২৫
কাকতালীয় ঘটনা মানে কী?
কোনো রকম যোগসূত্র ছাড়াই অনেক সময় এমন দুই বা ততোধিক ঘটনা ঘটে, যার মধ্যে বিস্ময়কর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। বাংলায় এসব ঘটনাকে চিহ্নিত করা হয় কাকতালীয়।
একদা একদিন একটি কাক তাল গাছের পাশ দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ একটা পাকা তাল ধুপ্ করে মাটিতে পড়ে গেল। মানুষজন ভাবল ওই ব্যাটা কাকই বুঝি তালটা ফেলেছে। আসলে কাকের মত দুর্বল ছোট পাখির পক্ষে এত বড় আর শক্ত বোঁটার ফল নীচে ফেলা শুধু মুশকিলই নয় অসম্ভবও। তালটা পেকে এমনিতেই পড়ে গেছে। কাক ও তালের কাহিনির এরূপ সম্পর্কহীন অথচ দৃশ্যত সম্পর্কযুক্ত ঘটনা থেকেই 'কাকতালীয়' নামের সূত্রপাত।
২৬
হিউম্যান সাইকোলজি-এর কিছু চমৎকার ফ্যাক্ট
১. দেখতে সুন্দর হওয়া মানুষগুলো অন্য মানুষদের কাছে সব থেকে বেশি গ্রহণযোগ্য। কিন্তু আপনার চেহারা দেখতে যদি গড়পরতা হয় তাহলে আপনাকে গড়ের থেকে বেশি কিছু করতে হবে। আর দেখতে একেবারে খারাপ লোকদের মানুষের কাছে গ্রহন যোগ্য হতে অসাধারন কিছু করতে হয়।
কারণ মানুষের মন শারীরিক সৌন্দর্যকে বেশি পছন্দ করে এবং মনের অপরিপক্কতার কারণে কুৎসিত চেহারাকে এড়িয়ে চলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যা গুরুত্বপূর্ণ তা হল অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য এবং সেই প্রজ্ঞা অভিজ্ঞতা যা সময় থেকে পাওয়া যায়।
2. আপনার বান্ধবী/প্রেমিককে ছেড়ে যাওয়া আপনার বন্ধুদের ছেড়ে যাওয়ার চেয়ে অনেক কঠিন বলে মনে হতে পারে।
কারণ রোমান্টিক সম্পর্ক আপনার শরীরে শক্তিশালী ফেরোমোন নিঃসৃতি কে প্ররোচিত করে যা আপনাকে আপনার সঙ্গীর সাথে শক্তিশালী বন্ধন অনুভূতি বিকাশ করতে বাধ্য করে। যার ফলে এই ধরনের সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা আপনার কাছে কঠিন মনে হয়।
৩. আপনি একজন ব্যক্তির প্রতি যত বেশি মনোযোগ দেবেন, সে আপনাকে তত বেশি attitude দেখাবে ।
এর কারণ হল মানুষ যত বেশি মনোযোগ পায়, তাদের মন মনে করে যে তারা খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং সুদর্শন এবং যে ব্যক্তি তার প্রতি মনোযোগ দিচ্ছে সে তার সঙ্গ পাবার জন্য মরিয়া।
৪. অর্থ বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস এবং সুখ জাগিয়ে তোলে। এটি তাদের কাজ করার প্রয়োজনীয়তা বাড়ায়।
এর কারন অর্থ আপনার প্রয়োজনীয়তা খুব সহজে পুরন করতে পারে এবং আপনার মনে আত্মতৃপ্তির জন্ম দিতে পারে।
২৭
ভালো থাকার উপায় কী?
1. মন খুলে হাসুন। হাসলে, আমাদের ব্রেন থেকে ডোপামিন হরমোন নির্গত হয়। যেটা আমাদের ভাল অনুভব করায়।
2. নিজের সাথে অন্যকে তুলনা করা বন্ধ করুন৷
3. কারোর কাছ থেকে কোনো কিছু প্রত্যাশা করবেন না। প্রত্যাশা, হতাশা এনে দেয়। যত কম প্রত্যাশা করবেন, তত সুখী হবেন।
4. আপনি যে অবস্থানেে আছেন তার জন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন।
5. নেতিবাচক লোকদেরকে ইগনোর করুন।
6. বর্তমানে মনোযোগ দেন। অতীত কখনো পরিবর্তন করতে পারবেন না।
7. ব্যর্থতা মেনে নিয়ে, ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যান।
8. প্রকৃতির সাথে সময় কাটান, এটা আপনার মনে প্রশান্তি এনে দিবে।
9. আপনার সাথে ঘটে যাওয়া সবকিছু আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। সুতরাং অপ্রত্যাশিত ঘটনা গুলো মেনে নিন। জীবনের কোন কিছু নিশ্চিত না।
10. নিজেকে যদি ভাল রাখতে চান অন্যের উপর নির্ভরশীল হবেন না।
আঞ্চলিক একটা কথা আছে, তোলা দুধে পোলা বাঁচে না। নিজেকে ভাল রাখার দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে। নইলে, ভাল থাকা আর হয়ে উঠবে না।
২৮
কিছু মানুষের গালেই টোল পড়ে কেন?
এটি মূলত একটি জিনগত ত্রুটি। জন্মের সময় শারীরিক গঠনের একদম শুরুর দিকে সাবকিউটেনাস কানেক্টিভ টিস্যুর পরিবর্তন ঘটে। সেই অর্থে এটি রিসেসিভ জিন নয়।এই একটি ত্রুটিপূর্ণ জিনই গালে 'টোল' এর জন্য দায়ী।
সাবকিউটেনাস কানেক্টিভ(যোজক) টিস্যু--
-যা হাইপোডার্মিস হিসেবে পরিচিত।এটি ত্বকের সবচেয়ে ভিতরের বা নিচের স্তর।
হাইপো(নিচে) +ডার্ম(ত্বক)→হাইপোডার্মিস
-এই স্তর চর্বি ও যোজক টিস্যু দ্বারা গঠিত।
- বৃহৎ রক্তনালী ও স্নায়ুগুলোকে ধারণ করে।
-অন্তরক হিসেবে কাজ করে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
রিসেসিভ জিন(বিরল জিন) হল যে জিন প্রভাবশালী জিনের উপস্থিতিতে প্রকাশিত হয়না।
মূলত হাইপোডার্মিসের সাবকিউটেনাস কানেক্টিভ টিস্যুতে জিনগত ত্রুটির ফলে টোলের সৃষ্টি হয়।যখন একজন ব্যক্তি হাসি দেয় তখন একটি নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়।তখন ত্বকের মাংসপেশিতে টান পড়ে।এই মাংসপেশি হলো জাইগোম্যাটিক মেজর।
⭕কেন টোল পড়ে?
গবেষণায় দেখা গিয়েছে জেনেটিক কারণে হয়।
✔️কোন মা-বাবার কারো একজনের টোল থাকলে সন্তানের থাকার সম্ভাবনা প্রায় ২৫-৫০%। এক্ষেত্রে দুজনের একজনের টোল সৃষ্টিকারী জিন সন্তানের মধ্যে থাকলেই চলবে।
✔️মা-বাবা দুজনের-ই থাকলে সন্তানের থাকার সম্ভাবনা ৫০-১০০%
✔️মা-বাবা কারোর-ই না থাকলে সন্তানের থাকার সম্ভাবনা নেই, যদিনা সে কোন জেনেটিক মিউটেশন শিকার হয়।
তাছাড়াও-
-মুখে অতিরিক্ত চর্বি জমে যাওয়ার কারণেও হতে পারে।
-অনেক শিশুদের ছোটবেলায় চর্বির কারণে টোল দেখা যায়।বয়স বৃদ্ধির সাথে সেই টোল আবার অদৃশ্য হয়ে যায়।
২৯
নিয়মিত পড়ার অভ্যাস কিভাবে আয়ত্ত করা যায়?
যেকোনো অভ্যেস তৈরী করার সময়ে " The 2 Minute Rule" অনুসরণ করতে পারেন।
মানে প্রথম দুই মিনিট আপনাকে নিজের সাথে লড়াই করতে হবে। যেমন ধরুন, আপনি ভাবলেন সকাল বেলা দৌড়াতে যাবেন। কিন্তু ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছে করছে না।
আপনাকে শুধু একটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে, যেটা হলো " The 2 Minute Rule"। মানে ঘুম থেকে উঠে মাত্র 2 মিনিট কষ্ট করে রানিং শ্যু পরে নিতে হবে। একবার জুতো পরে নিলে আর ঘুমোতে ইচ্ছে করবে না।
একই জিনিস বই পড়ার জন্যেও ব্যবহার করতে পারেন। যখনই পড়ার সময় পাবেন, মাত্র দুই মিনিট কষ্ট করে বইটা হাতে নিয়ে খুলে ফেলুন। তারপর পড়ুন। প্রথম প্রথম কষ্ট হবে, পড়তে ইচ্ছে হবে না। বই বন্ধ করে মোবাইল বা কম্পিউটার থেকে ইন্টারনেটে ঢুকতে ইচ্ছে হবে।
কিন্তু নিয়মিত একটু একটু করেও বই পড়তে থাকলে বইয়ের প্রতি একটা ভালোবাসা, একটা ভালোলাগা তৈরী হয়ে যাবে।
এই "The 2 Minute Rule" কিন্তু সিলেবাসের বই হোক বা গল্প উপন্যাসের বই হোক, যেকোনো ক্ষেত্রেই কাজে লাগাতে পারেন।
৩০
"ইট দ্যাট ফ্রগ" বইটি পড়ে আপনি কী শিখেছেন?
অলসতা পরিহার করে কম সময়ে অধিক কাজ করার ২১ টি মূল্যবান পদ্ধতি শিখেছি -
1. সেট দ্যা টেবিল
• জয়ের জন্য যেকোনো ব্যক্তির একটি বৈশিষ্ট্য থাকতে হয়- তা হলো উদ্দ্যশের সুনির্দিষ্টতা- একজন মানুষ কী চায় তার যথাযথ জ্ঞান এবং তা অর্জনে জ্বলন্ত আকাঙ্ক্ষা। - নেপোলিয়ন হিল
2. প্রতিদিনের অগ্রিম প্ল্যান করুন
• পরিকল্পনা হলো ভবিষ্যতকে বর্তমানে নিয়ে আসা যাতে আপনি এখনই কিছু করতে পারেন। - এলান লাকেইন
3. সবকিছুতে ৮০/২০ বিধি প্রয়োগ করুন
• আমাদের সবসময়েই পর্যাপ্ত সময় থাকে যদি আমরা তা চাই এবং সঠিকভাবে ব্যবহার করি। - জোহান উলফগ্যাংগ ভন গ্যোথে
4. পরিণাম বিবেচনা করুন
• প্রতিটি মানুষ মহান হয়ে উঠলো, প্রতিটি সফল মানুষই পেলো সফলতা, আনুপাতিক হারে যতটুকু দিতে পেরেছে, সে তার ক্ষমতা কোনও নির্দিষ্ট চ্যানেলে। - অরিসন সুয়েট মারডেন
5. অবিরাম এবিসিডিই মেথড প্র্যাকটিস করুন
• ফাস্ট ল অব সাকসেস হলো মনোনিবেশ করুন, একীভূত করুন সব। শক্তিকে এক পয়েন্টে এবং যাতে সরাসারি যাওয়া যায় সেই পয়েন্টে, যাতে কোনোদিকে দেখার দরকার হয় না। না ডানে, না বামে। - উইলিয়াম ম্যাথিউস
6. প্রধান গবেষণা ক্ষেত্রগুলো ফোকাস করুন
• যখন প্রতিটি ফিজিক্যাল ও মেন্টাল সম্পদকে ফোকাস করা হয়, কোনও সমস্যা সমাধানে কারও ক্ষমতা বিস্ময়করভাবে অনেকগুণ বৃদ্ধি পায়। - নরমান ভিন্সেন্ট পেইল
7. লো অব ফোর্সড এফিসিয়েন্সি মেনে চলুন
• পূর্ণ মনোযোগ, অকৃত্রিম ও ভেজালমুক্ত আকারে, একটি একক নির্জন বিষয়ে মনোযোগকে ফোকাস করার ক্ষমতা বোঝায়। - কমার
8. শুরু করার আগে একটি পরিপূর্ণ প্রস্তুতি নিন
• আপনার সক্ষমতার মাত্রা কত সেটা কোনও বিষয় নয়। আপনার জীবনে যা কিছুর উন্নয়ন করতে পেরেছেন তা থেকে আপনার সম্ভাবনা অনেক বেশি। - জেমস টি ম্যকরে
9. নিজের হোমওয়ার্ক করুন
• সফলতার একমাত্র নিশ্চিত উপায় হলো, আপনার কাছে প্রত্যাশার চেয়ে অধিক পরিমাণে ও ভালো মানের সার্ভিস প্রদান করা, কাজটি যাই হোক না কেন। - অগ মান্ডিনো
10. আপনার বিশেষ প্রতিভাকে লিভারেজ করুন
• আপনার কাজ করুন। শুধু নিজের কাজ, এর চেয়ে বেশি নয়- তা কিন্তু না। অপব্যয়ের জন্য কিছুটা বেশি- এই কিছুটা বেশি অবশিষ্ট থেকে মূল্যবান। - ডিন ব্রিগস
11. আপনার মুখ্য প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করুন
• আপনার হাতের কাজের উপর সব চিন্তা কেন্দ্রীভূত করুন। যতক্ষণ না ফোকাস করা যায়, সূর্যরশ্নি ততক্ষণ পোড়ায় না। - আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল
12. একবারে এক অয়েল ব্যারেল গ্রহণ করুন
• নিজের মান তুলনামূলকভাবে মাঝামাঝি হলেও যারা তা পূর্ণ ও বিরামহীনভাবে একই সময়ে একই বিষয়ে প্রয়োগ করেন তারা অনেক বেশি করতে পারে। - স্যামূয়েল স্মাইল
13. নিজের উপর চাপ নিন
• সফলতার প্রথম শর্তঃ আপনার শারীরিক ও মানসিক সব শক্তি একটি সমস্যার উপর অক্লান্তভাবে এবং অবিরাম প্রয়োগ করতে থাকুন। - থমাস এডিসন
14. আপনার ব্যক্তিগত ক্ষমতা সর্বোচ্চকরণ
• আপনার সম্পদ জড়ো করুন, মনের সব শক্তি এক করুন, সব শক্তিকে সুবিন্যস্ত করুন, কমপক্ষে একটি ফিল্ডে বিশেষজ্ঞ হতে আপনার সব সামর্থ্যের উপর আলোকপাত করুন। - জন হাগাই
15. নিজেকে অ্যাকশনে মোটিভেট করুন
• বড় এডভেঞ্চার, বিজয় ও সৃজনশীল মনকে যে উচ্ছ্বাসে বাধ্য করে তুলে তা হলো - মানুষের সর্বোচ্চ আনন্দ। - এন্তইন ডি সেইন্ট এক্সুপারি
16. সৃজনশীলভাবে গড়িমসি করা প্র্যাকটিস করুন
• বড় বড় কাজ সম্পন্ন করার জন্য প্রতিদিন সময় করে নিন। প্রতিদিনের কাজের লোডের পরিকল্পনা আগেই করে রাখুন। তুলনামূলকভাবে ছোট ছোট কাজগুলো বাছাই করে নিন যা অবশ্যই তাৎক্ষণিকভাবে সকালেই করতে হবে। তারপর বড় কাজ ধরেন এবং সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তা করতেই থাকুন। - বোর্ডরুম রিপোর্ট
17. সবচেয়ে কঠিন কাজটি আগে করুন
• যত বেশি দিন আমি বেঁচে আছি, তত বেশি আমি নিশ্চিত হচ্ছি যে, দুর্বল ও শক্তিশালীদের মধ্যেও, গুরুত্বপূর্ণ ও গুরুত্বহীন মানুষদের মধ্যে, প্রধান পার্থক্য হলো- এনার্জি-অজেয় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ-একবার নির্ধারণ করা একটি উদ্দেশ্য এবং তারপর মৃত্যু বা জয়লাভ। - স্যার থমাস ফাওয়েল বাক্সটন
18. স্লাইস অ্যান্ড ডাইস দা টাস্ক
• একটি অভ্যাস শুরু করা অদৃশ্য এক থ্রেড এর মত, যতবারই আমরা রিপিট করতে থাকি ততই আমরা একে শক্তিশালী করতে থাকি। এটকে অন্য ফিলামেন্টের সঙ্গে যোগ করুন, যতক্ষণ না তা একটি বড় ক্যাবল হয়ে ওঠে এবং আমাদের চিন্তা ও কাজে নিজেদের অপরিবর্তনীয়ভাবে বেঁধে ফেলে। - অরিসন সুফট মারডেন
19. সময়ের বড় চাঙ্ক তৈরি করুন
• আপনার সব শক্তিকে সীমিত টার্গেটের উপর কেন্দ্রীভূত করলে যে শক্তি পাবেন, জীবনে আর কোনোকিছুতে এর চেয়ে বেশি শক্তি যুক্ত হবে না। - নিডো কুইবেইন
20. জরুরি অবস্থায় সেন্স গড়ে তুলুন
• অপেক্ষা করবেন না। সময় কখনও 'জাস্ট রাইট' হয়ে আসবে না। যেখানে আছেন সেখান থেকেই শুরু করুন এবং যে উপকরণ আপনার নিয়ন্ত্রণে আছে তা দিয়ে কাজ করুন। কাজ চালিয়ে যেতে যেতে ভালো উপকরণ পেয়ে যাবেন। - নেপোলিয়ন হিল
21. প্রতিটি কাজকে সিঙ্গেল হ্যান্ডল করুন
• সত্যিকার পাওয়ার এখানে নিহিত আছে। যেকোনো মুহূর্তে, যেকোনো পয়েন্টে কীভাবে আপনার সম্পদ পরিমিত ব্যবহার করবেন, কেন্দ্রীভূত করবেন তা অবিরাম প্র্যাকটিসের মাধ্যমে শিখতে থাকুন। - জেমস এলেন
৩১
আমি কীভাবে আমার মস্তিষ্ককে আরও তীক্ষ্ণ, স্মার্ট এবং বিদ্যুতকে দ্রুততর করতে পারি?
