॥ জাপানের মানুষ  মোটা হয় না

কখনও ভেবে দেখেছেন? আমাদের অনেকেরই ৩০-এর মধ্যেই ভুঁড়ি হয়ে যায়, আর জাপানের মানুষ? তারা একেবারেই মোটা হয় না! এর পেছনে কয়েকটি বিজ্ঞানসম্মত কারণ আছে।

প্রথম কারণ হলো খাবার। জাপানি খাবারে থাকে কম ক্যালোরি এবং কম ফ্যাট। তারা বেশি মাছ, সবজি, সয়াবিন এবং সি ফুড  খায়। এছাড়া খাবারের পরিমাণ থাকে কম। ছোট প্লেটে ছোট পরিমাণ খাবার খুব ধীরে ধীরে খাওয়া হয়, ফলে অতিরিক্ত ক্যালোরি জমে না। সূর্য ডুবার পর তারা কিছুই খায় না।

দ্বিতীয় কারণ, তারা ফাস্ট ফুড খুব কম খায়। সোডা, চিপস বা অন্যান্য জাঙ্ক ফুড কম ব্যবহার করা হয়। তেল, চর্বি, চিনি ও লবণ খাবারে থাকে না বললেই চলে। তাই শরীরে অপ্রয়োজনীয় চর্বি জমার সম্ভাবনা অনেক কম থাকে।

তৃতীয় কারণ হলো দৈনন্দিন শারীরিক ক্রিয়াকলাপ। জাপানিরা বেশি হাঁটে, সাইকেল চালায় এবং বড় শহরে গাড়ির পরিবর্তে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করে। ফলে প্রতিদিন অনেক হাঁটাহাঁটি হয়, যা ক্যালোরি ব্যয় বাড়ায় এবং শরীরকে সুস্থ রাখে।

চতুর্থ কারণ হলো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সচেতনতা। সুস্থ এবং ফিট থাকা সমাজে গুরুত্বপূর্ণ বলে সবাই খাওয়া নিয়ন্ত্রণে রাখে। মোটা মানুষদের সেখানে অযোগ্য ও প্রতিবন্ধী হিসেবে ট্রিট করে সবাই।

পঞ্চম, “Hara hachi bu” নীতি। এর মানে হলো খাবার তখনই থামানো, যখন ৮০% পরিপূর্ণ বোধ হয়। বিজ্ঞান বলছে, যখন আমরা পুরোপুরি তৃপ্ত না হয়ে সামান্য ক্ষুধা রেখে খাওয়া শেষ করি, তখন শরীরের ক্যালোরি গ্রহণ স্বাভাবিক হয়, হরমোনের ভারসাম্য ঠিক থাকে এবং মেটাবলিজম স্থিতিশীল থাকে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং ওভারওয়েট হওয়ার ঝুঁকি কমে।

কিন্তু আমরা? বড় প্লেট, ফাস্ট ফুড, সোডা-চিপস আমাদের প্রলুব্ধ করে। হাঁটাহাঁটি কম, লিফট বেশি ব্যবহার করি, আর খাবারের নিয়ন্ত্রণে ঢিলেমি করি। তাই আমাদের ভুঁড়ি বাড়ে এবং স্বাস্থ্য সমস্যাও আসে।

যদি আমরা একটু জাপানি স্টাইল অনুসরণ করি - পরিমাণে খাই, বেশি হাঁটি এবং ফাস্ট ফুড কমাই - তাহলে আমাদের শরীরও সুস্থ এবং ফিট রাখা সম্ভব। @ বার্তা ২৪



মহেঞ্জোদারো শহরের ঘরবাড়ি নিয়ে কিছু আলোচনা।॥

28.12.2024।

যখন প্রথম মহেঞ্জোদারো শহরের কথা পড়ি তখন প্রথমেই বলা হয়েছিল "এটি ছিল প্রাচীনতম পরিকল্পিত শহর।"

তখন আমি এক প্রাচীন ছোট এলোমেলো ভাবে গড়ে ওঠা শহরের বাসিন্দা ছিলাম। সেই রকম শহরের স্কুলে, শহর গড়ার আগাম পরিকল্পনা কাকে বলে সেটা আমাদের বোঝাতে শিক্ষককে যথেষ্ট খাটতে হয়েছিল। কিন্তু বহুপরিশ্রম করেও তিনি যতটা শেখাতে চেয়েছিলেন তার এক দশমাংশও শেখাতে পারেন নি। কারণ আমাদের কল্পনার পরিধিই ছিল সীমিত।

হয়ত শিক্ষক মহাশয়েরও কল্পনার পরিধিই ছিল সীমিত। শেষ অবধি তিনি উদাহরণ হিসাবে বলেছিলেনঃ পরিকল্পিত শহর হল অনেকটা রেলওয়ে কলোনীর মত। আগে থেকে ঘরবাড়ি রাস্তাঘাট সব বানানো থাকবে, পাড়ায় পাড়ায় জলের ব্যবস্থা হিসাবে কূয়া থাকবে। লোক এসে থাকলেই হল। অনেকটা বুঝলেও ড্রেনে ঢাকা দেবার প্রয়োজনটা বুঝলাম না। কারণ রেলকলোনীতে সব খোলা ড্রেন।

তারপরে যখন পড়ালেন বিখ্যাত স্নানাগারের কথা, আমাদের কল্পনায় সেটা হয়ে গেল পাড় বাঁধানাো ঝাঁ চকচকে পুকুর।

তবে সব বাড়ি পোড়া ইঁটের জেনে মাথায় চক্কর। কারন আমাদের স্কুল তখন সবে সেমি-পাক্কা। মানে মেঝে থেকে সাড়ে তিন ফুট পাকা দেওয়াল বাকিটা বাঁশের দরমা বেড়া।

সব মিলিয়ে মহেঞ্জোদারো শহরের যে ছবি মাথায় গাঁথা হয়ে গেল তা হল বিশাল বড় একটা রেলওয়ে কলোনী। সেখানে রাস্তার দুইধারে ঢাকা দেওয়া ড্রেন। আর ড্রেনের পরে সারিসারি রেলের অফিসারদের মতই বড় বড় বাংলো টাইপের  লালা ইঁটের বাড়ি।  আর প্রতি পাড়ায় একটা করে পাড় বাঁধানো বিরাট পুকুর।

পরে অনেক বৎসর পরে চাকরী জীবন শেষ করে যখন মহেঞ্জোদারো শহরের কথা নতুন করে পড়তে বসলাম তখনও এই ছবিটাই তো মাথায় গাঁথা ছিল। ফলে শহর কে বানিয়েছিল ভাবলেই রেলওয়ে কোম্পানীর মত কোন অদৃশ্য প্রতিষ্ঠানের কথা মাথায় এসে যেত।

কিন্তু ইদানিং মনে সন্দেহ জেগেছে। ভাবছি আমার ধারনাটা আগাগোড়াই ভুল। সবটাই আমি কল্পনা করছি। মাস্টার তো কখনো বলেননি রেলওয়ের মত কোম্পানী ছিল। ওটা আমার নিজের উদ্ভাবন।

শহরে গ্রাফ পেপারের লাইনের মত করে সমকোনে রাস্তা, গ্রাফের প্রতি খোপে একটা বাড়ি, এমন বলা আছে। লেখা আছে।

সত্যি? সত্যি বিজ্ঞানীরা এমন করেই লিখেছেন? বলেছেন? না আমি এবং আমরা কল্পনায় শুন্যস্থান পূর্ণ করছি? 

পাঠ্যবই, ইতিহাস বই। যে কালেরই হোক, কেউ একজন লিখেছেন। যিনি মহেঞ্জোদারো শহর দেখেন নি এমন একজন লিখেছেন। ফলে তিনিও যে আমারই মত রেলকলোনীর কল্পনা জুড়ে দিচ্ছেন না তার নিশ্চয়তা কোথায়!

প্রকৃত চেহারা পাওয়া সম্ভব সেই বিজ্ঞানীর লেখায় যিনি দেখেছেন, খোঁড়াখুঁড়ি করেছেন, এবং চাক্ষুস দৃশ্যের বর্ণনা সরাসরি লিখছেন।

তারপরেও অনেক কিন্তু, যদি, থাকবেই। কারণ একটা প্রচলিত বাক্য হলঃ একজন প্রত্নবিদ সেটাই দেখতে পান যা তিনি দেখতে চান।

তবে ভরসার কথা হল, যখন শুধু নীরস তথ্য লিপিবদ্ধ করতে বসেন কেউ, সেখানে কল্পনার মিশেল হবে যৎসামান্য। অর্থাৎ তথ্য সত্যের খুব কাছাকাছি থাকবে।

সদ্য কিছু নীরস তথ্যবলী ঘাঁটতে ঘাঁটতে বুঝলাম সেই স্কুল বয়স থেকে এই শেষ বয়স অবধি অনেক ভুল ধারনা নিয়েই ঘুরে বেড়িয়েছি। সম্ভবত উপযুক্ত শিক্ষার অভাবে সৃষ্টি হওয়া আমার ব্যক্তিগত ভ্রান্তি।

ভাবার কথা হল আমার মত স্বল্প শিক্ষা প্রাপ্ত অনেক লোক আছেন, আর তাঁদেরও মাথায় থাকবে মহেঞ্জোদারো একটি রেলকলোনী না হোক শিল্পনগরী। শিল্পনগরি, শিল্প প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বাসস্থান। তা নইলে শহরের পরিকল্পকরা জানবে কি করে শহরে কত লোক বাস করবে? শহরে কত ঘর চাই, কত কুয়া চাই? গুনে গুনে সাড়ে সাতশ কূয়া তৈরী হল কোন হিসাবে, নিশ্চয় বাসিন্দার হিসাবে।

এখন বুঝি গোড়ায় গলদ। পরিকল্পিত শহরের ধারনাটাকেই আমি ভুল বুঝেছি।  না মহেঞ্জোদারো শহর পরিকল্পিত শহর হলেও সে শহরে কত লোকের কটা বাড়ি থাকবে কোথায় কটা কুয়া লাগবে, এত সব খুঁটিনাটি ভেবে কোন শিল্পদ্যোগপতি শহরটি গড়েননি। শহরের পরিকল্পনায় ছিল শহরের কাঠামো মাত্র। পরবর্তিকালে শুধু সেই পরিকল্পিত কাঠামোটুকু রক্ষা করা হযেছে প্রশাসনিক কঠোরতা দিয়ে।

সেই কাঠামোর পরিকল্পনা শহরের জন্মলগ্নথেকেই ছিলো? না পরে সৃষ্টি হয়েছিল? সেটা সুনিশ্চিত নয়। কারণ শহরের নিম্মতম স্তর আমরা খনন করতেই পারিনি। তাই শহরের জন্মকালের রূপ আমাদের অজানা। সেই অজানা অংশের শুন্যস্থান পূরণে ব্যবহার হচ্ছে কল্পনা। সেই কল্পনাই বলছে জন্মলগ্ন থেকেই শহরটি এই একইরকম ছিল।

একইরকম থাকার তত্ত্বকে সমর্থন দেবার জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী শক্তিশালী রক্ষণশীল জাতিগোষ্ঠীর সাংগঠনিক সম্ভাবনার কথাও আমরা কল্পনা করছি। উদাহরণ স্বরুপ নিয়ে এসেছি এই শহর গঠনের পরিকল্পনা, এক মাপের ইঁট, এক ওজন, ইত্যাদি।

দীর্ঘস্থায়ী রক্ষণশীলতা, আমাদের ভারতীয় সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। তাই আমরা স্বেচ্ছায় মাথায় গেঁথে নিয়েছি। মাথায় গেঁথে গেছে, শহরের সব বাড়ির ইঁট আগুনে পোড়ানো ইঁট। প্রতিটি ইঁটের মাপ এক। হরপ্পা সভ্যতার ১০ লক্ষাধিক বর্গ কিলোমিটার এলাকার জন্যই প্রযোজ্য।

অথচ বাস্তবে প্রত্নখনন বলছে বেশিরভাগ ইঁটই ছিল রোদে শুকানো ইঁট। অবশ্যই আগুনে পোড়ানো ইঁটও প্রচুর ব্যবহার হয়েছে।যা মানব সভ্যতার সেই আমলে প্রায় অকল্পনীয়। যাকে মর্টিমার হুইলার বলেছিলেনঃ বিলাসিতা।

কিন্ত তারপরেও রোদে শুকানো ইঁটের ব্যবহার ছিল সর্বাধিক। আর সব ইঁটের মাপ কখনও এক ছিলো না। যা ছিল, তা হল ইঁটের মাপের লম্বা চওড়া ঘনত্বের অনুপাত প্রায় এক ছিল। সেটা বজায় থাকাও অবশ্য সাধারণ ব্যপার না। তাই ব্যতিক্রম ছিলো সেখানেও। তবে ব্যাতিক্রম হল ব্যতিক্রম।       

মহেঞ্জোদারো শহরে সব বাড়ি ইঁটের। কোন কাদামাটির বাড়ি নেই। তাহলে কি ধরে নিতে হবে যে শহরের সব বাড়ি শহরের প্রশাসনিক বিভাগই বানিয়ে দিয়েছিল? শিল্প নগরীর কোয়ার্টারের মত করে? অথবা শহরের প্রতিটি বাসিন্দার আর্থিক সঙ্গতি অনেক উঁচু ঘাটে ছিল। বা কেবল মাত্র ধনবানেরাই শহরে বাস করতে অনুমতি পেত?

আবারও মনে করতে হয়, শহরের শুরুর কথা জানি না। শুরুর কয়েকশ বৎসর বাসিন্দাদের বাড়িঘর কেমন ছিল আমরা জানি না। এমন তো হতেই পারে গোড়ায় বেশিরভাগ বাড়িই ছিল কাদামাটির আর রোদে শুকোনো ইঁটের। ঘর বাড়ি ছিল এলোমেলোই। সিন্ধু নদীর বন্যা বার বার ডুবে যাওয়া শহরের বেশিরভাগ ঘরবাড়ি নতুন করে গড়তে হয়েছে। এমনটা খুবই সম্ভব যে নতুন করে গড়ার সময় তারা স্থির করে বন্যার জলের বাৎসরিক ক্ষতির থেকে বাঁচার জন্য ব্যবহার করবে আগুনে পোড়ানো ইঁট। কয়েক প্রজন্ম শহরে কাজ করে প্রতিটি পরিবারই মোটামুটি স্বচ্ছল, আর ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আগুনে পোড়া ইঁটের ব্যবহারই সাশ্রয়ী।

রাস্তাঘাটও শুরুতে আঁকাবাঁকা থাকলেও প্রতি বন্যার পরে নতুন করে বানাতে গিয়ে একটু একটু করে সোজা করা হয়েছে। সোজা রাস্তার সুবিধা বুঝতে পেরে।

আমিও ধারাবাহিকতার কথাই বলছি। কয়েক শতাব্দি জুড়ে গড়ে ওঠা শহর একটু একটু করে ক্রমান্বয়ে উন্নতই হবে। প্রকৃতপক্ষে হরপ্পা শহরও এভাবেই গড়ে উঠেছে। তবে লোথাল আর ধোলাভীরা এই দুই বন্দর শহর প্রকৃতপক্ষেই একেবারে প্রায় সম্পূর্ণ ভাবে পূর্ব পরিকল্পিত। 

স্কুল পাঠ্যবইতে পাওয়া কিছু তথ্য আমাদের কল্পনায় এমন এক শহরের ছবি গড়ে সেখানে প্রশাসনিক বাড়ি বাদে সব বসত বাড়ি একরকম। না মোটেই তা না। শহরে্র বাসিন্দাদের মধ্য আর্থিক বৈষম্য ছিল, অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মেই। সেই বৈষম্য আর ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে বাড়ির আকার আয়তন আলাদা আলাদা হবেই। বাড়ির বিভিন্ন গঠনের থেকে একজন বিজ্ঞানী তিনটি প্রধান গঠনধারা চিহ্নিত করেছেন।

বাড়ির আয়তন বিভিন্ন হবে কারণ সব পরিবারের সদস্য সংখ্য সমান না। আবার সব বাড়িই বসত বাড়ি ছিল না। কারখানা দোকানঘর বাদেও নেহাতই একা একজন থাকার ঘর, তারও তো দরকার সব শহরেই।

এই বিভিন্ন আয়তনের ঘরগুলোর একটা তালিকা প্রত্নবিদরা তৈরী করেছেন। সে তালিকা বলে শহরের বিভিন্ন এলাকাতেই ছিল মিশ্রিত আয়তনের বাড়ি। অর্থাৎ বর্তমান শিল্পনগরীর মত পদমর্যদা ভিত্তিক বাড়ির আয়তনের বিভিন্নতা এলাকা ভিত্তিক বিভিন্নতায় বিভক্ত ছিল না।

যে আয়তনের যত বাড়িঘর মহেঞ্জোদারোতে ছিল তা স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক সেটা বুঝতে গেলে শহরের আর্থ-সামাজিক চরিত্র নিয়ে একটু ভাবতে হবে। আরেকটা উপায় হল সমকালীন শহরের সাথে তুলনা করা। তাই মেসোপটেমিয়ার সমকালীন শহরের বাড়িরঘরের আয়তন তুলনা করে দেখা হয়েছে।

তারই সাথে বাড়ির আয়তন দেখে শহরে কতলোক ধনী মধ্যবিত্ত বা নিম্মবিত্ত বা দরিদ্র ছিল তারও একটা আভাস পেতে পারি।

একটা চেষ্টা করা হল।

মহেঞ্জোদারো শহরেঃ

৩০০ থেকে ৪৫০বর্গফুটের বাড়ি ৬টি।

৫০০ থেকে হাজার বর্গফুটের বাড়ি ১৬টি

১হাজার থেকে ২ হাজার বর্গফুটের বাড়ি ২০টি

২হাজার থেকে ২৭০০ বর্গফুটের বাড়ি ১৪টি

৩হাজার থেকে ৩২৩০ বর্গফুটের বাড়ি ৩টি।

৪হাজার থেকে ৫০০০ বর্গফুটের বাড়ি ৩টি।

এবং একটিই ৫০টি ঘরের ব্যতিক্রমি বাড়ি যাকে বলা হয়েছে "প্রাসাদ" তার আয়তন ১৮হাজার বর্গফুটের বেশি।

বাড়ির এই তালিকা আমাদের বলে, শহরে হত দরিদ্ররা সংখ্যায় কম ছিল। নিম্ম বিত্ত ও নিম্ম মধ্যবিত্ত ছিল সর্বাধিক। তারপরেই ছিল মধ্যবিত্তদের স্থান। আর বিত্তবানদের সংখ্যা অবশ্যই বেশ কম ছিল। সব মিলিয়ে হস্তশিল্প ও বানিজ্য নির্ভর শহরের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য মোটামুটি ভালোর দিকেই ছিল বলতে হবে।

এখানে অনুমান করে নিয়েছি যে সবাই আপন আয়ের পরিধিতে তাদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছিল। বাস্তবে সেরকম ঘটার সম্ভাবনা আধাআধি ধরা যায়। যেমন অনেকে পৈত্রিক সম্পত্তি পেয়ে আয়ের অনুপাতে ভালো বাড়িতে থাকবে, তেমনি অনেকের ভালো আয় থাকা সত্ত্বেও ভালো বাড়ি জোগাড় করতে পারবে না।

একটা কথা মাথায় রাখতে হবে যে, মহেঞ্জদারো শহর তার বাসিন্দাদের বর্ধিত সম্পদ অনুপাতে চাহিদা মেটাতে সক্ষম ছিলো না। কারণ শহরের পরিধি ছিল স্থিতিশীল। সেটা বোঝা সম্ভব কূয়ার সংখ্যা দিয়ে। শহর বাড়লে কূয়ার সংখ্যা বাড়ত। নিদেন পক্ষে লোকসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে তাল রেখে নতুন কূয়া খনন হবার কথা। সম্ভবত বাৎসরিক বন্যার সাথে মোকাবেলা করতে করতে ক্লান্ত শহরের প্রশাসকরা আর আয়তন বৃদ্ধিতে সায় দেয়নি।

মেসোপটেমিয়ার ঊর শহরের বাড়ির আয়তন দেখে মহেঞ্জদারোর সাথে তুলনা করলে মনে হবে ঊর শহরে দরিদ্র আর নিম্মবিত্ত আর নিম্ম মধ্যবিত্তেরা প্রায় সমসংখ্যক ছিল আর তারা সংখ্যায়ও বেশ ভালোই ছিল। তুলনায় মধ্যবিত্তের সংখ্যা মধ্যবিত্তের অর্ধেক। উচ্চবিত্তের সংখ্যা নুন্যতম। এই শহরের অর্থনৈতিক চেহারায় একটা পিরামিড আকৃতি দেখা যায়। এই পিরামিডাকৃতি সমাজ কৃষিভিত্তিক রাজপরিবার শাসিত সমাজের সামাজিক সংগঠনকেই সমর্থন দেয়।

২০০ থেকে ৪৫০বর্গফুটের বাড়ি ১১টি।

৫০০ থেকে হাজার বর্গফুটের বাড়ি ২১টি

১হাজার থেকে ২৫০দ হাজার বর্গফুটের বাড়ি ১৫টি

৩হাজার থেকে ৩৫০০ বর্গফুটের বাড়ি ৮টি।

৪হাজার থেকে ৫০০০ বর্গফুটের বাড়ি ১টি।

মহেঞ্জোদারো শহরে বিভিন্ন এলাকায় সবচেয়ে বড় আর ছোট বাড়ি।

বিশেষ করে লক্ষ্য করুণ তালিকার ৫ নম্বরের বড় বাড়িটি। যে বাড়ির নম্বর হিসাবে বলা হয়েছেঃ প্যালেস বা প্রাসাদ। ১৮ হাজার বর্গফুটের এই বাড়িতে আছে ৫০টি ঘর। প্রাসাদ বলতেই পারি। মেসোপটেমিয়ার মারি শহরে, চিনেও এমন একতলা বহুঘর বিশিষ্ট রাজপ্রাসাদের দেখা পাওয়া গেছে। 

তুষারমুখার্জি, তথ্যসুচীঃ- Edward Cork: Rethinking the Indus Myth, part-II:   Durham University, 2006



হরপ্পা সভ্যতা ॥ খৃষ্টপুর্ব ৩৫০০-১৩০০, মহেঞ্জো দারো--- খৃষ্টপুর্ব ৩৫০০- খৃষ্টপুর্ব ১৭০০


হরপ্পা সংস্কৃতির লোকেরা কাজ কর্ম করত ভাল কথা, খাবার জোগাড়ের জন্য সবাইকেই করতে হয়, কিন্তু তার বাইরে আর কি করতো?

কাজ ছাড়া গান-বাজনা করত। গান গাইতো কিনা বলা সম্ভব না, তবে বাজনা ছিল। আর খেলাধুলা। মাঠে গিয়ে কাবাডি খেলতো কিনা জানার উপায় নেই, তবে পাশা জাতীয় খেলার প্রচলন ছিল। হয়ত দাবা জাতীয় কোন খেলারও প্রচলন ছিল।

আর ছিল, খুব সম্ভব, পিট্টু খেলা। পাঁচ হাজার বৎসর আগেও শহরের গলিতে বাচ্চারা পিট্টু খেলত, ঠিক এখনকার মতোই (এখন শহরতলীর গলিতে)।ক্যাম্বিসের বল ছিল না, ঠিকই তাতে কি, দেখা গেছে সিন্ধু প্রদেশের ছোট ছোট শহরের গলিতে বাচ্চারা ছেঁড়া কাপড়ের বল বানিয়ে তাই দিয়ে খেলছে।

লেখা পড়ার চল খুব কিছু থাকার কথা না। অততীতের অন্ছিযন্লয সমাজেও লেখাপড়া একটি বিশেষ গুন হিসাবে ধরা হত। তাই এই জিনিষটা দুর্লভই ছিল। লেখা পড়া না থাকলে কিশোর বয়সে যা থাকবে তা হল গলিরে গলিতে হৈহৈ করা আর পিট্টু খেলা।

সীলের লেখা দেখে ভাবার কারণ নেই যে সবাই লেখা পড়া জানতো। সীলের এর ব্যবহার সম্ভবত ছিল ব্যাবসায়ীর বা প্রস্তুত কর্তার নাম বোঝাবার জন্য। কাজেই যারা কাজ করত তাদের মধ্যে গুটিকয় সীল চিনতে শিখে গিয়েছিল। চিনতে। না পড়েও চেনা যায়।

আরেক রকম সীল পাওয়া গেছে, সেটা অনুমান করা হয় ব্যবহার করা হত, গেটপাস বা পাসপোর্ট, হিসাবে। ছোট ছোট এই সীলমোহর গুলিতে ফুঁটো করা আছে সুতো ঢুকিয়ে বাঁধার জন্য।

হয়ত, শহরের দরজা পার হবার সময় হাতে ঐ সীল বেঁধে রাখতে হত, যাতে বোঝা যায় লোকটির শহরে ঢোকার অনুমতি আছে।

(কয়েক বৎসর আগের ষ্টেশনের কুলীরা যে রকম পেতলের নম্বর হাতে বেঁধে রাখতো)।

এই ক্ষেত্রেও সীলের লেখা পড়ার দরকার নেই। চিনলেই হল।

তবে সবার আগে আমাদের মাথায় কেন প্রশ্ন আসে না যে সব সময় পড়ার জন্য সীলে লেকা থাকলে তার আকার এক দেড় ইঞ্চি হবে কেন? অত ছোট সীলে ছবি লেখা একত্রে থাকলে সেগুলো দ্রুত পড়ার জন্য কখনই না।

অতএব স্কুল নেই। সকালে এক পেট খেয়ে দুইচারজন বন্ধুকে ডেকে নিয়ে শুরু হত পিট্টু খেলা। সরু গলিতে দুই দিকের বাড়ির দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হত তাদের সমবেত তুমুল উল্লাস।

দিনের শেষে প্রদীপের আলোয় বসত বড়দের খেলার আসর, ছক্কা ছক্কা তুমুল উল্লাস। অথবা দুপুরের অবসরে রান্না খাওয়া পাট চুকিয়ে, দস্যি ছেলেকে চেপে চেপে ঘুমপাড়িয়ে, পাশের বাড়ির সই এর সাথে বসত আরেক খেলা। ঘর বেছে হিসেব করে, টুক টুক করে আগিয়ে যেত গুটি। উল্লাসে চিৎকার করা চলবে না, বাচ্চার ঘুম ভেঙ্গে যাবে. তবু মুচকি হাসিতো আছেই।

হরপ্পান সভ্যতার শহরগুলো দেখা যতই আমাদের চমক লাগুকনা কেন, সেই সমাজ কিন্তু মুলত কৃষি নির্ভর ছিল।

কয়েকটি শহরের কয়েকটি জিনিষ উৎপাদন সমস্ত লোকের জীবিকা ছিলনা। গ্রামের লোকেদের মুল কাজ ছিল কৃষিকাজ, চাষীদের উদ্বৃত্ত উৎপাদন তাদের যে অতিরিক্ত আর্থিক ক্ষমতা দিত তার সুত্র ধরেই তৈরী হত সৌখীন জিনিষের চাহিদা।

সেই সৌখীন জিনিষের পর্যাপ্ত যোগান দিতেই তৈরী হয় শহর। শহরের অতিরিক্ত উৎপাদন বিদেশে বিক্রী করা হত। এটাই স্বাভাবিক অর্থনৈতিক চক্র।

©তুষারমুখার্জি  




॥তুয়ারেগ, যাযাবর পশুপালক জনগোষ্ঠী॥

আফ্রিকার সাহার এলাকায় বসবাস করা একটি যাযাবর পশুপালক জাতি এই তুয়ারেগরা। এরা মুলত বৃহত্তর বার্বার জাতির একটি শাখা বলেই ধরা হয়। তবে অধুনা করা জেনেটিক্স তথ্য সেই ধারনায় খানিক সন্দেহের ছায়া ফেলে। বর্তমানে প্রায় ৭০ লক্ষের এই জাতিটি কিন্তু বেশ কয়েকটি আধুনিক রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানায় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বসবাস করে। আর তাদের ভাবা হয় ঐ সব এলাকার বহুকাল ধরে চলতে থাকা জঙ্গী যুদ্ধ দাস ব্যবসা এসবের জন্য তারাই দায়ী। এই ধারনা খুব কিছু ভুলও না। তুয়াগেরাদের সমাজের অভিজাত শ্রেণীই হল তুয়াগে যোদ্ধারা। তাদের যুদ্ধ বরাবরই ছিল হানাদারি যুদ্ধ। সেই ঐতিহ্য তারা ধরে রেখেছে। আগে হাতে ছিল তরোয়াল বর্শা। এখন হাতে মেশিনগান, মিসাইল। এই যুদ্ধপ্রীতির জন্যই সুকৌশলে তাদের ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল একাদিক রাষ্ট্রের মধ্যে। যাতে তাদের ক্ষমতা কিছু কমে, তাদের নিয়ন্ত্রন সহজ হয়। ঘটেছে উল্টো। প্রতিটি রাষ্ট্র জড়িয়ে পড়েছে দীর্ঘকালীন রক্তক্ষয়ে।

॥তুয়ারেগদের ইতিহাস॥

এখন ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে নানা রাষ্ট্রের বাসিন্দা এই তুয়ারেগদের ভুমিকা বেশির ভাগ সময়েই রাষ্ট্রবিরোধী অস্ত্রধারী জঙ্গী। তুয়ারেগরা একাধিক আফ্রিকান দেশে চালাচ্ছে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। কিন্তু একসময় এরাই নিয়ন্ত্রন করত সাহারার পারাপার করা একাধিক বানিজ্যিক পথ। সেটা ঔপনিবেশিক আমলে যেমন তেমনি তার পরেও।

উনবিংশ শতাব্দিতে তুয়ারেগেদের বাসভুমিগুলো ছিল তাদের গড়া একাধিক রাজনৈতিক কনফেডারেশনের শাসনাধীন। কনফেডারেশনের মাথায় থাকতো বিভিন্ন গোষ্ঠীর বয়স্ক ও প্রধানদের নির্বাচিত প্রধান। কনফেডারেশনগুলোর শাসনকারীদের ব্যবহৃত ড্রামের প্রতীক থেকে এদের বলা হতে থাকে ড্রাম গ্রুপ। এরকম সাতটি কনফেডারেশনের অস্তিত্বের কথা জানা যায়।

১৮৮১ থেকে ফরাসী উপনিবেশ স্থাপনকারীদের সাথে তুয়ারেগদের টানা যুদ্ধ চলতে থাকে একাধিক এলাকায়। কিন্তু বহু বৎসর ধরে প্রতিরোধের পরে তরোয়ালধারী তুয়ারেগরা শেষ অবধি বন্দুকধারী ফরাসীদের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়। প্রথম সন্ধি হয় মালি তে ১৯০৫ সালে। নাইজারে সন্ধি হয় ১৯১৭তে।

ক্রমাগত যুদ্ধে ক্লান্ত ফরাসীরা তুয়ারেগদের নিজস্ব আভ্যন্তরীন রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় কোন হস্তক্ষেপ করে না। তারা শুধু চায় যে তুয়াগেদের কনফেডারেশনের প্রধান ফরাসীদের অধীনতা স্বীকার করুক। আর অবশ্যই কর দিক। ফলে ফরাসীদের রাজনৈতিক ক্ষমতার অধীনে চলে গেলেও তুয়ারেগদের নিজস্ব সমাজ জীবনে তার তাৎক্ষণিক প্রভাব খুব কিছু পড়েনি।

১৯৬০এর দশক থেকে ফরাসী উপনিবেশগুলো স্বাধীনতা পেতে শুরু করলে, অনেকগুলো নতুন রাষ্ট্র গড়ে ওঠে, ফলে তুয়ারেগদের বাসভুমি একাধিক রাষ্ট্রে ভাগ হয়ে যায়। এই নবগঠিত রাষ্ট্রগুলোর সব কটাতেই তারা সংখ্যালঘু। ফলে তাদের চিরাচরিত জীবনধারায় বাধা সৃষ্টি হতে থাকে।

প্রথমে আসে তাদের যাযাবর জীবন ত্যাগ করার নির্দেশ। তারপরে পশুপালনে নিয়ন্ত্রন শুরু হয়। বলা হয় তাদের পশুপালনের দরুন মরু এলাকার যৎসামান্য গাছপালাও শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে তুয়ারেগদের কেউ কেউ কৃষিকাজে হাত লাগাতে চেষ্টা করছে। আবার অনেকে নতুন করে গড়ে ওঠা শহরগুলোতে নানা কাজে ভিড়ে যাচ্ছে।

১৯৬০ নাগাদ স্বাধীনতা পাওয়ার সাথে সাথে যখন প্রথম এই রাষ্ট্রীয় সীমানা ভাগ হতে শুরু করে, তখন মালিতে তুয়ারেগরা বিদ্রোহ করে। সে বিদ্রোহ দমন করে মালির সেনাবাহিনী। কিন্তু ১৯৯০ সালে আবার সেই বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। মালির সাথে নাইজারেও বিদ্রোহ শুরু হয়। তুয়ারেগরা তাদের বাসভুমিতে স্বশাসন দাবী করে। কিন্তু তা মানা হয় না। যুদ্ধ শুরু হয়। দুই বৎসর পরে, কয়েক হাজার লোকের মৃত্যুর পরে, ফ্রান্স আর আলজিরিয়ার মধ্যস্থতায় একটা শান্তি চুক্তি হয়। বলা হয় তুয়ারেগদের মালি আর নাইজার সেনাবাহিনীতে নেওয়া হবে।

সে চুক্তি যথাযথ পালন হয় নি। যুদ্ধ চলতে থাকে একটু ঢিমে তালে। আবার ১৯৯৫-৯৬ সালে আরেকটা শান্তি চুক্তি করা হয়। চোরাগোপ্তা লড়াই চলছেই। ইতিমধ্যে তুয়ারেগদের কয়েকটি গোষ্ঠী মিলে নিজেদের সংগঠিত করেছে। তৈরী হয়েছে তাদের নিজস্ব পতাকা। সমস্যা বেশি নাইজারে। সেখানে তুয়ারেগরা চরম ভাবে অবহেলিত।তবে  কোন দেশের শাসনক্ষমতায় তাদের কোন প্রতিনিধিকেই জায়গা দেওয়া হয় নি। ফলে আগুন হয়ত আবার জ্বলবে।

এরই মধ্যে তুয়ারেগরা হাত পাকিয়েছে আধুনিক অস্ত্রে। যোদ্ধা তো তাদের জাতি-বর্ণের উচ্চতম শ্রেণীর, তাই যোদ্ধারা সম্মানীয়। এবার সেই যুদ্ধ ন্যায় না অন্যয়ের সেটা আলাদা বিষয়। তা নিয়ে তুয়ারেগরা মাথা ঘামায় না। কারন কোন যুদ্ধই পুরোপরি ন্যায় বা অন্যায়ের পথে চলে না। যুদ্ধে জেতা নিয়ে কথা। তুয়েরাগদের নামে অভিযোগ তারা ইসলামিক আতঙ্কবাদীদের সহায়তা করছে, তারা আল-কায়দার অংশ। হতেও পারে নাও হতে পারে। কোন যুদ্ধেই সত্যিকথার কোন দাম নেই।

॥তুয়ারেগ সমাজ॥

প্রথমেই বলতে হয় এই আফ্রিকানরা কিন্তু কৃষ্ণাঙ্গ নয়। তারই সাথে বলতেই হবে যে ঐ এলাকায় তুয়ারেগ সমাজই সম্ভবত একমাত্র মাতৃতান্ত্রিক সমাজ।

যদিও এখন তুয়ারেগরা মুলত ইসলাম ধর্মালম্বী তবু তারা এখনো অনেকাংশেই ধরে রেখেছে তাদের মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা।

তুয়ারেগদের সমাজ বংশধারা ভিত্তিক, পারিবারিক গোষ্ঠী নিয়ে গঠিত।

আর আছে সামাজিক-মর্যদাভেদ বিন্যাস। যা অনেকটা হিন্দুদের বর্ণভেদ প্রথার মতই চারটি বর্ণে ভাগ করা।

উচ্চতম বর্ণে আছে যোদ্ধা অভিজাতরা। দ্বিতীয় ধাপে পশুপালকরা। তৃতীয় ধাপে কারিগর শ্রেণীর লোক। আর সবার নিচে দাস। এই বর্ণগুলোর মধ্যে এক বর্ণের সাথে অন্য বর্ণের বিয়ে হবে না।

অভিজাত যোদ্ধারাই কেবল রাখতে পারবে অস্ত্র আর উট। যদিও তাদের উটের পালন পোষণের দায়িত্ব থাকবে দ্বিতীয় বর্ণের পশুপালকদের। পশুপালকরা গাধার মালিক হতে পারবে। কিন্তু উটের না।

তৃতীয় বর্ণের কারিগরদের মধ্যে আছে কাঠের মিস্ত্রী, গয়না বানানোর কারিগর, চামড়ার জিনিষ বানাবাবার কারিগর এমনি নানা ছোটখাট পেশার সবাই।

এই তিন শ্রেণীই প্রথম শ্রেণীর অভিজাতদের নিয়মিত কর দিতে বাধ্য থাকবে।

চতুর্থ বর্ণে দাস। দাসরা কিন্তু তুয়ারেগ জাতির নয়। তুয়ারেগদের সব দাসই কৃষ্ণকায় আফ্রিকান ও প্রধানত নিলোটিক জাতির লোক। এদের অনেককে ছোটখাট হামলায় ধরে আনা হয়েছে। তবে বেশিরভাগই নানা কৃষ্ণকায় আফ্রিকান দলপতি বা রাজাদের থেকে নগদ মুল্যে কেনা। বা যুদ্ধের ক্ষযক্ষতির মুল্য স্বরূপ পাওয়া।

দাস হল তুয়ারেগদের উট গাধার মতই সম্পদ বিশেষ। কেনা বেচা যৌতুক আর উত্তরাধিকার সুত্রে হাতবদল হয় দাসরা। দাসদের সন্তানরাও দাস। দাসদের বাসস্থান তুয়ারেগদের মুল বাসস্থান আলাদা করে সামান্য দুরে হয়।

॥মাতৃতান্ত্রিক তুয়ারেগ॥

আফ্রিকা, আরব এলাকার মধ্যে ব্যাতিক্রমি তুয়ারেগদের বংশধারা ভিত্তিক সমাজে ক্ষমতার ধারা বহন করে মায়েরা। এদের সমাজে এমনিতে আর সবার মত পুরুষেরা সিদ্ধান্ত নেয়, অর্থ উপার্জন করে, যুদ্ধ করে, কিন্তু ক্ষমতার হাত বদল হয় মায়ের বংশধারা ধরে। কোন পুরুষ গোষ্ঠীপ্রধানের মৃত্যু হলে তার ছেলে প্রধান হবে না। পরবর্তি প্রধান হবে মৃত প্রধানের বোনের ছেলে।

এই প্রথার উৎপত্তি সম্ভবত অনেকটা অতীতেই। কারন তুয়ারেগদের রাজনৈতিক পরিচিতি শুরু হয় রাণী তিন হিনান এর সময় থেকে। ১৫০০ বৎসরের প্রাচীন তিন হিনানের সমাধি আছে আলজেরিয়ার হোগার পর্বতে। তুয়ারেগদের প্রাচীন ভাষা তিফানাগ লিপি পাওয়া গেছে একটি সমাধির দেওয়ালে। দশম শতাব্দি থেকে তুয়ারেগদের কথা লিপিবদ্ধ হয়েছে নানা পর্যটকের বিবরণে তারমধ্যে আছেন ইবন বতুতার লেখাও।

॥তুয়ারেগ ও ইসলাম ধর্ম॥

বাকি সব জাতির মতই তুয়ারেগদেরও নিজস্ব ধর্ম ছিল। সেই ধর্ম ত্যাগ করে তারা ইসলাম ধর্ম নিয়েছে। সপ্তম শতাব্দীতে উমাইয়া খিলাফতের আমলে তুগারেরা ইসলাম ধর্ম গ্রহন করে। দ্বাদশ শতাব্দীতে টিমবাকটুতে তুয়ারেগরা একটি বড় ইসলামিক সংগঠন গড়ে তোলে। ফলে ঐ এলাকা জুড়ে ইসলাম ধর্ম প্রসার সহজতর হয়ে যায়। এরপরে ষোড়ষ শতাব্দিতে তারা সুন্নিদের মালিকি সম্প্রদায়ের পন্থা গ্রহন করে। তবে তুয়রেগদের ইসলাম ধর্মে পরিবর্তন সবটাই সুন্দরভাবে কখনোই হয় নি। কারন তুগারেদের নিজস্ব প্রাচীন ধর্ম তারা পুরো ত্যাগ করেনি কোনদিনই। বহুকাল দুটোই চালিয়েছে পাশাপাশি। এখনো তাদের নানা প্রাচীন ধর্মাচার তারা বজায় রেখেছে। বিশেষ করে মৃতদের স্মরণে করা আচার অনুষ্ঠানগুলো তাদের পক্ষে সহজে ত্যাগ করা এখনো বেশ কঠিন।

তুয়ারেগদের প্রাচীন ধর্ম ছিল মুলত বার্বারদের ধর্মের অনুসারী। বার্বারদের নানা ধর্মীয় আচরন আর দেবদেবীর আরাধনা তুয়ারেগরা অনুসরন করত।

প্রাগঐতিহাসিক খনন কাজে মাগরেবে পাওয়া গেছে কবর। যেখানে মৃতদেহে গেরুয়া মাটির প্রলেপ দেবার প্রথা ছিল। এমন একটি কবরের দেওয়ালেই পাওয়া গেছে প্রাচীন তুয়ারেগীয় লিপিতে লেখা।

ধর্মীয়-সমাজিক স্তরে তুয়ারেগদের এখন যে নাম মাত্র মাতৃবংশধারা পালন করতে দেখা যায়, (মৃত প্রধানের বোনের ছেলে প্রধান হবে), অনুমান করা যায় ইসলাম ধর্ম গ্রহনের পর ইসলামিক প্রথাগুলোর পালনের বাধ্যবাধকতার ফলেই মুল প্রথা থেকে সরে এসে প্রতীকি প্রথায় আশ্রয় নেওয়া।

সম্ভবত গোড়াতে তাদের সমাজ পুরোমাত্রায় মাতৃপ্রধান সমাজই ছিল। নতুবা এমন একটা খাপছাড়া প্রথা গড়ে ওঠার কথা না। ইসলামিক ধর্মের প্রভাবে তুয়ারেগরা এখন বহুবিবাহ প্রথা পালন করছে ঠিকই, কিন্তু তাদের আদিম সমাজে বহুবিবাহ প্রথা ছিলো না, সেটা সহজেই বোঝা যায়। বহুবিবাহ প্রথা আর মাতৃবংশধারা পালন দুটো একসাথে সম্ভবই না।

তুয়ারেগ মেয়েরা তেমন নিয়মিত বোরখাও পরে না। তবে সাহারা মরুতে বসবাসের দরুন তাদের ছেলেরা মুখ মাথা ঢেকে রাখে একটুকরো কাপড় দিয়ে, যা পাগডি আর মুখের ঢাকা দুটো কাজই কর। এগুলো সাধারনত নীল দিয়ে রঙ করা হয়। তবে এই ছেলেদের মুখ ঢাকার অধিকার জন্মায় কেবল তাদের যৌবন এলেই। বালকদের মুখ ঢাকার প্রথা নেই। প্রসঙ্গত, তুয়ারেগদের মিথোলজীতে আছে তাদের সাতটি গোষ্ঠীর সবাই একই মায়ের সন্তান।

॥তুয়ারেগ সংস্কৃতি॥

অন্য সব আরব ও আফ্রিকান লোকেদের থেকে একেবারে ভিন্ন এই তুয়ারেগরা মুলত মাতৃধারা পন্থি। মায়ের পরিচয় তাদের পরিচয়। সম্পত্তিও মায়ের দিক থেকেই হাতবদল হয়। তুয়ারেগ সমাজে মেয়েদের সম্মান বেশ উঁচু।

তুয়ারেগদের তাঁবু বানানো একটা গুরুত্বপূ্র্ণ বিষয়। সাধারনত বিয়ের সময়ই তাঁবু তৈরী হয়। তাঁবুর মালিক নারী। তবে এখন যারা কৃষিকাজ শুরু করেছে তাদের আলাদা ঘর তৈরী হয় পুরুষদের জন্য। নতুন যে ধারা চলছে তা হল বাড়ির উঠানে একটি তাঁবু থাকবে তার অধিকারী হবেন বাড়ির মহিলাটি।

তুয়ারেগদের মধ্যে আছে নাচ গানের সংস্কৃতি। বাচ্চা আর তরুনদের বাজাবার জন্য চার রকমের বাদ্যযন্ত্র আছে।

তিন রকমের নাচ। একটা বসে বসে, মাথা কাঁধ আর হাত নাড়িয়ে। আরেকটা কিছুটা শক্তিশালী নাচ পুরুষদের একক বা জোড়ে। আর আরেকটি নাচ নারী পুরুষের মিলিত নাচ। আর নানা রকমের খেলাধুলাতো আছেই। বেশ লম্বা তালিকা।

॥বর্তমান ভৌগোলিক অবস্থান॥

২৫ লক্ষ তুয়ারেগদের বাসস্থান এখন সাহারার এলাকার লিবিয়া, আলজেরিয়া, নাইজার, বুরকিনা ফাসো, মালি, টিম্বাকটু আর উত্তর নাইজেরিয়া জুড়ে।

ঘটনা হল, গোড়াতে তারা একটিই জাতি আর একটি ভৌগোলিক এলাকাতেই বসবাস করত। কিন্তু ফরাসী উপনিবেশের সময় থেকে শুরু করে, বর্তমানের স্বাধীন হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রগুলো, তাদের ভিনভিন্ন রাজনৈতিক সীমানা ঠিক করে নেবার ফলে তুয়ারেগদের বাসভুমি বহুভাগে ভাগ হয়ে গেছে। ফলে এখন তারা এক জাতি বটে কিন্তু বিভিন্ন রাষ্ট্রের বাসিন্দা।

॥তুয়ারেগ জেনেটিক্স তথ্য॥

তুয়ারেগাদের জেনেটিক্স তথ্য মাইটোকন্ড্রিয়া বলছে এরা উত্তর আফ্রিকা থেকে আসা।

অটোসোমাল জেনেটিক্স বলছে তুয়েরগাদের উৎপত্তি ৯হাজার থেকে ৩হাজার বৎসর আগে উত্তর আফ্রিকাতে।

॥তুয়ারেগদের জন্য একটু সহানুভুতি॥

তুয়ারেগদের নিয়ে সহানুভুতি থাকবে কারন একসম তারা বিদেশি উপনিবেশিক শক্তির সাথে বহুকাল যুদ্ধ চালিয়েছিল। অত লম্বা সময় লড়তে পেরেছে খুব কম জাতিই। তার পরে তাদের সাথে কোন আলোচনা না করে স্রেফ কিছু ব্যবসায়িক রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশলগত কারনে তুয়ারেগদের বাসস্থান বহু খন্ডে ভাগ করে দেওয়া হল। তারা আচমকা হয়ে পড়ল বহু রাষ্ট্রের বাসিন্দা। একে অপরের সাথে দেখা করতে পাসপোর্ট ভিসা লাগবে।

একে তো নিজেদের দেশ নেই হয়ে গেল তার উপরে তারা হয়ে গেল প্রতিটি রাষ্ট্রে সংখ্যালঘু। ফলে রাষ্ট্রগুলোর শাসন ক্ষমতায় তাদের অংশ নেবার সম্ভাবনা হয়ে গেল শুন্যের বরাবর। আমাদের দেশ ভাগ হয়েছে। আমরা করিনি। অন্যরা করে দিয়েছে। আমরা জানি এই অসহায় দুরবস্থার কষ্ট। আমরা তবু দুই ভাগ। একবার ভাবুন এটা যদি আট ভাগ হত? আটটি ভিন্ন রাষ্ট্র হত? এই অসহায়ের নরক যন্ত্রনা তুয়ারেগরা ভুগছে সেই ১৯৬০ থেকে। কোন পরিত্রান নেই। আমাদের সহানুভুতি তাদের জন্য থাকবেই।

॥তুয়ারেগদের খারাপ দিক॥

তুয়ারেগরা একসময় গোটা সাহারা এলাকার বানিজ্যিক পথগুলো নিয়ন্ত্রন করতো। সেটা করতে পারতো কারন তাদের ছিল মরুভুমিতে বসবাসের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বিপুল সংখ্যার যোদ্ধা। তুয়ারেগদের মধ্যে যোদ্ধাদের অভিজাত শ্রেণীভুক্তিই বলে যুদ্ধ বা সশস্ত্র হানাদারিই ছিল তাদের সবচেয়ে লাভজনক পেশা।

আধুনিক কালে কিছু তুয়ারেগ কিছুকাল সুখে ছিল লিবিয়ার গাদ্দাফির কাছে। গাদ্দাফি তাদের যুদ্ধের কাজে ব্যবহার করেছিল। কিন্তু গাদ্দাফির জমানা শেষ হতেই তাদের সুখের কালের পরিসমাপ্তি। কেমন আছে লিবিয়ার তুয়ারেগরা? কেউ খোঁজ রাখে না। এমনকি লিবিয়াতে কত তুয়ারেগ বাস করে তা নিয়ে যে সংখ্যা পাওয়া যায় তা হল দশ হাজার থেকে ১লক্ষ। এর থেকেই বোঝা সহজ যে লিবিয়াতে তাদের কোন খোঁজ খবর কেউ রাখে না।

ফরাসীদের সাথে বহুবৎসর টক্কর দিতে পেরেছিল তুয়ারেগ যোদ্ধারা। সেটা ফরাসীরা মনে রেখেছিল। ফলে ফরাসীরা প্রথমেই ব্যবসায়ীদের উপর হানাদারী বন্ধ করে, কারন ফরাসীরা তো মরুভুমির বালিয়াড়ী দখল করতে আসে নি। তারা এসেছে টাকা কামাতে। টাকা আসবে নিরুপদ্রবে বানিজ্য চললে। কাজেই ব্যবসায়ীদের থেকে তুয়ারেগ যোদ্ধাদের কর আদায় বা হানাদারী এগুলোতে বাধা পড়তে থাকলো।

যে পশুপালকরা যোদ্ধাদের কর দিত তাদের উটের দেখাশোনা করত, তাদের থাকা খাওয়া আরামের ব্যবস্থা করত, সেই পশুপালকদের অবস্থাও পড়তির দিকে। কারন তাদের থেকে ফরাসীরাও কর চায়। তার উপরে নানা প্রশাসনিক বিভাগে ভাগ হয়ে যাওয়া এলাকায় স্বাধীন ভাবে পশুচারনে অসুবিধা শুরু হল। এর ফল কিন্তু ভুগতে হল সেই যোদ্ধাদেরই।

এখানেই শেষ না বরং এটা শুরু। অভিজাত যোদ্ধা বা সামগ্রিক ভাবে তুয়ারেগদের অর্থনীতি নির্ভর করত দাসদের উপর। দাস কেনাবেচার ব্যবসা থেকে আয় বাদেও দাসদের থেকে বিনা পারিশ্রমিকে পাওয়া কাজ তাদের আয়ের বড় উৎস।

ফরাসীরা দাস ব্যবসার বিরোধী। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও তারা এই জায়গায় ব্যর্থ হয়েছিল। তুয়ারেগদের রাখা দাসরা বংশানুক্রমিক দাস। কাকে আটকাবে কাকে মুক্ত করবে? ফরাসীরা নতুন দাস কেনা বেচায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও যারা দাস হয়েছিল তাদের মুক্ত করার চেষ্টা করেনি। সম্ভবত যোদ্ধদের সাথে বিরোধ নতুন করে বাড়িয়ে দিতে অনিচ্ছুক ছিল।

ফলে ১৯৬০ এর দশকে ফরাসী উপনিবেশগুলো স্বাধীন হয়ে তুয়াগেরাদের বেশ কয়েক ভাগে ভাগ করে ফেললেও তুয়ারেগ যোদ্ধাদের দাসেরা থেকে গেল আগের মতই দাস হয়ে।

