নবী প্রায় নিঃস্ব ছিলেন। যুদ্ধজয়ে প্রাপ্ত সম্পদ যা তাঁর ছিলো, মৃত্যুর পর তা তাঁর কন্যাকে দেওয়া হয়নি। তাঁর একান্ত অনুসারী ও প্রথম খলিফা আবু বকর নিজের সমস্ত সম্পত্তি বায়তুল মাল তথা রাষ্ট্রীয় তহবিল সমর্পণ করেছিলেন। বস্তুতঃ ইসলাম মানেই সমর্পণ।
অ্যানিমেল ফার্ম "যে যায় লংকায় সেই হয় রাবন"
কিছু কথা: জর্জ অরওয়েল যখন তার শেষ উপন্যাসটি লিখেন তখন তিনি বেশ অসুস্থ। Tuberculosis-এ আক্রান্ত। ১৯৪২-৪৩ সালে লেখা এই উপন্যাসটি প্রকাশ হইতে কয়েক বছর লেগে যায়। কারণ কোনো প্রকাশনীই বইটি ছাপাতে রাজি হচ্ছিলেন না। অবশেষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৫ সালে বইটি প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত হওয়ার পরে বিশ্বজুড়ে একদিকে যেমন প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন অন্যদিকে নানা সমালোচনার জন্ম দিয়েছিলেন। রাশিয়া, আমেরিকা, কেনিয়াসহ নানা দেশে বইটিকে নিষিদ্ধ করা হয়। বইটির নাম Animal Firm
১৯৪৫ সালে প্রকাশিত হওয়া একটা বই কেনো ৭০ বছর পরে এসে আজও প্রাসঙ্গিক। কেনো শাসক শ্রেণির কাছে বইটি একটা আতংকের নাম তা যারা বইটি পড়েছন তারাই বুঝবেন। বইটির বিখ্যাত একটি লাইন হচ্ছে – "All animals are equal, but some animals are more equal than others."
বইটি মূলত তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে লেখেছিলেন। জোসেফ স্ট্যালিন যেভাবে রুশ বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে রাশিয়ার বিপ্লবের সাথে গাদ্দারি করতেছিলেন তাই বইটার কেন্দ্রবিন্দুতে আলোচনা করেছেন।
এই বইতে Metaphor এর পাশাপাশি উঠে এসেছে Human Nature, Betrayed Revolution, Dictatorship ইত্যাদি।ঃ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন– সহজ কথা কইতে আমায় কহযে, সহজ কথা কওন যায়না সহজে।
অর্থাৎ যা কিছু সহজ তা সহজে বর্ণনা করা যায়না।
উপন্যাসের ফার্মের নাম ছিলো Manor firm.
এই ফার্মের শাসক মি. জোনস ছিলেন অত্যাচারী। ফার্মের পশুদের তিনি সব সময় নির্যাতন করতেন।দিনের পর দিন নির্যাতনের স্বীকার হয়ে একদিন বৃদ্ধ, জ্ঞানী শূকর Major সবাইকে ডাকলেন। বললেন প্রতিবাদের কথা। আক্রমণের শিকার হয়ে মি. জোনস ফার্ম ছেড়ে পালালেন। ফার্মের নাম পরিবর্তন করা রাখা হলো–Animal Firm.
কিছুদিন ভালো যাওয়ার পর সাধারণ পশুরা বুঝতে শুরু করে যে Napoleon নামক এক পাগলা শূকরের কাছে ফার্মের নেতৃত্ব চলে গেছে। যে মূলত অত্যাচারী হয়ে উঠতেছেন।অনেকটা "যে যায় লংকায় সেই হয় রাবন" এমন।
নেপোলিয়নের সাথে জুটে আরো কিছু শূকর। যারা সারাদিন খেত আর ঘুমাতো। ওদের কাজ ছিলো তোষামোদ করা আর সাধারণ পশুদের নির্যাতন করা। সাধারণ পশুরা বুঝতে শুরু করলো যে তাদের জীবন আগে যেমন ছিলো তেমন আবার হয়ে গেছে। কিছু ক্ষেত্রে আগের চেয়েও খারাপ অবস্থায়।
এদিকে শাসক নেপোলিয়নকে এসব বলে কোনো লাভ নাই। তার আশেপাশের শূকরগুলো ছাড়া তিনি কারো কথাই শুনেন না।
উপন্যাসের ঘোড়া Boxer আর ক্লোভার ছিলো আমাদের সাধারণ জনগণের মতো। সারাদিন তারা খাটুনি করতো আর ভাবতো একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। ফার্মটিতে সুশাসন চলে আসবে। কিন্তু অবস্থা পাল্টায় না।
একটা সময় নেপোলিয়নের শূকররা আঁতাত করে মানুষের সাথে। শূকরগুলো মানুষের সাথে কার্ড খেলে, পার্টি করে ইত্যাদি। সাধারণ পশুরা আবিষ্কার করে যাদের বিরুদ্ধে বিপ্লব হয়েছিলো তারাই আবার ফিরে এসেছে নতুম রূপে। কারণ তারা শূকর আর মানুষের মধ্যে আর পার্থক্য খুঁজে পান না।
বিপ্লবের পরে বিপ্লবীরা ক্রমশ স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে।
এই উপন্যাসের বিখ্যাত ইনসাইট হলো- কীভাবে ভাষা হয়ে উঠতে পারে ম্যানিপুলেশন টুলস।
নেপোলিয়নের সাগরেদ স্কুইলার ছিলো একজন propagandist। অত্যাচার শাসকের কথাকে নানা টুইস্ট করে বলতো। আবেগ মিশিয়ে সাধারণ পশুদের বোকা বানাতো। যে কারণে বিপ্লব পরবর্তী সময়ে All Animal are equal থেকে হয়ে উঠে All animals are equal, but some animals are more equal than others. মানে সবাই সমান ঠিক আছে তবে কেউ কেউ একটু বেশি আলাদা।
Animal firm মূলত শোষিত বা oppressed দের সাইকোলজি expose করে। উপন্যাসের ঘোড়া Boxer মূলত আমরাই। যারা বারবার নিপীড়িত হওয়ার পরেও ভাবে একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে Animal firm এর Boxer এর পরিণতি এটাই বুঝায় যে স্বৈরাচাররা শুধু violence করেই টিকে থাকে ব্যাপারটা এমন না। তারা টিকে থাকে মানুষের ভয় ও আবেগকে কেন্দ্র করে। যেখানে মূলত শাসককে প্রশ্ন না করে সহ্য করে থাকে সাধারণরা ক্ষমতা যার হাতেই থাকুক না কেনো সব শাসকের শোষণ মূলত একই রকম। Power কীভাবে Human সাইকোলজিকে ডোমিনেট করে সেটাই বলে এই উপন্যাস।
২) Animal Firm যারা পড়েছেন তারা দেখবেন এই উপন্যাসের প্রাণীরা কখনোই প্রশ্ন করেনাই শাসকশ্রেণিকে। সব সময় স্লোগানে গলা মিলিয়েছে। শূকররা যা বলেছে তাতেই সাধারণ পশুরা গলা মিলিয়েছে। একে সাইকোলজির ভাষায় বলে Herd Mentality.
Animal firm এর প্রাণীরা অর্থ না বুঝেই বলে যেত – Four legs good, two legs bad.
আমাদের আশেপাশের পলিটিকাল লিডাররা বা তাদের এজেন্ডা অধিকাংশই ম্যানিপুলেটেড। যার খেসারত দিতে হয় সাধারণ জনগণকে।
Every Revolutionary ends up becoming an oppressor.
৩) ইসলামে এই নজির ভালো করে দেখা যায়। আমরা উমার রা. কে চিনি একজন কঠোর শাসক হিসেবে। তবুও তার অধীনস্থরা তার চোখে চোখ রেখে সব সময় প্রশ্ন করতেন। বিপ্লব পরবর্তী সময়ের শাসকের অবস্থা Animal Firm এর নেপোলিয়নের মতো কিভাবে হয়, তা দেখানো হয়েছে।
জর্জ অরওয়েলের
অ্যানিমেল ফার্ম (ডিটেইলড রিভিউ )
যে বইটা সবার পড়া উচিত কারণ এই বইকে বলা হয় পৃথিবীর সেরা বইগুলার একটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এই বইয়ের ডিমান্ড এত ছিল যে ১৯৪৫ এর পরে এই বই ছাপানোর জন্য দরকারী কাগজ পাওয়া যেত না এবং শত শত ভাষায় এই বইয়ের অনুবাদ হয়েছে। এই বই অনেক স্কুলেও পড়ানো হয় । তবে এটি জ্ঞানীদের জ্ঞান চর্চার কোনো বই নয়। এটা একটা রূপকথার বই। রূপকথার বই এত জনপির কিভাবে? তা জানতে হলে পুরো কাহিনীটা অতি মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে।
কাহিনী শুরু:
অ্যানিমেল ফার্মের গল্পটা কাহিনী শুরু ইংল্যান্ডের একটা ফার্মে। জোন সাহেব যিনি এই ফার্মের মালিক, তিনি এবং তার বউ মাত্র সারাদিন কাজকর্ম করে ফার্মে ঘুমাচ্ছেন। ঘুমানোর সাথে সাথেই ওই ফার্মের সব পশুপাখি কথা বলা শুরু করল। ফার্মের সবচেয়ে জ্ঞানী যে শুকরটা সেই শুকরটা একটা স্বপ্ন দেখেছে এবং এই স্বপ্নের ব্যাপারে সে 'ফার্মের বাকি সব অ্যানিমালদের' জানাইতে চায়। সবাই তাড়াতাড়ি ছুটে আসলো এবং চারিদিকে সাজ সাজ রব পড়ে গেল যে, গত রাতে শুকর সাহেব একটা স্বপ্ন দেখেছেন এবং এই স্বপ্নের ব্যাপারে সে আমাদের সবাইকে জানাইতে চায়। ঘোড়া আসলো, হাঁস আসলো, মুরগি আসলো, কুকুর আসলো, অন্যান্য শুকররা আসলো, আরো আসলো যত যত যত এনিমাল ছিল ফার্মের ভিতরে, ইভেন ফার্মের উপর দিয়ে যেসব পাখি উড়াউড়ি করতো; কাক, কবুতর, হাঁস তারা সবাই আসলো। সবাই আগ্রহী যে, স্বপ্নে আসলে উনি কি দেখেছে?
