HALO EFFECT কীভাবে আপনার মাথা নষ্ট করছে

মনোবিজ্ঞানী Edward Thorndike ১৯২০ সালে একটি গবেষণায় দেখান যে আমরা কাউকে একটি বিষয়ে ভালো মনে করলে তার সব কিছুকেই ভালো ভেবে নিই। সুন্দর চেহারার মানুষকে আমরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বুদ্ধিমান বিশ্বাসযোগ্য এবং ভালো মানুষ ভাবি। মাথার ভেতরে একটা অদৃশ্য শর্টকাট আছে যেটা বলে দেখতে ভালো মানেই সব ভালো। এই শর্টকাটের নামই Halo Effect।


মিনিমালিস্টিক জীবন যাপন করবেন যেভাবে

বর্তমান ব্যস্ত ও ভোগবাদী পৃথিবীতে মানুষ যত বেশি জিনিস অর্জন করছে, ততই মানসিক অস্থিরতা বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে মিনিমালিস্টিক জীবনধারা একটি শান্ত, সচেতন ও অর্থবহ জীবনের পথ দেখায়। মিনিমালিজম মানে দরিদ্র হওয়া নয়, বরং প্রয়োজন ও অপ্রয়োজনের পার্থক্য বুঝে জীবন সাজানো। অল্প জিনিসে সন্তুষ্ট থাকা মানুষের মানসিক চাপ কমায় বলে বিভিন্ন মনোবিজ্ঞান গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে। গবেষকরা বলেন, অতিরিক্ত ভোগ মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতাকে দুর্বল করে এবং ক্লান্তি বাড়ায়। তাই সচেতনভাবে সরল জীবন বেছে নেওয়া আধুনিক সময়ের এক নতুন মানসিক বিপ্লব। মিনিমালিস্টিক জীবন মানে নিজের সময়, শক্তি ও মনোযোগকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে ফিরিয়ে আনা।

মিনিমালিস্টিক জীবন শুরু করার প্রথম ধাপ হলো অপ্রয়োজনীয় জিনিস কমিয়ে ফেলা। ঘরে বছরের পর বছর ব্যবহার না করা বস্তু জমিয়ে রাখা মানসিক চাপ বাড়ায় বলে পরিবেশগত মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে। প্রয়োজনীয় জিনিস রেখে বাকিগুলো দান বা সরিয়ে দিলে মন হালকা অনুভব করে। দ্বিতীয়ত, কেনাকাটার আগে নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে এটি প্রয়োজন নাকি সাময়িক ইচ্ছা। গবেষণায় দেখা গেছে হঠাৎ কেনাকাটা আর্থিক উদ্বেগ ও অনুশোচনা বাড়ায়। পোশাক, প্রযুক্তি বা সাজসজ্জায় কম কিন্তু মানসম্মত জিনিস নির্বাচন করা মিনিমালিস্টিক অভ্যাস গড়ে তোলে। একই সঙ্গে সামাজিক তুলনা কমিয়ে নিজের জীবনযাত্রার উপর মনোযোগ দেওয়া জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কমানোও মিনিমালিজমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এতে মানসিক স্থিরতা বৃদ্ধি পায় এবং মনোযোগ শক্তিশালী হয়।

মিনিমালিস্টিক জীবন কেবল বস্তু কমানো নয়, সময় ব্যবস্থাপনাতেও সরলতা আনা। অপ্রয়োজনীয় সামাজিক বাধ্যবাধকতা ও মানসিক চাপ তৈরি করে এমন কাজ সীমিত করা প্রয়োজন। গবেষণায় দেখা যায় যারা সীমিত লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেন তারা বেশি উৎপাদনশীল ও সুখী হন। প্রতিদিনের রুটিন সহজ করলে সিদ্ধান্ত ক্লান্তি কমে যায়। পরিবার, স্বাস্থ্য, আত্মোন্নয়ন ও আধ্যাত্মিক চর্চাকে অগ্রাধিকার দেওয়া মিনিমালিস্টিক জীবনের মূল শক্তি। কম প্রতিশ্রুতি কিন্তু গভীর সম্পর্ক মানুষকে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক শান্তি দেয়। নিয়মিত আত্মমূল্যায়ন মানুষকে বুঝতে সাহায্য করে কোন জিনিস সত্যিই জীবনে মূল্য যোগ করছে। এভাবে ধীরে ধীরে জীবন হয়ে ওঠে ভারমুক্ত ও অর্থপূর্ণ।

মিনিমালিস্টিক জীবন মানে জীবনকে ছোট করা নয় বরং অর্থপূর্ণ করা। কম জিনিসে বেশি আনন্দ খুঁজে নেওয়ার মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত স্বাধীনতা। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে সরল জীবনযাপন উদ্বেগ কমায় এবং সুখের অনুভূতি বাড়ায়। যখন মানুষ বস্তু নয় অভিজ্ঞতাকে মূল্য দেয় তখন জীবন গভীর হয়। মিনিমালিজম আমাদের শেখায় প্রয়োজনীয়কে আঁকড়ে ধরতে এবং অপ্রয়োজনীয়কে ছেড়ে দিতে। তাই সচেতনভাবে মিনিমালিস্টিক জীবন বেছে নেওয়া মানে শান্ত, ভারসাম্যপূর্ণ ও পরিপূর্ণ জীবনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। @ SAM Motivation, 

References

Joshua Becker – The More of Less

Marie Kondo – The Life-Changing Magic of Tidying Up

American Psychological Association – Consumerism and Mental Wellbeing Studies

Journal of Environmental Psychology – Clutter and Stress Research

Harvard Business Review – Decision Fatigue and Simplified Living Research

Soichiro Honda জীবনে এমন কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন, যেখানে অনেকেই হয়তো সব আশা ছেড়ে দিতেন। কিন্তু তিনি হার মানেননি। বরং ধ্বংসস্তূপ থেকেই নতুন স্বপ্ন গড়ে তুলেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তার প্রতিষ্ঠিত কারখানা ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়ে। ১৯৪৪ সালে আমেরিকান বোমা হামলায় তার কারখানার বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর ১৯৪৫ সালে আরেকটি ভয়ংকর ভূমিকম্প অবশিষ্ট অংশও ধসে দেয়। মুহূর্তের মধ্যে তার বহু বছরের পরিশ্রম শেষ হয়ে যায়।

যুদ্ধ শেষে পুরো জাপান তখন অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছিল। রাস্তাঘাট ধ্বংস, যানবাহনের সংকট এবং পেট্রোলের অভাবে সাধারণ মানুষের জীবন কষ্টকর হয়ে উঠেছিল। এই পরিস্থিতিতে অনেক ব্যবসায়ী হতাশ হয়ে পড়লেও সোইচিরো হোন্ডা সমস্যার মধ্যেই নতুন সম্ভাবনা খুঁজে নেন। একদিন তিনি জাপানি সেনাবাহিনীর ফেলে যাওয়া একটি ছোট ইঞ্জিন দেখতে পান। তখন তার মাথায় এক অভিনব ধারণা আসে—যদি এই ইঞ্জিনটি সাইকেলের সঙ্গে লাগানো যায়, তাহলে মানুষ কম খরচে দ্রুত চলাচল করতে পারবে।

তিনি প্রথমে নিজের স্ত্রীর সাইকেলে সেই ছোট ইঞ্জিন লাগান। রাস্তায় মানুষ এটি দেখে অবাক হয়ে যায় এবং খুব দ্রুত এর চাহিদা বাড়তে শুরু করে। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বুঝতে পারেন, এটি বড় ব্যবসায় রূপ নিতে পারে। এরপর তিনি নিজেই ইঞ্জিন তৈরি শুরু করেন এবং ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন Honda Motor Company।

সোইচিরো হোন্ডার এই গল্প আমাদের শেখায়, জীবনে ব্যর্থতা বা ধ্বংস শেষ নয়। সাহস, সৃজনশীলতা এবং কঠোর পরিশ্রম থাকলে যেকোনো সংকট থেকেই নতুন সফলতার পথ তৈরি করা সম্ভব।


মানবসভ্যতার ইতিহাসে লেখার উদ্ভব নিয়ে এতদিন যে গল্পটি আমরা জেনে এসেছি, তা ছিল মূলত দুটি প্রাচীন লিপিকে ঘিরে—মিশরের হায়ারোগ্লিফ ও মেসোপটেমিয়ার কিউনিফর্ম। প্রায় ৫৩০০ বছর আগে এই দুই লিপির আবির্ভাব মানবজাতিকে প্রশাসন, বাণিজ্য ও জ্ঞান সংরক্ষণে এক নতুন শক্তি দেয়। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এই গল্প অসম্পূর্ণ। একই সময়ে ইরানের প্রাচীন অঞ্চলে জন্ম নিয়েছিল আরেকটি রহস্যময় লিপি—প্রোটো-এলামাইট। প্রায় ৫২০০ বছর পুরোনো এই লিপি প্রত্নতাত্ত্বিক খননে সুসা শহরসহ বিভিন্ন স্থানে পাওয়া গেছে। 

3

Nordic countries—যেমন Finland, Sweden, Norway এবং Denmark—এ একটি অদ্ভুত কিন্তু বাস্তব অভ্যাস দেখা যায়: ছোট শিশুদের বাইরে ঘুম পাড়ানো, এমনকি ঠান্ডা আবহাওয়াতেও।

এই প্রথা আসলেই অনেক এলাকায় প্রচলিত। বিশেষ করে ডে-কেয়ার বা কিন্ডারগার্টেনের বাইরে সারি সারি বেবি স্ট্রোলার (pram) দেখা যায়, যেখানে শিশুরা আরামে ঘুমাচ্ছে। অনেক অভিভাবকও বাড়ির বাইরে বা বারান্দায় তাদের শিশুকে ঘুমাতে দেন।

এর পেছনে মূল ধারণা হলো—তাজা বাতাস শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। নর্ডিক দেশগুলোতে বিশ্বাস করা হয় যে বাইরে ঘুমালে শিশুরা ভালোভাবে ঘুমায় এবং তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নত হতে পারে। এছাড়া ঘরের ভেতরের বাতাসের তুলনায় বাইরের ঠান্ডা কিন্তু পরিষ্কার বাতাসকে তারা বেশি স্বাস্থ্যকর মনে করে।

তবে এটি কোনো বেপরোয়া কাজ নয়। শিশুকে সবসময় ভালোভাবে গরম কাপড়ে মোড়ানো হয়, তাপমাত্রা খুব বেশি কমে গেলে বাইরে রাখা হয় না, এবং নিয়মিত নজরদারি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক বেবি মনিটর ব্যবহার করে শিশুর অবস্থাও পর্যবেক্ষণ করা হয়। @ Voice of Pipul

4

সম্পর্কের টানাপরনের আর মানুষের মনস্তাত্ত্বিক আচরণ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে একটি বিষয় বারবার সামনে আসে, জোর করে অধিকার আদায়ের চে'ষ্টা। মনোবিজ্ঞানের দৃ'ষ্টিতে, যখন আমরা কারো ওপর আমাদের অধিকার চাপিয়ে দিতে চাই, তখন আমরা অজান্তেই সেই মানুষটিকে আরও দূ'রে ঠেলে দিই।

‎​Focus On Your Self-Worth, Not On Someone's Attention.

‎​নিজের মূল্য বুঝতে পারাটা সবচেয়ে বেশি জরুরি। যেখানে আপনার গুরু'ত্ব নেই, সেখানে অধিকারের দাবি করা মানে নিজের ব্যক্তি'ত্বকে ছোট করা। জীবনের এমন  একটি পর্যায় আসে যখন কথা বলে নিজের অব'স্থান প্রমাণ করার চেয়ে নিরবতা অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

‎​Silence I the Ultimate Expression Of Strength And Dignity.

‎​চুপ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া কোনো দুর্বলতা নয়। বরং এটি আপনার আত্ম'সম্মানবোধের বহিঃপ্রকাশ। জোর করে কারো জীবনে নিজের জায়গা তৈরি করার চেয়ে সম্মানের সাথে সেখান থেকে প্রস্থা'ন করা অনেক বেশি শ্রেয়। এতে অন্তত আপনার মানসিক শান্তি বজায় থাকে।

‎​পরিশেষে একটি কথাই মনে রাখা প্রয়োজন, যা আপনার হওয়ার তা এমনিতেই আপনার হবে; তার জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি'র প্রয়োজন পড়ে না। যারা আপনাকে ভালোবাসে বা সম্মা'ন করে, তারা কখনোই আপনাকে অধিকার দেখানোর সুযোগ দেবে না, বরং নিজ থেকেই আপনার প্রাপ্য মর্যাদা বুঝিয়ে দেবে।

‎​নিজের মানসিক স্বাস্থ্যে'র যত্ন নিন এবং সুস্থ সুন্দর চিন্তা নিয়ে এগিয়ে চলুন। @ Mahamud Hasan Nahid

5

"পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রাজা হঠাৎ পাগল হয়ে গেলেন। ৭ বছর মাঠে ঘাস খেয়ে বেঁচে ছিলেন। তারপর আবার সুস্থ হলেন। বিজ্ঞান এখন বলছে কী হয়েছিল।"

৫৮৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দ।

জেরুজালেম শহর। আগুনে জ্বলছে। সুলাইমানের মন্দির ধ্বংস। হাজার হাজার মানুষ বন্দি।

জোর করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ব্যাবিলনে। যে রাজার আদেশে এত ধ্বংস। তাঁর নাম  নেবুখাদনেজার দ্বিতীয়। ব্যাবিলনের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজা। পৃথিবীর তৎকালীন সবচেয়ে বড়  সাম্রাজ্যের অধিপতি। মিশর থেকে পারস্যের সীমানা পর্যন্ত। সবই তাঁর। কিন্তু এই মানুষটার সাথে। কিছুদিন পরে। এমন কিছু ঘটল। যা শুনলে বিশ্বাস হয় না।

বাইবেলে লেখা আছে। দানিয়েল গ্রন্থে। একদিন নেবুখাদনেজার। তাঁর প্রাসাদের ছাদে দাঁড়িয়ে।

নিজের শহর দেখছিলেন। গর্বে বললেন। দেখো এই মহান ব্যাবিলন। যা আমি নিজের শক্তিতে বানিয়েছি। এবং সেই মুহূর্তে। আকাশ থেকে এলো একটা কণ্ঠস্বর। তোমার রাজত্ব শেষ।

তুমি মানুষের মাঝ থেকে বিতাড়িত হবে। পশুদের সাথে থাকবে। ঘাস খাবে। সাত বছর।

এবং সেই মুহূর্ত থেকেই। নেবুখাদনেজার পাগল হয়ে গেলেন।

সাত বছর।

পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রাজা। মাঠে। পশুর মতো। চার হাত-পায়ে হাঁটছেন। ঘাস খাচ্ছেন।

নখ পাখির নখের মতো বড় হয়ে গেছে। চুল ঈগলের পালকের মতো। তারপর সাত বছর পর।

হঠাৎ। আবার সুস্থ। প্রাসাদে ফিরে এলেন। রাজত্ব বুঝে নিলেন।

এটা কি সত্যি? নাকি শুধু বাইবেলের গল্প?  এখানেই আসল রহস্য। ব্যাবিলনীয় নিজেদের রেকর্ডে। এই সময়ের একটা বিশাল ফাঁক। নেবুখাদনেজার অনেক বছর। কোনো রাজকীয় কাজ করেননি। কোনো যুদ্ধ নেই। কোনো মন্দির নির্মাণ নেই। কোনো আইন জারি নেই।

কিছু নেই। ইতিহাসে। এই সময়টা। রহস্যজনকভাবে খালি।

বিজ্ঞান কী বলছে?

আধুনিক মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা। নেবুখাদনেজারের বিবরণ পড়ে। একটা রোগ শনাক্ত  করেছেন। বোঅ্যান্থ্রপি। এটা একটা মানসিক অসুখ। এতে আক্রান্ত মানুষ। নিজেকে পশু মনে করে। চার হাত-পায়ে চলে। পশুর মতো আওয়াজ করে। খাবার মাটিতে ফেলে খায়।

এই রোগ আজও আছে। বিরল। কিন্তু আছে।

কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

কেন হলো এই রোগ? মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন। অত্যধিক ক্ষমতা। অত্যধিক চাপ।

এবং হয়তো। গভীর অপরাধবোধ। জেরুজালেম ধ্বংসের পর। লক্ষ লক্ষ মানুষের কান্না। হয়তো। এই মানুষটার মনে। এমন কিছু করেছিল। যা বাইরে প্রকাশ না পেয়ে। ভেতরে।

বিস্ফোরণ হয়েছিল।

কিন্তু এখানে আরেকটা রহস্য। নেবুখাদনেজার সুস্থ হলেন। সাত বছর পর। ফিরে এলেন।  রাজত্ব করলেন। আরও কিছু বছর। এবং মৃত্যুর আগে। তাঁর শেষ উক্তি লেখা আছে। ব্যাবিলনীয় রেকর্ডে। তিনি বললেন। যিনি আকাশের রাজা। তিনিই আসল রাজা। পৃথিবীর রাজারা তাঁর সামনে কিছু নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে অহংকারী রাজা। জীবনের শেষে। সম্পূর্ণ বিনয়ী।

এই পরিবর্তন। কীভাবে হলো?

আরেকটা তথ্য।

নেবুখাদনেজার শুধু ধ্বংসকারী ছিলেন না। ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান। কথিত আছে তিনি  বানিয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রীর জন্য। মেডিয়ান রাজকন্যা। যিনি পাহাড়ের মেয়ে। মরুভূমির শহর দেখে। মন খারাপ করতেন। তাই নেবুখাদনেজার। সমতল ব্যাবিলনে। পাহাড়ের মতো বাগান বানিয়ে দিলেন। স্ত্রীর জন্য। একটু ভাবো। এই একজন মানুষ। জেরুজালেম পুড়িয়েছেন।

লক্ষ মানুষ বন্দি করেছেন। স্ত্রীর জন্য পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্য বানিয়েছেন। পাগল হয়ে মাঠে ঘুরেছেন। আবার সুস্থ হয়ে রাজত্ব করেছেন। এবং মৃত্যুর আগে। ঈশ্বরের সামনে মাথা নত করেছেন। কোনো মানুষ। এত বিরোধী। এত জটিল। এত রহস্যময় হতে পারে? @ শেষরাত

6

নেপোলিয়ন, আলেকজান্ডার — সবাই তাঁর কাছ থেকে শিখেছে। অথচ তাঁর নাম কেউ জানে না। মিশরের এই ফারাও ছিলেন সর্বকালের সেরা সামরিক কৌশলবিদ।

খ্রিস্টপূর্ব ১৪৫৭ সাল।

মেগিদ্দো শহরের সামনে। আজকের ইসরায়েলের মাটিতে। মিশরীয় সেনাবাহিনী দাঁড়িয়ে।

সামনে পাহাড়। পাহাড়ের ওপারে শত্রু। তিনটি পথ। একটা সহজ। দুটো কঠিন। সহজ পথে গেলে শত্রু আগে থেকে অপেক্ষা করছে। নিশ্চিত ফাঁদ। তাঁর সেনাপতিরা বললেন — সহজ পথে যাব। নিরাপদ। কিন্তু ফারাও বললেন — না। আমি সবচেয়ে কঠিন পথে যাব।

যে পথে শত্রু ভাবেনি কেউ আসবে। সেনাপতিরা ভয় পেলেন। কিন্তু ফারাও নিজেই সামনে হাঁটলেন। এবং সেই সিদ্ধান্তে জিতলেন ইতিহাসের প্রথম লিখিত যুদ্ধ। সেই ফারাওয়ের নাম — থুতমোস তৃতীয়।

থুতমোস তৃতীয়।

মিশরের ১৮তম রাজবংশের ফারাও। কিন্তু শুরুটা ছিল অপমানে। মনে আছে হাতশেপসুতের গল্প? সেই নারী ফারাও? থুতমোস তৃতীয় ছিলেন তাঁর সৎছেলে। হাতশেপসুত ২০ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। থুতমোস তৃতীয় সেই ২০ বছর অপেক্ষা করেছিলেন। ক্ষমতার বাইরে। অপমানে।

একাকীত্বে। কিন্তু সেই অপেক্ষার সময় তিনি একটাই কাজ করেছিলেন। শিখছিলেন। যুদ্ধের কৌশল। ইতিহাস। ভূগোল। এবং যখন সুযোগ এলো — পুরো পৃথিবী অবাক হয়ে গেল।

মেগিদ্দোর যুদ্ধ।

ইতিহাসে প্রথমবার একটা যুদ্ধের বিস্তারিত রেকর্ড রাখা হয়েছিল। কার্নাকের দেওয়ালে।

থুতমোস তৃতীয় কঠিন পাহাড়ি পথ বেছে নিলেন। শত্রু ভাবেনি এদিক থেকে কেউ আসবে। আচমকা আক্রমণ। শত্রু ছত্রভঙ্গ। মেগিদ্দো শহর দখল। এই যুদ্ধের কৌশল আজও পড়ানো হয়।

কিন্তু মেগিদ্দো শুধু শুরু।

থুতমোস তৃতীয় পরের ৩০ বছরে ১৭টি সামরিক অভিযান পরিচালনা করলেন। সিরিয়া। ফিলিস্তিন। নুবিয়া। লেবানন। প্রতিটিতে জয়। একটিতেও হার নেই। মিশরের সাম্রাজ্য হলো ইতিহাসের বৃহত্তম।

কিন্তু সবচেয়ে অজানা তথ্য এখন বলব।

থুতমোস তৃতীয় শুধু যুদ্ধ করতেন না। জয়ের পর তিনি করতেন অদ্ভুত কিছু। পরাজিত রাজাদের ছেলেদের মিশরে নিয়ে আসতেন। মিশরীয় সংস্কৃতিতে মানুষ করতেন। শিক্ষা দিতেন।

তারপর বড় হলে নিজের দেশে ফেরত পাঠাতেন। এখন তারা মিশরের বন্ধু। কারণ তারা মিশরেই বড় হয়েছে। মিশরকে ভালোবাসে। এটা ছিল ইতিহাসের প্রথম Soft Power কৌশল।

৩,৫০০ বছর আগে।

আরেকটা তথ্য।

থুতমোস তৃতীয় ছিলেন উদ্ভিদবিদও। সিরিয়া থেকে ফেরার সময় তিনি নিয়ে এসেছিলেন বিদেশী গাছ। ফল। পাখি। এবং কার্নাকের একটা কক্ষে সেই সব গাছপালার ছবি আঁকিয়েছিলেন।

পৃথিবীর প্রথম প্রাকৃতিক ইতিহাসের সংগ্রহ। ৩,৫০০ বছর আগে।

এই মানুষটার আরেকটা দিক কেউ বলে না।

তিনি ছিলেন ক্রীড়াবিদ। তীরন্দাজি। ঘোড়দৌড়। সাঁতার। সব ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অসাধারণ।

একজন মানুষের মধ্যে এত প্রতিভা। কীভাবে সম্ভব?

নেপোলিয়ন বোনাপার্ট।

তাঁকে পড়েছিলেন থুতমোস তৃতীয়ের কৌশল। আলেকজান্ডার। থুতমোসের অভিযানের মানচিত্র অনুসরণ করেছিলেন। আধুনিক সামরিক একাডেমিতে। মেগিদ্দোর যুদ্ধ এখনো পাঠ্যক্রমে। কিন্তু সাধারণ মানুষ। যারা নেপোলিয়ন চেনে। আলেকজান্ডার চেনে। তারা থুতমোস তৃতীয়কে চেনে না।

কেন?

একটু ভাবো।

২০ বছর অপমানে অপেক্ষা করলেন। সুযোগ পেলেন। এবং পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য গড়লেন। একটা যুদ্ধেও হারলেন না। নরম শক্তির কৌশল আবিষ্কার করলেন। প্রকৃতি ভালোবাসলেন। খেলাধুলা করলেন। এই মানুষটাকে আমরা চিনি না। কিন্তু যারা যুদ্ধের কৌশল শেখেন। তারা প্রতিদিন তাঁর নাম নেন।

7

"৪,০০০ বছর আগে যারা ব্যাংক বানিয়েছিল, তারা আকাশ থেকে সুদের হিসাব করত ! ব্যাবিলন সভ্যতার এই ৫টি তথ্য জানলে তোমার মাথা ঘুরে যাবে।"

আজ থেকে ৪,০০০ বছর আগের কথা।

ইউফ্রেটিস নদীর ধারে একটা শহর ছিল। শহরটার নাম ছিল ব্যাবিলন — যার অর্থ "ঈশ্বরের দরজা"। আর সত্যিই, সেই শহর ছিল যেন পৃথিবীর উপর স্বর্গের এক টুকরো।

কিন্তু স্কুলের বইয়ে আমরা শুধু হ্যাঙ্গিং গার্ডেন আর হামুরাবির আইনের কথা পড়েছি। আসল রহস্যগুলো? সেগুলো বইয়ের পাতায় নেই।

আজকে সেই পাঁচটা অজানা সত্য বলব, যেগুলো জানলে তুমি বলবে — "এটা কি সত্যিই সম্ভব?!"

পৃথিবীর প্রথম ব্যাংক ছিল ব্যাবিলনে — এবং সেখানে সুদও নেওয়া হত!

আধুনিক ব্যাংকিং সিস্টেম বলে যা জানো, তার শুরু কিন্তু ইতালিতে নয়। শুরু হয়েছিল ব্যাবিলনে, প্রায় ১৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। মন্দিরগুলো শুধু ধর্মের জায়গা ছিল না — সেগুলো ছিল একেকটা আর্থিক প্রতিষ্ঠান। সেখানে শস্য ও মূল্যবান ধাতু জমা রাখা হত, ঋণ দেওয়া হত, এমনকি লিখিত চুক্তিতে সিল মেরে বিক্রয় চুক্তিও হত। হ্যাঁ — তারাই ইতিহাসের প্রথম সেলস কন্ট্র্যাক্ট চালু করেছিল!

আমাদের ঘড়ির ৬০ মিনিট, ৩৬০ ডিগ্রি — সব ব্যাবিলনিয়দের দেওয়া উপহার!

তুমি কি কখনো ভেবেছ, কেন ১ ঘণ্টায় ৬০ মিনিট? কেন বৃত্তে ৩৬০ ডিগ্রি? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ব্যাবিলনের মাটিতে। তারা Base-60 গণনা পদ্ধতি ব্যবহার করত, যা ছিল অবিশ্বাস্য রকম কার্যকর। আজ থেকে হাজার বছর পর আমরা এখনো তাদের পদ্ধতিতেই সময় মাপছি! তোমার ফোনের ক্লক অ্যাপটা খোলো — সেখানে ব্যাবিলনের ছায়া আছে।

ব্যাবিলনিয়রা Calculus আবিষ্কার করেছিল — ইউরোপের ১,৫০০ বছর আগে!

এটা শুনলে তুমি হয়তো বিশ্বাস করবে না। কিন্তু বিজ্ঞানীরা মাটির তৈরি ট্যাবলেট বিশ্লেষণ করে প্রমাণ পেয়েছেন — ব্যাবিলনিয়ান জ্যোতির্বিদরা বৃহস্পতি গ্রহের গতিবেগ গণনা করতে এমন একটি পদ্ধতি ব্যবহার করত, যা আধুনিক ক্যালকুলাসের পূর্বপুরুষ। এই একই পদ্ধতি ইউরোপে "আবিষ্কৃত" হয়েছিল আরো দেড় হাজার বছর পরে! স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন যখন এই গবেষণা প্রকাশ করে, বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন — এটা "remarkably modern concept।"

চন্দ্রগ্রহণ আগে থেকেই জানত তারা — এবং কাউকে মেরে ফেলত সেজন্য!

ব্যাবিলনিয়ান পুরোহিত-জ্যোতির্বিদরা ১৮ বছরের Saros Cycle আবিষ্কার করেছিলেন, যা দিয়ে চন্দ্রগ্রহণ আগে থেকে বলা যেত। কিন্তু তাদের বিশ্বাস ছিল — চন্দ্রগ্রহণ মানে রাজার জন্য অশুভ লক্ষণ। তাই গ্রহণের আগে তারা একজন অন্য মানুষকে "ভুয়া রাজা" বানাত। গ্রহণ শেষ হলে সেই ভুয়া রাজাকে... হত্যা করা হত। যেন দেবতার ক্রোধ তার উপর পড়ে গেছে।  আসল রাজা? সে নিরাপদ।

৪,০০০ বছর আগে ব্যাবিলনের নারীরা ব্যবসা করত, সম্পদের মালিক হত!

যে যুগে বিশ্বের বেশিরভাগ জায়গায় নারীদের কোনো অধিকার ছিল না, সেই যুগে ব্যাবিলনের নারীরা নিজেরা ব্যবসা চালাতে পারত, মদ বিক্রি করতে পারত, এমনকি স্বামীর মৃত্যুর পরেও সম্পদের উপর সমান অধিকার রাখত। শুধু তাই নয় — তারা পুরোহিতও হতে পারত! এই সভ্যতা কি তাহলে আমাদের থেকে বেশি "আধুনিক" ছিল?

সেই ব্যাবিলন শহর আজ ইরাকের ধুলোয় মিশে আছে। ২০০৩ সালে আমেরিকান সেনাবাহিনী সেই পবিত্র ধ্বংসাবশেষের উপর সামরিক ঘাঁটি বানিয়েছিল — UNESCO রিপোর্ট করেছিল, তাতে "major damage" হয়েছে। ২০১৯ সালে অবশেষে এটি UNESCO World Heritage Site ঘোষিত হয়েছে।

8

গুপ্ত সমাজ — ইলুমিনাটি, ফ্রিম্যাসন, নাইটস টেম্পলার — সত্যি কী?

আপনার হাতে একটা আমেরিকান ডলার।

পেছনে তাকান। একটা পিরামিড। পিরামিডের উপরে একটা চোখ। সেই চোখের নিচে লেখা —

"Annuit Coeptis।"  অর্থ — "তিনি আমাদের উদ্যোগে সম্মত।" এই প্রতীক কে রেখেছিল? কেন রেখেছিল? এই একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে আসে ইতিহাসের সবচেয়ে রহস্যময় গল্প। গুপ্ত সমাজের গল্প। যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ছায়ায় বসে পৃথিবী চালিয়ে এসেছে বলে অনেকে মনে করেন।

নাইটস টেম্পলার — যাদের ধন আজও খোঁজা হচ্ছে।

১১১৯ সাল। ক্রুসেডের সময়। জেরুজালেমে নয়জন নাইট একটি আদেশ প্রতিষ্ঠা করলেন।

নাম — নাইটস টেম্পলার। তাদের কাজ ছিল — তীর্থযাত্রীদের রক্ষা করা। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা হয়ে উঠল ইউরোপের সবচেয়ে ধনী ও শক্তিশালী সংগঠন। তাদের কাছে ছিল বিশাল সম্পদ।

এবং রহস্যময় জ্ঞান। বলা হয় — তারা জেরুজালেমের মন্দিরের নিচে খনন করে পেয়েছিল এমন কিছু — যা পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। সেটা কী ছিল?

পবিত্র গ্রেইল? আর্ক অফ কোভেন্যান্ট?

কেউ জানে না। ১৩০৭ সালে ফ্রান্সের রাজা ফিলিপ চতুর্থ হঠাৎ সব টেম্পলারকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিলেন। একই দিনে। সারা ফ্রান্সে। টেম্পলারদের বিচার হলো। নেতা জ্যাক দে মোলাঁকে জীবন্ত পোড়ানো হলো। কিন্তু তাদের বিশাল সম্পদ? কোথাও পাওয়া গেল না।

আজও খোঁজা হচ্ছে।

ফ্রিম্যাসন — যাদের সদস্য ছিলেন আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতারা।

আমেরিকার প্রথম রাষ্ট্রপতি জর্জ ওয়াশিংটন। ফ্রিম্যাসন। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন। ফ্রিম্যাসন।

আমেরিকার ৩৯ জন প্রেসিডেন্টের মধ্যে ১৫ জন ছিলেন ফ্রিম্যাসন।ফ্রিম্যাসন কারা?

তারা বলেন — একটি ভ্রাতৃত্বমূলক সংগঠন। নৈতিকতা আর দার্শনিক শিক্ষার সমাজ। কিন্তু তাদের আচার গোপন। তাদের সংকেত গোপন। তাদের মিটিং গোপন। এবং সেই ডলারের পিরামিড আর চোখ? তারা স্বীকার করেন এটা ফ্রিম্যাসনের প্রতীকের সাথে মিলে যায়।

কিন্তু বলেন — এটা ঈশ্বরের সর্বদর্শী চোখ। কাকতালীয়? নাকি পরিকল্পিত?

ইলুমিনাটি — সবচেয়ে ভয়ংকর নাম।

১৭৭৬ সাল। বাভারিয়া। অ্যাডাম ভাইসহাউপট। একজন অধ্যাপক। তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন — অর্ডার অফ দ্য ইলুমিনাটি। লক্ষ্য ছিল মহৎ। ধর্মীয় প্রভাব থেকে মুক্ত সমাজ। কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। জ্ঞানের পক্ষে। মাত্র ১১ বছরে তাদের সদস্য হয়েছিল ২,০০০। ইউরোপের  ক্ষমতাশালীরা ছিলেন। তারপর ১৭৮৫ সালে বাভারিয়ার সরকার এই সংগঠন নিষিদ্ধ করল।

ইলুমিনাটি ভেঙে গেল। অথবা ভেঙে গেছে বলে আমরা মনে করি।

কারণ অনেকে বলেন — তারা শুধু আরও গভীরে চলে গেছে। আজও তারা আছে।

এবং পৃথিবীর বড় সিদ্ধান্তগুলো তারা নেয়।

সত্যি নাকি মিথ্যা?

এখানেই আসল প্রশ্ন। ইতিহাসবিদরা বলেন — নাইটস টেম্পলার ছিল। এটা সত্য। ফ্রিম্যাসন আছে। এটা সত্য। আদি ইলুমিনাটি ছিল। এটা সত্য। কিন্তু তারা পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করছে?

এটা প্রমাণিত নয়। তবে কিছু কাকতালীয় ঘটনা আছে। যা ব্যাখ্যা করা কঠিন।

যে ঘটনাগুলো রহস্যময়।

নাইটস টেম্পলারের সম্পদ কখনো পাওয়া যায়নি। ফ্রিম্যাসনের প্রতীক আমেরিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নোটে। ওয়াশিংটন ডিসির রাস্তার নকশায় লুকানো আছে একটা পেন্টাগ্রাম। উপরের শীর্ষ বাদ দিয়ে। যারা এটা আবিষ্কার করেছেন তারা বলেন — এটা কোনো কাকতালীয় নয়।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

২০২৩ সালে বিশ্বের ১ শতাংশ মানুষের হাতে বিশ্বের ৪৩ শতাংশ সম্পদ। ৮ জন ধনী মানুষের কাছে পৃথিবীর অর্ধেক মানুষের মোট সম্পদের সমান। এটা কি শুধুই বাজার অর্থনীতির ফল?

নাকি এর পেছনে কোনো পরিকল্পনা আছে? কোনো সংগঠন? কেউ প্রমাণ করতে পারেনি।

কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যায়।

শেষ কথা।

গুপ্ত সমাজ হয়তো পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করে না। কিন্তু এটুকু সত্য — ইতিহাসে এমন সংগঠন ছিল।

যারা ছায়ায় কাজ করেছে। যারা ক্ষমতাশালীদের একত্রিত করেছে। এবং পৃথিবীর বড়  ঘটনাগুলোকে প্রভাবিত করেছে। সেটা কতটুকু? সেটা কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর ইতিহাস দেয়নি। হয়তো কোনোদিন দেবেও না।

9

"মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকা যায় — এই বিশ্বাস থেকেই জন্ম হয়েছিল মমির। কিন্তু এই অদ্ভুত ধারণা কে প্রথম দিয়েছিল? এবং মমি বানানোর আসল উদ্দেশ্য কী ছিল?"