এখন একটা হিসাবে তুয়ারেগদের জনসংখ্যার আট শতাংশই এই কৃষ্ণাঙ্গ দাসরা। দাসদের নিয়ে সমস্যা এখনো বজায় আছে। কারন ইতিমধ্যে স্বাধীন হওয়া দেশগুলোতে তুয়ারেগদের দেখাদেখি চোরা পথে দাস ব্যবসা আবার নতুন করে ছড়াতে বসেছে। বিশেষ করে মালিতে এই সমস্যা বেশ বড় হয়ে উঠেছে। এখন যে বিরামহীন জঙ্গী সংঘাত চলছে এই দেশগুলোতে, যদিও বলা হচ্ছে তার পেছনে মদত দাতা আল-কায়দা ইত্যাদি, তবু এত বৎসর ধরে ফরাসীদের অনেক সময়ে সক্রিয় সহযোগিতা সত্ত্বেও তাকে দমাতে না পারার কারন বলে ভাবা হচ্ছে যে আসলেই শুধু তুয়ারেগরাই না এই দেশগুলোর অর্থবান ধনী নাগরিকরাও চাইছে এই গোলাগুলি ভয়ের আবহ বজায় থাকুক, যাতে তাদের দাস ব্যবসা চালু থাকে। এই গোলাগুলি চালানো আর দাস ব্যবসা চালানো দুটোরই পেছনে তুয়ারেগরা। তুয়ারেগ সমাজের সবচেয়ে মর্যদাবান শ্রেণীর পেশাই তো যুদ্ধ আর দাস কেনা বেচা। @ তুষারমুখার্জী 


\॥বর্মার রাজার বাংলা আক্রমণের উদ্যোগ॥

03-04-2025©তুষারমুখার্জি

এই লেখায় বর্তমান মিয়ানমারের পুরানো নাম বর্মা ব্যবহার করা হয়েছে। লেখার মুল উৎস বর্মা রাজ দরবারের লিখিত দলিলদস্তাবেজের ইংরেজী অনুবাদ। সৌজন্যে জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়।

মিয়ানমারের, তৎকালীন বর্মার রাজা বোদাওপায়া একসময় স্থির করেছিলেন বাংলা বিহার তিনি দখল করে নেবেন, কারণ বলা হয়েছিল, বিধর্মী লোকেরা বুদ্ধের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করছে না। এই বিধর্মী লোক বলতে তিনি কিন্তু আদতে বৃটিশদের বোঝাতে চেয়েছেন।

অসমে মোয়ামারিয়া বিদ্রোহে দুর্বল অহোম রাজত্বে গৌহাটির ক্ষমতালোভী অসৎ অহোম প্রশাসক বদনচন্দ্র শাস্তি এড়াতে ইংরেজদের সাহায্য চেয়েও ব্যর্থ হয়ে বর্মার সহায়তা চায়। সুযোগ বুঝে বর্মার রাজা অহোমদের হটিয়ে গোটা অসম দখল করে নিল।(১৮১৬) অসমে শুরু হল আট বৎসর ব্যাপী বর্মার সেনাদের নারকীয় অত্যাচার আর হত্যাযজ্ঞের তান্ডব। সেই দখলের আট বৎসর এখনো অসমের লোককথায় –আতহ্কের সময়, মান'র সময়। মান বলতে বর্মিদের বোঝানো হচ্ছে।

সেই বর্মি হত্যাযজ্ঞের ফলে অসমের জমিতে চাষ করার লোক নেই হয়ে গেল। যে সামান্য কিছু বেঁচে ছিল তারাও কাছাড় সিলেট হয়ে বাংলায় আশ্রয় নিল। কৃষিকাজ করার লোকের অভাবেই হল দুর্ভিক্ষ। লোকক্ষয় এতটাই ছিল যে ইংরেজরা যখন অসমে নিজেদের প্রশাসন বিস্তার করে তখন গোটা অসমের জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৭৭ লক্ষ। ঐ সময়ে বর্মার রাজা অসমের সাথে মনিপুরও কার্যত দখলে নিয়ে নিল। তবে কাছাড় জয়ন্তিয়া তখনও স্বাধীন।

এটা চিত্রপটের একদিক। অন্যদিকে---

বর্মার রাজা ঘণিষ্ঠ প্রভাব বিস্তার করেছেন শ্যামদেশ তথা থাইল্যান্ডে, লাওস কম্বোডিয়া আর ভিয়েতনামে। নিবিড় বানিজ্যিক সম্পর্কের আড়ালে সামরিক পরিকল্পনারও আভাস দেখা যেতে লাগলো। লাওস কম্বোডিয়া ভিয়েতনাম এই সব এলাকায় তখন ফরাসীদের উপনিবেশ।

ইংরেজদের বানিজ্যপথ কলকাতা চট্টগ্রাম রেঙ্গুন হয়ে চিনে, আফিমের ব্যবসা চলছে বিপুল বিক্রমে।

বর্মার এই আগ্রাসী চালচলন দেখে ইংরেজরা প্রমাদ গুনলো। তাদের চিন বানিজ্যপথ না চিরশত্রু ফরাসীদের হাতে চলে যায়। তারচেয়েও বড় ভয় বর্মা যদি কক্সবাজার হয়ে চট্টগ্রাম দখল করে কলকাতা দখলের অভিযান চালায়।

ইংরেজ অনুমানে ভুল ছিলো না। বর্মার ছিল বৃহত্তর সাম্রাজ্যের স্বপ্ন। এই আগ্রাসী নীতির নিয়ন্ত্রক বর্মার সেনানায়ক মাহা বান্ডুলা। পরিকল্পনা ছিল বর্মার সেনানায়ক উজানা কাছাড়ের দিক থেকে সিলেট দখল করবেন, আর বান্ডুলা আরাকান হয়ে চিটাগাং দখল করবেন প্রথম ধাক্কায়। তার পরে দুই বাহিনি একত্র হয়ে কলকাতা।

পরিকল্পনা মাফিক কাজ শুরু হয়েছিল ১৮২৩এর সেপ্টেম্বর মাসে। পরিকল্পিত বিজয় যাত্রা শুরু করে বান্ডুলা দ্রুত রামু অবধি দখল করে কক্সবাজারের মাত্র ১৬ কিলোমিটার দুরে থেমে গেলেন। কেন থেমে গেলেন তা কখনো জানা যায়নি।

কক্সবাজার আর কলকাতায় ঘনিয়ে এল প্রবল আতঙ্ক। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সব নাবিক সহ সব ইংরেজ আত্মরক্ষার জন্য মিলিশিয়া গড়ে ফেলল।

এরই মধ্যে অসম থেকে বর্মি সেনানায়ক উজানা যদি অসম থেকে সিলেট হয়ে এগোতে শুরু করে তবে তো গেল সব।  ইংরেজরা দ্রুত কাছাড় আর জয়ন্তিয়া রাজার সাথে চুক্তি করে, সিলেট থেকে ১৬০০ সেনা পাঠিয়ে দিলো কাছাড়ে। উজানাকে আটকাতে হবে।

কাছাড়ে সামান্যই যুদ্ধ হল। আপাত দৃষ্টিতে গোলবারুদের সরবরাহে টান পড়ায় বর্মি সেনারা যুদ্ধে ক্ষান্তি দিল। সেই ফাঁকে বৃটিশরা গোয়ালপাড়া থেকে গৌহাটি পাঠাল তিন হাজার সেনা পদব্রজে। তারা গৌহাটি এসে দেখল সব ভোঁভাঁ। বর্মি সেনারা বর্মা ফিরে গেছে।

কেন বান্ডুলা কক্সবাজারে ঢুকলেন না বা উজানা কেন সিলেটে ঢুকলেন না, কেন বর্মি সেনা বর্মা ফিরে গেলে, সবটাই ইংরেজদের কাছে অবোধ্য ঝাপসা। তাহলেও ইংরেজ বুঝে গেছে কাছাড়-সিলেট পথের যুদ্ধে এযাত্রা পার পেলেও ভবিষ্যত অন্ধকার। 

ইংরেজরা নিল এক ভিন্ন পথ। কক্সবাজারকে রক্ষা করতে আন্দামান থেকে যুদ্ধ জাহাজে গিয়ে ১০ হাজার সেনার রেঙ্গুন আক্রমণ।

বার্মার শক্তিশালী স্থল বাহিনি থাকলেও জলপথে ইংরেজেদের কাছে একেবারেই ছেলেমানুষ। জাহাজে এসে হাজার হাজার ইংরেজ সেনা নেমে পড়ল বর্মাতে। জলপথে তাদের সরবরাহও অটুট থাকবে।

৫ই মার্চ ১৮২৪ ইঙ্গ–বর্মা যুদ্ধ সরকারী ভাবে ঘোষণা করা হল। ১১মে ১৮২৪, ১০ হাজার বৃটিশ সেনা রেঙ্গুনে ঢুকে পড়লো।

২০ জুন ১৮২৪  বর্মা রাজসভার ঘোষণাঃ-

"কিছু বিদেশির ব্যবহার ক্রিমিনালের মত। তারা ঘাঁটি গেড়েছেঃ পানোয়া(রামু কক্সবাজার), ঢাকা, মুর্শিদাবাদে। তাদের ধরার জন্য দুইজন মন্ত্রিকে সেনানায়ক হিসাবে পাঠানো হয়েছিল দুটি পথে। ফলে সেই বিদেশিরা ভয় পেয়ে বাঁচার আশায় সমুদ্রপথে কিছু সেনা পাঠিয়ে রাজ্যের প্রান্তিক এলাকা হান্তাথাওয়াডি (পেগু) এলাকায় গোলমাল পাকাচ্ছে। তাদের সবাইকে ধরা হবে। তাদের পালানোর সম্ভাব্য সব পথ বন্ধ করতে হবে। নিম্ম বর্মার সব শহরের গ্রামে সব নৌকা আর সক্ষম লোকেদের একত্র করতে হবে। যত সেনা আছে সবাইকে রওয়ানা দিতে হবে নিচে লেখা অধিকারীদের অধীনে।"

"এরা সব বিদেশিকে ধরবে। একজনও যেন বাদ না পড়ে। সব নৌকায় ঘোরানো যায় এমন কামান আর বন্দুক বসাতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে কামান চালাবার ঘাত যেন নৌকাগুলো সহ্য করতে পারে।"  (তারপরে লেখা আছে একজন মন্ত্রি সহ পাঁচজনের নাম, আর তাদের বর্তমান কর্মক্ষেত্র আর এই সেনাভিযানে তাদের দায়িত্ব।)"

ঠিক একমাস পরে

১৯ জুলাই ১৮২৪ বর্মা রাজসভার ঘোষণাঃ-

১. "বিদেশি বিদ্রোহীরা হান্তাথাওয়াডি (পেগু)আক্রমণ করেছে। রাজা যাচ্ছেন তাদের বন্দী করতে। স্থানীয় সেনাদের একত্র করতে হবে। খাবারদাবার কামান বন্দুক গোলা বারুদ সহ হাতি ঘোড়া নৌকা, বজরা সহ সব রকমের যানবাহন প্রস্তুত রাখতে হবে।"

২. "সেনানায়ক মন্ত্রী মাহা বান্ডুলার অধীনের থাকা ধন্নওয়াতি রণক্ষেত্রের সেনা  সেখানেই থাকবে।। তবে মাহা বান্ডুলা নিজে যাবেন হান্তাথাওয়াডি(পেগু)।"

৩. "কাছাড়ের আক্কাবাদে থাকা দুইজন রেজিমন্টাল অফিসার মনিপুরে থাকা সব সেনাকেও ফিরিয়ে আনবে।"

৬ অগাস্ট ১৮২৪ বর্মা রাজসভার ঘোষণাঃ-

১. "মহারাজ ইন্দগ্গাধম্ম মহারাজগুরু, পোনা থাথানা বিনো, ব্রাহ্ণণ বিষয়ক উচ্চতম অধিকারী, নরোত্তম নামে একজন ব্রাহ্মণকে বেনারস থেকে এখানে পাঠিয়েছেন। দোভাষী সওয়ে ডাউং থেড্ডি, কিয়াউ হ্তিন, যাগা বিয়ানকে রওয়ানা হতে হবে। তারা যাবে মধ্য ভারতে, লক্ষ্ণৌ, নেপালে, পাঞ্চাল আর সিড্ডারায়। তারা বৃটিশ বিরোধীদের সাথে যোগাযোগ করবে। উদ্দেশ্য বাংলার বৃটিশদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত ভাবে যুদ্ধ করে তাদের সবাইকে হত্যা করা।"

২. "প্রমান আছে যে পানওয়া(রামু-কক্সবাজার), চিটাগাং, ঢাকা, মুর্শিদাবাদ একসময়ে ধন্নওয়াতির (ম্রোক উ, মিও হুয়াং) অধীন ছিল। সেই ধন্নওয়াতি এখন বার্মা রাজ্যের অধীন। তাই বার্মার সেনা অভিযান চালাবে পাটনা অবধি। সেনাদের পাঠানো হোক। মহারাজ ইন্দগ্গামা ধম্ম মহারাজগুরু, পোনা থাথানা বিনো, ব্রাহ্ণণ বিষয়ক উচ্চতম অধিকারীকে এই ঘোষণা ভারতে প্রচার করার জন্য বলা হোক।"

৩. "প্রধান সেনাপতি মহা বান্ডুলা এই ঘোষণা সাংকেতিক শব্দের মাধ্যমে, লক্ষ্মৌ, নেপাল, পাঞ্চাল আর সিড্ডারার রাজাদের পাঠাবে।"

~(এই সিড্ডারা কোথায়? পাঞ্চাল রাজ্য তখন ছিল?)~

৩১ অগাস্ট ১৮২৪. বর্মা রাজসভার ঘোষণাঃ-

"ভারতে, যেখানে বৌদ্ধ ধর্মের কথা সবাই ভুলে গেছে, সেখানে ধর্মবিরোধী, নীতিজ্ঞানহীন বিদেশিরা ঘাঁটি গেড়েছে। বুদ্ধের ভক্ত বর্মার রাজা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে সব অধার্মিককে তিনি বিতাড়িত করে ভারতে আবার বৌদ্ধ ধর্মকে নতুন  জীবন দিয়ে সগৌরবে ফিরিয়ে আনবেন। সেই উদ্দেশ্য প্রধান সেনাপতি মহা বান্ডুলাকে পাঠানো হচ্ছে পেগুতে। সাথে থাকবেন রাজপুত্র থ্যাওয়াডি। ১৬ হাজার সেনাকে পাঠানো হবে নিম্ম বার্মা থেকে বিদেশিদের বিতাড়ন করতে। যেহেতু বান্ডুলা সেখানেই আছেন, আর সমস্যাটি তিনি একাই সামলাতে সক্ষম, তাই রাজপুত্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়েই অপেক্ষারত থাকবেন।"

~>> সেই ধর্মের নামে যুদ্ধ। যুদ্ধে প্রতি পরিবারের সক্ষম লোকেদের যেতেই হবে। তাদের থেকে খুব কমই ফিরে আসবে। তাই শুধু রাজাদেশে কাজ হবে না আর। একমাত্র তুমুল অন্ধ আবেগই যুগিয়ে যাবে অবধারিত মৃত্যুর মুখে দাঁড়ানোর জন্য যুবকদের। তা নাহলে কোথায় বর্মার ছোট্ট গ্রামের ধান কাটা যুবক আর কোথায় কলকাতা পাটনা। যেসব নাম সে কেন, তার বাপদাদাও শোনেনি, তা দখল করতে সে কেন প্রাণের ঝুঁকি নেবে?~  

১১ ডিসেম্বর ১৮২৫ বর্মা রাজসভার ঘোষণাঃ-

"আমাদের পূর্বজদের আমল থেকে বৌদ্ধ ধর্ম পালনে প্রচুর উন্নতিই হয়েছিল এই রাজ্যে। ইদানিং কিছু ধর্মে অবিশ্বাসীদের আক্রমনে সেই গৌরবময় অতীত থেকে কিছুটা পিছিয়ে গেছি। ধর্মের রক্ষক হিসাবে রাজা এই পরিস্থিতির পরিবর্তন আনতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সেই উদ্দেশ্যে তিনি এক বিরাট সেনাবাহিনি নিয়ে হানথাওয়াড্ডি(পেগু) আর ইয়াঙ্গনের দিকে এগুচ্ছেন। প্রথমে তাদের বিদ্ধস্ত করবেন, তারপরে আক্রমণ করে জয় করবেন ভারত। সমস্ত সেনা একত্র করে রাজধানীর প্রতিরক্ষা দৃঢ় করুন। অভিযান শুরুর জন্য শুভ দিনক্ষণ জ্যোতিষরা বলে দেবেন। মাহা মিন হ্লা থিহা থু, উন-দাউক সহকারী মন্ত্রি পাগানে গিয়ে নদীর ভাটির দিকে সাময়িক প্রাসাদ গড়ার ব্যবস্থা করবে।"

~পরাজয় নিশ্চিত, রাজধানী রক্ষার শেষ চেষ্টা চলছে, তারই সাথে রাজধানী থেকে পালিয়ে গেলেও রাজার থাকার অসুবিধা না হয়, তাই যুদ্ধের মধ্যেও নতুন প্রাসাদ গড়ার কাজ চালু হয়ে গেল।~

দুইমাস পরে।

১৬ ফেব্রুয়ারী ১৮২৬,

পরজিত বার্মার রাজা ইংরেজদের সাথে সন্ধিচুক্তির আলোচনা শুরু করে দিয়েছেন। এই সন্ধিচুক্তিই ইয়ান্ডোবো চুক্তি নামে পরিচিত হবে।

তথ্যসূচীঃ-

১. Summary of Each Order in English. THE ROYAL ORDERS OF BURMA, A.D. 1598-1885 1988, 8: 1-310,   By:- THAN, TUN.

Published by Kyoto University Research Information Repository.

২. এ হিস্টোরি অফ আসাম। লেখক ই এ গেইট।, ইন্ডিয়ান সিভল সার্ভিস। প্রকাশকঃ দি থ্যাকার, স্পিঙ্ক অ্যান্ড কোং, কলকাতা, ১৯০৬.

৩. বৃটিশ এম্পায়ারস ফার্স্ট এন্ট্রি ইন্টু আসামঃ  মনিমুগ্ধ শর্মা, টাইমস অফ ইন্ডিয়া, মার্চ ১৬ ২০১৩



শষ্য আর ভেড়ার তর্ক॥

॥সুমের রম্যরচনা॥

এটা একটা সুমের কাহিনী। যদিও কাহিনীতে বলা আছে একেবারে যখন মানুষ কাপড়ও পরতো না সেই প্রাচীন কালের কথা এটা, কিন্তু সেটা হল গল্পের অংশ মাত্র। আলাদা গুরুত্ব নেই। এটা হয়ত সাড়ে তিন চার হাজার বৎসর আগের গল্প হবে। সঠিক জানা নেই।

এটা কি গল্প? না তা না। এটা এমনি একটা হাল্কা লেখা। শষ্য আর ভেড়ার বিতর্ক। কে বেশি ভালো বা বেশি কাজের। এমন কথোপকথন বাংলাতেও আছে মনে পড়ছে, বোধ হয় পেট মাথা এসব নিয়ে। সুমেরদের এমন বিতর্ক আছে মোট সাতটি।

এতে কোন গভীর তত্ত্ব কথা রূপক কিছুই নেই। শুধু হাল্কা মজার কথা।

আর সেখানেই এর গুরুত্ব। আজ থেকে চার হাজার বৎসর আগের লোকেরা যে এমন রম্য রচনায় হাত পাকিয়েছিলেন সেটাই সব চেয়ে বড় কথা।

সে অনেকদিন আগের কথা। সেই এক দেশ ছিল, যেখানে আকাশ মিশেছে মাটির সাথে। সেই দেশে আনুদেব তখনো শষ্যের সৃষ্টি করেন নি, ভেড়ারও সৃষ্টি করেন নি। মহান আনুনা দেবতারা কোন শষ্যের নামও শোনেনি। তখন উত্তুদেবীর জন্য না ছিল চরকা না ছিল তাঁত। থাকবেই বা কি করে। তখন তো আর অত উল পাওয়া যেত না। অত উল থাকবেই বা কি করে তখন তো আর একটা ভেড়ার দুটো ছানা হতো না। আর একটা ভাড়ার দুটো ছানা হবেই বা কি করে। ভেড়াই তো ছিলো না।

তখন কারুর ঘরে পঞ্চাশ দিনের শষ্য মজুত থাকতো না, চল্লিশ দিনের এমন কি ত্রিশ দিনের শষ্যও মজুত থাকতো না। কারুর বাড়িতে না। এই দেশেও না, পাহাড়ের দেশেও না, কোন পবিত্রদেশেও না। কোথাও না। কারন তখন তো শষ্যই জন্মায় নি।

তখন লোকে কোন পোশাক পরত না। রাজাদের মাথায় পাগড়ীও থাকতো না। পোশাক বানাবে কে, পোশাক বোনার দেবী উত্তুও তো তখন ছিলোই না। দেবী থাকবেই বা কেন, পোশাকই যদি বানানো না হত।

পোশাক বানাবে কি পোশাকের জন্য দরকারী ভেড়ার লোম তো নেই। লোম থাকবে কি করে, ভেড়াই তো নেই। ভেড়া থাকবে কি, পশুদের দেবতা চাক্কানও তখন কোথাও নেই। না মাঠে, না বনে, কোথাও নেই।

মানুষ ছিল। কিন্তু সেই মানুষের তখন পোশাক নেই বলে ন্যাঙটো ঘুরে বেড়াত মাঠে মাঠে, আর গম বার্লি কিছুই নেই বলে রুটিও নেই। তাই কি আর করা, মানুষ তখন ভেড়াদের মত মাঠে ঘাস খেত। গর্তে জমা জল চুমুক দিয়ে খেত।

অবশেষে দেবতারা যেখানে থাকতেন সেই পবিত্র আর উঁচু টিলায়, দেবতাদের পবিত্র বাসভুমে তাঁরা শষ্য আর ভেড়ার সৃষ্টি করলেন। দেবতাদের ভোজন কক্ষে আনুনা দেবতারা ভাড়ার মাংস আর রুটি খেলেন, ভেড়ার মিষ্টি দুধও খেলেন। খেলেন বটে তবে তৃপ্তির ঢেকুর উঠলো না। পেটই ভরেনি তো ঢেকুর উঠবে কোথা থেকে। সব কিছুই এত কম।

তাই তাঁরা ঠিক করলেন মানুষদের দিয়ে দেওয়া হোক শষ্য আর ভেড়া। তারা চাষ করে, লালন পালন করে অনেক শষ্য আর অনেক ভেড়া করুক। অনেক হলে তবে না পেট ভরবে।

সেই মত এনকিদেব বললেন এনলিলদেবকেঃ এই পবিত্র টিলায় শষ্য আর ভেড়া সৃষ্টি তো হল, এবার বরং এদের নীচে পাঠিয়ে দি। নীচে থাকা মানুষদের কাছে।

নীচে মানুষদের দেশে ভেড়াদের থাকার জন্য খোঁয়াড় তৈরী হল। সেই খোঁয়াড়ে ভেড়াদের ঘাস লতাপতা খেতে দেওয়া হল।

শষ্য চাষের জন্য জমি লাঙল জোয়াল সব দেওয়া হল।

এবার পরিশ্রমী মানুষেরা খুব তাড়াতাড়ি সব কাজ শিখে নিল। এখন ভেড়ার খোঁয়াড়ে পরিশ্রমি যুবক বিশাল ভেড়ার পালকে খাবার দিচ্ছে। ফসলে ভরা গমের মাঠে ঝলমলে হাসিখুশি তরুনীর কোমরে গমের বোঝা। মানুষের দেশেই স্বর্গের আনন্দ নেমে এল। ঝলমল করতে থাকল শষ্য আর ভেড়ায় ভরা মানুষের দেশ।

শষ্য আর ভেড়া নিয়ে এল অঢেল সম্পদ। দেশে আর খাবারের অভাব নেই।  দেবতাদের মধ্যেও এল সমৃদ্ধির আনন্দ। সবার মজুত ভান্ডার উপচে পড়ল শষ্যে আর ভেড়ায়। প্রতিটি গোলা প্রতিটি খোঁয়াড় ভরপুর এখন। যারা একসময় ধুলো ময়লায় কষ্টে থাকতো তারা এখন আর কষ্টে নেই। যেখানেই শষ্য আর ভেড়া সেখানেই সম্পদ। শষ্য আর ভেড়া দুজনই সমান ভাবে সব মানুষকে সম্পদশালী করে দিল। আনুদেব আর এনলিলদেবের মনপ্রাণ খুশিতে ভরে গেল।

এমন হাশিখুশির দিনে এক পানশালায় লোকেরা সুমিষ্ট প্রিয় পানীয় পান করতে করতে আলোচনা করছে কোন জমিতে আরো ভালো ফসল ফলানো যাবে কোন মাঠে ভালো ঘাস পাওয়া যাবে। এই সব আলোচনা করতে করতে শুরু হল এক বিতর্ক। কার উপকারিতা বেশি, গম না ভেড়া।

সে বিতর্কে যোগ দিল শষ্য আর ভেড়াও। তারাও তাদের নিজেদের কথা বলবেঃ

শষ্যঃ শোন বোন ভেড়া, আমি কিন্তু তোর চেয়ে ভালো। আমি সব সময় এক কদম এগিয়ে। আমি রাজপ্রাসাদে ঠাঁই পাই। রাজার উপচে পড়া ভান্ডারে থেকে রাজার গৌরব ছড়াই দেশ দেশান্তরে। আমি হলাম সেরা রাজপুত্রের মত। আমিই আনুনা দেবতাদের মানুষকে দেওয়া সব দানের সেরা দান। আমি তাদের শক্তি জোগাই বলেই রাজার সেনারা বিশাল বিক্রমে লড়াই করতে ভয় পায় না তারা যু্দ্ধ করে এমন ভাবে যেন মাঠে খেলা করছে।

আমি প্রতিবেশিদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক গড়ে দি (ভুরিভোজে)। তাদের ঝগড়াও মিটিয়ে দি (শষ্য বিনিময়)। আমি খালি পেটের দুঃখী বন্দীর মনে ভরসা জোগাই সে দুর্বল হবে না। আর আমাকে পেলে তার শক্তিও বাড়ে, তাই সেই বন্দীর কাছে তার বন্দীত্বের শেকলের ওজন হাল্কা হয়ে যায়।

ভেড়া রে, শুনে নে, আমি হলাম এনলিলের আদুরে মেয়ের মত। আমিই এজিনা-কুশু(সব রকমের শষ্যদানা)। তোকে তো সবাই কেবল খোঁয়াড়ে আটকে রাখে, আর চোঁচাঁ করে দুধ টেনে বের করে। শুনলি তো কেন আমি সেরা। এবার না হয় তুই বল, যদি কিছু বলার থাকে।

ভেড়াঃ ওরে বোন শষ্য, তুই তো অনেক কথাই বলে ফেললি। শোন তবে বলি। আমাকে সেই পবিত্র টিলা থেকে এনেছিলেন স্বয়ং আনুদেব। উত্তুদেবী যত ঝলমলে রাজপোশাকের সুতো বানান সবই তো আসে আমার গা থেকে। এই সব চারদিকের যত পাহাড় বন তাদের রাজা হলেন চাক্কান, আর তিনিই তো আমার দেবতা। সে চাক্কান দেব বিশাল দড়ি দিয়ে সব পাহাড়কে বেঁধে রাখেন। কেউ বেগড়বাঁই করতে পারে না। চাক্কানের আছে লম্বা ধনুক। আছে বিশাল গুলতি। তাঁর কেউ ভয়ে ট্যাঁ ফোঁ করতে পারে না।

রাজার সেনাদের কথা বলছিলি না, আরে রাজার সেনারা তো ভেড়ার মাংস খেয়েই গায়ে অত জোর পায়। চাষ করার জন্য মাঠে যারা কাজ করে তারাও মাংস খায়। আর কাজ করতে করতে তেষ্টা পেলে আমারই চামড়ার থলিতে জল ভরে নিয়ে সেই জল খায়। বুঝতেই পারছিস চামড়ার থলি না থাকলে অমন ঠান্ডা জল পেত না, জল না পেলে তোর পেছনে অত খাটতেই পারতো না। আর শুধু জল কেন? চাষিদের পায়ের চটিও তো সেই আমারই চামড়ায় বানানো। আর তেল? সব রকম তেল, সুগন্ধী তেল সহ সব দেবভোগ্য তেলও তো চামড়ার থলিতেই রাখা থাকে।

আরো আছে। আমার সাদা উলে বানানো পোশাক পরেই রাজা সভায় বসেন। আমার মাংসে দেবতাদের শরীরও পুষ্ট হয়। যে সব পুরোহিত মন্ত্রোচ্চারন করেন, সব কিছু পরিশুদ্ধ করেন, সেই পুরোহিতরা স্নান করে আমারই লোমে তৈরী পোশাক পরেন। তারা যখন পবিত্র ভোজনে বসেন তখনো তো আমিই থাকি। এই গুলো সব সময় থাকবে।

কিন্তু তোকে চাষ করার জন্য, ঘরে আনার জন্য যা কিছু, যেমন লাঙল, জোয়াল, ফসলের গাঁট বাঁধার দড়ি, এই সবই তো আজ আছে কাল নেই। তাহলে কে সেরা সেটা বুঝলি তো? এবার বল আর কিছু বলার আছে তোর?

শষ্যঃ আহা, কি বললি!!! ওরে, যখন আটা মেখে নরম তাল বানায়, যা দিয়ে নরম নরম রুটি বানাবে, সাজিয়ে রাখে গ্লাসে গ্লাসে বিয়ার, সেগুলোতো গমের আর বার্লিরই হয়। তখনো তো তোর রান্না ঘরের ধারে পাশে আসার নাম নেই। তুই মাংসের টুকরো, তুই পড়ে থাকিস রান্না ঘরের এক পাশে। কারণ আমাকে না হলে তোকে দিয়ে তো আর পেট ভরবে না।

মনে করে দেখ, তোর রাখাল মাঠে আমাকে দেখে লোভীর মত তাকিয়ে থাকে তোকে খাওয়াবে বলে, আর আমার চাষি তোর রাখালকে কাস্তে হাতে তাড়া করে।

তারপরে ভাব তুই যখন মাঠে বনে ঘুরে বেড়াস তখন তো সব সময় ভয়ে ভয়েই থাকিস, পাছে সাপে কামড়ায় বিছায় কামড়ায়। আবার কখনো অন্য লোকেরা এসে তোকে চুরি করে নিয়ে যায়। আমার ভাই ওসব ভয় টয়ের বালাই নেই।

আর প্রত্যেক রাত্রে তোর রাখাল তোদের সবাইকে এক এক করে গোনে, কটা মাদি কটা মদ্দা, কটা বাচ্চা কটা জোয়ান। সব খোঁয়াড়ে ঢুকেছে তো? গুনে গুনে মাটিতে দাগ কাটে রাখাল। রাখালের কত খাটনি হয় তোর পেছনে।

আরো আছে। যখন শহরে হাল্কা বাতাস আর মাঠে ঝড়ো বাতাস তখন তোদের থাকার জন্য, দুধ দুইবার জন্য রাখালকে ছাউনি দেওয়া ঘর বানাতে হয় কষ্ট করে।

অথচ আমাকে দেখ আমি বাতাসে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে মাঠে নাচতে থাকি। আমার জন্য চাষিকে ছাউনি বানাতে হয় না। আমি হলাম জাত যোদ্ধা, ওসব হাওয়া টাওয়াকে আমি পাত্তাই দি না। এবার বলতো এসব গুন আছে তোর? সব সময় তো পুতুপুতু করে থাকতে হয় তোকে। বুঝলি কেন আমি নিজেকে সেরা বলি? বল কি বলবি, আছে উত্তর?

ভেড়াঃ তুই তো ভালোবাসিস ঘোড়া খচ্চর। যখন বিদেশি শত্রুই হোক দেশি বদমাসই হোক ঘোড়া আর খচ্চরের পা দিয়ে তোকে মাড়াই করে তখন কেমন লাগে রে? পাহাড় থেকে আসা দাস, গরীব ঘরের বৌ বা গরীব ঘরের বাচ্চা তোকে দড়িতে ঠেঁসে বেঁধে এনে ফেলে মাড়াই করার ঘরের মেঝেতে, তারপরে তোর কানে মাথায় গায়ে পাঁড়িয়ে মাঁড়িয়ে পিটিয়ে তোকে আলাদা করে। তারপরেও পিষে পিষে গুঁড়ো করে তখন কেমন লাগে? তখনো মনে হয় তুইই সেরা?

এটাই শেষ না। এরপরে তোকে নিয়ে যাবে আরেকজন। জল মেখে কচলে কচলে তোর দলা পাকাবে, ঢোকাবে আগুনের চুল্লীতে। গরমে জ্বলবি আর ফুলবি। ততক্ষণে আমি কিন্তু সেজেগুজে খাবার টেবিলে। শোন বাপু খাবার টেবিলে আমিই আগে উঠি। তুই পরে। শোন সোজা কথা হল তোকেও খাবে আমাকেও খাবে।

তাহলেও আমার রাখাল তবু আমাকে দেখাশোনা করে বিক্রীর আগে। তোকে যারা পিষে পিষে আটা বানায় তারা কি খুব ভালো মানুষ বলে তোর মনে হয়? বল। বল। কি বলবি বল।

শষ্যঃ (ভেড়া তাকে পেষাই করার কথাটা অত বাজে ভাবে বলায় মনে খুব দুঃখই পেল, একটু রাগও হল, গলায় ঝাঁঝ চলে এল)ঃ ইসকুর তোর সৃষ্টি দেবতা, চাক্কান তোর রাখাল দেবতা, তা না হয় হলো, তাতে অত গুমোর কেন রে?

তুই তো থাকিস শুকনো মাটিতে। তোর ঘরে আগুন মাঠে আগুন, তবু পালাতে গেলে তোর পায়ে লাঠি মেরে খোঁড়া করে দেয়। মাঠে আর ঠিকঠাক হাঁটতেও পারিস না। এর পরেও বলছিস তুই সেরা আর সেটা আমাকে মানতে হবে? তোকে তো টুকরো টুকরো করে তোর চর্বি বের করে বাসনের মধ্যে ভরে বাজারে বিক্রী করে।

তোর চর্বি যখন বিক্রী করে তখন বাজারে বলেঃ যে পাত্র থেকে তোর চর্বি বের করা হল সেই পাত্রটিই শষ্যদানা দিয়ে ভরে দিতে। মনে রাখিস তোর বিক্রীর দাম হিসেব হয় আমাকে দিয়ে।

শেষ পর্যন্ত এই তর্কের রায় দেবার জন্য এনকিদেব এনলিল দেবকে বললেনঃ এনলিল শষ্য আর ভেড়া হল দুই বোন। আমার মনে হয় ওদের সেরকমেই থাকা উচিত।

তবে কি না আসলেই শষ্যই বেশি দরকারী। কাজেই ভেড়াকে হাঁটু গেড়ে শষ্যের কাছে বসতে হবে। ভেড়া শষ্যের পায়ে চুমু খাক। ভোর থেকে রাত, সবসময় শষ্যের জয়গান গাওয়াই উচিত মানুষের, কারণ মানুষকে পেটের খিদে মেটাবার জন্য চিরকাল শষ্যের কাছেই বাঁধা থাকতে হবে।

নিয়ম করে দিলাম, এখন থেকে যার কাছে রুপা আছে, যার কাছে মনিরত্ন আছে, যার কাছে গরু মোষ আছে, বা যার কাছে ভেড়া ছাগল আছে, সবাইকে যার কাছে শষ্য আছে তার দোরে আসতে হবে।

শেষ হল শষ্য আর ভেড়ার তর্ক। জ্ঞানের দেবতা এনকির বিচারে শষ্যই সেরা বলার তর্কে জিতল। এনকি দেবের জয় বল সবাই। ©তুষারমুখার্জী.11.03.2022 তথ্যসূত্রঃ- 1. The Debate between Sheep and Grain: Translation. : The Electronic Text Corpus of Sumerian Literature. University of Oxford.



॥জর্জিয়ার রাণী কেটেভান (1560-1624)॥

জর্জিয়ার বাগ্রাটোনি রাজপরিবারের কন্যা কেটেভান বিয়ে করেন কাখেতির রাজপুত্র দাভিতকে। কাখেতির রাজা আলেজান্ডার ২য় আরো দুটি পুত্র জর্জি ও কনস্টানটাইন থাকলেও প্রচলিত আইন অনুযায়ী দাভিতই সিংহাসনের উত্তরাধিকারী।

উচ্চাভিলাসী কনস্টানটাইনের এটা না পসন্দ। অতএব তিনি এক বিপদজনক পরিকল্পনা করে ইসলামধর্ম গ্রহন করে। এবং আশ্রয় নেন পারস্যের সম্রাট শাহ আব্বাস-১ম এর রাজসভায়।

কেটেভান-দাভিতের বিয়ের কয়েক বৎসর পরে রাজা আলেকজান্ডার-২য় রাজক্ষমতা ত্যাগ করে সন্ন্যাস গ্রহন করেন। রাজপ্রাসাদ ছেড়ে চলে যান কাথেতির এক প্রাচীন চার্চ আলাভার্ডিতে। কিন্তু মাত্র চারমাস রাজত্বের পরেই নবীন রাজা দাভিতের মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে দাভিত রেখে গেলেন দুটি সন্তান পুত্র তৈমুরাজ, আর কন্যা এলিন এর দায়িত্ব রাণী কাটাভানের উপর।

দাভিতের মৃত্যু সংবাদ পেয়েই পারস্য থেকে ছুটে আসেন কনস্টানটাইন মির্জা। দ্রুত পিতা আলেকজান্ডার-২য় ও ভাই জর্জিকে হত্যা করে আদেশ বা নির্দেশ মত দুটি মস্তক ভেট পাঠালেন পারস্যের শাহ আব্বাসকে। দেহদুটো অবশ্য আলাভার্ডির চার্চে পাঠানো হয় কবর দেবার জন্য।

রাজ্যের আইন অনুযায়ী রাজা হলেন দাভিত পুত্র তৈমুরাজ। বেশিদিন না। দ্রুত শাহ আব্বাস-১ম কাখেতি আক্রমন ও দখল করে নিয়ে অবাধ লুন্ঠন চালালেন। রাজপ্রাসাদ ও সব চার্চগুলো ধ্বংস করা হলো দ্রুত। এবং তখনকার রাজমাতা রাণী কেটেভান ও দাভিতের দুই সন্তানকে বন্দী করে নিয়ে গেলেন সিরাজ শহরে।১৬১৩।  

তারপরে শাহ আব্বাস আদেশ করলেন রাণী কেটেভানকে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করতে এবং তাঁকে বিয়ে করতে। কেটেভান সম্রাটের আদেশ অগ্রাহ্য করলেন। এর ফল কি হবে তা জানা। মনে মনে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হলেন।

ঠিক তাই মোট দশ বৎসর তিনি শাহ আব্বাস-১মএর কারাগারে বন্দী জীবন কাটিয়েছিলেন। এবার এই প্রত্যাখ্যান পর্বের পরে তাঁকে উৎসব সাজে সজ্জিত করে ভীড়ে ভর্তি এক উন্মুক্ত প্রাঙ্গনে নিয়ে যাওয়া হল।(২২ সেপ্টেম্বর ১৬২৪)

তারপরের ঘটনাবলীর লিখিত বিবরণ থাকলেও সেই নারকীয় নৃশংসতার বর্ণনা আমি লিখতে পারলাম না।

যাঁদের স্নায়ু ইস্পাতের বা যারা হরর মুভি ভক্ত তাঁরা ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রকের আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার প্রকাশিত দুইপাতার প্রতিবেদন পড়ে নেবেন।

সেখানে উপস্থিত ছিলেন পর্তুগালের সেন্ট অগাষ্টাইন ক্যাথলিক মিশনারিদের দুইজন। এনারা রাণীর ক্যাথলিক খৃষ্টিয় ধর্মাপ্রথানুসারে রাণীর কনফেশন বেনার জন্য এসেছিলেন প্রায় এক বৎসর আগেই। তারাই গোপনে রানী কেটেভানের দেহাবশেষ নিয়ে যায় জর্জিয়ার আলাভার্ডি চার্চে কবর দেবার জন্য। এবং তারা এই দেহাবশেষের অংশ বিশেষ ইয়োরোপের একাঠিক ক্যাথলিক চার্চে দান করেন স্মৃতি পেটিকায় রেখে।

কথিত সেখান থেকেই দেহাবশেষের একটি স্মৃতিপেটিকা ঐ পর্তুগীজ মিশনারীরা গোয়ার সেন্ট অগাস্টাইন চার্চেও নিয়ে আসে।

ঘটনার খুব কিছু প্রামান্য বিবরণ বা প্রমান না থাকলেও চার্চে রক্ষিত নানা নথীতে তার উল্লেখ ছিল। কথিত যে কেটেভানের ডান হাতের হাড় আনা হয়েছিল গোয়াতে (১৬২৭) এবং রাখা ছিল সেন্ট অগাস্টাইন চার্চে। শুধু ডান হাতের হাড়, আমাদের ভাবতে অসুবিধা হলেও, আসলে কেটেভানের দেহটি ঐ রকমই, অনেক টুকরোয় ছিল।

কেটেভানের দেহাবশেষ জর্জিয়ার লোকেদের কাছে ধর্মীয় আবেগে ভরপুর। জর্জিয়া সরকার ভারত সরকারকে অনুরোধ জানালেন ঐ পবিত্র দেহাবশেষ যেন জর্জিয়াতে পাঠানো হয়। ২০১৭ তে ভারত সরকার আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া আর জর্জিয়া সরকারের মধ্যে এক চুক্তি সাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তি অনুযায়ী সেই পবিত্র স্মৃতি ছয় মাসের জন্য জর্জিয়াতে থাকবে প্রদশর্নের জন্য। পরে সেই প্রদর্শন কাল আরো ছয় মাস বাড়ানো হয়।

এর আগেই রানী কেটেভান-কে সন্ত বলে ঘোষণা করেছে জর্জিয়ার অথর্ডক্স চার্চ। কিন্তু সমস্য হল পর্তুগীজ সেন্ট অগাষ্টাইন ভক্ত সম্প্রদায় ইয়োরোপের নানা শহরে রাণীর দেহাবশেষের টুকরো বিতরণ করলেও তার বেশিটাই এখন নিখোঁজ। এদিকে জর্জিয়ার আলাভার্ডি চার্চে থাকা দেহাবশেষ ১৭২০ তে এক আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য তা সরিয়ে ফেলার সময় নদীতে ডুবে যায়। ফলে বর্তমানে এই মহিয়সীর দেহাবশেষ একমাত্র ভারতেই আছে। যা ভারতের বিজ্ঞানীরা অনেক কষ্টে খুঁজে বের করেছিল ২০০৫ এ।

এখন জর্জিয়ার চায় ভারত তাদের হাতে সেই পবিত্র দেহাবশেষটুকু তুলে দিক। কিন্তু ভারতেও তো অনেক ভক্ত আছে। তারা চায় ভারতেই থাকুক।

তাই ভারত সরকার পবিত্র অস্থির একাংশ জর্জিয়া সরকারের হাতে তুলে দিতে সম্মত হয়।  অবশেষে জুলাই ২০২১ সেই পবিত্র দেহাবশেষ জর্জিয়া সরকারের হাতে তুলে দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর।  

এর মধ্যে আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার অংশগ্রহন স্বাভাবিক। প্রাচীন যা কিছু সবই তাঁরাই দেখাশোনা করবেন। কিন্তু জেনেটিক্স এল কোথা থেকে?

গোয়াতে রাখা দেহাবশেষ যে সত্যিই রাণী কেটেভান-এর সেটা জানার কাজে লাগলো জেনেটিক্স।

জর্জিয়ার কাখেতি রাজ্যের রাণী কেটেভান যে দশ বৎসর সিরাজ শহরে ইরাণ সম্রাটের বন্দী ছিলেন ইতিহাস স্বীকৃত। অথচ ইরাণের ইতিহাসবেত্তাদের চোখে শাহ আব্বাস-১ম এক মহান সম্রাট। তাই শাহ আব্বাস-১ম কেটেভানকে হত্যা করেছিল সেটা মেনে নিতে তাঁদের বেশ আপত্তি।

তবে সেই হত্যাকান্ডের কথা অবশ্য পাওয়া গিয়েছিল শাহ আব্বাস ১ম এর সভাসদ এসকেন্দর বেগ মুন্সীর লেখায়।

তার সাথে পাওয়া গেল সেন্ট অগাস্টাইন ভক্তদের মধ্যে দুইজনের কথা। এরা সিরাজ শহরে বন্দী কেটেভান এর সাথে দেখা করেছিলেন এবং খৃষ্টীয় প্রথানুযায়ী বন্দী কেটেভান এঁদের কাছে "কনফেশন" করেন। মৃত্যুর পরে এরাই কেটেভানের দেহাস্থি নানা জায়গায় বিতরণ করেন বেশ কয়েক বৎসর ধরে। তারই অংশ হিসাবে গোয়ার সেন্ট অগাস্টাইন চার্চেও দেহাস্থি আসে।

পুরাতত্ত্বঃ-

১৯৮০ র দশকে জর্জিয়া সোভিয়েত রাশিয়ার অঙ্গ। সোভিয়েত রাশিয়া ভারতকে অনুরোধ জানায় জর্জিয়ার এই পবিত্র দেহাস্থি খুঁজে দেবার জন্য। তখন থেকেই খোঁজ শুরু হয়। চার্চে রাখা বহু পুরানো নথি নক্সা পাঠ করে আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করে সম্ভাব্য দেহাস্থি। স্মৃতি পেটিকা আসার পরের দীর্ঘকালে এই চার্চের বহুবার সংস্কার করা হয়। ফলে দেহাবশেষ রাখা পাত্র ঠিক কোথায় আছে তার হদিস আর পাওয়া কঠিন। প্রাচীন নথি পাঠ করে বোঝা গেল ভল্টে রাখা ছিল।

এবার সবচেয়ে বড় সমস্যা হল চার্চের যে ভল্টে এই পবিত্র অস্থির স্মৃতি পেটিকা রাখা ছিল সেটা পুরো ভেঙ্গে পড়েছিল। ফলে পাথরের ঐ স্মৃতি পেটিকাও ভেঙ্গে যায়। সেখানেই আবার আরো দুটি অনুরুপ স্মৃতি পেটিকায় আরো দুটো অস্থি ছিল ভল্টের দেওয়াল ঐ পেটিকার উপরেই ভেঙ্গে পড়ায় অস্থিগুলো বাইরে ছিটকে চলে যায়। বহু খোঁজের পর পুরাতত্ত্ববিদরা অস্থি তিনটিই উদ্ধার করেন। এবং পেটিকার ঢাকনাও পেয়ে যান।

তিনটি দেহাস্থি। সি.কিউ.টি-১, সি.কিউ.টি-২,  সি.কিউ.টি-৩,

জেনেটিক্সঃ-

এবার প্রশ্ন এই তিনটির মধ্যে কোনটি রাণী কেটেভানের অস্থি সেটা জানা।

এগিয়ে এল হাদ্রাবাদের সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজি (সি.সি.এম.বি)এগিয়ে এল। দল গড়া হল থঙ্গরাজ নীরজ রাই জ্ঞানেশ্বর চৌবে লালজি সিং এবং আরো অনেকে।

থঙ্গরাজ বলেনঃ আগে রূপকুন্ডের হাড় থেকে৮০০ থেকে ২০০০ বৎসরের প্রাচীন ডিএনএ সংগ্রহ করলেও, গোয়ার ৩৫০ বৎসরের প্রাচীন এই দেহাস্থি থেকে সংগ্রহ ছিল বহুগুন কঠিন। কারণ রূপকুন্ডের প্রচন্ড ঠান্ডা আবহাওয়া ডিএনএ টিকে থাকতে সাহায্য করেছিল। আর এখানে উষ্ণ লবনাক্ত আবহাওয়া থাকা অস্থি থেকে জেনেটিক তথ্য জোগাড় আসলেই বিশাল কঠিন কাজ। তাহলেও একটা বড় সুবিধা ছিল। অস্থিগুলো রাখা ছিল সিল করা পাথরের বাক্সে, যতদিন না সেই বাক্স ভেঙ্গেছে। সেই সংরক্ষণ টুকুও অনেক সাহায্য করেছিল মাইটোকন্ড্রিয়ার জিন অবশিষ্ট থাকায়।

অবশেষে হল সেই কঠিন কাজটিও হল। তিনটি অস্থি থেকে মাইটোকন্ড্রিয়া ডিএনএ সংগ্রহ করা গেল।

এবার পরের ধাপ। সেই মাইটোক্নড্রিয়ার পাঠোদ্ধার হল ভারতের হাদ্রাবাদের গবেষণাগারে। কারন এগুলোর কার সেই পরিচয় ঠিক করতে হবে। হাদ্রাবাদের পরীক্ষাগারের ভান্ডারে ২২হাজার দক্ষিণ এশিয় জেনেটিক তথ্য রয়েছে। সেগুলোর সাথে এই তিনটি মিলিয়ে দেখা হল।

অস্থি সি.কিউ.টি-২ অস্থি সি.কিউ.টি-৩ এই দুইয়ের সাথে দক্ষিণ এশিয় জেনেটিক তথ্যের মিল পাওয়া গেল।

অস্থি সি.কিউ.টি-১ যার মাইটোকন্ড্রিয়া হ্যাপ্লোগ্রুপ ইউ১বি(U1b), তা কিন্তু কারুর সাথে মেলেনি। এবার জেনেটিক্স বিজ্ঞানীরা আর্কিওলজি বিভাগকে অনুরোধ করলেন জর্জিয়ার জেনেটিক তথ্য জোগাড় করে দিতে।

৩৩টি জর্জিয়ান জেনেটিক তথ্য জোগাড় হল। আর তারই মধ্যে দুটির জেনেটিক তথ্য মিলে গেল গোয়ার সিকিউটি-১ অস্থির সাথে। ইতিমধ্যে বিজ্ঞানীরা সেই অস্থি যে একজন মহিলার তাও বের করে ফেলেছেন।

এরপরে তো আর কোন সন্দেহই রইলো না যে গোয়ার সেন্ট অগাস্টাইন চার্চে রাখা দেহাস্থি জর্জিয়ার এক মহিলার, আর সেই মহিলার মাইটোকন্ড্রিয়া ইউ১বি এর সুত্র পাওয়া গেছে জর্জিয়াতে। তাছাড়া এই চার্চেই পাওয়া প্রাচীন আনুসাঙ্গিক নথিপত্র তো বলেছেই জর্জিয়ার মহিলা হলেন রাণী কেটেভান।

©তুষারমুখার্জি তথ্যসূত্রঃ-

1.Relic excavated in Western India is probably of Georgian Queen Ketevan: Neeraj Rai, K Thangaraj, Gyaneshwar Choubey. Lalji Shing, Aditya Nath Jha, Nizamuddin Taher, Manavendra Shing:

2. India hands over Holy Relic of St Queen Ketevan during Jaishankar’s trip to Georgia. : Dipanjan Roychowdhury, Economic Times. 09 July 2021

3. It is confirmed Relic found in Goa is of Georgian Queen. : Indian Express, Hyderabad, 23 Dec 2013




॥কালাহারির হোমো-স্যাপিয়েন্সরা॥

॥এক লক্ষ পাঁচ হাজার বৎসর আগেকার॥

প্রথমে ভাবা হত মেরে কেটে দেড় লক্ষ বৎসর আগে হোমো-স্যাপিয়েন্সরা পৃথিবীর আলো দেখেছে। এখন সেই ধারনা বদলে গেছে। এখন জানা গেছে দেড় নয়, সাড়ে তিন লক্ষ বৎসর আগেই হোমো-স্যাপিয়েন্সরা আফ্রিকায় ঘুরে বেড়াত।

আগে ভাবা হত হোমো-স্যাপিয়েন্সরা কেবল মাত্র ইথোপিয়ার বাসিন্দা ছিল। তারপরে জানা গেল না, হয়ত ইথোপিয়ার আগেই মরক্কোতে বাস করত তারা। একেবারে শুরুতে ইথোপিয়ার ওমো ভ্যালী আর কেনিয়ার তুরকানা হ্রদ এলাকায় সীমিত ছিল হোমো-স্যাপিয়েন্সরা এমনটাই ভাবা হত, কারন ঐ এলাকাতেই তাদের বসবাসের প্রত্ন প্রমাণ আর দেহাস্থি পাওয়া গেছে। এবং সেখানে দুই লক্ষ বৎসরের কিছু আগেই ছিল তাদের বসতি।

কিন্তু কিছুদিন আগেই জানা গেল না, আগের ধারনা হয়ত ভুল। মরক্কোর জেবেল ইরহুডের গুহায় হোমো-স্যাপিয়েন্সরা বসবাস করত আজ থেকে আনুমানিক ৩.৩৫ লক্ষ বৎসর আগে।