১। আপনার বিপরীত হাত মাঝে মাঝে ব্যবহার করুন। যেমন আপনি যদি কাজ করার জন্য সবসময় ডান হাত ব্যবহার করেন তবে মাঝে মাঝে বাম হাত করুন। আবার আপনি যদি নিয়মিত কাজের জন্য বাম হাত ব্যবহার করেন তবে মাঝে মাঝে ডান হাত ব্যবহার করুন। আপনি বিপরীত হাতে দাঁত ব্রাশ, বা কাগজে কিছু লাইন লিখতে পারেন।
২। নতুন নতুন কিছু পরার অভ্যাস করুন।
৩। প্রোগ্রামিং আপনার মস্তিষ্ক এর একটি গ্রে স্তরকে বৃদ্ধি করতে পারে। ফলে আপনার মস্তিষ্ক থাকবে তীক্ষ্ণ ও আপনার মন থাকবে সচল। জাবা, পাইথন দিয়ে প্রাথমিকভাবে শুরু করতে পারেন।
৪। আপনার শরীর গঠনের জন্য একটা পরিকল্পনা করেন। ভালো মন সুগঠিত শরীরে বসবাস করে।
৫। টেড টক( TeDTalk) শুনতে ও দেখতে পারেন। এটা চিন্তা করার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
৬। রুবিক কিউব সমাধান করার চেষ্টা করুন এটি আপনার মস্তিষ্ক এর নিউরন কে সজাগ করবে এবং আপনার মস্তিষ্ককের চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি করবে।
৭। পরিমাণ মতো কফি পান করুন কিন্তু বেশি পরিমাণ গ্রহণ করবেন না।
৮। দাবা এর মতো অন্যান্য মস্তিষ্ক বিষয়ক খেলা খেলবেন।
৯। আপনার সকালের নাস্তার মাঝে সবুজ শাকসবজি, শুকনা ফলমূল, ডিম এগুলো গ্রহণ করুন। রাতে দুধ গ্রহণ করুন। আপনার নিয়মিত খাবারের মাঝে ওমেগা ৩, মাছ, নারিকেল, ও জলপায় রাখুন।
১০। প্রতিদিন ৮ গ্লাস এর মতো পানি পান করুন। কিন্তু অতিরিক্ত পানি পান করবেন না। অনেকেই বেশি পরিমাণ পানি পান করাকে ভালো মনে করে কিন্তু একটি ভুল ধারণা । প্রতিদিন কমপক্ষে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমান।
৩২
বিদেশি ভ্রমণকারীর চোখে বাংলা
মধ্যযুগ ও প্রাক-আধুনিক যুগের বাংলা ছিল আমাদের ধারণার চেয়েও অন্যরকম। কীরকম তার বিবরণ পাওয়া যায় সেই সময় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটক ও অভিযাত্রীদের বিবরণে। তাদের ভ্রমণবৃত্তান্তে বাংলার সমাজ, অর্থনীতি, বন্দর, নদীপথ, কৃষি, বাণিজ্য, পোশাক, খাদ্য ও মানুষের জীবনযাত্রার নানা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চিত্র পাওয়া যায়।
মরক্কোর ইবনে বতুতা থেকে শুরু করে চীনের মা হুয়ান, ইতালির ভার্থেমা, পর্তুগালের বারবোসা, ইংল্যান্ডের রালফ ফিচ কিংবা ফ্রান্সের পিরার্দ—বিভিন্ন সময়ের এসব বিদেশি ভ্রমণকারীর চোখে বাংলা ছিল কখনো সমৃদ্ধ বাণিজ্যভূমি, কখনো নদী ও বন্দরের দেশ, আবার কখনো সূক্ষ্ম বস্ত্র ও বিপুল খাদ্যশস্যের এক গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিকারক অঞ্চল।
নিচে চতুর্দশ থেকে সপ্তদশ শতকের শুরু পর্যন্ত বাংলায় আসা ১২ জন বিদেশি ভ্রমণকারী ও তাঁদের গ্রন্থ/ভ্রমণবিবরণের সংক্ষিপ্ত তালিকা করেছি। তবে, সবার বিবরণ সমান প্রত্যক্ষ বা নির্ভরযোগ্য নয়; বিশেষ করে কেউ কেউ নিজে সব জায়গায় না গিয়ে অন্যের কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করেছেন।
১. ইবনে বতুতা — বিখ্যাতদের মধ্যে সবার আগে
মরক্কোর বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা (Ibn Battuta) ১৩৪৬ সালে বাংলায় আসেন। তিনি চট্টগ্রামে পৌঁছে সিলেটের দিকে যান এবং পরে সোনারগাঁওয়ে আসেন। সেখান থেকেই সমুদ্রপথে জাভার উদ্দেশে রওনা হন।
তাঁর Rihla বা ভ্রমণবৃত্তান্তে বাংলার নদীপথ, নৌযাত্রা, বাণিজ্য, কাপড়, চাল, দ্রব্যমূল্য, মানুষের জীবনযাপন এবং সোনারগাঁও সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।
২. ওয়াং দা-ইউয়ান — চীনা বণিক-ভ্রমণকারীর চোখে বাংলা
চীনা ভ্রমণকারী ওয়াং দা-ইউয়ান (Wang Dayuan) ইউয়ান যুগে সমুদ্রপথে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বহু স্থান ভ্রমণ করেন। তাঁর ভ্রমণ ও সংগৃহীত তথ্যের সংকলন Daoyi Zhilüe প্রায় ১৩৪৯ সালের দিকে সম্পূর্ণ হয়।
তাঁর গ্রন্থে বঙ্গ ও বঙ্গোপসাগরীয় বাণিজ্যজগতের উল্লেখ রয়েছে। তবে বাংলায় তাঁর সফরের নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই, তাই তাঁকে ইবনে বতুতার পরের পর্যায়ে রাখাই নিরাপদ।
তাঁর বিবরণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাংলার সঙ্গে চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারত মহাসাগরের সামুদ্রিক বাণিজ্যিক যোগাযোগ বোঝার ক্ষেত্রে।
৩. নিকোলো দে কন্তি — পঞ্চদশ শতকের ইতালীয় বণিক
ইতালীয় বণিক ও পর্যটক নিকোলো দে কন্তি (Niccolò de’ Conti) পঞ্চদশ শতকের প্রথমার্ধে এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ভ্রমণ করেন। প্রায় ১৪২১ সালের দিকে তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে বঙ্গোপসাগরের দিকে এসে বাংলায় প্রবেশ করেন এবং বর্ধমান (Bardhaman) অঞ্চলের উল্লেখ তাঁর ভ্রমণবিবরণে পাওয়া যায়। পরে তিনি স্থলপথে আরাকানের দিকে যান।
তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্ত বাংলার জন্য ইবনে বতুতা বা পরবর্তী মা হুয়ানের মতো বিস্তারিত নয়, তবে পঞ্চদশ শতকের ইউরোপীয় জ্ঞানভাণ্ডারে বঙ্গের উপস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক উৎস।
তাঁর ভ্রমণের বিবরণ তিনি নিজে পূর্ণাঙ্গ বই আকারে প্রকাশ করেননি; পরে Poggio Bracciolini তাঁর কাছ থেকে সংগৃহীত তথ্য লিখিত আকারে সংকলন করেন।
৪. মা হুয়ান — চীনা চোখে পঞ্চদশ শতকের বাংলা
চীনা মুসলিম পর্যটক ও অনুবাদক মা হুয়ান (Ma Huan) ঝেং হে-র সমুদ্রযাত্রার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৪৩২–৩৩ সালের দিকে তিনি বাংলায় আসেন।
তাঁর বিবরণে চট্টগ্রাম, সোনারগাঁও এবং গৌড়/পাণ্ডুয়াসহ বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের ভূগোল, বাণিজ্য, পোশাক, খাদ্য, কৃষি, মুদ্রা, পণ্য ও সামাজিক রীতিনীতি সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায়।
তাঁর বইটির নাম Ying-yai Sheng-lan —যা সাধারণত The Overall Survey of the Ocean’s Shores নামে অনূদিত হয়।
৫. ফেই শিন — ঝেং হে-র অভিযানের আরেক চীনা যাত্রী
ফেই শিন (Fei Xin) ছিলেন মিং চীনের সৈনিক, লেখক ও সমুদ্রযাত্রী। তিনি ঝেং হে-র নেতৃত্বাধীন সমুদ্রযাত্রাগুলোতে অংশ নেন এবং বিভিন্ন দেশের ভূগোল, মানুষ, পণ্য ও রীতিনীতি সম্পর্কে তথ্য লিপিবদ্ধ করেন।
তাঁর বাংলা-বিবরণ সাধারণত ১৪৩৩ সালের ঝেং হে-র সপ্তম সমুদ্রযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁর গ্রন্থে বাংলাকে Bengala নামে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থের নাম Xingcha Shenglan । গ্রন্থটির ভূমিকা ১৪৩৬ সালের। “Xingcha Shenglan”-এর ইংরেজি অনুবাদ সাধারণত The Overall Survey of the Star Raft ধরনের নামে করা হয়।
৬. গং ঝেন — ঝেং হে-র শেষ অভিযানের লেখক
গং ঝেন (Gong Zhen) ছিলেন মিং সাম্রাজ্যের লেখক ও অনুবাদক, যিনি ঝেং হে-র ১৪৩১–১৪৩৩ সালের সপ্তম ও শেষ সমুদ্রযাত্রার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
এই অভিযানের সময় চীনা নৌবহরের বাংলার সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে। গং ঝেন তাঁর গ্রন্থে Bengal-সহ ঝেং হে-র নৌবহরের বিভিন্ন গন্তব্যের বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন। তবে তিনি নিজে চট্টগ্রাম থেকে সোনারগাঁও পর্যন্ত গিয়েছিলেন—এমন প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই; তাই তাঁকে বাংলার প্রত্যক্ষ পর্যটক হিসেবে উপস্থাপন করছি না।
তাঁর গ্রন্থের নাম Xiyang Fanguo Zhi—অর্থাৎ মোটামুটি “পশ্চিম সমুদ্রের বিদেশি দেশগুলোর বিবরণ”। গ্রন্থটি ১৪৩৪ সালে সম্পন্ন হয়।
৭. লুদোভিকো দি ভার্থেমা — গৌড় ও বাংলার বাণিজ্যের বিবরণ
ইতালির বোলোনিয়ার লুদোভিকো দি ভার্থেমা (Ludovico di Varthema) ছিলেন পর্যটক, অভিযাত্রী ও লেখক। তিনি ১৫০২–১৫০৮ সালের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ভ্রমণ করেন।
বাংলায় আসার সময়টি বেশ নির্দিষ্ট। ১৩ মার্চ ১৫০৫ তিনি তেনাসেরিম থেকে ১১ দিনের সমুদ্রযাত্রার পর “Bengala” নামের বন্দরে পৌঁছান। Banglapedia এই স্থানটিকে সাতগাঁও (Saptagram) হিসেবে শনাক্ত করেছে।
তাঁর বইয়ের নাম Itinerario de Ludovico di Varthema Bolognese, সংক্ষেপে Itinerario। মূল ইতালীয় সংস্করণ ১৫১০ সালে রোমে প্রকাশিত হয়।
তাঁর বিবরণে বাংলার তুলা ও রেশমের কাপড়, চিনি, আদা, বাণিজ্য ও ধনী ব্যবসায়ীদের কথা পাওয়া যায়।
৮. দুয়ার্তে বারবোসা — বন্দর ও বাণিজ্যের বাংলা
পর্তুগিজ লেখক ও কর্মকর্তা দুয়ার্তে বারবোসা (Duarte Barbosa, প্রায় ১৪৮০–১৫২১) ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পর্তুগিজ বাণিজ্যিক জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
তাঁর ভ্রমণবিবরণ প্রায় ১৫১৮ সালের দিকে সম্পন্ন হয়। গ্রন্থটিতে বাংলার জন্য “The Kingdom of Bengala” নামে আলাদা অংশ রয়েছে, যেখানে বাংলার বন্দর, বাণিজ্য, পণ্য ও বিশেষ করে বস্ত্রের বিবরণ পাওয়া যায়।
গ্রন্থটির মূল নাম Livro em que dá relação do que viu e ouviu no Oriente Duarte Barbosa, যা ইংরেজিতে The Book of Duarte Barbosa নামে পরিচিত।
১৫১৮ সালটি মূলত গ্রন্থটি সম্পন্ন হওয়ার সময়, বারবোসা ঠিক ওই বছর বাংলায় এসেছিলেন—এমন নির্দিষ্ট প্রমাণ নেই অবশ্য।
৯. চেজারে ফেদেরিচি — সন্দ্বীপের সমৃদ্ধির সাক্ষী
ইতালীয় বণিক চেজারে ফেদেরিচি (Cesare Federici/Frederici) ষোড়শ শতকের একজন গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয় ভ্রমণকারী। তিনি ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যপথে দীর্ঘ সময় ভ্রমণ করেন এবং বাংলাতেও আসেন।
তাঁর বাংলা সফর প্রায় ১৫৬০-এর দশকে, এবং তাঁর বিবরণে সাতগাঁও, চট্টগ্রাম ও বিশেষ করে সন্দ্বীপ (Sondwip)-এর উল্লেখ পাওয়া যায়।
সন্দ্বীপ সম্পর্কে তাঁর মন্তব্যটি বিশেষভাবে বিখ্যাত। তিনি দ্বীপটির উর্বরতা এবং বিপুল ধান উৎপাদনের কথা উল্লেখ করেন। ষোড়শ শতকের বাংলার কৃষি ও সমুদ্রবাণিজ্য বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর বিবরণ তাই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্ত পরবর্তীকালে The Voyage and Travell of M. Caesar Frederick, Merchant of Venice, into the East India and beyond নামে ইংরেজিতে পরিচিত হয়।
১০. ভিনসেন্ট লে ব্লাঁ — ষোড়শ শতকের শেষভাগের ফরাসি পর্যটক
ভিনসেন্ট লে ব্লাঁ (Vincent Le Blanc, ১৫৫৪–প্রায় ১৬৪০) ছিলেন মার্সেইয়ের একজন ফরাসি ভ্রমণকারী।
প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী তিনি প্রায় ১৫৭৫ সালে বাংলায় আসেন। তাঁর বিবরণে চট্টগ্রাম, সাতগাঁও, শ্রীপুর ও চন্দ্রদ্বীপ/বাকলাসহ বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের উল্লেখ রয়েছে।
তাঁর ভ্রমণকাহিনি পরে The World Surveyed: Or, The Famous Voyages & Travailes of Vincent Le Blanc, or White, of Marseilles নামে প্রকাশিত হয়; ১৬৪৮ সালের এই প্রকাশনায় বাংলার জন্য “Of the Kingdom of Bengala, and Ternassery” নামে অধ্যায় রয়েছে।
তাঁর ভ্রমণকাহিনি ভ্রমণের বহু পরে প্রকাশিত এবং এর কিছু বর্ণনার ঐতিহাসিক নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
১১. রালফ ফিচ — ইংরেজ বণিকের চোখে ষোড়শ শতকের বাংলা
রালফ ফিচ (Ralph Fitch, প্রায় ১৫৫০–১৬১১) ছিলেন লন্ডনের ইংরেজ বণিক ও ভ্রমণকারী। ষোড়শ শতকের শেষভাগে ইংরেজ বণিকেরা পূর্বদেশের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যের সম্ভাবনা অনুসন্ধান করছিলেন।
তিনি ১৫৮৫–৮৬ সালের দিকে বাংলায় আসেন। আগ্রা থেকে যমুনা ও গঙ্গা নদীপথে নেমে তিনি তাণ্ডা হয়ে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছান। পরে চট্টগ্রাম, বাকলা, শ্রীপুর, সোনারগাঁও ও সন্দ্বীপ-সহ বাংলার নানা জায়গার বিবরণ দেন।
১৫৮৬ সালের ২৮ নভেম্বর তিনি শ্রীপুর থেকে পেগুর উদ্দেশে বাংলার উপকূল ত্যাগ করেন।
ফিচ নিজে কোনো পূর্ণাঙ্গ ভ্রমণগ্রন্থ লেখেননি। তাঁর ভ্রমণবিবরণ পরে Richard Hakluyt-এর The Principal Navigations, Voyages, Traffiques and Discoveries of the English Nation-এ প্রকাশিত হয়।
১২. ফ্রাঁসোয়া পিরার দ্য লাভাল — ১৬০৭ সালের চট্টগ্রাম
ফরাসি পর্যটক ও নাবিক ফ্রাঁসোয়া পিরার দ্য লাভাল (François Pyrard de Laval, প্রায় ১৫৭৮–১৬২৩) ১৬০১ সালে পূর্বদেশের উদ্দেশে যাত্রা করেন এবং দীর্ঘ সময় ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভ্রমণ করেন।
১৬০৭ সালে তিনি বাংলার চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছান এবং সেখানে প্রায় এক মাস অবস্থান করেন। তিনি স্থানীয় শাসক, খাদ্যদ্রব্যের প্রাচুর্য, চাল, বাণিজ্য ও বন্দরের পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রত্যক্ষ বিবরণ দেন। তাঁর বাংলায় অবস্থানের সময়কাল ও চট্টগ্রাম-বিবরণ বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রেও উল্লেখিত।
তাঁর গ্রন্থের নাম The Voyage of François Pyrard of Laval to the East Indies, the Maldives, the Moluccas, and Brazil। মূল ফরাসি সংস্করণ ১৬১১ সালে প্রকাশিত হয়।
এই পর্যটকরা সেই সময় এসেছিলন যেখন ইউরোপীয় উপনিবেশিক শক্তিগুলো আসতে শুরু করেছে কিন্তু জাঁকিয়ে বসে নি তখনও। এই বারোজনের বরাতে বাংলার বিবরণ আমরা পাই কিন্তু আরও অনেকে এসে থাকেবন, তাদের বর্ণনা হয়ত নেই বা আমাদের জানা নেই।
এই বারো জনের মধ্যে মা হুয়ান ও রালফ ফিচের লেখার অনুবাদ আমরা প্রকাশ করেছি, ইবনে বতুতা'র লেখাটির অনুবাদের প্রথম পর্ব শেয়ার করা হয়েছে।
@boikal
৩৩
হায়দ্রাবাদ প্রিন্সলি স্টেট
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট। পুরো ভারত যখন ব্রিটিশদের তাড়িয়ে স্বাধীনতার আলোয় ভাসছে, তখন ভারতের ঠিক মাঝখানে—একদম পেটের ভেতর—জন্ম নিচ্ছিল এক ভয়ঙ্কর টাইমবোমা। মানচিত্রের সেই বিশাল অংশটির নাম ছিল হায়দ্রাবাদ প্রিন্সলি স্টেট।
চারপাশ থেকে ভারত বেষ্টিত এই রাজ্যটির শাসক ছিলেন ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনী ব্যক্তি, নিজাম মীর উসমান আলী খান। বিশ্ববিখ্যাত ‘জ্যাকব ডায়মন্ড’-কে যিনি পেপারওয়েট হিসেবে ব্যবহার করতেন, তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন, "আমি ভারতেও যাব না, পাকিস্তানেও না। হায়দ্রাবাদ স্বাধীন দেশ হিসেবেই থাকবে।"
ভারতের মানচিত্রের ঠিক মাঝখানে অন্য একটি স্বাধীন, পাকিস্তান-ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্র টিকে থাকা মানেই ছিল দেশের অখণ্ডতা চিরতরে ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়া। শুরু হলো বিংশ শতাব্দীর অন্যতম রোমাঞ্চকর এবং রক্তক্ষয়ী ভূ-রাজনৈতিক দাবার চাল।
১. [ জনসংখ্যার অদ্ভুত সমীকরণ এবং বৈষম্যের সমাজ ]
১৯৪১ সালের সর্বশেষ সরকারি আদমশুমারি অনুযায়ী, হায়দ্রাবাদ রাজ্যের মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ৬৩ লাখ ৪১ হাজার (16.34 million)। এই জনসংখ্যার ধর্মীয় সমীকরণটি ছিল অত্যন্ত নজরকাড়া:
হিন্দু জনসংখ্যা:- প্রায় ৮৫% (১ কোটি ৪০ লাখের বেশি) ।
মুসলিম জনসংখ্যা:- প্রায় ১২% থেকে ১৩% (প্রায় ২১ লাখ)
অন্যান্য ধর্মাবলম্বী (খ্রিস্টান, শিখ, পার্সি, জৈন):- বাকি ২% থেকে ৩%
সংখ্যাগরিষ্ঠতার এই চরম বৈপরীত্যই ছিল রাজ্যের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। কারণ, জনসংখ্যার মাত্র ১২-১৩% হয়েও রাজ্যের সমস্ত অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধা একচ্ছত্রভাবে ভোগ করত মুসলিম শাসক ও অভিজাত শ্রেণি।
প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর ৯০ শতাংশেরও বেশি পদ ছিল মুসলিমদের দখলে। রাজ্যের সিংহভাগ উর্বর জমি ছিল মুসলিম ‘জাগিরদার’ বা জমিদারদের নিয়ন্ত্রণে। এমনকি রাজ্যের প্রধান সরকারি ও শিক্ষার মাধ্যম ছিল উর্দু ভাষা, যা সাধারণ মানুষের মাতৃভাষা (তেলেগু, মারাঠি বা কন্নড়) ছিল না।
অন্যদিকে, ৮৫% হিন্দু জনগোষ্ঠী সর্বক্ষেত্রে চরমভাবে অবহেলিত ও বঞ্চিত ছিল। তারা করের বোঝা টানত, কিন্তু রাজনীতি, প্রশাসন বা রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে তাদের কোনো ভূমিকা বা অধিকার ছিল না। এই তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক অবহেলাই পরবর্তীতে নিজাম-বিরোধী গণআন্দোলনের মূল জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছিল।
২. [ টাইমবোমার সলতে এবং 'রাজাকার' বাহিনীর উত্থান ]
১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর, শনিবার। নিজাম ভারতের সাথে এক বছরের জন্য একটি 'স্থিতাবস্থা চুক্তি' (Standstill Agreement) স্বাক্ষর করেন। কিন্তু পর্দার আড়ালে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হচ্ছিল। নিজামের প্রত্যক্ষ সমর্থনে কাসিম রিজভী নামক এক উগ্রপন্থী নেতার নেতৃত্বে গড়ে ওঠে 'রাজাকার' নামক এক নৃশংস, সশস্ত্র আধাসামরিক বাহিনী, যাদের মূল লক্ষ্য ছিল হিন্দুদের দমন করে মুসলিম আধিপত্য টিকিয়ে রাখা।
১৯৪৮ সালের শুরুর দিকে এই রাজাকাররা হায়দ্রাবাদের হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর পরিকল্পিত দমন-পীড়ন শুরু করে। জিজিয়া করের মতো জোরপূর্বক চাঁদা আদায়, অগ্নিসংযোগ আর লুণ্ঠন ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। এর মধ্যে সবচেয়ে নির্মম ট্র্যাজেডিটি ঘটে ১৯৪৮ সালের ৯ মে, রবিবার।
কর্ণাটক সীমান্তের গোরাতা গ্রামে ভারতের জাতীয় পতাকা ওড়ানোর অপরাধে রাজাকাররা পুরো গ্রামে হামলা চালায়। তারা সারবিধানভাবে দাঁড় করিয়ে ২০০ জনেরও বেশি হিন্দু গ্রামবাসীকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করে।
ঘটনার এক সপ্তাহ পর, ১৭ মে, ১৯৪৮, সোমবার জওহরলাল নেহরুর ক্যাবিনেট মন্ত্রী কে. এম. মুন্সী (K. M. Munshi) সশরীরে ওই গ্রামে গিয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শত শত গলিত লাশ ও পোড়া বাড়িঘর দেখতে পান, যা তিনি পরবর্তীতে তাঁর ‘End of an Era’ বইতে নথিভুক্ত করেন।
এই চরম অরাজকতার মুখে জীবন বাঁচাতে প্রায় ৪,০০,০০০ (চার লাখ) হিন্দু শরণার্থী হিসেবে ভারতের বোম্বে, মাদ্রাজ ও মহীশূরে পালিয়ে যান। দিল্লির দরবারে বসে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল বুঝতে পেরেছিলেন—হায়দ্রাবাদ এখন ভারতের বুকে এক 'ক্যান্সার', যার একমাত্র চিকিৎসা সামরিক অপারেশন।
৩. [ ১৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৮ (সোমবার): শুরু হলো ‘অপারেশন পলো’ ]
১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যুর ঠিক পর পরই ভারত অ্যাকশনে নামার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৪৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর, সোমবার ভোররাত ৪টা।
ভারতের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার প্যাটেলের নির্দেশে শুরু হলো ইতিহাসের অন্যতম দ্রুততম সামরিক অভিযান—"অপারেশন পলো"। হায়দ্রাবাদে সে সময় প্রচুর পোলো খেলার মাঠ ছিল বলেই এই অভিযানের কোডনেম রাখা হয়েছিল 'পলো'।
মেজর জেনারেল জয়ন্ত নাথ চৌধুরীর নেতৃত্বে ভারতীয় সেনাবাহিনী বোম্বে ও মাদ্রাজ—দুই দিক থেকে চতুর্দিক দিয়ে হায়দ্রাবাদে প্রবেশ করে। একদিকে অত্যাধুনিক ট্যাংক ও ভারী অস্ত্রে সজ্জিত ভারতীয় সেনা, অন্যদিকে নিজামের ২০ হাজার নিয়মিত সেনা এবং লাঠিসোঁটা-পুরোনো বন্দুকধারী ২ লাখেরও বেশি উগ্র রাজাকার দল। যুদ্ধ স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ১০৯ ঘণ্টা।
৪. [ ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৮ (শুক্রবার): নিজামের পতন ও রক্তের হোলিখেলা ]
১৯৪৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার বিকেল ৫টা। রেডিওতে নিজাম মীর উসমান আলী খান তাঁর বাহিনীর যুদ্ধবিরতি এবং আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেন। পাঁচ দিনের এই সংক্ষিপ্ত যুদ্ধে সরকারি হিসাবমতে ভারতের ৩২ জন সেনা এবং নিজাম বাহিনীর প্রায় ১,৩০০ থেকে ২,০০০ সদস্য নিহত হয়।
কিন্তু আসল ট্র্যাজেডি শুরু হয় আত্মসমর্পণের পর। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, রাজনৈতিক বৈষম্য এবং রাজাকারদের অত্যাচারের প্রতিশোধ নিতে স্থানীয় উগ্র জনতা সাধারণ ও নিরীহ মুসলিমদের ওপর পাল্টা সাম্প্রদায়িক হামলা শুরু করে।
ভারতের সরকারি 'পণ্ডিত সুন্দরলাল কমিটি'-র তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী (যা দীর্ঘ কয়েক দশক গোপন রাখার পর ২০১৩ সালে জনসমক্ষে আসে), অপারেশন পলো-র পরবর্তী কয়েক সপ্তাহের সহিংসতায় কমপক্ষে ২৭,০০০ থেকে ৪০,০০০ বেসামরিক মুসলিম নির্মমভাবে প্রাণ হারান। কোনো কোনো আন্তর্জাতিক ঐতিহাসিকের মতে এই সংখ্যা ছিল ১ থেকে ২ লাখের কাছাকাছি।
এক রাতের ব্যবধানে ক্ষমতার ভারসাম্য সম্পূর্ণ উল্টে যায়। এতকাল যে মুসলিমরা সমস্ত সুবিধা পেত, তারা চরম সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে।
সরকারি চাকরি থেকে হাজার হাজার মুসলিমকে বরখাস্ত করা হয়, 'জাগিরদারি প্রথা বিলোপ'-এর মাধ্যমে মুসলিম জমিদারদের বিশাল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। প্রাণভয়ে লাখ লাখ মুসলিম তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান এবং যুক্তরাজ্যে চলে যেতে বাধ্য হন।
৫.[ মানচিত্রের ব্যবচ্ছেদ এবং আজকের 'সাইবারাবাদ' ]
ভারতভুক্তির পর, ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি ভারতের মানচিত্র নতুন করে লেখা হয়। ১৯৫৬ সালের ১ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার, রাজ্য পুনর্গঠন আইনের মাধ্যমে মূল হায়দ্রাবাদ রাজ্যটিকে ভাষার ভিত্তিতে তিন টুকরো করে প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর সাথে বিলীন করে দেওয়া হয়।
এর মারাঠিভাষী অঞ্চল মহারাষ্ট্রে, কন্নড়ভাষী অঞ্চল কর্ণাটকে এবং তেলেগুভাষী অঞ্চল অন্ধ্র প্রদেশের সাথে যুক্ত হয়। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে অন্ধ্র প্রদেশ ভেঙে গঠিত হয় নতুন রাজ্য তেলেঙ্গানা।
আজকের দিনে সেই বিশাল হায়দ্রাবাদ রাজ্যটি মানচিত্রে নেই। কিন্তু তার প্রাচীন রাজধানী—চারমিনার আর নিজামী বিরিয়ানির শহর হায়দ্রাবাদ আজ বর্তমান ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যের রাজধানী।
ইতিহাসের সেই রক্তক্ষয়ী অধ্যায়কে পেছনে ফেলে এটি আজ বিশ্বের অন্যতম প্রধান আইটি হাব (IT Hub) বা 'সাইবারাবাদ'। অতীতের বুলেট আর বৈষম্যের দাগ মুছে ফেলে হায়দ্রাবাদ আজ আধুনিক প্রযুক্তি, শিক্ষা এবং অর্থনীতির এক অপ্রতিরোধ্য পাওয়ারহাউস। @ Tong Daing Ne
৩৪
চট্টগ্রামের ইতিহাস
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে এমন কিছু ঘটনার সন্ধান মেলে, যা কোনো রোমাঞ্চকর সিনেমাকেও হার মানায়। আজ থেকে প্রায় ৫০০ বছর আগে, ১৫৩২ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই অক্টোবর বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে ধেয়ে এসেছিল তেমনই এক প্রলয়ংকরী সামরিক ঝড়। যার আকস্মিক আঘাতে ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল স্বাধীন বাংলা রাজ্যের প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র—সমতল চট্টগ্রামের ইতিহাস।
০১. [ পটভূমি: বাংলার মহাসংকট ও এক চতুর রাজার নিখুঁত 'টাইমিং' ] :-
১৬শ শতাব্দীতে আজকের মতো রাজনৈতিক মানচিত্র ছিল না। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল তথা পার্বত্য চট্টগ্রাম তখন ত্রিপুরা রাজ্য ও স্থানীয় আদিবাসী রাজাদের স্বায়ত্তশাসনে সম্পূর্ণ আলাদা একটি স্বাধীন ভূখণ্ড ছিল। আর সমুদ্র উপকূলবর্তী সমতল চট্টগ্রাম ছিল স্বাধীন বাংলা রাজ্যের (বেঙ্গল সালতানাত) সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী সমুদ্রবন্দর।
সে সময় বাংলার হোসেন শাহী রাজবংশের শেষ সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে আফগান বীর শেরশাহ সুরির অনবরত আক্রমণ ঠেকাতে বাংলার মূল সেনাবাহিনী তখন ব্যস্ত ছিল।
সমতল চট্টগ্রামের এই অরক্ষিত ও প্রতিরক্ষাহীন অবস্থার মোক্ষম সুযোগটিই লুফে নেন আরাকানের (বর্তমান মিয়ানমার) ম্রাউক-ইউ সাম্রাজ্যের সিংহাসনে সদ্য বসা অত্যন্ত চতুর ও যুদ্ধবাজ রাজা মিন বিন। তিনি জানতেন, চাটগাঁর বন্দর কব্জা করতে পারলে পুরো পূর্ব ভারতের বাণিজ্যের চাবিকাঠি তাঁর মুঠোয় চলে আসবে।
০২. [ আন্তর্জাতিক ভাড়াটে সৈন্য, আধুনিক কামান ও ঝটিকা আক্রমণ ] :-
১৫৩২ সালের সেই কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে সমতল চট্টগ্রামের প্রহরীরা সাগরের দিগন্তে হঠাৎ এক বিশাল কালো ছায়া দেখতে পান। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পরিষ্কার হয়ে ওঠে দৃশ্যটি—১২,০০০ ধুরন্ধর পদাতিক সৈন্য এবং পর্তুগিজ ভাড়াটে গোলন্দাজদের এক ভয়ঙ্কর যৌথ নৌবহর নিয়ে হাজির স্বয়ং রাজা মিন বিন!
