যেভাবে 'আমার সোনার বাংলা' জাতীয় সংগীত হলো

'আমার সোনার বাংলা' গানটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে লিখেছিলেন বলে বিভিন্ন প্রবন্ধ ও লেখায় উঠে আসে। কারণ রবীন্দ্রনাথের জীবনীলেখক প্রশান্তকুমার পাল ১৯৯০ সালে প্রকাশিত বই 'রবিজীবনী'তে উল্লেখ করেছেন যে এই গানটি ১৯০৫ সালের ২৫শে অগাস্ট কলকাতা টাউন হলের একটি প্রবন্ধ পাঠের আসরে প্রথমবার গাওয়া হয়েছিল। ১৯৭১ পূর্ববর্তী বাংলাদেশে, অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রসংগীত হিসেবে অনেক অনুষ্ঠানেই এই গানটি গাওয়া হতো ।

তবে এটিকে জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করার ধারণা প্রথমবার তৈরি হয় ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে। "১৯৭১ সালের পহেলা মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আচমকা স্থগিত করার ঘোষণা দেয়ার মানুষের মধ্যে গণবিক্ষোভ দেখা যায়। ঢাকার অনেক জায়গায় পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে মানুষ বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।"

"দোসরা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বটতলায় পতাকা উত্তোলন করে সেটিকে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা বলে ঘোষণা করেন তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ, ডাকসুর ভিপি আ.স.ম. আবদুর রব। ওই দিনই দোসরা মার্চ বিকেলে ইকবাল হলের ক্যান্টিনে তৎকালীন ছাত্রলীগের একাংশের গুরু সিরাজুল আলম খানের উপস্থিতিতে স্বাধীনতার ইশতেহার লেখার চিন্তা করা হয় ও সন্ধ্যায় ইকবাল হলে ওই ইশতেহারটি লেখা হয়।" দোসরা মার্চ সন্ধ্যায় ইকবাল হলে বসে লেখা ইশতেহারটিতে 'আমার সোনার বাংলা'কে স্বাধীন বাংলার জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

জাতীয় সংগীত হিসেবে 'আমার সোনার বাংলা' ছাড়াও দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের 'এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি' গানটিও অনেকের পছন্দের তালিকায় ছিল।

তবে ওই গানটিকে দুটি কারণে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্বাচন করা হয়নি। "দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের এই গানে বাংলা বা বাংলাদেশ শব্দটি ছিল না। আরেকটি বিষয় ছিল যে এই গানের রেকর্ড সেসময় পাওয়া যায়নি",।  ১৯৭০ সালে জহির রায়হান 'জীবন থেকে নেয়া' চলচ্চিত্রে আমার সোনার বাংলা গানটি ব্যবহার করায় সেটির একটি রেকর্ড ছিল ।

আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃত হওয়ার আগে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বহু আন্দোলন ও প্রতিবাদ কর্মসূচিতে 'আমার সোনার বাংলা' গানটি ব্যবহার হয়েছে বলে উঠে এসেছে বিভিন্ন প্রবন্ধ ও গবেষণাধর্মী লেখায়।  ১৯৬৭ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী বেতার ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার নিষিদ্ধ করার পর সাংস্কৃতিক আন্দোলন শুরু করে সব সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। সেসময় সব সভা-সমাবেশে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করা হয়, যার মধ্যে 'আমার সোনার বাংলা' ছিল অন্যতম। ষাটের দশকের সেই আন্দোলন চূড়ান্তভাবে পূর্ণতা পায় একাত্তরের এপ্রিলে, যখন 'আমার সোনার বাংলা'কে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় সংগীতের স্বীকৃতি দেয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার।

১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় – যা পরে মুজিবনগর নামে পরিচিতি পায় – বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মত সরকারিভাবে জাতীয় সংগীত হিসেবে 'আমার সোনার বাংলা' পরিবেশন করে পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগর থেকে আসা ওই গায়কদল। পরে ১৯৭২ সালের ১৩ই জানুয়ারি বাংলাদেশের মন্ত্রিসভার প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকে 'আমার সোনার বাংলা'র প্রথম দশ চরণ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্বাচিত হয়। [ বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে।]



গাড়ি থামিয়ে পানির কল বন্ধ করা থেকে নিজের বেতন কমানো- নেহরুর অনেক অজানা দিক

পৃথিবীর ইতিহাসে "সেরা ৫জন ব্রিলিয়ান্ট" রাষ্ট্রপ্রধান -এর মধ্যে প্রথম ধরা হয় উইনস্টন চার্চিল (যুক্তরাজ্য): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর অদম্য নেতৃত্ব ও বাগ্মিতা মিত্রপক্ষকে জয়ী করতে প্রধান ভূমিকা রেখেছিল। রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি তিনি একজন নোবেলজয়ী লেখক এবং ইতিহাসবিদও ছিলেন। তাঁর কৌশলগত বুদ্ধি এবং সংকট মোকাবিলার ক্ষমতা তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।  

দ্বিতীয় স্থানে আব্রাহাম লিংকন (যুক্তরাষ্ট্র): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৬তম রাষ্ট্রপতি। অত্যন্ত সাধারণ প্রেক্ষাপট থেকে এসে নিজের মেধা ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে গৃহযুদ্ধের মতো কঠিন সময়ে দেশটিকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছিলেন। তাঁর 'গেটিসবার্গ অ্যাড্রেস' এবং দাসপ্রথা বিলোপের সিদ্ধান্ত তাঁকে বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মেধাবী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।  

তৃতীয় লি কুয়ান ইউ (সিঙ্গাপুর): আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনক। মাত্র এক প্রজন্মের মধ্যে একটি প্রাকৃতিক সম্পদহীন ছোট দ্বীপকে বিশ্বের অন্যতম উন্নত ও ধনী রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য তাঁকে সর্বকালের অন্যতম সেরা দূরদর্শী নেতা মানা হয়। তাঁর বুদ্ধিমত্তা ও শাসনব্যবস্থা আজও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কাছে গবেষণার বিষয়। 

চতুর্থ জার্মানির অ্যাঞ্জেলা মার্কেল : দক্ষ বিজ্ঞানী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করলেও  ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীরের পতনের পর তিনি রাজনীতিতে যোগ দেন।  তিনি ২০০৮-এর বৈশ্বিক আর্থিক সংকট, থেকে শুরু করে ২০১৫-এর শরণার্থী সংকট পর্যন্ত সকল সমস্যা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সামাল দেন। তাঁকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের 'ডি ফ্যাক্টো' বা অঘোষিত নেতা এবং বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।  

পঞ্চম স্থানে আছে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, যার জীবনীশক্তি ছিল চোখে পড়ার মতো। দিনে ১৬-১৭ ঘণ্টা কাজ করতেন তিনি।

গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক এবং স্তূপাকৃতি নথির মাঝেও তার চোখ এড়িয়ে যেত না একেবারে খুঁটিনাটি বিষয়। আর কোনও ছবি বাঁকাভাবে টাঙানো থাকলে বা আগোছালো থাকলে তিনি বিচলিত বোধ করতেন। ততক্ষণ স্থির হয়ে কোনও কাজ করতে পারতেন না যতক্ষণ না সেটা কেউ ঠিক করে বা গুছিয়ে দেয়।

নিজের কাজ নিজে করার অভ্যেস ছিল তার। “ শুধু নিজের কাজ নয়, অন্য কর্মকর্তাদের কাজও পণ্ডিতজি নিজেই করতেন।” কোনও নোট বা খসড়া সংশোধন করা এবং প্রত্যেকটা চিঠির উত্তর নিজেই দেওয়ার মধ্যে এক অদ্ভুত তৃপ্তি পেতেন জওহরলাল নেহেরুর ।”

“দফতরে আসার আগে তিন মূর্তি ভবনের লনে সাধারণ মানুষের সঙ্গে দেখা করতেন তিনি।”

“তার পরনে থাকত সাদা আচকান ও চুড়িদার পাজামা। তিনি একটা সাদা গান্ধী টুপি পরতেন, যেটা তার কেশহীন মাথা ঢেকে রাখত।”

“নেহরু এবং তার মন্ত্রীরা নিজেরাই নিজেদের বেতন কমিয়ে প্রথমে প্রতি মাসে ২,২৫০ টাকা এবং তারপরে প্রতি মাসে ২,০০০ টাকা করে দেন।”

অর্থের অপচয় অপছন্দ করতেন তিনি।

মশলা ছাড়া সাদামাটা খাবার পছন্দ করতেন মি. নেহেরু। অনেক সময়ই রাস্তাঘাটে ময়লা গ্লাসে দেওয়া চা বা পানি খেয়ে নিতেন।

জওহরলাল নেহরুর আচরণে তীব্র শালীনতাবোধের প্রতিফলন দেখা যেত। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সাধারণ সৌজন্যমূলক আচরণ করতেন তিনি। [ @এ আই ]




নারী হুররেম সুলতান কে ছিলেন?

হুররেম সুলতান–ছিলেন অটোমান সাম্রাজ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী নারী, ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী শাসক সুলতান সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টের প্রিয় স্ত্রী এবং একজন রহস্যময় ব্যক্তিত্ব।

হুররেম সুলতান, যার আরেক নাম রক্সেলানা, তিনি কেবল সম্রাটের একজন উপপত্নী বা সঙ্গিনী বা স্ত্রী-ই ছিলেন না; বরং দাসত্ব থেকে সাম্রাজ্যের প্রভাবশালী অবস্থানের চূড়ায় ওঠার এক অসাধারণ যাত্রা পাড়ি দিয়েছেন তিনি।

নিজেকে ভেঙেচুড়ে এমনই এক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিলেন যা ষোড়শ শতাব্দীর অটোমান রাজদরবারের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন রূপ এনে দিয়েছিলো।

১৪শ শতক থেকে ২০শ শতকের শুরুর দিকে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ, পশ্চিম এশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকায় আধিপত্য বিস্তার করেছিলো অটোমান সাম্রাজ্য। যা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্যগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচিত।

অনেক ইতিহাসবিদের মতে, হুররেমের উত্থানের মধ্য দিয়ে মূলত 'নারীদের সালতানাতের' একটি পর্ব শুরু হয়েছিল যখন অটোমান বা উসমানীয়দের শাসনে রাজপরিবারের নারীদের নজীরবিহীন প্রভাব বিস্তার করতে দেখা গিয়েছিল।

তুর্কিয়ে ভাষায় একে 'কাদিনইয়ার সালতানাতে' বলা হতো। যার অর্থ নারীদের শাসন করার বা নেতৃত্বের জায়গায় পৌঁছানো।

অটোমান বা উসমানীয় সাম্রাজ্যে সুলতানের প্রাসাদের ভেতরে হারেম ছিল। এই হারেম হলো প্রাসাদের আলাদা একটি অংশ যেখানে সুলতানের স্ত্রী, উপপত্নী, পরিবারের নারী সদস্য এবং নারী দাসীরা থাকতেন।

বেশিরভাগ ইতিহাসবিদরা মনে করেন, হুররেম সুলতান পনেরশ শতকের শুরুর দিকে রুথেনিয়া নামে এক ঐতিহাসিক অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন; আজকের দিনে যা ইউক্রেন, পোল্যান্ড এবং বেলারুশের কিছু অংশ জুড়ে ছিল। তিনি ইউক্রেন অঞ্চল থেকে অপহৃত কোনো বন্দি, অর্থোডক্স পুরোহিতের কন্যা, তিনি তাতার দস্যুদের হাতে বন্দি হয়েছিলেন। এরপর, তাকে দাস হিসেবে বিক্রি করা হয়েছিল। কিশোর বয়সে হুররেমকে অটোমান সাম্রাজ্যে আনা হয় এবং তাকে যুবরাজ সুলেমানের মা-র কাছে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়। তবে, সরকারি অটোমান নথিতে তাকে হাসেকি হুররেম সুলতান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফার্সি ভাষায় 'হুররেম' অর্থ সুখী বা আনন্দময়, এবং 'হাসেকি' হলো সুলতানের সন্তানের মায়ের জন্য সংরক্ষিত একটি সম্মানসূচক উপাধি।

শত বছরের প্রথা ভেঙে, সুলেমান হুররেমকে বিয়ে করেছিলেন – যা রাজদরবারকে বিস্মিত করেছিলো এবং হুররেমের অবস্থানকে নজিরবিহীন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলো।

এর আগে অন্য কোনো অটোমান সুলতান কোনো উপপত্নীকে বিয়ে করেননি।

অটোমান যুগের নথি এবং কবিতাগুলোয় মাঝে মাঝে তাকে "রাশিয়ান ডাইনি" হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা ছিল সমালোচকদের দেওয়া তার একটি অপমানজনক উপাধি।

বিশেষ করে অন্য নারীর গর্ভে জন্ম নেয়া সুলেমানের বড় ছেলে প্রিন্স মুস্তাফার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর তাকে এই এমন কটাক্ষমূলক উপাধি দেয়া হয়।

ধারণা করা হয়, হুররেমই তার এই মৃত্যুর নেপথ্যে ছিলেন, 

হুররেমের প্রভাব হারেমের চার দেয়ালের বাইরেও অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তবে সম্ভবত তার জনহিতকর কাজগুলো সবচেয়ে বেশি স্থায়ী হয়েছে।

তিনি ইস্তাম্বুল এবং জেরুসালেমে (যা তখন অটোমান সাম্রাজ্যের অংশ ছিল) মসজিদ, বিনামূল্যে খাওয়ানোর কেন্দ্র এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠান চালু করেছিলেন, 

ঐতিহাসিক নথি অনুসারে, হুররেম সুলতান ১৫৫৮ সালের ১৫ই এপ্রিল ইস্তাম্বুলে স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন।

[ বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে।]





সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদের কনস্টান্টিনোপল বিজয়, যা ইউরোপ আজও ভোলেনি

২৯শে মে ১৪৫৩, ঘড়িতে সময় রাত দেড়টা। পৃথিবীর এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ শহরের প্রাচীর আর গম্বুজগুলোর ওপর দিয়ে যেন বড় কোনো বিপদের সংকেত দিচ্ছে।

এই শহর হচ্ছে কনস্টান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তান্বুল) এবং প্রাচীরের বাইরে অটোমান বা উসমানীয় সেনারা চূড়ান্ত আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

শহরের প্রাচীর লক্ষ্য করে উসমানীয় কামান ৪৭ দিন ধরে গোলাবর্ষণ করছে। সেনাপতিরা বিশেষভাবে তিনটি স্থান লক্ষ্য করে তাদের গোলাবর্ষণ চালিয়ে যায়, যাতে প্রাচীর ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২১ বছর বয়সী উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদ হঠাৎ করেই তার বাহিনীর সামনে সারিতে পৌঁছে যান।

তিনি সিদ্ধান্ত নেন, চূড়ান্ত হামলা হবে 'মেসুত টিকিওন' নামক প্রাচীর মাঝামাঝি অংশে, যেখানে অন্তত নয়টি ফাটল সৃষ্টি হয় এবং পরিখার একটি বড় অংশ ফাটল ধরে।

সুলতান তুর্কি ভাষায় তার সৈন্যদের বললেন: "আমার বন্ধু ও পুত্ররা, এগিয়ে চলো, নিজেদের প্রমাণ করার সময় এসে গেছে!"

সঙ্গে সঙ্গেই বাঁশি, শিঙা, ঢোল এবং বিউগলের শব্দ রাতের নীরবতা ভেদ করে দেয়। তারা প্রাচীরের দুর্বল অংশে হামলা চালায়।

এক পাশে স্থলভাগ থেকে আর অন্য পাশে সমুদ্রে যুদ্ধজাহাজে লাগানো কামানের মুখ থেকে গোলা ছুঁড়তে শুরু করে সেনারা।

বাইজেন্টাইন সৈন্যরা প্রাচীর রক্ষা করার জন্য প্রস্তুত ছিল। কিন্তু দেড় মাস ধরে চলা অবরোধে তাদের মনোবল ভেঙে যায়। তারা হতাশ ও ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

অনেক সাধারণ মানুষও সেনাদের সাহায্য করতে প্রাচীরের কাছে এসে হামলাকারীদের লক্ষ্য করে পাথর ছুঁড়তে থাকে।

অন্যরা কাছের একটি গির্জায় ছুটে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে প্রার্থনা করতে শুরু করে। পাদ্রিরা গির্জার ঘণ্টা জোরে বাজাতে শুরু করে, এর ঢং ঢং শব্দে যারা ঘুমিয়ে ছিল তারাও জেগে ওঠে। সব খ্রিষ্টান, নিজেদের ধর্মীয় বিভেদ ভুলে, একত্রিত হয়ে শহরের সবচেয়ে বড় ও পবিত্র গির্জা হাজিয়া সোফিয়ায় জড়ো হলো।

অটোমানদের অগ্রযাত্রা থামাতে প্রতিরক্ষা বাহিনী সাহসিকতার সঙ্গে প্রাণপণ লড়াই করে যাচ্ছিলো।

ভোরের দিকে, তুর্কি সেনারা প্রাচীরের চূড়ায় পৌঁছে যায়। ততক্ষণে অধিকাংশ প্রতিরক্ষা সেনা মারা গেছে এবং তাদের সেনাপতি জিওভান্নি জাস্টিনিয়ানি গুরুতর আহত হন এবং তাকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।


পূর্ব দিক থেকে সূর্যের প্রথম আলোতে দেখা গেল, একজন তুর্কি সেনা কিরকোপোটা ফটকের ওপরে থাকা বাইজেন্টাইন পতাকা নামিয়ে উসমানীয় পতাকা উড়িয়ে দিচ্ছেন।

মুসলমানরা সাতশো বছরের প্রচেষ্টার পর অবশেষে কনস্টান্টিনোপল জয় করেছে।

এই জয় শুধু একটি শহরের দখল বা এক রাজা থেকে আরেক রাজার ক্ষমতা বদল ছিলো না—এর সঙ্গে সঙ্গে এক ঐতিহাসিক যুগের পতন ছিলো।

২৭ খ্রিস্টপূর্বে শুরু হওয়া রোমান সাম্রাজ্য ১৪৮০ বছর ধরে কোনো না কোনো রূপে টিঁকে থাকার পর অবশেষে পতন ঘটে।

তুর্কিরা শহরটি দখল করার পর, হাজার হাজার গ্রীকভাষী নাগরিক এখান থেকে পালিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে, বিশেষ করে ইতালিতে বসতি স্থাপন করে।

সে সময় ইউরোপ 'অন্ধকার যুগ'-এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলো এবং প্রাচীন গ্রিক সভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। কিন্তু কনস্টান্টিনোপলে তখনও গ্রিক ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা হতো।

এখানে আগত শরণার্থীদের কাছে হীরা এবং রত্নপাথরের চেয়েও মূল্যবান সম্পদ ছিল অ্যারিস্টটল, প্লেটো, টলেমি, গ্যালেন এবং অন্যান্য দার্শনিক, বিজ্ঞানী ও পণ্ডিতদের মূল গ্রীক পাণ্ডুলিপি। ইউরোপে প্রাচীন গ্রীক বিজ্ঞানের পুনরুজ্জীবনে তাদের সকলেরই বিরাট ভূমিকা ছিল এবংঐতিহাসিকদের মতে, এই কারণেই ইউরোপে রেনেসাঁ বা নবজাগরণের শুরু হয়। যা পরবর্তী কয়েকশো বছর ইউরোপকে গোটা পৃথিবীর থেকে এগিয়ে দেয়, যে ধারা আজও অব্যাহত।

কনস্টান্টিনোপলের পুরনো নাম ছিলো বাইজেন্টিয়াম। কিন্তু যখন ৩৩০ খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন প্রথম তার রাজধানী রোম থেকে এখানে স্থানান্তর করেন, তখন শহরের নাম বদলে তার নাম অনুসারে "কনস্টান্টিনোপল" রাখা হয় (আরবরা যাকে 'কুসতন্তিনিয়া' বলত)।


পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য পতনের পরেও, এই পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য কনস্টান্টিনোপলে টিকে থাকে এবং চতুর্থ থেকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত এই শহর এতটা উন্নতি করে যে তখন দুনিয়ার আর কোনো শহর তার ধারেকাছে ছিল না। এই কারণেই মুসলমানরা শুরু থেকেই এই শহরটি জয় করার স্বপ্ন দেখে আসছিলো।

এই লক্ষ্য পূরণে প্রথমদিককার কয়েকটি চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর, ৬৭৪ সালে একটি বিশাল শক্তিশালী নৌবহর প্রস্তুত করে আরবরা কনস্টান্টিনোপলের দিকে রওনা দেয়।

এই বহর শহরের বাইরে তাঁবু খাটিয়ে ক্যাম্প করে এবং পরবর্তী চার বছর ধরে বারবার প্রাচীর ভেদ করে শহরে ঢোকার চেষ্টা করে।

এই অবরোধ চলাকালেই, প্রখ্যাত সাহাবি হযরত আবু আইয়ুব আনসারী মারা যান। তার কবর আজও শহরের প্রাচীরের বাইরে রয়েছে।

এরপর, ৭১৭ সালে উমাইয়াদের আমির সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিক, আরো ভালো প্রস্তুতি নিয়ে আবার কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করেন।

কিন্তু এইবারও পরিণতি ভালো হয়নি। প্রায় দুই হাজার যুদ্ধজাহাজের মধ্যে মাত্র পাঁচটি ফিরে আসতে সক্ষম হয়।

সম্ভবত এই কারণেই, পরবর্তী ছয়শ বছর ধরে মুসলমানরা আর কনস্টান্টিনোপল-মুখী হননি, যতক্ষণ না সুলতান মেহমেদ অবশেষে শহরের উপর নিজের পতাকা উড়িয়ে পুরনো সব বদলা পূর্ণ করেন। শহর দখল করার পর, সুলতান তার রাজধানী এডিরনে থেকে কনস্টান্টিনোপলে স্থানান্তর করেন,।

সুলতান মেহমেদ হায়িয়া সোফিয়া নামের গির্জাটি মসজিদে রূপান্তর করেন, তবে তিনি শহরের দ্বিতীয় বড় গির্জা 'ক্লিসায়ে হাওয়ারিয়ান' বা চার্চ অব দ্য অ্যাপোস্টলসকে গ্রিক অর্থোডক্স সম্প্রদায়ের কাছেই রেখে দেন এবং এই সম্প্রদায় আজও একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকে আছে।

এই কারণেই ইউরোপ কখনো একে ভুলতে পারেনি।

গ্রিসে আজও বৃহস্পতিবারকে অশুভ দিন হিসেবে ধরা হয়।কারণ ১৪৫৩ সালের ২৯ মে ছিল বৃহস্পতিবার।

[ বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে।]






দুবাই যখন প্রায় ভারতের অংশ হয়ে গিয়েছিল

এখন হয়ত অনেকেই ভুলে গেছেন যে, বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে আরব উপদ্বীপের এক-তৃতীয়াংশই ব্রিটিশ ভারত সাম্রাজ্যের শাসনাধীন ছিল।

অ্যাডেন থেকে কুয়েত পর্যন্ত ছিল একের পর এক 'প্রোটেক্টরেট'। সবগুলোই ছিল দিল্লির শাসনাধীন, তদারকি করতেন 'ইন্ডিয়ান পলিটিকাল সার্ভিসের অফিসারেরা, আইন শৃঙ্খলার দায়িত্বে ছিল ভারতীয় বাহিনী আর জবাবদিহি করতে হত ভারতের বড়লাটের কাছে। 'ইন্টারপ্রেটেশন অ্যাক্ট, ১৮৮৯' অনুযায়ী এই সব 'প্রোটেক্টরেট' আইনতই ভারতের অংশ বলে ধরা হত। জয়পুরের মতো আধা-স্বাধীন ভারতীয় দেশীয় রাজ্যগুলোর যে বর্ণানুক্রমিক তালিকা ছিল, তার প্রথম নামটিই ছিল আবু ধাবির। লর্ড কার্জন যখন বড়লাট ছিলেন, সেই সময়ে তো তিনি উপদেশ দিয়েছিলেন, "কেলাত প্রদেশ (বর্তমানের বালোচিস্তান) বা লুস বেলার মতো ওমানকে ভারতীয় সাম্রাজ্যের একটি দেশীয় প্রদেশ হিসাবে গণ্য করা হোক।" পশ্চিম দিকে বর্তমানের ইয়েমেনের অ্যাডেন পর্যন্ত ভারতীয় পাসপোর্ট দেওয়া হত। অ্যাডেনই তখন ছিল ভারতের পশ্চিম প্রান্তের শেষ বন্দর। বম্বে প্রদেশের অধীন ছিল এই বন্দর শহর। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী যখন ওই শহরে গিয়েছিলেন ১৯৩১ সালে, সেখানে অনেক তরুণ আরব নিজেদের ভারতীয় জাতীয়তাবাদী হিসাবে পরিচয় দিতেন। ভারতের জনসাধারণের মধ্যে খুব কম মানুষই তখন জানতেন যে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য আরব অঞ্চলেও বিস্তার ঘটিয়েছে।

ভারতীয় সাম্রাজ্যের সম্পূর্ণ মানচিত্র খুবই গোপনে প্রকাশ করা হত। প্রথমের দিকে তুরস্ক আর পরে সৌদি আরব যাতে কোনো রকম ইন্ধন না পেয়ে যায়, সেজন্য আরব এলাকাগুলোর ব্যাপারে কোনো নথিও জনসমক্ষে আনা হত না।

১৯৪৭-এই ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয় আরব অঞ্চল

ব্রিটিশ রাজ ভেঙ্গে ভারত আর পাকিস্তানের স্বাধীনতার মাত্রই কয়েক মাস আগে, পয়লা এপ্রিল ১৯৪৭ সালে দুবাই থেকে শুরু করে কুয়েত পর্যন্ত উপসাগরীয় রাজ্যগুলো অবশেষে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। এরপরে, যখন ভারতীয় আর পাকিস্তানী কর্মকর্তারা কয়েকশো দেশীয় রাজ্যকে তাদের সদ্য গঠিত নিজ নিজ রাষ্ট্রে সংযুক্ত করার কাজ শুরু করছেন, তখন কিন্তু সেই তালিকায় উপসাগরীয় রাজ্যগুলো আর নেই।

তখন প্রশাসনিক চাপ থাকলে খুব সম্ভব ছিল যে 'পার্সিয়ান গাল্ফ রেসিডেন্সি' ভারত বা পাকিস্তানের স্বাধীনতার পরে যে কোনো একটি দেশের সঙ্গে সংযুক্ত হত, যেভাবে উপমহাদেশের প্রতিটি দেশীয় রাজ্যই জুড়ে গিয়েছিল দুটির মধ্যে কোনো একটি দেশের সঙ্গে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এটলি যখন ভারত থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার কথা ঘোষণার সঙ্গে আরব অঞ্চল থেকেও সরে আসার প্রস্তাব দিলেন, তখন গোপনে ও কৌশলে তা থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাই যুক্তরাজ্য আরও ২৪ বছর উপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের শাসন করে গেছে।

তবে শেষ দিকেও সেখানে সরকারি নোট বলতে ভারতীয় টাকা আর সহজতম যাতায়াতের জন্য ছিল 'ইন্ডিয়া লাইন' জাহাজ কোম্পানি এই ৩০টি আরব রাজন্য-শাসিত রাজ্য পরিচালিত হত 'ব্রিটিশদের দ্বারা।

ঔপনিবেশিক দায়-দায়িত্ব থেকে সরে আসার সিদ্ধান্তের অধীনেই শেষমেশ ১৯৭১ সালে ব্রিটিশরা উপসাগর থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে যায়।

দেশভাগের সময় যদি এই আরব উপদ্বীপগুলো ভারত বা পাকিস্তান কেউ দাবি করত তাহলে পরিস্থিতিটা সম্পূর্ণ পাল্টে যেতো। এখন তারাই এই উপসাগরীয় দেশগুলোতে ভৃত্যের কাজ করতে আসে।

একসময়ে ভারতীয় সাম্রাজ্যের একটা ছোট জায়গা ছিল যে দুবাই, তার না ছিল কোনও সম্মান, সেটাই এখন নতুন মধ্যপ্রাচ্যের উজ্জ্বল কেন্দ্র।

এখন যে কয়েক লক্ষ ভারতীয় বা পাকিস্তানি সেখানে বাস করেন, তাদের মধ্যে খুব অল্প কয়েকজনই জানেন যে একটা সময় এই দুবাই ভারত বা পাকিস্তান-এর অংশ ছিল  ।

সাম্রাজ্যের শেষবেলায় আমলাদের নেওয়া সিদ্ধান্তে তা তারা হারিয়েছে। 

@স্যাম ডালরিম্পল 'শ্যাটার্ড ল্যান্ডস : ফাইভ পার্টিশনস্ অ্যান্ড দ্য মেকিং অফ মডার্ন এশিয়া' গ্রন্থের লেখক।






রাজার শাসন থেকে কীভাবে ভারতের অঙ্গরাজ্যে পরিণত হয়েছিল সিকিম

হিমালয়ের কোলে ছোট পার্বত্য রাজ্য সিকিমের রাজা আঁচ করেছিলেন দিল্লি তাদের পুরনো নীতি থেকে সরে এসে সিকিমকে হয়তো ভারতের সঙ্গে মিশিয়ে নিতে চাইছে।

১৯৭৫ সালের ১৬ই মে ঠিক সেটাই ঘটেছিল । সিকিমে রাজতন্ত্রের অবসান ও ভারতের সঙ্গে সংযুক্তির পেছনে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও দেশের গোয়েন্দা সংস্থা 'র'-এর ভূমিকা সুবিদিত – কিন্তু সে আমলের পর্যবেক্ষকরা সবাই মানেন সিকিমের একজন জননেতা তথা রাজনীতিবিদের সমর্থন ও সহযোগিতা ছাড়া এ কাজ কিছুতেই সহজ হতো না! তিনি আর কেউ নন – কাজী লেন্দুপ দর্জি, নামের আদ্যক্ষর দিয়ে এলডি কাজী নামেও যিনি পরিচিত।


এখনও তথাকথিত ভারতীয় আধিপত্যবাদের কাছে নতি স্বীকার বা ভারতের কাছে দেশ 'বিক্রি' করে দেওয়ার প্রসঙ্গ এলেই দক্ষিণ এশিয়ার নানা প্রান্তে যার নাম সবার আগে আসে – তিনিই সেই লেন্দুপ দর্জি, 'স্বাধীন' সিকিমের শেষ প্রধানমন্ত্রী, আর ভারতের অঙ্গরাজ্য সিকিমের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী।

সিকিমের রাজার সঙ্গে দর্জির আজন্ম বিরোধ ও রাজনৈতিক সংঘাত, তাই ভারতীয় গোয়েন্দাদের সাহায্য ও ইন্দিরা গান্ধীর আশীর্বাদ নিয়ে সিকিমকে ভারতের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া এবং শেষ জীবনে সিকিমের বাইরে গিয়ে নিঃসঙ্গ মৃত্যু – লেন্দুপ দর্জির জীবন আসলে পলিটিক্যাল থ্রিলারকেও হার মানায়!

সপ্তদশ শতাব্দীতে প্রথম চোগিয়াল যখন তার রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন, তিনি শাসনের কাজে সুবিধার জন্য পুরো সিকিমকে বারোটি ইউনিটে ভাগ করেছিলেন – যার প্রতিটিকে বলা হত 'জং' (Dzong), আর এগুলোর দায়িত্বে ছিলেন এক একজন 'কাজী' (Kazi)। মুঘল আমলের যেমন জায়গির আর জায়গিরদার, বস্তুত তারই সিকিমি প্রতিশব্দ ছিল জং আর কাজী। এই কাজীদের মধ্যে আবার খুব প্রভাবশালী ছিলেন 'খাংসারপা' নামে একটি প্রাচীন লেপচা পরিবার, যারা ছিলেন দক্ষিণ সিকিমে 'চুকাং' জং-এর কাজী। লেন্দুপ দর্জি ছিলেন এই পরিবারেরই সন্তান। চুকাং-এর কাজীদের এতই প্রতিপত্তি ছিল যে লেন্দুপ দর্জিকে (১৯০৪-২০০৭) খুব তরুণ বয়সেই সিকিমের সবচেয়ে বড় আর বিখ্যাত তিব্বতি মনাস্টারি রুমটেকের প্রধান নির্বাচিত করা হয়েছিল।

তিব্বত থেকে আসা লেপচা ও ভুটিয়াদের হাতে সিকিমের শাসনভার থাকলেও সেখানকার জনসংখ্যার সিংহভাগই কিন্তু ছিলেন নেপাল থেকে আসা অভিবাসীরা। মানে লেপচা ও ভুটিয়ারা সমাজের সম্ভ্রান্ত ও অভিজাত, এবং ভূস্বামী শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করলেও সিকিমের তিন-চতুর্থাংশ বাসিন্দাই ছিলেন গরিব ও সাধারণ নেপালি।

এখন সিকিমের রাজারা নেপালি অভিবাসীদের পছন্দ না করলেও চুকাং-এর কাজীরা কিন্তু নেপালিদের মধ্যে খুব জনপ্রিয় ছিলেন। তার সবচেয়ে বড় কারণ, লেপচা হলেও নিজেদের জমিদারি বা এস্টেটে তারা নেপালি অভিবাসীদের জমি দিয়ে বসত করতেও উৎসাহ দিতেন। এই এথনিক নেপালিদের সমর্থন নিয়েই ক্রমে ক্রমে চুকাং-এর কাজী লেন্দুপ দর্জি সিকিমের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন – এবং সরাসরি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে থাকেন।

রাজ্য রাজনীতিতে ১৯৪৫-এ তিনি গঠন করেন 'সিকিম প্রজা মন্ডল', ১৯৫৩তে সেই দলই সিকিম স্টেট কংগ্রেস আর ১৯৬২তে সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেস নামে আত্মপ্রকাশ করে – এবং রাজপরিবারের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন চালাতে থাকে।

১৯৭৫ সালে সিকিমের ভারতভুক্তির আগের তিন দশক কাজী লেন্দুপ দর্জিই যে সেখানে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ছিলেন তাতে কোনও সন্দেহ নেই – কিন্তু তাকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখার জন্য চোগিয়ালও কোনও চেষ্টাই বাদ দেননি। কারণ তার বারবার মনে হয়েছিল এই দর্জির কারণেই তার দেশটি ভারতের কাছে হারাবে সে।


ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশ আর 'র' এর গোপন অপারেশন

লেন্দুপ দর্জি সিকিমে যতই জনপ্রিয় হোন, চোগিয়ালদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বহুদিন তিনি তেমন কিছু করতে পারেননি – যার প্রধান কারণ ছিল এই রাজার প্রতি ভারতের সক্রিয় সমর্থন।  স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বল্লভভাই প্যাটেল সিকিমকেও ভারতে মিশিয়ে দেওয়ার পক্ষে ছিলেন – কিন্তু প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু সে প্রস্তাবে সায় দেননি।

তার বদলে ১৯৫০ সালে দিল্লি সিকিমের রাজার সঙ্গে একটি চুক্তি করে তাদের 'প্রোটেক্টোরেট' মর্যাদা দেয় – মানে তাদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার সব দায়িত্ব নেয়। এর বদলে সিকিম তাদের বৈদেশিক সম্পর্ক, প্রতিরক্ষা, মুদ্রা, যোগাযোগ ব্যবস্থা আর ডাক বিভাগের ভার ভারতের হাতে তুলে দেয়।

কিন্তু ১৯৭১-র পর নেহরুর কন্যা ইন্দিরা গান্ধী এই নীতি বদলে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন।

ভারতের আর এক 'প্রোটেক্টোরেট' ও সিকিমের প্রতিবেশী ভুটান ১৯৬৮ সালে জাতিসংঘের সদস্যপদ পেয়ে যায় – যা একটি স্বাধীন, সার্বভৌম দেশ হিসেবে তাদের প্রতিষ্ঠা করে। ইন্দিরা গান্ধী চাননি ভুটানের দেখাদেখি সিকিমও একই রাস্তায় হেঁটে ভারতের অস্বস্তি বাড়াক।

খুব গোপনে এরপর সিকিমের গণতন্ত্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে একজোট করার কাজ শুরু হল, তাদের বোঝানো হল যে ভারত আর চোগিয়ালকে সমর্থন করবে না। এখান থেকেই কাজী লেন্দুপ দর্জির সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেসকে ভারতের আর্থিক ও অন্য সব ধরনের সাহায্য যোগানো শুরু হল। পাশাপাশি চোগিয়ালকেও এই ভুল ধারণার মধ্যে রাখার চেষ্টা হল যে নির্বাচন হলেও এখনও একটা আপষ রফা সম্ভব। ভারত যে শেষ পর্যন্ত সিকিমের সংযুক্তি চাইছে সেটা তাকে ঘুণাক্ষরেও টের পেতে দেওয়া হয়নি।

শেষ পর্যন্ত ১৯৭৪র ১৫ই এপ্রিল ভারতের নির্বাচন কমিশনের তদারকিতে সিকিমে যে ভোট হলো, তাতে লেন্দুপ দর্জির সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেস ৩২টি আসনের মধ্যে ৩১টিতেই জিতলো।


কাজী হলেন সিকিমের নির্বাচিত 'প্রধানমন্ত্রী' । তার সরকার ভারতের সঙ্গে 'অধিকতর সহযোগিতা' চেয়ে দু'সপ্তাহের মধ্যেই বিল আনলো – চোগিয়াল যার ঘোরতর বিরোধিতা করেছিলেন। এরপর সিকিমের ভারতের সঙ্গে সংযুক্তি ছিল নেহাত সময়ের অপেক্ষা – ১৯৭৫ সালের ১৬ই মে সব আনুষ্ঠানিকতার শেষে সিকিম অবশেষে ভারতের ২২তম অঙ্গরাজ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হলো। এর আগে ওই বছরেরই ১০ই এপ্রিল লেন্দুপ দর্জির নেতৃত্বে সিকিমের আইনসভা দুটি প্রস্তাব পাস করে – একটি ভারতের সঙ্গে 'পূর্ণ সংযুক্তি' চেয়ে, আর দ্বিতীয়টি চোগিয়ালের অপসারণ দাবি করে। ১৪ এপ্রিল সিকিমে একটি গণভোটও অনুষ্ঠিত হয় – যাতে এই দুটো প্রস্তাবই গৃহীত হয়।

তখন চোগিয়ালের এডিসি ছিলেন ক্যাপ্টেন সোনাম ইয়ংডা, তিনি পরে দাবি করেছেন রাজপ্রাসাদের সামনে সে সময় যে বিক্ষোভগুলো হতো, তাতে ভারতীয় সৈন্যরা লুকিয়ে সিভিল ড্রেস পরে এসে অংশ নিত! তার মতে, গণভোটের ফলও ভারতের কারসাজিতেই চুরিকরা হয়েছিল।

কাজী লেন্দুপ দর্জি সিকিমের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হলেও তার সেই ক্ষমতা কিন্তু বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৭৯তে সিকিমের পরের নির্বাচনে তার দল এসএনসি একটিও আসন পায়নি, 

দর্জির সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনের কার্যত সেখানেই ইতি। কয়েক বছর পর একবার সিকিমের নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিতে গিয়ে তিনি দেখেন ভোটার তালিকায় তার নামই নেই!

১৯৯০তে স্ত্রীর মৃত্যুর পর জীবনের শেষ সতেরো বছর তিনি একাকী নিঃসঙ্গ জীবন কাটিয়েছেন। দেখাশুনোর জন্য পুত্র-পরিজন বা আত্মীয়স্বজন কেউ ছিল না, "কাজ শেষ হওয়ার পরে ভারত যে তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে এটা লেন্দুপ দর্জি দিব্বি বুঝেছিলেন!"

" তিনি বলেছিলেন আমি জানি সিকিমের সবাই বলে আমি নাকি বিশ্বাসঘাতক, আমি নাকি সিকিমকে বেচে দিয়েছি।"

"তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই অভিযোগটা সত্যি, তাহলেও বলবো সিকিমের এই অবস্থার জন্য আমি একাই কি দায়ী?"

