শিক্ষার্থীদের ২০০ টি আদব কায়দা ও নৈতিকতা
শিক্ষার্থীদের ২০০ টি আদব কায়দা ও নৈতিকতা
ছাত্র-ছাত্রীদের ১৫১ থেকে ২০০ শিষ্টাচার
শিষ্টাচার-১৫১: আত্মসম্মান শুধুমাত্র অ্যাচিভমেন্ট বা অর্জন দিয়ে তৈরি হয় না। এটি তৈরি হয় অ্যালাইনমেন্ট-এর মাধ্যমে। অর্থাৎ আপনার মূল্যবোধ আর আপনার কর্ম একই রেখায় আছে কি না। আপনি যা বিশ্বাস করেন, আপনি কি সত্যিই সেই অনুযায়ী জীবন অতিবাহিত করছেন কি না? ধরুন একজন শিক্ষার্থী প্রতিদিন নিজেকে বলে, আমি ভবিষ্যতে বড় কিছু করব। কিন্তু সে প্রতিদিন সময় নষ্ট করে এবং নিজের কাজ ফেলে রাখে। তার সাবকনশাস মাইন্ড খুব ভালো করেই বুঝতে পারে যে, সে নিজের কথা রাখছে না। ফলে ধীরে ধীরে তার নিজের প্রতি শ্রদ্ধা কমতে থাকে। আবার একজন উদ্যোক্তা যদি সবসময় শর্টকাট খোঁজে, মানুষের বিশ্বাস ভঙ্গ করে কিংবা দ্রুত লাভের জন্য নীতি বিক্রি করে, সে হয়তো কিছু অর্থ উপার্জন করবে কিন্তু নিজের ভেতরের নৈতিক শক্তি হারাবে। কারণ মানুষের অবচেতন মন অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে সবকিছু লিপিবদ্ধ করে।
এই কারণেই অনেক সময় দেখা যায়, একজন সাধারণ মানুষ যার হয়তো খুব বেশি সম্পদ নেই, সে অনেক শান্তিতে থাকে। অন্যদিকে প্রচুর অর্থ থাকা সত্ত্বেও কেউ ভেতরে ভেতরে অস্থির থাকে। কারণ আত্মসম্মান ব্যাংক ব্যালেন্স দেখে তৈরি হয় না। এটি নির্মিত হয় নিজের চরিত্রের দৃঢ়তার ওপর ভিত্তি করে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাইকোলজিক্যাল ইনসাইট আছে। আমরা সাধারণত ভাবি মানুষ ভালো কাজ করে অন্যদের জন্য। কিন্তু বাস্তবে ভালো কাজ করার সবচেয়ে বড় উপকারটা হয় নিজের ভেতরে। কারণ প্রতিটি নৈতিক কাজ আপনার সাবকনশাস মাইন্ডকে একটি সংকেত দেয় যে, আমি এমন একজন মানুষ, যে নিজের নীতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে না। আর এই সংকেতটিই ধীরে ধীরে মজুত আত্মসম্মান তৈরি করে।
শিষ্টাচার-১৫২: আমরা অনেকেই মনে করি, "আমি যার সাথেই মিশি না কেন, আমি আমার মতো থাকবো।" এটি একটি ভুল ধারণা। নিউরোসায়েন্সের গবেষণা অনুযায়ী, আমরা যখন নির্দিষ্ট কোনো মানুষের সাথে সময় কাটাই, আমাদের ব্রেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের বডি ল্যাক্সগুয়েজ, কথা বলার ধরণ, রুচিবোধ এবং অভ্যাসগুলোকে 'কপি' করতে শুরু করে। আপনি অজান্তেই তাদের মতো হয়ে যাচ্ছেন! আপনি সবচেয়ে বেশি সময় যে ৫ জন মানুষের সাথে কাটান, আপনার উপার্জন, চিন্তা এবং চরিত্র ঠিক সেই ৫ জনের গড় মানের সমান হয়ে যায়। আপনার বন্ধু যদি স্থূলতা, ধূমপান বা হতাশার মধ্য দিয়ে যায়, তবে কোনো কারণ ছাড়াই আপনারও সেইসব সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ৫৭% পর্যন্ত বেড়ে যায়।
সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনি সচেতন বা অবচেতনভাবে যা দেখছেন, সোশ্যাল মিডিয়ার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) আপনাকে ঠিক সেই ধরণের কনটেন্টই বারবার দেখাতে বাধ্য করছে। এর ফলে আপনি একটি Echo Chamber বা বন্ধ ঘরে বন্দি হয়ে যাচ্ছেন। সস্তা, নেতিবাচক, ট্রোল বা উস্কানিমূলক কনটেন্ট দেখতে দেখতে আপনার চিন্তা-ভাবনা, রুচিবোধ, অভ্যাস, প্রোডাক্টিভিটি এবং মোরালিটি (নৈতিকতা) ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
গেম থিওরিতে একটি ধারণা আছে যা হলো স্ট্যাগ হান্ট। যদি দুই/তিনজন মানুষ একসাথে সহযোগিতা করে, তবে তারা বড় শিকার ধরতে পারে। কিন্তু যদি কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করে, তবে সবাই ধ্বংস হয়। বাস্তব জীবনও ঠিক এমনই। যারা দীর্ঘমেয়াদে চরিত্র ধরে রাখে, তারা ধীরে ধীরে এমন মানুষদেরই আকর্ষণ করে যারা বিশ্বাসযোগ্য। আর যারা সবসময় শর্টকাট খোঁজে, তারা শেষ পর্যন্ত নিজেদের চারপাশে একই মানসিকতার মানুষই পায়।
শিষ্টাচার-১৫৩: টাকা অনেকটা বীজের মতো। আপনি চাইলে সেটা এখনই খেয়ে ফেলতে পারেন, আবার চাইলে মাটিতে পুঁতে ভবিষ্যতের এক বিশাল বন তৈরি করতে পারেন। গরিব মানুষ সময় দিয়ে টাকা বাঁচায়, আর ধনী মানুষ টাকা দিয়ে সময় বাঁচায়। খন একজন মানুষ লন্ড্রি, ছোটখাটো কাজ বা আননেসেসারি অপারেশনাল টাস্কে নিজের মূল্যবান এনার্জি শেষ করে ফেলে, তখন তার ব্রেইন র্স্ট্যাটেজিক চিন্তা করার ক্যাপাসিটি হারিয়ে ফেলে। সে তখন শুধু সারভাইভ মোডে বেঁচে থাকে।
যে মানুষ নিজের সময় কিনতে শেখে, সে জীবনে লেভারেজ তৈরি করে। কারণ ফ্রি টাইম মানেই শুধু বিশ্রাম না; ফ্রি টাইম মানে নতুন স্কিল শেখা, নতুন বিজনেস মডেল চিন্তা করা, নেটওয়ার্ক বিল্ড করা এবং হাই ভ্যালু ডিসিশন নেওয়া। ইনকাম বাড়ার সাথে সাথে নিজের লাইফস্টাইলকে আনুপাতিক হারে বাড়িয়ে ফেলাই হলো লাইফস্টাইল ক্রিপ। রিয়েল ওয়েলথ তখনই তৈরি হয়, যখন ইনকাম বাড়লেও নিজের পেন্ডিং ডিসিপ্লিন পুরোপুরি কন্ট্রোলড থাকে। কারণ আপনার জমানো এই সারপ্লাস ক্যাশই ভবিষ্যতে নতুন অ্যাসেট তৈরি করবে।
ধনী মানুষরা অনেক সময় খুব সি¤পল জীবন বেছে নেয়, কারণ তারা ভালো করেই জানে, স্ট্যাটাস টেম্পোরারি, কিন্তু ফ্রিডম পার্মানেন্ট। তারা প্রতিমাসে অন্তত ইনকামের একটি নির্দিষ্ট অংশ নিজের স্কিল বিল্ডিং এবং ইনকাম জেনারেটিং অ্যাসেটে ইনভেস্ট করেন। একই সাথে একটি প্রাইমারি স্কিল বেছে নিয়ে আগামী ৫ বছর সেটিতেই মাস্টারি বিল্ড করার দৃঢ় কমিটমেন্ট নেন। কারণ ওয়েলথ কখনো শর্টকাট থেকে আসে না।
শিষ্টাচার-১৫৪: যারা সবসময় অযথা বিলাসিতা দেখায়, তাদের প্রতি মানুষ ধীরে ধীরে সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠে। লোক দেখানোর জন্য অনেকেই অপ্রয়োজনীয় খরচ করে ঋণে জড়িয়ে পড়ে। ফলে বন্ধুত্ব ও আত্মীয়তার সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি হয়, কারণ অতিরিক্ত প্রদর্শনী অহংকার বাড়ায়, আর অহংকার মানুষকে একসময় একা করে দেয় এবং স¤পর্ককে দুর্বল করে। যে ব্যক্তি নিজের অর্জন নিয়ে নীরব থাকে, সমাজ শেষ পর্যন্ত তাকেই বেশি মূল্য দেয়। সত্যিকারের ভদ্রতা হলো স্বাভাবিক থাকা, অযথা নিজেকে বড় প্রমাণ করার চেষ্টা না করা।
মানুষের প্রকৃত মূল্য আসে চরিত্র, জ্ঞান ও আচরণ থেকে, কিন্তু অনেকে মনে করেন দামি পোশাক, ফোন বা গাড়িই মর্যাদার পরিচয়। মনোবিজ্ঞানে এটিকে বলা হয় “Compensatory Consumption”, যেখানে মানুষ নিজের অভাববোধ পূরণ করতে বিলাসী জিনিসের আশ্রয় নেয়। গবেষণায় দেখা যায় সামাজিক স্বীকৃতির অভাব থাকলে মানুষ দামি ব্র্যান্ড ব্যবহার করে নিজের গুরুত্ব প্রমাণ করতে চায়। “Journal of Consumer Research”-এর গবেষণা বলছে, সামাজিকভাবে অনিরাপদ মানুষরা লোগোযুক্ত ও দৃশ্যমান বিলাসী পণ্য বেশি ব্যবহার করে। কারণ তারা চায় মানুষ তাদের সম্পর্কে দ্রুত উচ্চ ধারণা তৈরি করুক। বাস্তবে আত্মবিশ্বাসী ও প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা অনেক সময় সরল জীবনযাপন করেন, কারণ তাদের পরিচয় প্রমাণের জন্য বাহ্যিক প্রদর্শনের প্রয়োজন হয় না। তাই সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, ভেতরের শক্তি কম হলে বাহ্যিক প্রদর্শন বাড়ে।
শিষ্টাচার-১৫৫: আমাদের জীবনে অনেক সময় এমন মুহূর্ত আসে, যখন একটা জিনিস চোখে পড়ল, মন বলল “নিয়ে ফেলো!” কিনে ফেললাম ডিজিট্যাল লেনদেন করে। গবেষণা অনুসারে নগদ টাকার চেয়ে ডিজিট্যাল লেনদেন-এ খরচ করতে মানুষের মধ্যে অনুসুচনা তৈরি হয় কম। কিন্তু ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সেই উত্তেজনা অনেকটাই ফিকে হয়ে যায়। ঠিক সেই কারণেই আপনাকে ৭ দিনের টাকা নিয়ম মানতে হবে, যা আপনার impulse খরচকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে। কোনো বড় বা দামী জিনিস কেনার আগে নিজেকে বলুন-এখন নয়, ‘আমি এক সপ্তাহ সময় নেব’। আপনি দেখবেন, ৭ দিনের মধ্যে, আপনার উত্তেজনা বা আবেগ অনেকটা নীরব হয়ে যাবে। তখন আপনার চিন্তাভাবনা স্পষ্ট হবে, এই জিনিসটা কি সত্যিই আমার জীবনে প্রয়োজন, নাকি কেবল মুহূর্তের উচ্ছ্বাস?
মানুষ প্রায়শই ইমপালস খরচ করে কারণ আমাদের ব্রেন তৎক্ষণাত ‘reward’ চায়। কিন্তু সময় দিলে, আমরা প্রকৃত প্রয়োজন এবং আবেগের মধ্যে পার্থক্য করতে পারি। ছোট ছোট ধাপে এটাই জীবনকে আর্থিকভাবে শান্ত রাখে। এই নিয়ম আমাদের শেখায় আমরা প্রতিটি কেনাকাটার আগে কয়েকবার ভাবার সুযোগ আছে। তখন যুক্তি দিয়ে আবেগের চাহিদার গুরুত্ব বিশ্লেষণ করতে পারি।
শিষ্টাচার-১৫৬: অন্যের রাগের মুখে নিজেকে শান্ত রাখাতে প্রথমে একটু ‘পজ’ নিতে শিখুন। অর্থাৎ যখন কেউ আপনার সাথে খারাপ ব্যবহার করে বা রেগে যায়, তখনই পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাবেন না। কয়েক সেকেন্ডের জন্য থামুন এবং দীর্ঘশ্বাস নিন। এই ছোট্ট বিরতি আপনাকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করবে এবং এমন কিছু বলা থেকে বিরত রাখবে, যা পরে আপনাকে অনুতপ্ত করতে পারে। মানুষ সাধারণত তখনই রাগ করে যখন সে নিজে কোনো কষ্টে থাকে বা চাপে থাকে। যখন কেউ আপনার ওপর রাগ ঝাড়ছে, তখন ভাবুন হয়তো সে কোনো কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তার প্রতি ঘৃণা না দেখিয়ে দয়া বা করুণা দেখানোর চেষ্টা করুন। অন্যের ভুলগুলোকে বড় করে না দেখে ক্ষমা করতে শিখুন।
কেউ আপনার সাথে রূঢ় আচরণ করলেও আপনি পাল্টা ভালো ব্যবহার করুন। আপনার এই উদারতা পরিস্থিতি শান্ত করতে জাদুর মতো কাজ করবে। কেউ রেগে আপনার সাথে খারাপ ব্যবহার করলে মনে রাখবেন, এটা আসলে তার নিজের সমস্যা, আপনার নয়। তার রাগ তার অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ। তাই অন্যের ব্যবহার নিজের গায়ে মাখবেন না। অন্যের রাগ নিয়ন্ত্রণ করা আপনার হাতে নেই, কিন্তু নিজের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা আপনার হাতেই। শান্ত থাকা মানে দুর্বলতা নয়, বরং এটি আপনার আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মানসিক শক্তির পরিচয়। প্রত্যেকের নিজস্ব মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। অন্যের মতের সাথে মিল না থাকলেও তাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকুন। পৃথিবীর সবাই আপনার মতো ভাববে না; এটা মেনে নিন।
শিষ্টাচার-১৫৭: নারীর সকল স্বাধীনতার পূর্ব শর্ত অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। পারিবারিক নির্ভরতা, আর্থিক অক্ষমতা এবং সামাজিক বাধা, এসব কারণে নারীরা প্রায়ই নিজের অধিকার থেকেও বঞ্চিত হন। কিন্তু যখন একজন নারী আত্মনির্ভরশীল হন অর্থনৈতিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে, তখন তার জীবনের অধিকাংশ সমস্যার সমাধান সহজ হয়ে যায়।
আত্মনির্ভরশীলতা নারীর জন্য শুধু আয় করার সুযোগ নয়; তখন এটি আত্মসম্মান, স্বাধীনতা এবং নিরাপদ জীবনের শক্ত ভিত্তি। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নারী পরিবার ও সমাজে আলাদা সম্মান পান। যখন একজন নারী নিজের আয় করতে পারেন, তখন তাকে আর কারও কাছে ছোট হতে হয় না। কর্মজীবী নারী পরিবারকে এগিয়ে নেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মজীবী মায়েদের সন্তানদের স্কুলে উপস্থিতি ও শিক্ষার মান তুলনামূলকভাবে বেশি ভালো হয়। তাই নারীরা কেবল ঘরের কাজ করবেন, এই গতানুগতিক ধারণা ভাঙতে হবে। মা-বোনের করা রান্না ও ঘরের কাজসহ সকল সাংসারিক কাজে হাত লাগিয়ে সহযোগিতা করতে হবে। প্রয়োজনে পালা করে সব কাজ পুরুষদেরও করা উচিত। কর্মজীবী নারীদের যাতায়াতের সুব্যবস্থার প্রয়োজনে গণপরিবহনে সিট ছেড়ে দেয়াসহ যথাযত সন্মান দেখানো উচিত।
শিষ্টাচার-১৫৮: বাবা-মাকে সহ্য করতে পারছেন না। এই বংশগত ট্রমা ভাঙতে আপনাকে পরিবারের সবার সাথে ঝগড়া করতে হবে বা তাদের ঘৃণা করতে হবে এমন নয়। এর উপায় হলো তাদের ভুলগুলো নিজের জীবনে আর কন্টিনিউ হতে না দেয়া। আপনি হলেন আপনারর বংশের সেই 'চেইন ব্রেকার'। আপনি যখন সচেতনভাবে নিজের স্বভাব পরিবর্তন করবেন, তখন আপনি একটি বিষাক্ত পরিবেশ থেকে মুক্তি পাবেন। প্রথম কাজ হলো নিজেকে একজন দর্শক হিসেবে দেখা। যখনই আপনার মনে হবে আপনার বাবা-মা কোনো নেতিবাচক আচরণ করছেন (যেমন: অহেতুক রাগ বা কন্টোল করার চেষ্টা), তখন চুপ থাকুন। তখন মনে মনে বলুন, "এটি আমার বাবা-মার আসল সত্তা নয়, এটি আমার পূর্বপুরুষদের থেকে পাওয়া একটি পুরনো সফটওয়্যার।" এই আলাদা করার ক্ষমতা আমার আছে; আমি ওই পুরানো আবেগের দাস হবো না।
তারা নিজেরাও অতীতে হয়তো কোনো না কোনো ট্রমার শিকার ছিল। তা থেকে তারা বের হতে পারেননি। এই উপলব্ধি আপনার ভেতরের তিক্ততা কমিয়ে দেবে। আপনি তাদের ক্ষমা করেছেন, সেই পুরানো কারাগার থেকে বের হবার জন্য, নিজের শান্তির জন্য, তাদের জন্য নয়। বংশগত ট্রমা কাটানোর জন্য অনেক সময় পরিবারের সাথে মানসিক বা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি হয়। একে বলে 'হেলদি বাউন্ডারি'। আপনার মানসিক শান্তি নষ্ট করে এমন আলোচনায় অংশ নেওয়া বন্ধ করুন। ইগো দিয়ে নয়, বরং নিজের সুস্থতার জন্য বিনয়ের সাথে 'না' বলতে শিখুন। মনে রাখবেন, আপনি সবার প্রত্যাশা পূরণ করার জন্য জন্মাননি।
শিষ্টাচার-১৫৯: সব সম্পর্কেই ছোটখাটো সমস্যা থাকতে পারে। কিন্তু যখন কোনো সম্পর্কে বারবার এমন আচরণ দেখা যায়, যা মানসিকভাবে ক্লান্ত করে, আত্মসম্মানকে আঘাত করে বা নিজের মতো করে বাঁচার জায়গা কমিয়ে দেয়, তখন সম্পর্কটি ধীরে ধীরে টক্সিক হয়ে উঠতে পারে। যেমন: বন্ধু বা সঙ্গীর বারবার অসম্মান করা, কথার মাধ্যমে ছোট করা, অপমান করা বা অন্যদের সামনে হেয় করা। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা, কোথায় যাবেন, কার সাথে কথা বলবেন, যেকোনো সমস্যার জন্য সবসময় আপনাকেই দায়ী করা।
এতে করে আপনার মনে হবে, সম্পর্কে থাকার পর শান্তি পাওয়ার বদলে সবসময় চাপ, দুশ্চিন্তা বা অস্বস্তি অনুভব হওয়া। নিজের মতামত, পছন্দ বা অনুভূতি প্রকাশ করতে ভয় লাগবে। যখন দেখবেন, একই সমস্যা নিয়ে কথা বলার পরও কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না এবং এভাবে তা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তাহলে বুঝে নিতে হবে সম্পর্কটি টক্সিক। যে সম্পর্কটি আর ঠিক হওয়ার নয়, সেটি নিয়ে আশায় দিনের পর দিন অপেক্ষা করা বন্ধ করুন। মনে রাখবেন, আপনার মানসিক শান্তি অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে মূল্যবান। টক্সিক সঙ্গীর সাথে ‘বন্ধু’ হয়ে থাকা প্রায় অসম্ভব। তাই ধীরে ধীরে নয়, পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হোন।
শিষ্টাচার-১৬০: ধূমপান, বিড়ি, সিগারেট, তামাক গ্রহণ না করেও আপনি একই সমান ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন, বা বাড়িতে বসে আছেন এক জায়গায়, কাছেই কেউ ধূমপান করছে আর সেই ধোঁয়া আপনার নিঃশ্বাসে ঢুকছে, এটাই হলো প্যাসিভ স্মোকিং বা পরোক্ষ ধূমপান। অর্থাৎ ধূমপায়ীর ধূমপানের ধোঁয়া নিঃশ্বাসে গ্রহণ করা। এটাকে সেকেন্ডহ্যান্ড স্মোকিংও বলা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, প্রতি বছর ৮০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয় তামাক গ্রহণের কারণে। এর মধ্যে ১২ লাখ মানুষই প্যাসিভ স্মোকিং অর্থাৎ পরোক্ষ ধূমপানের শিকার। ধূমপায়ীদের আশেপাশের সকলেই এর ঝুঁকিতে থাকে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি ও স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে থাকে শিশুরা। এছাড়া গর্ভবতী মায়েদের জন্যও এটা বেশ ক্ষতিকর। শিশুর কম ওজন হওয়া, জন্মের সময় নানাবিধ সমস্যাসহ শিশু মৃত্যুর কারণও হতে পারে এই পরোক্ষ ধূমপান।
একটি পরিসংখ্যান বলছে বাংলাদেশের শিশুদের এ্যাজমার ২৩ শতাংশ, শ্বাসকষ্টের নিচের অংশের সংক্রমণের ৩৫ শতাংশ আর কানের সংক্রমণের ৩৯ শতাংশ দেখা দেয় পরোক্ষ ধূমপানের প্রভাবে। বাংলাদেশের ৪০ শতাংশেরও বেশি শিশু বাড়িতেই নিয়মিত পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়। পরিবারের কেউ ধূমপায়ী হলে তাকে ঘরের বাইরে ধূমপান করার অনুরোধ করুন। সম্ভব হলে ধূমপান শেষে সাবান দিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে এবং বাইরের কাপড় বদলে ঘরে ঢুকতে বলুন। ঘরের বাতাস বিশুদ্ধ রাখতে ভালো মানের ‘এয়ার পিউরিফায়ার’ ব্যবহার করতে পারেন, যা বাতাসে থাকা ক্ষতিকর কণা ফিল্টার করতে সহায়তা করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, সিগারেটের পরোক্ষ ধোঁয়ায় প্রায় ৭হাজারেরও বেশি রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে। যার মধ্যে অন্তত ৭০টি উপাদান ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিও বাড়ায় পরোক্ষ ধূমপান। কাজেই যখনই দেখবেন কোনো পরোক্ষ ধুমপান আপনার নিঃশ্বাসের কাছাকাছি, তখনই নিরবে সরে গিয়ে দূরত্ব নিয়ে দাঁড়ান।
শিষ্টাচার-১৬১: একজন ভালো অতিথি হওয়ার জন্য কেবল উপহার নিয়ে যাওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং আপনার আচরণও হওয়া উচিত মার্জিত। যেমন- সময়মতো পৌঁছানো এবং সময়মতো বিদায় নেওয়া। কখনো দাওয়াতের সময়ের আগে পৌঁছাবেন না, কারণ এতে গৃহকর্তা অপ্রস্তুত থাকতে পারেন। আবার অনেক দেরি করেও যাবেন না। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আড্ডা খুব বেশি দীর্ঘ করবেন না। গৃহকর্তা ক্লান্ত হওয়ার আগেই বিদায় নেওয়া একজন ভালো অতিথির লক্ষণ।
খালি হাতে অতিথির বাড়ি না যাওয়াই ভালো। ছোট এক প্যাকেট মিষ্টি, ফুল, বা ঘর সাজানোর কোনো ছোট জিনিস উপহার হিসেবে নিতে পারেন। এটি আপনার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। আড্ডার টেবিলে বারবার ফোন চেক করা বা ফোনে কথা বলা অভদ্রতা। সবার সাথে গল্পে মনোনিবেশ করুন এবং ফোনটি পকেটে বা ব্যাগে রাখুন। এমন কোনো বিষয়ে আলোচনা করবেন না যা অন্যদের অস্বস্তিতে ফেলতে পারে যেমন: রাজনীতি বা ব্যক্তিগত সমালোচনা। সবার সাথে হাসিখুশি এবং ইতিবাচক কথা বলুন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- দাওয়াত খেয়ে আসার পরদিন একটি মেসেজ বা ফোন করে ধন্যবাদ জানান। তাদের রান্না এবং আতিথেয়তার প্রশংসা করুন। একজন ভালো অতিথি হওয়া মানে হলো এমনভাবে থাকা যেন আপনার উপস্থিতিতে বাড়ির মালিক আনন্দিত হন এবং পরবর্তীতে আপনাকে আবার দাওয়াত দিতে আগ্রহী থাকেন।
শিষ্টাচার-১৬২: ছেলেটার বয়স ১০ বছর। কোনো এক ফুটপাতের পাশে হয়তো থাকে। রেস্টুরেন্টে গেল একদিন আইস্ক্রিম খেতে। তাকে দেখে রীতিমতো বিরক্ত রেস্টুরেন্টের ওয়েট্রেস। কারণ একটু পরই দোকান বন্ধ হয়ে যাবে। এই আইস্ক্রিমের দাম কত?
