২২
সামান্য ক্ষমতা মানুষকে কতটা বদলে দিতে পারে..
তুফানি বৃষ্টির মধ্যে একজন ডেলিভারি রাইডার খাবার নিয়ে একটা বিল্ডিংয়ের বেসমেন্ট পার্কিংয়ে পৌঁছাল। বাইরে তখন তীব্র শিলাবৃষ্টি। গ্রাহক বারবার কল করছে। কিন্তু রাইডার যেই ভেতরে ঢুকতে গেল, গেটে দাঁড়ানো ৫,০০০ টাকা মাইনের সিকিউরিটি গার্ড ব্যালান্স বার নামিয়ে দিয়ে বলল — "ডেলিভারি বাইক ভেতরে যাবে না।"
রাইডার হাত জোড় করে বলল, "ভাই, বাইরে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। শুধু খাবারটা দিয়ে ফিরে আসব।"
গার্ড বলল, "ভেতরে যেতে হলে আমার QR কোডে ৫০ টাকা দাও, সিকিউরিটির নামে।"
ভিজতে ভিজতে রাইডার দাঁড়িয়ে রইল। গ্রাহক ফোনে গালিগালাজ করছিল, আর গার্ড তার এই অসহায়তা দেখে মুচকি হাসছিল।
এই সেই একই গার্ড, যে ৬ মাস আগে গ্রাম থেকে এসেছিল এবং কনস্ট্রাকশন সাইটে ঠিকাদারের গালিগালাজ চুপচাপ সহ্য করত। কিন্তু এখন হাতে একটা রিমোট আর সামান্য একটু ক্ষমতা পেয়েই নিজেকে পার্কিংয়ের রাজা ভাবতে শুরু করেছে।
তার সবচেয়ে বেশি আনন্দ হয় তখনই, যখন ভিজে কাঁপতে থাকা ডেলিভারি ছেলেরা তার কাছে অনুনয়-বিনয় করে, সিগারেট অফার করে — আর তার মুখে ফুটে ওঠে মালিকসুলভ অহংকারী হাসি।
এটাই এই গল্পের সবচেয়ে তেতো সত্য —
আপনাকে পিষে ফেলা বা পদদলিত করা মানুষটা সবসময় কোনো বড় ব্যবসায়ী হয় না। অনেক সময় সামান্য একটু ক্ষমতা পাওয়া অন্য কোনো দরিদ্র মানুষই তা করে থাকে।
মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় **"স্ট্যানফোর্ড প্রিজন ইফেক্ট"** — অর্থাৎ দীর্ঘদিন চেপে রাখা বা নির্যাতিত কোনো মানুষকে সামান্য অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা দিলে, সে তার ওপরের মানুষদের সাথে লড়াই করে না — বরং নিজের চেয়ে দুর্বল মানুষদের ওপর সেই একই জুলুম ১০০ গুণ বাড়িয়ে প্রয়োগ করে।
**এমন মানসিকতার মানুষদের সামলানোর দুটো উপায়:**
**১.** তর্ক করবেন না, কাঁদবেন না — আপনার চোখের জল তার মিথ্যা অহংকারকেই আরও বাড়িয়ে তুলবে।
**২.** সরাসরি গ্রাহককে কল করে বলুন — "আপনার ডেলিভারি এসে গেছে, কিন্তু গার্ড ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না, আপনি নিজে একটু কথা বলে নিন।" সমস্যাটা সরাসরি সেই মানুষের কাছেই ফেলে দিন, যে এটা ঠিক করতে পারবে। @ gayan
২৩
আপনি কি সারাক্ষণ ভয়ে থাকেন পাছে কেউ আপনার ওপর রাগ করে ফেলে? সবাই আপনাকে "খুব লক্ষ্মী", "খুব ভালো মানুষ" বলে প্রশংসা করে কিন্তু ভেতরে ভেতরে আপনি চরম একা আর ক্লান্ত বোধ করেন?
সাইকোলজিতে এই অভ্যাসকে বলা হয় People Pleasing (সবাইকে সন্তুষ্ট রাখার প্রবণতা)।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এটি কোনো সাধারণ স্বভাব নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি ছোটবেলার Fear of Rejection (প্রত্যাখ্যানের ভয়) বা Fear of Abandonment (পরিত্যক্ত হওয়ার ভয়) থেকে তৈরি হয়। ছোটবেলায় হয়তো আমাদের অবচেতন মনে এই ধারণা ঢুকে গেছে যে—নিজের মতামত বা কষ্ট প্রকাশ না করে অন্যকে খুশি রাখলেই আমি ভালোবাসা পাব।
একটি বাস্তব উদাহরণ বা গল্প:
অনন্যা বন্ধুদের আড্ডায় বসেছে। সবাই মিলে প্ল্যান করল রাতে একটি হরর সিনেমা দেখতে যাবে। অনন্যা হরর সিনেমা প্রচণ্ড ভয় পায় এবং তার দেখতে একদম ইচ্ছা করছে না।
কিন্তু বন্ধুরা যখন তাকে জিজ্ঞেস করল, সে তার ভয়ের কথা বা অসম্মতির কথা প্রকাশই করল না। পাছে বন্ধুরা তাকে "বোরিং" ভাবে বা আড্ডা থেকে বাদ দিয়ে দেয়, তাই সে মিথ্যা হেসে বলল, "হ্যাঁ হ্যাঁ, দারুণ আইডিয়া! চল যাই!"
পুরো সিনেমা জুড়ে অনন্যা প্যানিক অ্যাটাকের মতো চরম আতঙ্কে ভুগল এবং দিনশেষে নিজেকে খুব অসহায় মনে হতে লাগল।
এখানে আসলে কী ঘটছিল?
অনন্যা নিজের মৌলিক আবেগ ও স্বাচ্ছন্দ্যকে বিসর্জন দিল শুধু অন্যের চোখে "ভালো" বা "একসেপ্টেড" হওয়ার জন্য। পিপল প্লিজিং মানুষকে ধীরে ধীরে নিজের আসল সত্তা (True Self) থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
পিপল প্লিজিং বন্ধ করার উপায়:
১. সবাই আপনাকে পছন্দ করবে না, এবং সেটা স্বাভাবিক: পৃথিবীর সবাইকে একসাথে খুশি রাখা অসম্ভব। আপনার ব্যক্তিত্ব সবার পছন্দ নাও হতে পারে, এতে আপনার মূল্যে কোনো কমতি হয় না।
২. পজ (Pause) দিতে শিখুন: কেউ কিছু অনুরোধ করলে সাথে সাথে "হ্যাঁ" না বলে একটু সময় নিন। বলুন "আমি একটু ভেবে জানাচ্ছি।"
৩. নিজের মতামত প্রকাশে ভয় পাবেন না: আপনার ভালোলাগা-মন্দলাগার মূল্য আছে। প্রকৃত বন্ধুরা আপনার সততাকে সম্মান করবে, কেবল আপনার "হ্যাঁ"-কে নয়।
মনে রাখবেন: অন্যকে খুশি করতে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলার চেয়ে নিজের কাছে সৎ থাকা অনেক বেশি শান্তির!
ফারিয়া মাহযাবিন নোভা
২৪
স্ক্রিনের বাইরে গেলেই কেন সেরা আইডিয়া আসে বিজ্ঞান কী বলছে জানতে পুরো পোস্টটা পড়ে ফেলুন
মাথা যেন ডাস্টবিন ─ নিস্তেজ নিষ্ক্রিয়
আপনি কি লক্ষ্য করেছেন সারাদিন ফোন ঘাঁটার পরও মাথায় নতুন কোনো আইডিয়া আসে না। অফিসের কাজ হোক বা নিজের ব্যবসার প্ল্যান সব জায়গায় মাথা কেমন যেন বন্ধ হয়ে থাকে। এর কারণ আপনার মস্তিষ্ক এক সেকেন্ডের জন্যও ফাঁকা সময় পায় না। খাওয়ার সময় রিলস দেখা। বাসে বসে স্ক্রল করা। ঘুমানোর আগেও চোখ ফোনে গাঁথা। মাথাকে জল খাওয়ার মতো একটু বিরতিও দেওয়া হয় না।
মস্তিষ্কের লুকিয়ে থাকা সুইচ
গবেষণা বলছে মস্তিষ্ক হঠাৎ সম্পূর্ণ নিস্তব্ধতা বা ফাঁকা সময় পেলে একটা বিশেষ নেটওয়ার্ক সক্রিয় হয়ে ওঠে যাকে বলা হয় ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক। এই সময়েই মাথা নিজে থেকে অতীতের অভিজ্ঞতা আর ভবিষ্যতের সম্ভাবনা জোড়া লাগিয়ে নতুন সমাধান তৈরি করে। মানে স্নান করার সময় বা হাঁটার সময় হঠাৎ যে দারুণ আইডিয়া মাথায় আসে সেটা কোনো ম্যাজিক না এটা বিজ্ঞান।
অদ্বৈতর গল্প
অদ্বৈত অফিসের একটা প্রজেক্ট নিয়ে দুই সপ্তাহ ধরে মাথা ঘামাচ্ছিল। ইউটিউব দেখেও কোনো লাভ হয়নি। একদিন ফোনের চার্জ শেষ হয়ে গেল বাসে বসে। বিরক্ত হয়ে জানালার বাইরে চুপচাপ তাকিয়ে ছিল প্রায় কুড়ি মিনিট। হঠাৎ মাথায় পুরো সমাধানটা স্পষ্ট হয়ে গেল। ফোন বন্ধ থাকাটাই তার সবচেয়ে বড় উপকার করে দিল।
মস্তিষ্ক বিনা বেতনের চাকুরে
আমরা ফোনকে এত ভালোবাসি যে বাথরুমেও সঙ্গে নিয়ে যাই কিন্তু নিজের মাথাকে পাঁচ মিনিট একা থাকতে দিই না। অথচ মাথাটাই আপনার সবচেয়ে দামি অফিস যেটা বিনা বেতনে চব্বিশ ঘণ্টা কাজ করতে রাজি শুধু একটু নিরবতা চায়।
সৃষ্টিশীল হয়ে ওঠার গোপন ফর্মুলা
প্রথমত দিনে অন্তত পনেরো মিনিট ফোন দূরে রেখে চুপচাপ বসুন।
দ্বিতীয়ত হাঁটার সময় ইয়ারফোন খুলে রাখুন।
তৃতীয়ত ঘুমানোর আগে স্ক্রিন বন্ধ করে চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকুন। এই ছোট্ট অভ্যাসই আপনার মাথায় বড় আইডিয়ার দরজা খুলে দিতে পারে।
আপনার মতামত দিন
আপনি কি সারাদিনে কখনো সম্পূর্ণ চুপচাপ একা সময় কাটান । আপনি যখন চুপচাপ থাকেন তখন আপনার মস্তিষ্ক কি কথা বলতে থাকে, সৃষ্টিশীল হয়ে ওঠে?
@ পার্থ প্রতিম রায়
২৫
কাজাখস্তানের ‘ঘুমের গ্রাম’!
একটা গ্রাম যেখানে মানুষ একবার ঘুমালে টানা ছয়দিন ঘুমিয়ে থাকে! শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, কাজাখস্তানের কালাচি গ্রামে এমন ঘটনাই সত্যি ঘটেছিল। এক সময় গ্রামটির জীবন ছিল একদম স্বাভাবিক। কিন্তু ২০১৩ সালের পর থেকেই শুরু হয় এই অদ্ভুত “ঘুমের মহামারি”।
এই গ্রামের মানুষ যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন তারা টানা কয়েকদিন, (কখনও ছয়দিন পর্যন্ত) ঘুমিয়েই থাকে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সময় তাদের না ক্ষুধা লাগে, না তৃষ্ণা পায়। আর যখন ঘুম ভাঙে, তখন সেই সময়ের কোনো স্মৃতিই থাকে না তাদের।
কালাচি গ্রামে মোট ৬৮০ জন মানুষের মধ্যে প্রায় ১৪১ জন এই রহস্যময় ঘুমের শিকার হয়েছেন। ঘুম থেকে ওঠার পর তাদের অনেকেই মাথাব্যথা, বমিভাব এবং অদ্ভুত দৃষ্টিবিভ্রমে ভুগেছেন।
তাহলে এমন কেন হচ্ছে? বিজ্ঞানীদের ধারণা, গ্রামের কাছাকাছি থাকা একটি পুরোনো ইউরেনিয়াম খনি থেকেই নির্গত তেজস্ক্রিয়তা এই ঘটনার পেছনে দায়ী হতে পারে। তবে এখনও পুরো রহস্যের সমাধান মেলেনি।
Collect from - বিজ্ঞানপোকা
২৬
প্রয়োজন নেই, এমন জিনিস কেন কিনি?
ঘরে কফি বানিয়ে খেলে যে খরচ হয়, বাইরে থেকে কিনে খেলে খরচ হয় বহুগুণ।
ধরে নিচ্ছি, তোমার একটি ইন্টারনেট সংযোগসহ ফোন আছে। তোমার না থাকলেও তোমার পরিবারের কারও আছে, যেটি তুমি ব্যবহার করো। এখন সবার হাতেই ফোন থাকে বলে বলছি। ফোন ব্যবহার করা মানে এখন মোটামুটি সারাক্ষণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে অ্যাকটিভ থাকা। কারও কারও অভ্যাস থাকে, সারাক্ষণ স্ক্রলিং করা। কেউ শর্ট ভিডিও দেখে। কেউ রান্না ও খাবারের ভিডিও দেখে। কেউ দেখে ভ্রমণ ব্লগ। আমার ছোট্ট বন্ধু ইয়াশ সারাক্ষণ অন্যদের ভিডিও গেমস খেলা দেখে! তাদের সবার মধ্যে কমন বিষয় হলো, সবাই মাঝেমধ্যে বিভিন্ন কেনাকাটার অনলাইন দোকানে চলে যায়—ইচ্ছা বা অনিচ্ছায়।
ধরো, তুমি রামেনের ভিডিও দেখছিলে। তোমার পেটে একটু ক্ষুধা লেগেছে। বাসার কিছু একটা খেয়ে নিলেই হয়ে যায়। তা না করে তুমি একটু ফুডপ্যান্ডা থেকে ঘুরে এলে, কোথায় ভালো রামেন পাওয়া যায়? এর দাম কত? আবার একটা সুন্দর জামা দেখলে কোনো ইনফ্লুয়েন্সারের গায়ে। জামাটা কোনো শপে আছে কি না, তা একটু খুঁজে দেখলে। ধরে নিচ্ছি, মাঝেমধ্যে এমন করো তুমি। তুমি না করলে অসুবিধা নেই, বরং ভালো। যে করে তার কথা বলছি। অনলাইন হোক বা মার্কেটে হোক, এ রকম উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরির মধ্যে তুমি হঠাৎ কিছু জিনিস নিশ্চয়ই কিনে ফেলো, যা তোমার একদমই প্রয়োজন নেই। কিছু জিনিস কিনতে চাও। তোমার মনে হতে পারে, এটি আমার এখন দরকার না হলেও খুব ‘সুন্দর’, পরে কাজে লাগবে। সুন্দর মানছি, কাজেও লাগবে জানা কথা। তবে ঠিক করে ভেবে দেখো, সত্যিই কি তোমার এই জামা প্রয়োজন ছিল?
ছাড়ের বিজ্ঞাপন দেখলেই প্রয়োজন ছাড়াই কেনাকাটা করতে ঝাপিয়ে পড়ে অনেকেই
ছাড়ের বিজ্ঞাপন দেখলেই প্রয়োজন ছাড়াই কেনাকাটা করতে ঝাপিয়ে পড়ে অনেকেই
এবার এমন তিনটি জিনিসের কথা ভাবো, যেগুলো তুমি গত তিন মাসের মধ্যে কিনেছ। যেগুলোর আসলে একদমই প্রয়োজন ছিল না। প্রথমে তোমার ভাবতে কষ্ট হতে পারে। কারণ, আমরা কেনাকাটার আগে নিজেদের বোঝাই মনে মনে। স্বীকার করতে চাই না যে এটি আমার দরকার নেই। নিজের কাছে যেহেতু উত্তর দিতে হবে, তাই সত্যি সত্যি অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার কথা ভাবতে অসুবিধা নেই। হতে পারে তুমি একটা ইয়ারবাড কিনেছ। আগে তোমার ইয়ারফোন ছিল, যেটায় তার আছে। ইয়ারবাডে তার নেই। আবার হতে পারে স্মার্টওয়াচ। তোমার স্মার্টফোনে এর সব ফিচারই আছে, তবু কিনেছ।
এবার প্রশ্ন করো নিজেকে, কেন আমরা এমন করি? কেন আমাদের প্রয়োজন নেই, এমন জিনিস দিয়ে ঘর ভরিয়ে ফেলি? জিনিস বা বস্তু ভালোমন্দ যা–ই হোক, কেন কিনি? এই যেমন আমি গত তিন মাসে অনেকগুলো বই কিনেছি, যেগুলো এখনো পড়িনি। সামনে পড়ব বলে মনে করি। কিন্তু আমার এখন এই বই কেনার দরকার ছিল না। এখনই না কিনলে এই বইগুলো শেষ হয়ে যাবে, ব্যাপারটা এমনও না। তবু আমি কিনলাম। আমরা এ রকম হামেশাই করি।
আমাদের অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা পরিবেশের ক্ষতি করছে
প্রয়োজন নেই, এমন জিনিস কেনার জন্য আমাদের উসকে দেয় চোখের সামনে সব সময় ঘুরতে থাকা ক্রমাগত বিজ্ঞাপন। টিভিতে চলছে, স্কুলের বন্ধু বা চারপাশের মানুষ কিনছে। এসব দেখে আমাদের মনে হয়, আরে, আমার একটা ইয়ারবাড নেই! আমি এখনো ইয়ারফোন নিয়ে ঘুরি! লোকে কী বলবে? এসব সামাজিক চাপ আমাদের ওপর বোঝা হয়ে চেপে বসে বলেই আমরা অপ্রয়োজনীয় বস্তু কিনি। কেনাকাটার জন্য আমাদের আকাঙ্ক্ষা বেড়ে যায়। একটু চিন্তা করলে বুঝতে পারবে, এর পেছনে আছে মনোবিজ্ঞান। এই বিদ্যা বলতে পারে, কেন কিছু মানুষ প্রয়োজন নেই, এমন জিনিস কেনার জন্য চাপ অনুভব করে।
বিজ্ঞাপন ছাড়া অন্যভাবেও বিক্রেতারা পণ্যের প্রচার করেন। রাস্তায় তুমি কমলা বিক্রি হতে দেখেছ। কিছু কমলা বিক্রি হয় ভ্যানে। কমলার স্তূপ থাকে। আবার কিছু চায়নিজ কমলা বাজারে পাওয়া যায়, যেগুলো লাল জালি ব্যাগে করে বিক্রি হয়। কমলা এভাবে বিক্রির সঙ্গে রং তত্ত্বের সম্পর্ক আছে। লাল ব্যাগে কমলাকে দেখতে আরও কমলা রঙের মনে হয়। কমলা বা মাল্টা যত উজ্জ্বল দেখায়, আমরা এটিকে ততই পরিপক্ব বলে মনে করি। লাল ব্যাগের পেছনে তত্ত্ব হলো, কমলার ওপরে লাল জালের পাতলা সুতাগুলো ওভারল্যাপিং বা একটা আরেকটার ওপর থাকে। তাই লালের প্রভাবে কমলা রঙের গাঢ়ত্বও বেড়ে গেছে বলে মনে হয়। ক্রেতার কাছে তখন কমলাকে খুব ভালো মানের মনে হয়। এভাবে কমলার পুরো ব্যাগটাই কেনার সম্ভাবনা থাকে (আমাদের দেশে ব্যাগ ধরেই কিনতে হয়, প্রয়োজন অনুযায়ী কেনা যায় না!)। কমলাকে স্তূপ করে রাখলে অল্প কিছু কমলা উজ্জ্বল থাকে, বাকিগুলো তেমন উজ্জ্বল দেখায় না। মাত্র কয়েকটিকে উজ্জ্বল বলে মনে হয়। পুরো কমলার স্তূপের রং তখন মার খেয়ে যায়।
তাই লাল জালের ব্যাগভর্তি কমলা দেখলে আমাদের দরকারমতো কমলা না কিনে পুরো ব্যাগ কিনে নিই। তুমি সবুজ জালের ব্যাগে কিছু সবুজ লেবু রেখে নিজেই পরীক্ষা করে দেখতে পারো। নিশ্চিত সবুজ লেবুকে আরও সবুজ মনে হবে।
দেশের বাইরে অনেকেই এখন মিনিমালিস্টিক জীবন যাপনের দিকে ঝুঁকেছে।
আধুনিক যুগে বেঁচে থাকার জন্য আমাদের খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন নেই। খাবার, থাকার জায়গা, জরুরি পোশাক—এসব থাকলেই বেঁচে থাকা যায়। অসুস্থ হলে চিকিৎসা করা অন্য আলাপ। এর বাইরে আমরা যা কিনি, তার অনেক কিছুই বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় নয়। ধরো, রেস্তোরাঁর দামি কফি, দশ জোড়া জুতা, কম্পিউটার থাকার পরও ল্যাপটপ ও আইপ্যাডের প্রয়োজন নেই। স্কুলশিক্ষার্থীর জন্য ব্যক্তিগত গাড়ির প্রয়োজন নেই। ইয়ারফোন থাকার পর ইয়ারবাডের প্রয়োজন নেই।
কিছু জিনিস কেনার ক্ষেত্রে আমরা ঘোরে পড়ে যাই। এটি কিনলে আমাদের সামাজিক অবস্থান উন্নত হবে, এমন ইলিউশন বা ঘোর তৈরি করে কিছু ব্র্যান্ড। যেমন অ্যাপল কোম্পানি। তারা আইফোনকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে, নতুন মডেল বাজারে এলেই সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে কেনার জন্য। এটি সাধারণ স্মার্টফোনের চেয়ে দামি। যারা সামাজিক স্বীকৃতি চায়, তারা এসব বিলাসবহুল পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়। একটা আইফোন হাতে থাকলে অন্যরা তাকে সম্পদশালী মনে করবে এবং তার প্রতি আকৃষ্ট হবে। একটা দামি ব্র্যান্ডের ঘড়ি থাকলে বড়াই করার একটা সুবিধা পাওয়া যায়। কোনো ব্যক্তি কোন বাড়িতে থাকে, কোন গাড়িতে চলাফেরা করে, কী পোশাক পরে বা কোথায় খাওয়াদাওয়া করে বা কোথায় ঘুরতে যায়—এগুলো দিয়ে মানুষকে অন্যরা মাপার চেষ্টা করে । এগুলো দিয়ে ব্যক্তি নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ পায়। এসব স্ট্যাটাস অর্জনের জন্য অনেকেই অপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনে।
অকারণে জিনিসপত্র কেনার আরেক কারণ কর্তৃত্ব। বস্তুর মালিকানার সঙ্গে মানুষের কাছে ক্ষমতা আসে। পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে, তার বেশির ভাগই আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তবে নির্দিষ্ট জিনিস আমাদের দখলে থাকলে আমাদের কিছু দায়িত্ব আছে বলে মনে হয়। তখন আমরা মহাবিশ্বের একটি ক্ষুদ্র অংশের কর্তা হয়ে উঠি।
মানুষের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে গেছে।
এবার ধরো আমি একটি নীল জামা কিনলাম। এরপর আমার মনে হতে পারে, এর সঙ্গে মিলিয়ে একটা প্যান্টও দরকার। আগের প্যান্টটা ঠিক ম্যাচিং হচ্ছে না। নতুন প্যান্ট দরকার। এই পোশাকের সঙ্গে দরকার একটা মানানসই ব্যাগ। নাহ, জুতাটাও ম্যাচ করছে না। নতুন জুতা দরকার। এভাবে কিনে ফেলব অনেক কিছুই। অথচ এর সব কটিই আমার যথেষ্টই আছে। নতুন কেনার প্রয়োজন ছিল না। তবু আমরা একটা তাগিদ অনুভব করব এগুলো কেনার। মনে হবে, এগুলো না ম্যাচ করলে আমাকে একেবারেই ভালো দেখাবে না। ইনস্টাগ্রামের ছবিতে সবাই একই জামা দেখবে। এটা কোনো কথা? অথচ আমাকে এত দিন কিন্তু ভালোই দেখা গেছে। যখন ম্যাচ করে এগুলো ব্যবহার করব, তখন আবার মনে হবে, আমার তো একটা লাল জামাও দরকার। শুরুতে ভালো লাগবে। তারপর এগুলো আর তেমন কোনো অনুভূতি দেবে না। তখন আবারও নতুন জামা কিনতে ইচ্ছা করবে। এটা অপ্রয়োজনীয় খরচের ফাঁদ এবং চক্র। এই চক্রের কথা বলেছেন ফরাসি দার্শনিক ডেনিস ডিডেরটের। পুরো ব্যাপারটাকে তাঁর নামের সঙ্গে মিলিয়ে বলা হয় ‘ডিডেরট ইফেক্ট’। এটি ভাঙতে সচেতন পদক্ষেপ লাগবে। তোমাকে এই চক্র নিয়ে সচেতন থাকতে হবে।
ঈদের সময় আমাদের দেশে বিচিত্র একটি জিনিস দেখা যায়। পাশের দেশের কোনো টিভি সিরিয়ালে কোনো চরিত্র যে জামা পরে অভিনয় করেছে, সেই জামার একটা নাম থাকে। আমাদের বাজার ভরে যায় সেই জামা দিয়ে। কেউ টিভি সিরিয়াল দেখে প্রভাবিত হয়। কেউ সিনেমার নায়কের স্টাইল দেখে প্রভাবিত হয়। অথবা ইনস্টাগ্রামের রিলসে কোনো ফ্যাশনের প্রবণতা দেখেও তোমার কিছু কিনতে ইচ্ছা করতে পারে।
আলমারিভর্তি জামা কাপড়, কিন্তু পরার কোনো কাপড় নেই—এমন মনে হয় অনেকেরই
ইউটিউবে তারকাদের গ্যাজেট আমাদের প্রভাবিত করে। তাঁরা যা কিছুর প্রচারণা চালান, আমরা সেগুলো পেলে সুখ ও সাফল্য অনুভব করি। ট্রেন্ড বা সাম্প্রতিক প্রবণতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে, এমন চাপ অনুভব করি। তবে চিন্তা করলে বুঝবে, এগুলো থেকে আমাদের সুখ আসে না। সর্বশেষ স্মার্টফোন বা নতুন ডিজাইনের পোশাক কিনলে যে আনন্দ হয়, তা খুবই সাময়িক। কদিন পর আরও নতুন কিছু কিনতে ইচ্ছা করে। সাধারণভাবে বলা যায়, আমাদের অভিজ্ঞতা, অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক ও নিজের আত্মোন্নতি থেকে তৈরি হয় সুখ। আনন্দের উৎস এগুলোই।
কেনাকাটার পর মানুষ মনে করে, এতে আমার স্যাটিসফেকশন বা সুখ তৈরি হবে। এ জন্য অন্যকে কিছু কিনে দিলে সে খুশি হয়। এভাবে বেশি জিনিস কেনাকাটা করলে টাকা বেশি বেশি হাতবদল হয়। অর্থনীতির জন্য বিষয়টি অবশ্যই ভালো। এতে সাময়িকভাবে আমাদের সুখানুভূতি হয়।
জীবনকে সমৃদ্ধ করার জন্য কিছু মানুষ শুধু অতি প্রয়োজনীয় বস্তুই ব্যবহার করেন। যা কাজে লাগে না, তা তাদের কাছে অতিরিক্ত। এদের বলে মিনিমালিস্ট। শুধু এমন বস্তুগুলো রাখেন, যা তাঁদের জীবনের একটি উদ্দেশ্য পূরণ করে। জীবনে তাঁরা সময় আর পরিশ্রম ও অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেন। যেকোনো বস্তুকে কর্মক্ষমতা দিয়ে মূল্যায়ন করেন এবং ভোগবাদকে প্রত্যাখ্যান করেন।
আবার কিশোর বয়সে আমরা আত্মপরিচয় খুঁজি। নিজেদের সামাজিক অবস্থান তৈরি করতে চাই। আমাদের বন্ধুরা আমাদের পছন্দ করবে কি না, তাচ্ছিল্যের মুখে পড়ব কি না, এমন ভয়ও আমাদের থাকে। একটা দামি ফোন বা ঘড়ি নিয়ে ক্লাসে গেলে বন্ধুরা ঘিরে ধরবে—অবচেতন মনে আমরা এগুলো ভাবি। ট্রেন্ডি জামাকাপড় বা গ্যাজেট কেনা মানে শুধু চমৎকার জিনিসের মালিক হওয়া নয়, আমরা যাদের নিজের সমান মনে করি, তাদের সমান হওয়া, তাদের ছাড়িয়ে যাওয়া কিংবা অন্যদের কাছ থেকে ভ্যালিডেশন বা বৈধতা চাওয়ার মতো বিষয়ও থাকে। আসলে আমরা কে, তা ঠিক করার জন্য বস্তুগত সম্পদের প্রয়োজন নেই। আমাদের মূল্য পোশাকের ব্র্যান্ড বা ফোনের মডেল দিয়ে সত্যিকার অর্থে পরিমাপ করা হয় না। আমাদের ভেতরের অনুভূতি, আবেগ আর নিজের প্রতি সৎ থাকাই আসল বিষয়। আবার পাশের বাসায় কিংবা বন্ধুর কাছে অমুক জিনিস আছে, আমারও সেটা লাগবে। তা না হলে আমি ওর থেকে পিছিয়ে যাব—এমন সামাজিক চাপ এড়ানোও জরুরি।
অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা থেকে বাঁচতে কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারো। ভেবে দেখো, তোমার কাছে কোনটা গুরুত্বপূর্ণ। কিসে তোমার আগ্রহ, তোমার লক্ষ্য কী? এগুলো ভাবলে তোমার মূল্যবোধ তৈরি হবে। সঠিক ব্যয় করার অভ্যাস হবে। কোথায় টাকা খরচ করবে, সেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। তোমাকে অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে। সত্যিই নতুন স্মার্টফোন বা জুতা দরকার, নাকি একটা অনলাইন কোর্স? নাকি তুমি কিছু টাকা জমাবে? অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে সেগুলোর সঙ্গে লেগে থাকলে তুমি চাপ সামলাতে পারবে। বিজ্ঞাপন দেখে কেনাকাটা বা ট্রেন্ড দেখে ঝাঁপিয়ে পড়া থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারবে।
জিনিস বা বস্তুর চেয়ে জীবনে গুরুত্ব দেওয়ার অনেক কিছু আছে। অভিজ্ঞতা অর্জন, শখ পূরণ আর অন্যদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়তে সময় আর শক্তি বিনিয়োগ করলে আনন্দ পাবে। তোমার পরিপূর্ণতার অনুভূতি হবে। বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, ভ্রমণ বা সৃজনশীল কিছু আয়ত্তের চেষ্টা চালালে মন ভালো থাকবে। তোমার জীবন সমৃদ্ধ হবে।
প্রয়োজন হলে জামা তো কিনতেই হবে কিন্তু অপ্রয়োজনে কেনাকাটা কতটা যৌক্তিক, ভেবে দেখা দরকার
জীবনকে সমৃদ্ধ করার জন্য কিছু মানুষ শুধু অতি প্রয়োজনীয় বস্তুই ব্যবহার করেন। যা কাজে লাগে না, তা তাদের কাছে অতিরিক্ত। এদের বলে মিনিমালিস্ট। শুধু এমন বস্তুগুলো রাখেন, যা তাঁদের জীবনের একটি উদ্দেশ্য পূরণ করে। জীবনে তাঁরা সময় আর পরিশ্রম ও অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেন। যেকোনো বস্তুকে কর্মক্ষমতা দিয়ে মূল্যায়ন করেন এবং ভোগবাদকে প্রত্যাখ্যান করেন। জীবনের সৌন্দর্য তাঁরা খুঁজে পান বস্তুর আসল উদ্দেশ্যকে তুলে ধরে। তুমি তাদের কথা জেনে নিজের জীবনে মিনিমালিজমের প্রতিফলন ঘটাতে পারো।
অপর দিকে তোমরা জানো, পৃথিবী এখন জলবায়ু পরিবর্তনের মুখোমুখি। এই প্রচণ্ড গরম তো এই বন্যা। প্রচুর বৃষ্টি। বিভিন্ন দেশে অস্বাভাবিক আবহাওয়া দেখা যাচ্ছে। আমাদের মতো জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ভুগছে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য মানুষের ভোগবাদী সংস্কৃতি অনেকখানি দায়ী। ফসিল ফুয়েল যত পোড়ানো হবে, পৃথিবীর তাপমাত্রা তত বাড়বে। এভাবে জগৎ বড় পরিবর্তনের মুখোমুখি হবে। মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। তাই জগৎকে বাঁচাতে তোমারও কিছু করার আছে। দরকার নেই, এমন জিনিস কেনা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারো। এভাবে তুমিও পৃথিবীকে রক্ষায় অবদান রাখতে পারবে।
কিশোর আলো
World Vision (বিশ্ব দর্শন)
২৭
নরক হলো অন্য মানুষেরা" — জঁ-পল সার্ত্র
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে জামাটা তিনবার বদলালেন।
একটা মেসেজ পাঠানোর আগে পাঁচবার পড়ে দেখলেন — কেমন শোনাবে।
অনুষ্ঠানে ঢোকার আগে দরজার কাছে এক সেকেন্ড থমকে দাঁড়ালেন। সবাই তাকাবে।
বাড়ি ফিরে রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবলেন — ওই কথাটা বলা ঠিক হয়নি, ও নিশ্চয়ই অন্যরকম ভেবেছে।
সারাদিন আপনি নিজের চোখে নিজেকে দেখেননি। দেখেছেন অন্যের চোখে।
তিনজন মানুষ, একটা ঘর
ফরাসি দার্শনিক জঁ-পল সার্ত্র ১৯৪৪ সালে একটা নাটক লিখেছিলেন।
গল্পটা এমন — তিনজন মৃত মানুষকে নরকে পাঠানো হলো। তারা ভেবেছিল আগুন থাকবে, শাস্তি থাকবে, যন্ত্রণা দেওয়ার কেউ থাকবে।
কিন্তু গিয়ে দেখল, নরক আসলে একটা সাধারণ ঘর। সেখানে কোনো আগুন নেই, কোনো জল্লাদ নেই। শুধু তিনজন মানুষ, আর ঘরে কোনো আয়না নেই।
আয়না না থাকায় কেউ নিজেকে দেখতে পাচ্ছে না। নিজেকে দেখতে হলে অন্যজনকে জিজ্ঞেস করতে হচ্ছে — "আমাকে কেমন দেখাচ্ছে?"
