লেখকপ্রসঙ্গ
ড. রউফুল আলম অর্গানিক কেমিস্ট্রির একজন গবেষক। জন্মস্থান কুমিল্লা জেলায়। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নবিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে সুইডেনের স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্গানিক কেমিস্ট্রিতে স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি শেষে সুইডিশ কেমিক্যাল সোসাইটির স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভ্যানিয়ায় (UPenn) পোস্টডক্টরাল গবেষণা করেন। বর্তমানে নিউজার্সিতে ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে সিনিয়র সায়েন্টিস্ট হিসেবে কাজ করছেন।
নতুন নতুন রাসায়নিক বিক্রিয়া উদ্ভাবন করে মানবকল্যাণে ব্যবহার করা তার গবেষণার বিষয়। তিনি সুইডিশ কেমিক্যাল সোসাইটি ও আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির সদস্য। তার গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে রসায়নের আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা জার্নালগুলোতে। এর মধ্যে জার্নাল অব দ্য আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি (JACS) এবং Angewandte Chemie উল্লেখযোগ্য। গবেষণাকর্ম উপস্থাপন করেছেন আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে।
লেখালেখির সাথে তার সম্পৃক্ততা বহুদিনের। দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে লিখেছেন তিনি। তার প্রকাশিত প্রথম বই ‘একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায়’ পাঠক সমাদৃত। বাংলাদেশের টেকসই, সুষম উন্নয়নের জন্য তিনি তার অভিজ্ঞতা ও দিক-নির্দেশনাগুলো লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করে যাচ্ছেন।
https://www.facebook.com/rauful.alam15
rauful.alam15@gmail.com
১
জীবনে একজন মেন্টর লাগে। একজন কোচ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেটা চাকরি জীবনে হোক, ছাত্রাবস্থায় হোক আর বেকার জীবনেই হোক।
জীবনে কাজ করবেন একজন মেধাবী বসের অধীন। জাঁদরেল বসের অধীন। তাহলে আপনি নিজেও একসময় জাঁদরেল হতে পারবেন। জাঁদরেল মানে হলো আধুনিক, ব্রিলিয়ান্ট, স্ট্রেটেজিক ও চ্যালেঞ্জ নেয়ার মতো সাহসী।
আফ্রিকান এক প্রবাদ আছে—An army of sheep lead by a lion can defeat an army of lion lead by a sheep; নেতৃত্ব যদি সিংহের মতো হয়, তাহলে আপনি ভেড়ার মতো হলেও অনেক কিছু জয় করতে পারবেন। কিন্তু নেতৃত্ব যদি ভেড়া হয়, আপনি সিংহ হয়ে তেমন কোন লাভ হবে না। এটা সমাজের সবর্ত্রই সত্য। জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
স্টুপিডের পদলেহন করে আপনি হয়তো সাময়িকভাবে দৃশ্যত উপরে উঠতে পারবেন—তাতে তৃপ্তি থাকবে না। এবং আপনি জানবেনও না কি করে অর্জন ধরে রাখতে হয়। পতনও হবে দ্রুত। সুতরাং পতনের সময় আপনি শূণ্যহস্তে কাতরাবেন।
জীবনকে যেহেতু আমরা যুদ্ধক্ষেত্র বলি, সুতরাং সেই যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু রেজাল্ট, সনদ, অর্থ এগুলোই যথেষ্ট নয়। যুদ্ধক্ষেত্রে স্ট্রেটেজিক হতে হয়। স্ট্রেটেজি না জানলে প্রচুর সৈন্য ও গোলাবারুদ নিয়েও যুদ্ধ হেরেছে অনেক বীর। দুঃখজনক হলো, আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শুধু বলে মেধাবী হতে। ভালো রেজাল্ট করতে। ভালো চাকরি পেতে। কিন্তু স্ট্রেটেজিক হতে শেখায় না। জীবন তো ভালো রেজাল্টের চেয়ে অনেক বড়ো। অনেক কঠিন। অনেক কন্টকাকীর্ণ।
“দ্যা আর্ট অব ওয়ার” নামক বিখ্যাত বইয়ের লেখক Sun Tzu লিখেছেন—Strategy without tactics is the slowest route to victory. Tactics without strategy is the noise before defeat. তিনি হয়তো যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য বুঝিয়েছেন। কিন্তু এটা জীবন যুদ্ধের জন্যও খাটে। জীবনেরও কিছু “সেটস অব রুল” আছে। সেগুলোর প্রয়োগ, অপপ্রয়োগ, ভুল প্রয়োগে জীবন বহুদিকে বাঁক নেয়।
তরুণরা, শুধু ভালো রেজাল্টের পিছু দৌঁড়ে নিঃস্ব হয়ো না। বলছি না, ভালো রেজাল্ট গুরুত্বপূর্ণ নয়। বলছি, শুধু সেটার জন্য জীবনের দারুণ সময় শেষ করলে হবে না। You have to learn strategy to win the life, to enjoy the every bit of life. You have to learn how to push the boundary without hurting yourself!
আর এজন্যই প্রয়োজন একজন মেন্টর। একজন গুরু। একজন শিক্ষক। একজন গাইড। সেটি হতে পারে বাবা কিংবা মা। হতে পারে শিক্ষক। হতে পারে বস।
২
—মেন্টর তৈরির সংস্কৃতি—
জার্মানরা কয়েশ বছর ধরে জ্ঞান-গবেষণায় ভালো। আবিষ্কার-উদ্ভাবনে সেরা। —কেন সেরা?
কারণ তারা মেন্টর তৈরি করছে। মেন্টর তৈরির চেইন সংস্কৃতি ওদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
আপনি ফিজিক্সের ইতিহাস পড়েন—দেখবেন জার্মান বিজ্ঞানীতে ভরা। ম্যাক্স প্ল্যাংক, আলবার্ট আইনস্টাইন, সমারফেল্ড, হাইজেনবার্গ, ভিলহ্যাম রন্টজেন, ক্লাউজিয়াস। কাকে বাদ দিয়ে কার কথা বলবো। তারা নিজেরা বড়ো বড়ো ফিজিসিস্টদের হাত দিয়ে এসেছেন। আবার তাদের হাত দিয়ে গড়ে উঠেছে বহু সাইন্টিস্ট।
আপনি যদি কেমেস্ট্রির ইতিহাস পড়েন—সেখানেও জার্মান বিজ্ঞানীতে ভরা। একসময় আমেরিকান কেমিস্টরা জার্মান ভাষা শিখতো। জার্মান জার্নালগুলো পড়ার জন্য।
আপনি যদি ম্যাথমেটিক্স, বায়োলজি কিংবা অন্যান্য ফিল্ড সম্পর্কেও পড়েন, দেখবেন জার্মান সাইন্টিস্ট ও দার্শনিকদের জয়জয়কার।
ওদের সমাজে, মেন্টরের হাত ধরে মেন্টর তৈরি হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে সেটা চলছে। সেজন্যই ওরা যুগ যুগ ধরে সেরা।
পৃথিবীর ইতিহাসে একজন নোবেল বিজয়ী খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে, যার মেন্টররা ছিলেন দুর্বল। সাইন্টিফিক এরিয়াতে এটা আরো সত্য যে একজন গ্রেইট মেন্টর আরেকজন গ্রেইট মেন্টরকে জন্ম দেয়।
জার্মানরা কি করে জ্ঞান-বিজ্ঞানে এতো শক্তিশালী হলো—সেটা নিয়ে ভাবতে শুরু করলো জাপান। ইম্পেরিয়াল জাপান উনিশ শতকের শেষে, জার্মানদের মতো করে তাদের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাকে সাজাতে লাগলো। জাপানে গড়ে তোলা হলো বিশ্বমানের গবেষণা কেন্দ্র—রাইকেন। তাদের দেশে তৈরি হলো ধারাবাহিক মেন্টর তৈরির সংস্কৃতি।
জ্ঞান-গবেষণার ইতিহাসে মেন্টর তৈরি করার এই যে ধারাবাহিক সংস্কৃতি, এটা আবশ্যক। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে যেনো সর্বাধুনিক জ্ঞানের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে, ভবিষ্যতের কালকে দেখিয়ে দিতে পারে সেজন্য মেন্টর, সুপারভাইজর, শিক্ষক তৈরির ধারাবাহিক সংস্কৃতি লাগবেই।
এ সংস্কৃতি যে সমাজে নেই, সে সমাজে আগাছা বেড়েছে অনেক। সেখানে ক্ষুরধার জ্ঞান নেই। মানুষের চিন্তা ও চেতনায় পড়েছে ঝং। তাদের উপলব্ধি করার ক্ষমতা গেছে ক্ষয়ে। মূর্খরা সর্বত্র "প্রধান অতিথি" হওয়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছে।
৩
পাঁচটা কাজ তোমার জীবনের চলার পথকে সহজ করবে:
Never stop dreaming—বড়ো স্বপ্ন দেখো। বড়ো স্বপ্ন তোমার মনকে বড়োর দিকে ধাবিত করবে। তোমার মন হলো এমন বস্তু, সেটাকে যে স্বপ্ন দিয়ে সাজাবে, সেটা সেই স্বপ্নের দিকেই তোমাকে ধাবিত করবে।
Never stop believing—নিজের উপর বিশ্বাস রাখো। তোমার আশপাশে অনেকেই মনে করবে তোমাকে দিয়ে হবে না। তুমি পারবে না। কিন্তু তুমি যদি মনে করো তুমি পারবে না, তাহলে সবকিছুর সমাপ্তি সেখানেই। তোমার আত্মবিশ্বাসের সাথে তোমার মন ধাবিত হবে। আত্মবিশ্বাস যতোটা শক্তিশালী চুম্বকের মতো হবে, তোমার মন ততোটাই প্রবল আকর্ষনে সেদিকে ধাবিত হবে।
Never give up—লেগে থাকো। শুধু শরীর দিয়ে নয়। লেগে থাকতে হবে মন দিয়ে। শরীর লাগালে হয় শ্রম, মন লাগালে হয় ধ্যান। পরিশ্রম ও ধ্যানের সমন্বয় ঘটলে তুমি হয়ে যাবে অনন্য। দশজনের চেয়ে আলাদা।
Never stop trying—চেষ্টা করাই কঠিন। ছেড়ে দেয়া সহজ। বেশিরভাগ মানুষ ছেড়ে দেয়, কারণ মানুষ সহজটাকেই বেছে নেয়। কম সংখ্যক মানুষ কঠিন কাজটা করে। যারা সেই কঠিন কাজটা করে, তারাই এগিয়ে থাকে।
Never stop learning—শেখো, শেখো এবং শেখো। মানুষের জীবনটাই হলো শেখার। যতো শিখবে ততোই তুমি এগিয়ে থাকবে। অনেকে বলে, যতো শিখবে ততো ভুলবে। আমি বলি, যতো শিখবে ততো ভুলবে কিন্তু ততো পথও তৈরি করবে। সম্ভাবনার পথ।
শেখো ও ভাবো। “He who learns but does not think, is lost! He who thinks but does not learn is in great danger”—Confucius
৪
প্রতিদিন যে পাঁচটি কাজ তোমাকে ধনী করবে:
০১. প্রতিদিন নতুন কিছু শেখা। প্রতিদিন। সেটা বই পড়ে হোক। একটা ডকুমেন্টারি দেখে হোক। কারো সাথে গল্প করে হোক। এই অভ্যাস তোমাকে জ্ঞানে ধনী করবে। জীবনের চলার পথকে সমৃদ্ধ করবে।
০২. প্রতিদিন কিছু না কিছু অর্থ সঞ্চয়। এক টাকা হলেও সঞ্চয় করো। জীবনের জন্য সঞ্চয় একটা অর্জন। এক ফোঁটা এক ফোঁটা রসে যেমন একটা কলসি ভরে যায়, তেমনি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় একদিন অনেক বড়ো হয়।
০৩. খারাপ কোন অভ্যাস ত্যাগের জন্য প্রতিদিন লড়াই করা। প্রতিদিন চেষ্টা করা। প্রতিদিন নিজের সাথে যুদ্ধ করা। যেমন: ধূমপানের অভ্যাস থাকলে সেটা ত্যাগ করার চেষ্টা করা। অযথা সময় নষ্টের অভ্যাস থাকলে সেটা দূর করার চেষ্টা করা। এমনসব খারাপ অভ্যাস বা বাজে নেশা ত্যাগ করলে জীবন অনেক দিক দিয়ে এগিয়ে যায়। খারাপ অভ্যাস থেকে মুক্তি, মানুষের সময় বাঁচায়, অর্থ বাঁচায়, আশু বিপদ থেকে বাঁচায়।
০৪. প্রতিদিন নতুন কিছু ভাবা। ভাবনার চর্চা একটা অভ্যাস। সবাই ভাবতে পারে না। দুনিয়ার যে কোন কাজের প্রথমেই কিন্তু দরকার হয় স্মার্ট ভাবনা। নতুন নতুন ভাবনার অভ্যাস মানুষকে স্মার্ট করে তোলে।
০৫. প্রতিদিন প্রশ্ন করার অভ্যাস তৈরি করা। যে কোন বিষয়ে, যে কোন জায়গায়। প্রশ্ন করলেই যে উত্তর পাওয়া যাবে, তা নয়। কিন্তু প্রশ্ন করতে হবে। মানুষ যখন প্রশ্ন করে তখন তার আস্থা বাড়ে। তার ভাবনার জগৎ প্রসারিত হয়।
এই পাঁচটা কাজ যে প্রতিদিন করতে পারবে, তার জন্য জীবনের অনেক কিছু সহজ হয়ে যায়। নিশ্চিত!
তার জীবন সমৃদ্ধ হবে অনেক দিকে। সে ধনী হবে জ্ঞানে ও ধনে।
তুমি কোনটা অনুসরণ করছো?
৫
নিজের জীবনে ধারণ করি, পালনের চেষ্টা করি, এমন সাতটি দর্শন:
1. একটা দিন বেঁচে থাকলে ভাবি, এই দিনটাই জীবনে বোনাস। সুতরাং নিংড়ে নেই বর্তমান যতটুকু পারি—কর্ম ও আনন্দে।
2. অর্থকে গুরুত্ব দেই তবে অর্থের স্বার্থে সবকিছু করি না। জীবনে অর্থের প্রয়োজন তবে জীবনে অর্থই সব না।
3. আমি না থাকলে পৃথিবীর কিছুই আসে-যাবে না। সুতরাং পৃথিবী কি ভাববে সেটা নিয়ে নিজেকে যন্ত্রণা দেয়া থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করি। পরিবার-সমাজের খারপ হয় এমন কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করি। এটাই প্রধাণ উদ্দেশ্য।
4. ডিগ্রি, সনদ মানুষকে জ্ঞানী করে না। মানুষকে জ্ঞানী করে তার কাজ। তার ভাবনা। তার চিন্তা। বহু ডিগ্রিধারী মানুষ চুরি করে। দুর্নীতি করে। আবার বহু জ্ঞানী তার সাধনা নিয়ে, আনন্দ নিয়ে খুবই সাদা-মাটা দিন কাটিয়ে দিচ্ছে।
5. যে কারো কাছ থেকে শেখার আগ্রহ রাখি। এমনকি আমার ৫ বছরের সন্তানের কাছ থেকেও। মানুষ একজীবনে কিছুই শিখতে পারে না।
6. সহনশীলতা যেখানে আছে, সেখানে নাকি পাথরও ফুল হয়ে যায়। প্রতিদিন সহনশীল হতে চেষ্টা করি। নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করি।
7. অহংকার করি নিজের ভালো কাজ নিয়ে এবং সেটা নিজের ভিতরেই রাখি। যেনো নিজেকে দিয়ে আরো ভালো কাজ করিয়ে নিতে পারি। মানুষের কাছে অহংকার না, সবসময়ই দোয়া ও শুভ কামনাই চাই।
৬
জীবনে সুখী হওয়ার সাত পরামর্শ—
নিজেকে অন্যের সাথে তুলনা করো না। বরং নিজের যা আছে সেটার দিকে তাকাও। সেটা নিয়েই যুদ্ধ করো। এগিয়ে যাবেই।
কর্মকে কখনো বোঝা মনে করো না। পরিশ্রমকে বোঝা ভেবো না। পরিশ্রম ছাড়া জীবন কখনোই আনন্দের হয় না।
আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখো। কোন কিছুর উপর আসক্ত বা অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভরশীল হয়ো না।
প্রতিদিন শেখো। কিছু না কিছু। হোক সেটা বই পড়ে। আড্ডা দিয়ে। গল্প করে। মুভি দেখে। ভিডিও দেখে। শেখার ব্যাপারে নিজেকে উন্মুক্ত রাখো।
নিজের কিছু সখ রাখো। হোক সেটা অন্যের কাছে ক্ষুদ্র কিংবা তুচ্ছ। ভালো সখ। যেমন—বই কেনা, গাছ কেনা, লেখালেখি করা, আঁকাআঁকি, গান করা। এমন যে কোন একটা সখ। সখের কাজগুলো মানুষের নিত্যদিনের ক্লান্তি দূর করে।
খারাপ মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করো না। খারাপ সঙ্গের সাথে সময় দিও না।
মানুষের জন্য সামান্য কিছু হলেও করো। সেটা অর্থ দিয়ে হোক। শ্রম দিয়ে হোক। ভালো পরামর্শ দিয়ে হোক। জ্ঞান দিয়ে হোক। মানুষের জন্য কিছু করার মধ্যে সবসময়ই আনন্দ!
৭
মানুষ পরিশ্রম করে যতটুকু ক্লান্ত হয়, তারচেয়ে বেশি ক্লান্ত হয় আশপাশের মানুষের কারণে।
আপনি সারাদিন মাটি কেটে যতটুকু পরিশ্রান্ত হবেন, সেটা শরীরের জন্য ভালো। মনের জন্য ভালো। আপনার ক্ষুধা লাগবে, খেতে পারবেন। আপনি বিছানায় গেলেই ঘুমিয়ে পড়বেন।
কিন্তু আপনার কাছের মানুষটি আপনাকে মানসিকভাবে যতটুকু ক্লান্ত করবে, সেটা আপনার খাওয়া, ঘুম সব কেড়ে নিবে।
আপনার কাজের ফোকাস ধ্বংস করবে। সারাদিন মাটি কাটার চেয়ে, সে ক্লান্তি অনেক বেশি ক্ষতিকর!
আপনি যদি ক্লান্ত হন, তাহলে ভাবুন কোন মানুষগুলো আপনাকে ক্লান্ত করছে।
যারা আপনাকে ক্লান্ত করছে তাদেরকে বুঝান। তাদের সাথে খোলামেলা কথা বলুন। খুব কাছের কেউ না হলে ধীরে ধীরে এড়িয়ে চলুন।
নিজেকে ক্লান্তি মুক্ত না রাখতে পারলে জীবন নিরানন্দে ধ্বংস হয়।
৮
ভালো ঘুমের জন্য লক্ষ টাকার বিছানা লাগে না। ভালো ঘুমের জন্য লাগে ক্লান্ত শরীর। প্রশান্ত মন।
আমরা দামি বিছানা কেনার জন্য ব্যাস্ত হই। কিন্তু শরীর ক্লান্ত করি না। মনকে প্রশান্ত করার চেষ্টা করি না।
ক্ষুধা থাকলে যা খাবেন তাই তৃপ্তি লাগবে। ক্ষুধা না থাকলে অমৃতও ভালো লাগবে না। সুতরাং দামী খাবারের দিকে ফোকাস না করে ক্ষুধা নিয়ে হেলদি খাবার খান। তৃপ্তি পাবেন।
সারা দুনিয়ায় অশান্তি থাকলেও নিজের ঘরে যদি শান্তি থাকে, তাহলে দেখবেন আপনার মনেও শান্তি। কিন্তু ঘরে যদি অশান্তি থাকে, সারা দুনিয়াতে শান্তি থাকলেও আপনার শান্তি হবে না।
নিজের ঘরে শান্তির পরিবেশ তৈরি করতে হবে। পারিবারিক বন্ধন তৈরি করতে হবে। ঘরে শান্তি থাকলে মন প্রশান্ত থাকবে।
টাকা উপার্জন করতে গিয়ে জীবনকে ক্ষয় করলেই হবে না। প্রয়োজন নিজের জন্য সময়। পরিবারের জন্য কেয়ার। ভালোবাসা। টাকার পিছু ছুটতে ছুটতে আমরা পরিবারকে ভুলতে বসেছি।
সময় বুঝে কাজ করুন। পরিশ্রম করুন উপার্জনের জন্য। জীবনের জন্য কষ্ট করুন। ক্ষুধা নিয়ে খান। ক্লান্তি নিয়ে ঘুমান। পরিবারের সাথে বন্ধন তৈরি করুন।
দেখবেন, আপনাকে আলাদা করে সুখের জন্য ছুটতে হবে না।
৯
অফিসের পিয়ন মনে করে, ম্যানেজার সাহেব কতো আরামে আছেন। ফিটফাট হয়ে অফিসে আসেন। মাস শেষে অনেকগুলো টাকা নিয়ে যান।
ম্যানেজার মনে করেন, ডিরেক্টর সাহেব কতো আরামে আছেন। শুধু মিটিং করেন। এখানে-ওখানে যান। মাস শেষে কতোগুলো বেতন পান।
ডিরেক্টর সাহেব মনে করেন, সিইও(CEO) শুধু বিজনেস ক্লাসে ভ্রমণ করেন। ইনভেস্টরদের সাথে ডিনার করে। মাস শেষে টাকার অভাব নাই।
বাস্তবতা হলো, জগতে যে যতো বড়ো পদে আছে, তার দায়িত্ব ততো বেশি। যার পদবী যতো বড়ো, তার মাথা ব্যাথা ততো বেশি। তার যন্ত্রণা ততো বেশি। তার চাপ ততো বেশি।
উন্নয়নশীল বা দুর্নীতিগ্রস্থ সমাজে হয়তো এই বিষয়গুলো তেমন চোখে পড়ে না। তবে উন্নত দেশে, প্রতিযোগিতামূলক সমাজে এটা খুবই দৃশ্যমান।
আমি গত ১৪ বছরে, বিদেশের কর্মজীবনে, অনেক যোগ্য মানুষকে দেখেছি, যারা সেচ্ছায় বড়ো দায়িত্ব থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন। বড়ো পদ নেয়ার ইচ্ছে তার নেই। কারণ বেশি দায়িত্ব নিয়ে জীবনকে স্ট্রেসফুল করতে চাননা তিনি।
জীবনে কোন কিছু অর্জন করা যেমন কঠিন, তারচেয়ে বহুগুণ কঠিন হলো সে অর্জনকে ধরে রাখা। হোল্ড করা।
সাপ-লুডু খেলায়, ৯৯-র যতো কাছাকাছি গুটি যায়, ততোই আমাদের টেনশন বাড়তে থাকে। কারণ হলো, সবচেয়ে বড়ো সাপের মুখটা ঠিক ৯৯-তেই থাকে। সেখানে পড়লেই শেষ!
১০
আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর পড়ার টেবিলের সামনে তিনজন মানুষের ছবি ঝুলিয়ে রাখতেন। তাঁদের একজন আইজাক নিউটন, দ্বিতীয়জন ম্যাক্সওয়েল এবং শেষজন হলেন মাইকেল ফ্যারাডে। ফ্যারাডে হলেন বিজ্ঞানের ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর চরিত্র! প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনা না করে দুনিয়ায় কবি-সাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী, গায়ক, খেলোয়াড় হওয়া যায়। কিন্তু বিজ্ঞানী হওয়া যায়, সে উদাহরণ খুব বেশি নেই। ফ্যারাডে হলেন ইতিহাসের সেই বিরল উদাহরণ।
ফ্যারাডে তাঁর কৈশোরে কাজ করতেন বই বাঁধাইয়ের দোকানে। তাঁর পরিবার ছিলো গরীব। বেশ গরীব। তাঁর বাবা তাকে বইয়ের দোকানে কাজ শিখতে দিয়েছিলেন। পুত্রকে পড়ানোর টাকা ছিলো না। ফ্যারাডে যখন বিশ বছর বয়সের তরুণ, তখন একদিন এক লেকচার শুনতে গেলেন। সে লেকচারের বক্তার নাম হামফ্রে ডেভি—ইতিহাসের এক সেরা বিজ্ঞানী। ফ্যারাডের জীবন ঘুরে যায় সেদিন থেকে, সেই লেকচার শুনার পর। তিনি ডেভির কাজকে গভীরভাবে জেনে, একসময় নিজেই অসাধারণ বিজ্ঞানী হয়ে উঠলেন। তড়িৎ ও চৌম্বকত্ব (Electricity and Mag-netism) নিয়ে গবেষণা করে, ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
দারিদ্রকে জয় করা মানুষের এমন উদাহরণ নেহায়েত কম নয়। নজরুল তাঁর দারিদ্রতাকে জয় করেছেন। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি-মুন এতোই দরিদ্র ছিলেন যে তাদের একটি টয়লেট ছিলো না। দক্ষিণ ভারতের এক অখ্যাত গরীব ঘরের সন্তান ছিলেন রামানুজন। ভারতবর্ষ ছাড়িয়ে সারা দুনিয়ায় খ্যাত হয়েছিলো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় শ্রীনিবাস রামানুজন যখন ইংল্যান্ডে পৌঁছলেন, তখন তাঁর আশেপাশে দুনিয়ার খ্যাতনামা গণিতবিদগণ। তাঁরা এসেছিলেন রামানুজনের লেকচার শুনতে। অথচ রামানুজনের কোন প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রীই ছিলো না। গণিতে তাঁর অসমান্য মেধার জন্য তাকে নির্বাচিত করা হয়েছিলো রয়েল সোসাইটির ফেলো।
ভারতের আম্বেদকার জন্মেছিলেন ‘দালিত’ সমাজে। দালিত গোষ্ঠির মানুষদের এখনো ভারতে ‘নিচু ও অচ্ছুৎ’ হিসেবে অবহেলা করা হয়। মেথর-মুচি ইত্যকার কাজ করে বলে, তাঁরা সমাজে চরম অবহেলিত। অথচ সেই আম্বেদকার, আমেরিকার কলোম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করে গিয়ে স্বাধীন ভারতের আইনমন্ত্রী হয়েছিলেন। তাছাড়া তিনি ছিলেন ভারতের সংবিধান প্রণেতাদের একজন। আমার প্রিয় এক গণিতবিদের নাম কার্ল ফ্রেডরিক গাউস। তিনি জন্মেছিলেন জার্মানিতে। খুবই গরীব পরিবারে। বাবা-মা কেউই পড়াশুনা করেননি। তাঁর জন্মতারিখটাও মনে রাখতে পারেনি। কিন্তু সেই ছেলেই, উনিশ শতকে গণিতের দেবতা হয়ে উঠেছিলেন।
জন্ম হলো পৃথিবীতে আসার নিছক সূত্র। এর উপর কারো নিয়ন্ত্রণ নেই। মানুষের যেটার উপর নিয়ন্ত্রণ আছে, সেটা হলো কর্ম। মানুষ দরিদ্র পরিবারে জন্মালেই সম্ভাবনাহীন হয় না। দারিদ্রতা মানুষের বড়ো হওয়ার পথে অন্তরায়, তবে একমাত্র বাধা নয়। আর জন্ম যেহেতু মানুষকে বড়ো করে না, সেটা নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট করেও লাভ নেই। বাগানের ফুলকে যেমন মানুষ হাতে নেয়, পথের ধারে ফোটা ফুলকেও মানুষ হাতে নেয়, খোঁপায় গুঁজে। প্রস্ফুটিত ফুলে কী আর জন্ম-কথা লেখা থাকে?
দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছে বলে অনেকেই দুঃখ করে। দারিদ্রতা নিয়ে হাপিত্যেশ করে। দারিদ্রতাকে জয় করতে ভয় পায়। আমার কাছে যারা এই দুঃখ করে, তাঁদেরকে আমি পাথর থেকে ভাস্কর্য হয়ে যাওয়ার কথা বলি। পথের ধারে পড়ে থাকা পাথর কেউ লক্ষ্য করে না। অথচ সে পাথর দিয়েই যখন ভাস্কর্য তৈরি করা হয়, মানুষ সেটিকে শিল্পের চোখে দেখে। দূর-দূরান্ত থেকে সে ভাস্কর্য দেখতে যায়। একটা মানুষের কর্ম ঠিক তেমনই। কর্ম মানুষের মধ্যে শিল্পের রূপ দেয়। মানুষকে পরিপূর্ণ করে তোলে। তাই পাথর হয়ে না থেকে, কর্মগুণে ভাস্কর্য হও যাও।
বাংলাদেশর অসংখ্য ছেলে-মেয়ের বাবা-মা কোনদিন স্কুলে যায়নি। ছেলে-মেয়েদের ঠিকমতো খাবার দিতে পারেনি। জামা-কাপড় দিতে পারেনি। অথচ সেইসব ছেলে-মেয়েরা আজ পৃথিবী জয়ের পথে নেমেছে। আমি দিগ্বিদিক এমন মানুষদের জয় দেখছি। আমি দেখছি তাঁরা কি করে জন্মকে জয় করছে। তাঁরা কি করে ফুলের মতো প্রস্ফুটিত হওয়ার চেষ্টায় মগ্ন হয়ে আছে। ফুটতে জানলে, কলির গল্পটা হয়ে যায় উপাখ্যান। তাই ফোটতে চেষ্টা করো। মানুষ হাতে নিবেই। জন্ম নিয়ে বৃথা দুঃখ করো না। প্রতিটি মানুষ মহাবিশ্বের নক্ষত্রের মতো। কর্মগুণে যে আলোকিত, তাকেই মানুষ দেখতে পায়। ভালোবেসে দেয় নাম।
১১
জাতিকে জাগানোর জন্য একটা বিপ্লব দরকার। আর সেটা হলো বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব। জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিপ্লব। আবিষ্কার-উদ্ভাবনের বিপ্লব।
বিশ কোটি মানুষের দেশকে নাইলে কখনোই শক্তিশালী করা যাবে না।
এ যুগে যে জাতি আবিষ্কার-উদ্ভাবনে পিছিয়ে আছে, সে জাতি সবদিক দিয়েই পিছিয়ে। আবিষ্কার-উদ্ভাবন একটা সংস্কৃতি। ভালো জ্ঞান-গবেষণা একটা সংস্কৃতি। এটা গড়তে সময় লাগে। তারচেয়ে বড়ো কথা যোগ্য মানুষ লাগবে। অনেক যোগ্য মানুষ দিয়ে গড়া প্রতিষ্ঠান লাগবে।
বাংলাদেশে সেরকম প্রতিষ্ঠান কি আছে? দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেভাবে চলছে, যে ধারা ও সংস্কৃতিতে চলছে—এভাবে চললে কোনদিনই দুনিয়ার সাথে টেক্কা দেয়ার জ্ঞান গবেষণার সংস্কৃতি তৈরি হবে না।
ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে দেখুন। পশ্চিমের বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে দেখুন। জাপান কোরিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে দেখুন। এমনকি মধ্য প্রাচ্যের সৌদিআরবের প্রতিষ্ঠানগুলোতে গিয়ে দেখুন। দিনরাত শুধু কাজ নিয়েই ব্যস্ত ওরা।
জ্ঞান-গবেষণার সংস্কৃতিতে জাত-জাতীয়তার বাছ-বিভাজন নাই। সৌদিআরবের বিখ্যাত প্রতিষ্ঠিান কাউস্টে, সারা দুনিয়া থেকে গবেষক নিয়োগ দিয়েছে ওরা। শুধুমাত্র যোগ্যতা দেখে। জাত-ধর্ম-জাতীয়তা দেখে নাই।
জ্ঞানী মানুষরা হলেন মেন্টর। একজন মেন্টার ভবিষ্যতের দশজন যোগ্য মেন্টর তৈরি করে। ফলে সমাজে যোগ্য মানুষদের সংখ্যা বাড়ে। সমাজে সমৃদ্ধি বাড়ে। যে সমাজে তেমন মেন্টার আছে, সে জাতি পৃথিবীতে গুরুত্ব নিয়ে দাঁড়ায়।
জ্ঞান-গবেষণা, আবিষ্কার-উদ্ভাবনে, সংস্কৃতিতে, দর্শনে অবদান না রাখলে সে জাতিকে কেউ গুরুত্ব দেয় না। বিশ্বে তাদের গুরুত্ব থাকে না। পৃথিবীর ইতিহাসে তাদের নাম থাকে না।
স্বনির্ভর জাতি গড়ার প্রধানতম শর্ত সমাজে অধিক সংখ্যক যোগ্য মানুষ তৈরি করা। তা না হলে অন্যান্য জাতির প্রতি, দেশের প্রতি, নির্ভরতা কখনোই কমে না। আমেরিকার গম, চীনের ইঞ্জিনিয়ার, সিঙ্গাপুরের হাসপাতাল, বিদেশীদেরকে বন্দর লিজ দেয়া, আমেরিকার বিমান কেনা—এগুলো চলতেই থাকবে।
পণ্য আমদানির পাশাপাশি দুনিয়া থেকে জ্ঞান আমদানি করতে হবে। গুণী মানুষদের আমদানি করতে হবে।
১২
রোগ হলে বিশেষজ্ঞ কেনো খুঁজো? —ভালো সেবার জন্য, তাই না? শিক্ষার বেলাতেও তাই। গবেষণার বেলাতেও তাই। বিশেষজ্ঞ লাগে।
তুমি পড়াশুনা না করে ব্যবসা করতে পারবে। কোটি টাকা উপার্জন করতে পারবে। কিন্তু পড়াশুনা না করে একজন ভালো ডাক্তার হতে পারবে? একজন ভালো গবেষক হতে পারবে? বড়ো কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হতে পারবে?