৫০ টাকা। ওয়েট্রেস উত্তর দিলেন। ছেলেটা তার জমানো কয়েনগুলো গুনতে শুরু করলো। কয়েনগুলো গোনা শেষ করে ছেলেটা আরেকটা আইসক্রিমের দাম জিজ্ঞেস করলো। - ওই ছোট আইসক্রিমের দাম কত? ৩৫ টাকা। ছেলেটা তার পুটলি থেকে কয়েনগুলো বের করে বলল - আচ্ছা একটা দেন। ছলেটা ৩৫ টাকা হিসাব করে দিয়ে দিলো। ওয়েট্রেস রাগী রাগী মুখ করে টাকা নিয়ে আইসক্রিম দিয়ে চলে গেলো। আর ছেলেটা কথা না বলে চুপচাপ আইসক্রিম খেয়ে বের হয়ে যায়। দোকান বন্ধ করার আগে ওয়েট্রেস যখন টেবিল পরিষ্কার করতে আসলেন, তিনি দেখতে পেলেন, সেখানে ১৫ টাকা রাখা। ছেলেটা তার জন্য টিপস হিসেবে যাওয়ার আগে ১৫ টাকা রেখে গিয়েছে!।
রীতিমতো ধাক্কা খেলো ওয়েট্রেস। তিনি বুঝতে পারলেন ছেলেটার কাছে ৫০ টাকাই ছিলো। কিন্তু সে প্রথম আইসক্রিমটা না কিনে কম টাকার দ্বিতীয় আইসক্রিম কিনেছে একমাত্র তাকে টিপস দেওয়ার জন্য। কাজেই বাহ্যিক চাকচিক্য পোশাক ও অর্থ-বিত্ত দেখে কাউকে দেবতূল্য কিংবা কারো সাদাসিদা অবস্থা দেখে তাকে অবহেলা, তাচ্ছিল্য করা উচিত নয়। অনেকে হয়তো অনেক টাকা উপার্জন করে। কিন্তু মনের দিক থেকে ছোটই থেকে যায়।
সত্যিকার অর্থে পৃথিবীতে একশ্রেণির মানুষ আছে, যারা শুধু পেতে চায়, দিতে চায় না। একান্ত ঠেকায় না পড়লে নিজের স্বার্থের বাইরে কানাকড়িও ছাড়তে চায় না। এরা সংকীর্ণমনা এবং চরম স্বার্থবাজ। এর বিপরীতে আরেকশ্রেণির মানুষ আছেন, যারা তাদের আয়কে মোট তিনটি ভাগে ভাগ করে নেন। এক ভাগ রাখেন নিজ পরিবার-পরিজনের জন্য, আর একটি ভাগ রাখেন ব্যবসা বা ভবিষ্যতের জন্য এবং তৃতীয় ভাগটি রাখেন মানবতার কল্যাণে। এরা প্রকৃত সুখী মানুষ। তাদের নীতি কথা হচ্ছে-
আমি ছোট ঘরে থাকি বড় মন লয়ে, যা পাই ভাগ করে খাই, থাকি সুখী হয়ে।
কেউ থাকে বড় ঘরে, ছোট মন লয়ে, যা পায় একা খায়, বাচে পশু হয়ে।
কাজেই মানবিক মানুষ হয়ে উঠুন। ছোট ঘরে বড় মন নিয়ে থাকুন।
শিষ্টাচার-১৬৩: ৮৫ বছর বয়স্কা এক বৃদ্ধা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ভাষণ দিবেন। সকলের অনুরোধে বৃদ্ধা ভাষণ দিতে স্টেজে উঠতে যেয়ে হঠাৎ পা পিছলে পড়ে যান। বৃদ্ধার এমন অবস্থা দেখে সবাই কিছুটা বিব্রত বোধ করেন। বৃদ্ধা কারও দিকে না তাকিয়ে হাসিমুখেই ভাষণ দিতে ওঠেন এবং শুরুতেই মাইক্রোফোনের সামনে বলেন, ‘উঠতে পেরেছি বলেই মাইকে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি।
যখন উঠতে গেছি তখন আমার ধারণা হয়েছিল এতো উঁচু জায়গার উপর আমি উঠতে পারবো না। ঠিক তাই হয়েছেÑ চেষ্টা করা মাত্র পড়ে গেছি। আর যখনই পড়ে গেছি তখনই মাথায় চিন্তা এসেছে আমি উঠেই ছাড়বো আর তাই উঠতে পেরেছি। তার মানে এখানে আমার জন্য পড়ে যাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তা না হলে উপরে ওঠার মতো মানসিকতার সৃষ্টি হতো না’।
বৃদ্ধার এমন প্রারম্ভিক বক্তব্য শুনে সবাই হাততালি দিতে শুরু করল। বৃদ্ধা এবারে সবাইকে থামতে বলে তার বক্তব্য দিতে শুরু করেন : বৃদ্ধ হবার অর্থ হলো অচল হয়ে থাকা। মানুষ কোনো কিছু না করলে তাকে অচল বলা যায়, আর অচলের আরেক অর্থ বৃদ্ধ হওয়া। এখানে কিছু করার অর্থ কোনো আয় করা নয় বরং কোনো কাজে লেগে থাকা। কারও বয়স যদি হয় ২০ আর সে কোনো কাজ না করে, তাহলে তার মূল বয়স হবে আমার সমান, ৮৫। আবার কারও বয়স যদি হয় ৮৫ কিন্তু সারাদিন কোনো না কোনো কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখে, তবে তার বয়স দাঁড়াবে তোমাদের সমান, ২০ বছরে। সুতরাং এখানে যারা আমার বক্তব্য শুনছো, তাদের সবাইকে আমি তোমাদের বন্ধু হিসেবে একটাই অনুরোধ করবো, কেউ তোমরা কথনো কাজের ভারে বৃদ্ধ না হয়ে বরং বয়সের ভারেও যুবক থাকার চেষ্টা করবে।
শিষ্টাচার-১৬৪: সবার সক্ষমতা সব ক্ষেত্রে সমান না। মেসি যেমন ফুটবলে ভালো, কোহলি তেমন ক্রিকেটে। এখন মেসি যদি ক্রিকেট খেলতে আসে, আর কোহলি ফুটবল, তাহলে কি হবে? তাহলে দুইজনই ভাববে, তারা দুনিয়ার সবচেয়ে বড় অথর্ব মানুষ, তাই না?
আইনস্টাইন বলেছিলেন, একটা মাছকে যদি গাছ বাইতে বলা হয়, তাহলে সে সারাজীবন ধরে গাছ বাওয়ার চেষ্টা করবে, আর ভাববে, এই দুনিয়ায় তারচেয়ে অক্ষম, অথর্ব কেউ নাই। কিন্তু তাকে পানিতে সাঁতার কাটতে দিলে? তখন সে কি আবিষ্কার করবে? এটাই হচ্ছে বিষয়। সবাই কোনো না কোনো জায়গায় সামর্থ্যবান। কিন্তু তাকে তার সেই শক্তির জায়গাটা বুঝতে হবে।
জীবনে লক্ষ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে আপনাকে চিন্তা করতে হবে একান্ত ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে। কিসে আপনি সুখী হবেন? আপনার জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী? লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আগে সেই পথ স¤পর্কে একটি ধারণা পেতে আপনাকে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করতে হবে। আর সেই পরিকল্পনাই হবে আপনার লক্ষ্য অর্জনের হাতিয়ার। পরিকল্পনাগুলোকে ছোট ছোট স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্যে পরিণত করুন, যা হতে পারে বার্ষিক, মাসিক এমনকি দৈনন্দিন জীবনের অংশ! নিজেকে প্রশ্ন করুন, ‘আজকের দিনশেষে আমার অর্জনের খাতায় কি কি অর্জন করতে পেরেছি?’
শিষ্টাচার-১৬৫: অনেক বছর আগে দুটি ছেলে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কষ্ট করে পড়াশুনা করতো। তাদের টাকা-পয়সা যখন খুব বিপজ্জনকভাবে কমে এলো, তখন তাদের মাথায় এক ফন্দি এলো। তারা ঠিক করলো ইগন্যাসি প্যাডারেউস্কিকে দিয়ে একটি পিয়ানো বাজানোর আসর বসিয়ে কিছু টাকা-পয়সা তুলে তাদের থাকার খরচ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাপ্য টাকা মিটিয়ে দেবে।
বিখ্যাত পিয়ানোবাদকের ম্যানেজার দু’হাজার ডলারের গ্যারান্টি চাইলেন। দু’হাজার ডলার সেই সময় অনেক টাকা। কিন্তু তবুও ছেলে দুটি রাজি হয়ে গেলো এবং পিয়ানো বাজানোর আসরের উদ্যোগ আয়োজন করতে শুরু করলো। অনেক চেষ্টা করেও কিন্তু তারা ১৬০০ ডলারের বেশি তুলতে পারলো না।
আসর শেষ হলে ছেলে দুটি সেই মহান শিল্পীকে খারাপ খবরটি শোনালো। শিল্পীকে তারা ১৬০০ ডলার এবং ৪০০ ডলারের একটি প্রতিজ্ঞাপত্র লিখে দিয়ে বললো যে, তারা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাকি ৪০০ ডলার জোগাড় করে দেবে। প্যাডারেউস্কি তাতে রাজি হলেন না। তিনি সেই প্রতিজ্ঞাপত্র ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে টাকাটাও তাদের হাতে দিলেন এবং বললেন, ‘এই টাকা থেকে তোমাদের খরচ-খরচা মেটাও। আমার লাগবে না।
তারপর অনেক বছর কেটে গেলো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধও শেষ হলো। প্যাডারেউস্কি তখন পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার দেশের হাজার হাজার ক্ষুধার্ত মানুষের অন্নসংস্থানে ব্যস্ত। হার্বাট হুভার তখন আমেরিকার খাদ্য ও সাহায্য বিভাগের প্রধান। তিনি প্যাডারেউস্কির আহ্বানে সাড়া দিয়ে কয়েক হাজার টন খাদ্য পোল্যান্ডে পাঠিয়ে দিলেন। খাদ্যাভাব প্রশমিত হলে প্যাডারেউস্কি নিজেই প্যারিসে এলেন হুভারকে ধন্যবাদ জানানোর জন্য। হুভার বললেন, ‘ঠিক আছে মি. প্যাডারেউস্কি, আপনার হয়তো মনে নেই, আমি যখন ছাত্র ছিলাম এবং বিপদে পড়েছিলাম; আপনি আমাকে সাহায্য করেছিলেন।’
সুতরাং প্রতিদান না পেলে হতাশ হবে না। প্রতিদান আশা না করাই বড় মনের পরিচায়ক, প্রতিদান আপনিই পাওয়া যায়। কোনো কাজ করে কারো থেকে কৃতজ্ঞতার আশায় থাকবেন না, বরং অকৃতজ্ঞতা পেলেও সহজভাবে মেনে নিন।
শিষ্টাচার-১৬৬: আমরা প্রচলিত ব্যাংক একাউন্ট স¤পর্কে জানি, যেখানে আপনি জামানত রাখতে পারেন এবং ইচ্ছেমতো টাকা তুলতে পারেন। ইমোশনাল একাউন্টের কনসেপ্টাও অনেকটা তেমনই। একজন মানুষের সাথে স¤পর্কের ক্ষেত্রে আপনি কতটা বিশ্বাস তৈরি করতে পেরেছেন, ওটাই হলো আপনার জামানত। অন্য একজন মানুষ আপনাকে কতটা নিরাপদ মনে করে, সেটাই হলো তার কাছে আপনার ইমোশনাল একাউন্টের ব্যালেন্স।
ওই একাউন্টে আপনি ভদ্রতা, মমতা, হৃদ্যতা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা ইত্যাদির মাধ্যমে আপনার রিজার্ভ বাড়াতে পারেন। আপনি আমাকে যদি নিরাপদ মনে করেন তাহলেই আপনার কাছে আমার রিজার্ভ বেড়ে গেল। আমি চাইলে সেই রিজার্ভ থেকে তখন টাকা তুলতে পারি। আমি যদি মাঝে মাঝে ভুলও করি, অআপনি ক্ষুব্ধ হবেন না, কারণ আপনার কাছে আমার রিজার্ভ রয়েছে, আমার প্রতি আপনার একটি আস্থা তৈরি হয়েছে।
আবার এই আমি যদি আপনাকে সম্মান না দেখাই, শ্রদ্ধাশীল না হই, আপনাকে বিপদে ফেলি, আপনাকে অগ্রাহ্য করি, আপনার বিশ্বাসকে সম্মান না করি, আপনাকে ভয় দেখাই, আপনার দুর্বলতাকে জনসম্মুখে প্রকাশ করে দেই, তাহলে কি আমার সেই একাউন্টটিতে কোনো রিজার্ভ থাকবে? আমি মূলত একাউন্টটি হারাব। এটাই হলো ইমোশনাল একাউন্ট।
আমাদের জীবনে সবচে’ বড় ইমোশনাল একাউন্টটি থাকে মায়েদের। প্রতিটি সন্তানের জীবনে মায়েদের এই একাউন্টটি এত বড় যে, এটাকে আর কেউ কাটিয়ে উঠতে পারেন না।সন্তানের ভালোর জন্য মা যে পরিমাণ কষ্ট এবং নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেন, তার নজির এই পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই এবং সন্তান নিজের অজান্তেই মা'র এই এত বেশি পরিমাণে থাকে যে, মা চাইলেও সেই ব্যালেন্স শেষ করতে পারেন না।
আপনি যদি পাবলিক ভিক্টরি চান, সামাজিকভাবে বিজয়ী হতে চান, তাহলে আপনার চারপাশের মানুষের সাথে আপনার ব্যালেন্স বাড়াতে হবে। একটু খেয়াল করে দেখুন, আপনার চারপাশের কোন্ মানুষটি সবচে’ বেশি এফেক্টিভ? দেখুন কার কথা মানুষ সবচে’ বেশি বিশ্বাস করছে? কাকে মানুষ নিরাপদ মনে করছে? কার কাছে মানুষ বিপদের সময় ছুটে যাচ্ছে? তার দিকে তাকান। দেখুন, তিনি কিভাবে তার চারপাশের মানুষের কাছে ইমোশনাল ব্যালেন্স বাড়িয়ে রেখেছেন। মানব জন্মের পরম সার্থকতা হলো, নিজের হাতটি সব সময় অন্যকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে দেওয়া।
পৃথিবীর সর্বকালের সর্বনিকৃষ্ট এক অক্ষরের স্বার্থপর শব্দ হলো ‘আমি’। এই আমি কোনোদিন ‘আমরা’ ছাড়া সার্থক হয় না। পৃথিবীর কোনো ভোগ, বিলাস, আনন্দ, উল্লাস, ক্রীড়া কৌতুক, বিনোদন, ভ্রমণ, সৃষ্টি ইত্যাদি একার দ্বারা সম্ভব নয়। দরকার সঙ্গীী-সাথী। সঙ্গী-সাথী নিয়ে যখন জীবন শুরু করবেন, তখন আপনাকে ‘আমি’র সব বৈশিষ্ট্য ত্যাগ করে আমরা-এর বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে হবে। আমি থেকে আমরাতে পরিবর্তিত হওয়ার জন্য আপনার মন-মানসিকতা, চিন্তা-চেতনা এবং কর্মে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। সর্বদা পাওয়ার জন্য, চাওয়ার জন্য অথবা ভোগের জন্য হাত না বাড়িয়ে নিজের সংকীর্ণতার গণ্ডি থেকে বের হওয়ার রাস্তা খুঁজতে হবে।
আপনি দাওয়াত দিয়ে খুব ভালো ভালো খাবার খাওয়ালেন, কিন্তু যাওয়ার সময় অতিথিকে সামান্য হাসিমুখে বিদায় দিলেন না, তাকে ঠিকমতো সময় দিলেন না, কিংবা অতিথির মনে হলো তাকে অবহেলা করা হয়েছে, সেই অতিথি কিন্তু নিজেকে গুটিয়ে নেবে। তার ইমোশনাল একাউন্টে আপনার ব্যালেন্স কমে যাবে। তাই ছোট ছোট বিষয়গুলোর প্রতি খেয়াল রাখুন।
আপনি যদি কাউকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন এবং সেটাকে রক্ষা করেন, তাহলে এর চেয়ে বড় ডিপোজিট আর হতে পারে না। আবার উল্টোটাও সত্যি। আপনি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলেন। তাহলে আপনার ব্যালেন্স কমিয়ে ফেললেন।
শিষ্টাচার-১৬৭: অনেকেই ইন্টিগ্রিটিকে সততার সাথে মিলিয়ে ফেলেন। বিষয়টি আসলে তা নয়। সততা হলো আপনি সত্যি কথাটি বলবেন। আর ইন্টিগ্রিটি হলো আপনার সবকিছু মিলিয়ে এমন একটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, যা আপনার একটি সত্ত্বা তৈরি করে।
ইন্টিগ্রিটি তৈরির সবচে’ ভালো উপায় হলো, তাদের প্রতি অনুগত থাকা, যারা আপনার সামনে উপস্থিত নেই। বিষয়টি আরেকটু খুলে বলা যেতে পারে। ধরুন, আপনি আপনার সহকর্মী মিলে অপর একজন সহকর্মীকে নিয়ে কথা বলছেন, তাকে নিয়ে এমন কিছু বলছেন যা তার সামনে হয়তো বলতেন না। অর্থাৎ যে মানুষটি উপস্থিত নেই তার প্রতি আপনি অনুগত থাকছেন না; তাকে আপনি রক্ষা করছেন না। আপনি আপনার ইন্টিগ্রিটি হারাচ্ছেন। আপনার যদি ইন্টিগ্রিটি থাকে, তাহলে আপনি সেই ব্যক্তিটিকে সামনে ডেকে এনে বলবেন, ঠিক কোন জায়গায় তিনি ভুলটি করেছেন কিংবা ঠিক কোথায় ঝামেলাটা হয়েছে।
ছোটবেলায় সিনেমায় দেখেছিলাম, একজন ভদ্র নারী আরেকজনকে বলছেন,‘খালা গো, আপনাকে একটা গোপন কথা কই, আর কাউরে কইয়েন না। আপনে আপন মানুষ বইল্যা কইতাছি। ওই বাড়ির বউ কিন্তু পোয়াতি..। এটা শুনে খালার চোখ বড় বড় হয়ে যায় এবং সেই ভদ্র নারী আবারও বলেন, ‘কাকপক্ষীও যেন না জানে গো’ এবং তিনি একই কথা পাড়ার সবাইকে বলে বেড়াচ্ছেন। এমন দৃশ্য নিশ্চয়ই আপনারাও দেখেছেন। ইন্টিগ্রিটি হলো মানুষটির অনুপস্থিতিতে তার প্রশংসা করা, সমালোচনা নয়, তার প্রতি অনুগত থাকা।
শিষ্টাচার-১৬৮: মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ নিজের অবস্থান মূল্যায়ন করে অন্যের সঙ্গে তুলনা করে, যাকে Social Comparison Theoryবলা হয়। যখন কেউ দেখে তার পরিচিত কেউ শান্তিতে আছে বা সফল হচ্ছে, তখন নিজের অপূর্ণতা তার চোখে বড় হয়ে ওঠে। ফলে মন ব্যর্থতার আয়না হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে আত্মীয়স্বজন বা প্রতিবেশীদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়। সামাজিক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ অন্যের ব্যর্থতায় সুখবোধ করে, এবং অন্যের ধারাবাহিক সুখে নিজে মানসিক চাপ অনুভব করে, যা তার মানসিক অস্বস্তির উৎস হয়ে যায়।
সুইডেনে নিজের আয়, অর্থ সম্পদ কিংবা সাফল্য নিয়ে কথা বলা বা গল্প করা একেবারেই নিষিদ্ধ। তবে এই আইন মূলত সুইডেনের সামাজিক রীতি; এই আইনকে বলা হয় ইয়ান্তেলাগেন বা ইয়ান্তেলোভেন। সুইডেন ছাড়াও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চলভুক্ত ডেনমার্ক ও নরওয়েতেও ইয়ান্তেলাগেন মেনে চলা হয়। এই রীতি অনুসারে সুইডিশরা নিজেদের নতুন গাড়ি, বাড়ি, চাকরি, মোটা অঙ্কের বেতন কিংবা আসবাবপত্র নিয়ে কখনোই শো-অফ করেন না। এমনকি তারা পরীক্ষার ভালো ফলাফল করলেও তা সবার মাঝে বলে বেড়ান না।
কেননা এতে অনেকে হিংসা করতে পারেন, আবার কেউ কেউ কষ্টও পেতে পারেন। তাই সুইডিশরা কখনোই নিজেকে বিশেষ কোনো ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন না। এই ইয়ান্তেলাগেনের সৃষ্টি হয়েছে একটি উপন্যাস থেকে। ১৯৩৩ সালে ডেনিশ-নরওয়েজিয়ান লেখক অ্যাকসেল স্যান্ডিমোজ তার উপন্যাসে প্রথম ইয়ান্তেলাগেনকে তুলে ধরেন। এতে তিনি একটি কাল্পনিক ইয়ান্তে শহরের কথা তুলে ধরেছেন। যে শহরটিতে ১০টি বিশেষ নিয়ম মেনে চলা হয়। এ নিয়মগুলোই ইয়ান্তেলাগেন। এগুলি মূলত একজন মানুষকে নিরহংকারী হওয়ার শিক্ষা দেয়। একজন মানুষ অর্থ, সম্পদ কিংবা জ্ঞানের দিক দিয়ে এগিয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু এরপরও সেই ব্যক্তি যেন নিজেকে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে বিবেচনা করবেন, সেটাই ইয়ান্তের আইন। এটি সুইডিশদের সম্পদ আর সাফল্য জাহির করা থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি নিজের ব্যর্থতা, দুঃখ-কষ্টকেও আড়াল করার শিক্ষা দেয়।
শিষ্টাচার-১৬৯: ফ্রেডম্যান ও রোজম্যান নামে দুই মনোবিজ্ঞানী ১৯৭৪ সালে মডেলটি তৈরি করেন। টাইপ এ ব্যক্তিত্বের লোকেরা খুব উচ্চাকাক্সিক্ষ হন, কঠোর পরিশ্রম করতে পারেন। একটা কিছু ধরলে সেটা যতক্ষণ না হচ্ছে ততক্ষণ তারা সেটায় লেগে থাকেন অর্থাৎ তাঁরা ধংংবৎঃরাব. যাঁরা উঁচুপদে কাজ করেন যেমন, বড় সংস্থার ডাইরেক্টর, বড় সংস্থার চেয়ারম্যান, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, নামী পেশাদার ব্যক্তিদের অনেকেই টাইপ ‘এ’ ব্যক্তিত্বের মানুষ। গরিব বড়লোক হলে ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন হয়। রাজনৈতিক নেতারা যখন ক্ষমতাচ্যুত হন তখন তাঁদের একরকম ব্যক্তিত্ব, আবার যখন মন্ত্রী-টন্ত্রী হন, তখন একরকম ব্যক্তিত্ব। ব্যক্তিত্ব এমন একটি জিনিস, যা অর্জন করতে পারলে পৃথিবী আপনার হাতের মুঠোয় চলে আসবে। ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলা সহজ কাজ নয়, এ গুণটি ধীরে ধীরে অর্জন করতে হয়।
আমাদের ব্যবহার ও আচরণের ক্ষেত্রে যে সব ব্যতিক্রম দেখা দেয়, মুডের যে ওঠানামা হয়, তার পিছনে আছে ওই উৎকণ্ঠার আক্রমণ। কারণ শৈশবে তার অনেক ইচ্ছা পূরণ হয়নি। হয়তো বাবা মা তাকে মারধর করতো। বন্ধুরা তাকে খেলায় নিতো না। তাকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করতো। সে জন্য তার চেতন মন বড় হয়ে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। সে সবাইকে আক্রমণ করছে। এতে করে সে মেজাজ না দেখালে, মাথা গরম না করলে কিছুতেই স্বস্তি পায় না।
মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করলে, অন্যদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করলে, অপমান করলে তবেই তার শান্তি হয়। ব্যক্তিত্বের ওপর এইভাবেই অবচেতন মনের প্রভাব পড়ে। চেহারা ব্যক্তিত্ব বৃদ্ধির অনেকখানি সহায়তা করে। ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের চেহারাকে ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। মনোবিদদের অনেকে মনে করেন দেহের গড়নের ওপরও মানুষের ব্যক্তিত্ব নির্ভর করে। ব্যক্তিত্বের একটি অপরিহার্য অঙ্গ হলো নিখুঁত উচ্চারণভঙ্গি। যারা ব্যক্তিত্ব অর্জন করতে চান তাদের নিয়মিত উচ্চারণ প্র্যাকটিস করতে হবে।
