয়।
সহায়তা নেওয়া
প্রয়োজন হলে একা কাজ না করে সহকর্মী, শিক্ষক বা বন্ধুদের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত। কাজ ভাগাভাগি করলে দায়িত্বের বোঝা হালকা হয় এবং কাজ দ্রুত ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। এ ছাড়া একে অপরের অভিজ্ঞতা ও দিকনির্দেশনা কাজে নতুন উদ্দীপনা যোগ করে এবং সমস্যার সমাধান দ্রুত হয়।
সময় ব্যবস্থাপনা ও ডেডলাইন নির্ধারণ
কাজের জন্য সঠিক সময় নির্ধারণ করা প্রোক্রাক্টিনেশন কমানোর অন্যতম কৌশল। দিনের কোন সময়ে আপনি সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে পারেন, সেই সময়টিকে কাজের জন্য বরাদ্দ করুন। কাজকে সময়ের সেগমেন্টে ভাগ করুন যেমন ২৫-৩০ মিনিটের জন্য কাজ এরপর পাঁচ মিনিটের বিরতি। এভাবে কাজ করলে তা মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে।
ডেডলাইন নির্ধারণও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি অংশের জন্য নির্দিষ্ট শেষ সময় রাখলে কাজকে প্রাধান্য দিয়ে শুরু ও শেষ করার অভ্যাস তৈরি হয়। মোবাইল বা কম্পিউটারে রিমাইন্ডার ব্যবহার করলে কোনো কাজ ভুলে যাওয়ার ঝুঁ*কি কমে এবং প্রতিটি কাজ সময়মতো সম্পন্ন করা সহজ হয়।
.খবরের কাগজ
সব পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া দেখানোর প্রয়োজন নেই
আধুনিক জীবনে ইঁদুর দৌড়ে আমরা প্রায়ই হাঁপিয়ে উঠি। সাফল্য, খ্যাতি আর অন্যের স্বীকৃতির পেছনে ছুটতে ছুটতে আমরা ভুলে যাই নিজেদের আসল পরিচয়। অথচ জেই শেঠির বিখ্যাত বই ‘থিংক লাইক আ মংক’ আমাদের শেখায়, কীভাবে সন্ন্যাসীর মতো চিন্তা করে এই কোলাহলপূর্ণ পৃথিবীতেও প্রশান্তি খুঁজে পাওয়া সম্ভব। চলুন, বইটির নির্যাস থেকে নেওয়া জীবন বদলানো কিছু দর্শন সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক:
আমরা নিজেদের কীভাবে দেখি? বইটিতে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক কথা বলা হয়েছে—‘আপনি নিজে যা ভাবেন আপনি তা নন। অন্যরা আপনার সম্পর্কে যা ভাবেন, আপনি তাও নন। বরং আপনি হলেন তাই, যা আপনি মনে করেন যে অন্যরা আপনাকে ভাবছে।’ এই জটিল চিন্তা থেকে বের হতে না পারলে আমরা আজীবন অন্যের কাল্পনিক প্রত্যাশা পূরণেই ব্যস্ত থাকব।
কর্মের দর্শন ও উদ্দেশ্য (ধর্ম)
জীবনের উদ্দেশ্য কী? লেখক বলছেন, আপনার প্রাকৃতিক দক্ষতা এবং বিশ্বের প্রয়োজনীয়তা যখন একবিন্দুতে মেলে, তখনই আপনি আপনার জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য বা ‘ধর্ম’ খুঁজে পান। তবে বড় কিছু অর্জনের জন্য ধৈর্যের প্রয়োজন। বীজ রোপণের পরদিনই যেমন ফল পাওয়া যায় না, সফলতার ক্ষেত্রেও তা-ই। আর এই যাত্রায় ফলের আশা ত্যাগ করে কাজের প্রক্রিয়ার ওপর মনোযোগ দিতে হবে। কারণ, ব্যর্থতা মানে হেরে যাওয়া নয়, এটি কেবল একটি ইঙ্গিত যে আপনাকে অন্য পথে চেষ্টা করতে হবে। জীবন তখনই সার্থক হয়, যখন আপনি অন্যের উপকারে আসতে পারেন। জীবনের মূল লক্ষ্যই হলো সেবা।
মানসিক প্রশান্তি ও ক্ষমা
মনের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ বা বিষ আমাদের শান্তি কেড়ে নেয়। ক্ষমা করা মানে অন্য ব্যক্তির কাজকে সমর্থন করা নয়; বরং নিজেকে সেই বিষ থেকে মুক্ত করা। পাশাপাশি যা হারিয়েছে তা নিয়ে আফসোস না করে, যা আছে তার জন্য কৃতজ্ঞ হতে শেখা। কৃতজ্ঞতাই সুখী হওয়ার সহজতম উপায়। অতীত নিয়ে অনুশোচনা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাদ দিয়ে বর্তমান মুহূর্তকে উপভোগ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। মনে রাখতে হবে, কোনো কিছুর প্রতি অতিরিক্ত আসক্তিই দুঃখের মূল কারণ।
মন ও চিন্তার নিয়ন্ত্রণ
চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে চিন্তাই আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করবে। নেতিবাচক চিন্তাগুলোকে জোর করে দূর না করে সেগুলোকে পর্যবেক্ষণ করতে শিখুন। আর যখনই খুব অস্থির বা উত্তেজিত বোধ করবেন, তখন গভীর শ্বাস নিন। আপনার নিশ্বাসই মনকে শান্ত করার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। সব পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখানোর প্রয়োজন নেই; মাঝেমধ্যে নীরবতা বজায় রাখা সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
একাকিত্ব বনাম নির্জনতা
আমরা একা থাকতে ভয় পাই, কিন্তু একা থাকা মানেই একাকিত্ব নয়। নির্জনতা (Solitude) হলো নিজের সঙ্গে সময় কাটানো এবং নিজের ভেতরকে চেনা। নিজের মূল্য নির্ধারণের চাবিকাঠি অন্যের হাতে দেবেন না। আপনি ভেতর থেকে যেমন, সেটিই আপনার আসল সম্পদ।
সম্পর্ক ও পরিবেশ
আপনি যে ধরনের মানুষের সঙ্গে সময় কাটাবেন, আপনার চিন্তাধারাও ঠিক তেমন হয়ে উঠবে। তাই ইতিবাচক মানুষের সান্নিধ্যে থাকা জরুরি। সম্পর্কের ক্ষেত্রে কথা বলার চেয়ে অন্যের কথা গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনা অনেক বড় গুণ। দিনের শুরুটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আপনার সকালটা যেভাবে শুরু হবে, সারা দিন সেভাবেই কাটবে। তাই দিনের শুরুটা হোক গঠনমূলক কোনো কাজের মাধ্যমে।
সন্ন্যাসীর মতো চিন্তা করার অর্থ এই নয়, সংসার ত্যাগ করে বনে চলে যেতে হবে। এর অর্থ হলো, সংসারে থেকেও মোহমুক্ত থাকা, নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং অন্যের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করা। আজ থেকেই এই ছোট ছোট পরিবর্তন নিজের জীবনে আনতে শুরু করুন, দেখবেন জীবনটা অনেক বেশি সুন্দর ও অর্থবহ হয়ে উঠেছে।
লেখা: সাব্বির হোসেন
কীভাবে এল ৪২০?