শুকর সাহেব বলা শুরু করলেন।-দেখো বন্ধুরা আমি অনেকদিন বেঁচেছি আমি অনেক কিছু দেখেছি জীবনে এবং আমার মনে হয় না, আমি আর খুব বেশিদিন বাঁচবো। আমি মরার আগে তোমাদের কিছু ব্যাপার বলে যাইতে চাই। আমাদের জীবনের মানেটা আসলে কি? একটু চিন্তা করে দেখো। আমরা অ্যানিমেলরা, আমরা জন্মের পর এক বছর বা ছয়/সাত মাসের মত একটু আনন্দের জীবন পাই এবং তারপরেই আমাদের যখন পূর্ণ বয়স হয়ে যায়, তখন থেকেই আমাদেরকে লেবার কিসেবে ব্যবহার করা হয়। আমরা ঘোড়া হলে আমাদের উপরে মানুষ চড়ে; গরু হলে আমাদের দিয়ে হাল চাষ করায় এবং আর যদি দুর্ভাগ্যবশত হাস-মুরগি হই, তাহলে আমাদের মেরে ফেলা হয় খাওয়ার জন্য। আর এসব কিছু করে মানুষ। মানুষ হল সবচেয়ে আজাইরা জাতি, যারা শুধু বুদ্ধি খাটিয়ে আমাদের উপরে ছড়ি ঘুরায়।
তোমরা চিন্তা করে দেখো; মানুষ দুধ দিতে পারে না, গরু পারে। মানুষ ডিম পারতে পারে না, মুরগি পারে। যদি আমরা এনিমালরা না থাকতাম, তাহলে মানুষ কিছুই করতে পারতো না। কিন্তু তারপরেও মানুষ আমাদেরকে দিয়ে সবকিছু করায়। আমাদেরকে মারে, ইচ্ছামতো চলাফেরা করার স্বাধীনতা দেয় না এবং যখন মন চায় আমাদের হত্যা করে খায়। তোমরা চিন্তা করে দেখো তো, আমরা এত যে ফসল ফলাই, এত চাষবাস করে এত খাদ্য তৈরি করি, যদি মানুষ না থাকতো, এত খাদ্য আমরা খেয়ে কোনদিন শেষ করতে পারতাম না। হাজার হাজার, লাখ লাখ, কোটি কোটি অ্যানিমালস খুব আরামে থাকতে পারতো। তাই এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার। এভাবে চলতে পারে না। আমাদের একটা গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লব করতে হবে। তোমরা কি বিপ্লব করার জন্য প্রস্তুত? সব অ্যানিমালরা একদম সঙ্গে সঙ্গেই চিৎকার করে ওঠে। হ্যাঁ প্রস্তুত। কারিশমাটিক নেতার এমন জোরালো বক্তব্য শুনে সবাই খুব উজ্জীবিত হইয়ে উঠল যে, হ্যাঁ আসলেই তো? এভাবে তো চলতে দেয়া যাবে না। আমরা সব করি, মানুষ কেন আমাদেরকে এভাবে শোষণ করবে? আমরা একটা বিপ্লব শুরু করব। শুরু হলো স্লোগান আর স্লোগান।
এত স্লোগান, চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হলো যে, ফার্মের মালিক জোন সাহেব, যিনি ঘুমিয়ে গিয়েছিল, উনার ঘুম তো ভেঙে যায় এবং উনি বন্দুক নিয়ে নিচে নেমে আসে দেখার জন্য যে এত চিল্লাচিল্লি কারা করছে। উনি বন্দুক নিয়ে নেমে আসছে দেখে এনিমেলরা তখন সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং সবাই যার যার মত করে পালিয়ে যায়, ঘুমিয়ে পড়ে। এভাবে বিপ্লবের প্রথম রাত শেষ হয় এবং তার ঠিক তিন রাত পরে যেই স্বপ্নটা দেখিয়েছিল সেই শুকর সাহেব মারা যায়। শুকর সাহেব মারা গেলেন কিন্তু উনি যে স্বপ্ন দেখিয়ে গিয়েছিল, এই স্বপ্ন কিন্তু এনিমলদের মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকল। প্রত্যেক রাতে, প্রত্যেক সপ্তাহেই গোপন মিটিং হয়। এই যে এনিমলরা একটা আন্দোলন করবে, একটা রেভলিউশন করবে মানুষের অধীনতা থেকে নিজেদের মুক্ত করব; এই ব্যাপারটার একটা নাম দেওয়া হলো- অ্যানিমালিজম। প্রথম দিকে সবকিছু ঠিকঠাক ছিল।
সবাই একমত, মানুষ আমাদের অনেক শোষণ করে; আমরা স্বাধীন চাই কিন্তু কিছুদিন পরেই ভিন্ন ভিন্ন জাতের এনিমলদের কাছ থেকে অদ্ভুত অদ্ভুত প্রশ্ন আসা শুরু হলো। একটা ঘোড়া জিজ্ঞেস করে যে, আচ্ছা যদি আমরা স্বাধীন হয়ে যাই এবং যদি আমরা সব মানুষকে তাড়িয়ে দিই বা মেরে ফেলি, তাহলে আমি কি চিনি খেতে পারবো? শুনেছি চিনি খুব মিষ্টি। বাকিরা তখন সবাই বলল যে, ধুর তুই হইলি এনিমেল। চিনি তো কোনো এনিমলের খাবার নয়। চিনি তো সরাসরি মাটির থেকে বা গাছের থেকে হয় না। তাই তুই চিনি পাবি না কিন্তু তারপরেও তোকে এই আন্দোলনের সমর্থন দিতে হবে। কারণ আমরা এখন যে গোলটা অর্জন করার চেষ্টা করছি, এটা তোর চিনি খাওয়ার চেয়ে অনেক অনেক বড়। তুই সারা বছর শুয়ে-বসে খাবি। আফটার অল, তুই তো আবার শুইতে-বসতে পারোস না। যাক, এসব নিয়ে পরে কথা হবে, আপাতত আমাদের গোল একটা, দফা একটা; আমরা মানুষের থেকে মুক্তি চাই। বিদ্রোহের আগুন পশুদের মধ্যে দানা বাঁধতে থাকে এবং এর মধ্যেই একটা ঘটনা ঘটে। একদিন জোন্স সাহেব রাত্রে বেলা অনেক মদ খেয়ে শহর থেকে ফেরত আসে বাসায় এবং মাতাল হওয়ায় ওনি ওইদিন এনিমেলদের খাবার দিতে ভুলে যায়। এর আগেও এরকম অনেক বার হয়েছে। কিন্তু এভার পুঞ্জিভুত ক্ষোভ, এই যে এতদিনে তাদের ভিতর জমে উঠা ক্ষোভ, এই যে ঠিকমত জাস্টিস না পাওয়ার ক্ষোভ, এই সব ক্ষোভ মিলে খাবার না দেবার ব্যাপারটায় সবাই স্ফুলিঙ্গর মত উত্তেজিত হয়ে উঠলো। গরুরা প্রথমে বের হয়ে আসে দড়ি ছিড়ে, যে আমাদেরকে কেনো খাবার দেয়া হয়নি। এ অন্যায় আমরা সহ্য করব না।
গরুদের দেখে ঘোড়ারাও বের হয়ে আসে এবং কিছুক্ষণের মধ্যে পুরা এনিমেল ফার্মের ভিতরে যত এনিমেল ছিল সবাই বের হয়ে আসে এবং সবাই ওই ফার্মের যে মালিক জোন সাহেব তার বাড়ির দিকে দৌড়ানো শুরু করে যে, এই মানুষ কিভাবে আমাদের খাবার না দিয়ে থাকে; বুআজকে বুঝিয়ে দেবো। কিন্তু আসলে ব্যাপারটা খাবারের না, দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ বের হবার রাস্তা পাওয়া গেলো। জোন সাহেব বারান্দা থেকে যখন দেখল যে, সব এনিমেল তার দিকে তেড়ে আসতেছে, সেই উল্টা অবাক হলো, ভাবল, এতদিন ধরে এদের এত খাওয়াইলাম, এত এদের আদর করলাম; তারপরও এরা আমাকে এভাবে আক্রমণ করছে কেন? জোন সাহেব আসলে বুঝেই না যে, আসলে কেন এমনটা হচ্ছে; জোন সাহেব পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। উনার সাথে ফার্মের কর্মচারীও পালিয়ে যায়। কারণ তাদেরকে যদি এই অ্যানিমেলরা পেত, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে মেরে ফেলা হতো। সবাই উল্লাস শুরু করে এবং সবাই মিলে জোন সাহেবের বাসায় ঢুকে ভাঙচুর শুরু করে। কারণ এই বাসাই তো সৈর শাসকের প্রতীক। এ বাসায় পাওয়া গেল ঘোড়াকে মারার চাবুক; শুকরকে জবাই করার ছুরি, গরুর নাঙ্গল ইত্যাদি সব এনে সামনে জড়ো করা হল। সিদ্ধান্ত হল অত্যাচার করার এই সব জিনিসপত্র স্বৈরাশাসকের স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে; যাতে বংশ পরস্পরায় এনিমলরা জানতে পারে, স্বৈরশাসক অতীতে কিভাবে তাদের উপর অত্যাচার করত। এনিম্যাল ফার্ম স্বাধীন হওয়ার পর সবাই আনন্দটা নিয়েই যে যার মত নিজ নিজ স্থানে ঘুমিয়ে পড়ে।
পরের দিন সকালবেলা স্বাধীন ফার্মের প্রথম সকাল সবাই ভোরবেলা উঠে কারণ যেহেতু ওরা এনিমেল সবাই ভোর ছয়টায় উঠে যায় কিন্তু কেউ বুঝতেছে না যে, আজকে আমরা কি করব? এরকম সময় দুইটা জ্ঞানী শুকর এসে বলে, আমরা হলাম মাস্টারমাইন্ড। এতদিন ধরে যে অ্যানিমালিজম চলছিল, আমরা গোপনে গোপনে এই আন্দোলনের প্ল্যানটা করেছিলাম। আমরা মিস্টার জোন্সের কিছু গোপন বইপত্র পেয়েছি, ওগুলা দেখে দেখে আমরা আমাদের এই স্বাধীন অঞ্চল চালাবার জন্য সাতটা রুল লিখে এনেছি । এই রুলগুলা এখন থেকে অ্যানিমাল কিংডমের সবাই পালন করবে। সাতটা রুল আছে, দুই পায়ে যারা হাঁটে, যেমন হাস-মুরগী, পাখি, মানুষ, তাদেরকে আমরা এখন থেকে আর বিশ্বাস করবো না। চার পায়ে যারা হাঁটে, তাদের উপর কোন অন্যায় অবিচার হলে, বেল্ট পরা গরু-ঘোড়া তাদের শায়েস্থা করবে ইত্যাদি ইত্যাদি। যাই হোক এরপর আরো এক দুইদিন কেটে যায় এবং ফার্মে প্রথম সমস্যা দেখা দেয় গরুগুলা যাদের দুধ দোয়ানো হয় নাই দুই থেকে তিন দিন; তারা কষ্ট পাওয়া শুরু করে কারণ এখন দুধ দোয়ানোর জন্য কোন মানুষ নাই। অনেক কষ্টে শুকর-ঘোড়ারা পরামর্শ করে দুধ ভাগাভাগির শর্তে বাহির থেকে বাদরকে দায়িত্ব দেয়া হয়। যা হোক, কোনো না কোনো ভাবে দুধ দোয়ানো সম্ভব হয় এবং পাঁচ বালতি দুধ পাওয়া যায়। এখন প্রশ্ন হলো তাদের ভাগের এই দুধ নিয়ে এনিমেলরা কি করবে? কোন উপায় না পেয়ে দুধ ওইভাবেই রেখে দেওয়া হয়। এরপর সবাই যে যার মতো করে কাজে চলে যায়। সারাদিন কাজবাজ করে ফেরত আসার পরে কয়েকজন নোটিস করে যে, ওই দুধ পাওয়া যাচ্ছে না। আশপাশে জিজ্ঞেস করা হল যে, দুধের কি হইলো? কিন্তু কেউ কোন সদুত্তর দিতে পারে নাই। যাই হোক এভাবে দিন চলতে থাকে।
এবার সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিল যে, বিভিন্ন কমিটি করা হবে। পাহারা দেওয়া কমিটি, ডিম কমিটি ইত্যাদি ইত্যাদি। একদিন এক ঘোড়া কাজ করে ফেরত আসতেছিল এবং ফেরত আসার সময় সে দেখে ওই যে জ্ঞানী দুই শুকর ছিল তাদের মধ্যে একজন এক বালতি দুধ নিয়ে হেঁটে হেঁটে একটা ঘরের দিকে যাচ্ছে। তখন ঘোড়াটা ওর পিছন পিছন যায় এবং সে দেখে যে, এই শুকরটা আসলে খরের সাথে দুধ মিশায়ে খাচ্ছে। সবাই রেগে যায়। এতদিন ধরে তো কেউ বুঝতো না যে, দুধ আসলে কই যেতো? এখন দেখে এই দুধ আসলে দুই জ্ঞানী শুকর খরের সাথে মিশায়ে খেয়ে ফেলে। সবারই ক্ষোভ এবং দুইটা শুকরকে জিজ্ঞেস করা হয়। এবার শুকরগুলা চিৎকার করে বলে যে, তোমাদের কি মনে হয় আমরা দুধ চুরি করছিলাম? আমাদের দুধ খাইতে ভালো লাগে না, তারপরেও আমরা কষ্ট করে দুধ খাই। কারণ দুধ খেলে ব্রেইন মানুষের মত কাজ করে না। ব্রেইন কাজ না করলে আমরা জোন্সের মত করে ফার্ম শাসন করতে পারবো না, এই ফার্ম চালাইতে পারবো না। এবং আমরা যদি এই ফার্ম চালাইতে না পারি, তাইলে আবার জোন্সই আবার ফেরত আসবে। তোমরা কি এটা চাও যে, আবার জোন্স ফেরত আসুক?
