রাসায়নিকমুক্ত ভাত রান্নার নতুন উপায়

ধোয়ার পর পানিসহ চুলায় চাপিয়ে দেওয়া হয় চাল। কিছুক্ষণ পর তা ফুটতে শুরু করে। দেশে দেশে এভাবেই ভাত রান্না করা হয়।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রচলিত এই পদ্ধতিতে চালে থাকা আর্সেনিকসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক অনেকাংশেই রয়ে যায়। তাই তাঁরা নতুন এক পদ্ধতি বাতলে দিয়েছেন।

নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের কুইনস ইউনিভার্সিটি বেলফাস্টের জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক অ্যান্ডি মেহারগ দাবি করেছেন, ভাত রান্নার সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হলো সারা রাত ভিজিয়ে রাখার পর চাল বারবার ধুতে হবে। যতক্ষণ চাল ধোয়া পানি পরিষ্কার পানির মতো স্বচ্ছ না হবে, ততক্ষণ এ প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হবে। এরপর এক ভাগ চালের সঙ্গে পাঁচ ভাগ পানি মিশিয়ে রান্না করতে হবে। মেহারগের নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী গবেষণায় দেখেছেন, ধান চাষের সময় যে কীটনাশক প্রয়োগ ও অন্যান্য পরিচর্যা করা হয়, তার মাধ্যমে চালের মধ্যে আর্সেনিকের মতো বি*ষ ও অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক জমা হতে পারে।

এই চাল থেকে যে ভাত হয়, তা খেয়ে হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস ও ক্যানসারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এতে শিশুর বেড়ে ওঠা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

মেহারগ জানান, তাঁরা প্রথমে এক ভাগ চালের সঙ্গে দুই ভাগ পানি মিশিয়ে রান্না করেন। এরপর পরীক্ষা করে দেখেন, চালের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সিংহভাগ আর্সেনিক  ও অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক রয়ে গেছে। দ্বিতীয় পদ্ধতিতে ভালো করে ধোয়ার পর এক ভাগ চালের সঙ্গে পাঁচ ভাগ পানি মিশিয়ে রান্না করেন। এবার দেখা যায়, অর্ধেক পরিমাণ আর্সেনিক  ও অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক দূর হয়েছে। তৃতীয় পদ্ধতিতে চালকে রাতভর পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। এ পদ্ধতি অবলম্বনের পর দেখা গেছে, ভাতে আর্সেনিকসহ বিষাক্ত রাসায়নিকগুলো ৮০ শতাংশ পর্যন্ত দূর হয়ে গেছে। @ প্রথম আলো


ভাত খাওয়ার সঠিক কৌশল জানলে এটি আপনার শরীরের জন্য মহৌষধ হয়ে উঠতে পারে। 

রান্নায় একটু চর্বি যোগ করুন

ভাতের গুণাগুণ বাড়াতে রান্নার সময় সামান্য ঘি বা ভালো মানের চর্বি যোগ করার পরামর্শ দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ। এক চা-চামচ ঘি শুধু যে ভাতের স্বাদ বাড়ায় তা নয়, এটি পেট দীর্ঘক্ষণ ভরা রাখতে সাহায্য করে এবং রক্তে শর্করার আকস্মিক বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে।

গরম ভাত নাকি বাসি ভাত?

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য পুষ্টিবিদের পরামর্শ হলো—গরম ভাতের চেয়ে ঠাণ্ডা বা বাসি ভাত বেশি উপকারী। রান্না করা ভাত সারা রাত ফ্রিজে রেখে পরদিন খেলে তাতে ‘প্রতিরোধী স্টার্চ’ তৈরি হয়। এটি অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্য দারুণ কাজ করে এবং রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা হঠাৎ বাড়তে দেয় না।

পাতে খাবার সাজানোর ক্রম বদলে নিন

বাঙালি খাবারে আমরা সাধারণত শুরুতেই ভাতের গ্রাস মুখে তুলি। কিন্তু পুষ্টিবিদরা বলছেন ভিন্ন কথা। ভাত খাওয়ার আগে পাতে থাকা আঁশযুক্ত খাবার যেমন, সালাদ বা শাকসবজি খেয়ে নিন। এরপর প্রোটিন (ডাল, মাছ, মাংস বা ডিম) খান। সবশেষে অবশিষ্ট প্রোটিনের সঙ্গে ভাতটুকু খান। এ নিয়মটি অনুসরণ করলে ভাতের পরিমাণ যেমন নিয়ন্ত্রণে থাকে, তেমনি হজমও হয় চমৎকার।

সময়ের গুরুত্ব ও ভালো ঘুম

রাতে ভাত খাওয়া নিষিদ্ধ হলেও মাঝে মধ্যে রাতে পরিমিত ভাত খেলে মস্তিষ্কে সেরোটোনিন ও মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণ বাড়ে, যা গভীর ও আরামদায়ক ঘুমে সহায়তা করে। তবে মনে রাখবেন, রাতের বেলা তা যেন অতি সীমিত থাকে।

গাঁজানো খাবারের পুষ্টি

অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য ফারমেন্টড বা গাঁজানো চালের খাবার অত্যন্ত কার্যকরী। আমাদের ঐতিহ্যবাহী পান্তা ভাত (কাঞ্জি), ইডলি বা দোসা এর অন্যতম উদাহরণ। প্রাতঃরাশে এ ধরণের খাবার খাওয়া হজম শক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। তাই ভাতকে খাদ্যাতালিকা থেকে বাদ না দিয়ে বরং তা খাওয়ার ধরনে পরিবর্তন আনলেই পাওয়া সম্ভব নিরোগ ও সুস্থ জীবন।  এনডিটিভি অবলম্বনে  @ বণিক বার্তা 


ড্রাগনফ্লাই, আমাদের পরিচিত ফড়িং—প্রকৃতির এক নিঃশব্দ যোদ্ধা। প্রতিদিন শত শত মশা খেয়ে এরা আমাদের চারপাশকে করে তোলে নিরাপদ, সুস্থ। না কোনো দাবি, না কোনো প্রচার—তবুও নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে তারা, আমাদের অজান্তেই। একটি ফড়িংকে মেরে ফেলা মানে শুধু একটি পোকা হত্যা নয়—এটা মশার বিরুদ্ধে চলা প্রাকৃতিক যুদ্ধকে দুর্বল করে দেওয়া।

প্রকৃতির এই ছোট সৈনিকদের বাঁচতে দিন, কারণ তাদের অস্তিত্বেই লুকিয়ে আছে আমাদের স্বস্তির নিঃশ্বাস। @ বিজ্ঞানকথা



ন্যানোপ্লাস্টিক

বিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরে ভাবছিলেন, সমুদ্রে যত প্লাস্টিক যাচ্ছে তার বড় একটা অংশ কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।কিন্তু নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, সেই প্লাস্টিক গায়েব বা হারিয়ে যায়নি, বরং সূর্যের আলো, ঢেউ আর দীর্ঘদিনের ভাঙনের ফলে খুবই ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়েছে, যাকে বলা হচ্ছে ন্যানোপ্লাস্টিক। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই ন্যানোপ্লাস্টিক এতটাই ছোট যে খালি চোখে দেখা যায় না। এটি শুধু সমুদ্রের পানিতেই নয়, বাতাসে, সামুদ্রিক প্রাণীর শরীরে, এমনকি খাদ্যচক্রের মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ, আমরা যে প্লাস্টিক দূষণকে শুধু ভাসমান বোতল, প্যাকেট বা আবর্জনা হিসেবে ভাবতাম, এখন তা অদৃশ্য কিন্তু আরও গভীর এক পরিবেশগত হুমকিতে রূপ নিচ্ছে।

এই গবেষণা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। প্লাস্টিক দূষণের সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হলো শুরুতেই প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো। কারণ একবার প্লাস্টিক সমুদ্রে গিয়ে ন্যানোপ্লাস্টিকে ভেঙে গেলে, সেটিকে পরে পরিষ্কার করা প্রায় অসম্ভব। তাই  সচেতনতা, প্লাস্টিকের ব্যবহার  কমানো, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকৃতি রক্ষা করার ছোট ছোট মাধ্যম হতে পারে।

@তাইয়েবুন নেছা..




আপনার ভালো থাকা  প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের ঘুম নষ্টের কারণ

মানুষ সামাজিক জীব, তাই অন্যের জীবনও আমরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক সময় একজন মানুষের সাফল্য বা ভালো থাকা অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা নয়, বরং অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আশ্চর্যের বিষয়, আপনার দুঃখে মানুষ সহানুভূতি দেখালেও আপনার সুখ অনেকের মনে অদৃশ্য অশান্তি তৈরি করে।

মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ নিজের অবস্থান মূল্যায়ন করে অন্যের সঙ্গে তুলনা করে, যাকে Social Comparison Theory বলা হয়। যখন কেউ দেখে তার পরিচিত কেউ শান্তিতে আছে, সফল হচ্ছে বা মানসিকভাবে স্থির আছে, তখন নিজের অপূর্ণতা তার চোখে বড় হয়ে ওঠে। ফলে আপনার উন্নতি তার কাছে আনন্দ নয়, বরং নিজের ব্যর্থতার আয়না হয়ে দাঁড়ায়।

বিশেষ করে আত্মীয়স্বজন বা প্রতিবেশীদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়, কারণ তারা আপনার অতীত জানে এবং আপনাকে একই জায়গায় আটকে থাকতে দেখতে অভ্যস্ত। আপনি যখন জীবন গুছিয়ে ফেলেন, আর্থিকভাবে স্থির হন বা মানসিক প্রশান্তি অর্জন করেন, তখন তাদের মনে অচেতন প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। গবেষণায় বলা হয়, কাছের মানুষের সাফল্য দূরের মানুষের সাফল্যের চেয়ে বেশি হিংসা তৈরি করে।

আরেকটি কারণ হলো সামাজিক প্রত্যাশা। অনেকেই মনে করে সবাই একই গতিতে চলবে, তাই কেউ আলাদা হয়ে গেলে সেটি অস্বস্তির কারণ হয়। আপনি যদি অভিযোগ কম করেন, নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত থাকেন এবং সুখী থাকেন, তখন যারা নেতিবাচকতায় অভ্যস্ত তারা নিজেকে অপ্রাসঙ্গিক মনে করতে শুরু করে। ফলে আপনার নীরব উন্নতি তাদের অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

মনোবিজ্ঞানীরা এটিকে “Benign Envy” ও “Malicious Envy” হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যেখানে কেউ অনুপ্রাণিত হয়, আবার কেউ ভিতরে ভিতরে বিরক্ত হয়। সামাজিক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ অন্যের ব্যর্থতায় সহানুভূতি দেখাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, কিন্তু অন্যের ধারাবাহিক সুখ মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।

তাই অনেক সময় আপনার শান্ত জীবন, সুস্থ পরিবার, কিংবা আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তিত্ব অজান্তেই অন্যদের মানসিক অস্বস্তির উৎস হয়ে যায়। কারণ আপনার অর্জন তাদের মনে প্রশ্ন তোলে: “আমি কেন পারলাম না?”

সুতরাং সবার ঘুম নষ্ট করার জন্য আপনাকে কিছুই করতে হয় না, শুধু ভালো থাকলেই যথেষ্ট। নিজের সুখ লুকিয়ে রাখা সমাধান নয়; বরং বিনয়ী থেকে এগিয়ে যাওয়াই পরিণত মানসিকতার পরিচয়। মনে রাখতে হবে, প্রকৃত সফলতা তখনই আসে যখন আপনি নিজের শান্তি বজায় রেখে অন্যের প্রতিক্রিয়াকে ব্যক্তিগতভাবে নেন না। @ SAM Motivation




নিজের অজান্তেই আমরা নিজেকে সস্তা করে ফেলি, যা একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব নষ্ট করে দেয়..

অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা আর আসক্তিই আপনাকে অন্যের কাছে সস্তা করে তুলতে পারে। সবসময় মাথায় রাখবেন মানুষ যা সহজে পায়, তার কদর তারা ঠিক ভাবে করতে পারে না।

দেখবেন যখন আপনার সবটুকু আবেগ কারো কাছে খোলা বইয়ের মতো হয়ে যায় এবং আপনি নিজের অস্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হন, তখনই সামনের মানুষটা আপনার ওপর আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। আপনার এই 'অসহায়ত্ব' তাকে এক অদ্ভুত ক্ষমতার দাপট দেয়, যার ফলে সে অবহেলা করার সাহস পায়।

লাইফে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, আপনি যাকে ঘিরে পৃথিবী সাজান, সে-ই আপনাকে ছাড়া ভালো থাকার বাহানা খোঁজে। মানুষ আসক্তি দেখাতে জানলেও তার ভার বইতে জানে না।

তাই অন্যের জন্য পাগল না হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখুন এবং নিজের একাকীত্বকে ভালোবাসুন। আপনি যখন নিজেকে গুরুত্ব দেবেন, তখনই মানুষ আপনাকে হারানোর ভয় পাবে; নতুবা আপনার অ তি-আসক্তিই তাকে ছেড়ে যাওয়ার লাইসেন্স ধরিয়ে দেবে।

আপনি যদি সবটা পড়ে থাকেন কমেন্টে আপনার মতামত প্রকাশ করুন।  @ লক্ষ্যপথ





বুদ্ধিমান মানুষ ইনভেস্ট করে নিজের উপর

মানুষ সাধারণত ইনভেস্ট বলতে টাকা, জমি বা ব্যবসার কথা বোঝে। কিন্তু সত্যিকারের বুদ্ধিমান মানুষ জানে সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ হলো নিজের উপর বিনিয়োগ করা। কারণ সম্পদ হারাতে পারে, বাজার ধসে যেতে পারে, কিন্তু নিজের দক্ষতা ও জ্ঞান কখনও নষ্ট হয় না।

প্রথমত, নিজের উপর ইনভেস্ট করা মানে দক্ষতা, জ্ঞান ও মানসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের গবেষণায় বলা হয়েছে, ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে টিকে থাকতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে skills development এবং continuous learning। একজন ব্যক্তি যখন নতুন দক্ষতা শেখে, প্রশিক্ষণ নেয় বা বই পড়ে নিজেকে উন্নত করে, তখন তার আয় ও সুযোগ দুটোই বৃদ্ধি পায়। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত আত্মউন্নয়নে সময় দেয় তারা দীর্ঘমেয়াদে কর্মজীবনে বেশি সফল হয়।

দ্বিতীয়ত, নিজের উপর বিনিয়োগ আত্মবিশ্বাস ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ায়। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, শিক্ষা ও ব্যক্তিগত উন্নয়ন মানুষের self-efficacy বৃদ্ধি করে, অর্থাৎ নিজের সক্ষমতার উপর বিশ্বাস তৈরি করে। যে ব্যক্তি নিজের চিন্তাশক্তি, যোগাযোগ দক্ষতা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ শেখে, সে জীবনের সংকট সহজে মোকাবিলা করতে পারে। শুধু অর্থ নয়, সময়, স্বাস্থ্য ও মানসিক শান্তির পেছনে বিনিয়োগ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ব্যায়াম, পড়াশোনা ও আত্মবিশ্লেষণ একজন মানুষকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করে তোলে।

তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও নিজের উপর বিনিয়োগ সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ গ্যারি বেকার “Human Capital Theory”-তে দেখিয়েছেন, মানুষের শিক্ষা ও দক্ষতাই তার প্রকৃত সম্পদ। ব্যবসা ব্যর্থ হতে পারে, চাকরি হারাতে পারে, কিন্তু দক্ষ মানুষ নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাই সফল উদ্যোক্তা ও নেতাদের জীবনী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা প্রথমে নিজের চিন্তা, জ্ঞান ও অভ্যাস পরিবর্তন করেছেন, তারপর সম্পদ অর্জন করেছেন।

চতুর্থত, নিজের উপর বিনিয়োগ মানুষকে স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাবান করে। যে ব্যক্তি শেখা বন্ধ করে না, সে বয়স বা পরিস্থিতির কাছে হার মানে না। গবেষণা বলছে lifelong learners মানসিকভাবে বেশি সুখী ও অভিযোজনক্ষম হয়। ফলে জীবনে অনিশ্চয়তা এলেও তারা দ্রুত নতুন পথ খুঁজে নেয়। একজন বুদ্ধিমান মানুষ জানে, নিজের উন্নয়নই ভবিষ্যতের নিরাপত্তা।

সবচেয়ে বড় সত্য হলো, মানুষই নিজের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাই বুদ্ধিমান মানুষ আগে নিজেকে গড়ে তোলে, তারপর পৃথিবী জয় করার চেষ্টা করে। নিজের উপর বিনিয়োগই এমন এক সম্পদ, যার লাভ সারাজীবন পাওয়া যায়। @ SAM Motivation

References

Becker, Gary S. – Human Capital Theory

World Economic Forum – Future of Jobs Report




সন্তানের আচরণের ৮০% আসে পিতার নিকট থেকে — নতুন গবেষণা

একসময় সমাজবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানে ধারণা ছিল, সন্তানের চরিত্র ও আচরণ গঠনে পিতা-মাতার অবদান প্রায় সমান অর্থাৎ ৫০/৫০। কিন্তু আধুনিক গবেষণা ধীরে ধীরে দেখাচ্ছে, সন্তানের আচরণ, ব্যক্তিত্ব, সাহস, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সামাজিক দক্ষতায় পিতার প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে অধিক শক্তিশালী হয়ে ওঠে। নতুন প্রজন্মের গবেষকরা বলছেন, পরিবারে পিতার ভূমিকা শুধু উপার্জনকারীর নয়, বরং আচরণগত মডেল নির্মাতার। শিশুরা কথা শোনার আগে আচরণ দেখে শেখে, আর সেই আচরণগত দৃষ্টান্ত অধিকাংশ সময় আসে পিতার কাছ থেকে। Yale Child Study Center-এর গবেষণায় দেখা গেছে, পিতা সন্তানের সম্পর্ক গঠন ও সামাজিক মানসিক বিকাশে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গভীর প্রভাব রাখেন। আগে ধারণা ছিল মা-ই প্রধান প্রভাবক, কিন্তু গবেষণা দেখাচ্ছে পিতা পারিবারিক পরিবেশের মান নির্ধারণ করেন এবং সেই পরিবেশ থেকেই সন্তানের আচরণ জন্ম নেয়।

আধুনিক গবেষণায় আরও দেখা যায়, পিতার সম্পৃক্ততা যত বেশি হয়, সন্তানের সমস্যা আচরণ তত কমে যায় এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বাড়ে। শিশুদের সাহসী হওয়া, ঝুঁকি মোকাবিলা শেখা, সামাজিক প্রতিযোগিতা বোঝা এবং আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে পিতার ভূমিকা আলাদা ও অনন্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। Penn State University-এর সাম্প্রতিক গবেষণায় এমনও দেখা গেছে যে, শিশুর শারীরিক স্বাস্থ্য ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক স্থিতিশীলতার উপর পিতার আচরণের প্রভাব মায়ের তুলনায় বেশি শক্তিশালীভাবে প্রতিফলিত হয়। গবেষকরা এটিকে “Father Influence Effect” হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যেখানে পিতা পরিবারের আবেগীয় আবহ নির্ধারণ করেন এবং সেই আবহ শিশুর ব্যক্তিত্বে গভীর ছাপ ফেলে। পিতা সাধারণত সন্তানকে চ্যালেঞ্জ নিতে শেখান, সীমা নির্ধারণ করেন এবং বাস্তব জীবনের প্রস্তুতি দেন। তাই সন্তানের নেতৃত্বগুণ, দায়িত্ববোধ ও আত্মনির্ভরতা প্রায়শই পিতার আচরণ অনুকরণ করে তৈরি হয়। অনেক গবেষক এখন বলছেন, সন্তানের আচরণগত বৈশিষ্ট্যের বড় অংশ পিতার মাধ্যমে প্রেরিত সামাজিক শিক্ষা থেকে আসে, যা প্রায় ৭০-৮০% পর্যন্ত প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

অতএব স্পষ্টভাবে বলা যায়, সন্তানের জীবনে পিতা শুধু অভিভাবক নন, তিনি একটি জীবন্ত আদর্শ। মা সন্তানের আবেগীয় নিরাপত্তা নির্মাণ করেন, আর পিতা তাকে পৃথিবীর মুখোমুখি দাঁড়াতে শেখান। আধুনিক গবেষণা আমাদের পুরোনো ৫০/৫০ ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। পরিবারে পিতার উপস্থিতি, আচরণ, দায়িত্ববোধ ও মানসিক পরিপক্বতা সন্তানের চরিত্র নির্মাণে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়তে শুধু মায়ের নয়, সচেতন ও দায়িত্বশীল পিতৃত্বই হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। উপসংহারে বলা যায়, সন্তানের আচরণের বিশাল অংশ পিতার জীবনধারা ও ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন; একজন ভালো পিতা মানেই একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি। @ SAM Motivation

References

Pruett, K. D. – Father’s Influence in the Development of Infant Relationships, Yale Child Study Center.

Nafisah, A. D. et al. – The Impact of Father Involvement in Early Childhood Problematic Behavior.

Sarkadi, A. et al. – Father Involvement and Cognitive Development in Early Childhood: Systematic Review.



বেওকুফ  যদি  খুব ধনী হয়ে যায়, তখন সে অন্যের সাথে মেশে না

একবার এক ইঁদুর একটা হীরা গিলে ফেলল। তখন হীরার মালিক শিকারীকে ডাকলো ইদুরটিকে মারার জন্য।

শিকারি যখন ইঁদুরটিকে মারার জন্য গেল, তখন দেখল সেখানে এক হাজারের মতো ইঁদুর আছে।

কিন্তু সে খেয়াল করল এতগুলো ইঁদুরের মধ্যে একটি ইঁদুর একটি উঁচু পাথরের উপরে বসে আছে।

ব্যাস, শিকারি  বন্দুক তাক করল, আর ইদুরটিকে মেরে ফেলল।

ইঁদুরের পেট  থেকে  হিরাটিও বের হয়ে আসলো।

হীরার মালিক তখন অবাক হয়ে বলল, আপনি এতগুলো ইঁদুরের মধ্যে আসল ইঁদুরটিকে চিনলেন কিভাবে?

শিকারি তখন হেসে খুব সুন্দর একটা জবাব দিল।

সে বলল,

যখন বেওকুফের কাছে সম্পদ চলে আসে বা বেওকুফ  যদি  খুব ধনী হয়ে যায়, তখন সে অন্যের সাথে মেশে না।

আমাদের জীবনেও ঠিক এমনটাই হয়।

সম্পদ পেলে আমরা ভীষণ অহংকারী হয়ে উঠি। @ লক্ষ্যপথ





Industrial Revolution

মানব ইতিহাসে এমন কিছু সময় এসেছে, যা পুরো পৃথিবীর জীবনধারা বদলে দিয়েছে। Industrial Revolution তার অন্যতম। ১৮শ শতকের শেষ দিকে শুরু হওয়া এই বিপ্লব মূলত ইউরোপে, বিশেষ করে United Kingdom-এ সূচিত হয় এবং ধীরে ধীরে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। শিল্পবিপ্লবের আগে উৎপাদন ব্যবস্থা ছিল হাতে-কলমে বা ছোট কারখানাভিত্তিক। কিন্তু এই সময়ে যন্ত্রের ব্যবহার শুরু হওয়ার ফলে উৎপাদন দ্রুত ও ব্যাপক হয়ে ওঠে। বাষ্পচালিত ইঞ্জিন, স্পিনিং জেনি এবং পাওয়ার লুমের মতো প্রযুক্তি শিল্পক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে।

এই বিপ্লবের ফলে মানুষ গ্রাম থেকে শহরে আসতে শুরু করে এবং নতুন নতুন কারখানা গড়ে ওঠে। শহরগুলো দ্রুত বিকশিত হয় এবং অর্থনীতি আরও গতিশীল হয়ে ওঠে। তবে এর সঙ্গে কিছু চ্যালেঞ্জও আসে—যেমন শ্রমিকদের কঠিন কর্মপরিবেশ, দীর্ঘ সময় কাজ এবং শিশু শ্রমের মতো সমস্যা। শিল্পবিপ্লব শুধু অর্থনীতিতেই নয়, সমাজ ও সংস্কৃতিতেও বড় পরিবর্তন আনে। নতুন প্রযুক্তি, পরিবহন ব্যবস্থা এবং যোগাযোগের উন্নয়ন মানুষের জীবনকে সহজ করে তোলে। রেলপথ ও স্টিমশিপের আবিষ্কার দূরত্ব কমিয়ে দেয় এবং বাণিজ্যকে আরও সম্প্রসারিত করে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বিপ্লব দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে আরও উন্নত হয়—বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আজকের ডিজিটাল যুগে পৌঁছেছে। সংক্ষেপে বলা যায়, শিল্পবিপ্লব শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; এটি এমন একটি পরিবর্তন, যা আমাদের বর্তমান আধুনিক জীবনের ভিত্তি তৈরি করেছে। @ Voice of Pipul





দুঃখ-কষ্ট  লুকাতে পারা একটা শিল্প।  যন্ত্রনা লুকাতে পারা একটা শিক্ষা। একটা যোগ্যতা। একটা আর্ট। একটা অর্জন।

সফলতার জন্য সাহস লাগে, শ্রম লাগে, ধৈর্য লাগে। তারচেয়ে অনেক বেশি সাহস ও শক্তি লাগে, ব্যর্থতার যন্ত্রনা লুকাতে। হজম করতে।

It is easier to find men who will volunteer to die than to find those who are willing to endure pain with patience—Julius Caesar

আপনি গতো পাঁচ বছর ধরে কাঙ্ক্ষিত চাকরির জন‍্য চেষ্টা করেছেন। যেই চাকরি পেয়েছেন, সেই সবাই বাহবা দিলো। আপনি যারপরনাই খুশি হলেন। আনন্দে বিগলিত হলেন। ভাসলেন।

কিন্তু আপনি যে গতো পাঁচ বছর দিনের পর দিন পুড়েছেন, কষ্টকে গোপন করেছেন— সেটা কি সবাই দেখেছে?

—দেখেনি।

আপনি যে পদে পদে লাঞ্ছিত হয়েছেন, সেটা কি সবাই জানে? —জানে না।

এই যে লাঞ্ছনাকে পুষতে পেরেছেন, ক্লান্তিকে গিলে মুখে হাসি রেখেছেন— সেটা একটা সংগ্রাম। সেটা একটা যোগ‍্যতা। সেই যোগ‍্যতাই আপনাকে সাফল‍্যের দিকে ধাবিত করেছে।

একটা রিলেশনশিপ টিকে থাকে কেন?

—কারনটা শুধু এই নয় যে আপনি পারফেক্ট পার্টনার পেয়েছন। কারণ, রিলেশনশিপের যে প‍্যারাগুলো আছে, সেগুলো হজম করতে পারছেন। যখন থেকে সেই পেইনগুলো হজম করতে পারবেন না, তখনই রিলেশনশিপ ফেইড হয়ে যায়।

দীর্ঘদিন যাদের সম্পর্ক টিকে আছে, বিয়ে টিকে আছে সেটা কিন্তু প্রতিদিন তাদের ভালোবাসার হাবুডুবুর কারনে নয়। বরং বিচ্ছেদের কারণ হয় এমন মুহূর্তগুলোকে শিল্পের সাথে মেইকআপ করতে পারার কারনে। সেটাকেই আমরা বলি সেক্রিফাইস, আন্ডারস্টেন্ডিং, মিউচুয়াল কমিটমেন্ট!