৫,০০০ বছর আগের কথা।

মিশরের মরুভূমিতে। এক কৃষক তার মৃত আত্মীয়কে কবর দিতে গেলেন। মাটি খুঁড়লেন।

শুইয়ে দিলেন। মাটি চাপা দিলেন। কিন্তু কয়েক মাস পর। অন্য কেউ সেই জায়গায় আবার মাটি খুঁড়তে গিয়ে। দেখল। মরদেহটা অক্ষত। পচেনি। কারণ। মিশরের গরম মরুভূমির বালি। শরীর থেকে সব জলীয় বাষ্প টেনে নিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই। মরদেহ সংরক্ষিত হয়ে গেছে। সেটা দেখে মিশরীয়রা ভাবল। এটা কি ঈশ্বরের ইচ্ছা? এবং সেই একটা দুর্ঘটনা থেকে। শুরু হলো ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর আবিষ্কার। মমিকরণ।

কিন্তু আগে বুঝতে হবে।

কেন মিশরীয়রা শরীর টিকিয়ে রাখতে চাইত? এই প্রশ্নের উত্তর। তাদের ধর্মবিশ্বাসে।

মিশরীয়রা বিশ্বাস করত। মানুষের মধ্যে দুটো সত্তা আছে।

প্রথমটা — কা।

মানে জীবনশক্তি। মৃত্যুর পর কা শরীর ছেড়ে যায়। কিন্তু সে ফিরে আসতে চায়।

দ্বিতীয়টা — বা।

মানে আত্মা। বা প্রতিদিন বের হয়। আবার ফিরে আসে। কিন্তু ফিরে আসতে হলে। শরীর অক্ষত থাকতে হবে। যদি শরীর পচে যায়। কা আর ফিরে আসতে পারবে না। এবং তখন। পরকালে।

সেই মানুষ চিরকালের জন্য হারিয়ে যাবে। তাই শরীর টিকিয়ে রাখা। শুধু ঐতিহ্য নয়। আত্মার বাঁচার একমাত্র উপায়।

এবার বুঝি।

মমি কে প্রথম বানিয়েছিল? আমরা জানি মিশরীয়রা। কিন্তু মিশরীয়দের আগে। প্রকৃতি বানিয়েছিল। মরুভূমির বালিতে। স্বাভাবিকভাবে। সেটা দেখে। মিশরীয়রা শিখেছিল।

এবং তারপর। ধীরে ধীরে। এই প্রক্রিয়া উন্নত করেছিল। হাজার বছর ধরে।  প্রথম দিকে। খ্রিস্টপূর্ব ৩২০০ সালের দিকে। মমিকরণ ছিল সহজ। শরীর শুকানো। কাপড়ে মোড়া।

শেষ। কিন্তু ধীরে ধীরে। মিশরীয়রা বুঝল। শুধু শুকালে হয় না। ভেতরের অঙ্গ পচে যায়।

তাই নতুন পদ্ধতি।

মমিকরণের পূর্ণ প্রক্রিয়া।

যেটা দেখলে বিজ্ঞানীরা আজও অবাক।

প্রথম ধাপ। মস্তিষ্ক বের করা। কিন্তু কীভাবে? মাথা না কেটে। নাক দিয়ে। একটা বিশেষ হুক দিয়ে। নাকের হাড় ভেঙে। মাথার ভেতরে ঢুকিয়ে।

মস্তিষ্ক ছোট ছোট টুকরো করে। বের করে আনা। এই একটা কাজই। আজকের সার্জনরাও সম্মান করেন। কারণ এতে মুখের হাড় অক্ষত থাকে। চেহারা নষ্ট হয় না।

দ্বিতীয় ধাপ।

পেট কাটা। বাম পাশে। ভেতরের অঙ্গ বের করা। কিন্তু হৃদয় নয়। হৃদয় রেখে দেওয়া হতো।

কারণ মিশরীয়রা ভাবত। হৃদয়ে থাকে মানুষের সব চিন্তা। পরকালে বিচারের সময়। হৃদয় ওজন করা হবে। পাপ বেশি হলে ভারী। পুণ্য বেশি হলে হালকা। তাই হৃদয় শরীরেই রাখা।

বের করা অঙ্গ। চারটে বিশেষ পাত্রে রাখা। ক্যানপিক জার। প্রতিটা পাত্রে এক ধরনের অঙ্গ।

প্রতিটার মাথায় এক দেবতার মুখ। হোরাসের চার ছেলে। পেট রক্ষা করেন হাপি। ফুসফুস রক্ষা করেন ইমসেতি। কলিজা রক্ষা করেন কেবেহসেনুফ। অন্ত্র রক্ষা করেন দুয়ামুতেফ।

তৃতীয় ধাপ।

নেট্রন লবণ। সারা শরীরে। ভেতরে। বাইরে। ৪০ দিন। এই লবণ শরীর থেকে সব আর্দ্রতা টেনে  নেয়। ৪০ দিন পর। শরীরের ওজন কমে। ৭৫ শতাংশ।

চতুর্থ ধাপ।

তেল। রজন। বিশেষ মিশ্রণ। শরীরে মাখানো। যাতে শুকিয়ে ভঙ্গুর না হয়ে যায়। এই মিশ্রণের রেসিপি। আজও পুরোপুরি জানা যায়নি। 

পঞ্চম ধাপ।

কাপড়ে মোড়া। কিন্তু সাধারণ কাপড় নয়। বিশেষ সুতার কাপড়। এবং প্রতিটা স্তরের মাঝে।

তাবিজ। মন্ত্র লেখা কাগজ। পরকালে রক্ষার জন্য।

এবার সবচেয়ে অবাক করা তথ্য।

এই পুরো প্রক্রিয়া। ৭০ দিন সময় নিত। এবং খরচ ছিল। একটা মাঝারি বাড়ির দামের সমান।

তাই শুধু ধনীরাই। পূর্ণ মমিকরণ করতে পারত। গরিবদের জন্য। সহজ পদ্ধতি। সিডার তেল দিয়ে। শুধু শুকানো। এবং একদম গরিবদের জন্য। শুধু বালিতে কবর। প্রকৃতির উপর ভরসা।

একটু ভাবো।

৫,০০০ বছর আগে। একটা দুর্ঘটনা। মরুভূমির বালিতে। স্বাভাবিকভাবে সংরক্ষিত মরদেহ।

সেটা দেখে। মানুষ একটা বিশ্বাস তৈরি করল। আত্মা ফিরে আসতে পারবে। যদি শরীর থাকে।

সেই বিশ্বাস থেকে। জন্ম নিল। পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল। সবচেয়ে রহস্যময়। এবং সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী। প্রযুক্তি। যা আজও। ৩,০০০ বছর পরে। আমাদের বিস্মিত করে।

10

ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর কারাগার — যেখানে মৃত্যুই ছিল মুক্তি।

একটা অন্ধকার ঘর। কোনো জানালা নেই।

কোনো আলো নেই। আপনি জানেন না এখন দিন না রাত। জানেন না কতদিন এখানে আছেন।

দেয়াল কথা বলে না। ছাদ কথা বলে না। একমাত্র শব্দ — নিজের হৃদয়ের ধুকপুকানি।

এক সপ্তাহ এভাবে থাকার পরে মানুষ পাগল হয়ে যায়। কিন্তু ইতিহাসের কিছু কারাগারে মানুষকে এভাবে রাখা হতো — মাসের পর মাস। বছরের পর বছর। আর সেটাই ছিল সবচেয়ে ছোট শাস্তি।

প্রথম — মামার্টাইন কারাগার। রোমের নরক।

রোমের মাটির নিচে। খ্রিস্টপূর্ব ৭শ শতাব্দী থেকে চালু। দুটো স্তর। উপরের স্তরে কিছুটা আলো আসে। কিন্তু নিচের স্তরে — সম্পূর্ণ অন্ধকার। সেখানে কাউকে নামানো হতো দড়ি দিয়ে।

একটা গর্তের মধ্যে দিয়ে। নিচে নামলে আর উপরে আসার পথ নেই। কারণ সেই গর্ত ঢাকা থাকত। শুধু খাবার নামিয়ে দেওয়া হতো। মাঝে মাঝে। রোমের সবচেয়ে বিখ্যাত বন্দিরা এখানে ছিলেন। ইতিহাস বলে — যিশুর শিষ্য পিটার এবং পলও এখানে বন্দি ছিলেন। সেই অন্ধকার গর্তে।

দ্বিতীয় — ইউনিট ৭৩১। ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর পরীক্ষাগার।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। জাপান অধিকৃত মাঞ্চুরিয়া। একটা গোপন সামরিক ইউনিট।

নাম — ইউনিট ৭৩১। এখানে বন্দিদের উপর পরীক্ষা চালানো হতো। কোনো অ্যানেস্থেশিয়া ছাড়া অস্ত্রোপচার। জীবন্ত মানুষের অঙ্গ কেটে দেখা হতো কীভাবে কাজ করে। ফ্রস্টবাইট পরীক্ষা। হাত বরফে ডুবিয়ে রাখা। দেখা হতো কতক্ষণে পচে যায়। চাপ পরীক্ষা। বন্দিদের এমন চেম্বারে রাখা হতো যেখানে বায়ুচাপ কমিয়ে দেওয়া হতো। চোখ বের হয়ে আসত। অঙ্গ ফেটে যেত। এই পরীক্ষায় কতজন মারা গেছে — আনুষ্ঠানিক হিসাবে ৩,০০০। অনানুষ্ঠানিক হিসাবে আরও বেশি। যুদ্ধের পরে এই ইউনিটের বিজ্ঞানীরা বিচার পাননি। কারণ আমেরিকা তাদের গবেষণার তথ্য চেয়েছিল। বিনিময়ে দিয়েছিল অভয়।

তৃতীয় — ব্ল্যাক হোল অফ কলকাতা।

১৭৫৬ সাল। বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার সৈনিকরা কলকাতা দখল করল। ব্রিটিশ বন্দিদের রাখা হলো একটা ছোট্ট ঘরে। ঘরের মাপ — ৪.৩ মিটার × ৫.৫ মিটার। ভেতরে ঢোকানো হলো ১৪৬ জন বন্দি। জুন মাসের ভ্যাপসা গরম। দুটো ছোট্ট জানালা। বাতাস নেই। জল নেই।

পরদিন সকালে দরজা খোলা হলো। মাত্র ২৩ জন বেঁচে ছিলেন। বাকি ১২৩ জন — শুধু দমবন্ধ হয়ে মারা গিয়েছিলেন। একটা রাতে।

চতুর্থ — পিট অফ ডেসপেয়ার। মনোবিজ্ঞানের কালো অধ্যায়।

১৯৬০-এর দশক। আমেরিকা। মনোবিজ্ঞানী হ্যারি হার্লো। তিনি বানরের উপর পরীক্ষা চালালেন। ছোট বানরছানাদের একটা সরু গর্তে রাখা হলো। একা।  কোনো আলো নেই। কোনো সঙ্গ নেই। সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। কয়েক সপ্তাহ পরে বের করা হলো। বানরগুলো আর কখনো  স্বাভাবিক হলো না। কোণে বসে নিজেরা নিজেদের আঘাত করত। কারো সাথে মিশত না।

এই পরীক্ষা থেকে প্রমাণিত হলো — একাকীত্ব শুধু মনকে নয়। মস্তিষ্ককেও চিরতরে বদলে দেয়।

পঞ্চম — আলকাট্রাজ। যেখান থেকে পালানো অসম্ভব ছিল।

সান ফ্রান্সিসকো বে-র মাঝখানে একটা দ্বীপ। আলকাট্রাজ। ১৯৩৪ থেকে ১৯৬৩।

চারদিকে ঠান্ডা সমুদ্র। তীব্র স্রোত। ৩ মাইল সাঁতরে মূল ভূখণ্ডে যেতে হবে। সম্ভব নয়।

এখানে রাখা হতো আমেরিকার সবচেয়ে বিপজ্জনক অপরাধীদের। আল ক্যাপোন। মেশিনগান কেলি। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর শাস্তি ছিল — ডি-ব্লক। একটা ছোট্ট সেল। ১ মিটার চওড়া। ২.৭ মিটার লম্বা। সম্পূর্ণ অন্ধকার। কোনো বই নেই। কোনো কথা বলার মানুষ নেই।

এখানে বন্দিরা সপ্তাহের পর সপ্তাহ থাকত। অনেকে বের হওয়ার পরে পাগল হয়ে গিয়েছিল।

ষষ্ঠ — উত্তর কোরিয়ার ক্যাম্প ১৪। আধুনিক নরক।

আধুনিক পৃথিবীতে। এখনও চলছে।  উত্তর কোরিয়ার রাজনৈতিক বন্দিশিবির। ক্যাম্প ১৪।

এখানে জন্ম নেওয়া শিশুরাও বন্দি। কারণ তাদের বাবা বা মা বন্দি। তিন প্রজন্ম ধরে।

যারা পালিয়ে বেঁচেছে তারা বলেছে — এখানে খাবার বলতে ছিল ইঁদুর আর সাপ। মানুষ মারা গেলে বাকিরা কাজ চালিয়ে যেত। লাশ সরাত বিকেলে। এই ক্যাম্পে এখনও কতজন আছে —

কেউ জানে না।

শেষ কথা।

কারাগার শুধু শরীরকে বন্দি করে না। মনকেও বন্দি করে।  আত্মাকেও। ইতিহাসের এই কারাগারগুলো প্রমাণ করে — মানুষ অন্য মানুষকে কতটা কষ্ট দিতে পারে। এবং একই সাথে প্রমাণ করে — মানুষ কতটা সহ্য করতে পারে। বেঁচে থাকতে পারে।  লড়তে পারে।


11

তিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর বিষ — যা রাজাদের ঘুমাতে দিত না।

রোমের এক রাজপ্রাসাদে ভোজসভা।

সম্রাট ক্লডিয়াস খাচ্ছেন। হাসছেন। তাঁর প্রিয় খাবার — মাশরুম। রান্না করেছেন তাঁর নিজের রাঁধুনি। খাওয়া শেষে তিনি শুতে গেলেন। ভোরবেলা খবর এলো — সম্রাট মারা গেছেন।

কেউ বুঝতে পারেনি কীভাবে। কিন্তু ইতিহাসবিদরা বলেন — সেই মাশরুমে বিষ ছিল।

বিষ দিয়েছিলেন তাঁর নিজের স্ত্রী — আগ্রিপিনা। কারণ তিনি চাইতেন নিজের ছেলে নিরো সম্রাট হোক। এবং সেটাই হলো। নিরো হলেন রোমের পরবর্তী সম্রাট। ইতিহাসের সবচেয়ে পাগল সম্রাট। একটা বিষের ফোঁটায় পৃথিবী বদলে গেল।

বিষ — ইতিহাসের সবচেয়ে নিঃশব্দ অস্ত্র।

যুদ্ধের ময়দানে মরলে বীর। বিষে মরলে — কেউ জানে না। তাই ক্ষমতার লড়াইয়ে বিষ ছিল সবচেয়ে প্রিয় অস্ত্র। কোনো শব্দ নেই। কোনো রক্ত নেই। শুধু একটা শান্ত মৃত্যু। এবং পরের দিন থেকে ক্ষমতা অন্যের হাতে।

প্রথম — বোর্গিয়া পরিবার। ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর বিষদাতা।

১৫শ শতাব্দী। ইতালি। বোর্গিয়া পরিবার। পোপ আলেকজান্ডার ষষ্ঠ। তাঁর ছেলে চেজারে। মেয়ে লুক্রেজিয়া। এই পরিবারের কাছে ছিল এক রহস্যময় বিষ — ক্যান্টারেলা। হোয়াইট পাউডার।

স্বাদহীন। গন্ধহীন। খাবারে বা পানীয়তে মিশিয়ে দাও। শিকার কিছু বুঝবে না। কিন্তু ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মারা যাবে। বোর্গিয়ারা এই বিষ দিয়ে কতজনকে মেরেছে — হিসাব নেই। রাজনৈতিক শত্রু। ধনী উত্তরাধিকারী। প্রতিদ্বন্দ্বী। একটা ভোজসভায় আমন্ত্রণ পেলে মানুষ ভয় পেত।

কারণ বোর্গিয়াদের আমন্ত্রণ মানেই — হয়তো শেষ রাতের খাবার।

দ্বিতীয় — মিথ্রিডেটস। যিনি বিষকেই বন্ধু বানিয়েছিলেন।

খ্রিস্টপূর্ব ১শ শতাব্দী। পন্টাসের রাজা মিথ্রিডেটস। তিনি এতটাই ভয় পেতেন বিষে মারা যাওয়ার — প্রতিদিন সকালে নিজে থেকেই অল্প অল্প বিষ খেতেন। শরীরকে অভ্যস্ত করাতেন।

বছরের পর বছর। এই পদ্ধতির নাম আজ — মিথ্রিডেটিজম।

তাঁর শত্রুরা যখন তাঁকে বিষ দিল — কিছুই হলো না। শরীর ততদিনে বিষকে চিনে ফেলেছে।

কিন্তু শেষ পরিণতি ছিল করুণ। রোমানদের হাতে পড়ার আগে তিনি নিজেই বিষ খেলেন।

কিন্তু মরলেন না। শরীর বিষে অভ্যস্ত। তখন নিজের দেহরক্ষীকে বললেন — "আমাকে তরোয়াল দিয়ে মারো।"

তৃতীয় — রাসপুটিন। যাকে বিষেও মারা যায়নি।

১৯১৬ সাল। রাশিয়া। রাসপুটিন — জার নিকোলাসের দরবারের রহস্যময় সন্ন্যাসী। তাঁকে মারার সিদ্ধান্ত নিল কয়েকজন রুশ অভিজাত।  পরিকল্পনা — বিষ দিয়ে। সন্ধ্যায় তাঁকে আমন্ত্রণ  জানানো হলো। পরিবেশন করা হলো কেক আর ওয়াইন। সবকিছুতে পটাসিয়াম সায়ানাইড।

যথেষ্ট পরিমাণে একজন মানুষকে কয়েক মিনিটে মারার। রাসপুটিন খেলেন। পান করলেন।

এবং — কিছুই হলো না। হাসতে হাসতে কথা বলছেন। তারপর তাঁকে গুলি করা হলো।

তিনি পড়ে গেলেন। কিন্তু উঠে দাঁড়ালেন। আবার গুলি। আবার উঠলেন। শেষে নদীতে ফেলে দেওয়া হলো। মৃত্যু হলো ঠান্ডায় ডুবে। এই মানুষটাকে আসলে কী থেকে বিষ কাজ করেনি —

আজও বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত নন।

চতুর্থ — চীনের গুপ্ত বিষ। যা শরীরে থাকত বছরের পর বছর।

প্রাচীন চীনে ছিল এক ভয়ংকর বিষ। গু বিষ। বিভিন্ন বিষধর প্রাণী একসাথে বন্ধ পাত্রে রাখা হতো। তারা একে অপরকে খেত। শেষে যে বেঁচে থাকত — তার শরীরে জমত সব প্রাণীর বিষ।

সেই প্রাণীকে পুড়িয়ে তৈরি হতো গু বিষ। এই বিষের বৈশিষ্ট্য ছিল — এটা শরীরে প্রবেশ করে ঘুমিয়ে থাকে। মাসের পর মাস। শিকার সুস্থ থাকে। তারপর বিষ দাতা যখন চায় —

সংকেত দেয়। এবং বিষ জেগে ওঠে। শিকার মারা যায়। কোনো প্রমাণ নেই। এই বিষের ভয়ে চীনের দরবারে মানুষ কাউকে বিশ্বাস করতে পারত না।

পঞ্চম — ভারতের বিষকন্যা।

প্রাচীন ভারতে। চাণক্যের অর্থশাস্ত্রে উল্লেখ আছে। বিষকন্যা। ছোট থেকে মেয়েদের অল্প অল্প বিষ খাওয়ানো হতো। বছরের পর বছর। শরীর অভ্যস্ত হয়ে যেত। তারা নিজেরা সুস্থ থাকত।

কিন্তু তাদের স্পর্শ। তাদের চুম্বন। মৃত্যু ডেকে আনত। শত্রু রাজার কাছে পাঠানো হতো এই মেয়েদের। উপহার হিসেবে। রাজা সন্দেহ করতেন না। কারণ দেখতে সুন্দর। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে রাজা অসুস্থ হয়ে পড়তেন। এবং মারা যেতেন। এই কৌশল সত্যিই ব্যবহার হয়েছিল কিনা —

ইতিহাসবিদরা এখনও বিতর্ক করছেন।

কিন্তু এটা লেখা আছে। হাজার বছরের পুরনো বইয়ে।

ষষ্ঠ — আধুনিক যুগের সবচেয়ে রহস্যময় বিষ।

২০০৬ সাল। লন্ডনে রুশ গোয়েন্দা আলেকজান্ডার লিটভিনেনকো। হঠাৎ অসুস্থ।

হাসপাতালে ভর্তি। ডাক্তাররা বুঝতে পারছেন না কী হয়েছে। শরীর ভেতর থেকে পুড়ে যাচ্ছে।

চুল পড়ে যাচ্ছে। অঙ্গ একটা একটা করে বিকল হচ্ছে। ২৩ দিন পরে মৃত্যু। তদন্তে বেরিয়ে এলো — তাঁকে বিষ দেওয়া হয়েছিল। পোলোনিয়াম ২১০। তেজস্ক্রিয় বিষ। এক গ্রামের কোটি ভাগের এক ভাগ পরিমাণে মারার ক্ষমতা রাখে। এই বিষ পৃথিবীতে মাত্র কয়েকটা জায়গায় তৈরি হয়। এবং সেই জায়গাগুলো কেবল সরকার নিয়ন্ত্রণ করে। কে দিয়েছিল?

তদন্ত হয়েছে। কিন্তু আজও আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ দোষী সাব্যস্ত হয়নি।

শেষ কথা।

হাজার বছর ধরে। বিষ ছিল ক্ষমতার সবচেয়ে নিঃশব্দ অস্ত্র। রাজপ্রাসাদ থেকে আধুনিক লন্ডনের রেস্তোরাঁ। কৌশল বদলেছে। কিন্তু খেলা বদলায়নি। ক্ষমতার জন্য। সিংহাসনের জন্য।

মানুষ আজও বিষ দেয়। শুধু পাত্র বদলেছে। চায়ের কাপ থেকে রাজনীতির টেবিলে।

12

ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর আচার — যা পড়লে রাতে ঘুম আসবে না।

একটু ভাবুন।

আপনার প্রিয়জন মারা গেছেন। শোকে ভেঙে পড়েছেন।

কিন্তু আপনার গোষ্ঠীর নিয়ম বলছে — তাঁর দেহ পুড়িয়ে সেই ছাই মিশিয়ে দিতে হবে কলার রসের সাথে। এবং পুরো পরিবারকে সেটা পান করতে হবে। এটা ঘৃণা নয়।

এটা ভালোবাসা। প্রিয়জনকে নিজের ভেতরে বহন করার ইচ্ছা। চিরকালের জন্য।

এই আচার পালন করত ব্রাজিলের ইয়ানোমামি উপজাতি। এবং এটা ছিল তাদের কাছে সবচেয়ে পবিত্র কাজ। আজকের পৃথিবীতে বসে আমরা এটাকে ভয়ংকর বলি।

কিন্তু তাদের কাছে — এটাই ছিল মৃতকে সম্মান জানানোর সর্বোচ্চ উপায়।

প্রথম আচার — জীবন্ত কবর।

প্রাচীন চীনে। রাজা মারা গেলে শুধু রাজাকে একা কবর দেওয়া হতো না। তাঁর সাথে কবর দেওয়া হতো — তাঁর স্ত্রী। দাস। ঘোড়া। সৈনিক। সবাই জীবন্ত। বিশ্বাস ছিল — পরকালেও রাজার সেবা করতে হবে। তাই তাদের সাথেই পাঠিয়ে দাও। চীনের প্রথম সম্রাট কিন শি হুয়াংয়ের কবরে পাওয়া গেছে — হাজার হাজার টেরাকোটার সৈনিক। আসল সৈনিকের বদলে মাটির।

কিন্তু তার আগের যুগে? আসল মানুষ। জীবন্ত। একটা অন্ধকার কবরে। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত।

দ্বিতীয় আচার — মৃতদের সাথে বসবাস।

মাদাগাস্কারের মালাগাসি উপজাতি। তাদের একটা আচার — ফামাদিহানা।

অর্থ — হাড় ঘুরানো। প্রতি সাত বছরে একবার। তারা পূর্বপুরুষদের কবর খুলে লাশ বের করে।

নতুন কাপড় পরিয়ে দেয়। সাথে নাচ করে। কথা বলে। খাবার খাওয়ায়। তারপর আবার কবরে রাখে। বিশ্বাস — মৃতরা আসলে মরেনি। তারা শুধু ঘুমাচ্ছে। পরিবারের সাথে এই সময়টুকু কাটানো তাদের আনন্দ দেয়। আজও এই আচার পালিত হয়। আধুনিক মাদাগাস্কারে।

তৃতীয় আচার — বিষ খেয়ে নিজেকে প্রমাণ।

ভারতের কিছু প্রাচীন উপজাতিতে। যুবক বয়সে পুরুষত্ব প্রমাণ করতে হতো। কীভাবে?

বিষধর সাপ ধরে। হাতে কামড়াতে দিয়ে। তারপর কোনো চিকিৎসা নেই। শরীরের নিজের শক্তিতে বাঁচতে হবে। যে বাঁচে — সে যোদ্ধা। যে মারা যায় — সে দুর্বল। এই আচার ছিল বাছাইয়ের পদ্ধতি। প্রকৃতির নিষ্ঠুর বিচার।

চতুর্থ আচার — বুলেট পিঁপড়ার গ্লাভস।

ব্রাজিলের সাতেরে মাউয়ে উপজাতি। একটি ছেলে পুরুষ হতে গেলে পার করতে হবে এক ভয়ংকর পরীক্ষা। বুলেট পিঁপড়া। এই পিঁপড়ার কামড়কে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে  বেদনাদায়ক। বুলেটের আঘাতের মতো ব্যথা। তাই নাম বুলেট পিঁপড়া। এই পিঁপড়া দিয়ে তৈরি গ্লাভস। সেই গ্লাভস হাতে পরতে হবে। ১০ মিনিট। পিঁপড়া কামড়াতে থাকে।

ছেলে চিৎকার করতে পারবে না। কাঁদতে পারবে না। স্থির থাকতে হবে। ১০ মিনিট পরে গ্লাভস খোলা। হাত ফুলে যায়। কাঁপতে থাকে। কিন্তু এটা শুধু একবার নয়। এই পরীক্ষা ২০ বার দিতে হয়। ২০ বার। তারপর সে সম্পূর্ণ পুরুষ হিসেবে স্বীকৃত। আজও এই আচার চলে।

পঞ্চম আচার — হাঙরের সাথে সাঁতার।

ফিজি দ্বীপের এক উপজাতি। সমুদ্রে সাঁতার কাটতে হবে। একা। রাতে। হাঙরের সাথে।

যে ভয় না পেয়ে ফিরে আসে — সে নেতা হওয়ার যোগ্য। কারণ নেতাকে সবচেয়ে বড় ভয়ের মুখেও স্থির থাকতে হয়। এই আচারে অনেকে মারা গেছে। কিন্তু আচার বন্ধ হয়নি।

ষষ্ঠ আচার — আকাশে দাফন।

তিব্বতের আকাশ দাফন। ঝাটোর। মানুষ মারা গেলে লাশ পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়।

সেখানে বিশেষ ব্যক্তিরা লাশ টুকরো টুকরো করেন। তারপর রেখে দেওয়া হয়। শকুন আসে।

খেয়ে নেয়। এটা ভয়ংকর মনে হলেও — তিব্বতিদের কাছে এটা সবচেয়ে পবিত্র।

কারণ তারা বিশ্বাস করেন — আত্মা শরীর ছেড়ে গেছে। শরীরটা শুধু খোল। সেই খোল দিয়ে অন্য প্রাণীদের বাঁচানো — এটাই শেষ দান। আজও তিব্বতে এই আচার চলে।

সপ্তম আচার — নিজের আঙুল কেটে শোক প্রকাশ।

ইন্দোনেশিয়ার দানি উপজাতি। পরিবারের কেউ মারা গেলে — নারীরা নিজের আঙুলের ডগা কেটে ফেলতেন। শোকের প্রতীক। এই নিয়ম ছিল কারণ — তারা বিশ্বাস করতেন শোক শুধু মনে নয়। শরীরেও অনুভব করতে হবে। যন্ত্রণা শোককে বাস্তব করে। এই আচার সরকারিভাবে নিষিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু বয়স্ক নারীদের হাতে আজও দেখা যায় — সেই কাটা আঙুলের চিহ্ন।

শেষ কথা।

এই আচারগুলো ভয়ংকর। অদ্ভুত। কখনো কখনো নিষ্ঠুর। কিন্তু প্রতিটার পেছনে ছিল একটা বিশ্বাস। একটা কারণ। একটা ভালোবাসা। যা আমরা বুঝতে পারি না। কারণ আমরা ভিন্ন সংস্কৃতিতে বড় হয়েছি। ইতিহাস আমাদের শেখায় — "ভয়ংকর" আর "ভুল" এক জিনিস নয়।

প্রতিটা সভ্যতার নিজস্ব সত্য ছিল।

13

মিশরের ওবেলিস্ক — ৪৫০ টন পাথর সমুদ্রে ভাসানোর অসম্ভব গল্প।

রোমের পিয়াজা দেল পোপোলো।

একটা বিশাল পাথরের স্তম্ভ। উচ্চতা ২৪ মিটার। ওজন ২৩৫ টন। এটা মিশরের।

৩,২০০ বছর আগে ফারাও রামেসিস দ্বিতীয় বানিয়েছিলেন। কিন্তু এটা রোমে কীভাবে এলো?

সমুদ্রপথে। ২,০০০ বছর আগে। কোনো আধুনিক ক্রেন নেই। কোনো ইঞ্জিন নেই। কোনো স্টিলের তার নেই। শুধু কাঠ। দড়ি। আর মানুষের অসাধারণ বুদ্ধি। এই গল্প শুনলে আজকের ইঞ্জিনিয়াররাও মাথা নামিয়ে দেন।

ওবেলিস্ক — পাথরের যে বার্তা আকাশের দিকে।

প্রাচীন মিশরে ওবেলিস্ক ছিল সূর্যদেবের প্রতীক। একটা পাথরের লম্বা স্তম্ভ। চারকোণা। উপরে পিরামিডের মতো মাথা। সেই মাথায় ইলেক্ট্রাম — সোনা আর রুপার মিশ্রণ। সূর্যের আলো পড়লে দূর থেকে জ্বলজ্বল করত। মন্দিরের সামনে জোড়ায় জোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকত।

কিন্তু এই বিশাল পাথর কোথা থেকে আসত? আসোয়ানের খনি থেকে। নীল নদের উপরে।

সেই পাথর কাটা হতো। নদীপথে নিয়ে যাওয়া হতো। কিন্তু রোমে নিয়ে যেতে হলে সমুদ্র পার করতে হবে।

সেই অসম্ভব জাহাজ।

রোমান সম্রাট অগাস্টাস মিশর জয় করলেন। মিশর থেকে ওবেলিস্ক নিয়ে যাবেন রোমে।

কিন্তু সমস্যা একটাই। একটা ওবেলিস্কের ওজন ২০০ থেকে ৫০০ টন। এত ভার বহন করতে পারে এমন জাহাজ কি বানানো সম্ভব? রোমানরা বানাল। সেই জাহাজের নাম ইতিহাসে লেখা নেই। কিন্তু তার বর্ণনা আছে। দৈর্ঘ্য প্রায় ১০০ মিটার। প্রস্থ ২০ মিটার। কাঠের তৈরি। কিন্তু এতটাই মজবুত যে ৫০০ টনেরও বেশি ভার নিতে পারত। ২,০০০ বছর পরে আধুনিক প্রকৌশলীরা সেই নকশা দেখে অবাক হয়েছেন। কারণ সেই জাহাজের গঠনে এমন কিছু নীতি ব্যবহার হয়েছিল — যা আধুনিক জাহাজবিদ্যায়ও ব্যবহার হয়।

ওবেলিস্ক জাহাজে তোলার সেই কৌশল।

সবচেয়ে বড় রহস্য ছিল — ৪৫০ টনের পাথর জাহাজে তুলবেন কীভাবে? ক্রেন নেই। হাইড্রোলিক নেই। রোমানরা যা করেছিল — প্রথমে নীল নদের পাড়ে একটা কৃত্রিম খাল খুঁড়ল।

জাহাজ সেই খালে আনা হলো। তারপর খালের পানি কমিয়ে দেওয়া হলো। জাহাজ নিচে নামল। ওবেলিস্ক লগ আর দড়ি দিয়ে টেনে জাহাজের উপর নিয়ে আসা হলো। তারপর খালে পানি ছাড়া হলো। জাহাজ উপরে উঠল। ওবেলিস্ক জাহাজে। এই কৌশল আজকের জাহাজঘাটায়ও ব্যবহার হয়। ড্রাই ডক পদ্ধতি। ২,০০০ বছর আগে রোমানরা এটা আবিষ্কার করেছিল।

সমুদ্রের যাত্রা — যে ভয়াবহতার কথা কেউ বলে না।

ভূমধ্যসাগর। ৩,০০০ কিলোমিটার পথ। মাঝ সমুদ্রে ঝড়। ৪৫০ টনের পাথর বুকে নিয়ে জাহাজ দুলছে। এই যাত্রায় কোনো রেডিও নেই। কোনো আবহাওয়ার পূর্বাভাস নেই। যদি ঝড়ে জাহাজ কাত হয়ে যায় — ৪৫০ টনের পাথর সরে যাবে। জাহাজ উল্টে যাবে। সবাই মরবে। এই জেনেও সেই যাত্রা করা হয়েছিল। এবং সফল হয়েছিল।

রোমে ওবেলিস্ক নামানোর কৌশল।

রোমে পৌঁছানোর পর আরেকটা সমস্যা। জাহাজ থেকে ওবেলিস্ক নামাতে হবে। তারপর শহরের মধ্যে নিয়ে যেতে হবে। তারপর সোজা করে দাঁড় করাতে হবে। রোমানরা এখানেও অসাধারণ কৌশল ব্যবহার করেছিল। বালির বস্তা। ওবেলিস্কের নিচে বালির বস্তা রাখা হলো।

ধীরে ধীরে বালি সরানো হলো। ওবেলিস্ক ধীরে ধীরে নামল।  তারপর দড়ি আর লিভার দিয়ে সোজা করা হলো। এই পুরো প্রক্রিয়া দেখতে রোমের হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিল।

পৃথিবীজুড়ে মিশরের ওবেলিস্ক।

আজ পৃথিবীতে ৩০টিরও বেশি মিশরীয় ওবেলিস্ক আছে। মাত্র ৯টি মিশরে। বাকিগুলো রোমে। লন্ডনে। প্যারিসে। নিউ ইয়র্কে। ইস্তাম্বুলে। লন্ডনের ক্লিওপেট্রার সুই — টেমস নদীর পাড়ে।

প্যারিসের লুক্সর ওবেলিস্ক — কনকর্ড চত্বরে। নিউ ইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কের ওবেলিস্ক।

এগুলো সব ৩,০০০ বছরেরও বেশি পুরনো। মিশর থেকে কীভাবে এলো — প্রতিটার গল্প আলাদা। কিন্তু প্রতিটাই অসাধারণ।

সবচেয়ে বড় ওবেলিস্ক — যেটা কখনো নড়েনি।

আসোয়ানের খনিতে আজও একটা অসম্পূর্ণ ওবেলিস্ক পড়ে আছে। উচ্চতা হতো ৪২ মিটার। ওজন হতো ১,২০০ টন। কিন্তু কাটতে কাটতে পাথরে ফাটল ধরল। বাতিল হয়ে গেল।

৩,৫০০ বছর ধরে সেখানেই পড়ে আছে। আধুনিক প্রকৌশলীরা বলেন — আজকের প্রযুক্তি দিয়েও এই পাথর সরানো ভীষণ কঠিন হতো। মিশরীয়রা এটা বানাতে চেয়েছিল।

খালি হাতে।

শেষ কথা।

৩,০০০ বছর আগের মানুষ। কোনো আধুনিক যন্ত্র নেই। তবু তারা এমন কিছু বানিয়েছিল —

যা আজও পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শহরগুলোর কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে। লন্ডনে। প্যারিসে। রোমে। নিউ ইয়র্কে। সবাই এই পাথরের সামনে দাঁড়িয়ে থামে। কিন্তু কেউ জানে না — এই পাথর কতটা অসম্ভব যাত্রা করে এখানে এসেছে।

14

ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর আচার  

একটু ভাবুন।

আপনার প্রিয়জন মারা গেছেন। শোকে ভেঙে পড়েছেন।

কিন্তু আপনার গোষ্ঠীর নিয়ম বলছে — তাঁর দেহ পুড়িয়ে সেই ছাই মিশিয়ে দিতে হবে কলার রসের সাথে। এবং পুরো পরিবারকে সেটা পান করতে হবে। এটা ঘৃণা নয়।

এটা ভালোবাসা। প্রিয়জনকে নিজের ভেতরে বহন করার ইচ্ছা। চিরকালের জন্য।

এই আচার পালন করত ব্রাজিলের ইয়ানোমামি উপজাতি। এবং এটা ছিল তাদের কাছে সবচেয়ে পবিত্র কাজ। আজকের পৃথিবীতে বসে আমরা এটাকে ভয়ংকর বলি।

কিন্তু তাদের কাছে — এটাই ছিল মৃতকে সম্মান জানানোর সর্বোচ্চ উপায়।

প্রথম আচার — জীবন্ত কবর।

প্রাচীন চীনে। রাজা মারা গেলে শুধু রাজাকে একা কবর দেওয়া হতো না। তাঁর সাথে কবর দেওয়া হতো — তাঁর স্ত্রী। দাস। ঘোড়া। সৈনিক। সবাই জীবন্ত। বিশ্বাস ছিল — পরকালেও রাজার সেবা করতে হবে। তাই তাদের সাথেই পাঠিয়ে দাও। চীনের প্রথম সম্রাট কিন শি হুয়াংয়ের কবরে পাওয়া গেছে — হাজার হাজার টেরাকোটার সৈনিক। আসল সৈনিকের বদলে মাটির।

কিন্তু তার আগের যুগে? আসল মানুষ। জীবন্ত। একটা অন্ধকার কবরে। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত।

দ্বিতীয় আচার — মৃতদের সাথে বসবাস।

মাদাগাস্কারের মালাগাসি উপজাতি। তাদের একটা আচার — ফামাদিহানা।

অর্থ — হাড় ঘুরানো। প্রতি সাত বছরে একবার। তারা পূর্বপুরুষদের কবর খুলে লাশ বের করে।

নতুন কাপড় পরিয়ে দেয়। সাথে নাচ করে। কথা বলে। খাবার খাওয়ায়। তারপর আবার কবরে রাখে। বিশ্বাস — মৃতরা আসলে মরেনি। তারা শুধু ঘুমাচ্ছে। পরিবারের সাথে এই সময়টুকু কাটানো তাদের আনন্দ দেয়। আজও এই আচার পালিত হয়। আধুনিক মাদাগাস্কারে।

তৃতীয় আচার — বিষ খেয়ে নিজেকে প্রমাণ।

ভারতের কিছু প্রাচীন উপজাতিতে। যুবক বয়সে পুরুষত্ব প্রমাণ করতে হতো। কীভাবে?