চোগিয়ালের 'অপশাসনও সমান দায়ী। গোটা ভারতের মধ্যে একমাত্র সিকিমের অধিবাসীদেরই আজও তাদের উপার্জনের ওপর কোনও আয়কর দিতে হয় না – আর দিল্লির এই সিদ্ধান্তের পেছনে একমাত্র আমার অবদান। লেন্দুপ দর্জি ২০০৭ সালে ২৮শে জুলাই ১০৩ বছর বয়সে মারা যান। 

[ বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে।]




ভারতবর্ষে আলু কীভাবে এলো?

বিশ্ব জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার মতে, সপ্তদশ শতকের প্রথম দিকে পর্তুগিজ নাবিকরা ভারতবর্ষে প্রথম আলু নিয়ে আসে বলে ধারণা করা হয়।

পর্তুগিজরা দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রায় আলু বোঝাই করে নিয়ে আসতো। কারণ আলু সহজে পচে না। সেদ্ধ করেই খাওয়া যায়। পেট ভরা থাকে অনেকক্ষণ।

এই ইউরোপীয় বণিকদের মাধ্যমে আলুর বিষয়ে ভারতের মানুষ প্রথম জানতে পারে।

কথিত আছে কেরালা রাজ্যের কোঝিকোড় শহরের কালিকট বন্দরের শ্রমিকদের অন্যতম খাবার হয়ে দাঁড়িয়েছিল আলু।

কিন্তু আলুকে ভারতবর্ষের সর্বত্র ছড়াতে কাজ করেছিল ইংরেজরা।

সপ্তদশ শতকের শেষ দিকে অর্থাৎ ব্রিটিশ আমলে ভারতবর্ষ তথা বাংলার প্রথম গভর্নর জেনারেল ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস।

তিনি ১৭৭২ থেকে ১৭৮৫ সাল পর্যন্ত টানা ১৩ বছর দায়িত্বে থাকাকালে নিজ উদ্যোগে আলুর চাষ করেছিলেন।

তিনি মূলত চেয়েছিলেন ভারতে কম দামে আলু চাষ করে ইউরোপে বিক্রি করতে।

তার হাত ধরে ভারতের পশ্চিম উপকূলের শহর মুম্বাই বা তৎকালীন বোম্বেসহ অনেক প্রদেশে আলুর চাষ বিস্তার লাভ করে। যা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।


ভারতে সরকারীভাবে প্রথম আলুর চাষ শুরু হয় উত্তরখণ্ড রাজ্যের পাহাড়ি এলাকা নৈনিতালে। সেখান থেকে আলু চাষের প্রবর্তন হয় মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জিতে। কাছাকাছি সময়ে কলকাতার পার্শ্ববর্তী কিছু এলাকায় ব্রিটিশরা আলু চাষ করলে বাঙালি খাবারে আলু প্রবেশ করে।

  আলুকে বাংলায় আরও বেশি প্রসিদ্ধ করেছিলেন আওধের নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ।

১৮৫৬ সালে নবাবের রাজ্য লখনউ ব্রিটিশরা দখল করে নিলে তিনি কলকাতায় নির্বাসিত জীবন কাটান।

সেসময় নবাবের বাবুর্চিরা কলকাতায় মুঘল লখনউ বিরিয়ানি প্রবর্তন করে এবং তাতে আলু মেশায়। সেই থেকেই বাংলার বিরিয়ানিতে আলু প্রবেশ করেছে বলে মনে করা হয়।

বাংলাদেশে এখন আলু এতোটাই জনপ্রিয় যে কোনো না কোনো পদে আলু থাকতেই হয়।

“আলু অল্প জমিতে বেশি ফলন হয় এতে কৃষকরা লাভবান হন। আবার দামে কম হওয়ায় ভোক্তারাও কিনতে পারেন। এছাড়া আলু খেতে সুস্বাদু এবং পুষ্টিগুণও ভাতের চাইতে বেশি। তাই আলু সারা দেশের মানুষ গ্রহণ করেছে।”

বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন অংশে বারি ১ থেকে ৯১সহ আরও বিভিন্ন জাতের আবাদ হয় যার বেশিরভাগের উৎপত্তিস্থল দেশ নেদারল্যান্ডস।

এরমধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত জাত হলো ডায়মন্ড (ডিম্বাকার), কার্ডিনাল (লালচে আলু), গ্রেনুলা (গোল আলু)।

সবচেয়ে বেশি আলু ফলে মুন্সিগঞ্জ, বগুড়া ও রংপুর জেলায়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সর্বশেষ পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, আলু উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম।


কিন্তু এই আলু ইংলিশ, পর্তুগিজ বা ইউরোপীয় কোনো ফসল নয়। তাহলে আলুর কোথা থেকে হয়েছে?

ক্যামব্রিজ ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি অব ফুডের তথ্যমতে, আজ থেকে আট হাজার বছর পূর্বে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুতে প্রথম আলু পাওয়া যায়। লিমা থেকে প্রায় ১০০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে টিটিকাকা হ্রদের কাছে প্রথমে আলু চাষ শুরু হয়েছিল। এরপর আদিবাসীরা আন্দিজ পর্বতমালায় পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে আলু চাষ করতো বলে জানা যায়। এভাবে আলু শীঘ্রই পেরু আর বলিভিয়ার ইনকাসহ পাহাড়ে বসবাসকারী অন্যান্য আদিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ খাবার হয়ে ওঠে।

কথিত আছে, পেরুর ইনকা সভ্যতায় চাষের জমিকে আলু বলা হতো। সেখান থেকেই বাংলায় আলু কথাটা এসেছে।

আলু ইউরোপীয়দের নজরে আসে পঞ্চদশ শতকে। ১৫৩২ সালে স্পেনের নাবিকেরা দক্ষিণ আমেরিকায় আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে। স্প্যানিশ আক্রমণে ইনকা সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায়। কথিত আছে, স্প্যানিশরা পেরুতে এসেছিল মূলত স্বর্ণের খোঁজে। স্বর্ণ তারা পায়নি। তবে আন্দিজ পর্বত এলাকায় স্থানীয়দের আলুর আবাদ তাদের নজরে আসে।

ফিরতি যাত্রায় জাহাজ বোঝাই করে নাবিকদের জন্য আলু নিয়ে যায় স্প্যানিশ বণিকরা। সেসময় সমুদ্র যাত্রায় নাবিকদের মধ্যে স্কার্ভি রোগ দেখা দিতো।

পরে দেখা যায় স্প্যানিশ জাহাজের যে সমস্ত নাবিক আলু খেয়েছে, তাদের স্কার্ভি রোগ হয়নি, কারণ আলুতে ভিটামিন সি আছে।

নাবিকেরা সব আলু খেয়ে শেষ করতে পারেনি। তাই কিছু আলু তারা স্পেন পর্যন্ত নিয়ে আসে।

ইউরোপে আসার পরেই নাম বদলে হয় পটেটো। এই স্প্যানিশদের হাত ধরেই আলুসহ টমেটো, অ্যাভোকাডো এবং ভুট্টার মতো ফসল বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।


 যে আন্দিজে, আলু গাছগুলি দিনে ১২ ঘণ্টা সূর্যালোক পেয়েছিল। কিন্তু ইউরোপের আবহাওয়া ছিল উল্টো। তাই ইউরোপে প্রথম দশক আলু চাষ ব্যর্থতার মধ্যে দিয়ে যায়।

অতপর ষোড়শ শতকে স্প্যানিশদের হাত ধরেই এর আবাদ ছড়িয়ে পড়ে ইতালি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড ও জার্মানি এক কথায় পুরো ইউরোপে। একই সময়ে চীন ও উত্তর আমেরিকায় আলু ছড়িয়ে পড়ে। চীনের তৎকালীন মিং সাম্রাজ্যের রাজারা আলুকে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। আজ এই চীন হয়ে উঠেছে বিশ্বের সর্বাধিক আলু উৎপাদনকারী দেশ।

ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের সময় প্রচুর কারখানা গড়ে ওঠে যা পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ছিল শ্রমজীবী মানুষের।এই বিশাল সংখ্যক শ্রমিকদের অল্প খরচে খাওয়ার জন্য আলুর প্রয়োজনীয়তা বেড়ে যায়।

সেসময় ইউরোপের কারখানা শ্রমিক এবং জেলেরা আলু বেশ পছন্দ করেছিল কারণ এটি সহজে নষ্ট হতো না। সহজে সেদ্ধ করে খাওয়া যেতো। পেট অনেকক্ষণ ভর্তি থাকতো।

আলুর জনপ্রিয়তার আরেকটি কারণ ছিল যুদ্ধ। ইউরোপের যুদ্ধ চলাকালীন সৈনিকদের কাছে আলু জনপ্রিয় খাবার হয়ে ওঠে।

আলুর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটি মাটির নিচে জন্মায়। শত্রুরা ফসল ধ্বংস করতে পারে না। দুটি বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির নাৎসি বাহিনীকে সচল রেখেছিল এই আলু।


ওই যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী যখন খাদ্য সংকট দেখা দেয় তখন খাবার হিসাবে আলুর কদর বিশেষ করে মিষ্টি আলুর কদর বেড়ে যায়। মিষ্টি আলু পুড়িয়ে বা সেদ্ধ করে খাওয়া যায়, কাঁচাও খাওয়া যায়।

সোভিয়েত পতনের পর উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতিতেও ধস নামে। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৮ দেশটিতে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। যাতে মারা যায় আড়াই লাখ থেকে সাড়ে তিন লাখ মানুষ। এমন অবস্থায় দেশটির তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান কিম জং ইল দেশকে দূর্ভিক্ষ থেকে বাঁচাতে আলু চাষ শুরু করে।

যুদ্ধের সময় কৃষকরা আলু সংরক্ষণ করতে পারতো। কেননা সৈন্যরা শস্যের গুদামে হামলা চালায়, কেউ ক্ষেত খনন করে না। এ সুবিধা দেখে এবং খাদ্য নিরাপত্তার কথা ভেবেই প্রুশিয়ার রাজা ফ্রেডরিক আলু চাষের নির্দেশনা দিয়েছিলেন।

এটাও দাবি করা হয় যে আলুর বিস্তার ইউরোপ ও এশিয়ায় জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ঘটায়। বিশেষ করে সপ্তদশ থেকে ঊনবিংশ শতকের মধ্যে বিশ্বের জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নগরায়নের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ছিল আলুর কারণে। @ সানজানা চৌধুরী বিবিসি নিউজ বাংলা





চে গেভারা যেভাবে কিউবার সশস্ত্র বিপ্লবের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন

মার্কসবাদী বিপ্লবী চে গেভারা ছিলেন কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রোর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং একজন বিশ্বস্ত সহযোগী। আর তাদের এই বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছিল রণাঙ্গনে। ১৯৫৯ সালের জানুয়ারিতে কিউবার বামপন্থী সশস্ত্র আন্দোলনকারীদের হাতে দেশটির বিতর্কিত সেনা শাসক ফুলখেনসিও বাতিস্তার পতন ঘটে, যেটি ইতিহাসে ‘কিউবার বিপ্লব’ নামে পরিচিত। সেই বিপ্লবের নেতৃত্বে ছিলেন ফিদেল কাস্ত্রো, আর চে গেভারা ছিলেন ‘সেকেন্ড-ইন-কমান্ড’ বা দ্বিতীয় প্রধান নেতা।

অথচ চিকিৎসা বিজ্ঞানে পড়াশোনা করা মি. গেভারা ছিলেন কিউবা থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরের একটি দেশ আর্জেন্টিনার নাগরিক এবং বিপ্লবের পাঁচ বছর আগেও মি. কাস্ত্রোর সঙ্গে তার পরিচয় ছিলো না।


১৯২৮ সালের ১৪ই জুন তিনি আর্জেন্টিনার রোসারিও শহরের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

হাঁপানির সমস্যা থাকায় মি. গেভারাকে ছোটবেলায় তার পরিবার খুব একটা বাইরে খেলতে পাঠাতো না। ফলে শৈশবের একটা বড় সময় তার কেটেছে অনেকটা ঘরবন্দী অবস্থায়। মূলত: এই সময়েই মি. গেভারার বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হয়, যা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বজায় ছিলো।

১৯৪৮ সালে তিনি আর্জেন্টিনার ইউনিভার্সিটি অব বুয়েনস আয়ার্সের মেডিসিন বিভাগে ভর্তি হন।

ভর্তি হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে ভ্রমণের নেশা মি. গেভারাকে পেয়ে বসে।

ভ্রমণের নেশা মি. গেভারাকে এতটাই পেয়ে বসেছিলো যে, ডাক্তারি পড়া শেষ না করেই আলবার্তো গ্রানাদোর সঙ্গে তিনি দক্ষিণ আমেরিকা দেখতে বের হন। ডাক্তারি পড়া শেষ করে মি. গেভারা ১৯৫৩ সালের এপ্রিলে আবারও দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন।

কিন্তু এবার তিনি এমন একটি সময়ে ভ্রমণে বের হয়েছেন, যখন ক্যারিবিয় অঞ্চলের দ্বীপরাষ্ট্র কিউবাতে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে।

স্বৈরশাসক ফুলখেনসিও বাতিস্তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে সেসময় অনেকেই গ্রেফতার হয়েছিলেন, যাদের মধ্যে তখনকার তরুণ নেতা ফিদেল কাস্ত্রোও ছিলেন।


কয়েক মাসের মধ্যেই মি. গেভারা মধ্য আমেরিকার দেশ গুয়াতেমালায় পৌঁছান। সেখানে তিনি রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।

কিউবায় বাতিস্তা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের অনেকে তখন গ্রেফতার এড়াতে গুয়াতেমালায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাদেরই একজন হলেন আন্তনিও নিকো লোপেজ। কিছুদিনের মধ্যে মি. লোপেজের সঙ্গে চে গেভারার দেখা হয় এবং দু’জনের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।

জানা যায় যে, মি. লোপেজই সেসময় মি. গেভারাকে ‘এল চে আর্জেন্টিনো’ বা ‘আর্জেন্টিনার চে’ নামে ডাকা শুরু করেন, যা পরবর্তীতে আরও ছোট হয়ে ‘চে’ নামে বেশি পরিচিতি পায়। মি. লোপেজের কাছ থেকে চে গেভারা কিউবার তরুণ নেতা ফিদেল কাস্ত্রো এবং তাদের আন্দোলন সম্পর্কে জানতে পারেন। এর মধ্যে গুয়াতেমালাতেও রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে থাকে। ১৯৫৪ সালে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে দেশটির সেনাবাহিনী। তখন গুয়াতেমালা ছেড়ে মি. গেভারা প্রথমে এল সালভেদর, তারপর মেক্সিকোয় চলে যান।


মেক্সিকোয় যাওয়ার পর মি. গেভারা রাজনীতিতে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং সেখানেই বছরখানেক কেটে যায়।

অন্যদিকে, কারাগারে বন্দী ফিদেল কাস্ত্রো ১৯৫৫ সালের মে মাসে সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি পান। এরপর পুনরায় গ্রেফতার এড়াতে তিনিও মেক্সিকোয় পালিয়ে যান। ১৯৫৫ সালে সেখানেই গ্রীষ্মের এক রাতে ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে প্রথমবারের মতো দেখা হয় চে গেভারার।

দেখা হওয়ার পর সেই রাতে দু’জন কয়েক ঘণ্টা ধরে আলাপ-আলোচনা করেন।

পরের দিন সকালে ফিদেল কাস্ত্রো মি. গেভারাকে কিউবার গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানান এবং চে গেভারা প্রস্তাবে রাজি হন।

মেক্সিকোয় থাকতেই সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে কিউবার তৎকালীন সেনা শাসক ফুলখেনসিও বাতিস্তাকে উৎখাতের পরিকল্পনা করতে থাকেন ফিদেল কাস্ত্রো। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৯৫৬ সালের ২৫শে নভেম্বরে একটি ইঞ্জিন-চালিত নৌকায় চড়ে মি. কাস্ত্রো ও ৭৯ জন সঙ্গীদের সাথে কিউবায় পাড়ি জমান চে গেভারা।


পূর্ব উপকূলে পৌঁছানোর পর নৌকাটি কেউবার সামরিক বাহিনীর হামলার শিকার হয়।

এতে নৌকার বেশির ভাগ যাত্রী মারা গেলেও ফিদেল কাস্ত্রো এবং চে গেভারা প্রাণে বেঁচে যান।

এরপর তারা সিয়েরা মায়েস্ত্রা নামের একটি পাহাড়ে আশ্রয় নেন এবং নতুন করে গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলেন।

এরপর সেখান থেকেই তারা পরবর্তী দুই বছর হাভানার সরকারের উপর গেরিলা আক্রমণ চালাতে থাকেন।

এই সময়ে সম্মুখ সমরে সাহসী ভূমিকায় রাখায় মি. গেভারাকে গেরিলা যুদ্ধের কমান্ডার করেন ফিদেল কাস্ত্রো।

দুই বছর গেরিলা আক্রমণ চালানোর পর ১৯৫৯ সালের পহেলা জানুয়ারি গেরিলা যোদ্ধারা কিউবার রাজধানী হাভানায় প্রবেশ করে এবং সেনা শাসক মি. বাতিস্তা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এরপর ফিদেল কাস্ত্রো কিউবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসেন। সমাজতান্ত্রিক ধারায় চালু করেন এক দলীয় শাসন ব্যবস্থা।


বিপ্লবের পর মি. গেভারাকে কিউবার নাগরিকত্ব দেওয়া হয় এবং তিনি কাস্ত্রোর নতুন সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে ওঠেন।

এরপর মি. কাস্ত্রো তাকে কিউবার শুভেচ্ছা দূত বানিয়ে এশিয়া ও আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশে সফরে পাঠান।

১৯৫৯ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে মি. গেভারা কিউবা সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে তৎকালীন মিশরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের, ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, ইন্দোনেশিয়া প্রেসিডেন্ট সুকর্ণ এবং যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

তার এই সফরের উদ্দেশ্য ছিলো- ঔপনিবেশিক শাসন থেকে সদ্য স্বাধীনতা অর্জন করা দেশগুলোকে কেউবার বিপ্লবের পক্ষে আনা এবং তাদের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করা। মি. গেভারা সফলভাবেই সেই দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হন ।

ফলে সফর শেষে দেশে ফেরার পর মি. কাস্ত্রো তাকে কিউবার শিল্পমন্ত্রী বানান। একইসঙ্গে, কিউবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও প্রেসিডেন্ট করেন।

ক্ষমতা গ্রহণের পর বাতিস্তার বহু সমর্থককে যুদ্ধাপরাধসহ নানান অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেয় কাস্ত্রোর সরকার।

চে গেভারা নিজেও সেই বিচারিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং অনেকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আদেশ দিয়েছিলেন বলে জানা যায়।

বিদেশি পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করেন যে, সেই বিচার ‘পুরোপুরি নিরেপক্ষ’ ছিলো না।


বেশ কয়েক বছর মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালন করার পর মি. গেভারা সিদ্ধান্ত নেন যে, এসব ছেড়ে কিউবার মতো বিপ্লব তিনি অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে দিবেন। সেই ভাবনা থেকে সরকারি সব দায়িত্বে ইস্তফা ১৯৬৪ সালের নভেম্বরে মি. গেভারা আবারও দেশ ভ্রমণ শুরু করেন।

এশিয়ায় ও আফ্রিকার একাধিক দেশ ঘুরে তার দুইমাসের সফর শেষ হয় মধ্য আফিকার কঙ্গোতে।

সেখানকার পরিস্থিতি দেখে মি. গেভারা সিদ্ধান্ত নেন যে, কঙ্গো থেকেই তিনি তার নতুন সশস্ত্র বিপ্লব শুরু করবেন।

প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য তিনি পুনরায় কিউবা ফিরে যান।

এরপর ১৯৬৫ সালের এপ্রিলে কিউবা থেকে একদল গেরিলা নিয়ে মি. গেভারা কঙ্গোর উদ্দেশ্যে রওনা হন।

কিন্তু সেখানে সফলতা না পেয়ে আবারও দক্ষিণ আমেরিকায় নজর দেন।

বিপ্লবের স্বপ্ন নিয়ে ১৯৬৬ সালের নভেম্বর মি. গেভারা বলিভিয়ায় পৌঁছান।

এর বছরখানেক পরেই ৩৯ বছর বয়সী এই বিপ্লবী দেশটির সামরিক বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন এবং তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

কিন্তু ততদিনে সারা বিশ্বের মার্কসবাদী বিপ্লবীদের কাছে চে গেভারা এক কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছিলেন।

[ বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে।]





ছয়শো বছরের অটোমান সাম্রাজ্যের শুরু ও শেষ যেভাবে

বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্যগুলির মধ্যে একটি, অটোমান সাম্রাজ্য ১৩ শতকে উসমান গাজীর হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

এই সময়ের মধ্যে, বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতন হয় এবং আনাতোলিয়া অনেক ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত হয়েছিল।

উল্লেখ্য, বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য বর্তমান ইতালি, গ্রীস ও তুরস্ক আর উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অংশ নিয়ে বিস্তৃত ছিল। অন্যদিকে, আনাতোলিয়া হচ্ছে বর্তমান তুরস্কের বড় একটি অংশ।

উসমান গাজী, ১২৫৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। সোগুত নামে ছোট একটি রাজ্যের তুর্কি সেনাপতি ছিলেন তিনি।

উসমান এক রাতে শেখ আদিবালি নামে এক বৃদ্ধ দরবেশের ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন।

ওই রাতে উসমান স্বপ্ন দেখেন যে তার বুক থেকে একটি বিশাল গাছ বেরিয়ে ডালপালা ছড়াচ্ছে এবং সারা বিশ্বে ছায়া ফেলছে।

উসমান পরে শেখ আদিবালীর কাছে তার এই স্বপ্নের কথা জানান। শেখ এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন: "হে উসমান, আল্লাহ তোমাকে এবং তোমার বংশধরদের কাছে রাজকীয় সিংহাসন অর্পণ করেছেন।"

তারপর আনাতোলিয়ার বেশিরভাগ অংশ জয় করে, আশেপাশের সেলজুক ও তুর্কোমান রাজ্যসহ বাইজেন্টাইন দখল করে নেন।

উসমানের উত্তরসূরিরা ইউরোপের দিকে নজর দেয়। তারা ১৩২৬ সালে গ্রীসের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর থেসালোনিকি জয় করে। এরপর ১৩৮৯ সালে সার্বিয়া জয় করে। কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহাসিক বিজয় ছিল ১৪৫৩ সালে। ওই বছর তারা বাইজেন্টাইনের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল) জয় করে।


মুসলমানরা এর আগের সাতশ' বছর ধরে এই শহরটি দখলের চেষ্টা করলেও এটির ভৌগলিক অবস্থান এমন ছিল যে, তারা প্রতিবারই ব্যর্থ হয়।

কনস্টান্টিনোপলের তিন দিক বসফরাস সাগরে বেষ্টিত হওয়ায় এই শহরটি আশ্রয়ের শহর হয়ে উঠেছিল।

বাইজেন্টাইনরা গোল্ডেন হর্ন পথটি বন্ধ করে দিয়েছিল। তাদের ২৮টি যুদ্ধজাহাজ অন্য দিকে পাহারা দিয়েছিল।

গোল্ডেন হর্ন হচ্ছে বসফরাস সাগরের সরু এক প্রণালী, যা ছিল ইস্তাম্বুল শহরের প্রধান জলপথ।

উসমানীয় সুলতান মেহমেত ফতেহ ১৪৫৩ সালের ২২শে এপ্রিল এমন এক পদক্ষেপ নেন যা কেউ ভাবতেও পারেনি।

তিনি মাটিতে তক্তা দিয়ে একটি মহাসড়ক তৈরি করেন এবং তেল-ঘি মিশিয়ে পথটিকে খুব পিচ্ছিল করে ফেলেন।

তারপর গবাদি পশুর সাহায্যে তার ৮০টি জাহাজকে এই পথে টেনে নিয়ে যান এবং এভাবে সহজেই ওই শহরের বিস্মিত প্রহরীদের পরাস্ত করেন তিনি।

বিজয়ী হয়ে মেহমেত তার রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে স্থানান্তর করেন এবং তাকে ‘সিজার অব রোম’ (রোমান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা) উপাধি দেয়া হয়।

এরপর বিজয়ী মেহমেতের নাতি ‘প্রথম সেলিম’ অন্যান্য দিকে দৃষ্টিপাত করেন।

তিনি ১৫১৬ ও ১৫১৭ সালে মিশরের মামলুকদের পরাজিত করে, মিশর ছাড়াও বর্তমান ইরাক, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, জর্ডানসহ সর্বোপরি হিজাজ জয় করে তার সাম্রাজ্যের আকার দ্বিগুণ বাড়িয়ে ফেলেন। এর পাশাপাশি, আজ থেকে ঠিক পাঁচশ বছর আগে হিজাজের দুটি পবিত্র শহর মক্কা ও মদিনা অধিগ্রহণ করে মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী শাসক হয়েছিলেন প্রথম সেলিম। ধারণা করা হয়, উসমানীয় খিলাফত ১৫১৭ সালে শুরু হয়েছিল, এবং প্রথম সেলিমকে প্রথম খলিফা হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তার আগ পর্যন্ত উসমানীয়দের 'সুলতান' বা 'পাদশাহ্' বলা হতো।

প্রথম সেলিমের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তিনি অল্প সময়ের মধ্যে একের পর এক সাম্রাজ্য দখল করতে পারতেন। এর বড় কারণ ছিল তার কার্যকর যুদ্ধ কৌশল।


পানিপথের যুদ্ধে তার এই রণকৌশল অনুসরণ করে ওই যুদ্ধে প্রথম গোলা বারুদ ব্যবহার করেন সম্রাট বাবর।

অটোমানরা শুরুতে ইউরোপের অনেক অঞ্চল দখল করে। তবে এই সাম্রাজ্য রাজনীতি, রণনীতি, অর্থনীতি - এই তিনটি ক্ষেত্রেই সবচেয়ে প্রসার লাভ করে প্রথম সুলেইমানের আমলে। তিনি ১৫২০ থেকে ১৫৬৬ সালে টানা ৪৫ বছর আমৃত্যু শাসনভারে ছিলেন।

সুলেইমান আলী খানের শাসনামলে সালতানাত বা অটোমান সাম্রাজ্য তার সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শীর্ষে পৌঁছেছিল।

এ কারণে তিনি পশ্চিম ইউরোপে 'সুলেইমান দ্য মেগনিফিসেন্ট' নামে পরিচিতি পেয়েছিলেন। অন্যদিকে, নিজ সাম্রাজ্যে তাকে বলা হতো কানুনি সুলতান। বেলগ্রেড ও হাঙ্গেরি জয় করে সুলেইমান তার সীমানা মধ্য ইউরোপ পর্যন্ত প্রসারিত করেছিলেন। তবে দু'বার চেষ্টা করেও অস্ট্রিয়ার বিলাসবহুল শহর ভিয়েনা জয় করতে পারেননি তিনি।

ইউরোপ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ১৬ ও ১৭ শতকে বিশ্বের বাকি অংশকে ছাড়িয়ে যায়। এর একটি কারণ সে সময় জাহাজ শিল্প বিকাশ লাভ করছিল।

এটি ছিল ইউরোপের 'আবিষ্কারের যুগ'। অর্থাৎ ইউরোপীয় নৌবহর বিশেষ করে স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, ডাচ আর ব্রিটিশ নৌবহরগুলো সারা বিশ্বের সমুদ্র অন্বেষণ করছিল। এভাবে আমেরিকা মহাদেশের আবিষ্কার হয় এবং ইউরোপীয়রা তা দখল করে। এই দখলদারিত্বের কারণে ইউরোপ বাকি বিশ্বের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে।


এসময় ইউরোপীয় বিশ্বের বিভিন্ন অংশে তাদের উপনিবেশ স্থাপন করতে শুরু করে।

ইউরোপীয়দের জন্য বেশি বেশি জলযান চালাতে নতুন নতুন যন্ত্র উদ্ভাবন করা এবং যন্ত্রগুলো উন্নত করার প্রয়োজন হয়ে ওঠে।

এই প্রয়োজনীয়তা থেকে সে সময় ইউরোপ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উন্নয়ন করতে থাকে।

এ সময় দ্বিতীয় আরেকটি শিল্প বেশ বিকাশ লাভ করে। আর সেটি হচ্ছে ছাপাখানা। এই ছাপাখানার উদ্ভাবন হয়েছিল ১৪৩৯ সালে।

ইউরোপে বৈজ্ঞানিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব ঘটানোর ক্ষেত্রে এক বিশাল ভূমিকা রেখেছিল এই ছাপাখানা।

সেই সময় বিজ্ঞান ও কলা - দুটি বিষয়ের উপর শুধুমাত্র অভিজাত ও গির্জার একচেটিয়া আধিপত্য ছিল, ছাপাখানার বদৌলতে তা সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে চলে আসে।

অটোমানরাও যদি ছাপাখানা ব্যবহার করা শুরু করতো, তাহলে হয়তো আজ পৃথিবীর ইতিহাস অন্যরকম হতো।

কিন্তু সুলতান ফাতিহের পুত্র দ্বিতীয় বায়েজিদ ১৪৮৩ সালে, যারা আরবি হরফে বই ছাপাতেন, তাদের জন্য মৃত্যুদণ্ড আরোপ করেন।

এর কারণ ছিল, আলেমগণ ছাপাখানাকে ফেরাঙ্গিদের উদ্ভাবন বলে ফতোয়া দিয়েছিলেন। তাদের মতে, ফেরাঙ্গিদের আবিষ্কারের উপর ভিত্তি করে কুরআন বা আরবি লিপিতে বই ছাপানো ধর্মবিরোধী।

তাই ইউরোপ যখন সময়ের সাথে এগিয়ে যাচ্ছিল তখন অটোমান সাম্রাজ্য বছরের পর বছর ততটাই পেছাতে থাকে এবং সংকুচিত হতে থাকে।

এরপর ব্রিটিশরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আনাতোলিয়া ছাড়া তাদের প্রায় সমস্ত অঞ্চল দখল করে নেয়।

 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর উসমানীয় সাম্রাজ্যের পরিকল্পিত ভাঙ্গন এবং তাদের উপর ব্রিটিশ নীতির বিরুদ্ধে ভারতীয় মুসলমানরা একটি রাজনৈতিক প্রচারণা শুরু করে যাকে ‘খিলাফত আন্দোলন’ । ১৯১৯ সালে মাওলানা মুহাম্মদ আলী ও মাওলানা শওকত আলীর নেতৃত্বে এই খিলাফত আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়।

এই আন্দোলন থেকে ব্রিটিশদের হুমকি দেওয়া হয়েছিল যে যদি তারা অটোমান খলিফা আবদুল হামিদকে পদচ্যুত করার চেষ্টা করে, তবে ভারতীয় মুসলমানরা তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে। ভারতের কংগ্রেস পার্টি ১৯২০ সালে খিলাফত আন্দোলনকে সমর্থন করতে শুরু করে। মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আইন অমান্য অভিযানের সূত্রপাত হয়েছিল এই খিলাফত আন্দোলনের মধ্য দিয়েই। মজার ব্যাপার হলো, কায়েদ-ই-আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ নিজেকে এই আন্দোলন থেকে দূরে রেখেছিলেন কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে এটি সফল হবে না। এই আন্দোলন গতি পাওয়ার আগে, ১৯২২ সালে কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে তুরস্কের জাতীয়তাবাদী বাহিনী দেশটি দখল করে এবং খলিফা আবদুল হামিদকে ক্ষমতাচ্যুত করে খিলাফতের পদ বাতিল করে। এর মাধ্যমে অটোমানদের ৬২৩ বছরের মহান সাম্রাজ্যের সূর্য চিরতরে অস্তমিত হয়।

[ বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে।]



১০



দুর্গাপুজো ও অসুর


পশ্চিমবঙ্গ, বিহার আর ঝাড়খণ্ডে তপশীলি উপজাতিদের যে সরকারি তালিকা আছে, তার মধ্যে প্রথম নামটিই এই অসুর উপজাতির। তারা পেশাগত ভাবে পাথর গলিয়ে লোহা বার করার কাজ করে থাকেন। সেই প্রাচীন পদ্ধতি সম্পূর্ণভাবে নিজেদের সম্প্রদায়ের মধ্যেই অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে রক্ষা করেন তারা। তবে অনেক অসুরই অন্যান্য পেশাও বেছে নিয়েছেন এখন। দের সম্প্রদায় এখনও বিশ্বাস করে যে দুর্গা আমাদের পূর্বপুরুষ মহিষাসুরকে হত্যা করেছিলেন।  দানব, রাক্ষস, দৈত্য, কিন্নর, নাগ, যক্ষ এরা সব মিলে যে অসুর সম্প্রদায়, তারা আসলে মানুষই ছিলেন। 


"মহিষাসুর ছিলেন অত্যন্ত বলশালী এবং প্রজাবৎসল এক রাজা। আদিবাসীদের প্রচলিত লোকগাথা অনুযায়ী এক গৌরবর্ণা নারীকে দিয়ে তাদের রাজাকে হত্যা করা হয়েছিল।"

"এক গৌরবর্ণা নারীই যে মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন, তা হিন্দু পুরাণেও আছে। দেবী দুর্গার যে প্রতিমা গড়া হয়, সেখানে দুর্গা গৌরবর্ণা, টিকলো নাক, যেগুলি আর্যদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য। দুর্গার আরেক নাম সেজন্যই গৌরী। অন্যদিকে মহিষাসুরের যে মূর্তি গড়া হয় দুর্গাপূজায়, সেখান তার গায়ের রঙ কালো, কোঁকড়ানো চুল, পুরু ঠোঁট। এগুলো সবই অনার্যদের বৈশিষ্ট্য,"।


যে আর্যরা ভারতে আসার পরে তারা কোনোভাবেই মহিষাসুরকে পরাজিত করতে পারছিল না। তাই তারা একটা কৌশল নেন। একজন নারীকে তারা ব্যবহার করেন মহিষাসুরকে বধ করার জন্য।

"রাজা মহিষাসুরের সময়ে নারীদের অত্যন্ত সম্মান দেওয়া হত। একজন রাজা কোনও নারীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হবেন না, বা তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবেন না, এরকমটাই ধারণা ছিল আর্যদের। তাই তারা এক নারীকে এই কাজে ব্যবহার করেছিলেন বলেই আদিবাসী সমাজ বিশ্বাস করে," দেবী দুর্গার মহিষাসুর বধের কাহিনী আসলে আর্য-অনার্যদের লড়াইয়ের কাহিনী। 


পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী সমাজ বলছে, দুর্গাপুজো হয় যে সময়ে, সেটা তাদের কাছে দাসাই মাস। সেই মাসের ষষ্ঠী, সপ্তমী থেকেই শুরু হয় শোক পালন। দাসাই, ভুয়াং এগুলো চলতে থাকে পাড়ায় পাড়ায়। আর দশমীর দিন হয় বড় অনুষ্ঠান।

“কোথাও অরন্ধন পালন করা হয়, কোথাও জানলা-দরজা বন্ধ করে ঘরে বসে থাকেন আদিবাসীরা, যাতে দুর্গাপূজার যে উৎসব, সেই মন্ত্র বা ঢাকের শব্দ যাতে তাদের কানে না যায়। “দুর্গাপূজার এই সময়ে তারা অশৌচ পালন করেন এবং ভুয়াং বাদ্যযন্ত্র নিয়ে নাচ হয়। দাসাই নাচ করেন তারা, যেখানে পুরুষরা নারী যোদ্ধার ছদ্মবেশ ধারণ করে কান্নার সুরে গান গেয়ে গ্রামে গ্রামে ঘোরেন। তাদের গানটা এরকম : তারা 'বিন্দি বা মাকড়সাকে বলে, 'ও বিন্দি, তোমরা কি কেউ আমার রাজাকে দেখেছ? আমাদের রাজাকে কোনও এক গৌরবর্ণা নারী চুরি করে নিয়ে গেছে',"


মহিষাসুর গবেষক প্রমোদ রঞ্জনের কথায়, "বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে এই অসুর জাতির ইতিহাস আর্যদের পূর্ববর্তী যুগের ইতিহাস। আমরা যেমন মহিষাসুরকে খুঁজে পেয়েছি বর্তমান উত্তর প্রদেশের বুন্দেলখন্ডে, আবার এখনকার যে মহীশুর বা মাইসোর শহর, সেই অঞ্চলেও মহিষাসুরের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। আবার খাজুরাহোর যে বিশ্বখ্যাত মন্দির, সেখানেও মহিষাসুরের মূর্তি পেয়েছি আমরা। অর্থাৎ শুধু যে লোকগাথায় মহিষাসুর আছেন, তা নয়। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনও খুঁজে পেয়েছি আমরা।"

'অসুর' নামের যে জনজাতি, তারা ছাড়াও ভারতের আদিমতম আদিবাসী বলে পরিচিত ছত্তিশগড়ের গোন্ড সম্প্রদায়ের মধ্যেও মহিষাসুরের লোকগাথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত আছে


গোখর পাহাড়ে আলাপ হওয়া এক সাধুর কাছে তাঁরা জানতে পারেন যে ওই অঞ্চলে মহিষাসুর ব্যাপকভাবে পূজিত হন। কোথাও ভৈঁসাসুর, কোথাও মাইকাসুর আবার কোথাও মহিষাসুর নামে তাঁর পূজো দেন দলিত শ্রেণীর যাদব আর পাল বংশীয় মানুষ। মহিষাসুরকে তাঁরা গরু, মোষের মতো গৃহপালিত পশুর রক্ষাকর্তা বলে মনে করেন।

মি. রঞ্জন বলছেন, গ্রামগুলিতে মহিষাসুরের মন্দির থাকে না, তবে বাঁধানো চাতাল মতো একটা জায়গায় পূজা করেন স্থানীয় মানুষ।

সব নিদর্শনগুলি দেখে মনে হয়, "মহিষাসুর নানা যুগেই ছড়িয়ে ছিলেন। তাই এটা সম্ভবত কোনও এক ব্যক্তি নন, এটা একটা উপাধি। যার পরম্পরা দক্ষিণ এশিয়ার নানা এলাকায় ছড়িয়ে আছে। যে পরম্পরা হাজার হাজার বছর ধরে বয়ে আসছেন আদিবাসীরা।"

[ বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে।]



১১



ইলুমিনাতি: ইতিহাসের 'সবচেয়ে রহস্যময়' গোপন সংস্থা 

অনেকে বিশ্বাস করে ইলুমিনাতি একটি গোপন, কিন্তু রহস্যময় বৈশ্বিক সংস্থা, যার লক্ষ্য বিশ্ব দখল করা, তারাই বিশ্বের বড় বড় বিপ্লব এবং বিখ্যাত ব্যক্তিদের হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত বলেও মনে করা হয়।

তবে প্রকৃতপক্ষে ইলুমিনাতি কারা ছিল এবং তারা কি সত্যিই বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করেছে? এই রহস্যময় সমাজ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবেন ১২টি প্রশ্নের উত্তর থেকে।

জানতে পারবেন এই সমাজের উদ্দেশ্য এবং কারা এর সাথে জড়িত ছিল।


১. প্রকৃত ইলুমিনাতি কারা ছিলেন?

