শিক্ষার্থীদের ২০০ টি আদব কায়দা ও নৈতিকতা
পরীক্ষার নিয়ম কানুনের জন্য এই লিঙ্কে প্রবেশ করুন -https://www.sunagorik.net/0
শিক্ষার্থীদের ২০০ টি আদব কায়দা ও নৈতিকতা
পরীক্ষার নিয়ম কানুনের জন্য এই লিঙ্কে প্রবেশ করুন -https://www.sunagorik.net/0
( নিচের প্রথম অংশটুকু শুধুমাত্র বাবা-মার শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্য)
প্রথম অংশ
প্রিয় শিক্ষার্থী ও অভিবাবক,
জাপান ও ইউরোপের গ্র্যাজুয়েশন লেভেল পর্যন্ত শিষ্টাচার পর্যবেক্ষণ করে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য ৫ বছরের চেষ্টায় তৈরি করেছি, এই ‘২০০শিষ্টাচার’ পুস্তিকাটি। এই বইটি শিক্ষার্থীদের মাঝে বিলি করে একটি প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। এই প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ সবাইকে একটি আয়োজিত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পুরস্কৃত করা হয় এবং তাদেরকে সাপ্তাহিক ‘আনন্দের আড্ডার মাধ্যমে' ২০টি সফ্টস্কিলে দক্ষতা অর্জনের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।
বিষয়গুলো হচ্ছে--১) জ্ঞান ও তথ্য জানায় কৌশল, ২) অন্যদের সঙ্গে ইতিবাচক আচরণ, ৩) জনসম্মুখে উপস্থাপনা ও বক্তৃতা দেবার দক্ষতা অর্জন, ৪) সততা ও নৈতিকতা, ৫) আত্মনির্ভরশীলতা, ৬) কর্তব্যনিষ্ঠাতা ও শৃঙ্খলাবোধ, ৭) গুরুজন ও মহিলাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা, ৮) সমন্বয় ও নেতৃত্ব দানের ক্ষমতা, ৯) অভিযোগ প্রতিকারে সহযোগিতা, ১০) অন্যকে বুঝানোর দক্ষতা, ১১) নিরপেক্ষতা বজায় রাখার ক্ষমতা, ১২) শোনে-বুঝে পরিমিত কথা বলার দক্ষতা, ১৩) মানসিক দৃঢ়তা, ১৪) সুবিধা।। বঞ্চিতদের প্রতি দাত্বিবোধ ১৫) চাহিদা নিয়ন্ত্রনে পারদর্শিতা ১৬) 'গিভ এন্ড টেক' নীতির চর্চা ১৭) সিদ্ধান্ত নেয়ার কৌশল, ১৮) ব্যার্থতা বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা ১৯) উত্থান-পতন মেনে টিকে থাকার পারদর্শিতা ২০) পরিকল্পিত উপায়ে কাজ করা ।
পাশাপাশি হলিডে ক্যাম্পিং-এ কিছু প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। যেমন- ১) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বা মক ড্রিল, ২) আগুন, ভূমিকম্প, বা সন্ত্রাসী হামলা মোকাবিলার কলাকৌশল। ৩) হঠাৎ অসুস্থ বা আহত ব্যক্তির চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ৪) পরিবেশ ও প্রকৃতিকে সংরক্ষণ, ৫) নিরাপদ খাদ্য শৃঙ্খলা, ৬) ময়লা ব্যবস্থাপনা 'স্পোগোমি গেম' ৭) স্টোরিটেলিং, ৮। মেমোরি গেম, ৯) গেমস জিমন্যাস্টিকস, ১০) সাইকেলিং ইত্যাদি প্রশিক্ষণ।
গত এক বছরে আমরা রাজধানীর লালবাগের ‘ইস্ট অ্যান্ড স্কুল’ থেকে শুরু করে কালীগঞ্জ, গাজীপুরের বেরুয়া হাইস্কুল পর্যন্ত অসংখ্য স্কুল-কলেজে সফলতার সাথে এই প্রোগ্রামটি পরিচালনা করে আসছি। এই কার্যক্রম সারাদেশে প্রসারিত করার জন্য শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সকলের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা কামনা করছি। -আবু ওবাইদ, নির্বাহী পরিচালক, সুনাহরিক সংঘ, ০১৫৫১-৯৬ ৯৬ ৯৬, ০১৬-৭৭ ৮৮ ৯৯ ০১
প্রকাশকের কথা
“ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বুর্দোর মতে, প্রতিটি মানুষ ‘হ্যাবিটাস’ দ্বারা পরিচালিত হয়। হ্যাবিটাস হলো, পরিবার ও সমাজের ভেতরে বেড়ে উঠার সময় ‘গড়ে ওঠা অভ্যাস ও মানসিকতা’। অর্থাৎ শৈশবে বেড়ে উঠার পরিবেশের উপর মানুষ তৈরি হয়।”
শিক্ষার্থী ও অভিবাবক,
এ-দেশের সরকারি-বেসরকারি যে-কোনো প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোথাও সেবা নিতে গেলে দেখা যায় ‘দারোয়ান থেকে সর্বোচ্চ কর্তা পর্যন্ত’ প্রায় সবাই বেশিনভাগ ক্ষেত্রে অসৌজন্যমূলক ও অসম্মানজনক আচরণ করে। একজন সেবা গ্রহীতাকে সালাম-আদাব বিনিময় করা, বসতে বলা, সমস্যার কথা জানতে চেয়ে তার সমাধানের পথ বাতলে দেয়ার মতো সভ্য আচার-আচরণ থেকে আমরা অনেক দূরে। নিজের ভাষায় নিজের মানুষের সঙ্গে একটু সুন্দর ও বিনয়ী আচরণ করার মতো শিক্ষা, মন-মানসিকতা আর সময় কোনোটাই থাকে না আমাদের কাছে। এর কারণ আমাদের সমাজ ব্যবস্থা ও শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা ও আদব-কায়দার চর্চা বা অনুশীলনের অভাব।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতা করতে শেখায়। শিশু-কিশোরেরা একে অপরের প্রতিযোগী হয়। একজন আরেকজনকে টপকে যাবে, মনে প্রাণে এই চেষ্টা থাকে; সঙ্গে যুক্ত হয় মা-বাবা। ফলে আমাদের জীবনে ঘাড়তি থেকে যাচ্ছে অন্যের প্রতি মানবতাবোধ, আদবকেতা আর সহযোগিতার মানসিকতা। জাতি হিসেবেই আমরা ক্রমেই অমানবিক ও অসহিষ্ণু হয়ে উঠছি।
৭৫ বছরের বেশি সময় ধরে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা শত শত শিশু ও তাদের অভিভাবকদের জীবন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ করে দেখেছেন, যেসব শিশু ছোটবেলা থেকেই পরিবার-পরিবেশের কাছ থেকে আন্তরিক ভালোবাসা, মানসিক সমর্থন ও ইতিবাচক সম্পর্ক পায়, তারাই পরবর্তী জীবনে তুলনামূলক বেশি সুখী, সফল ও সার্থক জীবন লাভ করে। কাজেই নৈতিকতা ও আদবকেতা শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। -প্রকাশক
বাবা-মা, অভিভাবক ও শিক্ষক’ এই লেখাটি মনোযোগ দিয়ে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া স্টেটের স্কুলশিক্ষক ‘জেন এলিয়ট’ তার শিক্ষার্থীদের উপর একটি এক্সপেরিমেন্টটি চালান। মার্টিন লুথার কিং-এর চিন্তাধারা তাকে সবসময় প্রভাবিত করতো। ১৯৬৮ সালে যখন মার্টিন লুথার কিংকে খুন করা হয়, তারপর থেকেই তিনি তার ছাত্র-ছাত্রীদের বর্ণবাদ, বৈষম্য এই ব্যাপারগুলো বোঝাতে চেষ্টা করেন। কিন্তু তা কিছুতেই ফলপ্রসূ হচ্ছিলো না।
স্থানীয় শিক্ষার্থীরা আগের মতোই মফস্বল থেকে আসা শিক্ষার্থীদের অবজ্ঞার চোখেই দেখে যাচ্ছিল। তাই, এলিয়ট প্রিয় শিক্ষার্থীদের উপর দুই মাসব্যাপী একটি এক্সপেরিমেন্ট চালালেন। প্রথমে তিনি তার ক্লাসটিকে দুটি গ্রুপে ভাগ করলেন। প্রথম গ্রুপে রাখলেন যাদের চোখের রং নীল এবং দ্বিতীয় গ্রুপে রাখলেন যাদের চোখ বাদামী। তিনি প্রথম গ্রুপ অর্থাৎ যাদের চোখের রঙ নীল তাদেরকে বাদামী চোখের শিক্ষার্থীদের চেয়ে উঁচু মর্যাদার বলে ধরে নিলেন এবং বেশি সুযোগ-সুবিধা দিতে শুরু করলেন। দ্বিতীয় গ্রুপের সদস্যদের কোণঠাসা করার জন্য তিনি তাদের বিভিন্ন দোষ-ত্রুটি সবার সামনে বর্ণনা করতে শুরু করলেন।
এর ফলাফল হলো খুবই চমকপ্রদ। প্রথম গ্রুপের শিক্ষার্থীরা অর্থাৎ যারা নিজেদেরকে সুপিরিয়র ভাবছে, তাদের আচরণ খুব দ্রুত পরিবর্তিত হতে লাগল। তারা ক্লাসে এখন সবচেয়ে মনোযোগী এবং কোনো কিছু না বুঝলে তারা সাথে সাথে প্রশ্ন করে। ক্লাস টেস্টেও তারা দ্বিতীয় গ্রুপের সদস্যদের চেয়ে অনেক ভাল করলো। সবথেকে মন খারাপ করা যে ব্যাপারটা ঘটল তা হলো, তারা তাদের দ্বিতীয় গ্রুপের বন্ধুদের সাথে খারাপ ব্যবহার করতে শুরু করল এবং তাদের উপর এক ধরনের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করতে লাগল। অন্যদিকে দ্বিতীয় গ্রুপের শিক্ষার্থীরা হীনম্মন্যতায় ভুগতে লাগল এবং সবদিক থেকে পিছিয়ে পড়তে লাগল। পরের মাসে ‘এলিয়ট’ একই এক্সপেরিমেন্ট চালালেন। কিন্তু এবার যাদের চোখের রঙ বাদামী তাদেরকে নীল চোখের শিক্ষার্থীদের চেয়ে সুপিরিয়র হিসেবে ধরে নিয়ে অনুপ্রেরণা দিতে লাগলেন। তখন ফলাফলও উল্টে গেল। অর্থাৎ নীল চোখ যাদের তারা সবকিছুতে পিছিয়ে পড়তে লাগল।
এই এক্সপেরিমেন্টটি আমাদেরকে বোঝায় যে, সমাজে যারা অবহেলিত তারা কেন পিছিয়ে পড়ে এবং নানা অপরাধের সাথে যুক্ত হয়। আর যারা সুপার পাওয়ার হয়, তারা কিসের জোরে দুনিয়াটা শাসন করে। পরিবারে বা সমাজে যদি কাউকে সমালোচনা বা অবহেলা কিংবা দমিয়ে রাখা হয়, তাহলে তার পক্ষে পাওয়ার হিসাবে গড়ে উঠা খুবই কঠিন; পক্ষান্তরে যদি কাউকে প্রশংসা ও উৎসাহিত করা হয়, তাহলে তাকে অনেকদূর নিয়ে যাওয়া সম্ভব। পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষই সম্ভাবনাময়, শুধু দরকার তার ভিতরের ঘুমন্ত শক্তিকে জাগিয়ে তোলা। নিজের পরিবার, সন্তান বা কর্মচারী কিংবা অন্য কেউ, সে যেই হোক, সর্বদা তাদেরকে প্রশংসা ও উৎসাহের মধ্যে রাখুন, দেখবেন সে সত্যিই জ্বলে উঠবে এবং তার কল্যাণে আপনি বেশি সুখী হবেন।
টিনএজ সন্তানের প্রতি মা-বাবার আচরণ:
* টিন এজে বাচ্চারা শিশুকাল ছাড়িয়ে কিশোরকালে পা দেয়। এ রূপান্তর শারীরিক ও মানসিকভাবে খুব কঠিন হয়। তারা চায় বাবা-মা এ কঠিন সময়ে তাদের বন্ধু হবেন। কিন্তু অনেক মা-বাবা ব্যাপারটা না বুঝে উল্টো আচরণ করেন। ফলাফল হচ্ছে- 'বিদ্রোহ'।
* ওরা কিছু বলতে চাইলেই ধমক দিয়ে থামিয়ে দেওয়া হয়। ফলে ওদের ভেতরে আগ্নেয়গিরি সৃষ্টি হয়- যা শেষ পর্যন্ত বিস্ফোরণ ঘটায়।
* তাদের প্রতিটি ভুলের জন্য বাড়িতে কড়া শাসন করা হয়। কিন্তু তারা তা চায় না- তারা সহমর্মিতা চায়। তা না পেলে তারা বেঁকে বসে। তাই কথায় কথায় বিচার না বসিয়ে ঠান্ডা মাথায় ভুলগুলো শোধরানোর পথ দেখানো উচিত। বয়সটাই ভুলের- এটা মা-বাবা যত দ্রুত বুঝবেন ততই মঙ্গল।
* তারা কোনো সমস্যার কথা বললেই মা-বাবা উপদেশের দীর্ঘ লেকচার দেন। বয়সটা লেকচার সহ্য করার নয়। তারা চায় মা-বাবা সমস্যা শুনবেন। সমাধান দেবেন। কিন্তু লেকচারের জ্বালায় তারা সমস্যার কথা বলাই বন্ধ করে দেয়।
* তারা প্রশংসা চায়। অনেক বাবা-মা ‘বাচ্চা লাই পাবে ভেবে’ তা করেন না। ফলে অভিমানের সমুদ্র তৈরি হয়। এ সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার জন্য কোনো সেতু নেই।
* মা- বাবা যখন তাদের বোঝার চেষ্টা করেন না তখন বাইরের কেউ সামান্য সহানুভূতি দেখালে তারা তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক সময় এভাবেই তাদের জন্য ফাঁদ পাতা হয়।
* মা-বাবার আরেকটি বড় ভুল হলো- টিন এজারদের শাসন করার জন্য তারা তৃতীয় পক্ষকে টেনে আনেন। এতে ওরা খুব অপমানিত বোধ করে। তাই আরো উদ্ধত হয়ে ওঠে- খুব বাজেভাবে রিয়্যাক্ট করে।
মূল কথা: 'টিন এজের বাচ্চা মানে বারুদ ঠাসা দেয়াশলাই। একটু ঘষা দেবেন দাউদাউ আগুন জ্বলে উঠবে। কাজেই শান্ত থেকে তাদেরকে ভালোবাসা দিয়ে মুড়িয়ে এগিয়ে রাখুন।
পিতা-মাতা, অভিভাবক ও শিক্ষক কর্তৃক শিশুর প্রতি কোমল আচরণ বা জেন্টল প্যারেন্টিং
* সন্তানের কথাগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে শুনুন। তাকে তাচ্ছিল্য করবেন না। সন্তানকে যতই শাস্তি দেবেন ততই সে অসামাজিক হবে।
* ‘সন্তানকে গুণগত সময় দিন। অর্থাৎ যতটুকু সময়ই তার সঙ্গে থাকছেন না কেন, সে সময়টুকু শুধু তাকেই দিন।
* তার সামনে কোনো অপরাধ করা বা অপরাধের পক্ষ নেওয়া থেকে বিরত থাকুন। বাবা-মা নিজেরা মিথ্যা বলবেন না, আইন ও নিয়ম ভাঙবেন না। সন্তানের সামনে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য বা তার শিক্ষকের সমালোচনা করা থেকে বিরত থাকুন; বাবা-মা একে অপরকে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ বা নিন্দা করবেন না, তর্কে জড়াবেন না।
* সন্তানের উপর অযথা চাপ তৈরি করবেন না-‘তোমাকে এটা পারতেই হবে’, এ ধরনের লক্ষ্য নির্ধারণ তাকে দেবেন না। কোনো অবস্থাতেই সন্তানকে মারবেন না, তীব্র কটাক্ষ করে বকবেন না, প্রয়োজনে বুঝিয়ে বলুন। অন্য কারও সঙ্গে সন্তানের তুলনা করবেন না, তাকে অহেতুক সন্দেহ করবেন না। গোপন নজরদারি করবেন না, প্রয়োজনে তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলুন।
* তার ভালো কাজের প্রশংসা করুন, অপছন্দের কাজ করলে একটা পর্যায় পর্যন্ত সেটির প্রতি গুরুত্ব দেবেন না। সন্তানের প্রতিভা বা আগ্রহের দিক বুঝে তা বিকাশের জন্য তাকে সুযোগ করে দিন।
* সন্তানের কোনো ব্যর্থতাকে সমালোচনা-বিদ্রƒপ করবেন না। সন্তানের ছোটখাটো সফলতার জন্য তাকে উৎসাহ দিতে হবে এবং কোনো কাজে ব্যর্থ হলে ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করে তা নিরসনের চেষ্টা করতে হবে।
* সন্তানের সঙ্গে একত্রে বিভিন্ন খেলা খেলুন। সপ্তাহে অন্তত একদিন সন্তানকে নিয়ে বেড়াতে যান। সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড, স্বেচ্ছাসেবা এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে দিন। বিকালে তাকে একটু বেড়াতে ও খেলতে দিন, একটু দৌড়-ঝাঁপ করতে দিন। শারীরিক শ্রম করতে উৎসাহিত করুন।
* সন্তানের মোবাইল ফোন বা ট্যাব ব্যবহার সীমিত করুন। প্রয়োজনে আপনি নিজেও মোবাইল ফোন ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগ ব্যবহার কমিয়ে দিন।
* পরিবারে সবাই অন্তত একবেলা একসঙ্গে বসে খাদ্য গ্রহণ করুন।
* সন্তানের বন্ধুদের গুরুত্ব দিন। ভালো বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে উৎসাহিত করুন। তবে পরিষ্কার ধারণা রাখুন, সে কাদের সঙ্গে যাচ্ছে, কোথায় সময় কাটাচ্ছে।
* সন্তানের বই-ব্যাগ, নিজের জামা, নিজের রুম, নিজের বিছানা তাকে পরিষ্কার করতে উৎসাহিত করুন। বাজার করা থেকে শুরু করে কোনো পাবলিক যোগাযোগের কাজে তাকে সংপৃক্ত করুন।
*‘জেন্টল প্যারেন্টিং’ মানে এই নয় যে, শিশুর বিশৃংখলাকে প্রশ্রয় দেবেন বা সব আব্দার মেনে নিবেন বরং তাকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা,শাসন ও নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
* সন্তানকে কখনো আড়ালে লুকিয়ে খেতে দেবেন না, এতে তার লুকিয়ে খাবার অভ্যাস তৈরি হবে। তাহলে ভবিষ্যতে সে আপনাকেও লুকিয়ে খাবে।
টিনএজ সন্তানের মা-বাবার প্রতি কিছু পরামর্শ:
*সন্তান কৈশোরোত্তীর্ণ হলে তাকে সঙ্গে নিয়ে মাঝেমধ্যে কাঁচা বাজারে যান।
* পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য ও বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে যথাযথ ধারণা দিন। আর্থিক ব্যাপারে অতিরঞ্জিত ধারণা দেবেন না।
*বিষয় ও বয়স বুঝে তাদেরকেও পারিবারিক আলোচনায় অংশীদার করুন।
*সন্তানকে পরিশ্রমী ও কষ্টসহিষ্ণু করে গড়ে তুলুন। 'আমরা কষ্ট করছি যাতে তোমাদের কষ্ট করতে না হয়'- এমন ধারণা দিয়ে সন্তানকে ননীর পুতুল বানাবেন না।
*ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করতে শেখান। অর্থাৎ ছোটবেলা থেকেই নৈতিক শিক্ষা দিলে সে লোভ, প্রতারণা দুর্নীতি, মিথ্যা অহমিকা থেকে দূরে থাকবে।
*সন্তানের ব্যাপারে অতিরিক্ত গোয়েন্দাগিরি করবেন না। কিন্তু সে কী করছে, কাদের সাথে মিশছে, সে-সম্পর্কে অবগত থাকুন।
* সবার সামনে শিশুকে বকবেন না। ভুল ধরিয়ে অপ্রস্তুত করবেন না। আলাদা করে মমতার সাথে বুঝিয়ে বলুন, সংশোধন করে দিন।
*কোনো কাজ করতে বলার পর সন্তান যদি বলে 'কেন?',
এর উত্তরে বলবেন না- 'আমি বলছি তাই'। আপনার এমন মন্তব্য তার মনে হতাশা, জেদ বা একগুঁয়েমির বীজ বুনে দিতে পারে। বরং সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলুন কাজটি কেন করা প্রয়োজন।
*সন্তানের যোগ্যতা নিয়ে কোনো নেতিবাচক কথা বলবেন না। কখনো বলবেন না যে, তার দ্বারা কিছু হবে না।
*একই কথা বার বার বলবেন না। এতে সন্তানের কাছে আপনার কথার গুরুত্ব কমে যেতে পারে। সারাক্ষণ আদেশ-নির্দেশ না দিয়ে তার করণীয় যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিন।
*শিশুদের কখনো অভিশাপ দেবেন না। আঘাত করবেন না। শাসন যেন কখনো ভীতিপ্রদ শাস্তিতে পরিণত না হয়।
*সন্তান বিপথে যায় ধীরে ধীরে। একটা অন্যায়ে ছাড় পেলে সে আরো বড় অন্যায় করতে উৎসাহিত হয়। তাই সন্তানের সাথে প্রয়োজনে দৃঢ় হতে দ্বিধা করবেন না।