ভালোবাসায় হাবুডুবু খাওয়ার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হলো এই সেক্রিফাইস, এই আন্ডারস্টেন্ডিং। বুক ভরা ভালোবাসা সবার থাকে, কিন্তু বুক ভরা সেক্রিফাইস সবার থাকে না। সেখানেই সম্পর্কগুলো টলে যায়। দুর্বল হয়ে ছিঁড়ে যায়।

কন্টিনিউয়াস পারস্পরিক বিশ্বাস রাখা— এটা অনেক কষ্টের। এবং এই কষ্টটা হজম শিখতে হয়। এটাই শিল্প! ভালোবাসাটা কিন্তু কাউকে শিখতে হয় না। এবং এইক্ষেত্রে দুজনকেই এটা শিখতে হয়। চর্চা করতে হয়।

দুঃখকে সঙ্গোপনে সাজিয়ে রাখার নাম হলো সাহস। কিন্তু দুঃখের সাথে প্রতিমুহূর্তে বাস করার নাম হলো আত্মাহুতি!

আমাদেরকে দুঃখ সাজানোর শিল্প শেখানো হয় না। কষ্ট প‍্যাকেট করে রাখার কৌশল আমাদেরকে শেখানো হয় না। অপমান ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেয়ার আত্মবিশ্বাস আমাদেরকে শেখানো হয় না। —এখানেই আমরা বেশিরভাগ মানুষ হেরে যাই।

আমাদেরকে শুধু শেখানো হয় সফল হও। ভালোবাসে উজাড় করে দাও! কিন্তু আমাদেরকে শেখানো হয় না— The art of life is the art of avoiding pain (Thomas Jefferson)।

আমাদেরকে শেখানো হয় না— Smooth seas do not make skillful sailors; শান্ত সমুদ্র কখনোই একজন দক্ষ নাবিক তৈরি করে না।

-সংগৃহীত।


১০


মানুষ হাই তোলে কেন? এটি কি কেবলই অলসতা, নাকি শরীরের একটি 'মাস্টার প্ল্যান'?

​অনেকেই মনে করেন ক্লান্তি বা ঘুমের অভাবে হাই ওঠে, কিন্তু নিউরোলজি এবং বিবর্তন নিয়ে বিজ্ঞান বলছে অন্য কথা। আমরা যখন সবার সামনে হাই তুলি, তখন ভাবি হয়তো লোকে আমাদের অলস ভাবছে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা!

আমাদের অজান্তেই শরীর তখন এক জটিল জৈবিক প্রক্রিয়া পরিচালনা করে। চলুন জেনে নিই হাই তোলার পেছনের আসল বিজ্ঞান:

​ মস্তিষ্কের ন্যাচারাল কুলিং সিস্টেম: কম্পিউটার গরম হয়ে গেলে যেমন ফ্যান ঘোরে, আমাদের মস্তিষ্ক অতিরিক্ত কাজ করলে বা উত্তপ্ত হয়ে উঠলে হাই তোলার মাধ্যমে ঠান্ডা বাতাস ভেতরে টানে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় 'থার্মোরেগুলেশন'। এটি আপনার মস্তিষ্ককে শান্ত ও সচল রাখে।

​ সচেতনতার রিচার্জ: যখন আমাদের হার্টরেট কমে যায় বা আমরা একঘেয়েমি অনুভব করি, শরীর হাই তোলার মাধ্যমে রক্তে অক্সিজেনের প্রবাহ বাড়িয়ে দেয়। এটি অনেকটা আমাদের শরীরের জন্য একটি 'রিসেট বাটন'-এর মতো কাজ করে, যা আমাদের তাৎক্ষণিক সজাগ করে তোলে।

​ ফুসফুসের সুরক্ষা: হাই তোলার সময় ফুসফুসের ক্ষুদ্র বায়ুথলি বা 'অ্যালভিওলাই' (Alveoli) প্রসারিত হয়, যা ফুসফুসের কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

​ সংক্রামক হাই ও সহানুভূতি: অন্যকে হাই তুলতে দেখলে আমাদের কেন হাই ওঠে জানেন? এটি আমাদের মস্তিষ্কের 'মিরর নিউরন'-এর কারসাজি! বিজ্ঞানীদের মতে, এটি মানুষের মধ্যে সামাজিক বন্ধন এবং একে অপরের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশের একটি অবচেতন মাধ্যম।

​ পরিশেষে: হাই তোলা মোটেও অলসতার চিহ্ন নয়, বরং এটি আপনার শরীরের একটি অত্যন্ত কার্যকর ও বৈজ্ঞানিক কৌশল যা আপনাকে মানসিকভাবে সজাগ রাখতে সাহায্য করে। এটি প্রকৃতির এক অদ্ভুত মাস্টার প্ল্যান!

@ রসে কষে বিজ্ঞান



মানুষ আর কুকুর একসাথেই বিবর্তিত হয়েছে। যদিও আক্ষরিক অর্থেই। প্রায় ১৫,০০০ থেকে ৩৩,০০০ বছর আগে যখন মানুষ এখনো হোমো সেপিয়েন্স হিসেবে পরিচিত হয়নি, তখন থেকেই নেকড়েরা (যে নেকড়েদের একটি ক্লেড থেকে কুকুর বিবর্তিত হয়) মানুষের ক্যাম্পের আশেপাশে ঘুরঘুর করত খাবারের লোভে। মানুষও তাদের তাড়িয়ে দেয়নি, বরং ধীরে ধীরে কাছে টেনে নিয়েছে। কারণ এই অ্যারেঞ্জমেন্ট দুইপক্ষের জন্যই লাভজনক ছিল। নেকড়ে রাতে পাহারা দিত, শিকারে সাহায্য করত আর মানুষ বিনিময়ে হাড়, মাংসের টুকরো দিত। এটা ছিল পৃথিবীর প্রথম মিউচুয়্যালিস্টিক পার্টনারশিপ। এটি বিজনেস ডিল না, সারভাইভাল ডিল। প্যালিওলিথিক যুগে মানুষ যখন ম্যামথ, বুনো ঘোড়া বা হরিণ শিকার করত, সেই একই শিকারের মাংস ভাগ হতো কুকুরের সাথে। একই আগুনের পাশে বসে, একই পাথরের পাত্রে। জার্মানির বন ইউনিভার্সিটির গবেষকরা ১৪,০০০ বছর পুরনো কুকুরের কঙ্কাল বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে তাদের দাঁতে এবং হাড়ে পরিষ্কার প্রমাণ আছে যে তারা রান্না করা নরম খাবার খেয়েছে, কাঁচা শিকার নয়। অর্থাৎ সেই কুকুরগুলো মানুষের সাথে একই খাবার খেয়েছে। একই প্লেটে না হলেও, একই ফায়ারের পাশে বসে। এটা শুধু পোষা প্রাণীর গল্প নয়, এটা একটা জয়েন্ট সারভাইভাল স্ট্র্যাটেজির গল্প।

এই কো-ইভোলিউশনে দুই প্রজাতিই বদলে গেছে। কুকুর পেয়েছে ছোট চোয়াল, নরম খাবার হজম করার ক্ষমতা, আর মানুষের সোশ্যাল সিগন্যাল পড়ার অবিশ্বাস্য দক্ষতা। মানুষ পেয়েছে রাতের প্রহরী, শিকারের পার্টনার, আর একটা এম্পেথেটিক কম্পানিওন। ইউনিভার্সিটি অফ পোর্টসমাউথের গবেষক ব্রায়ান হেয়ারের কাজ দেখিয়েছে  কুকুর মানুষের পয়েন্টিং জেসচার বোঝে, শিম্পাঞ্জি পর্যন্ত পারে না। এই ট্রেইট কুকুরের মধ্যে কোথা থেকে এলো? বিবর্তনে। কারণ যে কুকুর মানুষের ইশারা বুঝত, সে বেশি খাবার পেত, বেশি বাঁচত, বেশি বাচ্চা দিত।এভাবে আমাদের গল্প চলতে থাকে সাভানা থেকে সাইবেরিয়া পর্যন্ত।

‎কুকুরকে মারবেন না। তারা বুনো হওয়ার মত বিবর্তনীয় শক্তি হারিয়ে ফেলছে। সারাজীবন মারলেও ওরা আপনার ঘরের কাছে এসে দাঁড়াবে।  লেজ নাড়াবে। আর ব্রু কুচকিয়ে ভালোবাসা চাইবে। @ Md. Al Amin


আব্রাহাম লিংকনের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প:


৮৬০ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি ব্যবসা, আইন পেশা এবং রাজনীতিতে অসংখ্য ব্যর্থতা ও পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছিলেন, কিন্তু হাল ছাড়েননি।

ব্যর্থতা:

জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি নির্বাচনে (আইনসভা, কংগ্রেস, সেনেট) হেরেছেন এবং ব্যবসায় ব্যর্থ হয়ে ঋণী হয়েছিলেন।

হতাশা:

প্রিয়জনদের মৃত্যু এবং তীব্র বিষণ্নতা (depression) সত্ত্বেও তিনি নিজেকে ভেঙে পড়তে দেননি।

সাফল্য:

১৮৬০ সালে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী হিসেবে তিনি আমেরিকার ১৬তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

গৃহযুদ্ধ' (Civil War):

পরিচালনা করেন এবং দাসপ্রথা চিরতরে বিলুপ্ত করেন।

লিডারশিপ:

তার ধৈর্য, ক্ষমাশীল মনোভাব এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাকে ইতিহাসে মহানায়কের আসনে বসিয়েছে।

লিংকনের জীবনের এই ঘটনা আমাদের শেখায় যে, ব্যর্থতা চূড়ান্ত নয়, বরং তা সাফল্যের সিঁড়ি।

শ্রেষ্ঠত্ব:

গৃহযুদ্ধের সময় দেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখা, দাসপ্রথা বিলুপ্তি (Emancipation Proclamation) এবং মার্কিন সংবিধানের ১৩তম সংশোধনী পাসের মাধ্যমে তিনি আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও সফল প্রেসিডেন্ট হিসেবে গণ্য হন।

কঠোর পরিশ্রম ও ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতীক হিসেবে লিংকনের জীবনকে শ্রেষ্ঠ উদাহরণ মনে করা হয়।

@মৃণাল নন্দী

১৩


পহেলা বৌশাখে কি কোন ধর্মের মানুষ আলাদা করে কোন ধর্মীয় আচার পালন করে ?

বাংলা সালের সঙ্গে কোন ধর্মীয় বিষয় যুক্ত নেই, এটা সম্রাট আকবরও প্রবর্তন করেননি, তিনি খাজনা আদায়ের স্বার্থে কিছু পদ্ধতিগত সংস্কার করেছিলেন মাত্র । এটা হাজার বছর ধরে বাংলার ফসলী সাল হিসাবে চর্চিত হয়ে আসছে। শুধু এই অঞ্চলে নয়, নেপাল, ভারত, বার্মা, লাওস, কম্বোডিয়া, চীনের এক অংশ, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ আরো অনেক দেশে পহেলা বৈশাখ পালিত হয় ভিন্ন নামে, ভিন্ন আবহে।

ভাষা পরিবর্তনশীল। এক ভাষায় অন্য ভাষার অনেক শব্দ প্রবেশ করে। কোন শব্দ কোন ভাষা থেকে বা সূত্র থেকে এসেছে সেটা বড় কথা নয়। সেটা একবার ভাষার অংশ হয়ে গেলে তার সঙ্গে আর কোন সাম্প্রদায়িক সম্পৃক্ততা থাকে না। বৈশাখ শব্দের উৎপত্তি কিভাবে হয়েছে বা সোম মঙ্গল এসব শব্দ কিভাবে এসেছে তার চেয়ে বড় হল এগুলো বাংলা ভাষায় মিশে গেছে । আপনি যখন বলেন মঙ্গল বার তখন কি আপনার মনে হয় সেটা মঙ্গল গ্রহের নামে নাম, একটি গ্রহের নামে বারের নাম হবে কেন? নামের উৎস খুঁজে একটা শতাব্দি প্রাচীন বাংলা শব্দকে সাম্প্রদায়িক ট্যাগ লাগানো নিতান্তই শিশুসুলভ। প্যাগানদের থেকে অনেক শব্দ এ্যারাবিকে স্থায়ী হয়েছে। প্যাগান কারা জানেন তো ? না জানলে গুগল করুন।

.কেউ কিছু লিখে দিল, আর সেটা বিশ্বাস করার আগে একটু ঘাটুন সে বিষয়ে বিজ্ঞজনেরা কি বলেছেন। নিজের কমন সেন্স প্রয়োগ করুন।

.পহেলা বৈশাখ সম্পূর্ণ বাঙালি জাতির উৎসব। কেউ মঙ্গল শোভাযাত্রা করুক বা না করুক, কেউ পান্তা ইলিশ খাক বা না খাক তাতে পহেলা বৈশাখের সার্বজনীনতা খর্ব হবে কেন ? মূঘলদের চাপিয়ে দেয়া হিজরি সনই মেনে চলা হত এখানে। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল। দেখা যায় এখন এই সময়ে, এই আবহাওয়ায়, এই ঋতুতে হিজরি যে মাস ৪ বছর পরে সে মাস আর থাকবে না। হিজরি বছর সৌর বছরের চেয়ে ১০/১১ দিন কম। এ অঞ্চলের ফসল ফলত ঋতুর উপর নির্ভর করে। ঋতু আবর্তিত হয় সৌর সন অনুয়ায়ী, চন্দ্র সন অনুযায়ী নয়। হিজরি সনের হিসাবে খাজনা আদায়ে সমস্যা দেখা দিত। ধরুন হিজরি ৩ নং মাসে খাজনা আদায় করা হল এ বছর যখন কৃষকের ঘরে ফসল উঠল। ১০ বছর পরে হিজরি সেই একই মাসে এখানে শীতকাল। তাহলে কৃষক সবে ফসল বুনেছে তখন। সে সময়ে তার পক্ষে খাজনা দেয়া সম্ভব ? এমন অনেক বাস্তবতার মুখে সম্রাট আকবর আগে থেকেই প্রচলিত বাংলা সন নতুন করে সাজিয়ে মেনে নেন।

কোন কালচার এ্যারাবিক রিজিওনে না থাকলেই সেটা ধর্মের বিরুদ্ধে চলে যাবে ? পহেলা বৈশাখ ভিন্ন নামে নেপালে, চীনের কিছু অংশে, থাইল্যান্ডে, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, লাওস অনেক দেশে পালিত হয়। সবচেয়ে বড় আকারে পালিত হয় থাইল্যান্ডে সংক্রান নামে। আপনি জানেন আমাদের দেশের পাহাড়ি অঞ্চলে সাংগ্রাই নামে পালিত হয়। চৈত্র সংক্রান্তির কথা তো জানেন। তাহলে বুঝতেই পারছেন সংক্রান্তি > সাংগ্রাই > সংক্রান শব্দগুলোর উৎপত্তি কোন এক আদি শব্দ থেকে। সংস্কৃতিও এক দেশ থেকে অন্য দেশে গিয়ে মিশে যায়। এক সময় সে দেশের সংস্কৃতির অংশ হয়ে যায়। এখানে প্রত্যেক দেশের সংখাগুরু মানুষের ধর্মের পার্থক্য কিন্তু জানা আমাদের। অথচ, এই উৎসব সবাই করছে যে যার মত করে। বাংলা নববর্ষ পালনে এত সমস্যা কোথায় তাহলে ?

ভাষা, সংস্কৃতি কোন অঞ্চলের মানুষের জাতিসত্ত্বা গঠন করে। এর সঙ্গে আসলে ধর্মের কোন সম্পর্কে নেই। জার্মানিতে মুসলিম, খ্রীস্টান, হিন্দু যত মানুষই থাক না কেন যারা জার্মান ভাষায় কথা বলে, একই সংস্কৃতির অংশ তারা সবাই জার্মান। তেমনিভাবে জাপানিজ, চাইনিজ, ইংলিশ অনেক জাতিসত্ত্বা আছে। আমরা বাঙালি। ভাষা ও সংস্কৃতিই আমাদের এই বাঙালি পরিচয় দিয়েছে। 

পহেলা বৈশাখে কোন ধর্মীও আচার তো হয় না। মানুষের প্রাণের মিলন ঘটে। মানু্ষ সকল ভেদাভেদ ভুলে এক কাতারে মিশে যায়। দেশে নাটক হচ্ছে, সিনেমা বানানো হচ্ছে, যাত্রা চলছে, কনসার্ট চলে। তাহলে পহেলা বৈশাখ নিয়ে এত আপত্তি কেন ? পহেলা বৈশাখ তো সুস্থ সংস্কৃতি, কোনভাবেই অপসংস্কৃতি নয়। শাড়ি তো বাঙালি নারীর শ্বাশত পোষাক। শাড়িতে তো কোন অশ্লীলতা নেই। বিশ্বের প্রায় সকল জাতিই তাদের নববর্ষ ধুমধাম করে পালন করে, আমাদের জন্য সমস্যা তৈরি করে কেন শুধু ? @ nurul amin

ইতিহাসের কলম্বাস আর উৎসবের কলম্বাস

ক্রিস্টোফার কলম্বাস কোনো নিষ্পাপ নাবিক ছিলেন না, নেহাত ভাগ্যের ফেরে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছেন। তার ১৪৯২ সালের অভিযানের দিনলিপি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, তাঁর এই যাত্রা ছিল রাজপরিবারের এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ।

গ্রানাডা জয়ের পরপরই রাজা ফার্দিনান্দ এবং রানি ইসাবেলা খ্রিস্টধর্মের বিস্তার, নতুন ভূখণ্ড দখল এবং সম্পদের লোভে তাঁকে এই অভিযানের দায়িত্ব দেন। বিনিময়ে কলম্বাসকে দেওয়া হয়েছিল বংশপরম্পরায় শাসনক্ষমতা ও উপাধির প্রতিশ্রুতি। অর্থাৎ, শুরু থেকেই এই যাত্রার মূলমন্ত্র ছিল ক্ষমতা, জবরদখল এবং বস্তুগত পুরস্কার।

তবে তিনি কোনো শূন্য পৃথিবীতে পৌঁছান নি।

ক্যারিবীয় অঞ্চলের Taíno জনগোষ্ঠীর ছিল নিজস্ব রাজনৈতিক কাঠামো, ধর্মীয় জীবন, কৃষি, নৌচালনা এবং শিল্পসংস্কৃতি। লাইব্রেরি অফ কংগ্রেসের তথ্যমতে- কিউবা, জ্যামাইকা ও পুয়ের্তো রিকোসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এক বিশাল এবং সুসংগঠিত আদিবাসী সমাজ তখন বিদ্যমান ছিল। অর্থাৎ, কলম্বাস কোনো ফাঁকা মঞ্চে পা রাখেননি, বরং তিনি এক জীবন্ত সভ্যতার মুখোমুখি হয়েছিলেন।

কলম্বাসের নিজস্ব লেখনীই প্রমাণ করে যে, প্রথম সাক্ষাৎ কত দ্রুত দখলে রূপ নেয়। নিজের ডায়েরিতে তিনি স্প্যানিশ রাজমুকুটের নামে জমি দখলের কথা লিখেছিলেন। দ্বীপবাসীদের সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন ছিল রূঢ়- দ্বীপবাসীদের তিনি সহজে ধর্মান্তরযোগ্য বলে উল্লেখ করেন, তাদের মধ্যে কিছু মানুষকে স্পেনে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন, এমনকি দাসত্বের উপযোগী বলেও বিচার করেন। এবং বিশ্বাস করতেন সামান্য শক্তি প্রয়োগ করলেই তাদের দিয়ে যেকোনো ইচ্ছা পূরণ করা সম্ভব। তাঁর লেখায় বারবার সোনা, মশলা আর সম্পদের লোভ ফুটে উঠেছে। শোষণের সেই মানসিকতা প্রথম সাক্ষাৎ থেকেই স্পষ্ট ছিল।

১৪৯৩ সালের চিঠিতে এই দৃষ্টিভঙ্গি আরও খোলামেলা।

প্রথম ভ্রমণের পর রাজকীয় কর্মকর্তাদের উদ্দেশে লেখা চিঠিতে কলম্বাস প্রতিশ্রুতি দেন- সামান্য সহায়তা পেলেই তিনি রাজাদের প্রত্যাশামতো স্বর্ণ, মসলা, তুলা, মাষ্টিক, অ্যালো এবং “বিধর্মী দাস” সরবরাহ করতে পারবেন। শেষে তিনি বলেন, এত মানুষের খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরের মাধ্যমে কী বিপুল গৌরব আসবে। অর্থাৎ, তার নিজের ভাষাতেই এই উদ্যোগের সারমর্ম—সম্পদ, বন্দী, এবং ধর্মান্তর।

দ্বিতীয় অভিযানে অনুসন্ধান রূপ নেয় উপনিবেশ স্থাপনে।

১৪৯৩ সালে কলম্বাস অন্তত ১৭টি জাহাজ ও প্রায় ১,৫০০ মানুষ নিয়ে ফিরে যান "নতুন পৃথিবীতে"। হিস্পানিওলায় তিনি স্থাপন করেন "লা ইসাবেলা"- আমেরিকায় স্পেনের প্রথম ইউরোপীয় শহর। এই অভিযানে ছিলেন ধর্মপ্রচারক, স্থায়ী বসতি স্থাপনকারী এবং সাম্রাজ্য গঠনের যাবতীয় উপকরণ। অল্প সময়ের মধ্যেই স্প্যানিশরা তাইনো জনগণকে জোর করে "স্বর্ণখনিতে" কাজ করাতে শুরু করে এবং দাস হিসেবে স্পেনে পাঠাতে থাকে।

হিস্পানিওলা দ্বীপের ওপর এর প্রভাব ছিল ভয়াবহ।

লাইব্রেরি অফ কংগ্রেস উল্লেখ করে—মাত্র বিশ বছরের মধ্যে দ্বীপটির আদিবাসী জনসংখ্যা প্রায় দশ লাখ থেকে নেমে আসে মাত্র ত্রিশ হাজারে। এর পেছনে ছিল নির্যাতন, জোরপূর্বক খনিশ্রম, খাদ্য উৎপাদনের ভাঙন, পলায়ন এবং ইউরোপীয়দের বয়ে আনা রোগব্যাধির মিশ্রণ।

এটি কোনো মহান “আবিষ্কারের” সামান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল না- রক্তক্ষয়ী বিনাশ ছিল ক্যারিবীয়ায় স্পেনের সাম্রাজ্য গড়ার ভিত্তিই।

কলম্বাসের বিরুদ্ধে এই অভিযোগগুলো আধুনিক যুগের সৃষ্টি নয়। তাঁর শাসনকাল এতটাই বিশৃঙ্খল ছিল যে খোদ রাজপরিবারকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল। ১৫০০ সালে রাজকীয় কমিশনার ফ্রান্সিসকো ডি বোবাদিলা হিস্পানিওলায় এসে কলম্বাসের নিষ্ঠুরতার প্রমাণ পান।

তিনি সেখানে গিয়েছিলেন রাজকীয় কমিশনার ও প্রধান বিচারপতি হিসেবে। তিনি গিয়ে বিশৃঙ্খলা দেখতে পান, শোনেন কলম্বাস স্প্যানিশদের ফাঁসি দিয়েছেন, এরপর কলম্বাস ও তার ভাইকে গ্রেপ্তার করেন, নথিপত্র জব্দ করেন এবং শিকল পরিয়ে স্পেনে পাঠান। পরে রাজদম্পতি তাকে মুক্তি দিলেও গভর্নরের পদ আর ফিরিয়ে দেননি। তার নিজের পরিবারেও তার ভাবমূর্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল।

The Life of the Admiral Christopher Columbus—যা তার ছেলে Ferdinand Columbus-এর লেখা বলে ধরা হয়—ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলেও নিরপেক্ষ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয় না। আধুনিক সম্পাদকরাও বলেন, এটি ছিল একজন গর্বিত পুত্রের তার বাবার কলঙ্ক মোচনের একটি আবেগীয় প্রচেষ্টা মাত্র।

অর্থাৎ, কলম্বাসকে ঘিরে মিথ তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল অনেক আগেই।

সত্যি বলতে, ইতিহাসের কলম্বাস আর উৎসবের কলম্বাস—এই দুইয়ের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। কলম্বাসের নিজের লেখা, ষোড়শ শতকের সমালোচক Bartolomé de las Casas-এর সাক্ষ্য, এবং পারিবারিক স্মৃতিকথা, সবই তাকে দেখায়- দখল, জবরদস্তি ও শোষণের যন্ত্রের ভেতরে। তিনি কোনো বিমূর্ত সাহস বা নিষ্পাপতার প্রতীক ছিলেন না; তিনি ছিলেন এমন এক ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার সূচনালগ্নের অংশ, যা ব্যাপক মাত্রায় মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনে।

ইতালীয়-আমেরিকানরা গর্ব করার জন্য কলম্বাসের চেয়ে মহান প্রতীক পাবার যোগ্যতা রাখে।

এর উপযুক্ত উদাহরণ হতে পারেন মাদার ফ্রান্সেস জেভিয়ার ক্যাব্রিনি। এই ইতালীয় অভিবাসী সন্ন্যাসিনী আমেরিকায় এসে অসহায় মানুষের সেবায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। ত্যাগ আর সেবার মাধ্যমে তিনি অভিবাসী জীবনের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।

আমরা যদি সত্যই ইতালীয়-আমেরিকান গর্ব উদযাপন করতেই চায়, তবে এমন কাউকে বেছে নেওয়া উচিত যিনি মানুষের উপকার করেছেন। ইতিহাসের নিষ্ঠুর নায়ক কলম্বাসকে নয়, বরং মাদার ক্যাব্রিনির মতো মহৎ প্রাণকেই আমাদের আদর্শ করা উচিত।

[সিসিলিয়ান গবেষক লেখক কার্লো ত্রেভিসো'র লেখা নিবন্ধ থেকে অনুবাদ] @ boikal

১৫

মাতৃগর্ভে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি কীভাবে আগামী প্রজন্মকে দুর্বল করছে? 