প্রকাশের ক্ষমতাই হলো ব্যক্তিত্ব। যে নিজেকে প্রকাশ করতে পারে না, লজ্জা এবং সবার সামনে উঠে দাঁড়িয়ে দু চার কথা বলতে গেলে যাদের পা কাঁপে, জিভ শুকিয়ে যায় তাদের ব্যক্তিত্বে খামতি আছে। ব্যক্তিত্বের ৫০ শতাংশ নির্ভর করে চেহারা পোশাক-আশাক ও চালচলনের ওপর, কিন্তু বাকি অর্ধেকটা নির্ভর করে কথা বলার ভঙ্গির ওপর। যার মধ্যে উচ্চারণ ও কণ্ঠস্বরও পড়ে।
শিষ্টাচার-১৭০: উভয়ই জেতা হচ্ছে উভয়ের জন্য এটি ভালো একটা প্রক্রিয়া, যাতে তারা প্রতিনিয়ত উভয় পক্ষের ভালোটা খুঁজতে থাকে। এটা হলো এক ধরনের ‘দর্শন’ যার মাধ্যমে আপনাকে মূলত এই গুণটি অর্জন করতে হবে। এই গুণের মানুষগুলো সবকিছুতেই উভয়পক্ষের স্বার্থটি খেয়াল রাখে। তারা বিশ্বাস করে উভয়কেই জিততে হবে এবং উভয়কেই পরিতৃপ্ত হতে হবে। এরা পৃথিবীকে প্রতিযোগিতাপূর্ণ কোনো খেলার মাঠ হিসেবে দেখে না; এরা মূলত সহযোগিতা এবং সহমর্মিতা দিয়ে সবকিছু পরিচালিত করেন। তারা বিশ্বাস করে, এই পৃথিবীতে অনেক আছে, সেটা সবাই ভাগ করে নিলেও নিজের কমতি হবে না। তারা অপরকে ভাগ দেবার নীতির উপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়।
বাংলাদেশের বেশিসংখ্যক মানুষ হলো অপরকে হারিয়ে জেতার মানসিকতায় পরিচালিত মানুষ। তাদের ব্রেইনে এই স্ক্রিপ্টটা বসে আছে। তারা সব সময় জিততে চায় এবং অন্যকে ঠকিয়ে জিততে চায়। এর বাইরে এরা ভাবতেই পারে না। একটা কঠিন প্রতিযোগিতার ভেতর নিজেকে গড়ে তুলেছে এই গোত্রের মানুষগুলো। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরনের মানসিকতা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের খুব ছোটবেলা থেকেই মাথায় গেথে যায়। তারা বেড়ে ওঠে এই ফর্মূলা দিয়ে। তারা তাদের পরিবার থেকে এটা পেয়ে থাকে। এই ধরনের মনসিকতা তৈরিতে আরেকটি স্থান হলো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। আমাদের স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় কোথাও সহযোগিতার মনোভাব নেই। আমরা ক্লাসে একটি চরম প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করি। ফলে তারা টিম প্লেয়ার হয় না।
শুধু নিজের লাভের হিসাবে করবেন না। বরং উভয়ের স্বার্থ বিবেচনা করতে হবে। যাতে উভয়ের দ্বারা উভয়ের উপকার হয়। মনে রাখবেন, অপরের সমস্যা সমাধানের দ্বারাই নিজের উন্নতি সাধন করা যায়। স্বার্থপর লোভী ব্যক্তি বোকা ছাড়া কিছুই নয়। ভোগ নয়, ত্যাগেই সুখ। ত্যাগ মানে বর্জন নয় বরং বড় কিছুকে পাওয়া বা চাওয়ারই প্রমাণ বহন করে ত্যাগ। ফুল ফলে পরিণত হয় তার সুন্দর পাপড়িকে ঝরিয়ে দিয়ে।
অন্যকে যারা প্রাপ্য মর্যাদা ও সম্মান করে, কেবল তারাই প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা পেয়ে থাকেন। ব্যাপারটা ঠিক আয়নার মতো। আপনি আয়নার মধ্যে নিজের হাসিমুখ দেখতে চাইলে অবশ্যই নিজের মুখটা হাসি দিয়ে ভরতে হবে। অন্যের কাছ থেকে যে রকম ব্যবহার আশা করেন না, ভুলেও অন্যের সঙ্গে সে রকম ব্যবহার করবেন না।
শিষ্টাচার-১৭১: ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগের অনলাইন মাধ্যমে বন্ধুদের ছড়াছড়ি। মুঠোফোনেও আছে অনেক বন্ধু। কিন্তু এত বন্ধুর ভিড়ে কতজনের সঙ্গে একান্ত কিছু সময় কাটানো যায়? আপনার সত্যিকারের কাক্সিক্ষত বন্ধুর সংখ্যা কত? এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গবেষণা চালিয়ে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ফলিক্স রিড-সোকাস বলছেন, মানুষের একান্ত নিকট বন্ধু মাত্র পাঁচ থেকে আটজনে সীমিত। তারাই সারা জীবনের বন্ধু হতে পারে। তবে কেউ বাদ পড়লে নতুন কেউ এসে শূন্যস্থানটি দখল করে নেয়। এভাবে সংখ্যাটি প্রায় অপরিবর্তিত থাকে। দীর্ঘদিন গবেষণা করার পর গবেষকরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন, বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে কেবল বন্ধুত্ব নামক সম্পর্কটি টিকিয়ে রাখা একজন নারীর তুলনায় একজন পুরুষের জন্য বেশ কষ্টকরই! আর তাই তারা পুরুষদের জন্য এ সম্পর্কটিকে Just Friendship না বলে বললেন Partial Friendship! গবেষকরা জানালেন- আপনি যদি একজন নারী হয়ে থাকেন, তাহলে অবশ্যই সম্ভব। কিন্তু আপনি যদি পুরুষ হন, তাহলে আপনার জন্য বেশ জটিলই হয়ে যাবে।
দুই বন্ধু মিলে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে পারেন কিন্তু ব্যবসা দাঁড়ালেও বন্ধুত্ব পড়তে থাকে। শেষে এমন হতে পারে বন্ধুত্ব শত্রুতায় পরিণত হতে পারে। তাই বন্ধুর সাথে পার্টনারশিপ ব্যবসায়ে যাবেন না। মানুষের জীবনে কিছু লোক কিছু সময়ের জন্য ভালো বন্ধু, কিছু লোক অনেকদিনের জন্য ভালো বন্ধু, কিন্তু খুব জনই সারাজীবনের জন্য বন্ধু হয়। বন্ধুর প্রশংসায় মুগ্ধ ও শত্রুর সমালোচনায় বিচলিত হবেন না। এ দুয়েরই কোনো দাম নেই। বন্ধুরা প্রশংসা করবেই কারণ তারা সমালোচনা করে বন্ধুত্ব হারাবার ঝুঁকি নিতে পারে না। শত্রুরা সমালোচনা করবেই।
শিষ্টাচার-১৭২: কথার নাম মধুবাণী, যদি কথা কইতে জানি। কথায় লোকে হাতি পায়, কথায় লোকে লাথি পায়। এক রাজার গল্প। রাজা তাঁর পাচককে তাঁর জন্য বিশ্বের সর্বোৎকৃষ্ট খাদ্যবস্তু রন্ধন করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। পাচক শত পদের সুস্বাদু খাদ্য রন্ধন করল বটে, কিন্তু শত ব্যঞ্জনের প্রতিটির প্রধান উপাদান ছিল ‘জিহ্বা’। রাজা পরম তৃপ্তিভরে ভোজন স¤পন্ন করে পাচককে উপযুক্ত পারিতোষিক দিয়ে বললেন, ‘বেশ! আগামীকাল তুমি বিশ্বের নিকৃষ্টতম বস্তু রন্ধন করে আমাকে মধ্যাহ্নভোজে পরিবেশন কর।’
পরদিনও অন্যভাবে শত ব্যঞ্জন রন্ধন করা হল এবং সেই শত ব্যঞ্জনের মূল উপাদানও ছিল ‘জিহ্বা’। রাজা বিস্মিত হয়ে পাচককে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এইরূপ রন্ধনের কারণ কি?’ পাচক উত্তর দিল, ‘মহারাজ! জিহ্বা এমন একটি বস্ত যা সুন্দররূপে ব্যবহার করলে মানুষ ধন্য ধন্য করে এবং কদর্যভাবে ব্যবহার করলে মানুষ নিন্দা করে। জিহ্বা বন্ধুকে শত্রুতে পরিণত করে, আবার শত্রুকে বন্ধুকে রূপান্তরিত করে। কেবলমাত্র জিহ্বার সঠিক ব্যবহার দ্বারাই অনেক অসাধ্য কর্মস¤পাদন সম্ভব; আবার এই জিহ্বার অপব্যবহার দ্বারাই অনেক সুন্দর পরিবেশ বিষবৎ হয়ে উঠতে পারে। মহান! জিহ্বার অসুন্দর ব্যবহার মহাযুদ্ধের কারণ ঘটায়, আবার সুচারু ব্যবহার মহাযুদ্ধের অবসান ঘটায়। আর এই উপাদানটির সুব্যবহারের জন্য কোনো প্রকার অর্থনাশের আশঙ্কা নেই। রাজা পাচকের কথায় এবং যুক্তিতে মোহিত হয়ে তাকে সহস্র স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করলেন।
৬০ শতাংশ কাজ আর ৪০ শতাংশ কথা চাই। কাজের সমর্থনে কথা না বললে কেউ কাজকে গুরুত্ব দেবে না। সবাইকে আন্তরিক সম্ভাষণ জানান; হাসিমুখে কথা বলুন; ফলে তাদের সঙ্গে আপনার ঘনিষ্ঠতা বাড়বে। কথা বলার সময় প্রতিটি শব্দ স্পষ্ট করে উচ্চারণ করবেন। কথাকে যিনি শিল্প করে তুলতে পারেন, তিনিই বাগ্মীর মর্যাদা পান। কথা বলতে শিখুন সচেতনভাবেÑ শুধু মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য নয়, অন্যকে প্রভাবিত করার জন্য। যদি আপনার কথা খুব দ্রুত হয় তাহলে খুব সহজেই মানুষ আপনার কথা শোনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে কারণ, তারা বেশিরভাগ কথা বুঝতেই পারবে না। ধীরে ধীরে কথা বলতে হবে। কারো প্রতি উদাসীন ভাব দেখাবেন না। প্রথম দেখায় আন্তরিকতা প্রকাশ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সবার কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে হলে আচার ব্যবহার সুন্দর হতে হবে। আচার ব্যবহার সুন্দর না হলে বাহ্যিক সৌন্দর্যের কোনো মূল্য নেই।
শিষ্টাচার-১৭৩: প্রত্যেক মানুষের চরিত্রে কতগুলি প্রধান গুণ ও স্বভাব থাকে। যেমনÑ কেউ মন খোলা, সদা প্রফুল্ল, আবার কেউ ভাবনাগ্রস্ত, চাপা স্বভাবের। কেউ বিনয়ী, মিশুক আবার কেউ লাজুক, আত্মকেন্দ্রিক। কেউ চটপটে, বাস্তববাদী আবার কেউ বোকা, কল্পনাবাদী। কেউ অস্থিরমনা কেউ বা খুঁতখুতে, কেউ হিংসুটে, কেউ নারীকামী, কেউ নারীতে অনাসক্ত।
এরিস্টল, গল প্রমুখ দার্শনিকেরা বলেছেনÑ মুখের আকৃতি, মাথার ভেতরের ও বাইরের গঠন ইত্যাদির সাথে মন মানসিকতা ও ব্যক্তিত্বেও যোগ আছে। এ জন্য বলা হয় যে মুখ হচ্ছে মনের আয়না। কোনো বিশেষ অবস্থায় একটি লোক কেমন ব্যবহার করবে তা বুঝতে হলে তার এসব ভালো-মন্দ স্বভাব ছাড়াও তার উদ্দেশ্য ও অভিজ্ঞতা বুঝতে হবে। লোকের সাথে চলতে গিয়ে প্রথমেই দেখতে হবে আপনাকে সাহায্য-সহযোগিতা ও সৌজন্যমূলক ব্যবহারের পিছনে তার স্বার্থ কি। প্রত্যেকটা মানুষই স্বতন্ত্র। আপনার অবশ্যই নিজস্বতা বজায় রাখা উচিত। আপনি নিজে যেভাবে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন সেভাবেই বলবেন। অন্যকে অনুসরণ করতে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলার কোনো মানেই হয় না।
উইলিয়াম টেনজার একজন স্টক ব্রোকার ছিলেন। তিনি তার বিয়ের এক বছর পরেও তার স্ত্রীর সাথেও ভালোভাবে কথা বলতেন না এবং হাসি মজাও করতেন না। তিনি নিজের জীবনে বেশি খুশি ও সুখী ছিলেন না। অন্য লোকের সাথে তার রিলেশনশীপও খুব একটা ভালো ছিল না। একান্ত প্রয়োজন না হলে তিনি কখনো কারো সাথে কথা বলতেন না। তার স্ত্রী এই পরিস্থিতি নিয়ে খুবই দু:চিন্তায় পড়লেন। এটা কাটাবার জন্য তাকে একটি কথা বলার ক্লাবে ভর্তি করে দেয়া হলো। ক্লাবে ওনাকে একটা সিম্পল টিপস্ দেয়া হয়। টিপসটি হলো ওনাকে প্রতি ঘন্টায় অন্তত একবার কোনো মানুষের সাখে স্মাইল করতে হবে বা মৃদু হাসতে হবে। এটা উনি খুব সিরিয়াসলি নিলেন এবং এপ্লাই করা শুরু করে দিলেন। রাস্তাঘাটে পরিচিত কারো সাথে দেখা হলে সৌজন্যমূলক স্মাইল দেয়া শুরু করলেন। তিনি উপলব্দি করলেন, যাদের তিনি স্মাইল দেন, তারাও তাকে দেখে স্মাইল দিচ্ছেন। ধীরে ধীরে সবাই তার সাখে কথা বলা শুরু করে দিলেন এবং তিনি একজন ইতিবাচক নেতা হয়ে উঠলেন।
শিষ্টাচার-১৭৪: ঈর্ষাপরায়ণতার বিষাক্ত জীবাণু আমাদের রক্তের প্রতি কণিকায় মিশে আছে অনেককাল ধরেই। বাঙালি খুব বেশি ঈর্ষাকাতর। আমরা আমাদের বর্তমানের অবস্থা নিয়ে খুশি না। আমরা, আমাদের চেয়ে ভালো অবস্থানে যে আছে, তার অবস্থা নিয়ে সারাদিন চর্চা করি আর হাপিত্যেশ করে যাই। আবার, আমি যাকে নিয়ে ঈর্ষাপরায়ণ, সেও হয়তো আরেকজনকে নিয়ে ঈর্ষার চারাগাছে পানি দিচ্ছে ক্রমাগত। এ যেন এক চক্র।
কেউ হয়তো ভালো লেখে, ভালো গান গায়, ভালো আবৃত্তি করে। আমরা ঈর্ষাকাতর হই, সে এত সুন্দর গান গায়, আমি পারি না কেন? সে এত সুন্দর লেখে, আমি পারি না কেন? এটা আসলেই পুরোপুরি একটি নিস্ফল মানসিক ব্যাধি। সে ভালো গান গায়, কারণ সে গান গাওয়ার সহজাত প্রতিভা নিয়ে এসেছে, নিয়মিত গানের চর্চা করে সে। সে ভালো লেখে, কারণ সে অজস্র বই পড়েছে জীবনভর। সেও লেখালেখির সহজাত প্রতিভা নিয়ে এসেছে। আপনার প্রতিভা কোন দিকে, সেটা খুঁজে বের করুন। চর্চা করুন। মাহাত্মা গান্ধী দিন রাত সঙ্গীত চর্চা করলে কী ভুলটা হত ভাবা যায়? রবীন্দ্রনাথ কিন্তু ব্যারিস্টার হতে গিয়েও পারেননি। নিজেকে বোঝার জন্য সময় নিন। একট মানুষ সব পারবে, এমন তো কোনো কথা নেই। যেটা ভালো পারবে, সেটাতেই সর্বোচ্চ শ্রম দিলে, সেটাই তো সাফল্য পাওয়ার সহজ রাস্তা।
নিজে ঈর্ষাকাতর হয়ে আপনি নিজেকেই ছোট ও অপমানিত করছেন নিয়মিত। নিজের যাপিত জীবনকে করে তুলছেন দুর্বিষহ। তাই, “ঈর্ষার দুষ্টচক্র” থেকে বেরিয়ে আসুন, আর ইতিবাচকভাবে মানসিকতা নিয়ে তাকান চারপাশে। নিজের যতটুকু আছে, ততটুকু নিয়েই সন্তুষ্ট হতে শিখুন। আপনার প্রতিভাকে লালন-পালন করুন্
শিষ্টাচার-১৭৫: জ্ঞান হচ্ছে কতগুলো তথ্য যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। প্রজ্ঞা হচ্ছে সেই সিদ্ধান্ত যা মস্তিষ্ক নিজের যোগ্যতায় নিয়ে থাকে। সৃজনশীলতা হচ্ছে নতুন কিছু করার যোগ্যতা। জ্ঞানীরা একটি কাজ নিষ্ঠার সাথে করতে থাকে। কিন্তু একজন সৃজনশীল মানুষ সেই কাজটি দশজনকে দিয়ে না করিয়ে একজনকে দিয়ে করানো যায় কিনা সেই পথ বের করার কথা ভাববে। হয়তো বা এটাও ভাবতে পারে যে, কাজটি করার দরকার কি? এর একটি সহজ বিকল্প তো আছে! সৃজনশীলতা শুধুমাত্র অনুশীলন করা হলে সময়ের সাথে সাথে তার মান বাড়ে। সৃজনশীল মানুষের মাঝে নিয়ম ভাঙ্গার প্রবণতা, স্বাধীনচেতা, নানা ধরণের অভিজ্ঞতা অর্জন, ঝুঁকি নেয়া এমনকি সামান্য মনোরোগও দেখা যায়।
সৃজনশীল মানুষেরা বাকিদের জন্যে নতুন পথের উন্মোচন করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে গ্যালিলিও এর কথা। তার আবিষ্কার ছিল প্লেটো এবং এরিস্টটল-এর জ্যোতির্বিজ্ঞান মডেলের স¤পূর্ণ বিপরীত। এখন গ্যালিলিও যদি তার পূর্বে তৈরি পথে কঠোর অনুশীলন করতো; তাহলে তিনি এই নতুন সত্য জগতের সামনে মেলে ধরতে পারতো না। এভাবেই সৃজনশীলরা তাদের পাগলামির মাধ্যমে জগতকে এমনভাবে দেখে যেটা আগে কেউ দেখেনি।
সক্রেটিস পাগলদের ২টি ভাগে ভাগ করেছিলেন। প্রথমটি স¤পূর্ণভাবে জৈবগত সমস্যা আর দ্বিতীয়টি মূলত সামাজিক রীতিনীতি বিবর্জিত আচরণের পর্যায়ভুক্ত। সক্রেটিস দ্বিতীয় ভাগটিতে শিল্পী, প্রেমিক, ধর্মান্ধ, ভাববাদী অথবা নবীদের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। পরবর্তীতে প্লেটো বললেন,দ্বিতীয় ভাগটির উন্মাদনা যতক্ষণ পর্যন্ত না ধ্বংসাত্মক হিসেবে বিবেচিত হয়, তার আগ পর্যন্ত এটি বরং সামাজিক ক্ষমতা বৃদ্ধিতেই সাহায্য করে। অর্থাৎ মানব সভ্যতা বিকাশে এই পাগলদের সৃজনশীল ভূমিকাই মূখ্য। অর্থাৎ বিখ্যাত দার্শনিক ফুকোর ভাষায় বলা যায়, পাগলামীর মিশ্রণ ছাড়া কোনো প্রতিভার জন্ম হয় না। পার্থক্য হল কারো পাগলামীর মাত্রা নিয়ন্ত্রিত থাকে না।
প্রতিভা আর সৃজনশীলতার বড় শত্রু হল মুখস্তবিদ্যা। যখন আপনি কোনো কিছু মুখস্থ করেন, তখন আপনার ব্রেনে খুব চাপ পড়ে। এতে আপনার প্রকৃত মেধা নষ্ট হয়ে যায়Ñ যা হল চিন্তা করার ক্ষমতা। আমাদের দেশের ছাত্র-ছাত্রীরা পরিশ্রম করে সবচেয়ে বেশি কিন্তু শেখে সবচেয় কম। কারণ মুখস্থ করলে সৃজনশীলতা ও কল্পনাশক্তি কমে যায়।
আপনি হয়ত ভাবছেন মুখস্থ ছাড়া পড়ব কিভাবে, আপনি বুঝে পড়ুন কিন্তু নাক মুখ বন্ধ করে মুখস্থ করে না, ভাবুন, কল্পনা করুন, তাহলে দেখবেন অনেক তাড়াতাড়ি আপনার ব্রেনে পড়া সেভ হয়ে গেছে। সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আইনস্টাইন-এর মুখস্থ শক্তি এত কম ছিল যে, নিজের বাড়ির নাম্বারটাও মনে রাখতে পারতেন না। এর কারণ হল তিনি মুখস্থ করতেন না, কল্পনা করতেন আর এর ফলে তিনি হয়েছেন সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী।
শিষ্টাচার-১৭৬: “প্রোকাস্টিনেশন” হল একটি অভ্যাস যার ফলে অধিক জরুরি কাজ ফেলে অপেক্ষাকৃত কম জরুরি কাজ করা কিংবা অপছন্দের কাজ যা হয়তো অনেক গুরুত্বপূর্ণ, তা ফেলে পছন্দের কাজ যা হয়তো অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা। প্রোকাস্টিনেশন একটি বাজে অভ্যাস। প্রোকাস্টিনেশন এড়াতে কাজের তালিকা করুন, কি কি করতে হবে। যদি কাজটা বিশাল হয় তবে তাকে ভেঙ্গে ছোট ছোট ভাগ করুন, বেশি বেশি চিন্তা করা বন্ধ করুন, আর অপেক্ষা না করে এখনই শুরু করুন। মনোযোগ বিছিন্ন করতে পারে, এমন সবকিছু থেকে দূরে থাকো। কাজের পরিবেশ নিরিবিলি রাখার চেষ্টা করো। আপনার কাজের সাথে স¤পর্কযুক্ত কিছু প্রশ্ন করুন এআই-কে। এটা আপনার কাজ বুঝতে এবং কাজ করতে সাহায্য করবে। সম্ভব হলে খোলা বাতাসে একটু হেঁটে আসুন। এটা আপনাকে একটা ব্রেক দিবে এবং পুনরায় কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে সাহায্য করবে। এটা আপনাকে চিন্তা করার সময়ও দিবে। যদি আপনি একটানা কাজ করতে থাকেন, তবে সম্ভব হলে আধা ঘন্টার একটা ঘুম দিয়ে নিন। এতে পুনরায় কাজের গতি এবং কাজের মান ফিরে আসবে।
নিজেকে পুরস্কৃত করুন। যদি আইসক্রিম পছন্দ হয়, তবে একটা কাজ ভালোভাবে করার পর নিজেকে একটা আইসক্রিম দিন। খুঁজে বের কর কোন্ জিনিসটা আপনাকে খুব মজা দেয় এবং পুনরায় শক্তি খুঁজে পেতে সাহায্য করে। অবসবে সেটিতে সময় ব্যয় করুন। পাশাপাশি অন্যকে পুরস্কৃত করে করে অর্থাৎ ছোট্ট পুরষ্কার, উপহার, টিপস ইত্যাদির মাধ্যমে উৎসাহিত করে কাজ আদায় করার পদক্ষেপ নিন।
শিষ্টাচার-১৭৭: নেতৃত্ব হল বুদ্ধিমত্তা, বিশ্বাসযোগ্যতা, মানবিকতা, সাহস, ও শৃঙ্খলাবোধের সমন্বয়। লিঙ্কন ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক এন মেরি ই. ম্যাকসোয়েনের মতে, “নেতৃত্ব আসলে নেতাদের শোনার ও পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নিজেদের দক্ষতাকে কাজে লাগানোর ক্ষমতা, জোর করে কিছু চাপিয়ে না দিয়ে কাজ আদায় করার ক্ষমতা।”এককথায় নেতৃত্ব মানে হল নিজের যোগ্যতায় বড় হওয়া। একটা উদাহরণ দিইÑ এক শিক্ষক ক্লাসে ঢুকে ব্লাকবোর্ডে একটা লম্বা দাগ টানলেন। এবার সবাইকে উদ্দেশ্য করে জানতে চাইলেন: আচ্ছা তোমাদের মধ্যে কে আছো? যে এই দাগটিকে ছোট করতে পারবে? কিন্তু শর্ত হচ্ছে তোমরা একে মুছতে পারবে না!! না মুছেই ছোট করতে হবে! তারপর, ছাত্ররা সবাই অপারগতা প্রকাশ করলো। কারণ, মোছা ছাড়া দাগটিকে ছোট করার আর কোনো পদ্ধতি তাদের মাথায় আসছে না!!
এবার শিক্ষক দাগটির নীচে আরেকটি দাগ টানলেন, যা আগেরটির চেয়ে একটু বড়। ব্যস, আগের দাগটি মোছা ছাড়াই ছোট হয়ে গেলো! শিক্ষক বললেন, বুঝতে পারলে তোমরা? কাউকে ছোট করতে বা হারাতে হলে, তাকে ¯পর্শ না করেও পারা যায়! নিজেকে বড় করো, গড়ে তুলো, তাহলে অন্যের সমালোচনা/ দুর্নাম করে তাকে ছোট করতে হবে না, তুমি বড় হলে এমনিতেই সে ছোট হয়ে যাবে!