আমাদের নিত্যদিনের কথাবার্তায়, আলাপে কাউকে প্রতারক, অসৎ বা নেতিবাচক চিন্তার বোঝাতে অথবা ব্যঙ্গ করে প্রায়ই বলি 'ও তো একটা ৪২০।' এই সংখ্যাটি কীভাবে একজন মানুষের চরিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে গেল, তা আসলে বেশ আগ্রহ জাগানিয়া।
মূলত এর পেছনে রয়েছে উপমহাদেশের আইন, ইতিহাস এবং ভাষার সামাজিক ব্যবহার। '৪২০' সংখ্যাটির উৎস ব্রিটিশ শাসনামলের ইন্ডিয়ান পেনাল কোড (Indian Penal Code বা IPC)। ১৮৬০ সালে প্রণীত এই দণ্ডবিধিতে বিভিন্ন অপরাধের জন্য আলাদা আলাদা ধারা বা সেকশন নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে ধারা ৪২০ (Section 420) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই ধারার শিরোনাম হলো- 'Cheating and dishonestly inducing delivery of property', অর্থাৎ প্রতারণার মাধ্যমে অসৎ উদ্দেশ্যে অন্যের সম্পত্তি বা অর্থ হাতিয়ে নেওয়া।
আইনগতভাবে IPC-এর ৪২০ ধারা অনুযায়ী, কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে প্রতারণা করে, মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে তার কাছ থেকে টাকা, সম্পত্তি বা মূল্যবান কিছু আদায় করে নেয়, তবে সে অপরাধী হিসেবে গণ্য হয়। এ অপরাধের শাস্তি হিসেবে কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। ফলে আইন ও প্রশাসনের চোখে ৪২০ মানেই প্রতারণা এবং প্রতারক ব্যক্তি। [ জানা-অজানা 360 ]
কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি আইনি ধারার নম্বর কীভাবে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে চরিত্রগত অপবাদে পরিণত হলো? এর উত্তর লুকিয়ে আছে সমাজে আইনের প্রভাব ও লোকজ ভাষার বিবর্তনের মধ্যে। ব্রিটিশ আমল থেকেই আদালত, পুলিশ এবং মামলা-মোকদ্দমা সাধারণ মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলতে শুরু করে। সংবাদপত্রে, আদালতের রায় নিয়ে আলোচনায় কিংবা থানার ভাষায় 'চার শ কুড়ি মামলা' বা '৪২০ ধারায় গ্রেপ্তার'- এ শব্দগুলো নিয়মিত শোনা যেত। ধীরে ধীরে মানুষ বুঝে নেয়, ৪২০ মানে এমন একজন ব্যক্তি যে ঠকায়, ধোঁকা দেয় এবং বিশ্বাসভঙ্গ করে।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে '৪২০' শব্দটি আইনি পরিভাষা ছাড়িয়ে কথ্য ভাষায় ঢুকে পড়ে। তখন আর কাউকে সত্যিই আইনের ৪২০ ধারায় অভিযুক্ত হতে হয় না; বরং কেউ যদি বন্ধুকে ঠকায়, ব্যবসায় অসততা করে বা চালাকি করে লাভবান হতে চায়, তাহলেই তাকে মজা করে কিংবা ব্যঙ্গ করে '৪২০' বলা হয়। এভাবে সংখ্যাটি একটি প্রতীকে রূপ নেয়- প্রতারণা ও অসততার প্রতীক। ভারত ও বাংলাদেশে চলচ্চিত্র, নাটক এবং সাহিত্যেরও এখানে বড় ভূমিকা রয়েছে। বহু হিন্দি ও বাংলা সিনেমা, নাটকে '৪২০' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে প্রতারক চরিত্র বোঝাতে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সংখ্যার ব্যবহার মানুষের কাছে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও রসিকতাপূর্ণ। কাউকে সরাসরি 'তুমি অসৎ' বা 'তুমি প্রতারক' বললে তা আঘাতমূলক হতে পারে। কিন্তু 'তুমি তো একটা ৪২০' বললে কথাটা একই অর্থ বহন করলেও তা তুলনামূলকভাবে হালকা, ব্যঙ্গাত্মক এবং অনেক সময় হাস্যরসের মোড়কে বলা যায়। এ কারণেও সংখ্যাটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, '৪২০' কোনো রহস্যময় বা কুসংস্কারজাত সংখ্যা নয়। এর পেছনে রয়েছে নির্দিষ্ট একটি আইনি ধারা, ঔপনিবেশিক ইতিহাস এবং সমাজের ভাষাগত রূপান্তর। আইন থেকে লোকজ ভাষা, আর লোকজ ভাষা থেকে সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে এই সংখ্যা।
.
লেখা: ইস্রাফিল আকন্দ রুদ্র
৮-৮-৮ রুল: সফল ক্যারিয়ার ও সুস্থ জীবনের ভারসাম্য
বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক যুগে ক্যারিয়ারে সফল হতে গিয়ে আমরা প্রায়ই একটি চোরাবালিতে আটকে যাই। দিনরাত এক করে কাজ করাকে আমরা ভাবি সাফল্যের শর্টকাট। কিন্তু শরীর আর মন যখন বিদ্রোহ করে, তখন উপলব্ধি হয় যে আমরা বাঁচার জন্য কাজ করছি, না কি কাজ করার জন্য বাঁচছি? যারা কাজের চাপে নিজের ব্যক্তিগত জীবন হারিয়ে ফেলছেন, তাদের জন্য আধুনিক ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞানের এক জাদুকরি সমাধান হলো '৮-৮-৮ রুল'।
➤কী এই ৮-৮-৮ রুল
আমাদের প্রত্যেকের হাতে দিনে ২৪ ঘণ্টা সময় আছে। এই সময়কে তিনটি সমান ভাগে ভাগ করে ভারসাম্যপূর্ণ জীবন যাপন করাই হলো এই নিয়মের মূল কথা। অর্থাৎ
প্রথমত, ৮ ঘণ্টা কঠোর পরিশ্রম (Hard Work), এটি আপনার অফিস, ব্যবসা বা পড়াশোনার সময়। এই ৮ ঘণ্টা হবে নিরেট কাজ বা 'ডিপ ওয়ার্ক'-এর জন্য।
দ্বিতীয়ত, ৮ ঘণ্টা প্রশান্তির ঘুম (Good Sleep), সুস্থ মস্তিষ্ক এবং শরীরের জন্য পর্যাপ্ত ঘুম অপরিহার্য। এটি আপনার পরের দিনের কাজের জ্বালানি।
তৃতীয়ত, বাকি ৮ ঘণ্টা নিজের জন্য (Personal Time), এই শেষ ৮ ঘণ্টাই নির্ধারণ করে আপনি কতটা সুখী মানুষ। এটি ব্যয় হবে পরিবার, শখ, প্রার্থনা, ব্যায়াম এবং সামাজিক কাজে। [ জানা-অজানা 360 ]
➤ক্যারিয়ারে এই ভারসাম্য কেন জরুরি
১. প্রোডাক্টিভিটি বা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি: অফিসে অতিরিক্ত সময় কাটালেই বেশি কাজ হয়-এই ধারণাটি ভ্রান্ত। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত পরিশ্রম মানুষের সৃজনশীলতা কমিয়ে দেয়। ৮ ঘণ্টা মন দিয়ে কাজ করলে যে আউটপুট আসে, ক্লান্ত মস্তিষ্কে ১২ ঘণ্টায়ও তা সম্ভব নয়।