মাতৃগর্ভে থাকা একটি ভ্রূণ তার নিজস্ব কোনো ভিটামিন ডি তৈরি করতে পারে না। সে পুরোপুরি মায়ের সঞ্চয় বা লিভারের পাওয়ার ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল। গর্ভাবস্থার প্রথম দিন থেকে শুরু করে শিশুর মস্তিষ্ক গঠন, স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশ এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার (Immune system) শক্ত ভিত্তি—সবকিছুই নির্ভর করে মায়ের রক্তে ভেসে থাকা এই মাস্টার হরমোনের ওপর। প্লাসেন্টা বা অমরার মাধ্যমে এই হরমোন সরাসরি ভ্রূণের শরীরে প্রবেশ করে তার সেলুলার কমিউনিকেশন বা কোষের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে।

​বাংলাদেশের বর্তমান সংস্কৃতির দিকে তাকালে এক ভয়াবহ মেটাবলিক বিপর্যয়ের চিত্র ফুটে ওঠে। আমাদের দেশে একজন নারী গর্ভবতী হওয়ার পর তাকে অত্যন্ত সাবধানে আবদ্ধ পরিবেশে রাখার প্রবণতা দেখা যায়। শহুরে জীবনে এসি রুম আর কংক্রিটের চারদেয়ালে বন্দি হবু মায়েদের গায়ে এক ফোঁটা রোদও ঠিকমতো লাগে না। মায়ের শরীরে যখন ভিটামিন ডি-এর চরম আকাল থাকে, তখন মাতৃগর্ভে বেড়ে ওঠা শিশুটি জন্মগতভাবেই এক বিশাল মেটাবলিক ঘাটতি নিয়ে পৃথিবীতে আসে।

​সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো শিশুদের স্নায়ুবিক বিকাশ। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে শিশুদের অটিজম (Autism spectrum disorder) বা স্নায়ুবিক বিকাশের ত্রুটির পেছনের অন্যতম কারণ হিসেবে গর্ভাবস্থায় ভিটামিন ডি-এর অভাবকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। এই মাস্টার হরমোন ছাড়া শিশুর মস্তিষ্কের গঠন সম্পূর্ণ অপূর্ণ থেকে যায়। এছাড়া, শিশুর অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম বা পেটের ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্যও মাতৃগর্ভ থেকেই নির্ধারিত হয়। ভিটামিন ডি-এর অভাবে শিশুর অন্ত্র দুর্বল থাকে, যার ফলে জন্মের পর পরই শুরু হয় কোলিক পেইন বা অকারণে পেট ব্যথার কান্না। @ Probal Kumar Mondal


১৬

শো-অফ ছোটলোকির প্রমাণ দেয়

মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার অর্থ, পোশাক বা বাহ্যিক চাকচিক্যে নয়; বরং তার চিন্তা, ব্যবহার ও ব্যক্তিত্বে প্রতিফলিত হয়। আধুনিক সমাজে অনেকেই নিজের অবস্থান বা মর্যাদা প্রমাণ করার জন্য অযথা প্রদর্শন বা শো-অফকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বানিয়ে ফেলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই প্রবণতা আরও দৃশ্যমান হয়েছে, যেখানে মানুষ বাস্তব সুখের চেয়ে প্রদর্শিত সুখকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু সমাজবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত শো-অফ আসলে আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ নয়, বরং ভিতরের অনিরাপত্তা ও স্বীকৃতি পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। যে ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে আত্মমর্যাদাবান, তাকে নিজের অবস্থান বোঝাতে অতিরিক্ত প্রচারণার প্রয়োজন হয় না। নীরব ব্যক্তিত্ব সবসময় বেশি শক্তিশালী হয়, আর কৃত্রিম প্রদর্শন মানুষকে সাময়িক আলোচনায় আনলেও স্থায়ী সম্মান এনে দিতে পারে না। তাই অনেক চিন্তাবিদ মনে করেন, শো-অফ ভদ্রতার নয়, বরং ছোট মানসিকতার ইঙ্গিত বহন করে।

শো-অফের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক বিশ্লেষণ :

মনোবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্য করেছেন যে আত্মসম্মান কম থাকা মানুষ নিজের মূল্য বাড়ানোর জন্য বাহ্যিক জিনিসের ওপর নির্ভর করে। গবেষণায় দেখা যায়, যাদের আত্মবিশ্বাস দৃঢ় তারা নিজের সাফল্য নিয়ে কম প্রচার করে, কিন্তু যাদের আত্মপরিচয় দুর্বল তারা বিলাসিতা ও সম্পদ প্রদর্শনের মাধ্যমে সামাজিক স্বীকৃতি অর্জনের চেষ্টা করে। অর্থনীতিবিদ থরস্টেইন ভেবলেন তার বিখ্যাত “Conspicuous Consumption” তত্ত্বে দেখিয়েছেন, অনেক মানুষ প্রয়োজনের জন্য নয়, বরং অন্যদের প্রভাবিত করার জন্য ব্যয় করে। এই প্রবণতা সমাজে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা তৈরি করে এবং মানুষের মধ্যে তুলনামূলক হীনমন্যতা বাড়ায়। শো-অফ মানুষকে সাময়িক প্রশংসা এনে দিলেও ধীরে ধীরে সম্পর্কের আন্তরিকতা কমিয়ে দেয়। কারণ মানুষ বাহ্যিক আড়ম্বরের চেয়ে আন্তরিক আচরণকে বেশি বিশ্বাস করে। ফলে অতিরিক্ত প্রদর্শন সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টি করে এবং ব্যক্তিত্বের দুর্বলতা প্রকাশ করে।

ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ ও বাস্তব জীবনের প্রভাব :

ইতিহাস ও সমাজ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সত্যিকারের মহান মানুষরা কখনো নিজেদের বড় করে দেখানোর চেষ্টা করেননি। বিনয় ও সংযম সব যুগেই সম্মান অর্জনের প্রধান গুণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সামাজিক গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে যে বিনয়ী মানুষ দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়, কারণ তাদের আচরণে বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে। বিপরীতে যারা সবসময় নিজের সাফল্য, সম্পদ বা জীবনযাপন প্রদর্শনে ব্যস্ত থাকে, তারা ধীরে ধীরে মানুষের কাছে বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত শো-অফ নতুন প্রজন্মের মধ্যে মানসিক চাপ ও তুলনামূলক অসন্তোষ বাড়াচ্ছে বলেও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। এতে বাস্তব সুখের পরিবর্তে কৃত্রিম জীবনধারা গুরুত্ব পায় এবং মানুষ নিজের প্রকৃত সত্তা হারাতে শুরু করে। তাই ব্যক্তিত্বের প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশ পায় সরলতায়, আত্মমর্যাদায় ও মানবিক আচরণে, প্রদর্শনে নয়।

শো-অফ কখনোই মানুষের প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে পারে না; বরং তা অনেক সময় ব্যক্তিত্বের অপরিপক্বতা প্রকাশ করে। সত্যিকারের বড় মানুষ নিজের মূল্য নিজেই ধারণ করে, তাকে দেখিয়ে দিতে হয় না। বাহ্যিক চাকচিক্য মানুষকে কিছু সময়ের জন্য আলোচনায় আনতে পারে, কিন্তু বিনয়ই দীর্ঘস্থায়ী সম্মান এনে দেয়। যে ব্যক্তি নিজেকে বড় প্রমাণ করতে ব্যস্ত, সে আসলে নিজের ভিতরের শূন্যতাকেই প্রকাশ করে। সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে হলে প্রদর্শন নয়, প্রয়োজন চরিত্র, সততা ও মানবিকতা। তাই আমাদের উচিত শো-অফের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে সরলতা ও সৌজন্যের চর্চা করা। কারণ প্রকৃত আভিজাত্য থাকে আচরণে, প্রদর্শনে নয়। @ SAM Motivation

তথ্যসূত্র :

Thorstein Veblen — The Theory of the Leisure Class

American Psychological Association — Self-esteem and Social Behavior Studies

Journal of Consumer Research — Conspicuous Consumption Research


১৭


মানসিক নিপীড়নকারীরা ভয়ংকর, তারা মানুষকে নিরবে মেরে ফেলে

 মানুষকে হত্যা সবসময় অস্ত্র দিয়ে হয় না; অনেক সময় শব্দ, আচরণ ও অবহেলার মাধ্যমেই মানুষ ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। মানসিক নিপীড়ন এমন এক অদৃশ্য সহিংসতা, যার কোনো রক্তপাত নেই কিন্তু ক্ষত গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। বাইরে থেকে একজন মানুষ স্বাভাবিক দেখালেও ভিতরে সে ভেঙে পড়তে পারে প্রতিদিন। তাই আজকের সমাজে মানসিক নির্যাতনকারীরা সবচেয়ে ভয়ংকর, কারণ তারা কাউকে একদিনে নয়, বরং নীরবে প্রতিদিন হত্যা করে।

মানসিক নিপীড়নের ভয়াবহ বাস্তবতা

মানসিক নিপীড়ন বলতে অপমান, অবমূল্যায়ন, গ্যাসলাইটিং, অবহেলা, ভয় দেখানো কিংবা আত্মসম্মান ভেঙে দেওয়ার ধারাবাহিক আচরণকে বোঝায়। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন মানসিক নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস কমে যায়, হতাশা ও আত্মহত্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, মনস্তাত্ত্বিক সহিংসতা বিষণ্নতা, আত্মসম্মানহীনতা এবং আত্মঘাতী চিন্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত।

স্কুল বুলিং নিয়ে ৯৫ হাজার শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, যারা মানসিকভাবে নিপীড়িত হয়েছে তাদের উদ্বেগ, PTSD, ঘুমের সমস্যা ও মানসিক রোগের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেশি ছিল। অর্থাৎ শারীরিক আঘাত সেরে যায়, কিন্তু মানসিক আঘাত দীর্ঘদিন মস্তিষ্ক ও আচরণকে প্রভাবিত করে।

কেন মানসিক নির্যাতন “নীরব হত্যা”

মানসিক নিপীড়নের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো এটি দৃশ্যমান নয়। একজন মানুষকে বারবার বলা হলে সে অযোগ্য, ব্যর্থ বা মূল্যহীন, তখন সে ধীরে ধীরে সেই বিশ্বাসকে নিজের সত্য হিসেবে মেনে নেয়। এতে তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, আত্মপরিচয় এবং জীবনবোধ ধ্বংস হয়ে যায়।

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে এবং শরীরেও স্ট্রেসজনিত রোগ সৃষ্টি করে। অনেক ভুক্তভোগী বাইরের পৃথিবীতে হাসলেও ভিতরে তারা নিঃসঙ্গতা, ভয় ও আত্মঘৃণায় ভুগতে থাকে। তাই মানসিক নিপীড়নকারীরা সরাসরি হত্যা না করেও একজন মানুষের স্বপ্ন, সাহস ও বেঁচে থাকার ইচ্ছাকে ধ্বংস করে দেয়।

সামাজিক অবহেলা ও নীরব অপরাধ

সমস্যা হলো সমাজ এখনও মানসিক নির্যাতনকে গুরুত্ব দেয় না। মানুষ বলে, “এগুলো তো শুধু কথা”, অথচ সেই কথাই একজন মানুষকে ভেঙে দেয়। অনেক ভুক্তভোগী নিজের কষ্ট প্রমাণ করতে পারে না বলে চুপ থাকে। ফলে নির্যাতনকারী আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

সমাজ যখন মানসিক সহিংসতাকে ছোট করে দেখে, তখন অসংখ্য মানুষ নীরবে মানসিক মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। গবেষকরা সতর্ক করেছেন, মানসিক নির্যাতন দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক নির্যাতনের মতোই ক্ষতিকর এবং কখনও কখনও আরও গভীর প্রভাব ফেলে।

মানসিক নিপীড়ন কোনো সাধারণ আচরণ নয়; এটি মানুষের আত্মা ভেঙে দেওয়ার এক নিষ্ঠুর প্রক্রিয়া। যে মানুষ অন্যকে অপমান, নিয়ন্ত্রণ বা অবহেলার মাধ্যমে দুর্বল করে, সে শুধু সম্পর্ক নষ্ট করে না, একটি জীবনের আলো নিভিয়ে দেয়। তাই সমাজ, পরিবার ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানসিক সহিংসতার বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। মনে রাখতে হবে, মানুষ শুধু খাবার ও আশ্রয়ে বাঁচে না; সম্মান, ভালোবাসা ও মানসিক নিরাপত্তাই তাকে সত্যিকারভাবে জীবিত রাখে। @ SAM Motivation

তথ্যসূত্র

World Health Organization (WHO) – Psychological Violence and Mental Health Reports

American Psychological Association – Emotional Abuse and Psychological Trauma Studies

Zhao et al., School Bullying Results in Poor Psychological Conditions (2023)


১৮


স্পিরুলিনা (Spirulina) বর্তমান সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় একটি 'সুপারফুড'। 

এটি মূলত এক ধরণের নীল-সবুজ শৈবাল (Blue-green algae), যা স্বাদু এবং লোনা—উভয় জলেই জন্মে। পুষ্টিগুণে ঠাসা হওয়ায় নাসা (NASA) নভোচারীদের ডায়েটেও এটি যুক্ত করার পরামর্শ দিয়ে থাকে।

ফার্মেসি: ঢাকার প্রায় সব বড় ফার্মেসিতে (যেমন: লাজ ফার্মা, তামান্না ফার্মেসি, অ্যারোগা) স্কয়ার, ইনসেপ্টা বা একমি-র মতো নামী ব্র্যান্ডের স্পিরুলিনা ক্যাপসুল পাওয়া যায়।

২. সুপারশপ ও অর্গানিক শপ: আগোরা, স্বপ্ন বা মিনা বাজারে ডায়েট সাপ্লিমেন্ট সেকশনে এটি পাবেন। এছাড়া Ultimate Organic Life বা এই ধরণের অর্গানিক শপগুলোতে পাউডার ফর্ম পাওয়া যায়।

৩. অনলাইন শপ: দারাজ (Daraz), রকমারি (Rokomari), এবং বিভিন্ন অনলাইন ফার্মেসি (যেমন: Arogga, OsudPotro) থেকে ঘরে বসেই অর্ডার করতে পারেন।

​দাম কেমন?

​ব্র্যান্ড এবং পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে দামের ভিন্নতা হয়:

​দেশি ব্র্যান্ড (ক্যাপসুল/ট্যাবলেট): 

​Square (Navit): প্রতি পিস প্রায় ৮ টাকা (৩০টি ক্যাপসুলের বক্স ২৪০ টাকা)।

​Acme (Spirulina): প্রতি পিস প্রায় ৪ টাকা (৩০টির বক্স ১২০ টাকা)।

​Ibn Sina (Dirulina): প্রতি পিস প্রায় ৬ টাকা।

আমদানিকৃত/বিদেশি ব্র্যান্ড: 

​Now Foods বা Swanson: ১০০-২০০ ট্যাবলেটের দাম ১,৮০০ টাকা থেকে ৪,০০০ টাকার মধ্যে হতে পারে।

চিকেনে প্রোটিন আছে ৩১%, গরুর মাংসের প্রোটিন আছে ২৬℅, খাসির মাংসে আছে ১৩% আর স্পিরুলিনায় আছে ৭২%

১৯

ভারতের প্রথম শিক্ষা মন্ত্রী মৌলানা আজাদ ও কিছু কথা

মজার বিষয় হলো, তিনি কোনো ফর্মাল স্কুলিং করেননি। তিনি ভারতের নাগরিকও ছিলেন না; তাঁর দাদা মক্কায় বসবাস শুরু করেছিলেন, আর তিনি নিজেও মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মক্কা ও মিশরের ইসলামিক আল-আজহার মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছিলেন। তবুও পণ্ডিত নেহরু তাঁকে ভারতের শিক্ষা মন্ত্রী বানিয়েছিলেন।

শিক্ষা মন্ত্রী হওয়ার পর মৌলানা আজাদ নিজের চিন্তাধারার সঙ্গে মিল আছে—এমন একজন পাকা মুসলিম মানুষকে খুঁজতে লাগলেন, যাকে ভারতের শিক্ষা সচিব করা যায়। এই খোঁজের পর তিনি একজন পাকা মুসলিম কর্মকর্তা খাজা গুলাম সাইয়্যিদীনকে পেলেন।

কংগ্রেস মৌলানা আজাদকে ‘ভারত রত্ন’ পুরস্কার দেয় এবং তাঁর শিক্ষা সচিব খাজা গুলাম সাইয়্যিদীনকে ‘পদ্ম ভূষণ’ পুরস্কারে সম্মানিত করে।

এই খাজা গুলাম সাইয়্যিদীনের মেয়ের নাম সাইয়্যিদা হামিদ। যদিও সাইয়্যিদা হামিদ প্রশাসনিক সার্ভিস (IAS/Administrative Service)-এ ছিলেন না, তবুও ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় (PMO)-এ সচিব বানিয়েছিলেন, কারণ তিনি একটি কট্টর মুসলিম পরিবার থেকে এসেছিলেন।

এই সাইয়্যিদা হামিদকেই ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কারও দেওয়া হয়েছিল (কংগ্রেসের আমলে পদ্মশ্রী, পদ্ম ভূষণ ইত্যাদি পুরস্কার কিলো দরে বিতরণ করা হতো, আর তাতে মুসলমানদের বিশেষভাবে পছন্দ করা হতো)।

পরে মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী হন এবং সোনিয়া গান্ধী ও রাহুল গান্ধী ‘সুপার প্রাইম মিনিস্টার’ হয়ে ওঠেন। তখন এই একই কট্টর মুসলিম সাইয়্যিদা হামিদকে ক্যাবিনেট মন্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া হয় এবং তাঁকে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য করা হয়।

এই সাইয়্যিদা হামিদই বলেন যে এই পৃথিবী আল্লাহ তৈরি করেছেন, তাই বাংলাদেশি মুসলমানদেরও ভারতে থাকার অধিকার আছে এবং তাদের দেশ থেকে বের করে দেওয়া যায় না।

যাঁরা এখনো মনে করেন যে রাহুল গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী হওয়া উচিত, তাঁদের এখন থেকেই ভবিষ্যতের পরিস্থিতির জন্য মানসিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করে নেওয়া উচিত। সাহেব, মাথা আপনার—তাই সিদ্ধান্তও আপনার।

— টুইটার থেকে ###


২০

ইরানে শাহ উৎখাত হয়েছিল কেন?

তেহরানের রাস্তায় তখন শুধু স্লোগান ছিল না, ছিল জমে থাকা কয়েক দশকের রাগ। যে রাগের মধ্যে ছিল দমন-পীড়নের স্মৃতি, বিদেশি প্রভাবের অপমান, দ্রুত বদলে যাওয়া সমাজের অস্বস্তি, আর এমন এক শাসকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ—যিনি দেশকে আধুনিক করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেই আধুনিকতার মূল্য ঠিক কতটা, তা জনগণের কাছ থেকে কখনো জিজ্ঞেস করেন নি।

১৯৭৯ সালে ইরানের শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির পতন শুধু একটি রাজতন্ত্রের অবসান ছিল না। সেটি ছিল এমন এক বিস্ফোরণ, যেখানে ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, জাতীয়তাবাদ, শ্রেণি-অসন্তোষ—সব একসঙ্গে মিলেছিল। শেষ পর্যন্ত যে আগুনে শাহ ভস্মীভূত হলেন, সেই আগুন তিনি নিজেই বহু বছর ধরে অজান্তে জ্বালিয়ে রেখেছিলেন।

শাহ বংশের কথিত যুবরাজ রেজা পাহলভি যার পিতা শেষ শাহ মুহাম্মদ রেজা পাহলভির সন্তান- ইরানে সরকার পতনের অপেক্ষায় আছেন। আশা করছেন তাকে আবার ক্ষমতায় বসানো হবে। কিন্তু ইরানি জনগণ তার পিতার ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাটের কথা ভুলে গিয়েছে একথা এখনই তার আশা করা অপরিপক্কতা।

ইরানে ইসলামি বিপ্লাবের পেছনে যেসব বিষয় কাজ করেছে:

১. রাজনৈতিক স্বৈরাচার ও দমন-পীড়ন:

শাহের ইরানকে বাইরে থেকে দেখলে এক ধরনের সাফল্যের গল্প মনে হতো।

রাস্তা হচ্ছে, শিল্প হচ্ছে, শিক্ষা বাড়ছে, নারীদের জন্য নতুন অধিকার আসছে, শহর বড় হচ্ছে, পশ্চিমা দুনিয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশ “আধুনিক” হচ্ছে। কিন্তু এই চকচকে ছবির পেছনে আরেকটি বাস্তবতা ছিল—রাজনৈতিক স্বাধীনতা ক্রমে সংকুচিত হচ্ছিল।

শাহের শাসনামলে রাজনৈতিক স্বাধীনতার চরম অভাব ছিল। হিটলারে মত তার গোপন পুলিশ বাহিনী 'সাভাক' (SAVAK) ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর নির্মম নির্যাতন, জেল ও হত্যাকাণ্ড চালাত। এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষ ও বুদ্ধিজীবী মহলে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়।

২. পশ্চিমাভিমুখিতা ও 'হোয়াইট রেভল্যুশন':

শাহ ইরানকে দ্রুত আধুনিকায়ন করতে চেয়েছিলেন, যা 'শ্বেত বিপ্লব' নামে পরিচিত। কিন্তু এই আধুনিকায়ন ছিল অতিমাত্রায় পশ্চিমা ঘেঁষা। ইরানের রক্ষণশীল ধর্মীয় সমাজ মনে করত শাহ ইসলামি মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়ে দেশটিতে 'পাশ্চাত্য সংস্কৃতি' চাপিয়ে দিচ্ছেন। এর ফলে আলেম সমাজ এবং সাধারণ ধার্মিক জনগণ তার বিরুদ্ধে চলে যায়।

৩. অর্থনৈতিক বৈষম্য ও মুদ্রাস্ফীতি

সত্তরের দশকে তেলের দাম বাড়ায় ইরানের আয় প্রচুর বাড়লেও সেই অর্থ সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। বরং দুর্নীতির কারণে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ ধনাঢ্য হয়ে ওঠে এবং বিশাল একটি অংশ দরিদ্র থেকে যায়। আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও শ্রমিক শ্রেণি শাহের ওপর আস্থা হারায়।

৪. আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্ব:

নির্বাসিত ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি শাহ-বিরোধী আন্দোলনের প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। ক্যাসেট বন্দি বক্তৃতার মাধ্যমে তিনি দেশের মানুষের কাছে শাহের অপশাসনের চিত্র তুলে ধরতেন এবং "ইসলামি শাসন" প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখাতেন। তার ডাক ইরানের সব স্তরের মানুষকে (বামপন্থী থেকে কট্টরপন্থী) এক মঞ্চে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল।

৫. বিদেশি প্রভাব ও জাতীয়তাবাদ:

ইরানিদের মধ্যে একটি প্রবল ধারণা ছিল যে শাহ আমেরিকার হাতের পুতুল। ১৯৫৩ সালে জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে হটিয়ে শাহকে ক্ষমতায় ফেরাতে সিআইএ (CIA) যে ভূমিকা রেখেছিল, তা ইরানিরা ভোলেনি। এই বিদেশি হস্তক্ষেপ থেকে মুক্তি পেতে জাতীয়তাবাদী চেতনা সাধারণ মানুষকে আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করে। বস্তুত তার সরকার স্বাধীন ছিল না, পশ্চিমা শক্তির কাছেই পরাধীন ছিল, তারা দখলদার ইজরায়েলের সাথেও সম্পর্ক করেছিল।

৬. অতি-সামরিকায়ন:

সেই সময় ইরানের মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো উপেক্ষিত হচ্ছিল। শাহ দেশের সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদার চেয়ে আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র কেনায় বেশি আগ্রহী ছিলেন। ইরানের অর্থনীত তখনও ওই ভার সইতে উপযুক্ত ছিল না। জনকল্যাণের চেয়ে সামরিক শক্তিতে অতি-বিনিয়োগ দেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছিল, যা জনগণের অসন্তোষ আরও বাড়িয়ে দেয়।

পরিণাম:

১৯৭৮ সাল থেকে শুরু হওয়া গণবিক্ষোভ ও ধর্মঘট ইরানকে অচল করে দেয়। অবশেষে উপায় না দেখে ১৯৭৯ সালের ১৬ জানুয়ারি শাহ সপরিবারে ইরান ত্যাগ করেন। এর কিছুদিন পর আয়াতুল্লাহ খোমেনি ইরানে ফিরে আসেন এবং গণভোটের মাধ্যমে ইরানকে একটি 'ইসলামি প্রজাতন্ত্র' হিসেবে ঘোষণা করা হয়। @ বইকাল



বাওবাব: মাদাগাস্কারের প্রাচীন প্রহরী

মাদাগাস্কারের মেনাবে অঞ্চলের রুক্ষ ধুলোবালি ওড়া রাস্তায় দাঁড়ালে মনে হবে আপনি কোনো এক ভিন্ন গ্রহে পা রেখেছেন। গোধূলির আলো যখন দিগন্তে মিলিয়ে যেতে শুরু করে, তখন দীর্ঘ ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে থাকে কিছু দানবীয় অবয়ব। স্থানীয়রা বলেন, সৃষ্টিকর্তা যখন পৃথিবী বানাচ্ছিলেন, তখন শয়তান এসে বাওবাব গাছগুলোকে উপড়ে উল্টো করে পুঁতে দিয়েছিল। তাই এদের ডালপালাগুলো দেখতে অনেকটা শিকড়ের মতো, যা আকাশের দিকে তৃষ্ণার্ত আঙুল বাড়িয়ে থাকে।

মাদাগাস্কারকে বলা হয় 'বিবর্তনের গবেষণাগার', আর এই দ্বীপের সবচেয়ে বিস্ময়কর সৃষ্টি হলো অ্যাডানসোনিয়া (Adansonia) বা বাওবাব। বিশ্বে মোট আট প্রজাতির বাওবাব পাওয়া যায়, যার মধ্যে ছয়টিই পৃথিবীর আর কোথাও নয়, কেবল এই দ্বীপেই দেখা যায়। এদের মধ্যে সবচেয়ে রাজকীয় হলো গ্র্যান্ডিডিয়ার বাওবাব (Adansonia grandidieri)।

এই গাছগুলো কেবল উদ্ভিদ নয়, একেকটি জীবিত জলভাণ্ডার। একেকটি বাওবাব তার স্পঞ্জের মতো নরম কান্ডে প্রায় ১,২০,০০০ লিটার পর্যন্ত পানি জমিয়ে রাখতে পারে, যা দিয়ে তারা মাদাগাস্কারের দীর্ঘ ও কঠোর শুষ্ক মৌসুম অনায়াসে পার করে দেয়।

মরুদ্যানের প্রাণকেন্দ্র:

বাওবাব গাছকে কেন 'লাইফ অফ ট্রি' বা জীবনবৃক্ষ বলা হয়, তা এর ছায়ার নিচে দাঁড়ালে বোঝা যায়। এটি একটি সম্পূর্ণ ইকোসিস্টেম বা বাস্তুসংস্থান:

পরাগায়ন: রাতের আঁধারে যখন এর বড় বড় সাদা ফুল ফোটে, তখন লেমুর এবং ফলখেকো বাদুড়রা এর সুধা পান করতে ছুটে আসে। বিনিময়ে তারা বয়ে নিয়ে যায় জীবনদায়ী পরাগ।

আশ্রয়: বিশালাকার কান্ডে বাসা বাঁধে বিরল প্রজাতির পাখি এবং মৌমাছি।

মানুষের বন্ধু: স্থানীয় মালাগাছিদের কাছে এটি পবিত্র। এর বাকল দিয়ে তৈরি হয় শক্ত দড়ি, পাতা ব্যবহৃত হয় ভেষজ ওষুধ হিসেবে, আর ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ ফল যা 'মাঙ্কি ব্রেড' নামে পরিচিত, তা পুষ্টির এক বড় উৎস।

"বাওবাব আমাদের কাছে শুধু গাছ নয়, তারা আমাদের পূর্বপুরুষদের আত্মা বহনকারী নীরব সাক্ষী।" — স্থানীয় এক গ্রামপ্রধানের উক্তি।

হুমকির মুখে প্রাচীন আভিজাত্য

মাদাগাস্কারের 'অ্যাভিনিউ অফ দ্য বাওবাবস' পর্যটকদের জন্য স্বর্গরাজ্য হলেও, এর নেপথ্যের বাস্তবতা বেশ রূঢ়। এক সময় এই গাছগুলো ঘন রেইনফরেস্টের অংশ ছিল। কিন্তু গত কয়েক দশকে মানুষের আগ্রাসন, কৃষিকাজের জন্য বন উজাড় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই মহীরুহরা আজ কোণঠাসা।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই গাছগুলোর কোনো নতুন চারা বা 'তরুণ প্রজন্ম' খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। পুরনো গাছগুলো হাজার বছর ধরে টিকে থাকলেও, গবাদি পশুর অবাধ বিচরণ ও বন ধ্বংসের কারণে নতুন চারাগুলো বড় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না।

শেষ কথা

মাদাগাস্কারের দিগন্তে যখন বাওবাবের বিশালাকার অবয়বগুলো ঝাপসা হয়ে আসে, তখন এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা কাজ করে। এই প্রাচীন প্রহরীরা কয়েক শতাব্দী ধরে দ্বীপের রোদ-বৃষ্টি সয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু আধুনিক পৃথিবীর দ্রুত পরিবর্তনের সাথে পাল্লা দেওয়া তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ছে। এই অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করা কেবল মাদাগাস্কারের দায়িত্ব নয়, বরং পুরো বিশ্বের কাছে এক বড় চ্যালেঞ্জ।

