মনুষ্যত্বের বিকাশই মানুষের চরম সাধনা, কোনো ডিগ্রি বা ধন-সম্পদ অর্জন নয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও বলেছিলেন যে, যখন ডিগ্রিধারী ব্যক্তি মানবিকতা ও নীতিবোধ হারিয়ে ফেলে, তখন সেই শিক্ষা অর্থহীন হয়ে পড়ে এবং তা কেবল জীবিকা নির্বাহের যান্ত্রিক ছাড়পত্রে পরিণত হয়।

মূল বিষয়সমূহ:

মনুষ্যত্বই আসল:

শিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ভালো মানুষ হওয়া এবং সহমর্মিতা জাগ্রত করা।

ডিগ্রি বনাম জ্ঞান:

বিদ্যালাভ জ্ঞান দেয়, কিন্তু মনুষ্যত্ব না থাকলে সেই জ্ঞান সমাজ বা ব্যক্তির কোনো উপকারে আসে না।

যান্ত্রিকতা:

যখন ডিগ্রি শুধুমাত্র টাকা উপার্জনের মাধ্যম হয়, তখন মানুষের আত্মোন্নয়ন ব্যাহত হয়।

অতএব, ডিগ্রি যেন মানবিকতাকে ছাপিয়ে না যায়, বরং মানবিকতা যেন ডিগ্রির মাধ্যমে পূর্ণতা পায়-সেটাই কাম্য।

২. আপনার এই উপলব্ধি অত্যন্ত গভীর এবং সত্য। শিক্ষা যখন কেবল সনদ (Certificate) আর রোজগারের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেটি মস্তিষ্ককে শিক্ষিত করলেও হৃদয়কে করতে পারে না।

প্রকৃত শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে উন্নততর মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। কিন্তু বর্তমানের প্রতিযোগিতামূলক যুগে অনেকেই ডিগ্রিকে কেবল একটি পেশাদার বিনিয়োগ হিসেবে দেখেন। ফলে সমাজ পায় দক্ষ 'মেশিন', কিন্তু হারায় সংবেদনশীল 'মানুষ'।

সহমর্মিতা ও নীতিবোধহীন শিক্ষা আসলে অন্ধকারের মতো; যা নিজের স্বার্থ ছাড়া আর কিছু দেখতে পায় না।

আপনার এই দৃষ্টিভঙ্গি সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য এক বড়ো তাগিদ।

আপনার কি মনে হয় আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার কোনো নির্দিষ্ট পরিবর্তনের মাধ্যমে এই নৈতিক অবক্ষয় রোধ করা সম্ভব? @ মৃণাল নন্দী


তরমুজ ফল নাকি সবজি

উদ্ভিদবিজ্ঞানের মতে, গাছের যে অংশটি তার ফুলের গর্ভাশয় থেকে জন্মায় এবং যার ভেতরে বীজ সংরক্ষিত থাকে, তাকেই ফল বলে। সহজ করে বললে, ফলের মূল কাজ হলো তার বীজের দেখভাল করা এবং একসময় সেই বীজ ছড়িয়ে দিয়ে গাছের বংশধারা টিকিয়ে রাখা। আপেল, নাশপাতি কিংবা আমের শাঁসের ভেতর বীজ থাকে বলেই এরা নির্ভেজাল ফল। এমনকি বেগুন, শসা, কুমড়ো কিংবা টমেটোকে যে আমরা লবণ দিয়ে তরকারি হিসেবে রান্না করে খাই, এগুলোও কিন্তু উদ্ভিদবিজ্ঞানের চোখে ফল! কারণ, এদের প্রত্যেকের ভেতরেই বীজ থাকে।

সাধারণত রান্নার জগতে স্বাদ ও ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে ফল ও সবজিকে আলাদা করা হয়। সাধারণত যেগুলো মিষ্টি স্বাদের, সেগুলো ফল হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে যেগুলো ঝাল বা নোনতা পদ হিসেবে রান্না হয়, সেগুলো সবজি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু বিজ্ঞানের হিসাবটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাহলে সবজি কোনগুলো? বিজ্ঞানের ভাষায়, ফলের অংশটুকু বাদ দিয়ে গাছের বাকি সব খাওয়ার যোগ্য অংশই সবজি। এটি গাছের মূল, কাণ্ড বা পাতা হতে পারে। এই অংশগুলোর কাজ বংশবৃদ্ধি নয়, বরং গাছের খাদ্য সঞ্চয় করা বা কাঠামো ধরে রাখা। তাই এদের মধ্যে আপনি কখনোই প্রাকৃতিক উপায়ে লুকানো কোনো বীজ খুঁজে পাবেন না। উদ্ভিদবিজ্ঞানের মতে, গাছের যে অংশটি তার ফুলের গর্ভাশয় থেকে জন্মায় এবং যার ভেতরে বীজ সংরক্ষিত থাকে, তাকেই ফল বলে।

উদ্ভিদবিজ্ঞানের চোখে তরমুজ

উদ্ভিদবিজ্ঞানের নিয়ম খুব পরিষ্কার, যা ফুল থেকে জন্মায় এবং ভেতরে বীজ থাকে, তা-ই ফল। সেই হিসেবে তরমুজ নির্ঘাত একটি ফল। কিন্তু এখানেও একটি টুইস্ট আছে। তরমুজ আসলে একধরনের বিশেষায়িত বেরি, যাকে বিজ্ঞানীরা পিপো বলেন। এর বৈশিষ্ট্য হলো, বাইরে একটি শক্ত খোসা থাকে, ভেতরে রসালো শাঁস ও সারা ফলজুড়ে ছড়িয়ে থাকে বীজ। মজার ব্যাপার হলো, তরমুজের নিকটাত্মীয় মেলন বা বাঙ্গির বীজের গহ্বর থাকে ফলের ঠিক মাঝখানে। কিন্তু তরমুজ তার বীজ ছড়িয়ে রাখে পুরো শরীরজুড়ে।

তরমুজ যখন সবজি

শুনতে অদ্ভুত লাগলেও অনেক দেশে তরমুজকে সবজি হিসেবেই গণ্য করা হয়। চীনের কথাই ধরুন, সেখানে তরমুজের বাইরের শক্ত খোসা ফেলে না দিয়ে রান্না করে বা আচার বানিয়ে রীতিমতো সবজির মতো খাওয়া হয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা অঙ্গরাজ্য ২০০৭ সালে তরমুজকে আনুষ্ঠানিকভাবে সবজি হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে! এর মূল কারণ, তরমুজ চাষের পদ্ধতি। এটি শসা বা কুমড়োর মতো একই পদ্ধতিতে চাষ করা হয় এবং ফসল তোলার পর মাঠ থেকে গাছ পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা হয়। এগুলো মূলত সবজি চাষেরই প্রধান বৈশিষ্ট্য। এছাড়া তরমুজ যে কিউকারবিটেসি গোত্রের সদস্য, সেই গোত্রের প্রায় সব সদস্যই সবজি হিসেবে পরিচিত। যেমন লাউ, কুমড়ো, শসা বা ঝিঙে। তাই কৃষিতাত্ত্বিক দিক থেকেও এটিকে সবজির দলেই ধরা যায়।

তরমুজ আসলে একধরনের বিশেষায়িত বেরি, যাকে বিজ্ঞানীরা পিপো বলেন। এর বৈশিষ্ট্য হলো, বাইরে একটি শক্ত খোসা থাকে, ভেতরে রসালো শাঁস ও সারা ফলজুড়ে ছড়িয়ে থাকে বীজ।

পুষ্টির খনি

অনেকে ভাবেন তরমুজ মানেই কেবল মিষ্টি পানি। আসলে এতে প্রায় ৯২ শতাংশ পানি থাকলেও এর পুষ্টিগুণ মোটেও নগণ্য নয়। এটি ভিটামিন এ এবং ভিটামিন সি-এর চমৎকার উৎস। এতে থাকা লাইকোপেন আমাদের হৃৎপিণ্ড ও ত্বককে সুরক্ষা দেয়। এক কাপ তরমুজ থেকে আপনি পাবেন বায়োটিন, প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড এবং ভিটামিন বি-১ ও বি-৬ এর মতো প্রয়োজনীয় উপাদান। তরমুজের বীজও কিন্তু ফেলে দেওয়ার মতো নয়! এতে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড রক্তের খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে। প্রতি কাপ ফালি করা তরমুজে ক্যালরির পরিমাণ ৫০-এরও কম। তাই ওজন কমাতে চাইলেও এটি দারুণ সঙ্গী।

তরমুজের বহুমুখী ব্যবহার

রাশিয়া থেকে দক্ষিণ আমেরিকা—পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে তরমুজ খাওয়ার ধরন ভিন্ন। কেউ এটি সালাদে ব্যবহার করেন, কেউ ককটেল বানান, আবার কেউ এর খোসা দিয়ে তৈরি করেন মুখরোচক আচার। এর খোসা এবং শাঁসও কিন্তু খাওয়া যায় এবং খাওয়া হয়। যেহেতু তরমুজে প্রাকৃতিকভাবেই চিনি থাকে, তাই ডায়াবেটিস রোগীদের এটি খাওয়ার সময় পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি। তরমুজ এমন একটি শস্য, যা একই সঙ্গে বেরি, ফল এবং সবজির বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। এর পরিচয় আপনি যে নামেই দিন না কেন, এর রসালো স্বাদ ও পুষ্টিতে কোনো কমতি নেই। @ জান্নাতুল ফাতেমা সূত্র: এ-জেড অ্যানিম্যালস


রোমান সভ্যতার শক্তি, প্রযুক্তি এবং সংস্কৃতির প্রতীক Colosseum

প্রাচীন রোমের গৌরবময় স্থাপত্যের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত নিদর্শনগুলোর একটি হলো Colosseum। এটি শুধু একটি স্থাপনা নয়; বরং রোমান সভ্যতার শক্তি, প্রযুক্তি এবং সংস্কৃতির প্রতীক।

খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে সম্রাট Vespasian এই বিশাল অ্যাম্ফিথিয়েটারের নির্মাণ শুরু করেন এবং তার ছেলে টাইটাস এটি সম্পূর্ণ করেন। প্রায় ৫০,০০০ দর্শক ধারণক্ষমতা সম্পন্ন এই স্থাপনাটি সেই সময়ের জন্য এক বিস্ময়কর প্রকৌশল কীর্তি ছিল। কলোসিয়াম মূলত জনসাধারণের বিনোদনের জন্য ব্যবহৃত হতো। এখানে গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াই, বন্য প্রাণীর সঙ্গে যুদ্ধ এবং বিভিন্ন নাট্য প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হতো। এসব প্রদর্শনী অনেক সময় অত্যন্ত নিষ্ঠুর হলেও, রোমান সমাজে এটি ছিল জনপ্রিয় বিনোদনের একটি অংশ।

স্থাপত্যগত দিক থেকেও কলোসিয়াম ছিল অত্যন্ত উন্নত। এতে ব্যবহার করা হয়েছিল পাথর, কংক্রিট এবং বিশেষ আর্চ কাঠামো, যা এটিকে এত বড় আকারে নির্মাণ করা সম্ভব করেছিল। এছাড়া দর্শকদের দ্রুত প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য বিশেষ পথ ও গেট তৈরি করা হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানবসৃষ্ট ক্ষতির কারণে কলোসিয়ামের কিছু অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। তবুও এটি আজও দাঁড়িয়ে আছে, যেন অতীতের ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে।

বর্তমানে কলোসিয়াম একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র এবং বিশ্বের সাতটি আশ্চর্যের একটি হিসেবে স্বীকৃত। প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দেখতে আসে। সংক্ষেপে বলা যায়, রোমান কলোসিয়াম শুধু একটি স্থাপত্য নয়; এটি প্রাচীন রোমের সংস্কৃতি, প্রযুক্তি এবং ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। @Voice of Pipul



ইবনে খালদুনের রাষ্ট্র ও সমাজভাবনা

প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব, ইতিহাসবেত্তা, সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, সুফি এবং সর্বোপরি একজন দার্শনিক সব উপাধি জড়িয়ে আছে, তিনি ইবনে খালদুন, জন্ম ১৩৩২ সালে আফ্রিকার তিউনিসে। মুকাদ্দিমা হচ্ছে ইবনে খালদুনের সবচেয়ে মশহুর গ্রন্থ।  মোটাদাগে ছয়টি অধ্যায়ে বিভক্ত ই দীর্ঘ তাত্ত্বিক প্রস্তাবে তিনি মানবসমাজ, রাষ্ট্র, খেলাফত, সাম্রাজ্য, যাযাবরীয় সমাজ, নগরভিত্তিক সমাজ, বাণিজ্য, অর্থনীতি, প্রযুক্তিগত কলাকৌশল ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করেছেন। কোনো কোনো খালদুন-গবেষক খালদুনকে মার্ক্সের পূর্বসূরি হিসেবেও আখ্যা দিয়েছেন। আবার অনেকে খালদুনের ভাবনা তার সুফিবাদী দর্শনের প্রভাব কথা উল্লেখ করেছেন। ইতিহাসবিদরা কেন ভুল করেন—এ প্রশ্নের উত্তরে খালদুন মোট সাত ধরনের ভুলের কথা বলেন। এক. কোনো একটা মত বা গোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাতিত্বমূলক মনোভাব ইতিহাসবিদকে ভুল পথে পরিচালিত করে। দুই. ইসলামের ইতিহাসে ধারা বর্ণনাকারীর গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা সবাই ওয়াকিবহাল। বিশেষ করে হাদিসের শুদ্ধতা নির্ধারণে এটা খুব কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। খালদুনের দ্বিতীয় আপত্তি হচ্ছে এটা নিয়েই: এদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাও ভুলের একটা কারণ। তিন. ঘটনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বেখবর থাকা। চার. ভ্রান্ত পূর্বানুমানের ভিত্তিতে সত্যে পৌঁছার চেষ্টা করা। পাঁচ. বাস্তবতার সঙ্গে পরিস্থিতি কীভাবে খাপ খাচ্ছে সে বিষয়ে অজ্ঞ থাকা। ছয়. শাসকগোষ্ঠী ও উচ্চাসনের পদাধিকারদের খুশি করার মনোবাসনা। সাত. মানবসমাজের অবস্থার প্রকৃতি সম্পর্কে বেখবর থাকা। অর্থাৎ মোটাদাগে পক্ষপাতিত্ব, সহজে কোনো কিছুকে সত্য বলে মেনে নেয়ার ঝোঁক এবং অন্তর্নিহিত জ্ঞানকে ধরতে ব্যর্থ হওয়াটাই ইতিহাসবিদকে ভুল সিদ্ধান্তের দিকে পরিচালিত করে।  

মানুষ একা একা যথেষ্ট নয়, সবাইকে নিয়েই তাকে বসবাস করতে হয়। মানুষের প্রকৃতিই হচ্ছে সমাজে বেঁচে থাকার জন্য একে অন্যকে সহযোগিতা করতে হয়, একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে হয়।  মানুষ প্রতিযোগী মনোভাবাপন্ন, বর্বর এবং তীব্র বাসনা দ্বারা তাড়িত। একা একা ছেড়ে দিলে মানুষ নির্মমভাবে কেবল নিজের স্বার্থের পেছনেই ছুটবে। হবসের মতো পশ্চিমের চিন্তকরা যেভাবে মানুষের প্রাকৃতিক অবস্থাকে কদর্য ও নিষ্ঠুর বলে বিবেচনা করতেন, তার সঙ্গে তৎকালের মুসলিম চিন্তকদের চিন্তার মিল খুঁজে পান গবেষকরা। এমন অবস্থা থেকে আইন/ল জরুরি হয়ে ওঠে। অর্থাৎ এসব রোধ করার জন্য এক ধরনের কর্তৃত্ব বা অথরিটি প্রয়োজন। এটা অনিবার্য। তবে খালদুনের মধ্যে এর কিছুটা বিপরীত ভাবনাও দেখতে পাব। খালদুন মনে করতেন, মানুষ যত প্রকৃতির কাছে থাকে, ততদিন সে খাঁটি থাকে, তার উচ্চ চরিত্রের অধিকারী থাকে, শহুরে জীবন যাপন তাকে উল্টো নষ্ট করে। @ সহুল আহমদ: গবেষক ও লেখক 


ব্রাজিলে  বিশ্বের বৃহত্তম 'ইতালীয় শহর' সাও পাওলো 


সাও পাওলো-কে প্রায়ই ইতালির বাইরে বিশ্বের বৃহত্তম 'ইতালীয় শহর' বলা হয়। আর্জেন্টিনার বেশিরভাগ মানুষ আসলে ইতালিয়ান। কিন্তু এটাও বাস্তব যে, আর্জেন্টিনার চেয়ে ব্রাজিলে বেশি ইতালিয়ান বাস করে। কিন্তু সেটি তত আলোচিত হয় না। এর কারণ ব্রাজিলে ইতালিয়ানের সংখ্যা আর্জেন্টির চেয়ে বেশি হলেও ব্রাজিলের মোট জনসংখ্যার মাঝে সেটি শতাংশে অনেক কম। ইতালিয়ানদের বেশিরভাগ থাকে সাও পাওলো ও রিও ডি জেনেরিওর মত উপকূলীয় ও দক্ষিণ দিকের শহরগুলোতে।

সাও পাওলোতে যত ইতালিয়ান বাস করে ইতালির কোনো শহরেও তত না। ইতালির সবচে বড় শহর রোমের লোকসংখ্যা ২৮ লক্ষ। আর সাও পাওলোতে আছে ৫০ লক্ষ ইতালিয়ান যা শহরের অর্ধেক।

এই ইতালিয়ানদের বেশিরভাগই এসেছে সিসিলি দ্বীপ থেকে। এই শহরের ভেতরে আজও ছড়িয়ে আছে মেসিনা, পালের্মো এবং আগ্রিজেন্তো থেকে আসা পরিবারগুলোর পদচিহ্ন। তারা আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছিল শুধু কিছু অর্থ উপার্জন করে দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য নয়, বরং পুরোপুরি নতুন একটি জীবনে স্থায়ীভাবে মিশে যাওয়ার জন্য। এমন এক জীবন, যেখান থেকে আর কখনো ফিরে আসতে হবে না।

আমেরিকান সংস্কৃতিতে ইতালীয় অভিবাসনের যে ছবি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, তা হলো—জাহাজের নিচতলায় কষ্ট করে নিউইয়র্কে পৌঁছানো, মালবেরি স্ট্রিটের ঘিঞ্জি এলাকায় বসবাস, এবং পরে ধীরে ধীরে মূলধারার সমাজে মিশে যাওয়া।

কিন্তু ১৮৭৬ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে আনুমানিক দুই থেকে তিন লাখ সিসিলিয়ান দক্ষিণ দিকে, অর্থাৎ ব্রাজিলে পাড়ি জমিয়েছিল। আর যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া অনেক ইতালীয় অভিবাসীর মতো তারা একা আসে নি।

পালের্মো, মেসিনা, নেপলস ও জেনোয়া থেকে ছেড়ে যাওয়া স্টিমশিপে তারা পুরো পরিবার নিয়ে উঠেছিল। সঙ্গে ছিল তাদের সন্তানরাও। এই যাত্রা ছিল স্থায়ী—এটি কোনো সাময়িক “যাওয়া-আসা”র পরিকল্পনা ছিল না। আসলে এই পার্থক্যটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

একজন যুবক যদি একা অভিবাসী হয়ে যায়, তবে সে তার সংস্কৃতিকে স্মৃতিতে বহন করে। কিন্তু যখন একটি পুরো পরিবার একসঙ্গে অন্য দেশে যায়, তখন তারা সেই সংস্কৃতিকে নিজেদের হাতে করেই সঙ্গে নিয়ে যায়। তাদের রান্নার ধরন, সাধু-সন্তদের প্রতি ভক্তি, পেশাগত দক্ষতা এবং তারা যে মহল্লা গড়ে তোলে—সবকিছুর ভেতর সেই সংস্কৃতি মিশে থাকে।

ব্রাজিলে সিসিলীয় অভিবাসন শুরু থেকেই ছিল এক ধরনের শেকড়সহ স্থানান্তর—এক ভূখণ্ড থেকে আরেক ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে চলে যাওয়া।

১৮৮০ ও ১৮৯০-এর দশকে সিসিলিতে থেকে যাওয়া অনেকের জন্য আর বাস্তবসম্মত ছিল না। কৃষিপণ্যের দাম পড়ে গিয়েছিল। ঋণের বোঝা ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল। যে সালফার খনিগুলো একসময় পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি ধরে রেখেছিল, সেগুলো বন্ধ হতে শুরু করেছিল। জনসংখ্যা বাড়ছিল, কিন্তু অর্থনীতি সংকুচিত হচ্ছিল।

মেসিনার কোনো জেলে পরিবার বা আগ্রিজেন্তোর পাহাড়ি এলাকার কোনো কৃষক পরিবারের কাছে অভিবাসন কোনো রোমাঞ্চকর অভিযান ছিল না। এটি ছিল স্রেফ অঙ্ক। ঘরের হিসাব যখন আর মেলানো যাচ্ছিল না, তখন দেশ ছেড়ে যাওয়াই হয়ে উঠেছিল একমাত্র পথ।

ব্রাজিলে পৌঁছানোর পর অধিকাংশ ইতালীয় অভিবাসীকে পাঠানো হতো সাও পাওলো রাজ্যের কফি বাগানগুলোতে- সেসব ফাজেন্দা-তে, যেগুলো টিকে ছিল সস্তা শ্রম আর শ্রমিকদের ঠকানোর ওপর। অনেক সিসিলিয়ানও শুরুতে সেখানেই গিয়েছিল। কিন্তু তারা সেখানে পড়ে থাকে নি।

তারা ধীরে ধীরে চলে আসে সাও পাওলো শহরের ভেতরে, সেই দ্রুত বর্ধনশীল শিল্পাঞ্চলগুলোর দিকে, যেখানে একজন রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি বা ছোটখাটো ব্যবসায়ী নিজের জীবন গড়ে তুলতে পারত।

বিক্সিগা ও মোকা-র মতো এলাকাগুলো সিসিলীয় হয়ে উঠেছিল এমনভাবে, যা  কেবল জনসংখ্যার হিসাব দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। সেই রাস্তাগুলো দিয়ে হাঁটলে শোনা যেত পশ্চিম সিসিলির উপভাষা মিশে যাচ্ছে মেসিনিজ উচ্চারণের সঙ্গে। মোড়ের দোকানগুলোতে থাকত জায়তুনের তেল, শুকনো পাস্তা, লবণ-দেওয়া অ্যাঞ্চোভি মাছ।

বেকাররা (Baker) বানাত এমন গাঢ় খোসাওয়ালা রুটি, যার স্বাদ মানুষকে তাদের দেশের কথা মনে করিয়ে দিত।

আর এইখানেই রয়েছে সেই ছোট্ট অথচ সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সত্যটি—

সিসিলীয় রাজমিস্ত্রি ও কাঠমিস্ত্রিরাই নিজেদের বসতির মহল্লাগুলো নিজের হাতে গড়ে তুলেছিল। তারা শুধু একটি নতুন শহরে এসে বসবাস শুরু করেনি; তারা একটি নতুন শহর নির্মাণ করেছিল। আর সেটিকে এমনভাবে তৈরি করেছিল, যাতে তা তাদের ফেলে আসা বাড়ির মতো মনে হয়।

তাদের অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প ছিল অভিবাসী জীবনের পরিচিত সংগ্রামের গল্প। শুরুতে তারা মজুরি ভিত্তিক শ্রম দিয়ে কাজ শুরু করেছিল। পরিবারের সবাই কাজ করত—স্বামী, স্ত্রী এবং বড় সন্তানরা।

তারা ধীরে ধীরে সঞ্চয় করত। এরপর খুলত একটি মুদি দোকান, একটি বেকারি, অথবা ছোটখাটো নির্মাণ ব্যবসা।

বিশ্বাস ও পারস্পরিক সহায়তার নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল গ্রাম এবং পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তিতে। এক প্রজন্মের মধ্যেই শ্রমিকেরা মালিক হয়ে উঠত। আর দুই প্রজন্মের মধ্যে তাদের সন্তানরা সাও পাওলোর মধ্যবিত্ত সমাজে নিজেদের জায়গা করে নিত।

কোনো অভিবাসী গোষ্ঠী স্থায়ীভাবে থাকার পরিকল্পনা করছে কি না, তার একটি বড় লক্ষণ হলো তাদের ধর্মীয় জীবন।

যারা সাময়িকভাবে আসে, তারা নীরবে ইবাদত করে এবং ফিরে যাওয়ার আশায় থাকে। কিন্তু যারা স্থায়ীভাবে বসতি গড়তে আসে, তারা উৎসব পালন শুরু করে।

বিক্সিগা এলাকায় দক্ষিণ ইতালীয় অভিবাসীরা—যাদের মধ্যে অনেকেই সিসিলীয়—মাদোনা দি কাসালুচে উৎসব পালন শুরু করেছিল। এই উৎসবের শিকড় দক্ষিণ ইতালির কাম্পানিয়া-সিসিলি অঞ্চলে গভীরভাবে প্রোথিত।

আজও সেই উৎসব পালিত হয়। ফলে এটি সাও পাওলোর প্রাচীনতম ইতালীয় ধর্মীয় উৎসবগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। এটি ছিল এমন এক স্থানে নিজেদের গোষ্ঠীগত পরিচয় সচেতনভাবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা, যেখানে আগে এমন কোনো পরিচয় ছিল না।

আজ সাও পাওলোর পিজা সংস্কৃতি বিশ্ববিখ্যাত। এর শিকড় স্পষ্টভাবেই দক্ষিণ ইতালিতে।

বিশেষ করে সিসিলীয় ও নেপোলিটান বেকাররা তাদের পরিচিত রেসিপিগুলোকে ব্রাজিলের উপকরণে ও একটি শিল্পনগরীর দ্রুতগতির জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিল।

রিকোটা’র মিষ্টি স্বাদ, টাটকা পনির, গ্রাম্যধাঁচের রুটি—সবকিছুর মধ্যেই আজও সিসিলির রন্ধনশৈলীর ছাপ রয়ে গেছে। এমনকি যারা আজ এগুলো খায়, তাদের অনেকেই হয়তো জানেই না এই স্বাদের শিকড় কোথায়।

সাও পাওলোর “ইতালীয়” পরিচয়ের ভেতরে লুকিয়ে থাকা নীরব সত্যটি এখানেই।

এই পরিচয়ের একটি বিশাল অংশ গড়ে তুলেছিলেন সেইসব সিসিলীয়রা, যারা পরিবার, পেশা, রেসিপি এবং সাধু-সন্তদের প্রতি ভক্তি সঙ্গে নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়েছিলেন।

তারা এমন কিছু নির্মাণ করেছিলেন, যা এতটাই টেকসই যে আজও শহরটি তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে—যদিও সময়ের সঙ্গে শহরটি হয়তো ভুলে গেছে, কারা এর ভিত্তি স্থাপন করেছিল।@ বইকাল


১৯৪০ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে ভূমিকা  

নিম্নে তাঁদের সে সময়ের প্রধান কার্যাবলি ও ভূমিকা তুলে ধরা হলো:

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ভূমিকা (১৯৪০):

১৯৪০ সাল ছিল নেতাজির জীবনের এক সন্ধিক্ষণ। এই বছর তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের পথ বেছে নেন:

অ্যান্টি-কম্প্রোমাইজ কনফারেন্স:

১৯৪০ সালের মার্চ মাসে বিহারের রামগড়ে তিনি ফরওয়ার্ড ব্লকের উদ্যোগে 'অ্যান্টি-কম্প্রোমাইজ কনফারেন্স' বা আপসহীন সম্মেলন আহ্বান করেন। সেখানে তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলনের ডাক দেন।

হলওয়েল মনুমেন্ট আন্দোলন:

১৯৪০ সালের জুলাই মাসে কলকাতায় হলওয়েল মনুমেন্ট (অন্ধকূপ হত্যা স্মৃতিস্তম্ভ) অপসারণের জন্য তিনি বিশাল গণ-আন্দোলন গড়ে তোলেন।

কারাবরণ ও অনশন:

এই আন্দোলনের কারণে ২ জুলাই ১৯৪০ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে। কারাগারে থাকাকালীন তিনি আমরণ অনশন শুরু করেন, যার ফলে অসুস্থ হয়ে পড়লে সরকার তাঁকে নিজ বাড়িতে গৃহবন্দী করার নির্দেশ দেয়।

জিন্নাহর সাথে সাক্ষাৎ:

দেশভাগ ঠেকাতে এবং ভারতের অখণ্ডতা বজায় রাখতে ১৯৪০ সালের ২১ জুন নেতাজি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সাথে সাক্ষাৎ করেন।

ঐতিহাসিকদের মতে, তিনি জিন্নাহকে অখণ্ড ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দিয়ে দেশভাগের দাবি ত্যাগ করতে অনুরোধ করেছিলেন।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ভূমিকা (১৯৪০):

১৯৪০ সালে জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম রাজনীতির মোড় আমূল পরিবর্তন হয়:

লাহোর প্রস্তাব:

১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ নিখিল ভারত মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে জিন্নাহর সভাপতিত্বে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হয়। এই প্রস্তাবের মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো ভারতের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো নিয়ে আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করা হয়।

দ্বিজাতি তত্ত্ব (Two-Nation Theory):

জিন্নাহ এই অধিবেশনে তাঁর ভাষণে অত্যন্ত জোরালোভাবে 'দ্বিজাতি তত্ত্ব' উপস্থাপন করেন। তিনি দাবি করেন যে হিন্দু ও মুসলমান দুটি আলাদা জাতি এবং তারা একটি অখণ্ড রাষ্ট্রে শান্তিতে বসবাস করতে পারবে না।

গণ-জাগরণ:

তাঁর এই অনমনীয় অবস্থান ও লাহোর প্রস্তাব মুসলিম জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি করে এবং তাঁকে মুসলিম লীগের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। পরবর্তীতে ১৯৪১ সালের জানুয়ারিতে নেতাজি ভারত ত্যাগ করে আন্তর্জাতিক সাহায্যের সন্ধানে বিদেশে চলে যান এবং জিন্নাহ তাঁর পাকিস্তান আন্দোলনের দাবি নিয়ে রাজনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখেন। তথ্য: উইকিপিডিয়া @ মৃণাল নন্দী


পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর পূর্বপুরুষদের ইতিহাস 

পূর্বপুরুষ ও জাতি:

জিন্নাহর পিতামহ ছিলেন পুঞ্জা গোকুলদাস মেঘজি (বা পুঞ্জা মেঘজি)। তিনি গুজরাটের সৌরাষ্ট্র অঞ্চলের 'লোহানা ঠক্কর' বা 'ঠক্কর' সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তারা সাধারণত হিন্দু ধর্মের বৈশ্য বা বণিক শ্রেণিভুক্ত ছিল, ব্রাহ্মণ নয়।

ধর্মান্তরের কারণ:

পুঞ্জা মেঘজি মাছের ব্যবসা শুরু করেছিলেন। কিন্তু কঠোর নিরামিষাশী লোহানা হিন্দু সম্প্রদায় মাছের ব্যবসার কারণে তাদের সমাজচ্যুত বা বহিষ্কার করে। পরে তিনি পুনরায় হিন্দু সমাজে ফিরে আসার চেষ্টা করলেও গোঁড়া সমাজপতিরা তাকে গ্রহণ করতে রাজি হননি।

পুঞ্জলাল ঠাকুর (জিন্নাহর পিতা):

পুঞ্জা মেঘজির পুত্র ছিলেন পুঞ্জলাল ঠাকুর, যিনি পরে জিন্নাহভাই পুঞ্জা নামে পরিচিত হন। পিতার অবমাননা ও হিন্দু সমাজ থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার ক্ষোভ থেকে তিনি সপরিবারে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং গুজরাট ছেড়ে করাচিতে চলে যান।