এবং

এতকাল ভাবা হত আফ্রিকাতে হোমো-স্যাপিয়েন্সরা সমুদ্রের তটভুমিতেই বেশি করে বাস করত। কারন সমুদ্রতট ঘেঁষা এলাকাতেই সব চেয়ে বেশি প্রত্ন এলাকা পাওয়া গেছে। যে প্রত্নক্ষেত্রগুলোতে থেকে সহজেই ধারনা করা হয়, এই সমুদ্র তট আর তার কাছাকাছি ভুখন্ডে বাস করতে করতেই তাদের সামাজিক সাংস্কৃতিক জীবন যাত্রার শুরু হয়, তারা শিখতে শুরু করে নিত্য নতুন জিনিষের ব্যবহার। শুরু হয় প্রতীকের ব্যবহার।

সম্ভবত এই প্রাথমিক ধারনার ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছিল পরিযান তত্ত্ব, ভারতে তাদের আগমন ও পরিযান সমুদ্র তট ধরে। এবং তারা সমুদ্রতট ধরেই অগ্রসর হয়ে দক্ষিণ ভারত অবধি গিয়ে আবার উত্তর দিকে ঘুরে উডিষ্যা-বাংলা এলাকায় বসত গড়ে। তারপরে খানিক বিশ্রাম নিয়ে, এই এলাকা থেকেই তারা দক্ষিণ চিন আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। এই পরিযান মতবাদে এখনো খুব কিছু দ্বিমত নেই।

সমুদ্রতটবর্তী এলাকায় আদিম মানবদের বসতির নানা চিহ্ন, বিশেষ করে ঝিনুকের ব্যবহারের প্রাচুর্যের প্রত্ন চিহ্ন এই সমদ্রঘেঁষা মানব সংস্কৃতির উত্থান তত্ত্বকে প্রশ্ন করার কোন জায়গা রাখেনি এতকাল।

এবার কিছুটা ক্ষীণস্বরে হলেও প্রশ্ন তোলা সম্ভব হবে।

কারন সমুদ্রতট থেকে বহুদুরে পাওয়া গেছে মানব বসতির চিহ্ন, এবং প্রায় সমতুল জীবনধারা নিয়েই তারা ছিল সমুদ্রতট থেকে বহু বহু দুরে, পার্বত্য গুহাবাসে। ফলে ভবিষ্যতে আগেকার সমুদ্র ঘেঁষা পরিযান তত্ত্বকেও হয়ত প্রশ্ন করা যেতে পারে। না। এখুনি নয়। হয়ত ভবিষ্যতে।


॥আফ্রিকা থেকে নতুন যা জানা গেল।॥


কালাহারি উত্তর গা-মোহানা এলাকায় হোমো-স্যাপিয়েন্সরা বসবাস করত আজ থেকে ১লক্ষ পাঁচ হাজার বৎসর আগে।

আগের ভাবা সমুদ্রতট এলাকা থেকে বহু বহু দুরে কালাহারিতে এই মানব বসতি একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রাপ্তি। অবশ্যই এক লক্ষ বৎসর আগে কালাহারি এখনকার মত মরুভুমি ছিলো না। কালাহারি তখন ছিল উষ্ণ মন্ডলীয় অরন্যভুমি।

সুমদ্রতট থেকে ৬০০ কিলোমিটার ভেতরে, কালাহারির উত্তর গা-মোহানা পর্বতের একটি গুহাবাসে পাওয়া গেল প্রাচীন মানব বসতির চিহ্ন। কিন্তু এমন কি হতে পারে যে কালাহারিরি এই পার্বত্য গুহাবাস একটি ব্যতিক্রম মাত্র। কেবল একটিই মানব বসতি ছিল কালাহারিতে, বাকি সব ঐ সমুদ্রতটে।

অন্য জায়গায় প্রমাণ না পেলে একে ব্যাতিক্রমি হিসাবেই ধরতে হবে। কিন্তু এর আগে পাওয়া প্রাচীনতম মানব বসতি মরক্কোর জেবেল ইরহুডের গুহাবাসটিও তো সমুদ্রতটে ছিলো না। কাজেই গা-মোহানা গুহাবাসটিকেও ব্যতিক্রমি বলে আগে থেকেই ভাবা হয়ত উচিত হবে না।

বরং ভাবা যেতে পারে আফ্রিকার নানা অঞ্চলেই বসবাস ছিল হোমো-স্যাপিয়েন্সদের। আর কালাহারির গা-মোহানা সেই নানা মানব বসতিরই একটি।


॥গা-মোহানা গুহাবাস থেকে কি পাওয়া গেছে॥

তিনটি গুহাবাসে মানব বসতি সম্পর্কিত তাদের ব্যবহৃত নানা জিনিষ পাওয়া গেছে। যেমন পাথরের হাতিয়ার। উট পাখীর ডিমের খোলা, বেশ কয়েকটি সংগৃহীত পাথরের কৃষ্টাল। পাথরের হাতিয়ার নিয়ে খুব বেশি কিছু বলার নেই। মানব বসতি থাকলেই সেখানে পাথরের হাতিয়ার থাকা খুব স্বাভাবিক।

॥উট পাখীর ডিমের খোলা।॥

আমি নিজে বরাবর ভাবতাম মানুষ তো অন্য প্রাণীর মত করে জলাশয়ের ধারে উপুড় হয়ে জিব দিয়ে চেটে, বা চুমুক দিয়ে জল খাবে না, কারন শারীরিক গঠন সেই কাজের পক্ষে উপযুক্ত না। দুপায়ে খাড়া দাঁড়ানো মানুষের পক্ষে কোন কিছুতে তুলে জল খাওয়াই স্বাভাবিক। গোড়াতে সেটা হয়ত দুই হাত জড় করে আঁজলা করে জল খাওয়া দিয়ে শুরু করেছিল। কিন্তু সেই থেকে মাটির বাসন না বানানো অবধি হাতে করেই জল খাবে এটা আমার মনোমত ছিল না। তারপরে দেখতে পেলাম ভিস্তিওয়ালা। চামড়ার মধ্যে জল ধরে রাখার বহন করার কায়দা। এটা বহু প্রাচীন হতেই পারে। চামড়া সহজ লভ্য। তবে ট্যান না করলে বড় দুর্গন্ধ।

তারপরে দেখলাম বাঁশ, লাউয়ের খোল নারকোলের মালায় করে জল খেতে। বুঝলাম এটাও অনেক প্রাচীন পদ্ধতি হতে পারে।

কালাহারির গা-মোহানাতে পাওয়া গেল উট পাখির ডিমের খোলা। বিজ্ঞানীরা বলছেন এগুলোর ব্যবহার হতো জল খাওয়ার জল রাখার জন্য। এক লক্ষ বৎসর আগে সম্ভবত এটাই ছিল কালাহারির লোকেদের জল খাবার সরলতম সমাধান। এখানে আমরা বরং ভাবি এক লক্ষ বৎসর আগে তারা জল খাবার পাত্রের দরকার অনুভব করেছিল। এবং তার সমাধানও করে ফেলেছিল।


পানি।॥

কালাহারির ডলোমাইট পাহাড়ের গা-মোহানা গুহাবাসে পানি ছিল? ছিল। বিজ্ঞানীরা স্তরীভুত চুলাপাথরের নমুনা থেকে জানতে পেরেছেন এই এলাকায় পানি প্রবাহ হত, মাঝে মাঝে তা জোরে হত আবার কমে যেত বা বন্ধও হয়ে যেত। কিন্তু পানির প্রবাহ ছিল।


॥কৃষ্টাল।॥

২২টি কৃষ্টাল পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা জোর দিয়ে বলছেন এগুলো প্রাকৃতিক উপায়ে ঐ গুহাবাসে আসেনি। এগুলো আনা হয়েছিল বাইরে থেকে।

ফলে প্রশ্ন আসে কেন আনবে তারা? এই ছোট ছোট কৃষ্টালের টুকরোর কোন ব্যবহারিক মুল্য নেই। এবং এগলো গয়না হিসাবে ব্যবহার হতো তেমন কোন চিহ্নও নেই।

বিজ্ঞানীরা খেয়াল করলেন কালাহারির ঐ গুহাবাস বহু প্রাচীন কাল থেকে স্থানীয় লোকেদের ধর্মাচরন আরাধনা স্থল।

এই থেকে ওনারা অনুমান করলেন এমনটা সম্ভব হতেই পারে যে এক লক্ষ বৎসর ধরেই ঐ ধর্মাচরন প্রথা চলে আসছে। এবং সেই এক লক্ষ বৎসর আগের লোকেরাও ঐ কৃষ্টালের টুকরোগুলো কোন না কোন ধর্মাচরনে ব্যবহার করত।

আমি জানি না, ব্যক্তিগত ভাবে আমার মনে হয়েছে এটা আরোপিত ভাবনা। কিন্তু ঐ ক্ষুদে ক্ষুদে কৃষ্টালের টুকরো গুহাবাসে থাকার অন্য কোন তাৎপর্যও আমি ভাবতে পারছি না।

একেবারে সরল পথের বাইরে গিয়ে এক অতি সরলতর পথে ভাবনাকে নিয়ে গেলে ভাবা যায় কৃষ্টালগুলো সংগ্রহ করেছিল স্রেফ সেগুলো সুন্দর বলে।

প্রতন্বিদদের কথামতো এক লক্ষ বৎসর আগেই মানুষ ধার্মিক হতে শুরু করেছিল।

ভাবতে হয় এক লক্ষ বৎসর আগের স্যাপিয়েন্সরা সবে তাদের আধুনিক মস্তিস্কের পূর্ণতা পেয়ে কি ভাবতে শুরু করেছিল? দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বাইরে নতুন কিছু ভাবার আরম্ভটা কি দিয়ে? ধর্ম না সৌন্দর্য?


॥কাল নির্ণয়॥

কেমন করে জানা গেল কালাহারি গা-মোহানার বয়স এক লক্ষ পাঁচ হাজার বৎসর?

প্রথমত গুহাবাসের যে স্তরে প্রত্নসামগ্রী পাওয়া গেছে সেই স্তরের ইউরেনিয়াম-থোরিয়াম আইসোটোপ পরীক্ষা করে পাওয়া গেল স্তরের বয়স ১লক্ষ থেকে ১লক্ষ১০ হাজার বৎসর।

এরপরে ক্রীস্টালগুলোর আর ডিমের খোলার বয়স বের করা হল ল্যুমিনেসেন্স (OSL-Optically sTimulated luminescence) পদ্ধতিতে।

OSL পরীক্ষা হয় Institute of geology, university of innsbruk এর OSL Laboratoryতে । বিভাগীয় প্রধান Michael meyer এর তত্ব্বাবধানে।


॥প্রত্ন গবেষক দল॥

আজকাল কোন প্রত্ন গবেষণাই একক ব্যক্তির দ্বারা হয় না। কারন কাজেপর পদ্ধতি এতটাই বদলে গেছে যে একাধিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ লোকেদের উপস্থিতি দরকার হবেই। এই কালাহারির গা-মোহানা প্রত্ন অনুসন্ধানেও তেমনি বহুজনের দল ছিলেন তবে দলের প্রধান হিসাবে ছিলেন DR. Jayne Wilkins. (Griffith unversity, australian research centre for humaqn evolution.

গবেষণার ফল হিসাবে গবেষণাপত্র প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞান পত্রিকা nature এ।


গবেষণাপত্রের বাইরে আমার অতিরিক্ত যোগঃ

বর্তমানে বিজ্ঞানীরা প্রায় সহমত যে এক লক্ষ বৎসর আগে আমাদের এই আধুনিক হোমোস্যাপিয়েন্সদের মস্তিস্কের বর্তমান বিবর্তন ঘটে যায়। মানুষ যুক্তিসঙ্গত ভাবে চিন্তার যোগ্যতা অর্জন করে।

এবং এই এক লক্ষ বৎসর আগে কালাহারি অঞ্চলে বাস করত সান জনগোষ্ঠী। যারা বর্তমানের বৃত্তর খয়েসান গোষ্ঠীর আদিমতম শাখা।

এবং এই সান গোষ্ঠীর নামা গোষ্ঠীর দুইজনের ডিএনএ পাওয়া গেছে যা বিগত লক্ষ বৎসরপরেও অন্য কোন ডিএনএ-র সংস্পর্শে আসেনি।

আধুনিক কাঠামোর স্যাপিয়েন্স, হলাম এই আমরা। আর আমাদের আদিমতম সহোদর কালাহারির বাসিন্দা ঐ নামা গোষ্ঠীর লোক।

©তুষারমুখার্জী


তথ্যসুত্রঃ-

1. Science News : innovative humans thrived in water rich kalahari 105,000 years ago.

(dated: 1st april 2021: by staff reporter

2. ancient origin (2nd april 2021) 105,000 year old kalahari crystals challenge cuktural evolution story: By Alicia McDermott



ইংরেজি থেকে বাংলা সন কিভাবে বের করবেন?

ইংরেজি সাল থেকে ৫৯৩ বিয়োগ করলে পাবেন বাংলা সাল...

-

বাংলা ১লা বৈশাখ সবসময় ইংরেজি এপ্রিল মাসের ১৪  তারিখে  শুরু  হয়  এবং অন্যান্য মাস গুলো ইংরেজি মাসের ১৩-১৬ তারিখের মধ্যে হয়ে থাকে।

এবার জেনে নিন ইংরেজি মাসের কত তারিখে বাংলা মাস শুরু হয়।যেহেতু ইংরেজি ১৩-১৬ তারিখের মধ্যে বাংলা সব মাসের শুরুর দিন থাকে তাই কোডটি মনে রাখুন।

কোডটি হল:  (৪ ৫৫ ৬৬৬৬ ৫৫ ৪৩৫)

কোড এর ব্যাবহার: ৪ মানে ইংরেজি ১৪ তারিখ, ৫ মানে ইংরেজি ১৫, ৬ মানে ১৬ তারিখ

উদাহরন:  কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম:- ১৮৯৯ সালের ২৫ মে। এখন ১৮৯৯ থেকে ৫৯৩ বাদ দিন থাকে ১৩০৬। অর্থাৎ বাংলা ১৩০৬ সালে কাজী নজরুলের জন্ম সাল। এবার ২৫ মে থেকে বাংলা মাস বের করুন। আমাদের কোডের ১ম টি অর্থাৎ ৪ মানে এপ্রিল এর ১৪ তারিখ ১লা বৈশাখ।তারপর আছে ৫ মানে ১৫ মে অর্থাৎ ১৫ মে জ্যৈষ্ঠ মাসের ১ তারিখ।

তাই ১৫ থেকে ২৫ পর্যন্ত ১১ দিন অর্থাৎ ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বাংলা কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম সাল। --নিলয় নীল 


১০



পড়া মুখস্ত করার অসাধারণ কিছু কৌশল

দুই দিন আগে কি পড়েছিলেন ভুলে গেছেন। কিন্তু গত ঈদে কই নামাজ পড়েছিলেন, কয়েক বছর  আগে এসএসসি রেজাল্টের সময় কই ছিলেন, ঠিকই মনে আছে। তারমানে আপনার পড়ালেখা মনে  না থাকলেও, বাকি সব ঠিকই মনে থাকে। তাই বাকি সব মনে রাখার স্টাইলে খুব সহজেই পড়ালেখা  মনে রাখতে পারবেন-


০১. 

আগ্রহ নিয়ে খালি মাথায় পড়তে বসুন: 

খেলা, মুভি দেখার জন্য আপনি যেমন আগ্রহ নিয়ে,  জিতার আশা নিয়ে বসো। পড়ার সময়ও একইভাবে, নিজের ভিতর থেকে আগ্রহ নিয়ে, পড়া কঠিন,  মনে থাকে না, বুঝি না- এইসব ভুলে, খালি মাথা নিয়ে বসতে হবে। সেই জন্য ভোরে উঠে পড়তে  বসলে মাথা ক্লিন থাকে এবং পড়া দ্রুত মাথায় ঢুকে।


০২.

ছোট ছোট অংশে ভাগ করে পড়ুন: 

খুব সি¤পল একটা উদাহরণ দেই। ধরুন আপনার একটা  ফোন নাম্বার মনে রাখা দরকার। এখন ০১৭১৭৬৫৩৯২২ পুরাটা একসাথে পড়লে দুই মিনিট পরেই  ভুলে যাবা। তাই ভেঙ্গে ভেঙ্গে ০১৭১৭ – ৬৫৩ – ৯২২ স্টাইলে পড়ুন। পড়ার সময় চিন্তা করুন-  “০১৭১৭ (আধা সেকেন্ড দম নিয়ে) ৬৫৩ (আধা সেকেন্ড দম নিয়ে) ৯২২”, তাহলে মনে রাখা সহজ  হবে। এরপর নাম্বারটা ব্রেইনে সেট করার টার্গেট নিয়ে খেয়াল করে করে তিনবার পড়ুন। দুইবার না  দেখে কাগজে লিখুন। দেখবেন এক মাসেও এই নাম্বার ভুলবেন না। শুধু ফোন নাম্বার না, বড়  সাইজের প্রকারভেদ, ব্যবসায় নীতি, বিশাল প্রমাণ এই সিস্টেমে ভাগ ভাগ করে পড়ুন।


০৩.

মেইন পয়েন্টকে ক্লু হিসেবে ব্যবহার করুন: 

যেমন ধরুন নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র- “কোন বস্তুর  ভরবেগের পরিবর্তনের হার প্রযুক্ত বলের সমানুপাতিক এবং বল যে দিকে ক্রিয়া করে বস্তুর ভরবেগের  পরিবর্তন সেদিকেই ঘটে।” পড়ার সময় নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করবেন- এই সূত্রের মেইন পয়েন্ট  কি? একটু খেয়াল করলেই বুঝতে পারবেন এই সূত্রের মেইন পয়েন্ট হচ্ছে- “ভরবেগের পরিবর্তন”।  এবং ভরবেগের পরিবর্তনের দুইটা বৈশিষ্ট্য বলছে। এক: ভরবেগের পরিবর্তন- বলের সমানুপাতিক। 


দুই: ভরবেগের পরিবর্তন- বলের দিকে।

এখন আপনার ব্রেইনে সূত্রের নামের সাথে মেইন পয়েন্টের কানেকশন সেট করা লাগবে। যাতে সূত্রের  নাম শুনার সাথে সাথেই মূল বিষয়বস্তু ব্রেইনে ভেসে উঠে। সেজন্য প্রথমে সূত্রের নাম লিখবেন  তারপর কোলন(:) দিয়ে মেইন পয়েন্ট লিখবেন। অনেকটা এইভাবে “নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র:  ভরবেগের পরিবর্তন- বলের সমানুপাতিক, বলের দিকে”। এরপর থেকে যতবার সূত্রের নাম দেখবেন  ততবার কানেকশন এবং ক্লু দিয়ে পুরা সূত্র ইজিলি মনে করতে পারবেন।

যদি হাইলাইটার, কলম বা পেন্সিল দিয়ে দাগিয়ে পড়ার অভ্যাস থাকে, তাহলে শুধু মেইন পয়েন্ট বা  ক্লু গুলাকে দাগান। যাতে রিভাইজ দেয়ার সময় চোখ আগে দাগানো অংশের নিচে চলে যায়।


০৪. 

পড়ার টপিকের সাথে লাইফের ঘটনা মিশাও: 

আপনি এক সপ্তাহ আগে কি খাইছিলেন ভুলে  গেছো। কিন্তু কয়েক মাস আগে ঈদের দিন সকালে কি খাইছিলেন বা কয়েক বছর আগে এসএসসি  রেজাল্টের সময় কই ছিলেন, ঠিকই মনে আছে। তারমানে কোন কিছুর সাথে ইমোশন বা ই¯েপশাল  আগ্রহ থাকলে সেই জিনিস আমরা ভুলি না। সো, প্রত্যেকটা চ্যাপ্টারের গুরুত্বপূর্ণ জিনিসের সাথে  একটা ইমোশন বা লাইফের ¯েপশাল ঘটনা মিশাতে পারলে সেই জিনিস সহজে ভুলবেন না।

ধরুন, ফিজিক্সের ঋ = সধ সূত্র পড়ার সময় ভাবলা- বাসা থেকে মেসে আসার সময় আমি যে বল  দিয়ে আমার লাগেজটাকে টানতেছিলেনম সেই বল (ঋড়ৎপব) ছিলো ঋ, লাগেজের মধ্যে যা যা ছিলো  সেগুলার ভর(সধংং) হচ্ছে স আর ধ হচ্ছে আমার বলের কারণে লাগেজ যে ত্বরণ (ধপপবষবৎধঃরড়হ)  হইছিলো। তাই লাগেজ টানার সময় আমি ঋ = সধ পরিমাণ কাজ করছি। আর আমি যেহেতু জুনের  ১১ তারিখ বাসা থেকে মেসে উঠছিলেনম তাই জুনের ১১ তারিখ আমার ঋ=সধ দিবস। দেখছো,  কোন ঘটনা বা স্মৃতির সাথে পড়াকে মিলাতে পারলে সেটা মনে রাখা অনেক সহজ এবং মজার হয়ে  যায়।


০৫. 

যত বেশি লিখে লিখে পড়বে তত ভালো: 

দেখে দেখে পড়ার চাইতে হালকা সাউন্ড বা মনে মনে  উচ্চারণ করে পড়া ভালো। কন্সট্রেশন বেশিক্ষণ থাকে। তবে অংক, সূত্রের প্রমাণ, জটিল গ্রাফ  অবশ্যই লিখে লিখে পড়বা। দশবার রিডিং পড়ার চাইতে একবার লিখে পড়া বেশি ইফেক্টিভ। যদিও  সবকিছু ১০০% লিখে লিখে পড়তে গেলে বেশি সময় লেগে যাবে। তাই গুরুত্বপূর্ণ সূত্র, প্রমাণ বা  থিওরি অন্তত একবার না দেখে লিখবে। ম্যাথ কখনোই সমাধান সামনে খোলা রেখে করবেন না। বরং  পাশের রুমে রাখবা। যতবার আটকে যাবা ততবার উঠে গিয়ে দেখে আসবা। তারপরেও না দেখে  দেখে করার প্রাকটিস করুন নচেৎ পরীক্ষার হলে গিয়ে আটকে যাবা।


০৬. 

নিজেই নিজের টিচার হয়ে যাও: 

ক্লাসের বন্ধুদের সাথে আড্ডায় পড়ালেখার টপিক নিয়ে  আলোচনা করুন। কোন কিছু পড়া শুরু করার আগে কোন ফ্রেন্ডের কাছ থেকে বুঝে নিতে পারলে-  পড়া বুঝা ও মনে রাখা অনেক সহজ এবং দ্রুত হয়। আর ফ্রেন্ড খুঁজে না পাইলে নিজেই নিজের  টিচার হয়ে নিজেকে কোন জিনিস বুঝানোর চেষ্টা করুন। কারো কাছে পড়া বুঝতে গেলে তার কাছে ১  ঘন্টার বেশি থাকবা না। আপনি কাউকে পড়া বুঝাতে গেলে গেলে, ১ ঘন্টার বেশি সময় দিবা না।


০৭. 

পড়ার টেবিল, পড়ার রুম: 

যে সাবজেক্ট পড়বা সেই সাবজেক্টের বই ছাড়া অন্য বই টেবিলে রাখা  যাবে না। পড়ার টেবিল দরজার পাশে, ড্রয়িং রুমে রাখবা না। মানুষ আসতে যাইতে ডিস্টার্ব হবে। আবার বারান্দা বা জানালার পাশেও পড়ার টেবিল রাখবা না। নচেৎ কিছুক্ষণ পর পর বাইরে তাকিয়ে  নিজের অজান্তেই ১৫-২০ মিনিট নষ্ট করে ফেলবা। পড়ার রুমে কোন ইলেক্ট্রনিক্স যেমন টিভি,  ল্যাপটপ, ক¤িপউটার, মোবাইল ফোন রাখা যাবে না। মোবাইল বন্ধ করে পাশের রুমে রেখে আসবা। পড়ার সময় ডিকশনারি ব্যবহার করা লাগলে প্রিন্ট করা ডিকশনারি ব্যবহার করবেন।


০৮. 

রঙ্গিন করে এঁকে পড়ুন : 

অনেকগুলা বৈশিষ্ট্য, পার্থক্য, প্রকারভেদ মনে না থাকলে। সেগুলার  প্রথম বর্ণ দিয়ে একটা শব্দ বা ছন্দ তৈরি করুন ফেলো। ভূগোল বা বিজ্ঞানের কঠিন কোন চিত্র বা  গ্রাফ থাকলে, গ্রাফের কিছু অংশ কালো, কিছু অংশ নীল, কিছু অংশ লাল রঙের কলম/পেন্সিল দিয়ে  আঁকলে, গ্রাফ মনে রাখা সহজ হবে। কোন চ্যাপ্টারের গুরুত্বপূর্ণ গ্রাফ, বিদঘুটে পয়েন্টগুলো কয়েকটা  গ্রুপে ভাগ করে আলাদা কালারের কলম দিয়ে খাতায় লিখো। তারপর রিকশায়, বাসে বা সেলুনে চুল  কাটার সময় সেই খাতা খুলে সামনে রেখে দিবা। ব্যস, ফ্রি ফ্রি রিভাইজ দেয়া হয়ে যাবে। ই¤পরট্যান্ট চার্ট, পয়েন্টগুলা কাগজে লিখে দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখো। কয়েকটা গ্রাফ সিলিং এ লাগিয়ে  দাও। যাতে দিনের বেলায় বিছানায় শুইলে সেগুলা দেখে দেখে রিভাইজ দেয়া যায়। আর মশারির  ভিতর শোয়া লাগলে, মশারির উপরে বই বা খাতা রেখে ভিতর থেকে শুয়ে শুয়ে রিভিশন দাও।


০৯. 

রিভাইজ,রিভাইজ এন্ড রিভাইজ: 

গবেষণায় দেখা গেছে- আমরা আজকে সারাদিনে যত কিছু,  দেখি, শুনি, জানি বা পড়ি তার ৫দিন পরে চারভাগের তিনভাগই ভুলে যাই। তবে এই ভুলে যাওয়া  ঠেকানোর জন্য অনেকগুলা ট্রিকস আছে। যেমন- ৪৫ মিনিট পড়ে ১৫ মিনিটের নিবা এবং সেই ব্রেকে  পড়াটা মনে মনে রিভাইজ দাও এবং কোথাও আটকে গেলে আরেকবার দেখে নাও। এবং আজকে  গুরুত্বপূর্ণ কিছু পড়লে আগামীকাল ঘুমানোর আগে এই জিনিস ২০মিনিটে রিভাইজ দিয়ে দিবা।  তারপর এক সপ্তাহ পরে আরেকবার রিভাইজ দিলে এই পড়ার ৯০% জিনিস এক মাস পর্যন্ত  আপনার মনে থাকবে।প্রত্যেকটা সাবজেক্টের গুরুত্বপূর্ণ জিনিস, ক্লু, সামারি পয়েন্টগুলা আলাদা আলাদা খাতায় লিখে রাখবা।  চ্যাপ্টার ওয়াইজ। তারপর টিউশনি যাওয়ার পথে- রিক্সায়, বাসে, এমনকি স্টুডেন্টকে অংক করতে  দিয়ে সেই খাতা দেখতে থাকবা। যে জিনিসটা আজকে পড়ছো সেটা- গোসল, ভাত খাওয়া, সিঁড়ি দিয়েই নামা, বাসের জন্য অপেক্ষা,  এমনকি বাথরুম করার সময় চিন্তা করবেন। যতবেশি চিন্তা করবেন, যতবেশি মনে মনে রিভাইজ  দিবা তত বেশি মনে থাকবে।


১০. 

বইয়ের পিছনে সামারি লিস্ট:

প্রায় সব বইয়ের পিছনেই দুই-এক পাতা সাদা পৃষ্ঠা থাকে। আর না  থাকলে স্কচ-টেপ বা পিন দিয়ে লাগিয়ে নিবা। তারপর যে জিনিসগুলা ভুলে যাওয়ার চান্স বেশি বা পরে  ভালো করে রিভিশন না দিলে পরীক্ষার হলে লিখতে পারবেন না- সেগুলা পেইজ নাম্বার সহ বইয়ের  পিছনের সাদা কাগজে লিখে রাখবা। যাতে ৩-৪ ঘন্টা রিভিশন দেয়ার সুযোগ পাইলে, সবচেয়ে  গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলা পৃষ্ঠা নম্বর দিয়ে খুব সহজেই খুঁজে বের করে রিভিশন দিতে পারো।


১১.

ক্লাসে সিনসিয়ার থাকো: 

পড়ালেখা খুব কঠিন বা বোরিং কিছু না। একটু খেয়াল করলেই  পড়ালেখা ইজিয়ার বানায় ফেলা যায়। সেজন্য ক্লাস শুরু হওয়ার সময় থেকে সিনসিয়ার হতে হবে।  ক্লাসের ফার্স্ট বেঞ্চে বসে, খেয়াল করে ক্লাস নোট তুলে, সিরিয়াসলি এসাইনমেন্ট করে, বাসায় এসে  ঐদিনের লেকচারগুলোকে আধা ঘন্টা করে স্টাডি করলে, পড়া অর্ধেক সহজ হয়ে যায়।


১২. 

সিরিয়াস স্টুডেন্টদের বন্ধু হও: 

তিনজন সিরিয়াস স্টুডেন্টের সাথে একজন অগা-মগা থাকলেও  সে পড়ালেখায় ভালো করা শুরু করবে। আর আড্ডা, সিনেমা, খেলা দেখার পাগল পোলাপানদের  সাথে বন্ধুত্ব হলে পড়ালেখায় তোমাকে ছেড়ে পালাবে। সো, কষ্ট হলেও ভালো স্টুডেন্টদের সাথে থেকে  তাদের ফলো করুন। এটলিস্ট সিরিয়াস স্টুডেন্টদের সাথে উঠাবসা করুন- আপনার মানসিকতায়  পরিবর্তন আসবে। পড়ালেখায় মন বসবে। রেজাল্ট ভালো হবে।


১৩. 

প্রথম অক্ষর নিয়ে মজার কিছু বানাও: 

বাংলাদেশ সংবিধানে ১১ টা ভাগ আছে। এই ভাগগুলা  পড়ার সময় প্রত্যেকটা পয়েন্টের প্রথম অক্ষর খেয়াল করবি -(প)-প্রজাতন্ত্র, (রি) রাষ্ট্র পরিচালনার  মূলনীতি, (ম) মৌলিক অধিকার, (নি) নির্বাহী বিভাগ, (আ) আইন সভা, (বি) বিচার বিভাগ, (নি)  নির্বাচন, (ম) মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, (বা) বাংলাদেশের কর্ম বিভাগ, (জ) জরুরী  বিধানাবলী, (স) সংবিধান সংশোধন, বি- বিবিধ। এখন প্রথম অক্ষরগুলা দিয়ে মজার কিছু একটা  বানায় ফেল। যেমন, “পরীমনি আবি নিমবাজ সবি” তাইলে আর সংবিধানের ভাগগুলা সহজে আর  ভুলবি না। @ ঝংকার মাহবুব




সক্রেটিস ছিলেন একমাত্র গ্রীক যিনি জানতেন যে, তিনি মূর্খ। কিন্ত তাঁর প্রভাব আজও বিশাল।

বক্ষ্যমান লেখাটি জাপানের হিরোসাকি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জন এডওয়ার্ড ফিলিপসের ইংরেজিতে লেখা একটি প্রবন্ধ, নাম ÔThe Wisest of the GreekÕ] রাপীয়দের মধ্যে গ্রীকরাই প্রথম সভ্যতার শিল্প শেখে। তাদের দার্শনিক ও জ্ঞানীগণের দেখানো পথ ধরেই ইউরোপের অন্যান্য জাতির  মধ্যে শিক্ষা আলো ও সভ্যতা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেন। 

 সক্রেটিস  ছিলেন এক দরিদ্র নিরক্ষর ব্যক্তি, যিনি বাস করতেন গ্রীসের এ্যাথেন্সে। তিনি ছিলেন এক ভালো যোদ্ধা, যিনি জিমনিশিয়ামে লড়তেন; কিন্তু তিনি জানতেন যে, তিনি  বুদ্ধিজীবী নন। তাই গ্রীসের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ব্যক্তির কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করতে চেয়েছিলেন বলেই তিনি গ্রীকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী কে’ তা খুঁজতে তিনি গিয়েছিলেন ডেলফির বিখ্যাত পুরোহিতের কাছে। পুরোহিত ডেলফির গুহায় তাঁর আসনে বসে সক্রেটিসের প্রশ্ন শুনলেন। অতঃপর তাঁর উত্তর ছিলো, “গ্রীকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী হচ্ছে সক্রেটিস তুমি নিজে।”

“কিন্তু, এটা অসম্ভব!” তোতলিয়ে সক্রেটিস বললেন, “আমি এক মূর্খ।”

পুরোহিত বললেন, যে ব্যাক্তি নিজেকে মূর্খ বলে জানে এবং জ্ঞানের সন্ধান করে, সে হচ্ছে জ্ঞানী।  কিন্তু সক্রেটিস এই কথায় সন্তুষ্ট হলেন না। তিনি তাঁর নিজ নগরী এ্যাথেন্সে ঘুরে, যেখানে যতো লোক জ্ঞানী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাঁদের সবাইকে একই প্রশ্ন করতে লাগলেন ।

ঘটনাটি ছিলো যীশু ও মুহাম্মদ(সঃ)-এর জন্মেরও শতশত বছর আগে। গ্রীকরা তখন  বহু দেব-দেবীতে বিশ্বাস করতো এবং তাদের সকলেই বলিদান দিতো। সক্রেটিসও ধার্মিক হতে চেয়েছিলেন, তাই তিনি আর এক বিখ্যাত  পুরোহিতের কাছে গেলেন। 

 “ধর্মপরায়ণতা কী?” জিজ্ঞেস করলেন সক্রেটিস। “এটি হচ্ছে দেবতাদের সম্মান করা এবং তাঁদের ইচ্ছা তামিল করা।” পুরোহিত উত্তর দিলেন। সক্রেটিস পুনরায় বিভ্রান্ত হলেন। বললেন- “কিন্তু গ্রীসে দেবতারা [সংখ্যায়] অনেক। আমাদের দৈব-কাহিনীতে প্রায়ই তাঁরা নিজেদের মধ্যে লড়াই করেন। আমি কীভাবে জানবো কখন একজন দেবতাকে সমর্থন করতে হবে এবং কখন অন্য জনকে অনুসরণ করতে হবে?”

প্রশ্ন শুনে পুরোহিত বিব্রত হলেন এবং সক্রেটিসের জন্যে কোনো উত্তর ছিলো না তাঁর। এরপর সক্রেটিসের ধারালো প্রশ্নমালার উত্তর খুঁজতে অনেক জনসমাবেশ হতে থাকলো। জিমনিশিয়ামে অনেক তরুণ সক্রেটিসকে জ্ঞান বিষয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করলো। এই তরুণদের মধ্যে কেউ কেউ প্রকাশ্য দেব- দেবীর অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন করতে লাগলো। 

সক্রেটিস তখন এথেন্সের বাজারে এলোমেলোভাবে ঘোরাফেরা করতো, যেদিকে যেতো যেনো হেমিলনের বাঁশিওয়ালা, পিছনে যুবকদের সারি। শেষ পর্যন্ত এ্যাথন্সের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাছে বিষয়টি অসহ্য ঠেকলো। তারা সক্রেটিসের বিরুদ্ধে অধর্ম, দেবনিন্দা, দেবতাদের প্রশ্নবিদ্ধ করা দিয়ে তরুণদের নষ্ট করার অভিযোগ এনে তাঁকে বিচারের সম্মুখিন করলেন।

সক্রেটিস অভিযোগসমূহ অস্বীকার করলেন এই বলে যে, তাঁর প্রশ্নগুলো ছিলো দেবতাদের সম্মান করার জন্যে । তাঁর অভিযোগকারীগণ যখন  জিজ্ঞেস করলেন তিনি দেব-দেবীদের বিশ্বাস করতে পারেন কিনা, তখন সক্রেটিস এর সম্ভাব্যতা অস্বীকার করলেন।

তখন তারা তাঁকে অভিযুক্ত করলো তরুণদেরকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভ্রষ্ট করার, তারা জোর করতে থাকলেন এই বলে যে, সমাজের ওপর তাঁর মন্দ প্রভাব পড়ছে এবং তাঁর প্রশ্ন দিয়ে সমাজে আরও গোল বাঁধাবার পূর্বেই তাঁর মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত। 

সক্রেটিসকে তাঁর বন্ধুরা মিনতি করলেন প্রশ্ন করা বন্ধ করতে, কিন্তু তিনি বললেন এর অর্থ হবে দেব-দেবীকে স্বীকার করা। যখন বন্ধুরা পরামর্শ দিলেন ক্ষমা প্রার্থনার অথবা দেশান্তরী হওয়ার, তিনি তা প্রত্যাখ্যান করলেন। মুলত সক্রেটিস ছিলেন এক লড়াকু লোক এবং যুদ্ধের ময়দানে কখনও তাঁর অস্ত্রত্যাগ করেননি কিংবা ক্ষমা প্রার্থনা করেননি। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হলো। নির্ধারিত সময়ে সক্রেটিস হেমলক বিষ পান করলেন এবং কারাগারে মৃত্যুবরণ করলেন শোকাকুল বন্ধু পরিবেষ্টিত হয়ে। 

সক্রেটিসের সবেচেয়ে বিখ্যাত ছাত্র ছিলেন প্ল্যাটো। প্ল্যাটো চিন্তা করতে শুরু করেন যে, আমরা যে জগতকে জানি, তা সত্য জগৎ হতে পারে না। তিনি আরও ভাবেন, গণতন্ত্র যেহেতু সক্রেটিসকে মৃত্যুদন্ডে দণ্ডিত করেছে, শাসন ব্যবস্থা হিসেবে গণতন্ত্র ভালো হতে পারে না। তিনি এই ধারণা বিকশিত করেন যে,শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হওয়া উচিত জ্ঞানীদের দ্বারা।

এ্যারিস্টটল ছিলেন প্ল্যাটোর ছাত্র। তিনি ভাবনা-চিন্তা পরীক্ষার জন্যে নিয়মতান্ত্রিক যুক্তির এক শক্তিশালী পদ্ধতি বিকশিত করেন, যা আজ এ্যারিস্টটলিয়ান [যুক্তি] বলে পরিচিত। তিনি শিক্ষক হয়েছিলেন আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেইটের।

গ্রীকদের মধ্যে এসব সক্রেটিসপন্থীরা ছিলেন সংখ্যালঘু, কিন্তু তাঁদের প্রভাব আজও বিশাল। যখন খ্রিস্টধর্ম এবং পরবর্তীতে ইসলামধর্ম  গ্রীক সভ্যতা ও গ্রীস প্রভাবিত করলো, তখন মানুষ উপলব্ধি করতে শুরু করলো যে, সক্রেটিসের ছাত্রদের দেব-দেবী নিয়ে প্রশ্ন করা ঠিক ছিলো।  আজ, কেউই গ্রীক দেব-দেবীর অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না। মিথসমূহ সাহিত্য হিসেবে পঠিত হচ্ছে। 

ইসলাম ও ক্রিশ্চিয়ানিটি উভয় ধর্মের  চিন্তকদের মধ্যেও প্ল্যাটোর বিশাল প্রভাব রয়েছে। তার বাস্তব উদাহরণ ইসলামের মোতাজিলা।  ওসমান দানফোদিও থেকে শুরু করে  লেনিন পর্যন্ত যাঁরা মনে করেন যে, সমাজ পরিচালিনার দায়িত্ব থাকা উচিত একদল বুদ্ধিজীবীদের হাতে, তাঁদের চিন্তায় প্ল্যাটোর রাজনৈতিক ধারণার প্রভাব  আছে।

প্রাচীন গ্রীকদের মধ্যে আলেক্সান্ডাররের মতো সক্রেটিসও  বিশ্ব জয় করেছেন, জ্ঞানের সমুদ্রে নামার আগে সক্রেটিস অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠে জ্ঞানপ্রত্যাশীর কাছে । যেখানেই সভ্যতার বিস্তার, সেখানে এই  নিরক্ষর, সুযোদ্ধা অথচ দরিদ্র চিন্তকের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়; যিনি গ্রীকদের মধ্যে ছিলেন শ্রেষ্ঠতম জ্ঞানী। অনুবাদঃ মাসুদ রানা


মুসলমানেরাই কেবল জঙ্গি....?

১. হিটলার, একজন অমুসলিম। ৬০ লক্ষ ইহুদি হত্যা করেছিলো। মিডিয়া একবারও তাকে বলেনি সে খ্রিস্টান টেররিস্ট !

২. জোসেফ স্ট্যালিন, একজন অমুসলিম। সে ২০ মিলিয়ন মানুষ হত্যা করেছে,  এবং        ১৪.৫ মিলিয়ন মানুষ অসুস্থ হয়ে ধুকে ধুকে মারা গেছে । মিডিয়া এক বারও তাকে বলেনি সে খ্রিস্টান টেররিস্ট !

৩. মাও সে তুং একজন অমুসলিম। ১৪ থেকে ২০ মিলিয়ন মানুষ হত্যা করেছে ! মিডিয়া একবারও তাকে বলেনি সে বৌদ্ধ টেররিস্ট।

৪. এখনো মায়ানমারে প্রতিদিন মুসলিম রোহিঙ্গাদের খুন, ধর্ষণ , লুটপাট, উচ্ছেদ করছে ! তবুও কোনো মিডিয়া বলে না বৌদ্ধরা টেরোরিস্ট ! 

৫. মুসলিনী (ইটালী) ৪ লাখ মানুষ হত্যা করেছে ! সে কি মুসলিম ছিল? অন্ধ মিডিয়া একবারো বলে নাই খ্রিস্টান টেররিস্ট !

৬. অশোকা (কালিঙ্গা বেটল) ১০০ হাজার মানুষ হত্যা করেছে ! মিডিয়া একবারও তাকে বলেনি সে হিন্দু টেররিস্ট।

৭. জজ বুশ ইরাকে, আফগানিস্থানে  প্রায় ১.৫ মিলিয়ন মানুষ হত্যা করেছে ! মিডিয়া তো বলে নাই, খ্রিস্টান টেররিস্ট !

ইতিহাস সাক্ষী পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে বড় বড় গণহত্যা করেছে নন মুসলিমরা আর এরাই দিনরাত গণতন্ত্র জপে মুখে ফেনা তুলে ! অথচ এদের দ্বারাই মানবতা লুন্ঠিত !

কিছু প্রশ্ন...

ক. যারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু করেছিল, তারা কি মুসলিম ছিল ?

খ. যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করেছিল, তারা কি মুসলিম ছিল ?

গ. যারা অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কারের পর নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য ২০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসীকে হত্যা করেছিল,তারা কি মুসলিম ছিল ?

ঘ. যারা হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা নিক্ষেপ করেছিল, তারা  কি  মুসলিম  ছিল ?

ঙ. যারা আমেরিকা আবিষ্কারের পর নিজেদের প্রভাব বিস্তারের জন্য উত্তর আমেরিকাতে ১০০ মিলিয়ন এবং দক্ষিণ আমেরিকাতে ৫০ মিলিয়ন রেড- ইন্ডিয়ানকে হত্যা করেছিল, তারা কি মুসলিম  ছিল ?

চ. যারা ১৮০ মিলিয়ন আফ্রিকান কালো মানুষকে কৃতদাস বানিয়ে আমেরিকা নিয়ে গিয়েছিল। যাদের ৮৮ ভাগ সমুদ্রেই মারা গিয়েছিল এবং তাদের মৃতদেহকে আটলান্টিক মহাসাগরে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তারা কি মুসলিম ?

চ. যারা হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিরপরাধ নারী শিশু ও সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে লেছে, তারা কি মুসলিম ?

উত্তর হবে, এসব মহাসন্ত্রাসী ও অমানবিক কার্যকলাপের সাথে মুসলমানরা  কখনো জড়িত ছিল না এরকম জঙ্গি জঙ্গি খেলা আর কতদিন।

আমেরিকা নিজের স্বার্থের প্রয়োজনে জঙ্গী গোষ্টি তৈরী করে, প্রয়োজন শেষ হলে তাদের দমনের নামে মুসলিম দেশগুলোকে লুটেপুটে খায়। আইএস দমন আমেরিকার জন্য কযেক ঘন্টার ব্যাপার মাত্র। তা তারা করবে সবটুকু তেলের বিনিময়ে অস্ত্র বিক্রির পর। 


১৩



বেশি আয় করলেই সুখী হওয়া যায় না

প্রত্যেকেরই চেষ্টা থাকে একটু বেশি বেতনে নতুন চাকরির, বেশি আয়ের। গবেষণা বলছে, বেশি আয় হয়তো একজনের জীবনযাপন কিংবা স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে পারে কিন্তু এটা কারও জীবনের সুখ কিনতে পারে না। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা একটু বেশি উপার্জন  করেন  তাদের  মধ্যে অহংকার করার এবং স্বার্থপর  হওয়ার  মানসিকতা  দেখা দেয়। অন্যদিকে যাদের আয় তুলনামুলকভাবে কম তাদের মধ্যে সহমর্মী হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে। 

 ক্যালিফোর্ণিয়া ইউভার্সিটির গবেষণা বলছে, যারা বেশি টাকা উপার্জন করেন,  তাদের জীবনে তখন টাকাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোনো আয়েই তখন তারা সন্তুষ্ট হতে পারেন না। আরও বেশি পরিমাণ টাকার পেছনে ছোটেন। তাদের জীবনটা আবর্তিত হয় নিজেকে নিয়েই। 

অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে কম উপার্জনকারীরা অন্যদের সঙ্গে তাদের স¤পর্কের মধ্যে সুখ খুঁজে নেন।  যারা স¤পদশালী তারা হয়তো তাদের সামাজিক মর্যাদা এবং ব্যক্তিগত সাফল্য নিয়ে খুশি থাকেন কিন্তু কম উপার্জনকারীরা অন্যদের সঙ্গে তাদের স¤পর্ক, যোগাযোগ কিংবা অন্যের প্রতি নিজের দায়িত্বশীলতা নিয়ে সুখী থাকেন। সম্পদশালীরা একটা অহংকার নিয়ে কম উপার্জনকারদের সাথে মিশেন।


১৪

বাংলা সংস্কৃতির পোশাক

পাঞ্জাবী পাঞ্জাবের পোশাক।  এটি আফগানিস্তান, পাকিস্তান ঘুরে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এটি ৫০০ বছরের অধিক সময় বাংলায় পরিধেয় হয়ে আসছে। পূর্বে পাঞ্জাবীর সাথে ধুতি পরা হতো। কারণ ধুতি ছাড়া পরিধেয় কোন পোশাক ছিলো না। পরবর্তিতে  পায়জামা আসার পর পায়জামা ধুতির স্থান দখল করে। হিন্দু দাদারা যেহেতু ধুতি পরে, তার বিপরীতে পায়জামার চল মুসলিম সমাজে  দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। 

তবে পাকিস্তান হওয়ার আগ পর্যন্ত মুসলিমদের আনেকেই ধুতি পড়ত। যেমন-কবি কাজী নজরুল ইসলাম পাঞ্জাবীর সাথে সর্বদা ধুতি পরতে পছন্দ করতেন। উল্লেখ্য, পায়জামা হল ইরানী পোশাক। লুঙ্গি তামিল নাড়ুর পোশাক। এটি শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া সব ঘুরে মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে এসেছে। ১০০ বছরের কিছু বেশিকাল লুঙ্গি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সে সময় রেক্সগুন থেকে লুঙ্গি আমদানি হতো। লুঙ্গির ব্যবহার বৃদ্ধির সাথে সাথে বাঙালি মুসলমান সমাজ হিন্দুদের সাথে বেশভূষার পরিবর্তন ঘটাতে ধুতি পরিত্যাগ করে লুঙ্গীকে নিজেদের পরিধেয় হিসেবে গ্রহণ করে। তাহলে চার হাজারের বেশি সময় ধরে যে "বাঙাল" বা "বাঙ্গালা" জনপদ গড়ে উঠেছিলো তাদের পোশাক কি ছিলো!