মাদাগাস্কারের বাইরেও বাওবাব গাছের অস্তিত্ব রয়েছে, তবে প্রজাতি এবং গঠনশৈলীতে রয়েছে বিস্তর ফারাক। সারাবিশ্বে মূলত আটটি প্রজাতির বাওবাব পাওয়া যায়, যার একটি বিশাল অংশ মাদাগাস্কারের একান্ত নিজস্ব বা এন্ডেমিক।

১. আফ্রিকান বাওবাব (Adansonia digitata)

এটি বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত এবং বিস্তৃত প্রজাতির বাওবাব। এটি মূলত আফ্রিকা মহাদেশের মূল ভূখণ্ডে পাওয়া যায়।

দেশসমূহ: দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে, বতসোয়ানা, নামিবিয়া, কেনিয়া এবং সেনেগাল।

বৈশিষ্ট্য: মাদাগাস্কারের সরু ও লম্বা গ্র্যান্ডিডিয়ার বাওবাবের তুলনায় আফ্রিকান বাওবাব অনেক বেশি স্থূলকায় এবং এর ডালপালা অনেক বেশি বিস্তৃত হয়। এই গাছগুলো কয়েক হাজার বছর বাঁচতে পারে।

   বিশেষত্ব: বর্তমানে এটি ওমান এবং ইয়েমেনের কিছু অংশেও দেখা যায়, যা কয়েক শতাব্দী আগে মানুষ বা সমুদ্রের স্রোতের মাধ্যমে সেখানে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হয়।

২. অস্ট্রেলীয় বাওবাব (Adansonia gregorii)

আফ্রিকা এবং মাদাগাস্কারের বাইরে একমাত্র অস্ট্রেলিয়াতে প্রাকৃতিকভাবে বাওবাব জন্মায়। স্থানীয়ভাবে একে 'বোয়াব' (Boab) বলা হয়।

অঞ্চল: এটি মূলত পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার কিম্বার্লি (Kimberley) অঞ্চলে এবং নর্দান টেরিটরিতে দেখা যায়।

বৈশিষ্ট্য: আফ্রিকান প্রজাতির তুলনায় এটি আকারে বেশ ছোট হয় এবং এর কান্ড অনেকটা বোতলের মতো স্ফীত থাকে।

ঐতিহাসিক রহস্য: বিজ্ঞানীরা এখনো গবেষণা করছেন কীভাবে এই গাছটি আফ্রিকা থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছালো। ধারণা করা হয়, লাখ লাখ বছর আগে সমুদ্রের স্রোতে এর বীজ ভেসে সেখানে গিয়েছিল।

মজার তথ্য: ভারতের বাওবাব

আপনি জানলে অবাক হবেন যে, ভারতেও কিছু প্রাচীন বাওবাব গাছ দেখা যায়। বিশেষ করে গুজরাট, মহারাষ্ট্র (মুম্বাইয়ের কিছু এলাকায়) এবং মধ্যপ্রদেশের মাণ্ডু শহরে বিশালাকার বাওবাব গাছ রয়েছে। তবে এগুলো ভারতের আদি উদ্ভিদ নয়। ধারণা করা হয়, কয়েকশো বছর আগে আরব বণিক বা আফ্রিকান দাসরা এই বীজগুলো ভারতে নিয়ে এসেছিলেন। @ বইকাল


২২

দুই দেশের এক দ্বীপ কিন্তু চারটা অথরিটি।

এক দ্বীপে দুই দেশের আরেকটি উদাহরণ হল সাইপ্রাস। যদিও দেশ দুটো কিন্তু অথরিটি চারটা। দেশ দুটো হল উত্তর সাইপ্রাস ও দক্ষিণ সাইপ্রাস। এর মধ্যে উত্তর সাইপ্রাস একটি ডি ফ্যাক্টো স্বাধীন দেশ কিন্তু স্বীকৃতি নেই বললেই চলে, শুধু তুর্কি দেশটির স্বীকৃতি দিয়েছে। আর ম্যাপে দেখানো সবুজ এলাকা যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রণে, ও নীল এলাকা জাতিসংঘ নিয়ন্ত্রীত বাফার জোন।

দ্বীপটি বড় না, ছোটই। যদিও ইউরোপে ধরা হয়, তবু অবস্থান এশিয়ারই বেশি ঘনিষ্ট বলা চলে।

সাইপ্রাস দ্বীপটি ঐতিহাসিকভাবে গ্রিক সাইপ্রিয়ট এবং তুর্কি সাইপ্রিয়ট এই দুই জাতিগোষ্ঠীর আবাসস্থল।

গ্রিক সাইপ্রিয়টরা দ্বীপটিকে গ্রিসের সাথে যুক্ত করতে চেয়েছিল (এনোসিস), আর তুর্কি সাইপ্রিয়টরা এর বিরোধিতা করে বিভাজন বা তুরস্কের সাথে একীভূত হতে চেয়েছিল (তাকসিম)। এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে অবিশ্বাস ও সংঘাত দীর্ঘকাল ধরে বিদ্যমান ছিল।

বিভাজনের মূল কারণ হলো ১৯৭৪ সালে গ্রিক সামরিক জান্তার মদদে গ্রিক সাইপ্রিয়ট জাতীয়তাবাদীরা সাইপ্রাসের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট তৃতীয় মাকারিয়ুসকে উচ্ছেদ করে দ্বীপটিকে গ্রিসের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করে।

গ্রিক অভ্যুত্থানের প্রতিক্রিয়ায়, ১৯৬০ সালের গ্যারান্টি চুক্তি অনুসারে সাংবিধানিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার অজুহাতে তুরস্ক দ্বীপের উত্তরাঞ্চলে সামরিক অভিযান চালায়।

এই অভিযানের ফলে দ্বীপটি কার্যত বিভক্ত হয়ে যায়। গ্রিক সাইপ্রিয়টরা উত্তর থেকে দক্ষিণে এবং তুর্কি সাইপ্রিয়টরা দক্ষিণ থেকে উত্তরে চলে যেতে বাধ্য হয়।

বর্তমান পরিস্থিতি:

বর্তমানে দ্বীপের উত্তর তৃতীয়াংশ (প্রায় ৩৭%) তুর্কি প্রজাতন্ত্রের উত্তর সাইপ্রাস (Turkish Republic of Northern Cyprus - TRNC) নামে তুরস্ক-সমর্থিত সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এই অঞ্চলটিকে শুধুমাত্র তুরস্কই একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

দ্বীপের বাকি অংশ সাইপ্রাস প্রজাতন্ত্র (Republic of Cyprus) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য।

জাতিসংঘ এলাকা ও ব্রিটিশ এলাকা কেন?

জাতিসংঘ বাফার জোন (Green Line):

জাতিসংঘের একটি এলাকা রয়েছে যা উত্তর ও দক্ষিণ সাইপ্রাসের মাঝখানে বাফার জোন (Buffer Zone) বা গ্রিন লাইন নামে পরিচিত।

কারণ: ১৯৭৪ সালের সামরিক সংঘাতের পর গ্রিক ও তুর্কি বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ এড়াতে এবং শান্তি বজায় রাখতে এই নিরপেক্ষ অঞ্চলটি তৈরি করা হয়েছিল।

পরিচালনা: এটি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী (UNFICYP) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং প্রায়শই এটি একটি "নো-ম্যান'স ল্যান্ড" হিসাবে বিবেচিত। রাজধানী নিকোসিয়াও এই বাফার জোনের মাধ্যমে বিভক্ত।

ব্রিটিশ সার্বভৌম বেস এলাকা (Sovereign Base Areas - SBAs):

সাইপ্রাস ভূখণ্ডে দুটি ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি রয়েছে—আক্রোটিরি (Akrotiri) এবং ডেকিলিয়া (Dhekelia)। এই এলাকাগুলি ব্রিটিশ সার্বভৌম বেস এলাকা (SBAs) নামে পরিচিত।

কারণ: সাইপ্রাস ১৯৬০ সালে ব্রিটেন থেকে স্বাধীনতা লাভ করার সময়, সামরিক ও কৌশলগত গুরুত্বের কারণে ব্রিটেন এই দুটি এলাকাকে চিরস্থায়ীভাবে নিজেদের সার্বভৌমত্বের অধীনে রেখে দেয়। স্বাধীন সাইপ্রাসকে দেয় নি।

উদ্দেশ্য: এই ঘাঁটিগুলি মধ্যপ্রাচ্য এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ব্রিটেনের সামরিক কার্যক্রম এবং গোয়েন্দা তথ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থান হিসেবে রেখে দিয়েছে। এই এলাকাগুলি সাইপ্রাস প্রজাতন্ত্র বা উত্তর সাইপ্রাস কোনোটিরই অংশ নয়। @ বইকাল


২৩

কুর্দি বা কুর্দস কারা?

কুর্দিদের নিয়ে অনেকে মধ্যে ভুল ধারণা আছে। আমারই পরিচিত একজন এটাকে একটা আলাদা ধর্ম মনে করে। কুর্দি একটি জাতি। মধ্যপ্রাচ্যে শুধু আরবরাই বাস করে না, আরব ছাড়াও আরও কয়েকটি ছোট বড় জাতি আছে। কুর্দিরা হল আরব-মধ্যপ্রাচ্য এলাকার একটি অনারব জাতি। যেমন আমরা বাঙালিরা একটি জাতি। কুর্দিরা মুলত মুসলিম।

কুর্দিরা প্রায়ই আন্তর্জাতিক খবরের শিরোনাম হয়। তাদের পরিচয় জানব আমরা এই লেখায়।

আমরা কিন্তু একজন কুর্দিকে খুব ভাল ভাবে চিনি, তাকে নিয়ে গর্বও করি। তিনি সালাহউদ্দিন আয়ুবি, ক্রুসেডারদের পরাজিত করে জেরুজালেম বিজয়ী মহাবীর সালাহউদ্দিন। তিনি আরব ছিলেন না, একজন কুর্দি।

কুর্দি—বিশ্বের বৃহত্তম ‘রাষ্ট্রহীন’ জাতিগোষ্ঠী। তুরস্ক, ইরান, ইরাক এবং সিরিয়ার পার্বত্য অঞ্চলে বিভক্ত এই জাতিটির জীবনগাথা যেমন বীরত্বের, তেমনি বঞ্চনার।

পরিচয় ও আদি নিবাস:

কুর্দিরা মূলত একটি ইন্দো-ইউরোপীয় নৃগোষ্ঠী। তারা কোনোভাবেই আরব, তুর্কি বা পারস্য জাতিভুক্ত নয়। ঐতিহাসিকভাবে তারা ‘মেসোপটেমিয়া’র উত্তরাঞ্চল এবং জাগ্রোস পর্বতমালা সংলগ্ন এলাকায় বসবাস করে আসছে। এই ভৌগোলিক অঞ্চলটিকে ঐতিহাসিকভাবে ‘কুর্দিস্তান’ বলা হয়, যা বর্তমানে চারটি দেশের সীমান্তে বিভক্ত।

বিস্তৃতি: চার দেশে বিভক্ত:

বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩ থেকে ৪ কোটি কুর্দি মানুষের বসবাস। তাদের ভৌগোলিক বিস্তৃতি মূলত চার ভাগে বিভক্ত:

১. তুরস্ক (উত্তর কুর্দিস্তান): এখানে কুর্দিদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি (প্রায় ১.৫ থেকে ২ কোটি)।

২. ইরান (পূর্ব কুর্দিস্তান): দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে বিশাল এক কুর্দি জনগোষ্ঠী বাস করে।

৩. ইরাক (দক্ষিণ কুর্দিস্তান): সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর এখানে তারা একটি ‘স্বায়ত্তশাসিত’ অঞ্চল (KRG) গঠন করতে সক্ষম হয়েছে।

৪. সিরিয়া (পশ্চিম কুর্দিস্তান): উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় ‘রোজাতা’ নামে পরিচিত অঞ্চলে তারা বর্তমানে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।

ভাষা ও ধর্ম:

কুর্দিদের প্রধান ভাষা ‘কুর্দি’, যার রয়েছে শক্তিশালী সাহিত্যিক ভিত্তি। তবে ভৌগোলিক কারণে এর বেশ কিছু উপভাষা তৈরি হয়েছে, যার মধ্যে কুর্মানজি ও সোরানি প্রধান। এছাড়া জাজাকি ও গোরানি নামের আরও কিছু আঞ্চলিক উপভাষাও রয়েছে।

ধর্মীয়ভাবে কুর্দিদের সিংহভাগ সুন্নি মুসলিম। বিশেষ করে শাফেয়ি মাজহাব অনুসরণকারী সুন্নির সংখ্যা বেশি। তবে তাদের মধ্যে শিয়া মুসলিম, আলবীয় এবং ইয়াজিদি ধর্মাবলম্বী রয়েছে স্বল্প পরিমাণে।

সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট:

কুর্দি সমাজ মূলত গোত্রভিত্তিক হলেও গত কয়েক দশকে সেখানে আধুনিক রাজনৈতিক চেতনার ব্যাপক বিকাশ ঘটেছে। কুর্দিদের সংস্কৃতি পার্বত্য অঞ্চলের ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। রঙিন ঐতিহ্যবাহী পোশাক, লোকসঙ্গীত, নৃত্য এবং মৌখিক সাহিত্য তাদের সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রাজনৈতিক সংকট:

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২০ সালের ‘সেভ্রেস চুক্তিতে’ কুর্দিদের জন্য আলাদা রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও পরবর্তীতে ‘লুজান চুক্তির’ মাধ্যমে তা বাতিল করা হয়। এরপর থেকেই তারা তুরস্ক, ইরান ও সিরিয়ায় দমন-পীড়নের শিকার হয়ে আসছে। ইরাকে তারা সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেলেও তুরস্ক ও সিরিয়ায় তাদের রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র সংগ্রাম হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট, রাশিয়ার মত পরাশক্তিগুলো বার বার নিজেদের দরকারে কুর্দিদের ব্যবহার করেছে, ব্যবহার শেষে তাদের ছুড়ে ফেলেছে। কুর্দিদের এই দীর্ঘ ইতিহাস মূলত এক মরীচিকার পেছনে ছোটার গল্প, যেখানে রাষ্ট্রহীন এই জাতি বারবার পরাশক্তিদের স্বার্থের গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আর পরাশক্তিরা ত্যাগ করার পর বার বার ব্যাপক নির্যাতনের মুখে পড়েছে।

বিভিন্ন দেশে কুর্দি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে ওঠেছে। তুরস্কে কুর্দি রাজনৈতিক আন্দোলনের একটি উল্লেখযোগ্য সংগঠন হলো Kurdistan Workers' Party (PKK), যা বহু বছর ধরে তুর্কি সরকারের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত। তবে বর্তমানে সেখানে সরকারের সাথে চুক্তির পর শান্তি বিরাজ করছে। অন্যদিকে ইরাকে কুর্দিরা তুলনামূলকভাবে বেশি রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন অর্জন করেছে। ২০০৩ সালের পর সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয় Kurdistan Regional Government (KRG), যা উত্তর ইরাকের একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রশাসন পরিচালনা করে। সিরিয়ায় নতুন শার আল শারার সরকারও কুর্দিদের সাথে সমঝোতা, অধিকতর অধিকার দানের মাধ্যমে শান্তির দিকে যাচ্ছে। @ বইকাল


২৪

উপমহাদেশে দিনেমারদের ইতিহাস

উপমহাদেশে ইউরোপ থেকে জলপথে প্রথম আসে পর্তুগিজরা, তারপর ওলন্দাজরা, তারপরই আসে এক স্বল্পআলোচিত নাম- দিনেমার-রা. দিনেমররা আসলে ডেনিশ, তাদের দেশের নাম ডেনমার্ক। এই ডেনমার্ক থেকেই হয়তো অন্য কোনো জাতি তাদের "দিনেমার" বলত, উচ্চারণে মিল আছে। সম্ভবত পর্তুগিজরা, ওরাই তো আগে এসে বাকি ইউরোপের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। ডেনমার্কে অবশ্য দিনেমার নামে একটা গ্রাম আছে। যাই হোক, এই অজ্ঞানতা আমার ব্যক্তিগত, আপনারা জানতেন না তা বলছি না।

উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের এইচএসসি'র বইয়ে লেখা আছে-

"ডেনমার্কের অধিবাসীদের দিনেমার বলা হয়। ১৬১৬ খ্রিস্টাব্দে দিনেমারগণ উপমহাদেশে বাণিজ্য করার জন্য ‘দিনেমার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ গঠন করে এবং দক্ষিণ ভারতের ত্রিবাঙ্কুরে ও কলকাতার শ্রীরামপুরে তাদের বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে। অবশেষে দিনেমারগণ কোন প্রকার বাণিজ্যিক সফলতা ছাড়াই এদেশ থেকে চিরতরে বিদায় নেয়। "

বাংলায় যখন দিনেমার'রা এসেছিল তখন নরওয়ে ডেনমার্কের অধীনে ছিল। সেই হিসেবে শুধু ডেনমার্কের লোকজন এসেছি এটা জোর দিয়ে বলা যায় না, তাদের মধ্যে নরওয়ের লোকজনও থেকে থাকবে।

উপমহাদেশের লাভজনক মসলা ব্যবসার কথা শুনে ১৬১৬ সালে ডেনমার্ক তথা ড্যানিশ-নরওয়েজিয়ান ইউনিয়নের রাজা চতুর্থ ক্রিশ্চিয়ান ড্যানিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গঠনের নির্দেশ দেন। উদ্দেশ্য ছিল তৎকালীন সিলন (বর্তমান শ্রীলংকা) এবং ভারতে গোল মরিচ ও এলাচসহ নানা মসলার বাণিজ্য করা।

১৬৪৮ সালে রাজা চতুর্থ ক্রিশ্চিয়ান মারা যাওয়ার পর ড্যানিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে যায়। এর দুই বছর পর তার ছেলে রাজা তৃতীয় ফ্রেডারিক কোম্পানিটি বন্ধ করার ঘোষণা দেন।

দিনেমররা বাংলায় জলদস্যুতাও করেছে। ক্রীতদাসও বানাত (সূত্র: বাংলাপিডিয়া)।

পরবর্তীতে তারা আবার শুরু করে। আরেকটি ড্যানিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি স্থাপনের মাধ্যমে ডেনমার্ক-নরওয়ে এবং ট্র্যানকুয়েবারের মধ্যকার বাণিজ্য আবার শুরু হয়। গঠিত হতে থাকে নতুন নতুন বাণিজ্যকুঠি। ১৬৭৬ সালে বাংলায় কুঠি স্থাপন করে। ১৬৯৮ সাল নাগাদ তারা মোট তিন জায়গায় কুঠি স্থাপন করে।

১৭৫৫ সালে দিনেমাররা পশ্চিমবঙ্গের শ্রীরামপুরে আসে। জমি পেতে ও ব্যবসার জন্য ফরমান সংগ্রহে তাদের ১৬ হাজার পাউন্ড খরচ করতে হয়েছিল। ১৭৫৫ সালের ৮ অক্টোবর দিনেমারদের পতাকা ওড়ে। হুগলি নদীর তীরে অবস্থিত এ অঞ্চলটি ১৭৫৫ থেকে ১৮৪৫ সাল পর্যন্ত ড্যানিশ উপনিবেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তখন এর নাম ছিল ডেনমার্কের রাজার নামে "ফ্রেডারিকনগর"।

বাংলার তৎকালীন মোঘল শাসক ‘শায়েস্তা খাঁ’র সঙ্গে তাঁদের বিশেষ বনিবনা না হওয়ার জন্য, বঙ্গদেশে ব্যবসায়ে তাঁরা খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারেননি। ফলে একপ্রকার নিরাশ হয়েই ১৭১৪ খৃষ্টাব্দে তাঁরা সুবা বাংলা থেকে বিদায় নিলেও, পরে অবশ্য পুনরাগমন করেছিলেন। ইংল্যাণ্ডের দেখাদেখি তাঁরা আফ্রিকার উপকূলে ক্রিশ্চিয়ানবর্গ, অগষ্টেনবর্গ, ফ্রেডেন্সবর্গ প্রভৃতি ছোট ছোট কয়েকটি ঘাঁটিও তৈরী করেছিলেন, কিন্তু কোথাও তাঁদের ব্যবসা জমজমাট হয় নি। ফলে পরে সেগুলিকে তাঁদের ইংরেজদের কাছেই বিক্রি করতে হয়েছিল।

ইংরেজরা ১৮০১ সালে ডেনমার্কে হামলা করে, তারপর আবার ১৮০৭ সালে হামলা করে, ডেনমার্ক হেরে যায়। তার উপর দিনেমররা উপমহাদেশে বাণিজ্যে সুবিধা করতে না পেরে ১৮৪৫ সালে ইংরেজদের কাছেই কুঠিগুলো বিক্রি করে ভারত ছাড়ে।

উপমহাদেশে দিনেমারদের ইতিহাস কম আলোচিত হলেও সুদীর্ঘকাল তারা ব্যবসা করেছে। দেশীয় শাসক ও অন্যান্য ইউরোপিয় শক্তিগুলোর সাথে তাদের দ্বন্দ্ব অনেক ঘটনার জন্ম দিয়েছে। সেসব নিয়ে বিস্তারিত বই লেখার সুযোগ আছে, তেমন কোনো বইয়ের সন্ধান আমার জানা নেই। এটা শুধু একটা পরিচিতিমূলক লেখা মাত্র। @ বইকাল



২৫

 “নিউ ইয়র্ক” নামটি কীভাবে এলো? 

ছিল কয়েকটি সবুজে ঢাকা দ্বীপ, সেখানে বাস করত লেনাপে জাতির লোকেরা। প্রকৃতিতে মিশে ভালই ছিল। তারপর একদিন জাহাজে করে এল ইউরোপিয়রা। আজকের New York City—আকাশচুম্বী অট্টালিকা, ওয়াল স্ট্রিট, টাইমস স্কয়ার—সব মিলিয়ে আধুনিক বিশ্বের প্রতীক। কিন্তু এই শহরের নামটাই যেন এক ইতিহাসের দরজা। “নিউ ইয়র্ক” নামটি কীভাবে এলো? এর আগে কী ছিল? আর এই শহরের আসল শুরুটা কোথায়? চলুন, সময়ের পেছনে হাঁটি।

যখন এটি ছিল “মানাহাটা”:

ইউরোপীয়দের অনেক আগে, আজকের নিউ ইয়র্কের জায়গায় ছিল এক সম্পূর্ণ ভিন্ন জগৎ। Manhattan দ্বীপটির নাম ছিল “Manahatta”—এই নাম দিয়েছিল Lenape আদিবাসীরা।

“Manahatta” শব্দের অর্থ নিয়ে নানা ব্যাখ্যা আছে, তবে সাধারণভাবে ধরা হয়—“অনেক পাহাড়ের দ্বীপ”।

এই লেনাপে জনগোষ্ঠী ছিল প্রকৃতিনির্ভর—নদী, বন আর মৌসুমি কৃষির ওপর নির্ভর করেই তাদের জীবন চলত। তারা এই দ্বীপকে শহর বানানোর কথা ভাবেনি, বরং এটিকে তারা ব্যবহার করত জীবনের অংশ হিসেবে।

ডাচদের আগমন: “নিউ আমস্টারডাম”

১৭শ শতকে ইউরোপীয়রা এলো—ব্যবসার খোঁজে। Dutch West India Company এই অঞ্চলে বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ে তোলে এবং দ্বীপটির নতুন নাম দেয়—Nieuw Amsterdam (New Amsterdam)।

এই নামটি নেওয়া হয়েছিল নেদারল্যান্ডসের রাজধানী Amsterdam–এর নাম অনুসারে।

১৬২৬ সালে ডাচ গভর্নর Peter Minuit কথিতভাবে লেনাপেদের কাছ থেকে ম্যানহাটন “কিনে” নেন। যদিও ইতিহাসবিদরা বলেন, এটি হয়তো দুই পক্ষের ভিন্ন বোঝাপড়ার ফল—লেনাপেরা জমিকে স্থায়ীভাবে বিক্রি করার ধারণা রাখত না। আমেরিকার মাটিতে আদিবাসীদের কাছ থেকে ইউরোপিয়দের ভূমি কেনা এক হাস্যকর নির্দয় প্রক্রিয়া। তবুও, এই ঘটনাকে অনেকেই নিউ ইয়র্ক শহরের আনুষ্ঠানিক শুরুর প্রতীক হিসেবে দেখেন।

১৬৬৪: আবার নাম বদল

নিউ আমস্টারডাম বেশিদিন ডাচদের হাতে থাকেনি। ১৬৬৪ সালে ইংরেজরা এসে কোনো বড় যুদ্ধ ছাড়াই এই উপনিবেশ দখল করে নেয়। এরপরই শহরের নাম পাল্টে দেওয়া হয়—New York।

এই নামটি রাখা হয় ইংল্যান্ডের রাজা Charles II–এর ভাই James, Duke of York–এর সম্মানে। তখন তিনি ছিলেন “ডিউক অব ইয়র্ক”, এবং এই অঞ্চলটি তাকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল।

“York” থেকে “New York”:

“York” নামটি এসেছে ইংল্যান্ডের উত্তর দিকের রোমান যুগের শহর York থেকে। অর্থাৎ “New York” মানে দাঁড়ায়—পুরনো ইয়র্কের নতুন সংস্করণ। একটি ইউরোপীয় নাম, নতুন পৃথিবীর মাটিতে বসানো।

আজকের নিউ ইয়র্কে দাঁড়িয়ে “Manahatta” বা “New Amsterdam” খুঁজে পাওয়া কঠিন। তবুও, শহরের ইতিহাসের ভেতরে এই নামগুলো এখনো বেঁচে আছে। নিউ ইয়র্কে পতাকায় এখনও নেদারল্যান্ডের পতাকার তিন রঙ রয়ে গিয়েছে।

রাস্তার নাম, জাদুঘর, আর ইতিহাসের পাতায়—এই শহর মনে করিয়ে দেয়, তার পরিচয় একদিনে তৈরি হয়নি। @ বইকাল


২৬

একজন মানুষের নামে একটি দেশের নাম

মানুষের নামে গ্রামের নাম, শহরের নাম, জেলার নাম আছে লক্ষ লক্ষ, কিন্তু দেশের জাতির পরিচয় হয়ে উঠতে পারে কীভাবে? পৃথিবীতে বর্তমানে এমন দেশ আছে প্রায় ৯টি, যেগুলোর নামকরণ করা হয়েছে নির্দিষ্ট কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তি বা শাসকের নাম অনুসারে। দেশেগুলো হল:

১. ফিলিপাইন (Philippines)

স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের (King Philip II) নামানুসারে এই দেশটির নামকরণ করা হয়েছে। ১৫৪২ সালে স্পেনীয় অভিযাত্রীরা এই দ্বীপপুঞ্জটির নাম দেন 'লাস ইসলাস ফিলিপিনাস'।

২. সৌদি আরব (Saudi Arabia)

এই দেশটির নাম এসেছে আধুনিক সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ বিন সৌদ (Ibn Saud) বা 'সৌদ' বংশের নাম থেকে। ১৯৩২ সালে এই নামকরণ করা হয়।

৩. বলিভিয়া (Bolivia)

দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটির নাম রাখা হয়েছে বিখ্যাত বিপ্লবী নেতা সাইমন বলিভারের (Simon Bolivar) সম্মানে, যিনি দক্ষিণ আমেরিকার বেশ কিছু দেশকে স্পেনীয় শাসন থেকে মুক্ত করতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

৪. কলম্বিয়া (Colombia)

ভাগ্যানেষী ইতালিয় নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাসের (Christopher Columbus) নামানুসারে এই দেশটির নামকরণ করা হয়েছে।

৫. মরিশাস (Mauritius)

১৫৯৮ সালে ওলন্দাজরা  দ্বীপটি দখল করে এবং রাজপুত্র মরিটস অফ অরেঞ্জ (Maurice of Orange)-এর নামানুসারে এই দ্বীপরাষ্ট্রটির নাম রাখে 'মরিশাস'।