দ্য অর্ডার অফ দ্য ইলুমিনাতি বা ইলুমিনাতি হলো ব্যাভারিয়াতে (বর্তমান আধুনিক জার্মানির অংশ) প্রতিষ্ঠিত একটি গোপন সমাজ। যেটার ব্যাপ্তিকাল ছিল ১৭৭৬ থেকে ১৭৮৫ সাল পর্যন্ত। এই সমাজের সদস্যরা নিজেদেরকে 'পারফেকশনিস্ট' বা ‘নিখুঁত’ বলে অভিহিত করতো।

ইলুমিনাতির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আইনের অধ্যাপক অ্যাডাম উইসাপট। তার উদ্দেশ্য ছিল যুক্তি ও কল্যাণমুখী শিক্ষা প্রচার করা এবং সমাজ থেকে কুসংস্কার ও ধর্মের প্রভাব কমানো। ইলুমিনাতি মূলত মানুষকে ‘আলোকিত’ করার আদর্শে অনুপ্রাণিত একটি সংগঠন ছিল।


অ্যাডাম উইসাপট ইউরোপে রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি পরিবর্তন করতে চেয়েছিলেন, সরকারের উপর ধর্মের প্রভাব অপসারণ করতে এবং জনগণকে 'আলোর নতুন পথ' দেখাতে চেয়েছিলেন।

ইলুমিনাতি গোষ্ঠীর প্রথম বৈঠকটি ১৭৭৬ সালের পহেলা মে ইঙ্গলস্ট্যাড শহরের কাছে একটি জঙ্গলে অনুষ্ঠিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়, যেখানে পাঁচজন সদস্য উপস্থিত ছিলেন এবং ওই পাঁচজন সংগঠনের গোপন আদেশ পরিচালনা করবে, এমন নিয়ম জারি করা হয়েছিল।

সময়ের সাথে সাথে দলটির উদ্দেশ্য কিছুটা পরিবর্তিত হয়। তাদের নতুন লক্ষ্য হয়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা, সেইসাথে রাজতন্ত্র ও চার্চের মত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব কীভাবে ব্যাহত করা যায়, তার উপর মনোযোগ দেয়া।

ইলুমিনাতির কিছু সদস্য পরে তাদের সংগঠনে নতুন সদস্য আনতে অর্থাৎ সদস্য সংখ্যা বাড়াতে ফ্রিম্যাসন সোসাইটিতে যোগ দেয়।

ফ্রিম্যাসন সোসাইটি হলো শুধুমাত্র পুরুষদের নিয়ে গঠিত একটি প্রাচীন গোপন সমাজ, যেখানে সব সদস্য একে অপরকে সাহায্য করে এবং নিজেদের যোগাযোগের জন্য গোপন চিহ্ন ব্যবহার করে। পরবর্তীতে 'বার্ড অফ মিনার্ভা' নামের একটি পাখি এই সমাজের প্রতীকী চিহ্ন হয়ে ওঠে। বার্ড অফ মিনার্ভার এই বার্ড আসলে একটি পেঁচা, যা রোমান জ্ঞানের দেবী মিনার্ভার প্রতীক।

 

২. ইলুমিনাতি কীভাবে ফ্রিম্যাসনদের সাথে সম্পর্কিত?

ফ্রিম্যাসন মূলত এমন একটি সমাজ বা সংগঠন যেটি শত বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যা মধ্যযুগের স্টোনম্যাসন (যারা পাথর কেটে নানা রূপ দিতেন) এবং ক্যাথেড্রাল চার্চ নির্মাতাদের গিল্ড থেকে বিকশিত হয়েছিল।

নির্দিষ্ট কিছু দেশ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রিম্যাসনদের নিয়ে সবসময়ই বিভ্রান্তি ছিল। এ কারণে ১৮২৮ সালে, ফ্রিম্যাসনদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে এক-দফা লক্ষ্য নিয়ে একটি রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে ওঠে যার নাম ছিল অ্যান্টি-ম্যাসনিক পার্টি।

যেহেতু ইলুমিনাতি তাদের সংগঠনে ফ্রিম্যাসনদের নিয়োগ করেছিল, তাই দু'টি সংগঠন নিয়ে প্রায়ই বিভ্রান্তি দেখা দেয়।

 

৩. কীভাবে একজন ইলুমিনাতিতে যোগ দিতে পারে?

কেউ যদি ইলুমিনাতিতে যোগ দিতে চায়, তাহলে তার সেই সংগঠনের অন্যান্য সদস্যদের অনুমতি এক কথায় সর্বসম্মত অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।

সেইসাথে তাদের অঢেল সম্পদের মালিক হতে হবে এবং খ্যাতিমান হতে হবে।

এছাড়াও, ইলুমিনাতিতে সদস্যপদ পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি রয়েছে, যেখানে কিছু শ্রেণি বিভাজন দেখা যায়।

একজন নতুন সদস্য হিসেবে এই সংগঠনে প্রবেশ করার পর তিনি নভিস পদবি পান। এরপর তিনি হন মিনারভাল। যা কিনা নভিসের এক ধাপ উপরের স্তর। এর চাইতে উপরের স্তর হলো ‘এনলাইটেনড (আলোকিত) মিনারভাল’।

অর্থাৎ সংগঠনটির সদস্যদের এই তিনটি স্তরে ভাগ করা হতো এবং সময়ের সাথে সাথে তারা এক স্তর থেকে উপরের স্তরে উঠতেন।

র‍্যাঙ্ক যতোই বাড়তে থাকে সংগঠনটির নিয়ম তত জটিল হতে থাকে। যেমন: সংস্থাটির পূর্ণ সদস্য হতে হলে ১৩টি শর্ত পূরণ করা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়।

 

৪. ইলুমিনাতি কী কী নির্দিষ্ট আচার পালন করে?

এটা সত্য যে ইলুমিনাতি বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পালন করতো, যদিও সেই আচারগুলি কী অনেকাংশেই তা জানা যায়নি। এই সমাজের সদস্যদের পরিচয় গোপন রাখতে ছদ্মনাম ব্যবহার করা হতো। তবে সামান্য হলেও যে আচার-অনুষ্ঠানগুলোর ব্যাপারে জানা গিয়েছে, তা থেকে ধারণা পাওয়া যায় যে কিভাবে নতুনরা সংগঠনের উচ্চ স্তরে প্রবেশ করতো। এসব আচারের মধ্যে রয়েছে:

তখন নিয়োগকারীরা তাকে অঙ্গীকার করাতো যে তিনি সমাজের ভালোর জন্য তার ব্যক্তিগত স্বার্থ বিসর্জন দেবেন।

 

৫. সর্বদর্শী চোখ কী?

'আই অফ প্রভিডেন্স' হলো একটি প্রতীকী চিহ্ন কিংবা প্রতীক যেখানে একটি ত্রিভুজের মধ্যে একটি চোখের ছবি দেখা যায়।

এই ছবিটি বিশ্বের বিভিন্ন গির্জায়, ম্যাসনিক ভবনগুলোতে, এমনকি মার্কিন এক ডলারের নোটেও প্রদর্শিত হয়।

এই চিহ্নটি শুধুমাত্র ফ্রিম্যাসনদের সাথেই নয় বরং ইলুমিনাতির সাথেও জড়িত এবং বলা হয় যে এটি সংগঠনটির বিশ্বব্যাপী নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের প্রতীক।

তবে এটি একটি খ্রিস্টান প্রতীক বলে জানা গিয়েছে। মানবতার উপর ঈশ্বরের নজরদারিকে ফুটিয়ে তোলে এমন শিল্পকর্মে এই সর্বদর্শী চোখ প্রতীকটি ব্যবহার হয়ে থাকে।

পরে ১৮ শতকে, প্রতীকটি নতুন উপায়ে ব্যবহৃত হতে থাকে। ১৭৮৯ সালে ফরাসি পার্লামেন্ট বা জাতীয় গণপরিষদ গৃহীত একটি মানবাধিকার নথির সচিত্র সংস্করণ পাস হয়। সেখানে এই প্রতীকটি ব্যবহার করা হয়েছিল।

এই চিহ্ন এবং ইলুমিনাতির মধ্যে কোনও আনুষ্ঠানিক সংযোগ নেই। ফ্রিম্যাসন সমাজ এই চিহ্নটিকে তাদের ঈশ্বরের প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করার কারণেই হয়তো প্রতীকটি ইলুমিনাতির সাথে যুক্ত হয়ে পড়েছে। কারণ ইলুমিনাতি ও ফ্রিম্যাসন একসাথে জুড়ে ছিল।

 

৬. ইলুমিনাতি কি বিশ্ব দখলে সফল হয়েছে?

অনেকেই বিশ্বাস করে যে ইলুমিনাতি বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং এটি এমনই এক গোপন সংগঠন যার ব্যাপারে খুব কম লোকই জানে।

যেহেতু ইলুমিনাতির অনেক সদস্য ফ্রিম্যাসন সমাজে যোগ দিয়েছিলেন এবং ফ্রিম্যাসনের অনেকে ইলুমিনাতি দলে যোগদান করেছিল, তাই ইলুমিনাতি একা তাদের লক্ষ্যে কতদূর সফল হয়েছে সেটা বলা মুশকিল।

তবে অধিকাংশ ইতিহাসবিদ মনে করেন যে, মূল ইলুমিনাতি সংগঠনের প্রভাব বেশ সীমিত। তারা কেবলমাত্র মধ্যপন্থী হতে পেরেছিল।

 

৭. ইলুমিনাতি গ্রুপের বিখ্যাত সদস্য কারা ছিলেন?

১৭৮২ সালের মধ্যে, ইলুমিনাতি গ্রুপের সদস্য সংখ্যা ৬০০ জনের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। তাদের মধ্যে একজন হলেন ব্যারন অ্যাডলফ ভন নিগে, তিনি জার্মান সমাজের অভিজাতদের মধ্যে একজন বলে মনে করা হয়।

তিনি এর আগে ফ্রিম্যাসন সমাজের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং সাবেক ফ্রিম্যাসন হিসেবে, ইলুমিনাতিকে সংগঠিত ও প্রসারে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন।

প্রাথমিকভাবে, শুধুমাত্র অ্যাডাম উইসাপটের ছাত্ররা ইলুমিনাতির সদস্য ছিলেন, কিন্তু শিগগিরই ডাক্তার, আইনজীবী এবং সমাজের বুদ্ধিজীবীরা এই দলে যোগ দেন।

বলা হয় যে ১৭৮৪ সালের মধ্যে ইলুমিনাতির সদস্য দুই থেকে তিন হাজারের মত হয়ে যায়। কিছু সূত্র দাবি করেছে যে বিখ্যাত লেখক ইয়োহান ওয়ালফগ্যাং ফন গুঠাও এই সংগঠনে যোগ দিয়েছিলেন, তবে এ বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

 

৮. ইলুমিনাতির আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে কখন?

১৭৮৪ সালে, ব্যাভারিয়ার শাসক (ডিউক) কার্ল থিওডর আইন দ্বারা অনুমোদিত নয় এমন কোনও কর্পোরেশন বা সমাজ তৈরি করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।

পরের বছর তিনি দ্বিতীয় আদেশ (ডিক্রি) পাস করেন, যেখানে স্পষ্টভাবে ইলুমিনাতিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

ওই সময় ইলুমিনাতির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে সেখানকার সদস্যদের গ্রেফতার করা হতো, তখন বেশ কিছু নথি পাওয়া যায়, যেখানে নাস্তিক্যবাদ (ঈশ্বরে অবিশ্বাস) এবং আত্মহত্যার মত ধারনাকে সমর্থন করা হয়েছিল। সেইসাথে গর্ভপাত করার নির্দেশনাও পাওয়া যায়।

এসব নথিপত্র থেকে তৎকালীন শাসকদের মনে সন্দেহ দানা বাঁধে যে এই সংগঠনটি রাষ্ট্র এবং চার্চ উভয়ের জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তারপর থেকে, অর্ডার অফ দ্য ইলুমিনাতি সাধারণ মানুষের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। যদিও অনেকের ধারণা যে তারা গোপনে গোপনে ঠিকই সংগঠন টিকিয়ে রেখেছে।

 

৯. অ্যাডাম উইসাপটের পরিণতি কী?

অ্যাডাম উইসাপট ইউনিভার্সিটি অফ ইঙ্গলস্টাডের সাথে যুক্ত থাকলেও পরে তাকে বরখাস্ত করা হয়।

এরপর তিনি ব্যাভারিয়া থেকেও নির্বাসিত হন। পরে জার্মানির গোথা শহরে তিনি তার বাকি জীবন কাটান। এই শহরেই ১৮৩০ সালে মারা যান তিনি।


১০. কেন ইলুমিনাতির মিথ আজও টিকে আছে?

ইলুমিনাতি ভেঙে যাওয়ার পরপরই তাদের নিয়ে নানা গুজব ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়াতে শুরু করে।

১৭৯৭ সালে, ফরাসি ধর্মযাজক অ্যাবে অগাস্টিন বোরেলের ধারণা যে ‘অর্ডার অফ দ্য ইলুমিনাতি’র মত গোপন সমাজ ফরাসি বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছে।

পরের বছর, যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন একটি চিঠিতে লিখেছিলেন যে, ‘তিনি বিশ্বাস করেন ইলুমিনাতির হুমকি কেটে গিয়েছে’।

কিন্তু তার এই ধারণা আগুনে ঘি ঢালার মত কাজ করে এবং জানান দেয় সংগঠনটি গোপনে গোপনে তাদের কার্যক্রম পুরোদমে চালিয়ে যাচ্ছে।

পরবর্তীতে বিভিন্ন বই ও বক্তৃতায় সংগঠনটিকে নিন্দা করা হয় এবং তৃতীয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন ইলুমিনাতির সদস্য বলে মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়।

 

১১. কেন আজও মানুষ ইলুমিনাতিতে বিশ্বাস করে?

ইলুমিনাতি বিশ্বে আধিপত্য বিস্তার করে আছে, এই ধারণাটি মানুষের মন থেকে সম্পূর্ণরূপে উধাও হয়ে যায়নি বরং এটি পপুলার কালচারের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।

১৯৬৩ সালে, "প্রিন্সিপিয়া ডিসকর্ডিয়া" শিরোনামে নামে একটি বই প্রকাশ পায়, যেখানে ধর্মের বিপরীতে "ডিসকর্ডিয়ানিজম" নামে একটি বিকল্প বিশ্বাস ব্যবস্থার প্রচার করা হয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির হত্যাকাণ্ডের পিছনে ইলুমিনাতির ভূমিকা ছিল বলে দাবি করে ডিসকর্ডিয়ানিজমের কিছু অনুসারী। এ নিয়ে তারা বিভিন্ন জার্নালে জাল চিঠিও পাঠায়। উইলসন পরে রবার্ট শিয়াকে নিয়ে একটি বই প্রকাশ করেন, যার নাম 'দ্য ইলুমিনাতি ট্রায়োলজি', যেটি ভীষণ জনপ্রিয় হয় এবং এর সর্বাধিক কপি বিক্রি হয়। বইটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বিষয়ক সাহিত্যচর্চা ও চলচ্চিত্রের নতুন ধারার জন্ম দিয়েছে।

ইলুমিনাতি স্যাটানিজম বা শয়তানবাদ এবং অন্যান্য আদর্শের সাথেও যুক্ত ছিল যার ফলে সংগঠনটি ১৮ শতকের মূল ব্যাভারিয়ান গোষ্ঠীদের থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিল।

 

১২. নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার কী? ইলুমিনাতির সাথে কীভাবে সম্পর্কিত?

যারা নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার তত্ত্ব বা ইলুমিনাতিতে বিশ্বাস করে, তারা এটাও বিশ্বাস করে যে একটি অভিজাত গোষ্ঠী বিশ্ব শাসন করার চেষ্টা করছে।

বিভিন্ন সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছাড়াও, মার্কিন তারকা বিয়ন্সে ও জে-জি সহ বেশ কয়েকজন পপ তারকা এর সদস্য বলে শোনা গিয়েছে।

যদিও দু'জন তারকাই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারে বিশ্বাসী লোকেরা এটা বিশ্বাস করে যে একটি অভিজাত গোষ্ঠী বিশ্ব দখল করার চেষ্টা করছে।

[ বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে।]

১২


জিন্নাহ কেন বালুচিস্তানকে প্রথমে পাকিস্তানের ভেতরে চাননি?

ভারতবর্ষ ভাগ হওয়ার পর ২২৭ দিন পর্যন্ত একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র ছিল স্টেট অফ কালাত বা বালুচিস্তান। তারা পাকিস্তানের অংশ হতে চায়নি এবং পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহও সেই সময় তাতে সায় দিয়েছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশদের চলে যাওয়ার পর ভারত বা পাকিস্তানে স্বতন্ত্র শাসক রাজাদের শাসনে থাকা রাজ্যগুলোর পক্ষে স্বাধীন থাকা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

বালুচিস্তানের একটা বিশাল অংশ শীতল মরুভূমি, যা ইরানি মালভূমির পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত। বর্তমানে পাকিস্তানের বালুচিস্তান প্রদেশ, ইরানের সিস্তান-বালুচিস্তান প্রদেশ এবং আফগানিস্তানের একটি ছোট অংশে বিভক্ত প্রাচীন বালুচিস্তান। আফগানিস্তানের নিমরুজ, হেলমান্দ ও কান্দাহারও আগে বালুচিস্তানের অংশ ছিল।

বালোচরা সুন্নি মুসলমান। এমনকি শিয়া অধ্যুষিত ইরানের সিস্তান ও বালুচিস্তান প্রদেশেও বালোচ সুন্নি মুসলমানদের বাস রয়েছে।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বালুচিস্তানে বিদ্রোহের সুর উঠতে থাকে। সেখানে চীনের প্রবেশের পর থেকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

পাকিস্তান চীনকে বালুচিস্তানের গোয়াদর বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার পর থেকেই স্থানীয় বালুচরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে আসছে।

বালুচিস্তান বরাবরই পারস্য ও ভারতীয় সাম্রাজ্যের মধ্যে 'স্যান্ডউইচ'-এর মতো একটি অবস্থানে ছিল। এমনকি উত্তরের প্রতিবেশী আফগানিস্তানকেও এই দুই সাম্রাজ্যে ঘটা যুদ্ধের প্রভাব বইতে হয়েছে। তবে আফগানিস্তানের মতো আত্মরক্ষার প্রাচীর হিসেবে পাহাড় নেই বালুচিস্তানের।

প্রসঙ্গত, কালাতকে অনেকেই পাকিস্তানের হায়দ্রাবাদ বলে আখ্যা দিতেন। কালাত একটা স্বাধীন দেশীয় রাজ্য ছিল যা পাকিস্তানের অংশ হিসেবে সে দেশের সঙ্গে যোগ দিতে রাজি হয়নি। এদিকে হায়দ্রাবাদও ভারতে যোগ দিতে অস্বীকার করেছিল।


"বালুচিস্তান কিন্তু কোনোভাবেই পাকিস্তানে যোগদানের পক্ষে ছিল না। পাকিস্তান তো জোর করে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেছে। কালাতের খান চেয়েছিলেন স্বাধীন কালাত, কিন্তু পাকিস্তান তা চায়নি। ছোট ছোট স্বাধীন রাজ্যগুলোর পক্ষে স্বাধীন থাকা এত সহজ ছিল না।"  

"ভৌগোলিক দিক থেকে বালুচিস্তানের পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হলেও সেখানকার মানুষের মন কিন্তু একীভূত হয়নি। 


জিন্নাহর মৃত্যুর পরের পাকিস্তান

১৯৪৭ সালের ১১ই অগাস্ট মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ তার ভাষণে বলেছিলেন, "আপনারা স্বাধীন।আপনারা যার যার মন্দিরে, মসজিদে যেতে পারে, পাকিস্তানের যে কোনো উপাসনালয়ে যেতে পারেন আপনারা। আপনি যে ধর্ম, বর্ণ বা গোত্রভুক্তই হন না কেন, তার ভিত্তিতে সরকার কারও প্রতি কোনোরকম বৈষম্য করবে না।"

কিন্তু মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যুর পর পাকিস্তানে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।

১৯৫৬ সালে পাকিস্তান প্রথমবার সংবিধান প্রণয়ন করে। এরপর, যে সমস্ত স্বশাসিত রাজ্যগুলোকে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, সেখানে সেনাবাহিনী ও আমলাদের নিয়ন্ত্রণ বেড়ে যায়।

ভৌগোলিকভাবে স্বশাসিত রাজ্যগুলো পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলেও কোনো সামাজিক সংহতি তৈরি হয়নি। এই পরিস্থিতিতে আড়ালে থাকা বালোচ বিদ্রোহীরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চলে যায়। রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে কোনো সম্প্রীতি ছিল না। এই বিষয়গুলো আজও পাকিস্তানকে সমস্যায় ফেলছে।" যতদিন পাকিস্তান বালুচিস্তানকে নিরাপত্তা ও সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবে, ততদিন এই সমস্যার কোনো সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে না।  



১৩


মুসলিম বিশ্বের রাজধানী মদিনা থেকে কুফায় কেন স্থানান্তর করেছিলেন হযরত আলী?


রমজানের ১৯তম দিনে ভোরে কুফা মসজিদে ফজরের নামাজের সময় মুসলমানদের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী ইবনে আবি তালিবের মাথায় বিষমাখা তরবারি দিয়ে আঘাত করেন আব্দুল রহমান ইবনে মুলজুম।  

মারাত্মক এই আঘাত পাওয়ার ঠিক দুই দিন পর ২১তম রমজানের দিন হযরত আলী মারা যান।

হযরত আলীর খেলাফতকালে (ইসলামী শাসন ব্যবস্থা) নানা ঘটনা ঘটেছে,   তার খেলাফতকালের একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের রাজধানী মদিনা থেকে ইরাকের কুফা শহরে স্থানান্তর করা।যার কারণ এবং পরিণতি নিয়ে আজও বিতর্ক অব্যাহত।

কুফা কোথায় অবস্থিত ?

ইরাকের রাজধানী বাগদাদের ১৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে কুফা শহরটি অবস্থিত।

হযরত উমরের শাসনামলে কুফা শহরে বসবাসকারী লোকদের অনুদান দেওয়ার রীতি শুরু হয়।

এবং ২৪ হিজরি সালের মধ্যে এ শহরের জনসংখ্যা দেড় লাখে পৌঁছায়।  

আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামি রাষ্ট্রের প্রথম শহর হিসেবে মদিনা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

এখানে অবস্থিত ‘মসজিদে নববী’ বা নবীর মসজিদ সমগ্র মুসলিম বিশ্বের জন্য এখনও দ্বিতীয় পবিত্র স্থান।

নবীর জীবদ্দশায় মদিনা তার সদর দফতর ছিলো।

তবে, মদিনার পরিবর্তে যখন কুফাকে রাজধানী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, সে সময়ের নানা ঘটনাবলী লক্ষ্য করলে বিভিন্ন কারণ সামনে আসে।

যাই হোক, এরপর মদিনা আর খেলাফতের (ইসলামী শাসন ব্যবস্থা) কেন্দ্রে ফিরে আসতে পারেনি।

এমন কী, হযরত আলীর শাসনকাল শুরু হওয়ার আগেও ইসলামি বিশ্ব দ্বিধাবিভক্ত ছিলো।

৩৬ হিজরিতে জামালের যুদ্ধ বা উষ্ট্রের যুদ্ধের পরে ইসলামের চতুর্থ খলিফা রাজধানী হেজাজ থেকে ইরাকে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

ইতিহাসবিদদের মতে, মক্কা ও মদিনার পবিত্রতা রক্ষা করতে চাওয়াই ছিল হযরত আলীর এই সিদ্ধান্তের পেছনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

এবং যেহেতু কুফায় তার বিপুল সংখ্যক সমর্থক ছিল তাই তিনি এই শহরকে রাজধানী করতে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন।


রাজনৈতিক ও সামরিক কারণ

সে সময় ইসলামিক বিশ্বের প্রধান কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ছিল সিরিয়ার দামেস্ক, হেজাজের মক্কা ও মদিনা এবং ইরাকের বসরা ও কুফা।

এটি এমন একটা সময় ছিল যখন একদিকে মুয়াবিয়া বিন আবি সুফিয়ান দামেস্কের গভর্নর ছিলেন।

তিনি সুহাইল বিন হানিফের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অস্বীকার করেছিলেন। হযরত আলীর খেলাফত গ্রহণের পর সিরিয়ার জন্য সুহাইলকে গভর্নর করা হয়।

অন্য দিকে, মক্কাতে হযরত আলীও বিরোধীদের প্রতিরোধের মুখে পড়েছিলেন।

এই সিদ্ধান্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল হযরত আলী মদিনাকে আরও গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। হযরত আলী চেয়েছিলেন মদিনা যেন স্থানীয় রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত না হয়। এবং তিনি ইসলামের নবীর স্মৃতিবিজড়িত এই শহরটিকে ভবিষ্যতের গৃহযুদ্ধ এবং সম্ভাব্য যুদ্ধ থেকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন।

, হযরত আলী ইসলামের শাসন কেন্দ্র মদিনা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং অন্তত হেজাজ (সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চল) পর্যন্ত ইসলামের জীবন ব্যবস্থাকে রক্ষা করেছিলেন। এবং  অর্থনৈতিকভাবে, মদিনা ও হেজাজ অঞ্চলের কিন্তু ইরাক বা সিরিয়ার সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো ক্ষমতা ছিল না।

কারণ মদিনার অবস্থান ছিল মরু অঞ্চলে যেখানে চাষাবাদ, কৃষি, পরিবহন ও সক্রিয় ব্যবসা-বাণিজ্যের অভাব ছিল। অন্য দিকে ওই অঞ্চলের আয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল ইরাক। ইসলামী রাষ্ট্রের সম্প্রসারণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল, কুফার অবস্থান ছিল ভৌগোলিকভাবে তৎকালীন ইসলামী বিশ্বের প্রায় কেন্দ্রস্থলে।

যেখান থেকে ইরান, হেজাজ, সিরিয়া এবং মিশরকে নজরদারি করা যেত। আর দেশ পরিচালনার জন্যও এটি ভালো অবস্থান ছিল।

আরেকটি কারণ হলো, জনবলের দিক দিয়ে মদিনার সিরিয়ার সঙ্গে সর্বাত্মক যুদ্ধে যাবার মতো সামর্থ্য ছিল না।

অন্যদিকে কুফা নিজেই একটি ঘনবসতিপূর্ণ নগরী এবং বিশাল জনসংখ্যার শহরগুলির কাছাকাছি অবস্থিত ছিল। ফলে হযরত আলী বিভিন্ন ধরনের আগ্রাসন মোকাবেলায় সক্ষম ছিলেন।

কুফা পাঁচ বছর ইসলামী রাষ্ট্রের রাজধানী ছিল।

৪০ হিজরিতে যখন মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান মক্কা ও মদিনা দখল করে ইয়েমেনের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করেন, তখন ইয়েমেনের গভর্নর উবায়দুল্লাহ বিন আব্বাস যুদ্ধ না করে কুফায় ফিরে যান।

হযরত আলী যখন এই বিদ্রোহের খবর পেয়েছিলেন তিনিও যুদ্ধের জন্য একটি বাহিনী পাঠাতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু যখন ১৯তম রমজানের দিন তিনি তার পছন্দের রাজধানীর মসজিদে মারাত্মকভাবে আঘাত প্রাপ্ত হন এবং মারা যান, তখনও এই বাহিনী রওনা দেয়নি।

এরপর কুফা ইসলামিক সরকারের রাজধানী হওয়ার গৌরব হারায় এবং সরকারের কেন্দ্র সিরিয়ায় স্থানান্তরিত হয়।






সিলেটি নাগরী লিপি: বাংলার হারিয়ে যাওয়া এক ঐতিহ্যসম্পদ

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। বাংলা ভাষার একাধিক বর্ণমালা বা লিপি ছিল। দুটি বর্ণমালার একটি প্রমিত বাংলা বর্ণমালা, অপরটি সিলেটি নাগরী লিপি। সিলেটি নাগরী লিপিতে রচিত হয়েছে শত শত সাহিত্য, গ্রন্থ, দলিল, চিঠিপত্র। এ লিপিতে পরিচালিত হয়েছে মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কার্যক্রম। কয়েক শতাব্দী জুড়ে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রচলিত ছিল সিলেটি নাগরী লিপির সাহিত্য। সিলেট ছাড়াও কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা, ভৈরব, করিমগঞ্জ ও শিলচরে এর ব্যবহার ছিল। তখন এটি ব্যবহৃত হত বাংলালিপির বিকল্প হিসেবে।

সিলেটের মুসলমানরা আরবি, কাইথি, বাংলা ও দেবনাগরী লিপির সমন্বয়ে বিশেষ ধরনের একটি ভাষা লিপির প্রচলন করেছিলেন। এটি নাগরী লিপি হিসেবে পরিচিত ছিল। তৎকালীন শ্রীহট্টের মুসলমান সাহিত্যিকরা হিন্দি প্রভাবিত বাংলার পরিবর্তে নাগরী লিপিতে তাদের ধর্মীয় বই পুস্তক ও সাহিত্য চর্চা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। ধারণা করা হয়, হজরত শাহজালাল (র.) এর সমসাময়িক মুসলিম ধর্মপ্রচারকরা এই লিপির প্রসার ঘটিয়েছিলেন। 

গবেষক সৈয়দ মুর্তাজা আলী (১৯০২-১৯৮১ খ্রি.) লিখেছেন, “সিলেটের মুসলমানদের মধ্যে একপ্রকার নাগরী লিপির প্রচলন আছে। এই লিপি দেবনাগরী লিপি থেকে ভিন্ন এবং কেবলমাত্র সিলেট জেলার মুসলমানদের মধ্যে এর ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়।” নাগরী লিপি মূলত মুসলমানি ভাষা লিপি ছিল। সাধারণত হিন্দু অধিবাসীগণ এই বাংলা লিপির সাথে পরিচিত ছিল না। 

নাগরী লিপির উৎপত্তিকাল, এর বিকাশ এবং কীভাবে এই লিপির প্রচলন শুরু হয় এ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। নাগরী লিপি ও সাহিত্য গবেষকেদের এসব মতামতকে আমরা মোটামুটি তিনটি পক্ষে বিন্যস্ত করে দেখতে পারি। প্রথম পক্ষ মনে করেন, নাগরী লিপির উদ্ভব হয়েছে চর্তুদশ শতকের গোড়াতেই। হজরত শাহজালাল এবং তিনশত ষাট আওলিয়ার মাধ্যমে সিলেট অঞ্চলে ইসলাম ধর্মের প্রসার লাভ করে। তাদের অনুসারীদের দ্বারা নাগরী লিপি সৃস্টি হয়। দ্বিতীয় পক্ষ মনে করেন, ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে এ অঞ্চলে আফগান উপনিবেশ স্থাপিত হয়। এ সময় তাদের হাত ধরে নাগরী লিপির উদ্ভব হয়। কেননা আফগান মুদ্রায় নাগরী লিপির অক্ষরের উপস্থিতি পাওয়া যায়। তৃতীয় পক্ষ মনে করেন, ব্রিটিশ শাসনের সময়ে এ লিপির উৎপত্তি হয়। তাদের যুক্তি হচ্ছে ইংরেজ আমলে বাঙালি মুসলমানরা নিজেদের স্বকীয়তা ধরে রাখতে এবং হিন্দুদের প্রভাব মুক্ত থাকার জন্য এই লিপির আশ্রয় গ্রহণ করে।

তবে হজরত শাহজালালের সময়ে এই লিপির উদ্ভাব হয়েছে বলেই অধিকাংশ ভাষাবিদ মতামত দিয়ে থাকেন, কেননা তার সময়েই অত্র অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সর্বাপেক্ষা মুসলমানি প্রভাব দেখা যায়। নাগরী লিপিতে রচিত গ্রন্থের অনেকগুলো নামাজ, রোজা, হজ্জ, ইসলামি জীবনব্যবস্থা, ইসলামের ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ের উপরে রচিত। কিছু গ্রন্থ ইসলামি মারফত বিষয়ক। কিছু গ্রন্থের পুথিতে পীর ও আউলিয়াদের জীবনী লিখিত। আবার কিছু কিছু গ্রন্থের পুথিতে রয়েছে প্রেম-উপাখ্যান। এই সকল পুথি জনসাধারণের শোক ও দুঃখে সান্ত্বনার বাণী এবং বিশ্রামে আনন্দ প্রদান করত।

নাগরী লিপির নমুনা;

এ লিপিতে মোট বর্ণ সংখ্যা ছিল ৩৩টি। এর মধ্যে স্বরবর্ণ ৫টি, ব্যঞ্জনবর্ণ ২৭টি এবং ধ্বনি-নির্দেশক চিহ্ন ১টি। স্বরবর্ণ ৫টি হচ্ছে- আ, ই, উ, এ, ও। ব্যঞ্জনবর্ণ ২৭টি হচ্ছে- ক, খ, গ, ঘ, চ, ছ, জ, ঝ, ট, ঠ, ড, ঢ, ত, থ, দ, ধ, ন, প, ফ, ব, ভ, ম, র, ল, শ, হ, ড় এবং একমাত্র ধ্বনি-নির্দেশক চিহ্ন হচ্ছে- ং।

এই ৩৩টি অক্ষরের মধ্যে বিভিন্ন ভাষা লিপির প্রভাব রয়েছে বলে ভাষা গবেষকগণ মত প্রকাশ করেছেন। যদিও এই বিন্যাসের মধ্যেও বৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হয়। তবে সামগ্রিক বিবেচনায় তালিকাটি মোটামুটি নিম্নরূপ-

বাংলা বর্ণমালা থেকে গ্রহণ করা হয়েছে ৮টি অক্ষর। যথা- ই, ঘ, জ, ঠ, ড, ঢ, দ এবং ড়।

সিলেটি নাগরীর নিজস্ব বর্ণ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে ৭টি অক্ষর। যথা- আ, ঝ, ধ, র, ল, হ, ং।

আরবির অক্ষরের উচ্চারণের প্রভাব থেকে গ্রহণ করা হয়েছে ৪টি অক্ষর। যথা- ক, খ, ফ, ও।

দেবনাগরী ও কাইথি বর্ণের সাদৃশ্য থেকে গ্রহণ করা হয়েছে ১৪টি অক্ষর। যথা- উ, এ, গ, ঘ, চ, ট, ত, থ, ন, প, ফ, ব, ভ, ম।

তবে এসব অক্ষর লেখার ভঙ্গি আমাদের বর্তমান বাংলা অক্ষর থেকে ভিন্নতর। 

@ Nayeem Ahmad

১৫



॥চার হাজার বৎসর আগের সুমের স্কুল-শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষান্তে চাকরি॥

পাঁচ হাজার বৎসর আগে শুরুতে ছবি এঁকে লেখার শুরু হলেও ২৫০০ পূর্বাব্দে সেই ছবি বদলে যায় কিছু সাংকেতিক চিহ্নে। তিন হাজার বৎসর আগে লেখা শেখার জন্য স্কুলের কথা অবশ্যই কেউ ভাবেনি, কিন্তু লেখার উপযোগিতা বৃদ্ধির সাথে সাথে লেখা শেখার ব্যবস্থাপনাও তাদের মাথায় এসে যায়। শুরু হয় লেখার এবং পড়ারও স্কুল আনুমানিক ২৫০০ পূর্বাব্দে, তার প্রত্ন নমুনা পাওয়া গেছে সুমেরদের প্রথমদিককার শহর শুরুপ্পাক-এ। এবং এই শুরুপ্পাকেই রচিত হয় মানুষ সৃষ্টির কাহিনি, তার সাথে মহাপ্লাবনের কাহিনি।

প্রথম বদলগুলো শুরু হতে সময় লেগেছিল ৫০০ বৎসর। এই সময়কার নতুন চিহ্নে আগের ছবির একটা থাকলেও পরের পাঁচশ বৎসরে সেগুলো পুরো বদলে যায়। প্রথমদিককার ছবির প্রায় কোন মিলই আর থাকে না। এতে অসুবিধার বদলে সুবিধাই হল। আগে গাছের ছবি দেখে গাছই বোঝা যেত, পরের ধাপে গাছের সাংকেতিক চিহ্ন দিয়ে গাছ, বন, ঝোপঝাড় সবই বোঝানো সম্ভব হল। পিক্টোগ্রাফ বদলে এল আইডিওগ্রাফ। পরের ধাপে ঐ চিহ্নটি আরো বদলে হয়ে গেল কেবল গা শব্দ বোধক অক্ষর।

কিউনিফর্ম লিপি প্রথম পাঠোদ্ধার বেহিস্তুন শিলালিপি থেকে। প্রথমে পাঠোদ্ধার হল প্রাচীণ ফার্সী। তারপরে ব্যাবীলনীয় আক্কাদ। এই আক্কাদভাষার পাঠোদ্ধারের পরে জানা গেল আক্কাদ ভাষারও আগে ছিল সুমের ভাষা। আনুমানিক দুই হাজার বৎসর ভুলে থাকার পরে আবার সুমের ভাষা, প্রথম লিখিত ভাষা, পাঠ করতে শুরু করল মানুষ।

সুমের ভাষা ৫০০০ হাজার বৎসর আগে লেখা শুরু হল মুলত আর্থিক লেনদেন নিয়ে। চালান, রিসিপ্ট, ক্যাশমেমো, গ্যারান্টীকার্ড এই সব।

সুমেরদের প্রকৃত সাহিত্যিক লেখালেখি শুরু হয় ২০০০ সাধারণ পূর্বাব্দের পরে। তার আগে তাদের সব সাহিত্যই ছিল মুলত শোনার, পড়ার না। অনেকটা যেভাবে গানের স্বরলিপি থাকলেও তা শোনার জন্য, সেরকম। সেই মনোভাবেই সুমের সাহিত্য মুখে রচিত হত তারপরে মুখে মুখে সেটা শোনানো হত। এই শোনানোর কাজটা হত প্রধানত মন্দিরে। শোনাতেন পুরোহিতরা।

আনুমানিক ২৩৫০ সাধারণ পূর্বাব্দে আক্কাদ সম্রাট সারগন ঘোষণা করলেন সমস্ত রাজভাষা হবে আক্কাদ ভাষা। শুধু মন্দিরে আর জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় সুমের ভাষা ব্যবহার করা যাবে। দ্রুত সুমের ভাষার ব্যবহার কমতে শুরু করল, ফলে ভাষাটি ভুলতেও শুরু করল। ভাষা ভুলে যাওয়ায় মন্দিরে মন্দিরে সুমের ভাষায় রচিত প্রাচীন কাহিনি শুনতে আর ভীড় জমে না। ভীড় না জমলে পুরোহিতরা কাকে গল্প শোনাবেন? ফলে পুরোহিতরাও কাহিনিগুলো ভুলে যাবেন এমন শঙ্কা জাগল। মন্দিরের দেবতার মহিমাকীর্তন করা কাহিনি লোকে না শুনলে ক্রমে লোকে মন্দির আসাই তো বন্ধ করে দেবে। তখন কাহিনিগুলো রক্ষার তাগিদেই মাটির ট্যাবলেটে মৌখিক কাহিনিগুলো লেখা হতে শুরু করল।

সম্ভবত তারই ফলে আমরা দেখতে পাই সুমের রাজা সালগি কে। রাজা সালগি স্কুলে শিক্ষালাভ করেছেন, এবং সিংহাসনে বসে এই স্কুলগুলোর প্রভুত উন্নতি ঘটান।


॥সুমের স্কুল "এডুব্বা"॥

এই স্কুলগুলোর পরিচিতি ছিল ট্যাবলেট হাউস হিসাবে। আমাদের আধুনিক বাংলায় বলতে পারি গ্রন্থাগার। এখানে সমস্ত লিখিত ট্যাবলেট রাখা থাকত। স্কুলের উদ্দেশ্য শুধু লেখা শেখানোতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষিত দক্ষ নাগরিক গড়া। স্কুলের পাঠক্রম শেষ করতে কম করেও বার বৎসর লাগত। এতদিন ধরে তারা কি শিখত তার অনেক নমুনাও পাওয়া গেছে। তবে দ্বিতীয় পূর্ব সহস্রাব্দের পরের নমুনাই বেশি পাওয়া গেছে।

গোড়ায় স্কুলগুলো মন্দিরের অংশবিশেষ হিসাবে চালু হলেও পরে তারা পূর্ণ স্বাধীন প্রতিষ্ঠানে বদলে যায়। এটা সম্ভব হল কারণ স্কুলের সব খরচ এবং শিক্ষকদের মাইনে আসত ছাত্রদের দেওয়া টিউশন ফি থেকেই।

স্কুলের শিক্ষালাভের সুযোগ সর্বজনীন ছিল না। এমনিতেই বিদ্যার্থীদের মধ্যে ছেলেরাই বেশি, কচিৎ কখনো মেয়ে। বার বৎসর স্কুলে মাইনে দিয়ে শিক্ষাগ্রহণ সম্ভব ছিল কেবল অভিজাত ও ধনীদের সন্তানদেরই। মনে করতে পারি এমনি স্কুলেই পড়েছিলেন সুমের রাজা সালগি, পড়েছিলেন আসিরীয় সম্রাট আসুরবানিপাল।