আর যে যা বলছে, সেটাই হয়ে উঠছে সত্য। একজন আরেকজনকে বিচার করছে, সংজ্ঞায়িত করছে, বেঁধে ফেলছে। পালানোর উপায় নেই।
নাটকের শেষে একটি চরিত্র বলে ওঠে — "নরক হলো অন্য মানুষেরা।"
তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন — অন্যের দৃষ্টিতে নিজেকে চেনার চেষ্টা করলে জীবনটা নরক হয়ে যায়। মনোবিজ্ঞানে এর একটা নাম আছে — স্পটলাইট ইফেক্ট।আমাদের মনে হয়, একটা আলো সারাক্ষণ আমাদের ওপর পড়ে আছে, সবাই দেখছে।
সার্ত্রের ভাষায়, আপনি যা করেন, আপনি তা-ই। দর্শকের হাততালি দিয়ে নয়, নিজের কাজ দিয়েই আপনি তৈরি হন।
আপনার কোন সিদ্ধান্তটা এখনো আটকে আছে শুধু "মানুষ কী বলবে" এই ভয়ে?
@ Soul Wellness
২৮
বিদ্যাসাগর : সেকুলারিজম ও হিউম্যানিজমের অদ্বিতীয় মিশ্রণ
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবনের সবচেয়ে বড় বিতর্কিত অধ্যায় সম্ভবত প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে তাঁর বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্নটি। তাঁর ধর্মচিন্তা ও ঈশ্বরবিশ্বাস নিয়ে যে বিতর্ক তাঁর জীবদ্দশাতেই আরম্ভ হয়েছিল, মৃত্যুর প্রায় দেড়শো বছর পরেও তা মেটবার কোনও লক্ষণ আছে বলে মনে হচ্ছে না। এই বিষয়ে নানা মুনির নানা মত। কারুর মতে তিনি ঠিক চিরাচরিত নিষ্ঠাবান হিন্দু না হলেও মোটের উপর আস্তিক। কারুর মতে তিনি পরিপূর্ণ নাস্তিক। আবার তৃতীয় একদল আছেন, যাঁরা মনে করেন তিনি ছিলেন অ্যাগনস্টিক বা সংশয়বাদী অথবা পজিটিভিস্ট বা প্রত্যক্ষবাদী। এই রহস্য এইজন্যেই আরও ঘনীভূত হয়েছে কারণ বিদ্যাসাগর নিজে এই বিশেষ বিষয়টি সম্বন্ধে ব্যক্তিগত পরিসরে ছুটকো-ছাটকা দুই-একটি মন্তব্য ছাড়া লিখিতভাবে কোনোদিনই তেমন কোনও বক্তব্য রাখেন নি। আর আমাদের ট্র্যাজেডি হল বিবেকানন্দ অথবা রবীন্দ্রনাথের মতো বিদ্যাসাগরের অন্তরঙ্গ আলাপচারিতার কোনও রেকর্ড কেউ রেখে যান নি। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, “আমাদের কেবল আক্ষেপ এই যে, বিদ্যাসাগরের বসওয়েল কেহ ছিল না; তাঁহার মনের তীক্ষ্মতা, সবলতা, গভীরতা ও সহৃদয়তা তাঁহার বাক্যালাপের মধ্যে প্রতিদিন অজস্র বিকীর্ণ হইয়া গেছে, অদ্য সে আর উদ্ধার করিবার উপায় নাই।” ফলশ্রুতিতে, বিদ্যাসাগরের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে আলোচিত রাজনীতি, সমাজ, ধর্ম ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বিদ্যাসাগরের ঘরোয়া মনোভাব আমরা জানতে পারি না।
তবে এ-কথা নিয়ে বোধহয় কোনও বিতর্ক নেই যে, ঊনবিংশ শতাব্দীর বঙ্গদেশে যত ব্যক্তি জন্মেছিলেন তাঁদের মধ্যে অক্ষয়কুমার দত্ত এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর — এই দুজনই প্রত্যক্ষভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন অনুভব করেন নি, বরং ধর্মকে ব্যক্তিগত পরিসরে আবদ্ধ রেখে স্রেফ মানুষ এবং মানবতাবাদ নিয়ে ভাবনাচিন্তা করেছেন। এই সেকুলার এবং মানবমুখী দৃষ্টিভঙ্গির জন্যেই তাঁরা আধুনিক।
প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম সম্বন্ধে বিদ্যাসাগরের মতামত অনেকে জানবার চেষ্টা করেছেন। বিদ্যাসাগরের বক্তব্য ছিল, “ধর্ম যে কি তা বর্তমান অবস্থায় মানুষের জ্ঞানের অতীত এবং ইহা জানিবার প্রয়োজন নাই।”
লোকাচার সম্পর্কে বিদ্যাসাগরের নিজের একটি বিশিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। যে সমস্ত লোকাচারকে তিনি তৎকালীন পরিপ্রেক্ষিতে নিজের সমাজসংস্কার আন্দোলনের প্রতিবন্ধক মনে করতেন, সেগুলিকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করতেন এবং সেগুলির বিরুদ্ধে দাঁড়াতেন। কিন্তু যে সমস্ত লোকাচার অনেকখানি ‘নিরীহ প্রকৃতির’ ছিল, সেগুলিকে ‘মান্য’ করলে সমাজ–সংস্কার আন্দোলনের ক্ষেত্রে কোনও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হত না, সেই সমস্ত লোকাচার ও প্রচলিত নিয়মগুলিকে তিনি ‘সশ্রদ্ধভাবে’ নয়, নিতান্তই যান্ত্রিকভাবে মান্য করে চলতেন। এই প্রসঙ্গে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন বদরুদ্দীন উমর — “চিঠিপত্রের শিরোনামায় ‘শ্রীশ্রীদুর্গা শরণং’ ইত্যাদি লেখা এবং নিজ দেহে উপবীত ধারণ ইত্যাদি এই দ্বিতীয় ধরনেরই লোকাচার এবং প্রচলিত নিয়ম। এগুলি মান্য করার মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আস্তিকতা অথবা জাতিভেদে বিশ্বাস কোনোটিই বিন্দুমাত্র প্রমাণিত হয় না। কারণ একদিকে তিনি যেমন কোনোদিন লোকাচারের দাসত্ব করেননি, অন্যদিকে তেমনি তিনি প্রতিটি লোকাচার, দেশাচার ও প্রচলিত সামাজিক ব্যবহারের (social practice) বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণারও কোনো প্রয়োজন বোধ করেননি। এ বিষয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অতিশয় বাস্তবমুখী।” স্পষ্টতই, বিদ্যাসাগর তাঁর অসাধারন এবং প্রখর বাস্তববোধের ফলে কয়েকটা আচার আচরণকে মেনে নিয়েছিলেন, যেমন উপবীত ধারণ করা, শিখা ধারণ করা, চিঠিতে শ্রীহরি শরনং লেখা, মাতার মৃত্যুর পর শ্রাদ্ধ করা ইত্যাদি ইত্যাদি। আসলে এগুলির কোনও মাহাত্ম্যই তাঁর কাছে ছিল না, তাই কোনও ঈশ্বর অথবা ধর্মীয় প্রেরণায় নয়, যন্ত্রের মতো তিনি কয়েকটি সিম্বলিক আচরণ পালন করতেন যেগুলি ক্ষতিকারক নয়, অথচ কাছের মানুষরা দুঃখ পাবেনা না, অনাবশ্যক সংঘাত সৃষ্টি হবে না। আমার মনে হয়, এগুলি তাঁর এক ধরণের কৌশল ছিল যাতে রক্ষণশীল হিন্দুরা তাঁকে সরাসরি সমাজচ্যুত না করতে পারেন, ডিরোজিয়ানদের ক্ষেত্রে ঠিক যেমনটি ঘটেছিল। এই প্রসঙ্গে বিনয় ঘোষের একটি মন্তব্য উদ্ধৃত করা যায় — “বাইরের সমাজে যখন ধর্মের নামে অধর্মের বন্যা বইছিল, তখন ধর্ম নিয়ে সামাজিক সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়া তিনি নির্বুদ্ধিতা বলে মনে করেছিলেন।” ঈশ্বর আছেন কি নেই, এই নিয়ে তিনি অহেতুক মাথা ঘামান নি, বরং নদীর স্রোতে থেকে তিনি চিরকাল স্রোতের বিপরীতে সাঁতার দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এইভাবে নিজেকে তিনি চিরকাল একটি ক্যামোফ্লাজে আচ্ছাদিত করে রেখেছিলেন, যাতে তার আড়াল থেকে প্রগতিশীল কাজগুলি নির্বিবাদে চালিয়ে যেতে পারেন। এমন কোনও হটকারিতা করেন নি যাতে হিন্দু সমাজপতিরা তাঁকে বৃহত্তর সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন না করে দিতে পারে। তাই অন্যের বিশ্বাসে তিনি কখনও আঘাত দেন নি, কিন্তু বারবার আমরা দেখেছি, যে বিষয়গুলিতে তাঁর মৌলিক বিশ্বাসের প্রশ্ন অনিবার্যভাবে পথরোধ করেছে, সেগুলিতে তিনি দৃঢ়ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন — শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার তাঁর ‘শিক্ষক বিদ্যাসাগর : যাপিত জীবন এবং পরিকল্পিত উচ্চারণ’ প্রবন্ধে লিখেছেন, “অতিপ্রাকৃত বিশ্বাসের ঈশ্বর — সে প্রথাগত হিন্দুধর্মের বহুদেববাদ-ভিত্তিক হোক, আর ব্রাহ্মধর্মের একেশ্বরবাদ-ভিত্তিক হোক — সেই ঈশ্বর নামক ধারণা তাঁর ব্যবহারিক বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।”
বস্তুতঃ, বিদ্যাসাগর এভাবেই একাধিকবার কথাপ্রসঙ্গে ঈশ্বরের অস্তিত্বে সংশয় প্রকাশ করেছেন। সম্ভবত এই কারণেই দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর বিদ্যাসাগরকে এ্যাগনস্টিক বলেছিলেন — বিদ্যাসাগর কি নাস্তিক ছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তরে দ্বিজেন্দ্রনাথের জবাব, “ঐ একরকমের নাস্তিক ছিলেন, যাকে বলে অজ্ঞেয়বাদী।”
প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম অথবা ঈশ্বরের প্রতি বিদ্যাসাগরের এই ঔদাসীন্য মৃত্যু পর্যন্ত অম্লান ছিল। মৃত্যুর দুই-তিনমাস আগে তাঁর কন্যা বাড়িতে শান্তি-স্বস্ত্যায়নের ব্যবস্থা করেন। দীর্ঘ কয়েকবছর রোগভোগের পর বিদ্যাসাগর মানসিক ও শারীরিকভাবে তখন জীর্ণ শীর্ণ। সচরাচর সাধারণ মানুষ এই পরিস্থিতিতে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েন। নিজের বিশ্বাস না থাকলেও কন্যার অনুরোধে তাঁর মন রাখবার জন্য তিনি হোম-যজ্ঞের প্রস্তাবে সায় দিয়েছিলেন। এবার ভ্রাতা শম্ভুচন্দ্রের লেখনি থেকে জানা যাক, “একতলার যে ঘরে হোম হয়েছিল, সেটি ছিল দোতলা থেকে নামার সিড়ির পাশে। কিন্তু সে ঘরে বিদ্যাসাগর প্রবেশ করেন নাই। কন্যার বিশেষ অনুরোধে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ঈষৎ হেসে বললেন, মা এইখানেও ধোঁয়া আসছে, মনে দুঃখ করিস না।” তিল তিল করে যন্ত্রনা পেয়ে মৃত্যুর সন্নিকটে থাকা বিদ্যাসাগর জীবনের অন্তিম পর্বেও ততটাই বস্তুবাদী ছিলেন।
বিদ্যাসাগর ব্রাহ্মণত্বে বিশ্বাস করতেন না তাই গায়ত্রী মন্ত্র পড়তেন না; ঈশ্বরের বিষয়ে নির্বিকার ছিলেন তাই প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে চিরকাল শুধু আলোচনার বাইরে নয়, নিজস্ব সামাজিক জীবনেরও বাইরে রেখেছেন; মূর্তিপূজো তাঁর বিশ্বাসের পরিপন্থী ছিল তাই পূজোর সঙ্গে কোনো সংশ্রব রাখতেন না, ঘরে গৃহদেবতা ছিল না, বেনারসে গিয়ে বিশ্বনাথ মন্দির দর্শন করেন নি অথবা উইলে অসহায় মানুষদের বিরাট তালিকা দিয়ে প্রতিমাসে কে কত সাহায্য পাবেন তার ফিরিস্তি, গ্রামে প্রতিষ্ঠিত স্কুল ও দাতব্য চিকিৎসালয় এবং বিধবাবিবাহের জন্য কত খরচ বরাদ্দ তার হদিস থাকলেও দেবসেবার কোনো উল্লেখ রাখেন নি, অথচ জীবৎকালে ইন্ডিয়ান এ্যাসোসিয়েশন ফর কালটিভেশন অফ সায়েন্সকে এক হাজার টাকা দান করেছেন। বিদ্যাসাগর ক্ষতিকারক দেশাচারের বিরোধিতা করতেন তাই সমস্ত আত্মীয়দের বিপক্ষে গিয়ে পুত্রের বিধবা বিবাহ দিয়েছেন; শান্তি স্বাস্ত্যয়ন ইত্যাদিতে বিশ্বাস ছিল না তাই মরণকালে কন্যা হোম-যজ্ঞের ব্যবস্থা করলে, সে ঘরে তিনি প্রবেশ পর্যন্ত করেন নি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সেই দেড়শো বছর আগেও বিদ্যাসাগর তার শিশুপাঠ্য রচনাগুলিতে ধর্মীয় অনুষঙ্গ টানেননি। কাহিনীগুলির সঙ্গে ঈশ্বরের ও ধর্মীয় সংস্কারের সংস্রব নেই, জোর দিয়েছেন তিনি নীতিশিক্ষার ওপর, ভালোমন্দ বুঝে সচ্চরিত্র গঠনের ওপর। জন মার্ডক চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, “কিভাবে বিদ্যাসাগর শিশু ও কিশোরপাঠ্য বইয়ে না-ধর্মী (সেকিউলার) রীতিতে বস্তুবাদের মুলকথাটি তুলে ধরেছেন।”
বাস্তববাদী বিদ্যাসাগর উপলব্ধি করেছিলেন যে সহস্র বছরের কুসংস্কার ও কুপমণ্ডুকতায় যে সমাজ আবদ্ধ তাতে যদি আলো জ্বালাতে হয় তাহলে সমাজের ভিতর থেকেই আঘাত করতে হবে। তাই তিনি উনিশ শতকের হিন্দুসমাজের অন্ধবিশ্বাস ও প্রথাগুলিকে সবচেয়ে বলিষ্ঠভাবে আঘাত করলেও সমাজপতিরা কখনওই তাঁকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেন নি। এইভাবেই সেকুলারিজম ও হিউম্যানিজম তাঁর চরিত্রে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। ভারতীয় সমাজচিন্তকদের মধ্যে পার্থিব মানবতাবাদের চিন্তাধারার প্রবক্তা তাই এক এবং অদ্বিতীয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। @ শিবাশীষ বসু
তথ্যসূত্র :
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর - বিদ্যাসাগর চরিত
অমিয় কুমার সামন্ত - প্রসঙ্গ বিদ্যাসাগর
বদরুদ্দীন উমর - ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও উনিশ শতকের বাঙালী সমাজ
বিনয় ঘোষ - বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ
সৌরভ রঞ্জন ঘোষ সম্পাদিত - সংবর্তক : জন্মদ্বিশতবর্ষে বিদ্যাসাগর
বিপিনবিহারী গুপ্ত - পুরাতন প্রসঙ্গ
২৯
আজকের দিনে ১৯৩২ সালে প্রতিভাময়ী দৃঢ়প্রতিজ্ঞ স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার (৫ মে ১৯১১ – ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩২) শহীদ হয়েছিলেন।
১৯৩০-এর দশকের শুরুতে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলন মূলত পুরুষপ্রধান ছিল। সেই সময়ে চট্টগ্রামের ২১ বছর বয়সী এক স্কুলশিক্ষিকা, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে হাতে অস্ত্র তুলে নেন। প্রীতিলতা ছিলেন ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে সশস্ত্র আক্রমণের নেতৃত্বদানকারী প্রথম ভারতীয় নারীদের একজন।
ঢাকা থেকে ১৯৩০ সালে আই.এ. পরীক্ষা দিয়ে তিনি মেয়েদের মধ্যে প্রথম এবং সবার মধ্যে পঞ্চম স্থান লাভ করেন। এই ফলাফলের জন্য তিনি মাসিক ২০ টাকার বৃত্তি পান এবং কলকাতার বেথুন কলেজ়ে বি এ পড়তে যান। বেথুন কলেজ় থেকে দর্শনে ডিস্টিংশনসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তখন বেথুন কলেজ ছিল বহু বাঙালি নারীর স্বাধীনতা আন্দোলনের দীক্ষার অন্যতম পীঠস্থান। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত থাকায় কৃতিত্বের সাথে স্নাতক হলেও তিনি এবং তাঁর সঙ্গী বীণা দাশের পরীক্ষার ফল স্থগিত রাখা হয়। অবশেষে তাঁদের ২২ মার্চ, ২০১২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে মরণোত্তর স্নাতক ডিগ্রী প্রদান করা হয়।
যাহোক, তিনি কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে ফিরে আসেন এবং সংসারের অর্থকষ্ট মেটানোর জন্য শিক্ষকতা শুরু করেন। চট্টগ্রামে বিশিষ্ট দানশীল অপর্ণাচরণ দে’র সহযোগিতায় তখন নন্দনকাননে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল নন্দনকানন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, তিনি এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক পদে নিযুক্ত হন।
সেই সময়ে মাস্টারদা সূর্য সেনের সাথে সাক্ষাতের আগ্রহের কথা তিনি পূর্বপরিচিত বিপ্লবী কল্পনা দত্তকে বলেন। মাস্টারদা ১৯৩২ এর সেপ্টেম্বর মাসে ইউরোপিয়ান ক্লাব-এ হামলা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। এই ক্লাবটি ছিল ব্রিটিশদের জাতিগত ঔদ্ধত্যের প্রতীক; এর প্রবেশপথে লেখা ছিল: 'কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ।' ক্লাবটিতে আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল একটা বার্তা পৌঁছে দেওয়া, ভারতীয়রা নিজ ভূমিতে এই অপমান আর মেনে নেবে না। তাছাড়া ক্লাব-এ সন্ধ্যার পরে আনন্দ ফুর্তির জন্য বহু ব্রিটিশের জমায়েত হত৷ তাই লক্ষ্য হিসেবে জায়গাটি ছিল আদর্শ।
ইউরোপিয়ান ক্লাব-এ আক্রমণের দায়িত্ব মাস্টারদা নারী বিপ্লবীদের উপর দেবেন বলেন মনস্থির করেছিলেন। কিন্তু সাতদিন আগেই পুলিশের হাতে পুরুষবেশী কল্পনা দত্ত ধরা পরে গেলে আক্রমণে নেতৃত্বের ভার পড়ে একমাত্র নারী বিপ্লবী প্রীতিলতার উপর।
১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর, প্রীতিলতা একদল বিপ্লবীর নেতৃত্ব দিয়ে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব-এ আক্রমণ চালান। প্রীতিলতাকে পঞ্জাবী ছেলেদের মত পোশাক পরানো হয়েছিল। তাঁর সঙ্গে আক্রমণে অংশ নিয়েছিলেন কালীকিংকর দে, বীরেশ্বর রায়, প্রফুল্ল দাস, শান্তি চক্রবর্তী। প্রীতিলতা হুইসেল বাজিয়ে আক্রমণ শুরুর নির্দেশ দেবার পরেই ঘন ঘন গুলি আর বোমার আঘাতে পুরো ক্লাব কেঁপে কেঁপে উঠছিল।
অভিযানের সময় প্রীতিলতা আহত হন। ধরা পড়া ও নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে তিনি পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সায়ানাইড খেয়ে নেন; আত্মসমর্পণের পরিবর্তে আত্মাহুতির পথ বেছে নেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২১ বছর। সম্ভবনাময় ছিল তাঁর জীবন। সেই জীবন শেষ হয়েছিল এক ট্র্যাজেডিতে। অথবা ট্র্যাজেডিই বা বলি কেন, এই রকম মানুষ ছিলেন বলেই তো আজকে স্বাধীন ভারতে বাস করছি। সব দেশে, সব কালেই গুটিকয় মানুষ থাকেন যারা কোনো একটি আদর্শকে জীবনের পথে চলার মন্ত্র করে নিতে পারেন। সমগ্রের জন্য নিজের কথা ভাবেন না।
পরদিন পুলিশ ক্লাব থেকে ১০০ গজ দূরে মৃতদেহ দেখে পরবর্তীতে প্রীতিলতাকে শনাক্ত করে।
কলকাতা থেকে বহু দূরে যুক্ত বাংলার শেষ প্রান্তে প্রীতিলতার অসীম সাহস সমগ্র বাংলার তরুণ ও নারীদের অনুপ্রাণিত করেছিল।
২০২৩ সালে চট্টগ্রাম গিয়েছিলাম, গিয়েছিলাম চট্টগ্রামের সূর্য সেন ও তাঁর সহযাত্রীদের কথা বিশেষ করে মনে করতে। সশস্ত্র বিপ্লবীদের জীবনের কথা, জীবনদানের কথা হয়তো আমরা ভুলে গেছি। যাদের কথা ইতিহাস বইতে সংক্ষিপ্ত থেকে সংক্ষিপ্ততর, আমি সেই মাস্টারদা সূর্য সেন-এর ইতিহাস, প্রীতিলতা ওয়াদেদ্দারের ইতিহাস, বিপ্লবীদের ইতিহাস খুঁজতে চট্টগ্রামে গেছিলাম। গণেশ ঘোষ, কল্পনা দত্ত, অনন্ত সিংহ-র প্রতি আনত হতে চট্টগ্রামে গেছিলাম। সঙ্গে ছিল আমাদের ইতিহাস তথ্য ও তর্ক গ্রুপ-এর দীপরাজ দাশগুপ্ত।
এখনও রয়েছে সেই ইউরোপিয়ান ক্লাব। দীপরাজকে নিয়ে সারা দিন তীব্র রোদের মধ্যে জালালাবাদের ১০০ বছর আগের ইতিহাস খুঁজতে খুঁজতে একটু যেন হতাশ হলাম। প্রীতিলতা ওয়াদেদ্দারের স্মৃতিবিজড়িত সেই ইউরোপিয়ান ক্লাব, আজকে ধূলিমলিন; খুঁজতে গিয়ে গোলকধাঁধায় ঘুরতে হয়। তিনি যেখানে শিক্ষকতা করতেন তার বাইরে প্রীতিলতার একটি আবক্ষ মূর্তি রয়েছে। মনে মনে তাঁকে জানালাম শ্রদ্ধা।
চলে গেলাম মাস্টারদা সূর্য সেনের চট্টগ্রাম বিপ্লবের অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের দামপাড়া পুলিশ লাইন'স-এ। এখনও এটি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রধান কার্যালয় ও সর্ববৃহৎ পুলিশ লাইন। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল রাতে মাস্টারদা সূর্য সেনের পরিকল্পনা অনুযায়ী তাঁর ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি (চট্টগ্রাম শাখা)-র বিপ্লবীরা ব্রিটিশদের এই প্রধান অস্ত্রাগারটি আক্রমণ করেন।
হাতে ফুল ছিল না, চোখে জলও ছিল না। শুধু মাস্টারদার শেষ মুহূর্তের তীব্রতম অত্যাচারের কথা স্মরণ করে মনের, প্রাণের শ্রদ্ধা নিবেদন করলাম।
দুই বঙ্গেই সশস্ত্র বিপ্লবীদের কথা বিস্মৃতির আড়ালে চলে যাচ্ছে, তবুও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের অদম্য প্রতিরোধ ও নির্ভীক দেশপ্রেম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে নারীরও কিছু ভূমিকা ছিল। তাঁরা তাঁদের পুরুষ সহযোদ্ধাদের মতোই সমান সাহসিকতার সঙ্গে একদিন লড়াই করেছিলেন। @Madhusree Bandyopadhyay