*খেয়াল করুন, বন্ধু আত্মীয় এমনকি একই পরিবারের কারো কাছে যেতে সন্তান দ্বিধা করছে কিনা। কাউকে দেখে বা কেউ আদর করতে ডাকলে সে ভয়ে লুকিয়ে যেতে চায় কিনা। এমন মানুষের ব্যাপারে সতর্ক হোন।
*সন্তান যদি কখনো তার লাঞ্ছিত হওয়ার বিষয়টি বলতে চায়, তাকে জেরা না করে ধৈর্য ধরে শুনুন। তাহলে করণীয় ঠিক করতে পারবেন। উত্তেজিত হবেন না, এতে সে ঘটনা চেপে যেতে পারে। এসময় আপনার মমতা তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
*সন্তানকে আদরের নামে প্রশ্রয় দেবেন না ও শাসনের নামে অত্যাচার করবেন না। আদর ও শাসনের সমন্বয়ে তাকে বিকশিত হতে দিন।
*আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি ও ঝগড়া-বিবাদে কখনো শিশুদের জড়াবেন না।
*মাদ্রাসা/এতিমখানার অর্থসংগ্রহের কাজে আপনার শিশুদের নিয়োজিত করবেন না। ক্রমাগত অন্যের করুণা বা দয়া পেতে অভ্যস্ত হলে, সে শিশু কখনো স্বাবলম্বী ও দাতা হতে পারে না।
*শিশুসন্তানকে অতিরিক্ত উপহার, খেলনা ও বিলাসিতায় অভ্যস্ত করবেন না।
*পরিবারে মিথ্যা বলা, গালিগালাজ করা, অন্যের দুর্নাম করার প্রবণতা থাকলে তা পরিহার করুন। আত্মীয়, প্রতিবেশী সম্পর্কে বাসায় নেতিবাচক মন্তব্য/সমালোচনা করবেন না।
*সন্তান কোনোকিছু চাওয়ার সাথে সাথেই তাকে তা দেয়ার অভ্যাস পরিহার করুন। তাকে অতিরিক্ত হাতখরচ দেবেন না। কিন্তু যৌক্তিক প্রয়োজন পূরণে আন্তরিক হোন।
*সন্তানের যে-কোনো অর্জন ও সাফল্যে তাকে অভিনন্দন জানান, প্রশংসা করুন। যে-কোনো ব্যর্থতায় তার পাশে দাঁড়ান, উৎসাহ দিন। আপনার উৎসাহ তার ব্যর্থতাকেও সাফল্যে রূপান্তরিত করবে।
*নারী-পুরুষ, ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাইকে সম্মান করতে শেখান। বিশেষত ছেলে সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই নারীদের সম্মান করতে শেখান।
*অন্য ধর্মের কারো সাথে মিশবে না'- এ ধরনের কথা শিশুকে বলবেন না। তাকে সব ধর্ম ও মতের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে গড়ে তুলুন।
*শিশুকাল থেকেই সন্তানের মধ্যে দানের অভ্যাস গড়ে তুলুন। দেয়ার আনন্দ তাকে উদার করবে।
*সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা দিন। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত করুন।
*অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমানোর অভ্যাসকে প্রশ্রয় দেবেন না। শিশুসন্তানকে রাত ৯টার মধ্যে ঘুমাতে ও ভোরে ঘুম থেকে উঠতে উৎসাহিত করুন।
*দৃষ্টি-শ্রবণ-বাকক্তিহীন, চলৎশক্তিহীন এবং মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির প্রতি সমমর্মী ও সহযোগিতাপরায়ণ হতে সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই শেখান। তাদের নিয়ে কোনো ধরনের কটুক্তি/ব্যঙ্গবিদ্রুপ করা গর্হিত কাজ।
*শৈশব থেকেই সন্তানকে বলুন, 'তোমাকে ভালো মানুষ হতে হবে। মানুষের কল্যাণে কাজ করতে হবে।' জীবনের লক্ষ্য নিরূপণে তাকে সহযোগিতা করুন।
*দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও বীরত্বগাথা সম্পর্কে শিশুকে ধারণা দিন। সে যে এক মহান জাতির উত্তরসূরি- এ প্রত্যয় তার মনে গেঁথে দিন।
সন্তানকে অভাব ও আভিজাত্য দুটোই শেখাবেন
যখন একটি শিশু জানতে পারে যে অর্থ উপার্জনের জন্য পরিশ্রম করতে হয় এবং প্রতিটি জিনিস সহজে পাওয়া যায় না, তখন তার মধ্যে কৃতজ্ঞতা ও সংযমের মনোভাব তৈরি হয়। সে অপচয় কম করে এবং অন্যের কষ্টকে সম্মান করতে শেখে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু ছোটবেলা থেকে সীমিত সম্পদের মূল্য বুঝে বড় হয়, তারা ভবিষ্যতে আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বেশি দায়িত্বশীল হয়। একই সঙ্গে তারা ব্যর্থতা মোকাবিলায়ও তুলনামূলকভাবে বেশি সক্ষম হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে আভিজাত্যের শিক্ষা সন্তানকে আত্মমর্যাদা, পরিচ্ছন্নতা, শিষ্টাচার ও উন্নত জীবনযাপনের মানদণ্ড শেখায়। সমাজে চলাফেরা, অতিথি আপ্যায়ন, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলা এবং নিজের স্বপ্নকে বড় করে দেখার মানসিকতা আভিজাত্যবোধ থেকে আসে। একটি শিশু যদি কখনো ভালো পরিবেশ, উন্নত সংস্কৃতি ও সুন্দর জীবনধারার সঙ্গে পরিচিত না হয়, তাহলে সে নিজের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ ভেবে নিতে পারে। তাই তাকে উন্নত জীবনের স্বাদ ও সৌন্দর্য সম্পর্কে জানানো প্রয়োজন। এতে সে বড় লক্ষ্য স্থির করতে এবং তা অর্জনের জন্য পরিশ্রম করতে উদ্বুদ্ধ হয়।
মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিশুর মানসিক দৃঢ়তা গড়ে ওঠে বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। শুধুমাত্র প্রাচুর্য তাকে ভোগবাদী করে তুলতে পারে, আবার শুধুমাত্র অভাব তাকে হতাশ বা সংকুচিত মানসিকতার মানুষ বানাতে পারে। গবেষণায় দেখা যায়, যেসব পরিবার সন্তানদের বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ উভয়ের সঙ্গে পরিচিত করায়, তাদের মধ্যে সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বেশি থাকে। তারা অন্য মানুষের অবস্থাও সহজে উপলব্ধি করতে পারে, ফলে সহানুভূতিশীল ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে।
অভাব ও আভিজাত্যের সমন্বিত শিক্ষা সন্তানকে সামাজিক ভারসাম্য শেখায়। সে যেমন দরিদ্র মানুষের কষ্ট বুঝতে পারে, তেমনি উচ্চমানের পরিবেশেও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চলতে পারে।
মানুষের ইচ্ছাশক্তির চেয়ে তার চারপাশের পরিবেশ বেশি শক্তিশালী
কোনো ফসলের বীজকে যদি দুই ভাগে ভাগ করে একভাগ পিচঢালা রাস্তা বা মরুভূমিতে ছিটানো হয় এবং অন্যভাগ ভেজা উর্বর মাটিতে ছিটানো হয়, তাহলে উর্বর মাটির বীজ গাছ হয়ে বেড়ে উঠলেও, পিচঢালা রাস্তা বা মরুভুমিতে ছড়ানো বীজ কখনো গাছ হতে পারবে না। এখানে বীজের ভিতরের শক্তি বা গুণ নয়, বরং পরিবেশই কাজ করে। কারণ একটা বীজ তখনই গাছ হয়ে উঠবে, যখন সে উপযুক্ত পানি মাটি এবং আলো-বাতাস পাবে।
৫ বছরের বেশি সময় ধরে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা শত শত শিশু ও তাদের অভিভাবকদের জীবন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ করে দেখেছেন, যেসব শিশু ছোটবেলা থেকেই পরিবার-পরিবেশের কাছ থেকে আন্তরিক ভালোবাসা, মানসিক সমর্থন ও ইতিবাচক সম্পর্ক পায়, তারাই পরবর্তী জীবনে তুলনামূলক বেশি সুখী, সফল ও সার্থক জীবন লাভ করে।
মনস্তত্ত্বে একে বলা হয় Law of Environment, "Your environment will always win over your willpower (আপনার ইচ্ছাশক্তির চেয়ে আপনার চারপাশের পরিবেশ সবসময় বেশি শক্তিশালী)। আপনি যতই মোটিভেশনাল ভিডিও দেখেন না কেন, আপনি যদি একটি নেতিবাচক পরিবেশে থাকেন, তবে আপনার অবচেতন মন সেই পরিবেশেরই রূপ নেবে। আমি পানের দোকানে গেলে পানই পাব, রসগোল্লা পাব না। আমি রাগওয়ালার সাথে মিশলে রাগ পাব, হিংসাওয়ালার সাথে মিশলে হিংসা পাব।
আমরা অনেকেই মনে করি, "আমি যার সাথেই মিশি না কেন, আমি আমার মতো থাকবো।" এটি একটি ভুল ধারণা।
The Mirror Neuron Effect : আমাদের ব্রেনে এক ধরণের নিউরন থাকে যাকে বলা হয় 'মিরর নিউরন'। নিউরোসায়েন্সের গবেষণা অনুযায়ী, আমরা যখন নির্দিষ্ট কোনো মানুষের সাথে সময় কাটাই, আমাদের ব্রেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, কথা বলার ধরণ, রুচিবোধ এবং অভ্যাসগুলোকে 'কপি' করতে শুরু করে। আপনি অজান্তেই আপনার বন্ধুদের মতো হয়ে যাচ্ছেন! অর্থাৎ জিম রনের সূত্র: আপনি সবচেয়ে বেশি সময় যে ৫ জন মানুষের সাথে কাটান, আপনার উপার্জন, চিন্তা এবং চরিত্র ঠিক সেই ৫ জনের গড় মানের সমান হবে।
The Social Contagion Studz : হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির একটি দীর্ঘমেয়াদী গবেষণায় দেখা গেছে, আপনার বন্ধু যদি স্থূলতা (Obesity), ধূমপান বা হতাশার মধ্য দিয়ে যায়, তবে কোনো কারণ ছাড়াই আপনারও সেইসব সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ৫৭% পর্যন্ত বেড়ে যায়।
ডিজিটাল যুগের মোবাইল স্ক্রলিং: সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনি সচেতন বা অবচেতনভাবে যা দেখছেন, সোশ্যাল মিডিয়ার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) আপনাকে ঠিক সেই ধরণের কনটেন্টই বারবার দেখাতে বাধ্য করছে। এর ফলে আপনি একটি Echo Chamber বা বন্ধ ঘরে বন্দি হয়ে যাচ্ছেন। সস্তা, নেতিবাচক, ট্রোল বা উস্কানিমূলক কনটেন্ট দেখতে দেখতে আপনার চিন্তাভাবনা, রুচিবোধ, অভ্যাস, প্রোডাক্টিভিটি এবং মোরালিটি (নৈতিকতা) ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
আমার চিন্তাভাবনা কেমন, আমার রুচিবোধ কেমন, আমার অভ্যাস, আমার প্রোডাক্টিভিটি, আমার মোরালিটি- এগুলো অনেকটা এখন আরও কিছু বিষয়ের পাশাপাশি আমি কেমন কনটেন্ট কনজিউম করছি তার উপর নির্ভর করে।
আমরা যতবেশি ভালো কনটেন্টের সাথে এবং ভালো ও উন্নত মানের মানুষের সাথে থাকবো, তত বেশি ভালো থাকবো ও উন্নত জীবন পারো।
( নিচের দ্বিতীয় অংশটুকু শিক্ষার্থীদের জন্য)
দ্বিতীয় অংশ
পড়া মনে রাখার কৌশলগুলো কি কি?
১। বুঝে পড়া: অন্ধভাবে মুখস্থ না করে বিষয়টির মূল ভাব বোঝার চেষ্টা করুন। কোনো বিষয় পরিষ্কারভাবে বুঝলে তা মস্তিষ্কে স্থায়ী হয়।
২। লিখে পড়া : পড়ার পর তা না দেখে খাতায় লেখার অভ্যাস করুন। লেখার মাধ্যমে মস্তিষ্কের একাধিক ইন্দ্রিয় কাজ করে, ফলে পড়া সহজে মনে থাকে।
৩। ছোট ছোট অংশে ভাগ করে পড়া: একটানা না পড়ে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে পড়ো। যেমন ধরো তোমার একটা ফোন নাম্বার মনে রাখা দরকার। এখন ০১৭১০৫০৮৮৪৪ পুরাটা একসাথে পড়লে দুই মিনিট পরেই ভুলে যেতে পার। তাই ভেঙ্গে ভেঙ্গে ০১৭ - ১০৫০ - ৮৮৪৪ স্টাইলে পড়ো।
৪। বিরতি দিয়ে রিভিশন: জার্মান মনোবিজ্ঞানী হারমান এবিনঘসের মতে, পড়ার পরপরই রিভিশন না দিয়ে একটু বিরতি দিয়ে রিভিশন দিলে মনে রাখার ক্ষমতা বহু গুণে বাড়ে। আমরা যখন পড়ি, তার এক ঘণ্টা পর ৪৪ শতাংশ পড়া আমাদের মনে থাকে। একদিন পর ৩০ শতাংশ মনে থাকে। আর এক সপ্তাহ পর মাত্র ২০ শতাংশ মনে থাকে। তার মানে, এক সপ্তাহ পর ৮০ শতাংশই ভুলে যাই। কারণ আমরা যখন পড়ি, তখন তা আমাদের ব্রেইনের শর্ট-টার্ম মেমোরিতে জমা হয়। কিন্তু যদি আমরা বারবার রিভিশন দেই, তাহলে তা শর্ট-টার্ম মেমোরি থেকে লং-টার্ম মেমোরিতে স্থানান্তরিত হয়। তাই এক/দুইদিন বা কিছুদিন পর পর রিভিশন দিতে থাকুন, যতদিন আয়ত্বে না আসে।
৫। নিজেকে শিক্ষক ভাবা: কোনো কঠিন বিষয় পড়ার পর তা এমনভাবে বলুন, যেন আপনি অন্য কাউকে বিষয়টি পড়াচ্ছেন। এতে নিজের দুর্বলতাগুলো ধরা পড়ে।
৬। পোমোডোরো পদ্ধতি : একটানা পড়লে মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং কিছুক্ষণ পড়ার পর মস্তিষ্ক আর লোড নিতে পারে না। তাই ২৫-৩০ মিনিট সময় নিয়ে মনযোগ দিয়ে পড়ার পর ৫-৭ মিনিটের বিরতি নেবেন। বিরতির এই পাঁচ মিনিটে করতে হবে অন্য যে কোনো কাজ কিংবা বিশ্রাম।
৭। ভিজ্যুয়ালাইজেশন: আমরা যখন কোনো নাটক বা সিনেমা দেখি তখন সেই নাটক বা সিনেমাটা সহজেই মনে রাখতে পারি। তার কারণ, ভিজুয়ালাইজেশন। পড়ার বিষয়টিকে চোখের সামনে ছবির মতো কল্পনা করুন।
৮। ফ্লো-চার্ট: মেইন পয়েন্টগুলো দিয়ে কনসেপ্ট বা ফ্লো-চার্ট বানিয়ে রাখলে দ্রুত রিভিশন দেওয়া যায়। যেমন : আপনি করোনাভাইরাস নিয়ে কোনো প্যাসেজ বা টপিক পড়ছেন। এক্ষেত্রে ফ্লো-চার্টটি এমন হতে পারে : করোনাভাইরাস কী, ভাইরাসের উৎপত্তি, সংক্রমণের মাধ্যম, প্রতিরোধের উপায় ইত্যাদি।
৯। পর্যাপ্ত ঘুম: পড়া মনে রাখার জন্য পর্যাপ্ত ঘুম অত্যন্ত জরুরি।মস্তিষ্কে চাপ প্রয়োগ করে বা জোর করে মনে করার চেষ্টা না করে মস্তিষ্ককে কিছুক্ষণ বিশ্রাম দিন। ৩০ মিনিট বা ১ ঘন্টার ছোট ঘুম বা 'চড়বিৎ ঘধঢ়' মস্তিস্ককে পুনরায় কার্যকরী করে তুলতে সাহায্য করে।
১০। সারমর্ম তৈরি করা: বড় কোনো অধ্যায়ের মূল সারমর্ম তৈরি করুন, যেন ঐ সারমর্মটি দেখলেই পুরো অধ্যায়টি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এবার সারমর্মটি ছোট একটি কাগজে লিখে অধ্যায়টি বই এর যে পৃষ্ঠায় রয়েছে তার কোণায় পিন করে দিন। তাহলে মুখস্থ করা সহজ হয়ে যাবে। এছাড়াও কনসেপ্ট ট্রি-এর মাধ্যমে লিখতে পারেন। একটি গাছ অংকন করে পয়েন্টগুলো গাছের পাতার মধ্যে এঁকে ফেলুন। গাছটিকে একটি অধ্যায়ের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। এর প্রতিটি পাতায় অংশ গুলোর নিচে একটি করে সারমর্ম লিখে পড়লে পড়া মনে রাখতে সহজ হবে।
১১। কিওয়ার্ড তৈরি করা: গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো মুখস্থ করার চেষ্টা করুন। এছাড়াও বড় কোনো বাক্যকে একটি কিওয়ার্ডের মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করুন, যেন ওই কিওয়ার্ডটি দেখলেই পুরো লাইনটি মনে পড়ে যায়। তাহলে, পরীক্ষার সময় ওই কিওয়ার্ডটি মনে করতে পারলে পুরো লাইনটিই আপনার মনে পড়ে যাবে।
১২। ভোরে ঘুম থেকে উঠে পড়ার অভ্যাস করা: পর্যাপ্ত ঘুমের পর পড়া শুরু করলে মস্তিষ্ক নতুন তথ্য গ্রহণে প্রস্তুত থাকে। ফলে তাড়াতাড়ি মুখস্থ ও দীর্ঘ সময় মনে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে। তবে পর্যাপ্ত ঘুম (৭–৯ ঘণ্টা) না হলে ভোরে উঠে পড়ার বিশেষ লাভ নাও হতে পারে। আবার কেউ যদি স্বাভাবিকভাবেই রাতে বেশি মনোযোগী হন, তাহলে রাতের পড়াশোনাও সমান কার্যকর হতে পারে।
১৩। 'ডোর এফেক্ট' কাটিয়ে উঠা: আপনি পড়ার টেবিলে বসে একটা পড়া মুখস্ত করলেন, দরজা পার হয়ে অন্য ঘরে ঢুকতেই পড়াটা ভুলে গেলেন, "আমি কি যেন পড়েছি?" গবেষকদের মতে, মস্তিষ্ক পরিবেশকে বিভিন্ন "ঘটনা" বা "অধ্যায়ে" ভাগ করে সংরক্ষণ করে। যখন আপনি একটি নতুন স্থানে প্রবেশ করেন, মস্তিষ্ক আগের প্রসঙ্গ থেকে নতুন প্রসঙ্গে সরে যায়। এর ফলে আগের পড়া বা চিন্তার তথ্য সাময়িকভাবে কম সহজলভ্য হয়ে যায়। এই মনস্তাত্ত্বিক ঘটনাকে 'ডোর এফেক্ট' বলে। এর ফলে ঘরে পড়া পরীক্ষার হলে গেলে অনেক কিছ মনে থাকে না। এটি কাটানোর উপায় হল-মাঝে মাঝে ভিন্ন পরিবেশে ও অন্য কোথায় গিয়ে পড়াশুনা করা।
১৪। সুগন্ধ এফেক্ট': ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের স্নায়বিক পথ মস্তিষ্কের স্মৃতি ও আবেগ-সম্পর্কিত অংশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তাই কোনো নির্দিষ্ট গন্ধের সঙ্গে শেখার অভিজ্ঞতা যুক্ত হলে, পরে সেই একই গন্ধ স্মৃতি মনে করতে সাহায্য করতে পারে। এই ধারণাকে ঈড়হঃবীঃ-উবঢ়বহফবহঃ গবসড়ৎু-এর একটি রূপ হিসেবে দেখা যায়। পড়ার সময় একটি নির্দিষ্ট হালকা সুগন্ধ (যেমন লেবু, রোজমেরি, পুদিনা বা ল্যাভেন্ডার) ব্যবহার করলে আথবা রিভিশনের সময় বা পরীক্ষার আগে একই সুগন্ধ পেলে কিছু তথ্য মনে করতে সহায়তা করে। তাই একটি নির্দিষ্ট হালকা সুগন্ধকে পড়ার সময়ের সঙ্গে নিয়মিত যুক্ত করতে পারেন।
১৫। আনফিনিশড এফেক্ট ফলো করা: এই তত্ত্বটি অনুযায়ী, মানুষ সম্পন্ন করা কাজের চেয়ে অসম্পূর্ণ, অসমাপ্ত বা মাঝপথে থেমে যাওয়া কাজগুলো বেশি ভালোভাবে মনে রাখতে পারে। মনে করুন আপনি একটা পড়া সম্পূর্ণ শেষ করে তারপর অন্য একটি কাজ বা কিছু একটা করতে চাইছেন কিন্তু সেটা ভুল পদ্ধতি; সঠিক হল- পড়াশোনা মাঝপথে থামিয়ে দিলে বা অসম্পূর্ণ রেখে বিরতি নিলে পড়া বেশি মনে থাকে। এর কারণ হল- যখন কোনো পড়া শুরু করে শেষ করা হয় না, তখন মস্তিষ্ক সেই পড়াটিকে অসমাপ্ত হিসেবে ধরে রাখে। ফলে বাকীটুকুর জন্য মনোযোগ আকর্ষণ করে।