আসলে শ্রেষ্ঠ নেতা সে-ই, যার অধীনে কোনোকিছু অর্জিত হলে, তার সাথে জড়িত প্রতিটি মানুষই ভাবে যে, তারা সবাই মিলে কাজটি করেছে। নেতারা জন্মায় না; কঠোর চেষ্টা ও ত্যাগের মাধ্যমে একজন মানুষ নেতায় পরিণত হয়। নেতা মানে আপনি একটা হাজার টাকার নোট। একবার এক প্রফেসর ক্লাসে লেকচার দিচ্ছিল। সে পকেট থেকে হাজার টাকার একটা নোট বের করে জিঙ্গেস করল, কে কে এই নোটটি চাও? পুরো ক্লাসের সবাই এক সাথে হাত তুলল। এবার এবার প্রফেসর নোটটা দুমড়ে মুচড়ে নোংরা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে ডলে দিয়ে বলল, এখন এই হাজার টাকার নোটটা কে কে চাও। উত্তর এবারও সেই একই, সবাই হাত তুলল। তখন প্রফেসর উত্তর দিল, তোমাদের নিজেদেরকে তৈরি করতে হবে এই হাজার টাকার নোটটার মতো, জীবন তোমাকে দুমড়ে মুচড়ে অথর্ব করে দিলেও তোমার মূল্য কখনো কমবে না। তোমার মেধা, তোমার শিক্ষা, তোমার জ্ঞান তোমাকে স্থায়ীভাবে মূল্যবান করে রাখবে।
নেতাকে সর্বদা মনে রাখতে হবে-প্রতিটি মানুষের কাছে শিখার কিছু কিছু আছে। আর তুমি যত বেশি শিখবে, নানারকম অবস্থার সাথে তুমি ততই খাপ খাইয়ে নিতে পারবে, তত ভালোভাবে তুমি মানুষ চিনতে পারবে। কেউ যদি বলে কারো কথা বলায় ভুল ছিল, তর্ক না করে নেতার সেটা মেনে নেয়া উচিত, ক্ষমা চাওয়া উচিত এবং নেতা মানে একটি অভিযোগ বক্স, যাতে সবাই নির্ভয়ে অভিযোগের কথা বলতে পারে। সবাইকে কথা বলার সুযোগ করে দেয়া নেতাকেই নিশ্চিত করতে হয়।
লিও তলস্তয়-এর একটা বিখ্যাত গল্প আছেÑ এক ঈগল এক শেয়ালছানা ধরে নিয়ে চললো। শেয়াল মা গভীর দুঃখে অনেক কাকুতি মিনতি করলো। কিন্তু ঈগল তা শুনলো না। সে ভাবল, “অনেক উঁচুতে পাইন গাছে আমার বাসা। শেয়াল আমার কি আর ক্ষতি করতে পারবে? সে আমার নাগালই পাবে না।” এই ভেবে ছানাটিকে নিয়ে চললো। শেয়াল মা দৌঁড়ে গেল মাঠে, লোকের কাছ থেকে আগুন নিয়ে পাইন গাছে বয়ে আনল। সে গাছে আগুন লাগাতে যাচ্ছে; এমন সময় ঈগল ক্ষমা চেয়ে তাকে তার বাচ্চা ফেরত দিল। এই উপকথা থেকেই তৈরি হয়েছে ফায়ারফক্স নামে ইন্টারনেট ব্রাউজার। এর মুল কথা হল-একটা পিপঁড়াও একটা সৈনিকের সনোযোগ নষ্ট করতে পারে। যদি সে সময় মতো সেটা চেষ্টা করে। কাজেই অতি তুচ্ছ কিছুকেও অবহেলা কিংবা এড়িয়ে চলা নেতার নীতি বিরোদ্ধ। সবাইকে ধারণ করাই তার নীতি।
শিষ্টাচার-১৭৮: বিশ্বাস, নির্ভরতা আর বাঁধভাঙা স¤পর্কের মিলনস্থল হচ্ছে বন্ধু। যে কথা কাউকে বলা যায় না, তার আগল অকপটে খুলে দেওয়া যায় একজন প্রকৃত বন্ধুর কাছে। বন্ধুত্ব থেকে প্রেম-ভালোবাসাও হয়। তখন হয়তো এমন হয়ে যায় যে ঐ স¤পর্ক ছাড়া আমরা যেন কিছুই ভাবতে পারি না, জীবন যেন থেমে গেছে মনে হয়। নিজেদেরকে অস¤পূর্ণ মনে হতে শুরু করে এবং কখনোবা বেঁচে থাকাটাই অর্থহীন মনে হয়। তেমনিভাবে একসময় এই স¤পর্কের টানাপুড়ানও হয় বিভিন্নভাবে। যেমনভাবে শুরু হয় যেমন রমরমিয়ে, তেমনিভাবে তার শেষটাও হয় থমথমিয়ে। কিন্তু তারপরেও মানুষ এর টান ঠিক অনুভব করে প্রতিনিয়ত। সেই টানে কিছুটা ঢিল পড়লেই তার অভিযোগ, অভিমান, অনুরাগের সুর চরম হয়।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, যে স¤পর্কে দুজনের ভালো লাগা-খারাপ লাগা, পছন্দ-অপছন্দ এক, তাদের স¤পর্ক বহুদিন টিকে থাকে। আর যে স¤পর্কের মধ্যে এটা নেই সেই স¤পর্ক একটু হাওয়া দিলেই ভেঙে যায়। নারী পুরুষ উভয়েরই স্বাধীন চিন্তা ও নিজের একটি স্বতন্ত্র জগৎ রয়েছে। ভালোবাসার স¤পর্ক এমনই হওয়া উচিত যা পর¯পরের স্বাধীনতা, মূল্যবোধ ও সম্মানের স্থানগুলোকে অক্ষত ও সুরক্ষিত রাখবে। প্রিয় মানুষটির উপর অধিকার জন্মালেই অভিমান তৈরি হয়। তবে সারাক্ষণ ঝগড়া হওয়া মানেই স¤পর্ক সমাপ্তির পথে। তাই একে অপরকে আক্রমণাত্মক কথা না বলে যুক্তিতর্কের মাধ্যমে ভুল বোঝাবুঝিগুলো দূর করে নিতে পারলে স¤পর্ক ভালো থাকে। সঙ্গী যেমন, তেমনভাবেই তাঁকে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। তাঁর কাজ, পছন্দকে মানতে হবে। তাঁর আস্থা অর্জন করতে হবে। কিছু অপছন্দ হলে না রেগে ধীরে ধীরে তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করতে হবে।
এক কৃষকের বাগানে একটি ডালিম গাছ ছিল। তাতে কোনো ফল ধরত না। তাই কৃষক গাছটি কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিল। সেই ডালিম গাছে বাসা বানিয়েছিল একজোড়া চড়ুই পাখি। কৃষকের বউ কৃষককে অনুরোধ করে বলল, দয়া করে গাছটি কাটবেন না। তাহলে পাখিগুলো আশ্রয়হীন হয়ে যাব। কৃষক জবাব দিল, তারা আশ্রয়হীন হলে আমার কি! এ কথা বলে কৃষক যখন তার হাতের কুড়াল দিয়ে গাছটি কাটতে যাচ্ছিল, তখন কৃষকের বউ বললÑ দেখো পাখির বাসার নিচে মৌমাছিরা বাসা তৈরি শুরু করেছে। গাছে ছোট্ট মৌচাক দেখে কৃষক তার হাতের কুড়াল নামিয়ে ফেলল। সে ভাবল, গাছটি কেটে ফেললে মৌচাক থেকে সে মধু নিতে পারবে না।
আমাদের মধ্যে শতকরা ৯৯ ভাগ মানুষই ঐ কৃষকের মতো। আমরা নিজেদের স্বার্থ ছাড়া অন্য কিছুতে আমাদের আগ্রহ নেই। তাই কোনো মানুষকে দিয়ে যখন কোনো কাজ করাতে চাইবেন, তখন শুধু সেই মানুষটা কি জন্য আপনার কাজটি করে দিবেÑসে বিষয়ে খেয়াল রাখবেন। যদি আপনি সেই মানুষটার স্বার্থের দিক বিবেচনা না করেন, তাহলে সেও আপনার স্বার্থের দিকে দৃষ্টি দেবে না।
গুণগত সম্পর্কের অন্যতম নির্ধারক পার¯পরিক সম্মান। আচরণ, কথায়, সঙ্গীর আত্মসম্মানের দিক খেয়াল রাখুন। প্রতিদিন তার ছোটখাটো নানা ভালো কাজের প্রশংসা করুন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভালো কিছুর সঙ্গে নানা অপ্রাপ্তি, দ্বন্দ্ব, অপ্রত্যাশিত বিষয় যোগ হবে। অযথা প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে বা মনের মধ্যে না পুষে সরাসরি কথা বলুন। আপনার সঙ্গীকে তার পার্সোনাল ¯েপস দেয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিছু সময় আলাদা কাটাও। তাহলে একে অপরের সাথে যে সময়টা কাটাবে তা মধুর হয়ে উঠবে। সময় সবকিছু বদলে দেয়। স¤পর্ক শুরুর সময় আপনার পছন্দের মানুষটিকে যেমন দেখেছিলেন, সে যে সবসময় তেমনই থাকবে তা ভাবা বন্ধ করুন। আপনার স¤পর্ক ভেঙ্গে যাওয়ার সময় কষ্ট হবে, কিছুদিন পর ঠিক হয়ে যাবে। জীবনকে আবার নতুন করে সাজাতে হবে।
শিষ্টাচার-১৭৯: থেমে থেমে চলুন। কোথায় থামতে হয় চলা শুরুর আগে শিখে নিন। যে কোনো লেখাতে কমা ও পূর্ণচ্ছেদ থাকে। কোথাও একটু কম, কোথাও একটু বেশি থামতে হয়। আপনি কত জোরে ছুটছেন সেটার চেয়ে মুহূর্তের মধ্যে থামতে পারেন কি-না সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। জীবনে যা-ই করবেন সইয়ে সইয়ে করবেন। হিসেব কষে ব্রেক নিন, নয়তো আপনার জীবনেরই ব্রেক ডাউন ঘটবে। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সময় ধীরে ধীরে উঠবেন, তাড়াহুড়ো করবেন না। বলার সময় এক নাগাড়ে বলে যাবেন না। থামুন। অন্যকে বলতে দিন। সস্তায় কোনো অফার পেলে সঙ্গে সঙ্গে কিনবেন না, কারণ জিনিসটা সস্তায় কেন বিক্রি হচ্ছে সেটা অনুসন্ধান করবেন।
দীর্ঘ সময় বসে থাকলে দেহ অনমনীয় হয়ে পড়ে। তাই কাজ করার জন্য একটু বিরতি নিয়ে উঠে দাঁড়ান আর হাঁটাচলা করুন। যে কাজ একা করা যায় না, সে কাজের জন্য দক্ষ লোক খুঁজে না পেলে, সে কাজে হাত দেবেন না। কিন্তু যে কাজ একাই করা যায়, সে কাজে দোসর খুঁজতে যাবেন না; যে কাজ করতে দুজন লাগে সেখানে তিনজন লোক রাখবেন না। স্ট্রাগল অর্থাৎ সংগ্রাম মানুষকে বড় করে। একবার যদি মনের মধ্যে ফাঁকিবাজি ঢুকে যায়, তাহলে তার আর কিছু হওয়া মুশকিল। তখন সে নিজের অপারগতা ঢাকার জন্য শুধু অজুহাত খোঁজেন।
রবীন্দ্রনাথ স্কুল পালিয়েছেন। নজরুল তো বেশি পড়তেই পারলো না। লালন তো বুঝলই না স্কুল কি। আজ মানুষ তাঁদেরকে নিয়ে গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করছে। কারণ তারা কোনো অজুহাতকে প্রশ্রয় দেননি। এমনকি, অ্যাপেলের প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস্্ শুধু মাত্র ১ দিন ভাল খাবারের আশায় ৭ মাইল দূরে পায়ে হেঁটে উপাসনালয়ে যেতেন। ভারতের সংবিধান প্রণেতা আম্বেদকর নিম্নবর্ণের হিন্দু ছিলেন বলে স্কুলের বারান্দায় বসে বসে ক্লাস করতেন। কোনো গাড়ি তাঁকে নিতো না। তৈমুর লং খোঁড়া ছিলেন, নেপোলিয়ন বেঁটে ছিলেন। আব্রাহাম লিঙ্কনের মুখ ও হাত যথেষ্ট বড় ছিল। কিন্তু কিছুই তাদের উন্নতির পিছনে বাঁধা হতে পারেনি। তাই অন্য কিছু নয়, যদি কোনো কিছু আপনার বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা আপনার ভিতরের ফাঁকিবাজি। এই ফাঁকিবাজিকে জয় করুুন। সাফল্য ধরা দেবেই।
শিষ্টাচার-১৮০: নদীর পাশে ছোট্ট একটা জলাশয়। সেই জলাশয়ে বাস করতো তিন মাছ। প্রথম মাছটি খুব বুদ্ধিমান। নাম তার চারচোখা। পরেরটি অল্প বুদ্ধিমান। নাম তার উচুচোখা। শেষেরটি একেবারেই নির্বোধ। নাম তার পদ্মলোচন। একদিন সকালে সেই জলাশয়ের পাড়ে কিছু জেলে আসে তাদের জাল নিয়ে। জেলেদের দেখে চারচোখা মাছটি অন্য দুই মাছের সাথে কোনো কথা না বলেই সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেয়, পালতে হবে। সে মনে মনে ভাবলো, আমার এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে ওই দুই মাছের সাথে আলোচনা অর্থহীন, তারা শুধু আমাকে বিভ্রান্ত করে দেবে। ওই মাছ দুটো না পালানোর পক্ষে যুক্তি সাজাবে। কারণ তারা এই জলাশয়কে খুব ভালবাসে।
বুদ্ধিমান মাছটি এই ভেবে সে জলাশয় থেকে চুপিসারে এক লাফে পাশের নদীতে চলে গেল। অল্প বুদ্ধিমান মাছ উচুচোখা একটু পর টের পেল চারচোখা পালিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে সে ভাবলো আমারও পালিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এখন তো পালানোর উপায় নেই, জেলেরা একদম কাছে চলে এসেছে। হঠাৎ তার মনে পড়ল, চারচোখা তাকে শিখিয়েছিল কী করে মরা মাছের ভান করতে হয়। তাই ভেবে সে তার পেট উপরের দিকে রেখে পানির ঢেউয়ের সাথে নিজেকে ছেড়ে দিল। এক জেলে মরা মাছ ভেবে সে মাছটিকে পানির ঝাপ্টায় পাশের নালার দিকে টেলে দিল। উচুচোকা মাছটি নালার পানিতে মিলিয়ে গেল।
তৃতীয় নির্বোধ মাছ পদ্মলোচন নিজের বিপদ সম্পর্কে নিজে সম্পূর্ণ উদাসীন। যখন জেলেরা জলাশয়ে জাল ফেলল, তখন সে উত্তেজিত হয়ে লাফাতে লাগলো, কিন্তু শীঘ্রই জেলেদের জালে সে বন্দি হল। যখন সে জেলেদের জালে বন্দি হল তখন সে নিজের মনে বলল, আমি যদি এখান থেকে মুক্ত হতে পারি, আমি কখনই আর ওই জলাশয়ে বাস করব না। কিন্তু ক্ষণিক বাদে জ্বলন্ত উনুনের উপর লোহার কড়াইতে তাকে ভাজা হল। আমাদের জীবনে কিছু মানুষের অবস্থাও ওই নির্বোধ মাছ পদ্মলোচনের মতোই, চোখ নিয়ে আমাদের গর্বের শেষ নেই; নাম আমাদের পদ্মলোচন কিন্তু অদুরদর্শিতার কারণে আমাদের জীবন জ্বলন্ত উনুনে ভাজা মাছটির মতো, হতাশা, ক্ষোভ, ঘৃণা, ঈর্ষা আমাদের কুরে কুরে খাচ্ছে।
আমরা অনেকেই ভুল মানুষের সাথে অনেকটা সময় কাটিয়ে ফেলি। ভুল জায়গায় থেকে যাই, যেখানে আমদেরা আসলে কখনোই ফিট করে না। একসময় আমাদের ঘোর কাটে, ভাবি- “আরও আগে বের হয়ে আসা উচিত ছিল” “কেন এতদিন নষ্ট করলাম?” জীবনের অনেকটা সময় হারিয়ে গেল।