ধর্মীয় বিশ্বাস:

তারা ইসলাম ধর্মের খোজাহ শিয়া (ইসমাইলি) সম্প্রদায়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ নিজেকে কেবল মুসলিম হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন এবং জীবনের শেষভাগে অনেকে তাকে সুন্নি মতাদর্শের অনুসারী হিসেবেও উল্লেখ করেছেন।

জিন্নাহ নাম:

জিন্নাহভাই পুঞ্জার 'জিন্নো' (Zino) বা 'জিন্নাহ' ডাকনাম থেকেই পরিবারের পদবি হিসেবে 'জিন্নাহ' ব্যবহৃত হতে থাকে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৮৭৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং পরে পাকিস্তানের প্রধান নেতা বা কায়েদে আজম হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান।

জিন্নাহর এই পারিবারিক ইতিহাস তার অসাম্প্রদায়িক মনোভাব এবং আধুনিক জীবনবোধের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন।

সন্তান:

কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর কোনো ছেলে ছিল না, তিনি ছিলেন জিন্নাহর একমাত্র সন্তান। দিনা ওয়াদিয়া (Dina Wadia) হলেন জিন্নাহ ও তাঁর স্ত্রী রতনবাই পেটিটের একমাত্র মেয়ে, যিনি ১৯১৯ সালের ১৫ আগস্ট লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন।

দিনা ওয়াদিয়া সম্পর্কে কিছু তথ্য:

বিয়ে ও দূরত্ব:

দিনা যখন একজন পার্সি (অমুসলিম) নেভিল ওয়াদিয়াকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন জিন্নাহর সাথে তাঁর সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং তাঁদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়।

পরিচয়:

তিনি একজন ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ভারতীয়-আমেরিকান হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং ২০১৭ সালের ২ নভেম্বর নিউইয়র্কে ৯৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

বংশধর:

দিনা ওয়াদিয়ার সন্তান (নুসলি ওয়াদিয়া) এবং পরিবার ভারতেই থেকে গিয়েছিলেন।

মূলত, জিন্নাহর একমাত্র উত্তরাধিকারী ছিলেন দিনা ওয়াদিয়া, যিনি বাবার আদর্শ ও ধর্মীয় মতবিরোধের কারণে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন।

নেস ওয়াদিয়া এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:

নেস ওয়াদিয়া হলেন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর প্রপৌত্র (নাতনির ছেলে) এবং ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী। তিনি নাসলি ওয়াদিয়া ও মরিন ওয়াদিয়ার পুত্র এবং জিন্নাহর একমাত্র কন্যা দিনা ওয়াদিয়ার নাতি। নেস ওয়াদিয়া বর্তমানে আইপিএল দল 'পাঞ্জাব কিংস'-এর অন্যতম মালিক এবং ওয়াদিয়া গ্রুপের সাথে যুক্ত একজন বিশিষ্ট শিল্পপতি।

নেস ওয়াদিয়া সম্পর্কে কিছু তথ্য:

পরিচয়:

তিনি মুম্বাইয়ের একটি পার্সি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং জিন্নাহর উত্তরাধিকারী হিসেবে ভারতে বসবাস করেন।

ব্যবসায়িক ভূমিকা:

তিনি ওয়াদিয়া গ্রুপের বিভিন্ন কোম্পানি, যেমন-বম্বে ডাইং এবং বম্বে বার্মা ট্রেডিং কর্পোরেশনের সাথে উচ্চ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

ক্রিকেট:

তিনি ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (IPL) দল 'পাঞ্জাব কিংস' (পূর্বের কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব)-এর মালিকদের মধ্যে অন্যতম।

শিক্ষাগত যোগ্যতা:

তিনি যুক্তরাজ্যের ওয়ারউইক ইউনিভার্সিটি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্টে এমএসসি (MSc) করেছেন।

সংক্ষেপে:

নেস ওয়াদিয়া পাকিস্তানের জাতির জনকের বংশধর হলেও তিনি ভারতের মুম্বাইয়ে তার পারিবারিক ব্যবসা পরিচালনার সাথে জড়িত।

ছবিতে জিন্নাহ, তাঁর পত্নী রতন বাঈ জিন্নাহ, তাঁদের একমাত্র কন্যা দীনা জিন্নাহ এবং নেস ওয়াদিয়া, নেস ওয়াদিয়া হলো মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর প্রপৌত্র (নাতনির ছেলে)। তথ্য: উইকিপিডিয়া @মৃণাল নন্দী


মিশরীয় সভ্যতায় খৎনা বা পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগ ছেদনের প্রথাটি কোনো ধর্মীয় আচার হিসেবে নয়, এটি একটি শারীরিক শুদ্ধির অংশ হিসেবে শুরু হয়েছিলো।

১. প্রত্নতাত্ত্বিক দলিল: আঙ্খ-মাহোর সমাধি (Tomb of Ankhmahor)

খৎনা করার প্রথার সবচাইতে প্রাচীন এবং অকাট্য প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায় মিশরের সাক্কারা (Saqqara) নামক স্থানে। এটি ষষ্ঠ রাজবংশের (6th Dynasty) উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী আঙ্খ-মাহোর-এর সমাধির দেয়ালে খোদাই করা একটি চিত্রলিপি বা হায়ারোগ্লিফিক্স।

এই প্রত্নতাত্ত্বিক ফলকটি আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ২৪৫০ থেকে ২৩৪০ অব্দ (প্রায় ৪,৫০০ বছর আগে) পুরনো। এই চিত্রে স্পষ্ট দেখা যায়, একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে ধরে রাখা হয়েছে এবং অন্য একজন ধারালো পাথরের (Flint knife) সাহায্যে তার খৎনা সম্পন্ন করছেন। চিত্রলিপিতে সেখানে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে— "তাকে শক্ত করে ধরো, যাতে সে নড়াচড়া না করে।"

২. প্রত্নতাত্ত্বিক ফলকটির গুরুত্ব

এই ফলকটি ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয় কয়েকটি কারণে:

- চিকিৎসা ও শুদ্ধি: মিশরে এটি মূলত উচ্চবিত্ত, পুরোহিত এবং রাজকীয় ব্যক্তিদের জন্য বাধ্যতামূলক ছিলো। একে মনে করা হতো শারীরিক পবিত্রতা এবং যৌবনে পদার্পণের একটি চিহ্ন।

-লিখিত প্রমাণ: এটি প্রমাণ করে যে, কোনো আসমানী কিতাব বা হিব্রু সভ্যতার জন্মের অন্তত ১,০০০ বছর আগেই মিশরে এই অস্ত্রোপচারটি একটি প্রতিষ্ঠিত প্রথা হিসেবে বিদ্যমান ছিলো।

-উপকরণের ব্যবহার: ফলকটি থেকে জানা যায় যে, সেই সময় ধাতব ছুরির বদলে চকমকি পাথর (Flint) ব্যবহার করা হতো, যা পরবর্তীতে হিব্রু ঐতিহ্যেও দেখা যায়।

৩. আব্রাহামীয় (Abrahamic) ধর্মে এর রূপান্তর

মিশরীয় এই প্রাচীন প্রথাটি কীভাবে হিব্রু বা আব্রাহামীয় ঐতিহ্যে প্রবেশ করলো, তার ঐতিহাসিক বিবর্তন নিচে দেওয়া হলো:

হিব্রু সভ্যতায় প্রবেশ (আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ১৮০০-১৭০০ অব্দ): বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, ইব্রাহিম  বা আব্রাহাম যখন মিশরে গিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে কেনানে ফিরে আসেন, তখন তার সাথে এই মিশরীয় সংস্কৃতির নিবিড় যোগাযোগ ঘটে। প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিকদের মতে, হিব্রু জাতি এই মিশরীয় প্রথাটি গ্রহণ করে সেটিকে তাদের ঈশ্বরের সাথে করা এক 'পবিত্র চুক্তির' (Covenant) প্রতীকে রূপান্তর করে।

চিহ্ন হিসেবে ব্যবহার: মিশরে যা ছিলো  'শুদ্ধি' বা 'যৌবনে পদার্পণের চিহ্ন', আব্রাহামীয় ধর্মে তা হয়ে উঠলো বংশগত পরিচয়। অর্থাৎ, খৎনা করা থাকলেই বোঝা যেত সে আব্রাহামের বংশধর বা অনুসারী।

হিব্রু বা ইহুদি ধর্ম থেকে এই প্রথাটি পরবর্তীতে খ্রিষ্টধর্মের প্রাথমিক যুগে (যদিও পরে বাদ দেওয়া হয়) এবং সবশেষে ইসলাম ধর্মে একটি অপরিহার্য সুন্নত বা ধর্মীয় বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

এই প্রগতির যুগে এসেও মুসলিমরা বুঝতে পারছে না খৎনা কি? খৎনা এসেছে মিশরের হারাওদের শাসনব্যবস্থার প্রথা থেকে। অথচ কোরআন বারবার বলছে, ফেরাউন জাহান্নামি, অথচ সেই ফেরাউনের খৎনার চিহ্ন মুসলিমরা বয়ে বেড়াইছে ১৪শ বছর ধরে।



মোহনলালের গল্প!

মোহনলালকে সাধারণত কাশ্মীরি বলে উল্লেখ করা হলেও, তাঁর আরেকটি ভিন্ন পরিচয় ইতিহাসের অন্তরালে লুকিয়ে আছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, তাঁর আদি নিবাস ছিল মেদিনীপুরের সবং পরগণার একটি গ্রামে। শৈশব থেকেই তিনি লাঠিখেলা, অশ্বারোহণ এবং অস্ত্রচালনায় অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে যখন বর্গীরা তাঁর বোনকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। বর্গীদের পিছনে ধাওয়া করতে করতে অবশেষে তিনি মুর্শিদাবাদে এসে পৌঁছান।

এই ঘটনার প্রতিকার চেয়ে তিনি মুর্শিদাবাদে উপস্থিত হন এবং নবাব সিরাজউদ্দৌলার দরবারে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। তাঁর সাহস, তেজস্বিতা ও সামরিক দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে সিরাজ তাঁকে সেনানায়ক পদে নিয়োগ করেন। এদিকে, মোহনলালের অপহৃত বোনও নিজের বুদ্ধি ও কৌশলে বর্গীদের হাত থেকে পালিয়ে ফিরে আসেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মোহনলাল শুধু সেনানায়কই নন, বরং নবাবের দেওয়ান ও মনসবদার হিসেবেও প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। সিরাজের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে, এবং সেই সূত্রেই তাঁর বোন হীরার সঙ্গেও সিরাজের অন্তরঙ্গতা তৈরি হয়।

আঠারো শতকের বাংলায় মোহনলালের মতো ব্যক্তিত্ব ছিল অত্যন্ত বিরল। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা ও ছুতমার্গের ঊর্ধ্বে উঠে এক উদার মানসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। একইসঙ্গে তিনি ব্রিটিশ আধিপত্যের বিরুদ্ধে নবাবের প্রতি অটল আনুগত্য প্রদর্শন করেন। তবুও বিস্ময়করভাবে বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে তাঁর যথাযোগ্য মূল্যায়ন খুব কমই দেখা যায়। পারিবারিক জীবনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর কন্যার বিবাহ হয় সিরাজের সেনাবাহিনীর এক বিশিষ্ট সেনাপতি বাহাদুর আলি খানের সঙ্গে যিনি পলাশীর প্রান্তরে নবাবের পক্ষে বিশ্বস্ততার সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা করতে গিয়ে প্রাণ বিসর্জন দেন।

মোহনলাল বোন হীরা ছিলেন সিরাজের এক স্ত্রী। ধর্মান্তরের ফলে যার নাম হয় আলেয়া। তাদের এক পুত্র সন্তান হয়। পলাশীর যুদ্ধের দিন, ২৩ জুন ১৭৫৭ সালে, মোহনলাল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় সেই শিশুপুত্রকে নিয়ে ময়মনসিংহে আশ্রয় নেন এবং সেখানকার এক জমিদার পরিবারে তাঁকে দত্তক দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। সেই দত্তক পুত্রের নাম ছিল যুগলকিশোর রায়চৌধুরী। 

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন, পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌলা যখন যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করেন, তখন মোহনলালও পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করে পলাশী ত্যাগ করতে বাধ্য হন। তিনি অল্পসংখ্যক বিশ্বস্ত সৈন্য নিয়ে প্রথমে নিজের আবাসস্থলে ফিরে আসেন, যা ইতিহাসবিদদের মতে জাফরাগঞ্জ ও নশীপুর অঞ্চলের মধ্যে কোথাও অবস্থিত ছিল। কিন্তু তিনি খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছিলেন যে মুর্শিদাবাদে তাঁর অবস্থান আর নিরাপদ নয়। কারণ, নবাবের দরবারে যাঁদের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল—বিশেষত রায়দুর্লভ—তাঁরা তখন ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসছেন।

রায়দুর্লভ, যিনি একসময় নবাবি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন, সিরাজউদ্দৌলার দ্বারা অপসারিত হয়ে মোহনলালের প্রতি গভীর বিদ্বেষ পোষণ করতেন। পলাশীর পর নতুন নবাব হিসেবে মীরজাফরের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গেই রায়দুর্লভ আবার ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরে আসেন এবং মোহনলালের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ পান। তাঁর নির্দেশে মোহনলালের বিপুল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং তাঁকে গ্রেফতারের জন্য ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়।

এই সময়ে মীরজাফরের পুত্র মীরন এক নিষ্ঠুর ভূমিকা পালন করেন। পিতার সিংহাসন সুদৃঢ় করতে তিনি সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী ও শত্রুদের নির্মূল করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। সমসাময়িক বিবরণ থেকে জানা যায়, তিনি একটি ‘হত্যার তালিকা’ প্রস্তুত করেছিলেন, যাতে মোহনলাল ও তাঁর পরিবারের সদস্যরাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এই নির্মম অভিযানের শিকার হন মোহনলালের জ্যেষ্ঠ পুত্র শ্রীমন্তলাল। অপরদিকে, তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র হুক্কালাল কোনোভাবে পালিয়ে আত্মরক্ষা করতে সক্ষম হন।

এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মোহনলাল আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন। যদিও কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে দুর্লভরামের নির্দেশে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল। যাইহোক তাঁর পলাতক জীবনের নির্ভরযোগ্য তথ্য অত্যন্ত সীমিত, তবে বিভিন্ন লোককথা, আঞ্চলিক ইতিহাস এবং ঔপনিবেশিক আমলে সংগৃহীত কিছু উপাদান থেকে একটি সামগ্রিক চিত্র নির্মাণ করা যায়। ধারণা করা হয়, তিনি নদিয়া, বর্ধমান ও হুগলি জেলার বিভিন্ন স্থানে সন্ন্যাসীর বেশে ঘুরে বেড়াতেন। বিশেষত নদিয়ার জুড়ানপুর কালীপীঠে তাঁর অবস্থানের কথা স্থানীয় ঐতিহ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রচলিত। এই কালীপীঠ ছিল প্রাচীন বাংলার শক্তিসাধনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, এবং মোহনলাল নিজেও শাক্ত ধর্মাবলম্বী ছিলেন বলে জানা যায়। জনশ্রুতি অনুসারে, তিনি এই অঞ্চলে আশ্রয় নিয়ে গোপনে বহু যুবককে যুদ্ধবিদ্যায় প্রশিক্ষিত করতে থাকেন। এটি কেবল আত্মরক্ষার প্রয়াস ছিল না—বরং ইংরেজ আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক সুপ্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলার উদ্যোগ বলেই অনেকের ধারণা।

১৭৭০ সালের ভয়াবহ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর বাংলার সমাজজীবনে এক গভীর বিপর্যয় ডেকে আনে। এই দুর্ভিক্ষের সময় ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কঠোর রাজস্বনীতি সাধারণ মানুষের দুর্দশাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এই প্রেক্ষাপটে একটি জনপ্রিয় কাহিনি প্রচলিত আছে যে, মোহনলাল তাঁর সংগঠিত দল নিয়ে কোম্পানির রাজস্ববাহী নৌকা আক্রমণ করে খাদ্য ও অর্থ লুণ্ঠন করতেন এবং তা দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের মধ্যে বিতরণ করতেন। যদিও এই ঘটনার প্রত্যক্ষ প্রমাণ সীমিত, তবুও এটি তাঁর ব্যক্তিত্বের এক মানবিক ও সংগ্রামী দিককে তুলে ধরে। তবে ইংরেজ প্রশাসন এই ধরনের কর্মকাণ্ডের কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ বা হদিস পায়নি। ফলে ওইসব অঞ্চলকে পরবর্তীকালে ‘সন্ত্রাসপ্রবণ’ বলে চিহ্নিত করা হয় এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন প্রশাসনিক নিপীড়নের শিকার হয়।

মোহনলালের জীবনের অন্তিম অধ্যায় আরও বেশি রহস্যময়। একটি প্রচলিত মত অনুযায়ী, তিনি হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ায় অবস্থিত বৃন্দাবনচন্দ্র জিউ মঠে জীবনের শেষ দিনগুলি অতিবাহিত করেন। সেখানে আজও একটি স্মৃতিস্তম্ভ তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত বলে স্থানীয়ভাবে বিশ্বাস করা হয়। তবে এই দাবির ঐতিহাসিক প্রমাণ সুস্পষ্ট নয়, এবং তাঁর মৃত্যুর সঠিক সময়, স্থান বা পরিস্থিতি সম্পর্কে ইতিহাস নীরব।

এইভাবে দেখা যায়, মোহনলালের জীবন যেন দুই বিপরীত ধারার সংমিশ্রণ—একদিকে নিশ্চিত ইতিহাস, অন্যদিকে লোককথা ও অনিশ্চয়তা। তিনি ছিলেন এমন এক সেনানায়ক, যিনি নবাবি শাসনের পতনের পরও লড়াইয়ের মানসিকতা হারাননি। তাঁর ব্যক্তিত্বে আমরা দেখতে পাই আঠারো শতকের বাংলায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক প্রাথমিক প্রতিরোধচেতনার প্রতিফলন। মোহনলালের জীবন কেবল একটি ঐতিহাসিক চরিত্রের জীবনী নয়; এটি বাংলার ইতিহাসে হারিয়ে যাওয়া এক প্রতিরোধের কাহিনি। তাঁর শেষ পরিণতি আজও অজানা থেকে গেলেও, তাঁর সংগ্রাম ও সাহস ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

©Manas Bangla




যে ব্যক্তি নিজের যোগ্যতায় বিশ্বাস রাখে এবং সমাজের চাপে না ভেঙে নিজের পথে চলে, পৃথিবী বা সময় একসময় তার সাহসিকতা ও সফলতাকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। 


১০

বেবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান


প্রাচীন বিশ্বের সাতটি আশ্চর্যের মধ্যে সবচেয়ে রহস্যময় এবং আলোচিত স্থাপনাগুলোর একটি হলো Hanging Gardens of Babylon। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি ছিল এমন এক উদ্যান, যা মাটির উপর নয়, বরং স্তরবিন্যাস করা উঁচু কাঠামোর উপর নির্মিত ছিল—যেন আকাশে ঝুলছে। ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে বেবিলনের রাজা Nebuchadnezzar II এই উদ্যানটি নির্মাণ করেন। বলা হয়, তার স্ত্রী অ্যামিটিস মিডিয়ার সবুজ পাহাড়ি পরিবেশকে খুব মিস করতেন। তাকে খুশি করার জন্যই এই বিশাল ও সবুজ উদ্যান তৈরি করা হয়।

এই উদ্যানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল এর স্থাপত্য ও প্রকৌশল কৌশল। মরুভূমির মাঝে এত সবুজ গাছপালা ও ফুল টিকিয়ে রাখা ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ধারণা করা হয়, উন্নত সেচব্যবস্থার মাধ্যমে নদী থেকে পানি তুলে বিভিন্ন স্তরে পৌঁছে দেওয়া হতো, যা সেই সময়ের জন্য এক বিস্ময়কর প্রযুক্তি ছিল। তবে এই উদ্যানের অস্তিত্ব নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। এখন পর্যন্ত এর কোনো নির্দিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অনেকেই মনে করেন, এটি হয়তো একটি কিংবদন্তি, আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, এটি সত্যিই ছিল কিন্তু সময়ের সঙ্গে ধ্বংস হয়ে গেছে।

যাই হোক, বেবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান মানুষের কল্পনা ও ইতিহাসে এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। এটি শুধু একটি স্থাপনা নয়; বরং মানব সৃজনশীলতা ও প্রকৃতির সৌন্দর্যকে একসঙ্গে তুলে ধরার এক অসাধারণ উদাহরণ। সংক্ষেপে বলা যায়, বেবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান বাস্তব হোক বা কল্পনা—এটি মানব সভ্যতার এক চিরন্তন রহস্য এবং সৌন্দর্যের প্রতীক।



পারস্যের সাম্রাজ্যই ছিল ইতিহাসের প্রথম মহাশক্তি বা সুপারপাওয়ার।

‎এ সাম্রাজ্য বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ জনসংখ্যার উপর রাজত্ব করত। পশ্চিমে বলকান রাষ্ট্রসমূহ ও মিশর থেকে শুরু করে , উত্তরপূর্বে পশ্চিম ও মধ্য এশিয়া আর দক্ষিণ পূর্বে ভারতীয় উপমহাদেশে সিন্ধু উপত্যকা পর্যন্ত বিস্তৃতি ছিল তাদের সাম্রাজ্য। এটি এতটাই পাওয়ারফুল ছিল যে বলা হয় একমাত্র আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটই তাদের পরাজিত করতে পেরেছিলেন।

‎খ্রিস্টপূর্ব ৫৫৯ সালে, সাইরাস দ্য গ্রেট এর হাত ধরে পারস্যের ইতিহাস শুরু হয়। তিনি পারস্যের আশেপাশের রাজ্য, মিডিয়া লিবিয়া এবং ব্যাবিলন দখল করে বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী হন। একটি মাটির সিলিন্ডারে লিখে তিনি ঘোষণা দিলেন, 'আমি সাইরাস। এ বিশ্বের রাজা।যুদ্ধ নয় সহনশীলতার মাধ্যমে এ রাজ্য দখল করেছি।' ওই সিলিন্ডারটি ইতিহাসে সাইরেস সিলিন্ডার নামে পরিচিত। মাটির সিলিন্ডার এ অতি সূক্ষ্ম কিউনিফর্ম আকারে লেখা আছে সাইরেস এর ওই ঘোষণা। তার আদেশেই ওই সিলিন্ডারটি পরে রেওয়াজ হিসেবে ব্যাবিলনের প্রাচীরের ভিত্তি হিসেবে মাটির নিচে পুতে দেয়া হয়।

‎সাইরাসের মৃত্যুর পর তার উত্তরসসূরি দারায়ুস দ্য গ্রেট পারস্য সাম্রাজ্যের রাজসিক আসনে আসীন হয়ে সেটিকে একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রে পরিণত করেন। তিনি সাইরাসের পুত্র বারুদিয়ার কাছে থেক ক্ষমতা দখল করেন। তিনি এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে এ সাম্রাজ্য দখল করেন। তিনি ডাক ও একক মুদ্রা, প্রশাসনিক প্রদেশ চালু করেন। মিশরে নীল নদ ও লোহিত সাগরে মধ্যে একটি খাল খনন করেন। তিনিই নির্মাণ করেন আধুনিক 'পার্সেপলিস '। যেটি ছিল এই সাম্রাজ্যের রাজধানী। যেটিকে বলা হতো সূর্যের নিচে সবচেয়ে ধনী নগরী।

পার্সেপলিস

‎আজও দেখা যায়।পার্সেপলিসে ২০ মিটার উচু স্তম্ভসহ বিশাল ট্রেস গুলো। যেগুলোর মাথায় এখনো দেখা যায় পাখি, সিংহ, ঘোড়ার মূর্তি।

‎পরবর্তীতে দারাউস ও তার পুত্র জার্কেসিস ইউরোপ জয়ের চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। জার্কেসিস খ্রিষ্টপূর্ব ৪৯০ সালে যখন গ্রিস দখল করতে যান তখন অভিযানে বিখ্যাত এক ম্যারাথন যুদ্ধে পরাজিত হন। জার্কেসিস পরে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮০ সালে এথেন্স দখল করতে গেলে তার বাহিনী কয়েকবার গ্রিসের বাহিনীর কাছে হেরে যায়।

‎পরবর্তী দেড় শতাব্দী ধরে পারস্য সাম্রাজ্যে চলতে থাকে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ। মিশর হারানো ও পুনরুদ্ধার হয়। সাইডার বা বর্তমান লেবানন বিদ্রোহ করে ও তা পরে দমন করা হয়। এতসব সংকটের মাঝেও পারস্য বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্য হিসেবেই থেকে যায়।

‎এরপর আসে নতুন এক রাজা। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩০ সালে তিনি পারস্য দখল করেন। পারস্যের তখনকার রাজধানী পার্সেপলিস লুট করেন এবং আগুন ধরিয়ে দেন। বলা হয় এটি ছিল জার্কেসিসের অতীত কর্মকাণ্ডের প্রতিশোধ। আসলে আলেকজান্ডার পার্সেপলিস জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন প্রতিশোধ হিসেবে। কেননা জার্কেসিসও এককালে গ্রিসের এথেন্স জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন।

‎আলেকজান্ডার এর পর পারস্য অনেকটাই হারিয়ে যায় ইতিহাস থেকে।

৩২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডারের মৃত্যু হলে তার সেনানেতাদের মধ্যে পারস্যের সিংহাসন দখলের লড়াই শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত ১ম সেলেউকুস বা সেলুকাস পারস্যের রাজা হন। তিনি পূর্বে সিন্ধু নদ থেকে পশ্চিমে সিরিয়া ও এশিয়া মাইনর পর্যন্ত বিশাল এলাকার রাজা ছিলেন। তার বংশধরেরা পারস্যে সেলুকাসীয় রাজবংশ গঠন করে।

খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতকে মধ্য এশিয়া থেকে আগত পার্থীয় জাতির লোকেরা সেলুকাসীয় রাজবংশকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এরপর আরও প্রায় চারশত বছর পারস্য পার্থীয়দের অধীন সাম্রাজ্যের একটি অংশ ছিল।

৫ম শতকের শেষদিকে মধ্য এশিয়া থেকে শ্বেত হুন জাতির লোকেরা পারস্য আক্রমণ করে এবং ৪৮৩ সালে পারস্যের রাজা ২য় ফিরোজকে পরাজিত করে।

১০ শতক এর দিকে পারস্যের বিখ্যাত মহাকবি আবু কাশেম ফেরদৌসি তার মহাকাব্য শাহনামা বা রাজাদের কাহিনী নামে বইয়ে এসব পৌরাণিক গল্পের স্থান দেন ও ইতিহাসের বর্ণণা দেন।

১৬২০ খ্রিস্টাব্দের আগেও মানুষ জানতো না পার্সেপলিস কি ছিল।

বলা যায়, পারস্য আংশিকভাবে তিনবার বিজিত হয়েছে। প্রথমে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের হাতে (পুরোটাই), তারপর ৭ম শতকে আরবদের দ্বারা ইসলাম বিস্তারের সময় এবং শেষে ১৩ শতকে মঙ্গোল সাম্রাজ্যের আক্রমণে। প্রতিবারই পারস্য আবার নতুন করে উঠে দাঁড়িয়েছে এবং নতুন সাম্রাজ্য তৈরি করেছে।

মধ্য এশিয়ার উপর পারস্যের ব্যাপক প্রভাব ছিল। তাজিকিস্তান ও আফগানিস্তানে আজও পারসিক ভাষার প্রভাব দেখা যায়। দক্ষিণ এশিয়ায়ও পারস্যের বড় প্রভাব ছিল, যেখানে মুঘল সাম্রাজ্য দ্বারা পারসিক ভাষা ও সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়েছিল।

‎হাজার বছরের পারসিয়ানদের রাজধানী পার্সেপলিসের বড় অংশ জুড়েই অবস্থিত আজকের ইরান...@ The Analyst's Journal



‘সুপারফুড’ চিয়াসিড

সকালের ঘুম ভাঙতেই কাঁচের গ্লাসে সামান্য জলে ভিনদেশি এক চামচ বীজ ভিজিয়ে রাখেন অনেকেই। সেই ভেজানো বীজ খাওয়ার সময় আধুনিক মানুষ যেন এক অদ্ভুত মানসিক শান্তি পান, ভাবেন এক চুমুকেই হয়তো দীর্ঘায়ু আর সুস্বাস্থ্য কিনে নিচ্ছেন! মেদ কমানো, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে হার্ট ভালো রাখা—সবকিছুর এক জাদুকরী সমাধান হিসেবে ‘চিয়া সিড’ এখন আমাদের প্রতিটি স্বাস্থ্য সচেতন ড্রয়িংরুমের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

​ফাংশনাল পুষ্টি বিজ্ঞান এবং মেটাবলিক স্বাস্থ্যের গভীর লেন্স দিয়ে যদি এই রাতারাতি সুপারস্টার হয়ে ওঠা বীজটির ইতিহাস ঘাটেন, তবে বেরিয়ে আসবে কর্পোরেট মার্কেটিংয়ের এক অভাবনীয় মগজধোলাইয়ের গল্প। চিয়া সিড কোনো ক্ষতিকর বা খারাপ খাবার নয়, এটি অবশ্যই পুষ্টিকর। কিন্তু একে ঘিরে বিজ্ঞাপনের দুনিয়ায় যে বিশাল পুষ্টির রূপকথা তৈরি করা হয়েছে, আজ চলুন তার পেছনের সহজ বিজ্ঞান এবং কর্পোরেট ধোঁকাবাজিটা একটু বিশ্লেষণ করে দেখি। পাঠক হিসেবে পড়ার পর আপনার মনে হতেই পারে, “আরে, এতদিন তো বিষয়টা এভাবে ভেবে দেখিনি!”