সবাই চিৎকার করে বলে, না তা আমরা চাই না। তখন নিজেদের ভালোর জন্য সবাই মোটামুটি মেনে রাজি হয়ে যায়। আশপাশের অনেকগুলা ফার্মে আস্তে আস্তে খবর যাওয়া শুরু হয়। পাখিরা, কবুতররা খবর নিয়ে যায় যে, ওই ফার্ম স্বাধীন হয়ে গেছে। আশপাশের ফার্মের মালিকরা একটু টেনশনে পড়ে যায় যে, আমাদের ফার্মে যে এনিমেলরা আছে , এরা যদি বিদ্রোহ করে তাইলে কি হবে? তাই, এই ফার্মের মালিকগুলা একটা বুদ্ধি করল যে, আচ্ছা আমরা আমাদের এনিমেলদের সামনে আবল-তাবল গল্প করব । এই ফার্মের মালিকরা এনিমেলদের শুনিয়ে শুনিয়ে গল্প করা শুরু করে দিলো যে, পাশের ফার্ম যেটা স্বাধীন হয়েছে ,ওই ফার্মে এখন খুব বাজে অবস্থা; কোন আইন-কানুনের ব্যবস্থা নাই। এনিমেলরা নিজেরাই নিজেদের মাংস খাচ্ছে। যে যার সাথে পারছে মারামারি করছে, ওখানে রেপ হচ্ছে, খুনাখুনি হচ্ছে, আগুন জ্বালানো হচ্ছে । ভাগ্যিস আমাদের ফার্মের এনিমেলরা শিক্ষিত ও ভদ্র। এভাবে চলতে থাকে চলতে থাকে।
কিন্তু কিছুদিন এভাবে চলে এবং তারপরে আরেকটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখা যায়, যে জ্ঞানী দুইজন শুকর ছিল, এরা নিজেরাই অনেক ব্যাপারে একমত হইতে পারে না। এই দুই শুকরের মধ্যে যে ফাইনালি ডিসাইড হয় যে, আচ্ছা একটা ভোট হোক এবং নির্বাচনের মাধ্যমে এই দুই শুকরের মধ্যে একজন শুকরকে এনিমেলরা নির্বাচিত করব। পুরো অ্যানিমেল সমাজ তার কথা আমরা শুনবো। কারণ এত মতবিরোধ এর মধ্যে একটা ফার্ম চলতে পারে না। ইলেকশনের ব্যবস্থা হয়। চারদিকে বিশাল মিটিং মিছিল স্লোগান। ভোটের আগে একটা খুব বাজে ব্যাপার হয়। একটা শুকর বুঝে গেল যে, ও আসলে জিতবে না। কারণ অন্যজনের পক্ষে বেশি হাততালি ইত্যাদি। ওর অনুগত চারটা কুকুর ছিল, ওই চারটা কুকুরকে অন্য শুকরটার পিছনে লেলায় দেয়। কুকুরগুলো ধাওয়া করে ওকে মারার জন্য। কোন মতে জান নিয়ে শুকরটা ফার্ম টপকিয়ে দেওয়ালে পাশের ফার্মে চলে যায়। এরপরে তো আর ইলেকশনের কিছু নেই কারণ ক্যান্ডিডেট পালালিয়ে গেছে। তাই অন্যজন বিনা ভোটে ফার্ম চালাবার জন্য নির্বাচিত হয়। সবাই অবাক হয়ে দেখে যে, আগে যেই কুকুরগুলা তাদের মালিক জোন্সের সাথে ঘুরতো, জোন্সের সাথে হাঁটার সময় লেজ নাড়াইতো; সেই একই কুকুরগুলা এখন এই নতুন শুকর নেতার সাথে সারাদিন হাঁটে। নতুন নেতা শুকর বুজতে পারে কাজটা ঠিক হয়নি সবাই তাকে স্বৈরাচার, দখলদার বলবে।
এবার জনগণকে বোঝাইতে সে কাঠবিড়ালির দলকে বিভিন্ন এনিমেলের গ্রুপের পাঠায়। তারা বলে যে, দেখো আসলে নেতা এটা করতো না কিন্তু তার কাছে গোপন খবর ছিল যে, অন্য যে শুকর পালিয়ে গেছে, ওর সাথে জোন্সের গোপন আতাত হয়েছিল এবং ওরা ঠিক করছিল যে এই ফার্মটাই আবার জোন্সকে ফেরত দেওয়া হবে। অনেক গোপন ইনফরমেশন আছে, এগুলার ব্যাপারে তো তোমরা সাধারণ এনিমেলরা জানবা না, বুঝবা না। নেতা এগুলা জানতো এবং উনি অনেক কষ্টে আমাদের ফার্মটা বাচিয়েছে। ওনার ক্ষমতার কোন লোভ নাই। উনি ক্ষমতা চায়ও নাই, সবকিছু করছে শুধুমাত্র তোমাদের স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য; শুধুমাত্র তোমাদের ফার্মকে বাঁচানোর জন্য। অনেকে কাঠবিড়ালিদের এই কথা বিশ্বাস করে , আবার অনেকে বিশ্বাস করে না। যারা বিশ্বাস করে না, দেখা যায় আস্তে আস্তে তারা নাই হয়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে সবাই দেখে যে, তাদের পরিচিত অনেকেই নাই হয়ে গেছে। যারা মানে না এবং অন্য এনিম্যালদেরকে উল্টাপাল্টা বুঝায়, এরকম এনিম্যালদের সংখ্যা আস্তে আস্তে কমা শুরু করে। নতুন নেতার বিরুদ্ধে যখনই কেউ কিছু বলতো, তখন সবসময় একটা কথাই উত্তত দেয়া হতো যে, তোমাদের কি মনে নাই জোন্সের শাসন আমল কেমন ছিল? আমরা কত পরাধীন ছিলাম? এখন সবাই চুপ থাকো। নতুন নেতা আমাদের ফার্মকে উন্নয়নের জোয়ারে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। অনেক এনিম্যাল
নেতাকে খুশি করার জন্য এনিমেল ফার্মের বিভিন্ন জায়গায় বড় বড় মূর্তি বানায়। এই নতুন নেতা তার মূর্তিগুলা দেখে অনেক খুশি হয় যে, হ্যাঁ এরা আমাকে খুবই পছন্দ করে।
এখন নতুন নেতাকে তেল মারা এইসব এনিম্যাল সাঙ্গপাঙ্গকে স্পেশাল পাওয়ার আসা শুরু হয়। কারণ এরা নেতা শুকরের খুব কাছের লোক। আগে শুধু গরু থেকেই দুধ বের করত, এখন নেতার নিজ স্বজাতি শুকুরের দুধও জোর করে বের করতে হয়, যাতে নেতা সাংগোপাঙ্গরা খেতে পারে। কোনো এনিম্যাল এখন আর নেতা শুকরের সাথে দেখা করতে পারেনা। এরই মধ্যে আরো কিছু অদ্ভুত অদ্ভুত ব্যাপার হওয়া শুরু হয়। দুই মাসের জন্য যে শস্য জমায় রাখা হয়েছিল, হঠাৎ করে দেখা যায় ওই শস্য নাই। নেতা শুকরকে যখন বলা হলো, তখন তিনি বলেন, নিশ্চয়ই এটা জোন্সের ষড়যন্ত্র। জোন্স নিশ্চয়ই কিছু ফার্মের দুষ্কৃতিকারীদের সাথে মিলে শস্য চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি একটা তদন্ত কমিশন করেন এবং এই তদন্ত কমিশন ঘোষণা করবে যে, আসলে যে ইলেকশন করতে এসে পালিয়ে গিয়েছিল, সেই বিরোধী নেতা নাকি জোন্সের সাথে ষড়যন্ত্র করে দুজন মিলে চুরি করছে। তখন পালানো শুকরক্র দেশদ্রোহী ঘোষণা করা হলো। নেতা শুকরের বিরুদ্ধে কথা বলা এনিম্যালদেরকে ওই পালানো নেতার সহযোগী ষড়যন্ত্রকারী ট্যাগ দিয়ে জেলে ঢুকানো শুরু হলো। অনেকে ভয় টয় দেখিয়ে চুপচাপ করা হয়, তাদের মধ্যে অনেকের নাই হয়ে যায়।
শুধু তাই না ফার্মে যত গান লেখা হয় যত কবিতা লেখা হয় সবকিছু আগে নেতা শুকরের কার্যালয়ে পাঠাইতে হয়। এটা তিনি পড়েন এবং তার যদি পছন্দ হয় তাহলেই তার পারমিশন দেওয়া হয় যে, হ্যাঁ এটা এখন ফার্মে ছড়ানো যাবে। যদি তার পছন্দ না হয় তাহলে তখনই ওটা ছিড়ে ফেলে দেওয়া হয়। ছোট ছোট যে এনিমেলগুলা ফার্মে জন্মায়, তাদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হয় কিন্তু তাদের পড়াশোনার যে বই, সেগুলোর ভেতরে লেখা এই নেতা শুকর কিভাবে আসলে ফার্মটা স্বাধীন করেছে? নেতা শুকর কিভাবে তাদের সবার জন্য এত কষ্ট করে উন্নয়ন করছে। আস্তে আস্তে সব এনিম্যালরা আগের ইতিহাস ভুলে যাওয়া শুরু করে, অনেকেই মনে মনে ভাবে যে মানুষের অধীনে যখন ছিলাম তখনও আমাদের এত কষ্ট ছিল
না , কিন্তু কেউ এটা বলতে পারে না।
নেতা শুকর এবার পুরানো সংবিধান ছিড়ে ফেলে। নতুন সংবিধান বানায়। নতুন সংবিধানে একটাই লাইন; এক লাইনের সংবিধান। সেটা হলো অল অ্যানিমালস আর ইকুয়াল, বাট সাম এনিমেলস আর মোর ইকুয়াল দেন আদার।
'ইস্ট তুর্কিস্তান' থেকে ইউঘুর
১৯৪৪ সালে সেন্ট্রাল এশিয়াতে একটি স্বাধীন ও মুসলিম প্রধান রাষ্ট্র গঠন হয় ইউঘুর টার্কিক জনগোষ্ঠীর লোকদের নিয়ে। দেশটির নাম ছিল 'ইস্ট তুর্কিস্তান'।
টার্কিক জনগোষ্ঠীর মানুষেরা চাইনিজদের থেকে শারীরিক গঠন, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, সামাজিক সকল দিক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। তাই তারা চেয়েছিল নিজেস্ব স্বাধীন দেশে থাকতে।
তবে চীনের পশ্চিম অঞ্চলে এধরনের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র থাকা ছিল চীনের জন্য হুম/কিস্বরুপ। কেননা ইস্ট তুর্কিস্তান ছিল তৎকালীন ব্যবসা বানিজ্যের জন্য বিখ্যাত রাস্তা "সিল্ক রোডের" একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়। সিল্ক রোডের মাধ্যমেই তৎকালী বিশ্বের সকল বানিজ্য পরিচালিত হত।
তাই চীন সরকার চায়নি যে চীনের পশ্চিম অঞ্চলে কোন স্বধীন মুসলিম রাষ্ট্র এই সিল্ক রোডকে নিয়ন্ত্রণ করুক।
কিন্তু তাদের সামরিক শক্তি তেমন ছিলনা। সবচেয়ে ক্ষতির কারন ছিল উইঘুর মাঝে চায়না দ্বারা তৈরি দালাল শ্রেনী। যাদের সহযোগিতায় উইঘুর স্বাধীনতা বিলুপ্ত হয়ে।
এজন্যে ইস্ট তুর্কিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র ৫ বছরের মধ্যে চীন সরকার তা দখল করে ফেলে এবং ইস্ট তুর্কিস্তানে অবস্থানরত উইঘুর জনগোষ্ঠী যেন আর কোনদিন ইস্ট তুর্কিস্তান তৈরীর চেষ্টা না করে সেজন্য তাদেরকে চাইনিজ ট্রেডিশনের সাথে মেশানোর জন্য নানান প্রোগ্রাম চালু করে।
ছোট্ট আমেরিকা কিভাবে বিরাট হাতি হয়ে উঠলো
এমেরিকা এমন একটা দেশ - যাদের সীমানা কেবল বেড়েছে, কখনোই কমেনি। আজকের যে এমেরিকা আমরা দেখতে পাই - এটা তাদের জন্মগত সীমানা নয়। শুরুর এমেরিকা ছিলো বর্তমান এমেরিকার ৫% এরও কম ভূখণ্ডের।
দক্ষিণে ফ্লোরিডা তাদের ছিলো না, পশ্চিমে লুসিয়ানা তাদের ছিলো না, উত্তরে কেনটুকি তাদের ছিলো না, পূর্বে নর্থ ও সাউথ ক্যারোলিনাও তাদের ছিলো না। অর্থাৎ, মিসিসিপি নদীর পূর্বে আলাবামা অঞ্চলটুকুই তাদের আদি নিবাস।
বাকি অঞ্চল তারা একে একে দখল করেছে বা ক্রয় করেছে বা চুক্তির মাধ্যমে অর্জন করেছে। তাদের এই জবরদখলের ইতিহাস কয়েক শত বছরের।
শুধু পশ্চিমের কথা বললে - লস এঞ্জেলেস, ক্যালিফোর্নিয়া, নেভাদা, উতাহ, লাস ভেগাস, এরিজোনা, নিউ ম্যাক্সিকো, টেক্সাস - এই পুরো অঞ্চল তারা জবর দখল করেছে ম্যাক্সিকোর থেকে। কৌশল ছিলো প্রথমে পূর্ব থেকে সেটেলার পাঠিয়ে এই রাজ্যগুলোতে আধিপত্য বিস্তার। তারপর সময় সুযোগ বুঝে নৃশংস দাঙ্গা বাধিয়ে দখল করে নেয়া।
১৮৪৬-৪৮ সালে যুদ্ধ করে ম্যাক্সিকোর মোট ভূমির ৭০% দখল করে নেয় এমেরিকা।
সবচেয়ে বড় কথা - ম্যাক্সিকোর উর্বর ভূমি সম্পূর্ণটাই দখল করে নিয়ে ম্যাক্সিকোকে ঠেলে দেয় অনুর্বর বালু আর পাথরের দিকে। তারপর ম্যাক্সিকো আর কখনো দাঁড়াতে পারেনি, চোখ তুলে কথা বলতে পারেনি।
লুসিয়ানা, ফ্লোরিডা, ক্যালিফোর্নিয়া, আটলান্টা অঞ্চলগুলো ছিলো স্পেন ও পর্তুগালের।ঊনিশ শতকের শুরুতে লুসিয়ানা কেনার পরেই মূলত তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে থাকে। তারপর ঊনিশ শতক জুড়ে ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ডকে ভয় দেখিয়ে বিতাড়িত করে এগুলো যখন লিখে নেয় - তখন স্পেন কউবা ছাড়তে রাজি হয়নি। তারা চেয়েছিলো - এই অংশে তাদের একটা কলোনি ও ঘাঁটি থাক।
অই সময়ে এমেরিকা খুব দ্রুত বড় হয়ে চলছিলো। ছোট্ট এমেরিকা বিরাট হাতি হয়ে উঠলো। এবং তারা কিউবার জন্য গোঁ ধরলো।
স্পেন ততোদিনে বুঝে ফেলেছে - লুসিয়ানা, ফ্লোরিডা ছেড়ে ভুল করেছে। এখন আর কিউবা ধরে রাখা সম্ভব নয়। তারা আরেকটা ভুল বুঝতে পারে - এমেরিকার সাথে যুদ্ধে ম্যাক্সিকোকে সাহায্য না করার ভুল।
কিন্তু, এমেরিকা ভাবলো অন্যভাবে। তারা কৌশলে কিউবার মধ্যে গজাতে থাকা স্বাধীনতা আন্দোলনকে সাহায্য করলো। তারা ভাবলো - আগে স্পেনকে তাড়ানো যাক, পরে কউবা গিলে ফেলা আমাদের পক্ষে তুড়ির ব্যাপার।
স্পেনকে তাড়িয়ে কিউবা স্বাধীন হলো। কিন্তু সেখানে জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রবল হয়ে ওঠায় এমেরিকা অঙ্গরাজ্য ঘোষণা করতে পারলো না।
তার প্রধান কারণ - ম্যাক্সিকো সহ অন্যান্য ভূমি দখলের কৌশল ( সেটেলার পুশিং) এখানে সম্ভব হয়নি।
যাক - ১৮৯৮ সালে কিউবা মার্কিন প্রতিরক্ষার ( মার্কিন সামরিক শাসন) অধীনে স্বায়ত্তশাসন পেলো।