১৬। ‘ওয়ার্ক এফেক্ট’ হেঁটে হেঁটে পড়া: জটিল গণিত, বিশ্লেষণধর্মী বিষয় বা গভীর মনোযোগের কাজের জন্য বসে পড়া অনেক সময় বেশি কার্যকর। মুখস্থ করার অংশ, সংজ্ঞা, সূত্র, শব্দার্থ বা বক্তৃতা অনুশীলনের সময় ধীরে ধীরে হাঁটতে পারেন। হালকা হাঁটাচলা হাঁটার সময় মস্তিষ্কের রক্ত চলাচল ও কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং পড়া সহজে মনে গেঁথে যায়। ফলে স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ বহুগুণ বেড়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, পড়ার আগে বা পড়ার সময় হালকা হাঁটা মস্তিষ্কের তথ্য ধারণ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। তবে হেঁটে পড়ার সময় যদি একটু শব্দ করে বা উচ্চস্বরে পড়া যায়, তবে চোখ এবং কান—উভয়ের মাধ্যমেই মস্তিষ্কে তথ্য সহজে পৌঁছায়।
১৭। সান এফেক্ট': সূর্যের আলোকে মনোযোগ ও শেখার ক্ষমতা উন্নত করার একটি সহায়ক উপাদান হিসেবে ভাবা হয়। কারণ সূর্যের আলো সরাসরি মস্তিষ্কের মেলাটোনিন ও সেরোটোনিন হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা করে মনোযোগ ও কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে। আপনার পড়ার টেবিলটি এমন জানালার পাশে রাখুন যেখান থেকে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো আসে। পড়ার আগে বা সকালে ঘুম থেকে উঠে ১০-১৫ মিনিট বারান্দায় বা ছাদে গিয়ে হালকা রোদ গায়ে লাগান।
১৮। ফুড এফেক্ট': পড়া মনে থাকার সাথে খাবারের অত্যন্ত সরাসরি এবং গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের মস্তিষ্ক শরীরের মোট শক্তির প্রায় ২০% ব্যবহার করে, যা পুরোপুরি আসে খাবার থেকে। সঠিক পুষ্টিকর খাবার মস্তিষ্কের কোষগুলোকে সচল রাখে এবং স্মৃতিশক্তি (গবসড়ৎু) ও মনোযোগ (ঋড়পঁং) বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বাদাম ও বীজ, ডিমের কুসুম, চর্বিযুক্ত মাছ বা সামুদ্রিক মাছ, সবুজ শাকসবজি ও ফল এবং পর্যাপ্ত পানি স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে কার্যকরী সুপারফুড।
১৯। প্রোডাকশন ইফেক্ট : যখন আপনি কোনো শব্দ বা বাক্য উচ্চারণ করেন, তখন শুধু চোখ দিয়ে পড়া নয়, বরং দেখা, বলা এবং শোনা—তিনটি প্রক্রিয়া একসঙ্গে কাজ করে। ফলে তথ্যটি মস্তিষ্কে আরও আলাদা ও স্মরণযোগ্যভাবে সংরক্ষিত হতে। এই প্রক্রিয়ার ফলে মস্তিষ্কে একাধিক স্থায়ী স্মৃতিচিহ্ন তৈরি হয়, যা সাধারণ বা নীরব পাঠের চেয়ে তথ্য অনেক দিন মনে রাখতে সাহায্য করে।
বাংলা হাতের লেখা সুন্দর ও দ্রুত করার কৌশল
সুন্দর হাতের লেখা শিক্ষকের মন জয় করে, পরীক্ষকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং কর্মক্ষেত্রে আপনার পেশাদারিত্ব প্রমাণ করে।
হাতের লেখা সুন্দর ও গতি বাড়ানোর জন্য কিছু সহজ উপায়:
১. কাগজ ও কলম নির্বাচন করুন: অনুশীলনের জন্য লাইন টানা কাগজ ব্যবহার করুন। কাগজটি একটু কোণাকুণি করে রাখুন যাতে লিখতে সুবিধা হয়। এমন কলম নির্বাচন করুন যা আরামদায়ক এবং যা সহজেই স্লাইড করে।
২. সঠিক লেখার ভঙ্গি বজায় রাখুন: ডেস্কে সোজা হয়ে বসুন। কলমটি আলতো করে ধরুন। বেশি চাপ দিলে দেবেন না। লেখার সময় পুরো হাত না নড়ে শুধু আঙুল ব্যবহার করার চেষ্টা করুন। এতে লেখার গতি বাড়বে। বড় অক্ষর লেখার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এবং ছোট অক্ষর লেখা দ্রুত করে।
৩. হাতের লেখা বিশ্লেষণ করুন: নিজের বর্তমান হাতের লেখা দেখুন এবং কীভাবে এটি উন্নত করতে পারেন তা খুঁজে বের করুন। অক্ষরের আকার, গ্যাপ এবং লাইন পরীক্ষা করুন। প্রথমে বড় এবং স্পষ্ট ফন্ট প্র্যাকটিস করুন, ধীরে ধীরে ছোট লেখার দিকে যান।
৫. উপযুক্ত ফন্ট শৈলী বেছে নিন: একটি নির্দিষ্ট ফন্ট স্টাইল (ক্যালিগ্রাফি বা ব্লক লেটার) বেছে নিন। অনলাইনে অনেক ক্যালিগ্রাফি টিউটোরিয়াল পাওয়া যায়।
৬. অনুশীলনের অভ্যাস গড়ে তুলুন: প্রতিদিন অন্তত ২০-৩০ গদ বা কবিতা সুন্দর করে লেখার চেষ্টা করুন। ধীরে ধীরে লেখার গতি বাড়ান। ক্লান্ত হলে অনুশীলন বন্ধ করুন। বিশ্রাম নিয়ে আবার শুরু করুন। যে যত বেশি লিখবেন, তার লেখা তত বেশি দ্রুত হবে।
৭. হাতের পেশী দুর্বল হলে হাতের ব্যায়াম প্রতিদিন করুন: একটি ঘড়ি ব্যবহার করে দ্রুত লিখতে অনুশীলন করুন। শক্তিশালী কব্জির জন্য হাতের আঙুল এবং কব্জি ঘোরানো, মুঠো খোলা ও বন্ধ করা। হ্যান্ডগ্রিব ব্যবহার করতে পারেন।
৮. ফিডব্যাক নিন: আপনার লেখা অন্য কাউকে দেখান এবং তাদের মতামত নিন। আপনার উন্নতির জায়গাগুলো চিহ্নিত করুন এবং সেই অনুযায়ী কাজ করুন।
ছাত্র-ছাত্রীদের প্রথম ১০০ শিষ্টাচার
শিষ্টাচার-১: খাবারের প্রাথমিক চারটি নিয়ম:
ক) মুখ বন্ধ করে খাবার ছিবাবেন, চা-কপি পান করতে গিয়ে যেন শব্দ তৈরি না হয়, তা চর্চা করবেন। কয়েকজন একত্রে বসে খাবারের সময় কারো সাথে কিংবা মোবাইলে কথা বললে মুখের লালা তিন ফুট পর্যন্ত চারদিকে ছড়াতে থাকে; এটা অনেকটা পিঁয়াজ কাটলে ঝাঁজ ছড়ানোর মতো, যা খালি চোখে দেখা যায় না। এতে একজনের রোগ জীবাণু অন্যজনের পেটে যায়। এ অবস্থায় আপনার খাবার আড়াল করে রাখবেন।
খ) লবণ, চিনি মেশানো ও দুগ্ধ জাতীয় খাবার, আলু, রুটি, ভাত, তেল, ঘি, চর্বি ইত্যাদি যতটা সম্ভব কম খাবেন, শাক-সবজি, ফলমূল লাইভফুড বেশি খাবেন। ভাত দিয়ে শবজি নয়; সবজি দিয়ে ভাত খাবেন। অর্থাৎ একটি অতি ছোট প্লেটে ভাত-রুটির চেয়ে সবজি বা তরিতরকারি অনেক বেশি পরিমাণ নিয়ে ‘একটি ছোট চামচের মাধ্যমে’ খাবেন অতি ধীরে ধীরে কচ্ছপের গতিতে। হাত থেকে খাবারের দূরত্ব বজায় রাখবেন। হাত ওয়াশ না করে কোনো খাবারই ধরবেন না।
গ) দিনের তিন বেলা খাবারকে ৬ থেকে ১০ ভাগে ভাগ করে খাবেন, দিনে দু’ঘন্টার বেশি না খেয়ে থাকবেন না, অন্তত পানি হলেও খেতে হবে। সূর্য ডোবার পর বা রাতে শুধুমাত্র পানি ছাড়া সকল খাবার গ্রহণ ‘১২ থেকে ১৬ ঘন্টার চেয়ে বেশি সময়’ বন্ধ রাখুন। অর্থাৎ সকাল ১০টা/১২টা পর্যন্ত কিছু খাবেন না। একে ‘অটোফেজি’ বলে। এর অর্থ হল-আমাদের শরীরের কোষগুলি কিছু খাদ্য কণা ফ্রিজের মতো করে তার লাইসোজোমে জমা রাখে। বাহির থেকে খাদ্য না পেলে কোষগুলি সে জমানো খাবার গ্রহণ করে। ফলে শরীরের বিষাক্ত টক্সিন ও আবর্জনা দূর হয়, এতে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস ধ্বংস হয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং তারুণ্য ধরে রাখে।
ঘ) ডেড ফুড ও প্রসেস ফুড কম খাবেন। খাবারের সময় বা খাবারের পর পর পানি খাবেন না, অন্তত খাবারের আধা ঘন্টা আগে বা পরে খাবেন। ক্ষিধে না লাগলে কেউ জোর করলেও কিছু খাবেন না। ক্ষিধে লাগলে যদি সামনে খাবার না থাকে, তাহলে কিছু চিবানোর মতো কিছুক্ষণ অভিনয় করবেন; অথবা বাদাম জাতীয় হালকা কিছু চিবুবেন। এতে মস্তিষ্ক ধরে নেবে যে, খাবার খাওয়া হচ্ছে; ফলে ক্ষিধে মিটবে। উল্লেখ্য, পেটে ক্ষিধে লাগে না; ক্ষিধে লাগে রক্তে। এজন্য স্যালাইন দিলে ক্ষিধে মিটে যায়। খাদ্য উপাদান পেটের শিরা দিয়ে রক্তে যায়।
মলত্যাগের নিয়ম:-সপ্তাহে তিনবার থেকে দিনে তিনবার মলত্যাগ করাটা আদর্শ। ফল ও শাক সবজিতে আছে ফাইবার। ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার ও পানি পানে নিয়মিত মলত্যাগ হয়। হাই কমোড থেকে অনেক বেশি উপকারী লো-কমোড। এতে উরুুর মাধ্যমে পেটে চাপ পড়ে মলত্যাগ ভাল হয়। যদি লো-কমোড না থাকে, তাহলে কমোড সমান উচ্চতার একটা টুল কমোডর সামনে রেখে বসা যায়।
গোসলের নিয়ম:- প্রথমে পায়ের পাতা ভেজাতে হবে। এরপর ওপর দিকে কাঁধ পর্যন্ত তারপর মুখ, সবার শেষে মাথা। দুই বা তিন দিন পরপর গোসল করা স্বাস্থ্যসম্মত। অন্যসময় গামছা /তোয়ালে দিয়ে বগল এবং কুচকি মুছে সংক্ষিপ্ত গোসল হতে পারে। প্রতিদিন সাবান/জেল/শ্যাম্পু ব্যবহার করবেন না। এতে ত্বক/চুল উজ্জ্বলতা হারায়।
ঘুমের নিয়ম:-রাত ১০টার মধ্যে শুয়ে পড়া এবং ভোর ৫টা-৭টার মধ্যে ওঠা স্বাস্থ্যসম্মত। শিশু (৬-১৩ বছর): ৯-১১ ঘন্টা; কিশোর (১৪-১৭ বছর): ৮-১০ ঘন্টা; এবং প্রাপ্তবয়স্ক (১৮-৬৫ বছর): ৭-৯ ঘন্টা ঘুমাতে হবে। শোবার ঘর অন্ধকার এবং শান্ত হওয়া উচিত। শক্ত ও নরমের মাঝামাঝি গদি এবং নরম বালিশ ও পাশ বালিশ ব্যবহার করুন। সন্ধ্যার পর হাটা বা জগিং কিংবা ব্যায়াম করা বিজ্ঞানসম্মত নয়।
শিষ্টাচার-২: কোনো কিছু চাওয়ার সময় ‘দয়া করে’ বা প্লিজ বলতে হবে এবং কোনো কিছু পাওয়ার সময় থ্যাংকস বা ‘ধন্যবাদ’। যে কোনো ভুলের জন্য নিঃসংকোচে সরি বা ‘দুঃখিত’ বলতে হবে। কারো অনুমতি নেওয়ার আগে এসকিউজ মি বা ‘আমি আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি’ বলতে হবে।
শিষ্টাচার-৩: যে কারো ঘরে প্রবেশ করার আগে দরজায় কড়া নাড়ানো এবং অনুমতি চেয়ে নিতে হবে। নিজেদের নয় এমন কেনো জিনিস, এমনকি তার মা-বাবার জিনিসেও হাত দেওয়ার আগে অবশ্যই তাদের অনুমতি নিতে হবে। অন্যের জিনিসকে নিজের দামী জিনিসের মতো ভেবে, যত্ন করে রাখতে হবে এবং সময়মতো ফেরত দিতে হবে।
শিষ্টাচার-৪: সব সময় রাস্তার ডান পাশ দিয়ে হাঁটতে হবে। মোবাইল ব্যবহার, গান শোনা, বা অন্য কোনো কিছুতে মনোযোগ দিয়ে হাঁটা থেকে বিরত থাকতে হবে। রাস্তা পারাপারের ক্ষেত্রে বাঁক বা মোড়ের রাস্তা ব্যাবহার করবেন না। রাস্তায় দৌড়াদৌড়ি করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কেউ আপনার দিকে আসছেন দেখে তার দিকে তাকিয়ে থাকা অভদ্রতা।
শিষ্টাচার-৫: যত অল্প খাবারই হোক না কেন, খাবারগুলি অপরের সাথে ভাগ করে নেবার অভ্যাস চর্চা করতে হবে। কখনো একা খাবেন না। যখন কোনো আত্মীয় বা বন্ধুদের বাড়িতে যাবেন, তখন সেখানে শান্ত এবং নম্র হয়ে থাকবেন। তাদের পরিবেশিত খাবারের উপর কোনো খুঁতখুঁতে ভাব দেখাবেন না এবং আপনার পছন্দের খাবারের কথা বলবেন না।
শিষ্টাচার-৬: কেউ যদি আপনাকে খাওয়াতে নিয়ে যায় তবে অল্পদামি কোনো খাবার বাছাই করুন। ছুরি ডান হাতে এবং চামচ বা কাঁটা চামচ থাকবে বাম হাতে। গরম স্যুপ ফুঁ না দিয়ে চামচ দিয়ে নেড়ে ঠাণ্ড্া করুন। পাস্তা, নুডলস, কাঁটা চামচ দিয়ে খেতে হয়।
শিষ্টাচার-৭: হাঁচি বা কাশির সময় বা হাই তোলার সময় মুখ হাত দিয়ে চাপা দিতে হবে। কারো সামনে নাকে,গালে, মুখে হাত দেওয়া বা খোঁটা থেকে বিরত থাকতে হবে। হাত দিয়ে মুখ ঢাকার অর্থ আপনি নার্ভাস।
শিষ্টাচার-৮: যে কেউ ঘরে প্রবেশ করার সময় বা বের হবার সময় দ্রুত এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে বা হাতলটা টেনে ধরে ঢুকতে/বেরুতে সাহায্য করতে হবে। অতিথি যাবার সময় অবশ্যই বাড়ির গেট পর্যন্ত এগিয়ে দেয়া এবং তিনি অদৃশ্য না হওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকা উচিত।
শিষ্টাচার-৯: কারো সাথে পরিচয় হওয়া মাত্রই তার গ্রামের বাড়ি বা ব্যক্তিগত পরিচয় জানতে চাওয়া মূর্খতা ও অভদ্রতা। নিজে থেকে না বললে কারো ব্যক্তিগত বিষয়ে জানতে চাওয়া বা আলোচনা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। নিজের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয় ও সমস্যাদি শেয়ার করবেন না।
শিষ্টাচার-১০: কোনো কক্ষে প্রবেশের সময় সবাইকে সালাম। কাউকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার সময় তার স¤পর্কে ছোট একটা কথা যোগ করে দিন। ইনি আমার ভাই/বন্ধু রাসেদ, ও ভাল ক্রিকেট খেলে..। যখন কোন ব্যক্তি কক্ষে প্রবেশ করে, সে প্রথম বসে থাকা মানুষটার দিকে হাত বাড়াবে এবং বসে থাকা মানুষটি দাঁড়িয়ে হাত মেলাবে। বসে থেকে হাত মেলালে অভদ্রতা।
শিষ্টাচার-১১: রেস্তোরাঁ বা বাড়ীতে নিজের খাবারের ওয়েস্টিজ নিজেই ডাস্টবিনে ফেলবেন। অন্যের ওয়েস্টিজও নিজের মনে করে সংরক্ষণ করে ডাস্টবিনে ফেলতে হবে। আপনার ওয়েস্টিজ ও প্লেট অন্য কেউ পরিষ্কার করাটা অসভ্যতা।
শিষ্টাচার-১২: কখনো কাউকে কাজের লোক বা বুয়া বলে ডাকা যাবে না। মনে রাখতে হবে তারাও কারো না কারো ভাই, বোন, মা, বাবা। তাদেরকে সম্মান দিয়ে কথা বলতে হবে।
শিষ্টাচার-১৩: পাবলিক ট্রান্সপোর্টে বা কোথাও কোনো বয়স্ক ব্যক্তি, ছোট্ট শিশু বা মহিলা চোখে পড়লে, তাকে বসার স্থানটি ছেড়ে দেয়া উচিত। অসুস্থ ও প্রতিবন্ধী কাউকে দেখলে হাত বাড়িয়ে সহযোগিতা করতে হবে।
শিষ্টাচার-১৪:কোথাও গিয়ে পায়ের উপর পা তুলে বসা, পা নাচিয়ে চলা, হেলাল দিয়ে বাঁকিয়ে বসা কিংবা টেবিলে সামনে ঝুঁকে কারো সাথে কথা বলা অভদ্রতা। এছাড়া পরিবার, বন্ধু-বান্ধব বা অতিথির সাথে কথা বলার সময় মোবাইল টিপা কিংবা কোনো কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে যতক্ষণ পর্যন্ত না একা থাকা যাবে।
শিষ্টাচার-১৫: অন্যের অনুপস্থিতিতে কখনো তার সমালোচনা করবেন না। এই ধরণের আলাপ আলোচনা থেকে দূরে থাকুন। কেউ অন্যে কারো সমালোচনা করলে আপনি তা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুন; প্রয়োজনে স্থান ত্যাগ করুন। এতে করে সবার কাছে আপনি সম্মানিত হবেন।
শিষ্টাচার-১৬: প্রকাশ্যে চেঁচিয়ে, চিৎকার করে এবং অট্টহাসির সাথে জোরে জোরে কথা বলাটা প্যুয়র মেন্টালিটি বা কাঙ্গালি মানসিকতার লক্ষণ। কারো অগোচরে তার সমালোচনা করা, গোপনে অন্যের ক্ষতি করা, যেমন-আপনি যে-কোন পাবলিক প্লেসে গেলে দেখবেন, সেখানে এটা ভাঙ্গা, উঠা ছিরা বা কাটা; বাথরুম বা কোনো দেওয়ালে এটা ওটা লিখা-আঁকা, কারো বাড়ী বা গাড়ীর দিকে ঢিল মারা ইত্যাদি হলো কাঙ্গালি মানসিকতারই অবদমিত প্রতিক্রিয়া।
শিষ্টাচার-১৭: অপরিচিতজনের সঙ্গে কথাবার্তার সময় প্রথমে নিজের পরিচয় দিয়ে আলাপ শুরু করুন। কোনো প্রতিষ্ঠানে গেলে অপরিচিত সবাইকে স্যার, ম্যাম বলে সম্বোধন করা নিয়ম। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের বাইরে সবাইকে ভাইজান / আপামনি / বড়ভাই / ছোটভাই / মামা /আংকেল-আন্টি ইত্যাদি ব্যবহার করা উচিত।
শিষ্টাচার-১৮: শিক্ষক ও গুরুজনদের নিয়ে উপহাস/হাসাহাসি করা নিম্ন শ্রেণির বর্বর কাজ। এই আচরণ যারা করে, এমন জঘন্যদের বর্জন করুন। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় স্বজনসহ চেনা-পরিচিতদের ভাল গুণগুলোর প্রশংসা করতে হবে এবং খারাপ গুণ বা সমালোচনা এড়িয়ে চলতে হবে।
শিষ্টাচার-১৯: পরিবারের সদস্য, আত্মীয় বা অন্য যে-কোনো নারী-পুরুষ, কে কী পোষাক পরেছে, হিজাব না টপলেস, স্কাট না বিকিনি, তা নিয়ে উৎসুখ থাকা এবং মন্দ মন্তব্য করা জঘন্য অপরাধ। কে কি পরবে, তা তার রুচি ও পছন্দের ব্যাপার।
শিষ্টাচার-২০: বাড়িতে অতিথি এলে প্রথমে অতিথিদের ওয়াশরুমটা দেখিয়ে দিন, তার পরে অন্যরুম দেখান। আপনি কোথাও অতিথি হলে আয়োজকের জন্য অপেক্ষা না করে খাবার খাওয়া শুরু করবেন না। আপনার যদি আগে চলে যেতে হয়, তবে অনুমুতি নিন। কারো বাড়িতে অতিথি হলে তার অনুমতি না নিয়ে কোনো জিনিসে হাত দিবেন না।
শিষ্টাচার-২১: কারো মতামতে কিংবা কাজে ভুল ধরা উচিত নয়। এতে তার হীনমনোবৃত্তি দেখা দেয়। তাই কখনো বলবেন না “আপনার কাজ কিছুই হয় নাই।” বরং বলুন- “ঠিক আছে আপনি এভাবে করেছেন। কিন্তু আমার মনে হয় অন্যভাবে চেষ্টা করা যেতে পারে। যেমন..অর্থাৎ ভুল না ধরে তাকে প্রসংসা ও উৎসাহপূর্ণ পরামর্শ দিন।
শিষ্টাচার-২২: কখনো মুখটাকে হাঁড়ি করে রাখা যাবে না। সৌন্দর্য ও নের্তৃত্বের মূল শর্ত হল: মধুর স্বভাব, হাস্যোজ্জ্বল মুখ। তাই রাস্তাঘাটে পরিচিত কারো সাথে দেখা হলে স্মাইল দেয়া শুরু করতে হবে এবং সব সময় স্মাইলির সংগে কথা বলা চর্চা করতে হবে।