তার সাথে তালমিলিয়ে ঐ ধারণা প্রমানিতও হয়েছে পাঁচশত লিপিকারের নামের তালিকা থেকে। তালিকায় লিপিকারের নামের পাশে তার পিতার নাম পেশা লেখা বাধ্যতামুলক ছিল। সাধারণ পরিবারের ছেলেরা বিনা রোজগারে অতদিন কাটাবে তেমন আর্থিক সমৃদ্ধি তাদের ছিলো না। তবে কেউ সে সুযোগ পেত না তেমন ভাবারও কারণ নেই। মনে রাখতে হবে, সুমেরদের সমাজে ক্রীতদাসদেরও স্বাধীনভাবে রোজগারের ছিল নিজের স্বাধীনতা ক্রয়ের জন্য।  স্কুলের বার বৎসরের সিলেবাস। গোটা মেসোপটেমিয়ার স্কুলেই মোটামুটি একই পাঠ্যসুচী অনুসৃত হত। পাঠ্যসূচী মোটাদাগে দুই ভাগে বিভক্ত। বিজ্ঞান আর সাহিত্য।

সাধারণ পাঠ্যসুচীতে সবাইকে পড়তে হত কয়েকশ সুমের অক্ষর আইডিওগ্রাম, পড়া, লেখা। আইনের, চিকিৎসার, ব্যবসার, দলিল লেখার, হিসাবের, কারিগরি বিদ্যার নানা শব্দবন্ধ যার সংখ্যা কয়েক হাজার, তা শিখতে হবে। সুমের ব্যাকরণ, অভিধান, সুমের-আক্কাদ অভিধান, অংক শিখতে হবে। সেই সব অংক, যা লাগবে জমি জরীপে, ইঁটের হিসাব রাখতে, মন্দিরের হিসাব রাখতে, সেনাদলের রসদের হিসাব রাখতে। তার সাথে শেখানো হত প্রানীবিদ্যা শারীরবিদ্যাও। তারই সাথে শেখানো হত সাহিত্য রচনার পদ্ধতি। কারণ স্কুল জীবনের পরে তাকে এই সবই করতে হবে। 

বিজ্ঞান শিক্ষা বলতে আমরা ঝট করে যা অনুমান করি, কিছুটা মিল থাকলেও পুরোটা তেমন না। বিজ্ঞানের মধ্যে সুমের ব্যকরণও ছিল। তবে ক্রমেই এই বিজ্ঞান শাখার প্রভুত উন্নতি হয়। গোটা মেসোপটেমিয়ার সমস্ত পশুপাখীর জীবজন্তুর নাম লিপিবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। লিপিবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল দেশ অঞ্চল শহরের নাম। যতরকম খনিজ মেসোপটেমিয়াতে ব্যবহার হত সব খনিজপদার্থের নামও লেখা হয়ে গিয়েছিল। অংক জ্যামিতি এই সব ছাড়াও বিজ্ঞান শাখায় এই সবই ছাত্রদের শিখতে হত।


সাহিত্য শাখায় অজস্র সুমের মিথ গল্প কবিতা মহাকাব্য কাহিনি উপদেশাবলি সবই পড়তে হত। শিখতে হত প্রাচীন সুমের লিপি।

এই পড়ানোর জন্য স্কুলের সংগ্রহে থাকতো প্রাচীন সুমের ট্যাবলেট। আসুরবানিপালের লাইব্রেরীর বড় সংগ্রহ ছিল এই নানা স্কুলের সংগ্রহ।

পাঠশেষে ছাত্রের পরীক্ষায় একটা বিষয় শুনে লিখে নীচে নিজের নাম স্বাক্ষর করতে হবে প্রাচীন সুমের অক্ষরে। পরীক্ষা পাশের পরে নবীন লিপিকার অবিধা নিয়ে অধিকার পাবে স্বাধীন ভাবে সুমের সাহিত্য পাঠের, অথবা সুযোগে নিজে কোন সাহিত্য লিখতেও পারে।

নানা লেখা দেখে অনুমান করা যায় দশ বৎসর বা তার কিছু কম বয়স থেকেই স্কুলে যেতে হত। স্কুল প্রশাসনের মাথায় ছিল "উম্মিয়া"("দক্ষব্যক্তি" বা "স্কুলের পিতা")। আমাদের ভাষায় প্রধান শিক্ষক। এছাড়া থাকত বিযয়ভিত্তিক শিক্ষক যেমন অংকের, আঁকার, সুমের ভাষার। শিক্ষকদের বলা হত ⁼বড়ভাই⁼ বা ⁼বড় দাদা⁼। ছাত্ররা হল ⁼স্কুলের-ছেলে⁼।

তাছাড়া স্কুলের সিনিয়র ছাত্রদেরও কাজে লাগানো হত নবাগতদের শাসন করতে আর কিছুটা শেখাতেও। নবাগত ছাত্র কয়েক বৎসর পরে আর নবাগত থাকতো না। তখন যে সিনিয়রদাদা তার উপর হম্বিতম্বি চালাত তাকে সুযোগমত কড়কে দিত। এই সব নিয়ে ঝামেলা লেগেই থাকত। অবস্থা গুরুতর হলে প্রধান শিক্ষক আসরে নামতেন।

চার হাজার বৎসর আগের প্রাইমারি স্কুলের গল্প শোনা যাকঃ

নবীন ছাত্রটি সকালে ঘুম থেকে উঠে স্নান করে কিছু খেয়ে, মায়ের কাছ থেকে দুপুরের খাবার পোঁটলা করে, স্কুলের দিকে হাঁটা লাগাত। স্কুলে দেরীতে ঢুকলে, পড়া না পারলে, দুষ্টুমি করলে সপাসপ বেতের বাড়ি পড়ত পিঠে। স্কুলে লেখা ট্যাবলেট দেখে দেখে লেখার মাধ্যমেই শিক্ষা হত।


পাঠশেষে চাকরি? এমনিতে অনেক সুযোগ মনে হলেও বাস্তবে তা না। তখনকার সরকারী চাকরীতে (মন্দির, রাজপ্রাসাদ) সবার জায়গা হবে না এটাই স্বাভাবিক। তবে বেসরকারী চাকরীও ছিল। ধণাঢ্য বনিক, উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী, এদের সাথে সবসময়ই থাকতো একাধিক লিপিকার। অনেকেই শহরের প্রবেশ দ্বারের সামনে, মন্দিরের পাশে, বাজারের পাশে বসে থাকে, বনিকদের বা অন্য শহরবাসীদের প্রয়োজনে কিছু লিখে দেবার জন্য।

ভালো চাকরি তখনও বাবার যোগাযোগের উপর নির্ভরশীল। এমনিতে সুমেরদের সমাজে প্রচলিত নিয়ম বাবা যা করে পুত্রও তাই করবে। ফলে সুযোগ আরো সীমিত। সাধারনত লিপিকারদের কাজের সুযোগ সবচেয়ে বেশি মন্দিরে। সেখানে প্রচুর হিসাব করা দলিল লেখা মত হাজার একটা কাজ ছাড়াও সাহিত্যপাঠের সুযোগও আছে। কিন্তু বাস্তবে সব পুরোহিতই তো স্কুল পর্ব শেষ করে এসেছে। পুরোহিত হতে হলে স্কুলর শিক্ষা শেষ করে কঠিনতর পুরোহিত স্কুলের পাঠাভ্যাস শেষ করতে হয়।

তবু লিপিকারদের প্রয়োজনীয়তা নানা জায়গায় নানা পরিস্থিতিতে ছিলই। রণক্ষেত্রে যেতে হত লিপিকারকে। যুদ্ধে মৃত আহতদের সংখ্যার হিসাব করতে, আর রসদের হিসাব রাখতে।

ডাক্তারেরও দরকার লিপিকার। প্রেসকৃপশন লেখার জন্য। চিকিৎসার জন্য, রোগের বিশদ মনে রাখার জন্য, আর প্রমান রাখার জন্য। কারণ ভুল চিকিৎসার জন্য ডাক্তারকে অর্থদন্ড দিতে হত।

একটি মন্দিরের পুরোহিত-প্রশাসকের চিঠি পাওয়া গেছেঃ ⁼যে ২০০জন অস্থায়ী মজুরকে নেওয়া হয়েছে, তাদের দায়িত্ব আমার ঘাড়ে, তাদের দেবার জন্য রূপা আর উল আমি সংগ্রহ করেও বিলি করতে পারছি না, লিপিকারের অভাবে। হিসাব-রক্ষক লিপিকারদের তালিকা আপনার কাছে।⁼

বোঝাই যাচ্ছে তখনো প্যানেলে নাম ওঠার পরেও পোষ্টিং ঝুলে থাকত কোন অজ্ঞাত কারণে। সুমেররা ব্যুরোক্র্যাসিও গুলে খেয়েছিল। @  ©তুষারমুখার্জি।

তথ্যসুচীঃ-

1. Everyday life in Babylonia and Assyria _by H W F Saggs.

2. The Sumerians: by _ Samuel Noah Kramer.




মেসোপটেমিয়া ও মেলুহাদের গ্রাম

মেসোপটেমিয়ার সাথে হরপ্পা সভ্যতার বানিজ্যিক সম্পর্কের কথা সবাই জানেন। অনেকেই বলেছেন হরপ্পান লোকরা বসবাস করত মেসোপটেমিয়াতে। এটা প্রত্যক্ষ বিশদ প্রমানহীন অনুমান মাত্র। এবারে প্রধান প্রশ্ন। হরপ্পানরা মেসোপটেমিয়তে ঠিক কোন জায়গায় ছিল? তাদের বসবাসের গ্রাম বা নগরের নাম কি? আর তারা ওখানে কিভাবে গেল বা ঠিক কি কাজ করত?

যেহেতু সুমেররা সবই লিখে রাখত, তাই তাদের দেশে বসবসকারী হরপ্পানদের নিয়ে একটি কথাও লিখবে না এমনটা তো প্রায় অসম্ভব।

অবশ্য প্রায় পাঁচ লক্ষের মত মেসোপটেমিয়ান ট্যাবলেটের থেকে মাত্র হাজার পঞ্চাশের পাঠোদ্ধার করে ডিজিটালি সংরক্ষিত হয়েছে। কাজেই হয়ত হরপ্পানদের নিয়েও লেখা আছে, পড়া হয়নি।

কোন শ্রেণীর হরপ্পানরা ঐ দুরদেশে বসবাস করত? ব্যবসায়ীরা বানিজ্য করতে সেখানে বসবাস করত, সেটা তো কথার কথা মাত্র। আক্ষরিক অর্থে সত্য ধরে নেবার প্রয়োজন নেই। কারন অর্থবান ব্যবসায়ী তার দেশ-বাড়ি-পরিবার ছেড়ে দুরদেশে ব্যবসা বা বিশ্রামের জন্য কয়ে্কদিন বা কয়েকমাস থাকলেও সেখানে থেকে যাবে না, ফিরে আসবে।

সুমের সমাজ ব্যবস্থা আর তাদের নগর-রাজ্যগুলোর সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতিও খেয়ালে রাখলে বুঝবো যে, হরপ্পানদের জন্য সুমেরদের নগর-গ্রাম বসবাসের উপযুক্ত ছিল না।

সুমের সমাজের অভিজাত নাগরিক ছাড়া ছিল মুক্ত নাগরিকরা। সামান্য কিছু মুক্ত নাগরিকদের ছিল জমিজমা, বা বিশেষ কারিগরি দক্ষতা আর ব্যবসা। বেশিরভাগ মুক্তরাও মুলত দরিদ্র মজুর। এই দরিদ্ররা ঋণের দায়ে দাস হয়ে যেত।

বিদেশিদের আর হতদরিদ্রদের সাধারনত পাঁচিল ঘেরা নগরের ভেতরে বসবাসের সুযোগ থাকত না। বিদেশিদের জমি কেনার অধিকার ছিলো কি না তাতেও যথেষ্ট সন্দেহ। এই পরিস্থিতিতে হরপ্পার লোকেরা শখে মেসোপটেমিয়া যাবে না। গেলেও কি করে গেল বা কোথায় থাকত?

কি করে গেলঃ ভাবতে পারি কোন হরপ্পা ব্যবসায়ী কিছু কারিগর নিয়ে সেখানে উৎপাদন কেন্দ্র বানিয়ে পরিবহন খরচ বাঁচাবার কথা ভেবেছিল। ফলে কিছু হরপ্পা সভ্যতার নাগরিক তাদের বণিক প্রভুর আদেশে ঘরবাড়ি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চিরতরে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল বা বাধ্য করা হয়েছিল। চিরতরে, কারন ছুটিতে বাড়ি আসার গল্প তখন ছিলো না।

এছাড়া যুদ্ধবন্দী ও দাস হিসাবেও হরপ্পার কারিগরেররা সেখানে গিয়ে থাকতে পারে। দাস হিসাবে হরপ্পান কারিগরদের বিক্রী অসম্ভব না। তবে অত অতীতে সুমেররা বিদেশি বনিকদের থেকে দাস কিনতো তেমন কোন প্রত্যক্ষ প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। সেটা হয়েছিল কয়েক হাজার বৎসর পরে আসিরীয়দের কালে।

সুমের সমাজে দাসদের নিজে আলাদা করে খেটে টাকা জোগাড় করে নিজের দাম মিটিয়ে মুক্ত হবার সুযোগ ছিল। হতে পারে এই বন্দী সেনাদের অনেকেই তেমন করে একসময় মুক্ত হয়ে যায়। ফিরে উপায় নেই তাই থেকেই যায়।

সুমের আইনে কোন দাস যদি কোন মুক্ত নাগরিককে বিয়ে করে তবে তাদের সন্তান হবে মুক্ত নাগরিক। সুমের সমাজে দাসদের পরিবার অক্ষুন্ন রাখার কঠোর নিয়ম ছিল। কাজেই এই হরপ্পান দাসদের সন্তানরা পরের প্রজন্মেই হয়ে যাবে দেশের স্বাধীন নাগরিক। তখন তারা জমি কিনে বাড়ি বানাতে পারবে। নগরের মধ্যে বসবাস করতে পারবে। তাদের নাম ভাষা, ধর্ম স্থানীয় মুক্ত নাগরিক মায়ের মতই হবার সম্ভবনা বেশি থাকলেও পিতৃ পরিচয়ের একটা জাতিগত ছাপ থাকবেই। কারন সুমেরদের সমাজ পিতৃতান্ত্রিক।

মেসোপটেমিয়ায় হরপ্পানদের বসতির নাম লেখা ছিল। তুরস্কের ইস্তাম্বুল আর্কিওলজিকাল মিউজিয়ামে রাখা অতি সাধারণ সেই ট্যাবলেটে লেখা ছিল মেসোপটেমিয়ায় হরপ্পান বা মেলুহাদের গ্রামের নাম "গুয়াব্বা"। এটি দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ার লাগাসের কাছে।তুরস্কের মিউজিয়ামের ট্যাবেলেটে পাওয়া গেল "গুয়াব্বা" আর মেলুহাদের নাম একই সাথে একই লাইনে। ঊর তৃতীয় রাজবংশের রাজা সালগির ৪৮তম রাজত্বকালের একটি ট্যাবলেটের সিল ছিল ।


"গুয়াব্বা"-র দেবী ও মন্দির

"গুয়াব্বা" গ্রাম ছিল চিরাচরিত সুমের গ্রাম। এই গ্রামের সুমের দেবী 'নানসে' আর তাঁরই কন্যা দেবী 'নিনমার' এর মন্দিরের নাম একাধিক লেখায় এই গুয়াব্বা গ্রামের সথে যুক্ত হয়ে আছে।

লেখা আছে যে দেবী নানসে-র মন্দিরের ছয়জন সেবকের কাজকর্মের দায়িত্ব ছিল একজন মেলুহার লোক। এ ছাড়াও মেলুহানরা নানসে দেবীর মন্দিরে কাজ করতো তাও লেখা আছে অন্য ট্যাবলেটে। এর থেকে খুব সহজেই বোঝা যায় মেলুহার লোকের তখন সুমেরদের সমাজে মিশে গেছে মুক্ত নাগরিক হিসাবেই, আরে সুমের দেবদেবীদের আরাধনাও করছে তারা।

গুয়াব্বা-র বার্লি উৎপাদন।

গিরসুতে পাঠানো বার্লির হিসাবে দেখানো হয়েছে সে বার্লি এসেছে মেলুহান জমি থেকে। তারই সাথে আছে নিনমার-কি দেবীর মন্দিরের জমি থেকেও আসা বার্লির উল্লেখ। এই মেলুহাদের জমি থেকে আসা কাঠেরও উল্লেখ আছে ।

গুয়াব্বা-র বস্ত্র শিল্প।

গিরসু, নি-না, কি-নু-নির, এই তিনটি এলাকা নিয়ে যে ত্রিভুজ তৈরী হল সেটা ছিল দক্ষিণ মেসোপটেমিয়র বস্ত্র শিল্পের প্রধান উৎপদন কেন্দ্র। মোট ২৪বার উল্লেখ আছে এলাকটির, ঊর-৩য় পর্যায়ের থেকে পাওয়া ট্যাবলেটগুলোতে। জানা যায় বস্ত্র শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় গিরসুর শ্রমিকের বড় উৎস ছিল গুয়াব্বা। গয়াব্বা থেকে যাওয়া, মহিলা ৪২৭২ জন, শিশু ১৮০০ জন গিরসুর বয়ন শিল্পে নিযুক্ত ছিল। এক জায়গা থেকে এত কেন? একটা অনুমান এই গুয়াব্বা-র বসিন্দারা ছিল বংশানুক্রমিক ভাবে বয়ন শিল্পে দক্ষ।  


গুয়াব্বার হতদরিদ্র পরিবার

আক্কাদ সম্রাট সারগনের আমলের আগের একটি ট্যাবলেটে লেখাঃ ৫৫ জনের একটি দল গুয়াব্বা পৌঁছেছে। গিরসুর বাউ মন্দিরের এলাকায় ও মন্দিরের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করায় তাদের গুয়াব্বা পাঠানো হল। ১২টি পরিবারের এই দলের পাঁচটি পরিবারের প্রধানই একজন বিধবা।" 

গুয়াব্বা বন্দর

একাধিক ট্যাবলেটে উল্লেখ করা হয়েছে গুয়াব্বাকে বন্দর বলে। গুয়াব্বার সাথে উল্লেখ করা হয়েছে জেলে আর নোনা জলের মাছের কথা। সারগনের আগের ট্যাবলেটে এই গুয়াব্বতে বড় নৌকারও উল্লেখ আছে। একটি ট্যাবলেটে লেখা আছেঃ "গুয়াব্বার নিমার-কি মন্দিরের দিকে আগুন এগিয়ে যাচ্ছে। বড় নৌকা বয়ে এনেছে মুল্যবান ধাতু ও রত্ন।" সুমের মন্দিরের বন্দনা গীতিতেও গুয়াব্বার নাম দুই বার উল্লেখ করা হয়েছে।

গুয়াব্বা তখন কেবল নদীর পাড়ের গ্রাম। তখন বিখ্যাত তার বয়ন শিল্পের শস্তা শ্রমিক জোগানের জন্য।

গিরসু থেকে কত দুরে ছিল গুয়াব্বা? নৌকার গুন টেনে গেলে পাঁচ দিনের পথ।

ঊর তৃতীয় রাজবংশের রাজা ইব্বি-সিন এর রাজত্বের পনের বৎসর কালের একটি ট্যাবলেটে পাওয়া গেছে একটি শব্দ dar-me-luh-ha মেলুহা পাখি। পাখি না, ওটা হবে মুরগি। হরপ্পা সভ্যতা থেকেই যে মুরগি মোসোপটেমিয়াতে গিয়েছিল তাতে কারুর কোন সন্দেহ নেই।

এই রাজা ইব্বি-সিন কেই উপহার দেওয়া হয়েছিল মেলুহা-বিড়াল (suranu), মেলুহা-কুকুর, আর দুগ্ধবতী ছাগল (mas ga me-luh-ha).

মেলুহার কাঠ ব্যবহার হতো, মেসোপটেমিয়াতে। আসতো মাগান হয়ে। এই কা্ঠের ব্যবহার হত মুলত চেয়ার বানতে, সিংহাসন বানাতে। কাঠের মধ্যে হাতির দাঁতের ইনলে করা হত।   সেই কাঠ আবার ব্যবহার হতো নৌকা তৈরীতে। তবে হরপ্পা সভ্যতা থেকে মেসোপটেমিয়াতে কতটা কাঠ যেত তা নিয়ে খানিক খটকা থেকেই গেল।

আপাতত আর কিছু জানা নেই যে। তবে এখনও ৪.৫ লক্ষ ট্যাবলেট পড়া বাকি।ভবিষ্যতে হয়তো আরো অনেক কিছু জানা যাবে। ©তুষারমুখার্জি।

তথ্যসূচীঃ-

1. Guabba, the Meluhhan village in Mesopotamia_ by P.S. Vermaak.

2. The Sumerians, Their History Culture and character. _ by Samuel Noah Cramer.

3. Harappa.com,

4. Wikipedia.

১৭



॥মানসা মুসাঃ সব চেয়ে ধনী রাজা॥

অনেকদিন আগের কথা। হাজার বৎসর আগের এক রাজা। তাঁর মত ধনী রাজা আর কেউ ছিলো না। আগেও না পরেও না। সেই রাজা এত ধনী, এত ধনী ছিলেন, যে লোকে বলে তিনি ইচ্ছে করলে রাজপ্রাসাদে ঢোকার দশ কিলোলোমিটার লম্বা রাস্তা সোনা দিয়ে মুড়ে দিতে পারতেন অনায়াসে। তবে অত সোনা থাকলেও, তিনি অবশ্য তেমন উদ্ভট কিছু করার মত পাগল রাজা ছিলেন না।

মুল্যবৃদ্ধি মুদ্রাস্ফীতি এসব ধরেও একটা অনুমান তাঁর ৪০০ বিলিয়ন আমেরিকান ডলার সমমুল্যের সম্পদ ছিল। কিন্তু তার সাথে সবাই এটাও বলেন তাঁর সম্পদের কোন হিসেব করা অসম্ভব। এখনো বোধহয় তেমন ধনী কেউ নেই।  

তার রাজত্ব ছিল আফ্রিকার পশ্চিম পাশে। রাজত্ব ঠিক না ওনার ছিল সাম্রাজ্য। সে হিসাবে তাঁকে সম্রাটও বলা যেতেই পারে। তবে তাঁর নামের সাথে রাজা শব্দটা জুড়ে আছে বলেই তাঁকে রাজাই বলব। তাঁর সাম্রাজ্যের নাম মালি সাম্রাজ্য। মালি সাম্রজ্যের সীমানা বিশাল। 

ওনার নাম 'মানসা মুসা'। 'মানসা মুসা' মানে 'রাজা মুসা'।মানসা মুসা বা রাজা মুসা রাজা হবার আগে ছিলেন কানকু মুসা, যার অর্থ হল 'কাঙ্কুর ছেলে মুসা'। তা ছাড়া এই মুসলিম রাজা হজ্জ করেছেন বলে তাঁকে 'হাজী মুসা'ও বলা হত।

তার আরবী নাম মুসা ইবন আবু বকর সেলিম আল-টাকরুরি।

এই মানসা মুসার কিছুটা হলেও কপাল জোরেই রাজা হয়েছিলেন। মালি সাম্রাজ্যের নিয়ম ছিল কোন রাজা কোন যুদ্ধে বা বিদেশ ভ্রমণে গেলে আরেকজন সাময়িক রাজা ঘোষণা করে রাজ্যের দায়িত্ব দিয়ে যেতে হয়। তা মানসা মুসার আগের রাজা আবুবকরি কেইতা(২য়) আটলান্টিক সাগরে তরী ভাসালেন, ইচ্ছে এই মহাসাগরের শেষ দেখবেন। যাবার সময় প্রথানুযায়ী কাঙ্কু মুসাকে সাময়িক রাজদায়িত্ব দিয়ে গেলেন।

আবুবকরি কেইতা(২য়) তাঁর আটলান্টিক অভিযান থেকে আর ফিরে আসেননি কখনই। কাঙ্কু মুসা  ২হাজার জলযান ভাসালেন আটলান্টিক মহাসাগরে আবুবকরি কেইতা(২য়) কে খুঁজে আনার জন্য। সবাই ব্যর্থ হবার পরে সবার পরামর্শে কাঙ্কু মুসাই হয়ে গেলেন মানসা মুসা (রাজা মুসা)।

মানসা মুসার সাম্রাজ্য, মালি সাম্রাজ্য। এই সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন সুন্দিয়তা কেইতা ১২২৬ সালে যা টিকে ছিল ১৬৭০ সাল । এর মধ্যে আমাদের এই মানসা মুসা রাজত্ব করেছেন ১৩০৭ থেকে ১৩৩৭ সাল ।

তা মানসা মুসার এত সম্পদ এলো কোথা থেকে? 

মালি সাম্রাজ্যের আগের ঘানা সাম্রাজ্যের পতনের মধ্যে দিয়েই মালি সাম্রাজ্যের রমরমা। স্বভাবতই মালি সাম্রাজ্যের একটা অংশ ছিল পরাজিত ঘানা সাম্রাজ্য। ঘানা সাম্রাজ্যের রাজার বানানো নিয়ম ছিল সাম্রাজ্যের এলাকা থেকে যে যত সোনা সংগ্রহ করুক কোন আপত্তি নেই। প্রজারা সেটা ভোগ করবেই। তবে ছোট্ট একটা শর্ত। একটু বড় সোনার দানা হলেই সেটা রাজার সম্পত্তি। সেই সোনার দৌলতে ঘানা সাম্রাজ্যের খুব নামডাক তখন গোটা ইয়োরোপে। তাই ঘানা সাম্রাজ্য-এর যত সোনার কাঁকর সবই মানসা মুসার সম্পত্তি। আগের যা জমা ছিলো তাতো আছেই তার বাইরেও নতুন করে প্রতিদিন আরো সোনা রাজকোষে জমা পড়ছেই।

তা ছাড়া গোটা সাম্রাজ্যে অনেক অনেক হাতির দাঁত। অন্যদেশে হাতির দাঁতের বিশাল চাহিদা। আর ছিল লবন। নিত্যদিনের খাবারে লবন তো চাই ই। এই মালি সাম্রাজ্যের ছিল লবনের খনি, লবনের ব্যবসা। আর ছিল দাস ব্যবসা।

ইয়োরোপীয়দের দাস ব্যবসা আমরা জানি। এই দাস ব্যবসা আফ্রিকার সব রাজাই করতেন। প্রথমে নিজেদের মধ্যে। তারপরে আরব বনিকদের মাধ্যমে আরব সহ এশিয়ার নানা এলাকায়, আর ইয়োরোপেও দাস বিক্রী করা হত। পরের দিকে আফ্রিকান রাজা্রা সরাসরি দাস ব্যবসা শুরু করে। তাদের কাছে বড় বড় সমুদ্রগামী জাহাজ থাকায় জাহাজ ভর্তি করে হাজারে হাজারে দাস পাঠানো সহজ হয়েছিল।

মানসা মুসা সোনা, হাতির দাঁত, লবন, দাস, এই সব কেনা বেচার উপরে কর আদায় করতেন। ব্যবসা যেই করুক তাঁর টাকা বন্ধ হচ্ছে না তাতে।  

অথচ এত টাকা কি করবেন তিনি? টাকা তো খরচও করতে হয়। তাই তিনি আরব দেশ থেকে অনেক জ্ঞানী লোককে রাজধানী টিম্বাকটুতে এনে প্রজাদের শিক্ষিত করার উদ্দেশ্যে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে ফেললেন। সবাই শিক্ষিত হচ্ছিল। তবে ইসলামী ধর্ম বিষয়ক শিক্ষাই প্রাধান্য পেত।

এরপর একটি বিশালাকার মসজিদ গড়লেন তিনি,   যা এখনো টিকে আছে। খরচ? মসজিদ বানাতে খরচ বাবাদ লেগেছিল ২০০ কেজি সোনা।

তারপর?


তারপরের ঘটনা জানা যায় আফ্রিকান মুসলিম বুদ্ধিজীবী কাতির একটি লেখা "ক্রনিকল অফ দি সিকার" থেকে। কাটি লেখেনঃ

কাঙ্কান মুসা ভুল করে নিজের মা নানা কাঙ্কনকে হত্যা করেন। এই ঘটনার বিশাল অপরাধের পরম শাস্তির থেকে উদ্ধার পেতে তিনি প্রথমে শুরু করেন বিপুল পরিমানে নিজের সম্পদ বিলিয়ে দিতে শুরু করেন, তারই সাথে ঠিক করেন বেঁচে থাকতে তিনি আর কোন খাদ্য গ্রহন করবেন না। তারই সাথে উলেমাদের কাছে জানতে চান এই ভয়ঙ্কর অপরাধের পাপ থেকে কিভাবে মুক্তি পাবেন। তাঁকে পরামর্শ দেওয়া হয় তিনি যেন নবীর শরনাগত হন কৃত অপরাধের বোঝা থেকে মুক্ত হতে। নবীই কেবল আল্লাকে অনুরোধ করতে পারেন তাঁর অপরাধ ক্ষমা করতে। এই অপরাধ ক্ষালনের লক্ষেই মানসা মুসার মক্কা যাত্রা।

টিমবাকটু থেকে মক্কা সাড়ে ছয়  হাজার কিলোমিটার যাত্রাপথে তাঁর যে বৈভব প্রদর্শন হয় সেটাই সবার নজর কাড়ে। নজর কাড়ে কেবল আফ্রিকা বা আরবের লোকদের নয় ইয়োরোপেরও নজরে পড়ে। তাঁর তীর্থ যাত্রায় সাথে থাকে এক বিশাল ক্যারাভান যার শেষ দেখা যায় না। ৬০ হাজার সেনা ছাড়াও সেই ক্যারাভানে থাকে সাধারন কয়েক হাজার কর্মী আর দাস। ১২০০০ বিশেষ দাসের দল মহামুল্যবান সিল্কের পোষাক আর সোনার গয়নায় সজ্জিত। দলে ৮০টা উট। প্রতিটি উটের পিঠে ১৩৬ কেজি করে সোনার গুঁড়োর বোঝা।

কাঙ্কন মুসার সাথে ছিলেন তাঁর স্ত্রী ইনারি কোন্তে। ইনারি কোন্তের সাথে ছিল তাঁর নিজস্ব ৫০০ সেবাদাসি।

যাত্রা পথে জায়গায় জায়গায়, যেমন ডুকুরে, গুন্দাম, দিরে, ওয়ানকো, বাকোতে গড়ে দেন মসজিদ। তাঁর গড়া অনেক সমজিদ এখনো দাঁড়িয়ে আছে। যাত্রপথে কায়রো তে এসে তিনি তাঁর ঐ বিশাল ক্যারাভানের প্রয়োজনীয় রসদ কেনার জন্য দাম মেটাতে থাকেন সোনা দিয়ে, তার সাথে দরিদ্রদের মধ্যে অকাতরে বিলোতে থাকেন সোনা। এতটাই সোনা কায়রোতে বিলিয়ে দেন যে কায়রো শহরে সোনার দাম হৈহৈ করে নেমে যেতে থাকে। কায়রোতে ঘটল অভাবনীয় মুদ্রাস্ফিতি। পরবর্তী কালে বারো বৎসর লেগেছিল কায়রোর সেই মুদ্রাস্ফিতি স্বাভাবিক হতে।

একই অবস্থা হয় মক্কা আর মদিনাতেই। সেই দুই জায়গাতেও মানসা মুসার বিলিয়ে দেওয়া সোনার দরুন ঘটে প্রবল মুদ্রাস্ফিতি। মানসা মুসার মক্কা মদিনা সফর শেষ করে টিমবাকটু ফিরতে সময় লেগেছিল এক বৎসর। এই একবৎসর গোটা এলাকার অর্থব্যবস্থা তছনছ হয়ে যায়, মুসা দানের দাপটে।

মালি সাম্রাজ্য এই ঘটনার পরেও দাপটের সাথে আরো একশ বৎসর টিকে ছিল। ©তুষারমুখার্জি

তথ্যসূচীঃ-

1. Mansa Musa I : by Mark Cartwright, World History Encyclopedia.

2.  Musa I of Mali, Emperor of Mali : Encyclopedia Britannica.

3. Mansa Musa (Musa I of Mali) : National Geographic Education.

৪. Wikipedia & others.

১৮



আধুনিক মানুষদের ইতিহাস 

আনুমানিক তিন সাড়ে তিন লক্ষ বৎসর আগে আমাদের এই মানবগণের একটি শাখা হোমো-স্যাপিয়েন্সদের যাত্রা শুরু। সেই আদ্যিকালের স্যাপিয়েন্সদের বিবর্তিত রূপে আমরা কাঠামোগতভাবে আধুনিক স্যাপিয়েন্স।

তার  মানে এই আধুনিক বিশ্বের সবাই আসলেই ভাইবোন। আমরা সবাই, গোটা পৃথিবীর সবাই একই সামান্য কয়েকজন জননীর সন্তান।

দুই লক্ষ বৎসর আগে মাতৃবংশগতি মাইটোকন্ড্রিয়া হ্যাপ্লোগ্রুপ বলে শুরুতেই দুটো গোষ্ঠীর যাত্রা শুরু করেছিল। মাইটোকন্ড্রিয়া-L0, মাইটোকন্ড্রিয়া -L1

বর্তমান পৃথিবীর সবাই যতই জাতি বিদ্বেষ নিয়ে গর্বিত বা ঘৃণিত হই না কেন, সবাই ঐ মাইটোক্নড্রিয়া-L1 শাখার লোক। বিবর্তনের পথ ধর এসেছে মাইটোক্নড্রিয়া-L1, L2, L3..  ইত্যাদি। এদের মধ্যে মাইটোকন্ড্রিয়া-L3  শাখার জনাকয়েক অদম্য সাহসী জননীই হলেন আমাদের সবার জননী, যাঁরা পরম সাহসে ভর করে স্বদেশ আফ্রিকা ছেড়ে নতুন অজানা বৃহত্তর পৃথিবীতে পাড়ি দিয়েছিলেন।

আর মাইটোক্নড্রিয়া-L0 শাখার জননীরা? তাঁরা থেকে গেলেন আফ্রিকাতেই। আলাদা হয়ে। বিচ্ছিন্ন হয়ে। তাঁরা অনেকটা দুরে সরে গেলেন দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকায়। তাঁরা এখনো আছেন।

তাঁরা আমাদের অতি পরিচিত আফ্রিকানদের থেকে দেখতে খানিক আলাদা। তাঁরা অনেকেই এখনো তাঁদের অতীতেই বাস করেন। শিকারি-সংগ্রাহক যাযাবর, অর্ধ যাযাবর, পশুপালক। না তাঁরাও আধুনিক কালে অনেক বদলে গেছেন। কিন্তু আমুল বদল হয়নি এখনো।

পিতৃবংশগতির দিকে তাকালেও দেখব যখন আমরা বর্তমান বিশ্বের প্রায় সবাই হ্যাপ্লোগ্রুপ-J, H, R, O  এমন সব পিতৃবংশগতি গর্ব ঘৃণা প্রচারে ব্যস্ত, সেই দেড় লক্ষ বৎসর আগে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ারা কিন্তু একেবারে শুরুর পিতৃহ্যাপ্লোগ্রুপ-A, B  বহন করে দিব্য আছেন।

তাহলে এই প্রাচীনতম জনগোষ্ঠীর (L0+A,B) ভাষাই কি মানব জাতির প্রাচীনতম ভাষা?

না। কারন ভাষা বদলায় ভৌগোলিক পরিবেশs> জলবায়ু যখন যেমন জীবনধারাকে বদলে দেয় তার মানে আশ্চর্যজনক ভাবে ঐ মাইটোকন্ড্রিয়া-L0  Y-ক্রমোজম-A, B  নিয়ে এক দেড় লক্ষ বৎসর আগে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া প্রাচীন লোকেদের মধ্যে কিছু উচ্চারণ এখনো আছে যা গোটা বিশ্বে আর কোথাও নেই। ©তুষারমুখার্জি

১৯



ব্যক্তিত্ববান পুরুষ কখনই স্ত্রীর সাথে খারাপ আচরণ করেন না

একজন ব্যক্তিত্ববান পুরুষের জীবনধারা ও মানসিকতা কেবল তার নিজের সাফল্য এবং সামাজিক অবস্থান নির্ধারণ করে না, বরং তার ঘরোয়া সম্পর্ককেও প্রভাবিত করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যে পুরুষরা আত্মনিয়ন্ত্রণ, ধৈর্য্য ও নৈতিক গুণাবলীতে সমৃদ্ধ, তারা কখনই তাদের স্ত্রী বা সঙ্গীর প্রতি খারাপ আচরণ করেন না।

স্ত্রীর প্রতি ভালো আচরণ মানে কেবল সুন্দর সম্পর্ক নয়, এটি পরিবার ও সমাজে সম্মান ও স্থিতিশীলতার প্রতীক।

মূল বক্তব্য

১. আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ধৈর্য্য

গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যক্তিত্ববান পুরুষরা তাদের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। তাই ছোটখাট রাগ, হতাশা বা ক্ষোভের কারণে তারা কখনও স্ত্রীকে অবমাননা বা মানহানি করেন না। (Journal of Family Psychology, 2019)

২. সম্মান ও সমবেদনা

এ ধরনের পুরুষরা মানসিকভাবে সংবেদনশীল এবং সম্মান প্রদর্শনে বিশ্বাসী। তারা জানে, স্ত্রীর অনুভূতি আঘাত করলে পরিবারের বন্ধন দুর্বল হয়। (Family Relations Research, 2020)

৩. সক্রিয় যোগাযোগ ও সমস্যা সমাধান

ব্যক্তিত্ববান পুরুষরা বিবাদ বা মতবিরোধে কথা বলেই সমাধান খোঁজেন, কখনো হিংসা বা চাপ প্রয়োগ করেন না। এটি সম্পর্কের দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।

৪. নেতৃত্বের গুণাবলী

গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ঘরোয়া জীবনে নেতৃত্ব দিতে পারে, তারা কখনো সহিংসতা বা অবমাননার আশ্রয় নেয় না। বরং তারা উদাহরণ স্থাপন করে যে কিভাবে সৎ ও সদয় আচরণ সম্পর্ককে শক্তিশালী করে। (Journal of Marriage and Family, 2018)

মানসিক ও সামাজিক প্রভাব

স্ত্রীর প্রতি ভালো আচরণ শুধুমাত্র ঘরোয়া শান্তি বজায় রাখে না, এটি সন্তানদের মানসিক উন্নয়নেও সহায়ক। গবেষকরা দেখিয়েছেন, যারা বাবারা স্ত্রীর প্রতি সহানুভূতিশীল, তাদের সন্তানেরা মানসিকভাবে সুস্থ ও সামাজিকভাবে সচেতন হয়। (Child Development Studies, 2021)

একজন ব্যক্তিত্ববান পুরুষ কখনোই স্ত্রীর সাথে খারাপ আচরণ করেন না। তার আচরণে ধৈর্য্য, সম্মান, সহানুভূতি ও নৈতিকতার প্রতিফলন দেখা যায়। এই গুণাবলী শুধু ঘরোয়া জীবনে নয়, সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক বিকাশেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই প্রত্যেক পুরুষের জন্য এই শিক্ষাগুলো পালন করা জরুরি, যাতে পরিবার ও সমাজ উভয়েই সুস্থ ও সমৃদ্ধ থাকে। @ SAM Motivation

তথ্যসূত্র

Journal of Family Psychology, 2019 – Emotional Regulation in Marital Relationships

Family Relations Research, 2020 – Respect and Empathy in Marriage



২০


সঞ্চয় করবেন নাকি জীবন উপভোগ করবেন?