৬. সিশেলস (Seychelles)

ভারত মহাসাগরের এই দ্বীপরাষ্ট্রটির নাম ফ্রান্সের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী জ্যঁ মরো দ্য সেশেল (Jean Moreau de Séchelles)-এর নামানুসারে রাখা হয়েছে।

৭. মার্শাল আইল্যান্ডস (Marshall Islands)

ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন জন মার্শালের নামানুসারে এই দ্বীপরাষ্ট্রের নামকরণ করা হয়, যিনি ১৭৮৮ সালে এই দ্বীপগুলো পরিদর্শন করেছিলেন।

৮. সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস (Saint Kitts and Nevis)

Saint Kitts অংশটি এসেছে “Saint Christopher” থেকে, অর্থাৎ Saint Christopher-এর নামে।

“Kitts” হলো “Christopher”-এর সংক্ষিপ্ত রূপ।

Nevis এসেছে স্প্যানিশ শব্দ “Nuestra Señora de las Nieves” থেকে, যার অর্থ "Virgin Mary of the Snows”।

৯. কিরিবাস (Kiribati)

প্রশান্ত মহাসাগরের এই দেশটির নাম আগে ছিল গিলবার্ট আইল্যান্ডস। এই নামটি দেওয়া হয়েছিল ব্রিটিশ নাবিক Thomas Gilbert-এর নামে, যিনি ১৮শ শতকে এই দ্বীপপুঞ্জে আসেন। গিলবার্টকে স্থানীয়রা উচ্চারণ করত " কিরিবাস" যা ইংরেজি বানানে Kiribati. গিলবার্ট আইল্যান্ডস যখন স্বাধীন হয় তখন স্থানীয় উচ্চারণে নাম পাল্টে রাখে।

১০. আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র:

এটা শুধু একটা দেশের নাম না, দুটো মহাদেশের নাম।  আমেরিকা মহাদেশের নামকরণ করা হয়েছে ইতালীয় অভিযাত্রী এবং মানচিত্রকর আমেরিগো ভেসপুচি (Amerigo Vespucci)-এর নামানুসারে।

​১৫শ শতাব্দীর শেষভাগে যখন ক্রিস্টোফার কলম্বাস বর্তমান আমেরিকা অঞ্চলে পৌঁছান, তিনি ধারণা করেছিলেন যে তিনি এশিয়ার কোনো অংশে (ইন্ডিজ) পৌঁছেছেন। কিন্তু আমেরিগো ভেসপুচিই প্রথম ব্যক্তি যিনি যুক্তি দেন যে, এটি এশিয়া নয় বরং একটি সম্পূর্ণ 'নতুন বিশ্ব' বা নতুন মহাদেশ।

১৫০৭ সালে জার্মান মানচিত্রকর মার্টিন ওয়াল্ডসিমুলার (Martin Waldseemüller) একটি বিশ্ব মানচিত্র তৈরি করেন। তিনি ভেসপুচির এই নতুন আবিষ্কারের প্রতি সম্মান জানাতে দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের নাম দেন 'আমেরিকা' (Amerigo-এর স্ত্রীলিঙ্গ রূপ)।

প্রথমে এটি ছিল শুধু দক্ষিণ আমেরিকার নাম, পরো পুরো দুটো মহাদেশের নাম হয় আমেরিকা, উত্তর ও দক্ষিণ। দুটো মহাদেশের সবগুলো দেশকে একত্রে বলা হয় "আমেরিকাস", আর স্বাধীনতার পর দেশটির নাম রাখা হয় ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা।

১১. সান মারিনো:

সান মারিনো ইতালির ভেতরে একটা ছোট রাষ্ট্র। খ্রিস্টান সন্ত 'মারিনাস'-এর নাম অনুসারে এর রাজধানী শহরের পত্তন হয়েছিল। এটি বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন প্রজাতন্ত্র। মাউন্ট টিটানোর ওপর অবস্থিত এই প্রধান শহরের নামেই পুরো রাষ্ট্রের নাম রাখা হয়েছে।

অতীতে:

উপনিবেশিক আমলে ইউরোপিয় বেনিয়া সেসিল রোডসের নামে আফ্রিকার দুটো পরাধীন দেশের নাম রাখা হয়েছিল। দেশ দুটো হল- উত্তর রোডেশিয়া (১৯১১-১৯৬৪) ও দক্ষিন রোডেশিয়া (১৯২৩-৬৫ ও ১৯৭৯-৮০); যা বর্তমানে যথাক্রমে জাম্বিয়া ও জিম্বাবুয়ে। @ বইকাল


২৭

“New Zealand” নাম রাখা হয়েছিল কোন যায়গার নামে?

বিশ্ব মানচিত্রে “New Zealand” নামটি আজ খুবই পরিচিত—প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সবুজ পাহাড় আর বিচ্ছিন্ন দ্বীপজীবনের এক অনন্য প্রতীক। আর আমাদের কাছে পরিচিত ক্রিকেটের জন্য। কিন্তু এই নামটি কীভাবে এল? এটি কি স্থানীয় কোনো ভাষা থেকে এসেছে, নাকি ইউরোপীয়দের দেওয়া? এর পেছনের গল্পটি আসলে আবিষ্কার, ভুল ধারণা আর মানচিত্রের ইতিহাসে ভরপুর।

এক ভুল ধারণা থেকে শুরু:

১৬৪২ সালে ডাচ অভিযাত্রী আবেল তাসমান প্রথম ইউরোপীয় হিসেবে এই দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছান। তিনি এই নতুন ভূমির নাম দেন “Staten Landt”। তার ধারণা ছিল, এটি হয়তো দক্ষিণ আমেরিকার কাছাকাছি কোনো ভূমির সঙ্গে যুক্ত—যা সে সময় ইউরোপীয়দের কাছে রহস্যময় ও অজানা ছিল।

কিন্তু পরে এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। গবেষণা ও নতুন অভিযানের মাধ্যমে বোঝা যায়, এটি সম্পূর্ণ আলাদা একটি দ্বীপপুঞ্জ—বিশ্বের একেবারে অন্য প্রান্তে অবস্থিত।

ডাচ মানচিত্রকারদের দেয়া নতুন নাম:

এই ভুল সংশোধনের পর ডাচ মানচিত্রকাররা নতুন নাম খোঁজেন। তারা এই দ্বীপপুঞ্জের নাম দেন “Nova Zeelandia”—যা নেওয়া হয়েছিল নেদারল্যান্ডসের একটি উপকূলীয় প্রদেশ Zeeland থেকে।

“Zeeland” শব্দটির অর্থই হলো “সমুদ্রের দেশ” বা “Sea Land” আর "Nova" অর্থ "New"। তাই নতুন আবিষ্কৃত এই দ্বীপপুঞ্জের জন্য এই নামটি বেশ উপযুক্ত মনে হয়েছিল—কারণ এটিও ছিল সমুদ্রবেষ্টিত এক ভূমি। নেদারল্যান্ডসের Zeeland সমূদ্রের বুকে অনেকগুলো দ্বীপ নিয়ে জেগে থাকা এক বদ্বীপীয় অঞ্চল।

ব্রিটিশদের হাত ধরে স্থায়ী নাম:

পরবর্তীতে ১৮শ শতকে ব্রিটিশ অভিযাত্রী জেমস কুক এই দ্বীপগুলো বিস্তারিতভাবে অনুসন্ধান ও মানচিত্রে তুলে ধরেন। তার অভিযানের পর ব্রিটিশদের প্রভাব দ্রুত বাড়তে থাকে।

এই সময়েই “Nova Zeelandia” নামটি ইংরেজি উচ্চারণ ও ব্যবহারের মাধ্যমে রূপ নেয় “New Zealand”-এ। ধীরে ধীরে এই নামটিই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও স্থায়ী হয়ে যায়।

স্থানীয়দের দেওয়া আরেক নাম

যদিও “New Zealand” নামটি ইউরোপীয়দের দেওয়া, এই দ্বীপপুঞ্জের নিজস্ব একটি প্রাচীন নামও রয়েছে। স্থানীয় মাওরি জনগণ এই দেশকে বলে “Aotearoa”, যার অর্থ “লম্বা সাদা মেঘের দেশ”।

এই নামটি এসেছে তাদের প্রকৃতির সাথে গভীর সম্পর্ক থেকে—যেখানে আকাশ, মেঘ আর সমুদ্র মিলিয়ে এক অনন্য পরিচয় তৈরি করেছে। “Aotearoa” নামটি মনে করিয়ে দেয়—এই দেশের আসল গল্প শুরু হয়েছিল আরও আগে, যখন ইউরোপীয়রা এখনো সেখানে পৌঁছায়নি। @ বইকাল


২৮


এক শহর, দুই বিশ্ব: কেন ভাগ হয়েছিল বার্লিন?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বার্লিন—একটা শহর, যার রাস্তায় ধুলো ছিল, দেয়ালে ছিল গুলির চিহ্ন, আর মানুষের মনে ছিল এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তা। কিন্তু এই শহরের ভাগ্য আরও অদ্ভুত কিছু লিখে রেখেছিল ইতিহাস—একটি শহর, যা ভৌগোলিকভাবে এক জায়গায় থেকেও রাজনৈতিকভাবে হয়ে গেল দুই ভিন্ন বিশ্বের প্রতীক।

প্রশ্নটা সহজ: বার্লিন তো পুরোপুরি পূর্ব জার্মানির ভেতরে ছিল, তাহলে কেন সেটাকে ভাগ করা হয়েছিল?

উত্তরটা লুকিয়ে আছে যুদ্ধশেষের ক্ষমতার খেলায়।

যুদ্ধশেষে এক নতুন মানচিত্র:

১৯৪৫ সালে নাৎসি জার্মানির পতনের পর  হয়ে ওঠে বিজয়ী শক্তিগুলোর নিয়ন্ত্রণাধীন একটি দেশ। চারটি দেশ—

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও সোভিয়েত ইউনিয়ন —মিলে জার্মানিকে চারটি দখল অঞ্চলে ভাগ করে নেয়।

কিন্তু শুধু দেশ ভাগ করলেই তো হলো না—রাজধানী শহরের কী হবে?

উত্তরটা ছিল একই রকম:

জার্মানির মতোই বার্লিনকেও ভাগ করা হবে।

বার্লিন: ভৌগোলিকভাবে পূর্বে, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। এখানেই আসে সেই অদ্ভুত বাস্তবতা।

বার্লিন পুরোপুরি সোভিয়েত নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের ভেতরে ছিল। অর্থাৎ, মানচিত্রে এটি ছিল পূর্ব জার্মানির মাঝখানে একটি শহর। তবুও শহরটি চারটি সেক্টরে ভাগ করা হয়—

পশ্চিমাংশে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স; পূর্বাংশে সোভিয়েত ইউনিয়ন।

ফলে তৈরি হয় এক বিরল পরিস্থিতি:

পূর্ব জার্মানির ভেতরে পশ্চিমা শক্তির একটি “ছিটমহল”—West Berlin।

কেন এমন সিদ্ধান্ত?

প্রতীকী শক্তির লড়াই:

বার্লিন ছিল নাৎসি শাসনের কেন্দ্রবিন্দু। এই শহরের নিয়ন্ত্রণ মানে শুধু ভূখণ্ড নয়, ইতিহাসের ওপর নিয়ন্ত্রণ। তাই কোনো পক্ষই পুরো শহর ছেড়ে দিতে রাজি ছিল না।

আগেই নেওয়া সিদ্ধান্ত:

যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই Yalta Conference এবং Potsdam Conference-এ মিত্রশক্তিরা সিদ্ধান্ত নেয়—জার্মানি যেমন ভাগ হবে, বার্লিনও তেমন ভাগ হবে। তখনও ঠান্ডা যুদ্ধ শুরু হয়নি। তাই এই সিদ্ধান্তটা নেওয়া হয়েছিল পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব থেকেই—যদিও পরে সেটাই হয়ে ওঠে দ্বন্দ্বের কেন্দ্র।

একে অপরকে নজরে রাখা:

রাজনীতি সবসময় বিশ্বাসের ওপর চলে না, বরং নিয়ন্ত্রণের ওপর চলে।

পশ্চিমা শক্তিগুলো চায়নি যে সোভিয়েত ইউনিয়ন এককভাবে পুরো রাজধানী দখল করে রাখুক। আবার সোভিয়েতরাও পশ্চিমাদের পুরোপুরি বাইরে রাখতে পারেনি। ফলে শহরের ভেতরেই তৈরি হয় ক্ষমতার ভারসাম্য।

একটি শহর, দুই বাস্তবতা:

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বিভাজন কাগজ থেকে বাস্তবে নেমে আসে। একদিকে পশ্চিম বার্লিন—পুঁজিবাদী, পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রতীক। অন্যদিকে পূর্ব বার্লিন—সোভিয়েত প্রভাবাধীন সমাজতান্ত্রিক শাসনের অংশ।

এই দ্বৈত বাস্তবতা চরমে পৌঁছায় ১৯৬১ সালে, যখন হঠাৎ করেই শহরের মাঝখানে উঠে দাঁড়ায় বার্লিন দেয়াল—একটি দেয়াল, যা শুধু ইট-পাথরের ছিল না, বরং ছিল মতাদর্শের।

শেষ কথা: মানচিত্রের বাইরে এক গল্প

বার্লিনের বিভাজন কোনো ভৌগোলিক সিদ্ধান্ত ছিল না। এটি ছিল ক্ষমতা, প্রতীক আর রাজনীতির জটিল সমীকরণ।

একই শহরের দুই পাশে দুই পৃথিবী—

একদিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রিত বাস্তবতা।

আর সেই কারণেই, ইতিহাসের পাতায় বার্লিন শুধু একটি শহর নয়—এটি এক সময়ের প্রতিচ্ছবি, যা রেখে গিয়েছে অসংখ্য ভাঙার গল্প। @ বইকাল


২৯

হাওয়াই: আমেরিকার ভেতর বিলুপ্ত হওয়া আরেকটি স্বাধীন দেশ

প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানে ছড়িয়ে থাকা আগ্নেয় দ্বীপমালা—আজকের পর্যটনস্বর্গ—একসময় ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ, স্বীকৃত স্বাধীন দেশ। সেই দেশের নাম হাওয়াই।

স্বাধীন দেশের ইতিহাস:

হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে মানুষের বসতি স্থাপন শুরু হয় বহু শতাব্দী আগে, পলিনেশীয় নাবিকদের মাধ্যমে। তারা ছোট ছোট প্রধানত্ব (chiefdom) গড়ে তোলে। কিন্তু ১৮শ শতকের শেষদিকে ইতিহাসে আবির্ভূত হন এক শক্তিশালী নেতা— কামেহামেহা প্রথম।

তিনি সামরিক দক্ষতা, কৌশল এবং ইউরোপীয় অস্ত্রের ব্যবহার করে ১৭৯৫ থেকে ১৮১০ সালের মধ্যে পুরো দ্বীপপুঞ্জকে একত্র করেন। এর ফলে গড়ে ওঠে একটি ঐক্যবদ্ধ ও কেন্দ্রীয় শাসিত রাষ্ট্র—হাওয়াই রাজ্য। এটি ছিল একটি রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে পশ্চিমা প্রভাব ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, বিশেষ করে বাণিজ্য ও ধর্মপ্রচার কার্যক্রমের মাধ্যমে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও কূটনৈতিক সম্পর্ক:

১৯শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে হাওয়াই শুধু একটি দ্বীপ রাষ্ট্র ছিল না—এটি ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি সার্বভৌম দেশ।

১৮৪৩ সালে ব্রিটেন ও ফ্রান্স আনুষ্ঠানিকভাবে হাওয়াইয়ের স্বাধীনতা স্বীকার করে (Anglo-Franco Proclamation)। এরপর ধীরে ধীরে বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এর মধ্যে ছিল: আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান।

হাওয়াই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি, দূতাবাস বিনিময়, এবং কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বজায় রাখত। রাজধানী হনোলুলু হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, বিশেষ করে চিনি (sugar) ও কৃষিপণ্য রপ্তানির জন্য।

স্বাধীনতার সময়কাল:

হাওয়াই রাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ১৭৯৫ সালে গঠিত হয় এবং ১৮৯৩ সাল পর্যন্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে টিকে ছিল। অর্থাৎ প্রায় ৯৮ বছর ধরে এটি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে বিদ্যমান ছিল।

অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন ও বিদেশি প্রভাব:

১৯শ শতকের শেষভাগে হাওয়াইয়ের অর্থনীতি অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়ে আমেরিকান ও ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের উপর, বিশেষ করে চিনি শিল্পে। এই ব্যবসায়ীরা ধীরে ধীরে রাজনীতিতেও প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে।

হাওয়াইয়ের পতনের পেছনে কোনো সরাসরি সামরিক যুদ্ধ ছিল না, বরং ছিল ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। এর প্রধান কারণগুলো হলো:

* চিনির বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থ: ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে আমেরিকান ব্যবসায়ীরা হাওয়াইয়ে বড় বড় আখের বাগান (Sugar Plantations) গড়ে তোলেন। তারা চেয়েছিলেন হাওয়াইয়ের চিনি যেন বিনা শুল্কে আমেরিকায় রপ্তানি করা যায়। এই ব্যবসায়িক গোষ্ঠীই পরবর্তীতে ক্ষমতা দখলের মূল কারিগর ছিল।

* বেয়োনেট সংবিধান (১৮৮৭): ১৮৮৭ সালে আমেরিকান ব্যবসায়ীদের একটি সশস্ত্র গ্রুপ (Hawaiian League) তৎকালীন রাজা কালাকাউয়া-কে অস্ত্রের মুখে একটি সংবিধানে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে। এটি 'বেয়োনেট কনস্টিটিউশন' নামে পরিচিত। এর ফলে রাজার ক্ষমতা কমে যায় এবং সাধারণ আদিবাসীদের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে কেবল ধনী আমেরিকান ও ইউরোপীয়দের ক্ষমতা বাড়ানো হয়।

* রাণী লিলিুওকালানি-র প্রতিরোধ: ১৮৯১ সালে রাণী লিলিুওকালানি ক্ষমতায় এসে আদিবাসীদের ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে একটি নতুন সংবিধান চালুর চেষ্টা করেন। এতে আমেরিকান ব্যবসায়ীরা ক্ষিপ্ত হয়।

ক্ষমতা দখল ও চূড়ান্ত অন্তর্ভুক্তি (১৮৯৩-১৮৯৮):

* অভ্যুত্থান (১৮৯৩): লরিন থার্স্টনের নেতৃত্বে একটি 'কমিটি অফ সেফটি' গঠন করা হয়। ১৮৯৩ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত জন এল. স্টিভেন্স-এর সহায়তায় এবং মার্কিন নৌবাহিনীর (USS Boston) শক্তির ভয় দেখিয়ে তারা রাণীকে ক্ষমতাচ্যুত করে। রক্তপাত এড়াতে রাণী সাময়িকভাবে ক্ষমতা ত্যাগ করেন।

* প্রজাতন্ত্র ঘোষণা: বাগান মালিকদের নেতা সানফোর্ড বি. ডোল (Sanford B. Dole) নিজেকে 'রিপাবলিক অফ হাওয়াই'-এর প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন এবং আমেরিকার সাথে একীভূত হওয়ার প্রস্তাব দেন।

* যুক্তরাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্তি (১৮৯৮): যদিও তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড এই দখলদারিত্বের বিরোধী ছিলেন, কিন্তু ১৮৯৭ সালে সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবের অধিকারী উইলিয়াম ম্যাককিনলি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধের সময় হাওয়াইকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি (যেমন পার্ল হারবার) হিসেবে ব্যবহার করার অজুহাতে ১৮৯৮ সালে আমেরিকা আনুষ্ঠানিকভাবে একে নিজের ভূখণ্ড হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়।

এরপর হাওয়াই একটি মার্কিন টেরিটরিতে পরিণত হয়, এবং অবশেষে ১৯৫৯ সালে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ৫০তম অঙ্গরাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

বর্তমান জনসংখ্যা (২০২৬):

২০২৬ সালের সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, হাওয়াইয়ের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৪,৫৫,৬৬০ (১৪.৫ লক্ষের বেশি)। এর মধ্যে রাজধানী হনলুলুতেই বসবাস করেন ১০ লাখের বেশি মানুষ। হাওয়াই একটি বহুসাংস্কৃতিক অঞ্চল, যেখানে এশীয় (প্রায় ৩৭%), শ্বেতাঙ্গ (২১%) এবং আদিবাসী হাওয়াইয়ান বা প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের মানুষ (প্রায় ১০%) একসাথে বসবাস করেন।

প্রায় এক শতাব্দী স্বাধীন থাকার পর, শক্তিশালী বিদেশি স্বার্থের কাছে পরাজিত হয়ে হাওয়াই তার সার্বভৌমত্ব হারায়। আজ এটি যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হলেও, তার স্বাধীন অতীত এখনো ইতিহাসের পাতায় এবং স্থানীয় সংস্কৃতিতে জীবন্ত হয়ে আছে। @ বইকাল


৩০

রাশিয়ার আলাস্কা বিক্রি ও আমেরিকার এক অবিশ্বাস্য লাভের ইতিহাস

এক সময় যা ছিল রাশিয়ার তুষারাবৃত এক দুর্গম অঞ্চল, আজ তা আমেরিকার বৃহত্তম এবং সম্পদশালী অঙ্গরাজ্য। এবং আলাস্কাও কিন্তু একটা এনক্লেভ। মাত্র ৭.২ মিলিয়ন ডলারে একটি বিশাল ভূখণ্ড হাতবদল হওয়ার এই কাহিনী যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি কৌশলগত শিক্ষায় ভরপুর। যখন আলাস্কা রাশিয়ার ছিল তখন রাশিয়া ছিল তিনটি মহাদেশ জুড়ে, ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকা!

রাশিয়া কেন আলাস্কা বিক্রি করতে চাইল?

রাশিয়া ১৮৬৭ সালে আলাস্কা বিক্রি করার পেছনে বেশ কিছু কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক কারণ ছিল। মূলত তৎকালীন পরিস্থিতির চাপে পড়ে তারা এই বিশাল ভূখণ্ডটি আমেরিকার কাছে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

প্রধান কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:

ক্রিমিয়ান যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি: ১৮৫৩-১৮৫৬ সালের ক্রিমিয়ান যুদ্ধে রাশিয়া ব্রিটেনের কাছে পরাজিত হয়। এই যুদ্ধের ফলে রাশিয়ার অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং রাজকোষ প্রায় শূন্য হয়ে পড়েছিল। ফলে আলাস্কার মতো দুর্গম অঞ্চলের রক্ষণাবেক্ষণ করা তাদের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়ায়।

প্রতিরক্ষাজনিত ভয়: রাশিয়া আশঙ্কা করছিল যে ভবিষ্যতে যদি ব্রিটেনের সাথে আবার যুদ্ধ বাঁধে, তবে ব্রিটেন খুব সহজেই প্রশান্ত মহাসাগরে তাদের আধিপত্য ব্যবহার করে আলাস্কা দখল করে নেবে। রাশিয়া মনে করেছিল, যুদ্ধ করে এলাকাটি হারানোর চেয়ে তা বিক্রি করে কিছু অর্থ লাভ করা অনেক ভালো।

ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ও প্রতিকূল পরিবেশ: আলাস্কা ছিল রাশিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে অনেক দূরে এবং সেখানকার আবহাওয়া ছিল অত্যন্ত রুক্ষ। সেই সময়ে সেখানে যাতায়াত করা এবং শাসনকাজ পরিচালনা করা রাশিয়ার জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল।

সম্পদের অভাব (তৎকালীন ধারণা): সেই সময়ে রাশিয়ার ধারণা ছিল আলাস্কায় তেমন কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ নেই। তখন পর্যন্ত সেখানে সোনার খনি বা তেলের বিশাল মজুতের কথা কেউ জানত না। মূলত পশুর চামড়ার ব্যবসার জন্যই তারা সেখানে গিয়েছিল, যার লাভও তখন কমে আসছিল।

আমেরিকার সাথে সুসম্পর্ক: রাশিয়া চেয়েছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ব্রিটেনের শক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে আমেরিকার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে। আলাস্কা আমেরিকার কাছে বিক্রি করার মাধ্যমে তারা এই সম্পর্ককে আরও মজবুত করতে চেয়েছিল।

আলাস্কা কবে থেকে রাশিয়ার অংশ হয়েছিল?

রাশিয়া প্রায় ১২৬ বছর (১৭৪১ থেকে ১৮৬৭ সাল পর্যন্ত) আলাস্কা শাসন করেছিল। তবে মজার ব্যাপার হলো, এই দীর্ঘ সময়েও সেখানে রুশ নাগরিকের সংখ্যা খুব একটা বেশি ছিল না; সর্বোচ্চ পর্যায়েও তা মাত্র ৭০০ থেকে ৮০০ জনের মতো ছিল।

আলাস্কা আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ার অংশ হওয়ার প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল ১৮শ শতকের শুরুর দিকে। ডেনিশ অভিযাত্রী ভিটাস বেরিং, যিনি রাশিয়ার নৌবাহিনীর হয়ে কাজ করতেন, ১৭৪১ সালে প্রথম আলাস্কা উপকূল আবিষ্কার করেন। তাঁর এই অভিযানের মাধ্যমেই রাশিয়া প্রথম এই ভূখণ্ডের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। বেরিংয়ের অভিযানের পর রাশিয়ার পশম ব্যবসায়ীরা (Siberian fur traders) সামুদ্রিক ভোঁদড় এবং অন্যান্য পশুর দামী চামড়ার সন্ধানে আলাস্কায় আসতে শুরু করেন। তারা সেখানে ছোট ছোট বসতি স্থাপন করেন। গ্রিগোরি শেলিকভ নামে একজন রুশ ব্যবসায়ী ১৭৮৪ সালে আলাস্কার কডিয়াক দ্বীপে (Kodiak Island) প্রথম স্থায়ী রুশ বসতি স্থাপন করেন। ১৭৯৯ সালে রাশিয়ার জারের নির্দেশে 'রুশ-আমেরিকান কোম্পানি' গঠিত হয়। এই কোম্পানিকে আলাস্কার শাসনভার এবং একচেটিয়া বাণিজ্যের অধিকার দেওয়া হয়। মূলত তখন থেকেই আলাস্কা আনুষ্ঠানিকভাবে একটি রুশ কলোনি বা উপনিবেশ হিসেবে স্বীকৃত পায়।

আমেরিকার কাছে বিক্রির প্রক্রিয়াটি কীভাবে হল?