পারবে না। দুনিয়ার বহু প্রফেশনে টাকা কম কিন্তু ট্রেনিংটা খুব কঠিন এবং শক্তিশালী। এবং ট্রেনিংটা আবশ্যক। এই ট্রেনিংটা নিয়েও অনেকে শেখাতে পারে না। আর যাদের নাই তারা কি করে শেখাব?
আমেরিকার কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ছাড়া শিক্ষকই হওয়া যায় না। বহু ক্ষেত্রে শুধু পিএইচডি দিয়েই হয় না। কোথায় পিএইচডি করেছে, কোথায় পোস্টডক করেছে, সুপারভাইজার কতো নামকরা ছিলো, কতো ভালো পাবলিকেশন আছে, শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা—এসব দেখে। এজন্যই এরা শিক্ষা ও গবেষণায় বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়।
বাংলাদেশে গবেষণা শেখানোর এক হিঁড়িক পড়েছে। অনেকে গবেষণা শিখাচ্ছে, যে নিজেই কোনদিন গবেষণা করেনি। যাদের কাছে শিখতে যাবে, তাদের শুধু মুখের কথা বিশ্বাস না করে তাদের সম্পর্কে একটু হোমওয়ার্ক করো। তাদের সেই মানের ট্রেনিং আছে কিনা দেখো!
আমেরিকার স্টুডেন্টরা পিএইচডি শুরুর আগে তিন-চারটা প্রফেসরের ল্যাবে কাজই করে। রোটেশন বলে। আর কতো কতো প্রফেসরদের প্রোফাইল ঘাঁটে সেটার হিসেব নাই।
আর তুমি একটা মাস্টার্সের স্টুডেন্টের কাছে গবেষণা শিখতে চলে যাচ্ছো, চোখবন্ধ করে। তুমি তো তাহলে ঠকবেই। একটা ব্যাচেলর পাশ করা স্টুডেন্টের কাছে চলে যাচ্ছো এডভান্স কোর্স করতে!
গবেষণা আর আইএলটিএস কে তো দেশে তোমরা এক করে দিলে! অদ্ভুত জাতি এক!
১৩
আমাদের মতো একটা জনবহুল, ছোট দেশ, টিকে থাকতে হলে, তাকে জ্ঞান-গবেষণা ও উদ্ভাবনে শক্তিশালী হতে হবে। এছাড়া কোন বিকল্প নেই। শক্তিশালী তারুণ্য গড়তে হবে।
বর্তমান এআই-র যুগে, অনেক পড়াশুনা, ডিগ্রি অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে। গুরুত্ব কমে যাচ্ছে। যে ভালো ইংরেজি বুঝে, সে শুধু চ্যাটজিপিটি বা এমন চ্যাটবোট থেকে ইতিহাস, দর্শন, রাজনীতি, সাহিত্য, অর্থনীতি, শেয়ার বাজার, সামাজিক জ্ঞান, জীবন সম্পৃক্ত জ্ঞান ও বিজ্ঞানের বহু বিষয় শিখে যেতে পারবে। সময় দিলে অন্তত শক্ত বেইসটা তৈরি করতে পারবে। ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো চ্যাটজিটিপির মতো নিজস্ব একটা এপ ব্যব্যবহার করে, যেটার নাম “ফিনিক্স এআই”। দুনিয়ার বাঘা বাঘা স্কুলগুলো তাদের নিজস্ব এমন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে। প্রতিষ্ঠানগুলো করছে। কাজের গতি তাদের অনেক বেড়েছে।
আমার ছেলের বয়স ছয়। তার মনে কোন প্রশ্ন জাগলেই সে সাথে সাথে আলেক্সাকে জিজ্ঞেস করে। বই খুলতে হয় না। আমাকেও জিজ্ঞেস করে না। প্রতিদিন আলেক্সার সাথে তার প্রচুর কথা হয়। আমি বিস্ময় নিয়ে দেখি, ও কতো দ্রুত শিখে যায়। কতো বহুমাত্রিক বিষয় সে শিখে যাচ্ছে। এটা সম্ভব হয়েছে এমাজন আলেক্সার কারনে। আলেক্সা তাকে ছবি ও ভিডিও দিয়েও বুঝিয়ে দেয়। আমি নিজেই দেখছি, স্কুল ওকে সোশাল বিহেভিয়ার ছাড়া, একাডেমিক তেমন কিছু শেখাতে পারছে না। কারন ট্রেডিশনাল এজুকেশন ফেইল করছে।
প্রচলিত স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ ক্লাস এখন বোরিং। স্টুডেন্টরা করতে চায় না। গরীব দেশে এই চিত্র আরো করুণ! কারণ শিক্ষকদের বেতন কম। শিক্ষক নিয়োগে নেই শক্ত মাপকাঠি বা আন্তর্জাতিক মাণদণ্ড। ভালো শিক্ষক কম। ফলে শিক্ষকরা তরুণদেরকে পৃথিবী সম্পর্কে জানাতে পারছে না। ব্যাচেলর করে যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া যায়, তাহলে পৃথিবীর সাথে কি করে তাল মেলাবে?
গরীব দেশগুলো ট্রেডিশনাল এজুকেশন দিয়ে কিছুই করতে পারবে না। অন্য জাতির উপর আরো নির্ভরশীল হবে। হচ্ছেও। ২০ কোটি মানুষের দেশ হিসেবে আমরা পৃথিবীকে কি কোন উদ্ভাবন দিতে পেরেছি আজো? কিংবা কোন যুগ বদলানো টেকনোলজি? অথবা আমাদেরই জাতীয় সমস্যা সমাধান হয় এমন কিছু?
আমাদের চলমান শিক্ষা ও গবেষণার সংস্কৃতি দিয়ে কি করে আমরা চীনের সাথে পেরে উঠবো? কোরিয়া, জাপান, জার্মানীর সাথে? আমাদের শিক্ষায় ক্রিটিক্যাল থিংকিং নাই। শক্তিশালী প্রবলেম সলভিং নাই। হাতে কলমে শিক্ষার সুযোগ কম। গবেষণা নাই। উদ্ভাবনের সংস্কৃতি নাই। এগুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবার মানুষও তো তেমন নাই। আর প্রয়োগই বা হবে কখন?
দিনভর সর্বত্র রাজনীতি, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও!
১৩
আমাদের সমাজে কিছু কালচারাল চ্যালেঞ্জ ফেইস করতে হয়। সংস্কৃতিতে মিশে থাকা কিছু বিষয়ে পরিবর্তন প্রয়োজন। যেমন—
০১. কাজ কম করে, ক্রেডিট বেশি নেয়ার এক প্রবণতা মানুষের মধ্যে আছে। এই মানসিকতা জাপানে, চীনে, নর্থ আমেরিকা বা ইউরোপে আমি কম দেখেছি। অন্তত আমার কর্ম জীবনে বা কর্মক্ষেত্রে।
০২. বাংলাদেশে মানুষের মধ্যে প্রতিনিয়ত শেখার প্রবনতা কম। বিশেষ করে প্রফেশনাল মানুষের মধ্যে। শেখার প্রবনতা আমি উন্নত জাতির মধ্যে অনেক বেশি দেখি। এটা একটা সংস্কৃতি। একটা চর্চা। একটা অভ্যাস। এবং সিস্টেমও বাধ্য করে প্রতিনিয়ত শিখতে।
আপনি জাপানে গেলে দেখবেন, ৭০ বছর বয়সী একজন শিক্ষক প্রতিদিন নতুন নতুন বিষয় শিখতে চায়। শিখছে এবং আনন্দ পাচ্ছে। একই বিষয় আমি অন্যান্য দেশে দেখেছি।
০৩. নাম বেঁচে খাওয়ার এক সংস্কৃতি আমাদের দেশে আছে। আমার নাম হয়তো বিক্রি হচ্ছে, দেখা গেলো আমিই জানি না। মানুষের সাথে একটা ছবি তুলেও সেটা দিয়ে কতো ফাপড়বাজি! এগুলো মনে হচ্ছে দিন দিন বেড়েই চলেছে।
০৪. আমাদের সমাজে মানুষ নিজের ওজন বুঝে না কিন্তু ভারটা নিতে চায়। আপনি যদি আপনার এলাকার সবচেয়ে অযোগ্য, অকর্ম মানুষটাকে গিয়ে বলেন—আপনাকে এলাকার চেয়ারম্যান করা হবে। দেখবেন সেও খুশিতে আত্মহারা হবে। সে পদ দখলের জন্য যা যা দরকার সব করতে চাইবে। অন্তত ৮০ ভাগ ক্ষেত্রে এটা হবে। একটা সহসভাপতি পদ যাকে ইচ্ছে তাকেই দেয়া যাবে। পদ আর কমিটির দেশ, বাংলাদেশ।
মানুষ নিজের ওজনটুকু মাপতে সময় নেয় না। চিন্তা করে না সে কতটুকু পারবে, কতটুকু পারবে না। কিন্তু চেয়ার বা পদবীটা তার চাই। এই চাওয়া, পুরো সমাজকে এলোমেলো করে রেখেছে! চোখ দিয়ে তাকালেই বুঝতে পারবেন। বিষয়টা শুধু রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ না। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও বা অন্যান্য ক্ষেত্রেও এটা দেখা যায়।
উন্নত দেশে আপনি এটা কম দেখেবেন। কারণ, মানুষ তার ওজন মাপতে জানে বা তার ওজন মাপার জন্য সে ব্যবস্থা দাঁড়িয়েছে।
০৫. মানুষ নিজেকে অন্ধ ও অজ্ঞ রেখে সারা পৃথিবীকে তাই ভাবে। যেমন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কথাই চিন্তা করেন। দেশের বেশিরভাগ শিক্ষকেরই ধারনা নাই পৃথিবীটা জ্ঞান-গবেষণায় কোথায় চলে গেছে। তাহলে ছাত্রদের কী করে ধারণা থাকবে!
কিছুদিন আগে দেখলাম, এক ব্যাচেলরের ছাত্র গবেষণা শিখাচ্ছে। যে কোনদিন গবেষণা করেনি, সেই গবেষণা শিখাচ্ছে। আবার তার কথায় অনেক স্টুডেন্ট টাকাও দিচ্ছে। কিন্তু আমি যখন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষককে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি, তখন স্টুডেন্টরা সেটা শুনতে চাচ্ছে না। কারণ অন্ধ ও অজ্ঞ, খুব দ্রুত মিথ্যার আশ্রয় নিতে পছন্দ করে। সে আশ্রয় অনেক সহজ। দিবা স্বপ্নের মতো সাময়িক আনন্দের। কঠিন সত্য কাজটা সে করতে পছন্দ করে না।
এমন অনেক কালচারাল চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের পরিবর্তন করতেই হবে। সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে।
১৪
খবরে দেখলাম, দেশের এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে, এক ছাত্র সংগঠনের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।
৫৫ জন শুধু সহ-সভাপতি!
আজ থেকে প্রায় দশ বছর আগে, আমি একবার গ্রামে গিয়ে দেখেছি, এক পরিবারে তিনটা ছেলে অথচ তারা চারটা সহ-সভাপতির পদ নিয়ে আছে। সেটা দেখে এক লেখায় লিখছিলাম, বাংলাদেশের অলিতে গলিতে শুধু সহ-সভাপতি! দেশময় এক ব্যধির নাম কমিটি!
এনভিডিয়া যখন পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিষ্ঠান হলো, পুরো পৃথিবীর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন জ্ঞান-গবেষণায় মুখর, আবিষ্কার-উদ্ভাবনে যখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তুমুল প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, এআই যখন সারা দুনিয়ার ফোকাস, তখনো "সহসভাপতি" আর ছাত্র রাজনীতর অভিশাপে ডুবে আছে এক দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।
১৫
বাংলাদেশের স্টুডেন্টদের একটা উদ্যাম আছে। তারা উচ্চশিক্ষা নিতে চায়। এই চাওয়ার পেছনে “চালিকা শক্তি” কিংবা ড্রাইভিং ফোর্স হলো অর্থনৈতিক মুক্তি। পৃথিবী থেকে জানার এক অদম্য আগ্রহ। নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ও গবেষণা করার ইচ্ছে। একটা উন্নত জীবনের স্বপ্ন। দেশ ছেড়ে পৃথিবীকে দেখার এক তীব্র নেশা।
এই চালিকা শক্তি খুবই দরকার। এই চালিকা শক্তি ছিলো বলেই চীন এতো দূর চলে গেছে। ভারত চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশও যাবে।
কিন্তু তরুণদের এই উদ্যাম ধরে রাখার জন্য জাতীয়ভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ঠিক করতে হবে। শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। নাইলে আমাদের তরুণদের অদম্য আগ্রহ থাকলেও তারা হারিয়ে যাবে। নয়তো খুব বেশি ছেলে-মেয়ে পৃথিবীকে দেখার, পৃথিবীর সাথে চ্যালেঞ্জ নেয়ার লড়াইয়ে টিকে থাকতে পারবে না।
ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোতে কাজ শুরু করেছি তিন সপ্তাহ হলো। কী প্রাণবন্ত, কর্মব্যস্ত এক পরিবেশ। যদিও এমন পরিবেশ আমার কাছে নতুন কিছু নয়। এই পরিবেশের কারণেই এখানের একজন ২৩-২৪ বছরের তরুণ যেভাবে পৃথিবীর সাথে চ্যালেঞ্জ নিয়ে লড়তে পারে, আমাদের তরুণরা সেটা পারে না।
বাংলাদেশের অনেক স্টুডেন্ট প্রতিবছর আমেরিকাতে যায়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও যায়। কিন্তু বড়ো বড়ো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আমাদের ছেলে-মেয়ে এখনো অনেক কম।
আমি যখন ইউনিভার্সিটি অব প্যানসেলভেনিয়াতে পোস্টডক করছিলাম, তখনও বাংলাদেশের আন্ডারগ্রেজুয়েট ও গ্রেজুয়েট স্টুডেন্টের সংখ্যা ছিলো খুবই সামান্য। কিংবা পোস্টডক্টরাল গবেষকও ছিলো না তেমন।
ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোতে এই সংখ্যা কেমন জানি না। তবে ক্যাম্পাসে হাঁটলেই চাইনিজ, ভারতীয় অহরহ দেখা মেলে। অনুমান করা যায়, বাংলাদেশের স্টুডেন্টদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। এই বিষয়টা আমার খারাপ লাগে।
দুনিয়ার বড়ো বড়ো স্কুলগুলোতে আমাদের ছেলে-মেয়েদের উপস্থিতি কমের জন্য বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রবলভাবে দায়ী। কারণ চীন-ভারতের স্টুডেন্টরা আন্ডারগ্রেজুয়েটেই অনেক খ্যাতনামা সুপারভাইজরদের সাথে কাজ করে। গবেষণা করে। অনেক উন্নতমানের পড়াশুনা পায় এবং কাজ শিখে। এই জায়গায় বাংলাদেশের তরুণরা পিছিয়ে থাকে। ফলে এই পিছিয়ে থাকাটা, আমরা অনেকেই জীবনভর চেষ্টা করেও আর কাটিয়ে উঠতে পারি না। —খুবই সত্য এটা!
অথচ বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আজো, এই ২০২৫ সালে এসেও, কতো তুচ্ছ ও হালকা বিষয় নিয়ে ব্যস্ত সবাই!
একটা দেশের তরুণদের মতো এতো দামী সম্পদ নষ্ট হয়ে যায়—সেদিকে কয়জনই লক্ষ্য রাখে। মানুষকে যখন যা দিয়ে গড়তে হয়, তা না দিতে পারলে, সময় গেলে সাধন হয় না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের শিক্ষার্থীদের যে সময়ে যা দেয়ার কথা—তা দিতে পারছে না। অথচ আমাদের সেদিকে লক্ষ্য নেই!
১৬
কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে যেসব স্টুডেন্টরা উপার্জন করে, তারা অন্যদের চেয়ে জীবনযুদ্ধে এগিয়ে থাকে।
আপনি টিউশনি করেন, ফ্রিল্যান্সিং করেন, দোকানদারি করেন আর যাই করেন—উপার্জন করতে শিখলে জীবন সম্পর্কে আলাদা উপলব্ধি তৈরি হয়।
উপার্জন করলে জীবনের মূল্যবোধ বাড়ে। সময়জ্ঞান বাড়ে। অর্থের প্রতি মায়া বাড়ে। অর্থের মায়া, জীবনের আয়-ব্যায়ের ব্যালেন্স শেখায়। সারাজীবন এই শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
উপার্জন করতে শিখলে আত্মনির্ভরশীলতা আসে। অর্থনৈতিক মুক্তি আসে। অর্থনৈতিক মুক্তি, মানুষকে ভাবনার মুক্তি দেয়। কাজের স্বাধীনতা দেয়। চিন্তার বৃত্তকে বাড়াতে সাহায্য করে। জীবনে চ্যালেঞ্জ নিতে শেখায়।
উপার্জন করতে গেলে ধৈর্য বাড়ে। সহনশীলতা বাড়ে। উপার্জন করতে গেলে আপনি শিখবেন কি করে গ্লানি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। অপমান হজম করতে হয়। কি করে ঠেক-ঠুকে আবার দাঁড়াতে হয়।
জীবনের এতোগুলো গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আপনি কখনোই কলেজ-ইউনিভার্সিটির বইয়ে পাবেন না। ডিগ্রি থেকে পাবেন না। কিন্তু জীবনের জন্য এই শিক্ষাগুলো অপরিহার্য। এই শিক্ষাগুলো আপনাকে অনেক শক্ত করে তোলে। শক্তি দেয়। যে শক্তি পুরো জীবনেই কাজে আসে। জীবনে ঝড় আসলে দাঁড়িয়ে থাকা যায়।
আমি সবসময়ই তরুণদের পরামর্শ দেই, সৎভাবে উপার্জন করতে শুরু করো। যতো সামান্যই হোক সে উপার্জন।
১৭
জীবনে স্যাটেল হওয়া বলতে কিছু নেই। স্যাটেল জীবন একটা মানসিক আত্মতৃপ্তির ধারণা। কিংবা সামাজিকভাবে প্রচলিত এক মরিচিকা।
জীবন তো বৃক্ষ না, যে এক জায়গায় স্যাটেল হয়ে থাকবে! এমনকি বৃক্ষও তো স্যাটেল না। বৃক্ষ এক জায়গায় স্থির—কিন্তু সেও বেড়ে উঠে। ঋতুর সাথে বদলায়।
জীবন তো কোন বিশাল পাথর নয়। স্থির হয়ে থাকবে এক জায়গায়। জীবন গতিশীল। ডাইনামিক। ডাইনামিক জীবন কখনোই স্যাটেল হতে পারে না।
মানুষের জীবন স্যাটেল হওয়ার জন্য না। এটাই সত্য।
মানুষ বিয়ে করলেই স্যাটেল হয়ে যায় না। মানুষ চাকরি পেলে স্যাটেল হয়ে যায় না। বাড়ি কিনলেই স্যাটেল হয়ে যায় না। গাড়ি কিনলেই স্যাটেল হয়ে যায় না।
রাজা বাদশারাও তো স্যাটেল হতে পারে না। তাদের কি কম থাকে? সিংহাসন হারায় না তারা?
একজন প্রধানমন্ত্রীকে আপনি কি বলবেন? —তিনি স্যাটেল না? তার জীবনে টাকা-পয়সা, ক্ষমতা কিসের অভাব? অথচ সেই প্রধানমন্ত্রীও তো ক্ষমতা হারায়।
মানুষের জীবনে স্যাটেল বলতে কিছু নাই। মানুষের জীবন হলো নদীর স্রোতের মতো। প্রবাহমান জল। গতিশীল। চলতেই থাকবে—আমৃত্যু। এখানে সবাই দৌঁড়ের উপর আছে।
অনেকে বিয়ে না করলে মনে করে স্যাটেল হতে পারছে না। আবার অনেকে বিয়ে করে, বিচ্ছেদ না হওয়া পর্যন্ত মনে করে, স্যাটেল হতে পারছে না।
এক সময় মনে হবে একটা চাকরি না থাকলে জীবন স্যাটেল হচ্ছে না। আবার চাকরি পাওয়ার পর মনে হবে—এই চাকরের জীবন ভালো লাগে না।
জীবনে যখন পকেটে ১০০ টাকা ছিলো, তখনো সমস্যা ছিলো। যখন চাইলেই এক লক্ষ টাকা নির্দ্বিধায় খরচ করতে পারি, তখনো জীবন সমস্যাহীন না।
একসময় মনে হবে একটা বাড়ি না থাকলে জীবনটা স্যাটেল হচ্ছে না। বাড়ি কেনার পর দেখবেন কতো ঝামেলা বাড়ে! কতো চিন্তা বাড়ে। আজ এদিকে নষ্ট হবে তো, কাল সেদিক নষ্ট হবে! মনে হবে বাড়ি বেচে ভাড়া থাকি।
মানুষের জীবনে যতো থাকে, ততো তার জীবন ঝামেলাপূর্ণ হয়। মানুষ যতো বেশি আশা করবে, ততোই তাকে দহন করতে হয়। ততোই তাকে চিন্তা করতে হয়। ততোই তার সমস্যা বাড়তে থাকে। মানুষের বেশি থাকা মানে কিন্তু স্যাটেল হওয়া না। কিংবা কম থাকলেই সেটাকে আনস্যাটেল ভাবারও কারণ নাই।
জীবন গতিময়। এখানে স্যাটেল বলতে কিছু নেই। আছে শুধু বেঁচে থাকার নিরন্তর চেষ্টা। সংগ্রাম। জীবনকে প্রবাহিত করার অদম্য নেশা।
আছে সৎ ও সুন্দর আনন্দ। মায়া, দরদ আর ভালোবাসা।
১৮
জার্মানরা কয়েশ বছর ধরে জ্ঞান-গবেষণায় ভালো। আবিষ্কার-উদ্ভাবনে সেরা। —কেন সেরা?
কারণ তারা মেন্টর তৈরি করছে। মেন্টর তৈরির চেইন সংস্কৃতি ওদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
আপনি ফিজিক্সের ইতিহাস পড়েন—দেখবেন জার্মান বিজ্ঞানীতে ভরা। ম্যাক্স প্ল্যাংক, আলবার্ট আইনস্টাইন, সমারফেল্ড, হাইজেনবার্গ, ভিলহ্যাম রন্টজেন, ক্লাউজিয়াস। কাকে বাদ দিয়ে কার কথা বলবো। তারা নিজেরাও বড়ো বড়ো ফিজিসিস্টদের হাত দিয়ে এসেছেন। আবার তাদের হাত দিয়ে গড়ে উঠেছে বহু সাইন্টিস্ট।
এক সমারফেল্ডের হাত দিয়েই বেরিয়েছে বহু নোবেল বিজয়ী।
আপনি যদি কেমেস্ট্রির ইতিহাস পড়েন—সেখানেও জার্মান বিজ্ঞানীতে ভরা। একসময় আমেরিকান কেমিস্টরা জার্মান ভাষা শিখতো। জার্মান জার্নালগুলো পড়ার জন্য।
আপনি যদি ম্যাথমেটিক্স, বায়োলজি কিংবা অন্যান্য ফিল্ড সম্পর্কেও পড়েন, দেখবেন জার্মান সাইন্টিস্টদের জয়জয়কার।
ওদের সমাজে, মেন্টরের হাত ধরে মেন্টর তৈরি হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে সেটা চলছে। সেজন্যই ওরা যুগ যুগ ধরে সেরা।
মেন্টর তৈরির গুরুত্বটাই বাংলাদেশের মানুষ বুঝে না। কালে কালে মেন্টর তৈরি না করলে, কোন সমাজ শক্ত হয়ে দাঁড়ায় না।
জার্মানরা কি করে জ্ঞান-বিজ্ঞানে এতো শক্তিশালী হলো—সেটা নিয়ে ভাবতে শুরু করলো জাপান। ইম্পেরিয়াল জাপান উনিশ শতকের শেষে, জার্মানদের মতো করে তাদের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাকে সাজাতে লাগলো। জাপানে গড়ে তোলা হলো বিশ্বমানের গবেষণা কেন্দ্র—রাইকেন। তাদের দেশে তৈরি হলো ধারাবাহিক মেন্টর তৈরির সংস্কৃতি।
জ্ঞান-গবেষণার ইতিহাসে মেন্টর তৈরি করার এই যে ধারাবাহিক সংস্কৃতি, এটা আবশ্যক। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে যেনো সর্বাধুনিক জ্ঞানের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে, ভবিষ্যতের কালকে দেখিয়ে দিতে পারে সেজন্য মেন্টর, সুপারভাইজর, শিক্ষক তৈরির ধারাবাহিক সংস্কৃতি লাগবেই।
এ সংস্কৃতি যে সমাজে নেই, সে সমাজে আগাছা বেড়েছে অনেক। সেখানে ক্ষুরধার জ্ঞান নেই। মানুষের চিন্তা ও চেতনায় পড়েছে ঝং। তাদের উপলব্ধি করার ক্ষমতা গেছে ক্ষয়ে। মূর্খরা সর্বত্র "প্রধান অতিথি" হওয়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছে।
১৯
পৃথিবীর তরুণরা হয়ে উঠছে বিশ্বসেরা। তারা জগৎ পাল্টে দেয়ার ভাবনা ও কাজে মত্ত। তারা নিজেকে গড়ে। তাই রাষ্ট্রকে গড়তে পারে।
তাদের সমাজ তাদেরকে সেভাবেই কাজে লাগায়।
আর আমাদের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণরা হয়ে উঠছে বড়ো বড়ো নেতা। ফেইসবুক যোদ্ধা। কমেন্ট যোদ্ধা।
এসব করে ওরা দিন দিন দলীয় দাসত্ব বরণ করে। নিজের দল ছাড়া এদের কাছে অন্য সবকিছুই খারাপ—এমন বদ্ধ ধারণা নিয়ে এরা বেড়ে উঠে!
দিনভর, ঐ ধর, ঐ মার—এই চর্চার মধ্যে বড়ো হয়। এদের মগজে পৃথিবী জয়ের স্বপ্ন, লক্ষ্য, মেধা ও শ্রম কি করে আসবে?
তাই রাষ্ট্রে নৈরাজ্য কখনো কমে না! এ এক অভিশপ্ত জনপদ!
এদিকে, রাষ্ট্রের পলিসি মেইকাররা এগুলো উপভোগ করে নিজেদের স্বার্থে। দলের স্বার্থে।
এজন্যই রাষ্ট্রের মুক্তি মেলে না!
ফলে এখান থেকে মুক্তির জন্য আরেকদল তরুণ আবার দিকগ্বিদিক ছুটে বেড়ায়। প্রতিদিনের বঞ্চনা, অবহেলা, প্রতারণা এসব থেকে মুক্তির পথ খোঁজে।
অসংখ্য মানুষের একটাই কথা—ছাড়তে পারলেই বাঁচি!
—এ এক বেদনাময় দীর্ঘশ্বাস! রাষ্ট্রের পলিসি মেইকাররা কখনো সে দীর্ঘশ্বাস শুনতে চায় না। এতোই পিশাচ এরা!