মানুষের জীবনে অর্থ একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা, কিন্তু অর্থের উদ্দেশ্য নিয়ে চিরকাল একটি দ্বন্দ্ব বিদ্যমান—সঞ্চয় করবেন, নাকি জীবন উপভোগ করবেন। কেউ মনে করেন ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য সঞ্চয়ই সর্বোচ্চ প্রাধান্য পাওয়া উচিত, আবার কেউ বলেন বর্তমানকে উপভোগ না করলে জীবন অর্থহীন হয়ে পড়ে। এই দ্বিধা শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক গবেষণা বলছে, মানুষ যদি শুধুমাত্র ভবিষ্যতের চিন্তায় বর্তমানকে ত্যাগ করে, তবে মানসিক চাপ বাড়ে এবং জীবনের প্রতি সন্তুষ্টি কমে যায়। তাই সঞ্চয় ও উপভোগের মধ্যে একটি ভারসাম্য খুঁজে বের করা জরুরি।

অর্থ সঞ্চয় মানুষের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করে, যা হঠাৎ বিপদ বা জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তা করে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব পরিবার নিয়মিত সঞ্চয় করে তারা অর্থনৈতিক সংকটে তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে শুধুমাত্র সঞ্চয়ের পেছনে ছুটতে গিয়ে অনেকেই জীবনের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হন, যা দীর্ঘমেয়াদে হতাশা ও অসন্তোষ তৈরি করে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষের সুখ নির্ভর করে অভিজ্ঞতা ও সম্পর্কের উপর, যা অর্থ দিয়ে সরাসরি কেনা যায় না। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা জীবনের ছোট ছোট আনন্দ উপভোগ করেন তারা বেশি সুখী ও দীর্ঘজীবী হন।

অন্যদিকে, অতিরিক্ত উপভোগও ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এটি ভবিষ্যতের আর্থিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, শহরের অনেক তরুণ অতিরিক্ত ভোগবাদী জীবনযাপনের কারণে সঞ্চয়ে পিছিয়ে পড়ছেন। ফলে জরুরি মুহূর্তে তারা আর্থিক সংকটে পড়েন এবং মানসিক চাপ বাড়ে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ সঞ্চয় এবং একটি অংশ উপভোগের জন্য ব্যয় করা সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। এতে যেমন ভবিষ্যৎ নিরাপদ থাকে, তেমনি বর্তমান জীবনও অর্থবহ হয়।

জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য হলো সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্য দেওয়া। পরিবার, বন্ধু এবং নিজের জন্য সময় ব্যয় করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত থাকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই অন্ধভাবে সঞ্চয় বা অন্ধভাবে ভোগ—দুটোই চরমপন্থা, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।

সঞ্চয় এবং জীবন উপভোগ—দুটোই মানুষের জীবনে অপরিহার্য, তবে এদের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যে ব্যক্তি শুধু ভবিষ্যতের জন্য বাঁচে, সে বর্তমানকে হারায়; আর যে শুধু বর্তমান নিয়ে বাঁচে, সে ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তোলে। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো এমন একটি জীবনধারা গড়ে তোলা, যেখানে সঞ্চয় নিরাপত্তা দেয় এবং উপভোগ জীবনকে অর্থবহ করে। শেষ পর্যন্ত, অর্থ নয়, বরং সঠিকভাবে জীবনকে পরিচালনা করার দক্ষতাই মানুষের প্রকৃত সফলতা নির্ধারণ করে। @ SAM Motivation

References:

World Bank – Financial Inclusion and Savings Behavior Report

Harvard University – Adult Development Study

২১


॥সব সহপাঠী বন্ধু হয় না

 জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোর একটি হলো শিক্ষাজীবন। এই সময়েই আমরা অসংখ্য সহপাঠীর সঙ্গে পরিচিত হই, একসঙ্গে পড়ি, খেলি, সময় কাটাই। অনেকেই মনে করেন—যে একসঙ্গে পড়ে, সে-ই বন্ধু। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সব সহপাঠী কখনোই প্রকৃত বন্ধু হয়ে ওঠে না। বন্ধুত্ব একটি গভীর আবেগ, বিশ্বাস ও মূল্যবোধের সম্পর্ক, যা কেবল একসঙ্গে পড়াশোনা করার মাধ্যমে তৈরি হয় না।

সহপাঠী আর বন্ধুর পার্থক্য

সহপাঠী মানে হলো যাদের সঙ্গে একই প্রতিষ্ঠানে বা শ্রেণিতে পড়াশোনা করা হয়। কিন্তু বন্ধু সেই ব্যক্তি, যার সঙ্গে মানসিক সংযোগ, বিশ্বাস, সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক সম্মান থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের জীবনে গড়ে মাত্র ২-৫ জন সত্যিকারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু থাকে, যদিও পরিচিত বা সহপাঠীর সংখ্যা শতাধিক হতে পারে।

১. মানসিকতা ও মূল্যবোধের ভিন্নতা

সব সহপাঠীর চিন্তা-ভাবনা, জীবনদর্শন বা মূল্যবোধ এক রকম হয় না। কেউ প্রতিযোগিতামূলক, কেউ সহযোগিতামূলক। এই ভিন্নতার কারণে সবার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি করা সম্ভব হয় না।

২. স্বার্থের সংঘাত

শিক্ষাজীবনে অনেক সময় সহপাঠীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়—ভালো ফলাফল, শিক্ষকের প্রশংসা, বা সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে। এই প্রতিযোগিতা অনেক সময় সম্পর্ককে দুর্বল করে দেয়, ফলে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে না।

৩. বিশ্বাসের অভাব

বন্ধুত্বের মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস। কিন্তু সব সহপাঠীর সঙ্গে সেই বিশ্বাস তৈরি হয় না। অনেক সময় গোপন কথা ফাঁস হওয়া, পেছনে সমালোচনা করা ইত্যাদি কারণে সম্পর্ক সীমাবদ্ধ থেকে যায়।

৪. যোগাযোগ ও বোঝাপড়ার ঘাটতি

বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখতে নিয়মিত যোগাযোগ ও বোঝাপড়া প্রয়োজন। কিন্তু সব সহপাঠীর সঙ্গে এমন ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় না। ফলে সম্পর্ক শুধুই আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে।

৫. গবেষণার দৃষ্টিকোণ

সামাজিক মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের সামাজিক বৃত্ত তিন স্তরের হয়—পরিচিত, সহপাঠী/সহকর্মী, এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মাত্র ২০-৩০% সহপাঠীকে তারা প্রকৃত বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করে।

“Dunbar’s Number” তত্ত্ব অনুযায়ী, একজন মানুষ সর্বোচ্চ ১৫০ জনের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক রাখতে পারে, কিন্তু প্রকৃত বন্ধুর সংখ্যা খুবই সীমিত।

৬. সময়ের সাথে সম্পর্কের পরিবর্তন

সহপাঠীদের সঙ্গে সম্পর্ক অনেক সময় শুধুই নির্দিষ্ট সময় বা পরিস্থিতির জন্য থাকে। স্কুল বা কলেজ শেষ হলে অনেক সহপাঠীর সঙ্গে যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু প্রকৃত বন্ধুত্ব সময়ের সঙ্গে আরও দৃঢ় হয়।

৭. সত্যিকারের বন্ধুত্বের বৈশিষ্ট্য

যে সহপাঠী—

আপনার সুখে-দুঃখে পাশে থাকে

আপনার সাফল্যে ঈর্ষান্বিত না হয়ে খুশি হয়

আপনার ভুল হলে আপনাকে সংশোধন করে

সেই সহপাঠীই প্রকৃত বন্ধু হয়ে ওঠে। বাকিরা শুধু সহপাঠী হিসেবেই থেকে যায়।

 সব সহপাঠী বন্ধু হয় না—এটি একটি বাস্তব ও প্রমাণিত সত্য। বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে বিশ্বাস, ভালোবাসা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার উপর, যা সবার সঙ্গে তৈরি হয় না। তাই সহপাঠীদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখা জরুরি, কিন্তু কাকে সত্যিকারের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবেন, সে বিষয়ে সচেতন হওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জীবনে কম সংখ্যক হলেও প্রকৃত বন্ধু থাকাই সবচেয়ে বড় সম্পদ।

References

Dunbar, R. I. M. (1992). Neocortex size as a constraint on group size in primates.

Hall, J. A. (2018). How many hours does it take to make a friend? Journal of Social and Personal Relationships.

Fehr, B. (1996). Friendship Processes.



২২


॥ ভান্নিয়ালাটো (ভেদ্দা) জনগোষ্ঠী, শ্রীলঙ্কা॥. 

ভেদ্দা শব্দটি তামিল শব্দ। তামিল ভাষায় ভেদ্দা বলতে বোঝায় ধনুর্ধারী।  ভেদ্দারা শ্রীলঙ্কার প্রকৃত আদিবাসী। সিংহলিরা তামিলরা শ্রীলঙ্কায় পরে এসেছে। কিন্তু এখন ভেদ্দারা শ্রীলঙ্কার জনসংখ্যার মাত্র ১%.

ভেদ্দারা শ্রীলঙ্কার একটি শিকারি-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠী। এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুসারে ভেদ্দারাই শ্রীলঙ্কার প্রথম বাসিন্দা। তারা আনুমানিক চল্লিশ হাজার বৎসর আগে শ্রীলঙ্কায় আসে। একসময় সম্ভবত প্রায় গোটা শ্রীলঙ্কাতেই এদের বসবাস ছিল কিন্তু ক্রমে বহিরাগতদের চাপে তারা সীমিত হয়ে পড়ে।

ভৌগোলিক এলাকা ভিত্তিতে ভেদ্দাদের তিনটি আলাদা গোষ্ঠী। এবং কালক্রমে যেমন হয় ভেদ্দাদের অনেকেই আধুনিক সিংহলী জীবনযাত্রায় মিশে গেছে বা যাচ্ছে। ফলে অধুনা ভেদ্দা জনসংখ্যা কত তা নিয়ে খুব একটা মতের মিল নেই। যেমন অনুরাধাপুরে হাজার আটেক ভেদ্দা থাকলেও অনেকেই নিজেদের আর ভেদ্দা বলতে রাজী না। তাঁরা সামাজিক সম্মান বাড়াতে নিজেদের পূর্ব পরিচয় ত্যাগে উন্মুখ। একেবারে চিরাচরিত ভেদ্দা শিকারি-সংগ্রাহক জীবনধারা যারা ধরে রেখেছে কোন আপোষ না করে, তেমন লোকের সংখ্যা সম্ভবত মাত্র শ'তিনেক।

॥ভেদ্দা ভাষা॥

ভেদ্দাদের একটি নিজস্ব ভাষা আছে। সে ভাষা দ্রাবিড় বা সিংহলি ইন্দো-ইয়োরোপিয়ান ভাষার সাথে সম্পর্কহীন। ভেদ্দা ভাষায় ইন্দো-ইয়োরোপিয় বা দ্রাবিড় শব্দ প্রায় ঢোকেই নি। তারা তাদের প্রাচীন শব্দ ভেঙ্গে বা যোগ করে আধুনিক প্রয়োজনীয় শব্দ তৈরী করে নেয়। সিংহলি ভাষায় অনেক ভেদ্দা শব্দ ঢুকে গেছে। অবশ্য এখন যথারীতি বেশিরভাগ ভেদ্দাই সিংহলি বা তামিল বলে তাদের প্রতিবেশিদের ভাষা অনুসরন করে।

॥ধর্ম॥

ধর্মের দিক দিয়ে ভেদ্দরা মুলত মৃত পূর্বজদের ইয়াক্কু-তে (আত্মায়) বিশ্বাস রাখে। মৃত্যুর পরে পঞ্চমদিনে এই না-ইয়াক্কুদের উদ্দেশ্যে নারকেল, ভাত মধু এসব নিবেদন করতে হয়।

॥শিশু জন্ম॥

ভেদ্দা শিশু জন্মাবার পছন্দের জায়গা হল কোন গুহা। সঙ্গে থাকবে অভিজ্ঞ নারী, ধাত্রি হিসাবে। নাড়ি কাটা হবে তীরের ফলা দিয়ে। তবে আজকাল অনেকে সিংহলিদের দেখা দেখি আলাদা আঁতুড় ঘর বানিয়ে নেয়। এমনিতে এই সময় কোন খাবার দাবারে বিধি নিষেধ না থাকলেও গোসাপ জাতীয় প্রাণী আর হরিন খাওয়াটা এড়িয়ে যায়। বাচ্চা বয়স ভেদ্দাদের সুখের বয়স। কেউ বকাঝকা করে না। কোন দায় দায়িত্ব নেই। হেসে খেলে খুশীতে থাকো।

॥সামাজিক॥

ভেদ্দারা একে অপরের সাথে বেশ মিলে মিশে থাকে। কোন শিকার পেলে ভাগাভাগি করে খুশি মনে। বড়দের সম্বোধনে শ্রদ্ধাসুচক শব্দ ব্যবহার করতে হয়। আর জামাই-শ্বশুর সম্পর্ক হল সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক।

মৃত্যু হলে প্রথম পাঁচদিন পাতা দিয়ে মৃতদেহ ঢেকে রাখবে। অনেকে আবার মৃতের বুকের উপর পাথর চাপা দিয়েও রাখে। তারপরে মৃতদেহ কোন গুহাতে রেখে আসবে। এর পরে সেই গুহায় সহসা কেউ আর যাবে না। চেষ্টা থাকবে বার বৎসর অবধি না যাওয়ার।

সামাজিক জীবন ধারার হিসাবে ভেদ্দাদের দুই রকম গোষ্ঠী আছে।

কিছু থাকে সমতলে গ্রাম বানিয়ে। আর কিছু থাকে গুহায়।

গুহায় যারা থাকে তারা এক একটা দলের একত্রে থাকার জন্য বড় গুহাই পছন্দ করে। যদিও গুহার ভেতরা প্রতিচি পরিবারের শোবার এলাকা আলাদা করা থাকে। শোবার জন্য থাকলে হরিনের চামড়া পাতা হবে, না থাকলে পাথরেই টানটান।

খাবার জন্য সকলের রান্না এক জায়গাতেই। সেটাও সাধারনত একজন মহিলাই রান্না করবে। এদের সাথে নিজস্ব সম্পদের তালিকায় থাকবে, কুড়াল, তীর ধনুক, চকমকি পাথর, জল রাখার কোন পাত্র-সাধারনত কোন ফলের শক্ত খোলা। সুপারি রাখার ঝোলা, আর চুনের ডিব্বা। আর থাকবে আগুন ধরাবার জন্য চকমকি পাথর আর হরিনের চামড়া। আর অতি অবশ্য থাকবে কম করেও দুটো কুকুর। এরা কুকুরের খুব যত্ন নেয়। শিকারের জন্য ট্রেনিং দেয়। তবে ইদানিং অনেক ভেদ্দাই গুহার মধ্যে কাঠের ফ্রেমে ঘরও বানিয়ে ফেলছে।

গ্রামবাসী ভেদ্দাদের ঘরবাড়ি স্থায়ী ঘরবাড়ি। কুটির না পাকা বাড়ি সেটা সামর্থের উপর নির্ভর করে। পাকা বাড়ি অবশ্যই খুবই কম।

॥সমাজ জীবন॥

ভেদ্দারা মাতৃবংশগতি নিয়মে চলে। মেয়েরা  ইচ্ছে হলে গোষ্ঠীর বাইরে বিয়ে করতে পারে। ভেদ্দাদের বেলা পরিবারের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল গোষ্ঠী। সাধারনত গোটা পাঁচ পরিবার নিয়ে একটা গোষ্ঠী হয়। তবে পরিবার বেশি হয়ে গেলে বা অন্য কোন সমস্যা থাকলে একটি দুটি পরিবার আলাদা হয়ে যেতে পারে। তারা আবার তাদের আপন গোষ্ঠী গড়ে নেবে।

একটি পরিবারে থাকবে মা-বাবা অবিবাহিত শিশু কিশোর আর বিবাহিত মেয়ে আর মেয়ের জামাই।

সাধারনত ছেলেরাই পছন্দ করবে তার বিয়ের পাত্রীকে। তবে এই ব্যাপারে প্রাধান্য পাবে পিসতুতু বোন। ছেলে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাবে মেয়ের বাড়ি। সাথে থাকবে নানা উপহার, যথা মধু, শুকনো হরিণের মাংস, আর চাল বা অন্য দানা শষ্য। এই সব উপহার একটা জ্যা খোলা ধনুকে বেঁধে নিয়ে যাবে। প্রস্তাবে মেয়ে রাজী হলে ছেলের কোমরে একটা সুতোর পাকানো দড়ি (অনেকটা আমাদের পইতের মত) বেঁধে দেবে।

ব্যাস হয়ে গেল বিয়ে। এরপর থেকে সারাজীবন বরের কোমরে দড়ি বাঁধাই থাকবে। ওটা ছিঁড়ে গেলে বৌ আবার বানিয়ে দেবে। না অন্য মেয়ে বানালে চলবে না। কারন তা হলে তো সে ও বৌ হয়ে যাবে। তখন বর কার জেলখানায় থাকবে?

গ্রামের ভেদ্দারা অবশ্য আজকাল অত সব নিয়ম মানে না। তাছাড়া ঐ পিসতুতু বোনকে বিয়ে নিয়ে তাদের প্রচুর খিল্লি শুনতে হয় সিংহলিদের থেকে। তাই তারা অনেক সময় দুরের অন্য গ্রামে বিয়ে করে। যেখানে কেউ জানেনা যে তারা তুতু ভাই-বোন। তবে আজকাল একেবারে সিংহলিদের সাথেও বিয়ে হচ্ছে।

॥পোশাক॥

ভেদ্দারা গোড়াতে গাছের বাকল ব্যবহার করত। তারপরে এল সুতির কাপড়। সুতির কাপড় কিনতে হত। মাংস চামড়া মধুর বিনিময়ে। ছেলেদের জন্য একফালি লম্বাটে কাপড়। কোমরের সেই বৌয়ের পরিয়ে দেওয়া দড়ির সাথে সামনে থেকে পেছনে ঝুলিয়ে দেওয়া, দুই প্রান্তে ছয় আট ইঞ্চি করে ঝুলে থাকবে। ভেদ্দা নারীরা পরে কোমর থেকে হাঁটু অবধি সারং জাতীয় পোশাক।

॥খাবার॥

শিকারি-সংগ্রাহক ভেদ্দাদের খাবার মাটির নিচের মাটি আলু বা কাসাভা জাতীয় খাবার, মাংস, মধু। এর মধ্যে মাটি খুঁড়ে কন্দ জোগাড় করা মেয়েদের কাজ। ছেলেরা শিকার করবে আর মধু সংগ্রহ করবে। মধু ভেদ্দাদের খাবারের খুব গুরুত্ব পূরণ অঙ্গ। কন্দ জাতীয় যা কিছু পাওয়া গেল তা আগুনের গরম ছাইতে ঢেকে রেখে পোড়ানো হয়। মাংস আগুনের অনেকটা উপরে রেখে আস্তে আস্তে সেঁকা হয়। এছাড়া অন্য খাবার থাকলে সেটাকে কোন পাত্রে রেখে সেদ্ধ করা হয়। পেলে মাছও খায়। আর সারাদিন সুপারী চিবোবে। সাথে এট্টুস চুন।

ভেদ্দারা কিন্তু কখনো শিয়াল, মোষ, হাতি, চিতা শিকারও করবে না, মাংসও খাবে না। এগুলো তাদের নিষিদ্ধ খাবার।

॥নাচ বাজনা॥

ভেদ্দাদের নাচ আছে। নাচগুলো সবই নানা রকমের ইয়াক্কুদের সন্তুষ্টির জন্য। ছেলেরা গোল হয়ে নাচবে। আর পেটে চাপড় মেরে আওয়াজ তুলে তাল রাখবে। সাথে গানও থাকে।

শ্রীলঙ্কার মুসলমান

শ্রীলঙ্কার মুসলমানরা মুলত একটি ভিন্ন জাতি গোষ্ঠী হিসাবেই শ্রীলঙ্কায় বসবাস করে। এদের বলা হয় শ্রীলঙ্কার মুর জাতি। এদের ভাষা তামিল। ধারনা করা হয় ৭তম শতক থেকে শুরু করে ১৪০০শতক অবধি আরব মুসলমান বনিকরা আর মুল ভুখন্ডের তামিল মুসলমানরা বানিজ্য করতে ক্রমাগত আসা যাওয়া করতে করতে শ্রীলঙ্কায় সিংহলি বা তামিল মেয়েদের বিয়ে করে বসবাস করতে শুরু করে। বর্তমানে এরা শ্রীলঙ্কার জনসংখ্যার প্রায় ১০%* © তুষারমুখার্জী

তথ্যসূচীঃ-

1. Ancestral remains return to homeland of Sri Lankan tribes’ people.  Edinburg University.

2. Early man and the rise of civilization in Sri Lanka: The Archaeological evidence. By Dr. S U Deranyagala, Director General of Archaeology Sri Lanka.

3. Skeleton may be Asia’s oldest by UAC (Union Catholic News) Sri Lanka



২৩



বাঙালীর রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের ঐতিহাসিক স্কেচ

১৩৪২-৫২ খৃষ্টাব্দে সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ্‌ দিল্লি থেকে স্বাধীন হয়ে বাঙ্গালা সালতানাৎ গঠন করে নিজেকে 'সুলতান-ই-বাঙ্গালা' ঘোষণা করেন। সেই থেকে বাঙ্গালী নামের রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী পরিচয় লাভ করে।

১৭৫৭ সালে ইংরেজ বাণিজ্য সংস্থা ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর সাথে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হওয়ার মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে সমগ্র বাঙ্গালী জাতি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে চলে যায়।

একটানা ১৯০ বছর ইংরেজদের অধীনে শাসিত হওয়ার কালে বাংলার স্বাধীন রাজনৈতিক আকাঙ্খা পরিলক্ষিত হয় না। কিন্তু ১৯০৫ সালে ভারতে ব্রিটিশ-রাজের গভর্ণর জেনারেল লর্ড কার্জন বাংলাকে প্রশাসনিকভাবে ভাগ করে দিলে, বাঙালীর রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ে প্রধানতঃ বাঙালী হিন্দুরা প্রতিবাদ মুখর হয়ে ওঠে, যা শেষ পর্যন্ত ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে রূপ লাভ করে।

১৮৯১ সালের আদম শুমারীতে বাংলার জনসংখ্যার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা একটি সত্য ঘটনা বলে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও ১৯০৫ সাল থেকে শুরু হওয়া বাঙালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে মুসলমানদের অংশগ্রহণ প্রায়-নেই হওয়ার বিবিধ কারণের মধ্যে তিনটি প্রাধান কারণ ছিলো।


প্রথমতঃ আধুনিক জাতীয়তাবাদের ধারণা ছিলো একটি ইউরোপীয় ধারণা, যা ধারণ করার জন্যে প্রয়োজন ছিলো আধুনিক ইউরোপীয় শিক্ষা, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষা-দীক্ষায় অভিমানে পিছিয়ে থাকার কারণে, তৎকালীন বাঙালী মুসলমানদের মধ্যে ছিলো না।

দ্বিতীয়তঃ যে-বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে বাঙালী জাতীয়তাবাদী জাগরণ ও আন্দোলনের সূচনা হয়, তা মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববাংলাকে আলাদা প্রশাসনিক মর্য্যাদা দেওয়ার কারণে বঞ্চনাবোধে দগ্ধ বাঙালী মুসলমানদের কাছে আদরণীয় ছিলো।

তৃতীয়তঃ বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে বাঙালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের হিন্দু ধর্মের প্রতীক ও প্রভাব, দেশমাতাকে কালী মাতার রূপ হিসেবে দেখা এবং তারই বন্দনায় 'বন্দে মাতরম' ধ্বনি-সহ প্রায় সর্ববিষয়ে সংখ্যালঘু হিন্দুত্বের হিজেমোনী সংখ্যাগুরু মুসলমানদের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিলো না।

ফলে, এক বছরের মধ্যেই ১৯০৬ সালে পূর্ববাংলার রাজধানী ঢাকায় মুসলিম লীগ গড়ে ওঠে এবং সংস্কৃত ভাষার স্লৌগান 'বন্দে মাতরম'-এর বিপরীতে আরবি ভাষায় 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনি উচ্চারিত হতে থাকে।

১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয় এবং অখণ্ড বাংলা পুনঃএকত্রিত হয় এবং ১৯৩৫ সালে রচিত আইনের ভিত্তিতে ১৯৩৭ সালে প্রোভিনশিয়্যাল নির্বাচন হয়। এই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সংখ্যালঘু হিন্দুদের চেয়ে এগিয়ে থাকে এবং আবুল কাশেম ফজলুল হক বাংলার প্রধানমন্ত্রী হন।

১৯৪৩ সালে ইংরেজ শাসকদের সাথে মতদ্বৈতার কারণে আবুল কাশেম ফজলুল হক পদত্যাগ করলে, মুসলিম লীগের খাজা নাজিম উদ্দিন প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৪৬ সালে পুনরয়ায় নির্বাচন হলে শহীন হোসেন সোহরাওয়ার্দী বাংলার প্রধানমন্ত্রী হন।


এভাবে, শিক্ষা-দীক্ষায় ও সম্পদে-সম্মানে এগিয়ে থাকা উচ্চবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায় যখন উপলব্ধি করলো অখণ্ড বাংলায় গণতান্ত্রিক পদ্ধতির সরকারের অর্থই হলো শীর্ষনেতৃত্ব মুসলমানের অবস্থান, তাদের কাছে বাংলা মাতার অখণ্ডতার আবেদন গৌণ হয়ে গেলো।

ব্রিটিশ ভারতকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত করার পক্ষে মুসলিম লীগের নেতা অবাঙ্গালী নেতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পক্ষে ব্রিটিশ-রাজকে দিয়ে আইন করিয়ে নিলেন এবং তাতে অখণ্ড বাংলা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলো, তখন হিন্দু মহাসভার বাঙালী নেতা শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী হিন্দুদের জন্যে বাংলা বিভক্তি দাবী করলেন।

এদিকে, মুসলিম লীগের হোসেইন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম ভারত ও পাকিস্তান থেকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীন বাংলার প্রস্তাব করলেন এবং শরৎ বসুও তাদের মতের পক্ষে অবস্থান নিয়ে 'স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলা'র প্রস্তাব করলেন।

হিন্দু মহাসভার পক্ষে ভারতীয় কংগ্রেস দল সমর্থন দিলো। শরৎ বসুর স্বাধীন সমাজাতান্ত্রিক বাংলার প্রস্তাব সমাজতন্ত্রের আদর্শবাদী কমিউনিষ্ট পার্টি সমর্থন না করে বাস্তবে হিন্দু মহাসভার শ্যামা প্রসাদের প্রস্তাবের ভিত্তিক বাংলা বিভক্তিকে চূড়ান্ত হতে দিলো।

১৯৪৭ সালে বাংলার বিভক্তির মধ্য দিয়ে বাঙালী জাতীয়তাবাদের প্রথম তরঙ্গের সমাপ্তি ঘটলো। ফলে বাঙালী জাতীয়তাবাদের প্রথম তরঙ্গ কাল হচ্ছে ১৯০৫ থেকে ১৯৪৭ সাল।


বাঙালী জাতীয়তাবাদের দ্বিতীয় তরঙ্গ শুরু হয় ১৯৪৮ সাল থেকে। সে-বছর পাকিস্তানের পিতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকায় এসে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দান করেন। কিন্তু, তাঁর ঘোষণার সাথে সাথে ছাত্রনেতা আব্দুল মতিনের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয়ের ছাত্ররা প্রতিবাদ করে। তখন থেকেই শুরু হয় বাঙালী জাতীয়তাদের দ্বিতীয় তরঙ্গ।

সমগ্র জাতিকে সম্পৃক্ত করে দীর্ঘ নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যখন পাকিস্তানের মূল ভুখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে নিশ্চিত পরাজয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলো, তখন পাকিস্তানী বাহিনী তাদের মান ও প্রাণ বাঁচাতে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।

১৯৭১ সালের যুদ্ধের থিয়েটারে তিন বাহিনীর লড়াই তীব্রতা লাভ করে। একদিকে থাকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও অন্য দিকে বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনী ও ভারতে সশস্ত্র বাহিনী।

শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানী  হানাদার বাহিনী বাংলাদেশ ও ভারতীয় যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। আর এর মধ্য দিয়ে বাঙালী জাতীয়তাবাদের দ্বিতীয় তরঙ্গের বিজয় সূচিত হয়, যদিও বাঙালী জাতির পূর্বখণ্ড তাদের জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হলেও, পশ্চিমখণ্ড ভারতের মধ্যেই একটি অঙ্গরাজ্য হিসেবে অবস্থান করতে থাকে।

আমি মনে করি, বাঙালী জাতীয়তাবাদের আরেকটি তরঙ্গ - তৃতীয় তরঙ্গ - তাত্ত্বিকভাবে ভ্রূণাবস্থায় রয়েছে। এই তৃতীয় তরঙ্গের কাজ হবে প্রথম ও দ্বিতীয় তরঙ্গের সীমাবদ্ধতা দূর করে সমগ্র বাঙালী জাতির জন্যে সমগ্র বাংলাকে এক অভিন্ন রাষ্ট্রে সংগঠিত করা।

তবে, তৃতীয় তরঙ্গের সাফল্য নির্ভর করে প্রথম ও দ্বিতীয় তরঙ্গের দূর্বলতাগুলো বস্তুনিষ্ঠভাবে উপলবদ্ধি করা এবং তা কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে সঠিক তত্ত্বগত ও রাজনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা। @ মাসুদ রানা


২৪


আরবে উলুধ্বনি 

আরবে উলুধ্বনি বা ‘যাগারিত’ (Zaghareet) মূলত প্রাক-ইসলামিক যুগ থেকেই একটি প্রচলিত সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় রীতি ছিল। সেই সময়ে এটি কেবল আনন্দের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং মূর্তিপূজার সময় দেব-দেবীদের কাছে করুণা, বৃষ্টি বা সাহায্য চাওয়ার একটি বিশেষ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

আরব সমাজে উলুধ্বনির প্রচলন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য নিচে দেওয়া হলো:

ধর্মীয় উৎস:

প্রাক-ইসলামিক আরবে মহিলারা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে সম্মিলিতভাবে উলুধ্বনি দিতেন। বিশেষ করে যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে বা পূজার সময় দেবতাদের সন্তুষ্ট করতে এই ধ্বনি ব্যবহার করা হতো।

সাংস্কৃতিক বিবর্তন:

ইসলাম পরবর্তী যুগে এটি ধর্মীয় আবহে সরাসরি ব্যবহৃত না হলেও আরব সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে থেকে যায়। বর্তমানে এটি বিবাহ, শিশুর জন্ম বা যেকোনো বিশেষ অর্জনে আনন্দের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

আঞ্চলিক নাম:

মধ্যপ্রাচ্যে এটি অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন লেবানন ও সিরিয়ায় একে বলা হয় যালগাউতা (Zalghouta) এবং মিশরে যাগারিত।

লিঙ্গভিত্তিক প্রথা:

বাংলার মতো আরব বিশ্বেও উলুধ্বনি প্রধানত নারীদের মাধ্যমেই প্রচলিত। এটিকে আরব নারীদের শক্তিশালী আবেগ প্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবে গণ্য করা হয়।

উল্লেখ্য যে, হিব্রু ও সেমিটিক ভাষায় ‘হাল্লেলুয়াহ’ (Hallelujah) শব্দের মূল উৎসও এই উলুধ্বনির সাথে সম্পর্কিত বলে অনেক ভাষাবিদ মনে করেন, যা মূলত সৃষ্টিকর্তার মহিমা প্রচারের একটি ধ্বনি।

আরব দেশগুলোতে বর্তমানে উলুধ্বনি ব্যবহারের নির্দিষ্ট কোনো অনুষ্ঠান সম্পর্কে জানতে-- https://www.facebook.com/share/p/1CVBF6HLhu/

@ মৃণাল নন্দী




২৫



সাইকোথেরাপি (Psychotherapy)

সাইকোথেরাপি নিয়ে আমাদের সমাজে এখনো অনেক ভুল ধারণা আছে। অনেকেই মনে করেন এটি অপ্রয়োজনীয়, পাগলদের চিকিৎসা বা শুধু বিলাসিতা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

সাইকোথেরাপি কোনো দুর্বলতার চিহ্ন নয় এটা নিজের যত্ন নেওয়ার একটি শক্তিশালী সিদ্ধান্ত। যেমন শরীর অসুস্থ হলে ডাক্তার দেখাই, তেমনি মন অসুস্থ হলে সাহায্য নেওয়াও স্বাভাবিক।

সাইকোথেরাপি কি?

সাইকোথেরাপি (Psychotherapy) হলো একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, যেখানে প্রশিক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ (মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট বা কাউন্সেলর) কথোপকথনের মাধ্যমে একজন মানুষের মানসিক সমস্যা, আবেগগত চাপ, আচরণগত জটিলতা এবং জীবনসংক্রান্ত দ্বন্দ্ব মোকাবেলায় সহায়তা করেন।

এটি “টক থেরাপি” নামেও পরিচিত।

সাইকোথেরাপির প্রয়োজনীয়তা

মানুষ শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও অসুস্থ হতে পারে। যেমন—

দীর্ঘমেয়াদি দুশ্চিন্তা (Anxiety)

বিষণ্নতা (Depression)

ট্রমা (Trauma)

সম্পর্কের সমস্যা

আত্মবিশ্বাসের অভাব

রাগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা

জীবনের উদ্দেশ্যহীনতা

এসব সমস্যা অবহেলা করলে তা আরও জটিল হয়ে যায়।

সাইকোথেরাপি এসব সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করে ও সমাধানের পথ দেখায়।

কেন সাইকোথেরাপি প্রয়োজন হয়?

১. মানসিক চাপ কমাতে

বর্তমান জীবনে কাজ, পরিবার, সামাজিক চাপ সব মিলিয়ে অনেকেই ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েন। থেরাপি এই চাপকে বোঝা ও নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।

২. আবেগ বোঝা ও নিয়ন্ত্রণ করতে

অনেকেই নিজের অনুভূতি (রাগ, ভয়, কষ্ট) ঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারেন না। থেরাপি শেখায় কীভাবে আবেগকে স্বাস্থ্যকরভাবে প্রকাশ করা যায়।

৩. অতীতের ট্রমা থেকে মুক্তি পেতে

শৈশবের কষ্ট, টক্সিক সম্পর্ক, নির্যাতন এসব দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলে। থেরাপি এই ক্ষতগুলো ধীরে ধীরে নিরাময় করে।

৪. সম্পর্ক উন্নত করতে

পরিবার, দাম্পত্য বা বন্ধুত্ব সব সম্পর্কেই বোঝাপড়া দরকার। থেরাপি যোগাযোগ দক্ষতা বাড়ায়।

৫. আত্মবিশ্বাস ও আত্ম-জ্ঞান বাড়াতে

নিজেকে বুঝতে শেখা এটাই থেরাপির বড় শক্তি।

সাইকোথেরাপি দরকার নেই এই ধারণা কেন ভুল?

১) আমি তো পাগল না, থেরাপি কেন লাগবে?

২) থেরাপি শুধু গুরুতর মানসিক রোগের জন্য নয়, বরং সাধারণ জীবনের সমস্যার জন্যও।

৩) নিজেই সামলে নিতে পারবো

অনেক সময় আমরা সমস্যার ভেতরে থাকায় সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে পারি না।

এটা বিলাসিতা

মানসিক সুস্থতা কোনো বিলাসিতা নয়এটা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে সাইকোথেরাপি ব্যয়বহুল কেন?

১) প্রশিক্ষিত পেশাদার কম

২) সচেতনতা কম

৩) মানসম্মত সেবা সীমিত

৪) ব্যক্তিগত চেম্বারে উচ্চ ফি

তবে এখন কিছু জায়গায় কম খরচে বা ফ্রি কাউন্সেলিংও পাওয়া যাচ্ছে (NGO, বিশ্ববিদ্যালয়, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে)।

তাহলে কীভাবে সবার জন্য সহজলভ্য করা যায়?

১) মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো

২) সরকারি পর্যায়ে সাপোর্ট বৃদ্ধি

৩) স্কুল-কলেজে কাউন্সেলিং ব্যবস্থা

৪) কম খরচে অনলাইন থেরাপি চালু করা

তথ্যসূত্র (References)

American Psychological Association (APA) – Psychotherapy Overview

World Health Organization (WHO) – Mental Health Guidelines

National Institute of Mental Health (NIMH) – Psychotherapies


২৬


যে কারণে স্ত্রীকে হাত খরচের টাকা দেওয়া জরুরি

 দাম্পত্য জীবন শুধু ভালোবাসা বা দায়িত্বের উপর দাঁড়িয়ে থাকে না; এর সাথে জড়িয়ে থাকে পারস্পরিক সম্মান, আস্থা এবং আর্থিক নিরাপত্তা। অনেক পরিবারে স্বামী সংসারের খরচ চালালেও স্ত্রীর ব্যক্তিগত প্রয়োজনের জন্য আলাদা অর্থ দেওয়া হয় না। এতে স্ত্রীর আত্মসম্মান, স্বাধীনতা এবং মানসিক স্বস্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, সংসারে নারীর আর্থিক অংশগ্রহণ বা ব্যক্তিগত অর্থের সুযোগ তার ক্ষমতায়ন এবং পারিবারিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যে পরিবারে নারীরা কিছু ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবহার করার সুযোগ পান, সেখানে সম্পর্কের স্থায়িত্ব, পারিবারিক সুখ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর ভূমিকা তুলনামূলক বেশি থাকে। তাই স্ত্রীকে নিয়মিত হাত খরচের টাকা দেওয়া শুধু দয়া নয়; এটি দায়িত্ব, সম্মান এবং সুস্থ দাম্পত্য সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

১️⃣ আত্মসম্মান ও মর্যাদা রক্ষার জন্য

একজন মানুষের নিজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য অন্যের কাছে হাত পাততে হলে আত্মসম্মান আঘাতপ্রাপ্ত হতে পারে। স্ত্রী যদি প্রতিটি ছোট প্রয়োজনের জন্য স্বামীর কাছে অনুমতি চাইতে বাধ্য হন, তাহলে তার মধ্যে নির্ভরতার চাপ তৈরি হয়। নিয়মিত হাত খরচের টাকা থাকলে তিনি নিজের প্রয়োজনগুলো সম্মানের সাথে মেটাতে পারেন। এতে তার আত্মবিশ্বাসও বাড়ে। দাম্পত্য সম্পর্কেও পারস্পরিক সম্মানের পরিবেশ তৈরি হয়।

২️⃣ ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূরণের স্বাধীনতা

নারীদের অনেক ছোটখাটো ব্যক্তিগত প্রয়োজন থাকে যা সবসময় সংসারের বাজেটে ধরা হয় না। যেমন—ব্যক্তিগত প্রসাধনী, ছোট উপহার, বন্ধু বা আত্মীয়দের সাথে সামাজিক যোগাযোগ ইত্যাদি। যদি তার নিজের কিছু টাকা থাকে, তাহলে এসব প্রয়োজন সহজেই পূরণ করা যায়। এতে স্বামীর উপর অতিরিক্ত চাপও পড়ে না। একই সাথে স্ত্রী নিজের স্বাধীনতার অনুভূতিও পান।

৩️⃣ পারিবারিক সম্পর্ক মজবুত করতে সাহায্য করে

যে পরিবারে স্ত্রীকে সম্মান দিয়ে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দেওয়া হয়, সেখানে পারিবারিক সম্পর্ক সাধারণত বেশি সুস্থ থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, নারীর আর্থিক ক্ষমতায়ন দাম্পত্য কলহ কমাতে সাহায্য করে। কারণ এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া শক্তিশালী হয়। ফলে পরিবারে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পায়।

৪️⃣ জরুরি পরিস্থিতিতে কাজে লাগে

সংসারে অনেক সময় ছোটখাটো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়। যেমন—হঠাৎ ওষুধ কেনা, অতিথি আপ্যায়ন বা সন্তানের ছোট প্রয়োজন মেটানো। যদি স্ত্রীর কাছে কিছু ব্যক্তিগত টাকা থাকে, তাহলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সমস্যার সমাধান করতে পারেন। এতে সময় নষ্ট হয় না এবং স্বামীকেও সবসময় উপস্থিত থাকতে হয় না। সংসার পরিচালনা আরও সহজ হয়ে যায়।

৫️⃣ নারীর মানসিক স্বস্তি বাড়ায়

অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা অনেক সময় নারীদের মধ্যে মানসিক চাপ তৈরি করে। নিজের কোনো অর্থ না থাকলে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু নিয়মিত হাত খরচের টাকা থাকলে সেই চাপ অনেক কমে যায়। এতে নারী নিজেকে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে অনুভব করেন। মানসিক শান্তি দাম্পত্য জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

৬️⃣ ছোট সঞ্চয়ের সুযোগ তৈরি করে

অনেক নারী সংসারের খরচের পাশাপাশি ছোট ছোট সঞ্চয় করে থাকেন। হাত খরচের টাকা থাকলে সেই সঞ্চয়ের সুযোগ তৈরি হয়। এসব সঞ্চয় ভবিষ্যতে পরিবারকে সাহায্য করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে নারীর এই ছোট সঞ্চয় বড় সংকটে পরিবারকে রক্ষা করেছে। তাই এটি শুধু ব্যক্তিগত নয়, পারিবারিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

৭️⃣ সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখতে সহায়ক

সমাজে চলাফেরা করতে গেলে কিছু সামাজিক ব্যয় হয়। আত্মীয়দের জন্য ছোট উপহার, দাওয়াত বা সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ এসবের জন্য কিছু অর্থ প্রয়োজন। যদি স্ত্রীর নিজের হাত খরচ থাকে, তাহলে তিনি সম্মানের সাথে এসব দায়িত্ব পালন করতে পারেন। এতে সামাজিক সম্পর্কও দৃঢ় হয়। পরিবারও সমাজে সম্মান বজায় রাখতে পারে।

৮️⃣ নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ায়

অর্থনৈতিক ক্ষমতা মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় ভূমিকা রাখে। যখন একজন নারীর নিজের কিছু অর্থ থাকে, তখন তিনি পরিবার সম্পর্কিত অনেক বিষয়ে মতামত দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এতে সংসারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো যৌথভাবে নেওয়া সম্ভব হয়। এটি আধুনিক দাম্পত্য জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

৯️⃣ ভালোবাসা ও যত্নের প্রতীক

স্ত্রীকে হাত খরচ দেওয়া কেবল অর্থ দেওয়ার বিষয় নয়; এটি ভালোবাসা ও যত্নের প্রকাশও। এতে বোঝা যায় যে স্বামী স্ত্রীর ব্যক্তিগত প্রয়োজন ও সম্মানকে গুরুত্ব দেন। এই ছোট উদ্যোগ অনেক সময় দাম্পত্য সম্পর্কে গভীর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। সম্পর্ক আরও আন্তরিক ও উষ্ণ হয়ে ওঠে।

নারী ক্ষমতায়নের একটি বাস্তব পদক্ষেপ

নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে সমাজে অনেক আলোচনা হয়। কিন্তু বাস্তব জীবনে ছোট ছোট পদক্ষেপই সবচেয়ে বেশি কার্যকর। স্ত্রীকে নিয়মিত হাত খরচ দেওয়া সেই বাস্তব পদক্ষেপগুলোর একটি। এতে নারী নিজের সিদ্ধান্তে কিছুটা স্বাধীনতা পান। এটি পারিবারিক পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়নের একটি কার্যকর উপায়।

 দাম্পত্য সম্পর্কের ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা এবং দায়িত্ববোধ। স্ত্রীকে হাত খরচের টাকা দেওয়া কোনো বিলাসিতা নয়; বরং এটি একটি সুস্থ পারিবারিক সংস্কৃতির অংশ। এতে নারীর আত্মসম্মান বজায় থাকে, পারিবারিক সিদ্ধান্তে তার অংশগ্রহণ বাড়ে এবং দাম্পত্য সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এখনও সীমিত। তাই সংসারের ভেতর থেকেই যদি নারীকে সম্মানজনক অর্থনৈতিক সুযোগ দেওয়া যায়, তবে তা শুধু পরিবার নয়, পুরো সমাজের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন বয়ে আনতে পারে। @ SAM Motivation

References

Bangladesh Bureau of Statistics (BBS), Household Income and Expenditure Survey

BRAC Institute of Governance and Development, Women’s Economic Empowerment Study


২৭


॥জাপানের তিন অধ্যায়॥ ©তুষারমুখার্জী8-11-2021

॥জাপানের প্রথম অধ্যায়, মিনাতোগাওয়া অধ্যায় ॥

জানা গেল ৩০ থেকে ৪০  হাজার বৎসর আগে বৎসর আগে জাপানের ওকিনাওয়াতে একদল মানুষ থাকত। এদের নামাকরণ করা হয়েছে যেখানে এদের দেহাবশেষ পাওয়া গেছে সেই এলাকার নামানুসারে মিনাতোগাওয়া মানুষ বলে।

মিনাতোগাওয়া লোকেরাই কি বর্তমান জাপানীদের পূর্বজ? ওকিনাওয়ার দ্বীপের নয়টি প্রত্ন ক্ষেত্র থেকে মোট ১৫টি পূর্ণদেহাবশেষ পাওয়া যায়। 

মিনাতোগাওয়া পুরুষেরা গড়ে ৫ফুট আর মেয়েরা গড়ে ৪ফুট ৬ইঞ্চি লম্বা। কাঁধ চওড়া না হলেও শক্তসমর্থ গঠনের লোক ছিল এরা। কিন্তু এরা এই দ্বীপে এলো কি ভাবে বা গেলো কোথায়? বলা সহজ না। তবে ৩০-৪০ হাজার বৎসর আগে এই দ্বীপগুলোর সরাসরি ভুমি সংযোগ ছিল অন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয় দেশগুলোর সাথে। কাজেই তারা এসেছিল পায়ে হেঁটেই। তারপরে তারা দ্বীপ ছেড়ে চলে গেছে বা কোন কারনে সবাই শেষ হয়ে গেছে। তবে সংঘাতও একটা কারণ হতে পারে। একজন বিজ্ঞানীর মতে, কঙ্কালগুলোর মধ্যে তীরের আঘাতে মুত্যুর প্রমাণ পাওয়া গেছে। তার সাথে অনুমান করা হচ্ছে যে এদের মৃত্যুর পরে এদের মাংসও কাটা  আর সম্ভবত খাওয়াও হয়েছিল।

॥জাপানের দ্বিতীয় অধ্যায়, জোমোন অধ্যায়॥

আনুমানিক ১২ থেকে ১৪ হাজার বৎসর আগে জাপানে পা রাখে জোমোন সংস্কতির লোকেরা।  জোমোনদের ছয়টি প্রত্ন ক্ষেত্রের দশটি প্রাচীণ দেহাবশেষ থেকে মাইটোকন্ড্রিয়া-ডিএনএ (বয়স ৮হাজার থেকে ৩৭০০বৎসর) সংগ্রহ করা হয়। জোমোনদের মাইটোকন্ড্রিয়া হ্যাপ্লোগ্রুপ বের হল এম-৭এ, আর এন-৯বি। আধুনিক জাপানিদের মধ্যে এই জোমোন মাইটেকন্ড্রিয়া এম-৭এ আছে ৭.৯% আর এন-৯বি আছে ১.৩%

জোমোনরা যে একটিই জনগোষ্ঠী ছিল তেমন কিন্তু না। সম্ভবত তারা বেশ কয়েকটি বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী হিসাবেই ভাগে ভাগে বিভিন্ন কালে জাপানে পা রাখে। তারা আসে উত্তর-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, হিমালয়ের দক্ষিনাঞ্চল (তিব্বত) থেকে। চেহারার দিক থেকে তাদের মঙ্গোলয়েড বলাই যেতে পারে। পূর্ব-এশিয়দের সাথে চেহারায় মিল থাকলেও তাদের বেশি মিল আছে আমেরিকার আদি-বাসিন্দাদের সাথে। আবার দাঁতের গড়ন থেকে তাদের মিল আছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আর তাইওয়ানের বাসিন্দদের সাথে। জাপানের বিভিন্ন এলাকায় জোমোনদের চেহারায় বিভিন্নতা এখনো বজায় আছে অনেকটা। এদের মধ্যে হোক্কাইডো এলাকার লোকেদের চেহারা সব চেয়ে কম মেলে পূর্ব-এশিয়দের সাথে। হোক্কাইডোর বাসিন্দা একটি প্রাচীণ জনগোষ্ঠী হল আইনু জনগোষ্ঠী। আইনুদের দেখতে খুব একটা জাপানি মনে হবে না, এদের অনেক মিল আছে ইয়োরোপীদের চেহারার সাথে। তা ছাড়া তাদের ভাষাও জাপানি না। হোক্কাইডো প্রথম থেকে জাপানের অংশ ছিলোও না। পরে দখল করে জাপানের সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়। আনুমানিক জনা তিন চারশ আছে যারা নিজেদের আইনু পরিচয় ধরে রেখেছে এখনো।


প্রকৃতপক্ষে. এখন পর্যন্ত জানা তথ্যের ভিত্তিতে, বোধহয় মানবগোষ্ঠীর প্রাচীণতম মাটির বাসন তৈরী এই জোমোনদেরই। জোমোন সংস্কৃতির বিস্তার ছিল অনেক লম্বা। তাদের সংস্কৃতির  ছাপ উত্তর-পূর্ব ভারতেও পাওয়া যায়। তবে যেহেতু এরা আদতে একই এলাকার মানে তিব্বত-দক্ষিণ চিনের, তাই সাংস্কৃতিক ছাপ থাকতেই পারে।

২০২০ সালের কেমব্রীজ বিশ্ববিদ্য়ালয়ের একটি গবেষণা বলছে আট হাজার বৎসর আগে উত্তর-পূর্ব এশিয়া থেকে যে জনগোষ্ঠী জাপানে যায় তারাই জোমোনদের মাটির বাসন বানানোর পেছনে ছিল। ২০২১ মানে এই বৎসরের আরেকটি গবেষণায় বলা হয় জোমোনদের উৎপত্তি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুল ভুমিখন্ডে। আর সেখানেই উৎপত্তি পূর্ব-এশিয়দেরও। তবে যেহেতু ১৫হাজার বৎসর ধরে জাপানের দ্বীপে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল তাই তাদের মধ্যে প্রাচীনত্ব বেশি রয়ে গেছে।

জোমোনরা ছিল শিকারি-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠী। সাত হাজার বৎসর আগে থেকে তাদের যাযাবরত্ব কমে স্থায়ী বসতিতে থাকা, গাছ লাগানো, পশুপালন এসবের শুরু হয়ে য়ায়। তবে যথাযথ কৃষিকাজের প্রচলন হয় প্রায় শেষের দিকে। ১হাজার সাধারণ পূর্বাব্দ নাগাদ। এই কৃষিকাজ হল ধান চাষ। তা আসে কোরিয়ার দিক থেকে। তবে সেই ধান চাষ জলা জমিতে হত না। শুকনো জমিতেই হত। তাদের স্থায়ী বসতি গ্রামের আকার তেমন কিছু বড় না হলেও নেহাত ছোটও বলা যাবে না। গড়ে প্রায় একশ একর জায়গা নিয়ে আন্দাজ ৫শত লোকের বসবাস থাকত এই সব গ্রামে। জোমোনদের রান্না ঘর আর থাকার ঘর একদম আলাদা ছিল। রান্নার জায়গা হত খুঁটির উপর ছাউনি দিয়ে, উনুন বেশ বড়, সাধারনত একসাথে ৫জনের রান্নার সুবিধা নিয়ে তৈরী হত। আর সেটা থাকতো মাঝখানে। রান্নার জায়গা ঘিরে থাকত থাকার ঘরগুলো। অবশ্য গ্রামগুলো তেমন স্থায়ী হত না। শীতকালে চলে যেত সমুদ্রের কাছে। গরমকালে ভেতরে চলে আসত। জোমোনদের পোষাক গাছের বাকল। সেটা তারা সেলাই করেই ব্যবহার করত।

জোমোনরা বিভিন্ন জনগোষ্ঠী হওয়ায় তাদের ভাষা ধর্ম এসবও আলাদাই ছিল। গড়ে তাদের প্রকৃতি পুজারী বলা যেতে পারে। তাদের মধ্যে ওঝা-গুনিন ঝাড়-ফুঁক এসবের প্রচলন ছিল।


॥জাপানের তৃতীয় অধ্যায়॥

সাধারণ পূর্বাব্দ ৪০০ থেকে ৩০০ এই সময়ের মধ্য জাপানে পা রাখে আরেকটি জনগোষ্ঠী ইয়ায়োইরা। ইয়ায়োইরাই প্রকৃত পক্ষে আধুনিক জাপানিদের পুর্বজ। এদের আগমন কোরিয়া ও চিন থেকে। এরা চেহারার দিক থেকে জোমোনদের চেয়ে লম্বা ও কিছুটা রোগার দিকে। সাধারণভাবে জোমোনরা হল দক্ষিণ জাপানি আর ইয়ায়োইরা হল উত্তর জাপানি।

পরে আসা উত্তর জাপানি ইয়ায়োইরা সাংস্কৃতিক দিক থেকে অনেকটাই উন্নত ছিল। ইয়ায়োইরাই জাপানে ধান চাষের বিস্তারের দাবিদার বলা যেতে পারে। তারা জলাজমিতে ধান চাষ পদ্ধতি জানত। ইয়ায়োইরা নিয়ে এসেছিল লোহার ব্যবহার। ফলে লোহার ফলা লাগানো লাঙলে ধানের উৎপাদন বাড়লো উল্লেখযোগ্য ভাবে। ধানের উৎপাদন বাড়ায় তাদের জনসংখ্যাও বৃদ্ধি পেতে থাকলো অতি দ্রুত হারে।

ইয়ায়োইরা যাযাবর ছিল না। তারা পাশাপাশি ঘর তৈরী করে সংগঠিত গ্রামে থাকত। এদের মাটির বাসনও ছিল অনেক উন্নত।

ইয়ায়োইদের সাথে চিনের যোগাযোগ ছিল খুবই ঘণিষ্ঠ। ফলে কাপড় বোনার প্রচলন হয়ে গেল। শুরু হয়ে গেল সিল্কের উৎপাদন। চিন থেকে কোরিয়া হয়ে শুরু হয়ে গেল ধাতুর ব্যবহার জ্ঞান। তাদের ঘর হতো পাথর আর কাঠের।

ইয়ায়োইদের লেখার জন্য কোন লিপি ছিলো না। চিনের সাথে যোগাযোগের সুত্রে লেখা চিঠি আসত। অতি সামান্য কয়েকজন সেই লিপি পড়তে পারত। যারা পড়তে পারত তারাই তাদের প্রভুদের পড়ে শোনাত। ক্রমে ইয়ায়োইরা চিনের লিপিই ব্যবহার শুরু করল।

ইয়ায়োইদের সামাজিক শ্রেণীবিন্যাস ছিল। এবং সেটা কঠোর ভাবে পালন হত। উচ্চ শ্রেণীর লোকেরা রাস্তায় এলে নিম্ম শ্রেণীর লোকেদের রাস্তা ছেড়ে মাটিতে নেমে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকার প্রথা ছিল। গায়ে উল্কি আঁকা হতো সামাজিক শ্রেণীর পরিচায়ক হিসাবে।

প্রচুর পরিমান ধানের উৎপাদন, ধান সংরক্ষণ, দখলিকৃত জমি এই সব নিয়ে ইয়ায়োইদের সম্পদ উপচে পড়তে থাকল। তাদের জনসংখ্যার দ্রুতহারে বৃদ্ধিও তাদের সহায়ক। যত জনসংখ্যা বাড়ছে তত বেশি জমি চাষের আওতায় আসছে।

ফলে ক্রমে এই উত্তরের জাপানি ইয়ায়োইরা গোটা জাপানে ছড়িয়ে পড়ল। কোনঠাসা হতে থাকল দক্ষিণ জাপানের সংখ্যালঘু দরিদ্র জোমোনরা। তবে ইয়ায়োই জোমোন সংঘাতের তেমন কোন প্রমাণ নেই। তারা পাশাপাশি বসবাস করতে করতে বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে মিশে যেতে শুরু করল।

বর্তমান জাপানের সংখ্যাধিক জাপানি কিন্তু ইয়ায়োই জনগোষ্ঠীর বংশধর। তারা জোমোনরা ইয়ায়োইদের থেকে গড়ে দেড় দুই ইঞ্চি বেঁটে। জোমোনদের হাত লম্বা, কিন্ত পা খাটো। জোমোনদের মুখ চওড়া, চোখ গভীরে, ভ্রুর কাছের কপালের হাড় খানিক উঁচু। নাকের হাড়ও (কপালের কাছে) খানিক উঁচু। ইয়ায়োইদের চোখ ভাসা, নাক খাঁদা, মুখের দিক সরু। তবে জোমোনদের মধ্যে আইনুদের চেহারা ইয়ায়োইদের বেশি কাছে।

তাহলে বাকি থাকলো জাপানি ভাষার কথা।

জাপানি ভাষার সম্ভাব্য উৎপত্তি কোরিয়ায়। সেখান থেকে ইয়ায়োইদের মাধ্যমে প্রচলিত হয় গোটা জাপানে। তারা এই ভাষা রপ্ত করে কোরিয়ায় মুমুন সংস্কৃতির জাপোনিকদের (আনুমানিক ১৫০০ সাধারণ পূর্বাব্দে) থেকে। একসময় কোরিয়ার  মুমুন আর  ইয়ায়োই দুটো সংস্কৃতির লোকই ব্যবহার করত জাপোনিক ভাষা। তাহলে কোরিয়ার ভাষা? কোরিয়ান ভাষার বাহক কোরিয়নরা আসলে বহিরাগত। তারা এসেছে মাঞ্চুরিয়া থেকে। ©তুষারমুখার্জী

তথ্যসূচীঃ-

1. A study traces Origin of Japanese to Palaeolithic Minatogawa people._ by Tetsuya Ishikura 

2. Jomon Period _ Tony Hoang, World History Encyclopaedia, 2-3-2016

3. Population Dynamics in the Japanese Archipelago By Fuzuki Mizuno  

4. Wikipedia

২৮



মেসোপটেমিয়ার সব চেয়ে বড় শহর ঊরুক, আর প্রাচীণতম শহর এরিদু 

টাইগ্রিস আর ইউফ্রেটিস নদীর মাঝে মেসোপটেমিয়ার সব চেয়ে বড় শহর ঊরুক। ইউফ্রেটিস নদীর পাশের এই নগরের পত্তন আজ থেকে আনুমানিক ৬হাজার থেকে বৎসর আগে। শহরে অবিচ্ছন্ন মানব বসতি ছিল ৫.৩হাজার বৎসর ধরে।

বাগদাদের ১৫০ থেকে ২০০ কিলোমিটার দুরের বর্তমানের ওয়ারকা হল প্রাচীণ ঊরুক। ঊরুক আক্কাদ শব্দ। ঊরুকের সুমের নাম উনুগ।

যদিও অনেকের ধারনায় এটিই মেসোপটেমিয়ার প্রাচীনতম শহর, আসলে কিন্তু প্রাচীণতম শহর উপসাগরের কাছের এরিদু শহর । যার  বর্তমান নাম আবু শাহারাইন।(Abu Shaharain)। এবং কেউ কেউ বলেন এরিদুই বাইবেলের গার্ডেন অফ ইডেন।

জার্মানির প্রত্নবিদদের তত্ত্বাবধানে ঊরুকের প্রত্ন খনন প্রায় একশ বৎসর ধরে (শুরু ১৯১২-১৩) চললেও প্রকৃত খনন হয়েছে এলাকার মাত্র ৫% (মোট ৪৬ বারে)। খনন কাজের প্রায় একশ বৎসরের মধ্যে কাজ বন্ধ থেকেছে বহুবার, বহুবৎসর। কারন মাঝ খানে দুটো বিশ্ব যুদ্ধ গেছে, তারপরে ইরান ইরাক সংঘর্ষ, ইরাক কুয়েত সংঘর্য, আর সবার শেষে আমেরিকার ইরাক অভিযান। এবং এলাকাটি এখনো তেমন ভাবে শান্তিপূর্ণ বলা যাবে না।

সব সুমের শহরের মতই ঊরুকেরও প্রধান স্থাপনা মন্দির-জিগুরাত গড়ে উঠেছিল অধিষ্ঠাত্রী দেবতা বা দেবীর নামে। তবে অধিষ্ঠাত্রী না বলে পৃষ্ঠপোষক বললেই শহরে দেব-দেবীদের ভুমিকার গুরুত্ব ভাল বোঝা যাবে। ঊরুকের বেলা অতি অবশ্য আলোচনায় থাকতেই হবে গিলগামেসের উপাখ্যান। কারন গিলগামেশ শুধুই মহাকাব্যের নায়ক নন, তিনি ঊরুকের রাজাও ছিলেন। ঊরুকের বিশাল প্রাচীরের নির্মানকর্তা এই  গিলগামেশ। সেই প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে।

গিলগামেশের উপাখ্যান অনুযায়ী তাঁর মৃত্যু খানিকটা স্বেচ্ছা মৃত্যু।  গিলগামেশের আদেশে ইউফ্রেটিস নদীর জল আটকে নদীর বুকে তাঁর জন্য  তৈরী করা হয় পাথরের কবর ঘর। যে পাথরের ঘরে জীবিত গিলগামেশ  মৃত্যুর অপেক্ষায় শায়িত হন একখন্ড পাথরের উপর। এরপরে সেই কবর  বন্ধ  করে নদীর জল ছেড়ে দেওয়া হয়। সলিল সমাধি হয় গিলগামেশের। ©তুষার মুখার্জী




২৯



হোয়ার্ডিং ডিসঅর্ডার (Hoarding Disorder)


আপনার কি অপ্রয়োজনীয় জিনিস ফেলতে কষ্ট হয়? বা প্রয়োজন নেই জেনেও বারবার জিনিস কিনে ঘর ভরে ফেলেন? তাহলে হতে পারে এটি শুধু অভ্যাস নয়, বরং একটি মানসিক সমস্যার লক্ষণ। এই মানসিক সমস্যাটির নাম হোয়ার্ডিং ডিসঅর্ডার (Hoarding Disorder)।

হোয়ার্ডিং ডিসঅর্ডার (Hoarding Disorder) হলো এমন একটি মানসিক অবস্থা, যেখানে একজন ব্যক্তি অপ্রয়োজনীয় জিনিস ফেলে দিতে পারেন না বরং ক্রমাগত জিনিস কিনে ঘর ভরে ফেলে। ফলে ধীরে ধীরে ঘর অপ্রয়োজনীয় জিনিসে ভরে যায়। এটি শুধু জিনিস জমিয়ে রাখার বিষয় নয়, এর সাথে মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং সিদ্ধান্ত নিতে না পারার প্রবণতাও জড়িত থাকে। অনেক সময় মানুষ বুঝতেও পারে না যে বিষয়টি ধীরে ধীরে একটি সমস্যায় পরিণত হচ্ছে।

এই অভ্যাস যদি দৈনন্দিন জীবনে সমস্যা তৈরি করে, যেমন- ঘরে চলাফেরা করতে অসুবিধা, জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখতে না পারা বা মানসিক অস্বস্তি তৈরি হওয়া—তাহলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

কেন এমন হয়?

এই সমস্যার পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে—

* কিছু ক্ষেত্রে এটি পারিবারিক বা জেনেটিক হতে পারে।

* অনেক সময় ট্রমা, প্রিয়জনকে হারানো, ডিপ্রেশন বা উদ্বেগ থেকে এই অভ্যাস তৈরি হয়।

* আবার কারও কারও ক্ষেত্রে মনোযোগ, সিদ্ধান্ত নেওয়া বা জিনিস গুছিয়ে রাখার সমস্যাও এর সাথে জড়িত থাকে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে পেশাদার সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের সাহায্যে ধীরে ধীরে এই অভ্যাস নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। এই সময় সহানুভূতিশীল আচরণ করা জরুরি। জোর করে জিনিস ফেলে দিলে মানসিকভাবে আরও খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে। @ সামান্থা বারবারা রোজারিও



৩০


# মেসোপটেমিয়া : ঊরুক ও ভারতের হরপ্পা॥॥॥

কয়েক হাজার মাইলের দুরত্বে ভিন্ন প্রকৃতির দুইদল মানুষ দুটি শহর ও দুটি সভ্যতার জন্ম দেয়। 

ইরাক সরকারের প্রত্ন মন্ত্রনালয়ের তথ্যানুযায়ীঃ

উরুক শহরের প্রত্ন আয়তন ৫৪১ হেক্টর। বর্তমানে একে ঘিরে সৃষ্টি করা হয়েছে একটি বাফার জোন-২৯২ হেক্টরের। এই বাফার জোন হল গোটা শহর ঘিরে তিন কিলোমিটার চওড়া এলাকা, যা প্রত্ন শহরটিকে সযত্নে রক্ষা করার জন্য দরকার।

হরপ্পা সভ্যতার হরপ্পা শহরের চারপাশে বাফার জোন দুরে থাক, এলাকার ভেতরেই নতুন শহর গড়ে উঠেছে। নতুন করে নয়। বহুপ্রাচীণ কাল থেকেই। 

ঊরুকে কার্বন ডেটিং ও থার্মোল্যুমিসেন্স পরীক্ষা হয়েছে।

হরপ্পায় শুধু কার্বন ডেটিং হয়েছে।

ঊরুকের খনন কাজ চলেছে একশ বৎসর ধরে। তবে সামান্যই খোঁড়া হয়েছে।

হরপ্পায় খনন কাজ শুরু হয়েছিল ঊরুকের দশ বৎসর পরে। এখানেও সামান্যই খোঁড়া হয়েছে।

ঊরুকে কবর পাওয়া গেছে। হরপ্পায় কবর পাওয়া গেছে।

ঊরুকে এত হাজার বৎসর বাদে কাদা মাটির ইটের ঘরবাড়ির খুব কিছু অস্তিত্ব পাবার সম্ভাবনা ছিল না, তেমন কিছু পাওয়াও যায় নি। বেশিরভাগ জায়গায় গভীর খাত খুঁড়ে দেখে আবার মাটি চাপা দিয়ে দেওয়া হয়েছে।

হরপ্পায় পোড়া ইটের শহরের ধ্বংসাবশেষ কম বেশি দাঁড়িয়ে ছিল ১৮২৫ অবধি। তবে তার আগে অনেক আগে থেকেই হরপ্পা থেকে ইট চুরি নিত্যদিনের ঘটনা ছিল। সেটাই বড় করে হয়ে গেল বৃটিশ আমলে মুলতান লাহোর রেললাইন বানাবার সময়। ফলে হরপ্পাতে খননের সময় কিছুই দাঁড়িয়ে ছিলো না। হরপ্পাতেও কাদা মাটির ইট প্রচুর ব্যবহার হয়েছে। তবে মাটি খুঁড়ে পোড়া মাটির অনেক ভিত ভাঙ্গা দেওয়ালের অংশ বিশেষ চাতাল এসব পাওয়া গেছে। 

ঊরুক শহরের প্রত্নস্তর ১৬টি। হরপ্পার ছয়টি।

ঊরুক ইউফ্রেটিস নদীর পাড়ে। হরপ্পা রাভি নদীর পাড়ে।

ঊরুক শহরের এলাকায় প্রাচীনতম বসতি পাওয়া গেছে ৫হাজার সাধারন পূর্বাব্দের থেকে শুরু করে।

হরপ্পা শহরের প্রাচীনতম বসতি পাওয়া গেছে ৫হাজার সাধারন পূর্বাব্দের।

উরুকের ই-আন্না এলাকা শহর হিসাবে গড়ে উঠতে থাকে ৩.৮-৩.৪ হাজার সাধারণ পূর্বাব্দে।

হরপ্পা শহর গড়ে ওঠার প্রথম লক্ষণ দেখা দেয় ২.৮ হাজার বৎসর আগে। উরুকের পাক্কা হাজার বৎসর পরে।

ঊরুকের বিখ্যাত ৯.৫কিলোমিটার লম্বা দেওয়াল তৈরী হয় ২৭০০ সাধারণ পূর্বাব্দে।

হরপ্পায় দেওয়াল তৈরী শুরু হয় ২৬০০ সাধারণ পূর্বাব্দে।

ঊরুক শহর গড়ে উঠেছিল দুটো এলাকা জুড়ে। ই-আন্না আর কুল্লাবা।

হরপ্পা শহর চারটি এলাকায় বিভক্ত ছিল। পুরাত্ত্ববিদরা সেগুলোর সাংকেতিক নামাকরণ করেছেন, এলাকা `এ.বি` `ই` `এফ` ও `এইচ.টি` (`এইচ.টি` এখন আধুনিক শহর)

উরুকে দেওয়াল ঘেরা ই-আন্না এলাকায় ছিল বড় বড় উৎপাদন কেন্দ্র।

হরপ্পায় `এফ` এলাকায় ছিল মর্টিমার কথিত শষ্যাগার যা কেনয়ের বলছেন সভাঘর। এফ এলাকায় ছিল কয়েকটি খুবই বড় বাড়ি, সম্ভবত চাকরবাকরদের জন্য প্রয়োজনীয় আউটহাউস সহ। এই এলাকার বাইরে ছিল বেশ কয়েকটি গোল ইট বাঁধানো চাতাল। মর্টিমার সেগুলো শষ্য ঝাড়াইয়ের জন্য বললেও কেনয়ের বলছেন না তা নয়। তবে কেন বানানো হয়েছিল সেটা জানা নেই। ইদানিং কাছাকাছি পাওয়া গেছে দ্বিস্তরীয় চুল্লী। মাটির নীচে ঘেরা চুল্লীর উপরে তাপ ধোঁয়া বের হবার খোঁদলের জায়গায় আরেকটি চুল্লী। ব্যবহারিক কারন ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। সব মিলিয়ে হরপ্পার এফ এলাকাকে বিশেষ উৎপাদন কেন্দ্র ভাবা যেতে পারে, ঊরুকের ই-আন্নার এলাকার মত করেই।

ঊরুকে শহরের ভেতরে ছিল প্রচুর খাল। নানা দিকে, গোটা শহরের ভেতরে ছড়ানো। মুল নদী ইউফ্রেটিস থেকে শহরের ভেতরে খাল তো ছিলই, খাল ছিল শহরের বাইরের কৃষি জমিতে যাবার জন্য, জলা জমিতে যাবার জন্য। মোটামুটি রাস্তার ব্যাপারে কল্পনা করা যেতে পারে ঊরুক আর ভেনিসকে দুই ভাই হিসাবে।

হরপ্পার রাস্তা ছিল চওড়া চওড়া। শহরে ঢোকার প্রবেশ দ্বার প্রথমে ছিল সরু। মাত্র আড়াই মিটার চওড়া। বারে বারে সারাই করে সে প্রবেশদ্বারকে বিশাল চওড়া করা হয়েছে। তাছাড়া আরো দুই বা তিনটি প্রবেশ দ্বারও তৈরী হয়েছিল।

উরুকের প্রধান যানবাহন নৌকা। হরপ্পার প্রধান যানবাহন গরুর গাড়ি।

ঊরুকের প্রধান খাদ্য শষ্য ছিল বার্লি ও গম।

হরপ্পার প্রধান খাদ্য শষ্য ছিল বার্লি ও গম।

ঊরুকে প্রধানত কাদামাটির রোদে শুকানো ইট ব্যবহার করা হয়েছে।

হরপ্পায় কাদা মাটির ইট ব্যবহার করা হয়েছে প্রথমে। পরে পোড়া ইট ব্যবহার করা হয়েছে।

ঊরুকে কাঠের ব্যবহার করতে হলে সে কাঠ বহুদুর দেশ লেবানন থেকে আমদানি করতে হত।

হরপ্পায় কাঠ ঘরের কাছেই পাওয়া যেত। বিশেষ ভালো কাঠের জন্য হিমালয়ের পাদদেশ থেকে নদীতে ভাসিয়ে আনা সোজা কাজ।

ঊরুকের সাধারন লোক পরত ভেড়ার লোমের পোষাক। কোমর থেকে হাঁটু। কেবল মাত্র ধনবান ও রাজপরিবারের লোক সূতীর পোষাক পরত।

হরপ্পায় সম্ভবত সকলেই সূতীর পোষাক পরত।

ঊরুকে লেখা শুরু হয় ৩.৫হাজার সাধারণ পূর্বাব্দে।

হরপ্পায় ৩.৩ হাজার সাধারণ পূর্বাব্দে মাটির বাসনে সাঙ্কেতিক চিহ্ন আঁকা শুরু হয়ে যায়। তারপরে ২৮০০ সাধারণ পূর্বাব্দে সীলে লিপির দেখা পাওয়া যেতে শুরু করল।

ঊরুকে ২৭৫০ সাধারণ পূর্বাব্দে লেখা হয়ে গেল মহাকাব্য। ঊরুকের রাজা গিলগামেশের উপাখ্যান।

হরপ্পায় তেমন কিছুই পাওয়া যায় নি।

ঊরুকে রাতের বেলা শহরে মন্দির চত্বরে বাড়ির উঠানে জ্বালানো হত বিটুমেনের মশাল।

হরপ্পায় তেলের, সম্ভবত তিসির তেলের, প্রদীপ জ্বলত ঘরের ভেতরে।

২২৫০ থেকে ১৭৫০ সাধারণ পূর্বাব্দে গমের ফলন কমে গিয়েছিল ৬৫%. দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ার সব সাম্রাজ্যের পতন ঘটে একের পর এক।

২২০০ থেকে ২০০০ হরপ্পায় দ্রুত জনসংখ্যা বেড়েছিল। রাস্তার উপরে ঘরবাড়ি বানানো শুরু হয়ে গিয়েছিল। ২০০০ থেকেই বাড়তি জনসংখ্যার চাপে নাজেহাল হরপ্পা শহরে সামাজিক অশান্তির শুরু। যক্ষা কুষ্ঠ ইত্যাদি সংক্রামক রোগের বৃদ্ধি হতে শুরু করল। ১৯০০তে লোক শহর ত্যাগ করতে শুরু করে। নতুন একদল লোক শহরে বাস করতে আসে(সিমেট্র-এইচ)। এরা সাংস্কৃতিক ভাবে আগেকার স্থায়ী হরপ্পাবাসীদের থেকে ভিন্ন।

উরুক শহরে রাজনৈতিক গুরুত্ব হারায়  ২হাজার সাধারন পূর্বাব্দে।

হরপ্পা তার গুরুত্ব হারাতে শুরু করে একই সময়ে ২হাজার থেকে ১.৯ হাজার সাধারণ পূর্বাব্দে।

ঊরুক রাজনৈতিক গুরুত্ব হারালেও সাংস্কৃতিক-ধার্মিক গুরুত্ব বজায় রেখে টিকে থাকে ৩০০ সাধারন পূর্বাব্দের কিছু পরেও।

হরপ্পার হয়ত তেমন কোন সাংস্কৃতিক-ধার্মক ঐতিহ্য থাকলেও কোন অজ্ঞাত কারণে তার কোন মুল্য দেয় নি পরবর্তী কালের লোকেরা। রাখার কোন ইচ্ছা-তাগিদ পরবর্তী ভারতীয় রাজনৈতিক শক্তি গুলোরও কোন কালেই ছিল না।

হরপ্পা প্রায় জনশুন্য হয়ে গেলেও লোক বসতি ছিল ১৩০০ সাধারণ পূর্বাব্দ অবধি। তারপরের টুকু রহস্যে মোড়া। কারন হরপ্পাতে গ্রামীণ বসতি ছিল। হরপ্পার ধ্বংস স্তুপে গুপ্ত যুগে মন্দির তৈরী হয়েছিল, মোঘল আমলে সরাইখানা বা কেল্লা তৈরী হয়েছিল, তারওপরে একটি মসজিদ বা দরগা তৈরী হয়েছিল। লোক কাহিনীতে সেখানে রাজা ছিল। মহারাজা রণজিৎ সিং এর আমলে, বৃটিশ পর্যটক বার্ণস হরপ্পাতে পেয়েছিলেন পারসিক মুদ্রা ও হিন্দু রাজার মুদ্রা। তিনি সেগুলোর লেখার পাঠোদ্ধার করতে পারেন নি। ©তুষারমুখার্জী



৩১



॥॥ অথ অশ্ব কথা॥॥

মানব সভ্যতার উপরে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলেছে একটি প্রাণী, ঘোড়া। কৃষিকাজে, যোগাযোগে, পরিবহনে, যুদ্ধে তো আছেই, কিছু মাংস আর বেশি দুধের যোগানদার হিসাবে খাদ্যের প্রয়োজনেও আছে, আছে বিনোদনেও (ঘোড়দৌড়, পোলো)। মানব সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এই প্রাণী।

দ্রুতগতি সম্পন্ন কষ্টসহিষ্ণু এই প্রাণীটি মানুষের পরম আপনজন। প্রাচীনতম ঘোড়ার ডি.এন.এ সংগ্রহ আর বিশ্লেষন করে পাওয়া গেছে কানাডার ইয়ুকন-এ বরফের তলায় চাপা পড়ে থাকা দেহাবশেষ থেকে। (Orlando_2013) বয়স নির্ধারণ হয়েছে ৭.৮ লক্ষ থেকে ৫.৬ লক্ষ বৎসর।

তবে আধুনিক গৃহপালিত ঘোড়ার খবর কিন্তু একেবারেই হাল আমলের। ইয়োরেশিয়ান স্তেপের বোটাই (বর্তমানের কাজাকস্তানের)(Outram_2003) প্রত্নক্ষেত্রে গৃহপালিত ঘোড়ার প্রাচীনতম দেহাবশেষ পাওয়া গেছে, যার বয়স ৫.৫ হাজার বৎসর।

এখন পর্যন্ত জানা মতে ঘোড়ার প্রথম বাসস্থান উত্তর আমেরিকা (৫.৫ লক্ষ বৎসর আগে), তারপরে দক্ষিণ আমেরিকা। উত্তর আমেরিকাতে ঘোড়ার বিলুপ্তি ঘটে ১১,৭০০ বৎসর আগে। আর একটি বিশাল উল্কার পতন হয় ১২,৯০০ বৎসর আগে। তার ফলে যে প্রাকৃতিক পরিবর্তন হতে থাকে তাতে আমেরিকা থেকে অনেক বড় প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যায়। সম্ভবত সেই ঘটনার সাথেই ঘোড়াও বিলুপ্ত হয় আমেরিকা থেকে। তবে ১০,৫০০ বৎসর আগে আলাস্কায় ঘোড়া ছিল। আবার ৩,৭০০ বৎসর আগেও তাদের অস্তিত্ব ঐ এলাকায় ছিল, আর মাত্র ২৩০০ বৎসর আগে মানুষের সাথে তাদের সহবিচরনেরও প্রমাণ বের হয়ে আসছে। 

ঘোড়া কয়েকটি বৈশিষ্ট তার জন্মদাতার উপর নির্ভর করবে সেটা পশুপালকরা অভিজ্ঞতার জোরে জেনে গেছে।

সেই বৈশিষ্টগুলো হল ঘোড়ার চলন, রঙ, কষ্ট সহিষ্ণুতা, চারিত্রিক স্থিরতা-দৃঢ়তা।

ঘোড়ার চলন সব চেয়ে গুরুত্ব পূর্ণ। সাধারন ভাবে হাঁটা, দুলকি চালে দৌড়ানো,   আচমকা ক্ষণকালের জন্য অতি তীব্র গতি, অথবা একটানা তীব্র গতিতে দৌড়ানো। ঘোড়ার গতিবেগ বাড়ায় MSTN (myostatin)  জিন। তবে এর মধ্যে ও T-allele কাজ করে ঘোড়ার সমান বেগে বেশিদুর দৌড়োবার ক্ষমতা আর  C-allele সাহায্য করে ঘোড়ার অল্প সময়ের জন্য অসম্ভব দ্রত দৌড়ের ক্ষমতা পেতে।  আরবী ঘোড়ার T-allele বেশি কর্মক্ষম।

চাষের বা মাল পরিবহনের জন্য তীব্র গতিবেগ দরকার নেই। চাষের জন্য সাধারন হাঁটাই যথেষ্ট, পরিবহন মাল ও যাত্রী পরিবহনের জন্যও তীব্রগতি দরকার নেই, দরকার দুলকি চাল। যুদ্ধে, যোগাযোগে, কখনো সখনো তীব্র গতিবেগ দরকার বিশেষ লোকের জন্য বিশেষ প্রয়োজনে। সাধারন ঘোড়সওয়ার যোদ্ধাদের হয়ত ততটা গতিবেগ দরকার নেই।

এই গতিবেগের চাহিদার বিভিন্নতার জন্য পশুপালকরা প্রজনন নিয়ন্ত্রন করে।

তারপরে আসবে ঘোড়ার গায়ের রং। এখানে বিচিত্র খবর হল মানুষের মতই ঘোড়ারও গোড়াতে গায়ের রঙ সবার একরকম ছিল, হাল্কা বাদামী। পরে বদলাতে শুরু করে। আরো মজার কথা হল মানুষের মত ঘোড়ারও একটি জিনই এই কাজের কাজি। একটু মিউটেশন MC1R (Melanocortin receptor1)-এ ব্যস মানুষ বা ঘোড়া গায়ের রঙ বদলে যাবে।এই মিউটেশন কালো পিগমেন্টের পথ বন্ধ করে দেয় ফলে গায়ের রঙ ফ্যাকশে হয়ে যায়, যাকে আমরা ফর্সা বলি। আর মানুষের মাথার চুলকে লাল করে দেয় অনেক সময়েই কারন কালো আটকে লাল রঙকে প্রাধান্য দেয় এই মিউটেশন। এই লাল রঙের দরুনই ঘোড়ার হাল্কা বাদামী রঙ লালচে বাদামী দেখায়। পরে নিয়ন্ত্রিত প্রজনন এই বিশেষ রঙের ঘোড়ার বেশি জন্ম নেওয়াবার ব্যবস্থা করবে। ঘোড়ার বেলা ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী, মানুষের বেলা সমাজের চাহিদা অনুযায়ী রঙ বদলের খেলা।

তবে বিজ্ঞানীদের মতে এই কালো বন্ধ করে লাল রঙের প্রাধান্য মানুষের বেলা ব্যাথার অনুভুতি বেশি তীব্র করবে, বা ব্যাথায় তারা বেশি কাতর হবে। আর লালচে বাদামি(চেস্টনাট)ঘোড়া আবহাওয়া পরিবর্তনে বেশি মেজাজ পরিবর্তন করবে।

ঘোড়ার রঙে আরেকটি ব্যাপার আছে যা মানুষের নেই, তা হল শরীরের এক এক জায়গায় এক এক রঙ। ঘোড়া এটা হয়। এর জন্য দায়ী অন্য একটি জিন ASIP (Agouti signaling protein). এই জিনের মিউটেশনের ফলে প্রধানত ঘোড়ার গায়ে কালো রঙ দেখা দেবে। তবে সেটা একটা বিশেষ অঙ্গে বা অংশে সীমাবদ্ধ থাকবে। এটিও প্রজনন নিয়ন্ত্রনের দ্বারা নিয়ন্ত্রন করা যায়।

সব পশুর মতো ঘোড়াও তো বন্য ছিল, সেই বন্য ঘোড়ারা কোথায় গেল?

