১
বিড়াল কি বাঘের মাসি?
আজকের দিনে মানুষ বিড়ালের যেসব জাত পুষে থাকে, সেগুলোর পূর্বপুরুষেরা খ্রিষ্টপূর্ব ৪৪০০ এর দিকে দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া ও ইউরোপের সর্বত্র ছড়িয়ে ছিল। এরও প্রায় দুই হাজার বছর আগে এরা ফার্টাইল ক্রিসেন্টের (বর্তমান জর্ডান, সিরিয়া, লেবানন, ফিলি*স্তিন) কৃষিভিত্তিক মানব-বসতির আশেপাশে ঘোরাফেরা করত। এখনকার মতো সেসময়েও শস্যের ক্ষেতে ইঁদুরের দল প্রায়ই হানা দিত, আর তাদের পিছু নিত বিড়ালের দল (তখনও তারা বন্য ছিল)। এভাবেই মানু্ষের সাথে বিড়ালের প্রথম সাক্ষাৎ হয়।
এদিকে খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ সালের কাছাকাছি সময়ে মিশরজুড়ে বসবাস করা বিড়ালেরা ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। স্বভাবে শান্ত-শিষ্ট ও সামাজিক হওয়ায় দ্রুতই মানুষের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠে এরা। এরাও ফার্টাইল ক্রিসেন্টের বিড়ালদের মতো নিজেরাই ইঁদুরের খোঁজে জনবসতির আশপাশে ঘুরে বেড়াত।
গত নয় হাজার বছরে মিশর, রোমানিয়া ও আফ্রিকায় বসবাস করা দুইশোর অধিক বিড়ালের দেহাবশেষ ও মমির ডিএনএ পরীক্ষা করে এরকম বেশ চমকপ্রদ কিছু তথ্য পান বিজ্ঞানীরা। প্রাপ্ত তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে গবেষকরা অভিমত দেন, পোষা প্রাণী হিসেবে মানুষ বিড়ালকে গ্রহণ করার বহু আগেই জেনেটিক পরিবর্তনের কারণে বন্য বিড়ালেরা ধীরে ধীরে নম্র ও সামাজিক হয়ে ওঠে। একারণেই তারা হয়ে ওঠে পোষ মানানোর উপযোগী ও পরবর্তীতে মানুষের সার্বক্ষণিক সঙ্গী। এছাড়া ইঁদুর ধরায় পারদর্শী ছিল বলে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে খুব একটা বেগ পেতে হয়েনি তাদের। অন্যান্য পোষা প্রাণী; যেমন কুকুর, গরু, ভেড়া ইত্যাদি পশুকে মানুষ বেছে বেছে পোষ মানিয়েছিল দৈনন্দিন কাজের প্রয়োজনে। অন্যদিকে বিড়াল নিজেরাই নিজেদের বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন করে পরিণত হয় মানুষের সবচেয়ে প্রিয় পোষা প্রাণীতে। @ Muhaimenul Islam Nafees
২
মুঘল উত্তরাধিকার
প্রায় এক লাখ সৈন্য নিয়ে ওইদিন যদি ইব্রাহিম লোদি পানিপথে বাবরের মাত্র তেরো হাজার সৈন্যের কাছে পরাজিত না হতেন তাহলে হয়ত দিল্লির তথা ভারতবর্ষের ইতিহাস হয়ত আজ ভিন্নভাবে রচিত হতো।
যাইহোক, সিংহপুরুষ বাবর যখন দিল্লির পর, খানওয়া, চান্দেরির যুদ্ধে পুরো উত্তর ভারত ও জয় করে ফেলেন তখন মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি ভীষণ মজবুত হয়ে যায়। সব ই দারুণ চলছিল, কিন্তু সমস্যাটা বাঁধে চিরাচরিত সেই উত্তরাধিকার নিয়ে।
যদিও বাবর তার ছেলে হুমায়ুনকে উত্তরাধিকার হিসেবে মনোনীত করে যান, কিন্তু বাবরের অন্য ৩ পুত্র কামরান মির্জা, হিন্দাল মির্জা ও আসকারী মির্জারা তা মেনে নিতে পারেননি।
বাবর তার পুত্র হুমায়ুনকে ভাইদের সাথে ভালো ব্যবহারের অসিয়ত করে গিয়েছিলেন।
এজন্য হুমায়ুন তাদের ওপর বারবার দয়া দেখালেও বিশেষ করে তার ভাই কামরান মির্জা টানা বিদ্রোহ করে যান।
বাধ্য হয়ে হুমায়ুন কামরানকে হত্যা না করলেও তার দুই চোখে গরম শলাকা দিয়ে অন্ধ করে দেন এবং মক্কায় নির্বাসনে পাঠান।
এই পারিবারিক সংঘাত মুঘল সাম্রাজ্যকে এতটাই দুর্বল করে দিয়েছিল যে, হুমায়ুন শেষ পর্যন্ত শের শাহ'র কাছে মসনদ হারিয়ে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন।
এক্ষেত্রে অবশ্য হুমায়ুনের দুর্বলতা বা দুরদর্শিতার অভাব ও দায়ী আছে বলে মনে করা হয়।
যাইহোক, পরবর্তীতে সম্রাট আকবর যখন ক্ষমতায় বসেন তখন মুঘল সাম্রাজ্য তার চূড়ান্ত সমৃদ্ধি লাভ করলেও আকবর কর্তৃক তার পিতৃসম বৈরাম খানকে হত্যার কলঙ্ক তার নামের সাথে জড়িয়ে যায়।
মড়ার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে এদিকে আকবরের নিজ পুত্র সেলিম বা পরবর্তী সম্রাট জাহাঙ্গীরও বিদ্রোহ করে বসেন তার প্রতি।
এমনকি তিনি নিজের জন্য আলাদা স্বাধীন দরবার তৈরি করেন এবং আকবরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও ইতিহাসবিদ আবুল ফজলকে হত্যা করান বলেও কথিত আছে।
আকবরের পর এই সম্রাট জাহাঙ্গীর যখন ক্ষমতায় বসেন তখুনি বলা চলে গেম অব থ্রোনসের ডান্স অব দ্য ড্রাগনের মতো তীব্র গৃহযুদ্ধের সূচনাটি ঘটে যায়।
জাহাঙ্গীর সিংহাসনে বসার পরপরই তার জ্যেষ্ঠ পুত্র শাহজাদা খসরু পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। জাহাঙ্গীর পুত্র খসরুকে পরাজিত করেন।
শাস্তিস্বরূপ খসরুর অনুসারীদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয় এবং খসরুকে অন্ধ করে দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে জাহাঙ্গীরের আরেক পুত্র শাহজাহান (খুররাম) তার পথ নিষ্কণ্টক করতে বন্দি ও অন্ধ ভাই খসরুকে গোপনে হত্যা করান।
এর পর ভাতৃহন্তারক শাহজাহান যখন সিংহাসনে বসেন, তখন ক্ষমতার আর কোনো দাবিদার যেন না থাকে, সেজন্য তার চাচাতো ভাই শাহরিয়ারসহ পরিবারের প্রায় সব সম্ভাব্য পুরুষ প্রতিদ্বন্দীকে একযোগে হত্যা করার নির্দেশ দেন।
ফলে শাহজাহানের জন্য সিংহাসনের পথ হয়ে যায় পরিষ্কার।
কিন্তু সমস্যা বাঁধে শাহজাহান পরবর্তী উত্তরাধিকার নিয়ে।
তার চার পুত্র-দারা শিকোহ,, শাহ সুজা, আওরঙ্গজেব ও মুরাদ বখশ।
শাহজাহান তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র দারা শিকোহকে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতেন এবং তাঁকেই নিজের উত্তরাধিকারী হিসেবে দেখতে চাইতেন।
কিন্তু বাকিরা তা মেনে নেয়নি।
একসময় শাহজাহান গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
আর তখনই চার ভাই বুঝে গেল, সিংহাসন খালি হতে পারে।
শুরু হলো আসল ডান্স অব দ্য ড্রাগন।
প্রথমে শাহ সুজা বাংলাকে নিজের স্বাধীন রাজ্য ঘোষণা করলেন।
অন্যদিকে, আওরঙ্গজেব আঁতাত করলেন তার ভাই মুরাদের সাথে।
এবং মুরাদ গুজরাটে নিজের অবস্থান শক্ত করলেন।
এর পর আওরঙ্গজেব অবতীর্ণ হলেন সিংহাসনের সবচেয়ে বড় দাবীদার দারার বিরুদ্ধে যুদ্ধে।
সামরিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক কৌশলে সামুগড়ের যুদ্ধে তিনি দারাকে পরাজিত করলেন।
পরাজিত দারা গেলেন পালিয়ে।
আওরঙ্গজেব অবশ্য তখন শুধু ভাইকে পরাজিত করেই থামলেন না।
তিনি নিজের বাবা শাহজাহানকেও আগ্রা দুর্গে বন্দী করলেন।
যাইহোক, দারা আবার পরবর্তীতে ধরা পড়েন।
কথিত আছে আওরঙ্গজেব দারাকে ভিখারির পোশাকে দিল্লির রাজপথে অপমান করে ঘোরান এবং পরে শিরশ্ছেদ করে হত্যা করেন।
এর পর তার কাটামুণ্ডু উপহার হিসেবে অসুস্থ ও বন্দি পিতা শাহজাহানের কাছে পাঠান।
পুত্রদের মধ্যেকার এই হানাহানি দেখে ব্যথিত ও জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না শাহজাহানের।
বহু বছর আগে যে খড়গ তিনি নামিয়ে এনেছিলেন তার অন্য ভাইদের উপর, সেই খড়গ তার পুত্রদের হাত ধরে নেমে এলো তার ই ঘাড়ে।
যাইহোক, দারাকে হত্যার পর আওরঙ্গজেব করে বসলেন আরেক ট্রাজেডি।
সিংহাসন নিশ্চিত করা জন্য তিনি তার মিত্র ভ্রাতা মুরাদকে প্রথমে কৌশলে বন্দী করেন।
এর পর তার বিরুদ্ধে পুরোনো এক হত্যার অভিযোগ সামনে এনে বিচার করেন এবং তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
মুরাদ বিস্মিত ও হতভম্ব হয়ে তার আপন ভাই ও পরম মিত্র আওরঙ্গজেবের দিকে তাকিয়ে থেকে থেকে পাড়ি জমালেন পরপারে।
এদিকে তার অন্য ভাই সুজা কোনোরকমে জান নিয়ে পালিয়ে যান আরাকানে।
আরাকান রাজের দরবারে তিনি পান রাজনৈতিক আশ্রয়।
তবে কথিত আছে শুরুতে আরাকান রাজ তাকে আশ্রয় দিলেও পরবর্তীতে আরাকান রাজের সাথে তার কোনো একটা বিরোধ হয়।
ইতিহাসবিদ কেউ কেউ বলে আরাকান রাজ সুজার সুন্দরী স্ত্রী কন্যাকে দাবী করে।
কেউ কেউ বলে আরাকান রাজ, সুজার সাথে করে নিয়ে আসা বিপুল ধনদৌলত দাবী করে।
সুজা দুই ক্ষেত্রেই অস্বীকৃতি জানালে, গেম অব থ্রোনসের রেড ওয়েডিং এর মতো তার পুরো পরিবার সহ তাকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করে করে আরাকান রাজ।
ডান্স অব দ্য ড্রাগনের পর কেটে গেছে অনেক প্রহর, অনেক বেলা।
ভাইদের রক্তে হাত রঞ্জিত করা এই আওরঙ্গজেব ই অবশ্য পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন জিন্দাপীর, মহান উদার নেতা বাদশাহ আলমগীর!
নির্বিঘ্নে ও সফলতার সাথে প্রায় অর্ধশতক রাজত্ব করলেন তিনি।
কিন্তু তার মৃত্যু হলে তাঁর পুত্রদ্বয় মুহাম্মদ আজম শাহ এবং মুয়াজ্জমের মধ্যে সিংহাসনের জন্য আবার যুদ্ধে শুরু হয়।
যুদ্ধে আজম শাহ পরাজিত ও নিহত হন।
এভাবে মুঘল রাজপরিবার দুর্বল হতে থাকে।
আর তার সমাপ্তি ঘটে দ্বিতীয় বাহাদুর শাহের ইংরেজদের বিরুদ্ধে হেরে রেঙ্গুনে নির্বাসনের মাধ্যমে।
যাইহোক, মোটের উপর বিবেচনা করলে ইতিহাসের অন্যান্য অনেক সাম্রাজ্য থেকে মুঘল সাম্রাজ্যে নিজেদের মধ্যে হানাহানি অবশ্য কম ই ছিল।
তবে এতটাও না হতে পারতো যদি নির্দিষ্ট কোনো উত্তরাধিকার প্রথা শক্তভাবে বিরাজ করতো।
কিন্তু তা হয়নি।
ফলে মুঘলদের ক্ষেত্রে একটি ফার্সি প্রবাদ ছিল- ‘না খোশ খেশ, না খেশ খোশ’ অর্থাৎ ক্ষমতার লড়াইয়ে কোনো আত্মীয়ই আপন নয়।।
তাই হয়ত শক্তিশালী এই মহান মুঘল সাম্রাজ্য সারা ভারতবর্ষ দোর্দণ্ড প্রতাপে শাসন করলেও নিজেদের হাত রঞ্জিত হয়ে আছে নিজেদের ই রক্তে, যা এই সাম্রাজ্যের সোনালি ইতিহাসকে করে রেখেছে কলুষিত। @ সাইফ মিরাজ
৩
পৃথিবীর বৃহত্তম প্রাকৃতিক গুহা।
ভিয়েতনামের ফং না-কে ব্যাং জাতীয় উদ্যানে অবস্থিত সন ডং গুহা (Hang Son Doong) আয়তনের দিক দিয়ে পৃথিবীর বৃহত্তম প্রাকৃতিক গুহা।
অবস্থান ও আবিষ্কার: ভিয়েতনামের কোয়াং বিন প্রদেশে এটি অবস্থিত। ১৯৯১ সালে স্থানীয় বাসিন্দা হো খান প্রথম এর প্রবেশপথ খুঁজে পান এবং ২০০৯ সালে ব্রিটিশ গুহা গবেষণা দলের মাধ্যমে এটি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায়।
বিশাল আকৃতি: গুহাটি প্রায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং এর প্রধান চেম্বারটি ২০০ মিটারেরও বেশি উঁচু ও ১৫০ মিটার চওড়া। এটি এতটাই বিশাল যে এর ভেতরে একটি ৪০ তলা স্কাইস্ক্র্যাপার অনায়াসে এঁটে যেতে পারে।
নিজস্ব ইকোসিস্টেম: গুহার ছাদের কিছু অংশ ধসে পড়ার ফলে আলো ও বৃষ্টি প্রবেশ করে ভেতরের অংশে গড়ে উঠেছে আস্ত এক জঙ্গল (Edam)। এখানে প্রবাহিত নদী ও আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে গুহার ভেতরে নিজস্ব মেঘ, কুয়াশা এবং অনন্য জীববৈচিত্র্য তৈরি হয়।
সংরক্ষণ ও পর্যটন: গুহার পরিবেশ রক্ষায় এটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়। কেবল সরকারি অনুমোদিত সংস্থা 'অক্সালিস অ্যাডভেঞ্চার'-এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট সংখ্যক পর্যটক এখানে ভ্রমণের সুযোগ পান। Source: Oxalis Adventure
৪
মানসিক আঘাত পেলে মানুষ নিজের ক্ষতি করতে চায় কেন?
মানুষের মন খুব জটিল। কোনো প্রিয় মানুষকে হারানো, সম্পর্কের ভাঙন, প্রত্যাখ্যান, অপমান, বুলিং, পারিবারিক দ্বন্দ্ব কিংবা দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, এসব অভিজ্ঞতা কখনো কখনো এত তীব্র হয়ে উঠতে পারে যে মানুষ নিজেকে অসহায় ও আটকে পড়া মনে করে। এমন পরিস্থিতিতে কিছু মানুষের নিজের ক্ষতি করার চিন্তা আসতে পারে। এটি কেবল ‘দুর্বল মানসিকতার’ পরিচয় নয়; বরং এর পেছনে মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণ, মানসিক চাপ, চিন্তার ধরন এবং সামাজিক অভিজ্ঞতার জটিল সম্পর্ক থাকতে পারে।
তীব্র মানসিক কষ্টে মস্তিষ্ক কীভাবে প্রতিক্রিয়া করে?
কোনো ঘটনা যখন আমাদের কাছে অত্যন্ত চাপপূর্ণ মনে হয়, তখন মস্তিষ্ক ও শরীরের stress-response system সক্রিয় হয়। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ঘুম, মনোযোগ, মেজাজ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। একই সময়ে মানুষ পরিস্থিতিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তীব্র আবেগের সময় সমস্যার সমাধান করার ক্ষমতা সাময়িকভাবে সংকুচিত হতে পারে। তখন ভবিষ্যতে পরিস্থিতি ভালো হওয়ার সম্ভাবনার চেয়ে বর্তমানের কষ্টটাই অনেক বেশি বাস্তব মনে হয়। ফলে একজন মানুষ এমন সিদ্ধান্তের কথা ভাবতে পারে, যা স্বাভাবিক ও শান্ত অবস্থায় সে হয়তো কখনোই ভাবত না।
আবেগ নিয়ন্ত্রণের ভূমিকা
নিজের ক্ষতির সঙ্গে emotion regulation বা আবেগ নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। ২০১৯ সালের একটি systematic review ও meta-analysis-এ ৪৮টি প্রকাশনা এবং ৪৯টি independent sample বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আবেগ নিয়ন্ত্রণে বেশি সমস্যা থাকার সঙ্গে non-suicidal self-injury-এর উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক রয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হলেই কেউ নিজের ক্ষতি করবে। বরং গবেষণাটি দেখায়, তীব্র আবেগ সামলানোর অসুবিধা এবং নিজের ক্ষতি করার প্রবণতার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।
আরেকটি systematic review-তেও দেখা যায়, অনেক গবেষণায় self-harm-এর সঙ্গে আবেগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা এবং অত্যন্ত অস্বস্তিকর অনুভূতি এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
‘কোনো পথ নেই’—এমন মনে হয় কেন?
তীব্র মানসিক কষ্টের সময় মানুষ একই নেতিবাচক চিন্তা বারবার করতে পারে। মনোবিজ্ঞানে একে rumination বলা হয়। তখন সমস্যা নিয়ে চিন্তা চলতেই থাকে, কিন্তু কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করার ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
ফলে একজন কিশোর বা তরুণ মনে করতে পারে—‘কেউ আমাকে বুঝবে না’, ‘এই পরিস্থিতি কখনো বদলাবে না’ বা ‘আমি এখান থেকে বের হতে পারব না।’ বাস্তবে পরিস্থিতি পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও সংকটের মুহূর্তে মস্তিষ্ক সেটি দেখতে ব্যর্থ হতে পারে। এ কারণেই এমন অবস্থায় কাউকে শুধু ‘ভালোভাবে চিন্তা করো’ বলা যথেষ্ট নয়। তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দিয়ে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সামাজিক প্রত্যাখ্যান ও একাকিত্বের প্রভাব
মানুষ সামাজিক প্রাণী। পরিবার, বন্ধু ও সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক আমাদের মানসিক সুস্থতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বুলিং, সামাজিক প্রত্যাখ্যান, একাকিত্ব, পারিবারিক দ্বন্দ্ব কিংবা সম্পর্কের সমস্যা একজন মানুষের মানসিক অবস্থায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে কৈশোরে মস্তিষ্ক ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা এখনও বিকাশমান থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সামাজিক ও মানসিক চাপ এবং self-harm-সহ বিভিন্ন ঝুঁকিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে।
নিজের ক্ষতি কি সত্যিই কষ্ট কমিয়ে দেয়?
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, নিজের ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত একটি উদ্দেশ্য হতে পারে তীব্র আবেগ সামলানোর চেষ্টা। ২০২৫ সালের একটি systematic review-এ তরুণদের self-harm-এর বিভিন্ন motivation বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, emotion regulation, dissociation কমানোর চেষ্টা এবং self-punishment-এর মতো ব্যক্তিগত বা intrapersonal কারণগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। কখনো কোনো ব্যক্তি এমন আচরণের পর সাময়িকভাবে আবেগের পরিবর্তন অনুভব করতে পারে। কিন্তু এটি নিরাপদ সমাধান নয়। বরং নিজের ক্ষতি শারীরিক ও মানসিক, দুই ধরনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং পুনরাবৃত্ত আচরণের একটি চক্র তৈরি হতে পারে।
তাই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে লক্ষ্য হওয়া উচিত ক্ষতিকর আচরণ নয়, বরং যে আবেগ বা পরিস্থিতি থেকে সেই তাগিদ তৈরি হচ্ছে, সেটি নিরাপদভাবে মোকাবিলা করা।
এটি কি শুধু মনোযোগ পাওয়ার চেষ্টা?
না, এমন ধারণা ঠিক নয়। গবেষণায় self-harm-এর বিভিন্ন ব্যক্তিগত ও সামাজিক কারণ পাওয়া গেছে। কারও ক্ষেত্রে এটি আবেগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, কারও ক্ষেত্রে নিজের কষ্ট প্রকাশের চেষ্টা হতে পারে, আবার একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে। তাই এমন কাউকে ‘নাটক করছে’ বা ‘মনোযোগ চাইছে’ বলে উপহাস করা উচিত নয়। বরং তার আচরণকে একটি সাহায্যের প্রয়োজনের সংকেত হিসেবে দেখা বেশি মানবিক।
তাহলে কীভাবে সাহায্য করা যায়?
প্রথম প্রয়োজন হলো বিচার না করে শোনা। কেউ মানসিকভাবে ভেঙে পড়লে তার সঙ্গে শান্তভাবে কথা বলা, তাকে একা না রাখা এবং কোনো বিশ্বস্ত প্রাপ্তবয়স্ককে বিষয়টি জানানো গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে অভিভাবক, শিক্ষক, স্কুল কাউন্সেলর বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে। WHO কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন ও self-harm কমানোর জন্য evidence-informed psychosocial intervention-এর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
এমনকি সাম্প্রতিক গবেষণাতেও কিশোরদের self-harm কমাতে কিছু নির্দিষ্ট মনোবৈজ্ঞানিক হস্তক্ষেপের কার্যকারিতার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। ২০২৬ সালের একটি systematic review ও meta-analysis-এ Dialectical Behavior Therapy for Adolescents (DBT-A)-এর মাধ্যমে self-harm পুনরাবৃত্তি কমার কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে।
শেষ কথা:
মানুষ যখন নিজের ক্ষতি করার কথা ভাবে, তখন তার ভেতরে যে কষ্ট চলছে সেটিকে বাইরে থেকে সবসময় বোঝা যায় না। মস্তিষ্কের চাপ-প্রতিক্রিয়া, আবেগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা, নেতিবাচক চিন্তার পুনরাবৃত্তি, একাকিত্ব এবং সামাজিক সম্পর্ক—সবকিছু মিলেই এমন সংকট তৈরি হতে পারে। তাই এমন মানুষকে দোষ দেওয়া নয়, বোঝার চেষ্টা করাই প্রথম কাজ। কারণ তীব্র মানসিক কষ্টের মুহূর্তে মানুষ হয়তো নিজের সামনে থাকা সম্ভাবনাগুলো দেখতে পায় না। কিন্তু উপযুক্ত সহায়তা, নিরাপদ পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পেলে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে পারে। @ BIGYAN ALO
৫
“নার্সিজম: আত্মবিশ্বাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক অদৃশ্য অহংকার”
যেকোনো আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে চান এবং বেশিরভাগ সময়ই কিছুটা বাড়িয়ে বলতে পছন্দ করেন । তারাই মূলত নার্সিজমের সমস্যায় ভুগছেন।
বিজ্ঞানিদের মতে, নার্সিজম হলো - নিজের সৌন্দর্য আর সক্ষমতার অতিশায়িত অনুভূতি, যা নিজের প্রতি নিমগ্নতা তৈরি করে। এককথায় অতিশয় আত্নপ্রেম বলা যেতে পারে। বিজ্ঞানিরা আরও বলেন । সেটি হলো , ঘন্টায় ঘন্টায় যারা ফেসবুকে সেলফি আপলোড করেন তারাও এক ধরনের নার্সিসিস্ট!