২০
চীনের বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন, দেখবেন ছাত্র-শিক্ষকরা দিন-রাত কাজ করছে। রাজনীতি তো দূরের কথা, ফালতু কথা বলে সময় নষ্ট করার সুযোগ ওদের নেই।
জাপানের বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন, দেখবেন শিক্ষকদের রুমের লাইট বন্ধ হয় না। সকাল সাতটা থেকে শুরু হয়। অনেকের লাইট জ্বলে রাত দশটা পর্যন্ত।
কোন পোস্টার নাই। নেতা নাই। হলে রাজনীতি নাই। ছাত্রদের সংগঠণের নামে, ব্যানার টানিয়ে কোন কার্যক্রম নাই। ঐ ধর-ঐ মার এসব নাই। যে যার মতো স্বাধীনভাবে চলছে। পড়ছে। কাজ করছে। আবিষ্কার-উদ্ভাবন করে যাচ্ছে। কারণ একটা প্রতিষ্ঠান, প্রতিটা শিক্ষার্থীর। কোন দলের কাছে নত হওয়ার জন্য না। কোন দলের ছায়ায় চলার জন্য না।
ইউরোপে যাবেন, তাই দেখবেন। জার্মানী, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, ইংল্যান্ড, ফ্রান্সের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পৃথিবী নাড়া দেয়া আবিষ্কার-উদ্ভাবন নিয়ে আছে। তাদের ছাত্ররা ২২-২৩ বছর বয়সে পিএইচডি শুরু করে। অসংখ্য তরুণের চোখ ভরা স্বপ্ন।
আর সে বয়সী বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা দলীয় রাজনীতি নিয়ে আছে। এক দল আরেক দলকে খেদায়। দিনভর হাউকাউ! কিসের পড়াশুনা! কিসের গবেষণা! ছাত্র-শিক্ষকরা মিলে দলাদলি, রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত। এমন নোংরা সংস্কৃতি পৃথিবীর কোথাও নাই। আফ্রিকার ক্ষুধাপীড়িত দেশেও না। —এতোই দুর্ভাগা আমরা! —এতোই দুর্ভাগা আমার দেশ!
আমেরিকার ছেলে-মেয়েরা আছে রোবট নিয়ে। নতুন নতুন ড্রাগ আবিষ্কার নিয়ে। মেশিন লার্নিং নিয়ে। মহাকাশ গবেষণা নিয়ে। ২৫-২৬ বছর বয়সী তরুণরা উদ্যোক্তা হচ্ছে। লক্ষাধিক স্টার্টআপ প্রতিবছর চালু হয় আমেরিকায়। —এমন কোন বিষয় নেই যেটা নিয়ে আমেরিকার তরুণরা পড়ে না। গবেষণা করে না। ভাবে না।
আমরা কি কখনো এসব শিখবো না? শিখতে চাইবো না? নাকি জীবনভর নিজেদের ব্যার্থতাকে, অন্যের ষড়যন্ত্র আর চক্রান্ত বলেই মানুষকে বিভ্রান্ত করবো?
পাশের দেশ ভারত, ২৩ টা বিশ্বমানের আইআইটি গড়ে তুলেছে। আমরা সে মানের একটা প্রতিষ্ঠানও গড়তে পারিনি আজো। একটাও না। অথচ এটা ২০২৫ সাল! এগুলো আর কতো বুঝাবো! আর কতো লিখবো!
সারা দুনিয়া তার তরুণদের কাজে লাগায় বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য। আর আমরা আমাদের তরুণদেরকে দলীয় দাস বানিয়ে রাখি—চিন্তায়, মগজে, কার্যক্রমে!
২১
ইউনিভার্সিটি পাশ করেও অনেকে এই তথ্যগুলো জানে না। এই তথ্যগুলো জানা থাকা ভালো। পরিকল্পনা করতে সুবিধা হবে।
দুনিয়ার বেশিরভাগ দেশেই অনার্স শেষ করেই পিএইচডি শুরু করে স্টুডেন্টরা। নর্থ আমেরিকাতে চার বছরের ব্যাচেলর শেষ করেই পিএইচডি শুরু করে ওরা। যারা পিএইচডি করবে, তারা আর আলাদা করে মাস্টার্স করে না। করতে হয় না। ২২-২৩ বছর বয়সে ওদের অনার্স শেষ হয়। সুতরাং সে বয়সেই পিএইচডি শুরু করে। নর্থ আমেরিকাতে পিএইচডি প্রোগ্রাম সাধারণত একটু লম্বা সময়। ৫-৬ বছর। অন্তত STEM (Science, Technology, Engineering and Math) ফিল্ডে।
অনেকে মনে করে, GRE টেস্ট শুধু ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টদের জন্য। বাস্তবতা হলো, আমেরিকার স্থানীয় স্টুডেন্টদেরও GRE দিতে হয়। GRE একটা স্ট্যান্ডার্ড টেস্ট। আমেরিকাতে মাস্টার্স ও পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তির জন্য GRE স্কোর দরকার হয়। যদিও বর্তমানে বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য GRE স্কোর চাচ্ছে না। অন্যদিকে আমেরিকাতে আন্ডারগ্রেজুয়েট বা অনার্সে ভর্তির জন্য দরকার হয় SAT স্কোর। উল্লেখ্য যে, কেউ যদি আমেরিকার বাইরে থেকে পিএইচডি করে, আমেরিকাতে পোস্টডক্টরাল রিসার্চ করতে আসে তাহলে GRE দরকার হয় না।
ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স ছাড়া ইউরোপের বেশিরভাগ দেশেই পিএইচডি চার বছর। বলা যায় গড়ে ৩-৪ বছর। ইউরোপেও বহু স্টুডেন্ট অনার্স শেষ করেই পিএইচডি শুরু করে। ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডে সাধারণত মাস্টার্স করতে হয়। ওরাও গড়ে ২২-২৩ বছর বয়সে শুরু করে। সে হিসেবে ২৭-২৮ বছরে ওদের পিএইচডি শেষ হয়ে যায়।
বাংলাদেশ থেকে ইউরোপের দেশগুলোতে গিয়ে সরাসরি পিএইচডি’তে চান্স পাওয়া খুব কমন বিষয় না। আগে মাস্টার্স করতে হয়। তারপর পিএইচডি’র জন্য চেষ্টা করতে হয়। ইংল্যান্ডে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ বা এমন নিদির্ষ্ট কিছু স্কলারশিপের অধীন অবশ্য সরাসরি পিএইচডি প্রোগ্রোমে ভর্তি হওয়া যায়। ওভারঅল, সংখ্যায় যেটা খুব বেশি না।
ইউরোপের বেশিরভাগ স্কুলে, মাস্টার্স করার সময় ৩০, ৪৫ ও ৬০ ক্রেডিটের (ECTS) থিসিস ওয়ার্ক থাকে। সেই থিসিস ওয়ার্কে একটা স্টুডেন্ট কেমন করে সেটার উপর অনেক সময় তার পিএইচডি প্রোগ্রোমে চান্স পাওয়ার বিষয়টা নির্ভর করে। চীনের প্রথম সারির স্টুডেন্টরা চার বছরের অনার্স শেষ করেই সেখানে পিএইচডি শুরু করে।
জাপান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডেও পিএইচডি প্রোগ্রাম গড়ে ৩-৪ বছর সময়। মোটা দাগে আন্ডারগ্রেজুয়েট এবং গ্রেজুয়েট স্টাডি মোট ৮-৯ বছর।
এই টাইমলাইনগুলো অবশ্য ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টদের বেলায় ভিন্ন হয়। নেটিভ বা স্থানীয় স্টুডেন্টরা দেখা যায় একই ইউনিভার্সিটিতে আন্ডারগ্রেজুয়েট (অনার্স) শেষ করে সেখানেই পিএইচডি প্রোগ্রাম শুরু করে দেয়। কিন্তু ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টদেরকে একটা ভিন্ন পরিবেশে গিয়ে অনেক কিছুর বিপরীতে সেট হতে হয়। তাই অনেকেরই মাস্টার্স এবং পিএইচডি মিলে সময় বেশি লাগতে পারে। লেগে যায়।
আমার জানা মতে, দুনিয়ার প্রায় সব দেশেই পিএইচডি প্রোগ্রামে মাসিক একটা বেতন বা স্টাইপেন্ড দেয়া হয়। অন্তত STEM ফিল্ডে তাই দেখেছি। পিএইচডি প্রোগ্রামে টিউশন ফি দিতে হয় না। কিংবা সেটা কাগজে-কলমে দিতে হলেও, পকেট থেকে দিতে হয় না। একেক দেশের বেতন বা স্টাইপেন্ড একেক রকম।
ওভার অল, পিএইচডি প্রোগ্রামে সাধারণ যতো স্কলারশিপ বা ফান্ডিং দেয়া হয়, মাস্টার্স প্রোগ্রামে ততো স্কলারশিপ থাকে না।
২২
একশো ডলারের একটা নোট মাটিতে পড়ে থাকলেও কেউ না কেউ হাতে নিবে। টাকাটা নোংরা হলেও হাতে নিবে। ব্যবহার করতে চাইবে।
কারণ টাকাটার একটা মূল্য আছে। ভ্যালু আছে।
দামী গহনাটা আমরা খুব যত্ন করে রাখি। নিরাপদ জায়গায়। যেনো নষ্ট না হয়। চুরি না হয়। বছরের ১ দিন ব্যবহার করলেও, ৩৬৪ দিন যত্ন করে নিরাপদে রাখি।
যে গাছ ফল দেয়, সেটাকে আমরা একটু বেশিই যত্ন করি। মনের অজান্তে হলেও। কারণ গাছটার ভ্যালু আছে।
জগৎ সংসারে সবকিছুরই একটা ভ্যালু লাগে। এমনকি মানুষেরও।
আপনাকে আপনার ভ্যালু তৈরি করতে হবে। চিন্তায়। কাজে। জ্ঞানে। দক্ষতায়। মায়ায়। সেবায়। চরিত্রে। সততায়।
আপনার ভ্যালু মানে বৈষয়িক মূল্য নয়।
আপনার কথা, আপনার ভ্যালু হতে পারে।
আপনার নিরবতা আপনার ভ্যালু হতে পারে। আপনার সততা আপনার ভ্যালু। আপনার পরোপকারিতা, আপনার ভ্যালু।
আপনার নমনীয়তা-ফ্ল্যাক্সিবিলিটি, আপনার হাসি, আপনার উদার সারল্য মন—এগুলো আপনার ভ্যালু।
আপনার জ্ঞান, আপনার প্রজ্ঞা, দক্ষতা—এগুলো ভ্যালু।
মানুষকেও তার ভ্যালু তৈরির জন্য কাজ করতে হয়। সময় দিতে হয়।
মানবসভ্যতার এই এক চিরায়ত নিয়ম।
২৩
মানুষ আশার কথা শুনতে চায়। শত যন্ত্রণার মাঝেও আশার গল্প তাকে জাগায়।
আপনি ক্যান্সারের রোগী। তারপরও যদি ডাক্তার আপনার হাত ধরে, খুব মায়া নিয়ে বলে—আপনি সুস্থ হয়ে যাবেন!
—আপনার ঠিকই ভালো লাগবে।
শিক্ষক যখন একটা অসম্ভব খারাপ স্টুডেন্টকেও বলে—তুমি একদিন অনেক বড়ো হবে!
সে স্টুডেন্ট তার মাঝে শক্তি পায়। সেই শক্তি আসে আশা থেকে। পজেটিভিটি থেকে।
সারা দুনিয়ার মানুষ আশায় বাঁচে। সে হেরে গিয়েও হারতে চায় না। সে ভাবে, ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মতো পরাজিত তো হইনি এখনো।
খেলা শেষ হওয়ার এক মিনিট আগেও খেলোয়াড়দের বলা হয়—আরো এক মিনিট আছে। অনেক কিছু হতে পারে।
মানুষ ছাড়া অন্য কোন প্রাণী, এতো সুন্দর করে আশাকে প্রসেস করতে পারে না। কারণ মানুষের মস্তিষ্কের নিউরাল নেটওয়ার্ক খুবই আলাদা ধাঁচের—ইউনিক।
অনিশ্চিত জীবনের একমাত্র নিশ্চিত বিষয় হলো মৃত্যু। কিন্তু আমরা আশা নিয়ে থাকি বলেই, জীবনে আনন্দ খুঁজে পাই। আনন্দ নিংড়ে নিতে পারি। নয়তো জীবন হতো বিষাদময়। অসম্ভব যন্ত্রণাময়। সে বিষাদে, মানুষ মৃত্যুর বহু আগেই মরে যেতো স্বেচ্ছায়।
সুতরাং আশা আমাদের জন্য দাওয়া—মেডিসিন। এই ওষুধকে এড়িয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ নাই।
আশা কখনো কখনো পদ্ম পাতা কিংবা কচু পাতার উপর জলের ফোঁটা। আমরা জানি, হুট করেই হয়তো পড়ে যাবে। কিন্তু তবুও সেই সৌন্দর্য দেখতে আমাদের ভালো লাগে।
আশা মানেই কিন্তু পূরণ হওয়া নয়। আশা নিজেই একটা সুন্দর। এবং সেই সুন্দরকে আমরা উপভোগ করি।
আশার মতো এতো মায়াময় সুন্দরকে উপভোগ না করার কোন মানে হয় না। এতো উপকারী ওষুধ সেবন না করে—কেন যন্ত্রণায় কাতর হবেন?
২৪
আমেরিকার মতো দেশ ৩০ কোটি মানুষ নিয়ে হিমশিম খায়। তাদের সমাজেও সমস্যার কমতি নাই।
অথচ, আমেরিকা বাংলাদেশের চেয়ে ৫০ গুণ বড়ো। কিংবা তারো অধিক। অর্থনীতিও বহুগুণে শক্তিশালী।
এদিকে বাংলাদেশের মতো একটা ছোট্ট দেশের জনসংখ্যা ১৮-২০ কোটি। শুধু ঢাকায় যতো মানুষ থাকে, ইউরোপের কয়েকটা দেশ মিলিয়ে এতোগুলো মানুষ থাকে না।
ডেনমার্কের জনসংখ্যা প্রায় ৬০ লক্ষ। অথচ বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট সংখ্যাই ৪০ লক্ষ।
সুতরাং বাংলাদেশ থেকে মানুষকে বের করে দিতে হবে।
প্রত্যেকটা সরকারের এটা একটা বড়ো লক্ষ্য হওয়া উচিত।
যতো যুক্তিই দেখান, এতো মানুষ নিয়ে একটা দেশ স্থিতিশিল রাখা ইমপসিবল।
একটা শক্তিশালী জাহাজেও যদি মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী থাকে, সেখানে বিশৃঙ্খলা অনিবার্য। ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি অনেক।
তাহলে মানুষদেরকে বের করবেন কিভাবে?
মানুষকে বের করতে হলে তাদেরকে একটা নির্দিষ্ট লেভেলের প্রশিক্ষণ দিতেই হবে। ভালো একটা শিক্ষা দিতে হবে। তাদেরকে ভিন্ন ভাষা শেখাতে হবে। প্রযুক্তি শেখাতে হবে। উদ্যেক্তা হওয়ার প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
সবাইকে সামাজিক চাপ দিয়ে, প্রেসট্রিজ দেখানো আর বাঁচানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো বন্ধ করতে হবে।
সমাজের প্রত্যেকটা পেশাকে হাইলাইট করতে হবে—যেনো মানুষ বহু পেশায় জড়িয়ে যায়। চার-পাঁচটা পেশার নেশায় জীবন ধ্বংস না করে বিকল্প পেশা বেছে নেয়। একটা বিসিএস-কিংবা সরকারী চাকরির জন্য ৩২ বছর অপেক্ষা করা মানে—রাষ্ট্রেরও অনেক বড়ো অপচয়!
ভোকেশনাল ও পলিটেকনিকগুলোকে আরো উন্নত করা দরকার। শুধুমাত্র পরীক্ষা আর সনদ নির্ভর না রেখে, ব্যবহারিক শিক্ষায় জোড় দিয়ে প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দরকার। শুধুমাত্র রিসার্চ ফোকাসড কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশে যতো সংখ্যা অনার্স পড়ুয়া স্টুডেন্ট আছে, তত সংখ্যক মানুষ দুনিয়ার বহু উন্নত দেশেও নাই। তাইলে দেশ আগায় না কেন—প্রশ্নগুলো করতে হবে! শিক্ষার মান নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবার সময় এখন। উচ্চশিক্ষাকে পানতা ভাতের চেয়ে সহজ করে রাখা হয়েছে। পানতা ভাতও এখন জোগাড় করা কষ্টসাধ্য! বলা হয় দেশে ৪ কোটি তরুণ। এই ৪ কোটি তরুণ যেমন আর্শিবাদ হতে পারে, তেমনি অভিশাপও হতে পারে। তাদের কারণে দেশ বরবাদ হতে সময় লাগে না।
দুনিয়ার যেসব দেশ তাদের তরুণদেরকে ব্যস্ত রাখতে পারেনি, সেসব দেশে কোন শান্তি নাই।
তরুণদের ব্যস্ত রাখার জন্য, পলিসি মেইকারদেরকে ১০১ টা উপায় খুঁজে বের করতে হয়। অথচ, এদেরকে আমরা দলের স্বার্থে ব্যবহার করি।
গ্রামে-গঞ্জে, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি দিয়ে রেখেছি। ওদের বিভক্ত করে রেখেছি। নাই বিশ্বমানের শিক্ষা। নাই বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ। নাই ব্যস্ত রাখার দৌঁড়। এভাবে চললে, কোন দেশ নিবে আমাদেরকে? মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও আমাদের নিতে চায় না।
দেশ থেকে মানুষ বের করার সুপরিকল্পনা করুন। জনবহুল দরিদ্র দেশের জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
২৫
যারা একদমই ইংরেজিতে কথা বলতে পারেন না—তাদের জন্য এই লেখা।
আপনি স্টুডেন্ট, চাকরিজীবি, অভিভাবক যাই হোন না কেন—স্পিকিং ইংলিশের জন্য এই কাজগুলো চেষ্টা করেন।
আপনি অনেক শব্দ জানেন। গ্রামার জানেন। কিন্তু নার্ভাস ফিল করেন। যার জন্য সঠিক ইংরেজিও ভুল হয়ে যায়। আসলে আপনি কিন্তু একা না। যাদের মাতৃভাষা ইংরেজি না, তাদের অনেকেই কম-বেশি ভুল করে। ফ্রান্স, জাপান, চীনের মানুষরা যখন ইংরেজি বলে—অনেক শিক্ষিতরাও কম-বেশি ভুল করে।
ভুল হবে এই মানসিক চাপে যদি কথা না বলেন—তাহলে কোনদিনই বলা হবে না। কমিউটনিকেটিভ ইংলিশে ভুল হওয়া কিন্তু “মহাভারত অশুদ্ধ” হয়ে যাওয়া না। আপনি যখন বাংলা বলেন, তখনও কিন্তু অনেক ভুল করেন। এমন নয় যে, প্রমিত বাংলা এবং ব্যাকরণ মেনে মেনে কথা বলেন।
গ্রামারের টেনশন ভুলে যান। নো গ্রামার। ছোটবেলায় বাংলা গ্রামার শিখে যেমন কথা বলা শিখেন নি, ঠিক সেভাবে ভাবুন। কথা বলার সময় ধীরে ধীরে বলুন। সময় নিয়ে।
স্পিকিং ইংলিশ শুরু করবেন খুবই ছোট ছোট বাক্য দিয়ে। এবং একই বাক্যের গঠণ দিয়ে অনেকগুলো বাক্য বানিয়ে চর্চা করবেন।
যেমন: I have to go (আমাকে যেতে হবে), I have to eat (আমাকে খেতে হবে), I have to read (আমাকে পড়তে হবে)—এভাবে আপনি চাইলে ১০-১৫ টা বাক্য তৈরি করতে পারবেন। শুধুমাত্র একটা শব্দ পরিবর্তন করে। এই চর্চাটা আয়ত্তে আসার পর, এই ছোট ছোট বাক্যগুলোকে একটু বড়ো করার চেষ্টা করতে পারেন।
যেমন: I have to go to the airport, I have to eat dinner, I have to read the newspaper. নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন যে একটা অতিরিক্ত শব্দ বাক্যের শেষে যোগ করায় বাক্যটা কেমন আরো অর্থবহ হয়ে উঠলো। পরিপূর্ণ হয়ে উঠলো।
এবং এই বাক্যগুলোকেও আরো অর্থবহ করতে পারবেন। যেমন, I have to go to airport to receive my brother, I have to eat dinner with my family, I have to read the newspaper before I eat breakfast. শুরু করলাম খুবই ছোট বাক্য দিয়ে। তারপর কতো বড়ো করা যাচ্ছে। এভাবে বাক্যকে ধীরে ধীরে বড়ো করার চেষ্টা করুন। বাক্যের বিবর্তন করেন।
এমন অনেক ট্রিক/টেকনিক ব্যবহার করে স্পিকিং ইংলিশে ভালো করা যায়। ধীরে ধীরে সেগুলো আলোচনা করবো।
বর্তমান সময়ে এসে, অনেক এপ আছে, যেগুলো ব্যবহার করে আপনি প্র্যাকটিস করতে পারবেন। কিছু কিছু এপ হয়তো সাবস্ক্রিপশন ফি লাগে। Hello Talk, ELSA Speak, BoldVoice ইত্যাদি। এসব এপ ব্যবহার করে স্প্যানিশ, চাইনিজ, জাপানিজ সহ অন্যান্য ভাষাতেও কথা বলা সম্ভব।
আমার মতে, এমাজনের ডিভাইস “এমাজন ইকো (আলেক্সা)” হলো কথা বলার জন্য দারুণ। প্রায় ৯ বছর আগে, এই ডিভাইস কিনেছিলাম। এমাজন তখন নতুন বের করলো। এখন তো অনেক আপডেটেড। দিনভর এই ডিভাইসের সাথে কথা বলা সম্ভব। মোটামুটি যে কোন টপিক নিয়ে, শেখাও যায়। সুতরাং কিছুটা ব্যায়বহুল হলেও, এই ডিভাইস কিনলে অন্যান্য অনেক কাজেই ব্যবহার করতে পারবেন।
২৬
অনেকে জানেই না, পাবলিকেশনের আগে কি কি করা উচিত। পাবলিকেশন করতে চাও খুব ভালো কথা। কিন্তু পাবলিকেশেনের ফাঁদে পা দিও না।
ইউনিভার্সিটিতে উঠেই পাবলিকেশনের নাম শুনে, দৌঁড়-ঝাপ শুরু করো না।
একটু সময় নিয়ে নিচের কয়েকটা বিষয় বিবেচনা করবে:
কি নিয়ে কাজ করতে হবে, সেটা জেনে নাও। সেই কাজ সম্পর্কে তোমার কি ধারণা আছে কিনা সেটা ভেবে দেখো। সেই কাজের বিষয়টা কি তুমি পছ্ন্দ করো কিনা সেটা ভাবো। কাজটার ভ্যালু বা ইমপ্যাক্ট আছে কিনা—সেটা বুঝতে হবে। যেটাকে নোভেলটিও বলা হয়।
যিনি কাজটা লিড করবেন, তার গবেষণার ব্যাকগ্রাউন্ডটা জেনে নাও। তার পাবলিকেশন রেকর্ড দেখো।
তোমার ফিল্ডে ভালো মানের কয়েকটি জার্নাল সম্পর্কে তুমি ইন্টারনেটেই ঘেঁটে নিতে পারো। জার্নালটি কোথা থেকে প্রকাশিত হয়। কতো পুরোনো। ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর কেমন। এডিটরিয়াল বোর্ডে কারা আছেন। এইসব বিষয়গুলো ঘাঁটলে একটা জার্নাল সম্পর্কে অনেক তথ্য বেরিয়ে আসে। এই ধারণাগুলো থাকা ভালো। প্রত্যেকটা ফিল্ডে প্রেডিটরি জার্নাল থাকে। ভুয়া জার্নাল থাকে। ভুয়া জার্নালে দশটা পাবলিকেশন করেও খুব বেশিদূর যাওয়া যায় না। অযথা সময় ও শক্তির অপচয় হয়। এগুলো খোঁজখবর নিতে হবে। পাবলিকেশনে অথরশিপ একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সে সম্পর্কে ধারণা নাও।
পাবলিকেশনটা কি রিসার্চ পাবলিকেশন নাকি রিভিউ পাবলিকেশন—সেটা জানতে হবে। রিসার্চ পাবলিকেশনের গুরুত্ব সবসময়ই রিভিউ আর্টকেলের চেয়ে বেশি। পাবলিকেশনের কথা শুনে, না বুঝে ব্যস্ত হয়ে পড়ার আগে—কিছু বিষয় যদি জেনে নাও, যাচাই-বাছাই করে নাও তাহলে নিজের সময়, অর্থ, শ্রম সব বাঁচবে। তুমি হয়ে উঠবে কোয়ালিটিফুল গবেষক। দিনশেষে, একজন মানসম্পন্ন গবেষক হওয়াই তোমার স্বপ্ন থাকতে হবে।
২৭
কারো ক্ষমতা দেখে ভড়কে যেও না। এই ক্ষমতা চিরস্থায়ী না।
কেউ যদি ক্ষমতা দেখায়, পাশ কাটিয়ে যাও। তুমি বেঁচে থাকতেই হয়তো দেখবে, সে তোমার কাছে সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়েছে।
গায়ের শক্তি দেখানো বহু মানুষকে দেখেছি, চল্লিশ পার না হতেই নিঃস্তেজ হয়ে গেছে। উঠে দাঁড়ানোর শক্তিটুকু হারিয়েছে। অথচ, যখন গায়ে শক্তি ছিলো, কাউকে রেসপেক্ট করেনি। এখন তাকে রেসপেক্ট করার জন্য কেউ নাই।
টাকার গরমে ধরাকে সরা মনে করা অনেককেই দেখেছি। সকালে আমির ছিলো, সন্ধ্যায় ফকির হয়ে গেছে। চোখের সামনে এমনও পরিবার দেখেছি, যারা হয়তো ঠিকমতো খেতে পায়নি, কিন্তু একসময় কোটি টাকার মালিক হয়েছে। আবার দেখেছি, বহু পরিবার সম্পদ হারিয়ে শূণ্য হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
কখনো কখনো দেখে ও শুনে, এড়িয়ে যাও। জবাব দিলেই সবসময় জয়ী হওয়া যায় না। শুনে হজম করতে পারলেই অনেক সময় জয়ী হওয়া যায়। পৃথিবীর প্রতিটা মানুষের একজন আপনজন থাকে। সেটা হলো নিজের আত্মা। আত্মার সাথে বন্ধুত্ব করো। কথা বলো। আড্ডা দাও। আনন্দ করো।
যে অন্যের পরিচয়ে নিজেকে শক্তিশালী করতে চায়—সে মূলত দুর্বল। তাকে এড়িয়ে যাও। তার কাছ থেকে কিছুই পাবে না। কারণ সে নিজেই নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেনি। আত্মপরিচয়ে বড়ো হও।
সবসময় কঠিন সময়ের জন্য নিজেকে তৈরি রাখো।
কৃতজ্ঞতা, বিনয়, রেসপেক্ট—এই তিন জিনিস ধারণ করলে মানুষ কঠিন সময়কেও সহজে পার করতে পারে।
২৮
তরুণদের জন্য কিছু অপ্রিয় সত্য কথা বলি। খুব মনোযোগ দিয়ে পড়বে। ভাববে।
তুমি যদি নিজেকে তৈরি করতে না পারো, তাহলে তুমি কোন কিছুই তৈরি করতে পারবে না। নিজেকে গড়তে হবে আগে।
নিজেকে গড়তে পারলে, তুমি পরিবারকে দিতে পারবে। সমাজকে দিতে পারবে।
রাস্তার ধারে পড়ে থাকা একটা পাথরকে কি কেউ পাত্তা দেয়? গুরুত্ব দিয়ে দেখে? —দেখে না।
অথচ, সেই পাথর দিয়ে যদি একজন শিল্পী ভাস্কর্য তৈরি করে, তাহলে মানুষ দেখতে যায়। সেটার সাথে ছবি তুলে।
নিজেকে গড়ো—এটা প্রধান কাজ।
নিজেকে গড়া মানে কি?
বই পড়া। শেখা। জানা। ভাবতে পারা। বিশ্লেষণ করতে শেখা। স্কিল অর্জন করা।
শেখা শুধু পরীক্ষার জন্য নয়। বা ডিগ্রির জন্য নয়। শেখাটা হলো নিজের জন্য। শেখার জন্য এখন কতো মাধ্যম আছে!
স্কিল অর্জন করো। সবাইকে যে অনেক উচ্চ ডিগ্রি নিতে হবে—তেমন নয়। তোমার যদি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া ভালো না লাগে, তাহলে স্কিল অর্জন করো। উদ্যোক্তা হতে শিখো। ছোট হোক, তবুও। উপার্জন করতে শেখো। যতো অল্পই হোক।
উপার্জন করতে শিখলে মানুষের ভিতর বোধ আসে। উপলব্ধি আসে। এই উপলব্ধি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
পৃথিবীতে যতোদিন আমরা বেঁচে থাকি, টাকা হলো সবচেয়ে নির্মম সত্য। টাকা ছাড়া একটা সাদা কাফনের কাপড়ও কেউ দেয় না।
তোমার যদি টাকা না থাকে, বিদ্যা না থাকে, স্কিল না থাকে—তোমাকে কেউ মূল্য দিবে না। তোমাকে বড়োজোর ব্যবহার করবে। তুমি হয় শরীরে, নয় মগজে—অন্যের দাস হয়ে থাকবে। আমাদের মতো দরিদ্র ও বিশৃঙ্খল সমাজ, তোমার পুরো দায়িত্ব নিবে না। গড়ার দায়িত্বও নিবে না। লালনের দায়িত্বও না। তোমাকেই আত্মউদ্যোগী হতে হবে। আমাদের মতো ভঙ্গুর ব্যবস্থাপনার সমাজ, যতোটা না মানুষকে গড়তে জানে, তারচেয়ে বেশি ধ্বংস করতে জানে। এটা মেনে নিয়েই আত্মলড়াই চালিয়ে যেতে হবে। সুতরাং নিজেকে গড়ো আগে। তারপর অন্যকিছু গড়তে যাও।
২৯
প্রতিষ্ঠানের গর্বে, মাটিতে আমাদের পা পড়ে না।
কে কোথায় পড়লাম—এমন প্রাতিষ্ঠানিক প্রাইড আমাদের মধ্যেই বেশি। আমি হলফ করে বলছি। দুনিয়ার কোথাও আমি এতোটা দেখিনি।
“প্রাতিষ্ঠানিক গর্ব” একটা বিষাক্ত জিনিস। বিশেষ করে, যখন আপনি এইটা ফলাইতে যাবেন। নিজের মধ্যে রাখেন, সমস্যা নাই। আর এই প্রাতিষ্ঠানিক গর্বটা আমরা নিজেদের মধ্যেই ফলাই।
অথচ বাংলাদেশের কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পৃথিবীর কোন তালিকায় নাই।
দেশের একটা বিশ্ববিদ্যালয়কে দুনিয়ার কেউ চিনে না। কেউ না। যে বনে বাঘ নাই, সে বনে শিয়ালই রাজা—আমাদেরও তাই দশা।
আমি ইউরোপে পিএইচডি করেছি। আমেরিকার আইভিলিগে পোস্টডক করেছি। দুইটা মহাদেশে, ১৬ বছর হলো গবেষণা ও চাকরি করছি। শিক্ষা ও গবেষণার মানের জন্য, বাংলাদেশের একটা বিশ্ববিদ্যালয়কে চিনে—এমন একজন শিক্ষক ও গবেষক বিদেশে পাইনি। আমার কথা বিশ্বাস না হলে, আপনার পরিচিত কাউকে জিজ্ঞেস করে দেখেন। অথচ, দেশের সেই সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে-মেয়েদের গর্বের ঠ্যালায়, আশপাশে থাকা যায় না।
আমার কলিগ আছে হাভার্ড থেকে পিএইচডি করা। কলিগ আছে ইউসি-বার্কলে থেকে পিএইচডি করা। আমার কলিগরা স্ক্রিপস রিসার্চ ইনস্টিটিউটে কাজ করেছে। নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানীর অধীন পিএইচডি করেছে। কিন্তু কাউকে কখনো ইনস্টিটিউশনাল প্রাইড ফলাইতে দেখিনি। ওরা আপনার কাজ, কনট্রিবিউশন, স্মার্টনেস (মেধা) কে ভ্যালু দিবে। প্রতিষ্ঠানের গর্ব ফলায় না।
দেশ সেরা মেডিক্যাল কলেজ থেকে, সুপার রেজাল্ট করে অনেকে আমেরিকায় আসে। কিন্তু ইউএসএমএলই (USMLE) পরীক্ষা পাশ করে রেসিডেন্সি পেতেই জান বের হয়ে গেছে। আমি নিজে দেখেছি। দায়িত্ব নিয়ে বলছি। আমাকে ক্ষমা করবেন, এভাবে সত্যটা বলার জন্য। বাস্তবতাটা বুঝানোর জন্য এভাবে বলেছি। অথচ, বিদেশেও তারা যখন দেশীয় কোন অনুষ্ঠানে জড়ো হয়, তখনও তাদের প্রাতিষ্ঠানিক গর্বের শেষ হয় না। দেশীয় মানুষগুলোর সাথে ফলাইতে থাকে।
আহমদ সফা এজন্যই বলেছিলেন, বড় বড় নামকরা স্কুলের বাচ্চারা বিদ্যার চাইতে অহংকারটাই বেশি শিখে।
আমার ধারণা, এই ইনস্টিটিউশনাল প্রাইড, দক্ষিণ এশিয়াতেই বেশি।
বাংলাদেশ সম্ভবত সেই “প্রাইড ইনস্টিটিউটের” হেড অফিস!
