1
শিক্ষায় কোনো ‘সিলভার বুলেট’ নেই। পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন ও শিক্ষক—তিনটিই পরস্পরনির্ভরশীল। মূল্যায়ন পদ্ধতি এখনো মুখস্থনির্ভর শেখাকে উৎসাহিত করে। এমনকি সৃজনশীলের সংক্ষিপ্ত প্রশ্নেও পাঠ্যবইয়ের নির্দিষ্ট তথ্য হুবহু না লিখলে নম্বর পাওয়া যায় না। ধারাবাহিক মূল্যায়নের বদলে আমরা এক-দুটি বড় পরীক্ষার নম্বর দিয়ে শিখনমান বিচার করি। এসব বিষয়ে সংস্কার করতে হলে দক্ষ ও পর্যাপ্ত শিক্ষক লাগবে—সেই জায়গাতেও চরম সংকট রয়েছে। শিখনমান প্রত্যাশিত মাত্রায় না পৌঁছানোর পেছনে এগুলোই বড় কারণ।
1
ঝরে পড়ার পেছনে একটি বড় কারণ হলো অর্থনৈতিক অবস্থা। শিক্ষা এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে যত বেশি অর্থ ব্যয় করা যায়, তত ভালো শিক্ষা পাওয়া যায়। প্রাথমিক শিক্ষা নামমাত্র বিনা বেতনের হলেও বাস্তবে প্রাইভেট কোচিং, গাইড বই ও অন্যান্য খরচ অনিবার্য হয়ে উঠেছে। ফলে দরিদ্র পরিবারগুলোর শিশু—শহর ও গ্রাম উভয় জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়া ঠেকাতে হলে শিক্ষাকে বাস্তব অর্থে এ স্তরে ব্যয়মুক্ত করতে হবে এবং দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোয় বিশেষ সহায়তা দিতে হবে। শুধু উপবৃত্তি দিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না।
1
শিক্ষায় যে বৈষম্য, তা অর্থনৈতিক বৈষম্যেরই প্রতিফলন। শহরের ধনী পরিবার কিংবা গ্রামের উচ্চবিত্তরা ভালো স্কুলের সুযোগ পায়, আর দরিদ্র পরিবারগুলো সরকারি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল—যার মান প্রশ্নবিদ্ধ। বিশেষ করে শহরের বস্তি ও ভাসমান জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য কার্যত কেউ দায়িত্ব নেয় না—না শিক্ষা অধিদপ্তর, না সিটি করপোরেশন। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো যে প্রতিষ্ঠানেই শিশু পড়ুক না কেন, একটি ন্যূনতম মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। এটি কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং শিশু অধিকার সনদের আওতায় রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার।
2
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় মানসম্মত শিক্ষকের অভাব একটি বাস্তব ও বহুল আলোচিত চ্যালেঞ্জ। বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি, গবেষণা সক্ষমতা ও নৈতিক মানদণ্ডসম্পন্ন শিক্ষক তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি ও শ্রমবাজারের সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থাকে সমন্বয় করা। কেবল একাডেমিক জ্ঞান নয়, বরং সমস্যা সমাধান দক্ষতা, যোগাযোগ সক্ষমতা, দলগত কাজ এবং অভিযোজন ক্ষমতা আজকের কর্মবাজারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
3
শিক্ষার্থীরা শিক্ষা প্রক্রিয়ার সক্রিয় অংশীদার, উদ্ভাবক এবং ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশক। এ বিশ্বাস থেকেই প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি শিক্ষার্থীদের সহনির্মাতা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। আমাদের শিক্ষা দর্শনের মূল ভিত্তি হলো শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক ও অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা। আউটকাম বেজড শিক্ষা (ওবিই) কাঠামোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের সমস্যা চিহ্নিত করা, সমাধান প্রস্তাব করা এবং নেতৃত্বমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করা হয়। এতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের চিন্তা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা প্রয়োগের বাস্তব সুযোগ পায়।
4