২. বা*র্নআউট থেকে মুক্তি: টানা কয়েক মাস ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করলে 'বা*র্নআউট' বা মানসিক অবসাদ দেখা দেয়। ৮-৮-৮ রুল মেনে চললে কাজের প্রতি একঘেয়েমি আসে না এবং দীর্ঘ মেয়াদে ক্যারিয়ারে টিকে থাকা সহজ হয়।
৩. শারীরিক ও মানসিক সুস্বাস্থ্য: আমরা কাজের পেছনে ছুটতে গিয়ে স্বাস্থ্য বিসর্জন দিই। কিন্তু ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে পৌঁছে যদি শরীর ভেঙে পড়ে, তবে সেই সাফল্যের স্বাদ নেওয়া যায় না। পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিজের জন্য সময় রাখলে উচ্চ রক্তচাপ বা দুশ্চিন্তার মতো সমস্যাগুলো দূরে থাকে।
➤এটি বাস্তবায়ন করবেন যেভাবে
অনেকে বলতে পারেন, 'কর্পোরেট চাকরিতে কি আর ৮ ঘণ্টায় কাজ শেষ হয়?' তাদের জন্য কিছু টিপস-কাজের অগ্রাধিকার ঠিক করুন প্রতিদিন সকালে আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৩টি কাজ চিহ্নিত করুন এবং সেগুলো ৮ ঘণ্টার মধ্যেই শেষ করার চেষ্টা করুন।
ডিজিটাল ডিটক্স অফিস থেকে ফেরার পর ল্যাপটপ বা অফিসের ইমেইল থেকে দূরে থাকুন। বাড়ির ৮ ঘণ্টা সময় যেন অফিসের চিন্তা দখল করতে না পারে।
৩-এফ ও ৩-এইচ ফর্মুলা নিজের জন্য বরাদ্দ ৮ ঘণ্টাকে আরও অর্থবহ করতে ৩-এফ (Family, Friends, Faith) এবং ৩-এইচ (Health, Hygiene, Hobby)-এর পেছনে ব্যয় করুন।
➤শেষ কথা
বিখ্যাত শিল্পপতি রতন টাটা একবার বলেছিলেন, 'কাজ জীবনের একটি অংশ মাত্র, পুরো জীবন নয়।' আপনার পদবি বা স্যালারি কেবল আপনার ক্যারিয়ারের পরিচয়, কিন্তু আপনার স্বাস্থ্য এবং পরিবারই আপনার জীবনের আসল ভিত্তি। ক্যারিয়ারের সিঁড়িতে ওঠার সময় যদি ভিত্তিটাই নড়বড়ে হয়ে যায়, তবে সেই সাফল্য ক্ষণস্থায়ী। তাই আজ থেকেই শুরু করুন ৮-৮-৮ রুলের চর্চা। নিজের ২৪ ঘণ্টাকে নতুন করে সাজান, দেখবেন সাফল্য এবং সুখ-দুটোই আপনার হাতের মুঠোয়।
লেখা: Md Ashikur Rahman
ছবি: ইত্তেফাক
জাপানিজ জীবনদর্শন 'কাইজেন' (Kaizen)
নতুন বছরে আমরা অনেকেই বড় বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করি। কেউ ভাবি এবার পদোন্নতি পেতেই হবে, কেউ ভাবি নতুন কোনো কঠিন স্কিল শিখে ফেলব। কিন্তু মাস খানেক যেতেই সেই উদ্যম ফিকে হয়ে আসে। বড় লক্ষ্যের বিশালতা আমাদের অনেক সময় মানসিকভাবে ক্লান্ত করে দেয়। ঠিক এই জায়গাতেই জাদুর মতো কাজ করে জাপানিজ জীবনদর্শন 'কাইজেন' (Kaizen)। দ্বিতীয় বিশ্বযু*দ্ধ পরবর্তী বিধ্ব*স্ত জাপানকে বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করার পেছনে এই কাইজেন দর্শনের অবদান অনস্বীকার্য। বর্তমানে টয়োটা থেকে শুরু করে গুগল-বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মীদের এই নীতিতে উদ্বুদ্ধ করে।
➤কাইজেন কী
জাপানি শব্দ 'কাই' (পরিবর্তন) এবং 'জেন' (ভালো)-এর সমন্বয়ে গঠিত এই দর্শনের মূল কথা হলো-'ভালোর জন্য নিরন্তর পরিবর্তন'। তবে এটি রাতারাতি কোনো অলৌকিক পরিবর্তনের কথা বলে না। বরং এটি শেখায় প্রতিদিন খুব সামান্য কিন্তু নিয়মিত উন্নতির অভ্যাস। ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞানে একে বলা হয় 'কন্টিনিউয়াস ইমপ্রুভমেন্ট'।
➤কেন 'কাইজেন' প্রয়োগ করা দরকার
১. বড় লক্ষ্যের চাপ কমায় আমরা যখন বড় কোনো প্রজেক্ট বা ক্যারিয়ার পরিবর্তনের কথা ভাবি, আমাদের মস্তিষ্ক অবচেতনভাবে ভয় পায় এবং কাজ পিছিয়ে দেয় (Procrastination)। কাইজেন বলে, প্রজেক্টটি ছোট ছোট ভাগে ভাগ করুন যাতে সেটি করতে আপনার অলসতা না আসে।
২. ১ শতাংশের বিস্ময়: আপনি যদি প্রতিদিন আপনার কাজের দক্ষতা মাত্র ১ শতাংশ বৃদ্ধি করতে পারেন, তবে গাণিতিক হিসেবে বছর শেষে আপনি বর্তমানের চেয়ে প্রায় ৩৭ গুণ বেশি দক্ষ হয়ে উঠবেন। ক্যারিয়ারে এই সামান্য ব্যবধানই আপনাকে সাধারণ কর্মী থেকে টপ-পারফর্মার-এ পরিণত করবে।
৩. অপচয় রোধ: কাইজেন পদ্ধতিতে কাজের অপ্রয়োজনীয় ধাপগুলো ছেঁটে ফেলা হয়। অফিসে আপনার ডেস্কে ফাইল গোছানো থেকে শুরু করে ইমেইল আদান-প্রদান-প্রতিটি ধাপে কীভাবে সময় বাঁচানো যায়, সেই ছোট ছোট সংস্কারই কাইজেন।
➤৫-এস (5S) ফ্রেমওয়ার্ক: কর্মক্ষেত্র গোছানোর মূলমন্ত্র
জাপানিরা কাইজেন বাস্তবায়নে '৫-এস' পদ্ধতি ব্যবহার করে, যা যেকোনো পেশাজীবীর জন্য অত্যন্ত কার্যকর।
Seiri (Sort): আপনার কর্মক্ষেত্র থেকে অপ্রয়োজনীয় ফাইল বা ডিজিটাল ডেটা সরিয়ে ফেলুন।
Seiton (Set in Order): প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো এমনভাবে রাখুন যেন হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়।
Seiso (Shine): নিয়মিত নিজের কর্মস্থল ও কাজের টুলসগুলো পরিষ্কার ও সচল রাখুন।
Seiketsu (Standardize): ভালো কাজের পদ্ধতিগুলোকে একটি নিয়মে রূপ দিন।
Shitsuke (Sustain): এই নিয়মগুলো অভ্যাসে পরিণত করুন এবং ধৈর্য ধরে বজায় রাখুন।
➤যেভাবে শুরু করবেন
ক্যারিয়ারে কাইজেন প্রয়োগের জন্য কোনো আকাশছোঁয়া পরিকল্পনার দরকার নেই। কাল অফিসে গিয়ে কেবল নিচের তিনটি ছোট কাজ করার চেষ্টা করুন-
কাজের শুরুতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটির জন্য মাত্র ১৫ মিনিট নিবিড় মনোযোগ দিন।
অফিস থেকে বের হওয়ার আগে আপনার ডেস্ক গুছিয়ে রাখুন, যা আগামীকাল সকালে আপনাকে সতেজভাবে কাজ শুরু করতে সাহায্য করবে।
প্রতিদিন নতুন অন্তত একটি প্রফেশনাল টার্ম বা টেকনিক শিখুন। বিখ্যাত উদ্যোক্তাদের মতে, সাফল্য আদতে একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। বড় সাফল্যের জন্য অলৌকিক কিছুর অপেক্ষায় না থেকে আজকের দিনটি গতকালের চেয়ে মাত্র ১ শতাংশ ভালো করার চেষ্টা করুন। এই ছোট পদক্ষেপই আপনাকে নিয়ে যাবে সাফল্যের শিখরে।