ক্রমাগত সুনিয়ন্ত্রিত প্রজননের ফলে একসময় ঘোড়ার জিন বৈচিত্র কমতে থাকে। ইতিমধ্যে ৮৭ রকমের ঘোড়ার প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

স্তেপের এশিয় অংশে ছিল স্বেলাস্কিস হর্স (Przewalski’s) এটি মঙ্গোলিয়া এলাকার বন্য ঘোড়া। তখন বেঁচে ছিল মাত্র ১২ থেকে ১৬টি। রাশিয়ান সেনাবাহিনীর কর্নেল স্বেলাস্কি (জাতিতে পোলান্ডের লোক)প্রথম এর খোঁজ পেয়ে এর সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। তাঁর নামেই এই জাতের ঘোড়ার নামাকরন হয়। ক্রমে চীন আর মঙ্গোলিয়ার মিলিত প্রয়াসে এখন বিলুপ্ত প্রায় সজ্ঞা খেকে স্বেলাস্কিস হর্সের পদোন্নতি হয়েছে বিপন্ন প্রজাতিতে, সংখ্যা বেড়ে এখন দুই হাজারের বেশি। ১২ থেকে দুই হাজার।©তুষারমুখার্জী




৩২



নেদারল্যান্ড না হল্যান্ড 

নেদারল্যান্ডস (The Netherlands) হলো একটি পুরো দেশ, আর হল্যান্ড (Holland) হলো সেই দেশের একটি অংশ (দুটি প্রদেশ)।

নেদারল্যান্ডস মোট ১২টি প্রদেশ (Provinces) নিয়ে গঠিত। দেশের রাজধানী আমস্টারডাম এবং সরকারের মূল কেন্দ্র হেগ (The Hague) হল্যান্ডের অন্তর্ভুক্ত। নেদারল্যান্ডস শব্দটি ওলন্দাজ ভাষায় "Nederland" যার অর্থ "নিম্নভূমি" বা "Low Lands," যা দেশটির ভৌগোলিক অবস্থানকে নির্দেশ করে।

হল্যান্ড কোনো দেশ নয়, এটি নেদারল্যান্ডসের পশ্চিম দিকে অবস্থিত একটি অঞ্চলের নাম।

এটি নেদারল্যান্ডসের ১২টি প্রদেশের মধ্যে কেবল দুটি প্রদেশকে বোঝায়:

নর্ড হল্যান্ড (Noord-Holland বা উত্তর হল্যান্ড)

জুইড হল্যান্ড (Zuid-Holland বা দক্ষিণ হল্যান্ড)

আমস্টারডাম, রটারডাম এবং হেগ-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো এই হল্যান্ড অঞ্চলের মধ্যেই অবস্থিত।

নেদারল্যান্ডের মানুষদের ডাচ বলা হয়। আবার আমরা বইয়ে যে ওলান্দাজদের ইতিহাস পড়েছি সেটা এই ডাচদেরই আরেক নাম। ফরাশীরা তাদের ওলান্দাজ ডাকে।

বিভ্রান্তির কারণ ও সম্পর্ক

ঐতিহাসিকভাবে হল্যান্ড অঞ্চলের বিশেষ গুরুত্বের কারণেই এই বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে:

ঐতিহাসিক প্রাধান্য: ১৭শ শতকে, ডাচ গোল্ডেন এজ (Dutch Golden Age)-এর সময়, এই হল্যান্ড প্রদেশ ছিল নেদারল্যান্ডসের সবচেয়ে ধনী, ক্ষমতাশালী এবং অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী অঞ্চল। বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, নৌ-চলাচল এবং কলোনিয়াল কাজ এই অঞ্চল থেকেই পরিচালিত হতো।

বিদেশিদের ব্যবহার: এর ফলে, বিদেশিদের কাছে এই পুরো দেশটিই "হল্যান্ড" নামে পরিচিতি লাভ করে। তারা নেদারল্যান্ডসকে বোঝানোর জন্য সংক্ষেপে এই নামটি ব্যবহার করতে শুরু করে।

অনানুষ্ঠানিক ব্যবহার: এখনও, অনেক ডাচ মানুষও অনানুষ্ঠানিকভাবে বা খেলাধুলার সময় তাদের দেশকে "হল্যান্ড" বলে উল্লেখ করে, যদিও এটি ভুল।

গুরুত্বপূর্ণ নোট: ২০২০ সালে, নেদারল্যান্ডস সরকার আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ব্র্যান্ডিংকে আরও সঠিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য সরকারিভাবে "হল্যান্ড" নামটি ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা পুরো দেশকে বোঝাতে শুধু "নেদারল্যান্ডস" নাম ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে।

৩৩


দামী ফোন হাতে থাকার চেয়ে, ব্যাংকে দামী ব্যালেন্স থাকা অনেক বেশি স্মার্টনেস

লোক দেখানো বড়লোক হওয়ার চেয়ে, সত্যি ধনী হতে শিখুন।

আমরা এমন এক অদ্ভুত সময়ে বাস করছি, যেখানে মানুষের সফলতা মাপা হয় তার হাতের মোবাইল বা পরনের ব্র্যান্ড দিয়ে।

বন্ধুমহলে নিজেকে 'কুল' প্রমাণ করতে অনেকে কিস্তিতে (EMI) বা ধার করে ১ লাখ টাকার ফোন কেনেন।

কিন্তু ভেবে দেখুন তো—হাতে দামী ফোন, অথচ মাসের ২৫ তারিখে পকেটে হাত দিলে ১০ টাকাও নেই, বা কোনো মেডিকেল ইমার্জেন্সি এলে বন্ধুর কাছে ধার চাইতে হচ্ছে। এটা কি স্মার্টনেস? নাকি বোকামি?

স্মার্টনেস মানে অ্যাপলের লেটেস্ট মডেল হাতে রাখা নয়। স্মার্টনেস মানে হলো—পকেটে এমন একটা ব্যাকআপ রাখা, যাতে চাকরি চলে গেলে বা বিপদ এলেও আপনাকে কারো কাছে হাত পাততে না হয়।

কেন 'শো-অফ' বন্ধ করে 'সত্যি ধনী' হওয়া জরুরি?

১. 'লাইবিলিটি' ও 'অ্যাসেট' চিনুন (Know the Difference)

যে জিনিস কিনলে পকেট থেকে টাকা চলে যায় এবং যার দাম সময়ের সাথে কমে (যেমন: দামী ফোন, গ্যাজেট, বাইক), তা হলো লাইবিলিটি (Liability)।

আর যা আপনার পকেটে টাকা আনে বা যার দাম বাড়ে (যেমন: সেভিংস, ইনভেস্টমেন্ট, জমি, স্কিল), তা হলো অ্যাসেট (Asset)।

গরিব মানসিকতার মানুষ লাইবিলিটি জমায়, আর ধনী মানসিকতার মানুষ অ্যাসেট বানায়। আপনি কোন দলে?

২. কাকে ইমপ্রেস করছেন? (Who are you trying to impress?)

যাদের ইমপ্রেস করার জন্য আপনি ধার করে ফুটানি করছেন, বিশ্বাস করুন, বিপদের দিনে তারা আপনার ফোনও ধরবে না।

তাই নকল ইজ্জত কেনার চেয়ে আসল ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়ানো অনেক বেশি শান্তির। পকেটে টাকা থাকলে আত্মবিশ্বাস এমনিতেই চলে আসে, শো-অফ করতে হয় না।

৩. মানসিক শান্তি (Peace of Mind)

মাস শেষে কিস্তির মেসেজ বা ধারের বোঝা মাথায় নিয়ে ঘুমানোর চেয়ে, সাধারণ ফোন ব্যবহার করে নিশ্চিন্তে ঘুমানো অনেক বেশি সুখের।

আসল ধনীরা ব্র্যান্ড দেখায় না, তারা তাদের সম্পদ ও স্বাধীনতা উপভোগ করে।

শেষ কথা

তাই আজ থেকে সংজ্ঞাটা বদলে ফেলুন। লোক দেখানো বড়লোক হওয়ার দৌড় থেকে বেরিয়ে আসুন।

ফোনটা একটু পুরোনো মডেলের হলেও সমস্যা নেই, যদি আপনার ভবিষ্যতের ফান্ডটা নতুন ও শক্তিশালী হয়।

মনে রাখবেন, "টাকা থাকলে সবাই আপনার বন্ধু হতে চাইবে, কিন্তু টাকা না থাকলে ছায়াও পাশে থাকে না।"

নিজেকে বলুন—"আমি সস্তা শো-অফে বিশ্বাসী নই, আমি আসল সম্পদে বিশ্বাসী।"



৩৪


শহরের চেয়ে গ্রামের মানুষ বেশি কুটিল ও ঈর্ষাপরায়ণ 

 গ্রাম মানেই সরলতা, আন্তরিকতা আর নিঃস্বার্থ সম্পর্ক—এই ধারণা আমাদের সমাজে বহুদিন ধরে প্রচলিত। কিন্তু বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা ও আধুনিক গবেষণা বলছে, বিষয়টি সবসময় এত সরল নয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, গ্রামীণ সমাজে মানুষ একে অপরের প্রতি বেশি নজরদারি করে, তুলনা করে এবং ক্ষুদ্র স্বার্থের সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ফলে কুটিলতা ও ঈর্ষার প্রকাশ সেখানে আরও তীব্রভাবে দেখা যেতে পারে। এই প্রবন্ধে সেই বাস্তবতার কিছু দিক তুলে ধরা হলো।

১. সীমিত সম্পদ ও প্রতিযোগিতা

গ্রামে জমি, কাজ বা অর্থনৈতিক সুযোগ সীমিত থাকে। ফলে একই সম্পদ নিয়ে প্রতিযোগিতা বাড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, সীমিত সম্পদের পরিবেশে মানুষ বেশি হিংসা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক আচরণ করে। শহরে বিকল্প বেশি থাকায় এই চাপ তুলনামূলক কম।

২. সামাজিক নজরদারি বেশি

গ্রামে সবাই সবাইকে চেনে, কার কী হচ্ছে তা সহজেই জানা যায়। ফলে ব্যক্তিগত বিষয়ও হয়ে ওঠে পাবলিক আলোচনার বিষয়। এই অতিরিক্ত নজরদারি থেকে জন্ম নেয় তুলনা, সমালোচনা এবং ঈর্ষা।

৩. মানসিক চাপ ও অপ্রকাশিত হতাশা

গ্রামীণ জীবনে সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি অনেক সময় মানুষের ভেতরে হতাশা তৈরি করে। এই হতাশা সরাসরি প্রকাশ না পেয়ে অন্যের সফলতা দেখে ঈর্ষা বা কুটিল আচরণে রূপ নেয়।

৪. সামাজিক মর্যাদার লড়াই

গ্রামে সামাজিক অবস্থান (status) খুব গুরুত্বপূর্ণ। কে বেশি জমির মালিক, কার ছেলে বিদেশে—এসব বিষয় নিয়ে প্রতিযোগিতা চলে। ফলে অন্যের উন্নতি অনেক সময় সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ে।

৫. গসিপ বা পরনিন্দার প্রবণতা

বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, ছোট ও ঘনিষ্ঠ সমাজে গসিপের হার বেশি। গ্রামে বিনোদনের অভাব থাকায় অনেক সময় অন্যের জীবন নিয়েই আলোচনা চলে, যা কুটিলতা ও ঈর্ষা বাড়ায়।

৬. শিক্ষা ও সচেতনতার সীমাবদ্ধতা

শিক্ষা ও মানসিক বিকাশের সুযোগ কম থাকলে মানুষ সহজেই সংকীর্ণ চিন্তাধারায় আটকে যায়। এতে অন্যের সাফল্যকে ইতিবাচকভাবে না দেখে নেতিবাচকভাবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়।

৭. পরিবর্তনের প্রতি প্রতিরোধ

গ্রামে নতুন কিছু গ্রহণের প্রবণতা তুলনামূলক কম। কেউ নতুন কিছু করলে বা উন্নতি করলে তাকে সন্দেহ বা ঈর্ষার চোখে দেখা হয়। এটি সামাজিক কুটিলতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

গবেষণার আলোকে

সামাজিক মনোবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, ছোট ও ঘনিষ্ঠ কমিউনিটিতে “social comparison” বেশি হয়, যা ঈর্ষার প্রধান কারণ।

উন্নয়ন গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামীণ অঞ্চলে সীমিত অর্থনৈতিক সুযোগ মানুষের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্ব বাড়ায়।

বিভিন্ন দক্ষিণ এশীয় গবেষণায় (বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতের গ্রামভিত্তিক গবেষণা) পরনিন্দা ও সামাজিক চাপকে গ্রামীণ জীবনের বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

 গ্রামের মানুষ সবাই কুটিল বা ঈর্ষাপরায়ণ—এমন সার্বজনীন মন্তব্য সঠিক নয়। তবে বাস্তবতা হলো, গ্রামীণ জীবনের কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও সামাজিক পরিবেশ অনেক সময় এই ধরনের আচরণকে বাড়িয়ে তোলে। তাই সমাধান হলো শিক্ষা, সচেতনতা এবং পারস্পরিক সহমর্মিতা বাড়ানো। তখনই গ্রাম তার প্রকৃত সৌন্দর্য—সরলতা ও আন্তরিকতা—আবার ফিরে পেতে পারে। @ SAM Motivation

References

Festinger, L. (1954). A Theory of Social Comparison Processes. Human Relations.

World Bank (2016). Poverty and Shared Prosperity Report.



৩৫


ওপেন অফিস: একটি স্বপ্নের উত্থান ও ভাঙন

অফিসে নিজের ডেস্কে বসে একটি জরুরি কাজ করছেন। ঠিক সেই সময় পাশের ডেস্কে সহকর্মী হঠাৎ ফোনে কথা বলা শুরু করলেন উচ্চস্বরে। কিংবা উল্টো দিকের তিন–চারজন মিলে জুড়ে দিলেন অট্টহাসি। মুহূর্তের মধ্যেই আপনার মনোযোগ ভেঙে চুরমার। বিরক্তি জমে ওঠে মাথার ভেতর। কিন্তু কিছু বলার উপায় নেই। কারণ এটাই ওপেন–প্ল্যান, বা খোলামেলা অফিসের অলিখিত ধর্ম।

আধুনিক কর্পোরেট দুনিয়ায় কাঁচঘেরা দেয়ালহীন এই অফিসগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে প্রগতি, স্বচ্ছতা ও সহযোগিতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে—এখানে কোনো দেয়াল নেই, কোনো দূরত্ব নেই, সবাই সমান। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—এই নকশা কি সত্যিই কাজের গতি বাড়ায়? নাকি এটি ধীরে ধীরে কর্মীদের ঠেলে দেয় এক অদৃশ্য কিন্তু গভীর মানসিক চাপে?

আধুনিক ওপেন অফিসের প্রকৃত যাত্রা শুরু হয় ১৯৬৭ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়্যারে রাসায়নিক কোম্পানি ডুপন্ট তখন বড় পরিসরে এই ধারণা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। নিজেদের একটি অফিস ফ্লোর পুরোপুরি ভেঙে নতুনভাবে সাজানো হয়। দেয়াল সরিয়ে ফেলা হয় একেবারে। বিশাল এক কক্ষে সারি সারি ডেস্ক বসানো হয় কোনো রাখঢাক ছাড়াই। কেবল নিচু পার্টিশনের সাহায্যে সামান্য ব্যক্তিগত পরিসর তৈরি করা হয়েছিল। কোণার দিকে রাখা হয় কর্মীদের বিশ্রামকক্ষ, আধুনিক চেয়ার, আর নামী ডিজাইনারের তৈরি আসবাবপত্র। এটাই ছিল যুক্তরাষ্ট্রে ওপেন অফিসের প্রথম বড় কর্পোরেট প্রয়োগ।

সে সময় ধারণা করা হয়েছিল, কর্মীদের টেবিলের মাঝখানে দেয়াল না থাকলে পদমর্যাদার বাধা ভেঙে যাবে। ম্যানেজার ও জুনিয়র কর্মীর দূরত্ব কমবে। মানুষ সহজে একে অপরের কাছে যেতে পারবে, কথা বলতে পারবে, আইডিয়া ভাগ করে নিতে পারবে। ফলে তৈরি হবে পারস্পরিক সহযোগিতার এক প্রাণবন্ত পরিবেশ, যেখানে আলাপ থেকেই জন্ম নেবে নতুন চিন্তা, নতুন উদ্ভাবন, আর শেষ পর্যন্ত কোম্পানিরই লাভ হবে সবচেয়ে বেশি।

আজ বাংলাদেশসহ বিশ্বের অসংখ্য দেশে ওপেন অফিসই হয়ে উঠেছে কর্পোরেট নকশার মানদণ্ড। নতুন অফিস মানেই খোলা জায়গা, কাচের দেয়াল আর সারিবদ্ধ ডেস্ক। কিন্তু এত বছরের অভিজ্ঞতার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই নকশার জন্ম হয়েছিল, সেই স্বপ্ন কি সত্যিই পূরণ হয়েছে? নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওপেন অফিস কর্মীদের জন্য পরিণত হয়েছে এক নীরব যন্ত্রণার স্থাপত্যে?

ইতিহাসে প্রায়ই দেখা যায়, কোনো ধারণা কাগজে যতটা সুন্দর দেখায়, বাস্তবে তার রূপ ততটাই জটিল হয়ে ওঠে। ওপেন অফিসের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই ঘটেছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাবনা আর বাস্তবতার মাঝখানের ফারাক ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ওপেন অফিস নিয়ে প্রথম বড় ধরনের সমীক্ষা চালানো হয় ১৯৭০ সালে। সে সময় ১৮টি কোম্পানির ৩৫৮ জন কর্মীর মতামত নেওয়া হয়। তাঁদের অভিযোগগুলো ছিল প্রায় একই সুরে বাঁধা—অতিরিক্ত শব্দদূষণ, মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা, কাজের ছন্দ বারবার ভেঙে যাওয়া। অনেকেই জানান, সারাক্ষণ নিজেকে অন্যের নজরদারির ভেতরে আটকে থাকা মানুষের মতো মনে হয়। ব্যক্তিগত পরিসর বলতে কিছু নেই। কাজের শেষে ক্লান্তিও আগের চেয়ে অনেক বেশি। এখানে গোপনীয়তা বলতে কিছুই নেই।’ 

২০২০ সালের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় দুই–তৃতীয়াংশ নলেজ ওয়ার্কার এখন ওপেন–প্ল্যান অফিসে কাজ করেন। কর্পোরেট দুনিয়ার কাছে এর সুবিধাগুলো ছিল স্পষ্ট—কম জায়গায় বেশি মানুষ বসানো যায়, দেয়াল কম লাগে, খরচ কমে, আর তদারকিও সহজ হয়।

আধুনিক গবেষণাগুলো বলছে, অধিকাংশ কর্মীই এমন খোলামেলা অফিস পছন্দ করেন না। আরও বিস্ময়কর হলো—ওপেন অফিস কর্মীদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর বদলে অনেক ক্ষেত্রে তাদের আরও বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, তারা এখন একে অপরের সঙ্গে সরাসরি কথা কম বলেন; তার চেয়ে অনেক বেশি যোগাযোগ করেন ই–মেইল বা মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাফেলো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় বলা হয়, ওপেন–প্ল্যান অফিসে কাজ করলে সামাজিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা কমে যায়। এই পর্যবেক্ষণকে আরও শক্ত ভিত দেয় ২০১৮ সালে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের গবেষণা। গবেষক ইথান বার্নস্টিন ও স্টিফেন টারবান বিশেষ সেন্সর ব্যবহার করে ওপেন অফিসে কর্মীদের আচরণ বিশ্লেষণ করেন। তাঁদের ফলাফল ছিল চমকে দেওয়ার মতো। ব্যক্তিগত কক্ষ থেকে ওপেন ফ্লোরে স্থানান্তরের পর কর্মীদের সামনাসামনি কথা বলার পরিমাণ প্রায় ৭০ শতাংশ কমে যায়—অর্থাৎ তা নেমে আসে প্রায় এক–তৃতীয়াংশে। বিপরীতে বেড়ে যায় ই–মেইল ও ডিজিটাল বার্তার ব্যবহার।

গবেষণায় দেখা যায়, গোপনীয়তার অভাবই এর মূল কারণ। খোলামেলা পরিবেশে কর্মীরা জনসমক্ষে কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করেন। পাশের মানুষটি বিরক্ত হতে পারেন, কিংবা ব্যক্তিগত কথা শুনে ফেলতে পারেন—এই আশঙ্কায় তারা মুখোমুখি আলাপের বদলে নিরাপদ ডিজিটাল মাধ্যম বেছে নেন। অর্থাৎ, কর্মীদের মাঝখানের দৃশ্যমান দেয়াল তুলে দেওয়া হলেও তাদের মাঝখানে গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য মানসিক দেয়াল। ফলাফল—নিকটতা নয়, বরং আরও বেশি দূরত্ব।

এদিকে ওপেন অফিস নারীদের জন্য তৈরি করেছে ভিন্নমাত্রার মানসিক চাপ। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, খোলামেলা পরিবেশে নারীরা ‘ফিশবোল ইফেক্ট’-এ ভোগেন—নিজেকে যেন কাঁচের অ্যাকুরিয়ামের ভেতর থাকা মাছের মতো মনে হয়। ২০১৮ সালের একটি কেস স্টাডিতে নারীরা জানান, তাঁদের মনে হয় সারাক্ষণ কেউ না কেউ তাকিয়ে আছে বা বিচার করছে। ফলে কাজের চেয়ে অনেক সময়ই তাঁদের মনোযোগ চলে যায় নিজের পোশাক, আচরণ কিংবা বাহ্যিক উপস্থিতির দিকে। @ আবুল বাসার

৩৬


আপনার চারপাশের বিষাক্ত বা নেতিবাচক মানুষদের (Toxic People) থেকে দূরে থাকুন

​১. 'হ্যাসলার' (Hasslers) কারা?

গবেষকরা সেই সব মানুষকে 'হ্যাসলার' বলছেন যারা আপনার জীবনে প্রতিনিয়ত মানসিক চাপ বা ঝামেলার সৃষ্টি করে। এরা হতে পারে আপনার কোনো আত্মীয়, বন্ধু বা সহকর্মী যারা আপনার জীবনকে কঠিন করে তোলে।

​২. দ্রুত বার্ধক্য বা বুড়িয়ে যাওয়া:

গবেষণায় দেখা গেছে, আপনার জীবনে যত বেশি এ ধরণের বিরক্তিকর মানুষ থাকবে, আপনার শরীর তত দ্রুত বুড়িয়ে যাবে। গড়ে প্রতি একজন এমন 'হ্যাসলার' বা ঝামেলার মানুষের কারণে আপনার জৈবিক বয়স স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১.৫% দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

​৩. পরিবারের সদস্যদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি:

আর্টিকেলটিতে বলা হয়েছে, যদি এই বিরক্তিকর মানুষটি আপনার পরিবারের কোনো সদস্য হন, তবে তার প্রভাব আপনার শরীরের ওপর সবচেয়ে বেশি পড়ে। কারণ পরিবারের সদস্যদের এড়িয়ে চলা কঠিন এবং তাদের সাথে মানসিক টানাপোড়েন দীর্ঘস্থায়ী হয়।

​৪. স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব:

এই অতিরিক্ত মানসিক চাপের ফলে শরীরের ভেতরে প্রদাহ (Inflammation) বাড়ে এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এর ফলে হৃদরোগ, স্মৃতিভ্রম (Dementia) বা ক্যান্সারের মতো রোগের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, একজনের অতিরিক্ত হ্যাসলারের উপস্থিতিতে একজন মানুষ ক্যালেন্ডারের এক বছরে প্রায় ১.০১৫ বছর সমপরিমাণ জৈবিক বার্ধক্যের শিকার হন।

​৫. ব্যতিক্রম:

মজার ব্যাপার হলো, গবেষণায় দেখা গেছে যে জীবনসঙ্গী বা স্বামী/স্ত্রীর সাথে ঝামেলা থাকলেও তা বার্ধক্যের ওপর অতটা প্রভাব ফেলে না, যতটা পরিবারের অন্যান্য সদস্য বা বাইরের মানুষের ক্ষেত্রে দেখা গেছে। এর কারণ হতে পারে দাম্পত্য সম্পর্কের গভীরতা এবং সেখান থেকে পাওয়া সমর্থন।

♦️সুস্থ থাকতে এবং দীর্ঘকাল তারুণ্য ধরে রাখতে কেবল ভালো খাবার বা ব্যায়ামই যথেষ্ট নয়; বরং আপনার চারপাশের বিষাক্ত বা নেতিবাচক মানুষদের (Toxic People) থেকে দূরে থাকা অথবা তাদের সাথে মানসিক দূরত্ব বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।

​সহজ কথায়—আপনার জীবন থেকে যত বেশি ঝামেলাপূর্ণ মানুষ কমাতে পারবেন, আপনার শরীর তত কম বুড়িয়ে যাবে!

সূত্র: টেলিগ্রাফ


৩৭



আপনি কাজ করেন বেশি, কিন্তু এগিয়ে যায় অন্যরা কেন?

কর্পোরেট দুনিয়ায় কিছু সত্য আছে, যেগুলো বইয়ে লেখা থাকে না, ট্রেনিংয়ে শেখানো হয় না । আপনি যদি অতিরিক্ত ভালো মানুষ হন, তাহলে এই উদাহরণগুলো আপনার কাছে খুব চেনা লাগবে।

উদাহরণ–১: “আমি করে দিচ্ছি” সিনড্রোম

বাস্তবতা:

আপনার টিমের একজন রিপোর্ট জমা দেয় না। আপনি বলেন—“থাক, আমি করে দিচ্ছি।” একবার, দুইবার, তিনবার…একসময় পুরো টিম জানে—

🔥 এই কাজটা ওকেই দিয়ে দিলেই হবে।

ফলাফল:

• আপনি রাত ৯টা পর্যন্ত কাজ করেন

• সে ব্যক্তি স্বাভাবিক সময়েই বাসায় যায়

• পারফরম্যান্স রিভিউতে লেখা হয়:

“Team effort was good” কিন্তু নাম আসে না আপনার।


উদাহরণ–২: মিটিংয়ে চুপ থাকা মানুষ

বাস্তবতা:

মিটিংয়ে আপনার মাথায় ক্লিয়ার আইডিয়া আছে, কিন্তু বলেন না—“সিনিয়ররা কি খারাপ ভাববে?” আরেকজন কম জানে, কিন্তু জোরে কথা বলে।

ফলাফল:

• আপনার আইডিয়া পরে অন্য কেউ বলে দেয়

• ক্রেডিট পায় সে

• আপনি থেকে যান “Supportive Team Member”


উদাহরণ–৩: অতিরিক্ত কাজ = প্রমোশন? (ভুল ধারণা)

বাস্তবতা:

আপনি ভাবেন—“আমি যদি সব কাজ নিখুঁতভাবে করি, বস নিজে থেকেই বুঝবেন।” কিন্তু কর্পোরেট সিস্টেম ভাবে— 👉 এই মানুষটা এই রোলেই পারফেক্ট। ওকে সরালে কাজ করবে কে?

ফলাফল:

• কাজ বাড়ে

• দায়িত্ব বাড়ে

• কিন্তু পদবি ও বেতন একই থাকে


উদাহরণ–৪: ‘না’ বলতে না পারা

বাস্তবতা:

আপনার কাজ শেষ। বস বলেন—“এইটাও একটু দেখো।” আপনি জানেন এটা আপনার স্কোপের বাইরে, তবুও বলেন—“জি, দেখছি।”

ফলাফল:

• আপনার মূল কাজের কোয়ালিটি পড়ে যায়

• ভুল হলে দায় আপনার

• আর যিনি কাজটা দেওয়ার কথা, তিনি সেফ


উদাহরণ–৫: ভালো মানুষ, কিন্তু অদৃশ্য

বাস্তবতা:

আপনি ভদ্র, সময়মতো আসেন, কারও সাথে ঝামেলা করেন না। কিন্তু কর্পোরেট দুনিয়ায় 👉 ভদ্রতা নয়, ভিজিবিলিটি পুরস্কৃত হয়।

ফলাফল:

• বস আপনাকে “ভালো ছেলে/ভালো মেয়ে” বলেন

• কিন্তু স্ট্র্যাটেজিক মিটিংয়ে ডাকেন না

• সিদ্ধান্ত হয় আপনার অনুপস্থিতিতেই


উদাহরণ–৬: সব সমস্যার “ফায়ার ফাইটার” আপনি

বাস্তবতা:

যেখানেই সমস্যা ডেডলাইন মিস, ক্লায়েন্ট কমপ্লেইন, বসের প্রেসার—সবশেষে বলা হয়, “ওকে দাও, ও সামলে ফেলবে।”

ফলাফল:

• আপনি হয়ে যান Crisis Manager

• কিন্তু রোল, বেতন, টাইটেল—কিছুই বদলায় না

• সমস্যা সমাধান আপনার দায়িত্ব, সাফল্য কারও না


উদাহরণ–৭: আপনার সময়ের কোনো দাম নেই

বাস্তবতা:

আপনি সবসময় অ্যাভেইলেবল—লাঞ্চ টাইমে কল, ছুটির দিনে মেসেজ, রাত ১১টায় “একটু দেখবেন?”

ফলাফল:

• সবাই ধরে নেয়, আপনি ফ্রি

• আপনার কাজের সময়ের কোনো সীমা থাকে না

• আর যাদের বাউন্ডারি আছে, তারাই “Busy but Important”


উদাহরণ–৮: পারফরম্যান্স রিভিউতে আবেগ কাজ করে না

বাস্তবতা:

আপনি ভাবেন—“আমি তো সব সময় হেল্পফুল, এটা নিশ্চয়ই রিভিউতে কাউন্ট হবে।” কিন্তু রিভিউ শিটে লেখা থাকে শুধু—👉 KPI, সংখ্যা, আউটপুট

ফলাফল:

• আপনার অতিরিক্ত চেষ্টা অদৃশ্য থাকে

• যিনি নিজের কাজ প্রেজেন্ট করতে পারেন, তিনিই এগিয়ে যান


উদাহরণ–৯: ভদ্রতা বনাম আত্মবিশ্বাস

বাস্তবতা:

আপনি খুব পলাইট। কথা বলেন নিচু গলায়, ডিসিশন নিলে আগে সবার অনুমতি চান। অন্যজন কম জানে, কিন্তু বলে—“আমি এটা লিড করব।”

ফলাফল:

• লিডারশিপ যায় তার হাতে

• আপনি থাকেন এক্সিকিউশন লেভেলে

• কারণ কর্পোরেটে Confidence is often mistaken as Competence


উদাহরণ–১০: আপনি না বললে কেউ আপনার জন্য বলবে না

বাস্তবতা:

আপনি মনে করেন—“সময় হলে কোম্পানি নিজে থেকেই ইনক্রিমেন্ট/প্রমোশন দেবে।”কিন্তু অন্যরা সময়মতো বলে—“আমি এই রেজাল্ট এনেছি, নেক্সট স্টেপ কী?”

ফলাফল:

• তারা নেগোশিয়েট করে

• আপনি অপেক্ষা করেন

• কর্পোরেট দুনিয়ায় অপেক্ষা মানেই পিছিয়ে পড়া

📝 কর্পোরেট সত্য

🟢 কর্পোরেট দুনিয়ায় কেউ আপনার সীমা বানিয়ে দেবে না আপনাকেই বানাতে হবে।

🟢 ভালো কাজ করলে কাজ বাড়ে, ভ্যালু প্রেজেন্ট করলে গ্রোথ আসে। 

🟢 চুপ থাকা মানেই ভদ্রতা না অনেক সময় এটা দুর্বলতা হিসেবে ধরা হয়। 


✅ সমাধান

✔ কাজ নিন, কিন্তু স্কোপ ক্লিয়ার করে

✔ সাহায্য করুন, কিন্তু দায়িত্ব নিজের নামে না নিন

✔ কথা বলুন ডেটা ও ফলাফল দিয়ে

✔ ভদ্র থাকুন, কিন্তু নিজের জায়গা ছাড়বেন না

✅ সবচেয়ে Clear, Visible এবং Assertive মানুষরাই এগিয়ে যায়।


৩৮



"Self actualization" 

অধিকাংশ নারী কেন বছরের পর বছর পৈশাচিক নির্যাতন সহ্য করেও সেই ঘর থেকে বের হতে পারেন না? এর সবথেকে বড় কারণ হলো "পরনির্ভরশীলতা"। পেটের দায়ে আর থাকার জায়গার অভাবে অনেক সময় আত্মসম্মানকে বিসর্জন দিয়ে বিষাক্ত ছাদের নিচে পড়ে থাকতে হয়।

চলুন আজ 'ফারজানা'র গল্প শুনি। ফারজানা অনেক শিক্ষিত, কিন্তু বিয়ের পর স্বামীর ইচ্ছায় সে চাকরি করেনি। এখন স্বামী তাকে কথায় কথায় অপমান করে, গায়ে হাত তোলে। ফারজানা যখন প্রতিবাদ করতে চায়, স্বামী সরাসরি বলে দেয়, "আমার খেয়ে আমার পরে আমার ওপর কথা বলিস না, পছন্দ না হলে বেরিয়ে যা।" ফারজানা বের হতে পারে না, কারণ তার নিজের পকেটে এক টাকাও নেই।

এই যে অসহায়ত্ব, এটাই হলো শোষণের মূল হাতিয়ার। আজ আমরা কথা বলব কেন আর্থিক স্বাধীনতা আপনার জীবনের সবথেকে বড় ঢাল এবং কীভাবে আপনি শূন্য থেকে শুরু করতে পারেন।

১. টাকা আপনার মেরুদণ্ড:

আর্থিক স্বাধীনতা মানে শুধু দামী ব্যাগ কেনা নয়, এটি হলো আপনার সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা। আপনার যখন নিজের উপার্জন থাকবে, তখন কেউ আপনাকে চাইলেই অসম্মান করে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দিতে পারবে না। টাকা আপনাকে সেই আত্মবিশ্বাস দেয় যা দিয়ে আপনি চোখে চোখ রেখে বলতে পারেন, "আমি তোমার অন্যায়ের মুখাপেক্ষী নই।" আপনার নিজের টাকা মানে হলো আপনার নিজের নিরাপত্তা।

২. ছোট থেকে শুরু করুন:

অনেকে ভাবেন বড় কোনো চাকরি ছাড়া স্বাবলম্বী হওয়া যায় না। এটি ভুল ধারণা। আপনার যদি হাতের কাজ জানা থাকে, আপনি যদি ভালো রান্না করতে পারেন, কিংবা আপনি যদি কাউকে পড়াতে পারেন, তবে সেখান থেকেই শুরু করুন। ছোট একটি অনলাইন বিজনেস বা ফ্রিল্যান্সিং আপনার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। মনে রাখবেন, ফোঁটা ফোঁটা জলেই সমুদ্র হয়। আপনার উপার্জনের পরিমাণ শুরুতে কম হতে পারে, কিন্তু সেই টাকার স্বাদ হবে সম্মানের।

৩. সঞ্চয়ের অভ্যাস ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা:

বিপদ বলে কয়ে আসে না। সংসারের খরচের পাশাপাশি নিজের জন্য আলাদা একটি তহবিল তৈরি করুন। আপনার সেই জমানো টাকা আপনার বিপদের বন্ধু হয়ে দাঁড়াবে। অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন একজন নারীকে সমাজ বা পরিবার সহজে অবহেলা করতে পারে না। আপনার উপার্জন আপনার সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্যও একটি বড় সুরক্ষা বলয় তৈরি করে।

পরিপক্কতা মানে হলো এটা বোঝা যে, ভালোবাসা আর সম্মান দয়া করে পাওয়া যায় না, এটা অর্জন করতে হয়। আর সেই অর্জনের পথে সবথেকে বড় শক্তি হলো আপনার নিজের সক্ষমতা। আপনি যখন নিজের ভার নিজে নিতে পারবেন, তখনই আপনি প্রকৃত অর্থে স্বাধীন।

আপনি কি আজও ভাবছেন যে কেউ একজন এসে আপনার দায়িত্ব নেবে? সেই রাজপুত্রের গল্প বাদ দিয়ে নিজের জীবনের কারিগর নিজেই হোন। আপনার উপার্জিত প্রতিটি টাকা আপনার আত্মসম্মানের এক একটি ইঁট।




যদি প্রশ্ন করা হয় বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র কোনটি?

সৌদি আরব নাকি ইন্দোনেশিয়া?