বাংলার সুলতানি বাহিনী এই আকস্মিক ও অতর্কিত হামলার জন্য বিন্দুমাত্র প্রস্তুত ছিল না। মিন বিনের এই অভিযানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল পর্তুগিজদের সরবরাহ করা আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও উন্নত যুদ্ধজাহাজ।
কোনো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ নয়, কোনো মাসের পর মাস চলা অবরোধ নয়; মিন বিনের রণকৌশল ছিল একটাই—তীব্র গতি ও চরম বিধ্বংসী আঘাত।
পর্তুগিজদের আধুনিক কামানের গোলার আঘাতে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে থাকে সুলতানি বাহিনীর প্রতিরোধ। মাত্র কয়েক দিনের এক বিধ্বংসী ঝড়ে পতন ঘটে অজেয় সমতল চট্টগ্রাম দুর্গের। বাংলার বুক চিরে উধাও হয়ে যায় সুলতানের নিয়ন্ত্রণ, উড়ে যায় আরাকানিদের বিজয়ী পতাকা।
০৩. [ বৌদ্ধ রাজা যখন সেজেছিলেন 'সুলতান': মুদ্রার রাজনীতি ] :-
সমতল চট্টগ্রাম ও তার আশেপাশের মুসলিম প্রজাদের অসন্তোষ দমন করতে এবং সদ্য বিজিত অঞ্চলের ওপর নিজের শাসনকে সামাজিকভাবে বৈধতা দিতে রাজা মিন বিন এক অবিশ্বাস্য রাজনৈতিক চাল চালেন।
তিনি ছিলেন একজন কট্টর বৌদ্ধ রাজা, কিন্তু সমতল চাটগাঁয় নিজের প্রভাব ধরে রাখতে তিনি নিজের নামে যে রাজকীয় মুদ্রা (Coins) চালু করেন, সেখানে নিজেকে ঘোষণা করেন 'সুলতান জাবুক শাহ' (Zabuk Shah) নামে! একজন বৌদ্ধ রাজার মুদ্রায় মুসলিম সুলতানের নাম ও উপাধি খোদাই করার এই চতুর ঘটনা ইতিহাসে এক বিরল রাজনৈতিক প্রজ্ঞার দৃষ্টান্ত।
এই অবিশ্বাস্য ও ক্ষিপ্রতম বিজয়ের স্মৃতিকে আন্তর্জাতিকভাবে অমর করে রাখতে রাজা মিন বিন তাঁর রাজধানী ম্রাউক-ইউ-তে তৈরি করেন বিখ্যাত 'শিথাউং মন্দির' (Shitthaung Temple) বা ৮০,০০০ বুদ্ধমূর্তির মন্দির, যা আজও সেই ঝটিকা অভিযানের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আজকের ব্যস্ত ও অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি চট্টগ্রাম বন্দরের দিকে তাকালে কি বিশ্বাস হয়, আজ থেকে প্রায় ৫০০ বছর আগে আন্তর্জাতিক শক্তির খেলায় মাত্র কয়েকটা দিনে এই মাটির ভাগ্য লিখে দিয়েছিলেন আরাকানের এক দূরদর্শী রাজা? @ Tong Daing Ne
৩৫
থাইল্যান্ডের গ্রামীণ এলাকার মাহুত
চোখ বন্ধ করে একবার ভাবুন তো, আপনার চোখের সামনে থেকে আপনার পরিবারের সবচেয়ে প্রিয় সদস্যটিকে কেউ জোর করে অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে। আপনার বুকে তখন যে তীব্র হাহাকার আর আগুন জ্বলবে, ঠিক সেই আগুন বুকে নিয়ে এক থাই যুবক একা লড়ে গিয়েছিল পুরো পৃথিবীর অপরাধ জগতের বিরুদ্ধে।
আমাদের কাছে যা স্রেফ চার-পাঁচ টনের একটা বিশাল বন্য প্রাণী, থাইল্যান্ডের মানুষের কাছে তা হলো তাদের ঘরের সন্তান, তাদের রক্ষাকর্তা এবং তাদের হাজার বছরের পবিত্রতার প্রতীক। থাই সংস্কৃতির এই পরম শ্রদ্ধার গল্পটি কোনো রূপকথা নয়, বরং এটি এমন এক আত্মিক টান যাকে রূপালী পর্দায় রক্তের অক্ষরে ফুটিয়ে তুলেছেন বিশ্বখ্যাত অ্যাকশন লেজেন্ড টনি জা (Tony Jaa)।
[ ০১. ইতিহাসের পাতা থেকে ধর্মের পবিত্রতায় হাতির সিংহাসন ] -
থাইল্যান্ডের বুকে হাতির প্রতি এই ভালোবাসার শিকড় আজ থেকে শত শত বছর গভীরে প্রোথিত। বৌদ্ধ পুরাণ অনুযায়ী, গৌতম বুদ্ধের জন্মের ঠিক আগে তাঁর মা রানী মায়া স্বপ্নে একটি পবিত্র সাদা হাতি দেখেছিলেন, যা ছিল বিশুদ্ধতা এবং অলৌকিক সৌভাগ্যের প্রতীক। শুধু ধর্মগ্রন্থেই নয়, থাই জাতির অস্তিত্ব রক্ষার ইতিহাসেও হাতি জড়িয়ে আছে অবিচ্ছেদ্যভাবে।
১৮৫৫ সালের ৫ এপ্রিল তৎকালীন শ্যাম দেশ (বর্তমান থাইল্যান্ড) তাদের জাতীয় পতাকা উন্মোচন করে, যার ঠিক মাঝখানে সগর্বে স্থান পেয়েছিল একটি সাদা হাতির ছবি। প্রাচীনকালে যখনই বার্মিজ শত্রুরা থাইল্যান্ড আক্রমণ করত, থাই রাজারা এই হাতির পিঠে চড়েই যুদ্ধক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। থাইরা তাদের হাতিকে বলত "মোবাইল দুর্গ"—যে নিজের বুক পেতে দিয়ে বাঁচাত দেশের স্বাধীনতা। তাই থাইল্যান্ডে হাতি কোনো খাঁচায় বন্দি রাখার জীব নয়, সে দেশের প্রথম জাতীয় বীর।
[ ০২. সাষ্টাঙ্গে প্রণতি: যেভাবে এক জীবন্ত দেবতাকে সম্মান জানায় থাইল্যান্ড ] :-
থাই সংস্কৃতির সবচেয়ে অশ্রুসজল অধ্যায় হলো হাতির প্রতি তাদের নিবেদিত সম্মান। এটি কোনো কৃত্রিম আচার নয়, বরং এক পরম আধ্যাত্মিক সংযোগ। থাইরা যখনই কোনো হাতির সামনে যায়, তারা তাদের ঐতিহ্যবাহী 'ওয়াই' (Wai) প্রথায় দুই হাত জোড় করে হাতির শুঁড়ের কাছে মাথা নত করে প্রণাম জানায়।
থাইল্যান্ডের গ্রামীণ এলাকায়, বিশেষ করে মাহুত (হাতি পালনকারী) পরিবারগুলোতে কোনো শুভ কাজের আগে বা দূর যাত্রায় যাওয়ার সময় হাতির সামনের বিশাল পায়ের নিচে নিজের মাথা ঠেকিয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করা হয়। তারা বিশ্বাস করে, এই পবিত্র পায়ের স্পর্শ তাদের সমস্ত পাপ এবং দুর্ভাগ্য দূর করে দেয়।
প্রতি বছর ১৩ মার্চ থাইল্যান্ডে সাড়ম্বরে 'জাতীয় হাতি দিবস' (National Elephant Day) পালন করা হয়, যেখানে হাতিদের জন্য রাজকীয় ভোজের আয়োজন করা হয়। এমনকি ২০১৯ সালের মে মাসে থাইল্যান্ডের রাজা মহা ভাজিরালংকর্নের রাজ্যাভিষেকের সময় ১০টি পবিত্র হাতিকে রাজকীয় পোশাকে সাজিয়ে রাজপ্রাসাদের সামনে আনা হয়েছিল, যেখানে হাতিরা স্বয়ং রাজার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে শুঁড় তুলে রাজকীয় কায়দায় প্রণাম জানিয়েছিল।
[ ০৩. যখন সিনেমা আর বাস্তব জীবনের আবেগ এক হয়ে যায় ] :-
থাই মানুষের এই নিঃশর্ত ভালোবাসাকে বিশ্বমঞ্চে যিনি সবচেয়ে শক্তিশালীভাবে তুলে ধরেছেন, তিনি আর কেউ নন—টনি জা। ২০০৩ সালের ২১ জানুয়ারি যখন তাঁর বিখ্যাত সিনেমা 'ওং বাক' (Ong-Bak: The Thai Warrior) মুক্তি পায়, তখন বিশ্ববাসী প্রথম দেখেছিল থাই সংস্কৃতির আধ্যাত্মিক গভীরতা ।
কিন্তু হাতির প্রতি থাইদের আসল বুকফাটা আর্তনাদ দুনিয়া প্রত্যক্ষ করেছিল ২০০৫ সালের ১১ আগস্ট, যেদিন মুক্তি পেয়েছিল তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আবেগঘন সিনেমা 'টম-ইয়াম-গুং' (Tom-Yum-Goong / The Protector) ।
সিনেমাটির সেই দৃশ্যটি কি আপনার মনে আছে? আন্তর্জাতিক চোরাকারবারীরা যখন খাম (টনি জা)-এর গ্রাম থেকে তার প্রাণের চেয়ে প্রিয় হাতি 'পো ইয়াই' এবং তার সন্তান 'কোন'-কে চুরি করে সিডনিতে পাচার করে দেয়, তখন খামের প্রতিটি কিক আর পাঞ্চের পেছনে কাজ করেছিল এক আদিম ক্ষোভ ।
সিডনির একটি বিলাসবহুল রেস্তোরাঁয় যখন খাম আবিষ্কার করে যে তার পবিত্র হাতিকে হত্যা করে হাড় দিয়ে ড্রাগন মূর্তি বানানো হয়েছে, তখন সে ওই হাড়ের কঙ্কালের সামনে গিয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিল এবং পরম শ্রদ্ধায় দুই হাত জোড় করে মৃত হাতির পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে প্রণাম জানিয়েছিল ।
এই আবেগটি এত নিখুঁত হওয়ার কারণ ছিল বাস্তবমুখী—টনি জা নিজে থাইল্যান্ডের 'সুরিন' অঞ্চলের এক ঐতিহ্যবাহী কুয়াই (Kui) মাহুত পরিবারে হাতিদের সাথে খেলাধুলা করে বড় হয়েছেন । তাই পর্দার সেই হাহাকার কোনো অভিনয় ছিল না, ওটা ছিল একজন আসল থাই সন্তানের নিজের ভাইয়ের জন্য কান্না।
[ ০৪. মার্শাল আর্টের গুরু যখন চার পায়ের এক প্রাণী ] :-
থাই মানুষ একটি পশুকে কতটা উচ্চতায় স্থান দিতে পারে, তার সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক ও শারীরিক প্রমাণ মেলে টনি জা-এর নিজস্ব যুদ্ধকৌশলে। ২০০৮ সালের ৪ ডিসেম্বর যখন 'ওং বাক ২' (Ong Bak 2) থাইল্যান্ডের সিনেমা হলগুলোতে ঝড় তোলে, তখন বিশ্ববাসী এক নতুন ধারার মার্শাল আর্টের প্রেমে পড়ে ।
এই সিনেমায় টনি জা ব্যবহার করেছিলেন তাঁর নিজস্ব উদ্ভাবিত যুদ্ধশৈলী—'মুয়াই কোতচাসান' (Muay Kotchasan), যার আভিধানিক অর্থ 'এলিফ্যান্ট বক্সিং' । এই যুদ্ধবিদ্যার প্রতিটি ডিফেন্স, প্রতিটি হাড়ভাঙা কাউন্টার-অ্যাটাক এবং শারীরিক ভারসাম্য তৈরি হয়েছে হাতির শুঁড়ের মার, তার পায়ের অমানুষিক চাপ এবং তার গম্ভীর আক্রমণের ভঙ্গি থেকে ।
মানুষ যেখানে অন্য মানুষকে গুরু মানে, সেখানে থাই warriors-রা একটি প্রাণীকে গুরু মেনে তার সুরক্ষায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে।
[ ০৫. শেষের কবিতা: হাতির চোখেই বাঁচে থাইল্যান্ডের আত্মা ] :-
আজকের আধুনিক যুগেও থাইল্যান্ডের মানুষ তাদের এই ঐতিহ্যকে ভুলে যায়নি। আজও যদি দেশটির কোনো প্রত্যন্ত জঙ্গলে একটি সাদা হাতির সন্ধান মেলে, থাই আইন অনুযায়ী তাকে সরাসরি রাজপরিবারের মর্যাদা দিয়ে রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে রাখা হয়। 'ওং বাক' কিংবা 'টম-ইয়াম-গুং' শুধু হাড় ভাঙার কিংবা চোখ ধাঁধানো স্টান্টের সিনেমা নয়; এগুলো হলো থাইল্যান্ডের হাজার বছরের সংস্কৃতির এক একটা জীবন্ত দলিল ।
এই সিনেমাগুলো আমাদের শেখায় যে, শ্রদ্ধা যখন রক্তের সম্পর্ককে ছাড়িয়ে যায়, তখন একটি পশুর সম্মান আর তার পায়ের ধুলো বাঁচাতে একটা ছেলেও পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে একা দাঁড়িয়ে যেতে পারে। হাতি থাইল্যান্ডের অহংকার, তাদের ইতিহাস এবং তাদের চূর্ণ না হওয়া এক পবিত্র আত্মা। @ Tong Daing Ne
৩৬
হিপারকাসের নক্ষত্র তালিকা
খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে, যখন পৃথিবীতে টেলিস্কোপের কোনো অস্তিত্বই ছিল না, তখন একজন মানুষ খালি চোখে রাতের আকাশ দেখে নক্ষত্রের অবস্থান মাপছিলেন। শুধু দেখে থেমে থাকেননি, তিনি চেয়েছিলেন আকাশকে সংখ্যায় ধরে রাখতে। কোন নক্ষত্র কোথায় আছে, কতটা উজ্জ্বল, আর সময়ের সঙ্গে তার অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তৈরি হয়েছিল প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নক্ষত্র তালিকা। আর এই কাজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রিক জ্যোতির্বিদ হিপারকাসের নাম।
হিপারকাসের নক্ষত্র তালিকা আজ আর সম্পূর্ণ অবস্থায় আমাদের হাতে নেই। মূল পাণ্ডুলিপিও হারিয়ে গেছে। তবু প্রায় দুই হাজার বছর পর তার কিছু অংশের সন্ধান পাওয়া গেছে, আর তাতেই বোঝা গেছে প্রাচীন এই জ্যোতির্বিদের পর্যবেক্ষণ কতটা নিখুঁত ছিল।
হিপারকাসের জন্ম আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৯০ সালে বর্তমান তুরস্কের নাইসিয়ায়। তাঁর জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক কাজের বড় অংশ রোডস দ্বীপকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব ১৪৭ থেকে ১২৭ সালের সময়কালে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণগুলো সম্পন্ন হয় বলে সাধারণভাবে মনে করা হয়।
তাঁর নক্ষত্র তালিকায় প্রায় ৮৫০টি নক্ষত্র ছিল বলে ধারণা করা হয়। কিছু গবেষণায় সংখ্যাটি এক হাজারের কাছাকাছি হতে পারে বলেও আলোচনা রয়েছে। প্রতিটি নক্ষত্রকে শুধু নাম দিয়ে চিহ্নিত করা হয়নি। আকাশে তার অবস্থানও পরিমাপ করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
আর এখানেই হিপারকাসের কাজের বিশেষত্ব। তিনি নক্ষত্রের অবস্থান নির্ধারণে এমন একটি স্থানাঙ্ক পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন, যার সঙ্গে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের পরিচিত ব্যবস্থা ডান উত্থান ও ক্রান্তির মিল রয়েছে। অর্থাৎ আকাশকে তিনি কেবল একটি দৃশ্য হিসেবে দেখেননি, বরং একটি পরিমাপযোগ্য মানচিত্র হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন।
নক্ষত্রের উজ্জ্বলতাও তিনি শ্রেণিবদ্ধ করেছিলেন। সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলো ছিল প্রথম মাত্রায়, আর খালি চোখে দেখা যায় এমন তুলনামূলক ম্লান নক্ষত্রগুলো ষষ্ঠ মাত্রায়। আজকের জ্যোতির্বিজ্ঞানে উজ্জ্বলতা মাপার পদ্ধতি অনেক বেশি সূক্ষ্ম এবং সংখ্যাগতভাবে নির্দিষ্ট। তবে নক্ষত্রকে মাত্রা অনুযায়ী ভাগ করার সেই প্রাচীন ধারণার ধারাবাহিকতা এখনও টিকে আছে।
হিপারকাসের কাজের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল। আকাশের নক্ষত্রগুলো কি চিরকাল একই রকম থাকে?
প্লিনি দ্য এল্ডারের বর্ণনায় জানা যায়, হিপারকাস একটি নতুন নক্ষত্র দেখতে পেয়েছিলেন বলে কথিত আছে। ঘটনাটি তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। যদি একটি নতুন নক্ষত্র দেখা দিতে পারে, তাহলে নক্ষত্র কি জন্মায় বা হারিয়েও যেতে পারে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পুরোনো পর্যবেক্ষণের সঙ্গে নতুন পর্যবেক্ষণ তুলনা করা প্রয়োজন ছিল। আর সেখান থেকেই নক্ষত্রের অবস্থান নথিবদ্ধ করার প্রয়োজন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে হিপারকাসের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার সম্ভবত নক্ষত্রের জন্ম বা মৃত্যুকে ঘিরে ছিল না। তিনি লক্ষ্য করেন, দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে নক্ষত্রগুলোর অবস্থান এবং বিষুববিন্দুর সম্পর্ক বদলে যাচ্ছে। এর কারণ ছিল পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষের ধীর পরিবর্তন। এ ঘটনাকেই বলা হয় অয়নচলন।
পৃথিবীর অক্ষ একটি নিখুঁত স্থির দিক ধরে থাকে না। অনেকটা ঘূর্ণায়মান লাটিমের অক্ষের ধীর দুলুনির মতো, পৃথিবীর অক্ষও দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে দিক পরিবর্তন করে। ফলে আকাশে নক্ষত্রগুলোর অবস্থান একই থাকলেও তাদের স্থানাঙ্কের সঙ্গে বিষুববিন্দুর সম্পর্ক ধীরে ধীরে বদলায়।
হিপারকাস এই পরিবর্তনের হার আনুমানিক এক ডিগ্রি প্রতি শতাব্দী হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন। আধুনিক হিসাবের তুলনায় এটি পুরোপুরি নিখুঁত নয়, কিন্তু সেই সময়ের প্রযুক্তি ও পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির কথা বিবেচনা করলে এর নির্ভুলতা অসাধারণ।
হিপারকাসের মূল নক্ষত্র তালিকা পরে হারিয়ে যায়। তাঁর কাজের বড় অংশ সম্পর্কে আমরা জানতে পারি পরবর্তী জ্যোতির্বিদদের লেখার মাধ্যমে। বিশেষ করে টলেমির আলমাজেস্ট এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
টলেমি দ্বিতীয় শতকে একটি বড় নক্ষত্র তালিকা তৈরি করেন, যেখানে এক হাজারের বেশি নক্ষত্র ছিল। দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রশ্ন নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক ছিল। টলেমি কতটা নিজের পর্যবেক্ষণ ব্যবহার করেছিলেন এবং কতটা হিপারকাসের আগের তথ্যের ওপর নির্ভর করেছিলেন?
এই বিতর্কে ২০২২ সালে নতুন একটি সূত্র গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেন্ট ক্যাথরিন মঠে সংরক্ষিত একটি পুরোনো পাণ্ডুলিপি, যাকে কোডেক্স ক্লাইম্যাসি রিস্ক্রিপটাস বলা হয়, বহুস্তরীয় চিত্রগ্রহণ প্রযুক্তির মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়। পাণ্ডুলিপিটির ওপরের লেখা সরিয়ে দেওয়ার পর নিচে থাকা পুরোনো লেখার কিছু অংশ দৃশ্যমান হয়। সেখানে হিপারকাসের নক্ষত্র তালিকার বলে মনে করা কিছু তথ্য পাওয়া যায়।
এর মধ্যে করোনা বোরিয়ালিস বা মুকুট আকৃতির নক্ষত্রপুঞ্জের নক্ষত্রগুলোর স্থানাঙ্ক ছিল। গবেষণায় দেখা যায়, সেগুলো আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১২৯ সালের আকাশের সঙ্গে বেশ ভালোভাবে মিলে যায়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব স্থানাঙ্ক টলেমির দেওয়া তথ্যের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে বেশি নির্ভুল বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। এর ফলে হিপারকাসের পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি এবং টলেমির সঙ্গে তাঁর কাজের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে গবেষণার সুযোগ তৈরি হয়।
আজ আমরা নক্ষত্রের অবস্থান মাপতে অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ, ক্যামেরা এবং মহাকাশযান ব্যবহার করি। হিপারকাসের কাছে এসবের কিছুই ছিল না। তিনি কী ধরনের যন্ত্র ব্যবহার করতেন, তার সবটা আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না। তবে আর্মিলারি স্ফিয়ারসহ বিভিন্ন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। সেই যন্ত্রের সাহায্যে আকাশের নির্দিষ্ট বিন্দুর সঙ্গে নক্ষত্রের অবস্থান তুলনা করা সম্ভব ছিল।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাঁর পদ্ধতি। একটি নক্ষত্রকে একবার দেখে তার অবস্থান মনে রাখার বদলে তিনি পরিমাপ, নথিবদ্ধকরণ এবং পুরোনো তথ্যের সঙ্গে তুলনার ওপর জোর দিয়েছিলেন। বিজ্ঞান এগোয় মূলত এভাবেই। একটি পর্যবেক্ষণ তখনই শক্তিশালী হয়ে ওঠে, যখন সেটিকে অন্য পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়।
হিপারকাসের নক্ষত্র তালিকা হারিয়ে গেলেও তাঁর কাজের প্রভাব হারায়নি। টলেমির জ্যোতির্বিদ্যায় তার ছাপ ছিল। পরবর্তী সময়ে ইসলামি বিশ্বের জ্যোতির্বিদরা গ্রিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের বহু কাজ সংরক্ষণ, অনুবাদ ও উন্নত করেন। নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয় এবং আকাশের মানচিত্র তৈরির ধারাটিও এগিয়ে যায়।
শতাব্দীর পর শতাব্দী পরে আধুনিক মহাকাশ বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিশনের নামও রাখা হয় হিপারকাসের নামে। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার Hipparcos উপগ্রহ মহাকাশে নক্ষত্রের অবস্থান ও গতির অত্যন্ত নির্ভুল পরিমাপ করেছে। প্রাচীন এক জ্যোতির্বিদের নাম তাই আধুনিক মহাকাশ বিজ্ঞানের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে আছে।
হিপারকাসের গল্প আসলে শুধু একটি হারিয়ে যাওয়া নক্ষত্র তালিকার গল্প নয়। এটি দেখায়, বিজ্ঞান সবসময় বড় যন্ত্র দিয়ে শুরু হয় না। কখনও কখনও শুরু হয় রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে করা একটি সাধারণ প্রশ্ন দিয়ে।
একটি নক্ষত্র কোথায় আছে? আগামী বছরও কি ঠিক সেখানেই থাকবে? আর হাজার বছর পরে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে মানুষ আকাশকে গল্পের জগৎ থেকে পরিমাপের জগতে নিয়ে এসেছে। হিপারকাস সেই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথিকৃৎ। তাঁর হাতে রাতের আকাশ প্রথমবারের মতো একটি নিয়মিত মানচিত্রের রূপ পেয়েছিল। টেলিস্কোপ আসার বহু আগেই মানুষ বুঝতে শুরু করেছিল, মহাবিশ্বকে শুধু দেখা যায় না, তাকে মাপাও যায়।
সোর্স: ডিসকাভারি, উইকিপিডিয়া
৩৭
মেসা ভের্দে: পাহাড়ের খাঁজে ঝুলন্ত সেই শহর, যেখান থেকে একদিন সবাই হঠাৎ চলে গিয়েছিল।
আমেরিকার কলোরাডোর মালভূমিতে বিশাল পাথুরে খাঁজ, আর সেই খাঁজের গভীরে, পাহাড়ের গায়ে ঝুলন্ত অবস্থায় গড়ে উঠেছে এক আস্ত শহর। পাথরের ঘর, গোলাকার আচার-অনুষ্ঠানের কক্ষ, সরু সিঁড়ি, সবকিছু এমনভাবে বানানো, যেন পাহাড়টাই তাদের ছাদ। এটা মেসা ভের্দে। প্রায় ৭০০ বছরের বেশি সময় ধরে খালি পড়ে থাকা এই শহর প্রশ্ন তোলে, মানুষ কেন এমন দুর্গম জায়গায় ঘর বাঁধল, আর কেনই বা একদিন হঠাৎ সব ফেলে চলে গেল?