তথ্যসূত্র
1. Kalpana Dutt, Chittagong Armoury raiders: reminiscences, (Peoples' Pub. House, Bombay, 1973). Internet archive.
2. After 80 yrs, posthumous degrees for revolutionaries, The Times of India। 22 March, 2012.
৩০
কয়েকজন বাঙালি হিন্দু লেখক এবং নাট্যকারের হাত ধরে সিরাজউদ্দৌলা এক ‘ট্র্যাজিক হিরো’-তে পরিণত হন।
নবাব সিরাজউদ্দৌলার মৃত্যুর পর প্রায় ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশীয় এবং ব্রিটিশ—উভয় ইতিহাসবিদদের কাছেই তিনি একজন খলনায়ক বা নেতিবাচক চরিত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সমসাময়িক ফার্সি ইতিহাসবিদ গোলাম হোসেন তাবাতাবাই তাঁর ‘সিয়ার-উল-মুতাক্ষেরিন’ গ্রন্থে সিরাজকে একজন উদ্ধত, নিষ্ঠুর, লম্পট এবং অদূরদর্শী তরুণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ব্রিটিশরা তাকে 'অন্ধকূপ হত্যা'র (Black Hole Tragedy) খলনায়ক হিসেবে প্রচার করেছিল।
কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে কয়েকজন বাঙালি হিন্দু লেখক, ঐতিহাসিক এবং নাট্যকারের হাত ধরে সিরাজউদ্দৌলা এক ‘মহান দেশপ্রেমিক’ এবং ‘ট্র্যাজিক হিরো’-তে পরিণত হন।যাঁরা সিরাজকে মহানায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে প্রধান কয়েকজন হলেন।
অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়: ১৮৯৮ সালে তিনি 'সিরাজদ্দৌলা' নামে একটি যুগান্তকারী গবেষণামূলক গ্রন্থ প্রকাশ করেন। তিনিই প্রথম জোরালোভাবে ব্রিটিশদের তৈরি 'অন্ধকূপ হত্যা'র গল্পকে মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত বলে প্রমাণ করেন। তিনি সিরাজকে একজন নিষ্ঠুর স্বৈরাচারের বদলে ষড়যন্ত্রের শিকার এক দুর্ভাগ্যবান দেশপ্রেমিক শাসক হিসেবে তুলে ধরেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বইটির ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।
গিরিশচন্দ্র ঘোষ: ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তিনি 'সিরাজদ্দৌলা' নাটকটি রচনা করেন। এই নাটকটি সিরাজকে আপামর বাঙালির কাছে এক মহান জাতীয় বীরে পরিণত করে। নাটকে সিরাজের দেশপ্রেম এবং মিরজাফর-ঘসেটি বেগমদের বিশ্বাসঘাতকতা এত আবেগপূর্ণভাবে ফুটে উঠেছিল যে, ব্রিটিশ সরকার ভয় পেয়ে নাটকটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল।
নবীনচন্দ্র সেন: তাঁর 'পলাশীর যুদ্ধ' (১৮৭৫) মহাকাব্যে সিরাজউদ্দৌলার পতন এবং বাংলার স্বাধীনতা হরণের বিষয়টি অত্যন্ত করুণ ও আবেগময় ভাষায় ফুটিয়ে তোলা হয়, যা সাধারণ মানুষের মনে সিরাজের প্রতি গভীর সহানুভূতি তৈরি করে।
শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত: ১৯৩৮ সালে তাঁর লেখা 'সিরাজদ্দৌলা' নাটকটি মঞ্চ ও পরবর্তীতে যাত্রাপালার মাধ্যমে সিরাজকে বাংলার ঘরে ঘরে এক আবেগের প্রতীকে পরিণত করে।
@ The Saifullah
২০২১ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু গবেষক ১৩৩ জন স্কুল শিক্ষার্থীর উপর পরীক্ষা চালিয়ে জানান, গণিত অনুশীলন না করলে কিংবা ছেড়ে দিলে মস্তিষ্কের খুবই গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক (গামা অ্যামাইনো বিউটাইরিক অ্যাসিড)-এর ক্ষরণ হ্রাস পায়, যার দরুন কমে যায়, নতুন কিছু শেখার প্রবণতা, পড়া মনে রাখা, প্রবলেম সলভিং স্কিল উপস্থিত বুদ্ধি, সিদ্ধান্ত এবং যুক্তি প্রদর্শনের দক্ষতা।
৩১
বিরিয়ানির ইতিহাস
বিরিয়ানির ইতিহাস আসলে কোনো একক দেশ বা একজন শাসকের তৈরি খাবারের ইতিহাস নয়। এটি পারস্য–মধ্য এশিয়া–দক্ষিণ এশিয়ার কয়েক শতাব্দীর সাংস্কৃতিক ও খাদ্য-আদানপ্রদানের ফল। “বিরিয়ানি মুঘলরা আবিষ্কার করেছিলেন”—এমন সরল বক্তব্য ঐতিহাসিকভাবে যথেষ্ট নির্ভুল নয়। বরং মুঘল যুগে এটি ভারতীয় উপমহাদেশে একটি স্বতন্ত্র রূপ পায় এবং পরে বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে অসংখ্য স্থানীয় রূপ তৈরি করে।
১. “বিরিয়ানি” নামটির উৎস কোথায়?
“বিরিয়ানি” শব্দটির উৎস সাধারণত ফারসি ভাষায় খোঁজা হয়। দুটি ফারসি শব্দের সঙ্গে এর সম্পর্ক দেখানো হয়:
birinj (বিরিঞ্জ) = চাল/ভাত
biryan/birian (বিরিয়ান) = ভাজা বা রান্নার আগে ভেজে নেওয়া
তবে শব্দটির সুনির্দিষ্ট ব্যুৎপত্তি নিয়ে কিছু মতভেদ আছে। তাই “শব্দটি ফারসি”—এটা মোটামুটি গ্রহণযোগ্য হলেও, শব্দের উৎস প্রমাণ করলেই আধুনিক বিরিয়ানির আবিষ্কারস্থল পারস্য প্রমাণিত হয় না।
২. বিরিয়ানির পূর্বসূরি ছিল “পিলাফ/পোলাও”
বিরিয়ানির ইতিহাস বোঝার জন্য পিলাফ বা পোলাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পারস্য ও মধ্য এশিয়ার রান্নায় বহু শতাব্দী ধরে চালের সঙ্গে মাংস, ঘি/চর্বি, মসলা, শুকনো ফল ইত্যাদি রান্নার প্রচলন ছিল। মধ্যযুগীয় ইসলামী বিশ্বের বাণিজ্য, সামরিক অভিযান, অভিবাসন এবং রাজদরবারের মাধ্যমে এ ধরনের রান্নার পদ্ধতি বিস্তৃত হয়।
কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে:
পোলাও = বিরিয়ানি নয়।
পোলাও সাধারণত তুলনামূলকভাবে সুগন্ধি ও হালকা; বিরিয়ানিতে মাংসের মেরিনেশন, মসলা, চালের স্তর, এবং অনেক ক্ষেত্রে dum বা সিল করা পাত্রে ধীরে রান্নার পদ্ধতি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
---
৩. ভারতীয় উপমহাদেশে আসার আগে কি মাংস-ভাতের খাবার ছিল?
হ্যাঁ। এ কারণেই “বিরিয়ানি সম্পূর্ণ বিদেশি খাবার”—এমন বক্তব্যও অতিরঞ্জিত।
দক্ষিণ ভারতের প্রাচীন তামিল সাহিত্যে ūn sōru (উন্ সোরু) নামে একটি খাবারের উল্লেখ পাওয়া যায়—মাংস, চাল, ঘি ও মসলা দিয়ে তৈরি খাবার। এটি খ্রিস্টীয় প্রথম কয়েক শতকের সাহিত্যে পাওয়া যায় এবং পরবর্তী মাংস-ভাতের খাবারের সঙ্গে এর কাঠামোগত সাদৃশ্য রয়েছে।
অর্থাৎ ভারতীয় উপমহাদেশে মাংস + চাল + মসলা-ভিত্তিক খাবার মুঘলদের আগেও ছিল।
তাই আধুনিক বিরিয়ানিকে সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝানো যায় এভাবে:
> পারস্য ও মধ্য এশিয়ার চাল-মাংস রান্নার ঐতিহ্য + ভারতীয় উপমহাদেশের মসলা ও স্থানীয় রান্নার ঐতিহ্য = পরবর্তীকালের বিরিয়ানি।
---
বিরিয়ানি কোনো একদিনে আবিষ্কৃত খাবার নয়। এটি সম্ভবত কয়েক শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা একটি hybrid cuisine—যেখানে পারস্য-মধ্য এশিয়ার rice-meat tradition, ভারতীয় মসলা ও স্থানীয় রান্নার পদ্ধতি এবং মুঘল/নবাবি দরবারের culinary experimentation একত্রিত হয়েছে।
আর ভারতীয় উপমহাদেশে আসার পর বিরিয়ানি নিজেই আবার বহুবার “নতুন করে জন্ম নিয়েছে”—আওধি, হায়দরাবাদি, কলকাতা, ঢাকা, সিন্ধি, মালাবারি, থালাসেরি, আম্বুর, তামিলনাড়ু ইত্যাদি রূপে। তাই আজকের বিরিয়ানিকে একটি দেশের আবিষ্কার না বলে পারস্য, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়ার একটি খাদ্য-ঐতিহ্য বলা বেশি সঠিক। @ সংকলন
৩২
নিউ গিনি: উপনিবেশিক ইতিহাস শেষে এক দ্বীপে দুই দেশ
অস্ট্রেলিয়ার ঠিক উত্তরে ছোট্ট সাগরের ওপাড়ে আছে এক বিশাল দ্বীপ। চারদিকে নীল সমুদ্র, মাঝখানে দীর্ঘ পর্বতমালা, প্রায় পুরোটাই ঘন সবুজ অরণ্য, এটি নিউ গিনি। সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়টি হল একটি সোজা রেখা (অল্প একটু যায়গায় আকাবাকা আছে), যা দ্বীপটিকে প্রায় মাঝ বরাবর ভাগ করে দিয়েছে।
রেখাটির পশ্চিমে ইন্দোনেশিয়া, পূর্বে পাপুয়া নিউ গিনি।
এই বিভাজন কোনো প্রাকৃতিক সীমারেখার ফলে তৈরি হয় নি, এর পেছনে রয়েছে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক প্রতিযোগিতা, বিশ্বযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাব। অবশ্য দ্বীপটি শতশত ভাষা ও জাতিতে বিচিত্র ও বিভক্ত।
নিউ গিনি অস্ট্রেলিয়ার উত্তরে, প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে এর দূরত্ব খুব বেশি নয়; মাঝখানে রয়েছে টরেস প্রণালি। দ্বীপটির পশ্চিমে ইন্দোনেশিয়ার অন্যান্য দ্বীপপুঞ্জ, উত্তরে প্রশান্ত মহাসাগর এবং দক্ষিণে আরাফুরা সাগর।
প্রায় ৭ লাখ ৮৫ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডের পর পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম দ্বীপ। এর মেরুদণ্ডের মতো চলে গেছে পর্বতমালা। কোথাও তুষারাবৃত শৃঙ্গ, কোথাও ঘন ক্রান্তীয় বন, আবার কোথাও জলাভূমি ও নদীর বিস্তীর্ণ অঞ্চল।
প্রকৃতির এই বৈচিত্র্যের সঙ্গে পাল্লা দেয় মানুষের বৈচিত্র্য। হাজার হাজার বছর ধরে এখানে বসবাস করছে বহু স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী। বিশেষ করে দ্বীপটির পূর্বাংশের পাপুয়া নিউ গিনি পৃথিবীর ভাষাগত বৈচিত্র্যের অন্যতম বড় কেন্দ্র। দুর্গম পাহাড় ও বিচ্ছিন্ন উপত্যকার কারণে বহু জনগোষ্ঠী দীর্ঘকাল নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক রীতিনীতি ধরে রেখেছে।
ইউরোপীয়রা যখন এই দ্বীপের উপকূলে পৌঁছায়, তখন নিউ গিনি মানুষবিহীন ‘অজানা ভূমি’ নয়। এটি ছিল মানুষের বহু প্রজন্মের বসতভূমি। ‘আবিষ্কার’ তাই ইউরোপীয় দৃষ্টিকোণের শব্দ, স্থানীয় মানুষের কাছে এই ভূমি কখনোই অনাবিষ্কৃত ছিল না।
আফ্রিকার গিনি থেকে ‘নিউ গিনি’:
ইউরোপীয় মানচিত্রে নিউ গিনির উপস্থিতি স্পষ্ট হতে শুরু করে ১৬শ শতকে। পর্তুগিজ নাবিকেরা প্রথম দিকেই দ্বীপটির উপকূলে পৌঁছান। ১৫২৬–২৭ সালের দিকে পর্তুগিজ নাবিক জর্জ দে মেনেজেস দ্বীপটির পশ্চিমাঞ্চলে পৌঁছেছিলেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ আছে।
এরপর আসে স্পেনীয়দের পালা। ১৫৪৫ সালে স্পেনীয় নাবিক ইনিগো অর্তিজ দে রেতেস দ্বীপটির উত্তর উপকূল ধরে যাত্রা করেন। তিনিই দ্বীপটির নাম দেন Nueva Guinea- ‘নতুন গিনি’। আর আফ্রিকায় আছে তিন তিনটি পুরোনো গিনি!
রেতেসের চোখে দ্বীপটির মানুষ ও আফ্রিকার Guinea অঞ্চলের মানুষের মধ্যে কিছুটা সাদৃশ্য ধরা পড়েছিল বলে মনে করা হয়। সেই ধারণা থেকেই আফ্রিকার Guinea-এর সঙ্গে ‘Nueva’ বা ‘New’ যুক্ত হয়। পরে ইউরোপীয় মানচিত্রে নামটি স্থায়ী হয়ে যায়- New Guinea।
তবে নামটি প্রতিষ্ঠিত হলেও দ্বীপটির বিশাল অভ্যন্তরীণ অঞ্চল ইউরোপীয়দের কাছে দীর্ঘদিন রহস্যই থেকে যায়। উপকূলের বাইরে ছিল দুর্গম পাহাড়, অরণ্য ও বিচ্ছিন্ন জনপদ। ইউরোপীয় অনুসন্ধান সেখানে পৌঁছাতে সময় নেয়।
কিন্তু ১৯শ শতকের শেষদিকে নিউ গিনির প্রতি ইউরোপীয় আগ্রহের চরিত্র বদলে গেল। এবার আর শুধু মানচিত্র আঁকার কৌতূহল নয়, শুরু হলো ভূখণ্ড দখলের প্রতিযোগিতা।
তিন ইউরোপিয় শক্তির ভাগ-বাটোয়ারা:
১৮৮০-এর দশকে প্রশান্ত মহাসাগর হয়ে উঠেছিল ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র। ব্রিটেন, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডস, এই তিন শক্তিই নিউ গিনির বিভিন্ন অংশে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে।
পশ্চিমাংশে নেদারল্যান্ডসের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে দ্বীপটির দক্ষিণ-পূর্ব অংশে ব্রিটিশ প্রভাব তৈরি হয়। ১৮৮৪ সালে জার্মানি উত্তর-পূর্ব নিউ গিনিতে নিজেদের কর্তৃত্ব ঘোষণা করে। একই সময়ে ব্রিটেন দক্ষিণ-পূর্ব অংশে নিজেদের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে।
পরবর্তী চুক্তিগুলো এই দাবিগুলোকে আরও স্পষ্ট করে দেয়। একসময় একটি ভূখণ্ডের ওপর তিন ঔপনিবেশিক শক্তির তিন ধরনের প্রশাসনিক পরিচয় তৈরি হলো।
১. পশ্চিমে ডাচ নিউ গিনি।
২. দক্ষিণ-পূর্বে ব্রিটিশ নিউ গিনি।
৩. উত্তর-পূর্বে জার্মান নিউ গিনি।
বিশ্বযুদ্ধের পর:
১৯১৪ সালে অস্ট্রেলীয় বাহিনী জার্মান নিউ গিনি দখল করে নেয়। যুদ্ধে জার্মানির পরাজয়ের পর তার উপনিবেশগুলোও বিজয়ীরা ভাগবাটোয়ারা করে নেয়। লীগ অব নেশনসের ম্যান্ডেটের অধীনে জার্মান নিউ গিনির প্রশাসন অস্ট্রেলিয়ার হাতে চলে যায়।
এর ফলে নিউ গিনির পূর্বাংশের দুই আলাদা ঔপনিবেশিক ভূখণ্ড- সাবেক ব্রিটিশ নিউ গিনি এবং সাবেক জার্মান নিউ গিনি ক্রমে একই অস্ট্রেলীয় প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে চলে আসে।
অন্যদিকে পশ্চিম নিউ গিনি থেকে যায় নেদারল্যান্ডসের হাতে।
এভাবেই ২০শ শতকের প্রথমার্ধে দ্বীপটির রাজনৈতিক অবস্থা এসে দাঁড়ায় পশ্চিমে ডাচ শাসন, পূর্বে অস্ট্রেলীয় শাসন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আবারও নিউ গিনিকে যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে আসে। জাপানি বাহিনী দ্বীপটির বিভিন্ন অংশে অগ্রসর হয় এবং মিত্রবাহিনীর সঙ্গে ভয়াবহ লড়াই হয়। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পূর্ব নিউ গিনি আবার অস্ট্রেলীয় প্রশাসনের অধীনে ফিরে আসে।
কিন্তু এবার পৃথিবী বদলে গেছে। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যগুলো দুর্বল হচ্ছে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরে স্বাধীনতার দাবি জোরালো হচ্ছে। নিউ গিনিও সেই পরিবর্তনের বাইরে থাকল না।
পশ্চিমে ইন্দোনেশিয়া, পূর্বে স্বাধীন পাপুয়া নিউ গিনি:
১৯৪৯ সালে নেদারল্যান্ডস ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা স্বীকার করে। কিন্তু পশ্চিম নিউ গিনি তখনও ডাচদের হাতে। ইন্দোনেশিয়া দাবি করল, সাবেক ডাচ ইস্ট ইন্ডিজের অংশ হিসেবে পশ্চিম নিউ গিনিও তাদের রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।
বিরোধ ক্রমে তীব্র হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ১৯৬২ সালে নিউ ইয়র্ক চুক্তির মাধ্যমে পশ্চিম নিউ গিনির প্রশাসন সাময়িকভাবে জাতিসংঘের হাতে যায়। পরে ১৯৬৩ সালে অঞ্চলটির প্রশাসন ইন্দোনেশিয়ার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
১৯৬৯ সালে পশ্চিম নিউ গিনির ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়, যার ফলাফল ছিল ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে অঞ্চলটির থাকা। সেই প্রক্রিয়ার পদ্ধতি নিয়ে পরবর্তীকালে বিতর্ক ও সমালোচনা হয়েছে; তবে এর পর থেকেই পশ্চিম নিউ গিনি ইন্দোনেশিয়ার প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ।
অন্যদিকে পূর্ব নিউ গিনির ইতিহাস এগিয়েছে অন্য পথে। অস্ট্রেলিয়ার অধীনে থাকা Papua ও New Guinea-কে ১৯৪৯ সালে একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থার অধীনে আনা হয়। ধীরে ধীরে স্বশাসনের দিকে এগিয়ে যায় ভূখণ্ডটি। অবশেষে ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭৫ সালে জন্ম নেয় স্বাধীন রাষ্ট্র 'পাপুয়া নিউ গিনি'। এভাবেই কয়েক শতকের অভিযাত্রা, ঔপনিবেশিক প্রতিযোগিতা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি পরিণতি পায়।
@ বইকাল
৩৩
*প্লাস্টিকের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া এক খাঁটি মিনারেলের খনি - মাটির কলসি!*
আমরা অনেকেই ভাবি, আধুনিক প্রযুক্তির দামি ফিল্টার কিংবা বোতলজাত মিনারেল ওয়াটারই হয়তো সবচেয়ে নিরাপদ। কিন্তু আমরা কি জানি, এই কৃত্রিম ফিল্টারিং প্রক্রিয়ায় পানি তার অনেক প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক খনিজ উপাদান হারিয়ে ফেলে? অথচ আমাদের গ্রামবাংলায় যুগ যুগ ধরে চলে আসা এক প্রাকৃতিক সমাধান লুকিয়ে আছে, যা পানিকে একই সাথে শতভাগ নিরাপদ, সুস্বাদু এবং মিনারেল সমৃদ্ধ করে তোলে।
গ্রামে প্রকৃতির উপহার—"বৃষ্টির পানি" এবং আমাদের ঐতিহ্য—"মাটির ফিল্টার বা কলসি", এই দুটির মেলবন্ধন কীভাবে আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য এক চমৎকার নিয়ামত হতে পারে, চলুন জেনে নেওয়া যাক:
১. বৃষ্টির পানি: প্রকৃতির নিজস্ব বিশুদ্ধতা:
টানা বৃষ্টি শুরুর প্রথম ১০-১৫ মিনিট পর টিনের চাল বা ছাদ থেকে যে পরিষ্কার পানি নেমে আসে, তা প্রাকৃতিকভাবেই অত্যন্ত বিশুদ্ধ ও ক্ষতিকর কেমিক্যাল মুক্ত। এই পানি সংগ্রহ করে ৪ থেকে ৮ স্তরের সুতি কাপড়ে ছেঁকে নিয়ে ১০-২০ মিনিট ফুটিয়ে নিলেই তা হয়ে যায় শতভাগ জীবাণুমুক্ত ও পানের যোগ্য।
২. মাটির ফিল্টারের জাদুকরী ছোঁয়া:
বৃষ্টির পানি প্রাকৃতিকভাবে কিছুটা মৃদু (Soft Water) হওয়ায় এতে মিনারেলের পরিমাণ কম থাকে। কিন্তু এই পানি যখন পোড়ামাটির ফিল্টার বা মাটির কলসিতে রাখা হয়, তখন মাটি থেকে প্রাকৃতিকভাবেই ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন এবং সিলিকার মতো শরীরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান পানিতে দ্রবীভূত হয়।
৩. অ্যাসিডিটি দূর করে ও পিএইচ (pH) ব্যালেন্স করে:
আমাদের শরীর সুস্থ রাখতে ক্ষারীয় বা অ্যালকালাইন পানি ভীষণ উপকারী। মাটি প্রাকৃতিকভাবেই ক্ষারীয়। ফলে মাটির পাত্রে রাখা পানি শরীরের ভেতরের অ্যাসিডিক উপাদানকে প্রশমিত করে পিএইচ লেভেল নিয়ন্ত্রণ করে। যারা নিয়মিত গ্যাস্ট্রিক বা হজমের সমস্যায় ভোগেন, তাদের জন্য মাটির পাত্রের পানি এক মহৌষধ!
৪. কোনো বিদ্যুৎ ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা:
মাটির পাত্রের গায়ে থাকা অসংখ্য অদৃশ্য ক্ষুদ্র ছিদ্র দিয়ে পানি বাষ্পীভূত হয়, যা পাত্রের ভেতরের পানিকে প্রাকৃতিকভাবেই দারুণ ঠান্ডা ও প্রাণবন্ত (Lively) রাখে। ফ্রিজের কৃত্রিম ঠান্ডা পানির মতো এতে গলা ব্যথা বা ঠাণ্ডা লাগার কোনো ভয় থাকে না।
৫. সম্পূর্ণ প্লাস্টিক ও কেমিক্যাল মুক্ত:
আধুনিক প্লাস্টিক ফিল্টার থেকে পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক মেশার ঝুঁকি থাকে। অন্যদিকে মাটির ফিল্টার সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব এবং সাশ্রয়ী। কোনো বিদ্যুৎ বা দামি রাসায়নিক ছাড়াই এটি পরিবারকে দেয় সুরক্ষার নিশ্চয়তা।
*মনে রাখার কিছু জরুরি টিপস:
• দীর্ঘমেয়াদে বড় ড্রাম বা ট্যাংকে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করলে (যা ৪-৬ মাস পর্যন্ত ভালো থাকে), তা পানের ঠিক আগে অবশ্যই ফুটিয়ে নিয়ে মাটির কলসিতে ঢালবেন।
• মাটির কলসি বা ফিল্টার সবসময় ঘরের অন্ধকার ও ঠান্ডা জায়গায় রাখবেন যেন শ্যাওলা না জমে।
• প্রতিবার নতুন পানি ভরার আগে কলসি ভালো করে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে নেওয়া উচিত।
*কৃত্রিমতার এই যুগে শরীরকে সুস্থ আর সতেজ রাখতে চলুন আবার ফিরে যাই প্রকৃতির সেই খাঁটি অভ্যাসে। প্লাস্টিক আর কেমিক্যালকে 'না' বলে, মাটির ছোঁয়ায় জীবনকে করে তুলি আরও সুন্দর, আরও প্রাণবন্ত ও দীর্ঘজীবী।
@ salman hossain
৩৪
উন্নত দেশগুলো লড়াই করে কোয়ালিটির জন্য, আর বাঙালিরা লড়াই করে কোয়ান্টিটির জন্য।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়– তারা সংখ্যার পেছনে ছোটে না, তারা ছোটে মানের পেছনে। আর ঠিক উল্টোটা দেখা যায় বাংলাদেশের বাঙালি সমাজে। এখানে “কতটা ভালো” তার চেয়ে “কতটা বেশি” এই প্রশ্নটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, গবেষণা, দক্ষতা ও বাস্তব প্রয়োগ। ফিনল্যান্ড, জার্মানি বা জাপানে একজন শিক্ষার্থী কম নম্বর পেলেও যদি দক্ষ হয়, সে সম্মান পায়। অন্যদিকে বাংলাদেশের বাঙালি সমাজে কত GPA পেলো, কয়টা সার্টিফিকেট আছে, কয়টা কোচিং করেছে এসবই মুখ্য। ফলে ডিগ্রির সংখ্যা বাড়ে, কিন্তু দক্ষ জনশক্তি তৈরি হয় না। বাংলাদেশের বাঙালিরা গ্র্যাজুয়েট উৎপাদন করে, মানুষ তৈরি করে না।
উন্নত গণতন্ত্রগুলোতে রাজনৈতিক লড়াই হয় শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান তৈরির জন্য, জবাবদিহিমূলক প্রশাসনের জন্য, নীতির মানের জন্য। আর বাংলাদেশের রাজনীতিতে লড়াই হয় কে কত মানুষ নামাতে পারবে, কার মিছিল বড়, কার জানাজায় লোক বেশি, কার পোস্ট বেশি ভাইরাল। নীতির মানের চেয়ে ভিড়ের পরিমাণই মূল্যায়নের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়।
জাপান বছরে অল্প গাড়ি বানায়, কিন্তু সেগুলোর মান এমন যে, সারা পৃথিবী কিনতে চায়। জার্মানি কম ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করে, কিন্তু তারা বিশ্বমানের। বাংলাদেশের বাঙালিরা করে উল্টোটা। গার্মেন্টে লাখ লাখ শ্রমিক, কিন্তু স্কিল কম, মজুরি কম। রেমিট্যান্স আসে, কিন্তু উদ্ভাবন আসে না। বাংলাদেশের বাঙালিরা সস্তা শ্রমে কোয়ান্টিটি দেয়, উন্নত দেশ উচ্চ দক্ষতায় কোয়ালিটি দেয়।
উন্নত সমাজে একটি বই কম বিক্রি হলেও যদি তা চিন্তাকে সমৃদ্ধ করে, সেটাই সাফল্য। আর বাঙালিদের কাছে কত ভিউ, কত লাইক, কত ফলোয়ার! একটা ফাঁপা কনটেন্টও যদি ভাইরাল হয়, সেটাই "সফলতা"। গভীরতা নয়, হাইপ-ই হয়ে ওঠে মানদণ্ড।
উন্নত দেশগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার পরিকল্পনা করে ২০–৩০ বছরের জন্য। তারা প্রশ্ন করে– এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কী দেবে? আর বাংলাদেশে প্রশ্ন হয়– এই সিদ্ধান্তে কয়টা ভোট বাড়বে? কয়টা লোক খুশি হবে? ফলে সংখ্যার রাজনীতি টিকে থাকে, কিন্তু টেকসই উন্নয়ন হয় না।
উন্নত দেশগুলো বোঝে ১০ জন ভালো মানুষ ১০ হাজার অদক্ষ মানুষের চেয়ে বেশি মূল্যবান। আর বাংলাদেশের বাঙালি সমাজ এখনো বিশ্বাস করে— “সংখ্যাই শক্তি, মান পরে দেখা যাবে।” যতদিন বাংলাদেশের বাঙালিরা কোয়ান্টিটির মোহ থেকে বের হয়ে কোয়ালিটির গুরুত্ব বুঝতে না পারবে, ততদিন ভিড় বাড়বে, কিন্তু সভ্যতা নয়। গলা বাড়বে, গভীরতা বাড়বে না। সংখ্যা বাড়বে, সক্ষমতা বাড়বে না। @ অনিন্দ্য জয়
৩৫
ফালতু আর নোংরা জিনিসকে ঘেঁটে দেখার সীমাহীন আগ্রহ বাঙালির জন্মগত চরিত্র।
সৌদি আরবে অ্যালকোহল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবুও সেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এবং চড়া দামে অ্যালকোহলের কালোবাজার গড়ে উঠেছে! অনেক ধনী ব্যক্তি গোপনে পশ্চিমা দেশ থেকে অ্যালকোহল আমদানি করে থাকেন!