ডিজিটাল লিটারেসি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে কারিকুলাম আধুনিকায়ন এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটি প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা, বিশ্লেষণী চিন্তাশক্তি ও উদ্ভাবনী সক্ষমতা বিকাশের লক্ষ্যে নিয়মিতভাবে পাঠ্যক্রম হালনাগাদ করছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডাটা সায়েন্স, বিজনেস অ্যানালিটিকসসহ নতুন ও সময়োপযোগী একাডেমিক প্রোগ্রাম চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। আমরা বরাবরই শিক্ষার্থীদের কেবল জ্ঞানগ্রহীতা নয়, বরং জ্ঞান সৃষ্টির অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করি। পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, শ্রেণীকক্ষভিত্তিক শিক্ষা, প্রজেক্টভিত্তিক লার্নিং ও উদ্ভাবন কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের মতামত ও সৃজনশীল উদ্যোগকে গুরুত্ব দেয়া হয়। ভবিষ্যতে ইয়ুথ লিডারশিপ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ আরো জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে,
5
কারিকুলাম উন্নয়ন, সহশিক্ষা কার্যক্রম, গবেষণা ও সামাজিক উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের যুক্ত করে আমরা তাদের মতামত, সৃজনশীলতা ও নেতৃত্বের ক্ষমতাকে গুরুত্ব দিচ্ছি। শিক্ষার্থীদের মানের ক্ষেত্রে বলতে চাই, ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড ভিন্ন হলেও উপযুক্ত গাইডেন্স, মেন্টরশিপ ও একাডেমিক সাপোর্ট পেলে তারা নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়। বর্তমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যুগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান উপযোগী করে গড়ে তোলা। পাঠ্যভিত্তিক জ্ঞানের সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতা, সমস্যা সমাধান দক্ষতা, যোগাযোগ দক্ষতা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এখন ডিগ্রিকেন্দ্রিকতা থেকে সরে এসে দক্ষতাকেন্দ্রিক শিক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে।
6
বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যুগে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষা ও শিল্প খাতের মধ্যকার ব্যবধান কমানো। পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ দক্ষতা, ডিজিটাল সক্ষমতা ও নৈতিক মানোন্নয়ন। দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে পাঠ্যক্রমকে সময়োপযোগী রাখা এবং শিক্ষার্থীদের আজীবন শেখার মানসিকতা তৈরি করাই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় দায়িত্ব। আমরা আমাদের পাঠ্যক্রমে ডাটা অ্যানালিটিকস, এআই বেসিকস, প্রোগ্রামিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, ফিনটেক ও নৈতিক প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করছি। ভবিষ্যতে ইন্টারডিসিপ্লিনারি প্রোগ্রাম চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তির সঙ্গে মানবিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও অর্জন করতে পারে।
7
আমরা বর্তমানে যে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলছি, তার লক্ষ্য শুধু পুঁথিগত বিদ্যা বা সার্টিফিকেটের জন্য নয়। প্রকৃত শিক্ষা হবে এমন, যা একজন শিক্ষার্থীকে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ করবে। সে শুধু নিজের স্বার্থ বা অস্তিত্বের কথা ভাববে না, বরং সমাজকে এগিয়ে নেয়ার চিন্তা করবে। প্রযুক্তির পরিবর্তন আগে ছিল গাণিতিক হারে কিন্তু এখন তা হচ্ছে জ্যামিতিক হারে। এই দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা শিক্ষার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমরা উচ্চশিক্ষাকে রূপান্তর করার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন প্রজেক্টে যুক্ত হয়েছি, যেমন—‘হায়ার এডুকেশন অ্যাকসিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট), যা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সাহায্য করবে।
7
আমরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা নামের গাছটাকে দিন দিন শীর্ণ হয়ে যেতে দেখছি, এর গোড়ায় শিক্ষা খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দের নামে সার-পানি ঢালা বিশেষ প্রয়োজন, সেদিকে আমরা নজর দিচ্ছি না। তাই শিক্ষা ব্যবস্থার গোড়া থেকেই শিক্ষার মান উন্নত করতে হবে। শিক্ষা কার্যক্রম হতে হবে স্টুডেন্ট ওরিয়েন্টেড। শিক্ষার্থীদের কথা বলতে দিতে হবে, তাকে প্রশ্ন করতে দিতে হবে, তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠা পাবে। সেই সঙ্গে শিক্ষকদের মননে পরিবর্তন আনাটা বেশ জরুরি। একজন প্রশিক্ষিত শিক্ষকই পারবেন ক্লাসরুমের কেমিস্ট্রি বদলে দিতে।
8
বিইউএফটিতে ২৩টি স্টুডেন্ট ক্লাব রয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা বিতর্ক, আইটি, ফ্যাশন, পরিবেশ, ক্রীড়া ও সামাজিক সেবামূলক কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। এর মাধ্যমে তারা পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা, প্রকল্প নকশা এবং ক্লাবভিত্তিক উদ্যোগে নেতৃত্ব নিয়ে শিক্ষা প্রক্রিয়া সহনির্মাণ করে। ভবিষ্যতে আমরা শিক্ষার্থীদের আরো বেশি করে গবেষণা প্রকল্প, ইন্টার্নশিপ ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যুক্ত করার পরিকল্পনা করছি, যাতে তারা ফ্যাশন, প্রকৌশল, ব্যবসা ও প্রযুক্তি খাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অংশীদার হয়।
8
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে বিইউএফটির কারিকুলাম আধুনিকায়নে আমরা ডিজিটাল সাক্ষরতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশন যুক্ত করেছি। পাঠ্যক্রমে ডাটা অ্যানালিটিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডিজাইন, স্মার্ট উৎপাদন ও টেকসই উন্নয়ন যুক্ত হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা ফ্যাশন, প্রকৌশল, ব্যবসা ও প্রযুক্তি খাতের ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য প্রস্তুত হয়। ল্যাবগুলোতে আধুনিক সফটওয়্যার ও ডিজিটাল টুলস যুক্ত করা হয়েছে। বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন প্রোগ্রাম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসমৃদ্ধ প্রকৌশল বা ব্যবসায় প্রশাসনের স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম, যা ২০২৬-২৭ সেশনে চালু হতে পারে।
9
আমাদের মূল কৌশল হলো শিক্ষা ও গবেষণাকে ভৌগোলিক সীমানার বাইরে নিয়ে যাওয়া। আমরা তিনটি স্তরে কাজ করে আসছি। প্রথমত, পাঠ্যক্রমের আন্তর্জাতিকীকরণ-আমরা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অ্যাক্রেডিটেশনপ্রাপ্ত পাঠ্যক্রম প্রস্তুত করছি, যা শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক মান অনুযায়ী দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করে। দ্বিতীয়ত, কৌশলগত অংশীদারত্ব—বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমাদের সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) রয়েছে। তৃতীয়ত, ক্যাম্পাস ডাইভারসিটি-দেশী ও বিদেশী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে কাজ করার পরিবেশ আমরা গড়ে তুলছি। এর পাশাপাশি, আমাদের দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান ২০২৩-২০৩৩ আন্তর্জাতিকীকরণ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে। এর লক্ষ্য হলো এআইইউবিকে একটি আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে বসেই বিশ্বের সেরা মানের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে।
10
প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলো মূলত ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। এখানকার উদ্যোক্তারা ব্যবসায়িক মানসিকতা থেকে আসেননি, সমাজসেবার মানসিকতা থেকে এসেছেন। সরকার যদি উপাচার্য বা ট্রেজারার নিয়োগের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নেয় এবং সেখানে রাজনৈতিক প্রভাব চলে আসে, তবে শিক্ষার মান ধরে রাখা অসম্ভব হবে। আমরা দেখেছি, সরকারি অনেক জুট মিল বা টেক্সটাইল মিল অলাভজনক হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু প্রাইভেট সেক্টর টিকে আছে তাদের দক্ষতার কারণে।
গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করতে অবকাঠামো এবং সাংগঠনিক কাঠামো—দুটোই জরুরি। ইউএপি এই দুই জায়গাতেই শক্ত অবস্থানে আছে। আমরা প্রতি বছর ইনফ্রাস্ট্রাকচারের বাইরেও শুধু গবেষণার জন্য একটি নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ রাখি। আমাদের শিক্ষকদের বাধ্যতামূলকভাবে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে গবেষণা প্রকাশ করতে হয়। ইউনেস্কোর সঙ্গে কাজ করছি, যা আমাদের শিক্ষার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রমাণ। তবে আরো উন্নতির সুযোগ আছে। ইউজিসি বা সরকারের উচিত নিছক তদারকি বা খবরদারি না করে, কোয়ালিটি অডিট এবং সুপারভিশনে জোর দেয়া। অনেক বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তির আবেদন করে, বিশেষ করে ফার্মেসিতে, কিন্তু আসনস্বল্পতার কারণে আমরা তাদের নিতে পারি না।
আমরা আইটি, এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা), মেকাট্রনিকস, রোবোটিকস এবং ডিজিটাল মাল্টিমিডিয়ার ওপর জোর দিচ্ছি। আমাদের পরিকল্পনা আছে একটি স্বতন্ত্র আইটি ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার, যেখানে প্রথাগত ডিগ্রির বাইরে গিয়ে হাতে-কলমে প্রযুক্তিগত শিক্ষা দেয়া হবে।
11
বাংলাদেশের জনশক্তিকে মানবসম্পদে পরিণত করতে দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। আর দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে শিক্ষা সংস্কারের বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবির) ভিসি অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে বহির্বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শিক্ষা সংস্কারের মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন সময়ের দাবি।
12
শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক এবং প্রেসিডেন্ট: ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইট্যাব)। সাবেক কান্ট্রি ডিরেক্টর- ভাব বাংলাদেশ এবং শিক্ষা বিশেষজ্ঞ -ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি। ইমেইল: masumbillah65@gmail.com
বাংলাদেশের অনেক পরিচিতির মধ্যে আরেকটি পরিচিতি হচ্ছে ‘শিক্ষিত বেকারের দেশ’। উচ্চশিক্ষা অর্থাৎ গ্র্যাজুয়েশন ও মাস্টার্স পাস করেও ২৮ লাখের মতো বেকার রয়েছে দেশে। যুগোপযোগী কারিকুলাম অনুসরণ না করা, বাজারের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের দক্ষতা তৈরি না হওয়া এবং শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটির কারণে এই অবস্থা।
বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলোয় দক্ষ ও অতি দক্ষ জনসংখ্যা ৬০ শতাংশের কাছাকাছি থাকে। জার্মানিতে প্রায় ৭৩ শতাংশ জনসংখ্যা দক্ষ। জাপানে ৬৬, সিঙ্গাপুরে ৬৫, অষ্ট্রেলিয়ায় ৬০, চীনে ৫৫, দক্ষিণ কোরিযায় ৫০, মালয়েশিয়ায় প্রায় ৪৬ শতাংশ শিক্ষার্থী কারিগরি মাধ্যমে অধ্যয়ন করে।
বিপরীতে বাংলাদেশে সার্বিকভাবে স্বল্পদক্ষ ও দক্ষ জনশক্তি ৩৮ শতাংশ বলা হলেও কারিগরিভাবে দক্ষ, মধ্যমানের দক্ষ কিংবা স্বল্প দক্ষ জনশক্তি মাত্র ১৪ শতাংশ। বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৭ হাজার ৮১৯টি (ব্যানবেইস ২০২২)।
শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে অথচ সমাজে কারিগরি শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহ দেখা যাচ্ছে। সমাজে এখনো মনে করে কারিগরি শিক্ষা আর্থিক ও শিক্ষাগতভাবে পিছিযে পড়াদের শিক্ষা, এটি প্রিভিলেইজডদের নয়। ফলে, অসচ্ছল পরিবারের ছেলেমেয়েরাও সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে চান। ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীরা পাস করার পর চাইলেই যেকোনো ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটতে ভর্তি হতে পারেন না। জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ দেশে একটি কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সুপারিশ করেছিলো সেটির বাস্তবায়ন তো দূরের কথা বিষয়টি নিয়ে কোন কথাই শোনা যাচ্ছে না। অথচ দেশকে স্বাবলম্বী করতে হলে ও বেকারের সংখ্যা কমাতে হলে কারিগরি শিক্ষা জনপ্রিয় করা, প্রসার ঘটানো ও উন্নত করার কোনো বিকল্প নেই।