​প্রথম ফাঁদটি পাতা হয়েছে ‘সুপারফুড’ শব্দটির মাধ্যমে। আপনি শুনলে অবাক হবেন, চিকিৎসা বিজ্ঞান বা পুষ্টিবিদ্যার বইতে ‘সুপারফুড’ বলে আদতে কোনো নির্দিষ্ট শব্দ বা শ্রেণিবিভাগ নেই। এটি পুরোপুরি একটি কর্পোরেট মার্কেটিংয়ের শব্দ, যা চড়া দামে পণ্য বিক্রির জন্য চতুরতার সাথে ব্যবহার করা হয়। চিয়া সিড মূলত মধ্য আমেরিকার দেশগুলোর (যেমন মেক্সিকো) একটি প্রাচীন এবং সাধারণ শস্য। সেখানকার স্থানীয়রা এটি খেত। কিন্তু গ্লোবাল মার্কেট একে সারাবিশ্বে চড়া দামে বিক্রির জন্য এমনভাবে প্রমোট করেছে, যেন এটি ছাড়া সুস্বাস্থ্য একেবারেই অসম্ভব।

​দ্বিতীয় ধোঁকাবাজিটি লুকিয়ে আছে ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি এসিডের জাদুকরী গল্পে। বিজ্ঞাপনে প্রায়ই বুক ফুলিয়ে দাবি করা হয়, চিয়া সিডে নাকি সামুদ্রিক মাছের চেয়েও বেশি ওমেগা-থ্রি রয়েছে! এটি একটি নিখুঁত অর্ধসত্য, যা সাধারণ মানুষকে খুব সহজেই বিভ্রান্ত করে। চিয়া সিডে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-থ্রি থাকে ঠিকই, কিন্তু সেটি হলো উদ্ভিজ্জ রূপ, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে এএলএ (ALA)। অন্যদিকে, আমাদের মানবদেহের মস্তিষ্ক ও হার্টের সরাসরি কাজে লাগে যে ওমেগা-থ্রি, তার নাম হলো ইপিএ (EPA) এবং ডিএইচএ (DHA)—যা আমরা সরাসরি সামুদ্রিক মাছ থেকে পাই।

​সহজ কথায় বললে, চিয়া সিডের ওমেগা-থ্রি হলো অনেকটা কাঁচামালের মতো। মানবদেহ এই কাঁচামাল (ALA) কে ভেঙে সরাসরি ব্যবহার উপযোগী উপাদানে (EPA/DHA) রূপান্তর করতে পারে খুব সামান্যই। বিজ্ঞানের ভাষায় এই রূপান্তরের হার মাত্র ৫ থেকে ১৫ শতাংশ! চিয়ার নিজস্ব কিছু প্রদাহরোধী (অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি) গুণ আছে, এটা সত্যি। কিন্তু একে সামুদ্রিক মাছের সরাসরি বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানোটা নিছকই মুনাফা লোটার কর্পোরেট অতিরঞ্জন ছাড়া আর কিছুই নয়।

​তৃতীয় এবং সবচেয়ে কষ্টের দিকটি হলো, বিদেশি আভিজাত্যের মোহে পড়ে আমাদের নিজেদের শেকড়ের পুষ্টিকে চরমভাবে অবহেলা করা। চিয়া সিডে ফাইবার, প্রোটিন এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। কিন্তু আমরা ভুলে গেছি আমাদের অতি পরিচিত সস্তা দেশি ‘তিসি’ এবং ‘তোকমা’ দানার কথা।

​তোকমা দানা হলো আমাদের স্থানীয় আবহাওয়া ও মাটিতে উৎপাদিত অসাধারণ একটি বীজ। এতে চিয়ার চেয়েও কিছুটা বেশি ফাইবার বা আঁশ থাকে। গরমের দিনে তোকমা ভেজানো জল আমাদের পেট যেমন ঠান্ডা রাখে, তেমনি অন্ত্রের গাট মাইক্রোবায়োমের (উপকারী ব্যাকটেরিয়া) জন্য দারুণ একটি ‘প্রি-বায়োটিক’ খাবার হিসেবে কাজ করে।

​অন্যদিকে, আমাদের অবহেলিত তিসির বীজে চিয়ার চেয়েও বেশি এএলএ ওমেগা-থ্রি রয়েছে। এর চেয়েও বড় চমক হলো, তিসিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ‘লিগন্যান’ নামক একটি বিশেষ উপাদান। নারীদের হরমোনাল ব্যালেন্স ঠিক রাখতে, মেটাবলিক হেলথ উন্নত করতে এবং স্তন ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগ প্রতিরোধে এই লিগন্যান চিয়া সিডের চেয়ে বহুগুণ বেশি শক্তিশালী! তিসিকে খাওয়ার আগে শুধু একটু গুঁড়ো করে নিতে হয়, এই যা পার্থক্য। চিয়া সিড পুষ্টিকর হলেও আমাদের দেশি বীজগুলো কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই, বরং কিছু ক্ষেত্রে অনেক বেশি কার্যকর এবং শক্তিশালী।

​চতুর্থ বিষয়টি হলো অর্থনৈতিক বাস্তবতা বা পকেট কাটার হিসাব। হাজার হাজার মাইল দূর থেকে জাহাজে বা বিমানে চড়ে, চকচকে প্যাকেটে বন্দি হয়ে এই চিয়া সিড আমাদের দেশে আসে। শুধু এই দীর্ঘ পরিবহন খরচ এবং বিদেশি ব্র্যান্ডিংয়ের কারণে একটি সাধারণ বীজের দাম হয়ে যায় আকাশচুম্বী। প্রকৃতি সবসময় আমাদের চারপাশেই, আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পুষ্টি ছড়িয়ে রাখে। আপনি যখন হাজার টাকা কেজি দরে চিয়া কিনছেন, তখন আপনি মূলত পুষ্টির চেয়ে ওই চকচকে প্যাকেজিং আর মার্কেটিংয়ের দামই বেশি দিচ্ছেন।

​সুস্বাস্থ্যের কোনো শর্টকাট জাদুকরী বীজ হয় না। ফাংশনাল পুষ্টি বিজ্ঞানের মূল কথা হলো বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক খাবার এবং ন্যাচারাল হিলিং। আপনার যদি সামর্থ্য থাকে, তবে ডায়েটে মাঝে মাঝে চিয়া সিড রাখতেই পারেন, তাতে কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু একে জাদুকরী সুপারফুড ভেবে এর ওপর অন্ধভাবে নির্ভরশীল হওয়ার কিছু নেই। আপনার রান্নাঘরে থাকা সস্তা তিসি গুঁড়ো করে খাওয়া কিংবা গ্রীষ্মকালে বাজার থেকে কিনে আনা দেশি তোকমা দানাই হতে পারে আপনার মেটাবলিজমের জন্য সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু। বিজ্ঞাপনের মায়ার জাল থেকে বেরিয়ে এসে নিজের মাটির আসল খাবারগুলো চিনতে শেখাই হলো সত্যিকারের স্বাস্থ্যসচেতনতা। @ Probal Kumar Mondal




হুদুড় দুর্গা

দুর্গাপুজোর ঢাকের আওয়াজ আর অকালবোধনের আবহে যখন চারদিক মুখরিত হয়, ঠিক সেই সময়ই পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহল থেকে শুরু করে ঝাড়খণ্ডের বিস্তীর্ণ মালভূমি অঞ্চলে এক ভিন্ন স্বরের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। যেখানে শক্তিরূপিনী দেবী দুর্গা নন, বরং পূজিত বা স্মরিত হন মহিষাসুর– যাকে আদিবাসী সাঁওতাল ও কুর্মি-সমাজ চেনে তাদের বীর রাজা ‘হুদুড় দুর্গা’ হিসেবে। তা কেবল একটি ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বরং আর্য-অনার্য দ্বন্দ্বের এক দীর্ঘ ইতিহাসের মৌখিক পরম্পরা।

হুদুড় দুর্গা (Hudur Durga) কে? সাঁওতালি লোকগাথা ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে ‘হুদুড়’ শব্দের অর্থ হল প্রচণ্ড শক্তিশালী বায়ুপ্রবাহ বা ঝড়। আর ‘দুর্গা’ শব্দটি এখানে কোনও নারীদেবতার প্রতীক নয়, বরং এটি একটি উপাধি, যা ‘দুর্ভেদ্য’ বা ‘অপরাজেয় রক্ষক’কে বোঝায়। সাঁওতালদের আদিপুরুষ ও বীরযোদ্ধা হিসেবে ‘হুদুড় দুর্গা’ তাদের কাছে এক দেবতুল্য চরিত্র।

গবেষকদের মতে, মহিষাসুর বা হুদুড় দুর্গা ছিলেন খেড়ওয়াল (সাঁওতালদের প্রাচীন জাতিগোষ্ঠী) জাতির এক অসীম সাহসী রাজা। তিনি ছিলেন তাঁর প্রজারক্ষক এবং কৃষিজীবী অনার্য সমাজের পথপ্রদর্শক।

ভারতবর্ষের ইতিহাস ও পুরাণ পাঠের ক্ষেত্রে, আমরা সাধারণত একটি আধিপত্যকামী বয়ান শুনতে অভ্যস্ত। যেখানে দেবতারা সুসভ্য, ধার্মিক এবং অসুররা অন্ধকারচ্ছন্ন, অত্যাচারী। কিন্তু এই বয়ানের সমান্তরালে প্রবহমান আদিবাসী লোকগাথা আমাদের এক সম্পূর্ণ ভিন্ন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। বিশেষ করে রাঢ়বঙ্গ ও জঙ্গলমহলের সাঁওতাল ও খেরওয়াল জনগোষ্ঠীর কাছে মহিষাসুর বা ‘হুদুড় দুর্গা’ কোনও দানব নন, বরং তিনি ছিলেন তাদের মহান রাজা, রক্ষাকর্তা এবং এক বীর শহীদ। আর্য ও অনার্য সংস্কৃতির এই সংঘাতের প্রেক্ষাপটে হুদুড় দুর্গার আখ্যানটি কেবল একটি লোককথা নয়, বরং এটি একটি জাতির আত্মপরিচয় রক্ষার লড়াইয়ের দলিল।

নৃতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিকদের মতে, আর্যদের ভারত আগমনের সময় এদেশের আদি বাসিন্দা বা অনার্যদের সঙ্গে তাদের দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষ হয়েছিল। আর্যরা ছিল পশুপালক ও যাযাবর, অন্যদিকে অনার্যরা ছিল কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় অভ্যস্ত। আর্যরা যখন সিন্ধু অববাহিকা থেকে গাঙ্গেয় উপত্যকার দিকে অগ্রসর হতে থাকে, তখন তারা স্থানীয় শক্তিশালী রাজাদের বা গোষ্ঠীপ্রধানদের বাধার মুখে পড়ে।

পুরাণে যাদের ‘অসুর’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে, তাঁরা আসলে ছিলেন স্থানীয় ভূমিপুত্র বা আদিবাসী জনজাতি। ‘অসুর’ শব্দটি সংস্কৃত ‘অ’ এবং ‘সুর’ (দেবতা নয় যারা) থেকে এলেও, আদিবাসী নৃতত্ত্ব অনুযায়ী, তাঁরা ছিলেন অজেয় শক্তির অধিকারী যোদ্ধা। হুদুড় দুর্গা এমনই এক অনার্য বীর, যিনি আর্যদের সাম্রাজ্য বিস্তারে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

সাঁওতালি লোকগাথা অনুযায়ী, হুদুড় দুর্গা ছিলেন খেরওয়াল জাতির অতি জনপ্রিয় রাজা। তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ এবং তাঁর শাসনামলে প্রজারা অত্যন্ত সুখে ছিল। তাঁর শারীরিক শক্তি ও সমরকৌশল এতই উন্নত ছিল যে, আর্য দেবতারা সম্মুখ সমরে তাঁর কাছে বারবার পরাজিত হচ্ছিলেন। সাঁওতালদের বিশ্বাস অনুযায়ী, হুদুড় দুর্গা শব্দটি এসেছে ‘হুদুড়’ (প্রচণ্ড শক্তিশালী ঝড়) এবং ‘দুর্গা’ (দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা) থেকে। অর্থাৎ, তিনি ছিলেন এমন এক শাসক যাকে পরাজিত করা ছিল অসম্ভব। আর্যরা যখন বুঝতে পারে যে, গায়ের জোরে বা যুদ্ধের ময়দানে এই বীরকে হারানো যাবে না, তখন তারা কূটকৌশলের আশ্রয় নেয়।

পৌরাণিক কাহিনিতে, দেবী দুর্গা দেবতাদের তেজোরাশি থেকে সৃষ্ট এক মহাশক্তি। কিন্তু আদিবাসী পাঠে এই চিত্রনাট্য বদলে যায়। সাঁওতালদের লোকসংস্কৃতি অনুযায়ী, আর্যরা হুদুড় দুর্গার একটি বিশেষ দুর্বলতা খুঁজে পায়। অনার্য সমাজ, বিশেষ করে খেরওয়াল বা সাঁওতালদের মধ্যে নারীর সম্মান অত্যন্ত উচ্চে। তাঁদের সামাজিক নীতি অনুযায়ী, কোনও পুরুষ কোনও নারীর ওপর অস্ত্র তুলতে পারেন না, এমনকী আত্মরক্ষার খাতিরেও নয়। এই নীতিকে হাতিয়ার করে আর্যরা এক সুন্দরী নারীকে (যাঁকে পুরাণে দেবী দুর্গা বলা হয়েছে) হুদুড় দুর্গার রাজ্যে পাঠায়। সাঁওতালি পরম্পরা দাবি করে, সেই নারী হুদুড় দুর্গার সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করে এবং বিশ্বাস অর্জন করে। কেউ কেউ বলেন, বিবাহের প্রস্তাব বা মৈত্রীর আড়ালে এই নারী রাজার অন্তঃপুরে প্রবেশ করেছিল। আর্যদের নির্দেশিত এই কৌশলের মূল লক্ষ্য ছিল, রাজাকে নিরস্ত্র অবস্থায় আক্রমণ করা।

ষষ্ঠী থেকে দশমী– যখন বাঙালির ঘরে ঘরে উৎসবের ঢল, আদিবাসী সমাজে তখন বিষাদের ছায়া। লোকগাথা বলে, যুদ্ধের এক পর্যায়ে যখন সেই নারী হুদুড় দুর্গার সামনে যুদ্ধংদেহী মূর্তিতে অবতীর্ণ হন, তখন রাজা হুদুড় দুর্গা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান। তিনি দেখলেন, তাঁর সামনে এক নারী অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে। সাঁওতাল জাতির চিরন্তন সংস্কার অনুযায়ী, নারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা কাপুরুষতা। হুদুড় দুর্গা জানতেন, তিনি যদি অস্ত্র ধরেন, তবে তিনি জয়ী হবেন, কিন্তু তাতে তাঁর জাতির আদর্শ লুণ্ঠিত হবে। নিজের নীতি এবং জাতির সম্মান-রক্ষার্থে তিনি হাতে থাকা ঢাল-তলোয়ার ত্যাগ করেন। পৌরাণিক চিত্রে আমরা দেখি, দুর্গা মহিষাসুরকে ত্রিশূল দিয়ে বিদ্ধ করছেন, কিন্তু অনার্য-বয়ান বলে– এটি কোনও যুদ্ধ ছিল না, এটি ছিল নিরস্ত্র বীরের ওপর, এক নারীর মাধ্যমে আর্যদের সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

হুদুড় দুর্গা নিহত হওয়ার পর অনার্য সমাজ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। তাদের ভূমি দখল করে নেওয়া হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষ তাদের প্রিয়-রাজার মৃত্যু মেনে নিতে পারেনি। তাদের মনে এক ক্ষীণ আশা ছিল যে, রাজা হয়তো মারা যাননি, তিনি শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে বনের গভীরে বা গুহায় আত্মগোপন করেছেন। এই ‘নিখোঁজ রাজা’কে খুঁজে বের করার প্রচেষ্টাই কালক্রমে ‘দাঁশাই নাচ’-এ রূপ নিয়েছে।

দাঁশাই নাচের সময় পুরুষরা কেন নারীর পোশাক পরেন? এর কারণ হল, আর্য সৈন্যরা পুরুষদের দেখলেই হত্যা করত। তাই আর্যদের চোখে ধুলো দিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামে নিখোঁজ রাজাকে খুঁজে বের করার জন্য অনার্য পুরুষরা নারীর ছদ্মবেশ ধারণ করেছিলেন।

হাতে ভুয়াং (এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র) নিয়ে তাঁরা যখন নাচেন, তখন প্রতিটি গানের আগে বলেন ‘হায় রে হায় রে’। এই ‘হায় রে’ শব্দটির মাধ্যমে তাঁরা তাঁদের হারিয়ে যাওয়া বীর রাজার জন্য বিলাপ করেন। এটি কোনও আনন্দের নাচ নয়, এটি একটি করুণ অনুসন্ধানের পদযাত্রা।

পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া এবং বর্ধমান (বর্তমানে পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান) জেলার আদিবাসী পল্লিগুলোতে এই প্রথা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। বিশেষ করে রাঢ়বঙ্গের মাটিতে যেখানে সাঁওতাল ও কুর্মি জনজাতির বসবাস বেশি, সেখানে দুর্গাপুজোর সময়টা আনন্দের বদলে শোকের আবহ নিয়ে আসে। বহু আদিবাসী গ্রাম এখনও আছে যেখানে দুর্গাপুজোর দিনগুলোয় প্রদীপের আলো জ্বালানো হয় না, বা মাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ থাকে।

সাম্প্রতিক কালে, হুদুড় দুর্গার আখ্যানটি দলিত ও আদিবাসী পরিচিতি রাজনীতির (Identity Politics) এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এটি মূলধারার হিন্দু পৌরাণিক বয়ানের বিপরীতে একটি ‘বিকল্প ইতিহাস’ (Alternative History) হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। নৃতাত্ত্বিকদের মতে, ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন কৃষিভিত্তিক সভ্যতা এবং যাযাবর পশুপালক আর্যদের মধ্যকার সংঘাতই এই উৎসবের মূল উৎস। মহিষাসুর শব্দটির মধ্যে ‘মহিষ’ যুক্ত থাকা ইঙ্গিত দেয় যে, তিনি সম্ভবত কোনও মহিষ-পালক উপজাতির প্রধান ছিলেন। বৈদিক আর্যদের ইন্দো-ইউরোপীয় সংস্কৃতির সঙ্গে স্থানীয় প্রাগৈতিহাসিক সংস্কৃতির যে টক্কর হয়েছিল, হুদুড় দুর্গার আখ্যান তারই এক বিবর্তিত রূপ।

হুদুড় দুর্গা বা মহিষাসুর বন্দনা প্রমাণ করে যে, ভারতবর্ষের সংস্কৃতি একরৈখিক নয়। এখানে একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিজয় এবং শোকের দুটি সমান্তরাল ধারা বয়ে চলেছে। বাংলার লোকসংস্কৃতিতে হুদুড় দুর্গা কেবল এক হারিয়ে যাওয়া রাজার গল্প নয়, বরং প্রান্তিক মানুষের নিজস্ব কণ্ঠস্বর এবং তাঁদের শেকড়ের সন্ধানের এক অনন্য দলিল। যখন মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীর আরাধনা হয়, তখন জঙ্গলমহলের নির্জন কোনও আখড়ায় ভুয়াং-এর শব্দে বেজে ওঠে এক চিরন্তন হাহাকার– নিজের মাটিকে রক্ষা করতে গিয়ে পরাজিত হওয়া এক মহানায়কের জন্য। @ আবির সরকার

তথ্যসূত্র
সাঁওতালি লোকসংস্কৃতি ও দাঁশাই নাচ, মহাদেব হাঁসদা, কলকাতা (২০১২)।
ভারতের আদিবাসী সমাজ ও ইতিহাস, কুণাল চট্টোপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ।
রাঢ়বঙ্গের লোকদেবতা ও সমাজভাবনা, অলক সরকার, লোকসংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্র।


১৪


বাঙালিয়ানা 

বাঙালি মুসলমান হয়েছে আটশো বছর আগে। তার আগে ছিলো হিন্দু। এর আগে ছিলো বৌদ্ধ। শুরুতে ছিলো অনার্য তথা দ্রাবিড়। এই দ্রাবিড়রা ছিলো মূলত 'বাঙালি।'

বাঙালি বহুবার রাষ্ট্র বদল করেছে। শুরুতে রাষ্ট্র ছিলো না, কোন সাম্রাজ্যেও ছিলো না। ছিলো স্বাধীন। সে স্বাধীন-অনার্য বাঙালিকে প্রথমে আর্যরা এসে তাদের ধর্মে অন্তর্ভুক্ত করে। তার বহু পরে সম্রাট অশোক বাঙালিকে বৌদ্ধ বানিয়ে নিজের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নতুন এক আইডেন্টিটি দিয়েছেন। তারপর হিন্দু রাজারা তাদের হিন্দু রাজত্বের আওতাভুক্ত করে তাদেরকে হিন্দু আইডেন্টিটি জুড়ে দিয়েছেন। সবশেষে বখতিয়ার খলজির বাংলা জয়ের পর বাঙালির বৃহৎ অংশ মুসলমান হয়ে ওঠেছে।

এরই মধ্যে বাঙালির রাষ্ট্র বদল ঘটেছে কয়েকবার। শুরুতে বৌদ্ধ-হিন্দু বিভিন্ন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত থেকে পরবর্তীতে বাঙালি ব্রিটিশ-ভারতীয় অন্তর্ভুক্ত হয়ে, তারপর পাকিস্তান নামক একটি রাষ্ট্রের মধ্যে চব্বিশ বছর থেকে এখন 'বাংলাদেশে' আছে। কিন্তু বাংলাদেশে আবার সমগ্র বাঙালি নেই। বাঙালির একাংশ এখানে, আরেকাংশ এখনো ভারত রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়ে বসবাস করতেছে।

বাঙালি বৌদ্ধ হওয়ার পর বাঙালির প্রধান উৎসব ছিলো 'বুদ্ধ পূর্ণিমা', হিন্দু হওয়ার পর প্রধান উৎসব ছিলো 'দূর্গা পূজা' মুসলমান হওয়ার পর প্রধান উৎসব হয়েছে 'ঈদুল ফিতর।' এদিকে বাঙালি কখনো ভারতের স্বাধীনতা দিবস, কখনো পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস পালন করে এসেছে, সবশেষ বাঙালির একাংশ এখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস পালন করে। এগুলো সবই পরিবর্তিত, বিবর্তিত, রুপান্তরিত হয়েছে, হচ্ছে।

বাঙালির ধর্ম পরিচয়, রাষ্ট্র পরিচয়ের সাথে বাঙালির সকল পরিচয় পরিবর্তন হয়ে যায়। কিন্তু বাঙালির একটি পরিচয় অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, সেটি হলো, বাঙালিয়ানা ( বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য, বাংলা সুর-সংগীত, বাংলার ভাত-মাছ, বাংলার নদ-নদী, বাংলার নর-নারী, বাংলার শাড়ী-লুঙ্গি-পাঞ্জাবি, বাংলার পশুপাখি, জলাজঙ্গল, বাঁশির সুর, ধান, পাট, বক, চিল, টেপা পুতুল, পেঁচা, ময়ূরের পেখম, আকাশ-বাতাস, দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ, শিশুর সতেজ হাসি, সবুজের সমারোহ)

এই বাঙালিয়ানা বিবর্তিত হয়েছে। বহুকিছু বিলুপ্ত হয়েছে। বহু কিছু যুক্ত হয়েছে। কিন্তু বাংলা ভাষা হারায়নি, বাংলা সংগীত-সুর আর বাংলার সবুজ হারায়নি। এই বাংলা সংগীত, সুর আর সবুজের নীড়ে বারবার রচিত হবে-

'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।'

নোট:

আর্যরা পৌত্তলিক ছিল না, স্থানীয় অনার্যরা প্যাগান ছিল, কিছু অনার্য আবার লিঙ্গ বা প্রস্তরের মাধ্যমে ঈশ্বর উপাসনা করতো যেটা প্যাগান আর নিরাকারের মাঝামাঝি। আর্যরা অগ্নি উপাসক ছিল, নদী বা সমুদ্র পাশে বা বৃক্ষ কিংবা পাহাড়ে যাগ যজ্ঞ করত, আর্যরা ছিল মূলত ইরান আর সেন্ট্রাল এশিয়ান অঞ্চলে, পরে সিন্ধু বা হরপ্পা সভ্যতার মাধ্যমে ভারতে বিস্তার লাভ করে এটা তার আগে ছিল কিনা ঠিক প্রমাণ পাওয়া যায় না, থাকলেও সেটা ধ্বংসপ্রাপ্ত হতে পারে। যাই হোক আর্যরা অনার্য প্যাগানদের সাথে মিশেই আর্য যাগ যজ্ঞ আর অনার্য মূর্তি পূজা লিঙ্গ উপাসনার মেলবন্ধনে তৈরি করে সনাতন ধর্ম, যেটা আপাদমস্তক প্রকৃতি উপাসনা, অনার্যরাও প্রকৃতির পূজাই করতো শুধু ডিফারেন্স ছিল প্রকৃতিকে মূর্তির মাধ্যমেও উপাসনা করতো তারা। বাঙ্গালী রাজা শশাঙ্কের সময় মূলত হিন্দু হয় তার আগে কেও প্রকৃতি উপাসক অনার্য শ্রমণ ধর্মানুসারী আর কেও বৌদ্ধ ছিল, হিন্দু হবার পর বাঙ্গালীর প্রধান উৎসব ছিল গাযন, শিবরাত্রি, দোল এগুলো। দুর্গাপূজো অনেক পরে আসে বাঙ্গালীর কাছে, মূলত ১৫ শতকের দিকে দুর্গাপূজার প্রবর্তন হয় বাংলায় রাজশাহীর তাহেরপুরের জমিদার কংস নারায়ণের হাত ধরে যেটা ছিল বসন্তকালীন দুর্গাপূজা বা বাসন্তী পূজা, শারদীয় দুর্গাপূজা বলে মিছু ছিল না তখন, শারদীয় পূজা আসে সম্ভবত নদীয়ার রাজা কৃষ্ণ চন্দ্র রায়ের সময়। 



ফিলিপস রেডিও বৃত্তান্ত -১৯৬৯ সালে এদেশে ট্রান্সকম ইলেকট্রনিকস ফিলিপস রেডিও আমাদানি করেন,১৯৩১ সালে ডাচনাগরিক এন্টনি ফিলিপস, ফিলিপস রেডিও তৈরি করেন

১৯৭০ সালে ফিলিপস রেডিও ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে কারন পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের উত্তাল সময়ের খবর ফিলিপস রেডিওর কল্যাণে  বিবিসি নিউজে শুনা যেত।

গ্রামে বিয়ের সময় যৌতুক হিসেবে ফিলিপস রেডিও দেওয়া হতো,অনেক যুবক বাবার সম্পত্তি বিক্রি করে ফিলিপস রেডিও ক্রয় করতেন, নতুন জামাই ফিলিপস রেডিও হাতে নিয়ে শ্বশুর বাড়ীতে আসতেন,গ্রামের কৃষক জমির আইলে ফিলিপস রেডিও রেখে জমিতে কাজ করতেন

কালক্রমে বর্তমান প্রজন্ম বলতে পারবেনা ফিলিপস রেডিও  সম্পর্কে


১৫

কার্যকর চিন্তাভাবনার ৬ কৌশল

আপনি ব্যবসা করুন বা চাকরিতে থাকুন, উন্নতির জন্য নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর এই উন্নতির পথে সবচেয়ে বড় সহায়ক হলো কার্যকরভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা। সঠিকভাবে চিন্তা করতে পারা এক ধরনের দক্ষতা, যা আয়ত্তে আনতে পারলে নিজের কাজের প্রতি আত্মতৃপ্তি যেমন বাড়ে, তেমনি ফলাফলও হয় আরও উন্নত। তবে পরিকল্পনা ছাড়া হঠাৎ করে কোনো সিদ্ধান্ত বা চিন্তা তুলে ধরলে তা অনেক সময় ব্যবস্থাপকদের কাছে অগভীর বলে মনে হতে পারে।

তাই প্রয়োজন গুছিয়ে, ভেবেচিন্তে এগোনো। নিচে এমন কিছু টিপস তুলে ধরা হলো, যা আপনাকে কার্যকরভাবে চিন্তা করতে এবং সফলতার পথে এগিয়ে যেতে সহায়তা করবে।

১. প্রচলিত ধারার বাইরে ভাবতে শিখুন

নিজের কর্মস্থলে কোনো কিছু চিন্তা করার চেষ্টা করবেন না। এটি ভালো দুটি কারণে-

এক. চিন্তা করার জন্য আপনাকে একটি শান্ত পরিবেশ দরকার, যেখানে আপনার মনের দুয়ার উন্মুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকবে।

দুই. চিন্তা করাকে আপনার ব্যবসায়িক কাজের সঙ্গে গুলিয়ে না ফেলা। চিন্তা করে আইডিয়া বের করা যদি কাজের অংশ হিসেবে ধরে থাকেন, দেখবেন প্রতি মাসে সঠিক চিন্তাধারা আর আইডিয়ার খরা চলবে। 

২. মূল বিষয়কে ফোকাস করুন

চিন্তা শুরু করুন একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে প্রাধান্য করে এবং তাতেই পুরোটা সময় যতটা সম্ভব মনোনিবেশ করুন। যেমন আপনি কোম্পানির পরবর্তী পণ্য নিয়ে চিন্তা না করে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী যা যা পণ্য দরকার তা নিয়ে ভাবতে পারেন। পণ্যের ফিচার বাদ দিয়ে পণ্যের যেসব মান ক্রেতার কাজে আসবে তা নিয়ে চিন্তা করুন।

চিন্তাধারায় বাধ্যবাধকতা রাখতে কুণ্ঠাবোধ করবেন না, অনেকেই ভাবে বাধ্যবাধকতা থাকলে সৃজনশীল চিন্তাধারা ব্যাহত হয়, কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটি একদম ভিন্ন। সব অপশন নিয়ে বসে থাকলে আপনার বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকবে। তাই একটি সমস্যাকে কেন্দ্র করে আপনার চিন্তাকে এগিয়ে নিয়ে যান, যাতে আপনি ওই সমস্যা সমাধানে সৃজনশীল আইডিয়া বের করতে পারেন।

৩. আইডিয়া বানান, পরিকল্পনা নয়

চিন্তাধারা দিয়ে কোনো পরিকল্পনা বা রোডম্যাপ নয়, বরং আইডিয়া এবং সেগুলোর চ্যালেঞ্জ খুঁজে বের করতে হবে। উচ্চপর্যায়ের একটি আইডিয়া বের করে দলের সবাইকে সেই আইডিয়াকে বিভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে চ্যালেঞ্জ করে দেখতে হবে। আইডিয়া বের করা আর সেটা চ্যালেঞ্জ করার মধ্যে পার্থক্য আছে অবশ্যই কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আপনি তাতে দক্ষ হয়ে উঠবেন এবং কখন পরবর্তী আইডিয়া নিয়ে ভাবতে হবে তা আপনি নিজেই বুঝে যাবেন।

৪. মানসিক পরিকল্পনা করুন

মাইন্ড ম্যাপের সাহায্যে সবকিছুর নোট নিন আপনার মনের মধ্যে যা আপনার চিন্তাধারাকে শানিত করবে। মাইন্ড ম্যাপ দিয়ে আপনি একটি কেন্দ্রীয় আইডিয়ার জন্য আরও সমগোত্রীয় আইডিয়া খুঁজে পেতে পারবেন। এভাবে মনের মধ্যে আইডিয়ার বিন্যাস করা গতানুগতিক নোট নেওয়ার চেয়ে বেশি কার্যকর।

৫. অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখুন

বিরক্তিকর মানুষ আপনার চিন্তাধারার ব্যাঘাত ঘটাবেই। একজন হয়তো আপনার আইডিয়াকে মেনে নিতে পুরোপুরি অস্বীকৃতি জানাবে। আইডিয়াকে হতে হবে বাস্তবসম্মত আর কোনো আইডিয়াকে নাকচ করে দেওয়ার আগে অন্তত একটি ফিডব্যাক জানানো জরুরি। যারা আইডিয়াকে নাকচ করে দেয় তাদের বর্জন করতে হবে। আরেক ধরনের মানুষ আছে যারা একটি আইডিয়া পেলেই তা নিয়ে চিন্তাধারা ডালপালা ছড়িয়ে দেয় এবং আর অন্য কোনো কিছুর ব্যাপারে খেয়াল থাকে না। চিন্তাধারার মূল লক্ষ্য একটি আইডিয়া নিয়ে পড়ে থাকা নয়। যতক্ষণ না পর্যন্ত সবাই আইডিয়ার ব্যাপারে একমত হচ্ছে, ততক্ষণ চিন্তাধারার সেশন চালু রাখা উচিত।

৬. পরবর্তী করণীয় ঠিক করুন

চিন্তাধারা সেশন শেষ করে দিলেন পরবর্তী করণীয় ঠিক না করেই- তাহলে সেটা হবে বোকামি এবং তখন চিন্তা করার প্রক্রিয়াটাই পুরো ভেস্তে যাবে। যদি কোনো আইডিয়া নিয়ে পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে আপনার হাতে সময় না থাকে, তাহলে আপনার কষ্ট করে চিন্তা করার প্রক্রিয়ায় শরিক না হওয়াটাই শ্রেয়। পরবর্তী সময়ে আইডিয়া নিয়ে সবার সঙ্গে কথা বলুন এবং কী করা উচিত তা নির্ধারণ করে কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যান। @ তারেক বিন ফিরোজ