তার ৪ বছরের মাথায় কিউবা পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করে এবং স্বাধীন হয়। এই প্রথম এমেরিকা তাদের ‘ভূখণ্ড বাড়ানো’ মিশনে ব্যর্থ হলো। মুখের মধ্যে ঢুকে যাওয়া ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে হলো।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ১৯৫৯ পর্যন্ত সামরিক শাসনের নেতৃত্ব দিয়েছেন মার্কিন বিরোধী বাতিস্তা। এই ফাঁকে সেখানে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা গজিয়ে ওঠে এবং আরেক মার্কিন বিরোধী ‘জাতীয়তাবাদী সমাজতান্ত্রিক’’ নেতা ফিদেল কাস্ত্রো ক্ষমতায় বসে একদলীয় ‘কমিউনিস্ট শাসন’ কায়েম করেন।
১৯০২ সালে এমেরিকার দক্ষিণমুখী ভূখণ্ড বিকাশ থেমে গিয়েছিল। তার আগে উত্তরে কানাডার সাথে সীমান্ত নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল।
এমেরিকা যে ম্যাক্সিকোর ভূখণ্ড জবরদখলের পর আর দক্ষিণে আসতে পারেনি - তার প্রধান দেয়াল ছিলো কিউবা। দীর্ঘ সামরিক শাসন এবং ‘'কমিউনিস্ট’ শাসনের ব্যারিকেড ভেঙে দক্ষিণে প্রবেশ সম্ভব হয়নি।
২০১৬ সালে কাস্ত্রোর মৃত্যুর পর কিউবার সেই দেয়াল ভেঙে যায়। কিউবার বর্তমান প্রশাসন সম্পূর্ণভাবে মার্কিন এলাইন মেন্টেইন করে।
গত কয়েক বছরে কিউবান প্রশাসনের নিরব সম্মতিতে কিউবাতে মার্কিন সংস্কৃতি, চিন্তাধারার ব্যাপক চাষাবাদ হয়েছে। কৌশলগতভাবেও এমেরিকার সমান্তরালে চিন্তা করে বর্তমান কিউবা। এমনকি - আগামীকাল সকালে ঘুম থেকে জেগে যদি শোনেন - কিউবা নিজেকে এমেরিকার অধীন ঘোষণা করেছে - তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। অর্থাৎ, দীর্ঘ ১২০ বছর পরে এসে এমেরিকার কিউবা দখল আংশিক সফল হয়েছে।
আংশিক বলছি, কারণ - জাতীয়তাবাদী চেতনা সাধারণত সুপ্ত থাকে। যদিও - উনবিংশ শতকের জবরদখল আর একবিংশ শতকের জবরদখলের রূপ একরকম হবে না।
কিউবার ‘দেয়াল’ ভেঙে পড়ার পর এমেরিকার দক্ষিণমুখী আগ্রাসনে আর বাধা থাকলো না। ল্যাতিন এমেরিকা এমেরিকার সবচেয়ে নিকটতম ভূখণ্ড এবং সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত হওয়ার পরও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এমেরিকার চোখ আটকে ছিলো ইউরোপ এবং এশিয়ার দিকে।
তার প্রধান কারণ - বিশ শতকের তেল গ্যাসের যত খনি আবিষ্কার হয়েছিল - তার বেশিরভাগ মধ্যপ্রাচ্যে এবং বিশ্বযুদ্ধোত্তর অর্থনীতির বড় অংশ ইউরোপে। শেষ কয়েক দশকে এমেরিকা এসব অঞ্চলে তাদের আধিপত্য পাকাপোক্ত করেছে।
এশিয়া এবং ইউরোপের অধিকাংশ মার্কিন বলয়ভুক্ত। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড সম্পূর্ণ মার্কিন বলয়ভুক্ত।
প্রশান্ত এবং আটলান্টিকের বেশিরভাগ তাদের আধিপত্য।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে হাতিয়ে নেয়া বিপুল তেলের সঞ্চয় আছে তাদের। তার উপর সাম্প্রতিক সময়ে নিজেদের তেল গ্যাস আবিষ্কার হয়েছে।
এবার বাকি তাদের সীমানা বৃদ্ধি করা।
হ্যাঁ, একবিংশ শতকে সীমানা বৃদ্ধি হয়তো ঊনবিংশ শতাব্দীর মতো হবে না। হয়তো নামমাত্র ‘'দেশীয় প্রতিনিধি’’ বসানো হবে ক্ষমতার চেয়ারে এবং সাংস্কৃতিক ও চিন্তাধারার চাষাবাদের মাধ্যমে অন্যরকম মার্কিনীকরণ করা হবে। কিন্তু, কিউবার মতো করে গ্রাস করার চেষ্টা করা হবে ভেনেজুয়েলা এবং ‘'ওয়েস্ট ইন্ডিজ’কে।
পুরো ল্যাতিন এমেরিকা প্রয়োজন নেই মার্কিনীদের। কিউবা তো হাতের মুঠে। পানামাও হাতের বাইরে নয়।
ক্যারিবিয়ান সাগরের অন্যান্য দেশ ( ওয়েস্ট ইন্ডিজ - যেটা মূলত ছোট ছোট অনেকগুলো দ্বীপরাষ্ট্র) এমেরিকার এলাইনে আছে।
কেবল হাতের বাইরে আছে আংশিকভাবে কলম্বিয়া, সম্পূর্ণভাবে ভেনেজুয়েলা।
এই দুইটা দেশের ঘাড় মটকে নিজের অধীনে নিয়ে নিলে পুরো ক্যারিবিয়ান অঞ্চল মার্কিন ‘'দখলে’ চলে আসে।
একবিংশ শতকে এটা ভৌগোলিক সীমানা বৃদ্ধি না করলেও রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও চিন্তাধারার আধিপত্যের মাধ্যমে একরকম একীভূত করে নেয়া বুঝাবে। @ নাগাসিকা
ইহুদির প্রতি ঘৃণা
হিটলারের সহযোগী ছিলেন আইখম্যান। তিনি ছিলেন গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে ইহুদিদের হত্যা করার রূপকার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের পরাজয় হলে তিনি ব্রাজিলে পালিয়ে যান এবং
ছদ্মবেশে একটি কৃষি ফার্মে কাজ করেন।
কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি আইখম্যানের।অনেক বছর পর ইহুদিদের হাতে ধরা পড়েন তিনি।তার উপর ভীষণ ক্ষিপ্ত ছিলো ইহুদিরা।
তাকে হত্যা করার সমস্ত প্রস্তুতি শেষ করলো তারা।হত্যা করার আগে আইখম্যানের শেষ ইচ্ছার কথা জানতে চাওয়া হলে তিনি মৃত্যুর পূর্বে ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করার ইচ্ছা পোষণ করেন।তার এমন ইচ্ছার কথা শুনে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসতে থাকে উপস্থিত সবাই।
ভর্ৎসনা করে তারা বলে, "বাছাধন,তুমি মনে করেছো, ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করলেই ইহুদিরা তোমাকে মাফ করে দেবে!? তা হবে না।মরতে তোমাকে হবেই।"
এসময় কয়েকজন কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করে, "আচ্ছা তোমার এই ইচ্ছা কেনো হলো,বলো তো?"
আইখম্যান নির্বিকার চিত্তে জবাব দিয়ে বলেন, "তোমরা যে আমাকে ছাড়বে না,এটা আমি নিশ্চিত।তাই মারা যাওয়ার আগে দেখে যেতে চাই,আরেকটা ইহুদি মারা গেলো।"
ইহুদিদের প্রতি কতটুকু ঘৃণা থাকলে মৃত্যুর আগেও আরেকটি ইহুদির মৃত্যু দেখতে চায়....(সংগৃহীত)
এনজিও স্কুলের শিক্ষক সিলভা এবং ব্রাজিলের পথশিশু
২০০৯ ইংরেজি সাল। ব্রাজিলের রিও ডি জানেইরোর একটি স্কুলের মাঠে একটি কফিন রাখা হয়েছে। কফিনটির ভিতরে একজন শিক্ষকের মৃতদেহ। খুন হয়ে গেছেন তিনি। ছাত্রছাত্রীরা তাদের প্রিয় শিক্ষকের নিথর দেহ ছুঁয়ে দেখছে একবার করে, এবং কাঁদছে। খানিক পরে চিরবিদায় অনুষ্ঠানে শোকসঙ্গীত বাজানো হবে। শোকসঙ্গীত যারা বাজাবেন তাদের মধ্যে একজন ছাত্রের নাম— দিয়েগো ফ্রাৎজাও তর্কাতো। তার বয়স সেদিন— ১২ বছর।
শিশুটি জন্মেছিলো ব্রাজিলের একটি বস্তি পারাদা দা লুকাসে। ফুটপাতে-রাস্তায় জীবন কাটাতে-কাটাতে, অনাহারী, নিঃস্ব, কুকুর-বেড়ালের সাথী এই শিশুটি, একদিন সে খাবারের অভাবে মাথা ঘুরে পড়ে যায় রাস্তার ধারে। ওই সময়কালে ব্রাজিলের রাস্তায় এটা নিত্যদিনের দৃশ্য ছিল— কুকুরের সাথে দরিদ্র শিশুর একটুকরো রুটি নিয়ে কাড়াকাড়ি। ক্ষুধার যন্ত্রণা সইতে না-পারা শিশুর নিথর পড়ে থাকতো রাস্তার ধারে। কিন্তু, শিশু তর্কাতোর সেদিনের মূর্ছা যাওয়ার একমাত্র কারণ শুধুমাত্র ক্ষুধা নয়, এক দুরারোগ্য ব্যাধি। সেদিন রাস্তায় পড়ে থাকা সেই অচেতন শিশুকে বুকে তুলে নিলেন শিক্ষক তর্কাতোকে। নতুন জীবনে দিলো তিনি।
পৃথিবীতে এমন কিছুকিছু মানুষ থাকে , যারা শিশুর প্রতি এই অমানবিকতা দেখেই কেঁদে ফেলে! যারা বোকামানুষ। শিক্ষক এভান্দ্রো সিলভা অমনই একজন,বোকা মানুষ। সিলভা ছিলেন একটি এনজিও-স্কুলের শিক্ষক, ব্রাজিলের পথ শিশুদেরকে নিয়ে কাজ করতো তারা। তাই শিশুদের ব্যবহার করে যারা মাদক, চোরাকারবার করতো, তাদের লালচোখের লক্ষ্যে পরিণত হয়েছিলো এই এনজিও শিক্ষক। মাদক, চোরাকারবারী বিশেষ টার্গেট ছিলেন— শিক্ষক সিলভা।
দুরারোগ্য ব্যাধি মেনিনজাইটিস রোগে ভোগা শিশুটিকে স্কুলে ভায়োলিন শিখেছিলো শিক্ষক সিলভার পরম যত্নে-মমতায়। স্কুলের সবাই জানতো, এই ছেলেটি বাঁচবে না আর বেশিদিন, তবু তারা জীবনের উচ্ছলতায় বাঁচিয়ে রেখেছিলো তাকে প্রতিটি মুহূর্তেই। এভাবেই চলছিল কিন্তু ২০০৯ সালে একটি গলির আঁধারে খুন হয়ে গেলেন— মানবিক শিক্ষক সিলভা।
সিলভার কফিনটি আনা হল স্কুলপ্রাঙ্গন থেকে। অদূরে, সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ালো, তাঁরই হাতে গড়া ভায়োলিন-বাদিয়ে ছাত্রছাত্রীরা। এই ছোটছোট শিশুকিশোরদের ঐ সারিতে, একটি দুর্বলদেহী-লিকলিকে-অসুস্থ শিশুটি ভায়োলিন বাজিয়ে চলেছে অপার মমতায়, আর, তার দু'টি চোখ বেয়ে গড়িয়ে নামছে নিশ্চুপ জলধারা, অবিরল।
স্থানীয় ফটোগ্রাফার মার্কোস ত্রিস্তাও ধারণ করেন ঐ দৃশ্যটি। পরদিন ছবিটি প্রথম ছাপা হয়েছিলো স্থানীয় 'ও গ্লোবো' পত্রিকায়, এরপর রাতারাতি ছড়িয়ে গিয়েছিলো সারা দুনিয়ায়। কেন ছবিটি বিশ্বব্যাপী এভাবে আবেদন সৃষ্টি করলো? আধুনিক ফটোগ্রাফ ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম মায়াবী ফটোগ্রাফের স্বীকৃতি পেলো? স্বার্থহীন মানুষের জন্য মানুষ কাঁদবে চিরকাল— এ-ই তো কথা ছিল।
প্রিয় শিক্ষকের বিচ্ছেদে অঝোরে বুকভাঙা কান্নারত সেই ছাত্র— শিশু তর্কাতো— মারা গেলো এর ক'দিন পরেই, এও তো মানুষের জীবন!
শিশুর বুকের ভিতরে ভালোবাসার বীজ বুনে দাও আজ, এবং শুধুমাত্র এভাবেই, আগামীকাল সৃষ্টি হবে মহৎ সভ্যতা। (তথ্যসূত্র : মালাম ব্লগ,০৩.২০১৭)
সামাজিক দায়বদ্ধতা
সম্প্রতি বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। দেখা যাচ্ছে, একটি পিঁপড়ে কলোনিতে কোনো তরুণ সদস্য যদি গুরুতর বা সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়, তবে সে নিজেই কলোনির অন্য সদস্যদের কাছে এক বিশেষ সংকেত পাঠায়—যার অর্থ কার্যত, “আমায় সরিয়ে দাও।” বিজ্ঞানীদের ভাষায়, এটি এক ধরনের স্বেচ্ছা আত্মত্যাগ।
এই সংকেত আসলে বিশেষ রাসায়নিক বার্তা বা ফেরোমোন। অসুস্থ পিঁপড়ে ফেরোমোন বাতাসে ছড়িয়ে দিলে সুস্থ ও কর্মক্ষম পিঁপড়েরা তা সঙ্গে সঙ্গে শনাক্ত করে। এরপর তারা আক্রান্ত সদস্যটিকে কলোনি থেকে সরিয়ে দেয়, যাতে রোগটি আর ছড়িয়ে না পড়ে। অনেক ক্ষেত্রেই এই ‘সরিয়ে দেওয়া’-র পরিণতি হয় মৃত্যু। বিজ্ঞানীরা একে বলছেন জৈব-কোয়ারান্টিন—কলোনিকে সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন রাখার এক প্রাকৃতিক ব্যবস্থা।
পিঁপড়েরা যেন স্পষ্টভাবেই বোঝে—রোগ একবার ছড়িয়ে পড়লে পুরো কলোনি, এমনকি সম্পূর্ণ সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তাই ব্যক্তিগত অস্তিত্বের চেয়ে তাদের কাছে কলোনির সামগ্রিক স্বাস্থ্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণেই অসুস্থ পিঁপড়েরা নিজের অস্তিত্ব বিসর্জন দিতে পিছপা হয় না। এটি কোনো আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত নয়, বরং ঠান্ডা মাথার সামাজিক দায়বদ্ধতা।
সমাজের জন্য আত্মত্যাগের প্রশ্নে প্রকৃতির রাজ্যে পিঁপড়েরা যে মানুষের চেয়ে অনেকখানি এগিয়ে, তা এই গবেষণা নতুন করে আমাদের ভাবতে বাধ্য করে।
স্বর্ণকাররা দীর্ঘদিন ধরে ধাতু গলানো ও তৈজস তৈরি করার কাজে নিযুক্ত থাকেন। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরনের কাজের কারণে তাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি অন্যান্য মানুষের তুলনায় বেশি হয়ে থাকে।
ধোঁয়া, ধুলা এবং উচ্চ তাপের সঙ্গে নিয়মিত সংস্পর্শ ফুসফুস, হৃদয় ও অন্যান্য অঙ্গের সমস্যা বাড়াতে পারে। Occupational Safety & Health Administration (OSHA) এবং বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা দেখিয়েছে, ধাতু কারিগর বা স্বর্ণকারদের জীবনকাল সাধারণ মানুষের তুলনায় কিছুটা কম হতে পারে। সুতরাং, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা করাই স্বর্ণকারদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জাপানের একটি অনন্য কর্মসংস্কৃতি ইনেমুরি!