বিজ্ঞানিদের গবেষণায় নার্সিজমে ভোগা ব্যক্তিদের আরো কিছু বৈশিষ্ট্য উঠে এসেছে। যেমন: আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পছন্দ করা, অন্যকে উপদেশ দিতে পছন্দ করা, উচ্চাকাঙ্খা, সুবিধাবাদী , ভুল অস্বীকার করা ইত্যাদি।
সবসময় অন্যকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে পছন্দ করে নার্সিস্টরা। তবে অন্যকে সাহায্য করার বেলায় বরাবরই পিছিয়ে যায় তারা। অন্যকে নিয়ন্ত্রন করতে পছন্দ করে থাকেন। কারণ , সবসময় নিজের কথা ভাবতেই ভালোবাসেন। তারা নিজের ভুল মেনে নিতে রাজি নয়, বরং নিজের ভুল অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেন। 'তোমার কারণেই আমি এমন করেছি ' এই বাক্য তাদের মুখে প্রায়ই শোনা যায়।
সাইকোথেরাপিস্ট এবং 'দা নারসিসিস্ট' বইয়ের লেখক জোসেফ ব্রুগ বলেছেন , কিছু মানুষ আছেন যারা নিজেদের নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করেন।
নার্সিসিস্ট বিষয়ক দুইটি বই 'উইল আই বি গুড এনাফ?' এবং 'উইল আই এভার বি ফ্রি অফ ইউ?' -এর লেখক ক্যারিল ম্যাকবার্ড বলেন, "যারা নার্সিজম সমস্যায় ভুগছেন, তারা যখন যা চান ঠিক ওই মুহূর্তে তা পেতে চান। অপেক্ষা করা তাদের জন্য অতি অপছন্দের।"
ম্যাকবার্ট আরও বলেন, নিজেদের ভবিষ্যতে অনেক সফল এবং প্রভাবশালী একজন ব্যক্তি হিসেবে কল্পনা করতে পছন্দ করেন নার্সিসিস্ট মানুষগুলো। তারা নিজেকে অন্য সবার থেকে বেশি ক্ষমতাবান এবং আলাদা ভাবতে ভালোবাসেন। তাছাড়া ধনী হওয়ার তীব্র ইচ্ছা থাকে এদের মধ্যে।
'নার্সিজমের সকল রূপ ও ধরণ হয়তো ধিকৃত নয়; কেননা স্বভাবজাত আত্মপ্রেমের সাথেই নার্সিজম সম্পৃক্ত। কিন্তু ২০১৩ সালের পশ্চিমা দেশগুলো কয়েকটি গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল। মানুষকে অস্থিরতায় আক্রান্তকারী মৌলিক পাঁচটি বিষয়ের মধ্যে 'নার্সিজমকে' গুরুত্বপূর্ণ একটি আখ্যায়িত করেছে।
নার্সিসিস্টিক মানুষের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য;
১)নিজেকে অন্যদের চেয়ে বিশেষ বা শ্রেষ্ঠ মনে করা সবসময় প্রশংসা ও স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা করা সমালোচনা সহ্য করতে না পারা।
২)নিজের ভুলের দায় অন্যের ওপর চাপানো
অন্যের অনুভূতি বা প্রয়োজনকে গুরুত্ব না দেওয়া।
৩)নিজের সুবিধার জন্য অন্যকে ব্যবহার করার প্রবণতা সম্পর্কের শুরুতে খুব আকর্ষণীয় বা যত্নশীল হলেও পরে নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ করা।
৪)নিজের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে—এমন পরিস্থিতি এড়াতে চেষ্টা করা।
কথিত আছে, 'নার্সিস' নামক এক যুবক (নার্জিসও বলা হয়) পানিতে নিজের চেহারা দেখে নিজের প্রেমে পড়ে যায়। এজন্য সে কাউকে ভালোবাসত না। সে বিবাহও করেনি। কারণ, সে কাউকে নিজের উপযুক্ত পায়নি। এই কল্পকথা থেকেই বিজ্ঞানীরা 'নার্সিজম' নামক জটিল এক মানসিক রোগের কথা জানতে পেরেছে। 'নার্সিজম' কাল্পনিক একটি ঘটনা, যা আত্মপ্রেমকে কেন্দ্র করে প্রচলিত হয়েছে। এই জটিলতা মহিলাদের তুলনায় পুরুষদের বেশি আক্রান্ত করে। এটার কারণ, হতে পারে পুরুষরা আত্মপ্রকাশ, কাজ করার সুযোগ বেশি পায়। ফলে সবকিছু ভুলে থাকা তুলনামূলক ভাবে তাদের জন্য সহজ। আবার এইজন্য হতে পারে যে, পুরুষদের মধ্যে আবেদনময়ী নারীদের প্রতি সংবেদনশীল স্বভাব থাকে ঠিক, কিন্তু তারা সাময়িকভাবে প্রিয় জিনিস অর্জনে নিজেকে ভুলে যাওয়া ও নিজেকে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে। ফলে নার্সিজমে আক্রান্ত হলে তারা নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারে।
এক ব্যক্তি তার দৃষ্টিতে সর্বশ্রেষ্ঠ মহিলার খোঁজ করছিল এবং পেয়েছিলো। কিন্তু তাকে বিবাহ করেনি। একজন তাকে বিয়ে না করার কারণ জিজ্ঞেস করলে, সে বলল, হ্যাঁ, আমি সর্বশ্রেষ্ঠ মহিলা পেয়েছিলাম, কিন্তু সেও সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষ খোঁজ করছিল, তাই বিয়ে করতে পারিনি! এই হলো নার্সিজমের পরিণতি! অর্থাৎ তাদের কেউই কাউকে শ্রেষ্ঠ ভাবতে পারেনি।
(তথ্যসূত্র: সংগৃহীত) Takrim Hassan Toky
৬
বর্তমান keyboard এর একদম উপরের অক্ষর গুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে Q W E R T Y U I O P এই অক্ষরগুলো রয়েছে। ইংরেজি টাইপরাইটার লিখতে যে অক্ষর গুলো লাগে সেগুলো প্রথম সারিতেই রয়েছে। ১৮৭০ সালের দিকে সেলসম্যানরা ক্রেতাদের চমকে দেয়ার জন্য এই ট্রিকটি ব্যবহার করতেন। তারা খুব দ্রুত আঙ্গুল চালিয়ে টাইপরাইটার শব্দটি লিখে দেখাতেন এবং মানুষ তাতে মুগ্ধ হয়ে যেত। ফলে মানুষ টাইপরাইটার বেশি কিনত।
মানুষের সামনে পরিবর্তনের সুযোগ আসলেও এই লেআউটটি পরিবর্তন করেনি শুধুমাত্র তাদের অভ্যাসের জন্য। মানুষ এই লেআউটটিতে এত বেশি অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল যে ১৯৩৬ সালে Dvorak নামের একটি নতুন ও আরামদায়ক লেআউট বাজারে আসলেও মানুষের কাছে আগের লেআউটটি বেশি গ্রহণযোগ্য হয়েছিল।
কথায় আছে মানুষ অভ্যাসের দাস। আজকের এই যুগে এসেও আমরা টাইপ করার জন্য যে লেআউট ব্যবহার করছি সেটি ১৮৭০ সালের পুরনো মেকানিক্যাল সমস্যার সমাধান। মানুষ যদি কোন একটি জিনিসে একবার অভ্যস্ত হয়ে যায় এরপরে যত ভাল জিনিসই আসুক না কেন সে তার পুরনো অভ্যাসকে বদলাতে পারে না। @ BIGYAN ALO
৭
হিপনোসিস: মনের নিয়ন্ত্রণ নাকি মস্তিষ্কের বিস্ময়কর ক্ষমতা?
হিপনোসিস আসলে কী? এটি কীভাবে কাজ করে? আর কেন এটি মানুষের আচরণ ও অনুভূতিকে প্রভাবিত করতে পারে?
সিডনির ম্যাককুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কগনিটিভ বিজ্ঞানী ও হিপনোসিস গবেষক অ্যামান্ডা বার্নিয়ার (Amanda Barnier) বলেন, হিপনোসিসের সময় অনেক মানুষের মধ্যে এমন অনুভূতি তৈরি হয় যে তারা যেন নিজের অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই। তাঁর ভাষায়, "হিপনোটাইজড ব্যক্তিরা অনেক সময় মনে করেন, তাদের অভিজ্ঞতাগুলো যেন নিজের ইচ্ছায় নয়, অন্য কোনো শক্তির প্রভাবে ঘটছে। মানুষের এই মানসিক ক্ষমতাটি সত্যিই বিস্ময়কর।" তবে তিনি একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও স্পষ্ট করেন—বর্তমান বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে, হিপনোসিসের মাধ্যমে কাউকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কাজ করানো সম্ভব।
বিজ্ঞানীদের মতে, হিপনোসিস হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যা একজন মানুষকে গভীর মনোযোগ, একাগ্রতা এবং উচ্চমাত্রার সাজেশন গ্রহণের উপযোগী একটি মানসিক অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে। এই অবস্থায় কিছু মানুষের কাছে হিপনোটিস্টের দেওয়া পরামর্শ বা সাজেশন (suggestion) বাস্তব অভিজ্ঞতার মতো অনুভূত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কারও মনে হতে পারে তাঁর আঙুল সত্যিই আটকে গেছে, কিংবা কোনো অস্ত্রোপচারের সময় তিনি ব্যথা অনুভব করছেন না। তবে হিপনোটিস্টের কোনো অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা থাকে না। তিনি মূলত কথোপকথন ও নির্দেশনার মাধ্যমে একজন ব্যক্তিকে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে এবং মানসিকভাবে শিথিল হতে সাহায্য করেন। এখানে কোনো গোপন মন্ত্র বা জাদুকরী শব্দ ব্যবহৃত হয় না।
হিপনোসিসের প্রথম ধাপকে বলা হয় ইনডাকশন (Induction)। এ পর্যায়ে একজন ব্যক্তিকে চোখ বন্ধ করতে, শরীর শিথিল করতে এবং চারপাশের পরিবেশের পরিবর্তে হিপনোটিস্টের কণ্ঠে মনোযোগ দিতে বলা হয়। এরপর দেওয়া হয় নির্দিষ্ট কিছু সাজেশন, যেমন—
- "তোমার চোখের পাতা এত ভারী হয়ে গেছে যে তুমি চোখ খুলতে পারছ না।"
- "তোমার কানের পাশে একটি মাছি উড়ছে।"
- "তোমার হাতটি ধীরে ধীরে অসাড় হয়ে যাচ্ছে।"
যারা হিপনোটিক সাজেশনের প্রতি তুলনামূলকভাবে বেশি সংবেদনশীল, তাদের কাছে এসব অনুভূতি শুধু কল্পনা নয়, বরং বাস্তব অভিজ্ঞতার মতো মনে হতে পারে।
মস্তিষ্কে কী ঘটে?
হিপনোসিস নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রমাণগুলোর একটি এসেছে মস্তিষ্কের স্ক্যান গবেষণা থেকে। যদিও এসব গবেষণার অনেকগুলোই ছোট পরিসরে পরিচালিত হয়েছে, তাই এগুলোকে এখনো চূড়ান্ত প্রমাণ বলা যায় না। তবুও ফলাফলগুলো ইঙ্গিত দেয়, হিপনোটিক সাজেশনের সময় মানুষ যে অভিজ্ঞতার কথা বলে, তার সঙ্গে মস্তিষ্কের কার্যকলাপের বাস্তব পরিবর্তনের মিল পাওয়া যায়।
২০০০ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় মাত্র আটজন অত্যন্ত হিপনোটাইজেবল ব্যক্তিকে অংশগ্রহণ করানো হয়। হিপনোসিসের সময় তাঁদের বলা হয়েছিল, তাঁরা যেন সাদা-কালো ছবিকে রঙিন এবং রঙিন ছবিকে সাদা-কালো হিসেবে দেখেন।
ফলাফলে দেখা যায়, যখন অংশগ্রহণকারীরা সাদা-কালো ছবিকে রঙিন হিসেবে অনুভব করার চেষ্টা করেন, তখন মস্তিষ্কের রং শনাক্ত করার সঙ্গে যুক্ত অঞ্চলগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। আবার রঙিন ছবিকে সাদা-কালো হিসেবে অনুভব করার সময় ওই অঞ্চলগুলোর সক্রিয়তা কমে যায়।
অর্থাৎ, হিপনোটিক সাজেশন শুধু মুখের কথা বা অভিনয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপেও সেই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল। তবে গবেষণাটি ছোট পরিসরের হওয়ায় এ বিষয়ে আরও বৃহৎ গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
অ্যামান্ডা বার্নিয়ারের মতে, হিপনোসিসের সময় তৈরি হওয়া অভিজ্ঞতা একজন ব্যক্তির কাছে বাস্তব অভিজ্ঞতার মতোই শক্তিশালী মনে হতে পারে।
চিকিৎসায় হিপনোসিস
হিপনোসিস শুধু মঞ্চের বিনোদন নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চিকিৎসা ও মনোচিকিৎসায়ও এটি ব্যবহার করা হয়। চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহৃত এই পদ্ধতিকে সাধারণত হিপনোথেরাপি (Hypnotherapy) বলা হয়।
প্রশিক্ষিত থেরাপিস্টরা হিপনোথেরাপি ব্যবহার করেন—
- ব্যথা নিয়ন্ত্রণে,
- উদ্বেগ কমাতে,
- ঘুমের সমস্যা মোকাবিলায়,
- ধূমপান ছাড়তে সহায়তা করতে,
- এবং কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আচরণ বা অভ্যাস পরিবর্তনে সহায়ক হিসেবে।
টেক্সাসের বেইলর বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী গ্যারি এলকিন্স (Gary Elkins) বলেন, বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যায় হিপনোথেরাপির কার্যকারিতা যাচাই করতে বহু ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে এটি উল্লেখযোগ্য উপকার দেয়, কিছু ক্ষেত্রে মাঝারি মাত্রার সুফল পাওয়া যায়, আবার কিছু সমস্যায় এর কার্যকারিতার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ নেই।
তাই অ্যামান্ডা বার্নিয়ার সতর্ক করে বলেন, "সব মানুষের জন্য, সব পরিস্থিতিতে এবং সব সমস্যার সমাধান হিপনোসিস নয়।" বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজন হলে এটি অন্যান্য চিকিৎসা বা মনোচিকিৎসার পাশাপাশি একটি সহায়ক (adjunct) পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। @ BIGYAN ALO
৮
অ্যাপেন্ডিক্স
অ্যাপেন্ডিক্স হলো শরীরের ভালো ব্যাকটেরিয়ার একটা অতিরিক্ত সম্ভার। যখন অন্ত্রে কোনোভাবে বিষেশত কলেরা, ডায়রিয়ার মতো রোগের পর ভালো ব্যাকটেরিয়ার অভাব দেখা দিলে অ্যাপেন্ডিক্সে থাকা ভালে ব্যাকটেরিয়া সে অভাব পূুরণ করে। অর্থাৎ অ্যাপেন্ডিক্স আমাদের শরীরের কোনো মুখ্য অঙ্গ না এটা বিকল্প অঙ্গ হিসেবে থাকে তাই ফেলে দিলেও সমস্যা হয় না।
অ্যাপেন্ডিক্স আসলে একটি সরু নালির মতো যার এক প্রান্ত বন্ধ এবং অপর প্রান্ত বৃহদন্ত্রের সাথে যুক্ত। যখন এই সরু নালীর মুখ কোনো কারণে বন্ধ হয়ে যায় তখনই অ্যাপেন্ডিসাইটিস সৃষ্টি হয় এবং ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনসহ তখন প্রদাহও সৃষ্টি হতে থাকে ।
Mashtura Binte Rashid
৯
"টার্মিনাল লুসিডিটি"
ভাবুন তো, একজন মানুষ যিনি আলঝেইমার্স বা ডিমেনশিয়ার কারণে গত কয়েক বছর ধরে নিজের পরিবারের কাউকেই চিনতে পারছিলেন না, কথা বলাও প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন... মৃত্যুর ঠিক কয়েক ঘন্টা বা কয়েক দিন আগে তিনি হঠাৎ করে পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে গেলেন! সবাইকে চিনতে পারলেন, পুরোনো দিনের গল্প করলেন, এমনকি হাসিমুখে সবার কাছ থেকে বিদায়ও নিলেন।
সিনেমার দৃশ্য মনে হচ্ছে? কিন্তু বাস্তবে এমনটা ঘটে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই রহস্যময় ঘটনাটিকে বলা হয় "টার্মিনাল লুসিডিটি" (Terminal Lucidity) বা মৃত্যুর ঠিক আগের মানসিক স্বচ্ছতা।
কী ঘটে এই সময়ে?
মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও রোগীরা সাময়িকভাবে তাদের স্মৃতি ফিরে পান।
যাঁরা দীর্ঘদিন কথা বলেননি, তাঁরা স্পষ্ট ও স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে শুরু করেন।
প্রিয়জনদের সাথে শেষবারের মতো একটি সুন্দর মুহূর্ত কাটানোর সুযোগ তৈরি হয়।
বিজ্ঞান কী বলছে?
চিকিৎসাবিজ্ঞান আজও এই ঘটনার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। একটি ক্ষতিগ্রস্ত মস্তিষ্ক মৃত্যুর ঠিক আগে কীভাবে হঠাৎ এতটা সচল ও নিখুঁত হয়ে ওঠে, তা বিজ্ঞানীদের কাছে এক বিশাল বিস্ময়। কেউ বলেন এটি মস্তিষ্কের শেষ মুহূর্তের রাসায়নিক পরিবর্তন বা এনার্জি সার্জ, আবার অনেকেই এর মধ্যে আত্মার এক অদ্ভুত সুন্দর বিদায়বেলার সংযোগ খুঁজে পান।
মৃত্যু এক অমোঘ সত্য, কিন্তু চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আগে প্রিয়জনকে এমন একটা সুন্দর স্মৃতি উপহার দিয়ে যাওয়া আসলেই এক অদ্ভুত রহস্য।
আপনার কি এমন কোনো ঘটনার কথা জানা আছে? পরিবার বা পরিচিত কারো ক্ষেত্রে কখনো এমন কিছু দেখেছেন বা শুনেছেন? কমেন্টে শেয়ার করতে পারেন।
১০
পৃথিবীতে এমন একটি প্রাণী আছে যে কখনোই প্রাকৃতিকভাবে মারা যায় না! কল্পবিজ্ঞান মনে হলেও এটি একদম সত্যি।
সাগরের অতল গহ্বরে ঘুরে বেড়ানো এই জাদুকরী প্রাণীর নাম Turritopsis dohrnii, যাকে আমরা "অমর জেলিফিশ" (Immortal Jellyfish) হিসেবে চিনি।
কীভাবে এরা অমরত্ব লাভ করে?
জেলিফিশগুলো যখন বৃদ্ধ হয়ে যায়, অসুস্থ হয়, কোনো বিপদে পড়ে কিংবা খাবারের অভাব দেখা দেয়—তখন এরা মারা যাওয়ার বদলে নিজেদের কোষগুলোকে সম্পূর্ণ নতুন করে সাজিয়ে ফেলে। বিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় "Transdifferentiation"।
সহজ কথায়, এরা বুড়ো বয়স থেকে আবার শিশু অবস্থায় (Polyp stage) ফিরে যায় এবং সম্পূর্ণ নতুন করে জীবন শুরু করে! অবিশ্বাস্য এই চক্রটি তারা বারবার ঘটাতে পারে। যার মানে হলো—অন্য কোনো প্রাণীর শিকার না হলে বা মারাত্মক কোনো দুর্ঘটনায় না পড়লে এরা আক্ষরিক অর্থেই অমর।
প্রকৃতির এই অদ্ভুত খেয়াল আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমাদের এই পৃথিবীটা কত রহস্যে ঘেরা।
আচ্ছা, মানুষ যদি এই অমর জেলিফিশের মতো বুড়ো বয়স থেকে আবার শৈশবে ফিরে যেতে পারতো, তাহলে আপনি জীবনের কোন সময়টাতে ফিরে যেতে চাইতেন?
১১
প্রাচীন তিমি
প্রায় ৫ কোটি বছর আগে, পৃথিবীর সমুদ্রের সবচেয়ে বিশাল প্রাণীটির পূর্বপুরুষ ছিল একেবারেই ভিন্ন রকম। Pakicetus-এর মতো প্রাচীন তিমিরা চার পায়ে স্থলে চলাফেরা করত এবং দেখতে অনেকটা ছোট কুকুর বা হরিণের মতো ছিল। তারা নদী ও জলাভূমির আশপাশে বাস করত এবং ধীরে ধীরে পানিতে বেশি সময় কাটাতে শুরু করে।
এরপর কয়েক কোটি বছর ধরে বিবর্তনের পথে তাদের পা ও শরীর বদলাতে থাকে, নাকের অবস্থান পরিবর্তিত হয় এবং তারা পুরোপুরি জলজ প্রাণীতে পরিণত হয়। প্রায় ৩৪ মিলিয়ন বছর আগে কিছু তিমির বংশে ফিল্টার-ফিডিং বা বেলিন ব্যবস্থার বিকাশ দেখা যায়—যে গোষ্ঠীর আধুনিক সদস্যদের মধ্যে রয়েছে নীল তিমি
১২
সবকিছু পানসে আর স্বাদহীন লাগছে।
খাবারের টেবিলে আপনার ভীষণ পছন্দের একটি পদ সাজানো আছে। দারুণ আগ্রহ নিয়ে মুখে পুরে দিলেন। কিন্তু অবাক হয়ে খেয়াল করলেন আগের মতো সেই খাবারে আর কোনো মজা পাচ্ছেন না। সবকিছু কেমন যেন পানসে আর স্বাদহীন লাগছে। স্বাদ বাড়ানোর জন্য বাধ্য হয়ে আপনাকে অতিরিক্ত লবণ ছিটিয়ে নিতে হচ্ছে কিংবা তরকারিতে একটু বেশি মিষ্টি না দিলে কিছুই মুখে রুচছে না। পরিবারের অন্যরা হয়তো ভাবছেন আপনি ইচ্ছা করেই খাবারে খুঁত ধরছেন অথবা আপনার জিহ্বার রুচি নষ্ট হয়ে গেছে। আসলে এটি কোনো সাধারণ রুচিহীনতা নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে আছে রক্তে অতিরিক্ত শর্করা এবং আপনার স্বাদকোরকগুলোর এক গভীর নীরব সংগ্রাম।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় স্বাদ কমে যাওয়ার এই অবস্থাকে হাইপোজিউসিয়া (Hypogeusia) এবং স্বাদের বিকৃতি ঘটাকে ডিসজিউসিয়া (Dysgeusia) বলা হয়। আমাদের জিহ্বায় থাকা স্বাদকোরক বা টেস্ট বাডগুলো সাধারণত প্রতি দশ থেকে চৌদ্দ দিনের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবেই নতুন করে তৈরি হয়। কিন্তু রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত থাকলে জিহ্বার সূক্ষ্ম রক্তনালীগুলোতে রক্ত সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হয়।
পর্যাপ্ত রক্ত ও পুষ্টির অভাবে স্বাদকোরকগুলোর এই নতুন করে তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়া বা সেলুলার টার্নওভার ভীষণভাবে ধীর হয়ে যায়। পুরনো ও দুর্বল স্বাদকোরক দিয়ে তখন খাবারের আসল স্বাদ গ্রহণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এর পাশাপাশি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ হলো শরীরের ভেতরের খনিজ উপাদানের চরম ঘাটতি। রক্তে শর্করা বেড়ে গেলে কিডনি সেটি বের করে দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত মূত্র তৈরি করে। বারবার প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণ জলজ দ্রবণীয় খনিজ বেরিয়ে যায়, যার মধ্যে জিঙ্ক অন্যতম। আমাদের জিহ্বায় গাস্টিন নামক একটি বিশেষ প্রোটিন থাকে, যা স্বাদ গ্রহণের জন্য অপরিহার্য। আর এই গাস্টিন প্রোটিন তৈরির প্রধান উপাদানই হলো জিঙ্ক। জিঙ্কের ঘাটতি তৈরি হলে মস্তিষ্ক খাবারের সঠিক স্বাদ অনুবাদ করার ক্ষমতা সরাসরি হারিয়ে ফেলে। তাছাড়া ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথির কারণে অনেক সময় স্বাদ পরিবহনের সাথে যুক্ত স্নায়ুগুলোও দুর্বল হয়ে পড়ে, যা খাবারের আনন্দকে পুরোপুরি মাটি করে দেয়।
অতিরিক্ত লবণ বা চিনি দিয়ে এই সমস্যার সমাধান তো হবেই না, বরং তা শরীরের আরও বড় ক্ষতি ডেকে আনবে। জিঙ্কের ঘাটতি মেটানো এবং স্নায়ু সচল করার জন্য কিছু বিজ্ঞানভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
প্রথমত, খাবারের প্রাকৃতিক স্বাদ উপভোগ করার জন্য মাইন্ডফুল ইটিং বা মনোযোগ দিয়ে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। খাবার দ্রুত না গিলে খুব ধীরে ধীরে চিবিয়ে তরল করে খেতে হবে। মুখের লালার সাথে খাবার ভালোভাবে মিশলে তা অবশিষ্ট স্বাদকোরকগুলোকে উদ্দীপিত করে। লালার ভেতরেই খাবার দ্রবীভূত হয়ে স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে স্বাদের সংকেত পৌঁছায়।
দ্বিতীয়ত, কোষের ভেতরে জিঙ্কের এই বিশাল শূন্যতা পূরণ করতে হবে। খাদ্যতালিকায় জিঙ্ক সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক খাবার যেমন মিষ্টি কুমড়ার বিচি, সামুদ্রিক মাছ, লাল মাংস, কাজুবাদাম এবং মসুর ডাল নিয়মিত রাখতে হবে। জিঙ্ক শুধু স্বাদ ফিরিয়ে আনতেই সাহায্য করে না, এটি শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকেও বহুগুণ শক্তিশালী করে তোলে।
তৃতীয়ত, স্বাদহীনতা কাটাতে খাবারে কৃত্রিম লবণ বা চিনির পরিবর্তে প্রাকৃতিক ভেষজ ও মসলার ব্যবহার বাড়াতে হবে। খাবারে গোলমরিচ, দারুচিনি, তাজা আদা, রসুন, পুদিনা পাতা বা সামান্য লেবুর রস যোগ করলে তা ঘ্রাণশক্তিকে তীব্র করে। ঘ্রাণশক্তির সাথে স্বাদ গ্রহণের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। চমৎকার ঘ্রাণ অনেক সময় দুর্বল স্বাদকোরকগুলোকে জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করে।
চতুর্থত, মুখের ভেতরে সঠিক আর্দ্রতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। মুখ শুকিয়ে গেলে খাবার লালায় মিশতে পারে না, ফলে স্বাদ গ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয়। সারাদিন অল্প অল্প করে জল পান করার পাশাপাশি জিহ্বা পরিষ্কার রাখার মাধ্যমে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার আবরণ সরিয়ে ফেলতে হবে, যাতে স্বাদকোরকগুলো সরাসরি খাবারের সংস্পর্শে আসতে পারে।
খাবারের স্বাদ বুঝতে না পারা আপনার জিহ্বার কোনো সাধারণ দোষ নয়। এটি মূলত কোষের ভেতরের পুষ্টিহীনতা এবং স্নায়বিক দুর্বলতার একটি স্পষ্ট ভাষা। খাদ্যাভ্যাসে একটুখানি নজর দিলে এবং প্রয়োজনীয় খনিজের ঘাটতি মেটালে খুব সহজেই খাবারের সেই পুরনো স্বাদ আর আনন্দ আবারও ফিরে পাওয়া সম্ভব। @ Probal Kumar Mondal
১৩
১৭৯৯ সালে চতুর্থ মহীশূর যুদ্ধে টিপু সুলতান শ্রীরঙ্গপত্তমের যুদ্ধে শহীদ হওয়ার পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তার পরিবারকে প্রথমে তামিলনাড়ুর ভেলোর দুর্গে বন্দী রাখে। ১৮০৬ সালে ভেলোর বিদ্রোহের সঙ্গে তাদের যোগসূত্র সন্দেহ করা হলে ব্রিটিশরা তাদের আরও দূরে সরিয়ে দেয় এবং কলকাতার টালিগঞ্জ এলাকায় নির্বাসনে পাঠায়। সেখানে তারা বাকি জীবন কাটান
ভেলোর থেকে কলকাতায় নির্বাসন
১৭৯৯ সালের পতনের পর টিপুর পরিবারের সদস্যদের মহীশূর থেকে সরিয়ে ভেলোর নিয়ে যাওয়া হয়।
১৮০৬ সালের ভেলোর বিদ্রোহের পর ব্রিটিশরা আতঙ্কিত হয়ে টিপুর রাজপরিবারকে কঠোর নিরাপত্তায় কলকাতা শহরে স্থানান্তরিত করে।
কলকাতায় তাদের মূলত তৎকালীন জঙ্গল ও তস্কর অধ্যুষিত উপকণ্ঠ রাসপাগলা (রাসপাগলা এলাকা) অঞ্চলে থাকার জায়গা ও জমি দেওয়া হয়, যা বর্তমানে কলকাতার অন্যতম অভিজাত অঞ্চল টালিগঞ্জ নামে পরিচিত। পরবর্তীতে পরিবারের সদস্যরা পেন্সনের অর্থে টালিগঞ্জ ও তার আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় স্থায়ীভাবে জমি ও আবাসন গড়ে তোলেন
কলকাতার জীবন ও স্মৃতি
কলকাতার মাটিতেই টিপু সুলতানের বহু পুত্র ও বংশধর জীবন কাটান এবং মৃত্যুবরণ করেন।
কলকাতার বিখ্যাত রাস্তা যেমন প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোড এবং প্রিন্স গোলাম মোহাম্মদ শাহ রোড টিপু সুলতানের এই রাজপরিবারের নামানুসারেই নামকরণ করা হয়েছে।
তাদের বংশধরদের অনেকে এখনও কলকাতায় বসবাস করছেন এবং তাদের ইতিহাস শহরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
@Md Julfikar Ali
১৪
বস্তিবাসীর আবাসন সমস্যা
পৃথিবীর প্রায় সব রাষ্ট্রই বস্তিবাসীর আবাসন সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছে। ব্রিটেনের ‘পার্ক হিলস’ বা ‘রবিন-হুড গার্ডেনস’, ফ্রান্সের ‘গ্রান্দ এসেম্বলেস’, জাপানের ‘দানচি’, রাশিয়ার ‘ক্রুশ্চেভকা’, জার্মানির ‘প্লাটেনবাউ’, আমেরিকার ‘কো-অপ সিটি’, ব্রাজিলের ‘সুপারকোয়াড্রা’ এবং আরও অনেক অনেক উদাহরণ রয়েছে। প্রায় প্রতিটি প্রকল্প রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে করা হয়েছিল এবং এদের মূল উদ্দেশ্য ছিল খুব কম খরচে, কম জায়গায় সবচেয়ে বেশি মানুষ আঁটানো। এগুলো এমন প্রকল্প এবং এমন ধরনের বিনিয়োগ, যেটা থেকে রাষ্ট্র নগদ কোনো মুনাফা পায় না। বস্তিবাসীদের জন্য বানিয়ে দেওয়া আবাসনগুলো বস্তিবাসীরা বরাদ্দ পাওয়ার পর বেশি দামে অপেক্ষাকৃত সচ্ছল মানুষকে বিক্রি করে বা ভাড়া দিয়ে নিজে আবার অন্য একটি বস্তিতে ফিরে যান। কেনিয়ার ‘কিবেরা স্লাম আপগ্রেডেশন’, ব্রাজিলের ‘পোরতো মারাভিলা’, কম্বোডিয়ার ‘বোয়েং কাক লেক রিক্লেমেশন’, মুম্বাইয়ের ‘ধারাভি রিডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’, আমাদের ভাষানটেক প্রকল্প এমনকি সাম্প্রতিক বাউনিয়া বাঁধের ভাড়াভিত্তিক বস্তি উন্নয়ন প্রকল্প—এই সব কটিতেই একই ধরন দেখা যায়।
বিপুল পরিমাণ মানুষের ঘর সরকারকে বানিয়ে দিতে হবে, এই কঠিন চিন্তা থেকেই থাইল্যান্ড সরে এসেছে। দরিদ্র মানুষ নিজের বাসা নিজেই বানিয়ে নেবেন। সরকার শুধু তাঁকে মৌলিক কিছু সহযোগিতা দেবে এ জন্য। থাইল্যান্ডের সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘কমিউনিটি অর্গানাইজেশনস ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের’ কাজেরই প্রক্রিয়া হলো- থাক্র জমিটি একটি সমবেত সমবায় ট্রাস্টের অধীনে করা হয়। এই সমবায় ট্রাস্টের মাধ্যমেই সব নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কেউ যদি সংগত কারণেই এখানে না থাকতে চান, তবে সে অন্য কাউকে তার অংশ হস্তান্তরিত করতে পারেন। এর জন্য হস্তান্তরের টাকা তিনি বাজারমূল্যে সমবায় ট্রাস্ট-এর মাধ্যমে পেয়ে যান। নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত (২০ থেকে ৩০ বছর) বসবাস করার আনুষ্ঠানিক অনুমতি দেয়া হয় । এই সময়টুকুর মধ্যে বস্তিতে বসবাসকারী দরিদ্র মানুষগুলো সাপ্তাহিক কিস্তির মাধ্যমে ঘরের উচ্চ মূল্যের ভাড়া পরিশোধ করে। সমবায় ট্রাস্ট তাদের এই টাকা দিয়ে সরকারের সহায়তায় সেখানে বা অন্যত্র তাদের জন্য নতুন আবাসন নির্মাণ করেন। এভাবেই নিজের অবস্থার উন্নতি করে তারা সংকট কাটিয়ে ওঠেন। এ ক্ষেত্রে সরকারও লাভবান হয়। কারণ, বছরের পর বছর এখান থেকে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত ছিল। অথচ বস্তিবাসী কোনো না কোনো পক্ষকে চাঁদা বা ভাড়া দিতে বাধ্য ছিল। এখন তাদের এই ভাড়াটা সরাসরি পুঁজি হিসেবে জমা হয়, যার সাথে সমপরিবার সরকারি টাকা যোগ হয়ে তাদের আবাসন বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিশ্চিত হয়। ফলে তাঁদের সে স্থান থেকে সরানোর পরিবর্তে, তাঁদের দিয়েই ওই বসতি ও এলাকার উন্নয়ন করার সুযোগ তৈরি হয় এবং রাজস্ব নিশ্চিত হয়।
১৫
সত্যি কি পৃথিবী ঘুরছে?