শিষ্টাচার-২৩: নেতৃত্ব দিতে চাইলে নিজে কম বলে অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার অভ্যাস চর্চা করতে হবে। যত বেশি শুনবেন, ততবেশি তথ্য ও শ্রদ্ধা পাবেন। অন্যকে এমন কোনো কথা বলা যাবে না, যাতে সে বিরক্ত হয়ে উঠে। যে কথা বলা দরকার, সেটা বলার আগে মনে মনে কয়েকবার গুছিয়ে নিতে হবে। বাড়তি কথা একদম নয়।
শিষ্টাচার-২৪: সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলা এক ধরনের আর্ট। অন্যদের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলুন। কথার মাঝে কথা বলা যাবে না। যখন কিছু বলার থাকে না, তখন চুপ করে থাকত হবে। নম্রতার সাথে হাসি, আনন্দ আর আন্তরিকতা মিশিয়ে কথা বলা চর্চা করতে হবে।
শিষ্টাচার-২৫: কথা বলতে বলতে অযথা বা অপ্রয়োজনীয় তর্কে মেতে উঠবেন না। এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে, কথা না বাড়িয়ে সে জায়গা থেকে সরে যেতে হবে। তর্কে জেতা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আপনি জিতলে অন্যের মন বিষিয়ে উঠবে। নির্বোধের কথার উত্তর না দেয়াই তার যথার্থ উত্তর।
শিষ্টাচার-২৬: অন্যের সঙ্গে ফিসফিস করে বা ইশারা ইঙ্গিতে কথা বলা যাবে না- যা তৃতীয় জনের পক্ষে বোধগম্য নয়। অনেকের মাঝে যদি কাউকে কিছু একান্তই বলতে হয় তাহলে নিচু স্বরে বা আড়ালে ডেকে নিয়ে বলতে হবে। একাধিকজন উপস্থিত থাকলে মাত্র একজনের সঙ্গে কথা বলা যাবে না, সবার সাথে কম/বেশি কথা বলতে হবে।
শিষ্টাচার-২৭: নতুন সম্পর্ক তৈরি করার ক্ষেত্রে, তার প্রশ্নের জবাব একলাইনে দেবেন না, ‘কথার হাত-পা বের হবার মত’ কিছু তথ্য বা ঘটনা বলতে হবে। যেমন: আপনি কোথায় থাকেন জানতে চাইলে; এক শব্দে না বলে এভাবে বলবেন- মোহাম্মদপুর, ঈদগাঁ মাঠের পাশে, কাছেই জেনেভা ক্যাম্প। অন্য পাশে শিয়া মসজিদ। তখন অন্যজন কথা এগুতে পারবে।
শিষ্টাচার-২৮: যদি আপনি সামনের মানুষটির সাথে কথা আরো বাড়াতে চান, তাহলে সামনের মানুষটির কথার অংশ তোতা পাখির মত রিপিট করতে হবে। যেমন- এক ব্যক্তি বলল- সে একটা বিয়ে বাড়ি থেকে ফিরছে। আপনি বলুন: বিয়ে? ব্যক্তি:-হ্যাঁ, আমার মামাত বোনের বিয়ে। আপনি: -মামাত বোন? ব্যক্তি:--হ্যাঁ, সে ডাক্তারি পড়ছে। আপনি:- ও ডাক্তার? এভাবে রিপিট করে করে চালিয়ে যান।
শিষ্টাচার-২৯: সোজা হয়ে সিংহের মত দাঁড়াতে হবে। আপনার কাঁধ, কোমর, গোড়ালি একটি সরলরেখায় থাকবে, বুক সামনের দিকে। আর বসে থাকার সময় আপনার ঘাড় সোজা, কাঁধ শিথিল, কনুই চেয়ারের হাতলে, হাঁটু ফ্লোরের সাথে সমকোণে,পায়ের পাতা ফ্লোরের সাথে লাগানো থাকবে।
শিষ্টাচার-৩০: ভিন্ন মত এবং অন্য ধর্মের প্রতি সম্মান ও সহনশীলতা দেখাতে হবে। সবার সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করার জন্য বাড়াতে হবে অন্যের সাথে মেশার দক্ষতা। আপনি যতবেশি মানুষের সঙ্গে মিশবেন, ততবেশি আপনার সৌভাগ্যের দরজা খুলে যাবে। সুযোগ মিশুক মানুষের জন্য সর্বদা অপেক্ষামান থাকে।
শিষ্টাচার-৩১: কারো সাথে দেখা করতে গেলে খালি হাতে যাবেন না, সে যদি বলেও কিছু লাগবে না, তবুও ছোট কিছু (অন্তত একটা চকলেট কিংবা আপনার খাবারের ছোট্ট একটু অংশ) নিয়ে যান। মাঝে মাঝে প্রিয় মানুষদের কিছু না কিছু উপহার দিন।
শিষ্টাচার-৩২: মুড না থাকা অস্বাস্থ্যের লক্ষণ। মুড নেই বলে দরকারি কাজ থেকে হাত গুটিয়ে থাকলে পরে আর মুড আসতে চায় না। এর কারণ, কাজটা না করার জন্য আমাদের ব্রেন অসংখ্য অজুহাত তৈরি করে। ব্রেনের এ অজুহাত বন্ধ করার জন্য ৫ সেকেন্ডের মধ্যেই সচেতন হয়ে যান। নিজেকে বলুন, ইয়েস এক্ষুণি আমি এটা করবো এবং শুরু করে দিন; নয়তো ব্রেনের ড্রেনে পড়ে যাবেন।
শিষ্টাচার-৩৩: কাউকে এমন কোনো মন্তব্য করতে যাবেন না- যা অন্যকে হেয় প্রতিপন্ন করে। তার কোনো অদক্ষতা, অক্ষমতার প্রতি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন না। আক্রমণাত্মক ঠাট্টা মসকারা, কাউকে কটাক্ষ বা ব্যঙ্গক্তি করা বা কাউকে নিয়ে ট্রল করার মধ্যে পরোক্ষভাবে কাউকে অপমান করা হয়।
শিষ্টাচার-৩৪: সর্বক্ষেত্রে আমাদের অথেনটিক হতে হবে। অথেনটিক অর্থ হচ্ছে খাঁটি, বিশুদ্ধ, সত্য, বিশ্বাসযোগ্য, আসল, নির্ভরযোগ্য, নির্ভেজাল, অকৃত্রিম। যদি কাজে-কর্মে কোনো ভুল হয়ে যায় তবে তা সহজে মেনে নিন এবং স্বীকার করুন। প্রয়োজনে বিনয়ের সঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করুন।
শিষ্টাচার-৩৫: নিজের বড়ত্ব জাহির করার জন্য আপনাকে কেউ ছোট করলে রেগে যাবেন না। তবে হাসিমুখে আপনি যে তাদের কথায় আঘাত পেয়েছেন সেটা বুঝিয়ে বলুন। প্রতিনিয়ত যারা আপনাকে অপমানের চেষ্টা করে, তাদেরকে নিজ থেকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন।
শিষ্টাচার-৩৬: আপনি মনে মনে হয়তো ভালো কিছু করতে চেয়েছিলেন কিন্তু কথায় ও আচরণে সেটি ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলতে বা প্রকাশ করতে না পারলে, ফলাফল উল্টো হয়ে যাবে। কোনো বিষয় নিয়ে সঠিক সময়ে নীরব থাকা কিংবা স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করতে না পারলে সবকিছু আপনার বিরুদ্ধে চলে যাবে। কাজেই আপনি কি করেছেন বা করতে চাইছেন, তার ¯পষ্ট ব্যাখ্যা দিন, মনে মনে রাখবেন না।
শিষ্টাচার-৩৭: নিজের ঘরের সব কথা বন্ধুকে বলে দেবেন না। কোনো বিষয় নিয়ে পরিবারের মানুষদের সঙ্গে ঝগড়া হলে তা বন্ধুকে জানাবেন না। এতে আপনার পারিবারিক কলহের কথা সবাই জেনে যাবে। আপনাদের অর্থনৈতিক অবস্থা, অস্বচ্ছলতার কথা বন্ধুকে জানিয়ে নিজেকে ছোট করবেন না। কিন্তু কেউ যখন কোনো গোপন বিষয় আপনাকে জানায়, তা নিজ দায়িত্বে গোপন রাখুন।
শিষ্টাচার-৩৮: শরীরকে যা খাওয়ানো হয়, শরীর তেমনটি হয়ে ওঠে। অনুরূপ মনকে যে খোরাক দেওয়া হয়, মনও তেমন হয়ে ওঠে। মনের খোরাক হচ্ছে, ভাল বই, জ্ঞানী ব্যক্তি, ভাল চ্যানেল ইত্যাদি। আপনি যদি কিছুদিন হতাশাবাদী মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করেন, তাহলে আপনিও হতাশাস্থ মানুষ হয়ে যাবেন। তাই নেতিবাচক শক্তি এড়িয়ে চলুন।
শিষ্টাচার-৩৯: অন্যের কাছে নিজের দক্ষতা জাহির করতে সবকিছু জানার ভান করে চুপ থাকবেন না। যে ব্যক্তি প্রশ্ন করে কিছু জানতে চায়, সে বোকা থাকে পাঁচ মিনিটের জন্য, আর যে জানার ভান করে প্রশ্ন করে না, সে বোকা থাকে সারা জীবন।
শিষ্টাচার-৪০: কোন কাজ তাড়াহুড়া করে স্বল্প সময়ের মধ্যে করে ফেলার চেষ্টা করা ঠিক নয়। কাজের সংখ্যা নয়, কাজের মানই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাড়াহুড়া বিপদের কারন।
শিষ্টাচার-৪১: রাগের সময় অনেক বেফাস কথাও মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে; যা সর্বনাশ ডেকে আনে। জিহ্বার উপর কড়া শাসন চালান। রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন। মনে রাখবেন, একটা ৩ইঞ্চি লম্বা জিহ্বা ৬ ফুট লম্বা একাধিক মানুষকে নিমিষেই হত্যা করতে পারে।
শিষ্টাচার-৪২: প্রতিশ্রুতি দিলে তা যে কোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। অপারগতায় ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। চরিত্রবানরা একবার কথা দিলে সেটা যত তুচ্ছ বা কঠিন হোক তা পালন করবেই। তাই ভেবে-চিন্তে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।
শিষ্টাচার-৪৩: আপনি পোশাক যদি পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি না হন, তাহলে বহুক্ষেত্রে আপনাকে অবমূল্যায়িত হতে হবে, যা কার্যসিদ্ধিতে সহায়ক হবে না। এটা ছোট্ট মেয়ে শিশুকে পরিচ্ছন্ন পোষাক পরিয়ে সাজিয়ে একা একটা রেস্টোরেন্টে পাঠানো হলো, উপস্থিত সবাই তাকে আদর করে খাওয়াল। কিন্তু একটু পরে একই মেয়ে শিশুকে যখন একটু নোংরা পোষাকে বিশ্রীভাবে পাঠানো হলো, সবাই তাকে তাড়িয়ে দিতে লাগল।
শিষ্টাচার-৪৪: কোনো প্রয়োজনে কোথাও গেছেন, সেখানে সালাম দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা ভদ্রতা। বসতে আনুমতি চাওয়া, খুব সংক্ষেপে আপনার প্রয়োজন তুলে ধরা, প্রশ্নের সঠিক জবার দেয়া ইত্যাদি ভদ্রতা ও সভ্য আচরণের অংশ।
শিষ্টাচার-৪৫: প্রতিযোগিতায় নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্য প্রতিযোগিতাকে প্রতিহিংসায় পরিণত করা যাবে না। কারো সঙ্গে অন্যায় করে, শত্রুতা করে বা জোর করে আসন ছিনিয়ে নিলে, সে হয় ছিনতাইকারী প্রতিযোগী নয়।
শিষ্টাচার-৪৬: নিজের কাজ নিজে করার অভ্যাস হচ্ছে আত্মনির্ভরশীলতা। অপরের উপর অধিক মাত্রায় নির্ভরশীল হলে, তাতে স¤পর্কের আসল আনন্দটাই নষ্ট হয়ে যায়। কারণ আপনার কাছে যা নির্ভরশীলতা, অপরজনের কাছে তা-ই বাড়তি দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব সামলানো তার বোঝা হয়ে দাঁডায়।
শিষ্টাচার-৪৭: হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, মোবাইলের নীল আলো শরীরের মেলাটোনিন নামের একটি হরমোনের উৎপাদন কমিয়ে দেয়। এই মেলাটোনিনই আপনাকে ঘুম পাড়ানোর কাজ করে। অর্থাৎ আপনি ফোন দেখতে দেখতে নিজেই নিজের ঘুমকে তাড়িয়ে দিচ্ছেন। কারণ, আমাদের মস্তিষ্ক নীল আলোকে দিনের আলো মনে করে। রাতে ফোন দেখলে মস্তিষ্ক ভাবে এখনো দুপুর এবং ঘুমের দরকার নেই। তাই ঘুমানোর কমপক্ষে ১ ঘণ্টা আগে ফোন রেখে দিন।
শিষ্টাচার-৪৮: কারো সাথে পরিচয় হওয়া মাত্রই তার গ্রামের বাড়ি বা ব্যক্তিগত পরিচয় জানতে চাওয়া মূর্খতা ও অভদ্রতা। নিজে থেকে না বললে কারো ব্যক্তিগত বিষয়ে জানতে চাওয়া বা তাকে নিয়ে সমাালোচনা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। নিজের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয় ও সমস্যাদি শেয়ার করবেন না।
শিষ্টাচার-৪৯: দ্বিতীয়বার রিং হওয়ার পরেও যদি কল না ধরে তবে কল কেটে দিন। অপরিচিত কাউকে কল দিলে আপনার পুরো পরিচয়টা প্রথমে বলুন। ম্যাসেজের উত্তর ম্যাসেজের মাথ্যমে দিন, কল করে নয়।
শিষ্টাচার-৫০: কাছের লোকজনের প্রতি প্রতিদিন আরো বেশি মনোযোগী হতে হবে। তাঁদের সান্নিধ্যে থাকা অবস্থায় কিছুতেই অন্যমনস্ক হওয়া যাবে না।
শিষ্টাচার-৫১: যত বিলাসবহুল জীবনযাপন করবেন, মজার মজার খাবার খাবেন, ততবেশি দেখা দেবে লাইফস্টাইল অসুখ। যা কিছু মজার ও সহজ সবকিছু খারাপ বা মন্দ আর যা কিছু কঠিন এবং অতৃপ্তিকর তা ভালো এবং কল্যাণকর।
শিষ্টাচার-৫২: অনেক সময়ই আমাদের নিচ থেকে ভারী কোনো বস্তু উঠাতে হয়। কিন্তু এ সময় অবশ্যিই উঠানোর নিয়ম মানতে হবে। কারণ এটি আমাদের শরীরে বিভিন্ন ব্যাথা-বেদনা এমনকি পঙ্গুত্ব হওয়ার সাথে জড়িত। পিঠ যদি সোজা না থাকে বা কুঁজো হয়ে থাকে, তবে চোট পাবেন। কোনো ভারী জিনিস তুলতে হলে প্রথমে সোজা করে বসে যাবেন,তারপর তুলতে হবে। শরীরের মাঝ ভাগ বরাবর ভারী বস্তুটি তুলতে হবে।
শিষ্টাচার-৫৩: অতিথি হিসেবে কোথাও গেলে নিজের ইচ্ছেমতো চেয়ার টেনে বসে না পড়ে আপ্যায়ক চেয়ারে না বসা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। আর অবশ্যই বসার সময় কর্কশ শব্দে চেয়ার না সরিয়ে, আস্তে করে টেনে নিয়ে পিঠ সোজা করে বসতে হবে। প্রধান অতিথি বসবেন হোস্টের ডানপাশে। খাবার টেবিলের সবার সাথে গতি রক্ষা করতে হবে খাওয়ার সময়। টেবিলে খাবার পরিবেশন করতে হবে হোস্টের বামপাশ থেকে। তরল জাতীয় খাবারগুলো প্রধান পদের বামে এবং অন্য খাবারগুলো ডানে রাখতে হয়। যে খাবারের পদটি আপনি খেতে চাইছেন, তা হাতের নাগালের মধ্যে যদি না থাকে, তবে পাত্রটির কাছে থাকা মানুষটিকে অনুরোধ করুন। অন্যকে টপকে বা খাবার টেবিলে ভর দিয়ে পাত্রটি টানতে যাবেন না।
দাওয়াতে বা রেস্তোরাঁয় মাছের কাঁটা বা মাংসের হাড় চিবিয়া খাওয়া বেশ দৃষ্টিকটু। এ অভ্যাস পরিহার করা উচিত। খাবার টেবিলে হাঁচি বা কাশি পেলে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে মুখে রুমাল বা হাত দিয়ে ঢেকে নিতে হবে। খাবার টেবিলে ন্যাপকিন কোলের ওপর বিছিয়ে নিয়ে খাওয়া শুরু করতে হবে।
শিষ্টাচার-৫৪: খাওয়ার মাঝে টেবিল ছেড়ে কোথাও গেলে ন্যাপকিনটি চেয়ারের ওপর রেখে যেতে হবে। খাওয়া শেষ হলে ন্যাপকিন টেবিলের নিজের স্থানের বামপাশে রেখে দিতে হবে। দাঁতে খাবার আটকে গেলে অবশ্যই মুখে হাত দিয়ে ঢেকে অপর হাত দিয়ে বের করা উচিত। খাওয়া শেষে প্লেটে হাত ধুবেন না। খাবার টেবিল থেকে ওঠার সময় পাশেরজনকে বলে টেবিল শিষ্টাচার-৫৪: আমেরিকান স্টাইলে ছুরি ও কাঁটা চামচ দিয়ে কয়েক গ্রাস খাবার কেটে নিতে হয়। খাবার সময় ছুরিটিকে প্লেটে রেখে কাঁটা চামচ দিয়ে খেতে হয়। কাঁটা চামচ ধরতে হয় ডান হাতে। * ইউরোপিয়ান স্টাইলে ছুরি ডান হাতে এবং চামচ বা কাঁটা চামচ থাকে বাম হাতে। পুরো খাবার সময়টাতেই দুই হাতে ছুরি আর চামচ থাকে। * কাঁটা চামচ ব্যবহারের সময় এবং হাতলের ওপর অংশ ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি, তর্জনি ও মধ্যমা দিয়ে ধরতে হয়।
* খাবার বিরতিতে আপনার কাঁটা চামচ ছুরির ওপর ক্রস করে রাখুন। এর কাঁটাগুলো নিচের দিকে মুখ করে থাকবে। খাওয়া শেষে ছুরি ও কাঁটা চামচ পাশাপাশি রাখুন। * স্যুপ খাওয়া শেষ হলে স্যুপের চামচ স্যুপের প্লেটে রাখুন, কাপের ভেতর রাখবেন না। * স্যুপ গরম হলে তাতে ফুঁ না দিয়ে চামচ দিয়ে নেড়ে ঠাণ্ডা করুন। স্যুপের চামচের পার্শ্বদেশ আপনার মুখে প্রবেশ করবে, * মাছ কেটে খেতে হলে আগে মাছটিকে কাঁটা চামচ দিয়ে ধরুন। তারপর ঠিক মাঝ বরাবর মুড়ো থেকে লেজ বরাবর কাটুন। প্রথমে ওপরের অংশ খেতে হবে, এরপর নিচের অংশ। * মাংস খাবার সময় চামচ ব্যবহার করা হয় না। * পাস্তা, নুডলস, স্প্যাগেন্ডি কাঁটা চামচ দিয়ে খেতে হয়।
চপস্টিক ধরার সঠিক ধাপগুলো হলো: একটি চপস্টিক পেনসিল ধরার মতো করে বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনী দিয়ে ধরুন। এটি হবে ওপরের চপস্টিক, যা নড়াচড়া করবে।দ্বিতীয় বা নিচের চপস্টিকটি বৃদ্ধাঙ্গুলির গোড়া এবং অনামিকার ওপর স্থিরভাবে বসান। নিচের চপস্টিকটি স্থির রেখে ওপরেরটি পেনসিলের মতো নড়িয়ে খাবার ধরতে হয়। কবজি নয়, আঙুল দিয়ে চপস্টিক চালনা করা এবং খুব বেশি চাপ না দিলেই সহজে এর ব্যবহার শিখে যাবেন।
শিষ্টাচার-৫৫: সবাই ভাইরাল হওয়ার নেশায় অপসংস্কৃতি দিকে ঝুঁকছেন।."নেগেটিভিটি যেখানেই দেখবেন, সেখান থেকেই নিজেকে সরিয়ে নেবেন। এটা দুর্বলতা নয়, বরং নিজের প্রতি দায়িত্বশীল থাকা।". নিজেকে বাঁচান অপ্রয়োজনীয় মানুষের আগ্রাসন থেকে। আপনার জন্য আসল মানুষগুলোকে চিনে নিন। যারা আপনার ভালোটা চায়। বাকি দুনিয়াকে জঞ্জাল ভাবুন, পথে চলতে গিয়ে আগাছা আর কাঁটাঝোপ থাকবেই, কিন্তু আপনাকেই পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।"
"সব কথার উত্তর দিতে নেই, সবকিছুর প্রতিক্রিয়াও দিতে নেই। নিজেকে প্রমাণ করার দরকার নেই, শুধু নিজের পথে স্থিরভাবে এগিয়ে যান। এমন সময় আপনি যা করবেন তা হলো ইগনোর"। কারণ জীবনে কিছু মানুষ থাকবেই, যাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো আবর্জনা ছড়ানো, অন্যের জীবনে বিষ ঢালা। অপ্রয়োজনীয় তর্ক বা কাউকে কিছু বোঝাতে যাবেন না। কেউ যদি আপনাকে মূর্খ বলে, হেসে বেরিয়ে আসুন। এতে আপনার এনার্জি আর মানসিক শান্তি দুটোই বাঁচবে।"