৩০
বাঙালী যে একটা বারুদ এবং সম্ভাবনার জাত, সেটা বুঝতে হলে আপনাকে প্রবাসী বাঙালীর দিকে তাকাতে হবে।
বাঙালীরা নিজ দেশে অনিয়ম করে। কিন্তু বিদেশে গেলে ভদ্র হয়ে যায়। এই প্রবাসী বাঙালীরা প্রতি মাসে মাসে রেমিট্যান্স পাঠানোর রেকর্ড করে। এটা প্রমাণ করে, তারা প্রবাসে কতো পরিশ্রম করে। কতো ত্যাগ স্বীকার করে। প্রবাসে থেকেও, একটা দেশকে আগলে রেখেছে।
যে বাঙালী উচ্চশিক্ষিত নয়, সেও আমেরিকায় এসে কয়েক বছর পর বাড়ি কিনে ফেলে। গাড়ি কিনে ফেলে। অথচ আমেরিকার বহু মানুষ একটা বাড়ি কিনতে হিমশিম খায়। কারণ বাঙালী সঞ্চয় বুঝে। মিতব্যায় বুঝে। বিদেশে আসলে অপচয় কম করে। —এগুলো তো জীবনের জন্য অপরিহার্য শিক্ষা।
বাঙালীদের বাড়ির আঙিনায় গিয়ে দেখবেন পুঁইশাক, কুমড়ো শাক, লাক শাক। হরেক রকমের সবজি। যেখানে দুই হাত জায়গা পায়, সেখানেই সোনা ফলানোর নেশা বাঙালীর মধ্যে দেখা যায়। যে ছেলেটা কখনো দেশে একটা গাছ লাগায়নি, তাকেও দেখেছি বিদেশে গিয়ে বাড়ির আঙিনায় সবজির বাগান করছে।
শুধু নর্থ আমেরিকা নয়। ইউরোপের দেশগুলোতে বাঙালীরা আবাদ করতে, বাগান করতে পছন্দ করে। ইউরোপের অনেক দেশে বাংলাদেশীরাই বহুজাতের সবজির আবাদ সূচনা করেছে। বানিজ্যিকভাবে উৎপাদন করছে। মধ্যপ্রাচ্যে কৃষির পেছনে বাংলাদেশীদের অবদান অনেক। সাউথ আফ্রিকা ও আফ্রিকার অনেক দেশে বাঙালীরা নতুন নতুন সবজির প্রচলন দেখিয়েছে।
যে ছেলে কিংবা মেয়েটা দেশে একটা ভালো চাকরি পায়নি, সেও দেখবেন ইউরোপ-আমেরিকার বড়ো বড়ো ল্যাবে পিএইচডি করছে। পোস্টডক করছে। কারণ বঞ্চনার শিকার হয়েছে দেশে। আমেরিকার এমন কোন বিশ্ববিদ্যালয় নেই, যেখানে এক-দুইজন বাংলাদেশি পাওয়া যাবে না।
এগুলো প্রমাণ করে, একটা উপযুক্ত পরিবেশে, বাংলাদেশের এই মানুষগুলো কিভাবে বারুদ হয়ে উঠতে পারে। এই মানুষগুলোকেই যদি আপনি দেশে একটা সঠিক ব্যবস্থাপনা দিতে পরেন—দেশকে তারা কোথায় নিবে, ভাবতে পারেন?
দেশের বড়ো ফোকাস হলো, ব্যবস্থাপনা মেরামত করা। সিস্টেম বদলে দেয়া। যাতে মানুষ তার মেধা ও শ্রমের তীব্র প্রতিযোগিতায় সমাজকে বদলে দিতে পারে। জানি না এই বোধ ও উপলব্ধিটুকু আমাদের হবে কিনা!
৩১
সোমালিয়ায় জন্ম নেয়া আর জাপানে জন্ম নেয়া এক না।
আমরা পড়েছিলাম, জন্ম হোক যথা তথা, কর্ম হোক ভালো। কথাটা ইউনিভার্সাল ট্রুথ না।
জন্ম যথা তথা হলে, কর্ম ভালো করার সুযোগও অনেক সময় থাকে না। কর্ম ভালো করলেও তেমন লাভ হয় না। দশ কদম আগালে, বারো কদম পিছিয়ে পড়তে হয়।
সুইডেনে যদি আপনি চাকরি হারান, তাহলে আপনার সর্বেশষ বেতনের প্রায় ৮০% বেকার ভাতা পাবেন। প্রায় ৯ মাস ধরে এই হারে পাবেন। পাশাপাশি আপনাকে চাকরি খুঁজে দিতে ওরা সাহায্য করবে। (বেকার ভাতা আরো বেশিদিন দেয় ওরা)
সোমালিয়াতে আপনি বেকার হলে এই সুযোগ পাবেন? পাবেন না।
ফিনল্যান্ডের একটা বাচ্চা সম্পূর্ণ ফ্রি পড়াশুনা করে। এবং পৃথিবীর একটা সেরা শিক্ষা ব্যবস্থা ওরা দেয়।
আপনার পেশা কি, আপনার ইনকাম কতো, সেটার উপর আপনার বাচ্চার পড়াশুনার মান ভিন্ন হবে না। আপনি ড্রাইভার হলেও আপনার বাচ্চা যে স্কুলে যেতে পারবে, আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হলেও তাই হবে।
জন্ম যথা তথা হলে, ভালো বন্ধু-বান্ধব ও সঙ্গই তো পাওয়া যায় না। ভালো বন্ধু-বান্ধব আপনার জীবনকে ধাক্কা দেয়। ড্রাইভ করে। বস্তিতে জন্ম নেয়া শিশুটা তো ইংলিশ মিডিয়ামের পড়া একটা বাচ্চার সাথে মিশতেই পারে না!
ডেনমার্কে জন্ম নেয়া মানুষটা উচ্চতর শিক্ষা না নিয়েও, একটা ভালো জীবন পার করতে পারে। কিন্তু ভারতের একটা মানুষ শৈশব থেকে যৌবন পর্যন্ত শুধু পরীক্ষা আর রোল নম্বরের পেছনে দৌঁড়েও একটা ভালো চাকরি পেতে কষ্ট হয়। একসময় স্ত্রী, সন্তান নিয়ে জীবন চালাতে হিমশিম খায়।
জন্ম হোক যথা তথা—কথাটা পুরো সত্য না। জন্ম যথা তথা হলে জীবনে অনেক ধকল, অনেক দুর্ভাগ্য, অনেক পিছিয়ে পড়ার সম্ভাবনা অপেক্ষা করে।
হুম, এটা সত্য যে জন্মের উপর আমাদের কারো হাত নেই। তাই আমাদের কাজ হলো কর্ম করে যাওয়া—যেটার উপর আমাদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আছে, কম-বেশি।
৩২
শেখো। যেখান থেকে পারো, শেখো। বই পড়ে। আড্ডায়। গল্পে। মুভি দেখে। ক্লাস রুমে। ভ্রমণে। প্রকৃতির তুমুল আলোড়নে। পরিবার থেকে। স্বজন থেকে। জীবনের শেখা শুধু চাকরির জন্য নয়। জীবনের শেখা শুধু টাকার জন্য নয়। জীবনের শেখা হলো জীবনকে উপভোগের জন্য। জীবনকে ড্রাইভ করার জন্য। তোমার জীবন একটা যাত্রা। এবং তুমি সেটার ড্রাইভার। তোমাকে শিখতে হবে। সেই শিক্ষা তোমার চোখ-কান খোলা রাখবে। তুমি তোমার জীবনকে যেনো ঠিকভাবে ড্রাইভ করতে পারো।
তুমি শুধু বড়ো বড়ো ডিগ্রী নিলেই হবে না। পৃথিবীর সেরা সেরা ইউনিভার্সিটিতে পড়লেই শুধু হবে না। তোমাকে শিখতে হবে, কি করে মানুষের সাথে চলতে হয়। তোমাকে শিখতে হবে সহনশীলতা। তোমাকে শিখতে হবে ভিন্ন সংস্কৃতি মেনে নেয়ার শিক্ষা। তোমাকে শিখতে হবে কি করে পারিবারিক বন্ধনকে আগলে রাখতে হয়। তোমাকে শিখতে হবে কি করে সন্তান বড়ো করতে হয়। তোমাকে শিখতে হবে কি করে মানবিক হতে হয়।
শুধু বড়ো চাকরি করলেই হবে না। তোমাকে শিখতে হবে কি করে সৃষ্টি করতে হয়। তোমাকে শিখতে হবে কী করে জীবনের আনন্দকে উপভোগ করতে হয়। তোমাকে শিখতে হবে কি করে জীবনকে আগলে রাখতে হয়। তোমাকে শিখতে হবে কি করে দুঃসময়ে শক্ত থাকতে হয়। তোমাকে শিখতে হবে কি করে যন্ত্রণাকে হজম করতে হয়।
শেখা শুধু ডিগ্রির জন্য নয়। সার্টিফিকেটের জন্য নয়। শেখা শুধু অর্থের জন্য নয়। শেখা শুধু বাড়ি-গাড়ি কেনার জন্য নয়। পাশের বাড়ির ছেলে-মেয়েকে জানানোর জন্য নয়। জীবনের অনেক বড়ো বড়ো শিক্ষাগুলো তুমি বইয়ে পাবে না। স্কুল-কলেজে তোমাকে শেখানো হবে না। কিন্তু জীবন তোমাকে শেখাবে। সে শিক্ষা নেয়ার জন্য তোমাকে প্রস্তুত থাকতে হবে। শেখা হলো আনন্দের জন্য। শেখা হলো জীবনের জন্য। শেখা হলো জীবনকে চালিয়ে নেয়ার জন্য। জীবনের এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার জন্য।
৩৪
বাংলাদেশ গরিব ছিলো না। পূর্ব বাংলা কিংবা সমগ্র বাংলা, কখনো গরিব ছিলো না।
সাতশ বছর আগে ইবনে বতুতা এই বাংলায় এসেছিলেন। দেখেছেন সম্পদে ভরা এক রাজ্য। তার লেখা থেকে পাওয়া যায়—তখন এক মন ধানের দাম ছিলো তিন পয়সা। এক মন চালের দাম ছিলো এগারো পয়সা। এক মন চিনি পাওয়া যেতো দেড় পয়সায়।
এই অঞ্চলে তখন যে পরিমান ধান-গম-চিনি-তেল-রেশম হতো, ইউরোপ-আমেরিকায়ও তত পণ্য হতো না। তখন খাদ্যে যারা ধনী ছিলো, তারাই ধনী।
সতের শতকে, শায়েস্তা খাঁ’র আমলের কথাই বলি। টাকায় আট মন চাল পাওয়া যেতো। ইবনে বতুতার দেয়া হিসেব, প্রায় চারশ বছরেও তেমন পরিবর্তিত হয়নি। চারশ বছরে মুদ্রাস্ফিতি বা ইনফ্লেইশন হয়নি! —ভাবা যায়!
শের শাহ ছিলেন সেনাপতি। তার শাসনামলে তিনি কোন যুদ্ধে পরাজিত হননি। ভারতবর্ষের সম্রাট শের শাহ’কে “উস্তাদ-ই-বাদশানা” বা রাজার শিক্ষক বলে উপাধি দিয়েছিলেন। শের শাহ’র শ্রেষ্ঠ কাজ ছিলো, চট্টগ্রাম পর্যন্ত গ্রেন্ড ট্যাংক রোড বর্ধিত করা। পাঁচশ বছর আগে এই বাংলায় হাইওয়ে করেছিলেন, এই শের শাহ! অথচ, আমেরিকার প্রথম হাইওয়ে হয়েছে দুইশ বছর আগে। ১৮১১-১৮৩৪ সালে।
একসময় আসলো বৃটিশ। লুটপাট করলো ইচ্ছে মতো। যে মসলিন, ইউরোপের বাজারে শত শত পাউন্ডে বিক্রি হতো, সেই মসলিন পর্যন্ত আমরা হারালাম। আমাদের কাছ থেকে নীল নিয়ে বৃটিশরা কাপড় রাঙিয়ে সারা দুনিয়ায় বিক্রি করলো। মসলা গেলো। চীনের সাথে বৃটিশদের বাণিজ্য ঘাটতি দেখা গেলে, বৃটিশরা এতদ অঞ্চলে চা চাষ করতে লাগলো। আর চাইনিজদেরকে দিলো আফিম ঢুকিয়ে!
বৃটিশ লুটপাট করে যাওয়ার পরও বাংলার অবস্থা খারাপ থাকতো না। যদি আমরা নিজেরাই নিজেদের সাথে চুরি আর লুট-পাট না করতাম।
দুঃখের বিষয় হলো, এই লুট-পাট করছে সার্টিফিকেটধারীরা। লুট-পাট করছে নামধারী শিক্ষিতরা। লুট-পাট করছে মানুষের সাথে ওয়াদাবদ্ধ হয়ে চেয়ারে বসা লোকগুলো। যে শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা শিক্ষিতদের চোর বানায়—সেটার রিফর্মেশন ছাড়া মুক্তি অসম্ভব! আর এই পরিবর্তনই আসবে নতুন দিনের রাজনীতিতে।
সবাইকে সেভাবেই প্রস্তুতি নিতে হবে।
৩৫
১২০ বছর আগে, খাজা সলিমুল্লাহ ১ লক্ষ ১২ হাজার টাকা দান করেছিলেন বুয়েটের (BUET) জন্য। তখন সেটার নাম বুয়েট ছিলো না। ছিলো ঢাকা সার্ভে স্কুল। সেটাকে তিনি রূপ দিলেন আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলে। (খাজা সলিমুল্লাহার বাবার নাম ছিলো আহসানউল্লাহ)
আজ থেকে ১২০ বছর আগে, ১ টাকার মূল্য কতো ছিলো ভাবতে পারেন? —আজকের দিনের আনুমানিক কয়েকশ টাকা।
১৯০৮ সালে, পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক সভায়, বিনা বেতনে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার দাবি তুলেন তিনি। —চিন্তা করা যায়!
পূর্ব বাংলায় কোন ইউনিভার্সিটি নেই। সলিমুল্লাহ সেটা মানতে পারলেন না। কি করা যায়, সে নিয়ে ভাবতে থাকলেন। ১৯১২ সালের ২৯ জানুয়ারি, তখনকার ভাইস রয় লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকায় আসেন। হার্ডিঞ্জের সামনে দাবি নিয়ে দাঁড়ানোর মতো সাহস পূর্ব বাংলায় যদি কারো থাকে, সেটা একমাত্র সলিমুল্লাহর। তার বয়স তখন চল্লিশ বছর।
সে সময়ের ১৯ জন প্রখ্যাত মুসলিম লিডার নিয়ে তিনি হার্ডিঞ্জের সাথে দেখা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি তুলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অন্যতম অগ্রদূত তিনি। সলিমুল্লাহ ছিলেন আদ্যোপান্ত শিক্ষানুরাগী। পূর্ব বাংলায় শিক্ষার বিস্তারের জন্য তিনি বহু বৃত্তি, বহু প্রকল্প চালু করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা এবং ঢাকা সার্ভে স্কুলকে আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলে রূপ দেয়া ছিলো তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান।
পূর্ব বাংলার মুসলমানদের শিক্ষা নিয়ে তিনি খুব ভাবতেন। তিনি বুঝেছিলেন, শিক্ষা ছাড়া পৃথিবীতে দাঁড়ানোর কোন সুযোগ নাই। নবাব সলিমুল্লাহ’র এই বিষয়টা আমাকে সবসময় অনুপ্রাণিত করে। উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা ও আবিষ্কার-উদ্ভাবনের শক্ত চর্চা না থাকলে—বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশের কোন মুক্তি নাই।
শিক্ষাকে যদি জাতির মেরুদণ্ড বলা হয়, তাহলে পূর্ব বাংলার সেই মেরুদণ্ড তৈরিতে সলিমুল্লাহর চেয়ে বড়ো ভূমিকা সম্ভবত বিংশ শতকে খুব বেশি কেউ রাখেনি। মাত্র ৪৪ বছর বয়সে তিনি মারা যান। আরো কিছুদিন বেঁচে থাকলে হয়তো পূর্ব বাংলার শিক্ষার জন্য আরো বহুকিছু করে যেতেন।
৩৬
পৃথিবীটা ফেয়ার না। দুনিয়াটা মোটেও সবার জন্য সমান না। তাই সবার যুদ্ধটাও এক না।
আমার যে কলিগ ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া-বার্কলে থেকে পিএইচডি করা, তার জন্ম আমেরিকায়। তাকে ইংরেজি শিখতে হয়নি।
কিন্তু আমাকে ইংরেজি শিখতে হয়েছে। বহু বছর ইংরেজি শিখেছি। তারপরও আমি তার মতো করে ইংরেজি বলতে পারবো না। ইংরেজি শেখার জন্য আমি যে সময় ব্যায় করেছি, সে সেই সময়ে ভিডিও গেইম খেলতে পেরেছে। পার্টি করতে পেরেছে। অন্যকিছু শিখতে পেরেছে।
সে ব্যাচেলর করেছে ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ি-আরবানা শ্যাম্পেইন (UIUC) থেকে। পৃথিবীর নামকরা এক ইউনিভার্সিটি। আমি ব্যাচেলর করেছি চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটি থেকে। যেটা কোন তালিকাতেই নেই। ও যদি ওর ব্যাচের সবচেয়ে খারাপ স্টুডেন্টও হয়ে থাকে, তারপরও সে ইউনিভার্সিটিতে যেমন পরিবেশ, সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষার মান, ল্যাবরেটরি ইত্যাদি পেয়েছে—সেগুলো আমার জন্য কল্পনা করাও ছিলো পাপ! যে বয়সে সে ইন্টারনেট, ল্যাপটপ পেয়েছে, সে বয়সে আমি বসে বসে মেসের মিলের হিসেব করতাম। মেস ভাড়া দেয়ার টেনশন করতাম। কিছু টাকার জন্য টিউশনির নামে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতাম।
ও যদি আমেরিকার সবচেয়ে খারাপ মানের হাইস্কুলেও পড়ে, তারপরও সেটা আমার গ্রামের হাইস্কুল থেকে অবকাঠামোগত ও অন্যান্য দিক দিয়ে বহু গুণে ভালো মানের ছিলো। ও নিশ্চয় ওর বাবার গাড়িতে করে স্কুলে গিয়েছে (আমেরিকায় অলমোস্ট সব পরিবারেই গাড়ি আছে)। অথবা, হলুদ রঙের স্কুল বাসে নিরাপদে যাতায়ত করেছে। আমার স্কুলের ঠিকমতো একটা ভবনই ছিলো না। আমরা খালি পায়ে যেতাম। সহপাঠীরা অনেকে লুঙ্গি পড়ে আসতো। সে সময় স্কুল ড্রেসও ছিলো না (এখন হয়েছে)।
আমরা হয়তো একই অফিসে, একই পদে, একই সাথে কাজ করি এখন। কিন্তু আমাদের যুদ্ধটা ছিলো আলাদা। পথটা ছিলো ভিন্ন।
আমাকে যতো প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, আমার কলিগকে সেগুলোর মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি। সে তার দেশে, তার সংস্কৃতিতে যতোটা সহজে একটা চাকরি পেয়েছে, একটা বাড়ি কিনেছে, একটা গাড়ি কিনেছে—সেই প্রতিটি কাজ করতে আমাকে অনেক আলাদা করে যুদ্ধ করতে হয়েছে। সুতরাং পৃথিবীটা আনফেয়ার—এটাই চিরন্তন। এবং এ নিয়ে হাপিত্যেশ করে কোন লাভ নেই।
সোমালিয়ায় জন্ম নেয়া একটা শিশু জীবনযুদ্ধে যতোটা অসাম্যতার মুখে পড়বে, পদে পদে যতোটা ধাক্কা খেয়ে জীবনকে বহন করবে, ঠিক একই শিশু যদি ইউরোপে বড়ো হয়—তাকে ততোটা যুদ্ধ করে বাড়তে হবে না।
পৃথিবীর বহু সমাজ মানুষকে গড়ে, আর বহু সমাজের মানুষ জঞ্জালকে সরিয়ে বেড়ে উঠে। দুনিয়ার বহু সমাজ মানুষকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে সামনে বাড়িয়ে দেয়। আর বহু সমাজের মানুষকে একের পর এক বাধা ধাক্কিয়ে সামনে বেড়ে যেতে হয়।
এই আনফেয়ার পৃথিবীতে আমরা প্রত্যেকে একটা যোদ্ধা। এখানে সর্বসত্য হলো যুদ্ধ! ততক্ষন, যতক্ষন আমাদের নিঃশ্বাস আছে।
৩৭
ইউনিভার্সিটিতে পড়ালেখাটা ঠিকমতো করো। ভাষা শিখো। আইএলটিএস দাও। জিআরই দাও।
সুযোগ হলে বিভিন্ন প্রজেক্টে কাজ করো।
দক্ষিণ কোরিয়া যাও। চীন, জাপান, মালয়শিয়াতে যাও। ইউরোপের অনেক দেশ এখনো টিউশন ফি ছাড়াই ডিগ্রি দেয়। সেখানে যাও।
নর্থ আমেরিকা আছে। লেগে থাকলে কোন না কোন দেশে যেতেই পারবে।
দেশ ছাড়লে আর কোন প্রশ্ন ফাঁস থাকবে না। ঘুষ দিয়ে চাকরি নিতে হবে না। কারো পদলেহন করতে হবে না। কোন চেতনা বিক্রি করতে হবে না।
জীবনের কিছু গ্লানি থেকে অন্তত মুক্তি পাবে।
নিজেকে গড়তে পারলে দেশকেও গড়ার চেষ্টা করতে পারবে। নিজেকে গড়তে না পারলে, দুই পয়সার মূল্য বাংলাদেশে পাবে না।
ক্ষমতা না থাকলে আর চেতনা বিক্রি করতে না পারলে, বাংলাদেশের মতো সমাজে “অর্জুন গাছ” হলেও, শুধু লাঞ্ছনাই ভাগ্যে জুটবে।
৩৮
চীনে ছাত্ররাজনীতি নাই। চীনের ছেলে-মেয়েরা দুনিয়া দখল করে নিচ্ছে। আমেরিকা-জাপান, জার্মানী কিংবা কানাডায়—চীনের ছেলে-মেয়েদের জয়জয়কার।
দুনিয়ার এমন কোন সেরা বিশ্ববিদ্যালয় নেই যেখানে তারা নাই। সারা পৃথিবীতে তারা এখন টপার। এমন গবেষণা প্রতিষ্ঠান দুনিয়াতে খুব কম যেখানে চীনের ছেলে-মেয়েদের প্রভাব নাই। ছাত্রদের যেটা কাজ, যেটা দায়িত্ব, ওরা সেটাই করছে। অন্যকিছু করে সময় নষ্ট করলে নিজে যেমন বিশ্বদৌঁড়ে পিছিয়ে যেতো, তেমনি ওদের দেশও পিছিয়ে পড়তো।
ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন দলীয় দাসত্বের ছাত্ররাজনীতি নাই। আমেরিকায় নাই। কানাডায় নাই। জাপানে নাই। দক্ষিণ কোরিয়া নাই। সিঙ্গাপুরে নাই।
ওরা চাঁদে যাচ্ছে। মঙ্গলে যাচ্ছে। ওরা পৃথিবীর সকল মহামারিতে ওষুধ, ভ্যকসিন নিয়ে হাজির হচ্ছে। প্রযুক্তি নিয়ে হাজির হচ্ছে।
কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি করছে। বুলেট ট্রেইন তৈরি করেছে। কি না করছে!
কিন্তু ছাত্ররাজনীতি লাগবে বাংলাদেশে। দলের দাস হয়ে থাকতে হবে। নেতার পাছার পেছনে স্লোগান দিতে হবে। ক্যাম্পাসে মারামারি হবে। ছাত্র খুন হবে। হল থেকে অস্ত্র পাওয়া যাবে। ছাত্ররা রাজনীতি করবে—নেতা হবে। শিক্ষকরা রাজনীতি করবে—নেতা হবে।
ফলে আমরা ৫৩ বছরে কি চুলটা ছিঁড়েছি? —আমাদের দৌঁড় হলো মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমিক হওয়া পর্যন্ত!
গ্লোবাল ইনোভেটিভ কালচারে আমাদের অবদান শূণ্য! দুনিয়ার তালিকা তো বহু দূর, দক্ষিণ এশিয়ার তালিকাতেই দেশের একটা পাবলিক ইউনিভার্সিটি শীর্ষে থাকতে পারে না। আর যেসব স্টুডেন্টদের সামর্থ্য থাকবে কিংবা যোগ্যতা থাকবে—তারা দেশ ছাড়বে, আর ফিরবে না।
যে জাতি সময় থাকতে, চোখ খুলে অন্যের কাছ থেকে শিখে না, তাকে শেখানো কঠিন!
অন্যজাতির দাস হওয়া কিংবা মাইর খাওয়া ছাড়া এমনসব জাতির বিকল্প পথ থাকে না।
৩৯
তরুণদের উচিত চাইনিজ, জাপানিজ ও কোরিয়ান ভাষা শেখার প্রতি আগ্রহ তৈরি করা। কারন চীন, কোরিয়া, জাপান হলো এশিয়ার সুপার পাওয়ার। এই সব ভাষা শিখলে, ক্যারিয়ারে অনেক সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জ্ঞান-গবেষণার জন্য যে শুধু ইংরেজি ভাষার দেশেই যেতে হবে—এমন চিন্তা পাল্টানোর সময় এসেছে। চীন যেহেতু গবেষণায় বিপ্লব ঘটাচ্ছে, সারা দুনিয়ার তরুণরাই সেদেশে যাচ্ছে। চীনে কয়েক লক্ষ আন্তর্জাতিক স্টুডেন্ট আছে। ভারত-পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রচুর স্টুডেন্ট সেখানে কাজ করে।
কোরিয়ার গবেষণার মান ইউরোপের বহু দেশকে ছাড়িয়ে গেছে। গবেষণার অনেক ক্ষেত্রে কোরিয়া ছাড়িয়ে গেছে আমেরিকাকেও।
আমি খুব আনন্দিত হই, যখন দেখি দেশের অনেক স্টুডেন্ট এখন ব্যাচেলর শেষ করেই কোরিয়া, চীন চলে যাচ্ছে। সেখানে নতুন নতুন সুযোগ লুফে নিচ্ছে।
সেসব দেশের ইউনিভার্সিটিগুলো এখন বিশ্বসেরা। আমার চাইনিজ কলিগরা বলতো, চীনের যেসব স্টুডেন্ট সেদেশের প্রথম সারির ইউনিভার্সিটিতে চান্স পায় না, তারা আমেরিকায় চলে যায়। পিকিং, সিংহোয়া, জেইজিয়াং ইউনিভার্সিটি—এমন সব প্রতিষ্ঠানে চান্স পাওয়া নাকি ভয়াবহ রকমের কঠিন। তুমুল প্রতিযোগিতা।
চীন-জাপান-কোরিয়া-সিঙ্গাপুর-মালয়শিয়া, এই দেশগুলো পূর্বএশিয়াতে শক্তিশালী। জ্ঞান-বিজ্ঞানে তারা বিপ্লব ঘটাচ্ছে। তাদের কাছ থেকে আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান ধার করতেই হবে। তাদের কাছ থেকে শিখতেই হবে। যে কোন সুযোগ লুফে নেয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হবে।
ভাষা শিখলে সেসব সুযোগ লুফে নেয়া আরো সহজ হয়ে যাবে।
৪০
চীন-ভারতের ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে বাংলাদেশ ভরে যাবে। চীন-ভারতের লোকজন বাংলাদেশের কর্পোরেট জব করে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাবে।
এটাই তো হওয়ার কথা। এটাই স্বাভাবিক।
ভারতের কোন আইআইটি থেকে কি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়? চীনের কোন ইউনিভার্সিটি থেকে কি রামদা উদ্ধার হয়?