বিষধর সাপ ধরে। হাতে কামড়াতে দিয়ে। তারপর কোনো চিকিৎসা নেই। শরীরের নিজের শক্তিতে বাঁচতে হবে। যে বাঁচে — সে যোদ্ধা। যে মারা যায় — সে দুর্বল। এই আচার ছিল বাছাইয়ের পদ্ধতি। প্রকৃতির নিষ্ঠুর বিচার।

চতুর্থ আচার — বুলেট পিঁপড়ার গ্লাভস।

ব্রাজিলের সাতেরে মাউয়ে উপজাতি। একটি ছেলে পুরুষ হতে গেলে পার করতে হবে এক ভয়ংকর পরীক্ষা। বুলেট পিঁপড়া। এই পিঁপড়ার কামড়কে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে  বেদনাদায়ক। বুলেটের আঘাতের মতো ব্যথা। তাই নাম বুলেট পিঁপড়া। এই পিঁপড়া দিয়ে তৈরি গ্লাভস। সেই গ্লাভস হাতে পরতে হবে। ১০ মিনিট। পিঁপড়া কামড়াতে থাকে।

ছেলে চিৎকার করতে পারবে না। কাঁদতে পারবে না। স্থির থাকতে হবে। ১০ মিনিট পরে গ্লাভস খোলা। হাত ফুলে যায়। কাঁপতে থাকে। কিন্তু এটা শুধু একবার নয়। এই পরীক্ষা ২০ বার দিতে হয়। ২০ বার। তারপর সে সম্পূর্ণ পুরুষ হিসেবে স্বীকৃত। আজও এই আচার চলে।

পঞ্চম আচার — হাঙরের সাথে সাঁতার।

ফিজি দ্বীপের এক উপজাতি। সমুদ্রে সাঁতার কাটতে হবে। একা। রাতে। হাঙরের সাথে।

যে ভয় না পেয়ে ফিরে আসে — সে নেতা হওয়ার যোগ্য। কারণ নেতাকে সবচেয়ে বড় ভয়ের মুখেও স্থির থাকতে হয়। এই আচারে অনেকে মারা গেছে। কিন্তু আচার বন্ধ হয়নি।

ষষ্ঠ আচার — আকাশে দাফন।

তিব্বতের আকাশ দাফন। ঝাটোর। মানুষ মারা গেলে লাশ পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়।

সেখানে বিশেষ ব্যক্তিরা লাশ টুকরো টুকরো করেন। তারপর রেখে দেওয়া হয়। শকুন আসে।

খেয়ে নেয়। এটা ভয়ংকর মনে হলেও — তিব্বতিদের কাছে এটা সবচেয়ে পবিত্র।

কারণ তারা বিশ্বাস করেন — আত্মা শরীর ছেড়ে গেছে। শরীরটা শুধু খোল। সেই খোল দিয়ে অন্য প্রাণীদের বাঁচানো — এটাই শেষ দান। আজও তিব্বতে এই আচার চলে।

সপ্তম আচার — নিজের আঙুল কেটে শোক প্রকাশ।

ইন্দোনেশিয়ার দানি উপজাতি। পরিবারের কেউ মারা গেলে — নারীরা নিজের আঙুলের ডগা কেটে ফেলতেন। শোকের প্রতীক। এই নিয়ম ছিল কারণ — তারা বিশ্বাস করতেন শোক শুধু মনে নয়। শরীরেও অনুভব করতে হবে। যন্ত্রণা শোককে বাস্তব করে। এই আচার সরকারিভাবে নিষিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু বয়স্ক নারীদের হাতে আজও দেখা যায় — সেই কাটা আঙুলের চিহ্ন।

শেষ কথা।

এই আচারগুলো ভয়ংকর। অদ্ভুত। কখনো কখনো নিষ্ঠুর। কিন্তু প্রতিটার পেছনে ছিল একটা বিশ্বাস। একটা কারণ। একটা ভালোবাসা। যা আমরা বুঝতে পারি না। কারণ আমরা ভিন্ন সংস্কৃতিতে বড় হয়েছি। ইতিহাস আমাদের শেখায় — "ভয়ংকর" আর "ভুল" এক জিনিস নয়।

প্রতিটা সভ্যতার নিজস্ব সত্য ছিল।

15

আজটেক সভ্যতা — হৃদয় উপড়ে নেওয়ার পেছনে যে বিজ্ঞান ছিল।

পিরামিডের চূড়ায় একজন মানুষ।

চারজন পুরোহিত তাঁকে শক্ত করে ধরে আছেন। পঞ্চম পুরোহিত হাতে ধারালো পাথরের ছুরি।

এক মুহূর্তে — বুক চিরে হৃদয় বের করা হলো। তখনও স্পন্দন হচ্ছে। সেই স্পন্দিত হৃদয় সূর্যের দিকে তুলে ধরা হলো। নিচে হাজার হাজার মানুষ। তারা চিৎকার করল না। কাঁদল না।

বরং তারা বিশ্বাস করত — এই বলিদান না হলে কাল সূর্য উঠবে না। পৃথিবী অন্ধকারে ডুবে যাবে।

এটা বর্বরতা ছিল না তাদের কাছে। এটা ছিল ভালোবাসা। পৃথিবীকে বাঁচানোর জন্য।

আজটেক — যে সভ্যতাকে আমরা ভুল বুঝেছি।

মেক্সিকোর মাঝখানে। একটা হ্রদের উপরে শহর। টেনোকটিটলান। ১৫০০ সালে এই শহরের জনসংখ্যা ছিল ২ লক্ষেরও বেশি। সেই সময়ে লন্ডনের জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৫০,০০০।

একটা হ্রদের উপরে বানানো শহর। কৃত্রিম দ্বীপ। পানির উপর রাস্তা। খাল। এবং চারদিকে ভাসমান বাগান। যেখানে সবজি আর ফুল জন্মাত। স্প্যানিশ বিজয়ীরা প্রথমবার দেখে বলেছিলেন — "এটা স্বপ্নের মতো। বিশ্বাস করতে পারছি না।"

মানব বলিদানের পেছনে যে বিশ্বাস।

আজটেকরা বিশ্বাস করত — পৃথিবী ইতিমধ্যে চারবার ধ্বংস হয়েছে। প্রতিবার সূর্য নিভে গেছে।

এখন পঞ্চম সূর্য চলছে। এই সূর্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। কীভাবে? রক্ত দিয়ে। মানুষের হৃদয় দিয়ে। তারা বিশ্বাস করত — দেবতারা পৃথিবী বানাতে নিজেদের রক্ত দিয়েছিলেন। তাই মানুষকেও রক্ত দিতে হবে। এটা বিনিময়। এটা কর্তব্য। এই বিশ্বাসই তাদের কাছে বিজ্ঞান ছিল।

যে জ্ঞান স্প্যানিশরা ধ্বংস করে দিয়েছিল।

আজটেকদের ছিল অসাধারণ চিকিৎসাবিদ্যা। তারা জানত কোন গাছের পাতায় কোন রোগ সারে। ক্ষত সারাতে পারত। দাঁতের চিকিৎসা করত। তাদের ছিল নিজস্ব লিপি। বই। জ্ঞানের ভাণ্ডার। ১৫২১ সালে স্প্যানিশ বিজয়ী হার্নান কর্টেস টেনোকটিটলান দখল করলেন।

তারপর যা করলেন — আজটেকদের সব বই পুড়িয়ে দিলেন। সব মন্দির ভেঙে দিলেন।

হাজার বছরের জ্ঞান — কয়েকদিনে ছাই। আজ মাত্র কয়েকটা আজটেক বই টিকে আছে।

বাকিটা চিরতরে হারিয়ে গেছে।

আজটেক ক্যালেন্ডার — যা মায়াদের মতোই নির্ভুল। আজটেকদের ক্যালেন্ডার পাথরে খোদাই।

সেই পাথর আজও মেক্সিকো সিটিতে। ওজন ২৪ টন। ব্যাস ৩.৬ মিটার। এই পাথরে আজটেকদের সময়ের হিসাব। দুটো ক্যালেন্ডার একসাথে। একটা ২৬০ দিনের। একটা ৩৬৫ দিনের। প্রতি ৫২ বছরে দুটো মিলে যায়। সেই মুহূর্তকে আজটেকরা মনে করত সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ এই মুহূর্তে পৃথিবী ধ্বংস হতে পারে। তখন বিশাল আগুন জ্বালানো হতো।

দেবতাকে মানব বলি দেওয়া হতো। সূর্যকে আরও ৫২ বছর বাঁচিয়ে রাখার জন্য।

সেই এক মুহূর্ত — যে ভুলে সভ্যতা শেষ হলো।

১৫১৯ সাল। একটা জাহাজ এলো। ভেতর থেকে বের হলো সাদা চামড়ার মানুষ।

ঘোড়ার পিঠে। চকচকে বর্ম পরা। আজটেক সম্রাট দ্বিতীয় মোক্তেজুমা বিশ্বাস করলেন —

এরা দেবতা। কারণ আজটেক পুরাণে বলা ছিল — একদিন সাদা চামড়ার দেবতা পূর্ব থেকে আসবেন। মোক্তেজুমা তাদের স্বাগত জানালেন। উপহার দিলেন। তাদের প্রাসাদে ঢোকার অনুমতি দিলেন। সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় ভুল। স্প্যানিশরা দেবতা ছিল না।

তারা ছিল বিজয়ী। এবং মাত্র ২ বছরে তারা পুরো আজটেক সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দিল।

যে জিনিসটা স্প্যানিশরা আনেনি — কিন্তু সেটাই সব মেরেছিল।

স্প্যানিশ সৈনিক ছিল মাত্র কয়েকশো। আজটেক সৈনিক ছিল হাজার হাজার। তাহলে কীভাবে হারল আজটেকরা? গুটিবসন্ত। স্প্যানিশরা অজান্তে নিয়ে এসেছিল এই রোগ।  ইউরোপে এই রোগে মানুষ মরত। কিন্তু যারা বেঁচে যেত — তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতো।

কিন্তু আজটেকরা এই রোগ আগে কখনো দেখেনি। শহরের পর শহর ফাঁকা হয়ে গেল।

মানুষ মরতে লাগল। যুদ্ধের আগেই ৫০ শতাংশ মানুষ মারা গেল। একটা রোগ যা অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী ছিল।

শেষ কথা।

একটা সভ্যতা। যারা হ্রদের উপরে শহর বানিয়েছিল। যারা পৃথিবীকে ভালোবেসে মানুষের হৃদয় উৎসর্গ করত। যারা ২৪ টনের পাথরে সময়ের হিসাব রেখেছিল। তারা শেষ হয়ে গেল। একটা রোগে আর একজন বিজয়ীর লোভে। তাদের শহর আজ মেক্সিকো সিটির নিচে। তাদের মন্দিরের উপরে আজ ক্যাথেড্রাল। কিন্তু তাদের গল্প — মাটির নিচ থেকে আজও বের হয়ে আসছে।

16

মিশরের সবচেয়ে সফল ফারাওদের একজন ছিলেন নারী — মৃত্যুর পর তাঁর সব মূর্তি ভেঙে দেওয়া হয়েছিল — নাম মুছে দেওয়া হয়েছিল — কিন্তু কেন?

খ্রিস্টপূর্ব ১৪৭৮ সাল।

মিশরের সিংহাসন খালি। নতুন ফারাও হওয়ার কথা থুতমোস তৃতীয়ের। কিন্তু সমস্যা একটাই —

থুতমোস তৃতীয়ের বয়স মাত্র দুই বছর। দুই বছরের শিশু মিশর শাসন করবে কীভাবে?

তাই সিংহাসনে বসলেন তাঁর সৎমা। সহ-শাসক হিসেবে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সব বদলে গেল। সহ-শাসক নয়। তিনি হলেন পুরোদস্তুর ফারাও। দাড়ি পরলেন। পুরুষের পোশাক পরলেন। ফারাওয়ের সব চিহ্ন গ্রহণ করলেন। এবং পরের ২০ বছর মিশর শাসন করলেন।

এতটাই দক্ষতায়। এতটাই শক্তিতে। যে ইতিহাসবিদরা বলেন — হাতশেপসুত ছিলেন মিশরের সবচেয়ে সফল ফারাওদের একজন।

হাতশেপসুত শুধু শাসন করেননি।

তিনি নির্মাণ করেছিলেন। প্রচুর। দেইর এল-বাহারির মর্চুয়ারি মন্দির। আজও দাঁড়িয়ে আছে।

পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর প্রাচীন স্থাপত্যগুলোর একটা। কার্নাকে দুটো বিশাল ওবেলিস্ক।

প্রতিটার উচ্চতা ৩০ মিটার। সোনায় মোড়ানো। সূর্যের আলোয় দূর থেকে দেখা যেত।

কিন্তু সবচেয়ে অবাক করা কাজ ছিল পুন্ত অভিযান।

পুন্ত।

এই নামের জায়গা কোথায় ছিল আজও নিশ্চিত নয়। কেউ বলেন আফ্রিকার পূর্ব উপকূলে।

কেউ বলেন আরব উপদ্বীপে। হাতশেপসুত সেখানে জাহাজ পাঠালেন। পাঁচটি বিশাল জাহাজ।

এবং ফিরে এলো সোনা। গন্ধরস। হাতির দাঁত। গাছ। এতটাই সফল যে মন্দিরের দেওয়ালে পুরো অভিযানের ছবি আঁকা হলো। আজও দেখা যায়।

একটু ভাবো।

৩,৫০০ বছর আগে। একজন নারী। শুধু শাসন নয়। বাণিজ্য অভিযান পাঠাচ্ছেন। সমুদ্রপথে।

অজানা দেশে। এই সাহস কোথা থেকে পেয়েছিলেন? হাতশেপসুত মারা গেলেন। মিশর ফিরে গেল থুতমোস তৃতীয়ের হাতে। সেই দুই বছরের শিশু তখন যুবক। এবং তিনি এমন কিছু করলেন — যা ইতিহাসে বিরল। হাতশেপসুতের সব মূর্তি ভাঙা হলো। সব শিলালিপি থেকে তাঁর নাম মুছে দেওয়া হলো। মন্দিরের দেওয়াল থেকে তাঁর ছবি কেটে ফেলা হলো। যেন তিনি কখনো ছিলেনই না।

কিন্তু কেন?

এই প্রশ্ন বিজ্ঞানীরা শতাব্দী ধরে করে আসছেন। কেউ বলেন — ক্ষোভ। থুতমোস তৃতীয় হয়তো ক্ষুব্ধ ছিলেন। একজন নারী তাঁর জায়গা দখল করেছিলেন। কেউ বলেন — ভয়। হাতশেপসুত এতটাই শক্তিশালী ছিলেন যে মানুষ তাঁকে মনে রাখলে হয়তো বিদ্রোহ হতো। কেউ বলেন — রাজনীতি। থুতমোসের উত্তরাধিকারকে প্রশ্নের মুখে পড়তে না হয় তার জন্য। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর তত্ত্ব হলো — ইতিহাস থেকে কাউকে মুছে দেওয়া যায়। যদি ক্ষমতা থাকে।

কিন্তু ইতিহাস মুছে যায়নি।

১৮২২ সালে। শ্যাম্পোলিয়ঁ হায়ারোগ্লিফিক্স পড়তে শিখলেন। এবং ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো হাতশেপসুতের গল্প। ভাঙা মূর্তির টুকরোগুলো জোড়া লাগানো হলো। মুছে দেওয়া নাম পড়া হলো। এবং ৩,৩০০ বছর পর হাতশেপসুত ফিরে এলেন। ইতিহাসে। আরও শক্তিশালী হয়ে।

২০০৭ সালে বিজ্ঞানীরা হাতশেপসুতের মমি শনাক্ত করলেন।

কীভাবে? একটা দাঁতের মাধ্যমে। তাঁর মমির সাথে রাখা একটা বাক্সে পাওয়া গিয়েছিল একটা দাঁত। DNA পরীক্ষায় দেখা গেল — সেই দাঁত এবং একটা অজ্ঞাত মমি। একই মানুষের।

এবং সেই মমিই হাতশেপসুত। ৩,৩০০ বছর পর। একটা দাঁত তাঁর পরিচয় ফিরিয়ে দিল।

একটু ভাবো।

একজন মানুষ ২০ বছর মিশর শাসন করলেন। মন্দির বানালেন। বাণিজ্য অভিযান পাঠালেন।

মিশরকে সমৃদ্ধ করলেন। মৃত্যুর পর তাঁকে মুছে দেওয়া হলো। ৩,৩০০ বছর অন্ধকারে ছিলেন।

কিন্তু একটা দাঁত তাঁকে ফিরিয়ে আনল। ইতিহাস কখনো পুরোপুরি মুছে যায় না। সত্যি সবসময় ফিরে আসে। দেরিতে হলেও।

17

৯০ বছর বেঁচে ছিলেন। ৬৭ বছর শাসন করেছিলেন। ১০০টি সন্তান ছিল। মৃত্যুর ৩,০০০ বছর পরেও পাসপোর্ট পেয়েছিলেন — এই ফারাও সম্পর্কে যা জানো তার বেশিরভাগই ভুল।

১৯৭৪ সাল।

মিশর সরকার একটা পাসপোর্ট তৈরি করল। পাসপোর্টে ছবি আছে। পেশা লেখা আছে — রাজা। এবং সেই পাসপোর্ট নিয়ে একটি বিশেষ যাত্রী চড়ল বিমানে। কায়রো থেকে প্যারিস।

ফ্রান্সের বিমানবন্দরে নামার পর সামরিক সম্মান দেওয়া হলো তাঁকে। যেভাবে কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে সম্মান দেওয়া হয়। কিন্তু সেই যাত্রী কথা বলতে পারেন না। হাঁটতে পারেন না।

কারণ তিনি মারা গেছেন। ৩,০০০ বছর আগে। তাঁর নাম — রামেসিস দ্বিতীয়।

ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী ফারাও।

রামেসিস দ্বিতীয়।

মিশরীয়রা ডাকত — রামেসিস দ্য গ্রেট। মহান রামেসিস। ৯০ বছর বেঁচে ছিলেন।

সেই যুগে যখন মানুষ গড়ে ৩০-৪০ বছর বাঁচত। ৬৭ বছর ধরে মিশর শাসন করেছিলেন।

৮টি প্রধান স্ত্রী ছিলেন। সন্তান ছিল কমপক্ষে ১০০। এবং তাঁর নামে মিশরে যত মন্দির আছে —

অন্য কোনো ফারাওয়ের নামে তার অর্ধেকও নেই।

কিন্তু এই মানুষটার সবচেয়ে বড় যুদ্ধের গল্পটা একটু আলাদা।

কাদেশের যুদ্ধ। খ্রিস্টপূর্ব ১২৭৪ সাল।  মিশর বনাম হিটাইট সাম্রাজ্য। দুই পক্ষেই হাজারো রথ। লক্ষ লক্ষ সৈন্য। ইতিহাসের প্রথম বড় রথযুদ্ধ।  রামেসিস প্রায় বন্দি হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর বাহিনী ঘেরাও। কিন্তু তিনি একাই রথে চেপে শত্রুর মাঝে ঢুকে পড়লেন। এবং ফিরে এলেন।

যুদ্ধ শেষে রামেসিস দাবি করলেন — জিতেছি। হিটাইটরাও দাবি করল — জিতেছি।

সত্যিটা হলো কেউ জেতেনি।

ড্র।

কিন্তু রামেসিস মিশরের সব দেওয়ালে লিখিয়ে দিলেন — তিনি জিতেছেন। বিশাল বিশাল ছবি।

নিজে একা হাজারো শত্রু বধ করছেন। পৃথিবীর প্রথম রাজনৈতিক প্রচারণা। ৩,৩০০ বছর আগে।

এবার সেই তথ্য বলব যা সবচেয়ে কম মানুষ জানে।

কাদেশের যুদ্ধের পর মিশর আর হিটাইটরা একটা চুক্তি সই করল। সেই চুক্তির কপি আজও আছে। ইস্তাম্বুলের জাদুঘরে। এবং জাতিসংঘের নিউইয়র্ক সদরদপ্তরের দেওয়ালে। কারণ এটা পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম লিখিত শান্তিচুক্তি। ৩,৩০০ বছর পুরনো। আর আজকের বিশ্বসংস্থা সেটাকে সম্মান জানায়।

এবার ফিরে আসি পাসপোর্টের গল্পে।

১৯৭৪ সালে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করলেন — রামেসিসের মমিতে ছত্রাক আক্রমণ করেছে।

নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফ্রান্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসা সম্ভব। কিন্তু সমস্যা হলো — মিশরীয় আইনে যেকোনো মানুষের মৃতদেহ বিদেশে যেতে হলে পাসপোর্ট লাগে। তাই মিশর সরকার   রামেসিসের জন্য পাসপোর্ট বানাল। পেশা — রাজা।

৩,০০০ বছর আগে মারা যাওয়া মানুষের পাসপোর্ট। ফ্রান্সে নামার পর তাঁকে রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদা দেওয়া হলো। কারণ জীবিত থাকলে তিনি রাজাই হতেন। ইতিহাসের সবচেয়ে অদ্ভুত কূটনৈতিক ঘটনা।

কিন্তু সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য।

রামেসিসের মমি পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করলেন — তাঁর চুলের রং ছিল লাল।

মিশরীয়দের চুল সাধারণত কালো। লাল চুলের ফারাও। এবং তাঁর DNA পরীক্ষায় দেখা গেছে —

তাঁর জিনোমে মধ্যপ্রাচ্যের বৈশিষ্ট্য। রামেসিস কি মিশরীয় ছিলেন? নাকি অন্য কোথাও থেকে এসেছিলেন তাঁর পূর্বপুরুষেরা? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি মেলেনি।

রামেসিস দ্বিতীয় মারা গেলেন খ্রিস্টপূর্ব ১২১৩ সালে।

৯০ বছর বয়সে। তখন তাঁর শরীরে ছিল আর্থ্রাইটিস। দাঁতের রোগ। বিজ্ঞানীরা বলেন — শেষ জীবনে তিনি চলতে পারতেন না। প্রচণ্ড কষ্টে ছিলেন। তবু ৬৭ বছর শাসন করেছিলেন।

এই মানুষটা সত্যিই মহান ছিলেন? নাকি শুধু নিজের গল্প নিজেই লিখেছিলেন?

একটু ভাবো।

৩,৩০০ বছর পরেও তাঁর নাম টিকে আছে। মিশরের মাটিতে তাঁর মন্দির টিকে আছে।

জাতিসংঘের দেওয়ালে তাঁর চুক্তি টিকে আছে। এবং প্যারিসে তাঁর মমি চিকিৎসা পেয়েছে।

কোনো মানুষ কি এর চেয়ে বেশি অমর হতে পারে?

18

মিশরের এই ফারাও একদিনে সব দেবতা বাতিল করে দিলেন — মন্দির ভাঙলেন — নতুন ধর্ম চাপিয়ে দিলেন — এবং তারপর হঠাৎ উধাও হয়ে গেলেন।"

৩,৩৫০ বছর আগের কথা।

মিশরের সিংহাসনে বসলেন এক নতুন ফারাও। নাম — আমেনহোটেপ চতুর্থ।

শুরুতে সব স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে — তিনি এমন কিছু করলেন যা মিশরের হাজার বছরের ইতিহাসে কেউ করেনি। এবং কেউ করার সাহস পায়নি।

মিশরে তখন হাজারো দেবতা।

আমুন। রা। ওসিরিস। হোরাস। প্রতিটি দেবতার আলাদা মন্দির। আলাদা পুরোহিত।

আলাদা সম্পদ। পুরোহিতরা এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল যে ফারাওকেও মাঝেমাঝে তাদের কথা মানতে হতো। এই অবস্থায় নতুন ফারাও ঘোষণা করলেন — এখন থেকে মিশরে শুধু একটাই দেবতা। আতেন।

সূর্যের আলো। বাকি সব দেবতা বাতিল। তাদের মন্দির বন্ধ। পুরোহিতদের ক্ষমতা শেষ।

একটু বোঝো।

হাজার বছরের পুরনো ধর্ম। হাজারো দেবতা। লক্ষ লক্ষ মানুষের বিশ্বাস। একজন মানুষ এক ঘোষণায় সব বাতিল করে দিলেন। শুধু তাই না। নিজের নামও বদলে নিলেন। আমেনহোটেপ থেকে হলেন — আখেনাতেন। মানে — আতেনের কাছে উপকারী।

এবং রাজধানী সরিয়ে নিলেন সম্পূর্ণ নতুন এক শহরে। নাম দিলেন — আখেতাতেন।

মানে — আতেনের দিগন্ত। আজকের আমারনা।

এখানে সবচেয়ে অবাক করা তথ্য।

আখেনাতেনের শিল্পকলা আগের সব ফারাওয়ের চেয়ে আলাদা। মিশরীয় শিল্পে ফারাওকে সবসময় নিখুঁত দেখানো হতো। শক্তিশালী। সুন্দর। দেবতার মতো।

কিন্তু আখেনাতেনের ছবিতে — লম্বা মাথা। সরু গলা। চওড়া নিতম্ব। মেয়েলি শরীর।

কেন?

বিজ্ঞানীরা আজও নিশ্চিত নন।

কেউ বলেন এটা নতুন শিল্পরীতি। কেউ বলেন তিনি সত্যিই এরকম দেখতে ছিলেন। কেউ বলেন তাঁর কোনো জেনেটিক রোগ ছিল। এবং কেউ কেউ বলেন — এই চেহারা পৃথিবীর কোনো মানুষের মতো না।

কিন্তু সবচেয়ে বড় রহস্য।

আখেনাতেন ১৭ বছর রাজত্ব করলেন। তারপর হঠাৎ — অদৃশ্য।

কোনো রেকর্ড নেই। কোনো সমাধি নেই। কোনো মৃত্যুর বিবরণ নেই। শুধু — নেই।

তাঁর পরের ফারাওরা তাঁর নাম মুছে দিলেন। সব শিলালিপি থেকে। সব দেওয়াল থেকে।

সব ইতিহাস থেকে। যেন তিনি কখনো ছিলেনই না। কেন এত চেষ্টা?

যদি তিনি শুধু একজন ব্যর্থ ফারাওই হন — তাহলে তাঁকে মুছে দেওয়ার এত দরকার কী ছিল?

এবার সেই তথ্য বলব যা সবচেয়ে কম মানুষ জানে।

আখেনাতেন পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম একেশ্বরবাদী শাসক। একটাই ঈশ্বর।

মোজেস, যীশু, মুহাম্মদ — সবার আগে। এবং কিছু ইতিহাসবিদ মনে করেন — মোজেসের একেশ্বরবাদ আসলে আখেনাতেনের ধর্ম থেকে অনুপ্রাণিত।

কারণ সময়কাল মিলে যায়। মিশরে ইহুদিদের বাস মিলে যায়। এবং আখেনাতেনের আতেন পূজার সাথে ইহুদি ধর্মের অনেক মিল। যদি এটা সত্যি হয় — তাহলে পৃথিবীর তিনটি বড় ধর্মের শিকড় হয়তো এই একজন মিশরীয় ফারাওয়ের মধ্যে।

আখেনাতেনের স্ত্রী ছিলেন নেফারতিতি।

ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত মুখগুলোর একটা। তাঁর মূর্তি আজও বার্লিনের জাদুঘরে।

কিন্তু নেফারতিতিও একদিন হঠাৎ অদৃশ্য। কোনো সমাধি নেই। কোনো মৃত্যুর বিবরণ নেই।

কেউ বলেন তিনি পরে ফারাও হয়েছিলেন।নিজে। গোপনে। পুরুষের বেশে। এবং তাঁরই ছেলে ছিলেন তুতেনখামেন।

একটু ভাবো।

একজন ফারাও পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো ধর্মব্যবস্থা বাতিল করে দিলেন।

একেশ্বরবাদের বীজ বুনলেন। এবং হঠাৎ মুছে গেলেন। তাঁর শহর ছেড়ে দেওয়া হলো।

তাঁর নাম মুছে দেওয়া হলো। ৩,০০০ বছর মানুষ জানতই না তিনি ছিলেন। ১৮৮৭ সালে আমারনার মাটিতে কিছু মাটির ফলক পাওয়া না গেলে হয়তো আজও জানত না। তাহলে প্রশ্ন হলো — আর কতজন ফারাওয়ের কথা আমরা জানি না? আর কতটা ইতিহাস মুছে দেওয়া হয়েছে?

19

১৯০৭ সাল। ভিয়েনা।

একজন ১৮ বছরের তরুণ ভিয়েনার বিখ্যাত আর্ট একাডেমিতে ভর্তির পরীক্ষা দিলেন।

পরীক্ষকরা বললেন — "তোমার মধ্যে প্রতিভা নেই।" প্রত্যাখ্যান। দ্বিতীয়বারও চেষ্টা করলেন।

আবার প্রত্যাখ্যান। সেই তরুণ ভিয়েনার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরলেন। ভিক্ষা করলেন। রাতে পার্কের বেঞ্চে ঘুমালেন। মনের ভেতরে জমতে লাগল ক্ষোভ। ঘৃণা। হতাশা।

সেই তরুণের নাম — অ্যাডলফ হিটলার।

যদি সেই আর্ট একাডেমি তাঁকে সেইদিন ভর্তি নিত —

হয়তো পৃথিবীর ইতিহাস সম্পূর্ণ অন্যরকম হতো।

একজন ব্যর্থ মানুষ কীভাবে পৃথিবী দখল করল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি হেরেছিল। মানুষ ছিল ক্ষুধার্ত। বেকার। অপমানিত। এই সময়ে হিটলার উঠে দাঁড়ালেন। মঞ্চে উঠলেন। বললেন — এই পরাজয়ের দায় ইহুদিদের। এই দুর্দশার দায় দুর্বল নেতাদের। জার্মানি আবার মহান হবে। মানুষ শুনল। বিশ্বাস করল। ১৯৩৩ সালে হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর। এবং তারপর শুরু হলো ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর অধ্যায়।

ছয় বছরে আট কোটি।

১৯৩৯ সালে পোল্যান্ড আক্রমণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু। ৬ বছরে ৮ কোটি মানুষ মারা গেল।

মানবজাতির ইতিহাসে এত কম সময়ে এত মানুষ আর কখনো মারা যায়নি। শহরের পর শহর ধ্বংস হলো। লন্ডনে বোমা। স্তালিনগ্রাদে বরফ আর রক্ত। নরম্যান্ডির বালিতে লাশ। কিন্তু সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায় ছিল আলাদা।

হলোকস্ট — যা মানবজাতি কখনো ভুলতে পারবে না।

হিটলার সিদ্ধান্ত নিলেন — ইউরোপের সব ইহুদিকে নিশ্চিহ্ন করতে হবে। ট্রেনে করে মানুষ নিয়ে যাওয়া হলো। অশউইৎজ। ট্রেব্লিংকা। বেলজেক। মৃত্যু শিবির। গ্যাস চেম্বার। ৬০ লক্ষ ইহুদি মারা গেলেন। তাদের সাথে আরও ৫০ লক্ষ — রোমা, প্রতিবন্ধী, রাজনৈতিক বন্দি।

মোট ১ কোটি ১০ লক্ষ মানুষ। পরিকল্পিতভাবে। ঠান্ডা মাথায়। যারা এই কাজ করেছিল — তারা সাধারণ মানুষ ছিল। প্রতিবেশী। বন্ধু। বাবা। এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য। মানুষ মানুষকে এভাবে মারতে পারে।

স্তালিনগ্রাদ — যেখানে যুদ্ধের ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছিল।

১৯৪২ সাল। হিটলার রাশিয়া আক্রমণ করলেন। নেপোলিয়নের মতো একই ভুল। স্তালিনগ্রাদে ২০০ দিনের যুদ্ধ। রাস্তায় রাস্তায়। ঘরে ঘরে। ছাদে ছাদে। শীতে তাপমাত্রা মাইনাস ৪০ ডিগ্রি।

জার্মান সৈনিকরা জমে গেল। ৩ লক্ষ জার্মান সৈনিক ঘেরাও হলো। শেষে আত্মসমর্পণ।

সেই মুহূর্তে বোঝা গেল — হিটলার হারবেন।

হিরোশিমা — যে বোমার পর পৃথিবী বদলে গেল।

৬ আগস্ট ১৯৪৫। সকাল ৮টা ১৫ মিনিট। জাপানের হিরোশিমা শহরের উপর একটা বিমান।

বিমান থেকে একটা বোমা। ৪৩ সেকেন্ড।

তারপর —

এক মুহূর্তে ৭০,০০০ মানুষ। মিলিয়ে গেল। একটা শহর। পরমাণু বোমা।

মানবজাতি প্রথমবার বুঝল — এখন আমরা নিজেরাই নিজেদের পৃথিবী ধ্বংস করতে পারি।

হিটলারের শেষ।

১৯৪৫ সালের এপ্রিল। বার্লিনে রাশিয়ান বাহিনী। হিটলার বাংকারে। বাইরে সব শেষ।

৩০ এপ্রিল। হিটলার নিজেই নিজের জীবন শেষ করলেন। সাথে তাঁর স্ত্রী।

এর ৮ দিন পরে জার্মানি আত্মসমর্পণ করল। ৬ বছরের যুদ্ধ শেষ। কিন্তু ক্ষত শেষ হলো না।

20

২৬১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ।

যুদ্ধ শেষ। কলিঙ্গের মাটিতে লাখো লাশ। রক্তে লাল নদী। পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া গ্রাম। জয়ী সম্রাট তাঁর ঘোড়া থেকে নামলেন। সামনে তাকালেন। এবং হঠাৎ — কাঁদতে শুরু করলেন।

পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সম্রাট। যুদ্ধজয়ের মাঠে। একা। কাঁদছেন। এই দৃশ্য ইতিহাসে আর কখনো দেখা যায়নি। আশোক। মৌর্য সাম্রাজ্যের তৃতীয় সম্রাট। ভারত থেকে শুরু করে আফগানিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত সাম্রাজ্য। তাঁর আগে দুজন সম্রাট ছিলেন — চন্দ্রগুপ্ত আর বিন্দুসার। কিন্তু আশোক তাদের সবার চেয়ে বড় সাম্রাজ্য গড়েছিলেন। যুদ্ধে যুদ্ধে।

রক্তে রক্তে। তাঁকে ডাকা হতো — চণ্ড আশোক। মানে ভয়ঙ্কর আশোক। সিংহাসন পেতে নিজের ৯৯ জন ভাইকে হত্যা করেছিলেন বলে শোনা যায়। এই মানুষটাই একদিন বদলে গেলেন। পুরোপুরি।

কলিঙ্গের যুদ্ধ। আজকের ওড়িশা। আশোক জিতলেন।  কিন্তু এই যুদ্ধে মারা গেল ১ লাখ মানুষ।

আহত হলো আরও দেড় লাখ। বাস্তুচ্যুত হলো কয়েক লাখ। যুদ্ধের পর আশোক ময়দানে  হাঁটলেন। লাশের স্তূপ। কান্নারত মা। মৃত শিশু। পোড়া বাড়ি। এবং হঠাৎ এই সম্রাটের ভেতরে কিছু একটা ভেঙে গেল। তিনি তাঁর শিলালিপিতে নিজেই লিখেছেন — "কলিঙ্গ বিজয়ের পর আমার মনে অনুশোচনা হলো। বিজয়ের যে আনন্দ থাকে — তা আমি অনুভব করতে পারিনি।"

পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো বিজয়ী সম্রাট এভাবে লিখেননি।

এই লোকটা ৯৯ ভাই মেরেছেন। লাখো মানুষের হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন। সেই মানুষটার মন হঠাৎ পরিবর্তন হলো কেন? কী দেখেছিলেন তিনি সেই মাঠে? বিজ্ঞানীরা বলেন — এটা পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত রূপান্তরের একটা। একজন মানুষ নিজেকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলতে পারেন। আশোক তার প্রমাণ।

কলিঙ্গের পর আশোক বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করলেন।

কিন্তু এখানেও তিনি আলাদা। তিনি নিজের ধর্মকে জোর করে চাপিয়ে দেননি। তাঁর শিলালিপিতে লেখা — "সব ধর্মই সম্মানযোগ্য। অন্যের ধর্মকে আঘাত করা উচিত নয়।"

২,৩০০ বছর আগে। যখন সারা পৃথিবীতে ধর্মযুদ্ধ চলছে। তখন একজন সম্রাট লিখছেন — ধর্মীয় সহিষ্ণুতার কথা।

কিন্তু সবচেয়ে অজানা তথ্যটা এখন বলব।

আশোক পৃথিবীর প্রথম সম্রাট যিনি সরকারি হাসপাতাল বানিয়েছিলেন। মানুষের জন্য।

পশুর জন্যও। রাস্তার পাশে গাছ লাগিয়েছিলেন। কূয়া খুঁড়েছিলেন। ধর্মশালা বানিয়েছিলেন। এবং সবচেয়ে বড় কাজ —  তাঁর শিলালিপি। ৩৩টি শিলালিপি। পাথরে খোদাই করা। তাঁর সাম্রাজ্যের প্রতিটা কোণে। সেখানে লেখা মানুষের অধিকারের কথা। পশুর অধিকারের কথা।

পরিবেশের কথা। ২,৩০০ বছর আগে।

আশোকের পর কেউ এই আদর্শ ধরে রাখতে পারেনি।

তাঁর মৃত্যুর পর মৌর্য সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ল। হাজার বছর তাঁর কথা ভুলে গিয়েছিল মানুষ। ১৯ শতাব্দীতে ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদরা তাঁর শিলালিপি পড়তে শুরু করলেন। এবং পৃথিবী আবার চিনল — এই অসাধারণ মানুষকে। যিনি ক্ষমতার শীর্ষে থেকে বলেছিলেন — যুদ্ধ ভুল।