লেখা: Md Ashikur Rahman
প্রেজেন্টেশন স্কিল বাড়াতে যা করবেন
এর আগে আমরা প্রেজেন্টেশন স্কিলের গুরুত্ব সম্পর্কে লিখেছি। তবে প্রেজেন্টেশন স্কিল কীভাবে ভালো করা যেতে পারে, সে ব্যাপারে ইত্তেফাক ক্যারিয়ার-এর পাঠকদের অনেকেই ই-মেইল ও ফেসবুকের মাধ্যমে পরামর্শ চেয়েছেন। এবার থাকছে প্রেজেন্টেশন ভালো করার কিছু কৌশল নিয়ে আলাপ।
১. কনটেন্ট ভালোভাবে বুঝে নিন
আপনি কী বলছেন তা নিজে আগে ভালোভাবে বোঝা জরুরি। মুখস্থ নয়, আত্মস্থ করুন। ভাবনা থেকে বলুন। বুলেট পয়েন্ট লিখে রাখুন, যা গাইড হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।
২. কাঠামো সাজান
একটি ভালো প্রেজেন্টেশনের তিনটি ধাপ-
ভূমিকা: কী নিয়ে বলবেন ও কেন এটা গুরুত্বপূর্ণ।
মূল অংশ: যুক্তি, উদাহরণ, তথ্য দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা।
উপসংহার: মূল অংশটি সংক্ষেপে আবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া।
৩. চর্চা করুন
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রেজেন্টেশন করার চর্চা করতে পারেন।
মঞ্চভী*তি থাকলে বন্ধু বা পরিবারের কারোর সামনে উপস্থাপনের চর্চা করুন।
আপনার প্রেজেন্টেশনটি কত সময়ের মধ্যে শেষ করার কথা, সেটি করতে পারছেন কিনা, টাইম কিপিংয়ের মাধ্যমে লক্ষ রাখুন।
৪. টেক্সট কম, ছবি বেশি
লম্বা-লম্বা টেক্সট লেখার চেয়ে স্লাইডে বুলেট পয়েন্ট লিখলে এবং তা মুখে ব্যাখ্যা করলে সেটি শ্রোতাদের বেশি আকৃষ্ট করে। স্লাইড সাজান পরিমিতভাবে। বেশি রঙচঙে করার দরকার নেই। একটা থিম ধরে রাখুন। ফন্টেও ভারসাম্য রাখুন।
৫. বডি ল্যাঙ্গুয়েজ
ভালো প্রেজেন্টেশনের জন্য দর্শক বা শ্রোতার চোখে চোখ রাখুন। আই-কনটাক্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া হাত নাড়া, বাচনভঙ্গির দিকেও খেয়াল রাখুন। কথা বলার সময় মাঝে মাঝে ছোট বিরতি নিন। গতি যেন খুব বেশি না হয়, আবার খুব ধীরও না হয়।
৬. প্রশ্নের উত্তর দিন
যেকোনো প্রেজেন্টেশনে ভালো করতে হলে ইন্টার্যাকশন দরকার। শ্রোতাদের প্রশ্ন করুন, তাদের মধ্যে থেকেও কারোর কথা শুনুন। এরপর অন্যদের কাছ থেকে পালটা প্রশ্ন নিন। এই আলাপচারিতা তৈরি হলে প্রেজেন্টেশন আরো আকর্ষণীয় হবে।
৭. আত্মবিশ্বাসী হোন, মুখে হাসি রাখুন
প্রথমদিকে নার্ভাস হওয়াটা স্বাভাবিক, কিন্তু মুখ গম্ভীর করবেন না। চেহারায় হাসি ধরে রাখুন। যে বিষয়ে কথা বলছেন, ধরে নিন আপনিই এতে সেরা। এই আত্মবিশ্বাসই আপনাকে ভালো প্রেজেন্টেশন দিতে সাহায্য করবে।
কাজ শেষে কেন প্রয়োজন 'পোস্টম*র্টেম অ্যানালাইসিস'
একটি বড় প্রজেক্ট শেষ হলো। মাসব্যাপী হা*ড়ভাঙা খাটুনি, বিনিদ্র রজনী আর টানটান উত্তেজনার অবসান। ফলাফল যাই হোক-সাফল্য বা ব্যর্থতা-আমরা সাধারণত প্রজেক্ট শেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলে পরের কাজে ঝাঁ*পিয়ে পড়ি। কিন্তু এখানেই আমরা একটি বড় ভুল করে ফেলি। কোনো কাজ শেষ হওয়ার পর তার চুলচেরা বিশ্লেষণ না করলে সাফল্যের স্থায়িত্ব বা ব্যর্থতার শিক্ষা-দুটোই অধরা থেকে যায়। মনোবিজ্ঞান এবং ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় 'পোস্ট-ম*র্টেম অ্যানালাইসিস'।
পোস্টমর্টেম কী এবং কেন?
চিকিৎসাবিজ্ঞানে মৃ/ত্যুর কারণ জানতে পোস্টম*র্টেম করা হয়। পেশাদার জীবনে এটি কোনো কাজের মৃ*ত্যুর বিশ্লেষণ নয়, বরং সেই কাজের 'জীবনবৃত্তান্ত' পর্যালোচনা। একটি প্রজেক্ট বা পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ঠান্ডা মাথায় বসা এবং নির্মোহভাবে বিচার করা যে কী ঠিক ছিল আর কী ভুল ছিল।
সোভিয়েত মনোবিজ্ঞানী ব্রমা জেইগারনিক বলেছিলেন, অসম্পূর্ণ কাজ আমাদের মস্তিষ্কে চাপ তৈরি করে। তেমনি অসম্পূর্ণ বিশ্লেষণ আমাদের ক্যারিয়ারে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটায়। পো*স্টম*র্টেম অ্যানালাইসিস সেই লুপ বা চক্রটি ভে*ঙে দেয়।
➤বিশ্লেষণের চারটি স্তম্ভ
এই জটিল প্রক্রিয়াটিকে চারটি সহজ প্রশ্নে ভাগ করা যায়-
সাফল্যের ময়নাতদন্ত (What went well?):
আমরা অনেক সময় শুধু ভুল খুঁজি। কিন্তু কোন কৌশলটি আমাদের লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করেছে, সেটি চিহ্নিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই ভালো দিকগুলোই হবে আপনার ভবিষ্যতের 'বেস্ট প্র্যাকটিস'।
ভুলের ব্যবচ্ছেদ (What went wrong?):
কোথায় আমাদের পরিকল্পনায় ঘাটতি ছিল? বাজেট কেন বাড়ল? কিংবা পরীক্ষার হলে কেন জানা উত্তর ভুল হলো? কোনো ব্লেম-গেম বা দোষারোপ ছাড়া বাস্তবতাকে মেনে নেওয়াই এই ধাপের সার্থকতা।
শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা (What did we leam?):
প্রতিটি কাজ আমাদের নতুন কিছু শেখায়। টেকনিক্যাল দক্ষতা থেকে শুরু করে মানুষের সাথে আচরণের কৌশল-এই নতুন শিক্ষাগুলো লিখে রাখা জরুরি।
ভবিষ্যৎ রূপরেখা (Next steps):
পরের বার একই ধরনের কাজ করার সময় আমরা কোন ভুলগুলো বর্জন করব? এই ধাপটিই মূলত আপনাকে সাধারণ থেকে অসাধারণে পরিণত করবে।
➤পড়াশোনায় ও ক্যারিয়ারে এর প্রভাব:
শিক্ষার্থীদের জন্য এটি হতে পারে 'গেম চেঞ্জার'। একটি সেমিস্টার শেষে যদি কোনো শিক্ষার্থী তার পড়ার রুটিন ও ফলাফল নিয়ে পোস্টমর্টেম করে, তবে পরের সেমিস্টারে তার ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। অন্যদিকে, করপোরেট জগতে বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি এখন প্রতিটি ক্যাম্পেইন শেষে বাধ্যতামূলকভাবে পোস্টমর্টেম মিটিং করে। এতে টিমের স্বচ্ছতা বাড়ে এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়।
➤কীভাবে শুরু করবেন?