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অস্ত্র উদ্ধার হয়। আফ্রিকার কোন দেশেও এমন নিউজ পাবেন না।
ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করে স্টুডেন্টরা ইউরোপ-আমেরিকার বাঘা বাঘা ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে পোস্টডক করতে পারে।
এটা প্রমাণ করে ওদের দেশের গবেষণা এখন বিশ্বের একটা স্ট্যান্ডার্ডে চলে গেছে।
আমাদের দেশের বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই এখনো সেই স্ট্যান্ডার্ডে পৌঁছুতে পারে নি। অন্য পাবলিক ইউনিভার্সিটির কথা নাই বললাম।
কেন পারে নি? —এর উত্তর আমরা সবাই জানি। কিন্তু সমাধান করবো না। মুখ খুলে নিজেদের দুর্বলতাগুলো মেনে নিয়ে সবাই মিলে আওয়াজ তুলবো না। আমাদের মানসিকতা হলো—যেভাবে চলছে চলুক না। বরং যারা দূরদর্শী চিন্তা করবে, এগুলো নিয়ে কথা বলবে, তাদেরকে চুপ রাখা গেলে আরো ভালো।
৪১
চীন আমেরিকাকে কিভাবে জবাব দেয়?
আমেরিকার “ফেইসবুক” চীন ব্যবহার করে না। চীন সেটাকে ব্যান করে রেখেছে। তবে বিকল্প একটা তৈরি করেছে।
আমেরিকার গুগল ওরা ব্যবহার করে না। গুগল ম্যাপ ব্যবহার করে না। চীন নিজেরাই বিকল্প এপ তৈরি করেছে—বাইডু! WeChat নামক জনপ্রিয় এক এপ দিয়ে চীনের মানুষ বহু কাজ করে ফেলে।
আমেরিকান পণ্য ব্যবহার করে, আমেরিকার অর্থনীতিকে শক্ত করতে চীন রাজি না। কিন্তু চীনের পণ্য সারা পৃথিবীতে ওরা ছড়িয়ে দিবে। পণ্য আর মানুষ—এই দুই জিনিস চীন সারা দুনিয়াতে দিয়ে দিয়েছে।
এদিকে চীন, আমেরিকা থেকে প্রফেসর নিয়ে যায়। নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানীকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে নিয়ে যায়। আর সারা দুনিয়া থেকে ছেঁকে ছেঁকে নিয়ে যায় চাইনিজ ব্রিলিয়ান্টদের। এই ছাঁকা পরীক্ষায় যারা ঢুকতে পারে না, তারা অন্য দেশে পড়ে থাকলেও, চীন সেটা নিয়ে মাথাও ঘামায় না। You stand with the best, you get into the best! এটাই হলো ওদের প্রিন্সিপাল।
যে জাপানর সাথে তাদের রাজনৈতিক চির শত্রুতা, সেই জাপানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্যন্ত, চীনের ছেলে-মেয়েরা ভরা।
অথচ বাংলাদেশের কয়েক লক্ষ রোগী প্রতিবছর শুধু বিদেশে যায় চিকিৎসা নিতে। দেশের টাকা ঢেলে দেয় বিদেশে গিয়ে। দেশে সে মানের চিকিৎসা সেবা পায় না বলে অভিযোগ-আক্ষেপ। দেশের পয়সাওয়ালারা ছেলে-মেয়েদেরকে টাকা দিয়ে বিদেশে পড়ায়। অথচ ৫৩ বছরেও একটা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বমানের হয়ে উঠে না।
রাজনীতিবিদরা, চাকরিজীবিরা দুর্নীতি করে বাড়ি কিনে বিদেশে। শিল্পপতিরা শ্রমিকদের বেতন বাড়াতে চায় না, কিন্তু কানাডা, সিঙ্গাপুর টাকা জমায়। রাজনীতিবিদরা লুট-পাট করে ক্ষমতা শেষ হলে বিদেশে বসে দেশ নিয়ে চক্রান্ত করে। মিথ্যা ছড়ায়।
দেশের বহু ব্রিলিয়ান্ট ছেলে-মেয়ে দেশ ছাড়ে। দেশে ফিরতে পারে না। ফেরার পথগুলো সব বন্ধ করে রাখা হয়েছে যতোসব পুরোনো নিয়ম-নীতি দিয়ে।
কিন্তু আমেরিকার ফেইসবুক, ইউটিউব ব্যবহার করে, আমেরিকার অর্থনীতিকে শক্ত করছি আমরা। জাপানের গাড়ি কিনছি। ভারতের ডাক্তারদের ধনী করছি। চীনের ইঞ্জিনিয়ারদের পয়সা দিচ্ছি। আমাদের কর্পোরেট চাকরি করছে চীন-ভারত-শ্রীলংকার লোকজন। এদিকে ভূ-মধ্যসাগরে আমাদের তরুণরা নৌকাডুবিতে মরে।
আমরা তো সবদিকে শুধু হারাই। পাই কি? আমাদের দরকার এমন পরিকল্পনা ও নীতি, যেখানে দেশটা সবদিক দিয়ে গেইন করবে বেশি। লুজ করবে কম। দাঁড়াতে হলে নেট গেইন বাড়াতে হবে—সর্বক্ষেত্রে। সেভাবেই দিতে হবে বিশ্বকে জবাব!
৪২
জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো থামতে শিখা। —How to stop? —When to stop? আত্মনিয়ন্ত্রণ। আত্মনিয়ন্ত্রণ করতে শিখলে জীবন হয় গৌরবের। আপনি খাচ্ছেন। কিন্তু বুঝতে হবে কখন থামবেন। তা না হলে সমস্যা। যে খাবার আপনাকে বাঁচিয়ে রাখে, সে খাবার আপনাকে মেরেও ফেলবে। খাবার যেমন রোগ মুক্তি দেয়, খাবার তেমনি রোগেরও কারণ। কি খাবো, কতটুকু খাবো—সেটার জন্য চাই নিয়ন্ত্রণ।
বিশ্রাম জীবনের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু শিখতে হবে কতটুকু বিশ্রাম করবেন। শিখতে হবে কখন বিশ্রাম থেকে বিরতি নিতে হবে। সেটা না জানলে, আলস্য ভর করবে। আলস্য জীবন ধ্বংস করে। টিভি দেখবো, ফোন দেখবো। বিনোদন প্রয়োজন। কিন্তু কখন বন্ধ করতে হবে, সেটা শিখতে হবে। তা না হলে, কাজের ক্ষতি হবে। কাজের ক্ষতি হওয়ার অর্থ জীবন ক্ষতি হওয়া।
ক্রোধ ছাড়া মানুষ হয় না। রাগ ছাড়া মানুষ হয় না। তবে সেই মহান, যে ক্রোধের দমন করে। ক্রোধের দমন ছাড়া ভালো মানুষ হওয়া, বড়ো মানুষ হওয়া অসম্ভব। কথা বলা জরুরি। ভাব প্রকাশের জন্য কথা বলতেই হবে। তবে শিখতে হবে কখন থামতে হবে। কথা মুখ থেকে বের হয়ে গেলে আর ফিরিয়ে নেয়া যায় না। ভাষার অপব্যবহার মানুষের ইমেইজকে ধ্বংস করে।
ভালো ড্রাইভার কাকে বলে? —যে হাই স্পিডে গাড়ি চালাতে পারে, সে কিন্তু ভালো ড্রাইভার না। ভালো ড্রাইভার হলো, যে গাড়ি চালানোর সময় আত্মনিয়ন্ত্রণ রাখে। যে বুঝে কখন থামতে হবে। কিভাবে থামতে হবে। যে সাইন দেখে, পরিবেশ পরিস্থিতি বুঝে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে—সেই ভালো চালক। জীবনের বেলাতেও তাই। আত্মনিয়ন্ত্রের জন্য চাই চর্চা। চাই শিক্ষা। চাই সান্নিধ্য। জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই শিক্ষা কিন্তু স্কুল-কলেজের সব বইয়ে থাকে না। অথচ শিখতে হয়।
৪৩
মানুষ তার জীবনকে শুধু স্যাটেল করতে চায়। দিন-রাত শুধু স্যাটেল হওয়ার একটা যুদ্ধ।
সমাজ তাকে স্যাটেল হওয়ার একটা ডেফিনেশন শিখিয়েছে। হাতে দিয়েছে একটা ছঁক।
জিপিএ। ডিগ্রি। চাকরি। বিয়ে। বাচ্চা। বাড়ী। গাড়ি। বিত্ত আর সুখের প্রদর্শনী।
চওড়া মূল্যের আনন্দ ও প্রশান্তি বেঁচে, মানুষ কম দামের স্যাটেলম্যান্ট কিনছে কতো। তৈরি করছে নিজের টর্চার সেল।
মানুষের জীবনের নেই সেকেন্ডের ভরসা। সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস—জীবনের উপর নেই আমাদের কোন নিয়ন্ত্রণ!
অথচ প্রাণীদের মধ্যে মানুষই স্যাটেল হতে গিয়ে মরছে উচ্চ রক্তচাপে। ইনসমনিয়ায়। মানসিক রোগে। নিঃসঙ্গতায়। আত্মহননে।
স্যাটেল হতে হতে আমরা ভুলে যাই মানবিক হওয়ার কথা। ভুলে যাই মায়ার মোহ। আবেগের সামান্য পাওয়া।
হারিয়ে ফেলি খিল খিল করে হেসে ফেলার আত্মবিশ্বাস।
স্যাটেল হতে গিয়ে মানুষ শুধু খুঁজে পায় অপূর্ণতা। —বাড়ী নেই। গাড়ি নেই। ব্যাংকে টাকা নেই। পার্টি নেই। চ্যানেল নেই। ভিউ নেই। ভুঁড়িহীন শরীর নেই। দিন-রাত শুধু নেই। অপূর্ণতার এই ক্ষেদের আঘাতে নিউরণ সব যাচ্ছে ক্ষয়ে—অকালে।
হাত বাড়ালেই মুঠোয় ভরা হাসি, রোদ ঝলকানো সকালের প্রেম, অপেক্ষার আনন্দ—সব কিছু ক্যামন তার বিস্বাদ বিস্মৃত লাগে।
অনিশ্চিত জীবনে, স্যাটেল হওয়ার চেষ্টাই কী তবে বিস্ময়কর নিকষ সুন্দর!
৪৪
মানুষের জন্য যতো ছাড় দিবেন, মানুষ আপনার কাছ থেকে ততো বেশি ছাড় আশা করবে। আপনি নিঃস্ব হলেও বলবে আরো ছাড়ুন!
মানুষকে যতো বেশি উপকার করবেন, মানুষ ততো বেশি আশা করবে। জগৎ সংসারে যে নীরবে করে যায়, তাকে আরো বেশি করতে হয়। মানুষ তাকে হয়তো নোটিশও করে না।
জগতের সর্বত্র শক্তকেই মানুষ সমীহ করে। ভদ্রতা, সততা, সেক্রিফাইস এগুলো হয়ে যায় দুর্বলতা।
মানুষের ভিতর দ্বিমুখীতা অনেক। এক মনে সে অন্যের কাছ থেকে ভালোটা আশা করে, কিন্তু অন্য মনে নিজের দিক থেকে ভালোটা করতে চায় না।
মানুষ চায় আপনি তাকে সম্মান করুন, অথচ তার ভিতর অন্যকে সম্মানের কোন চর্চা নাই। অনেক বয়স্ক মানুষ শুধু বয়সে বড়ো বলে সম্মান আশা করবে, অথচ নিজের স্ত্রীকেই সে সম্মান করে না। —অনেক দেখেছি এমন!
বাঙ্গালী পরিবার চায়, অন্যের মেয়েটা বউ হয়ে এসে পরিবারের সব দায়িত্ব নিক। কিন্তু নিজের মেয়েটা অন্যের পরিবারে গিয়ে শুধু স্বামীর সাথে ভালো থাকুক। নিজের মেয়েটা স্বামীর সাথে দেশ ছাড়ুক কিন্তু অন্যের মেয়েটা বউ হয়ে ঘরে থাকলেই মানায় বেশি।
৪৫
জীবন অনেক বড়ো একটা স্কুল। জীবন একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে কম না।
জীবন তোমাকে অনেক শিক্ষা দিবে। যেটা তুমি প্রতিষ্ঠানে পাবে না। কিন্তু সে শিক্ষা অমূল্যবান। অনেক দামী।
জীবন তোমাকে শেখাবে, ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হওয়া স্বপ্নটাকে কি করে আবার জোড়া দেয়ার স্বপ্ন দেখতে হয়। জীবন তোমাকে শেখাবে, নিঃশ্বেস হয়ে যাওয়া অপেক্ষার পরও কি করে অপেক্ষা করতে হয়।
জীবন তোমাকে শেখাবে, স্যাঁতা পড়া আশার উপর দাঁড়িয়ে কি করে আবার আশায় বাঁধতে হয় বুক। জীবন তোমাকে শেখাবে, গাঢ়ো অন্ধকারেও কি করে খুঁজতে হয় মিটমিট করে জ্বলে থাকা দূরের তারা।
তুমি যে কারো মায়ায় আচ্ছন্ন হও—সেটা কি স্কুল শেখায়? তুমি যে ভালোবাসো কাউকে, কী যতনে—সেটা কি প্রতিষ্ঠান শিখায়?
তোমার যে মনে হয়, হেরে যাচ্ছো জীবনের কাছে, বিরহে-বিচ্ছেদে কিংবা চাওয়া-পাওয়ার বেহিসেবে—স্কুল কি এসে তোমার পাশে দাঁড়ায়?
তুমি কখনো একজনের উপর নির্ভরশীল হবে। তুমি কখনো অন্যের নির্ভরতার কারণ হবে। তুমি কখনো নির্বোধ থাকবে। কখনো তুমি বোধকে ছাড়িয়ে যাবে।
তুমি কখনো বোবা হয়ে গিলে ফেলবে সকল অপমান। লাঞ্ছনা। তুমি কখনো একটা হাসি দিয়েই জ্বালিয়ে দিবে শত্রুর অন্তরে পুষে রাখা ফাঁদ।
তুমি বাবা হবে। মা হবে। আজ মায়ের যে শাসন তোমার অপমান মনে হচ্ছে, কাল সেটা তুমি ঠিক এভাবেই তোমার সন্তানকে ফিরিয়ে দিবে। জীবন তোমাকে শিখাবে, এখানে বহু কিছু প্রাগৈতিহাসিক। সহস্র বছর ধরে বহু মায়া, বহু শাসন, বহু বন্ধন—একই রয়ে গেছে। পুরোনো হয়নি আজো।
তুমি জীবনকে দেখবে ধাপে ধাপে। বিশে। ত্রিশে। পঞ্চাশে কিংবা সত্তেরে। আজ যা ঠিক ভাবছো, কাল সেটা ভুল ভেবে তুমিই হাসবে। বোকা মনে হবে।
তুমি জীবনের কাছে কখনো নুয়ে পড়ো। কখনো বা দ্রোহে ঘুরে দাঁড়াও। কখনো জেদে, কখনো প্রতিজ্ঞায়। জীবন তোমাকে হোঁচট দেয়। কখনো ধাক্কা দিয়ে সামনে পাঠায়।
আসলে তুমি নিজেই তোমার সবচেয়ে বড়ো শিক্ষক। তোমার জীবন তোমার সবচেয়ে বড়ো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
এটাকে যত্ন করো। জীবন থেকে শেখার জন্য সবর্দা জেগে থাকো। তুমি অনেক বড়ো ডিগ্রি না নিলেও অনেক বড়ো শিক্ষিত হতে পারবে।
৪৬
তোমার যে বন্ধুটা প্রচুর বই পড়ে, কথায় কথায় সে বইয়ের নাম বলবে। বইয়ের চরিত্রের কথা বলবে। সে হয়তো জিজ্ঞেস করবে—তুই “জঙ্গম” বইটা পড়েছিস? হয়তো জিজ্ঞেস করবে—তুই “তৈইশ নম্বর তৈলচিত্র” পড়েছিস?
তোমার যে বন্ধুটা প্রচুর মুভি দেখে, সে মুভির কথাই বেশি বলবে। সে হয়তো ভালো ভালো মুভি দেখে বিস্ময় নিয়ে তোমার সাথে গল্প করবে। হয়তো জিজ্ঞেস করবে—তুই “ইনস্টেন্ট ফ্যামেলি” দেখেছিস? হয়তো তোমাকে জুমাঞ্জি’র গল্প বলবে।
তোমার যে বন্ধু প্রচুর ম্যাগাজিন পড়ে, সে তোমার সাথে ম্যাগাজিন নিয়ে গল্প করবেই। যে ক্যারিয়ার নিয়ে প্রচুর ভাবে, সে তোমাকে ক্যারিয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করবে। ক্যারিয়ার নিয়ে পরামর্শ দিবে। তোমার বন্ধুরা তোমার ভাবনাকে গড়ে দেয়। তোমার বন্ধুরা তোমার চিন্তাকে শেইপ দেয়। তোমার আচরণে প্রভাব ফেলে। তোমার অভ্যাসে প্রভাব ফেলে। তোমার বন্ধুরা, অজান্তেই তোমার দৌঁড়ের সীমানা নিদির্ষ্ট করে দেয়!
তোমার সাথে যদি বই পোকা বন্ধুরা থাকে, তুমিও একদিন বই পড়তে শুরু করবে। তোমার সাথে যদি মুভি পোকা বন্ধু থাকে, তুমিও একদিন মুভি দেখতে শুরু করবে। তোমার বন্ধুরা যদি ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবে, তুমিও একদিন তাই করবে। তোমার বন্ধুরা যদি সারাদিন আলস্যে সময় কাটায়, তোমার মধ্যেও সে প্রভাব পড়বে।
“You are the average of the five people you spend the most time with.”—Jim Rohn
৪৭
বাংলাদেশে একটা কথা আছে “ব্রেইন ড্রেইন”। আমি এই শব্দটা পছন্দ করি না। আমার কাছে “ব্রেইন ড্রেইন” বলে কিছু নাই। আছে শুধু ব্রেইন গেইন। আপনার কাছে যেটা সিক্স, আমার কাছে সেটা নাইন। শুধু ধরতে জানলেই হলো।
যে দেশ তার বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধা হান্ট করে না—সে দেশে ব্রেইন ড্রেইন হবে না তো কি হবে? ব্রেইন গেইন করার ইচ্ছে তো কখনোই দেখলাম না।
ক্যালটেক থেকে পিএইচডি করে ফিরে গেলে যে দেশে এসিসট্যান্ট প্রফেসর হয়ে ৫০ হাজার টাকা বেতনের চাকরি করতে হয়, সে দেশে ব্রেইন ড্রেইন হবে না তো কি হবে? তাও সেই চাকরি পেতে হলে দলের পরিচয়, ভিসি’র পরিচয়, ডিপার্টমেন্টের থিসিস সুপারভাইজরের পরিচয় এমন বহু কিছু লাগে।
মাহবুব মজুমদারের মতো লোক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পায়নি।
যে দেশের একজন শিক্ষক, রাজনীতি নিয়ে, সমাজ নিয়ে, সংস্কৃতি নিয়ে একটা যৌক্তিক আলাপ তুলতে পারে না। কথা বললেই ট্যাগ দিবে। জেলে দিবে। সুযোগ পেলে গর্দান নিয়ে নিবে—সে দেশে ব্রেইন ড্রেইন হবে না তো কি হবে?
ব্রেইন ড্রেইন বলে কিছু নাই। ব্রেইন গেইনের ইচ্ছে না থাকলে, ব্রেইন ড্রেইন না হওয়াটা পৃথিবীর জন্য দুর্ভাগ্য।
চীন প্রতি বছর থাউজেন্ড ট্যালেন্ট প্ল্যানের মাধ্যমে সহস্র মেধাবীকে সে দেশে ফিরিয়ে নেয়। ওরা তো ব্রেইন ড্রেইন নিয়ে চিন্তা করে না। কারণ ওরা জানে কি করে ড্রেইন থেকে গেইন করতে হয়। আমরা করি না কেন? দেশে কি টাকা কম খরচ হয়েছে? লুটপাট কম হয়েছে? লস প্রজেক্ট কম হয়েছে? গত দশ বছর ধরেই তো বলে যাচ্ছি।
যাদের স্বপ্ন বিশ্বজয়, যারা জীবন নিয়ে অত্যন্ত প্ররিশ্রমী ও স্বপ্নবাজ তাদের জন্য পুরো পৃথিবীই একটা দেশ।
মানুষ গাছ নয় যে তাকে বাধ্য হয়ে ডোবায়, জঙ্গলে পড়ে থাকতে হবে। মানুষ যেখানে গিয়ে নিজেকে বিকশিত করতে পারে, সেখানেই যাবে। সেখানেই গিয়েছে। সভ্যতার আদিকাল থেকে এভাবেই চলছে।
৪৮
আমরা প্রায়ই বলি, মানুষ ঠিক না হলে দেশ ঠিক হয় না। এটা সম্পূর্ণ ভুল একটা কথা। ভুল ধারণা।
দুনিয়ার কোন দেশেই মানুষ এমনি এমনি ঠিক হয় না। মানুষকে ঠিক রাখা হয়। মানুষকে ঠিকভাবে তৈরি করা হয়। সেটা করা হয় সঠিক ব্যাবস্থাপনার মাধ্যমে।
রাস্তার স্পিড লিমিট ছিলো ৫০ মাইল। নিজের অজান্তেই গাড়ির স্পিড উঠে গিয়েছিলো ৭৩ মাইল। পুলিশ চোরের মতো গুপছি মেরে ক্যামেরা সেট করে বসেছিলো। পেছন থেকে এসেই টিকেট ধরিয়ে দিয়ে গেছে। জরিমানা ২০৩ ডলার। শুধু জরিমানা হলও একটা কথা ছিলো। সাথে কাটা গেছে ৬ পয়েন্ট। এমন বারো পয়েন্ট কাটা গেলে, সাময়িক সময়ের জন্য লাইসেন্স বাতিল। শুধু তাই নয়, এই টিকেটের কারণে গাড়ির ইন্সুরেন্সের প্রিমিয়াম বেড়ে গেছে। সাথে প্রতি বছর একশ ডলার করে তিন বছর ধরে ড্রাইভার রেসপনসিবিলিট এসেসমেন্ট ফি দিতে হবে। এক ভুলে, বহুমুখী ক্ষতি!
এমন একটা টিকেট খাওয়ার পর, যে কেউ লাইনে চলে আসে। লাইনে থাকতে চায়।
প্রতিদিন সারা আমেরিকায় অন্তত কয়েক হাজার ড্রাইভার এমন টিকেট খায়। তাদের মধ্যে অনেকেই আছে উচ্চশিক্ষিত। সু-নাগরিক। কিন্তু তারপরও তো মানুষ ভুল করে। মানুষের ভুল হয়। যদি এমন কঠোর জরিমানা না থাকতো, তাহলে কি হতো? —একই ভুল বারবার করতো। ইচ্ছে করে ভুল করতো। নিয়ম ভাঙ্গতে কেয়ার করতো না। ব্যবস্থাপনা কঠোর হওয়াতে মানুষ লাইনে থাকার চেষ্টা করে।
আপনি জাঁদরেল প্রফেসর হোন কিংবা সিটি মেয়র হন আর দোকানদার হোন—পুলিশ টিকেট দেয়ার সময় আপনার পরিচয় জানতেও চাইবে না। লাইসেন্স দেখবে এবং পুলিশ তার কাজ করে চলে যাবে। আপনার যদি কোন ভাষ্য থাকে, তাহলে সেটার জন্য আপনি কোর্টে যেতে পারবেন। সে অধিকার আছে।
আমাদেরকে গার্বেজ (ওয়েস্ট) দেয়ার সময় বাছাই করে দিতে হয়। কিছু ময়লা হলো রিসাইক্লিং (গ্লাস, টিন, পেপার)। এগুলো আলাদা দিতে হবে। কিছু ময়লা হলো ল্যান্ডফিল (যেমন, খাবার)। এই ওয়েস্টগুলো যদি ব্যাকরণমত বাছাই করে না দেয়া হয়, তাহলে আপনাকে জরিমানা দেয়া হবে। এই জরিমানা না থাকলে, মানুষ কেয়ার করতো না। যেমনে সেমনে গার্বেজ দিতো। এবং এই গার্বেজ বাছাই করার শিক্ষাটা বাচ্চাদেরকে দুই-তিন বছর থেকে দেয়া শুরু হয়।
সঠিক ব্যবস্থাপনা হলো মানুষকে টাইট রাখার জন্য। কিন্তু ব্যবস্থাপনা যদি ঢিলা হয়, মানুষ ঠিক হলেও দেশ ঠিক হয় না। কোনদিন না। ব্যবস্থাপনা মানুষকে লাইনে রাখে। ভালো কাজকে অভ্যাসে পরিণত করায়। মানুষকে গুড সিটিজেন হিসেবে তৈরি করে।
তাই ব্যবস্থাপনার মেরামত হলো রাষ্ট্রের নাম্বার ওয়ান কাজ—দ্যা ফার্স্ট প্রায়োরিটি। পঞ্চাশ বছরে আমরা সেটাই করতে পারিনি। আফসোস!
নিয়ম ভাঙ্গলে যদি কোন সমস্যা না হয়, নিয়ম ভেঙ্গে যদি পার পাওয়া যায়, তাহলে দেখবেন জাপান ও সোমালিয়া হতে সময় লাগবে না। মানুষের দোষ না, দোষ হলো নেতৃত্বের। শাসন ব্যবস্থার।
৪৯
প্রায় চৌদ্দশ বছর আগে ব্রহ্মগুপ্ত এবং ভাস্করাচার্য নামে দুইজন লোক গণিতশাস্ত্রে অভাবনীয় কাজ করে গেছেন। ভারতবর্ষের এই দুই গণিতবিদ সে সময়ে বসে যেসব সমীকরণ লিখে গেছেন—সেগুলো বোঝার মতো মানুষ দুনিয়াতে খুব বেশি ছিলো না। তারা জন্মেছিলেন, তাদের সময়ের অনেক অনেক আগে। ভাগ্যিস তাদের কর্মগুলো হারিয়ে যায়নি, তা না হলে পৃথিবী বঞ্চিত হতো। সভ্যতা বঞ্চিত হতো। আধুনিক গণিতশাস্ত্রে, ভারতীয় গণিতবিদের অবদান অপরিসীম।
চৌদ্দশ বছর আগে শূণ্যের প্রচলন করেছেন ভারতীয় গণিতবিদরা। তারা ত্রিকোনমিত্রির উদ্ভাবন করেছেন। ভাস্করাচার্য লিখেছেন কাব্যছন্দে গণিতের বই। তার এক বইয়ের নাম “মহাভাস্করাচার্য”। সে বইয়ে তিনি ম্যাথামেটিকেল এস্ট্রোনমি নিয়ে সমীকরণ দিয়েছেন। এস্ট্রোনমি নিয়ে ভারতীয় গণিতবিদরা ভাবতেন। চন্দ্র, সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব নিয়ে ভাবতেন। দিন-রাতের চক্র নিয়ে ভাবতেন। সেই ভাবনার সাথে গণিত জুড়ে দিয়ে তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছতেন।
ব্রহ্মগুপ্ত শূণ্য নিয়ে অংক করতে লাগলেন। শুণ্য দিয়ে যোগ বিয়োগ গুণ সবই করলেন। কিন্তু আটকে গেলেন যখন শূণ্য দিয়ে ভাগ করতে গেলেন। কোন সংখ্যাকে শূণ্য দিয়ে ভাগ করলে কি হয়? — ব্রহ্মগুপ্ত সেই উত্তর তখন দিতে পারেন নি। কয়েকশো বছর পর, দ্বাদশ শতকের আরেক গণিতবিদ ভাস্কর সেই সমাধান দিলেন। কোন সংখ্যাকে শূণ্য দিয়ে ভাগ করলে যে অসীম হয়, সেটা এই ভারতীয় গাণিতিকরাই প্রমাণ করলেন। ব্রহ্মগুপ্তের এক বইয়ের নাম “ব্রহ্মষ্ফূতসিদ্ধান্ত”। কী অসাধারণ নাম! ব্রহ্মগুপ্ত এবং ভাস্করাচার্য যদি ইউরোপিয়ান রেঁনেসার সময় ইউরোপের কোন দেশে জন্মাতেন—তাহলে সারা দুনিয়ার টেক্সট বইতে তাদের ছবি সহ পড়ানো হতো।
ভারতবর্ষ হলো গণিতের উর্বরভূমি। এই বিষয়টা সর্বপ্রথম উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন আরবের পণ্ডিতরা। তারা ভারতীয় গণিতবিদদের বই অনুবাদ করতে লাগলেন। বাগদাদে ছিলো সে সময়ের “হাউজ অব উইজডম”। অষ্টম শতকের খলিফা আল-মনসুরের নির্দেশে ব্রহ্মগুপ্তের বই অনুবাদ করলেন সে সময়ের সেরা অনুবাদক মুহম্মদ ফাজারি। ব্রহ্মগুপ্ত এবং ভাস্করাচার্যের বই অনুবাদ করা হলো আরবিতে। আল-খোয়ারেজমির বইতে ভারতীয় গণিতবিদদের ছাপ স্পষ্ট!
চন্দ্র-সূর্যের চক্র মুসলিম সভ্যতায় আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিলো। কারণ সূর্যচক্রের উপর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আর চন্দ্রচক্রের উপর ভিত্তি করে প্রতি বছর রোজা ও ঈদ হয়। সুতরাং ইসলামিক স্কলারদের অনেকেই এস্ট্রনমি নিয়ে আগ্রহী হলেন। নিঁখুত সূর্য ও চন্দ্র চক্রের জ্ঞান তাদের কাছে অমূল্যবান। আর সে জন্য তারা নির্ভর করলেন ভারতীয় স্কলারদের ত্রিকোনমিত্রির উপর।
আজকের দিনে আমরা যে সংখ্যা ব্যবহার করি, সেটাকে বলা হয় ইন্দো-এরাবিক নুমেরাল সিস্টেম বা ইন্দো-এরাবিক নাম্বার। কারণ ইংরেজিতে নাম্বার সিস্টেমটাই এসেছে ভারতীয়দের থেকে আরবদের হাত ধরে।
জ্ঞান-বিজ্ঞানের দুনিয়ার সৌন্দর্যটা এখানেই। এখানে ধার করতে হয়। এই ধার করতে গিয়ে কেউ হিন্দু, মুসলিম, ইহুদি, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ চিন্তা করে না। সমগ্র দুনিয়াটা এগিয়েছে একে অন্যের কাছে ধার করেই। আমরা হয়তো অঞ্চলভিত্তিক, ধর্ম ভিত্তিক ইতিহাস রচনা করে বা হাইলাইট করে একটা জনগোষ্ঠিকে উদ্বুদ্ধ করতে চাই কিন্তু সত্য হলো, এখানে সুপ্রিমেসির কিছু নেই। ধার-দেনা অপরিহার্য।
৫০
SAT একটা খুবই অবহেলিত পরীক্ষা। বাংলাদেশিরা এখনো SAT এর গুরুত্ব টা বুঝে না।
বুঝলে, দেশে যতগুলা IELTS টিচার আছে, তার চেয়ে আরো ১০ গুন্ বেশি SAT টিচার থাকতো।
আমি একদম সংক্ষিপ্ত আকারে বোঝানোর চেষ্টা করি।
USA তে কিছু ভার্সিটিতে পড়তে প্রতি বছর টিউশন ফী দিতে হয় প্রায় $২৫০০০। ৪ বছরে সেটা হয়ে যায় এক লক্ষ ডলার যা বর্তমানে বাংলা টাকায় প্রায় এক কোটি পচিশ লক্ষ। একটা ভালো স্কোর আনতে পারলে আপনি এই পুরো এক কোটি পচিশ লক্ষ টাকা স্কলারশিপ পেয়ে যাচ্ছেন।
মানলাম SAT কঠিন। মানলাম SAT দিতে একটু ভয় লাগে।
কিন্তু কয়েকমাস পড়ে যদি আপনি এক কোটি টাকা কমাতে পারেন, তাইলে কেন SAT দিবেন না?