ক্লিফ প্যালেস: পাথরের গায়ে ২০০টা ঘর।
মেসা ভের্দেতে ছয় শতাধিক "ক্লিফ ডুয়েলিং" বা পাহাড়-গুহা বসতি আছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় ও বিখ্যাত "ক্লিফ প্যালেস"। এতে প্রায় ১৫০টার মতো কক্ষ আর ২৩টা "কিভা" বা গোলাকার আচার-অনুষ্ঠানের কক্ষ ছিল বলে ধারণা করা হয়। অনুমান, এখানে একসময় প্রায় ১০০ জনের মতো মানুষ থাকত। পুরো কাঠামো একটা বিশাল পাথরের খাঁজের নিচে, প্রায় প্রাকৃতিক ছাদের আড়ালে বানানো, যা রোদ আর বৃষ্টি দুটো থেকেই সুরক্ষা দিত।
যাযাবর থেকে স্থপতি জাতি।
মেসা ভের্দের নির্মাতারা ছিলেন এমন এক জনগোষ্ঠী, যাদের আজ প্রত্নতাত্ত্বিকরা "অ্যানসেস্ট্রাল পুয়েবলোয়ান" বলেন। এই নামকরণ তুলনামূলক নতুন, কারণ পুরনো শব্দ "আনাসাজি" এসেছিল নাভাহো ভাষা থেকে, যার অর্থ কারও কারও মতে "প্রাচীন শত্রু", তাই আধুনিক পুয়েবলো জনগোষ্ঠী নিজেরাই এই নতুন নামকরণ চেয়েছেন। তাঁরা এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন আনুমানিক ৬০০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে, প্রথমে মালভূমির ওপরে, পরে ১২শ শতকের শেষ দিকে হঠাৎ করেই পাহাড়ের খাঁজের ভেতরে চলে যান।
কেন পাহাড়ের খাঁজে?
এই স্থানান্তরের কারণ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক আছে। কেউ বলেন প্রতিরক্ষার জন্য, কারণ পাহাড়ের গায়ের বাড়িতে ওঠা কঠিন, তাই আক্রমণ ঠেকানো সহজ। কেউ বলেন এটা জলবায়ুর কারণে, খাঁজের ভেতরের অংশ গ্রীষ্মে ঠান্ডা আর শীতে তুলনামূলক উষ্ণ থাকত সূর্যের কোণের কারণে। আবার কারও মতে এটা সামাজিক বা ধর্মীয় কারণেও হতে পারে। কোনো একটা কারণকে চূড়ান্ত ধরার মতো প্রমাণ নেই।
জল, যা ছিল জীবনের কেন্দ্রে।
মেসা ভের্দে অঞ্চলে বৃষ্টি অনিয়মিত। বাসিন্দারা তাই জল সংগ্রহের জন্য জটিল ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন, ছোট বাঁধ, জলাধার আর খাঁজের ভেতরের প্রাকৃতিক ঝর্ণার ব্যবহার। কৃষিকাজ হত মালভূমির ওপরে, ভুট্টা, মটরশুঁটি আর স্কোয়াশ। প্রতিদিন মানুষকে পাহাড় বেয়ে ওপরে গিয়ে চাষ করে, আবার নিচে খাঁজের ঘরে ফিরে আসতে হত।
মাত্র এক শতকের মধ্যেই খালি।
সবচেয়ে অবাক করা তথ্য, এই বিশাল খাঁজ-বসতিগুলোয় মানুষ থেকেছে মাত্র প্রায় ৭৫ থেকে ১০০ বছরের মতো সময়। ১৩শ শতকের শেষ দিকে, আনুমানিক ১২৮০-এর দশকের মধ্যে, পুরো অঞ্চল প্রায় সম্পূর্ণভাবে পরিত্যক্ত হয়ে যায়। গাছের বলয় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ওই সময়ে দীর্ঘস্থায়ী এক ভয়াবহ খরা হয়েছিল, প্রায় ১২৭৬ থেকে ১২৯৯ সাল পর্যন্ত। এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল সম্ভবত মাটির উর্বরতা কমে যাওয়া, বন উজাড় আর সামাজিক সংঘাত। মানুষ দক্ষিণে সরে গিয়ে আজকের নিউ মেক্সিকো আর অ্যারিজোনার পুয়েবলো জনগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষ হন।
১৮৮৮ সালের এক তুষারঝড়ে পুনরাবিষ্কার।
স্থানীয় রাঞ্চার রিচার্ড ওয়েদারিল আর তাঁর জামাতা চার্লি মেসন ১৮৮৮ সালে গবাদি পশু খুঁজতে খুঁজতে তুষারের ভেতর দিয়ে হঠাৎ ক্লিফ প্যালেসের সামনে গিয়ে দাঁড়ান। যদিও নাভাহো ও উটে জনগোষ্ঠীর মানুষ এই অঞ্চল আগে থেকেই চিনতেন। ১৯০৬ সালে মেসা ভের্দে আমেরিকার প্রথম জাতীয় উদ্যান হয়, যেটা মূলত মানব ইতিহাস রক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
মূলধারার ব্যাখ্যা কী?
এখানে কোনো গোপন ষড়যন্ত্র নেই, বরং সমস্যা ছিল প্রথমদিকের খননে। ১৯শ শতকের শেষে অনেক "কালেক্টর" এখান থেকে হাজার হাজার প্রত্নবস্তু তুলে নিয়ে বিক্রি করে দেন, যার ফলে বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রাসঙ্গিক তথ্য চিরতরে হারিয়ে যায়। আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব এখন অনেক বেশি সতর্ক, আর আজকের পুয়েবলো জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পরামর্শ করেই গবেষণা চালানো হয়, কারণ তাঁরাই এই নির্মাতাদের সরাসরি উত্তরসূরি।
কিন্তু প্রশ্নগুলো থেকেই যায়।
শুধু খরাই কি পুরো অঞ্চল খালি করার একমাত্র কারণ? নাকি এর সঙ্গে ছিল কোনো গভীর সামাজিক বা ধর্মীয় সংকট? প্রত্নতাত্ত্বিকরা কিছু ধ্বংসাবশেষে সহিংসতার চিহ্নও পেয়েছেন, যা ইঙ্গিত দেয় শেষ দিকগুলো হয়তো শান্তিপূর্ণ ছিল না। মানুষ কেন এত দ্রুত, এত বিশাল আয়োজনের বাড়ি ফেলে চলে গেল, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
শেষ কথা।
মেসা ভের্দে মনে করিয়ে দেয়, মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে কতটা দূর যেতে পারে, আবার প্রকৃতি বদলে গেলে কতটা দ্রুত সব ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। পাহাড়ের খাঁজে হাজার বছর ধরে টিকে থাকা সেই পাথরের ঘরগুলো আজও দাঁড়িয়ে আছে, শুধু তাদের বাসিন্দারা নেই।
@সম্রাট রায় চৌধুরী
৩৮
থেরবাদ (হীনযান) এবং মহাযান
নিজের আলো নিজে হও’—মহাপরিনির্বাণের আগে শিষ্য আনন্দকে এই শেষ বার্তাটি দিয়েছিলেন গৌতম বুদ্ধ।তথাগত বুদ্ধের শিক্ষা ছিল সরল, বাস্তবমুখী এবং মনস্তাত্ত্বিক। কিন্তু তাঁর চলে যাওয়ার কয়েকশ বছরের মধ্যেই এই এক নদীর জল যেন দুটি শক্তিশালী স্রোতে ভাগ হয়ে গেল—একটির নাম থেরবাদ (হীনযান), অন্যটি মহাযান।
একই বুদ্ধের অনুসারী হয়েও কেন তৈরি হলো দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ? এর পেছনে উদ্দেশ্যই বা কী ছিল? চলুন এক নিঃশ্বাসে জেনে নেওয়া যাক বৌদ্ধ ইতিহাসের সেই রোমাঞ্চকর মোড় বদলের গল্প।
ফ্লাশব্যাংক: কীভাবে এবং কেন এলো এই বিভাজন?
তথাগত বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পর রাজগৃহের সপ্তপর্ণী গুহায় বসেন শত শত অর্হৎ ভিক্ষু। উদ্দেশ্য একটাই— তথাগত বুদ্ধ যা শিখিয়েছেন, তা যেন এক চুলও না বদলায়। কিন্তু সময় যত গড়াল, ভারতবর্ষের বুকে সাম্রাজ্য বদলাল, মানুষের চিন্তাভাবনাও বদলাতে শুরু করল।
বুদ্ধের মৃত্যুর প্রায় ৪০০ বছর পর, খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে কুশান সম্রাট কণিষ্কের আমলে কাশ্মীরে বসে চতুর্থ বৌদ্ধ মহাসম্মেলন (সংগীতি)। আর এখানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ভেতরের দুটি বড় মানসিকতা:
(১)সংরক্ষণশীল দল (The Traditionalists): প্রবীণ ভিক্ষুদের এই দলটির কথা ছিল, "তথাগত বুদ্ধ যা বলে গেছেন, তার বাইরে আমরা একটা কমা-দাঁড়িও বদলাবো না। নির্বাণ লাভ করতে হলে কঠোর সন্ন্যাস জীবন আর আত্মনিয়ন্ত্রণই একমাত্র পথ।" এই ধারাটিই আজকের ‘থেরবাদ’ বা স্থবিরবাদ (প্রাচীনদের পথ)।
(২)সংস্কারবাদী দল (The Liberals): তরুণ ও প্রগতিশীল ভিক্ষুদের দলটির যুক্তি ছিল, "যুগ পাল্টাচ্ছে। সাধারণ সংসারী মানুষ যদি কঠোর সন্ন্যাসের ভয়ে ধর্ম থেকে দূরে সরে যায়, তবে তথাগত বুদ্ধের করুণা সবার কাছে পৌঁছাবে কী করে? আমাদের কিছু নিয়ম শিথিল করতে হবে।" এই উদার পথটিই হলো ‘মহাযান’।
উদ্দেশ্য কী ছিল?
[১] থেরবাদের উদ্দেশ্য: তথাগত বুদ্ধের ঐতিহাসিক খাঁটি শিক্ষা ও কঠোর জীবনধারাকে কোনো রকম ভেজাল ছাড়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হুবহু বাঁচিয়ে রাখা। এর মূল লক্ষ্য ‘অর্হত্ব’ বা ব্যক্তিগত পরম মুক্তি।
[২]মহাযানের উদ্দেশ্য: বৌদ্ধধর্মকে একটি বিশ্বজনীন, সহজ এবং ভক্তিমূলক ধর্মে রূপ দেওয়া, যাতে রাজা থেকে শুরু করে সাধারণ চণ্ডাল—সবাই যেন এই তরীতে উঠতে পারে। এর মূল লক্ষ্য ‘বোধিসত্ত্ব’ বা নিজের মুক্তিকে বিসর্জন দিয়ে জগতের সব জীবের সমষ্টিগত মুক্তি নিশ্চিত করা।
তথাগত বুদ্ধের মূল শিক্ষার সাথে এগুলো কতটুকু যায়?
এই প্রশ্নের উত্তরটি খুব চমৎকার। আপনি যদি আয়নার একপাশ থেকে দেখেন তবে একরকম, অন্যপাশ থেকে দেখলে অন্যরকম।
(১)ঐতিহাসিক দিক থেকে থেরবাদ একদম নিখুঁত: তথাগত বুদ্ধ বুদ্ধত্ব লাভের পর মগধ ও কোশলের মাটিতে হেঁটে হেঁটে যে পালি ভাষায় উপদেশ দিয়েছিলেন, থেরবাদের 'পালি ত্রিপিটক' তারই হুবহু প্রতিলিপি।তথাগত বুদ্ধ নিজেকে কখনো ঈশ্বর দাবি করেননি, মূর্তিপূজা করতে বলেননি। থেরবাদ ঠিক এই শিক্ষাটিই ধরে রেখেছে।
(২)দার্শনিক স্পিরিটের দিক থেকে মহাযান অনন্য: তথাগত বুদ্ধের চরিত্রের সবচেয়ে বড় গুণটি কী ছিল? ‘মহামৈত্রী’ এবং ‘মহাকরুণা’। মহাযানপন্থীরা তথাগত বুদ্ধের এই করুণার দিকটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। তারা বলল, শুধু নিজের মুক্তি খোঁজা তো এক ধরণের স্বার্থপরতা। তথাগত বুদ্ধ যেভাবে নিজের মুক্তির পরও ৪৫ বছর মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন, আমাদেরও সবার মুক্তির জন্য কাজ করতে হবে। মহাযান তথাগত বুদ্ধের এই উদার আত্মত্যাগের বার্তাকে ধারণ করেছে।
আজ বিশ্বে কারা কোন পথ ফলো করে?
বর্তমানে ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী এই দুই ধারার অনুসারীরা স্পষ্ট বিভক্ত:
(১)দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (থেরবাদ): আমাদের বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া এবং লাওসের বৌদ্ধরা থেরবাদ ঐতিহ্য মেনে চলেন। এখানে বুদ্ধকে শিক্ষক মনে করা হয়, পালি ত্রিপিটক পড়া হয় এবং কঠোর আত্মশুদ্ধির (যেমন বিপাসনা ধ্যান) চর্চা করা হয়।
(২)পূর্ব ও মধ্য এশিয়া (মহাযান): চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তিব্বত, মঙ্গোলিয়া ও ভিয়েতনামের বৌদ্ধরা মহাযান (এবং এর শাখা যেমন জেন বা তিব্বতি বজ্রযান) মেনে চলেন। তারা তথাগত বুদ্ধকে পরম করুণাময় অলৌকিক সত্তা হিসেবে দেখে, বোধিসত্ত্বদের (যেমন অবলোকিতেশ্বর) আরাধনা করে এবং সংস্কৃত থেকে অনূদিত মহাযান সূত্রগুলো পাঠ করে।
শেষ কথা
থেরবাদ যদি হয় একটি গাছের মূল শিকড়, তবে মহাযান হলো তার বিশাল ডালপালা ও ফুল-ফল। শিকড় ছাড়া যেমন ডালপালার অস্তিত্ব নেই, তেমনি ডালপালা ছাড়া শিকড়ের সৌন্দর্য সবার চোখে পড়ে না। পথ দুটি আলাদা হতে পারে, কিন্তু দুটি পথের গন্তব্যই কিন্তু এক—দুঃখের চিরন্তন অবসান। @ @Tong Daing Ne
৩৯
হাসিডিক ইহুদি (Hasidic Judaism)
টাইম মেশিনে চড়ে কয়েকশ বছর অতীতে চলে যাওয়ার কথা ভাবুন তো? আমেরিকার নিউইয়র্কের মতো জাঁকজমকপূর্ণ আধুনিক শহরের বুকেই রয়েছে এমন এক এলাকা, যেখানে পা রাখলে আপনার মনে হবে আপনি ভুল করে ১৮ শতকের কোনো ইউরোপীয় গ্রামে চলে এসেছেন।
রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে হেঁটে যাচ্ছেন পুরুষেরা—সবার গায়ে হাঁটু পর্যন্ত লম্বা কালো কোট, মাথায় বিশাল পশমি টুপি, আর কানের দুপাশে ঝুলছে চুলের লম্বা গোছা।
এরাই হলেন হাসিডিক ইহুদি (Hasidic Judaism)। আধুনিক সভ্যতার সমস্ত চাকচিক্য আর প্রযুক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, তারা নিজেদের গুটিয়ে রেখেছেন এক কঠোর ধর্মীয় ও রহস্যময় বৃত্তের ভেতর। চলুন, বাইরের পৃথিবীর সব কোলাহল বাদ দিয়ে আজ আমরা প্রবেশ করব তাদের সেই রহস্যময় জীবনের গভীরে।
১. সূচনা ও ধর্মীয় বিশ্বাস: হৃদয়ের উপাসনা-
১৮ শতকে পূর্ব ইউরোপে (বর্তমান ইউক্রেন অঞ্চলে) রাব্বি ইসরায়েল বেন এলিয়েজার নামের এক ধর্মগুরু এই আন্দোলনের সূচনা করেন, যাঁকে অনুসারীরা ভালোবেসে ডাকতেন 'বাল শেম তোভ' (উত্তম নামের অধিকারী) বলে।
সে সময় ইহুদি ধর্ম কেবলই জটিল আইনি বিতর্ক আর শুকনো নিয়মকানুনে বন্দি হয়ে পড়েছিল। বাল শেম তোভ সাধারণ ও দরিদ্র ইহুদিদের বললেন, "ঈশ্বরকে পাওয়ার জন্য মস্ত বড় পণ্ডিত হওয়ার দরকার নেই; গভীর ভালোবাসা, আনন্দ, গান আর নাচের মাধ্যমেই ঈশ্বরের সবচেয়ে কাছে পৌঁছানো যায়।"
হাসিডিকরা ইহুদিদের গোপন রহস্যবাদী বিদ্যা 'কাব্বালা' (Kabbalah) দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত। তারা বিশ্বাস করেন, মহাবিশ্বের প্রতিটি ধূলিকণায় ঈশ্বর লুকিয়ে আছেন। তাদের সমাজের কেন্দ্রবিন্দু হলেন 'রেব্বে' (Rebbe) বা প্রধান ধর্মগুরু।
হাসিডিকরা তাদের রেব্বেকে সাধারণ মানুষ ভাবেন না, বরং ঈশ্বরের প্রতিনিধি মনে করেন। বিয়ে করা, ব্যবসা শুরু করা কিংবা জটিল রোগের চিকিৎসা—রেব্বের অনুমতি বা দোয়া ছাড়া তাদের জীবনে একটি পাতাও নড়ে না।
২. পারিবারিক জীবন: ৬ থেকে ১২ সন্তানের এক একটি সংসার-
হাসিডিকদের পারিবারিক জীবন বাইরের যেকোনো মানুষের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। তাদের জীবনের মূল লক্ষ্যই হলো একটি বড় পরিবার গঠন করা।
অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ বা পারিবারিক বিয়ে: তাদের সমাজে প্রেম-ভালোবাসার কোনো স্থান নেই। ছেলে-মেয়ের বয়স ১৮ থেকে ২০ হলেই পেশাদার ঘটক (Matchmaker) দিয়ে বিয়ে ঠিক করা হয়। বিয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে পাত্র-পাত্রী বড়জোর একবার বা দুবার কথা বলার সুযোগ পান।
হাসিডিক পরিবারগুলোতে গড় সন্তান সংখ্যা ৬ থেকে ৮ জন। তবে ১০ থেকে ১২ জন সন্তান থাকা খুবই সাধারণ বিষয়।
কেন এত সন্তান? এর পেছনে রয়েছে ধর্মীয় এবং ঐতিহাসিক কারণ। ইহুদি ধর্মগ্রন্থে ঈশ্বরের প্রথম নির্দেশ হলো—"ফলপ্রসূ হও এবং বংশবৃদ্ধি করো।"
দ্বিতীয়ত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের হলোকাস্টে প্রায় ৬০ লাখ ইহুদি মারা যান, যার বড় অংশই ছিলেন হাসিডিক। তারা মনে করেন, বেশি সন্তান জন্ম দিয়ে তারা তাদের সেই হারানো পূর্বপুরুষদের শূন্যতা পূরণ করছেন।
বিয়ের পর হাসিডিক নারীরা তাদের আসল চুল পরপুরুষের সামনে উন্মুক্ত রাখতে পারেন না। তাই তারা নিজেদের মাথার চুল একদম ছোট করে ছেঁটে ফেলেন এবং বাইরে বের হওয়ার সময় মাথায় পরচুলা (Wig) বা বিশেষ স্কার্ফ ব্যবহার করেন।
৩. শিক্ষা ব্যবস্থা: যেখানে বিজ্ঞান ও গণিত নিষিদ্ধ!-
হাসিডিকদের শিক্ষা ব্যবস্থা শুনলে যে কেউ চমকে উঠবেন। তারা তাদের সন্তানদের সাধারণ সরকারি স্কুলে পাঠান না। তাদের ছেলেদের জন্য রয়েছে বিশেষ ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যাকে বলা হয় 'ইেইয়েশিভা' ।
সেখানে ছোটবেলা থেকে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কেবল তোরাহ, তালমুদ এবং ধর্মীয় আইনকানুন মুখস্থ করানো হয়। তাদের এই সিলেবাসে আধুনিক বিজ্ঞান, ভূগোল, ইতিহাস বা গণিতের কোনো স্থান নেই।
এমনকি তারা যে দেশে বাস করছেন (যেমন আমেরিকা), সেখানকার মূল ভাষা ইংরেজিও তাদের ঠিকমতো শেখানো হয় না। মেয়েদের অবশ্য কিছুটা সাধারণ শিক্ষা দেওয়া হয়, কারণ পুরুষরা সারাদিন ধর্মকর্মে ব্যস্ত থাকায় নারীদেরই বাইরের জগৎ ও সংসারের হিসাব-নিকাশ সামলাতে হয়।
৪. অর্থনৈতিক ব্যবস্থা: কীভাবে চলে এত বড় বড় সংসার?-
আধুনিক শিক্ষা নেই, প্রযুক্তি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, অথচ একেকটি পরিবারে ৮-১০ জন সন্তান! মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে—তারা আসলে টাকা আয় করে কীভাবে? তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটি বেশ চমকপ্রদ:
নারীদের উপার্জন: - হাসিডিক পুরুষদের প্রধান কাজই হলো সারাদিন ধর্মগ্রন্থ পড়া। তাই অনেক পরিবারে নারীরাই হাল ধরেন। তারা ঘরের কাছাকাছি ইহুদিদের নিজস্ব ডে-কেয়ার, বুটিক বা গ্রোসারি দোকানে কাজ করে সংসারের খরচ চালান।
হীরার ব্যবসা ও রিয়েল এস্টেট: - হাসিডিক পুরুষদের একটি বড় অংশ নিউইয়র্কের বিখ্যাত ডায়মন্ড ডিস্ট্রিক্ট (হীরার বাজার) নিয়ন্ত্রণ করে। এ ছাড়া রিয়েল এস্টেট (বাড়ি কেনাবেচা ও ভাড়া দেওয়া) ব্যবসায় তাদের বিশাল একচেটিয়া আধিপত্য রয়েছে।
এই ব্যবসাগুলোতে উচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে নিজেদের মধ্যকার পারস্পরিক বিশ্বাস ও যোগাযোগ বেশি কাজে লাগে।
নিজস্ব বৃত্তের ব্যবসা: - তাদের সমাজে বাইরের পণ্য বা খাবার নিষিদ্ধ (তারা কেবল 'কোশার' বা তাদের ধর্মীয় নিয়মে তৈরি খাবার খায়)।
ফলে নিজেদের সমাজের ভেতরই বিশাল এক অর্থনৈতিক বাজার তৈরি হয়েছে। সুপারমার্কেট, কাপড়, জুতো, ধর্মীয় বইয়ের দোকান—সবই তারা নিজেদের মধ্যে কেনাবেচা করে।
সরকারি সাহায্য: - আমেরিকা এবং ইসরায়েলে অনেক হাসিডিক পরিবার তাদের বিশাল সন্তান সংখ্যার কারণে সরকারের কাছ থেকে বড় অঙ্কের ফুড স্ট্যাম্প ও চাইল্ড কেয়ার ভাতা পেয়ে থাকে, যা তাদের টিকে থাকতে সাহায্য করে।
৫. নিজস্ব আদালত ও বিচার ব্যবস্থা (Beth Din)-
হাসিডিকদের নিজস্ব সমাজ ব্যবস্থা এতটাই শক্তিশালী যে, তারা যেকোনো অভ্যন্তরীণ বিবাদ বা ঝামেলার জন্য দেশের প্রচলিত পুলিশ বা সরকারি আদালতের কাছে সহজে যান না। তাদের রয়েছে নিজস্ব ধর্মীয় আদালত, যাকে বলা হয় 'বেথ দিন' (Beth Din)।
এই আদালতে বিচারক হিসেবে বসেন সমাজের প্রবীণ ও পণ্ডিত রাব্বিরা। তোরাহ ও ইহুদি ধর্মীয় আইনের (Halakha) ওপর ভিত্তি করে এখানে জমিজমা, ব্যবসা, পারিবারিক কলহ এবং বিবাহবিচ্ছেদের বিচার করা হয়।
বেথ দিন-এর রায় হাসিডিক সমাজের সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে মেনে নিতে হয়। যদি কেউ এই আদালতের রায় অমান্য করে সরকারি পুলিশের কাছে যায়, তবে তাকে সমাজের শত্রু বা 'বিশ্বাসঘাতক' (Moser) হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং সমাজ তাকে একঘরে করে দেয়।
৬. উৎসবের দিনগুলো: আনন্দ ও আধ্যাত্মিকতার মহোৎসব-
হাসিডিকদের উৎসবের দিনগুলো সাধারণ ইহুদিদের চেয়ে অনেক বেশি প্রাণবন্ত ও আবেগঘন হয়। তারা উৎসবের দিনে তাদের সমস্ত কঠোরতা ভুলে বাঁধভাঙা আনন্দে মেতে ওঠেন।
প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার সূর্যাস্ত থেকে শনিবার সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়কে তারা 'শাবাত' বা পবিত্র দিন হিসেবে পালন করেন। এই ২৪ ঘণ্টা তারা সমস্ত প্রকার কাজ, রান্না, গাড়ি চালানো, এমনকি লাইটের সুইচ অন-অফ করা থেকেও বিরত থাকেন। পুরো পরিবার একসাথে টেবিলে বসে ঐতিহ্যবাহী গান গায় এবং খাবার খায়।
'পুরিম' উৎসবের দিন হাসিডিক পুরুষ ও শিশুরা হরেক রকমের অদ্ভুত ও মজার পোশাক (Costume) পরে রাস্তায় নামেন। 'সিমখাত তোরাহ' উৎসবের দিনে তারা ধর্মগ্রন্থ তোরাহ বুকে জড়িয়ে ধরে সারারাত গোল হয়ে নাচেন এবং আনন্দ উল্লাস করেন।
তিশ (Tish): - এটি তাদের এক বিশেষ উৎসবের রাত, যেখানে শত শত অনুসারী তাদের 'রেব্বে'-র চারপাশে টেবিল ঘিরে বসেন। রেব্বে খাবারের কিছু অংশ মুখে দেওয়ার পর বাকি খাবার অনুসারীদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া হয়, যাকে তারা বরকত বা পবিত্র উপহার মনে করেন। এরপর গভীর রাত পর্যন্ত চলে আধ্যাত্মিক গান ও টেবিল চাপড়ে নাচ।
৭. তারা কেন বাকি ইহুদিদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা?-
বিশ্বে কোটি কোটি ইহুদি আছেন যারা জিন্স-টিশার্ট পরেন, কর্পোরেট চাকরি করেন, সিনেমা দেখেন আর সবার সাথে মিশে যান। কিন্তু হাসিডিকরা তাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা তিনটি দেয়ালে নিজেদের বন্দি করে রেখেছেন।
ভাষা: তারা ইংরেজি বা হিব্রু নয়, নিজেদের মধ্যে কথা বলেন প্রাচীন ইউরোপীয় ইহুদি ভাষা 'ইদ্দিশ' (Yiddish) ভাষায়। এর উদ্দেশ্য হলো বাইরের সংস্কৃতির ছোঁয়া যেন তাদের সমাজে না লাগে।
প্রযুক্তি বর্জন:- তাদের ঘরে কোনো টেলিভিশন, রেডিও বা কম্পিউটার থাকে না। তারা সাধারণ স্মার্টফোন ব্যবহার করেন না। এর বদলে তারা ব্যবহার করেন 'কোশার ফোন' (Kosher Phone)। এই বিশেষ ফোনে কোনো ইন্টারনেট, ক্যামেরা বা মেসেজিং অ্যাপ থাকে না; এটি দিয়ে কেবল ফোন করা এবং ধরা যায়।
পোশাকের ভিন্নতা:- পুরুষদের লম্বা দাড়ি, কানের পাশের বিশেষ চুলে (Payot) তারা নিজেদের অহংকার প্রকাশ করেন। মহিলারা সবসময় শরীর সম্পূর্ণ ঢেকে রাখা লম্বা স্কার্ট ও ফুলহাতা পোশাক পরেন।
৮. সমাজচ্যুত (Ex-Hasidic) জীবনের অন্ধকার গল্প: এক অদৃশ্য খাঁচা-
বাইরে থেকে এই সমাজকে যতোটা সুশৃঙ্খল বা আধ্যাত্মিক মনে হয়, এর ভেতরে রয়েছে এক নির্মম খাঁচাও। কোনো তরুণ বা তরুণী যদি এই দমবন্ধ পরিবেশ থেকে বেরিয়ে সাধারণ স্বাধীন জীবন বাঁচতে চায়, তবে তার কপালে জোটে চরম মানসিক ও সামাজিক নির্যাতন।
কেউ যদি সমাজ ছেড়ে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তার নিজের মা-বাবা এবং ভাই-বোন তার সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে। সমাজ তাকে চিরতরে 'মৃত' ঘোষণা করে এবং তার জন্য রীতিমতো ধর্মীয় নিয়ম মেনে পারিবারিক শোকসভা (Shiva) করা হয়।
কোনো বিবাহিত ব্যক্তি যদি সমাজ ছাড়তে চান, তবে সমাজ ও আদালতের মারপ্যাঁচে তার সন্তানদের তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়, যেন শিশুরা বাইরের 'পাপের দুনিয়া' দ্বারা প্রভাবিত না হয়।
যেহেতু তারা ছোটবেলা থেকে বিজ্ঞান বা ইংরেজি শেখেনি এবং ইন্টারনেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কীভাবে ব্যবহার করতে হয় তাও জানে না, তাই বাইরের আলো ঝলমলে পৃথিবীতে এসে তারা এক মহাসমুদ্রে পড়েন। একাকীত্ব, অর্থকষ্ট এবং চেনা মানুষদের হারানোর তীব্র মানসিক ট্রমার কারণে এদের অনেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
বর্তমানে অবশ্য Footsteps-এর মতো কিছু অলাভজনক সংস্থা গড়ে উঠেছে, যারা এই সমাজচ্যুত মানুষদের সাধারণ শিক্ষা, চাকরি এবং নতুন জীবনে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে।
জনসংখ্যা এবং বর্তমান চালচিত্র--
বিশ্বজুড়ে কট্টরপন্থী বা অতি-রক্ষণশীল (হারেদি) ইহুদিদের মোট জনসংখ্যা প্রায় ২১ লাখ। এর মধ্যে কেবল এই 'হাসিডিক' উপ-গোষ্ঠীর জনসংখ্যা প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখের মতো। তাদের সবচেয়ে বড় বসতি রয়েছে ইসরায়েলে এবং আমেরিকার নিউইয়র্কের ব্রুকলিন (বিশেষ করে উইলিয়ামসবার্গ ও বরো পার্ক) এলাকায়। উচ্চ জন্মহারের কারণে প্রতি ২০ বছরে তাদের জনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে!