জাপানের কিছু অফিসে কর্মীদের কাজের মাঝেই হালকা ঘুমাতে দেখা যায়,এটাকে বলা হয় ইনেমুরি। ইনেমুরি মানে কাজ ফাঁকি দেওয়া নয়, বরং এটি অতিরিক্ত পরিশ্রম ও দায়িত্বশীলতার নীরব প্রকাশ।তবে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার, এটি কোনো লিখিত আইন বা সব কোম্পানির আনুষ্ঠানিক নিয়ম নয়। যে কর্মী নিয়মিত পরিশ্রম করে, তার ক্ষেত্রে ইনেমুরি সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য। অলসতার চিহ্ন হলে বিষয়টি নেতিবাচক হিসেবেও দেখা হতে পারে। ইনেমুরি মূলত জাপানের সংস্কৃতিগত সহনশীলতার একটি দৃষ্টান্ত।
বাদ দিন ৭ অভ্যাস
মেধা থাকলেই সাফল্য পাওয়া যায়, সব সময় এমন নাও হতে পারে। অনেক সময় মানুষের কিছু অভ্যাস ও মানসিকতা এগিয়ে যাওয়ার পথ আটকে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স ম্যাথার্স বলেন, প্রত্যেক মানুষের মধ্যে অপ্রকাশিত সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু কিছু অভ্যাস অনেকের সাফল্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই বাদ দিন ৭ অভ্যাস।
১. অতীতে আটকে থাকা:
আপনাকে সব সময় একই থাকতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। জীবনের কোনো এক সময়ে কেউ হয়তো আপনার গণিতে দুর্বলতা নিয়ে কথা বলেছে। কোনো আত্মীয় হয়তো আপনাকে অলস বলেছে। কিন্তু তাই বলে সেসব মন্তব্য মাথায় নিয়ে বসে থাকার কোনো কারণ নেই। মানুষের দক্ষতা ও সক্ষমতা সব সময় এক থাকে না। সময়ের সঙ্গে, চেষ্টা করলে অনেক কিছু বদলে ফেলা যায়। অ্যালেক্স ম্যাথার্স বলেন, এসব মন্তব্য মানুষ করবেই। কিন্তু সমস্যা হয়, যখন আমরা সেই ধারণাগুলোকে নিজের পরিচয় বলে ধরে নিই। অনেকে মনে করেন, নিজেকে বদলাতে হলে আগে আত্মবিশ্বাস বা সঠিক সময় দরকার। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ফলে নতুন বছর শুরু করুন ইতিবাচকতা দিয়ে। বদলে ফেলুন নিজের অতীতমুখিতা।
২. সবাইকে খুশি করার ভয়:
সফল হতে চাইলে আগে এই বাস্তবতা মেনে নিতে হবে যে, সবাই আপনাকে পছন্দ করবে না। জীবনে যতই ভালো কাজ করুন না কেন, এমন মানুষ থাকবে যারা আপনাকে ভুল বুঝবে বা সমালোচনা করবে। তাই সব সময় অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে গেলে অনেক সময় উল্টো ফল হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, সবার মন জোগানোর চেষ্টা করতে গিয়ে অনেক মানুষ দীর্ঘদিন মানসিক চাপ ও ক্লান্তিতে ভোগে। সবকিছুতে ‘হ্যাঁ’ বলার অভ্যাস মানুষকে ভেতরে-ভেতরে নিঃশেষ করে দেয়। এই মানসিক চাপ কাজের মনোযোগ কমিয়ে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত সাফল্যের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
যতদিন নিজেকে না বদলাচ্ছেন, তত দিন নতুন করে এসব কথা শুনতেই হবে আপনাকে। তার চেয়ে ভালো বরং নিজেকে বদলে ফেলা—অন্যের ক্ষতি না করে নিজের মতো করে চলা।
৩. নিজের সক্ষমতার চেয়ে কম করে কাজ করা:
বেশির ভাগ মানুষ প্রয়োজনের বেশি চেষ্টা করে না। যতটুকু করলে চলে ততটুকুতেই থেমে যায়। কিন্তু এতে জীবন এগোয় না। এভাবে চলতে থাকলে অজান্তেই মানুষ পিছিয়ে পড়তে শুরু করে। জীবনে সব সময়ই প্রতিযোগিতা থাকে। তাই থেমে গেলে চলবে না। নিজের সামর্থ্য বাড়াতে হবে এবং নিয়মিত উন্নতির চেষ্টা করতে হবে। ধারাবাহিক পরিশ্রম আর নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতা ছাড়া প্রকৃত সক্ষমতা প্রমাণ করা সম্ভব নয়।
৪. পরিস্থিতিকে দোষ দেওয়া:
ব্যর্থ মানুষেরা সাধারণত সমস্যাকে স্থায়ী এবং নিজেদের অযোগ্যতার ফল বলে মনে করে। অন্যদিকে সফল মানুষেরা ব্যর্থতাকে সাময়িক ও পরিস্থিতিগত বিষয় হিসেবে দেখে। ‘আমার প্রতিভা নেই’ বা ‘পরিবেশ অনুকূলে নয়’—এসব আসলে মানসিক অজুহাত। যখন আপনি এসব ভাবনা ঝেড়ে ফেলতে পারবেন, দেখবেন নিজে চেষ্টা করে যাচ্ছেন সাফল্য পেতে।
৫. কাজ অর্ধেক রেখে দেওয়া:
সফল মানুষদের একটি সাধারণ অভ্যাস হলো, কাজ শেষ করা। অ্যালেক্স ম্যাথার্স বলেন, ছোট কাজ থেকেই শুরু করা উচিত। যেমন বাসন ধোয়া হলে পুরো শেষ করা, ঘর পরিষ্কার করলে ভালোভাবে পরিষ্কার করা। এই অভ্যাসের মাধ্যমে ধীরে ধীরে পুরো কাজ শেষ করতে পারার মানসিকতা তৈরি হয়, যা জীবনের সব ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।
৬. একঘেয়েমিকে ভয় পাওয়া:
অনেকে একটু একঘেয়েমি লাগলেই মোবাইল ফোন হাতে তুলে নেন। কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢোকেন বা কখনো ভিডিও দেখে সময় কাটান। মনে হয়, এতে বিরক্তি কমবে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, এই অভ্যাস আসলে মানুষকে আরও অস্থির ও অসন্তুষ্ট করে তোলে। সফল মানুষেরা বিষয়টা অন্যভাবে দেখে। তারা সব সময় নিজেকে ব্যস্ত রাখতে চায় না। একটু নীরবতা, একটু একঘেয়েমিকে তারা মেনে নিতে শেখে। এই সময়েই তাদের মন শান্ত হয়, আর নতুন আইডিয়া আসার সুযোগ তৈরি হয়।
৭. সাফল্যকে প্রয়োজন মনে না করা:
অ্যালেক্স ম্যাথার্সের মতে, যদি সাফল্যকে আপনি শুধু সম্ভাবনা হিসেবে দেখেন, তাহলে গড়পড়তা জীবনই আপনার ভবিষ্যৎ হয়ে দাঁড়াবে। সাফল্যকে নিজের প্রতি দায়িত্ব হিসেবে দেখতে হবে। আপনার কাছে সাফল্যের মানে কী, তা স্পষ্টভাবে ঠিক করে সেই অনুযায়ী জীবন গড়ে তোলাই এগিয়ে যাওয়ার মূল চাবিকাঠি। সূত্র: ভিএন এক্সপ্রেস
প্রাচীন ভারতের এই বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞানচর্চার প্রধান কেন্দ্র ছিল:
১. তক্ষশিলা (Taxila): বর্তমান পাকিস্তানে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন শিক্ষা কেন্দ্র। এটি মূলত চিকিৎসাশাস্ত্র এবং রাষ্ট্রনীতির (চাণক্য এখানে শিক্ষক ছিলেন) জন্য বিখ্যাত ছিল।
২. নালন্দা (Nalanda): বিহারে অবস্থিত প্রাচীন ভারতের সবচেয়ে প্রভাবশালী বিশ্ববিদ্যালয়। এটি মহাযান বৌদ্ধধর্ম এবং বিজ্ঞানের প্রধান কেন্দ্র ছিল। বর্তমানে এর ধ্বংসাবশেষ একটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট এবং আপনি এটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট ভিজিট করতে পারেন।
৩. বিক্রমশিলা (Vikramshila): পাল রাজা ধর্মপাল বিহারের ভাগলপুরে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। এটি মূলত তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম শিক্ষার জন্য বিখ্যাত ছিল।
৪. ওদন্তপুরী (Odantapuri): এটিও পাল রাজবংশের আমলে বিহারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটি নালন্দার পর দ্বিতীয় প্রাচীনতম মহাবিহার হিসেবে পরিচিত ছিল।
৫. বল্লভী (Vallabhi): বর্তমান গুজরাটে অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি হীনযান বৌদ্ধধর্ম শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র ছিল। এটি তার উন্নত প্রশাসন এবং অর্থশাস্ত্র শিক্ষার জন্য পরিচিত ছিল।
৬. পুষ্পগিরি বা পুষ্পগিরি (Pushpagiri): বর্তমান ওড়িশায় অবস্থিত এই প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারটি ললিতগিরি, রত্নগিরি এবং উদয়গিরি পাহাড় জুড়ে বিস্তৃত ছিল। এটি লিপি এবং শিল্পকলার জন্য বিখ্যাত ছিল।
গাধাকে নিয়ে একটি বড় পরিকল্পনা
কিছু সিংহ মিলে একটি গাধাকে বন্দী করলো। সেই সিংহের মধ্যে একটি সিংহ বলল, একে মেরো না। আমার কাছে একে নিয়ে একটি বড় পরিকল্পনা আছে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী গাধাটিকে, সিংহ তাদের নিজের সাথে রাখল। এর খুব আদর যত্ন করে কথাটির বিশ্বাস জিতে নিল। তারপর একদিন একে গাধার সমাজে ছেড়ে দিল কিন্তু এবার গাধাটি আর গাধার মত নয় বরং সিংহের মত রাজা হয়ে আসলো গাধার সমাজে।
যেহেতু এই গাধার সাথে সিংহের বন্ধুত্ব ছিল তাই অন্য গাধারা একে ভয় পেতে লাগলো। এরা ওর বিরুদ্ধে কোন কথা বলতে দ্বিধাবোধ করত।
সিংহ যখন গাধাটির সাথে দেখা করতে আসতো, তখন গাধাটি রাজার মত তার পিছনে একটি গাধার দল নিয়ে সিংহের সাথে দেখা করতে আসতো। আর সিংহের যাওয়ার সময় তাকে গাধা উপহার দিত খাওয়ার জন্য।
এই গাধা সিংহের মতো ক্ষমতাবান হয়ে গেল কিন্তু সে সিংহের কাছে সেই গাধাই রয়ে গেল রয়ে গেল। সে,, গাধা সমাজে রাজা হয়ে গিয়েছিল ঠিকই কিন্তু সে এমন একটি শক্তির সাথে আটকে গিয়েছিল, যেখান থেকে সে পালাতে পারছিল না।
যার কারণে সে হাজার হাজার নিরাপদ গাধাকে কোরবানি দিয়েছিল শুধু এই ভেবে যে, এতে করে সে আরো বেশি শক্তিশালী হবে এবং সে তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পারবে। কিন্তু এমন একদিন এলো যেদিন সব গাধারা একজোট হয়ে সেই গাধার অন্যায়ের বিরোধিতা করলো এবং ওরা সিদ্ধান্ত নিল এরপর যখনই সিংহ আসবে তখন তাদের মধ্যে কেউ গাধার সাথে সেখানে যাবে না। তা এর পরিণাম যতই খারাপ হোক না কেন।
পরের দিন যখন সিংহ এলো তখন সেই গাধা একাই তার সাথে দেখা করতে গেল। তার পিছনে কোন গাধার পাল ছিল না। তখন গাধাটি সিংহকে অনুরোধ করে বলল যে, তার ভয় এখন গাধার সমাজ থেকে শেষ হয়ে গেছে । তাকে এখন কেউ ভয় পায় না। তার কথাও কেউ শোনে না।
এই কথা শুনে সিংহরা সিদ্ধান্ত নিল, এই গাধা তো এখন আর কোন কাজে আসবে না। তাই তারা ওই গাধাটিকে সাথে নিয়ে গেল তাদের খাওয়ার জন্য। এইভাবে শেষ পর্যন্ত সেই গাধাটিরও শিকার হয়ে গেল।।
ঠিক এইরকমই প্রত্যেকটা সমাজে এমন গাধা অবশ্যই থাকে যে, নিজের লোভের কারণে, নিজের শক্তি বাড়ানোর জন্য, নিজের ক্ষমতার জন্য, নিজের সমাজকেই বিপদে ফেলে দেয়।
কাজী নজরুল সম্পর্কে যে ২০টি তথ্য আপনি না-ও জেনে থাকতে পারেন।
কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ছিল বিচিত্র আর বহুবর্ণিল। তাঁর সেই জীবনের কতটুকুই-বা আমরা জানি? আজ নজরুলজয়ন্তীতে নজরুল-গবেষকদের লেখা বিভিন্ন বই ও পত্রিকা ঘেঁটে এখানে বিদ্রোহী কবি-সম্পর্কিত এমন ২০টি তথ্য তুলে ধরা হলো, যেগুলো আপনি না-ও জেনে থাকতে পারেন!
১. নজরুলের জীবন কোনো নিয়মের জালে আটকা ছিল না। যখন যা ভালো লাগত, তিনি তা-ই করতেন। দিন নেই, রাত নেই হই হই রব তুলে উঠে পড়তেন কোনো বন্ধুর বাড়িতে। তারপর চলত অবিরাম আড্ডা আর গান!
২. নজরুলের লেখার জন্য কোনো বিশেষ পরিবেশ লাগত না। গাছতলায় বসে যেমন তিনি লিখতে পারতেন, তেমনি ঘরোয়া বৈঠকেও তাঁর ভেতর থেকে লেখা বের হয়ে আসত।
৩. নজরুল ইসলাম কোনো অনুষ্ঠানে গেলে ঝলমলে রঙিন পোশাক পরতেন। কেউ তাঁকে রঙিন পোশাক পরার কারণ জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, রঙিন পোশাক পরি অনেক মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত তথ্য দিয়েছেন, নজরুল তাঁর ঝলমলে পোশাকের ব্যাপারে বলতেন, ‘আমার সম্ভ্রান্ত হওয়ার দরকার নেই। আমার তো মানুষকে বিভ্রান্ত করবার কথা!’