মানুষ একদিনে জানতে পারেনি যে পৃথিবী ঘুরছে। ধারণাটি বহু শতাব্দী ধরে তৈরি হয়েছে, কিন্তু সরাসরি পরীক্ষায় পৃথিবীর ঘূর্ণন দেখানো যায় অনেক পরে।
প্রাচীন গ্রিসেই কিছু দার্শনিক ভাবতেন পৃথিবী হয়তো স্থির নয়। কিন্তু অ্যারিস্টটলের প্রভাবশালী মত ছিল, পৃথিবী স্থির এবং সূর্য-চাঁদ-নক্ষত্র পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। তাঁর যুক্তি ছিল: "পৃথিবী যদি এত দ্রুত ঘুরত, তাহলে আমরা তার প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখতে পেতাম।" আর এই ভূকেন্দ্রিক ধারণাই প্রায় এক হাজার বছর প্রধান মত হিসেবে টিকে ছিল।
এরপর নিকোলাস কোপার্নিকাস ষোড়শ শতাব্দীর শুরুতে একটি বিপ্লবী ধারণা দেন। তাঁর মতে, পৃথিবী নিজ অক্ষের ওপর প্রতিদিন একবার ঘোরে এবং একই সঙ্গে সূর্যের চারদিকে ঘোরে। তিনি ১৫৪৩ সালে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে এই মডেল প্রকাশ করেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো—কোপার্নিকাস ধারণাটি প্রস্তাব করেছিলেন, কিন্তু পৃথিবীর ঘূর্ণনের সরাসরি পরীক্ষামূলক প্রমাণ তাঁর হাতে ছিল না।
তারপর গ্যালিলিও ও কেপলারের কাজ পৃথিবী-কেন্দ্রিক মহাবিশ্বের ধারণাকে দুর্বল করে। বিশেষ করে গ্যালিলিও ১৬১০ সালে বৃহস্পতির চারটি উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ করেন, যা দেখায়, সবকিছু যে পৃথিবীকেই কেন্দ্র করে ঘুরবে, এমন কোনো নিয়ম নেই।
কিন্তু প্রশ্নের আসল উত্তর আসে ১৮৫১ সালে।।ফরাসি পদার্থবিজ্ঞানী লেয়ন ফুকো একটি দীর্ঘ দোলক ব্যবহার করে পৃথিবীর ঘূর্ণনকে সরাসরি দৃশ্যমান করে দেন। এটিই বিখ্যাত Foucault pendulum। দোলকটি যখন সামনে-পেছনে দুলছিল, তখন তার দোলনের সমতল যেন ধীরে ধীরে ঘুরে যাচ্ছিল। আসলে দোলকটি নিজের জড়তার কারণে প্রায় একই সমতলে দুলতে থাকছিল।ঘুরছিল পৃথিবী, দোলক নয়।
১৮৫১ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি প্যারিস অবজারভেটরিতে ফুকো পরীক্ষাটি প্রদর্শন করেন। পরে প্যারিসের Panthéon-এ আরও বিশাল দোলক দিয়ে পরীক্ষাটি করা হয় এবং পৃথিবীর ঘূর্ণন মানুষের চোখের সামনে অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
অর্থাৎ প্রাচীন যুগেও পৃথিবী ঘোরে, এমন ধারণা ছিল, কিন্তু গ্রহণযোগ্য প্রমাণ ছিল না। ১৫৪৩: কোপার্নিকাস বলেন, পৃথিবী নিজ অক্ষে ঘোরে এবং সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে।
১৬০০–১৭০০: গ্যালিলিও, কেপলার ও নিউটনের কাজ এই নতুন মহাজাগতিক ছবিকে শক্তিশালী করে।
১৮৫১: ফুকোর দোলক পৃথিবীর ঘূর্ণনের একটি সরাসরি, দৃশ্যমান পরীক্ষামূলক প্রমাণ দেয়।
আর মজার ব্যাপার হলো, আজও আমরা পৃথিবীর ঘূর্ণন সরাসরি অনুভব করি না। কারণ আমরা, আমাদের চারপাশের বায়ু, সমুদ্র এবং পৃথিবীর পৃষ্ঠ সবকিছুই একসঙ্গে ঘুরছি। NASA-এর হিসাব অনুযায়ী পৃথিবী নিজের অক্ষে প্রায় ২৩.৯ ঘণ্টায় একবার ঘোরে। @ Bigyan Tottho
ডাব কাঁকড়া
পৃথিবীর বৃহত্তম স্থলজ সন্ধিপদ প্রাণী (arthropod) হলো ডাব কাঁকড়া (Birgus latro), যার নিবাস ফিলিপাইনে।
এই বিশাল ক্রাস্টেশিয়ানগুলো ৯ পাউন্ড (৪ কেজি) পর্যন্ত ওজনের হতে পারে এবং এদের পায়ের দৈর্ঘ্য ৩ ফুট (১ মিটার) পর্যন্ত হয়ে থাকে।
এদের নখর এতই শক্তিশালী যে তা দিয়ে ডাব ফাটিয়ে ফেলতে পারে, এমনকি গাছের ওপরে উঠেও ডাব পেড়ে আনতে সক্ষম।
পালাভান এবং কয়েকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে এদের দেখা মেলে। ডাব কাঁকড়া নিশাচর, অধরা এবং ৬০ বছরেরও বেশি বাঁচতে পারে। এদের আকার এবং শক্তি সত্ত্বেও, অতিরিক্ত আহরণের কারণে অনেক জায়গায় এরা সংরক্ষিত প্রজাতি হিসেবে গণ্য। ফিলিপিনো লোককাহিনীতে এদের শক্তি ও রহস্যময় আচরণের জন্য এরা দ্বীপের কিংবদন্তি হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।
১৬
ইউরোপ ছিল এশিয়ার একটি উপদ্বীপ!?
ইউরোপীয়রা নিজেরা কখনো স্বাধীন ছিল না, এখন যেমনটি আছে। রাজনৈতিকভাবে না, অর্থনৈতিকভাবে না, বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে না, আধ্যাত্মিকভাবে না, বস্তুগতভাবেও না। ইউরোপ কখনোই ইতিহাসের প্রান্তে একা দাঁড়িয়ে থাকা কোনো স্ব-নির্মিত সভ্যতাও ছিল না। ইতিহাসে বড় সভ্যতার যে নামগুলো শুনি সেগুলো বেশিরভাগ অইউরোপীয়।
ইউরোপ ছিল এশিয়ার একটি উপদ্বীপ, যা পুরোনো জগৎ দ্বারা পরিবেষ্টিত, পুরোনো বাণিজ্য পথ দ্বারা পুষ্ট, পুরোনো বিজ্ঞান দ্বারা শিক্ষিত, পুরোনো শ্রম দ্বারা সমৃদ্ধ এবং বারবার সেইসব মানুষের দ্বারা উদ্ধারপ্রাপ্ত, যাদেরকে পরে সে নিজের চেয়ে নিচু বলে ভান করত।
ইউরোপ যখন সমুদ্র পার হলো, আমেরিকা গেল, তখনও এটা থেমে ছিলনা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও কিন্তু স্বাধীন ছিল না। এটি ছিল আদিবাসীদের ভূমি। আফ্রিকানদের শ্রম, চুরি করা মেক্সিকান ভূখণ্ড, ক্যারিবিয়ানদের সম্পদ আহরণ ও এশীয়দের বর্জ্য নিয়ে বর্তমান আমেরিকা।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বিশ্ব সাম্রাজ্যের উপর নির্মিত একটি বসতি স্থাপনকারী উপনিবেশ হল ইউরোপ। আর আমেরিকা ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল, অথচ নিজের সম্পদ উৎপাদনের জন্য ক্রীতদাস আফ্রিকানদের উপর, সীমানা সম্প্রসারণের জন্য আদিবাসীদের ভূমিচ্যুতির উপর এবং নিজেকে ন্যায্যতা প্রমাণের জন্য আমদানি করা ইউরোপীয় রাজনৈতিক কল্পকাহিনীর উপর নির্ভরশীল ছিল।
অস্ট্রেলিয়াও স্বাধীন ছিল না। এটি ছিল আদিবাসী ভূমিতে রোপিত একটি ব্রিটিশ বসতি স্থাপনকারী উপনিবেশ, যা আগ্রাসন, গণহত্যা, জোরপূর্বক উচ্ছেদ, চুরি করা শিশু, কারাবন্দী শ্রম, সাম্রাজ্যবাদী আইন এবং টেরা নুলিয়াসের (terra nullius) কল্পনার মাধ্যমে নির্মিত হয়েছিল। তারা একে বসতি স্থাপন বলত কারণ এটি ছিল একটি সংগঠিত চুরির মতো। ব্রিটিশদের পতাকা আর জাল কাগজপত্র শুনতে বড্ড বেশি সৎ মনে হচ্ছিল।
কানাডাও স্বাধীন ছিল না। এটি ছিল ফরাসি ও ব্রিটিশদের একটি বসতি স্থাপনকারী প্রকল্প, যা ফার্স্ট নেশনস, মেটিস এবং ইনুইটদের ভূমির উপর নির্মিত হয়েছিল। এই ভূমিগুলো চুক্তির মাধ্যমে একত্রিত ছিল, কিন্তু সেই চুক্তি ভঙ্গ করেছে এই রাষ্ট্র—যার আবাসিক বিদ্যালয়, সম্পদ আহরণ এবং রাজতন্ত্র এখনও নেপথ্যে বসে আছে, ঠিক যেন পরচুলা পরা কোনো জমিদার রাষ্ট্র হিসেবে ভান করছে।
নিউজিল্যান্ডও স্বাধীন ছিল না। এটি ছিল ব্রিটিশদের চাপিয়ে দেওয়া একটি উপনিবেশ, যা চুক্তিভিত্তিক ভাষা, ভূমি আদালত, সামরিক অভিযান এবং ঔপনিবেশিক আইনে মোড়া ভূমির উপর তৈরি করা হয়েছিল, এবং তারপর একটি পোস্টকার্ডের মতো করে সাজানো হয়েছিল যাতে এই চুরিকে মনোরম দেখায়।
দক্ষিণ আফ্রিকাও স্বাধীন ছিল না। ডাচ এবং ব্রিটিশ বসতি স্থাপনকারীরা স্বাধীনতা তৈরি করেনি। তারা বর্ণবাদী পুঁজিবাদ, ভূমি চুরি, খনি সাম্রাজ্য, আইন প্রণয়ন, বর্ণবৈষম্য এবং আধিপত্যের একটি সম্পূর্ণ কাঠামো তৈরি করেছিল, যার জন্য আফ্রিকান শ্রমের প্রয়োজন ছিল এবং একই সাথে আফ্রিকানদের মানবিকতাকে অস্বীকার করা হয়েছিল।
রোডেশিয়া বা আজকের জিম্বাবুয়েও স্বাধীন ছিল না। এটি ছিল একটি চুরি করা বাড়িতে বসে ঔপনিবেশিক বসতি স্থাপনকারীদের এক উন্মত্ততা, যারা এমন ভূমির উপর সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করেছিল যা কখনোই তাদের ছিল না, এবং তারপর যখন ইতিহাস খাজনা আদায় করতে এসেছিল, তখন অবাক হওয়ার ভান করেছিল।
ইসরায়েলও সেভাবে স্বাধীন নয়, যেভাবে বসতি স্থাপনকারী রাষ্ট্রগুলো স্বাধীন হওয়ার ভান করে। প্রতিটি ইউরোপীয় বসতি স্থাপনকারী রাষ্ট্র এই একই স্ববিরোধিতা বহন করে। তারা এমন ভূমির উপর পতাকা ওড়ায় যা তারা তৈরি করেনি। তারা কবরের উপর রাজধানী তৈরি করে, চুরির উপর সংবিধান লেখে, আগ্রাসনকে বসতি স্থাপন বলে, এবং অন্যদের পরাধীন বলে।
নতুন প্রতিবেদন জানতে ফলো করুন
১৭
"কাল থেকে সব বদলে ফেলব!"
(কিন্তু সেই 'কাল' আর কখনোই আসে না)
আমরা প্রায়ই ভাবি, কাল থেকে আমি একদম নতুন মানুষ। ভোরে উঠব, ডায়েট করব, সোশ্যাল মিডিয়া কম ব্যবহার করব, আর রাগ তো একদমই করব না। কিন্তু ২-৩ দিন পরই দেখা যায় আমরা আবার সেই আগের রুটিনেই ফিরে গেছি।
কেন এমন হয় আসলে? আমাদের মস্তিষ্ক হঠাৎ করে বিশাল কোনো পরিবর্তন মেনে নিতে পারে না... মানুষের আচরণ পরিবর্তন আসলে কোনো ম্যাজিক নয়, এটি একটি ধারাবাহিক সাইকোলজিক্যাল প্রসেস, যা ধীরে ধীরে পরিবর্তন করতে হয়।
সাইকোলজিতে আচরণ পরিবর্তন এর ৫টি মজার ধাপ আছে। মিলিয়ে দেখুন তো আপনি এখন কোন ধাপে আছেন।
১. আরে নাহ, আমার কোনো সমস্যা নেই: শুরুতে আমরা মানতেই চাই না যে আমাদের কোনো বদভ্যাস আছে। কেউ ভুল ধরিয়ে দিলে উল্টো রেগে যাই।
২. হুম, মনে হয় একটু সমস্যা হচ্ছে: হঠাৎ কোনো একদিন, হয়তো কারো কথায় বা নিজের কোনো ভুলের কারণে আমাদের মনে হয় - নাহ, আমার এই রাগের অভ্যাসটা বা রাত জাগার অভ্যাসটা এবার বদলানো দরকার।
৩. দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া: শুধু বুঝলেই হয় না, ভেতর থেকে তাগিদ আসতে হয়। যতক্ষণ না বদভ্যাসের কারণে আমরা বড় কোনো বিপদে পড়ি বা আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়, ততক্ষণ আমরা বদলাতে চাই না!
৪. খারাপের বদলে ভালো: বদভ্যাস ছাড়ার সবচেয়ে দারুণ কৌশল হলো তার জায়গায় নতুন একটি ভালো অভ্যাস বসিয়ে দেওয়া। যেমন: রাগ উঠলে চিৎকার করার বদলে এক গ্লাস পানি খাওয়া, কিংবা ফোন স্ক্রোল করার বদলে ২ পৃষ্ঠা বই পড়া।
৫. কাজ হচ্ছে তো: কয়েকদিন পর নিজেকে নিজে একটু যাচাই করা। নতুন অভ্যাসটা কি আসলেই কাজ করছে? না করলে অন্য কোনো উপায় খোঁজা।
আমাদের ব্যার্থতার সবচেয়ে বড় কারণ কি জানেন? আমরা একদিনে বা একসাথে জীবনের সব বদভ্যাস পালটে ফেলতে চাই।
কিন্তু সফল হতে চাইলে একসাথে সব নয়, একবারে কেবল একটি অভ্যাস পরিবর্তনের চেষ্টা করুন।
আপনি আপনার জীবনের কোন অভ্যাসটি সবার আগে পরিবর্তন করতে চান? কমেন্ট করে জানাতে পারেন।
– Showkat Jubayer
১৮
ছোটো ছোটো ডিভোর্স দাম্পত্য জীবনে সুখ আনে!
এয়ারপোর্ট ডিভোর্স কোনো আইনি বিবাহবিচ্ছেদ নয়, বরং ভ্রমণের সময় দম্পতিদের মধ্যে ঝগড়া এড়াতে এবং মানসিক শান্তি বজায় রাখতে একটি আধুনিক ও জনপ্রিয় ট্রাভেল ট্রেন্ড। এই কৌশল অনুযায়ী, বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর নিরাপত্তা তল্লাশি পার হয়ে দম্পতিরা সাময়িকভাবে একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে যান। এরপর তারা নিজ নিজ পছন্দমতো সময় কাটিয়ে সরাসরি বিমানের বোর্ডিং গেটে বা প্লেনের ভেতরে গিয়ে আবার একত্র হন। এই ছোটো একটু পরিকল্পিত ডিভোর্স বিরক্তি এড়িয়ে সুখ এনে দিতে পারছে৷
২০২৫ সালের আগস্টে ব্রিটিশ সাংবাদিক হিউ অলিভার ‘দ্য সানডে টাইমস’-এর একটি কলামে প্রথম এই শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেন এবং একে ‘সুখী সম্পর্কের গোপন রহস্য’ বলে অভিহিত করেন। এই ট্রেন্ডের জনপ্রিয়তা বাড়ছে!
ভ্রমণের শুরুতে বিমানবন্দরে নানা ধরনের মানসিক চাপ তৈরি হয়, যা অনেক সময় দম্পতিদের মধ্যে ছোটখাটো ঝগড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ভালোবাসা বজার রাখতে মানুষ ‘এয়ারপোর্ট ডিভোর্স’ বেছে নিচ্ছেন৷
দম্পতির একজন হয়তো অনেক সময় হাতে নিয়ে বিমানবন্দরে পৌঁছাতে ভালোবাসেন, অন্যজন হয়তো শেষ মুহূর্তে পৌঁছাতে অভ্যস্ত। সিকিউরিটি পার হওয়ার পর কেউ হয়তো লাউঞ্জে নিরিবিলিতে বসে বই পড়তে বা কাজ করতে চান, আবার কেউ হয়তো ডিউটি-ফ্রি শপগুলোতে ঘুরে কেনাকাটা করতে পছন্দ করেন। বিমানবন্দরে গেট পরিবর্তন, দীর্ঘ লাইন বা ফ্লাইটের বিলম্বের কারণে তৈরি হওয়া বিরক্তি যেন সঙ্গীর ওপর গিয়ে না পড়ে, তার একটি মনস্তাত্ত্বিক সমাধান এটি।
বিমানবন্দরে কিছু সময়ের এই স্বাধীনতা বা দূরত্ব সম্পর্কের ওপর থেকে চাপ কমিয়ে পুরো ভ্রমণটিকে আরও আনন্দদায়ক ও চাপমুক্ত করে তোলে। কেউ কারো বিরক্তির কারণ যখন না হবেন তখন তো কেবল ভালোবাসাই থাকবে৷ এই বিরক্তিটাই জীবনকে বিষিয়ে তোলে এবং সম্পর্কে ভাঙন তৈরি করে৷ আমার সমস্যা নিয়ে আমিই থাকি৷ আরেকজনের উপর কেনো তা চাপিয়ে দিবো? তাই স্থায়ী ডিভোর্স এড়াতে ক্ষণস্থায়ী ডিভোর্সের উপর নির্ভর করতে পারেন৷ @ Mojib Rahman
১৯
বদলে যাচ্ছে বিয়ে ব্যবস্থা! কী হবে ভবিষ্যতে?