বাঙ্গালিরা সেলাইবিহীন পোশাক পরতো। এর কারণ তখনো সুঁই নামক বস্তু আবিষ্কৃত হয়নি। চরকায় বোনা সুতো আর তাঁতে বোনা সেলাইবিহীন মোটা কাপড় ছিলো তাদের পরিধেয়। পুরুষদের পোশাক ছিলো খাটো ধুতি, কাধে গামছা, কখনোবা চাদর, শাল, আর নারীদের শাড়ি। এগলো সব সেলাইহীন পোশাক। 

বাংলার সহজিয়া সম্প্রদায়সহ আনেক ধর্মীয় গোষ্ঠী (আমাদের সহজিয়া কলাম লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদসহ) এখনো সেলাহীন পোশাক পরে। এদেশে লুঙ্গী আসার পর থেকে ধুতি হিন্দুয়ানী পোশাক আর লুঙ্গি মুসলমানদের পোশাক বলে মগজে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। 

এখনও ধুতির নাম শুনলে বাংলাদেশের মুসলিমরা এটাকে শুধু দাদাবাবুদের পোশাক বলে মনে করে, নিজেদের পোশাক বলে কল্পনাও করতে পারে না। তবে মজার ব্যাপার হল বাঙালী হিন্দুসমাজেও ধুতি হারিয়ে গেছে। শ্রাদ্ধ, বিয়ে, পূজা ছাড়া এখন আর কাউকে ধুতি পরতে দেখা যায় না। বাংলা সংস্কৃতির সবচেয়ে পুরোনো এই পোশাকটিই হারিয়ে গেছে ধর্মীয় বিভেদের জালে পড়ে।

পহেলা বৈশাখে যারা বাঙালিয়ানা দেখাতে পায়জামা, পাঞ্জাবী, ফতুয়া, লুঙি পরে বেরুন, তাদের পোশাক কি আদৌ বাঙালি পোশাক? নাকি ধার করা সংস্কৃতি? পোশাকের কথা কি বলব, অনেকে তো পহেলা বৈশাখকেই বাঙালি সংস্কৃতি হিসাবে মানতে চান না। তাদের কাছে প্রশ্ন: আপনারা  পহেলা বৈশাখকে বর্জন করছেন ভাল কথা, কিন্তু বাংলায় কথা বলেন কেন? যাই হোক, আজকাল তো দেশে-বিদেশে অনেক বাঙালি ইংরেজিতেই কথা বলে। তারা সাহেবদের অনুকরণে কোট-প্যান্ট পরতে শিখে গেছে, তবে সেগুলোকেই  আজও বাঙালিরা নিজেদের পোষাক বলে মনে করে না। 

বাঙালি মেয়েদের আদি পোষাক শাড়িও হচ্ছে সেলাইহীন পোষাক। সুতা এবং কাপড় বোনার শিল্প ভারতবর্ষে এসেছিল মেসোপটেমিয়ান সভ্যতা থেকে। সিন্ধু উপত্যকার নারী- পুরুষ সুতা বুনত। ভারতে  সুতা প্রথম চাষ ও বুনন শুরু হয় খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে। ঐ সময় সুতায় যে রঙ ব্যবহার হতো, তা এখনো ব্যবহার করা হয়; যেমন- নীল গাছ বা হলুদ থেকে পাওয়া রং।  

শাড়ির সর্বপ্রথম চিত্রায়ন পাওয়া যায় সিন্ধু প্রদেশের এক পুরোহিতের প্রস্তর মূর্তিতে। সিন্ধু উপত্যকার লোকেরা দীর্ঘ কাপড়ের টুকরা কোমরবন্ধ হিসেবে ব্যবহার করতো। 

আর্যরা যখন প্রথম দক্ষিণ ভারতের নদী অববাহিকায় আসে, তখন স্থানীয় অধিবাসীদের থেকে তারা প্রথম সুতায় বোনা লম্বা কাপড় পরিধানের অভ্যাস শুরু করে। সিন্ধু এলাকার মহিলাদের এই কটিবন্ধ কাপড়ের নাম ছিল নিভি (ঘরার)। মহিলাদের এই কটিবন্ধ নিভি-ই হল শাড়ির অগ্রদূত। পরবর্তীতে কাঁচুকি (কধহপযঁশর) নামে এক টুকরা কাপড় শরীরের উপরের অংশে জড়িয়ে পরার প্রচলন নারীদের মধ্যে ছিল, যা থেকে ব্লাউজের প্রচলন শুরু হয়।

এরপর কারুকাজ ও নকশার উন্নতি এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যই এই সেলাইবিহীন কাপড়ের দীর্ঘ  তিন খন্ডে বিভক্ত হয়- নীভি কোমর ও নিম্নাংশ জড়িয়ে থাকতো এক টুকরো, কাচুকি উপরের অংশে থাকতো আর এক টুকরো এবং তৃতীয় টুকরো শালের মতো দীর্ঘ কাপড়টাকে বলা হত উত্তরীয়। পুরার যুগে এবং সাহিত্যের যুগে মেয়েদের মধ্যে শাড়ির একটা অংশ মাথায় তোলার কোনো প্রচলন ছিল না।

শাড়ির এই পথ চলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে মোঘল শাসনামলে।  মোঘল ছেলেরা দীর্ঘ কোর্তা পরতো, সাথে সরু সালোয়ার। এই সময়েই প্রথম নারীদের শাড়ির শেষ অংশ আঁচল বা পাল্লু হিসাবে পরিচিত হয় এবং মহিলারা তা মাথা ঢাকতে বা ওড়না হিসাবে ব্যবহার করতে শুরু করে, যেহেতু সেই সময় মুসলিম শাসনাধীন।  সেহেতু এ সময় থেকে মহিলাদের মাথা ঢাকার রেওয়াজ চালু হতে শুরু হয়। 

বর্তমানে শাড়ির যে দীর্ঘ আঁচল রাখা হয় এবং তা মাথা ও ঘাড়ে ঘুরিয়ে নেয়া হয়, তা ওই সময় থেকেই চালু হয়। ভারতবর্ষের বিভিন্ন এলাকা বিভিন্ন ধরনের শাড়ির উৎপাদনের জন্যে বিখ্যাত; যেমন ঢাকাই জামদানী, কাশ্মিরী রেশমী সিল্ক, টাংগাইলের তাঁত বা মধ্য প্রদেশের মহেশ্বর শাড়ী।

১৫

ষোড়শী না সুইট সিক্সটিন

ল্যবিবাহের রীতি উনিশ শতকেও কত ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় বিখ্যাত লোকদের জীবনী থেকে। রবীন্দ্রনাথের দাদা দ্বারকানাথ ঠাকুর বিয়ে করেছিলেন পনেরো বছর বয়সে।   চিন্তার দিক দিয়ে তিনি সে যুগের তুলনায় খুব আধুনিক হলেও তার পুত্র অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের বাবা   দেবেন্দ্রনাথের বিয়ে দিয়েছিলেন সতেরো বছর বয়সে, আর রবীন্দ্রনাথের মায়ের বা পাত্রীর বয়স ছিল  এগারো। 

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজনারায়ণ বসু, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কেশবচন্দ্র সেন, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কালীপ্রসন্ন সিংহ, রমেশচন্দ্র দত্ত- সেকালের বিখ্যাত এই ব্যক্তিরা সবাই বিয়ে করেছিলেন   তাদের বয়স সতেরো হবার মধ্যেই। তাদের পাত্রীদের বয়স ছিল আরও অনেক কম। বঙ্কিমচন্দ্র যাকে বিয়ে   করেছিলেন, তার বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর। দেবেন্দ্রনাথ এবং বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর স্ত্রীর বয়স ছিলো  ছয় বছর। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রীর বয়স ছিল সাত বছর, বিদ্যাসাগরের আট, কেশব সেন এবং   জ্যোতিরিন্দ্রনাথের নয়, শিবনাথ শাস্ত্রীর দশ আর রাজনারায়ণ বসুর স্ত্রীর বয়স ছিল এগারো বছর।   

এসব বিচারে বলতে হয়, আদর্শ পাত্র ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ২৩ বছর বয়সে অভিভাবকদের ইচ্ছায় একটি নিরর ও মাত্র এগারো বছর বয়সের মেয়ের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল।  আদতে ইংরেজ আমলে ধর্মবর্ণ-নির্বিশেষে প্রায় সব বাঙালি মেয়ের বিয়ে হতো সাত-আট থেকে ১০ বছরের মধ্যে। 

যেসব পরিবারের অভিভাবকদের কিছুটা কাণ্ডজ্ঞান ছিল, তাঁরা রজঃবতী না হওয়া পর্যন্ত   পুত্রবধূকে শাশুড়ি, দাদিশাশুড়ি বা বিধবা পিসির কাছে শুতে দিতেন। তবে কাণ্ডজ্ঞান ও বিবেচনাসম্পন্ মানুষের সংখ্যা বাঙালি সমাজে চিরকালই বিরল। প্রাপ্তবয়স্ক ছেলের সুখ-শান্তির কথা চিন্তা করে   অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নব বধূকে ছেলের ঘরে ঠেলে দিত। ঐ বাল্যবধূর আর্তনাদ আকাশ পর্যন্ত পৌঁছালেও শ্বশুর-শাশুড়ি রাখতেন কানে তুলা গুঁজে।  

একদিন এরকম একটি ঘটনা ঘটে কলকাতার এক গলির মধ্যে। এক হৃষ্টপুষ্ট যুবক বছর আটেকের এক  শিশুকে ধুমধাম করে বিয়ে করে আনে। নির্মম অভিভাবকেরা তাকে বাসরঘরে ঠেলে দেন। কিছক্ষুণ পর মেয়েটির আর্তচিৎকারে মধ্যরাতেই পাড়া-পড়শিরা সে বাড়ির সামনে এসে ভিড় করে। নিরুপায় হয়ে বাড়ির লোকজন বালিকাটিকে নিয়ে যায় কলকাতা মেডিকেল কলেজে। 

পরদিন হতভাগিনী শেষ-নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। খবরটি কাগজে আসে। পত্রিকায় খবরটি ফলাও করে আসায় ইংরেজ কর্মকর্তাদের তাতে দৃষ্টি পড়ে। ফলে তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন, ঋতুমতী হওয়ার আগে মেয়েদের বিয়ে নিষিদ্ধ করে আইন প্রণয়ন করা হবে। এই নির্মম ঘোষণা বাঙালি পুরুষেরা মানবেন কেন? তাঁরা তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন এবং প্রতিবাদে ফেটে পড়েন।  সম্প্রতি আমাদের মন্ত্রিপরিষদ মেয়েদের বিয়ের বয়স অবস্থার পরিপেক্ষিতে ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ করার কথা বলেছেন। 

ষোড়শী শব্দটি কয়েক’শ বছর ধরে বাঙালি কবিদের ছিল খুবই প্রিয়। আমাদের জাতীয় কবিও তাঁর   সেরা সৃৃষ্টিতে বলেছেন: 'আমি ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম উদ্দাম, আমি ধন্যি।' কবি ১৬ বছর   বয়স্কার সঙ্গে প্রেমপিরিত করে ধন্য হবেন, আর বাংলার ছোকরারা কি বসে বসে আঙুল চুষবে? তাই  মন্ত্রিপরিষদে মেয়েদের বিয়ের বয়স ষোলোতে রাখতে  চান। যেটাঅসভ্যতার নিদর্শন বলে সুধী সমাজ হইচই করছে। আসলে মেয়েদের ১৬ বয়সটির প্রতি শুধু বাঙালি পুরুষদেরই লোভ, তা নয়।  ইংরেজরাও কম যায় না।  তারা  ষোড়শী না বলে বলে সুইট সিক্সটিন-মিষ্টি ষোলো।  -সৈয়দ আবুল মাকসুদ 

১৬

মানুষ কি আবার সেই গুহার জীবনে ফিরে যাচ্ছে?

ইউরোপের বেশ কিছু দেশ- ফ্রান্স, স্পেইন, পর্তুগাল,নেদারল্যান্ড লুক্সেমবার্গ এর মত জার্মান এথিক্স কাউন্সিলও আপন ভাই- বোনের মধ্যে বিয়েতে  বৈধতা  দিয়েছে! জার্মান এথিক্স কাউন্সিলের ভাষ্য, দুজন প্রাপ্ত- বয়স্ক মানুষ তাদের মধ্যে শারীরিক সস্পর্ক স্থাপন করবে কি-না তা তাদের ব্যক্তিগত বিষয়। সমাজ এটিকে নিষেধাজ্ঞার জায়গায় নিয়ে যেতে পারে না। 

প্রাচীন গুহা মানবদের জীবন প্রবাহ থেকে জানা যায়, আজকের মত এত সুসৃংখল যৌন জীবন তাদের ছিল না। তখন যৌনাচার হত যাচ্ছে তাই ভাবে, যে যেভাবে পারে। অপেক্ষা কৃত শক্তিমান পুরুষ  অপেক্ষাকৃত আকর্ষণীয়া নারীকে তার শক্তিবলে ধর্ষণ করা শুরু করতো, যত কয়জনকে ইচ্ছা, যত বার ইচ্ছা। 

এমনকি, তাগড়া জোয়ান হয়ে ওঠা শক্তিশালী পুরুষটির আকর্ষন যদি তার বোনের দিকেও যেত, সে তাকে ছিনিয়ে  নিতেও পিছপা হত না। তখন মানুষে মানুষে কাড়াকাড়ির বা সংঘাত-সংঘর্ষের বিষয় ছিল মূলত মাত্র দুটি, খাদ্য ও নারী। আর এই কাড়াকাড়িতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ত  অপেক্ষাকৃত দূর্বলেরা বিশেষকরে ঐ সকল বয়স্ক পুরুষেরা  যাদের খাদ্যের সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা নারীরও প্রয়োজন তখনও ফুরিয়ে যায়নি। বয়স্ক পুরুষেরা শক্তিমান জোয়ানদের সঙ্গে নারী নিয়ে লড়াই করতে গিয়ে হেরে গিয়ে মৃত্যু বরণ করত অথবা খাদ্য আয়োজন থেকেও তারা বাদ পড়ত। 

 গুহার ভিতর যুবতি মেয়েদের নিয়ে একাধিক জোয়ান ভাইদের মধ্যে যাতে সংঘর্ষ না বাধে  তার জন্য নিয়ম তৈরী ও তার প্রয়োগের চেষ্টা হতে থাকে। এভাবেই সংসার, সমাজে, একের পর এক সুবিধাজনক নিয়ম ও আইন প্রণীত ও সংশোধীত হতে হতে আজকের অবস্থায় এসে পৌছেছে। গুহা জীবনে ভাই-বোনে বিয়েকরার একটা জিনগত প্রবণতা কম-বেশি আজো রয়ে  গেছে।  যার প্রমান ইউরোপে আপন ভাই-বোনের মধ্যে বিবাহ। বিজ্ঞান এটা সমর্থন করে না, কারণ এতে জেনেটিক সমস্যা হয়। -কাগজ ডেস্ক

১৭

নিম্ন বর্ণের হিন্দুদের গলার ঘন্টি আর বৌদ্ধ ন্যাড়া ভিক্ষুকদের উপর অত্যাচারের ফলে বাঙালিরা মুসলমান হয়ে গেল!

সুফীরা বিভিন্ন দেশে তাঁদের মত প্রচারের জন্য বেরিয়ে পড়লে; তাদের কার্যকলাপে মুগ্ধ হয়ে লক্ষণ সেন পান্ডুয়ায় একটি মসজিদ নির্মাণের অনুমতি দেন এবং প্রচুর ভূ-সম্পত্তি দান করেন। এতে বহু লোক ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়। তবে তাদের সংখ্যা তেমন উল্লেখযোগ্য ছিল না। পরবর্তীতে যে সব ধর্ম প্রচার করতে এসেছিলেন তারা মুসলমান প্রশাসক (১২০৪ থেকে ১৭৫৭ পর্যন্ত)দের সহায়তা পেয়েছিলেন। (যেমন- ১৩৪২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৪১৪ খ্রীষ্টাব্দ এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৪৬৬ খ্রীষ্টাব্দে থেকে ১৪৮৭ খ্রীষ্টাব্দে পর্যন্ত সময়ে ইরানী ইলিয়াস শাহী বংশের সুলতানেরা বাংলা শাসন করেন। তারপর ১৪৮৭ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ১৪৯৩ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত আবিসিনীয় হাবশী বংশের সুলতানের স্বল্পকালীন শাসনের পর ১৪৯৩ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ১৫৩৮ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত আরবী হোসেন শাহী বংশের সুলতানেরা এ দেশ শাসন করেন। ১৫৩৮ খ্রীষ্টাব্দে হুমায়ুন বাংলা দখল করেন। কিন্তু তিনি বেশি দিন তা ধরে রাখতে পারেননি। ১৫৩৯ খ্রীষ্টাব্দে শের শাহ বাংলার অধিকার নেন । 

১৫৭৬ খ্রীষ্টাব্দের থেকে দিল্লীর মোগল সম্রাটদের নিযুক্ত সুবেদাররা বাংলা শাসন করতে থাকেন। আইনগত মোগল সম্রাটের সুবেদার থাকলেও কার্যত ১৭১৭ খ্রীষ্টাব্দে মুর্শিদ কুলি খাঁ বাংলায় স্বাধীন নবাবতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করেন। ১৭৫৭ খ্রীষ্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের জয়লাভ পর্যন্ত এই নবাবরাই বাংলা শাসন করেন।)

এ দেশের মানুষ মুসলমান হয়ে যাওয়ার সব থেকে বড় কারণ ব্রাহ্মণ্য ধর্মের অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়া আকুতি। পাল আমলে দেশে অনেক বৌদ্ধ ছিল। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পৃষ্ঠপোষক সেন-বর্মন-দেব আমলে তাদের ওপর অকথ্য অত্যাচার হত। সেই অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা পাবার আশায় তুর্কী 

আক্রমণকারীদের তারা দেবতার আসনে বসিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই বহু সংখ্যক বৌদ্ধ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। বাংলার যে উত্তর ও পূর্ব অংশে বৌদ্ধদের সংখ্যা বেশি ছিল, সেই উত্তর ও পূর্ব অংশে পরবর্তীকালে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ছিলেন মুণ্ডিত মস্তক অর্থাৎ ন্যাড়া। তাই তাদের নেড়ে বলে বিদ্রুপ করা হত। পরে তাঁরা যখন মুসলমান হলেন তাঁদের সূত্র ধরে সব মুসলমানকেই নেড়ে বলে উপহাস করার উন্নাসিকতা প্রচলিত হল।

সেন আমলে ব্রাহ্মণরা সমাজকে এমনভাবে বেঁধেছিল যে সাধারণ মানুষ পদে পদে শোষিত, বঞ্চিত এবং অপমানিত হত.... স্মৃতি-পুরাণ বলে অভিহিত ধর্মশাস্ত্রগুলি অংশ বিশেষ চতুর বিদ্বানরা এমনভাবে রচনা করেছিল যাতে ধর্ম বা শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে সাধারণ মানুষের বৃহত্তর অংশকে অনায়াসে দাস শ্রেণীতে পরিণত করা যায় এবং তাদের শ্রম, তাদের ভূমি ও তাদের নারী ভোগ করা যায়। উচ্চবর্ণের লোকেরা যাতে তাদের ছোঁয়াচ এড়িয়ে চলেতে পারে তার জন্য নিম্নবর্ণের লোকদের গলায় ঘন্টি ঝুলিয়ে চলতে হত। কিন্তু সে যদি মুসলমান হয়ে যেত, তাহলে রক্ষা পেত।

ব্রাক্ষণ্য ধর্মের তুলনায় ইসলাম ধর্ম মানুষকে অনেক বেশি সমানাধিকার দেয়। মুসলমান হলে সে আর যে কোন মুসলমানের সঙ্গে সমান। তার ছোঁয়া লাগলে তার সমাজে আর কারও জাত যায় না। যার ফলে নিম্ন বর্ণের অত্যাচারিত মানুষেরা দলে দলে মুসলমান হয়ে গেল। ত্রয়োদশ থেকে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত বাংলায় সুফী প্রচারের স্বর্ণযুগ। ষোড়শ শতকে চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের  ফলে বাঙালি সমাজে সূফীদের প্রভাব অনেক কমে যায়।  

১৮

অমৃত বচন 

🌻বেশিরভাগ শিক্ষকই পাঠবইয়ের বাইরে পড়াশোনা করতে অনাগ্রহী নয়। এরা কেবল চাকরি করে শিক্ষকতা নয়!

🌻মানুষকে পশু বললে ক্ষেপে যায়, কিন্তু সিংহ বললে খুশি হয়!!

🌻বরযাত্রার সময় বর সবার পিছনে থাকে আর বাকীরা সামনে। কিন্তু কবর যাত্রায় মৃত দেহ সবার আগে থাকে আর মানুষ- জন পিছনে!  সমস্ত পৃথিবী সুখের দিনে আগে আর দুঃখের দিনে পিছনে।

🌻ধর্মান্ধরা অন্য ধর্মের সমালোচনায় খুশিতে বিগলিত হয়, নিজ ধর্মের সমালোচনার গন্ধ পেলেই হিংস্র হয়ে ওঠে।

🌻সারাটা জীবন বোঝা বইলো দেয়ালের পেরেকটা আর মানুষ সুনাম করলো পেরেকে টাঙানো ছবিটার!!

🌻প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকরা কেবল শিক্ষার্থীদের শিক্ষক আর সাহিত্যিকরা গোটা সমাজের শিক্ষক!

🌻ছেলেরা যৌবনের শুরুতে প্রেম করার জন্য মারিয়া হয়ে ওঠে; তবে নিজের বোনকে সবসময় এসব থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে।

🌻পুরুষ কখনোই সুন্দর মন চায় না, সুন্দর শরীর চায়!

🌻কান্না হলো নারীর দাবি আদায়ের বড়ো অস্ত্র!

🌻নারী সুন্দর করে হেসে কথা বললেই পুরুষরা সুযোগ খোঁজে!

🌻টাকার বিকল্প  হচ্ছে ‘বিনয়’। কেননা, বিনয় দিয়েও অনেক কাঠিন্যকে জয় করা যায়!

🌻ধর্ম নিয়ে পুরুষ যতটুকু আগ্রহী নারী ততটুকু নয়!

🌻বেশি কথা বলা নারীদের পুরুষ কম পছন্দ করে।

🌻খ্যাতিমানদের সাথে ছবি তুলে যারা নিজেকে প্রচার করতে চায় বুঝতে হবে তারা ব্যক্তিত্ব সংকটে ভুগছে!

🌻বাধ্য না হলে বাঙালি আইনের ধার ধারে না!

🌻নিঃস্বার্থভাবে মানুষ অপরের প্রশংসা করে না, চাপ, লাভ এবং লোভে করে!

🌻শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষার মুখ্য উদ্দেশ্য ভালো সার্টিফিকেট অর্জন, জ্ঞানার্জন নয়!

🌻কাজ করলে কাজ বাড়তেই থাকে, আর না করলে একসময় খুঁজেও পাওয়া যায় না!

🌻ধার করার কথা মনে থাকলেও যথাসময়ে যারা ফেরত দেওয়ার কথা ভুলে যায়, বুঝতে হবে তাদের মনুষ্যত্বে ঘাটতি রয়েছে।

🌻মৌলিকত্ব না থাকলে জনপ্রিয়রাও একসময় কালের গর্ভে হারিয়ে যায়।

🌻স্ত্রী এবং লেখক উভয়ই প্রতিনিয়ত প্রশংসা কামনা করে।

🌻মেহমানের উপস্থিতিতে গ্রামের মানুষ খুশি আর শহরের মানুষ বিরক্ত!

🌻যারা ওয়াজ করে তারা কখনোই দান-খয়রাত করে না।

🌻পুরুষ বেশি কাম প্রত্যাশী, কারণ তারা শারীরিক আর নারী বেশি আদর-ভালবাসা প্রত্যাশী,  কেননা তারা সামাজিক।

🌻পুরুষের পছন্দের তালিকায় হাস্যময়ী নারীরাই শীর্ষে।

🌻মানুষ স্বভাবতই যেমন স্মৃতিকাতর তেমনি যৌনকাতরও।

🌻পশ্চিমারা পশুদের প্রতি যতটা দায়িত্বশীল সন্তানের প্রতি ততটুকু নয়।

কুলীন ব্রাহ্মণের কন্যা এবং বিবাহবণিক

  পশ্চিমবঙ্গ বা রাঢ় অঞ্চলে ব্রাহ্মণের অভাবের কারণে একাদশ শতাব্দীতে উত্তর ভারতের কনৌজ থেকে বাংলায় ৫টি গোত্রের ব্রাহ্মণকে আনা হয় বলে জানা যায়। এরাই বাংলায় কুলীন ব্রাহ্মণ নামে পরিচিত হয়। এই কুলীন ব্রাহ্মণদের পদবী ছিল বন্দ্যোপাধ্যায়, গঙ্গোপাধ্যায়, চট্টোপাধ্যায়, মুখোপাধ্যায় ও ভট্টাচার্য। সামাজিক মর্যাদায় এই কুলীন ব্রাহ্মণদের মর্যাদা সমাজের অন্যান্য ব্রাহ্মণদের চাইতেও উপরে ছিল। মধ্যযুগে বাংলায় আসার পর, এদের বিবাহের যে প্রচলিত নিয়ম তৈরি হয় তা হল, একজন পুরুষ কুলীন ব্রাহ্মণ ’কুলীন বা অকুলীন’ যেকোন ব্রাহ্মণ বংশেই বিয়ে করতে পারবেন, কিন্তু কুলীন ব্রাহ্মণ কন্যার বিয়ে হবে কেবলমাত্র কুলীন বংশেই (যদি কুলীন কন্য কুলীন বংশের বাইরের কাউকে বিয়ে করত তবে তার পিতা কৌলিন্য হারাতো)। তো, কুলীনদের মধ্যে নারী ও পুরুষের এই বৈবাহিক বৈষম্যের ফলাফল কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। দেখা গেল, কুলীন ব্রাহ্মণ কন্যাদের জন্য পাত্র পাওয়া যায় না। কুলীন পুরুষেরা সুন্দরী পাত্রী পেলে ঠিকই অকুলীন কন্যাকে বিয়ে করে নিত, কিন্তু কুলীন কন্যারা ছিল এক্ষেত্রে অসহায়। আর এরই সুযোগে কুলীনদের মধ্যে বেড়ে গেল বহুবিবাহ। কুলীন কন্যার পিতার ছিল সামাজিক রীতিতে কন্যাদায় মুক্ত হবার তাড়া, কুলীন ব্রাহ্মণ পেলেই কন্যার পিতাকে যে করেই হোক তার সাথে বিয়ে দিয়ে কন্যাদায়মুক্ত হতে অস্তির হয়ে উঠতো। 

      কুলীন পরুষেরা বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে গিয়ে অর্থের বিনিময়ে কুলীন কন্যাকে বিয়ে করতো,  এক্ষেত্রে কুলীন কন্যা নিজের বাপের বাড়িতেই থাকতো। এরপর মাঝেমাঝে বছরে দুই একবার কুলীন স্বামী তার স্ত্রীকে দেখতে আসতো, ভালমন্দ খেয়ে দেয়ে, রাত কাটিয়ে আবার চলে  যেতো। অর্থের লোভে কুলীন পুরুষেরা একে বাণিজ্যিক পেশায় পরিণত করেছিল। রামনারায়ণ তর্করত্ন এদের নাম দিয়েছিলেন বিবাহবণিক। এদের পেশাই ছিল বিয়ে করে আয় করা, আর বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে গিয়ে স্ত্রীদের বাড়িতে গিয়ে কয়েকদিনের জন্য থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা ও সালিয়ানা দক্ষিণা আদায় করা। 

    দেখা যেতো অনেক সময় কুলীন ব্রাহ্মণেরা কুল রক্ষার জন্য মৃত্যুশহ্যায় থাকা কোন কুলীন পাত্রের সাথেই মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিত। আর দুইদিন পরেই পাত্রের মৃত্যু হলে মেয়ে বিধবা হয়ে যেত। অনেক সময় বিবাহবণিকেরা রাতে শুতে গিয়ে স্ত্রীর সব গয়না নিয়ে চ¤পট দিত। এই বিবাহবণিকদের সাথে বিবাহিতা কুলীন নারী যৌনতৃষ্ণা মেটাতে না পেরে অনেক সময় পরপুরুষের সাথে যৌনক্রিয়ায় লিপ্ত হত, আর তার ফল হত অবাঞ্চিত সন্তান আর ভ্রƒণ হত্যা। 

    কুলীন নারীদের এই অবৈধ সহবাসের কথা রামনারায়ণ তর্করত্ন তার কুলীনকলসর্বস্থ’ নাটকের এক অংশে লেখেন "পুত্র তিন বৎসর শ্বশুরবাড়ি যায়নি। হঠাৎ খবর এল তার একটি কন্যাসন্তান হয়েছে। পুত্র আশ্চর্য হয়ে পিতাকে যখন এ কথা বলছে, তখন পিতা বলছেন- “বাপু হে, তাতে ক্ষতি কি? আমি বিবাহ করবার পর একবারও শ্বশুর বাড়ি যাইনি। শুভদৃষ্টির পর একেবারে তোমার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়।"

    এই কৌলীন্য প্রথা নিরোধের জন্য নিরলস প্রয়াস চালিয়েছিলেন রামনারায়ণ তর্করত্ন ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। এই প্রচেষ্টার ফলে যে জনমত গড়ে ওঠে তারই প্রভাবে ১৯ শতকে কৌলীন্য প্রথার অবলুপ্তি ঘটে। -সুমিত রায়

২০

“স্তনকর "

জ থেকে কয়েকশ বছর আগে ভারতের কেরালা অঙ্গরাজ্যে হিন্দুদের মধ্যে এক প্রকার ট্যাক্স বা কর প্রচলিত ছিলো। করটির নাম স্তনকর নৎবধংঃ ঃধী। এর আরেকটি নাম মুলাককারাম(সঁষধশশধৎধস)

স্তনকর বা ব্রেস্টট্যাক্স কি? 

ঐ সময় নিয়ম ছিলো শুধু ব্রাহ্মণ ব্যতিত অন্য কোন হিন্দু নারী তার স্তনকে ঢেকে রাখতে পারবে না। শুধুমাত্র ব্রাহ্মণ শ্রেণীর হিন্দু নারীরা তাদের স্তনকে একটুকরো সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতে পারতো, বাকি হিন্দু শ্রেণীর নারীদেরকে প্রকাশ্যে স্তন উন্মুক্ত করে রাখতে হতো। তবে যদি কোন নারী তার স্তনকে কাপড় দ্বারা আবৃত করতে চাইতো, তবে তাকে স্তনের সাইজের উপর নির্ভর করে ট্যাক্স বা কর দিতে হতো। 

এই নির্মম করকেই বলা হয় স্তনকর বা ব্রেস্টট্যাক্স। ১৮০৩ সালে নাঙ্গেলী নামক এক নারী তার স্তনকে আবৃত করে রাখে। যখন গ্রামের ট্যাক্স কালেকটর তার থেকে স্তনকর চাইতে আসে, তখন নালেঙ্গী তা দিতে অস্বীকার করে এবং নিজের দুটি স্তনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। 

তখন ব্যাপারটা দেখে ট্যাক্স কালেকটর অবাক হয়ে যায়।  কিছুক্ষণ পরে স্তন থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের জন্য নাঙ্গেলীর মৃত্যু হয়। স্ত্রীর মৃত্যু শোকে নালেঙ্গীর স্বামীও সাথে সাথে আত্মহত্যা করে। এই ঘটনার পর থেকেই স্তনকর রোহিত হয়। 

তবে স্তনকর রোহিত হলেও দক্ষিণ ভারতে নারীদের স্তন আবৃত করার জন্য বহু সংগ্রাম করতে হয়েছে।  ১৯ শতাব্দীর মাঝে এসে যখন কিছু হিন্দু নারী তাদের শরীরের উপরের অংশ আবৃত করার অধিকার দাবি করে, তখন হিন্দু পুরোহিতরা স্পষ্ট করে বলে দেয়, নিচু বর্ণের নারীদের শরীরের উপরের অংশ আবৃত করা ধর্ম বিরোধী। বিষয়টি নিয়ে ১৮৫৯ সালে দক্ষিণ ভারতে একটি দাঙ্গা সংগঠিত হয়। এই দাঙ্গার উদ্দেশ্য ছিলো হিন্দু নারীদের শরীরের উপরের অংশ আবৃত করার অধিকার আদায় করা। এই দাঙ্গা কাপড়ের দাঙ্গা হিসেবেও পরিচিত। 

  কিছুদিন আগে এক হিন্দুর স্ট্যাটাসে দেখছিলাম। সে বলছিলো ঐ সময় মহিশুর (দক্ষিণ ভারতের এলাকা) শাসনকর্তা টিপু সুলতান নাকি তরবারি ভয় দেখিয়ে অনেক হিন্দু নারীকে মুসলিম বানিয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। ইতিহাস বলছে, ঐ সময় টিপু সুলতান হিন্দুদের এ জংলী কালচার মোটেও পছন্দ করেননি। তিনি চেয়েছেন এই নগ্নতা বন্ধ হোক। 

  তিনি হিন্দু নারীদের আহ্বান করেছিলেন- “যদি তোমরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করো, তবে কাপড় পরার  অধিকার পাবে।” এ কথা শুনে হাজার হাজার হিন্দু নারী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলো । অথচ এই ইতিহাসটি  বিকৃত করে প্রচার করছে কট্টর হিন্দুরা। 

এ সম্পর্কে হিন্দু ইতিহাসবিদ সুরজিত দাসগুপ্ত বলেন- সে সময় ভারতবর্ষের কেরালাতে অমুক হিন্দু নারী ইসলাম গ্রহণ করেছে এটা বলার প্রয়োজন ছিলো না, বলতে হতো শুধু কুপপায়ামিডুক শব্দখানা। এ শব্দখানার অর্থ গায়ে জামা চড়িয়েছে। 

(সূত্র: বই-সুরজিত দাসগুপ্তের ভারতবর্ষ ও ইসলাম, পৃষ্ঠা: ১৩০-১৩১)



২১

মুঘল আমলে বঙ্গদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা: মিথ এবং বাস্তব

বাংলাদেশে মুঘল শাসনের ভিত মোটামুটি সংহত হতে আরম্ভ করে সম্রাট আকবরের সময়ে থেকে। এই সময়েই টোডরমল প্রথমবার বাংলার রাজস্ব নির্ণয় করলেন। রমেশ চন্দ্র দত্ত তাঁর ‘দি ইকোনমিক হিস্ট্রি ইফ ইন্ডিয়া আন্ডার আর্লি ব্রিটিশ রুল’ গ্রন্থে জানিয়েছেন,

সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময়ে যাঁরা বাংলার সুবেদার হয়ে আসেন তাঁদের মধ্যে মীরজুমলা, শায়েস্তা খান, খান-ই-জাহান, ইব্রাহিম খান এবং আজিম-উশ-শানের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৬৫৯ সালে মীর জুমলা বাংলার সুবেদার হয়ে এসে ক্রমাগত আসাম ও কোচবিহারের রাজার সঙ্গে যুদ্ধে ব্যস্ত থাকেন। তাঁর দীর্ঘদিনের যুদ্ধের ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে বাংলাদেশের কৃষকদের উপর তিনি আরও রাজস্বের বোঝা চাপিয়ে দেন। এর ফলে জনজীবনে প্রবল অর্থাভাব দেখা দেয় এবং প্রচুর মানুষ অনাহারে মৃত্যুর শিকার হন। খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণ ছিল অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাহীনতার জন্য খাদ্যদ্রব্য চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অভ্যন্তরীণ শুল্কের কর্মকর্তাদের নির্মম অত্যাচার।

মীর জুমলার পরে ১৬৬৪ সালে বাংলার শাসক হয়ে আসেন শায়েস্তা খান। তিনি সুযোগ্য শাসক ছিলেন। বঙ্গদেশের ইতিহাসে শায়েস্তা খানের সুখ্যাতির প্রধান কারণ হচ্ছে তাঁর সময়ের সস্তা দ্রব্যমূল্য—টাকায় আট মণ চাল বিক্রির মতো অবিশ্বাস্য ঘটনা তাঁর সময়েই প্রথম ঘটে। তবে তিনি বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন এবং অর্থলোভী ছিলেন। 

১৭০০ সাল নাগাদ মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব লক্ষ্য করেন, বিভিন্ন কারণে বাংলার রাজস্ব আদায় ক্রমে কমে আসছে। পরিস্থিতির উন্নতির জন্য তিনি তাঁর বিশ্বস্ত কর্মচারী করতালাব খাঁ-কে (পরবর্তীকালে মুর্শিদকুলী খাঁ নামে বিখ্যাত) বাংলার দেওয়ান নিযুক্ত করলেন।

বাংলার কৃষক শ্রমিক কারিগরদের রক্ত জল করা পরিশ্রম থেকে আদায় করা শুল্ক থেকে দিল্লির সম্রাটকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব পাঠানো হত। বাংলার অর্থনীতি সঙ্কটময় হয়ে উঠেছিল বাদশাহকে রাজস্ব দিতে গিয়ে। ‘অর্থনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপট’ প্রবন্ধে সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন—

‘শত শত চটের থলেতে করে রৌপমুদ্রা দিল্লিতে প্রেরণের পর দেশ এমন মুদ্রাসঙ্কটে পড়ে যেত যে টাকার সরবরাহ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে সময়ে লাগতো ন্যুনপক্ষে ছয় মাস।’

সুবেদার থেকে আরম্ভ করে সকল স্তরের কর্মচারীরা যে অর্থ সঞ্চয় করতেন তার অধিকাংশই বাংলার বাইরে চলে যেত। ইংরেজ শাসনকালে বাংলার যে অবস্থা হয়েছিল এটা তারই পূর্বাভাষ। অবশ্য ঔপনিবেশিক শোষণের সঙ্গে মুঘল বা নবাবদের শোষণের পার্থক্য একটা আছে—ইংল্যান্ড-এ যে টাকাটা যেত সেটা ভারতের সংবহনের বাইরে চলে যেত, কিন্তু মুঘল সম্রাটের হাতে গেলে তা ভারতীয় অর্থনীতির মধ্যে থাকত। তবে এখানে একটা প্রশ্ন আছে, দিল্লিতে যাওয়া এই টাকা কি বাংলার মানুষের জন্য খরচ করা হত? অনেকে বলেন, মুঘল যুগে দেশের টাকা দেশে থাকত, তাঁদের মনে রাখতে হবে, সে যুগের ভারতবর্ষে আজকের মতো যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ছিল না। পশ্চিমবঙ্গের শুল্ক ছত্রিশগড়ের আদিবাসী উন্নয়নে খরচ হত না। দিল্লির বাদশাহের ঘরে সেই রাজস্বের টাকা ঢোকার পর কানাকড়িও ফিরে আসত না। সেই শুল্ক বাদশাহ ও তাঁর প্রতিপালিতদের ফুর্তি আর বিলাসব্যসনে, বড়ো বড়ো ইমারত আর স্থাপত্য বানাতে এবং বিশাল মুঘল সেনার রক্ষণাবেক্ষণে খরচ করা হত।

‘সোনার বাংলা: কিংবদন্তি ও বাস্তব’ প্রবন্ধে আকবর আলি খান লিখেছেন,

‘বাংলায় লোকের আয়ের তুলনায় দ্রব্যমূল্য সস্তা ছিল না এ ধরনের ইঙ্গিত ইবনে বতুতার ভ্রমণবৃত্তান্তেই রয়েছে। প্রথমত ইবনে বতুতা লিখেছেন, বাংলায় করের হার খুব বেশি ছিল। পূর্ব বাংলা সফরের কথা উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, ‘এখানকার প্রজারা মুসলমান রাজার বিধর্মী প্রজা। এদের ফসলের শতকরা পঞ্চাশ ভাগ নিয়ে নেয়া হয়। তার উপরে তাদের কর দিতে হয়।’ যেহেতু আদায়কৃত কর জনগণের কল্যাণে ব্যয় করা হত না, বরং দিল্লিকে নজরানা প্রদান এবং যুদ্ধের জন্য ব্যয় করা হত, সেহেতু করের উচ্চহার জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বিশেষভাবে ত্রাস করে।’

কৃষকদের হিতের জন্য জমিদারদের কোনো মাথাব্যথা ছিল না। গবেষক বিপ্লব দাশগুপ্ত জানিয়েছেন—

‘একজন অত্যাচারী জমিদার ৭৫০টি কৃষক পরিবারকে ভূমিদাসের পর্যায়ে নামিয়ে এনেছিলেন।’

ইরফান হাবিব, আবুল ফজলের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আইন-ই-আকবরী’ থেকে তথ্য তুলে দেখিয়েছেন,

‘বাংলায় নুন ছিল খুবই দুষ্প্রাপ্য এবং দুর্মূল্যও। বাংলার কোনো কোনো অংশে এবং আসামে মানুষ বাধ্য হয়ে ব্যবহার করত কলাগাছের গোড়া পুড়িয়ে এক ধরণের উৎকট বস্তু; এর মধ্যে অবশ্য কিছু পরিমাণে নুন আছে।’

সোনার বাংলা: কিংবদন্তি ও বাস্তব’ প্রবন্ধের লেখক আকবর আলি খানের মতে—

‘প্রাপ্ত তথ্য থেকে মনে হয় যে, প্রাক-ব্রিটিশ বাংলায় মজুরির হার ছিল খুবই কম। তাঁতিদের দারিদ্র সম্পর্কে যেসব পরিমাণগত ও বর্ণনামূলক বিবরণ পাওয়া যায় সেসব এ অনুমানই সমর্থন করে। তবে নিম্নহারে মজুরি শুধু তাঁতিদের মধ্যেই চালু ছিল না। সম্ভবত এ ধরনের অর্থনীতি, যেখানে জীবনধারণের সর্বনিম্ন পর্যায়ের আয় ছিল, সেখানে সকল শ্রমিকেরই মজুরি ছিল কম। এর অর্থ হল, বাংলার জাঁকালো বহির্বাণিজ্যের সুফল ছিল অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। … মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা ও বিদেশী বণিকরাই প্রধানত বাংলার বহির্বাণিজ্যের মুনাফা লুটেছে। তারা কৃষি ও শিল্পজাত পণ্যের বিনিময়ে সোনা-রূপা আমদানি করতো । বেশিরভাগ আমদানিকৃত সোনা-রূপা দিল্লিতে রাজস্ব হিসেবে পাঠানো হতো, অবশিষ্ট গোপনে মজুদ করা হত। প্রাক-ব্রিটিশ বাংলার বহির্বাণিজ্য তাই প্রবৃদ্ধির যন্ত্র ছিল না, এ বাণিজ্যই ছিল সম্পদপাচারের মাধ্যম।’

একটি চমৎকার কথা বলেছেন দেবাশিস ভট্টাচার্য তাঁর একটি প্রবন্ধে—

‘ইউরোপ যখন একের পর এক বানিয়ে চলেছে জ্ঞানবিজ্ঞানের বিচিত্র বিষয়ের ছাপা বই, জটিল বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি, ঘড়ি, পাম্প, ইঞ্জিন—তখন কিন্তু এ দেশীয় ধনীশ্রেষ্ঠ বণিকেরা ইউরোপীয় বণিকদের কাছ থেকে সে সব মোটেই দাবি করছেন না! সে সব বস্তু যে আদৌ আছে এই ধরাধামে, এবং সেগুলো হাতে থাকা এবং না থাকার মধ্যে যে পার্থক্য বিস্তর, এই বোধটাই তাঁদের ছিল না। আদিম হাতিয়ার এবং বংশানুক্রমিক দক্ষতামাত্র সম্বল করে দেশীয় কারিগরবর্গ যে অনুপম হস্তশিল্প বানাতেন (মূলত সুতিবস্ত্র), যৎসামান্য মূল্যে তা কারিগরের কাছ থেকে হস্তগত করে, এবং তার উন্নতিসাধন কীভাবে হবে সে নিয়ে একটুও মাথা না ঘামিয়েই, সোনারুপোর বিনিময়ে তা বিদেশি বণিকের কাছে বেচে ফুলেফেঁপে উঠতে পারলেই তাঁদের সুখ।’ @শিবাশীষ বসু 



২২

সিপাহী বিদ্রোহের অজানা ইতিহাস

সিপাহী বিদ্রোহের মূল কারণ হিসেবে ধরা হয়ে থাকে চর্বিযুক্ত কার্তুজের ব্যবহার। এনফিল্ড রাইফেল অন্যতম কারণ ছিল অবশ্যই, তবে একমাত্র নয়। তবে হ্যাঁ, স্ফুলিঙ্গটা ছড়িয়েছিল চর্বিযুক্ত কার্তুজের ব্যবহারের কারণে। 

ব্রিটিশরা ভারতবাসীকে ঘৃণা করত। এমনকি মানুষ বলেই মনে করত না। তাদের দৃষ্টি ছিল কেবলই ভারতবর্ষের খাজানার উপর। এমনকি ভারতীয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকেও হেনস্তা হতে হতো অযোগ্য ব্রিটিশ কর্মকর্তার কাছে। যেজন্য ভারতবাসীও এড়িয়ে চলত তাদের। ১৭৫৭ সাল থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতবর্ষ থেকে প্রচুর সম্পদ বিলেতে পাচার করেছিল। এজন্য ভেঙে পড়েছিল ভারতীয় অর্থনীতি। রাজা-বাদশাহ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের অর্থকোটা চলে এসেছিল শূন্যে। নতুন সংস্কৃতি ও ভাষার প্রয়োগে শিক্ষিত যুবকেরা বেকার হয়ে পড়েছিল।

কর্মক্ষেত্রেও ছিল ব্যাপক বৈষম্য। যেখানে একজন ভারতীয় কর্মকর্তার বেতন ধার্য হতো মাত্র ৯ টাকা; সেখানে একজন ইংরেজ কর্মকর্তা পেতেন ৪০ টাকারও অধিক। পদোন্নতির ক্ষেত্রেও ছিল এরকমই রেষারেষি। যোগ্যতার চেয়ে স্বজনপ্রীতিই ছিল বেশি। যোগ্য ভারতীয় কর্মকর্তার চেয়ে অনভিজ্ঞ ইংরেজ কর্মকর্তাই সবসময় পদোন্নতি পেত। আর ভারতীয় নাগরিক বছরের পর বছর সেই একই বেতনে চাকরি করে যেত। না হতো পদোন্নতি, না বাড়ত বেতন; এমনকি সামান্য ভুলে আবার কাটা হতো এই বেতন থেকে জরিমানার অংশ।

ধর্মীয় কারণে সিপাহী যুদ্ধ দানা বাঁধছিল বেশ আগে থেকেই। সতীদাহ প্রথা নিবারণ, বিধবা বিবাহ আইন ইত্যাদি কারণে হিন্দুরা বেশ ক্ষেপে ছিল ইংরেজিদের উপর। আবার, জোর করে খ্রিষ্টধর্মে রূপান্তর খেপিয়ে তুলেছিল মুসলমানদের। এরপর এসেছিল চর্বিযুক্ত কার্তুজওয়ালা এনফিল্ড রাইফেল। ইংরেজদের সকল বৈষম্য আর অন্যায় মাথা পেতে নিয়েছিল ভারতবাসী। কিন্তু ধর্মের অবমাননা সহ্য করতে পারেনি হিন্দু-মুসলিম কোনো পক্ষই। তাই মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে বিদ্রোহ।

সিপাহীরা বিভিন্ন ব্যারাক দখল করা শুরু করল। বাধা হিসেবে যারাই এলো, তারাই মৃত্যুমুখে পতিত হলো। মুহূর্তেই দিল্লী দখল করে সিপাহীরা বাহাদুর শাহকে দিল্লীর সম্রাট ঘোষণা করলো। বাহাদুর শাহ সম্রাটের আসনে বসে নতুন করে সকল কিছু সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার ঘোষণা দেন। দিল্লীর মতো এত বড় আর গুরুত্বপূর্ণ একটা রাজ্য ইংরেজদের হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ে তারা। পাশাপাশি কানপুর এবং লখনৌও চলে যায় বিদ্রোহীদের দখলে।

কিন্তু সেরকম কিছুই হয়নি। মূলত সিপাহী যুদ্ধের ব্যর্থতার কারণ হিসেবে দুটি ব্যাপারকে প্রাধান্য দেয়া হয়। এক, সুযোগ্য নেতৃত্বের অভাব এবং দুই, শিখ সেনারা ভারতীয় হয়েও ব্রিটিশদের সহযোগিতা করা। বাহাদুর শাহ তেমন যোগ্য নেতৃত্বের পরিচয় দিতে পারেননি। আর সিপাহীরাও জোটবদ্ধ হয়েছিল বটে, কিন্তু বিদ্রোহী মনোভাব হওয়ায় হতে পারেনি তারাও সামরিকভাবে সংঘবদ্ধ। উপরন্তু, শিখ সেনারা ব্রিটিশদের সঙ্গে হাত মেলাবার পর সিপাহীদের অধিকৃত অনেক অঞ্চলই ধীরে ধীরে হাতছাড়া হতে থাকে ও সিপাহীদের মনোবল ভেঙে পড়ে।

সিপাহীরা দিল্লী অধিকৃত করে রেখেছিল দীর্ঘ পাঁচ মাস। কিন্তু এতদিনেও তারা দিল্লীর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়নি। তাই ব্রিটিশরা শিখদের নিয়ে আক্রমণ করামাত্রই দিল্লী দখল করে নেয়। আর দিল্লীর পতন হলে সামগ্রিকভাবেই সিপাহীরা মনোবল হারিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। কেননা, ইতোমধ্যেই বিদ্রোহীদের ধরে নিয়ে বিচারের ধারেকাছেও না ঘেঁষে ব্রিটিশরা জনসম্মুখে ফাঁসিতে ঝোলাচ্ছিল বা নির্বিচারে গুলি করে মারছিল। তাই পালানো ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো উপায় ছিল না বিদ্রোহীদের। তবে সিপাহী বিদ্রোহের কারণে ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অবসান হয়, এবং ভারতবর্ষ ব্রিটিশ রাজ্যের একটি অঙ্গরাজ্য বলে ঘোষিত হয়।


@ Wazedur Rahman Wazed



২৩

মে দিবস: শ্রমিক শ্রেণির অধিকার আদায়ে রক্তাক্ত সংগ্রামের ইতিহাস

শিল্প বিপ্লবের পর থেকে দীর্ঘদিন ধরে পৃথিবীজুড়ে শ্রমিকের কর্মঘন্টার ব্যাপারটি সুরাহা হয়নি, বৃহৎ পুঁজির অধিকারি মালিকপক্ষ ঠিক করে দিচ্ছে শ্রমিকের কয় ঘন্টা কাজ করতে হবে। দৈনিক দশ, বারো কিংবা তার চেয়ে বেশি ঘন্টা কাজ আদায় করিয়ে নেওয়া হয়েছে একজন শ্রমিকের কাছ থেকে। এই দীর্ঘ কর্মঘন্টার প্রভাব পড়েছে তার দৈনন্দিন জীবনে। তাই বিশ্বের নানা প্রান্তের শ্রমিক সংগঠনগুলো আট ঘন্টা কাজকে ‘প্রমাণ কর্মঘন্টা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে। মে মাসের এক তারিখ যে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ পালিত হয়ে থাকে সেটিও মূলত আট ঘণ্টা কাজের দাবি প্রতিষ্ঠিত করার আন্দোলন হিসেবেই শুরু হয়েছিল। তবে এই আন্দোলন বিশ্বজুড়ে শ্রমিক শ্রেণির সামগ্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

বৃহৎ পুঁজির কারখানা যত বেশি কর্মক্ষম থাকবে, তা থেকে পণ্য উৎপাদন চলবে। বাজার যত গতিশীল থাকবে সরকারেরও তত লাভ, সরকার সেখান থেকে আদায় করবে নানা ধরনের কর। ভিক্টোরিয়ান যুগের সাহিত্যের দিকে চোখ মেললেও দেখা যাবে কলকারখানাকে এক দানবের সাথে তুলনা দেওয়া হয়েছে কোথাও কোথাও, শ্রমিকের শেষ রক্তবিন্দুতে ফুলে ফেপে উঠছে কারখানার মালিকেরা। তাই ১৮৮৬ সালের আমেরিকার শিকাগো শহরের শ্রমিক আন্দোলন, যেটি এখন ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ বা ‘মে দিবস’ নামে পরিচিত সেটি শ্রমজীবী মানুষকে পথ দেখিয়ে যায়।

মে দিবসের ইতিহাস

আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পর শিকাগো শহর হয়ে উঠে শিল্পায়নের অন্যতম কেন্দ্র। আমেরিকান শ্রমিকের পাশাপাশি শিকাগো শহরে জার্মানি এবং ইউরোপের বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিকেরা কাজের খোঁজে আসতে শুরু করে। গড়ে দেড় ডলার প্রতিদিনের মজুরীতে হাড়ভাঙ্গা খাটুনী, সপ্তাহে ছয়দিন কাজ করতে হয় মালিকপক্ষের ইচ্ছে অনুযায়ী সময়মতো। একটি কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শ্রমিকদেরকেও একটি যন্ত্র হিসেবে গণ্য করা হয়েছে দীর্ঘদিন, উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলা কিংবা কোনো দাবি তোলা ছিল তার ক্ষমতার বাইরে। 

আট ঘন্টাকে প্রমাণ কর্মঘন্টা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে মালিকের হাতে নিপীড়িত হয়েছে অনেক শ্রমিক, যাদের বেশিরভাগই সংগঠিত ছিল না। আন্দোলন করে দাবি আদায় করতে চাইলেই নিপীড়ন করে উদাহরণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, শ্রমিকদের মনে ভয়ের সঞ্চার করা হয়েছে। এভাবে পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায় তখন আমেরিকার শিকাগো, নিউ ইয়র্ক, উইসকনসিন এবং বিভিন্ন রাজ্যে গড়ে উঠতে থাকে সংঘবদ্ধ আন্দোলন। ১৮৮৪ সালের অক্টোবর মাসে আমেরিকার ‘ফেডারেশন অফ অর্গানাইজড ট্রেডস এন্ড লেবার ইউনিয়নস’ এর এক বৈঠকে আট ঘন্টা কাজের সময়কে কীভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায় সেই বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। আমেরিকার বিভিন্ন লেবার ইউনিয়নের সম্মতিক্রমে ১৮৮৬ সালের মে মাসের এক তারিখকে ঠিক করা হয়, যেদিন সাধারণ ধর্মঘট ডাকা হয়। দাবি একটাই, আট ঘন্টার বেশি আর কাজ নয়।

মালিকপক্ষ এই আন্দোলনকে মোকাবেলার জন্য শুরু থেকেই শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের গ্রেফতার করতে থাকে, আন্দোলনকারীদের বাছাই করে নিপীড়ন করতে থাকে। তবে এতে করে শ্রমিক অসন্তোষ না কমে বরং আরো বাড়তেই থাকে। মালিকপক্ষের চাপিয়ে দেওয়া চৌদ্দ ঘন্টা/ষোল ঘন্টা কাজের শিকল ভেঙে আমেরিকার শ্রমিক শ্রেণি দাবি তোলে দৈনিক আট ঘণ্টাকে আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠার।

আট ঘন্টা কাজ, আট ঘন্টা বিশ্রাম, আট ঘন্টা নিজের জন্য 

১৮৮৬ সালের মে মাসের এক তারিখ পূর্ব ঘোষিত সাধারণ ধর্মঘটে আমেরিকার বিভিন্ন এলাকার শ্রমিকদের স্লোগান ছিল, 

“Eight Hours for work. Eight hours for rest. Eight hours for what we will.”