শিষ্টাচার-৫৬: কারো সাথে আঙুল তুলে কথা বলা বেয়াদবি। কারণ এর মাধ্যমে আপনি যাদের দিকে আঙুল তুলছেন, তাদের প্রতি আপনার শ্রদ্ধার সম্পূর্ণ অভাব বুঝায় এবং অন্যের প্রতি আক্রমণাত্মক ভাব প্রকাশ করে। তাই সব সংস্কৃতিতেই এটিকে অশালীন মনে করা হয়। কথা বলার সময় যদি আপনার এই অভ্যাস আসে, তাহলে সচেতনভাবেই একটি পরিহার করুন। এছাড়া কথা বলার সময় বেশি হাত নাড়া বা এলোমেলোভাবে বসা অথবা দাঁড়ানো কিংবা সামনের দিকে ঝুঁকা বা পিছনের দিকে বেঁকে যাওয়া ভঙ্গিতে কথা বলাও অসৌজন্যতা হিসেবে দেখা হয়।
শিষ্টাচার-৫৭: যখন মানুষ তার বিবেকের কথা শোনে, তখন সে নৈতিকভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়। নৈতিকতা বিসর্জন মানে নিজের বিবেকের বিরুদ্ধে যাওয়া। সততা ও নৈতিকতা মানুষকে সত্যিকার মানুষে পরিণত করে। সততা ছাড়া কোনো সম্পর্কই দীর্ঘস্থায়ী হয় না, তা ব্যক্তিগত হোক বা পেশাগত। যখন আপনি সৎ থাকেন, তখন মানুষ আপনাকে বিশ্বাস করতে শেখে। এই বিশ্বাসই যে-কোনো সম্পর্কের ভিত গড়ে তোলে।
মিথ্যা বা অসততা সাময়িক সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা শুধু অবিশ্বাস আর তিক্ততাই সৃষ্টি করে। জীবনে এমন অনেক পরিস্থিতি আসে, যখন বহু প্রলোভন আসতে পারে। হতে পারে সেটা দ্রুত ধনী হওয়ার সুযোগ, অন্যায়ভাবে সুবিধা পাওয়া। কিন্তু এই প্রলোভন এড়িয়ে চলুন। মনে রাখবেন, ক্ষণিকের প্রলোভন সাময়িক আনন্দ দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা ক্ষতির কারণ হয়। কোনো চাপের মুখেও অন্যায়কে প্রশ্রয় দেবেন না। সততা একটি অভ্যাস। ছোট ছোট সৎ কাজ আপনার চরিত্রকে মজবুত করে। মনে রাখবেন, আপনার সততাই আপনার সবচেয়ে বড় সম্পদ ।
শিষ্টাচার-৫৮: টাকা ধার করার অভ্যাস ত্যাগ করুন। আপনি হয়তো বলবেন, ওর কাছে তো মাত্র একবার টাকা ধার চেয়েছি। বন্ধু তো, বন্ধুই যদি প্রয়োজনে বন্ধুর পাশে না দাঁড়ায় তাহলে কিভাবে হবে? কিন্তু আপনার এই আচরণ ভিখারী মানসিকতার জন্ম দিবে। ফ্রয়েড বলেন, যদি কেউ মনে করে, তাকে আপনার আর্থিক দায়িত্ব বহন করতে হয়, তখন আপনাদের সম্পর্কে তার নিচু ধারণা ও বিরক্তিকর মনোভাব তৈরি হয়। তখন সে আপনার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করবে।
শিষ্টাচার-৫৯: কখনো অজুহাত দেবেন না, অজুহাত সাময়িক আরাম দিলেও তা আপনার উন্নতির পথে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়। জীবনকে পূর্ণভাবে বাঁচার প্রথম শর্তই হলো নিজের দায়ভার নিজে নেওয়া। অতীত আপনার অভিজ্ঞতা হতে পারে, কিন্তু আপনার পরিচয় নয়। গতকাল আপনি কী ছিলেন, তা বড় কথা নয়, আজ আপনি কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, সেটাই নির্ধারণ করবে আপনার আগামীকাল কেমন হবে।
আমরা নিজেদের অবচেতন মনে সারাক্ষণ কিছু নেতিবাচক ভাবনা ভাবি। যেমন ‘আমি পারব না’, ‘আমার ভাগ্য খারাপ’, ‘এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে’। এই গল্পগুলো বদলে ফেলুন। নিজেকে বিজয়ী হিসেবে কল্পনা করলে বাস্তবও বদলাতে শুরু করবে। স্বপ্ন দেখা শুধু শুরু করলেন, কিন্তু সেই স্বপ্নকে ছুঁতে প্রয়োজন অবিরাম এবং শক্তিশালী কর্মতৎপরতা। প্রতিটি কাজে প্রাণশক্তি আর ভালোবাসা ঢেলে দিন। দৃষ্টিভঙ্গি বদলান: কাজকে সমস্যা বা বাধা হিসেবে না দেখে, সুযোগ হিসেবে দেখুন। কিছু অজুহাত যেমন-
* ‘আমি খুব ব্যস্ত’: ব্যস্ততা সবারই আছে। এটি কোনো একচেটিয়া সমস্যা নয়। আসলে আমরা যা পছন্দ করি বা যা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, আমরা তার জন্যই সময় বের করি। ব্যস্ততার দোহাই না দিয়ে সময় ব্যবস্থাপনায় নজর দিন।
* ‘আমি খুব ক্লান্ত’: এটি ইচ্ছাশক্তির অভাব ছাড়া আর কিছুই নয়। যদি ক্লান্তি সত্যিই বাধা হয়, তাহলে আপনার খাদ্যাভ্যাস ও ঘুমের মান উন্নত করুন। ক্লান্তি যেন আপনার স্বপ্নকে থামিয়ে না দেয়।
* ‘আমি অসুস্থতা বোধ করছি’: সত্যিই অসুস্থ হলে বিশ্রাম নিন। কিন্তু আলসেমি ঢাকতে এই অজুহাত ব্যবহার করবেন না। নিজের শারীরিক অবস্থার নিয়ন্ত্রণ আপনার হাতেই।
* ‘এটি সঠিক সময় নয়’: নিখুঁত সময়ের অপেক্ষা করতে করতে অনেক অসাধারণ আইডিয়া অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়। এখনই শুরু করার পথ খুঁজুন, নিখুঁত সময় হয়তো কখনোই আসবে না।
* ‘এটি আমার সাধ্যের বাইরে’: কমফোর্ট জোনের বাইরে যেতে আমরা সবাই ভয় পাই। কিন্তু অনিশ্চয়তাকে উপভোগ করতে শিখুন। দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে এলে প্রাপ্তির ঝুলি অনেক বড় হবে।
* ‘এটি অসম্ভব’: সাহসী মানুষের অভিধানে ‘অসম্ভব’ বলে কিছু নেই। কোনো কাজ যদি অন্য কেউ পেরে থাকে, তবে আপনিও পারবেন। আর কেউ না পেরে থাকলে আপনিই হবেন প্রথম।
শিষ্টাচার-৬০: মানুষকে তার উৎকৃষ্ট নামে আবেগ মিশিয়ে ডাকুন। এত আপনাকে একজন মনোযোগী ও আন্তরিক মানুষ হিসেবে তুলে ধরবে। পরিচয়ের ঠিক পরপরই নামটি কয়েকবার মনে মনে বলুন এবং মৃদুস্বরে উচ্চারণ করুন।যেমন:"শুভ, আপনার সাথে পরিচিত হয়ে ভালো লাগলো"। নাম ধরে ডাকার সময় পেশা বা বয়সের ভিত্তিতে ‘ভাই’, ‘আপা’, ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ শব্দের সাথে নামের সমন্বয় করুন (যেমন: রহিম ভাই, সালাম সাহেব)। প্রত্যেক মানুষের কাছে নিজের উৎকৃষ্ট নামটাই সবচেয়ে মধুর লাগে। তাই ব্যঙ্গ সম্বোধনের দ্বারা মানুষকে হেয় ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয় বলে তার মন বিষিয়ে উঠে। ফলে তাকে সে মনে মনে ঘৃণা করে। কাজেই, কাউকে বিকৃত নামে ডাকা থেকে বিরত থাকুন। এছাড়া, আপনি যখনই কোনো কিছুর জন্য নিজেকে নিয়োজিত করেন, তখনো মনে মনে বা শব্দ করে নিজের নাম উচ্চারণ করে, কাজটি সুন্দরভাবে শেষ করতে নিজেকে প্রতিশ্রুতি দিন; কিছু দেবার বা ভোগ করার, যা আপনার পক্ষে করা সম্ভব। এরপর সত্যিই তা করুন।
শিষ্টাচার-৬১: উপকারির নিকট সব সময় কৃতজ্ঞ থাকুন। যিনি আপনার কোনো উপকার করেছে বা আপনার প্রশ্নের জবাব দিয়েছে তার প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন; থ্যাঙ্কস বলুন, খুশি মনে ধন্যবাদ দিন। পরবর্তীতে তার সাথে দেখা হলে তাকে তার আগের কথা বা কাজের জন্য পুনরায় ধন্যবাদ দিয়ে মনে করিয়ে দিন। কেউ উপকার করলে মাঝে মাঝে তার উপকারের কথা তাকে স্মরণ করিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন কিন্তু পরের উপকার করে আপনি তা মনে রাখবেন না। কৃতজ্ঞতা পাওয়ার আশায় কোনো কিছু করা বা দেওয়া উচিত নয়, বরং দেবার আনন্দেই দেয়া উচিত। উপকারির কাছে অকৃতজ্ঞতাই আশা করা উচিত, তাতে হতাশ হবার ভয় থাকে না। অনেকে অপর লোকের কাছ থেকে বেশি কিছু আশা করেন এবং তা না পেলে নিরাশ হয়ে পড়েন। এটা উচিত নয়। অপরের কাছ থেকে যত কম আশা করা যায়, হতাশাও তত কমে যাবে। সব সময় মনে রাখবেন, অভিযোগ-প্রতিবাদ শুধু বোকা লোকদের ভাষা; এইসব পরিহার করতে হবে।
শিষ্টাচার-৬২: কাউকে সরাসরি হুকুম না করে আব্দার কিংবা অনুরোধের সুরে বলুন। এতে মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক ও শ্রদ্ধাবোধ বজায় থাকে। অনেকে আছেন- যারা সব সময় সর্বোসর্বা হয়ে অন্যকে দিয়ে কাজ করাতে বোকার মতো হুকুম করেন; তারা জানেন না যে, হুকুম জিনিসটা কেউ পছন্দ করে না। কোনো কাজে হুকুম দেওয়া মানে তাকে ছোট প্রমাণ করা। এটা খুব খারাপ। কোনো কাজের জন্য কাউকে সরাসরি হুকুম না করে একটু ঘুরিয়ে আব্দার কিংবা অনুরোধের সুরে বলুন, অথবা কাজটা করতে পরোক্ষভাবে তাকে উৎসাহিত করুন।
প্রত্যক্ষ বাক্য না বলে সবসময় পরোক্ষ বাক্য বলার অভ্যাস করুন। যেমনÑ এই করিম, বাজারে যাও; এটা প্রত্যক্ষ বা সরাসরি বাক্য। এটা না বলে এভাবে বলুনÑ করিম, বাজার করা দরকার, এখন গেলে সবকিছু টাটকা পাওয়া যাবে, তাই না? হুকুমের সুর: "দরজাটা বন্ধ করো।"
অনুরোধের সুর: "দয়া করে দরজাটা বন্ধ করবে?" অথবা "দরজাটা বন্ধ করলে ভালো হয়।"
শিষ্টাচার-৬৩: বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনসহ চেনা-পরিচিতদেরকে যতটা সম্ভব প্রশংসা করুন। প্রত্যেক মানুষের মনের গভীরে থাকে প্রশংসা পাবার আকুতি। মানুষের বাহ্যিক পরিপাটি, সবই তার প্রতিফলন। কাজেই যেখানে যাকে পাবেন, তাকে যতটা সম্ভব প্রশংসা করতে কুণ্ঠাবোধ করবেন না। তার গুণগুলোর সোজাসুজি প্রশংসা করুন। আপনার প্রশংসা তার মনকে ভরিয়ে তুলবে। এমন কি আপনার ছোট প্রশংসাটির জন্য দেখবেন, সারাজীবন সে আপনাকে মনে রাখবে।
প্রশংসা হচ্ছে আত্মার খাদ্য। উপযুক্ত খাদ্য পেলে মন আত্মবিশ্বাসে, মনোবলে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে। কিন্তু সাবধান, তোষামোদ করবেন না। তোষামোদ হচ্ছে, জাল করা টাকার মতো- যা চালাতে গেলে প্রতি মুহূর্তে ঝুঁকি। সৎ থাকুন যখন কেউ আপনার প্রশংসা করছেন। প্রশংসা কখনো প্রত্যাখ্যান করবেন না এবং অবশ্যই মনে করবেন না যে, আপনাকে প্রশংসা ফেরত দিতে হবে। বিনয়ী হতে হলে আপনাকে মাত্রাতিরিক্ত লাজুক, শান্ত বা সাধু হতে হবে এমনটা নয়।
শিষ্টাচার-৬৪: কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করবেন: ১) অর্থহীন অহঙ্কার থেকে বিরত থাকুন ২) আপনি, আপনার পরিবার বা নিকট আত্মীয়রা কত অর্থ-সস্পদের মালিক এসব আলোচনা এড়িয়ে চলুন। কে কত অর্থ উপার্জন করেছেন এসব আলোচনাও বন্ধ করুন। আপনার এইসব ছোটলোকিপনা অন্য মানুষের বিরক্তি ও ঈর্ষা-হিংসা কারণ হতে পারে। ৩) নিজের গুণাবলী নিয়েও আলোচনা করবেন না: আপনি স্মার্ট, মেধাবী ও চতুর এগুলো বলার মধ্যে কোনো বাহাদুরি নেই। আপনার যদি ভালো কোনো গুণাবলী থেকে থাকে, তাহলে মানুষ নিজ থেকেই আপনার প্রতি আকৃষ্ট হবে। ৪) অহেতুক অন্যের কথাবার্তায় নিজেকে জড়াবেন না: আপনি তাদের কাজে আসলে তারা আপনাকে নিজে থেকে আলোচনায় আহ্বান জানাবে।
শিষ্টাচার-৬৫: নিজের দোষ-ত্রুটির সমালোচনা করতে শিখুন, অন্যের নয়। সমালোচনা হচ্ছে পোষা পায়রার মতো, তাকে যেখানে যত দূরে ছেড়ে দেয়া হোক, ঠিক নিজের ঘরে ফিরে আসবেই। সহজ কথায়, আপনি যতটুকু অপরের সমালোচনা করবেন-নিজেই (প্রকাশ্যে-গোপনে) ততটুকু অপরের সমালোচনার সম্মুখীন হবেন। নিজের দোষ-ত্রুটির সমালোচনা করতে শিখলে তার দ্বারা অবশ্যই বড় হওয়া সম্ভব।
কাজেই অপরের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নিজের সমালোচনা করতে শিখুন। অযথা মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকা ভালো। যার বাসায় ছোট টিভি আছে, তাকে বড় টিভির গুণ বর্ণনা করা ঠিক নয়। এক কথায়, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কারো কোনো বিষয়ে, বিরূপ মন্তব্য করবেন না কিংবা অপেক্ষাকৃত উন্নত কিছুর সাথে তুলনা করবেন না। মানুষের জীবনী শক্তির অধিকাংশই শেষ হয়ে যায় শুধু পাশের মানুষের নেগেটিভ কথা শুনতে শুনতে। লক্ষ্য করে দেখবেন, আপনি যখন কোনো ভালো কাজ করতে যাচ্ছেন, তখন একগাদা মানুষ জড়ো হয়ে আপনাকে নিরুৎসাহিত করবে। এসব এড়িয়ে চলুন।
শিষ্টাচার-৬৬: খুঁতখুঁতে স্বভাব পরিত্যাগ করুন। এমন অনেক ব্যক্তি আছেন, যারা অনেক খুঁতখুঁতে। সব কিছু মনের মতো বা একেবারে নিখুঁত না হলে তাদের মন ভরে না, নিজের সব কিছুকে খুঁতহীন একটা অবস্থায় নিয়ে যেতে চান। এরকম মানুষ সমাজজীবনে, কর্মজীবনে, ব্যক্তিজীবনে অস্থির লোক হিসেবে গণ্য হয়। আবার অনেক লোক আছেন, যারা সামনে দিয়ে মশা গেলেও ধরে ফেলেন কিন্তু পিছন দিয়ে হাতি গেলেও টের পায় না। এরা সঠিকভাবে কাজটা হয়নি বলে অভিযোগ তুলে মজুরকে শোষণ করে মাজারে দান করে। এরা শ্রমিকের ন্যায্য পাওনার বেলায় খুব হিসাবি, অথচ ভোগ-বিলাসিতার বেলায় হিসাবি নয় মোটেই। এই মনোভাব খুব জঘন্য।
আমাদের মনে রাখা উচিত- একজন কর্মী যদি তার কাজের যথার্থ পুরস্কার পায়, তাহলে তার হৃত উদ্যম অবশ্যই শতগুণে বেড়ে যায়। কর্মী বা সহপাঠীরা যত ভুল করুক, উত্তেজিত হবেন না, আফসোস করবেন না; মনে করবেন, ভুলটা আপনার। কাজটা অন্যভাবে বুঝানোর বা যোগ্যা লোককে দায়িত্ব দেয়ার দরকার ছিল।
শিষ্টাচার-৬৭: মুদ্রাদোষ পরিহার করুন: কেউ কথা বলার সময় হাত নাড়ে বেশি। আবার অনেকে আছেন, যারা কোনো কাজের জন্য কারো গায় হাত দিয়ে অনুনয়-বিনয় করেন। কেউ মানুষের সামনে দাঁত খোঁচায়, কেউ বা হাত চাপা না দিয়ে ঢেঁকুর তোলেন, হ্ইা তোলেন, জোরে কাশেন, হাঁচি দেন। কেউ বা যেখানে-সেখানে থুথু পানের পিক ইত্যাদি ফেলেন।
আমাদের দেশে খুব কম মানুষ আছেন, যারা টেলিফোনটি বাজা দেখতে পারেন না। তারা আপনাকে বসিয়ে রেখেই ফোনটি ধরবেন এবং অনেকক্ষণ কথা বলবেন। আপনি যে এত কষ্ট করে ট্রাফিক জ্যাম ঠেলে তার কাছে গিয়েছেন, সেটা তার কাছে গুরুত্ব পায় না, আপনার থেকেও মূল্যবান হয়ে ওঠে টেলিফোন বা অন্যান্য কাজ। এটা চরম অসভ্যতা। জাপানে বা উন্নত দেশে যদি কোনো অতিথির সামনে এ ধরণের মুদ্রাদোষ কেই দেখে, তারা এটাকে চরম বেয়াদবী বলে ধরে নেয়।
শিষ্টাচার-৬৮: ধীরগতি ও স্পষ্ট বাক্যে কথা বলুন । প্রত্যেক জরুরি কথা শুরু করার আগে এবং শেষ হলে কয়েক মুহূর্ত থেমে থাকুন। এতে কথাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে শ্রোতার মনে আলাদা আসন করে নেবে। কথা কম হবে অথচ বেশি প্রভাবশালী শব্দে সমৃদ্ধ হওয়া চাই। ছোট ছোট উদ্ধৃতি, প্রবাদ-প্রবচণ, বাণী এবং হাস্যকর সংলাপযুক্ত করে বক্তব্যকে নাট্যরসে সমৃদ্ধ করে তুলুন। গলার সুর ও প্রকাশভঙ্গির উঠানামা করুন। গুরুত্ব অনুসারে শব্দের ওপর জোর বাড়ান-কমান।
পরিবার, শৈশব স্মৃতি, স্কুল-কলেজ দিনগুলো, জীবনে নানা বাধা, আশা-আকাক্সক্ষা, জয়, শখ, বিনোদন, বিখ্যাত ব্যক্তির সাক্ষাৎ ইত্যাদি অভিজ্ঞতা গুছিয়ে বললে চমৎকার ফল পাবেন। বক্তব্যের বিষয়ের সঙ্গে সাদৃশ্যমূলক উপমা দিন। কোনো গল্প বা হাসির টিপ্পনি যদি বলেন, তা হওয়া চাই সংক্ষিপ্ত, অথচ জোরালো এবং চিত্ত আকর্ষক। যদি অপর কেউ কোনো কৌতুক- রহস্যের অবতারণা করেন, সেটা আপনার জানা থাকলেও তা অপরকে বলতে বাধা দেবেন না বরং খুব উৎসাহ নিয়ে শুনবেন।
শিষ্টাচার-৬৯: সামনের মানুষটির মুড বুঝে কথা বলুন। আপনার জীবনে এমন ঘটনা অনেক আছে যে, যখন আপনি খুব খারাপ মুডে আছেন, আর একজন এসে খুব উত্তেজিতভাবে আনন্দ প্রকাশ করে আপনার সাথে কথা বলছেন, তামাশা করছেন। এই সময় ওই লোকটির প্রতি বিরক্তিও আসতে পারে বা রাগ আসতে পারে। ফলে আপনি, মানুষটি থেকে দূরে সরে যেতে চেষ্টা করেন। এটা আরো বেশি মাত্রায় দেখা যায়, যদি দুজনের মধ্যে ক্লোজ রিলেশন না থাকে।
এই কারণে যখন আপনি কারো সাথে কথা বলা শুরু করবেন, তখন আপনাকে দেখতে হবে যে, সামনের মানুষটির মুড কেমন আছে। যদি সে ‘লো’ বা খারাপ মুডে থাকে, তাহলে আপনি তার সাথে খুব বেশি এক্সাইটেড মুডে কথা বলবেন না। প্রথমে আপনি শান্তভাবে তার সাথে কথা বলা শুরু করুন। তারপর ধীরে ধীরে আপনার মুড এবং এক্সসাইট লেবেল বাড়ান। এই টেকনিকটা আপনার সামনে থাকা মানুষটির মুডও ঠিক করে দিতে পারে।
শিষ্টাচার-৭০: অনন্ত চাহিদা মানে অশান্তির ঘর। জীবনের দাবি হচ্ছে চাহিদা। মানব জীবন চাহিদার শেষ নেই। একটা চাহিদা না মিটতেই আর একটা চাহিদা তৈরি হয়। তবে একজন প্রকৃত মানুষ জীবনে যা যা চায় , তার সবকিছু পূর্ণ হওয়া উচিত নয়। শিশু এবং মূর্খ যারা তারাই সবকিছু চায়। কারণ চাওয়ার গুণাগুণ বিচারের ক্ষমতা এদের নাই। সাধারণ মানুষের সবসময় সুখী হয়ে থাকে, কারণ তাদের চাওয়া অতি সাধারণ, যা সহজে পূর্ণ করা সম্ভব। মানুষের অনন্ত চাহিদা তাকে অশান্তির পথে টেনে নেয়।