আধুনিক পৃথিবীর বুকেও শত বছরের প্রাচীন এক সংস্কৃতিকে হুবহু বাঁচিয়ে রাখার এই যে অবিশ্বাস্য জেদ—এটাই হাসিডিক ইহুদিদের পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় ও কৌতূহল উদ্দীপক জনগোষ্ঠীতে পরিণত করেছে। @ Tong Daing Ne
৪০
বখতিয়ার খলজির তিব্বত অভিযান ।
১২০৪ খ্রিস্টাব্দে নদীয়া ও গৌড় জয়ের পর তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজির নাম পুরো ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু এর ঠিক দুই বছর পর, ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি এমন এক সামরিক অভিযানে হাত দেন, যা তাঁর অপরাজেয় ভাবমূর্তি ধূলিসাৎ করে দেয় এবং তাঁর করুণ মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেটি ছিল—তিব্বত অভিযান।
পারস্য ইতিহাসবিদ মিনহাজ-ই-সিরাজের বিখ্যাত 'তবকাত-ই-নাসিরী' গ্রন্থের তথ্য এবং আধুনিক সামরিক ইতিহাসের আলোকে চলুন অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে জেনে নেওয়া যাক—কেন খলজি তিব্বত আক্রমণ করেছিলেন এবং তিব্বতিরা কীভাবে তাঁর ১০,০০০ অশ্বারোহী বাহিনীকে প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছিল।
১. কেন খলজি তিব্বত অভিযান করেছিলেন? (মূল উদ্দেশ্য)
অনেকে মনে করেন এটি কেবলই ভূখণ্ড জয়ের অন্ধ আকাঙ্ক্ষা ছিল, কিন্তু এর পেছনে ছিল গভীর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কারণ:
যুদ্ধঘোড়ার উৎস নিয়ন্ত্রণ:
তৎকালীন সময়ে যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল উন্নত জাতের তুর্কি ও মধ্য এশীয় ঘোড়া। বাংলা অঞ্চলটি ছিল এই ঘোড়া আমদানির শেষ প্রান্তে। তিব্বত ছিল বিখ্যাত 'টাঙ্গন' ঘোড়া এবং প্রাচীন সিল্ক রুটের (Silk Road) অন্যতম বড় বাণিজ্য কেন্দ্র। খলজি চাচ্ছিলেন এই রুটের নিয়ন্ত্রণ সরাসরি নিজের হাতে নিতে।
বিপুল সম্পদের লোভ:
তিব্বতের সোনা, কস্তুরী ও মূল্যবান জড়িবুটির একচেটিয়া বাণিজ্য দখল করাও ছিল তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।
ভৌগোলিক সীমানা বিস্তার:
চীন ও মধ্য এশিয়ার প্রবেশদ্বারে নিজের আধিপত্য বিস্তার করে খেলাফতের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।
২. তিব্বতিরা কীভাবে এই আক্রমণ প্রতিহত করেছিল? (রণকৌশল)
১২০৬ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে বখতিয়ার খলজি প্রায় ১০,০০০ অভিজ্ঞ ও বাছাইকৃত তুর্কি অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে রওনা হন। পথপ্রদর্শক হিসেবে ছিলেন 'আলি মেচ' নামক এক স্থানীয় উপজাতীয় প্রধান, যিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তারা কামরূপ (বর্তমান আসাম) হয়ে হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ি পথ পার হয়ে তিব্বতের সীমান্ত চম্বি উপত্যকায় (Chumbi Valley) প্রবেশ করেন। কিন্তু সেখানে তিব্বতিরা যে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, তা ছিল অবিশ্বাস্য:
'স্কর্চড আর্থ' বা পোড়ামাটি নীতি:
তিব্বতিরা বুঝতে পেরেছিল যে সমতল ভূমির তুর্কি অশ্বারোহী বাহিনীর সাথে সম্মুখ সমরে জেতা কঠিন। তাই তারা পিছু হটার সময় চারপাশের সমস্ত শস্যক্ষেত পুড়িয়ে দেয়, খাদ্যশস্য ধ্বংস করে এবং কুয়োগুলোর পানি বিষাক্ত বা অকেজো করে দেয়। ফলে তুর্কি বাহিনী চরম খাদ্য সংকটে পড়ে।
ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক সুবিধা:
হিমালয়ের মাইনাস ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা, তীব্র ঠাণ্ডা, তুষারপাত এবং উচ্চতাজনিত কারণে অক্সিজেনের স্বল্পতায় তুর্কি সৈন্যরা শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ দুর্বল হয়ে পড়ে।
গেরিলা আক্রমণ ও অবরুদ্ধকরণ:
তিব্বতিরা পাহাড়ের আড়াল থেকে অতর্কিত তীর ও পাথর ছুঁড়ে তুর্কিদের রসদ সরবরাহের লাইন কেটে দেয়। একটি শক্তিশালী দুর্গের সামনে এসে তুর্কিরা যখন অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং বুঝতে পারে যে তিব্বতিদের বিশাল শক্তিবৃদ্ধি ঘটছে, তখন খলজি পিছু হটার সিদ্ধান্ত নেন।
৩. কেন এই অভিযান সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল? (যৌক্তিক কারণ)
লজিস্টিকস ও আবহাওয়ার ভুল মূল্যায়ন:
বখতিয়ার খলজি সমতল ভূমির যুদ্ধে পারদর্শী ছিলেন। কিন্তু হিমালয়ের মতো অতি দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে ১০,০০০ সৈন্যের খাদ্য ও রসদ সরবরাহ বজায় রাখা যে কতটা অসম্ভব, সেই ভৌগোলিক হিসাবনিকাশে তিনি মারাত্মক ভুল করেছিলেন।
কামরূপের রাজার বিশ্বাসঘাতকতা ও ফাঁদ:
ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত ও প্রায় মৃতপ্রায় তুর্কি বাহিনী যখন পিছু হটে আসাম বা কামরূপ অঞ্চলের ওপর দিয়ে ফিরছিল, তখন কামরূপের রাজা পৃথু এক মারাত্মক ফাঁদ পাতেন। তিনি তুর্কিদের কোনো খাদ্য সাহায্য তো দেনইনি, উল্টো তিস্তা বা বাগমতি নদী পার হওয়ার সময় নদীর ওপর থাকা একমাত্র পাথরের সেতুটি ভেঙে দেন।
নদীতে সলিল সমাধি:
সেতু ভেঙে যাওয়ায় তুর্কি সৈন্যরা ঘোড়া নিয়ে গভীর নদীতে ঝাঁপ দিতে বাধ্য হয়। প্রবল স্রোত এবং নদীর ওপার থেকে কামরূপের সৈন্যদের তীরের আঘাতে সিংহভাগ সৈন্য নদীতে ডুবে মারা যায়।
অভিযানের নির্মম পরিণতি
১০,০০০ অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে যাওয়া বখতিয়ার খলজি যখন দেবকোটে (বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর) ফিরে আসেন, তখন তাঁর সাথে ছিল মাত্র ১০০ জনের মতো জীবিত সৈন্য। এই ভয়াবহ পরাজয়, নিজের বিশ্বস্ত সৈন্যদের মৃত্যুর গ্লানি এবং তীব্র মানসিক অবসাদে তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। ১২০৬ খ্রিস্টাব্দের শেষভাগে, এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাঁরই এক ক্ষুব্ধ সেনাপতি আলী মর্দান খলজি তাঁকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেন।
সারকথা:
বখতিয়ার খলজির তিব্বত অভিযান প্রমাণ করে যে, সামরিক বীরত্ব যতই থাকুক না কেন—প্রকৃতি, ভূগোল এবং রসদ সরবরাহের সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া কেবল অন্ধ সাহসের ওপর ভর করে দুর্গম অঞ্চল জয় করা অসম্ভব। তিব্বতিদের চতুর প্রতিরক্ষামূলক কৌশল এবং প্রকৃতির শক্তির কাছেই সেদিন বাংলার প্রথম মুসলিম বিজেতার পতন ঘটেছিল।
@ Tong Daing Ne
৪১
বখতিয়ার খিলজি্র নদীয়া আক্রমণ
বাংলার ইতিহাসে ১২০৪ (মতান্তরে ১২০৫) খ্রিস্টাব্দ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই বছরই তুর্কি সেনাপতি বখতিয়ার খিলজির হাত ধরে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা হয়। কিন্তু প্রচলিত ইতিহাসে যে বলা হয়—"মাত্র ১৭-১৮ জন সৈন্য দেখে রাজা লক্ষ্মণ সেন ভয়ে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন"—আধুনিক ইতিহাসবিদদের মতে এই ঘটনাটি পুরোপুরি সত্য নয়, বরং এটি একটি অতিরঞ্জিত বিবরণ। চলুন জেনে নেওয়া যাক এর আসল ঐতিহাসিক সত্য।
আক্রমণকারী ছিলেন তুর্কি বংশোদ্ভূত আফগান সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি। বিহার জয়ের পর ধন-ধান্যে পূর্ণ বাংলা জয় করাই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য।
সেন রাজাদের মূল রাজধানী ছিল লক্ষণাবতী (লখনৌতি) বা গৌড়। নদীয়া (নবদ্বীপ) ছিল মূলত তাঁদের দ্বিতীয় বা অস্থায়ী অবকাশকালীন রাজধানী। রাজা লক্ষ্মণ সেন তখন প্রায় ৮০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ। তিনি মূলত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং গঙ্গা স্নানের জন্য নদীয়াতে অবস্থান করছিলেন। একটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হওয়ায় নদীয়াতে লখনৌতির মতো শক্তিশালী দুর্গ বা বিশাল স্থায়ী সেনাবাহিনী মোতায়েন ছিল না। বখতিয়ার খিলজি এই কৌশলগত দুর্বলতার সুযোগটিই নিয়েছিলেন।
তৎকালীন ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজের ‘তবকাত-ই-নাসেরী’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে, বখতিয়ার খিলজির আক্রমণের আগেই নদীয়ার রাজদরবারের জ্যোতিষীরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, এক দীর্ঘবাহু তুর্কি সেনা বাংলাকে জয় করবে। এই ভবিষ্যদ্বাণীর কারণে আক্রমণের আগেই রাজদরবারের অনেক অমাত্য, ব্যবসায়ী এবং পণ্ডিত ভয়ে নদীয়া ছেড়ে চলে যান। এর ফলে সেন রাজদরবারে যুদ্ধের আগেই একটি মনস্তাত্ত্বিক পরাজয় বা ভীতি তৈরি হয়েছিল।
বখতিয়ার খিলজি প্রচলিত সামরিক পথ এড়িয়ে অরণ্যময় অঞ্চল দিয়ে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে নদীয়া সীমান্তে পৌঁছান। তাঁর মূল বাহিনী পেছনেই ছিল, কিন্তু গতি বেশি থাকায় মাত্র ১৭-১৮ জন অশ্বারোহী নিয়ে তিনি প্রথমে রাজপ্রাসাদের তোরণে পৌঁছান। তাঁরা নিজেদের ঘোড়া ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রাসাদের ভেতরে ঢুকে পড়েন এবং আকস্মিক আক্রমণ শুরু করেন।
যখন এই হামলা ঘটে, রাজা তখন মধ্যাহ্নভোজ করছিলেন। আকস্মিক এই হামলায় প্রাসাদের রক্ষীরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং প্রাসাদের ভেতরেই যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। তৎকালীন প্রধান সেনাবাহিনী নদীয়ার বাইরে থাকায় এবং তাৎক্ষণিক কোনো বড় প্রতিরোধ গড়ার সুযোগ না থাকায়, রাজা তাঁর পরিবার নিয়ে নৌপথে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। আধুনিক ইতিহাসবিদদের মতে, এটি কোনো কাপুরুষোচিত পলায়ন ছিল না, বরং যুদ্ধক্ষেত্রের চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে একটি কৌশলগত পশ্চাদপসরণ (Strategic Retreat) ছিল।
নদীয়া হাতছাড়া হলেও রাজা লক্ষ্মণ সেন কিন্তু রাজ্য ছেড়ে দূর দেশে পালিয়ে যাননি। তিনি রাজপরিবার নিয়ে নৌপথে পূর্ব বঙ্গের বিক্রমপুরে (বর্তমান মুন্সিগঞ্জ, বাংলাদেশ) চলে যান। সেখানে গিয়ে তিনি পুনরায় নিজেকে গুছিয়ে নেন এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত (১২০৬ খ্রি.) আরও প্রায় দুই বছর স্বাধীনভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর দুই পুত্র—বিশ্বরূপ সেন ও কেশব সেন এই অঞ্চল থেকে মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় প্রতিরোধ টিকিয়ে রেখেছিলেন এবং সেন বংশের শাসন আরও প্রায় ৫০ বছর বজায় ছিল।
মজার ব্যাপার হলো, বখতিয়ার খিলজি নদীয়া আক্রমণ করে জয় করলেও তিনি নদীয়াকে তাঁর রাজধানী বানাননি। তিনি জানতেন, নদীয়া ভৌগোলিকভাবে সুরক্ষিত নয় এবং সেন রাজাদের মূল বাহিনী এসে তাঁকে ঘিরে ফেলতে পারে। তাই তিনি নদীয়া শহর ছেড়ে উত্তরবঙ্গের লখনৌতিতে তাঁর রাজধানী স্থানান্তর করেন।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, বখতিয়ার খিলজি কেবল উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম বাংলার একাংশ জয় করতে পেরেছিলেন, সমগ্র বাংলা নয়। নদীয়া ত্যাগের ঘটনাটি কোনো লজ্জাজনক পলায়ন ছিল না, বরং সম্পূর্ণ পরাজয় এবং বন্দীত্ব এড়ানোর একটি তাৎক্ষণিক সামরিক সিদ্ধান্ত ছিল। @ Tong Daing Ne
৪২
নাবাতিয়ান সভ্যতা: যারা মরুভূমির বুকে পাহাড় কেটে শহর বানিয়েছিল।
একটা কল্পনা করুন। চারদিকে শুধু বালি আর পাথর, বছরে বৃষ্টি হয় হাতে গোনা কয়েক দিন। এমন জায়গায় কেউ কি এক হাজারের বেশি বছর ধরে ধনী একটা রাজ্য চালাতে পারে? পেরেছিল। নাবাতিয়ানরা। তাদের রাজধানী পেট্রা আজকের জর্ডনে, একটা লালচে পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা শহর। ইতিহাসে এমন শহর আর নেই। অথচ ১৮১২ সাল পর্যন্ত ইউরোপের কেউ জানতই না, এটা কোথায়।
যাযাবর থেকে বণিক-রাজা।
নাবাতিয়ানরা ছিল আরব যাযাবর গোষ্ঠী। খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতকের শেষ দিকে গ্রিক লেখকদের লেখায় প্রথম তাদের নাম পাওয়া যায়। গ্রিক ইতিহাসবিদ দিওদোরাস লিখেছেন, তারা নিজেদের স্বাধীনতা রক্ষা করতে নিয়ম করেছিল: শস্য বোনা যাবে না, ফলের গাছ লাগানো যাবে না, ঘর বানানো যাবে না। মানে স্থায়ী বসতি নয়, যাতে শত্রুরা তাদের ধরতে না পারে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এই নিয়ম বদলে যায়, কারণ তারা আবিষ্কার করে বাণিজ্যের সোনার খনি।
ধূপ আর মশলার পথের মালিক।
দক্ষিণ আরবের লোবান আর গন্ধরস তখন ছিল প্রায় সোনার দামে বিক্রি হওয়া জিনিস। মন্দিরে পোড়ানো হত, মৃতদেহ সংরক্ষণে লাগত, রোমান অভিজাতদের বিলাসিতায় লাগত। ভারত থেকে আসা মশলাও এই পথ দিয়ে ভূমধ্যসাগরের দিকে যেত। নাবাতিয়ানরা মরুভূমির পথ, কূপ আর জলের উৎস চিনত। যাদের কাছে জলের খবর থাকে, তারা মরুভূমির রাজা। ক্যারাভান আসত, কর দিত, বিশ্রাম নিত, আর পেট্রা ধনী হত।
মরুভূমির বুকে জলের শহর।
পেট্রায় বছরে বৃষ্টি হয় মাত্র ১৫০ মিলিমিটারের মতো। অথচ নাবাতিয়ানরা সেখানে জলের জন্য আলাদা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। পাহাড়ের গায়ে কাটা নালা, বাঁধ, মাটির নলের পাইপ আর পাথর কেটে বানানো অসংখ্য কূপ (জলাধার)। বর্ষার হঠাৎ বন্যার জল তারা ধরে রাখত, আর শুকনো মৌসুমে ব্যবহার করত। এটা এমন কিছু ছিল, যা আজকের প্রকৌশলীরাও শ্রদ্ধার চোখে দেখেন। ১৯৬৩ সালে সেই প্রাচীন ব্যবস্থার একটা অংশ অবহেলায় পড়ে থাকায় আকস্মিক বন্যায় ২০ জনের বেশি পর্যটক মারা যান। পরে আধুনিক ব্যবস্থা বানানো হয় ওই প্রাচীন পথ মাথায় রেখেই।
সিক: শহরে ঢোকার গোপন পথ।
পেট্রায় ঢুকতে হলে যেতে হয় "সিক" নামে এক সরু গিরিখাত দিয়ে। প্রায় ১.২ কিলোমিটার লম্বা, কোথাও কোথাও চওড়ায় মাত্র কয়েক মিটার, দুপাশে ৮০ মিটার পর্যন্ত উঁচু খাড়া পাথুরে দেয়াল। শত্রুর জন্য এটা মৃত্যুফাঁদ, আর বাণিজ্যের জন্য একটাই পথ। তারপর হঠাৎ সরু ফাঁকের ওপারে দেখা যায় ৩৯ মিটার উঁচু "আল-খাজনেহ" বা ট্রেজারি, পুরোটা একটা পাহাড়ের গা থেকে খোদাই করা। মনে করা হয় ওপর থেকে নিচের দিকে কেটে কেটে নামা হয়েছিল। নামটা আসলে ভুল। "খাজনেহ" মানে ধনভাণ্ডার, স্থানীয় বেদুইনদের বিশ্বাস ছিল, ফারাও এখানে গুপ্তধন লুকিয়ে রেখেছিলেন। আসলে এটা সম্ভবত রাজার সমাধি। কোন রাজার, তা নিয়ে আজও তর্ক আছে।
সৌদি আরবের মরুভূমিতে আরেক শহর।
নাবাতিয়ানদের সাম্রাজ্য শুধু জর্ডনে ছিল না। সৌদি আরবের উত্তরে আল-উলার কাছে হেগরা (মাদাইন সালিহ) নামে আরেকটা বড় শহর ছিল, যেখানে ১০০টার বেশি পাথর কাটা সমাধি আছে। ২০০৮ সালে এটাই সৌদি আরবের প্রথম ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যস্থল হয়। বিশ্বাস করা কঠিন, কিন্তু পেট্রা আর হেগরার মাঝে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার। সেই ফাঁকজুড়ে ছিল নাবাতিয়ানদের বাণিজ্যপথ।
যে ভাষা থেকে আরবি লিপি এসেছে।
নাবাতিয়ানরা ছিল আরব, কিন্তু লিখত আরামীয় ভাষার একটা রূপে। সময়ের সঙ্গে তাদের লিপি এমন রূপ নেয়, যা থেকে পরবর্তীকালে আরবি লিপির বিকাশ হয়েছে বলে অধিকাংশ গবেষক মনে করেন। অর্থাৎ আজ যে বর্ণমালায় কোটি কোটি মানুষ লেখে, তার একটা শিকড় গেছে এই মরুভূমির বণিকদের কলমে।
তারপর কী হল?