৪. নজরুলের পাঠাভ্যাস ছিল বহুমুখী। তিনি পবিত্র কোরআন, গীতা, বাইবেল, বেদ, ত্রিপিটক, মহাভারত, রামায়ণ যেমন পড়তেন, তেমন পড়তেন শেলি, কিটস, কার্ল মার্ক্স, ম্যাক্সিম গোর্কিসহ বিশ্বখ্যাত লেখকদের লেখা। রবীন্দ্রনাথের ‘গীতবিতান’-এর সব কটি গান মুখস্থ করে ফেলেছিলেন তিনি!
৫. বাংলা গানে নজরুলই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি সব ধরনের বিষয় নিয়ে গান লিখেছেন। তাঁর গানের সংখ্যা অনেকে চার হাজার বললেও আসলে তিনি গান লিখেছিলেন প্রায় আট হাজারের মতো, যার অধিকাংশই সংরক্ষণ করা যায়নি।
৬. বাঙালি কবিদের মধ্যে নজরুলই ছিলেন সবচেয়ে বেশি রসিক। তাঁর কথায় হাসির ঢেউ উঠত। হিরণ্ময় ভট্টাচার্য ‘রসিক নজরুল’ নামে একটি বই লিখেছেন। যাঁরা বইটি পড়েননি, তাঁদের পক্ষে বোঝা কষ্টকর নজরুল কী পরিমাণ রসিক ছিলেন! একটা উদাহরণ দেওয়া যাক, একবার এক ভদ্রমহিলা নজরুলকে খুব স্মার্টলি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি কি পানাসক্ত?’ নজরুল বললেন, ‘না, বেশ্যাসক্ত!’ কবির কথায় ভদ্রমহিলার মুখ কালো হয়ে গেল। আর তক্ষুনি ব্যাখ্যা করলেন নজরুল, ‘পান একটু বেশি খাই। তাই বেশ্যাসক্ত, অর্থাৎ বেশি+আসক্ত = বেশ্যাসক্ত!’
৭. নজরুলের প্রেমে পড়েননি, এমন পুরুষ কিংবা নারী খুঁজে পাওয়া ভার। তাঁর চরম শত্রুরাও তাঁর ভালোবাসার শক্তির কাছে হার মেনেছেন। কবি বুদ্ধদেব বসু নজরুলকে প্রথম দেখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে। তিনি লিখেছেন, ‘সেই প্রথম আমি দেখলাম নজরুলকে। এবং অন্য অনেকের মতো যথারীতি তাঁর প্রেমে পড়ে গেলাম!’ শুধু বুদ্ধদেব বসু নন, তাঁর স্ত্রী প্রতিভা বসুও নজরুলের প্রেমে পড়েছিলেন। সেই কাহিনি নিয়ে তিনি লিখেছেন ‘আয়না’ নামে একটি গল্প। কী অবাক কাণ্ড! স্বামী-স্ত্রী দুজনেই একই লেখকের প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছেন!
৮. কাজী নজরুল ইসলাম প্রচুর পান ও চা খেতেন। লিখতে বসার আগে পর্যাপ্ত পরিমাণ চা আর এক থালা পান নিয়ে বসতেন তিনি। পান শেষ করে চা, এরপর আবার চা শেষ করে পান খেতেন। তিনি বলতেন, ‘লেখক যদি হতে চান/ লাখ পেয়ালা চা খান!’
৯. নজরুল ছিলেন সত্যিকারের হস্তরেখা বিশারদ। তিনি অনেকের হাত দেখে যা বলতেন, তা-ই ঘটতে দেখা গেছে। একবার এক লোককে বললেন, আপনার বিদেশযাত্রা আছে, লোকটি সত্যিই কয়েক দিনের মধ্যে বিদেশ চলে গেল! আরেকজনকে বললেন, ‘আপনি পৃথিবীর বাইরে চলে যেতে পারেন।’ পরে ওই লোকটির মৃত্যু ঘটেছিল!
১০. মাঝেমধ্যে রাগান্বিত হলে নজরুল তাঁর সামনে যদি কোনো বই-খাতা পেতেন বা কাগজ পেতেন, তা ছিঁড়ে কুচি কুচি করে ফেলতেন।
১১. অর্থের ব্যাপারে নজরুল ছিলেন ভয়াবহ বেহিসাবি। হাতে টাকা এলেই তা বন্ধুবান্ধব নিয়ে আমোদ-ফুর্তি করে শেষ করে দিতেন। আর বলতেন, ‘আমি আমার হাতের টাকা বন্ধুদের জন্য খরচ করছি। আর যখন ওদের টাকা হবে ওরাও আমার জন্য খরচ করবে, চিন্তার কোনো কারণ নেই।’
১২. নজরুল তাঁর দুই পুত্রের ডাকনাম সানি (কাজী সব্যসাচী) আর নিনি (কাজী অনিরুদ্ধ) রেখেছিলেন তাঁর দুই প্রিয় মানুষ সান ইয়াত-সেন ও লেনিনের নামানুসারে।
১৩. নজরুল তাঁর সন্তানদের খুবই ভালোবাসতেন। এমনকি তিনি তাঁদের নিজ হাতে খাওয়াতেন আর ছড়া কাটতেন, ‘সানি-নিনি দুই ভাই/ ব্যাঙ মারে ঠুই ঠাই।’ কিংবা ‘তোমার সানি যুদ্ধে যাবে মুখটি করে চাঁদপানা/ কোল-ন্যাওটা তোমার নিনি বোমার ভয়ে আধখানা।’
১৪. নজরুল ছিলেন সত্যিকারের জনদরদি মানুষ। একটি ঘটনা দিয়ে তার প্রমাণ দেওয়া যেতে পারে। দক্ষিণ কলকাতার এক দরিদ্র হিন্দু মেয়ের বিবাহ। কোনোরকমে কন্যা বিদায়ের আয়োজন চলছে। নজরুল খবরটি পেলেন। তিনি দ্রুত বাজারে গেলেন। এক হিন্দু বন্ধুকে নিয়ে বিয়ের বাজার করলেন। তারপর ধুমধাম করে মেয়েটির বিয়ে হলো। মেয়ের বাবা নজরুলকে প্রণাম করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘আমরা আপনাকে ভুলব না কোনো দিন।’ এমনই ছিলেন কবি। তাঁর বাড়িতে সাঁওতাল, গারো, কোল—সবাই দল বেঁধে আসতেন। আপ্যায়িত হতেন উৎসবসহকারে।
১৫. নজরুল কবিতা ও গানের স্বত্ব বিক্রি করে উন্নত মানের একটি ক্রাইসলার গাড়ি কিনতে পেরেছিলেন। এই গাড়ি ছিল সেই সময়ের সবচেয়ে বিলাসবহুল ও দামি।
১৬. নজরুল ট্রেনের প্রথম শ্রেণির কামরা ভাড়া করে মাঝেমধ্যে প্রমোদভ্রমণে যেতেন।
১৭. নজরুলের দৃষ্টিশক্তি ছিল অসামান্য। তিনি গভীর অন্ধকারেও বহুদূরের কোনো জিনিস স্পষ্ট দেখতে পেতেন।
১৮. নজরুল ছিলেন অসম্ভব রকমের ক্রীড়াপ্রেমী। সময় পেলেই তিনি ফুটবল খেলা দেখতে স্টেডিয়ামে ছুটতেন বন্ধুবান্ধব নিয়ে। যেদিন বাড়ি থেকে সোজা খেলা দেখতে যেতেন, সেদিন দুই পুত্র সানি আর নিনিকে সঙ্গে নিতেন। একবার খেলা দেখতে গেছেন। স্টেডিয়ামে পাশে বসে আছেন হুমায়ূন কবির। খেলা ভাঙার পর ভিড়ের মধ্যে দুই পুত্র খানিকটা আড়ালে চলে গেল। হঠাৎ পেছন থেকে নজরুলের হাঁকডাক শোনা গেল, ‘সানি কোথায়? নিনি কোথায়?’ মাঠসুদ্ধ লোক হাঁ হয়ে নজরুলকে দেখছে। এরই মধ্যে দুই পুত্রকে ঠেসে ধরে ট্যাক্সি করে বাড়ি নিয়ে এসে তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।
১৯. নজরুল বেশ দক্ষ দাবাড়ু ছিলেন। যেদিন বিশেষ কোনো কাজ থাকত না, সেদিন তিনি দাবা খেলতেন। খেলায় এমন মগ্ন হতেন যে খাওয়া-নাওয়ার খেয়ালও থাকত না। মাঝেমধ্যে নজরুলের বাড়িতে দাবার আসর বসাতে আসতেন কাজী মোহাতার হোসেন ও হেম সোম।
২০. কলকাতায় নজরুলের তিনতলা বাড়ির সামনে ছিল একটা ন্যাড়া মাঠ। খেলা নিয়ে বহু কাণ্ড ঘটেছে ওই মাঠে। একবার জোর ক্রিকেট খেলা চলছে। নজরুল গ্যালারি অর্থাৎ বারান্দায় দাঁড়িয়ে খেলারত তাঁর দুই পুত্রকে জোর উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে বড় পুত্র সানি এল ব্যাট করতে। প্রথম বলেই ছয়! নজরুলের সে কি দাপাদাপি! ঠিক পরের বল আসার আগে তিনি চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘সানি, ওই রকম আরেকটা মার।’ ব্যস বাবার কথায় উত্তেজিত হয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ব্যাট চালাল পুত্র। ব্যাট অবশ্য বলে লাগল না। লাগল উইকেটকিপারের চোয়ালে! বেশ রক্তারক্তি অবস্থা! অবশেষে খেলা বন্ধ করা হলো।
এমনই নানা রঙের মানুষ ছিলেন নজরুল। যাঁর জীবনে দুঃখ-কষ্টের অভাব ছিল না, আবার রং-রূপেরও অভাব ছিল না। পৃথিবীর খুব কম মানুষই বোধ হয় এমন মহাজীবনের অধিকারী হন। বুদ্ধদেব বসু যথার্থই বলেছিলেন, ‘কণ্ঠে তাঁর হাসি, কণ্ঠে তাঁর গান, প্রাণে তাঁর অফুরান আনন্দ—সব মিলিয়ে মনোলুণ্ঠনকারী এক মানুষ।’___ নজরুল অঞ্জলি
পৃথিবীতে এমন পাখি খুব কমই আছে, যারা জীবনের এতটা সময় আকাশেই কাটিয়ে দেয়।
এই ছোট্ট পাখিটি একবার উড়তে শুরু করলে টানা দশ মাস মাটিতে নামে না। খাওয়া, বিশ্রাম, ঘুম,,,, সবই হয় অসীম আকাশে ভেসে থাকতে থাকতে। যেন আকাশই তার আশ্রয়, আকাশই তার জীবন।
গ্রীষ্মে এরা পোল্যান্ড, স্কটল্যান্ড বা উত্তর আয়ারল্যান্ডে বাসা বাঁধে। আর প্রতি জুলাইয়ে হাজার হাজার সুইফট ইউরোপ ছেড়ে পাড়ি জমায় আফ্রিকার পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলে। সেখানে শীত পার করে আবার ফিরে আসে নিজের দেশে।
অন্য পাখিরা যেখানে দূরপাল্লার ভ্রমণ শেষে বিশ্রামের জন্য মাটিতে নামে, কমন সুইফট ঠিক উল্টো। গবেষণায় দেখা গেছে, তারা আকাশেই ঘুরে বেড়াতে পারে মাসের পর মাস।
এই পাখিরা পুরোপুরি মধ্যবাতাসে পোকামাকড় খেয়ে থাকে। তারা উড়ন্ত অবস্থায় পোকামাকড় এবং ছোট ছোট এ্যারিয়াল স্পাইডার খেয়ে বাঁচে আর আকাশে ভেসে থাকতেই তাদের বিশেষ বিশ্রাম নেওয়ার ক্ষমতা আছে।
প্রকৃতির এই বিস্ময়কর পাখিটি যেন মনে করিয়ে দেয়,,,,
স্বাধীনতা শুধু ডানা মেলে উড়ার নাম না, স্বাধীনতা হলো নিজের আকাশ খুঁজে নেওয়া
পিরালি ব্রাহ্মণ কী? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে পিরালি ব্রাহ্মণ বলা হয় কেন?