হিংসা ভুল। মানুষকে ভালোবাসতে হবে।

আজ ভারতের জাতীয় প্রতীকে সেই সিংহ।

আশোকের স্তম্ভের সিংহ। এবং জাতীয় পতাকায় আশোক চক্র। একজন সম্রাটের স্মৃতি।

যিনি জিতেছিলেন। কিন্তু জয়ের চেয়ে বড় কিছু খুঁজেছিলেন।

21

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি — একটা দোকান যেভাবে দেশ দখল করেছিল।

৩১ ডিসেম্বর ১৬০০।

লন্ডনে ২৪ জন ব্যবসায়ী একটা টেবিলে বসলেন। উদ্দেশ্য একটাই — ভারতের সাথে মশলার ব্যবসা করবেন। রানি এলিজাবেথ প্রথম তাদের একটা কাগজে সই করে দিলেন। সেই কাগজের নাম — রয়েল চার্টার। সেইদিন কেউ জানত না — এই ছোট্ট কোম্পানি একদিন পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী আর ক্ষমতাশালী প্রতিষ্ঠান হবে। এবং একটা পুরো দেশকে গিলে ফেলবে।

মশলার লোভ থেকে সাম্রাজ্যের শুরু।

সেই যুগে ভারতের মশলা ছিল ইউরোপে সোনার চেয়েও দামি। কালো মরিচ। এলাচ। দারুচিনি।

ইউরোপের ধনীরা এই মশলার জন্য পাগল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে এলো ব্যবসা করতে।

প্রথমে বিনয়ের সাথে। মুঘল সম্রাটদের কাছে অনুমতি চাইল। ছোট ছোট ফ্যাক্টরি খুলল।

সুরাট। মাদ্রাজ। বম্বে। কলকাতা। কেউ বুঝতে পারেনি — এই ব্যবসায়ীরা আসলে কী চায়।

যে কৌশলে একটা কোম্পানি দেশ দখল করে।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কৌশল ছিল তিনটে।

প্রথমটা — বিভেদ তৈরি করো।

ভারতের রাজারা ছিলেন বিভক্ত। হিন্দু রাজা আর মুসলিম নবাবের মধ্যে সংঘাত। কোম্পানি একপক্ষকে সাহায্য করত। বিনিময়ে পেত বাণিজ্যিক সুবিধা। তারপর আরেক পক্ষকে সাহায্য করত। এইভাবে সবার কাছ থেকে সুবিধা নিত। আর রাজারা পরস্পর লড়াই করতে করতে দুর্বল হয়ে পড়তেন।

দ্বিতীয়টা — ঋণের ফাঁদ। কোনো রাজা অর্থকষ্টে পড়লে কোম্পানি ঋণ দিত।

সেই ঋণ শোধ করতে না পারলে — জমি। বন্দর। বাণিজ্যের অধিকার। একে একে সব চলে যেত।

তৃতীয়টা — নিজস্ব সেনাবাহিনী।

১৭৫৭ সালের মধ্যে কোম্পানির নিজের সেনাবাহিনী।

ভারতীয় সিপাহিরাই লড়াই করত। ব্রিটিশ অফিসারের নেতৃত্বে। ভারতীয়রাই ভারত দখলে সাহায্য করছিল।

পলাশীর যুদ্ধ — যেদিন সব বদলে গেল।

১৭৫৭ সাল। বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলা। পলাশীর প্রান্তরে যুদ্ধ। নবাবের সেনাপতি মীর জাফর বিশ্বাসঘাতকতা করলেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই নবাব হেরে গেলেন। কারণ তাঁর বিশ্বাসের মানুষই তাঁকে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। সেই একটা যুদ্ধে বাংলার ২০০ বছরের স্বাধীনতা শেষ হলো। এবং ভারত দখলের আসল শুরু হলো।

যে সত্যটা আজও শিউরে দেয়।

পলাশীর যুদ্ধের সময় ভারত ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর একটা। বিশ্বের মোট অর্থনীতির ২৫ শতাংশ ছিল ভারতের। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার সময় — সেটা নেমে এসেছিল মাত্র ৪ শতাংশে। ১৫০ বছরে ভারতের সম্পদ কোথায় গেল? ব্রিটেনে। অর্থনীতিবিদদের হিসাবে ব্রিটিশরা ভারত থেকে নিয়ে গিয়েছিল আজকের হিসাবে প্রায় ৪৫ লক্ষ কোটি ডলার। শুধু মশলার ব্যবসা করতে এসে।

১৮৫৭ — যখন ভারত জেগে উঠেছিল।

কিন্তু ভারত চুপ করে ছিল না। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহ। হিন্দু আর মুসলিম সিপাহিরা একসাথে লড়াই করলেন। দিল্লি। লখনউ। কানপুর। সারা ভারতে আগুন। কিন্তু ব্রিটিশরা দমন করল। নির্মমভাবে। বিদ্রোহীদের কামানের মুখে বেঁধে উড়িয়ে দেওয়া হলো। সেই বিদ্রোহের পরেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাতিল হলো। সরাসরি ব্রিটিশ রানির শাসন শুরু হলো।

কোম্পানির শেষ — কিন্তু শাসন চলল।

১৮৫৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হলো। কিন্তু ব্রিটিশ শাসন চলল আরও ৯০ বছর। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা। কিন্তু স্বাধীনতার সময় ভারতভাগ হলো। দুই দেশ। দুটো ক্ষত। লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু। অনেক ঐতিহাসিক বলেন — এই বিভাজনও ছিল ব্রিটিশ কৌশলের অংশ। বিভেদ তৈরি করো। শাসন করো। সেই একই পুরনো কৌশল।

শেষ কথা।

২৪ জন ব্যবসায়ী মশলার ব্যবসা করতে এসেছিলেন । চলে যাওয়ার সময় রেখে গেলেন —

দুটো দেশ। কোটি কোটি দরিদ্র মানুষ। শত বছরের ক্ষত। এবং একটা শিক্ষা — যে জাতি বিভক্ত থাকে — তাকে দখল করতে অস্ত্র লাগে না।  শুধু সুযোগের অপেক্ষা করতে হয়।

22

"মুঘল সাম্রাজ্য — যে রহস্যগুলো ইতিহাস বই কখনো বলেনি।"

একজন বৃদ্ধ মানুষ।

আগ্রার লাল কেল্লার একটা ছোট্ট ঘরে বসে আছেন। জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে দূরে সাদা মার্বেলের একটা স্থাপত্য। তাজমহল। তিনিই সেটা বানিয়েছিলেন। কিন্তু আজ তিনি বন্দি।

নিজের ছেলের হাতে। ৮ বছর ধরে প্রতিদিন শুধু জানালা দিয়ে তাজমহল দেখেন। আর মনে পড়ে সেই মানুষটার কথা — যার জন্য এই স্বপ্নের স্থাপত্য তৈরি হয়েছিল। মমতাজ।

তাঁর মৃত স্ত্রী। এই মানুষটার নাম শাহজাহান। মুঘল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে করুণ সম্রাট।

শুরুটা ছিল অন্যরকম।

১৫২৬ সাল। একজন মানুষ কাবুল থেকে এলেন। সাথে মাত্র ১২,০০০ সৈনিক।

সামনে ইব্রাহিম লোদির ১ লক্ষ সৈনিক আর ১,০০০ হাতি। পানিপথের মাঠে দুটো বাহিনী মুখোমুখি। সবাই ভাবল — এই যুদ্ধ মিনিটেই শেষ হবে। কিন্তু সেই মানুষটার হাতে ছিল একটা অস্ত্র যা ভারতবর্ষ আগে দেখেনি। তোপ। কামানের গোলার শব্দে লোদির হাতিগুলো ভয় পেয়ে পালাতে শুরু করল। নিজেদের সৈনিকদের পিষে। সেই যুদ্ধ শেষ হতে লাগল মাত্র কয়েক ঘণ্টা। সেই মানুষটার নাম — বাবর। মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা।

যে সত্য কেউ বলে না।

বাবর ভারত জয় করেছিলেন। কিন্তু ভারতকে ভালোবাসেননি। তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন —

এই দেশে গরম বেশি। মানুষ ভালো না। সবকিছু অচেনা। তিনি চাইতেন কাবুলে ফিরে যেতে।

কিন্তু ফেরা হলো না। ১৫৩০ সালে মারা গেলেন। তাঁর ছেলে হুমায়ুন অসুস্থ ছিলেন।

বাবর নাকি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন — ছেলের রোগ আমাকে দাও। কিছুদিন পরে হুমায়ুন সুস্থ হলেন। বাবর মারা গেলেন।

হুমায়ুন — যিনি সিংহাসন হারিয়ে ফিরে পেয়েছিলেন।

বাবরের পর হুমায়ুন। কিন্তু তিনি সিংহাসন ধরে রাখতে পারলেন না। শের শাহ সুরি তাঁকে হারিয়ে দিলেন। হুমায়ুন পালালেন। ১৫ বছর নির্বাসনে। পারস্যে আশ্রয় নিলেন। সেখানে প্রেমে পড়লেন। বিয়ে করলেন। এবং সেই বিয়েতে জন্ম নিলেন এক পুত্র — যে একদিন হবেন ইতিহাসের সবচেয়ে মহান মুঘল সম্রাট। আকবর।

আকবর — যে রহস্যটা কেউ বলে না।

আকবর ছিলেন নিরক্ষর। পড়তে পারতেন না। লিখতে পারতেন না। কিন্তু স্মৃতিশক্তি ছিল অসাধারণ। যা একবার শুনতেন — মনে থাকত। তিনি প্রতিদিন বিদ্বান মানুষদের ডেকে বই পড়াতেন। শুনতেন। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান, জৈন — সব ধর্মের পণ্ডিতদের সাথে আলোচনা করতেন। এবং একটা নতুন ধর্ম তৈরি করলেন — দীন-ই-ইলাহি। সব ধর্মের সেরা জিনিস নিয়ে।

ইতিহাসবিদরা বলেন — মুঘল সাম্রাজ্যের সোনালি যুগ ছিল আকবরের আমলে। কারণ তিনি ধর্মের উপরে মানুষকে রেখেছিলেন।

শাহজাহান ও তাজমহলের অজানা গল্প। তাজমহল ভালোবাসার স্মৃতিসৌধ — এটা সবাই জানে। কিন্তু যা জানে না — তাজমহল বানাতে গিয়ে শাহজাহানের রাজকোষ প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। ২০,০০০ কারিগর। ২২ বছর। ৩২ মিলিয়ন রুপি। সেই যুগে এই পরিমাণ অর্থ ছিল অকল্পনীয়। এবং একটা কথা প্রচলিত আছে — তাজমহল শেষ হওয়ার পর শাহজাহান নাকি সব কারিগরের হাত কেটে দিয়েছিলেন। যেন আর কেউ এমন কিছু বানাতে না পারে।

এটা সত্য কিনা — ইতিহাসে প্রমাণ নেই। কিন্তু গল্পটা আজও ঘুরে বেড়ায়।

আওরঙ্গজেব — ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত সম্রাট।

শাহজাহানের চার ছেলে। ক্ষমতার জন্য যুদ্ধ। আওরঙ্গজেব জিতলেন। নিজের তিন ভাইকে হত্যা করলেন। বাবাকে বন্দি করলেন। ৮ বছর বাবা বন্দি ছিলেন। আওরঙ্গজেব নিজে ছিলেন কঠোর ধার্মিক। সাদা পোশাক পরতেন। নিজের হাতে টুপি সেলাই করে বিক্রির টাকায় খেতেন।

রাজকোষের টাকা নিজের জন্য খরচ করতেন না। কিন্তু তাঁর নীতি ছিল কঠোর।

হিন্দু মন্দির ভাঙার নির্দেশ দিয়েছিলেন। জিজিয়া কর ফিরিয়ে এনেছিলেন। এই সিদ্ধান্তগুলোই মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের বীজ বপন করেছিল।

মুঘল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় রহস্য।

আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্য দ্রুত ভাঙতে শুরু করল। মারাঠারা শক্তিশালী হলো।

ব্রিটিশরা এলো। ১৮৫৭ সালে শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর। বৃদ্ধ। ক্ষমতাহীন।

ব্রিটিশরা তাঁকে রেঙ্গুনে নির্বাসনে পাঠাল। মৃত্যুর আগে তিনি লিখেছিলেন —

"কত বদনসিব হ্যায় জাফর দফনে কে লিয়ে — দো গজ জমিন ভি না মিলি কু-এ-ইয়ার মে।"

কত হতভাগা এই জাফর — কবরের জন্যও পেলাম না দুই গজ মাটি প্রিয় মাতৃভূমিতে।

৩০০ বছরের মুঘল সাম্রাজ্যের সমাপ্তি হলো একজন বৃদ্ধের কবিতায়।

শেষ কথা।

বাবর এসেছিলেন বিজেতা হয়ে। আকবর ছিলেন মহান। শাহজাহান ভালোবাসার জন্য স্থাপত্য বানিয়েছিলেন। আওরঙ্গজেব ধর্মের জন্য সাম্রাজ্য হারিয়েছিলেন। এবং বাহাদুর শাহ জাফর কবিতা লিখতে লিখতে নির্বাসনে মরেছিলেন। ৩০০ বছরের এক সাম্রাজ্যের গল্প —

যা শুধু ইতিহাস নয়, মানুষের আবেগ, ভালোবাসা, লোভ আর পতনের গল্প।

23

২৯ মে ১৪৫৩।

ভোরের আলো ফোটার আগেই হাজার হাজার তুর্কি সৈনিক কনস্টান্টিনোপলের দেওয়ালে উঠতে শুরু করল। ভেতরে মাত্র ৭,০০০ ক্লান্ত সৈনিক। বাইরে ৮০,০০০। শহরের শেষ সম্রাট কনস্টান্টাইন একাদশ তাঁর রাজকীয় পোশাক খুলে ফেললেন। সাধারণ সৈনিকের পোশাক পরে যুদ্ধে নামলেন। আর ফিরে এলেন না। সেই রাতে ১,১০০ বছরের পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য শেষ হয়ে গেল। এবং শুরু হলো ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়।

২১ বছরের সেই যুবক।

মেহমেদ দ্বিতীয়। মাত্র ২১ বছর বয়সে অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতান। তাঁর বাবা মুরাদ দ্বিতীয় ছিলেন শক্তিশালী সুলতান। কিন্তু মেহমেদ ছিলেন অন্য ধাতুর। ছোটবেলা থেকে তাঁর একটাই স্বপ্ন। কনস্টান্টিনোপল। সেই শহর যেটা ১,০০০ বছর ধরে জয় করা যায়নি। যেটাকে ঘিরে রেখেছে বসফরাস প্রণালী। যার দেওয়াল এতটাই মজবুত যে শত শত বছর ধরে কোনো শত্রু ভাঙতে পারেনি। মেহমেদ বললেন — আমি পারব।

সেই অসম্ভব পরিকল্পনা।

কনস্টান্টিনোপলের তিনদিকে ছিল সমুদ্র। বসফরাস প্রণালীতে বাইজেন্টাইনদের শক্তিশালী নৌবহর। সরাসরি আক্রমণ সম্ভব নয়। তখন মেহমেদ যা করলেন — সেটা ইতিহাসের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য সামরিক কৌশলগুলোর একটা। একরাতের মধ্যে ৭২টি জাহাজ স্থলপথে টেনে নিয়ে গেলেন। পাহাড়ের উপর দিয়ে। কাঠের গুঁড়ির উপর ফেলে টেনে টেনে। ৭২টি জাহাজ — পাহাড় পার করে — সমুদ্রের অন্য পাশে। বাইজেন্টাইনরা ভোরে উঠে দেখল — তাদের পেছনে শত্রুর নৌবহর। তারা বিশ্বাসই করতে পারল না।

সেই কামানের গর্জন।

মেহমেদের হাতে ছিল সেই যুগের সবচেয়ে বড় কামান। হাঙ্গেরিয়ান প্রকৌশলী উরবান বানিয়েছিলেন। এই কামানের গোলা ছিল ৫৪৪ কিলোগ্রাম। এত বড় কামান আগে কেউ দেখেনি। কিন্তু একটা সমস্যা ছিল। প্রতিটা গোলা ছোড়ার পর কামান ঠান্ডা করতে লাগত ৩ ঘণ্টা। তাই দিনে মাত্র ৭ বার গোলা ছোড়া যেত। কিন্তু সেই ৭ বারই যথেষ্ট ছিল।

৫৩ দিনের অবরোধের পর কনস্টান্টিনোপলের দেওয়াল ভাঙল।

বিজয়ের পরে মেহমেদ যা করলেন।

শহর জয়ের পর মেহমেদ ঘোড়ায় চড়ে ঢুকলেন। হাজিয়া সোফিয়া — ১,০০০ বছরের পুরনো সেই বিশাল গির্জার সামনে দাঁড়ালেন। একমুঠো মাটি নিয়ে নিজের মাথায় ছিটিয়ে দিলেন।

বিনয়ের প্রতীক। তারপর ভেতরে ঢুকে নামাজ পড়লেন। গির্জাটাকে মসজিদে রূপান্তরিত করলেন। কিন্তু ভেতরের খ্রিষ্টান শিল্পকর্ম ধ্বংস করলেন না। রঙ দিয়ে ঢেকে দিলেন।

কারণ তিনি বলেছিলেন — এই শিল্প মানবজাতির সম্পদ।

যে সত্যটা ইতিহাস বই বলে না। মেহমেদ শুধু যোদ্ধা ছিলেন না। তিনি কথা বলতেন ৬টি ভাষায়। গ্রিক দার্শনিকদের বই পড়তেন। শহর জয়ের পর গ্রিক বিদ্বানদের সংরক্ষণ করলেন।

তাঁদের জ্ঞান যেন হারিয়ে না যায়। অনেক ঐতিহাসিক বলেন — এই গ্রিক জ্ঞানই পরে ইউরোপে পৌঁছে ইতালিতে রেনেসাঁ শুরু করেছিল। একটা শহরের পতন ইউরোপের পুনর্জন্ম ঘটিয়েছিল। ইতিহাসের এই ironটা কেউ বলে না।

৬০০ বছরের সাম্রাজ্য।

কনস্টান্টিনোপল জয়ের পর অটোমান সাম্রাজ্য হয়ে উঠল পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র। পূর্বে পারস্য থেকে পশ্চিমে আলজেরিয়া। উত্তরে হাঙ্গেরি থেকে দক্ষিণে ইয়েমেন। ৩টি মহাদেশে সাম্রাজ্য। ৬০০ বছর ধরে। তিনটি মহাদেশের মানুষ একই সাম্রাজ্যের নাগরিক।

ইতিহাসে এমন উদাহরণ বিরল।

পতনের গল্প।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমানরা ভুল পক্ষ বেছে নিয়েছিল। জার্মানির সাথে। যুদ্ধ শেষে সাম্রাজ্য টুকরো টুকরো হয়ে গেল। আরব দেশগুলো আলাদা হলো। বলকান দেশগুলো আলাদা হলো।

১৯২৩ সালে তুরস্ক প্রজাতন্ত্র ঘোষিত হলো। ৬০০ বছরের সাম্রাজ্যের সমাপ্তি। শেষ সুলতান নির্বাসনে গেলেন। একটা যুগ শেষ হলো।

শেষ কথা।

একজন ২১ বছরের যুবক স্বপ্ন দেখেছিলেন।

সেই স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন। এবং সেই একটা বিজয় পৃথিবীর ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিল। মেহমেদ দ্বিতীয়।

যাঁকে ইতিহাস ডাকে — "ফাতিহ।"

বিজেতা।

24

স্পার্টা — যে শহর শিশুদের মেরে শক্তিশালী হতো।

একটা শিশু জন্ম নিল।

তাকে নিয়ে যাওয়া হলো শহরের বয়স্ক নেতাদের সামনে। তারা শিশুটাকে দেখলেন।

হাত-পা নাড়লেন। শরীর পরীক্ষা করলেন। যদি শিশুটা সুস্থ আর শক্তিশালী হয় — বাঁচবে।

যদি দুর্বল হয় — পাহাড়ের খাদে ফেলে দেওয়া হবে। এটা কোনো বর্বর উপজাতির গল্প নয়।

এটা ছিল স্পার্টার নিয়ম। পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর এবং সবচেয়ে বিস্ময়কর শহরের।

স্পার্টা — যেখানে দুর্বলতা ছিল পাপ।

প্রাচীন গ্রিসে দুটো শহর ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী। এথেন্স — জ্ঞান আর দর্শনের শহর।

স্পার্টা — যুদ্ধের শহর। এথেন্সে মানুষ পড়ত। লিখত। দর্শন চর্চা করত। স্পার্টায় মানুষ শুধু একটাই কাজ করত — যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকা। জন্মের আগে থেকেই শুরু হতো।

গর্ভবতী মায়েরা প্রতিদিন ব্যায়াম করতেন। শক্তিশালী মা — শক্তিশালী সন্তান।

এটাই ছিল স্পার্টার বিশ্বাস।

সাত বছরের শিশু — একা।

স্পার্টার ছেলে শিশুর বয়স যখন ৭ হতো —সেদিন মায়ের কোল থেকে কেড়ে নেওয়া হতো।

কোনো কান্না নয়। কোনো বিদায়ের আলিঙ্গন নয়। শুরু হতো আগোগে — স্পার্টার সামরিক প্রশিক্ষণ। প্রথম রাতেই ঘুমাতে দেওয়া হতো খোলা আকাশের নিচে। কোনো কম্বল নেই। কোনো বালিশ নেই। ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে শিখতে হতো — এই কষ্টই স্বাভাবিক। খাবার দেওয়া হতো কম। ইচ্ছা করেই। কারণ ক্ষুধার্ত শিশু নিজে খাবার যোগাড় করতে শিখবে। চুরি করতেও শেখানো হতো। কিন্তু ধরা পড়লে শাস্তি ছিল ভয়ংকর। চুরি করার জন্য নয় — ধরা পড়ার জন্য।

যে শিক্ষা আজকের পৃথিবীও দিতে পারে না।

১২ বছর বয়সে জুতা কেড়ে নেওয়া হতো। সারা বছর খালি পায়ে। পাথর, কাঁটা, বরফ — সব মাড়িয়ে চলত। ১৮ বছরে শুরু হতো আসল পরীক্ষা। একা এক বছর জঙ্গলে কাটাতে হতো।

কোনো অস্ত্র নেই। কোনো সঙ্গী নেই। কোনো খাবার নেই। বেঁচে থাকতে হবে নিজের বুদ্ধিতে।

২০ বছরে হতো পূর্ণ যোদ্ধা। কিন্তু সেনাবাহিনীতে থাকতে হতো ৩০ বছর পর্যন্ত। বিয়ে করলেও স্ত্রীর সাথে থাকা যেত না। ব্যারাকেই রাত কাটাত।

স্পার্টার নারী — ইতিহাসের সবচেয়ে স্বাধীন।

স্পার্টার নারীরা ছিলেন ইতিহাসের সবচেয়ে অসাধারণ। গ্রিসের অন্য শহরে নারীরা ঘরের বাইরে যেতে পারতেন না। স্পার্টায় নারীরা ব্যায়াম করতেন। দৌড়াতেন। কুস্তি লড়তেন। সম্পত্তির মালিক হতেন। ব্যবসা করতেন। কারণ স্পার্টার যুক্তি ছিল সহজ — শক্তিশালী মা জন্ম দেবেন শক্তিশালী যোদ্ধার। এক স্পার্টান মা তাঁর ছেলেকে ঢাল দিয়ে বিদায় করেছিলেন এই কথা বলে —

"এই ঢাল নিয়ে ফিরে এসো। নয়তো এই ঢালের উপর শুয়ে।" জয়ী হয়ে ফেরো। নয়তো মৃত হয়ে ফেরো। পরাজিত হয়ে নয়।

থার্মোপাইলি — ৩০০ বনাম ৩ লক্ষ।

৪৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। পারস্যের রাজা জার্ক্সেস এলেন গ্রিস আক্রমণ করতে। তাঁর সেনাবাহিনী — ৩ লক্ষ। থার্মোপাইলির সরু গিরিপথে দাঁড়িয়ে রইলেন রাজা লিওনিডাস। সাথে মাত্র ৩০০ স্পার্টান।

তিন দিন তারা আটকে রাখলেন পুরো পারসিক বাহিনীকে। তিন দিন। ৩০০ মানুষ। ৩ লক্ষের বিরুদ্ধে। শেষে সবাই মারা গেলেন। কিন্তু সেই তিন দিনেই বাকি গ্রিস প্রস্তুত হতে পারল।

পারস্য হারল। ৩০০ জনের মৃত্যু বাঁচিয়েছিল পুরো গ্রিসকে।

স্পার্টার শেষ।

এত শক্তিশালী শহর কীভাবে শেষ হলো? স্পার্টার পতন হয়েছিল একটাই কারণে। তারা শুধু যুদ্ধ শিখিয়েছিল। জ্ঞান শেখায়নি। ব্যবসা শেখায়নি। শিল্প শেখায়নি। এথেন্স থেকে বের হয়েছিল সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল। স্পার্টা থেকে বের হয়েছিল শুধু যোদ্ধা। একদিন যখন যুদ্ধ থামল — স্পার্টার আর কিছুই ছিল না।

শেষ কথা।

একটা শহর যে বিশ্বাস করত — দুর্বলতা পাপ। সেই শহরের ৩০০ মানুষ একদিন পুরো পৃথিবীকে থামিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু শুধু শক্তি দিয়ে সভ্যতা টেকে না। স্পার্টা সেটা প্রমাণ করে গেছে।

25

"মাত্র ৭ বছরে ইউরোপের অর্ধেক মানুষ মরে গেল —

আর সেই মৃত্যুর পরে পৃথিবী হয়ে গেল সম্পূর্ণ নতুন।"

১৩৪৭ সাল।

ইতালির সিসিলি বন্দরে ১২টি জাহাজ এসে ভিড়ল। বন্দর কর্তৃপক্ষ জাহাজের কাছে গেলেন।

এবং তাঁরা যা দেখলেন — তা দেখে থমকে গেলেন। বেশিরভাগ নাবিক মৃত। যারা বেঁচে আছেন — তাদের শরীরে কালো কালো ফোড়া। চোখ দিয়ে রক্ত পড়ছে। কর্তৃপক্ষ সঙ্গে সঙ্গে জাহাজগুলো বন্দর থেকে সরিয়ে দিলেন। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। যা আসার — এসে গিয়েছিল। এরপর যা হলো — পৃথিবী আর আগের মতো রইল না।

যে মহামারি ইতিহাস বদলে দিয়েছিল।

ব্ল্যাক ডেথ। ১৩৪৭ থেকে ১৩৫৩ সাল। মাত্র ৭ বছরে ইউরোপের ৫ কোটি মানুষ মারা গেল।

সেই সময়ে ইউরোপের মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেক। কোনো কোনো শহরে ৮০ ভাগ মানুষ মারা গেল। রাস্তায় লাশ পড়ে থাকত। কবর দেওয়ার লোক ছিল না।

গির্জার ঘণ্টা এত বেশি বাজত যে শেষে বাজানো বন্ধ করে দেওয়া হলো —

কারণ মানুষ সেই শব্দ আর সহ্য করতে পারছিল না।

কীভাবে এলো এই মহামারি।

মধ্য এশিয়া থেকে শুরু। ইঁদুরের শরীরে থাকা মাছি। সেই মাছি কামড়াত মানুষকে।

এবং সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ত ইয়েরসিনিয়া পেস্টিস ব্যাকটেরিয়া। তিনটি রূপে আক্রমণ করত।

প্রথমটায় শরীরে ফোড়া হতো — বগলে, ঘাড়ে, কুঁচকিতে।

দ্বিতীয়টায় ফুসফুস আক্রান্ত হতো — কাশি থেকে ছড়াত।

তৃতীয়টা ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর — রক্তে ছড়িয়ে পড়ত।

তৃতীয় ধরনে আক্রান্ত হলে বাঁচার সম্ভাবনা ছিল প্রায় শূন্য।

মানুষ যা করেছিল বাঁচতে।

সেই যুগে জীবাণু কী জিনিস — কেউ জানত না। তাই মানুষ আশ্রয় নিল কুসংস্কারে।

কেউ ভাবল — এটা ঈশ্বরের শাস্তি। নিজেকে বেত্রাঘাত করলে পাপ মুক্তি হবে। দলে দলে মানুষ রাস্তায় নেমে নিজেদের মারতে লাগল। কেউ ভাবল — ইহুদিরা কূপে বিষ মিশিয়েছে।

ইউরোপজুড়ে ইহুদি গণহত্যা শুরু হলো। কেউ ভাবল — খারাপ বাতাসই রোগ ছড়াচ্ছে।

তাই নাকে ফুলের তোড়া ধরে রাখত। সেই সময়ের ডাক্তাররা পরতেন একটা অদ্ভুত পোশাক।

মুখে চঞ্চুর মতো মুখোশ। সেই মুখোশের ভেতরে ভরা থাকত ভেষজ উদ্ভিদ।

তারা ভাবতেন গন্ধ রোগ আটকাবে। এই মুখোশই আজকের হ্যালোউইনের সেই ভয়ংকর চরিত্র।

যে শহর বাঁচিয়েছিল একটা সিদ্ধান্ত।

ইতালির ভেনিস। তারা একটা নিয়ম করল। যেকোনো জাহাজ বন্দরে ভেড়ার আগে ৩০ দিন দূরে অপেক্ষা করবে। পরে সেটা বাড়িয়ে করা হলো ৪০ দিন। ইতালিয়ান ভাষায় ৪০ সংখ্যা হলো "quaranta।" সেখান থেকেই এসেছে আজকের "Quarantine" শব্দ। করোনার সময় আমরা যে কোয়ারেন্টাইনে ছিলাম — সেটার জন্ম হয়েছিল ৭০০ বছর আগে। একটা মহামারি ঠেকাতে গিয়ে।

মৃত্যুর পরে যা হলো — সেটাই সবচেয়ে অবাক করা।

এত মৃত্যুর পর পৃথিবী ভেঙে পড়ল না। বরং বদলে গেল। আগে জমির মালিকরা ছিলেন সর্বেসর্বা। কৃষকরা ছিলেন দাসের মতো। কিন্তু এত মানুষ মারা যাওয়ার পর কৃষক কমে গেল।

জমির মালিকদের এখন কাউকে দরকার জমি চাষ করতে। কৃষকরা দাবি করল বেশি মজুরি।

জমির মালিকরা মানতে বাধ্য হলো। ইউরোপের সামন্তপ্রথা ভাঙতে শুরু করল। সাধারণ মানুষের ক্ষমতা বাড়ল। এই পরিবর্তনই একদিন ডেকে আনল রেনেসাঁ। আধুনিক ইউরোপের জন্ম। এক ভয়ংকর মহামারির কোলে।

করোনার সাথে যে মিলটা শিউরে দেয়।

২০২০ সালে করোনা এলো। মানুষ ঘরে বন্ধ হলো। অর্থনীতি ধুলোয় মিশল।

কিন্তু তারপর? রিমোট ওয়ার্ক এলো। কর্মীরা বেশি সুবিধা দাবি করল। কোম্পানিগুলো মানতে বাধ্য হলো। পৃথিবীর কাজের ধরন বদলে গেল। ঠিক যেভাবে ব্ল্যাক ডেথের পরে বদলেছিল।

৭০০ বছরের ব্যবধানে — একই গল্প।

শেষ কথা।

মহামারি শুধু মানুষ মারে না। মহামারি পৃথিবী বদলে দেয়। ব্ল্যাক ডেথ ইউরোপকে মেরে ফেলেনি। বরং একটা পুরনো পৃথিবীকে মেরে নতুন পৃথিবীকে জন্ম দিয়েছিল। হয়তো করোনাও তাই করছে। আমরা এখনও বুঝতে পারছি না।

26

"১২,৮০০ বছর আগে পৃথিবীতে একটা ধূমকেতু আঘাত করেছিল — এক রাতে শেষ হয়ে গিয়েছিল একটা পুরো সভ্যতা — এবং সব ধর্মের মহাপ্লাবনের গল্প আসলে এই ঘটনারই স্মৃতি"

বাইবেলে আছে।কোরআনে আছে। হিন্দু পুরাণে আছে।মায়াদের গ্রন্থে আছে।

চীনের প্রাচীন লেখায় আছে।আদিবাসী অস্ট্রেলিয়ানদের গল্পে আছে। পৃথিবীর প্রতিটা সভ্যতায়।

প্রতিটা ধর্মে।প্রতিটা সংস্কৃতিতে। একটাই গল্প।আকাশ থেকে আগুন নামল।পৃথিবী কাঁপল।

বন্যায় ডুবে গেল সব। একটা সভ্যতা শেষ হয়ে গেল। এত আলাদা আলাদা জায়গায়।

এত আলাদা আলাদা মানুষ। কিন্তু একই গল্প। কাকতালীয়? নাকি সবাই একটাই সত্যি ঘটনার কথা মনে রেখেছে?

২০০৭ সাল।

বিজ্ঞানীদের একটা দল একটা গবেষণাপত্র প্রকাশ করল। পৃথিবীর ছয়টি মহাদেশে।

আলাদা আলাদা স্থানে। একই স্তরের মাটিতে। একই জিনিস পাওয়া গেছে। নানো-ডায়মন্ড।

প্রচণ্ড তাপ আর চাপে তৈরি। শুধু একটাই জিনিস এত তাপ আর চাপ তৈরি করতে পারে।

মহাজাগতিক আঘাত। এবং সেই মাটির স্তরের বয়স — ঠিক ১২,৮০০ বছর।

১২,৮০০ বছর আগে।

ঠিক সেই সময়। পৃথিবী থেকে হঠাৎ বিলুপ্ত হয়ে গেল ম্যামথ। ঘোড়া।

বিশাল শিংওয়ালা হরিণ। উত্তর আমেরিকার প্রায় সব বড় প্রাণী। একসাথে।

হঠাৎ। বিজ্ঞানীরা এতদিন বলতেন — শিকারিরা মেরে ফেলেছে। কিন্তু এখন প্রশ্ন উঠছে।

মানুষ কি এত দ্রুত এত প্রাণী মারতে পারে? নাকি অন্য কিছু ঘটেছিল?

এবার সেই তথ্য বলব যা তোমাকে সত্যিই  ভাবতে বাধ্য করবে ।

ঠিক ১২,৮০০ বছর আগে। পৃথিবীতে হঠাৎ একটা তাপমাত্রার পরিবর্তন।

বরফ যুগ শেষ হচ্ছিল। পৃথিবী গরম হচ্ছিল। হঠাৎ। আবার ঠান্ডা হয়ে গেল।

হাজার বছরের জন্য। বিজ্ঞানীরা এই সময়কে বলেন — ইয়ংগার ড্রায়াস।

কী কারণে হঠাৎ এই পরিবর্তন? এতদিন উত্তর ছিল না।

কিন্তু ২০২৩ সালে নতুন গবেষণা বলছে —

একটা ধূমকেতু। বা ধূমকেতুর টুকরো। পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে আঘাত করেছিল।

কানাডার বরফের চাদরে। বিস্ফোরণে বরফ গলে গেল। বিশাল বন্যা। আকাশে আগুন।

তাপমাত্রা বদলে গেল। প্রাণী বিলুপ্ত হলো। এবং যদি সেই সময় কোনো উন্নত মানব সভ্যতা থাকত — সেও শেষ হয়ে গেল।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

সেই সময় কি সত্যিই কোনো উন্নত সভ্যতা ছিল? গোবেকলি তেপে — ১২,০০০ বছর পুরনো।

ইওনাগুনি — ১০,০০০ বছর আগে সমুদ্রে ডুবে গেছে। নান মাডোল — রহস্যময় কাঠামো।

এবং পৃথিবীর প্রতিটা পুরনো সভ্যতার গল্পে —একটা মহাবিপর্যয়ের কথা।

আকাশ থেকে আগুন। পৃথিবী কাঁপা। বন্যায় সব ভেসে যাওয়া। বেঁচে যাওয়া মানুষ নতুন করে শুরু।

এটা কি শুধু গল্প?

নাকি ১২,৮০০ বছর আগের সেই রাতের স্মৃতি —

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মুখে মুখে টিকে আছে?