খ্রিস্টাব্দ ১০৬ সালে রোমান সম্রাট ট্রাজান নাবাতিয়ান রাজ্য নিজেদের সাম্রাজ্যে যুক্ত করে নেন, নাম দেন "আরাবিয়া পেত্রাইয়া"। বাণিজ্যের গতিপথও ধীরে ধীরে বদলে যায়, সমুদ্রপথ বড় হয়ে ওঠে। ৩৬৩ সালের ভয়ংকর ভূমিকম্পে পেট্রার বহু অংশ ধ্বংস হয়। ৫৫১ সালে আরেকটা ভূমিকম্পে বাকিটুকুও শেষ। ধীরে ধীরে শহর জনশূন্য হয়ে যায়। বাইরের দুনিয়া প্রায় ১০০০ বছর এটার কথা ভুলে গিয়েছিল, যদিও স্থানীয় বেদুইনরা কখনো ভোলেনি।
১৮১২: এক ছদ্মবেশীর আবিষ্কার।
সুইস অভিযাত্রী জোহান লুডভিগ বুর্কহার্ট মুসলিম পণ্ডিতের ছদ্মবেশে "শেখ ইব্রাহিম" নাম নিয়ে হারানো শহরের খোঁজে বের হন। এক গাইডকে বলেন, তিনি নাকি হারুনের সমাধিতে পশু বলি দিতে চান। সেই ছুতোয় পেট্রায় ঢুকে পড়েন এবং ইউরোপকে জানান। ১৯৮৫ সালে পেট্রা ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যস্থল হয়, ২০০৭ সালে "নতুন সাত আশ্চর্যের" একটি। "ইন্ডিয়ানা জোন্স" সিনেমার ছোঁয়াতেও অনেকে এটা প্রথম চেনে।
মূলধারার ব্যাখ্যা কী?
এখানেও ইতিহাস "ষড়যন্ত্র করে মুছে ফেলা" হয়নি। প্রধান সমস্যা, নাবাতিয়ানরা নিজেদের ইতিহাস লিখে যায়নি। আমাদের কাছে আছে প্রধানত পাথরের শিলালিপি, সমাধির লেখা আর গ্রিক-রোমান লেখকদের বর্ণনা। মানে আমরা এদের কথা জানি বাইরের লোকের চোখ দিয়ে। সেখানে অনেক ফাঁক থাকবেই। তার ওপর মূলধারার ইতিহাস পড়ানো হয় গ্রিক-রোমান কেন্দ্র থেকে। আরবের মরুভূমির বণিক রাজ্য পেছনের সারিতে পড়ে যায়।
কিন্তু প্রশ্নগুলো থেকেই যায়।
পেট্রার বিশাল অংশ এখনো খোঁড়া হয়নি। ২০১৬ সালে উপগ্রহ ছবি আর ড্রোন ব্যবহার করে গবেষকরা পেট্রার দক্ষিণে একটা বিশাল আনুষ্ঠানিক মঞ্চ শনাক্ত করেন, যেটা কারও চোখে পড়েনি। ওটার উদ্দেশ্য এখনো ব্যাখ্যা করা যায়নি। আর ট্রেজারির ভেতরে আসলে কাকে সমাহিত করা হয়েছিল, নাবাতিয়ানদের দেবতা দুশারা আর আল-উজ্জাকে ঠিক কীভাবে পুজো করা হত, এসব নিয়ে আজও তর্ক চলছে।
শেষ কথা।
নাবাতিয়ানদের গল্প বলে, একটা সভ্যতাকে বড় করে তোলে কেবল তার সেনাবাহিনী বা শিলালিপি নয়। জল কোথায় পাওয়া যায়, রাস্তা কোথা দিয়ে গেছে, এই জ্ঞানও একটা শক্তি। যারা মরুভূমিকে বাণিজ্যের হাইওয়ে বানিয়েছিল, তাদের নাম আমরা কজন জানি?
আপনার কাছে প্রশ্ন: পেট্রার নাম শুনেছেন, কিন্তু নাবাতিয়ানদের কথা কি আগে জানতেন? ইতিহাসের কোন অধ্যায় নিয়ে পরের পোস্ট চান? কমেন্টে বলুন। এই অজানা ইতিহাস ছড়িয়ে দিতে একটা শেয়ার করুন। @সম্রাট রায় চৌধুরী
৪৩
অবরোধ বাসিনী থেকে আজকের নারী প্রজন্ম
রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন শত বছর আগের ৪৭টি বাস্তব ঘটনা নিয়ে লিখেছিলেন অবরোধ বাসিনী৷ তাতে ওই সময়ের নারীদের জীবন চিত্র আমরা বুঝতে পারি৷ কনকনে শীতে পালকিতে বসেই শিশু সন্তান নিয়ে রাত কাটালেও মুখ ফুটে বলতে পারেননি৷ স্বামীর পরিবর্তে আরেকজনের ধুতির হলুদে খুট ধরে চলে গিয়েছেন এক নারী বহু দূর৷ স্বামী বলতে ঐই হলুদ পাড়ই যে চিনেন! আজকের তরুণীরা পড়ে হাসে তবে বিশ্বাস করতে চায় না নারীরা অমন ভয়ানক অবস্থায় ছিলেন৷
ব্রিটিশ ভারতের সম্ভবত সমগ্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সর্বপ্রথম নারী গ্র্যাজুয়েট ছিলেন কাদম্বিনী গাঙ্গুলী এবং চন্দ্রমুখী বসু (১৮৮৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে)। এশিয়ার প্রথম নারী ডাক্তার কাদম্বিনীর বিয়ে হয় বিক্রমপুরের লেখক ও শিক্ষাবিদ দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীর সাথে। এর তিন যুগ পরে সম্ভবত দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মুসলিম নারী চিকিৎসক (ডেন্টিস্ট) হন ফাতেমা জিন্নাহ। আরও পরে বাংলাদেশের বেগম ফজিলাতুন্নেসা জোহা ১৯২৫ সালে তিনি কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে বিএ (স্নাতক) পাস করেন। এরপর ১৯২৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত বিভাগে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। তিনিই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম ছাত্রী। পরবর্তীতে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য স্কলারশিপ নিয়ে বিলাত (যুক্তরাজ্য) যান। তিনিই নজরুলের প্রেম প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ফজিলাতুন্নেসার প্রতি এই না-পাওয়া প্রেমের বেদনা থেকে নজরুল বেশ কিছু আবেগঘন চিঠি এবং বিখ্যাত কিছু কবিতা (যেমন: 'বর্ষা-বিদায়', 'তোমারে পড়েছে মনে') রচনা করেছিলেন। এমনকি কবি তাঁর বিখ্যাত 'সঞ্চিতা' কাব্যগ্রন্থটি ফজিলাতুন্নেসাকে উৎসর্গ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি রাজি না হওয়ায় পরবর্তীতে এটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উৎসর্গ করা হয়।
পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার মেয়ে বেগম সুলতান মীর আমিরুদ্দিন ছিলেন সমগ্র ভারতের প্রথম মুসলিম নারী আইন স্নাতক। ১৯২২ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি তাঁর ব্যাচে একমাত্র নারী শিক্ষার্থী ছিলেন এবং প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দির বোন শায়স্তা সোহরাওয়ার্দী ইকরামুল্লাহ কলকাতার লরেটো কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে ১৯৪০ সালে তিনি প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি জাতিসংঘের প্রতিনিধি ও মরক্কোর রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তারই কন্যা সালমা সোবহান বাংলাদেশের প্রথম নারী ব্যারিস্টার। পাকিস্তান পর্যন্ত মুসলিম মেয়েদের উচ্চশিক্ষা একেবারেই হাতেগোণা।
পাকিস্তান আমলে দুএকজন করে হিন্দু নারী সারাদেশের স্কুলগুলোতেই শিক্ষার্জন শুরু করেন৷ তখনকার চিত্রটি বলেছিলেন আমার এক প্রবীণ শিক্ষক৷ মেয়েরা ক্লাস রুম থেকে স্যারদের সাথেই বেরিয়ে যেতেন কমন রুমে বা হেড স্যারের রুমের সামনে৷ আরেকজন শিক্ষক এসে ক্লাসে ঢুকলেই তারা আবার ঢুকতেন৷ কোন ছাত্রই সহপাঠিনীর সাথে কথা বলতে পারতো না৷
আমি সিক্সে ভর্তি হই দুজনের পরে৷ আমার আগে ছিল একটি মেয়ে৷ সিক্সে থাকতেই তার বিয়ে হয়ে যায়৷ এসএসসি পরীক্ষা দিতে দিতে আরো কয়েকজনেরই বিয়ে হয়৷ আমার এক ক্লাস নিচে পড়তো একটি মেয়ে— ফার্স্টগার্ল৷ সেভেনে থাকতেই বিয়ে হয়ে গেল৷ আমার এক ক্লাস উপরেও একজন ভাল ছাত্রী ছিলেন ডাঃ মিলি আপা৷ তার বাবা ও মা ছিলেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক৷ ফলে তার জীবন ছিল সহজ ও সাবলীল৷ আরেকটু সিনিয়র ছিলেন সাবেক এমপি এড. সানজিদা খানম মালা আপা৷ তাঁর জীবনও সংগ্রামের৷ আমার সহপাঠিনী ছিল সাবেক এমপি অপু উকিল৷ তাকেও অনেক সংগ্রাম করেই পড়তে হয়েছে৷ আমাদের ৭০/৭৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৪/১৫জন মেয়ের মধ্যে অপু উকিলই পড়াশোনা শেষ করেছে৷ আমি সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে কোন নারী শিক্ষককেও পাইনি৷ আজ আমাদের স্কুলে নারী শিক্ষক অনেক৷ ছাত্রীর সংখ্যা ৫০%+!
আজ যারা বলেন আমাদের নারীরা ব্রিটিশ আমলের চেয়ে পিছিয়ে তারা কেবল প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের চুল খোলা ছবিটিই দেখেন৷ তৎকালীন সামগ্রিক নারীদের বিশেষ করে মুসলিম নারী সমাজের চিত্রটা দেখেন না৷ অনেকে বলেন, তাদের সহপাঠীরা বোরকা পরতেন না৷ ১৯৯৭ সালে পাবনা শহরের একটি গার্লস স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে আমি ও সহকর্মী বন্ধু মুক্তা একটি জরিপ করি৷ আমি গণনা করি ২৮ জন মেয়ে বোরকা পরা৷ ওর গণনাতেও ছিল ২৮জন বোরকা ছাড়া৷ মানে হল তখন ওই স্কুলে ৫০% মেয়েই বোরকা পরতো৷
সম্প্রতি একজন অধ্যাপক বন্ধুর কাছে জানতে চাইলাম আপনার ক্লাসে কতজন মেয়ে বোরকা বা হিজাব পরেন৷ ওনি বললেন ১০%৷ ৪০ বছর আগে সব পরিবারের মেয়েরা স্কুলে আসতে পারতেন না৷ কেবল অগ্রসর পরিবারের মেয়েরাই পড়তে আসতেন৷ আজ ওই চরম পশ্চাৎপদ পরিবারের মেয়েটিও স্কুলে আসছেন৷ তাকে বোরকা পরেই স্কুলে আসতে হয়৷ যখন ৫/১০জন পশ্চাৎপদ পরিবারের মেয়ে একত্রিত হন তখনকার চিত্রই বাংলাদেশ নয়৷ এখন বহু মেয়েই একা বের হচ্ছেন৷ আমার মেঝো ভায়রার মেয়ে মাগুরা থেকে একা ঢাকায় এসে ভর্তি হয়েছিলেন। এখন অনেকেই গ্রাম থেকে ঢাকায় পড়তে আসছেন৷ চাকরী করতে একাই চলে যাচ্ছেন দূরের শহরে৷ আমার সাথে অন্তত ২৫/৩০ জন মেয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে কাজ করেছেন দক্ষতার সাথে৷ এদের মধ্যে মাত্র একজন মেয়ে হিজাব পরতেন বাকিরাতো সাধারণ পোশাকই পরেন৷ এটাওতো বাংলাদেশ৷ শত বছরে রোকেয়া থেকে আজকের নারীদের অগ্রগতিটা বিপুল৷ এই ধারা থামানোর ক্ষমতা কারো নেই, মোল্লাতন্ত্রেরও নেই। @ mojibur rohoman
৪৪
সামারিটানরা কি ইহুদিদের হারিয়ে যাওয়া আত্মীয়
তোরাহ পাঠ করে, কিন্তু ইহুদি নয়, কিন্তু ইহুদি ঐতিহ্য থেকেই উৎসারিত, জেরুজালেম তাদের পবিত্রতম স্থান নয়, ইহুদিদের সাথে তাদের বেশ কিছু মিল আছে, আবার অনেক অমিলও আছে, উভয়ই মাসিহের অপেক্ষায় আছে। প্রাথমিকভাবে আপনিও হয়ত তাদের কথা শুনলে ইহুদিই মনে করবেন, কিন্তু ইহুদি ও তারা নিজেরা উভয়ই তাদের ইহুদি মনে করে না। আপনি পরোপকারি মানুষ অর্থে হয়ত "এ গুড সামারিটান" বাগধারাটিও (idiom) শুনেছেন- তারা এই সামারিটান। এক প্রায় অজানা ধর্মীয় গোষ্ঠী।
সামারিটান: তারা কারা? ইহুদিদের হারিয়ে যাওয়া আত্মীয়, নাকি প্রাচীন বনি ইসরায়েলের আসল উত্তরাধিকারী?
“গুড সামারিটান”, অপরিচিত বিপদগ্রস্ত মানুষকে নিঃস্বার্থভাবে সাহায্যকারী। শব্দটি পৃথিবীর বহু ভাষায় পরিচিত। কিন্তু যে সামারিটানদের নিয়ে যিশু (ইসা আ.) সেই বিখ্যাত উপমা দিয়েছিলেন, তারা কোনো কাল্পনিক জনগোষ্ঠী নয়। আজও প্রায় ৯০০ সামারিটান পৃথিবীতে বেঁচে আছেন। তাদের একটি অংশ পবিত্রভূমির হোলনে এবং অন্য অংশ পশ্চিম তীরের নাবলুসের কাছে মাউন্ট গেরিজিমের ঢালে বসবাস করে।
তারা ইহুদি নয়, মুসলমানও নয়, তবে প্রথম দেখায় হয়ত তাদের মুসলিম মনে করতে পারেন, তাদের পোশাক ইহুদিদের চেয়ে মুসলিমদের সাথে বেশি মিলে। আবার ইহুদি ধর্ম থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কোনো নতুন ধর্মের অনুসারীও নয়। বরং তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্যের শিকড় প্রাচীন ইসরায়েলীয় ধর্মে। তোরাহ, মোশি, একেশ্বরবাদ, খৎনা ও তোরাহভিত্তিক উৎসব, এসব ক্ষেত্রে ইহুদিদের সঙ্গে তাদের গভীর মিল। কিন্তু একই সঙ্গে জেরুজালেমের পরিবর্তে মাউন্ট গেরিজিমকে পবিত্রতম স্থান মনে করা এবং মূসার (আ.) পাঁচটি গ্রন্থের বাইরে ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থের বাকি অংশ গ্রহণ না করা তাদের আলাদা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তি।
নিজেদের তারা বনি ইসরায়েলীয়দের প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক মনে করে এবং বিশ্বাস করে, ইহুদিদের মতো তারাও প্রাচীন ইসরায়েলীয় জাতির উত্তরসূরি। তবে ইহুদিদের থেকে তাদের ধর্মীয় পরিচয় আলাদা, সামারিটানিজমকে বর্তমানে একটি স্বতন্ত্র ধর্মীয় ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তারা কারা এবং কোথায় থাকে?
সামারিটানদের নিজেদের ভাষায় পরিচয়ের একটি রূপ হলো Bene Yisrael ha-Shamerim, অর্থাৎ “ইসরায়েলের ঐতিহ্যের রক্ষক”। তাদের ঐতিহ্য অনুযায়ী তারা বিশেষভাবে ইফ্রাইম ও মানাশে-ইউসুফ (আ.) দুই পুত্রের বংশধর এবং লেবি গোত্রের সঙ্গেও নিজেদের সম্পর্কিত মনে করে। তবে এটি সামারিটানদের নিজস্ব ঐতিহাসিক-ধর্মীয় ঐতিহ্য; আধুনিক ইতিহাসবিদরা এটিকে সরাসরি প্রমাণিত বংশপরম্পরা হিসেবে দেখেন না।
আজ সামারিটানদের প্রধান দুটি বসতি। একটি পশ্চিম তীরে নাবলুসের কাছে মাউন্ট গেরিজিমের কিরিয়াত লুজা, অন্যটি হোলন শহরে। ২০২৬ সালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাদের মোট সংখ্যা প্রায় ৯০০ বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং দুই কেন্দ্রেই মোটামুটি অর্ধেক করে মানুষ বাস করে।
ইহুদিদের সঙ্গে এত মিল কেন?
কারণ দুই জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় শিকড় একই প্রাচীন ইসরায়েলীয় ঐতিহ্যে। উভয়েই এক ঈশ্বরে বিশ্বাস করে, মোশিকে (মুসা আ.) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নবী হিসেবে মানে, তাওরাহ বা পাঁচটি মূসার (আ.) গ্রন্থকে পবিত্র মনে করে, খৎনা ও সাবাথ পালন করে এবং তাওরাহভিত্তিক খাদ্য ও ধর্মীয় বিধি অনুসরণ করে। তাওরাহর বিভিন্ন উৎসবও উভয় সম্প্রদায়ের ধর্মীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু কয়েকটি মৌলিক জায়গায় তাদের পথ আলাদা:
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য পবিত্র স্থান নিয়ে। ইহুদিদের ধর্মীয় কেন্দ্র জেরুজালেম, আর সামারিটানদের কাছে পবিত্রতম স্থান মাউন্ট গেরিজিম। তাদের বিশ্বাস, প্রাচীন বনি ইসরায়েলীয়দের প্রকৃত উপাসনাস্থল ছিল গেরিজিমেই। গেরিজিমে একসময় সামারিটানদের একটি মন্দিরও ছিল, যা খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের শেষ দিকে হাসমোনীয় শাসক জন হিরকানাস ধ্বংস করেন।
আরেকটি বড় পার্থক্য ধর্মগ্রন্থে। ইহুদিদের হিব্রু বাইবেলে তাওরাহর পাশাপাশি নবীদের গ্রন্থ ও অন্যান্য রচনা রয়েছে। কিন্তু সামারিটানদের ধর্মগ্রন্থ মূলত শুধু পাঁচটি মূসার গ্রন্থ: তাওরাহ। তারা পরবর্তী ইহুদি নবীদের গ্রন্থকে তাদের ধর্মীয় ক্যাননের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেনি। তাদের ধর্মীয় নেতৃত্বও রাব্বিদের পরিবর্তে বংশানুক্রমিক পুরোহিত ও প্রধান পুরোহিতকেন্দ্রিক।
তারা ইহুদিদের থেকে আলাদা হলো কখন:
বিষয়টি সরল নয়। সামারিটানদের নিজেদের ঐতিহ্যে বিচ্ছেদের ঘটনা আরও প্রাচীন, তাদের ধর্মীয় কাহিনিতে শিলোহ ও পুরোহিত এলির সময় থেকেই ইসরায়েলীয় ধর্মীয় বিভাজনের কথা বলা হয়। কিন্তু আধুনিক ইতিহাসবিদরা রাতারাতি “বিচ্ছেদ” ঘটেছে বলে মনে করেন না।
গবেষণায় দেখা যায়, খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম থেকে দ্বিতীয় শতক পর্যন্ত সামারিয়া ও জুদিয়ার ইসরায়েলীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মিল যথেষ্ট ছিল। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় ও প্রথম শতকে এসে মাউন্ট গেরিজিম বনাম জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনেক গবেষক তাই খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতককে সামারিটান পরিচয়ের স্বতন্ত্র রূপ নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে দেখেন।
বিশেষ করে খ্রিস্টপূর্ব ১১১–১১০ সালের দিকে জন হিরকানাস গেরিজিমের সামারিটান মন্দির ও শহর ধ্বংস করার পর দুই সম্প্রদায়ের ধর্মীয় দূরত্ব আরও গভীর হয়। তারপরও কয়েক শতাব্দী ধরে রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য জমে একটি পৃথক সামারিটান পরিচয় তৈরি হয়।
ধর্মগ্রন্থে ভিন্নতা:
সামারিটানদের তাওরাহকে "সামারিটান পেন্টাটিউক" (Samaritan Pentateuch) বলা হয়। এটি মূসা (আ.) পাঁচটি গ্রন্থই ধারণ করে, কিন্তু ইহুদিদের প্রচলিত Masoretic Text-এর সঙ্গে এর প্রায় ৬,০০০টি পাঠভেদ রয়েছে। তবে এগুলোর অধিকাংশই বানান, ব্যাকরণ, শব্দের ক্রম ইত্যাদির ছোটখাটো পার্থক্য; সবগুলো ধর্মীয় মতবিরোধ নয়।
কিছু পার্থক্য অবশ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে বিখ্যাত হলো সামারিটান পাঠে মাউন্ট গেরিজিমে বেদি নির্মাণের নির্দেশকে দশম আজ্ঞা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা। অর্থাৎ তাদের ধর্মগ্রন্থের মধ্যেই গেরিজিমের পবিত্রতার বিশেষ গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, এই স্বতন্ত্র পাঠধারার গুরুত্বপূর্ণ বিকাশ খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয়–প্রথম শতকে ঘটে।
তবে সামারিটান তাওরাহকে কেবল “ইহুদি তাওরাহর বিকৃত সংস্করণ” বলা আধুনিক গবেষণার দৃষ্টিতে অতিরিক্ত সরলীকরণ। প্রাচীন ইহুদি ও সামারিটান উভয় ঐতিহ্যের পাঠের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে এবং ডেড সি স্ক্রলসেও এর সঙ্গে সম্পর্কিত প্রাচীন পাঠরীতির সন্ধান পাওয়া গেছে।
আজকের সামারিটানরা:
প্রাচীন যুগে তাদের জনসংখ্যা দশ বা শত হাজারে পৌঁছেছিল বলে ঐতিহাসিক পুনর্গঠনে ধারণা করা হয়। কিন্তু রোমান ও বাইজেন্টাইন যুগের যুদ্ধ ও বিদ্রোহ, নিপীড়ন, ধর্মান্তর এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তনে তাদের সংখ্যা ক্রমাগত কমে যায়।
বিশ শতকের শুরুতে পরিস্থিতি এতটাই খারাপ ছিল যে ১৯০৮ সালে তাদের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৫৫ জন, আর ১৯১৭ সালে ১৪৬ জন বলে সামারিটান সম্প্রদায়ের নিজস্ব পরিসংখ্যানে উল্লেখ আছে। পরে জনসংখ্যা আবার ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে।
আজ তাদের জীবন দুই ভিন্ন রাজনৈতিক পরিবেশে বিভক্ত। হোলনের সামারিটানরা বসতিকারী সমাজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত এবং আধুনিক হিব্রু ব্যবহার করে। মাউন্ট গেরিজিমের কিরিয়াত লুজার সামারিটানরা পশ্চিম তীরে বসবাস করে এবং দৈনন্দিন জীবনে আরবির ব্যবহার বেশি; ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে সামারিটান হিব্রু ও সামারিটান আরামাইকও ব্যবহৃত হয়।
তাদের ধর্মীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানগুলোর একটি হলো পাসওভার বা পেসাখের বলি, যা তারা এখনও মাউন্ট গেরিজিমে পালন করে। দুই কেন্দ্রের সামারিটানরাও এ উপলক্ষে গেরিজিমে একত্রিত হয়।
ইসরায়েল সংকটের মাঝখানে বসবাস করলেও সামারিটান সম্প্রদায়ের প্রশাসনিক ও নাগরিক অবস্থান কিছুটা স্বতন্ত্র। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে সম্প্রদায়টি প্রশাসনিকভাবে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ- দুই ব্যবস্থার সাথেই জড়িত হয়ে আছে; কিরিয়াত লুজার অনেক সামারিটানের ক্ষেত্রে দুই ধরনের নাগরিক পরিচয়ও রয়েছে।
সব মিলিয়ে সামারিটানরা ইহুদিদের শাখা নয়; আবার প্রাচীন ইসরায়েলীয় ঐতিহ্য থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নও নয়। ইহুদি ও সামারিটান উভয়ই একই প্রাচীন ইসরায়েলীয় ধর্মীয় জগত থেকে বিকশিত দুটি স্বতন্ত্র ধারা। আর সামারিটানদের ইতিহাস ও রাজনীতিতে প্রভাব কম বলে আলোচনার আড়ালেই থেকে গিয়েছে, অথচ তাদের নিজস্ব ধর্মগ্রন্থ, পবিত্র পাহাড়, পুরোহিততন্ত্র ও স্বতন্ত্র ধর্মীয় আচার রয়েছে।
@boikal
৪৫
বীজগণিতের অন্যতম মূল শিক্ষা
ছোট ক্লাস থেকেই ছাত্রছাত্রীদের বীজগণিত শেখানো হয়। x² + y², (a+b)², a²-b² এর মতো সূত্র মুখস্থ করতে হয়, অজানা রাশির মান বের করতে হয়, সমীকরণ সমাধান করতে হয়। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, “জীবনে এগুলো কোথায় কাজে লাগবে?” সত্যি বলতে, বড় হয়ে আমাদের অধিকাংশ মানুষকে হয়তো বাজারে গিয়ে (a+b)² লিখে হিসাব করতে হয় না। কিন্তু বীজগণিতের আসল ব্যবহার সূত্রটি সরাসরি মনে রাখার মধ্যে নয়, বরং অজানা বিষয়কে পরিচিত তথ্যের সাহায্যে বের করার চিন্তাপদ্ধতির মধ্যে। আমরা যখন বলি, “কোনও একটি জিনিসের দাম জানা নেই, কিন্তু মোট দাম এবং অন্য তথ্য জানা আছে, তাহলে অজানা দাম কত?” তখন আমরা আসলে বীজগণিতেরই সমস্যা সমাধান করছি।
ধরা যাক, একটি পরিবারের মাসিক আয় নির্দিষ্ট। বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ, বাজার, যাতায়াত এবং অন্যান্য খরচের কিছু অংশ জানা আছে, কিন্তু মাসের শেষে কত টাকা সঞ্চয় হচ্ছে তা জানা নেই। সেই অজানা টাকাকে x ধরে হিসাব করলে খুব সহজেই একটি সমীকরণ তৈরি করা যায়। ব্যবসায় একজন দোকানদার পণ্য কেনার দাম, লাভের হার এবং বিক্রির দাম নিয়ে একই ধরনের হিসাব করেন। ব্যাংকে ঋণের কিস্তি, সুদ ও সময়ের হিসাবেও গাণিতিক সম্পর্ক ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ জীবনের অনেক সমস্যায় আমরা অজান্তেই একটি অজানা মানকে একটি প্রতীক দিয়ে ধরে নিয়ে, জানা তথ্যগুলোর মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করি। এটাই বীজগণিতের অন্যতম মূল শিক্ষা।
এর ব্যবহার আরও স্পষ্ট হয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে। কোনও গাড়ি নির্দিষ্ট গতিতে চললে কত সময়ে কত দূরত্ব অতিক্রম করবে, একটি ট্যাঙ্কে নির্দিষ্ট হারে জল ঢুকলে কত সময়ে তা পূর্ণ হবে, একটি বৈদ্যুতিক সার্কিটে ভোল্টেজ বা রোধের পরিবর্তনে কারেন্ট কীভাবে বদলাবে—এসব ক্ষেত্রেই বিভিন্ন রাশির মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করতে হয়। প্রকৌশলী যখন একটি সেতুর নকশা করেন, বিজ্ঞানী যখন কোনও পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করেন, কম্পিউটার প্রোগ্রাম যখন কোনও ইনপুট থেকে ফলাফল বের করে, তখন পেছনে থাকে এই ধরনের গাণিতিক সম্পর্ক। এমনকি GPS, কম্পিউটার গ্রাফিক্স, রোবটের চলাচল, মহাকাশযানের গতিপথ কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অনেক গণনাতেও বীজগাণিতিক সমীকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। স্কুলে শেখা প্রতিটি সূত্রকে ভবিষ্যতে হুবহু ব্যবহার করতেই হবে, এমন নয়। যেমন একজন মানুষ হয়তো সারাজীবনে একবারও (a+b)² = a²+2ab+b² লিখবেন না। কিন্তু সেই সূত্র শেখার সময় তিনি যে অভ্যাসটি তৈরি করেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। একটি জটিল সমস্যাকে ছোট অংশে ভাগ করা, অজানা বিষয়কে একটি প্রতীক দিয়ে প্রকাশ করা, বিভিন্ন তথ্যের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে বের করা এবং ধাপে ধাপে সমাধানে পৌঁছানো—এই দক্ষতাগুলো শুধু গণিতের জন্য নয়। অর্থনীতি, বিজ্ঞান, কম্পিউটার, প্রকৌশল, ব্যবসা এমনকি দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও একই ধরনের যুক্তি কাজে লাগে। তাই বীজগণিতকে শুধু “সূত্র মুখস্থ করার বিষয়” হিসেবে দেখলে এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি চোখ এড়িয়ে যায়।
শেষ পর্যন্ত বীজগণিতের সবচেয়ে বড় ব্যবহার হয়তো কোনও নির্দিষ্ট সূত্রে নয়, ভাবার পদ্ধতিতে। বাস্তব জীবনের অনেক সমস্যার উত্তর সরাসরি চোখের সামনে থাকে না। কিছু তথ্য জানা থাকে, কিছু অজানা থাকে এবং সেই তথ্যগুলোর মধ্যে কোনও একটি সম্পর্ক লুকিয়ে থাকে। বীজগণিত আমাদের শেখায় সেই অজানাকে x ধরে সমস্যাটিকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনতে। তাই স্কুলের খাতায় লেখা x হয়তো বড় হয়ে আমাদের সামনে আর দেখা যায় না, কিন্তু অজানা সমস্যাকে ভেঙে সমাধান করার সেই চিন্তাটি আমাদের সঙ্গে থেকে যায়।
[©] উপম বিকাশ |
৪৬
*ধানের চেয়েও পুরনো, সিন্ধু সভ্যতা থেকে আমাদের পাতে মিলেটের গল্প,*
মিলেট (Millet) বা বাজরা জাতীয় শস্যকে একবিংশ শতাব্দীর একটি অলৌকিক বা 'সুপারফুড' (Superfood) বলা চলে। এটি কেবল পুষ্টিগুণেই অনন্য নয়, বরং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একটি চমৎকার ফসল।
প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের উপমহাদেশে মিলেটের প্রচলন ছিল। স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে বর্তমান বিশ্বে এটি আবার জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
আজ থেকে কয়েক শত বছর বা হাজার বছর আগে ভারতীয় উপমহাদেশসহ পৃথিবীর বহু অঞ্চলে ধান বা গমের চেয়েও মিলেট বা বাজরা জাতীয় শস্য অনেক বেশি চাষ এবং খাওয়া হতো।
ইতিহাস এবং প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ঘাঁটলে এর পেছনে চমৎকার কিছু কারণ এবং ঐতিহাসিক সত্য জানা যায়:
ঐতিহাসিক প্রমাণ ও আমাদের সংস্কৃতি:
• সিন্ধু সভ্যতার প্রধান খাদ্য: হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদারো সভ্যতার (আজ থেকে প্রায় ৪,৫০০ বছর আগে) প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে প্রচুর পরিমাণে মিলেটের (বিশেষ করে কাউন ও রাগী) প্রমাণ মিলেছে। তখন সিন্ধু অববাহিকার মানুষের প্রধান খাবার ছিল মিলেট, ধান বা গম নয়।
• বাংলা সাহিত্যের প্রমাণ: মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য, যেমন 'মনসামঙ্গল' বা 'চণ্ডীমঙ্গল' কাব্যে সাধারণ মানুষের খাদ্যাভ্যাসের বর্ণনায় কাউনের চালের ক্ষীর, চিনা চালের ভাত এবং পিঠার প্রচুর উল্লেখ পাওয়া যায়। তখন অতি উচ্চবিত্ত বা রাজপরিবার ছাড়া সাধারণ মানুষের ঘরে প্রতিদিনের ভাতের চাল বলতে কাউন বা চিনাকেই বোঝাত।
ধানের চেয়ে মিলেট কেন বেশি চাষ হতো?