কিন্তু এবার একটু অন্যভাবে দেখুন। হ্যাঁ, আপনি সময় নষ্ট করেছেন। কিন্তু আপনি পুরো জীবনটা তো নষ্ট করেননি। আপনি বুঝতে পেরেছেন, কোনটা আপনার জন্য না, কোন ধরণের মানুষ বা জায়গা আপনাকে ছেড়ে দিতে হবে। এটা বুঝেওঅনেক মানুষ পুরো জীবনটাই ভুল জায়গায় কাটিয়ে দেয়, কখনো বের হয় না অথবা হতে পারে না। আপনি অন্তত বুঝতে পেরেছেরন, বের হয়ে এসেছেন। তাই শুধু অনুশোচনা না করে, নতুন করে শুরু করাটা খুবই জরুরি। আপনি সময় হারিয়েছেন, কিন্তু নিজেকে হারাননি।
শিষ্টাচার-১৮১: গ্রিক কল্পকাহিনীর ট্রয় নগরীতে যে যুদ্ধ হচ্ছিলো সেই যুদ্ধেরই বীর যোদ্ধা ছিলেন ‘একিলিস’। যাকে কেউ হারাতে পারার কথা না; যার অমর হবার'ই কত ছিলো। কিন্তু তাকেও মরতেই হয়েছিলো। একিলিসের পিতা মানুষ হলেও মা ছিলেন দেবী। একিলিসের জন্মের পর তার দেবী মা পুত্রকেও অমর করতে চাইলেন। একিলিসকে অমর করার জন্য মা তাকে পাতালের এক নদীতে ডুবিয়েছিলেন।
সেই পানি একিলিসের শরীরের যে যে অংশ ছুঁয়েছে, তাতেই রোগ, জরা, ব্যধি ছুঁতে না পারার মত এক বর্মে পরিণত হয়েছে। কিন্তু! কিন্তু গোড়ালি ধরে ডুবিয়েছিলেন বলে শরীরের ওই অংশটি শুকনো থেকে গিয়েছিল, যা পরবর্তীতে দেখা গেল একিলিসের একমাত্র দুর্বল স্থান। ফলস্বরূপ যুদ্ধের ময়দানে কেবল গোড়ালিতে বিদ্ধ হওয়া একটি তীর একজন বীরের সমস্ত শরীর বিবশ করে দিয়েছিলো। এ গল্প আমাদের শেখায় যে, সবকিছু যতই নিখুঁতভাবে তৈরি করা হোক না কেন, তাতে একটি খুঁত থাকেই। পৃথিবীর কোনো বস্তু, কর্ম বা ব্যবস্থা কোনো কিছু সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত নয়। কোথাও না কোথাও কোনো না কোনো অপূর্ণতা থেকে যায়।
তাই, জীবনে কোনো কিছু নিয়ে অহংকার করবার কিছু নেই। মাত্র এক সেকেন্ডে আপনার জীবন তছনছ করে দিতে পারে ফোন কল থেকে আসা েেকানো নির্মম দুঃসংবাদে, অথবা বড় কোনো দুর্ঘটনা থেকে মাত্র কয়েক সেকেন্ড দূরত্বে আছেন আপনি। কোনো ব্যক্তি, বস্তু, ক্ষমতা, সৌন্দর্য কিংবা সম্পদ চিরদিন একই অবস্থায় টিকে থাকে না। সময়ের প্রবাহে সবকিছুই পরিবর্তিত হয় এবং একসময় বিলীন হয়ে যায়।
জাপানি দর্শনে একটি ধারণা রয়েছে, যাকে বলা হয় "ওয়াবি-সাবি" (Wabi-Sabi)। এই দর্শন আমাদের শেখায় যে, কোনো কিছুর অপূর্ণতা বা খুঁতের মাঝেই তার আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে। ফার্সি কবি জালালুদ্দিন রুমি একটি বিখ্যাত উক্তি করেছিলেন: "he wound is the place where the light enters you" (ক্ষত বা খুঁতটিই সেই জায়গা, যা দিয়ে তোমার ভেতরে আলো প্রবেশ করে)। অর্থাৎ নিখুঁততার চেয়ে একটি চরিত্রের বা বস্তুর খুঁত তাকে বেশি আকর্ষণীয় ও মানবিক করে তোলে। পৃথিবীর সবচেয়ে আদর্শ বা সফল মানুষের চরিত্রেও কোনো না কোনো দুর্বলতা বা খামতি থাকে। শতভাগ নিখুঁততার পেছনে ছোটা এক ধরণের মরীচিকা। খুঁত বা অপূর্ণতা আছে বলেই পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত সংশোধনের, নতুন আবিষ্কারের এবং বিবর্তনের সুযোগ থাকে। এই অনিবার্য খুঁতকে মেনে নিয়েই আমাদের সৃষ্টির আনন্দকে উপভোগ করা উচিত।
সবকিছুর মধ্যেই যে, কোনো না কোনো খামতি বা অপূর্ণতা লুকিয়ে থাকে। এই উপলব্ধি আমাদের অহংকার ত্যাগ করতে শেখায়। ভুলের সম্ভাবনা মেনে নিয়ে তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে শেখায়। কোনো কাজকে শতভাগ নির্ভুল মনে না করে, নিয়মিত আত্মসমালোচনা, সংশোধন এবং উৎকর্ষের সাধনাই হওয়া উচিত আমাদের জীবনের আদর্শ। অপূর্ণতাই আমাদেরকে নতুন জ্ঞান অর্জন, নতুন সৃষ্টি এবং আরও ভালো ভবিষ্যৎ নির্মাণের অনুপ্রেরণা জোগাবে।
শিষ্টাচার-১৮২: গ্র্যান্ডিওসিটি (Grandiosity) মানে হলো এমন একটা মানসিক অবস্থা, যেখানে নিজেকে অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ, শ্রেষ্ঠ বা অজেয় মনে হয়। , সমালোচনা বা ভয়ের প্রতি উদাসীনতা চলে আসে। এই নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটির একটা ইতিবাচক দিক হলো ব্যক্তি বাহ্যিক প্রশংসা বা ভয়ের উপর আর নির্ভর করে না, নিজের মূল্য নিজেই তৈরি করে। কিন্তু এটা খতরনাক হয় তখন, যদি এই স্তরটা অতিরিক্ত হয়ে যায়, তাহলে দুটো ঝুঁকি তৈরি হয়। যেমন- এক: মানুষের সাথে আস্তে আস্তে আমার দূরত্ব বেড়ে যায়, কারণ তখন সে আর অন্যের অনুভূতিকে ততটা গুরুত্ব দেয় না।
দুই: অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস থেকে বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। সবাই আপনাকে ছেড়ে যাচ্ছে কথাটা হয়তো ভুল, সত্যি কথা হচ্ছে আপনি নিজের দেওয়ালটা এত উঁচু করে ফেলছেন যে, কেউ আপনার কাছে পৌঁছাতে পারছে না। “আমি কখনো কোন কিছুর জন্য আফসোস করবো না, কারো কাছে নত হবো না, যতদিন বাচি মাথা উঁচুই থাকবে, এতে কেউ আমার পাশে থাকলে থাকুক না থাকলে নাই।” এই উড়হ'ঃ ঈধৎব মানসিকতা আপনাকে প্রতিনিয়ত নিঃস্ব এবং ধ্বংস হওয়ার জন্য প্রস্তুত করবে।
পৃথিবী যত টাকা, ক্ষমতা, প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাচ্ছে ততই মানুষ একা হয়ে যাচ্ছে, সম্পর্কহীন হয়ে যাচ্ছে। সবার কাছে স্মার্টফোন আছে, কিন্তু কথা বলার মানুষ নাই। সবার কাছে সোশ্যাল মিডিয়া আছে, কিন্তু সত্যিকারের বন্ধুত্ব নেই। আর এই শূন্যতাই ডিপ্রেশন, ক্রোধ, সামাজিক বিভাজন তৈরি করছে। তাই পরিবর্তন শুরু করতে হবে ভালোবাসা দিয়ে, নিজের পরিবার, বন্ধু, প্রতিবেশী, এমনকি অপরিচিতদের প্রতিও সহানুভূতি এবং মানবিকতা দেখান। মনে রাখবেন, আত্ম অহমিকা পরিহার করে পারষ্পরিক সুন্দর সম্পর্কই করতে পারে সুখী ও সমৃদ্ধশালী।
শিষ্টাচার-১৮৩: যা আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে, তার ওপর মনোযোগ দেওয়া; আর যা আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, তা শান্তভাবে গ্রহণ করার দর্শন স্টোয়িসিজম। আমাদের চিন্তা, সিদ্ধান্ত ও আচরণ আমাদের হাতে; কিন্তু অন্যের মতামত ও অন্যান্য ঘটনা আমাদের নিয়ন্ত্রণে নয়। অতীতকে যেমন পরিবর্তন করা যাবে না এবং তেমনি ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তাই বর্তমান মুহূর্তের ওপর সম্পূর্ণ মনোযোগ দিতে হবে এবং প্রতিটি ক্ষণকে অর্থপূর্ণভাবে যাপন করতে হবে। জীবনের যেকোনো পরিস্থিতিকে, তা ভালো হোক বা মন্দ, সানন্দে গ্রহণ করে, ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিবর্তন বা অনিবার্য ক্ষতিকে মেনে নিয়ে, তাকে নতুন সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করাই হলো স্টোয়িকদের প্রধান শিক্ষা।
জীবনে সবকিছু আমাদের ইচ্ছামতো না চললেও আমরা নিজেকে সামলিয়ে ইচ্ছামতো চলতে শোখার নাম স্টোয়িসিজম। প্রাচীন রোমের সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াস, দাস এপিকটেটাস, আর ধনী সেনেকা এঁরা সবাই এই দর্শনকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। তাঁরা বলতেন: আপনি যা পেয়েছেন, তা হারানোর ভয়ে কাঁপতে থাকবেন না। যা আছে, সেটা পুরোপুরি উপভোগ করুন। যা চলে গেছে, তার জন্য অশ্রু ফেলবেন না। মানুষ আপনাকে অ'পমান করতেই পারে, কিন্তু আপনি অপমানিত হবেন কি না, সেটা আপনার সিদ্ধান্ত। জীবনে ব্যর্থতা আসতেই পারে, কিন্তু ব্যর্থতাকে মেনে নিবেন কিনা, সেটা নিজের সিদ্ধান্ত। ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়, উদ্ধিগ্নতা থাকবেই, কিন্তু সেই ভয়কে জীবনের ড্রাইভার সিটে বসাবেন, নাকি বিদায় করবেন, সেটা আপনার হাতে।
স্টোয়িসিজম আমাদের শেখায়- প্রতিটা দিনকে শেষ দিন ধরে বাঁচুন। একজন দার্শনিক বলেছিলেন: আমরা বাস্তবের চেয়ে কল্পনায় বেশি কষ্ট পাই। সাইকোলজিক্যালি এটা সত্য। আমাদের উদ্ধিগ্নতার বড় একটা অংশ আসে, সেইসব জিনিস নিয়ে ভাবতে ভাবতে, যেগুলো এখনো ঘটেইনি। ফলে বাস্তব সমস্যার চেয়ে কল্পিত বিপদকে ভেবে ভেবে আমরা আতঙ্কের সধ্যে দিন কাটাই। মস্তিষ্ক ভবিষ্যতের অন্ধকারে এমন সব দানব তৈরি করে, যেগুলো বাস্তবে কখনো ঘটবে না। অতিতেও এমন অনেক আতঙ্ক আর টেনশনে অনেকদিন অতিবাহিত হয়েছে, বর্তমানে কি তা আছে? আগামীতেও থাকবে না, একটা না একটা রাস্তা বের হবেই। কাজেই খারাপ অনুভূতির দাস হওয়া যাবে না। জীবন পরিচালনা সহজ করুন। মানুষ বদলাবেই, অনেক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে না, প্রিয় মানুষ হারিয়ে যাবেই, এরপরও নতুন আনন্দে বাঁচার মতো রসদ খুঁজে পাবেন।
শিষ্টাচার-১৮৪: মানুষ সাধারণত ইনভেস্ট বলতে টাকা, জমি বা ব্যবসার কথা বোঝে। কিন্তু সত্যিকারের বুদ্ধিমান মানুষ জানে সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ হলো নিজের উপর বিনিয়োগ করা। কারণ সম্পদ হারাতে পারে, বাজার ধসে যেতে পারে, কিন্তু নিজের দক্ষতা ও জ্ঞান কখনও নষ্ট হয় না।
প্রথমত, নিজের উপর ইনভেস্ট করা মানে দক্ষতা, জ্ঞান ও মানসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের গবেষণায় বলা হয়েছে, ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে টিকে থাকতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে skills development Ges continuous learning। একজন ব্যক্তি যখন নতুন দক্ষতা শেখে, প্রশিক্ষণ নেয় বা বই পড়ে নিজেকে উন্নত করে, তখন তার আয় ও সুযোগ দুটোই বৃদ্ধি পায়। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত আত্মউন্নয়নে সময় দেয় তারা দীর্ঘমেয়াদে কর্মজীবনে সবচেয়ে বেশি সফল হয়।
দ্বিতীয়ত, নিজের উপর বিনিয়োগ আত্মবিশ্বাস ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ায়। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, শিক্ষা ও ব্যক্তিগত উন্নয়ন মানুষের self-efficacy বৃদ্ধি করে। যে ব্যক্তি নিজের চিন্তাশক্তি, যোগাযোগ দক্ষতা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ শেখে, সে জীবনের সংকট সহজে মোকাবিলা করতে পারে।
তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও নিজের উপর বিনিয়োগ সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ গ্যারি বেকার “Human Capital Theory”-তে দেখিয়েছেন, মানুষের শিক্ষা ও দক্ষতাই তার প্রকৃত সম্পদ। জীবনে যা কিছু ঘটুক, দক্ষ মানুষ নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। নিজের উপর বিনিয়োগ মানুষকে স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাবান করে। যে ব্যক্তি শেখা বন্ধ করে না, সে বয়স বা পরিস্থিতির কাছে হার মানে না। সবচেয়ে বড় সত্য হলো, মানুষই নিজের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাই বুদ্ধিমান মানুষ আগে নিজেকে গড়ে তোলে, তারপর পৃথিবী জয় করার চেষ্টা করে।
শিষ্টাচার-১৮৫: দুঃখ-কষ্ট সামলে স্বাভাবিকভাবে চলতে পারা একটা শিল্প। যন্ত্রনা লুকিয়ে চলা একটা যোগ্যতা। একটা আর্ট। একটা অর্জন। সফলতার জন্য সাহস লাগে, শ্রম লাগে, ধৈর্য লাগে। তারচেয়ে অনেক বেশি সাহস ও শক্তি লাগে, ব্যর্থতার যন্ত্রণা সামলে স্বাভাবিকভাবে চলতে। আপনি গত পাঁচ বছর ধরে অনেক চেষ্টা করেছেন। যেই সফল হয়েছেন, সবাই বাহবা দিলো। কিন্তু আপনি যে গত পাঁচ বছর দিনের পর দিন চেষ্টা করেছেন, কষ্টকে গোপন করেছেন, সেটা কেউ দেখেনি, আপনার লাঞ্ছনা কেউ জানে না। এই যে লাঞ্ছনাকে পুষতে পেরেছেন, ক্লান্তিকে গিলে মুখে হাসি রেখেছেন, সেটাই একটা যোগ্যতা। একটা রিলেশনশিপ টিকে না থাকার কারন শুধু এই নয় যে আপনি পারফেক্ট পার্টনার পাননি। বরং, রিলেশনশিপের যে প্যারাগুলো আছে, সেগুলো হজম করতে পারেননি বলে। এজন্য যে কোনো ধরণের রিলেশনশিপের ভিত্তি বলা হয় সেক্রিফাইস, আন্ডারস্টেন্ডিং, মিউচুয়াল কমিটমেন্ট!