ইরানে পশ্চিমা সিনেমা, মিউজিক ও টিভি নিষিদ্ধ। তবুও দেশটি বিশ্বে পাইরেটেড মিডিয়া এবং আন্ডারগ্রাউন্ড মিউজিক প্রোডাকশনের জন্য বিখ্যাত!
পাকিস্তানে পর্ণগ্রাফি দেখা নিষিদ্ধ। তবুও পর্ণগ্রাফি দেখার ক্ষেত্রে পাকিস্তানিরা বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে!
চীনে পশ্চিমা প্রযুক্তি প্লাটফর্ম গুগল, ফেসবুক ইত্যাদি নিষিদ্ধ। কিন্তু তারা নিজস্ব ভার্সন উইচ্যাট, টিকটক ইত্যাদি তৈরি করে বিশ্বে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে!
অন্যদিকে, জার্মান ও নেদারল্যান্ডসে গাঁজা নিষিদ্ধ নয়, বরং আইনগত বৈধ। তবুও জার্মানি এবং ডাচ তরুণদের মধ্যে গাঁজা সেবনের হার খুবই কম, যা অনেক দেশের “নিষিদ্ধ করলে সমাধান” থিওরিকে ভুল প্রমাণ করে।
বাংলাদেশে কমনসেন্স নিষিদ্ধ নয়, তবুও বাঙালির মধ্যে কমনসেন্সের ব্যবহার নেই বললেই চলে। এদেশে মিথ্যাচার করে এবং গুজব ছড়িয়ে বাঙালিকে ঘোল খাওয়ানো যায় এবং সস্তা ও চটকদার কন্টেন্ট বানিয়ে বাঙালিকে বিভ্রান্ত ও অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে ব্যস্ত রেখে লক্ষ-লক্ষ ভিউ এবং হাজার-হাজার ডলার কামানো যায়। বাংলাদেশের পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থায় জনগণকে শেখানোই হয় না কোনটাকে ইগনোর করতে হয়, আর কোনটাকে গুরুত্ব দিতে হয়। ফালতু আর নোংরা জিনিসকে ঘেঁটে দেখার সীমাহীন আগ্রহ বাঙালির জন্মগত চরিত্র। বাঙালি কোনোকিছু না ঘেঁটে বুঝতেই পারে না জিনিসটা আসলে ‘নোংরা’ ছিলো। @ অনিন্দ্য জয়
৩৬
অন্যের আচরণ সবসময় আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকবে না—কিন্তু নিজের আচরণ থাকবে।
জীবনে কেউ আপনাকে কষ্ট দেবে, কেউ অবহেলা করবে, কেউ আপনার সীমারেখা বুঝবে না।
কিন্তু অন্যের আচরণ সামলাতে গিয়ে নিজেকেই হারিয়ে ফেলতে হবে—এমন কোনো কথা নেই।
নিজেকে ভালো রাখার জন্য কিছু বিষয় মনে রাখা জরুরি—
১. সবকিছু নিজের দায়িত্ব ভাববেন না।
সবাইকে খুশি করা, সবার সমস্যা সমাধান করা কিংবা সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া আপনার কাজ নয়।
কিছু আপনার সামর্থ্যের বাইরে হলে “না” বলতে শিখুন।
সবসময় সবার জন্য উপস্থিত থাকা মানেই ভালো মানুষ হওয়া নয়।
২. কষ্টের সময় নিজের যত্ন আরও বেশি নিন।
কেউ কষ্ট দিয়েছে বলে খাওয়া-ঘুম নষ্ট করা, নিজের কাজ বন্ধ করে দেওয়া কিংবা সারাক্ষণ একই বিষয় নিয়ে ভাবতে থাকা—শেষ পর্যন্ত ক্ষতিটা আপনারই।
মন খারাপ থাকলেও নিজের মৌলিক প্রয়োজনগুলোর যত্ন নিন। কারণ ভেঙে পড়া অবস্থায় নেওয়া সিদ্ধান্ত সবসময় পরিষ্কার হয় না।
৩. কাউকে ধরে রাখতে গিয়ে নিজের মূল্য কমিয়ে দেবেন না।
কেউ দূরে সরে যাচ্ছে বলে বারবার নিজেকে প্রমাণ করা, অতিরিক্ত চেষ্টা করা কিংবা নিজের প্রয়োজনগুলো উপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই।
একটি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে দুজনেরই চেষ্টা প্রয়োজন। শুধু একজন বারবার চেষ্টা করে গেলে একসময় সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।
৪. নিজের কষ্ট সবার কাছে প্রকাশ করা জরুরি নয়।
সব মানুষ আপনার ব্যক্তিগত কথা জানার মতো নিরাপদ নয়।
কাকে কতটা বলবেন, সেটা বেছে নিন। আপনার দুর্বলতাকে যে মানুষ পরে আপনার বিরুদ্ধেই ব্যবহার করবে না—নিজের গভীর কথাগুলো বলার জন্য এমন মানুষকেই বেছে নেওয়া ভালো।
৫. পরামর্শ শুনুন, কিন্তু নিজের বিচারবুদ্ধি হারাবেন না।
কেউ বয়সে বড় হলেই তার প্রতিটি কথা আপনার জন্য সঠিক হবে—এমন নয়। আবার কেউ অভিজ্ঞ হলেই তার অভিজ্ঞতা আপনার পরিস্থিতির সঙ্গে হুবহু মিলে যাবে—তাও নয়।
পরামর্শ নিন, ভেবে দেখুন, তারপর নিজের পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিন।
৬. সবসময় ঝুঁকিমুক্ত জীবন সম্ভব নয়।
নতুন কিছু শুরু করা, পরিবর্তন আনা কিংবা নিজের জন্য কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কিছু অনিশ্চয়তা থাকবেই।
ভুল হওয়ার ভয়েই যদি সবসময় একই জায়গায় আটকে থাকেন, তাহলে নতুন কিছু শেখার সুযোগও কমে যাবে।
তাই হুট করে নয়—ভেবে, বুঝে এবং প্রয়োজনীয় ঝুঁকি নিয়ে এগোতে শিখুন।
৭. আপনার সঙ্গে যা হয়েছে, তা যেন আপনাকে বদলে না দেয়।
জীবনে কিছু মানুষ আপনাকে কষ্ট দেবে। এমন অভিজ্ঞতাও আসতে পারে, যা আপনি কখনোই প্রাপ্য ছিলেন না।
কিন্তু সেই অভিজ্ঞতার কারণে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, সবাইকে অবিশ্বাস করা কিংবা নিজের ভালো দিকগুলো হারিয়ে ফেলার প্রয়োজন নেই।
খারাপ অভিজ্ঞতা থেকে সতর্ক হোন, কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাকেই নিজের স্বভাব বানিয়ে ফেলবেন না।
৮. নিজের মূল্য অন্যের আচরণ দিয়ে মাপবেন না।
কেউ আপনাকে গুরুত্ব দিল না, আপনার চেষ্টা বুঝল না কিংবা আপনাকে বেছে নিল না—তাতে আপনার মূল্য কমে যায় না।
নিজের যত্ন নিন। নিজের সীমারেখা বুঝুন। প্রয়োজনে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করুন।
কারণ আত্মসম্মান মানে সবাইকে ছেড়ে দেওয়া নয়।
কোথায় মানিয়ে নেওয়া যায়, আর কোথায় নিজের জন্য দাঁড়ানো প্রয়োজন—সেটা বুঝতে পারাও আত্মসম্মান।
শেষ কথা
অন্য মানুষ কী করবে, সেটা সবসময় আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।
কেউ আপনাকে ভালোবাসবে, কেউ ভুল বুঝবে।
কেউ সম্মান করবে, কেউ অবহেলা করবে।
কেউ পাশে থাকবে, কেউ চলে যাবে।
কিন্তু তাদের আচরণের কারণে আপনি নিজের সঙ্গে কেমন আচরণ করবেন—সেটা আপনার হাতে।
তাই অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা না করে,
নিজেকে হারিয়ে না ফেলার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
কারণ জীবনে অনেক কিছু হারানো যায়—
কিন্তু নিজেকে হারিয়ে ফেলা যেন তার মধ্যে না থাকে।
৩৭
বেলুচিস্তান
আজকের বিশ্ব মানচিত্রে বেলুচিস্তানকে আমরা পাকিস্তানের আয়তনের দিক থেকে সবচেয়ে বড় (প্রায় ৪৪%) এবং খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এক অঞ্চল হিসেবে চিনি। কিন্তু এই ভূখণ্ডের পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পেছনে কোনো স্বতঃস্ফূর্ত বা আনন্দের ইতিহাস নেই, বরং আছে এক নির্মম প্রতারণা, সামরিক আগ্রাসন এবং দশকের পর দশক ধরে চলা জাতিগত নিপীড়নের গল্প।
ইতিহাসের পাতায় লুকিয়ে থাকা সেই নির্মম সত্যকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতির পরিচয়কে কীভাবে জোরপূর্বক বুটের তলায় পিষে ফেলা হয়েছিল এবং সেই ক্ষত কীভাবে আজও বেলুচ জনগণকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
০১. [ ব্রিটিশদের আগের বেলুচিস্তান: স্বাধীন সালতানাত ও ঐতিহ্যবাহী গোত্রশাসন ] -
১৮৩৯ সালে ব্রিটিশদের আগমনের আগে বেলুচিস্তানের ইতিহাস ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং এখানে কোনো বিদেশি শক্তির স্থায়ী শাসন ছিল না। মূলত ১৬৬৬ সালে মীর আহমেদ খানের হাত ধরে স্বাধীন মুসলিম বেলুচ সালতানাত '(খানাত অব কালাত) গড়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে একটি স্বশাসিত শক্তিশালী কনফেডারেসি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
এই সালতানাতের সবচেয়ে পরাক্রমশালী শাসক প্রথম মীর নাসির খানের আমলে (১৭৪৯-১৭৯৪) মাকরান, লাসবেলা ও খারানের মতো অঞ্চলগুলোকে এক সুতায় বেঁধে একটি ঐক্যবদ্ধ কাঠামো গঠন করা হয়।
এই সময়ে বেলুচিস্তান নিজস্ব কর ব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা ও সামরিক বাহিনী নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন দেশ হিসেবে পরিচালিত হতো এবং বিভিন্ন সময়ে পারস্যের সাফাবি বা ভারতের মুঘল সাম্রাজ্যের কিছুটা প্রভাব থাকলেও, বেলুচ গোত্রপ্রধানরা সবসময় তাদের অভ্যন্তরীণ স্বায়ত্তশাসন কঠোরভাবে বজায় রেখেছিলেন।
০২. [ ব্রিটিশ আমল: দুই ভাগে বিভক্ত প্রশাসন ও চুক্তির রাজনীতি ] -
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পূর্বে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে বেলুচিস্তান কোনো একক প্রশাসনিক ইউনিট ছিল না, বরং ব্রিটিশরা তাদের সাম্রাজ্যিক স্বার্থ এবং আফগানিস্তান ও রাশিয়ার সীমান্ত সুরক্ষার জন্য এই অঞ্চলকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করে শাসন করত। এর একটি অংশ ছিল 'ব্রিটিশ বেলুচিস্তান', যা কোয়েটা, নাসিরাবাদ এবং বোলান পাসের মতো কৌশলগত এলাকা নিয়ে গঠিত ছিল এবং এখানে সরাসরি একজন ব্রিটিশ চিফ কমিশনার ভাইসরয়ের অধীনে পরিচালনা করতেন।
অন্য অংশটি গঠিত হয়েছিল আধা-স্বাধীন দেশীয় রাজ্যসমূহ নিয়ে, যার মধ্যে কালাত, মাকরান, লাসবেলা এবং খারান অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই দেশীয় রাজ্যগুলো তাদের নিজস্ব প্রথাগত আইন এবং 'শাহি জিরগা' বা আঞ্চলিক উপজাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো পরিচালনা করত, আর ১৮৫৪ ও ১৮৭৬ সালের বিশেষ চুক্তির মাধ্যমে শুধুমাত্র পররাষ্ট্র নীতি ও সুরক্ষার বিষয়টি তারা ব্রিটিশদের হাতে ন্যস্ত করেছিল।
০৩. [ মুসলিম হয়েও কেন পাকিস্তানে যেতে চায়নি স্বাধীনচেতা বেলুচরা? ] -
১৯৪৭ সালে যখন দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ধর্মকে পুঁজি করে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির উন্মাদনা তুঙ্গে, তখন বেলুচরা এই ধর্মীয় জিগিরকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছিল, কারণ মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও তাদের নিজেদের একটি স্বতন্ত্র প্রাচীন সংস্কৃতি, ভাষা এবং হাজার বছরের নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস ছিল।
তৎকালীন কালাত বা বেলুচিস্তানের নবগঠিত দুই কক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের (Dar-ul-Awam) সদস্যরা সর্বসম্মতিক্রমে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাবকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করে দেন। বেলুচ নেতাদের বক্তব্য ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার—তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে তারা মুসলিম হতে পারেন কিন্তু তারা পাকিস্তানি নন এবং ধর্মের নামে তারা তাদের স্বাধীন সার্বভৌম পরিচয় কোনো কৃত্রিম রাষ্ট্রের কাছে সমর্পণ করবেন না।
তারা দূরদর্শিতা দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন যে পাঞ্জাবি মুসলিম শাসিত পাকিস্তান মূলত একটি নতুন ধরনের ঔপনিবেশিক মানসিকতার রাষ্ট্র হতে যাচ্ছে, যা পরবর্তীতে অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছিল।
০৪. [ ১৯৪৭–১৯৪৮: জিন্নাহর বিশ্বাসঘাতকতা এবং বন্দুকের মুখে বেলুচিস্তান দখল ] -
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ব্রিটিশরা উপমহাদেশ ছেড়ে যাওয়ার সময় কালাত রাজ্য একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যার ভিত্তি ছিল ১১ আগস্ট ১৯৪৭ সালের একটি ঐতিহাসিক ত্রিপক্ষীয় চুক্তি, যেখানে লর্ড মাউন্টব্যাটেন ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ স্বয়ং কালাতের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।
ফলস্বরূপ, ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ সালে কালাতের খান আনুষ্ঠানিকভাবে বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং সেখানে নিজস্ব জাতীয় পতাকা উড়িয়ে স্বাধীনভাবে দেশ পরিচালনা শুরু হয়। কিন্তু পাকিস্তানের নজর পড়েছিল বেলুচিস্তানের বিশাল ভূখণ্ড, কৌশলগত অবস্থান এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর, যার ফলে রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে ব্যর্থ হওয়ার পর পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেন।
অবশেষে ২৭ মার্চ ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী বেলুচিস্তানের উপকূল অবরুদ্ধ করে কালাতের রাজধানী কোয়েটা ও রাজপ্রাসাদ চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে এবং চরম রক্তপাত এড়াতে আক্ষরিক অর্থেই বন্দুকের নলের মুখে দাঁড়িয়ে কালাতের খান মীর আহমেদ ইয়ার খান পাকিস্তানের একীভূতকরণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন, যার ফলে মাত্র ২২৭ দিনের মাথায় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মানচিত্রকে গিলে খায় নবগঠিত পাকিস্তান।
০৫. [ তীব্র বৈষম্য ও political rights হরণ: এক আধুনিক পাকিস্তানি উপনিবেশ ] -
পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার বেলুচদের সাথে চরম অমানবিক, বৈষম্যমূলক এবং ঔপনিবেশিক আচরণ করে আসছে, যা এই অঞ্চলের মানুষকে স্থায়ী ক্ষোভের দিকে ঠেলে দিয়েছে। অর্থনৈতিক শোষণের চরম নজির হলো, বেলুচিস্তানের 'সুই গ্যাস' এবং বিপুল খনিজ সম্পদ দিয়ে পুরো পাকিস্তানের চাকা সচল রাখা হলেও, বেলুচিস্তান নিজেই পাকিস্তানের সবচেয়ে দরিদ্র ও অবহেলিত অঞ্চল হিসেবে রয়ে গেছে, যেখানে প্রায় ৭০% মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে।
রাজনৈতিকভাবে বেলুচদের কোনো প্রকৃত অধিকার নেই এবং ১৯৭৩ সালে তৎকালীন পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো বেলুচিস্তানের নির্বাচিত প্রগতিশীল প্রাদেশিক সরকারকে দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়ে বরখাস্ত করে সামরিক শাসন জারি করেছিলেন। এছাড়াও, পাকিস্তান সেনাবাহিনী সেখানে "তুলে নিয়ে খুন করা" (Enforced Disappearances) নীতি অনুসরণ করে হাজার হাজার শান্তিকামী বেলুচ ছাত্র, বুদ্ধিজীবী ও অধিকারকর্মীকে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর মাধ্যমে গুম করে ফেলেছে, যাদের আর কোনোদিন খোঁজ পাওয়া যায়নি।
০৬. [ রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও প্রাণের আহুতি ] -
স্বাধীনতার দীর্ঘ লড়াই প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত বেলুচরা এই জোরপূর্বক দখলদারিত্বকে কখনোই মেনে নে এবং ১৯৪৮ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত অন্তত পাঁচবার বড় ধরনের সশস্ত্র গণবিদ্রোহ (১৯৪৮, ১৯৫৮, ১৯৬৩, ১৯৭৩ এবং ২০০৪-এর পরবর্তী সময়) সংঘটিত হয়েছে।
১৯৪৮ সালে কালাতের খানের ভাই প্রিন্স আব্দুল করিম প্রথম প্রতিরোধের ডাক দেন এবং পরবর্তীতে ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৭ সালের চতুর্থ বিদ্রোহের সময় পাকিস্তানি বিমানবাহিনী ইরানের সহায়তায় বেলুচদের ওপর নির্বিচারে কার্পেট বোমাবর্ষণ করে, যাতে প্রায় ৭,৩০০ থেকে ৯,০০০-এর বেশি বেলুচ স্বাধীনতাকামী ও সাধারণ বেসামরিক মানুষ পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে প্রাণ হারান।
সব মিলিয়ে ১৯৪৮ থেকে বর্তমান ২০২৬ সাল পর্যন্ত স্বাধীনতার এই দীর্ঘ লড়াইয়ে হাজার হাজার বেলুচ তাদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, যার প্রকৃত সংখ্যা পাকিস্তান সরকার সবসময়ই গোপন করে আসছে এবং ২০০৬ সালে প্রবীণ বেলুচ নেতা নওয়াব আকবর বুগতিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করলে স্বাধীনতার এই আগুন আরও তীব্র রূপ নেয়।
০৭. [বেলুচদের প্রতিরোধ সংগঠনসমূহ: অধিকার আদায়ের গেরিলা বাহিনী ] -
বর্তমানে বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার লড়াই মূলত ধর্মনিরপেক্ষ ও জাতীয়তাবাদী ভাবধারার বিভিন্ন সশস্ত্র ও রাজনৈতিক সংগঠন অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে পরিচালনা করছে। এর মধ্যে 'বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি' (BLA) হলো বর্তমান প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সক্রিয় সশস্ত্র গ্রুপ, যা পাকিস্তানের সামরিক স্থাপনা ও চীনা অর্থনৈতিক করিডোরের (CPEC) ওপর একের পর এক সফল গেরিলা ও আত্মঘাতী হামলা চালাচ্ছে।
পাশাপাশি, ড. আল্লাহ nazar বেলুচের নেতৃত্বাধীন 'বেলুচিস্তান লিবারেশন ফ্রন্ট' (BLF) বেলুচিস্তানের দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মাঠপর্যায়ে লড়াই করে যাচ্ছে এবং নওয়াব আকবর বুগতির নাতি ব্রাহামদাগ বুগতির নেতৃত্বাধীন 'বেলুচ রিপাবলিকান আর্মি' (BRA) অন্যতম প্রতিরোধ বাহিনী হিসেবে সক্রিয় রয়েছে।
০৮. [ উপসংহার: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ] -
১৯৭১ সালে পাকিস্তান যেভাবে বাঙালিদের ওপর অত্যাচার ও গণহত্যা চালিয়ে বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছিল, ঠিক একই রকম নৃশংস সামরিক অত্যাচার তারা আজ দশকের পর দশক ধরে বেলুচিস্তানে চালিয়ে যাচ্ছে। ধর্মের দোহাই দিয়ে বা বুলেটের জোর খাটিয়ে যে একটি স্বাধীনচেতা জাতিকে চিরকাল দাস বানিয়ে রাখা যায় না, বেলুচিস্তানের ক্ষতবিক্ষত ইতিহাস তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। বন্দুকের নলের মুখে মানচিত্রের সীমানা সাময়িকভাবে বদলে দেওয়া গেলেও, একটি পুরো জাতির বুক চিরে জেগে ওঠা মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে যে কখনোই স্তব্ধ করা যায় না, তা আজ বেলুচরা তাদের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করে চলেছে।
৩৮
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং কালাত রাজ্যের সার্বভৌমত্ম
১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট। করাচির একটি রুদ্ধদ্বার কক্ষে টেবিলে রাখা একটি বিশেষ চুক্তিপত্র । কলম হাতে দাঁড়িয়ে আছেন পাকিস্তানের হবু গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং কালাত রাজ্যের সার্বভৌম শাসক মীর আহমেদ ইয়ার খান ।
জিন্নাহ তখন স্মিত হেসে বালোচদের আশ্বস্ত করছেন, "কালাত একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবেই মর্যাদা পাবে।" কিন্তু এই দৃশ্যপটের ঠিক ২২৭ দিন পর, ১৯৪৮ সালের ২৭ মার্চ, সেই একই জিন্নাহর নির্দেশে স্বাধীন বালুচিস্তানের কপালে সেঁটে দেওয়া হয় পাকিস্তানের সিলমোহর। এটি কেবল একটি ভূখণ্ড দখলের গল্প নয়; এটি ছিল বিশ্বরাজনীতির জটিল সমীকরণ, ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা আর 'রিয়েলপলিটিক'-এর এক নির্মম ঐতিহাসিক আখ্যান।
[ ১. ] আইনি উপদেষ্টা জিন্নাহ এবং বালোচদের আকাশচুম্বী ভরসা -
এই নাটকের নেপথ্য সূত্রপাত হয়েছিল আরও আগে, ১৯৪৬ সালে। যখন খান অব কালাত নিজের রাজ্যের স্বাধীনতার জন্য ব্রিটিশদের সাথে লড়ছিলেন, তখন তার প্রধান আইনি উপদেষ্টা ছিলেন স্বয়ং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ । জিন্নাহ তখন ব্রিটিশদের সামনে অকাট্য যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে, কালাত কোনো সাধারণ ভারতীয় দেশীয় রাজ্য নয়, বরং এর অবস্থান নেপাল বা ভুটানের মতোই সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র । জিন্নাহর এই প্রখর আইনি মস্তিস্কের ওপর বালোচদের আস্থা ছিল প্রশ্নাতীত।
[ ২. ] কালাতের স্বাধীনতা ঘোষণা এবং পার্লামেন্টের সেই ঐতিহাসিক 'না' -
সেই আস্থার ওপর ভিত্তি করেই ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ শাসনের অবসানের ঠিক পরদিনই কালাত বা বালুচিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে । তারা নিজেদের জন্য একটি আধুনিক সংবিধান তৈরি করে এবং গঠিত হয় নিজস্ব দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট—‘দার-উল-আওয়াম’ ।
স্বাধীনতা লাভের পর জিন্নাহ যখন কালাতকে পাকিস্তানের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে একীভূত হওয়ার প্রস্তাব পাঠান, তখন কালাতের নির্বাচিত পার্লামেন্ট ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে সর্বসম্মতিক্রমে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে । বালোচদের অবস্থান পরিষ্কার ছিল—তারা মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের পরম বন্ধু হতে রাজি, কিন্তু নিজেদের স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে রাজি নয় ।
[ ৩. ] পাকিস্তানের অস্তিত্বের সংকট এবং জিন্নাহর কৌশলগত মোড়-
ঠিক এই বিন্দুর পরই ইতিহাসের মোড় ঘুরে যায় এবং জিন্নাহর সামনে এক কঠিন কৌশলগত সংকট তৈরি হয়। ১৯৪৮ সালের শুরুতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীর নিয়ে যুদ্ধাবস্থা এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছিল। জিন্নাহর পাকিস্তানি নীতিনির্ধারকরা বুঝতে পারলেন, বালুচিস্তানের বিশাল ভূখণ্ড, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং বিশেষ করে এর সমুদ্র উপকূল ছাড়া পাকিস্তানের কোনো ভৌগোলিক গভীরতা বা নিরাপত্তা থাকবে না।
[ ৪. ] ব্রিটিশদের গোপন সবুজ সংকেত এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি-
একই সময়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও হাওয়া বদলাতে শুরু করে। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ব্রিটিশ সামরিক নীতিনির্ধারকরা গোপন নথিতে জানান যে, মধ্য এছিয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়নের সাম্যবাদী প্রভাব রুখতে হলে বালুচিস্তান উপকূলে কালাতের মতো ছোট সেনাবাহিনীর বদলে পাকিস্তানের মতো একটি শক্তিশালী ও অনুগত সামরিক শক্তির নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। ব্রিটিশদের এই প্রচ্ছন্ন সবুজ সংকেত জিন্নাহর হাতকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
[ ৫. ] নেহেরুর দরজায় কালাত এবং জিন্নাহর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত-
এরই মধ্যে আরেকটি নাটকীয় মোড় আসে, যখন খবর ছড়ায় যে পাকিস্তানের চাপ থেকে বাঁচতে খান অব কালাত গোপনে ভারতের জওহরলাল নেহেরু সরকারের কাছে কৌশলগত সাহায্য চেয়েছেন। নেহেরু ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে সেই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করলেও, এই গুঞ্জন জিন্নাহকে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে। জিন্নাহ বুঝতে পারেন, আদর্শিক বুলি দিয়ে রাষ্ট্র বাঁচে না, রাষ্ট্র বাঁচে কঠোর বাস্তবতায়।
[ ৬. ] 'ভাগ করো এবং শাসন করো': কালাতকে অবরুদ্ধ করার চাল-
জিন্নাহ সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা না করে প্রথমে রাজনৈতিক চাল চালেন। ১৯৪৮ সালের ১৭ মার্চ জিন্নাহর রাজনৈতিক প্রভাবে কালাত রাজ্যের অধীনস্থ তিনটি আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল—খাড়ান, লাস বেলা এবং মাকরানের শাসকেরা কালাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পাকিস্তানের সাথে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেন । এক রাতের ব্যবধানে স্বাধীন কালাত রাজ্য তার অর্ধেকের বেশি ভূখণ্ড এবং সম্পূর্ণ সমুদ্র উপকূল হারিয়ে চারদিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
[ ৭. ] জিন্নাহর সরাসরি সামরিক নির্দেশ এবং কামানের গর্জন-
যখন রাজনৈতিক চালে কালাত রাজ্যকে চারদিক থেকে অবরুদ্ধ করা হলো, তখনো খান অব কালাত আত্মসমর্পণ করতে রাজি ছিলেন না। এই পরিস্থিতিতে জিন্নাহ আর বিন্দুমাত্র অপেক্ষা না করে গভর্নর জেনারেল হিসেবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে বালুচিস্তানে সরাসরি সামরিক অভিযান চালানোর চূড়ান্ত নির্দেশ দেন।
জিন্নাহর সেই আনুষ্ঠানিক আদেশের পর, ১৯৪৮ সালের ২৬ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী বালুচিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল পাসনি ও জিবানিতে সামরিক আগ্রাসন শুরু করে এবং কালাত শহর ঘিরে ফেলে । চারদিক থেকে অবরুদ্ধ, অর্থনৈতিকভাবে অবশ এবং সরাসরি পাকিস্তানি কামানের মুখে দাঁড়িয়ে খান অব কালাত বুঝতে পারেন, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ কেবলই ধ্বংস ডেকে আনবে।
[ ৮. ] জিন্নাহর সেই চরম 'প্রতারণা' এবং একটি স্বাধীন জাতির পরাধীনতা-
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কালো অধ্যায়টি রচিত হয় ১৯৪৮ সালের ২৭ মার্চ । মাত্র ২২৭ দিন আগে বালোচদের স্বাধীনতার যে গ্যারান্টি জিন্নাহ নিজে আইনি উপদেষ্টা হিসেবে দিয়েছিলেন, সেই স্বপ্নকে নিজের পাঠানো সেনাবাহিনীর বুটের তলায় ধূলিসাৎ করে দেন তিনি । যে জিন্নাহ কালাতের স্বাধীনতার জন্য আইনি লড়াই লড়ে বালোচদের আস্থা অর্জন করেছিলেন এবং চুক্তিপত্রে সই করেছিলেন, ক্ষমতার মসনদে বসে তিনি নিজে সামরিক শক্তি লেলিয়ে দিয়ে বালোচদের পিঠে ছুরিকাঘাত করলেন ।
বন্দুকের নলের মুখে দাঁড়িয়ে খান অব কালাত নিরুপায় হয়ে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তি পত্রে (Instrument of Accession) স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন । এক কলমের খোঁচায় স্বাধীন বালুচিস্তানের সার্বভৌমত্ব কেড়ে নিয়ে তাকে পাকিস্তানের একটি পরাধীন প্রদেশে পরিণত করা হয়। এটি কোনো পারস্পরিক চুক্তি ছিল না; এটি ছিল জিন্নাহর দেওয়া প্রতিশ্রুতির এক চরম ঐতিহাসিক লঙ্ঘন ও প্রতারণা।
[ ৯. ] দাবার চালের শেষ এবং দীর্ঘস্থায়ী আগ্নেয়গিরি-
জিন্নাহর এই নির্মম প্রতারণা ও সামরিক আগ্রাসন বালোচদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে দমাতে পারেনি, বরং এক দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। এই জোরপূর্বক অন্তর্ভুক্তির মাত্র তিন মাস পর, ১৯৪৮ সালের জুলাইয়ে খানের ভাই প্রিন্স আব্দুল করিমের নেতৃত্বে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র বালোচ বিদ্রোহ শুরু হয় । জিন্নাহর সেই ২২৭ দিনের ছক আজ ২০২৬ সালেও বালুচিস্তানের পাহাড়ে পাহাড়ে জ্বলছে এক অবিরাম সংঘাতের আগুন হয়ে, যা পাকিস্তান রাষ্ট্র কখনোই পুরোপুরি নেভাতে পারেনি ।
আপনার যুক্তিসঙ্গত মতামত কী?