হাজার বছর ধরে বিজ্ঞান বলেছে — মহাপ্লাবনের গল্প কল্পকাহিনী। কিন্তু ছয়টা মহাদেশের মাটিতে। একই স্তরে। একই সময়ের। নানো-ডায়মন্ড। পোড়া মাটি। বিলুপ্ত প্রাণীর হাড়।

এগুলো কল্পকাহিনী নয়। এগুলো প্রমাণ। এবং এই প্রমাণ বলছে — সব ধর্মের মহাপ্লাবনের গল্প হয়তো একটাই সত্যি ঘটনার প্রতিধ্বনি।

একটু ভাবো।

তোমার ধর্মে যে মহাপ্লাবনের কথা আছে। তোমার পূর্বপুরুষ যে ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের কথা বলে গেছেন। হয়তো সেটা সত্যিই ঘটেছিল। ১২,৮০০ বছর আগে। একটা রাতে।

আকাশ জ্বলে উঠেছিল। পৃথিবী কেঁপেছিল। পানি উঠে এসেছিল। এবং যারা বেঁচে গিয়েছিল —

তারা সেই রাতের কথা ভুলতে পারেনি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম। হাজার বছর। গল্প হয়ে।

পৌরাণিক কাহিনী হয়ে। ধর্মীয় গ্রন্থ হয়ে। টিকে আছে। আজও।

27

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ — একটা গুলি যেদিন পৃথিবী বদলে দিয়েছিল।

২৮ জুন ১৯১৪।

সারায়েভো শহর। বসনিয়া। একটা গাড়ি রাস্তায় থামল। ড্রাইভার ভুলপথে এসে পড়েছিলেন।

গাড়ি ব্যাক করানোর চেষ্টা করছেন। ঠিক সেই মুহূর্তে রাস্তার পাশে একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন যুবক দেখলেন — গাড়িতে বসা সেই মানুষটাকে। তাঁর হাত কাঁপছিল।

পিস্তল বের করলেন। গুলি করলেন। সেই যুবকের নাম গাভ্রিলো প্রিন্সিপ। গাড়িতে ছিলেন অস্ট্রিয়ার যুবরাজ আর্কডিউক ফ্রানজ ফার্দিনান্দ। সেই একটা গুলি। তারপর যা হলো — ইতিহাসে আর কখনো হয়নি।

একটা হত্যা। একটা পৃথিবী।

অস্ট্রিয়া বলল — সার্বিয়া এই হত্যার পেছনে আছে। সার্বিয়াকে শাস্তি দিতে হবে। রাশিয়া বলল — সার্বিয়া আমাদের মিত্র। অস্ট্রিয়া হামলা করলে আমরা যুদ্ধ করব। জার্মানি বলল — অস্ট্রিয়া আমাদের মিত্র। রাশিয়া যুদ্ধে নামলে আমরাও নামব। ফ্রান্স বলল — রাশিয়া আমাদের মিত্র।

ব্রিটেন বলল — ফ্রান্স আমাদের মিত্র। একটা হত্যা। এক মাসের মধ্যে পুরো ইউরোপ যুদ্ধে।

ইতিহাসবিদরা বলেন — ইউরোপ ছিল বারুদের স্তূপ। ফার্দিনান্দের হত্যা ছিল শুধু একটা দেশলাই কাঠির আঁচ।

ট্রেঞ্চ — যে নরক মানুষ নিজেরা বানিয়েছিল।

যুদ্ধের মাঠে দুটো পক্ষ মাটি খুঁড়ে গর্ত বানাল। লম্বা লম্বা খাঁদ। সেই খাঁদের নাম ট্রেঞ্চ। পশ্চিম ফ্রন্টে ট্রেঞ্চের দৈর্ঘ্য ছিল ৭০০ কিলোমিটার। সৈনিকরা সেই ট্রেঞ্চে থাকত মাসের পর মাস। কোমর পর্যন্ত কাদা। ইঁদুর। উকুন। পচা লাশের গন্ধ। শীতে জমে যেত। গরমে পুড়ত। এবং যেদিন আক্রমণের নির্দেশ আসত — ট্রেঞ্চ থেকে বের হতে হতো। সামনে শত্রুর মেশিনগান।

বেশিরভাগ সৈনিক কয়েক পা যাওয়ার আগেই মারা যেত। সোমে নদীর যুদ্ধে মাত্র প্রথম একদিনে ব্রিটিশ পক্ষের ৫৭,০০০ সৈনিক হতাহত হয়েছিলেন। একদিনে।

যে অস্ত্রগুলো দিয়ে মানুষ মানুষকে মেরেছিল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রথমবার ব্যবহার হলো বিষাক্ত গ্যাস। ক্লোরিন গ্যাস। মাস্টার্ড গ্যাস। গ্যাস হামলার পর সৈনিকরা অন্ধ হয়ে যেত। ফুসফুস পুড়ে যেত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে মরত। প্রথমবার ব্যবহার হলো ট্যাংক। প্রথমবার ব্যবহার হলো যুদ্ধবিমান। প্রতিটা নতুন অস্ত্র মানে একটাই — আরও বেশি মানুষ মারার উপায়।

সেই এক মুহূর্ত — যা মানুষ ভোলেনি।

১৯১৪ সালের বড়দিনের রাত। পশ্চিম ফ্রন্টে দুটো ট্রেঞ্চের মাঝখানে। জার্মান ট্রেঞ্চ থেকে ভেসে এলো গান। ব্রিটিশ সৈনিকরা অবাক হয়ে শুনলেন। তারপর একজন জার্মান সৈনিক হাত তুলে উঠে দাঁড়ালেন। ধীরে ধীরে মাঝখানের মাঠে নামলেন। ব্রিটিশরাও নামলেন। সেই রাতে দুই পক্ষ হাত মেলাল। সিগারেট ভাগ করে খেল। এমনকি ফুটবল খেলল। পরদিন আবার যুদ্ধ। কিন্তু সেই একটা রাত দেখিয়ে দিয়েছিল — শত্রু বলে কিছু নেই। শুধু আছে মানুষ। যাদের একে অপরকে মারতে বাধ্য করা হয়েছে।

যুদ্ধ শেষ — কিন্তু শান্তি আসেনি।

১৯১৮ সালে যুদ্ধ থামল। ১ কোটি ৭০ লক্ষ মানুষ মরেছিল। আরও ২ কোটি আহত। ভার্সাই চুক্তিতে জার্মানিকে দোষী ঘোষণা করা হলো। বিশাল ক্ষতিপূরণ। জমি হারানো। সেনাবাহিনী সীমিত। জার্মানি অপমানিত হলো। সেই অপমান মনে রইল। মাত্র ২০ বছর পরে সেই অপমানের প্রতিশোধ নিতে উঠে দাঁড়াল একজন। অ্যাডলফ হিটলার। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ ছিল আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু।

শেষ কথা।

একটা গুলি। একজন মানুষের মৃত্যু। এবং তারপর ১ কোটি ৭০ লক্ষ মানুষ মারা গেল। কারণ রাজারা আর সরকাররা চেয়েছিল। সাধারণ মানুষ শুধু মরেছিল। ট্রেঞ্চে। গ্যাসে। গুলিতে। তাদের বেশিরভাগ জানতই না — কেন মরছে। এটা ইতিহাস নয়। এটা মানবজাতির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার গল্প। @ সম্রাট রায় চৌধুরী 

28

তারা ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষ —

একটা নাম শুনলেই রাজারা ঘুমাতে পারতেন না। "

রাজা ঘুমাচ্ছেন।

চারদিকে শত শত প্রহরী।

মহলের দেওয়াল ৩০ ফুট উঁচু।

তবু ভোরবেলা রাজার বালিশের পাশে পাওয়া গেল একটা ছুরি।

সাথে একটা চিঠি — "এবার ছুরিটা তোমার বুকে দিতে পারতাম।"

পরদিন রাজা সেই শত্রুর সব দাবি মেনে নিলেন।

কারণ তিনি বুঝে গিয়েছিলেন —

এই মানুষদের থেকে পালানোর কোনো পথ নেই।

এরাই ছিল হাশাশিন।

যে নাম থেকে এসেছে আজকের "Assassin" শব্দটা।

হাশাশিন — যে নামে রাজারা কাঁপতেন।

১০৯০ সাল। পারস্য।

ইরানের আলামুত পর্বতের চূড়ায় একটা দুর্গ।

সেখানে বসবাস করতেন হাসান-ই-সাব্বাহ।

তিনি ছিলেন একজন ধর্মীয় নেতা। কিন্তু তাঁর ক্ষমতার অস্ত্র ছিল সৈন্যবাহিনী নয়।

তাঁর অস্ত্র ছিল একটাই —

নিখুঁত হত্যাকারী।

তিনি তরুণদের বেছে নিতেন। বছরের পর বছর প্রশিক্ষণ দিতেন।

ছদ্মবেশ ধারণ। ধৈর্য। নিঃশব্দে চলা। লক্ষ্যের কাছে মাসের পর মাস অপেক্ষা।

তারপর — একটা মুহূর্ত।

এবং সেই মুহূর্তে কেউ বাঁচতে পারত না।

যে কারণে তারা ছিল অজেয়।

হাশাশিনরা কখনো পালাত না।

কারণ পালানো তাদের কাজ ছিল না।

লক্ষ্য হত্যা করে তারা ধরা দিত।

মৃত্যুকে তারা ভয় পেত না।

কেন?

হাসান-ই-সাব্বাহ তাদের বিশ্বাস করিয়েছিলেন — মৃত্যুর পরে স্বর্গ আছে।

এই বিশ্বাসই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

একজন সৈনিক যে মৃত্যুকে ভয় পায় না —

তাকে কোনো প্রহরী থামাতে পারে না।

ক্রুসেডারদের নেতারাও ভয়ে থাকতেন।

মধ্যপ্রাচ্যে তখন ক্রুসেডের যুদ্ধ চলছে।

হাশাশিনরা শুধু মুসলিম নেতাদের হত্যা করেনি।

তারা খ্রিষ্টান ক্রুসেডারদের নেতাদেরও হত্যা করেছিল।

যে পক্ষ বেশি টাকা দিত — সেই পক্ষে কাজ করত।

ইতিহাসের প্রথম পেশাদার হত্যাকারী সংগঠন।

ইউরোপের রাজারা এতটাই ভয় পেতেন যে অনেকে হাশাশিনদের নিয়মিত কর দিতেন —

শুধু নিরাপদে থাকার জন্য।

জাপানের নিনজা — আরেক কিংবদন্তি।

হাশাশিনরা যদি পারস্যের অন্ধকার হয় —

নিনজারা ছিল জাপানের।

১৪শ থেকে ১৭শ শতাব্দী।

নিনজারা ছিল না শুধু হত্যাকারী।

তারা ছিল গুপ্তচর। তথ্য সংগ্রহকারী। বিদ্রোহ দমনকারী।

তাদের পোশাক কালো ছিল না।

এটা সিনেমার মিথ।

আসল নিনজারা পোশাক পরত সাধারণ মানুষের মতো।

কৃষক সেজে থাকত। ব্যবসায়ী সেজে থাকত।

মাসের পর মাস লক্ষ্যের পাশে থেকে সব তথ্য সংগ্রহ করত।

তারপর — নিখুঁত সময়ে — আঘাত।

ইতিহাসের সবচেয়ে রহস্যময় হত্যা।

১৫৮২ সাল। জাপান।

ওডা নোবুনাগা — জাপানের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক নেতা।

হঠাৎ তাঁর নিজের এক বিশ্বস্ত সেনাপতি বিদ্রোহ করল।

নোবুনাগা একটা মন্দিরে আশ্রয় নিলেন।

মন্দির ঘিরে ফেলা হলো।

পালানোর পথ নেই।

নোবুনাগা মন্দিরে আগুন লাগিয়ে দিলেন।

নিজেকে শেষ করে দিলেন।

কিন্তু ইতিহাসবিদরা বলেন — এই বিদ্রোহের পেছনে ছিল নিনজাদের হাত।

প্রমাণ নেই। কিন্তু সন্দেহ আজও যায়নি।

রোমের সবচেয়ে বিখ্যাত হত্যাকাণ্ড।

৪৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। রোম।

জুলিয়াস সিজার সেনেটে ঢুকলেন।

বন্ধুরা ঘিরে ধরল।

২৩টি ছুরির আঘাত।

মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন।

কিন্তু সবচেয়ে বেদনার ছুরিটা এসেছিল তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু ব্রুটাসের হাত থেকে।

পড়তে পড়তে সিজার বললেন —

"Et tu, Brute?"

"তুমিও, ব্রুটাস?"

ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত শেষ কথা।

সবচেয়ে ঠান্ডা মাথার হত্যাকারী।

চীনের ইতিহাসে Jing Ke।

খ্রিস্টপূর্ব ২২৭ সাল।

কিন্ন রাজ্যের রাজা — যিনি পরে হবেন চীনের প্রথম সম্রাট কিন শি হুয়াং।

তাঁকে হত্যা করতে পাঠানো হলো Jing Ke-কে।

পরিকল্পনা ছিল — একটা মানচিত্রের ভাঁজে লুকানো ছুরি।

রাজার সামনে মানচিত্র খুলবেন। ছুরি বের হবে। এক আঘাতে শেষ।

সব ঠিকঠাক চলছিল।

মানচিত্র খোলা হলো।

ছুরি বের হলো।

কিন্তু শেষ মুহূর্তে রাজা সরে গেলেন।

Jing Ke ব্যর্থ হলেন। ধরা পড়লেন। মারা গেলেন।

কিন্তু তাঁর সাহসের গল্প চীনে আজও বলা হয়।

শেষ কথা।

ইতিহাসের এই আততায়ীরা ছিল তাদের যুগের সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষ।

তারা অস্ত্র দিয়ে নয় — ধৈর্য দিয়ে জিততেন।

শক্তি দিয়ে নয় — কৌশল দিয়ে।

আজকের দুনিয়ায় হয়তো তারা নেই।

কিন্তু তাদের নামগুলো আজও ভাষায় বেঁচে আছে।

Assassin। Ninja। Spy।

এই শব্দগুলো এসেছে তাদের কাছ থেকেই।

@ সম্রাট রায় চৌধুরী 


29


হাতে ছিল রক্তের দলা — জন্মের সময়ই বলা হয়েছিল

এই ছেলে একদিন পৃথিবী জয় করবে। "

১১৬২ সাল।

মঙ্গোলিয়ার এক তাঁবুতে একটি শিশু জন্ম নিল।

ধাত্রী শিশুর হাত খুলে দেখলেন — মুঠোর ভেতরে রক্তের একটা দলা।

জমাট বাঁধা রক্ত।

মঙ্গোল বিশ্বাস অনুযায়ী এর একটাই অর্থ —

এই শিশু একদিন মহান যোদ্ধা হবে।

পৃথিবী কাঁপবে তার পায়ের শব্দে।

শিশুর বাবা সেদিন একটা শত্রু উপজাতির নেতাকে যুদ্ধে হারিয়ে এসেছিলেন।

সেই নেতার নাম ছিল তেমুজিন।

বিজয়ের স্মৃতিতে তিনি নিজের ছেলের নাম রাখলেন — তেমুজিন।

সেই তেমুজিনই একদিন হবেন —

চেঙ্গিস খান।

যে শৈশব মানুষকে দানব বানায়।

তেমুজিনের বয়স যখন ৯ —

তার বাবা ইয়েসুগেই গেলেন প্রতিবেশী উপজাতির সাথে সন্ধি করতে।

ফেরার পথে তাতার শত্রুরা তাঁকে বিষ খাইয়ে দিল।

তেমুজিন বাবার মৃতদেহ নিয়ে ফিরল নিজের উপজাতিতে।

কিন্তু উপজাতির নেতারা বলল —

একটা মৃত মানুষের ছেলেকে আমরা মানব না।

পুরো পরিবারকে তাড়িয়ে দেওয়া হলো।

মা সোয়েলুন একা সাত সন্তান নিয়ে মঙ্গোল স্টেপের বুকে বেঁচে রইলেন।

শীতে বরফ। গরমে খরা। খাবার নেই। আশ্রয় নেই।

তেমুজিন ইঁদুর ধরে খেত। মাছ ধরত। ঘাসের শিকড় খেত।

সেই অপমান। সেই ক্ষুধা। সেই একাকীত্ব —

সব জমা হচ্ছিল একটা ছোট্ট বুকের ভেতরে।

বন্দিত্ব থেকে বিজয়ের শুরু।

কিশোর বয়সে তেমুজিনকে ধরে নিয়ে গেল শত্রু উপজাতি।

গলায় পরানো হলো কাঠের খাঁচা — যাতে পালাতে না পারে।

কিন্তু তেমুজিন পালাল।

রাতের অন্ধকারে। একা।

সেই পালানোর গল্প মঙ্গোল স্টেপে ছড়িয়ে পড়ল।

মানুষ শুনল — এই ছেলে সাধারণ নয়।

একে একে যোদ্ধারা এসে যোগ দিতে শুরু করল তার সাথে।

যে কারণে সে অন্যদের চেয়ে আলাদা ছিল।

মঙ্গোল সমাজে তখন নিয়ম ছিল —

জয়ী উপজাতি পরাজিতদের সব লুট নেবে। নেতাকে হত্যা করবে।

তেমুজিন এই নিয়ম ভাঙলেন।

পরাজিত শত্রুর সাধারণ যোদ্ধাদের তিনি নিজের বাহিনীতে নিলেন।

বললেন — তুমি এখন থেকে আমার লোক।

সমতার কথা বললেন। যোগ্যতার কথা বললেন।

জন্ম নয় — সাহস আর বুদ্ধি দিয়ে উপরে উঠবে।

এই একটা নিয়মেই তাঁর বাহিনী হয়ে উঠল অপ্রতিরোধ্য।

১২০৬ সাল — পৃথিবী কাঁপল।

সব মঙ্গোল উপজাতি একত্রিত হলো।

এক বিশাল সভায় তেমুজিনকে ঘোষণা করা হলো —

"চেঙ্গিস খান।"

অর্থ — সর্বজনীন শাসক।

এরপর যা হলো — ইতিহাস আর কখনো দেখেনি।

২৫ বছরের মধ্যে চেঙ্গিস খান জয় করলেন চীন। মধ্য এশিয়া। পারস্য। আফগানিস্তান। রাশিয়ার অংশ।

একটা মানুষের জীবদ্দশায় জয় করা ভূখণ্ড —

আজকের রাশিয়া থেকে শুরু করে ইরান পর্যন্ত।

আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের চেয়েও বড়।

যে সত্যটা ইতিহাস বইয়ে নেই।

চেঙ্গিস খানকে আমরা জানি শুধু ধ্বংসকারী হিসেবে।

কিন্তু আরেকটা চেঙ্গিস খান ছিলেন।

তিনি প্রথম আইন তৈরি করেছিলেন যেখানে লেখা ছিল —

ধর্মের কারণে কাউকে হত্যা করা যাবে না।

তাঁর সাম্রাজ্যে বৌদ্ধ, মুসলিম, খ্রিষ্টান — সবাই নিজের ধর্ম পালন করত।

তিনি বাণিজ্যপথ খুলে দিয়েছিলেন।

সিল্ক রোড তাঁর শাসনামলে এতটাই নিরাপদ ছিল যে একজন সোনার থালা মাথায় নিয়ে একা হেঁটে যেতে পারত — কেউ ছিনিয়ে নিত না।

এই মানুষটাকে কি শুধু দানব বলা ঠিক?

সবচেয়ে বড় রহস্য — মৃত্যু এবং সমাধি।

১২২৭ সাল।

চেঙ্গিস খান মারা গেলেন।

কীভাবে — আজও নিশ্চিত নয়।

কেউ বলেন যুদ্ধের আঘাতে। কেউ বলেন রোগে। কেউ বলেন এক রাজকুমারী তাঁকে হত্যা করেছিলেন।

তাঁর শেষ ইচ্ছা ছিল — সমাধির জায়গা যেন কেউ না জানে।

তাঁর লাশ বহনকারী সব সৈনিককে হত্যা করা হলো।

সমাধি খোঁড়া শেষ হলে সেই শ্রমিকদেরও হত্যা করা হলো।

সমাধির উপর দিয়ে হাজার ঘোড়া দৌড়ানো হলো — যেন মাটি সমান হয়ে যায়।

তারপর সেই জায়গায় গাছ লাগানো হলো।

৮০০ বছর পরেও চেঙ্গিস খানের সমাধি খুঁজে পাওয়া যায়নি।

শেষ কথা।

একটা ৯ বছরের ছেলে।

বাবা মরে গেছেন। উপজাতি তাড়িয়ে দিয়েছে। ঘরে খাবার নেই।

সেই ছেলে একদিন পৃথিবীর অর্ধেকটা শাসন করেছিল।

আজকের বিজ্ঞানীরা বলেন — পৃথিবীতে প্রতি ২০০ জনে একজন মানুষের শরীরে চেঙ্গিস খানের জিন আছে।

তাঁর রক্ত আজও বয়ে চলছে।


30

"৫,০০০ বছর আগের শহর — রাস্তা ছিল সোজা, নর্দমা ছিল পরিষ্কার।

তারপর একদিন — সবাই হঠাৎ চলে গেল।"

১৯২২ সাল।

একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ পাকিস্তানের সিন্ধু নদীর তীরে মাটি খুঁড়ছিলেন।

হঠাৎ তাঁর কোদাল একটা পাথরে ঠেকল।

আরেকটু খুঁড়লেন। আরেকটু।

তারপর তাঁর চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।

মাটির নিচে একটা পুরো শহর।

রাস্তা আছে। বাড়ি আছে। স্নানঘর আছে। পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা আছে।

৫,০০০ বছর আগের শহর।

যেখানে আধুনিক লন্ডনেরও নর্দমা ব্যবস্থা ছিল না — সেই যুগে এই শহরে প্রতিটা বাড়িতে পাকা নর্দমা।

নাম — মহেঞ্জোদারো।

অর্থ — মৃতের টিলা।

যে সভ্যতা সবাইকে অবাক করেছিল।

সিন্ধু সভ্যতা।

৫,০০০ বছর আগে যখন মিশরে পিরামিড তৈরি হচ্ছে, মেসোপটেমিয়ায় যুদ্ধ চলছে — তখন এই উপমহাদেশে চুপচাপ গড়ে উঠেছিল পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত শহর।

মহেঞ্জোদারো আর হরপ্পা — দুটো বড় শহর।

কিন্তু শুধু দুটো নয়। পরে আবিষ্কার হয়েছে আরও ১,০০০-এরও বেশি শহর ও গ্রাম।

বিস্তৃতি ছিল আজকের পাকিস্তান, ভারত আর আফগানিস্তান জুড়ে।

মিশর আর মেসোপটেমিয়া মিলিয়ে যত জায়গা — তার চেয়েও বড় ছিল এই সভ্যতা।

যে জিনিসগুলো দেখে বিজ্ঞানীরা থমকে গিয়েছিলেন।

মহেঞ্জোদারোর রাস্তা ছিল একদম সোজা।

পূর্ব-পশ্চিম আর উত্তর-দক্ষিণ — grid pattern-এ।

আজকের আমেরিকার শহরের মতো।

প্রতিটা বাড়িতে ছিল আলাদা স্নানঘর। পাকা ইটের মেঝে।

বাড়ির নোংরা পানি যেত ঢাকা নর্দমায়। নর্দমা যেত শহরের বাইরে।

এই ব্যবস্থা ইউরোপে এসেছিল আরও ৪,০০০ বছর পরে।

শহরে ছিল বিশাল শস্যাগার — যেখানে গোটা শহরের খাবার মজুত রাখা হতো।

ছিল বিশাল সুইমিং পুলের মতো "গ্রেট বাথ" — যেটা ধর্মীয় কাজে ব্যবহার হতো।

সবচেয়ে অবাক করা বিষয়।

এই সভ্যতায় কোনো অস্ত্রের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

কোনো যুদ্ধের চিহ্ন নেই।

কোনো রাজার প্রাসাদ নেই।

কোনো সৈনিকের কবর নেই।

মিশরে ফারাওর মূর্তি। মেসোপটেমিয়ায় রাজার স্মৃতিস্তম্ভ।

কিন্তু সিন্ধু সভ্যতায় — কোনো রাজার নাম নেই। কোনো নেতার ছবি নেই।

তাহলে এই বিশাল সভ্যতা কীভাবে চলত?

কে সিদ্ধান্ত নিত?

আজও কেউ জানে না।

যে রহস্য সবচেয়ে গভীর।

সিন্ধু সভ্যতার একটা নিজস্ব লিপি ছিল।

ছোট ছোট সিলে খোদাই করা সেই লিপি।

হাজারো সিল পাওয়া গেছে।

কিন্তু সেই লিপি আজও পড়া যায়নি।

পৃথিবীর সেরা ভাষাবিদরা চেষ্টা করেছেন। কম্পিউটার দিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

কিছুতেই কিছু হয়নি।

মিশরের হায়ারোগ্লিফিক্স পড়া গেছে। মেসোপটেমিয়ার কিউনিফর্ম পড়া গেছে।

কিন্তু সিন্ধু লিপি — আজও নীরব।

সেই লিপিতে কী লেখা আছে জানা গেলে হয়তো সব রহস্যের উত্তর মিলে যেত।

সবচেয়ে বড় রহস্য — হঠাৎ উধাও।

খ্রিস্টপূর্ব ১৯০০ সাল।

একটা সভ্যতা যেটা হাজার বছর ধরে শান্তিতে চলে আসছিল — হঠাৎ শেষ হয়ে গেল।

কোনো যুদ্ধের চিহ্ন নেই।

কোনো মহামারির প্রমাণ নেই।

কোনো দুর্ভিক্ষের ইতিহাস নেই।

শুধু — একদিন সবাই চলে গেল।

কোথায় গেল?

কেউ জানে না।

কেউ বলেন জলবায়ু পরিবর্তনে নদী শুকিয়ে গিয়েছিল। কেউ বলেন মহামারি। কেউ বলেন আর্যদের আগমন।

কিন্তু কোনো একটা ব্যাখ্যাই সম্পূর্ণ নয়।

৫,০০০ বছর আগের এই মানুষগুলো কোথায় গেল — এই প্রশ্নের উত্তর আজও ইতিহাসের কাছে নেই।

শেষ কথা।

আমাদের এই উপমহাদেশেই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত সভ্যতা।

যারা যুদ্ধ করেনি। রাজার পূজা করেনি। শান্তিতে থেকেছিল হাজার বছর।

তারপর হঠাৎ — নিখোঁজ।

তাদের ভাষা আজও পড়া যায় না।

তাদের ইতিহাস আজও জানা যায় না।

কিন্তু তাদের বানানো নর্দমা আজও টিকে আছে।


31


"একটা সাম্রাজ্য যেটা ১,০০০ বছর টিকেছিল — কিন্তু শেষে মাত্র কয়েক দশকে ধুলোয় মিশে গেল। "

৪৭৬ সাল।

রোমের শেষ সম্রাট রোমুলাস অগাস্টুলাস সিংহাসন থেকে উঠে দাঁড়ালেন।

তাঁর বয়স মাত্র ১৬।

সামনে দাঁড়িয়ে আছে জার্মান যোদ্ধা ওডোয়াসার।

কোনো যুদ্ধ হলো না। কোনো চিৎকার নেই। কোনো রক্তপাত নেই।

শুধু একটা মুকুট — এক মাথা থেকে আরেক মাথায় চলে গেল।

এইভাবেই শেষ হলো পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্য।

১,০০০ বছরের রোমান সাম্রাজ্য।

একটা ১৬ বছরের ছেলের নীরব আত্মসমর্পণে।

যে সাম্রাজ্য ছিল পৃথিবীর মানচিত্র।

রোমান সাম্রাজ্যের শীর্ষে ছিল প্রায় ৭ কোটি মানুষ।

ইংল্যান্ড থেকে মিশর। স্পেন থেকে ইরাক।

পুরো ভূমধ্যসাগর ছিল তাদের — তারা ডাকত "আমাদের সমুদ্র" বলে।

রোমান রাস্তা এত মজবুত ছিল যে আজও ইউরোপের অনেক জায়গায় সেই রাস্তার উপর দিয়ে গাড়ি চলে।

তাদের আইন ব্যবস্থা আজকের পৃথিবীর আইনের ভিত্তি।

তাদের স্থাপত্য আজও দাঁড়িয়ে আছে।

তারপরও তারা পড়ে গেল।

কেন?

প্রথম কারণ — ভেতর থেকে পচন।

রোমের পতন হয়নি বাইরের শত্রুতে।

পতন হয়েছিল ভেতর থেকে।

২৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রোমে ৮৪ জন সম্রাট এসেছিলেন।

তাদের মধ্যে মাত্র ২৪ জন স্বাভাবিক মৃত্যুতে মারা গেছেন।

বাকি ৬০ জনকে হত্যা করা হয়েছিল।

নিজেদের লোকের হাতে।

সেনাপতিরা সম্রাটকে হত্যা করত। নতুন সম্রাট বসাত। কিছুদিন পর সেই সম্রাটকেও হত্যা করত।

ক্ষমতার লোভ রোমকে ভেতর থেকে খেয়ে ফেলছিল।

দ্বিতীয় কারণ — অর্থনীতির ধস।

রোমের অর্থনীতি চলত দাসদের উপর।

যুদ্ধ জিতলে দাস আসত। দাস দিয়ে কাজ হতো। সাম্রাজ্য চলত।

কিন্তু যখন যুদ্ধ বন্ধ হলো — দাস আসা বন্ধ হলো।

তখন রোম শুরু করল মুদ্রার সোনা কমিয়ে দিতে।

যে মুদ্রায় আগে ছিল খাঁটি সোনা — সেখানে মেশানো হলো সস্তা ধাতু।

মানুষ বুঝতে পারল। বিশ্বাস উঠে গেল।

জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বী হলো।

মধ্যবিত্ত শ্রেণি ধ্বংস হয়ে গেল।

গরিব আরও গরিব হলো।

তৃতীয় কারণ — সীমান্তে চাপ।

উত্তর থেকে আসছিল গথ, ভিসিগথ, হুন।

তারা একসময় রোমের সীমান্তে থাকত।

কিন্তু মধ্য এশিয়া থেকে ভয়ংকর হুনদের আক্রমণে তারা পালিয়ে আসতে শুরু করল।

রোম তাদের ভেতরে ঢুকতে দিল। সৈনিক হিসেবে নিল।

কিন্তু তারা রোমান হলো না।

নিজেদের নেতাকেই মানল। নিজেদের ভাষায় কথা বলল।

রোমান সেনাবাহিনীতে রোমানই কমে গেল।

যে সেনারা রোমকে রক্ষা করছিল — তারাই ছিল রোমের শত্রু।

চতুর্থ কারণ — যেটা কেউ বলে না।

সীসা।

রোমানরা পানির পাইপ বানাত সীসা দিয়ে।

রান্নার পাত্র ছিল সীসার।

ওয়াইনে মেশানো হতো সীসার মিষ্টি যৌগ।

সীসা বিষাক্ত। ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের ক্ষতি করে।

গবেষকরা রোমান সম্রাটদের হাড় পরীক্ষা করে দেখেছেন — তাদের শরীরে সীসার মাত্রা ছিল স্বাভাবিকের ১০০ গুণ বেশি।

পাগলামি, সিদ্ধান্তহীনতা, নিষ্ঠুরতা — রোমান সম্রাটদের এই বৈশিষ্ট্যের পেছনে হয়তো ছিল সীসার বিষ।

কালিগুলা। নিরো। কমোডাস।

ইতিহাসের সবচেয়ে পাগল সম্রাটরা — সবাই রোমান।

যে কথাটা আজকের জন্য।

এডওয়ার্ড গিবন ১৭৭৬ সালে লিখেছিলেন রোমান সাম্রাজ্যের পতনের ইতিহাস।

তিনি বলেছিলেন —

রোম ধ্বংস হয়নি বাইরের শত্রুতে।

রোম ধ্বংস হয়েছিল কারণ রোমানরা রোমান থাকেনি।

তারা বিলাসিতায় ডুবে গিয়েছিল।

রাজনীতি দুর্নীতিতে ভরে গিয়েছিল।

মানুষ দেশের চেয়ে নিজেকে বড় ভাবতে শুরু করেছিল।

এই কথাগুলো ১,৫০০ বছর আগের।

কিন্তু আজকের পৃথিবীতে পড়লে কেমন লাগছে?


32



৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ।

মিশরের রাজা টলেমি একটা স্বপ্ন দেখলেন।

পৃথিবীর সব জ্ঞান এক জায়গায় জমা করবেন। সব ভাষার বই, সব দেশের পাণ্ডুলিপি — একটা ছাদের নিচে।

সেই স্বপ্নই হলো আলেক্সান্দ্রিয়ার মহাগ্রন্থাগার।

আর সেই স্বপ্ন একদিন আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল।

প্রথম কথা — এই গ্রন্থাগারে আসলে কী ছিল?

শুধু বই নয়।

টলেমির আইন ছিল — আলেক্সান্দ্রিয়া বন্দরে যে জাহাজ ঢুকবে, তার সব বই বাজেয়াপ্ত করা হবে। নকল বানিয়ে মালিককে ফেরত দেওয়া হবে। আসলটা থাকবে গ্রন্থাগারে।

এইভাবে ৭ লক্ষেরও বেশি পাণ্ডুলিপি জমা হয়েছিল।

আজ থেকে ২,৩০০ বছর আগে এখানে বসে এরাটোস্থেনেস শুধু একটা কূপের ছায়া মেপে বের করেছিলেন পৃথিবীর পরিধি — ভুল মাত্র ২%।

আরিস্টার্কাস এখানে বসে বলেছিলেন পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে — কোপার্নিকাসের ১,৮০০ বছর আগে।

হেরোফিলাস এখানে মানুষের মস্তিষ্ক কেটে প্রমাণ করেছিলেন — চিন্তার জায়গা হৃদয় নয়, মাথা।

এই সব জ্ঞান ছিল এখানে। লেখা ছিল পাপিরাসের পাতায়।

আর সেই পাতাগুলোই একদিন ছাই হয়ে গেল।

দ্বিতীয় কথা — কে লাগিয়েছিল আগুন?

এখানেই সবচেয়ে বড় রহস্য।

ইতিহাসে চারজনের নাম আসে।

প্রথম — জুলিয়াস সিজার। ৪৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বন্দরে শত্রুর জাহাজে আগুন দিয়েছিলেন। সেই আগুন ছড়িয়ে গ্রন্থাগারে পৌঁছেছিল কিনা — বিতর্ক আছে।

দ্বিতীয় — রোমান সম্রাট অরেলিয়ান। ৩য় শতকে যুদ্ধের সময় শহরের একটা অংশ ধ্বংস করেছিলেন।

তৃতীয় — খ্রিস্টান বিশপ থিওফিলাস। ৩৯১ খ্রিস্টাব্দে "পৌত্তলিক" জ্ঞান ধ্বংস করার নামে।

চতুর্থ — আরব সেনাপতি আমর ইবন আস। ৬৪১ খ্রিস্টাব্দে মিশর জয়ের পর।

কিন্তু সত্যি কথা হলো — গ্রন্থাগার একবারে পোড়েনি।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বারবার লুট হয়েছে, বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটু একটু করে মরেছে।

কোনো একজন দোষী নয়। দোষী হলো অনেকে।

আর সবচেয়ে বড় দোষী হলো — আমাদের উদাসীনতা।

তৃতীয় কথা — কী হারিয়ে গেছে?

এটা জানলে বুকের ভেতর মোচড় দেয়।

অ্যারিস্টটলের সব রচনার মাত্র এক তৃতীয়াংশ আমরা পেয়েছি। বাকি দুই তৃতীয়াংশ এই গ্রন্থাগারে ছিল বলে ধারণা।

সোফোক্লিসের ১২৩টি নাটকের মধ্যে টিকে আছে মাত্র ৭টি।

প্রাচীন ব্যাবিলনের চিকিৎসাশাস্ত্র ছিল। মিশরের ফারাওদের গোপন ইতিহাস ছিল। ভারত আর চীনের প্রাচীন জ্ঞানের অনুবাদ ছিল।

সবচেয়ে কষ্টের কথা হলো — আমরা জানি কোন বইগুলো ছিল। নামের তালিকা আছে। কিন্তু ভেতরে কী লেখা ছিল, তা কেউ কোনোদিন জানবে না।

চিরতরে হারিয়ে গেছে।

চতুর্থ কথা — আমরা আসলে কতটা পিছিয়ে গেছি?

ইতিহাসবিদরা একটা ভয়ানক হিসাব দেন।

যদি আলেক্সান্দ্রিয়ার জ্ঞান টিকে থাকত — শিল্পবিপ্লব আসত ১,০০০ বছর আগে। ইউরোপের মধ্যযুগের অন্ধকার হয়তো আসতই না। চিকিৎসাবিজ্ঞান এগিয়ে যেত কয়েক শতাব্দী।

লক্ষ লক্ষ মানুষ যে রোগে মারা গেছে — তারা বেঁচে থাকত।

একটা আগুন — আর গোটা মানবজাতির হাজার বছর নষ্ট।


33

এক মহান সেনাপতির শেষ যাত্রা—Pompey-এর বিশ্বাসঘাতকতার মৃত্যু

এক যুদ্ধেই বদলে গেল রোমের ভবিষ্যৎ

খ্রিস্টপূর্ব ৪৮ সালের ৯ আগস্ট, Battle of Pharsalus-এ Julius Caesar-এর সেনাবাহিনী সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করে Pompey the Great-এর বাহিনীকে।

এই যুদ্ধের পর শুধু একটি সেনাপতির পরাজয় হয়নি—

কার্যত রোমান প্রজাতন্ত্রের পতন শুরু হয়ে যায়

Pompey, যিনি বহু বছর ধরে রোমের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সম্মানিত সেনাপতি ছিলেন, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাতে বাধ্য হন।

পালানো, কিন্তু কোথায় নিরাপত্তা?

পরাজয়ের পর Pompey ছদ্মবেশে পালিয়ে যান। তার সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী Cornelia এবং কিছু বিশ্বস্ত সঙ্গী।

তিনি পূর্ব দিকে যাত্রা করেন এবং আশ্রয়ের জন্য বেছে নেন মিশর—

একটি দেশ, যেখানে তার আগে থেকেই প্রভাব ছিল।

সেখানে তখন শাসন করছিলেন কিশোর রাজা Ptolemy XIII, যিনি নিজের বোন Cleopatra-র সঙ্গে ক্ষমতার লড়াইয়ে জড়িত ছিলেন।

Pompey আশা করেছিলেন—

পুরনো সম্পর্ক তাকে বাঁচাবে

এক সিদ্ধান্ত—যা বদলে দিল সবকিছু

মিশরের প্রকৃত ক্ষমতা ছিল তিনজন উপদেষ্টার হাতে—Pothinus, Achillas, এবং Theodotus।

তারা একটি কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়েছিল—

Pompey-কে আশ্রয় দেবে, নাকি তাকে সরিয়ে দেবে?