১. আলোচনার সূত্রপাত (১৮৬৬-১৮৬৭)

রাশিয়া ১৮৫৬ সালের ক্রিমিয়ান যুদ্ধের পর থেকেই আলাস্কা বিক্রির কথা ভাবছিল। ১৮৬৬ সালে জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার তার ওয়াশিংটনস্থ রাষ্ট্রদূত ব্যারন এডুয়ার্ড ডি স্টোকল (Baron Eduard de Stoeckl)-কে নির্দেশ দেন আমেরিকার সাথে আলোচনা শুরু করতে। স্টোকল এবং সিউয়ার্ড ১৮৬৭ সালের মার্চের শুরুতে ওয়াশিংটনে গোপন বৈঠক শুরু করেন।

২. ম্যারাথন আলোচনা ও চূড়ান্ত চুক্তি (৩০ মার্চ, ১৮৬৭)

১৮৬৭ সালের ২৯ মার্চ রাতে সিউয়ার্ড এবং স্টোকল এক দীর্ঘ ম্যারাথন আলোচনায় বসেন। সেই সময়ের যোগাযোগ ব্যবস্থা আজকের মতো উন্নত ছিল না, তবুও তারা রাতভর আলোচনা করে ভোরের দিকে একটি চুক্তিতে পৌঁছান। পরদিন ৩০ মার্চ, ১৮৬৭ ভোর ৪টায় চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়।

   বিক্রয় মূল্য: মাত্র ৭.২ মিলিয়ন ডলার।

   জমির পরিমাণ: প্রায় ৫,৮৬,০০০ বর্গমাইল (প্রতি একর মাত্র ২ সেন্টের মতো)।

৩. রাজনৈতিক বাধা ও অনুমোদন

চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও আমেরিকার ভেতরে এটি নিয়ে বেশ সমালোচনা হয়। অনেকেই এই বিশাল বরফাবৃত ভূমি কেনাকে অর্থের অপচয় মনে করেছিলেন। তারা একে উপহাস করে 'Seward’s Folly' বা 'সিউয়ার্ডের বোকামি' এবং 'Seward’s Icebox' বলতেন। তবে সিউয়ার্ডের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় এবং সিনেটের প্রভাবশালী সদস্য চার্লস সামনারের সমর্থনে ৯ এপ্রিল, ১৮৬৭ সালে মার্কিন সিনেট এই চুক্তি অনুমোদন করে।

৪. আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা হস্তান্তর

১৮ অক্টোবর, ১৮৬৭ তারিখে আলাস্কার সিতকা (Sitka) শহরে আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ার পতাকা নামিয়ে আমেরিকার পতাকা উত্তোলন করা হয়। রুশ সৈন্যরা এলাকা ছেড়ে চলে যায় এবং আলাস্কা আনুষ্ঠানিকভাবে আমেরিকার একটি 'ডিপার্টমেন্ট' হিসেবে যুক্ত হয়।

মজার বিষয় হলো, রাশিয়ার কাছ থেকে আলাস্কা কেনার সেই চেকটি আজও আমেরিকার জাতীয় আর্কাইভে সংরক্ষিত আছে।

আমেরিকানরা তাদের এই 'বোকামি'র ভুল বুঝতে পেরেছিল এবং আলাস্কাকে মহামূল্যবান মনে করতে শুরু করেছিল:


মূলত দুটি প্রধান আবিষ্কার আলাস্কার ভাগ্য এবং আমেরিকার অর্থনীতি বদলে দিয়েছিল:

১. সোনার খনি আবিষ্কার (Klondike Gold Rush)

১৮৯৬ সালে আলাস্কার পার্শ্ববর্তী ইউকন অঞ্চলে এবং পরবর্তীতে আলাস্কার নিজস্ব ভূখণ্ডে (যেমন: নোম এবং ফেয়ারব্যাঙ্কস) বিশাল সোনার খনি আবিষ্কৃত হয়। হাজার হাজার মানুষ ভাগ্যান্বেষণে সেখানে ভিড় জমায়। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই আলাস্কা থেকে যে পরিমাণ সোনা উত্তোলিত হয়েছিল, তার মূল্য ছিল আমেরিকার দেওয়া ক্রয়মূল্যের (৭.২ মিলিয়ন ডলার) চেয়ে বহুগুণ বেশি।

২. 'কালো সোনা' বা তেলের খনি

বিংশ শতাব্দীতে আলাস্কায় আবিষ্কৃত হয় বিশাল তেলের মজুদ। বিশেষ করে ১৯৬৮ সালে উত্তর ঢালে (Prudhoe Bay) উত্তর আমেরিকার বৃহত্তম তেলের খনি আবিষ্কৃত হয়। বর্তমানে আলাস্কা আমেরিকার জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান উৎস।

আলাস্কার গুরুত্ব কেন আরও বেড়ে গেল?

মাছ ও বনজ সম্পদ: আলাস্কার সমুদ্র উপকূল সামুদ্রিক মাছ (বিশেষ করে স্যামন) এবং বিশাল বনাঞ্চল আমেরিকার অর্থনীতিতে প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার যোগ করে।

কৌশলগত অবস্থান (Strategic Importance): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং পরবর্তী শীতল যুদ্ধের সময় বোঝা গিয়েছিল আলাস্কা আমেরিকার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এটি এশিয়া এবং উত্তর মেরুর খুব কাছে হওয়ায় সামরিক ও বিমান চলাচলের জন্য একটি শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে কাজ করে।

পর্যটন: বর্তমানে আলাস্কার বরফাবৃত পাহাড়, গ্লেসিয়ার এবং বন্যপ্রাণী দেখার জন্য প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পর্যটক সেখানে যান, যা থেকে বিশাল রাজস্ব আয় হয়।

একটি মজার তথ্য: আমেরিকা আলাস্কা কিনেছিল প্রতি একর মাত্র ২ সেন্ট দরে। আজ সেই জমির সামান্য এক টুকরো অংশও কয়েক হাজার ডলারে কেনা সম্ভব নয়। রাশিয়া যখন এটি বিক্রি করেছিল, তখন তারা এর মাটির নিচের সম্পদ সম্পর্কে একেবারেই জানত না।

আলাস্কা কবে অঙ্গরাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়?

আমেরিকার হাতে আসার পর আলাস্কাকে পূর্ণাঙ্গ অঙ্গরাজ্যের মর্যাদা পেতে বেশ দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ১৮ অক্টোবর, ১৮৬৭ সালে রাশিয়া থেকে হস্তান্তরের পর প্রায় ৯১ বছর ২ মাস ২১ দিন পর এটি আমেরিকার ৪৯তম অঙ্গরাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

আলাস্কাকে অঙ্গরাজ্য করার পথে প্রধান বাধা ছিল এর বিশাল দূরত্ব এবং কম জনসংখ্যা। এছাড়া তৎকালীন আমেরিকার অনেক রাজনীতিবিদের ধারণা ছিল যে আলাস্কা অনেক বেশি দুর্গম এবং সেখানে শাসন পরিচালনা করা কঠিন হবে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আলাস্কার কৌশলগত গুরুত্ব (জাপানের খুব কাছে হওয়ায়) প্রমাণিত হওয়ার পর একে অঙ্গরাজ্য করার দাবি জোরালো হয়। @ বইকাল


৩১

পূর্ব তিমুর এশিয়ার নতুনতম দেশ। ইন্দোনেশিয়া থেকে দেশটি স্বাধীন হয়।

 তিমুর দ্বীপের পূর্ব অংশে দেশটির অবস্থান, পশ্চিম অংশে ইন্দোনেশিয়া। পূর্ব তিমুরের একটা ছিটমহল আছে পশ্চিমে, নাম হলো ওকুসি-অ্যাম্বেনো (Oecusse-Ambeno)। এটি ভৌগোলিকভাবে ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম তিমুর (West Timor) দ্বারা পরিবেষ্টিত, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এটি পূর্ব তিমুরের অংশ।

এটি একটি এক্সক্লেভ (পূর্ব তিমুরের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন) এবং ইন্দোনেশিয়ার প্রেক্ষাপটে একটি এনক্লেভ। এটি কীভাবে তৈরি হলো তার ইতিহাস বেশ পুরনো এবং ঔপনিবেশিক লড়াইয়ের সাথে যুক্ত:

১. পর্তুগিজ ও ডাচদের লড়াই

১৬শ শতাব্দীতে পর্তুগিজরা প্রথম তিমুর দ্বীপে আসে। ওকুসি ছিল তাদের প্রথম পদার্পণস্থল এবং দীর্ঘকাল ধরে এটিই ছিল তাদের প্রধান কেন্দ্র। পরবর্তীতে ডাচরা (ওলন্দাজ) এই দ্বীপের পশ্চিম অংশে আধিপত্য বিস্তার শুরু করে। কিন্তু এই এলাকাটি পর্তুগালের প্রভাবে রয়ে যায়। আর ইন্দোনেশিয়া স্বাধীন হয় নেদারল্যান্ড শাসিত এলাকাগুলো নিয়ে।

২. লিসবন চুক্তি (১৮৫৯):

পর্তুগাল এবং নেদারল্যান্ডসের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত বিরোধের পর ১৮৫৯ সালে লিসবন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিতে তিমুর দ্বীপকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়:

   পূর্ব অংশ: পর্তুগালের অধীনে (পর্তুগিজ তিমুর)।

   পশ্চিম অংশ: ডাচদের অধীনে (ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ, যা বর্তমানে ইন্দোনেশিয়া)।

তবে ওকুসি অঞ্চলটি পর্তুগিজদের কাছে ধর্মীয় ও ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ এখানেই তারা প্রথম চার্চ স্থাপন করেছিল। তাই ওকুসি ডাচদের এলাকায় (পশ্চিম অংশে) থাকা সত্ত্বেও এটি পর্তুগিজদের অধীনেই রাখা হয়।

৩. চূড়ান্ত সীমানা নির্ধারণ (১৯১৬):

১৯১৬ সালে হেগ-এ একটি চূড়ান্ত চুক্তির মাধ্যমে ওকুসির বর্তমান সীমানা নিশ্চিত করা হয়। এর ফলে এটি একটি বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড বা এক্সক্লেভ হিসেবে থেকে যায়।

৪. আধুনিক স্বাধীনতা (২০০২):

১৯৭৫ সালে ইন্দোনেশিয়া পুরো পূর্ব তিমুর দখল করে নিলেও ২০০২ সালে যখন পূর্ব তিমুর পূর্ণ স্বাধীনতা পায়, তখন ওকুসি তার ঐতিহাসিক ও ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার হিসেবে স্বাধীন পূর্ব তিমুর রাষ্ট্রেরই অংশ হিসেবে থেকে যায়।

মজার তথ্য: ওকুসি থেকে পূর্ব তিমুরের মূল ভূখণ্ডে যেতে হলে হয় ইন্দোনেশিয়ার ভেতর দিয়ে স্থলপথে যেতে হয় (যার জন্য পাসপোর্টের প্রয়োজন), নয়তো সমুদ্রপথে ফেরি ব্যবহার করতে হয়। @ বইকাল

৩২

বাল্টিক দেশ

বাল্টিক দেশ বলতে এস্তোনিয়া (Estonia), লাতভিয়া (Latvia), এবং লিথুয়ানিয়া (Lithuania)—এই তিনটি দেশকে বোঝায়। ইউরোপের উত্তর-পূর্ব কোণে, বাল্টিক সাগরের পূর্ব উপকূলে অবস্থান করায় এদেরকে সম্মিলিতভাবে বাল্টিক দেশ বা Baltic States বলা হয়। আপনারা খবরে প্রায়ই বাল্টিক দেশ টার্মটি শুনে থাকবেন।

তিন দেশই বাল্টিক সাগরের পূর্ব উপকূলে, ফিনল্যান্ডের দক্ষিণে, রাশিয়ার পশ্চিমে, পোল্যান্ড ও বেলারুশের উত্তরে অবস্থিত। তিন দেশই প্রায় একই সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১৯৯১ সালে স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করে। তিন দেশই ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) ও ন্যাটো (NATO)–এর সদস্য। তুলনামূলকভাবে প্রযুক্তি-নির্ভর, দ্রুত উন্নয়নশীল ছোট অর্থনীতি।

কিছু ইন্টারেস্টিং ফ্যাক্ট:

Estonia

বিশ্বের সবচেয়ে ডিজিটাল দেশগুলোর একটি।

ইন্টারনেট ভোটিং-এ বিশ্বের পথিকৃত।

Skype, TransferWise (Wise) এর মতো টেক কোম্পানি এস্তোনিয়া-উদ্ভুত।

রাজধানী Tallinn-এর পুরনো শহর UNESCO World Heritage Site।

Latvia

রাজধানী Riga হলো ইউরোপের সবচেয়ে বড় Art Nouveau স্থাপত্যসংগ্রহের শহর।

Latvia-তে আগের যুগের Pagan ধারা এখনও লোকসংস্কৃতিতে টিকে আছে—Jāņi midsummer festival খুব বিখ্যাত।

এখানে Gauja National Park সবচেয়ে বড় বন্যপ্রাণীর আবাস।

Lithuania

লিথুয়ানিয়া ছিল একসময় ইউরোপের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্র (১৪শ–১৫শ শতক)—Baltic থেকে Black Sea পর্যন্ত বিস্তৃত।

বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো বাল্টিক ভাষা—Lithuanian—প্রাচীন বৈশিষ্ট্য এখনও বহন করে। @ বইকাল


৩৩


কালিনিনগ্রাদ (Kaliningrad) ওব্লাস্ট রাশিয়ার একটি ছিটমহল (এক্সক্লেভ)। 

এটি বাল্টিক সাগরের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত এবং এর উত্তরে ও পূর্বে লিথুয়ানিয়া এবং দক্ষিণে পোল্যান্ড অবস্থিত।

তবে এটা আদিকাল থেকে রাশিয়ার ছিল না। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় রাশিয়া পেয়ে গিয়েছে এই যায়গাটা, যার কারণে বাল্টিক সাগরে তার একটা বেরুনোর যায়গা হয়েছে।

কালিনিনগ্রাদ রাশিয়ার একটি ওব্লাস্ট, যা প্রদেশের মত অনেকটা। কালিনিনগ্রাদ ওব্লাস্টের আয়তন ১৫,১২৫ বর্গ কিমি. যা রংপুর বিভাগের চেয়ে বারোশ' বর্গ কিমি. কম।

লোক সংখ্যা ১০ লক্ষ ১৩ হাজার, জনংসখ্যার ঘনত্ব ৬৯ জন প্রতি বর্গ কিলোমিটারে।

এটি বাল্টিক অঞ্চলে রাশিয়ার প্রধান নৌ ও সামরিক শক্তির কেন্দ্র। এখানে রাশিয়া মাঝেমধ্যে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে, যার কারণে এটি ইউরোপীয় নিরাপত্তা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে।

এছাড়া এটি বাল্টিক সাগরে রাশিয়ার একমাত্র বরফমুক্ত বন্দর (ice-free Russian port), যা সামরিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার নৌবাহিনীর বাল্টিক ফ্লিটের সদর দপ্তর এই কালিনিনগ্রাদ অঞ্চলে অবস্থিত।

এটি কীভাবে রাশিয়ার হলো?

একসময় এর নাম ছিল কনিগসবার্গ (Königsberg) এবং এটি জার্মানির প্রুশিয়া রাজ্যের অংশ ছিল। এর অধিবাসীরাও ছিল জার্মান, ভাষা ছিল জার্মান, সব স্থাননাম ছিল জার্মান ভাষায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন এলাকা দখল করে এবং এর নাম বদলে “কালিনিনগ্রাদ” রাখে (সোভিয়েত নেতা মিখাইল কালিনিনের নামে)। জনসংখ্যার বেশিরভাগই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বসতি স্থাপন করা রুশ বংশোদ্ভূত মানুষ।

যুদ্ধের পরে ১৯৪৫ সালে মিত্রশক্তিগুলোর (Allied forces) মধ্যে স্বাক্ষরিত পটসডাম চুক্তি অনুসারে, পূর্বতন পূর্ব প্রুশিয়ার উত্তরাংশ সোভিয়েত ইউনিয়নের রুশ ফেডারেটিভ সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের (RSFSR) অন্তর্ভুক্ত হয়। দক্ষিণের অংশ পোল্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়।

এর লক্ষ লক্ষ জার্মান অধিবাসীকে হয় পালিয়ে যেতে হয় অথবা সোভিয়েতরা তাদের বিতাড়িত করে। এরপর রাশিয়া মূলত এই অঞ্চলে তাদের নিজেদের অধিবাসীদের দিয়ে জনবসতি গড়ে তোলে।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটলে, এর অংশ হিসেবে থাকা তিনটি বাল্টিক রাষ্ট্র (লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া, এস্তোনিয়া) স্বাধীন হয়। যেহেতু কালিনিনগ্রাদ ছিল রুশ ফেডারেটিভ সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের অংশ, এটি বিচ্ছিন্ন না হয়ে রাশিয়ার একটি অংশ হিসেবেই থেকে যায়, যা এখন ইউরোপের মাঝখানে রাশিয়ার একটি ছিটমহল। @ বইকাল


৩৪

প্রথম সৌদি রাষ্ট্র: মরুভূমির বুকে জন্ম নেওয়া 'আমিরাত অফ দিরিয়াহ'

প্রথম সৌদি রাষ্ট্র (First Saudi State), যা ইতিহাসে আমিরাত অফ দিরিয়াহ (Emirate of Diriyah) নামে পরিচিত, শুধু একটি মধ্যপ্রাচ্যের রাজ্য ছিল না, বরং আধুনিক সৌদি আরবের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অধ্যায়। চলুন, সংক্ষেপে এই রাষ্ট্রের পরিচয় এবং উত্থান-পতনের গল্প জেনে নেওয়া যাক।

পরিচিতি: ধর্ম ও রাজনীতির মিলন

আমিরাত অফ দিরিয়াহ ছিল একটি অনন্য রাষ্ট্র, যা ১৭৪৪ সালে (বর্তমানে সৌদি সরকার ১৭২৭ সালকে প্রতিষ্ঠা বছর হিসেবে ধরে) ধর্মীয় আদর্শ ও রাজনৈতিক ক্ষমতাকে একত্রিত করে আরব উপদ্বীপে আত্মপ্রকাশ করে।

আনুষ্ঠানিক নাম: আমিরাত অফ দিরিয়াহ (Emirate of Diriyah)।

অবস্থান: মূলত আরবের নজদ (Najd) অঞ্চল, যা বর্তমানে সৌদি আরবের কেন্দ্রস্থল।

রাজধানী: দিরিয়াহ শহর (Diriyah) – নজদ অঞ্চলের একটি মরুদ্যান-ভিত্তিক বসতি।

প্রতিষ্ঠাতা ও মূলনীতি:

এই রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল এক ঐতিহাসিক চুক্তির মাধ্যমে, যা ছিল এর টিকে থাকার মূল ভিত্তি:

ইমাম মুহাম্মদ বিন সাউদ (Muhammad bin Saud): রাজনৈতিক নেতা (আমির/ইমাম)। তিনি ছিলেন দিরিয়াহ-এর শাসক, যিনি সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা সরবরাহ করেন। তাঁর বংশধররাই (আল সাউদ) আজও সৌদি আরব শাসন করছেন।

মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব (Muhammad ibn Abd al-Wahhab): ধর্মীয় সংস্কারক (শেখ)। তিনি ইসলামের একটি কঠোর সংস্করণ (যা ওয়াহহাবিজম নামে পরিচিত) প্রচার করেন, যা রাষ্ট্রকে আদর্শিক ভিত্তি ও ঐক্যের শক্তি দেয়।

এই দুই নেতার জোটের মাধ্যমে, আমিরাত অফ দিরিয়াহ সামরিক শক্তি দিয়ে তাদের প্রভাব বিস্তার করে এবং ধর্মীয় সংস্কারের মাধ্যমে স্থানীয় গোত্রগুলোকে একত্রিত করে।

উত্থান ও বিস্তার

১৭৪৪ সালের পর থেকে এই রাষ্ট্র দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠে:

১. অভ্যন্তরীণ সংহতি: নজদ অঞ্চলের গোত্রগুলো ধীরে ধীরে এই নতুন ধর্মীয়-রাজনৈতিক শক্তির অধীনে আসতে শুরু করে।

২. সামরিক অভিযান: সুসংগঠিত ওয়াহহাবি সেনাবাহিনী আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান শুরু করে।

৩. ক্ষমতার চূড়া: ১৮০০ সালের মধ্যে আমিরাতটি বিশাল সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। তারা মক্কা এবং মদিনার মতো পবিত্র শহরগুলি দখল করে নেয় এবং বর্তমান কুয়েত, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের কিছু অংশ পর্যন্ত তাদের প্রভাব বিস্তার করে। তাদের আক্রমণে ইরাকের কারবালা শহরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

এই উত্থানের ফলে তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তি, অটোমান সাম্রাজ্যের (Ottoman Empire) সাথে তাদের সরাসরি সংঘাত শুরু হয়।

তন: অটোমান-সৌদি যুদ্ধ (১৮১৮)

আমিরাত অফ দিরিয়াহ-এর দ্রুত বিস্তার এবং পবিত্র স্থান মক্কা-মদিনা দখলের ঘটনা অটোমান সুলতানকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। তারা এই বিদ্রোহ দমন করার জন্য মিশরের শক্তিশালী শাসক মুহাম্মদ আলী পাশাকে দায়িত্ব দেন।

চূড়ান্ত লড়াই: মুহাম্মদ আলী পাশার পুত্র ইব্রাহিম পাশার নেতৃত্বে মিশরীয় বাহিনী নজদ আক্রমণ করে। দীর্ঘ ছয় মাসের অবরোধের পর ১৮১৮ সালে তারা দিরিয়াহ শহর দখল ও ধ্বংস করে দেয়।

ফলাফল: ইমাম আব্দুল্লাহ বিন সাউদ-কে বন্দী করে অটোমান রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে পাঠানো হয় এবং সেখানে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। দিরিয়াহ সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হয় এবং এর নেতারা বিতাড়িত হন।

এর মাধ্যমেই ফার্স্ট সৌদি স্টেট বা আমিরাত অফ দিরিয়াহ-এর পতন ঘটে।

উত্তরাধিকার:

আমিরাত অফ দিরিয়াহ ধ্বংস হয়ে গেলেও এর আদর্শ সম্পূর্ণরূপে বিলীন হয়নি। এর পতনের কয়েক বছর পরেই আল সাউদ পরিবারের বেঁচে থাকা সদস্যরা সেকেন্ড সৌদি স্টেট (আমিরাত অফ নজদ) প্রতিষ্ঠা করেন, যা প্রথম রাষ্ট্রের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। চূড়ান্তভাবে, এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতাই বিংশ শতাব্দীতে আধুনিক সৌদি আরব (Third Saudi State) প্রতিষ্ঠায় পথ দেখিয়েছিল।

দিরিয়াহ আজ ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান (UNESCO World Heritage Site), যা তার গৌরবময় অতীতকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

সৌদ রাজবংশ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং এর পরবর্তী সময়ে ফ্রান্স-ব্রিটিশ দখলদার বাহিনীর সাথে আতাত করে মধ্যপ্রাচ্যকে ইউরোপীয় কলনিতে পরিণত করেছে।Sykes-Picot চুক্তির নামে ব্রিটেন-ফ্রান্স মধ্যপ্রাচ্যকে খণ্ডবিণ্ড করে চির অরাজক সীমান্তের জন্ম দিয়েছে।১৯৭৪ সালে তো রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখার সর্তে পেট্রো-ডলার চুক্তি আর মার্কিন ঘাটি করতে দিয়েছে।এখন উচ্ছন্নে যাওয়া যুবরাজ MBS ভিশন ২০৩০ এর নামে পশ্চিমা সংস্কৃতি আমদানি করছে।এক কথায় মক্কা-মদিনার পবিত্র ভূমির দেশকে সৌদ রাজবংশ পশ্চিমা সংস্কৃতির আদুর ঘর বাহিয়ে ফেলেছে যেখানে ইসলাম পরে পর্যটন আগে  @ বইকাল


৩৫


পুরো পৃথিবীই ইউরোপীয় লুটপাটের শিকার হয়েছে। শুধু লাইবেরিয়া, ইথিওপিয়া, থাইল্যান্ড, দুই কোরিয়া ও জাপান বাদে।

ইথিওপিয়া সামগ্রিকভাবে ইউরোপীয় উপনিবেশ ছিল না। ইতিহাসের বৃহৎ অংশে এটি স্বাধীন রাজ্য ছিল এবং ইউরোপীয়দের কাছে উপনিবেশের মতো দখল হওয়া এড়িয়েছে। তবে ১৯৩৫–১৯৪১ সালের মধ্যে ইতালির সাময়িক দখল হয়েছিল যখন মুসোলিনির ইতালি ইথিওপিয়াকে জয় করে সেখানে আগ্রাসন চালায়। এই দখল কিছু বছর স্থায়ী হলেও তা ইউরোপীয় উপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা হিসেবে দীর্ঘমেয়াদি হয়নি এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ এবং ইথিওপীয় বাহিনী দেশটির স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।

লাইবেরিয়া কখনো ইউরোপীয় শক্তি দ্বারা উপনিবেশ হিসেবে শাসিত হয়নি। এটি মূলত ১৯শ শতকের শুরুতে আমেরিকান কলোনাইজেশন সোসাইটি (American Colonization Society) দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মুক্ত আফ্রিকান-আমেরিকানদের জন্য একটি কলোনি হিসেবে, কিন্তু এটি ইউরোপীয় দেশগুলোর উপনিবেশ ছিল না। স্বাধীনতা ঘোষণা করে ১৮৪৭ সালে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং ইউরোপীয় শক্তির অধীনে কখনও স্থায়ীভাবে ছিল না। @ বইকাল

৩৬


রিপাবলিক অব টেক্সাস: এক স্বাধীন দেশ (১৮৩৬-৪৫) থেকে মার্কিন অঙ্গরাজ্য

বিশ্ব ইতিহাসে এমন খুব কম ভূখণ্ড আছে যারা একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরু করে পরবর্তীতে স্বেচ্ছায় অন্য একটি দেশের সাথে যুক্ত হয়েছে। রিপাবলিক অব টেক্সাস তেমনই এক অনন্য উদাহরণ। ১৮৩৬ থেকে ১৮৪৫ সাল পর্যন্ত প্রায় এক দশক টেক্সাস একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে টিকে ছিল, যা শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৮তম অঙ্গরাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

১. বিপ্লব ও স্বাধীনতার জন্ম

টেক্সাস একসময় মেক্সিকোর অংশ ছিল। মেক্সিকো সরকার সেখানে আমেরিকানদের বসতি স্থাপনের অনুমতি দিলেও দ্রুতই ভাষা, ধর্ম এবং দাসপ্রথা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট সান্তা আনা যখন স্বৈরতান্ত্রিক শাসন শুরু করেন, তখন টেক্সাসবাসী বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ১৮৩৬ সালের ২ মার্চ টেক্সাস আনুষ্ঠানিকভাবে মেক্সিকো থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে।

২. আলমো এবং চূড়ান্ত বিজয়

স্বাধীনতার ঘোষণার পরপরই টেক্সাসবাসীরা 'আলমো'র যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলেও সেই পরাজয় তাদের সংকল্পকে আরও দৃঢ় করে। ১৮৩৬ সালের ২১ এপ্রিল জেনারেল স্যাম হিউস্টনের নেতৃত্বে 'সান হাসিন্টো'র যুদ্ধে মেক্সিকান বাহিনীকে পরাজিত করে টেক্সাস চূড়ান্ত বিজয় ও স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনে। জন্ম নেয় 'রিপাবলিক অব টেক্সাস'।

৩. একটি স্বাধীন দেশের সংগ্রাম (১৮৩৬-১৮৪৫)

স্বাধীন দেশ হিসেবে টেক্সাসের পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। একদিকে মেক্সিকোর পক্ষ থেকে পুনরায় আক্রমণের হুমকি, অন্যদিকে চরম অর্থনৈতিক সংকট ও বিশাল ঋণের বোঝা দেশটিকে বিপাকে ফেলে দেয়। নিজস্ব মুদ্রা ও প্রশাসন থাকলেও টেক্সাস বুঝতে পেরেছিল যে, দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হলে একটি শক্তিশালী মিত্রের প্রয়োজন।

৪. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্তি (Annexation)

টেক্সাস শুরু থেকেই আমেরিকার সাথে যুক্ত হতে চাইলেও মার্কিন রাজনীতির সমীকরণ ছিল জটিল। উত্তরের রাজ্যগুলো টেক্সাসকে একটি 'দাসপ্রথা সমর্থিত রাজ্য' হিসেবে গ্রহণ করতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। তবে ১৮৪৪ সালে জেমস কে. পোল্ক আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর দৃশ্যপট বদলে যায়। তার সীমানা সম্প্রসারণ নীতির অধীনে ১৮৪৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর টেক্সাস আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুক্ত হয়।