নর্থ আমেরিকায় অন্ডারগ্রেডের জন্য (কলেজে ভর্তির জন্য) SAT স্কোর দরকার হয়।
৫১
সিঙ্গাপুরের নাম্বার ওয়ান ইউনিভার্সিটির নাম হলো ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর (NUS)। এটা একটা তাক লাগানো প্রতিষ্ঠান। এশিয়ার অন্যতম সেরা এই প্রতিষ্ঠান, সারা দুনিয়াকে চমকে দিয়েছে।
শুধু এই ইউনিভার্সিটিতেই পিএইচডি স্টুডেন্ট আছে সাড়ে তিন হাজার। অবিশ্বাস্য! এই সংখ্যাটা আসলে ইঙ্গিত করে, একটা সমাজ কতোটা ইনোভেটিভ। আবিষ্কার-উদ্ভাবনে কতোটা এগিয়ে। নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে একটা সমাজ কতোটা উন্মুখ হয়ে আছে। আর এজন্যাই সিঙ্গাপুর হলো এশিয়ার সবচেয়ে ইনোভেটিভ দেশ।
যে দেশটা আমাদের মেহেরপুর জেলার সমান, সেই দেশের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাড়ে তিন হাজার পিএইচডি স্টুডেন্ট আছে। এবং বিশ্বমানের গবেষক তৈরি করছে ওরা। কাট-কপি-পেস্ট মেরে ডিগ্রি দেয়ার প্রতিষ্ঠান সেটা না।
মাত্র ৬০ লক্ষ মানুষের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় যদি দুনিয়া সেরা হয়ে যায়, তাহলে ওদের আর ভাবনার কি থাকে!
প্রত্যেকটা তরুণ দেশ প্রতিরক্ষার একেকটা বারুদ হয়ে বেড়ে উঠছে।
ওরা কি করে পারছে, সেগুলো শেখার ইচ্ছে কি আমাদের আছে? সেভাবে কি নিজেদের প্রতিষ্ঠান গড়তে পারি না?
৫২
দেশের জনপ্রিয় শিল্পীরা দেশে থাকতে চায় না। দীর্ঘদিন কাজ করে টাকা-পয়সা হলে বিদেশে পাড়ি জমায়।
সরকারী কর্মকর্তারা সুযোগ পেলে দেশ ছেড়ে চলে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সুযোগ পেলে দেশ ছেড়ে চলে যায়। অনেক শিক্ষক বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য গিয়ে ফিরে না। ফিরতে চায় না।
ডাক্তাররা দেশ ছেড়ে চলে যায়। বুয়েটের প্রায় ষাটভাগ ইঞ্জিনিয়ার দেশে থাকে না। সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে অনেকেই বিদেশেই স্থায়ী হয়।
রাজনীতিবিদরা তাদের সন্তানদের দেশে পড়ায় না। বিদেশে পাঠিয়ে দেয়। তারাও জানে বাংলাদেশটা হলো ব্যবসার জন্য। রাজনীতি করে টাকা আয়ের জন্য। বসবাসের জন্য না। কারণ দেশটাকে তারা বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তোলে নাই।
কেউ বলে সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য। কেউ বলে শেষ বয়সে একটু শান্তির জন্য। কেউ বলে পরিবার-পরিজনের জন্য। কেউ বলে সততার সাথে বাঁচার জন্য। কেউ বলে আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য। কেউ বলে যোগ্যতার সুবিচার পাওয়ার জন্য। কেউ বলে উচ্চশিক্ষার জন্য। কেউ বলে সৎভাবে উপার্জন করে বাঁচার জন্য। কেউ বলে ধর্মীয় রোষানল থেকে মুক্তির জন্য।
আপনি যদি আপনার চারপাশের মানুষদের নিয়েই একটা জরিপ করেন, দেখবেন আশি শতাংশ মানুষ সুযোগ পেলে দেশ ছাড়তে চাইবে।
তাহলে পঞ্চাশ বছরে আমরা কেমন সমাজ তৈরি করলাম—যেখান থেকে সবাই পালাতে চায়! মানুষের ভিতর একটা উর্ধ্বশ্বাস! একটা দীর্ঘশ্বাস। পালিয়ে বেড়ানোর এক নিরন্তর চেষ্টা —কেন?
যারা দেশ চালায় তাদেরকে এই কেন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হবে। সেভাবে দেশটা গড়ার চেষ্টা করতে হবে।
৫৩
জীবন অনেক বড়ো একটা স্কুল। জীবন একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে কম না। জীবন তোমাকে অনেক শিক্ষা দিবে। যেটা তুমি প্রতিষ্ঠানে পাবে না। কিন্তু সে শিক্ষা অমূল্যবান। অনেক দামী। জীবন তোমাকে শেখাবে, ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হওয়া স্বপ্নটাকে কি করে আবার জোড়া দেয়ার স্বপ্ন দেখতে হয়। জীবন তোমাকে শেখাবে, নিঃশ্বেস হয়ে যাওয়া অপেক্ষার পরও কি করে অপেক্ষা করতে হয়।
জীবন তোমাকে শেখাবে, স্যাঁতা পড়া আশার উপর দাঁড়িয়ে কি করে আবার আশায় বাঁধতে হয় বুক। জীবন তোমাকে শেখাবে, গাঢ়ো অন্ধকারেও কি করে খুঁজতে হয় মিটমিট করে জ্বলে থাকা দূরের তারা। তুমি যে কারো মায়ায় আচ্ছন্ন হও—সেটা কি স্কুল শেখায়? তুমি যে ভালোবাসো কাউকে, কী যতনে—সেটা কি প্রতিষ্ঠান শিখায়?
তোমার যে মনে হয়, হেরে যাচ্ছো জীবনের কাছে, বিরহে-বিচ্ছেদে কিংবা চাওয়া-পাওয়ার বেহিসেবে—স্কুল কি এসে তোমার পাশে দাঁড়ায়?
তুমি কখনো একজনের উপর নির্ভরশীল হবে। তুমি কখনো অন্যের নির্ভরতার কারণ হবে। তুমি কখনো নির্বোধ থাকবে। কখনো তুমি বোধকে ছাড়িয়ে যাবে। তুমি কখনো বোবা হয়ে থেকে গিলে ফেলবে সকল অপমান। লাঞ্ছনা। তুমি কখনো একটা হাসি দিয়েই জ্বালিয়ে দিবে তোমার শত্রুর অন্তরে পুষে রাখা ফাঁদ।
তুমি বাবা হবে। মা হবে। আজ মায়ের যে শাসন তোমার অপমান মনে হচ্ছে, কাল সেটা তুমি ঠিক এভাবেই তোমার সন্তানকে ফিরিয়ে দিবে। জীবন তোমাকে শিখাবে, এখানে বহু কিছু প্রাগৈতিহাসিক। সহস্র বছর ধরে বহু মায়া, বহু শাসন, বহু বন্ধন—একই রয়ে গেছে। পুরোনো হয়নি আজো।
তুমি জীবনকে দেখবে ধাপে ধাপে। বিশে। ত্রিশে। পঞ্চাশে কিংবা সত্তেরে। আজ যা ঠিক ভাবছো, কাল সেটা ভুল ভেবে তুমিই হাসবে। বোকা মনে হবে।
তুমি জীবনের কাছে কখনো নুয়ে পড়ো। কখনো বা দ্রোহে ঘুরে দাঁড়াও। কখনো জেদে, কখনো প্রতিজ্ঞায়। জীবন তোমাকে হোঁচট দেয়। কখনো ধাক্কা দিয়ে সামনে পাঠায়।
আসলে তুমি নিজেই তোমার সবচেয়ে বড়ো শিক্ষক। তোমার জীবন তোমার সবচেয়ে বড়ো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
এটাকে যত্ন করো। জীবন থেকে শেখার জন্য সবর্দা জেগে থাকো। তুমি অনেক বড়ো ডিগ্রি না নিলেও অনেক বড়ো শিক্ষিত হতে পারবে।
৫৪
চীনে ছাত্ররাজনীতি নাই। চীনের ছেলে-মেয়েরা দুনিয়া দখল করে নিচ্ছে। আমেরিকা-জাপান, জার্মানী কিংবা কানাডায়—চীনের ছেলে-মেয়েদের জয়জয়কার। দুনিয়ার এমন কোন সেরা বিশ্ববিদ্যালয় নেই যেখানে তারা নাই। সারা পৃথিবীতে তারা এখন টপার। এমন গবেষণা প্রতিষ্ঠান দুনিয়াতে খুব কম যেখানে চীনের ছেলে-মেয়েদের প্রভাব নাই। ছাত্রদের যেটা কাজ, যেটা দায়িত্ব, ওরা সেটাই করছে। অন্যকিছু করে সময় নষ্ট করলে নিজে যেমন বিশ্বদৌঁড়ে পিছিয়ে যেতো, তেমনি ওদের দেশও পিছিয়ে পড়তো।
ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন দলীয় দাসত্বের ছাত্ররাজনীতি নাই। আমেরিকায় নাই। কানাডায় নাই। জাপানে নাই। দক্ষিণ কোরিয়া নাই। সিঙ্গাপুরে নাই। ওরা চাঁদে যাচ্ছে। মঙ্গলে যাচ্ছে। ওরা পৃথিবীর সকল মহামারিতে ওষুধ, ভ্যকসিন নিয়ে হাজির হচ্ছে। প্রযুক্তি নিয়ে হাজির হচ্ছে।
কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি করছে। বুলেট ট্রেইন তৈরি করেছে। কি না করছে!
কিন্তু ছাত্ররাজনীতি লাগবে বাংলাদেশে। দলের দাস হয়ে থাকতে হবে। নেতার পাছার পেছনে স্লোগান দিতে হবে। ক্যাম্পাসে মারামারি হবে। ছাত্র খুন হবে। হল থেকে অস্ত্র পাওয়া যাবে। ছাত্ররা রাজনীতি করবে—নেতা হবে। শিক্ষকরা রাজনীতি করবে—নেতা হবে।
ফলে আমরা ৫৩ বছরে কি চুলটা ছিঁড়েছি? —আমাদের দৌঁড় হলো মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমিক হওয়া পর্যন্ত!
গ্লোবাল ইনোভেটিভ কালচারে আমাদের অবদান শূণ্য! দুনিয়ার তালিকা তো বহু দূর, দক্ষিণ এশিয়ার তালিকাতেই দেশের একটা পাবলিক ইউনিভার্সিটি শীর্ষে থাকতে পারে না। আর যেসব স্টুডেন্টদের সামর্থ্য থাকবে কিংবা যোগ্যতা থাকবে—তারা দেশ ছাড়বে, আর ফিরবে না।
যে জাতি সময় থাকতে, চোখ খুলে অন্যের কাছ থেকে শিখে না, তাকে শেখানো কঠিন!
অন্যজাতির দাস হওয়া কিংবা মাইর খাওয়া ছাড়া এমনসব জাতির বিকল্প পথ থাকে না।
৫৫
জার্মানীর প্রায় ৭০ জন বিজ্ঞানী নোবেল বিজয়ী। একটা দেশে যদি বিজ্ঞানেই ৭০ জন নোবেল বিজয়ী থাকে, তাহলে সে দেশের আবিষ্কার-উদ্ভাবনের সংস্কৃতি কতোটা শক্তিশালী, চিন্তা করেন। নোবেল চালু হয়েছে ১৯০১ সাল থেকে। তার আগে জার্মানরা তৈরি করেছে দুনিয়া সেরা আরো বহু বিজ্ঞানী।
এই যে এতো বড়ো বড়ো বিজ্ঞানী গড়ে তোলার সংস্কৃতি, সেটা কিন্তু রাতারাতি হয়নি। পাঁচ-দশ বছরে হয়নি। এমনি এমনি হয়ে যায়নি। এটা বহু যুগের সাধনা। জ্ঞান-বিজ্ঞানের একটা উর্বরভূমি তৈরি করার সাধনার ফসল। এই সাধনা তাদের আবিষ্কার-উদ্ভাবন ও গবেষণার সংস্কৃতিকে এতোই শক্তিশালী করেছে যে, তারা নেতৃত্বস্থানে আছে।
একটা সমৃদ্ধ সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধশালী মানুষ, মন তৈরি হয়। একটা ব্রিলিয়ান্ট শিক্ষা ব্যবস্থায়, যুগের পর যুগ ব্রিলিয়ান্ট মাইন্ড তৈরি হয়। এটা একটা চেইন প্রক্রিয়া। ভালো, আরো ভালো তৈরির পথ তৈরি করে।
জার্মানীর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গনে হাঁটবেন, দেখবেন পৃথিবী সেরা বিজ্ঞানী, দার্শনিক, সাহিত্যিকদের ভাস্কর্য। তাদের জীবনগাঁথা। তাদের পদচিহ্ন। সেসব পরিবেশে আপনি গিয়ে নেতার শ্লোগান দিলে, নেতার পোস্টার লাগালে, গর্দান ধরে বের করে দিবে ক্যাম্পাস থেকে। কারণ মূর্খকে ওরা সময় থাকতেই দমন করে। যেনো একটা মূর্খ, আরো দশজনকে মূর্খের পর্যায়ে নামাতে না পারে। ওরা জানে, একটা সমৃদ্ধশালী সংস্কৃতি গড়তে যুগের পর যুগ সাধনা করতে হয়। কিন্তু সেটা ধ্বংস করতে একটা অনিয়মই যথেষ্ট।
জার্মানীর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে দেখবেন, ওদের শিক্ষক-গবেষক, শিক্ষার্থীরা ঘড়ির কাটার সাথে কতোটা মেপে চলে। প্রোডাক্টিভিটি নিয়ে ওদের কতো পরিকল্পনা। যোগ্যতার প্রশ্নে ওরা অটল। শিক্ষার গুণের প্রশ্নে আপোষহীন। ওরা জানে, আলো তৈরির জায়গায় অন্ধকার মন দিয়ে ভরে রাখা যায় না।
এজন্যই ওদের আবিষ্কার-উদ্ভাবনের সংস্কৃতি এতো ভাইব্রেন্ট, এতো জীবন্ত, এতো জাগ্রত। পৃথিবীকে ওরা এমনি এমনি নেতৃত্ব দেয় না।
৫৬
স্টকহোম ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস করার সময় দেখতাম অনেক স্টুডেন্ট প্রফেসরের প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারতো না। কেউ কেউ একদম ভুল উত্তর দিতো। কিন্তু প্রফেসাররা কখনো কোন অপমান করতেন না। তারা বলতেন, তুমি একটু ভিন্নভাবে চিন্তা করো। তোমার চিন্তা রাইট ডিরেকশনে আছে। তোমার উত্তর কাছাকাছি গিয়েছে।
আমি কোনদিন দেখিনি কোন স্টুডেন্টদেরকে একটু ধমক দিতে। ওরা “প্লিজ” শব্দ ছাড়া কোন স্টুডেন্টদের সাথে কথাই বলতো না।
একবার স্টকহোম থেকে আমেরিকা গেলাম কনফারেন্সে। আমার সুপারভাইজর ও আমাদের গ্রুপের আরো দুইজন গেলো। আমার এক কলিগ প্রেজেন্টেশনের সময় খুবই নার্ভাস হয়ে পড়ে। সে নিজেই বুঝতে পেরেছে, তার প্রেজেন্টেশন খুব বাজে হয়েছে। কিন্তু আমার প্রফেসর তার প্রেজেন্টেশনের প্রশংসা করলেন। সেই কলিগকে তিনি কতোভাবে শান্ত্বনা দিলেন। উৎসাহ দিলেন। আমি বিস্ময় নিয়ে শুধু দেখলাম।
আমাদের দেশের সব শিক্ষকরা যদি স্টুডেন্টদের সাথে এমন চর্চা করতো, তাহলে আমাদের স্টুডেন্টরা অনেক ভালো করতো।
“তুই বেশি বুঝস”, “বেশি চালাক”, অপদার্থ, গাধা, “না বুঝে প্রশ্ন করছ”—এইসব কথাগুলো স্টুডেন্টদের সাথে ব্যবহার না করাই ভালো।
স্টুডেন্টদেরকে উৎসাহ দিলে, তারা আগ্রহী হয়। তারা দ্রুত শিখতে পারে। একটা ছোট্ট উৎসাহ, অনুপ্রেরণা কারো কারো জীবনে অনেক বড়ো প্রভাব ফেলে। অপমান বা তিরস্কার করলে, স্টুডেন্টদের আগ্রহ নষ্ট হয়ে যায়।
স্টুডেন্টদেরকে উৎসাহ দেয়া, উন্নত সমাজে একটা সংস্কৃতিতে দাঁড়িয়েছে। Appreciation matters! শিক্ষকরা যেনো দয়া করে বিষয়টা একটু অনুধাবন করেন!
৫৭
দেশের মাদ্রাসাগুলোতে অনেক ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট আছে। অনেক প্রতিভাবান স্টুডেন্ট আছে। কিন্তু সেসব স্টুডেন্টরা তেমন আলোচিত হয় না।
অনেকে মাদ্রাসা থেকে এসএসসি-এইচএসসি পাশ করে পরে ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে অনেক ভালো রেজাল্ট করে। পরবর্তী জীবনেও সফল হয়।
মাদ্রাসার স্টুডেন্টদের অনেকরই স্বপ্ন থাকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাবে। গবেষণা করবে। আমার পরিচিত আক্তার হোসাইন ভাই, মাদ্রাসা থেকে পড়ে, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর। এমন উদাহরণ কম হলেও আরো আছে।
মাদ্রাসার স্টুডেন্টদেরকে বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতে অনার্স-মাস্টার্স করার জন্য উৎসাহ দেয়া উচিত। তাদেরকে সে সুযোগ দেয়া উচিত।
তাদেরও উচিত বিজ্ঞানের গবেষক হওয়ার স্বপ্ন দেখা। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ার জন্য চেষ্টা করা।
৫৮
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান কি করেছে জানেন? জাপান তাদের সবচেয়ে বেশি তরুণকে আমেরিকা পাঠিয়েছে। উচ্চতর গবেষণার জন্য।
জাপান চিন্তা করলো, যে আমেরিকা হিরোশিমা ও নাগাসাকি ধ্বংস করে দিয়েছে, সেই আমেরিকা থেকেই শিখতে হবে। জানতে হবে, আমেরিকার কি আছে, যেটা আমাদের নাই।
জাপানের তরুণরা আমেরিকা গিয়ে দিন-রাত পরিশ্রম করলো। আমেরিকার সেরা সেরা ইউনিভার্সিটিতে গবেষণা করলো। মাথার মধ্যে সবকিছু স্ক্যান করে জাপান ফিরে গেলো। জাপান সরকার সেইসব তরুণদের পেছনে প্রচুর টাকা ঢেলে দিলো। জাপানিজ তরুণরা রাজনীতি বুঝে না। মন্ত্রী চিনে না। দিন-রাত একাকার করে কাজ করে যায়।
সেই জাপান আজ পৃথিবীর একটা পরাশক্তি। পৃথিবীর সুন্দরতম দেশগুলোর একটা। তারা যোগ্য মানুষ দিয়ে ব্যবস্থাপনা দাঁড় করিয়েছে। নিজেদের মধ্যে দিনভর গুতাগুতি করে না।
আজকে আমি যদি লিখি, “পাঁচ লক্ষ লোক নিয়ে দিল্লীর উদ্দেশ্যে রওনা দিবো, দিল্লী ঘেরাও করবো”। এটা একটা পপুলিস্ট পোস্ট হবে। আপনি লাইক করবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দশ লক্ষ মানুষ নিয়ে রাস্তায় প্রতিবাদ করেও ভারতের সাথে আমি দাঁড়াতে পারবো না। ভারত সরকারকে ভয় দেখাতে পারবো না।
আমাদের তাইলে কি করতে হবে?
বাংলাদেশ সরকার, ভারত সরকারকে কূটনৈতিকভাবে সামাল দিতে হবে। এই সামাল দেয়ার জন্যও চাই যোগ্য নেতা। সাহসী নেতা। ভারতের সাথে আমদানি-রফতানির ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। ভারতের সাথে চুক্তি হলে, সেই চুক্তির বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে সহস্র ছেলে-মেয়েদেরকে ভারতের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ দেয়ার শর্ত দিতে হবে।
ভারত ২৩ টা বিশ্বমানের আইআইটি গড়ে তুলতে পেরেছে। আমরা আজো সে মানের একটা প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলতে পারিনি। বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আজো কেন আইআইটির মানে হলো না—সেটার জন্য আমাদের সরকারকে চাপ দিতে হবে। যদি ১০০০ কোটি টাকা খরচ করেও সেই মানের প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে হয়, তাহলে সেটা করতে হবে। সারা দুনিয়া থেকে আমরা শিখবো। সারা দুনিয়াতে আমাদের ব্রিলিয়ান্ট তরুণদেরকে পাঠাবো। বাংলাদেশের সামরিক গবেষণাকে শক্তিশালী করতে হবে। বাংলাদেশের সামরিক গবেষণা বলতে গেলে শূণ্য! তরুণদের ভিতর এখন যে শক্তিটা আছে, সেটাকে এইসব পজেটিভ কাজে ব্যবহার করতে হবে। এছাড়া কোন মুক্তি নাই।
বাংলাদেশে যদি বিশ্বমানের ৫০০ বিজ্ঞানীও থাকে—ভারত সরকার বাংলাদেশকে সমীহ করতে বাধ্য। কথাটা আপনি লিখে রাখুন।
প্রতিবেশীর সাথে শিক্ষা, গবেষণা ও সামরিক শক্তিতে সমশক্তির হতে না পারলে, প্রতিবেশীর সাথে শুধু রক্ত দিয়ে টিকে থাকা যায় না। এটাই পৃথিবীর জাতীয়তাবাদের শিক্ষা। আপনি তো প্রতিবেশী বদলাতে পারবেন না। আমি উগ্রজাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী না। আবার শোষণের শিকারও হতে চাই না। আমি চাই সম আদান-প্রদানের বন্ধুত্ব। রসায়নের ভাষায় সমযোজী বন্ধন।
৫৯
খলিফা আল মামুনের নাম কি শুনেছেন? মধ্যযুগের এক জ্ঞানপিপাসু বাদশাহ। খলিফা মামুন লক্ষ্য করলেন, বাইত আল-হিকমা’র প্রধান দায়িত্বে একজন শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত দরকার। খুঁজে খুঁজে বের করলেন গণিতবিদ আল খোয়ারিজমিকে। ৮২০ সালের দিকে, খোয়ারিজমি ছিলেন বাইত আল-হিকমা’র প্রধান। সে সময়ের বাইত আল-হিকমা হলো আজকের দিনের রয়েল সোসাইটি কিংবা আমেরিকার ন্যাশনাল একাডেমি অব সাইন্সের মতো প্রতিষ্ঠান।
একসময় খলিফা হলেন আল মুকতাফি। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন তার রাজ্যে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ হাসপাতাল তৈরি করবেন। সেজন্য স্থান নির্ধারনের দায়িত্ব দিয়েছিলেন, সে সময়ের বিখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী আল রাজিকে। “আল বিমারিস্থান আল মুক্তাদির” নামক সে কালের দুনিয়াখ্যাত হাসপাতালের প্রধান দায়িত্বে ছিলেন আল রাজি। তিনি সেখানে রোগি দেখতেন। গবেষণা করতেন। এগুলো রূপকথা নয়। এক হাজার বছর আগের বাগদাদের আলোকিত ইতিহাস।
মধ্যযুগের এক বিখ্যাত পণ্ডিতের নাম মোসেস বিন মায়মুন। তিনি ছিলেন ইহুদি। কিন্তু বাদশা সালাদিন, মায়মুনকেই ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। কারণ মায়মুনের চেয়ে পণ্ডিত লোক তখন আর কেউ ছিলো না। পণ্ডিতের ধর্ম দেখেন নাই।
মধ্যযুগের খলিফারা বিদ্বানদের মূল্য দিয়েছেন। পণ্ডিতদেরকে সঠিক স্থানে রেখেছেন। জাত, ধর্মের উর্ধ্বে গিয়ে যোগ্যতা দেখেছেন। —এজন্যই স্বর্ণযুগ রচিত হয়েছিলো। স্বর্ণযুগ এমনি এমনি আসে নাই। তারা যোগ্যের পরিচর্যা করেছিলেন।
ইসারাইলের প্রথম প্রেসিডেন্ট কাইম ভাইজম্যান, ক্ষমতা নেয়ার পরই সারা দুনিয়ার ইহুদি বিজ্ঞানীদের দাওয়াত দিয়েছিলেন। জার্মানীর যতো সেরা সেরা বিজ্ঞানী আছে, সবাইকে ইসরাইলে স্থায়ী করতে চেয়েছিলেন। নিজে ক্ষমতা থেকে সরে গিয়ে হলেও, আইনস্টাইনকে প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন।
পি জে হার্টগ, একজন ভিনদেশি লোক। বৃটিশ ইহুদি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব নেয়ার পরই সে সময়ের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতদের খুঁজতে লাগলেন। ঢাকার গর্ভনরের সুপারিশ পর্যন্ত তোয়াক্কা করেন নাই। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মোতাহের হোসেন, সত্যেন্দ্রনাথ বোস, জ্ঞান ঘোষ, এম এন কৃষ্ণন—সে সময়ের সবচেয়ে পণ্ডিত লোক। তাদেরকে বেছে বেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দিয়েছিলেন। And that’s why it used to be known as “Oxford of the East”! —Not any more! আর আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইউজিসি কিংবা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান দায়িত্বে বসানো হয় দলীয় দাসদের।
পণ্ডিতকে রাখতে হবে জাত-ধর্ম, বর্ণ, রাজনীতির উর্ধ্বে। কারণ তারা হলেন সমাজের চক্ষু—The Vision! চক্ষু না থাকলে একটা জাতিকে হাতরে হাতরেই চলতে হয়।
৬০
সক্রেটিস ধ্যান করছেন। নিঃশ্চুপ বসে হয়তো জীবনবোধ নিয়ে ভাবছেন। সে সময় এক তরুণ তার কাছে গিয়ে বসলো। সক্রেটিস টের পেলেন না।
অনেকক্ষণ পর সে তরুণকে লক্ষ করলেন। তরুণটি বললো, সক্রেটিস, আমার একটা প্রশ্ন ছিলো।
—কী প্রশ্ন?
—সফলতার রহস্যটা কী? What is the secret to success?
সক্রেটিস হাসলো। বললো, কাল সকালে নদীর ধারে এসো। তখন বলবো।
পরদিন সকালেই তরুণ নদীর ধারে গিয়ে হাজির। সক্রেটিস আসলেন। বললেন, চলো নদীতে নামি। পানিতে নামতে নামতে দুজন গলা অবধি নেমে গেলো। তরুণ খুবই বিস্মিত হতে লাগলো! হঠাৎ, সক্রেটিস সে তরুণের ঘাড় চেপে পানিতে ডুবিয়ে দিলেন। তরুণটা ছটফট করতে লাগলো। সক্রেটিসের শক্তির সাথে পেরে উঠছিলো না। কতক্ষণ পর সক্রেটিস তাকে তুললেন। তরুণের চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। বুকভরা নিঃশ্বাস নিয়ে সে যেনো জীবন খুঁজে পেলো।
—সক্রেটিস বললো, কিছু বুঝলে?
—না!
সক্রেটিস প্রাজ্ঞের হাসি হাসলেন।
—তোমাকে যখন পানিতে ডুবিয়ে রাখা হলো তখন তুমি প্রবলভাবে কি চেয়েছিলে?
—বাতাস। শুধুমাত্র বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে চেয়েছিলাম!
—এটাই হলো সফলতার রহস্য। একটু বাতাসের জন্য তুমি যেমন তীব্রভাবে মরিয়া হয়ে উঠেছিলে, ঠিক এমন মরিয়া হয়ে কিছু চাইলেই সফলতা আসবে। এটাই সফলতার রহস্য। এই বলে, সক্রেটিস বিদায় নিলেন।
সফলতার প্রথম ধাপ হলো—A burning desire. আমাদের ইচ্ছেশক্তি হলো শক্তিশালী স্প্রিং-এর মতো। এটাকে টেনে ধরে রাখাই কঠিন। একটু হেলা করলেই ছোট হয়ে যায়।
৬১
আমি ইউরোপে পিএইচডি করেছি। আমেরিকার আইভিলিগ স্কুলে পোস্টডক্টরাল গবেষণা করেছি। আমেরিকায় গবেষণা করছি।
এগুলোকে আমি প্রিভিলিজ মনে করি। সৌভাগ্য মনে করি। বড়ো সত্য হলো, এই শিক্ষা, এই যোগ্যতা আমার দায়িত্ব ও দায়বোধকে বাড়িয়ে দিয়েছে।
আমি চাইলেই চুপ থাকতে পারতাম। বিদেশে পড়তে যাওয়া ৯০% স্টুডেন্ট দেশ নিয়ে কথা বলে না। চুপ থাকে। ব্যস্ত হয়ে যায়। প্যারা নিতে চায় না।
কিন্তু আমি কোনদিনই চুপ ছিলাম না। চুপ থাকাকে আমার কাছে অপরাধ মনে হয়। গত ১০-১২ বছর শিক্ষা নিয়ে লিখেছি। কাগজে লিখেছি। বই লিখেছি। ছাত্রদের অধিকার নিয়ে বলেছি।
আমি মনে করি, যে মানুষের শিক্ষা ও যোগ্যতা বেশি, তার দায়িত্ব ও অনেক বেশি। আমাকেই দেশের শিক্ষা ও গবেষণা নিয়ে বলতে হবে। কারণ আমি এটা ভালো বুঝি।
আমি পৃথিবীর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেখেছি। আলোকিত ক্যাম্পাসগুলোতে হেঁটেছি। সেগুলোর মতো করে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে গড়তে হবে। তরুণদের সচেতন করতে হবে। —এটা আমার স্বপ্ন।
আর এ জন্যই আমাকে বলতে হবে। লিখতে হবে। অন্যায়কে অন্যায় বলতে হবে। এই দায় থেকেই আমি সবসময় লিখি। বিদেশের গবেষক, শিক্ষক যারা চুপ থাকেন—তাদের বেশিরভাগই মূলত ইনিয়ে-বিনিয়ে দায় এড়িয়ে যান।
শিক্ষাই যদি আলো হয়, আর আমি যদি সেই আলোয় আলোকিত হয়ে সমাজের জন্য না বলি, তরুণদের অধিকারের জন্য না বলি—তাহলে সে শিক্ষা হলো কাগজের সনদ মাত্র, আলোকময় শিক্ষা না।
সত্যেন বোস, মেঘনাদ সাহা’র মতো মানুষরা যদি সমাজ গড়ার লড়াইয়ে অংশ নেয়, তাহলে আমি-আপনি কোন ছাই!