এই স্লোগানের মাঝে শ্রমিক নিজের অবস্থান ঠিক করে নিচ্ছে, যেখানে সে আট ঘন্টার বাইরে শ্রমিক যদি না চায় তাহলে তাকে দিয়ে কাজ করানো যাবে না। আমেরিকার শ্রমিকঘন এলাকাগুলোতে এই স্লোগান আর মূল দাবি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। পহেলা মে থেকে তিন তারিখ পর্যন্ত এই আন্দোলন ছিল অহিংস, পুলিশের অবস্থান ছিল বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শ্রমিক সমাবেশের পাশে। 

সরকার এবং কর্তৃপক্ষ বল প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রচুর পুলিশ মাঠে নামে। শিকাগোর ম্যাককরমিক হারভেস্টিং মেশিন কোম্পানির সামনে পুলিশ গুলি চালায় শ্রমিকদের উপর, সেখানে নিহত হয় দুই জন। ছত্রভঙ্গ শ্রমিকদের বিপুল সংখ্যক হতাহত হয়।

এই হতাহতের সংবাদ শ্রমিকদের মাঝে উত্তেজনার সৃষ্টি করে, চার তারিখ অনেক সংঘটিত শ্রমিকদের আন্দোলন, পুলিশ এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে শুরু হয় উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় এবং সংঘর্ষ। এই সংঘর্ষে সাতজন পুলিশ এবং চারজন  শ্রমিক নিহত হয়। দাবি আদায় করতে আসা শত শত নিরস্ত্র শ্রমিক হতাহত হয়। পৃথিবীর শ্রমিক সংগ্রামের ইতিহাসে রক্তের অক্ষরে এটি লেখা হয়ে থাকে ‘Haymarket massacre নামে।

মূলত এই বিচারের মাধ্যমে আমেরিকার সরকার এবং প্রশাসন মালিকপক্ষের পক্ষে তাদের অবস্থান নেয়, মূল দাবি ‘আট ঘন্টা প্রমাণ কর্মঘন্টা’ এই দাবিকে এড়িয়ে যায়।

১৮৮৯ সালে মে মাসের এক তারিখকে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ বলে ঘোষণা দেয় ‘ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর ওয়ার্কার্স এন্ড সোসালিস্টস’। 

দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ১৯১৬ সালে আমেরিকা আট ঘন্টা কাজের দাবিকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার পথে এগিয়ে যায়। ১৯১৭ সালে রাশিয়ার জার দ্বিতীয় নিকোলাসের পতনের চারদিন পরে আমেরিকা অফিসিয়াল ডিক্রির মাধ্যমে ‘দিনে আট কর্মঘন্টা’র স্বীকৃতি দেয়।

@ Shah MD. Minhajul Abedin




২৪



ব্লকচেইন ও বিটকয়েন

ব্লকচেইন হলো একটি নিরাপদ ও অপরিবর্তনীয় ডিজিটাল লেজার প্রযুক্তি, যা তথ্যের ব্লকগুলোকে ক্রিপ্টোগ্রাফির মাধ্যমে সংযুক্ত করে । ২০০৯ সালে সাতোশি নাকামোটো প্রথম ব্লকচেইন ব্যবহার করে বিটকয়েন (প্রথম ডিজিটাল ক্রিপ্টোকারেন্সি) চালু করেন । ব্লকচেইন হলো ভিত্তি প্রযুক্তি, আর বিটকয়েন হলো তার ওপর চলা একটি অ্যাপ্লিকেশন, যা ব্যাংক ছাড়া পিয়ার-টু-পিয়ার লেনদেন নিশ্চিত করে। 

ব্লকচেইন ও বিটকয়েন সম্পর্কে মূল তথ্য:

ব্লকচেইন শুধু বিটকয়েনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, এবং ব্যাংকিংয়ের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে তথ্য সংরক্ষণ ও নিরাপদ লেনদেনে বিপ্লব ঘটাচ্ছে ।

টাকা যেমন একধরনের মুদ্রা, তেমনি বিটকয়েন একধরনের ‘ক্রিপ্টোকারেন্সি’। বিটকয়েন ছাড়াও লাইটকয়েন, বিটক্যাশ ইত্যাদি আরো অনেক ক্রিপ্টোকারেন্সি রয়েছে। এসকল ক্রিপ্টোকারেন্সি ইস্যুর মূল উদ্দেশ্য হলো যাতে আমরা ব্যাংক কিংবা রাষ্ট্রের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ না হয়ে নিজেরাই বিশ্বাসযোগ্য লেনদেন সেরে ফেলতে পারি।

বিটকয়েনের জন্মপ্রক্রিয়া

বিটকয়েন তৈরি হয় বিটকয়েন মাইনারের মাধ্যমে। সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসে যেভাবে টাকা ছাপানো হয়, সেরকমভাবে ক্রিপ্টোকারেন্সি ছাপার জন্য কোনোরকম ছাপাখানা নেই। কারণ, ক্রিপ্টোকারেন্সির কোনো দৃশ্যমান শরীরী অস্তিত্ব থাকে না। একেকটি ক্রিপ্টোগ্রাফিক পাজল সমাধান করে একেকটি বিটকয়েন তৈরি হয়।

বিটকয়েনের সাথে ব্লকচেইনের কী সম্পর্ক?

বিটকয়েন বা অন্যান্য ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে আমরা যেসব লেনদেন করে থাকি সেসবের তো একটি হিসাব রাখা প্রয়োজন। নাহলে জনাব করিম জনাব রহিমের কাছে ডেটা বিক্রি করার পরে যদি দাবি করেন যে, জনাব রহিম তাকে তার প্রাপ্য কয়েন দেননি, তখন ঝগড়া লেগে যেতে পারে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য এসব লেনদেনের একটি হিসাবনিকাশ রাখা দরকার। ব্যাংকিং পদ্ধতিতে অ্যানালগ যুগে লেজার বুক থাকত, যাতে প্রতিটি অ্যাকাউন্টের মধ্যকার লেনদেনের লগ রাখা হতো। আর এখন ডিজিটাল লেজার বুক ব্যবহার হয়, এই যা পার্থক্য। তবে বিটকয়েন বা অন্যান্য ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের লেজার বুকই হলো আমাদের এই ব্লকচেইন। ব্লকচেইন আসলে ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের লেজারবুক! 

ব্লকচেইন কীভাবে কাজ করে?

ব্লকচেইন শব্দটি দেখেই বোঝা যাচ্ছে, এটি অনেকগুলো ব্লকের একটি চেইন বা শেকল। এখন প্রশ্ন হলো, ব্লক কী? সহজ কথায়, একটি ব্লকে কোনো একটি মুহূর্তের প্রায় ১০ মিনিটে সংঘটিত সকল লেনদেনের তথ্য ‘এনক্রিপ্টেড’ অবস্থায় থাকে। এই ব্লকটি তার পূর্ববর্তী ব্লকের সাথে যুক্ত থাকে, তার আগেরটি তারও আগের ব্লকটির সাথে। এভাবে একটি চেইন তৈরি হয়েছে যা আসলে বেড়েই চলেছে প্রতিনিয়ত। ব্লক ব্যবহারের একটি ‘পাবলিক কি’ (Public Key) এবং একটি ‘প্রাইভেট কি’ (Private Key) থাকে। আমার যদি একটি পাবলিক কি থাকে তবে সেটি দেখে আমার নেটওয়ার্কের যে কেউ বুঝতে পারবেন, লেনদেনটি আসলেই আমি করেছি কিনা। অর্থাৎ আমি যদি মূল্য পরিশোধ না করে থাকি, তবে সেটি অস্বীকার করার কোনো সুযোগই থাকছে না আমার কাছে। পাবলিক কির মাধ্যমে লেনদেনের স্বচ্ছতা রাখাটা সহজ হয়ে যাচ্ছে এভাবে। তাহলে প্রাইভেট কির কাজটি কী? লেনদেনটি যে কারো কাছে দৃশ্যমান হলেও এই লেনদেনের বিস্তারিত কেবল তিনিই জানতে পারবেন, যার কাছে প্রাইভেট কি রয়েছে।

ব্লকচেইন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

ব্লকচেইন যদি হ্যাক হয়ে যায়?

ব্লকচেইনের আসল কার্যকারীতা এখানেই যে ব্লকচেইন হ্যাক হওয়া একপ্রকারে অসম্ভব। প্রতিটি ব্লকের একটি ইউনিক হ্যাশ থাকে এবং প্রতিটি ব্লক তার আগের ব্লকের সাথে যুক্ত। যদি কোনো হ্যাকার কোনো ব্লকে প্রবেশ করে, তবে সাথে সাথে সেই ব্লকের হ্যাশ বদলে যাবে। হ্যাশ পালটে যাওয়া মানে সেই ব্লক পুরোপুরি ‘ইনভ্যালিড’ হয়ে যাওয়া। এরপর চেইন আকারে পরবর্তী ব্লকগুলো ইনভ্যালিড হতে থাকবে। কারণ, প্রতিটি ব্লক তার আগেরটির সাথে যুক্ত! হ্যাকার যদি সফলভাবে হ্যাক করতে চান, তবে তাকে প্রতিটি ব্লক আবার ভ্যালিড করতে প্রতিটির জন্যে ৫২% ইউজারের ভোট প্রয়োজন, যেটি আদতে অসম্ভব।



২৫

ব্রেইন স্ক্যানিং: মস্তিষ্কের রহস্য অনুসন্ধানের নেপথ্যে তিন প্রযুক্তি

লেখায় থাকছে এমনই তিন প্রযুক্তির কথা, যা মানব মস্তিষ্কের রহস্য উন্মোচনে যুগের পর যুগ ভূমিকা রেখে চলেছে। প্রতিটি প্রযুক্তিরই আছে কিছু বিশেষ সুবিধা, আবার আছে কিছু সীমাবদ্ধতাও, আবার প্রত্যেকটির কাজও আলাদা।

ইইজি (EEG)

পূর্ণরূপ করলে দাঁড়ায় ইলেক্ট্রো-এনসেফ্যালো-গ্রাফি (electroencephalography)। এটি আসলে একটি বৈদ্যুতিক-শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক ক্রিয়াকলাপ পর্যবেক্ষণ করা হয়। নাম শুনে বেশ বিদঘুটে মনে হলেও কাজের ধরণ কিন্তু বেশ সাধারণ। কিন্তু তা জানার আগে মস্তিষ্কের নিউরনের দিকে একটু নজর দেয়া যাক।

মানব মস্তিষ্কের প্রায় ৮০ বিলিয়ন নিউরনের প্রতিটিতে আছে প্রায় ১০ হাজার সিন্যাপটিক যোগাযোগ। তারা প্রতিনিয়ত আমাদের যাবতীয় কাজের জন্য একটি আরেকটির সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে প্রতি সেকেন্ডে। আর এই যোগাযোগের কাজটি হয়ে থাকে ইলেকট্রন আদান প্রদানের মাধ্যমে। 

এই নিউরনগুলো বৈদ্যুতিক আধানযুক্ত। যোগাযোগের সময় ইলেকট্রন বিনিময়ের কারণে আধানগুলো একধরনের তরঙ্গ সৃষ্টি করে। এই তরঙ্গ তৈরির প্রক্রিয়ার নাম ভলিউম কন্ডাকশন। আর এই তরঙ্গকে কাজে লাগিয়েই ইইজি করা হয়।

যখন মস্তিষ্কে তরঙ্গ সৃষ্টি হয়, তখন মাথায় বসানো এই ইলেক্ট্রোডগুলোতে বিভব পার্থক্য সৃষ্টি হয়, যা মাপতে থাকে এর সাথে যুক্ত কম্পিউটার। এভাবে প্রাপ্ত তথ্যগুলো সংরক্ষণ করে ইইজি করা হয়। এই প্রযুক্তি কিন্তু প্রায় ১০০ বছরের পুরনো। ১৯২৪ সালে হান্স বার্জার সর্বপ্রথম মানব মস্তিষ্কের ইইজি করেন।

এফএমআরআই (fMRI)

মস্তিষ্ক গবেষণাকে আরো একধাপ এগিয়ে দিয়েছে এফএমআরআই বা ফাংশনাল ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং (functional magnetic resonance imaging)। এমআরআই প্রযুক্তির কথা আমরা অনেকেই জানি, যেখানে চৌম্বকক্ষেত্র আর বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করে পুরো শরীরের বিস্তারিত একটা ছবি পাওয়া যায়। এফএমআরআই পদ্ধতিতেও ঠিক একই প্রযুক্তিই ব্যবহার করা হয় কিন্তু পুরো শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ছবি নেয়ার পরিবর্তে শুধুমাত্র মস্তিষ্কের অক্সিজেন আর রক্ত সঞ্চালনের উপর লক্ষ্য রাখা হয়।

এখন মনে প্রশ্ন জাগে, এই কাজ কেন করা হয়? উত্তর হলো, আমরা যখন কোনো চিন্তা করি বা বুদ্ধিবৃত্তিক কোনো কাজ করি তখন মস্তিষ্কের যে সকল অঞ্চল এই কাজের সাথে সম্পৃক্ত থাকে, সেসব অঞ্চলে অনেক বেশি পরিমাণ অক্সিজেন প্রয়োজন হয়। আর তাই অধিক দ্রুত পরিমাণে রক্ত সঞ্চালন ঘটে সেসব অঞ্চলে। আর এই রক্ত সঞ্চালনের তারতম্য থেকে খুব সহজেই বোঝা যায় মস্তিষ্কের ঠিক কোন অংশটি ঐ কাজে সাড়া দিচ্ছে।

এমআরআই এর শুরুটা হয় বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ আইজাক রাবির হাত ধরে। পরমাণুর ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ধর্ম আবিষ্কারের জন্য ১৯৪৪ সালে তাকে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল দেয়া হয়। এর প্রায় অর্ধশতাব্দী পর নব্বইয়ের দশকে নিউ জার্সির বেল ল্যাবরেটরিতে কাজ করার সময় সেইজি ওগাওয়া লক্ষ্য করেন, কম অক্সিজেন যুক্ত রক্তের হিমোগ্লোবিন চৌম্বকক্ষেত্র দ্বারা যেভাবে প্রভাবিত হয় বেশি অক্সিজেন যুক্ত হিমোগ্লোবিন তার থেকে অন্যভাবে প্রভাবিত হয়। আর এই ধর্মকে কাজে লাগিয়েই তৈরি করা হয় এফএমআরআই। তবে এরও আগে ত্রিশের দশকে লিনাস পলিং নামের এক রসায়নবিদ এই ধর্ম আবিষ্কার করেন বলে শোনা যায়।

পিইটি (PET)

তৃতীয় এই প্রযুক্তিটি আরো বেশি নিখুঁত। পিইটি বা পজিট্রন ইমিশন টমোগ্রাফি (positron emission tomography), যা মূলত কাজ করে রাসায়নিক বিষয়গুলো দেখার জন্য। মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ বা টিস্যুগুলো কীভাবে কাজ করে এবং মস্তিষ্কে কী ধরনের রাসায়নিক ক্রিয়াকলাপ চলছে তা জানতে নির্ভর করতে হয় এই প্রযুক্তির ওপর। শুধু তা-ই নয়, পিইটির মাধ্যমে পুরো মস্তিষ্কের একটি ত্রিমাত্রিক ছবি পাওয়া যায় যাতে বিভিন্ন অংশ আলাদাভাবে বিশ্লেষণ এবং গবেষণার কাজে আসে।

শরীরে একধরনের তেজস্ক্রিয় পদার্থ ইনজেকশনের মাধ্যমে পুশ করে দেয়া হয় ভেইনের মাধ্যমে। এরপর অপেক্ষা করা হয় রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছানোর। এই তেজস্ক্রিয় পদার্থকে বলা হয় ট্রেসার (Tracer)। অতি স্বল্পমাত্রায় এই ট্রেসার প্রয়োগ করা হয়, তাই ক্ষতি হবার কোনো সম্ভাবনাও থাকে না। এরপর বিজ্ঞানীগণ মস্তিষ্কে ট্রেসারের গতিপথ পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন এবং বিভিন্ন অংশের তথ্য সংগ্রহ চালিয়ে যান এর থেকে নির্গত তেজস্ক্রিয় রশ্মির সাহায্যে। @Md Shakil Mahmud Arafat


২৬

লন্ডন টু কলকাতা বাস সার্ভিস: বিস্ময়কর এক যাত্রাপথের ইতিহাস

বাসে করে কতখানি পথই বা পাড়ি দেয়া সম্ভব। নিজদেশ থেকে প্রতিবেশী দেশ কিংবা তার পাশের কোনো দেশে? তা-ও নাহয় হলো। কিন্তু সেই বাসযাত্রা যদি হয় ডজনখানেক দেশ পাড়ি দেয়ার জন্য? সেটা ভাবতে গেলে কপালে মৃদু ভাঁজ পড়াটা খুবই স্বাভাবিক। তেমনি এক বিস্ময়কর বাসের যাত্রাপথের বিষয়ে জানা যায় । ইংল্যান্ডের লন্ডন থেকে ভারতের কলকাতা পর্যন্ত চলত সেই বাস। দু’জায়গার মাঝের দূরত্ব দাঁড়ায় প্রায় আট হাজার কিলোমিটারে! আজ থেকে প্রায় ষাট বছর আগেকার বাসে চেপে এই পথ পাড়ি দিতেন যাত্রীরা। সেটার নাম ছিল ‘ইন্ডিয়া ম্যান’। ১৯৫৭ সালের ১৫ এপ্রিল  লন্ডনের ভিক্টোরিয়া কোচ স্টেশন থেকে যাত্রা শুরু ইন্ডিয়া ম্যানের। ২০ জন যাত্রী নিয়ে প্রথম যাত্রা করে বাসটি। 

এর টিকিটের দামও নেহায়েত কম ছিল না। লন্ডন থেকে কলকাতা যেতে যাত্রীদের গুনতে হতো ৮৫ পাউন্ড, আর ফিরতি পথের ভাড়া ছিল ৬৫ পাউন্ড। ফ্রান্স, ইতালি, যুগোস্লাভিয়া, বুলগেরিয়া, তুরস্ক, ইরান এবং পাকিস্তান হয়ে ভারতে প্রবেশ করতো ইন্ডিয়াম্যানের বাস।

দিনের বেলা বাসযাত্রা চললেও রাতের বেলা বাস থামত কোনো হোটেলে। হোটেল না পাওয়া গেলে যাত্রীরা তাবু খাঁটিয়ে ঘুমানোর ব্যবস্থা করতেন। বাসের ড্রাইভার এবং মালিক গ্যারো-ফিশার জানান, যাত্রাপথে তিনি গড়ে ২০০ কিলোমিটার পথ টানা বাস চালাতেন। 

একই সময়ে লন্ডন-কলকাতা পথের আরো একটি বাসের ব্যাপারে জানতে পারা যায়। অ্যালবার্ট ট্রাভেল নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে পরিচালিত এই বাস সার্ভিসে অ্যালবার্ট (Albert) নামের দ্বিতল একটি বাস ব্যবহার করা হতো। বাসটি লন্ডন থেকে কলকাতা পর্যন্ত ১৫ বার এবং লন্ডন থেকে সিডনি পর্যন্ত চারবার যাতায়াত করেছিল বলে জানা যায়। 

অ্যালবার্টে চেপে লন্ডন থেকে কলকাতা আসতে যাত্রীদের খরচ পড়ত ১৪৫ পাউন্ড। তবে এর সাথে যুক্ত ছিল বাস সার্ভিসের অফার করা আরামদায়ক সব ব্যবস্থা। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য লাউঞ্জ, যেখানে বসে যাত্রা পথের দৃশ্য অবলোকন করা যেত আয়েশ করে। ছিল স্লিপিং বাঙ্ক, যেখানে চলন্ত বাসেও চাইলে শুয়ে বা ঘুমিয়ে নেয়া যেত ইচ্ছানুযায়ী। দিন-রাতের আবহাওয়ার তারতম্য কিংবা প্রচন্ড ঠাণ্ডার ভেতর দিয়ে যাবার সময় ব্যবহারের জন্য ছিল ফ্যান হিটার, পুরু কার্পেটে মোড়ানো বাস ফ্লোর আর রঙিন পর্দা। 

অ্যালবার্টের নিচতলায় ছিল বই পড়ার স্থান এবং খাবার লাউঞ্জ। আর ওপরতলায় ছিলো অবজারভেশন লাউঞ্জ। সেই সাথে খাবার রান্নার জন্য একটি পূর্ণ রান্নাঘর, পার্টির জন্য রেকর্ড করা গান ও রেডিওর ব্যবস্থাসহ আরো অনেক কিছু। সেই সময়ের হিসেবে দূরপাল্লার একটি বাস হিসেবে অ্যালবার্ট সত্যিই ছিল ‘ঘরের বাইরের ঘর’। 

১৯৭৬ সাল পর্যন্ত লন্ডন-কলকাতা পথের বাস চালু ছিল বলে তথ্য পাওয়া যায়। তৎকালীন ইরানী রাজনৈতিক পরিবর্তন, ভারত-পাকিস্তানের সীমান্ত সংক্রান্ত জটিলতায় এই পথে বাস চলাচল অনিরাপদ হয়ে ওঠে। ফলে এই বাস যাত্রাপথ বন্ধ করে দেয়া হয়। @ Abdullah Al Mahmood


২৭

বাংলার ওলন্দাজরা

১৯৪৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা লাভের আগপর্যন্ত ওলন্দাজরাই ছিল সর্বেসর্বা। ভারতে ইংরেজরা যে ব্যবস্থা কায়েম করে রেখেছিল, ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রেও ওলন্দাজদের ভূমিকা ছিল একই রকম।

ওলন্দাজদের জাহাজা প্রথম বাংলার উপকূলে দেখা যায় ১৬০৩ সালে, বাণিজ্য করতেই এসেছিল তারা। কাপড়, চিনি, সল্টপিটার, আফিম আর ঘি, বাংলা থেকে এগুলো কিনে নিয়ে যেত তারা। কাপড় চলে যেত সরাসরি আমস্টারডামে, বাকিগুলো বরাদ্দ ছিল ওলন্দাজদের অন্যন্য উপনিবেশের জন্য। আমস্টারডামের অভিজাতদের কাছে বাংলার কাপড়ের চাহিদা বেড়ে যায় বহগুণ। ১৬৯৭ সাল থেকে ১৭১৮ সালের মধ্যে আমস্টারডামের ৮৩ শতাংশ কাপড় আমদানি হতো বাংলা থেকে।

ওলন্দাজ কোম্পানির অন্যতম প্রধান ইয়ান আলবার্ট সিখটারমান বাংলায় বেশ বিলাসী জীবনযাপন করতেন। যখন তিনি তার সম্পদ নিয়ে তার জন্মভূমি ডাচ রিপাবলিকের গ্রোনিংগেন শহরে ফিরে আসেন, তখন তাকে লোকজন ‘নবাব অফ গ্রোনিংগ্রেন’ উপাধি দেয়। ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হর্তাকর্তারা হুগলি থেকে কাশিমবাজারে এই যাওয়া-আসাকে বেশ আড়ম্বরভাবে উদযাপন করতেন, যা সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত নিয়মিতভাবে হতো। কাশিমবাজারে ওলন্দাজদের বিশাল এক কাপড়ের কারখানা ছিল, যেখান থেকে বাংলা অঞ্চল থেকে পাওয়া লভ্যাংশের বেশ বড় একটা উঠে আসতো।

হাতেগোণা কয়েকজন ওলন্দাজ কর্মকর্তা মিলে একটি ক্লাব গঠন করে, নাম দেয় ‘স্মল কোম্পানি’। এই স্মল কোম্পানির সবাই একত্রিত হয়ে কোম্পানির টাকা আত্মসাৎ করে নিজেরা ফুলে ফেঁপে উঠেছিল। তাছাড়া নিজেদের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য কেনা পণ্য তারা কিনতো কোম্পানির অর্থ দিয়ে। মোগলদের করও ঠিকভাবে দিতো না এই ওলন্দাজ কর্মকর্তারা। বাংলায় ওলন্দাজ কর্মকর্তাদের অবৈধ ব্যবসা নেদারল্যান্ডসে এক ‘ওপেন সিক্রেট’ বিষয় হয়ে যায়।

চিনসুরাহ, বারানগর এবং বাজার মির্জাপুর বলে তিনটি জমিদারি কিনে নেয় তারা। এর বিনিময়ে এই তিন অঞ্চলে থাকা সমস্ত জমির মালিক হয়ে যায় তারা। ১৭৬৫ সালের পরেই ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় দেওয়ানী অধিকার লাভ করে, অর্থাৎ খাজনা-কর আদায় করার অধিকার। এরপর থেকেই ভারতে পা রাখার একটি শক্ত জায়গা পায় ইংরেজরা, সেখান থেকেই ধীরে ভারতের অন্যান্য অঞ্চল নিজেদের করায়ত্তে নিতে শুরু করে তারা। একইসাথে অ্যাংলো-ডাচ সম্পর্কেরও অবনতি শুরু হয়, ইংরেজরা তাদের ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়ে দিতে শুরু করে। বন্দর হিসেবে কলকাতার গুরুত্ব বাড়ার সাথে ব্যস্তানুপাতিক হারে চিনসুরাহের গুরুত্ব কমতে থাক। ১৭৮১ সালে বাংলাসহ অন্যান্য জায়গায় ওলন্দাজদের যা যা এলাকা ছিল, সব নিজেদের অধিকারে নিয়ে নেয় ইংরেজরা। আর এভাবেই বাংলায় শেষ হয় ওলন্দাজ অধ্যায়। @ Usama Rafid



২৮

লুজান চুক্তি: অটোমান সাম্রাজ্যের কফিনে শেষ পেরেক

১৯১৪ সালে অস্ট্রিয়া-জার্মানির সাথে ফ্রান্স, ব্রিটেন ও রাশিয়ার যে যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে, আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়েছিল তা কেবল ইউরোপের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানেই ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় আরও অনেক দেশ সেই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ইউরোপের খ্রিস্টান-প্রধান রাষ্ট্রগুলোর পরস্পরবিরোধী যুদ্ধে মুসলিমদের তেমন কোনো স্বার্থ নিহিত না থাকলেও তখনকার অটোমান সাম্রাজ্যের নীতিনির্ধারকেরা জার্মানির পক্ষে যোগ দেয়। সমৃদ্ধ অর্থনীতি, উন্নত শিল্পখাত, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, অত্যন্ত ভালোমানের অস্ত্রশস্ত্র থাকার পরেও পরাজিত হয় জার্মানি ও তার মিত্ররা। যুদ্ধের পর অক্ষশক্তির দেশগুলোকে স্বাক্ষর করতে হয় বেশ কয়েকটি অপমানজনক চুক্তিতে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও আলোচিত লুজান চুক্তি, যার মাধ্যমে শেষ হয়ে যায় বৃহৎ অটোমান সাম্রাজ্য, জন্ম হয় আজকের আধুনিক তুরস্কের। 

১৯১৮ সালের নভেম্বরে জার্মানি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে এবং ১৯১৯ সালের জুনে ভার্সাই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এদিকে অটোমানদের এই পরাজয় মেনে নেওয়া সহজ ছিল না। তারা চেষ্টা করতে থাকে যথাসম্ভব প্রতিরোধ গড়ে তোলার। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি! মিত্রবাহিনী ঢুকে পড়ে অটোমানদের মূল ভূখন্ডে। মিত্রবাহিনী সম্মিলিত আক্রমণে দখল করে নিতে থাকে ইস্তাম্বুলের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ। মসনদে তখন নতুন খলিফা ষষ্ঠ মুহাম্মদ। 

এরূপ পরিস্থিতিতে খলিফা ছিলেন নিরুপায়। মিত্রবাহিনীর আগ্রাসন মেনে নেওয়া ছাড়া তেমন কিছুই করার ছিল না তার। তাই ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ও জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে শান্তিচুক্তির পথ বেছে নিতে হয়, তা যতই অপমানজনক হোক না কেন। ১৯২০ সালের ১০ই আগস্ট, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জয়ী দেশগুলোর সকল অসম শর্ত মেনে নিয়ে সেভ্রেস চুক্তির প্রস্তাবে রাজি হন খলিফা ষষ্ঠ মুহাম্মদ। 

চুক্তি অনুযায়ী উত্তর আফ্রিকা ও আরব অঞ্চলসমূহের উপর অটোমানদের আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকল না। আর্মেনিয়াকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নেওয়া ও স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান গঠন ছিল সেভ্রেস চুক্তির অন্যতম শর্ত। এছাড়াও পূর্ব থ্রেস ও পশ্চিম আনাতোলিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলসহ এজিয়ান দ্বীপসমূহ ছেড়ে দিতে হয় গ্রীসের হাতে। নৌ-বন্দরগুলো আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণাধীন রেখে অটোমান বিমান বহর নিয়ে নেয় মিত্রবাহিনী। ফলে এককালের বৃহৎ সাম্রাজ্য সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে আনাতোলিয়ার পার্বত্যাঞ্চল ও রাজধানী ইস্তাম্বুলে। 

১৯২০ সাল, কামাল পাশার নেতৃত্বে আঙ্কারা সরকারের সৈনিকেরা স্মার্নাতে (বর্তমান ইজমির) জয়লাভ করে গ্রীসের বিরুদ্ধে। পরের বছর সাকারিয়ার যুদ্ধে আবারও পরাজিত হয় গ্রীক বাহিনী। 

পরপর দুটি জয়ের পর কামাল পাশার সরকারের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি সমুন্নত হয়, রাশিয়ার সমর্থনও মেলে। কিছুদিন পর ফ্রান্স ও ইতালি আঙ্কারা সরকারকে মৌখিক স্বীকৃতি দেয়। এবং তাদের দখলকৃত অঞ্চলগুলো থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর গ্রীসও একটি চুক্তির মাধ্যমে পূর্ব থ্রেস ও স্মার্নার উপর তাদের দাবী ত্যাগ করে। এরূপ পরিস্থিতিতে আঙ্কারা সরকার তুর্কি জনগণের আলোর দিশারি হয়ে ওঠে।  

১৯২২ সালে অটোমান সুলতান পদটি বিলুপ্ত ঘোষণা করার মাধ্যমে ষষ্ঠ মুহাম্মদকে পদচ্যুত করে আঙ্কারা সরকার। এবং ইস্তাম্বুলের শাসনভার নিজেদের হাতে নিয়ে দ্বিতীয় আবদুল মাজিদকে খলিফার দায়িত্ব অর্পণ করে। 

নতুন খলিফা দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সেভ্রেস চুক্তি বাতিলের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কয়েক মাস ধরে মিত্রশক্তির সাথে আলোচনা চলে। শেষে সিদ্ধান্ত হয়, সেভ্রেস চুক্তি বাতিল হলেও নতুন আরেকটি চুক্তি হবে, যার মাধ্যমে মিত্রশক্তির দেশগুলো তুর্কিদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিলেও থাকবে বিশেষ কিছু শর্ত।

লুজান চুক্তি

মিত্রশক্তির দেশগুলো চেয়েছিল স্বাধীনতার স্বীকৃতি দিলেও এমন কিছু করতে, যেন আবারও অটোমানদের মতো শক্তিশালী ধর্মীয় শক্তি হিসেবে তুরস্ক মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। এসব বিষয় মাথায় রেখেই ১৯২৩ সালের ২৪ জুলাই সুইজারল্যান্ডের লুজানে স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক এই চুক্তি। এর একপক্ষে ছিল ফ্রান্স, ব্রিটেন, ইতালি, জাপান, গ্রীস, রোমানিয়া ও যুগোস্লাভিয়া। অন্যপক্ষে অটোমান সাম্রাজ্যের উত্তরসূরি তুরস্ক। 

সেভ্রেস চুক্তির মতোই লুজান চুক্তির ফলে মুসলিমদের পবিত্র ভূমি মক্কা-মদিনার উপর চূড়ান্তভাবে নিয়ন্ত্রণ হারায় তুর্কিরা। হাতছাড়া হয়ে যায় জেরুজালেমও। মেনে নিতে হয় আর্মেনিয়ার স্বাধীনতা। তবে কুর্দিস্তানের যে স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব মিত্রপক্ষের ছিল তা ছেড়ে দেয় তারা। আবার সাইপ্রাস ও ডোডেক্যানিজের মতো গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ দুটি নিয়ে নেয় ব্রিটেন ও ফ্রান্স। 

চুক্তিপত্রে নির্ধারণ করে দেওয়া হয় পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সাথে তুরস্কের সীমানা। মিত্রপক্ষের স্বীকৃতি অনুযায়ী দেশটির আয়তন দাঁড়ায় ৭ লক্ষ ৮৩ হাজার বর্গ কিলোমিটার। এজিয়ান সাগরে উপকূল থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার প্রবেশাধিকার দিয়ে বাকি সব দ্বীপের মালিকানা দিয়ে দেওয়া হয় গ্রীসকে। চুক্তিপত্রের অবস্থা এমন হয়েছিল যে, তুরস্ককে একটি সুবিধা দিয়ে মিত্রপক্ষ নিচ্ছিল ৪টি করে সুবিধা!

ভৌগোলিকভাবে তুরস্কের অবস্থান ইউরোপ ও এশিয়ার মাঝামাঝি। দুই মহাদেশের সংযোগস্থল হিসেবে দেশটির গুরুত্বও অনেক। এছাড়াও ইস্তাম্বুলের বসফরাস প্রণালী যুক্ত করেছে কৃষ্ণ সাগর ও মর্মর সাগরকে। এটি ইউরোপ ও এশিয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথ। লুজান চুক্তির মাধ্যমে বসফরাসকে আন্তর্জাতিকীকরণ করা হয়। ফলে প্রণালীর মালিকানা তুরস্কের হাতে থাকলেও এখান দিয়ে যাতায়াত করা জাহাজগুলোর উপর কোনো সামরিক নিয়ন্ত্রণ থাকল না তুরস্কের। 

নতুন সীমানা নির্ধারিত হওয়ায় তুরস্কের অনেক খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী গ্রীসে চলে যায়। আবার গ্রীস থেকেও অনেক মুসলিম তুরস্কে চলে আসে। 

লুজান চুক্তির নামে মিত্রশক্তি এমনভাবে অটোমান সাম্রাজ্যের ব্যবচ্ছেদ করে যে, আরও কয়েকটি  নতুন দেশের জন্ম হয়। শুধু তা-ই নয়, লুজান চুক্তির ১৪৩টি ধারা জুড়ে নবগঠিত  তুরস্ককে বেধে দেওয়া হয় বিভিন্ন অসম শর্তের বেড়াজালে। @ Rakibul Hasan


২৯


ভাটি বাংলার ‘বার ভূঁইয়া’র উত্থান

সমগ্র বাংলা বিজয়ের ক্ষেত্রে মুঘলদের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিলো ভাটি অঞ্চলের জমিদাররা। ‘বার ভূঁইয়া’ নামেই যারা বেশি পরিচিত ছিলেন। বার ভূঁইয়ারা মূলত বাংলার অসামান্য ভৌগোলিক সুবিধা পেয়েছিলেন। প্রবল বর্ষণের কারণে বছরের অর্ধেকেরও বেশি সময় এ অঞ্চলটি পানির নিচে থাকতো। যোগাযোগ ব্যবস্থা বেশ দুর্গম হওয়ায় মুঘলরা সহজে এই অঞ্চলের সাথে মানিয়ে নিতে পারেননি। বন্যাপ্রবণ এই অঞ্চলে দুর্ধর্ষ মুঘল অশ্বারোহী বাহিনী তেমন কাজেই লাগানো সম্ভব হয়নি। তাছাড়া মশার উপদ্রব তো ছিলোই। এসব কারণেই দীর্ঘদিন বার ভূঁইয়ারা মুঘলদের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ ধরে রাখতে পেরেছিলেন।

বাংলার পূর্বাঞ্চল আর দক্ষিণাঞ্চলের নিম্নাংশ মূলত ভাটি বাংলা নামে পরিচিত ছিল। পদ্মা, ব্রক্ষ্মপুত্র আর মেঘনার অববাহিকায় থাকা এ অঞ্চলটুকুর সীমানা নির্ধারণ করা যায় এভাবে- উত্তরে বৃহত্তর ময়মনসিংহ, উত্তর-পূর্বে সিলেটের বাণিয়াচংগ, পূর্বে ত্রিপুরা, দক্ষিণে পদ্মা নদী এবং পশ্চিমে ইছামতী নদী। অর্থাৎ, বৃহত্তর ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেটের নিম্নাঞ্চল আর ত্রিপুরা নিয়েই ছিলো ভাটি বাংলা। এই ভাটি বাংলাই ছিল মূলত বার ভূঁইয়াদের শক্ত ঘাটি।  

সম্রাট আকবরের বাংলা অভিযানের সময় বাংলায় কিছু জমিদারের অস্তিস্ত্ব ছিল। এসব জমিদাররা বলতে গেলে স্বাধীনভাবেই বাংলা শাসন করতেন। প্রাথমিকভাবে বাংলার এসব জমিদারদের একত্রে ‘বার ভূঁইয়া’ বলা হতো। বার ভূঁইয়া বলতে সত্যি সত্যিই বারজন জমিদারের অস্তিত্ব ছিল এবং তাদের নেতাসহ এই সংখ্যাটা মোট ১৩ জনে দাঁড়ায়। আবার সম্রাট আকবরের শাসনামলের বার ভূঁইয়া আর সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলের বার ভূঁইয়ারা আবার এক না। সম্রাট আকবরের শাসনামলের অনেক ভূঁইয়ারই মৃতুর পর তাদের পুত্ররা তাদের স্থলাভষিক্ত হয়েছিলেন। 

ভাটি বাংলার বার ভূঁইয়াদের মূল নেতা ছিলেন ঈশা খান। বার ভূইয়াদের মধ্যে অন্যতম প্রভাবশালী ছিলেন বিক্রমপুরের চাঁদ রায় ও কেদার রায়। এছাড়া সোনারগাঁও শাসন করতেন ইবরাহীম নারাল, আর মহেশ্বরদীর জমিদার ছিলেন করিমদাদ মুসাজাই। মজলিশ দিলাওয়ার আর মজলিশ প্রতাপ ছিলেন জোয়ানশাহী আর খালিয়াজুরি পরগণার জমিদার। এছাড়াও প্রভাবশালী ভূঁইয়াদের তালিকায় ছিলেন গাজীপুরের গাজী পরিবারও। এই পরিবারের উত্থান হয় ফজল গাজীর হাত ধরে, তবে আকবরের সমসাময়িক ছিলেন টিলা গাজী, বাহাদুর গাজী, কাসিম গাজী, সেলিম গাজী, সুলতান গাজী, চাঁদ গাজী প্রমুখ। প্রভাবশালী ভূঁইয়াদের তালিকায় আরও আছেন বরিশালের (চন্দ্রদ্বীপ) কন্দর্প নারায়ণ, ভুসনার (খুলনা-ফরিদপুর) মুকুন্দ রায়। এছাড়াও আছেন ভুলুয়ার (নোয়াখালী) লক্ষণ মাণিক্য, দিনাজপুরের প্রমথ রায়। রাজশাহীতে প্রভাবশালী ছিলেন পীতাম্বর রায়, বীর হাম্বির ছিলেন বাঁকুড়ার ক্ষমতায়, নাটোরে ছিলেন কংস নারায়ণ। @ Masud Ferdous Eshan




বাংলার নতুন সুবাদার ইসলাম খান চিশতীর ভাটি অভিযান

১৫৯৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইন্তেকাল করেন ভাটি বাংলার বার ভূঁইয়াদের দাপুটে নেতা মসনদ-ই-আলা ঈশা খান। ঐ একই বছরের শুরুর দিকে ইন্তেকাল করেন ঈশা খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মাসুম খান কাবুলি। ভাটির এই দুই বীর খুবই অল্প সময়ের ব্যবধানে দুনিয়া থেকে বিদায় নিলে গোটা ভাটি অঞ্চল শোকে স্তব্ধ হয়ে পরে। এবার ভাটির মসনদে বসলেন ঈশা খানেরই সুযোগ্য পুত্র মুসা খান। পিতার মতো তিনিও উপাধী নিলেন ‘মসনদ-ই-আলা’। ঈশা খানের জীবদ্দশাতেই তিনি নিজের দক্ষতা আর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। আর এখন ঈশা খানের অবর্তমানে মুঘল সালতানাতের বিরুদ্ধে ভাটি বাংলার প্রতিরোধ যুদ্ধের এই গুরুদায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন তিনি। এদিকে মাসুম খান কাবুলির মৃত্যুর পর তার শূন্যস্থান পূরণ করলেন তার পুত্র মির্জা মুমিন। পিতার মতো তিনিও ভাটির রাজার প্রতি অনুগত রইলেন।

অন্যদিকে বার ভূঁইয়াদের বিরুদ্ধে সংঘঠিত শেষ যুদ্ধে বাংলার সুবাদার রাজা মানসিংহ নিজের দুই পুত্র হারিয়ে কিছুটা শোক আর কিছুটা ক্লান্তি থেকে ছুটি নিয়ে ১৫৯৮ সালের শুরুর দিকে আজমিরে বিশ্রাম নিতে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু খুব দ্রুত তাকে আবারও বাংলা সীমান্তের দিকে ধেয়ে আসতে হলো। মানসিংহের অবর্তমানে তখন বাংলার সুবাদার ছিলেন মানসিংহের নাতি মহাসিংহ।

ভাটিতে ঈশা খানের ইন্তেকালের পর ভাটি বাংলার প্রতিরোধ সংগ্রামের নেতা হিসেবে মসনদ-ই-আলা মুসা খানকে তেমন কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। শেষবারের ব্যর্থ অভিযানের পর মুঘল সেনাবাহিনী আর বাংলার দিকে আগানোর সুযোগ পায়নি। মুসা খানের সহযোগী হিসেবে এবার বের শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছিলেন বুকাইনগরের খাজা উসমান আর বিক্রমপুরের জমিদার শ্রী কেদার রায়।

১৬০৪ সাল নাগাদ ছোটখাট কয়েকটি যুদ্ধে সফলতা পাওয়ার পর মানসিংহ আত্রাই নদীর তীরবর্তী নাজিরপুর দুর্গে অবস্থান নিলেন। পরের বছরের শুরুর দিকে বাদশাহ আকবর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মানসিংহ আর বাংলায় অভিযান চালানোর সুযোগ পেলেন না। বাদশাহর ডাকে তাকে আগ্রা চলে যেতে হলো। ১৬০৫ সালের ১৫ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করলেন বাদশাহ আকবর। তবে বাদশাহের জন্য পরিতাপের বিষয় হলো, সমগ্র বাংলার উপর তিনি কখনোই পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে যেতে পারেননি।

বাদশাহ আকবরের মৃতুর এক সপ্তাহ পর চতুর্থ মুঘল বাদশাহ হিসেবে অভিষেক হলো শাহজাদা সেলিমের। তিনি রাজকীয় উপাধী নিলেন নূর-উদ-দীন মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর। বাদশাহী পাওয়ার পর গুরুত্বপূর্ন একটি সমস্যা হলো বাংলা।

সাময়িকভাবে তিনি রাজা মানসিংহকেই বাংলার সুবাদার নিয়োগ দিলেন। এর এক বছর পর, অর্থাৎ ১৬০৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর বাংলার সুবাদার হিসেবে নিয়োগ পেলেন বাদশাহ জাহাঙ্গীরের দুধভাই কুতুবউদ্দিন খান কোকা। পরের বছর বিহারের সুবাদার জাহাঙ্গীর কুলি খানকে এবার বাংলার সুবাদার নিয়োগ করে পাঠানো হলো। কিন্তু, বৃদ্ধ এই সুবাদার বাংলার আবহাওয়ার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারলেন না। ১৬০৮ সালের এপ্রিল মাসে অসুস্থ হয়ে তিনি ইন্তেকাল করলেন। কাজেই এই কয়েকটি বছর ভাটিবাংলায় নতুন করে কোনো অভিযান প্রেরণ করা সম্ভব হলো না।

১৬০৮ সালের ৬ মে বাদশাহ বাংলার নতুন সুবাদার হিসেবে ইসলাম খান চিশতীর নাম ঘোষণা করলেন। তিনি এসময় বিহারের সুবাদার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ইসলাম খান সাহসী ছিলেন, ছিলেন ধীর-স্থির। অনেক ভেবে-চিন্তে ঠান্ডা মাথায় সময় নিয়ে তিনি যুদ্ধপরিকল্পনা করতেন, অন্যান্য অফিসারদের পরামর্শ নিয়ে কাজ করতেন তিনি। এতে তারা নিজেদের বঞ্চিত মনে করার সুযোগ পেতেন না। তার পরিকল্পনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ফাঁকফোকর কম থাকতো, বিপদের মুহূর্তে হুট করেই সিদ্ধান্ত না বদলে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকতেন তিনি। তাছাড়া তার ভেতরে রাজকীয় হাবভাব ছিলো, যার ফলে অধীনস্তরা তাকে সমীহ করতো। 

৩৮ বছর বয়স্ক   ইসলাম খান চিশতী বুঝলেন বিদ্রোহের মূল ভূমি ভাটি থেকে সুবাহর রাজধানী বেশ দূরে অবস্থিত। কাজেই তিনি সুবাহ বাংলার রাজধানী সরিয়ে এনে একেবারে ভাটির কাছাকাছি স্থাপন করার পরিকল্পনা করছিলেন। ইসলাম খান তখনই ঢাকাকে রাজধানী ঘোষণা করলেন।

ইসলাম খান জানতেন ভাটিতে ভুঁইয়াদের শক্তির মূল স্তম্ভ হলো তাদের দুর্ধর্ষ নৌবহরটি। কাজেই সুবাদার ইসলাম খান এবার নৌবাহিনী ঢেলে সাজানোর কাজে হাত দিলেন। সুবাহ বাংলার মীর-ই-বহর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো দুর্ধর্ষ নৌসেনাপতি মালিক আলী ইহতিমাম খানকে।

বাংলার পরিপূর্ণ বিজয় অর্জনের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে পরিবর্তন আনার প্রয়োজন মনে করলেন ইসলাম খান। বিগত দিনগুলোতে বাংলার প্রশাসনে বেশ কিছু অদক্ষ, অযোগ্য আর অকর্মণ্য ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে জেঁকে বসেছে। সময়ে সময়ে এরা নানারকম সমস্যা তৈরি করতেন। ইসলাম খান বাদশাহের কাছে গুরুত্বপূর্ন পদগুলোতে পরিবর্তন আনার অনুরোধ করলেন। বাদশাহ জাহাঙ্গীর ইসলাম খানকে এই বলে আশ্বস্ত করলেন যে, বাংলা বিজয়ের জন্য ইসলাম খানের যা যা দরকার হবে, তার সবই তাকে দেওয়া হবে।

একই সঙ্গে ভাটিতে অভিযানের জন্য তিনি উন্নত মানের কামান, অস্ত্রশস্ত্রসহ বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ আর প্রয়োজনীয় রসদ প্রেরণ করলেন। অন্যদিকে নিজেদের সীমিত সম্পদ আর লোকবল নিয়ে আরেকটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের জন্য অপেক্ষা করছিলেন ভাটির রাজা মসনদ-ই-আলা মুসা খান। @ Masud Ferdous Eshan




নরখাদক আঘোরীদের ইতিকথা

উত্তর প্রদেশের বেনারাস শহর। বিশাল এক খোলা মাঠে। অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকার। হঠাৎ করেই আগুন জ্বলে উঠল। চন্দন কাঠের চিতায় একজন। একদল নগ্ন আঘোরী সাধু তাকে আর সেই চিতাকে গোল করে ঘিরে ঢাকের তালে তালে উদোম তালে নাচছেন! ধীরে ধীরে নাচের বৃত্ত ছোট হতে শুরু করেছে, এমন সময় এক সাধু নাচের বৃত্ত থেকে বের হয়ে এসে পোড়ানো মৃতদেহ থেকে এক টুকরো মাংস ছিড়ে নিয়ে মুখে পুরে দিলেন!

এটা গল্প নয়। এই কর্মকান্ড আঘোরী সম্প্রদায়ের সাধুদের, বলা যায় ভারতকে চিহ্নিত করতে হলে যেসব চিহ্ন ব্যবহার করা হয় তার একটা এই সাধুরা। বেনারাসসহ ভারতের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকা এ সাধুদের লোকজন যেমন শ্রদ্ধা-ভক্তি করে, ঠিক তেমনভাবে তাদেরকে ভয় পাওয়া লোকসংখ্যাও কম নয়।

আঘোরীদের বিশ্বাস

আঘোরীরা মূলত দেবতা ‘শিব’-এর পূজারী। তারা বিশ্বাস করে শিবই সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, ধ্বংসকারী এবং সবকিছুর পরিচালনাকারী। শিবের মহিলা রূপ মৃত্যুর দেবী ‘মহাকালী’-এর উদ্দেশ্যই তারা প্রার্থনা করে। আঘোরীদের মতে, “শিবই সবকিছু। হিন্দুধর্মের সব দেবতাই শিবের কোনো না কোনো রূপ। তাই আঘোরীরা শিবকে সন্তুষ্ট করার দায়িত্ব নিয়েছে।”

আঘোরীদের বাসস্থান

কালো চুলের বিশাল জটাধারী আঘোরী সাধুদেরকে সহজেই চোখে পড়ে। ধ্যান করার জন্য সাধারণত তারা শ্মশানের মতো নির্জন জায়গাকেই বেছে নেয়। এছাড়াও হিমালয়ের ঠান্ডা গুহা, গুজরাটের নিষ্প্রাণ মরুভূমি এমনকি বাংলার ঘন জঙ্গলেও তাদের দেখা মেলে। তবে বেনারাস শিবের প্রিয় জায়গা হওয়ায় গঙ্গার তীরেই আঘোরী সাধুদের সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

আঘোরীদের পোষাক

আঘোরীদের জন্য চুল বা গোফ-দাড়ি কাটা নিষিদ্ধ। সাধারণত কালো পোষাক পরতে দেখা গেলেও অনেক সময় তাদেরকে দেখা যায় অর্ধনগ্ন অবস্থায়। শ্মশানে ধ্যান করার সময় তারা পোড়ানো মৃতদেহের ছাই সারা শরীরে মেখে তার উপরে বসেই ধ্যান করা শুরু করেন, এ সময় তাদের পরনে থাকে শুধুমাত্র একটি কৌপিন। এছাড়া রুদ্রাক্ষের মালা আর মানুষের খুলি তো গলায় রয়েছেই। এছাড়াও মাঝেমধ্যে তাদেরকে দেখা যায় সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায়, পার্থিব সবকিছু ঝেড়ে ফেলার উদ্দেশ্যে তারা এটি করে থাকেন!