অবিশ্বাস্য হলেও উত্তরটি হলো কাজাখস্তান, কাজাখস্তানের আয়তন ২৭ লাখ ২৪ হাজার ৯০০ বর্গকিলোমিটার যা বিশ্বের ৯ম বৃহত্তম দেশ। এই আয়তন দেশটিকে বৃহত্তম মুসলিম দেশ হিসেবে তুলে ধরেছে।

দেশটির বর্তমান জনসংখ্যা ২ কোটি, যার মধ্যে ৭০ শতাংশই ইসলাম ধর্মের অনুসরণ করে। মুসলমানদের  সংখ্যা বেশি হওয়া স্বত্তেও দেশটিতে আজো মসজিদ নির্মাণ ও সামাজিক ধর্মীয়  অনুষ্ঠানগুলো পালনে সরকারি অনুমতি নিতে হয়। এই সংস্কৃতির মূলে রয়েছে বহু বছর পূরনো শোষণ-নীতি।

৮ ম শতাব্দিতে আরবরা দেশটির দক্ষিণ অঞ্চলে প্রথম ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু করেন। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে গোটা কাজাখস্তানে। এসময় কাজাখস্তানে তুর্কি, আরব, উইঘুর ইত্যাদি জাতির সংমিশ্রণে তৈরি হয় কাজাখ জাতি।

এ জাতি ১৮ শতাব্দি পর্যন্ত নিজেদের সংস্কৃতি ধর্ম ও ঐতিহ্যতে সমৃদ্ধ হতে থাকে। বলা হয় সেসময় দেশটিতে ইসলাম ধর্মের প্রসার এমন ভাবে ঘটেছিলো যে মধ্য এশিয়ায় এ জাতির চেয়ে বেশি ধর্ম অনুরগি জাতি আর দু’টি ছিলো না।

কিন্তু ১৮৭৬ সালের মাঝামাঝি সময়টাতে রাশিয়ান জার সম্রাট কাজাখস্তান দখল করে নেয়। তখন থেকে ইসলাম ধর্ম নিয়ন্ত্রণে উঠে পড়ে লাগে রাশিয়ান জার সম্রাটগোষ্ঠী। প্রায় দেড়শ বছর ধরে চলে দমন-পীড়ন।

১৯১৭ সালে রাশিয়ান জার সাম্রাজ্যের পতনের পর কাজাখস্তান চলে যায় কমিউনিজমের অধীনে। রাজা যায় রাজা আসে কিন্তু শো*ষনের ধরণ পরিবর্তন হয়নি। কমিউনিস্ট পার্টি ইসলাম ধর্ম প্রচার এবং প্রসারে নিয়ন্ত্রণ তখনো জারি ছিলো।

সে সময়টাতে দেশের কোথাও মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নিতে গেলে অবশ্যই সোভিয়েত কমিউনিস্ট ক্ষমতাসীনদের অনুমতি নিতে হতো। অনুমতির বাইরে যেসব মসজিদ গড়ে উঠেছিল সেসব ভেঙে ফেলা হয়েছিলো। 

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়, স্বাধীন হয় কাজাখস্তান। স্বাধীন কাজাখাস্তানে ধর্মীয় কার্যকলাপের উপর সব বিধি নিষেধ উঠে না গেলেও অনেকাংশই এখনো আগের মতই আছে।

মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণের ক্ষেত্রে কাজাখাস্তানিদের আজো অনেক বেগ পোহাতে হয়; আজো নিতে হয় সরকারি অনুমতি। অথচ সেসব মসজিদগুলো পুরোপুরি ভাবে-ই মুসলিম জনসাধারণের উদ্যোগে তৈরি হয়। সেখানকার মুসলমানদের মাঝে ধর্মীয় সচেতনতা, ইসলামি সংস্কৃতি ও আকিদা শিক্ষার ক্ষেত্রে কেন্দ্রবিন্দুর ভূমিকা পালন করে মসজিদ্গুলো। @ Tapsh Chatterjee,


৪০

সন্দেহ কোনো দুর্বলতা নয় বরং এটি এমন এক শক্তি, যা মানুষকে চিন্তা করতে বাধ্য করে

১৬৪৭ সালে ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া পিয়ের বায়েল, যিনি ১৭০৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন, ছিলেন ইউরোপের বুদ্ধিবাদী চিন্তার এক গুরুত্বপূর্ণ পথপ্রদর্শক। ধর্মীয় সংঘাত ও অন্ধ বিশ্বাসে ভরা এক সময়ে দাঁড়িয়ে তিনি এমন এক প্রশ্ন তুলেছিলেন, যা আজও সমান প্রাসঙ্গিক

তার সময়ে ইউরোপজুড়ে ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে তীব্র সংঘাত চলছিল। এই প্রেক্ষাপটে বায়েল সাহস করে বলেন—মানুষ ভুল করতেই পারে, তাই কোনো বিশ্বাসকে অন্ধভাবে গ্রহণ না করে তাকে পরীক্ষা করা উচিত। তিনি ধর্মীয় সহনশীলতার পক্ষে কথা বলেন এবং যুক্তিকে মানবজীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে চান।

বায়েলের মতে, সন্দেহ কোনো দুর্বলতা নয়। বরং এটি এমন এক শক্তি, যা মানুষকে চিন্তা করতে বাধ্য করে। যখন আমরা প্রশ্ন করি—তখনই আমরা সত্যের দিকে এগোই। কারণ অন্ধ বিশ্বাস মানুষকে স্থির করে দেয়, আর সন্দেহ তাকে সচল রাখে।

আজকের ডিজিটাল যুগে এই চিন্তা আরও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা যায়, ভুয়া খবর বা ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে তখনই, যখন মানুষ যাচাই না করে বিশ্বাস করে। অর্থাৎ সন্দেহের অভাবই মিথ্যাকে শক্তিশালী করে।

তবে বায়েল কখনোই নৈরাজ্যবাদী সন্দেহের পক্ষে ছিলেন না। তিনি এমন সন্দেহের কথা বলেছেন, যা যুক্তি ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে সত্যকে খুঁজে পেতে সাহায্য করে। এই ধরনের সন্দেহই জ্ঞানকে গভীর করে এবং মানুষকে সচেতন করে।

শেষ কথা—সত্য কখনোই ভয় পায় না প্রশ্নকে। বরং প্রশ্নই তাকে পরিষ্কার করে, শক্তিশালী করে। তাই সন্দেহ যদি যুক্তির আলোতে পরিচালিত হয়, তবে সেটিই সত্যের সবচেয়ে কাছের পথ। @ অনন্তলোকেরস্পর্শ


৪১


সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার লাইট থেরাপি

শীতের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দিন ছোট হয়ে আসে এবং সূর্য দ্রুত অস্ত যায়। এই আবহাওয়ার পরিবর্তন একেকজনের ওপর একেকভাবে প্রভাব ফেলে। কেউ কেউ এই ধীরগতির জীবন উপভোগ করলেও অনেকের জন্য তা ক্লান্তিকর ও বিষণ্ণতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একে সাধারণভাবে ‘উইন্টার ব্লুজ’ বলা হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি পরিচিত সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার (এসএডি) নামে।

২০২৪ সালে আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের এক গবেষণায় দেখা যায়, গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ৪০ শতাংশ ব্যক্তির শীতকালে মেজাজ বা মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটে। নারীদের মধ্যে এই অবনতির হার পুরুষদের তুলনায় বেশি। এর ফলে মানুষের কর্মশক্তি কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ঘুম পাওয়া এবং ওজন বৃদ্ধি পাওয়াসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়।

এই শীতকালীন বিষণ্ণতা কাটাতে বর্তমানে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে লাইট থেরাপি। লাইট থেরাপি ল্যাম্প হলো এমন একটি যন্ত্র, যা প্রাকৃতিকভাবে সূর্যের আলোর মতো আলো ছড়ায়। লাইট থেরাপি ল্যাম্প শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম বা অভ্যন্তরীণ ঘড়ি ঠিক রাখতে সাহায্য করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, লাইট থেরাপি ল্যাম্পের ৫ থেকে ১০ হাজার লাক্স উজ্জ্বলতার আলো মস্তিষ্কের সেরোটোনিন ও ডোপামিন নিঃসরণ বাড়ায় এবং মেলাটোনিন নিয়ন্ত্রণ করে, ফলে মেজাজ ভালো থাকে ও ঘুমের সমস্যা কমে।

ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট লিসা স্ট্রোম্যানের মতে, পরিসংখ্যানগতভাবে এই যন্ত্র অ্যান্টি-ডিপ্রেশন ওষুধের মতোই কার্যকর হতে পারে। তবে ওষুধের মত লাইট থেরাপিও নিয়ম মেনে ব্যবহার করা জরুরি। শীতের সময় ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথম ৩০ মিনিট এটি ব্যবহার করা সবচেয়ে বেশি কার্যকর। @ Rupayan Chowdhury 


৪২



ফুড পয়জনিং বা খাদ্যে বিষক্রিয়া

ফুড পয়জনিং বা খাদ্যে বিষক্রিয়া হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে দূষিত, পচা ও জীবাণুযুক্ত খাবার বা পানি গ্রহণের ফলে শরীরে অস্বস্তি ও অসুস্থতা দেখা দেয়। সাধারণভাবে বললে, দূষিত বা নষ্ট খাবার খেলে যে অসুস্থতা হয়, সেটিই হলো ফুড পয়জনিং।

প্রধানত, খাবারে জীবাণুর আক্রমণের কারণেই ফুড পয়জনিং হয়। অপরিষ্কার পরিবেশ, দূষিত পানি, অস্বাস্থ্যকর রান্না ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খাবারে জীবাণু প্রবেশ করে। খাবার যদি ৪° সেলসিয়াস থেকে ৬০° সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে দীর্ঘক্ষণ থাকে, তবে এই অবস্থাকে ডেঞ্জার জোন বলা হয়। কারণ, এই তাপমাত্রায় ব্যাকটেরিয়া খুব দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে।

বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও পরজীবী খাদ্যকে দূষিত করতে পারে। যেমন: Salmonella, E. coli, Norovirus, Rotavirus, Giardia lamblia ইত্যাদি। আবার, কীটনাশক, ফরমালিন বা অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থযুক্ত খাবারও কোষে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। এসব কারণে খাবার শরীরে গেলে অন্ত্রে প্রদাহ হয়, পানি ও ইলেক্ট্রোলাইট কমে যায়। ফলে ডায়রিয়া, বমি ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়।

অস্বাস্থ্যকরভাবে খাবার রান্না ও সংরক্ষণ করলে, খাবার দীর্ঘক্ষণ বাইরে রেখে দিলে, ভেজাল বা মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার খেলে ফুড পয়জনিং হতে পারে। মূলত স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাবেই ফুড পয়জনিং হয়।

ফুড পয়জনিংয়ের বিভিন্ন লক্ষণ রয়েছে। যেমন: বমি ও বমিভাব, পেটব্যথা, ডায়রিয়া, শরীর দুর্বল লাগা, হালকা বা মাঝারি জ্বর, পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন ইত্যাদি।

একবার ফুড পয়জনিং হয়ে গেলে পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। এসময় হালকা খাবার খেতে হবে। অতিরিক্ত মশলা ও চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। পাশাপাশি বিশ্রাম নিতে হবে। আর অবস্থা গুরুতর হলে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।

ফুড পয়জনিং প্রতিরোধের জন্য সব সময় স্বাস্থ্যসম্মতভাবে খাবার রান্না ও সংরক্ষণ করতে হবে। রান্না এবং খাওয়ার আগে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিতে হবে। কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখতে হবে। পাশাপাশি নষ্ট এবং মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার ত্যাগ করতে হবে।

সচেতনতার মাধ্যমে সহজেই ফুড পয়জনিং প্রতিরোধ করা যায়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও খাদ্য সচেতনতা অনুসরণ করলে ফুড পয়জনিংয়ের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। তাই সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে হলে অবশ্যই খাবারের ক্ষেত্রে একটু বেশি সচেতন হতে হবে। @ Rupayan Chowdhury 

তথ্যসূত্র: https://bn.wikipedia.org/wiki/খাদ্যে_বিষক্রিয়া


৪৩

 গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনভূমি বা রেইনফরেস্ট

পৃথিবীকে শীতল রাখতে এবং পৃথিবীর কার্বন ভারসাম্য রক্ষায় গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনভূমি বা রেইনফরেস্টের ভূমিকা অপরিসীম। গাছপালা বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে নিজেদের কাণ্ড ও শাখায় জমা রাখে, যা ‘কার্বন সিঙ্ক’ নামে পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি রেইনফরেস্ট এখন উল্টো কাজটি করছে, অর্থাৎ কার্বন শোষণের তুলনায় এটি কার্বন নিঃসরণই বেশি করছে।

গত ১৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান জার্নাল নেচার-এ প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রেইনফরেস্টের প্রায় ১১ হাজার গাছের ওপর চালানো প্রায় ৫০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই বনের গাছপালাগুলো এখন যতটুকু কার্বন শোষণ করছে তার চেয়ে বেশি কার্বন বাতাসে ছাড়ছে। ১৯৭১ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে এই বন প্রতিবছর একরপ্রতি গড়ে প্রায় ৫৫৩ পাউন্ড কার্বন শোষণ করত। কিন্তু ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে একই পরিমাণ এলাকায় কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৩০ পাউন্ডে। এটি বিশ্বের প্রথম কোনো রেইনফরেস্ট যা কার্বন শোষক থেকে কার্বন উৎসে পরিণত হওয়ার উদাহরণ স্থাপন করলো।

গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, বনে গাছের মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। সাধারণত গাছ মারা গেলে, পচনের মাধ্যমে গাছের সঞ্চিত কার্বন পুনরায় বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসে। তবে এই অঞ্চলের মৃত গাছগুলোর ক্ষেত্রে এমনটি যথাযথভাবে ঘটছে না। এর পিছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। এই গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক হান্নাহ কার্লের মতে, শুষ্ক বাতাস, উচ্চ তাপমাত্রা এবং খরা—এর সবই গাছ দ্রুত মরে যাওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়াও চরম আকার ধারণ করেছে। ফলে তীব্র ঘূর্ণিঝড়সহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রবণতা বেড়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ঘূর্ণিঝড়ের কারণে গাছের মৃত্যু, রেইনফরেস্টের কার্বন ধারণক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

হান্নাহ কার্লের মতে, অস্ট্রেলিয়ার এই রেইনফরেস্ট বিশ্বের অন্যান্য রেইনফরেস্টের ভবিষ্যতের জন্যও এক সতর্ক সংকেত। গবেষকরা মনে করেছেন, যদি এই প্রবণতা পৃথিবীর অন্যান্য রেইনফরেস্টগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে, তবে বৈশ্বিক কার্বন ভারসাম্য মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হতে পারে । এই পরিবর্তন জলবায়ু পরিবর্তনের মাত্রা এবং বন ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার প্রমাণ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং বলা যেতেই পারে, বৈশ্বিক জলবায়ুর স্থিতিশীলতা রক্ষায় পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়ানো অতীব জরুরি।

তথ্যসূত্র: https://www.tbsnews.net/.../internati.../news-details-411476

মূল গবেষণাপত্র: https://www.nature.com/articles/s41586-025-09497-8



৪৪


নদীর গতিপথ পরিবর্তন আর নদীভাঙন

বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। তাই এখানে নদীর গতিপথ পরিবর্তন এবং নদীভাঙন ভৌগোলিক, ভূতাত্ত্বিক ও জলবায়ুগত কারণে খুবই সাধারণ ঘটনা। প্রথমেই নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণগুলো উল্লেখ করি। মূলত অতিরিক্ত পলি জমা হওয়ার কারণেই এদেশে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়। আমাদের দেশে পাহাড়ি এলাকা থেকে আসা বালি, কাদা ও পলি নদীর তলদেশে জমে যায়। ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাঁক খেয়ে অন্যদিকে মোড় নেয়। বর্ষাকালে নদীতে পানি বেড়ে গেলে স্রোতের চাপ বেশি হওয়ায়ও নদীর গতিপথে পরিবর্তন আসতে পারে। টেকটোনিক বা ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনও নদীপ্রবাহের দিক বদলাতে পারে। বাঁধ, সেচ প্রকল্প, ড্রেজিং বা নদী দখল করা ইত্যাদি কারণেও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়। তাছাড়া বাংলাদেশের বেশিরভাগ নদী বাঁকানো, তাই সময়ের সাথে সাথে বাঁক বড় হয়েও নদীর গতিপথ বদলায়।

ভূ-পদার্থবিদ ড. মাইকেল স্টেকলার তার ২০১৬ সালের এক গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষ কীভাবে গাঙ্গেয় গঙ্গার বদ্বীপ এলাকার চেহারা বদলে দিয়েছিল। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে ভূমিকম্পে বদলে গিয়েছিল গঙ্গার গতিপথ। উল্লেখ্য যে, গঙ্গাই ব্রহ্মপুত্র নদ হয়ে বাংলাদেশের বৃহত্তম নদী মেঘনার সঙ্গে মিলিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে।

নদীর গতিপথ পরিবর্তন আর নদীভাঙনের কারণ প্রায় একই। তাই স্বাভাবিকভাবেই নদীর গতিপথ পরিবর্তনও নদীভাঙনের একটি বড় কারণ। বর্ষাকালে পানির প্রবল স্রোতও নদীতীরের ভূমিকে ক্ষয় করে নদীভাঙন ঘটায়। তাছাড়া এদেশের নদীর তীরের ভূমির গঠন দুর্বল, তাই সহজেই ভেঙে যায়। তার উপর নদীতীর সংলগ্ন গাছগাছালি কেটে ফেলায় নদীতীরের ভূমির গঠন দুর্বল হয়। অবৈধ বালু উত্তোলন ও পরিকল্পনাবিহীন বাঁধ নির্মাণও নদীভাঙনের কারণ।

নদীভাঙন আর নদীপথ পরিবর্তনের বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণ থাকলেও মানবসৃষ্ট কারণগুলো একটি বড় ভূমিকা পালন করে। তাই উক্ত ঘটনাগুলো ঠেকাতে আমাদের সচেতনতা একান্তই কাম্য।

তথ্যসূত্র: ১. https://bn.m.wikipedia.org/wiki/নদীভাঙন



৪৫


আলেক্সান্ডার দ্যা গ্রেট 

আলেক্সান্ডার দ্যা গ্রেট ৩৫৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ৩০ বছর বয়েসে অর্ধেক পৃথিবী জয় করেছিলেন সেটা আমরা অনেকেই জানি, তিনি প্রাচীন গ্রিসের ম্যাসিডনের রাজা ছিলেন এবং ব্যাবিলন জয় করার পরে পারস্য সাম্রাজ্য জয় করেন ও তারপর প্রাচীন ভারতবর্ষ জয় করেন।

আলেকজান্ডার তিনটি বড় ধরনের যুদ্ধ করে ৩৩০ খ্রিস্টপূর্বে পারস্য-নেতা তৃতীয় ডরিয়াসকে পরাজিত  করেন। আলেকজান্ডার পারস্যবাসীর পরাজয় ঘটান ৩৩১ খ্রিস্টপূর্বে। এরপর তিনি অগ্রসর হন আরও পূর্ব দিকে। ভারতের উত্তর-পশ্চিম দিকে।

যে বা যারাই আলেকজান্ডারের কর্তৃত্ব মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, আলেকজান্ডার তাঁকেই পরাভূত করেন। অভিযান চালিয়ে যেতে মুখিয়ে ছিলেন আলেকজান্ডার। কিন্তু সেনাবাহিনী বাদ সাধল। বিশাল সেনাবাহিনীর বাধার মুখে পূর্বমুখী অভিযান বন্ধ করতে বাধ্য হলেন আলেকজান্ডার।

জ্যোতিষী ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন ব্যাবিলনই আলেকজান্ডারের শেষ গন্তব্য

খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ অব্দের মে মাস। সারা বিশ্ব কাঁপিয়ে দেওয়া এই বীরের বয়স তখন ৩২, সিংহাসনে আরোহণের পর এক যুগেরও বেশি সময় কাটিয়ে দিয়েছেন চেনা পৃথিবীর অনেকটা জয় করতে। আলেকজান্ডারের স্বপ্ন ছিল, তাঁর বিশাল এ সাম্রাজ্যের আরও বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃতি ঘটাবেন।

কিন্তু তাঁর সে স্বপ্ন কখনই বাস্তবে রূপ নেয়নি। সেনাবাহিনীর বাধার মুখে কয়েক বছরের সামরিক অভিযান শেষ করে আলেকজান্ডার ফিরে এলেন বাগদাদে। এই সুযোগে তিনি বিশ্রামে যান। আলেক্সান্ডারের পর পর দুই সেনাপতির নাম পাওয়া যায়, একজন সেলুকাস যিনি ভারতবর্ষে কিছুকাল রাজত্ব করেন, আর দ্বিতীয় সেনাপতি ছিলেন প্রথম টলেমি, যার রাজত্ব মিশরে শুরু হয়।

তখন সপ্তম ক্লিওপেট্রা ৬৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন এবং মিশরে টলেমীয় রাজবংশের শেষ সক্রিয় ফারাও ছিলেন।

টলেমীয় রাজবংশ: তার রাজবংশ প্রায় ৩০৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের সেনাপতি প্রথম টলেমির হাত ধরে শুরু হয়েছিল।

সময়কাল: ৬৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে যখন সপ্তম ক্লিওপেট্রার জন্ম হয়, তখন তার পরিবার প্রায় ২৫০ বছর ধরে ক্ষমতায় ছিলেন।

তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে টলেমীয় রাজবংশের অবসান ঘটে এবং মিশর রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।

বিখ্যাত ক্লিওপেট্রা, যাঁর জুলিয়াস সিজার এবং মার্ক অ্যান্টনির সাথে সম্পর্ক ছিল, রাজবংশ প্রতিষ্ঠার প্রায় ২৫০ বছর পর (প্রায় ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে) জন্মগ্রহণ করেন। @ Mir Monaz Haque



৪৬



নিয়ান্ডারথাল মানব প্রজাতি

বর্তমান ইরাক, সিরিয়া এবং তুরস্কের মধ্যবর্তী একটি এলাকায়, যা কুর্দিস্তান নামে পরিচিত, একটি গুহায় সম্প্রতি অতি পুরানো মানব দেহাবশেষ পাওয়া গিয়েছে । এই এলাকাটি বিশেষ আগ্রহের বিষয় ছিল, কারণ এটাকে খুব প্রাচীন মানব প্রজাতির সমাধিস্থল বলে ধরে নেওয়া হতো । বছরের পর বছর অনুসন্ধান চালিয়ে শত শত মানুষের দেহাবশেষ পাওয়া গিয়েছে। আর বৈজ্ঞানিক তদন্তে দেখা গেছে যে কিছু দেহাবশেষ ৭৫,০০০ বছরেরও বেশি পুরানো এবং প্যালিওনথ্রোপোলজিস্টদের (Palaeoanthropologists) শ্রমসাধ্য গবেষণায় শনাক্ত করা হয়েছে যে দেহাবশেষগুলি নিয়ান্ডারথাল নামক মানব প্রজাতির ছিল।

নিয়ান্ডারথালরা ছিল বিবর্তনের অগ্রযাত্রার প্রথম দিকের (কিন্তু প্রাচীনতম নয়) মানব প্রজাতি যারা ১৫০,০০০ থেকে 200,000 বছর আগে আফ্রিকা মহাদেশ থেকে এসেছিল এবং প্রধানত জার্মানির নিয়ান্ডারথাল অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিল। এর মধ্যে কিছু লোক পরবর্তীতে আরও উত্তরে এবং কেউ কেউ দক্ষিণে ইরাক ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় চলে যায়। এই লোকেরা গুহাবাসী ছিল এবং শিকারী ও সংগ্রাহক ছিল, যার অর্থ তারা পশু শিকার করত, হত্যা করত এবং সেগুলিকে খেত, যেমনটি বর্তমান সময়ের বাঘ, সিংহ ইত্যাদি প্রাণী করে থাকে । তবে এলাকার অন্যান্য সরঞ্জামের আবিষ্কার ফলে দেখা যায় যে এই লোকেরা আগুন ব্যবহার করতে শিখছিল এবং তাই সম্ভবত খাবার রান্না করার কৌশল শিখছিল। কবরস্থানের টুকরো এবং হাড়ের টুকরোগুলো কষ্ট করে কঙ্কালটিকে একত্রিত করা হয়েছিল। একজন মহিলার দেহাবশেষ কোনো প্রকারে ভালভাবে সংরক্ষিত ছিল I

আফ্রিকা থেকে আগত আর এক মানব প্রজাতি প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার বছর আগে এই এলাকায় প্রবেশ করে ও নিয়ান্ডারথাল প্রজাতি প্রায় ৩০,০০০ বছর আগে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যায় । হোমোসেপিয়েন্স (Homo sapiens) (আধুনিক মানুষ) নামে পরিচিত এই নতুন প্রজাতিটি আসলে আমাদেরই পূর্বপুরুষ ছিল। তবে এই প্রজাতির মধ্যে কিছু আন্তঃপ্রজনন ছিল বলে ধরা হয়, কারণ নিয়ান্ডারথালদের জিনগুলি কোভিড ভাইরাসকে ভালভাবে প্রতিরোধ করতে সক্ষম ছিল, যেমনটি সাম্প্রতিক কোভিড মহামারীতে প্রদর্শিত হয়েছিল I পূর্ব ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং পার্শ্ববর্তি এলাকার লোকেরা মাত্র কয়েক শতাংশ নিয়ান্ডারথাল জিন বহন করে কোভিড সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে ভালভাবে মোকাবিলা করেছিল। @ আনিসুর রহমান


৪৭



আপনি যখন ঘুমান, আপনার মস্তিষ্ক তখন মোটেই ঘুমায় না। 

ঘুমের শুরুতেই আমরা প্রবেশ করি NREM বা নন-র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট ধাপে। এই সময়ে শরীর গভীর বিশ্রামে চলে যায়, কিন্তু ব্রেন শুরু করে তার ডেটা ম্যানেজমেন্ট। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষণায় দেখা গেছে, সারাদিনে আমরা যা শিখি বা দেখি, তা আমাদের শর্ট-টার্ম মেমোরিতে অস্থায়ীভাবে জমা থাকে। ঘুমের এই গভীর স্তরে ব্রেন সেই তথ্যগুলোকে বাছাই করে। অপ্রয়োজনীয় স্মৃতিগুলোকে ডিলিট করে দেয় এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলোকে ‘হিপোক্যাম্পাস’ থেকে সরিয়ে পাঠিয়ে দেয় মস্তিষ্কের স্থায়ী স্টোরেজ ‘নিও-কর্টেক্স’-এ। অর্থাৎ, আজ আপনি যা শিখলেন, তা যদি রাতে ঠিকমতো না ঘুমান, তবে কাল তা স্থায়ী স্মৃতিতে রূপান্তরিত হবে না।

এরপর আসে ঘুমের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ধাপ "REM (Rapid Eye Movement) স্লিপ"। এই ধাপেই আমরা স্বপ্ন দেখি। এই সময়ে আমাদের ব্রেনের ‘লিম্বিক সিস্টেম’ বা আবেগের কেন্দ্র প্রচণ্ড সক্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমাদের যুক্তিবাদী অংশ ‘প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’ তখন প্রায় নিষ্ক্রিয় থাকে।

বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসায়েন্টিস্ট ম্যাথিউ ওয়াকার (Matthew Walker) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, REM ঘুম হলো আমাদের জন্য এক ধরনের ‘ওভারনাইট থেরাপি’। এটি দিনের বেলা পাওয়া মানসিক আঘাত বা দুশ্চিন্তাগুলোকে প্রসেস করে। ফলে সকালে উঠে আমরা মানসিকভাবে হালকা বোধ করি। স্বপ্ন দেখা মানে স্রেফ ছবি দেখা নয়, এটি হলো মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার এক জাদুকরী প্রক্রিয়া।

এবার আসি এক বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক তথ্যে। ২০১৩ সালে রচেস্টার ইউনিভার্সিটির ডক্টর মাইকেন নেডারগার্ড (Maiken Nedergaard) একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার করেন। তিনি দেখেন, ঘুমের সময় মস্তিষ্কে এক ধরনের বিশেষ ‘পরিষ্কারক ব্যবস্থা’ কাজ শুরু করে, যাকে বলা হয় ‘গ্লিমফ্যাটিক সিস্টেম’ (Glymphatic System)।

দিনের বেলা ব্রেনের কাজের ফলে নিউরনের ফাঁকে ফাঁকে ‘বেটা-অ্যামাইলয়েড’ নামক এক ধরনের বিষাক্ত প্রোটিন বা বর্জ্য জমা হয়। এই বর্জ্য যদি পরিষ্কার না হয়, তবে আলঝেইমারস বা ডিমেনশিয়ার মতো রোগ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। ঘুমের মধ্যে আমাদের মস্তিষ্কের কোষগুলো সংকুচিত হয়ে যায়, যাতে মেরুদণ্ডের তরল বা ‘সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড’ দ্রুত প্রবাহিত হয়ে ব্রেনকে ধুয়ে পরিষ্কার করে দিতে পারে। ঘুমের এই ‘ডিপ ক্লিনিং’ প্রক্রিয়া ছাড়া আমাদের মস্তিষ্ক বিষাক্ত বর্জ্যের স্তূপে পরিণত হতো।

ব্রেন কেবল পরিষ্কারই হয় না, এটি নিজেকে আরও দক্ষ করে তোলে। একে বলা হয় ‘সিন্যাপটিক প্রুনিং’ (Synaptic Pruning)। উইসকনসিন-ম্যাডিসন ইউনিভার্সিটির গবেষক গিউলিও টোনোনি (Giulio Tononi) তার ‘সিন্যাপটিক হোমওস্ট্যাসিস হাইপোথিসিস’-এ দেখিয়েছেন যে, সারাদিন কাজ করার ফলে নিউরনগুলোর মধ্যে হাজার হাজার অপ্রয়োজনীয় কানেকশন তৈরি হয়। ঘুম সেই অপ্রয়োজনীয় ডালপালাগুলোকে ছেঁটে ফেলে দেয় যাতে গুরুত্বপূর্ণ কানেকশনগুলো আরও শক্তিশালী হতে পারে। এটি অনেকটা কম্পিউটার রিফ্রেশ করার মতো, যাতে পরদিন সকালে ব্রেন পূর্ণ গতিতে কাজ করতে পারে।

আপনি কি কখনো লক্ষ্য করেছেন, কোনো কঠিন সমস্যার সমাধান রাতে খুঁজে পাচ্ছিলেন না, কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠেই উত্তরটা মাথায় চলে এলো? এর কারণ হলো, ঘুমের মধ্যে ব্রেন বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন তথ্যের মধ্যে নতুন নতুন সংযোগ তৈরি করে। এটি তথ্যের জট খোলে এবং সৃজনশীল সমাধান খুঁজে বের করে। এই কারণেই অনেক বিজ্ঞানী ও শিল্পী তাদের জীবনের সেরা আইডিয়াগুলো ঘুমের পর বা স্বপ্নের মধ্যে পেয়েছেন।

তাহলে বুঝতেই পারছেন, ঘুম মানে কেবল শরীরটা এলিয়ে দেওয়া নয়। ঘুম হলো মস্তিষ্কের মেরামতি, স্মৃতি সাজানো, বিষাক্ত বর্জ্য পরিষ্কার এবং নিজেকে নতুন করে সাজিয়ে নেওয়ার এক অত্যাবশ্যক বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া।

ঘুমকে অবহেলা করা মানে হলো নিজের ব্রেনকে ধীরে ধীরে অকেজো করে দেওয়া। একটি সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে আপনার রাতের ওই কয়েক ঘণ্টার গভীর ঘুমের মধ্যেই। @ আল মামুন রিটন


৪৮

প্রাকৃতিকভাবেও মানুষ খাপ খাইয়ে নিতে পারে

আর্জেন্টিনার আন্দিজ পর্বতের ৩,৭৭৫ মিটার উঁচুতে অবস্থিত সান আন্তোনিও দে লস কোব্রেস শহরের মানুষ এমন পানি পান করে বেঁচে আছেন, যা একজন সাধারণ মানুষের জন্য হতে পারে মৃ'ত্যু'র কারণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পানিতে আর্সেনিকের নিরাপদ মাত্রা প্রতি লিটারে মাত্র ১০ মাইক্রোগ্রাম। অথচ এই শহরের পানিতে সেই মাত্রা ছিল প্রায় ২০০ মাইক্রোগ্রাম। অর্থাৎ সহনীয় সীমার বিশ গুণ! অন্তত ৭,০০০ থেকে ১১,০০০ বছর ধরে এই চরম বিষাক্ত পরিবেশে টিকে থাকার কারণে এখানকার মানুষদের শরীরে এক অভাবনীয় জেনেটিক মিউটেশন ঘটেছে।

২০১৫ সালে উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা সেখানকার ১২৪ জন নারীর ডিএনএ পরীক্ষা করে দেখেন, তাদের শরীরে 'AS3MT' নামক জিনের একটি বিশেষ রূপান্তর ঘটেছে। এই জিনটি বিষাক্ত আর্সেনিককে দ্রুত ভেঙে কম ক্ষতিকর উপাদানে পরিণত করে, যা অনায়াসে প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। এটি মানব বিবর্তনের ইতিহাসে একটি দারুণ আবিষ্কার, যা প্রমাণ করে প্রাকৃতিকভাবেও মানুষ বিষাক্ত রাসায়নিকের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। (বিজ্ঞান্বেষী)



৪৯


শিয়া সুন্নীর আসল ইতিহাস

শিয়া সুন্নীর কোরান এক। কিছু তর্জমায় পার্থক্য আছে।  শিয়া হলো নবীর বংশধারা। নবীর ওফাতের পর হযরত আলী রা: এর লোকরা বললো, নবী পরের খলিফা ঠিক করে গেছেন। সব সময় নবীর বংশধারা থেকে নেতা হবে। ভিত্তি হবে আধ্যাত্মিকতা ও মর্যাদা। মানে বড় পীর। মানে এক প্রকার রাজতন্ত্র। এ বিতর্কে ফাতেমা আহত হয়ে পরে মারা যায়। এর বাইরে হযরত আবুবকর রা:, ওমর রা:, ওসমান রা: বললো নবী নেতা ঠিক করে যাননি। নেতা সব সময় হবে যিনি বেশি ইসলামিক জ্ঞানী ও জনগণের নেতা।  জনগণ তা নির্ধারণ করবে। এর থেকে শিয়া সুন্নী।

সুন্নীরা এর পর পর দীর্ঘ শাসন ও দেশ জয় করায় সুন্নী সংখ্যা বেড়ে যায়, শিয়া কম। খলিফা নির্বাচন নিয়ে নবীর বংশ হাশেমী ও উমাইয়া গোত্রের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল। খলিফা হযরত ওসমান কোরান গ্রন্থনা করলে আলীর দল সুযোগ পেয়ে কোরান গ্রন্থনা সঠিক হয়নি, অনেক আয়াত পুড়িয়ে দিছে বলে লোকজনকে উস্কে দিলে আলীর সমর্থকরা হযরত ওসমানকে কোরান পড়া অবস্থায় ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। শুরু ওসমান হত্যার বিতর্ক। এ নিয়ে ফেতনা (বিতর্ক, সংঘর্ষ, যুদ্ধ) তে আলীর বিপক্ষ হয় হযরত আয়শা। হয় উটের যুদ্ধ। আয়শার দল হেরে যায় আলীর দলের কাছে। আলী আগেই ওসমান বংশের প্রভাবে মদিনায় থাকতে না পেরে কুফায় রাজধানী নিয়ে যায়। উমাইয়া গভর্ণর সিরয়ায় আলীকে মানে না মুয়াবিয়া। বলছিল আগে ওসমান হত্যার বিচার হতে হবে। আলী তা করেনি। শুরু আলী বনাম মুয়াবিয়ার সিপ্পিন যুদ্ধ। তাতে কেউ জেতেনি। মুয়াবিয়ার শাসন মিশর হয়ে মরক্কো তারপর স্পেন পৌঁছে যায়। পরে মিশরে ফাতেমিদ শিয়া শাসন আসে, তারাই কায়রোকে গড়ে, আইউবিদ শাসন গিয়ে শিয়া মতবাদ বাদ দিলে সব সুন্নী হয়। সুন্নীরাই ফিলিস্তিন দখল করে আনাতোলিয়ার রোমান শাসন দুর করে।

আলী মারা গেলে (৬৬১ সালে) তাঁর ছেলে ইমাম হাসান খলিফা হয়। তবে মুয়াবিয়ার সাথে পেরে না উঠে ৬ মাস পর ক্ষমতা ছেড়ে দেয় যুদ্ধ ছাড়া। তাঁকে মুয়াবিয়া পক্ষ গোপনে তাঁর এক স্ত্রীকে দিয়ে বিষ খাইয়ে মারে ৬৭১ সালে।

হাসান ক্ষমতা ছাড়ার পর ইসলামী শাসন ছিল কেবল মুয়াবিয়া উমাইয়া খিলাফত। আলীর অনুসারীরা আলীর কথার হাদিস নিয়ে তৎপর ছিল, শিয়া শাসন কোথাও ছিল না।

মুয়াবিয়ার ছেলে ইয়াজিদ খলিফা হলে ইমাম হোসেন তাকে মানবে না। তাই ইয়াজিদ ষঢ়যন্ত্র করে। মদিনায় হোসেনের টিকে থাকা কঠিন হয় বৈরী শাসনের জন্য। কুফার আলীপক্ষ তাঁকে কুফা যেতে বলেন। তিনি পরিবার নিয়ে কুফা যান। মদিনা থেকে কুফা ১২/১৪ শ কিলোমিটার, যেতে মাস খানেক সময় লাগে। এরমধ্যে আলীপক্ষ আর ফ্রন্টে থাকেনি, ইয়াজিদ পক্ষ পরিবারটির অধিকাংশকে কারবালা প্রান্তরে নির্মমভাবে হত্যা করলে আলীর অনুসারীরা সিরিয়াস হয়। শিয়া মতবাদ প্রতিষ্ঠা পায় নবী কন্যা ফাতেমার নামে ফাতেমিদ খেলাফতে। তা বেশিদিন টিকেনি।

নবীর চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব বাগদাদে আব্বসীয় শাসন করে উমাইয়া হটিয়ে। তারা শুরুতে শিয়া, পরে যুক্তিতে সুন্নী শাসন করে দীর্ঘদিন।

সাফাবিদ শাসন ইরানে শুরু করেন ১৫০১ সালে। সেই থেকে ইরানে তিনি সুন্নী মত নিষিদ্ধ করে শিয়া মতে ইরানে রাজতন্ত্র শুরু করেন। ১৭৩৬ এর পর নাদিরশাহ ইরান দখল করে। তিনি সুন্নী শিয়ার মাঝামাঝি মতে ছিলেন।  

শিয়ারা নবীর বংশ থেকে। সুন্নীরাও এক জায়গার তবে মতবাদে শিয়ারা কোনঠাসা হয়, শুরুতে রাজতন্ত্র করতে চাইছিল বলে তারা আগাতে পারেনি। আবার ইমাম হাসান হোসেনের নিহত হওয়ার নির্মমতার আবেগে কিছু এলাকায় শিয়া শাসন হয়, ব্যাপক মুসলিমরা শিয়া সমর্থন করেনি।

আফগানে যে শাসন এখন তা শিয়া মতবাদের আমিরাত, অথচ আফগানে ৯০% সুন্নী। ইরানে শিয়া মতবাদে শাসন করতে ইমাম পদ্মতি করে খোমেনি, খামেনি অগণতান্ত্রিক শাসন।

শিয়া বা সুন্নী সবই প্রায় একরকম। কারো আলাদা কোরান নেই। আব্বাসীয় সময়ে সুন্নী হাদিস হয় শাসনের মেজাজ মত। হাদিস গ্রন্থ করতে নবী বলেননি, ৪ প্রধান সাহাবীরাও বলেনি। সহি হাদিস নিয়ে ইসলামে মতভেদ চরমে। অনেকে যেন কোরান থেকে হাদিসকে বড় মনে করে। @ মোহাম্মদ আমিন


৫০


কিশোর বয়সে পর্যাপ্ত ও সময়মতো ঘুম মস্তিষ্কের বিকাশে যুক্ত

গবেষণায় ধারাবাহিকভাবে দেখা গেছে যে কিশোর বয়সে পর্যাপ্ত ও সময়মতো ঘুম মস্তিষ্কের বিকাশ, মনোযোগ ও শেখার ক্ষমতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই বয়সে শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম কিছুটা দেরিতে ঘুমানোর দিকে ঝোঁকে, কিন্তু তবুও নিয়মিত সময় মেনে ঘুমাতে যাওয়া ও পর্যাপ্ত (সাধারণত ৮–১০ ঘণ্টা) ঘুম নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘুমের সময় মস্তিষ্কে দিনের শেখা তথ্যগুলো পুনর্গঠিত ও সংরক্ষিত হয় যাকে মেমোরি কনসোলিডেশন বলা হয়। ফলে যারা নিয়মিত তাড়াতাড়ি ঘুমায়, তাদের মনোযোগ, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং তথ্য মনে রাখার ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর থাকে।

অন্যদিকে, দেরিতে ঘুমানো বা অপর্যাপ্ত ঘুম কিশোরদের মধ্যে ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার দুর্বলতা এবং মুডের সমস্যা বাড়িয়ে দেয়। এসবের প্রভাব সরাসরি তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্সে পড়ে ফলাফল হিসেবে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। বিভিন্ন গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যারা নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম পায় তারা ক্লাসে বেশি মনোযোগী থাকে, শেখার গতি দ্রুত হয় এবং পরীক্ষায় ভালো ফল করার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই কিশোরদের জন্য একটি নির্দিষ্ট ঘুমের রুটিন তৈরি করা, ঘুমানোর আগে স্ক্রিন টাইম কমানো এবং আরামদায়ক ঘুমের পরিবেশ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রেফারেন্স:

American Academy of Sleep Medicine (AASM),