কুমড়ার বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচার গল্প

​আজকের সুস্বাদু ও মিষ্টি কুমড়ার সূচনা কিন্তু মোটেও মিষ্টি ছিল না। লক্ষ লক্ষ বছর আগে বন্য স্কোয়াশ বা প্রাচীন কুমড়ার স্বাদ ছিল প্রচণ্ড তিক্ত।

​পাহাড়সম প্রাণীদের প্রিয় খাদ্য

বন্য কুমড়ায় উপস্থিত ছিল 'কুকুরবিটাসিন' (Cucurbitacin) নামের এক ধরনের বিষাক্ত ও অত্যন্ত তিতা রাসায়নিক যৌগ। ছোট ছোট প্রাণী কিংবা স্তন্যপায়ী জীবের পক্ষে এই ফল খাওয়া ছিল অসম্ভব ও বিপজ্জনক। কিন্তু বিশালাকৃতির মেগাফওনা (Megafauna)—যেমন উলি ম্যামথ, গ্যাংট স্লথ (দৈত্যাকার স্লথ) ও প্রাচীন মাস্টোডনদের বিশাল শরীরের সামনে এই তিতকুটে স্বাদ কোনো বাধা হতে পারেনি। তারা অনায়াসে আস্ত কুমড়া চিবিয়ে খেয়ে ফেলত। তাদের পরিপাকতন্ত্রে তিতা যৌগটির কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পড়ত না, বরং বীজগুলো না হজম হয়ে মলের সাথে দূর-দূরান্তে অক্ষত অবস্থায় ছড়িয়ে পড়ত। এভাবে বিশালকায় প্রাণীদের মাধ্যমেই বন্য কুমড়া এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বংশবৃদ্ধি করত।

​প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও বীজ ছড়ানোর মাধ্যম বিনাশ

প্রায় ১০,০০০ থেকে ১২,০০০ বছর আগে পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে উত্তর আমেরিকার পরিবেশ দ্রুত বদলাতে শুরু করে। মানুষের শিকার বৃদ্ধি ও আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে ম্যামথ ও দৈত্যাকার স্লথের মতো মেগাফওনা প্রাণীগুলো পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। বড় তৃণভোজী প্রাণীরা হারিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে প্রাচীন বন্য স্কোয়াশের প্রাকৃতিক বীজ ছড়ানোর প্রধান মাধ্যমটি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। ফলে মিষ্টি কুমড়ার পূর্বপুরুষেরা ধীরে ধীরে সংখ্যায় কমতে থাকে এবং প্রাকৃতিক নিয়মে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়।

​মানুষের হাত ধরে বেঁচে ফেরা

প্রকৃতির এই চরম সংকটের মুখে উদ্ধারকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয় মানুষ। প্রাচীন উত্তর আমেরিকার আদিবাসীরা খেয়াল করে যে এসব তিতা ফলের শক্ত খোসা শুকিয়ে চমৎকার পাত্র, জপযন্ত্র ও পানির পাত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়। প্রথমে ব্যবহারের সুবিধার জন্য মানুষ বন্য স্কোয়াশ সংগ্রহ ও রোপণ করা শুরু করে।

​পরবর্তীতে কৃত্রিম প্রজনন ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চাষিরা এমন কিছু কুমড়ার প্রজাতি বেছে নিতে থাকে, যেগুলোতে তিতা রাসায়নিক 'কুকুরবিটাসিন'-এর পরিমাণ কম ছিল। কয়েক শতাব্দী ধরে ধাপে ধাপে চাষাবাদ করার ফলে তিতকুটে বন্য স্কোয়াশ বদলে গিয়ে তৈরি হয় আজকের মিষ্টি, পুষ্টিকর ও সুস্বাদু কুমড়া। বিশালকায় ম্যামথেরা প্রজাতিটিকে অতীতে বাঁচিয়ে রাখলেও, শেষ পর্যন্ত মানুষের চাষাবাদের ফলেই কুমড়া আজও টিকে রয়েছে।

​কুমড়ার এই ইতিহাস ও মেগাফওনা প্রাণীদের সাথে এর অদ্ভুত সম্পর্ক নিয়ে আপনার আর কোনো নির্দিষ্ট তথ্য জানার আছে কি?—