প্রশ্ন হচ্ছে কোন কিছু মুখস্থ করা এবং শিক্ষার্থীর অন্তর্নিহিত মেধার বিকাশ কি একই জিনিস, নাকি একে অপরের পরিপূরক নাকি এ দুটো বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে? পার্থক্য থেকে থাকলে সেটি কতটুকু? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কোচিং সেন্টারের শিক্ষক কিংবা গৃহশিক্ষক কর্তৃক সরবরাহকৃত কোন তথ্য বা উত্তর যখন কোন শিক্ষার্থী আত্মস্থ করে হুবহু পরীক্ষায় খাতায় লিখে সেটি এক ধরনের নকল যেটিকে বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, মাথায় নকল নিয়ে যাওয়ার মতো বিষয়টি।হুবহু অন্যের তথ্য মাথায় নিয়ে নির্দিষ্ট সময় পরে খাতায় ঢেলে দেয়া এক ধরনের এক শক্তি তবে তাকে ঠিক মেধা বলা যায়না।
আবৃত্তিকার, ছড়াকার, গায়ক, হাফেজ—দর্শক-শ্রোতাদের মাতিয়ে রাখেন। তারা বিষয়টির গভীরে না গেলেও তাদের মুখস্থ শক্তির দ্বারা কিন্তু দর্শকদের অভিভুত করে ফেলেন। এখন যে গান তারা গাইলেন, যে কবিতা পাঠ করলেন তার নিগূঢ় রহস্য, বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করতে পারলেন, কোন ধরনের কবিতা ও গান সেটিও ভালোভাবে আবিষ্কার করতে পারলেন, বৈশিষ্টাবলী বুঝলেন। একইভাবে যিনি কোরানের আয়াত শুধু মুখস্থ না তার অর্থ, ব্যাখ্যা সুন্দরভাবে করলেন এবং নিজের জীবনেও বাস্তবায়ন করছেন, সেটি হচ্ছে বাস্তব প্রয়োগ, সেটি তিনি অন্য মানুষদেরও শেখাতে পারেন, বুঝাতে পারেন, সেই অনুযায়ী অন্যদের জীবন যাপনে উদ্ধুদ্ধ করতে পারেন। এখানেই শুধু মুখস্থ করা আর মুখস্থের সাথে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও প্রয়োগ করতে পারার মধ্যে তফাৎ।
====
ড. মাহরুফ চৌধুরী : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য
mahruf@ymail.com
পরিবার মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনের প্রাথমিক প্রতিষ্ঠান। এটি কেবল একটি সামাজিক সংগঠনের একক নয়, বরং নৈতিকতা, মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ ও শৃঙ্খলার প্রাথমিক পাঠশালা। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের মতে, রাষ্ট্র পরিবারের সম্প্রসারিত রূপ। কাজেই একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়তে চাইলে আমাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে দেশের প্রতিটি পরিবারকে এক একটি আদর্শ পরিবার হিসেবে গড়ে তোলার জন্য, যাতে করে সুনাগরিক ও সুশাসক তৈরির প্রাথমিক প্রক্রিয়াটি পরিবারেই শুরু হয়।
জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট (১৭২৪-১৮০৪) মতে, ‘নৈতিক শিক্ষা ছাড়া কোনও মানুষ প্রকৃত অর্থে মানুষ হয়ে উঠতে পারে না’। এই নৈতিক শিক্ষারই প্রথম পাঠ শুরু হয় পরিবারে। পরিবারে শিশুরা যেমন ভালোবাসা, সহমর্মিতা, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ শেখে, তেমনি ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা, অধিকার-দায়িত্বের পার্থক্য সম্পর্কেও ধারণা পেতে থাকে।
রাষ্ট্রীয়ব্যবস্থা থেকে এ অপসংস্কৃতির চক্র ভাঙতে হলে পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে গণতান্ত্রিক চর্চা, মতামতের স্বাধীনতা, দায়িত্ব ভাগাভাগি এবং নৈতিক শিক্ষার ভিত্তি নির্মাণ। পরিবারকে হতে হবে ন্যায়, সহমর্মিতা ও সমতার প্রথম পাঠশালা, যেখানে শিশুরা শিখবে ন্যায়-অন্যায়ের ধারণা, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল্য। কেবল তখনই একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের ভিত্তি রচনা সম্ভব।
---