জিন্নাহর এই সরাসরি সামরিক অভিযান ও বলপ্রয়োগের কৌশলকে আপনি কি পাকিস্তানের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে রাজনৈতিক দূরদর্শিতা বলবেন, নাকি একটি বিশ্বাসী স্বাধীন জাতির সাথে চরম ঐতিহাসিক প্রতারণা হিসেবে গণ্য করবেন? নিচে আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্ট করুন এবং পোস্টটি শেয়ার করে ইতিহাসের এই অজানা ট্র্যাজেডি বন্ধুদের সাথে আলোচনা করুন। @টং ডাইং নে
৩৯
ওয়াহাবিজম
একটা গোটা সমাজকে ভেতর থেকে বদলে দিতে, কতগুলো বোমার প্রয়োজন হয়? উত্তরটা শুনলে হয়তো চমকে যাবেন। কারণ একটিও না, স্রেফ কয়েক বিলিয়ন ডলার আর একটি সুপরিকল্পিত মতাদর্শ দিয়ে, আস্ত একটি ধর্ম ও সমাজকে চিরতরে বদলে ফেলা সম্ভব।
আজ ইউটিউবে হাউ সৌদি আরাবিয়া এক্সপোর্টেড ওয়াহাবিজম নামের একটি ভিডিও দেখছিলাম। অনেকেই ভাবেন রাজনীতি স্রেফ বন্দুক আর ক্ষমতার খেলা! কিন্তু আমি সব সময় প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে ভাবতে পছন্দ করি, তাই আমি দেখেছি, কীভাবে সাম্রাজ্যগুলো মানুষের বিশ্বাসকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় এই বিশাল মতাদর্শিক সাম্রাজ্যের শুরুটা হয়েছিল একেবারে সাদামাটাভাবে ১৭৪৪ সালে। আরবের এক শুষ্ক মরুভূমিতে মুহাম্মদ ইবনে আবদ আল ওয়াহাব নামের এক ধর্মপ্রচারক ঘুরছিলেন। তার মতবাদ ছিল অত্যন্ত কট্টর এবং আপসহীন।
তিনি বিশ্বাস করতেন, তৎকালীন মুসলিমরা তাদের মূল ধর্ম থেকে সরে গিয়ে মাজার, সাধু সন্ন্যাসী আর পীর ফকিরদের ভক্তি করা শুরু করেছে। তার মতে, এগুলো ছিল সরাসরি শিরক বা অমার্জনীয় অপরাধ যার একমাত্র শাস্তি মৃত্যু। সাধারণ মানুষ আর স্থানীয় শাসকরা তার এই চরম কট্টরপন্থা মেনে নিতে পারেনি, তাই তাকে বারবার বিতাড়িত হতে হয়।
কিন্তু গল্পের মোড় ঘোরে যখন তিনি দিরিয়া নামের এক মরূদ্যানের শাসক মুহাম্মদ ইবনে সৌদের সাথে দেখা করেন। তাদের দুজনের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়। চুক্তিটি ছিল খুব সহজ এবং নিখুঁত এক রাজনৈতিক চাল, ওয়াহাব সৌদ পরিবারকে ধর্মের নামে শাসন করার চূড়ান্ত বৈধতা দেবেন, আর বিনিময়ে ইবনে সৌদ তার সেনাবাহিনী দিয়ে ওয়াহাবের কট্টর মতবাদকে প্রতিষ্ঠিত করবেন।
ধর্ম আর ক্ষমতার এমন ভয়ংকর সমীকরণ ইতিহাসে খুব কমই দেখা গেছে।
এই চুক্তির ওপর ভর করেই, তারা যখন মক্কা আর মদিনা দখল করল, তখন তারা হাজার বছরের পুরনো সমস্ত মাজার আর ঐতিহাসিক স্থান ধ্বংস করে দিল। এই ঘটনা তৎকালীন অটোম্যান সাম্রাজ্যকে এতটাই ক্ষিপ্ত করেছিল যে, তারা মিশরীয় সেনাপতি পাঠিয়ে দিরিয়া শহরটিকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয় এবং সৌদ নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
কিন্তু ওই যে মতাদর্শের বীজ বোনা হয়ে গিয়েছিল, তা আর ধ্বংস করা যায়নি। ধারণা করা যায়, তলোয়ার দিয়ে শহর ধ্বংস করা গেলেও, মানুষের মগজে ঢুকে যাওয়া চিন্তা এত সহজে মুছে ফেলা যায় না।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যখন আবদুল আজিজ আবার রিয়াদ দখল করে সৌদি আরব নামক রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠা করলেন, তখন এই রাষ্ট্রটির গণ্ডি ছিল কেবল মরুভূমির বুকেই সীমাবদ্ধ। তাদের কাছে না ছিল টাকা, না ছিল কোনো বৈশ্বিক প্রভাব। কিন্তু ১৯৩৮ সালে মাটি খুঁড়ে যখন কালো সোনা বা তেল বের হলো, তখন যেন আলাদিনের জাদুকরী প্রদীপ হাতে পেল সৌদ পরিবার। চোখের পলকে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গরিব রাষ্ট্রটি বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হলো।
পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে যখন মিশরের গামাল আবদেল নাসের আরব জাতীয়তাবাদের ডাক দিলেন তখন রাজতন্ত্রের ভিত কেঁপে ওঠে। নাসের ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ, তুমুল জনপ্রিয় এবং রাজতন্ত্রের ঘোর বিরোধী।
সৌদি রাজপরিবার বুঝতে পেরেছিল, শুধু ট্যাংক দিয়ে এই প্রবল জাতীয়তাবাদের জোয়ার ঠেকানো যাবে না। নাসের যদি আরবদের জাতীয়তাবাদ দিয়ে এক করতে চান, তবে সৌদি আরব বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের ধর্ম দিয়ে এক করবে।
প্যান আরবিজমের বিপরীতে তারা দাঁড় করাল, প্যান ইসলামিজম।
শুরু হলো বিশ্বজুড়ে ওয়াহাবিজম ছড়ানোর এক অভাবনীয় নীলনকশা। ১৯৬১ সালে মদিনা ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলো যার কাজ ছিল বিশ্বজুড়ে তরুণদের মগজ ধোলাই করে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো।
তবে এই প্রসারের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট আসে ১৯৭৯ সালে। এই একটি বছর পুরো বিশ্বের ইতিহাসকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। একদিকে ইরানে ইসলামি বিপ্লব হলো, যার ফলে শিয়া ধর্মগুরু আয়াতুল্লাহ খোমেনি ক্ষমতায় এসে সরাসরি সৌদি আরবের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করলেন। খোমেনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করলেন, সৌদি রাজপরিবার ইসলামি বিশ্বের নেতা হওয়ার অযোগ্য।
অন্যদিকে নভেম্বরের এক ভোরে জুহায়মান আল ওতাইবির নেতৃত্বে, শত শত সশস্ত্র বিদ্রোহী মক্কার গ্র্যান্ড মসজিদ দখল করে নিল। তাদের অভিযোগ ছিল, সৌদি রাজপরিবার চরম দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে এবং তারা পশ্চিমাদের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছে।
পবিত্র কাবা চত্বরে টানা দুই সপ্তাহ ধরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলে।
ঠিক একই সময়ে আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়ন আগ্রাসন চালায়।
চারদিক থেকে আসা এই প্রবল চাপের মুখে সৌদি রাজপরিবার অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যায়। তারা বুঝতে পারে, নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে হলে তাদেরকে কট্টরপন্থীদের চেয়েও বেশি কট্টর হতে হবে। বিদ্রোহীদের দমন করার পর, তারা সমাজকে উদার করার বদলে উল্টো আরও রক্ষণশীল করে তুলল।
এরপর তারা যে কাজটি করল তা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অপারেশন। তারা দেশে সিনেমা হল বন্ধ করল, নারীদের টেলিভিশন থেকে সরিয়ে দিল আর ধর্মীয় পুলিশদের হাতে তুলে দিল অসীম ক্ষমতা। আর দেশের বাইরে শুরু করল পেট্রো ডলারের বন্যা।
আমি এই ভিডিওর বাইরেও বেশ কিছু ডেটা নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করেছি এবং যে পরিসংখ্যানগুলো পেয়েছি, তা সত্যিই শিউরে ওঠার মতো। ভিডিওতে বলা হয়েছে তারা পঁচাত্তর বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে, কিন্তু অন্যান্য স্বাধীন গবেষণায় দেখা যায় এই অর্থের পরিমাণ আরও অনেক বেশি।
রাজা ফাহাদ শুধুমাত্র এই মতাদর্শ প্রচারের জন্য প্রতিদিন দুই লাখ ব্যারেল তেলের সমপরিমাণ অর্থ আলাদা করে রাখতেন। আশির দশকেই যার মূল্য ছিল বছরে প্রায় এক দশমিক আট বিলিয়ন ডলার।
তারা বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার মসজিদ, মাদ্রাসা, ইসলামিক সেন্টার আর বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করেছে। শুধু ২০০০ সালের মধ্যেই তারা তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যামূলক একশ আটত্রিশ মিলিয়ন কোরআন বিশ্বজুড়ে বিনামূল্যে বিতরণ করে। এই কোরআনগুলোর ব্যাখ্যামূলক অংশে, অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তাদের কট্টর মতাদর্শ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা সাধারণ পাঠকরা নিজেদের অজান্তেই গ্রহণ করে নেয়।
আমার নিজের গবেষণায় আমি দেখেছি, আমাদের দক্ষিণ এশিয়ায় এই পেট্রো ডলার কীভাবে সমাজ কাঠামোকে ভেতর থেকে ধ্বংস করেছে। ২০০৫ সালের দিকে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য পঁয়ত্রিশ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল ধর্মীয় সম্প্রসারণ প্রকল্প অনুমোদন করা হয় বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
উদাহরণস্বরূপ ২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মাত্র দুই বছরে প্রায় পঁচিশ হাজার সৌদি প্রভাবিত আলেম আড়াইশ মিলিয়ন ডলারের তহবিল নিয়ে ভারতে প্রবেশ করে। বাংলাদেশ, ভারত আর পাকিস্তানের আনাচেকানাচে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠে, হাজার হাজার অনিয়ন্ত্রিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
শুধু বাংলাদেশেই একটি বিশেষ কট্টরপন্থি ধারা হাজার হাজার মসজিদ ও মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রণ করে, যেখানে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী রাষ্ট্রের কোনো তদারকি ছাড়াই একমুখী শিক্ষা গ্রহণ করছে। কাশ্মীরের মতো জায়গায় যেখানে শত শত বছর ধরে সুফিবাদের চর্চা ছিল, যেখানে মানুষ সহনশীলতার মাধ্যমে স্রষ্টার আরাধনা করত, সেখানে আজ দেড় মিলিয়নের বেশি মানুষ সরাসরি ওয়াহাবি মতাদর্শের অনুসারী হয়ে উঠেছে।
এসব অঞ্চলের স্থানীয় সংস্কৃতি, লোকজ ঐতিহ্য আর সহনশীলতার যে কাঠামো ছিল, তা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে মুছে ফেলা হয়েছে। সেখানে সৌদি টাকায় তৈরি হয়েছে শত শত নতুন ইমারত আর তার ভেতরে বেড়ে উঠেছে অসহিষ্ণু মন।
আমরা যখন রাস্তায় কোনো কট্টর মানসিকতার প্রতিফলন দেখি, আমরা সাধারণ মানুষকে দোষ দিই। আমরা ভাবি, মানুষ হয়তো নিজে থেকেই এমন অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। কিন্তু একজন আমি এখানেই প্রশ্ন তুলি। এই অসহিষ্ণুতা কোনো প্রাকৃতিক বিবর্তন নয়, এটি একটি ম্যানুফ্যাকচার্ড বা উৎপাদিত সংস্কৃতি।
হাজার হাজার মাইল দূরে থাকা একটি রাজপরিবারের সিংহাসন বাঁচাতে, বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের মগজ ধোলাই করা হয়েছে। তারা নিজেদের ভেতরের বিদ্রোহ দমন করতে, কট্টরপন্থাকে রপ্তানি করেছে, আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। আফগানিস্তানে সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য তারা হাজার হাজার তরুণকে যুদ্ধের ময়দানে পাঠিয়েছে।
এতে তাদের দুটি লাভ হয়েছে। প্রথমত তাদের নিজেদের দেশের সম্ভাব্য বিদ্রোহীরা দেশের বাইরে গিয়ে যুদ্ধে ব্যস্ত থেকেছে আর দ্বিতীয়ত বিশ্বজুড়ে তাদের ধর্মের রক্ষক হিসেবে একটি ইমেজ তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, আজ সৌদি আরবের চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। বর্তমান যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ভিশন ২০৩০ এর নামে দেশে সিনেমা হল খুলছেন, স্টেডিয়ামে কনসার্ট হচ্ছে, নারীরা স্বাধীনভাবে গাড়ি চালাচ্ছেন। ২০১৮ সালে ওয়াশিংটন পোস্টের এক সাক্ষাৎকারে তিনি প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন যে, স্নায়ুযুদ্ধের সময় পশ্চিমাদের ইশারাতেই তারা বিশ্বজুড়ে এই কট্টরপন্থা ছড়িয়েছিলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঠেকানোর জন্য।
তারা আজ আধুনিকতার পথে হাঁটছে কারণ তাদের এখন আর সেই পুরনো মতাদর্শের প্রয়োজন নেই। কিন্তু গত চল্লিশ বছরে তারা তৃতীয় বিশ্বের সমাজগুলোর শিরায় শিরায় যে বিষ ঢুকিয়ে দিয়েছে, তা তো রাতারাতি উধাও হয়ে যাবে না। তাদের টাকায় তৈরি হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো আজও একই সিলেবাসে লক্ষ লক্ষ মগজ তৈরি করে যাচ্ছে।
তারা নিজেদের খোলস বদলে ফেলেছে, অথচ আমাদের সমাজকে ঠেলে দিয়েছে এক অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভেতর। এটিই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি, যারা আগুন লাগায় তারা নিজেদের ঘর ঠিকই বাঁচিয়ে নেয় আর পুড়ে ছাই হয় সাধারণ মানুষের শত বছরের ঐতিহ্য।
আমি সব সময় বিশ্বাস করি, ইতিহাস শুধু অতীত নয়, এটি আমাদের বর্তমানকে বোঝার সবচেয়ে শক্তিশালী চশমা। এই পুরো বিষয়টি নিয়ে যখন গভীরভাবে ভাবি, তখন বুঝতে পারি, অন্ধভাবে কোনো স্রোতে গা ভাসানো কতটা বিপজ্জনক।
আমরা অনেক সময়ই বুঝতে পারি না, আমাদের চিন্তাধারা, আমাদের বিশ্বাস, এমনকি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের আচার আচরণগুলো কীভাবে দূর দেশের কোনো রাজনৈতিক হিসাব নিকাশের শিকার হচ্ছে।
আমি সব সময় চেষ্টা করি ঘটনার পেছনের আসল মোটিভগুলো মানুষের সামনে তুলে ধরতে। কোনো অন্ধ বিশ্বাস বা চাপিয়ে দেওয়া মতবাদকে যাচাই না করে গ্রহণ করা মানেই হলো, নিজের চিন্তার স্বাধীনতাকে অন্যের হাতে তুলে দেওয়া।
আপনাদের কি মনে হয় আমাদের সমাজের এই যে ধীরে ধীরে পরিবর্তন তার পেছনেও কি এমন কোনো দীর্ঘমেয়াদী খেলা আজও চলছে? আমরা কি আজও অন্য কারও লেখা চিত্রনাট্যের অদৃশ্য পুতুল হয়েই বেঁচে আছি?
৪০
দেশটির নাম মাল্টা হল কেন?
বাংলাদেশে Citrus গোত্রের কমলাসদৃশ একটি ফল বেশ জনপ্রিয়। নাম তার—মাল্টা। একই নামে ইউরোপের দক্ষিণে, ভূমধ্যসাগরের বুকে রয়েছে একটি ছোট দ্বীপরাষ্ট্র।
আয়তনের দিক থেকে দশম ছোট দেশ, লোকসংখ্যা ৫ লক্ষ ৮৮ হাজার, ভাষা মাল্টিজ।
ইউরোপের এই ছোট্ট দেশটির নামের ইতিহাস নিজেই বেশ চমকপ্রদ। কারণ আজকের Malta নামটি একদিনে তৈরি হয়নি। প্রায় দুই হাজার বছরের ইতিহাসে গ্রিক Melite, রোমান Melita, আরবি Malitah/Mālṭah পেরিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে আজকের Malta।
প্রাচীন নাম ছিল Melite:
ভূমধ্যসাগরের মাঝামাঝি অবস্থানের কারণে মাল্টা প্রাচীনকাল থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। উত্তর আফ্রিকা, সিসিলি, ইতালি ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরের সমুদ্রপথের কাছাকাছি হওয়ায় ফিনিশীয়, কার্থেজীয়, গ্রিক ও রোমানদের যাতায়াত ছিল এখানে।
মাল্টার প্রাচীনতম নির্ভরযোগ্য নামগুলোর একটি হলো গ্রিক Μελίτη (Melitē)। দ্বিতীয় শতাব্দীর ভূগোলবিদ Ptolemy দ্বীপটির পাশাপাশি এর প্রধান শহর Melite-এর কথাও লিখেছেন। আধুনিক গবেষণায় প্রাচীন শহরটির অবস্থান বর্তমান Mdina–Rabat অঞ্চলের সঙ্গে শনাক্ত করা হয়।
খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীর Acts of the Apostles-এও সেন্ট পলের জাহাজডুবির স্থান হিসেবে দ্বীপটির নাম Melitē দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় দুই হাজার বছর আগে গ্রিক ভাষার এই নামটি ব্যবহৃত হচ্ছিল।
রোমান যুগে নামটি লাতিন ভাষায় হয়ে যায় Melita। খ্রিস্টপূর্ব ২১৮ সালে রোম মাল্টা দখল করার পর এই রূপটি রোমান লেখালেখিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। Diodorus Siculus, Strabo ও পরবর্তী লেখকদের রচনায় Melita নামটি পাওয়া যায়।
“মধুর দ্বীপ”—নাকি অন্য কিছু?
Melite নামটির উৎসের সন্ধান কিন্তু এত সহজ নয়। একটি বহুল প্রচলিত ব্যাখ্যা হলো, নামটি গ্রিক meli (μέλι) অর্থাৎ “মধু” শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত। সেখান থেকেই Malta-কে কখনো “Land of Honey” বা “মধুর দেশ” বলা হয়। মাল্টায় মধু উৎপাদনের দীর্ঘ ইতিহাস এবং স্থানীয় মৌমাছির উপপ্রজাতি থাকায় ব্যাখ্যাটি বেশ জনপ্রিয়।
কিন্তু এটিকে নিশ্চিত করে বলা যায় না। University of Malta-র অধ্যাপক Horatio Vella-র গবেষণায় এই ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতার কথা উঠে এসেছে। তাঁর মতে, শুধু Melite ও গ্রিক meli শব্দের মিল দেখেই নামটির অর্থ “মধু” নির্ধারণ করা যায় না। Melite গ্রিক পুরাণের একটি Nereid বা সমুদ্র-পরীর নামও ছিল; ভূমধ্যসাগরের অন্য স্থানেও একই নামের ব্যবহার পাওয়া যায়।
আরও একটি ব্যাখ্যা মাল্টার নামকে নিয়ে যায় আরও পুরোনো—ফিনিশীয়-পিউনিক যুগে।
ফিনিশীয়দের Maleth:
ফিনিশীয়রা খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দে মাল্টায় বাণিজ্যিক ঘাঁটি গড়ে তুলেছিল। একটি প্রস্তাব অনুযায়ী, তাদের ভাষার Maleth বা Malath শব্দের অর্থ ছিল আশ্রয়স্থল, নিরাপদ স্থান বা বন্দর। সেখান থেকেই পরবর্তী Melite নামের উৎপত্তি হতে পারে।
মাল্টার ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করলে ব্যাখ্যাটি আকর্ষণীয়। ভূমধ্যসাগরের ব্যস্ত সমুদ্রপথে দ্বীপটির প্রাকৃতিক উপসাগরগুলো নাবিকদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় দিতে পারত।
তবে এটিও নিশ্চিত প্রমাণিত ব্যুৎপত্তি নয়। Maleth → Melite সম্পর্কটি গবেষণায় প্রস্তাবিত হলেও সর্বসম্মত নয়। তাই “Malta” শব্দের অর্থ নিশ্চিতভাবে “বন্দর”—এমন দাবি করাও ঠিক হবে না।
আরবি যুগে Melita থেকে Mālṭah:
নামের ইতিহাসে বড় পরিবর্তন আসে নবম শতাব্দীর শেষদিকে। ৮৬৯–৮৭০ সালের দিকে মুসলিম বাহিনী মাল্টা জয় করে, ফলে মাল্টা মুসলিম বিশ্বের অংশ হয়ে যায়। এরপর কয়েক শতাব্দী ধরে আরবি ভাষা দ্বীপটির সমাজ ও স্থাননামে গভীর প্রভাব ফেলে।
আরবি লেখকদের কাছে দ্বীপটির নামের রূপ পাওয়া যায় Malitah বা Mālṭah। মুসলিম ভূগোলবিদ আল-ইদ্রিসি দ্বাদশ শতাব্দীতে মাল্টার বর্ণনা করেছেন। তাঁর লেখায় দ্বীপটির অবস্থান ও প্রাকৃতিক সম্পদের পাশাপাশি মধুর প্রাচুর্যের কথাও পাওয়া যায়।
এখানে ইতিহাসের একটি মজার সমাপতন আছে। নামটির প্রকৃত উৎস মধু না হলেও, মধ্যযুগেও মাল্টা মধুর জন্য পরিচিত ছিল। ফলে পরবর্তী যুগে Melite নামটিকে গ্রিক meli—“মধু”-র সঙ্গে যুক্ত করার প্রবণতা আরও সহজে জনপ্রিয় হয়ে যায়।
Mālṭah থেকে Malta:
দ্বাদশ শতাব্দী থেকে মাল্টা আবার নরম্যানসহ ইউরোপীয় খ্রিস্টান শাসনের অধীনে আসে। কিন্তু এতদিনে নামটির একাধিক রূপ তৈরি হয়ে গেছে, লাতিন Melita, আরবি Mālṭah, এবং বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষার স্থানীয় রূপ।
ধীরে ধীরে এর মধ্য থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয় Malta.
বসবাসকারী অধিবাসীদের আরবিতে বলা হতো ‘মালতি’ (Malti)—যা আজও মাল্টিজ ভাষায় নিজেদের পরিচয় দিতে ব্যবহৃত হয়।
ধারাটি এক লাইনে আনলে: ফিনিশীয়-পিউনিক Maleth/Malath বা প্রাচীন গ্রিক Melitē থেকে রোমান লাতিন Melita, তারপর মধ্যযুগীয় আরবিতে Malitah / Mālṭah, সেখান থেকে আধুনিক নাম "মাল্টা"।
তাহলে Malta নামের আসল অর্থ কী?