আঘোরীদের খাবার

অন্যান্য সাধুদের চেয়ে আঘোরীদের একটি বড় পার্থক্য হলো খাবার। অন্যান্য সাধুরা যেখানে নিরামিষাশী, সেখানে আঘোরীরা খেতে পারে যেকোন কিছুই। আবর্জনা থেকে শুরু করে মানুষের মাংস এমনকি মানুষের মলমূত্র পর্যন্তও তারা খায়! কারণ? কারণ তারা বিশ্বাস করে শিব সবচেয়ে খারাপের মধ্যেও বিদ্যমান।

আঘোরীদের মূলমন্ত্রই হচ্ছে নোংরামির মধ্যে বিশুদ্ধতাকে খুঁজে বের করা। তাছাড়া তারা বিশ্বাস করে মলমূত্র খাওয়া তাদের ভিতরের আত্মঅহমিকাকে ধ্বংস করতে সাহায্য করে। বেঁচে থাকার জন্য তারা যতটুকু দরকার ততটুকুই খায়, তাদের কাছে খাবারের স্বাদ বা চেহারা কোনো বিষয় নয়। তবে বেনারাসের মতো জনবহুল শহরেও কেউ তাদেরকে নরমাংস খেতে বাঁধা দেয় না, কারণ তাদের খাওয়ার জন্য শ্মশানের পোড়ানো মৃতদেহ রয়েছেই।

আঘোরীদের ধ্যান

ধ্যান করার জন্য আঘোরীরা বেছে নেয় শ্মশানকে। একেবারে মধ্যরাত থেকে তারা পোড়ানো মৃতদেহের উপর বসে ধ্যান শুরু করে। তারা বিশ্বাস করে এই সময়টিতে কোনো মানুষ বা কোনো আত্মা ঘোরাফেরা করে তাদের ধ্যানের মনোযোগ নষ্ট করতে পারবে না। এছাড়া তারা ধ্যান করার আগে খানিকটা গাঁজাও টেনে নেয় যাতে ধ্যানের মনোযোগ আরও সুদৃঢ় করতে পারে। এছাড়া তারা দাবী করে, গাঁজার ঘোর তাদেরকে আত্মা দেখতে সাহায্য করে! যদিও গাঁজা টানার পরেও তাদের চোখ থাকে শান্ত-নির্লিপ্ত।

আঘোরীদের ক্ষমতা

আঘোরীরা দাবী করে তাদের কাছে পৃথিবীর সব রোগেরই ঔষধ রয়েছে, যেগুলো ক্যান্সার এমনকি এইডসকেও সারিয়ে তুলতে পারে! তারা এগুলো পোড়ানো মৃতদেহগুলো থেকে সংগ্রহ করে এবং একে বলা হয় ‘মানুষের তেল’! তারা বিশ্বাস করে এগুলো দিয়ে সব রোগই সারিয়ে তোলা সম্ভব কিন্তু মানুষ এগুলো ব্যবহার করে না সামাজিক বাধার কারণে। আঘোরীদেরকে বলা হয় পৃথিবীর সেরা কালো জাদুকর। কোনো অসুস্থ মানুষের রোগকে তারা কালো জাদুর সাহায্যে মৃতদেহে ঢুকিয়ে দেয় এবং মৃতদেহ পুড়িয়ে রোগটিকে ধ্বংস করে ফেলে! @ Usama Rafid




কুরবানির ধর্মীয় ইতিহাস: ত্যাগের একাল-সেকাল

যুগে যুগে কুরবানির প্রথা ছিল বিভিন্ন রকম। বাইবেল বা তাওরাতের মতো ধর্মগ্রন্থ আর ইবনে কাসিরের মতো তাফসিরগুলো আমাদের জানায়, আগেকার যুগে, যা কুরবানি করা হচ্ছে সেটা খাওয়া নিষিদ্ধ ছিল, যেটা এখন নয়। সেটা শস্য হোক আর প্রাণীই হোক, খাওয়া যেত না। ইহুদীদের তাওরাতে জানা যায়, কুরবানির বেদীতে রেখে কুরবানদাতা দূরে সরে আসতেন। আকাশ থেকে তখন একটা আগুন এসে পুড়িয়ে দিয়ে যেত সেই উৎসর্গ, পুড়ে গেলে বোঝা যেত, আল্লাহ কবুল করেছেন কুরবানি। যদি আগুন না আসে, তাহলে কবুল হয়নি।

মুসলিমরা যে নিয়মে জবাই করে তাকে ‘যাবিহা’ বলে, আর ইহুদীরা যে নিয়মে কুরবানি বা জবাই করে সেটাকে ‘শেহিতা’ বলে। কোনো ইহুদী বা খ্রিস্টান যদি শেহিতা পদ্ধতিতে জবাই করে, তবে সেই মাংস খাওয়া মুসলিমদের জন্য হালাল; নতুবা হারাম।

কুরবানির ঈদ ‘ঈদুল কবির’ নামেও পরিচিত ইয়েমেন, সিরিয়া ও উত্তর আফ্রিকার মরক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, লিবিয়া ও মিসরের মতো দেশে। ঈদুল কবির মানে ‘বড়’ ঈদ। জিলহজ মাসের ১০ তারিখে অনুষ্ঠিত এ ঈদ মিসর, সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যে ‘ঈদুল বাকারাহ’ নামেও পরিচিত। পাকিস্তান, ভারত আর বাংলাদেশের কিছু জায়গাতেও এটি ‘বকরি ঈদ’ বলে পরিচিত। @ Abdullah Ibn Mahmud


রোমান সম্রাট নিরো

রোমান সম্রাট নিরোর নাম এমন মানুষ বিরল। জুলিও-ক্লডিয়ান রাজতন্ত্রের সবচাইতে কুখ্যাত এ সম্রাট আত্মহত্যা করেছিলেন মাত্র ৩০ বছর বয়সে। সৎ বাবা সম্রাট ক্লডিয়াসের মৃত্যুতে মাত্র ১৭ বছর বয়সে সম্রাট হন নিরো। তার শাসনকালের প্রথম পাঁচ বছর ছিল রোমানদের স্বর্ণযুগ। মন্ত্রণা পরিষদের স্বাধীনতা বৃদ্ধি, গোপন বিচারের নামে হত্যা ও দুর্নীতি কমিয়ে আনা, খেলাধুলা ও বিনোদনভিত্তিক অনুষ্ঠান আয়োজনসহ নানা কারণে রোমানদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছিলেন নিরো।

এছাড়াও কর কমানো ও দাস অধিকার বৃদ্ধি তার জনপ্রিয়তা আরো উসকে দেয়। খেলাধুলার নামে প্রাণী হত্যা ও রক্তক্ষয়ী গ্ল্যাডিয়েটর কমব্যাট বন্ধ করে গ্রিক কুস্তি চালু করেন তিনি। এসব কারণে তার সকল পাগলামি সত্ত্বেও লোকজন তাকে পছন্দ করত। বিখ্যাত সম্রাট ট্রাজান, নিরোর শাসনামলের প্রথম পাঁচ বছরকে উল্লেখ করেছেন রোমানদের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ শাসনামল হিসেবে। কিন্তু সহিংসতা আর নিষ্ঠুরতার পূজারী নিরোর আসল রূপ ফুটে উঠতে বেশি সময় লাগেনি। রাজনৈতিক খুন, লাম্পট্য, খ্রিষ্টানদের উপর অমানবিক অত্যাচার নিরোকে শীঘ্রই পরিণত করে একজন অত্যাচারী সরম্রাটে।

মায়ের সাহায্যে ক্ষমতায় এসেছিলেন নিরো। তার মা এগ্রিপিনা দ্য ইয়াঙ্গার ছিলেন প্রথম সম্রাট অগাস্টাসের সরাসরি বংশধর। ১৩ অক্টোবর, ৫৪ খ্রিষ্টাব্দ। হঠাৎই মারা যান সম্রাট ক্লডিয়াস। ধারণা করা হয়, ক্লডিয়াসের খাদ্য পরীক্ষককে ঘুষ দিয়ে খাবারে বিষ মিশিয়েছিলেন এগ্রিপিনা। সেটা সত্য হোক বা মিথ্যা, ফলাফল দাঁড়ায় একই। ১৭ বছরের বালক নিরো, পৃথিবীর ইতিহাসের সবচাইতে বৃহৎ সাম্রাজ্যকে বেছে নেন তার স্বেচ্ছাচারিতার উপকরণ হিসেবে। ক্ষমতায় এসে মাকে নিজের প্রধান উপদেষ্টা বানালেও পরে শিক্ষাগুরু ও বিদ্বান দার্শনিক সেনেকার পরামর্শে মায়ের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসেন নিরো।  

ক্ষিপ্ত এগ্রিপিনা ব্রিটানিকাস ও তার চাচাতো ভাইদেরকে সাথে নিয়ে চক্রান্ত শুরু করেন। কিন্তু নিরো তার মাকে ভালোভাবেই চিনতেন। তিনি এগ্রিপিনাকে নৌকাডুবিতে হত্যা করার চেষ্টা করেন। এগ্রিপিনা কোনোভাবে সেখান থেকে বেঁচে ফিরলেও নিরো তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করার নির্দেশ দেন। কী ঘটতে যাচ্ছে, তা বুঝতে পেরে এগ্রিপিনা নিজের পেটের দিকে ইশারা করে চিৎকার করেন- “আমাকে এখানে ছুরিকাঘাত করো, যেখানে এক দানব বেড়ে উঠেছিল!”

২৩ মার্চ, ৫৯ খ্রিষ্টাব্দ। নিহত হন এগ্রিপিনা। এর পরবর্তী বছরগুলোতে নিরো রাজকার্য ছেড়ে দিয়ে সঙ্গীত-অভিনয়-নারীসঙ্গ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তিনি অলিম্পিকেও অংশগ্রহণ করেন। বলাই বাহুল্য, তার অংশগ্রহণ করা সবগুলো ইভেন্টে তিনিই বিজয়ী হয়েছিলেন।

৬২ খ্রিষ্টাব্দ। নিরোর উপপত্নী পপেয়া সাবিনা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন।  কলঙ্ক এড়াতে নিরো ক্লডিয়ার সাথে বিবাহবিচ্ছেদ করে তাকে নির্বাসনে পাঠান। রোমের জনগণ এর বিরোধিতা করায় তিনি ক্লডিয়াকে হত্যা করেন। প্রথমে নিজের মা, তারপর স্ত্রী। নিরোর জনপ্রিয়তা হ্রাস পেতে থাকে। তবে এসব নয়, নিরো কুখ্যাত হয়ে আছেন অন্য কীর্তির জন্য।

সময়কাল ১৮ জুলাই, ৬৪ খ্রিষ্টাব্দ। বলা হয়, নিজ প্রাসাদসহ রোমনগরী যখন আগুনে পুড়ে ছাই হচ্ছিল, নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিলেন এবং মহাকাব্য থেকে গান গাচ্ছিলেন। এ নরকযজ্ঞ চলেছিল এক সপ্তাহ ধরে। যদিও বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ট্যাসিটাসের মতে, নিরো তখন রোম থেকে কয়েক মাইল দূরে জন্মস্থান এন্টিয়ামে তার নিজস্ব প্রাসাদে ছিলেন। আগুন লাগার খবরকে নিরো গুজব বলে এড়িয়ে যান এবং হয়তোবা কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছিলেন। এ ব্যাপারে মতভেদ আছে।

এ বিশাল অগ্নিকাণ্ডের পেছনে নিরোকে দায়ী করা হলেও ট্যাসিটাসের মতে, নিরো এটা করেননি। বরং রোমে ফিরে এসে দুর্গতদের জন্য খাদ্য ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করেন এবং অগ্নিকাণ্ড পরবর্তী সময়ে নাকি রোমের অনেক সংস্কার ও উন্নতি সাধন করেন নিরো। এছাড়া এ অগ্নিকাণ্ডে তার নিজের প্রাসাদও অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে নিরো নিজে এ অগ্নিকাণ্ডের জন্য দায়ী করেন সংখ্যালঘু খ্রিস্টানদেরকে। তাদেরকে জীবিতাবস্থায় গায়ে অগ্নিসংযোগ করে, ক্রুশবিদ্ধ করে ও বন্যপ্রাণী লেলিয়ে দিয়ে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেন এবং এ উপলক্ষে উৎসব অনুষ্ঠানের ও আয়োজন করেন নিরো।

এ ঘটনা নিরো’র জনপ্রিয়তা আরো কমিয়ে দেয়। চক্রান্তের অভিযোগে ২৩ জন অভিজাতকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেন তিনি। যাদের মধ্যে তার শিক্ষাগুরু সেনেকাও ছিলেন। 

৬৮ খ্রিষ্টাব্দের শুরুতে, নিরো ‘গল’ (বর্তমানে ফ্রান্স) এর রাজা ভিনডেক্সকে আঞ্চলিক কর বাড়িয়ে দেওয়ার আদেশ করেন। ক্রমশ কর বৃদ্ধিতে বিরক্ত ভিনডেক্স বিদ্রোহ করে বসেন। এখানে মজার এক কাজ করে বসেন ভিনডেক্স। তিনি স্পেনের রাজা গালাবাকে নতুন সম্রাট ঘোষণা করে বসেন। যদিও গালাবা নিরোর অনুরক্ত ছিলেন।

৯ জুলাই, ৬৮ খ্রিষ্টাব্দ। ঘুম থেকে উঠে, নিরো নিজেকে নিঃসঙ্গ অবস্থায় আবিষ্কার করেন। উন্মাদ রাজা বিলাপ শুরু করেন,“আমার কি কোনো বন্ধু নেই, শত্রুও নেই?”

কিন্তু না, বন্ধু না থাকলেও শত্রুর অভাব ছিল না নিরোর। পরিস্থিতি অনুধাবন করে তিনি পালিয়ে যান ও শেষমেশ আত্মহত্যা করেন আত্মপ্রেমে বুঁদ এই সম্রাট। মৃত্যুর আগে তিনি বিড়বিড় করছিলেন, “আহ, আমার সাথে সাথে কত বড় একজন শিল্পীর মৃত্যু হলো!” @ Mahmud Hasan






‘রঙয়ের উৎসবের বিবর্তন’


বাঙলাদেশের লোক হোলিকে শ্রীকৃষ্ণের দোলযাত্রা বলে। মনে করা হয় বসন্তের উদগমে দেশের নানা প্রান্তে লোকসমাজে যে সব উৎসব পালিত হত, সেগুলোই কালক্রমে হোলি উৎসবে পরিণত হয়েছে। উত্তর ভারতের লোক অবশ্য একে ‘হোলি’ বলে। কিন্তু বাঙলা ও ওড়িশার লোকরা ‘দোলযাত্রা’ বলে। দাক্ষিণাত্যে এর নাম ‘সিঙ্গা’। আর একেবারে দক্ষিণাঞ্চলের লোকরা বলে ‘কমন্নন হব্ব’।

হিন্দুরা এ সময় পরস্পরের গায়ে রঙ দিয়ে আনন্দে মেতে ওঠে। তবে বাঙলায় ও ওড়িশায় এটা ফাল্গুনী পূর্ণিমার দিনই পালিত হয়। কিন্তু উত্তর ভারতে এটা পালিত হয় পূর্ণিমা কেটে গেলে প্রতিপদে।


 দোল বা হোলি উপলক্ষ্যে নারী-পুরুষের হাতে দু’-একদিনের জন্য—এমনকি নিতান্ত রক্ষণশীল গ্রামীণ সমাজেও যে ধরণের সামাজিক ছাড়পত্র তুলে দিতে দেখা যায়, সেটা থেকে মনে করবার কারণ রয়েছে যে, বসন্ত উৎসব উপলক্ষ্যে নারী-পুরুষের অবাধে মেলামেশা করবার যে রীতি অতীতে সারা পৃথিবীতেই প্রচলিত ছিল, সেই সুপ্রাচীন ঐতিহ্য এখানে বর্তমানেও টিকে রয়েছে। আজও উত্তর ভারতের, বিশেষতঃ—বৃন্দাবন অঞ্চলের, কোনো-কোনো গ্রামে হোলি উপলক্ষ্যে অশালীন শব্দ ও অঙ্গভঙ্গী সহযোগে নাচগান করাকেও হোলির আনুষঙ্গিক হিসেবে গণ্য করা হয়। গবেষকদের মতে সেখানে যৌন উচ্ছৃংখলতা বিগত শতকে প্রচলিত ছিল। 


দোল বা হোলিতে ব্যবহৃত প্রধান দুটি রঙ হল—লাল ও সবুজ; এগুলি মূলতঃ যথাক্রমে রক্ত এবং সবুজ বাসন্তিক পাতার বর্ণপ্রতীক। গবেষকদের মতে এগুলি স্পষ্টতঃই তারুণ্যের এবং যৌবনোৎসবের দ্যোতনা বহন করে চলেছে। মনোবিজ্ঞানীরা এই দুটি রঙকে যথাক্রমে কামনার ব্যঞ্জনাবাহী এবং যৌবনের অনুভূতিসঞ্চারী বলে গণ্য করে থাকেন। এই কারণেই দোল বা হোলিতে রঙ মাখানোকেও গবেষকরা একধরণের প্রচ্ছন্ন যৌনাচার হিসেবেই গণ্য করে থাকেন। সুতরাং, দোল বা হোলি যে আদিতে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর প্রথাসিদ্ধ যৌনাচারভিত্তিক উৎসব, তথা মদনোৎসব এবং উর্বরতা কেন্দ্রিত ধর্মধারার সমন্বিত বিবর্তন,—এবিষয়ে বোধ হয় সন্দেহ করবার বিশেষ কিছুই নেই।


উত্তর ভারতের হোলি বাংলায় যে দোলে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছে, এটার পিছনেও এই ধারণাই প্রচ্ছন্ন রয়েছে। বাংলায় বৈষ্ণব ধর্মের ব্যাপক প্রসারের ফলশ্রুতিতে রাধা ও কৃষ্ণের বসন্ত রাসলীলা এবং হোলি এখানে সমন্বিত হয়ে গিয়েছে। বাঙালির যেহেতু—‘কানু ছাড়া গীত নেই’, তাই বাংলার তরুণ-তরুণীদের মদনোৎসব স্বভাবতঃই রাধা কৃষ্ণের দোলের ব্যঞ্জনায় রক্ষণশীল বাঙালী সমাজমনে প্রতিভাসিত হয়েছে। কৃষ্ণ রাধার—দোলায় গমন—কথাটি এখানে সবিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ঐ দোলা থেকেই দোল শব্দটি এসেছে।



দোলের সাথে চাঁচরের সম্পর্কও বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। বাংলায় বসন্তকালের শুক্লা চতুর্দশীতে চাঁচর নামের একটি অনুষ্ঠানের দ্বারা আজও এর সূচনা ঘটে থাকে। বাংলার কোথাও কোথাও এই চাঁচরকে মেড়া পোড়ানো বা বুড়ির ঘর পোড়ানো বলা হয়ে থাকে। এতে খড় ও বাঁশ দিয়ে একটি ছোট্ট ঘরের মত তৈরি করে সেটার মধ্যে স্থানবিশেষে পিটুলির তৈরি একটি মানুষ বা ভেড়ার মূর্তি রাখবার পরে যথারীতি বিষ্ণুপূজা করে সেই ঘরে অগ্নিসংযোগ করা হয়। অতীতের বিহার প্রদেশে আবার আগুনের সঙ্গে ভেড়ার মূর্তির কোনও সম্পর্ক ছিল না। সেখানে তখন চতুর্দশীর পরিবর্তে পূর্ণিমার রাত্রে ছেলেরা চুরি-চামারি করে নানা জায়গা থেকে কাঠ সংগ্রহ করে সেগুলিতে আগুন ধরিয়ে দিতেন; আর সেই আগুনে ছোলাগাছ, তিসি, সুপারি, নারকেল, পিঠা প্রভৃতি নিবেদন করবার রীতি প্রচলিত ছিল। 


কিছুকাল আগেও রাজশাহী, ময়মনসিংহ, বরিশাল ও মেদিনীপুর থেকে শুরু করে দক্ষিণের গঞ্জাম জেলা, পশ্চিমের হাজারিবাগ, এমনকি সুদূর কুমায়ূন পর্যন্ত সর্বত্র হোলির পরে যে ছাই পড়ে থাকত, সেটাকে সাধারণ মানুষ বিশেষ দৈবগুণসম্পন্ন বলে বিবেচনা করতেন। তখন মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, এই ছাই মাঠে ছড়িয়ে দিলে দ্বিগুণ ফসল ফলবে। এমনকি আজও শস্যে পোকা লাগবে না—এই বিশ্বাসে কোন কোন জায়গার মানুষ এই ছাই গোলার মধ্যে রেখে দেন। অন্যদিকে হাজারিবাগ জেলার কিছু কিছু জায়গার মানুষেরা এখনও বিশ্বাস করেন যে, হোলির পোড়া কাঠ কোনো ফলগাছের উপর দিয়ে ছুঁড়ে দিলে সে গাছে দ্বিগুণ ফল ধরবে। আবার মধ্যপ্রদেশের গণ্ডজাতির মানুষেরা এখনও হোলির আগুনে তপ্ত লাঙলের ফাল দিয়ে বছরের প্রথম ভূমিকর্ষণের কাজটি করে নেন।


ভারতে চাঁচর বা হোলি ঠিক কবে থেকে প্রথম আরম্ভ হয়েছিল, ইতিহাস থেকে এবিষয়ে কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তবে জৈমিনি প্রণীত ‘পূর্বমীমাংসা’ নামক গ্রন্থের শবরস্বামীকৃত ভাষ্যে হোলাকার শব্দটির উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। ‘পূর্বমীমাংসা’ গ্রন্থের এই ভাষ্যটি কমপক্ষে হলেও খৃষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর আগেই রচিত হয়েছিল বলে ঐতিহাসিকেরা অনুমান করে থাকেন। 

অতীতের বিভিন্ন গবেষকদের দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায় যে, কোন একসময়ে উড়িষ্যার দক্ষিণভাগে থাকা কন্ধ জাতির মানুষের মধ্যে মেরিয়া নামক নরবলির প্রচলন ছিল। কিন্তু এরপরে বৃটিশ আমলের ভারতে নরবলি আইনতঃ নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পরে কন্ধরা বাধ্য হয়ে মানুষের পরিবর্তে মহিষ বলি দিতে শুরু করেছিলেন। এর আগে ভূমির উৎপাদিকা শক্তি বৃদ্ধির জন্য একজন মানুষকে খণ্ড খণ্ড করে তাঁর মাংস ক্ষেতের মাটিতে পুঁতে দেওয়ার রীতি এঁদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। এছাড়া ভারতের কোনো কোনো গ্রামে তখন আবার এধরণের ব্যক্তিকে ধীরে ধীরে দগ্ধ করে সেই ছাই মাঠে বা যে নদী থেকে জমিতে সেচের জল দেওয়া হত, সেই নদীর জলে মিশিয়ে দেওয়ার রীতিও প্রচলিত ছিল। অনেক জায়গায় আবার মানুষটিকে বলি দেওয়ার পরদিন তাঁর মাথা এবং দেহের অবশিষ্ট অংশ ও অস্থি যথাসম্ভব সংগ্রহ করে একটি জীবন্ত ভেড়ার সঙ্গে একত্রে দগ্ধ করা হত। এরপরে সেই ছাইকে মাঠে ছড়িয়ে দেওয়া হত অথবা জলে গুলে ঘরে বা শস্যের গোলায় শস্য রক্ষা হবে, এই আশায় লেপে দেওয়া হত।


এসব ছাড়াও অতীতের উড়িষ্যার কন্ধ জাতির মধ্যে তখন এই মেরিয়া-সংহার উপলক্ষ্যে অসম্ভব রকমের মদ্যপান এবং স্ত্রী ও পুরুষের মধ্যে যথেচ্ছ মেলামেশার রীতিও চালু ছিল বলে জানা যায়। কন্ধদের মত ছিল যে, ধরিত্রী দেবী শস্যের মাধ্যমে মানুষকে যে প্রাণশক্তি বিতরণ করেন, তাঁরা নরবলি দিয়ে সেই প্রাণশক্তিকে পুনরায় ধরিত্রীকে প্রত্যর্পণ করে থাকেন। গবেষকদের মতে, ভূমির উর্বরা-শক্তি বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে কন্ধরা তখন এধরণের যে অনুষ্ঠানটি করতেন, সে উপলক্ষ্যে তাঁদের সমাজের মধ্যে অবাধ কামচেষ্টা হওয়াও নিতান্তই স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। এখনও পর্যন্ত সব গবেষকই এবিষয়ে সহমত পোষণ করেছেন যে, অতীতে কন্ধদের মধ্যে প্রচলিত থাকা এই অনুষ্ঠানটির সঙ্গে হোলির সাদৃশ্য কোনভাবেই আকস্মিক ছিল না। তাঁদের মতে, হয়ত অতীতের কোন একসময়ে সমগ্র উত্তর এবং মধ্য ভারতে ভূমির উৎপাদিকাশক্তি বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নরবলির প্রচলন ছিল; যা পরে এসব অঞ্চলে ব্রাহ্মণ্য বা আর্য রীতিনীতির প্রসারের ফলে পরিবর্তিত অথবা ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল। এবং শুধুমাত্র কন্ধদের মত অরণ্যাশ্রয়ী কিছু জাতির মধ্যেই এটা অপেক্ষাকৃত অবিকৃত অবস্থায় থেকে গিয়েছিল। প্রসঙ্গতঃ লক্ষ্য করবার বিষয় হল যে, আজও হোলি উৎসবে হিন্দুদের মধ্যেও কোথাও কোথাও আগুনের মধ্যে দিয়ে মানুষকে লাফিয়ে যেতে হয়, তো কোথাও আবার পিটুলির মানুষকে দহন করতে হয়। এমনকি কিছুকাল আগেও কিছু কিছু জায়গার হিন্দুদের মধ্যে এই উৎসবের অঙ্গ হিসেবে জীবন্ত ভেড়া পোড়ানোর রীতি প্রচলিত থাকলেও, বর্তমানে কোথাও কোথাও ভেড়ার মূর্তি দাহ করা হয়ে থাকে। এছাড়া এখনও বহু জায়গাতেই এই দাহের পরে ছাই সংগ্রহ করে শস্যের বা শস্যক্ষেত্রের উন্নতিবিধান করবার চেষ্টা দেখতে পাওয়া যায়। যায়। অর্থাৎ—নরবলির পরিবর্তে বর্তমান সময়ের আদিবাসী সমাজে যেমন এর একটি লঘু সংস্করণ প্রবর্তিত হয়েছে, ঠিক তেমনি হিন্দুধর্মালম্বীদের মধ্যেও আগের অবিমিশ্র কামচেষ্টার পরিবর্তে কামভাবান্বিত ভঙ্গি অথবা গান কিংবা শুধুমাত্র সামান্য ঠাট্টা-তামাসায় আগের রীতির রেশমাত্র অবশিষ্ট থেকে গিয়েছে। @ রানা চক্রবর্তী





·কেন কিছু মানুষ কথা বলার সময় বারবার অন্যদের বাধা দেয়

এই আর্টিকেলটিতে মনোবিজ্ঞানের আলোকে আলোচনা করা হয়েছে যে, কেন কিছু মানুষ কথা বলার সময় বারবার অন্যদের বাধা দেয়।

​অনেকেই মনে করেন যারা মাঝপথে কথা বলে তারা অভদ্র, কিন্তু মনোবিজ্ঞান বলছে এর পেছনে অনেক গভীর কারণ থাকতে পারে। মূল কারণগুলো হলো:

​১. আবেগ নিয়ন্ত্রণের অভাব:

অনেকে খুব বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তাদের মাথায় কোনো আইডিয়া এলে তারা সেটা তৎক্ষণাৎ বলতে চান, পাছে ভুলে না যান। এটি মূলত ধৈর্য বা নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতার অভাব থেকে হয়।

​২. এডিএইচডি:

যাদের এডিএইচডি বা মনোযোগের ঘাটতি রয়েছে, তাদের জন্য অন্যের কথা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা কঠিন। তাদের মস্তিষ্ক খুব দ্রুত কাজ করে, তাই তারা কথা থামিয়ে নিজের চিন্তা শেয়ার করতে চায়।

​৩. আধিপত্য বিস্তার করা:

কিছু মানুষ অবচেতনভাবে বোঝাতে চায় যে তারা অন্যদের চেয়ে বেশি জানে বা তাদের কথা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কথা থামিয়ে দিয়ে তারা আলোচনার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেওয়ার চেষ্টা করে।

​৪. দুশ্চিন্তা বা সোশ্যাল অ্যাংজাইটি:

অনেকে সামাজিক পরিস্থিতিতে ঘাবড়ে যান। তারা চুপ থাকতে ভয় পান বা মনে করেন তারা যদি দ্রুত কথা না বলেন তবে অন্যরা তাদের গুরুত্ব দেবে না। এই অস্বস্তি থেকেই তারা বারবার কথা বলে ফেলেন।

​৫. সাংস্কৃতিক পার্থক্য:

কিছু সংস্কৃতিতে বা পরিবারে একসাথে কথা বলাকে 'সক্রিয় অংশগ্রহণ' হিসেবে দেখা হয়। তাদের কাছে এটি অভদ্রতা নয়, বরং তারা মনে করে তারা আলোচনায় উৎসাহ দেখাচ্ছে।

​৬. কথা শোনার দক্ষতার অভাব:

অনেকে শোনার জন্য না শুনে কেবল উত্তর দেওয়ার জন্য শোনেন। সামনের মানুষটি কী বলছে তা বোঝার চেয়ে তারা নিজের পরবর্তী কথাটি সাজাতে বেশি ব্যস্ত থাকেন।

​৭. আত্মকেন্দ্রিকতা:

কিছু ক্ষেত্রে এটি কেবল স্বার্থপরতা হতে পারে। ব্যক্তি মনে করেন তার মতামতই সবচেয়ে সেরা এবং অন্যের কথা শোনার কোনো প্রয়োজন নেই।

বারবার কথা বলার পেছনে সবসময় খারাপ উদ্দেশ্য থাকে না। এটি কারো মানসিক অবস্থা, অভ্যাস বা বড় হওয়ার পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। তবে সুস্থ যোগাযোগের জন্য অন্যকে কথা বলতে দেওয়া এবং ধৈর্য ধরে শোনা অত্যন্ত জরুরি।

​কিভাবে এটি কমানো যায়?

সচেতন থাকা, কথা বলার আগে গভীর শ্বাস নেওয়া এবং "সক্রিয়ভাবে শোনা" বা অ্যাক্টিভ লিসেনিং প্র্যাকটিস করার মাধ্যমে এই অভ্যাস পরিবর্তন করা সম্ভব। @ @ Paint with Ashraf






অরবিন্দের দর্শন

ভারতের ইতিহাসে এমন কিছু চিন্তাবিদ আছেন যারা রাজনীতি, দর্শন ও আধ্যাত্মিকতাকে একসাথে নতুন অর্থ দিয়েছেন। অরবিন্দ ঘোষ বা শ্রী অরবিন্দ তাদের মধ্যে অন্যতম। ১৮৭২ সালের ১৫ আগস্ট কলকাতায় জন্ম নেওয়া এই দার্শনিক প্রথমে ছিলেন বিপ্লবী রাজনীতিক, পরে হয়ে ওঠেন এক গভীর আধ্যাত্মিক চিন্তক। ১৯৫০ সালের ৫ ডিসেম্বর তাঁর জীবনাবসান হলেও তাঁর চিন্তা আজও বহু মানুষকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়।

অরবিন্দের দর্শনের মূল ধারণা ছিল আধ্যাত্মিক বিবর্তন। চার্লস ডারউইনের জীববৈজ্ঞানিক বিবর্তনের মতোই তিনি মনে করতেন মানুষের চেতনারও একটি বিবর্তন আছে। তাঁর মতে মানুষ কোনো চূড়ান্ত অবস্থা নয়; বরং এটি একটি মধ্যবর্তী ধাপ। ভবিষ্যতে মানুষ আরও উচ্চতর চেতনার স্তরে পৌঁছাতে পারে।

এই ধারণাকে তিনি বলেছিলেন “সুপারমাইন্ড” বা অতিমানসিক চেতনা। অরবিন্দ বিশ্বাস করতেন, মানুষের ভেতরে যে আধ্যাত্মিক শক্তি আছে তা একদিন ধীরে ধীরে বিকশিত হয়ে নতুন ধরনের মানবচেতনার জন্ম দেবে। সেই মানুষ হবে আরও সচেতন, আরও মানবিক এবং আরও ঐক্যবদ্ধ।

অরবিন্দের এই দর্শন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “The Life Divine”-এ। এখানে তিনি দেখিয়েছেন, আধ্যাত্মিকতা মানে পৃথিবী থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়; বরং পৃথিবীর জীবনকে আরও উচ্চতর চেতনার মাধ্যমে রূপান্তর করা।

তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ছিল Integral Yoga। এই যোগপদ্ধতি শুধু ধ্যান বা ব্যক্তিগত মুক্তির জন্য নয়; বরং মানুষের সম্পূর্ণ চেতনা ও জীবনের রূপান্তরের জন্য। অরবিন্দ মনে করতেন, সত্যিকারের আধ্যাত্মিকতা তখনই পূর্ণ হয় যখন তা মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও সমাজকে বদলে দেয়।

আজকের প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে অরবিন্দ ঘোষের দর্শন একটি গভীর প্রশ্ন তোলে—

মানুষ কি কেবল প্রযুক্তির উন্নতিতেই এগোবে, নাকি তার চেতনারও বিবর্তন ঘটবে?

সম্ভবত অরবিন্দ আমাদের মনে করিয়ে দেন, মানুষের ভবিষ্যৎ শুধু যন্ত্রের উন্নতিতে নয়; বরং মানুষের ভেতরের চেতনার জাগরণেই লুকিয়ে আছে।




৩৭


সাপের বিষ 

বাংলা 'বিষ' শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ 'Toxin'। Toxin আবার দুই প্রকার। 'Venom' এবং 'Poison'। কোনো কিছু যদি রক্তে মিশে গিয়ে বিষক্রিয়া হয় তাহলে সেটা হচ্ছে  'Venom'। এজন্য সাপের বিষকে 'Venom' বলা হয়, Poison নয়।তাই সাপেকাটা রোগীকে Antivenom দেওয়া হয়। আর কোনো কিছু যদি পেটে গিয়ে বিষ ক্রিয়া সৃষ্টি করে তাহলে সেটাকে বলা হয় 'Poison'। যেমন: ইঁদুর মারা বিষ, কীটনাশক ইত্যাদি। কেউ সাপের বিষ খেয়ে ফেললে কী হবে? সাপের বিষ হচ্ছে প্রোটিন। এটা শুধু রক্তের সাথে মিশে গিয়েই বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে। অন্যথায় নয়। পেটে গেলে আমাদের পাকস্থলীর এনজাইম- পেপসিন বা ট্রিপসিন এটিকে রাসায়নিকভাবে ভেঙে দিবে। যার ফলে বিষ হজম হয়ে যাবে। সুতরাং যে পরিমাণ বিষ রক্তে গেলে মৃত্যু ঘটে, সেই পরিমাণ বিষ আমাদের পেটে গেলেও কিছু হবে না। তবে পেটে যাওয়ার আগে ঠোঁট, মুখ, দাঁতের মাড়ি, খাদ্যনালী বা পাকস্থলীতে ঘা, আলসার বা কাটা অংশ থাকলে সেখান দিয়ে বিষ রক্তে মিশে গিয়ে মৃত্যু ঘটাতে পারে।বাংলা সিনেমায় নিশ্চয়ই দেখেছেন,সাপুড়ে সাপে কাটা রোগীর বিষাক্ত রক্ত মুখ দিয়ে টেনে বের করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করে।বাস্তবেও এমন ঘটনা ঘটে।সাপের বিষ তার মুখ বা পেটে গেলে সমস্যা হবার কথা নয়। যদি সে মৃত্যুবরণ করে তবে বুঝতে হবে তার মুখ বা পাকস্থলীতে কোনো ক্ষতস্থান ছিলো। সেই ক্ষতস্থান দিয়ে বিষ রক্তে গিয়ে মিশে মৃত্যুবরণ করেছে। National Geographic Channel - এ দেখেছি, এক জন লোক একটা বিষাক্ত সাপ ধরে তার থেকে বিষ বের করে একটা গ্লাসে নিয়ে একেবারে তাজা বিষটুকু খেয়ে ফেলেছে। তার বক্তব্য : "সাপের বিষে দুধ, ডিম ও মাংসের মতোই প্রোটিন আছে। তাই সে সাপের বিষ পান করে প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করছে!" যদি এই ব্যক্তির মুখ বা পেটের কোনো অংশে ক্ষতস্থান থেকে থাকে তবে তার মৃত্যু অবধারিত।

রক্তে মেশার পর বিষ আবার তিনভাবে কাজ করে। যেমন: (১) হিমোটক্সিন (২) সাইটোটক্সিন (৩) নিউরোটক্সিন । গ্রীক শব্দ 'হিমো' অর্থ রক্তকে বুঝায়। সুতরাং হিমোটক্সিন হলো এমন একটি বিষ যা রক্তকণিকাকে আক্রমন করে। 'রাসেলস ভাইপার'

সাপের বিষ হিমোটক্সিন। 'সাইটো' মানে কোষ বুঝায়। সুতরাং সাইটোটক্সিন বিষ নির্দিষ্ট কোষকে আক্রমন করে। 'কোবরা' সাপের বিষ সাইটোটক্সিন। আর 'নিউরো' মানে স্নায়ু। সুতরাং নিউরোটক্সিন বিষ মানবদেহের স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রান্ত করে। 'শঙ্খিনী'

সাপের বিষ নিউরোটক্সিন।



৩৮

ধূমপান ছাড়ার কার্যকর অ্যাপ

‘‘অধিকাংশ সময়ে সিগারেট খাওয়ার কথা বলে আমাদের অবচেতন মন। ধরুন চা খেয়েছি, এ বার একটা সিগারেট খাওয়া দরকার। কিংবা খাবার খেয়েছি, এ বার একটা সিগারেট খাওয়া দরকার। কোনও কাজ এগোচ্ছে না। তা হলে একটা সিগারেট খাওয়া দরকার। এমনকি, দারুণ আরামে আছি, তখনও একটা সিগারেট খাওয়া দরকার। সিগারেট খাওয়া বন্ধ করতে হলে এই ভাবনাটাকেই প্রথম বদলানো দরকার হয়। আর সে কাজটাই করেছিল ওই মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন। আমার মস্তিষ্কের ভাবনা-চিন্তার ধরনটাই বদলে দিয়েছিল।’’

অরশাদ যা বলেছেন, তা ভুল নয় মোটেই। নিকোটিনের প্রভাব মানসিক অবস্থাকে অনেকটাই প্রভাবিত করে। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, মস্তিষ্কের যে অংশটি পুরস্কার পেলে উৎসাহিত হয়, উদ্দীপিত হয়, নিকোটিন সেই অংশের তারে নাড়া দেয়। ফলে আবেগ, ভাল লাগা, মন্দ লাগা সব কিছুর সঙ্গেই অদ্ভুত ভাবে জুড়ে যায় নিকোটিন। যে কারণে প্রচণ্ড ব্যস্ততার ফাঁকে নিজেকে হালকা করতে যখন চা-বিরতি নেওয়া হয়, তখন সিগারেটে টান দেন ধূমপায়ীরা। কারণ তাতে প্রচুর কাজের পরে পাওয়া বিরতির পুরস্কারটিকে আরও ভাল লাগে।

এই পুরস্কার পাওয়ার ইচ্ছে আর অনুভূতির সঙ্গে যদি অন্য কিছু জুড়ে ফেলা যায়, তবে ধূমপানের তীব্র ইচ্ছেও কমবে। বলিউড অভিনেতা অরশাদ বলেছেন, ‘‘আমি যে কোনও মূল্যে ধূমপান ছাড়তে চাইছিলাম। কোনও মোবাইল অ্যাপ দিয়ে ৩৫ বছরের অভ্যাস বদলানো সম্ভব ভাবিনি। তবু ভেবেছিলাম চেষ্টা করেই দেখি। দেখা গেল ৭ দিনের মধ্যে সিগারেট খাওয়ার কথা আর মনেই হচ্ছে না আমার।’’ শেষ সিগারেটটি খাওয়ার ২ দিন পরে বাড়িতে পার্টি ছিল অরশাদের। সেখানে আসা অতিথিরা সকলেই ধূমপান করছিলেন, কিন্তু অরশাদের তা দেখেও কোনও অসুবিধা হয়নি। ইচ্ছে হয়নি ধূমপানের। তিনি মোবাইল অ্যাপের সাহায্য নিয়েছেন। ধূমপান ছাড়ানোর এমন অ্যাপ অজস্র রয়েছে। ইজ়িকুইট, কুইটস্টার্ট, সিওরকুইট, কুইটনাও, স্মোক ফ্রি অ্যাপ— ইত্যাদি। একটু পড়ে দেখে নিন কোনটি আপনার জন্য উপযুক্ত।



৩৯



প্রাচীন ফার্সি ভাষার সাথে ল্যাটিন বা গ্রিক ভাষার যতটা মিল রয়েছে আরবি ভাষার সাথে তার কোনো সম্পর্কই নেই।

সেই সময়ে এই অঞ্চলে প্রধানত দুটি গোত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিল, যাদের একটি হলো মিড এবং অন্যটি পার্সিয়ান। মিড গোত্রটি ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং শক্তিশালী যারা এই অঞ্চলের প্রথম বড় সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল। অন্যদিকে পার্সিয়ানরা বাস করত দক্ষিণ দিকের পার্স নামক একটি অঞ্চলে, যেখান থেকে মূলত পারস্য নামের উৎপত্তি।

প্রথমদিকে পার্সিয়ানরা খুব একটা শক্তিশালী ছিল না এবং কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে, এই ছোট গোত্রটি একদিন পুরো বিশ্বের ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করে দেবে। কিন্তু ক্ষমতার সমীকরণ সবসময় স্থির থাকে না এবং সঠিক নেতৃত্বের ছোঁয়ায় যেকোনো সাধারণ গোত্র বৈশ্বিক পরাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।

এই সমীকরণ বদলে দেওয়ার পেছনে যার অবদান সবচেয়ে বেশি তিনি হলেন, সাইরাস দ্য গ্রেট। প্রাচীন বিশ্বের অন্যান্য সাম্রাজ্যগুলো যখন ধ্বংসযজ্ঞ এবং নির্বাসনের মাধ্যমে নিজেদের আধিপত্য কায়েম করত, সাইরাস তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কৌশল অবলম্বন করেছিলেন।

তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, শুধুমাত্র তলোয়ারের জোরে একটি বিশাল সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাই তিনি ভয় দেখানোর পরিবর্তে আনুগত্য অর্জনের ওপর জোর দিয়েছিলেন।

মিডদের পরাজিত করার পর তিনি বিজিত অঞ্চলের মানুষদের ওপর নিজের ভাষা বা ধর্ম চাপিয়ে দেননি। বরং তিনি তাদের মন্দিরগুলো রক্ষা করেছিলেন তাদের দেবতাদের প্রতি সম্মান দেখিয়েছিলেন এবং তাদের সংস্কৃতিকে আরও বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন। ব্যবিলনে নির্বাসিত ইহুদিদের কাছে তিনি কোনো আগ্রাসী শাসক ছিলেন না বরং তিনি ছিলেন একজন মুক্তিদাতা।

সাইরাস অত্যন্ত চতুরতার সাথে নিজেকে স্থানীয় দেবতাদের মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করতেন। এটি ছিল এক অসাধারণ রাজনৈতিক এবং মানসিক কৌশল, যা তাকে বিনা রক্তপাতে মানুষের হৃদয় জয় করতে সাহায্য করেছিল। তার এই দূরদর্শী কৌশলের কারণেই পারস্য সাম্রাজ্য খুব দ্রুত এশিয়া মাইনর থেকে শুরু করে মিশর এবং মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল।

তারা শুধু ভূখণ্ডই দখল করেনি বরং যোগাযোগের জন্য বিশাল সড়ক নেটওয়ার্ক, দ্রুতগামী বার্তা প্রেরণের ব্যবস্থা এবং একটি অত্যন্ত দক্ষ আমলাতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তুলেছিল। এটি ছিল ইতিহাসের প্রথম প্রকৃত সুপারপাওয়ার বা পরাশক্তি, যা শুধুমাত্র পেশিশক্তির ওপর নয় বরং অসাধারণ কূটনীতি এবং প্রাগম্যাটিজমের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল।

তবে কোনো সাম্রাজ্যই চিরকাল অজেয় থাকে না।

খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩৪ সালে পশ্চিম থেকে এক নতুন শক্তির উত্থান ঘটে, যার নেতৃত্বে ছিলেন তরুণ এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী আলেকজান্ডার। তার উদ্দেশ্য শুধু পারস্য দখল করা ছিল না, বরং তিনি চেয়েছিলেন গ্রিসের পুরনো অপমানের প্রতিশোধ নিতে এবং নিজেকে এক কিংবদন্তিতে পরিণত করতে। আলেকজান্ডারের সুশৃঙ্খল বাহিনীর সামনে পারস্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছিল ঠিকই, কিন্তু এরপর যা ঘটেছিল তা ইতিহাসের অন্যতম চমকপ্রদ ঘটনা।

আলেকজান্ডার পারস্যকে ধ্বংস করার পরিবর্তে এর সংস্কৃতি এবং প্রশাসনিক কাঠামোর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। তিনি পার্সিয়ান রাজকন্যাদের বিয়ে করেছিলেন, সেখানকার রাজকীয় পোশাক পরতে শুরু করেছিলেন এবং নিজেকে প্রাচীন পারস্য রাজাদের বৈধ উত্তরসূরি হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।

আধুনিক কর্পোরেট ভাষায় বলতে গেলে, এটি ছিল একটি হোস্টাইল টেকওভার, যা পরবর্তীতে একটি কালচারাল মার্জারে পরিণত হয়েছিল।

আলেকজান্ডার বুঝতে পেরেছিলেন, এত বিশাল একটি সাম্রাজ্য শাসন করতে হলে শুধু সামরিক শক্তি যথেষ্ট নয় বরং স্থানীয় রীতিনীতি এবং প্রতীকের সাথে নিজেকে একীভূত করা প্রয়োজন। তার এই পার্সিয়ানাইজেশন বা পারস্যীকরণ তার নিজের গ্রিক সৈন্যদের মধ্যে চরম অসন্তোষ তৈরি করেছিল, কারণ তারা এসেছিল পারস্যকে ধ্বংস করতে, আর তাদের নেতাই কিনা পারস্যের জাঁকজমক এবং সংস্কৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। কিন্তু আলেকজান্ডারের লক্ষ্য ছিল পূর্ব এবং পশ্চিমের মধ্যে এক বৈশ্বিক সভ্যতার নির্মাণ।

আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর পারস্য সাম্রাজ্য খণ্ড বিখণ্ড হয়ে গেলেও, এর মূল সাংস্কৃতিক সত্তা কখনো হারিয়ে যায়নি। এরপর সাসানীয় সাম্রাজ্য এসে প্রাচীন পারস্যের ঐতিহ্য এবং জরাথুস্ট্রবাদ বা অগ্নি উপাসক ধর্মকে পুনরায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

কিন্তু সপ্তম শতাব্দীতে আরব উপদ্বীপ থেকে উঠে আসা নতুন শক্তি ইসলামের আগমনে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দৃশ্যপট চিরতরে বদলে যায়। আরবদের বিজয়ের ফলে জরাথুস্ট্রবাদ ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হতে থাকে এবং ইসলাম ধর্ম ও আরবি ভাষা প্রশাসনিক জায়গা দখল করে নেয়। কিন্তু পারস্যের প্রাচীন আত্মা তখনো বেঁচে ছিল তাদের কবিতা বিজ্ঞান শিল্পকলা এবং দর্শনের মাঝে।

তারা নতুন ধর্ম গ্রহণ করেছিল ঠিকই, কিন্তু নিজেদের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সম্পূর্ণ বিসর্জন দেয়নি।

এরপর শতাব্দী ধরে এই অঞ্চল তুর্কি, মঙ্গোল এবং অন্যান্য শক্তির দ্বারা শাসিত হলেও একটি স্বতন্ত্র পার্সিয়ান পরিচয় সবসময় টিকিয়ে রাখা হয়েছিল। এই স্বতন্ত্র পরিচয় সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি পায়, সাফাভিদ রাজবংশের হাত ধরে। তারা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে শিয়া ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, যা ইরানকে সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ আরব বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি পরিচিতি দান করে।

সাফাভিদদের এই সিদ্ধান্ত শুধু ধর্মীয় ছিল না, বরং এটি ছিল নিজেদের একটি আলাদা রাজনৈতিক বলয় তৈরি করার এক মাস্টারস্ট্রোক।

তারা পার্সিয়ান শিল্পকলা, স্থাপত্য এবং দর্শনকে নতুন করে পৃষ্ঠপোষকতা করতে শুরু করে, যা পারস্যের পরিচয়ে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। এই সময়েই ইরান শব্দটি নিজেদের ভেতরে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে, যার অর্থ হলো আর্যদের ভূমি।

কিন্তু বহির্বিশ্বে তখনো এই অঞ্চলটি পারস্য নামেই পরিচিত ছিল।

বিদেশীদের কাছে পারস্য মানেই ছিল এক রহস্যময় দেশ, যেখানে উড়ন্ত গালিচা, সূক্ষ্ম কারুকাজ এবং প্রাচীন রূপকথার ছড়াছড়ি। তবে পশ্চিমা বিশ্ব পারস্যকে একধরনের প্রাচ্যবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখত, যা অনেক সময় এই অঞ্চলকে বিলাসবহুল কিন্তু পিছিয়ে পড়া এবং দুর্বল একটি রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরত।

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যখন রেজা শাহ পাহলভি ক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন তখন তিনি দেশের এই পশ্চিমা ইমেজের পরিবর্তন করতে চাইলেন।

তিনি ছিলেন অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং দেশকে আধুনিক ও পশ্চিমা ধাঁচে গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন বহির্বিশ্বের কাছে দেশের সম্মান বাড়াতে হলে সবার আগে নিজেদের পুরনো লেবেল বা ব্র্যান্ড নেম পরিবর্তন করা জরুরি।

১৯৩৫ সালে তিনি এক যুগান্তকারী এবং চরম সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি সারা বিশ্বের সমস্ত দূতাবাসের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠান, যেখানে বলা হয় বহির্বিশ্ব যেন এখন থেকে পারস্য নামের পরিবর্তে তাদের নিজস্ব নাম ইরান ব্যবহার করে।

এটি শুধু একটি শব্দের পরিবর্তন ছিল না। এটি ছিল পশ্চিমা ঔপনিবেশিক মানসিকতার শেকল ভেঙে নিজেদের একটি আধুনিক শক্তিশালী এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার এক দুর্দান্ত কৌশল।

রেজা শাহ পাহলভি বিশ্বকে বার্তা দিতে চেয়েছিলেন যে তারা আর সেই পুরনো রূপকথার পারস্য নেই বরং তারা এখন আধুনিক এবং আত্মনির্ভরশীল ইরান।

অবশ্যই এই সিদ্ধান্ত দেশের ভেতরে অনেক বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। তাদের মতে পারস্য নামটির সাথে জড়িয়ে ছিল সাইরাস এবং দারিয়ুসের মতো মহান রাজাদের স্মৃতি এবং হাজার বছরের এক গৌরবময় অতীত। নাম পরিবর্তন করার অর্থ হলো সেই বিশাল ইতিহাস থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলা।

কিন্তু রেজা শাহের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত ছিল এবং বিশ্বের মানচিত্রে পারস্য আনুষ্ঠানিকভাবে ইরান হয়ে যায়।

তবে গল্পের এখানেই শেষ নয়। ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর যখন আয়াতুল্লাহ খামেনির নেতৃত্বে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং রিপাবলিক অফ ইরান প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন পশ্চিমা বিশ্বের সাথে ইরানের সম্পর্ক সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে মোড় নেয়।

যেই আধুনিক এবং প্রগতিশীল ইমেজ তৈরি করার জন্য রেজা শাহ নাম পরিবর্তন করেছিলেন, সেই ইরান পরবর্তীতে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত হতে থাকে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং কট্টরপন্থার এক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে।

আজকের দিনে ইরান নামটির সাথে বৈশ্বিক রাজনীতির এক জটিল সমীকরণ জড়িয়ে আছে। অথচ অদ্ভুতভাবে পারস্য নামটি আজো মানুষের মনে এক রোমান্টিক এবং জাদুকরী আভা ছড়ায়, যা মনে করিয়ে দেয়, সেই হারিয়ে যাওয়া বিশাল সাম্রাজ্য এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতির কথা।

এই পুরো বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, আইডেন্টিটি বা পরিচয় কত শক্তিশালী একটি হাতিয়ার হতে পারে। একটি নাম শুধু কিছু ভৌগোলিক সীমারেখাকে নির্দেশ করে না, বরং এটি বিশ্বের কাছে আপনি নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করতে চান তার প্রতিফলন ঘটায়।

পারস্য থেকে ইরান হয়ে ওঠার এই দীর্ঘ যাত্রা প্রমাণ করে যে, ক্ষমতা এবং সংস্কৃতির লড়াই শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে হয় না বরং মানুষের মনস্তত্ত্বে এবং ইতিহাসের পাতায় প্রতিনিয়ত চলতে থাকে।

একটি শক্তিশালী জাতি কখনো নিজেদের অতীতকে মুছে ফেলতে পারে না, তবে তারা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে। যখন কোনো রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান নিজেদের ভিশন পরিবর্তন করে তখন তাদের ব্র্যান্ডিংও পরিবর্তন করতে হয়। কিন্তু সেই পরিবর্তন কতটা সফল হবে তা নির্ভর করে তারা নিজেদের শেকড়কে কতটা শক্তভাবে ধরে রাখতে পেরেছে তার ওপর।



৪০


সুলতানা রাজিয়া 

ভারতবর্ষের ইতিহাসে রাজিয়াই একমাত্র নারী, যিনি দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং রাজদন্ড ধারণ করে প্রবল প্রতাপে শাসন করেন।

তিনি নিজেকে 'সুলতান' বলে অভিহিত করতেন। 'সুলতানা রাজিয়া' কথাটি ভ্রান্ত। আরবি শব্দ 'সুলতানা'কথার অর্থ সুলতানের স্ত্রী। রাজিয়া কোনও সুলতানের স্ত্রী ছিলেন না। তিনি নিজেই ছিলেন সার্বভৌম শক্তির অধিকারী এবং সুলতান।

দাসবংশের সুলতান রাজিয়ার পিতা ছিলেন শামসুদ্দিন ইলতুৎমিশ মাতার নাম সুলতানা তুর্কমান খাতুন।

ইলতুৎমিশের পুত্ররা কেউ শাসনকার্যে উপযুক্ত ছিলেন না বলে তিনি তাঁর কন্যা রাজিয়াকে তাঁর সিংহাসনের উত্তরাধিকারিণী মনোনীত করেন ।কিন্তু আমীর ওমরাহরা একজন নারীর কর্তৃত্ব মেনে নিতে রাজি ছিলেন না। এই কারণে ইলতুৎমিশের মৃত্যুর পর তারা তাঁর পুত্র রুকনউদ্দিন ফিরোজকে সিংহাসনে বসান।

দুর্বলচিত্ত ও অপদার্থ এই সম্রাটের শাসনে সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে নানা স্থানে বিদ্রোহ দেখা যায়। শেষে দিল্লির একদল ওমরাহের সমর্থনে সুলতান রাজিয়া (১২৩৬-১২৪০) পুনরায় সিংহাসনে বসেন। তিনি ৪ বছর শাসনকার্য পরিচালনা করেন।

সুলতান রাজিয়া অতি সুদক্ষা নারী ছিলেন ।শাসনকার্য পরিচালনা, যুদ্ধ বিদ্যা, দ​য়া দাক্ষিণ্য সব দিক দিয়েই কৃতী ছিলেন। অবগুন্ঠন ত্যাগ করে পুরুষের পোশাকে প্রকাশ্যে দরবারে বসতেন। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে অশ্বারোহণ ,শিকার ও যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য পরিচালনা করতেন।

তিনি অতি ক্ষমতাশীল তুর্কি অভিজাতবর্গ যারা 'চল্লিশ চক্র বা বন্দেগান ই চাহেলাগান' নামে পরিচিত ছিল, তাদের ক্ষমতা খর্ব করতে উদ্যোগী হন। সরকারি পদে তিনি অ-তুর্কিদের নিয়োগ করতে থাকেন।

ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে রাজিয়া জালাল উদ্দিন ইয়াকুত নামের একজন ইথিওপিয়ান(হাবসি) দাসকে নিয়োগ করেন। ইয়াকুতকে তিনি অত্যন্ত বিশ্বাস করতেন। এর ফলে তুর্কি অভিজাতবর্গ রাজিয়ার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে নামেন।

১২৩৯ সালে লাহোরের তুর্কি অভিজাতবর্গ রাজিয়ার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। তারা রাজিয়ার ভাই বাহারামকে সুলতান ঘোষণা করে। রাজিয়া সরহিন্দের শাসনকর্তা আলতুনিয়ার সাহায্যে ক্ষমতা ফিরে পাবার চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি পরাজিত হন এবং পলায়ন করেন । পলায়নকালে ১২৪০ সালে তার একজন ভৃত্য বিশ্বাসঘাতকতা করে তাকে খাদ্যে বিষ দিয়ে হত্যা করে।

রাজিয়া সুলতানের ব্যাপারে সবিস্তারে জানা যায় মিনহাজউদ্দিন সিরাজের তবকৎ ই নাশিরি নামক গ্রন্থে।



৪১


কর্নাটকের কোরাগা ট্রাইব ও হরপ্পা সভ্যতা

হরপ্পা সভ্যতায় দ্রাবিড় ভাষীদের সম্ভাব্য অবদানের বিষয়ে আমাদের একটা প্রাথমিক ধারণা আছে।

এই বিষয়ে দ্রাবিড় ভাষীদের দাবি হলো, তাদের উৎস প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার লাগোয়া ঈলম। সেখান থেকে তাদের পূর্বজরা এসেছিল  হরপ্পা সভ্যতার এলাকায়। তারই একটি প্রামাণ্য সূত্র হিসাবে বর্তমানে পাকিস্তানে বসবাসকারীদের ব্রাহুইদের কথা বলা হয়। কারন এরা কিছু পরিমানে দ্রাবিড় ভাষী।

(আর যাদের কথা অজ্ঞাত কারণে পূর্ব ভারতে আলোচিত হয় না তবে তামিলরা আলোচনা করে তারা হলো কুরুখ বা ওরাওঁ , মোটামুটি ছোটনাগপুর এলাকায় বসবাসকারী এই দ্রাবিড় ভাষীদের পশ্চিমবাংলাতেও দেখা যায়।)

এবার এদের সাথে যোগ হবে আরেকটি নাম কোরাগা।

হরপ্পা সভ্যতার অবনতি হবার সর্বজনীন স্বীকৃত কারণ,  ২০০ বছর ধরে ক্রমাগত বৃষ্টি কমতে থাকায় সভ্যতাটির শহর গুলি চরম আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। ফলে শহরবাসীরা শহর ত্যাগ করে চলে যেতে বাধ্য হয়।

এছাড়া সিন্ধু প্রদেশে আগেই সিন্ধু নদীর জল প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হওয়া বাঁধে আটকে গিয়ে অতি দীর্ঘস্থায়ী বন্যার সৃষ্টি করে। ফলে মহেঞ্জোদারো শহর তো বটেই গ্রামাঞ্চল থেকেও লোক পালাতে বাধ্য হয়।

ভৌগোলিক কারণে সিন্ধু প্রদেশ এলাকার থেকে বের হয়ে পালিয়ে যাওয়ার রাস্তা ছিল দক্ষিণ ভারতের দিকে। তাই তারা দক্ষিণ ভারতে চলে আসে।

জেনেটিক বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে সিন্ধু প্রদেশ থেকে ছিন্নমূল লোকদের দক্ষিণ ভারতে আসার জেনেটিক তথ্যের ভিত্তিতে একটি জনবিন্যাসের মডেল ভাবা  শুরু হয়।

এছাড়াও হরপ্পা সভ্যতার এলাকা থেকে দক্ষিণ ভারতে চলে আসা লোকেরা যে দ্রাবিড় ছিল তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন ছিল মধ্যপ্রাচ্যে উদ্ভূত জিন বহনকারী প্রাচীন দ্রাবিড় ভাষী জনগোষ্ঠীর দক্ষিণ ভারতে খোঁজ পাওয়া।

সেই  উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর খোঁজ পাওয়া গেছে।

দক্ষিণ পশ্চিম তটভূমির কর্ণাটক ও কেরলে। তাদের নাম কোরাগা জনগোষ্ঠী।

সমগ্র ভারতের প্রধান জনসমষ্টির জনবিন্যাসকে তিনটি জেনেটিক প্রবাহে বিভক্ত করা হয়েছে । এই তত্ত্ব বিজ্ঞানী মহলে স্বীকৃত।

সেই তিনটি প্রবাহ হল ১. প্রাচীন আদি ভারতীয়রা,  ২.  ১২হাজার বছর আগে আসা ইরানের সাথে সম্পর্কিত একটি জনগোষ্ঠী, আর। ৩.  স্টেপে এলাকার জিন বহনকারী একটি জনগোষ্ঠীর আগমন।

কিন্তু এখানেই শেষ না। নানা প্রত্ন নিদর্শন ও ঘটনা অনুযায়ী আরেকটি জেনেটিক প্রবাহ থাকার কথা।

এই চতুর্থ প্রবাহের সাথেই থাকছে হরপ্পা সভ্যতা এলাকায় উচ্চ ফলনশীল বীজ ব্যবহার করে কৃষিকাজে প্রভূত উন্নতি করা ও তারই ফলস্বরূপ হরপ্পা সভ্যতার শহরগুলো গঠন ও সমৃদ্ধির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।

মেহেরগড় এলাকায়  ১২ হাজার বৎসর আগের একটি নতুন জনগোষ্ঠীর আগমন ছাড়াও আরো একটি জনগোষ্ঠীর আগমন সম্বন্ধে প্রাচীন দন্ত বিশেষজ্ঞ জন লুকাস ও হেমফিল তাঁদের মেহেরগড় কঙ্কালগুলোর গবেষণা শেষে নিশ্চিত হয়ে ঘোষণা করেছিলেন নতুন জনগোষ্ঠী এসেছিল।  সেটাই এই অজানা চতুর্থ জেনেটিক প্রবাহ। তবে পরিচয় পাওয়া বাকি ছিল।

ডেভিড রাইখ তার দক্ষিণ এশিয়ার জেনেটিক বিন্যাসের গবেষণা পত্রে প্রত্যক্ষ প্রমাণের অভাবে সেই চতুর্থ জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে না পারলেও বলেছেন একদল লোক অবশ্যই প্রবেশ করেছিল উচ্চ ফলনশীল বীজ নিয়ে।

২০২৪ প্রিয়া মুরজানি সেই চতুর্থ জেনেটিক প্রবাহকে চিহ্নিত করেছেন সারাজম থেকে আগত জনগোষ্ঠী হিসাবে।  তবে তিনি জিনের বদলে জিনের মিউটেশনকেই প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন।

(একটি কথা: কেন শুধু এই চারটি প্রবাহ নিয়ে আলোচনা? কেন অস্ট্রোএশিয়াটিক মুন্ডা বা তিব্বতি চিনা বা তিব্বতি বর্মির কথা আসছে না?  প্রশ্ন উঠবেই ।আপাতত সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি কোন চেষ্টা করব না। কারণ সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রসঙ্গ। আর লিখতে গেলে খান দুই মহাভারত হয়ে যাবে)

অজানা চতুর্থ সেই জেনেটিক প্রবাহের খোঁজে ম্যাঙ্গালোর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের একটি গবেষণা ইতিমধ্যে European journal of human genetics (EJHG) তে প্রকাশিত হওয়াতে একে মোটামুটি ভাবে বিজ্ঞানসম্মত বিজ্ঞান স্বীকৃত গবেষণাপত্র হিসেবে আমরা ধরে নিতে পারি ।

এই বিজ্ঞানীদের দল বলেছেন ইরান থেকে আরেকটি দল এসেছিল।  এবং হরপ্পা সভ্যতায় তাদের অবদান থাকার সম্ভাবনা যথেষ্ট বেশি। প্রত্যক্ষ প্রমাণ আলাদা করে চিহ্নিত করা সম্ভব না হলেও তাদের আগমনের স্থান ও কাল হিসেব করে বলা যায় হরপ্পা সভ্যতায় তাদের ভূমিকা অতি অবশ্যই ছিল।

এই বিজ্ঞানীদের দ্বারা সদ্য আবিষ্কৃত জেনেটিক তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়েছে যে সেই অজানা জেনেটিক প্রবাহের একটি ধারা বহন করছে কর্নাটকের কোরাগা জনগোষ্ঠী।

ম্যাঙ্গালোর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা গবেষণা পত্র প্রকাশের সাথে সাথে সাংবাদিকদেরও জানিয়েছেন খবরটি।

এই কোরাগা জনগোষ্ঠীকে বলা হয়েছে প্রোটো দ্রাবিড়।

তারা বর্তমানে দক্ষিণ কর্নাটকে বাস করলেও তাদের ভাষার ব্যাকরণে ছাপ রয়েছে উত্তরের নানা বৈশিষ্ট্যের।

যা প্রমান করে তারা উত্তর থেকে ক্রমে সরে এসেছে দক্ষিণে।

বিজ্ঞানীরা জানান:  কোরাগাদের মাইটোকনড্রিয়া হল ইউ ১ (U1)

এই মাইটোকনড্রিয়াটির আপ উৎপত্তি ভারতের বাইরে ইউরেশিয়াতে। শেষতম হিমযুগে।

কোরাগাদের সমাজে শুধুমাত্র নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের প্রথা থাকায়  ইউ১ মাইটোকনড্রিয়া তাদের মধ্যে অতি উচ্চ হার পাওয়া যায়।

কোরাগাদের প্রাচীন দ্রাবিড় ভাষা তার সাথে পশ্চিম এশিয় সুপ্রাচীন মাইটোকনড্রিয়ার যুগ্ম অবস্থিতি বলে তারা প্রকৃতই সুপ্রাচীন দ্রাবিড়। আর তাদের ভাষা এতটাই প্রাচীন যে তাকে বলা হচ্ছে প্রোটা দ্রাবিড়।

কোরাগাদের মধ্যে সব সহ ও ১৯টি হ্যাপ্লোগ্রুপের দেখা পাওয়া গেছে

এবার কোরেগাদের পরিচয় :---

দক্ষিণ কর্নাটকের উদিপি ও কেরালার কাসারগড় জেলায় এদের বাস। জনসংখ্যা ২০০১ এ ছিল কুড়ি হাজার দু হাজার এগারো তে তা নেমে গেছে ১৬হাজারে।

এটুকু বললে পরিচয় এর কিছুই বলা হলো না।

জাতি বর্ণ ভেদের দেশে বলতে হবে জাতীয় বর্ণ পরিচয়।

কারাগো  হলো একটি প্রান্তিক হতদরিদ্র জাতি। বর্ণে তারা অস্পৃশ্য শুদ্র। শুধু শুদ্র নয় শুদ্রের মধ্যেও নিচু জাতি । চন্ডাল।

হোক চন্ডাল তবুও তো হিন্দুই। তবে তাদের নিজস্ব একটা ধর্মের প্রচলনও আছে। নানা তুকতাক হয। নানা ধরনের আরাধনা হয় । তাদের আরাধ্যের মধ্যে আছে ভূত ও দেবতা। তবে প্রধান দেবতা হলো সূর্য।

কারাগো সমাজ তিনটি প্রধান গোত্রে বিভক্ত। সাপিনা,  আন্দে, ও কাপ্পাদা। বৈবাহিক সম্পর্কের ব্যাপারে, নিজ জাতের মধ্যেই বিয়ে করতে হবে। তবে নিজ গোত্রে নয়।

কোরাগারের সমাজ মাতৃতান্ত্রিক, নাম আলিয়া সনাতন সমাজ, এটা ছিল। এখন আধুনিক যুগে তারা ক্রমে ঝুঁকে পড়ছে, আর সবার মত, পিতৃতান্ত্রিক সমাজে।

থাকার জায়গা বলতে আগে ছিল লতাপাতার কুঁড়েঘর এখন সরকার থেকে ঘরদোর বানিয়ে দিচ্ছে।

কর্নাটকে আজালু নামে একটি সামাজিক প্রথা পালন করা হতো। এখনও কোথাও কোথাও হয়। এই প্রথা অনুযায়ী কোরাগাদের খাবারের মধ্যে কাটা চুল কাটা নোখ এসব মিশিয়ে তাদেরকে জোর করে খেতে বাধ্য করা হতো। এছাড়া মোষের দৌড়ের মতো করে তাদেরকেও দৌড় করানো হতো দর্শকদের আনন্দ দেবার জন্য ।

এই অমানবিক প্রথাটি ২০০০ সালে সরকারিভাবে আইনত নিষিদ্ধ করা হয়।  তবে আমাদের দেশে দূর দূরান্তের গ্রামে কে কটা আইন মানে?

কোরাগাদের নিত্যদিনের খাবার বলতে অবশ্যই ভাত।

তারা মাংস খেতে ভালোবাসে। গরু এবং শুয়ারের মাংস তাদের অতি প্রিয়।

জানিনা সঠিক কিনা একজনের লেখায় দেখলাম তারা মাংস খাবার জন্য কোন জীবন্ত প্রাণী বধ করে না বরং স্বাভাবিকভাবে মরে যাওয়া প্রাণীর মাংস খায়।

দারিদ্র আর খাদ্যাভাবে ও পুষ্টির অভাবে তাদের মধ্যে শিশু মৃত্যুর হার খুব বেশি।

খেয়ে পরে থাকার জন্য তারা বনজ সম্পদ থেকে ঝুড়ি ইত্যাদি বানিয়ে বিক্রি করে। এছাড়া দিনমজুরি তো আছেই। কর্নাটকে তারা মূলত সাফাই কর্মী।

কেরালা সরকার তাদের জমির পাট্টা দিয়ে সাহায্য করার উদ্যোগ নিয়েছে।

সংগীত চর্চায় তারা ব্যবহার করে ঢোল আর বাঁশি।

শিক্ষাব্যবস্থা দুরবস্থাই ছিল। এখন অবস্থা বদলাচ্ছে। ২০১০ এর তাদের থেকে একজন পিএইচডি করে। ২০১২ তে ২ জন NET তে সাফল্য পেয়েছে।

সরকার থেকে নানা পথে নানা এজেন্সি লাগিয়ে অবস্থা বদলাবার চেষ্টা হচ্ছে ঠিকই, তবু হয়তো এখনো অনেক লম্বা সময় লাগবে।

এই লেখার সাথে আমার মাথায় এল একটা কথা,  দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীকে হরপ্পা সভ্যতার স্থপতি না হোক সহযোগি তো অতি অবশ্যই বলা যায়। আজ সেই সব চিহ্নিত ছোট ছোট জনগোষ্ঠীগুলো সমাজের নিম্নতম স্তরে চরম তারিখ দিয়ে দিন গুজরাণ করছে। কেন?

এটাই কি যথার্থ চিত্র? @ তুষার মুখার্জি


৪২



১৯১৮ তে প্রথম বার জাপানে দেখানো হয় এই তথ্যচিত্রটি। ব্রাজিলের আমাজনের দুই জন এমনি হতভাগার কাহিনী।

তাদের নাম জানা নেই। তারা দুই বন্ধু অথবা দুই ভাই, তাও জানা নেই । তারা শুধু দুজন। তাই কাজ চালাবার জন্য একটা নাম দেওয়া হয়েছে আউরা ও আউরে।

ভাষা বিজ্ঞানীদের অনুমান তাদের ভাষা তুপি-গুয়ারানি ভাষা পরিবারের অংশ। কিন্তু সে ভাষাপরিবারও লুপ্ত।

আওরা আওরেকে নিয়ে ডকুমেন্টারি করেছেন জাপানের nhk তারা আমাজনের বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীদের পুনর্বাসনের জন্য নতুন করে গড়া একটি গ্রামে এই দুজনকে দেখতে পায়।

ওই এলাকাতেই ১৯৮৭ থেকে ভূমিহীন ব্রাজিলবাসীদের বসবাসের ঢালাও অনুমতি দেওয়া হয়। ফলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বহু ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী তাদের চিরাচরিত আপন বাসভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়ে যায়। এরপরে তারা সরকারি প্রশাসনের অধীনে সরকারের নির্মিত গ্রামে থাকতে বাধ্য হয়।

এমনি একটি গ্রামে থাকেন ৬০- ৬৫ বছর বয়সি আউরা।

পায়ে গঠনে ত্রুটির জন্য বয়স্ক আউরা স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারে না। এখন সে শিকার করে নিজের খাবার জোগাড় করতেও অক্ষম। ব্রাজিল সরকার অবশ্য তার খাবার জামাকাপড় আর চিকিৎসার ভার নিয়েছে।

প্রধান সমস্যা হলো আউরা যে ভাষায় কথা বলে তা কেউ বুঝতে পারে না। আর, আউরার নাম আসলেই আউরা ও নয়, এই নামটি দিয়েছে ব্রাজিল সরকারের কর্মীরা তার আসল নাম আমরা কেউ জানিনা।

ঘটনার শুরু ১৯৮৯ । আমাজনের বন কেটে বসতি পত্তন করা ব্রাজিলিয়ান কৃষকদের একটি পরিবার প্রথম দেখা পায় আউরার। তার সাথে ছিল আরেক সঙ্গী যার নাম রাখা হয়েছিল আউরে। সেই ব্রাজিলিয়ান কৃষক দম্পতির বর্ণনায় :-

এক সকালে দেখি দরজার কাছে দুইজন দাঁড়িয়ে। হাতে বড় দা । পরনে একেবারে কিচ্ছু নেই। খুব উত্তেজিত ভাবে কিছু বলছে। কিন্তু আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না। আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম টাকা-পয়সা চাইছে। কিন্তু কিছুই তো বোঝা যাচ্ছে না কি বলছে। ক্রমে ভিড় বাড়লে তারা চলে যায়।

এরপর থেকে একাধিক নতুন গড়া ব্রাজিল গ্রাম থেকেই একই খবর আসতে থাকে। সবাই ভীত। ব্রাজিলিয়ান সরকার এই দুজনকে খুঁজে বের করার জন্য একটি দল গড়ে। সেই দলের চেষ্টায় জিনগু এলাকার টোকানটিনস নদীর কাছে গভীর বনে তাদের দেখা পাওয়া যায়। বাঁশ আর পাতা দিয়ে বানানো কুঁড়েঘরের মেঝেতে শোবার জন্য লতাপাতা বিছানো ছিল ঘরে। খাবার বলতে কয়েকটি ছোট ছোট জীব এর হাড় দেখা গেছে।

ওই ব্রাজিলিয়ান দলের ফটোগ্রাফারের ক্যামেরার ফ্ল্যাশের ঝলকানিতে ভয় পেয়ে দুজন দৌড়ে পালিয়ে যায়। তারপরে খুঁজে খুঁজে দুজনকেই পাকড়াও করে একটি মিনি ট্র্যাকে করে অন্য একটা গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়।

এরা ধরা পড়েছে শুনে এই প্রথমে বলা ব্রাজিলিয়ান কৃষক দম্পতি যে মন্তব্য করেন সেটা হল:

"যাক এ্যদ্দিনে আমাদের এই জমি সত্যি সত্যি আমাদের হলো।"

ধরার পরে দুইজনের সাথে কথা বলার জন্য ৭-৮টি  স্থানীয় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর লোক এনে চেষ্টা করা হলেও কোন ফল পাওয়া গেল না। তারা কারুর কথা বোঝে না। তাদের কথাও কেউ বোঝেনা।

সরকারের দেওয়া পোশাক তারা পরেছে। কিন্তু যে গ্রামেই রাখা হয় সেখানেই সমস্যা । তাদের কথা তো বোঝা যায় না।

দুজনের মধ্যে আউরে সব সময় সন্দেহের তীক্ষ্ণ চোখে এবং রাগের চোখে সবার দিকে তাকায়। তার চোখ দেখেই সবাই ভয় পায়। গ্রামের পর গ্রাম থেকে অভিযোগ আসতে থাকে এবং তাদের গ্রাম বদলানো হতে থাকে।

আউরে ও আউরার মধ্যে কি সম্পর্ক? ভাই? বন্ধু? বোঝার কোন উপায় নেই। তবে দুজন সব সময় একসাথে থাকে। শিকার করা খাওয়া শোয়া সব একসাথে।

তবে যেটা বোঝা গেছে তাদের আচরণ থেকে সেটা হল আউরে সব সময় আউরাকে চোখে চোখে রাখত। অনেকটা পাহারাদারের মতো বা রক্ষাকর্তার মত। মনে হতো আউরা কে রক্ষা করাই তার প্রধান কাজ ছিল।

ইতিমধ্যে একজন ভাষাবিদ নোরভাল অলিভিয়েরে এদের সাথে টানা থেকে থেকে এদের ভাষা বোঝার অনবরত চেষ্টা করতে করতে গোটা কয় শব্দের একটা আনুমানিক অর্থ আন্দাজ করতে পেরেছিলেন।

২০১২ আউরে অসুস্থ। চিকিৎসার জন্য শহরে নিয়ে যাওয়া হলো। আউরে এবং আউরার এই প্রথম শহরে আসা। গাড়ি দেখলেই তাদের আতঙ্ক হচ্ছে। পরীক্ষা নিরীক্ষার পর হাসপাতালে জানা গেল আউরের ক্যান্সার। বাঁচেনি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পাশে বসে ছিল আউরা।

কিন্তু ব্যস। যে দুজন সব সময় একত্রে ছিল, মৃত্যুর পর থেকেই সেই আউরের নাম আর একবারও উচ্চারণ করেনি আউরা।

ডকুমেন্টারি বানাবার সময় আউরার থাকার জন্য ছিল একটি টালির ঘর। ঘরে একটি চেয়ার একটি টেবিল। শোয়ার জন্য কোন চৌকি ছিল না। সে শুতো কাপড়ের দোলনায়। এলাকায় আসা নানা আধুনিক জিনিসে আউরার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। কেবল একটু বড় রঙিন পুঁতি  দিলে মালা গেঁথে নিজের গলায় পরে থাকে।

তার জন্য সরকার থেকেই রান্না খাবার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তার ঘরের থেকে পঞ্চাশ মিটার দূরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দিনরাত্রির দুজন নার্স বারে বারে এসে তার খোঁজ খবর নিয়ে যায়। কোন কোন দিন মেজাজ মর্জি ভালো থাকলে সে নিজে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে সকালের চা জল খাবার খায়। তারপরে ঘরে ফিরে আপন মনে অনর্গল বকবক করতে থাকে। যার অর্থ কেউ বোঝেনা।

আসলে আউরা এখন মানসিক দিক দিয়ে অপ্রকৃতিস্থ।

ভাষাবিদ নোরভাল আউরার সঙ্গে থেকে থেকে কথা বোঝার চেষ্টা করেছেন কিন্তু আউরা যে কখনো একটি গোটা বাক্য বলে কি না সেটাও তো বোঝা যায় না।

তবে আউরার বলা শব্দগুলোতে একই শব্দ বারবার ফিরে আসে। নোরভাল বলেন আউরা সম্ভবত একটাই গল্প বলে। সবসময়ই সেই একটাই গল্প বলে। সেই একটাই গল্প সে হাজার বার, লক্ষ বার বলে যায় । কিন্তু তার গল্প কেউ বোঝে না।

ভাষাবিদ তার বলা শব্দগুলো থেকে সবচেয়ে বেশিবার ফিরে আসা কয়েকটি শব্দ, অবশ্যই কিছুটা আনুমানিক অর্থ,  উল্লেখ করেছেন:-

মৃত্যু, শিশু, নারী, দাড়ি,বিদেশি, আলোর ঝলক, তীব্র শব্দ, জাগুয়ার,  গরু, হাঁটা, দুজনে অনেক হাঁটা , তির, নারকেল, শুয়োর, বন, পাখি

স্থানীয় সব ছোট ছোট জাতিদের থেকে আউরা ও আউরের ভাষা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

এর অর্থ হল, তাদের একটি ভিন্ন জনগোষ্ঠী ছিল। তাদের গ্রাম ঘরবাড়ি পরিবার আপনজন সবই ছিল।

কি হয়েছিল?? কোথায় সব উবে গেল?

তীব্র শব্দ, আলোর ঝলক, আউরা কি গুলির কথা বলছে?

জাপানি ডকুমেন্টারি দল আউরার সম্ভাব্য বাসস্থানের খোঁজ করে করে সেখানে গিয়ে দেখে এলাকাটি একটি মাইনিং কোম্পানির দখলে। প্রথম দিন অনুমতি না পেলেও পরে অনুমতি জোগাড় করে ভেতরে গিয়ে দেখা যায় গোটা এলাকায় কোন গাছপালা নেই ঘাসে ভরা বিশাল পশু চরানোর মাঠ। এখন আর কোন কিছু বোঝার বা অনুমান করার উপায় নেই।

এখন আউরার বয়স বয়স ৬০ ৬৫ মতো। যে কটা বছর সে বেঁচে থাকবে তার মধ্যে নোরভাল পারবে কি তার বলা কথা বুঝতে?

হয়তো আউরার সাথে একটি ভাষা একটি জনগোষ্ঠীর সব কথা সব তথ্য সংস্কৃতি ইতিহাস মুছে যাবে বরাবরের মতো।

তার সাথে মুছে যাবে সেই সব কথা, কি হয়েছিল সেই  জনগোষ্ঠীর? সেই সব নারী পুরুষ শিশুর? কেন তাদের কোন চিহ্নই নেই এখন? @ তুষার মুখার্জি


৪৩


মিয়ানমার 

মিয়ানমারের বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব উ থান্ট। তিনি ছিলেন জাতিসংঘের তৃতীয় মহাসচিব 1961 থেকে 1971 তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পাবেন শেষ মুহূর্তে একজন বিখ্যাত ব্যক্তির বিরোধিতায় সেই পুরস্কার চলে গেল ইউনিসেফের হাতে। মিয়ানমারের আরেকজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার পেলেন এবং শান্তির নোবেল পেয়ে প্রবল অশান্তিতে ভুগছেন। তিনি আং সান সু চি।

মিয়ানমার আগে পরিচিত ছিল বার্মা নামে। সেই হিসেবে বার্মার লোকজনের পরিচয় ছিল বর্মী বলে।  বর্মীরা ধর্মে প্রধানত থেরবাদী বৌদ্ধ।

বৌদ্ধ হলেই শান্তিকামী হবে সে ধারণা কে নসাৎ করেছে বর্মিরা।

ছোটবেলা অসমে বর্মার লোকের নারকীয় অত্যাচারের কাহিনী এখন অসমে "মান-র দিন" বলে পরিচিত।

বর্মি অত্যাচারের কাহিনি আরো একটু শুনে নিন।

আধুনিক কালে বর্মি জান্তা সরকার রোহিঙ্গাদের সে দেশের নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকার করেছে। অবশ্য এটাও ঠিক রোহিঙ্গারাও বর্মার বাসিন্দা হতে চায়নি। তারা পার্শ্ববর্তী মুসলিম দেশের নাগরিক হতে চেয়েছিল।

কিন্তু আরেকটি জাতি কিছুই চায়নি। শুধু শান্তিতে থাকা ছাড়া। তবু তারা মিয়ানমার এর নাগরিকত্ব পায়নি। তারা হলো সমুদ্রের যাযাবর জনগোষ্ঠী মোকেন। মোকেনদের কোন এক অজানা কারণে মিয়ানমার সরকার নাগরিকত্ব দেয়নি। কয়েক হাজার লোকের ছোট জনগোষ্ঠী জলেই ভেসে বেড়ায়। তাদের কোন দেশ নেই।

ফেসবুকে আমার এক বন্ধু ছিল মায়ানমারেরই নাগরিক জাতিতে সে মন (Mon)জনগোষ্ঠীর। এরা অস্ট্রো এশিয়াটিক, তাই জাতিগত ভাবে মোঙ্গোলীয় বর্মিদের থেকে আলাদা। দুই বৎসর তার ফেসবুক পোস্ট দেখেছিলাম। অবশ্যই google translation এর সাহায্যে। তারপরে শেষ ভিডিও দেখি তার গ্রামের বাড়ি ঘর পুড়ছে। এরপর থেকে তার একাউন্টে আর কোন পোস্ট হয়নি।২০১৮

আমার এই মিয়ানমার ইতিহাস লেখায় এই মন -জাতির কথাও থাকবে।

বার্মা ছিল আজাদ হিন্দ বাহিনীর রণাঙ্গন সেখান থেকে ইম্ফল কোহিমা অবধি এগিয়ে এসেছিল আজাদ হিন্দ বাহিনী ।

শরৎচন্দ্রের লেখায় যুদ্ধকালীন বর্মার দুরবস্থা, লোকেদের গভীর বনের মধ্য দিয়ে পালিয়ে ভারতে চলে আসা। প্লেগে সহায়হীন মৃত্যু ,  ক্ষুধার মৃত্যু মিছিল... মিয়ানমার নিয়ে কোন উজ্জ্বল ছবি স্মৃতিতে জমা হয়নি।

শিলিগুড়ির ও চেন্নাইয়ের বর্মা বাজার মিয়ানমার থেকে ভারতীয় বিতাড়নের করুণ স্মৃতি মাত্র।

কেন হাজার হাজার ভারতীয় মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়েছিল তার কিছু কিছু ব্যাখ্যা হয়তো আমরা পেয়েছি নানা লেখা থেকে।  অনেকেই লিখেছেন । তাঁরা যেমনটা বুঝেছেন তেমনটাই লিখেছেন। সমস্যা হলো তাঁরা হয়তো পরিস্থিতি ভুল বুঝেছেন।  ফলে যা লিখেছেন সেটাও ভুল লেখা হয়েছে। এবং আমরা যা বুঝেছি তাঁদের লেখা পড়ে, স্বাভাবিক ভাবেই  ভুল ই শিখেছি।

এবার সরাসরি ইতিহাস।

জাতিগতভাবে মোঙ্গোলীয় মিয়ানমারবাসীরা ভাষায় তিব্বতি-বর্মী ভাষা গোষ্ঠীর।

মিয়ানমার বেশ বড় দেশ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম দেশ ।

এই বিশাল প্রতিবেশী দেশটির ইতিহাস সংস্কৃতি সভ্যতা নিয়ে আমরা খুব সামান্য জানি। এই বিশাল দেশের ইতিহাস বুঝতে দেশটিকে মনে মনে ভাগ করে নিয়ে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। আমার লেখাতে টুকরোগুলো উল্লেখ থাকবে। থাকবে তাদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

দেশটির মানব বসতির প্রাচীনতার দিক থেকে সবার প্রথমে আসবে  ৭.৫ লক্ষ বছর আগে বসবাস করা হোমো ইরেক্টাসদের কথা। তার পরের স্যাপিয়েন্সরা আসে অনেক পরে। মাত্র ২৫ হাজার বছর আগে।

এখানে আমার প্রশ্ন....তাহলে ভারত থেকে হোমো সেপিয়েনসরা ৫০,০০০ বছর আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া গেল কোন পথে ? মিয়ানমারে তাদের কোন চিহ্নই পাওয়া যায় নি? না। কিছুই পাওয়া যায় নি। পাওয়া গেছে কেবল ২৫ হাজার বৎসর আগের পাথরের হাতিয়ার।

ইরাবতি নদীর ধারে প্রস্তরযুগীয় হাতিয়ারের পরে দেখা মেলে নব্যপ্রস্তর যুগীয় সংস্কৃতির ১০ থেকে ৬০০০ বছর আগে সান প্রদেশে সান প্রদেশের পাদা লিন গুহায়। সেই গুহায় গুহাচিত্র বর্ণিত কৃষিকাজের মধ্যে দিয়ে।

১৫০০ সাধারণ পূর্বাব্দে নাগাদ ব্রোঞ্জ আর তামার ব্যবহার শুরু হয়। লোহার ব্যবহার শুরু হয় ৫০০ সাধারন পুর্বাব্দে মান্দালয়ে।  মান্দালয়ের কাছে সামোন ভ্যালিতে চিন ও ভারতের সাথে বাণিজ্য চলতো প্রথম সহস্রাব্দে।

মোন বা মন নামের অস্ট্রো এশিয়াটিক জাতিটি ইরাবতী নদীর ব-দ্বীপ ও লাগোয়া থাইল্যান্ডের বাসিন্দা। সম্ভবত তারা অতীতে থাইল্যান্ড থেকেই মিয়ানমার এসেছিল।

এই জাতি টির মাধ্যমেই মিয়ানমারে প্রবেশ করে বৌদ্ধ ধর্ম। এমনটাই সেখানকার প্রচলিত বিশ্বাস। আসলে ঠিক তাই নয়। তাদের জনপদে উপনিবেশ গড়েছিল দক্ষিণ ভারতীয়রা। সম্ভবত নাগার্জুনকোন্ডার শিলালিপিতে উল্লিখিত নানা দেশে বৌদ্ধ প্রচারকদের যাওয়ার যে তালিকা আছে তার মধ্যে এই এলাকাও ছিল। শুধু নাম বদলে গেছে বলে চেনা দুর্ঘট হয়ে গেছে।

সম্ভবত এই মন্ দের এলাকাটিই এককালে ভারতীয় সাহিত্যের সুবর্ণভূমি। অবশ্যই কল্পনা। কারন সুবর্নভূমি তো চিরকাল একটি অনির্দিষ্ট ভূমিখন্ড, শুধু তা নির্দিষ্ট ছিল দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায়। এই মন-দের প্রতিষ্ঠিত জনপদ যে বিশাল এলাকা বৃস্তিত ছিল তার উজ্জ্বলতম স্থান ছিল পেগু। সম্ভবত সংস্কৃত সাহিত্যের হংসবতী(? )

এই মন দের বাসভূমি বর্মার দক্ষিন পশ্চিমে।

দক্ষিণ পূর্বের আরাকানের কথা পরে বলব।

মধ্য বর্মায় পিউ জাতির আগমন ঘটে সম্ভবত তিব্বতের উরমহাত এলাকা থেকে। অন্য মতে তারা আসে দক্ষিণ চীনের ইউনান এলাকা থেকে। 

পিউদের গঠিত পিউ নগর রাজ্যগুলোর ইতিহাসের শুরু প্রথম শতাব্দী থেকে।  এই সময়ে একাধিক শক্তিশালী নগর-রাজ্য গড়ে ওঠে, এদের মধ্যে  শ্রেষ্ঠ নগর রাজ্যের তকমা পাবে "শ্রী ক্ষেত্র"।

এই নগর রাজ্যগুলির সমৃদ্ধি তাদের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলে ভারত ও চীনের সাথে। সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় স্তরে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের যুগপৎ প্রসার ও বিকাশ ঘটতে থাকে পিউ নগর-রাজ্যগুলোতে।

৭৫০-৮০০ নাগাদ দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের নানচাউ বা নানঝাউ এলাকা থেকে বারমার জাতি অনবরত আক্রমণ করতে থাকে পিউ জাতির উপরে। নবম শতাব্দীতে  এই বারমার জাতি মান্দালয়ের কাছে "বাগান" এ তাদের প্রথম বসতি স্থাপন করে।  তারপরে নিরন্তর লড়াই চলতে থাকে আর ক্রমাগত সাফল্য আসতে থাকে বাররমাদের পক্ষে।  আজ সেই যোদ্ধা বারমার জাতিই মিয়ানমারের প্রধান বর্মি জনগোষ্ঠী।

বার্মা,  রাজ্য থেকে সাম্রাজ্যে উত্তরণ

বারমারদের প্রথম জনপদ "বাগান" এলাকা থেকে বিজয় যাত্রা শুরু,  তাই অনেক সময় তাদের সাম্রাজ্যকে বাগান অথবা উচ্চারণ ভেদে পাগান বলা হয়।

ইরাবতী নদীর উজানের দিকের উপত্যকায় বারমার জাতির আগমন কাল মোটামুটি নবম শতাব্দীতে। তারপরে এই জাতির আনোয়ারহতা (অন্য মতে অনিরূদ্ধ?)।  ১০৪৪এ বাগান বা পাগান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এক বৃহত্তর, যাকে মধু মেখে বলা হয় ঐক্যবদ্ধ বার্মা বা বর্মি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হল।

এরপরেই গোটা বার্মায় বর্মি ভাষার আধিপত্য স্থাপিত হল। তার সাথে সাম্রাজ্যের সমর্থনে পুষ্ট থেরবাদী বৌদ্ধ ধর্মেরও একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হল।

যার উত্থান হয় তার পতন ও হবে। একাধিক মোঙ্গোলীয় জাতিগুলোর ক্রমাগত আক্রমনে বাগান সাম্রাজ্য দুর্বল হতে হতে অবসান হল ১২৮৭তে।

পাগান সাম্রাজ্যের পতনের পরে খুব স্বাভাবিক ভাবেই বার্মা আবার ছোট ছোট টুকরোতে ভাগ হয়ে গেল। উত্তর বার্মায় শান ও বর্মিদের আভা রাজবংশ মাথা তোলে শক্তিশালী হিসাবে। আর দক্ষিণ বার্মায় থাকলো মন-দের পেগু রাজবংশ।

এরপরে তাউঙ্গু বা কোনবাউং রাজবংশ আরেকবার বোটা বার মাকে একত্র করার চেষ্টা করে অথবা বলা চলে তারা ক্রমাগত তাদের সাম্রাজ্যের সীমা বাড়াবার চেষ্টায় যত ছিল সেই উদ্দেশ্যে তারা প্রথমে আরাকান  দখল করে।  পরবর্তীকালে অসম ও মনিপুর তাদের দখলে নিয়ে আসে,  এবং তারপরে তারা বাংলা ও বিহার দখল করার আশায় প্রথম ধাপে সিলেট দখল করার জন্য সেনাবাহিনী পাঠায়। এক দ্বি মুখী আক্রমণে সেই বাহিনী কক্সবাজারের কাছে রামু দখল করে ফেলে।  তারপর কোন এক অজানা কারণে হঠাৎ থেমে যায় ।

এরই প্রতিক্রিয়ায় ব্রিটিশরা ১৮২৪এ আক্রমণ চালায় আরাকানে। সেই যুদ্ধ শেষ হয় ইয়াণ্ডাবু শান্তি সন্ধিতে। পরাজিত মিয়ানমার রাজা বিপুল আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হয় । বৃটিশ প্রতিনিধি মিয়ানমারের রাজসভায় উপস্থিত থাকে ক্ষতিপূরণের পুরো টাকা না পাওয়া অবধি। তার সাথে মিয়ানমার রাজা বৃটিশদের জানান মণিপুর ও অসমের ব্যাপারে তাদের কোন বক্তব্য নেই। বৃটিশরা বা মনিপুর ও অসমের রাজারা যা মনে করে করতে পারে।

কিন্তু এত করেও শান্তি কাল অনন্তকাল হল না। আরো দুটো যুদ্ধ হল মিয়ানমার ও বৃটিশ সেনার মধ্যে।

অবশেষে শেষ মিয়ানমার রাজাকে বৃটিশরা নির্বাসিত করল মহারাষ্ট্রের রত্নগিরি এলাকায়।

আবার  বৃটিশরাই শেষ মোগল সম্রাটকে দিল্লি থেকে নির্বাসিত করেছিল বার্মায়।

বার্মায় ব্রিটিশ শাসনের শুরু হয় ১৮২৬ এ তখনকার রাজধানী আবার কাছে ইয়াণ্ডাবুতে এক শান্তি চুক্তির মাধ্যমে।তখন বার্মার এক ছোট অংশ বৃটিশদের দখলে ছিল। তারপরে টুকটাক যুদ্ধ হচ্ছিল। বড় যুদ্ধ হয় আরো  দুটো । মোট

তিনটি বড় যুদ্ধের বছরগুলো হল ১৮২৪ ২৬ ১৮ ৫২ আর ১৮৮৫

ইঙ্গ বার্মা  যুদ্ধের সারসংক্ষেপ

সব যুদ্ধের কারণ অবশ্যই আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে ক্ষমতার বলয় বৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা । এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নেই। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বার্মার প্রাকৃতিক সম্পদ দখল ও নিয়ন্ত্রণের ইচ্ছা পোষণ করতো। সুযোগ পাচ্ছিল না।

অহোম রাজাদের ঘরোয়া কোন্দলের সুযোগে বর্মার রাজা অসমে ক্ষমতা বিস্তারের সুযোগ পেল। এই সময়ে অহম রাজারা সাহায্য চাইলেও বৃটিশ উৎসাহ দেখায়নি। কারণ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হিসেবে অসমে নাক গলালে খাজনার চেয়ে বাজনার খরচ বেশি হয়ে যাবে।

ঐ সময়েই বার্মার অর্থনৈতিক বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ে এসে গিয়েছিল থাইল্যান্ড মালয়েশিয়া ভিয়েতনাম।  ভিয়েতনাম কম্বোডিয়া লাওসে ফরাসী উপনিবেশ থাকার ফলে ফরাসিদের সাথে বার্মার সম্পর্ক নিবিড় হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছিল।

এদিকে চীনের সাথে ব্রিটিশদের বাণিজ্য পথ বার্মার গা ঘেঁষে। ফরাসিরা বার্মায় পা রাখলে ইংরেজদের চৈনিক বাণিজ্যের ইতি ঘটবে। গতিক বুঝে ভবিষ্যৎ ভেবে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কপালে ভাঁজ পড়ল।

বার্মার রাজা ও এই খেলাটা অন্য স্তরে নিয়ে যাবার জন্য এক অভাবনীয় অথবা স্রেফ দুঃসাহসী এক পরিকল্পনা করলেন। সেটা পরিকল্পনা ছিল, না নিখাদ বুদ্ধিহীনতা তাকে গ্রাস করেছিল, সে কথা বলা কঠিন। বার্মার রাজ দরবারে বিবরণীতে দেখা যায় বুদ্ধের দেশ বাংলা ও বিহারে বিদেশি বিধর্মীদের উপস্থিতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে বার্মার রাজা তার সেনাপতিকে আদেশ দিচ্ছেন বাংলা বিহার দখল করে বৌদ্ধ ধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে।

রাজার আদেশ অনুসারে সিলেট চট্টগ্রামে দ্বিমুখী আক্রমণের পরিকল্পনা হলো।

অসম থেকে কাছাড় হয়ে সিলেটে এগিয়ে যাবে বার্মার বাহিনী। আরাকান থেকে বার্মার প্রধান বাহিনীটি চট্টগ্রাম হয়ে এগিয়ে যাবে। পরে এই দুই বাহিনী একত্র হয়ে পূর্ব বাংলা কলকাতা বিহার দখল করে বুদ্ধের জন্মস্থানে পৌঁছাবে।

সমর পরিকল্পনা মত আরাকান দিকের বর্মী বাহিনী ঝড়ের বেগে কক্সবাজারের কয়েক কিলোমিটার দূরে রামুতে পৌঁছে গেল অসমের বাহিনী কাছাড় টপকে সিলেটের সীমান্তে হাজির।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি হারে কাঁপুনি লেগে গেল সিলেট চট্টগ্রাম দখলের পরে কলকাতা সোজা রাস্তা। সমস্ত সক্ষম ব্রিটিশদের নিয়ে করা হলো মিলিশিয়া। প্রয়োজনে হাতাহাতি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি শুরু হলো

হঠাৎ বার্মার বাহিনী থেমে গেল কেন থেমে গেল সেই রহস্য আজও অজানা

তবে অসমের দিকের বাহিনীর সম্ভবত সরবরাহ লাইনে অসুবিধার জন্য থেমেছিল কিন্তু চট্টগ্রামমুখী বাহিনীর কি হয়েছিল তা অজানাই থাকলো। তার শুধু থামালো না ফিরেও গেল।

ব্রিটিশরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। তারই সাথে তাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার সামরিক পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়িত করার প্রয়োজনীয়তা ও বুঝলো।

ব্রিটিশরা জানে স্থলপথে বার্মার সেনাবাহিনী প্রায় অপ্রতিরোধ্য। তাই এক অভিনব পরিকল্পনায় আন্দামান থেকে জাহাজে হাজার হাজার সেনা নামানো হলো আরাকানে। তাদের সাথে আছে টিপু সুলতানের থেকে নকল করা রকেট।

বার্মার কোন ধারনা ছিলনা জাহাজে এত সুন্দরী এভাবে আক্রমণ হারা যায় ফলে তাদের অলক্ষিত উপকূল মোটামুটি দ্রুতই দখল করে ফেলল। তারপর একটু অবশ্য ছিল কঠিন যুদ্ধ। আভা-র কাছাকাছি পৌঁছতে ব্রিটিশদের লেগে গেল দুই বৎসর।

কিন্তু ব্রিটিশরা রাজধানী আভা-র কাছাকাছি আসতেই বার্মার রাজা ভয় পেয়ে নতি স্বীকার করে সন্ধি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে ফেললেন।

এই দুই বছরের যুদ্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যা খরচ হয় তাতে কোম্পানিটি প্রায় দেউলিয়া হবার মুখে। এবার তারা বার্মার থেকে খরচের সব টাকা আদায় করবে। এবং সেই অর্থদণ্ডেই বার্মা চিরকালের মতো খোঁড়া হয়ে গেল। সম্পদশালী বার্মা সম্পদহীন হয়ে গেল বরাবরের মতো । তারপরেও দুইবার বার্মার সাথে ব্রিটিশদের যুদ্ধ হয় কিন্তু সেসব কথা পরে হবে।

এখন বল অন্য বার্মার দিকে তাকাই

প্রাচীন বার্মার দিকে আমার প্রথম চোখ পড়ে রয়াল এশিয়াটিক সোসাইটির শ্রীক্ষেত্র মিউজিয়াম কালেকশন ইনভেন্টরি এই নামের একটি পিডিএফ ছবির বই দেখে।

স্বভাবতই মিয়ানমারের অন্য মিউজিয়ামে কি আছে তা দেখার ইচ্ছা জাগে। অথচ প্রায় কিছুই পেলাম না। খুব অদ্ভুত। টুকটাক কিছু ছবি পেলাম মিয়ানমারের স্থানীয়ভাবে ব্যক্তিগত স্তরে ছাপানো। সব অর্থেই নিম্মি মানের। তবু তার থেকে একটা প্রাথমিক ধারণা তৈরি হচ্ছে প্রাচীন বার্মা সম্বন্ধে।

মিয়ানমারের প্রত্ন বিভাগ ও মিউজিয়ামের ইতিহাস

মধ্য ও উত্তর বার্মার অনেকটা দখল হয়ে যাবার পরে ব্রিটিশ সেনা মান্দালয়ে পাকাপাকি ঘাঁটি গেড়ে মান্দালয় রাজপ্রাসাদের নাম রাখল ফোর্ট ড্যাফরিণ। ঝটপট প্রাসাদে তৈরি হয়ে গেল ব্রিটিশ ক্লাব আর অবশ্যই একটি গির্জা তার সাথে তৈরি করা হলো সরবরাহ বিভাগের গুদাম অফিসারদের কোয়াটার আর যা না হলেই নয় সেই সেনা ব্যারাক।

১৯০১ লর্ড কার্জন মান্যালয়ে এসে সেই রাজপ্রাসাদ তথাকথ জাফরিন পরিদর্শন করলেন সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনী কে আদেশ দিলেন সব খালি করো সংরক্ষণের দায় দায়িত্ব চলে গেল বেসামরিক প্রশাসনিক বিভাগে। বদলের প্রথম পর্বে ই সচিব স্তরের কর্তা ব্যক্তি মি. তাও সেইন থোকে-র দায়িত্বে খোলা হল আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার শাখা অফিস।

১৯০৪ ১৯০৪ আনন্দ মন্দির এর কাছে বার্মার প্রথম মিউজিয়াম এর উদ্বোধন হলো

১৯১৯ ফরাসি নাগরিক মিস্টার চার্লস ডুরিওয়েল শিলালিপি অফিসের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন।

১৯২৬ থেকে ১৯২৯ এর মধ্যে প্রত্ন বিভাগ শ্রীক্ষেত্র এবং হামওয়াজার মত প্রাচীন শহরগুলির বেশ কয়েকটি স্থানে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য আরম্ভ করে দিল।

১৯৩৭৩৮ সালে আমেরিকান দার্শনিক এবং কার্নেগী ইনস্টিটিউটে ডঃ এবং অধ্যাপক মুভিয়াস ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের উপর গবেষণার জন্য মায়ানমারে এলেন।

১৯৫৪ সালের পয়লা নভেম্বর প্রত্ন বিভাগের নাম পরিবর্তন করে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ রাখা হয় আগের নাম কি ছিল সেটা আমি জানতে পারিনি।

১৯৭০ নবগঠিত প্রশ্ন বিভাগ আবিষ্কার করে। সেখানে প্রায় ১৩ হাজার বছর আগের মানুষের অস্তিতের প্রমাণ পাওয়া যায়। এক বিরাট সাফল্য।

১৯৭২ নতুন প্রশাসনিক বদলে রক্ত বিভাগ এখন থেকে একটি সম্পূর্ণ আলাদা বিভাগ হয়ে গেল।

২০০৭ রক্ত বিভাগ এখন সংস্কৃতি মন্ত্রকের অধীনে নতুন নাম হল প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ও জাতীয় জাদুঘর এবং গ্রন্থাগার ডিপার্টমেন্ট অফ আর্কিওলজি ন্যাশনাল মিউজিয়াম এন্ড লাইব্রেরী

মন্ত্রকের অধীনে একই সাথে থাকলো চারুকলা বিভাগ, জাতীয় শিল্প ও সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়, রেঙ্গুন ও পান্ডালয়। এবং হিস্টোরিকাল রিসার্চ সেন্টার।

১৯৮১ মিয়ানমারের একজন দক্ষ প্রত্নবিদ বিভাগের পূর্ণ সময়ের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন প্রথমবারের মতো।

দ্বিতীয় একবার মা যুদ্ধের ১৮৫২ পরে দক্ষিণ বারোয়ার শিলালিপি গুরুর সংরক্ষণ ও পাথরের জন্য ভারতীয় পুরা তথ্য বিভাগের দায়িত্বে একটি আলাদা বিভাগ খোলা হয়েছিল।

১৮৮১ জার্মান অধ্যাপক পালি ভাষা বিশেষজ্ঞ ড.ফোরচার্মার ভবেসক হিসাবে নিযুক্ত হন সমস্যা ছিল তিনি ভাষাবিদ প্রাচীন শিলালিপি সংরক্ষণের বিষয়ে কিছুই  জানতেন না।

পায়দা লিন গুহা

১৯৭০ সাল প্রদেশের তাউঙ্গিল জেলার ইউনেস্কো হেরিটেজ সাইট পায়দা লিন গুহা এলাকায় দুটো গুহা ছিল। এর মধ্যে ছোটটি বসবাসের জন্য ব্যবহার হতো আর বড়রটি একটি পথ দিয়ে পরস্পরের সাথে জোড়া নয়টি খোপ ছিল। দুটো বড় ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো ভেতরে আসতো। লালচে গিরিমাটিতে গুহার দেওয়ালে আঁকা ছিল মানুষের হাতের ছাপ মাছ ষাঁড় বাইসন হরিণ এ ছাড়াও কিছু অস্পষ্ট ছবিও ছিল।

এছাড়া দেওয়ালের গায়ে তিনশটির মতো অগভীর গর্ত বা ফুটো করা ছিল। গুহায় পাওয়া কাঠ কয়লা ও হাড়ের রেডিও কার্বন ডেটিং করে ১৭০০ থেকে ১৩ হাজার বৎসর আগের সময় নির্ধারণ করা গেছে।

তথ্যসূত্র

কোর্স অন কালচারাল হেরিটেজ প্রটেকশন ইন দা এশিয়া প্যাসিফিক রিজিয়ান টুয়েন্টি টুয়েলভ

রিসার্চ এনালাইসিস এন্ড প্রিজারভেশন অফ আর্কিওলজিকাল এন্ড রিমাইন্স

কালচারাল হেরিটেজ প্রটেকশন কর্পোরেশন অফিস এশিয়া প্যাসিফিক কালচারাল সেন্টার ফর ইউনেস্কো এজেন্সি ফর কালচারালস জাপান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস

রয়েল অর্ডারস অফ ফার্মা এডি 1598-1885, লেখক রান টুন। কুরেনাল, কিয়োটো ইউনিভার্সিটি জাপান। @ তুষার মুখার্জি


৪৪

 মিয়ানমারের ইতিহাস  

নিচে লেখা সংক্ষিপ্ত বর্মার ইতিহাসের সময় শুরু হবে ২০০ সাধারণাব্দ থেকে।  তবে প্রাগৈতিহাসিক কালের উল্লেখ একেবারেই না থাকলে অসুবিধা হবে। তাই প্রয়োজনে উল্লেখ থাকবে।