পিরালি ব্রাহ্মণ হলো বাংলার ব্রাহ্মণ সমাজের একটি "থাক" বা উপসম্প্রদায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-সহ ঠাকুর পরিবারের সদস্যবৃন্দ ছিলেন এই থাকভুক্ত ব্রাহ্মণ।ঐতিহাসিকভাবে "পিরালি" শব্দটি নেতিবাচক ও অপবাদমূলক অর্থে প্রয়োগ হয়ে আসছে।
নগেন্দ্রনাথ বসুর "বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস" গ্রন্থে ব্রাহ্মণ কাণ্ডের তৃতীয় ভাগে ব্যোমকেশ মুস্তফী "পিরালী ব্রাহ্মণ বিবরণ" প্রথম খণ্ডে কুলাচার্য নীলমণি ভট্টের কারিকা অবলম্বনে পিরালি থাকের উৎপত্তির বিবরণ দিয়েছেন।
সেখানে বলা হয়েছে: যশোর জেলার চেঙ্গুটিয়া পরগনার গুড়-বংশীয় জমিদার দক্ষিণারঞ্জন রায় চৌধুরীর চার পুত্র কামদেব, জয়দেব, রতিদেব ও শুকদেব। তন্মধ্যে কামদেব ও জয়দেব তৎকালীন স্থানীয় শাসক মামুদ তাহির ওরফে পির আলির প্রভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। শাস্তিস্বরূপ যাঁরা ধর্মান্তরিত হননি তাঁরা-সহ পুরো পরিবারকে সমাজচ্যুত করা হয়। ব্যোমকেশ মুস্তফীর অনুমান, পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি কোনো সময়ে এই ঘটনাটি ঘটে। রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষ পিঠাভোগের জমিদার জগন্নাথ কুশারী শুকদেবের কন্যাকে বিবাহ করেন। ফলে তিনি পিরালি থাকভুক্ত হয়ে যান। এভাবে রবীন্দ্রনাথও পিরালি থাকভুক্ত ব্রাহ্মণ হয়ে যান।
প্রসঙ্গত, প্রাচীন যশোর জেলার পিঠাভোগ গ্রামের (বর্তমান খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার) পিরালি ব্রাহ্মণ পুরুষোত্তম কুশারীর বংশধর, মহেশ্বর কুশারী এবং তাঁঁর ছেলে পঞ্চানন কলকাতায় চলে যান। মহেশ্বর কুশারীর অপর সন্তান প্রিয়নাথ কুশারী পিঠাভোগ গ্রামে থেকে যান। তাঁর বংশধরগণ এখনো পিঠাভোগ গ্রাম-সহ খুলনা বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করছেন।
পিরালি ব্রাহ্মণ হওয়ায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবারের সঙ্গে হিন্দুরা জাতচ্যুত হওয়ার ভয়ে পারিবারিক সম্পর্ক করত না। তাই ঠাকুর পরিবার যশোরের পিরালি পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক করতেন। এ কারণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং তাঁর জেষ্ঠভ্রাতা ভারতের প্রথম আইসিএস সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও যশোরের পিরালি ব্রাহ্মেণের মেয়ে বিয়ে করাতে হয়েছে। ১৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দে নদিয়ার এক জমিদারের ছেলে জানকীনাথ ঘোষাল দ্বারকানাথ ঠাকুরের পৌত্রী এবং দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চতুর্থ কন্যা স্বর্ণকুমারী দেবীকে বিয়ে করেন। পিরালি ব্রাহ্মণ বংশের মেয়ে বিয়ে করায় জানকীনাথকে পরিবারচ্যুত করা হয়েছিল। @ ড. মোহাম্মদ আমীন সূত্র: ১. নগেন্দ্রনাথ বসু, বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস। ২. প্রশান্তকুমার পাল, "রবিজীবনী" প্রথম খণ্ড,
হতাশ হওয়ার আগে এই ৩টি কথা মনে গেঁথে নিন:
১. জীবন কোনো রেস নয়, এটা একটা জার্নি, সবার জীবন একই ঘড়িতে চলে না।
কেউ ২২ বছর বয়সে গ্র্যাজুয়েট হয়েও ৫ বছর চাকরি পায় না। আবার কেউ ২৭ বছরে শুরু করে ৩০ বছরের মধ্যে সিইও (CEO) হয়ে যায়।
আপনার বন্ধুর সময় এখন চলছে, আপনার সময়ও আসবে। শুধু অপেক্ষাটা একটু দীর্ঘ হচ্ছে, কারণ আপনার গল্পটা অন্যদের চেয়ে আলাদা।
২. পকেটে টাকা না থাকাটা লজ্জার নয়, থেমে থাকাটা লজ্জার
বেকার থাকা কোনো অপরাধ নয়, কিন্তু বেকারত্ব নিয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকাটা অপরাধ।
শুরুটা ছোট হোক। টিউশনি, ছোট ব্যবসা বা নতুন কোনো স্কিল শেখা—যেকোনো কিছু করুন।
মনে রাখবেন, শূন্য পকেট আপনাকে যা শেখাবে, পৃথিবীর কোনো ইউনিভার্সিটি তা শেখাতে পারবে না।
৩. আপনি 'বাতিল' নন, আপনি 'তৈরি' হচ্ছেন
প্রকৃতির একটা নিয়ম আছে—যে ফলটা পাকতে সময় বেশি নেয়, সেটার স্বাদও বেশি হয়।
ঈশ্বর আপনাকে বড় কিছুর জন্য প্রস্তুত করছেন বলেই আপনার পরীক্ষাটা এত কঠিন। এই যন্ত্রণাই একদিন আপনার সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হবে।
শেষ কথা
বয়স বা শূন্য পকেট দিয়ে নিজেকে বিচার করবেন না। সূর্য ডোবার পর অন্ধকার তো নামেই, কিন্তু তারপরই আসে নতুন ভোর।
আপনার সেই 'ভোর' খুব কাছেই। হাল ছাড়বেন না।
নিজেকে বলুন—"আমার সময় আসছে। আমি হার মানতে আসিনি, আমি জিততে এসেছি।
সম্রাট আওরঙ্গজেব ও তার দুই বোন
মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব বিকেলে রাজ প্রাসাদ সংলগ্ন বাগানে বসে আছেন, সাথে তার প্রিয় ভৃত্য খোদাবক্স। তাদের দুইজনের মধ্যে কথা হচ্ছিল শাহজাদী জাহান আরাকে নিয়ে। জাহান আরা আওরঙ্গজেবের বড় বোন।
আওরঙ্গজেব আরাম কেদারায় হেলান দিয়ে খোদাবক্সকে জিজ্ঞেস করলেন, শাহজাদী জাহান আরাকে নিয়ে কী করা যায় বুঝতে পারছি না খোদাবক্স। উনি কী ঝামেলা করেন ঠিক নাই। তোমার কী মনে হয়?
খোদাবক্স মাথা নিচু করে বলল, জাহাঁপনা, আমার মনে হয় না উনি খারাপ কিছু করবেন। আমার কাছে থাকা শেষ খবর অনুযায়ী, উনি আগ্রার দুর্গে আপনার পিতা, মহান সম্রাট শাহজাহানের সাথে দাবা খেলছিলেন।
এই সময়ে কয়েকজন দাস দাসী সমেত সেখানে আগমন করলেন আওরঙ্গজেবের আরেক বোন রওশন আরা। বোনকে দেখে আওরঙ্গজেব খুশি হলেন। এই বোন যুদ্ধে তার পক্ষে ছিলেন। গয়নাগাটি, অর্থ সম্পদ দিয়ে সাহায্য করেছেন।
প্রাথমিক কুশলের পরে, রওশন আরা মূল কথায় গেলেন, বললেন, জাহাঁপনা, আমাদের বড় বোন জাহান আরা তো এখন আগ্রার প্রাসাদে অবস্থান করছেন। বাকী জীবন ওইখানেই তার থাকতে হবে আপনি জানেন। তার নিজস্ব প্রাসাদটি খালি পড়ে আছে। এটি আমি আমার জন্য চাই আপনার কাছে।
মুঘল বাদশাহর ছেলেদের জন্য আলাদা প্রাসাদ থাকলেও, মেয়েরা থাকতেন রাজ প্রাসাদেই। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন জাহান আরা। তার ছিল নিজস্ব প্রাসাদ। এতোটাই রাজনৈতিক প্রভাব ছিল তার।
বোনের এই প্রস্তাবে কয়েক মুহুর্তের জন্য আওরঙ্গজেবের ভ্রু কুঁচকে গেল, খোদাবক্সের দৃষ্টি এড়াল না। পরক্ষণেই হাসি ফুটে উঠল আওরঙ্গজেবের মুখে। তিনি বললেন, উত্তম প্রস্তাব বোন রওশন আরা। আমি কীভাবে তোমাকে না করতে পারি, ভাই দারা শিকোহর সাথে যুদ্ধে তুমি আমার পক্ষে ছিলে আমাদের মহান পিতার বিরুদ্ধে গিয়েও, এই ঋণ আমি শোধ করতে পারব না। কিন্তু বোন, তোমার মত বিদুষী, রুচিশীল ও জ্ঞানী নারী এই সাম্রাজ্যে দ্বিতীয়টি মিলবে না। তাই আমি চাই, তুমি রাজ প্রাসাদে থাকো, এবং আমার পুত্র কন্যাদের শিক্ষা দাও, যাতে তারা বিজ্ঞ হয়ে উঠতে পারে। আমি ব্যস্ত থাকব রাজকাজে, অভিভাবক হিশেবে তাদের পাশে তোমার থাকা দরকার। শেষকথা, রওশন আরা চলে যান। এরপরে আওরঙ্গজেব খোদাবক্সকে জিজ্ঞেস করেন, বলো তো হে খোদাবক্স, কেন আমি রওশন আরাকে ওই প্রাসাদ দিলাম না?
খোদাবক্স মাথা চুলকে বললো, আপনার সন্তানদের সুশিক্ষিত হিশেবে গড়ে তোলার জন্য।
আওরঙ্গজেব হাসলেন, বললেন, না। যে নারী পিতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে পারে, সে ভাইয়ের বিরুদ্ধেও ষড়যন্ত্র করতেই পারে। তারে দূরে রাখা নিরাপদ হবে না, খোদাবক্স।
এ দেশের বর্তমানের তিনটি সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করছে-
১. মানুষজনের জন্য কোন কাজ নেই।
২. কাজের জন্য কোন মানুষ নেই।
৩. আর যাদের কাজ আছে তাদের কাজের যোগ্যতাই নেই।
লাইফ স্ট্যাইলের কিছু টিপস:
### :: লিফটে ওঠার সময় পাশের ব্যক্তিকে হাসিমুখে চোখ ও হাতের ইশারায় আগে ওঠার আহ্বান জানান। নামার সময়ও একই কাজ করুন।
### :: কোথাও হাঁটছেন। এমন কোনো জায়গা পেলেন যেখানে একসাথে একজন পার হওয়া যায়, সেখানেও একই কাজ করুন। দুই সেকেন্ড দাঁড়িয়ে বিপরীতের মানুষটাকে আগে পার হতে আহ্বান করুন।
### :: কেউ কোনো ন্যায়সঙ্গত, লজিক্যাল আচরণ করলে তাকে ধন্যবাদ দিন। হোক সে রিকশাওয়ালা, দোকানদার। আমি ভাড়া দিয়ে বা কিছু কেনাকাটা করে সবসময় ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় নিই।
### :: বাসে বা কোনো যানবাহনে ভ্রমণের সময় চেষ্টা করুন ফোনে কথা না বলতে। যদি বলতেই হয় খুব আস্তে আস্তে বলুন৷ জরুরি না হলে বলুন, আমি এখন গাড়িতে। নেমে কথা বলি।
### :: আউটডোরে কারো সাথে তর্কে জড়ালেন। সে গালাগালি করছে। আপনি করবেন না। শুধু আশপাশের মানুষকে ও তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলবেন, "এইসব গালি কিন্তু আমিও জানি। কিন্তু আমার মা একজন ভদ্রমহিলা। এসব গালি ব্যবহার করতে শেখায়নি আমাকে।"
আর আপনি আমি যেহেতু ফেরেশতা না, তাই সে লিমিট ছাড়িয়ে গেলে যা খুশি করতে পারেন। নো অবজেকশন। মানুষকে শিক্ষা দেওয়ারও দরকার আছে।
### :: বাইরে থেকে বাসায় এসে পোশাক চেঞ্জ করার সময় উলটো করে খুলবেন না। সোজা করে খুলবেন। বা উলটো করে খুললেও সোজা করে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখবেন শুকাতে দেওয়ার মতো করে। কিছুদিন অভ্যাস করলেই অভ্যাস হয়ে যাবে।
### :: বারান্দায় জায়গা থাকলে অন্তত একটা গাছ হলেও রাখবেন। সেই গাছকে পরিষ্কার রাখবেন৷ পানি দিবেন। গোড়ার মাটি মাঝে মাঝে ঝুরঝুরে করে দিবেন। গাছকে মমতা দিয়ে স্পর্শ করবেন। বৃক্ষপ্রেম বাড়বে।
### :: ফুটপাতে হাঁটার সময় বাম সাইড দিয়ে হাঁটবেন। ডানপাশে বা মাঝখান দিয়ে না। অর্ধেক জায়গা রাখুন অন্যদের বের হয়ে যাওয়ার জন্য।
(ফুটপাতে বিশৃঙ্খলভাবে অন্যকে সমস্যা করে হাঁটলে আমার মাথায় রক্ত উঠে যায়। ইচ্ছা করে পেছন থেকে লাথি মেরে ফেলে দিই। কিন্তু এই ইচ্ছা মনেই থাকে। স্পষ্ট করে বলি, "একটু স্বাভাবিক ভাবে হাঁটেন। অন্যকে যাওয়ার জায়গা দেন।!)
### :: রান্না করার আগে সব কাজ গুছিয়ে নিন। রান্নাঘরের মেঝে প্রয়োজনে মিনিটে মিনিটে মুছুন৷ পায়ের নিচে ন্যাকড়া রেখে পা দিয়েই মুছুন। ব্যবহৃত বাসন সাথে সাথেই ধুয়ে ফেলুন। আর চুলা ও আশপাশ রান্নাচলাকালীনই মুছে রাখুন।
### :: রাস্তাঘাটে চলার সময় ভদ্র কেউ আপনার দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে মুচকি হাসুন। চলে যান। কথা বলার পরিবেশ হলে কথা বলুন যদি সে আগে কথা বলে। এতে করে নতুন মানুষের সাথে পরিচয় হয়। লাইফে একজন পরিচিত মানুষ বাড়ে৷ অনেক কিছু শেখাও যায়। অনেক অভিজ্ঞতাও বিল্ড হয়।
:### : বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি বা বাইক চালালে সাবধানে চালান। চাকা থেকে যেন অন্যের গায়ে কাদাপানি না লাগে খেয়াল রাখুন। অযথা হর্ন বাজাবেন না। মানুষ ইদানীং বেয়াদবের মতো হর্ন বাজায়। বাইক ফুটপাতে উঠাবেন না। আপনি বাইকের পেছনে থাকলে নিষেধ করুন। বাইক থেকে নামার সময় দেখুন আশপাশে কেউ আছে কিনা। নামার সময় যেন আপনার পা তার গায়ে না লাগে। বাইকে ওঠার আগে জিজ্ঞেস করুন, "আমি কি উঠবো?"