পাশ্চাত্যে বিয়েবিহীন জীবনই এখন সবচেয়ে জনপ্রিয়৷ ফ্রান্সে ৬০%+ শিশুর পিতামাতাই বিয়ে করেননি৷ জনপ্রিয় ফুটবলার রোনাল্ডো পাঁচ সন্তানের পিতা হওয়ার পরে বিয়ে করলেন! বিয়েটা গুরুত্ব হারিয়েছে আবার বিয়েরও নতুন নতুন ধরন এসেছে যা প্রচলিত বিয়ের ধারণাকেই বদলে দিচ্ছে৷
জাপানের সমাজব্যবস্থায় দিনদিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘সেপারেশন ম্যারেজ’ বা দূরবাসী বিয়েতে। বিয়ের পর বিবাহিত জীবনের কোনো পরিবর্তন নেই! দুজনেই দূরের কর্মস্থলে থাকেন, সপ্তাহান্তে দেখা হয়৷ আবার চলে যাচ্ছেন দুজন দুজনকে ছেড়ে৷ স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গে কোনো সমস্যাও চলছে না! দুজনেই খুব খুশি! দুজন দুজনের খবরও রাখছেন। তবে ঝগড়াঝাটির সুযোগ নেই৷ সবকিছু ঠিকঠাকই চলছে। দূরত্বে থাকা এমন নব দম্পতিদের বিয়েই হচ্ছে ‘সেপারেশন ম্যারেজ’। অর্থাৎ বিয়ে করে আলাদা থাকার রীতি। বিয়ের পর প্রতিটা কাজে কেউ কারো উপর খবরদারি করে না। সেপারেশন ম্যারেজে আইনত বিবাহিত হলেও দম্পতি স্বেচ্ছায় দূরে আলাদা থাকেন। এই বিয়ের ক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রী সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও একসাথে থাকবেন কিনা তাও দুজনের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। যদি ভাল না লাগে তবে চিরবিচ্ছেদ— আলবিদা!
তবে সেপারেশন ম্যারেজের ক্ষেত্রে সারা সপ্তাহ নিজের মতো কাটালেও পার্টনারের জন্য স্পেশাল একটি দিন বরাদ্দ থাকে। যেদিন তারা একসাথে সময় কাটান। ঘুরতে যান অথবা একসাথে ডিনার ডেটে বের হন। শুধু জাপান নয়, অন্যান্য দেশেও দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে জাপানিদের এই সেপারেশন ম্যারেজ। দক্ষিণ এশিয়া কি পিছিয়ে থাকবে?
দক্ষিণ এশিয়ায় সংসার সুখের করতে কেবল সেক্রিফাইজ করতে করতে দুজনেরই জীবন শেষ হয়—সুখের দেখা না পেয়েই৷ মানুষ সুখে থাকতে বিভিন্ন পরামর্শ দেয়৷ তার সবগুলোতেই নিজেকে বিসর্জন দিতে হয়৷ স্থায়ী সম্পর্ক মানেই ঝামেলা ও অশান্তি৷ কখনো অশান্তি মাত্রা ছাড়িয়ে যায়৷ পরস্পরকে আপাদমস্তক ঘৃণা করেও এক বাড়িতে থাকতে হয়৷ ঢাকার বিখ্যাত একজন পরিচালকের সুন্দরী শালিকা আমাকে বলেছিল, তার বোন ও ভগ্নিপতি সাত বছর ধরে পরস্পরের সাথে কোন কথা বলেন না৷ এক কক্ষে থাকেনও না! তবুও সংসার চলছে৷ নিজের ঘর থেকে সুখ চলে গিয়ে সেখানে ভর করে আছে মানসিক অশান্তি। সন্তানের জন্য টিকিয়ে রাখছে সংসার! সেই ভয়ে শালিকা মেয়েটি বিয়ে করতে চাইতো না৷ সেপারেশন ম্যারেজ সিস্টেম থাকলে সে হয়তো বিয়ে করতো৷ তার বোনকে পরামর্শ দেয়ার লোকের অভাব ছিল না কিন্তু ঘর ছাড়তে বলার কেউ ছিল না৷
বিয়ে যদি নিজের জীবন আর নিজের হাতে থাকতে না দেয় তবে দাসে পরিণত হয়েই সারাজীবন কাটিয়ে দিতে হবে৷ সেপারেশন ম্যারেজে এতো কিছু থাকে না৷ এখানে দাসে পরিণত হওয়ার বহু আগেই বিদায় নেয়ার সুযোগ এসে যায়৷ ফলে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে এই জাপানিজ কালচার৷ এটাই হয়ে উঠতে পারে ভবিষ্যতের বিয়ে৷
তবে সাম্প্রতিক সময়ে স্যাপিও বা স্যাপিওসেক্সুয়াল বিবাহ আরও আকর্ষণীয় করছে জীবনকে৷ সুন্দরী অভিনেত্রীর চেয়ে জ্ঞানী নারীর সান্নিধ্যই জীবনকে সুন্দর করে৷ অমর্ত্য সেন ও অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় এটা উপলব্ধি করেই অর্থনীতি নিয়ে সারাজীবন কথা চালিয়ে যাওয়ার মতো নারীকেই বেছে নিয়েছেন৷ অভিজিতের স্ত্রী তো নোবেলও পেয়েছেন তাঁর সাথেই৷ এটি এমন একটি বৈবাহিক সম্পর্ক, যেখানে শারীরিক সৌন্দর্য বা সামাজিক পদমর্যাদার চেয়ে সঙ্গীর বুদ্ধিমত্তা, প্রজ্ঞা এবং মানসিক গভীরতা সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পায়৷ স্যাপিওসেক্সুয়াল শব্দ থেকে এর উৎপত্তি, যার অর্থ বুদ্ধিমত্তার প্রতি তীব্র আকর্ষণ অনুভব করা৷ এই ধরনের বিয়েতে দম্পতিরা একে অপরের মেধা, চিন্তাভাবনা, এবং জটিল জীবনবোধের প্রেমে পড়েন। গভীর আলোচনা, বই পড়ার অভ্যাস, বা কোনো বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক বিষয়ে বিতর্ক তাদের সম্পর্কের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।
মানসিক ও আধুনিক ধারণার আরেকটি বিয়ে হলো মিন্ডফুল ম্যারেজ এই ধরনের বিয়েতে দম্পতিরা একে অপরের মানসিক স্বাস্থ্য, আবেগ এবং আত্মিক উন্নতির দিকে সবচেয়ে বেশি নজর দেন। এখানে জোরপূর্বক কোনো নিয়ম চাপিয়ে না দিয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং সচেতনতার মাধ্যমে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা হয়।
ওপেন ম্যারেজ হলো এমন এক ধরণের বৈবাহিক সম্পর্ক যেখানে দম্পতিরা বিবাহিত থাকা সত্ত্বেও পারস্পরিক সম্মতিতে অন্য কারও সাথে রোমান্টিক বা শারীরিক সম্পর্কে জড়ানোর স্বাধীনতা পান। এটি সততা এবং কঠোর পারস্পরিক সম্মতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। দার্শনিক ও লেখক সার্ত্র ও সিমোন এমন বিয়েতে আবদ্ধ ছিলেন৷
প্রাচীনকালের মতো শুধু বংশবৃদ্ধি বা অর্থনৈতিক সুরক্ষার জন্য নয়, বরং মূলত গভীর বন্ধুত্ব, সমঅধিকার এবং মানসিক সাহচর্যের উদ্দেশ্যে যে বিয়ে করা হয়, তাকে কম্প্যানিয়নেট ম্যারেজ বলে।
ভৌগোলিক ও জীবনযাত্রাকেন্দ্রীক বিয়ে
লিভিং-অপার্ট-টুগেদার বিয়েতে দম্পতিরা আইনগতভাবে বিবাহিত এবং সম্পর্কে গভীরভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকেন, কিন্তু তারা এক ছাদের নিচে বাস করেন না। নিজেদের কাজের সুবিধা, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বা নিজস্ব স্পেস বজায় রাখার জন্য তারা আলাদা বাড়িতে বসবাস করেন। এটা জাপানের সেপারেশন ম্যারেজ’ বা দূরবাসী বিয়ের মতোই৷
প্রযুক্তির আধুনিক যুগে ডিজিটাল বা মেটাভার্স ধরনের বিয়েতে দম্পতিরা বাস্তব পৃথিবীর পাশাপাশি বা শুধুমাত্র ভার্চুয়াল জগতে (যেমন মেটাভার্স) নিজেদের অবতারের মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন করেন।
কনভেনিয়েন্স বা কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ কোনো রোমান্টিক আকর্ষণ বা ভালোবাসার ভিত্তিতে হয় না। মূলত রাজনৈতিক সুবিধা, আইনি নাগরিকত্ব (গ্রিন কার্ড), বা অর্থনৈতিক কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য এই ধরণের চুক্তিভিত্তিক বিয়ে করা হয়। এতে কখনও রোমাঞ্ছ থাকে না৷ কখনও ব্যক্তিগত অনুভূতির কথাও জানানো হয় না৷ এটা নিছকই ব্যবসা৷
সোলো ম্যারেজ বা সোলোগ্যামি হলো নিজেকে নিজে বিয়ে করার একটি রীতি। কোনো সঙ্গী ছাড়াই নিজের আত্মমর্যাদা, আত্মপ্রেম এবং স্বাধীনতা উদযাপন করতে মানুষ প্রতীকীভাবে এই ধরণের বিয়ে করে থাকে।
আরও নতুন নতুন ধরনের বিয়ে আসছে এবং আসবে৷ আগামীতে প্রচলিত বিয়ে কমে যাওয়ায় দ্রুতই কমতে শুরু করবে জনসংখ্যাও৷ পৃথিবী আরও সবুজ হবে বাড়বে প্রকৃতির রাজত্ব৷ কমে যাবে ধর্মবোধ৷ মানুষ আরও সুখে থাকবে এবং জীবন হবে আরও সুন্দর৷ @ Mojib Rahman
২০
কিছু রোগ ছোঁয়াচে, আবার কিছু রোগ ছোঁয়াচে হয় না কেন?
ছোঁয়াচে রোগগুলো ক্ষতিকর জীবাণু দ্বারা এক শরীর থেকে অন্য শরীরে ছড়ায়, কিন্তু অ-ছোঁয়াচে রোগগুলো শরীরের অভ্যন্তরীণ ত্রুটি বা জীবনযাত্রার কারণে হয়।
ছোঁয়াচে রোগ কেন হয় এবং ছড়ায়?
জীবাণুর আক্রমণ: এগুলো ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাকের মতো ক্ষুদ্র জীবাণু দ্বারা হয়।
সরাসরি ছড়ানো: রোগী থেকে সুস্থ মানুষের দেহে সহজে স্থানান্তরিত হয়।
ছড়ানোর মাধ্যম: হাঁচি, কাশি, হাতের স্পর্শ বা একই জিনিস ব্যবহারের মাধ্যমে ছড়ায়।
উদাহরণ: সর্দি-কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, করোনা এবং যক্ষ্মা।
অ-ছোঁয়াচে রোগ কেন ছড়ায় না?
জীবাণুর অনুপস্থিতি: এগুলোতে কোনো ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া কাজ করে না।
অভ্যন্তরীণ কারণ: জিনগত সমস্যা, অঙ্গের অকার্যকারিতা বা পুষ্টির অভাব থেকে হয়।
২১
নিজের পরিবারের স্বাস্থ্য ইতিহাস জানা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
নিজের পরিবারের স্বাস্থ্য ইতিহাস বা চিকিৎসা ইতিহাস জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি আপনাকে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে আগে থেকেই সচেতন করে এবং সময়মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে সাহায্য করে।
পারিবারিক স্বাস্থ্য ইতিহাস জানার গুরুত্ব
রোগের ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ: পরিবারে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ বা নির্দিষ্ট কোনো ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে আপনার মধ্যেও সেই রোগগুলো হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে কিনা তা জানা সহজ হয়। [1, 2]
আগাম সতর্কতা ও স্ক্রীনিং: ঝুঁকি জানা থাকলে ডাক্তাররা নির্দিষ্ট কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা স্ক্রীনিংয়ের পরামর্শ দ্রুত শুরু করতে পারেন, যা রোগকে শুরুতে দমন করতে সাহায্য করে। [1, 2]
জীবনযাত্রার পরিবর্তন: বংশগত রোগ সম্পর্কে জানলে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, নিয়মিত ব্যায়াম করা এবং ধূমপানের মতো ক্ষতিকর অভ্যাস বর্জন করে সুস্থ জীবনযাপন বজায় রাখা যায়। [1, 2]
সঠিক চিকিৎসা পরিকল্পনা: চিকিৎসকের কাছে আপনার পারিবারিক ইতিহাস তুলে ধরলে তিনি আপনার জন্য সঠিক ওষুধ ও জীবনধারার নির্দেশিকা তৈরি করতে পারেন।
বেশ কিছু চিকিৎসা শর্ত আছে যেগুলো বিকশিত হতে পারে যদি তাদের পারিবারিক ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত ঘটনা থাকে। এর মধ্যে রয়েছে:
হাঁপানি
জন্মগত অক্ষমতা (উদাহরণস্বরূপ, স্পাইনা বিফিডা বা ফাটল ঠোঁট)
কর্কটরাশি (স্তন, ডিম্বাশয়, প্রোস্টেট, অন্ত্র/কোলন বা চামড়া)
ডায়াবেটিস
জেনেটিক অবস্থা (সিস্টিক ফাইব্রোসিস, হিমোফিলিয়া)
হৃদরোগ
উচ্চ্ রক্তচাপ
উচ্চ কোলেস্টেরল
মানসিক অসুখ
অস্টিওপোরোসিস
গর্ভাবস্থার ক্ষতি এবং মৃত প্রসব
স্ট্রোক.
থাইরয়েড ব্যাধি
পরিবারের চিকিৎসা ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন হওয়ার সুবিধা কী?
একটি পরিবারের চিকিৎসা ইতিহাস চিকিত্সকদের নির্দিষ্ট চিকিৎসা অবস্থার ঝুঁকির মাত্রা চিহ্নিত করতে সাহায্য করতে পারে। রোগের আগে থেকে স্ক্রীনিং করা ডাক্তারদের অগ্রগতির ঝুঁকি কমাতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করতে পারে। চিকিত্সকরা জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং ওষুধের পরামর্শও দিতে পারেন যা এই অবস্থার সূত্রপাত প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে।
তাই, পরিবারে বিদ্যমান অসুস্থতা সম্পর্কে সচেতন হওয়ার জন্য বাবা-মা, দাদা-দাদি, ভাইবোন, প্রথম-ডিগ্রী আত্মীয় এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে আলোচনা করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
কি তথ্য এক সংগ্রহ করতে পারেন?
পারিবারিক গাছের যে কোনো প্রধান স্বাস্থ্য অবস্থা(গুলি)
যে বয়সে একজন ব্যক্তির এই অবস্থা নির্ণয় করা হয়েছিল
মৃত্যুর সময় বয়স, যদি অবস্থা মারাত্মক ছিল
জাতিগত বা সাংস্কৃতিক পটভূমি (কিছু জাতিগত কিছু নির্দিষ্ট অবস্থার বিকাশের ঝুঁকি বেশি)
সাধারণ জীবনযাত্রার তথ্য (ব্যক্তি কি ধূমপান করেছেন বা ক্ষতিকারক পদার্থের সাথে কাজ করেছেন?)
কোন ঘনিষ্ঠ আত্মীয় (উদাহরণস্বরূপ, প্রথম কাজিন) একসাথে সন্তান আছে?
পারিবারিক চিকিৎসা ইতিহাসের কারণে কারা ঝুঁকিতে রয়েছে?
প্রতিটি পরিবার অনন্য, এবং সেইজন্য, নির্দিষ্ট পরিবারগুলি এক ধরণের ব্যাধিতে বেশি প্রবণ। কিছু কারণ যা ইঙ্গিত দিতে পারে যে পরিবারটি নির্দিষ্ট অবস্থার বিকাশের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে তার মধ্যে রয়েছে:
একই বা সম্পর্কিত স্বাস্থ্যের অবস্থা সহ বেশ কয়েকটি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ব্যক্তি, উদাহরণস্বরূপ:
স্তন এবং ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার
অন্ত্র/কোলন এবং এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যান্সার
ডায়াবেটিসহৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ঢালের ন্যায় আকারযুক্ত রোগ
২২
হাসিখুশি থাকলে শরীর ভালো থাকে কেন?
হাসিখুশি ও প্রাণখোলা হাসি আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সরাসরি সাহায্য করে, কারণ এটি শরীরের ভেতরের হরমোন ও রক্ত সঞ্চালনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।
হাসিখুশি থাকলে শরীর ভালো থাকার কারণসমূহ:
স্ট্রেস হরমোন কমে: হাসলে বা খুশি থাকলে শরীর থেকে কর্টিসোল ও অ্যাড্রিনালিনের মতো ক্ষতিকর স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা কমে যায়। ফলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং হৃদযন্ত্রের ওপর চাপ কমে।
হ্যাপি হরমোন বাড়ে: হাসি ও আনন্দ আমাদের মস্তিষ্কে এন্ডোরফিন, ডোপামিন ও সেরোটোনিনের মতো ভালো লাগার হরমোন বা নিউরোট্রান্সমিটারের নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়। এগুলো প্রাকৃতিকভাবে ব্যথা কমায় এবং মন শান্ত রাখে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে: হাসিখুশি মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেম গোমড়ামুখো বা সবসময় মানসিক চাপে থাকা মানুষের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়।
অক্সিজেন ও রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি: হাসার সময় আমরা দীর্ঘ শ্বাস নিই, যার ফলে ফুসফুসে বেশি বাতাস প্রবেশ করে। এতে রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং সারা শরীরে রক্ত সঞ্চালন সচল ও উন্নত হয়।
লাফিং থেরাপি বা হাসি থেরাপি হলো এমন একটি স্বাস্থ্য পদ্ধতি , যা শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বাড়াতে এবং চাপ কমাতে হাসি ও হাস্যরস ব্যবহার করে।
কীভাবে চর্চা করবেন
শ্বাসের ব্যায়াম: বুক ভরে লম্বা শ্বাস নিয়ে এবং ধীরে ধীরে ছেড়ে শরীর ও মনকে শিথিল করুন।
ইচ্ছাকৃত হাসি: কোনো কারণ ছাড়াই কৃত্রিম হাসি দিয়ে শুরু করুন, যা পরবর্তীতে স্বতঃস্ফূর্ত হাসিতে রূপ নেয়।
দলগত চর্চা: যোগব্যায়ামের শ্বাসপ্রশ্বাসের সাথে হাসি মিলিয়ে দলগতভাবে 'লাফিং ইয়োগা' বা হাসির ব্যায়াম করা যায়।
২৩
অতিরিক্ত মানসিক চাপ আমাদের শরীরকে কিভাবে প্রভাবিত করে?
দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ কীভাবে শরীরকে অসুস্থ করে?
অতিরিক্ত ও দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি তৈরি করে। [1, 2, 3]
মানসিক চাপ যেভাবে শরীরকে প্রভাবিত করে
হরমোনের ভারসাম্যহীনতা: চাপ বাড়লে শরীর কর্টিসল ও অ্যাডড্রেনালিনের মতো হরমোন বেশি তৈরি করে, যা হার্টবিট ও রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়।
শারীরিক লক্ষণ: এর ফলে মাথাব্যথা, পেশিতে টান, বুক ধড়ফড় করা এবং অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভূত হয়।
হজমে সমস্যা: পেট খারাপ, কোষ্ঠকাঠিন্য, গ্যাস্ট্রিক বা পেট ফাঁপার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
ঘুমের ব্যাঘাত: রাতে ঠিকমতো ঘুম হয় না, যার ফলে শরীর ও মন দুর্বল হয়ে পড়ে। [1, 2, 3, 4, 5, 6, 7, 8, 9]
দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ কীভাবে শরীরকে অসুস্থ করে
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস: দীর্ঘদিন চাপ থাকলে শরীর ইনফেকশন বা সাধারণ সর্দি-কাশির বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
হৃদরোগের ঝুঁকি: রক্তচাপ সবসময় বেশি থাকায় ধমনিতে চাপ পড়ে, যা পরবর্তীতে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।
মানসিক অবসাদ: দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে উদ্বেগ (Anxiety), প্যানিক অ্যাটাক ও তীব্র বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশন তৈরি হয়।
স্মৃতিশক্তি হ্রাস: কর্টিসলের অতিরিক্ত মাত্রার কারণে মনোযোগ ও স্মরণশক্তি কমে যায়।
মানসিক চাপ কমাতে প্রাণায়াম (শ্বাসের ব্যায়াম), মেডিটেশন এবং কিছু নির্দিষ্ট খাবার শরীর ও মনকে দ্রুত শান্ত করতে সাহায্য করে।
এখানে মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমানোর জন্য কার্যকর কিছু উপায় তুলে ধরা হলো:
১. শ্বাসের সহজ ব্যায়াম (Deep Breathing)
৪-৭-৮ টেকনিক: চোখ বন্ধ করে ৪ সেকেন্ড নাক দিয়ে গভীরভাবে শ্বাস নিন। ৭ সেকেন্ড শ্বাসটি ভেতরে আটকে রাখুন। এরপর ৮ সেকেন্ড ধরে মুখ দিয়ে আস্তে আস্তে শ্বাসটি সম্পূর্ণ ছেড়ে দিন। এটি ৪-৫ বার পুনরাবৃত্তি করুন।
বক্স ব্রিদিং (Box Breathing): ৪ সেকেন্ড শ্বাস নিন, ৪ সেকেন্ড আটকে রাখুন, ৪ সেকেন্ড ধরে ছাড়ুন এবং আবার ৪ সেকেন্ড ফাঁকা রাখুন। এটি হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক করতে অত্যন্ত কার্যকর।
২. রিলাক্সেশন কৌশল (Relaxation Techniques)
মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন: প্রতিদিন ১০-১৫ মিনিট শান্ত হয়ে বসে নিজের শ্বাসের ওপর মনোযোগ দিন। মন এদিক-ওদিক চলে গেলে জোর না করে আবার শ্বাসে মনোযোগ ফিরিয়ে আনুন।
প্রোগ্রেসিভ মাসল রিলাক্সেশন (PMR): পায়ের আঙুল থেকে শুরু করে মাথার পেশি পর্যন্ত শরীরের প্রতিটি অংশ ৫ সেকেন্ডের জন্য শক্ত বা সংকুচিত করুন, তারপর ছেড়ে দিয়ে শিথিল (relax) করুন। এটি শরীরের শারীরিক ক্লান্তি ও পেশির টান দূর করে।
হালকা স্ট্রেচিং বা ইয়োগা: প্রতিদিন অন্তত ২০ মিনিট হাঁটাহাঁটি বা ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করলে শরীরে 'এন্ডোরফিন' বা ফিল-গুড হরমোন নিঃসৃত হয়।
৩. স্ট্রেস-রিলিভিং খাবার ও পানীয়
গ্রিন টি বা ক্যামোমাইল টি: এগুলোতে থাকা 'এল-থিয়ানিন' এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মস্তিষ্ককে শান্ত রাখে এবং ভালো ঘুমে সাহায্য করে।
ডার্ক চকোলেট: পরিমিত পরিমাণে ডার্ক চকোলেট (৭০% বা তার বেশি কোকো সমৃদ্ধ) খেলে কর্টিসল বা স্ট্রেস হরমোন কমে।
ম্যাগনেসিয়াম ও ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ খাবার: কাঠবাদাম, কাজুবাদাম, পালং শাক, এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড যুক্ত মাছ (যেমন: ইলিশ, রুই বা সামুদ্রিক মাছ) স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত রাখতে সাহায্য করে।
ভিটামিন সি যুক্ত ফল: লেবু, কমলা বা আমলকী শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং মানসিক চাপের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে কোষকে রক্ষা করে।
২৪
নিয়মিত হাঁটাচলা করা হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের জন্য কেন উপকারী?
প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটাচলা প্রয়োজন কেন?
নিয়মিত হাঁটাচলা হৃদপিণ্ডের পেশিকে শক্তিশালী করে এবং ফুসফুসের অক্সিজেন গ্রহণ ক্ষমতা বাড়ায়, যা পুরো শরীরে রক্ত সঞ্চালন উন্নত করে।
হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের জন্য হাঁটার উপকারিতা
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ: হাঁটার ফলে রক্তনালীগুলো প্রসারিত হয়, যা উচ্চ রক্তচাপ কমাতে এবং ক্ষতিকর LDL কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস: এটি হৃদপিণ্ডের কার্যক্ষমতা বাড়ায়, ফলে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।
ফুসফুসের ক্ষমতা বৃদ্ধি: হাঁটার সময় আমরা গভীরভাবে শ্বাস নিই। এটি ফুসফুসের বাতাস ধরে রাখার ক্ষমতা (Lung Capacity) বাড়ায় এবং রক্তে অক্সিজেনের সরবরাহ নিশ্চিত করে।
সহনশীলতা বা স্ট্যামিনা বৃদ্ধি: নিয়মিত হাঁটলে ফুসফুস ও হৃদযন্ত্র কম পরিশ্রমে বেশি কাজ করতে পারে, ফলে সহজে ক্লান্তি আসে না।
প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা কেন প্রয়োজন?
যুক্তরাষ্ট্রের AHA (American Heart Association) সহ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সুস্থ থাকার জন্য সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মানের ব্যায়াম করা উচিত। প্রতিদিন ৩০ মিনিট করে সপ্তাহে ৫ দিন হাঁটলে এই লক্ষ্য পূরণ হয়। এটি প্রয়োজনীয় কারণ:
ক্যালোরি বার্ন ও ওজন নিয়ন্ত্রণ: ৩০ মিনিট হাঁটলে শরীর সঞ্চিত চর্বি ও ক্যালোরি পোড়াতে শুরু করে, যা ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে।
ইনসুলিনের কার্যকারিতা বৃদ্ধি: এটি রক্তে শর্করার মাত্রা কমায় এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সরাসরি ভূমিকা রাখে।
মানসিক প্রফুল্লতা: একটানা ৩০ মিনিট হাঁটলে মস্তিষ্কে 'এন্ডোরফিন' ও 'সেরোটোনিন' হরমোন নিঃসৃত হয়, যা সারাদিনের মানসিক চাপ ও বিষণ্ণতা দূর করে।
হাড় ও জয়েন্টের সুরক্ষা: এটি পায়ের পেশি মজবুত করে এবং জয়েন্ট বা গিঁটের তরল চলাচল স্বাভাবিক রেখে বাতের ব্যথা কমায়।
২৫
জগিং এর সঠিক নিয়ম ও কৌশল
হাঁটার সেরা গতি হলো মাঝারি থেকে দ্রুত গতি (Brisk Walking), যেখানে শরীর থেকে হালকা ঘাম ঝরবে কিন্তু কথা বলতে কোনো কষ্ট হবে না।
নিচে হাঁটার গতি এবং সঠিক নিয়মে জগিং শুরু করার নির্দেশিকা দেওয়া হলো:
১. হাঁটার গতি কেমন হওয়া উচিত?