(১) প্রাগৈতিহাসিক ৪০০ সাধারণ পূর্বাব্দ থেকে ১০৫৭ সাধারণাব্দ হল বর্মার অস্ট্রোএশিয়াটিক জাতি মন(MON)দের  কাল।

এর মধ্যে ৪০০ সাধারণ পূর্বাব্দ থেকে ৮২৫ সাধারণাব্দ মন শাসনকালের কম বেশি একটা ইতিহাস জানা যায়। সেই ইতিহাস:

থাটন রাজ্য।

অস্ট্রোএশিয়াটিক মনজাতি শাসিত রাজ্য হল থাটন রাজ্য। (এখানে বলে রাখা ভালো এই মন দের সাথে মঙ্গ বা মগদের গুলিয়ে ফেলবেন না।) মন হলো মিয়ানমারের একমাত্র অস্ট্রো এশিয়াটিক জাতি। মন জাতিটি বরাবর থাইল্যান্ডেও বাস করে। এই মনদের আরেকটি নাম প্রচলিত আছে তালাইঙ। এই তালাইঙ বা তালাইঙ্গ শব্দের উৎস অনেকের মতে অন্ধ্রের তেলেঙ্গানা থেকে এসেছে।  অর্থাৎ অতীতে অন্ধ্রের তেলেঙ্গানার তেলেঙ্গা নামক কোন জাতির সাথে এদের সম্পর্ক ছিল। সে সম্পর্ক সরাসরি জেনেটিক নাও হতে পারে, সম্ভবত সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কথাই বলা হয়েছে। তবে বর্তমানে মনদের কাছে এই তালাইঙ শব্দটি খুব একটা পছন্দের নয়। তারা ব্যবহার করে না।

ভাষাগত ভাবে মনদের সাথে মেলে খেমের ও কম্বোডিয়ার লোকেদের ভাষা। তবে কম্বোডিয়া ও একক জাতির দেশ নয়। কম্বোডিয়াতে কয়েকশত ভিন্ন ভিন্ন জাতির বাস। কোন জাতির সাথে ভাষাগত মিল আছে সেটা বের করতে হবে।

মিয়ানমারের দক্ষিণ পশ্চিম অংশে থাইল্যান্ডের সীমান্তের কাছের এই থাটন শহরটির নামেই মনদের রাজত্বের পরিচিতি ছিল। তবে এই থাটন শহরের অথবা মন রাজ্যেরই কয়েকটি প্রাচীন নাম প্রচলিত আছে। যথা সূবর্ণভুমি, সুবন্নাভূমি, সুয়ার্ণভূমি, থুওয়ান্নাভূমি। এসব নামের অবশ্য তেমন কোন প্রত্ন প্রমান নেই,  নানা লোককথায় উল্লেখ আছে মাত্র।

বর্তমানে বিলিন এর উইনকা শহরে প্রত্ন খনন কাজ চলছে। শহরে চল্লিশটি টিলা বা ঢিবি পাওয়া গেছে যার মাত্র চারটিতে খনন কাজ চলছে। সব কাজ শেষ হলে হয়তো কিছু নতুন তথ্য পাওয়া যাবে অথবা কিছু লোক কথাই সত্য বলে প্রমাণিত হয়ে যাবে।

মনদের রাজ্যে গোড়া থেকেই ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাব ছিল। অনেকের ধারণা শুধুই সাংস্কৃতিক নয় ভারত থেকে আসা লোকও এখানে বসবাস করত। অর্থাৎ এটা আংশিকভাবে ভারতীয় উপনিবেশ ছিল। তবে তার কোন প্রত্যক্ষ প্রত্ন প্রমাণ নেই। প্রত্ন প্রমাণ যা আছে তা হল মন রাজ্যের সাথে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ছিল দক্ষিণ ভারত উড়িষ্যা এবং শ্রীলংকার।

থাটনের মন রাজ্যের অবনতি শুরু হয় থেমের সাম্রাজ্যের আক্রমণে । তবে ১০৫৭তে রাজ্যটির মন শাসনের অবসান হয় পিউ সাম্রাজ্যের অধীনে যাওয়ার পরে।

প্রায় বুদ্ধের সমকালীন মনদের রাজ্যটিতে পরপর ৫৯ জন রাজা রাজত্ব করে গেছেন। এটাও বহুলাংশে স্বীকৃত যে বর্মাতে বৌদ্ধ ধর্মের প্রবেশ ঘটে এই রাজ্যটি থেকেই। দক্ষিণ ভারত ওড়িষ্যা ও শ্রীলংকার সাথে যোগাযোগ সেই ধারণাকে সমর্থন করে।

তবে মিয়ানমারের আরো কয়েকটি জাতি দাবী করে তারাই প্রথম দেশটিতে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচলন ঘটিয়েছিল। সেই সব দাবি প্রধানত  লোককথার ভিত্তিতে এবং জাতিগত অহংকার প্রতিষ্ঠার জন্য। তবে একেবারে সবটাই লোককথা সেটাও জোর দিয়ে বলা যাবে না এখনো।

এই মনদের সৃষ্ট লিপিই হল গোটা বর্মার সমস্ত লিপির উৎস। এই মন লিপির প্রাচীনতম নমুনাটির লিখন কাল ছিল  ১০৫৮  সাধারণাব্দ। অর্থাৎ মনদের থাটন শহর পতনের এক বছর পরের।

(২) ২০০ থেকে ১০৫০সাধারণাব্দ। পিউ  নগর রাজ্য ও সাম্রাজ্য।  দক্ষিণ চীনের ইউনিয়ন থেকে আসা পিউ জাতির রাজত্বকাল।

মিয়াংমাও, বেইকথানো, হালিন, শ্রীক্ষেত্র এইসব ছিল পিউ জাতিদের নগর রাজ্যের কয়েকটি প্রধান নগর। আর পিউরা নিজেদের বলতো তিরচুল।

তিব্বতি বর্মী ভাষী এই পিউ জনগোষ্ঠী পাঁচশো পূর্ব শতাব্দীর আগেই বর্মাতে প্রবেশ করে। ধান উৎপাদনে দক্ষ পিউ রা উত্তর বর্মা থেকে ইরাবতী নদীর অববাহিকা ধরে ক্রমে দক্ষিণ বর্মা অবধি নিজেদের অধিকার নিয়ে আসে। চীনের ট্যাং রাজবংশের (৭ম-১০ম শতাব্দীর) নথি অনুযায়ী পিউদের (নাম উচ্চারিত হযত পিয়াও) ছিল ১৮টি নগর রাজ্য।

তবে বর্তমানে মিয়ানমারে মাত্র বারোটি শহরেরই খোঁজ পাওয়া গেছে। প্রতিরক্ষা প্রাচীর সহ পাঁচটি শহরের খোঁজ পাওয়া গেছে । বাকি সবই ছোটখাটো শহর। এর মধ্যে খনন কাজ হয়েছে মাত্র তিনটিতে। বেইকথানো শ্রীক্ষেত্র, ও হালিন। বিখ্যাত রাজারা হলেন আনোয়ারহাটা, বায়িন, নঞ, আলম্প্রা

শ্রী ক্ষেত্র আমাদের চেনা শব্দ বর্মি ভাষায় শ্রীক্ষেত্র হল থায়েখিত্তায়া। আর বেইকথানো সংস্কৃতে হয়ত ছিল, অনেকের মতে বিষ্ণু, তবে আমার মনে হয় বৈকুণ্ঠ। সহজ বোধ্য এই শহরগুলো স্থাপনকালে হিন্দু ধর্মের বিশেষ করে বিষ্ণু আরাধনার প্রাবল্য ছিল। বেইকথানোর প্রতিষ্ঠাকাল বলা হয় প্রথম শতাব্দীতে। পরে এই হিন্দু বৈষ্ণব পিউ সাম্রাজ্য হয়ে যায় পূর্ণরূপে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী।

(৩) ৮৪৯-১০৪৪, সাধারণাব্দ। বাগান সম্রাজ্যের প্রাথমিক পর্যায়।

১০৪৪-১২৯৭সাধারণাব্দ। পরিণত বাগান সাম্রাজ্য।

বাগান বা পাগান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হল বর্তমান বর্মার প্রধান জাতি বামার বা বারমার। এরাও এসেছে দক্ষিণ চীন থেকে।

(পাগান শব্দটি বর্মার ইতিহাসে বহুল ব্যবহৃত তবুও এই শব্দের ব্যবহারে আমি দুটো অসুবিধা পাচ্ছি। পাগান বলতে আব্রাহামিক ধর্মীয়রা অতীতে ইয়োরোপে চিহ্নিত করেছিল অ-ইব্রাহিমিক পৌত্তলিক এবং নিম্মস্তরীয় ধার্মিক ধারনা কে। যা মুলত একটি অপমান সূচক শব্দ ছিল। যদিও খুব আশ্চর্যজনক ভাবে বহু হিন্দুকেও নিজের ধর্মকে পাগান ধর্ম বলতে শুনেছি।

মিয়ানমারে কিন্তু পাগান একটি বিশেষ কালের বিশেষ জাতিগোষ্ঠী।

দ্বিতীয় সমস্যা হলো প্যাগান নামে মিয়ানমারে একজন রাজা ছিলেন। ব্রিটিশ আমলে সেই রাজার সাথে ব্রিটিশদের যুদ্ধ হয়েছিল।

এইসব সমস্যার কথা ভেবে আমি পাগান শব্দের বদলে অন্য সমার্থক শব্দ বাগান ব্যবহার করব, এই লেখায়।)

বাগানরা পিউদের নগর রাজ্যগুলো দখল করে প্রকৃতপক্ষেই এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। সেই সাম্রাজ্যের সীমানা ধরে আমরা বর্তমান মিয়ানমারের সীমারেখা অনেকটাই টেনে ফেলতে পারি।

কিন্তু উত্থান হলে পতনও হবেই।

প্রায় ১তশতকে মধ্য বর্মার সান জাতি এই বারমার জাতির তথা বাগান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করে এবং উত্তর ও পূর্ব দিক থেকে তাদেরকে ঘিরে ফেলে। শুরু হয় বাগান সাম্রাজ্যের পতন।

(৪) ১২৯৭-১৫৫৫ সাধারণাব্দ। উচ্চ বর্মা এলাকায় লাগাতর যুদ্ধ।

(৫) ১২৯৭-১৩৬৪ সাধারণাব্দ। মিনসেইং ও পিনিয়া রাজ্য

(৬) ১৩১৫-১৩৬৪ সাগাইং রাজ্য।

(৭) ১৪৮২-১৫৪২ প্রোমো রাজ্য।

(৮) ১২৮৭-১৫৩৯, ১৫৫০-১৫৫২, হানথাবাদি রাজ্য

(৯) ১২১৫-১৫৬০, শান রাজ্যসমুহ

(১০) ১৫১০-১৭৫২ টঙ্গু রাজবংশ।

(১১) ১৫১০-১৭৫২ টঙ্গু সাম্রাজ্য

(১২) ১৫৯৯-১৭৫২, নিয়াং গিয়াং (পুনরুদ্ধার)

(১৩) ১৭৪০-১৭৫৭, হানথাবাদি রাজ্য (পুনরুদ্ধার)

(১৪) ১৭৫২-১৮৮৫ কোনবাউং রাজবংশ।

(১৫) ১৮২৬-১৯৪৮ বৃটিশ উপনিবেশ।

একটি আংশিক লোককথা, যার থেকে ইতিহাসের সূত্র পাওয়া যায়।

১০৫৭পিউ রাজা আনোয়ারহটা মনদের রাজধানী থাটন অধিকার করে।

লোককথা বলছে, বৌদ্ধ সন্ন্যাসী শিন আরাহান পিউ রাজা আনোয়ারহটাকে থেরাবাদ বুদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত করেন। তারপরে আনোয়ারহটা থাটন রাজা মানুহার কাছে থেরবাদ বৌদ্ধ ধর্মের মূল পুঁথিগুলো চান। মানুহা তা দিতে অস্বীকার করলে আনোয়ারহটা মানুহার রাজ্য আক্রমণ করেন। দীর্ঘ তিন মাস অবরোধের পরে জয় আসে। রাজা মানুহা পরাজিত হন।  থাটনের পতন ঘটে। এরপরে রাজা আনোয়ারহটা থাটনে থাকা বৌদ্ধ পুঁথিগুলো নিয়ে পিউ সাম্রাজ্যের ধর্মীয় সংস্কৃতি গঠন করেন। পরবর্তীকালে এই থাটনের দক্ষ অস্ট্রো এশিয়াটিক মন কারিগরেরা বাগানদের তিন হাজার স্মৃতি গৃহ তৈরি করতে সাহায্য করে বা বলা যায় সাহায্য করতে বাধ্য হয়। এবং এও বলা হয় সেই নির্মাণকার্যের শিল্প দক্ষতা ছিল আঙ্কোর ওয়াটের সমতুল।

এই লোক কাহিনী থেকে আমরা জানতে পারলাম যে বর্মার বৌদ্ধ ধর্মের প্রসারের মূলে উৎস ছিল মন জাতি। আর মনজাতিদের বৌদ্ধ ধর্মের উৎস জানাই আছে, দক্ষিণ ভারত, উড়িষ্যা এবং শ্রীলংকা।

কষ্ট করে অনেক খটোমটো তথ্য পড়লেন যদিও সবটাই ভুলে যাবেন কালকেই।

এবার একটু রিল্যাক্স

শেষ পাতের চাটনি

উচ্চ বার্মা ও নিম্ন বার্মা। পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ববঙ্গ। ঘটি ও বাঙাল।

বাঙলায় ঘটি বাঙাল, বর্মী ভাষায় আয়ন থা ও আয়ক থা। সমার্থক।

উচ্চ বর্মার আয়ক-থা লোকেরা বলে তাদের এলাকাই প্রকৃত মিয়ানমার। কারণ সেই এলাকায় আছে শ্রেষ্ঠ শহর মান্দালয় ও তার আশপাশের খনিজে সমৃদ্ধ অঞ্চল। বিদেশী সীমান্ত থাকায় তাদের বৈদেশিক বাণিজ্যও চলে। অনেক সময় কাচিন ও শান প্রদেশ বাসীদের এলাকাকেও এই মধ্যেই রাখা হয়।

এই আয়ক-থা, আয়ন-থা  কিন্তু চালু হয়েছিল ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলে।

ঘটি বাঙাল ও তাই? @ তুষার মুখার্জি



তাইওয়ানে ডেনিসোভান।

ডেনিসোভানদের প্রথম খোঁজ পাওয়া যায় ডেনিসোভা নামের একটি গুহাতে । একটি হাতের কড়ে আঙ্গুলের হাড় থেকে সংগৃহীত ডিএনএ বিশ্লেষণ করে। এর আগে জানা ছিল স্যাপিয়েন্সের সমসাময়িক নিয়েন্ডারথলদের কথা। এবার জানা গেল মানবদের আরও একটি শাখা ছিল।

যেহেতু ডেনিসোভা গুহাতে তাদের প্রথম পাওয়া গেছে তাই তাদের নাম রাখা হলো ডেনিসোভান।

তখন ডেনিসোভানদের পরিচয় জানার একমাত্র সম্বল ছিল কয়েক টুকরো হাড় আর কয়েকটি দাঁত।

ডেনিসোভা গুহাতে ডেনিসোভানদের ডিএনএ বের হওয়ার পরে অনেক বৎসর কেটে গেছে।

সেখানে আরো কয়েকটি হাড়ের টুকরো পাওয়া গেছে।

আরেকটু বিশদে তাদের ডিএনএ বিশ্লেষণ সম্ভব হয়েছে।

সেই সব তথ্য জুড়ে একটা অনুমান করা হয়েছে তাদের উচ্চতা হবে আনুমানিক পাঁচ ফুট থেকে পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি আর ওজন হবে ৫৫ থেকে ৬০ কেজি। তবে এগুলো একেবারেই আনুমানিক। কঙ্কাল না পেলে এসব হিসাব এসে প্রায় বাতুলের হিসাব।

এরপরে তিব্বতের কার্স্ট বাশাইয়া কেভ থেকে পাওয়া গেল একটি চোয়ালের হাড় আর দাঁত।  সেগুলো চীনেরই এক সংগ্রহালয় রাখা ছিল বহুবছর। তখন ভাবা হয়েছিল এগুলো হোমো ইরেক্টাসদের।

অবশেষে সেই রহস্যের পর্দা উঠলো।

সেই চোয়ালের হাড় ও দাঁত থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করা সম্ভব ছিল না । সংগ্রহ করা হলো প্রোটিন। দাঁতের প্রোটিন নিষ্কাশন করে তা থেকে জানা গেল এই চোয়ালের হাড় ডেনিসোভানদের। সেই গুহাতে খোঁজখবর করে আরেকটি পাঁজরের হাড় ও পাওয়া গেল।

এবার নিশ্চিত জানা গেল ডেনিসোভানরা তিব্বতে বসবাস করত। ইতিমধ্যে তিব্বতীদের মধ্যে কম অক্সিজেনের টিকে থাকার ক্ষমতা দানকারী একটি জিনের খোঁজ পাওয়া গেল EPAS1.

এবং এই জিনটি পাওয়া গেল ডেনিসোভানদের মধ্যেও।

দুইয়ে দুইয়ে যোগ করলে চার হয়।

বোঝা গেল ওই বিশেষ জিনটি তিব্বতিরা পেয়েছে ডেনিসোভানদের থেকে।

পরের ধাপে সেই জিনটি আসে নেপালের শেরপাদের কাছে।

তাই পর্বতারোহনে সব সময় চাই শেরপা গাইড।

এরপর ডেনিসোভা গুহাতে পাওয়া গেল আরো কিছু হাড়। ডিএনএ বিশ্লেষণ করে জানা গেল সেই হাড় এক আনুমানিক ১৩ বছর বয়সের কিশোরীল। ডেনিসোভা গুহার কিশোরীর নাম রাখা হল ডেননি ।

ডেননির মা ছিলেন ডেনিসোভান আর বাবা ছিলেন নিয়েন্ডারথল।

জানা গেল অতীতে ডেনিসোভান ও নিয়েন্ডারথল মিলেমিশে সংসার পেতেছিল এবং এটি এই একবার  নয় একাধিকবার, একাধিক প্রজন্মেও।

এছাড়া আমরা তো জানি, আমাদের জিনে রয়েছে নিয়েন্ডারথল ও ডেনিসোভান জিন।

বাঙালিদের মধ্যেও ডেনিসোভান জিন আছে। এবং তা আছে মোটামুটি ভালই পরিমানে। অন্তত উত্তর ভারতীয়দের থেকে বেশি পরিমাণে।

এছাড়া দক্ষিণ ভারতীয়দের মধ্যে আছে ডেনিসোভান জিন।

সমস্ত মোঙ্গলীয় তথা পূর্ব এশিয়দের মধ্যে ডেনিসোভান জিন রয়েছে।

তবে সবচেয়ে বেশি হারে রয়েছে পাপুয়ানদের মধ্যে। প্রায় ছয় থেকে আট শতাংশ।

ডেনিসোভানরাও তিনটি ভিন্ন জাতিতে বিভক্ত ছিল।  একেবারে সম্পূর্ণ আলাদা জাতি ছিল কিনা সেটা বলা কঠিন। তবে জেনেটিকালি তারা তিন ভাগে বিভক্ত ছিল। ভাগ গুলো নামাকরণ করা হয়েছে D0,D1,D2,

এ‍টাও জানা গেছে যে তারা মাত্র ১৫ হাজার বছর আগেও পাপুয়াতে ছিল।

বহুদিন ধরে চীনের একটি খুলি মানবজাতির কোন শাখার সেটা নিয়ে ধন্দ ছিল। খুঁলিটির নাম রাখা হয়েছিল, ড্রাগন ম্যান।

এখন নিশ্চিত ভাবে জানা গেছে ড্রাগন ম্যান খুলিটি আসলে ডেনিসোভান খুলি।

এই ঘটনার আগেই তাইওয়ান এর নদী মোহনায় পেংঘু

দ্বীপে পাওয়া যায় একটি চোয়াল। সেখানকার জেলেদের জালে উঠে আসে একটি মজবুত চোয়ালের হাড় যার সঙ্গে দাঁত ও লেগে ছিল।

মূল তাইওয়ানের প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে দূরের দ্বীপে ৬০ থেকে  ১২০ মিটার গভীর জলের তলায় এটি পাওয়া গিয়েছিল।

ডিএনএ সংগ্রহ করা যায়নি। কার্বন ডেটিং বা ইউরেনিয়াম ডেটিংও সম্ভব হয়নি। কাজেই বোঝা কঠিন ছিল এটি কোন মানবপ্রজাতির দাঁত।

এবার নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করা হলো। ডিএনএ না পাওয়া গেলে ও প্রোটিন তো পাওয়া যাবে। দাঁতের থেকে প্রোটিন সংগ্রহ হল।

সেই প্রোটিন থেকে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হলো এটি ডেনিসোভান চোয়াল।

কিন্তু কবেকার?

সরাসরি সময় বের করা সম্ভব হয়নি। তাই ঘুরপথে একটা চেষ্টা করা হলো।

যেখানে চোয়াল পাওয়া গিয়েছিল তারই কাছ থেকে জৈব পদার্থ সংগ্রহ করে সেগুলোর বয়স বের করা হলো।

দুটো ভিন্ন বয়স পাওয়া গেল সত্তর হাজার আর ১৯০ থেকে ১৩০ হাজার বৎসর।

এখন একটা প্রশ্ন এসে গেল।

তাইওয়ান দ্বীপে ডেনিসোভানরা এলো কি করে? তাদের তো সমুদ্র পাড়ি দিতে হয়।

ভূবিশারদরা জানান, না তখন সমুদ্র ছিল না,  ওখানটাতে স্থলপথ ছিল।

তিব্বতের পরে তাইওয়ান। ডিএনএ না পেয়েও স্যাপিয়েন্স, নিয়েন্ডারথল, ডেনিসোভান চেনা যাবে

দাঁতের প্রোটিন তো পাওয়া যাবে। তাতেই কাজ হবে। @ তুষার মুখার্জি




রোদের আসল জাদুকরী সময়: কখন রোদ পোহালে আসলেই ভিটামিন ডি তৈরি হয়?

​ছোটবেলা থেকেই আমরা একটা কথা খুব শুনে এসেছি—"ভোরের মিষ্টি রোদ গায়ে মাখা স্বাস্থ্যের জন্য দারুণ।" কুয়াশা মাখা সকালে কিংবা হালকা শীতে যখন পুব আকাশে সূর্য উঁকি দেয়, তখন সেই সোনালী রোদ গায়ে লাগাতে আমাদের সবারই খুব ভালো লাগে। মন শান্ত হয়, চোখের আরাম হয়। কিন্তু ফাংশনাল পুষ্টিবিজ্ঞানের আয়নায় যদি আমরা এই ভোরের রোদকে দেখি, তবে একটা চমকপ্রদ সত্য বেরিয়ে আসে। সত্যিটা হলো, ভোরের এই স্নিগ্ধ রোদে আপনার মন হয়তো প্রফুল্ল হয়, কিন্তু শরীরে এক ফোঁটা ভিটামিন ডি-ও তৈরি হয় না!

​অবাক হচ্ছেন? হওয়ারই কথা। আমাদের বহুকালের বিশ্বাসের সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের এই তথ্যটা একটু সাংঘর্ষিক মনে হতে পারে। বিষয়টি বুঝতে হলে আমাদের একটু সূর্যের আলোর গভীরে তাকাতে হবে। সূর্যের আলোতে প্রধানত দুই ধরনের অতিবেগুনি রশ্মি বা আলট্রাভায়োলেট রে (UV rays) থাকে—UVA এবং UVB। এই দুটোর চরিত্র একদম আলাদা।

​UVA রশ্মি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পৃথিবীতে থাকে। এটি মেঘলা দিনেও থাকে। এই রশ্মি আমাদের ত্বকের গভীরে প্রবেশ করে, ত্বককে কালচে করে, এমনকি ত্বকের বার্ধক্য বা বলিরেখাও ত্বরান্বিত করে। কিন্তু সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো, এটি কোনোভাবেই ভিটামিন ডি তৈরি করতে পারে না।

​অন্যদিকে, শরীরে ভিটামিন ডি তৈরির একমাত্র জাদুকরী চাবিকাঠি হলো UVB রশ্মি। এর একটি বিশেষ স্বভাব আছে। সূর্য যখন দিগন্তের খুব কাছাকাছি থাকে (যেমন খুব সকালে বা পড়ন্ত বিকেলে), তখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল বা ওজোন স্তরের পুরু আবরণ ভেদ করে এই রশ্মি মাটিতে পৌঁছাতে পারে না। বায়ুমণ্ডল একে শুষে নেয়।

​তাহলে এই জাদুকরী UVB রশ্মি কখন পাওয়া যায়? ঠিক তখনই, যখন সূর্য আমাদের মাথার কাছাকাছি বা ঠিক ওপরে থাকে। সহজ কথায়, আমাদের দেশে বেলা ১০টা থেকে দুপুর ২টা বা ৩টা পর্যন্ত। এই সময়টাতেই রোদ একটু কড়া থাকে, আর ঠিক তখনই আমাদের ত্বকের নিচে থাকা কোলেস্টেরল এই রশ্মির সংস্পর্শে এসে সবচেয়ে বেশি ভিটামিন ডি উৎপাদন করতে পারে।

​প্রাকৃতিক নিরাময় বা ন্যাচারাল হিলিংয়ের ক্ষেত্রে রোদ মাপার একটি চমৎকার ও সহজ সূত্র আছে, যাকে বলা হয় 'ছায়ার সূত্র' বা Shadow Rule। আপনি রোদে দাঁড়িয়ে নিজের ছায়ার দিকে তাকান। ছায়া যদি আপনার নিজের উচ্চতার চেয়ে লম্বা হয় (যেমনটা সকালে বা বিকেলে হয়), তবে নিশ্চিত জানবেন সেখানে ভিটামিন ডি তৈরির জন্য পর্যাপ্ত UVB নেই। আর ছায়া যদি আপনার চেয়ে ছোট হয় (দুপুরের দিকে), তবেই বুঝবেন আপনার শরীরের সেই ঐশ্বরিক কারখানায় সঞ্জীবক হরমোনটি তৈরি হওয়ার কাজ পুরোদমে শুরু হয়েছে।

​আমরা অনেকেই খুব ভোরে পার্কে বা ছাদে হাঁটতে যাই, আর মনে মনে তৃপ্তি পাই এই ভেবে যে, দৈনিক ভিটামিন ডি-এর চাহিদা তো পূরণ হয়েই গেল। এই নিরীহ ভুল ধারণার কারণেই দিনের পর দিন রোদে গিয়েও আমাদের রক্ত পরীক্ষায় ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি থেকে যায়।

​এখন আপনার মনে একটি খুব স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগতে পারে: "দুপুরের কড়া রোদে তো বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা বেশ কঠিন! আমি যদি আমার গাড়ির কাঁচ বন্ধ করে কিংবা অফিসের বিশাল কাঁচের জানালার পাশে বসে দুপুরের রোদ গায়ে লাগাই, তাহলে কি আমি ভিটামিন ডি পাবো?"

​এই কৌতূহল জাগানিয়া প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের আগামী পর্বে: 'যে রোদে ভিটামিন ডি নেই: কাঁচের ওপারে, গাড়ির ভেতর এবং ছায়ার পেছনের অদ্ভুত গল্প।' @ Probal Kumar Mondal 



সবাই ভাবে, হাড় মানে শুধুই ক্যালসিয়াম।

কিন্তু আসলে হাড়ের গঠন অনেকটা স্টিল ও কংক্রিটের মতো। আজীবন হাড়গোড় ভাল রাখতে ক্যালসিয়াম ও কোলাজেন ২টাই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কোলাজেন হলো স্টিলের মতো, এটি হাড়ের ভেতরে ফাইবার নেটওয়ার্ক তৈরি করে, যা হাড়কে নমনীয়তা ও কিছুটা ইলাস্টিসিটি দেয়।

আর, ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য মিনারেল হলো কংক্রিটের মতো, এগুলো কোলাজেন ফ্রেমওয়ার্কের ফাঁকা জায়গাগুলো ভরে দেয়, ফলে হাড় শক্ত ও টেকসই হয়।

যদি কোলাজেন না থাকে, তাহলে হাড় ভঙ্গুর হয়ে যাবে, একটু চাপেই ভেঙে যাবে।

আর যদি ক্যালসিয়াম না থাকে, তাহলে হাড় নরম ও বাঁকানো হয়ে যাবে।

হাড়ে কোলাজেন ও ক্যালসিয়াম দুটিই সমান জরুরি।

এ কারণেই হাড়ের জন্য শুধু ক্যালসিয়াম খেলেই হবে না; সাথে প্রোটিন, ভিটামিন C, ভিটামিন D এবং কোলাজেন সমৃদ্ধ খাবারও লাগবে।

কোলাজেন হলো দেহের স্ট্রাকচারাল প্রোটিন। সোজা কথায়, এটা দেহের প্রাকৃতিক আঠা, যা সবকিছুকে শক্তভাবে একসাথে ধরে রাখে।

শরীর নিজেই প্রাকৃতিকভাবে কোলাজেন তৈরি করে।

তবে ২০-৩০ বছর বয়সের পর থেকে দেহে কোলাজেন উৎপাদন কমতে শুরু করে।

বিশেষ করে, নারীদের ক্ষেত্রে মেনোপজ পরবর্তী সময় ও হরমোন পরিবর্তনের কারণে কোলাজেন পতন ত্বরান্বিত হয়।

এই প্রক্রিয়াকে আরো বেশি তরান্বিত করে ফ্রি র‍্যাডিক্যালের প্রভাব, ধূমপান, মদ্যপান, চিনি, রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট, রিফাইন্ড ফুড, জাংকফুড ইত্যাদি!

এর ফলাফল হিসাবে দেখা দেয় হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া (osteoporosis), জয়েন্টে ব্যথা ও শক্ত ভাব।

৩০ বছরের পর যখন শরীর স্বাভাবিকভাবে কম কোলাজেন তৈরি করতে শুরু করে, তখন খাদ্য থেকেই এটি পাওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে যায়।

বয়সের সঙ্গে কোলাজেন কমে যাওয়া স্বাভাবিক, তবে সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন করলে এই প্রক্রিয়া ধীর করা সম্ভব।

যেমন- পর্যাপ্ত প্রোটিন ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্টযুক্ত খাবার গ্রহণ, পর্যাপ্ত পানি পান, ধূমপান ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা, নিয়মিত ব্যায়াম।

ভিটামিন সি কোলাজেন সংশ্লেষণের একটি অপরিহার্য কো-ফ্যাক্টর।

কোলাজেন উৎপাদন অপ্টিমাইজ করতে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবারের সাথে কোলাজেন সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করা উচিত।

কোলাজেন সমৃদ্ধ খাবারের তালিকা–

- হাড়ের ঝোল (Bone Broth)

পশুপাখির হাড়, হাটু-গোড়ালির হাড় (পায়া)

মাছের মাথা, মাছের চামড়া, ছোট মাছ, হাঁস-মুরগির চামড়া ও পা

- অঙ্গপ্রত্যঙ্গ (Organ Meats)

পশুপাখির লিভার (কলিজা), কিডনি, গিলা (হৃদপিণ্ড), মগজ (Brain)

- হোল প্রোটিন

ডিম, মাছ, মাংস, ডাল।

- পশুপাখির চামড়া কোলাজেনের ভাল উৎসগুলোর একটি। গরু ছাগলের চামড়া রান্না করে খাওয়া যায়। হাঁস-মুরগির চামড়াসহ মাংস খাওয়া যায়।

- মাছের মধ্যে কোলাজেন সবচেয়ে বেশি থাকে স্কিন, কাঁটা, মাথায় ও ছোট মাছে।

শুধু কোলাজেন খেলেই হবে না, শরীরে যাতে এটি উত্তমরূপে এবজর্ব হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

এর জন্য প্রয়োজন–

- ভিটামিন-সি: লেবু, কাচা মরিচ, আমলকী, টমেটো, ক্যাপসিকাম, ব্রোকলি

- তামা, জিংক সমৃদ্ধ খাবার: বাদাম, তিল, যকৃত (লিভার), বীজ, ডাল, ছোলা, ডিম

- সালফার সমৃদ্ধ খাবার: পেঁয়াজ, রসুন, ডিম, বাঁধাকপি, ব্রকলি, ফুলকপি

- অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট সমৃদ্ধ খাবার: কালো চাল, লাল চাল, সবুজ শাক, হলুদ, গ্রিন টি, হার্বাল টি

সবচেয়ে উত্তম হলো ব্যালান্সড ডায়েট ফলো করা, যেখানে মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, শাকসবজি, ফলমূল, বীজ এর সমন্বয় থাকে।

কোলাজেন বাড়ানোর জন্য এই খাবারগুলো খেলে যেমন ভালো, তেমনি চিনি, রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেটযুক্ত, রিফাইন্ড ফ্যাটযুক্ত খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ এতে কোলাজেন তৈরি হওয়ার হার কমে যায় এবং শরীরে ইনফ্লামেশন হয়।

- দিনে অন্তত ২–৩ লিটার পানি পান করুন। কোলাজেন হাইড্রেশনের জন্য পানি দরকার।

- ধূমপান, অতিরিক্ত চিনি, জাঙ্ক ফুড বাদ দিন। এগুলো কোলাজেন ভেঙে দেয়। অস্বাস্থ্যকর খাবার (প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিনি, রিফাইন্ড খাবার) কোলাজেন উৎপাদন বাধাগ্রস্ত করে।

- রোদে প্রতিদিন ১০–১৫ মিনিট থাকুন। এটা ভিটামিন D ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করবে।

- মানসিক দুশ্চিন্তা ও ঘুমের অভাব কোলাজেন উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। চাপ বা দুশ্চিন্তা কর্টিসল হরমোন বাড়িয়ে দেয়, যা কোলাজেন ভাঙনের গতি বাড়িয়ে দেয়। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবেও কোলাজেন ক্ষয় হয়। ঘুমের সময় শরীরের কোষ মেরামত হয়, যা কোলাজেন উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। @ Captain Green


৪৮


মহাকবি হোমার

হোমার প্রাচীন গ্রিসের এক কিংবদন্তি মহাকবি, যাকে পাশ্চাত্য সাহিত্যের সূচনালগ্নের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে বিবেচনা করা হয় । তাঁর নাম উচ্চারিত হলেই মনে পড়ে মানব সভ্যতার দুই অমর মহাকাব্য, ইলিয়াড এবং ওডিসি ।এই দুটি মহাকাব্য শুধু সাহিত্যিক কীর্তি নয়, প্রাচীন গ্রিক সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস ও বীরত্ববোধের এক অমূল্য দলিল । তাই হোমারকে একজন কবি হিসেবে নয়, প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার সাংস্কৃতিক নির্মাতা হিসেবেও দেখা হয় ।

ঐতিহাসিকদের মতে, হোমার সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীতে জীবিত ছিলেন, অর্থাৎ আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৮৫০ সালের দিকে তার জীবনকাল ধরা হয় । যদিও তার জন্মস্থান, জীবনবৃত্তান্ত কিংবা ব্যক্তিগত পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য খুবই কম । গ্রিসের বিভিন্ন শহর—যেমন সময়র্ণা চিয়স, কালাফোন, রহদেশ এবং এথেন্স নিজেদেরকে হোমারের জন্মস্থান বলে দাবি করেছে । এই কারণে অনেক গবেষক মনে করেন যে হোমারের জীবন সম্পর্কে যে তথ্যগুলো প্রচলিত আছে তার অনেকটাই কিংবদন্তি বা লোককথার মাধ্যমে গড়ে উঠেছে  ।

প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী হোমার ছিলেন একজন অন্ধ কবি । প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যে অনেক সময় তাঁকে অন্ধ গায়ক বা ভ্রমণকারী কবি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যিনি গ্রিসের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে কবিতা আবৃত্তি করতেন । “হোমেরোস” শব্দটির একটি অর্থ ‘অন্ধ’ বলে ধারণা করা হয়, যদিও ভাষাতাত্ত্বিকভাবে এই ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে । তবুও অন্ধ কবির এই চিত্রটি ইতিহাসে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং বহু শিল্পী ও সাহিত্যিক তাঁর এই প্রতিকৃতি কল্পনায় এঁকেছেন ।

হোমারের সর্বাধিক বিখ্যাত সৃষ্টি হল “ইলিয়াড”, যা মূলত ট্রয় যুদ্ধের একটি অংশের কাহিনীকে কেন্দ্র করে রচিত । এই মহাকাব্যে গ্রিক ও ট্রয়বাসীদের মধ্যকার দীর্ঘ যুদ্ধের বীরত্ব, অহংকার, প্রতিশোধ এবং মানবিক বেদনার গভীর চিত্র ফুটে উঠেছে । বিশেষ করে গ্রিক বীর অচিল্লেস এবং ট্রয়ের রাজপুত্র হেক্টর-এর দ্বন্দ্ব এই কাব্যের অন্যতম নাটকীয় অংশ । ইলিয়াড শুধু যুদ্ধের গল্প নয়, এটি মানুষের ক্রোধ, সম্মানবোধ, ভাগ্য এবং দেবতাদের হস্তক্ষেপের এক মহাকাব্যিক নাট্যরূপ ।

অন্যদিকে “ওডিসি” মহাকাব্যটি এক ভিন্ন ধরনের গল্প তুলে ধরে । এতে ট্রয় যুদ্ধের পর গ্রিক বীর ওডিসি এর দীর্ঘ ও বিপদসংকুল বাড়ি ফেরার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে । যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তিনি নিজের রাজ্য ইথাকা-তে ফিরতে চাইলেও নানা অলৌকিক বাধা, দানব, জাদুকরী ও দেবতাদের ক্রোধের কারণে তার যাত্রা দীর্ঘ দশ বছর ধরে চলতে থাকে । এই মহাকাব্যে মানুষের ধৈর্য, বুদ্ধি, কৌশল এবং পরিবারের প্রতি আকাঙ্ক্ষার এক অসাধারণ সাহিত্যিক প্রকাশ দেখা যায় ।

হোমারের রচনাগুলো প্রথমে লিখিত আকারে ছিল না, এগুলো মৌখিক ঐতিহ্যের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছিল । প্রাচীন গ্রিসে কবিরা গানের সুরে এই মহাকাব্যগুলো আবৃত্তি করতেন । পরে ধীরে ধীরে এগুলো লিখিত আকারে সংরক্ষিত হয় । এই কারণে অনেক পণ্ডিত মনে করেন যে “হোমার” হয়তো একজন ব্যক্তি নয়, বহু কবির দীর্ঘ মৌখিক ঐতিহ্যের সম্মিলিত প্রতীকও হতে পারেন। ইতিহাসে এই বিতর্ককে “হোমেরিক প্রশ্ন” বলা হয় ।

যাই হোক, ব্যক্তি হিসেবে হোমারের অস্তিত্ব নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক না কেন, তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত এই মহাকাব্যগুলো প্রাচীন গ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রে স্থান পেয়েছিল । শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গ্রিক শিশুদের শিক্ষা শুরু হতো ইলিয়াড ও ওডিসি পড়ার মাধ্যমে । এতে তারা শুধু ভাষা বা কবিতা নয়, বীরত্ব, নৈতিকতা, সম্মান এবং সামাজিক মূল্যবোধ সম্পর্কে ধারণা লাভ করত । ফলে হোমারের সাহিত্য গ্রিক জাতিসত্তা ও সংস্কৃতির ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ।

পরবর্তী দুই হাজার বছর ধরে ইউরোপীয় সাহিত্য, দর্শন এবং শিল্পকলায় হোমারের প্রভাব অত্যন্ত গভীর । প্রাচীন রোমান কবি ভার্জিল থেকে শুরু করে রেনেসাঁ যুগের সাহিত্যিক, এমনকি আধুনিক পাশ্চাত্য সাহিত্যেও হোমারের প্রভাব সুস্পষ্টভাবে দেখা যায় । যুদ্ধ, বীরত্ব, মানবিক দুর্বলতা এবং ভাগ্যের বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রাম, এই বিষয়গুলো তাঁর কাব্যে এমনভাবে ফুটে উঠেছে যে তা আজও পাঠকদের মুগ্ধ করে ।

শেষে বলতেই হয় হোমার শুধু একজন কবি নন, তিনি প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও কল্পনার এক বিশাল প্রতীক । তাঁর রচিত মহাকাব্যগুলো মানবসভ্যতার সাহিত্যিক ঐতিহ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে আজও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক । @ Sufal Sarkar


৪৯



এন্ডোক্রাইন ডিসরাপ্টরস' (Endocrine Disruptors) বা হরমোন ধ্বংসকারী কেমিক্যাল। 

নামটা একটু খটমটে হলেও এদের কাজটা খুব সোজা—এরা আপনার শরীরের হরমোনাল সিস্টেম বা পুরো সিগন্যালিং ব্যবস্থাটাকে হ্যাক করে ফেলে।

আমাদের শরীরের ভেতরে হরমোনগুলো অনেকটা চাবি আর তালার মতো কাজ করে। নির্দিষ্ট হরমোন নির্দিষ্ট রিসেপ্টর বা তালায় গিয়ে লাগে, আর শরীর সেই অনুযায়ী কাজ করে। কিন্তু আমাদের চারপাশের এই কেমিক্যালগুলোর (যেমন- BPA, Phthalates, Parabens) আণবিক গঠন এতটাই আমাদের নারী হরমোন 'ইস্ট্রোজেন'-এর মতো যে, এরা সহজেই আমাদের শরীরে ঢুকে সেই তালাগুলোতে গিয়ে বসে পড়ে।

শরীর তখন বিভ্রান্ত হয়ে যায়। সে ভাবে শরীরে তো প্রচুর ইস্ট্রোজেন (নারী হরমোন) আছে! তখন সে প্রাকৃতিকভাবে আপনার মূল পুরুষ হরমোন 'টেস্টোস্টেরন' তৈরি করা একেবারে কমিয়ে দেয়। ফলাফল? স্পার্ম কাউন্ট কমে যাওয়া, স্পার্মের অস্বাভাবিক আকার, আর প্রজনন সক্ষমতা তলানিতে গিয়ে ঠেকা।

কোথায় থাকে এই হরমোন ধ্বংসকারী কেমিক্যালগুলো?

 প্লাস্টিকের পানির বোতল ও টিফিন বক্স: বিশেষ করে যখন আমরা প্লাস্টিকের পাত্রে গরম খাবার রাখি বা ওভেনে গরম করি, তখন বিপিএ (BPA) নামের কেমিক্যাল সরাসরি আমাদের খাবারে মিশে যায়।

সুগন্ধি, ডিওডোরেন্ট ও সাবান: এগুলোতে থাকা 'থ্যালেটস' (Phthalates) নামের কেমিক্যাল শুধু সুগন্ধ ধরে রাখতেই ব্যবহার করা হয় না, এটি সরাসরি টেস্টোস্টেরন লেভেল কমিয়ে দেয়।

 নন-স্টিক প্যান: এই প্যানগুলোতে টেফলনের যে কোটিং থাকে, তা অতিরিক্ত গরমে এক ধরনের টক্সিক গ্যাস তৈরি করে যা হরমোনের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

 ক্যান বা টিনের খাবার: এই ক্যানগুলোর ভেতরেও বিপিএ-র প্রলেপ দেওয়া থাকে যাতে খাবার নষ্ট না হয়, কিন্তু সেই কেমিক্যাল খাবারের সাথে মিশে আমাদের শরীরে ঢুকছে।

সমাধান কিন্তু খুব একটা কঠিন নয়, শুধু একটু সচেতনতা দরকার।

আজ থেকেই প্লাস্টিকের বোতলের বদলে কাঁচ বা স্টিলের বোতল ব্যবহার শুরু করুন। প্লাস্টিকের বক্সে খাবার গরম করা একেবারেই বন্ধ করে দিন। নন-স্টিক প্যানের বদলে পুরোনো দিনের মতো লোহার কড়াই (Cast Iron) বা মাটির পাত্র ব্যবহার করতে পারেন। আর চেষ্টা করুন প্রসাধনী বা সুগন্ধি কেনার সময় 'Paraben-free' বা 'Phthalate-free' লেখা আছে কি না দেখে নিতে।

আমাদের পুরুষত্ব কোনো বায়বীয় জিনিস নয়, এটি হরমোনের একটি সূক্ষ্ম খেলা। চারপাশের এই অদৃশ্য রাসায়নিক বিষ থেকে নিজেকে একটু আড়াল করতে পারলেই, আপনার শরীর তার হারানো ভারসাম্য খুব সহজেই ফিরে পাবে। @ Probal Kumar Mondal 


৫০



জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ড

সাল ১৯১৯। ১৩ এপ্রিল। পাঞ্জাবের অমৃতসর। দিনটি ছিল বৈশাখী উৎসবের। আনন্দ আর উৎসবের মেজাজ থাকার কথা ছিল, কিন্তু বাতাসে ছিল বারুদের গন্ধ। জালিয়ানওয়ালাবাগ (Jallianwala Bagh)-এর সেই বদ্ধ মাঠে জড়ো হয়েছিল হাজার হাজার নিরস্ত্র মানুষ—নারী, শিশু, বৃদ্ধ। তারা এসেছিল শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানাতে। সেই ভিড়ের মধ্যে এক কোণে দাঁড়িয়ে মানুষকে জল খাওয়াচ্ছিলেন ২০ বছরের এক এতিম যুবক। নাম—উধম সিং। হঠাৎ প্রবেশ পথ আটকে দাঁড়াল ব্রিটিশ জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ার এবং তার সশস্ত্র বাহিনী। কোনো সতর্কবার্তা নেই। ডায়ার নির্দেশ দিলেন—"ফায়ার!" টানা ১০ মিনিট ধরে চলল ১৬৫০ রাউন্ড গুলি। পালানোর কোনো পথ ছিল না। মানুষ একে অপরের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল। কেউ দেওয়াল টপকাতে গিয়ে গুলি খেল, কেউ বাঁচার জন্য কুয়োয় ঝাঁপ দিল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে উৎসবের মাঠ পরিণত হলো লাশের পাহাড়ে। রক্তে কাদা হয়ে গেল অমৃতসরের মাটি। উধম সিং সেই নরক দেখেছিলেন। তিনি সারারাত সেই রক্তমাখা মাঠে ঘুরে ঘুরে আহতদের জল খাইয়েছিলেন আর লাশ সরিয়েছিলেন। সেই রাতেই তিনি রক্তভেজা মাটি হাতে নিয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন— "এই গণহত্যার বদলা আমি নেব। যে এর জন্য দায়ী, তাকে আমি ছাড়ব না।"

২১ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা জালিয়ানওয়ালাবাগের সেই কসাই জেনারেল ডায়ার ১৯২৭ সালেই রোগে ভুগে মারা যান। কিন্তু উধম সিং জানতেন, আসল খলনায়ক ডায়ার ছিল না। আসল খলনায়ক ছিল তৎকালীন পাঞ্জাবের লেফটেন্যান্ট গভর্নর মাইকেল ও'ডায়ার (Michael O'Dwyer)। এই ও'ডায়ারই ডায়ারকে নির্দেশ দিয়েছিল এবং গণহত্যার পর ডায়ারকে পুরস্কৃত করেছিল। উধম সিং জানতেন, সাপ মারতে হলে তার গর্তে ঢুকেই মারতে হবে। শুরু হলো তার এক অবিশ্বাস্য যাত্রা। তিনি নাম ভাঁড়িয়ে আফ্রিকা, আমেরিকা হয়ে অবশেষে ১৯৩৪ সালে লন্ডনে পৌঁছালেন। লন্ডনে তিনি কখনো মেকানিকের কাজ করলেন, কখনো ছুতোর মিস্ত্রি হলেন, আবার কখনো সিনেমায় এক্সট্রা হিসেবে কাজ করলেন। কিন্তু তার লক্ষ্য ছিল একটাই—মাইকেল ও'ডায়ার। তিনি ও'ডায়ারের গতিবিধি নজরে রাখতেন। একটা সুযোগের অপেক্ষায় তিনি ২১টি বছর পার করে দিলেন। ২১ বছর! ভাবা যায়? একটা মানুষ কতখানি ঘৃণা আর জেদ পুষে রাখলে এটা সম্ভব!

১৩ মার্চ, ১৯৪০: প্রতিশোধের দিন লন্ডনের ক্যাক্সটন হল (Caxton Hall)। সেদিন সেখানে ইস্ট ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশন এবং সেন্ট্রাল এশিয়ান সোসাইটির যৌথ মিটিং চলছে। মাইকেল ও'ডায়ার সেখানে বক্তা হিসেবে আমন্ত্রিত। উধম সিং এক অসামান্য বুদ্ধি খাটালেন। তিনি একটি মোটা বই কিনলেন। সেই বইয়ের পাতাগুলো এমনভাবে কাটলেন, যাতে তার ভেতরে একটা রিভলবার লুকিয়ে রাখা যায়। বইটা বগলে চেপে তিনি কোনো তল্লাশি ছাড়াই হলে ঢুকে পড়লেন। হলভর্তি মানুষ। ব্রিটিশ আভিজাত্যের ঝলকানি। মিটিং শেষ হলো। ও'ডায়ার মঞ্চ থেকে নামার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। উধম সিং ভিড় ঠেলে মঞ্চের একদম কাছে চলে গেলেন। বইটি খুললেন। বের করলেন তার বহু বছরের সাথি—সেই রিভলবার। আর কোনো দ্বিধা নয়। পরপর দুটি গুলি। গুলিগুলো সোজা গিয়ে বিঁধল ও'ডায়ারের বুকে আর ফুসফুসে। যে লোকটা হাজার হাজার ভারতীয়কে পোকার মতো পিষে মারার হুকুম দিয়েছিল, সে লুটিয়ে পড়ল লন্ডনের মাটিতে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু। উধম সিং পালানোর চেষ্টা করলেন না। তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে রইলেন। যখন পুলিশ তাকে ধরল, তার মুখে ছিল বিজয়ের হাসি। তিনি জানতেন, তার কাজ শেষ। তার দেশের হাজার হাজার শহীদের আত্মা আজ শান্তি পেয়েছে।

রাম মোহাম্মদ সিং আজাদ উধম সিংকে যখন আদালতে তোলা হলো, বিচারক তার নাম জিজ্ঞেস করলেন। তিনি উত্তর দিলেন—"রাম মোহাম্মদ সিং আজাদ"। রাম (হিন্দু), মোহাম্মদ (মুসলিম), সিং (শিখ)—আর শেষে আজাদ (স্বাধীন)। তিনি ব্রিটিশদের বুঝিয়ে দিলেন, তোমরা আমাদের ধর্ম দিয়ে ভাগ করে শাসন করেছ, কিন্তু আমি সেই সব ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের জন্য লড়ছি। আদালতে তিনি গর্জে উঠে বলেছিলেন— "আমি তাকে মেরেছি কারণ সে এটারই যোগ্য ছিল। সে আমার দেশের আত্মাকে পিষে মারতে চেয়েছিল, তাই আমি তাকে শেষ করেছি। ২১ বছর ধরে আমি এই দিনটার অপেক্ষা করেছি। আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না। আমার দেশের মানুষ না খেয়ে মরছে, আর তোমরা এখানে বিলাসিতা করছ। আমি গর্বিত যে আমি আমার দেশের জন্য মরতে পারছি।"

ফাঁসি ও অমরত্ব ৩১ জুলাই, ১৯৪০। পেন্টনভিল জেল। ফাঁসির দড়ি গলায় পরার সময়ও তিনি হাসছিলেন। তিনি চলে গেলেন, কিন্তু রেখে গেলেন এক অবিশ্বাস্য ইতিহাস। যে মানুষটি এতিমখানায় বড় হয়েছিলেন, যার কেউ ছিল না—তিনি একাই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের হৃদপিণ্ডে আঘাত করেছিলেন। ১৯৭৪ সালে স্বাধীন ভারত সরকার তার দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে আনে। আজও যখন কেউ জালিয়ানওয়ালাবাগের সেই দেওয়ালের গুলির দাগ দেখে, তাদের কানে ভেসে আসে উধম সিংয়ের সেই প্রতিজ্ঞা। তিনি শুধু প্রতিশোধ নেননি, তিনি বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন—ভারতীয়রা কখনো ক্ষমা করতে জানে, কিন্তু আঘাত করলে তারা শত্রুর ঘরে ঢুকে সেই আঘাত ফিরিয়ে দিতেও জানে।

সোর্স  Wikipedia: Udham Singh