আসিফ বায়েজিদ শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রম গবেষক, যুক্তরাজ্য
bayezid777@gmail.com
চিন্তা করে দেখেন, আপনি ভীষণ ক্ষুধার্ত, অপুষ্টি আর রোগে ভোগা একজন মানুষ। তেমন সময় আপনাকে ঠাণ্ডা জমাট একটি আইসক্রিম এনে দিলে সেটা খেয়ে আপনার কতটা উপকার হবে? আপনার তখন পাওয়ার কথা পুষ্টিকর খাবার ও ফলমূলের সরবরাহ আর ধারাবাহিকতা। মন ভোলানো আইসক্রিম খেয়ে আপনার আনন্দ লাগতে পারে, কিন্তু আপনার পক্ষে দেহগঠন বা ভারী কোনো কাজ করা কতটা সম্ভব হবে, সে বিবেচনা আপনার ওপরই ছেড়ে দিলাম।
একই কাণ্ড ঘটেছে শিক্ষায়। হয় ক্ষমতাসীন দলের প্রচারণা অথবা চটকদার কোনো চমক দেখানো ছাড়া আমাদের শিক্ষার আর বিশেষ কার্যকারিতা দেখি না। প্রমাণ চান? বঙ্গদেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী নিরক্ষর। ক্লাস থ্রি থেকে ফাইভের শিক্ষার্থীদের অর্ধেকের বেশি বাংলা-ইংরেজি পড়ে বুঝতে পারে না, যোগ-বিয়োগ পারে না। বিভ্রান্ত হয়ে মাধ্যমিক আর উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় আগ্রহী প্রার্থীদের ১০ শতাংশ ও ন্যূনতম পাস নম্বর তুলতে পারে না।
13
সংস্কারের জন্য আমাদের জ্ঞান ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার সংমিশ্রণে একটা নতুন পদ্ধতি তৈরি করতে হবে। মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরশীলতা ভাঙতে হবে। এটি বাস্তবায়ন করতে হলে শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অভিভাবক সবাইকে সম্পৃক্ত করতে হবে। বিগত সরকার সবাইকে সম্পৃক্ত না করে সচেতনতা না বাড়িয়েই নতুন পদ্ধতি বাস্তবায়ন করতে গিয়েছিল, তাই সেটা ব্যর্থ হয়েছে। শিক্ষা খাতের সংস্কার দ্রুত করার কোনো সুযোগ নেই, সময় নিয়ে ধাপে ধাপে করতে হবে। যত বেশি সম্ভব অংশীদারকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
বিভিন্ন শিল্পে প্রচুর বিদেশী নাগরিক কাজ করছে। তারা কোন দেশ থেকে এসেছে, সে তথ্য হয়তো আছে, কিন্তু তারা কে কোন খাতে কাজ করছে, কী ধরনের পদে কাজ করছে, সে তথ্য সরকারের কাছে নেই। সে জায়গাগুলোয় আমাদের তরুণরা কেন যেতে পারছে না? কেউ তো নিজের ইচ্ছায় বিদেশীদের কাজ দিতে চায় না, তারা দেশী লোকই চায়। এ স্কিল গ্যাপ চিহ্নিত করে আমাদের শিক্ষার্থীদের সে স্কিলগুলো দিতে হবে।
জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়া পাশে ইআরএফের সভাপতি দৌলত আরা, বিএফইউজের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী ও ডিইউজের সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম।
ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত
উচ্চশিক্ষার মান বৃদ্ধি করতে আমাদের ইংরেজি ভাষা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকেই ইরেজি শিক্ষা চালু করতে হবে। বিভিন্ন শিক্ষা কমিশন রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, তৃতীয় শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থীরা বিদেশি ভাষা শিখতে (গ্রহণ করতে) পারে। উচ্চশিক্ষাঙ্গনকে রাজনীতিমুক্ত রাখতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে, ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের পাঠ্যসূচি (শিক্ষাক্রম) হবে আধুনিক, আন্তর্জাতিক ও সমকালীন। শিক্ষাক্রম এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যেন শিক্ষার্থীর অর্জিত জ্ঞান মানুষ ও সমাজের কল্যাণে ব্যবহার করা যায়। মোটকথা, শিক্ষা হতে হবে কর্মমুখী ও গণমুখী।
===========
বিভাস গুহ : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক bivashguha32261@gmail.com
