জেন্টাল প্যারেন্টিং
পরীক্ষার নিয়ম কানুনের জন্য এই লিঙ্কে প্রবেশ করুন -https://www.sunagorik.net/0
জেন্টাল প্যারেন্টিং
পরীক্ষার নিয়ম কানুনের জন্য এই লিঙ্কে প্রবেশ করুন -https://www.sunagorik.net/0
( নিচের প্রথম অংশটুকু শুধুমাত্র বাবা-মার শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্য)
প্রথম অংশ
অভিভাবক-শিক্ষকদের সূচিপত্র
১। লেখকের কথা-
২। প্রকাশকের কথা-
৩। বাবা-মা ও শিক্ষক এই লেখাটি মনোযোগ দিয়ে পড়ুন-
৪। পিতা-মাতা, অভিভাবক ও শিক্ষক কর্তৃক শিশুর প্রতি কোমল আচরণ বা জেন্টল প্যারেন্টি-
৫। প্যারেন্টিং স্টাইল-
৬। টিনএজ সন্তানের প্রতি মা-বাবার আচরণ-
৭। টিনএজ সন্তানের মা-বাবার প্রতি কিছু পরামর্শ-
৮। সন্তানকে অভাব ও আভিজাত্য দুটোই শেখাবেন-
৯। ইচ্ছাশক্তির চেয়ে চারপাশের পরিবেশ বেশি শক্তিশালী-
১০। সন্তানকে ঘুম থেকে তোলার সময় কিছু ভুল-
১১। বাচ্চাদের পড়ালেখায় আগ্রহী করতে-
১২। ভাইবোনের দ্বন্দ্ব ও ‘গোল্ডেন চাইল্ড’ সিনড্রোম-
১৩। বাচ্চার জেদ ও ম্যানিপুলেটিভ' আচর-
১৪।খাবারের ঘুষ বা ইমোশনাল ইটিং-
১৫। বাচ্চা লালন-পালনে ৫টি জাপানি শিক্ষা! -
১৬। কোরিয়ান বাচ্চাদের 'নুনচি' (ঘঁহপযর)-
১৭। ফ্রেঞ্চ বাচ্চারা কেন খাওয়ার সময় জেদ করে না-
১৮। জাপানি বাচ্চাদের টিফিনের বক্স-
১৯। ফাদার উন্ড জেনারেশনাল ট্রমা-
২০। ‘আমার বাচ্চা অন্যদের চেয়ে এগিয়ে’ মানসিকতা-
২১। শিশুকে সামাজিক দক্ষতা শেখান-
২২। একসঙ্গে অনেক কথা বলবেন না-
২৩। দূর থেকে চিৎকার না করে কাছে যান-
২৪। একই কথা বারবার বলবেন না-
২৫। শোনার ও দেখার অভ্যাসকে মজার করে তুলুন-
২৬। সন্তানের কথা শুনুন-
২৭। ঘরের নিয়ম শিখিয়ে দিন-
২৮। সন্তানের জন্য মানসম্মত সময় দিন-
২৯। ভালোবাসা প্রকাশ করুন-
৩০। সন্তানের আচরণে মনোযোগ দিন-
৩১। বয়ঃসন্ধিকালে বন্ধুদের চাপে ভুল পথে যাওয়া-
৩২। ‘ওভার-প্যারেন্টিং’ একটি সংক্রামক মহামারি-
৩৩। শারীরিক শাস্তি-
৩৪। বুলিংয়ের সাইকোলজি-
৩৫। বাচ্চাদের মস্তিষ্ক বিকাশে আপনি কী করবেন?-
৩৬। যারা মুখস্থ করতে পারেন না, তারা মেধাবী-
৩৭। বাচ্চাদের বুদ্ধি বিকাশের অন্যতম পথ, দৌড়-
৩৮। বাচ্চাকে কখনো আড়ালে লুকিয়ে খেতে দেবেন না-
৩৯। ধর্ম ভালো কিন্তু ধর্মান্ধতা নয়-
৪০। উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করুন-
৪১। সন্তানের সাথে কিভাবে গড়ে তুলবেন নিবিড় বন্ধন-
৪২। ছেলে আর মেয়েতে তফাৎ করবেন না-
৪৩। বকা-ঝকা নয়, শিশুদেরকে আনন্দের মাঝে রাখুন-
৪৪। সন্তানের পড়াশোনা, খেলাধুলায় উৎসাহ দিন-
৪৫। সন্তানের আগ্রহকে গুরুত্ব দিন-
৪৬। নেগেটিভ কথা বাচ্চাকে কখনোই বলবেন না-
৪৭। এই মুহূর্তে কান্না বন্ধ করো-
৪৮। লিঙ্গ বিভেদ না করে দলগত কাজের অনুপ্রেরণা দিন-৪৯
৪৯। দাঁড়াও, তোমার বাবা/মা আসুক!-
৫০। বাচ্চাকে হেরে যেতে দিন-
৫১। বাচ্চাকে দায়িত্ব নিতে দিন-
৫২। বাচ্চার শখকে উৎসাহ দিন-
৫৩। সত্যিটা জানান-
প্রিয় শিক্ষার্থী ও অভিবাবক,
জাপান ও ইউরোপের গ্র্যাজুয়েশন লেভেল পর্যন্ত শিষ্টাচার পর্যবেক্ষণ করে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য ৫ বছরের চেষ্টায় তৈরি করেছি, এই ‘২০০শিষ্টাচার’ পুস্তিকাটি। এই বইটি শিক্ষার্থীদের মাঝে বিলি করে একটি প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। এই প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ সবাইকে একটি আয়োজিত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পুরস্কৃত করা হয় এবং তাদেরকে সাপ্তাহিক ‘আনন্দের আড্ডার মাধ্যমে' ২০টি সফ্টস্কিলে দক্ষতা অর্জনের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।
বিষয়গুলো হচ্ছে--১) জ্ঞান ও তথ্য জানায় কৌশল, ২) অন্যদের সঙ্গে ইতিবাচক আচরণ, ৩) জনসম্মুখে উপস্থাপনা ও বক্তৃতা দেবার দক্ষতা অর্জন, ৪) সততা ও নৈতিকতা, ৫) আত্মনির্ভরশীলতা, ৬) কর্তব্যনিষ্ঠাতা ও শৃঙ্খলাবোধ, ৭) গুরুজন ও মহিলাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা, ৮) সমন্বয় ও নেতৃত্ব দানের ক্ষমতা, ৯) অভিযোগ প্রতিকারে সহযোগিতা, ১০) অন্যকে বুঝানোর দক্ষতা, ১১) নিরপেক্ষতা বজায় রাখার ক্ষমতা, ১২) শোনে-বুঝে পরিমিত কথা বলার দক্ষতা, ১৩) মানসিক দৃঢ়তা, ১৪) সুবিধা।। বঞ্চিতদের প্রতি দাত্বিবোধ ১৫) চাহিদা নিয়ন্ত্রনে পারদর্শিতা ১৬) 'গিভ এন্ড টেক' নীতির চর্চা ১৭) সিদ্ধান্ত নেয়ার কৌশল, ১৮) ব্যার্থতা বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা ১৯) উত্থান-পতন মেনে টিকে থাকার পারদর্শিতা ২০) পরিকল্পিত উপায়ে কাজ করা ।
পাশাপাশি হলিডে ক্যাম্পিং-এ কিছু প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। যেমন- ১) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বা মক ড্রিল, ২) আগুন, ভূমিকম্প, বা সন্ত্রাসী হামলা মোকাবিলার কলাকৌশল। ৩) হঠাৎ অসুস্থ বা আহত ব্যক্তির চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ৪) পরিবেশ ও প্রকৃতিকে সংরক্ষণ, ৫) নিরাপদ খাদ্য শৃঙ্খলা, ৬) ময়লা ব্যবস্থাপনা 'স্পোগোমি গেম' ৭) স্টোরিটেলিং, ৮। মেমোরি গেম, ৯) গেমস জিমন্যাস্টিকস, ১০) সাইকেলিং ইত্যাদি প্রশিক্ষণ।
গত এক বছরে আমরা রাজধানীর লালবাগের ‘ইস্ট অ্যান্ড স্কুল’ থেকে শুরু করে কালীগঞ্জ, গাজীপুরের বেরুয়া হাইস্কুল পর্যন্ত অসংখ্য স্কুল-কলেজে সফলতার সাথে এই প্রোগ্রামটি পরিচালনা করে আসছি। এই কার্যক্রম সারাদেশে প্রসারিত করার জন্য শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সকলের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা কামনা করছি। -আবু ওবাইদ, নির্বাহী পরিচালক, সুনাহরিক সংঘ, ০১৫৫১-৯৬ ৯৬ ৯৬, ০১৬-৭৭ ৮৮ ৯৯ ০১
প্রকাশকের কথা
“ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বুর্দোর মতে, প্রতিটি মানুষ ‘হ্যাবিটাস’ দ্বারা পরিচালিত হয়। হ্যাবিটাস হলো, পরিবার ও সমাজের ভেতরে বেড়ে উঠার সময় ‘গড়ে ওঠা অভ্যাস ও মানসিকতা’। অর্থাৎ শৈশবে বেড়ে উঠার পরিবেশের উপর মানুষ তৈরি হয়।”
শিক্ষার্থী ও অভিবাবক,
এ-দেশের সরকারি-বেসরকারি যে-কোনো প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোথাও সেবা নিতে গেলে দেখা যায় ‘দারোয়ান থেকে সর্বোচ্চ কর্তা পর্যন্ত’ প্রায় সবাই বেশিনভাগ ক্ষেত্রে অসৌজন্যমূলক ও অসম্মানজনক আচরণ করে। একজন সেবা গ্রহীতাকে সালাম-আদাব বিনিময় করা, বসতে বলা, সমস্যার কথা জানতে চেয়ে তার সমাধানের পথ বাতলে দেয়ার মতো সভ্য আচার-আচরণ থেকে আমরা অনেক দূরে। নিজের ভাষায় নিজের মানুষের সঙ্গে একটু সুন্দর ও বিনয়ী আচরণ করার মতো শিক্ষা, মন-মানসিকতা আর সময় কোনোটাই থাকে না আমাদের কাছে। এর কারণ আমাদের সমাজ ব্যবস্থা ও শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা ও আদব-কায়দার চর্চা বা অনুশীলনের অভাব।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতা করতে শেখায়। শিশু-কিশোরেরা একে অপরের প্রতিযোগী হয়। একজন আরেকজনকে টপকে যাবে, মনে প্রাণে এই চেষ্টা থাকে; সঙ্গে যুক্ত হয় মা-বাবা। ফলে আমাদের জীবনে ঘাড়তি থেকে যাচ্ছে অন্যের প্রতি মানবতাবোধ, আদবকেতা আর সহযোগিতার মানসিকতা। জাতি হিসেবেই আমরা ক্রমেই অমানবিক ও অসহিষ্ণু হয়ে উঠছি।
৭৫ বছরের বেশি সময় ধরে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা শত শত শিশু ও তাদের অভিভাবকদের জীবন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ করে দেখেছেন, যেসব শিশু ছোটবেলা থেকেই পরিবার-পরিবেশের কাছ থেকে আন্তরিক ভালোবাসা, মানসিক সমর্থন ও ইতিবাচক সম্পর্ক পায়, তারাই পরবর্তী জীবনে তুলনামূলক বেশি সুখী, সফল ও সার্থক জীবন লাভ করে। কাজেই নৈতিকতা ও আদবকেতা শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। -প্রকাশক
বাবা-মা, অভিভাবক ও শিক্ষক’ এই লেখাটি মনোযোগ দিয়ে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া স্টেটের স্কুলশিক্ষক ‘জেন এলিয়ট’ তার শিক্ষার্থীদের উপর একটি এক্সপেরিমেন্টটি চালান। মার্টিন লুথার কিং-এর চিন্তাধারা তাকে সবসময় প্রভাবিত করতো। ১৯৬৮ সালে যখন মার্টিন লুথার কিংকে খুন করা হয়, তারপর থেকেই তিনি তার ছাত্র-ছাত্রীদের বর্ণবাদ, বৈষম্য এই ব্যাপারগুলো বোঝাতে চেষ্টা করেন। কিন্তু তা কিছুতেই ফলপ্রসূ হচ্ছিলো না।
স্থানীয় শিক্ষার্থীরা আগের মতোই মফস্বল থেকে আসা শিক্ষার্থীদের অবজ্ঞার চোখেই দেখে যাচ্ছিল। তাই, এলিয়ট প্রিয় শিক্ষার্থীদের উপর দুই মাসব্যাপী একটি এক্সপেরিমেন্ট চালালেন। প্রথমে তিনি তার ক্লাসটিকে দুটি গ্রুপে ভাগ করলেন। প্রথম গ্রুপে রাখলেন যাদের চোখের রং নীল এবং দ্বিতীয় গ্রুপে রাখলেন যাদের চোখ বাদামী। তিনি প্রথম গ্রুপ অর্থাৎ যাদের চোখের রঙ নীল তাদেরকে বাদামী চোখের শিক্ষার্থীদের চেয়ে উঁচু মর্যাদার বলে ধরে নিলেন এবং বেশি সুযোগ-সুবিধা দিতে শুরু করলেন। দ্বিতীয় গ্রুপের সদস্যদের কোণঠাসা করার জন্য তিনি তাদের বিভিন্ন দোষ-ত্রুটি সবার সামনে বর্ণনা করতে শুরু করলেন।
এর ফলাফল হলো খুবই চমকপ্রদ। প্রথম গ্রুপের শিক্ষার্থীরা অর্থাৎ যারা নিজেদেরকে সুপিরিয়র ভাবছে, তাদের আচরণ খুব দ্রুত পরিবর্তিত হতে লাগল। তারা ক্লাসে এখন সবচেয়ে মনোযোগী এবং কোনো কিছু না বুঝলে তারা সাথে সাথে প্রশ্ন করে। ক্লাস টেস্টেও তারা দ্বিতীয় গ্রুপের সদস্যদের চেয়ে অনেক ভাল করলো। সবথেকে মন খারাপ করা যে ব্যাপারটা ঘটল তা হলো, তারা তাদের দ্বিতীয় গ্রুপের বন্ধুদের সাথে খারাপ ব্যবহার করতে শুরু করল এবং তাদের উপর এক ধরনের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করতে লাগল। অন্যদিকে দ্বিতীয় গ্রুপের শিক্ষার্থীরা হীনম্মন্যতায় ভুগতে লাগল এবং সবদিক থেকে পিছিয়ে পড়তে লাগল। পরের মাসে ‘এলিয়ট’ একই এক্সপেরিমেন্ট চালালেন। কিন্তু এবার যাদের চোখের রঙ বাদামী তাদেরকে নীল চোখের শিক্ষার্থীদের চেয়ে সুপিরিয়র হিসেবে ধরে নিয়ে অনুপ্রেরণা দিতে লাগলেন। তখন ফলাফলও উল্টে গেল। অর্থাৎ নীল চোখ যাদের তারা সবকিছুতে পিছিয়ে পড়তে লাগল।
এই এক্সপেরিমেন্টটি আমাদেরকে বোঝায় যে, সমাজে যারা অবহেলিত তারা কেন পিছিয়ে পড়ে এবং নানা অপরাধের সাথে যুক্ত হয়। আর যারা সুপার পাওয়ার হয়, তারা কিসের জোরে দুনিয়াটা শাসন করে। পরিবারে বা সমাজে যদি কাউকে সমালোচনা বা অবহেলা কিংবা দমিয়ে রাখা হয়, তাহলে তার পক্ষে পাওয়ার হিসাবে গড়ে উঠা খুবই কঠিন; পক্ষান্তরে যদি কাউকে প্রশংসা ও উৎসাহিত করা হয়, তাহলে তাকে অনেকদূর নিয়ে যাওয়া সম্ভব। পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষই সম্ভাবনাময়, শুধু দরকার তার ভিতরের ঘুমন্ত শক্তিকে জাগিয়ে তোলা। নিজের পরিবার, সন্তান বা কর্মচারী কিংবা অন্য কেউ, সে যেই হোক, সর্বদা তাদেরকে প্রশংসা ও উৎসাহের মধ্যে রাখুন, দেখবেন সে সত্যিই জ্বলে উঠবে এবং তার কল্যাণে আপনি বেশি সুখী হবেন।
পিতা-মাতা, অভিভাবক ও শিক্ষক কর্তৃক শিশুর প্রতি কোমল আচরণ বা জেন্টল প্যারেন্টিং
* সন্তানের কথাগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে শুনুন। তাকে তাচ্ছিল্য করবেন না। সন্তানকে যতই শাস্তি দেবেন ততই সে অসামাজিক হবে।
* ‘সন্তানকে গুণগত সময় দিন। অর্থাৎ যতটুকু সময়ই তার সঙ্গে থাকছেন না কেন, সে সময়টুকু শুধু তাকেই দিন।
* তার সামনে কোনো অপরাধ করা বা অপরাধের পক্ষ নেওয়া থেকে বিরত থাকুন। বাবা-মা নিজেরা মিথ্যা বলবেন না, আইন ও নিয়ম ভাঙবেন না। সন্তানের সামনে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য বা তার শিক্ষকের সমালোচনা করা থেকে বিরত থাকুন; বাবা-মা একে অপরকে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ বা নিন্দা করবেন না, তর্কে জড়াবেন না।
* সন্তানের উপর অযথা চাপ তৈরি করবেন না-‘তোমাকে এটা পারতেই হবে’, এ ধরনের লক্ষ্য নির্ধারণ তাকে দেবেন না। কোনো অবস্থাতেই সন্তানকে মারবেন না, তীব্র কটাক্ষ করে বকবেন না, প্রয়োজনে বুঝিয়ে বলুন। অন্য কারও সঙ্গে সন্তানের তুলনা করবেন না, তাকে অহেতুক সন্দেহ করবেন না। গোপন নজরদারি করবেন না, প্রয়োজনে তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলুন।
* তার ভালো কাজের প্রশংসা করুন, অপছন্দের কাজ করলে একটা পর্যায় পর্যন্ত সেটির প্রতি গুরুত্ব দেবেন না। সন্তানের প্রতিভা বা আগ্রহের দিক বুঝে তা বিকাশের জন্য তাকে সুযোগ করে দিন।
*সন্তানের কোনো ব্যর্থতাকে সমালোচনা-বিদ্রƒপ করবেন না। সন্তানের ছোটখাটো সফলতার জন্য তাকে উৎসাহ দিতে হবে এবং কোনো কাজে ব্যর্থ হলে ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করে তা নিরসনের চেষ্টা করতে হবে।
*সন্তানের সঙ্গে একত্রে বিভিন্ন খেলা খেলুন। সপ্তাহে অন্তত একদিন সন্তানকে নিয়ে বেড়াতে যান। সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড, স্বেচ্ছাসেবা এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে দিন। বিকালে তাকে একটু বেড়াতে ও খেলতে দিন, একটু দৌড়-ঝাঁপ করতে দিন। শারীরিক শ্রম করতে উৎসাহিত করুন।
* সন্তানের মোবাইল ফোন বা ট্যাব ব্যবহার সীমিত করুন। প্রয়োজনে আপনি নিজেও মোবাইল ফোন ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগ ব্যবহার কমিয়ে দিন।
* পরিবারে সবাই অন্তত একবেলা একসঙ্গে বসে খাদ্য গ্রহণ করুন।
* সন্তানের বন্ধুদের গুরুত্ব দিন। ভালো বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে উৎসাহিত করুন। তবে পরিষ্কার ধারণা রাখুন, সে কাদের সঙ্গে যাচ্ছে, কোথায় সময় কাটাচ্ছে।
*সন্তানের বই-ব্যাগ, নিজের জামা, নিজের রুম, নিজের বিছানা তাকে পরিষ্কার করতে উৎসাহিত করুন। বাজার করা থেকে শুরু করে কোনো পাবলিক যোগাযোগের কাজে তাকে সংপৃক্ত করুন।
*জেন্টল প্যারেন্টিং’ মানে এই নয় যে, শিশুর বিশৃংখলাকে প্রশ্রয় দেবেন বা সব আব্দার মেনে নিবেন বরং তাকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা,শাসন ও নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
* সন্তানকে কখনো আড়ালে লুকিয়ে খেতে দেবেন না, এতে তার লুকিয়ে খাবার অভ্যাস তৈরি হবে। তাহলে ভবিষ্যতে সে আপনাকেও লুকিয়ে খাবে।
টিনএজ সন্তানের প্রতি মা-বাবার আচরণ:
* টিন এজে বাচ্চারা শিশুকাল ছাড়িয়ে কিশোরকালে পা দেয়। এ রূপান্তর শারীরিক ও মানসিকভাবে খুব কঠিন হয়। তারা চায় বাবা-মা এ কঠিন সময়ে তাদের বন্ধু হবেন। কিন্তু অনেক মা-বাবা ব্যাপারটা না বুঝে উল্টো আচরণ করেন। ফলাফল হচ্ছে- 'বিদ্রোহ'।
* ওরা কিছু বলতে চাইলেই ধমক দিয়ে থামিয়ে দেওয়া হয়। ফলে ওদের ভেতরে আগ্নেয়গিরি সৃষ্টি হয়- যা শেষ পর্যন্ত বিস্ফোরণ ঘটায়।
*তাদের প্রতিটি ভুলের জন্য বাড়িতে কড়া শাসন করা হয়। কিন্তু তারা তা চায় না- তারা সহমর্মিতা চায়। তা না পেলে তারা বেঁকে বসে। তাই কথায় কথায় বিচার না বসিয়ে ঠান্ডা মাথায় ভুলগুলো শোধরানোর পথ দেখানো উচিত। বয়সটাই ভুলের- এটা মা-বাবা যত দ্রুত বুঝবেন ততই মঙ্গল।
*তারা কোনো সমস্যার কথা বললেই মা-বাবা উপদেশের দীর্ঘ লেকচার দেন। বয়সটা লেকচার সহ্য করার নয়। তারা চায় মা-বাবা সমস্যা শুনবেন। সমাধান দেবেন। কিন্তু লেকচারের জ্বালায় তারা সমস্যার কথা বলাই বন্ধ করে দেয়।
*তারা প্রশংসা চায়। অনেক বাবা-মা ‘বাচ্চা লাই পাবে ভেবে’ তা করেন না। ফলে অভিমানের সমুদ্র তৈরি হয়। এ সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার জন্য কোনো সেতু নেই।
*মা- বাবা যখন তাদের বোঝার চেষ্টা করেন না তখন বাইরের কেউ সামান্য সহানুভূতি দেখালে তারা তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক সময় এভাবেই তাদের জন্য ফাঁদ পাতা হয়।
* মা-বাবার আরেকটি বড় ভুল হলো- টিন এজারদের শাসন করার জন্য তারা তৃতীয় পক্ষকে টেনে আনেন। এতে ওরা খুব অপমানিত বোধ করে। তাই আরো উদ্ধত হয়ে ওঠে- খুব বাজেভাবে রিয়্যাক্ট করে।
মূল কথা: 'টিন এজের বাচ্চা মানে বারুদ ঠাসা দেয়াশলাই। একটু ঘষা দেবেন দাউদাউ আগুন জ্বলে উঠবে। কাজেই শান্ত থেকে তাদেরকে ভালোবাসা দিয়ে মুড়িয়ে এগিয়ে রাখুন।
টিনএজ সন্তানের মা-বাবার প্রতি কিছু পরামর্শ:
🌑সন্তান কৈশোরোত্তীর্ণ হলে তাকে সঙ্গে নিয়ে মাঝেমধ্যে কাঁচা বাজারে যান।
🌑 পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য ও বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে যথাযথ ধারণা দিন। আর্থিক ব্যাপারে অতিরঞ্জিত ধারণা দেবেন না।
🌑বিষয় ও বয়স বুঝে তাদেরকেও পারিবারিক আলোচনায় অংশীদার করুন।
🌑সন্তানকে পরিশ্রমী ও কষ্টসহিষ্ণু করে গড়ে তুলুন। 'আমরা কষ্ট করছি যাতে তোমাদের কষ্ট করতে না হয়'- এমন ধারণা দিয়ে সন্তানকে ননীর পুতুল বানাবেন না।
🌑ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করতে শেখান। অর্থাৎ ছোটবেলা থেকেই নৈতিক শিক্ষা দিলে সে লোভ, প্রতারণা দুর্নীতি, মিথ্যা অহমিকা থেকে দূরে থাকবে।
🌑সন্তানের ব্যাপারে অতিরিক্ত গোয়েন্দাগিরি করবেন না। কিন্তু সে কী করছে, কাদের সাথে মিশছে, সে-সম্পর্কে অবগত থাকুন।
🌑সবার সামনে শিশুকে বকবেন না। ভুল ধরিয়ে অপ্রস্তুত করবেন না। আলাদা করে মমতার সাথে বুঝিয়ে বলুন, সংশোধন করে দিন।
🌑কোনো কাজ করতে বলার পর সন্তান যদি বলে 'কেন?',
এর উত্তরে বলবেন না- 'আমি বলছি তাই'। আপনার এমন মন্তব্য তার মনে হতাশা, জেদ বা একগুঁয়েমির বীজ বুনে দিতে পারে। বরং সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলুন কাজটি কেন করা প্রয়োজন।
🌑 সন্তানের যোগ্যতা নিয়ে কোনো নেতিবাচক কথা বলবেন না। কখনো বলবেন না যে, তার দ্বারা কিছু হবে না।
🌑একই কথা বার বার বলবেন না। এতে সন্তানের কাছে আপনার কথার গুরুত্ব কমে যেতে পারে। সারাক্ষণ আদেশ-নির্দেশ না দিয়ে তার করণীয় যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিন।
🌑শিশুদের কখনো অভিশাপ দেবেন না। আঘাত করবেন না। শাসন যেন কখনো ভীতিপ্রদ শাস্তিতে পরিণত না হয়।
🌑সন্তান বিপথে যায় ধীরে ধীরে। একটা অন্যায়ে ছাড় পেলে সে আরো বড় অন্যায় করতে উৎসাহিত হয়। তাই সন্তানের সাথে প্রয়োজনে দৃঢ় হতে দ্বিধা করবেন না।
🌑খেয়াল করুন, বন্ধু আত্মীয় এমনকি একই পরিবারের কারো কাছে যেতে সন্তান দ্বিধা করছে কিনা। কাউকে দেখে বা কেউ আদর করতে ডাকলে সে ভয়ে লুকিয়ে যেতে চায় কিনা। এমন মানুষের ব্যাপারে সতর্ক হোন।
🌑সন্তান যদি কখনো তার লাঞ্ছিত হওয়ার বিষয়টি বলতে চায়, তাকে জেরা না করে ধৈর্য ধরে শুনুন। তাহলে করণীয় ঠিক করতে পারবেন। উত্তেজিত হবেন না, এতে সে ঘটনা চেপে যেতে পারে। এসময় আপনার মমতা তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
🌑সন্তানকে আদরের নামে প্রশ্রয় দেবেন না ও শাসনের নামে অত্যাচার করবেন না। আদর ও শাসনের সমন্বয়ে তাকে বিকশিত হতে দিন।
🌑আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি ও ঝগড়া-বিবাদে কখনো শিশুদের জড়াবেন না।
🌑মাদ্রাসা/এতিমখানার অর্থসংগ্রহের কাজে আপনার শিশুদের নিয়োজিত করবেন না। ক্রমাগত অন্যের করুণা বা দয়া পেতে অভ্যস্ত হলে, সে শিশু কখনো স্বাবলম্বী ও দাতা হতে পারে না।
🌑 শিশুসন্তানকে অতিরিক্ত উপহার, খেলনা ও বিলাসিতায় অভ্যস্ত করবেন না।
🌑পরিবারে মিথ্যা বলা, গালিগালাজ করা, অন্যের দুর্নাম করার প্রবণতা থাকলে তা পরিহার করুন। আত্মীয়, প্রতিবেশী সম্পর্কে বাসায় নেতিবাচক মন্তব্য/সমালোচনা করবেন না।
🌑 সন্তান কোনোকিছু চাওয়ার সাথে সাথেই তাকে তা দেয়ার অভ্যাস পরিহার করুন। তাকে অতিরিক্ত হাতখরচ দেবেন না। কিন্তু যৌক্তিক প্রয়োজন পূরণে আন্তরিক হোন।
🌑সন্তানের যে-কোনো অর্জন ও সাফল্যে তাকে অভিনন্দন জানান, প্রশংসা করুন। যে-কোনো ব্যর্থতায় তার পাশে দাঁড়ান, উৎসাহ দিন। আপনার উৎসাহ তার ব্যর্থতাকেও সাফল্যে রূপান্তরিত করবে।
🌑 নারী-পুরুষ, ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাইকে সম্মান করতে শেখান। বিশেষত ছেলে সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই নারীদের সম্মান করতে শেখান।
🌑 অন্য ধর্মের কারো সাথে মিশবে না'- এ ধরনের কথা শিশুকে বলবেন না। তাকে সব ধর্ম ও মতের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে গড়ে তুলুন।
🌑 শিশুকাল থেকেই সন্তানের মধ্যে দানের অভ্যাস গড়ে তুলুন। দেয়ার আনন্দ তাকে উদার করবে।
🌑 সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা দিন। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত করুন।
🌑 অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমানোর অভ্যাসকে প্রশ্রয় দেবেন না। শিশুসন্তানকে রাত ৯টার মধ্যে ঘুমাতে ও ভোরে ঘুম থেকে উঠতে উৎসাহিত করুন।
🌑দৃষ্টি-শ্রবণ-বাকক্তিহীন, চলৎশক্তিহীন এবং মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির প্রতি সমমর্মী ও সহযোগিতাপরায়ণ হতে সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই শেখান। তাদের নিয়ে কোনো ধরনের কটুক্তি/ব্যঙ্গবিদ্রুপ করা গর্হিত কাজ।
🌑শৈশব থেকেই সন্তানকে বলুন, 'তোমাকে ভালো মানুষ হতে হবে। মানুষের কল্যাণে কাজ করতে হবে।' জীবনের লক্ষ্য নিরূপণে তাকে সহযোগিতা করুন।
🌑দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও বীরত্বগাথা সম্পর্কে শিশুকে ধারণা দিন। সে যে এক মহান জাতির উত্তরসূরি- এ প্রত্যয় তার মনে গেঁথে দিন।
সন্তানকে অভাব ও আভিজাত্য দুটোই শেখাবেন
যখন একটি শিশু জানতে পারে যে অর্থ উপার্জনের জন্য পরিশ্রম করতে হয় এবং প্রতিটি জিনিস সহজে পাওয়া যায় না, তখন তার মধ্যে কৃতজ্ঞতা ও সংযমের মনোভাব তৈরি হয়। সে অপচয় কম করে এবং অন্যের কষ্টকে সম্মান করতে শেখে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু ছোটবেলা থেকে সীমিত সম্পদের মূল্য বুঝে বড় হয়, তারা ভবিষ্যতে আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বেশি দায়িত্বশীল হয়। একই সঙ্গে তারা ব্যর্থতা মোকাবিলায়ও তুলনামূলকভাবে বেশি সক্ষম হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে আভিজাত্যের শিক্ষা সন্তানকে আত্মমর্যাদা, পরিচ্ছন্নতা, শিষ্টাচার ও উন্নত জীবনযাপনের মানদণ্ড শেখায়। সমাজে চলাফেরা, অতিথি আপ্যায়ন, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলা এবং নিজের স্বপ্নকে বড় করে দেখার মানসিকতা আভিজাত্যবোধ থেকে আসে। একটি শিশু যদি কখনো ভালো পরিবেশ, উন্নত সংস্কৃতি ও সুন্দর জীবনধারার সঙ্গে পরিচিত না হয়, তাহলে সে নিজের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ ভেবে নিতে পারে। তাই তাকে উন্নত জীবনের স্বাদ ও সৌন্দর্য সম্পর্কে জানানো প্রয়োজন। এতে সে বড় লক্ষ্য স্থির করতে এবং তা অর্জনের জন্য পরিশ্রম করতে উদ্বুদ্ধ হয়।
মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিশুর মানসিক দৃঢ়তা গড়ে ওঠে বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। শুধুমাত্র প্রাচুর্য তাকে ভোগবাদী করে তুলতে পারে, আবার শুধুমাত্র অভাব তাকে হতাশ বা সংকুচিত মানসিকতার মানুষ বানাতে পারে। গবেষণায় দেখা যায়, যেসব পরিবার সন্তানদের বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ উভয়ের সঙ্গে পরিচিত করায়, তাদের মধ্যে সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বেশি থাকে। তারা অন্য মানুষের অবস্থাও সহজে উপলব্ধি করতে পারে, ফলে সহানুভূতিশীল ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে।
অভাব ও আভিজাত্যের সমন্বিত শিক্ষা সন্তানকে সামাজিক ভারসাম্য শেখায়। সে যেমন দরিদ্র মানুষের কষ্ট বুঝতে পারে, তেমনি উচ্চমানের পরিবেশেও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চলতে পারে।
মানুষের ইচ্ছাশক্তির চেয়ে তার চারপাশের পরিবেশ বেশি শক্তিশালী
কোনো ফসলের বীজকে যদি দুই ভাগে ভাগ করে একভাগ পিচঢালা রাস্তা বা মরুভূমিতে ছিটানো হয় এবং অন্যভাগ ভেজা উর্বর মাটিতে ছিটানো হয়, তাহলে উর্বর মাটির বীজ গাছ হয়ে বেড়ে উঠলেও, পিচঢালা রাস্তা বা মরুভুমিতে ছড়ানো বীজ কখনো গাছ হতে পারবে না। এখানে বীজের ভিতরের শক্তি বা গুণ নয়, বরং পরিবেশই কাজ করে। কারণ একটা বীজ তখনই গাছ হয়ে উঠবে, যখন সে উপযুক্ত পানি মাটি এবং আলো-বাতাস পাবে।
৫ বছরের বেশি সময় ধরে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা শত শত শিশু ও তাদের অভিভাবকদের জীবন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ করে দেখেছেন, যেসব শিশু ছোটবেলা থেকেই পরিবার-পরিবেশের কাছ থেকে আন্তরিক ভালোবাসা, মানসিক সমর্থন ও ইতিবাচক সম্পর্ক পায়, তারাই পরবর্তী জীবনে তুলনামূলক বেশি সুখী, সফল ও সার্থক জীবন লাভ করে।
মনস্তত্ত্বে একে বলা হয় Law of Environment, "Your environment will always win over your willpower (আপনার ইচ্ছাশক্তির চেয়ে আপনার চারপাশের পরিবেশ সবসময় বেশি শক্তিশালী)। আপনি যতই মোটিভেশনাল ভিডিও দেখেন না কেন, আপনি যদি একটি নেতিবাচক পরিবেশে থাকেন, তবে আপনার অবচেতন মন সেই পরিবেশেরই রূপ নেবে। আমি পানের দোকানে গেলে পানই পাব, রসগোল্লা পাব না। আমি রাগওয়ালার সাথে মিশলে রাগ পাব, হিংসাওয়ালার সাথে মিশলে হিংসা পাব।
আমরা অনেকেই মনে করি, "আমি যার সাথেই মিশি না কেন, আমি আমার মতো থাকবো।" এটি একটি ভুল ধারণা।
The Mirror Neuron Effect : আমাদের ব্রেনে এক ধরণের নিউরন থাকে যাকে বলা হয় 'মিরর নিউরন'। নিউরোসায়েন্সের গবেষণা অনুযায়ী, আমরা যখন নির্দিষ্ট কোনো মানুষের সাথে সময় কাটাই, আমাদের ব্রেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, কথা বলার ধরণ, রুচিবোধ এবং অভ্যাসগুলোকে 'কপি' করতে শুরু করে। আপনি অজান্তেই আপনার বন্ধুদের মতো হয়ে যাচ্ছেন! অর্থাৎ জিম রনের সূত্র: আপনি সবচেয়ে বেশি সময় যে ৫ জন মানুষের সাথে কাটান, আপনার উপার্জন, চিন্তা এবং চরিত্র ঠিক সেই ৫ জনের গড় মানের সমান হবে।
The Social Contagion Studz : হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির একটি দীর্ঘমেয়াদী গবেষণায় দেখা গেছে, আপনার বন্ধু যদি স্থূলতা (Obesity), ধূমপান বা হতাশার মধ্য দিয়ে যায়, তবে কোনো কারণ ছাড়াই আপনারও সেইসব সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ৫৭% পর্যন্ত বেড়ে যায়।
ডিজিটাল যুগের মোবাইল স্ক্রলিং: সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনি সচেতন বা অবচেতনভাবে যা দেখছেন, সোশ্যাল মিডিয়ার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) আপনাকে ঠিক সেই ধরণের কনটেন্টই বারবার দেখাতে বাধ্য করছে। এর ফলে আপনি একটি Echo Chamber বা বন্ধ ঘরে বন্দি হয়ে যাচ্ছেন। সস্তা, নেতিবাচক, ট্রোল বা উস্কানিমূলক কনটেন্ট দেখতে দেখতে আপনার চিন্তাভাবনা, রুচিবোধ, অভ্যাস, প্রোডাক্টিভিটি এবং মোরালিটি (নৈতিকতা) ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
আমার চিন্তাভাবনা কেমন, আমার রুচিবোধ কেমন, আমার অভ্যাস, আমার প্রোডাক্টিভিটি, আমার মোরালিটি- এগুলো অনেকটা এখন আরও কিছু বিষয়ের পাশাপাশি আমি কেমন কনটেন্ট কনজিউম করছি তার উপর নির্ভর করে।
আমরা যতবেশি ভালো কনটেন্টের সাথে এবং ভালো ও উন্নত মানের মানুষের সাথে থাকবো, তত বেশি ভালো থাকবো ও উন্নত জীবন পারো।
প্যারেন্টিং স্টাইল
জেন্টল প্যারেন্টিং কী?
জেন্টল প্যারেন্টিং হলো শিশু লালন-পালনের এমন একটি পদ্ধতি যা সংযোগ, সহানুভূতি, সম্মান, শিশুর অনুভূতির স্বীকৃতি এবং ইতিবাচক শৃঙ্খলার ওপর গুরুত্ব দেয়। এটি মূলত গত দশকে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা একটি আধুনিক প্যারেন্টিং ধারণা।
মনোবিজ্ঞানী ডায়ানা বাউমরিন্ড ১৯৬০-এর দশকে প্যারেন্টিং স্টাইলের একটি বিখ্যাত শ্রেণীবিভাগ তৈরি করেন, যা পরবর্তীতে ম্যাকোবি ও মার্টিন সম্প্রসারিত করেন। এখন পর্যন্ত ৬ধরনের পেরেন্টিং স্টাইল লক্ষ্য করা যায় :
১.Authoritarian (স্বৈরাচারী)
এ ধরনের প্যারেন্টিং-এ বাবা-মা শিশুদের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তারা সন্তানের কাছ থেকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি প্রত্যাশা করেন। এই প্যারেন্টিং-এ বাবা মায়েরা সন্তানের অন্ধ আনুগত্য প্রত্যাশা করেন। যেখানে শাস্তির পরিমাণ এবং ধরনও খুব কঠিন হয়। উদাহরণ: কোনো প্রশ্ন নয়, যা বলছি তাই করো। না মানলে শাস্তি পাবে।
এ ধরনের প্যারেন্টিং-এ সন্তানেরা সাধারণত প্রচÐ মানসিক চাপের মধ্যে বড়ো হয়। হীনমান্যতা এবং প্রায় সময় অপরাধবোধে ভোগে। তাদের মধ্যে আত্মসম্মানবোধ এবং আত্মবিশ্বাস-এর প্রচুর ঘাটতি থাকে। তাদের মধ্যে মানসিক সমস্যা বেশি দেখা যায় এবং পড়াশোনাতেও পিছিয়ে থাকে।
২. Authoritative (কর্তৃত্বপূর্ণ)
এ ধরনের প্যারেন্টিং-এ বাবা মায়েরা শিশুদের ওপর উচ্চাকাঙ্ক্ষা রাখলেও তাদের প্রতি নমনীয় হয়ে থাকেন। তারা শিশুদের কথা শুনেন, তাদের পছন্দ-অপছন্দকে মূল্যায়ন করেন এবং তাদেরকে প্রয়োজন অনুসারে ব্যক্তি স্বাধীনতা দিয়ে থাকেন। উদাহরণ: রাত ৯টার মধ্যে ঘুমাতে যেতে হবে, কারণ পর্যাপ্ত ঘুম না হলে তোমার মনোযোগ ও স্বাস্থ্য খারাপ হবে।
এ ধরনের প্যারেন্টিং স্টাইলে শিশুদের চিন্তাধারা এবং দৃষ্টিভঙ্গি উন্মুক্ত থাকে। তারা বড়ো বড়ো সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়। এদের সামাজিক দক্ষতা ভালো থাকে এবং পড়ালেখাতে ও পরবর্তীতে এদের মানসিক জটিলতার ঝুঁকি কম থাকে।
৩.Permissive (অনুমতিমূলক)
এ ধরনের প্যারেন্টিং স্টাইলে অভিভাবক অত্যন্ত স্নেহশীল ও বন্ধুসুলভ, কিন্তু নিয়ম প্রয়োগে দুর্বল, শিশুকে খুশি রাখাই মূল লক্ষ্য, শৃঙ্খলা প্রায় নেই। উদাহরণ: শিশু জেদ করলে সহজেই নিয়ম শিথিল করে দেওয়া, শাস্তি এড়িয়ে যাওয়া।
এতে শিশুর আত্মনিয়ন্ত্রণের ঘাটতি তৈরি হয়। শিশু স্কুলে ও সামাজিক পরিবেশে নিয়ম মানতে চায় না। কিছুটা জেদি ও চাহিদাসম্পন্ন আচরণ করে। হতাশা সহ্য করার ক্ষমতা কম হয়।
৪.Uninvolved/Neglectful Parenting (উদাসীন বা অবহেলাপূর্ণ প্যারেন্টিং) এ ধরনের প্যারেন্টিং স্টাইলে অভিভাবক শিশুর জীবনে সামান্যই জড়িত থাকে। শারীরিক চাহিদা হয়তো পূরণ হয়, কিন্তু আবেগীয় সংযোগ, তত্ত¡াবধান বা নিয়মকানুন প্রায় থাকে না। শিশুদের সীমাহীন ছাড় দিয়ে থাকেন এবং প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত নমনীয় হন।
শিশুদের মতামতের উপর তেমন একটা হস্তক্ষেপ করে না। বাবা মায়েরা শিশুদের প্রতি তেমন একটা আকাঙ্ক্ষা অথবা প্রত্যাশাও রাখেন না। সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব দেখা যায় এ ধরনের প্যারেন্টিং স্টাইলে। কম আত্মসম্মানবোধ, নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক ও একাডেমিক ক্ষেত্রে দুর্বল পারফরম্যান্স, আচরণগত সমস্যা, মাদকাসক্তির ঝুঁকি ও আবেগীয় সমস্যা তৈরি হয়।
৫.Helicopter(হেলিকপ্টার প্যারেন্টিং: অতিরিক্ত সুরক্ষামূলক) এ ধরনের প্যারেন্টিং শিশুর প্রতিটি সিদ্ধান্তে নাক গলানো হয়, এতে শিশুর স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ব্যাহত হয়, উদ্বেগ বাড়ে।
৬. free-range/attachment (ফ্রি-রেঞ্জ/আটাচমেন্ট প্যারেন্টিং) এ ধরনের প্যারেন্টিং শিশুকে স্বাধীনভাবে ঝুঁকি নিতে দেওয়া ও অভিজ্ঞতা থেকে শেখার ওপর জোর দেওয়া হয়, তবে সঠিক ভারসাম্য না থাকলে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হতে পারে।
কোন্ প্যারেন্টিং সবচেয়ে কার্যকরী?
গবেষণায় সবচেয়ে বেশি সমর্থিত হলো কর্তৃত্বপূর্ণ প্যারেন্টিং (Authoritative)। এর কারণ: এটি নিয়ম ও আদর, দুটোরই ভারসাম্য বজায় রাখে। শিশু বোঝে কেনো নিয়ম মানা দরকার (যুক্তি দেওয়া হয়), শুধু ভয়ে নয়। শিশুর মতামত শোনা হয়, ফলে সে নিজেকে মূল্যবান বোধ করে। দীর্ঘমেয়াদে আত্মনিয়ন্ত্রণ, মানসিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক দক্ষতা, সবক্ষেত্রেই ভালো ফলাফল দেখা যায়।
তবে কোনো অভিভাবকই সবসময় একটি নির্দিষ্ট স্টাইলে ১০০% আটকে থাকেন না। পরিস্থিতি অনুযায়ী বিভিন্ন স্টাইলের মিশ্রণ ব্যবহার করেন। সংস্কৃতি, পরিবারের প্রেক্ষাপট এবং শিশুর নিজস্ব স্বভাবও এই স্টাইলগুলোকে প্রভাবিত করে। তবে মাঝারি কড়াকড়ির প্যারেন্টিংও ভালো ফলাফল দিতে পারে, যদি তার সাথে যথেষ্ট স্নেহ ও যত্ন থাকে।
সবচেয়ে কার্যকর parenting-এর ৫টি মূল উপাদান
১. উষ্ণ সম্পর্ক: শিশুকে বোঝানো, ‘তুমি ভুল করলেও আমি তোমাকে ভালোবাসি।’
২. পরিষ্কার ও বয়স-উপযোগী নিয়ম: কী করা যাবে/ কী করা যাবে না, সেটা স্পষ্ট করা।
৩. নিয়মের কারণ বোঝানো: শুধু ‘না’ নয়Ñ কেন না সেটাও এক ধরনের বলা।
৪. শাস্তির বদলে শেখানো: ভুল আচরণের consequence থাকবে, কিন্তু অপমান/ভয় দেখানো নয়।
৫. স্বাধীনতা ধীরে ধীরে বাড়ানো: বয়স বাড়ার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া।
এখানে লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘ভালো শিশু বানানো’ নয়, বরং এমন একজন মানুষ তৈরি করা, যে নিজে থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
সন্তানকে ঘুম থেকে তোলার সময় কিছু ভুল
স্কুলে যাওয়ার আগে প্রায়শই বিছানা ছাড়তে চায় না। কখনও অসুখের বাহানা দেয়, কখনও আবার সত্যিই ডুবে থাকে গভীর ঘুমের ঘোরে। এ নিয়ে বাবা-মায়েদের হয়রানির শেষ নেই। অনেকেই চোটপাট করেন সন্তানের উপর। সন্তানকে ঘুম থেকে তোলার সময় কিছু ভুল এড়িয়ে চলা জরুরি।
১. চিৎকার করে ডাকবেন না
উচ্চস্বরে ডাকলে শিশুর ঘুম হঠাৎ ভেঙে যায় ঠিকই, কিন্তু এতেই প্যানিক বা অ্যাংজাইটির মতো দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সমস্যার পথ প্রশস্ত হয়। নিয়মিত এমন চললে, অনিদ্রা কিংবা বুক ধড়ফড়ের মতো উপসর্গও জুড়ে যেতে পারে।
২. হঠাৎ করে লাইট জ্বালিয়ে বা ফ্যান অফ করে দেবেন না
এতে শিশুর মনে অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে শিশু বড়ো হয়ে অন্যের প্রতি সমব্যথী হতে শেখে না।
৩. ওঠা মাত্রই বকাঝকা বা সমালোচনা করবেন না
অনেক মা-বাবাই মনে করেন, সন্তানের ঘুম থেকে না ওঠা ইচ্ছাকৃত, তাই বকুনি দিয়ে ঘুম ভাঙান। এতেও প্রভাব পড়ে শিশুর আত্মবিশাসে।
৪. ঘুম ভাঙতেই একসঙ্গে অনেক নির্দেশ দেবেন না
এতে শিশুটি আগামীতে দ্বিধা ও সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগবে।
তবে কী করবেন?
১. শান্তভাবে ঘুম ভাঙান। নরম কণ্ঠে নাম ধরে ডাকুন বা আলতো করে কাঁধে হাত রেখে জাগান।
২. নিজেকে সামলে নেওয়ার জন্য খানিকটা সময় দিন।
৩. হঠাৎ লাইট না জ্বালিয়ে, পর্দা সরিয়ে প্রাকৃতিক আলো ঢুকতে দিন। সূর্যের আলো শরীরকে স্বাভাবিকভাবে জেগে উঠতে সাহায্য করে।
ভাইবোন বা কাজিনের দ্বন্দ্ব ও ‘গোল্ডেন চাইল্ড’ সিনড্রোম:
‘তোমার ওই ভাইয়াকে দেখো, কত সুন্দর করে এক জায়গায় বসে পড়ছে, আর তুমি সারাদিন শুধু লাফিয়ে বেড়াচ্ছ!’ অথবা, ‘তোমার ছোটো বোনটা কত শান্ত, আর তুমি একটা আস্ত বজ্জাত!’
প্রায় প্রতিটি পরিবারে ভাইবোন বা কাজিনদের মধ্যে এই ধরনের তুলনামূলক কথাবার্তা খুব সাধারণ একটি বিষয়। বাবা-মায়েরা মনে করেন, একজনকে উদাহরণ হিসেবে দেখালে হয়তো অন্যজন তাকে দেখে শিখবে বা অনুপ্রাণিত হবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটে ঠিক তার উল্টোটা।
পারিবারিক মনস্তত্ত্বে (Family Dynamics) যখন বাবা-মা অজান্তেই একজন সন্তানের প্রতি একটু বেশি পক্ষপাতিত্ব দেখান, তখন সেখানে দুটি ভিন্ন চরিত্র তৈরি হয়:
১) দ্য গোল্ডেন চাইল্ড (The Golden Child):
এই শিশুটি পরিবারের 'পারফেক্ট' সন্তান। সে কথা শোনে, পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে। আপাতদৃষ্টিতে সন্তানটিকে খুব সুখী মনে হলেও, সাইকোলজি বলছে, এরা প্রচণ্ড মানসিক চাপে ভোগে। এদের ভেতরে সবসময় একটি ভয় কাজ করেÑ‘আমি যদি কোনো ভুল করি, তবে কি বাবা-মা আমাকে আর ভালোবাসবে না?’ এই পারফেকশনিজমের চাপে এরা নিজেদের আসল সত্তাকে হারিয়ে ফেলে।
২) দ্য স্কেপগোট বা বলির পাঁঠা (The Scapegoat:
পরিবারের যত দোষ, সব এই শিশুটির ঘাড়ে চাপে। সে একটু চঞ্চল বা রাগী স্বভাবের হতেই পারে। বারবার তাকে 'খারাপ' বা 'অবাধ্য' বলার ফলে সে একসময় বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, ‘আমি আসলেই খারাপ, আমাকে কেউ ভালোবাসে না।’ মনোযোগ পাওয়ার জন্য সে তখন আরও বেশি অবাধ্য হয়ে ওঠে (Negative Attention Seeking)। এদের আত্মবিশ্বাস একদম তলানিতে গিয়ে ঠেকে।
‘স্কেপগোট’ শিশুটি তার নিজের বাবা-মায়ের অবহেলার জন্য ওই ‘গোল্ডেন চাইল্ড’ ভাই বা বোনটিকে মনে মনে ঘৃণা করতে শুরু করে। তারা একে অপরকে সহযোগী ভাবার বদলে, ‘প্রতিযোগী’ (Competitor) হিসেবে দেখতে শুরু করে। বড়ো হয়ে এই ভাইবোনেরাই একে অপরের সবচেয়ে বড়ো শত্রুতে পরিণত হয়।
সমাধান: আলাদা আলাদা শক্তির কদর করুন (Celebrate Individuality)। প্রতিটি শিশুই আলাদা। একজন হয়তো অংকে খুব ভালো (গোল্ডেন চাইল্ড), আরেকজন হয়তো ছবি আঁকতে বা খেলাধুলায় ভালো (স্কেপগোট)। দুই জনের এই আলাদা প্রতিভাকে সমানভাবে উদ্যাপন করুন। পড়াশোনার মাপকাঠি দিয়ে সবার মেধা বিচার করবেন না।
বাচ্চাদের সামনে কখনো বলবেন না-‘ও খুব শান্ত’ আর ‘তুমি খুব পাজি।’ বাচ্চারা খুব দ্রুত এই লেবেলগুলো নিজেদের চরিত্রে ধারণ করে ফেলে। পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানের সাথে আলাদাভাবে সময় কাটান।
বাচ্চার জেদ ও ম্যানিপুলেটিভ' আচর
দুপুরের খাবারের আগে বাচ্চা জেদ ধরেছে চকলেট খাবে। মা কড়া গলায় বলে দিলেন, ‘না, ভাত খাওয়ার আগে কোনো মিষ্টি খাবার নয়।’ বাচ্চা মুখ গোমড়া করে কাঁদতে কাঁদতে পাশের রুমে বাবা বা দাদার গেল। চকলেট পেল।
বাচ্চারা অত্যন্ত বুদ্ধিমান হয়। তারা খুব দ্রুত সমীকরণ মিলিয়ে ফেলে যে, “মা ‘না’ বললে বাবার কাছে যেতে হবে, আর দুজনেই ‘না’ বললে সোজা দাদা-দাদির কাছে যেতে হবে।” এই সুযোগ নেওয়ার প্রবণতা তাদের ভেতরে এক ধরনের ‘ম্যানিপুলেটিভ’ আচরণ তৈরি করে। তারা বড়দের একে অপরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে শেখে।
মনোবিজ্ঞান বলে, বাচ্চারা নিয়মের মধ্যে বা ‘বাউন্ডারি’র ভেতর সবচেয়ে নিরাপদ বোধ করে। যখন তারা দেখে যে নিয়মগুলো ফ্লেক্সিবল ( যেমন: মায়ের কাছে যেটা মানা, বাবা কিংবা দাদির কাছে সেটা জায়েজ), তখন তারা কনফিউজড হয়ে যায়। এই কনফিউশন থেকে তাদের ভেতরে একরোখা জেদ এবং ঘ্যানঘ্যানে স্বভাব তৈরি হয়। তাই পরিবারের সব সদস্য বা স্বামী-স্ত্রীর 'ইউনাইটেড ফ্রন্ট' (টহরঃবফ ঋৎড়হঃ) করুন: অর্থাৎ বাচ্চার নিয়মকানুনের ব্যাপারে স্বামী এবং স্ত্রীকে আগে একমত হতে হবে। এতে পারিবারিক ইগো ক্ল্যাশ (ঊমড় পষধংয) তৈরি হবে না। কোনো অবস্থায় বাচ্চার সামনে দ্বিমত নয়।
খাবারের ঘুষ বা ইমোশনাল ইটিং:
বাচ্চা যখন হাউমাউ করে কাঁদছে, আমরা চট করে তার হাতে একটি ললিপপ বা জুস ধরিয়ে দিই। কিংবা, বাচ্চা হয়তো শপিং মলে জেদ করে মেঝেতে বসে পড়ে, আমরা দূর থেকে বলি, ‘কান্না থামালে কিন্তু এখনই আইসক্রিম কিনে দেব!’ বাচ্চার কান্না সাথে সাথে থেমে যায়, আর বাবা-মা হিসেবে আমরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচি।
কিন্তু সাময়িক শান্তি পাওয়ার এই ‘শর্টকাট’ পদ্ধতি আপনার সন্তানের সারাজীবনের জন্য আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। যখন আপনি বাচ্চার কষ্ট, রাগ বা কান্নার সময় তাকে কিছু দেন, তখন তার ব্রেন একটি নতুন সমীকরণ শেখে: এর নাম ‘কোপিং মেকানিজম’ (ঈড়ঢ়রহম গবপযধহরংস)। শিশুটি ভাবতে শেখে যে, মনের যেকোনো অস্বস্তি দূর করার একমাত্র উপায় হলো জেদ বা কান্না। এর দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যৎ খুবই ভয়ংকর? এই শিশুরা কখনোই শেখে না কীভাবে কষ্ট, হতাশা বা রাগের মতো স্বাভাবিক আবেগগুলোকে স্বাস্থ্যকর উপায়ে প্রসেস করতে হয়। ফলে তারা খাবার দিয়ে সেই অনুভূতিগুলোকে চাপা দিয়ে দেয়। যখন আঘাত পাবেতখনই সে অবচেতনভাবেই এক গাদা পিজ্জা, আইসক্রিম বা ফাস্টফুড খেয়ে নিজেকে সান্ত¡না দেওয়ার চেষ্টা করবে। মানসিক চাপে পড়লেই তাদেরকে ফ্রিজ খুলতে হবে, যার শেষটা হচ্ছে মদ, গাঁজা, সিগারেট বা মাদক।
বাচ্চা লালন-পালনে ৫টি জাপানি শিক্ষা!
১. 'শিতসুকে' (Shitsuke) বা শৃঙ্খলার ধারণা: জাপানি সংস্কৃতিতে ‘শিতসুকে’ মানে বাচ্চাদের বকা দেওয়া বা শাস্তি দেওয়া নয়, বরং ভালো অভ্যাসগুলোকে বাচ্চার স্বভাবে পরিণত করা। বাবা-মায়েরা নিজেরা সকল নিয়ম মেনে চলেন এবং বাচ্চারা তাদের দেখেই শেখে। তারা বাচ্চাদের ভুলগুলো ধরিয়ে দেন খুব শান্তভাবে, অতি গোপনে।
আমাদের জন্য শিক্ষা: বাচ্চাকে কথায় কথায় শাসন না করে বা অন্যের সামনে বকা না দিয়ে, তাকে শান্তভাবে বোঝানোর অভ্যাস করা। আপনি নিজে রুটিন মেনে চললে বাচ্চাও আপনাকে অনুকরণ করবে।
২. অন্যের অসুবিধার কথা ভাবতে শেখানো (Omoiyari): জাপানিরা বাচ্চাদের 'ওমোইয়ারি' বা অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শেখায়। পাবলিক প্লেসে জোরে কথা বললে বা দৌড়াদৌড়ি করলে অন্যের অসুবিধা (Meiwaku) হতে পারে-এই বোধটা তাদের খুব ছোটবেলা থেকেই ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। তাই তারা রেস্টুরেন্ট বা ট্রেনে খুব শান্ত থাকে।
আমাদের জন্য শিক্ষা: ‘তুমি এটা করলে ওর কষ্ট হবে’ বা ‘তোমার এই কাজে অন্যের অসুবিধা হতে পারে’Ñএইভাবে ছোটবেলা থেকেই সহানুভূতির জায়গাটা তৈরি করতে হবে।
৩. ছোটবেলা থেকেই আত্মনির্ভরশীলতা (Hajimete no Otsukai): জাপানে বাচ্চাদের নিজেদের কাজ নিজে করতে উৎসাহিত করা হয়। নিজের জুতো নিজে পরা শুরু করে একা একা বাড়ির কাছের দোকান থেকে ছোটখাটো জিনিস কিনে আনার দায়িত্ব তাদের দেওয়া হয়। এতে তাদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে যায়।
আমাদের জন্য শিক্ষা: বাচ্চাদের অতিরিক্ত আগলে (Overprotective) না রেখে বয়সানুপাতে ছোটো ছোটো দায়িত্ব দিন। এ কাজগুলো তাদের স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করবে।
৪. 'আমায়ে' (Amae) বা গভীর ভালোবাসা ও নির্ভরতা: আত্মনির্ভরশীল হওয়ার মানে বাচ্চাদের দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং পাশে থেকে বাচ্চার সাথে গভীর মানসিক সংযোগ (Attachment) বজায় রাখা। মায়ের নজরের মধ্যেই বাচ্চা চলাফেরা করেন। এতে বাচ্চার মনে প্রবল নিরাপত্তাবোধ তৈরি হয়, যা তাকে আত্মবিশ্বাসী ও স্বাধীন হতে সাহায্য করে।
আমাদের জন্য শিক্ষা: বাচ্চার স্বাধীনতায় বাধা না দিয়ে, তাকে পর্যাপ্ত সময় এবং মানসিক নিরাপত্তা দিন।
৫. স্কুলে সমতা এবং দায়িত্ববোধ(Osoji): জাপানের স্কুলগুলোতে কোনো ক্লিনার বা ঝাড়ুদার থাকে না। বাচ্চারা নিজেরাই নিজেদের ক্লাসরুম, বাথরুম এবং স্কুলের মাঠ পরিষ্কার করে। এই চর্চা তাদের শেখায় যে কোনো কাজই ছোটো নয় এবং নিজের চারপাশ পরিষ্কার রাখা নিজেরই দায়িত্ব।
আমাদের জন্য শিক্ষা: পড়াশোনার পাশাপাশি ঘরে-বাইরের কাজে সাহায্য করাকে সমান গুরুত্ব দিন। এতে বাচ্চাদের ভেতর অহংকার তৈরি হয় না এবং তারা দায়িত্ব নিতে শেখে।
কোরিয়ান বাচ্চাদের 'নুনচি' (Nunchi)
কারিয়ান সংস্কৃতিতে একটি কথা খুব প্রচলিত-যার নুনচি নেই, সে জীবনে সফল হতে পারে না।’ ‘নুনচি’ (Nunchi) মানে হলো ‘রুম রিড করা’ বা চারপাশের পরিবেশ এবং মানুষের আবেগ বুঝতে পারার সূ² ক্ষমতা। কোরিয়ান বাচ্চারা খুব সহজেই বুঝতে পারে কখন চুপ থাকতে হবে, কখন অন্যকে সাহায্য করতে হবে বা কখন কেউ মন খারাপ করে আছে।
কোরিয়ান বাবা-মায়েরা বাচ্চাদের শেখান যে, পৃথিবীতে শুধু তারাই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নয়; চারপাশের মানুষেরও অনুভূতি এবং স্পেস আছে। তারা কোথাও বেড়াতে গেলে, লিফটে ওঠার সময় বা রেস্টুরেন্টে ঢোকার আগে বাচ্চাকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে শেখান। তাকে বলুন, ‘দেখো তো, এখানকার পরিবেশটা কেমন? সবাই কি শান্ত হয়ে বসে আছে?’ কেউ ঘুমালে নিজে থেকেই তারা গলার আওয়াজ নিচু করতে শেখে। নুনচির একটি বড়ো অংশ হলো মানুষ মুখে যা বলছে না, তার শারীরিক ভাষা দেখে তা বুঝতে পারা।
কীভাবে প্রয়োগ করবেন?
বাসায় কেউ মন খারাপ করে বসে থাকলে, বাচ্চাকে দূর থেকে দেখিয়ে বলুন, ‘দেখো, বাবার মনটা আজ খারাপ মনে হচ্ছে। চলো তো, বাবাকে একটু জড়িয়ে ধরে আসি।’ কিংবা আপনি যখন কারো সাথে ফোনে বা সামনাসামনি কথা বলছেন, তখন বাচ্চা যদি কিছু বলতে আসে, তাকে শান্তভাবে ইশারায় একটু অপেক্ষা করতে বলুন। তাকে শেখান, ‘আগে অন্যের কথা শেষ হতে দিতে হয়।’ আপনার কথা শেষ হলে পুরো মনোযোগ তার দিকে দিন এবং প্রশংসা করুন যে সে সুন্দর করে অপেক্ষা করেছে।
অথবা কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে বাচ্চাকে মানসিক প্রস্তুতি দিন। গাড়িতে বসে শান্তভাবে বুঝিয়ে বলুন, ‘আমরা এখন যেখানে যাচ্ছি, সেখানে দৌড়াদৌড়ি করা যাবে না। তুমি চাইলে এক জায়গায় বসে খেলতে পারো।’ তাদের আগে থেকে বুঝিয়ে বললে তারা খুব চমৎকারভাবে সহযোগিতা করে।
কোরিয়ানরা বাচ্চাদের শেখায় অন্যের আনন্দে আনন্দিত হতে এবং কষ্টে পাশে দাঁড়াতে। খেলার মাঠে অন্য কোনো বাচ্চা পড়ে গিয়ে ব্যথা পেলে আপনার সন্তানকে বলুন, ‘ইস, ও ব্যথা পেয়েছে! চলো তো, ওকে একটু সাহায্য করি।’ অন্যের কষ্ট দেখে হাসা বা এড়িয়ে যাওয়ার বদলে তাদের ভেতর সহমর্মিতা বা এমপ্যাটি (Empathy) জাগিয়ে তুলুন।
বাচ্চার আইকিউ (IQ) হয়তো তাকে ভালো রেজাল্ট এনে দেবে, কিন্তু একটি প্রখর 'নুনচি' তাকে পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং জীবনে একজন ভালো ও সফল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে।
ফ্রেঞ্চ বাচ্চারা কেন খাওয়ার সময় জেদ করে না
‘আমার বাচ্চা তো একদমই মাছ বা সবজি খেতে চায় না!’ দেশের বেশিরভাগ বাবা-মায়েরই সাধারণ একটি অভিযোগ এটি। কিন্তু ফরাসি শিশুরা খাওয়ার টেবিলে শান্ত হয়ে বসে থাকে, বড়দের মতো সব ধরনের খাবার খায়। সেখানে বাচ্চাদের জন্য আলাদা কোনো মেন্যু নেই অর্থাৎ বাচ্চাদের জন্য আলাদা করে খিচুড়ি বা ম্যাশড খাবার তৈরির কোনো চল নেই। বড়রা টেবিলে যা খান, বাচ্চাদেরও ঠিক তা-ই দেওয়া হয়। ছোটবেলা থেকেই পরিবারের বাকিদের সাথে একই খাবার খাওয়ার ফলে তারা সব ধরনের স্বাদ ও টেক্সচারের সাথে পরিচিত হয়ে ওঠে।
আমাদের জন্য শিক্ষা: আপনারা যা খাচ্ছেন, সেটাকেই বাচ্চার উপযোগী করে পরিবেশন করুন।
ফ্রান্সে বাচ্চাদের দিনে মাত্র একবার নির্দিষ্ট সময়ে স্ন্যাকস দেওয়া হয় (যাকে তারা বলে 'এড়হুঃবৎ')। এর বাইরে তারা সারাদিন টুকটাক কিছু খায় না। বারবার বিস্কুট বা চিপস না খাওয়ার ফলে মূল খাবারের সময় (লাঞ্চ বা ডিনার) তাদের পেট ঠিকমতো খালি থাকে এবং সত্যিকারের ক্ষুধা লাগে। ক্ষুধা লাগলে বাচ্চারা সাধারণত খাবার নিয়ে জেদ করে না।
আমাদের জন্য শিক্ষা: মূল খাবারের অন্তত ২ ঘণ্টা আগে বাচ্চাদের যেকোনো ধরনের ভারী স্ন্যাকস, জুস বা মিষ্টি জাতীয় খাবার দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
কোনো নতুন খাবার দেখলে বাচ্চারা অনেক সময়ই বলতে পারে "আমি এটা খাবো না"। ফরাসি বাবা-মায়েরা তখন জোর করেন না, বরং বলেন, ‘তোমাকে পুরোটা খেতে হবে না, শুধু এক চামচ মুখে দিয়ে দেখো।’গবেষণায় দেখা গেছে, একটি নতুন খাবারের স্বাদ বুঝতে বাচ্চার অন্তত ১০-১৫ বার সেই খাবারটি চেখে দেখার প্রয়োজন হয়।
আমাদের জন্য শিক্ষা: বাচ্চা কোনো খাবার একবার রিজেক্ট করলেই কিছুদিন পর আবার ভিন্ন কোনো উপায়ে রান্না করে তার সামনে দিন।
ফ্রেঞ্চ বাবা-মায়েরা জোর করে বাচ্চার মুখে খাবার গুঁজে দেন না। তারা বিশ্বাস করেন, এক বেলা কম খেলে বাচ্চার কোনো ক্ষতি হবে না, পরের বেলায় সে ঠিকই খেয়ে নেবে।
আমাদের জন্য শিক্ষা: বাচ্চার পেছনে প্লেট নিয়ে ঘুরে ঘুরে খাওয়ানোর চেয়ে, তাকে নিজের হাতে খাওয়ার স্বাধীনতা দিন। জোর করলে খাবারের প্রতি ভীতি ও বিরক্তি তৈরি হয়।
টিফিনের বক্স খুললেই কি আপনার বাচ্চা মুখ বাঁকায়?
সকাল বেলা হাজারো ব্যস্ততার মাঝে ঘুম চোখে আপনি হয়তো বাচ্চার জন্য ডিম-রুটি বা নুডলস বানিয়ে বক্সে ভরে দেন। কিন্তু স্কুল ছুটির পর দেখেন, বাচ্চা সেটা ছুঁয়েও দেখেনি। আপনি হয়তো রাগে ফেটে পড়েন, ‘এত কষ্ট করে বানিয়ে দিলাম, আর তুই না খেয়ে চলে আসলি!’ কিন্তু কখনো কি ভেবেছেন, প্রতিদিন একই রকম দেখতে ম্যাড়ম্যাড়ে খাবারটি একটি শিশুর ব্রেনকে কতটা একঘেয়েমিতে ভোগায়?
অন্যদিকে জাপানের দিকে তাকালে আমরা এক অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য দেখতে পাই। সেখানে মায়েরা বাচ্চার টিফিন বক্স বা 'বেন্তো' (ইবহঃড়)-কে আক্ষরিক অর্থেই শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। তারা ভাত, সবজি আর ডিম দিয়ে কার্টুন বা প্রাণীর মুখ তৈরি করে দেন। জাপানিদের কাছে এই ‘বেন্তো’ শুধু পেট ভরানোর খাবার নয়, এটি হলো সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের ভালোবাসার একটি নীরব চিঠি, যা বাচ্চা দুপুরের বিরতিতে খুলে পড়ে! এটি তৈরিতে টাকা নয়, আইডিয়াই যতেষ্ট।
সাইকোলজি বলে, মানুষ (বিশেষ করে শিশুরা) সবার আগে খাবার খায় চোখ দিয়ে, এরপর নাক দিয়ে, আর সবার শেষে মুখ দিয়ে। খাবারের রং, আকার এবং সাজানো দেখে বাচ্চার ব্রেনে ‘ডোপামিন’ রিলিজ হয়, যা তার রুচি বাড়িয়ে দেয়। ম্যাড়ম্যাড়ে বা এক রঙের খাবার দেখলে ব্রেন সিগন্যাল দেয় যে এটি খেতে ভালো হবে না। অপছন্দের খাবার (যেমন- সবজি) দেখলেই বাচ্চাদের একটি অনীহা তৈরি হয়। কিন্তু সেই একই গাজর বা শসা যখন আপনি একটি তারার (ঝঃধৎ) বা ফুলের আকৃতিতে কেটে দেন, তখন ব্রেন ওই সবজিটিকে ‘খেলার’ জিনিস ভাবে। ফলে সহজেই সেটি খেয়ে ফেলে।
জাপানি বেন্তোর মূল মন্ত্রই হলো ‘পোর্শন কন্ট্রোল’ বা পরিমিত খাবার। একগাদা ভাত বা রুটি ঠেসে না দিয়ে, অল্প কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন এবং সবজির একটি রঙিন ব্যালেন্স বাচ্চার মেধা ও স্বাস্থ্যের জন্য অনেক বেশি জরুরি। সেখানে শিশুদের শেখানো হয় কীভাবে খাবারের কদর করতে হয়, কোন্ খাবারে কী পুষ্টি আছে। টিফিন বক্স শুধু খাবার নয়, এটি মায়ের একটা আলিঙ্গন!
ফাদার উন্ড জেনারেশনাল ট্রমা
একজন বাবা যখন শুধু ‘এটিএম মেশিন’ বা 'ভয়ের পাত্র' হয়ে থাকেন, কিন্তু সন্তানের বন্ধু, খেলার সঙ্গী বা নিরাপদ আশ্রয় হতে পারেন না, তখন বাবার সাথে সন্তানের কোনো আবেগিক সংযোগ (ঊসড়ঃরড়হধষ ঈড়হহবপঃরড়হ) থাকে না, তখন বাচ্চার মনে ক্ষত তৈরি হয়।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, যে মেয়ে বাবার কাছ থেকে পর্যাপ্ত সময়, প্রশংসা বা শারীরিক স্পর্শ (যেমন- জড়িয়ে ধরা বা কপালে চুমু খাওয়া) পায় না, সে বড়ো হয়ে সেই শূন্যস্থান পূরণের জন্য অন্য মানুষের কাছে মরিয়া হয়ে ভালোবাসা খোঁজে। সামান্য মনোযোগ পেলেই তারা অনেক সময় ‘টক্সিক’ বা ক্ষতিকর সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে এবং সব অন্যায় মুখ বুজে সহ্য করে। আবার বাবার স্পর্শ বঞ্চিত ছেলেরা বড়ো হয়ে নিজেরাও তাদের স্ত্রী বা সন্তানের সাথে ইমোশনাল কানেকশন তৈরি করতে পারে না। ফলে জেনারেশনাল ট্রমার মতো এই ‘ফাদার উন্ড’ এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়।
অর্থ, দামী গ্যাজেট বা বড়ো বাড়ি কখনো একজন বাবার শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে না। সে চায়, আপনি তার কথাগুলো মন দিয়ে শুনছেন কি না, কিংবা কষ্টের সময় পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন কি না।
‘আমার বাচ্চা অন্যদের চেয়ে এগিয়ে’ মানসিকতা
‘আমার বাচ্চা সবার চেয়ে সেরা’Ñএই প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা সাময়িকভাবে বাবা-মায়ের অহংকার বাড়ালেও, বাচ্চার মানসিক বিকাশে এটি মারাত্মক ক্ষতিকর। যেমনÑ সবসময় ‘ফাস্ট’ বা সেরা হওয়ার প্রত্যাশা বাচ্চার ওপর তীব্র মানসিক চাপ (অহীরবঃু) তৈরি করে, যা তার স্বাভাবিক ও আনন্দময় শৈশব কেড়ে নেয়।
আবার অন্য বাচ্চাদের চেয়ে নিজেকে সবসময় মহান বা এগিয়ে রাখার কারণে তার মাঝে অহংকার তৈরি হয় এবং অন্যদের প্রতি এমপ্যাথি বা সহানুভূতি নষ্ট হয়ে যায়। সবসময় পড়াশোনা, প্রতিযোগিতা বা সাফল্যের পেছনে ছুটতে বাধ্য করায় বাবা-মাসহ চারপাশের পরিবেশের সাথে বাচ্চার একধরনের নীরব মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়।
শিশুকে সামাজিক দক্ষতা শেখান
বাচ্চাকে একা ঘরে বন্দি না রেখে সমবয়সীদের সাথে প্লে-ডেট (Play Date) বা মেলামেশার সুযোগ দিন। বিকেলে পার্কে নিয়ে যান বা প্রতিবেশীর বাচ্চার সাথে খেলতে দিন। শুরুতে তারা একে অপরের পাশে বসে দেখবে বা একাকী খেলবে, এটিও সামাজিক হওয়ার প্রথম ধাপ। সে যখন নিজে থেকে কাউকে কিছু দেবে বা কারো কথা শুনবে, তখন তার প্রচুর প্রশংসা করুন-‘ওয়াও! তুমি তোমার বন্ধুকে খেলনাটা দিলে? তুমি কত ভালো!’ এই প্রশংসা তাকে পরবর্তী সময়ে আরও ভালো আচরণ করতে উৎসাহিত করবে। শুধু শেয়ারিং নয়, অন্যকে ‘হ্যালো’ বলা, ‘থ্যাংক ইউ’ বা ‘সরি’ বলা কিংবা বড়দের ‘সালাম’ দেওয়াও এর অংশ। খেলাচ্ছলে তাকে এই ভদ্রতাগুলো শিখিয়ে দিন।
একসঙ্গে অনেক কথা বলবেন না
‘টিভি বন্ধ করো, হাত ধোও, জামা বদলাও, দাঁত ব্রাশ করো, তারপর ঘুমাতে যাও।’ এতগুলো নির্দেশ একসঙ্গে দিলে ছোটো শিশুর পক্ষে সব মনে রাখা কঠিন। সে হয়তো প্রথম এক দুইটি কাজ করবে, বাকিগুলো ভুলে যাবে। তাই কাজগুলো ভাগ করে বলুন। ছোটো ছোটো নির্দেশ শিশুদের মেনে চলতে ও মনে রাখতে অনেক সহজ হয়।
দূর থেকে চিৎকার না করে কাছে যান
রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে বললেন, ‘পড়তে বসো!’ কিন্তু শিশুর মন তখন খেলায়। সে হয়তো শুনলই না। তাই কাছে গিয়ে, চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলুন। প্রয়োজনে কাঁধে আলতো করে হাত রাখুন। এতে সে বুঝবে, আপনি গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলছেন।
একই কথা বারবার বলবেন না
অনেক অভিভাবক একই কথা পাঁচ-ছয়বার বলেন। ফল কী হয়? শিশু শিখে যায় যে, প্রথমবার শুনতে হবে না। কারণ মা বা বাবা আরও কয়েকবার বলবেন! তাই এক বা দুইবার বলুন। তারপরও না শুনলে আগে থেকে ঠিক করা নিয়ম মেনে চলুন। আবার নির্দেশ মেনে চললে প্রশংসা করতেও ভুলবেন না।
শোনার ও দেখার অভ্যাসকে মজার করে তুলুন
শিশুরা খেলতে খেলতে সবচেয়ে ভালো শেখে। হাঁটতে বের হয়ে বলুন, ‘শোনো তো, কয়টা পাখির ডাক শুনতে পাও?’
অথবা বলুন, ‘কুকুরের বসে থাকার দৃশ্যটি কেমন লাগছে?’
এ ধরনের ছোটো ছোটো খেলায় শিশুর মনোযোগ বাড়ে। শোনার ও মনোযোগ সহকারে দেখার অভ্যাসও গড়ে ওঠে।
সন্তানের কথা শুনুন
শিশুরা শুধু কথা শুনে শেখে না, দেখেও শেখে। আপনি যদি মোবাইল দেখতে দেখতে তার কথা শোনেন, তাহলে সে-ও একসময় অন্যের কথা গুরুত্ব দেবে না।
তাই সন্তান যখন কোনো গল্প বলছে, স্কুলের কথা বলছে বা নতুন কিছু দেখাতে চাইছে, তখন একটু সময় দিন। মোবাইলটা হাত থেকে নামিয়ে রাখুন। তার দিকে তাকান। প্রশ্ন করুন। শিশুরা যখন বুঝতে পারে, তাদের কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনা হচ্ছে, তখন তারাও অন্যের কথা বেশি মনোযোগ দিয়ে শুনতে শেখে।
ঘরের নিয়ম শিখিয়ে দিন
প্রতিটি পরিবারে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম থাকা জরুরি। যেমন-হোমওয়ার্ক শেষ না করা পর্যন্ত টিভি না দেখা, পরিবারে কাউকে কটূক্তি না করা, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম এড়িয়ে চলা ইত্যাদি। প্রথমবার ভুল করলে সতর্ক করে দেয়া যেতে পারে, তবে নিয়ম ভাঙার ফল কী হতে পারে তা তাকে বোঝাতে হবে। এতে শিশু নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে এবং দায়িত্ববোধ বাড়বে।
সন্তানের জন্য মানসম্মত সময় দিন
প্রতিদিনের ব্যস্ত শিডিউলের মধ্যেও চেষ্টা করুন পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে খেতে বসার। সকালে ঘুম থেকে উঠে শিশুর সঙ্গে সময় কাটানো, স্কুলে পৌঁছে দেয়া কিংবা একসঙ্গে হাঁটা সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে পারে। প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটি দিন সবাই একসঙ্গে আড্ডা দেবেন, মুভি দেখবেন বা পছন্দের কোনো খাবার খাবেন।
ভালোবাসা প্রকাশ করুন
শুধু ভালোবাসলেই হবে না, বরং তা প্রকাশ করাটাও জরুরি। শিশুর প্রশংসা করুন, তার প্রতি কঠোর সমালোচনার বদলে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রাখুন। এতে সন্তান বুঝবে যে, সে যে কোনো সমস্যায় আপনাকে পাশে পাবে।
সন্তানের আচরণে মনোযোগ দিন
বয়স অনুযায়ী শিশুর আচরণ পরিবর্তিত হয়। তাই তার প্রতি বিশেষ নজর রাখা জরুরি। বিশেষ করে, সে কি অন্যদের প্রতি দুর্ব্যবহার করছে, মিথ্যা বলছে বা অযথা রাগ করছে কিনা, সেদিকে খেয়াল রাখুন। যদি এমন কিছু লক্ষ্য করেন, তাহলে রেগে না গিয়ে তার সঙ্গে খোলামেলা কথা বলুন এবং বোঝানোর চেষ্টা করুন।
সঠিক অভিভাবকত্ব মানেই সন্তানের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। তাই কঠোর শাসনের পরিবর্তে ভালোবাসা, বোঝাপড়া এবং সময় দেয়ার মাধ্যমে সন্তানের সঠিক মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করুন।
বয়ঃসন্ধিকালে বন্ধুদের চাপে ভুল পথে যাওয়া
বয়ঃসন্ধিকালে বাবা-মায়ের চেয়ে বন্ধুদের প্রভাব বেশি থাকে। ‘পিয়ার প্রেসার’ বা বন্ধুদের চাপে পড়ে সন্তান যেন কোনো ভুল পথে (যেমন: ক্ষতিকর অভ্যাস বা বাজে আড্ডা) না যায়, তা নিশ্চিত করার জন্য সর্বদা সতর্ক থাকুন।
বন্ধুদের ভুল প্রস্তাবে জোরালোভাবে 'না' বলার সাহস তৈরি করুন। বাচ্চাকে বোঝান যে, সত্যিকারের বন্ধুরা কখনো ক্ষতিকর কোনো কাজের জন্য অফার বা চাপ দেয় না।
অতিরিক্ত শাসন এড়িয়ে এমন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ুন, যেন কোচিং বা বন্ধুদের আড্ডায় কোনো অস্বস্তিকর ঘটনা ঘটলে সে নির্দ্বিধায় আপনাকে জানাতে পারে।
সন্তানের বন্ধুদের বাসায় আমন্ত্রণ জানান। পারিবারিক পরিবেশে তাদের সাথে মিশলে সন্তানের ফ্রেন্ড সার্কেল সম্পর্কে আপনার পরিষ্কার ধারণা তৈরি হবে।
কোনো অস্বস্তিকর পরিস্থিতি বা বাজে আড্ডায় আটকে গেলে কীভাবে স্মার্টলি সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে হয় (যেমন:‘বাসায় জরুরি কাজ আছে’ বলে চলে আসা), তা আগে থেকেই শিখিয়ে রাখুন।
‘ওভার-প্যারেন্টিং’ একটি সংক্রামক মহামারি
ছেলের স্কুলব্যাগটি তার মা ঘামে ভিজে কাঁধে বয়ে নিয়ে যাওয়া! বাচ্চার একটু ঠান্ডা লাগলেই তাকে স্কুলে যেতে না দেওয়া। স্কুলে বন্ধুদের সাথে মানিয়ে নিতে না পারলে বাচ্চার সোশ্যাল স্কিল না বাড়িয়ে উল্টো স্কুল পরিবর্তন করে ফেলা। এগুলিকে বলে ‘ওভার-প্যারেন্টিং’।
আপনি চান না আপনার বাচ্চা কোনো কষ্ট পাক, কোনো প্রতিযোগিতায় হেরে যাক বা কোনো আঘাত পাক। তাই বাচ্চার সামনে কোনো সমস্যা আসার আগেই আপনি ‘সুপারম্যান’-এর মতো সেটা সমাধান করে দেন। কিন্তু আপনি কি জানেন, সন্তানের পথের সব কাঁটা সরিয়ে দিয়ে আপনি আসলে তাকে ভবিষ্যতের কঠিন বাস্তবতার জন্য চরমভাবে ‘অযোগ্য’ এবং ‘দুর্বল’ করে তুলছেন? সাইকোলজির ভাষায়, বাবা-মা যখন বাচ্চার প্রতিটি ছোটোখাটো কাজ নিজে করে দেন বা প্রতিটি সমস্যা সমাধান করে দেন, তখন বাচ্চার ব্রেন একটি ভয়ংকর মেসেজ পায়Ñআমি ঘুমাই, আমার একজন রক্ষাকর্তা আছে। ব্রেনের এই অবস্থাকে ‘লার্নড হেল্পলেসনেস’ বা অর্জিত অসহায়ত্ব বলা হয়। এই বাচ্চারা বড়ো হয়ে কোনো নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে প্রচÐ ভয় পায় এবং সহজেই প্যানিক অ্যাটাক বা ডিপ্রেশনের শিকার হয়।
বিজ্ঞান বলছে, ছোটবেলায় যে শিশু যত বেশি ‘মাইক্রো- ফেইলিউর’ (ছোটো ছোটো ব্যর্থতা) ফেস করে, বড়ো বয়সে তার ‘রেজিলিয়েন্স’ বা যেকোনো বিপদ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা তত বেশি শক্তিশালী হয়। বাচ্চার কান্না বা সাময়িক কষ্ট জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ। এই কষ্ট বাচ্চাকে ম্যাচিউর বা পরিণত হতে সাহায্য করে। বাচ্চা কোনো সমস্যায় পড়লে বা কিছু একটা করতে না পারলে সাথে সাথে দৌড়ে গিয়ে করে দেবেন না। তাকে কিছুক্ষণ চেষ্টা করতে দিন।
আপনি তার রক্ষাকর্তা হিসেবে নয়, বরং তার ছায়াসঙ্গী হিসেবে পাশে থাকুন। তাকে বিশ্বাস করতে শেখান যে, পৃথিবী যতই কঠিন হোক না কেন, সে সেই কঠিন পৃথিবীতে একাই লড়াই করে জয়ী হওয়ার ক্ষমতা রাখে!
শারীরিক শাস্তি
কথায় কথায় কি আপনার প্রচÐ রাগ উঠে যায়? এগুলো কোনো স্বাভাবিক লক্ষণ নয়; এগুলো হলো ছোটবেলায় সেই ‘কঠোর শাসন’ এবং ভয়ের পরিবেশে আপনার বড়ো হওয়ার সরাসরি সাইকোলজিক্যাল ইমপ্যাক্ট বা ট্রমা!
আপনার বাচ্চা হঠাৎ মারাত্মক কোনো ভুল করে ফেলল। আপনি হয়তো রাগে অন্ধ হয়ে ঠাস করে বাচ্চার গালে একটা চড় বসিয়ে দিলেন। বকা দিয়ে বললেন, ‘তোকে না হাজারবার বলেছি দৌড়াদৌড়ি করবি না! মাইর না খেলে তোরা মানুষ হবি না!’
কিন্তু আপনি কি জানেন, আপনার ওই একটি চড় বা শারীরিক আঘাত আপনার সন্তানের মঙ্গলের বদলে তার মস্তিষ্কে এমন এক ভয়ংকর এবং স্থায়ী ক্ষত তৈরি করছে, যা তাকে ভবিষ্যতে একজন ভীতু, মিথ্যুক অথবা চরম আগ্রাসী মানুষে পরিণত করবে?
হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির নিউরোসায়েন্টিস্টদের মতে, যেসব বাচ্চাকে নিয়মিত শারীরিক শাস্তি (চড়, থাপ্পড় বা বেত দিয়ে মারা) দেওয়া হয়, তাদের ব্রেনের ‘প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স’ (যে অংশটি লজিক বা বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণ করে) ধীরে ধীরে সংকুচিত বা ছোটো হয়ে যায়। যা তার নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা বা আইকিউ (ওছ) স্থায়ীভাবে কমিয়ে দেয়। ফলে তাদের সেলফ-কন্ট্রোল, মনোযোগ এবং ইমোশন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গবেষণায় পরিষ্কার দেখা গেছে, কঠোর শাসনে বড়ো হওয়া শিশুদের মধ্যে পরবর্তীতে মাদকাসক্তি, ডিপ্রেশন এবং অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ার হার সবচেয়ে বেশি।
বাচ্চা যখন রেগে থাকে বা কাঁদে, তখন তাকে জ্ঞান দেবেন না। আগে তাকে জড়িয়ে ধরুন, তার লেভেলে বসে চোখে চোখ রেখে কথা বলুন। তার ব্রেন শান্ত হলে তারপর তাকে বোঝান সে কী ভুল করেছে।
বুলিংয়ের সাইকোলজি
স্কুলে বা খেলার মাঠে যখন কোনো বাচ্চাকে প্রতিদিন মোটা বা কালো বলে খ্যাপানো হয়, অথবা তাকে হেয় করা হয়, তখন তার ব্রেনে ক্রমাগত ‘কর্টিসল’ (স্ট্রেস হরমোন) রিলিজ হতে থাকে।
দিনের পর দিন এই ট্রমায় থাকার কারণে বাচ্চার ব্রেন এক ধরনের ‘লার্নড হেল্পলেসনেস’ বা শেখানো অসহায়ত্বে ভুগে। সে ভাবতে শুরু করে, ‘আমি হয়তো আসলেই খারাপ। বাবা-মাকে বললে তারা উল্টো আমাকেই বকা দেবে। এই ভয় থেকেই তারা দিনের পর দিন মুখ বুজে অত্যাচার সহ্য করে।
যে বাচ্চাটি অন্যকে মারে বা বুলি করে, সাইকোলজিতে তাকে বলা হয় ‘প্রজেকশন’। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, বুলি করা বাচ্চাটি নিজের পরিবারে বা বড়ো ভাই-বোনের কাছে নিজেই নির্যাতনের শিকার। নিজের সেই অসহায়ত্ব বা রাগ সে স্কুলের দুর্বল বাচ্চাদের ওপর শক্তি খাটানোর মাধ্যমে মেটাতে চায়। এদের ব্রেনে ‘কগনিটিভ এমপ্যাথি’ (অন্যের কষ্ট বোঝার ক্ষমতা) ঠিকমতো বিকশিত হয় না। তারা অন্যের চোখের পানি দেখে মজা পায়, কারণ এতে তারা নিজেদের ‘পাওয়ারফুল’ বা ক্ষমতাবান মনে করে। বাচ্চাকে শেখান, কীভাবে চোখের দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বলতে হয়, ‘স্টপ! তুমি আমার সাথে এভাবে কথা বলতে পারো না!’ সাথে সাথে টিচারকে জানাতে বলুন।
শিশুকে পড়াশোনায় আগ্রহী করে তুলবেন যেভাবে
* মোবাইল এবং টেলিভিশন হলো সবচেয়ে বেশি সময়গ্রাসী। শিশুরা এর মোহে একবার পড়লে পড়া মাথায় ওঠে। তাই একটি নির্দিষ্ট সময় ব্যতীত টেলিভিশন দেখতে দেবেন না।
* অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন প্রিয় মিউজিকের সাথে অনেক শিশুই সাচ্ছন্দ্যে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারে। আপনার শিশু কোন্ প্রকারের এটা বুঝে ব্যবস্থা নিতে হবে।
* শিশুরা স্বভাবগত ভাবেই কিছুটা চঞ্চল হয়ে থাকে। ক্লাশ টেনে পড়া একজন শিক্ষার্থী টানা এক ঘন্টা মনোযোগ দিয়ে পড়তে পারে, অপরদিকে একজন কিন্ডারগার্টেনে পড়া শিশুর পক্ষে টানা পনের মিনিট পড়াটাই অনেক। তাই তার চঞ্চলতাকে কিছুটা প্রশ্রয় দিতেই হবে।
* একটা বড় এবং রঙচঙে ক্যালেন্ডার কিনুন। সেখান থেকে নির্দিষ্ট সেমিস্টারের মাসগুলো কেটে নিয়ে দেয়ালে লাগিয়ে দিন। বিশেষ দিনগুলিকে রঙিন পেন্সিল দিয়ে দাগ দিতে বলুন সন্তানকে। যেমন, ক্লাস টেস্ট, সেমিস্টার ফাইনাল, পিএল ইত্যাদি দিনগুলিকে আলাদা আলাদা রঙে রাঙাতে দিন। এতে করে সে পরীক্ষার জন্যে মানসিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারবে।
* প্রতিটি অধ্যায় পড়া শেষে ছোট্ট নোট নিতে বলুন।
* বড় কোন কিছু করতে না দিয়ে স্রেফ বইটি উল্টে-পাল্টে দেখতে বলুন।
* টেবিল এবং চার্ট আকারে তার পড়া প্রস্তুত করে দিন।
* পড়া শেষে সে কী শিখলো? তাকে নিজের ভাষায় বলতে দিন, মোটেও গতানুগতিক কেতাবী ভঙ্গিতে নয়।
* বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই মনে করে যে ক্লাশে শিক্ষক যা লিখছেন তার প্রতিটি শব্দ লিখে ফেললেই নোট নেয়া হয়ে যায়। হ্যাঁ, তা হয়, তবে তা সবসময় খুব ফলপ্রসু নাও হতে পারে। নোট লিখতে গেলে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের পাশে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা, অথবা বিশেষ অংশগুলো হাইলাইট করলে তা পড়ার সময় সহায়তা করতে পারে।
বাচ্চাদের মস্তিষ্ক বিকাশে আপনি কী করবেন?
৫ বছর বয়সের পর থেকে মস্তিষ্কের বিকাশ ধীর গতিতে কাজ করা শুরু করে। তাই এই সময়টাতে কিছু কার্যক্রমের মাধ্যমে মাধ্যমে দ্রুতই আপনার বাচ্চার মস্তিষ্ক বিকাশে সচেতন হোন।
* আপনার বাচ্চার শেখার ও দক্ষতার উন্নয়ন ঘটানোর ক্ষেত্রে তাদের সাথে সময় কাটানোটা হলো সবচাইতে উপকারী পন্থা। বাচ্চারা মা-বাবার সাথে সময় কাটানোর মধ্য দিয়ে ভাষা, মুখভঙ্গি এবং আবেগের প্রকাশ শেখে। এমনকি আপনার ছোঁয়াও আপনার সন্তানের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। ছোট ছোট কাজ, যেমন- হাত ধরে হাঁটা, হাত ধরে লেখা শেখানো, এইগুলো বেশ কার্যকরী।
* বই পড়ার অভ্যাসটি বাচ্চাদের মনে গেঁথে দেয়াটা খুব জরুরি। আপনি বিভিন্ন ধরনের লেখা বই দিতে পারেন। পড়লে বাচ্চাদের শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবে। এছাড়াও পড়লে ওদের কল্পনাশক্তি বিকশিত হয় এবং কথাবার্তাও সুসঙ্গত হয়।
* বাচ্চারা প্রাকৃতিকভাবেই কৌতূহলী হয়ে থাকে। কিন্তু যখন প্রতিটি বিষয়ে অনবরত প্রশ্ন করার জন্য ওদেরকে থামিয়ে দেয়া হয় বা প্রশ্নগুলো অবহেলা করা হয়; কৌতূহলের এই প্রবণতাটি ওদের মাঝ থেকে হারিয়ে যাবে।
* যদি আপনার বাচ্চা টিভি বা ইন্টারনেটে শিক্ষণীয় কিছু দেখে থাকে তবে অবশ্যই আপনি ওর পাশে থাকবেন, যাতে করে সেই অনুষ্ঠানগুলো ওর জন্য কার্যকরী হতে পারে। তবে দিনে সর্বোচ্চ ২ ঘণ্টার বেশি টিভি বা ক¤িপউটার দেখতে দেয়া ঠিক নয়।
বাইরের পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে এবং কমিউনিকেশন ও সামাজিকতায় দক্ষ হতে অন্য বাচ্চাদের সাথে মেলামেশা ও কথা বলতে দিন। খেলাতে রয়েছে হার-জিতের ব্যাপার। হেরে গেলে থেমে না থেকে অন্যদের সাথে পাল্লা দিয়ে কীভাবে আবারও একই ¯পৃহা নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হয় তা শেখান। এছাড়াও জিতে গেলে নিজের খুশি অন্যদের সাথে কীভাবে ভাগাভাগি করে নিতে হয় সেটাও শেখান।
* বিভিন্ন ধরনের ইন্সট্রমেন্ট বাজানো শেখান। গবেষক কলিন্স বলেছেন, “গান বা বাজনা শোনার সময় আমাদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ সাড়া দেয়। কেউ যখন কোনো ইন্সট্রুমেন্ট বাজায়, তখন তার মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলি স¤পৃক্ত হয়ে কাজ করে।”
* ঘারাঘুরি করলে মনটা শুধু ফ্রেশই হয় না, বরং জ্ঞানও বাড়ে। বাইরে কোথাও ঘুরে আসলে বাচ্চার একঘেঁয়েমি কাটবে এবং জ্ঞানও বাড়বে।
* অবসরে বাচ্চাকে আর্ট করা ও ক্রাফটিং শিখান। আর্ট করা ও ক্রাফটিং শিখালে তার সৃজনশীলতা বাড়বে। সেক্ষেত্রে ইউটিউবে বিভিন্ন টিউটোরিয়াল দেখে যে-কোনো বিষয়ে শিখাতে পারেন।
* আপনার বাসার ছাদে অথবা জানালার পাটাতনে, ড্রেসিং টেবিলে অথবা ঘরের বিভিন্ন কর্নারে ছোটো টবে পাতাবাহার, বনসাই, মানিপ্ল্যান্ট ছাড়াও বিভিন্ন রকমের গাছ রাখতে পারেন। চারপাশে গাছপালা থাকলে তার মন প্রফুল্ল হবে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের অনেকটা কাছাকাছিও থাকবে।
যারা মুখস্থ করতে পারেন না, তারা মেধাবী
মুখস্থ করলে কল্পনাশক্তি কমে যায়। যখন আপনি কোনো কিছু মুখস্থ করেন, তখন আপনার ব্রেনে খুব চাপ পড়ে। এতে আপনার প্রকৃত মেধা নষ্ট হয়ে যায়Ñ যা হল চিন্তা করার ক্ষমতা। আমাদের দেশের ছাত্র-ছাত্রীরা পরিশ্রম করে সবচেয়ে বেশি কিন্তু শেখে সবচেয় কম।
আপনি হয়ত ভাবছেন মুখস্থ ছাড়া পড়ব কিভাবে, আপনি পড়ুন কিন্তু নাক মুখ বন্ধ করে মুখস্থ করবেন না, ভাবুন, কল্পনা করুন তাহলে দেখবেন অনেক তাড়াতাড়ি আপনার ব্রেনে পড়া সেভ হয়ে গেছে। সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আইনস্টাইন-এর মুখস্থ শক্তি এত কম ছিল যে, নিজের বাড়ির নাম্বার মনে রাখতে পারতেন না। এর কারণ হল তিনি মুখস্থ করতেন না, কল্পনা করতেন আর এর ফলে তিনি হয়েছেন সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী।
বাচ্চাদের বুদ্ধি বিকাশের অন্যতম পথ,
বাচ্চার সাথে নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এতে করে আপনি ও আপনার বাচ্চার শুধু ফিটনেসই বাড়বে না, বরং হাঁটলে আপনাদের মন-মেজাজ ভালো থাকবে, আপনারা সৃজনশীল হয়ে উঠবেন, বøাড সার্কুলেশন বাড়বে, শরীর সুস্থ থাকবে এবং বাচ্চার সাথে আপনার মানসিক বন্ধনও মজবুত হবে। এছাড়া ঘুম না হওয়ার সমস্যাটাও আর থাকবে না, ক্ষিধেও বাড়বে। তাই নিয়ম করে প্রতিদিন বাসার আশেপাশে যেখানে আপনার ভালো লাগে, সেখানে বাচ্চাকে নিয়ে হাঁটার চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন, বইয়ে মুখ গুঁজে রাখলে বুদ্ধি বাড়ে না। টিভির দেখলে বা গেমস খেললেও বুিদ্ধ বাড়ে না। বাচ্চার বুদ্ধি বিকাশের একটাই পথ, হাঁটা এবং দৌড়।
আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব এজিং-এর গবেষণায় দেখা গেছে, হাঁটলে ও দৌড়ালে মানুষের শরীর থেকে ক্যাথাপসিন-বি নামে একটি প্রোটিন বেরোয়। এই প্রোটিন সরাসরি মস্তিষ্কে প্রবাহিত হয়। এই ক্যাথাপসিন-বি প্রোটিনেই লুকিয়ে আছে বুদ্ধি বাড়ার রহস্য। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, কম পক্ষে ৪ মাস ধরে সপ্তাহে ২ থেকে ৩ বার ২০ মিনিট করে দৌড়ালে শরীরে ক্যাথাপসিন বি প্রোটিনের নিঃসরণ বাড়তে থাকে। ফলে মস্তিষ্কে নিউরোজেনেসিসগুলি প্রভাবিত হয়।
বাচ্চাকে কখনো আড়ালে লুকিয়ে খেতে দেবেন না,
এতে তার লুকিয়ে খাবার অভ্যাস তৈরি হবে।
বাচ্চাকে কখনো বন্ধু বা প্রতিবেশী বাচ্চাদের থেকে আড়ালে লুকিয়ে খেতে দেবেন না, একবার লুকিয়ে খাবার অভ্যাস তৈরি হলে ভবিষ্যতে সে আপনাকেও লুকিয়ে খাবে। বাচ্চা যাতে তার খাবার অন্যদের সাথে শেয়ার করে, সেদিকে লক্ষ্য রাখুন।
দৌড় ধর্ম ভালো কিন্তু ধর্মান্ধতা নয়
মানবতার প্রথম শিক্ষা-শুধু অন্যকে ভালোবাসা নয়; অন্য ধর্মের মানুষকেও ভালোবাসতে শেখা। এর জন্য ছোটবেলা থেকে ছেলে-মেয়েদের শিক্ষা দিন। সাবালক না হওয়া পর্যন্ত ধর্মের তত্ত¡ বোঝাতে যাবেন না। শুধু ধর্মীয় কল্যাণমূলক উপদেশ ও নীতিকথাগুলো বলুন। ছোটকাল থেকে তাদের প্রকৃতপ্রেমি ও মানবতাবাদী হিসেবে গড়ে তুলুন। ছেলে-মেয়েদের সামনে অন্য মানুষের বা ধর্মের নিন্দা করবেন না। এমনকি তাদের সামনে কোনো গুরুজনদের সমালোচনা বা মিথ্যে বদনাম করলে শিশুরা আপনার প্রতিও শ্রদ্ধা হারাবে, তাদের আচরণে সে অশ্রদ্ধা প্রকাশ পাবে। সন্তানের সামনে এমন কোনো কাজ করা উচিৎ নয়, যা পরবর্তীতে তার মনে খারাপ প্রভাব ফেলবে।
উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করুন
বিজ্ঞানীররা প্রমাণ করেছেন যে, মানুষের আচরণের জন্য দায়ী তার শরীরের মধ্যে থাকা জিন ও পরিবেশ। বাবা-মা ও শিশুর চারপাশের পরিবেশ ভালো হলে সন্তান ভালো হবে। আর বাবা-মা অপরাধী বা আশ-পাশের পরিবেশ খারাপ হলে সন্তানও অপরাধী বা খারাপ হবে।
বাবা-মার অসৎ চরিত্র সন্তানদের মানসিক ক্ষতি করে সবচেয়ে বেশি। বাবা-মা ঘুষখোর, দুর্নীতিপরায়ণ, অপরাধী হলে, নিকট আত্মীয়দের দেখাশোনা না করলে, সন্তানরাও তাই শেখে। যেসব পরিবারে বাবা সব খারাপের জন্য বা নেতিবাচক ঘটনা (যেমন- সন্তান ফেল করলে, বখে গেলে, দোষ করলে, ভুল করলে, প্রেম করলে ইত্যাদি)-র জন্য মাকে দায়ী করে, সেসব পরিবারের শিশুরা বড় হয়ে একই আচরণ করে। বংশ পর¤পরায় এভাবে চলতে থাকে নষ্ট জীবনের চক্র।
সন্তানের সাথে কিভাবে গড়ে তুলবেন নিবিড় বন্ধন
বাবার কণ্ঠস্বর, চেহারা, শরীরের গন্ধ ইত্যাদি মিলিয়ে সবকিছু প্রতিটি সন্তানের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাবোধ তৈরি করে। এটি সন্তানের পরিপূর্ণ বিকাশে যা গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করে। সন্তানের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে তার প্রথম আইডল তার বাবা। একটি শিশু প্রথম থেকেই তার বাবাকে সার্বক্ষণিক অনুসরণ করে। সন্তানদের দিকে বাবার একটু নজর দেওয়া, কথাবার্তায় বন্ধু হয়ে মিশে যাওয়া, কাজের ক্ষেত্রে পরামর্শ দেওয়াÑ সন্তানের মনে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেয়। বাবার সাথে সুস¤পর্কের কারণে সন্তানের মনস্তাত্তি¡ক বিকাশ ঘটে খুবই দ্রæত ও অনেক সুদৃঢ়ভাবে।
ছেলে আর মেয়েতে তফাৎ করবেন না
ছেলে বা মেয়ে যে-ই হোক না কেন, বাবা-মার প্রধান দায়িত্বই হলো উভয়ের প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি রাখা বা উভয়কেই সমান চোখে দেখা। কোনো অবস্থাতেই ছেলে বা মেয়ের ভেদাভেদ করা যাবে না। মেয়ে সন্তান হলে মা দেখবে, ছেলে সন্তান হলে বাবা দেখবেÑ এমন ধ্যান-ধারণা কিছুতেই রাখা উচিত নয়।
বকা-ঝকা নয়, শিশুদেরকে আনন্দের মাঝে রাখুন
বাচ্চা মানুষ, ভুল তো করবেই। তাই বলে বেশি বকা-ঝকা করতে যাবেন না। তার ভুলের কারণে কী কী খারাপ হয়েছে বা হতে পারে তা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করবেন। ভবিষ্যতে যেন এমন ভুল আর না করে, সেই ব্যাপারে সতর্ক থাকতে বলুন। বিনা কারণে সন্তানকে ধমকানো বা শারীরিক নির্যাতন করা কোনো অবস্থাতেই ঠিক নয়। শিশুর কোমল মনে এগুলো দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। তাই অকারণে যেকেনো ব্যাপারে মেজাজ খারাপ করা একদমই ঠিক নয়।
সন্তানের পড়াশোনা, খেলাধুলায় উৎসাহ দিন
বাচ্চারর পড়াশোনা ও খেলাধুলায় সবসময় উৎসাহ দিতে হবে। তাকে বোঝাতে হবে, পড়ার সময় পড়া আর খেলার সময় খেলা। শুধু পড়াশোনার দিকে নজর দিলে চলবে না। খেলাধুলাতে শিশুকে উৎসাহ দিন। কারণ খেলাধুলোর মধ্য দিয়েই শিশুর শারীরিক-মানসিক বিকাশ ঘটে এবং নিয়মানুবর্তিতা শেখা হয়। অন্যকে সম্মান দেয়া, জয় বা পরাজয় মেনে নেয়া, বিরুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবেলা করা, এসব কিছুই একটি শিশু খেলার মাঠ থেকেই শিখে নেয়।
সন্তানের আগ্রহকে গুরুত্ব দিন
প্রতিটি বাচ্চারই নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছা থাকে, এর প্রতি গুরুত্ব দেয়া উচিত। বাবা-মা নিজে কী চায় সেটা না দেখে বাচ্চা কী হতে চায়, কী করতে চায় সেই দিকটিই ভালভাবে খেয়াল রাখতে পারলে শিশুরা বাবা-মার কাছে খুব সহজেই তাদের ইচ্ছে আর সুপ্ত প্রতিভাগুলো মেলে ধরতে পারে।
সন্তানের কাজটি যদি যথাযথ বলে মনে না হয়, তাহলে সন্তানকে বোঝানোর চেষ্টা করতে হবে। সন্তান যেন বাবা-মায়ের আড়ালে কিছু করার চেষ্টা না করে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। “বাবাকে বললেই বাবা নিষেধ করবে” এমন চিন্তা-ভাবনা যেন বাচ্চারা পোষণ না করে, সে জন্য বাবাদের অনেক বেশি সচেষ্ট হতে হবে।
নেগেটিভ কথা বাচ্চাকে কখনোই বলবেন না
বাচ্চারা অবুঝ। তারা নিষ্পাপ। কিন্তু তাই বলে তাদের আত্মসম্মানবোধের কোনো কমতি নেই। তারা ভুল করবে এটাই স্বাভাবিক। তার জন্যে তিরস্কারও করা যেতে পারে, তবে তা মোটেও নেতিবাচক ভঙ্গিতে নয়। “তুমি খারাপ”, “তুমি পচা” এই সাধারণ কথাটাও তার মধ্যে হীনম্মন্যতা সৃষ্টি করতে পারে। নেগেটিভ কথা বলতে হবে পজেটিভ ভঙ্গিতে। যেমন, “তুমি তো অনেক ভালো। ভালো বাবুরা অমন আচরণ করে না। এতে অন্যেরা কষ্ট পায়।” এভাবে বললে তার প্রশংসা করে উৎসাহও দেওয়া যায় এবং অন্যকে কষ্ট দেয়া ঠিক নয়, এই বোধও তার মাঝে জাগ্রত করা যায়।
এই মুহূর্তে কান্না বন্ধ করো
বাচ্চা হয়তো একেবারেই অকারণে কান্নাকাটি করছে এবং কোনোভাবেই তার কান্নাকাটি বন্ধ করা যাচ্ছে না। তবুও তাকে কখনোই এই কথাটি বলা যাবে না। বিশেষ করে কঠিন স্বরে একেবারেই নয়। কারণ, একজন শিশু তার অনুভূতিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে জানে না। তাকে বারবার এই কথা বলে ধমক দিলে বা ভয় দেখালে সে হয়তো কিছু সময় পরে কান্নাকাটি বন্ধ করে ফেলবে। কিন্তু, তার মনের মাঝে আবেগ অনুভূতি কোনটাসা হতে শুরু করবে। তাই উক্ত কথা বলার পরিবর্তে তাকে বলা যেতে পারে- ‘আমাকেও বলো কেনো কান্নাকাটি করছো। তোমার জন্য কী করতে পারি?’
লিঙ্গ বিভেদ না করে দলগত কাজের অনুপ্রেরণা দিন
অনেক সময় বাচ্চারা সাধ্যের বাইরেও কিছু করতে চায়। সেক্ষেত্রে সরাসরি না বলে ব্যাপারটা অন্যভাবে সমাধান করতে পারেন। যেমন- “চলো দুজনে মিলে করি”। এতে করে চেয়ারও তোলা যাবে, সাথে সে দলগতভাবে কাজ করার শিক্ষাও পাবে। তাদের মধ্যে লিঙ্গবিভেদ করা ঠিক না। সে তার মত করে চলুক। বাধা দিলে সে বরং জীবনের নব নব রূপ দেখা থেকে বঞ্চিত হবে। তারা হোক আরো কৌতুহলী এবং দক্ষ।
দাঁড়াও, তোমার বাবা/মা আসুক!
এটা বহুলচর্চিত একটি ভুল। এতে শিশুরা উদ্বিগ্ন এবং শঙ্কিত হয়ে পড়ে, বিশেষ করে বারবার যদি এমন বলা হয়। যদি সে বারবার কোনো একটা ভুল করতেই থাকে, তাহলে বাচ্চাকে জিজ্ঞেস করুন, “তোমার বাবা/মা’কে তুমি বলবে নাকি আমি তাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলবো?”। এভাবে আপনার শিশুকে তার ভুলের দায়ভার নিতে শেখান।
বাচ্চাকে হেরে যেতে দিন
বাবা-মা কখনোই চান না সন্তান হেরে যাক। তাই অনেকেই বুক দিয়ে আগলে রাখেন সন্তানকে। সাহায্য করেন জিততে। এটা ঠিক যে বাবা-মা হিসেবে আপনি চান না যে, সন্তান হেরে গিয়ে কষ্ট পাক। কিন্তু মনে রাখবেন যে, হারের মাধ্যমেই মানুষ শেখে এবং বড় হয়। একবার হারলে মানুষ হারকে মোকাবেলা করার শক্তি পায়। বিপদে পড়ার মাধ্যমে মানুষের আরো বেশি মানসিক শক্তি বাড়ে সামনের বিপদকে সরিয়ে দেওয়ার। আর তাই সন্তান কষ্ট পেয়ে কাঁদলে বা হেরে গিয়ে মন খারাপ করলে বাচ্চাকে শান্তনা না দিয়ে ঘটনার মুখোমুখি হবার সাহস দিন।
বাচ্চাকে দায়িত্ব নিতে দিন
আমাদের সমাজে সন্তান কি করবে না করবে সে সবের সিদ্ধান্ত অনেকখানি তার মা-বাবাই নিতে চান। কিন্তু সবচাইতে ভালো হয় যদি আপনার সন্তানকে তার জীবনের সিদ্ধান্ত তাকেই নিতে দেন এবং বোঝান যে, যেহেতু সে এই সিদ্ধান্ত নিজে থেকেই নিচ্ছে সুতরাং এর ফলাফলটাও পুরোপুরি তার। এতে করে সন্তান নিজের সিদ্ধান্ত নেবার মতো মানসিক শক্তি অর্জন করবে।
সন্তানকে চ্যালেঞ্জ দিন। হতে পারে সেটা ঘরের কোনো ব্যাপারে কিংবা স্কুলের কোনো খেলায়। এতে করে সে শিখবে নিজের শক্তিতে কি করে আরো ভালো অবস্থানে যাওয়া যায়। আর সে ভালো কিছু করলে সেটাকে উদযাপনও করুন।
বাচ্চার শখকে উৎসাহ দিন
সন্তানের অনেক রকমের শখ থাকতে পারে। হতে পারে সেটা কিছু সংগ্রহ করা কিংবা বই পড়া। সন্তানের নিজের শখকে ধরে রাখার ক্ষেত্রে উৎসাহ দিন। এতে করে সে মুক্তভাবে নিজের ইচ্ছেমতন কাজ করতে সুযোগ পাবে।
সত্যিটা জানান
হয়তো আপনার সন্তান অন্যদের চাইতে কিছু একটা কম পারে, বা কোনো দিক দিয়ে খানিকটা পিছিয়ে আছে। মোটেই তাকে বড় বড় কথা বলে মন ভালো করার চেষ্টা করবেন না। কারণ সেটা হয়তো খানিক সময়ের জন্যে তার মন ভালো করে দেবে। এর চাইতে বরং তাকে সত্যিটা বলুন যে, আসলেই সে খানিকটা পিছিয়ে রয়েছে বন্ধুদের চাইতে এবং আরেকটু চেষ্টা করলে অনেক বেশি ভালো করতে পারবে।
সমাপ্ত