অল্পতে সস্তুষ্ট থাকতে পারলেই মন শান্ত ও সুখি হবে। আমরা সর্বদা ভাবি কি পেলাম না, কী নাই আমাদের? কী আছে, তা ভুলেও আমাদের ভাবনায় আসে না। কী পেলাম না তা নিয়ে হিসাব না করে, যা আছে তা মনে মনে বিবেচনায় নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চেষ্টা করুন। আপনার থেকে বেশি যাদের আছে তাদের দিকে না তাকিয়ে, আপনার থেকে কম যাছে যাদের তাদের দিকে তাকিয়ে নিজের পার্থক্য করুন। একঘেঁয়ে সুখ বা আনন্দ লাভই যদি কারো উদ্দেশ্য হয়, তবে তা সফল হওয়া কঠিন। কারণ নিরানন্দের পরেই শুধু আনন্দের এবং কষ্ট বা দুঃখের পরেই সুখের অনুভূতি আসে। যে লোক সব সময় গাড়িতে চড়ে তার পক্ষে গাড়ি চড়ায় কোনো সুখ নেই।
যে রোজ ভালো খায় তার পক্ষে ভালো খাওয়াটটা সুখের অংশ বলে মনে হবে না। কাজেই সুখের স্বাদ পেতে হলে আগে কিছুটা দুঃখের অংশ থাকা চাই। রাতকে বাদ দিয়ে যেমন দিন হয় না, তেমনি হতাশা, অপ্রাপ্তি কিংবা দুঃখ-কষ্টকে বাদ দিয়ে সুখ কিংবা আনন্দ হয় না। প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি দুটোই জীবনের অংশ। যার প্রাপ্তি তালিকা যত বড়, তার অপ্রাপ্তির তালিকা তার চেয়েও বৃহৎ হয়।
শিষ্টাচার-৭১: কারো দ্রুত সফলতা দেখে নিজেকে ব্যর্থ ভাবা বন্ধ করুন। আমাদের জীবনের অন্যতম বড় একটি হতাশার কারণ হলো অন্যের সাথে নিজের তুলনা করা। বিশেষ করে যখন আমরা দেখি আমাদের সাথে পড়ালেখা করা বন্ধুরা বা সমবয়সীরা খুব দ্রুত চাকরি পেয়ে যাচ্ছে, বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে বা জীবনে খুব তাড়াতাড়ি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে, তখন আমাদের নিজেদের খুব তুচ্ছ মনে হয়। মনে হয়, "সবাই জীবনে কত এগিয়ে গেল, আর আমি বোধহয় কিছুই করতে পারলাম না!" এই তুলনার মানসিকতা আমাদের নিজের যোগ্যতা এবং পরিশ্রমের ওপর থেকে বিশ্বাস কমিয়ে দেয়।
কিন্তু পৃথিবীর একটা অমোঘ নিয়ম হলো, সবার সফলতার সময় বা 'টাইম জোন' কখনো এক হয় না। কেউ হয়তো ২৫ বছর বয়সে সফলতা পেয়ে ৩৫ বছরে গিয়ে আটকে যায়, আবার কেউ হয়তো ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত শুধু নিজেকে প্রস্তুত করে এবং তারপর এমন এক উচ্চতায় পৌঁছায় যা অন্যদের কল্পনারও বাইরে। আপনার বন্ধুরা আজ যে জায়গায় পৌঁছেছে, সেটি তাদের গন্তব্য হতে পারে, কিন্তু আপনার লক্ষ্য হয়তো তার চেয়ে অনেক বেশি বড়। আর লক্ষ্য যত বড় হয়, সেখানে পৌঁছানোর রাস্তাটাও ততটাই দীর্ঘ এবং সময়সাপেক্ষ হয়।
একটি ছোট্ট মাটির ঘর তৈরি করতে কয়েক দিন সময় লাগে, কিন্তু একটি বিশাল রাজপ্রাসাদ তৈরি করতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। আপনি যে আজ নীরবে পরিশ্রম করছেন, দিনের পর দিন অপেক্ষা করছেন, এটি আপনার কোনো ব্যর্থতা নয়। এটি হলো আপনার সেই বিশাল রাজপ্রাসাদ তৈরির কাজ। সবার গল্প একরকম হয় না। কেউ খুব দ্রুত সফল হয়, কারণ তাদের গন্তব্য হয়তো খুব কাছে। আর আপনার সময় লাগছে, কারণ আপনার গন্তব্যটা সাধারণ নয়। অন্যের দৌড় দেখে নিজের জীবনের মূল্য নির্ধারণ করাটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বোকামি।
একটি সাধারণ গাছ কয়েক মাসের মধ্যেই বড় হয়ে যায়, কিন্তু একটি বিশাল বটগাছ বড় হতে বছরের পর বছর সময় নেয়। আপনি সেই বটগাছ হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আপনার একাকীত্ব আর সাধনা এগুলো কোনো দুর্বলতা নয়। এগুলো হলো আপনাকে আরও শক্তিশালী করার এক একটি ধাপ।
শিষ্টাচার-৭২: যদি কোনো মানুষের এই ধারণা থাকে যে, তার মাঝে আরো অনেক লুকানো শক্তি আছে; তাহলে সে যা কাজ করছে, প্রয়োজনে তার থেকে বহুগুণ বেশি কাজ সে অবশ্যই করতে পারবে। যার যত বেশি আত্মবিশ্বাস, সে তত বেশি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে।
আত্মবিশ্বাসে মন সর্বদাই সবল ও নির্ভীক থাকে। আত্মবিশ্বাসে কর্মক্ষমতা দিন দিন বাড়তে থাকবে। মনে রাখবেন, প্রতিটি মানুষের কাজের চেহারাটি তার আত্মবিশ্বাসের অনুরূপ হবে। আত্মবিশ্বাস বিকাশের তিনটি উপায়।
১) সাফল্যের কথা ভাবুন, ব্যর্থতার ভাবনাকে প্রশ্রয় দেবেন না। কঠিন পরিস্থিতিতে ‘আমি জিতবো’, ‘আমি সফল হবো’ এই ধারণাটি বদ্ধমূল করে তুলুন। সাফল্যের চিন্তা আপনার মনকে সফল হওয়ার পরিকল্পনা প্রস্তুত করতে সাহায্য করে। ২) সফল মানুষটিও সাধারণ মানুষ, তবে তার নিজের ওপর, নিজের কাজের ওপর আস্থা ছিল বলেই সে সফল। তাই কখনও নিজেকে ছোট ভাববেন না। ৩) বড় বড় আশা রাখুন। আপনার বিশ্বাসের আয়তন যতখানি, ততটাই বড় হবে আপনার সাফল্যের আয়তন। ছোট ছোট লক্ষ্য স্থির করলে প্রাপ্তিও হবে যৎসামান্য। বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করুন, এই বড় লক্ষ্যকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে অগ্রসর হোন।
শিষ্টাচার-৭৩: শুধু নিজের কথা নয়, অন্যের কথাও ভাবুন: আমরা সবাই নিজের সুযোগ-সুবিধা, আরাম-আয়েশ, ভালো-মন্দ সবার আগে হিসেব করে নিই। তবে সেটা যদি জীবনের প্রতি ক্ষেত্রেই মাত্রাতিরিক্ত হয়ে যায় এবং অন্যর কথা না ভেবে শুধু নিজেরটাই বেশি বেশি ভাবতে থাকি, তাহলে তা বেশি স্বার্থপরতায় রূপ নেয়। মূলত নিজের সুবিধার জন্য অন্য কারো ক্ষতি করছি এটাই আসলে স্বার্থপরতা।
অনেক সময় মানুষ নিজেরটা এতটাই ভাবে যে, অন্যের কথা ভাবতে চায় না। নিজের সুবিধা আদায়ের জন্য সহকর্মী বা পাশের মানুষটিকে অন্যের কাছে ছোট করে, আঘাত করে। এই ধরনের স্বার্থপরতা ও সংকীর্ণতা মনে পুষে রাখবেন না। কারণ সময়ের স্রোতে স্বার্থপরতার ব্লাকহোলে আপনি হারিয়ে যাবেন। অন্যকে সাহায্য করুন। দাতা হোন, গ্রহীতা নয়।
ধরুন কেউ কোনো ভুল করে ফেলেছে। আর আপনি তখন তার সঙ্গে চোটপাট শুরু করলেন। তার ফোন রিসিভ করেন না বা ব্লক করে রাখেন। ফ্রয়েড বলেন, অপরের দোষ ত্রুটি সহ্য করতে না পারলে, কারো সঙ্গে তোমার সম্পর্ক গড়ে উঠবে না বরং যাদের সঙ্গে সম্পর্ক আছে তারাও পালিয়ে যাবে। অতি সহজ কথায়, আপনার হাত ততটুকু প্রসারিত করতে পারেন, তা যেন অন্যোর নাকে গিয়ে না লাগে।
শিষ্টাচার-৭৪: মূর্খ চাপাবাজরা সংঘবদ্ধ ও লজ্জাহীন। নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতার একটি বড় উৎস হলো মূর্খদের সংঘবদ্ধতা। মূর্খরা তাদের সীমিত জ্ঞান এবং ভুল ধারণাকে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রকাশ করে। সাইকোলজিতে এটিকে “উঁহহরহম-কৎঁমবৎ ঊভভবপঃ” বলে। অর্খাৎ যারা কম জানে, তারা নিজেদের যোগ্যতা বেশি মনে করে। ফলে মূর্খ চাপাবাজরা চেঁচামেচি করে কিছু বলে অন্যদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে চায়। অপরদিকে, জ্ঞানীরা প্রায়ই সাবধানে কথা বলেন। তারা নীরব বা সংযমী থাকেন।
তাই, গলাবাজী-চাপাবাজী এড়িয়ে চলুন। আপনার মাথায় অনেক পরিকল্পনা আছে, আইডিয়া আছে, অনেক বড় বড় লক্ষ্য আছে। কিন্তু কাজের বেলায় ঠন ঠন। আপনাকে শুধু বড় বড় বুলি আওড়াতে শোনা যায়। শুধু বলেন আগামীমাস থেকেই নেমে পড়বো। তারপর ফাটিয়ে দেব। আপনার এই আচরণে আপনার চারপাশের মানুষগুলো ধীরে ধীরে একটি জিনিস বুঝে ফেলছে। সেটা হচ্ছে, চাপাবাজের গলাবাজী। আপনাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। তাই আপনার কাছ থেকে কেটে পড়লেই ভালো। আপনি যখন বড় বড় পরিকল্পনার কথা বলেন, তখন আপনি চান তারা আপনার প্রশংসা করুক। কিন্তু মানুষ দেখে যে, সবকিছুই অন্তঃশ্বাস শূন্য ফাঁকা বুলি। তখন আপনার গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়। আপনাকে সবাই ফালতু ভেবে নেয়।
শিষ্টাচার-৭৫: টেনশন এমন বাতাস, যা যে-কোনো দিক থেকে হঠাৎ আাসতে পারে, যা এড়ানো সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে পরিস্থিতিকে মেনে নেয়া বুদ্ধিমানের কাজ। সবচেয়ে নিকৃষ্ট অবস্থাকেও যে মেনে নিতে পারে, তার হারাবার কিছুই থাকে না। সমস্যা চিরস্থায়ী নয়। মনে করলে দেখতে পাবেন বিগত দিনে আপনি অনেক বড় বড় সমস্যায় দিশেহারা হয়েছিলেন, ভয়ে আতঙ্কে জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছিলেন। সে সব সমস্যাগুলো কি এখন আছে? নিশ্চয়ই নেই। আজকের সমস্যাও আগামিকাল থাকবে না। তখন হয়তো নতুন সমস্যা দেখা দিবে। কাজেই সমস্যায় বিচলিত হবেন না। ভেঙ্গে পড়বেন না। সমস্যাকে ধৈর্যের সাথে মোকাবিলা করুন। সমস্যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তা সময়ের উপর ছেড়ে দিন। দেখবেন সেটা নরম হতে হতে সমাধানের নাগালে এসে যাবে। মোট কথা বাস্তবকে মেনে নিন। প্রত্যেক মানুষের অন্তত এমন একজন বন্ধু থাকা উচিত, যাকে মনের কথা বলে হালকা হওয়া যায়। রাগ উত্তেজনা কখনো মনে পুষে রাখতে নেই। এতে কষ্ট ও টেনশনের মাত্রা আরো বাড়বে।
শিষ্টাচার-৭৬: জীবনের উত্থান-পতন আসবেই। উত্থান-পতন মেনে নিয়ে লেগে থাকুন। সব সময় মনে রাখবেন আপনি আজ যে অবস্থায় আছেন তার থেকে অনেক খারাপ অবস্থায় আছে পৃথিবীর অনেক মানুষ। যদি আপনি কোনো একটি কাজে প্রচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন, তাহলে হতাশ না হয়ে বরং ভাবুন কি কারণে তা ব্যর্থ হলো? তাহলেই তা অন্য নতুন কোনো উপায়ে শুরু করা যায়। ভুল সংশোধন করে নতুন ভাবে পরিকল্পনা সাজিয়ে কাজ করতে থাকুন। জীবনে যত বেশি উত্থান-পতন হবে, আপনার লক্ষ্য ততই নিকটে আসার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।
আমরা যেমন মাছে-ভাতে বাঙালি, জাপানিরাও মাছে-ভাতে জাপানি। কিন্তু আমাদের সাথে জাপানিদের মূল পার্থক্য হল- তাদের লেগে থাকার ক্ষমতা আমাদের চেয়ে শতগুণ বেশি। আমরা ধরি আর ছাড়ি। কিন্তু জাপানিরা কোনো কিছু ১০০% আয়ত্ব আসা পর্যন্ত ছাড়ে না। কখনো হাল ছেড়ে দেবেন না। কারণ, আপনি জানেন না, আপনার লক্ষের কত কাছাকাছি ব্যর্থতাই সাফল্যে পৌঁছানোর পথ। সমস্ত সাফল্যের কাহিনীর সঙ্গে আছে ব্যর্থতার কাহিনীও। কিন্তু সফলতা লাভের পর ব্যর্থতা মানুষের নজরে পড়ে না। সবাই মনে করে লোকটি ভাগ্যবান।
শিষ্টাচার-৭৭: স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধু এবং সহকর্মীদের খুশি করতে সবাই বেশ অর্থ খরচে প্রস্তুত থাকেন। অথচ এটা অর্থহীন পয়সার অপচয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কারো জন্যে পয়সা খরচ করে বড় একটা উপহার কিনলে অল্প সময়ের জন্যে খুব ভালো লাগবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে নয়। অর্থকষ্টে না থাকতে চাইলে এসব অর্থ সঞ্চয় করে রাখুন। মানুষের অর্থনৈতিক জীবনটা অনেক বেশি বাস্তবিক। তাই হিসাব করে খরচ করতে হবে। প্রকৃতপক্ষে নিজের কাছে অর্থ থাকাটা পুরস্কারের মতো। এছাড়া অর্থ খরচ করেও কাউকে স্থায়ীভাবে তুষ্ট করা যায় না। বন্ধুত্ব ধরে রাখতে দামি উপহার প্রদান বা অর্থ খরচ করে দামি রেস্টুরেন্টে খাওয়ানো শেষ পর্যন্ত অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।
শিষ্টাচার-৭৮: রাজা ষোড়শ লুই ধনী গরিব নির্বিশেষে সবাই যাতে তার সভায় থাকেন, তিনি তা খেয়াল রাখতেন। সবকিছু খেয়াল করতেন। সব শ্রেণির মানুষ সভায় না থাকলে তিনি অসন্তুষ্ট হতেন এবং যাদের খুব কম দেখা যেতো তারা তার রোষে পড়তেন। তিনি তার কাছে আসার সমস্ত মানুষ জনকে আন্তরিকতা দিয়ে কাছে টেনে রাখতেন, কখনো কাউকে খবরদারি, কটু কথা বলা, রাগ দেখানো কিংবা অভদ্রতা দেখাতেন না। তিনি মনে করতেন, নিজেকে রক্ষা করার জন্য দুর্গ তৈরি করা আসলে আপনাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা। নিজেকে বিচ্ছিন্ন করার পরিবর্তে নিজেকে অন্যের কাছে মেলে ধরুন। নতুন নতুন বন্ধু করুন, নিজেকে আরো বিভিন্ন মহলে প্রবেশ করান। আপনি অন্যদের সঙ্গে যত মিশবেন, আপনি তত উদার ও সহজ হতে পারবেন।
আপনাকে যত্রতত্র যেতে হবে, বিভিন্ন মহলে ও বিভিন্ন ধরনের লোকের সঙ্গে মিশতে হবে। দেখা গেছে যেসব ব্যক্তি শৈশবে বাবার কর্মসূত্রে বা অন্য কারনে বিভিন্ন জায়গায় বেড়ে উঠেছেন, তারাই পরবর্তীতে সফলতা পেয়েছেন। যেসব ভাড়াটিয়া ঘুরে ঘুরে বাসা পাল্টিয়ে থাকেন, তাদের সন্তানরা বাস্তব ক্ষেত্রে হিরো হয়।
শিষ্টাচার-৭৯: জীবনটা রেস নয়, জীবনটা জার্নি! একটা নির্দিষ্ট বয়সের পরেই এদেশের ছেলেমেয়েদের একটা বড় অংশ বলতে থাকে: আমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবেনা। এখন আর বয়স নেই? অনেক সময় আমাদের এমনটা মনে হতে পারে। বাস্তবতা হল, লক্ষ্য পূরণ করা আসলে যেকোনো বয়সে সম্ভব।
আপনার বয়স ২০,বা ৯০ যাইহোক না কেন লক্ষ্য পূরণ করা নির্ভর করে আপনার মানসিক প্রস্তুতি, আগ্রহ এবং সঠিক কৌশলের ওপর, বয়সের উপর নয়। লিও তলস্তয় সাইকেল চালানো শিখেছিলেন ৬৭ বছর বয়সে, আর্টিস্ট পাবলো পিকাসো বিয়ে করেছিলেন ছিয়াত্তর বছর বয়সে। লিওনিদ হুরউইজ, ৯০ বছর বয়সে নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন! সবচেয়ে বেশি বয়সী যে মানুষটি এভারেস্টে উঠেছেন তাঁর নাম ইউকিরো মুইরা, ৮১ বছর বয়সে! হাল ছেড়ে দিবেন না।
সফলতার মার্কশিট বলে কিছু নাই। যদি থাকতো তাহলে ড্রপ আউট স্টুডেন্ট ইলন মার্কস, মার্ক জুকারবার্গ,বিল গেটসরা বিশ্বের সেরা ধনী হতেন না। লক্ষ্য পূরণ করতে সঠিক মানসিক প্রস্তুতি, আত্মবিশ্বাস এবং ধারাবাহিক পরিশ্রমের মাধ্যমে আপনি যেকোনো বয়সেই সফল হতে পারবেন। বয়স একটা সংখ্যা মাত্র।
শিষ্টাচার-৮০: যখন কোনো মানুষ কোনোকিছু করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে অনর্ববরত চেষ্টা করতে থাকেন, তখ্ন অসুবিধা যাই থাকুক, তিনি সফল হবেনই। ক্ষমতার জগতে আপনার অন্য লোকের সাহায্য দরকার হবে, যাঁরা আপনার থেকে বেশি ক্ষমতাবান। তাদের সঙ্গে নিজেকে সম্বন্ধযুক্ত করুন। যদি আপনি একটি উপযুক্ত ক্ষমতার উৎস খুঁজে পান, তার সঙ্গে নিজেকে সম্বন্ধযুক্ত করুন।
কখনো কিছু পাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করবেন না। সব সময় ধৈর্যশীল হোন, দেখবেন যে, সবকিছু একসময় আপনার নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। এই সঠিক সময় নিরূপণের জন্য পরিস্থিতির ভাব শুঁকে উপযুক্ত সময় বের করুন, সেটা আপনাকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করবে। যখন সময় হয়নি তখন পিছনে সরে যাওয়া আয়ত্ব করুন এবং অপেক্ষা করুন। যখন সময় ও সুযোগ একবিন্দুতে আসবে, তখন হিংস্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ুন। যে সাফল্য ধীরে ধীরে গড়া হয় একমাত্র তাই টিকে থাকে।
শিষ্টাচার-৮১: নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করুন, গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবেন। যে হীনম্বন্যতায় ভোগে, তার যতই যোগ্যতা থাক, সে তুচ্ছ নগণ্যই রয়ে যায়। কারণ মনের অবস্থা থেকেই ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়ার উৎপত্তি হয়। কেউ নিজেকে তুচ্ছ মনে করলে, সে অনুরূপ হতে বাধ্য। তাই নিজেকে যে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে না, সে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পার না, গুরুত্ব পায় না।
আপনি গভীরভাবে যা বিশ্বাস করেন, আপনার অবচেতন মন সেই বিশ্বাসকে সফল করার জন্য আপনার শরীর এবং মস্তিষ্ককে দিয়ে এক ধরণের স্বয়ংক্রিয় কাজ করিয়ে নেয়। এট কে বলে অবচেতন মনের ‘কাইনেটিক এ্যাকশন’। যেমন, আপনি হয়তো রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন, হঠাৎ একটি বিজ্ঞাপনের দিকে আপনার নজর গেল, যা আপনার জন্য খুব প্রয়োজন ছিল। এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়; এটি আপনার অবচেতন মনের ‘কাইনেটিক এ্যাকশন’ যা আপনার চোখকে সঠিক দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে।