দুঃখ সাজিয়ে গোপন করার শিল্প বা কষ্ট প্যাকেট করে রাখার কৌশল আমাদেরকে কোথাও শেখানো হয় না। অপমান ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেয়ার আত্মবিশ্বাস আমাদেরকে শেখানো হয় না। তাই যন্ত্রণায় ভেঙে না পড়ে স্থির থাকার জন্য কিছু দক্ষতা চর্চা করুন। যেমন- *যেকোনো দুঃখজনক বা বেদনাদায়ক পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখাবেন না। কিছুটা সময় নিন, এতে আবেগের তীব্রতা কমে আসবে। মনের ভেতর তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করলেও মুখের অবয়ব বা কথায় তা প্রকাশ করবেন না। নিজেকে বোঝান যে, বাইরের নেতিবাচক ঘটনা আপনার নিয়ন্ত্রণে নেই, কিন্তু আপনার মুখের অভিব্যক্তি এবং আচরণ সম্পূর্ণ আপনার নিয়ন্ত্রণে। মনের ভেতরের ঝড়কে বাইরে প্রকাশ না করার প্রতিজ্ঞাই আপনাকে মানসিকভাবে শক্তিশালী করবে। তীব্র কষ্টের মুহূর্তেও চোখের পলক স্থির রাখা, দীর্ঘশ্বাস চেপে যাওয়া এবং কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করুন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অভিব্যক্তি নিয়ন্ত্রণের অনুশীলন করতে পারেন, যাতে আপনার চোখ বা মুখের ভাষা আপনার ভেতরের কষ্টকে ফাঁস না করে দেয়।
*মনোযোগ অন্য কাজে লাগান। পড়াশোনা, কাজ, সৃজনশীল কিছু, বা শখ, এসব মস্তিষ্ককে ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করে। *একজন বিশ্বাসযোগ্য মানুষের কাছে নিজের কথা বলা দুর্বলতা নয়; বরং চাপ কমানোর একটি কার্যকর উপায়। সব অনুভূতি প্রকাশ করতে হবে এমন নয়, আবার সব অনুভূতি লুকাতেও হবে এমন নয়। কখন, কোথায়, কীভাবে প্রকাশ করবেন, এই বিচারবোধই আসল দক্ষতা। অর্থাৎ নিজেকে সংযতভাবে প্রকাশ করতে শিখুন।
*মানুষ যখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে, তখন বেশি কথা বলতে গিয়ে নিজের অজান্তেই দুঃখ প্রকাশ করে ফেলে। তাই কষ্টের সময়ে কথা কম বলুন এবং যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু সংক্ষেপে ও শান্তভাবে বলুন।
শিষ্টাচার-১৮৬: শো-অফ ছোটলোকির প্রমাণ দেয়। মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার টাকা, পোশাক বা চাকচিক্যে নয়; বরং তার চিন্তা, ব্যবহার ও ব্যক্তিত্বে প্রতিফলিত হয়। আধুনিক সমাজে অনেকেই নিজের অবস্থান বা মর্যাদা প্রমাণ করার জন্য অযথা প্রদর্শন বা শো-অফকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বানিয়ে ফেলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ বাস্তব সুখের চেয়ে প্রদর্শিত সুখকে বেশি প্রদর্শন করছেন। কিন্তু সমাজবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত শো-অফ আসলে আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ নয়, বরং ভিতরের অনিরাপত্তা ও স্বীকৃতি পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। যে ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে আত্মমর্যাদাবান, তাকে নিজের অবস্থান বোঝাতে অতিরিক্ত প্রচারণার প্রয়োজন হয় না। নীরব ব্যক্তিত্ব সবসময় বেশি শক্তিশালী হয়, আর কৃত্রিম প্রদর্শন মানুষকে সাময়িক আলোচনায় আনলেও স্থায়ী সম্মান এনে দিতে পারে না। তাই শো-অফ ছোট মানসিকতার ইঙ্গিত বহন করে।
মনোবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্য করেছেন যে আত্মসম্মান কম থাকা মানুষ নিজের মূল্য বাড়ানোর জন্য বাহ্যিক জিনিসের ওপর নির্ভর করে। গবেষণায় দেখা যায়, যাদের আত্মবিশ্বাস দৃঢ় তারা নিজের সাফল্য নিয়ে কম প্রচার করে, কিন্তু যাদের আত্মপরিচয় দুর্বল তারা বিলাসিতা ও সম্পদ প্রদর্শনের মাধ্যমে সামাজিক স্বীকৃতি অর্জনের চেষ্টা করে। অর্থনীতিবিদ থরস্টেইন ভেবলেন তার বিখ্যাত “Conspicuous Consumption” তত্ত্বে দেখিয়েছেন, অনেক মানুষ প্রয়োজনের জন্য নয়, বরং অন্যদের প্রভাবিত করার জন্য ব্যয় করে। এই প্রবণতা সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টি করে এবং ব্যক্তিত্বের দুর্বলতা প্রকাশ করে। যারা সবসময় নিজের সাফল্য, সম্পদ বা জীবনযাপন প্রদর্শনে ব্যস্ত থাকে, তারা নিজেদের ভিতরের শূন্যতাকেই প্রকাশ করে এবং ধীরে ধীরে মানুষের কাছে বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। সমাজে গ্রহণযোগ্যতার জন্য প্রদর্শন নয়, প্রয়োজন বিনয়, সততা ও মানবিকতা।
শিষ্টাচার-১৮৭: বংশগত ট্রমা বলতে বোঝায় এমন মানসিক আঘাত বা ট্রমার প্রভাব, যা এক প্রজন্মের অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের আচরণ, মানসিকতা, সম্পর্ক বা আবেগের ওপর প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ, যদি আপনার বাবা-মা, দাদা-দাদী বা নানা-নানী তাদের জীবনে চরম কোনো কষ্টকর জীবন, হতাশা, অত্যাচার, ক্ষোভ বা মানসিক আঘাতের ট্রমা কাটিয়ে উঠতে না পারেন, তবে তার নেতিবাচক প্রভাব অবচেতনভাবেই তাদের সন্তান বা বংশধরদের হিসেবে আপনার আচরণ ও জিনে প্রকাশ পেতে পারে। যেমন-শৈশবে বাবা-মায়ের অবহেলা, নির্যাতন বা আসক্তি। এমন পরিবারে বড় হওয়া যেখানে সব সময় ভয় ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ ছিল। সব সময় অকারণ উদ্বেগ বা ভয়ের অনুভূতি ছিল। মানুষকে সহজে বিশ্বাস করতে না পারা। সব সময় "নিখুঁত" হওয়ার চাপ ইত্যাদি। আরো সহজভাবে বলতে গেলে, আপনি যদি শৈশবে বাবা কর্তৃক মা-কে নির্যাতন করতে দেখেন, বড় হয়ে আপনিও নিজের অজান্তে স্ত্রীর প্রতি একই আচরণ করবেন।
পারিবারিক বা বংশগত ট্রমা কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজন আগে নিজেকে পরিশুদ্ধ করা। আপনার বাবা মা, যাদের কিছু আচরণ আপনি সহ্য করতে পারছেন না। তাদের সাথে ঝগড়া করে বা তাদের ঘৃণা করে বংশগত ট্রমা ভাঙতে চাওয়া বড় ভুল। দরকার হলো তাদের ভুলগুলো নিজের জীবনে আর কন্টিনিউ হতে না দেয়া। আপনি যখন সচেতনভাবে নিজের নেতিবাচক স্বভাবগুলো বদলে ফেলবেন, তখন আপনার একটি সুন্দর এবং সুস্থ পৃথিবী তৈরি হবে। আপনিই হচ্ছেন আপনার বংশের সেই 'চেইন ব্রেকার'।
আপনি যদি পরিবারের এমন কোনো অভ্যাস বা স্বভাব খুঁজে পান, যা তুমি নিজের জীবনে আর দেখতে চান না; তাহলে আজই সেটি ভাঙার পদক্ষেপ নিন: *প্রথম কাজ হলো নিজেকে একজন দর্শক হিসেবে দেখা। যখনই আপনার মনে হবে বাবা-মা কোনো নেতিবাচক আচরণ করছে (যেমন: অহেতুক রাগ বা আপনাকে কন্টোল করার চেষ্টা), তখন থেমে যান। মনে মনে বলুন, "এটি সভ্য আচরণ নয়, এটি আমার পূর্বপুরুষদের থেকে পাওয়া একটি পুরনো সফটওয়্যার।" এটি আমার ডিএনএ-তে ডাউনলোড হতে দেবো না।
দ্বিতীয় কাজ হলো, ক্ষমা করা, এর মানে এই নয় যে, তাদের অন্যায়কে আপনি মেনে নিচ্ছেন। ক্ষমা মানে হলো সহানুভুতিশীল হওয়া, যা তাদেরকে অতীতে আটকে রেখেছে। তারা যা পায়নি, তা আপনাকে দিতে পারেনি বলে। তৃতীয়ত, বংশগত ট্রমা কাটানোর জন্য অনেক সময় পরিবারের সাথে মানসিক বা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি হয়। একে বলে 'হেলদি বাউন্ডারি'। আপনার মানসিক শান্তি নষ্ট করে এমন আচরণ ও আলোচনায় অংশ নেওয়া বন্ধ করুন।
শিষ্টাচার-১৮৮: ধূমপান মানে শুধু নিজের ক্ষতি করে না, শিশুর ভবিষ্যৎও নষ্ট করে। যাদের ঘরে সিগারেটের ধোঁয়া নেই, তাদের তুলনায় সিগারেটের ধোঁয়ার কাছে থাকা শিশুরা অনেক বেশি আগ্রাসী হয়ে ওঠে। গবেষণায় লিন্ডা পাগানি দেখিয়েছেন, সিগারেটের ধোঁয়া কিভাবে শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশমান অংশকে দুর্বল করে। এটা শুধু ফুসফুস নয়, তাদের আচরণও বদলে দেয়। ফলে শিশু ছোটখাটো বিষয়ে রেগে যায়, আক্রমণাত্মক হয় এবং সামাজিক সমস্যা তৈরি করে। এই ধোঁয়া শিশুর মস্তিষ্ককে নিউরোটক্সিক্যান্ট বা স্নায়ুবিষ হিসেবে বিষিয়ে তোলে, যা দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে।
৪৫ বছর বয়সী একজন আমেরিকান, ১৭ বছর বয়স থেকে ধূমপান শুরু করেছেন এবং প্রায় ২৮ বছর ধরে প্রতিদিন সিগারেট খাচ্ছেন। তার স্ত্রী বলেন, জেমস আগে খুব শান্ত ছিলেন, কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার মেজাজ একেবারে খিটখিটে হয়ে গেছে। ছোটখাটো কথায় রেগে যান, চিৎকার করেন এবং মাঝে মাঝে ঘরের জিনিসপত্র ভেঙে ফেলেন। জেমস নিজেও কখনো ভাবেননি যে, তার হাতের ওই সিগারেটই ধীরে ধীরে তার মেজাজ আর আচরণ পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে।
২০১৬ সালে Nicotine & Tobacco Research জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় শেষ পর্যন্ত ২৯,৯৭১ জন মানুষের তথ্য নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হয়। এর মধ্যে ২২,৫২৯ জন কখনো ধূমপান করেননি বা আগে করলেও ছেড়ে দিয়েছেন, আর ৭,৪৪২ জন প্রতিদিন ধূমপান করেন। ফলাফল দেখে সবাই চমকে গিয়েছিলেন। প্রতিদিন ধূমপান করা মানুষদের অন্যের ওপর সহিংসতা, অর্থাৎ মারামারি বা আক্রমণের হার যারা ধূমপান করেন না তাদের তুলনায় ২.৫ গুণ বেশি।
ম্যালবোর্নের রয়্যাল হাসপাতালের ডা. সারাহ হোয়াইট বলেছেন, ধূমপান শুধু ফুসফুসের ক্ষতি করে না, মন আর মেজাজকেও ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেয়। আর সবচেয়ে আনন্দের খবর হলো, ধূমপান ছেড়ে দিলে আবার সেই শান্ত, সুন্দর এবং স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাওয়া যায়। শিশুরা শান্ত, সুস্থ ও সফল হোক, এটাই যদি আমাদের সবার চাওয়া হয়, তাহলে আজ থেকেই বাড়িতে তামাকের ধোঁয়ামুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। যারা ধূমপান করেন, তাদেরকে আদবের সাথে অনুরুধ করতে হবে নিজের স্বার্থে।
শিষ্টাচার-১৮৯: যে পরিবার ও সমাজে নারীরা বেশি অধিকার ভোগ করে, সে সমাজে পুরুষেরা অপেক্ষাকৃত বেশি সুখী থাকে। আর নারীর ৯০ ভাগ সমস্যার সমাধান হয় আত্মনির্ভরশীলতায়। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব পরিবারে নারীরা আয় করেন, সেখানে দারিদ্র্যের হার কম এবং পরিবারে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মানও উন্নত হয়।
নারীর সমস্যার মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো নির্ভরশীলতা। যে নারী আত্মনির্ভরশীল নয়, তাকে অনেক অন্যায় পরিস্থিতি মেনে নিতে হয়। তাই নারীর শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন শুধু নারীর জন্য নয়, পুরো পরিবার ও সমাজের অগ্রগতির জন্য অত্যন্ত জরুরি। অনেক নারী এখনও নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক সমস্যার মধ্যে বসবাস করেন। অন্যের ওপর নির্ভরতা এবং সামাজিক বাধার কারণে নারীরা প্রায়ই মানবেতর জীবন যাপন করেন, যার ফলে সুস্থ ও বুদ্ধিমান নতুন প্রজন্ম বা সুখী পরিবার অধরা থেকে যায়।
একজন শিক্ষিত ও দক্ষ নারী নিজের সন্তানদের শিক্ষায় সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দেন। গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষিত মায়েদের সন্তানদের শিক্ষার মান তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি ভালো হয়। ফলে শিক্ষিত আত্মনির্ভরশীল নারী একটি প্রজন্মকে উন্নত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে পারেন। আত্মনির্ভরশীলতা নারীর আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। নিজের যোগ্যতায় কিছু অর্জন করার অনুভূতি তাদেরকে মানসিকভাবে শক্ত করে তোলে। কর্মক্ষেত্র, ব্যবসা বা দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে নারী সমাজে নিজের পরিচয় তৈরি করতে পারেন।
একজন শিক্ষিত ও আত্মনির্ভরশীল নারী কেবল নিজের জীবনই বদলান না; তিনি একটি পরিবারের স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, মূল্যবোধ ও সন্তানের ভবিষ্যতের ভিত্তি শক্তিশালী করেন। একটি পরিবারে যখন মা শিক্ষিত ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হন, তখন সন্তানেরা অবচেতনভাবেই আত্মবিশ্বাসী হয়ে বড় হয় এবং সফলতা পায়। শুধু তাই নয়, শিক্ষিত ও আত্মনির্ভরশীল মা তার সন্তানকে একটি ট্রমা-মুক্ত, সুস্থ ও নিরাপদ পারিবারিক পরিবেশে বড় হওয়ার সুযোগ করে দেয়। তাই নারীকে ভাল মানের শিক্ষায় উৎসাহিত করা ও সুযোগ করে দেয়া আমাদের প্রত্যেকের নৈতিক দায়িত্ব।
শিষ্টাচার-১৯০: অনেক মানুষই টাকা হাতে পেলেই খরচ করে ফেলেন। এটা শুধু অভ্যাস না, এর পেছনে কিছু মানসিক ও বাস্তব কারণ কাজ করে। প্রথম কারণ, তাৎক্ষণিক আনন্দের টান। আমরা সাধারণত এখনই আনন্দ চাই। কিছু কিনলে সঙ্গে সঙ্গে একটা সুখের অনুভূতি আসে। এই ছোট আনন্দটা অনেক সময় ভবিষ্যতের বড় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে প্রয়োজনের সময় হা-হুতাশ করে কাটাই।
দ্বিতীয় কারণ, পরিকল্পনার অভাব। অনেকেরই কোনো স্পষ্ট বাজেট বা লক্ষ্য থাকে না। কত আয়, কত খরচ, কত জমা রইল, এগুলো আগে থেকে ঠিক না থাকলে টাকা পেলে সেটা অজান্তেই খরচ হয়ে যায়। তৃতীয় কারণ, সামাজিক প্রভাব। বন্ধু, সহকর্মী বা সোশ্যাল মিডিয়া দেখে আমরা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনি। অন্যদের লাইফস্টাইল দেখে মনে হয় “আমাকেও এটা লাগবে”, যদিও বাস্তবে দরকার নেই। চতুর্থ কারণ, নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ কম। কেউ কেউ জানেন যে খরচ কমানো দরকার, কিন্তু নিজেকে থামাতে পারেন না। ফলে হঠাৎ সিদ্ধান্তে খরচ করে ফেলে। আবার অনেকেই মন খারাপ বা চাপের সময় শপিং করেন। এতে সাময়িকভাবে আনন্দ লাগে, কিন্তু পরে বুঝতে পারেন টাকাটা অপ্রয়োজনীয় জায়গায় গেছে।
মোট কথা হল, টাকা পেলেই খরচ করা স্বাভাবিক মনে হলেও, এটা দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার কারণ হয়। যদি একটু সচেতন হয়ে খরচের আগে ভাবা যায়, ছোট একটা বাজেট করা যায়, তাহলে এই অভ্যাস ধীরে ধীরে বদলিয়ে দুশ্চিন্তামুক্ত অভিজাত্যময় জীবন সম্ভব হয়।
শিষ্টাচার-১৯১: প্রতিদিন ১ থেকে ২ঘণ্টা সময় নিজের জন্য রাখবেন, মেটাবলিক ভাষায় একে বলা হয় 'রিকভারি উইন্ডো'। এই সময়ে আপনি পৃথিবীর সব দায়িত্ব থেকে ছুটি নেবেন। এই সময়ে আপনি কারো ভাই-বোন, মা-বাবা, স্বামী-স্ত্রী বা কর্মী নন, আপনি কেবলই একজন মানুষ, যার একটু বিশ্রামের অধিকার আছে। এই সময়টুকুর মূল উদ্দেশ্য হলো আপনার শরীর ও মস্তিষ্ককে রিকভারি করা। এই সময়টুকু এবারে না হয়ে দুই বা তিন-চার বারেও হতে পারে।