১৬


বন্ধুদের সাথে দেয়া প্রতিটি আড্ডাকে স্মরণীয় করে তুলবেন যেভাবে

কেন প্রতিটি আড্ডা একইরকম লাগে

একটু ভেবে দেখুন। বেশিরভাগ আড্ডায় কী নিয়ে কথা হয়? কাজের চাপ, কে কোথায় ভাল আছে, অমুকের বিয়ে হল, তমুকের প্রমোশন হল, দেশের অবস্থা ভাল না—এই প্রসঙ্গগুলি ঘুরেফিরে আসে। প্রথমবার হয়ত মনোযোগ দিয়ে শোনেন, তৃতীয়বার শুনতে শুনতে সবাই মোবাইলে স্ক্রল করছেন।

এটা হয় কারণ আড্ডার কোনো কাঠামো থাকে না। সবাই ক্লান্ত হয়ে আসেন, কেউ নতুন কিছু তৈরি করার শক্তি রাখেন না, তাই পরিচিত প্রসঙ্গেই ফিরে যান। 

আরেকটা বিষয় হল, আমরা বেশিরভাগ আড্ডায় কথা বলি, কিন্তু কিছু করি না। শুধু কথা বললে মানুষ একে অপরের কথা জানে, কিন্তু একটা ভাল মুহূর্ত তৈরি হয় না। মুহূর্ত তৈরি হয় একসাথে কিছু করলে, একসাথে কোনো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেলে।

মনোবিজ্ঞানের একটা পুরোনো পর্যবেক্ষণ আছে—মানুষ সম্পর্ক মনে রাখে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে, শুধু কথোপকথনের মাধ্যমে না। যে বন্ধুর সাথে একবার ট্রেন মিস করেছিলেন, রাতে স্টেশনে আটকে ছিলেন, সেই বন্ধুর কথা আলাদাভাবে মনে থাকে। কারণ সেদিন শুধু কথা হয়নি, কোনো ঘটনাও ঘটেছিল।

তাই, একটা ছোট পরিবর্তন আনুন—জায়গা বদলান

একই চায়ের দোকান, একই রেস্তোরাঁ, একই কারো বাসা—এই পরিচিত জায়গাগুলি আরামদায়ক, কিন্তু মস্তিষ্ক সেখানে গেলে পুরোনো প্যাটার্নেই চলে যায়। একই জায়গা, একই আলোচনা।

নতুন জায়গায় গেলে মস্তিষ্ক একটু সজাগ হয়। চারপাশটা নতুন বলে মনোযোগ একটু ভিন্ন থাকে। কথাও ভিন্ন হয়।

এটা বড় কোনো পরিবর্তন না। একই এলাকায় এমন একটা জায়গা খুঁজুন যেখানে আগে যাননি। একটা পুরোনো পাড়ার গলির ভেতরে চায়ের দোকান, একটা ছাদ আছে এমন জায়গা, একটা পার্ক—যেখানে পরিবেশটা একটু আলাদা। জায়গা বদলালে কথাও বদলায়।

কথার বাইরে গিয়ে কিছু করুন

এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একসাথে কিছু করলে সেটা মনে থাকে, শুধু কথা বললে থাকে না।

কিন্তু এখানে "কিছু করা" মানে বড় পরিকল্পনা না। বড় ট্যুর, দামি রেস্তোরাঁ, বিস্তারিত আয়োজন—এগুলি মাঝে মাঝে হয়, কিন্তু প্রতিবার সম্ভব না। ছোট ছোট কাজও মুহূর্ত তৈরি করতে পারে।

একজনের বাসায় সবাই মিলে একটা রান্না করুন। কে কী আনবে ঠিক করুন, একসাথে রাঁধুন, একসাথে খান। রান্নার সময় কথা হয়, হাসি হয়, কেউ ভুল করলে সবাই মিলে ঠিক করে। এই পুরো প্রক্রিয়াটাই একটা গল্প হয়ে যায়।

একসাথে কিছু শিখুন। ইউটিউবে একটা ভিডিও দেখে একসাথে চেষ্টা করুন। অরিগামি, কোনো সহজ রেসিপি, এমনকি একটা কার্ড গেম যেটা কেউ জানে না। নতুন কিছু শেখার সময় সবাই একটু অসহায় থাকে, সেই অসহায়ত্বটা একসাথে ভাগ করলে একটা আলাদা ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।

পুরোনো ছবি বা ভিডিও দেখুন। যদি দীর্ঘদিনের বন্ধু হন, পুরোনো ছবি বের করুন। কলেজের ছবি, আগের কোনো ট্যুরের ভিডিও। এগুলি দেখলে আলোচনা নিজে থেকেই গভীর হয়ে যায়।

আড্ডায় সত্যিকারের কথা হোক

এই বিষয়টা নিয়ে কম কথা হয়, কিন্তু এটা অনেক বড়।

বেশিরভাগ আড্ডায় আমরা পৃষ্ঠের কথা বলি। কে কী করছে, কোথায় যাচ্ছে, কী কিনল ইত্যাদি। এসব আসলে তথ্য—কথোপকথন না। কথোপকথন হল যখন কেউ বলে "আসলে এই বছরটা আমার জন্য বেশ কঠিন ছিল" এবং বাকিরা সত্যিকার মনোযোগ দিয়ে শোনে।

কিন্তু এই কথাগুলি আপনাআপনি আসে না। কারো না কারো শুরু করতে হয়।

একটা সহজ উপায় হল, সরাসরি জিজ্ঞেস করুন। "সত্যি করে বল তো, তুই কেমন আছিস?" এই প্রশ্নটা "কেমন আছিস" থেকে আলাদা। এটা শুনলে মানুষ থামে, একটু ভাবে, তারপর সত্যিকারের উত্তর দেয়।

অথবা একটা প্রশ্ন রাখুন আড্ডার মাঝে। "এই বছর এমন কী হয়েছে যেটা তুই ভাবিসনি?" বা "এখন এমন কী একটা জিনিস শিখতে চাও যেটা কখনও চেষ্টা করোনি?" এই ধরনের প্রশ্ন কথাকে অন্য দিকে নিয়ে যায়। মানুষ আড্ডায় এই ধরনের প্রশ্ন আশা করে না, তাই একটু অবাক হয়, তারপর সত্যিকারের কথা বলে।

ফোন দূরে রাখুন (অন্তত কিছুক্ষণের জন্য)

এটা বলতে বলতে ক্লিশে হয়ে গেছে, তবু বলতে হবে।

দলে পাঁচজন থাকলে দেখুন কতজন মাঝে মাঝে ফোন দেখছে। কেউ ছবি তুলছে, কেউ মেসেজ দেখছে, কেউ স্ক্রল করছে। সবাই একই জায়গায় আছে, কিন্তু মনোযোগ বিভক্ত।

ফোন না রাখলে কথা পুরোপুরি শোনা হয় না। কথা পুরোপুরি শোনা না হলে কেউ সত্যিকারের কথা বলে না। সত্যিকারের কথা না হলে আসলে আড্ডায় গভীরতা তৈরি হয় না।

একটা ছোট নিয়ম করতে পারেন: খাওয়ার সময় সবার ফোন টেবিলের একপাশে থাকবে। শুধু এতটুকু। পুরো আড্ডায় না, শুধু খাওয়ার সময়। এটুকুতেই পার্থক্য টের পাবেন।

মাঝে মাঝে দুজনে দেখা করুন

সবাই একসাথে মানেই সেরা আড্ডা, এটা সত্যি না।

পাঁচ-ছয়জনের দলে প্রত্যেকের সাথে প্রত্যেকের গভীর কথা হওয়া কঠিন। কেউ চুপ থাকে, কেউ বেশি কথা বলে, কেউ এক কোণে চলে যায়।

দুজনে দেখা করুন মাঝে মাঝে। যে বন্ধুর সাথে আসলে অনেকদিন মন খুলে কথা হয়নি, তাকে আলাদা করে ডাকুন। দুজনের আড্ডায় কথা গভীর হয়, মনোযোগ ভাগ হয় না এবং সেই বন্ধুর জীবনটা আসলে কেমন যাচ্ছে বোঝা যায়।

বড় দলের আড্ডার পাশাপাশি এই একের-পর-এক সময়গুলি বন্ধুত্বকে টিকিয়ে রাখে।

স্মরণীয় মুহূর্ত পরিকল্পনা করে হয় না, কিন্তু মাটি তৈরি করা যায়

সেরা স্মৃতিগুলি সাধারণত অপরিকল্পিত হয়। কোনো একটা আড্ডায় হঠাৎ বৃষ্টি এলো, সবাই ভিজলেন। কেউ একটা হাস্যকর কথা বলল, সবাই এত হাসলেন যে চোখে জল এলো। কেউ একটা পুরোনো গল্প বলল যেটা সবাই ভুলে গিয়েছিল।

এগুলি পরিকল্পনা করা যায় না। কিন্তু এগুলি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ানো যায়।

সম্ভাবনা বাড়ে যখন সবাই মানসিকভাবে উপস্থিত থাকে। ফোন সরিয়ে, কথায় মনোযোগ দিয়ে, নতুন কিছুর মধ্যে থেকে। তখন অপ্রত্যাশিত মুহূর্তগুলি আসার জায়গা পায়।

মাটি তৈরি করুন। ফুল নিজে থেকেই ফুটবে।

জায়গা বদলান। একসাথে কিছু করুন। সত্যিকারের প্রশ্ন করুন। ফোন সরিয়ে রাখুন। মাঝে মাঝে দুজনে দেখা করুন।

এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলি আড্ডাকে অনুষ্ঠান থেকে অভিজ্ঞতায় বদলে দেয়। আর অভিজ্ঞতাগুলিই মনে থাকে, বছরের পর বছর। @City Alo


১৭


অফিসের কর্মী, বাড়ির বুয়া, ড্রাইভার ও গার্ড পুনঃনিয়োগ করবেন না

বর্তমান নগর জীবনে গৃহকর্মী, ড্রাইভার ও নিরাপত্তাকর্মীরা অনেক পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তবে সম্পর্কটি যতই ঘনিষ্ঠ মনে হোক, এটি মূলত একটি পেশাগত সম্পর্ক, আবেগের নয়। অনেক পরিবার ভুল করে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া কর্মীকে পুনরায় নিয়োগ দেয়, যা ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব কর্মী অসন্তোষ বা স্বার্থহানির কারণে চাকরি হারায়, তাদের মধ্যে প্রতিশোধমূলক আচরণের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি থাকে। তাই ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও পারিবারিক গোপনীয়তা রক্ষায় পুনঃনিয়োগের সিদ্ধান্ত খুব সতর্কতার সাথে নেওয়া উচিত।

প্রথমত, চাকরি থেকে বাদ দেওয়া কর্মীরা অনেক সময় সামাজিকভাবে বদনাম ছড়ানোর মাধ্যমে প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করে। তারা পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয়, ব্যক্তিগত তথ্য বা ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা ঘটনা বাইরে প্রচার করে পরিবারের সম্মান ক্ষুণ্ণ করতে পারে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কর্মক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তি নিজের মানসিক আঘাত ঢাকতে নেতিবাচক গুজব ছড়ানোর পথ বেছে নেয়। পুনঃনিয়োগ করলে সেই কর্মী পূর্বের অসম্পূর্ণ স্বার্থ হাসিলের সুযোগ খোঁজে। অনেক ক্ষেত্রে তারা আর্থিক সুবিধা, অতিরিক্ত প্রভাব বা ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। এর ফলে নিয়োগকর্তা ধীরে ধীরে নিজের ঘরেই অনিরাপদ হয়ে পড়েন।

দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা ঝুঁকিই সবচেয়ে বড় বিষয়। ড্রাইভার, গার্ড বা গৃহকর্মীরা ঘরের সময়সূচি, অর্থনৈতিক অবস্থা, সদস্যদের চলাফেরা ও দুর্বল মুহূর্ত সম্পর্কে বিস্তারিত জানে। নিরাপত্তা গবেষণায় বলা হয়, অধিকাংশ বাসাবাড়ির চুরি বা হামলার ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ তথ্য বড় ভূমিকা রাখে। অসন্তুষ্ট বা স্বার্থান্বেষী সাবেক কর্মী সেই তথ্য প্রতিবেশী, প্রতিদ্বন্দ্বী বা অপরাধী চক্রের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। এমনকি পুনঃনিয়োগের পর তারা বিশ্বাস অর্জন করে আরও বড় ক্ষতির সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাই পরিবার পরিচালনায় তথ্যের সীমাবদ্ধতা অত্যন্ত জরুরি। বাড়ির সব সিদ্ধান্ত, আর্থিক তথ্য বা ব্যক্তিগত আলোচনায় তাদের সম্পৃক্ত করা নিরাপত্তার দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ।

তৃতীয়ত, পেশাগত সীমারেখা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক পরিবার মানবিকতার জায়গা থেকে পুরনো কর্মীকে ফিরিয়ে নেয়, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত আবেগ প্রায়ই সমস্যার জন্ম দেয়। কর্মসংস্থান বিষয়ক গবেষণা বলছে, পরিষ্কার নিয়ম ও দূরত্ব বজায় রাখা কর্মসম্পর্ককে সুস্থ রাখে। কর্মীকে সম্মান দেওয়া জরুরি, কিন্তু অন্ধ বিশ্বাস দেওয়া নয়। নিয়োগ, মূল্যায়ন ও বিদায় সবকিছুই পেশাগত নিয়মে হওয়া উচিত। নতুন কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে পরিচয় যাচাই, রেফারেন্স চেক ও দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখা নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হওয়া দরকার।

বাড়ির নিরাপত্তা ও সম্মান রক্ষা আবেগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চাকরি থেকে বাদ দেওয়া কর্মীকে পুনঃনিয়োগ অনেক সময় ঝুঁকি বাড়ায়, কারণ পূর্বের অসন্তোষ, গোপন তথ্যের অপব্যবহার ও ব্যক্তিগত স্বার্থের সংঘাত আবারও ফিরে আসে। সচেতন পরিবার কখনো সব তথ্য সবার কাছে উন্মুক্ত করে না এবং সম্পর্কের সীমা পরিষ্কার রাখে। মানবিক আচরণ অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু নিরাপত্তাহীন মানবিকতা কখনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তাই পরিবার, সম্পদ ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে বাড়ির বুয়া, ড্রাইভার ও গার্ড পুনঃনিয়োগ না করাই অধিক নিরাপদ সিদ্ধান্ত।

References :

International Labour Organization (ILO) – Domestic Workers and Security Risks Studies

Harvard Business Review – Employee Trust and Workplace Boundaries Research



১৮


আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাবে নিজেকে একজন পরিপূর্ণ ও শক্তিশালী মানুষ মনে হবে।

কেউ আপনার টেক্সটের রিপ্লাই দিচ্ছে না, আপনি চিন্তা, রাগ, insecurity, মাথায় নানান প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, আপনি ভাবছেন সে কি আমাকে ignore করছে?

নিজের আবেগকে নিজের কন্ট্রোলে রাখতে পারলে You stop chasing, আপনি আর কারো attention, ভালোবাসা বা approval পাওয়ার জন্য ছুটবেন না।যে আসতে চায়, সে নিজে থেকেই আসবে।

আপনি আর সবাইকে নিজেকে প্রমাণ করতে যাবেন না।

কেউ ভুল বুঝলে সেটাকে accept করতে পারবেন, সবাইকে convince করার দরকার নেই। অতিরিক্ত ব্যাখ্যা দেওয়া বন্ধ করবেন।

আপনি অন্য কারো জন্য নিজেকে ছোট ভাবা বন্ধ করে দিবেন, নিজের জায়গা, নিজের মূল্য নিয়ে confident থাকবেন।

আগে হয়তো অন্যের কথা বা আচরণে আপনার মন খারাপ হতো মুড টা পাল্টে যেত কিন্তু এখন আপনি নিজেই নিজের ইমোশনা কে কন্ট্রোল করতে পারেন। নিজেকে নিজেই  নিয়ন্ত্রণ করুন এই চাবিটা অন্যের হাতে দেবেন না।

এটা আসলে অন্যের থেকে বা দূরে হয়ে যাওয়ার বিষয় না।

মানে আপনি insensitive বা রূঢ় বা কঠিন হয়ে যাচ্ছেন না।

আপনি শুধু ভিতর থেকে strong হচ্ছেন, সবকিছুই করবেন শুধু যেটাতে আপনার আত্মসম্মানে আঘাত লাগে বা নিজেকে ছোট অনুভব করবেন, সেটা এড়িয়ে যাবেন।

যখন আপনার happiness আর compromise করার মতো কিছু থাকে না, তখন আপনি নিজের শান্তি, নিজের মূল্য কাউকে খুশি করার জন্য চেয়ে থাকেবেন না।

তখনই মানুষও আপনাকে respect করা শুরু করবে।

যেদিন আপনি নিজের শান্তিকে priority দেবেন, সেদিন থেকেই আপনার জীবনের game change হয়ে যাবে। @ লক্ষ্যপথ


 

বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট

বিশ্বাস করতেন যে, বাহ্যিক চাকচিক্য বা শারীরিক গঠনের চেয়ে মানুষের চরিত্র এবং নৈতিকতাই হলো তার আসল সৌন্দর্য। তার মতে, এই সৌন্দর্যের মূল ভিত্তি হলো মানুষের বিবেক এবং বুদ্ধিবৃত্তি।

কান্ট কেন এমনটি বলেছিলেন তার মূল কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:

কর্তব্যবোধ ও বুদ্ধিবৃত্তি:

কান্টের মতে, মানুষ অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা কারণ মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি (Rationality) আছে। যখন কোনো মানুষ কেবল নিজের ইচ্ছা বা আবেগের বশবর্তী না হয়ে বুদ্ধির নির্দেশে সঠিক কাজ (কর্তব্য) করে, তখনই তার আসল মহত্ত্ব বা সৌন্দর্য ফুটে ওঠে।

শর্তহীন আদেশ (Categorical Imperative):

তিনি মনে করতেন, নৈতিকতা কোনো লাভ-ক্ষতির হিসাব নয়। একজন মানুষ যখন এমন কাজ করে যা সবার জন্য নিয়ম হতে পারে, তখন সেই কাজের মাধ্যমেই সে প্রকৃত সৌন্দর্যের অধিকারী হয়।

মানবিক মর্যাদা (Dignity):

কান্ট বলতেন, প্রত্যেক মানুষের একটি অন্তর্নিহিত মূল্য বা মর্যাদা আছে। নৈতিকতা সেই মর্যাদাকে রক্ষা করে এবং মানুষকে অন্য কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের "উপায়" হিসেবে না দেখে বরং তাকে "লক্ষ্য" হিসেবে শ্রদ্ধা করতে শেখায়।

বিবেকের আদালত:

তিনি নৈতিকতাকে একটি "মনের আদালত" হিসেবে দেখতেন যেখানে বিচার হয় ব্যক্তির উদ্দেশ্যের ওপর ভিত্তি করে। যদি কোনো কাজের পেছনে সৎ উদ্দেশ্য থাকে, তবে সেটিই মানুষের প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে, যা কোনো কৃত্রিম সৌন্দর্যের চেয়ে অনেক বেশি দামী।

সহজ কথায়:

কান্টের কাছে সৌন্দর্য কেবল চোখে দেখার বিষয় ছিল না; বরং তা ছিল মানুষের নৈতিক দৃঢ়তা এবং সত্যের প্রতি অবিচল থাকা, যা তাকে মহিমান্বিত করে তোলে।

ইমানুয়েল কান্ট

(১৭২৪–১৮০৪) ছিলেন অষ্টাদশ শতকের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী জার্মান দার্শনিক, যাঁর চিন্তা আধুনিক দর্শনের গতিপথ বদলে দিয়েছিল। তিনি আধুনিক দর্শনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ এবং জ্ঞানতত্ত্ব (Epistemology), নীতিশাস্ত্র (Ethics) ও নন্দনতত্ত্বের (Aesthetics) ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন।

কান্টের জীবনের কিছু বিশেষ দিক

জন্ম ও বেড়ে ওঠা:

তিনি প্রাশিয়ার কোনিগসবার্গে (বর্তমানে রাশিয়ার কালিনিনগ্রাদ) জন্মগ্রহণ করেন এবং সারাজীবন সেখানেই কাটিয়েছেন।

সুশৃঙ্খল জীবন:

তিনি তাঁর অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও রুটিনমাফিক জীবনযাপনের জন্য বিখ্যাত ছিলেন।

শিক্ষা:

তিনি কোনিগসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা, গণিত ও দর্শন শাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেন।

প্রধান দার্শনিক অবদান ও গ্রন্থাবলি:

কান্টের দর্শন মূলত মানুষের যুক্তি ও অভিজ্ঞতার সীমানা নির্ধারণের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ

কাজগুলো হলো:

১. ক্রিটিক অফ পিওর রিজন (Critique of Pure Reason, ১৭৮১): এটি তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ, যেখানে তিনি দেখিয়েছেন যে মানুষের জ্ঞান কেবল অভিজ্ঞতা থেকে আসে না, বরং মনের কিছু সহজাত কাঠামোর উপরও নির্ভর করে।

২. ক্রিটিক অফ প্র্যাকটিক্যাল রিজন (Critique of Practical Reason, ১৭৮৮):

এখানে তিনি তাঁর বিখ্যাত ক্যাটেগরিক্যাল ইম্পারেটিভ (Categorical Imperative) বা নৈতিক কর্তব্যের তত্ত্ব প্রদান করেন।

৩. ক্রিটিক অফ জাজমেন্ট (Critique of Judgment, ১৭৯০):

এই গ্রন্থে তিনি নন্দনতত্ত্ব বা সৌন্দর্যবোধ নিয়ে আলোচনা করেছেন।

বিখ্যাত কিছু উক্তি:

"বিজ্ঞান হলো সুসংগঠিত জ্ঞান, আর প্রজ্ঞা হলো সুসংগঠিত জীবন"।

*মানুষের চরিত্র এবং নৈতিকতাই হলো তার আসল সৌন্দর্য।*

"আমাদের সমস্ত জ্ঞান ইন্দ্রিয়ানুভব দিয়ে শুরু হয়, তারপর বুদ্ধিবৃত্তিতে পৌঁছায় এবং যুক্তি দিয়ে শেষ হয়"।

কান্টের ৩০০তম জন্মজয়ন্তী ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে জার্মানিতে বেশ গুরুত্বের সাথে উদ্‌যাপিত হয়েছে।

আপনি কি কান্টের 'ক্যাটেগরিক্যাল ইম্পারেটিভ' বা তাঁর নৈতিক দর্শন সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে চান?

তথ্য: উইকিপিডিয়া সংগ্রহ: মৃণাল নন্দী


২০


Thomas Midgley Jr যিনি একাই বাস্তুতন্ত্রের বিপর্যয়ের সবথেকে বড় কারণ 

আজ একজন প্রকৌশলী ও রসায়নবিদের কথা জানবো, যিনি (হয়তো) অজান্তেই সারা পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রে সব থেকে বড় বিপর্যয় ডেকে আনেন। এমনকি যার আবিষ্কারের কুফল আজও আমরা অজান্তেই ভোগ করে চলেছি। বিজ্ঞানীরা বলেন “He had more impact on the atmosphere than any other single organism in Earth’s history.” এবং দুঃখের বিষয় হলো, তাঁর একটি আবিষ্কারই তাঁর নিজের মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠে।

২০শ শতকের শুরুতে পশ্চিম বিশ্বে চলছিল শিল্পবিপ্লবের যুগ। সেইসময় গাড়ি বাড়ছে, যন্ত্র বাড়ছে, প্রযুক্তি এগোচ্ছে, আর বিজ্ঞানী এবং প্রকৌশলীরা নিত্য নতুন আবিষ্কার করে দৈনন্দিন জীবনে বড়সড় পরিবর্তন আনছেন। গাড়ির ইঞ্জিনে তখন একটা বড় সমস্যা ছিল “knocking”। এই সমস্যার সমাধান করলেন আমাদের আজকের আলোচ্য প্রকৌশলী/রসায়নবিদ। তিনি দেখালেন যে পেট্রোলের সাথে টেট্রাইথাইল লেড মেশালে ইঞ্জিনের knocking সমস্যার সমাধান হয়, ইঞ্জিন অনেক মসৃণভাবে চলে। তখনকার সময়ে এটা ছিলো গাড়িশিল্পে এক বৈপ্লবিক আবিষ্কার। তিনি ধারণা করেছিলেন যে লেড/সীসা যেহেতু প্রকৃতিতেই পাওয়া যায়, তাই এর তেমন কোনও বিরূপ প্রভাব পড়বেনা। কিন্তু ধীরে ধীরে সামনে এলো এর অন্ধকার দিকগুলো। বাতাসে ছড়িয়ে পড়া সীসা মানুষের শরীরে জমা হয়ে আমাদের স্নায়ুতন্ত্রে স্থায়ী সমস্যা তৈরি হয়। এমনকি শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে এই সীসা মারাত্মক ক্ষতি করে। মনে করা হয় যে শুধুমাত্র গাড়ির ধোঁয়ায় উপস্থিত সীসার জন্য সারা পৃথিবীর প্রায় সব মানুষের গড় বুদ্ধ্যাঙ্ক (IQ) প্রায় ১২-১৫ পয়েন্ট কমে গেছে। এটি ছিল এই প্রকৌশলী/রসায়নবিদের প্রথম কীর্তি।

তিনি এখানেই থামেননি। তিনিই সেই ব্যক্তি যিনি ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার এইসব জায়গায় coolant হিসাবে ক্লোরোফ্লুওরোকার্বন (chlorofluorocarbon - CFC) ব্যবহার প্রচলন করেন। এই গ্যাস ছিলো সহজলভ্য, সাশ্রয়ী, খুব স্থিতিশীল এবং সহজে ব্যবহারযোগ্য। তিনি ভেবেছিলেন এই গ্যাস বিষাক্ত নয়। সারা বিশ্বে এর ব্যবহার বাড়তে থাকে। কিন্তু কয়েক দশক পরে বিজ্ঞানীরা দেখলেন এই CFC-ই ধীরে ধীরে ওজোন স্তর ধ্বংস করছে। ফলে দেখা দিচ্ছে ওজোন স্তরে বিশাল গর্ত, সূর্যের ক্ষতিকর UV রশ্মি সরাসরি আসছে পৃথিবীতে। ত্বকের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ছে। এটি একটি গ্রিন হাউস গ্যাস ও বটে। অর্থাৎ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে এই গ্যাস।

এই প্রকৌশলী/রসায়নবিদের নাম হল Thomas Midgley Jr. তিনি ছিলেন একজন আমেরিকান। তিনি শেষ জীবনে পোলিও আক্রান্ত হয়ে পড়েন। এমনকি সেইসময় বিছানায় তিনি স্বাভাবিক ভাবে নড়াচড়াও করতে পারতেন না। এই অস্বাভাবিকতাকে জয় করার জন্য তিনি বিছানাতেই দড়ি আর পুলি দিয়ে একটি মেশিন বানান তাঁর শেষ জীবনে। এবং দুঃখের বিষয় হল সেই দড়িতেই গলা জড়িয়ে গিয়ে শ্বাসরোধ হয়ে তিনি মারা যান।  @ সৌরভ ঘোষ 

২১


মেসোপটেমিয় ভেনিস: ইরাকের হারিয়ে যাওয়া ভাসমান গ্রাম

ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত মেসোপটেমীয় জলাভূমি বা 'আহওয়ার' (Al-Ahwar) কেবল একটি প্রাকৃতিক এলাকা নয়, এটি ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভুক্ত এই অঞ্চলটি টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিস নদীর মিলনস্থলে অবস্থিত। জলাভূমিগুলোতে 'মাদান' বা 'জলাভূমির আরব' (Marsh Arabs) জনগোষ্ঠী বসবাস করে। তারা এক অনন্য সংস্কৃতির অধিকারী আধা-যাযাবর গোত্র, যাদের জীবনধারা গত কয়েক হাজার বছরে খুব সামান্যই পরিবর্তিত হয়েছে।

স্থাপত্যের বিস্ময়: নলখাগড়ার ঘর

মাদানদের পুরো জীবন গড়ে উঠেছে এই জলাভূমিকে কেন্দ্র করে। তাদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো তাদের ভাসমান বাড়িগুলো, যা সম্পূর্ণভাবে জলাভূমি থেকে সংগৃহীত 'কাসাব' নামক এক ধরণের বিশাল নলখাগড়া দিয়ে তৈরি। এই ঘাসগুলো বাঁশের মতো দেখতে এবং প্রায় ২৫ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।

মাদানরা এই জাঁকজমকপূর্ণ ভাসমান বাড়িগুলো তৈরি করে ছোট ছোট দ্বীপের ওপর, যেগুলোকে বলা হয় 'তুহুল'। এই দ্বীপগুলো দেখতে স্থিতিশীল মনে হলেও আসলে তা বেশ নরম এবং কর্দমাক্ত। তাই প্রতিবেশীদের দিকে ভেসে যাওয়া এড়াতে গ্রামবাসীরা প্রায়ই তাদের দ্বীপগুলোকে নোঙর দিয়ে আটকে রাখে।

এই বাড়িগুলোর নির্মাণকৌশলও বিস্ময়কর:

এগুলো তৈরি করতে কোনো পেরেক, কাঠ বা কাঁচের প্রয়োজন হয় না। মাত্র তিন দিনেই একটি বাড়ি তৈরি করা সম্ভব। এই বাড়িগুলো বহনযোগ্য। বসন্তকালে পানির স্তর বেড়ে গেলে এগুলো খুলে উঁচু স্থানে নিয়ে আবার একদিনের মধ্যেই বসানো যায়। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ করলে একটি নলখাগড়ার বাড়ি ২৫ বছরেরও বেশি সময় টিকে থাকে।

ঐতিহাসিকভাবেই এই জলাভূমি ছিল পলাতক দাস এবং কৃষকদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। মাদানরা তাদের আতিথেয়তার জন্য পরিচিত; তারা কখনোই সাহায্যপ্রার্থী কোনো আগন্তুককে ফিরিয়ে দেয় না। তাদের সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘরকে বলা হয় 'মুধিফ' (Mudhif), যা মূলত মেহমানখানা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

মাশহূফ (Mashoof): জলাভূমিতে চলাচলের জন্য তারা এক ধরণের বিশেষ ঐতিহ্যবাহী নৌকা ব্যবহার করে, যাকে 'মাশহূফ' বলা হয়। এটিই তাদের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম।

অর্থনীতি: মাদানদের প্রধান জীবিকা হলো মহিষ পালন এবং মাছ ধরা। এখানকার মহিষগুলো পানিতে সাঁতার কাটতে অভ্যস্ত, যা পর্যটকদের জন্য একটি দারুণ দৃশ্য।

বিপর্যয়:

মাদানদের এই ঐতিহ্যের ওপর বড় আঘাত আসে ১৯৯১ সালের ইরাক বিদ্রোহের সময়। বিদ্রোহীদের একটি বড় অংশ দক্ষিণ ইরাকের এই দুর্গম জলাভূমিগুলোতে আশ্রয় নেয়। এখানকার বিশাল বিশাল নলখাগড়ার বন এবং গোলকধাঁধার মতো জলপথ বিদ্রোহীদের জন্য নিখুঁত লুকানোর জায়গা ছিল। সদ্দাম হোসেন বুঝতে পেরেছিলেন যে, বিদ্রোহীদের নির্মূল করতে হলে আগে তাদের আশ্রয়ের জায়গাটি ধ্বংস করতে হবে। তাই সরকার ১৯৭০-এর দশকের একটি সেচ প্রকল্প পুনরায় চালু করে। টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর পানি যাতে জলাভূমিতে ঢুকতে না পারে, সেজন্য বিশাল সব কৃত্রিম বাঁধ এবং মাটির দেয়াল (Dykes) তৈরি করা হয়। যার মাধ্যমে এই বিশাল জলাভূমি শুকিয়ে যায়।