৫. যুদ্ধের সূত্রপাত ও নতুন মানচিত্র

টেক্সাসের এই অন্তর্ভুক্তি মেক্সিকো মেনে নেয়নি। এর ফলে ১৮৪৬ সালে মেক্সিকান-আমেরিকান যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধে আমেরিকার জয়লাভের ফলে কেবল টেক্সাসই নয়, ক্যালিফোর্নিয়া ও নেভাদাসহ বর্তমান আমেরিকার পশ্চিম দিকের বিশাল এলাকা মার্কিন মানচিত্রে যুক্ত হয়।

আজকের শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ টেক্সাস একসময় একটি ছোট, লড়াকু এবং স্বাধীন দেশ ছিল। মেক্সিকোর শাসন থেকে মুক্তি এবং পরবর্তীতে আমেরিকার সাথে যুক্ত হওয়া—এই দুই ঘটনাই উত্তর আমেরিকার বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র গঠনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

গাড়ো সবুজ এলাকাটি টেক্সাস প্রজাতন্ত্র, ও হালকা সবুজ অংশটি টেক্সাস ক্লেইম করত কিন্তু নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে নি।

টেক্সাসকে যারা স্বীকৃতি দিয়েছিল:

১. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (United States)

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছিল প্রথম দেশ যারা টেক্সাসকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। ১৮৩৭ সালের ৩ মার্চ প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকসন টেক্সাসের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেন। ওয়াশিংটনে টেক্সাসের একটি দূতাবাস ছিল এবং দুই দেশ নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যিক প্রতিনিধি বা দূত বিনিময় করেছিল।

২. ফ্রান্স (France)

১৮৩৯ সালে ফ্রান্স প্রথম ইউরোপীয় দেশ হিসেবে টেক্সাসকে স্বীকৃতি দেয়। অস্টিনে (টেক্সাস) ফ্রান্স একটি রাজকীয় দূতাবাস বা 'ফ্রেঞ্চ লেগেশন' (French Legation) নির্মাণ করেছিল, যা আজও পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত। ফ্রান্স মূলত টেক্সাসের তুলা আমদানির প্রতি আগ্রহী ছিল।

৩. গ্রেট ব্রিটেন (Great Britain)

ব্রিটেন প্রথমে টেক্সাসকে স্বীকৃতি দিতে দ্বিধা করেছিল, কারণ তারা মেক্সিকোর সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক নষ্ট করতে চায়নি এবং টেক্সাসের দাসপ্রথার বিরোধী ছিল। তবে ১৮৪০ সালে ব্রিটেন টেক্সাসের সাথে বাণিজ্য ও নৌ-চুক্তি স্বাক্ষর করে। ব্রিটেন মূলত চেয়েছিল টেক্সাস যেন আমেরিকার অংশ না হয়ে একটি স্বাধীন বাফার স্টেট (Buffer State) হিসেবে টিকে থাকে।

৪. নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়াম

ইউরোপের এই দুটি দেশও টেক্সাসকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। ১৮৪০ সালে নেদারল্যান্ডস এবং ১৮৪১ সালে বেলজিয়াম টেক্সাসের সাথে বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষর করে। টেক্সাস থেকে পশম এবং তুলা আমদানির বিনিময়ে তারা শিল্পজাত পণ্য রপ্তানি করত।

৫. অন্যান্য দেশ ও অঞ্চল

এছাড়াও টেক্সাস হান্সিয়াটিক লীগ (জার্মানির বাণিজ্যিক শহরগুলোর জোট) এবং মেক্সিকোর বিদ্রোহী প্রদেশ ইউকাতান (Yucatan)-এর সাথেও কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ বজায় রেখেছিল। @ বইকাল


৩৭

উভয় বিশ্বযুদ্ধে হেরেছে এমন দেশ তিনটি-

১. জার্মানি:

জার্মানি উভয় যুদ্ধের প্রধান নেপথ্য শক্তি ছিল এবং দুবারই নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: জার্মানি 'সেন্ট্রাল পাওয়ারস'-এর অংশ হিসেবে ১৯১৮ সালে পরাজিত হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ: নাৎসি জার্মানি 'অক্ষশক্তি' (Axis Powers) হিসেবে ১৯৪৫ সালে পরাজিত হয়।

২. অস্ট্রিয়া:

অস্ট্রিয়া উভয় যুদ্ধেই জার্মানির সঙ্গে জোটবদ্ধ ছিল। অস্ট্রিয়াকে ২য় বিশ্বযুদ্ধে আসলে সরাসরি পরাজিত দেশ বলা যায় না। বরং তারা স্বাধীনতা লাভ করে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্য হিসেবে জার্মানির প্রধান মিত্র ছিল এবং ১৯১৮ সালে সাম্রাজ্যটি ভেঙে যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ: ১৯৩৮ সালে জার্মানি অস্ট্রিয়াকে দখল করে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত (Anschluss) করে নিয়েছিল। ফলে ১৯৪৫ সালে জার্মানির পতনের সাথে সাথে অস্ট্রিয়াও পরাজিত দেশ হিসেবে গণ্য হয়।

৩. হাঙ্গেরি:

হাঙ্গেরিও উভয় যুদ্ধে পরাজিত পক্ষের অংশ ছিল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবে তারা ১৯১৮ সালে হেরে যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ: হাঙ্গেরি ১৯৪০ সালে অক্ষশক্তিতে যোগ দেয় এবং যুদ্ধের শেষ দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে পরাজিত হয়।

কিছু বিশেষ ক্ষেত্র (বুলগেরিয়া ও তুরস্ক):

বুলগেরিয়া: তারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে অক্ষশক্তিতে থাকলেও ১৯৪৪ সালে তারা পক্ষ পরিবর্তন করে মিত্রশক্তির হয়ে যুদ্ধ শেষ করে। তাই টেকনিক্যালি তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ী শিবিরে ছিল।

তুরস্ক (অটোমান সাম্রাজ্য): অটোমান সাম্রাজ্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হয়ে ভেঙে যায়। তবে আধুনিক তুরস্ক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একদম শেষ মুহূর্তে (১৯৪৫ সালে) নামমাত্র মিত্রশক্তিতে যোগ দিয়েছিল, তাই তারা পরাজিত দেশ নয়।

জার্মানি, অস্ট্রিয়া এবং হাঙ্গেরি—এই তিনটি দেশই মূলত দুটি বিশ্বযুদ্ধেই পরাজিত হিসেবে পরিচিত। @ বইকাল


৩৮

সভ্যতার প্রধান ভিত্তি।

মিসরে নীল নদ, ইরাকে দজলা ও ফোরাত, উপমহাদেশে সিন্ধু নদী, চীনে ইয়াংসি নদী, আমেরিকার অসংখ্য পাহাড়ি নদী ও হ্রদ ঘিরে সভ্যতাগুলো গড়ে উঠেছিল।

মানুষ বেঁচে থাকার জন্য পানি, উর্বর মাটি এবং সহজ যাতায়াত ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। একারণেই পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতাগুলো মূলত বিভিন্ন বড় বড় নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল। ইতিহাসে এগুলোকে 'নদীমাতৃক সভ্যতা' বলা হয়।

মেসোপটেমীয় সভ্যতা: এটি পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতা। 'মেসোপটেমিয়া' শব্দের অর্থ হলো 'দুই নদীর মধ্যবর্তী ভূমি'। এখানে সুমেরীয়, ব্যাবিলনীয়, আসিরীয় ও ক্যালডীয় সভ্যতা বিকশিত হয়েছিল।

মিশরীয় সভ্যতা: গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস মিশরকে 'নীল নদের দান' বলেছিলেন। নীল নদের বাৎসরিক বন্যায় যে পলি জমত, তা ব্যবহার করেই এই সভ্যতা কৃষি ও অর্থনীতিতে সমৃদ্ধ হয়েছিল।

সিন্ধু সভ্যতা: সিন্ধু নদের অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই সভ্যতাটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং নগরকেন্দ্রিক। হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো ছিল এই সভ্যতার প্রধান দুটি শহর।

চীনা সভ্যতা: হোয়াংহো নদীর অববাহিকায় এই সভ্যতা বিকশিত হয়। হোয়াংহো নদীকে একসময় 'চীনের দুঃখ' বলা হলেও এই নদীর পানি ও উর্বর মাটিই চীনা সভ্যতার মূল ভিত্তি তৈরি করেছিল। @ বইকাল


৩৯

ভেড়ার দ্বীপপুঞ্জ: ফারো আইল্যান্ডস-এর এক ঝলক

প্রশান্ত মহাসাগরের নির্জনতা বা গ্রীষ্মমন্ডলীয় তাপ নয়, বরং উত্তর আটলান্টিকের হিমশীতল ঢেউ আর সবুজ পাহাড়ের মায়াবী কুয়াশার মাঝে লুকিয়ে আছে এক অসাধারণ দ্বীপপুঞ্জ—ফারো আইল্যান্ডস (Faroe Islands)।

প্রকৃতির এক লুকানো রত্ন

ফারো আইল্যান্ডস ডেনমার্ক রাজ্যের অধীনস্থ একটি স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপপুঞ্জ (Autonomous Territory)। স্কটল্যান্ড, নরওয়ে এবং আইসল্যান্ডের ঠিক মাঝখানে এর অবস্থান। এখানকার নামটির মধ্যেই এর পরিচয় লুকানো—ফারো (Føroyar) শব্দটির অর্থ হলো 'ভেড়ার দ্বীপপুঞ্জ'। এই দ্বীপগুলোতে মানুষের চেয়ে ভেড়ার সংখ্যা বেশি!

ভৌগোলিক বিস্ময়

ফারো আইল্যান্ডস হলো মোট ১৮টি প্রধান দ্বীপ এবং অসংখ্য ছোট ছোট দ্বীপ ও শিলা নিয়ে গঠিত একটি আর্কিওপ্যালাগো।

ভৌগোলিক চেহারা: এখানকার ভূপ্রকৃতি অত্যন্ত নাটকীয়। উঁচু খাড়া পাহাড়, সবুজ উপত্যকা, এবং সমুদ্রের ওপর হাজার হাজার ফুট উঁচু ক্লিফ (সমুদ্রতট) এখানকার মূল আকর্ষণ। বিখ্যাত সোরভাগসভাতন হ্রদ (Lake Sørvágsvatn), যা এমনভাবে তৈরি যে দেখলে মনে হয় যেন হ্রদটি সমুদ্রের উপরে ঝুলে আছে—তা এই দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে আইকনিক দৃশ্যগুলির মধ্যে অন্যতম।

জলবায়ু: এখানকার জলবায়ু অপ্রত্যাশিত এবং পরিবর্তনশীল। উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোতের কারণে শীতকালে খুব বেশি ঠাণ্ডা পড়ে না, তবে সারা বছরই কিছুটা ঠান্ডা থাকে ও প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় এবং কুয়াশা দেখা যায়।

মানুষ ও সংস্কৃতি

ফারোরা হলো এক মিশ্র সংস্কৃতি, যেখানে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এবং ভাইকিং ঐতিহ্যের প্রভাব সুস্পষ্ট।

ভাষা: এখানকার প্রধান ভাষা হলো ফারোইজ (Faroese), যা প্রাচীন নর্স ভাষা থেকে এসেছে। ডেনিশ ভাষাও এখানে প্রচলিত।

রাজধানী: দেশটির রাজধানী হলো টরশভন (Tórshavn), যা বিশ্বের ক্ষুদ্রতম রাজধানী শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং ভাইকিংদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত।

অর্থনীতি: এখানকার অর্থনীতি মূলত মৎস্যশিল্প এবং সামুদ্রিক কৃষি (যেমন স্যামন মাছের খামার) নির্ভর। সম্প্রতি পর্যটনশিল্প দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ফারো আইল্যান্ডসের নিজস্ব পতাকা, ভাষা এবং পার্লামেন্ট (Løgting) রয়েছে, যদিও তাদের পররাষ্ট্রনীতি এবং প্রতিরক্ষা ডেনমার্কের দ্বারা পরিচালিত হয়। তাই এটি পুরো স্বাধীন দেশ নয়। ডেনমার্কের অধীন দুটি দেশের একটা, অপরটি হল গ্রিনল্যান্ড। @ বইকাল


৪০

আমেরিকার রাজ্যগুলো ধূমপানবিরোধী ক্যাম্পেইন

আমেরিকায় প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সিগারেট ধূমপানের হার ১৯৬৫ সালের ৪২.৪% থেকে ২০২৪ সালে ৯.৯%-এ নেমে আসা পাবলিক হেলথের ইতিহাসে অন্যতম বড় সাফল্য। এটি কোনো একক ❝ মিরাকল ড্রাগ ❞ বা একটা আবিষ্কারের ফল নয়। বরং বিজ্ঞান, নীতি, মামলা-মোকদ্দমা এবং সমাজের সম্মিলিত ইচ্ছার ৬০ বছরের অবিরাম লড়াইয়ের ফল—যা টোব্যাকো ইন্ডাস্ট্রির প্রবল বিরোধিতার মুখেও চলেছে।

১৯৬৪ সালের Surgeon General’s Report-এ প্রথমবার সরকারিভাবে প্রমাণিত হয় যে ধূমপান ফুসফুসের ক্যান্সার, হার্ট অ্যাটাক, লাং ডিজিজ ইত্যাদির কারণ। এটি ছিল একটা বিশাল টার্নিং পয়েন্ট। এরপর থেকে ডাক্তার, সরকার ও জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ে। পরবর্তীকালে পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতি (১৯৮৬) এবং অন্যান্য গবেষণা জনমত বদলে দেয়।

ধূমপানকে কমিয়ে দেয়ার জন্য বারবার সিগারেটের দাম বাড়ানো হয়েছে। আমেরিকার রাজ্যগুলোতে বারবার ট্যাক্স বাড়ানো হয়েছে। ১৯৭৫ সালে মিনেসোটায় ধূমপানমুক্ত আইন শুরু হয়েছে, এখন প্রায় সব রাজ্যে অফিস, রেস্টুরেন্ট, পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষিদ্ধ। এতে পরোক্ষ ধূমপান কমেছে এবং সামাজিকভাবে ধূমপানকে ❝অস্বাভাবিক❞ করে তুলেছে।

১৯৭০ সালে টিভি-রেডিওতে সিগারেটের বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়ে যায়। পরে আরও কড়া নিয়ম আসে।

১৯৬৫ থেকে প্যাকেটে সতর্কবার্তা দেয়া শুরু হয়, পরে একই সাথে গ্রাফিক ছবি দেওয়া যুক্ত হয়েছে।

২০০৯ সাল থেকে Family Smoking Prevention and Tobacco Control Act-এর মাধ্যমে টোব্যাকো কোম্পানির উপর FDA-এর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হয়েছে।

একই সাথে হয়েছে মামলা-মোকদ্দমা। আমেরিকায় ১৯৯৮ সালের Master Settlement Agreement (MSA) এর মাধ্যমে ৪৬টি রাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল টোব্যাকো কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করে ২৪৬ বিলিয়ন ডলারের বৃহত্তম সেটেলমেন্ট আদায় করে (২৪ হাজার ৬০০ কোটি ডলার)। এর ফলে কোম্পানিগুলোকে যুবকদের টার্গেট করে বিজ্ঞাপন বন্ধ করতে হয়। এই টাকা দিয়ে রাজ্যগুলো ধূমপানবিরোধী ক্যাম্পেইন চালায়। এর ফলে সিগারেটের দাম বাড়ে এবং যুবকদের ধূমপান কমে।

একই সাথে বিভিন্ন জনসচেতনতা ক্যাম্পেইন ও সামাজিক পরিবর্তন যেমন বাস্তব ধূমপায়ীদের গল্প লাখো মানুষকে সিগারেট ছাড়তে সাহায্য করেছে।

ধূমপানের কুফল জানানোর যুবকদের জন্য ক্যাম্পেইন ধূমপানকে আমেরিকার সমাজে কঠিন করে তুলেছে। এর ফলে ১৯৯৭ সালের ৩৬.৪% থেকে যুবকদের মাঝে ধূমপানের হার এখন ২-৩%-এ নেমেছে।

এরই মধ্যে সামাজিক নর্ম বদল হয়েছে। আগে ডাক্তাররাও ধূমপান করতেন। এখন পাবলিক স্পেসে নিষিদ্ধ হওয়ায় ধূমপানকে ❝স্টিগমা❞ বা ❝কুসংস্কার❞ হিসেবে দেখা হয়।

এসব কিছুর সাথে ধূমপান ছাড়ার সময়কার বিভিন্ন সুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে, যেমন নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (প্যাচ, গাম), ওষুধ (varenicline ইত্যাদি), কাউন্সেলিং এবং কুইটলাইন। আমেরিকার রাজ্য ও ফেডারেল প্রোগ্রামগুলো এগুলোকে বিনামূল্যে বা সস্তায় দিয়েছে।

আমেরিকার নতুন প্রজন্মের সদস্যরা ধূমপান শুরু না করায় দীর্ঘমেয়াদে প্রাপ্তবয়স্কদের মাঝে ধূমপানের হার কমেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ১৮-৩০ বছর বয়সীরা এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে।

আরেকটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো কিছু মানুষ সিগারেট থেকে ই-সিগারেটে সরে গেছে, যা সিগারেটের হার আরও কমিয়েছে। কিন্তু সামগ্রিক নিকোটিন ব্যবহার এখনও ১৮.৮%।

আমেরিকার এই সাফল্য রাজ্য ও স্থানীয় স্তরের সমন্বিত প্রোগ্রামের ফল। একা ফেডারেল সরকারের নয়। তবে এখনও বৈষম্য আছে—নিম্ন আয়, গ্রামীণ এলাকা, কম শিক্ষিত এবং প্রতিবন্ধীদের মধ্যে ধূমপানের হার বেশি।

আমেরিকায় এটি ৬০ বছরের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা যা ট্যাক্স, আইন, ক্যাম্পেইন, মামলা এবং সচেতনতার সমন্বয়। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে শক্তিশালী ইন্ডাস্ট্রির বিরুদ্ধেও দীর্ঘমেয়াদি সম্মিলিত উদ্যোগ সফল হতে পারে।  @ দীপায়ন তূর্য


৪১

অনেক মানুষই টাকা হাতে পেলেই খরচ করে ফেলেন। এটা শুধু অভ্যাস না, এর পেছনে কিছু মানসিক ও বাস্তব কারণ কাজ করে।  

প্রথমত, তাৎক্ষণিক আনন্দের টান

আমরা সাধারণত এখনই ভালো লাগা চাই। কিছু কিনলে সঙ্গে সঙ্গে একটা সুখের অনুভূতি আসে। এই ছোট আনন্দটা অনেক সময় ভবিষ্যতের বড় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়।

দ্বিতীয়ত, পরিকল্পনার অভাব

অনেকেরই স্পষ্ট কোনো বাজেট বা লক্ষ্য থাকে না। কত আয়, কত খরচ, কত সেভিংস এগুলো আগে থেকে ঠিক না থাকলে টাকা আসলেই সেটা অজান্তেই খরচ হয়ে যায়।

তৃতীয়ত, সামাজিক প্রভাব

বন্ধু, সহকর্মী বা সোশ্যাল মিডিয়া দেখে আমরা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনি। অন্যদের লাইফস্টাইল দেখে মনে হয় “আমাকেও এটা লাগবে”, যদিও বাস্তবে দরকার নেই।

চতুর্থত, নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ কম

কেউ কেউ জানেন যে খরচ কমানো দরকার, কিন্তু নিজেকে থামাতে পারেন না। এটাকে ইমপালসিভ স্পেন্ডিং বলা যায় হঠাৎ সিদ্ধান্তে খরচ করা।

পঞ্চমত, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা কম

অনেকে ভাবেন “আগামীতে যা হবে দেখা যাবে”। এই মানসিকতার কারণে সেভিংস বা ইনভেস্টমেন্টের গুরুত্ব কমে যায়।

ষষ্ঠত, স্ট্রেস বা মন খারাপ

অনেকেই মন খারাপ বা চাপের সময় শপিং করেন। এতে সাময়িকভাবে ভালো লাগে, কিন্তু পরে বুঝতে পারেন টাকাটা অপ্রয়োজনীয় জায়গায় গেছে।

শেষ কথা

টাকা পেলেই খরচ করা স্বাভাবিক মনে হলেও, এটা দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার কারণ হয়। যদি একটু সচেতন হয়ে খরচের আগে ভাবা যায়, ছোট একটা বাজেট করা যায়, আর নিজের লক্ষ্য ঠিক রাখা যায় তাহলে এই অভ্যাস ধীরে ধীরে বদলানো সম্ভব। @ ShimuRimu


৪২

নিজের যাত্রাকে অন্যের সাথে মিলিয়ে হতাশ হবেন না।

কারো ২৫ বছরে চাকরি হয়, আবার কেউ ৪০ বছরে গিয়ে কোটিপতি হয়—সবার ঘড়ির সময় এক নয়।

ফেসবুকে বা লিঙ্কডিনে ঢুকলেই মনে হয়—"সবাই কত সফল! কারো প্রমোশন হচ্ছে, কেউ বিদেশে যাচ্ছে, কেউ বাড়ি কিনছে। শুধু আমিই বোধহয় এক জায়গায় আটকে আছি।"

এই চিন্তাটা আমাদের কুড়ে কুড়ে খায়।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, পৃথিবীটা কোনো ১০০ মিটার দৌড় প্রতিযোগিতা নয় যে সবাইকে একই সময়ে ফিনিশ লাইনে পৌঁছাতে হবে।

জীবনটা হলো একটা ম্যারাথন, যেখানে প্রত্যেকের রাস্তা আলাদা, গতি আলাদা এবং গন্তব্যও আলাদা।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ৫৫ বছরে অবসর নিয়েছিলেন, আর ডোনাল্ড ট্রাম্প ৭০ বছরে গিয়ে শুরু করেছিলেন। দুজনেই সফল, শুধু তাদের সময়টা আলাদা।

তাই নিজেকে অন্যের সাথে তুলনা করে কষ্ট পাবেন না।

কেন হতাশ না হয়ে নিজের সময়ের অপেক্ষা করবেন?

১. প্রত্যেকের প্রশ্নপত্র আলাদা (Different Question Papers)

স্কুলের পরীক্ষায় সবার প্রশ্ন এক থাকে, তাই অন্যেরটা দেখে লেখা যায়।

কিন্তু জীবনের পরীক্ষায় সবার প্রশ্নপত্র আলাদা।

কারো হয়তো অর্থের অভাব, কারো পারিবারিক সমস্যা, আবার কারো শারীরিক অসুস্থতা।

তাই অন্যের উত্তর দেখে নিজের জীবন চালাতে গেলে আপনি ফেল করবেন। আপনার পরিস্থিতি অনুযায়ী আপনার লড়াইটা আপনাকেই লড়তে হবে।

২. আগে ফোটা মানেই সেরা নয়

শিমুল ফুল বসন্তের শুরুতেই ফোটে, কিন্তু খুব দ্রুত ঝরে যায়। আর বটগাছ বড় হতে সময় নেয়, কিন্তু মহীরূহ হয়ে কয়েকশ বছর দাঁড়িয়ে থাকে।

আপনার সফলতা আসতে দেরি হচ্ছে মানে সৃষ্টিকর্তা আপনার ভিত্তি (Foundation) শক্ত করছেন। যা দ্রুত আসে, তা দ্রুত চলেও যায়। যা দেরিতে আসে, তা স্থায়ী হয়।

৩. জীবন কোনো চেক-লিস্ট নয়

২৫ বছরেই চাকরি পেতে হবে, ৩০ বছরেই বাড়ি করতে হবে—এই নিয়মগুলো সমাজের বানানো, জীবনের নয়।

দেরিতে শুরু করা মানেই হেরে যাওয়া নয়।

বরং অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে যারা দেরিতে শুরু করে, তারা অনেক সময় দ্রুত সফল হওয়া মানুষদের চেয়েও অনেক দূর পর্যন্ত যায়।

শেষ কথা

আপনার বন্ধু এগিয়ে গেছে বলে ঈর্ষা করবেন না, তাকে অভিনন্দন জানান।

আর নিজেকে বলুন—"আমার সময়টা হয়তো এখন নয়, কিন্তু আমার সময়টা যখন আসবে, তখন সেটা দেখার মতো হবে।"

ঘড়ির কাঁটা কারো জন্য থামে না, আপনার ভালো সময়টাও আসছে। শুধু হাল ছাড়বেন না।

নিজেকে বলুন—

"আমি পিছিয়ে নেই, আমি আমার নিজস্ব টাইমজোনে (Time Zone) আছি।" @ MotivationalQuotesBangla



 স্মার্ট যোগাযোগের এই কার্যকরী কৌশল 

আপনি কি কখনো ভেবেছেন কেন কিছু মানুষের কথা শুনতে সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসে থাকে, আর কারো কথা এড়িয়ে যেতে চায়? পার্থক্যটা শুধু তাদের শব্দচয়নে নয়, বরং কথা বলার ধরনে। নিজের ব্যক্তিত্বকে আরও আকর্ষণীয়, আত্মবিশ্বাসী ও প্রভাব বিস্তারকারী করে তুলতে চান? তাহলে জেনে নিন স্মার্ট যোগাযোগের এই কার্যকরী কৌশলগুলো!

১. তাড়াহুড়ো করে কথা বলবেন না

অনেক দ্রুত কথা বললে শ্রোতা আপনার কথার মূল ভাব ঠিকমতো বুঝতে পারে না। তাছাড়া, দ্রুত কথা বলাকে সাধারণত নার্ভাসনেস বা আত্মবিশ্বাসের অভাব হিসেবে ধরা হয়। ধীরে, শান্তভাবে এবং প্রতিটি শব্দ গুছিয়ে বলার চেষ্টা করুন। এতে আপনার কথায় যেমন গাম্ভীর্য আসবে, তেমনি শ্রোতারাও আপনার বক্তব্যকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করবে।

২. চোখে চোখ রেখে কথা বলুন

আই কন্ট্যাক্ট (Eye Contact) বা চোখে চোখ রেখে কথা বলা সফল যোগাযোগের অন্যতম প্রধান শর্ত। আপনি যখন কারো চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে কথা বলেন, তখন তা আপনার সততা এবং প্রবল আত্মবিশ্বাসকে তুলে ধরে। এটি প্রমাণ করে যে আপনি নিজের কথায় বিশ্বাস রাখেন এবং সামনের মানুষটির প্রতি মনোযোগী। তবে একনাগাড়ে তাকিয়ে না থেকে স্বাভাবিকভাবে চোখের দৃষ্টি বিনিময় করুন।

৩. যা বলবেন, পরিষ্কার করে বলুন

অস্পষ্ট উচ্চারণ বা বিড়বিড় করে কথা বলা আপনার স্মার্টনেসকে মুহূর্তেই ম্লান করে দেয়। আপনার বক্তব্য যতই যৌক্তিক হোক না কেন, তা যদি স্পষ্ট না হয় তবে তা মূল্যহীন। প্রতিটি শব্দ স্পষ্ট উচ্চারণে বলার চেষ্টা করুন। কণ্ঠস্বরের ওঠানামা (Voice modulation) ব্যবহার করুন যাতে কথা একঘেয়ে বা রোবোটিক না হয়ে যায়।

৪. ঘুরিয়ে কথা বাদ দিন

অনেকেই একটি সহজ কথা বোঝাতে অযথাই অনেক অপ্রাসঙ্গিক ভূমিকা দিয়ে শুরু করেন। এতে শ্রোতার মনোযোগ নষ্ট হয় এবং বিরক্তি তৈরি হয়। আপনি যা বোঝাতে চাইছেন, সরাসরি সেই প্রসঙ্গে কথা বলুন। অপ্রয়োজনীয় কথা বর্জন করে সোজাসাপ্টা ও প্রাসঙ্গিক কথা বলার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

৫. পয়েন্টে এসে কথা শেষ করুন

যেকোনো আলোচনার একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বা উপসংহার থাকে। নিজের মূল পয়েন্টটি বা বক্তব্যটি শ্রোতাকে ভালোভাবে বুঝিয়ে বলার পর সেখানেই থেমে যাওয়া উচিত। কথা অযথা দীর্ঘ করলে কথার ওজন ও আকর্ষণ কমে যায়। মনে রাখবেন, কম কথায় সঠিক ও গভীর অর্থ প্রকাশ করাই হলো সত্যিকারের স্মার্টনেস। @ Mohiuddin Ahmed

 

৪৪


লোকচক্ষুর আড়ালে নিজেকে উন্নত করে চলুন। 


​১. প্রদর্শন বনাম প্রকৃত শৃঙ্খলা:

অনেকে সকালে খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে বা স্বাস্থ্যকর খাবার খায় শুধু অন্যকে দেখানোর জন্য (যেমন: সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা)। যারা তাদের ডিসিপ্লিন বা শৃঙ্খলাকে সবার সামনে প্রদর্শন করে, তারা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং একসময় সেটি ছেড়ে দেয়। কিন্তু যারা প্রচার ছাড়াই নীরবে নিজের কাজ করে যায়, তারা বছরের পর বছর তা ধরে রাখতে পারে।

​২. কেন অন্যকে জানালে ক্ষতি হয়? 