হাঁটার গতি মূলত আপনার ফিটনেস ও লক্ষ্যের ওপর নির্ভর করে। একে তিন ভাগে ভাগ করা যায়:
ধীর গতি (Casual Walk): ঘণ্টায় প্রায় ৩-৪ কিলোমিটার। এটি মূলত ওয়ার্ম-আপ বা বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য উপযোগী।
মাঝারি থেকে দ্রুত গতি (Brisk Walk - সবচেয়ে সেরা): ঘণ্টায় প্রায় ৫-৬ কিলোমিটার। অর্থাৎ, প্রতি মিনিটে ১০০ থেকে ১২০ কদম। এই গতিতে হৃদস্পন্দন বাড়বে, শরীর গরম হবে, কিন্তু আপনি পাশে থাকা কারো সাথে অনায়াসে কথা বলতে পারবেন (একে বলে 'টক টেস্ট')। হৃদযন্ত্রের উপকারের জন্য এই গতি সবচেয়ে কার্যকর।
অত্যন্ত দ্রুত গতি (Power Walking): ঘণ্টায় ৭ কিলোমিটার বা তার বেশি। এটি ক্যালোরি পোড়াতে এবং চর্বি কমাতে সাহায্য করে।
২. জগিং এর সঠিক নিয়ম ও কৌশল
জগিং হলো হাঁটার চেয়ে দ্রুত কিন্তু দৌড়ানোর চেয়ে ধীর গতিতে ছন্দময়ভাবে ছোটা। হঠাৎ করে জগিং শুরু করলে পেশি বা জয়েন্টে চোট লাগতে পারে। তাই নিচের নিয়মগুলো মেনে চলুন:
ক. শুরুর প্রস্তুতি ও ওয়ার্ম-আপ
সরাসরি জগিং শুরু করবেন না: প্রথমে ৫-১০ মিনিট সাধারণ গতিতে হেঁটে শরীর ও পেশিকে গরম (Warm-up) করে নিন।
সঠিক জুতো নির্বাচন: অবশ্যই ভালো মানের রানিং বা জগিং শু ব্যবহার করুন, যা পায়ের পাতা ও গোড়ালির ওপর শক বা আঘাতের চাপ কমিয়ে দেয়।
খ. জগিং করার সঠিক অঙ্গভঙ্গি (Posture)
শরীর সোজা রাখুন: শরীর একদম সোজা বা সামান্য সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে রাখুন। ঘাড় বা পিঠ বাঁকাবেন না। চোখ থাকবে সামনের দিকে।
পায়ের পাতার ব্যবহার: গোড়ালি দিয়ে মাটিতে জোর আঘাত করবেন না। পায়ের পাতার মাঝখানের অংশ (Mid-foot) দিয়ে মাটিতে ল্যান্ড করার চেষ্টা করুন। এতে হাঁটুতে চাপ কম পড়ে।
হাতের মুভমেন্ট: কনুই ৯০ ডিগ্রি কোণে বাঁকা থাকবে এবং হাঁটার ছন্দের সাথে হাত দুটি শরীরের দুপাশে প্রাকৃতিকভাবে সামনে-পেছনে দুলবে।
গ. শ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়ম
বুক দিয়ে ছোট ছোট শ্বাস না নিয়ে পেট দিয়ে গভীরভাবে শ্বাস নিন (Nose-Mouth Breathing)। নাক দিয়ে শ্বাস নিয়ে মুখ দিয়ে হালকা করে ছাড়তে পারেন। এতে শরীরে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছায় এবং দ্রুত হাঁপিয়ে যাওয়া রোধ হয়।
ঘ. সময় ও তীব্রতা (নতুনদের জন্য কৌশল)
আপনি যদি নতুন হন, তবে 'রান-ওয়াক' পদ্ধতি বেছে নিন। যেমন: ৫ মিনিট দ্রুত হাঁটুন, এরপর ২ মিনিট জগিং করুন। এভাবে ২০-৩০ মিনিট করুন। ধীরে ধীরে হাঁটার সময় কমিয়ে জগিংয়ের সময় বাড়ান।
জগিং শেষ করার পর হঠাৎ করে বসে পড়বেন না। ৫ মিনিট ধীর গতিতে হেঁটে শরীর ঠান্ডা (Cool-down) করুন এবং হালকা স্ট্রেচিং করুন।
২৬
অতিরিক্ত শরীরচর্চা কী শরীরের ক্ষতি করতে পারে?
একটানা বেশি কাজ করলে শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে কেন?
অতিরিক্ত শরীরচর্চা অবশ্যই শরীরের ক্ষতি করতে পারে, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানে 'ওভারট্রেনিং সিন্ড্রোম' (Overtraining Syndrome) নামে পরিচিত।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম ছাড়া খুব বেশি ব্যায়াম করলে এবং একটানা অতিরিক্ত পরিশ্রম করলে শরীর কেন ক্লান্ত ও অসুস্থ হয়ে পড়ে, তার বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো:
অতিরিক্ত শরীরচর্চা যেভাবে শরীরের ক্ষতি করে
পেশি ও জয়েন্টের ক্ষতি: অতিরিক্ত ব্যায়ামের ফলে পেশি পুনর্গঠনের (Muscle Recovery) সময় পায় না। এতে পেশিতে তীব্র টান ধরা, লিগামেন্ট ইনজুরি এবং জয়েন্টে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা হতে পারে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া: অতিরিক্ত পরিশ্রমে শরীরে স্ট্রেস হরমোন (যেমন কর্টিসল) অনেক বেড়ে যায়। এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়, ফলে শরীর সহজেই সর্দি-কাশি বা ইনফেকশনে আক্রান্ত হয়।
হৃদযন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ: সামর্থ্যের বাইরে দীর্ঘক্ষণ তীব্র ব্যায়াম করলে হৃদপিণ্ডের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যা অনিয়মিত হৃদস্পন্দন (Arrhythmia) বা হার্টের দেয়াল শক্ত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
ক্রনিক ফ্যাটিগ বা দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি: শরীর সবসময় ক্লান্ত থাকে, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় এবং রাতে ঠিকমতো ঘুম হয় না (Insomnia)।
একটানা বেশি কাজ করলে শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে কেন?
আমাদের শরীর একটি ইঞ্জিনের মতো। একটানা কাজ করলে শরীরে মূলত চারটি বড় পরিবর্তন ঘটে, যার কারণে আমরা ক্লান্তিবোধ করি:
ল্যাকটিক অ্যাসিড জমা হওয়া: একটানা পরিশ্রমের ফলে পেশিতে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়। তখন পেশিগুলো অবাত শ্বসনের মাধ্যমে শক্তি তৈরি করে, যার উপজাত (Byproduct) হিসেবে পেশিতে ল্যাকটিক অ্যাসিড জমা হয়। এই অ্যাসিড জমার কারণেই পেশি অবশ ও ক্লান্ত হয়ে আসে।
শক্তির উৎস ফুরিয়ে যাওয়া: কাজের জ্বালানি হিসেবে শরীর পেশি ও লিভারে জমা থাকা গ্লাইকোজেন (শর্করা) ব্যবহার করে। একটানা কাজ করলে এই গ্লাইকোজেনের মজুদ শেষ হয়ে যায়, ফলে শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে।
মস্তিষ্কে অ্যাডেনোসিন বৃদ্ধি: জেগে থাকা এবং কাজ করার সময় মস্তিষ্কে অ্যাডেনোসিন (Adenosine) নামক একটি রাসায়নিক উপাদান জমা হতে থাকে। এর পরিমাণ যত বাড়ে, মস্তিষ্ক তত বেশি ক্লান্তির সংকেত পাঠায় এবং আমাদের বিশ্রামের বা ঘুমের প্রয়োজন হয়।
পানির ঘাটতি বা ডিহাইড্রেশন: একটানা কাজ করলে ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে পানি ও প্রয়োজনীয় ইলেক্ট্রোলাইটস (যেমন সোডিয়াম, পটাশিয়াম) বেরিয়ে যায়। শরীরে পানির মাত্রা সামান্য কমলেও রক্ত সঞ্চালন ধীর হয়ে যায়, যা দ্রুত ক্লান্তি আনে।
২৭
নিয়মিত দেরি করে ঘুমালে শরীর কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়?
বর্তমান মোবাইলের যুগে প্রতিদিন ডিজিটাল ডিটক্স করা কেন জরুরি?
নিয়মিত দেরি করে ঘুমালে শরীরের প্রাকৃতিক সার্কাডিয়ান রিদম (জৈবিক ঘড়ি) নষ্ট হয়ে যায়, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে ক্রনিক রোগ এবং মানসিক অবসাদ তৈরি করে। অন্যদিকে, বর্তমান স্ক্রিন-নির্ভর যুগে মানসিক প্রশান্তি ও ভালো ঘুমের জন্য প্রতিদিন ডিজিটাল ডিটক্স করা অপরিহার্য।
নিচে এর বিস্তারিত প্রভাব ও কারণগুলো দেওয়া হলো:
নিয়মিত দেরি করে ঘুমালে শরীর যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়
হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি: রাত জাগার ফলে শরীরে কর্টিসল (স্ট্রেস হরমোন) এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়। এটি উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট অ্যাটাক এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা হ্রাস: দেরিতে ঘুমালে মস্তিষ্কের টক্সিন বা বর্জ্য পদার্থ পরিষ্কার হতে পারে না। ফলে মনোযোগের অভাব, সিদ্ধান্তহীনতা, তীব্র স্মৃতিভ্রম এবং খিটখিটে মেজাজ তৈরি হয়।
ওজন বৃদ্ধি ও মেদ জমা: রাত জাগলে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন 'লেপটিন' কমে যায় এবং ক্ষুধা বৃদ্ধিকারী হরমোন 'ঘেরলিন' বেড়ে যায়। এর ফলে গভীর রাতে জাঙ্ক ফুড খাওয়ার প্রবণতা বাড়ে এবং দ্রুত ওজন বৃদ্ধি পায়।
ত্বকের বার্ধক্য ও চুল পড়া: ঘুমের সময় ত্বক নিজেকে মেরামত করে। দেরি করে ঘুমালে চোখের নিচে কালো দাগ (Dark Circles), ব্রণ এবং অকালে চামড়া কুচকে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
বর্তমান মোবাইলের যুগে প্রতিদিন ডিজিটাল ডিটক্স করা কেন জরুরি?
ডিজিটাল ডিটক্স মানে হলো প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মোবাইল, ল্যাপটপ বা যেকোনো ধরনের স্ক্রিন থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা। বর্তমান সময়ে এটি জরুরি কারণ:
মেলাটোনিন হরমোন রক্ষা ও ভালো ঘুম: মোবাইল স্ক্রিনের 'ব্লু লাইট' (Blue Light) আমাদের মস্তিষ্ককে ভ্রম তৈরি করে যে এখনও দিন রয়েছে। ফলে ঘুম আনার হরমোন মেলাটোনিন নিঃসৃত হতে পারে না। ঘুমানোর অন্তত ১ ঘণ্টা আগে মোবাইল বন্ধ রাখলে দ্রুত ও গভীর ঘুম হয়।
মানসিক চাপ ও আলফা-স্টেট পুনরুদ্ধার: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অতিরিক্ত তথ্য, নোটিফিকেশন এবং রিলস/শর্টস দেখার ফলে মস্তিষ্ক সবসময় উত্তেজিত (Hyper-aroused) থাকে। ডিজিটাল ডিটক্স মস্তিষ্ককে শান্ত হতে এবং ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে।
মনোযোগের ক্ষমতা (Attention Span) বৃদ্ধি: সারাক্ষণ মোবাইল ব্যবহারের ফলে মানুষের কোনো একটি কাজে দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। প্রতিদিন কিছু সময় ফোন দূরে রাখলে কাজের দক্ষতা ও ফোকাস বাড়ে।
বাস্তব সামাজিক যোগাযোগ ও চোখের সুরক্ষা: স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে পরিবার বা প্রকৃতির সাথে সময় কাটালে চোখের ওপর চাপ কমে (Digital Eye Strain দূর হয়) এবং মানসিক একাকীত্ব দূর হয়।
২৮
প্রতিদিন ফল ও শাকসবজি খাওয়া উচিত কেন?
সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের জন্য ক্ষতিকর কেন?
প্রতিদিন ফল ও শাকসবজি খাওয়া শরীরকে প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সরবরাহ করে রোগমুক্ত রাখে। অন্যদিকে, সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের কোষের ডিএনএ নষ্ট করে অকাল বার্ধক্য ও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।
এদের প্রয়োজনীয়তা ও ক্ষতিকর দিকগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
প্রতিদিন ফল ও শাকসবজি খাওয়া উচিত কেন?
ফল ও শাকসবজিকে প্রকৃতির "প্রতিরক্ষামূলক খাদ্য" বলা হয়। নিয়মিত এগুলো খেলে শরীরে যে উপকারগুলো হয়:
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি: শাকসবজি ও ফলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, এ এবং জিঙ্ক থাকে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে এবং ইনফেকশন থেকে রক্ষা করে।
হজমের উন্নতি ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর: এগুলোতে থাকা উচ্চমাত্রার ডায়েটরি ফাইবার বা আঁশ অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে, হজমপ্রক্রিয়া সহজ করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য পুরোপুরি দূর করে।
ক্রনিক রোগের ঝুঁকি হ্রাস: ফল ও সবজির অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরে ফ্রি-র্যাডিক্যালের বিরুদ্ধে লড়াই করে। ফলে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেক কমে যায়।
ওজন ও রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ: এগুলোতে ক্যালোরি ও চর্বির পরিমাণ খুব কম থাকে, যা ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে।
সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি (UV Rays) ত্বকের জন্য ক্ষতিকর কেন?
সূর্যের আলো থেকে মূলত দুধরনের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি পৃথিবীতে আসে—UVA এবং UVB। এগুলো ত্বকের গভীরে প্রবেশ করে ক্ষতিসাধন করে:
অকাল বার্ধক্য বা ফটোএজিং (Photoaging): UVA রশ্মি ত্বকের গভীর স্তর পর্যন্ত পৌঁছায় এবং ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা ধরে রাখার উপাদান কোলাজেন ও ইলাস্টিন ভেঙে ফেলে। এর ফলে ত্বকে অকালেই বলিরেখা (Wrinkles), কালো দাগ এবং চামড়া ঝুলে যাওয়ার সমস্যা দেখা দেয়।
সানবার্ন বা ত্বক পুড়ে যাওয়া: UVB রশ্মি সরাসরি ত্বকের উপরিভাগকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর কারণে ত্বক লাল হয়ে যাওয়া, জ্বালাপোড়া করা এবং চামড়া উঠে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে, যাকে আমরা সানবার্ন বলি।
ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি: অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের কোষের অভ্যন্তরীণ ডিএনএ (DNA) গঠন নষ্ট করে দেয়। এই ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত হলে কোষগুলো অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, যা পরবর্তীতে মেলানোমা বা ত্বকের ক্যানসারে রূপ নিতে পারে।
মেলানিনের ভারসাম্যহীনতা: সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে ত্বককে বাঁচাতে শরীর অতিরিক্ত মেলানিন তৈরি করে। এর ফলে ত্বকে মেছতা, তিল এবং সান ট্যান বা ত্বকের রঙ কালচে হয়ে যায়।
২৯
বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের ত্বকে ভাঁজ পড়ে কেন?হাড় ভেঙে গেলে কিভাবে তা নিজে নিজেই সেরে ওঠে?
বয়স বাড়ার সাথে সাথে ত্বকে ভাঁজ পড়ে কারণ শরীর কোলাজেন উৎপাদন কমিয়ে দেয় এবং ত্বকের ইলাস্টিন বা স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট হয়ে যায়। অন্যদিকে, হাড় ভেঙে গেলে শরীর নতুন অস্থিকোষ ও রক্তনালী তৈরি করে প্রাকৃতিকভাবে তা নিজে নিজেই জোড়া লাগিয়ে ফেলে।
নিচে এই দুটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার বিস্তারিত কারণ তুলে ধরা হলো:
বয়স বাড়ার সাথে সাথে ত্বকে ভাঁজ বা বলিরেখা পড়ে কেন?
আমাদের ত্বক মূলত কয়েকটি স্তরে গঠিত এবং বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে এতে কিছু জৈবিক পরিবর্তন ঘটে:
কোলাজেন ও ইলাস্টিন হ্রাস: কোলাজেন (Collagen) হলো এক ধরণের প্রোটিন যা ত্বকে দৃঢ়তা দেয় এবং ইলাস্টিন (Elastin) ত্বককে টানটান রাখে। বয়স ২৫ পার হওয়ার পর প্রতি বছর শরীরে কোলাজেন উৎপাদন কমতে থাকে। ফলে ত্বক তার স্বাভাবিক টানটান ভাব ও ইলাস্টিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং চামড়া ঝুলে গিয়ে ভাঁজ পড়ে।
প্রাকৃতিক তেলের ঘাটতি: বয়স বাড়লে ত্বকের নিচের তেল গ্রন্থিগুলো (Sebaceous glands) কম সক্রিয় হয়ে পড়ে। এর ফলে ত্বক শুষ্ক হয়ে যায় এবং শুষ্ক ত্বকে সহজেই বলিরেখা বা ভাঁজ প্রকাশ পায়।
চর্বির স্তর পাতলা হওয়া: ত্বকের একদম ভেতরের স্তরে যে চর্বির আস্তরণ থাকে, তা ধীরে ধীরে পাতলা হতে শুরু করে। ফলে গাল, চোখ ও কপালের চারপাশের চামড়া আলগা হয়ে ঝুলে পড়ে।
হাড় ভেঙে গেলে যেভাবে নিজে নিজেই সেরে ওঠে (Bone Healing Process)
হাড় ভেঙে যাওয়ার পর এটি নিজে নিজেই জোড়া লাগার ক্ষমতা রাখে। এই নিরাময় প্রক্রিয়াটি মূলত চারটি ধাপে সম্পন্ন হয়:
[১. হেমাটোমা বা রক্ত জমাট বাধা] ➔ [২. নরম তরুণাস্থি বা ক্যালাস গঠন] ➔ [৩. শক্ত হাড় বা বোন ক্যালাস গঠন] ➔ [৪. রিমডেলিং বা হাড়ের পুনর্গঠন]
১. রক্ত জমাট বাঁধা (Hematoma Formation): হাড় ভাঙার সাথে সাথে এর ভেতরের রক্তনালীগুলোও ফেটে যায়। ভাঙা অংশের চারপাশে রক্ত জমাট বেঁধে একটি চটচটে আবরণ (Clot) তৈরি করে। এটি ভাঙা স্থানটিকে সাময়িকভাবে স্থির রাখতে এবং সেখানে ইনফেকশন প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।
২. নরম টিস্যুর সেতু তৈরি (Fibrocartilaginous Callus): ভেঙে যাওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে শরীর ভাঙা অংশে নতুন রক্তনালী তৈরি করে। বিশেষ কিছু কোষ (Fibroblasts ও Chondroblasts) সেখানে এসে কোলাজেন এবং নরম তরুণাস্থি (Cartilage) তৈরি করে ভাঙা দুটির মাঝখানে একটি নরম সেতু বা ক্যালাস গড়ে তোলে।
৩. শক্ত হাড়ে রূপান্তর (Bony Callus Formation): ভাঙার প্রায় ২-৩ সপ্তাহ পর 'অস্টিওব্লাস্ট' (Osteoblast) নামক বিশেষ কোষ সেখানে খনিজ ও ক্যালসিয়াম জমা করতে শুরু করে। এই নরম তরুণাস্থি ধীরে ধীরে শক্ত হাড়ে (Spongy bone) রূপান্তরিত হয়। এই ধাপটি সম্পন্ন হতে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
৪. হাড়ের চূড়ান্ত পুনর্গঠন (Bone Remodeling): এটি নিরাময়ের শেষ ধাপ, যা মাসের পর মাস এমনকি বছর ধরে চলতে পারে। 'অস্টিওক্ল্যাস্ট' (Osteoclast) নামক কোষ হাড়ের অতিরিক্ত বা অসম অংশগুলো ক্ষয় করে হাড়টিকে তার আগের নিখুঁত আকৃতি ও শক্তি ফিরিয়ে দেয়।
(বিশেষ দ্রষ্টব্য: হাড় নিজে নিজে জোড়া লাগতে পারলেও, ভাঙা অংশটি যদি সঠিক সোজা অবস্থানে প্লাস্টার বা অপারেশনের মাধ্যমে আটকে রাখা না হয়, তবে হাড় বাঁকা হয়ে জোড়া লেগে যেতে পারে।)
৩০
অরিতিক্ত মোবাইল ব্যাবহার শরীরের কী ক্ষতি করতে পারে?
অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার আমাদের চোখ, মেরুদণ্ড, ঘুম এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা এবং ভুল ভঙ্গিতে ফোন ব্যবহারের কারণে শরীরে বেশ কিছু দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা দেখা দেয়।
নিচে অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের মূল ক্ষতিকর দিকগুলো আলোচনা করা হলো:
১. চোখের সমস্যা (Digital Eye Strain)
চোখ শুষ্ক হয়ে যাওয়া: মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় আমরা স্বাভাবিকের চেয়ে কম পলক ফেলি। এতে চোখ শুষ্ক হয়ে যায় এবং চুলকানি বা জ্বালাপোড়া করে।
ঝাপসা দেখা ও মাথাব্যথা: দীর্ঘক্ষণ ধরে ছোট স্ক্রিনের দিকে ফোকাস করার কারণে চোখের পেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ে, যার ফলে দৃষ্টি ঝাপসা হতে পারে এবং তীব্র মাথাব্যথা শুরু হয়।
২. মেরুদণ্ড ও হাড়ের ক্ষতি
টেক্সট নেক সিন্ড্রোম (Text Neck): ফোন ব্যবহারের সময় আমরা সাধারণত ঘাড় সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে রাখি। ঘাড় যত বেশি ঝোঁকে, মেরুদণ্ডের ওপর মাথার ওজন তত বেশি পড়ে (প্রায় ২৭ কেজি পর্যন্ত)। এর ফলে ঘাড়, পিঠ ও কাঁধে তীব্র ব্যথা হয়।
টেক্সট ক্ল (Text Claw) এবং টানেল সিন্ড্রোম: সারাক্ষণ আঙুল দিয়ে স্ক্রল করা বা ফোন ধরে রাখার কারণে হাতের বুড়ো আঙুল ও কবজির পেশিতে চাপ পড়ে। এর থেকে কার্পাল টানেল সিন্ড্রোম বা স্নায়ুর সমস্যা হতে পারে, যার ফলে হাত অবশ বা দুর্বল মনে হয়।
৩. ঘুমের মারাত্মক ব্যাঘাত
মেলাটোনিন হরমোন কমে যাওয়া: মোবাইল স্ক্রিন থেকে যে ক্ষতিকর ব্লু লাইট (Blue Light) নির্গত হয়, তা মস্তিষ্কে মেলাটোনিন (ঘুমের হরমোন) উৎপাদনে বাধা দেয়। ফলে রাতে সহজে ঘুম আসতে চায় না এবং অনিদ্রা (Insomnia) দেখা দেয়।
৪. মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব
অহেতুক উদ্বেগ ও ডোপামিন আসক্তি: সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক, কমেন্ট বা নোটিফিকেশন মস্তিষ্কে সাময়িক আনন্দদায়ক রাসায়নিক 'ডোপামিন' নিঃসরণ করে। এটি এক ধরণের আসক্তি তৈরি করে, যার ফলে ফোন দূরে থাকলে মানুষ একা, উদাসীন বা উদ্বিগ্ন (Anxiety) বোধ করে।
মনোযোগের ক্ষমতা কমে যাওয়া: সারাক্ষণ ফোনের নোটিফিকেশন চেক করার অভ্যাসের কারণে যেকোনো জরুরি কাজে মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা (Attention Span) মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়।
৫. অন্যান্য শারীরিক সমস্যা
ওজন বৃদ্ধি: অলসভাবে এক জায়গায় বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোন ব্যবহারের কারণে শারীরিক পরিশ্রম কমে যায়, যা স্থূলতা বা ওজন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
কানের সমস্যা: দীর্ঘ সময় ধরে হেডফোন বা ইয়ারফোন ব্যবহার করে উচ্চ শব্দে গান শোনা বা কথা বলার কারণে কানের শ্রবণশক্তি দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
৩১
বেশি ঝাল খাবার খেলে শরীরে ঘাম দেয় কেন?