একাকী কাটানো এই সমযটুকু আপনাকে 'রেস্ট অ্যান্ড ডাইজেস্ট' (বিশ্রাম এবং নিরাময়) অবস্থায় নিয়ে আসে। ফলে আপনার হরমোনগুলো নিজেদের কাজ ঠিকমতো করার পরিবেশ পায়। তবে এই একান্ত সময়ের সবচেয়ে কড়া মেটাবলিক নিয়মটি হলো- মোবাইল, ল্যাপটপ, টিভি বা যেকোনো ধরনের স্ক্রিন থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা। আমরা অনেকেই মনে করি, শুয়ে শুয়ে ফেসবুক বা ইউটিউব দেখাই বুঝি বিশ্রাম। কিন্তু বিজ্ঞান একে বিশ্রাম বলে না। মোবাইলের নীল আলো এবং অনবরত নতুন তথ্যের স্রোত আপনার মস্তিষ্কে 'ডোপামিন'-এর হঠাৎ স্পাইক বা বৃদ্ধি ঘটায়। এটি স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করার বদলে উল্টো আরও বেশি ক্লান্ত ও উত্তেজিত করে তোলে।
আমাদের মস্তিষ্কের সাথে শরীরের হরমোন তৈরির গ্রন্থিগুলোর একটি গভীর যোগাযোগের রাস্তা আছে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় এইচপিএ-অ্যাক্সিস। মানসিক চাপ, কর্মক্লান্তি এবং স্ক্রিনের আসক্তি এই যোগাযোগ ব্যবস্থাকে এলোমেলো করে দেয়। যখন আপনি সম্পূর্ণ নীরবতায় সময় কাটান, তখন এই এইচপিএ-অ্যাক্সিস আক্ষরিক অর্থেই 'রিস্টার্ট' বা পুনরায় সচল হওয়ার জন্য জাদুর মতো কাজ করে।
সবচেয়ে অবাক করা তথ্য হলো, নীরবতা মস্তিষ্কের নতুন কোষ তৈরিতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন অন্তত দুই ঘণ্টা নীরবে থাকলে মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যাম্পাস নামক অংশে নতুন কোষ জন্মাতে শুরু করে। মস্তিষ্কের এই অংশটি আমাদের স্মৃতি, আবেগ এবং নতুন কিছু শেখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সহজ কথায়, নীরবতা আপনার স্মৃতিশক্তিকে ধারালো করে তোলে। যখন আমরা সব ধরনের কোলাহল থেকে মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দিই, এই সময় মস্তিষ্ক অপ্রয়োজনীয় তথ্য মুছে ফেলে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে মনোযোগ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। ফলে আপনার ফোকাস এবং সৃজনশীল চিন্তা করার ক্ষমতা দুটোই বেড়ে যায়।
শিষ্টাচার-১৯২: আমাদের সমাজে একটা মেয়ে যখন একটু বুঝতে শেখে, তার হাতে আমরা সুন্দর সুন্দর পুতুল, ছোট্ট মাটির হাঁড়ি-পাতিল কিংবা প্লাস্টিকের কিচেন সেট কিনে দিই এবং ঘরের চার দেয়ারের বেতর বড় করে তুলি। আপাতদৃষ্টিতে এটি খুব সাধারণ আর মিষ্টি একটা দৃশ্য মনে হলেও, নিউট্রিশনের দৃষ্টিকোণ থেকে এই চর্চার পরিণতি কিন্তু ভীষণ ভয়ংকর। ছেলেদের মাঠে দৌড়াদৌড়ি, লাফ-ঝাপ, গাছে ওঠা আর ঘাম ঝরানো খেলার কারণে ছোটবেলা থেকেই তাদের শরীরে শক্তিশালী পেশী বা মাসল তৈরি হয়ে থাকে। অন্যদিকে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক জায়গায় বসে পুতুল খেলা বা ইনডোর গেমসের কারণে আমাদের মেয়েদের শরীরে পেশীর গঠন ঠিকমতো গঠিত হতে পারে না। আর এখানেই শুরু হয় জীবনের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যগত ভুল।
আমরা বাঙালি জিনগত গড়নে, বেশি ভাত বা কার্বোহাইড্রেড খাওয়ার কারণে প্রাকৃতিকভাবেই 'ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্ট' হওয়ার প্রবল ঝুঁকিতে থাকি। অর্থাৎ, আমাদের শরীর শর্করা বা সুগারকে খুব একটা ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারে না।
চিকিৎসা বিজ্ঞানে বলা হয়, যার শরীরে পেশী যত সুগঠিত, তার ইনসুলিন সেনসিটিভিটি তত ভালো। কিন্তু আমাদের মেয়েদের ছোটবেলা থেকেই কায়িক শ্রম বা পেশী-নির্ভর খেলাধুলার বাইরে রাখার কারণে, ফলে বয়স বাড়লে পুরো মেটাবলিক সিস্টেম ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। খুব অল্প বয়সেই মেয়েরা অনিয়মিত পিরিয়ড, অতিরিক্ত ওজন, থাইরয়েড, চুল পড়া বা ব্রণের মতো যন্ত্রণাদায়ক সমস্যায় ভুগতে শুরু করে।
এই মেটাবলিক দুর্বলতা একজন নারীর গর্ভধারণের প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে জটিল করে তোলে। পেশীহীন, দুর্বল ও হরমোনের ভারসাম্যহীন একটা শরীর নিয়ে একজন নারী একটি সুস্থ সন্তানের জন্ম দেবে আর নিজের সুস্ততার জন্য সংগ্রাম করবে কি জটিল ভাবা যায়। সুতরাং কন্যা শিশুকেও ছেলে শিশুর মতো মাঠে-ঘাটে বড় করুন। বাজার করাসহ তাকে সকল শ্রমনির্ভর দায়িত্ব দিন।
শিষ্টাচার-১৯৩: বন্ধুদের বেশিরভাগ আড্ডায় কী নিয়ে কথা হয়? পড়া, কাজ, কে কোথায় ভাল আছে, অমুকের বিয়ে হল, তমুকের বাড়ি হল, দেশের অবস্থা ভাল না, এই প্রসঙ্গগুলি ঘুরে ফিরে আসে। শুনতে শুনতে সবাই মোবাইলে স্ক্রল করছেন। এটা হয় কারণ আড্ডার কোনো কাঠামো থাকে না। সবাই ক্লান্ত হয়ে আসেন, কেউ নতুন কিছু তৈরি করার শক্তি রাখেন না, তাই সেই একই প্রসঙ্গেই ফিরে যান।
আরেকটা বিষয় হল, আমরা বেশিরভাগ আড্ডায় কথা বলি, কিন্তু কিছু করি না। শুধু কথা বললে মানুষ একে অপরের কথা জানে, কিন্তু একটা ভাল মুহূর্ত তৈরি হয় না। মুহূর্ত তৈরি হয় একসাথে কিছু করলে, একসাথে কোনো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেলে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষ সম্পর্ক মনে রাখে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে, শুধু কথোপকথনের মাধ্যমে নয়। যে বন্ধুর সাথে একবার গাড়ি মিস করেছিলেন, রাতে স্টেশনে আটকে ছিলেন, সেই বন্ধুর কথা আলাদাভাবে মনে থাকে। কারণ সেদিন শুধু কথা হয়নি, কোনো ঘটনাও ঘটেছিল।
তাই, বন্ধুদের নিয়ে আড্ডায় একটা ছোট পরিবর্তন আনুন, জায়গা বদলান। একই চায়ের দোকান, একই কারো বাসা, এই পরিচিত জায়গাগুলি আরামদায়ক, কিন্তু মস্তিষ্ক সেখানে গেলে পুরোনো প্যাটার্নেই চলে যায়। একই প্রসঙ্গ। নতুন জায়গায় গেলে মস্তিষ্ক একটু সজাগ হয়। চারপাশটা নতুন বলে মনোযোগে একটু ভিনত্না থাকে, কথাও ভিন্ন হয়। একই এলাকায় এমন একটা জায়গা খুঁজুন, যেখানে আগে যাননি। একটা পুরোনো পাড়ার গলির ভেতরে চায়ের দোকান, একটা ছাদ আছে এমন জায়গা, একটা পার্ক, যেখানে পরিবেশটা একটু আলাদা। জায়গা বদলালে শুধু কথা নয়, অভিজ্ঞতাও বদলায়। এই নতুন পরিবেশে একসাথে কিছু করলে সেটা মনে থাকে। কিন্তু এখানে "কিছু করা" মানে বড় পরিকল্পনা না। ছোট ছোট কাজ ও মুহূর্ত তৈরি করতে পারেন। যেমন- একজনের বাসায় সবাই মিলে একটা রান্না করুন। কে কী আনবে ঠিক করুন, একসাথে রাঁধুন, একসাথে খান। রান্নার সময় কথা হয়, হাসি হয়, কেউ ভুল করলে সবাই মিলে ঠিক করে। এই পুরো প্রক্রিয়াটাই একটা গল্প হয়ে যায়।
একসাথে কিছু শিখুন। ইউটিউবে একটা ভিডিও দেখে একসাথে চেষ্টা করুন। ছবি বা ভিডিও দেখুন। সেরা স্মৃতিগুলি সাধারণত অপরিকল্পিত হয়। কোনো একটা আড্ডায় হঠাৎ বৃষ্টি এলো, সবাই ভিজলেন। কেউ একটা পুরোনো গল্প বলল যেটা সবাই ভুলে গিয়েছিল। এভাবে বন্ধুত্বের যত্ন নিন, ফুল নিজে থেকেই ফুটবে।
শিষ্টাচার-১৯৪: যে মানুষ হাল ছাড়ে না, সে কখনো প্রকৃত অর্থে হারেও না। মেধাবিরা হেরে গেলেও পরিশ্রমীরা হারে না মানুষের জীবনে সফলতার প্রশ্ন উঠলে প্রথমেই আসে মেধার কথা, কিন্তু বাস্তবতা বলছে সফলতার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ধারাবাহিক পরিশ্রম। জন্মগত মেধা একজন মানুষকে শুরুতে এগিয়ে দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে প্রয়োজন অধ্যবসায়। বহু গবেষণায় দেখা গেছে, জীবনের বড় অর্জনগুলো কেবল বুদ্ধিমত্তার উপর নির্ভর করে না বরং নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টার উপর দাঁড়িয়ে থাকে। মেধাবীরা অনেক সময় দ্রুত সাফল্য পেয়ে আত্মতুষ্ট হয়ে পড়ে, কিন্তু পরিশ্রমীরা ধাপে ধাপে নিজেদের উন্নত করে যায়। তাই বলা হয়, সাময়িকভাবে মেধাবি হারতে পারে, কিন্তু পরিশ্রমী মানুষ শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের মনোবিজ্ঞানী অ্যাঞ্জেলা ডাকওয়ার্থের “Grit Theory” অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের মূল উপাদান হলো অধ্যবসায় ও সুপরিকল্পিত পরিশ্রম। তাঁর গবেষণায় দেখা যায়, মেধা নয় বরং ধারাবাহিক চেষ্টা শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের সফলতার বড় কারণ। আমেরিকার বিখ্যাত 'ওয়েস্ট পয়েন্ট মিলিটারি একাডেমি' এবং 'ন্যাশনাল স্পেলিং বি' (National Spelling Bee)-র প্রতিযোগীদের ওপর গবেষণা করে তিনি দেখেন যে, যেসব শিক্ষার্থীর জন্মগত আইকিউ বা মেধা অনেক বেশি ছিল, তারা সবাই সফল হয়নি। বিপরীতে, যাদের 'গ্রিট স্কোর' বা অধ্যবসায়ের হার বেশি ছিল, তারা কম মেধা বা কম পরীক্ষার স্কোর নিয়েও শীর্ষস্থান অর্জন করেছে। ফলাফল: ডাকওয়ার্থ প্রমাণ করেন যে, মেধা হলো একটি সম্ভাবনা (Potential), কিন্তু অধ্যবসায় সেই সম্ভাবনাকে দক্ষতায় (Skill) রূপান্তর করে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যারল ডুয়েক “Growth Mindse” ধারণায় দেখিয়েছেন, যারা নিজেদের উন্নত করা সম্ভব বলে বিশ্বাস করে এবং কঠোর পরিশ্রম করে, তারাই বেশি সফল হয়। অনেক মেধাবী মানুষ ব্যর্থতায় ভেঙে পড়ে কারণ তারা চ্যালেঞ্জের সাথে লড়াইয়ের অভ্যাস তৈরি করে না। অন্যদিকে পরিশ্রমী মানুষ ব্যর্থতাকে শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করে আবার উঠে দাঁড়ায়।
ইতিহাসে দেখা যায়, টমাস এডিসন হাজারবার ব্যর্থ হয়ে বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কার করেছিলেন, যা প্রমাণ করে অধ্যবসায় মেধার সীমাকেও অতিক্রম করতে পারে। আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানের "নিউরোপ্লাস্টিসিটি" ধারণা অনুযায়ী, নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে মস্তিষ্ক নতুন স্নায়ুসংযোগ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ দক্ষতা অনুশীলনের মাধ্যমে বৃদ্ধি পায়। আধুনিক গবেষণার আলোকে বলা যায়, জন্মগত মেধা মানুষের সম্ভাবনার একটি অংশমাত্র। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব সাফল্যে রূপান্তরিত করে অধ্যবসায়, নিয়মিত অনুশীলন।
শিষ্টাচার-১৯৫: ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও সুপার ইনফ্রাস্ট্রাকচার: শুধু ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন কোনো কাজেই আসবে না, যদি সুপার ইনফ্রাস্ট্রাকচার অর্থাৎ তার ভিতর প্রাণ না থাকে। সুপার ইনফ্রাস্ট্রাকচার হল সামাজিক ও সাংস্কৃতি উন্নয়ন। কোনো পরিবার বা সমাজ কিংবা দেশকে প্রকৃতভাবে উন্নত হতে হলে, তাকে অবশ্যই সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে উন্নত হতে হয়। অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে একই তালে এগিয়ে নিতে না পারলে কখনই স্থায়ী উন্নয়ন আসে না।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এবং দার্শনিক মার্থা নাসবাউম তাঁদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, কেবল ভৌত অবকাঠামো বৃদ্ধি কোনো জাতির প্রকৃত উন্নয়ন নির্দেশ করে না। তাঁদের মতে, একটি সুউচ্চ আধুনিক হাসপাতাল (ইনফ্রাস্ট্রাকচার) কোনো কাজে আসবে না, যদি সেখানে সেবা দেওয়ার মতো দক্ষ, মানবিক ও নৈতিকতাসম্পন্ন চিকিৎসক ও নার্স (সুপার ইনফ্রাস্ট্রাকচার) না থাকে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের বিকাশ ছাড়া অবকাঠামো কেবল একটি 'নির্জীব কঙ্কাল'।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট পুটনাম তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ 'বোলিং অ্যালোন' গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, উত্তর ইতালি এবং দক্ষিণ ইতালিতে সমপরিমাণ সরকারি অর্থায়ন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা সত্ত্বেও উত্তর ইতালি অনেক বেশি উন্নত ও সমৃদ্ধ। এর কারণ ছিল উত্তর ইতালির পারস্পরিক বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক সক্রিয়তা, নাগরিক সচেতনতা ও সামাজিক সংগঠন। অন্যদিকে দক্ষিণ ইতালিতে শক্তিশালী অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের কারণে দুর্নীতি ও অপরাধ বৃদ্ধি পায়, যা উন্নয়নকে স্থবির করে দেয়। এই গবেষণা এটি প্রমাণ করে যে, একই দেশ, একই কাটামোগত সুবিধা থাকা সত্তেও সামাজিক-সাংস্কৃকিত উন্নয়ন ছাড়া ভৌত পরিকাঠামো অর্থহীন।
সামাজিক বিজ্ঞানী জেমস কিউ. উইলসন এবং জর্জ এল. কেলিং ১৯৮২ সালে বিখ্যাত 'ব্রোকেন উইন্ডোজ থিওরি' তত্ত্বটি দেন। এটি দেখায় কীভাবে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আচরণ ভৌত অবকাঠামোকে প্রভাবিত করে।
গবেষণা দেখা যায়, একটি চমৎকার আধুনিক ভবন (ইনফ্রাস্ট্রাকচার) তৈরি করার পর, তার একটি জানালার কাচ ভেঙে যায় এবং সমাজ বা সংস্কৃতির অবক্ষয়ের কারণে কেউ তা মেরামত করে না (সুপার ইনফ্রাস্ট্রাকচারের অভাব), বরং যে যা সামনে পায়, ভাঙ্গা জানালা দিয়ে ফেলে। এভাবে অবচেতনভাবেই ওই এলাকায় অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যায়। মানুষ ধরে নেয় যে, এখানে কোনো আইন বা সামাজিক শৃঙ্খলা নেই। নিউইয়র্ক শহর নব্বইয়ের দশকে এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে কেবল অবকাঠামো সংস্কার নয়, বরং মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আচরণ পরিবর্তনের (যেমন: যত্রতত্র ময়লা না ফেলা, ট্রাফিক আইন মানা) মাধ্যমে অপরাধের হার নাটকীয়ভাবে কমিয়ে এনেছিল।
আফ্রিকার অনেক দেশ বা ভেনিজুয়েলার মতো দেশে প্রচুর খনিজ সম্পদ এবং বড় বড় শহর বা পরিকাঠামো থাকা সত্ত্বেও সেখানে দেখা যায়, হাসপাতাল আছে, মানসম্মত চিকিৎসা নাই, জনগণ অন্য দেশে গিয়ে চিকিৎসা করে; বিদ্যালয় আছে, কিন্তু মানসম্মত শিক্ষা নেই, স্কিল নেই, চাকরি নেই; আদালত আছে, আইনের শাসন নেই; বিদ্যুৎ আছে শিল্পোদ্যোগ নেই, বিনিয়েগ নেই; দেশের শিল্পপতিরা টাকা বিদেশে পাচার করে। সবকিছু আমাদের সাথে মিলে যায়, কারণ আমরা সুপার ইনফ্রাস্ট্রাকচার বিকশিত করতে পারিনি।
শিষ্টাচার-১৯৬: কিছুকাল আগেও মহিলাদের গৃহবন্দী করে রাখত আমাদের সমাজ। খাওয়া পরার জন্য রীতিমতো হাত পাততে হত স্বামী, বাবা অথবা সন্তানের কাছে। পুরুষ মানুষের মূল্য বুঝাতে লোকে বলতো সোনার আংটি বাঁকা হলেও দাম কমে না। আর নারীর মূল্য বুঝাতে লোকে বলত: মেয়ের নাম ফেলি; পরে নিলেও গেলি, যমে নিলেও গেলি। অর্থাৎ কোনরকম ফেলতে পারলেই বাঁচে। মেয়েদের উপনাম ছিল তিনটা- আপদ, বিপদ ও মুসিবত।