‘কাইনেটিক এ্যাকশন’ সবসময় যে ইতিবাচক হবে তা নয়। যদি কেউ অবচেতন মনে সারাক্ষণ রোগ, ভয় বা ব্যর্থতার চিন্তা লালন করে, তবে অবচেতন মন সেই নেতিবাচক নির্দেশকেই কার্যকর করতে শুরু করে। একে বলা হয় ‘সাইকোসোম্যাটিক’ প্রভাব। যেমন- আপনি যখন খুব ভয়ের কিছু ভাবেন, তখন আপনার হার্টবিট বেড়ে যায় বা হাত ঘামতে শুরু করে।
তাই, বারবার ইতিবাচক কথা ভাবুন। যেমন, “আমি সুস্থ এবং আত্মবিশ্বাসী।” এই শব্দগুলো অবচেতন মনে কম্পন সৃষ্টি করে এবং ধীরে ধীরে কাইনেটিক এ্যাকশনে রূপান্তরিত হবে। মনে রাখবেন, আপনার অবচেতন মন একটি উর্বর জমি, সেখানে আপনি যা বপন করবেন, কাইনেটিক এ্যাকশনের মাধ্যমে প্রকৃতি আপনাকে ঠিক তাই ফিরিয়ে দেবে।
আপনার ইতিবাচক চেহারাটা আপনার সঙ্গে কথা বলে এবং অন্যদের সঙ্গেও কথা বলে। মানুষ আপনার ইতিবাচক চেহারা দেখেই আপনার মূল্যায়ন করে। অর্থাৎ আপনাকে মূল্যায়নের প্রথম ভিত্তি আপনার ইতিবাচক চেহারা ও পোশাক। আর প্রথম দর্শনে যে ধারণাটা সৃষ্টি হয় তা-ই সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হয়।
শিষ্টাচার-৮২: একটি ছোট দলে নিজের সামাজিক পরিবেশ সীমিত রাখলে তা নিরস, বিরক্তিকর, একঘেঁয়ে হয়ে যায়। নতুন বন্ধুত্ব গড়তে নতুন নতুন সংগঠনে যোগ দিন, আপনার সামাজিক পরিধি বিস্তৃত করুন। তাছাড়া, যে কোনো জিনিসের মতই মানুষের বৈচিত্রতা জীবনে নতুন স্বাদ আনে, নতুন বন্ধুত্বের মাধ্যমে জীবনকে ব্যাপক দিশা দেয়, মনের রসদ জোগায়। যত বেশি বন্ধুত্ব গড়ে তুলবেন, ততই বেশি উপরে ওঠার সম্ভাবনা থাকবে। আর সবার প্রিয় হয়ে উঠলে নিজেকে উপরে তোলাও সহজ হবে। এমন কিছু বন্ধু তৈরি করুন যাদের মতামত আপনার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভিন্ন ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করুন। বিপরীতমুখীদের সঙ্গে আলাপ করুন। তবে লক্ষ্য রাখবেন এরা সবাই যেন সম্ভাবনাময় বিচক্ষণ ব্যক্তি হয়।
শিষ্টাচার-৮৩: যে বন্ধু বৎসল তার বন্ধু ভাগ্য হবেই। যদি আপনি বন্ধুত্ব গড়ে তোলার দায়িত্ব অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেন, তাহলে সম্ভবত আপনার বেশি বন্ধু জুটবে না। নতুন বন্ধুত্ব পাতানোর তিনটি উপায়: ১. যে কোনো জায়গায়, যে কোনো সময় সুযোগ পেলেই নতুন লোকের সঙ্গে আলাপ করুন। প্রথমে আপনার নাম এবং কোথায় থাকেন, এখানে কি কাজ তা সংক্ষেপে বলুন।
২.লক্ষ্য রাখবেন, অন্যজন যেন আপনার নামটা স্পষ্ট শুনতে ও বুঝতে পারে এবং লক্ষ্য রাখবেন, আপনি যেন অন্যজনের নামটা তারই মতন করে উচ্চারণ করেন। তারপর তাকে কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দিন। কোথায় থাকে? কোন কাজে এসেছে কিনা? ইত্যাদি। এরপর সামান্য প্রশংসা করুন। যেমন তার জামাটা খুব সুন্দর, তাকে দেখতে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে কিংবা তার কিছু কোনো স্বভাব আচরণ ইত্যাদি। ৩. কোনো বাক্য শেষ করে চুপ হয়ে যাবেন না। অতিরিক্ত কিছু বলুন। তাকে তার মতামত, মন্তব্য, কৃতিত্ব সম্বন্ধে বলার সুযোগ দিন। ইজি হলে তার ঠিকানা ও ফোন নম্বর চেয়ে নিন।
শিষ্টাচার-৮৪: ভেড়ার পালে একটা নেতা থাকে। ভেড়ারা নেতাকে এমন অন্ধভাবে অনুসরণ করে, নেতা যদি নদীতে ঝাঁপ দেয়, তাহলে অন্যান্য ভেড়ারা কোন বিকল্প চিন্তা না করেই তাকে অনুসরণ করে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়বে। ইংরেজিতে একটা শব্দ আছে “শীপল” (Sheeple)। শীপ এবং পিপল-এর সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে এই শব্দটি। যে মানুষ ভেড়ার মতো আচরণ করে,তাকেই শীপল বলা হয়। বিশেষ করে একজন মানুষ যখন কোন ব্যক্তি বা মতবাদকে অন্ধভাবে অনুসরণ করে, কোন চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই, সন্দেহাতীত বা প্রশ্নাতীতভাবে উক্ত ব্যক্তি বা মতবাদের নির্দেশনা মান্য করে বা অনুসরণ করে, তাদেরকেই শীপল বলা হয়।
বাংলাদেশে দুই ধরণের শীপল-এর সংখ্যাধীক্য লক্ষ্য করা যায়। নাম্বার ওয়ান- ধর্মীয় শীপল এবং নাম্বার টু- রাজনৈতিক শীপল! ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক শীপল-এর মিশ্রণও আর এক ধরনের শীপল আছে। তবে কেউ যদি নিজে শীপল হয়ে থাকেন, তাহলে অন্যান্য শীপলদের উপস্থিতি সে টের পায় না। পড়াশুনার কারণে বিশ্বের অনেক দেশে শীপলদের সংখ্যা দিন দিন কমছে, আর বাংলাদেশে বাড়ছে।
প্রতিটি মানুষের নিজস্ব মাথা আছে। নিজের ব্রেনকে কাজে লাগিয়ে মানুষ অন্যের মতামত, চিন্তা বা সিদ্ধান্তকে বিচার-বিশ্লেষণ করতে পারে, চ্যালেঞ্জ করতে পারে, ভিন্নমত পোষণ করতে পারে। কিন্ত,মানুষ তা না করে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক নেতাদের অন্ধভাবে অনুসরণ করে। আপনার ব্রেনটিকে কাজে লাগান। চিন্তা করুন, গবেষণা করুন, প্রশ্ন করুন, প্রশ্নের উত্তর জানার চেষ্টা করুন! তখন দেখতেই পাবেন আপনার চারপাশে শীপলদের উপস্থিতি কত ভয়াবহ!! একটা কলম না লিখলেও সক্রেটিসকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী বলা হয়। কারণ প্রশ্ন ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তকে তিনি মেনে নিতেন না। সবকিছুতে সে প্রশ্নের পর প্রশ্ন ছুড়ে দিতেন।
নিজের ভুলত্রুটিগুলোকে নিজে ধরতে পারা এবং নিজেকে নতুনভাবে পরিচালনা করার যে ক্ষমতা, তাকে মনোবিজ্ঞানে বলা হয় ‘মেটাকগনিশন’। অর্থাৎ আপনি ভুল করছেন কি-না, তা বুঝতে পারা এবং কাজটি কীভাবে করবেন, সে সম্পর্কে আপনার নিজস্ব ধারণা বা সচেতনতা থাকা।
মনোবিজ্ঞানী জন ফ্লাভেল বলেন, ধরুন আপনি পড়তে বসে বারবার মোবাইল ফোনের দিকে তাকাচ্ছেন। মনে হচ্ছে আমার আজ পড়তে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু আপনি যদি ‘মেটাকগনিশন’ ব্যবহার করেন, তবে আপনি প্রশ্ন করবেন যে, আমি কেন বারবার ফোন ধরছি। তখন আপনি বুঝতে পারবেন যে, আসলে পড়ার অধ্যায়টি কঠিন লাগছে বলেই আপনার মন ফোন দিয়ে নিজেকে আড়াল করতে চাইছে। এই সত্যটি বুঝতে পারার সাথে সাথেই আপনি ফোনটি দূরে রেখে পড়ার সহজ অংশ দিয়ে আবার শুরু করতে পারবেন। এভাবে নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করা, বিষণ্ণতা থেকে মুক্তি পাওয়া এবং যেকোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এই ক্ষমতার সঠিক ব্যবহার আপনাকে সাধারণ থেকে অসাধারণ করে তুলবে। অর্থাৎ নিজের ক্রুটিকে বুঝে নিজেকে সংশোধন করে নতুনভাবে কাজ করার‘ মেটাকগনিশন’ ব্যবহার করতে হবে।
শিষ্টাচার-৮৫: কারো ইচ্ছায় হউক, অনিচ্ছায় হউক’ কোটি কোটি মানব সন্তান জন্ম নিয়েছে পৃথিবীতে। কিন্তু এ মানব সন্তানগুলো জন্মের সময় জন্মস্থান কিংবা জন্মদাতা বেঁছে নেবার সুযোগ কি পেয়েছিল? যারা জন্ম নিয়েছে পৃথিবীর দুর্বল জন্মদাতার অধীনে, তারা অন্য সবল মানবের নিষ্ঠুরতার স্বীকার হয়ে করুন জীবন-যাপন করছে। কেউ চুরি কছে, কেউ দাসত্ব করছে, কেউ সঠিক শিক্ষা না পেয়ে কট্টরপন্থী কিংবা কেউ সাধারণ শ্রমিক; এরা সবাই সুবিধাবঞ্চিত মানব সন্তান। আমরা শুধু আমাদের সন্তানদের সুবিধার কথা ভেবেছি, আর অন্যদের বঞ্চিত করে চলেছি। এটা চরম অমানবিকতা।
এই মুহূর্তেও আপনার চারপাশে লক্ষ লক্ষ মানুষ জন্মের পরই শাস্তি পেয়ে বসে আছে Ñ শুধু কোথায় জন্মেছে, সেই অপরাধে। তাদের কণ্ঠ আমরা শুনতে পাই না, তাদের মুখ আমরা দেখতে পাই না বা চাই না। শুধু ভুল মানুষের ঘরে জন্মেছে বলেই জন্মের পর থেকে তারা শাস্তি পাচ্ছে। তারা সকল কিছু থেকে সুবিধাবঞ্চিত। তাই তাদের প্রতি সহানুভুতি রাখাটাই আমাদের সবচেয়ে বড় মানবিকতা।
আপনি যে-ই হোন, যেকোন মুহুর্তে পৃথিবী থেকে আপনাকে বিদায় নিতে হবে এবং এ পৃথিবীতে আপনি আর আসতে পারবেন না। ফলে অজস্র টাকা আর মরিচিকার পিচনে ছুটে জীবন শেষ করে বোকারাই। জ্ঞানীরা অন্যের সাথে শেয়ার করে জীবন উপভোগ করে; অন্যকে ভাল রাখার মাধ্যমে নিজে ভাল থাকার চেষ্ঠা করে। স্বার্থপররা নিজের শুক্র কিটের বাইরে কিছুই বুঝতে চায় না, এমনকি নিজের মেয়েদেরকেও বঞ্চিত করে ছেলেদের পেট বাড়ায়। এই অসভ্য সংকীর্ণমনা মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে, আপনি পশুদের কাতারে থাকবেন, মানুষ নয়।
শিষ্টাচার-৮৬: কেউ যত ভাল মানুষ হোক বা যত ভালো মেয়েকে বিয়ে করোক না কেন, তার খুঁত থাকবেই। সঙ্গীর খুঁতের দিকে তাকিয়ে থাকলে, তার যোগ্যতাকে কখনো দেখতে পাওয়া যায় না। সঙ্গীর অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলে, বর্তমান জীবনকে হারাতে হয়। অন্যের কারো জৌলুসকে সুখ ভেবে নিয়ে, নিজের সম্পর্ককে অসুখের আখড়ায় পরিণত করা যাবে না। সম্পর্ক হলো একটি গাছের চারা, যাকে নিয়মিত পরিচর্যা করলে একটি ফলদায়ক গাছে পরিণত হবে; পরিচর্যা না-করলে, ধুঁকতে-ধুঁকতে, দ্রুতই মরে যাবে।
সম্পর্কের টানাপরনে কারো উপর জোর করে অধিকার আদায়ের চে'ষ্টা করবেন না। মনোবিজ্ঞানের দৃ'ষ্টিতে, যখন আমরা কারো ওপর আমাদের অধিকার চাপিয়ে দিতে চাই, তখন আমরা অজান্তেই সেই মানুষটিকে আরও দূ'রে ঠেলে দিই। এক্ষেত্রে নিরবতা সবচেয়ে বেশি কার্যকরী। চুপ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া কোনো দুর্বলতা নয়। বরং এটি আপনার আত্ম'সম্মানবোধের বহিঃপ্রকাশ। জোর করে কারো জীবনে নিজের জায়গা তৈরি করার চেয়ে সম্মানের সাথে, সেখান থেকে প্রস্থা'ন করা অনেক বেশি শ্রেয়। এতে অন্তত আপনার মানসিক শান্তি বজায় থাকে। যা আপনার হওয়ার তা এমনিতেই হবে;তার জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি'র প্রয়োজন পড়ে না। যারা আপনাকে ভালোবাসে বা সম্মা'ন করে, তারা কখনোই আপনাকে অধিকার দেখাবে না, বরং নিজ থেকেই আপনার প্রাপ্য মর্যাদা বুঝিয়ে দেবে।
আবার আর এক ধরনের মানুষ আছে, সে বা তারা আপনার উপর অধিকার ফলাবে না, বা সরাসরি অবহেলাও করবে না, বরং তারা আপনাকে অতিরিক্ত কেয়ার দিয়ে আপনার নিজের সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাটুকু নষ্ট করে দেবে। তারা আপনার সব ছোটখাটো সিদ্ধান্ত নিজে নিতে শুরু করবে; আপনি কি পরবেন, কি খাবেন, কার সাথে কথা বলবেন, কোথায় যাবেন ইত্যাদি সব। আপনি ভাববেন এটা ভালোবাসা, কিন্তু আসলে এটি আপনার আত্মনির্ভরশীলতা কেড়ে নেওয়ার প্রথম ধাপ। সে বা তারা আপনাকে অবচেতনভাবেই বিশ্বাস করাবে যে, "তুমি নিজে কোনো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না, আমি না থাকলে তুমি শেষ হয়ে যাবে।" এক সময় আপনি নিজের ভালো লাগা বা খারাপ লাগার জন্যও তাদের মুখাপেক্ষী হয়ে পরবেন। তারা মুখ ফিরিয়ে নিলে আপনার পুরো পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যাবে।
যে ভালোবাসা আপনাকে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে ভয় পাওয়ায়, তা কোনো ভালোবাসা নয়, তা এক অদৃশ্য শিকল। তারা আপনার ডানাগুলো কেটে দিচ্ছে, যাতে আপনি কখনো তাদের খাঁচা থেকে উড়ে যেতে না পারেন।
শিষ্টাচার-৮৭: অর্থের পেছনে ছুটতে থাকা একটা অনন্তকালের যাত্রা। ছুটতেই থাকো, ছুটতেই থাকো। প্রতি মুহূর্তে নতুন নতুন চাহিদারা তাড়িয়ে বেড়াবে। প্রতিনিয়ত গন্তব্যটা আরো একটু করে দূরে সরে যাবে। ক্যারিয়ারের সিঁড়িটাও বোধহয় অমন। উঠতে উঠতে কোনো একদিন ভীষণ ক্লান্ত লাগবে। একদিন থামতে হবে। এরপর মনে হবে, এই ভয়ংকর প্রতিযোগিতায় কি পেলাম আর কি হারালাম। তাই জীবনে অর্থ ও ক্যারিয়ার-এর পিছনে জীবন শেষ করবেন না। অতিরিক্ত অর্থ আপনাকে অহংকারী ও বিচ্ছিন্ন করে তুলবে। আপনি যত বিলাসবহুল জীবনযাপন করবেন ততবেশি দূষণে আপনার শরীর ব্যাধিতে ভরে উঠবে। দেখা দেবে নানা লাইফস্টাইল অসুখ।
প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ সবচেয়ে যে ক্ষতিটা করবে, মানুষের সঙ্গে সুস্থ স্বাভাবিক সম্পর্ক নষ্ট করে দেবে। দৃষ্টিভঙ্গি এমনভাবে আচ্ছন্ন করবে যে মনে হবে টাকা দিয়ে আপনি সবই কিনতে পারেন। আপনার ধারণা হবে একমাত্র আপনিই এ পৃথিবীতে যোগ্যতম ব্যক্তি। আপনার চেয়ে অপেক্ষাকৃত গরিব লোকদের সাথে সম্পর্ক এড়িয়ে চলতে চাইবেন ।
শিষ্টাচার-৮৮: ইদুঁরের কলোনির উপর পরীক্ষা-নিরীক্ষার উপর ভিত্তি করে মানব সভ্যতাকে বোঝার চেষ্টা করেন বিজ্ঞানীরা। যা 'ইউনিভার্স ২৫' নামে বিখ্যাত। এতে ইদুঁরের জন্য একটি 'আদর্শ দুনিয়া' নির্মাণ করেন বিজ্ঞানীরা। সেখানে ইঁদুরেরা থাকবে এবং বংশবৃদ্ধি করবে। যাকে ইদুরের স্বর্গও বলা যায়। অঢেল খাবার, পানি ও থাকার জন্য প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জায়গা। শুরুতে সেখানে তিনি চার জোড়া ইঁদুর রাখা হয়, যেগুলা অল্প সময়ের মধ্যে বংশবৃদ্ধি শুরু করে। অবাক করা ব্যাপার হল, ইঁদুরদের সেই স্বর্গে মাত্র ৩১৫ দিন পরেই বংশবৃদ্ধির হার কমে যায়। যখন ইঁদুরের সংখ্যা বেড়ে ৬০০ তে পৌছালো, তখন সেখানে দুটি জাত তৈরি হয়; ভালো ও 'বিকৃত'। এরপর থেকে দূর্বল ইঁদুরগুলো সবলদের আক্রমণের শিকার হয় এবং কোণঠাসা হয়ে পড়ে'।
নারী ইঁদুররা বেশি সন্তান জন্ম দেবার পরিবর্তে জন্ম নেয়া সন্তানদের প্রতি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠে এবং জন্মহার ক্রমেই কমতে শুরু করে। পুরুষদের মাঝে একটি নতুন জাতের ইঁদুরের উৎপত্তি হয়, যারা বংশবৃদ্ধির জন্য 'লড়াই' করতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা শুধু খাদ্য ও ঘুম নিয়ে তারা ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বিজ্ঞানী জন ক্যালহোনের মতে, আগামীতে সমৃদ্ধ মানব জাতীর জন্য দুটি ধাপ আসছে। 'প্রথমত হচ্ছে জীবন অর্থহীন হয়ে পড়া এবং বংশবৃদ্ধি ও সন্তান প্রতিপালনের প্রতি অনিহা। 'দ্বিতীয়্ত হচ্ছে মৃত্যু'। কারণ সমৃদ্ধির পরিণাম হচ্ছে মৃত্যুর দিকে দ্রুত যাত্রা। তাই স্টিভ জবসের সেই বিখ্যাত সূত্র সবসময় মেনে চলুন, "ক্ষুধার্ত থাকুন ভালো থাকুন।"
শিষ্টাচার-৮৯: জীবনসঙ্গী বা সন্তানকে কিংবা আত্মীয়-স্বজন বা অধীনস্থ কাউকে আড়ালে বা সবার সামনে ছোট করা, বকাবকি করা, তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা, কোনো কিছু নিয়ে প্রশ্ন তোলা, চিৎকার-চেঁচামেচি করা, খোঁটা দেয়া, অবিশ্বাস করা, অপমান বা অসম্মান করাটাকে ‘গ্যাসলাইটিং’ বলে। এটা এক ধরনের মানসিক অত্যাচার। কারো সামনে কিংবা বেডরুমের মধ্যে এভাবে যে কাউকে, সঙ্গী বা সন্তানকে লজ্জা দিলে বা অপমান করলে, তাদের, আত্মবিশ্বাস, মনোবল একেবারে তছনছ হয়ে ভেঙ্গে যায়। ফলে ভিকটিম নিজেকে অসহায়, দুর্বল, অযোগ্য ও ব্যার্থ মানুষ ভাবতে শুরু করে এবং ক্রমেই, তার মানসিক ট্রমা বেড়ে যায় এবং সে মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকেন। কাজেই কাউকে নিয়ে হাসাহাসি করবেন না। কাউকে হেয় করবেন না।
কারো মুখের উপর অভিযোগ বা ধমকের সুরে কথা বলবেন না যে, ‘তুমি কী বোঝো? চুপ করো’, ‘মেয়ে মানুষ মেয়ে মানুষের মতো থাকো’ ‘এটা কোরো না’, ‘এখানে যেয়ো না’, ‘অমুকের সঙ্গে মিশবে না’, ‘এ ধরনের পোশাক পরবে না’ ইত্যাদি কথা প্রতিনিয়ত শুনতে শুনতে হীনম্মন্যতায় ভুগতে থাকা মানুষটি ভিতরের আশা-আকাঙ্ক্ষা, পছন্দ-অপছন্দ, ইচ্ছা-স্বাধীনতা সব মরে যায়।
দাম্পত্য জীবনে দুজনই পরস্পরকে গ্যাসলাইটিং করতে গিয়ে পরস্পরের গতিবিধির ওপর নজর রাখেন, বারবার ফোন করেন। ফোন করার সঙ্গে সঙ্গে ফোন না ধরলে কৈফিয়ত চাওয়া,ফোনে একবার না পেলে বারবার ফোন করা, গোপনে টাকা সরানো, কল লিস্ট চেক করা,্ম্যাসেজ চেক করা, ফেসবুক পাসওয়ার্ড জানতে চাওয়া, বিকৃত নামে ডাকা ইত্যাদি হচ্ছে ‘গ্যাসলাইট আচরণ।’ পরিবারে কেউ যদি গ্যাসলাইটিংয়ের শিকার হন, সেটা শিশু ও অন্যান্যদের ওপরও খুব নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আর এতদল 'হ্যাসলার' মানুষ আছেন, যারা আপনার জীবনে প্রতিনিয়ত মানসিক চাপ বা ঝামেলার সৃষ্টি করে। জীবনে যত বেশি এ ধরণের বিরক্তিকর মানুষ থাকবে, আপনার শরীর তত দ্রত আপনি বুড়িয়ে যাবেন। যদি এই বিরক্তিকর মানুষটি আপনার পরিবারের কোনো সদস্য হন, তবে তার প্রভাব আপনার শরীরের ওপর সবচেয়ে বেশি পড়ে। কারণ পরিবারের সদস্যদের সাথে মানসিক টানাপোড়েন দীর্ঘস্থায়ী হয়।