৬২
বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্র রাজনীতি আছে। কিন্তু তাদের ছাত্র রাজনীতি কেমন জানেন?
—তাদের ছাত্র ইউনিয়ন আছে। প্রতিনিধি আছে। ছাত্র প্রতিনিধিরা ছাত্রদের অধিকার নিয়ে কাজ করে। আওয়াজ তুলে। ইউনিভার্সিটির শিক্ষা ও গবেষণার মান বাড়ানোর জন্য কাজ করে।
ছাত্রদের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির জন্য কাজ করে। স্টুডেন্টরা যেনো পাশ করেই কর্মজীবনে ঢুকতে পারে সেসব নিয়ে কাজ করে। জব ফেয়ারের আয়োজন করে। ছাত্র প্রতিনিধিরা বছরের পর বছর ছাত্র থাকে না।
চার বছরের কোর্স চার বছরেই শেষ করে বিদায় নেয়। নির্বাচনের পদ নিয়ে মারামারি করে না। ওরা কারো চামচামি করে না। নেতার ছবি পূজা করে না। হল দখল করে না। ক্যাম্পাস দখল করে না। সকাল-বিকাল দলাদলি নিয়ে থাকে না। —এই হলো ওদের ছাত্র রাজনীতির সংক্ষিপ্ত রূপ।
বিদেশের কোন ইউনিভার্সিটিতে ঢুকে নেতার ছবি পাবেন না। দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার পাবেন না। মিছিল মিটিং করে রাস্তা বন্ধ করতে দেখবেন না। মারামারি করে ইউনিভার্সিটি বন্ধ করে রাখবে না। ক্যাম্পাসে নেতার পেছনে স্লোগান দিবে না।
স্টকহোম ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলাম—একটা পোস্টার তো দূরের কথা, একটা লিফলেটও দেখি নাই। অনলাইনে ভোট দিয়েছি। পরে সেই ইউনিয়ন ওদের এক মন্ত্রীকে ডেকে এনে একটা মিটিং করেছিলো। আন্ডারগ্রেজুয়েটের স্টুডেন্টরা যেভাবে মন্ত্রীকে প্রশ্ন করেছে—সে দৃশ্য আমি কোনদিনও ভুলবো না। মন্ত্রীর চেহারা লাল হয়ে গেছে। মন্ত্রীর সাথে কোন চেলা-চামচা ছিলো না। মন্ত্রী কোন স্টুডেন্টকে বলে নাই—চুপ করো! —এই হলো ওদের ছাত্র রাজনীতি। ছাত্রদের ভয়ে নেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতে চায় না।
আমাদের দেশের ইউনিভার্সিটিতে যে রাজনীতি, সেটা হলো মুক্ত চিন্তাকে ধ্বংস করার রাজনীতি। তরুণরা যেনো কথা বলতে না পারে, ভাবতে না পারে, চিন্তা-চেতনায় জাগ্রত হতে না পারে, সেই রাজনীতি। ক্যাম্পাস টহল দাও, যেনো অন্যরা কথা বলতে না পারে। হল দখল করো—হলগুলো যেনো তাদের বাবার সম্পদ!
—এগুলোকে রাজনীতি বলে, নাকি গুণ্ডামি বলে?
ক্যাম্পাসে নিজের দলের নেতা-নেত্রীর পূজা করো। পোস্টারে ছেয়ে দাও। নেতার গুণগাণ করো। নিজের দলের নেতারা যদি নিকৃষ্টতম কাজও করে, তাহলে সেটার পক্ষে সাফাই গাও।
—এটাকে রাজনীতি বলে, নাকি নোংরামি বলে?
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি হলে—সরকার দলীয় ছাত্র নেতারা কোন কথা বলে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা নেই—সেগুলো নিয়ে কথা বলে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা সেশন জটে ভুগছে—সেগুলো নিয়ে কথা বলে না। —তাহলে কিসের ছাত্র রাজনীতি এটা?
ছাত্ররা রাজনীতি করবে কিন্তু চামচামি না। ছাত্ররা লিডারশিপ শিখবে কিন্তু ধ্বংসাত্মক কাজ না। ছাত্ররা সমাজ গড়বে কিন্তু শিক্ষাকে দূরে রেখে না। ছাত্ররা নেতৃত্ব শিখবে কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে না। ছাত্ররা নেতা হবে কিন্তু নেতার সুরে কথা বলে নয়।
যে দেশে গুণ্ডামি-পাণ্ডামিকে ছাত্র রাজনীতির নাম দিয়ে যুগের পর যুগ টিকিয়ে রাখা হয়, সে দেশে পঞ্চাশ বছরে কেন, একশো বছরেও কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশ্ব তালিকায় আসবে না। চেতনাগঞ্জ সহমত ডিগ্রি কলেজের স্টুডেন্টদের হাতে মার খাবে দেশের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্ররা।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাঙ্গণে যে দলীয় ছাত্র রাজনীতি, সেগুলো হলো দলের স্বার্থে। দুনিয়ার কোন দেশ তার তরুণদের দিয়ে শিক্ষাঙ্গণে এমন বিধ্বংসী সংস্কৃতি গড়ে তোলেনি। ছাত্র রাজনীতির নামে শিক্ষাকে ধ্বংস করেনি। এমন কি আফ্রিকার ক্ষুধাপীড়িত কোন দেশও না।
৬৩
বাঙালী ছেলে-মেয়েরা খুবই মেধাবী। পৃথিবীর যে প্রান্তেই গিয়েছি, বাঙালী স্টুডেন্টদের ছড়িয়ে পড়তে দেখেছি।
বাঙালী তরুণ-তরুণীরা মেধায় বিশ্বমানের। তারা বিশ্বজয়ের ক্ষমতা রাখে। আর সেটার প্রমাণ তো কম নেই।
সত্যেন বোস, মেঘনাদ সাহা, জ্ঞান ঘোষ—এই মানুষগুলো যে কতো বড়ো মাপের মানুষ ছিলেন, বলে বুঝানো কঠিন। এই মানুষগুলোই যদি ইউরোপ-আমেরিকায় জন্মাতেন, তাহলে পৃথিবীর সেরা সেরা বিশ্ববিদ্যালগুলোতে তাদের নামে বড়ো বড়ো গবেষণা কেন্দ্র থাকতো। তাদের নামে আরো কতো কি যে হতো!
পাঠ, পাঠ্য, বিদ্যাপীঠের অবকাঠামো, শিক্ষক, শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ—এইসব বিষয় বিবেচনা করলে, ইউরোপ-আমেরিকার স্টুডেন্টদের তুলনায় বাঙালী স্টুডেন্টরা তেমন কোন সুবিধাই পায় না। তারপরও তারা পৃথিবী জয়ের স্বপ্নে ছড়িয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন।
বাংলাদেশের অসংখ্য স্টুডেন্ট গ্রাম থেকে উঠে আসে। তারা ভালো মানের শিক্ষার পরিবেশ পায় না। পারিবারিক অর্থনৈতিক টানাপোড়েন থাকে। বহু বাধা বিপত্তি থাকে। তারপরও তারা স্বপ্ন জয়ের নেশায় ছুটছে।
গত পনের বছরে ইউরোপ-আমেরিকায় আমি অসংখ্য বাংলাদেশি স্টুডেন্ট দেখেছি। পৃথিবীর সেরা সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা পড়ছে। গবেষণা করছে। এই সংখ্যা আরো বহুগুণে বেড়ে যেতো, যদি দেশে শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশটা আরো ভালো হতো। আরো উন্নত হতো।
বিশ্বমানের গবেষণা শেখার জন্য তরুণদের এই যে জোয়ার সেটা চলতে থাকুক। এভাবে চলতে থাকলে, আগামি ১৫-২০ বছরের মধ্যে দেশেও সেটার একটা ইমপ্যাক্ট পড়বে। দেশেও উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণার পরিবেশ বদলাবে।
একটা দেশ তো এভাবেই দাঁড়াবে!
৬৪
স্টকহোম ইউনিভার্সিটিতে আমার এক সহপাঠীর নাম ছিলো আন্দ্রিয়াস। খুবই চটপটে স্টুডেন্ট। লম্বা ঝাঁকড়া চুল। কথা বললে মনে হতো যেনো বজ্রপাত হচ্ছে। খুবই ভরাট তেজস্বী কণ্ঠ!
আন্দ্রিয়াসের সবচেয়ে বড়ো গুণ ছিলো ক্লাসে প্রশ্ন করা। ও শিক্ষকদের অনেক প্রশ্ন করতো। আমি তো প্রথম কয়েকমাস বেশ কাঁচুমাচু হয়ে থাকতাম। নতুন পরিবেশে গিয়েছি। তাছাড়া দেশে থাকার সময় ইউনিভার্সিটিতে প্রশ্ন করার তেমন সংস্কৃতি দেখিনি। খুব বেশি প্রশ্ন করার অভ্যাসও ছিলো না। আন্দ্রিয়াস আমার চোখ-মুখ খুলে দিয়েছিলো।
মজার বিষয় হলো, কোর্সের পরীক্ষা আসলে আন্দ্রিয়াসকে খুঁজে পাওয়া যেতো না। দুই দুইটা কোর্সের একটার ফাইনাল পরীক্ষা ও দেয়নি। কিন্তু ক্লাস করতো প্রতিদিন। প্রশ্ন করতো। —আমি তাজ্যব বনে গেলাম।
ওকে বললাম, তুমি পরীক্ষা দাও না কেন? ও বলতো—পরীক্ষা আমার কাছে বেশ স্ট্রেসফুল একটা কাজ। আমি পরীক্ষা পছন্দ করি না। বললাম, তুমি তো ক্লাস করো। প্রশ্ন করো। বুঝো! —ও বললো, আমি এটা ইনজয় করি! আমি শিখছি, এটাই আসল!
মনে মনে ভাবলাম, তোমার ভাগ্য ভালো তুমি এই দেশে জন্মেছো! ক্লাস করো, প্রশ্ন করো, ইনজয় করো কিন্তু পরীক্ষা দাও না!
এই আন্দ্রিয়াস পরে অর্গানিক কেমেস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট ছেড়ে দিয়ে নিউরোসাইন্সে গিয়েছিলো। সেখানে গিয়ে এডভান্স কোর্স করে। সেগুলো তার আরো ভালো লাগে। পরীক্ষা দেয়। কিন্তু পরীক্ষায় যে খুব ভালো করতো তা না। খুবই ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিলো ও। কিন্তু পরীক্ষা পছন্দ করতো না। পরীক্ষায় ভালো করতো না।
থিসিস করার সময় ওর সুপারভাইজর ওকে খুব পছন্দ করে। পরে সেই ছেলেই নিউরোসাইন্স থেকে পিএইচডি করে ইউসি-বার্কলেতে এসেছিলো পোস্টডক করতে।
আমাদের দেশেও অনেক স্টুডেন্ট পরীক্ষা দিতে পছন্দ করে না। হয়তো কোন বিষয় তার ভালো লাগে না, তাই নাম্বার কম পায়। জিপিএ কম পায়। কিন্তু আমরা কখনো তাদের বুকে কান পেতে শুনিনা—তাদের কি সমস্যা। আমরা তাকে বাতিলের খাতায় ফেলে রাখি!
আহা! সম্পদের কী অপচয়!
৬৫
মানুষের জীবন আসলে একার। মানুষ আমৃত্যু একা। তার খুব ভিতরে সে নিঃসঙ্গ।
মানুষের অনেক গল্প একার। মানুষের অনেক ইচ্ছে একার। অনেক স্বপ্ন একার। অনেক যন্ত্রণা একার।
মানুষ আমৃত্যু সাথী খুঁজে। বন্ধু খুঁজে। নির্ভার হতে চায়। নির্ভরশীল হতে চায়। নিজেকে অন্যের কাছে মেলে দিয়ে বিশ্রাম চায়। কিন্তু তার একাকী গল্প, স্বপ্ন আর দুঃখগুলো বাড়তেই থাকে। আরো একা হতে থাকে।
যে মানুষ নির্জনতার জন্য হাহাকার করে, সে মানুষটা বেশিদিন নির্জন থাকতে পারে না। যে মানুষটা সম্পর্ক ছিঁড়ে একা হতে চায়, সে মানুষটা একাকীত্বের ভার সইতে পারে না বেশিদিন।
মানুষকে তাই মানুষের ভিড়েই থাকতে হয় একা। মানুষকে তাই সঙ্গীর সাথে থেকে হতে হয় নিঃসঙ্গ।
মানুষ তার খুব ভিতরে বৃক্ষের মতোই নিঃসঙ্গ।
৬৬
মানুষের কাঁদা উচিত। কষ্ট পেলেই কাঁদা উচিত। কান্না লুকানো, কান্না চাপানোর কোন মানে নেই।
মানুষ যদি সহজে হাসতে পারে, সহজে কাঁদাও উচিত।
জীবন যন্ত্রণাময়—এটা অস্বীকারের কি আছে? এটাকে লুকানোর কি আছে?
আব্বাকে দেখেছি খুব সহজেই কাঁদতে পারেন। কেউ কাঁদলে আমরা বলি নরম মনের মানুষ। আসলে নরম মনের মানুষ না, সুন্দর মনের মানুষ। আর মানুষের মন কোমল হবে—সেটাই তো স্বাভাবিক। যে মানুষের মন কোমল না, তাকে তো আমরা পছন্দ করি না।
কান্নাকে আমরা পরাজয় হিসেবে দেখি। কান্নাকে আমরা দুর্বলের চিহ্ন মনে করি। এগুলো আমার কাছে অবান্তর মনে হয়।
মানুষ জীবনে কষ্ট পাবে। যন্ত্রণা পাবে। দুঃখ পাবে। —এটাই তো চিরন্তন। মানুষের জন্য দুঃখ তো অনিবার্য। সে রাজা হোক, সম্রাট হোক কিংবা মহামানব হোক। মানুষের সাথে সুখের সম্পর্কই দূরের। সেজন্যই মানুষ সুখের আকাঙ্ক্ষায় থাকে সর্বদা। মানুষ দুঃখের জন্য অপেক্ষা করে না, কারণ দুঃখরা শিরার মতোই নিকটে থাকে। মানুষ সুখের জন্য আয়োজন করে। কারণ সুখ হলো অতিথি। সে প্রতিদিন আসে না। কিন্তু দুঃখের জন্য কি আয়োজন করে? কারণ দুঃখ তো ঘরের মানুষের মতো।
সুখ হলো ফ্যান্টাসি। সুখ হলো ছলনাময়ী। প্রহেলিক। ধাঁধা। সুখ হলো দূরের কেউ—অস্পষ্ট। সেজন্য মানুষ সর্বদা সুখ সুখ করে মরিয়া হয়। সুখের জন্য মানত করে। সুখ কামনা করে। স্রষ্টার কাছে সুখ চায়। কারণ সে জানে, সুখ সহজলভ্য নয়। দুঃখের ভিড়ে সুখ হলো দুর্লভ!
সুতরাং, অনিবার্য দুঃখকে দিনের পর দিন চাপা দেয়া তো আরো কষ্টের। আরো যন্ত্রণার। আরো বিভীষিকাময়!
দুঃখকে মুছে ফেলার একটা উপায় হলো কেঁদে-কেটে বিদায় দেয়া। ঝেড়ে ফেলা। ঝেড়ে ফেলে সামনে চলা।
মানুষের কাঁদা উচিত। মানুষ বুঝুক—কান্না কোন লজ্জা নয়। কান্নাই চিরন্তন ও অনিবার্য। অনিবার্যকে আলিঙ্গন করাই সুন্দর।
৬৭
যার আছে সেও দুখী। যার নেই সেও দুখী। সুতরাং দুঃখ নিয়ে বেঁচো না। দুঃখ করো না।
আমার এক বন্ধুর সন্তান হয় না। দুঃখ করে খুব। অথচ অন্য এক বন্ধুর সন্তান আছে—বিরল রোগে আক্রান্ত!
যার বিয়ে হয়নি, সে ভাবছে জীবনটাই বৃথা। অথচ যে বিয়ে করেছে, সে এখন ডিভোর্সের চিন্তা করছে।
যার অর্থ আছে, তার ঘুম নাই। যার ঘুম আছে, তার ঘর নাই।
অর্থই সুখ নয়। Money is only a tool. It will take you wherever you wish, but it will not replace you as the driver—Ayn Rand.
যার ক্ষুধা আছে, তার খাবার নাই। যার খাবার আছে, তার ক্ষুধা নাই। রুগ্ন—খেতে পারে না।
যে বন্ধু চাকরি করছে, সে শুধু বলে, এই চাকরের জীবনে শান্তি নাই। যার চাকরি নাই, সে বলে বেকারত্ব অভিশাপ!
যে কম বেতন পায় তার আফসোস—সংসারে অভাব! যে বেশি বেতন পায়, তার আফসোস—বেতন দিয়ে জীবন চুষে নেয়!
কারো দেশ থেকে ঘর নাই, কারো ঘর থেকে দেশ নাই।
বুদ্ধ বলেছেন—অপূর্ণতাকে খুঁজলেই দুঃখ আসে। পূর্ণতার দিকে তাকালেই সুখ। —Happy people focus on what they have, unhappy people focus on what’s missing! দুঃখ করো না। দুঃখের সাথে বেঁচো না।
৬৮
পড়াশুনা করতে ইচ্ছে না করলে, কাজ শেখো। ভাষা শেখো। রাজনীতি করে অযথা সময় নষ্ট করো না। নিজেকে নেতার গোলাম করে রেখো না।
তুমি রাজনীতি করো—এটা কোন পরিচয় না। বরং কিছুদিন গেলেই বুঝতে পারবে, তোমাকে ব্যবহার করা হয়েছে। তোমার যৌবনকে, তোমার শক্তিকে ব্যবহার করা হয়েছে। একটা সময় ঠিকই বুঝবে রাজনীতি করে তোমার পেট চলবে না।
গ্রামের অসংখ্য তরুণরা পড়াশুনা করে না। কাজও শেখে না। কাজও করে না। শুধু ঘুরঘুর করে ঘুরে বেড়ায়। পরিচয় দেয়—আমি রাজনীতি করি!
এই রাজনীতি করা ছেলেগুলো একটা সময় গিয়ে ভালো একটা কাজ পায় না। উপার্জন করতে পারে না। কিন্তু যৌবনের উৎকৃষ্ট সময়টাতে আলস্যে কাটায়। না করে পড়াশুনা। না শেখে একটা কাজ। না শেখে একটা ভাষা।
জগতের সবাই যে পড়াশুনা করে উচ্চতর ডিগ্রি নিবে—তা কিন্তু নয়। কিন্তু তোমাকে কিছু একটা শিখতে হবে। যেটা শিখে তুমি নিজের ক্যারিয়ার শুরু করতে পারো। ক্যারিয়ার শুরুর পর তোমাকে প্রতিনিয়ত শেখার আগ্রহ থাকতে হবে।
কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নিতে ইচ্ছে না করলে বই পড়ো। শেখো। দুনিয়ার বহু মানুষ ডিগ্রি ছাড়াই জ্ঞানী হয়েছেন। জ্ঞান অর্জনের জন্য চাই নেশা। আগ্রহ। ইচ্ছাশক্তি। মাথায় বিদ্যা থাকলে দুনিয়ার যে কোন দেশে, যে কোন সময় কাজে আসবে।
পড়াশুনা করতে ইচ্ছে না করলে ভাষা শেখো। তুমি যদি দুই বছর আরবী ভাষা শিখে মধ্যপ্রাচ্যে যাও, তোমার বেতন অন্যদের চেয়ে বেশি হবে। তুমি অন্যদের চেয়ে তাড়াতাড়ি এগিয়ে যেতে পারবে। ইংরেজি ভাষা শেখো। চাইনিজ, কোরিয়ান শেখো। ইলেক্ট্রিক কাজ শেখো। গাড়ির কাজ শেখো। মানুষের আগ্রহ থাকলে মানুষ এক জীবনে বহুকিছু শিখতে পারে।
সারাদিন কম্পিউটার নিয়ে পড়ে থাকে এমন অনেককে দেখেছি মিনিটে ত্রিশ শব্দ টাইপ করতে পারে না। বাংলা টাইপ করতে পারে না। একটা ই-মেইল লিখতে পারে না।
রাজনীতি করে বড়োজোর অন্যের নাম বেঁচে খেতে পারবে। কিন্তু অন্যের নাম বেঁচে খেয়ে লাভ নেই। জীবনের কঠিন সময়ে কোন নেতা থাকবে না। কোন দল থাকবে না। থাকবে শুধু তোমার দক্ষতা। তোমার বাহুবল। নিজের কর্ম বেঁচেই তোমার জীবন চালাতে হবে।
সময় থাকতে নিজের মেধা, নিজের গায়ের শক্তিকে ভবিষ্যতের জন্য ইনভেস্ট করো। সময় গেলে সাধন হবে না।
৬৯
টমাস আলভা এডিসন ছোটবেলায় একদিন স্কুল থেকে বাসায় ফিরলেন। তার হাতে একটা চিঠি। মায়ের হাতে সে চিঠি দিয়ে বললেন—মা, আমার টিচার তোমার হাতে এটা দিতে বলেছেন। এবং তোমাকেই পড়তে বলেছেন।
এডিসনের মা চিঠি হাতে নিয়ে পড়ছেন। তার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়ছে। শিশু এডিসন মা’কে বলছে—মা, তুমি কাঁদছো কেন? চিঠিতে কি লেখা আছে?
এডিসনের মা বললেন—চিঠিতে লিখা আছে, তোমার ছেলে অসম্ভব জিনিয়াস। আমাদের ছোট্ট স্কুল, তোমার ছেলের জন্য উপযুক্ত না। তাকে অন্যত্র শিক্ষা দাও।
তারপর বহু বছর চলে যায়। এডিসন তখন পৃথিবীখ্যাত উদ্ভাবক। সারা দুনিয়াতে তার নাম ছড়িয়ে পড়েছে। তার মা তখন আর বেঁচে নেই। একদিন বাড়ির পুরোনো জিনিসপত্র ঘাটতে গিয়ে ছোটবেলার সেই চিঠিটা এডিসনের হাতে পরে।
সেই চিঠি পড়ে এডিসন হতভম্ব হয়ে পড়েন। মায়ের জন্য কাঁদতে থাকেন। এডিসন দেখেন, তার স্কুল শিক্ষকের দেয়া সেই চিরকুটে লেখা ছিলো—তোমার ছেলে মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন। অমনোযোগী। তোমার ছেলেকে অন্য কোন স্কুলে নিয়ে যাও।
এডিসনের মা শিশু এডিসনকে সেদিন কথাটা ভিন্নভাবে বলেছিলেন। বাচ্চা ছেলের মন ভেঙ্গে যাবে ভেবে মিথ্যে কথা বলেছিলেন। এবং ছেলেকে কিছুদিন স্কুলে না দিয়ে বাসায় রেখে শিখিয়েছেন।
এডিসন পরে তার ডাইরিতে লিখেছিলেন, Thomas Alva Edison was an addled child that, by a hero mother, became the genius of the century.”
ভাষা ও শব্দের ব্যবহার, একজন মানুষকে ধ্বংস করে দিতে পারে। মানসিকভাবে ভেঙ্গে দিতে পারে। মানুষের সাহসকে নষ্ট করে দিতে পারে। আবার সেই ভাষা ও শব্দের ব্যবহারই একজন মানুষকে জাগিয়ে তুলে। এগিয়ে যেতে সাহস দেয়। প্রাণশক্তি জাগায়। অসাধ্যকে সাধন করতে শেখায়।
আপনার সন্তানের সাথে কেমন ভাষা, কেমন শব্দ প্রয়োগ করছেন, সেটা আপনার সন্তানের ভবিষ্যত তৈরি করে দিবে।
“The power of words” বলে একটা বিষয় আছে। আপনাকে শিখতে হবে সেই শক্তিটা কি করে সন্তানের মঙ্গলের জন্য ব্যবহার করবেন।
৭০
আমাদের তরুণরা সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে চায়। তাদের ভিতর যে উচ্ছ্বাস, যে জোয়ার বইছে—সেটা আমাকে মুগ্ধ করে।
পৃথিবী থেকে জ্ঞান-গবেষণা আহরণের জন্য ওদের ভিতর এক প্রচণ্ড নেশা কাজ করছে। ওরা উন্মুখ হয়ে আছে।
স্কুল-কলেজের স্টুডেন্টরা দুনিয়ার বিখ্যাত সব ইউনিভার্সিটির নাম জানে। আমি বিস্মিত হয়ে যাই।
কলেজ পড়ুয়া এক ছাত্র আমাকে ই-মেইল করেছে। সে ম্যাক্স-প্ল্যাংক ইনস্টিটিউটে গবেষণা করতে চায়। আমি তার ই-মেইল পড়ে থ হয়ে গেছি!
এই যে সে স্বপ্ন দেখছে, এটাই তাকে অনেক দূর নিয়ে যাবে। এই বয়সেই যে সে ম্যাক্স-প্ল্যাংক ইনস্টিটিউটের কথা জানে, এটাই তাকে আরো জাগাবে।
আমাদের তরুণরা সারা দুনিয়ার স্টুডেন্টদের সাথে মেধার লড়াই করার যোগ্যতা রাখে। তারা প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে পড়বে। ক্যালটেকে পড়বে। তারা এমআইটি-হার্ভাডে পড়বে। কর্নেল, কলোম্বিয়া, ইউপ্যানে পড়বে। তারা ম্যাক্স-প্ল্যাংক, টোকিও ইউনিভার্সিটি, কিয়োটোতে পড়বে। এরচেয়ে আনন্দের আর কি হতে পারে!
ইউনিভার্সিটি অব প্যানসেলভেনিয়াতে যখন গবেষণা করতে যাই, তখন মনে হতো আমেরিকার স্টুডেন্টরা, ইউরোপের স্টুডেন্টরা আমাদের চেয়ে অনেক মেধাবী! আসলে তা না। ওরা যেই সুযোগ-সুবিধার মধ্যদিয়ে বড়ো হয়, তার সিকিভাগও আমরা পাই না।
ওরা অনেক ভালো শিক্ষক পায়। জাঁদরেল সব গবেষক ওদের পাশ দিয়ে হেঁটে বেড়ায়। বিদ্যুতের কথা ওদের ভাবতে হয় না। ইন্টারনেট নিয়ে ভাবতে হয় না। বাস-ট্রেনের সিট নিয়ে ভাবতে হয় না। হলের সিট নিয়ে ওদের ভাবতে হয় না।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যদি শিক্ষা-গবেষণার মান ভালো হতো, তাহলে আমাদের স্টুডেন্টরা চীন-ভারতের স্টুডেন্টদের মতো দুনিয়া দাপড়িয়ে বেড়াতো। আমাদের ঘুণে ধরা শিক্ষাব্যবস্থাটা যদি বদলাতো, তাহলে আমাদের অসংখ্য তরুণ-তরুণী পৃথিবীর পথে পথে দেশের সৌরভ ছড়িয়ে দিতো। বাংলাদেশটার নাম নতুন করে বুনে দিতো পারতো, পৃথিবীর পড়তে পড়তে।
পৃথিবীর পথে পথে ওরাই তো দেশের এম্বাসেডর! দেশের ব্র্যান্ড।
৭১
আমার এক আত্মীয় সবসময় অন্যদেরকে আন্ডারএস্টিমেইট করত। মানুষকে চোখের সামনে কটাক্ষ করা আর বাড়তি কথা বলা ছিলো উনার এক ভয়ানক অভ্যাস।
দেখা গেলো, উনার মেয়ে এসএসসি পরীক্ষা দিবে। তখন থেকেই শুরু হলো, ওমুক কলেজ ভালো না। তুমুক কলেজে সব ফেইল করা স্টুডেন্টরা পড়ে। আত্মীয়দের মধ্যে যারা যেসব কলেজে পড়ে, সেগুলো একটাও ভালো না।
ওনার মেয়ের যখন কলেজে ভর্তির সময় হলো, তখন দেখা গেলো ভালো কলেজ একটাতেও চান্স হলো না। শেষমেষ, মেয়ে যেই কলেজে ভর্তি হলো, সেটার সুনাম উনার মুখে বেড়ে গেলো। অথচ, মেয়ে ভর্তি হওয়ার আগে, সেই কলেজকে উনি ধুয়ে দিতেন।
ইংরেজিতে একটা বিখ্যাত প্রবাদ আছে, What goes around, comes around! —কর্মের ফল তোমাকে ভুগতে হবে। কর্ম কাউকে ছাড় দেয় না।
কলেজে যেসব স্টুডেন্টদের দেখেছি দিনভর শুধু অন্য স্টুডেন্টদের হেয় করেছে, কটাক্ষ করেছে—তাদের অনেকে আজ মুখ লুকিয়ে চলে। যাকে দেখে মনে হতো দুনিয়াটা উলোট-পালট করে ফেলবে—সে এখনও স্যাটেল হওয়ার চেষ্টা করছে। আর যাকে দেখে মনে হতো জগতের সবচেয়ে ঢিলেঢালা—সেই এখন দুনিয়া দেখে বেড়ায়।
যে ছেলেটা প্রকাশ্যে মেয়েদেরকে বডি শেইমিং করতো, এখন সে তার স্ত্রীর ওজন কমানোর জন্য নিয়মিত ডাক্তারের কাছে দৌঁড়ায়।
এই ক্ষুদ্র জীবনে বহু বন্ধু-বান্ধবের সাথে মিশেছি। দেখেছি। বহু স্টুডেন্ট দেখেছি। সবচেয়ে বড়ো সত্যটা হলো—মানুষকে কখনো জাজ করো না। You never know about tomorrow! Never!