১৯৫৯ সালে ভারতে এরকম গৃহবন্দী ৭জন গুজরাটি গৃহবধূ ঘরের মধ্যে থেকেই স্বাবলম্বী হয়ে নিজেদের স্বাধীন করতে স্বপ্ন দেখলেন। যশয়ন্তী, পার্বতী, উজাম, ভানু, লাগু, দিওয়ালী ও জয়াবেন নামের সাত গৃহবধূ তৎকালীন ৮০ টাকা ঋণ করে বাড়িতে পাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন। এটি ঘরের মধ্যেই তৈরি করা যায়, ঘরের বাইরে বেরোতে হবে না। প্রথমে মাত্র চার প্যাকেট পাঁপড় তারপর আস্তে আস্তে ব্যবসা বাড়ে। কিন্তু তারা কর্মচারী নিয়োগ করেননি বরং অন্যান্য পরিবার থেকে যুক্ত হওয়া মহিলাদের পার্টনারশিপ নিয়েছিলেন। নাম দিলেন "লিজ্জত পাঁপড়", ভারতে লিজ্জতের বর্তমান রেভেনিউ ২৬০০ কোটি, লিজ্জত পরিবার ৪৫০০০! তারা হাজার হাজার নারীকে সাবলম্বী করেছেন! ২০২১ সালে ভারত সরকারের পদ্মশ্রী পুরস্কারে সম্মানিত করা হয় যশয়ন্তীকে।
মোট কথা হল, আপনি যা-ই করেন, তা যদি সংঘবদ্ধভাবে করতে পারেন, তাহলে জয় সুনিশ্চিত হয়। সুতরাং যেকোনো ক্লাব, ফোরাম, সংঘ বা দলের সাথে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে হলেও সঙ্গে থাকুন,সঙ্গবদ্ধ থাকুন। স্ফুলিঙ্গ এক জায়গা থেকে শুরু হয় কিন্তু ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। জগতে কোনো কিছুই একা-একা নিপুণভাবে পরিচালনা করা যায় না। এর জন্য সঠিক যথাযথ ও বিশ্বস্ত করিৎকর্মা ব্যক্তিদের প্রয়োজন হয়; কিন্তু করিৎকর্মা ব্যক্তিবর্গের জায়গায় যদি কিছু আগাছা চলে আসে, তা হলে তা তলে তলে ভয়ংকর ক্ষতিসাধন হতে থাকে। আগাছার ক্ষতিকর দিকগুলি একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, আগাছা মূল গাছটির রস-পুষ্টির উপর ভাগ বসিয়ে স্ববংশে বেড়ে উঠে, শেষ পর্যন্ত আগাছ্রাা সেই মূল গাছটিকেই চারিদিক দিয়ে ঘিরে ফেলে, নিঃশ্বাস রুদ্ধ করে ফেলে। মজার ব্যাপার হলো- আগাছ্ ারোপন করতে হয় না, এমনিতেই গজায়।
কোনো দলে, পরিবারে বা বন্ধুমহলে যদি মাত্র একজনও খারাপ সদস্য (আগাছা) থাকে; (যেমন অভদ্র, কাজচোর বা সবসময় হতাশাগ্রস্ত, নেতিবাচক মানুষ) তাহলে সে দলে একে অপরের প্রতি আস্থা, বিশ্বাস কমায় এবং তর্ক-বিতর্ক সৃষ্টি করে, যার ফলে পরিবারে বা বন্ধু মহল বা দলে যোগাযোগ দুর্বল হতে থাকে বা গ্রুপিং সৃষ্টি হয় এবং দল খারাপ পারফর্ম করে থাকে। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের উইল ফেল্পসের গবেষণায় উঠে এসেছে, মাত্র একজন খারাপ সদস্য গোটা দলের পরিবেশ ও ফলাফল নষ্ট করতে পারে। এখানে বাকি সদস্যরা যতই ভালো ও দক্ষ হোক না কেন, তার ওপর সাফল্য নির্ভর করে না বরং দলের সবচেয়ে দুর্বল ও খারাপ সসদস্যের ওপর নির্ভর করে। কাজেই দলের সবচেয়ে দুর্বল ও খারাপ সদস্যে চিহ্নিত করে আলাদাভাবে তার মান উন্নয়নে চেষ্ঠা করতে হবে, নয়তো বিদায় দিতে হবে।
শিষ্টাচার-১৯৭: শিক্ষার্থী হোন, তা না হলে আপনি প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবেন না। শেখা এবং সাফল্য লাভ ব্যাপার দুটো অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। ‘মানুষের শেখা কখনো শেষ হয় না। এটি একটি চিরন্তন প্রক্রিয়া’। জীবনের সকল পর্যায়ে আপনার শিক্ষাগ্রহণ জরুরি। আমাদের জীবন একটি বিশ্ববিদ্যালয়। আপনি যা-ই করেন কিংবা যে-ই অভিজ্ঞতা হোক না কেন আপনার, আপনাকে প্রতিদিন কিছু একটা শিখতে হবে। এটিই আমাদের জীবন। প্রতিদিনই আপনি নতুন চিন্তা-ভাবনা, অনুভূতি এবং মনোবল সঞ্চার করবেন।
প্রতিদিন নিত্য নতুন কিছু শেখাও কিন্তু এক ধরনের সাফল্য। তাই, আপনার জ্ঞানকে প্রসারিত করার জন্য নতুন নতুন জিনিস শিখতেই হবে, তা না হলে আপনি প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবেন না। বিরক্তিকর কোনো কাজ থেকেও আনন্দময় কিছু নেওয়ার চেষ্টা করুন। দিন শেষে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, ‘আজ আমি কী শিখলাম? জীবনে সফলতা অর্জন করার জন্য আমাকে আর কী কী করতে হবে? কখনো আপনার উত্তরগুলো হবে ¯পষ্ট, আবার কখনো হবে অ¯পষ্ট। কিন্তু নিয়মিত প্রশ্নগুলো করলে আপনি নিজেকে প্রতিদিন আরো উন্নত করতে পারবেন।
প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এত দ্রুত পাল্টাচ্ছে যে মানুষের অর্জিত প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি দ্রুতই কার্যকারিতা হারাচ্ছে। বৈশ্বিক মানবসম্পদ জায়ান্ট ম্যানপাওয়ার গ্রুপ (Manpower Group) সফল ক্যারিয়ারের জন্য একটি নতুন সূচক বা ম্যাট্রিক তৈরি করেছে, যার নাম "লার্নেবিলিটি"। ম্যানপাওয়ার গ্রুপের বৈশ্বিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বর্তমানে বিশ্ববিখ্যাত কোম্পানিগুলোর ৮৬% নিয়োগকর্তা প্রার্থীর বর্তমান দক্ষতার চেয়ে তার 'লার্নেবিলিটি' বা নতুন কিছু শেখার মানসিকতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। আপনি অতীতে কতটা মেধাবী ছিলেন বা কোন স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেছেন, তা এখন আর চাকরি বা সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। বরং আপনি বর্তমানে একজন শিক্ষার্থীর মতো নতুন জ্ঞান, প্রযুক্তি কত দ্রুত শিখতে পারছেন, সেটাই একমাত্র চাবিকাঠি। কারণ, স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, যখন কোনো মানুষ প্রতিনিয়ত নতুন কিছু শেখে, তখন তার মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বহুগুণ বেড়ে যায়।
শিষ্টাচার-১৯৮: আগ-পিচ না ভেবে হয়তো পাইপলাইনে থাকবার জন্য লাফ দিয়ে পাইপের মধ্যে ঢুকে পড়লেন। সেই পাইপলাইনে জ্যাম করে সমস্যা তৈরি করলেন। কিন্তু লাভ কিছুই হলো না, বরং বড় ক্ষতি হয়ে গেল। নিজের ওজন বুঝে পা ফেলতে হবে, ওজন না বুঝে ঝাঁপ দিলে বিপদে পড়তে হবে। আসলে আমাদের বেশির ভাগ মানুষই খুব বেশি ‘চিন্তা’ করার ধীশক্তি রাখেই না। বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন মনে করতেন—‘৫ শতাংশ মানুষ চিন্তা করতে পারেন। ১০ শতাংশ মানুষ মনে করেন যে, তারা চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতা রাখেন। অন্যদিকে ৮৫ শতাংশ মানুষ যেন পণ করেছে, তারা বরং মারা যাবেন তবু চিন্তাভাবনার ধার ধারবেন না।’ তারা আসলে অবোধ শিশুর মতো। যেই শিশু জানে না, আগুনে হাত দিলে হাত পুড়বে, সে তো আগুনের উজ্জ্বল জ্যোতি দেখে তাকে ধরতে ব্যাকুল হয়।
সঠিক সিদ্ধান্তের ওপর জীবনের বাঁচার আনন্দ নির্ভর করে। আমরা জীবনে চলার পথে অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি আর তার মাসুল সারা জীবন দিতে হয়। অতি আবেগের কারণে তরুণদের সিদ্ধান্ত নিতে ভুল হয়ে যায়। যার ফলে মন খারাপ থেকে শুরু করে ঝগড়া কিংবা খারাপ পথে অগ্রসর হওয়ার মতো ভয়াবহ কিছু ঘটতে পারে। যেকোনো পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভালোভাবে তিনটি বিষয়ের দিকে অবশ্যই নজর দিতে হবে। এক) আসলেই সিদ্ধান্তটি সুস্থ মস্তিষ্কে নিচ্ছি নাকি আবেগের বশে! দুই) যে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবো; এই বিষয়ে কারো সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। তাতে সিদ্ধান্তে ভুল হওয়ার সুযোগ কম হবে। তিন) যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে কী কী সমস্যা হতে পারে কিংবা কী কী সুবিধা হতে পারে, তা হিসাব করতে হবে।
রোমান সেনাপতি ও একনায়ক জুলিয়াস সিজার ৫৮-৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের গ্যালিক যুদ্ধের কথা লেখার সময় ‘আমি বদলা নিয়েছি’ না লিখে লিখেছিলেন ‘সিজার বদলা নিয়েছে’। নিজের নাম নিয়ে নিজেকে সম্বোধনের এই কৌশলকে বলে ইলিয়েজম। এর সূত্র হলো: কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় নিজেকে তৃতীয় ব্যক্তির জায়গায় রেখে চিন্তা করলে, আবেগ অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত হয়ে যায় এবং নিরপেক্ষ হয়ে ভাবা যায়। জানেন তো সোলেমানস প্যারাডক্স বলে একটি গবেষণা আছে। ‘বাইবেল’ বর্ণিত প্রাচীন রাজা সোলেমান রাজ্যের সবাইকে বিজ্ঞ পরামর্শ দেওয়ার জন্য জনপ্রিয় রাজা ছিলেন। কিন্তু নিজের জীবনে কোনো সঠিক সিদ্ধান্তই নিতে না পারার কারণে শেষ পর্যন্ত রাজ্য ছেড়ে তাঁকে পালাতে হয়েছিল। অর্থাৎ, ‘আমরা নিজেদের ব্যক্তিগত সমস্যায় সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগি; কিন্তু অন্যেকে সিদ্ধান্ত বা পরামর্শ দেয়া সহজ হয়ে যায়। পুরো ব্যাপারটি ঘটে মনের ভিতর আবেগের জন্য। তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় নিজেকে তৃতীয় ব্যক্তির জায়গায় রেখে চিন্তা করলে অর্থাৎ সোলেমানস প্যারাডক্স মাথায় রাখলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে।
শিষ্টাচার-১৯৯: মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনকে এক সিনেটর তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বলেছিল, ‘মি. লিংকন, আপনার ভুলে যাওয়া উচিত হবে না যে, আপনার বাবা আমার পরিবারের জন্য জুতা তৈরি করত।’ উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘স্যার, আমি খুব ভালো করেই জানি আমার বাবা আপনার পরিবারের জন্য জুতা তৈরি করতেন। শুধু আপনার কেন, এখানে এ রকম অনেকেই আছেন, যাদের পরিবারের জন্য বাবা জুতা তৈরি করতেন। জুতা তৈরিতে তিনি ছিলেন একজন জিনিয়াস। তিনি এমন এক অদ্ভুত নির্মাতা ছিলেন যে, আজ পর্যন্ত তার নির্মাণ নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি বা কেউ অভিযোগ করেনি। আপনার কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে বলুন, আমি আপনার জন্য আরেক জোড়া জুতা তৈরি করে দেব। আমি নিজেও জুতা বানাতে পারি।’ লিংকন আরও বলেন, কোনো কাজ ছোট নয়। ছোট সে, যে কাজকে ছোট ভেবে অহেতুক বিদ্রুপ করে।
আইনসম্মত ও মানবকল্যাণমূলক প্রতিটি কাজ সমান সম্মানের দাবিদার। একজন চিকিৎসক যেমন সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি একজন কৃষক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, বিদ্যুৎকর্মী, রাজমিস্ত্রি বা পরিবহনকর্মীও অপরিহার্য। কৃষক খাদ্য উৎপাদন না করলে শহরের মানুষ বাঁচবে না। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা কাজ বন্ধ করলে জনস্বাস্থ্য সংকট দেখা দেবে। বড় সাফল্যের সূচনা প্রায়ই ছোট কাজ থেকেই হয়। বিশ্বের বহু সফল উদ্যোক্তা, বিজ্ঞানী, ক্রীড়াবিদ ও শিল্পী তাঁদের জীবনের শুরুতে ছোট কাজ করেছেন। তারা কাজকে লজ্জার নয়, শেখার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
জাপানের স্কুলগুলোতে কোনো আলাদা পরিচ্ছন্নতাকর্মী থাকে না; শিক্ষার্থীরা এবং শিক্ষকেরা মিলে নিজেদের ক্লাসরুম ও টয়লেট পরিষ্কার করে। এর উদ্দেশ্য হলো শৈশব থেকেই শিশুকে শেখানো যে, কোনো কাজই ছোট নয়। অন্যদিকে, জার্মানিতে একজন দক্ষ মেকানিক এবং একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের সামাজিক মর্যাদা ও জীবনযাত্রার মান প্রায় সমান। সেখানে পেশা দিয়ে মানুষকে বিচার করা হয় না। একজন রিকশাচালক বা চায়ের দোকানদার সততার সাথে কষ্ট করে নিজের জীবিকা নির্বাহ করছেন, যা অত্যন্ত সম্মানজনক। বিপরীতে, যে ব্যক্তি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে ঘুষ খাচ্ছে, দুর্নীতি করছে, নৈতিকভাবে সেই ব্যক্তিটিই সমাজের সবচেয়ে "ছোট" বা নিকৃষ্ট স্তরে অবস্থান করছে। কাজেই আইনসম্মত প্রতিটি পেশাকে সমান সম্মান দেখাতে হবে।
শিষ্টাচার-২০০: প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে গ্রিক দার্শনিক প্লেটো তাঁর বিখ্যাত 'এলিগোরি অফ দি কেভ' "Allegory of the Cave" বা "গুহার উপমা" উপস্থাপন করেন, যেখানে একটি গুহার ভিতর হাত-পা বাধা কিছু মানুষ গুহার একটা দেয়ালের দিকে মুখ করে বসে আছে। তাদের পিছনে একটি রাস্তা পাশ দিয়ে চলে গেছে; আর রাস্তার পাশে একটি আগুনের কুন্ডলি জ্বলছে। এই আগুনের আলোর কারণে রাস্তা দিয়ে হাঁটা পশুর ছায়া গুহার সামনের দেয়ালে পড়তো।
বন্ধীরা যেহেতু পিছনে দেখতে পারতো না, তাই দেয়ালে পরা এসব বড় বড় ছায়াকে তারা ভুত ও দানব বলে মনে করতো। যেহেতু তারা কখনো বাইরের পৃথিবী দেখেনি, তাই তারা বিশ্বাস করত, দেয়ালে দেখা ছায়াগুলোই বাস্তব। একদিন একজন বন্দী মুক্ত হয়ে গুহার বাইরে আসে। ফলে সে প্রকৃত পৃথিবী,গাছপালা, নদী, মানুষ, আকাশ এবং সূয দেখতে পায়। তখন সে বুঝতে পারে, এতদিন যে ছায়াগুলোকে তারা সত্য মনে করত, সেগুলো আসলে ‘পশুর ছায়া’ মাত্র। এবার মুক্ত ব্যক্তিটি গুহায় ফিরে গিয়ে বন্ধীদের কাছে প্রকৃত সত্যটা জানাল। কিন্তু বন্ধীরা তার কথা বিশ্বাস করল না, কারণ তারা সে ছায়াকেই একমাত্র সত্য বলে বিশ্বাস করতে অভ্যস্ত। জন্ম থেকে যা দেখে আসছে, যা শুনে আসছে, যা কল্পনা করে আসছে’ ওদের কাছে তা-ই সত্য।
মনোবিজ্ঞানে Confirmation Bias নামে একটি ধারণা রয়েছে। মানুষ সাধারণত এমন তথ্যকেই সহজে বিশ্বাস করে, যা তারা ছোটকাল থেকে শুনে আসছে। প্লেটোর গুহার বন্দীরাও নতুন সত্য গ্রহণ করতে পারেনি, কারণ তারা পুরোনো বিশ্বাসেই অন্ধ ছিল। প্লেটোর গুহা আমাদের শেখায়: *সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা সব তথ্য সত্য নয়। *গুজব বা প্রচারণা যাচাই না করে বিশ্বাস করা উচিত নয়। *শিক্ষা মানে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল নয়; বরং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা অর্জন। *জ্ঞানী হওয়া মানে বিনয়ী হওয়া এবং সত্য অনুসন্ধানে প্রশ্ন করা, উত্তর খুঁজে বের করা। এই গল্পের মূল শিক্ষা হলো, যা চোখে দেখা যায়, তা-ই শেষ সত্য নয়; সত্যকে জানতে হলে জ্ঞান, যুক্তি দিয়ে অনুসন্ধান করতে হবে।
এই গল্পের প্রতিটি উপাদান একটি গভীর ধারণার প্রতীক।
গুহা = অজ্ঞতা, সীমিত চিন্তা ও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি।
শিকল = কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা।
দেয়ালের ছায়া = গুজব বা কাল্পনিক ভয়।
আগুন = কল্পকাহিনী, রূপকথা।
সূর্য = প্রকৃত সত্য, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা।
মুক্ত বন্দী = শিক্ষিত ও অনুসন্ধানী মানুষ।
আর পুরো ঘটনায় হঠাৎ মুক্তি পাওয়া মানুষটির এখন কি হবে? সে যেহেতু অন্যদের মুক্ত করতে অক্ষম, তার জানা সত্যটা নিয়ে সে একা একা সারা জীবন কটিয়ে দেয় এবং সে চাইলেও তার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে না। বর্তমান ডিজিটাল যুগে ভুয়া খবর, বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং অ্যালগরিদমনির্ভর তথ্য অনেক সময় মানুষকে একটি সীমিত তথ্যজগতে আটকে রাখে। গবেষকেরা একে Echo Chamber বা Filter Bubble বলে থাকেন। এটি প্লেটোর “ছায়ার জগত”-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়।