Theodotus একটি নির্মম যুক্তি দেয়—

“মৃত মানুষ কখনো বিপদ সৃষ্টি করে না।”

এবং সেই যুক্তিই Pompey-এর ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।

বিশ্বাসঘাতকতার মুহূর্ত

খ্রিস্টপূর্ব ৪৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর, মিশরের Pelusium উপকূলে Pompey-এর জাহাজের কাছে একটি ছোট নৌকা পাঠানো হয়।

নৌকায় ছিল Achillas এবং এক সময়ের Roman সৈনিক Lucius Septimius—যিনি একসময় Pompey-এর অধীনে কাজ করেছিলেন।

Pompey নৌকায় ওঠেন, বিশ্বাস নিয়ে।

তার স্ত্রী দূর থেকে সব দেখছিলেন।

কিছু একটা ভুল মনে হচ্ছিল—

কিন্তু তখন আর কিছু করার ছিল না।

শেষ মুহূর্ত—নিঃশব্দ মৃত্যু

Pompey তখন একটি ভাষণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, যা তিনি রাজাকে শোনাতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু তিনি কখনো সেই ভাষণ দিতে পারেননি।

নৌকাটি যখন তীরে পৌঁছায়—

Septimius পিছন থেকে তাকে আঘাত করে।

Pompey কোনো কথা না বলেই মারা যান।

তিনি নিজের টোগা মুখের ওপর টেনে দেন—

এক নিঃশব্দ, মর্যাদাপূর্ণ শেষ মুহূর্ত

তার বয়স ছিল ৫৮ বছর—

জন্মদিনের ঠিক একদিন আগে

শেষ ভাবনা—শক্তি, রাজনীতি, আর বিশ্বাসঘাতকতা

Pompey-এর মৃত্যু শুধু একজন মানুষের শেষ নয়—

এটি ছিল এক যুগের সমাপ্তি।

একজন মহান সেনাপতি,

একটি ভুল সিদ্ধান্ত,

আর এক বিশ্বাসঘাতকতা—

যা প্রমাণ করে—

রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় বিপদ শত্রু নয়,

বরং ভুল বিশ্বাস


34


"একটা রাতে ফ্রান্সের হাজার বছরের রাজতন্ত্র শেষ হয়ে গেল। রাজাকে গিলোটিনে শিরশ্ছেদ করা হলো। এবং সেই বিপ্লব থেকে যে তিনটি শব্দ বেরিয়ে এলো — তা আজও পৃথিবী চালাচ্ছে।"

১৭৮৯ সালের জুলাই মাসে প্যারিসের রাস্তায় মানুষ ক্ষুধার্ত। রুটির দোকানে রুটি নেই। দাম এতটাই বেশি যে সাধারণ মানুষ কিনতে পারছে না। কিন্তু ভার্সাই প্রাসাদে রাজা ষোড়শ লুই এবং রানি মারি আঁতোয়ানেত বিলাসিতায় ডুবে আছেন। রাজপ্রাসাদের খরচ মেটাতে প্রতি বছর যে টাকা লাগে, তাতে হাজার হাজার দরিদ্র পরিবার বছরের পর বছর চলতে পারত। এবং ১৪ জুলাই ১৭৮৯ তারিখে প্যারিসের রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ জমা হলো। তাদের হাতে অস্ত্র। গন্তব্য — বাস্তিল দুর্গ, ব্রিটিশ স্বৈরাচারের প্রতীক। এবং সেই রাতে ইতিহাস বদলে গেল।

ফরাসি বিপ্লবের পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ। ফ্রান্সের সমাজ তখন তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত। প্রথম শ্রেণি — পাদ্রি। দ্বিতীয় শ্রেণি — অভিজাত। এই দুটো শ্রেণি কোনো কর দিত না। তৃতীয় শ্রেণি — বাকি সবাই, মানে ৯৮ শতাংশ মানুষ। তারাই সব কর দিত, তারাই অনাহারে মরত। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের কোনো কথা ছিল না। এই অন্যায় দশকের পর দশক ধরে চলছিল। এবং ১৭৮৯ সালে যখন খরা হলো, ফসল নষ্ট হলো, রুটির দাম আকাশ ছুঁল — তখন সেই জমে থাকা ক্ষোভ বিস্ফোরণ হয়ে বেরিয়ে এলো।

বাস্তিল দুর্গ দখলের পর আর থামানো গেল না। সারা ফ্রান্সে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ল। অভিজাতরা পালাল, অনেকে মারা গেল। রাজা ষোড়শ লুইকে বন্দি করা হলো। এবং ১৭৯৩ সালে প্যারিসের প্রধান চত্বরে গিলোটিনে তাঁর শিরশ্ছেদ করা হলো। কয়েক মাস পরে রানি মারি আঁতোয়ানেতকেও একই পরিণতি। হাজার বছরের ফরাসি রাজতন্ত্র শেষ হলো একটা ধারালো ফলার এক কোপে।

কিন্তু বিপ্লব তখনো শেষ হয়নি। বরং শুরু হলো সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অধ্যায়। রেইন অব টেরর বা আতঙ্কের রাজত্ব। বিপ্লবীরা নিজেরাই একে অপরকে হত্যা করতে লাগল। যাকে বিপ্লবের শত্রু মনে হয়, তাকেই গিলোটিনে পাঠানো হয়। মাত্র ১০ মাসে ১৭,০০০ মানুষের আনুষ্ঠানিক মৃত্যুদণ্ড হলো, অনানুষ্ঠানিকভাবে আরও অনেক বেশি। বিপ্লবের অন্যতম নেতা রবেসপিয়েরও শেষ পর্যন্ত গিলোটিনে মারা গেলেন।

কিন্তু এই সব রক্তপাতের মাঝে একটা জিনিস বেরিয়ে এলো যা মানব ইতিহাস বদলে দিল। তিনটি শব্দ। লিবার্তে, এগালিতে, ফ্রাতের্নিতে। মানে স্বাধীনতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব। এই তিনটি ধারণা ফরাসি বিপ্লবের আগে শুধু দার্শনিকদের বইয়ে ছিল। কিন্তু বিপ্লবের পরে এগুলো রাষ্ট্রের নীতি হয়ে গেল। সব মানুষ সমান। সব মানুষের অধিকার আছে। কেউ জন্মসূত্রে বড় নয়।

এই ধারণা ছড়িয়ে পড়ল সারা ইউরোপে, তারপর সারা পৃথিবীতে। আমেরিকার গণতন্ত্র, ভারতের সংবিধান, জাতিসংঘের মানবাধিকারের ঘোষণা — সব কিছুর পেছনে আছে সেই তিনটি শব্দ যা ফরাসি বিপ্লব পৃথিবীকে দিয়েছিল।

এবার একটা অজানা তথ্য। রানি মারি আঁতোয়ানেত নাকি বলেছিলেন — "রুটি নেই? তাহলে কেক খাও।" এই কথাটা তাঁর অসংবেদনশীলতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার হয়। কিন্তু ইতিহাসবিদরা বলছেন, এই কথা তিনি আসলে বলেননি। এটা পরে তাঁর নামে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাস্তবে মারি আঁতোয়ানেত বিভিন্ন সময়ে দরিদ্রদের সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু বিপ্লবের আগুনে সত্যি-মিথ্যার তফাৎ গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। গল্পটা প্রচার হয়ে গিয়েছিল, মানুষ বিশ্বাস করেছিল, এবং সেই বিশ্বাসই রাজবংশের পতনে ভূমিকা রেখেছিল।

ফরাসি বিপ্লব আমাদের আরও একটা শিক্ষা দেয় যা আজকের পৃথিবীতেও প্রাসঙ্গিক। যে বিপ্লব ন্যায়বিচারের জন্য শুরু হয়েছিল, সেটাই কিছুদিনের মধ্যে সন্ত্রাসে পরিণত হলো। যারা অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়েছিল, তারাই নতুন অত্যাচারী হলো। ক্ষমতা পেলে মানুষ বদলে যায় — এই সত্যিটা ফরাসি বিপ্লব বারবার প্রমাণ করেছে।

একটু ভাবো।

একটা বিপ্লব হয়েছিল মানুষের অধিকারের জন্য। সেই বিপ্লব লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। কিন্তু সেই বিপ্লবের ধারণাগুলো আজকের গণতন্ত্রের ভিত্তি। রক্তের উপর দিয়েই কি সব মহান ধারণা আসতে হয়? @ শেষরাত


35


শো-অফ করা বা লোক দেখানো সবচেয়ে বড় ছোটলোকি

মানুষ তার চরিত্র, আচরণ ও মূল্যবোধ দিয়ে বড় হয়, সম্পদ বা বাহ্যিক চাকচিক্য দিয়ে নয়।

সমাজে এমন অনেক মানুষ দেখা যায় যারা নিজের বাস্তব অবস্থার চেয়ে বড় দেখানোর জন্য অকারণে শো-অফ করে।

লোক দেখানো আচরণ সাময়িক প্রশংসা আনতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সম্মান নষ্ট করে দেয়।

সভ্য সমাজে বিনয়কে মহত্ত্ব আর অহংকারকে ছোট মানসিকতার লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়।

এই কারণেই বলা হয়, শো-অফ করা বা লোক দেখানো সবচেয়ে বড় ছোটলোকি।

কারণ প্রকৃত ভদ্র মানুষ নিজের অর্জন নিয়ে উচ্চস্বরে ঘোষণা দেন না, কাজ দিয়েই পরিচয় তৈরি করেন।

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, অতিরিক্ত শো-অফ সাধারণত আত্মবিশ্বাসের অভাব ঢাকার চেষ্টা।

গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিজের জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট নয় তারা অন্যদের সামনে অতিরিক্ত প্রদর্শনী করতে চায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিলাসিতা প্রদর্শনের প্রবণতা নিয়ে করা গবেষণায় দেখা যায়, এটি তুলনামূলক হীনমন্যতা ও সামাজিক প্রতিযোগিতা বাড়ায়।

মানুষ যখন অন্যের প্রশংসা পাওয়াকে প্রধান লক্ষ্য বানায়, তখন নিজের বাস্তব উন্নয়ন থেমে যায়।

ভারত ও বাংলাদেশের সামাজিক আচরণ বিষয়ক গবেষণায় বলা হয়েছে, বিনয়ী মানুষ দীর্ঘমেয়াদে বেশি সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পায়।

অর্থাৎ শো-অফ সাময়িক জনপ্রিয়তা দিলেও স্থায়ী সম্মান দেয় না।

শো-অফ করার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো মানুষের বিশ্বাস হারানো।

যারা সবসময় বড় বড় কথা বলে বা অযথা বিলাসিতা দেখায়, তাদের প্রতি মানুষ ধীরে ধীরে সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠে।

লোক দেখানোর জন্য অনেকেই অপ্রয়োজনীয় খরচ করে ঋণে জড়িয়ে পড়ে।

এতে পারিবারিক অশান্তি, মানসিক চাপ ও আর্থিক সংকট তৈরি হয়।

শো-অফ মানুষকে তুলনার ফাঁদে ফেলে, ফলে অন্যের সাফল্য সহ্য করা কঠিন হয়ে যায়।

বন্ধুত্ব ও আত্মীয়তার সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি হয়, কারণ মানুষ আন্তরিকতার বদলে অভিনয় অনুভব করে।

অতিরিক্ত প্রদর্শনী অহংকার বাড়ায়, আর অহংকার মানুষকে একসময় একা করে দেয়।

সত্যিকারের বড় মানুষরা সাধারণ জীবনযাপন করেও গভীর প্রভাব রেখে যান।

ইতিহাসে দেখা যায়, মহান ব্যক্তিরা নিজের সাফল্যের প্রচার নয় বরং কাজের মাধ্যমে সমাজ বদলেছেন।

বিনয়, সংযম ও স্বাভাবিকতা মানুষের ব্যক্তিত্বকে সম্মানিত করে তোলে।

যেখানে শো-অফ মানুষকে কৃত্রিম করে, সেখানে সরলতা মানুষকে গ্রহণযোগ্য করে।

সামাজিক মর্যাদা আসে চরিত্র থেকে, প্রদর্শনী থেকে নয়।

তাই আত্মসম্মান রক্ষা করতে হলে বাহ্যিক দেখানোর চেয়ে ভেতরের উন্নয়ন জরুরি।

 শো-অফ কখনো প্রকৃত সম্মান এনে দেয় না বরং মানুষকে ধীরে ধীরে ছোট করে ফেলে।

লোক দেখানো আচরণ মানুষকে বাস্তবতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং সম্পর্ককে দুর্বল করে।

যে ব্যক্তি নিজের অর্জন নিয়ে নীরব থাকে, সমাজ শেষ পর্যন্ত তাকেই বেশি মূল্য দেয়।

সত্যিকারের ভদ্রতা হলো স্বাভাবিক থাকা, অযথা নিজেকে বড় প্রমাণ করার চেষ্টা না করা।

অতএব, শো-অফ নয়, বিনয়ী জীবনযাপনই একজন মানুষকে প্রকৃত অর্থে বড় করে তোলে।

References :

Goffman, Erving (1959). The Presentation of Self in Everyday Life.

Twenge, Jean M. (2013). Narcissism and Social Media Behavior Study.

Veblen, Thorstein (1899). The Theory of the Leisure Class.

@ SAM Motivation


36


আত্মসম্মান কেন জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ

মানুষ জীবনে অর্থ হারায়, সম্পর্ক হারায়, সুযোগ হারায়।

তারপরও আবার উঠে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু একজন মানুষ যখন নিজের কাছেই নিজের মূল্য হারিয়ে ফেলে, তখন সমস্যা শুধু বাইরের পৃথিবীতে সীমাবদ্ধ থাকে না, যুদ্ধ শুরু হয় নিজের ভেতরে।

পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধ হচ্ছে সেই সংগ্রাম, যেখানে একজন মানুষ প্রতিদিন নিজের সাথেই লড়াই করে। কারণ বাইরে কেউ আপনাকে কতটা সম্মান দেবে, তার আগে আপনি নিজেকে কতটা সম্মান করেন, সেটাই আসল ভিত্তি তৈরি করে।

আমরা সাধারণত ভাবি আত্মবিশ্বাস মানেই বড় বড় কথা বলা, সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া বা মানুষের সামনে খুব শক্তিশালী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করা। কিন্তু আত্মসম্মান আসলে অনেক গভীর বিষয়। এটি হলো নিজের কাছে নিজের রিপুটেশন।

পৃথিবীর সবাইকে হয়তো আপনি কিছু সময়ের জন্য ফাঁকি দিতে পারবেন, কিন্তু নিজের ভেতরের মানুষটাকে কখনও ফাঁকি দিতে পারবেন না। কারণ সে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে। আপনি কী বলছেন, কী করছেন, কোন জায়গায় আপস করছেন কিংবা কোথায় নিজের নীতি বিসর্জন দিচ্ছেন, সবকিছু সে নীরবে হিসাব রাখছে

একটা ব্যবসার কথা চিন্তা করুন। কোনো কোম্পানি যদি বারবার নিজের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, গ্রাহককে ঠকায় কিংবা কর্মীদের সঙ্গে অন্যায় করে, তাহলে ধীরে ধীরে বাজারে তার রিপুটেশন নষ্ট হয়ে যায়।

ঠিক একইভাবে, আপনি যখন নিজের কাছে দেওয়া কথা রাখেন না, তখন নিজের ভেতরেও আপনার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হতে থাকে। আপনি হয়তো বাইরে হাসছেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে নিজের ওপর বিশ্বাস হারাতে শুরু করেন। আর এই নেতিবাচক প্রভাবই মানুষের মানসিক শক্তি ধ্বংস করে দেয়।

অনেক মানুষ মনে করে লো সেলফ এস্টিম বা হীনম্মন্যতা আসে কারণ তারা যথেষ্ট সফল নন। কিন্তু বাস্তবে অনেক সফল মানুষও সন্তপনে নিজেকে অপছন্দ করেন।

কারণ আত্মসম্মান শুধুমাত্র অ্যাচিভমেন্ট বা অর্জন দিয়ে তৈরি হয় না। এটি তৈরি হয় অ্যালাইনমেন্ট এর মাধ্যমে। অর্থাৎ আপনার মূল্যবোধ আর আপনার কর্ম একই রেখায় আছে কি না। আপনি যা বিশ্বাস করেন, আপনি কি সত্যিই সেই অনুযায়ী জীবন অতিবাহিত করছেন?

ধরুন একজন শিক্ষার্থী প্রতিদিন নিজেকে বলে, আমি ভবিষ্যতে বড় কিছু করব। কিন্তু সে প্রতিদিন সময় নষ্ট করে এবং নিজের কাজ ফেলে রাখে। তার সাবকনশাস মাইন্ড খুব ভালো করেই বুঝতে পারে যে সে নিজের কথা রাখছে না। ফলে ধীরে ধীরে তার নিজের প্রতি শ্রদ্ধা কমতে থাকে।

আবার একজন উদ্যোক্তা যদি সবসময় শর্টকাট খোঁজে, মানুষের বিশ্বাস ভঙ্গ করে কিংবা দ্রুত লাভের জন্য নীতি বিক্রি করে, সে হয়তো কিছু অর্থ উপার্জন করবে কিন্তু নিজের ভেতরের নৈতিক শক্তি হারাবে। কারণ মানুষের অবচেতন মন অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে সবকিছু লিপিবদ্ধ করে।

এই কারণেই অনেক সময় দেখা যায়, একজন সাধারণ মানুষ যার হয়তো খুব বেশি সম্পদ নেই, সে অনেক শান্তিতে থাকে। অন্যদিকে প্রচুর অর্থ থাকা সত্ত্বেও কেউ ভেতরে ভেতরে অস্থির থাকে। কারণ আত্মসম্মান ব্যাংক ব্যালেন্স দেখে তৈরি হয় না। এটি নির্মিত হয় নিজের চরিত্রের দৃঢ়তার ওপর ভিত্তি করে।

নাভাল একটি অসাধারণ কথা বলেছিলেন। মানুষের আত্মসম্মান বাড়ানোর সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়গুলোর একটি হলো নিজের মরাল কোড অনুযায়ী বাঁচা। অর্থাৎ আপনি নিজের জন্য যে নিয়ম ঠিক করেছেন, সেটি কঠোরভাবে অনুসরণ করা। কারণ আপনি যখন নিজের কাছেই নিজের কথা রাখেন, তখন ধীরে ধীরে আপনার মন আপনাকে বিশ্বাস করতে শুরু করে।

আমরা অনেক সময় স্যাক্রিফাইস শব্দটিকে ভুল বুঝি। কেউ বলে, আমি কাজের জন্য অনেক ত্যাগ করেছি। কিন্তু বেশিরভাগ সময় সেটি আসলে কম গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছেড়ে দিয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু গ্রহণ করা।

সত্যিকারের ত্যাগ হলো তখন, যখন আপনি এমন কিছু করেন যা শুধুমাত্র নিজের লাভের জন্য নয় বরং ভালোবাসা, দায়িত্ব বা নীতির জন্য করেন।

আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, মানুষ জীবনের শেষে সবচেয়ে বেশি গর্ববোধ করে এই ধরনের মুহূর্তগুলো নিয়েই। নতুন গাড়ি কেনা বা দামী ফোন ব্যবহারের স্মৃতি খুব দ্রুত ফিকে হয়ে যায়। কিন্তু কাউকে সাহায্য করার জন্য নিজের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়ার স্মৃতি অনেক গভীরে স্থায়ী হয়ে থাকে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাইকোলজিক্যাল ইনসাইট আছে। আমরা সাধারণত ভাবি মানুষ ভালো কাজ করে অন্যদের জন্য। কিন্তু বাস্তবে ভালো কাজ করার সবচেয়ে বড় উপকারটা হয় নিজের ভেতরে।

কারণ প্রতিটি নৈতিক কাজ আপনার সাবকনশাস মাইন্ডকে একটি সংকেত দেয় যে, আমি এমন একজন মানুষ, যে নিজের নীতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে না। আর এই সংকেতটিই ধীরে ধীরে মজুত আত্মসম্মান তৈরি করে।

সমাজের দিক থেকেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি হাই ট্রাস্ট সোসাইটি তখনই তৈরি হয়, যখন মানুষ স্বল্পমেয়াদী লাভের বদলে দীর্ঘমেয়াদী লাভ বেছে নেয়।

ধরুন ব্যবসায় দুইজন মানুষ একে অপরকে বিশ্বাস করতে পারেন। তাহলে তাদের কাজ দ্রুত হয় এবং সেখানে কোনো সংশয় থাকে না। কিন্তু সবাই যদি প্রতারণার আশ্রয় নেয়, তবে পুরো সমাজে এক ধরণের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। তখন প্রত্যেকে প্রত্যেককে সন্দেহ করতে শুরু করে।

গেম থিওরিতে একটি ধারণা আছে যা হলো স্ট্যাগ হান্ট। যদি দুইজন মানুষ একসাথে সহযোগিতা করে, তবে তারা বড় শিকার ধরতে পারে। কিন্তু যদি কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করে, তবে সবার ক্ষতি হয়।

বাস্তব জীবনও ঠিক এমনই। যারা দীর্ঘমেয়াদে চরিত্র ধরে রাখে, তারা ধীরে ধীরে এমন মানুষদেরই আকর্ষণ করে যারা বিশ্বাসযোগ্য। আর যারা সবসময় শর্টকাট খোঁজে, তারা শেষ পর্যন্ত নিজেদের চারপাশে একই মানসিকতার মানুষই পায়।

এখানে একটি গভীর প্রজ্ঞা লুকিয়ে আছে। আপনি যদি শিকারি হন, তবে একসময় নিজেকে শুধুই একই ধরণের মানুষের মাঝে আবিষ্কার করবেন। তখন সম্পর্কেও শান্তি থাকবে না আর ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও নয়। কারণ সবাই সবাইকে ব্যবহার করতে চাইবে।

কিন্তু আপনি যদি চরিত্রবান মানুষ হন, তবে ধীরে ধীরে আপনার চারপাশে এক ধরণের স্থিতিশীল এবং গুণী মানুষের বলয় তৈরি হবে।

আত্মসম্মান এর সঙ্গে শৈশবের সম্পর্কও অত্যন্ত গভীর। যেসব মানুষ ছোটবেলায় নিঃশর্ত ভালোবাসা পায়নি, তারা অনেক সময় বড় হয়ে নিজের মূল্য নিয়ে সংশয়ে ভোগে। তারা সবসময় বাইরের প্রশংসা বা ভ্যালিডেশন খুঁজে বেড়ায়। কেউ প্রশংসা করলে ভালো লাগে আর সমালোচনা করলে তারা ভেঙে পড়ে। কারণ তাদের ভেতরের ভিত্তি দুর্বল থাকে।

কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একজন মানুষ সচেতন চেষ্টার মাধ্যমে নিজের ভেতরে সেই সম্মানবোধ জাগিয়ে তুলতে পারে।

একটি সুন্দর ধারণা হলো ইন্টারনাল গোল্ডেন রুল। আমরা জানি প্রচলিত নিয়ম হলো অন্যদের সাথে এমন আচরণ করা যেভাবে আমরা প্রত্যাশা করি তারা আমাদের সাথে করবে।

কিন্তু এই নিয়ম বলে, নিজের সাথে এমন আচরণ করো যেভাবে তোমার সাথে আচরণ করা উচিত ছিল। অর্থাৎ নিজেকে বারবার অপমান না করা, নিজের ভুলের জন্য অমানবিকভাবে নিজেকে আঘাত না করা এবং নিজের সত্তাকে সম্মান করা।

ভালোবাসার ক্ষেত্রেও মানুষ একটি ভুল করে। সবাই ভালোবাসা পেতে চায়। কিন্তু নাভাল বলছেন, ভালোবাসা পাওয়ার অনুভূতির চেয়েও শ্রেষ্ঠ হলো কাউকে সত্যিকারে ভালোবাসার অনুভূতি। কারণ যখন আপনি ভালোবাসেন, তখন আপনার হৃদয় উন্মোচিত হয়, আরও প্রশস্ত হয়। এভাবে আপনি নিজেও আরও উন্নত হন, আপানর বেটার ভার্সনে পৌঁছান।

একজন বাবা যখন সন্তানের জন্য পরিশ্রম করেন, একজন শিক্ষক যখন শিক্ষার্থীকে গড়ে তোলেন কিংবা একজন উদ্যোক্তা যখন সাধারণ মানুষকে সেবা দেয়ার মাধ্যমে ভ্যালু তৈরি করেন, তখন তারা শুধু অন্যদের উপকার করেন না, বরং নিজের ভেতরেও এক ধরণের সার্থকতা তৈরি করেন।

আজকের পৃথিবীতে মানুষ নিজের মূল্য নির্ধারণ করছে ফলোয়ার বা সাবস্কাইবার সংখ্যা, বেতন কিংবা বিলাসিতা দিয়ে। কিন্তু এগুলো খুবই ভঙ্গুর। কারণ এগুলো বাহ্যিক বিষয়। বাইরের পরিস্থিতি বদলে গেলে পরিচয়ও তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে যায়।

অথচ সত্যিকারের আত্মসম্মান তৈরি হয় ভেতরের অবিচলতা থেকে। আপনি একা থাকলেও কি নিজেকে শ্রদ্ধা করতে পারেন? আপনি কি এমন একটি জীবন অতিবাহিত করছেন যা নিজের কাছে সৎ মনে হয়?

অনেক মানুষ অভিযোগ করে যে তারা কাজের অনুপ্রেরণা পাচ্ছে না। কিন্তু অনুপ্রেরণার চাইতেও বড় একটি বিষয় আছে যা হলো আত্মসম্মান।

যে মানুষ নিজের কাছেই নিজের মর্যাদা হারিয়ে ফেলেছে, তার জন্য উদ্যম ধরে রাখা কঠিন। কারণ তার নিজ মনই তাকে আর বিশ্বাস করে না। তাই জীবনে বড় পরিবর্তন আনার আগে ছোট ছোট ক্ষেত্রে নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা শুরু করতে হয়।

সময়মতো বিশ্রাম নেওয়া, প্রতিদিন কিছু না কিছু পড়া, শারীরের যত্ন নেওয়া এবং সঠিক সময়ে কাজ শেষ করা। এই ছোট ছোট শৃঙ্খলা বা ডিসিপ্লিন গুলোই ধীরে ধীরে ভেতরের ভিত্তি তৈরি করে।

সবশেষে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। আত্মসম্মান কোনো উক্তি দিয়ে হুট করে তৈরি হয় না। এটি নির্মিত হয় প্রতিদিনের প্রতিটি কাজের মাধ্যমে।

আপনি প্রতিদিন কী করছেন, কোন জায়গায় আপস করছেন আর কোথায় নিজের আদর্শ ধরে রাখছেন, এসবের সমষ্টিই একসময় আপনার পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়। আর যখন একজন মানুষ নিজের কাছেই সম্মানিত হয়ে ওঠে, তখন বাইরের কোনো আঘাত তাকে সহজে বিচ্যুত করতে পারে না।

যেদিন একজন মানুষ নিজের কাছেই সম্মানিত হয়ে ওঠেন, সেদিন থেকে পৃথিবীর মতামত তাঁর জীবন নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।

@  Nur Rahman


37


গণিত মানুষ তৈরি করেছে — এটা আমরা মনে করি। কিন্তু কিছু সংখ্যা আছে যা মনে হয় মানুষ আবিষ্কার করেনি, বরং প্রকৃতি নিজেই ব্যবহার করে। ফুলের পাপড়িতে, শামুকের খোলে, ছায়াপথের বাহুতে, মানবদেহের অনুপাতে — একই সংখ্যা বারবার দেখা যায়। কেউ রাখেনি। কিন্তু আছে। আজ সেই রহস্যময় সংখ্যাগুলোর কথা বলব — যা বিজ্ঞানকে অবাক করে রেখেছে।

প্রথম — ফিবোনাচি সংখ্যা।

১, ১, ২, ৩, ৫, ৮, ১৩, ২১, ৩৪, ৫৫...

প্রতিটা সংখ্যা আগের দুটোর যোগফল। সহজ নিয়ম। ইতালির গণিতবিদ ফিবোনাচি ১২০২ সালে এটা লিখেছিলেন। কিন্তু সমস্যা হলো এই সংখ্যাগুলো পৃথিবীতে সব জায়গায় আছে — ফিবোনাচির জন্মের আগে থেকে।

সূর্যমুখীর বীজ সাজানো থাকে ফিবোনাচি সংখ্যায়। ৩৪টা বাম দিকে, ৫৫টা ডান দিকে। পাইন কোনের আঁশ সাজানো থাকে ৮ এবং ১৩-এ। লিলি ফুলের পাপড়ি ৩টা। বাটারকাপে ৫টা। ডেইজিতে ১৩টা। শামুকের খোল ফিবোনাচি অনুপাতে বাড়ে। এবং মানুষের আঙুলের হাড়গুলো ফিবোনাচি অনুপাতে।

কেউ গাছকে বলেনি এভাবে সাজাতে। কেউ শামুককে বলেনি এভাবে বাড়তে। তবু তারা এটা করে। কারণ এটাই প্রকৃতির সবচেয়ে দক্ষ পদ্ধতি। কিন্তু প্রকৃতি এটা কীভাবে জানল?

দ্বিতীয় — গোল্ডেন রেশিও। ১.৬১৮।

ফিবোনাচি সংখ্যার যেকোনো দুটো পরপর সংখ্যার ভাগ করো। উত্তর আসবে ১.৬১৮-এর কাছাকাছি। এই সংখ্যাটার নাম গোল্ডেন রেশিও বা ফি।

গ্রিক পার্থেনন মন্দিরে এই অনুপাত। লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মোনালিসায় এই অনুপাত। মিশরের পিরামিডে এই অনুপাত। কিন্তু এগুলো মানুষ ইচ্ছে করে রেখেছে। আসল অবাক করার বিষয় হলো — মানবদেহে এই অনুপাত। নাভি থেকে মাথার উপর পর্যন্ত উচ্চতা ভাগ করো পুরো উচ্চতায়। উত্তর ১.৬১৮। কাঁধ থেকে আঙুলের ডগা ভাগ করো কনুই থেকে আঙুলের ডগায়। উত্তর ১.৬১৮। ডিএনএ-র প্রতিটা চক্রের দৈর্ঘ্য ৩৪ আংস্ট্রম, প্রস্থ ২১ আংস্ট্রম। ৩৪ ভাগ ২১ সমান ১.৬১৯।

কেউ মানুষের শরীর ডিজাইন করেনি এই অনুপাতে। তবু এই অনুপাত আছে। কে রেখেছে?

তৃতীয় — পাই। ৩.১৪১৫৯...

বৃত্তের পরিধি ভাগ করো ব্যাসে। উত্তর পাই। সবসময়। যেকোনো বৃত্তে। ছোট হোক বড় হোক। কিন্তু পাইয়ের সবচেয়ে রহস্যময় বৈশিষ্ট্য হলো — এটা অমূলদ। মানে এটা কখনো শেষ হয় না। ৩.১৪১৫৯২৬৫৩৫৮৯৭৯... অনন্তকাল পর্যন্ত চলে। কোনো প্যাটার্ন নেই। কোনো পুনরাবৃত্তি নেই।

বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত ১০০ ট্রিলিয়ন দশমিক স্থান পর্যন্ত বের করেছেন। এখনো শেষ হয়নি। এখনো কোনো প্যাটার্ন নেই। একটা বৃত্তের মতো সহজ জিনিসের পরিধি গণনা করতে গিয়ে এমন একটা সংখ্যা পাওয়া যায় যা অসীম এবং অনিয়মিত।কেন? বিজ্ঞান জানে না।

চতুর্থ — ১৩৭।

পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে রহস্যময় সংখ্যা। ফাইন স্ট্রাকচার কনস্ট্যান্ট। মানে — আলো এবং পদার্থের মধ্যে মিথস্ক্রিয়ার শক্তির মাত্রা প্রায় ১ ভাগ ১৩৭। এই সংখ্যা না হলে পরমাণু তৈরি হতো না। পরমাণু না হলে অণু নেই। অণু না হলে জীবন নেই।

নোবেলজয়ী পদার্থবিদ ভলফগ্যাং পাউলি সারাজীবন এই সংখ্যার রহস্য বোঝার চেষ্টা করেছেন। মৃত্যুর আগে তিনি হাসপাতালের যে কক্ষে ছিলেন সেই কক্ষের নম্বর ছিল ১৩৭। তিনি বলেছিলেন — এটা কোনো কাকতালীয় নয়। আরেক নোবেলজয়ী রিচার্ড ফাইনম্যান বলেছিলেন — পদার্থবিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বড় লজ্জা হলো তারা জানে না ১৩৭ কোথা থেকে এলো।

পঞ্চম — শূন্য।

সব সংখ্যার মধ্যে সবচেয়ে অদ্ভুত হলো শূন্য। এটা কিছু নেই। কিন্তু এটা ছাড়া কিছু করা যায় না। শূন্য না থাকলে ১০ লেখা যায় না। ১০০ লেখা যায় না। আধুনিক গণিত, কম্পিউটার, ডিজিটাল প্রযুক্তি — সব অচল।

কিন্তু শূন্যের সবচেয়ে বড় রহস্য হলো — এটা কি সত্যিই আছে? শূন্য কি বাস্তব? যদি কিছু না থাকে, তাহলে কি সেটা কিছু? প্রাচীন গ্রিকরা শূন্যকে সংখ্যা মানেনি। কারণ "কিছু না" কীভাবে সংখ্যা হতে পারে? এই প্রশ্ন আজও দার্শনিকদের ভাবায়।

ষষ্ঠ — ৪৩।

এটা সবচেয়ে কম পরিচিত কিন্তু সবচেয়ে রহস্যময়। সৌরজগতে বড় গ্রহগুলোর মধ্যে বৃহস্পতির কক্ষপথ এবং মঙ্গলের কক্ষপথের অনুপাত প্রায় ৪৩ নিয়মে বাঁধা। চাঁদের কক্ষপথে সৌর ঘড়ির সাথে সম্পর্ক ৪৩-এর গুণিতকে। এবং অবাক করার বিষয় হলো ভারতীয় বৈদিক জ্যোতির্বিদরা ৩,০০০ বছর আগে এই সংখ্যাটা ব্যবহার করতেন তাদের গণনায়। কীভাবে তারা জানতেন?

বিজ্ঞানীরা এটাকে কাকতালীয় বলেন। কিন্তু এত কাকতালীয় একসাথে?

একটু ভাবো। ফুলের পাপড়ি, শামুকের খোল, মানবদেহ, পিরামিড, ডিএনএ — সব জায়গায় একই সংখ্যা। কেউ রাখেনি। কিন্তু আছে। এটা কি প্রমাণ করে যে পৃথিবীতে একটা লুকানো গণিত আছে — যা সব কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে? নাকি আমরা প্যাটার্ন খুঁজতে খুঁজতে যেখানে নেই সেখানেও দেখছি?