খুব দ্রুত জলাভূমি মরুভূমিতে পরিণত হয়, খাদ্যের অভাব দেখা দেয় এবং মাদানরা তাদের পৈতৃক ভিটা ছাড়তে বাধ্য হয়। এক সময়ের সমৃদ্ধ এই এলাকাটি প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। জলাভূমির আকার ১০%-এ চলে গিয়েছিল।

পুনর্জন্ম ও বর্তমান অবস্থা:

২০০৩ সালে সদ্দাম সরকারের পতনের পর, স্থানীয় জনগণ বাঁধগুলো ভেঙে দেয় যাতে পুনরায় জলাভূমিতে পানি ফিরে আসতে পারে। একই সময়ে চার বছরের একটি দীর্ঘ খরার অবসান ঘটে, যা প্রাকৃতিক উপায়ে জলাভূমিকে পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে। এটি ১৯৭০-এর দশকের আয়তনের প্রায় ৫০ শতাংশে ফিরে এসেছে।

২০১৬ সালে ইউনেস্কো (UNESCO) এই জলাভূমিকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করে। যদিও বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন এবং তুরস্ক ও ইরানের বাঁধ নির্মাণের কারণে উদ্ধারকৃত জলাভূমিটি আবার পানির সংকটে পড়েছে, তবুও এটি এখনও মাদানদের টিকে থাকার লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

মাদানদের এই জীবনধারা আমাদের পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া ছাড়াও যে যুগযুগান্ত ধরে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে চমৎকার স্থাপত্য গঠন করা সম্ভব, ইরাকের এই 'মেসোপটেমীয় ভেনিস' তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। @ বইকাল



আমরা যদি গভীরভাবে তাকাই যুদ্ধ, সহিংসতা, বিদ্বেষ, অবিচার, নিষ্ঠুরতা সবকিছুর মূলে রয়েছে ভালোবাসার শূন্যতা। যেখানে ভালোবাসা নেই, সেখানে ঘৃণা ঢুকে যায়। যেখানে সহানুভূতি নেই, সেখানে নিষ্ঠুরতা জন্ম নেয়। যেখানে সংযোগ নেই, সেখানে বিচ্ছিন্নতা এবং ভয় তৈরি হয়। একজন মানুষ যখন ভালোবাসা পায় পরিবার থেকে, বন্ধুদের থেকে, সমাজ থেকে তখন সে অন্যদের প্রতিও ভালোবাসা দিতে পারে। কিন্তু যখন কেউ সারাজীবন প্রত্যাখ্যাত, উপেক্ষিত, অবহেলিত থাকে তখন সেই শূন্যতা রাগ, ঘৃণা, প্রতিহিংসায় পরিণত হয়।

বাস্তবতা হলো, পৃথিবী যত টাকা, ক্ষমতা, প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাচ্ছে ততই মানুষ একা হয়ে যাচ্ছে, সম্পর্কহীন হয়ে যাচ্ছে। সবার কাছে স্মার্টফোন আছে, কিন্তু কথা বলার মানুষ নেই। সবার কাছে সোশ্যাল মিডিয়া আছে, কিন্তু সত্যিকারের বন্ধুত্ব নেই। আর এই শূন্যতাই ডিপ্রেশন, ক্রোধ, সামাজিক বিভাজন তৈরি করছে। তাই পরিবর্তন শুরু করতে হবে ভালোবাসা দিয়ে নিজের পরিবার, বন্ধু, প্রতিবেশী, এমনকি অপরিচিতদের প্রতিও সহানুভূতি এবং মানবিকতা দেখান। মনে রাখবেন, ভালোবাসাই একমাত্র শক্তি যা ঘৃণা মুছে দিতে পারে। সেটাই সবচেয়ে মূল্যবান এবং সবচেয়ে জরুরি।

২৩

হরমোন ও হেনরি স্টারলিং

ভাবুন তো—আমাদের শরীরের এক অঙ্গ থেকে আরেক অঙ্গে কীভাবে বার্তা পৌঁছায়? আগে বিজ্ঞানীরা ভাবতেন, শরীরের সমস্ত নিয়ন্ত্রণই কেবল স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে হয়। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এই ধারণা বদলে যায় এক যুগান্তকারী আবিষ্কারে।

১৯০২ সালে দুই বিজ্ঞানী— আর্নেস্ট হেনরি স্টার্লিং (Ernest Henry Starling) এবং উইলিয়াম বেলিজ (William Bayliss)—একটি অসাধারণ পরীক্ষা করেন। তাঁরা দেখান, অন্ত্রে উৎপন্ন একটি রাসায়নিক পদার্থ রক্তের মাধ্যমে অগ্ন্যাশয়ে পৌঁছে তাকে সক্রিয় করে। এই পদার্থটির নাম দেওয়া হয় সেক্রেটিন (Secretin)—এটি ছিল ইতিহাসের প্রথম আবিষ্কৃত হরমোন।

এই আবিষ্কারই প্রমাণ করল—শরীরে শুধু স্নায়ু নয়, রাসায়নিক বার্তাবাহকরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আর এই নতুন ধারণাকে ভাষা দিতে গিয়ে ১৯০৫ সালে স্টারলিং প্রথম ব্যবহার করেন একটি শব্দ—“Hormone” (গ্রিক শব্দ hormao থেকে, যার অর্থ “উদ্দীপিত করা” বা “চালনা করা”)।

হরমোন হলো প্রাণীদেহের এক বিশেষ ধরনের রাসায়নিক বার্তাবাহক (chemical messenger)। এগুলি প্রাণীদের দেহের অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি (endocrine glands) থেকে নিঃসৃত হয়ে রক্তের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও তন্ত্রে পৌঁছায় এবং তাদের কাজকে নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় করে।

অর্থাৎ, হরমোন হলো দেহের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা—যা নিঃশব্দে কিন্তু নির্ভুলভাবে শরীরের প্রতিটি প্রক্রিয়াকে সুশৃঙ্খল রাখে।

আর্নেস্ট হেনরি স্টারলিং এর জীবন কথা

১৮৬৬ সালের ১৭ এপ্রিল আজকের দিনে জন্মগ্রহণ করেন আর্নেস্ট হেনরি স্টার্লিং । তিনি ছিলেন একজন বিশ্ববিখ্যাত ব্রিটিশ শারীরতত্ত্ববিদ (physiologist), যিনি মানবদেহের কার্যপ্রণালী নিয়ে অসামান্য গবেষণা করেছেন। আধুনিক শারীরবিদ্যার বিকাশে তাঁর অবদান অপরিসীম।

উইলিয়াম বেলিসের সঙ্গে তাঁর যৌথ গবেষণায় আবিষ্কৃত সিক্রেটিন-ই প্রথম প্রমাণ করে যে, রাসায়নিক পদার্থ রক্তের মাধ্যমে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই আবিষ্কার থেকেই জন্ম নেয় “হরমোন” ধারণা—যা আজ জীববিজ্ঞানের এক মৌলিক ভিত্তি।

তিনি রক্ত সঞ্চালনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব দেন তা হলো Starling’s hypothesis—যেখানে দেখানো হয় কীভাবে বিভিন্ন বলের প্রভাবে কৈশিক রক্তনালীর ভেতর দিয়ে তরল আদান-প্রদান ঘটে।

তাঁর আরেকটি বিখ্যাত অবদান হলো হৃদপিণ্ডের সূত্র (Law of the Heart)-

হৃদপেশী যত বেশি প্রসারিত হয়, তার সংকোচন তত বেশি শক্তিশালী হয়। এই নীতিই পরবর্তীতে হৃদযন্ত্রের কার্যপ্রণালী বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা

হরমোন ও স্নায়ুর সমন্বয়ে পরিপাকক্রিয়া কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়, তা তিনি ব্যাখ্যা করেন। রক্তের সিরাম প্রোটিনের ভূমিকা সম্পর্কেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন।

১৯২৪ সালে তিনি B. Verney-এর সঙ্গে যৌথভাবে বৃক্কের নেফ্রনে জলের পুনঃশোষণ প্রক্রিয়া নিয়েও গবেষণা করেন।

১৯২৭ সালের ২ মে, ৬১ বছর বয়সে এই মহান বিজ্ঞানীর জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া জ্ঞান আজও জীববিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভিত্তি হয়ে আছে।

আজ তাঁর ১৬০ তম জন্মবার্ষিকীতে, আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি সেই মানুষটিকে, যিনি আমাদের শরীরের এক অদৃশ্য কিন্তু অপরিহার্য যোগাযোগ ব্যবস্থার নাম দিয়েছিলেন—হরমোন। @— পঞ্চানন মণ্ডল ১৭ এপ্রিল ২০২৩


২৪

কনফুসিয়াসের বিখ্যাত উক্তি ও মূল দর্শন 

প্রতিশোধ কেবল শত্রুর ক্ষতি করে না, এটি প্রতিশোধ গ্রহণকারীর নিজের জীবন এবং চরিত্রকেও ধ্বংস করে দেয়। একে 'দুইটি কবর' খুঁড়ার সাথে তুলনা করার কারণগুলো নিচে সহজভাবে দেওয়া হলো:

১. নিজের আত্মিক মৃত্যু:

কনফুসিয়াসের মতে, যখন কেউ প্রতিশোধের নেশায় মত্ত হয়, তখন সে তার মানবিকতা, ধৈর্য এবং বিবেক হারিয়ে ফেলে। শত্রু শারীরিকভাবে আঘাত পেলেও, প্রতিশোধ গ্রহণকারী মানসিকভাবে নিজের 'সত্তা' বা 'বিবেককে' বিসর্জন দেয়। এটাই তার নিজের জন্য প্রথম কবর।

২. চক্রবৃদ্ধি ধ্বংস:

প্রতিশোধ একটি অন্তহীন চক্র তৈরি করে। আপনি যখন কাউকে আঘাত করেন, তখন তার পরিবার বা পক্ষ থেকে পাল্টা আঘাত আসার সম্ভাবনা থাকে। এর ফলে শান্তি আসার বদলে শত্রুতা আজীবন চলতে থাকে, যা শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষকেই নিঃশেষ করে দেয়।

৩. ঘৃণার বিষ:

প্রতিহিংসা মনের শান্তি কেড়ে নেয়। আপনি যতক্ষণ প্রতিশোধের কথা ভাবছেন, ততক্ষণ আপনার মস্তিষ্ক ঘৃণা এবং নেতিবাচকতায় পূর্ণ থাকে। এই মানসিক বিষক্রিয়া আপনাকে সুন্দরভাবে বাঁচতে দেয় না, বরং ভেতর থেকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে।

সারকথা:

কনফুসিয়াস মানুষকে ক্ষমা এবং সহনশীলতার শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, শত্রুকে ক্ষমা করা মানে তাকে ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং নিজেকে ঘৃণার বোঝা থেকে মুক্ত করা।

আপনি কি কনফুসিয়াসের অন্য কোনো জীবনদর্শন বা নীতিবাক্য সম্পর্কে জানতে আগ্রহী?

কনফুসিয়াস

(খ্রিস্টপূর্ব ৫৫১–৪৭৯) ছিলেন প্রাচীন চীনের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, শিক্ষক এবং রাজনৈতিক চিন্তাবিদ। চীনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে তার প্রভাব অত্যন্ত গভীর এবং তা প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে বিদ্যমান।

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও দর্শন:

আসল নাম:

তার পারিবারিক নাম ছিল 'কং' এবং ব্যক্তিগত নাম 'কিউ'। তাকে 'কং ফুজি' বা 'মহান গুরু কং' হিসেবেও সম্বোধন করা হতো।

দর্শন:

কনফুসিয়াসের মূল দর্শন ছিল নীতিশিক্ষাভিত্তিক। তিনি বিশ্বাস করতেন যে শিক্ষার ভিত্তি হওয়া উচিত নৈতিকতা এবং মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে সদাচরণ বজায় রাখা।

কনফুসীয়বাদ:

তার শিক্ষা ও চিন্তাধারা থেকেই 'কনফুসীয়বাদ' বা 'রুইজম' নামক এক অনন্য জীবন দর্শনের সৃষ্টি হয়েছে, যা চীনের শাসনব্যবস্থা ও সংস্কৃতির মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

মূল নীতিসমূহ:

পারিবারিক মূল্যবোধ:

তিনি পরিবারকে সমাজের মূল একক মনে করতেন এবং বাবা-মায়ের প্রতি ভক্তি (Filial Piety) ছিল তার দর্শনের অন্যতম স্তম্ভ।

সুশাসন:

তার মতে, রাষ্ট্র হওয়া উচিত একটি বিশাল পরিবারের মতো, যেখানে শাসক হবেন উদার ও স্নেহশীল পিতার মতো।

সামাজিক শৃঙ্খলা:

পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সঠিক আচরণের মাধ্যমে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব বলে তিনি মনে করতেন।

বিখ্যাত উক্তি:

"সবকিছুরই সৌন্দর্য আছে, কিন্তু সবাই তা দেখতে পায় না"।

"নিজের সমকক্ষ নয় এমন কাউকে বন্ধু করো না"।

"আমরা তিনটি উপায়ে প্রজ্ঞা অর্জন করতে পারি: প্রথমত মনন দিয়ে (সর্বোত্তম), দ্বিতীয়ত অনুকরণ করে (সবচেয়ে সহজ) এবং তৃতীয়ত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে (সবচেয়ে তিক্ত)"।

তথ্য: উইকিপিডিয়া সংগ্রহ: মৃণাল নন্দী


২৫

গ্র্যান্ডিওসিটি 

(Grandiosity) অর্থাৎ এটা এমন একটা মানসিক অবস্থা যেখানে নিজেকে অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ, শ্রেষ্ঠ বা অজেয় মনে হয়। বাহ্যিক অনুমোদন, সমালোচনা বা ভয়ের প্রতি উদাসীনতা চলে আসে। এটা নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ট্রেইটসের সাথে কিছুটা মিলে, কিন্তু এটা কোন ডিসঅর্ডার না।

আবার এর আরেকটা ইতিবাচক দিকও আছে। কার্ল জাং-এর তত্ত্ব অনুসারে এটাকে Individuation এর একটা পর্যায় বলা যায়। যখন মানুষ নিজের অভ্যন্তরীণ সত্ত্বার সাথে গভীর সংযোগ তৈরি করে, তখন সমাজের 'পার্সোনা' (বাইরের মুখোশ) থেকে মুক্তি পায়। ফলে অন্যের মতামত আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। মাসলোর সেল্ফ অ্যাকচুয়ালাইজেশন তত্ত্বেও এই অবস্থাটা দেখা যায় যেখানে ব্যক্তি বাহ্যিক প্রশংসা বা ভয়ের উপর আর নির্ভর করে না, নিজের মূল্য নিজেই তৈরি করে। 

এটাকে খতরনাক বলার কারণ হলো, এই স্তরটা যদি অতিরিক্ত হয়ে যায়, তাহলে দুটো ঝুঁকি তৈরি হয়। যেমন;

১। মানুষের সাথে আস্তে আস্তে আমার দূরত্ব বেড়ে যেতে পারে (কারণ তখন আর অন্যের অনুভূতিকে ততটা গুরুত্ব দিই না)। 

২। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস থেকে বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। অর্থাৎ এটা একই সাথে মুক্তির অনুভূতি এবং সতর্কতার সংকেত দুটোই। 

আমি নিজেই অনুভব করছি বর্তমানে আমার সাথে কারো সুসম্পর্ক নেই বললেই চলে, আগে যাদের সাথে রেগুলার কথা হতো এখম আমরা একে অপরের ব্লক লিস্টে আছি। সবাই আমাকে ছেড়ে গেছে কথাটা হয়তো ভুল, সত্যি কথা হচ্ছে আমি নিজের দেওয়ালটা এত উঁচু করে ফেলেছি যে কেউ আমার কাছে পৌঁছাতে পারেনা।

ঘটনা যাইহোক: তবে আমি জাহিদ কখনো কোন কিছুর জন্য আফসোস করবো না, নত হয়ে আমি বাঁচতে পারব না যতদিন বেঁচে আছি আমার মাথা উঁচুই থাকবে, এতে কেউ আমার পাশে থাকলে থাকুক না থাকলে নাই।

আমার এই অভিজ্ঞতা থেকে যদি আপনি কিছু শিখতে চান, তাহলে এটাই বলব।

আত্মনির্ভরশীলতা আর I Don't Care মানসিকতা ভালো। কিন্তু সেটাকে স্বাস্থ্যকর রাখতে চাইলে নিয়মিত সেল্ফ-রিফ্লেকশন আর গ্রাউন্ডিং প্র্যাকটিস করবেন। (যেমন: জার্নালিং, মেডিটেশন, বা বিশ্বস্ত কারো সাথে খোলাখুলি কথা বলা)। যদি মনে হয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, তাহলে অবশ্যই একজন প্রফেশনাল সাইকোলজিস্টের সাথে কথা বলুন।

আমি নিঃস্ব এবং ধ্বংস হওয়ার জন্য প্রস্তুত, কিন্তু আমি চাইনা আপনি আমার পাঠক হয়ে আপনারও একই অবস্থা হোক.!

সব সময় নিজে ভুল করে শিখতে হয় না, মাঝেমধ্যে অন্যের ভুল থেকেও শিখতে হয় তবেই জীবন সহজ হয়। @ Jahid Hasan 


২৬

শাক্যমুনি  ও লোটাস সূত্র 

~ খৃষ্ট জন্মের প্রায় হাজার বছর আগে প্রাচীন ভারতবর্ষে সনাতন হিন্দু ধর্মের মানুষের মধ্যে বিভিন্ন কারণে মতপার্থক্য তৈরি হতে শুরু করেছিল এবং তা থেকে আস্তে আস্তে সমাজে বিভেদ তৈরি হতে শুরু করেছিল।

~ সনাতন হিন্দু ধর্মের মধ্যে সেই বিভেদের কারণে সমাজের বেশ কিছু জ্ঞানি মানুষ বিভিন্ন উপায়ে নিজের নিজের বলিষ্ঠ মতামত প্রকাশ করতে শুরু করে। খুব সম্ভবত তাদের মধ্যে একজন ছিলেন শাক্যমুনি, যাকে অধিকাংশ মানুষই গৌতম বুদ্ধ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। আবার অনেকে তাঁকে গৌতমের কোনও এক পূর্বজন্ম বলেছেন।

~ এই শাক্যমুনি যে মতাদর্শের কথা বলেছিলেন তা অনেকাংশে গৌতম বুদ্ধ প্রণীত বৌদ্ধ ধর্মের সঙ্গে মিলে যায়। অনেক ঐতিহাসিকের মতে শাক্যমুনি ছিলেন গৌতম বুদ্ধ পূর্ববর্তী বৌদ্ধ মতাদর্শের জনক। তবে তিনি সেই অর্থে নিজের মতাদর্শকে প্রচার করেননি অথবা করতে পারেননি।

~ শাক্যমুনির মতাদর্শের একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল লোটাস সূত্র যা পরবর্তীকালের বৌদ্ধ ধর্মপ্রচারকরা গ্রহণ করেছিল। নিজের সময়েও শাক্যমুনি কিছু মানুষের মধ্যে তার মতাদর্শের বীজ বপন করেছিলেন বলে অনেক ঐতিহাসিকের মত। তাঁরা নাকি ভারতীয় উপমহাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন সুদূর মিশর এবং গ্রিস পর্যন্ত।

~ খৃষ্টপূর্ব প্রায় ন’শো বছর আগে থেকেই ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে মশলা বোঝাই জাহাজ নাবাতিয়া হয়ে পৌঁছে যেত প্রাচীন মিশরে। সেই সম্পর্কিত কিছু তথ্যপ্রমাণ বিভিন্ন রিসার্চে উঠে এসেছে।

~ আমাদের ধারণা মশলা বোঝাই সেই জাহাজের সঙ্গে শাক্যমুনির মতাদর্শও গিয়ে পৌঁছেছিল প্রাচীন মিশরে, অবশ্যই তার কোনও অনুরাগীর মাধ্যমে।

~ প্রাচীন মিশরে সেই সময় এমন একজন ফারাও রাজত্ব করতেন যিনি নিজেও ছিলেন জ্ঞানের পূজারি, নাম প্রথম শেশঙ্ক। খুব সম্ভবত তিনি শাক্যমুনির সেই অনুরাগীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন তার রাজধানী বন্দর নগরী মেম্ফিসে। 

লোটাস সূত্র হলো মহাযান বৌদ্ধধর্মের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় গ্রন্থ, যা বুদ্ধত্বের পথকে সবার জন্য সমান বলে ঘোষণা করেনারী-পুরুষ, জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষই জ্ঞানলাভ করে বুদ্ধ হতে পারে ।  @ বিশ্বজিৎ সাহা

 

২৭


কে এই ভিকারুন নেসা নুন?

ভিকারুণ নিসা নুন স্কুল এন্ড কলেজ চিনিনা এমন কেউ নেই, কিন্তু এই ভিকারুণ নিসা নুন কে ছিলেন, কেমন ছিলেন তা অনেকেই জানিনা। ভিকারুণ নিসা নুন ছিলেন ফিরোজ খান নুনের স্ত্রী।

ফিরোজ খান নুন ছিলেন ১৯৫৭-৫৮ এর সময় পাকিস্তানের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী। এর আগে তিনি ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত পূর্ব বাংলার গভর্নর ছিলেন। তারপর পরের তিন বছর (১৯৫৩-১৯৫৬) পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন।

ফিরোজ খান নুন বিয়ে করেন ভিক্টোরিয়াকে (ভিকারুণ নিসার পূর্ব নাম)। জন্মগত দিক দিয়ে ভিক্টোরিয়া অস্ট্রিয়ান ছিলেন। বিয়ের পর ভিক্টোরিয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে 'ভিকার-উন-নিসা' (ایک مسجد ہے) নাম পরিবর্তন করেন।

ফিরোজ খানের এর রাজনৈতিক জীবনেরও সক্রিয় সঙ্গী ছিলেন ভিকারুণ নিসা। ফিরোজ খানের সাথে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। ইন্ডিয়ার ভাইসরয়ের মন্ত্রীপরিষদ থেকে পদত্যাগ করে স্ত্রীকে নিয়ে লাহোর চলে আসেন ফিরোজ খান নুন। তারপর ফিরোজ খানের পাশাপাশি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন ভিকারুণ নিসা। পাঞ্জাবে যখন  Civil Disobedience Movement চলছিল, সে সময় লেডি নুন তিনবার গ্রেফতার হওয়ার পরেও দমে যাননি। ব্রিটিশ সমর্থিত খিজরের মন্ত্রীসভার বিরুদ্ধে পুণরায় আন্দোলনকে সংগঠিত করতে সহযোগিতা করেন।

স্বামীর মৃত্যুর পরেও ভিকারুণ নিসা বিভিন্ন সামাজিক সেবা মূলক কাজে জড়িত থাকেন। পূর্ব বাংলার মেয়েদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এই দেশ থেকে যেন মেয়েরা অক্সফোর্ড, ক্যাম্ব্রিজ এর মতো উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য যেতে পারে, সেজন্য চেষ্টা করে যান ভিকারুণ নিসা নুন।

সেই ছোট পরিসরের ভিকারুণ নিসা নুন স্কুল এন্ড কলেজ আজ দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ। প্রত্যেকটা মহৎ কাজের পেছনে কারা ছিলেন সেসব জানার জন্যে আমাদের ইতিহাস পাঠ খুবই জরুরি। @ লক্ষপথ

২৮


টাকার মালিক হতে গিয়ে টাকার দাস হয়ে যাচ্ছেন না তো?

মানুষ অর্থ উপার্জন করে নিরাপত্তা, স্বাচ্ছন্দ্য ও সম্মান অর্জনের জন্য।

কিন্তু এক সময় দেখা যায়, টাকা আর জীবনের অংশ থাকে না, বরং জীবনই টাকার অংশ হয়ে যায়।অর্থ তখন লক্ষ্য নয়, আসক্তিতে পরিণত হয়।সমাজে আজ অনেক মানুষ সফল হলেও শান্ত নয়, ধনী হলেও তৃপ্ত নয়।কারণ তারা টাকার মালিক হতে গিয়ে অজান্তেই টাকার দাসে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতা শুধু নৈতিক প্রশ্ন নয়, এটি মনোবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের গবেষণায়ও আলোচিত একটি বিষয়।

 গবেষণা বলছে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে অর্থ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একটি নির্দিষ্ট সীমার পরে অর্থ সুখ বাড়ায় না।

মনোবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, সুখের মূল উৎস হচ্ছে সম্পর্ক, স্বাধীনতা ও সামাজিক সংযোগ; শুধু সম্পদ নয়।অনেক মানুষ অর্থকে নিরাপত্তা নয়, পরিচয়ের প্রতীক বানিয়ে ফেলে।

তখন আয় বাড়লেও উদ্বেগ কমে না।বরং দায়িত্ব, প্রতিযোগিতা ও তুলনার চাপ বাড়তে থাকে।

বিশ্বব্যাপী গবেষণায় দেখা গেছে, বস্তুবাদী মানসিকতা ব্যক্তিগত সুখ ও মানসিক সুস্থতার সাথে নেতিবাচকভাবে সম্পর্কিত। অর্থ জমাতে গিয়ে মানুষ সময় হারায়, সম্পর্ক হারায়, এমনকি নিজের আনন্দও হারায়।পরিবারের সাথে সময় না দিয়ে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা বানাতে গিয়ে বর্তমানটাই নষ্ট হয়ে যায়। অফিসের টার্গেট, বিনিয়োগ, লাভ-লোকসানের হিসাব জীবনকে যান্ত্রিক করে তোলে। মানুষ তখন কাজ করে বাঁচার জন্য নয়, বাঁচে কাজ করার জন্য।

মানুষ স্বাভাবিকভাবে তুলনামূলক প্রাণী।

নিজের আয় নয়, অন্যের আয় দেখে সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টি তৈরি হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, আয় বৃদ্ধি সুখ বাড়ায় তখনই, যখন সামাজিক অবস্থানও বাড়ে; অন্যথায় তৃপ্তি আসে না।এই মানসিক ফাঁদ মানুষকে কখনো সন্তুষ্ট হতে দেয় না। একটি বাড়ি হলে গাড়ি চাই, গাড়ি হলে বড় গাড়ি চাই। এভাবেই প্রয়োজন ধীরে ধীরে লোভে রূপ নেয়। অর্থ তখন স্বাধীনতা দেয় না, বরং নতুন দাসত্ব সৃষ্টি করে। অতিরিক্ত অর্থকেন্দ্রিক জীবন মানুষকে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দেয়। সোশ্যাল তুলনা ও প্রতিযোগিতা মানুষের সুখ কমিয়ে দেয় বলেও গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে। ফলে বাইরে সফলতার হাসি থাকলেও ভেতরে ক্লান্তি জমতে থাকে।

 টাকা খারাপ নয়; টাকার প্রতি ভুল দৃষ্টিভঙ্গিই সমস্যা। অর্থকে উদ্দেশ্য না বানিয়ে মাধ্যম বানাতে পারলে ভারসাম্য আসে। গবেষণায় দেখা গেছে, অর্থ চাপ কমাতে সাহায্য করলেও প্রকৃত সুখ আসে অর্থের সঠিক ব্যবহার থেকে। যারা অর্থ দিয়ে অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক ও মানবিক কাজে বিনিয়োগ করে তারা বেশি সন্তুষ্ট থাকে। সময়ের উপর নিয়ন্ত্রণ, স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং অর্থপূর্ণ জীবনই প্রকৃত সম্পদ। যে ব্যক্তি টাকা নিয়ন্ত্রণ করে সে ধনী; আর যাকে টাকা নিয়ন্ত্রণ করে সে বন্দী।  সফলতা মানে শুধু ব্যাংক ব্যালেন্স নয়, মানসিক শান্তিও।

জীবনে এমন অবস্থান দরকার যেখানে টাকা আমাদের জন্য কাজ করবে, আমরা টাকার জন্য নয়।

অর্থ মানুষের প্রয়োজন, কিন্তু পরিচয় নয়।

টাকার মালিক হওয়া সম্মানের, কিন্তু টাকার দাস হওয়া বিপজ্জনক।

যখন আয় বাড়ে কিন্তু হাসি কমে যায়, তখন বুঝতে হবে কোথাও ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে।

জীবনের আসল সম্পদ হলো সময়, সম্পর্ক, স্বাস্থ্য ও মানসিক প্রশান্তি।

টাকা সেই সম্পদ রক্ষা করার মাধ্যম হওয়া উচিত, বিকল্প নয়।

তাই প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ: আপনি কি টাকা ব্যবহার করছেন, নাকি টাকা আপনাকে ব্যবহার করছে?