শত শত বছর আগে যখন আধুনিক সেচ ব্যবস্থা, রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ছিল না, তখন প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে মিলেটই ছিল কৃষকদের প্রথম পছন্দ:
• প্রকৃতির সাথে লড়াই করার ক্ষমতা: মিলেট চাষে ধানের মতো কাদা করা জমি বা প্রচুর পানির দরকার হয় না। বৃষ্টি না হলেও বা খরা দেখা দিলেও মিলেট সহজে মরে না।
• সংরক্ষণ যোগ্যতা: প্রাচীনকালে এখনকার মতো হিমাগার বা আধুনিক গুদাম ছিল না। মিলেট বা রাগী এমন একটি শস্য, যা কোনো রকম কীটনাশক ছাড়াই ১০ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত ঘরে ভালো রাখা যায়। ফলে তখনকার মানুষ দুর্ভিক্ষের হাত থেকে বাঁচতে মিলেট জমা করে রাখত।
• সব ধরণের মাটিতে ফলন: পাহাড়ের ঢাল, চরাঞ্চল কিংবা অনুর্বর লাল মাটি—সব জায়গাতেই মিলেট অনায়াসে জন্মাত, যেখানে ধানের চাষ করা অসম্ভব ছিল।
তাহলে মিলেট হারিয়ে গেল কেন?
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে (১৯৬০-এর দশকে) এশিয়ায় 'সবুজ বিপ্লব' (Green Revolution) ঘটে। সেই ষড়যন্ত্রের ফলসরুপ :
১. উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান ও গমের উদ্ভাবন হয়।
২. সরকারিভাবে ধান ও গম চাষে প্রচুর ভর্তুকি এবং সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হয়।
৩. ধীরে ধীরে মানুষের মানসিকতায় পরিবর্তন আসে এবং মিলেটের মতো পুষ্টিকর খাবারকে 'গরিবের খাবার' বা 'পাখির খাবার' হিসেবে গণ্য করা শুরু হয়। ফলে মাঠের পর মাঠ মিলেট চাষের জমি ধানের দখলে চলে যায়।
তবে আশার কথা হলো, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পুষ্টিহীনতার বিরুদ্ধে লড়তে বর্তমান বিশ্ব আবার সেই শত শত বছর আগের 'অলৌকিক' শস্য মিলেটের বুকেই ফিরে আসছে।
মিলেট কেন অনন্য? (পুষ্টি ও স্বাস্থ্যগুণ)
মিলেটকে অলৌকিক খাবার বলার পেছনে রয়েছে এর অসাধারণ কিছু স্বাস্থ্যগত সুবিধা:
• ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: মিলেটের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) বেশ কম। এটি রক্তে হুট করে শর্করার মাত্রা বাড়ায় না, যার ফলে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটি একটি আদর্শ খাবার।
• গ্লুটেন-মুক্ত (Gluten-free): যাদের সিলিয়াক ডিজিজ (Celiac Disease) আছে বা গ্লুটেনে অ্যালার্জি আছে, তারা গমের বিকল্প হিসেবে নিশ্চিন্তে মিলেট খেতে পারেন।
• হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়: এতে প্রচুর পরিমাণে ম্যাগনেসিয়াম ও পটাশিয়াম রয়েছে, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং হার্ট ভালো রাখে।
• হজমশক্তি বৃদ্ধি ও ওজন নিয়ন্ত্রণ: মিলেট ডায়েটারি ফাইবার বা আঁশে ভরপুর। এটি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে, দীর্ঘক্ষণ পেট ভরিয়ে রাখে এবং ওজন কমাতে সাহায্য করে।
• পুষ্টির খনি: এতে প্রচুর পরিমাণে আয়রন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং রক্তশূন্যতা দূর করে।
পরিবেশ ও চাষাবাদের ক্ষেত্রে অলৌকিক অবদান:
শুধু শরীরের জন্য নয়, পৃথিবীর জন্যও মিলেট একটি জাদুকরী ফসল:
• কম পানিতে চাষ: ধান বা গমের তুলনায় মিলেট চাষে অত্যন্ত কম পানির প্রয়োজন হয়। খরাপ্রবণ এলাকাতেও এটি সহজে জন্মে।
• কীটনাশক মুক্ত: এই ফসলে রোগবালাই কম হয়, তাই রাসায়নিক সার বা ক্ষতিকর কীটনাশকের ব্যবহার প্রায় লাগে না বললেই চলে।
• জলবায়ু সহনশীল: তীব্র গরম বা প্রতিকূল আবহাওয়াতেও মিলেট টিকে থাকতে পারে, যা ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
* গবাদি পশুর খাবার : মিলেট আহরনের পর, অবশিষ্ট্য গাছটি ঘাস হিসেবে গবাদি পশুকে খাওয়ালে পশু প্রচুর শক্তিশালী হয়, দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সেই পশু হাল চাষ বা কাঠের ঘানি টানতে পারে। তাই উন্নত মানের ঘাসের পরিবর্তে মিলেট চাষ করলে নিজেদের পাশাপাশি গবাদি পশুর খাবারের ব্যবস্থাও হয়ে যায়।
# বাংলাদেশে চাষযোগ্য এমন কয়েকটি মিলেট : চিনা, কাউন, রাগি, বাজরা এবং জোয়ার—এই পাঁচটিই অত্যন্ত পুষ্টিকর মিলেট পরিবার। বাংলাদেশে কাউন ও চিনা প্রাচীন কাল থেকেই ব্যাপক চাষ হয়, তবে বর্তমান সময়ে পুষ্টিগুণের কারণে রাগি, বাজরা ও জোয়ার চাষের প্রতিও কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।
নিচে এই ৫টি শস্যের চাষের সংক্ষিপ্ত নির্দেশিকা এবং বাংলাদেশে এই বীজগুলো পাওয়ার প্রধান উৎসগুলো দেওয়া হলো:
৫টি মিলেটের চাষের সংক্ষিপ্ত নির্দেশিকা:
★ চাষ পদ্ধতি ও বৈশিষ্ট্য :
* শস্যের নাম : কাউন (Foxtail),
চাষের সময়: অগ্রহায়ণ-মাঘ (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি),
মাটির ধরন : বেলে-দোআঁশ মাটি,
পরিপক্কতার সময় : ৯০ - ১১০ দিন,
বীজ ছিটিয়ে বা সারিতে ২৫ সেমি দূরত্বে বোনা যায়। সেচের প্রয়োজন খুব কম পড়ে।
* শস্যের নাম : চিনা (Proso),
চাষের সময় : মধ্য নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি,
মাটির ধরন : পলি বা বেলে-দোআঁশ,
পরিপক্কতার সময় : ৬০ - ৮০ দিন, অত্যন্ত কম সময়ে ফলন দেয়। চরাঞ্চলে চাষের জন্য এটি সবচেয়ে সেরা।
* শস্যের নাম : রাগি (Finger),
চাষের সময় : রবি মৌসুম (নভেম্বর-ডিসেম্বর),
মাটির ধরন : লাল মাটি, পাহাড়ি বা দোআঁশ,
পরিপক্কতার সময় : ১১০ - ১২০ দিন,
বীজতলা তৈরি করে চারা রোপণ করলে ফলন ভালো হয়। সারি থেকে সারি ৩০ সেমি দূরত্ব রাখা উচিত।
* শস্যের নাম : বাজরা (Pearl),
চাষের সময় : নভেম্বর-জানুয়ারি (রবি) অথবা খরিফ-১,
মাটির ধরন : বেলে মাটি বা কম উর্বর শুকনো মাটি,
পরিপক্কতার সময় : ৮৫ - ৯০ দিন,
খরা সহনশীল। অতিরিক্ত জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না, তাই উঁচু জমিতে বোনা ভালো।
* শস্যের নাম : জোয়ার (Sorghum),
চাষের সময় : মধ্য নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর,
মাটির ধরন : সব ধরণের মাটিতে হয়, (দোআঁশ সেরা),
পরিপক্কতার সময় : ১০০ - ১১৫ দিন,
সারিতে ৪৫ সেমি দূরত্বে বীজ বোনা হয়।
# বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় ৩টি মিলেট হলো: কাউন (Foxtail Millet), চিনা (Proso Millet) এবং রাগী (Finger Millet)। আমাদের দেশের জলবায়ু এবং মাটির উর্বরতা অনুযায়ী এই জাতগুলো চাষ করা সবচেয়ে সহজ এবং এগুলো বাজারে বেশ জনপ্রিয়।
নিচে এই ৩টি মিলেটের সুস্বাদু ও সহজ রেসিপি দেওয়া হলো:
১. কাউন চাল (Foxtail Millet):
• জনপ্রিয় রেসিপি: কাউনের ঝরঝরে পোলাও-
• উপকরণ: কাউনের চাল ১ কাপ, পানি ২ কাপ, পেঁয়াজ কুচি, আদা-রসুন বাটা, গরম মসলা, ঘি/তেল এবং পছন্দমতো সবজি।
• প্রস্তুত প্রণালী: প্রথমে কাউনের চাল ভালো করে ধুয়ে ২০-৩০ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন। প্যানে তেল বা ঘি গরম করে গরম মসলা ও পেঁয়াজ কুচি ভেজে নিন। এবার সবজি ও সামান্য আদা-রসুন বাটা দিয়ে কষিয়ে নিন। পানি ঝরানো কাউনের চাল দিয়ে ২ মিনিট ভাজুন। এরপর পরিমাণমতো গরম পানি ও লবণ দিয়ে ঢেকে দিন। পানি শুকিয়ে চাল সেদ্ধ হয়ে এলে মৃদু আঁচে ১০ মিনিট দমে রাখুন। তৈরি হয়ে যাবে পুষ্টিকর কাউনের পোলাও।
২. চিনা চাল (Proso Millet) :
কাউনের মতোই চিনা (কিছুটা বড়)
• জনপ্রিয় রেসিপি: চিনা চালের ঝাল খিচুড়ি-
• উপকরণ: চিনা চাল ১ কাপ, মুগ বা মসুর ডাল আধ কাপ, হলুদ-মরিচ গুঁড়ো, জিরা গুঁড়ো, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ এবং তেল।
• প্রস্তুত প্রণালী: চিনা চাল ও ডাল একসাথে ধুয়ে আধা ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখুন। পাত্রে তেল গরম করে পেঁয়াজ ও মসলা কষিয়ে নিন। এবার চাল ও ডাল দিয়ে কিছুক্ষণ নেড়ে ৩ কাপ পানি দিন। বলক আসলে চুলার আঁচ কমিয়ে ঢাকনা দিয়ে দিন। চাল-ডাল পুরোপুরি সেদ্ধ হয়ে মাখামাখা হলে নামিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।
৩. রাগী বা মারুয়া (Finger Millet):
এটি লালচে রঙের হয় এবং এতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম থাকে। শিশুদের বাড়ন্ত বয়সের পুষ্টির জন্য এটি দারুণ উপকারী। এটি উচ্চ রোগবালাই প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন এবং পাহাড়ি বা ঢালু অঞ্চলেও ভালো জন্মে।
• জনপ্রিয় রেসিপি: রাগীর পুষ্টিকর হালুয়া বা জাউ (Porridge)-
• উপকরণ: রাগীর আটা বা গুঁড়ো ৪ চামচ, তরল দুধ ২ কাপ, গুড় বা মধু স্বাদমতো, এবং বাদাম কুচি।
• প্রস্তুত প্রণালী: প্রথমে আধ কাপ পানিতে রাগীর আটা ভালো করে গুলে নিন যাতে কোনো দলা পেকে না থাকে। এবার একটি পাত্রে দুধ গরম করে তাতে এই মিশ্রণটি ঢেলে দিন। মাঝারি আঁচে অনবরত নাড়তে থাকুন যেন নিচে লেগে না যায়। মিশ্রণটি ঘন হয়ে এলে নামানোর আগে গুড় বা মধু এবং ওপরে বাদাম কুচি ছড়িয়ে দিন। এটি সকালের নাশতার জন্য একটি চমৎকার পুষ্টিকর খাবার।
# বাংলাদেশে এই ৫টি মিলেটের বীজ কোথায় পাবেন?
বাংলাদেশে কাউন ও চিনা ছাড়া বাকি ৩টি (রাগি, বাজরা, জোয়ার) বীজ সচরাচর সাধারণ বাজারে পাওয়া যায় না। বীজ সংগ্রহের প্রধান মাধ্যমগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. সরকারি প্রতিষ্ঠান (সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য)
• বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI): বারির উদ্যানতত্ত্ব বা মাঠ ফসল বিভাগ এই দানাশস্যগুলোর বীজ সংরক্ষণ ও গবেষণা করে। গাজীপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI)-এর প্রধান কার্যালয় বা তাদের আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্রে যোগাযোগ করে প্রদর্শনী প্লটের জন্য বীজ সংগ্রহ করা যাবে।
• উপজেলা কৃষি অফিস: আপনার এলাকার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার অফিসে যোগাযোগ করলে তারা সরকারি কোনো প্রকল্প বা বিএডিসি (BADC) এর মাধ্যমে এই বীজগুলো এনে দিতে পারেন।
২. অনলাইন বীজ ও নার্সারি শপ (ছোট পরিসরে চাষের জন্য)
• Daraz Bangladesh: ছোট জায়গায় ট্রায়াল দেওয়ার জন্য বা ছাদবাগানে চাষের জন্য Daraz Bangladesh Ragi & Millet Seeds-এ কাঁচা ও আনপলিশড রাগি, বাজরা ও জোয়ারের বীজ পেয়ে যাবেন। মূলত পাখি বা কবুতরের খাবার (Bird Feed) হিসেবে বিক্রিত বীজগুলো ধুয়ে-শুকিয়ে জমিতে বপন করলেও চারা গজায়।
• ফেসবুক এগ্রো গ্রুপ: ফেসবুকে বিভিন্ন ছাদবাগান বা আধুনিক কৃষি ভিত্তিক গ্রুপ রয়েছে। যেখানে প্রগতিশীল চাষিরা নিজেদের উৎপাদিত রাগি ও বাজরার বীজ বিক্রি করেন।
৩. অর্গানিক শপ (খাওয়ার উপযোগী দানা থেকে বীজ)
• আপনি যদি একেবারে খাঁটি এবং আনপলিশড আস্ত দানা থেকে বীজ তৈরি করতে চান, তবে Krishok Bazar অথবা Astha Shop Bangladesh এর মতো অর্গানিক গ্রোসারি শপ থেকে আস্ত রাগি বা বাজরা কিনে বপন করতে পারেন। তবে কেনার আগে নিশ্চিত হয়ে নিন যে শস্যটি আস্ত (Whole Grain) কিনা।
# এসব জায়গায় বীজ পাওয়া না গেলে করনীয় : পাখির খাবারের দোকানে যে মিলেট বিক্রি হয়, তা দিয়েও চাষ করা সম্ভব। তবে সব ধরনের মিলেট থেকে ভালো ফলন নাও পাওয়া যেতে পারে। পাখির খাবারের মিলেট দিয়ে চাষ করার ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা, ঝুঁকি এবং করণীয় নিচে আলোচনা করা হলো:
কেন চাষ করা সম্ভব? (সুবিধা)
• আনপলিশড ও প্রাকৃতিক: পাখির খাবারের মিলেটগুলো সাধারণত সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক, আস্ত দানা (Whole Grain) এবং আনপলিশড (খোসা সহ) হয়ে থাকে। বীজ থেকে চারা গজানোর জন্য খোসা সহ আস্ত দানা হওয়া আবশ্যিক।
• সহজলভ্যতা ও কম খরচ: এই বীজগুলো ওজনে এবং খুব কম দামে যেকোনো পাখির দোকানে বা বাজারে পাওয়া যায়, যা পরীক্ষামূলক চাষের জন্য দারুণ।
প্রধান ঝুঁকি ও সমস্যাগুলো-
১. অঙ্কুরোদগমের হার (Germination Rate) কম হতে পারে: পাখির খাবারের দোকানে বীজগুলো কতদিনের পুরোনো বা কীভাবে সংরক্ষিত হয়েছে তা জানা থাকে না। বীজ বেশি পুরোনো বা স্যাঁতসেঁতে হলে চারা গজানোর হার ২০-৩০% এ নেমে আসতে পারে।
২. জাতের অনিশ্চয়তা: এই মিলেটগুলো কোন জাতের (হাইব্রিড নাকি লোকাল) তা নিশ্চিত হওয়া যায় না। অনেক সময় এগুলো থেকে গাছ বড় হলেও শীষে পর্যাপ্ত দানা আসে না।
৩. রোগবালাইয়ের : এই বীজগুলো শোধন (Seed Treatment) করা থাকে না। ফলে মাটি ও বীজের মাধ্যমে গাছে ছত্রাক বা অন্যান্য রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে।
বপন করার আগে আপনার করণীয় (পরীক্ষা ও প্রস্তুতি):
পাখির দোকানের মিলেট সরাসরি জমিতে না বুনে নিচের পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করলে সফলতার হার অনেক বেড়ে যাবে:
• ১. অঙ্কুরোদগম পরীক্ষা (Floating & Germination Test):
• প্রথমে কিছু মিলেট পানিতে ভিজিয়ে দিন। যেগুলো ভেসে উঠবে সেগুলো ফেলে দিন (কারণ ওগুলো ভেতর থেকে ফাঁপা)।
• এরপর বাকি বীজগুলো একটি ভেজা সুতি কাপড় বা টিস্যু পেপারে মুড়িয়ে ২-৩ দিন অন্ধকার স্থানে রাখুন। যদি দেখেন ৭০-৮০% বীজে সাদা অঙ্কুর গজিয়েছে, তবে বুঝবেন এই বীজটি জমিতে চাষের উপযোগী।
• ২. বীজ শোধন: চারাকে ছত্রাক ও রোগবালাই থেকে বাঁচাতে বীজ বপনের আগে সামান্য ছত্রাকনাশক (যেমন: কার্বেনডাজিম বা ম্যানকোজেব গুঁড়ো) অথবা প্রাকৃতিক নিম তেল দিয়ে বীজগুলো একটু মাখিয়ে নিতে পারেন।
• ৩. ছোট স্কেলে শুরু করা: পাখির দোকানের মিলেট দিয়ে একবারে বড় জমিতে বাণিজ্যিক চাষ না করে প্রথমে একটি ছোট টবে, ড্রামে বা জমির এক কোণে পরীক্ষামূলকভাবে বুনে দেখা উচিত গাছ এবং ফলন কেমন হচ্ছে।
*আসন্ন দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় আজ থেকেই মিলেটের বীজ সংগ্রহ করে রাখুন।
@ samim islam
৪৭
লালিবেলা: ইথিওপিয়ার পাহাড়ে মাটির ভেতর থেকে খোদাই করা এগারোটা গির্জা, যেগুলো মাটির নিচে থেকেও আকাশের দিকে মাথা তুলে আছে।
ইথিওপিয়ার উত্তরের পাহাড়ি অঞ্চলে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৫০০ মিটার উঁচুতে, মাটি খুঁড়ে নেমে গেলে দেখা যায় এক অদ্ভুত দৃশ্য। গির্জা, কিন্তু তার ছাদ মাটির সমতলের সমান, দেয়ালগুলো নেমে গেছে নিচের দিকে। এগুলো একটাও ইট দিয়ে গাঁথা নয়, প্রতিটা একটা গোটা পাথরের চাঁই থেকে ওপর থেকে নিচের দিকে খোদাই করে বের করা, একটাই আস্ত পাথর, পুরোপুরি জায়গায় বসানো, কোনো জোড়া লাগানো অংশ নেই। এটা লালিবেলা, ইথিওপিয়ার এগারোটা এমন "মনোলিথিক" বা এক-পাথরে-খোদাই গির্জার শহর।
এক রাজার নামে শহর।
এই গির্জাগুলো নির্মিত হয় আনুমানিক ১২শ শতকের শেষ থেকে ১৩শ শতকের শুরুর দিকে, ইথিওপিয়ার জাগওয়ে রাজবংশের রাজা লালিবেলার শাসনামলে, আর শহরের নামও তাঁরই নামে। কিংবদন্তি বলে, রাজা লালিবেলা জেরুজালেম তীর্থযাত্রায় যেতে না পারার কারণে ইথিওপিয়াতেই একটা "নতুন জেরুজালেম" গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যাতে মুসলিম বিজয়ের কারণে পবিত্র ভূমিতে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়া তীর্থযাত্রীরা নিজের দেশেই তীর্থ করতে পারেন। শহরের কিছু স্থাননামও (যেমন একটা নদীর নাম "জর্ডান") এই জেরুজালেম-সংযোগের ইঙ্গিত বহন করে।
পাথর কেটে নামার কৌশল।
নির্মাতারা প্রথমে বিশাল আকারের একটা গর্ত বা পরিখা খুঁড়তেন পাথরের চারদিক ঘিরে, যাতে মাঝখানে একটা আস্ত পাথরের ব্লক অবশিষ্ট থাকে। এরপর সেই ব্লককে বাইরে থেকে ভেতরের দিকে, ওপর থেকে নিচের দিকে খোদাই করে গির্জার আকার দেওয়া হত, জানালা, দরজা, স্তম্ভ, ছাদের অলংকরণ, সবকিছু একই পাথরের অংশ হিসেবে। সবচেয়ে বড় গির্জা "বেতে মেদহানে আলেম"-এর উচ্চতা প্রায় ১১ মিটার, দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৩ মিটার, এবং এটাকে বিশ্বের বৃহত্তম মনোলিথিক পাথর-খোদাই স্থাপনাগুলোর একটা বলে মনে করা হয়।
ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে যুক্ত এক শহর।
গির্জাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, এদের যুক্ত করেছে সরু সুড়ঙ্গ আর পরিখা-পথ, যার মধ্য দিয়ে মানুষ এক গির্জা থেকে আরেক গির্জায় যেতে পারে, রোদ-বৃষ্টি এড়িয়ে। কিছু সুড়ঙ্গ অন্ধকার আর সরু, প্রতীকীভাবে "নরক থেকে স্বর্গের" যাত্রা বোঝাতে ব্যবহৃত হত বলে স্থানীয় বিশ্বাস। "বেতে গিয়োর্গিস" বা সেন্ট জর্জ গির্জা, ক্রুশ আকৃতিতে খোদাই করা, মাটির প্রায় ১২ মিটার গভীরে অবস্থিত, লালিবেলার সবচেয়ে আইকনিক ছবিগুলোর একটা।
দেবদূতদের সাহায্যের কিংবদন্তি।
স্থানীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী, বিশ্বাস করা হয় দিনে মানুষ কাজ করত, আর রাতে দেবদূতরা এসে কাজ এগিয়ে দিতেন, যার ফলে এত বিশাল কাজ তুলনামূলক অল্প সময়ে শেষ হয়েছিল। ঐতিহাসিকভাবে এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত নয়, তবে এই কিংবদন্তি আজও স্থানীয় ধর্মীয় বিশ্বাসের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ, আর গির্জাগুলোর পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
আজও জীবন্ত এক তীর্থস্থান।
লালিবেলার গির্জাগুলো কোনো পরিত্যক্ত ধ্বংসাবশেষ নয়, প্রায় ৮০০ বছর ধরে এগুলো অবিচ্ছিন্নভাবে ধর্মীয় উপাসনার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ইথিওপিয়ান অর্থোডক্স তেওয়াহেদো চার্চের অনুসারীরা আজও নিয়মিত এখানে প্রার্থনা করেন, আর প্রতি বছর বিশেষ করে ক্রিসমাসের সময় (ইথিওপিয়ান ক্যালেন্ডারে জানুয়ারি মাসে) হাজার হাজার তীর্থযাত্রী এখানে সমবেত হন।
মূলধারার ব্যাখ্যা কী?