প্রতিদিন বিভিন্নভাবে মানুষ শিক্ষা লাভ করে থাকে। কবি সুনির্মল বসুর ভাষায়, ‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর/সবার আমি ছাত্র/নানান ভাবের নতুন জিনিস/শিখছি দিবারাত্র। এ পৃথিবীর বিরাট খাতায়/পাঠ্য যেসব পাতায় পাতায়/শিখছি সেসব কৌতূহলে/সন্দেহ নাই মাত্র।’ সত্যিই শেখার শেষ যেমন নেই, বয়সও তেমন নেই। প্রত্যেক শিশুর প্রথম শিক্ষক হচ্ছেন মা, তারপর পরিবার। পরিবারের কাছ থেকে প্রথমে শিশু শিক্ষালাভ করে। পারিবারিক শিক্ষা শিশুর জীবনে বেশি প্রভাব ফেলে। পরিবারের মানুষদের আচার-আচরণ শিশুকে প্রভাবিত করে; তাই শিশুদের সঙ্গে পরিবারের সবাইকে আচরণে সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। পরিবারের পর শিশুরা বিদ্যালয় গমনোপযোগী হলে বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। শিশুর প্রথম আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় প্রাথমিক বিদ্যালয় বা সমমানের প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে। সে অর্থে প্রতিটি শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
-----
মো. মুজিবুর রহমান : অধ্যাপক (শিক্ষা) ও সাবেক অধ্যক্ষ, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ
====
অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেছেন, বিশ্ব নাগরিক হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে, সেই ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা চাই আমরা। এজন্য যা কিছু প্রয়োজন, সব যেন শ্রেণিকক্ষ থেকেই অর্জন করা সম্ভব হয়। বর্তমান বিশ্বে মাতৃভাষার পাশাপাশি ইংরেজি এবং আরও অন্তত একটি ভাষা জানা জরুরি। বর্তমানে মানবজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বেড়েই চলেছে। পাশাপাশি বর্তমানে চিকিৎসাসহ নানান ক্ষেত্রে রোবোটিক্স ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব বিদ্যা এবং তা কাজে লাগানোর শিক্ষা জরুরি। নইলে আমাদের পিছিয়ে পড়তে হবে। দৃষ্টান্ত হিসাবে নার্সিং শিক্ষার কথা বলা যেতে পারে। শুধু দেশের ভেতরে নয়, বাইরেও নার্সের কর্মসংস্থানের বাজার অবারিত। নার্সদের কাজ কেবল আগের মতো রোগীর বিছানাপত্র গুছানো আর ওষুধ খাওয়ানোর মধ্যেই সীমিত নয়। ডাক্তারের অনুপস্থিতিতে তাকে রোগীর সংকটকালে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হয়। এখন নার্সকে যদি সেভাবে গড়ে তুলতে হয় তবে নার্সিং শিক্ষাক্রম আধুনিকায়ন ও প্রয়োজনের নিরিখে সাজাতে হবে।
ড. মোহম্মদ আবদুল বারী : ব্রিটিশ বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ, গ্রন্থকার, নাগরিক অ্যাডভোকেট ও প্যারেনটিং কনসালটেন্ট https://drabdulbari.com/
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্কুল কিংবা মাদ্রাসা-উভয় ক্ষেত্রেই প্রাথমিক স্তরের শিক্ষায় বিনিয়োগ এখন কেবল স্রেফ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়; বরং আমাদের ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধি এবং নাগরিক জীবনের গুণমান নিশ্চিত করতে এটিকে প্রধান জাতীয় অগ্রাধিকার হিসাবে বিবেচনা করা উচিত। এ বিষয়ে ইতিহাসের সাক্ষ্য খুবই স্পষ্ট। জাপান যখন উপলব্ধি করল, তারা পশ্চিমা বিশ্বের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছে, তখন মেইজি শাসকরা একটি সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন : কেবল সমরাস্ত্র বা বাণিজ্যের মাধ্যমে নয়, বরং প্রতিটি শিশুকে শিক্ষিত করে তোলার মাধ্যমে তারা আধুনিকায়নের দিকে এগোবে। সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, মানসম্মত শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং একটি সুশৃঙ্খল ও মেধাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে জাপান মাত্র এক প্রজন্মের ব্যবধানে বিশ্বের অন্যতম উদ্ভাবনী ও শিক্ষিত জাতিতে পরিণত হয়েছিল।
বাধ্যতামূলকভাবে সপ্তাহে ১-২ ঘণ্টা বিতর্ক, খেলাধুলা, শিল্পচর্চা, পাঠচক্র ও বিজ্ঞান ক্লাবের মতো সহপাঠ্য কার্যক্রম চালু করতে হবে। মানসিক সুস্বাস্থ্য, সামাজিক সম্পর্ক, নৈতিকতা, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, ডিজিটাল নাগরিকত্ব এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মতো বিষয়গুলো শেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষা, আচরণ ও মানসিক সুস্থতায় সন্তানকে সহায়তা করার জন্য অভিভাবকদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও সহায়তা প্রদান।