মনোবিজ্ঞানে ‘ওভারজাস্টিফিকেশন ইফেক্ট’ (Overjustification Effect) বলে একটি বিষয় আছে। এর মানে হলো, আপনি যখন নিজের আনন্দের জন্য কোনো কাজ করেন এবং সেই কাজের জন্য বাইরের কোনো পুরস্কার (যেমন: লাইক, কমেন্ট বা প্রশংসা) পেতে শুরু করেন, তখন আপনার ভেতরের আসল অনুপ্রেরণা কমে যায়। কাজটা তখন আপনার নিজের থাকে না, সেটি হয়ে যায় ‘পারফরম্যান্স’ বা দর্শক দেখানোর বিষয়।

​৩. দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের রহস্য:

যেকোনো ভালো অভ্যাস ধরে রাখার জন্য তিনটি জিনিস প্রয়োজন:

​স্বাধীনতা (Autonomy): আমি নিজের ইচ্ছায় এটা করছি।

​দক্ষতা (Competence): আমি বুঝতে পারছি যে আমি উন্নতি করছি।

​সম্পর্ক (Relatedness): অন্যের সাথে সংযোগ।

গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদী সফলতার জন্য প্রথম দুটি—অর্থাৎ নিজের ইচ্ছা এবং নিজের উন্নতির বোধই সবচেয়ে বেশি কাজ করে। এখানে ইন্টারনেটের অপরিচিত মানুষের প্রশংসার কোনো ভূমিকা নেই।

​যখনই আপনি কোনো অভ্যাস নিয়ে খুব বেশি গল্প করেন, তখন আপনার মন সেই কাজটির চেয়ে 'মানুষ কী ভাবছে' তা নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এতে কাজের মান কমে যায়।

​৪. যারা টিকে থাকে, তারা শান্ত থাকে:

আপনার পরিচিত সবচেয়ে সুশৃঙ্খল মানুষটির কথা ভাবুন। দেখবেন, তিনি সাধারণত নিজের রুটিন নিয়ে খুব বেশি চিৎকার করেন না। তিনি প্রতিদিন তার কাজটা করে যান খুব নীরবে। আমাদের সমাজ আমাদের শিখিয়েছে যে—কিছু করলে সেটা দেখাতে হবে। কিন্তু আসল সার্থকতা হলো নিজের পরিবর্তন, যা অন্যকে দেখানোর জন্য নয়।

​৫. লোকচক্ষুর আড়ালে শৃঙ্খলা গড়ার উপায়:

​লক্ষ্য গোপন রাখুন: আপনি নতুন কিছু শিখতে চাইলে বা করতে চাইলে এখনই সবাইকে জানানোর দরকার নেই। নীরবে শুরু করুন।

​ভেতরের উন্নতি মাপুন: বাইরে থেকে কেমন দেখাচ্ছে তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিন আপনার ভেতরে কেমন অনুভব হচ্ছে তার ওপর।

​অহেতুক কষ্ট নয়, ধারাবাহিকতা: শৃঙ্খলার মানেই হলো শুধু কষ্ট পাওয়া নয়, বরং কোনো বাহাদুরি ছাড়াই প্রতিদিন কাজটি চালিয়ে যাওয়া।

আসল 'ফ্লেক্স' বা বাহাদুরি এটা নয় যে আপনি কত কঠিন কাজ করতে পারেন। আসল বাহাদুরি হলো আপনি কতটা নিঃশব্দে এবং ধারাবাহিকভাবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারেন, যেখানে কেউ আপনার স্কোর রাখছে না। যখন আপনি নিজের কাজের মধ্যেই তৃপ্তি পাবেন, তখন আপনার আর বাইরের কোনো অনুপ্রেরণার প্রয়োজন হবে না। @ Paint with Ashraf


৪৫

ইনস্ট্যান্ট ওটস

সকালের নাস্তায় আজকাল এক নতুন আভিজাত্যের নাম ওটস। চকচকে বিদেশি প্যাকেটে মোড়ানো এই খাবারটি না খেলে যেন আধুনিক স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের দিনই শুরু হতে চায় না। টিভিপর্দায় বা সোশ্যাল মিডিয়ায় বড় বড় তারকারা হাসিমুখে ওটস খাওয়ার দৃশ্য দেখিয়ে আমাদের মগজধোলাই করে চলেছেন প্রতিনিয়ত। কিন্তু ফাংশনাল পুষ্টি বিজ্ঞান ও মেটাবলিক স্বাস্থ্যের চশমা দিয়ে দেখলে এই বিদেশি সুপারফুডের পেছনের আসল কর্পোরেট চালটি খুব সহজেই ধরা পড়ে।

​আমাদের বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ইনস্ট্যান্ট ওটসগুলো আসলে চরমভাবে প্রক্রিয়াজাত। কারখানায় এগুলোকে বারবার গরম করে এবং পিষে এমন পাতলা করা হয় যে এর আসল ফাইবার বা আঁশ প্রায় নষ্ট হয়ে যায়। দ্রুত রান্না করার সুবিধার্থে এগুলোকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয় যে এটি খেলে আর চিনি খাওয়ার মধ্যে খুব একটা পার্থক্য থাকে না। এরপর স্বাদ বাড়ানোর জন্য অনেক প্যাকেটে মেশানো হয় কৃত্রিম ফ্লেভার আর লুকানো চিনি।

আপনি হয়তো ভাবছেন সকাল সকাল এক বাটি স্বাস্থ্য খাচ্ছেন অথচ বাস্তবে আপনার পেটে যাচ্ছে দ্রুত রক্তে গ্লুকোজ বাড়ানোর এক নিখুঁত কর্পোরেট রেসিপি। ওটস মূলত শীতপ্রধান দেশের শস্য যা ধুরন্ধর মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে আমাদের মতো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশের মানুষের জন্য দামি সুপারফুড বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

​অথচ আমাদের হাতের কাছেই রয়েছে ওটসের চেয়ে অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর, হালকা এবং অন্ত্রের বন্ধু দেশীয় খাবার খই। বিশেষ করে লাল ধানের খই তৈরির প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক। খোসাসহ ধান বালুর তাপে ভেজে খই তৈরি হয় বলে ধানের সবটুকু ফাইবার ও পুষ্টিগুণ এর ভেতরেই অটুট থাকে। এতে কোনো রাসায়নিক বা প্রিজারভেটিভ মেশানোর বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। সকালের নাস্তায় এক বাটি খই ঘরে পাতা টক দই এবং সামান্য দেশি ফল বা লাল গুড় দিয়ে খেলে তা আমাদের মাইক্রোবায়োমের জন্য এক অসাধারণ জাদুকরী খাবার হিসেবে কাজ করে। খইয়ের ফাইবার বা আঁশ হলো প্রি-বায়োটিক আর দই হলো প্রো-বায়োটিক। এই দুইয়ের মিলনে আমাদের পরিপাকতন্ত্র শান্ত থাকে, হজমপ্রক্রিয়া শক্তিশালী হয় এবং রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা একদম স্থিতিশীল থাকে।

​কর্পোরেট কোম্পানিগুলো কখনোই চাইবে না আপনি সস্তায় দেশি খাবার খেয়ে সুস্থ থাকুন। তারা চায় আপনি হাজার মাইল দূর থেকে জাহাজে চড়ে আসা দামি ইনস্ট্যান্ট ওটস কিনে তাদের মুনাফার পাহাড় বড় করুন। শিকড়ের পুষ্টি বা আমাদের নিজস্ব মাটি ও আবহাওয়া অনুযায়ী উৎপাদিত প্রাকৃতিক খাবারগুলোই আসলে আমাদের মেটাবলিজমের সাথে সবচেয়ে ভালো মানিয়ে নেয়। তাই পরের বার সুপারশপে গিয়ে অতিরিক্ত দাম দিয়ে ওটসের প্যাকেট কেনার আগে একবার ভাববেন আপনি কি আসলে নিজের স্বাস্থ্য কিনছেন নাকি বিদেশি কর্পোরেটদের পকেট ভারী করছেন।

প্রতিদিন সকালে দই খই খেয়ে আমাদের পূর্বপুরুষেরা যে সুস্বাস্থ্য ধরে রাখতেন সেই ন্যাচারাল হিলিংয়ের পথে ফিরে যাওয়াই হতে পারে আমাদের অন্ত্র ও পকেটের জন্য সবচেয়ে বড় বুদ্ধিমত্তা। @ Probal Kumar Mondal

৪৬


পেটের কথা পেটে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ

নিজের সাফল্যের এই ৩টি গোপন প্ল্যান কাউকে বললেই কিন্তু সব মাটি হয়ে যাবে!

Work Hard in Silence, Let Your Success Make the Noise

আমরা অনেকেই আবেগের বশবর্তী হয়ে বা উৎসাহে নতুন কোনো প্ল্যান করলেই বন্ধুদের বা আত্মীয়দের বলে ফেলি।

"আমি নতুন ব্যবসা শুরু করছি", "আমি বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করছি" ইত্যাদি।

কিন্তু খেয়াল করে দেখবেন, বলার পরেই কাজটা কোনো না কোনো কারণে আটকে যায় বা নষ্ট হয়ে যায়।

এর কারণ শুধু 'নজর' নয়, এর কারণ মনস্তাত্ত্বিকও। যখন আপনি সবাইকে বলে দেন, তখন আপনার মস্তিষ্ক আগেই এক ধরণের 'তৃপ্তি' বা 'ডোপামিন' রিলিজ করে দেয়, ফলে কাজ করার আসল জেদটা কমে যায়। তাছাড়া, সবার মনমানসিকতা সমান হয় না; কেউ উৎসাহ দেয়, আবার কেউ নিরাশার কথা বলে আপনার কনফিডেন্স ভেঙে দেয়।

তাই নিজের ভালোর জন্যই এই ৩টি বিষয় গোপন রাখুন:

সাফল্যের যে ৩টি বিষয় ভুলেও প্রকাশ করবেন না:

১. পরবর্তী পদক্ষেপ (Your Next Move)

দাবা খেলায় যেমন চাল দেওয়ার আগে কাউকে বলা হয় না, জীবনেও তাই।

আপনি কাল কী করবেন, কোথায় ইনভেস্ট করবেন বা কোন চাকরির জন্য চেষ্টা করছেন—এটা কাজ হওয়ার আগে কাউকে জানাবেন না।

লোকে ফলাফল দেখতে পছন্দ করে, আপনার প্রচেষ্টার গল্প শুনতে নয়। কাজটা হয়ে গেলে সবাই এমনিতেই জানবে, কিন্তু হওয়ার আগে ঢাকঢোল পেটালে পদে পদে বাধা আসতে পারে।

২. নিজের উপার্জন বা সঞ্চয় (Your Income & Savings)

আপনার পকেটে কত টাকা আছে বা আপনি কত টাকা বেতন পান—এটা একান্তই ব্যক্তিগত।

টাকা বেশি শুনলে মানুষ ধার চাইবে বা হিংসা করবে, আর কম শুনলে অবহেলা করবে।

তাই নিজের আর্থিক অবস্থা নিয়ে কারো সাথে আলোচনা না করাই বুদ্ধিমানের কাজ। মনে রাখবেন, "টাকা আর চাবি—সবসময় নিজের কাছে সাবধানে রাখতে হয়।"

৩. নিজের দুর্বলতা বা পারিবারিক সমস্যা (Your Weakness)

রাগের মাথায় বা আবেগে নিজের দুর্বলতার কথা বা ঘরের অশান্তির কথা বাইরের মানুষকে বলবেন না।

আজ যে আপনার বন্ধু, কাল সে পরিস্থিতি বা স্বার্থের কারণে বদলে যেতে পারে। তখন আপনার বলা ওই দুর্বল কথাগুলোই আপনার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতে পারে।

তাই নিজের ক্ষতের কথা সবাইকে দেখিয়ে বেড়াবেন না, সবাই মলম লাগাবে না, কেউ কেউ লবণও ছিটিয়ে দিতে পারে।

শেষ কথা

বুদ্ধিমান মানুষরা সমুদ্রের মতো—ওপরে শান্ত, কিন্তু ভেতরে গভীরতা।

নিজের স্বপ্নকে সুরক্ষিত রাখতে শিখুন। সবাইকে সব কথা বলতে নেই।

গোপনে পরিশ্রম করুন, নিজেকে তৈরি করুন। যেদিন সফল হবেন, সেদিন শব্দটা আপনার মুখ থেকে নয়, লোকেদের তালি থেকে আসবে।

নিজেকে বলুন—

"আমার প্ল্যান আমার শক্তি, এটা আমি নষ্ট হতে দেব না।" @ MotivationalQuotesBangla

৪৭


বিষণ্ণতা ও মানসিক স্বাস্থ্য: রোদহীন মেঘলা দিনে অকারণেই কেন মন খারাপ হয়? 

বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় 'সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার' (SAD) বা ঋতুভিত্তিক বিষণ্ণতা।

​আমাদের মস্তিষ্কে 'সেরোটোনিন' (Serotonin) নামের একটি জাদুকরী রাসায়নিক উপাদান বা নিউরোট্রান্সমিটার থাকে। এই সেরোটোনিনই হলো আমাদের সুখ, আনন্দ, প্রশান্তি আর ফুরফুরে মেজাজের প্রধান কারিগর। আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, এই হ্যাপি হরমোন বা সেরোটোনিন তৈরির মূল সুইচটি লুকিয়ে আছে সূর্যালোকের কাছে। যখন দুপুরের কড়া রোদ আমাদের ত্বকে এসে পড়ে এবং চোখের রেটিনায় আলোর ঝলকানি পৌঁছায়, তখন আমাদের মস্তিষ্কে এক আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। সেরোটোনিনের মাত্রা বেড়ে গিয়ে মন হয়ে ওঠে সতেজ আর প্রাণবন্ত।

​আর এই পুরো প্রক্রিয়ার মাস্টারমাইন্ড হলো আমাদের চিরচেনা ভিটামিন ডি। মস্তিষ্কের যে অংশগুলো আমাদের আবেগ ও মনন নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে ভিটামিন ডি-কে গ্রহণ করার অসংখ্য রিসিভার বা অ্যান্টেনা (VDR) বসানো রয়েছে। রক্তে ভিটামিন ডি সঠিক মাত্রায় থাকলে তা 'ট্রিপটোফ্যান' নামের একটি অ্যামিনো অ্যাসিডকে সেরোটোনিনে রূপান্তরিত হতে সরাসরি সাহায্য করে।

​কিন্তু শীতের কুয়াশা বা বর্ষার টানা মেঘলা দিনে যখন আমরা রোদ থেকে বঞ্চিত হই, তখন আমাদের রক্তে ভিটামিন ডি-এর মাত্রা কমতে শুরু করে। রোদ না পাওয়ায় মস্তিষ্কের ওই জাদুকরী কারখানাটি আর হ্যাপি হরমোন তৈরি করতে পারে না। ফলে সেরোটোনিনের অভাবে মনের ভেতর এক অদ্ভুত অন্ধকার নেমে আসে। কোনো কাজে উৎসাহ না পাওয়া, সারাক্ষণ শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করা, আর অকারণেই মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া—এগুলো মূলত সেই রাসায়নিক শূন্যতারই বহিঃপ্রকাশ। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, এই রোদহীন দিনগুলোতে হঠাৎ করেই মিষ্টি, কেক, চকলেট বা বেশি করে ভাত খাওয়ার তীব্র এক আকাঙ্ক্ষা বা ক্রেভিং তৈরি হয়। কারণ, শরীর মরিয়া হয়ে শর্করার সাহায্যে সাময়িকভাবে সেরোটোনিন বাড়ানোর চেষ্টা করে।

​প্রকৃতির সাথে মানুষের এই প্রেমটা কেবল আবেগের নয়, মেটাবলিকও বটে। কংক্রিটের চারদেয়ালে বন্দি আধুনিক জীবনে আমরা যখন রোদ থেকে স্বেচ্ছায় নির্বাসন নিচ্ছি, তখন আমরা মূলত আমাদের মানসিক শান্তিকেই গলা টিপে হত্যা করছি। বিষণ্ণতার এই মেঘ কাটাতে শুধু অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট বা মন ভালো করার ওষুধের ওপর নির্ভর না করে, প্রকৃতির কাছেই ফিরে যেতে হবে।

একটু রোদ উঠলেই ছাদে বা খোলা আকাশে নিচে গিয়ে সেই সোনালী উষ্ণতা গায়ে মেখে নেওয়া, আর খাদ্যতালিকায় দেশি মুরগির ডিম, গাওয়া ঘি বা সামুদ্রিক মাছের মতো স্বাস্থ্যকর ফ্যাট রাখা—এগুলোই হতে পারে মন ভালো রাখার সবচেয়ে মোক্ষম প্রাকৃতিক দাওয়াই।

​মনের মেঘ কাটলেও অনেকেরই রাতের ঘুম যেন কিছুতেই আসতে চায় না। এপাশ-ওপাশ করেই রাত শেষ হয়ে যায়। রোদ আর ভিটামিন ডি-এর সাথে আমাদের এই ঘুমের হরমোনের সম্পর্কটা আসলে কী?

​এই মেটাবলিক ধাঁধার উত্তর মিলবে আগামী পর্বে 'ঘুম না আসার যাতনা: সার্কাডিয়ান রিদম, ভিটামিন ডি এবং স্লিপ হরমোন মেলাটোনিনের যুগলবন্দী।'

 @ Probal Kumar Mondal


৪৮

৬ টা চরম সত্য, যা সবার জানা উচিত, 

১/ কঠোর পরিশ্রম জীবনে সবসময় সফলতা নিয়ে আসে না। কঠোর পরিশ্রমের পাশাপাশি, স্মার্ট ডিসিশন আর কনসিস্টেন্সি এই দুটোর উপর বেশি জোর দেওয়া উচিত।

২/ সময় কারো জন্য থেমে থাকে না। তাই আজ যা করতে পারবেন, সেটা আজকেই শেষ করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। কারণ কাল হয়তো একই সুযোগ নাও আসতে পারে।

৩/ সবাই আপনার ভাল চাইবে না। তাই সবাইকে খুশি করার চেষ্টা না করে, নিজের লক্ষ্যেই ফোকাস করুন।

৪/ Comfort zone আপনাকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেয়। তাই মাঝে মাঝে নিজেকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলুন। কারণ গ্রোথ অনেকসময় আনকম্ফোর্টেবল জায়গা থেকেই হয়।

৫/ সঠিক সময় বলে কিছু নেই। আজ এই সময়টাই আপনার জন্য সবচেয়ে ভালো সময়। তাই দেরি না করে আজ থেকেই কাজ শুরু করে দিন।

৬/ টাকা হয়তো সব কিছু না। কিন্তু টাকা না থাকলে অনেক কিছু করাই বেশ কঠিন হয়ে যায়। আবার টাকার পাশাপাশি স্কিলস আর ভ্যালু ক্রিয়েট করাতেও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। @ লক্ষ্যপথ


৪৯

কমিউনিকেশন স্কিল বা যোগাযোগ দক্ষতার ২০টি অপ্রিয় সত্যঃ

কথা বলতে পারলেই কমিউনিকেশন হয় না। চুপ থাকাও একটা বড় স্কিল।

১. শোনার ভান করা: অধিকাংশ মানুষ শোনে না, তারা শুধু অপেক্ষা করে কখন তাদের বলার পালা আসবে। এটাকে বলা হয় "Active Listening"-এর অভাব।

২. বডি ল্যাঙ্গুয়েজই আসল: আপনার মুখের কথার চেয়ে আপনার হাত নাড়ানো, চোখের চাহনি বা দাঁড়ানোর ভঙ্গি ৫৫% বেশি ভাব প্রকাশ করে।

৩. তর্ক করে জেতা যায় না: তর্কে জিতলে আপনি ইগোতে জিতবেন, কিন্তু সম্পর্ক হারাবেন। মানুষকে ভুল প্রমাণ করে কেউ কখনো তাদের মন জয় করতে পারেনি।

৪. নাম মনে রাখা: কারো নাম ভুলে যাওয়া মানে তাকে বুঝিয়ে দেওয়া—"তুমি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নও।" নাম মনে রাখা কমিউনিকেশনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

৫. স্পষ্টতা (Clarity): কঠিন শব্দ ব্যবহার করলেই স্মার্ট হওয়া যায় না। যে যত সহজ ভাষায় কঠিন কথা বোঝাতে পারে, সে তত ভালো কমিউনিকেটর।

৬. "আমি" বাদ দেওয়া: কথায় কথায় "আমি, আমার" করলে লোকে বিরক্ত হয়। "আপনি, আপনার" বললে মানুষ আগ্রহী হয়।

৭. গল্প বলা (Storytelling): মানুষ ডাটা বা তথ্য মনে রাখে না, মনে রাখে গল্প। ভালো কথা বলতে হলে ভালো গল্প বলা শিখতে হবে।

৮. নীরবতা শক্তিশালী: কথার মাঝখানে একটু থামা (Pause) বা নীরব থাকা আপনার কথার গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। তোতাপাখির মতো বকবক করলে ভ্যালু কমে।

৯. লিখিত যোগাযোগ: ইমেইল বা চ্যাটিংয়ে ইমোশন বোঝা যায় না, তাই সেখানে ভুল বোঝাবুঝি বেশি হয়। শব্দ চয়নে সতর্ক হতে হয়।

১০. ফিডব্যাক স্যান্ডউইচ: কাউকে নেগেটিভ কথা বলতে হলে আগে প্রশংসা করুন, মাঝখানে সমালোচনা করুন, শেষে আবার প্রশংসা করুন। সরাসরি সমালোচনা করলে মানুষ ডিফেন্সিভ হয়।

১১. আই কন্টাক্ট: কথা বলার সময় চোখে চোখ না রাখলে মানুষ ভাবে আপনি মিথ্যা বলছেন বা আত্মবিশ্বাসী নন। আবার বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে ভাবে আপনি আগ্রাসী। ব্যালেন্স জরুরি।

১২. প্রশ্ন করা: যারা ভালো কমিউনিকেটর, তারা নিজেরা কম বলে এবং প্রশ্ন করে অপরপক্ষকে কথা বলার সুযোগ দেয়।

১৩. না বলা: ভদ্রভাবে "না" বলতে পারা একটা আর্ট। সবাইকে খুশি করতে "হ্যাঁ" বললে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়।

১৪. টোন বা গলার স্বর: "কী বলছ"—এটা রাগী টোনে একরকম, আর নরম টোনে আরেকরকম। শব্দের চেয়ে টোন বেশি ইম্প্যাক্ট ফেলে।

১৫. ফোন বা স্ক্রিন: কারো সাথে কথা বলার সময় ফোনের দিকে তাকানো চরম অপমানজনক আচরণ।

১৬. আবেগের নিয়ন্ত্রণ: রাগের মাথায় বলা কথাগুলো পরে যতই স্যরি বলেন, দাগ থেকে যায়। রাগ উঠলে মুখ বন্ধ রাখাই সেরা কমিউনিকেশন।

১৭. সবজান্তা ভাব: কেউ কিছু বললেই "আমি জানি" বলাটা খুব বিরক্তিকর অভ্যাস।

১৮. সংক্ষিপ্ততা: অফিসের প্রেজেন্টেশন বা মেইলে কেউ বড় রচনা পড়তে চায় না। যত সংক্ষেপে মূল কথা বলা যায়, তত ভালো।

১৯. সহমর্মিতা (Empathy): অন্যের জুতায় পা দিয়ে তার ফিলিংস বুঝতে না পারলে কমিউনিকেশন কখনোই গভীর হয় না।

২০. প্র্যাকটিস ছাড়া হয় না: বই পড়ে সাঁতার শেখা যায় না, তেমনি শুধু ভিডিও দেখে কথা বলা শেখা যায় না। মানুষের সাথে মিশতে হবে, ভুল করতে হবে এবং শিখতে হবে। @ লক্ষ্যপথ

৫০

ছেলেকে দেওয়া একজন আদর্শ বাবার উপদেশঃ

১. জুতা সেলাই বা রং করতে চাইলে মেরামতকারীর দোকানের সামনে পা বাড়িয়ে দিওনা, বরং জুতাটা খুলে নিজে একবার মুছে দিও।

২. কখনও কাউকে কামলা, কাজের লোক বা বুয়া বলে ডেকোনা। মনে রেখো তারাও কারো না কারো ভাই, বোন, মা, বাবা। তাদেরকে সম্মান দিয়ে ডেকো।

৩. বয়স, শিক্ষা, পদ বা পদবীর দিক দিয়ে কেউ ছোট হলেও কখনও কাউকে ছোট করে দেখোনা। নইলে তুমি ছোট হয়ে যাবে।

৪. পড়াশুনা করে জীবনে উন্নতি করো, কিন্তু কারো ঘাড়ে পা দিয়ে উপরে উঠার চেষ্টা করো না।

৫. কাউকে সাহায্য করে পিছনে ফিরে চেওনা, সে লজ্জা পেতে পারে।

৬. সব সময় পাওয়ার চেয়ে দেয়ার চেষ্টা করো বেশি । মনে রেখো, প্রদানকারির হাত সর্বদা উপরেই থাকে।

৭. এমন কিছু করোনা যার জন্য তোমার এবং তোমার পরিবারের উপর আঙুল ওঠে।

৮. ছেলে হয়ে জন্ম নিয়েছো, তাই দায়িত্ব এড়িয়ে যেওনা।

৯. তোমার কি আছে তোমার গায়ে লেখা নেই। কিন্তু তোমার ব্যবহারে দেখা যাবে তোমার পরিবার কোথায় আছে।

১০. কখনও মার কথা শুনে বউকে এবং বউয়ের কথা শুনে মাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিও না। কাউকে ফেলতে পারবে না।

১১. কারও বাসায় নিমন্ত্রন খেতে গেলে বাসায় দু-মুঠো ভাত খেয়ে যেও। অন্যের পাতিলের ভাতের  আশায় থেকো না।

১২. কারো বাসার খাবার নিয়ে সমালোচনা করো না। কেউ খাবার ইচ্ছে করে অস্বাদ করার চেষ্টা করে না।

১৩. বড় হবার জন্য নয়, মানুষ হবার জন্য চেষ্টা করো।

১৪. শ্বশুর কিংবা শাশুড়িকে এতটা সম্মান দিও,  যতটুকু সম্মান তোমার বাবা-মাকে দাও। এবং তাদের প্রতি এমন আচরন করো, যাতে করে তাদের  মেয়েকে তোমার বাড়ি পাঠানোর জন্য উতলা থাকে।

১৫. সব সময় ভদ্র ও নম্রভাবে চলো এবং কথা বলো। কিন্তু অন্যায়ের সাথে আপোষ করোনা।

@ লক্ষ্যপথ