বেশি ঝাল খাবার খেলে আমাদের মস্তিষ্ক মনে করে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে গেছে, আর সেই কাল্পনিক গরম থেকে শরীরকে ঠান্ডা করতেই মূলত ঘাম নিঃসৃত হয়।
এই পুরো প্রক্রিয়াটি যেভাবে ঘটে:
ক্যাপসাইসিনের ভূমিকা: মরিচে ক্যাপসাইসিন (Capsaicin) নামক একটি রাসায়নিক উপাদান থাকে, যা ঝাল স্বাদের জন্য দায়ী।
মস্তিষ্কে ভুল সংকেত: আমরা যখন ঝাল খাবার খাই, তখন এই ক্যাপসাইসিন মুখের ভেতরের তাপ-সংবেদনশীল স্নায়ু বা রিসেপ্টরগুলোকে (TRPV1) উদ্দীপিত করে। এই রিসেপ্টরগুলোর কাজ হলো শরীরে আসল গরম লাগলে (যেমন রোদে গেলে বা আগুনে হাত লাগলে) মস্তিষ্ককে জানানো। কিন্তু ক্যাপসাইসিন কোনো আসল তাপ ছাড়াই এই রিসেপ্টরগুলোকে সক্রিয় করে তোলে [nih.gov]।
হাইপোথ্যালামাসের প্রতিক্রিয়া: স্নায়ুর মাধ্যমে এই সংকেত যখন মস্তিষ্কের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র বা হাইপোথ্যালামাসে (Hypothalamus) পৌঁছায়, তখন মস্তিষ্ক ভুলবশত ধরে নেয় যে শরীরের তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে গেছে [nih.gov]।
ঠান্ডা করার প্রক্রিয়া বা ঘাম: শরীরকে এই কাল্পনিক অতিরিক্ত তাপ থেকে বাঁচাতে এবং স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ফিরিয়ে আনতে মস্তিষ্ক সাথে সাথে ঘাম গ্রন্থিগুলোকে (Sweat glands) সক্রিয় করে দেয়। ফলে আমাদের মুখ, কপাল বা পুরো শরীর ঘেমে ওঠে। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় গ্যাস্ট্রেটরি সোয়েটিং (Gustatory Sweating) বা খাবারজনিত ঘাম বলা হয়।
ঝাল খাওয়ার পর আপনার কি অতিরিক্ত বুক জ্বালাপোড়া বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হয়? আপনি চাইলে ঝালের তীব্রতা দ্রুত কমানোর কিছু সহজ ঘরোয়া উপায় (যেমন পানি ছাড়া অন্য কী খাওয়া উচিত) জেনে নিতে পারেন।
৩২
হার্ট অ্যাটাক, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট ও হার্ট ফেইলিওর কী?
স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাকের মধ্যে পার্থক্য কী?
হার্ট অ্যাটাক হলো রক্ত সঞ্চালনের সমস্যা, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলো ইলেকট্রিক্যাল বা স্পন্দনের সমস্যা এবং হার্ট ফেইলিওর হলো পাম্পিং বা শক্তি কমে যাওয়ার সমস্যা। অন্যদিকে, হার্ট অ্যাটাক হয় হৃদপিণ্ডে এবং স্ট্রোক হয় মস্তিষ্কে।
এদের বিস্তারিত এবং পার্থক্য নিচে সহজ ভাষায় ছকের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
১. হার্ট অ্যাটাক, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট ও হার্ট ফেইলিওর কী?
রোগ বা অবস্থা
মূল সমস্যা ও কারণ
লক্ষণ ও তীব্রতা
হার্ট অ্যাটাক (Heart Attack)
হৃদপিণ্ডের কোনো ধমনিতে রক্ত চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে অক্সিজেন না পেয়ে হার্টের পেশি মরতে শুরু করে।
তীব্র বুক ব্যথা, বাম হাতে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট ও ঘাম হওয়া। আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণত জ্ঞান হারান না। এটি একটি জরুরি অবস্থা।
কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট (Cardiac Arrest)
হৃদপিণ্ডের ভেতরের বৈদ্যুতিক সংকেত বিঘ্নিত হলে হার্ট হঠাৎ করে পাম্প করা বন্ধ করে দেয়।
ব্যক্তি সাথে সাথে জ্ঞান হারান এবং শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি হতে পারে এবং তাৎক্ষণিক CPR না দিলে মৃত্যু নিশ্চিত।
হার্ট ফেইলিওর (Heart Failure)
হার্ট পুরোপুরি বন্ধ হয় না, তবে শরীরের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী বা ক্রনিক রোগ। অল্প পরিশ্রমে হাঁপিয়ে যাওয়া, পা বা শরীর ফুলে যাওয়া এবং বুকে তরল জমা হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা যায়।
প্রধান লক্ষণ
• বুকে তীব্র চাপ বা মোচড় দেওয়া ব্যথা
• ব্যথা বাম হাত, ঘাড় বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়া
• অতিরিক্ত ঘাম হওয়া এবং শ্বাসকষ্ট।
২. স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাকের মধ্যে পার্থক্য
অনেকেই স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাককে একই মনে করেন, কিন্তু এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অঙ্গের রোগ:
বৈশিষ্ট্য
হার্ট অ্যাটাক (Heart Attack)
এটি সরাসরি হৃদপিণ্ডে (Heart) ঘটে।
মূল কারণ
হৃদপিণ্ডের ধমনিতে চর্বি জমে রক্ত চলাচল বা অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া।
প্রাথমিক প্রভাব
হৃদপিণ্ডের পেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
স্ট্রোক (Stroke)
এটি সরাসরি মস্তিষ্কে (Brain) ঘটে।
মস্তিষ্কের রক্তনালী ফেটে যাওয়া (Hemorrhagic) বা রক্তনালীতে রক্ত জমাট বেঁধে রক্ত চলাচল বন্ধ হওয়া (Ischemic)।
প্রধান লক্ষণ
• মুখের একপাশ বেঁকে যাওয়া বা অবশ হওয়া
• একদিকের হাত বা পা অবশ হয়ে যাওয়া
• অস্পষ্ট কথা বলা বা কথা জড়িয়ে যাওয়া।
প্রাথমিক প্রভাব
মস্তিষ্কের কোষ মারা যায়, যার ফলে শরীরের একপাশ অবশ বা প্যারালাইসিস হতে পারে।
(সহজ কথায় মনে রাখার নিয়ম: হার্ট অ্যাটাক হলো "হার্টের সমস্যা" আর স্ট্রোক হলো "মস্তিষ্কের বা ব্রেইনের সমস্যা"।)
৩৩
হঠাৎ ভয়ে কেঁপে উঠলে কী হার্ট ফেইল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে?
সাধারণত কোনো সুস্থ মানুষের হঠাৎ ভয়ে কেঁপে উঠলে তাৎক্ষণিকভাবে হার্ট ফেইলিওর (Heart Failure) হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কারণ, হার্ট ফেইলিওর হলো একটি দীর্ঘস্থায়ী বা ক্রনিক রোগ, যা সময়ের সাথে সাথে হার্টের পাম্প করার ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে ঘটে।
তবে তীব্র ভয় বা আকস্মিক বড় ধরণের কোনো মানসিক ধাক্কা (যেমন তীব্র শোক, আতঙ্ক বা দুর্ঘটনা) সাময়িকভাবে হৃদযন্ত্রের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এর বৈজ্ঞানিক কারণ এবং ব্যতিক্রমী ঝুঁকিগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. ভয়ের কারণে শরীরে কী ঘটে?
হঠাৎ খুব ভয় পেলে আমাদের মস্তিষ্ক 'ফাইট অর ফ্লাইট' (Fight or Flight) মোড অন করে দেয়। এর ফলে শরীর প্রচুর পরিমাণে অ্যাড্রেনালিন হরমোন নিঃসরণ করে। এই হরমোনের কারণে:
হৃদস্পন্দন বা পালস রেট খুব দ্রুত বেড়ে যায়।
রক্তচাপ (Blood Pressure) সাময়িকভাবে বৃদ্ধি পায়।
পেশি সংকুচিত হয় ও শরীর কাঁপতে থাকে।
সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে ভয় কেটে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিক হয়ে আসে এবং হার্টও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যায়。
২. ব্যতিক্রমী কিছু ঝুঁকি (কাদের ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে?)
যদিও সাধারণ মানুষের হার্ট ফেইলিওর হয় না, তবে চরম ভয়ের ফলে খুব বিরল কিছু ক্ষেত্রে নিচের সমস্যাগুলো হতে পারে:
আন্ডারলাইং বা লুকানো হৃদরোগ থাকলে: যদি কোনো ব্যক্তির আগে থেকেই হৃদরোগ (যেমন করোনারি ধমনী ব্লক বা হার্টের দুর্বলতা) থাকে যা তিনি নিজেও জানেন না, তবে হঠাৎ তীব্র ভয়ের কারণে হার্টের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ব্রোকেন হার্ট সিন্ড্রোম (Broken Heart Syndrome): চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে 'স্ট্রেস কার্ডিওমায়োপ্যাথি' বলা হয়। তীব্র ভয়, আতঙ্ক বা গভীর শোকের কারণে অতিরিক্ত অ্যাড্রেনালিন হরমোন নিঃসরণ হয়ে সাময়িকভাবে হার্টের একটি অংশ দুর্বল হয়ে পড়ে। এর লক্ষণগুলো হুবহু হার্ট অ্যাটাকের মতোই (যেমন বুকে তীব্র ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট)। তবে এটি সাধারণত অস্থায়ী এবং সঠিক চিকিৎসায় দ্রুত সেরে ওঠে।
প্যানিক অ্যাটাক (Panic Attack): অনেক সময় তীব্র ভয়ের কারণে প্যানিক অ্যাটাক হয়, যেখানে বুক ধড়ফড় করা, শরীর কাঁপা এবং শ্বাসকষ্টের মতো লক্ষণ দেখা দেয়। অনেকে এটিকে হার্ট অ্যাটাক মনে করে ভুল করেন, তবে এটি আসলে তীব্র মানসিক উদ্বেগের একটি রূপ।
আপনি যদি পুরোপুরি সুস্থ ও হৃদরোগমুক্ত হয়ে থাকেন, তবে সাধারণ ভয় বা চমকে ওঠার কারণে হার্ট ফেইল করার কোনো আশঙ্কা নেই।
৩৪
দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে মাথা ঘোরায় কেন?
দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে মাথা ঘোরার মূল কারণ হলো রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া এবং মস্তিষ্কে রক্ত ও অক্সিজেনের সরবরাহ সাময়িকভাবে হ্রাস পাওয়া। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন (Orthostatic Hypotension) বা পোস্টুরাল হাইপোটেনশন বলা হয়。
দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে শরীরে মূলত যে প্রক্রিয়াগুলো ঘটে এবং মাথা ঘোরায়:
রক্ত নিচে জমা হওয়া (Blood Pooling): আমরা যখন দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, তখন মহাকর্ষ বলের (Gravity) কারণে শরীরের রক্ত স্বাভাবিকভাবেই নিচের দিকে অর্থাৎ পা ও পেটের রক্তনালীতে গিয়ে জমা হতে শুরু করে।
হৃদযন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্রের সাড়াদানে বিলম্ব: সাধারণত সুস্থ শরীরে রক্ত নিচে নেমে গেলে স্নায়ুতন্ত্র দ্রুত সংকেত পাঠিয়ে পায়ের রক্তনালীগুলোকে সংকুচিত করে এবং হার্টবিট বাড়িয়ে রক্তকে পুনরায় ওপরে ঠেলে দেয়। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে, শরীরে পানির ঘাটতি থাকলে বা কোনো কারণে এই স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া ধীর হলে রক্ত ওপরে উঠতে পারে না।
মস্তিষ্কে অক্সিজেনের ঘাটতি: এর ফলে হার্ট থেকে মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত রক্ত পৌঁছাতে পারে না। মস্তিষ্ক যখন কয়েক সেকেন্ডের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও গ্লুকোজ থেকে বঞ্চিত হয়, তখনই মাথা ঘোরে, চোখ ঝাপসা হয়ে আসে বা শরীর দুর্বল লাগে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মানুষ অজ্ঞান (Fainting) হয়ে যেতে পারে।
অন্যান্য যেসব কারণে এটি বেশি হতে পারে:
ডিহাইড্রেশন বা পানির শূন্যতা: শরীরে পানি বা লবণের ঘাটতি থাকলে রক্তের পরিমাণ (Blood Volume) কমে যায়, যা এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
রক্তস্বল্পতা (Anemia): রক্তে হিমোগ্লোবিন কম থাকলে কোষে অক্সিজেন সরবরাহ এমনিতেই কম হয়, ফলে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে দ্রুত মাথা ঘোরে।
ওষুধের প্রভাব: উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ বা কিছু নির্দিষ্ট মূত্রবর্ধক ওষুধ (Diuretics) খেলে রক্তচাপ অতিরিক্ত কমে যাওয়ার কারণে এমন হতে পারে।
তাৎক্ষণিক করণীয় ও প্রতিরোধ:
১. মাথা ঘোরানো মাত্রই কোনো নিরাপদ জায়গায় বসে পড়ুন বা শুয়ে পড়ুন। শুয়ে পড়ে পা দুটিকে শরীরের তুলনায় কিছুটা ওপরে তুলে রাখলে মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন দ্রুত স্বাভাবিক হয়।
২. দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন না। দাঁড়িয়ে থাকার সময় মাঝে মাঝে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে একটু ওঠানামা করুন বা পা সামান্য নাড়াচড়া করুন, এতে পায়ের পেশি রক্তকে ওপরের দিকে ঠেলে দিতে সাহায্য করবে।
৩. প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি ও তরল খাবার গ্রহণ করুন।
৩৫
কেটে গেলে কিছুক্ষণ পর রক্তপাত স্বাভাবিকভাবে বন্ধ হয়ে যায় কেন?
শরীরের কোনো অংশ কেটে গেলে আমাদের শরীরে থাকা প্রতিরক্ষামূলক জৈবিক ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই রক্ত বন্ধ হওয়ার বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় হিমোস্ট্যাসিস (Hemostasis) বা রক্ত তঞ্চন বলা হয়。
মূলত ৩টি ধাপে শরীর রক্তপাত বন্ধ করে থাকে:
১. রক্তনালীর সংকোচন (Vasoconstriction)
শরীরের কোনো অংশ কাটার সাথে সাথেই সেখানকার ক্ষতিগ্রস্ত রক্তনালীগুলো বা ব্লাড ভেসেলগুলো সংকুচিত হয়ে ছোট হয়ে যায়। এর ফলে ওই কাটা জায়গায় রক্ত প্রবাহের গতি অনেকটাই কমে যায়, যা রক্তপাত কমাতে প্রথম সাহায্য করে।
২. প্লাটিলেট প্লাগ গঠন (Platelet Plug Formation)
আমাদের রক্তে প্লাটিলেট (Platelets) বা অণুচক্রিকা নামক এক ধরণের ছোট রক্তকণিকা থাকে। রক্তনালী কেটে গেলে প্লাটিলেটগুলো দ্রুত সেখানে ছুটে আসে এবং আঠার মতো একে অপরের সাথে ও ক্ষতস্থানের দেয়ালে লেগে যায়। তারা সবাই মিলে একটি অস্থায়ী জট বা প্লাগ (Plug) তৈরি করে কাটা গর্তটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়。
৩. রক্ত জমাট বাঁধা (Coagulation Cascade)
রক্তে থাকা বিভিন্ন প্রোটিন, যাদের ক্লটিং ফ্যাক্টর (Clotting Factors) বলা হয়, তারা একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু করে। এর শেষ ধাপে রক্তে থাকা তরল ফাইব্রিনোজেন প্রোটিন শক্ত সুতোর মতো ফাইব্রিন (Fibrin) জালে রূপান্তরিত হয়। এই জালটি প্লাটিলেটের অস্থায়ী প্লাগের ওপর একটি শক্ত জালের মতো আস্তরণ তৈরি করে, যাতে লোহিত রক্তকণিকাগুলো আটকে যায় এবং রক্ত পুরোপুরি জেলির মতো জমাট বেঁধে (Clot) রক্তপাত স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়। পরবর্তীতে এটিই শুকিয়ে শক্ত খসখসে চামড়া বা কুড়ি (Scab) তৈরি করে, যার নিচে নতুন ত্বক তৈরি হয়।
(বিশেষ দ্রষ্টব্য: যদি কারো শরীরে এই ক্লটিং ফ্যাক্টরের অভাব থাকে, তবে রক্ত সহজে জমাট বাঁধতে চায় না। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় হিমোফিলিয়া (Hemophilia) বলা হয়।)
৩৬
ব্রেন স্ট্রোক হলে কেন মানুষের মুখের এক পাশ অবশ হয়ে যায়?
ব্রেন স্ট্রোক হলে মানুষের মুখের এক পাশ অবশ হয়ে যায় কারণ স্ট্রোকের ফলে মস্তিষ্কের যে অংশটি মুখের পেশি নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানকার কোষগুলো অক্সিজেন না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বা মারা যায়।
আমাদের প্রতিটি শারীরিক নড়াচড়া মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু অংশের সংকেতের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। স্ট্রোকের সময় মুখের এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যেভাবে ভেঙে পড়ে, তার বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো:
১. মস্তিষ্কের গোলার্ধ এবং বিপরীত দিকের নিয়ন্ত্রণ (Contralateral Control)
আমাদের মস্তিষ্কের বাম অংশ শরীরের ডান দিক নিয়ন্ত্রণ করে এবং মস্তিষ্কের ডান অংশ শরীরের বাম দিক নিয়ন্ত্রণ করে। যদি মস্তিষ্কের ডান গোলার্ধে (Right Hemisphere) স্ট্রোক হয়, তবে শরীরের এবং মুখের বাম পাশ অবশ বা প্যারালাইজড হয়ে যায়। একইভাবে, মস্তিষ্কের বাম পাশে স্ট্রোক হলে মুখের ডান পাশ বেঁকে বা অবশ হয়ে যায়।
২. ফেসিয়াল নার্ভ বা মুখের স্নায়ুর ওপর প্রভাব
মস্তিষ্ক থেকে উদ্ভূত সপ্তম ক্রেনিয়াল নার্ভ বা ফেসিয়াল নার্ভ (Facial Nerve) আমাদের মুখের দুই পাশের পেশির নড়াচড়া (যেমন: হাসা, চোখ বন্ধ করা, কথা বলা বা খাবার চিবানো) নিয়ন্ত্রণ করে।
স্ট্রোকের সময় মস্তিষ্কের মোটর কর্টেক্স (Motor Cortex) অংশে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে, সেটি ফেসিয়াল নার্ভকে আর কোনো বৈদ্যুতিক বা রাসায়নিক সংকেত পাঠাতে পারে না।
সংকেত না পাওয়ার কারণে মুখের ওই নির্দিষ্ট পাশের পেশিগুলো তাদের কার্যক্ষমতা হারায়, আলগা হয়ে ঝুলে পড়ে এবং অবশ হয়ে যায়। এর ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি হাসতে গেলে মুখের একপাশ বেঁকে যায় বা লালা ঝরতে থাকে।
৩. স্ট্রোক চেনার 'FAST' নিয়ম
স্ট্রোকের লক্ষণগুলো দ্রুত চেনার জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে FAST সূত্রটি ব্যবহার করা হয়, যার প্রথম লক্ষণটিই মুখের অবশতা নির্দেশ করে:
F - Face Drooping (মুখ বেঁকে যাওয়া): ব্যক্তিকে হাসতে বললে যদি মুখের একপাশ ঝুলে বা বেঁকে যায়।
A - Arm Weakness (হাতের দুর্বলতা): দুটি হাত ওপরে তুলতে বললে যদি একটি হাত অবশ লাগে বা নিচে নেমে যায়।
S - Speech Difficulty (কথায় জড়তা): সাধারণ কোনো কথা বলতে বললে যদি কথা অস্পষ্ট বা জড়িয়ে যায়।
T - Time to call Ambulance (দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া): এই লক্ষণগুলো দেখামাত্র কোনো সময় নষ্ট না করে রোগীকে দ্রুত স্ট্রোক সেন্টারে বা হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। কারণ স্ট্রোকের পর প্রথম ৪.৫ ঘণ্টা (Golden Hour) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আপনার পরিচিত কেউ কি হঠাৎ মুখের একপাশ বেঁকে যাওয়া বা অবশ হওয়ার মতো লক্ষণ অনুভব করছেন? এটি স্ট্রোক ছাড়াও 'বেলস পালসি' (Bell's Palsy) নামক সাধারণ স্নায়ুর সমস্যার কারণেও হতে পারে—আপনি কি এই দুটির মধ্যকার পার্থক্য জানতে চান?
৩৭
শীতকালে ভাইরাস সংক্রমণের প্রকোপ বেশি দেখা যায় কেন?
আবহাওয়া পরিবর্তনের সময় সর্দি-কাশি বা ঠাণ্ডা লাগা বেশি হয় কেন?
শরীরে জীবাণু সংক্রমণ হলে জ্বর আসে কেন?
🌡️ শীতকালে শুষ্ক বাতাস ও আবদ্ধ পরিবেশের কারণে ভাইরাসের স্থায়িত্ব বাড়ে এবং আবহাওয়া পরিবর্তনের সময় তাপমাত্রার ওঠানামায় শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। আর শরীরে জীবাণু প্রবেশ করলে ইমিউন সিস্টেম তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যাকে আমরা জ্বর বলি।
নিচে প্রতিটি বিষয়ের বৈজ্ঞানিক কারণ সহজ ভাষায় আলোচনা করা হলো:
১. শীতকালে ভাইরাস সংক্রমণের প্রকোপ বেশি দেখা যায় কেন?
ভাইরাসের অনুকূল পরিবেশ: ইনফ্লুয়েঞ্জা বা রাইনোভাইরাসের মতো শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাসগুলো ঠান্ডা ও কম আর্দ্র (Dry air) বাতাসে বেশি সময় বেঁচে থাকে এবং শক্তিশালী থাকে. [1, 2]
বাতাসে ভাইরাসের দীর্ঘ স্থায়িত্ব: শীতকালের বাতাস শুষ্ক হওয়ায় হাঁচি-কাশির মাধ্যমে বের হওয়া ড্রপলেট বা কণাগুলো সহজেই বাতাসে ভেসে থাকতে পারে এবং দূরে ছড়িয়ে পড়ে. [1, 2]
আবদ্ধ পরিবেশ (Indoor Crowding): ঠান্ডার কারণে মানুষ ঘরের ভেতরে দরজা-জানলা বন্ধ করে বেশি সময় কাটায়. বাতাস চলাচল কম হওয়ায় একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে ভাইরাস দ্রুত ছড়ায়. [1, 2, 3]
নাকের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার দুর্বলতা: ঠান্ডা বাতাস নাক দিয়ে প্রবেশের সময় নাকের ভেতরের রক্তনালীগুলো সংকুচিত হয়ে যায়. ফলে নাকের ভেতরের সিলিয়া (ছোট লোম ও শ্লেষ্মা) জীবাণু আটকে বাইরে বের করে দেওয়ার ক্ষমতা কিছুটা হারিয়ে ফেলে. [1, 2]
২. আবহাওয়া পরিবর্তনের সময় সর্দি-কাশি বেশি হয় কেন?
শরীরের মানিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ: যখন হঠাৎ গরম থেকে ঠান্ডা বা ঠান্ডা থেকে গরম পড়ে, তখন শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে নতুন আবহাওয়ার সাথে মানিয়ে নিতে হয়। এই রূপান্তরকালীন সময়ে শরীরের ইমিউন সিস্টেম সাময়িকভাবে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে. [1, 2]
ভাইরাসের সক্রিয়তা বৃদ্ধি: আবহাওয়া পরিবর্তনের সময় (যেমন শরৎ বা বসন্তের শুরুতে) নির্দিষ্ট কিছু ভাইরাস বংশবৃদ্ধির জন্য আদর্শ তাপমাত্রা পায় এবং প্রকৃতিতে হঠাৎ তাদের সংখ্যা ও সক্রিয়তা বেড়ে যায়. [1]
মিউকাস মেমব্রেন শুকিয়ে যাওয়া: তাপমাত্রার আকস্মিক পরিবর্তনে আমাদের শ্বাসনালীর ভেতরের আস্তরণ (Mucous Membrane) শুষ্ক বা খসখসে হয়ে পড়ে, ফলে জীবাণু খুব সহজেই কোষের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে. [1, 2]
৩. শরীরে জীবাণু সংক্রমণ হলে জ্বর আসে কেন?
জ্বর কোনো রোগ নয়, এটি মূলত জীবাণুর বিরুদ্ধে শরীরের লড়াই করার একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষামূলক সংকেত ও অস্ত্র. [1]
[জীবাণু প্রবেশ] ➔ [পাইরোজেন রাসায়নিক নিঃসরণ] ➔ [মস্তিষ্কের থার্মোস্ট্যাট বৃদ্ধি] ➔ [জ্বর (শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি)]
মস্তিষ্কের নির্দেশ: শরীরে যখনই কোনো ক্ষতিকর ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করে, তখন আমাদের শ্বেত রক্তকণিকাগুলো তাদের ধ্বংস করতে 'পাইরোজেন' (Pyrogens) নামক এক ধরণের রাসায়নিক উপাদান তৈরি করে.
থার্মোস্ট্যাট পরিবর্তন: এই পাইরোজেন রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্কের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র হাইপোথ্যালামাসে (Hypothalamus) পৌঁছায়. মস্তিষ্ক তখন শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা (৯৮.৬° ফারেনহাইট) বাড়িয়ে নতুন একটি উচ্চ তাপমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়.
জীবাণু দুর্বল করা: ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াগুলো সাধারণত আমাদের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় খুব দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে পারে. কিন্তু তাপমাত্রা ১০০° ফারেনহাইটের ওপরে চলে গেলে তারা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি থমকে যায়.
ইমিউন সিস্টেমকে সচল করা: উচ্চ তাপমাত্রায় আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধকারী কোষগুলো (যেমন: শ্বেত রক্তকণিকা ও অ্যান্টিবডি) সাধারণ সময়ের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত এবং কার্যকরভাবে জীবাণুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারে.
৩৮
কেমোথেরাপি চিকিৎসায় মাথার চুল উঠে যায় কেন?
কেমোথেরাপির ওষুধগুলো শরীরে দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া ক্যানসার কোষগুলোকে ধ্বংস করার পাশাপাশি আমাদের চুলের গোড়ার সুস্থ ও দ্রুত বর্ধনশীল কোষগুলোকেও আক্রমণ করে, যার ফলে মাথার চুল উঠে যায়।
এই প্রক্রিয়াটি যেভাবে ঘটে:
দ্রুত বর্ধনশীল কোষকে টার্গেট করা: কেমোথেরাপির ওষুধগুলো তৈরি করা হয় শরীরের এমন কোষগুলোকে ধ্বংস করার জন্য যারা খুব দ্রুত বিভাজিত বা বংশবৃদ্ধি করে (যেমন ক্যানসার কোষ)।
চুলের কোষের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব: আমাদের শরীরের ক্যানসার কোষ ছাড়া আর যে কোষগুলো প্রাকৃতিকভাবে সবচেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি পায়, তার মধ্যে অন্যতম হলো চুলের গোড়ায় থাকা হেয়ার ফলিকল (Hair Follicles) কোষ। কেমোথেরাপির ওষুধ ক্যানসার কোষ ও চুলের এই দ্রুত বর্ধনশীল সুস্থ কোষের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারে না। ফলে এটি চুলের গোড়ার কোষগুলোকেও আক্রমণ করে এবং নষ্ট করে দেয় [mayoclinic.org].