পোস্টমর্টেম করার জন্য খুব জটিল কোনো সফটওয়্যারের প্রয়োজন নেই। একটি ডায়েরি বা এক্সেল শিটই যথেষ্ট। কাজের শেষে নিজেকে অন্তত ৩০ মিনিট সময় দিন। নিজের কাজের দুর্বলতাগুলো স্বীকার করার সাহস অর্জন করুন। মনে রাখবেন, আজকের ভুলগুলোই কালকের অভিজ্ঞতার মূলধন।
বিখ্যাত উদ্যোক্তাদের মতে, যারা নিজেদের কাজের পোস্টমর্টেম করে না, তারা আসলে অভিজ্ঞ নয়; তারা কেবল একই বছর বারবার যাপন করে। তাই ক্যারিয়ার বা পড়াশোনায় যদি প্রকৃত উন্নয়ন চান, তবে কাজ শেষে আয়নার সামনে দাঁড়ানোর অভ্যাস করুন।
লেখা: Md Ashikur Rahman
সিভি, রেজ্যুমে ও কাভার লেটার: পার্থক্য কী?
চাকরিতে আবেদন করার সময় আমাদের সবারই কমবেশি সিভি বা রেজ্যুমে ও কাভার লেটার প্রয়োজন হয়। ইউরোপ বা ব্রিটেনে সিভির চল বেশি থাকলেও আমেরিকায় রেজ্যুমের প্রাধান্য বেশি। অনেক ক্ষেত্রে আমাদের দেশে সিভি-রেজ্যুমে একই অর্থে ব্যবহৃত হয়। তবে একটা ব্যাপার খেয়াল রাখা দরকার; সিভি, রেজ্যুমে ও কাভার লেটার এক নয়।
অনেকেই এই তিনটিকে এক করে ফেলেন যদিও এদের মধ্যে কাঠামোগত এবং উপস্থাপনার দিক দিয়ে অনেক পার্থক্য রয়েছে।
সিভি (Curriculum Vitae)
সিভি বা কারিকুলাম ভিটাই শব্দটি এসেছে লাতিন ভাষা থেকে। এর আক্ষরিক অর্থ হলো জীবনের পথ! সিভি দেখতে ক্ষুদ্র। এটি মূলত দুই থেকে তিন পাতার হয়। এর পাঠক হয়তো মাত্র কয়েকজন, কিন্তু চাকরি সন্ধানীদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। সিভিতে আপনার জীবনের যাবতীয় প্রায় সবকিছু লেখা থাকে যেমন- আপনার ক্যারিয়ারের লক্ষ্য, শিক্ষা, কাজের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, অর্জন, প্রকাশনা, সম্মাননা ইত্যাদি।
সিভি সাধারণত সময়ানুক্রমিক হয়ে থাকে। সাম্প্রতিক পর্যায় থেকে এর শুরু হয়। কাজের প্রয়োজন অনুসারে যত পেছনে যাওয়া যায়, ততটাই উল্লেখ করা হয়।
সিভি সাধারণত বিভিন্ন কাজের আবেদনের সময় অপরিবর্তিত থাকে। তবে নিয়মিত হালনাগাদ করা জরুরি।
রেজ্যুমে (Resume)
Resume শব্দটি ফরাসি যার অর্থ সংক্ষিপ্ত বিবরণী। রেজ্যুমে হলো CV-র সংক্ষিপ্ত রূপ যেখানে ব্যক্তির শিক্ষাগত যোগ্যতা ও কাজের অভিজ্ঞতার ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত বিবরণ থাকে। রেজ্যুমে সাধারণত এক পাতার হয়ে থাকে। এতে পুরো জীবনবৃত্তান্ত থাকে না। সংক্ষিপ্ত হবার কারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়।
সর্বজনীন কোনো গঠন না থাকায় ব্যক্তি ও কাজের বা আবেদনের ওপর ভিত্তি করে রেজ্যুমের গঠন ভিন্ন হয়। এখানে কেবল যে কাজের জন্য অবেদন করছেন, সে কাজের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, শিক্ষা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাসঙ্গিক তথ্য দেওয়া থাকে।
রেজ্যুমের তথ্য সময়ানুক্রমিক হতে পারে। আবার কাজভিত্তিকও হতে পারে। অর্থাৎ নির্ধারিত কাজের জন্য আপনার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দিয়ে রেজ্যুমে সাজানো। অবশ্য অনেকে দুই ধরনকে এক জায়গায় নিয়ে আসেন। রেজ্যুমে লেখা তাই ব্যক্তিগত প্রেক্ষাপটের ওপর নির্ভরশীল।
অনেক সময় রেজ্যুমের তথ্য বুলেট লিস্ট আকারে দেওয়া থাকে। এতে চাকরিদাতা কম সময়ের মধ্যে আবেদনকারী সম্পর্কে ধারণা পান।
কাভার লেটার (Cover Letter)
সিভি ও রেজ্যুমে অনেকটা এক রকম হলেও কাভার লেটার কিছুটা আলাদা। এর মূল উদ্দেশ্য চাকরিপ্রার্থী হিসেবে আপনার যোগ্যতা যথাসম্ভব সংক্ষেপে তুলে ধরা।
চাকরির আবেদনের সময় কাভার লেটার সাধারণত সিভি বা রেজ্যুমের সঙ্গে লিখে দিতে হয়। নাম থেকেই বোঝা যায় যে এটি এক ধরনের চিঠি বা পত্র। এটি লিখতেও হয় চাকরিদাতা বরাবর। এতে থাকে সম্বোধন, কিছু প্যারাগ্রাফ ও সমাপ্তি।
এক কথায় বলা যায়, সিভি ও রেজ্যুমের সঙ্গে কাভার লেটার পরিপূরক ভূমিকা পালন করে। কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য কাভার লেটার তৈরির সময় যে ব্যপারগুলোতে ফোকাস করতে হবে সেগুলো হলো-
-আপনি যে কাজের জন্য আবেদন করছেন তা কীভাবে আপনাকে উদ্দীপ্ত করে।
-এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করতে আপনি কেন আগ্রহী।
-আপনাকে আপনার নির্বাচিত ক্যারিয়ারে আসার জন্য কোন ব্যাপারটা অনুপ্রাণিত করে।
লেখা: গুলশান হাবিব রাজীব
জেইগারনিক ইফেক্ট (Zeigarnik Effect)
অসম্পূর্ণ কাজের মানসিক চাপকে সাফল্যের শক্তি বানান!