দুই হাজার বছরের ইতিহাস ঘেঁটে সবচেয়ে সৎ উত্তর হলো—আমরা নামটির ধারাবাহিক রূপান্তর সম্পর্কে অনেকটাই জানি, কিন্তু একেবারে প্রথম উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত নই।
“মধু” থেকে নামটি এসেছে—এটি জনপ্রিয় একটি ঐতিহ্যবাহী ব্যাখ্যা। “আশ্রয়স্থল” বা “বন্দর” অর্থের ফিনিশীয়-পিউনিক Maleth থেকে এসেছে—এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব। আবার Melite নিজেই কোনো প্রাচীন গ্রিক নাম হতে পারে—এমন সম্ভাবনাও রয়েছে।
তাই “Malta মানেই মধুর দ্বীপ”—শুনতে যত সুন্দরই হোক, ইতিহাসের বিচারে এটিকে চূড়ান্ত সত্য বলা যায় না। @boikal
৪১
বেগুন
বাজারে বেগুন দেখলে আমরা সাধারণত শুধু একটি সব্জিই দেখি। লম্বা বেগুনি বেগুন, গোল বেগুন, সাদা বেগুন কিংবা ডোরাকাটা বেগুন। কিন্তু কয়েক হাজার বছর পিছিয়ে গেলে এই পরিচিত সব্জিটিকে হয়তো চিনতেই পারতাম না। কারণ আজকের বেগুন প্রকৃতির হাতে তৈরি কোনো অপরিবর্তিত উদ্ভিদ নয়। মানুষের চাষাবাদ, বাছাই এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য ধরে রাখার মধ্য দিয়ে এটি ধীরে ধীরে বদলেছে।
বেগুনের বৈজ্ঞানিক নাম Solanum melongena। মজার বিষয় হলো, এটি আমাদের পরিচিত আলু ও টমেটোরই ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। তিনটিই একই Solanum গণের উদ্ভিদ। কিন্তু বেগুন এই পরিবারের অন্য অনেক পরিচিত ফসলের মতো আমেরিকা থেকে আসেনি। এটি পুরোনো বিশ্বের উদ্ভিদ, যার বিবর্তন ও গৃহপালনের ইতিহাস এশিয়ার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
আর এখানেই গল্পটি আরও আকর্ষণীয়।
আজকের চাষ করা বেগুনের সবচেয়ে কাছের বুনো পূর্বপুরুষ হিসেবে বিজ্ঞানীরা Solanum insanum-কে চিহ্নিত করেছেন। এই বুনো উদ্ভিদকে দেখলে আধুনিক বেগুনের সঙ্গে পার্থক্য বেশ স্পষ্ট। এর গাছে কাঁটা থাকতে পারে, ফল তুলনামূলক ছোট এবং ফলের আকার ও গঠনে অনেক বেশি বৈচিত্র্য দেখা যায়। আধুনিক বেগুনে মানুষের পছন্দের যে বৈশিষ্ট্যগুলো আমরা দেখি, যেমন বড় ফল, মাংসল অংশ, নির্দিষ্ট আকার ও বিভিন্ন রং, সেগুলো দীর্ঘ সময়ের নির্বাচনের ফল।
অর্থাৎ মানুষ যখন কোনো বুনো উদ্ভিদ থেকে এমন গাছ বেছে নিয়েছে যার ফল একটু বড়, একটু বেশি মাংসল বা খেতে তুলনামূলক ভালো, তখন সেই গাছের বীজ পরের প্রজন্মে ব্যবহার করা হয়েছে। আবার সেই প্রজন্মের মধ্যেও পছন্দের গাছ বেছে নেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়া একবার বা দুবারে শেষ হয়নি। বহু প্রজন্ম ধরে চলা এই নির্বাচন ধীরে ধীরে উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য বদলে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা আধুনিক বেগুনের জিনগত বৈচিত্র্য বিশ্লেষণ করেও গৃহপালনের সময় ঘটে যাওয়া এই ধরনের পরিবর্তনের প্রমাণ পেয়েছেন।
কিন্তু বেগুনের আসল জন্মভূমি কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর একেবারে সোজা নয়।
একসময় ধারণা করা হতো, বেগুন হয়তো ভারতেই প্রথম গৃহপালিত হয়েছিল। আবার অন্য গবেষণায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, বিশেষ করে ভারত থেকে মিয়ানমার ও দক্ষিণ চীনের বিস্তৃত অঞ্চলকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়েছে। বর্তমানে গবেষণাগুলো থেকে যে ছবি পাওয়া যায়, তাতে ভারত, মিয়ানমার, দক্ষিণ চীন এবং আশপাশের অঞ্চল বেগুনের প্রাথমিক বিবর্তন ও গৃহপালনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি কিছু গবেষক একাধিক জায়গায় স্বাধীনভাবে গৃহপালনের সম্ভাবনার কথাও বলেছেন। তাই “বেগুনের জন্ম ঠিক এই একটি জায়গায়”—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছনো এখনও ঠিক হবে না।
তবে একটি বিষয় বেশ পরিষ্কার। বেগুনের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অন্তত কয়েক হাজার বছরের পুরোনো। প্রাচীন ভারতীয় ও চীনা কৃষি ও উদ্ভিদবিষয়ক লেখায় বেগুনের উল্লেখ পাওয়া যায়। গবেষণায় সংস্কৃত সাহিত্যে আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের শেষভাগে বেগুনের ব্যবহার ও চাষের প্রমাণের কথা উঠে এসেছে। চীনা সাহিত্যে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর মধ্যেই বেগুনের উল্লেখ পাওয়া যায়। অর্থাৎ আধুনিক বেগুনের বহু আগেই মানুষ এই উদ্ভিদটিকে চিনত, ব্যবহার করত এবং সম্ভবত চাষও করত।
এরপর শুরু হয় বেগুনের আরেক যাত্রা। এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এটি ধীরে ধীরে পশ্চিমের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। আরব বণিক ও মুসলিম বিশ্বের বিস্তারের সঙ্গে বেগুন পশ্চিম এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা এবং পরে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে যায়। ইউরোপীয়দের সমুদ্রযাত্রার যুগে এটি আরও দূরের অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। ফলে আজ যে বেগুনকে আমরা ভারতীয় রান্নার অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করি, তার ইতিহাস আসলে ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ইউরোপের মানুষের দীর্ঘ যোগাযোগের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে।
আর বেগুনের সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয়গুলোর একটি হলো এর চেহারা বদলানোর ক্ষমতা। একই প্রজাতির মধ্যেই আজ আমরা দেখি লম্বা, গোল, ডিম্বাকার, সাদা, সবুজ, বেগুনি, কালচে কিংবা ডোরাকাটা নানা ধরনের ফল। এই বৈচিত্র্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের চাষাবাদ এবং মানুষের বাছাই। প্রকৃতি যে বৈচিত্র্য তৈরি করেছিল, মানুষ তার মধ্য থেকে নিজের প্রয়োজন ও পছন্দ অনুযায়ী কিছু বৈশিষ্ট্য বারবার বেছে নিয়েছে। ধীরে ধীরে সেই নির্বাচনের ছাপ জমেছে উদ্ভিদের জিনে।
তাই আজ রান্নাঘরে পড়ে থাকা একটি বেগুনকে একটু অন্য চোখে দেখা যায়। এটি শুধু একটি সব্জি নয়। এর মধ্যে রয়েছে বুনো উদ্ভিদ থেকে চাষের ফসল হয়ে ওঠার ইতিহাস, মানুষের নির্বাচনের ইতিহাস এবং উদ্ভিদের বিবর্তনের ইতিহাস।
যে বেগুন আজ আমাদের হাতের মুঠোয়, তার পূর্বপুরুষ একসময় ছিল অনেক বেশি বুনো, ছোট এবং কাঁটাযুক্ত। হাজার হাজার বছরের মানুষের সঙ্গে পথ চলতে চলতে সে বদলেছে। আর সেই বদলের শেষ ফলটাই আজ আমাদের রান্নাঘরের বেগুন। @ Science News
৪২
মানব ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে যৌনতা এক অবিচ্ছেদ্য উপাদান হিসেবে প্রবাহিত হয়েছে। এটি কেবল শারীরিক প্রবৃত্তি বা প্রজননের প্রয়োজনেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং মানুষের সমাজ, সংস্কৃতি, শিল্প, ধর্ম এবং দর্শনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত থেকেছে। যৌনতা মানুষের অভিজ্ঞতার অন্যতম মৌলিক প্রকাশ, যা আমাদের সভ্যতার গঠনে, সম্পর্কের টানাপোড়েনে এবং সামাজিক বিন্যাসের ধারায় গভীর প্রভাব ফেলেছে।
প্রাচীন সভ্যতাগুলির দিকে তাকালে দেখা যায়, যৌনতা সেখানে লজ্জা বা গোপনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং উৎসবমুখর, শিল্পিত ও আধ্যাত্মিক এক অভিজ্ঞতা হিসেবে গণ্য হতো। সুমেরীয়, ব্যাবিলনীয় বা প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় যৌনতা দেবদেবীর সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। উর্বরতার দেবী বা প্রজনন দেবতার পূজা ছিল কৃষিভিত্তিক সমাজের কেন্দ্রে। কৃষি উৎপাদনের সাফল্যকে যেমন মাটির উর্বরতার সঙ্গে যুক্ত করা হতো, তেমনই মানুষের মিলন ও সন্তান জন্মকেও মহাজাগতিক এক চক্রের অংশ বলে মনে করা হতো।
ভারতীয় সভ্যতায় যৌনতার ইতিবাচক দিকটি বিশেষভাবে ফুটে উঠেছিল। কামসূত্র, অর্থশাস্ত্র, কিংবা প্রাচীন শৈব-শাক্ত তন্ত্রসাধনায় যৌনতা এক আধ্যাত্মিক শক্তি, যেখানে দেহের মিলন ছিল আত্মার মিলনের প্রতীক। মন্দিরশিল্পে খোদাই করা অসংখ্য ভাস্কর্য, যেমন খাজুরাহো বা কোনারকের মন্দিরে দেখা যায়, যৌনতাকে অপবিত্র বা লজ্জাজনক নয়, বরং নান্দনিক ও ঈশ্বরপ্রদত্ত সৃজনশীল শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছে। মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় সমাজ যেখানে যৌনতাকে প্রায়শই পাপ হিসেবে চিত্রিত করছিল, সেখানে ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি যৌনতাকে জীবনযাত্রার অপরিহার্য ও আনন্দদায়ক অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।
গ্রিক সভ্যতাও যৌনতাকে বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছে। হোমারের মহাকাব্য থেকে শুরু করে সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটলের দার্শনিক আলোচনায় প্রেম ও যৌনতার বিভিন্ন রূপ স্থান পেয়েছে। তাদের কাছে শারীরিক প্রেম যেমন প্রাকৃতিক ছিল, তেমনি মানসিক ও আত্মিক প্রেমকেও উচ্চতর স্তরে স্থাপন করা হয়েছিল। এথেন্সের ভাস্কর্য, নাটক এবং সাহিত্য মানবদেহকে সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে, যা যৌনতাকে মানব অস্তিত্বের এক অনন্য শিল্পরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
চীন ও জাপানের প্রাচীন সংস্কৃতিতে যৌনতা ছিল জীবনীশক্তির উৎস। চীনা দাওবাদে বিশ্বাস করা হতো, নারী-পুরুষের মিলন মহাজাগতিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষার উপায়। ইন ও ইয়াং—এই দ্বৈত শক্তির সংযোগেই জীবনের পূর্ণতা। জাপানি শুঙ্গা শিল্প যৌনতাকে অঙ্কিত করেছিল প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতা এবং মানবিক আনন্দের রূপে। এইসব দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের কাছে যৌনতাকে কেবল শারীরিক তৃপ্তি নয়, বরং দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক অর্থবহ করে তুলেছিল।
মানব যৌনতার ইতিহাসে ভালোবাসা ও সম্পর্কের ইতিবাচক দিকও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যুগে যুগে কবি-সাহিত্যিকরা প্রেমের গীতি রচনা করেছেন, যেখানে যৌনতা কখনো লজ্জার বিষয় নয় বরং গভীর আবেগ ও সম্পর্কের স্বাভাবিক পরিণতি। ভারতীয় সাহিত্যে জয়দেবের গীতগোবিন্দ, মধ্যযুগের সুফি কবিতা, কিংবা ইউরোপীয় রেনেসাঁসের প্রেমকাব্যে যৌনতা প্রেমের চরম পরিপূর্ণতা হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে।
আধুনিক যুগে যৌনতাকে বিজ্ঞান ও চিকিৎসাশাস্ত্রও নতুনভাবে দেখেছে। সিগমুন্ড ফ্রয়েড মানব মনোবিশ্লেষণে যৌনতাকে একটি মৌলিক চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। বিশ শতকের যৌনবিপ্লব মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে এক বিপুল পরিবর্তন আনে। যৌনতা আর নিষিদ্ধ আলোচনার বিষয় না থেকে মানবাধিকারের অংশ হয়ে ওঠে। নারীর স্বাধীনতা, সমকামিতা, লিঙ্গ সমতা—সবই যৌনতাকে একটি ইতিবাচক সামাজিক আলোচনায় নিয়ে আসে। এই পরিবর্তন শুধু শারীরিক স্বাধীনতার নয়, বরং মানসিক মুক্তিরও প্রতীক।
আজকের বিশ্বে যৌনতা ব্যক্তিগত পরিচয়ের অংশ হিসেবে স্বীকৃত। এটি শুধু প্রজনন নয়, বরং ভালোবাসা, আনন্দ, আত্মপ্রকাশ এবং সম্পর্কের ভিত্তি। যৌনতা মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাকে সমৃদ্ধ করেছে, শিল্পকে দিয়েছে নতুন দিগন্ত, সমাজকে দিয়েছে পারস্পরিক বোঝাপড়ার গভীরতা।
অতএব মানব যৌনতার ইতিবাচক ইতিহাস হলো মানুষের স্বাভাবিকতা ও সৃজনশীলতার ইতিহাস। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যৌনতা কোনো লজ্জার বিষয় নয়, বরং জীবন, ভালোবাসা এবং মানবিকতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইতিহাসে যেমন দেখা গেছে, যৌনতার ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সমাজকে করেছে উদার, শিল্পকে করেছে নান্দনিক, আর মানুষের সম্পর্ককে দিয়েছে গভীরতা ও স্বচ্ছতা। তাই যৌনতাকে স্বীকার করা মানেই জীবনকে তার স্বাভাবিক, প্রাকৃতিক ও সুন্দর রূপে গ্রহণ করা। @ Sufal Sarkar
৪৩
চট্টগ্রাম বন্দর কি আজ ভারতের নিয়ন্ত্রণে থাকত? ইতিহাস যা আমাদের জানায় না!
আজ আমরা যে স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে গর্ব করি, তার মূল চালিকাশক্তি বা 'লাইফলাইন' হলো চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর। কিন্তু আপনি কি জানেন, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের টেবিলে এই বন্দরটি প্রায় ভারতের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছিল? যদি লিয়াকত আলী খান সেদিন অনমনীয় অবস্থান না নিতেন, তবে আজ চট্টগ্রাম বন্দরকে ভারতের 'দয়ার ওপর' নির্ভর করে চলতে হতো!
ইতিহাসের সেই রোমাঞ্চকর এবং কৌশলগত অধ্যায়টি সবার জানা প্রয়োজন: রাঙ্গামাটিতে উড়েছিল ভারতের পতাকা!
১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে অমুসলিম (প্রধানত বৌদ্ধ ও হিন্দু) জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৯৭% থেকে ৯৮%। স্বাভাবিকভাবেই সিরিল র্যাডক্লিফের প্রাথমিক মানচিত্রে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতের অংশ ছিল এবং ১৫ আগস্ট রাঙ্গামাটিতে ভারতের পতাকাও ওড়ানো হয়েছিল। জওহরলাল নেহেরু এবং সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এই অঞ্চলটি পেতে মরিয়া ছিলেন।
লিয়াকত আলী খানের সেই মাস্টারস্ট্রোক
ঠিক এই সংকটময় মুহূর্তে পাকিস্তানের তৎকালীন হবু প্রধানমন্ত্রী নবাবজাদা লিয়াকত আলী খান এক ঐতিহাসিক ও অটল অবস্থান নেন। তিনি ব্রিটিশ ও সীমানা কমিশনকে অকাট্য যুক্তি দিয়ে বোঝান যে—কর্ণফুলী নদীর উৎস এবং এর অববাহিকার সিংহভাগই পার্বত্য চট্টগ্রামে। এই নদীই চট্টগ্রাম বন্দরের নাব্যতা রক্ষা করে। পার্বত্য চট্টগ্রাম যদি ভারতের হাতে চলে যায়, তবে কর্ণফুলী নদীর নিয়ন্ত্রণ থাকবে ভারতের কাছে। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরকে আজীবন ভারতের 'পায়ের নিচে' বা মর্জির ওপর নির্ভর করে চলতে হবে, যা পূর্ব বাংলার অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেবে।
ভারতের ৭ রাজ্যের স্থায়ী 'লকডাউন'!
লিয়াকত আলী খানের তীব্র প্রতিরোধ ও অনমনীয় দরকষাকষির মুখে শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হন র্যাডক্লিফ। আসামের করিমগঞ্জ মহকুমাকে ভারতের হাতে দিয়ে (যাতে ত্রিপুরা, কাছাড় ও শিলচর ল্যান্ডলকড না হয়ে যায়), তার বিনিময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৭টি রাজ্য (সেভেন সিস্টার্স) স্থায়ীভাবে ভূ-বেষ্টিত বা ল্যান্ডলকড হয়ে পড়ে, যা থেকে বাঁচতে তারা আজো বিলিয়ন ডলার খরচ করে মিয়ানমার বা কালাদান প্রজেক্টের মতো বিকল্প খুঁজছে।
আমাদের কৃতজ্ঞতা কোথায়?
আমরা পাকিস্তানের নাম শুনতে চাইনা। তাই লিয়াকত আলী নাম শুনতে চাইবে কে? লিয়াকত আলী খানের সেই দূরদর্শী কূটনৈতিক চালের কারণেই আজ চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর ভারতের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও স্বাধীনভাবে বাংলাদেশের একক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেশভাগের টেবিলে পূর্ব বাংলার অর্থনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে লিয়াকত আলী খানের এই অবদান ও অনমনীয় দৃঢ়তার কথা বাংলাদেশের মানুষের সবসময় স্বীকার করা উচিত এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
@ Khaled Mahmud
ক্ষমতার প্রথম ধাপই হলো মানুষের ব্রেনের প্রেডিক্টেবল প্যাটার্নটাকে ভেঙে দেওয়া। আপনি যখন এমন কিছু করবেন যা মানুষ আগে কখনো দেখেনি, তখন তাদের মনে এক ধরনের মানসিক চাপ তৈরি হবে। তারা আপনার কাজের অর্থ খোঁজার জন্য আপনার পেছনে ঘুরবে। প্রাচীনকালে কার্থেজের বিখ্যাত সেনাপতি হানিবাল এই কৌশলটা ব্যবহার করে রোমানদের বোকা বানিয়েছিলেন।
হানিবাল যখন তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে রোমানদের হাতে একটা পাহাড়ের নিচে আটকা পড়লেন, তখন তিনি এক অদ্ভুত চাল চাললেন। তিনি হাজার হাজার গরুর শিংয়ের সাথে মশাল বেঁধে তাতে আগুন ধরিয়ে দিলেন। রাতের অন্ধকারে ওই জ্বলন্ত মশাল নিয়ে গরুগুলো যখন পাহাড়ের দিকে ছুটতে শুরু করল, তখন রোমান পাহারাদাররা ভাবল এগুলো হয়তো শয়তান বা প্রেতাত্মা!
রোমান সৈন্যরা ভয়ে তাদের পাহারার জায়গা ছেড়ে পালিয়ে গেল, আর এই সুযোগে হানিবাল তার পুরো বাহিনী নিয়ে ওই পাহাড়ি রাস্তা পার হয়ে গেলেন। অজানা জিনিসের প্রতি মানুষের এই যে আদিম ভয় আর আকর্ষণ, এটাকে কাজে লাগানোই হলো ক্ষমতার সবচেয়ে বড় আর্ট। আপনি যখন পুরোপুরি খোলা বই হবেন না, তখন মানুষ আপনাকে নিয়ে ভয় পাবে এবং একই সাথে আপনাকে শ্রদ্ধা করবে। @ Touhidul Islam
৪৩
হাল সাফলিয়েনি হাইপোজিয়াম: মাল্টার মাটির নিচে সেই মন্দির, যেখানে মিলেছে সাত হাজারেরও বেশি মানুষের হাড়।
ভূমধ্যসাগরের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র মাল্টায়, ১৯০২ সালে কিছু শ্রমিক একটা নতুন বাড়ির জন্য জলাধার খুঁড়ছিলেন। হঠাৎ তাঁদের কোদাল আটকে যায় শক্ত পাথরে, আর মাটি সরাতেই বেরিয়ে আসে এক বিশাল ভূগর্ভস্থ কক্ষের মুখ। এটাই ছিল হাল সাফলিয়েনি হাইপোজিয়াম, মাটির নিচে তিন স্তরে খোদাই করা এক বিশাল প্রাগৈতিহাসিক মন্দির-কমপ্লেক্স, যা প্রায় ৫০০০ বছর ধরে মাটির নিচে লুকিয়ে ছিল।
পাথরের ভেতরে পাথরের নকশা।
হাইপোজিয়াম নির্মিত হয়েছিল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩৬০০ থেকে ২৫০০ সালের মধ্যে, তিনটা ভিন্ন সময়কালে ধাপে ধাপে সম্প্রসারিত হয়ে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হল, পুরো কাঠামোটা প্রাকৃতিক গুহা নয়, বরং সম্পূর্ণভাবে চুনাপাথর কেটে মানুষের হাতে খোদাই করা, শুধু পাথরের হাতিয়ার আর হরিণের শিং ব্যবহার করে, ধাতব হাতিয়ারের যুগেরও আগে। ভেতরের দেয়ালে খোদাই করা আছে মাল্টার ভূমির ওপরে থাকা মেগালিথিক মন্দিরগুলোর স্থাপত্য শৈলীর অনুকরণ, স্তম্ভ, খিলান, এমনকি সিলিংয়ে প্রাকৃতিক গুহার আকৃতি নকল করা কারুকাজ।
"ওরাকল রুম"-এর শব্দের রহস্য।
হাইপোজিয়ামের সবচেয়ে রহস্যময় অংশগুলোর একটা "ওরাকল রুম", একটা ছোট্ট কুলুঙ্গি-আকৃতির কক্ষ, যেখানে কেউ গভীর স্বরে কথা বললে বা শব্দ করলে তা পুরো কাঠামোজুড়ে অস্বাভাবিকভাবে প্রতিধ্বনিত হয় এবং বহুদূর পর্যন্ত শোনা যায়, অথচ উঁচু স্বরের শব্দ তেমন ছড়ায় না। আধুনিক শব্দবিজ্ঞান গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধ্বনি-বিবর্ধন প্রভাব সম্ভবত কক্ষের নির্দিষ্ট মাত্রা এবং আকৃতির কারণে ঘটে, বিশেষ করে পুরুষ কণ্ঠস্বরের একটা নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কে। এই বৈশিষ্ট্যটা ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা হয়েছিল নাকি কাকতালীয়ভাবে ঘটেছে, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক আছে।
সাত হাজারেরও বেশি মানুষের অবশেষ।
খননের সময় এই ভূগর্ভস্থ কাঠামোর বিভিন্ন কক্ষে পাওয়া যায় আনুমানিক সাত হাজারেরও বেশি মানুষের দেহাবশেষ, প্রায় একহাজার বছরের বেশি সময় ধরে ক্রমান্বয়ে সমাহিত করা। এই বিশাল সংখ্যা দেখে গবেষকরা মনে করেন, এটা কোনো একটা নির্দিষ্ট বিপর্যয়ের ফল নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত একটা সাম্প্রদায়িক সমাধিক্ষেত্র এবং একই সঙ্গে ধর্মীয় উপাসনার স্থান ছিল, যেখানে মৃতদের পাশাপাশি জীবিতদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানও অনুষ্ঠিত হত।
"ঘুমন্ত নারী": এক রহস্যময় মূর্তি।
হাইপোজিয়াম থেকে পাওয়া সবচেয়ে বিখ্যাত নিদর্শন একটা ছোট্ট টেরাকোটা মূর্তি, যাকে বলা হয় "স্লিপিং লেডি" বা ঘুমন্ত নারী, একজন স্থূলকায় নারী একটা ছোট বিছানায় কাত হয়ে শুয়ে আছেন এমন ভঙ্গিতে। এই মূর্তির প্রকৃত অর্থ নিয়ে বিতর্ক আছে, কেউ মনে করেন এটা কোনো উর্বরতার দেবীর প্রতীক, কেউ মনে করেন এটা মৃত্যু এবং পুনর্জন্মের ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত, ঘুম আর মৃত্যুর প্রতীকী সংযোগ বোঝাতে। মূর্তিটা বর্তমানে মাল্টার জাতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।
সংরক্ষণের কঠোর নিয়ম।
হাইপোজিয়ামের নরম চুনাপাথর অত্যন্ত সংবেদনশীল, আর পর্যটকদের নিঃশ্বাসে থাকা আর্দ্রতা এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড কাঠামোর মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। ১৯৯০-এর দশকে ব্যাপক ক্ষয়ের লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর কর্তৃপক্ষ এটা কয়েক বছরের জন্য পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, এবং একটা আধুনিক জলবায়ু-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা স্থাপনের পর সীমিত সংখ্যক দর্শনার্থীর (দৈনিক মাত্র কয়েকশো জন, আগে থেকে বুকিং করে) জন্য আবার খুলে দেওয়া হয়। ১৯৮০ সালে এটা ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যস্থল হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
মূলধারার ব্যাখ্যা কী?
এখানে কোনো ষড়যন্ত্র নেই, তবে জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে কিছু ভুল দাবি ছড়িয়ে আছে, যেমন অস্বাভাবিক লম্বা মানুষের কঙ্কাল পাওয়ার দাবি, যা প্রত্নতাত্ত্বিকরা সম্পূর্ণভাবে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেন এবং এর কোনো নথিভুক্ত প্রমাণ নেই। প্রকৃত বৈজ্ঞানিক গবেষণা মাল্টার এই প্রাগৈতিহাসিক মন্দির-নির্মাতাদের সাধারণ মানুষ হিসেবেই চিহ্নিত করে, যাদের ছিল অসাধারণ স্থাপত্য দক্ষতা এবং জটিল ধর্মীয় বিশ্বাস।
কিন্তু প্রশ্নগুলো থেকেই যায়।
"ওরাকল রুম"-এর ধ্বনি-প্রভাব ইচ্ছাকৃত নকশার ফল, নাকি প্রাকৃতিক কাকতালীয় ঘটনা, তার নিশ্চিত উত্তর নেই। "ঘুমন্ত নারী" মূর্তির প্রকৃত ধর্মীয় অর্থ এবং এই বিশাল সমাধিক্ষেত্রের সম্পূর্ণ সামাজিক কাঠামো এখনো পুরোপুরি বোঝা যায়নি, কারণ এই সংস্কৃতির কোনো লিখিত ভাষা টিকে নেই। আর মাল্টার এই মন্দির-নির্মাণ সংস্কৃতি ঠিক কেন হঠাৎ করেই খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ সালের কাছাকাছি সময়ে বিলুপ্ত হয়ে গেল, তারও কোনো নিশ্চিত ব্যাখ্যা নেই।
শেষ কথা।
হাল সাফলিয়েনি হাইপোজিয়াম মনে করিয়ে দেয়, মানুষ মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার জন্য কতদূর যেতে পারে, পাথরের হাতিয়ার দিয়ে মাটির গভীরে খোদাই করে এক আস্ত মন্দির বানিয়ে ফেলতে পারে, যেখানে জীবিত আর মৃত একসঙ্গে বাস করত হাজার বছর ধরে। আজ সেই নীরব কক্ষগুলো এখনো তাদের প্রাচীন প্রতিধ্বনি বহন করে চলেছে।
@ শেষরাত, সম্রাট রায় চৌধুরী
৪৫
তিওয়ানাকু: আন্দিজের উচ্চতায় সেই সভ্যতা, যেখানে পাথর কাটা হয়েছিল আশ্চর্যজনক নিখুঁততায়, ইনকাদেরও অনেক আগে।
বলিভিয়ার আন্দিজ পর্বতমালায়, বিখ্যাত টিটিকাকা হ্রদের কাছে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৮০০ মিটার উচ্চতায়, এমন এক প্রতিকূল পরিবেশে গড়ে উঠেছিল এক শক্তিশালী সভ্যতা, যার নাম তিওয়ানাকু। এই উচ্চতায় বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় অনেক কম, তাপমাত্রা রাতে হিমাঙ্কের নিচে নেমে যায়, তবু এখানেই মানুষ গড়ে তুলেছিল এক জটিল নগর সভ্যতা, যা ইনকা সাম্রাজ্যের উত্থানের প্রায় হাজার বছর আগে থেকে ফুলে-ফেঁপে উঠেছিল।
হ্রদের ধারে এক আধ্যাত্মিক কেন্দ্র।
তিওয়ানাকু সভ্যতা তার সবচেয়ে সমৃদ্ধ সময়ে পৌঁছায় আনুমানিক খ্রিস্টাব্দ ৫০০ থেকে ১০০০ সালের মধ্যে। শহরের কেন্দ্রে ছিল বিশাল ধর্মীয় এবং প্রশাসনিক কমপ্লেক্স, যেখানে পিরামিড-আকৃতির মন্দির, প্রাঙ্গণ এবং আচার-অনুষ্ঠানের স্থাপনা ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিকরা মনে করেন, তিওয়ানাকু শুধু একটা রাজনৈতিক রাজধানী ছিল না, বরং আন্দিজ অঞ্চলের একটা গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় তীর্থস্থান হিসেবেও কাজ করত, যেখানে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসত উপাসনার জন্য।
সূর্যের দরজা।
তিওয়ানাকুর সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপনা "পুয়ের্তা দেল সোল" বা "সূর্যের দরজা", একটা বিশাল একক পাথরের ব্লক থেকে খোদাই করা তোরণ, ওজন আনুমানিক ১০ টনেরও বেশি। এর ওপরের অংশে খোদাই করা আছে একটা কেন্দ্রীয় দেবতার মূর্তি, যাকে অনেকে "স্টাফ গড" বা "দণ্ডধারী দেবতা" বলে চিহ্নিত করেন, চারপাশে সারিবদ্ধ ছোট ছোট মানব বা পাখি-মুখো মূর্তি। এই খোদাইচিত্রের প্রতীকী অর্থ সম্পূর্ণভাবে স্পষ্ট নয়, তবে এটা সম্ভবত একটা ক্যালেন্ডার বা মহাজাগতিক ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে বলে ধারণা করা হয়।
পুমা পুংকু: নিখুঁততার এক ধাঁধা।
তিওয়ানাকুর কাছেই আছে আরেকটা বিস্ময়কর স্থাপনা, পুমা পুংকু, যেখানে পাওয়া গেছে অসাধারণ নিখুঁতভাবে কাটা পাথরের ব্লক, যাদের কোণ এবং প্রান্ত এমন সূক্ষ্মভাবে তৈরি যে আধুনিক প্রকৌশলীরাও এই কারিগরি দক্ষতা দেখে মুগ্ধ হন। কিছু পাথরে জটিল খাঁজ এবং ছিদ্র আছে, যা সম্ভবত ধাতব সংযোগকারী ব্যবহার করে পাথরগুলোকে একসঙ্গে জোড়া লাগানোর জন্য ব্যবহৃত হত। ইন্টারনেটে প্রায়ই দাবি করা হয়, এই নিখুঁততা মানুষের সাধ্যের বাইরে এবং ভিনগ্রহী প্রযুক্তির প্রমাণ, কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিকরা এই দাবি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ পাথর কাটার সরঞ্জাম এবং অসমাপ্ত কাজের নমুনা উভয়ই সাইটে পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে এটা মানুষেরই দীর্ঘ পরিশ্রমের ফল, ধাতুর পরিবর্তে পাথরের হাতিয়ার এবং ঘর্ষণ কৌশল ব্যবহার করে সম্পন্ন করা।
উঁচু ভূমিতে কৃষি বিপ্লব।
তিওয়ানাকুর মানুষ "সুকা কোল্লু" নামে একধরনের উন্নত কৃষি কৌশল উদ্ভাবন করেছিলেন, যেখানে উঁচু ক্ষেতের সারির মাঝে জলভরা খাল রাখা হত। এই খালগুলো দিনে সূর্যের তাপ শোষণ করে রাতে তা ধীরে ধীরে ছেড়ে দিত, যা তীব্র রাতের ঠান্ডা থেকে ফসলকে সুরক্ষা দিত এবং ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিত। আধুনিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই প্রাচীন কৌশল পুনরায় প্রয়োগ করলে আজও ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়, যা তিওয়ানাকুর কৃষি প্রযুক্তির কার্যকারিতা প্রমাণ করে।
খরার আঘাতে পতন।
আনুমানিক একাদশ শতাব্দীর কাছাকাছি সময়ে, তিওয়ানাকু সভ্যতা দ্রুত পতনের মুখে পড়ে। বরফের কোর নমুনা এবং হ্রদের পলি বিশ্লেষণ থেকে প্রাপ্ত জলবায়ু তথ্য দেখায়, এই সময়ে এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী এবং তীব্র খরা হয়েছিল, যা তিওয়ানাকুর কৃষি ব্যবস্থা, বিশেষ করে তাদের নির্ভরশীল "সুকা কোল্লু" পদ্ধতিকে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই পরিবেশগত বিপর্যয় সামাজিক অস্থিরতা এবং কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থার পতনের দিকে নিয়ে যায় বলে বর্তমানে বিজ্ঞানসম্মতভাবে সমর্থিত একটা তত্ত্ব।
মূলধারার ব্যাখ্যা কী?