চুল পড়ে যাওয়া: চুলের গোড়ার কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে চুল দুর্বল হয়ে পড়ে এবং চিকিৎসার শুরু হওয়ার সাধারণত ২ থেকে ৩ সপ্তাহের মধ্যে চুল পড়া শুরু হয় [mayoclinic.org]. শুধু মাথায় নয়, ভ্রু, চোখের পাপড়ি এবং শরীরের অন্যান্য অংশের চুলও এর ফলে পড়ে যেতে পারে।
আশার কথা হলো: কেমোথেরাপির কারণে হওয়া এই চুল পড়া সাধারণত অস্থায়ী। কেমোথেরাপির সেশন সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে মাথার চুল আবার স্বাভাবিক নিয়মেই গজাতে শুরু করে
৩৯
জর্দা, তামাক বা গুটখা খেলে মুখগহ্বরে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে কেন?
জর্দা, তামাক বা গুটখা সরাসরি মুখের ভেতরের কোষের ডিএনএ (DNA) ধ্বংস করে এবং সেখানে থাকা বিষাক্ত রাসায়নিকের দীর্ঘস্থায়ী সংস্পর্শের কারণে মুখগহ্বরে ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অধীনস্থ ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার (IARC)-এর মতে, তামাক ও সুপারি মানুষের জন্য সরাসরি ক্যানসার সৃষ্টিকারী (Group 1 Carcinogen) উপাদান।
এগুলো নিয়মিত সেবন করলে মুখের ভেতরে যে ক্ষতিকর প্রক্রিয়াগুলো ঘটে, তার বৈজ্ঞানিক কারণ নিচে দেওয়া হলো:
১. বিষাক্ত রাসায়নিক ও ডিএনএ ড্যামেজ (TSNAs)
জর্দা ও গুটখায় তামাক-নির্দিষ্ট নাইট্রোসামিন (TSNAs) নামক অত্যন্ত শক্তিশালী ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান থাকে। ধোঁয়াবিহীন এই তামাক যখন মুখে দীর্ঘক্ষণ রাখা হয়, তখন এই বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদানগুলো মুখের নরম টিস্যুর মাধ্যমে কোষে প্রবেশ করে এবং কোষের ভেতরের ডিএনএ (DNA) গঠন নষ্ট করে দেয়। ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত হলে কোষগুলো অস্বাভাবিক ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, যা পরবর্তীতে টিউমার বা ক্যানসারে রূপ নেয়।
২. চুন ও সুপারির মারাত্মক পারস্পরিক বিক্রিয়া
গুটখা বা পানের সাথে ব্যবহৃত চুন (Slaked lime) এবং সুপারি (Areca nut) আলাদাভাবেও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে:
সুপারির বিষাক্ততা: সুপারিতে থাকা 'অ্যারিকোলিন' (Arecoline) নামক অ্যালকালয়েড কোষের স্বাভাবিক বিভাজন প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটায়।
চুনের প্রভাব: ক্ষারীয় চুন মুখের নরম ত্বককে পুড়িয়ে দেয় বা ক্ষত (Microscopic abrasion) তৈরি করে। এই ক্ষতগুলোর মাধ্যমে তামাক ও সুপারির বিষাক্ত উপাদানগুলো খুব সহজে এবং সরাসরি রক্তের ও কোষের গভীরে প্রবেশ করতে পারে।
৩. ওরাল সাবমিউকাস ফাইব্রোসিস (OSMF)
গুটখা ও সুপারি নিয়মিত চিবানোর ফলে মুখের ভেতরের মাংসপেশি শক্ত ও জালের মতো হয়ে যায়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ওরাল সাবমিউকাস ফাইব্রোসিস বলা হয়। এর ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি মুখ পুরোপুরি হাঁ করতে পারেন না, ঝাল খাবার খেতে তীব্র জ্বালাপোড়া করে এবং মুখের চামড়া সাদাটে বা লালচে হয়ে যায়। এটি ক্যানসার হওয়ার পূর্ববর্তী একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ধাপ (Pre-cancerous condition)। [1, 2, 3, 4, 5]
৪. দীর্ঘস্থায়ী সরাসরি সংস্পর্শ (Prolonged Contact)
সিগারেটের ধোঁয়া ফুসফুসে চলে গেলেও, জর্দা বা গুটখা মানুষ মুখের একটি নির্দিষ্ট অংশে (যেমন মাড়ি বা গালের ভেতরের অংশে) ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেপে রাখে। এই দীর্ঘস্থায়ী সরাসরি সংস্পর্শের কারণে মুখের ওই নির্দিষ্ট অংশের কোষগুলো একটানা বিষাক্ত রাসায়নিকের চরম ডোজ পেতে থাকে, ফলে সেখানেই ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে।
ক্যানসারের প্রাথমিক কিছু লক্ষণ (যা অবহেলা করা উচিত নয়):
মুখের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে থাকা কোনো সাদা বা লালচে দাগ (Leukoplakia/Erythroplakia)।
মুখের ভেতরের কোনো ক্ষত বা ঘা যা ২-৩ সপ্তাহের মধ্যেও শুকোচ্ছে না।
মুখ হাঁ করতে বা খাবার গিলতে কষ্ট হওয়া এবং কোনো কারণ ছাড়াই মুখ থেকে রক্ত আসা।
৪০
অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া শরীরের জন্য ক্ষতিকর কেন?
অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর, কারণ এটি জীবাণুকে ওষুধ-প্রতিরোধী (Antibiotic Resistance) করে তোলে এবং অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে সাধারণ কোনো সংক্রমণও ভবিষ্যতে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
অতিরিক্ত বা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের মূল ক্ষতিকর দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বা কার্যকারিতা হারানো
যখন কেউ বারবার বা অপ্রয়োজনে (যেমন: ভাইরাসজনিত সর্দি, কাশি বা ফ্লুতে) অ্যান্টিবায়োটিক খায়, তখন শরীরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াগুলো ওই ওষুধের বিরুদ্ধে লড়াই করার কৌশল শিখে নেয়। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) বলা হয়। এর ফলে ব্যাকটেরিয়াগুলো শক্তিশালী 'সুপারবাগ'-এ পরিণত হয় এবং পরবর্তীতে আসল কোনো বড় রোগের সময় ওই অ্যান্টিবায়োটিক আর শরীরে কোনো কাজ করে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর মতে, এটি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বড় স্বাস্থ্য হুমকি।
২. অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ক্ষতি (Gut Microbiome Disruption)
আমাদের পাকস্থলী ও অন্ত্রে কোটি কোটি ভালো বা উপকারী ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা হজমপ্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। অ্যান্টিবায়োটিক ভালো ও খারাপ ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না, ফলে এটি ক্ষতিকর জীবাণুর পাশাপাশি উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোকেও মেরে ফেলে। এর কারণে: [1, 2]
দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, গ্যাস্ট্রিক ও পেটে তীব্র ব্যথা হতে পারে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
৩. লিভার ও কিডনির ক্ষতি
আমরা যে ওষুধই খাই না কেন, তা শরীর থেকে বের করার জন্য লিভার এবং কিডনিকে কাজ করতে হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া হাই-ডোজ বা অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করলে এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যা পরবর্তীতে লিভারের কার্যক্ষমতা নষ্ট বা কিডনি ড্যামেজের কারণ হতে পারে।
৪. ফাঙ্গাল বা ছত্রাকজনিত সংক্রমণ বৃদ্ধি
শরীরের ভালো ব্যাকটেরিয়াগুলো মরে যাওয়ার কারণে প্রাকৃতিকভাবে ফাঙ্গাস বা ছত্রাক বৃদ্ধির পথ সুগম হয়। ফলে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার পর মুখে ঘা (Thrush) কিংবা নারীদের ক্ষেত্রে ভ্যাজাইনাল ইস্ট ইনফেকশনের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। [1, 2]
৫. তীব্র অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া
অনেকের শরীরে নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি তীব্র অ্যালার্জি থাকতে পারে। না জেনে অতিরিক্ত বা ভুল ওষুধ খেলে ত্বকে র্যাশ ওঠা, চুলকানি, শ্বাসকষ্ট, এমনকি 'অ্যানাফিল্যাক্সিস'-এর মতো মারাত্মক ও জীবনঘাতী অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন হতে পারে। [1, 2]
অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সঠিক নিয়ম:
চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া কখনোই নিজে থেকে ফার্মেসি থেকে কিনে অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না।
অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স সবসময় সম্পূর্ণ করতে হবে। ২-১ টা বড়ি খাওয়ার পর সুস্থ বোধ করলেও মাঝপথে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করা যাবে না, কারণ এতে রেজিস্ট্যান্স হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।
৪১
তাবিজ, আংটি, মাদুলি - কোনটা কাজ করে?
১. আংটি - পাথরে কি ভাগ্য বদলায়?
দোকানে বলে - নীলা শনি কাটায়, পলা মঙ্গল কাটায়।
আমি NASA র একটা তথ্য দিচ্ছি - শনি গ্রহ পৃথিবী থেকে ১২০ কোটি কিমি দূরে। ওই গ্রহ থেকে আলো আসতে ৮০ মিনিট লাগে। আপনার হাতের ৫ গ্রামের পাথর ওই গ্রহের রশ্মি টেনে আনবে - এটা পদার্থবিজ্ঞানের কোনো সূত্রে পড়ে না।
American Gemological Institute বলছে - নীলা, পলা, গোমেদ সবই অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড। রাসায়নিক ভাবে সব এক। রঙটা আলাদা শুধু।
তাহলে কাজ করে কেন মনে হয়?
কারণ Placebo। Journal of Psychosomatic Research (2020) বলছে, ১০ হাজার টাকা দিয়ে আংটি কিনলে ব্রেন ভাবে "আমি এবার সুরক্ষিত"। তখন Cortisol কমে, Confidence বাড়ে। কাজটা পাথর করে না, আপনার Confidence করে।
২. তাবিজ-মাদুলি - ভেতরে কি আছে?
Journal of Infection and Public Health (2018) বলছে - পুরনো মাদুলির ভেতরে কাগজ, সিঁদুর আর Staphylococcus ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। বাচ্চাদের গলায়, কোমরে বহুদিন থাকলে স্কিন ইনফেকশন হয়।
Harvard Medical School (2021) বলছে - তাবিজ পরে ভালো লাগাটা Placebo। ব্রেন Endorphin ছাড়ে। ভালো লাগে, কিন্তু রোগ সারে না।
আর The Lancet (2019) বলছে Nocebo র কথা - "খুললেই ক্ষতি হবে" - এই ভয়টা আপনাকে তাবিজের ক্রেতা বানিয়ে রাখে।
৩. তাহলে কি করবেন?
আমি এই সিরিজে কাউকে ছোট করি না। আমার ঠাকুমাও মাদুলি পরতো।
আমি শুধু বলি - জায়গাটা বুঝুন।
মনে জোর পাওয়ার জন্য যদি আংটি পরেন - পরুন। ওটা আপনার মনের Vitamin।
কিন্তু মনে রাখবেন -
~ জ্বর হলে আংটি না, প্যারাসিটামল কাজ করবে।
~ চাকরি না হলে নীলা না, রাত জেগে পড়াটা কাজ করবে।
~ ব্যবসায় লস হলে গোমেদ না, হিসেবটা কাজ করবে।
আংটি, তাবিজ, মাদুলি - তিনটেই আপনার ভয় কমায়, কিন্তু আপনার ভবিষ্যৎ বদলায় না। ভবিষ্যৎ বদলায় আপনার পরিশ্রম।
আপনার সবচেয়ে দামি আংটি, সবচেয়ে বড় তাবিজটা আপনার নিজের দুটো হাত।
@ সু জ য়, বিজ্ঞানকথা
৪২
বাটারফ্লাই এফেক্ট
আজ সকালে আপনি ঘুম থেকে ৫ মিনিট দেরিতে উঠলেন।
তার জন্য বাসটা মিস করলেন। বাস মিস করার জন্য রাস্তায় দাঁড়ালেন। আর রাস্তায় দাঁড়ানোর জন্যই আপনার এক পুরনো বন্ধুর সাথে দেখা হলো। সেই বন্ধুর সূত্রেই আপনি একটা নতুন চাকরির খোঁজ পেলেন।
ভাবুন তো, শুধু ৫ মিনিট দেরির জন্য আপনার পুরো জীবন বদলে গেল!
এটাই বিজ্ঞান। এটার নাম Butterfly Effect।
বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড লরেঞ্জ বলেছিলেন — "ব্রাজিলের আমাজনে একটা প্রজাপতি ডানা নাড়ালে, তার হাওয়ায় আমেরিকার টেক্সাসে একটা টর্নেডো হতে পারে।"
কিভাবে সম্ভব?
কারণ এই পৃথিবীতে কোনো কিছুই একা নয়। সবকিছু সুতো দিয়ে বাঁধা। ধুলো, মাটি, অনু, পরমাণু, আলো, বাতাস, মানুষ — সবাই সবার সাথে যুক্ত।
আমার কাছে এই যুক্ত থাকাটাই সবচেয়ে বড় ক্ষমতা। এই প্রকৃতির নিয়মটাই সব চালায়।
দার্শনিক স্পিনোজা একেই বলেছিলেন Deus sive Natura — ঈশ্বর মানে প্রকৃতি। আইনস্টাইনও বলতেন, "আমি স্পিনোজার ঈশ্বরে বিশ্বাস করি, যে ঈশ্বর নিজেকে প্রকৃতির নিয়মের মধ্যে প্রকাশ করেন।"
আপনি কাউকে একটা ছোট মিথ্যা বললেন, সেটা থেকে একটা গুজব হলো, গুজব থেকে একটা দাঙ্গা হলো। এটাকে বলে Domino Effect। একটা ডমিনো পড়লে, তার ধাক্কায় সব ডমিনো পড়ে যায়।
তাই বিজ্ঞান বলছে — জটিল ও সংবেদনশীল সিস্টেমে কখনও কখনও অতি ক্ষুদ্র পরিবর্তনও দীর্ঘমেয়াদে বড় পার্থক্য সৃষ্টি করতে পারে।
আপনার আজকের একটা ছোট কাজ, একটা ছোট সিদ্ধান্ত, একটা ছোট দয়া — কাল অনেক বড় কিছু হয়ে ফিরে আসতে পারে।
আপনি আলাদা নন। আপনি এই সিস্টেমেরই অংশ।
আপনি বদলালে, সিস্টেম বদলাবে।
বৈজ্ঞানিক ভিত্তি: Lorenz, E.N. (1963). Deterministic Nonperiodic Flow. J. Atmos. Sci. 20:130-141
@ সু জ য়, বিজ্ঞানকথা
৪৩
ভূত, প্রেত, আত্মা, কালো জাদু - সত্যি আছে, নাকি পুরোটাই মনের ভয়?
ছোটবেলায় ঠাকুমা বলত - "ওই বাঁশঝাড়ে ভূত আছে।" আমি যেতাম না।
বড় হয়ে রাত ১২টায় ওই বাঁশঝাড়ের পাশ দিয়েই ফিরলাম। দেখলাম ভূত নেই, দুটো লোক বসে মদ খাচ্ছে। বুঝলাম - ভূতের গল্পটা ছিল ঠাকুমার বানানো সিসিটিভি।
ভূত কোথায় থাকে?
ভূত কখনো কলেজ স্ট্রিটে বইপাড়ায় থাকে না, ইডেনে আইপিএলের সময় থাকে না। ভূত সবসময় থাকে শ্মশানে, পুকুর পাড়ে, আর সবচেয়ে বেশি থাকে গরিব মানুষের ঘাড়ে।
আম্বানির বাড়িতে কখনো ভূত ঢোকে না, ভূত ঢোকে রহিম চাচার ছেলের ঘাড়ে - যে ৩০০ টাকা রোজে কাজ করে। কারণ ওঝার ৫০০ টাকা ফি আম্বানি দেবে না, রহিম চাচাই দেবে। এটাই ভূতের অর্থনীতি।
বিজ্ঞান কী বলছে?
১. বোবায় ধরা / Sleep Paralysis:
আপনারা বলেন - "রাতে ভূত বুকে চেপে বসেছিল।" বিজ্ঞান বলে এটা Sleep Paralysis।
PubMed-এ গবেষণা বলছে - "Sleep paralysis is a state of momentary bodily immobilization... characterized by atonia during REM sleep"। আরেকটি পেপার বলছে - "propose a neuroscientific account for why people see ghosts during sleep paralysis"।
ঘুম আর জাগরণের মাঝে শরীর অবশ থাকে, ব্রেন জেগে থাকে, তখনই ভূত দেখেন।
২. Pareidolia:
অন্ধকারে দড়িকে সাপ মনে হয় কেন? বিজ্ঞান বলছে Pareidolia।
"where people perceive familiar patterns, such as human faces or figures, in random stimuli, thus giving rise to experiences of apparitions"। ব্রেন সব জায়গায় মুখ খোঁজে, তাই গাছের ছায়াকেও ভূত মনে হয়।
৩. প্রিয়জনকে দেখা:
মা মারা যাওয়ার পর মাকে দেখেছেন? এটা ভূত নয়, Grief Hallucination।
Psychology Today বলছে - "Known as grief or bereavement hallucinations, they are a perception-like experience of someone who has died, and usually a reaction to acute grief"। এটা ভালোবাসা, ভূত নয়।
৪. ২১ গ্রাম আত্মা - ডাহা মিথ্যে:
১৯০৭ সালে ডাক্তার ম্যাকডুগাল বলেছিল আত্মার ওজন ২১ গ্রাম। Snopes বলছে - "the experiment was flawed because the methods used were suspect, the sample size was much too small"। আধুনিক বিজ্ঞান বলছে - "No accepted modern research confirms that a soul has measurable weight"। মরার পর জল বেরিয়ে যায় বলে ওজন কমে।
কালো জাদু?
সবচেয়ে বড় ব্যবসা। ব্যবসা চলছে না - কালো জাদু করেছে! বিয়ে হচ্ছে না - বাণ মেরেছে! সমাধান - ৫০০১ টাকা।
আমি চ্যালেঞ্জ করছি - কোনো তান্ত্রিক যদি পারেন, আমার ওপর করে দেখান। একটা চুলও বাঁকা করতে পারবেন না।
শেষ কথা -
যেদিন থেকে কারেন্ট এসেছে, সেদিন থেকে ভূত ৯০% কমে গেছে। ভূতও কারেন্টকে ভয় পায়!
ভূত থাকে না শ্মশানে, ভূত থাকে আমাদের ব্রেনে।
ভূতের থেকে বাঁচতে তাবিজ লাগে না, টর্চ লাগে। আর সাহসের জন্য ওঝা লাগে না, যুক্তি লাগে।
যদি ভূত থাকত, তাহলে শহীদদের আত্মা এসে ব্রিটিশদের ঘাড় মটকাত, ক্ষুদিরাম ফিরে আসত। আসেনি। কারণ যে যায়, সে আর ফেরে না।
আমি নাস্তিক, আমি ভূত মানি না। আমি মানুষ মানি।
তথ্যসূত্র:
1. Jalal et al., Frontiers in Human Neuroscience - Sleep Paralysis Ghost Intruder 2. PubMed - Sleep Paralysis Pathogenesis 3. Psychology Today - Grief Hallucinations 4. Snopes / Discover Magazine - 21 Grams Debunked
@ সু জ য়, বিজ্ঞানকথা
৪৪
কেন অনেক মানুষ একটি রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করার পর, সেই দলের ভুলগুলোকে মানতে বা স্বীকার করতে চায় না, এর পেছনে কী ধরনের মনস্তাত্ত্বিক কারণ কাজ করে?
উত্তর: মানুষ যখন একটা রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করেন, তখন সেটা শুধু "ভোট দেওয়া" থাকে না। মাথার ভিতরে একগাদা মনস্তাত্ত্বিক মেকানিজম চালু হয়ে যায়। তাই দলের ভুল দেখেও না-দেখার ভান করেন। এর পেছনে ৬টা বড় কারণ কাজ করে:
১. কগনিটিভ ডিসোন্যান্স — মনের অস্বস্তি এড়ানো
আপনি বিশ্বাস করেন "আমার দলটা ভালো, সৎ, দেশের জন্য কাজ করে"। হঠাৎ দেখলেন দলের নেতা ঘুষ খেয়েছেন বা ধর্ষণে অভিযুক্ত। তখন মাথায় দুটো বিপরীত চিন্তা ধাক্কা খায়:
"আমি ভালো দলকে সাপোর্ট করি" 2. "আমার দল খারাপ কাজ করেছে"
এই ধাক্কাটার নাম কগনিটিভ ডিসোন্যান্স। মস্তিষ্ক এই অস্বস্তি সহ্য করতে পারে না। তাই সবচেয়ে সহজ রাস্তা নেয় — "না, খবরটা ভুল", "বিরোধীদের চক্রান্ত", "এটা হতেই পারে না"। ভুল মানার চেয়ে বিশ্বাস বদলানো বেশি কষ্টের। তাই ভুলকেই অস্বীকার করেন।
২. আইডেন্টিটি ফিউশন — দলটা "আমি" হয়ে যাওয়া
অনেকের কাছে রাজনৈতিক পরিচয় ধর্ম বা জাতির মতোই শক্ত আইডেন্টিটি। "আমি বাম", "আমি বিজেপি", "আমি তৃণমূল" — এটা শুধু মত না, এটা "আমি কে" তার অংশ।
এখন দলের সমালোচনা মানে আপনার নিজের উপর আক্রমণ। কেউ যদি বলেন "আপনার দল ধর্ষককে বাঁচাচ্ছে", আপনার মনে হয় "আমাকে ধর্ষকের দালাল বলছে"। তাই আপনি ডিফেন্সিভ হয়ে যান। যুক্তি না, ইগো লড়ে। দলকে বাঁচানো মানে নিজেকে বাঁচানো।
৩. মোটিভেটেড রিজনিং — আগে সিদ্ধান্ত, পরে যুক্তি
আমরা ভাবি মানুষ আগে তথ্য দেখে, তারপর সিদ্ধান্ত নেয়। আসলে উল্টো। আগে ঠিক করে ফেলেন "আমার দল ঠিক", তারপর সেই সিদ্ধান্তকে জেতানোর মতো তথ্য খোঁজেন।
আপনার দলের নেতার বিরুদ্ধে ১০টা প্রমাণ থাকলেও মস্তিষ্ক ১টা সন্দেহজনক "ক্লিনচিট" খুঁজে বের করে বলবে, "এই দেখুন, নির্দোষ"। এটাকে বলে কনফার্মেশন বায়াস। আমরা সত্য খুঁজি না, নিজের বিশ্বাসকে জেতাই।
৪. সানক কস্ট ফ্যালাসি — এতদিন দিয়েছি, এখন ছাড়ি কী করে?