ড. হাসনান আহমেদ : প্রফেসর, ইউআইইউ; প্রাবন্ধিক ও গবেষক; প্রেসিডেন্ট, জাশিপ
যোগাযোগঃ
অধ্যাপক ড. হাসনান আহমেদ
ফোন নম্বর: ০১৭১৮৬৩৪০৫৭
G-20, Extension Pallabi, Mirpur, Dhaka-1216
01718634057
ই-মেইল: hasnanahmed@yahoo.com
Web page: pathorekhahasnan.com
শিক্ষার মধ্যে পুরোপুরি তিনটি অংশ থাকতেই হবে-এক. শিক্ষা হতে হবে জীবনমুখী; দুই. শিক্ষা হতে হবে কর্মমুখী; এবং তিন. শিক্ষা মনুষ্যত্ববোধ-সঞ্চারক হতে হবে। এ তিনটি উদ্দেশ্যের বাস্তবায়নের ফল হবে একজন শিক্ষিত লোকের বৈশিষ্ট্য; অথবা এ ত্রিমুখী শিক্ষা যে অর্জন করবে, তাকে আমাদের সমাজে শিক্ষিত লোক বলব। নিজের উন্নয়নে, সামাজিক ও দেশের উন্নয়নে সে অবদান রাখতে পারবে। এভাবে শিক্ষা দিতে গেলে নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই তা শুরু করতে হবে।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে এদেশে ভালো শিক্ষকের সংখ্যা ক্রমেই বিলীন হওয়ার পথে। শিক্ষক হতে গেলে তার মধ্যে শিক্ষা ও জ্ঞান যেমন থাকতে হবে, আবার জ্ঞানান্বেষীও হতে হবে। অনেক শিক্ষক নিম্নমানের শিক্ষা নিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রেও ইতোমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। নিম্নমানের ,,,,, টাকা কিংবা মামা-খালুর জোরে শিক্ষক হয়ে শিক্ষাঙ্গনে ঢুকেছে। শিক্ষাঙ্গনে এদের পাল্লা এখন ভারী। তাদের যত বেশি করেই প্রশিক্ষণ দেওয়া হোক না কেন, কাঠ কখনো ইটে রূপান্তরিত হয় না।
শিক্ষক যত খারাপই হোক, যদি ছাত্রছাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত সময় দিত, মন দিয়ে পড়াত, প্রশিক্ষণটা কাজে লাগাত, শিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণ না করত, প্রাইভেট টিউশনির রমরমা ব্যবসা না ফাঁদত, তাহলে পরিস্থিতির কিছুটা হলেও উন্নতি হতো। শিক্ষকদের এখন শুধু বেতন বাড়ানোর দিকে ঝোঁক। সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের রাত-দিন একটাই চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে-‘কীভাবে বেতন বাড়ানো যায়’। একজন নিম্নমানের শিক্ষক শিক্ষাঙ্গনে ঢুকলে হাজার হাজার ছেলেমেয়ের জীবন নষ্ট হয়ে যায়। ভুগছে কোমলমতি অবুঝ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
===
অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এখন বহু জায়গায় খণ্ডকালীন চাকরি করেন, কোচিং করান। এসব করতে গিয়ে তারা ক্লাস নেওয়ার আগেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। আবার বাস্তবতা এমন, তারা যে বেতন পান, তা দিয়ে সংসার চলে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যেখানে তিন জায়গায় কাজ করে জীবিকা চালান, সেখানে নর্থ সাউথ বা অন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক একই শহরে চার-পাঁচ গুণ বেশি বেতন পান। এ বৈষম্য কীভাবে টিকিয়ে রাখা যায়? যে শিক্ষক একবার নর্থ সাউথে যাবেন, তার তো দিন সেখানেই শেষ। তিনি তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনো সেবা দিতে পারলেন না। এ রকম তিনটি জায়গায় কেউ গেলে, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সেবাটা কী দেবেন? এটি আবার আইন করে বন্ধ করা সম্ভব না। কারণ, যতদিন ক্ষুধা থাকবে, তা নিবারণের চেষ্টা তিনি করবেন।
বিগত সরকারের আমলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় না চাইলেও, সেখানে উন্নয়নে এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গাছ কেটে, জলাভূমি-খাল সব ভরাট করে উঠতে থাকল ভবন। মুনাফা হলো ঠিকাদারের, শিক্ষার কী লাভ হলো জানি না!চাহিদা ও পরিকল্পনা ছাড়া ঢালাওভাবে ভবন নির্মাণ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় মানে শুধু ভবন নয়, এটি হলো চিন্তার কৌটায় আলো জ্বালানো। এটা হতে হবে শতবছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানে।