‘সেল্‌ফ লার্নিং’ শিক্ষা আন্দোলন

'সেলফ লার্নিং' কি ও কেন?

শিক্ষা মানুষের জ্ঞান অর্জন, দক্ষতার বিকাশ এবং আচরণের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটায়সহজ করে বললে: শিক্ষা হল নতুন কিছু শেখা, বোঝা এবং নিজেকে উন্নত করা।  বিশ্বের প্রায় সব দেশেই প্রাথমিক পর্যায়ে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলিত। এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থায় সব শিক্ষার্থীকে একই বই পড়ানো হয় এবং একই ধরনের শিক্ষা দেয়া হয়। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। দেশে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে অন্তত ১১ ধরনের। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে প্রতিষ্ঠানের ধরন ও কারিকুলামভেদে শিক্ষার্থীদের অর্জিত জ্ঞান এবং দক্ষতার মধ্যে বিশাল ফারাক দেখা যায়। প্রতিষ্ঠানভেদে শিক্ষার্থীদের দক্ষতার পার্থক্যের বিষয়টি উঠে এসেছে প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির (নেপ) গবেষণায়ও। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে যেই অভিভাবক যত বেশি অর্থ ব্যয় করতে পারবে, তার সন্তান তত মানসম্মত শিক্ষা পাবে। যে অভিভাবক অর্থ ব্যয় করতে পারবেন না, তার সন্তান শিক্ষায়ও পিছিয়ে থাকবে। শিক্ষায় এ বৈষম্য দেশকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা।এছাড়া আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অনেকে নিয়মিত ক্লাস করাচ্ছেন না। নানা রকম গোজামিল জোড়া তালি দিয়ে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে শিক্ষকদের উপস্থিতি খুবই হতাশাজনক এবং পড়াশুনার মান অত্যন্ত নিম্নমুখী। ফলে পঠনপাঠনের ঘাটতি পূরণ  করতে শিক্ষার্থীরা কোচিং ক্লাসের দিকে ঝুঁকছেন। এতে হাজার হাজার কোটি টাকার কোচিং বাণিজ্য হচ্ছে; যা শিক্ষা ব্যবস্থাকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। 

দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল শিক্ষা ব্যবস্থা হল-ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থা। উন্নত কারিকুলামের পর্যাপ্ত রিসোর্স থাকার ফলে বাংলাদেশে ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থা ভালোভাবেই চলমান আছে। অন্যদিকে দেশের সবচেয়ে সহজলভ্য শিক্ষাব্যবস্থা হল বিনামূল্যে সরকারি শিক্ষব্যবস্থা, এনজিও কর্তৃক শিক্ষা ব্যবস্থা ও কওমি শিক্ষা ব্যবস্থা। এই শিক্ষাব্যবস্থাগুলোকে যদি আমরা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের উপযোগী কারিকুলাম স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে তৈরি না করি, তাহলে আমাদের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী অদক্ষ থেকে যাবে।  আমরা যদি উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সত্যিকার একটি  টেকসই শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে একটি সভ্য, নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন একটি সমাজ গঠন করতে চাই, তাহলে দক্ষতা ও নৈতিকতা—এ দুইয়ের সমন্বয়ে সময়োপযোগী 'সেলফ লার্নিং' শিক্ষাব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।  এটি বাস্তবায়নের জন্য   কোনো কোন বড় অংকের অর্থ ব্যয় করতে হবে না। শুধুমাত্র একটা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তই যথেষ্ট। 



শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অনেকে নিয়মিত ক্লাস করাতে পারছেন না।বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে শিক্ষকদের উপস্থিতি খুবই হতাশা জনক এবং পড়াশুনার মান অত্যন্ত নিম্নমুখী। ফলে প্রশ্ন উঠেছে পঠনপাঠনের যে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে, তা পূরণ হবে কী করে? সে সমস্যা সমাধানেই ‘সেল্‌ফ লার্নিং’ ব্যবস্থা সরকারের পক্ষ থেকে চালু করতে হবে। এতে  ইউটিউবের মতো মাধ্যম ব্যবহার করে সেরা শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে "বিষয় ভিত্তিক" শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করতে হবে। ফলে “নিজের স্কুলের শিক্ষকদের বাইরে, পড়ুয়ারা সেরা শিক্ষকদের ক্লাশ করতে পারবে, পাশাপাশি এতে শিক্ষকরাও প্রশিক্ষণ পাবে। কোনো কিছু না বুঝলে শিক্ষার্থীরা কমেন্ট করতে পারবে এবং একই বিষয়ে অন্যান্য শিক্ষকের আরো ক্লাশ দেখতে পারবে। এছাড়া নিজ স্কুলের শিক্ষকদের কাছেও বিষয়টা আরো বুঝে নিতে পারবে। এতে করে ভিকারুন্নেসা নুন স্কুল কিংবা নটোরডেম কলেজের সাথে, অজপাড়া গ্রামের যে কোনো স্কুল এবং কলেজের শিক্ষার মানের গ্যাপ বা দূরত্ব কমে যাবে। বিদেশে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও উপকৃত হবে।


প্রাথমিক কাজ কি কি?

# প্রতিযোগিতামূলক আয়োজনের মাধ্যমে  বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দিয়ে প্রথম শ্রেণী থেকে মাস্টার্স শ্রেণি পর্যন্ত প্রত্যেকটি ক্লাসের জন্য আলাদা করে বিষয়ভিত্তিক মানসম্মত ভিডিও তৈরি করা। 

#  সে সব ভিডি "শ্রেণী ,পাঠ্য বই ও সাবজেক্ট তালিকা বদ্ধ করে" বাংলাদেশ শিক্ষা পোর্টালের পাশাপাশি ইউটিউব লিঙ্ক-এ আপলোড করা। 

# প্রতিটা ভিডিওর কমেন্ট সেকশনে অন্তত চারটি ফ্রি এআই চ্যাট বটের লিংক রাখাযাতে শিক্ষার্থী কোনো কিছু না বুঝলে সরাসরি বলতে পারে এবং উত্তর নিতে পারে।

# উক্তশ্রেণী্র এই সাবজেক্ট-এর একটা শিক্ষক ফোরাম লিংক ভিডিওর বিবরণীতে ট্যাগ করে রাখা। যাতে করে উক্ত সাবজেক্টের শিক্ষকেরা তাদের মতামত ও শিক্ষনীয় দিক নিয়ে আলোচনা করতে পারে, প্রয়োজনে নিজেদের তৈরি ভিডিও, বক্তব্য ও নোট আপলোড করতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে কোন নোট বা আপডেট থাকলে তা উপস্থাপন করতে পারে।

# ধীরে ধীরে ধাপে ধাপে  শিক্ষা ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন করা,  বিশেষ করে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে আসা। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুব কমই আপগ্রেডিশন বা সংস্করণ করেছে। এখন সময় এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অনার্স ও মাস্টার্সে যেসব কোর্স পড়ানো হয়, সেগুলোয় এ সময়ের উপযোগী নতুন কোর্স সংযোজন করা, যাতে পড়াশোনা শেষে যেকোনো সেক্টরে কাজ করার জন্য ন্যূনতম একটি ভিত্তি তৈরি হয়। 

শিক্ষার্থীদের সুবিধা:

পড়ুয়ারা বাড়িতে বসেই মোবাইলে এই ভিডিওগুলি দেখতে পাবে। তবে, যে সমস্ত স্কুলের স্মার্ট ক্লাসরুম রয়েছে তারা স্কুলেই ওই ভিডি চালিয়ে পঠনপাঠন এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।  বারবার replay করে মন দিয়ে শুনে নিলে অবশ্যই পড়াশুনা এবং উত্তরের মান ভাল হবে।”