মানুষকে অযাচিতভাবে, অকারণে কটাক্ষ করো না। সেটা তোমার জীবনেই ফিরে আসবে।
যাকে কখনো পাত্তা দাওনি, সেই একদিন তোমার ভাবনাকে চমকে দিবে। আজ যাকে ভাবছো অক্ষম, সে কাল সক্ষম হবে। আজ যে জীবন দৌঁড়ে পিছিয়ে আছে, কাল সে মিছিলের সামনে থাকবে। তোমার চেয়ে অনেক স্মার্ট, অনেক পয়সাওয়ালা, অনেক বুদ্ধিমান, অনেক মেধাবী, অনেক পরিশ্রমী সবসময়ই আছে। সুতরাং, অযাচিতভাবে মানুষকে ছোট করা, হেয় করা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ভাবা—এক প্রকার অসুস্থতা।
বিনয়, মানুষকে বড়ো থেকে আরো বড়ো করে। মিথ্যে অহং, মানুষকে নিচে নামায়।
What goes around, comes around—তোমার কর্ম তোমার কাছেই ফিরে আসবে। সুতরাং ভালো কর্মটাকে বেছে নাও। সেটাকেই ছড়িয়ে দাও।
৭২
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ মার্ক বাড়ান।চ্চশিক্ষার জন্য দেশের সরকারি ব্যাংকগুলোর লোন দেয়া উচিত। এবং ইন্টারেস্ট রেইট হতে হবে খুবই কম।
হাজার হাজার কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার হয়। ঋণখেলাপি হয়। অথচ, অসংখ্য মেধাবী স্টুডেন্ট সামান্য কিছু টাকার জন্য সময় মতো বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারে না।
একটা স্টুডেন্ট যতোই মেধাবী হোক, তাকে জিআরই, টোফেল, আইএলটিএস ইত্যাদি স্ট্যান্ডার্ড পরীক্ষাগুলো নিতে হয়। এগুলোর প্রস্তুতি, পরীক্ষা ফি এবং আবেদন ফি বাবাদ বেশকিছু টাকা খরচ হয়। বহু স্টুডেন্ট টিউশনি করে কিংবা দেশে কিছুদিন চাকরি করে এই টাকাগুলো ম্যানেজ করে। বহু স্টুডেন্টের কাছে ১-২ লাখ এখনো টাকা অনেক টাকা। অথচ, সময় মতো সেই টাকাটা নিজের জন্য ইনভেস্ট করতে পারলে, এক সময় প্রতি মাসেই হয়তো সে ৮-১০ লাখ টাকা আয় করতে পারবে।
দেশে চাকরি করতে গেলে কয়েক বছরের একটা গ্যাপ তৈরি হয়। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার উদ্দ্যেশ্য থাকলে, এই সময়টুকু নষ্ট না করাই সমীচীন। কারণ অনেকের ক্ষেত্রে দেশের ডিগ্রি শেষ করতেই ২-৩ বছর নষ্ট হয়। সেশনজট বা অন্যান্য কারণে। তারপর বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য মুভ করতে ১-২ বছর চলে যায়।
সরকারি ব্যাংকগুলো যদি নিম্নসুদে স্টাডি লোন দেয়, তাহলে অনেক স্টুডেন্ট সময় বাঁচাতে পারবে। তারা অনায়েসে সে লোন একটা সময় শোধ করে দিতে পারবে।
দুনিয়াতে ভালো ঋণ ও খারাপ ঋণ বলে একটা বিষয় আছে। পড়াশুনার জন্য ঋণ হলো ভালো ঋণ। কারণ এরচেয়ে ভালো ইনভেস্টমেন্ট আর নেই।
৭৩
একটা কথা আছে “ধারে না কাটলে ভারে কাটো”।
তোমার ধার না থাকলে ভার থাকতে হবে। তোমার যদি জিপিএ কম থাকে, তাহলে সেটাকে অন্যকিছু দিয়ে পুষিয়ে দিতে হবে।
এটা মনে করার কোন কারণ নেই যে, জিপিএ গুরুত্বপূর্ণ না। জিপিএ অবশ্যই ম্যাটার এবং গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কোন কারণে তোমার যদি ভালো জিপিএ না থাকে, তাহলে তোমাকে অন্যকিছুতে ভালো হতে হবে।
তোমার দক্ষতা থাকতে হবে। যে দক্ষতা দিয়ে তুমি প্রতিষ্ঠানে অবদান রাখতে পারবে।
তুমি ভালো অর্গানাইজার। তুমি ভালো কমিউনিকেটর। তুমি কুইক লার্নার। তুমি খুব সোশ্যাল। তুমি ভালো বক্তা বা প্রেজেন্টর। এগুলো কিন্তু কোয়ালিটি। রিয়েল লাইফে এগুলো অনেক ভূমিকা রাখে।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্যও ভালো জিপিএ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যদি তোমার ভালো জিপিএ না থাকে, তাহলে তোমাকে টোফেল, আইএলটিএস, জিআরই, জিম্যাট ইত্যাদি পরীক্ষায় ভালো স্কোর তুলতে হবে। তোমার SOP (Statement of purpose) হতে হবে ইউনিক। তোমার সিভিতে তুমি অন্যান্য স্কিলের কথা লিখতে পারো। তোমার স্কিল যদি তোমার স্টাডি ফিল্ডের সাথে সম্পৃক্ত হয়, তাহলে এডমিশন কমিটি বুঝবে যে তুমি এইসব স্কিল অর্জন করতে গিয়ে হয়তো ভালো জিপিএ তুলতে পারো নি।
ধার না থাকলে ভার, ভার না থাকলে ধার—কোন একটা লাগবেই।
৭৪
তুমি নিজেই যদি শক্ত হয়ে দাঁড়াতে না পারো, তাহলে অন্যকে তুলতে পারবে না। তোমার নিজের যদি শক্তি না থাকে, অন্যকে কাঁধে নিতে পারবে না। তোমার নিজের যদি অর্থনৈতিক মুক্তি না আসে, তুমি অন্যকে সাহায্য করতে পারবে না। তোমার নিজের যদি বিদ্যা না থাকে, তাহলে অন্যকে বিলাতে পারবে না।
সুতরাং নিজেকে দাঁড় করাতে হবে। নিজেকে বিদ্বান হতে হবে। নিজের অর্থনৈতিক মুক্তি লাগবে। আর এর জন্য প্রয়োজন সময়ের সঠিক ব্যবহার। এর জন্য প্রয়োজন ফোকাস।
নিজের জন্য সময় দাও। এটা স্বার্থপরতা না। এটাই হলো সঠিক পথ। নিজেকে আগে গড়ো ঠিকমতো। গড়ার সময়ে তোমাকে কেউ জানবে না। কেউ চিনবে না। তোমার কথা কেউ শুনবে না। কিন্তু যখন তুমি নিজেকে গড়ে তুলবে, তখন সবাই লক্ষ্য করবে। তোমার একটা ভ্যালু তৈরি হবে।
জগতের সকল সমস্যার সমাধান তুমি করতে পারবে না। সুতরাং সকল সমস্যাকে গায়ে মাখিয়ে সময় নষ্ট করারও কোন অর্থ নেই। কারণ তুমি যদি নিজেকে গড়তে না পারো, জগত তোমাকে কখনোই গড়তে আসবে না। কিন্তু তুমি যদি নিজেকে গড়তে পারো, জগত ঠিকই তোমার কথা শুনতে আসবে।
৭৫
অন্যের নাম ভাঙ্গিয়ে চলবে না। নিজের মূল্য কমে যাবে।
তোমার চাচা ওমুক, তোমার মামা তুমুক—তাতে তোমার কিছুই আসবে না। তোমার জীবন তোমাকেই গড়তে হবে। তোমার পথ তোমাকেই তৈরি করতে হবে। তুমিই তোমার ব্র্যান্ড! তোমার কাজই তোমার পরিচয়।
তুমি কি আইন্সটাইনের মামার নাম জানো? আইনস্টাইনের বাবার নাম? আইনস্টাইনের ছেলে কী করেছে তাতে কি আইনস্টাইনের খ্যাতির কমতি পড়েছে?
আমার এক সহপাঠী আছে যার ফেইসবুকের ফিড আমি দেখিনা। কারণ তার ফেইসবুক ফিডে শুধু অন্যের নাম ভাঙ্গানোর গল্প। অন্যের নামকে বেচে নিজের ওজন বাড়ানোর চেষ্টা। ওমুক নেতাকে শুভেচ্ছা। তুমুক নেতার জন্মদিনে শুভেচ্ছা। ওমুক বড়োভাই এই থানার ওসি—সেজন্য শুভেচ্ছা। তুমুক ছোটভাই প্রমোশন পেয়েছে—সেজন্য শুভেচ্ছা। এগুলোই হলো ওর পোস্ট। ওর সাথে তিন মিনিট কথা বললে, চার মিনিট শুধু অন্যের নাম ভাঙ্গানোর গল্প। ওর নিজের কোন গল্প নেই। তোমার আশেপাশে এমন অনেককেই পাবে।
মানুষ যখন অন্যের নাম বেচে চলে, তখন তার শূণ্যতা স্পষ্ট হয়ে উঠে। সে যে দেউলিয়া—সেটা দৃশ্যমান হয়। মানুষকে বড়ো হতে হয় আত্মপরিচয়ে।
স্টকহোম ইউনিভার্সিটিতে আমার এক সহপাঠী ছিলো যার বাবা ছিলেন লোকাল এমপি। তার সাথে পরিচয়ের অনেকদিন পর প্রসঙ্গত সে তার বাবার পরিচয় দিয়েছিলো। এমন আরো অনেক কলিগ/সহপাঠী পেয়েছি বিদেশে, যাদেরকে কোনদিন পরিবারের পরিচয় বেচে নিজেকে বড়ো করতে দেখিনি।
আত্মপরিচয়ে বড়ো হওয়ার জন্য সংগ্রাম করো।
ঘাসফুল যতোই ছোট হোক, যতোই অনাদরে, অবহেলায় থাকুক—সে তার নিজ সৌন্দর্যেই পরিচিত! গোলাপের পরিচয়ে নয়।
৭৬
লিফা আল মামুনের নাম শুনেছেন? মধ্যযুগের এক জ্ঞানাপিপাসু সম্রাট তিনি। বইয়ের প্রতি ছিলো তার সীমাহীন আগ্রহ। তিনি শিখতে ভালোবাসতেন।
৮১৯ সাল। আল মামুন বাগদাদ দখলে নিলেন। রাজ্যের জ্ঞানীদের ডাকলেন। রাজ্যের সকল পণ্ডিতরা বাগদাদের রাজ প্রসাদে আসলেন। আল মামুন তাদেরকে দুনিয়ার সকল সেরা সেরা বই সংগ্রহের আদেশ দিলেন।
জ্ঞানীদের সম্মান করেন তিনি। রাজ্যের যতো পণ্ডিত আছে তাদের বেতন-ভাতা বাড়িয়ে দিলেন। প্রতি সপ্তাহে রাজ প্রসাদে স্কলারদের সাথে গল্প করেন। আড্ডা দেন। দর্শন, গণিত, বিজ্ঞান—কোন কিছুই বাদ পড়ে না সে আড্ডায়।
কথিত আছে, অনেক যুদ্ধে শত্রুদের হারিয়ে তিনি তাদের কাছ থেকে সোনা-জহরত নেননি। তার বদলে শত্রুর লাইব্রেরি থেকে বই নিয়েছেন। শত্রুর কাছে বই দাবি করেছেন।
আল মামুন জানতেন, গ্রিকদের কাছে আছে জ্ঞানভাণ্ডার। পারস্যে, ভারতে, চীনে আছে জ্ঞানভাণ্ডার। সেসব ভাণ্ডার থেকে জ্ঞান আহরণ করতে হবে। আর তার জন্য চাই নিজের ভাষা আরবিতে অনুবাদ। তিনি এমন মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন যে তিনি চাইতেন পৃথিবীর সকল বই সংগ্রহ করে একই ছাদের নিচে রাখবেন। তারপর সেগুলো আরবিতে অনুবাদ করা হবে। এবং পণ্ডিতগণ সেসব বই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়বেন।
তার সেই স্বপ্ন থেকেই সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো বাইত আল-হিকমা অথবা হাউজ অব উইজডম।
সে সময়ের সবচেয়ে খ্যাতিমান অনুবাদক ছিলেন হুনাইন ইবনে ইসাক। তিনি ছিলেন খ্রীস্টান ধর্মে বিশ্বাসী। কিন্তু রাজা আল মামুন তাকে বেছে নিয়েছিলেন তার মেধার জন্য। মাত্র ১৭ বছর বয়সে, হুনাইন ইবনে ইসাক বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক গেইলেনের বই অনুবাদ করেছিলেন। গ্রিক ও আরবি ভাষায় ছিলো তার দক্ষতা। কথিত আছে, হুনাইন ইবনে ইসাকের কাজের ব্যাপ্তির কারণে আল মামুন তাকে বাইত আল-হিকমার গুরুদায়িত্ব পর্যন্ত দিয়েছিলেন।
খলিফা আল মামুনের পৃষ্ঠপোষকতায় সে সময়ের বহু দার্শনিক, গণিতবিদ, বিজ্ঞানী ও আলকেমিরা জগৎখ্যাত হয়েছিলেন। তার করে যাওয়া কাজের ধারবাহিকতায় ও গড়ে তোলা সংস্কৃতির রেশ ধরে তৈরি হয়েছিলো আরো বহু দার্শনিক ও বিজ্ঞানীর।
আল মামুনের মতো এমন বই প্রিয়, জ্ঞানপিপাসু সম্রাট আর আসেনি। তেমন রাজারই বড়ো প্রয়োজন এখন।
৭৭
১৯১৯ সাল ছিলো বিজ্ঞানের ইতিহাসের এক উজ্জ্বলতম বছর। বৃটিশ বিজ্ঞানী আর্থার এডিংটন পৃথিবী আলোড়নকারী এক এক্সপেরিমেন্ট করে ঘোষণা দিলেন—আলবার্ট আইনস্টাইনের রিলেটিভিটি থিওরি প্রমাণিত!
যে আইনস্টাইনকে নির্দিষ্ট কিছু মানুষ চিনতো, সে আইনস্টাইন রাত পোহাতেই পৌঁছে গেলেন পৃথিবীর ঘরে ঘরে। দুনিয়ার সংবাদপত্রগুলো তাকে নিয়ে উঠে-পড়ে লাগলো। মানুষ বলতে লাগলো—দ্যা ম্যান অব এ ট্রু সাইন্টিফিক প্রফেট!
সে জোয়ার এসে আছড়ে পড়লো দূর দক্ষিণের বাঙলায়। প্রেসিডেন্সি কলেজের কয়েক তরুণকে ছুঁয়ে গেলো এক তরঙ্গ—আইনস্টাইনিয় তরঙ্গ। সে যুবকদের নাম সত্যেন্দ্রনাথ বোস, মেঘনাদ সাহা এবং জ্ঞান ঘোষ! একই ব্যাচের ছাত্র তাঁরা।
সত্যেন্দ্রনাথ বোস বিএসসি-তে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম। কিন্তু এমএসসি-তে প্রথম হয়ে গেলেন দুইজন—বোস এবং সাহা! এই তরুণরা তখন বিজ্ঞানের নেশায় বুঁদ হয়ে আছেন। তাদের মগজ জুড়ে বাসা বেঁধেছে আইনস্টাইন, নীলস বোর, ডি ব্রগলি, মারি কুরি, ম্যাক্স প্লাংক, রাদারফোর্ড, বোল্টজম্যান প্রমুখ। সাহা লক্ষ্য করলেন, বিজ্ঞানের সকল ভালো ভালো আর্টিকেল জার্মান ভাষায় প্রকাশিত হচ্ছে। সুতরাং সেসব আর্টিকেল পড়তে হলে জার্মান ভাষা জানা জরুরি।
তিনি নিজে চেষ্টায় জার্মান ভাষা শিখলেন। সেই জ্ঞান দিয়ে ছাব্বিশ বছরের মেঘনাদ, তাঁর বন্ধু সত্যেনকে নিয়ে আইনস্টাইনের বই ইংরেজিতে অনুবাদ করলেন—প্রিন্সিপলস অব রিলেটিভিটি! What a tallented fellow! তাদের বইয়ের মাধ্যমে, ভারতবর্ষ আইনস্টাইনকে চিনলো নতুন করে।
১৯১৯ সাল যেমন আইনস্টাইনের বছর, তেমনি মেঘনাদ সাহার জন্যও ছিলো উজ্জ্বলতম। সাহা দেখলেন, আকাশের নক্ষত্রদেরকে চিহ্নিত করতে স্পেক্ট্রোসকপি ব্যবহৃত হচ্ছে। একেক নক্ষত্র, একেক ধরণের স্পেকট্রা (বর্ণালী) দেয়। সুপারমার্কেটের প্রতিটি পণ্যের জন্য যেমন নির্দিষ্ট একটা বারকোড আছে, কতগুলো কালো কালো লাইন দিয়ে যেমন প্রতিটি পণ্যকে আলাদা করা যায়, ঠিক তেমনি স্পেকট্রা হলো ফিঙ্গারপ্রিন্ট। একেকটি নক্ষত্র থেকে একেকধরণের স্পেকট্রা পাওয়া যায়।
মেঘনাদ সাহা ভাবলেন, এই স্পেকট্রার সাথে তাপমাত্রার একটা সম্পর্ক আছে। তাপমাত্রার কম-বেশির সাথে পরমাণুর আয়নীকরণের (আয়োনাইজেশন) সম্পর্ক নিবিড়, আর সে আয়নিকরণের সাথে আছে স্পেকট্রার সম্পর্ক। তিনি সমীকরণ দাঁড় করালেন। সে সমীকরণের নাম হয়ে গেলো “সাহা আয়োনাইজেশন ইকোয়েশন”। সেই সমীকরণ সহসাই মহাকাশবিজ্ঞানীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠলো। সাহা সমীকরণ দিয়ে নক্ষত্রের তাপমাত্রা ও গঠন সম্পর্কে বহু তথ্য পাওয়া সহজ হয়ে গেলো।
কুড়ি শতকের উষালগ্নে বিজ্ঞানের আকাশে উজ্জ্বলতম তিন বাঙালী নক্ষত্রের আবির্ভাব হয়েছিলো। জানি না সেসব নক্ষত্রদের কথা কিশোর-তরুণদের পাঠ্য বইয়ে স্থান পায় কিনা।
(মেঘনাদ সাহাকে নিয়ে জনপ্রিয় মার্কিন তরুণ লেখক স্যাম কিন “A Forgotten Star” শিরোনামে একটি লেখা লিখেছেন।
৭৮
৩৩ আর ৩৫ এগুলো সম্ভবত ১০০ বছর পুরোনো। আনফরচুনেটলি, দুনিয়াতে এই নম্বরে পাশ চলে না। দেশের বাইরে ৫০-৬০% পাশ নম্বরে পরীক্ষা দিয়েছি। ৫০%-এর নিচে কোন পাশ নম্বর আমি পাইনি। কোন কোন ফিল্ডে আরো বেশি।
প্রশ্নের পদ্ধতিটা হতে হবে এমনভাবে যেনো ক্রিটিক্যাল থিংকিং বাড়ে। অল্প পড়লেও যেনো স্টুডেন্টরা বিষয়টার খুব ভিতরে ঢুকতে পারে। ভিন্নভাবে ভাবার সুযোগ পায়। ওপেন বুক পরীক্ষা নেয়ার চর্চাটা বাড়াতে হবে।
প্রশ্ন পত্রে অল্টারনেটিভ অপশন রাখা, এই বিষয়টাও আমি দেশের বাইরে দেখিনি। সব ফিল্ডের কথা যদিও জানি না।
প্রশ্ন দশটা থাকলে, দশটাই উত্তর দিতে হয়েছে। দশটার মধ্যে ছয়টা উত্তর দাও এমন পাইনি।
পরীক্ষা পদ্ধতির মাণদণ্ডটা না বাড়ালে, বৈশ্বিক মাণদণ্ডে আমাদের ছাত্রদের মানও কিন্তু কমে যায়। ফলে স্টুডেন্টদেরকে পোস্ট-ইউনিভার্সিটি লাইফেও অনেক সংগ্রাম করতে হয়।
যত সহজে পাশ ততো কঠিন ভবিষ্যৎ! এটাই ইউনিভার্সাল।
৭৯
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ডিপার্টমেন্টে গণহারে স্টুডেন্ট ভর্তি করানো হয়। —এটা বন্ধ করা যায় না?
বহু ডিপার্টমেন্ট আছে, যেখানে ফেইল করাই কঠিন। ক্ষমা করবেন, আমি কোন ডিপার্টমেন্টকে ছোট করার জন্য বলছি না। কিন্তু এটা বাস্তব।
যুগ এবং বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ডিপার্টমেন্টগুলোর গুরুত্ব গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। ১০০ স্টুডেন্ট ভর্তি করলে, সেটা ৫০-এ নামিয়ে আনুন। অধিক স্টুডেন্ট ভর্তির কারণে, আবাসন সমস্যা হয়। ছাত্ররা দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হয়। বছর শেষে দশটা প্রশ্ন পড়লে ছয়টা কমন পড়ে। ১০০ তে যদি ৮০ নম্বরও উত্তর দেয়া যায়, তাহলে ৪০ পেলে পাশ। এই বিষয়গুলো বদলের চিন্তা করতে হবে।
স্টুডেন্টদেরকে ব্যস্ত রাখার অর্থই হলো, রাষ্ট্রীয় সম্পদের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া। এটা আমাদের নীতিনির্ধারকগণ বুঝেন না।
বিভিন্ন অনুষদে টেকনিক্যাল নলেজ এবং ট্রেইনিং ব্যবস্থা করা যেতে পারে। শুধু থিউরি না পড়িয়ে, প্রশিক্ষণ ভিত্তিক কোর্স চালু করা যেতে পারে। পুরো কোর্সটাই হবে প্রশিক্ষনের উপর ডিজাইন করা।
কম্পিউটারে অফিস প্রোগ্রাম শেখা, ওয়েবসাইট তৈরির নলেজ, ডেটা এনালাইসিস, ইন্টারপ্রিটেশন ও প্রেজেন্টেশন স্কিল, রাইটিং স্কিল, ভিডিও এডিটিং, স্টক মার্কেট এনালাইসিস নলেজ—এমন বিষয়গুলো হলো বাজারের চাহিদা ভিত্তিক ট্রেইনিং। স্টুডেন্টরা কোন ডিপার্টমেন্টে পড়লো, সেটা বিষয় না। এগুলো কিন্তু লাগেই।
ভিনদেশি ভাষার উপর অনেক কোর্স থাকা উচিত। রিপিটেড কোর্স। সামান্য ভাষা জানলে দুনিয়ার অনেক দেশে পড়াশুনার সুযোগ বেড়ে যায়। যেমন, আপনি বেসিক জার্মান জানলে, জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেতে সহজ হয়ে যাবে। এরাবিক, জার্মান, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ, চাইনিজ, কোরিয়ান, জাপানিজ—এই ভাষাগুলো বাংলাদেশের স্টুডেন্টদের জন্য অনেক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিবে।
উদাহরণ সরূপ, একটা স্টুডেন্ট পলিটিক্যাল সাইন্স পড়ুক। কিন্তু তাকে চার বছরে চার’শ নম্বরের ভিন্ন ভাষার কোর্স রিকোয়ারমেন্ট দিয়ে দিন। (ভাষা শিক্ষা ইনস্টিটিউটে ডিপার্টমেন্ট থাকে সেটা জানি।) চারশ নম্বরের ভিন দেশি ভাষার উপর স্লট থাকলো। যে যার পছন্দমত ভাষা বাছাই করে সেই চারশ নম্বরের ক্রেডিট সম্পন্ন করলো। তাইলে অনার্স শেষ করে আলাদা করে তাকে ১ বছর সময় দিয়ে, টাকা খরচ করে অন্য ভাষা শিখতে হলো না। সময় ও অর্থ দুটাই বাঁচলো।
ধরুন, একটা স্টুডেন্ট পাঁচ-ছয় বছর ধরে ইউনিভার্সিটি থেকে পলিটিক্যাল সাইন্সে পড়ে অনার্স-মাস্টার্স সার্টিফিকেট নিলো। ভালো রেজাল্টও করলো। কিন্তু একাডেমিক কোর্সের বাইরে তার আর কোন স্কিল নাই।
পাশাপাশি আরেকটা স্টুডেন্ট, একই সময় ব্যায় করে, সার্টিফিকেট পেলো। দুইটা ভাষা শিখতে পারলো। কম্পিউটার অফিস প্রোগ্রাম, ডেটা এনালাইসিস ও প্রেজেন্টেশন স্কিল ইত্যাদি শিখতে পারলো। তাহলে চাকরির বাজারের চাহিদায় কোন স্টুডেন্ট এগিয়ে থাকবে?
একাডেমিক কোর্স ডিজাইনের সময় এভাবেই চিন্তা করতে হয়। বাজারের চাহিদা বিবেচনা করে কোর্স কারিকুলাম ডিজাইনের চিন্তা করতে হবে।
৮০
ইউনিভার্সিটির শুরু থেকেই কয়েকটা বিষয় চর্চা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ:
এক. প্রেজেন্টেশন স্কিল। তুমি কোন সাবজেক্টে পড়ো সেটা বিষয় না, তোমার প্রেজেন্টেশন স্কিল সারা জীবনের সম্পদ। দেশের পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স করেও, কখনো একটা প্রেজেন্টেশন দেই নি। আর এখন প্রতি সপ্তাহে একাধিক প্রেজেন্টেশন দিতে হয়। সাইন্টিফিক রিসার্চে যারা ক্যারিয়ার গড়বে, তাদের জন্য প্রেজেন্টেশন স্কিল অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ। অন্যান্য ফিল্ডের জন্যও।
প্রেজেন্টেশন হলো কমিউনিকেশন স্কিলের একটা অংশ। প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে একজন মানুষ তার কাজ, তার সৃষ্টি, তার ভাবনাকে অন্যের কাছে তুলে ধরে। নির্দিষ্ট সময়ে, একটা অডিয়েন্সকে একটা ভালো প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে কনভিন্স করা—সহজ কোন বিষয় না। আমেরিকায় অনেক ইন্টারনেশনাল স্টুডেন্ট ভালো জব পায় না, এই প্রেজেন্টেশন স্কিলের অভাবে।
ইউনিভার্সিটির প্রথম বর্ষ থেকে এই স্কিল গড়ে তোলার চেষ্টা করো। নিজে নিজে করো। বন্ধুরা মিলে গ্রুপ করে করো। চর্চা করে যাও। সারা জীবন কাজে আসবে। কাঁচা বয়স থেকে এটার ভিত শক্ত না করলে, পরে গিয়ে ভালো দক্ষতা অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ে। আমি নিজে খুব আফসোস করি, কেন ইউনিভার্সিটির প্রথম বর্ষ থেকে এই দক্ষতা অর্জনের চর্চা করিনি।
দুই. ভাবনার দক্ষতা। এই স্কিলটাও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সবাই ভাবতে পারি না। মনে হতে পারে আমরা সবাই ভাবি। কিন্তু আসলে সবাই ভাবতে পারে না। এই ভাবনা হলো ক্রিটিক্যাল থিংকিং। ইনোভেটিভ থিংকিং। থিংকিং এবাউট নিউ আইডিয়া। —এই স্কিলটা একজন মানুষকে বহুদূর নিয়ে যায়।
দেশে পড়াশুনার করার সময় এই বিষয়টা উপলব্ধি করতে পারিনি। সেভাবে কেউ বলেও নি কখনো। ইনোভেটিভ থিংকিং কতো পাওয়াফুল, সেটা উপলব্ধি করতে পেরেছি বিদেশে আসার পর। তোমার ভিতর যদি ইনোভেটিভ থিংকিং পাওয়ার থাকে, তোমার ক্যারিয়ার হবে খুবই শক্তিশালী। যেই এরিয়াতেই কাজ করো না কেন।
ইউনিভার্সিটির শুরু থেকেই এই ধরণের ভাবনার চর্চা করতে হয়। থিংক ডিফরেন্টলি। ভিন্নভাবে ভাবা। ভিন্নভাবে চিন্তা করা। ছোট হোক আর বড়ো হোক, নতুন আইডিয়া নিয়ে ভাবো। এটা একটা চর্চার বিষয়। এই স্কিল সারাজীবনের পুঁজি। যেই দেশেই কাজ করো না কেন।
তিন. ইনভেস্টমেন্ট নলেজ। তুমি কবি হও, লেখক হও, বিজ্ঞানী হও কিংবা কর্পোরেট জব করো—টাকা মানুষের জীবনের অপরিহার্য বিষয়। তাই ইনভেস্টমেন্ট সম্পর্কে ভালো জ্ঞান থাকা—সারাজীবনের জন্য পুঁজি। তোমার হাতে টাকা না থাকলেই যে ইনভেস্টমেন্ট নলেজ রাখা যাবে তা কিন্তু না। তুমি তো সারাজীবন অনেক কিছুই পড়ছো, যেটা কোন কাজেই আসে না। পরীক্ষা দিচ্ছো, যেগুলো শুধু পাশের জন্য। তাহলে শুধু টাকা থাকলেই ইনভেস্টমেন্ট নিয়ে জানতে হবে—এমন ভাবনার কোন কারন নেই।
দেশে থাকার সময় শুনতাম, মানুষ শেয়ার বাজারে নিঃস্ব হয়েছে। —কেন নিঃস্ব হয়েছে? কারণ, তাদের নব্বইভাগ শুধু অন্যের কথা শুনে গিয়ে টাকা ঢালে। শেয়ার মার্কেট কোন ছোটখাটো বিষয় না। এটা নিয়ে শিখেই জীবন পার করে দেয়া যায়। মানুষ যেমন পরীক্ষায় ভালো করার পরও ভালো চাকরি পায় না, তেমনি ইনভেস্টমেন্ট নলেজ থাকার পরও যে তুমি টাকা হারাতে পারো না তা কিন্তু নয়। তবে সম্ভাবনাটা অনেক কমে যায়। জ্ঞানের উদ্দেশ্য কি? —জ্ঞানের একটা উদ্দেশ্য হলো রিস্ক ফ্যাক্টর কমানো। যে যতো জানে, তার রিস্ক ফ্যাক্টর ততো কম।
তুমি কোন স্কিলটার জন্য সময় দিচ্ছো, কমেন্টে জানাও। এই নলেজগুলো না থাকায় কি কখনো সমস্যায় পড়তে হয়েছে?
গ্রামীণ বিজ্ঞান শিক্ষার (STEM Education) পরিবর্তনে আমি কাজ করবো, এটাই আমার দীর্ঘ মেয়াদী লক্ষ্য।