### :: শাপলা বা পদ্মবিলে গিয়ে ছবি তোলার জন্য বা শখের জন্য ফুল তুলবেন না।
এটা ইদানীং মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। যা বেয়াদবি পর্যায় লাগে। কাশবনে ঘুরতে গিয়েও বেহুদা হাতে কাশফুল নিয়ে ঘুরবেন না।
### :: কাউকে উপহার দিতে হলে ফুল অ্যাভয়েড করুন। সেই টাকায় বই বা অন্যকিছু কিনুন। ফুল একবেলা পরেই ডাস্টবিনে চলে যায়। টাকা খরচ করলে কাজেই খরচ করুন।
### :: সবাই মিলে একসাথে খেতে গেলে বিল ভাগাভাগি করুন। বা একদিন আপনি দিন। আরেকদিন সে দিবে এমন ডীল করে নিন।
### :: বাইরে বের হওয়ার আগে জুতা মোছার অভ্যাস করুন। জুতা মুছতে বা পরিষ্কার করতে ৩-৪ মিনিট লাগে।
### :: পকেটে কিছু এলাচ লবঙ্গ রাখুন। মাঝে মাঝে একটা করে মুখে দিন। এলাচের একটা বিচি মুখে দিন। পুরোটা না।
কারো সাথে কথা বলার সময় কাজে দেবে।
### :: পোশাক নির্বাচনে সচেতন হোন। বয়স অনুযায়ী রুচিশীল পোশাক পরুন। বুঝতে না পারলে পছন্দের কাউকে জিজ্ঞেস করুন কী ধরনের পোশাক পরবেন বা যা কিনেছেন বা পরেন তা ঠিক আছে কিনা।
### :: গায়ে ব্যাড স্মেল না হলেও পারফিউম, বডিস্প্রে ইউজ করুন।
### :: মোজা গন্ধ না হলেও একবার পরেই ধুয়ে ফেলুন। ২০-৩০ টাকার মোজা ইউজ না করাই ভালো। মোজা এক রঙের কিনুন। কালো রঙ বেস্ট।
আপনি হয়তো মেনে চলেন বা কিছু কিছু মেনে চলেন না।
ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোর স্বাধিকার ও দাতাগোষ্ঠী
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে বিশ্বমোড়ল গ্রেট ব্রিটেন। লন্ডন ছিল টাকার বাজার। বলা হতো বৃটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য কখনও ডোবে না। শুরু হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী তখন উইন্সটন চার্চিল। চার্চিল ছিলেন ঝানু রাজনীতিবিদ। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তিনি প্রমাণ রাখলেন তিনি শুধু রাজনীতিবিদই নন একজন সফল কূটনীতিবিদও বটে।
হিটলারের আগ্রাসনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তি কেঁপে উঠেছে। হিটলার রেডিওতে ঘোষণা দিয়েছে লন্ডন শহরকে আমি জলে ডুবে মারবো।
ব্রিটেনের সামনে তখন রাস্তা ছিল একটাই। যুদ্ধে যদি নতুন মহাশক্তি আমেরিকা তাঁদের পাশে দাঁড়ায়।
প্রধানমন্ত্রী উইন্সটন চার্চিল যোগাযোগ করলেন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ফ্রাংকলিন রুজভেল্ট এর সাথে। রুজভেল্ট ছিলেন ঠিক এই সুযোগের অপেক্ষায়।
প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট মিলিত হলেন চার্চিলের সাথে আটলান্টিক মহাসাগরে। তারা দুজন ভাসছিলেন ব্রিটেনের রণতরী ‘প্রিন্সেস অফ ওয়েলস’ এ।
তিনদিন আলোচনা করলেন তারা। রুজভেল্ট চার্চিলকে জানালেন তার প্রস্তাব। আমেরিকা তার সর্বোচ্চটা দিয়ে ব্রিটেনকে বাঁচাবে। শর্ত একটাই, যুদ্ধ শেষ হলে সারা পৃথিবীতে ব্রিটেনের অধীনে যত ভূখণ্ড আছে, সেখানে স্বাধিকার দিতে হবে। মানে হল, ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোর মানুষ স্বাধিকার পাবে। তাঁরা নিজেরা চাইলে ব্রিটেনের অধীনে থাকবে, না চাইলে স্বাধীন হয়ে যাবে।
চার্চিল কিন্তু নিরুপায়। যদিও ইচ্ছা করলে তিনি এই প্রস্তাব নাও মানতে পারেন। জাহাজের উপর দাঁড়িয়ে তিনি চারদিক তাকালেন। তারপর গভীর ভাবনায় ডুবে গেলেন। তার মনে হল, হিটলার আসছেন লন্ডনের দিকে। রুজভেল্টের কথা না শুনলে তাঁর গোটা সাম্রাজ্যই চলে যাবে জার্মানির হাতে।
অন্যদিকে, রুজভেল্টের কথা শুনলে যুদ্ধ শেষে স্বাধীন হয়ে যাবে ব্রিটিশ উপনিবেশ একে একে। ব্রিটেনের মুকুট থেকে ধীরে ধীরে খসে পড়বে একটি একটি পালক। চার্চিল আবার ভাবলেন, এই প্রস্তাব মানলে ব্রিটেনের মানুষ আমাকে ছাড়বে না। কিন্তু যুদ্ধটা ব্রিটেন জিতে যাবে।
চার্চিল আবার ভাবলেন, আমি আর প্রধানমন্ত্রী হতে পারব না। আর হয়েছেও তাই। পরের নির্বাচনে তিনি হেরেছিলেন।
আটলান্টিকের বুকে দাঁড়িয়ে সেদিন চার্চিলকে মানতে হল রুজভেল্টের কথা। স্বাক্ষর হল চুক্তি, আটলান্টিক চার্টার - That Treaty is known as The Lend Lease Agreement of 1941 - USA and UK;. এটা ছিল জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ। নিশ্চিত হয়ে গেল, যুদ্ধ শেষে ব্রিটেন একে একে হারাবে তাঁদের সকল উপনিবেশ।
শুরু হল আলোচনা ১৯৪৪ সালে। এবার আমেরিকার মাটিতে। নিউ হ্যাম্পসায়ারের ব্রেটন উডসে। মাউন্ট ওয়াশিংটন হোটেলে। ততদিনে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার রূপরেখা অনেকটাই হয়ে গেছে।
টানা বাইশ দিন আলাপ চলল ব্রেটন উডসে। জন্ম হল তিনটি প্রতিষ্ঠানের, বিশ্ব ব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা। পৃথিবী পেল এক নতুন মহাজনী কারবার।
চুক্তি অনুযায়ী যুদ্ধ শেষেই পৃথিবীজুড়ে স্বাধীন হতে থাকল ব্রিটিশ উপনিবেশগুলো। এই নতুন দেশগুলো ভীষণ গরীব। আবার ইউরোপও বিধ্বস্ত। এই দেশগুলোকে বাঁচাতে আমেরিকার নেতৃত্বে এগিয়ে আসলো আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক।
আইএমএফ আর বিশ্বব্যাংক শুধু ঋণই দেয় না। ঋণের সাথে-সাথে দেয় একটা উন্নয়ণ পরিকল্পনাও। তার প্রতি ছত্রে লেখা দাতাগোষ্ঠীর অলঙ্ঘনীয় পরামর্শ।
এইঅলঙ্ঘনীয় পরামর্শ সকল দেশের জন্য প্রায় একই রকম। তাদের মূল কথা - ‘সরকার হচ্ছে দেশের জন্য বোঝা, তাই সরকারের হাত যতটা পারো ছেঁটে দাও। সবকিছু প্রাইভেট করে দাও। সব উন্মুক্ত করে দাও।’
কিন্তু চাইলেই তো আর প্রাইভেট কোম্পানি পাওয়া যায় না। দেশ হতদরিদ্র। অত প্রাইভেট কোম্পানি কই। দেশে বড় প্রাইভেট কোম্পানি নেই, তো কী হয়েছে? ধনী দেশগুলোতে তো আছে! মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি। তাঁরা যাবে। খালি হাতে যাবে না, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার নিয়ে যাবে।
এই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার কোথায় থেকে আসবে? যদি আমেরিকান ডলার খুঁটিয়ে দেখি, তাহলে দেখবে লেখা আছে, THIS NOTE IS LEGAL TENDER FOR ALL DEBTS, PUBLIC OR PRIVATE. নীচে কোন সিগনেচার নেই।
আমাদের টাকায় কী লেখা আছে?
সবাই দেখেছে।চাহিবা মাত্র বাহককে দিতে বাধ্য থাকিবে ইত্যাদি। নীচে বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক গভর্নরের সই আছে।
তফাৎটা কী?
তফাৎটা হল, কেউ (অর্থাৎ কোন অন্য দেশ) যদি বাংলাদেশী টাকা পছন্দ না করে, তাহলে সে ঐ টাকার বিনিময়ে সমান ভ্যালুর সোনা দাবী করতে পারে। বাংলাদেশী টাকা ছাপাতে সোনার মূল্যমাণ করে রাখা আছে আন্তর্জাতিক বিনিময়ের জন্য।
আর আমেরিকা?
সেই দেশ সত্তর বছর আগেই ডলারের সাথে সোনার সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়েছে। তারা সম্পর্ক করেছে পেট্রোলের সঙ্গে।
তারা আরবকে বুঝিয়েছে, অন্য কোন দেশ যদি পেট্রোল কিনতে আসে তাহলে একমাত্র ডলারে পেমেন্ট নিতে হবে।
এখন বাংলাদেশ যদি আরবে তেল কিনতে যায়, তাহলে আগে তাকে আমেরিকার কাছে গিয়ে ডলার আনতে হবে। আমেরিকা কী করবে? সে, কিছু সাদা কাগজ নিয়ে সেটাতে ডলার প্রিন্ট করে বাংলাদেশকে ধরিয়ে দিয়ে বলবে, যা বেটা, তেল কিনে আন।
সৌদি এটা মানছে কেন?
তার কারণ, সেই দেশের রাজা, রাজার গুষ্টি, তাদের সিকিউরিটি, পরিকাঠামো, উন্নয়ণ, সবকিছুর ঠিকা নিয়েছে আম্রিকা, আরবদেশ তার ঋণ এইভাবে শোধ করছে।
মানে বোঝা গেল? যদি কেউ ডলারে আস্থা না রেখে ফেরত দিতে চাইল, বিনিময়ে সোনা চাইল।
পাবেনা। আমেরিকা তখন বলবে, আমি কি সেটা প্রমিস করেছি? ডলার হচ্ছে একটা ঋণপত্র, এর বিনিময়ে তোমাকে পেট্রলই নিতে হবে।
১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিক্সন সৌদি আরবকে তাদের সব পেট্রোলিয়াম পণ্য, অর্থাৎ শোধিত তেল, খনিজ তেল ও গ্যাস একমাত্র মার্কিন ডলারে বিক্রি করার প্রস্তাব দেন। সেদিনের পর থেকে পেট্রো ডলারের যাত্রা শুরু করে।
সেই বিলিয়ন ডলার দিয়ে অনেক বড় বড় অফিস হবে। ব্যবসা আসবে। লক্ষ লক্ষ লোকের চাকুরি হবে। তাঁদের অনেক ভাল বেতন হবে। ভাল বেতন হলে সঞ্চয় বেশি হবে। সরকারের ট্যাক্স বেশি আদায় হবে। সরকারও ধনী হবে। দেশের উন্নয়ন হবে এবং হতেই থাকবে।
তবে এই মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি ডলার ঢালবে, তাদের দিকটাও কিন্তু দেখতে হবে। এরা যেন উপকার করতে গিয়ে কোন সমস্যায় না পড়ে।
আর এইজন্য তোমাদের দেশের আইন-কানুন একটু রদবদল করতে হবে। দেশের বাজেট ওদের শর্ত মোতাবেক প্রণয়ন করতে হবে।
এইসব মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি যদি ভুল করেও কোন ভুল করে ফেলে, তাদের বিচার কিন্তু করবে দাতাগোষ্ঠী। এই শর্ত মেনেই এগুতে হবে।
এরপর স্বচ্ছতার জন্য পরামর্শক নিয়োগ হবে। তারা পরামর্শ দিবে, দেখবে সবকিছু ঠিক আছে কিনা। অনেক বড় বড় পণ্ডিত তারা।
এই পরামর্শদাতাদের বেতন-বোনাস একটু বেশিই হবে।
বড় বড় পণ্ডিতরা সব পরামর্শ দেবে। যে যেই কাজ সবচেয়ে ভাল করতে পারে, শুধু সেই সেই কাজটা করতে পারবে। যেমন, গমের দাম যদি বেশি হয় আর অন্য দেশে কম। তারমানে অন্যরা তোমাদের থেকে গম উৎপাদনে ভাল। তাই তোমরা আর গম জন্মাবে না। কম দামে গম কিনবে ওদের থেকে। বাস্তব উদাহরণ হচ্ছে আমাদের পাটশিল্প, আই এম এফ আর বিশ্বব্যাংকের বিশেষ পরামর্শে ধ্বংস হয়েছে।
এভাবে একের পর এক শর্তে এক একটা গরীব দেশকে বেঁধে ফেলে এই দাতাসংস্থা। তাদের এইসব চাতুরী বেশিরভাগ দেশ বোঝে না প্রথমে। যখন বুঝতে পারে, তখন আম-ছালা দুইই গেছে বিদেশী কোম্পানির হাতে। ততদিনে ছোট ছোট শিল্প ধ্বংস হয়ে গেছে। বাজার ভরে গেছে বড় বড় কোম্পানির বিদেশী পণ্যে। ঋণ তো শোধ হয়ইনি, উল্টো বেড়েছে।
গত ৯ জুন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলা সৌদি আরবের দীর্ঘ ৫০ বছরের পেট্রোডলার চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। ওয়াশিংটন নতুন করে এ চুক্তি নবায়ন করতে চাইলেও সেই চুক্তি নতুন করে চালু করতে আগ্রহী নয় সৌদি।
এ চুক্তির অবসানের ফলে সৌদি আরব এখন নিজেই অপরিশোধিত তেল বিক্রি করতে পারবে। অর্থাৎ মার্কিন ডলারের বদলে চীনা আরএমবি, ইউরো, ইয়েন, এবং ইউয়ানসহ বিভিন্ন মুদ্রায় তেল বিক্রি করবে পারবে সৌদি আরব।
সঙ্গত কারণে পেট্রো ডলার বাঁচাতে যুক্তরাষ্ট্রেকে নতুন পরিকল্পনা নিতে হচ্ছে। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অপরিশোধিত তেলের মজুদ রয়েছে ভেনেজুয়েলায়। ভেনেজুয়েলার সেই তেল চায় যুক্তরাষ্ট্র।
প্রশ্ন হল যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা কি এবার কাজ করবে? ©রাজিক হাসান