অনেক সময় দেখা যায়, একটি কাজ শেষ করার পর আমরা তা দ্রুত ভুলে যাই, কিন্তু কোনো কাজ অর্ধেক করে রেখে দিলে সেটি বারবার আমাদের মাথায় ঘুরপাক খায়। কেন এমন হয়? মস্তিষ্কের এই অদ্ভুত প্রবণতাকেই মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় 'জেইগারনিক ইফেক্ট'।
১৯২০-এর দশকে সোভিয়েত মনোবিজ্ঞানী ব্লুমা জেইগারনিক লক্ষ করেন, রেস্তোরাঁর ওয়েটাররা সেই অর্ডারগুলো বেশি মনে রাখতে পারেন-যেগুলোর বিল এখনো পরিশোধ করা হয়নি। কিন্তু বিল দেওয়ার সাথে সাথেই তারা অর্ডারগুলো ভুলে যান। তার গবেষণার সারকথা হলো- 'মানুষ সম্পূর্ণ কাজের চেয়ে অসম্পূর্ণ বা বাধাগ্রস্ত কাজগুলোর কথা বেশি মনে রাখে।'
➤এটি যেভাবে প্রভাবিত করে
জেইগারনিক ইফেক্ট মূলত আমাদের মস্তিষ্কের একটি রিমাইন্ডার সিস্টেম। যখন আমরা কোনো কাজ শুরু করি কিন্তু শেষ করি না, তখন মস্তিষ্ক একটি মানসিক উত্তেজনা (Psychic Tension) তৈরি করে। এটি আমাদের অবচেতন মনে কাজটির কথা মনে করিয়ে দিতে থাকে।
অ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রে: কোনো অধ্যায় অর্ধেক পড়ে ঘুমাতে গেলে দেখবেন ঘুমানোর আগে বারবার ওই পড়ার কথা মনে পড়ছে।
ক্যারিয়ার-রিলেটেড কাজে: অফিসের কোনো জরুরি ইমেইল ড্রাফটে রেখে দিলে সেটি বারবার মাথায় আসবে এবং অন্য কাজে মনোযোগ দিতে বাধা দেবে। একে বলা হয় 'কগনিটিভ ইচ' (Cognitive Itch) বা মানসিক 'চুল*কানি'।
➤ইফেক্টের ইতিবাচক প্রয়োগ
কাজ শুরু করার জড়তা কাটানো : আমরা অনেক সময় বড় কাজ দেখে ভয়ে শুরুই করি না। জেইগারনিক ইফেক্ট অনুযায়ী, আপনি যদি কাজটি মাত্র ৫ মিনিটের জন্য শুরু করেন, তবে আপনার মস্তিষ্ক সেটি শেষ করার জন্য ভেতর থেকে তাড়না দেবে। তাই শুরু করাটাই অর্ধেক কাজ শেষ করার সমান।
এই মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতাটি যেমন আমাদের দুশ্চিন্তা বাড়াতে পারে, তেমনি সঠিক কৌশলে একে ব্যবহার করলে পড়াশোনা ও ক্যারিয়ারে অসাধারণ ফলাফল পাওয়া সম্ভব।
কৌশলী বিরতি (Strategic Breaks): পড়তে পড়তে বা কাজ করতে করতে যখন আপনি খুব ভালো ফ্লো-তে থাকবেন, ঠিক তখনই একটি ছোট বিরতি নিন। যেহেতু কাজটি অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে, বিরতির সময় আপনার মস্তিষ্ক অবচেতনভাবে ওই বিষয়টি নিয়ে ভাববে। ফলে ফিরে এসে পুনরায় কাজে মনোযোগ দেওয়া সহজ হবে।
টু-ডু লিস্টের ব্যবহার: মাথায় যখন অনেক অসম্পূর্ণ কাজের চিন্তা ঘুরপাক খায়, তখন সেগুলো কাগজে লিখে ফেলুন। এতে মস্তিষ্ক মনে করে যে কাজটির একটি ব্যবস্থা হয়েছে, ফলে মানসিক চাপ কমে এবং বর্তমান কাজে মনোযোগ দেওয়া যায়।
জটিল সমস্যার সমাধান: কোনো জটিল অঙ্কের বা কোডিংয়ের সমাধান না মিললে জোর করে বসে না থেকে কিছুক্ষণ অন্য কাজ করুন। অসম্পূর্ণ কাজের জেইগারনিক ইফেক্টের কারণে আপনার মস্তিষ্ক ব্যাকগ্রাউন্ডে সমাধান খুঁজতে থাকবে এবং হঠাৎ করেই আপনার মাথায় আইডিয়া চলে আসবে।
সময় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে জেইগারনিক ইফেক্ট আমাদের শেখায় যে, বড় কাজের পাহাড় দেখে বসে না থেকে ছোট একটি অংশ অন্তত শুরু করা উচিত। একবার শুরু করে দিলে আপনার মস্তিষ্কই আপনাকে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাবে।
লেখা: Md Ashikur Rahman
পার্কিনসন্স ল : সময়ের সঠিক ব্যবহার
কোনো একটি কাজ শেষ করার জন্য আমাদের যদি সাতদিন সময় দেওয়া হয়, তবে দেখা যায় সেই কাজটির পেছনে পুরো সাতদিনই ব্যয় হচ্ছে। আবার একই কাজ যদি মাত্র দুই দিনে শেষ করার তাগিদ থাকে, তবে আশ্চর্যজনকভাবে আমরা তা দুই দিনেই সম্পন্ন করতে পারি। এই যে সময়ের সঙ্গে কাজের প্রসারণ, একেই বলা হয় 'পার্কিনসন্স ল' (Parkinson's Law)। ১৯৫৫ সালে ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ সিরিল নর্থকোট পার্কিনসন এক প্রবন্ধে প্রথম এই ধারণাটি দেন। তার মতে, 'একটি কাজ ঠিক ততটুকুই বিস্তৃত হয়, যতটুকু সময় সেটি শেষ করার জন্য বরাদ্দ করা থাকে।' অর্থাৎ, হাতে বেশি সময় থাকলে আমাদের মস্তিষ্ক কাজটিকে জটিল করে ফেলে এবং আমরা আলস্য বা দীর্ঘসূত্রতার আশ্রয় নিই।
➤এটি আমাদের যেভাবে প্রভাবিত করে
পার্কিনসন্স ল মূলত আমাদের কর্মদক্ষতা বা প্রোডাক্টিভিটি-তে একটি বড় বাধা। যখন আমাদের হাতে অনেক সময় থাকে, তখন আমরা সেই সময়ের সদ্ব্যবহার করার চেয়ে তা পূরণের চেষ্টা করি। যেমন-
একটি ইমেইল লিখতে হয়তো মাত্র ১০ মিনিট লাগে, কিন্তু আপনি যদি ভাবেন এটি লাঞ্চের আগে পাঠাবেন, তবে দেখা যাবে ওই এক ঘণ্টা সময় আপনি ওই একটি ইমেইলের পেছনেই খরচ করছেন।
পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এক মাস সময় থাকলে আমরা প্রথম ২০ দিন বেশ ঢিলেঢালাভাবে কাটাই, অথচ শেষ ১০ দিনে ঠিকই পুরো সিলেবাস শেষ করি।
➤পার্কিনসন্স ল প্রয়োগের উপায়
ক্যারিয়ার বা পড়াশোনায় এই নিয়মের নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে উঠতে নিচের কৌশলগুলো অনুসরণ করা যেতে পারে।
কৃত্রিম ডেডলাইন তৈরি করা:
কোনো কাজ শেষ করার আসল যে সময়সীমা (D*eadline) আছে, তার আগেই নিজের জন্য একটি কাল্পনিক ডে*ডলাইন ঠিক করুন। [ জানা-অজানা 360 ]
কাজের গুরুত্ব বুঝে সময় বরাদ্দ:
সব কাজকে সমান সময় না দিয়ে কাজের কাঠিন্য অনুযায়ী সময় ভাগ করুন। বড় কাজের জন্য ছোট ছোট সময়সীমা বা 'টাইম বক্সিং' করলে কাজের গতি বাড়ে।
পারফেকশনিজমের ফাঁ*দ থেকে মুক্তি:
অনেক সময় আমরা নিখুঁত করতে গিয়ে সাধারণ একটি কাজকে টেনে লম্বা করি। পার্কিনসন্স ল বলে, কাজের পেছনে অকারণে অতিরিক্ত সময় দিলে কাজের মান সবসময় বাড়ে না, বরং সময় নষ্ট হয়।
টাইমার ব্যবহার করা হাতের কাজটি করার সময় ঘড়িতে অ্যালার্ম বা টাইমার সেট করে নিতে পারেন। এতে আপনার মস্তিষ্ক সজাগ থাকবে যে আপনার হাতে সময় কম, ফলে মনোযোগ বিচ্যুত হওয়ার সুযোগ কমে যাবে।
সময় ব্যবস্থাপনার মূল কথা কেবল কঠোর পরিশ্রম নয়, বরং বুদ্ধিমত্তার সাথে সময়ের ব্যবহার। পার্কিনসন্স ল বুঝতে পারলে আপনি সময়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবেন। কম সময়ে কাজ শেষ করার অভ্যাস গড়ে তুললে আপনি কেবল অধিক উৎপাদনশীলই হবেন না, বরং নিজের জন্যও পর্যাপ্ত অবসর খুঁজে পাবেন।
লেখা: মো. আশিকুর রহমান
আপনার বড় শত্রু আপনি নিজেই
আমরা প্রায়ই বাইরের মানুষকে শত্রু মনে করি; কিন্তু প্রকৃত শত্রু বাস করে আমাদের মনে। এর নাম অহংকার। যেহেতু এর বসবাস মনে, তাই নিয়ন্ত্রণও আমাদের হাতে। আমরা হয় একে বাড়তে দিই, নয়তো দমিয়ে রাখি। এটি কোনো কাল্পনিক দৈত্য নয়; বরং এটি আমাদের 'আমি' বা 'শ্রেষ্ঠত্বের' বোধ। যখনই মনে হবে, আপনি নিজেকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ভাবছেন বা নিজের অর্জন নিয়ে অতিরিক্ত গর্ব করছেন, বুঝবেন আপনার ভেতরের শত্রু জেগে উঠছে। তখনই একে থামানো জরুরি।
কথা বনাম শোনা
অহংকার আপনাকে অনর্গল কথা বলতে উৎসাহিত করে, নিজের গুণগান গাইতে শেখায়। কিন্তু নম্রতা আপনাকে অন্যের কথা শোনার ক্ষমতা দেয়। মনে রাখবেন, যিনি বলেন তিনি শুধু যা জানেন তা বলেন; কিন্তু যিনি শোনেন, তিনি নতুন কিছু শেখেন।
'সব জান্তা' মনোভাবের বিপর্যয়
অহংকারের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো, এটি শেখার দরজা বন্ধ করে দেয়। অহংকারী মানুষ নিজেকে সবকিছু জানে বলে ভাবতে শুরু করেন। একজন প্রকৃত শিক্ষার্থী সব সময় জানে যে সে সবকিছু জানে না। নতুন কিছু শিখতে হলে বিনয়ী হতে হবে এবং নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করতে হবে।
ফোকাস: নিজের ওপর নাকি অন্যের ওপর?
ইগো আমাদের আত্মকেন্দ্রিক করে তোলে। এটি সারাক্ষণ শুধু নিজের স্বার্থ বা ইমেজের ওপর মনোযোগ দেয়। বিপরীতে, নম্রতা আমাদের মনকে অন্যের ওপর ফোকাস করতে শেখায়। সত্যিকার অর্থে সফল মানুষ শুধু নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকেন না; তাঁরা ভাবেন, কীভাবে অন্যকে এগিয়ে নেওয়া যায়।
প্রলোভন ও তুলনা
অহংকার আমাদের শুধু অন্যকে খুশি করার বা ইমপ্রেস করার প্রলোভন দেখায়। আমরা যা পেয়েছি, তাতে সন্তুষ্ট থাকি না; অন্যের জীবনের দিকে তাকাই। এমন সময় নিজের লক্ষ্য এবং মূল্যবোধের দিকে মনোযোগ দিন। অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে, নিজের জন্য কী গুরুত্বপূর্ণ এবং কী অর্জন করতে চান-সেদিকে মনোযোগ দিন।
সাফল্য ও ব্যর্থতার সঠিক পাঠ
জীবন সব সময় সমানভাবে যায় না। সাফল্য ও ব্যর্থতা উভয় ক্ষেত্রে অহংকার বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। সাফল্য মানেই শ্রেষ্ঠত্ব নয়। ব্যর্থ হলে মনে করবেন না, আপনি প্রতারিত হয়েছেন বা জন্মগতভাবে ব্যর্থ; বরং এটি নতুন শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ।
নিজেকে একটি দেয়ালের মতো ভাবুন। কোনো দেয়াল এক দিনে তৈরি হয় না। ছোট ছোট সৎ কর্ম এবং বিনয়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে চরিত্র গড়ে ওঠে। অহংকারকে পাশে সরিয়ে, মাথা উঁচু করে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া-এটিই প্রকৃত বিজয়।
লেখা: সাব্বির হোসেন
পাবলিক স্পিকিংয়ে দক্ষ হওয়ার ১০টি কার্যকর কৌশল
পাবলিক স্পিকিংয়ের কথা ভাবলেই অনেকের বুক ধড়ফড় করে, হাতের তালু ঘেমে যায়। কিন্তু সত্য হলো, এটি কোনো জন্মগত প্রতিভা নয়; চর্চার মাধ্যমে শেখা যায়। সঠিক প্রস্তুতি ও কৌশল থাকলে আপনি ভ*য়কে জয় করে একজন আত্মবিশ্বাসী বক্তা হয়ে উঠতে পারেন। চলুন জেনে নিই, পাবলিক স্পিকিংয়ে দক্ষ হওয়ার ১০টি টিপস:
নার্ভাস হলে অনুশীলন করুন
বক্তব্যের আগে নার্ভাস লাগা খুবই স্বাভাবিক। হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, হাত কাঁপা বা গলা শুকিয়ে আসা-এসব শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। এগুলোকে ব্যর্থতার লক্ষণ ভাবার কোনো কারণ নেই। বরং এই নার্ভাসনেস আপনাকে আরও সতর্ক করে তোলে। এ জন্য সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ভালোভাবে প্রস্তুতি নেওয়া হবে। বিষয়টি ভালোভাবে বুঝুন, নোট করুন এবং বারবার অনুশীলন করুন। আয়নার সামনে, বন্ধুর সামনে বা নিজেকে ভিডিও করে অনুশীলন করলে দ্রুত উন্নতি সম্ভব।
শ্রোতাদের সম্পর্কে জানুন
বক্তব্য তৈরি করার আগে ভাবুন আপনি কাদের সামনে কথা বলবেন। শিক্ষার্থী, পেশাজীবী নাকি সাধারণ মানুষ? শ্রোতাদের বয়স, আগ্রহ ও প্রেক্ষাপট বুঝে ভাষা, উদাহরণ ও তথ্যের গভীরতা ঠিক করুন।
বক্তব্য গুছিয়ে নিন
আপনার বক্তব্যর কাঠামো তৈরি করুন। বিষয়, সাধারণ উদ্দেশ্য, নির্দিষ্ট লক্ষ্য, কেন্দ্রীয় ধারণা ও মূল পয়েন্ট লিখে রাখুন। মনে রাখবেন, প্রথম ৩০ সেকেন্ডে শ্রোতাদের মনোযোগ ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করুন
সব সময় শ্রোতাদের দিকে মনোযোগ রাখুন। তাদের চোখের ভাষা, ভঙ্গি ও প্রতিক্রিয়া লক্ষ করুন। এতে আপনি বক্তব্যের গতি ও উদাহরণ সামঞ্জস্য করতে পারবেন। একেবারে মুখস্থ বা যান্ত্রিক বক্তব্য দেওয়ায় আগ্রহী শ্রোতার মনোযোগ হারাতে পারেন। জীবন্ত যোগাযোগই ভালো উপস্থাপনার চাবিকাঠি।