জীবনের সেরা বিনিয়োগ ব্যাংকে নয়, মানুষের মাঝে এবং নিজের আত্মার শান্তিতে। @SAM Motivation

তথ্যসূত্র

Self Determination Theory and Well-Being Research

Boyce, Brown & Moore (Income Rank and Life Satisfaction Study)

Materialism and Well-Being Meta-Analysis Research


৩০

ডাইনোসররা পৃথিবীতে প্রায় ১৬ কোটি ৫০ লাখ থেকে ১৮ কোটি বছর ধরে রাজত্ব করেছিল।

তাদের এই দীর্ঘ রাজত্বকাল সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে দেওয়া হলো:

রাজত্বকাল:

ডাইনোসরদের যুগ শুরু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ২৪ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে (মধ্য ট্রায়াসিক যুগে) এবং শেষ হয়েছে প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে (ক্রিটেসিয়াস যুগের শেষে)।

বিলুপ্তি:

একটি বিশাল গ্রহাণুর আঘাত এবং তার ফলে সৃষ্ট পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে তারা পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

মেসোজোয়িক যুগ:

তাদের এই পুরো রাজত্বকালটি মূলত ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের 'মেসোজোয়িক' যুগের অন্তর্ভুক্ত, যা তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত ছিল: ট্রায়াসিক, জুরাসিক এবং ক্রিটেসিয়াস।

মানুষের সাথে সম্পর্ক:

ডাইনোসররা বিলুপ্ত হওয়ার প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ বছর পর পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাব ঘটেছিল, তাই কোনো মানুষের পক্ষেই ডাইনোসরকে জীবিত দেখা সম্ভব ছিল না। তথ্য: উইকিপিডিয়া সংগ্রহ: মৃণাল নন্দী

৩১


"চোখের বদলে চোখ, গোটা বিশ্বকে অন্ধ করে দেবে"

মহাত্মা গান্ধীর এই বিখ্যাত উক্তিটি মূলত প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধের কুফল এবং তাঁর অহিংস (Non-violence) দর্শনকে তুলে ধরে। তিনি কেন এই কথাটি বলেছিলেন তার মূল কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

হিংসার অন্তহীন চক্র:

গান্ধীজি বিশ্বাস করতেন যে, যদি একজন মানুষ অন্য একজনের ক্ষতি করে এবং তার বদলে দ্বিতীয় ব্যক্তিটিও প্রথম জনের সমান ক্ষতি করে, তবে সেই হিংসা চলতেই থাকে। এই চক্র কখনো শেষ হয় না এবং শেষ পর্যন্ত তা পুরো সমাজের জন্য ধ্বংসাত্মক হয়ে দাঁড়ায়।

প্রতিশোধ বনাম ন্যায়বিচার:

'চোখের বদলে চোখ' নীতিটি প্রাচীন বিচার ব্যবস্থার অংশ ছিল, যেখানে অপরাধীর সমান শাস্তি নিশ্চিত করা হতো। কিন্তু গান্ধীজির মতে, এই প্রতিশোধ গ্রহণ কখনো প্রকৃত শান্তি আনতে পারে না; বরং এটি মানবিকতাকে অন্ধ ও সহানুভূতিহীন করে তোলে।

ক্ষমার মহত্ত্ব:

তাঁর দর্শনে ক্ষমা ছিল পরম ধর্ম। তিনি মনে করতেন, প্রতিশোধ নেওয়ার চেয়ে ক্ষমা করার জন্য অনেক বেশি মানসিক শক্তির প্রয়োজন এবং এটিই পারে সমাজ থেকে ঘৃণা দূর করতে।

শান্তি ও সংহতি:

গান্ধীর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সমাজের সর্বস্তরে সম্প্রীতি বজায় রাখা। তিনি সতর্ক করেছিলেন যে, সবাই যদি প্রতিশোধ নিতে শুরু করে, তবে পৃথিবীতে কোনো শান্তিকামী মানুষ অবশিষ্ট থাকবে না, যা রূপক অর্থে 'পুরো বিশ্ব অন্ধ হয়ে যাওয়া'।

মহাত্মা গান্ধী

(১৮৬৯–১৯৪৮) ছিলেন ভারতের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন প্রধান রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক নেতা। তিনি অহিংসা ও সত্যাগ্রহ আন্দোলনের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান এবং ভারতে তাঁকে 'জাতির পিতা' হিসেবে শ্রদ্ধা করা হয়।

গান্ধীজির জীবন ও কর্মের প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

জন্ম ও পরিচয়:

তাঁর পূর্ণ নাম মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। তিনি ১৮৬৯ সালের ২রা অক্টোবর ভারতের গুজরাট রাজ্যের পোরবন্দরে জন্মগ্রহণ করেন।

শিক্ষা ও পেশা:

তিনি লন্ডনে আইন বা ব্যারিস্টারি পড়াশোনা করেন এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় আইনজীবী হিসেবে কর্মরত থাকাকালে প্রথম বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে নাগরিক অধিকার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।

স্বাধীনতা আন্দোলন:

১৯১৫ সালে ভারতে ফিরে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত উল্লেখযোগ্য আন্দোলনগুলোর মধ্যে রয়েছে:

অসহযোগ আন্দোলন (Non-cooperation Movement)

লবণ সত্যাগ্রহ বা ডান্ডি অভিযান (১৯৩০)

ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪২)

উপাধি:

তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ও আদর্শের জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে 'মহাত্মা' উপাধিতে ভূষিত করেন।

রচিত গ্রন্থ:

তাঁর বিখ্যাত আত্মজীবনীর নাম 'দ্য স্টোরি অব মাই এক্সপেরিমেন্টস উইথ ট্রুথ' (The Story of My Experiments with Truth) এবং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বই হলো 'হিন্দ স্বরাজ'।

মৃত্যু:

১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি নাথুরাম গডসে নামক এক ব্যক্তির গুলিতে তিনি নিহত হন।

তাঁর জন্মদিন ২রা অক্টোবর প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী 'আন্তর্জাতিক অহিংস দিবস' হিসেবে পালন করা হয়।

তথ্য: উইকিপিডিয়া সংগ্রহ: মৃণাল নন্দী


৩২

কম খরচে বেশি প্রোটিন পেতে

খেসারি ডাল সস্তা, সুস্বাদু, সহজলভ্য এবং প্রোটিনে ভরপুর। কিন্তু যেহেতু উদ্ভিজ্জ প্রোটিন তাই একে একা খেলে সেই প্রোটিন পুরোপুরি কাজে লাগে না। কারণ খেসারিতে কিছু প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড কম থাকে। তাই সম্পূর্ণ ভারসাম্যপূর্ণ প্রোটিন পেতে আরো কিছু জিনিসের কম্বিনেশন লাগবে।

একাধিক ডাল মিশিয়ে খাওয়া শুধু এক ধরনের ডাল খাওয়ার চেয়ে ভালো। কারণ এতে প্রোটিনের গুণগত মান বাড়ে।

যারা মূলত কম খরচে প্রোটিন পেতে চায় তাদের জন্য ডাল মিশিয়ে খাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ।

দেশি ডাল যেমন খেসারি, মুগ, মসুর বা ছোলার মতো ডালগুলোর প্রত্যেকটির নিজস্ব শক্তি ও ঘাটতি আছে। একটির যে সীমাবদ্ধতা, অন্যটি সেটাকে পূরণ করতে পারে। ফলে যখন এগুলো একসাথে রান্না করা হয়, তখন প্রোটিন ব্যালান্স তৈরি হয়। এটি আরও কার্যকর হয় যখন এর সঙ্গে ভাত খাওয়া হয়, কারণ চাল ও ডালের মধ্যে এক পারস্পরিক সম্পর্ক আছে, যেখানে একটির ঘাটতি অন্যটি পূরণ করে।

এক ধরনের ডাল প্রোটিন দেয় ঠিকই, কিন্তু তার মান মাঝারি পর্যায়ের থাকে। মিশ্র ডাল খেলে সেই মান আরও উন্নত হয়। তাই উত্তম পদ্ধতি হলো অন্তত দুই বা তিন ধরনের ডাল একসাথে ঘন করে রান্না করা এবং ভাতের সঙ্গে খাওয়া। খেসারি ডাল একাধিক ডালের সঙ্গে মিশিয়ে ঘন করে রান্না করে ভাতের সাথে খেলে সবচেয়ে উত্তম হবে। এটি মাংস, ডিম, দুধ বা মাছের মতো সম্পূর্ণ প্রোটিন না হলেও, বেশ কাছাকাছি মান পাওয়া সম্ভব।

খেসারি সহ অন্যান্য ডাল রান্নার আগে পানিতে ভিজিয়ে রেখে সেই পানি ফেলে দিয়ে ভালোভাবে সিদ্ধ করলে এর ক্ষতিকর উপাদান কমে যায় এবং হজমও সহজ হয়।

দেশি ডাল কম্বিনেশনের কিছু উদাহরণ এরকম:

- খেসারি ৩০% + মুগ ৭০%

- খেসারি ২৫–৩০% + মসুর ৭০–৭৫%

- খেসারি ২০–২৫% + ছোলা ৭৫–৮০%

- খেসারি ২০–২৫% + মুগ ৩৫–৪০% + মসুর ৩৫–৪০%

চাইলে খেসারির পরিমাণ আরো বাড়াতে পারেন। কোনো সমস্যা নেই।

এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ রেজাল্ট পাওয়া যায় খেসারি, মুগ ও মসুর এই তিনটি একসঙ্গে মেশানো হলে। এই মিশ্রণে প্রতিটি ডালের নিজস্ব শক্তি একত্রিত হয়ে এমন একটি প্রোটিন কাঠামো তৈরি করে, যা পুষ্টিগতভাবে উত্তম এবং স্বাদেও গ্রহণযোগ্য। সুযোগ থাকলে মাঝে মাঝে এর সাথে ডিম রাখা উত্তম।

Mission: Captain Green


৩৩

ওশো 

ওশো মনে করতেন, তথাকথিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আধ্যাত্মিকতার চেয়ে ব্যবসার দিকে বেশি মনোযোগী। তিনি বলতেন, যেখানে মন্দির-মসজিদ বা মাজারের দানবাক্সে কোটি কোটি টাকা জমা হয় কিন্তু পাশে থাকা মানুষটি না খেয়ে মরে, সেখানে ধর্ম কেবল একটি শোষণের হাতিয়ার।

অন্ধবিশ্বাস ও যুক্তিহীনতা:

তাঁর মতে, মানুষ যখন নিজের বুদ্ধি বা বিবেক ব্যবহার না করে কেবল কাল্পনিক পুরস্কার বা পরকালের ভয়ে দান করে, তখন তারা তাদের বুদ্ধিবৃত্তি হারিয়ে ফেলে। এই "নির্বোধ" হওয়ার প্রক্রিয়াটিকেই তিনি আক্রমণ করেছিলেন।

দারিদ্র্যের উপাসনা বনাম প্রাচুর্য:

ওশো দারিদ্র্যকে মহিমান্বিত করার ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি বলতেন, দারিদ্র্য কোনো গুণ নয়, বরং একটি রোগ। মানুষ যখন প্রকৃত উন্নয়নের চেয়ে অলৌকিক কিছু পাওয়ার আশায় মন্দিরে টাকা ঢালে, তখন সেই দেশের প্রকৃত সমৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়।

প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিদ্রোহ:

তিনি প্রথাগত ধর্মের কাঠামোর সমালোচনা করে বলতেন, "ধর্ম কোনো সংগঠন নয়, এটি একটি ব্যক্তিগত উপলব্ধি।" যখন ধর্ম সংগঠনের রূপ নেয় এবং অর্থ সংগ্রহ শুরু করে, তখন তা আর ধর্ম থাকে না, ব্যবসা হয়ে দাঁড়ায়।

ওশোর মূল বার্তা ছিল:

মানুষ যেন অন্ধের মতো কাউকে অনুসরণ না করে নিজের সচেতনতা (Awareness) বৃদ্ধি করে এবং জীবনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে শেখে।

ওশো

(১১ ডিসেম্বর ১৯৩১–১৯ জানুয়ারি ১৯৯০), যিনি আচার্য রজনীশ বা ভগবান শ্রী রজনীশ নামেও বিশ্বজুড়ে পরিচিত, ছিলেন একজন ভারতীয় আধ্যাত্মিক গুরু, দার্শনিক এবং রহস্যবাদী। তিনি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম আলোচিত এবং বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত।

ওশো সম্পর্কে মূল কিছু তথ্য নিচে দেওয়া হলো:

প্রারম্ভিক জীবন:

ওশোর প্রকৃত নাম ছিল চন্দ্র মোহন জৈন। তিনি ভারতের মধ্যপ্রদেশের কুচওয়াদাতে জন্মগ্রহণ করেন। আধ্যাত্মিক পথে আসার আগে তিনি দর্শনের অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেছেন।

দর্শন ও শিক্ষা:

ওশো প্রথাগত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং অন্ধবিশ্বাসের পরিবর্তে ব্যক্তিগত সচেতনতা, ধ্যান এবং মননশীলতার ওপর জোর দিতেন। তিনি মানুষের সৃজনশীলতা, হাসি এবং ভালোবাসাকে আধ্যাত্মিকতার অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করতেন।

ধ্যান পদ্ধতি:

তিনি ‘ডায়নামিক মেডিটেশন’ বা সক্রিয় ধ্যান পদ্ধতির প্রবর্তক। তার মতে, আধুনিক মানুষের জন্য স্থির হয়ে বসে ধ্যান করা কঠিন, তাই শরীরের গতিশীলতার মাধ্যমে মনের স্থিরতা আনা প্রয়োজন।

বিতর্ক:

১৯৬০-এর দশকে যৌনতা সম্পর্কে তার খোলামেলা দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাকে ভারতে "সেক্স গুরু" বলা হতো। ১৯৮০-র দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগনে তিনি ‘রজনীশপুরম’ নামে একটি শহর গড়ে তোলেন, যা নিয়ে পরবর্তীকালে ব্যাপক আইনি জটিলতা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়।

উত্তরাধিকার:

১৯৯০ সালে পুনেতে তার মৃত্যু হয়। বর্তমানে তার আশ্রমটি ওশো ইন্টারন্যাশনাল মেডিটেশন রিসোর্ট নামে পরিচিত, যা সারা বিশ্বের আধ্যাত্মিক পিপাসুদের কাছে একটি প্রধান আকর্ষণ।

তার অগণিত বক্তৃতা এবং বই আজও পৃথিবীব্যাপী পাঠকদের অনুপ্রাণিত করে।

তথ্য: উইকিপিডিয়া সংগ্রহ: মৃণাল নন্দী

৩৪

ধনী হওয়াটা কারো ভাগ্যের গল্প না।, এর পেছনে কিছু কঠিন বাস্তবতা, 

Elon Musk কেন এত ধনী এটা শুধু ভাগ্যের গল্প না। এর পেছনে কিছু কঠিন বাস্তবতা, সিদ্ধান্ত, আর দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিক কাজ আছে। বিষয়টা এমনভাবে বোঝা যায়, যেটা একজন সাধারণ মানুষও নিজের জীবনে কাজে লাগাতে পারে।

প্রথমত, তিনি সমস্যা দেখেছেন অন্যভাবে। যেখানে অনেকে শুধু চাকরি খোঁজে, তিনি দেখেছেন কোথায় বড় সমস্যা আছে। যেমন বিদ্যুৎচালিত গাড়ি (Tesla), মহাকাশ ভ্রমণ (SpaceX), অনলাইন পেমেন্ট (PayPal)।

এই জায়গাগুলোতে তিনি কাজ শুরু করেছেন, যেগুলো ভবিষ্যতে বড় হবে এটাই প্রথম শিক্ষা: বড় চিন্তা করা, কিন্তু বাস্তব সমস্যার উপর।

দ্বিতীয়ত, ঝুঁকি নেওয়ার সাহস। PayPal বিক্রি করে যে টাকা পেয়েছিলেন, সেটার বড় অংশ আবার নতুন কোম্পানিতে ঢেলে দেন। অনেক সময় এমন হয়েছে তার কাছে ব্যক্তিগতভাবে খুব কম টাকা ছিল।

এখান থেকে শিক্ষা: নিরাপদ খেললে বড় কিছু হয় না। তবে অন্ধ ঝুঁকি না হিসাব করে ঝুঁকি।

তৃতীয়ত, পরিশ্রমের মাত্রা। তিনি সপ্তাহে ৮০–১০০ ঘণ্টা কাজ করতেন। এটা সবার জন্য বাস্তবসম্মত না, কিন্তু বার্তাটা পরিষ্কার

অন্যদের চেয়ে একটু বেশি সিরিয়াস হলে ফল আলাদা হয়।

চতুর্থত, একাধিক আয়ের উৎস তৈরি। Tesla, SpaceX, আরও কিছু উদ্যোগ সব মিলিয়ে তার সম্পদ তৈরি হয়েছে।

এখানে শিক্ষা: একটা আয়ের উপর নির্ভর না করে ধীরে ধীরে নতুন উৎস তৈরি করা।

পঞ্চমত, দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টি। অনেক ব্যবসা শুরুতে লাভ দেয়নি। কিন্তু তিনি সময় দিয়েছেন।

এখানে মূল কথা: ধৈর্য ছাড়া বড় কিছু হয় না।

এখন প্রশ্ন একজন গরীব মানুষ কী শিখতে পারে?

১. ছোট থেকে শুরু করুন, কিন্তু থেমে থাকবেন না

২. একটা দক্ষতা শিখুন (যেমন কাজ, ট্রেড, অনলাইন স্কিল)

৩. খরচ কমিয়ে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের অভ্যাস গড়ুন

৪. ধীরে ধীরে নতুন আয়ের পথ খুঁজুন

৫. হাল ছাড়বেন না সময় লাগবেই

সোজা কথায়, Elon Musk রাতারাতি ধনী হননি।

তিনি আলাদা ভাবে চিন্তা করেছেন, ঝুঁকি নিয়েছেন, আর দীর্ঘ সময় ধরে লেগে ছিলেন।

@ ShimuRimu


৩৫

লেবানন

লেবাননের জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ খ্রিস্টান। এর মধ্যে ২১ শতাংশই ম্যারোনিট খ্রিস্টান। যারা মূলত ক্যাথলিক। লেবাননের প্রেসিডেন্ট পদটি তাদের জন্য সংরক্ষিত। তবে প্রধানমন্ত্রী পদে বসতে পারেন শুধু সুন্নিরা। আর স্পিকার হতে পারবেন শুধু শিয়ারা।

আমরা আজকের যে লেবাননের কথা জানি তা শাম থেকে আলাদা করা হয়েছিল ম্যারোনিটদের স্বার্থরক্ষার জন্য। মাউন্ট লেবাননের আশেপাশে এই ম্যারোনিটদের বসবাস ছিল। সেই পাহাড়ের নামেই সিরিয়া তথা শাম ভেঙে আজকের লেবাননের সৃষ্টি করে ফ্রান্স।

সপ্তম শতকে মুসলমানরা যখন শাম জয় করে তারও আগে থেকে সেখানে ম্যারোনিটদের বসবাস ছিল। এরপর থেকে বিগত ১৪০০ বছর ধরে সেখানে ইসলামের প্রচার ও চর্চা হয়ে আসছে। ১৪০০ বছর পরও শামে ম্যারোনিট খ্রিস্টানদের উপস্থিতি হচ্ছে ইসলামের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অন্যতম উদাহরণ।

এই ১৪০০ বছরে মুসলিমরা চাইলে তাদের নিশ্চিহ্ন করতে পারতো কিংবা জোর করে ধর্মান্তরিত করতে পারতো। কিন্তু ইসলাম তা শিক্ষা দেয় না। যার ফলে আজও লেবাননে ম্যারোনিটরা টিকে আছে। শুধু টিকে আছে বললে ভুল হবে, বরং বেশ প্রতাপের সাথেই টিকে আছে।

বিপরীতে প্রায় ৮০০ বছর শাসনের পরও স্পেন থেকে বিতাড়িত হতে হয়েছে মুসলমানদের। শুধু মুসলমান না, ইহুদিদেরও তাড়িয়ে দিয়েছে খ্রিস্টানরা। ইউরোপ থেকেও ইহুদিদের বিতাড়িত করেছে তারা। অথচ উসমানিদের ৬০০ বছরের শাসনামলে সাম্রাজ্যের সবখানেই মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদিরা শান্তিতে বসবাস করেছে। লেবানন ও ফিলিস্তিন যখন উসমানিদের অধীনে ছিল তখন সেখানেও বড় ধরনের কোনো অশান্তির খবর শোনা যায়নি।

৬০০ বছর ভারত শাসন করেছে মুসলমানরা। ভারতের বর্তমান হিন্দুত্ববাদীরা দাবি করে তৎকালীন মুসলিম শাসকরা হিন্দুদের উপর অকথ্য নির্যাতন করেছে। অথচ তাদের কথা সত্য হলে আজ ভারতে হিন্দুদের সংখ্যা মুসলিমদের চেয়ে তিন গুণ বেশি হওয়ার কথা ছিল না। অন্তত দিল্লি কিংবা উত্তর প্রদেশে তো মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেরকম হয়নি৷

মুসলমানরা যদি বর্বর হতো, যদি তরবারি জোরে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হতো তাহলে উসমানি সাম্রাজ্যে কিংবা মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা দেশগুলোতে বর্তমানে আজ মুসলিম ভিন্ন অন্য ধর্মের কারো থাকার কথা ছিল না।

স্পেনে খ্রিস্টানদের অত্যাচারের কারণে আজ সেখানকার মুসলিম জনসংখ্যা মাত্র ৪.৫%। তাদের রিকনকুইস্তার সময় মুসলমানদের পাশাপাশি প্রায় ৩ লাখ ইহুদিকে ধর্মান্তরিত করা হয়েছিল। যে ৪০-৮০ হাজার ইহুদি ধর্মান্তরিত হয়নি তাদের বিতাড়িত করা হয়েছিল।

মুসলিম যোদ্ধারা রাজ্য জয়ের জন্য তরবারি ব্যবহার করেছে। তারা কাউকে ইসলাম গ্রহণ করানোর জন্য তরবারি ব্যবহার করলে ভারতে যেমন হিন্দু থাকতো না, তেমনি লেবাননে ম্যারোনিটরা আজও প্রেসিডেন্ট হতে পারতো না।

@ জাহিদ হাসান মিঠু


৩৬

ম্যান্ডেলা

 একজন সফল নেতার শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান থাকলেই চলে না, বরং সাধারণ মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা ও সহানুভূতি থাকা জরুরি। ম্যান্ডেলা তার নিজের জীবনেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে-দীর্ঘ ২৭ বছর কারাবাসের পর তিনি যখন মুক্ত হন, তখন তিনি প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমা ও পুনর্মিলনের পথ বেছে নিয়েছিলেন।

সামাজিক পরিবর্তন:

তিনি মনে করতেন, যখন মেধা (মস্তিষ্ক) এবং সততা বা দয়া (হৃদয়) এক হয়, তখন মানুষ অজেয় হয়ে ওঠে এবং সমাজকে ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন করার সক্ষমতা পায়। ম্যান্ডেলা আরও যোগ করেছিলেন যে, এই দুটির সাথে যদি 'সুনিপুণ লেখনী বা সাবলীল ভাষা' (a literate tongue or pen) যুক্ত হয়, তবে তা এক অসাধারণ শক্তিতে পরিণত হয়।

নেলসন ম্যান্ডেলা

(১৮ জুলাই ১৯১৮-৫ ডিসেম্বর ২০১৩) ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা এবং দেশটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি। দক্ষিণ আফ্রিকায় তাকে প্রায়ই 'মাদিবা' নামে ডাকা হয়, যা তার গোত্রীয় নাম এবং এটি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রতীক।

তার জীবন ও সংগ্রামের কিছু মূল তথ্য নিচে দেওয়া হলো:

সংগ্রাম ও কারাবাস:

তিনি শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু শাসনের বিরুদ্ধে এবং বর্ণবৈষম্য (Apartheid) নিরসনে দীর্ঘ সংগ্রাম করেন। এই অপরাধে তাকে জীবনের ২৭ বছর কারাগারে কাটাতে হয় (১৯৬২-১৯৯০)।

শান্তিতে নোবেল:

দক্ষিণ আফ্রিকায় শান্তিপূর্ণভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং বর্ণবাদ অবসানে অবদানের জন্য তিনি ১৯৯৩ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্কের সাথে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন।

রাষ্ট্রপতি:

কারামুক্তির পর তিনি ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন দেশটির প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান।

আদর্শ:

তিনি বিশ্বজুড়ে শান্তি, ক্ষমা এবং জাতিগত পুনর্মিলনের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে পরিচিত। তিনি বিশ্বাস করতেন, "মানুষ ঘৃণা করতে শেখে, আর যদি তারা ঘৃণা করতে শেখে, তবে তাদের ভালোবাসাও শেখানো সম্ভব।"

তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন:

দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি নেতা এবং শান্তিতে নোবেল বিজয়ী নেলসন ম্যান্ডেলা ১৯৯৭ সালের ২৫শে মার্চ বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন।

তাঁর এই সফরের উল্লেখযোগ্য কিছু তথ্য হলো:

উপলক্ষ:

বাংলাদেশের স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী (২৫ বছর) উদযাপন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি ঢাকায় আসেন।

সঙ্গী:

তাঁর সাথে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাত এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট সুলেমান ডেমিরেলও আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে এসেছিলেন।

কার্যক্রম:

তিনি সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং সেখানে একটি গাছ রোপণ করেন।

ভাষণ:

ম্যান্ডেলা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন। সেখানে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন এবং নিজেকে বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে ঘোষণা করেন।

একটি মজার তথ্য হলো, সেই সফরে তিনি বাংলাদেশের আম খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু মার্চ মাস হওয়ায় তখন আমের মৌসুম ছিল না।

তথ্য: উইকিপিডিয়া সংগ্রহ: মৃণাল নন্দী

৩৭


ধৈর্য যে স্কিলটা না থাকলে টাকা আপনার হাতে টিকবে না

আপনি কি কখনো লক্ষ্য করেছেন আমরা সবাই দ্রুত ফল চাই?

দ্রুত রেজাল্ট, দ্রুত সাফল্য, দ্রুত টাকা।আমরা এমন এক যুগে বাস করি যেখানে লোডিং…শব্দটা দেখলেই বিরক্তি লাগে।

কিন্তু একটা অদ্ভুত সত্য আছে মার্কেট আপনার টাকা নেয় না, আপনার অস্থিরতা দিয়ে আপনি নিজেই তা দিয়ে দেন।

দ্রুত লাভের লোভ: আমাদের নীরব শত্রু

ধরুন, আপনি নতুন কিছু শুরু করলেন ইনভেস্টিং, ব্যবসা, বা স্কিল শেখা।প্রথম কয়েকদিন সবকিছু রোমাঞ্চকর। ইউটিউব ভিডিও, মোটিভেশন, প্ল্যান সব ঠিক।

তারপর?

ফল আসতে দেরি হলেই মনের ভেতর ছোট একটা ভয় ঢুকে পড়ে:

আমি কি ভুল করছি?

এটা কি কাজ করবে?

আরেকটা শর্টকাট ট্রাই করি না?

এই জায়গাতেই বেশিরভাগ মানুষ হার মানে।

তারা হারেন মার্কেটের কাছে না হারেন নিজের অস্থিরতার কাছে।

ধৈর্য আসলে কী?

ধৈর্য মানে বসে থাকা না।ধৈর্য মানে প্রতিদিন ছোট ছোট সঠিক কাজ করে যাওয়া, যদিও বড় ফল এখনো দেখা যাচ্ছে না।

একটা বীজ লাগানোর পর আপনি কি প্রতিদিন মাটি খুঁড়ে দেখেন গাছ বের হয়েছে কিনা?

না।আপনি পানি দেন, অপেক্ষা করেন। বিশ্বাস রাখেন।

টাকা, ক্যারিয়ার, স্কিল সব একই নিয়মে কাজ করে।

আমরা কেন অস্থির হয়ে যাই?

কারণ আমরা অন্যের হাইলাইট রিল দেখি।কেউ ৬ মাসে সফল হয়েছে শুনি, কিন্তু তার ৬ বছরের ব্যর্থতা দেখি না।আমরা ফল দেখি, প্রক্রিয়া দেখি না।

ফলে আমরা ভাবি

“আমারটা এত সময় নিচ্ছে কেন?”

এই প্রশ্নটাই আসলে সবচেয়ে বিপজ্জনক।

আসল গেমটা কোথায়?

সফল মানুষ আর ব্যর্থ মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য স্কিল না।ইন্টেলিজেন্সও না।পার্থক্য হলো কে কতদিন ধরে খেলায় থাকতে পারে।যারা টিকে থাকে, তারা জেতে।যারা মাঝপথে ছাড়ে, তারা ভাবে মার্কেট খারাপ ছিল।

আজ একটা ছোট সিদ্ধান্ত নিন

আজ থেকে নিজেকে একটা কথা বলুন:

আমি দ্রুত ধনী হতে চাই না।

আমি দীর্ঘ সময় ধরে ধনী থাকতে চাই।

এই চিন্তা বদলালেই আপনার সিদ্ধান্ত বদলাবে।

আপনার আচরণ বদলাবে।এবং ধীরে ধীরে আপনার ফলও বদলাবে।কারণ সত্যিটা খুবই সহজ:

ধৈর্য কখনো হারে না। মানুষ মাঝপথে ছেড়ে দেয়।

@ 𝙀𝙡𝙚𝙫 𝙄𝙌 2.0

৩৮


স্বাদের সঙ্গে আমাদের ঘ্রাণশক্তির সম্পর্ক 

মানুষের জিভে জন্মের সময় থাকে প্রায় ৯,০০০ টেস্ট ব্লাড—যেগুলো আমাদের মিষ্টি, নোনতা, টক, তেতো স্বাদ আলাদা করে চিনতে সাহায্য করে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই টেস্ট বাডের পুনর্গঠন ধীরে ধীরে কমে যায়। বিশেষ করে ৫০-এর পর সংখ্যা যেমন কমে, তেমনি সংবেদনশীলতাও হ্রাস পায়। ফলে একই খাবার আগের মতো সুস্বাদু লাগে না।তবে বিষয়টি শুধু বয়সের ওপর নির্ভর করে না—জেনেটিক্স, দাঁতের সমস্যা, ধূমপান, কিংবা দীর্ঘমেয়াদি রোগও এতে বড় ভূমিকা রাখে।

স্বাদের সঙ্গে আমাদের ঘ্রাণশক্তির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নাকের ভিতরের 𝐨𝐥𝐟𝐚𝐜𝐭𝐨𝐫𝐲 𝐫𝐞𝐜𝐞𝐩𝐭𝐨𝐫 কোষের সংখ্যাও কমতে থাকে, যার ফলে খাবারের ফ্লেভার অনুভব করার ক্ষমতা কমে যায়। তাই অনেক সময় সর্দি-কাশি হলে যেমন খাবার নিরামিষ লাগে, ঠিক তেমনি বয়সজনিত পরিবর্তনেও খাবারের স্বাদ ফিকে হয়ে যেতে পারে। এই পরিবর্তনের কারণে অনেকেই বেশি নোনতা বা মিষ্টি খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়েন—যা দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ রক্তচাপ বা ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

তবে আশার কথা হলো—এই পরিবর্তন পুরোপুরি ঠেকানো না গেলেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। পর্যাপ্ত পানি পান করে শরীরে লালার পরিমাণ ঠিক রাখা, ধূমপান এড়িয়ে চলা, ডায়াবেটিসের মতো রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রয়োজন হলে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করা—এসবই স্বাদ অনুভূতি ধরে রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া লেবুজাতীয় ফল, মসলা, হার্বস বা ভিনেগার দিয়ে খাবার মেরিনেট করলে স্বাদ অনেক বেশি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে—অতিরিক্ত লবণ বা চিনি ছাড়াই।

𝐒𝐨𝐮𝐫𝐜𝐞𝐬:

* 𝐃𝐫 𝐍𝐢𝐬𝐡 𝐌𝐚𝐧𝐞𝐤, 𝐒𝐜𝐢𝐞𝐧𝐜𝐞 𝐅𝐨𝐜𝐮𝐬, 𝐀𝐩𝐫𝐢𝐥 𝟐𝟎𝟐𝟔

* 𝐍𝐚𝐭𝐢𝐨𝐧𝐚𝐥 𝐈𝐧𝐬𝐭𝐢𝐭𝐮𝐭𝐞 𝐨𝐧 𝐀𝐠𝐢𝐧𝐠 (𝐍𝐈𝐀) – 𝐓𝐚𝐬𝐭𝐞 𝐚𝐧𝐝 𝐒𝐦𝐞𝐥𝐥 𝐂𝐡𝐚𝐧𝐠𝐞𝐬 𝐰𝐢𝐭𝐡 𝐀𝐠𝐞

* 𝐇𝐚𝐫𝐯𝐚𝐫𝐝 𝐇𝐞𝐚𝐥𝐭𝐡 𝐏𝐮𝐛𝐥𝐢𝐬𝐡𝐢𝐧𝐠 – “𝐖𝐡𝐲 𝐲𝐨𝐮𝐫 𝐬𝐞𝐧𝐬𝐞 𝐨𝐟 𝐭𝐚𝐬𝐭𝐞 𝐜𝐡𝐚𝐧𝐠𝐞𝐬 𝐚𝐬 𝐲𝐨𝐮 𝐚𝐠𝐞


৩৯

মৌমাছির যুদ্ধ

=================

৪ নভেম্বর, ১৯১৪।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তখন তুঙ্গে। জার্মানির উপনিবেশ পূর্ব আফ্রিকা, বর্তমান তানজানিয়ার টাঙ্গা বন্দরে ব্রিটিশ ও ভারতীয় সৈন্যদের এক বিশাল বাহিনী দাপটের সাথে এগিয়ে আসছিল জার্মান ঘাঁটি দখলের নেশায়। ব্রিটিশদের সৈন্যসংখ্যা ছিল জার্মানদের তুলনায় প্রায় আট গুণ বেশি। কিন্তু তারা জানত না, এই রণক্ষেত্রে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে এক অজেয় 'তৃতীয় পক্ষ'।

যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। কামানের গোলার বিকট শব্দে কেঁপে উঠল চারপাশ। ঘটনাক্রমে কিছু গোলা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে আঘাত করল বনের বিশাল সব গাছে। সেখানেই ছিল বুনো মৌমাছির অজস্র চাক। মুহূর্তের মধ্যে আকাশ কালো হয়ে গেল। কোনো শত্রু সৈন্য নয়, বরং হাজার হাজার ক্ষিপ্ত মৌমাছি নেমে এল রণক্ষেত্রে। শুরু হলো হুল ফোটানোর উৎসব।