শিষ্টাচার-৯০: ধনী-গরিব হওয়াটাতে আপনার হাতে নেই। কিন্তু মনটা সমৃদ্ধ করে তোলা একেবারেই সম্ভব। সেটা আপনারই হাতে। দারিদ্রকে সবার আগে তাড়াতে হবে মনের ভেতর থেকে। রাজার মতো আচরণ করুন। তবে রাজার মতো বিলাসিতা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের রয়েল সোসাইটির অধীনে স্পেন্ট নামক একটি গেম পরিচালিত হয়। এটির মাধ্যমে ধনী পরিবারের সন্তানদেরকে এমন একটি পরিস্থিতিতে ফেলা হয়, যেখানে তাকে একজন অতি দরিদ্র ব্যক্তি হিসাবে এক মাস বেঁচে থাকতে হয়। খাবারের কষ্ট, থাকার কষ্টসহ একজন দরিদ্র ব্যক্ত্রি প্রতিদিন কি অবস্থার মধ্য দিয়ে দিন-রাত কাটে, কত পরিশ্রম করে তা তাকে ভোগ করতে হয়। যেমন, পাথর ভাঙ্গা, মাটি বা গাছ কাটা, খোলা মাঠে ঘুমানো, শাকপাতা সিদ্ধ করে খাওয়া ইত্যাদি। কিন্তু এই গরিব অবস্থায় তার আচরণ যদি রয়েল ফ্যামিলির মানুষের মত বজায় থাকে; রাগ,দুঃখ,হতাশা বা দারিদ্রতা সুন্দরভাবে ম্যানেজ করতে পারে, তবেই সে উপযুক্ত সার্টিফিকেট পায়; যা তার রয়েল ফ্যামিলিতে গেইট বা সিঁড়ির সঙ্গে ঝুলানো থাকে। কাজেই গরিব হোন কিন্তু গরিবের মতো আচরণ করবেন না। অল্প খাবেন, কিন্তু পরিবেশনটা হবে আর্টিস্টিক; সিম্পল সাদামাটা পরেন, কিন্তু জামা হবে পরিচ্ছন্ন ও ম্যাচিং করা; অল্প কথা বলেন, কিন্তু প্রতিটি শব্দ হবে স্পষ্ট, ধীরে এবং চিন্তা করে।
শিষ্টাচার-৯১: সাধারণত মানুষের ক্ষমতা ও অর্থবল বেড়ে গেলে তার অপরিকল্পিত কাজ ও অপচয় বৃদ্ধি হয়। সোজা বাংলায় বলে অতি বাড় বাড়া। গরিব যদি ধনী হয়ে উঠে তাহলে তারা পুরনো বন্ধু-বান্ধব পরিচিতদের ধীরে ধীরে চিনতে পারে না। ক্ষমতায়িত লোকেরা তার চেয়ে বেশি ক্ষমতাবানদের সাথে মেশে। গণতান্ত্রিক সুশীল নেতা বা নেত্রীও একচ্ছত্র ক্ষমতা পেলে স্বৈরাচারিতে পরিণত হয়। কিন্তু দিন শেষে রাত আসে। বহু জাদরেল অফিসার রিটায়ার করার পর সাপ থেকে কেঁচোয় পরিণত হন। নামের আগে যতক্ষণ না একটা এক্স বা প্রাক্তন বসছে, ততক্ষণ আর তিনি এ পৃথিবীর মানুষ থাকেন না। প্রতিবেশির যখন টাকা-পয়সা বেশি নেই, তখন তিনি আপনাকে দাদা বলে ডাকবেন। যেই তাঁর অবস্থান ভাল হবে, অমনি দাদার বদলে গাধা বলবেন। যার যত অর্থ জমে, তার তত স্বার্থ বিনাশ হয়। ক্ষমতায়িত ব্যক্তি তার কাজকর্মের জন্যই প্রতিদিন শত্রু তৈরি করে। এই শত্রুরা তার পতন ডেকে আনে। যখন অর্থ যশ একনাগারে চলতে থাকে; তখন নিজেকে কন্ট্রোল করতে শিখতে হয়। কোথায় থামতে হবে তা উপলব্ধি করতে হয়। অতিরিক্ত আশা, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং অতিরিক্ত কল্পনা এই ৩টি ইমোশন সবসময় ছেঁটে নিন। নয়তো আপনাকে স্থায়ীভাবেই থেমে যেতে হবে।
শিষ্টাচার-৯২: বিভিন্ন সংস্কৃতি মিলেমিশে একটি বৃহত্তর সম্প্রদায় গড়ে তুলুন। ব্রিটিশ নাট্যকার জাংউইল-এর ‘দ্য মেন্টিং পট’ নামের নাটকে মূলত অভিবাসী সম্প্রদায়গুলো একত্রিত হওয়ার মাধ্যমে একটি নতুন জাতির উদ্ভবের কাহিনী বলা হয়। ‘মেন্টিং পটে’ বিভিন্ন ধরনের ধাতুকে একত্রে রাখা হয় এবং তারপর উত্তপ্ত করে গলানো হয়। এই উত্তাপে প্রতিটি ধাতু তার নিজস্ব গঠনতন্ত্র হারিয়ে ফেলে এবং অন্য ধাতৃগুলোর সঙ্গে মিশে একটি একক সমন্বিত ধাতু তৈরি করে। এই নীতি অনুসরণ করে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে সেখানে বিভিন্ন জাতি, সংস্কৃতি এবং ধর্মের মানুষ একত্রে মিশে একটি অভিন্ন সামাজিক পরিচয় তৈরি করেছে। মেন্টিং পটের মাধ্যমে একটি বহুমুখী, সহনশীল এবং সংহত সমাজ গড়ে ওঠে, যেখানে সকল সংস্কৃতি মিলেমিশে একটি বৃহত্তর সম্প্রদায়ের জন্ম হয়। এতে মুক্তভাবে মত বিনিময়ের সুযোগ থাকায় নতুন আইডিয়া এবং উদ্ভাবনের জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে, যা প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, সাহিত্য এবং শিল্পকলায় বিপ্লব ঘটিয়েছে। এই জন্যই যুক্তরাষ্ট্র সকলের কাছে এখনো স্বপ্ন পূরণের দেশ হিসেবে পরিচিত। আপনার পরিবার ও পরিবেশের চারপাশে এমনিভাবে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ সম্প্রদায়, ধনী-গরীব, বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের সংমিশ্রণে নতুন একটি সমাজ তৈরি করুন। মনে রাখুন, শুধু মিষ্ঠি খেয়ে আপনি বাচতে পারবেন না; টক, ঝাল, তিতা বা নোনতাসহ সর্বভুক হতে হবে, তবেই শরীর সকল ভিটামিন, প্রোটিন মিনারেলসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন খাদ্য উপাদান পাবে।
শিষ্টাচার-৯৩: পরিবর্তন জীবনের অনিবার্য গতি। আপনি কিছুদিন তার গতিরোধ করতে পারেন, কিন্তু চিরদিন পারেন না। পরিবর্তনের বিরোধিতা করলে পরিবর্তনের ঝড়ে ও বৃষ্টিতে আপনি ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবেন। পরিবর্তনের পক্ষে থাকুন। নতুন ভাবনা-চিন্তা উপেক্ষা করবেন না। একসময় যা প্রাসঙ্গিক ছিলো আজ তার প্রাসঙ্গিকতা নেই।
বয়স্ক মানুষ কখনো কোনো পরিবর্তন হয় চায় না। পরিবর্তন করতে চাইলে কম বয়সি ও যুবকদের মধ্য দিয়ে করতে হয়। কনফুসিয়াস বলেছিলেন— পুরুষের সবচেয়ে খারাপ এবং বোকামীর দিক হলো সে সহজে পরিবর্তন মেনে নেয় না। এক সময় নোকিয়া ছিল মোবাইল বিশ্বের রাজা; কোডাক ছিল ফটোগ্রাফির সম্রাট; ব্লকবাস্টার ছিল বিনোদন জগতের বিশাল শক্তিশালি নাম। তারা কেন হারিয়ে গেল? কারণ তারা পরিবর্তনের সাথে নিজেকে আপডেট করেনি। ভবিষ্যৎ তাদেরই হয়, যারা পরিবর্তনকে ভয় না পেয়ে গ্রহণ করতে শিখে।
নেটওয়ার্ক গড়ে তুলুন। নেটওয়ার্ক আপনাকে নতুন নতুন সুযোগ এনে দিবে, কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আপনার উন্নতি হবে তা ভাবুন, তাদের সাথে ধীরে ধীরে নিজেকে কানেক্ট করুন। প্রশিক্ষণ, ইভেন্ট, সেমিনার, কর্মশালা ইত্যাদিতে অংশগ্রহন করুন। এখান থেকে সমমনা মানুষদের সাথে পরিচিত হবার সুযোগ পাবেন।
এক খণ্ড হীরার কথা চিন্তা করুন। মাটির নিচে হাজার হাজার বছর চাপা থাকলেও, তার মূল্য কমে যায় না এবং মানুষ তার মূল্য বুঝতে পারে না; যে পর্যন্ত না সেটি মানুষের হাতে আসে! একইভাবে আপনার প্রতিভা যত বড়ই হোক, যদি নেটওয়ার্ক না থাকে, যদি মানুষ তা দেখতে না পায়; তাহলে সেই প্রতিভার বাজারমূল্যও তৈরি হবে না।
তাই দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ নিন। সঠিক প্রশিক্ষণ আপনাকে নতুন জ্ঞান অর্জন, কাজের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে সহায়তা করবে। নিজের দুর্বলতাকে উন্নতির সুযোগ চিহ্নিত করুন। বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আপনার অজানা বিষয়ের উপর অসংখ্য ফ্রি কোর্স আছে, যা ঘরে বসেই শেখা যায়। প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর তা ধরে রাখার জন্য নিয়মিত অনুশীলন করুন। স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ করে নেটওয়ার্ক তৈরি করুন এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করুন।
শিষ্টাচার-৯৪: চেনাজানা নিরীহ মানুষ, ভিড়ের মধ্যে হয়ে যায় এক অচেনা মানুষ। মানুষ একলা একরকম আচরণ করে আর যখন সে ভিড়ের মধ্যে যায়, তখন তার আচরণ হয় অন্য রকম। স্তাভ লে বঁ নামের ফরাসি পণ্ডিতের ‘দ্য ক্রাউড: আ স্টাডি অব দ্য পপুলার মাইন্ড’ নামে বইতে (১৮৯৫ সালে) প্রথম ভিড় করা মানুষের এই মনস্তত্ত্ব তুলে ধরা হয়। অনেক একা মানুষ যখন কোনো মুহূর্তে ভিড়ের মধ্যে একাত্ম হয়ে যায়, তখন তাদের মন মোটেও একলা মানুষের মনের মতো থাকে না। তার মনে তখন সঠিক চেতনা থাকে না। সব মানুষের মন মিলে বিশাল এক খারাপ মানুষের মনের মতো কাজ করে। তখন তাদের সিদ্ধান্তও হয় কোনো আদিম প্রাণির মতো। তার শরীর মন, বিবেক, বোধবুদ্ধি, যুক্তি বলে কিছু থাকে না। তৈরি হয় মপ। কাজেই, ভিড় এডিয়ে চলুন।
শিষ্টাচার-৯৫: যদি আপনি খুব বলবান হন, সমালোচকদের পিটিয়ে ঠাণ্ডা করতে চাইবেন। যদি ধনবান হন, তাহলে টাকা দিয়ে তাদের মুখ বন্ধ করতে চাইবেন আর যদি আপনি কমজোরি হন তাহলে ধুত্তোর নিকুচি করেছে বলে কাজটা ছেড়ে দেবেন। কিন্তু কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলে, নিজের কানে ছিপি দিয়ে কান বন্ধ রাখুন। কোনোমতেই সমালোচকদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করবেন না। ওরাই আপনার প্রকৃত বন্ধু, আপনার সত্যিকারের ক্রুটিগুলি ওরাই বের করবে।
কিছু মানুষ আছেন ইচ্ছা করে নিজের দুর্বল দিক তুলে ধরেও মানুষের প্রশংসায় ভাসেন। কিছু দুর্বল দিক শেয়ার করলে মানুষ দৃশ্যত আপনার ভেতরে খুঁত খুঁজে পাবে ঠিকই, কিন্তু এটা আপনাকে সামাজিকভাবে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলবে। দুর্বল দিক তুলে ধরার ক্ষেত্রে একটা বিষয় মনে রাখতে পারেন, বিষয়টা যেন আপনার হেরে যাওয়া মনোভাবের পরিচায়ক না হয়. বরং তা যেন অন্যদের জন্য প্রেরণাদায়ী এবং আগামীতে দূর্বলতা কাটানোর অঙ্গীকার।
শিষ্টাচার-৯৬: দিন বদলায়, যুগ বদলায়, সমাজও বদলায় ও নতুন সমাজ পুরনো দিনের ধ্যান-ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে অথবা নতুন দিনের ভোরে পুরনো দিনের ভাবনা-চিন্তা ভুল ছিলো বলে প্রমাণ হয়। তাই কখনো ভাববেন না, যা ভাবছেন, যা জেনেছেন সেটাই শেষ কথা। অথবা আপনার গুরু বা বই কিংবা আপনার নেতা আপনাকে যা বুঝিয়েছেন সেটাই সত্যি। বলতে পারেন তখনকার মতো সত্যি, কিন্তু চিরকালের জন্য নয়। এর বিপরীতটা সত্যি হতে পারে।
দুটি পরস্পরবিরোধী বিশ্বাসের পক্ষে বহু লোক থাকে। সেই বিশ্বাসের জন্য দুপক্ষের লোকই প্রাণ দেয়। বার্টান্ড রাসেলকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিলো আপনার বিশ্বাসের জন্য আপনি কি প্রাণ দিতে পারেন? রাসেল বলেছিলেন, না। আমার বিশ্বাসটা তো ভুল হতে পারে। সময়ই একমাত্র বিচার করতে পারে কোনটা ভুল, কোনটা ঠিক। কাজেই নিজেকে অভ্রান্ত এবং সবজান্তা ভাববেন না, অন্যদের তো নয়ই।
শিষ্টাচার-৯৭: অধিকাংশ লোকই যত ধরেন তত ছাড়েন। উপকারী বন্ধুকে ছেড়ে দেন। অনেকদিন ধরে সম্পর্কের পর একে অন্যকে ছেড়ে দেয়। অনেকে বৃদ্ধ বাবা-মা, ভাই-বোনদের সঙ্গে রক্তের সম্পর্কও অস্বীকার করে স্বতন্ত্র জীবনযাপন করেন। এক সময়ের উপকারীকে ছেড়ে যাওয়া আকছার ঘটে। যখন যাকে দরকার হয়, মানুষ তখন তাকে ধরে আর দরকার না থাকলে ছাড়ে। যেটা ছাড়া উচিত সেটাকে সারাজীবন মানুষ ধরে রেখে দেয়, যেমন সিগারেট, খারাপ সঙ্গ। আর যেটা ধরে রাখা উচিত তাকে ছেড়ে দেয়, যেমন বন্ধু-পরিজন-সম্পর্ক।
মানুষ মূলত স্বার্থপর প্রাণি। তার ভালোবাসা, শ্রদ্ধা সবটা প্রয়োজনভিত্তিক। দুধ নাই তো মাছি নাই। আমরা প্রথমে ধরি আবেগের বশে, অথবা অন্যের অনুকরণ করে। যতক্ষণ না পাই, মনটা আকুলি-বিকুলি করে। তারপর পেয়ে গেলে তৃষ্ণাটা মিটে যায়। বিরক্ত হই। এর কারণ, মস্তিষ্ক যেকোনো নতুন সুখকে কিছুদিন পর স্বাভাবিক করে ফেলে। নতুন স¤পর্ক, নতুন চাকরি, নতুন গাড়ি, নতুন মোবাইল। সবকিছু একটা নির্দিষ্ট সময় পর আর উত্তেজনা দেয় না। একে বলে ‘হেডোনিক অ্যাডাপটেশন’।
ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী এড ডিনার এবং তার দলের গবেষণা বলছে লটারিতে কোটি টাকা জেতা মানুষ এবং দুর্ঘটনায় পক্সগু হওয়া মানুষ দুজনেই কিছদিনের মধ্যে প্রায় একই মাত্রার সুখ অনুভবে ফিরে আসে। মানে বিশাল সুখও মস্তিষ্ক গ্রাস করে নেয় এবং বিশাল দুঃখও মস্তিষ্ক একসময় মেনে নেয়। তাই মাঝে মাঝে ইচ্ছাকৃতভাবে যা আছে, তা থেকে বিরতি নেওয়া উচিত। কারণ একটু দূরত্ব তৈরি হলেই মস্তিষ্ক আবার সেই জিনিসের মূল্য বুঝতে পারে।
শিষ্টাচার-৯৮: কারও অভদ্র আচরণে দুঃখ পাবেন না। ভদ্রতা অনেকটা জন্মগত। ভদ্রলোকের ছেলেরাই সাধারণ ভদ্রলোক হয়। এটি একটি জেনেটিক উত্তরাধিকার। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ছেলে-মেয়েরা খুবই ভদ্র। পরিবেশগত কারণে ভদ্রলোকদের সংখ্যা কমছে। কারণ নিজেকে সুখী অনুভব না করলে লোকে ভদ্র আচরণ করতে পারে না। আজকাল নানা কারণে লোকের মেজাজ খিঁচড়ে থাকে। ভেতরে ভেতরে থাকে অভাববোধ, অপারাগতাবোধ, হীনম্মন্যতা।
তাই মন বিক্ষিপ্ত হলে চিত্তও হতাশগ্রস্ত ও বিষাদগ্রস্ত হয়ে থাকে। অন্যের কাছ থেকে ভদ্র ব্যবহার চাইলে নিজে বেশি ভদ্র ব্যবহার করুন। অন্যের অভদ্রতার দ্বারা কিছুতেই প্রভাবিত হবেন না। আপনি নিজে ভদ্র না হলে অন্যের কাছ থেকে ভদ্র ব্যবহার দাবি করতে পারেন না। ভদ্র হওয়ার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে রাগ ক্ষোভ দমন করুন। হেসে কথা বলুন।
কোল গার্ল হিসেবে পরিচিত জার্মান চেন্সলার মার্কেলকে একবার তার সহকারি জিজ্ঞেস করল- ম্যম কাছে দোকান থাকা সত্তেও আপনি এতদূরে এই ছোট্ট দোকানে সদাই কেনেন কেন? একে তো দোকানদারের এটিটিউট ভাল নয়, আপনার দিকে তাকায়ও না, তার উপর সবকিছু পাওয়া যায় না। উত্তরে মার্কেল বলল-আমার সাথে সবাই ভাল আচরণ করে, ফলে খারাপ আচরণের বিপরীতে ভাল আচরণ চর্চা করার সুযোই পাই না, আমার ভিতরের ভদ্রতাবোধ যাতে ক্ষতিগ্রস্থ না হয়, তাই আসা। অর্থাৎ খারাপ আচরণের বিপরীতে ভদ্রতা চর্চা করতে হবে।
শিষ্টাচার-৯৯: স্থায়ী বন্ধু রাখতে গেলে টাকা ধার দেবেন না, টাকা ধার দিলে বন্ধু হারাবেন ও একজন শত্রু তৈরি করবেন। কারণ, বাংলাদেশের একটা বিপুল সংখ্যক মানুষ মনে করে কারো কাছ থেকে টাকা ধার নিলে সেটা ফিরিয়ে দেওয়ার দরকার নেই। টাকা ধার দেওয়ার পরে আপনি বুঝতে পারবেন যে, টাকা ধার দিয়ে আপনি নিজেই বরং মহাবিপদে পড়ে গেছেন। এক পর্যায়ে এমন পরিস্থিতিও দাঁড়ায় যে, সে আপনাকে দেখলে অন্য রাস্তা দিয়ে চলে যাবে। পুরো পৃথিবীর মধ্যে বাংলাদেশ পৃথিবীর এক মাত্র দেশ, যেখানে টাকা পয়সা অন্য ব্যক্তির কাছ থেকে ধার দেনার কোনো লিখিত ডকুমেন্ট রাখা হয় না। হ্যা, যদি কাউকে টাকা ধার দিতে হয়, তাহলে তা একেবারেই দিন উপহার হিসেবে; ফেরতের আশা করবেন না। আবার কারো কাছ থেকে ধার নিবেনও না। পেটে-ভাতে কষ্ট করে চলবেন। প্রয়োজনে না খেয়ে থাকবেন। যদি অল্প দিনের জন্যে টাকা ধার নিতে হয়, ক্রেডিট কার্ড নিতে পারেন। এতে অন্যকেও বিব্রত আর বিরক্ত করা হলো না, আবার নিজের মান-সম্মানও বাঁচলো।
শিষ্টাচার-১০০: কারো জন্য জীবন থেমে যায় না। আমরা কেউ চাই না সুন্দর এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে। জীবন একটাই। এই জীবন অন্য কারোর জন্য নয়, প্রত্যেকের নিজের জন্যই বেঁচে থাকতে হয়। অন্য কারও উপর অভিমান করে মহামূল্যবান জীবনটা নষ্ট করার মধ্যে কোনো মহাত্ম নেই। ভালোবাসা-বিচ্ছেদ, দুঃখ-হাসি থাকবে, কান্না-কষ্ট থাকবে। আর সব মিলিয়েই জীবন।
এটাই চরমভাাবে সত্যি যে, এই বিশাল পৃথিবীতে কারও জন্যে সব শেষ হয়ে যায় না। নিজের মতো করে বাঁচতে চাইলে বাঁচার অনেক পথ আছে। একটা হাত সরে গেলেও হাজারটা হাত থাকে। পৃথিবীর কোনো না কোনো প্রান্তে সেই প্রসারিত হাত অপেক্ষার প্রহর গুনে বসে থাকে, আপনাকে পূর্ণ করবে বলে।
যে যেতে চায় তাকে যেতে দিন, যে আসতে চায় তাকে আসতে দিন। যে কটা দিন বাঁচবেন মাথা উঁচু করে বাঁচতে হবে, হেরে যাওয়া নয়। পৃথিবীতে কোন কিছুই স্থায়ী নয়, সবকিছু পরিবর্তনশীল। একটা গ্লাস কতক্ষণ ধরে রাখতে পারবেন? সেটা হাতের শক্তির উপর নির্ভর করে না, করে সময়ের উপর।