নিজের ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করুন
নিজের মতো থাকুন। রোবটের মতো নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা করবেন না। আপনার ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠলে বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে, আর শ্রোতারা আপনাকে একজন বাস্তব মানুষ হিসেবে দেখবে।
গল্প, রসিকতা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা যোগ করুন
একটি মজার গল্প বা হালকা রসিকতা বক্তব্যকে প্রাণবন্ত করে তোলে। শ্রোতারা সাধারণত ব্যক্তিগত ছোঁয়া পছন্দ করে, আর গল্প সেটিই এনে দেয়।
আউটলাইন ব্যবহার করুন
নোট বা স্লাইড থেকে পুরো বাক্য পড়লে শ্রোতার সঙ্গে সংযোগ নষ্ট হয়। বরং কিছু শব্দ, চিত্র বা সংকেত ব্যবহার করুন। এতে আপনি মূল পয়েন্ট মনে রাখতে পারবেন এবং সরাসরি শ্রোতাদের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারবেন।
বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার করুন
পাবলিক স্পিকিং শুধু মুখের কথা নয়, শরীরও কথা বলে। দাঁড়ানোর ভঙ্গি, চোখের যোগাযোগ ও অঙ্গভঙ্গি মিলিয়ে আপনার বার্তা আরও শক্তিশালী হয়।
অপ্রয়োজনীয় অঙ্গভঙ্গি বাদ দিন
নার্ভাস হলে অনেকে এক পা থেকে অন্য পায়ে দুলতে থাকেন, আবার কেউ একেবারে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন-দুটোই সমস্যা। চলাফেরা হোক ধীর, পরিকল্পিত ও অর্থবহ। প্রতিটি নতুন পয়েন্টে অবস্থান বদলালে বক্তব্য আরও প্রাঞ্জল হয়।
শুরুতে মনোযোগ আকর্ষণ করুন
'আজ আমি আপনাদের 'ক' বিষয় নিয়ে কথা বলব'-এভাবে শুরু করলে অনেকের মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন। বরং চমকপ্রদ তথ্য, আকর্ষণীয় ঘটনা বা সংক্ষিপ্ত উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু করুন। শেষে বক্তব্যের সারসংক্ষেপ এবং একটি শক্তিশালী বার্তা দিয়ে শেষ করুন, যা শ্রোতারা মনে রাখবে।
ভিডিও দেখুন, নিজেকে আবিষ্কার করুন
নিজের উপস্থাপনার ভিডিও দেখা খুব কার্যকর। এতে বোঝা যায় কোথায় অপ্রয়োজনীয় দোলানো বা চোখের যোগাযোগের ঘাটতি আছে। নিয়মিত অনুশীলন ও রেকর্ডিং আপনাকে একজন আত্মবিশ্বাসী বক্তা হিসেবে গড়ে তুলবে।
মনে রাখুন:
ভালো যোগাযোগ কখনোই নিখুঁত হয় না। কিন্তু প্রতিদিনের অনুশীলন, ক্লাস, মিটিং বা ছোট পরিসরে বক্তব্যের অভিজ্ঞতা আত্মবিশ্বাসকে শক্তিশালী করে। ভ*য় নয়, প্রস্তুতিই আপনাকে একজন স্মরণীয় বক্তায় পরিণত করবে।
ছবি: আজকের পত্রিকা, ইন্টারনেট।
টু-মিনিট রুল : দীর্ঘসূত্রতা দূর করার সহজ টোটকা
আমরা প্রায়ই ছোট ছোট কাজ জমিয়ে রাখি। একটি ই-মেইলের উত্তর দেওয়া, টেবিলটা একটু গুছিয়ে রাখা কিংবা একটা ফোন কল করার ক্ষেত্রেও আলসেমি করি। আমরা ভাবি, 'এ তো মাত্র দুই মিনিটের কাজ, পরে করে নেব।' কিন্তু এই ছোট ছোট কাজগুলোই এক সময় পাহাড় সমান হয়ে আমাদের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করে। এই চক্র ভাঙার সবচেয়ে সহজ অস্ত্র হলো টু-মিনিট রুল।
কী এই টু-মিনিট রুল?
এই নিয়মটি খুব সাধারণ: 'যদি কোনো কাজ করতে দুই মিনিটের কম সময় লাগে, তবে সেটি পরে করার জন্য জমিয়ে না রেখে এখনই করে ফেলুন।' এটি শুনতে খুব সাধারণ মনে হলেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। আমাদের মস্তিষ্কের একটি স্বভাব হলো অসম্পূর্ণ কাজের বোঝা বয়ে বেড়ানো। যখন আমরা দুই মিনিটের কাজগুলো দ্রুত শেষ করে ফেলি, তখন মস্তিষ্ক অনেক বেশি হালকা বোধ করে এবং বড় কাজে মনোযোগ দেওয়া সহজ হয়।
এটি যেভাবে কাজ করে
শুরু করার জড়তা কাটায়:
যেকোনো বড় কাজের সবচেয়ে কঠিন অংশ হলো শুরু করা। এই রুলটি আমাদের মস্তিষ্ককে ফাঁকি দেয়। কাজটা যেহেতু ছোট, তাই মস্তিষ্ক খুব একটা বাধা দেয় না।
মানসিক প্রশান্তি দেয়:
ছোট ছোট কাজ শেষ করার মাধ্যমে আপনি একটি 'Sense of Accomplishment' বা জয়ের অনুভূতি পান, যা আপনাকে বড় কাজে উৎসাহ দেয়।
বিশৃঙ্খলা রোধ করে:
ঘর অগোছালো হওয়া বা ইনবক্সে মেইল জমে যাওয়া মূলত দুই মিনিটের আলস্যের ফল। এই নিয়ম মানলে অগোছালো অবস্থা তৈরিই হয় না।
জেমস ক্লিয়ার-এর সংস্করণ:
নতুন অভ্যাস গড়তে বিখ্যাত লেখক জেমস ক্লিয়ার (Atomic Habits) এই নিয়মটিকে নতুন অভ্যাস গড়ার কাজে ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেন, যেকোনো বড় অভ্যাসকে দুই মিনিটের একটি ছোট সংস্করণে নিয়ে আসুন।
ব্যায়াম করা: দুই মিনিট শরীরচর্চা করুন।
বই পড়া: মাত্র এক পৃষ্ঠা পড়ুন।
লেখালিখি: মাত্র দুই লাইন লিখুন।
উদ্দেশ্য হলো অভ্যাসের 'শুরু' করাটাকে সহজ করা। একবার শুরু করে ফেললে সেটি চালিয়ে যাওয়া অনেক সহজ হয়ে যায়।
ক্যারিয়ার ও দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ
অফিসে:
কোনো ফাইলের ওপর স্বাক্ষর করা, ডেস্কের কাপটা ধুয়ে রাখা, বা ক্যালেন্ডারে একটি মিটিং নোট করা।
বাসায়:
খাওয়ার পর প্লেটটি ধুয়ে রাখা, ময়লাগুলো ডাস্টবিনে ফেলা বা কাপড় গুছিয়ে রাখা।
ব্যক্তিগত:
কাজে কাউকে ধন্যবাদ জানিয়ে মেসেজ দেওয়া বা প্রয়োজনীয় কোনো অ্যাপ আপডেট দেওয়া।
সতর্কতা
টু-মিনিট রুল মানে এই নয় যে সারাদিন শুধু ছোট ছোট কাজই করবেন। এর উদ্দেশ্য হলো বড় কাজের ফাঁকে ছোট ছোট কাজগুলো যাতে আপনার মনোযোগ নষ্ট না করে, তাই সেগুলোকে দ্রুত শেষ করে ফেলা।
লেখা: মো. আশিকুর রহমান