বন্দুক আর মেশিনগান ফেলে অভিজ্ঞ ব্রিটিশ সৈন্যরা প্রাণভয়ে দৌড়াতে শুরু করল। জানা যায়, রয়্যাল ইঞ্জিনিয়ার্সের এক সিগন্যাল ম্যানের শরীরে প্রায় ৩০০টি হুল ফুটেছিল। ব্রিটিশরা সংখ্যায় অনেক বেশি হওয়া সত্ত্বেও মৌমাছির এই অতর্কিত আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। ইতিহাসের পাতায় এই অদ্ভুত লড়াই চিরস্মরণীয় হয়ে আছে "Battle of the Bees" বা মৌমাছির যুদ্ধ নামে —যেখানে মানুষের বারুদ হেরে গিয়েছিল প্রকৃতির এক ক্ষুদ্র পতঙ্গের কাছে।

১৫ এপ্রিল, ২০২৬ — ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর নেতিভোটে ঘটে এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। হিব্রু সংবাদ মাধ্যমগুলোতে প্রকাশ - হঠাৎ করেই হাজার হাজার মৌমাছির এক বিশাল ঝাঁক শহরের আকাশ ঢেকে ফেলে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আকাশে হঠাৎ কালো মেঘের মতো একটি বিশাল ঘন পিণ্ড দেখা যায়, যা মুহূর্তের মধ্যে দোকানপাট, গাড়ি, ভবনের বারান্দা ও গাছপালার ওপর আছড়ে পড়ে। আতঙ্কিত বাসিন্দারা নিরাপত্তার জন্য দ্রুত ঘরবাড়ি ও দোকানের দরজা-জানালা বন্ধ করে দেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সতর্কতা জারি করে নাগরিকদের ঘরে থাকার পরামর্শ দেয়। একদল ক্ষুদ্র পতঙ্গ মারণাস্ত্র সমৃদ্ধ একটি শহরকে সাময়িকভাবে অচল করে দেয়।

সময়ের ব্যবধান এক শতাব্দীর অধিক হলেও মৌমাছির দল আবারো সেই ধ্রুব সত্যেরই সাক্ষ্য দিল — গোলাবারুদ, আধুনিক প্রযুক্তি, বিধ্বংসী মারণাস্ত্র কিংবা গর্বের প্রতিরক্ষা কবচ আয়রন ডোম, প্রকৃতির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণীর অসীম শক্তির কাছে আজও তুচ্ছ। প্রকৃতি তার ক্ষুদ্রতম সৈন্যদল দিয়েই দাম্ভিক মানুষের আগ্রাসী ও যুদ্ধংদেহী অহংকার চূর্ণ করার ক্ষমতা রাখে।

@ Atiq Charu


৪০

কেউ ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করে, সে ধর্মীয়ভাবে ‘বনি ইসরায়েল’-এর অংশ হয়ে যায়, 

বনি ইসরায়েল হচ্ছে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে সৌভাগ্যবান এবং একি সাথে সবচেয়ে দূর্ভাগা জাতি। বনি ইসরায়েলের ইতিহাস অনেক লম্বা। তবে বর্তমানে ইসরায়েলিরা নিজেদের যেই বনি ইসরায়েলের উত্তরসূরী বলে দাবি করে, এবং জেরুজালেম সহ সম্পূর্ণ মধ্যপ্রাচ্য দখলের চেষ্টা করছে, আর ইতিহাসের সর্বোচ্চ জুলুম করছে। এরা আসলে কতটা বনি ইসরায়েলের উত্তরসূরী এই প্রশ্নটা চেপে যাওয়া হচ্ছে।

বর্তমান ফিলিস্তিনি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অনেক মুসলিম ও খ্রিস্টানদের ধমনীতেও প্রাচীন বনি ইসরায়েলিদের রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে।

ইতিহাসে যখনই কোনো বড় আক্রমণ হয়েছে (যেমন ব্যাবিলনীয় বা রোমান আক্রমণ), তখন সাধারণত শহরের ধনী, শিক্ষিত এবং প্রভাবশালী ইহুদিদের বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হতো, বা তারা ভয়ে পালিয়ে যেত। কিন্তু যারা সাধারণ কৃষক ছিল, যারা মাটির সাথে মিশে থাকত, তারা কোথাও যেত না।

ইতিহাসবিদদের মতে, রোমানরা যখন দ্বিতীয় উপাসনালয় ধ্বংস করে ইহুদিদের তাড়িয়ে দেয়, তখনো সাধারণ কৃষকদের একটি বড় অংশ ওই এলাকাতেই থেকে যায়। তারা কর প্রদান করত এবং টিকে থাকার জন্য নিজেদের পরিচয় গোপন করত বা পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিত।

সপ্তম শতাব্দীতে যখন আরব মুসলিমরা ফিলিস্তিন ও জেরুজালেম জয় করে, তখন তারা স্থানীয় জনগণের ওপর ধর্ম চাপিয়ে দেয়নি। কিন্তু দীর্ঘ কয়েকশ বছরের শাসনামলে স্থানীয় ইহুদি এবং খ্রিস্টানদের বড় একটি অংশ স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।

এই ধর্মান্তরিত মানুষেরা আসলে কারা ছিল? তারা ছিল সেই প্রাচীন বনি ইসরায়েলেরই বংশধর, যারা রোমানদের তাড়ানোর পর ওই মাটিতেই রয়ে গিয়েছিল। তারা কেবল তাদের ধর্ম এবং ভাষা, হিব্রু থেকে আরবিতে পরিবর্তন করেছিল, কিন্তু তাদের ডিএনএ বা রক্ত পরিবর্তন হয়নি।

আধুনিক বিজ্ঞান এই দাবিকে জোরালো সমর্থন দেয়। ২০০০ এবং ২০১০ সালের দিকে করা বেশ কিছু বিখ্যাত জেনেটিক স্টাডি, যেমন: নেবেল এবং হ্যামারের গবেষণায় দেখা গেছে:—

ফিলিস্তিনি মুসলিম এবং ইহুদিদের (বিশেষ করে যারা সেফার্দি ও মিজরাহি)-এদের মধ্যে জিনগত মিল অত্যন্ত বেশি।

মিজরাহি ইহুদি: এরা মূলত ইরাক, ইরান বা ইয়েমেনের। এদের বংশগতি প্রাচীন বনি ইসরায়েলের সবচেয়ে কাছাকাছি বলে মনে করা হয়।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, একজন ফিলিস্তিনি আরবের সাথে, প্রাচীন লেভান্তাইন (প্রাচীন ইসরায়েলি) বংশগতির মিল একজন ইউরোপীয় ইহুদি আশকেনাজি'র চেয়েও অনেক বেশি গভীর।

আজকের দিনের সংঘাতের দিকে তাকালে একটি নির্মম সত্য বেরিয়ে আসে— অনেক ক্ষেত্রে এটি আসলে একই রক্তের দুই ভাইয়ের লড়াই। এক ভাই ২,০০০ বছর নির্বাসনে থেকে আবার ফিরে এসেছে (আধুনিক ইহুদি)।

অন্য ভাই ২,০০০ বছর ওই মাটিতেই পড়ে ছিল, কিন্তু সময়ের আবর্তে সে তার ধর্ম ও পরিচয় বদলে ফেলেছে। যারা (বর্তমান ফিলিস্তিনি), ও আশেপাশের লেবানিজ, জর্দানি, ইরাকি, সিরিয়ান ও মিশরীয় অনেকেই।

তাই এটি বলা মোটেও ভুল হবে না যে, যে ফিলিস্তিনিদের ওপর আজ ইসরায়েল যে জুলুম করছে, তাদের অনেকেরই পূর্বপুরুষ ছিলেন সেই প্রাচীন বনি ইসরায়েল বা হযরত মুসা (আ.) ও দাউদ (আ.)-এর অনুসারী।

রক্তের হিসেবে বর্তমান ফিলিস্তিনিরা ওই মাটির প্রকৃত দাবিদার, এবং জেনেটিক্যালি তারা প্রাচীন বনি ইসরায়েলের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

অন্যদিকে, আধুনিক ইসরায়েলিদের বড় একটি অংশ ইউরোপীয় বা বিদেশি সংমিশ্রণ নিয়ে এসেছে। তারা যখন যাযাবর হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছে, তখন বিয়ে শাদি ও বংশ বিস্তার করেছে অন্যান্য জাতির সাথে।

এমনকি ইতিহাসে যতবার ইহুদীরা শক্তিশালী হয়েছে, তারা ততবার অন্যান্য জাতির উপরে সর্বোচ্চ জুলুম করেছে, এবং জুর করে ধর্মান্তরিত করেছে, যাদের গায়ে বনি ইসরায়েলিদের রক্ত নেই।

অষ্টম শতাব্দীতে কাস্পিয়ান সাগরের তীরে 'খাজার' (Khazars) নামক একটি তুর্কি গোত্র দলগতভাবে ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করেছিল। বর্তমানে অনেক ইউরোপীয় ইহুদি আসলে সেই খাজারদের বংশধর, যাদের সাথে প্রাচীন বনি ইসরায়েলের সরাসরি কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই।

ইহুদি হওয়া কেবল বংশের বিষয় নয়, এটি ধর্মেরও বিষয়। ইতিহাসে অনেকে ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করেছে। যখন কেউ ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করে, সে ধর্মীয়ভাবে ‘বনি ইসরায়েল’-এর অংশ হয়ে যায়, যদিও তার রক্তে প্রাচীন হিব্রু বংশগতি নেই।

বর্তমান ইসরায়েলে এমন অনেক ইহুদি আছে, যারা আফ্রিকার (যেমন: ইথিওপিয়ান ইহুদি) বা ভারতের। তাদের পূর্বপুরুষরা ধর্ম পরিবর্তনের মাধ্যমে এই পরিচিতি পেয়েছে।

ইতিহাসের এই নির্মম সত্যটি বর্তমানে রাজনৈতিক কারণে অনেক সময় এড়িয়ে যাওয়া হয়। কারণ এটি স্বীকার করে নেওয়া মানে হলো— ইসরায়েল আসলে নিজেরই ‘রক্তের ভাইদের’ বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে এবং তাদেরই নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ করছে।

ফিলিস্তিনি মুসলমানরা ঐতিহাসিক ভাবে এই ভূমির আসল দাবিদার হলেও, বর্তমানে ইসরায়েলিরা বিশেষ করে আশকেনাজি জুইশরা, এই সত্যটা চেপে গিয়ে নিজেদেরকে আসল মালিক দাবি করছে। যেটা আসলে ইউরোপীয় কলোনাইজারদের একটা এক্সটেন্ডেড ভার্সন।

@ Allora Insights


৪২


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে জাপান আত্মসমর্পণ করতে রাজি হচ্ছিল না।

মূলত ৩টা কারণে আমেরিকা পারমাণবিক বোমা বেছে নিল:

১। যদি স্থলযুদ্ধ করা হয়, তাহলে লাখ লাখ আমেরিকান সৈন্য মারা যাবে।

২। যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই সোভিয়েত ইউনিয়নকে নিজেদের সামরিক শক্তি দেখাতে চেয়েছিল আমেরিকা—যাতে পরবর্তী বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব বাড়ানো যায়।

৩। জাপানের “শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ” নীতির কারণে তাদের মনোবল ভাঙা কঠিন ছিল। পারমাণবিক বোমা সেই মনোবল ভেঙে দেবে এমন বিশ্বাস ছিল আমেরিকার।

যে ধরনের বোমা ব্যবহার করা হয়েছিল :

১। হিরোশিমা: Little Boy (ইউরেনিয়াম ভিত্তিক)

২। নাগাসাকি: Fat Man (প্লুটোনিয়াম ভিত্তিক)

ধ্বংসযজ্ঞ যেমন ছিল:

১। বিস্ফোরণে মুহূর্তেই হাজার হাজার মানুষ ছাই হয়ে যায়

২। ভবন, রাস্তা, গাছ—সবকিছু মুহূর্তে ধ্বংস

৩। তাপমাত্রা প্রায় সূর্যের পৃষ্ঠের মতো (মিলিয়ন ডিগ্রি) হয়ে উঠে

৪। হিরোশিমা: প্রায় ১,৪০,০০০ মানুষ (১৯৪৫ সালের শেষ পর্যন্ত)মৃত্যু হয়।

৫। নাগাসাকি: প্রায় ৭০,০০০ মানুষ মৃত্যু বরণ করে

তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব:

১। অনেক মানুষ তৎক্ষণাৎ না মরে পরে ক্যান্সার ও অন্যান্য রোগে মারা যায়

২। শিশুদের মধ্যে জন্মগত বিকলাঙ্গতা দেখা দেয়

৩। বহু বছর ধরে পরিবেশ ও মানব স্বাস্থ্যের ক্ষতি চলতে থাকে

এই দুই বোমা নিক্ষেপের পর জাপান ১৫ আগস্ট ১৯৪৫ সালে আত্মসমর্পণ করে, যার মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়।

ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছে ইরানী সভ্যতার আজ রাতে মৃত্যু ঘটবে যদি ইরান তার কথা মত আপোষ না করে।

এছাড়া কিছুদিন আগে সে পরমাণু হামলার হুমকিও দিয়েছে ইরানকে।

জাপানের ঘটনা দেখে কি মনে হয়, সে কি পরমাণু বেছে নিবে.? আপনার মন্তব্য কমেন্টে জানান।

@ Finlit Masud


৪৩

ইবনে খলদুনের আল মুকাদ্দিমা ও সাম্রাজ্যের পতন

=================================

ইবনে খলদুন (১৩৩২–১৪০৬) ছিলেন মধ্যযুগের একজন মুসলিম মনীষী, যাকে আধুনিক সমাজবিজ্ঞান (Sociology), ইতিহাসতত্ত্ব (Historiography) এবং অর্থনীতির (Economics) অন্যতম জনক মনে করা হয়।

তিনি কেবল একজন তাত্ত্বিক ছিলেন না, বরং বাস্তব জীবনেও ছিলেন একজন ঝানু কূটনীতিবিদ, বিচারক এবং সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ইবনে খলদুন মোঙ্গল সাম্রাজ্যের পতন ঘটার বহু শতাব্দী আগেই তার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।

তার জন্ম তিউনিসিয়ায় হলেও তার পূর্বপুরুষরা ছিলেন ইয়েমেনি বংশোদ্ভূত আন্দালুসিয়ান (স্পেন)। তিনি তার জীবনে উত্তর আফ্রিকা (তিউনিসিয়া, মরক্কো, আলজেরিয়া), স্পেন এবং মিশরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও বিচারিক দায়িত্ব পালন করেছেন। মিশরে তিনি প্রধান বিচারক (কাজী) হিসেবেও নিযুক্ত ছিলেন।

অ্যাডাম স্মিথের শত শত বছর আগেই ইবনে খলদুন শ্রমের বিভাজন, মূল্যতত্ত্ব এবং কর ব্যবস্থা নিয়ে আধুনিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, অতিরিক্ত কর ধার্য করলে উৎপাদন কমে যায় এবং শেষ পর্যন্ত রাজকোষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ইবনে খলদুন মূলত বিখ্যাত তার কালজয়ী গ্রন্থ 'আল-মুকাদ্দিমা' (Al-Muqaddimah) এর জন্য। এটি ছিল তার বিশ্ব ইতিহাসের বিশাল সংকলন 'কিতাব আল-ইবার'-এর প্রথম খণ্ড বা ভূমিকা। এই বইটিতে তিনি ইতিহাস লেখার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের উত্থান পতনের যে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা এর আগে কেউ করতে পারেননি।

ইবনে খলদুন মনে করতেন, একটি রাজবংশের গড় আয়ু সাধারণত তিন প্রজন্ম বা ১২০ বছর। প্রথম প্রজন্ম কষ্ট করে সাম্রাজ্য গড়ে, দ্বিতীয় প্রজন্ম তা ভোগ করে এবং তৃতীয় প্রজন্ম অলসতা ও বিলাসিতার মাধ্যমে তা ধ্বংস করে।

আজকের মধ্যপ্রাচ্যে হুবহু ইবনে খলদুনের তত্ত্বের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এমনকি ইয়াংকি সাম্রাজ্যও খলদুনের তত্ত্বের বাইরে নয়।


৪৪


ব্যাটল অফ থার্মোপাইল : এক ঐতিহাসিক বিশ্বাসঘাতকতা

=================================

খ্রিস্টপূর্ব ৪৮০ অব্দে পারস্য সম্রাট জারক্সিস (Xerxes I) এবং গ্রিক নগর রাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিত বাহিনীর মধ্যে সংঘটিত ব্যাটল অফ থার্মোপাইল বা থার্মোপাইলের যুদ্ধ ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর এবং আলোচিত সমর কাহিনী। বিশেষ করে স্পার্টান যোদ্ধাদের বীরত্বের জন্য এই যুদ্ধ অমর হয়ে আছে।

পারস্য সাম্রাজ্য যখন বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে গ্রিস দখলের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হয়, তখন গ্রিকরা তাদের আটকানোর জন্য থার্মোপাইল নামক একটি অত্যন্ত সংকীর্ণ গিরিপথ বেছে নেয়। একপাশে খাড়া পাহাড় আর অন্যপাশে সমুদ্র থাকায় এই পথটি ছিল প্রাকৃতিকভাবেই দুর্ভেদ্য। এটি ছিল গ্রিসের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশের একমাত্র সহজ পথ।

স্পার্টার রাজা লিওনাইডাস (Leonidas) ছিলেন এই বাহিনীর নেতৃত্বে। যদিও বলা হয় মাত্র ৩০০ জন স্পার্টান যুদ্ধ করেছিলেন, বাস্তবে তাদের সাথে আরও প্রায় ৭,০০০ গ্রিক সৈন্য ছিল। সম্রাট জারক্সিসের অধীনে ছিল বিশাল বাহিনী। ঐতিহাসিকদের মতে এর সংখ্যা ছিল প্রায় ৭০,০০০ থেকে ৩,০০,০০০ (প্রাচীন বর্ণনায় এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলা হতো)।

প্রথম দুই দিন পারস্য বাহিনী তাদের সংখ্যাধিক্য সত্ত্বেও গ্রিকদের হঠাতে ব্যর্থ হয়। গ্রিকদের সুশৃঙ্খল ফ্যালাঙ্কস (Phalanx) ব্যুহ এবং উন্নত ঢাল বর্শার সামনে পারস্যের হালকা অস্ত্রধারী সৈন্যরা টিকতে পারছিল না। গ্রীকদের অত্যন্ত দুর্ভাগ্য যে, এফিয়াল্টেস (Ephialtes) নামক এক স্থানীয় ব্যক্তি পারস্য বাহিনীকে পাহাড়ের আড়ালে আরেকটি একটি গোপন পথের সন্ধান দেয়।

এই পথ ব্যবহার করে পারস্য বাহিনী গ্রিকদের পেছন দিক থেকে ঘিরে ফেলে (যা অনেকটা পিন্সার বা সাঁড়াশী অভিযানের মতো ছিল)। লিওনাইডাস যখন বুঝতে পারেন যে তারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন, তখন তিনি বাকি গ্রিক সৈন্যদের পিছু হটার নির্দেশ দেন এবং নিজের ৩০০ স্পার্টান ও কিছু থেস্পিয়ান যোদ্ধা নিয়ে আমৃত্যু লড়াই করার সিদ্ধান্ত নেন।

রাজা লিওনাইডাস এবং তার যোদ্ধারা শেষ পর্যন্ত লড়াই করে বীরের মতো মৃত্যুবরণ করেন। যদিও গ্রিকরা এই যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল, কিন্তু তাদের এই প্রতিরোধ পারস্য বাহিনীকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয় এবং গ্রিকদের নৌবাহিনীকে পরবর্তী যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য মূল্যবান সময় উপহার দেয়।

শেষ পর্যন্ত গ্রিকরা পারস্য বাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে বিতাড়িত করতে সক্ষম হয়। এই যুদ্ধ আজও অদম্য সাহস এবং রণকৌশলের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে গণ্য হয়।


৪৫


রাশিয়ার আলাস্কা বিক্রি ও আমেরিকার এক অবিশ্বাস্য লাভের ইতিহাস

=================================

এক সময় যা ছিল রাশিয়ার তুষারাবৃত এক দুর্গম অঞ্চল, আজ তা আমেরিকার বৃহত্তম এবং সম্পদশালী অঙ্গরাজ্য। এবং আলাস্কাও কিন্তু একটা এনক্লেভ। মাত্র ৭.২ মিলিয়ন ডলারে একটি বিশাল ভূখণ্ড হাতবদল হওয়ার এই কাহিনী যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি কৌশলগত শিক্ষায় ভরপুর। যখন আলাস্কা রাশিয়ার ছিল তখন রাশিয়া ছিল তিনটি মহাদেশ জুড়ে, ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকা!

রাশিয়া কেন আলাস্কা বিক্রি করতে চাইল?

রাশিয়া ১৮৬৭ সালে আলাস্কা বিক্রি করার পেছনে বেশ কিছু কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক কারণ ছিল। মূলত তৎকালীন পরিস্থিতির চাপে পড়ে তারা এই বিশাল ভূখণ্ডটি আমেরিকার কাছে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

প্রধান কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:

ক্রিমিয়ান যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি: ১৮৫৩-১৮৫৬ সালের ক্রিমিয়ান যুদ্ধে রাশিয়া ব্রিটেনের কাছে পরাজিত হয়। এই যুদ্ধের ফলে রাশিয়ার অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং রাজকোষ প্রায় শূন্য হয়ে পড়েছিল। ফলে আলাস্কার মতো দুর্গম অঞ্চলের রক্ষণাবেক্ষণ করা তাদের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়ায়।

প্রতিরক্ষাজনিত ভয়: রাশিয়া আশঙ্কা করছিল যে ভবিষ্যতে যদি ব্রিটেনের সাথে আবার যুদ্ধ বাঁধে, তবে ব্রিটেন খুব সহজেই প্রশান্ত মহাসাগরে তাদের আধিপত্য ব্যবহার করে আলাস্কা দখল করে নেবে। রাশিয়া মনে করেছিল, যুদ্ধ করে এলাকাটি হারানোর চেয়ে তা বিক্রি করে কিছু অর্থ লাভ করা অনেক ভালো।

ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ও প্রতিকূল পরিবেশ: আলাস্কা ছিল রাশিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে অনেক দূরে এবং সেখানকার আবহাওয়া ছিল অত্যন্ত রুক্ষ। সেই সময়ে সেখানে যাতায়াত করা এবং শাসনকাজ পরিচালনা করা রাশিয়ার জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল।

সম্পদের অভাব (তৎকালীন ধারণা): সেই সময়ে রাশিয়ার ধারণা ছিল আলাস্কায় তেমন কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ নেই। তখন পর্যন্ত সেখানে সোনার খনি বা তেলের বিশাল মজুতের কথা কেউ জানত না। মূলত পশুর চামড়ার ব্যবসার জন্যই তারা সেখানে গিয়েছিল, যার লাভও তখন কমে আসছিল।

আমেরিকার সাথে সুসম্পর্ক: রাশিয়া চেয়েছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ব্রিটেনের শক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে আমেরিকার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে। আলাস্কা আমেরিকার কাছে বিক্রি করার মাধ্যমে তারা এই সম্পর্ককে আরও মজবুত করতে চেয়েছিল।

আলাস্কা কবে থেকে রাশিয়ার অংশ হয়েছিল?

রাশিয়া প্রায় ১২৬ বছর (১৭৪১ থেকে ১৮৬৭ সাল পর্যন্ত) আলাস্কা শাসন করেছিল। তবে মজার ব্যাপার হলো, এই দীর্ঘ সময়েও সেখানে রুশ নাগরিকের সংখ্যা খুব একটা বেশি ছিল না; সর্বোচ্চ পর্যায়েও তা মাত্র ৭০০ থেকে ৮০০ জনের মতো ছিল।

আলাস্কা আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ার অংশ হওয়ার প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল ১৮শ শতকের শুরুর দিকে। ডেনিশ অভিযাত্রী ভিটাস বেরিং, যিনি রাশিয়ার নৌবাহিনীর হয়ে কাজ করতেন, ১৭৪১ সালে প্রথম আলাস্কা উপকূল আবিষ্কার করেন। তাঁর এই অভিযানের মাধ্যমেই রাশিয়া প্রথম এই ভূখণ্ডের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। বেরিংয়ের অভিযানের পর রাশিয়ার পশম ব্যবসায়ীরা (Siberian fur traders) সামুদ্রিক ভোঁদড় এবং অন্যান্য পশুর দামী চামড়ার সন্ধানে আলাস্কায় আসতে শুরু করেন। তারা সেখানে ছোট ছোট বসতি স্থাপন করেন। গ্রিগোরি শেলিকভ নামে একজন রুশ ব্যবসায়ী ১৭৮৪ সালে আলাস্কার কডিয়াক দ্বীপে (Kodiak Island) প্রথম স্থায়ী রুশ বসতি স্থাপন করেন। ১৭৯৯ সালে রাশিয়ার জারের নির্দেশে 'রুশ-আমেরিকান কোম্পানি' গঠিত হয়। এই কোম্পানিকে আলাস্কার শাসনভার এবং একচেটিয়া বাণিজ্যের অধিকার দেওয়া হয়। মূলত তখন থেকেই আলাস্কা আনুষ্ঠানিকভাবে একটি রুশ কলোনি বা উপনিবেশ হিসেবে স্বীকৃত পায়।

আমেরিকার কাছে বিক্রির প্রক্রিয়াটি কীভাবে হল?

১. আলোচনার সূত্রপাত (১৮৬৬-১৮৬৭)

রাশিয়া ১৮৫৬ সালের ক্রিমিয়ান যুদ্ধের পর থেকেই আলাস্কা বিক্রির কথা ভাবছিল। ১৮৬৬ সালে জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার তার ওয়াশিংটনস্থ রাষ্ট্রদূত ব্যারন এডুয়ার্ড ডি স্টোকল (Baron Eduard de Stoeckl)-কে নির্দেশ দেন আমেরিকার সাথে আলোচনা শুরু করতে। স্টোকল এবং সিউয়ার্ড ১৮৬৭ সালের মার্চের শুরুতে ওয়াশিংটনে গোপন বৈঠক শুরু করেন।

২. ম্যারাথন আলোচনা ও চূড়ান্ত চুক্তি (৩০ মার্চ, ১৮৬৭)

১৮৬৭ সালের ২৯ মার্চ রাতে সিউয়ার্ড এবং স্টোকল এক দীর্ঘ ম্যারাথন আলোচনায় বসেন। সেই সময়ের যোগাযোগ ব্যবস্থা আজকের মতো উন্নত ছিল না, তবুও তারা রাতভর আলোচনা করে ভোরের দিকে একটি চুক্তিতে পৌঁছান। পরদিন ৩০ মার্চ, ১৮৬৭ ভোর ৪টায় চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়।

   বিক্রয় মূল্য: মাত্র ৭.২ মিলিয়ন ডলার।

   জমির পরিমাণ: প্রায় ৫,৮৬,০০০ বর্গমাইল (প্রতি একর মাত্র ২ সেন্টের মতো)।

৩. রাজনৈতিক বাধা ও অনুমোদন

চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও আমেরিকার ভেতরে এটি নিয়ে বেশ সমালোচনা হয়। অনেকেই এই বিশাল বরফাবৃত ভূমি কেনাকে অর্থের অপচয় মনে করেছিলেন। তারা একে উপহাস করে 'Seward’s Folly' বা 'সিউয়ার্ডের বোকামি' এবং 'Seward’s Icebox' বলতেন। তবে সিউয়ার্ডের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় এবং সিনেটের প্রভাবশালী সদস্য চার্লস সামনারের সমর্থনে ৯ এপ্রিল, ১৮৬৭ সালে মার্কিন সিনেট এই চুক্তি অনুমোদন করে।

৪. আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা হস্তান্তর

১৮ অক্টোবর, ১৮৬৭ তারিখে আলাস্কার সিতকা (Sitka) শহরে আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ার পতাকা নামিয়ে আমেরিকার পতাকা উত্তোলন করা হয়। রুশ সৈন্যরা এলাকা ছেড়ে চলে যায় এবং আলাস্কা আনুষ্ঠানিকভাবে আমেরিকার একটি 'ডিপার্টমেন্ট' হিসেবে যুক্ত হয়।

মজার বিষয় হলো, রাশিয়ার কাছ থেকে আলাস্কা কেনার সেই চেকটি আজও আমেরিকার জাতীয় আর্কাইভে সংরক্ষিত আছে।

আমেরিকানরা তাদের এই 'বোকামি'র ভুল বুঝতে পেরেছিল এবং আলাস্কাকে মহামূল্যবান মনে করতে শুরু করেছিল:

মূলত দুটি প্রধান আবিষ্কার আলাস্কার ভাগ্য এবং আমেরিকার অর্থনীতি বদলে দিয়েছিল:

১. সোনার খনি আবিষ্কার (Klondike Gold Rush)

১৮৯৬ সালে আলাস্কার পার্শ্ববর্তী ইউকন অঞ্চলে এবং পরবর্তীতে আলাস্কার নিজস্ব ভূখণ্ডে (যেমন: নোম এবং ফেয়ারব্যাঙ্কস) বিশাল সোনার খনি আবিষ্কৃত হয়। হাজার হাজার মানুষ ভাগ্যান্বেষণে সেখানে ভিড় জমায়। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই আলাস্কা থেকে যে পরিমাণ সোনা উত্তোলিত হয়েছিল, তার মূল্য ছিল আমেরিকার দেওয়া ক্রয়মূল্যের (৭.২ মিলিয়ন ডলার) চেয়ে বহুগুণ বেশি।

২. 'কালো সোনা' বা তেলের খনি

বিংশ শতাব্দীতে আলাস্কায় আবিষ্কৃত হয় বিশাল তেলের মজুদ। বিশেষ করে ১৯৬৮ সালে উত্তর ঢালে (Prudhoe Bay) উত্তর আমেরিকার বৃহত্তম তেলের খনি আবিষ্কৃত হয়। বর্তমানে আলাস্কা আমেরিকার জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান উৎস।

আলাস্কার গুরুত্ব কেন আরও বেড়ে গেল?

মাছ ও বনজ সম্পদ: আলাস্কার সমুদ্র উপকূল সামুদ্রিক মাছ (বিশেষ করে স্যামন) এবং বিশাল বনাঞ্চল আমেরিকার অর্থনীতিতে প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার যোগ করে।

কৌশলগত অবস্থান (Strategic Importance): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং পরবর্তী শীতল যুদ্ধের সময় বোঝা গিয়েছিল আলাস্কা আমেরিকার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এটি এশিয়া এবং উত্তর মেরুর খুব কাছে হওয়ায় সামরিক ও বিমান চলাচলের জন্য একটি শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে কাজ করে।

পর্যটন: বর্তমানে আলাস্কার বরফাবৃত পাহাড়, গ্লেসিয়ার এবং বন্যপ্রাণী দেখার জন্য প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পর্যটক সেখানে যান, যা থেকে বিশাল রাজস্ব আয় হয়।

একটি মজার তথ্য: আমেরিকা আলাস্কা কিনেছিল প্রতি একর মাত্র ২ সেন্ট দরে। আজ সেই জমির সামান্য এক টুকরো অংশও কয়েক হাজার ডলারে কেনা সম্ভব নয়। রাশিয়া যখন এটি বিক্রি করেছিল, তখন তারা এর মাটির নিচের সম্পদ সম্পর্কে একেবারেই জানত না।

আলাস্কা কবে অঙ্গরাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়?