@ সম্রাট রায় চৌধুরী 


38


১২১৭ সাল। পশ্চিম আফ্রিকার ম্যান্ডে রাজ্যে একটা ছেলে জন্ম নিল — রাজার ছেলে। কিন্তু কেউ তাঁকে নিয়ে আনন্দ করল না। কারণ এই ছেলে হাঁটতে পারছে না। বছরের পর বছর মেঝেতে হামাগুড়ি দিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে। দরবারের মানুষ হাসে, বলে — এই ছেলে কোনোদিন কিছু হবে না।

রাজার মৃত্যুর পর বৈমাত্রেয় ভাই সিংহাসন নিল। এই ছেলে তাঁর মাকে নিয়ে দেশান্তরী হলো। বছরের পর বছর অন্যের দয়ায়, অন্যের আশ্রয়ে বেঁচে থাকল। সেই ছেলের নাম সুন্দিয়াতা কেইতা — এবং এই ছেলেই একদিন পশ্চিম আফ্রিকার সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হবেন।

কিন্তু আগে সেই বিখ্যাত মুহূর্তের কথা বলি।

একদিন রাজসভায় রানি সাসুমা সুন্দিয়াতার মাকে একটা বাবলা পাতা দিতে অস্বীকার করলেন। রান্নায় লাগবে, কিন্তু রানি দিলেন না। অপমান করলেন — বললেন, যার ছেলে হাঁটতে পারে না, তার কী অধিকার আছে আমার কাছে চাইতে। সুন্দিয়াতার মা কেঁদে ফিরলেন। এবং সেই কান্না সুন্দিয়াতা দেখলেন। পরদিন সুন্দিয়াতা মাটিতে হাত দিলেন, পা দিয়ে ঠেললেন — এবং উঠে দাঁড়ালেন। প্রথমবারের মতো নিজের পায়ে। তারপর হাঁটলেন সোজা সেই বাবলা গাছের কাছে। একটাই টানে গাছটা মাটি থেকে উপড়ে ফেললেন। মায়ের হাতে দিলেন। এবং বললেন — মা, আজ থেকে আর কারো কাছে হাত পাততে হবে না।

এই গল্প আফ্রিকার সবচেয়ে বিখ্যাত মহাকাব্যে লেখা আছে — সুন্দিয়াতার মহাকাব্যে। যা আজও পশ্চিম আফ্রিকায় গ্রিয়ট, মানে পেশাদার গল্পকাররা, গান আর গল্পে মানুষকে শোনায়। সাতশো বছর ধরে।

সুন্দিয়াতার আসল যুদ্ধ আরও বড়।

সেই সময়ে পশ্চিম আফ্রিকায় সুমাওরো কান্তে নামে এক ভয়ঙ্কর রাজা ছিলেন, যাদুশক্তির দাবিদার। কেউ তাঁকে হারাতে পারেনি। সুমাওরো ম্যান্ডে রাজ্য দখল করে সুন্দিয়াতার মানুষদের দাস বানিয়েছিল। নির্বাসনে থাকা সুন্দিয়াতার কাছে তাঁর দেশের মানুষ এলো, বলল — শুধু তুমিই পারবে।

সুন্দিয়াতা ফিরলেন। একটা ছোট্ট দল নিয়ে। এবং ১২৩৫ সালে কিরিনার যুদ্ধে সুমাওরো কান্তেকে পরাজিত করলেন। কথিত আছে, একটা বিশেষ তীর — যার ডগায় সাদা মোরগের পালক — সুমাওরোর দেহে লাগলে তাঁর যাদুশক্তি শেষ হয়ে যায়। এবং সেই তীরই যুদ্ধের মোড় বদলে দিল।

কিরিনার যুদ্ধের পর সুন্দিয়াতা একে একে পশ্চিম আফ্রিকার রাজ্যগুলো একত্রিত করলেন। মালি সাম্রাজ্য পরিণত হলো পশ্চিম আফ্রিকার সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্যে। তাঁর নীতি ছিল অন্যদের মতো নয় — পরাজিত রাজাদের তিনি সম্মান দিলেন। তাদের নিজের এলাকায়, নিজের ভাষায়, নিজের ধর্মে থাকতে দিলেন। শুধু মালি সাম্রাজ্যের অংশ হলেই হলো।

এবার সেই তথ্য যা সবচেয়ে কম মানুষ জানে।

সুন্দিয়াতার মহাকাব্য এবং শেক্সপিয়ারের হ্যামলেটের আশ্চর্যরকম মিল আছে — নির্বাসিত রাজকুমার, মায়ের অপমান, প্রতিশোধ এবং শেষে সিংহাসন ফিরে পাওয়া। এমনকি ডিজনির দ্য লায়ন কিং সুন্দিয়াতার গল্প থেকে অনুপ্রাণিত বলে অনেকে বিশ্বাস করেন।

কিন্তু সুন্দিয়াতার মৃত্যু আজও রহস্য। কেউ বলেন নদীতে ডুবে, কেউ বলেন যাদুবিদ্যায়, কেউ বলেন তীরের আঘাতে। কীভাবে মারা গেলেন — আজও নিশ্চিত নয়।

একটু ভাবো।

একটা ছেলে শিশুকালে হাঁটতে পারত না, দেশান্তরী হয়েছিল, অন্যের দয়ায় বেঁচে ছিল। কিন্তু সেই ছেলে উঠে দাঁড়িয়েছিল এবং পশ্চিম আফ্রিকার সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য গড়েছিল। মায়ের অপমানের প্রতিশোধ — একটা গাছ উপড়ে এবং একটা সাম্রাজ্য তৈরি করে। @ সম্রাট রায় চৌধুরী 


39



"ইতিহাসের ৬টি মানব পরীক্ষা — যা দেখে পৃথিবী থমকে গিয়েছিল। সরকার জানত। বিজ্ঞানীরা জানত। কিন্তু যাদের উপর করা হয়েছিল তারা জানত না।"

বিজ্ঞানের অগ্রগতি মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে। কিন্তু সেই অগ্রগতির পেছনে কখনো কখনো এমন কিছু ছিল যা আজও পৃথিবী মনে রাখে ভয় আর লজ্জায়। সরকারের সমর্থনে, বিজ্ঞানীদের হাতে, নিরীহ মানুষের উপর এমন কিছু পরীক্ষা হয়েছে — যা জানলে মনে হয় সভ্যতা মানে শুধু প্রযুক্তি নয়, মানবতাও।

প্রথম — টাস্কিগি সিফিলিস পরীক্ষা। আমেরিকা। ১৯৩২-১৯৭২।

আমেরিকার আলাবামায়। ৪০০ জন কৃষ্ণাঙ্গ কৃষক। তাদের বলা হলো — সরকার তাদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেবে। তারা রাজি হলেন। কিন্তু আসলে তাদের সিফিলিস রোগ আছে কিনা দেখার জন্য পরীক্ষা হচ্ছিল। এবং সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো — ১৯৪৭ সালে পেনিসিলিন আবিষ্কার হলো, যা সিফিলিস সারিয়ে দিতে পারে। কিন্তু এই মানুষগুলোকে পেনিসিলিন দেওয়া হলো না। কারণ বিজ্ঞানীরা দেখতে চাইছিলেন চিকিৎসা ছাড়া রোগটা শেষ পর্যন্ত কী করে।

৪০ বছর ধরে এই পরীক্ষা চলল। ১২৮ জন মারা গেলেন সিফিলিসে বা এর জটিলতায়। ৪০ জনের স্ত্রী সংক্রমিত হলেন। ১৯ জন শিশু জন্মেছিল সংক্রমিত হয়ে। ১৯৭২ সালে একজন সাংবাদিক এটা ফাঁস করলেন। পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে গেল। ১৯৯৭ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইলেন। কিন্তু যারা মারা গেছেন তারা আর ফিরলেন না।

দ্বিতীয় — সিআইএর এমকেআলট্রা। আমেরিকা। ১৯৫৩-১৯৭৩।

স্নায়ুযুদ্ধের সময়। আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ একটা গোপন প্রকল্প শুরু করল। মানুষের মন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব কিনা তা পরীক্ষা করতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, হাসপাতালের রোগী, সামরিক বাহিনীর সদস্য — তাদের না জানিয়ে দেওয়া হলো এলএসডি এবং অন্যান্য মাদক। মাথায় বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হলো। ঘুমের মধ্যে বার বার একই বার্তা শোনানো হলো।

উদ্দেশ্য ছিল — মানুষকে এমনভাবে প্রোগ্রাম করা যাতে সে নির্দিষ্ট কাজ করবে নিজের ইচ্ছা ছাড়া। অনেকে পাগল হয়ে গেলেন, অনেকে মারা গেলেন। ১৯৭৩ সালে সিআইএ বেশিরভাগ নথি পুড়িয়ে দিল। ওয়াটারগেট তদন্তের সময় এটা প্রকাশ হলো। কংগ্রেসে শুনানি হলো। কিন্তু যেহেতু নথি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে — সব সত্য আজও জানা যায়নি। এবং যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন তাদের কোনো ক্ষতিপূরণ মেলেনি।

তৃতীয় — স্ট্যানফোর্ড প্রিজন এক্সপেরিমেন্ট। আমেরিকা। ১৯৭১।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। মনোবিজ্ঞানী ফিলিপ জিম্বার্ডো একটা পরীক্ষা করতে চাইলেন। সাধারণ মানুষ ক্ষমতা পেলে কী করে? ২৪ জন স্বেচ্ছাসেবক ছাত্র। অর্ধেক হলো কারারক্ষী, অর্ধেক হলো বন্দি। একটা নকল কারাগার বানানো হলো। পরীক্ষা চলার কথা ছিল দুই সপ্তাহ।

মাত্র ছয় দিনে পরীক্ষা বন্ধ করতে হলো। কারণ কারারক্ষীরা এতটাই নিষ্ঠুর হয়ে উঠল যে বন্দিরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে শুরু করল। তারা কেউ কারারক্ষী নয়, এটা নাটক — কিন্তু তারপরেও। এই পরীক্ষা প্রমাণ করল — পরিস্থিতি মানুষকে দানব বানাতে পারে। যে সাধারণ ছেলে কালকে পাশের বাড়িতে থাকত, আজ তাকে ক্ষমতা দিলে সে নিষ্ঠুর হয়ে যেতে পারে। এই তত্ত্ব আজও সমাজবিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেন — কীভাবে গণহত্যা, কীভাবে সাধারণ মানুষ অত্যাচারে অংশ নেয় তা বোঝাতে।

চতুর্থ — ইউনিট ৭৩১। জাপান। ১৯৩৭-১৯৪৫।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে চীনের মাঞ্চুরিয়ায় জাপানি সেনাবাহিনীর একটা গোপন ইউনিট। বাইরে থেকে কাঠের তৈরি একটা কারখানা মনে হতো। ভেতরে জীবন্ত মানুষের উপর জৈবিক অস্ত্রের পরীক্ষা। চীনা এবং রুশ বন্দিদের উপর প্লেগ, কলেরা, টাইফয়েড ব্যাকটেরিয়া ইচ্ছে করে দেওয়া হতো। তারপর দেখা হতো কত দ্রুত মারা যায়, কীভাবে ছড়ায়।

মোট মৃত্যু — তিন হাজার থেকে দশ হাজার বন্দি। এবং সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পরিণতি হলো — যুদ্ধের পর আমেরিকা এই ইউনিটের বিজ্ঞানীদের বিচার করেনি। বরং তাদের গবেষণার ফলাফলের বিনিময়ে তাদের ক্ষমা দেওয়া হয়েছিল। কারণ আমেরিকা সেই তথ্য নিজেরা ব্যবহার করতে চেয়েছিল। মানে অপরাধীরা মুক্ত হলো এবং তাদের অপরাধের ফল ব্যবহার হলো।

পঞ্চম — গুয়াতেমালা সিফিলিস পরীক্ষা। আমেরিকা। ১৯৪৬-১৯৪৮।

টাস্কিগির মতোই আরেকটা পরীক্ষা। কিন্তু আরও ভয়ঙ্কর। আমেরিকান ডাক্তাররা গুয়াতেমালায় গিয়ে ইচ্ছে করে সিফিলিস ছড়ালেন — কারাগারের বন্দিদের মধ্যে, মানসিক হাসপাতালের রোগীদের মধ্যে, সৈনিকদের মধ্যে। উদ্দেশ্য — পেনিসিলিন কতটা কার্যকর তা পরীক্ষা করা। কিন্তু এই মানুষগুলো জানত না তাদের উপর পরীক্ষা হচ্ছে।

এই পরীক্ষার কথা ২০১০ সালে প্রকাশ হলো — ৬০ বছর পরে। প্রেসিডেন্ট ওবামা গুয়াতেমালার প্রেসিডেন্টকে ফোন করে ক্ষমা চাইলেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় — আমেরিকা যদি গুয়াতেমালায় এটা করে থাকে, আর কোথায় করেছে? সব কি প্রকাশ হয়েছে?

ষষ্ঠ — মিলগ্র্যাম আজ্ঞাবহতার পরীক্ষা। আমেরিকা। ১৯৬১।

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে। মনোবিজ্ঞানী স্ট্যানলি মিলগ্র্যাম একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন — কেন সাধারণ মানুষ হিটলারের আদেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা করেছিল? শুধু কি বিকৃত মানুষেরাই করেছিল? নাকি সাধারণ মানুষও আদেশ পেলে করে?

তিনি পরীক্ষা করলেন। স্বেচ্ছাসেবকদের বলা হলো তারা শিক্ষা পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। অন্য ঘরে একজন মানুষ আছে — সে ভুল উত্তর দিলে এই স্বেচ্ছাসেবক বৈদ্যুতিক শক দেবে। আসলে অন্য ঘরে কেউ ছিল না, শুধু অভিনেতা ব্যথার আওয়াজ করত। কিন্তু স্বেচ্ছাসেবকরা জানত না। ফলাফল — ৬৫ শতাংশ মানুষ শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ শক দিতে রাজি হয়েছিল শুধু কারণ একজন কর্তৃপক্ষের মানুষ বলেছিল — চালিয়ে যাও, এটা দরকার।

৬৫ শতাংশ। মানে প্রতি ১০ জনের ৬ জন। এরা সাধারণ মানুষ। প্রতিবেশী, বন্ধু, সহকর্মী। তারা আদেশ পেলে কষ্ট দিতে পারে। এই পরীক্ষা বদলে দিয়েছিল মানুষ সম্পর্কে আমাদের ধারণা।

এই ছয়টি পরীক্ষার দিকে তাকালে একটা ভয়ঙ্কর সত্যি বেরিয়ে আসে। বিজ্ঞান যখন নৈতিকতা হারায় তখন সে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। এবং এই পরীক্ষাগুলো হয়েছিল আমেরিকায়, জার্মানিতে, জাপানে — পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত দেশগুলোতে। তাহলে প্রশ্ন — সভ্যতা কি আসলে আমরা যেটুকু ভাবি ততটুকু?

@ সম্রাট রায় চৌধুরী


40\



পৃথিবীর ৬টি স্থাপত্য — যা মানুষ বানিয়েছে বলে বিশ্বাসই হয় না। কোনোটা ১২,০০০ বছর পুরনো, কোনোটায় ১০০ টনের পাথর এতটাই নিখুঁতভাবে কাটা যে আজকের লেজার মেশিনেও এটা সম্ভব কিনা সন্দেহ।

ইতিহাসের বই বলে মানুষ ধীরে ধীরে উন্নত হয়েছে। পাথর যুগ থেকে ধাতু যুগ, তারপর আধুনিক সভ্যতা। কিন্তু পৃথিবীতে এমন কিছু স্থাপত্য আছে যা দেখলে মনে হয় — এই গল্পটা সম্পূর্ণ নয়। কারণ এই স্থাপত্যগুলো বানাতে যে প্রযুক্তি দরকার তা আজকের পৃথিবীতেও চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু বানানো হয়েছিল হাজার হাজার বছর আগে। আজ সেই ছয়টি স্থাপত্যের কথা বলব।

প্রথম — গোবেকলি তেপে। তুরস্ক। ১২,০০০ বছর পুরনো।

১৯৯৪ সালে তুরস্কের দক্ষিণে একটা পাহাড়ে কৃষক কিছু পাথর দেখলেন। প্রত্নতত্ত্ববিদরা এলেন। খুঁড়তে শুরু করলেন। এবং বেরিয়ে এলো যা দেখে সবার চোখ কপালে উঠে গেল।

বিশাল পাথরের স্তম্ভ। প্রতিটার ওজন ১০ থেকে ২০ টন। উচ্চতায় ৬ মিটার পর্যন্ত। এবং প্রতিটাতে খোদাই করা নানা প্রাণীর ছবি। সাপ, শেয়াল, বাঘ। এতটাই সূক্ষ্ম, এতটাই জীবন্ত। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বয়স। পরীক্ষায় বেরিয়ে এলো — এটা ১২,০০০ বছর পুরনো। মিশরের পিরামিডের ৭,০০০ বছর আগে। স্টোনহেঞ্জের ৬,০০০ বছর আগে।

সেই সময়ে মানুষ কৃষি জানত না। শহর ছিল না। কীভাবে এত বড় পাথর কাটা হলো? কীভাবে সরানো হলো? কে করল? এবং সবচেয়ে বড় রহস্য — কেউ এটা ইচ্ছে করে মাটিচাপা দিয়েছিল। কেন? কী লুকাতে চেয়েছিল?

দ্বিতীয় — স্টোনহেঞ্জ। ইংল্যান্ড। ৫,০০০ বছর পুরনো।

ইংল্যান্ডের মাঠে গোলাকারে সাজানো বিশাল পাথর। কিছু পাথরের ওজন ২৫ টন। এবং এই পাথর আনা হয়েছিল ওয়েলস থেকে — ২৫০ কিলোমিটার দূর থেকে। কীভাবে? কোনো চাকা ছিল না। কোনো ঘোড়ার গ#হারানো_ইতিহাস

কিন্তু স্টোনহেঞ্জের সবচেয়ে অবাক করার দিক হলো জ্যোতির্বিদ্যা। গ্রীষ্মকালীন অয়নকালে ভোরবেলা সূর্য ঠিক স্টোনহেঞ্জের প্রবেশপথ দিয়ে ওঠে। শীতকালীন অয়নকালে সূর্যাস্ত ঠিক বিপরীত পাশ দিয়ে হয়। এই নির্ভুলতা পেতে বছরের পর বছর পর্যবেক্ষণ দরকার। ৫,০০০ বছর আগে মানুষ এটা করেছিল — কোনো ক্যালেন্ডার ছাড়া, কোনো যন্ত্র ছাড়া।

কে বানিয়েছিল? কেন বানিয়েছিল? আজও নিশ্চিত নয়।

তৃতীয় — সাকসাইহুয়ামান। পেরু। ইনকা সভ্যতা।

কুসকোর কাছে একটা পাহাড়ের চূড়ায়। বিশাল পাথরের দুর্গ। কিছু পাথরের ওজন ১০০ টনেরও বেশি। এবং এই পাথরগুলো এতটাই নিখুঁতভাবে কাটা এবং জোড়া লাগানো যে দুটো পাথরের মাঝে একটা কাগজও ঢোকানো যায় না।

স্পেনিশরা পেরু দখল করে এই পাথর দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছিল। তারা ভেবেছিল দানবেরা বানিয়েছে। কিন্তু আসল রহস্য হলো — এই পাথরগুলো পাহাড় থেকে কাটা হয়েছিল ৩০ কিলোমিটার দূরে। তারপর সমতল মাঠের উপর দিয়ে এনে পাহাড়ের উপরে তুলে এভাবে সাজানো হয়েছিল। ইনকারা কোনো লেখা রাখেনি। কোনো ব্লুপ্রিন্ট নেই। কোনো নির্দেশিকা নেই। কিন্তু এই কাজ হয়েছিল।

চতুর্থ — বাল্বেক। লেবানন।

লেবাননের বেকা উপত্যকায়। রোমান মন্দির। কিন্তু মন্দিরের নিচে পাওয়া গেছে আরও পুরনো একটা কাঠামো। সেই কাঠামোর পাথর দেখলে গা হিম হয়ে যায়। একটা পাথরের ওজন ১,২০০ টন। আরেকটা ১,৬৫০ টন। আজকের সবচেয়ে শক্তিশালী ক্রেন মাত্র ১,২০০ টন তুলতে পারে। কিন্তু বাল্বেকের পাথর শুধু তোলাই নয় — সূক্ষ্মভাবে কাটা, সুনির্দিষ্টভাবে জায়গায় বসানো।

কে করেছিল? রোমানরা করেনি — রোমান লেখায় এই পাথরের কোনো উল্লেখ নেই। আগের কোনো সভ্যতা? কিন্তু কোন সভ্যতা? এবং কীভাবে?

পঞ্চম — নান মাডোল। মাইক্রোনেশিয়া।

প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে। একটা দ্বীপের পাশে সমুদ্রে ভাসমান শহর। কৃত্রিম দ্বীপের উপর পাথরের ঘর। ৯২টি কৃত্রিম দ্বীপ। এবং এই পাথরের ওজন ৫০ থেকে ৬০ লাখ টন মোট। কোথা থেকে এই পাথর আনা হয়েছিল? দ্বীপে এই ধরনের পাথর নেই। নিকটতম সম্ভাব্য উৎস ৩০ কিলোমিটার দূরে। কীভাবে সমুদ্রে ভাসিয়ে আনা হলো?

স্থানীয় কিংবদন্তি বলে — যাদুমন্ত্রে পাথর উড়িয়ে এনে বানানো হয়েছিল। আধুনিক বিজ্ঞান অন্য উত্তর খুঁজছে। কিন্তু এখনো পায়নি।

ষষ্ঠ — কৈলাস মন্দির। ভারত।

মহারাষ্ট্রের ইলোরায়। একটা পাথরের পাহাড় কেটে তৈরি। একটাই পাথর থেকে। একটা পুরো মন্দির কমপ্লেক্স। উচ্চতায় ৩২ মিটার, দৈর্ঘ্যে ৮৪ মিটার। খ্রিস্টাব্দ অষ্টম শতাব্দীতে তৈরি। হিসাব করা হয়েছে এই মন্দির বানাতে কমপক্ষে ৪ লাখ টন পাথর কাটা হয়েছিল।

কিন্তু সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো পাথর কাটার নিয়ম। সাধারণত পাথর নিচ থেকে কাটা হয়। কিন্তু কৈলাস মন্দির কাটা হয়েছিল উপর থেকে নিচে। মানে প্রথমে ছাদ কাটা হয়েছিল, তারপর দেওয়াল, তারপর মেঝে। এই পদ্ধতিতে একটাও ভুল করার উপায় নেই। একবার ভুল হলে সব শেষ। কিন্তু কোথাও একটাও ভুল নেই।

এই ছয়টি স্থাপত্যের দিকে তাকালে একটাই প্রশ্ন মাথায় আসে। আমরা কি সত্যিই ইতিহাস জানি? নাকি মানব ইতিহাস আমাদের জানার চেয়ে অনেক বেশি জটিল এবং অনেক বেশি পুরনো?

আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়টির মধ্যে কোনটা আপনার কাছে সবচেয়ে অবাক করার মনে হলো? এবং আপনি কি মনে করেন এই স্থাপত্যগুলো প্রমাণ করে যে আমাদের আগে কোনো উন্নত সভ্যতা ছিল?

১. গোবেকলি তেপে — ১২,০০০ বছর পুরনো

২. স্টোনহেঞ্জ — ২৫০ কিলোমিটার থেকে পাথর

৩. সাকসাইহুয়ামান — কাগজ ঢোকে না ফাঁকে

৪. বাল্বেক — ১,৬৫০ টনের পাথর

৫. নান মাডোল — সমুদ্রে ভাসমান শহর

৬. কৈলাস মন্দির — উপর থেকে নিচে কাটা

কমেন্টে নম্বর দিন। এই গল্প যদি ভালো লেগে থাকে — একটা শেয়ার করুন।

পরের পোস্টে আসছে — "পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় প্রাণী — যাদের অস্তিত্ব বিজ্ঞান স্বীকার করে না, কিন্তু হাজার হাজার মানুষ দেখেছে।"

তৈরি থাকুন।

@ সম্রাট রায় চৌধুরী


41


অনেক পেশেন্ট এসে হতাশ হয়ে বলেন, "আমি তো নিয়মিত দামি ক্যালসিয়াম এবং হাই-ডোজের ভিটামিন ডি খাচ্ছি, রোদেও হাঁটছি, তারপরও আমার হাড়ের ক্ষয় কেন কমছে না? কেন হাঁটু বা কোমরের ব্যথা আগের মতোই রয়ে গেছে?"

গতানুগতিক ধারায় আমরা ভাবি, হাড়ের জন্য ক্যালসিয়াম আর ভিটামিন ডি-ই হলো শেষ কথা। তাই ঘাটতি দেখা দিলেই আমরা ওষুধের ডোজ বাড়িয়ে দিই। কিন্তু ফাংশনাল পুষ্টি বিজ্ঞান আমাদের সমস্যাটির একদম গোড়ায় নিয়ে যায়। আপনার হাড়ের স্বাস্থ্য শুধু আপনি কী খাচ্ছেন তার ওপর নির্ভর করে না, বরং আপনার শরীর তা কতটা 'শোষণ' (Absorption) করতে পারছে, তার ওপর নির্ভর করে। আর এই ভিটামিন ডি শোষণের আসল চাবিকাঠি আপনার পাকস্থলী বা হাড়ে নয়, বরং লুকিয়ে আছে আপনার লিভার এবং গলব্লাডারের (পিত্তথলি) গভীরে।

​বিষয়টি একটু সহজ করে বুঝিয়ে বলছি। ভিটামিন ডি কোনো সাধারণ ভিটামিন নয়, এটি আসলে এক ধরণের প্রাক-হরমোন এবং এটি 'ফ্যাট-সলিউবল' বা চর্বিতে দ্রবণীয়। এর মানে হলো, ভিটামিন ডি আপনার অন্ত্রে তখনই শোষিত হবে, যখন এর সাথে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর চর্বি থাকবে এবং সেই চর্বি শরীর ঠিকমতো হজম করতে পারবে। আর চর্বি হজম করার জন্য আমাদের শরীরের সবচেয়ে জরুরি উপাদান হলো 'বাইল' বা পিত্তরস, যা তৈরি হয় লিভারে এবং জমা থাকে গলব্লাডারে। যখন আমাদের মেটাবলিক হেলথ বা বিপাকীয় স্বাস্থ্য খারাপ থাকে—যেমন ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বা ফ্যাটি লিভারের সমস্যা থাকে—তখন লিভার থেকে এই পিত্তরস পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি হতে পারে না।

আবার প্রতিদিনের রান্নায় অতিরিক্ত রিফাইনড সিড অয়েল বা সয়াবিন তেল খাওয়ার কারণে পিত্তরস অনেক সময় ঘন ও আঠালো হয়ে যায় (Sluggish bile)। এই অবস্থায় আপনি যখন ভিটামিন ডি ক্যাপসুল খান, পিত্তরসের অভাবে তা অন্ত্রে শোষিতই হতে পারে না, বরং মলের সাথে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়।

​ভিটামিন ডি শোষিত না হলে আপনার শরীর অন্ত্র থেকে ক্যালসিয়ামও গ্রহণ করতে পারে না। ফলে আপনি যতই ক্যালসিয়ামের বড়ি গিলেন না কেন, তা হাড়ে না পৌঁছে রক্তনালী বা জয়েন্টে জমে প্রদাহ তৈরি করে। আর শরীর তার রক্তে ক্যালসিয়ামের স্বাভাবিক মাত্রা ধরে রাখতে বাধ্য হয়ে আপনার হাড়কে গলিয়ে ভেতর থেকে ক্যালসিয়াম টেনে নিতে থাকে। অর্থাৎ, একটি অসুস্থ লিভার বা ফ্যাটি লিভার আপনার পুরো হাড়ের কাঠামোকে নীরবে ধ্বংস করে দিতে পারে।

একটি সাধারণ ভিটামিন ঘাটতি ভেবে আমরা যে সমস্যার সমাধান শুধু সাপ্লিমেন্ট দিয়ে করার চেষ্টা করছি, তার আসল রুট কজ বা মূল কারণ হলো আমাদের দুর্বল মেটাবলিজম।

​এর ফাংশনাল সমাধান কী? ভিটামিন ডি-এর ডোজ না বাড়িয়ে আপনার লিভার এবং গলব্লাডারকে সুস্থ করার দিকে নজর দিন। খাদ্যতালিকায় রিফাইনড তেলের বদলে কোল্ড-প্রেসড সরিষার তেল, খাঁটি ঘি, বা এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েলের মতো 'গুড ফ্যাট' যোগ করুন, যা পিত্তরস নিঃসরণ বাড়ায়।

সেই সাথে প্রতিদিনের খাবারে কিছু তিতা জাতীয় সবজি—যেমন করলা বা উচ্ছে রাখতে পারেন। তিতা স্বাদ আমাদের লিভারকে উদ্দীপিত করে এবং স্বাস্থ্যকর পিত্তরস তৈরি করতে ম্যাজিকের মতো কাজ করে। লিভার যখন সুস্থ হবে এবং পিত্তরস ঠিকমতো কাজ করবে, তখন সাধারণ খাবার বা সাপ্লিমেন্ট থেকে আপনার শরীর পুরোপুরি ভিটামিন ডি শোষণ করতে পারবে।

মেটাবলিক স্বাস্থ্যের এই ছোট ছোট জটগুলো খুলে দিলেই আপনার শরীর তার নিজস্ব ন্যাচারাল হিলিং ক্ষমতায় হাড়ের ক্ষয়রোধ করতে সক্ষম হবে। @ Probal Kumar Mondal 


42


আধুনিক শিশু-সুরক্ষা নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে: boundary (সীমারেখা)। যখন কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি শিশুদের দিয়ে বারবার ব্যক্তিগত শারীরিক সেবা নেন । যেমন-

১) শরীর টেপানো,

২) গা-মাথা মালিশ করানো,

৩) খুব ঘনিষ্ঠ শারীরিক স্পর্শে অভ্যস্ত করা

রোগ শাস্ত্রে “পেডোফিলিয়া (Pedophilia)” হলো এমন একটি মানসিক বা যৌন আকর্ষণ, যেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি বয়ঃসন্ধির আগের শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ অনুভব করে। আর “পেডোফাইল” বলতে সাধারণভাবে সেই ব্যক্তিকে বোঝানো হয়, যার মধ্যে এ ধরনের আকর্ষণ থাকে। ধারণা করা হয় বাংলাদেশের অধিকাংশ আবাসিক মাদ্রাসার শিক্ষকগণ এ রোগে আক্রান্ত

তাই সভ‍্য, সামাজিক ও মানবিক ভাবে উন্নত দেশগুলোতে স্কুল, শিশু-কেন্দ্র, স্কাউটিং, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সবখানেই বলা হয়-

১) শিক্ষক ও শিশুর মধ্যে স্পষ্ট পেশাগত সীমা থাকা উচিত,

২) অপ্রয়োজনীয় শারীরিক ঘনিষ্ঠতা এড়ানো উচিত,

৩) এবং এমন পরিবেশ তৈরি করা উচিত যেখানে শিশু সহজে “না” বলতে পারে।

এই কারণে আধুনিক child safeguarding নীতিতে কিছু চর্চা বন্ধ বা সীমিত করার কথা বলা হয়-

যেমন:

১) শিশুদের দিয়ে শিক্ষকের ব্যক্তিগত শরীর টেপানো, বিছানা গোছানো, ব্যক্তিগত কাজ করানো

২) “স্যারের কথা মানতেই হবে” ধরনের ভয়ভিত্তিক সংস্কৃতি

৩) একান্তে দীর্ঘ সময় শিশুদের রাখা

৪) “ভদ্র ছাত্র মানে চুপ থাকা” — এই মানসিকতা

৫) শিশুকে নিজের অস্বস্তির কথা বলতে নিরুৎসাহিত করা

@ ফকির চাঁদ 


43


আমরা জানি, খাদ্যদ্রব্য ফ্রিজিং তাপমাত্রায় (সাধারণত -১৮° সেলসিয়াস বা তার নিচে) পচে না। যার মূল কারণ হলো এই নিন্ম তাপমাত্রায় অণুজীবের কার্যক্রম স্থবির হয়ে যায়।

​খাবার পচানোর জন্য দায়ী প্রধান উপাদান হলো ব্যাকটেরিয়া, মোল্ড (ছত্রাক) এবং ইস্ট। এই অণুজীবগুলো বেঁচে থাকার এবং বংশবিস্তার করার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ তাপ ও আর্দ্রতা প্রয়োজন। ফ্রিজিং তাপমাত্রায় এদের বিপাকীয় (metabolic) কার্যক্রম প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে এরা খাবার নষ্ট করার মতো শক্তি পায় না।

এছাড়া ​অণুজীবদের বেঁচে থাকার জন্য তরল পানির প্রয়োজন। ফ্রিজারে খাবার রাখলে এর ভেতরে থাকা পানি বরফে পরিণত হয়। যেহেতু পানি কঠিন অবস্থায় থাকে, তাই ব্যাকটেরিয়া সেই পানি ব্যবহার করতে পারে না। একে বৈজ্ঞানিক ভাষায় 'Water Activity' কমে যাওয়া বলা হয়।

অন্যদিকে ​খাদ্যদ্রব্যের ভেতরে প্রাকৃতিকভাবেই কিছু এনজাইম থাকে যা সময়ের সাথে সাথে খাবারকে নরম বা বিবর্ণ করে দেয়। ফ্রিজিং এই এনজাইমগুলোর রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতি অনেক কমিয়ে দেয়। ফলে খাবার দীর্ঘক্ষণ সতেজ থাকে।

এখানে মনে রাখা জরুরি যে, ফ্রিজিং ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলে না, বরং তাদের সুপ্ত অবস্থায় (dormant) রাখে। খাবার যখন আবার স্বাভাবিক তাপমাত্রায় আনা হয়, তখন এই অণুজীবগুলো পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠে।

​দীর্ঘ সময় ফ্রিজে রাখলে খাবারের পচন না ধরলেও 'ফ্রিজার বার্ন' (Freezer Burn) বা বাতাসের সংস্পর্শে আসার কারণে খাবারের স্বাদ ও টেক্সচারে কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে।

@ সাইকোলজি এবং বিজ্ঞানের অজানা তথ্য


44

ঢাকা বিভাগের গাজীপুর জেলার ঐতিহাসিক ভাওয়াল রাজপরিবারের "ভাওয়াল সন্ন্যাসী" মামলা ছিল বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে অবিভক্ত ভারতবর্ষের একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর এবং ঐতিহাসিক আইনি লড়াই। এই মামলার মূল বিষয় ছিল ভাওয়াল রাজবাড়ির মেজোকুমার রমেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরীর প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত করা।

ঘটনার প্রেক্ষাপট;

১৯০৯ সালে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ভাওয়ালের মেজোকুমার রমেন্দ্রনারায়ণ রায় সস্ত্রীক দার্জিলিং যান। সেখানে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে তার মৃত্যুর সংবাদ প্রচারিত হয় এবং হিন্দু রীতি অনুযায়ী তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে বলে জানানো হয়।

এর প্রায় ১২ বছর পর ১৯২১ সালে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে বাকল্যান্ড বাঁধে এক জটাধারী সন্ন্যাসীর দেখা মেলে, যার চেহারার সাথে মৃত বলে ঘোষিত মেজোকুমারের অবিশ্বাস্য মিল ছিল।

ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা:

সন্ন্যাসী নিজেকে ভাওয়ালের রাজকুমার বলে দাবি করলে জমিদারির দখল নিয়ে এক দীর্ঘ আইনি যুদ্ধ শুরু হয় ।

পরিচয় নিয়ে দ্বিমত: মেজোকুমারের বোন জ্যোতির্ময়ী দেবী সন্ন্যাসীকে তার ভাই হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও তার স্ত্রী বিভাবতী দেবী তাকে 'প্রতারক' হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেন।

আদালতের রায়:

১৯৩০ সালে সন্ন্যাসী মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে ১৯৩৭ সালে ঢাকার দায়রা আদালত রায় দেয় যে সন্ন্যাসীই প্রকৃত রমেন্দ্রনারায়ণ রায়।

উচ্চতর আদালত:

এই রায়ের বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে আপিল করা হয়, কিন্তু সেখানেও সন্ন্যাসীর পক্ষেই রায় বহাল থাকে।

সর্বশেষ ১৯৪৬ সালে লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিল তাকেই প্রকৃত রাজকুমার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে চূড়ান্ত রায় দেয়।

করুণ পরিণতি:

চূড়ান্ত আইনি বিজয়ের আনন্দ বেশিদিন উপভোগ করতে পারেননি তিনি।

প্রিভি কাউন্সিলের রায়ের খবর পৌঁছানোর মাত্র কয়েকদিন পরেই, ১৯৪৬ সালে কলকাতায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রমেন্দ্রনারায়ণ রায়ের মৃত্যু হয়।

সংস্কৃতিতে প্রভাব:

এই রোমাঞ্চকর কাহিনী নিয়ে অসংখ্য নাটক, বই এবং চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।

তার মধ্যে ল্লেখযোগ্য:চলচ্চিত্র:

উত্তম কুমার অভিনীত বিখ্যাত চলচ্চিত্র সন্ন্যাসী রাজা এবং সৃজিত মুখোপাধ্যায় পরিচালিত জয়া আহসান ও যীশু সেনগুপ্ত অভিনীত এক যে ছিল রাজা।

বই: পার্থ চ্যাটার্জির লেখা 'The Prince and the Sannyasi'



45


কেন কিছু মানুষ দ্রুত শিখে এগিয়ে যায়, আর বাকিরা সারাজীবন পিছিয়ে থাকে ?

একটা অদ্ভুত বিষয় খেয়াল করেছেন? একই ক্লাসে পড়েও কেউ খুব দ্রুত স্কিল ডেভেলপ করে ফেলে, নতুন জিনিস বুঝে ফেলে, ক্যারিয়ারে এগিয়ে যায়। আর কেউ বছরের পর বছর চেষ্টা করেও স্ট্রাগল করতে থাকে।

মজার বিষয় হলো বেশিরভাগ সময় এর সঙ্গে ইন্টেলিজেন্স এর সম্পর্ক খুব বেশি নেই। কারণ আজকের পৃথিবীতে ইনফরমেশন সবার কাছেই আছে। এআই আছে, ইউটিউব আছে, অনলাইন কোর্স আছে, বই আছে, মেন্টর আছে। তবুও সবাই গ্রো করে না। কেন?