এখানে প্রকৃত রহস্য নেই, তবে ইন্টারনেটে ব্যাপকভাবে প্রচারিত ভুল তথ্য আছে। পুমা পুংকুর "অসম্ভব নিখুঁততা" নিয়ে ভিনগ্রহী তত্ত্ব সম্পূর্ণভাবে ভিত্তিহীন এবং মূলধারার প্রত্নতত্ত্ব দ্বারা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যাত, কারণ নির্মাণ প্রক্রিয়ার প্রত্যক্ষ প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ (হাতিয়ার, অসমাপ্ত কাজ, নির্মাণ কৌশলের ধারাবাহিক বিকাশ) স্পষ্টভাবে বিদ্যমান। ২০০০ সালে তিওয়ানাকু ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যস্থল হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
কিন্তু প্রশ্নগুলো থেকেই যায়।
"সূর্যের দরজা"র খোদাইচিত্রের সম্পূর্ণ প্রতীকী অর্থ এখনো অনিশ্চিত। তিওয়ানাকুর নিজস্ব কোনো লিখিত ভাষার প্রমাণ পাওয়া যায়নি, ফলে তাদের রাজনৈতিক কাঠামো এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের বিস্তারিত বিবরণ মূলত অনুমানের ওপর নির্ভরশীল। আর পুমা পুংকুর পাথরগুলো ঠিক কীভাবে এই দুর্গম উচ্চতায় পরিবহন করা হয়েছিল, তার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি নিয়েও গবেষণা এখনো চলমান।
শেষ কথা।
তিওয়ানাকু মনে করিয়ে দেয়, মানুষের সৃজনশীলতা এবং পরিশ্রম পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতিকূল পরিবেশেও এক বিস্ময়কর সভ্যতা গড়ে তুলতে পারে, কোনো অতিপ্রাকৃত সাহায্য ছাড়াই। কিন্তু সেই একই সভ্যতা প্রকৃতির নির্দয় পরিবর্তনের কাছে কতটা ভঙ্গুর হতে পারে, তাও তিওয়ানাকুর পতন আমাদের শেখায়।
@ শেষরাত, সম্রাট রায় চৌধুরী
৪৬
জিগান্তিজা: মাল্টার সেই মন্দির, যা স্টোনহেঞ্জ আর গিজার পিরামিডের চেয়েও পুরনো।
ভূমধ্যসাগরের ছোট্ট দ্বীপ গোজোতে, পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বিশাল পাথরের ব্লক দিয়ে তৈরি এক মন্দির-কমপ্লেক্স। কিছু পাথরের ওজন পাঁচ টনেরও বেশি। স্থানীয় ভাষায় এর নাম "জিগান্তিজা", যার অর্থ "দৈত্যের টাওয়ার"। কিংবদন্তি বলে, এক দৈত্যাকার নারী তাঁর শিশুকে কোলে নিয়ে একাই এই বিশাল পাথর বহন করে এই মন্দির বানিয়েছিলেন। বাস্তবে এটা মানুষের হাতে বানানো, আর তার বয়স জানলে চমকে উঠতে হয়, এটা স্টোনহেঞ্জের চেয়ে প্রায় ১০০০ বছর, আর মিশরের গিজার পিরামিডের চেয়েও প্রায় ৫০০ বছর পুরনো।
পৃথিবীর প্রাচীনতম স্বাধীন পাথরের স্থাপনা।
জিগান্তিজা নির্মিত হয়েছিল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩৬০০ থেকে ৩২০০ সালের মধ্যে। এটাকে বর্তমানে বিশ্বের প্রাচীনতম স্বাধীনভাবে দাঁড়িয়ে থাকা (মাটির নিচে খোদাই করা নয়, বরং সম্পূর্ণভাবে ভূপৃষ্ঠে নির্মিত) মনুষ্যনির্মিত স্থাপত্যগুলোর একটা বলে মনে করা হয়। মাল্টা দ্বীপপুঞ্জজুড়ে এমন মোট সাতটা মন্দির-কমপ্লেক্স ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যস্থল হিসেবে স্বীকৃত, একসঙ্গে "মেগালিথিক টেম্পলস অফ মাল্টা" নামে পরিচিত, আর জিগান্তিজা তাদের মধ্যে সবচেয়ে পুরনো এবং সবচেয়ে বড়।
তিন-পাতার নকশা, এক বিশেষ স্থাপত্যশৈলী।
মাল্টার এই মন্দিরগুলোর একটা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হল এদের "থ্রি-লোব" বা তিন-পাতা আকৃতির নকশা, দেখতে অনেকটা ক্লোভার পাতার মতো অর্ধবৃত্তাকার কক্ষগুলো একটা কেন্দ্রীয় করিডোর থেকে বেরিয়ে গেছে। জিগান্তিজায় দুটো এমন মন্দির পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে, একটা তুলনামূলক পুরনো, আরেকটা পরে যুক্ত করা। বাইরের দেয়ালের কিছু পাথরের উচ্চতা প্রায় ৬ মিটার পর্যন্ত, আর পুরো কাঠামো ছোট ছোট চুনাপাথরের নুড়ি দিয়ে ভরাট করে মজবুত করা হয়েছিল।
বেদী, আগুন আর প্রাণী বলির চিহ্ন।
মন্দিরের ভেতরে পাওয়া গেছে পাথরের বেদী, খোদাই করা সর্পিল নকশা এবং প্রাণীর হাড়ের অবশেষ, যা থেকে গবেষকরা অনুমান করেন এখানে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং সম্ভবত প্রাণী বলি অনুষ্ঠিত হত। কিছু বেদীর নিচে ফাঁপা জায়গা পাওয়া গেছে, যা সম্ভবত নৈবেদ্য রাখার জন্য বা আচার-অনুষ্ঠানের সময় বিশেষ শব্দ তৈরির উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হত বলে অনুমান করা হয়।
পাথর সরানোর রহস্য।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, ধাতব হাতিয়ার বা চাকা ছাড়াই এই বিশাল পাথরের ব্লক কীভাবে পরিবহন এবং স্থাপন করা হয়েছিল। প্রত্নতাত্ত্বিকরা ধারণা করেন, নির্মাতারা গোলাকার পাথরের বল বা কাঠের লগ ব্যবহার করে বড় পাথরগুলো গড়িয়ে নিয়ে যেতেন, অনেকটা রোলারের মতো কৌশলে। মাল্টার অন্য মন্দির-স্থানগুলোতে এই ধরনের গোলাকার "বল-বিয়ারিং" পাথর সত্যিই পাওয়া গেছে, যা এই তত্ত্বকে সমর্থন করে।
হঠাৎ থেমে যাওয়া এক সভ্যতা।
আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ সালের কাছাকাছি সময়ে, এই মন্দির-নির্মাণ সংস্কৃতি হঠাৎ করেই বিলুপ্ত হয়ে যায়, এবং দ্বীপে একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতির (ব্রোঞ্জ যুগের) মানুষের আগমন ঘটে। এই আকস্মিক পরিবর্তনের পেছনের কারণ, দুর্ভিক্ষ, মহামারি, পরিবেশগত বিপর্যয়, নাকি বহিরাগত আক্রমণ, তা নিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিকদের মধ্যে আজও কোনো সুনির্দিষ্ট ঐকমত্য নেই।
আঠারো শতকের নথিভুক্তি।
যদিও স্থানীয় মানুষ বহুদিন ধরেই এই স্থাপনার কথা জানতেন, জিগান্তিজা প্রথম ইউরোপীয় পণ্ডিতদের দ্বারা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয় অষ্টাদশ শতাব্দীতে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পদ্ধতিগত খনন শুরু হয়, যা ধীরে ধীরে এই মন্দিরের প্রকৃত প্রাচীনত্ব এবং গুরুত্ব উন্মোচন করে। ১৯৮০ সালে জিগান্তিজা ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যস্থল হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
মূলধারার ব্যাখ্যা কী?
এখানে কোনো ষড়যন্ত্র নেই, তবে "দৈত্যদের তৈরি" কিংবদন্তিটা বহুদিন ধরে স্থানীয় লোককথায় টিকে ছিল, কারণ সাধারণ মানুষের পক্ষে ধাতব হাতিয়ার ছাড়া এত বিশাল পাথর নিয়ন্ত্রণ করা কল্পনাতীত মনে হত। আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব এখন নিশ্চিতভাবে দেখিয়েছে, এটা সাধারণ মানুষেরই কীর্তি, তাদের অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা এবং প্রকৌশল জ্ঞানের প্রমাণ, কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তি নয়।
কিন্তু প্রশ্নগুলো থেকেই যায়।
মন্দিরগুলোর সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় তাৎপর্য এবং আচার-অনুষ্ঠানের প্রকৃত প্রকৃতি এখনো পুরোপুরি অস্পষ্ট, কারণ এই সংস্কৃতির কোনো লিখিত ভাষা টিকে নেই। মন্দির-নির্মাণ সংস্কৃতির আকস্মিক পতনের কারণ নিয়েও গবেষণা চলমান। আর মাল্টার এই ছোট্ট দ্বীপে কীভাবে এত অল্প সময়ে এত বিশাল এবং জটিল স্থাপত্য গড়ে ওঠার মতো সামাজিক সংগঠন তৈরি হয়েছিল, তাও পুরোপুরি বোঝা যায়নি।
শেষ কথা।
জিগান্তিজা মনে করিয়ে দেয়, মানুষের কল্পনাশক্তি আর সংগঠিত পরিশ্রম কতদূর যেতে পারে, এমনকি ধাতুর যুগ শুরু হওয়ারও আগে। একটা ছোট্ট দ্বীপের মানুষ পাঁচ টন ওজনের পাথর তুলে তৈরি করেছিল এমন এক মন্দির, যা আজও ৫৫০০ বছর পরে দাঁড়িয়ে আছে, স্টোনহেঞ্জ আর পিরামিডের চেয়েও প্রাচীন এক নীরব সাক্ষী হয়ে।
@ শেষরাত, সম্রাট রায় চৌধুরী
৪৭
ব্রু না বইন: আয়ারল্যান্ডের সেই উপত্যকা, যেখানে নিউগ্রেঞ্জের পাশে লুকিয়ে আছে আরও দুটো রহস্যময় সমাধি-শহর।
আয়ারল্যান্ডের বয়ন নদীর বাঁকে বিস্তৃত এক উপত্যকা, যাকে বলা হয় "ব্রু না বইন", অর্থাৎ "বয়নের প্রাসাদ"। এখানেই আছে বিখ্যাত নিউগ্রেঞ্জ, যার কথা আগেই বলেছি। কিন্তু নিউগ্রেঞ্জ একা নয়, তার পাশেই আরও দুটো বিশাল সমাধি-স্থাপনা আছে, নাউথ আর ডাউথ, যাদের গল্প নিউগ্রেঞ্জের চেয়ে কম পরিচিত, কিন্তু কোনো অংশে কম রহস্যময় নয়।
নাউথ: সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে বেশি খোদাই করা।
নাউথ আসলে নিউগ্রেঞ্জের চেয়েও বড় একটা সমাধি-ঢিবি, ব্যাস প্রায় ৯৫ মিটার, নির্মিত আনুমানিক একই সময়ে, খ্রিস্টপূর্ব ৩২০০ সালের কাছাকাছি। এর ভেতরে আছে দুটো আলাদা সরু সুড়ঙ্গপথ, পূর্ব আর পশ্চিম দিকে মুখ করা, যা একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত নয়। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হল, নাউথে পৃথিবীর যেকোনো একক নব্যপ্রস্তর যুগীয় স্থাপনার তুলনায় সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মেগালিথিক শিল্পকর্ম পাওয়া গেছে, প্রায় ২০০টারও বেশি পাথরে খোদাই করা নকশা, সর্পিল, বৃত্ত, রেখা আর জ্যামিতিক প্যাটার্ন।
চাঁদের ক্যালেন্ডার, পাথরে খোদাই।
নাউথের একটা পাথরে খোদাই করা নকশা নিয়ে ১৯৯০-এর দশকে একটা চমকপ্রদ তত্ত্ব সামনে আসে, কিছু গবেষক দাবি করেন এই নকশা চাঁদের পর্যায়ক্রমিক রূপ পরিবর্তনের (অমাবস্যা থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত) একটা প্রতীকী চিত্রায়ণ হতে পারে, যা একে বিশ্বের প্রাচীনতম চান্দ্র মানচিত্রগুলোর একটা করে তুলতে পারে। তবে এই ব্যাখ্যা সব প্রত্নতাত্ত্বিকের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, অনেকে মনে করেন এটা নিছক আলংকারিক নকশা, নির্দিষ্ট জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক অর্থ ছাড়াই।
ডাউথ: কম খনন করা, বেশি রহস্যময়।
তিনটা প্রধান স্থাপনার মধ্যে ডাউথ সবচেয়ে কম গবেষণা করা হয়েছে। এর নামের অর্থ আইরিশ পুরাণে "অন্ধকার" বা "অন্ধকারের ঘর"-এর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে কিছু পণ্ডিত ব্যাখ্যা করেন, যদিও এই ব্যুৎপত্তি নিয়েও ভিন্নমত আছে। ডাউথেও নিউগ্রেঞ্জের মতো একটা সুড়ঙ্গপথ আছে, যেখানে শীতকালীন অয়নান্তের সূর্যাস্তের আলো একটা নির্দিষ্ট কোণে প্রবেশ করে, যদিও এই প্রভাব নিউগ্রেঞ্জের মতো ব্যাপকভাবে পরিচিত বা অধ্যয়ন করা হয়নি।
উনিশ শতকের ধ্বংসাত্মক খনন।
দুর্ভাগ্যক্রমে, ডাউথ ঊনবিংশ শতাব্দীতে বেশ কিছু অপেশাদার এবং ধ্বংসাত্মক খননের শিকার হয়েছিল, বিশেষ করে ১৮৪৭-৪৮ সালের দুর্ভিক্ষের সময় কর্মসংস্থান প্রকল্পের অংশ হিসেবে পরিচালিত খননে, যেখানে যথাযথ প্রত্নতাত্ত্বিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়নি এবং বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রাসঙ্গিক তথ্য চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়। এই কারণে ডাউথ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান নাউথ বা নিউগ্রেঞ্জের তুলনায় অনেক কম সুনির্দিষ্ট।
ছোট ছোট উপগ্রহ সমাধি।
তিনটা প্রধান স্থাপনা ছাড়াও, পুরো ব্রু না বইন উপত্যকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে অন্তত ৪০টার বেশি ছোট ছোট "স্যাটেলাইট" বা উপগ্রহ সমাধি-ঢিবি, এছাড়া আছে কাঠের বৃত্ত (উডহেঞ্জ), আচার-অনুষ্ঠানের চত্বর এবং অন্যান্য নব্যপ্রস্তর যুগীয় স্থাপনা। এটা প্রমাণ করে, পুরো উপত্যকাটাই প্রায় হাজার বছর ধরে একটা বিশাল, ক্রমাগত ব্যবহৃত এবং সম্প্রসারিত ধর্মীয় ও সামাজিক কেন্দ্র ছিল, শুধু তিনটা বিচ্ছিন্ন সমাধি নয়।
মূলধারার ব্যাখ্যা কী?
এখানে কোনো ষড়যন্ত্র নেই, তবে জনপ্রিয়তার একটা অসামঞ্জস্য আছে। নিউগ্রেঞ্জের শীতকালীন অয়নান্তের আলোর ঘটনা এতটাই নাটকীয় এবং সহজে বোঝানো যায় যে এটা আন্তর্জাতিক মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে, যেখানে নাউথের বিশাল শিল্পকর্ম সংগ্রহ বা ডাউথের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য তুলনামূলক কম আলোচিত থেকে গেছে। ১৯৯৩ সালে পুরো ব্রু না বইন কমপ্লেক্স একসঙ্গে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যস্থল হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
কিন্তু প্রশ্নগুলো থেকেই যায়।
নাউথের "চান্দ্র মানচিত্র" তত্ত্ব সঠিক কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এখনো ঐকমত্য নেই। ডাউথের ধ্বংসাত্মক খননের কারণে এর আসল ব্যবহার এবং নির্মাণ-পরবর্তী ইতিহাস অনেকটাই অস্পষ্ট থেকে গেছে। আর পুরো উপত্যকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট স্থাপনাগুলোর মধ্যে সম্পর্ক এবং তাদের নির্মাণের সুনির্দিষ্ট সময়ক্রম নিয়েও গবেষণা এখনো চলমান।
শেষ কথা।
ব্রু না বইন মনে করিয়ে দেয়, একটা বিখ্যাত আবিষ্কারের পাশে প্রায়ই আরও গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কম আলোচিত প্রতিবেশী লুকিয়ে থাকে। নিউগ্রেঞ্জের আলোর মায়া যতটা মুগ্ধ করে, নাউথ আর ডাউথের নীরব পাথরও ততটাই গল্প বহন করে, শুধু তাদের গল্প বলার সুযোগটা এখনো পুরোপুরি আসেনি।
@ শেষরাত, সম্রাট রায় চৌধুরী
৪৮
ইতালির আল্পস পর্বতমালার পাদদেশে, একটা দীর্ঘ উপত্যকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে হাজার হাজার পাথরের চাঁই, আর তার গায়ে খোদাই করা আছে অগণিত ছবি, মানুষ, পশু, অস্ত্র, বাড়িঘর, ধর্মীয় প্রতীক। এটা ভ্যাল কামোনিকা। এখানে মোট খোদাইচিত্রের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন অনুমান আছে, কারও হিসাবে দেড় লক্ষ, কারও মতে তিন লক্ষেরও বেশি, যা এই উপত্যকাকে ইউরোপের বৃহত্তম প্রাগৈতিহাসিক পাথরচিত্র সংগ্রহে পরিণত করেছে।
একটা পাথর, বহু প্রজন্মের হাত।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হল, এই চিত্রগুলো একসঙ্গে বা একই যুগে আঁকা হয়নি। সবচেয়ে পুরনো খোদাইচিত্রগুলো আঁকা হয়েছিল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৮০০০ সালের কাছাকাছি সময়ে, মেসোলিথিক যুগে, আর সর্বশেষ কিছু চিত্র যুক্ত হয়েছে রোমান যুগ এমনকি মধ্যযুগের শুরুর দিকেও। অর্থাৎ একই পাথরের গায়ে হাজার হাজার বছর ধরে একের পর এক প্রজন্ম নিজেদের ছবি এঁকে গেছে, কখনো আগের চিত্রের ওপর দিয়ে, কখনো তার পাশে। এই ধারাবাহিকতা একে শুধু একটা শিল্পকর্ম নয়, একটা জীবন্ত ঐতিহাসিক দলিলে পরিণত করেছে।
শিকারি থেকে কৃষক, তারপর যোদ্ধা।
চিত্রগুলোর ধারাবাহিক পরিবর্তন থেকে গবেষকরা এই অঞ্চলের সামাজিক বিবর্তনের একটা স্পষ্ট চিত্র পান। প্রাথমিক চিত্রগুলোতে প্রধানত হরিণ, বুনো ছাগল আর শিকারের দৃশ্য, পরের যুগে দেখা যায় কৃষিকাজ, লাঙল আর গৃহপালিত পশুর ছবি, আর ব্রোঞ্জ ও লৌহ যুগের চিত্রে দেখা যায় যোদ্ধা, তলোয়ার, ঢাল আর যুদ্ধরথ। এভাবে ভ্যাল কামোনিকা ইউরোপীয় প্রাগৈতিহাসিক সমাজের প্রযুক্তিগত আর সামাজিক রূপান্তরের একটা টাইমলাইন হয়ে উঠেছে, পাথরের গায়ে খোদাই করা।
রহস্যময় "ক্যামুনিয়ান রোজ"।
চিত্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত একটা প্রতীক হল "ক্যামুনিয়ান রোজ", একটা জ্যামিতিক নকশা যা দেখতে অনেকটা চাকা বা ফুলের মতো। এই প্রতীকটার প্রকৃত অর্থ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক আছে, কেউ মনে করেন এটা সূর্যের প্রতীক, কেউ মনে করেন এটা কোনো ধর্মীয় বা মহাজাগতিক চিহ্ন। এই প্রতীকটা আজ ইতালির লম্বার্ডি অঞ্চলের সরকারি প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়, এবং একে ইতালির জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়।
"ঐতিহাসিক গ্রাফিতি"র প্রাচীনতম রূপ।
কিছু গবেষক ভ্যাল কামোনিকার চিত্রগুলোকে মানব ইতিহাসের প্রাচীনতম এবং দীর্ঘস্থায়ী "গ্রাফিতি ঐতিহ্য" হিসেবে বর্ণনা করেন। রোমান যুগের কিছু খোদাইচিত্রে ল্যাটিন লেখাও পাওয়া গেছে, যেখানে সৈনিক বা ভ্রমণকারীরা নিজেদের নাম বা বার্তা রেখে গেছেন, ঠিক যেমন আজকের মানুষ দেয়ালে নাম লিখে যায়। এই ধারাবাহিকতা দেখায়, নিজের চিহ্ন রেখে যাওয়ার মানবিক তাগিদ কতটা প্রাচীন এবং সর্বজনীন।
আধুনিক গবেষণার সূচনা।
যদিও স্থানীয় মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই পাথরচিত্রের কথা জানতেন, পদ্ধতিগত বৈজ্ঞানিক গবেষণা শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, বিশেষ করে ইতালীয় প্রত্নতাত্ত্বিক এমানুয়েল আনাতি এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত "সেন্টার ফর ক্যামুনিয়ান স্টাডিজ"-এর মাধ্যমে। ১৯৭৯ সালে ভ্যাল কামোনিকা ইতালির প্রথম ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যস্থল হিসেবে স্বীকৃতি পায়, যা এই দেশের সমৃদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিগুলোর একটা।
মূলধারার ব্যাখ্যা কী?
এখানে কোনো ষড়যন্ত্র নেই, ভ্যাল কামোনিকা নিয়ে ব্যাপক এবং দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা হয়েছে। সমস্যাটা মূলত পরিচিতিতে, ফ্রান্সের লাসকো গুহাচিত্র বা স্পেনের আলতামিরার তুলনায় ভ্যাল কামোনিকা আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে কম পরিচিত, যদিও এর ব্যাপ্তি এবং সময়কাল উভয় দিক থেকেই এটা অনন্য। এই উপত্যকার বিশালতাও একটা কারণ, চিত্রগুলো একটা কেন্দ্রীভূত জায়গায় নয়, বরং প্রায় ৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে, যা একে একটা একক পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে প্রচার করা কঠিন করে তোলে।
কিন্তু প্রশ্নগুলো থেকেই যায়।
সঠিক মোট চিত্রের সংখ্যা এখনো অনিশ্চিত, কারণ নতুন নতুন খোদাইচিত্র আজও আবিষ্কৃত হচ্ছে, এবং অনেক পাথর প্রাকৃতিক ক্ষয় বা গাছপালার নিচে ঢাকা পড়ে আছে। "ক্যামুনিয়ান রোজ"-এর মতো বহু প্রতীকের প্রকৃত অর্থ আজও অনিশ্চিত, কারণ এই সংস্কৃতির কোনো লিখিত ভাষা টিকে নেই যা দিয়ে প্রতীকগুলোর সরাসরি ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে।
শেষ কথা।
ভ্যাল কামোনিকা মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস সবসময় একবারে লেখা হয় না, কখনো কখনো তা লেখা হয় হাজার বছর ধরে, একই পাতায়, একের পর এক প্রজন্মের হাতে। একটা পাথরের ওপর আট হাজার বছরের মানব সভ্যতার পরিবর্তনের ছাপ পড়ে থাকা, এটা হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ এবং সবচেয়ে নীরব এক ইতিহাসের বই।
@ শেষরাত, সম্রাট রায় চৌধুরী
৪৯
বোরোবুদুর: জাভার জঙ্গল আর আগ্নেয় ছাইয়ের নিচে চাপা পড়া বিশ্বের বৃহত্তম বৌদ্ধ মন্দির।
ইন্দোনেশিয়ার মধ্য জাভায় দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল পাথরের পিরামিড-মন্দির, নয়টা স্তরে সাজানো, চূড়ায় একটা বিশাল স্তূপ, চারপাশে ঘিরে আছে সবুজ ধানখেত আর দূরে আগ্নেয়গিরির ছায়া। এটা বোরোবুদুর, নির্মিত আনুমানিক নবম শতাব্দীতে শৈলেন্দ্র রাজবংশের শাসনামলে। কিন্তু একটা সময় ছিল, যখন এই বিশাল মন্দির সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে গিয়েছিল, ঘন জঙ্গল আর আগ্নেয় ছাইয়ের স্তরের নিচে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কারও চোখে পড়েনি।
পাথরে খোদাই করা এক মহাবিশ্বের মানচিত্র।
বোরোবুদুর নির্মিত হয়েছে প্রায় ২০ লক্ষ ঘনফুট আগ্নেয় পাথর দিয়ে, কোনো সিমেন্ট বা মশলা ছাড়াই, শুধু নিখুঁত ফিটিং কৌশলে। মন্দিরের নকশা বৌদ্ধ মহাজাগতিক দর্শনের তিনটা স্তরকে প্রতিফলিত করে, কামধাতু (কামনার জগৎ), রূপধাতু (রূপের জগৎ) আর অরূপধাতু (নিরাকার জগৎ)। তীর্থযাত্রীরা নিচ থেকে ওপরে উঠতে উঠতে প্রতীকীভাবে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের পথে এগিয়ে যেতেন, শেষে পৌঁছাতেন চূড়ার বিশাল স্তূপে।
২৫০০টার বেশি খোদাইচিত্র, এক পাথরের বই।
মন্দিরের দেয়ালজুড়ে আছে প্রায় ২৬৭২টা খোদাই করা রিলিফ প্যানেল এবং ৫০৪টা বুদ্ধমূর্তি, যা একে বিশ্বের সবচেয়ে সম্পূর্ণ বৌদ্ধ রিলিফ সংগ্রহে পরিণত করেছে। এই খোদাইচিত্রগুলোতে বুদ্ধের জীবনকাহিনি, বিভিন্ন জাতক কাহিনি (বুদ্ধের পূর্বজন্মের গল্প) এবং সেই সময়ের জাভার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, জাহাজ, বাজার, পোশাক, চিত্রিত হয়েছে। যদি একজন দর্শক প্রতিটা রিলিফের সামনে দাঁড়িয়ে সেটা পর্যবেক্ষণ করেন, পুরো মন্দির প্রদক্ষিণ করতে কয়েক কিলোমিটার হাঁটতে হয়।
পাথরের স্তূপায় বন্দি বুদ্ধমূর্তি।
মন্দিরের ওপরের তিনটা বৃত্তাকার স্তরে আছে ৭২টা ছোট ছোট ঘণ্টা-আকৃতির স্তূপ, প্রতিটার ভেতরে একটা করে বুদ্ধমূর্তি, জালি-কাটা পাথরের কাঠামোর আড়ালে আধা-দৃশ্যমান অবস্থায় বসানো। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, কেউ যদি জালির ফাঁক দিয়ে হাত ঢুকিয়ে ভেতরের মূর্তির নির্দিষ্ট অংশ স্পর্শ করতে পারেন, তাহলে তাঁর মনোবাসনা পূর্ণ হয়, যদিও এটা লোককথা, প্রমাণিত কোনো ঐতিহাসিক রীতি নয়।
হঠাৎ পরিত্যাগ, নাকি ধীর বিস্মৃতি?