আমেরিকার হাতে আসার পর আলাস্কাকে পূর্ণাঙ্গ অঙ্গরাজ্যের মর্যাদা পেতে বেশ দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ১৮ অক্টোবর, ১৮৬৭ সালে রাশিয়া থেকে হস্তান্তরের পর প্রায় ৯১ বছর ২ মাস ২১ দিন পর এটি আমেরিকার ৪৯তম অঙ্গরাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

আলাস্কাকে অঙ্গরাজ্য করার পথে প্রধান বাধা ছিল এর বিশাল দূরত্ব এবং কম জনসংখ্যা। এছাড়া তৎকালীন আমেরিকার অনেক রাজনীতিবিদের ধারণা ছিল যে আলাস্কা অনেক বেশি দুর্গম এবং সেখানে শাসন পরিচালনা করা কঠিন হবে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আলাস্কার কৌশলগত গুরুত্ব (জাপানের খুব কাছে হওয়ায়) প্রমাণিত হওয়ার পর একে অঙ্গরাজ্য করার দাবি জোরালো হয়।

@ বইকাল


৪৬

তালেবান সৃষ্টির গোড়ার কথা

=====================

তালেবানদের কিছু কিছু স্ট্যান্ড অনেকেই অপছন্দ করতে পারি, সমালোচনাও করতে পারি। আমারও ব্যক্তিগত মতামত আছে। কিন্তু সেজন্য এন্টি-তালেবান ন্যারেটিভ তৈরির জন্য ইতিহাস চাপা দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

তালেবান সম্পর্কে এটা বলা হয়, তালেবান “আই.এস.আই” (পাকিস্তানের গোয়েন্দা) –এর তৈরি, কেউ কেউ আবার বলেন “সি.আই.এ” (আমেরিকার গোয়েন্দা)–এর তৈরি। কিন্তু এই যুক্তিও পুরোপুরি সত্য নয়। তালেবান মূলত তৈরি হয়েছিলো স্থানীয় প্রতিরোধ আন্দোলন হিসেবে। ঠিক যেভাবে সোভিয়েত তৈরি হয়েছিলো, যারা সোভিয়েত বিপ্লব করেছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় “সংগ্রাম কমিটি” তৈরি হয়েছিলো এলাকায় এলাকায়, ঠিক সেই ভাবেই।

তালেবান তৈরির সময়ে কোন ভিন্ন রাষ্ট্রের বা কোন গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার গল্প অন্তত ইতিহাস সমর্থন করে না। আজকেই দেখুন না, তালেবান কে “Legitimate Political Force” হিসেবে জাতিসংঘ অবধি সমর্থন জানিয়েছে। আপনাদের অনেকেরই তাদের রাজনৈতিক দর্শন বা রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ পছন্দ নাও হতে পারে। অনেক সমালোচনাও থাকতে পারে, সত্যি বলতে আমার নিজেরও আছে। কিন্তু জাতিসংঘ যাদের একটি “Legitimate Political Force” হিসেবে সমর্থন দিয়ে আফগানিস্তানে সরকার গঠন করতে বলেছেন তাই তাদের উত্থানের কারণ জানাটা অ্যাকাডেমিক কারণেও জরুরী নয় কি?

তালেবান তৈরির ইতিহাস আপনি পাবেন “জেমস ফার্গুসন” –এর লেখা “The True Story of the World’s Most Feared Guerrilla Fighters” বইটিতে। আমি সেই বই থেকেই তালেবান গঠনের ইতিহাস আপনাদের জানাবো। যা আপনি অন্য কোথাও সহজে খুঁজে পাবেন না।

১৯৯২ সালে সোভিয়েত সমর্থিত নজিবুল্লাহ সরকারের পতনের পর চার বছর ধরে আফগানিস্তানে চলে এক ভয়াবহ অরাজকতা। কোনো শাসন নেই, আইন নেই, বিচার নেই একেক দিকে একেক যুদ্ধবাজেরা তাদের এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। চাঁদাবাজি হচ্ছে, ডাকাতি হচ্ছে, খুন হচ্ছে, ধর্ষণ চলছে। এইবার লর্ডরা কেউ সাবেক মুজাহিদিন, কেউ সাবেক নজিবুল্লাহ সরকারের সামরিক অফিসার, কেউ বা নিছকই দুর্বৃত্ত ডাকাত। এই প্রেক্ষাপটে গল্পের শুরু।

যখন আফগানিস্তানের রাস্তায় রাস্তায় এই দস্যুদের চেকপোস্ট। তারা চাঁদা তোলে সবার কাছে, জুলুম করে। চাঁদা দিতে কেউ রাজি না হলে তাদেরকে পেটানো হয়, খুন করা হয়, অপহরণ করা হয়। চাঁদা দিতে দিতে একসময় নিঃস্ব হয়ে যায় ব্যবসায়িকরা। ঠিক যেভাবে আমাদের ট্রাকগুলো চাঁদা দিতে দিতে গ্রাম থেকে ঢাকায় আসেন, ঠিক সেভাবেই।

পণ্যের দামের কয়েক গুণ দস্যুদের চাঁদা দিতেই চলে যায়। একটা বা দুটো নয়! শত শত চেকপোস্টে তোলা হত চাঁদা। যার অস্ত্র আছে সেও একটা চেকপোস্ট বসিয়ে ফেলে। উদাহরণস্বরুপ বলছি, কান্দাহার থেকে পাকিস্তানের বর্ডার ছিলো ৬৫ মাইল দূরে। আর এই ৬৫ মাইলের মধ্যে চাঁদা তোলার চেকপোস্ট ছিলো প্রায় ৫০টি। কান্দাহের ছিলো সবচেয়ে কুখ্যাত এক ডাকাতের চেকপোস্ট। তার নাম হলো, “সালেহ”।

নামে ফেরেশতা কিন্তু কাজে ঠিক ততখানি শয়তান। এই ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি চেকপোস্ট বসিয়েছিলো। সে শুধু চাঁদা-ই তুলতো না, যে নারীকে পছন্দ হত তাকেই তুলে নিয়ে যেত। প্রাণে অবশ্য মারতো না কিন্তু আটকে রেখে ও পালা করে তাদের সম্ভ্রম হানি করতো এই শয়তানেরা। কিন্তু দুই হতভাগ্য তরুণী প্রাণে বাঁচেনি।

হেরাত থেকে কান্দাহার আসার পথে সালেহের বাহিনীর হাতে তারা পরে। তাদের নরপশুরা দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হোন না, তাদেরকে পেটাতে পেটাতে হত্যা করে। তারপরেও তারা ক্ষান্ত হয় না, এই নারীদের উলঙ্গ মৃত দেহ চেকপোস্টের সামনে ফেলে রাখে। খোদা-তায়ালার কাছে ফরিয়াদ জানানো ছাড়া দরিদ্র, প্রতিরোধহীন, গ্রামবাসীর এই নির্মমতা দেখেও কিছুই করার ছিলো না।

এর কয়েকদিন পরেই কান্দাহার শহরে এক যুদ্ধ শুরু হয় তিন যুদ্ধবাজের মধ্যে। একজনের নাম ওস্তাদ আব্দুল হালিম, একজনের নাম হাজী হাম্মেদ, আরেকজনের নাম মোল্লা নকিব। এই তিন ওয়ার লর্ড পাঁচদিন ধরে যুদ্ধ চালায় কান্দাহারে। এই তিনজনের লড়াইয়ে কান্দাহার ধ্বংসস্তূপে রুপান্তরিত হয়। রাস্তায় রাস্তায় মরদেহ। সারা শহর জুড়ে জ্বলছে আগুন আর উঠছে ধোঁয়া।

৬ষ্ঠ দিন ছিলো শুক্রবার। জুম্মার নামাজের পরে কান্দাহারের বাসিন্দা একটি গণমিছিল শুরু করেন। হঠাৎ এই গণমিছিলের সামনে এক ট্যাঙ্ক নিয়ে হাজির হোন এক সাবেক মুজাহিদিন। তার নাম বাডু। হেন অপরাধ নেই যা এই বাডু করতো না। সে লুট করতো, চাঁদাবাজি করতো, ধর্ষণ করতো আর খুনের মহোৎসব চালাতো।

কোন উস্কানি ছাড়াই বাডু সেই মিছিলে ট্যাঙ্ক থেকে ফায়ার করে। অনেক মানুষ মারা যান। আমার সংখ্যাটা ঠিক জানা নেই, আহত হয় শত শত জন। কান্দাহার গভীর শোকের চাদরে মুড়ে থাকে আর সৃষ্টিকর্তার কাছে ফরিয়াদ জানাতে থাকে।

কিন্তু সেদিন আরেক সাবেক মুজাহিদিন তার চোখে ঘুম নেই। তার নাম মোল্লা আব্দুস সালাম জাইফ। মওলানা জাইফ সোভিয়েতরা চলে যাবার পরে অস্ত্র ত্যাগ করে একটি গ্রামের মসজিদে ইমামতি করতেন। এর পাশাপাশি একটি ছোট মাদ্রাসা চালাতেন। ঘুমহীন চোখে মওলানা জাইফ কাঁদতে থাকলেন আর ভাবতে থাকলেন কীভাবে এই অসহায় গ্রামবাসীকে সাহায্য করা যায়? বিদ্যৎ চমকের মত তার মাথায় এলো একটি নাম, “মোল্লা ওমর”। আরেক সাবেক মুজাহিদিন। যার সাথে থেকে, কাঁধে কাঁধ রেখে লড়াই করেছেন মোল্লা জাইফ সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে।

সোভিয়েতদের যুদ্ধের সময়ে দুজনেই বোমা বর্ষণে আহত হয়েছিলেন। মোল্লা ওমর সেই যুদ্ধে একটি চোখ হারিয়ে কান্দাহারের পঁচিশ মাইল দূরে সাঙ্গিসারে একটি মাদ্রাসা চালান। মোল্লা জাইফ অস্থির হয়ে মোল্লা ওমরের সাথে দেখা করতে যান পরের দিন। দীর্ঘদিন পরে তার কমরেড কে পেয়ে একে অপরের কুশলাদি বিনিময় করে মোল্লা জাইফ মোল্লা ওমরকে বলেন, “ভাই আমাদের এই গ্রামবাসীকে জুলুম থেকে রক্ষা করতে হবে, এই দূর্দশা সহ্য করা সম্ভব নয়”।

মোল্লা জাইফ মোল্লা ওমরকে বলেন, এই কাজের নেতৃত্ব আপনাকেই দিতে হবে ভাই। মোল্লা ওমর কিছুটা ইতস্তত বোধ করছিলেন কারণ তার স্ত্রী কিছুদিন আগেই একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। তবুও মোল্লা ওমর কিছু সময় পর সম্মতি দেন। তিনি বলেন, এই কাজটি খুবই ঝুকি সম্পন্ন। আমি আমার সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তান ও পরিবারের নিরাপত্তা কে কুরবানি দিচ্ছি। কিন্তু আপনারা পরিস্থিতি কঠিন হয়ে গেলে আমাকে ত্যাগ করবেন না তো?

মোল্লা জাইফ আর তার সাথে থাকা সবাই শপথ নেন যে, দৃঢ়ভাবে মোল্লা ওমরের নেতৃত্ব মেনে নেবেন আর কখনোই তাকে ত্যাগ করবেন না।

পরদিন মোল্লা জাইফ ও মোল্লা ওমরের ছাত্র এবং সাবেক মুজাহিদিন মিলে একটি মাটির মসজিদে যান। যার নাম ছিলো, সাদা মসজিদ। সেখানে শপথ নিয়ে তারা গঠন করেন তালেবান বাহিনী।

কিন্তু তালেবানদের কোন রসদ ছিলো না। সামান্য কয়েকটা পুরনো অস্ত্র, টাকাও ছিলো না। কিন্তু বিপরীতে যেসব দুর্বৃত্ত রয়েছে তাদের তুলনায় কিছুই না। মওলানা জাইফ তার সারাজীবনের সঞ্চিত সম্পদ ১০ হাজার আফগানি মুদ্রা দান করেন তালেবানের তহবিলে। এটাই তাদের প্রথম ফান্ড ছিলো। কিন্তু এই দশ হাজার আফগানি মুদ্রা ঠিক কতটুকু? এই টাকা দিয়ে সে সময়ে কাবুল শহরের একটি রেস্টুরেন্টে দশজনের একটি মাঝারি মানের ডিনার করা সম্ভব ছিলো। তারমানে আমাদের হিসেবে তিন বা সর্বোচ্চ চার হাজার টাকা।

আর সাথে ছিলো একটা গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। আর সেটা হলো রাশাদের ফেলে যাওয়া একটি মটরসাইকেল। তবে তার কোন সাইলেন্সার ছিলো না। মানে বিকট শব্দ হত। ফলে অনেক দূর অবধি থেকে শোনা যেত যে, তালেবানেরা আসছে। এই শব্দের কারণে গ্রামবাসী এই মটরসাইকেলের নাম দেন, “ইসলামের ট্যাঙ্ক”।

এই ট্যাঙ্ক যখন চলতো তখন গ্রামবাসীদের মনে আনন্দ ও খুশী দেখা যেত। এরপর তারা একের পর এক চেকপোস্টে হামলা করেন। ইয়াকুত, বিসমিল্লাহ, পীর মোহাম্মদ ইত্যাদি তার মধ্যে অন্যতম।

এই সব চেকপোস্ট গুড়িয়ে দেওয়ায় গ্রামবাসী আশ্বাস তো পায় পাশাপাশি শত শত যুবক অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন তালেবানদের সাথে। এরপর ঐ কুখ্যাত সালেহ, তাকেও তালেবানরা পরপারে পাঠিয়ে দেন। এবং তার মুখে পাপের টাকাগুলো গুজে দেয়।

তারপরের ইতিহাস মোটামুটি সবারই কিছু না কিছু জানা আছে। একবার ভাবুন তো, আপনি যদি এই দরিদ্র গ্রামবাসী হতেন? আপনার বাবা কে যদি ট্যাঙ্কের গোলায় উড়িয়ে দেওয়া হত? তাও জুম্মার নামাজের পরে। আর আপনার বোনেরা যদি দিনের পর দিন এই দুর্বৃত্তের দ্বারা নিগৃহীত হত? আপনি তাহলে ঠিক কি করতেন? @~মেহেদি হাসান

৪৭


নাসিরউদ্দিন তুসি

১২৫৬ খ্রিস্টাব্দে চেঙ্গিস খানের নাতি হালাকু যখন পারস্য আক্রমন করে তখন স্থানীয় নাগরিকদের অনেকে আশ্রয় নেন পাহাড় চুড়োয় অবস্থিত কুখ্যাত হাশাশিনদের দূর্গগুলোতে। শেষ বৃহৎ দুর্গ আল আমুত দখলে নেয়ার পর সেখানে আশ্রয় নেয়া এক অদ্ভূত লোককে প্রায় বন্দী অবস্থায় আবিস্কার করে মোঙ্গলরা৷

কুখ্যাত হাশাশিনরা সেই লোককে একটি আলাদা কক্ষে প্রচুর বইপত্র ও গবেষনার সুবিধাসহ রেখে দিয়েছে। হালাকু তাঁর সাথে কথা বলে বুঝতে পারেন - লোকটি জ্যোতির্বিদ্যা ভালো জানে, নক্ষত্রের অবস্থান ও দিক নির্ণয়ে পারদর্শী।

হত্যা না করে তাকে সাথে রেখে দেয় হালাকু খান, বাগদাদ অভিযানের জন্য এই লোককে কাজে লাগবে৷

লোকটির নাম নাসিরউদ্দিন তুসি। ত্রিকোণমিতিকে গনিতের স্বতন্ত্র শাখা হিসেবে চিহ্নিত করা তার কাজ। মহাকাশ বিজ্ঞানের  “তুসি-কাপল” মডেল তার নামে।

১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদে হালাকুর অভিযানে সঙ্গী হন তুসি। বাগদাদ দখল করে মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রধান জ্ঞাণ ভান্ডার “বায়তুল হিকমা” ধ্বংস করে তারা। সারা পৃথিবী থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন ভাষার অতি মুল্যবান কয়েক লক্ষ পান্ডুলিপি পুড়িয়ে দেয়।

নাসিরুদ্দিন তুসি ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে ৪ লক্ষ পান্ডুলিপি বাঁচাতে পেরেছিলেন। নিয়ে এসেছিলেন নিজের শহরে। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একটি গ্রন্থাগার। হালাকু খানকে বুঝিয়ে একটি মানমন্দিরও স্থাপন করেছিলেন।

নাসিরুদ্দিন তুসি'র শহর মারাগেহ, বর্তমান ইরানের উত্তর- পূর্বে আজারবাইজান প্রদেশে, বিখ্যাত তাবরিজ শহরের কাছে। তুসির মৃত্যুর পর ভূমিকম্প ও নানা রাজনৈতিক পরিবর্তনে গ্রন্থাগারটি আর থাকেনি। বাগদাদ থেকে বাঁচিয়ে আনা এবং তাঁর নিজের লেখার পান্ডুলিপিগুলো স্থান পায় তেহরান, ইস্তাম্বুলে। বড় অংশ চলে যায় ইউরোপে।

মানমন্দিরটির ধ্বংসাবশেষ  টিকে ছিলো। পরে এটি সংস্কার করে পুরনো কাঠামোর সাথে নতুন ডিজাইন যোগ করা হয়৷

প্রত্নতাত্বিক ও ইতিহাসবিদদের কাছে মারাগেহ ও নাসিরুদ্দিন তুসির মানমন্দির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

ইরানের কিছু প্রত্নসম্পদ ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে পাচারের একটা সংবাদ দেখলাম। মনে পড়লো, ২০০৩ সালে বাগদাদ দখলের পর কিভাবে জাতীয় জাদুঘরের অমুল্য পুরাকীর্তিগুলো লুট করে কালোবাজারে বিক্রী করে দিয়েছিলো তারা৷

এসব ঘটে, এসব ঘটানো হয় গণতন্ত্র ও সভ্যতার নামে।

© Hasan Murshed



নাম জুলিয়া বাটারফ্লাই হিল। পরিবেশবাদী আন্দোলনে তিনি এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন।

​১৯৯৭ সালে ২৩ বছর বয়সী এই নারী ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ১,০০০ বছরের পুরনো রেডউড গাছে চড়ে বসেন, যার নাম তিনি দিয়েছিলেন ‘লুনা’।

মাটি থেকে ১৮০ ফুট উঁচুতে এই গাছে ওঠার পেছনে তার উদ্দেশ্য ছিল প্যাসিফিক লাম্বার কোম্পানির প্রাচীন বন উজাড় করার প্রতিবাদ জানানো। তিনি ভেবেছিলেন বড়জোর কয়েক সপ্তাহ সেখানে থাকবেন। ​কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি সেখানে একটানা ৭৩৮ দিন অবস্থান করেন।

​গাছের ওপর মাত্র ৬x৬ ফুটের দুটি প্ল্যাটফর্মে বাস করতেন জুলিয়া। হাড়কাঁপানো বৃষ্টি, তুষারঝড় এবং ঘণ্টায় ৯০ মাইল বেগের বাতাসের ঝাপটা—সবই তিনি সহ্য করেছেন সেখানে থেকে। স্বেচ্ছাসেবকরা ২.৫ মাইল পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে তার জন্য খাবার নিয়ে আসতেন।

বৃষ্টির পানি পান করে আর সৌরশক্তি চালিত ফোনের মাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে তিনি বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছিলেন প্রাচীন বন ধ্বংসের এই করুণ পরিণতির দিকে।

​১৯৯৭-৯৮ সালের শীতকালে ভয়াবহ ‘এল নিনো’ ঝড় আঘাত হানে।

জুলিয়া পরবর্তীতে লিখেছিলেন, "এক রাতে আমার মনে হয়েছিল আমি মারা যাব। বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৯০ মাইল। কল্পনা করুন আপনি একটি পাগলা ঘোড়ার পিঠে বসে আছেন।" কিন্তু এত কিছুর পরেও তিনি নিচে নামেননি।

​দুই বছরেরও বেশি সময় জুলিয়া লুনার ওপর কাটান। কোম্পানির নানা হয়রানি, একাকীত্ব আর মৃত্যুর ভয়—সবই তিনি জয় করেছেন। তিনি যতক্ষণ ওই গাছে ছিলেন, ততক্ষণ ওই এলাকায় গাছ কাটা বন্ধ ছিল।

​অবশেষে ১৯৯৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর, ৭৩৮ দিন পর জুলিয়া নিচে নেমে আসেন। প্যাসিফিক লাম্বার কোম্পানির সাথে তার একটি চুক্তি হয়—তারা লুনা গাছটি এবং তার চারপাশের ২০০ ফুটের বাফার জোন রক্ষা করতে সম্মত হয়।

​লুনা আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। যদিও ২০০০ সালে কেউ একজন গাছটির ক্ষতি করার চেষ্টা করেছিল। বর্তমানে স্টিল কেবল দিয়ে গাছটিকে স্থিতিশীল রাখা হয়েছে এবং এটির নিয়মিত দেখাশোনা করা হয়।

জুলিয়া পরবর্তীতে তার এই অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি বেস্ট সেলার বই লিখেন—"দ্য লেগাসি অফ লুনা"। তিনি এখন সারাবিশ্বে পরিবেশ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। -- The Sparkling Shine of the Creation



চিনি আমাদের আনন্দের প্রতীক

চিনি, আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অপরিহার্য অংশ। সকালে কাপে চা বা কফিতে, বেকিং এ, বা যেকোনো মিষ্টিতে—চিনি যেন আনন্দের প্রতীক। কিন্তু এই সাদা মধুর কণার পেছনে লুকিয়ে আছে ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস অধ্যায়গুলোর একটিও। ইউরোপের গ্র্যান্ড কফি হাউস থেকে শুরু করে, ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের সবুজ আখক্ষেত পর্যন্ত, চাহিদা যেমন বাড়ছিল, তেমনি মানুষের জীবন ও স্বাধীনতার দামও বেড়ে যাচ্ছিল।

১৮শ শতাব্দীর ইউরোপে চিনির চাহিদা অভাবনীয়ভাবে বেড়ে যায়। কেবল দারিদ্র্য বিমোচন বা মিষ্টি খাওয়ার আনন্দ নয়, এটি তখন সামাজিক মর্যাদার প্রতীকও ছিল। ধনী পরিবারগুলোর খাবারে চিনির ব্যবহার মানে সামাজিক অবস্থান প্রদর্শন। কিন্তু সেই চাহিদা পূরণের জন্য তৈরি করা হয়েছিল একটি ভয়ানক যন্ত্র।

ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে আখ চাষের আবিষ্কার এবং ব্যাপক বাণিজ্য শুরু হয়। আখ, যা থেকে চিনির মূল উৎপাদন হয়, প্রচুর শ্রমের দাবি করেছিল। আখের ক্ষেত্রগুলোতে কাজ করা সহজ কাজ নয়।

সূর্যের তাপে পরিশ্রম, জটিল কাটা-চেরা প্রক্রিয়া এবং আখ থেকে চিনির উৎপাদন—সবই ছিল কঠিন। স্থানীয় মানুষরা এই পরিশ্রমে আগ্রহী ছিল না। তখন ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীরা সমাধান হিসেবে আফ্রিকা থেকে মানুষকে বৃত্তিমূলকভাবে ধরে আনার সিদ্ধান্ত নিল।

এই মানুষদের নাম দেওয়া হয় দাস। ইউরোপীয়ারা আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে এই মানববাজার গড়ে তোলে। প্রতিটি কেজি চিনির পেছনে একজন মানুষের জীবন খরচ হয়েছিল। বিশাল জাহাজে, কড়া শৃঙ্খলায় বাঁধা মানুষদের মাস বা বছরের জন্য যাত্রা করানো হতো, যেখানে প্রচণ্ড অসুস্থতা, খাদ্যাভাব এবং অত্যাচারজনিত মৃত্যুর হার ছিল ভয়াবহ। ইতিহাসবিদরা উল্লেখ করেন, ১৬শ থেকে ১৮শ শতকে ১২–১৫ মিলিয়ন আফ্রিকান মানুষকে এভাবে আনা হয়েছিল, যার এক বিশাল অংশ মারা গিয়েছিল যাত্রাপথে।

চিনির চাহিদা বৃদ্ধি এবং আখ চাষের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা মিলিয়ে এই দাস-শ্রমের শিল্পবাণিজ্য এক বিশাল ব্যবসা হয়ে দাঁড়ায়। শুধু শ্রমিকদের জীবন নয়, তাদের পরিবার, সংস্কৃতি, ভাষা সবই ভেঙে যায়। আফ্রিকায় তাদের গ্রামগুলো ধ্বংস করা হয়, মানুষকে বিদেশে বিক্রি করা হয়, আর ইতিহাসে তাদের অস্তিত্বের স্বরক্ষণের জন্য কিছুই রইল না।

ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী, ১৭শ শতকে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের বার্বাডোস, জ্যামাইকা, হাইতি, কিউবা—এই সব দ্বীপেই দাসশ্রমিকদের মাধ্যমে আখ চাষের কলাকৌশল শুরু হয়। বার্বাডোসের ক্ষেত্রে, ১৬৭০ সালের পর চিনি রপ্তানি ২০ বছরের মধ্যে ২০,০০০ টন ছাড়িয়ে যায়। এর পেছনে কাজ করা মানুষদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০,০০০। জ্যামাইকায় চিনি উৎপাদনের জন্য ১৭৫০ সালের দিকে প্রায় ১০০,০০০ দাস শ্রমিক ব্যবহার করা হতো।

চিনির চাহিদা বৃদ্ধি শুধু অর্থনৈতিক লাভই ছিল না, এটি বণিক, শিল্পপতি এবং রাজনীতিবিদের জন্য ক্ষমতার প্রতীকও ছিল। ইংল্যান্ডের লন্ডনে চিনি ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতিকরা উপনিবেশগুলোর উপর চাপ তৈরি করত, যাতে দাসশ্রম অব্যাহত থাকে। এই চাহিদা আর উপনিবেশ নীতি একসঙ্গে কাজ করে চিনি এবং মানবপিছনের ইতিহাসকে মিশিয়ে দেয়।

আধুনিক পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায়, আমাদের প্রতিদিনের বাজারে সস্তা চিনি, যেটা ভারত, ব্রাজিল বা থাইল্যান্ড থেকে আসে, তার মূল উৎপাদন ব্যবস্থার ছাপ এখনো অনুভূত হয়। যদিও দাসপ্রথা বন্ধ হয়েছে, কিন্তু বিশ্ব বাণিজ্যের অমিতব্যয়ী চাহিদা এবং শ্রমের সস্তা ব্যবহারের ধারা এখনো বিদ্যমান। উদাহরণস্বরূপ, বর্তমানে ব্রাজিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় চিনির উৎপাদক দেশ। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ব্রাজিল প্রায় ৩৭ মিলিয়ন টন চিনি উৎপাদন করেছে। এর প্রায় ৭০% রপ্তানি হয়।

চিনি কেবল খাদ্য বা অর্থ নয়; এটি ইতিহাসের স্মৃতি। প্রতিটি কেজি চিনির পেছনে রয়েছে মানুষের সংগ্রাম, মৃত্যু এবং অত্যাচারের গল্প। যদি আমরা সচেতন হই, আমরা বুঝতে পারি যে মিষ্টি খাবার খাওয়ার সময় আমরা একদম অন্য এক পৃথিবীর গল্প খাচ্ছি। একটি মিষ্টির টুকরোই আমাদের মনে করিয়ে দিতে পারে যে অতীতের অন্ধকারের সঙ্গে বর্তমানের আনন্দ কতটা সংযুক্ত।

আমরা যখন সুপারমার্কেটে সস্তা চিনি কিনি, তখন ভাবি না যে ইউরোপের রাজপ্রাসাদ, ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের আখক্ষেত, আফ্রিকার জাহাজ এবং দাসশ্রম—সবই মিলিয়ে সেই একটি কেজি চিনি উৎপন্ন করেছে। ইতিহাসের এই সংযোগে আমরা দেখতে পাই, শুধু পণ্য নয়, প্রতিটি রপ্তানি এবং আমদানি একটি মানব ইতিহাসের অংশ।

যদিও আজ দাসপ্রথা ইতিহাসের পাতায় লুপ্ত, কিন্তু চিনির চাহিদা এবং তার উৎপাদনের জটিলতা এখনও প্রমাণ করে যে বাণিজ্য কখনো শুধু অর্থ নয়, মানবতার গল্পও বয়ে আনে। আমাদের উচিত এই ইতিহাসকে মনে রাখা এবং সচেতনভাবে খাওয়া। তাই যখন আমরা চিনি ব্যবহার করি, আমাদের মনে রাখা উচিত, প্রতিটি চিনি কণার সঙ্গে একেকটি জীবন এবং ইতিহাস জড়িত।

চিনি কেবল মিষ্টি নয়। এটি মানব ইতিহাসের একটি প্রতিফলন। ইউরোপীয় ধনী পরিবারগুলোর চাহিদা, ক্যারিবিয়ান আখক্ষেতের শ্রম, আফ্রিকান মানুষের সংগ্রাম—সব মিলিয়ে একটি গল্প যা কখনো মুছে যাবে না। আমরা যদি সচেতন হই, আমরা শুধু মিষ্টি উপভোগ করব না, আমরা সেই ইতিহাসকেও সম্মান জানাব।

এভাবেই একটি কেজি চিনির পেছনে লুকিয়ে আছে বহু মানুষের জীবন, ইতিহাস এবং মানবিক যন্ত্রণা। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে অর্থনৈতিক লাভের সঙ্গে সঙ্গে মানবতার মূল্যও অবহেলিত হতে পারে। আজ আমরা চাইলে সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারি, এবং ভোগের আনন্দকে মানবিক সচেতনতার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারি।

চিনি আজও আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। তবে আমরা যদি ইতিহাস জানতে চাই, প্রতিটি চিনি কণার সঙ্গে যুক্ত মানব যন্ত্রণার গল্পটি ভুলতে পারি না। এক কেজি চিনির পেছনে একজন মানুষের জীবন—এটি শুধু ইতিহাস নয়, এটি আমাদের শিক্ষা, আমাদের সতর্কবার্তা এবং আমাদের নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রতীক।

© Ariful Islam Adil


৫০


১৯১৮ সালের আগে গ্রেট ব্রিটেন সবাই ভোট দিতে পারতো না।

কারা ভোট দিতে পারতো?

ভোটিং রাইট  সম্পদশালী ব্যক্তিদের জন্য রিজার্ভ ছিলো। নারীরা ১৯১৮ সালের আগে ভোট দিতে পারতো না। ১৯১৮ সালের পর আংশিক ভোটাধিকার পায়।

১৯১৫ সালের আগে আমেরিকাতে একটা অদ্ভুত আইন চালু ছিলো। এটার নাম ছিলো: Grandfather Clause

তো এই আইন অনুযায়ী আমেরিকার সিভিল ওয়ারের আগে যাদের পূর্ব পুরুষরা ভোট দিতে পারতো শুধু মাত্র তারাই ভোটার হিসেবে ইলিজেবল হইতো।

সাউন্ডস ইন্টারেস্টিং?

এই খানেই খেলাটা ছিলো।

সিভিল ওয়ারের আগে কালোরা ছিলো স্লেভ। সো তাদের পূর্বপুরুষদের খুব কম সংখ্যক মানুষেরই ভোটাধিকার ছিলো। এইটা বেসিক্যালি সিস্টেমে কালোদের ভোটাধিকার কাইড়া নেবার প্রসেস।

দক্ষিণ আফ্রিকাতে ১৯৯৪ সালের আগে কালোদের ওই অর্থে কোন ভোটাধিকার ছিলো না।

ফ্রান্সে ১৮৪৮ সালের আগে শুধু বড়লোকরাই ভোট দিতে পারতো। এইটাকে বলা হতো: "Censitary Suffrage"

-- M Hasan