আপনি ১০ বছর ধরে একটা দলকে ভোট দিয়েছেন, মিছিল করেছেন, ফেসবুকে তর্ক করেছেন, বন্ধু হারিয়েছেন। এত "ইনভেস্টমেন্ট"।
এখন যদি মানেন যে দলটা ভুল, তার মানে আপনার ১০ বছরের সময়, আবেগ, এনার্জি — সব জলে গেল। এই লসটা মানতে মস্তিষ্ক রাজি না। তাই ভুল জেনেও আঁকড়ে থাকেন। "এতদূর এসে এখন ভুল ছিল বললে লোকে কী বলবে?" — এই লজ্জা আটকে দেয়।
৫. ট্রাইবালিজম — "ওরা বনাম আমরা"
মানুষের মস্তিষ্ক লক্ষ বছর ধরে গোষ্ঠীতে বেঁচেছে। গোষ্ঠীর বাইরে মানে বিপদ। রাজনৈতিক দল এখনকার দিনের "ট্রাইব"।
একবার "আমরা" বনাম "ওরা" দাগ কেটে গেলে, "ওরা" যা বলবে সব মিথ্যা লাগবে। "আমাদের" লোক খুন করলেও মনে হবে "ওদের চেয়ে তো ভালো"। এটাকে বলে লেসার ইভিল ইফেক্ট। নিজের দলের দোষকে ছোট করে দেখেন, কারণ বিরোধীকে আরও খারাপ ভাবেন।
৬. ব্যাকফায়ার ইফেক্ট — ভুল ধরিয়ে দিলে আরও জোরে আঁকড়ে ধরা
মজার ব্যাপার হল, কাউকে প্রমাণসহ দেখালে যে তার দল ভুল, তিনি অনেক সময় আরও গোঁড়া হয়ে যান।
কারণ তথ্যটা তার আইডেন্টিটিতে আঘাত করে। মস্তিষ্ক তখন "ফাইট মোডে" চলে যায়। যুক্তি শুনবেন না, উল্টে আপনাকে শত্রু ভাববেন। এজন্য ফেসবুকে তর্ক করে কাউকে দল বদলাতে দেখেন না। উল্টে গালি খেতে হয়।
শেষ কথা: এই মেকানিজমগুলো আমাদের সবার মাথাতেই কমবেশি কাজ করে। দল-মত নির্বিশেষে। তাই কারও দলের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার আগে বুঝতে হবে, আপনি তার তথ্যের সাথে না, তার আইডেন্টিটির সাথে লড়ছেন।
@ সু জ য়, বিজ্ঞানকথা
চাষি চব্বিশটা মাছ এনে স্ত্রীকে দিয়েছে রান্নার জন্য। রান্নার পর সেই মাছ চাখতে গিয়ে প্রায় সবটাই খেয়ে ফেলছে চাষি বউ। পড়ে আছে একটা মাত্র মাছ। অগত্যা উপায়? স্ত্রী খেতে বসে স্বামীকে মাছের হিসাব দিচ্ছে এইভাবে,
মাছ আনিলা ছয় গণ্ডা,
চিলে নিলে দু’গণ্ডা।
বাকি রহিল ষোলো,
ধুতে আটটা জলে পলাইল।
তবে থাকিল আট,
দুইটায় কিনিলাম দুই আটি কাঠ।
তবে থাকিল ছয়,
প্রতিবাসিকে চারিটা দিতে হয়।
তবে থাকিল দুই,
আর একটা চাখিয়া দেখিলাম মুই।
তবে থাকিল এক,
এখন হইস যদি ভাল মানুষের পো,
কাঁটাখানা খাইয়া মাছ খান থো।”
এই হল উইলিয়াম কেরির গল্প সংগ্রহে মেছো বাঙালির কথা।
৪৫
এই গ্রহের প্রথম মেরুদণ্ডী প্রাণী হল মাছ
এই গ্রহের প্রথম মেরুদণ্ডী প্রাণী হল মাছ। অন্য কথায়, আমার ও আপনার মহান-মহান ১৮-১৯ কোটি প্রজন্ম আগের দিদা ছিলেন একটি ছোট, মিষ্টি মাছ-জাতীয় প্রাণী।
৪১ কোটি বছর আগে কোন এক বিশেষ ধরনের মাছ জলের কিনারা থেকে ডাঙাতে উঁকি দিল। ওদের বুকের কাছের শক্ত পাখনা আর হাড় সাহায্য করল ডাঙাতে উঠতে। ওদের একটা অংশ বিবর্তিত হয়ে প্রথম টেট্রাপড শ্রেণীর প্রাণী হল। টেট্রাপডের অর্থ যার চারটে পা আছে। মাছ বাদ দিয়ে যাবতীয় স্থলভূমির মেরুদণ্ডী প্রাণী যেমন ব্যাঙ, কচ্ছপ, বাজপাখি, সিংহ, বাঁদর, মানুষ - হল টেট্রাপড। এমনকি আজকে স্থলভূমির যে প্রাণীদের পা নেই, যেমন সাপ, তাদেরও টেট্রাপড বলা হয়। কারণ একদিন তাদের পা ছিল।
মাছ হল সম্ভবত সবচাইতে সফল মেরুদণ্ডী।
ধান অভি বহুত দূর।।
৪০-৪১ কোটি বছর আগে, সমুদ্রের গায়ে ডাঙায় এদিকে ওদিকে মস গজালো। এই মসের শিকড় ছিল না। ছিল চুলের মত আকর্ষ, যা তাকে মাটির সঙ্গে আটকে রাখে। একই জায়গায় ফিলামেন্টস মস গজাতে থাকলে এক সময়ে তাদের সূর্যালোকে ঘাটতি হয়, বৃদ্ধির আর জায়গা থাকে না। সূর্যের আলো পেতে তখন আমাদের শহরের বাড়ির মত বাড়তে থাকে দৈর্ঘে। ৪০ কোটি বছর আগে ওই মাসের মত ছোট্ট উদ্ভিদ উদ্ভূত হয়। ওদের অবশ্য দেখতে অনেকটা মসের মত। মস ও ফাঙ্গিদের রাজত্বে ছায়া ঘেরা আশ্রয়ে ১৫ সেমি লম্বা ছোট্ট ‘কুকসনিয়া’ টিকে ছিল। তবে উদ্ভিদবিদ্যায় কুকসনিয়ার বিশেষ গুরুত্ব আছে, কারণ এরাই সম্ভবত স্থলে বসবাস করা প্রথম উদ্ভিদ যাদের কাণ্ডের ভিতরে জল পরিবহন করবার জন্য বিশেষ টিস্যু ছিল। এদের বলে ভাস্কুলার উদ্ভিদ।
৩৮ কোটি বছর আগে স্থলভূমি জুড়ে ছিল ক্লাবমস। এখনও স্যাঁতসেঁতে জায়গায় ক্লাবমস পাওয়া যায়। তবে তখনকার ক্লাবমস হত ৫০ মিটার দীর্ঘ, অর্থাৎ শহীদ মিনারের থেকেও সামান্য লম্বা। ভেতরে শক্ত কাঠ ছিল না। আজ থেকে অন্তত ৩৫ কোটি বছর আগে শক্ত কাঠের কাণ্ডযুক্ত আর্কিওপ্টেরিস-এর মত গাছ এল যাদের কিছুটা আজকের উদ্ভিদের মতই দেখতে ছিল। এদের পাতাগুলো অনেকটা ফার্ন গাছের পাতার মত।
ঘাস এসেছে এই সেদিন, ৫.৫ কোটি বছর আগে। আর এদের এক গোত্র হল আমাদের চাল।
৩৫ কোটি বছর আগে কোনভাবে যদি চলে যেতে পারতাম সেই পৃথিবীতে, হাতে রাখতাম একটা ছিপ। বসে থাকতাম ছোট ডিঙিতে। চারিদিকে ঘন বন জঙ্গল এবং জলাভূমি। সেই জঙ্গল চাপা পড়ে জন্ম দিয়েছে দেউচা পাঁচামির। তো, কয়লার অভাব হয়তো হত না। তখন তো আর পাচারকারি নেই।
মৎস মারিতাম আগুন জ্বালিয়া খাইতাম সুখে।
তবে কিনা, মানুষ এসেছে এই সেদিন, ৩ লক্ষ বছর আগে। চাষবাস শুরু করেছে ১০ হাজার বছর আগে।
যতবার প্রাণের ইতিহাস পড়ি, ততবার মনে হয় নগন্য মানুষ আমি। পৃথিবীর ইতিহাসের ০.০০৭% সময়ে আমরা আছি। টিকে আছি অজস্র অণুজীব, পোকা, উদ্ভিদ, পশু, পাখির বদান্যতায়। তারা তো এসে গেছে অনেক আগে, নিজেদের মত সুখেই আছে। যতক্ষণ না আমরা তাদের নিকেশ করছি।
তথ্যসূত্র -
1. Joseph Kirschvink and Peter Douglas Ward, A New History of Life: The Radical New Discoveries about the Origins and Evolution of Life on Earth, Bloomsbury press, 2015
2. Michel J Benton, The history of Life, a very short introduction, Oxford, 2008
3. Pranay Lal, Indica, A deep Natural History of Indian Subcontinent, Penguin Random House, India, 2016
৪৬
পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট গল্প, মাত্র ৬ শব্দের....
সবচেয়ে ছোট গল্পগুলোর মধ্যে বিখ্যাত একটি হলো আর্নেস্ট হ্যামিংওয়ের গল্পটি। মাত্র ছয় শব্দের গল্প। গল্পটা প্রায় সকলেরই জানা।
হ্যামিংওয়ে গল্পটা লিখেছিলেন বাজি ধরে। এখন মনে প্রশ্ন জাগছে নিশ্চয়ই! কার সঙ্গে বাজি ধরেছিলেন হ্যামিং? প্রচলিত আছে বাজি ধরেছিলেন অপর দুই মহারথীর সঙ্গে।
এক গ্রীষ্মে বোটে করে মাছ ধরতে গিয়েছেন তিনজন। হ্যামিংওয়ে, ফিদেল কাস্ত্রো আর চে গুয়েভরা। অনেকক্ষণ বড়শি নিয়ে বসে থেকেও কোনো মাছের দেখা না পেয়ে বিরক্ত হয়ে উঠছেন সবাই। বিরক্তি কাটাতে চে গুয়েভরা বললেন- আরে ধূর! মাছে খায় না তো কী হয়েছে? আমরা তো খেতে পারি।
বলতে বলতে তিনি স্ন্যাক্সের প্যাকেট খুলে খাওয়া শুরু করলেন। হ্যামিংওয়ে আর ক্যাস্ত্রোই বা আর বসে থাকবেন কেন। খাওয়া শুরু করলেন তারাও। খেতে খেতে ফিদেল কাস্ত্রো হ্যামিংওয়েকে বললেন- তা কী এমন গল্প লেখো? এখন একটা গল্প লিখে দেখাও তো। হ্যামিংওয়ে বললেন- এখন? এই মাঝ নদীতে গল্প লিখব কী করে? নোটবুক খাতাপত্র তো সব রেখে এসেছি।
চে গুয়েভরা তখন খাওয়া শেষে টিস্যু পেপারে হাত মুছছিলেন। হাত মোছা বন্ধ করে তিনি টিস্যু পেপারটা হ্যামিংওয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন- এই নাও টিস্যু পেপার। ইচ্ছে থাকলে এখানেও লেখা যায়। হ্যামিংওয়ে হাত বাড়িয়ে টিস্যু পেপারটি নিলেন। খাওয়া বন্ধ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন নদীর শান্ত স্বচ্ছ জলের দিকে। তারপর লিখলেন ছয়টি শব্দ।
এই ছয়টি শব্দ পরবর্তীতে পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত ক্ষুদ্র ছোট গল্প হয়ে গেল। তিনি লিখলেন- 'ফর সেল, বেবিস সুজ,নেভার ওরন।' অর্থ্যাত্, 'বিক্রির জন্য, শিশুর জুতো, ব্যবহৃত নয়'।
গল্পটির ভাবার্থ এইরকম- বাচ্চার জন্য জুতো কেনা হয়েছিল। তবে সেই বাচ্চাটি পৃথিবীর আলোই দেখেনি। মায়ের গর্ভেই শিশুটির মৃত্যু হয়। ছয় শব্দে গর্ভে মারা যাওয়া শিশুর জন্য মায়ের অনুভূতি! এ ধরণের গল্পকে বলা হয় 'ফ্ল্যাশ ফিকশন' বা অণুগল্প। মাইক্রো শর্ট স্টোরি নামেও ডাকা হয় এসব গল্পকে। গল্পটি দারুণ পছন্দ হলো ফিদেল কাস্ত্রো এবং চে গুয়েভরা দু'জনেরই। ক্যাস্ত্রো সঙ্গে সঙ্গে ১০ ডলার বের করে বকশিশ দিলেন হ্যামিংওয়েকে।
তবে এই গল্পটার রচনা নিয়ে আরো একটি গল্প চালু আছে। হ্যামিংওয়ে একদিন তার অফিসের ছয় কলিগের সঙ্গে গল্প করছিলেন। হঠাত্ তিনি বললেন- মাত্র ছয় টি শব্দ দিয়ে তিনি একটি চমত্কার গল্প লিখতে পারবেন। তার কলিগরা হেসেই উড়িয়ে দিলো। বললো, ঠিক আছে। ১০ ডলারের বাজি। হ্যামিংওয়ে গল্পটা লিখলেন এবং বাজিতে জিতে গেলেন।
মার্কিন সাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে ১৯৫৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন। তিনি সাতটি উপন্যাস, ছয়টি ছোট গল্প সংকলন এবং দুটি নন ফিকশন গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন। তার মৃত্যুর পর আরো তিনটি উপন্যাস, চারটি ছোট গল্প সংকলন এবং তিনটি নন-ফিকশন গ্রন্থ প্রকাশ হয়েছিল। তার প্রকাশিত গ্রন্থের অনেকগুলোই আমেরিকান সাহিত্যের চিরায়ত বা ক্লাসিক গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়।
পৃথিবীর আরেকটি ক্ষুদ্রতম গল্প বা ফ্ল্যাশ ফিকশনের কথা জানেন কি? ‘নক’ নামের এ গল্পটির লিখেছিলেন ফ্রেড্ররিক ব্রাউন। এটি এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ভূতের গল্প। এ গল্পের লেখক ফ্রেড্ররিক ব্রাউনও ছিলেন আমেরিকান। গল্পটি নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছা করছে? গল্পটি হলো-
'দ্য লাস্ট ম্যান অন আর্থ সেট আ রুম। দেয়ার ওয়াজ আ নক অন দা ডোর'। এর অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, পৃথিবীর সর্বশেষ মানুষটি একাকী একটা রুমে বসে আছেন। হঠাত্ কে যেন তার দরজায় নক করল।
লাইনটি পড়তে পড়তে আপনার মনে হয়তো অনেক প্রশ্নের উদয় হয়েছে? ভাবছেন পৃথিবীর শেষ মানুষ… তাহলে দরজায় নক করলে কে? এজন্যই এই লাইন দুটি জায়গা করে নিয়েছে ছোট গল্পের তালিকায়।
@ Shihab Nayeem Uddin
৪৭
ডলফিন কীভাবে আমাদের চিনে নেয় ও জীবন বাঁচায়
ডলফিন শুধু খেলার সঙ্গী নয়, তাদের আছে এক আশ্চর্য ক্ষমতা, যা বিজ্ঞানীরা এখনও পুরোপুরি উন্মোচন করতে পারেননি। ইকোলোকেশন বা প্রাকৃতিক সোনার ব্যবহার করে ডলফিন আমাদের হাড়ের আকার ও ঘনত্ব দেখে মানুষকে চিনতে পারে।
তারা শব্দ তরঙ্গ ছড়িয়ে দেয় এবং প্রতিফলিত প্রতিধ্বনি পড়ে আমাদের একটি স্পষ্ট “শব্দ–চিত্র” তৈরি করে — এমনকি অন্ধকার বা ঘোলা পানিতেও। তাদের কাছে প্রতিটি মানুষ ততটাই অনন্য, যতটা আমাদের আঙুলের ছাপ।
কিন্তু আশ্চর্য বিষয় হলো, তারা এই ক্ষমতাকে কীভাবে ব্যবহার করে। শত শত বছর ধরে মানুষ জানে, ডলফিন ডুবে যাওয়া নাবিকদের হাঙর থেকে দূরে সরিয়েছে, সাঁতারুদের চারপাশে ভিড় করে রক্ষা করেছে, এমনকি কারও ভেসে থাকার শক্তি না থাকলে তাদের ভাসিয়ে রেখেছে যতক্ষণ না উদ্ধার এসেছে।
আমাদের মতোই বাতাসে শ্বাস নেওয়া স্তন্যপায়ী হওয়ায়, ডলফিন যেন ডুবে যাওয়ার বিপদটি বোঝে। এই যৌথ দুর্বলতা আমাদের ও তাদের মধ্যে এক নীরব সম্পর্ক তৈরি করেছে — আস্থায়, সহমর্মিতায় এবং বোঝাপড়ায় গড়া সম্পর্ক।
এগুলো কেবল প্রবৃত্তি নয়, বরং সাহস ও করুণার কাজ — এক বুদ্ধিমান প্রাণীর পক্ষ থেকে আরেকজনের জন্য। প্রমাণ করে যে, বিশাল নীল সমুদ্রে প্রজাতির সীমা পেরিয়েও বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে পারে।
@ Shihab Nayeem Uddin
৪৮
দীর্ঘ সময় গোসল বা সাঁতার কাটলে হাত-পায়ের ত্বক কুঁচকে যায় কেন?
আপনার কি কখনো খেয়াল হয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে পানিতে থাকলে হাত ও পায়ের আঙুলের ত্বক কুঁচকে যায়? অনেকেই মনে করেন, এটা পানিতে অতিরিক্ত সময় থাকার ফলে ত্বক পানি শোষণ করে ফোলে ওঠার কারণে হয়। কিন্তু আসলে এর পেছনে আছে একটি চমকপ্রদ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা!
আমাদের হাত ও পায়ের ত্বকের বাইরের স্তর (স্ট্রাটাম কর্নিয়াম) শরীরের অন্যান্য অংশের তুলনায় বেশি মোটা এবং এতে কেরাটিন নামক এক ধরনের প্রোটিন থাকে, যা পানি শোষণ করতে পারে। যখন আমরা দীর্ঘ সময় পানির সংস্পর্শে থাকি, তখন এই স্তরটি অতিরিক্ত পানি শোষণ করে এবং কুঁচকে যেতে শুরু করে। তবে, এটা শুধু পানি শোষণের ফলেই হয় না, বরং এটি আমাদের শরীরের স্নায়ুতন্ত্রের একটি প্রতিক্রিয়া।
গবেষণায় দেখা গেছে, এটি মূলত আমাদের স্নায়ুতন্ত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি প্রক্রিয়া। পানিতে থাকার সময় শরীর আমাদের আঙুলের ত্বককে কুঁচকে ফেলে, যাতে হাত ও পা ভিজে থাকা অবস্থায়ও ভালোভাবে কিছু ধরতে পারে। এটি প্রকৃতির একটি চমৎকার ব্যবস্থা, যা আমাদের পূর্বপুরুষদের জন্য ভেজা পরিবেশে টিকে থাকার সুবিধা দিয়েছিল।
তাই, পরের বার যদি দেখেন যে দীর্ঘ সময় গোসল বা সাঁতার কাটার পর ত্বক কুঁচকে গেছে, চিন্তার কিছু নেই! এটা আপনার শরীরের বুদ্ধিমান প্রতিক্রিয়ারই একটি অংশ।
@ Shihab Nayeem Uddin
৪৯
খাবার হজম হতে কত সময় লাগে এবং কখন খাওয়া ভালো:
পানি সঙ্গে সঙ্গেই শোষিত হয় (০–১০ মিনিট)। খালি পেটে সকালে পানি খাওয়া সবচেয়ে উপকারী।
জলসমৃদ্ধ ফল (তরমুজ, বাঙ্গি, আঙুর) ২০–৩০ মিনিটে হজম হয়। খালি পেটে বা খাবারের মাঝে খান।
অম্লীয় ফল (কমলা, আনারস, কিউই) ৩০–৪০ মিনিটে হজম হয়। সকালে বা স্ন্যাক্স টাইমে ভালো, তবে খাবারের পরপর খেলে গ্যাস হতে পারে।
আপেল, নাশপাতি, পেঁপে ৪০–৫০ মিনিটে হজম হয়। খালি পেটে বা খাবারের মাঝে খেলে ভালো।
কাঁচা শাকসবজি (শসা, গাজর, সালাদ) ৩০–৪০ মিনিটে হজম হয়। দুপুর বা রাতের খাবারের আগে খেলে উপকারি।
রান্না করা সবজি ৪০–৫০ মিনিট লাগে। দুপুর বা রাতে খাওয়া যায়।
ভাত, রুটি, আলু প্রায় ১.৫–২ ঘণ্টা লাগে। দুপুর বা রাতে ভালো।
ডাল, ছোলা, সয়াবিন ২–৩ ঘণ্টা লাগে। দুপুর বা বিকেলের দিকে খেলে হজম সহজ হয়।
দুধ ও দই ৩-৪ ঘণ্টা লাগে। সকালে বা রাতে খাওয়া ভালো।
সেদ্ধ ডিম ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট লাগে, ভাজা ডিমে সময় বেশি লাগে। সকাল বা দুপুরে ভালো।
মাছ ১ ঘণ্টায় হজম হয়। দুপুর বা রাতে উপযোগী।
মুরগি ২-৩ ঘণ্টা লাগে। দুপুর বা রাতে ভালো।
গরু/খাসি মাংস ৩–৪ ঘণ্টা লাগে। দুপুরে খাওয়া উত্তম, রাতে খেলে হজম ধীর হয়।
বাদাম ও বীজ ২–৩ ঘণ্টা লাগে। সকালে বা বিকেলে স্ন্যাক্স হিসেবে ভালো।
ফাস্টফুড ও তেলেভাজা ৩–৪+ ঘণ্টা লাগে। যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন।
টিপস:
ফল সবসময় খালি পেটে বা খাবারের অন্তত ১ ঘণ্টা আগে খান।
দুপুরে ভারী খাবার, রাতে হালকা খাবার রাখুন।
পানি খাবারের ঠিক আগে বা ৩০ মিনিট পরে পান করুন।
@ Shihab Nayeem Uddin
৫০
জার্সি: যে দ্বীপের রাজা ব্রিটেনের, কিন্তু সেটি ব্রিটেনের অংশ নয়!
ইংলিশ চ্যানেলের নীল জলের মধ্যে, ফ্রান্সের উপকূল থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে একটি ছোট দ্বীপ—জার্সি। আয়তনে খুব বড় নয়, জনসংখ্যাও মাত্র এক লাখ। কিন্তু সাংবিধানিক পরিচয়ের দিক থেকে জার্সি পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত জায়গাগুলোর একটি।
কারণ জার্সি স্বাধীন দেশ নয়, আবার যুক্তরাজ্যেরও অংশ নয়। তাহলে এটি কার? এটি সরাসরি British Crown বা ব্রিটিশ রাজমুকুটের অধীন।
১. জার্সি আসলে কী?
জার্সি হলো একটি British Crown Dependency। এই একই ধরনের মর্যাদা রয়েছে কাছের আরেক দ্বীপ Guernsey এবং আইরিশ সাগরের 'আইল অব ম্যান'-এর।
Crown Dependency-কে সহজভাবে বোঝাতে গেলে বলা যায়, এগুলো ব্রিটিশ রাজমুকুটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত স্বশাসিত অঞ্চল। জার্সির নিজস্ব সংসদ, সরকার, আদালত ও আইন রয়েছে। এমনকি এর নিজস্ব মুদ্রা 'জার্সি পাউন্ড' আছে।
কিন্তু জার্সি জাতিসংঘের সদস্য নয়, কারণ এটি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র নয়।
অন্যদিকে এটিকে যুক্তরাজ্যের অংশও বলা যায় না। যুক্তরাজ্যের সংসদ জার্সির জন্য আইন তৈরি করতে পারে না। জার্সির অভ্যন্তরীণ আইন মূলত জার্সির নিজস্ব সংসদই তৈরি করে।
২. তাহলে ব্রিটেনের রাজার ভূমিকা কী?
বর্তমান ব্রিটিশ রাজা চার্লস তৃতীয় জার্সিরও সাংবিধানিক প্রধান। তবে তিনি সেখানে নিরঙ্কুশ রাজা বা সম্রাট নন। জার্সির প্রতিদিনের শাসন তাঁর হাতে নেই। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের States Assembly আইন তৈরি করে এবং জার্সির সরকার প্রশাসন পরিচালনা করে।
তবু জার্সির সঙ্গে 'ক্রাউন'-এর সম্পর্কটি যুক্তরাজ্যের তুলনায় কিছুটা আলাদা।
জার্সির States Assembly কোনো আইন পাস করলে সেটি কার্যকর হওয়ার জন্য 'রয়াল এসেন্ট' প্রয়োজন। যুক্তরাজ্যেও রয়াল এসেন্ট-এর প্রয়োজন হয়, কিন্তু সেখানে এটি এখন প্রায় সম্পূর্ণ আনুষ্ঠানিক বিষয়। জার্সির সাংবিধানিক ব্যবস্থায় 'ক্রাউন'-এর ভূমিকা তুলনামূলকভাবে বেশি স্বতন্ত্র।
তবে এর মানে এই নয় যে রাজা যখন-তখন সেখানে হস্তক্ষেপ করতে পারেন। জার্সি নিজের সংসদ ও সরকারের মাধ্যমে নিজেই পরিচালিত হয়।
৩. জার্সি কেন যুক্তরাজ্যের অংশ নয়?
এর পেছনে রয়েছে প্রায় হাজার বছরের পুরোনো ইতিহাস। জার্সি ঐতিহাসিকভাবে নর্মান্ডি'র সঙ্গে যুক্ত ছিল। ১০৬৬ সালে নর্মান্ডি'র ডিউক উইলিয়াম ইংল্যান্ড জয় করে ইংল্যান্ডের রাজা হন। ফলে নর্মান্ডি এবং ইংরেজ 'ক্রাউন'-এর মধ্যে একটি বিশেষ সম্পর্ক তৈরি হয়।
কিন্তু ১২০৪ সালে ইংল্যান্ডের রাজা জন নর্মান্ডি'র মূল ভূখণ্ড ফ্রান্সের কাছে হারান। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তখন Channel Islands ইংরেজ 'ক্রাউনের' অধীনেই থেকে যায়। আর জার্সি এই চ্যানেল আইল্যান্ডসের একটি দ্বীপ।
জার্সি ফ্রান্সের অংশ হয়ে গেল না, আবার ইংল্যান্ডের সাধারণ প্রশাসনের মধ্যেও ঢুকে গেল না। বরং সরাসরি ব্রিটিশ রাজ-এর সাথে তার পুরোনো সম্পর্ক রয়ে গেল।
শত শত বছর ধরে সেই সম্পর্ক পরিবর্তিত হয়ে আজকের 'ক্রাউন ডিপেন্ডেন্সি' ব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে।
৪. জার্সির নিজের কী কী আছে?
নিজস্ব সংসদ (States Assembly) ও সরকার
নিজস্ব আদালত, আইন ও করব্যবস্থা
নিজস্ব মুদ্রা ও পতাকা
নিজস্ব নির্বাচন ব্যবস্থা
এসব সত্ত্বেও জার্সি স্কটল্যান্ড বা ওয়েলসের মতো যুক্তরাজ্যের কোনো অংশ নয়।
৫. প্রতিরক্ষা:
জার্সির নিজস্ব সেনাবাহিনী নেই। এর প্রতিরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দায়িত্ব যুক্তরাজ্য পালন করে। তবে এর অর্থ এই নয় যে জার্সির অভ্যন্তরীণ সরকার লন্ডনের অধীন।
সহজ উদাহরণে বলা যায়, জার্সি অনেকটা এমন একটি স্বশাসিত দ্বীপ, যার নিজের সংসদ ও সরকার আছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এবং প্রতিরক্ষার মতো কিছু বিষয়ে ব্রিটিশ রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল।
জার্সি কি তাহলে একটি দেশ?
দৈনন্দিন জীবনে জার্সিকে অনেক সময় “দেশ” বলা হয়। কারণ এর নিজস্ব ভূখণ্ড, জনগণ, সরকার, আইন ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের অর্থে এটি সার্বভৌম দেশ নয়।
এই অদ্ভুত সাংবিধানিক অবস্থানের কারণেই জার্সি একই সঙ্গে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু যুক্তরাজ্যের বাইরে; নিজের সংসদ ও সরকার রয়েছে, কিন্তু স্বাধীন রাষ্ট্র নয়; আর একই রাজা যুক্তরাজ্য ও জার্সির সাংবিধানিক প্রধান হলেও দুই জায়গায় তাঁর অবস্থান ও ক্ষমতার ভিত্তি এক নয়।
আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের 'নিউ জার্সি' অঙ্গরাজ্যের নাম এসেছে এই 'জার্সি' থেকে!
জার্সি ফিফার সদস্য নয়, তাই বিশ্বকাপ বাছাই খেলতে পারে না। তবে ICC'র সদস্য হওয়ায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলে।
বইকাল