দশম শতাব্দীর কাছাকাছি সময়ে, কারণ পুরোপুরি স্পষ্ট নয়, মধ্য জাভার রাজনৈতিক কেন্দ্র পূর্ব জাভায় সরে যায়, আর বোরোবুদুর ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হতে শুরু করে। এই স্থানান্তরের পেছনের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ধারণা করা হয় কাছের মেরাপি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, রাজনৈতিক পালাবদল, অথবা ইসলাম ধর্মের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, যা ধীরে ধীরে জাভায় বৌদ্ধ ও হিন্দু প্রভাবকে ছাপিয়ে যায়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মন্দিরটা ঘন জঙ্গল আর আগ্নেয় ছাইয়ের নিচে চাপা পড়ে যায়, প্রায় বিস্মৃত হয়ে।
১৮১৪ সালে ব্রিটিশ গভর্নরের নির্দেশে পুনরাবিষ্কার।
জাভায় সাময়িক ব্রিটিশ শাসনামলে, স্যার টমাস স্ট্যামফোর্ড র্যাফলস (যিনি পরে সিঙ্গাপুর প্রতিষ্ঠার জন্য বিখ্যাত হন) স্থানীয়দের কাছ থেকে জঙ্গলে ঢাকা এক বিশাল স্মৃতিস্তম্ভের গুজব শুনে একজন প্রকৌশলীকে অনুসন্ধানে পাঠান। কয়েক মাস ধরে গাছপালা কেটে আর ছাই সরিয়ে বেরিয়ে আসে সম্পূর্ণ মন্দিরের কাঠামো। পরবর্তী কয়েক দশকে ডাচ ঔপনিবেশিক প্রশাসন এবং পরে স্বাধীন ইন্দোনেশিয়া সরকার ধাপে ধাপে ব্যাপক সংস্কার কাজ চালায়, সবচেয়ে বড় পুনরুদ্ধার প্রকল্প হয় ১৯৭৫ থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যে, ইউনেস্কোর সহায়তায়।
মূলধারার ব্যাখ্যা কী?
এখানে কোনো ষড়যন্ত্র নেই, বোরোবুদুরের ইতিহাস মোটামুটি সুপ্রতিষ্ঠিত। মন্দিরের নিজস্ব শিলালিপি, সমসাময়িক অন্যান্য জাভানীয় নথি এবং প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ মিলিয়ে নির্মাতা এবং সময়কাল সম্পর্কে গবেষকদের মধ্যে যথেষ্ট ঐকমত্য আছে। ১৯৯১ সালে বোরোবুদুর ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যস্থল হিসেবে স্বীকৃতি পায়। সমস্যাটা বরং আন্তর্জাতিক পরিচিতিতে, বহু মানুষ আংকর ওয়াট বা মিশরের পিরামিডের নাম জানলেও বোরোবুদুরের কথা শোনেননি, যদিও এটা বিশ্বের বৃহত্তম একক বৌদ্ধ স্থাপনা।
কিন্তু প্রশ্নগুলো থেকেই যায়।
মন্দির পরিত্যাগের সঠিক কারণ, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, রাজনৈতিক পালাবদল, নাকি ধর্মীয় পরিবর্তন, এই তিনটার মধ্যে কোনটা প্রধান ভূমিকা রেখেছিল, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে এখনো ঐকমত্য নেই। এছাড়া মন্দিরের একদম নিচের ভিত্তি স্তরে "হিডেন ফুট" নামে পরিচিত একটা লুকানো রিলিফ সিরিজ আছে, যা নির্মাণের সময়ই অতিরিক্ত পাথর দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল, সম্ভবত কাঠামোগত স্থিতিশীলতার জন্য অথবা ধর্মীয় কারণে, তবে ঠিক কেন ঢাকা হয়েছিল তা নিশ্চিত নয়।
শেষ কথা।
বোরোবুদুর মনে করিয়ে দেয়, বিশ্বাসের একটা বিশাল স্মৃতিস্তম্ভও সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে, প্রকৃতির চাদরে ঢাকা পড়ে যেতে পারে, তারপরও একদিন আবার আলোয় ফিরে আসতে পারে। পাথরে খোদাই করা সেই ২৫০০টার বেশি গল্প আজও নীরবে অপেক্ষা করছে, কেউ ধীরে ধীরে হেঁটে গিয়ে সেগুলো পড়বে বলে।
@ শেষরাত, সম্রাট রায় চৌধুরী
৫০
বাংলাদেশের জনগণ কেন সরকারকে জমির খাজনা দেয়?
উত্তর: কারন, জমির প্রকৃত স্বার্বভৌম মালিক সরকার। জনগন খাজনার বিনিময়ে অনিদৃষ্টকালীন মালিক হিসেবে জমি ভোগদখল করে। আমরা যে টাকা দিয়ে অন্যের থেকে জমি কিনি, সেক্ষেত্রে টাকার বিনিময়ে কেবল ভোগদখল সত্ব পরিবর্তন হয়, মুল স্বার্বভৌম মালিকানা সরকারেরই থেকে যায়।
প্রশ্ন: সরকার কিভাবে জমির স্বার্বভৌম মালিক হলো?
উত্তর: ব্রিটিশ আমলে সব জমির মালিক ছিলো হিন্দু জমিদারগন। জনগণ জমিদারের থেকে জমি বর্গা নিয়ে চাষ করতো। যে ফসল হতো তা সমান ৩ ভাগ করে একভাগ ব্রিটিশরা নিতো, একভাগ জমিদার পেতো, বাকি একভাগ কৃষক পেতো। এই কারনে ব্রিটিশ আমলে অপুষ্টি আর খাদ্যাভাবে বাঙালিরা ছিলো রোগা-হাড্ডিসার, কুচকুচে কালো, পরিধানের মত কাপড় পেতোনা, পুরুষরা খালি গায়ে নেংটি পরতো, আর মহিলারা পড়তো ব্লাউজ বিহীন কাপড়। গোটা ভারতবর্ষে পুর্ববঙ্গ তথা বর্তমান বাংলাদেশ ছিল সবচেয়ে দরিদ্র, দুর্ভিক্ষপিড়িত, পশ্চাৎপদ, অনুন্নত অঞ্চল। বাঙালীদের তাচ্ছিল্য করে বলা হতো ভুখা, নাঙ্গা, কাঙাল, চাষাভুষার জাত।
পাকিস্তান গঠনের পর পাকিস্তান সরকার ১৯৫০ সালে জমিদার উচ্ছেদ আইন পাশ করে জমিদারি প্রথা বাতিল করে। সরকার হিন্দু জমিদারদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে সমস্ত জমি কিনে নেয়। এরপর সেসব জমি স্থানীয় ভোগদখল কারীদের মাঝে খাজনা আদায়ের শর্তে বিতরন করে দেয়। এভাবে স্থানীয় জনগন ২০০ বছর পর জমির মালিকানা ফেরত পায়। নিজের জমির পুরো ফসল ভোগ করার সুজোগ পায়। নেংটির পরিবর্তে লুঙ্গি পরা শুরু করে।
এছাড়া ১৯৪৭ সালে এদেশ থেকে মাইগ্রেশন করে ভারতে চলে যাওয়া সাধারন হিন্দুদের জমিও পাকিস্তান সরকার কিনে নেয়। এরপর ভারত থেকে মাইগ্রেশন করে এদেশে আসা বিহারি, কুচবিহারী, অসমীয় সহ অন্যান্য অবাঙালী মুসলিম জনগণের হাতে সরকার সেসব জমি হস্তান্তর করে। এভাবে মাইগ্রেশন করে আসা অবাঙালি মুসলিমরাও জমির মালিকানা পায়।
প্রশ্ন: হিন্দু জমিদাররা কিভাবে জমির মালিক হলো?
উত্তর: দিল্লি সালতানাতের সময়কাল থেকে এই অঞ্চলের বেশিরভাগ ভুমির মালিক ছিলো অন্য অঞ্চল থেকে হিজরত করে আসা ধনাঢ্য মুহাজির মুসলিমগন। এরা ছিলো অত্যন্ত উচ্চবিত্ত, সম্মানিত, অভিজাত গোষ্ঠী। এরা স্থানীয় হিন্দু, বোদ্ধদের কাছ থেকে ক্রয়সুত্রে জমির মালিক হয়। ব্রিটিশ শাসনেও তারা স্বাধীনভাবে জমি ভোগদখল, ক্রয়-বিক্রয় করতো, তবে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানীকে কর বাবদ খাঁজনা প্রদান করতো।
মুসলমানদের ভুমি মালিকানার ওপর আঘাত আসে ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইনের মাধ্যমে। এই আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট দিনে সুর্যাস্তের আগেই জমির খাজনা বাবদ সমূদয় অর্থ ব্রিটিশদের হাতে হস্তান্তর করতে হতো। না করতে পারলে নিলামের মাধ্যমে জমির মালিকানা কেড়ে নেয়া হতো।
এটি ছিল মুসলমানদের জমির মালিকানা কেড়ে নেয়ার লক্ষ্যে ব্রিটিশ ও হিন্দুদের এক যৌথ ষড়যন্ত্র। আইনের মারপ্যাচে মুসলিম ভুপতিদের বেকায়দায় ফেলে তাদের জমি নিলামে তোলা হতো। নিলামে আগে থেকেই সিন্ডিকেট করে থাকা হিন্দুরা অতি নগন্য দামে সেই জমি কিনে নিতো।
এভাবে অসংখ্য মুসলিম উচ্চবর্গের পরিবার ভুমির মালিকানা হারাতে শুরু করে। অনেকে ভয়ে নিলামের আগেই নিজেদের জমি হিন্দুদের কাছে বিক্রি করে দেয়। এভাবে রাতারাতি অসংখ্য সম্রান্ত মুসলিম পরিবার দেউলিয়া হয়ে যায়। হিন্দুরা হয়ে যায় জমিদার। আর সাধারণ মুসলিমরা নিজের জমিতেই বর্গাচাষীতে পরিনত হয়।
প্রশ্ন: অবাঙালী মুহাজির মুসলমানরা কিভাবে জমির মালিক হয়েছিলো?
মুসলমানদের আগমনের পুর্বে এই অঞ্চলের ভুমি হিন্দু এবং বোদ্ধা জনগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিলো। হজরত শাহজালালের সময় থেকে দিল্লি সালতানাত এরপর মুঘল আমল পর্যন্ত এই অঞ্চলে আরব, পারস্য, খোরাসান, আবিসিনিয়া, মধ্য এশিয়া সহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুসলিম মুহাজিরগন আগমন করে। তাদের অনেকে ছিলো ধর্মপ্রচারক, আবার অনেকে এসেছেন ব্যাবসা-বানিজ্য প্রসারের লক্ষ্যে। তাদের অনেকেই পুরো পরিবার সমেত এই অঞ্চলে হিজরত করে। সেই যুগে দেশ-বিদেশ ভ্রমন করা এই মুহাজিরগন ছিলেন অত্যন্ত জ্ঞানী, নানারকম শিল্পে দক্ষ এবং ধনী।
যেমন- জামদানী ও মসলিন কাপড়, কাশিদা, কার্পেট, স্থাপত্য ও রাজমিস্ত্রি কাজ, কাগজ, আতর ও সুগন্ধি, কাচের পন্য, চীনামাটির পন্য, তালা, ধাতব কারুকার্য এগুলো কোনোটাই এই অঞ্চলের শিল্প নয়, এগুলো মুসলিম মুহাজিরদের হাত ধরে আরব, পারস্য, আবিসিনিয়া এবং মধ্য এশিয়া থেকে এই অঞ্চলে এসেছে।
এরা ধর্ম প্রচারের পাশাপাশি শিক্ষকতা, শিল্পের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থের বিনিময়ে ভুমি ক্রয় করতো। এরকম অনেকগুলো মুহাজির পরিবার বাংলায় এসেছে। যেমন: সৈয়দ, শেখ, মৌলভী, মোল্লা, মীর্জা, মীর, খুরাসানি, বুখারী, তাবরিজি, হামাদানি, শিরাজি, বাগদাদি, মিসরি, হেরাতি, কাবুলী, লাহোরি, দেহলভি, মুলতানি, হাবশি, হাসেমি ইত্যাদি। অর্থাৎ এসব বংশের লোকেরা বাঙালী নয়। এরা আদি হিন্দুও নয়, বরং মুহাজির মুসলিম।
বাংলাদেশে যত সুফি, দরবেশ, ওলী এসেছেন তারা সকলেই ছিলেন মুহাজির। তারা কেউই বাঙালী নন। বাংলাদেশে যত পুরাতন দরবার শরিফ, মসজিদ, মাদ্রাসা আছে সেগুলোও মুহাজির মুসলিমরাই তৈরি ও পরিচালনা করেছেন। সমাজে এসব মুহাজির বংশের অত্যন্ত সম্মানজনক অবস্থান ছিলো। এরা ছিল এই অঞ্চলের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত, বিত্তবান, অভিজাত এবং খানদানি পরিবার। নিজেদের জ্ঞান, দক্ষতা ও অর্থবিত্তের মাধ্যমে তারা এই অঞ্চলের অভিজাত, সম্মানিত গোষ্ঠী হয়ে উঠে।
খাটি বাঙালীরা নৃ-তাত্বিকভাবে মাঝারি উচ্চতার, চিকন এবং কালো বর্নের। কিন্তু মুহাজিরদের অনেকেই ছিল লম্বা, ফর্সা উন্নত গড়নের। তাদের সংমিশ্রণে বর্তমানে বাঙালীদের মধ্যে এত বৈচিত্র্যতা এসেছে।
অতিতে বিবাহের ক্ষেত্রে বংশপরিচয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হতো। কোনো স্থানীয় বাঙালী যদি মীর, মির্জা বা সৈয়দের মত অভিজাত বংশ থেকে ছেলের বউ আনতে পারতো তাহলে একে বিরাট সাফল্য মনে করা হতো। একই ভাবে এসব বংশে মেয়ে বিয়ে দেয়াও ছিলো সম্মানের বিষয়।
১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে মাধ্যমে ব্রিটিশরা এসব পরিবারের সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে তাদেরকে অনেকটা দুর্বল করে দেয়। অনেকের মানহানী করা হয়। তবে এখনো বাংলাদেশে এই বংশগুলো টিকে আছে। যদিও দির্ঘদিন এই অঞ্চলে বসবাস এবং স্থানীয় বাঙালীদের সাথে বিবাহের কারনে এদের ব্লাডলাইন মিশ্র হয়ে গেছে। তবু আপনার বংশও যদি এর মধ্যে কোন একটা হয়, তাহলে আপনিও বাঙালী নন।
তবে এখানেও এক ধাপ্পাবাজি আছে। বর্তমানে অনেক বাঙালী নিজের নামের সাথে এসব অভিজাত বংশের টাইটেল লাগিয়ে অভিজাত সাঁজে। এই যেমন আমাদের কাকু মির্জা আব্বাস। ওনার আসল নাম ছিলো আব্বাস মিয়া। রাজনীতিতে এসে নামের সাথে মির্জা লাগিয়ে অভিজাত সেঁজেছেন। আমাদের রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলের হিস্ট্রি আমি জানিনা। যদি উনি সত্যিই মির্জা বংশের হন, তার মানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিও বাঙালী না
প্রশ্ন: তাহলে প্রকৃত বাঙালী মুসলিম কারা?
উত্তর: হিন্দুদের মুলত ৪টি জাত। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং নমশূদ্র। জাত অনুযায়ী সমাজে এদের পেশা বা সামাজিক ভূমিকাও পুর্বনির্ধারিত। যথা-
ব্রাহ্মণ: পুরোহিত, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী।
ক্ষত্রিয়: যোদ্ধা, শাসক ও অভিজাত।
বৈশ্য: কৃষক, ব্যবসায়ী ও কারিগর।
শূদ্র: শ্রমিক ও সেবক।
ব্রাহ্মণরা ছিল সমাজের মুল পরিচালক এবং অত্যন্ত অত্যাচারী। তারা ক্ষত্রিয়দের দিয়ে বৈশ্য এবং শূদ্রদের উপর অর্থহীন, অমানবিক ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি চাপিয়ে দিয়ে জুলুম করতো। একটা শিশু জন্মের পর সে জানতে পারতো বড় হয়ে তাকে বাধ্যতামুলক চাষা হতে হবে, কারন সে বৈশ্যের ঘরে জন্ম নিয়েছে।
ব্রাহ্মণদের অত্যাচার থেকে রক্ষা পেতে এবং মুসলিম মুহাজিরদের ধর্মপ্রচারে প্রভাবিত হয়ে বৈশ্য ও শূদ্র জাতের হিন্দুরা দলে দলে ইসলাম গ্রহন করে। আর এরাই হচ্ছে খাটি বাঙালী মুসলিম। আর বাঙালী মুসলিম মানেই বৈশ্য বা নমশূদ্র, কারন ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয়দের মুসলিম হওয়ার দৃষ্টান্ত বিরল।
তবে ইসলাম গ্রহনের পর এসব নওমুসলিম পরিবার গুলোকে ব্রাহ্মণরা একঘরে করে দিতো। সমাজে তাদের কোনো কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকতো না। এই অবস্থায় নওমুসলিমদের সাহায্যে এগিয়ে আসতো ধনাঢ্য মুহাজিরগন। তারা নিজেদের জমি নওমুসলিমদের মাঝে বিতরন করতো। সেসব জমিতে চাষাবাদ করাই ছিলো স্থানীয় নওমুসলিম বাঙালিদের একমাত্র পেশা।
এর ফলে বাংলার সমাজে অন্য সকল প্রাচীন পেশা, যেমন:- কামার, কুমার, ধোপা, নরসুন্দর (নাপিত), স্বর্ণকার, রৌপ্যকার, ব্যাবসায়ী ইত্যাদি সকল পেশা হিন্দুদের দখলে চলে যায়। বাঙালি মুসলমানদের পেশা ছিলো চাষাবাদ এবং মাছধরা।
এজন্যই সবধরনের ইতিহাস অনুযায়ী বাঙালী মুসলিম মানেই চাষা। চাষা মানেই মুসলিম। হিন্দুরা এখনো বংশপরম্পরায় তাদের প্রাচীন সেই পেশা ধরে রেখেছে। একারণে দেখবেন বাংলাদেশের বেশিরভাগ কামার, কুমার, ধোপা, নাপিত, স্বর্ণকার, রৌপ্যকার এরা হিন্দু।
অর্থাৎ বাঙালী মুসলিম মানেই আদি নমশূদ্র এবং বৈশ্য। বাঙালী মুসলিম মানেই চাষা, সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র শ্রেনী, এতটাই দরিদ্র যে নিজেদের জমিও নেই। তাই মুসলমানদের জন্য বাঙালী পরিচয় কোনো গর্বের বিষয় নয়, বরং এটি প্রমান করে আপনি এই অঞ্চলের সবচেয়ে নিচু শ্রেনীর নাগরিক। এমনকি এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শাসকদের কেউই বাঙালী ছিলেন না।
যেমন: বাংলার শেষ স্বাধীন নবার সিরাজ উদ দৌলা এবং তার নানা নবাব আলিবর্দী খান মির্জা বংশের লোক। আর মীর্জাগন হলো তুর্কি। সিরাজের মাতৃভাষা ছিলো ফার্শি এবং মুর্শিদাবাদের রাষ্ট্রীয় কাজে ফার্শি এবং উর্দু ব্যাবহৃত হতো। নবাবের পেয়াদা, কর্মচারীরাও কেউ বাঙালী ছিলোনা।
আবার পরবর্তীতে ইংরেজদের অধিনে নবাব হওয়া নবাব মীরজাফর আলী খান এবং মীর কাশিম আলী খান ছিলেন মীর বংশের লোক। আর মীরগন ইরাক থেকে আগত। তারাও ফার্শিভাসী। অর্থাৎ, বাংলার নবাবরা কেউই বাঙালী ছিলেন না। নবাবিতে বাঙালী বা বাংলা ভাষার কোনো গুরুত্ব ছিলোনা।
বাংলার বারো ভূঁইয়াদের অনেকেই বাঙালী ছিলেন না। যেমন বারো ভূঁইয়াদের নেতা ইসাঁ খা নিজেই ছিলেন রাজপুত্র জাতির।
এদিকে সালতানাত-ই-বাংলার সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহও বাঙালি ছিলেন না। তিনি একজন সিস্তানি পার্শিয়ান।
বাংলা বিজেতা ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি ছিলেন একজন তুর্কি।
এমনকি শেখ মুজিব নিজেও বাঙালী নন। শেখরা এসেছে আরব উপদ্বীপ থেকে। মানে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ্য বাঙালী নিজেও বাঙালী নন
অর্থাৎ এই অঞ্চলের শাষক থেকে শুরু করে সমস্ত অভিজাত শ্রেনী ছিলেন অবাঙ্গালী এবং তারা কেউই আদী হিন্দু নয়। আদি হিন্দু বাঙালী মুসলিমরা ছিলো চাষা, সমাজের সবচেয়ে নিচু শ্রেনীর নাগরিক।
মজার বিষয় হলো, ৭১ এর পর শেখ মুজিব বাঙালী জাতীয়তাবাদ পয়দা করে সবাইকে গনহারে বাঙালী বানিয়ে দেয়। বাঙালীত্বকে তারা এমন ভাবে প্রচার করেছে যেন এটি খুবই মহান, গৌরবের বিষয়। এমনকি মীর, মির্জাদের উত্তরসূরীরাও ইতিহাস ভুলে নিজেদের বাঙালী বানাতে উঠেপড়ে লেগেছে। এ যেন নবাবের বংশধর হয়ে নমশূদ্র হওয়ার খায়েশ।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এই বাঙালিত্বের প্রোপাগান্ডা দুর করতে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করেন। এই অঞ্চলের মিশ্র জাতিসত্তার জন্য জিয়ার এই উদ্দোগ ছিলো খুবই কার্যকর। কিন্তু জিয়ার মৃত্যুর পর এই উদ্দ্যোগ আর সামনে এগুয়নি।
প্রশ্ন: তাহলে অভিজাত বাঙালি মুসলিম বংশ গুলো কোথা থেকে এসেছে?
বাংলাদেশে এখনো কিছু প্রভাবশালী, অভিজাত মুসলিম পরিবার আছে। যেমন: মজুমদার, চৌধুরী, দেওয়ান ইত্যাদি। প্রশ্ন হলো, হিন্দু জমিদারগনই যদি সব জমির মালিক হয়, তাহলে এসব এলিট মুসলিম পরিবার তৈরি হলো কিভাবে? এককথায় - চাটুকারিতা করে।
ব্রিটিশ জমিদারি এটেস্টগুলো ছিল বেশ বড়, এখনকার কয়েকটি জেলা নিয়ে ছিলো এদের পরিব্যাপ্তি। এতবড় অঞ্চল একজনের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন বিধায় জমিদারিকে একাধিক অঞ্চলে ভাগ করে প্রতিটি অংশে স্থানীয় কাউকে শাসন, খাজনা আদায় ও তদারকির দায়িত্বে নিয়োগ দেয়া হতো।
এই সুযোগে কিছু চাটুকার মুসলিম জমিদারের আস্থা অর্জন করে আঞ্চলিক কর্তিত্ব পায়। এদের নানারকম উপাধি ছিলো, যেমন- খাজা, মালিক, দেওয়ান, আমীর, বেগ, সরকার, মজুমদার, ভুঁইয়া, মহিশান, পাটোয়ারী, শিকদার, গাজী, চৌধুরী ইত্যাদি। যদিও এগুলো মুলত মুঘল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন পদের নাম, কিন্তু হিন্দু জমিদারগন তাদের অনুগত পেয়াদাদের খুশি করতে এসব উপাধি প্রদান করতো।
যেমন: দেওয়ানরা ছিল আঞ্চলিক শাষক। মজুমদাররা ছিলো খাঁজনা আদায়কারী। পাটোয়ারীরা ছিলো হিসাবরক্ষক। গাজীরা ইসলামি জিহাদের গাজি নয়, তারা ছিলো হিন্দু জমিদারদের লাঠিয়াল।
এরা সকলেই ছিলো কম-বেশি অত্যাচারি। এদের কাজ ছিলো জনগনের গলায় পারা দিয়ে খাজনা আদায় করে জমিদারের হাতে তুলে দেয়া। পাকিস্তান সরকার জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের ফলে এসব পরিবার তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিপুল জমি-সম্পত্তির মালিক হয়ে যায়। বাংলাদেশে এখনো এসব পরিবারের অস্তিত্ব আছে, এবং এরা এখনো বেশ জমি-সম্পত্তির মালিক। আপনি আপনার এলাকায় কোনো মজুমদার, মহিসান বা দেওয়ান বাড়ি থাকলে খোঁজ নিয়ে দেখুন এরা অতিতে অত্যাচারি ছিলো এবং এখনো নাকউঁচু স্বভাবের।
এই গোষ্ঠী গুলোর ভেতর হিন্দু, মুসলিম উভয়ই ছিলো। মুসলিম পরিবারগুলো বাংলাদেশে এখনো আছে, তাহলে হিন্দু অভিজাত পরিবার গুলো কই?
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময় এসব অত্যাচারি, অভিজাত হিন্দু পরিবার মুসলমানদের প্রতিশোধের ভয়ে ভারতে চলে যায়। এই কারনে বাংলাদেশে তেমন কোনো অভিজাত হিন্দু নাই, যা আছে সব নিম্নবর্গের সাধারণ হিন্দু।
তারা নিজেদের প্রচুর জমি-সম্পত্তি, পাকা দালানকোঠা সবকিছু পাকিস্তান সরকারের কাছে বিক্রি করে ভারতে চলে যায়। পাকিস্তান সরকার ভারত থেকে আসা বিহারি, রাজপুত, কুচবিহারী, অসীময় মুসলমানদের এসব হিন্দুদের সম্পত্তিতে পুনর্বাসন করে। একারনেই বিহারি সহ অন্যান্য অবাঙালী হিজরতকারীরা এদেশে আসার পর মোটামুটি ভাল পর্যায়ে ছিলো। অথচ প্রোপাগান্ডা চালানো হয় বিহারিরা বাঙালিদের সম্পত্তি দখল করে বড়লোক হয়েছে।
৭১ এ উগ্র বাঙালীরা অবাঙ্গালীদের হত্যা করে তাদের জমি-সম্পত্তি, বাড়িঘর দখল করে নেয়। এমনকি বর্তমানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় যেই জমিতে অবস্থিত সেটিও এক বিহারি মুসলিমের ছিল। সরকারিভাবে প্রাপ্ত নিজেদের ঘরবাড়ি হারিয়ে তারা এখন বিহারি ক্যাম্পে মানবেতর ভাবে বসবাস করছে।
ব্রিটিশ আমলে মুসলিম জমিদার ছিল?
হ্যা ছিলো, তবে খুবই কম সংখ্যক। যেমন টাঙ্গাইলে ছিল, ঢাকার নবাব পরিবার ছিল। তবে এরা সবাই ছিলো ইংরেজদের চাটুকার। যেমন আমাদের ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহর দাদা নবাব খাজা আব্দুল গনি ছিলেন ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের সময় ঢাকার নবাব। সেসময় তিনি জনগণের সাথে গাদ্দারি করে ব্রিটিশদের অর্থ ও সেনা সহায়তা দিয়ে সিপাহি বিপ্লব দমনে সহায়তা করেন। বিপ্লব দমনের পর ইংরেজরা খুশি হয়ে তাকে "স্যার" উপাধি প্রদান করে।
বাই দা ওয়ে, ঢাকার নবাব পরিবারও কিন্তু বাঙালী ছিলেন না। তারা ছিল কাশ্মীরি। তাদের ভাষা ছিল ফার্সি ও উর্দু। ঢাকার নবাবির দাপ্তরিক ভাষা ছিল উর্দু। কি অবস্থা, ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহর দাপ্তরিক ভাষা উর্দু হলে সমস্যা নাই, কিন্তু মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর পাকিস্তানে দাপ্তরিক ভাষা উর্দু হলে জাত গেল, জাত গেল...
তাই আপনি যদি একজন খাটি বাঙালী হন, জাতভেদ খুঁজেন এবং বাঙালীত্ব নিয়ে গর্ববোধ করেন, তাহলে এর মানে আপনি এই অঞ্চলের সবচেয়ে নিচু জাতের মানুষ। সৈয়দ, মীর, মীর্জাদের মত বহিরাগত মুসলিমরা এসেছিলো বলে আপনার পুর্বপুরুষগন নমশূদ্র থেকে মুসলিম হয়েছে। নয়তো এখন ব্রাহ্মণদের জুতার নিচে থাকতেন।
শাসকরা মুসলিম হওয়া সত্বেও দিল্লি সালতানাত, মুঘল সাম্রাজ্য, এমনকি মুর্শিদাবাদের দরবারে বেশিরভাগ সদস্য ছিলেন হিন্দু। মুসলিম শাসনাধীন হওয়া সত্বেও ভারতবর্ষের সমাজে হিন্দুদের আধিপত্যই ছিলো বেশি, তারা ছিলো সংখ্যাগুরু। ১৯৪০ নাগাদ ভারতবর্ষে মুসলমানের সংখ্যা ছিলো মাত্র ১০ কোটি, যা মোট জনসংখ্যার মাত্র ২৪%। এমনকি মুঘল আমলেও ভারতের বেশিরভাগ অঞ্চলে গরু জবাই নিষিদ্ধ ছিলো। মুঘল সম্রাটরা হিন্দুদের মনরক্ষায় কুরবানি ঈদের নাম দেয় "বকরি ঈদ" মানে ছাগলের ঈদ। ভারতবর্ষে মুসলমানরা সামাজিক ভাবে প্রভাবশালী হয়েছে পাকিস্তান সৃষ্টির পর। @ অনির্বাণ-Wings Of Aviation