এখানে কোনো "হারানো সভ্যতা" রহস্য নেই, ইতিহাস এবং স্থাপত্য উভয়ই সুপরিচিত এবং সুপ্রতিষ্ঠিত। ইথিওপিয়ার নিজস্ব লিখিত ঐতিহ্য (গিজ ভাষায়) এবং পরবর্তী রাজকীয় নথিতে লালিবেলা রাজার নির্মাণকাজের বিবরণ পাওয়া যায়। সমস্যাটা মূলত আন্তর্জাতিক পরিচিতির অভাবে, দীর্ঘদিন ইথিওপিয়া বৈশ্বিক ইতিহাস চর্চায় প্রান্তিক অবস্থানে ছিল, ফলে এই বিস্ময়কর স্থাপত্য মিশরীয় বা মধ্যপ্রাচ্যের বিস্ময়ের তুলনায় কম আলোচিত থেকে গেছে। ১৯৭৮ সালে লালিবেলা ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যস্থল হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
কিন্তু প্রশ্নগুলো থেকেই যায়।
এত বিশাল আর নিখুঁত কাজ ঠিক কত বছরে শেষ হয়েছিল, তার সুনির্দিষ্ট সময়রেখা আজও অস্পষ্ট, কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন কাজ কয়েক দশক ধরে চলেছিল, কিছু গির্জা হয়তো লালিবেলার শাসনামলের আগে বা পরেও নির্মিত হয়ে থাকতে পারে। কতজন কারিগর এই কাজে যুক্ত ছিলেন, তাদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ঠিক কোথা থেকে এসেছিল, এসব প্রশ্নেরও নিশ্চিত উত্তর নেই।
শেষ কথা।
লালিবেলা মনে করিয়ে দেয়, বিশ্বাসের শক্তি কখনো কখনো পাহাড়কেও গির্জায় বদলে দিতে পারে। একটা রাজ্য যখন তীর্থের পথ বন্ধ পায়, তখন সে নিজের মাটিতেই নতুন এক পবিত্র শহর গড়ে তোলে, পাথর কেটে, ধৈর্য ধরে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। আজও সেই পাথর প্রতিদিন প্রার্থনার সুরে ভরে ওঠে।
আপনার কাছে প্রশ্ন: লালিবেলার কথা কি আগে শুনেছিলেন? দেবদূতদের সাহায্যের এই কিংবদন্তি সম্পর্কে আপনার কী মনে হয়? কমেন্টে বলুন। এই অজানা ইতিহাস ছড়িয়ে দিতে একটা শেয়ার করুন।
পরের পোস্টে আসছে পালেঙ্কে। মেক্সিকোর গভীর জঙ্গলে ঢাকা পড়ে থাকা মায়া সভ্যতার এক শহর, যেখানে এক রাজার সমাধি থেকে পাওয়া পাথরের ঢাকনায় খোদাই করা ছবি নিয়ে আজও বিতর্ক চলে, এটা কি মৃত্যুর প্রতীক, নাকি অন্য কিছু।
পেজটা ফলো করে রাখুন। মিস করলে আফসোস হবে। কারণ ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায়গুলো এখনো শেষ হয়নি।
@সম্রাট রায় চৌধুরী
৪৮
মোহসীনউদ্দীন দুদু মিয়া:
তিনি ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত সমাজ সংস্কারক ও ফরায়েজী আন্দোলনের প্রবক্তা হাজী শরীয়তউল্লাহর একমাত্র পুত্র । ১৮১৯ সালে মাদারীপুরে জন্ম নেওয়া এই মহান পুরুষ ১৮৪০ সালে পিতার ওফাতের পর ফরায়েজী আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ নেন।
সে সময় বাংলার নিপীড়িত কৃষকসমাজ একদিকে হিন্দু জমিদার, অন্যদিকে ইউরোপীয় নীলকরদের দ্বিমুখী শোষণে জর্জরিত ছিল। দুদু মিয়া নিরস্ত্র নিপীড়িত কৃষকদের সংগঠিত করে জমিদার ও নীলকরদের ভাড়াটে লাঠিয়াল বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, এবং তাদের শক্তিমত্তা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দেন। ফলে ১৮৩৮ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ দুই দশক ফরায়েজী অধ্যুষিত এলাকায় শান্তি বজায় ছিল।
দুদু মিয়ার সবচেয়ে বিপ্লবী ঘোষণা ছিল যে, জমি থেকে অন্যায় ভাবে খাজনা আদায় আল্লাহর আইনের পরিপন্থী। জমির হক একমাত্র কৃষকের। শ্রমের ওপরই যে জমির প্রকৃত মালিকানা নিহিত, এই মতবাদ সেকালের বাংলায় ছিল এক যুগান্তকারী চিন্তা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নিপীড়িত কৃষকরা তাঁর এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে তাঁর পতাকাতলে সমবেত হয়। একইসাথে তিনি গ্রামীণ সমাজে নিজস্ব বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে ফরায়েজী খলিফার অনুমতি ছাড়া সরকারি আদালতে যাওয়া নিষিদ্ধ করেন। এটি ছিল এক ধরনের সমান্তরাল সামাজিক শাসনব্যবস্থা, যা জনগণকে ঐক্যবদ্ধ ও স্বনির্ভর করে তোলে।
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের পর তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয়, ১৮৬১ সালে মুক্তি পান এবং ১৮৬২ সালের ২৪/২৫ সেপ্টেম্বর তিনি ইন্তেকাল করেন। @ পাঠশালা CBS
৪৯
বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ানি
১৭৬৫ সাল। রবার্ট ক্লাইভ দ্বিতীয়বার বাংলার গভর্নর হয়ে ফিরলেন। এসেই দেখলেন ভয়াবহ চিত্র—ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিজস্ব কর্মচারীরাই স্থানীয় নবাব-জমিদারদের কাছ থেকে অবাধে "নজরানা" (উপহার-ঘুষ) নিচ্ছে, ব্যক্তিগত বাণিজ্য করে পকেট ভরাচ্ছে। কোম্পানির স্বার্থ তখন কর্মচারীদের ব্যক্তিস্বার্থের কাছে জিম্মি।
ক্লাইভ যা করলেন, তা রীতিমতো বিপ্লব:
প্রত্যেক কর্মকর্তাকে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করালেন এই বলে যে আর কোনো উপহার বা নজরানা নেওয়া যাবে না।
বেতন বাড়িয়ে দিলেন, যাতে ঘুষের "প্রয়োজন" কমে।
লবণ, সুপারি, তামাকের বৈধ ব্যবসার জন্য গড়লেন "সোসাইটি অব ট্রেড"—কর্মচারীরা যেন বৈধ পথেই আয় করতে পারে।
একই বছর, আগস্ট মাসে এলাহাবাদের চুক্তিতে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ানি তুলে দিলেন কোম্পানির হাতে। রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা এখন সরাসরি কোম্পানির। আর সেই বিশাল ক্ষমতার লাগাম টানতেই ক্লাইভের এই সংস্কার।
প্রশ্ন হলো—একটা ব্যবসায়িক কোম্পানি যখন রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে পায়, তখন কি সংস্কার দিয়ে দুর্নীতি সত্যিই থামানো যায়? নাকি ক্ষমতাই একসময় সংস্কারকদেরও গ্রাস করে নেয়? @ ridwan
৫০
১৩৯৬ সালে সংঘটিত হয় মধ্যযুগের ইতিহাসে ঘোষিত শেষ ক্রুসেড।
নিকোপোলিসের প্রান্তরে সংঘটিত এই ক্রুসেডে হোলি রোমান লীগ, বায়জান্টাইন, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া, ভেনিস, জেনোয়া, পোল্যান্ড, জার্মানি সহ ইউরোপের অধিকাংশ শক্তিধর সাম্রাজ্যগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে।
তবে সুলতান বায়েজিদ ইলদিরিমের নেতৃত্বে উসমানীয় বাহিনী এই যুদ্ধে ইউরোপের সম্মিলিত ক্রুসেডার বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে।
সর্ববৃহৎ ক্রুসেডের পতন: নিকোপলিসের যুদ্ধ - মধ্যযুগীয় ইতিহাসে ঘোষিত সবচেয়ে বড় ও শেষ ক্রুসেড।
১৩৯৬ সালের এইদিনে (২৫ সেপ্টেম্বর) উসমানীয় সুলতান বায়েজিদের নিকটে সম্মিলিত ক্রুসেড বাহিনী (হাঙ্গেরি, ক্রোয়েশিয়া, বুলগেরিয়া, ওয়ালশিয়া, ফ্র্যান্স, রোডেশিয়া, রাইনল্যান্ড, বাভারিয়া, সাক্সানি, পোল্যান্ড, বোহেমিয়া, নাভারে, স্পেন, ব্রিটেন, বারগুন্ডি, জার্মান, ভেনিস, নেদারল্যান্ড, ইতালি, স্কটল্যান্ড, সুইডেন, জেনোয়া, সেন্ট জন ও অন্যান্য) পরাজিত হয়েছিল।
১৩৯৪ সালে পোপ নবম বোনাফিস নতুন করে ক্রুসেডের ডাক দেন। বাইজান্টাইন সম্রাট ম্যানুয়েল (দ্বিতীয়) পালাইয়োলগোস ও হাঙ্গেরীর রাজা সিগিসমুন্ড পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে সাহায্য চেয়ে পাঠান। ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় রিচার্ড উসমানীয় সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করার শপথ নেন। ফ্রান্সের অভিজাত শ্রেণী এতে স্বতস্ফূর্তভাবে সাড়া দেয়।
বিশাল ক্রুসেডার বাহিনী ১৩৯৬ সালের ৩০ এপ্রিল ফ্রান্সের দিজন থেকে যাত্রা শুরু করে। তারা যাচ্ছিল বেশ উৎসবমুখর সাজে সজ্জিত হয়ে। চব্বিশটি গাড়ি জুড়ে শুধু তাঁবু আর প্যাভিলিয়ন ছিল। ১৩৯৬ সালের জুলাই মাসে যখন সেই বাহিনী বুদায় পৌঁছে, তখন আনন্দে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলেন রাজা সিগিসমুন্ড।
আনন্দের আতিশায্যে সিগিসমুন্ড বলেন যে, এখন তিনি কেবল উসমানীয় বাহিনীকে ইউরোপ থেকে বিদায় করতে পারবেন তা নয়, বরং যদি আকাশটাও ভেঙে পড়ে তাহলে নিজের বর্শার সাহায্যে সেটাকে ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়েও রাখতে পারবেন! কিন্তু ওদিকে বুদায় খ্রিস্টান বাহিনীর যুদ্ধ পরিষদে গন্ডগোল বেঁধে যায়।
সিগিসমুন্ড চেয়েছিলেন যে, দীর্ঘ যাত্রাপথের ক্লান্তি নিয়ে সুলতান বায়েজিদ যেন এখানে আসেন। কিন্তু এতে ফরাসি ও মিত্রদের আহমিকায় আঘাত লাগে। তারা নিজেরাই সুলতান বায়েজিদের সাথে লড়াইয়ের জন্য এগিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর দানিয়ুব নদীর পশ্চিম তীর ধরে সম্মিলিত খ্রিষ্টান বাহিনী যাত্রা শুরু করে।
একসময় তারা মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে প্রবেশ করে। তারা অকাতরে ধ্বংসযজ্ঞ ও লুটতরাজ শুরু করে দেয়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে ছিলো ফরাসি বাহিনী। এরপর তারা গিয়ে পৌঁছান ভিদিনে, যার শাসক ছিলেন ইভান স্ট্রাটসিমির। তিনি অটোমান সামন্তরাজ হয়ে থাকতে ইচ্ছুক ছিলেন না।
ইভান বিনা প্রতিরোধে আত্মসমর্পন করেন। তবে, সামান্য সংঘর্ষ হয়েছিল উসমানীয় সেনা ছাউনিতে। সেখানে অল্পতেই জয় পায় খ্রিস্টান বাহিনী। এই খন্ডযুদ্ধে বিজয়ের পর ফরাসি সৈন্যরা গর্ব করতে শুরু করল যে, ওসমানীয় বাহিনী ক্রুসেডের ময়দানে তাদের সামনে টিকতেই পারবে না!
এরপর তারা এগিয়ে গিয়ে ওরয়াহোভো দূর্গ অবরোধ করে। দূর্গের সৈন্যরা তাদের জীবন ও সম্পদের ক্ষতি করা হবে না- এই শর্তে আত্মসমর্পণ করেন। সিগিসমুন্ড সেটা মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু গেট খোলার সাথে সাথে ফরাসি বাহিনী শহরে প্রবেশ করে এবং হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসের লীলাখেলায় মেতে ওঠে।
এখানে হাজার খানেক নগরবাসীকে বন্দী করা হয় এবং পুরো নগর জ্বালিয়ে দেয়া হয়। এরপর তার এগোতে শুরু করে নিকোপলিসের দিকে। পথিমধ্যে আরো কিছু দুর্গ তাদের বশ্যতা মেনে নেয়। কিন্তু যাত্রাপথে একটি দুর্গ তাদের নজর এড়িয়ে যায়। সুযোগ বুঝে সেখানের দূতেরা অতিদ্রুত বেগে সুলতানকে খবর দিতে রওনা হয়।
অবশেষে ১২ সেপ্টেম্বর ক্রুসেডার বাহিনী নিকোপলিস দুর্গের একেবারে কাছাকাছি চলে আসে। তারা এ দুর্গ অবরোধ করে ফেলে। তারা জল ও স্থলপথে শহরটি থেকে যাওয়া-আসার সকল পথ বন্ধ করে দেয়। তখন নিকোপলিসের শাসক ছিলেন দোয়ান বে। তিনি দূর্গের দখলে অনড় হয়ে রইলেন।
ওদিকে ক্রুসেডের খবর পেয়ে সুলতান দ্রুত নিকোপলিসের দিকে যাত্রা করেন। সিগিসমুন্ড ৫০০ অশ্বারোহী পাঠিয়েছিলেন উসমানীয় বাহিনীর আগমনের ব্যাপারে খোঁজ রাখতে। তারা বিশাল উসমানীয় বাহিনীর আগমনের খবর জানায়। মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে অতদুর থেকে উসমানীয়দের আগমন কেউই প্রত্যাশা করেনি।
উসমানীয়দের যাত্রা বিলম্বিত করতে কাউচির লর্ড এঙ্গেরান্ড ৫০০ অশ্বারোহী ও ৫০০ তীরন্দাজ নিয়ে এগিয়ে যান। তার বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণে উসমানীয়দের বেশ কিছু সেনা হতাহত হয়। এঙ্গেরান্ড ক্যাম্পে ফিরে আসেন এবং উসমানীয়রা দ্রুত সামলে নিয়ে এগিয়ে যান। ২৪ সেপ্টেম্বর উভয় বাহিনী মুখোমুখি হয়।
ক্রুসেড বাহিনীর পেছনে ছিলো নিকোপলিসের দুর্গ ও দানিয়ুব নদী। তাদের নৌবাহিনী ছিলো দানিয়ুব নদীতে। তাদের সামনে ছিল কাউন্ট অব নাভার্সের নেতৃত্বাধীন নাইট বাহিনী। এর পেছনে ছিল সিগিসমুন্ডের নেতৃত্বাধীন পদাতিক ও অশ্বারোহী সেনার দল। দুই পাশে ছিলো ট্রানসিলভানিয়ান ও ওয়ালাশীয় সেনাদের সমাবেশ।
উসমানীয় বাহিনীর সামনে ছিল আকিঞ্চি দল, তাদের পেছনে আজাপ বাহিনী এবং তারপর জেনিসারি দল। বাহিনীর দুই পাশে ছিলো আনাতোলীয় ও রুমেলীয় বাহিনী। আর পেছনে সিপাহীদের নিয়ে রিজার্ভ ফোর্সে ছিলেন সুলতান বায়েজিদ নিজে। তিনি দিনভর বিভিন্ন অংশের সেনাপতিরা নিজ নিজ অংশকে সংগঠিত করেন।
২৫ সেপ্টেম্বর ফরাসি নাইটরা হামলা চালায় আকিঞ্চিদের উপর। আকিঞ্চি বাহিনী কিছুটা প্রতিরোধ গড়লেও পরে সেটা ভেঙে যায়। তাদের মাঝ দিয়ে ফরাসিরা স্রোতের মতো প্রবেশ করে। অবশ্য আকিঞ্চিদের মূল কাজ ছিলো প্রতিপক্ষের শুরুর দিকের যাত্রায় বিঘ্ন ঘটানো। তারা সেটা ঠিকভাবেই শেষ করেছিল।
এই বাহিনী ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে দুই পাশে পদাতিক বাহিনীর সাথে যোগ দিল। এসময় অটোমান তীরন্দাজ বাহিনী ফরাসিদের ঘোড়াগুলোকে আহত করে দেয়। কারণ, নাইটদের বর্ম ভেদ করে তীর পৌঁছানোর চেয়ে ঘোড়াকে আহত করা সহজ ছিল। এরপর চৌকশ জেনিসারি বাহিনী হামলে পড়ে প্রতিপক্ষের উপর।
কিন্তু নাইটদের ভারী বর্ম তাদের বাড়তি প্রতিরক্ষা দিচ্ছিল। একসময় যুদ্ধের বিজয়ের পাল্লা ক্রুসেডারদের হেলে পড়তে শুরু করে। কারণ, ভারী অস্ত্র ও বর্মে সজ্জিত নাইটদের সামনে উসমানীয় বাহিনীকে বেশ বিপর্যস্ত দেখাচ্ছিলো। এক পর্যায়ে নাইটরা পাহাড়ের উপরে উসমানীয় বাহিনীর শিবির ধ্বংস করতে গেল।
কিন্তু এখানেই লুকনো ছিলো সুলতানের মূল কৌশল। তিনি পাহাড়ের উপরে নিজের শক্তিশালী সিপাহীদের রিজার্ভ ফোর্স নিয়ে অপেক্ষারত ছিলেন। তারা ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল নাইটদের উপর। ততক্ষণে ভারী অস্ত্র নিয়ে পাহাড়ের উপর উঠে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল ফরাসি নাইটরা।
এ আক্রমণের ধকল তাই আর সইতে পারলো না তারা। যারা পারলো, তারা পালিয়ে নিজেদের প্রাণ রক্ষা করলো। আর অন্যরা সবাই কচুকাটা হতে থাকল। কাউন্ট অব নাভার্স বন্দী হলে নাইট বাহিনী আত্মসমর্পন করে। যুদ্ধ হাতছাড়া হতে শুরু করেছে দেখে সিগিসমুন্ড নিজের বাহিনী নিয়ে আক্রমণে চলে আসলেন।
হাঙ্গেরীয়দের হাতে আবারও পর্যুদস্ত হলো আকিঞ্চি ও আজাপ বাহিনী। এবার হাঙ্গেরীয়দের রুখতে এগিয়ে গেল রুমেলীয় ও আনাতোলীয় সিপাহীরা। আবারো শুরু হলো তুমুল লড়াই। ওদিকে আকিঞ্চিরা আক্রমণে ফিরে এলো। তারা পেছন থেকে চেপে ধরলো হাঙ্গেরীয়দের। এ আঘাত হাঙ্গেরীয় সেনারা সইতে পারল না।
ক্রুসেডাররা দানিয়ুব নদী দিয়ে পালাতে শুরু করে। অতিরিক্ত সৈন্যের ভারে তাদের বেশকিছু নৌকা ডুবে যায়, কিছু নৌকায় আগে থেকে চড়ে থাকা সেনারা অন্যরা উঠতে গেলে ফেলে দেয়। অনেকে সাঁতার কাটতে গিয়ে ভারি বর্মের কারণে ডুবে যায়। ভেনিসের এক জাহাজে চড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন সিগিসমুন্ড।
এই যুদ্ধের সৈন্য সংখ্যার বিষয়ে খ্রিস্টান ঐতিহাসিকরা বরাবরই অসত্যের আশ্রয় নিয়েছে। তাদের চরম পরাজয়কে সহনীয় হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য তারা স্বল্প সংখ্যা দেখিয়ে থাকে। তবে, ঐতিহাসিক শুকরুল্লাহ প্রমাণসহ দেখিয়েছেন যে, ক্রুসেড ও উসমানীয় সেনা সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১,৩০,০০০ ও ৬০,০০০।
যুদ্ধে বা পলায়ন পথে ক্রুসেড বাহিনীর প্রায় সকল সৈনিক নিহত হয়। খুব স্বল্প সংখ্যক লোক পালিয়ে যেতে সমর্থ হয়েছিল। তাদের পরাজয় এমন ভয়াবহ ছিল যে, প্রায় ৫০ বছর তারা চেষ্টা করে গিয়েছে যাতে, উসমানীয়রা তাদের উপর রাগ না করে। এটাও ঠিক যে, যুদ্ধে উসমানীয় সেনাবাহিনীর ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ কম ছিল না।
Mohammad Salimullah