কারণ মডার্ন ওয়ার্ল্ডে সবচেয়ে বড় অ্যাডভান্টেজ আর ইন্টেলিজেন্স না। সবচেয়ে বড় অ্যাডভান্টেজ হলো কে কত দ্রুত শিখতে পারে এবং নিজেকে কত দ্রুত আপডেট করতে পারে।

একটা সময় ছিল যখন কোনো স্কিল শিখে ২০ বছর ক্যারিয়ার চালানো যেত। আজ টেকনোলজি, এআই, বিজনেস মডেল, মার্কেট বিহেভিয়ার এত দ্রুত বদলাচ্ছে যে পুরনো নলেজ খুব দ্রুত আউটডেটেড হয়ে যাচ্ছে।

আগে যে এমপ্লয়ি ১০ বছর একই স্কিল দিয়ে ভ্যালুয়েবল ছিল এখন সেই স্কিল হয়তো তিন বছরেই ইরেলিভ্যান্ট হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ আজকের পৃথিবীতে ফাস্ট লার্নার হওয়া শুধু ভালো গুণ না বরং এটি একটি সারভাইভাল স্কিল।

কিন্তু সমস্যা হলো বেশিরভাগ মানুষ শেখার ভুল পদ্ধতিতে আটকে আছে। তারা ভাবে লার্নিং মানে বেশি ইনফরমেশন কনজিউম করা। আরও বই, আরও ভিডিও, আরও নোটস, আরও কোর্স। অথচ আমাদের ব্রেইন এভাবে কাজই করে না।

মানুষ এআই না। এআই একসাথে লাখ লাখ জিনিস প্রসেস করতে পারে কিন্তু মানুষের ব্রেইন একটি সিরিয়াল প্রসেসর। এটি একসাথে সীমিত জিনিস হ্যান্ডেল করতে পারে।

আমাদের ব্রেইনের প্রিফন্টাল কর্টেক্স যেটাকে ব্রেইনের সিইও বলা হয় নতুন কিছু শেখার সময় সবচেয়ে বেশি এনার্জি কনজিউম করে। নতুন থিওরি, নতুন কনসেপ্ট, নতুন ফ্রেমওয়ার্ক সবকিছু এই অংশকে মেটাবলিক প্রেশারের মধ্যে ফেলে।

অর্থাৎ লার্নিং আসলে একটি বায়োলজিক্যাল কাজও। তাই ব্রেইন ন্যাচারালি ওভারলোড অ্যাভয়েড করতে চায়।

এখানে সবচেয়ে বড় মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং হলো আমরা ফ্রিকশনকে ফেইলিওর ভাবি। কোনো কিছু কঠিন লাগলেই মনে করি আমি হয়তো এনাফ স্মার্ট না। অথচ নিউরোসায়েন্স বলে ঠিক উল্টো কথা।

যখন ব্রেইন স্ট্রাগল করে আনসার জেনারেট করতে তখন লার্নিং আরও গভীর হয়। একে বলে জেনারেশন ইফেক্ট। অর্থাৎ স্ট্রাগল মানেই ফেইলিওর না। অনেক সময় স্ট্রাগলই রিয়েল লার্নিং এর সাইন।

এখানে একটা খুব পাওয়ারফুল অ্যানালজি আছে। জিমে মাসল গ্রো হয় কখন? যখন মাসল প্রেশারের মধ্যে যায়। আপনি যদি কখনো জিমে এক্সারসাইস করার সময় ওয়েট না বাড়ান বডি কখনো অ্যাডাপ্ট করবে না।

ব্রেইনও একইভাবে কাজ করে। আপনি যদি সবসময় ইজি কনটেন্ট কনজিউম করেন, প্যাসিভভাবে ভিডিও দেখেন, তাহলে ব্রেইন ডিপ রিওয়্যারিং করে না। ব্রেইন গ্রো করে তখনই যখন তাকে অ্যাক্টিভলি জেনারেট, কানেক্ট এবং স্ট্রাগল করতে হয়।

আজকের সবচেয়ে ডেঞ্জারাস প্রবলেম হলো মানুষ এআইকে কোচ হিসেবে না বরং ক্রাচ হিসেবে ব্যবহার করছে। এআই দিয়ে আনসার বের করে নিচ্ছে, সামারি বানিয়ে নিচ্ছে, অ্যাসাইনমেন্ট লিখে নিচ্ছে কিন্তু নিজের ব্রেইনকে চ্যালেঞ্জ করছে না।

এর ফলে ইনফরমেশন পাওয়া সহজ হচ্ছে কিন্তু আন্ডারস্ট্যান্ডিং শ্যালো হয়ে যাচ্ছে। এটা অনেকটা ক্যালকুলেটর সবসময় ব্যবহার করতে করতে বেসিক ম্যাথ ইনটুইশন হারিয়ে ফেলার মতো। টুল পাওয়ারফুল কিন্তু মিসইউজ করলে ব্রেইন উইক হয়ে যায়।

এই পুরো লার্নিং সিস্টেমের সবচেয়ে ফ্যাসিনেটিং অংশ হলো টপ পারফর্মাররা বেশি ইনফরমেশন মেমোরাইজ করে না বরং তারা ইনফরমেশন কম্প্রেস করে। চেস গ্র্যান্ডমাস্টার ম্যাগনাস কার্লসেনের উদাহরণ ধরা যাক। তিনি বোর্ডের প্রতিটি মুভ আলাদা করে মুখস্থ রাখেন না। তিনি প্যাটার্ন চিনতে শেখেন। অর্থাৎ হাজার হাজার সিচুয়েশনকে কয়েকটি মিনিংফুল চাঙ্কে কম্প্রেস করেন। মূলত সেখান থেকেও প্যাটার্ন তৈরি হয়।

এটাই আসল লার্নিং সিক্রেট। ব্রেইন র ডেটা ক্যারি করতে পারে না বরং প্যাটার্ন ক্যারি করে। তাই স্মার্ট লার্নার বেশি পড়ে না বরং বেটার অর্গানাইজ করে।

ধরুন আপনি বিজনেস শিখছেন। যদি আপনি মার্কেটিং নিয়ে ৫০টা র‍্যান্ডম কনসেপ্ট মুখস্থ করেন ব্রেইন ওভারলোড হবে। কিন্তু যদি বুঝেন সব মার্কেটিং আসলে অ্যাটেনশন, ট্রাস্ট এবং কনভারশনের খেলা তাহলে ব্রেইন সাডেনলি ক্লারিটি পায়। কারণ ফ্র্যাগমেন্টেড ইনফরমেশন প্যাটার্নে পরিণত হয়েছে। কমপ্রেশন মানে এটাই।

আমরা অনেকেই লার্নিং শুরু করি ইনফরমেশন দিয়ে। কিন্তু টপ লার্নাররা লার্নিং শুরু করে সিলেকশন দিয়ে। তারা প্রথমে জিজ্ঞেস করে এই বিষয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ২০% কী? কারণ বেশিরভাগ বই, কোর্স বা লেকচার আসলে একটি কোর আইডিয়াকে ঘিরেই তৈরি হয়। আপনি যদি সেই কোর আইডিয়া ধরতে পারেন লার্নিং ড্রামাটিক্যালি ফাস্টার হয়ে যায়।

এখানে আরেকটি পাওয়ারফুল কনসেপ্ট হলো অ্যাসোসিয়েশন। ব্রেইন নতুন কিছু আইসোলেট করে শিখতে পারে না। নতুন নলেজ তখনই টিকে থাকে যখন তা পুরনো নলেজের সঙ্গে কানেক্ট হয়। এজন্য ভালো টিচার অ্যানালজি ব্যবহার করেন। কারণ অ্যানালজি ব্রেইনের জন্য ব্রিজ তৈরি করে।

ধরুন কেউ ব্লকচেইন এক্সপ্লেইন করছে। যদি সে শুধু টেকনিক্যাল ডেফিনিশন দেয় ব্রেইন স্ট্রাগল করবে। কিন্তু যদি বলে এটা অনেকটা পাবলিক নোটবুকের মতো যেখানে সবাই রেকর্ড দেখতে পারে কিন্তু সিক্রেটলি তথ্য চেঞ্জ করতে পারে না তখন ব্রেইন ইনস্ট্যান্টলি ফ্যামিলিয়ার প্যাটার্ন খুঁজে পায়। এটাই অ্যাসোসিয়েশনের শক্তি।

লার্নিং এর আরেকটি বড় ট্র্যাপ হলো ইনফরমেশন হোর্ডিং। অনেক মানুষ কোর্স কালেক্ট করে, বই কেনে, নোটস সেভ করে, ভিডিও প্লেলিস্ট বানায় কিন্তু অ্যাপ্লাই করে না। তারা মনে করে নলেজ জমানোই প্রগ্রেস। অথচ রিয়েল লার্নিং এর সঙ্গে কনজাম্পশনের সম্পর্ক সারপ্রাইজিংলি কম।

এখানে কিম পিকের গল্প গভীর শিক্ষা দেয়। তার মেমোরি এক্সট্রাঅর্ডিনারি ছিল। হাজার হাজার বই মনে রাখতে পারতেন। কিন্তু ডেইলি লাইফ নেভিগেট করতে স্ট্রাগল করতেন। কারণ মেমোরি আর মাস্টারি এক জিনিস না।

আপনি পৃথিবীর সব ইনফরমেশন স্টোর করতে পারেন তবুও ইফেক্টিভলি ব্যবহার করতে নাও পারেন। আজকের ইন্টারনেট এইজে এই ট্র্যাপ আরও কমন। মানুষ ইনফরমেশন রিচ কিন্তু অ্যাপ্লিকেশন পুওর হয়ে যাচ্ছে।

এজন্য লার্নিং এর দ্বিতীয় ধাপ হলো কম্পাইল। অর্থাৎ নলেজকে অ্যাক্টিভ স্কিলে কনভার্ট করা। আর এর জন্য তিনটি জিনিস ক্রিটিক্যাল।

আমাদের ব্রেইন আলট্রাডিয়ান সাইকেলে কাজ করে। রাফলি ৯০ মিনিট ডিপ ফোকাস মেনটেইন করতে পারে তারপর রেস্ট দরকার হয়। কিন্তু মডার্ন লাইফস্টাইল ব্রেইনকে রেস্ট নিতে দেয় না।

আমরা ননস্টপ স্ক্রল করি, মাল্টিটাস্ক করি, নোটিফিকেশন দেখি। ফলে ব্রেইন কখনো সম্পূর্ণ ফোকাস বা সম্পূর্ণ রিকভার কোনোটাই করতে পারে না।

ডিপ লার্নিং আসলে ডিপ অ্যাটেনশনের ফল। আর ডিপ অ্যাটেনশন এখন রেয়ার স্কিল। যে ব্যক্তি ডিস্ট্রাকশন কন্ট্রোল করতে পারে সে অ্যাভারেজ ইন্টেলিজেন্স নিয়েও এক্সট্রাঅর্ডিনারি গ্রোথ করতে পারে। কারণ মডার্ন ওয়ার্ল্ডে অ্যাটেনশন ইটসেলফ ইজ লেভারেজ।

টেস্টিং এর কনসেপ্টটাও ফ্যাসিনেটিং। বেশিরভাগ মানুষ অনেকদিন পড়ে তারপর শেষে এক্সাম দেয়। কিন্তু ইফেক্টিভ লার্নাররা ছোট ছোট লুপ তৈরি করে। লার্ন, টেস্ট, লার্ন, টেস্ট। এটা অনেকটা স্টার্টআপের অ্যাজাইল ডেভেলপমেন্ট এর মতো। দ্রুত ফিডব্যাক লুপ লার্নিং অ্যাক্সিলারেট করে।

একটা কনসেপ্ট পড়লেন? সঙ্গে সঙ্গে এক্সপ্লেইন করুন। একটা স্কিল শিখলেন? সঙ্গে সঙ্গে অ্যাপ্লাই করুন। একটা আইডিয়া বুঝলেন? কাউকে শেখানোর চেষ্টা করুন।

কারণ টিচিং হলো আলটিমেট কমপ্রেশন টেস্ট। আপনি কোনো বিষয় সত্যিই বুঝেছেন কিনা সেটা বোঝা যায় যখন আপনি সেটাকে সহজ ভাষায় এক্সপ্লেইন করতে পারেন।

এখানে টিচ টু লার্ন কনসেপ্ট অসাধারণ পাওয়ারফুল। অনেক টপ পারফর্মার ইমাজিনারি অডিয়েন্সের সামনে এক্সপ্লেইন করে প্র্যাকটিস করেন। কারণ টিচিং ব্রেইনকে ফোর্স করে অর্গানাইজ করতে, সিম্প্লিফাই করতে এবং কানেক্ট করতে।

প্যাসিভ রিডিং ব্রেইনে শ্যালো ট্রেস তৈরি করে কিন্তু টিচিং ডিপ নিউরাল কানেকশন তৈরি করে।

আরেকটি ইন্টারেস্টিং ইনসাইট হলো স্লো প্র্যাকটিস। আমরা ভাবি ফাস্ট রিপিটিশন মানেই ফাস্ট লার্নিং। কিন্তু ফিজিক্যাল স্কিলের ক্ষেত্রে স্লো প্র্যাকটিস অনেক বেশি ইফেক্টিভ।

গিটার, স্পোর্টস, পাবলিক স্পিকিং সবকিছুতে স্লো কনশাস রিপিটিশন ব্রেইনকে মাইক্রো মুভমেন্ট অবজার্ভ করতে শেখায়। স্লো ডাউন করলে ব্রেইন প্যাটার্ন ক্লিয়ার দেখতে পায়।

কিন্তু লার্নিং এর সবচেয়ে আন্ডাররেটেড অংশ সম্ভবত রেস্ট। মডার্ন হাসল কালচার রেস্টকে লেজিনেস বানিয়ে ফেলেছে। অথচ নিউরোসায়েন্স বলছে লার্নিং দুই স্টেজের প্রসেস। অর্থাৎ আপনি যখন রেস্ট নিচ্ছেন তখনও ব্রেইন কাজ করছে।

রিসার্চ দেখায় ইনটেন্স লার্নিং এর পর কয়েক সেকেন্ড পজ নিলেও ব্রেইন লার্নড সিকোয়েন্স রিপ্লে করে বহু গুণ স্পিডে। অর্থাৎ রেস্ট ওয়েস্ট টাইম না বরং এটি ইনভিজিবল প্র্যাকটিস। অনেকটা জিমের রিকভারির মতো। মাসল ওয়ার্কআউটের সময় গ্রো করে না বরং রিকভারির সময় গ্রো করে। ব্রেইনও তাই।

এখানে ফার্মিং অ্যানালজি অসাধারণ। একজন কৃষক জানে মাটি যদি কখনো রেস্ট না পায় তবে ফার্টিলিটি কমে যায়। কিন্তু মডার্ন মানুষ নিজের ব্রেইনকে একটুও রেস্ট দেয়া না।

ফলে কনটেন্ট, নোটিফিকেশন, ওয়ার্ক, স্ট্রেস, এন্টারটেইনমেন্ট সবকিছু দিয়ে ব্রেইন ভরে রাখে। ফলে ডিপ থিংকিং এবং ডিপ লার্নিং দুটোই দুর্বল হয়ে যায়।

ঘুমের গুরুত্ব এখানেই আসে। ঘুম শুধু শরীরের বিশ্রাম না বরং এটি একটি মেমোরি কনসোলিডেশন সিস্টেম। অনেক রিসার্চ সাজেস্ট করে ঘুমের সময় ব্রেইন দিনের শেখা ইনফরমেশন রিপ্লে করে এবং আরও শক্তিশালী কানেকশন তৈরি করে।

এই পুরো ডিসকাশনের সবচেয়ে পাওয়ারফুল ইনসাইট হলো লার্নিং রেস না। সবসময় কেউ না কেউ আপনার চেয়ে দ্রুত শিখবে। কিন্তু কম্প্যারিজন একটি ফাঁদ। আপনার আসল কম্পিটিশন হলো গতকালের আপনি। আপনি কি গত বছরের চেয়ে বেটার থিংকার? বেটার লার্নার? বেটার প্রবলেম সলভার হতে পেরেছেন কিনা?

আরেকটি গভীর সাইকোলজিক্যাল বিষয় হলো একসাথে পারফর্মার এবং ক্রিটিক হওয়া যায় না। অনেক মানুষ লার্নিং এর সময়ই নিজেকে জাজ করতে থাকে। আমি স্লো, আমি ডাম্ব, আমি পারব না। এতে ব্রেইন ডিফেন্সিভ হয়ে যায়। শেখার সময় পারফর্মার হতে হয়। কিউরিওসিটি মোডে থাকতে হয়। কনস্ট্যান্ট সেলফ জাজমেন্ট লার্নিং স্পিড কমিয়ে দেয়।

আজকের এআই ওয়ার্ল্ডে এই মাইন্ডসেট আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এআই বেসিক ইন্টেলিজেন্স অ্যাডভান্টেজ কমিয়ে দিচ্ছে। আগে ইনফরমেশন অ্যাক্সেস ইটসেলফ পাওয়ার ছিল। এখন পাওয়ার হলো কে দ্রুত অ্যাডাপ্ট করতে পারে, কে দ্রুত নিউ মেন্টাল মডেল বিল্ড করতে পারে, কে দ্রুত ওল্ড অ্যাজাম্পশন আপডেট করতে পারে। ফিউচার বিলং করবে তাদের কাছে যারা লাইফ লং লার্নার হতে পারবে।

একজন অন্ট্রাপ্রেনরের জন্য এই লার্নিং সিস্টেম প্রাইসলেস। বিজনেস ল্যান্ডস্কেপ এত দ্রুত বদলাচ্ছে যে ফিক্সড নলেজ দিয়ে সারভাইভ করা কঠিন। মার্কেট চেঞ্জ, কনজিউমার সাইকোলজি, এআই টুলস, ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেল সবকিছু ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে। যে ফাউন্ডার দ্রুত লার্ন করতে পারে সে দ্রুত পিভট করতে পারে।

একজন স্টুডেন্টের জন্যও শিক্ষা পরিষ্কার। শুধু সিলেবাস শেষ করলেই হবে না। আপনাকে বুঝতে হবে কীভাবে ব্রেইন রিটেইন করে, কীভাবে অ্যাটেনশন কাজ করে এবং কীভাবে অ্যাক্টিভ রিকল কাজ করে। কারণ লার্নিং মেথড অনেক সময় লার্নিং কনটেন্ট এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রফেশনাল লাইফেও একই সত্য। অনেক এমপ্লয়ি হার্ড ওয়ার্কিং কিন্তু স্লো লার্নার। আর কিছু এমপ্লয়ি অ্যাভারেজ ইন্টেলিজেন্স নিয়েও দ্রুত গ্রো করে কারণ তারা ফিডব্যাক লুপ ছোট রাখে, দ্রুত টেস্ট করে এবং দ্রুত অ্যাডাপ্ট করে। ক্যারিয়ার গ্রোথের বড় অংশ ইন্টেলিজেন্স না বরং লার্নিং অ্যাজিলিটি।

এই ভিডিওর সবচেয়ে বড় শিক্ষা আমি যা পেয়েছি তা হল, নিজেকে সময় দিন। অনেক মানুষ ভাবে তারা ন্যাচারালি খারাপ লার্নার। অথচ বাস্তবে তারা শুধু ভুল সিস্টেম ব্যবহার করছে। বীজ মাটিতে পুঁতলেই পরদিন গাছ হয় না। তেমনি ব্রেইনেরও রিদম আছে, তাকেও সময় দিতে হবে।

লার্নিং অনেকটা সাগরের মতো। তারও জোয়ার ভাটা আছে। আপনি যদি সেই রিদম রেসপেক্ট করেন, কনসিস্টেন্ট থাকেন, স্ট্রাগল অ্যাকসেপ্ট করেন এবং রেস্টকে গুরুত্ব দেন তাহলে ধীরে ধীরে ব্রেইন এক্সট্রাঅর্ডিনারি অ্যাডাপ্টেবিলিটি ডেভেলপ করে।

আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে ডেঞ্জারাস মানুষ সেই না যার আইকিউ বেশি। সবচেয়ে ডেঞ্জারাস মানুষ হলো সেই যে খুব দ্রুত শিখতে পারে, ভুল ভাঙতে পারে, নতুন প্যাটার্ন বুঝতে পারে এবং নিজেকে কন্টিনিউয়াসলি রিইনভেন্ট করতে পারে। কারণ ফিউচার তাদেরই যারা শুধু নলেজ গ্যাদার করে না বরং নিজেদের ব্রেইনকে ইভলভ করতে শেখে।

ভবিষ্যতে সফল মানুষ তারা হবে না যারা বেশি জানে বরং তারাই হবে যারা সবচেয়ে দ্রুত নতুন করে শিখতে পারে। @ Nur Rahman



46


একটি শিক্ষণীয় গল্প–

মেয়েকে বিয়ে দেয়ার পর যখন সে আবার বাবার বাড়ি আসে, তখন মা খুব আগ্রহ ভরে জানতে চায় যে ঐ বাড়িতে তার কেমন লেগেছে?

মেয়ে জবাবে বলে— “আমার ওখানে ভালো লাগেনা। মানুষগুলো কেমন যেন। পরিবেশটাও আমার ভালো লাগছেনা”।

মেয়ের ভেতর এক ধরনের হতাশা দেখতে পায় তার মা। দেখতে দেখতে বেশ কিছুদিন কে'টে যায়। মেয়ের চলে যাবার সময় চলে আসে। চলে যাবার ঠিক আগের দিন মা তার মেয়েকে নিয়ে রান্না ঘরে প্রবেশ করেন।

মা হাড়িতে পানি দেন এবং তা গরম করতে থাকেন। একসময় যখন তা ফুটতে থাকে তখন মা হাড়িতে গাজর, ডিম আর কফির বিন দেন। এভাবে বিশ মিনিট পর মা আগুন নিভিয়ে ফেলেন। একটি বাটিতে গাজর, ডিম এবং কফির বিন নামিয়ে রাখেন।

এবার তিনি মেয়েকে উদ্দেশ্যকরে বলেন— “তুমি এখান থেকে কি বুঝতে পারলে আমাকে বল”?

মেয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে বলে— “আমি দেখলাম তুমি গাজর, ডিম আর কফির বিন সিদ্ধ করলে মাত্র”।

মেয়ের কথা শুনে মা বললেন— “হ্যাঁ, তুমি ঠিকই দেখেছ। তবে তুমি কি আরও কিছু লক্ষ্য করনি?”

মেয়ে বলে— “না- মা”।

মা বলে— “গাজর মোটামুটি শক্ত ধরনের, ডিম খুব হালকা আর কফির বিন খুবই শক্ত। কিন্তুযখন এগুলিকে গরম পানিতে রাখা হল তখন তিনটি জিনিসের তিন রকম অবস্থা হল। গাজর খুব নরম হয়ে গেল, আর ডিম শক্ত হয়ে গেল আর কফির বিন সুন্দর ঘ্রান আর মিষ্টি স্বাদে পানিতে মিশে গেল”।

মা এবার দৃষ্টি অন্যদিকে নিয়ে যেন অনেক অতীতে চলে যেতে চাইলেন। তারপর আবার বাস্তবে ফিরে এসে মেয়ের দিকে ফিরে বললেন “আমি তোমাকে এখন যে কথাগুলি বলব, আমার মাও ঠিক এইভাবেই আমাকে এ কথাগুলি বলেছিল। আমি জানিনা কথাগুলি তোমার কতটুকু উপকারে আসবে, তবে আমার জীবনকে অনেক প্রভাবিত করেছিল”।

মা কিছুক্ষন বিরতি দিয়ে বলতে লাগলেন—

“তুমি যদি তোমার স্বামীর বাড়িতে নিজেকে কঠিনভাবে উপস্থাপন কর, তবে প্রতিকূল পরিবেশের সাথে তোমার সংঘর্ষ হবে- তোমাকে দুর্বল করে ঠিক গাজরেরমতই নরম করে ফেলবে- তোমার ব্যক্তিত্বকে ভেঙে ফেলবে।

যদি তুমি নিজেকে নরম-ভঙ্গুর করে উপস্থাপন কর তবে প্রতিকূল পরিবেশ তোমাকে কব্জা করে ফেলবে, আঘাতের পর আঘাত এসে তোমার হৃদয়কে একসময় কঠিন করে ফেলবে ঠিক ডিমের মত।

কিন্তু তুমি যদি তোমার ভালবাসা দিয়ে নিজেকে প্রতিকূল পরিবেশের সাথে মিশিয়ে দিয়ে তার অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে নিতে পার তবে পরিবেশ সুন্দর হয়ে উঠবে ঠিক যেমন কফির বিন গরম পানির সাথে নিজেকে মিশিয়ে দিয়ে পানিকে সুস্বাদু আর চারপাশকে মিষ্টি ঘ্রানে ভরিয়ে দিয়েছে”।

পরের দিন যখন মেয়েটি তার স্বামীর বাড়িতে যাচ্ছিল তখন তার ভিতর এক আশ্চর্য শান্ত ভাব আর এক দৃঢ় প্রত্যয় প্রকাশ পাচ্ছিল। আমাদের চারপাশের পরিস্থিতি সবসময় অনুকুল থাকবেনা, তাই বলে নিজেকে পরিস্থিতির কাবু না করে র্ধৈয্য, ভালবাসা, সহমর্মিতা নিয়ে পরিস্থিতিকে কাবু করতে হবে ।

-সংগৃহীত। @ Jamil Hosen


47


৭ দিনের টাকা নিয়ম: কেন প্রতিটি খরচের আগে একটু অপেক্ষা করা জরুরি

আমাদের জীবনে অনেক সময় এমন মুহূর্ত আসে—একটা জিনিস চোখে পড়ল, মন বলল “নিয়ে ফেলো!” আর আমরা ঢুকিয়ে দিই সেটা কার্টে। কিন্তু ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সেই উত্তেজনা অনেকটাই ফিকে হয়ে যায়। ঠিক সেই কারণেই আমি আপনাকে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই ৭ দিনের টাকা নিয়ম একটি সহজ কিন্তু শক্তিশালী চাবি, যা আমাদের impul​​se খরচকে নিয়ন্ত্রণে রাখে।

কীভাবে কাজ করে:

কোনো বড় বা দামী জিনিস কেনার আগে নিজেকে বলুন: “আমি এক সপ্তাহ সময় নেব।৭ দিনের মধ্যে, আপনার উত্তেজনা বা আবেগ অনেকটা নীরব হয়ে যাবে। তখন আপনার চিন্তাভাবনা স্পষ্ট হবে এই জিনিসটা কি সত্যিই আমার জীবনে প্রয়োজন, নাকি কেবল মুহূর্তের উচ্ছ্বাস?

কেন এটা কার্যকর:

মানুষ প্রায়শই ইমপালস খরচ করে কারণ আমাদের ব্রেন তৎক্ষণাত “reward” চায়। কিন্তু সময় দিলে, আমরা প্রকৃত প্রয়োজন এবং আবেগের মধ্যে পার্থক্য করতে পারি। ছোট ছোট ধাপে এটাই জীবনকে আর্থিকভাবে শান্ত রাখে।

কল্পনা করুন:

আপনি এক নতুন গ্যাজেট দেখলেন। প্রথম মুহূর্তে মনে হলো, “মUST_HAVE!” কিন্তু সাত দিন পরে, হয়তো আপনি বুঝবেন, আপনার পুরানো ডিভাইসটাও যথেষ্ট ভাল। অথবা হয়তো, এই সময়ে আপনি এমন একটি স্মার্ট বিকল্প খুঁজে বের করবেন যা আরও ভালো।

একটি ছোট চ্যালেঞ্জ:

আজই কোনো বড় খরচের আগে নিজেকে ৭ দিনের সময় দিন। লক্ষ্য করুন কীভাবে আপনার সিদ্ধান্ত বদলায়, কীভাবে আবেগ আর যুক্তি মিলে যায়।

শেষমেশ, এই নিয়ম আমাদের শেখায় আমরা প্রতিটি টাকা কেনার আগে শুধু ভাবার সুযোগ পাই। আর সেই এক সপ্তাহে আমাদের পকেটও খুশি থাকে, মনও।

আপনার জন্য বার্তা:

কখনো কোনো জিনিসকে “তৎক্ষণাৎ কিনে ফেলতে হবে” ভাববেন না। ৭ দিন অপেক্ষা করুন। জীবনের ছোট ছোট জয় এই ধৈর্য থেকেই আসে।

@ 𝙀𝙡𝙚𝙫 𝙄𝙌 2.0



সত্যিই বড় হতে চাইলে, সেই মানুষগুলোর সঙ্গে থাকুন যারা আপনাকে উত্তেজিত করে, শেখায়, প্রেরণা দেয়। যারা আপনাকে নতুন আইডিয়া ভাবতে সাহায্য করে। যারা ব্যবসার সুযোগ, নতুন লক্ষ্য এবং জীবনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করে।

স্মরণ করুন: আপনার মেধা এবং সম্ভাবনা শুধুমাত্র আপনার চিন্তায় নয়, আপনার সংযোগের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। তাই আজই নিজেকে জিজ্ঞেস করুন “আমি কি সেই মানুষের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছি, যারা আমাকে উড়তে সাহায্য করছে, নাকি সেই মানুষের সঙ্গে যাদের কথা শুনে আমি শুধু বসে থাকি?”

যে মানুষগুলো আপনাকে উন্নত করে, তাদের সঙ্গে সময় কাটান। বাকিদের সঙ্গে নয়। কারণ আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হল আপনার সময়।



48


ডার্ক সাইকোলজিতে একে বলা হয় 'Emotional Dependency' বা পরনির্ভরশীলতার ফাঁদ। ম্যানিপুলেটররা আপনাকে সরাসরি অবহেলা করবে না, বরং তারা আপনাকে অতিরিক্ত কেয়ার দিয়ে আপনার নিজের সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাটুকু নষ্ট করে দেবে।

কীভাবে এই ফাঁদে আপনি পঙ্গু হয়ে যান:

• সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া: সে আপনার সব ছোটখাটো সিদ্ধান্ত নিজে নিতে শুরু করবে—আপনি কী পরবেন, কার সাথে কথা বলবেন, কোথায় যাবেন। আপনি ভাববেন এটা ভালোবাসা, কিন্তু আসলে এটি আপনার আত্মনির্ভরশীলতা কেড়ে নেওয়ার প্রথম ধাপ।

• আত্মবিশ্বাস ধুলোয় মেশানো: সে আপনাকে অবচেতনভাবেই বিশ্বাস করাবে যে— "তুমি নিজে কোনো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারো না, আমি না থাকলে তুমি শেষ হয়ে যাবে।"

• মানসিক পঙ্গুত্ব: এক সময় আপনি নিজের ভালো লাগা বা খারাপ লাগার জন্যও তার মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েন। সে হাসলে আপনি হাসেন, সে মুখ ফিরিয়ে নিলে আপনার পুরো পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যায়।

যে ভালোবাসা আপনাকে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে ভয় পাওয়ায়—তা কোনো ভালোবাসা নয়, তা এক অদৃশ্য শিকল। তারা আপনার ডানাগুলো কেটে দিচ্ছে যাতে আপনি কখনো তাদের খাঁচা থেকে উড়ে যেতে না পারেন। @ Mind Manipulation 


49


বন্ধুদের দ্রুত সফলতা দেখে নিজেকে ব্যর্থ ভাবা বন্ধ করুন; মনে রাখবেন, সস্তা খেলনা কারখানায় একদিনেই তৈরি হয়, কিন্তু একটি মূল্যবান হীরা তৈরি হতে বছরের পর বছর নীরব চাপ সহ্য করতে হয়।

Great Things Take Time, Trust Your Process

আমাদের জীবনের অন্যতম বড় একটি হতাশার কারণ হলো অন্যের সাথে নিজের তুলনা করা। বিশেষ করে যখন আমরা দেখি আমাদের সাথে পড়ালেখা করা বন্ধুরা বা সমবয়সীরা খুব দ্রুত চাকরি পেয়ে যাচ্ছে, বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে বা জীবনে খুব তাড়াতাড়ি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে, তখন আমাদের নিজেদের খুব তুচ্ছ মনে হয়। মনে হয়, "সবাই জীবনে কত এগিয়ে গেল, আর আমি বোধহয় কিছুই করতে পারলাম না!" এই তুলনার মানসিকতা আমাদের নিজের যোগ্যতা এবং পরিশ্রমের ওপর থেকে বিশ্বাস কমিয়ে দেয়।

কিন্তু পৃথিবীর একটা অমোঘ নিয়ম হলো, সবার সফলতার সময় বা 'টাইম জোন' কখনো এক হয় না। কেউ হয়তো ২৫ বছর বয়সে সফলতা পেয়ে ৩৫ বছরে গিয়ে আটকে যায়, আবার কেউ হয়তো ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত শুধু নিজেকে প্রস্তুত করে এবং তারপর এমন এক উচ্চতায় পৌঁছায় যা অন্যদের কল্পনারও বাইরে। আপনার বন্ধুরা আজ যে জায়গায় পৌঁছেছে, সেটি তাদের গন্তব্য হতে পারে, কিন্তু আপনার লক্ষ্য হয়তো তার চেয়ে অনেক বেশি বড়। আর লক্ষ্য যত বড় হয়, সেখানে পৌঁছানোর রাস্তাটাও ততটাই দীর্ঘ এবং সময়সাপেক্ষ হয়।

একটি ছোট্ট মাটির ঘর তৈরি করতে কয়েক দিন সময় লাগে, কিন্তু একটি বিশাল রাজপ্রাসাদ তৈরি করতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। আপনি যে আজ নীরবে পরিশ্রম করছেন, দিনের পর দিন অপেক্ষা করছেন—এটি আপনার কোনো ব্যর্থতা নয়। এটি হলো আপনার সেই বিশাল রাজপ্রাসাদ তৈরির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কাজ। এই নীরব প্রস্তুতির সময়টাতে নিজেকে কখনো ছোট ভাববেন না।

প্রকৃতির দিকে তাকালে দেখবেন, কারখানায় প্লাস্টিকের সস্তা খেলনা প্রতিদিন হাজার হাজার তৈরি হয়, কিন্তু একটি মূল্যবান হীরা তৈরি হতে মাটির নিচে বছরের পর বছর প্রচণ্ড চাপ এবং তাপ সহ্য করতে হয়। আপনার এই অপেক্ষার প্রহরগুলো আসলে আপনাকে সেই হীরার মতোই দামি এবং মজবুত করে তুলছে।

নিজের ওপর বিশ্বাস ধরে রাখতে আজ থেকেই এই ৩টি বিষয় মেনে চলুন:

১. অন্যের সাথে তুলনা বন্ধ করুন (Stop Comparing):

সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যের হাসিমুখের ছবি বা সফলতার গল্প দেখে নিজের জীবনের বিচার করবেন না। সবার যাত্রা আলাদা, সবার গল্প আলাদা। আপনার গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়টি হয়তো একটু পরেই শুরু হতে যাচ্ছে।

২. নিজের প্রতি মনোযোগ দিন (Focus on Your Growth):

অন্যরা কী করছে তা নিয়ে মাথা ঘামানো বন্ধ করে, আপনার নিজের দক্ষতা কীভাবে আরও বাড়ানো যায় সেদিকে ফোকাস করুন। আজকের এই সময়টাকে নিজের সেরা ভার্সন তৈরির কাজে লাগান।

৩. ধৈর্য এবং নীরবতা বজায় রাখুন (Trust the Timing):

সফলতা একদিনে আসে না, কিন্তু একদিন ঠিকই আসে। মানুষের কথায় কান না দিয়ে নীরবে নিজের কাজ চালিয়ে যান। আপনার কাজের চূড়ান্ত ফলাফলই একদিন সবার সব প্রশ্নের জবাব দিয়ে দেবে।

শেষ কথা

দ্রুত পাওয়া সফলতা অনেক সময়ই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাই অন্যের দ্রুত প্রাপ্তি দেখে হতাশ হবেন না। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন, আপনার জন্য অনেক বড় এবং চমৎকার কিছু অপেক্ষা করছে। শুধু নিজের মাটি শক্ত করে ধরে রাখুন।

নিজেকে বলুন—

"আমি সস্তা কোনো খেলনা নই, আমি এমন এক হীরা যা নিজের আলো ছড়ানোর জন্য প্রস্তুত হচ্ছে!"

@ MotivationalQuotesBangla


50


কারো ২৫ বছরে চাকরি হয়, আবার কেউ ৪০ বছরে গিয়ে কোটিপতি হয়—সবার ঘড়ির সময় এক নয়, তাই নিজের যাত্রাকে অন্যের সাথে মিলিয়ে হতাশ হবেন না।

Trust Your Own Timeline

ফেসবুকে বা লিঙ্কডিনে ঢুকলেই মনে হয়—"সবাই কত সফল! কারো প্রমোশন হচ্ছে, কেউ বিদেশে যাচ্ছে, কেউ বাড়ি কিনছে। শুধু আমিই বোধহয় এক জায়গায় আটকে আছি।"

এই চিন্তাটা আমাদের কুড়ে কুড়ে খায়।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, পৃথিবীটা কোনো ১০০ মিটার দৌড় প্রতিযোগিতা নয় যে সবাইকে একই সময়ে ফিনিশ লাইনে পৌঁছাতে হবে।

জীবনটা হলো একটা ম্যারাথন, যেখানে প্রত্যেকের রাস্তা আলাদা, গতি আলাদা এবং গন্তব্যও আলাদা।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ৫৫ বছরে অবসর নিয়েছিলেন, আর ডোনাল্ড ট্রাম্প ৭০ বছরে গিয়ে শুরু করেছিলেন। দুজনেই সফল, শুধু তাদের সময়টা আলাদা।

তাই নিজেকে অন্যের সাথে তুলনা করে কষ্ট পাবেন না।

কেন হতাশ না হয়ে নিজের সময়ের অপেক্ষা করবেন?

১. প্রত্যেকের প্রশ্নপত্র আলাদা (Different Question Papers)

স্কুলের পরীক্ষায় সবার প্রশ্ন এক থাকে, তাই অন্যেরটা দেখে লেখা যায়।

কিন্তু জীবনের পরীক্ষায় সবার প্রশ্নপত্র আলাদা।

কারো হয়তো অর্থের অভাব, কারো পারিবারিক সমস্যা, আবার কারো শারীরিক অসুস্থতা।

তাই অন্যের উত্তর দেখে নিজের জীবন চালাতে গেলে আপনি ফেল করবেন। আপনার পরিস্থিতি অনুযায়ী আপনার লড়াইটা আপনাকেই লড়তে হবে।

২. আগে ফোটা মানেই সেরা নয়

শিমুল ফুল বসন্তের শুরুতেই ফোটে, কিন্তু খুব দ্রুত ঝরে যায়। আর বটগাছ বড় হতে সময় নেয়, কিন্তু মহীরূহ হয়ে কয়েকশ বছর দাঁড়িয়ে থাকে।

আপনার সফলতা আসতে দেরি হচ্ছে মানে সৃষ্টিকর্তা আপনার ভিত্তি (Foundation) শক্ত করছেন। যা দ্রুত আসে, তা দ্রুত চলেও যায়। যা দেরিতে আসে, তা স্থায়ী হয়।

৩. জীবন কোনো চেক-লিস্ট নয়

২৫ বছরেই চাকরি পেতে হবে, ৩০ বছরেই বাড়ি করতে হবে—এই নিয়মগুলো সমাজের বানানো, জীবনের নয়।

দেরিতে শুরু করা মানেই হেরে যাওয়া নয়।

বরং অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে যারা দেরিতে শুরু করে, তারা অনেক সময় দ্রুত সফল হওয়া মানুষদের চেয়েও অনেক দূর পর্যন্ত যায়।

শেষ কথা

আপনার বন্ধু এগিয়ে গেছে বলে ঈর্ষা করবেন না, তাকে অভিনন্দন জানান।

আর নিজেকে বলুন—"আমার সময়টা হয়তো এখন নয়, কিন্তু আমার সময়টা যখন আসবে, তখন সেটা দেখার মতো হবে।"

ঘড়ির কাঁটা কারো জন্য থামে না, আপনার ভালো সময়টাও আসছে। শুধু হাল ছাড়বেন না।

নিজেকে বলুন—

"আমি পিছিয়ে নেই, আমি আমার নিজস্ব টাইমজোনে (Time Zone) আছি।"

কারা নিজের সময়ের ওপর বিশ্বাস রাখেন? কমেন্টে লিখুন— "MY TIME IS COMING"

@ MotivationalQuotesBangla